৫২. খুব নরম খুব সবুজ ঘাস

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

৫২

রেমি খুব নরম খুব সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটছে এখন। পাঁ ডুবে যাচ্ছে কোমল সব স্পর্শের মধ্যে। শিউরে উঠছে গা। চারদিকে কী গভীর সবুজ সব টিলা। মাঝখানে একটা স্বপ্নের মতো অবিশ্বাস্য সুন্দর উপত্যকা। এত সুন্দর যে বিশ্বাস হয় না, ভয় করে। এরকম জায়গায় তো কখনো আসেনি আগে রেমি। কে নিয়ে এল তাকে!

পাশে পাশে একজন পুরুষ হাঁটছে। খুব কাছে। খুব গা ঘেঁষে। টের পাচ্ছে রেমি, কিন্তু তার মুখের দিকে সে তাকায় না। যেন জানে কে। কিংবা যেন জানতে নেই কে। কেউ একটা হবে। তবে পুরুষটির গায়ে কোনো গন্ধ নেই। তার কোনো ছায়া নেই। রেমি তবু নিশ্চিন্ত। এরকমই যেন হওয়ার কথা।

এত সুন্দর জায়গা তবু তারও কি একটু দোষ থাকতেই হবে? না থাকলে হত না? উপত্যকার ঢাল বেয়ে, নরম ঘাস মাড়িয়ে যেখানে এসে পৌঁছোলো রেমি, সেখানে একটা ছোটো নদী। আঁকা বাঁকা। কিন্তু তাতে একটা রক্তিম স্রোত বয়ে যাচ্ছে। একটা ঝোপের ধারে পড়ে আছে একটি ভ্রূণ-প্রতিম শিশুর নিথর দেহ।

রেমি থেমে সামান্য ভয়ের একটা শব্দ করল। অমনি একটা পুরুষ হাত এসে চেপে ধরল তার মুখ। সেই হাতে সিগারেটের তীব্র গন্ধ। না, সিগারেট নয়। অ্যালকোহল? না, অন্য কিছু।

রেমি লোকটার মুখের দিকে তাকাল না। নদীর দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। উল্টো দিকে হাঁটতে লাগল। পাশাপাশি গা ঘেঁষে পুরুষটিও।

রেমি বলল, ট্রেন আসতে এত দেরী করছে কেন?

পুরুষের গলাটা গমগম করে বলে উঠল, আজ দেরী হবে।

কোথা দিয়ে ট্রেন আসবে তা জানে না রেমি। এখানে তো কোনো রেল লাইন নেই, স্টেশন নেই! তবু বলল।

না, আছে। ভাবতে না ভাবতেই সে দেখল, একটা ছোট্ট প্ল্যাটফর্ম। লাল মোরমে ছাওয়া। অনেক কৃষ্ণচূড়া ফুল গাছ থেকে লাল মোরমে ঝরে পড়ে আছে। একটা সবুজ টিউবওয়েল। কোনো মানুষ নেই। যাত্রী নেই। পয়েন্টসম্যান বা কুলি নেই। স্টেশনের রঙিন ঘর থেকে অবিরল টরেটক্কার শব্দ আসছে।

খুব নির্বিকার মনে রেমি ধীরে ধীরে পুরুষটির পাশাপাশি পায়চারী করতে লাগল মোরমের ওপরে। এমা, সে জুতো বা চটি পরে আসেনি আজ! খালি পায়ের নিচে মোরমের দানা কিরকির করছে। সুড়সুড়ি দেয়।

সে সরাসরি তাকায় না। কিন্তু পাশ-চোখে লক্ষ করে, তার সঙ্গী পুরুষটি আকাশের দিকে চেয়ে আছে। চেয়ে থাকারই কথা যেন। রেমি নিজেও আকাশের দিকে তাকায়। সেখানে রক্তমেঘ। সমস্ত দিগন্ত জুড়ে ছড়িয়ে আছে ভয়াবহ লাল। এত লাল রং কোথাও জড়ো হতে আর দেখেনি রেমি।

প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে লোহার বেড়ার ধারে রেমি একটু দাঁড়ায়। দেখতে পায়, একটা শেয়াল সেই শিশুদেহটি মুখে করে একটা জলা থেকে উঠে আসছে। রেমিকে দেখে শেয়ালটা থমকে দাঁড়ায়। চোখে চোখ রাখে। তারপর অপরাধীর মতো চোখ নামিয়ে নিয়ে হেঁটে চলে যেতে থাকে।

রেমি এবার আর চেঁচায় না। চেঁচাননা বারণ।

রেমি বিষণ্ণ গলায় বলল, নিয়ে গেল।

গমগমে পুরুষ-কণ্ঠ বলে, ঢিল মারছি, দাঁড়াও,।

আতঙ্কে রেমি বলে, না থাক। শেয়ালটা পাগল।

তাতে ভয় কি? আমরা বেড়ার মধ্যে আছি।

তবু থাক। আমরা তো চলেই যাবো।

যাবো কী করে? টিকিট হয়নি যে।

কেন?

টিকিটবাবু নেই।

তাহলে কী হবে?

দেখি, যদি টিকিটবাবু আসে। নইলে এখানেই রাত কাটাবো আমরা।

লোকে নিন্দে করবে না?

এখানে লোক নেই। শুধু শেয়ালেরা থাকে।

শুধু শেয়াল! মা গো!

আর কিছু বলল না রেমি। দাঁড়িয়ে রইল। সামনে লাল আকাশ।

বাইরে দেয়ালে পিঠ রেখে দুজনে তখনো দাঁড়িয়ে।

ধুব আর জয়ন্ত।

জয়ন্ত বলছিল, আমি দিদির সম্পর্কে সব খোঁজ খবর রাখি জামাইবাবু।

কী খবর বলো তো?

দিদিকে আপনি নষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন।

তাই নাকি?

সব জানি। নইলে রাজার সঙ্গে ওকে নিয়ে কথাটা উঠত না।

তোমার দিদিকে তোমার চেয়ে আমি একটু বেশী চিনি।

চেনারই কথা। কিন্তু আপনি সত্যিই তো আর দিদিকে চেনার চেষ্টা করেননি। আমার দিদি একটু সরল, হয়তো বোকাও। আপনাকে ঠিক মতো বুঝতে পারেনি। ও কী করে বুঝবে যে, ইউ হ্যাভ ইভিল ডিজাইনস! তাই কাজটা আপনার কাছে সহজ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যদি দিদি তখন একবাবও আমাকে জানাত, তাহলে—

তাহলে কী?

তাহলে আপনি আজ এত সুস্থ স্বাভাবিক থাকতেন না। দিদিকেও মরতে হ’ত না।

জয়ন্ত, আজ অনেক কথা হয়েছে। থাক।

আপনার সঙ্গে আমাদের এমনিতেও সম্পর্ক বিশেষ ছিল না। দিদি যদি মরে যায় তাহলে একেবারেই থাকবে না। আমি তো আপনার পরোয়া করি না।

এসব শুনে ধ্রুবর কোনো প্রতিক্রিয়া হচ্ছিল না। রাগ, দুঃখ, অনুতাপ কিছুই নয়। কিন্তু তার খুব অদ্ভুত একটা কথা মনে হচ্ছিল। রেমি যদি মরে যায় তবে নীচের ঘরে একা থাকতে তার কি ভূতের ভয় করবে? এমন নয় যে, ধ্রুবর ভূতের ভয় আছে। কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, এবার ভূতের ভয় হতেও পারে। রেমি মৃত্যুর পর বোধহয় মাঝে মাঝে এসে হানা দেবে স্বপ্নে। গলা টিপে ধরতে চাইবে কি?

ধ্রুব নড়তে পারছিল না আর একটা কারণেও। তার পিঠের দিকে মেরুদণ্ডের নীচে দুপাশে একটা তীব্র ব্যথা টের পাচ্ছিল সে। নড়তে গেলেই সেই ব্যথা বর্শার ফলার মতো মাজা ভেদ করতে চায়। সেই সঙ্গে তলপেটটা বড্ড ভারী লাগছে।

ধ্রুব অস্ফুট একটা যন্ত্রণার শব্দ করল। জয়ন্ত একবার ফিরে দেখল তাকে। কিছু বললেন?

না। আমার কোমরে একটা ব্যথা হচ্ছে।

হচ্ছে? বলে জয়ন্ত একটু হাসে।

হাসছো কেন? এটা কি মজার কথা?

না, আপনার যে যন্ত্রণা-টন্ত্রণা একটু-আধটু হচ্ছে এটা জেনে নিশ্চিন্ত হলাম। আপনার কিছু হোক, খুব খারাপ কিছু এটা আমি আন্তরিকভাবে চাই।

ধ্রুব মুখটা একটু বিকৃত করল। না, তার রাগ হচ্ছে না। খুব শীত করছে তার।

জগাদা বেরিয়ে এসে চারদিকে চেয়ে হঠাৎ তাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসে।

এখানে দাঁড়িয়ে কী করছো?

কী করব আর? দাঁড়িয়ে আছি।

ওটা কে? বউদিমণির ভাই না?

জয়ন্ত বলল, হ্যাঁ। কেন, আমি থাকলে অসুবিধে আছে কিছু?

জগা স্থির চোখে জয়ন্তকে একটু মেপে নিয়ে বলে, অসুবিধে আমাদের কেন হবে? বলছিলাম, দাঁড়িয়ে না থেকে ভিতরে গিয়ে বসতেও পারেন।

না, বেশ আছি। দিদি মরলে বাড়ি চলে যাবো।

বাঃ, ভাইয়ের উপযুক্ত কথা বটে।

হ্যাঁ। আগে কখনো শোনেননি তো এরকম কথা! এবার শুনে নিন।

শুনছি ভাই। আমি হলাম জগা। সবাই চেনে। সম্পর্কটা এরকম না হলে ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে যেত।

আপনি যে জগা তা জানি। একজন পলিটিক্যাল উন্মাদের ভাড়া করা গুণ্ডা। কিন্তু তা বলে অত রুস্তমী দেখাচ্ছেন কেন? আমি আপনাদের মতো লোককে কেয়ার করি না।

জগা স্থির নেত্রে কিছুক্ষণ জয়ন্তকে লক্ষ করে। তার হাত পা কঠিন হয়ে ওঠে। তবে নিজেকে সে খুব সামলে রাখে।

ধ্রুবর দিকে চেয়ে জগা বলে, তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?

একটা ব্যথা হচ্ছে।

চলো, ভিতরে গিয়ে বসবে।

না জগাদা। ঠিক আছি।

ব্যথাটা খুব বেশী হচ্ছে বুঝতে পারছি। তুমি তো সহজে কাতরাও না।

খুব নয়। সহ্য করতে পারব। ওদিককার কোনো খবর আছে?

না। কেউ কিছু বলছে না। কর্তাবাবু খুব কাঁদছেন। ওই যে হোমিও ডাকতার এসে গেছে। যাই।

একটা নীল গাড়ি এসে থেমেছে। একজন বুড়ো মানুষ লাঠিতে ভর করে নামছিলেন।

ধ্রুব এক পলক দেখেই বিরক্তিতে চোখ সরিয়ে নিল। রেমি মৃত্যুর দিকে কতটা এগিয়ে গেছে তা জানে না ধ্রুব। তবে এটা জানে, এখন ছোটো ছোটো মিষ্টি ও সুস্বাদু হোমিওপ্যাথির বড়ি দিয়ে লড়াইটা চালানো যাবে না।

জগা খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে ডাক্তারকে ধরে ধরে ভিতরে নিয়ে গেল।

ধ্রুবর কোথাও একটু বসতে ইচ্ছে করছিল। বুকের মধ্যে যে একটা চাপ বাঁধা হাঁসফাঁস ভাব সেটা বায়ুজনিত। একটু বমি করলে চাপটা কমে যেতে পারে। কোমরের ব্যথাটাও। তার স্বাভাবিক শরীর চমৎকার। সহনশীল, চটপটে, শক্তপোক্ত। এই সব ব্যথা-বেদনা ইত্যাদি আনে মদ্যপান। আজকের দিনটায় খেলেই ভাল হত।

লোকলজ্জা ধ্রুবর বড় একটা নেই। সে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেয় এবং ধীরে ধীরে ফুটপাথে উবু হয়ে বসে। গলায় আঙুল চালিয়ে হড়াৎ করে খানিকটা জল তুলে দেয়।

সেই অবস্থাতেই সে লক্ষ করে রেমির তেঁ-এটে খচ্চর ভাইটা একলাফে কয়েক হাত সরে গেল।

বমিটা বেরিয়ে যাওয়ায় খানিকটা ভাল লাগল ধ্রুবর। নিজের বমির সামনেই বসে রইল সে। গাড়লের মতো। মাথাটা সামান্য ঘুরছে। তবে হালকা লাগছে।’

আত্মীয়-স্বজন বড় কম আসেনি। এতক্ষণ বাইরে অনেকে ঘোরাঘুরি করছিল, জটলা পাকাচ্ছিল। এখন কেউ নেই। কয়েকটা গাড়ি শুধু দাঁড়িয়ে আছে।

বলতে কী, ধ্রুবর আজ একটু একা লাগছে। বহুকাল এরকম একা বোধ করেনি সে। কেন এমন মনে হচ্ছে?

ধ্রুব তার অপ্রকৃতিস্থ মাথায় ব্যাপারটার একটা ব্যাখ্যা খুঁজতে থাকে। মনে হচ্ছে, রেমির সঙ্গে তার জাগতিক সম্পর্ক ছিঁড়ে যেতে বসেছে বলেই বোধহয় এই একা বোধ। রেমি যদি মরে যায় তাহলে কাল থেকে তার সব বন্ধন গেল। না, একথা ঠিক, রেমি বেঁচে থাকতেও তার কোনো বন্ধন ছিল না। কিন্তু বড় স্টিম লঞ্চের পিছনে বাঁধা গাধাবোটের মতো লেঙুর তো ছিল। স্টিম লঞ্চ হয়তো টেরই পায় না গাধাবোটকে, কিন্তু তবু থাকে তো। এবার সেটুকুও যাচ্ছে। চমৎকার। ধ্রুবর বরং খুশী হওয়ার কথা।

ধ্রুব খুশি যে একেবারেই হচ্ছে না তা নয়। বন্ধনমুক্তি কার কাছে না সুখের! তাছাড়া ভাগ্যবানেরই বউ মরে। কিন্তু তবু একা বোধটাও বড় স্পষ্ট।

ধ্রুব দাঁড়ানোর একটা চেষ্টা করল। কিন্তু হাঁটুর জোড় খুলতে চাইল না। এরকমই হওয়ার কথা। পেটে অঢেল মদ। কিন্তু নেশাটা কেটে গেছে। কিন্তু মদ তো তার ক্রিয়া করবেই। নেশা হয়নি বলেই বরং দ্বিগুণ ক্রিয়া করবে। শোধ নেবে শরীরের নানা জায়গায় ছোবল মেরে। তাই নিচ্ছে।

বাড়ি ফিরে যেতে পারে ধ্রুব। কিন্তু জানে ফিরে গিয়ে ঘুমোতে পারবে না। একা ঘরে আজ তার গা ছমছম করবে। বাড়ি আজ বড় ফাঁকা। প্রায় সবাই এখানে চলে এসেছে।

ধ্রুব একটা বড় শ্বাস ফেলল। নেশা করে বহুবার পথে-ঘাটে পড়ে থেকেছে। তাতে লজ্জা নেই তার। সে তো কিছু টেব পায় না তখন। কিন্তু এরকম পরিপূর্ণ সচেতন অবস্থায় রাস্তায় শুয়ে পড়া কি সম্ভব? তার এখন ভীষণ ইচ্ছে করছে শুয়ে একটু চোখ বুজে থাকে।

শোবে? একটু দ্বিধা করে ধ্রুব। তারপর সামান্য হাসল। লোকলজ্জা সংকোচ এসব বিসর্জন দিতে তার দ্বিধা থাকা উচিত নয়।

বমির জায়গাটা থেকে সামান্য সরে গিয়ে ধ্রুব দেয়াল ঘেঁষে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল ফুটপাথে।

আঃ! ভারী আরাম পেল সে। শীত করছিল একটু। সেটা কিছু নয়। ফুটপাথে হাজার হাজার মানুষ কলকাতায় রাত কাটায়। আজ সচেতনভাবে ফুটপাথে শুয়ে নিজেকে তাদের সঙ্গে এক করে ভাবতে পেরে ভারী রোমাঞ্চ হল তার। চমৎকার!

মাথার নীচে আড়াআড়ি ডান হাতখানা রেখে সে চিৎ হয়ে আকাশের দিকে তাকাল। ফুলঝুরির মতো আলোর কণা ছড়িয়ে আছে আকাশময়। মেঘ নেই, কুয়াশা নেই। রাত্রি চলেছে ভোরের আলোর দিকে। রেমি কি রাতটা কাটাতে পারবে!

এই সুন্দর রাত্রিটিতে ধ্রুবরও খুব মরে যেতে ইচ্ছে করছে। কোনো কারণ নেই। এমনি। এখন হঠাৎ ফুটপাথে শুয়ে মরে গেলে কেমন হয়?

একটা কুকুর খুব সন্তর্পণে তার বমিটা শুঁকছে। সন্দেহভরে তাকে একটু চেয়ে দেখে। ধ্রুব কুকুরটাকে তাড়ায় না। ওকেও তো টিকে থাকতে হবে। থাক।

ধ্রুব চোখ বোজে। তার ঘুম আসছে।

জামাইবাবু!

উঁ! ধ্রুব চোখ খুলে বুকের সামনে দুটো পা দেখতে পায়। অনেক উঁচুতে যেন মাথাটা।

শুয়ে আছেন কেন?

এমনি। ভাল লাগছে।

আপনি কি খুব বেশী অসুস্থ?

কেন, জেনে কী হবে?

বলুন না।

আমি অসুস্থ হলে তো তুমি খুশিই হও। তাই না?

আমি হই। কিন্তু দিদি হয় না।

তার মানে?

আমার দিদি আপনাকে বড় ভালবাসত। ডেসপাইট ইওর ইভিল ডিজাইনস।

তাই নাকি? হবে। আমি ভালবাসার কথা বেশী জানি না।

আপনার জানার কথাও নয়। যারা পায় তারা মর্ম বোঝে না। আপনার যন্ত্রণাটা কি খুব বেশী?

না। এখন ব্যথাটা নেই। আমাকে একটু ঘুমোতে দাও।

এখানে ঘুমোবেন কেন? কাছেই আপনাদের গাড়ি আছে। ব্যাকসীটে গিয়ে শুয়ে পড়ুন।

গাড়ির ব্যাকসিটে যে শোওয়া যায় তা আমি জানি। কিন্তু আমার এখানেই ভাল লাগছে।

আপনার রিলেটিভরা দেখতে পেলে রাগ করবে।

তাতে তোমার কী?

বললাম তো, আমার কিছু না।

দিদির কথা কী বলছিলে?

দিদি আপনাকে ভালবাসত। কাজটা ঠিক করত না। কিন্তু বাসত। অন্ধের মততা, বোকার মতো। দিদি যদি টের পায় আপনি ফুটপাথে শুয়ে আছেন আর আমি আপনকে ওঠানোর চেষ্টা করছি না তাহলে দিদি খুব দুঃখ পাবে।

রেমি এখন সুখদুঃখের ওপারে।

জানি। তবু দিদির কথা ভেবেই আমার অস্বস্তি হচ্ছে।

আমাকে তোমার লাথি মারতে ইচ্ছে করছে না?

না। আমি ইতর নই। আপনি উঠুন।

আমি বেশ আছি জয়। চমৎকার।

ডাক্তার ডাকবো?

না। ডাক্তার কী করবে? আমি একটু ঘুমোই।

জয়ন্ত দ্বিধাভরে দাঁড়িয়ে রইল।

ধ্রুব চোখ বুজল। টের পেল জয়ন্তর রবারসোলের জুতো মৃদু শব্দে সরে যাচ্ছে!

ঘুম এল ঝাঁপিয়ে। যেন একরাশ জল এসে ডুবিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে গেল তাকে।

রেমির ট্রেণ আসছে না।

সে মৃদুস্বরে বলল, আমার জুতো হারিয়ে গেছে। কিনে দেবে?

গমগমে পুরুষ কণ্ঠ বলে, জুতো! সে তো তোমার পায়েই আছে।

রেমি অবাক হয়ে দেখে, ওমা! তাই তো! কী চমৎকার এক জোড়া লাল চপ্পল তার পায়ে! মাখনের মতো নরম।

চপ্পলের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ চমকে ওঠে রেমি! এ মা গো! রক্ত! রক্ত গড়াচ্ছে যে! চটির রঙ লাল বটে, কিন্তু রক্তের লাল!

রেমি চেঁচিয়ে উঠে চটিজোড়া পা থেকে ছেড়ে ফেলবার চেষ্টা করছিল। ভীষণ ঝাঁকুনি লাগছিল শরীরে।

সে কি ভুল বকছে? রেমি আবছা ক্ষীণ চোখের আলোয় ছায়া ছায়া কিছু লোককে দেখতে পায়। অপারেশন থিয়েটার? হ্যাঁ, তাই তো! তবে এতক্ষণ সে কোথায় ছিল? কত দূরে?

আবার কি চলে যাবে রেমি? অস্ফুট এক অভিমানে সে বলে, তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিলে ওগো? কোথায়? রাজার সঙ্গে আমার বিয়ে দেবে বলে? শুনেছো কখনো নিজের বউকে কেউ অন্যের সঙ্গে বিয়ে দেয়?

হ্যাঁ, পাগল ধ্ৰুব একদা তাই করেছিল।

বেড়াতে যাওয়ার নাম করে ধ্রুব রেমিকে বের করে আনল বাড়ি থেকে। ট্যাকসিতে তুলে সাঁ করে নিয়ে এল ওয়েলিংটন স্কোয়ারের কাছে একটা বাড়িতে।

ঠিক বাড়ি নয়। একটা রহস্যজনক আস্তানা। পুরোনো একটা বাড়ির দোতলায় রেমিকে নিয়ে উঠল ধ্রুব। খুব নোংরা পরিবেশ। পচা তরকারি খোসা, রোদ না লাগা দেয়াল, নর্দমা ইত্যাদির মিশ্র গন্ধে গা ঘুলিয়ে ওঠে।

লোকজন কেউই প্রায় ছিল না। দোতলার বারান্দার শেষপ্রান্তে একটা ঘর। সেই ঘরে রাজা ম্লানমুখে বসে আছে।

রেমি রাজাকে দেখেই আঁতকে উঠে বলে, এ আমাকে কোথায় আনলে তুমি?

ধ্রুব কঠিন স্বরে বলে, জায়গাটা খারাপ নয় রেমি। তোমাকে মানায়।

তার মানে?

এখানে যতটা নোংরামি তার চেয়ে ঢের বেশী নোংরামি তোমার মনে।

কী বলছো এসব? আমি যা করেছি শুধু তোমার জন্য।

জানি। বিশ্বাসও করি। কিন্তু তা করতে গিয়ে এ বেচারাকে ডুবিয়ে দিয়েছো।

বেমি রুখে উঠে বলে, আমি কাউকে ডোবাইনি।

ওকে জিজ্ঞেস করো ও তোমার প্রেমে পড়ে গেছে কিনা।

সে দোষ আমার নয়।

তুমি ওকে প্রশ্রয় দিয়েছো। প্রেম-প্রেম খেলা খেলেছো আমি এ খেলা অপছন্দ করি।

বেনি হঠাৎ পাগলের মতো চেচিয়ে উঠল, না! না! না! না!

ধ্রুব তার মুখ চেপে ধরল জোরালো হাতে। বলল, খবরদার চেঁচাবে না।

রেমি এক ঝটকায় মুখটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, একশবার চেঁচাব। তুমি এ কাণ্ড কেন করছো তা কি আমি জানি না?

কী জানো?

তুমি শ্বশুরমশাইয়ের ওপর শোধ তুলতে চাও।

তার মানে?

উনি আমাকে ভালবাসেন। খুব বেশী ভালবাসেন। আমাকে ওর কাছ থেকে দূর করে দিয়ে তুমি ওঁকে জব্দ করতে চাও। আমি জানি! সব জানি!

আশ্চর্য এই, ধ্রুব এই কথা শুনে মিইয়ে গেল। তারপর মুচকি একটু হাসল।

সকল অধ্যায়
১.
১. ১৯২৯ সালের শীতকালের এক ভোরে
২.
২. টহলদার একটা কালো পুলিশ ভ্যান
৩.
৩. কিশোরী রঙ্গময়ি
৪.
৪. ধ্রুব
৫.
৫. ধনীর বাড়িতে শোক
৬.
৬. নার্সিংহোমে রক্তের অভাব নেই
৭.
৭. ভাই হেমকান্ত
৮.
৮. হানিমুন
৯.
৯. সন্ধের কুয়াশামাখা অন্ধকার
১০.
১০. রেমি
১১.
১১. পিতার বাৎসরিক কাজ
১২.
১২. সারারাত পুলিশ হোটেল ঘিরে রইল
১৩.
১৩. ভাই সচ্চিদানন্দ
১৪.
১৪. ভোটে জিতে কৃষ্ণকান্ত মন্ত্রী হয়েছেন
১৫.
১৫. ঝিমঝিম করে ভরা দুপুর
১৬.
১৬. অচেনা গলা
১৭.
১৭. তরল মন্তব্য
১৮.
১৮. ছন্দাকে নিয়ে আসা হল
১৯.
১৯. নতুন এক আনন্দ
২০.
২০. রেমি কিছুতেই বুঝতে পারছিল না
২১.
২১. রাজেন মোক্তারের ছেলে শচীন
২২.
২২. কূট সন্দেহ
২৩.
২৩. গভীর রাত্রি পর্যন্ত হেমকান্তর ঘুম হল না
২৪.
২৪. রেমি মাথা ঠান্ডা রেখে
২৫.
২৫. মুখখানা অমন শুকনো দেখাচ্ছে কেন
২৬.
২৬. আচমকা একদিন দুপুরে
২৭.
২৭. শচীন অনেকক্ষণ কাজ করল
২৮.
২৮. বেলুন দিয়ে সাজানো একটা জিপগাড়ি
২৯.
২৯. বিশাখা
৩০.
৩০. শ্বশুর আর জামাইয়ের সাক্ষাৎকার
৩১.
৩১. হেমকান্ত জীবনে অনেক সৌন্দর্য দেখেছেন
৩২.
৩২. থানায় যাওয়ার আগে ধ্রুব
৩৩.
৩৩. পুজো আর আম-কাঁঠালের সময়
৩৪.
৩৪. ঢেউয়ের সঙ্গে ভাব হয়ে গেল রেমির
৩৫.
৩৫. চপলার বাবা মস্ত শিকারি
৩৬.
৩৬. বিস্ময়টাকে চট করে লুকিয়ে
৩৭.
৩৭. চপলা বাড়িতে পা দেওয়ার পর
৩৮.
৩৮. ঘর-বার করতে করতে
৩৯.
৩৯. এত কলকব্জা কখনও দেখেনি সুবলভাই
৪০.
৪০. অপারেশন থিয়েটারের চোখ-ধাঁধানো আলো
৪১.
৪১. বৈশাখ মাসে কোকাবাবুদের একটা মহাল
৪২.
৪২. রেমি যে মারা যাচ্ছে
৪৩.
৪৩. অনাথ ডাক্তারের মেলা টাকা
৪৪.
৪৪. সেই একটা দিন কেটেছিল
৪৫.
৪৫. কয়েকদিন যাবৎ অনেক ভাবলেন হেমকান্ত
৪৬.
৪৬. ভিড়ের ভিতর দাঁড়িয়ে
৪৭.
৪৭. মামুদ সাহেব
৪৮.
৪৮. মানুষেরা ভীষণ অবুঝ
৪৯.
৪৯. এক তীব্র, যন্ত্রণাময় অশ্বখুরধ্বনি
৫০.
৫০. এত ভয় রেমি জীবনেও পায়নি
৫১.
৫১. কুঞ্জবনে আর এসো না
৫২.
৫২. খুব নরম খুব সবুজ ঘাস
৫৩.
৫৩. একটা পঙক্তি
৫৪.
৫৪. একটু মায়া কি অবশিষ্ট ছিল
৫৫.
৫৫. স্ত্রী চরিত্র কতদূর রহস্যময়
৫৬.
৫৬. হাতে-পায়ে খিল ধরল রেমির
৫৭.
৫৭. এরকম বৃষ্টির রূপ
৫৮.
৫৮. মাথার ঠিক ছিল না রেমির
৫৯.
৫৯. চপলা খুব ধীরে ধীরে
৬০.
৬০. রাজার ফ্ল্যাট
৬১.
৬১. বাবা, আমি কাল যাব না
৬২.
৬২. গায়ে নাড়া দিয়ে
৬৩.
৬৩. ইরফান নামে যে লোকটা
৬৪.
৬৪. আজ আর নেই
৬৫.
৬৫. শশিভূষণের মামলা
৬৬.
৬৬. যে সময়টায় রেমির পেটে ছেলেটা এল
৬৭.
৬৭. আজ শচীনের চেহারার মধ্যে
৬৮.
৬৮. মেয়েটির হাসিটি অদ্ভুত সুন্দর
৬৯.
৬৯. শচীন কাশী রওনা হওয়ার আগের দিন
৭০.
৭০. গাড়ির ব্যাকসিটে বসে ধ্রুব
৭১.
৭১. বরিশালের জেলে সতীন্দ্রনাথ সেনের অনশন
৭২.
৭২. একটি লোকও নার্সিংহোম ছেড়ে যায়নি
৭৩.
৭৩. কৃষ্ণকান্ত এক জ্বালাভরা চোখে সূর্যোদয় দেখছিল
৭৪.
৭৪. ধ্রুবর যে একটা কিছু হয়েছে
৭৫.
৭৫. এক সাহেব ডাক্তার আনানো হল
৭৬.
৭৬. ধ্রুব রঙ্গময়ির দিকে চেয়ে
৭৭.
৭৭. লোকটা কী বলছে
৭৮.
৭৮. একটা হত্যাকাণ্ড এবং মৃত্যু
৭৯.
৭৯. আবার সেই কিশোরী
৮০.
৮০. সে আর সে
৮১.
৮১. প্রদোষের আলো
৮২.
৮২. ধ্রুব, বাপ হয়েছিস শুনলাম
৮৩.
৮৩. সংজ্ঞা যখন ফিরল
৮৪.
৮৪. প্রশান্ত ধ্রুবকে লক্ষ করছিল
৮৫.
৮৫. ফেরার পথে ঘোড়ার গাড়ি
৮৬.
৮৬. নোটন
৮৭.
৮৭. বজ্রনির্ঘোষের মতো কণ্ঠস্বর
৮৮.
৮৮. ধ্রুব আর নোটন
৮৯.
৮৯. রামকান্ত রায় খুন
৯০.
৯০. মরবি কেন
৯১.
৯১. হেমকান্ত একটু সামলে উঠেছেন
৯২.
৯২. বাথরুমের দরজা খুলে
৯৩.
৯৩. প্রস্তাবটা দ্বিতীয়বার তুলতে
৯৪.
৯৪. স্বচ্ছ গোলাপি মশারির মধ্যে
৯৫.
৯৫. ইহা কী হইতে চলিয়াছে
৯৬.
৯৬. কৃষ্ণকান্তকে দেখে জীমূতকান্তি
৯৭.
৯৭. আজ এই দিনপঞ্জীতে যাহা লিখিতেছি
৯৮.
৯৮. কৃষ্ণকান্ত নিজের বাইরের ঘরটায় এসে
৯৯.
৯৯. নীল আকাশের প্রতিবিম্বে নীলাভ জল
১০০.
১০০. ধ্রুব খুবই মনোযোগ দিয়ে
১০১.
১০১. যখন বাড়ি ফিরিলাম
১০২.
১০২. দরজা খুলে বৃদ্ধা
১০৩.
১০৩. বিশাখার বিবাহ
১০৪.
১০৪. গুজবটা কী করে ছড়াল কে জানে
১০৫.
১০৫. কাশী আসিবার পর
১০৬.
১০৬. বাবা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%