লোটন ষষ্ঠীর কথা

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়

এক ব্রাহ্মণীর এক ছেলে, একটি বউ, আর একটি মেয়ে। মেয়ের তিনটি ছেলে আর বউয়ের সাত ছেলে। পাড়ার লোকেরা বলে, ‘আহা! ব্রাহ্মণীর কী বরাত, মা ষষ্ঠী যেন ডাল ভেঙে পড়েছেন! ব্রাহ্মণীর সময়ও ভালো, ছেলে দশ টাকা রোজগার করে, মাকে ভক্তি করে।’ শ্রাবণ মাস, শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীর দিন গিন্নি ষষ্ঠী পুজোর আয়োজন করছেন, তাঁর সোনার ছয়টি লোটন ছিল, তাই দিয়ে বছর বছর ষষ্ঠী পুজো করেন। গিন্নি কৌটো খুলে দেখেন যে তাঁর তিনটি লোটন আছে আর তিনটি নেই। তখন গিন্নি বউকে ডেকে বললেন, ‘বউমা! আমার এ সর্বনাশ কে করলে? লোটন কে চুরি করেছে? মা ষষ্ঠীর জিনিস কার নিতে ভরসা হল?’ এই কথা শুনে বউ কেঁদে-কেটে ছেলের মাথায় হাত দিয়ে দিব্বি করলে, ‘আমি যদি লোটন নিয়ে থাকি, তাহলে আমার সাত বেটার মাথা খাই।’ মেয়েকে জিজ্ঞাসা করতে মেয়ে বললে, ‘আমি জানি না মা, তোমাদের বাড়ি আমি ক-দিনই বা আছি? এই আজ বাদে কাল শ্বশুরবাড়ি চলে যাব।’ গিন্নি কোনো কথা না বলে ক্ষীরের লোটন গড়ে ষষ্ঠীকে দিলেন। বউ মনের দুঃখে সে দিন আর কিছুই খেলে না। সমস্ত দিন কেঁদে কেঁদে রাত্রে আশে-পাশে সাতটি ছেলে নিয়ে শুয়ে রইল। স্বামী এসে সমস্ত শুনলে, শুনে রেগে বউকে কিছু না বলে, মার কাছে শুয়ে, মায়ে বেটায় কত কথা কইতে কইতে ঘুমোল।

তার পর দিন সকলে ঘুম থেকে উঠে দেখে যে, বউয়ের সাতটি ছেলে মরে রয়েছে। বউ কেঁদে পাড়া মাথায় করলে। তখন মেয়ে বলতে লাগল—‘দেখলে মা, দেখলে দাদা, ও লোটন বউ ঠিক নিয়েছে, তা না হলে আর এ সর্বনাশ হয়! কীরকম রাক্ষুসী দেখলে, ঠাকুরের জিনিস চুরি করে আবার ছেলের মাথায় হাত দিয়ে দিব্যি? মর মর, দূর করে দাও, ওর মুখ দেখতে নেই।’ বউ কাঁদতে কাঁদতে ঘরের দরজা বন্ধ করে মরা ছেলেগুলি বুকে করে নিয়ে পড়ে রইল। সমস্ত দিন গেল। ছেলেদের পোড়াবার জন্যে স্বামী এসে দরজা খুলতে বললে, বউ কিছুতেই দরজা খুললে না। মা ষষ্ঠীর দয়া হল। তিনি রাত্রে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণীর বেশ ধরে বউ-এর ঘরের ভিতর এলেন। বউ বললে, ‘কে মা তুমি! এখানে কেমন করে এলে?’ মা ষষ্ঠী বললেন, ‘আমি কেউ নই বাছা! বলি, তুই আবাগী ছেলের মাথায় হাত দিয়ে দিব্যি করলি, আবার কাঁদছিস!’ বউ বললে, ‘আমি তো লোটন নিইনি মা! তাই দিব্যি করেছি।’ ষষ্ঠী ঠাকরুণ বললেন, ‘ছি মা, তুমি সাত ছেলের মা হলে, তোমার কি এই কাজ! সত্যি হোক, মিথ্যে হোক, কখন ছেলের মাথায় হাত দিয়ে দিব্যি কোরো না।’ এই বলে তিনি বাঁশপাতা ঝেড়ে ছেলেদের গায়ে জলের ছিটে দিতেই, সাতটি ছেলে বেঁচে উঠল। ছেলেগুলো বলতে লাগল, ‘মা গো মা! এত ঘুমিয়ে পড়েছিলুম, আমাদের ডাকনি? বড়ো ক্ষিদে পেয়েছে, কিছু খেতে দাও মা।’ এদিকে মা ষষ্ঠী অন্তর্দ্ধান হয়েছেন। বউ চেয়ে দেখে দেখে যে মা নেই, খালি ছেলেরা চেঁচাচ্ছে। খানিক পরে সকাল হল। বউ ছেলেপুলে নিয়ে দরজা খুলে দেখে যে ননদের তিনটি ছেলে মরে গেছে! গিন্নী এই সব দেখে অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, এ কী ব্যাপার! স্বামী বউয়ের মুখে রাত্রের ঘটনা শুনে অবাক হলেন। মেয়ের ঘুম ভাঙতে চেয়ে দেখে যে তার তিনটি ছেলেই মরে গেছে। সে কেঁদে-কেটে বাড়ি মাথায় করলে। মায়ে ঝিয়ে মা ষষ্ঠীর কাছে মাথা খুঁড়তে লাগলেন।

এমন সময় দৈববাণী হল—‘জানিস না মাগি! তোর মেয়ে আমার লোটন চুরি করে আবার পরের মেয়ের নামে দোষ দিয়ে সতী হয়েছে! এখন কাঁদতে লজ্জা করে না? যদি ভালো চাস তো তোর মেয়েকে বউ-এর পায়ে ধরতে বলগে যা।’ তখন আর কারও কিছু জানতে বাকি রইল না। ননদ ভাজের পায়ে ধরে কাঁদতে লাগল। বউ বললে, ‘ভয় কী ঠাকুরঝি! মা যখন দয়া করেছেন, তখন আর ভাবনা নেই। তুমি লোটন বার করে দাও, তোমার ছেলেরা বাঁচবে। মার কোপে তোমার এমন হয়েছে, এখনি মার দয়া হবে, তুমি লোটন বার করে দাও।’ তখন ননদ তাড়াতাড়ি বাক্স খুলে লোটন বার করে দিলে।

বউ তখন সেই মা ষষ্ঠীর দেওয়া বাঁশপাতার জল ছেলেদের গায়ে ছিটিয়ে দিতেই তিনটি ছেলে উঠে বসল! বউ-এর এই অদ্ভুত ক্ষমতা দেখে সকলে তাকে দেবতার মতো ভক্তি করতে লাগল। বোনকে ভাই ছি-ছি করতে লাগল। বললে ‘তোর পাপেই আমার ছেলে মরেছিল, তোর ছেলেও মরেছিল। ভাগ্যিস অমন বউ পেয়েছিলুম, তাই তার পুণ্যে আজ সব হারানো ধন পেলুম।’ ননদ ভাজের কাছে গিয়ে পায়ে ধরে মাপ চাইলে, দাদার পায়ে ধরে মাপ চাইলে। গিন্নি মেয়েকে বকতে লাগলেন। মেয়ের লোটন চুরির কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বউকে সকলে ভালোবাসতে লাগল। বউ-এর সুখ্যাতি, আর মা ষষ্ঠীর দয়া দেশ-বিদেশে প্রচার হল। সেই থেকে সকলে শ্রাবণ মাসে এই লোটন ষষ্ঠীর পূজা করে। লোটন চুরি করার জন্যে সকলে এতে লোটন ষষ্ঠী বা লুন্ঠন ষষ্ঠী বলে। এই ষষ্ঠী করলে ছেলেপুলে কখনও অকালে মরে না।

লোটন ষষ্ঠীর কথা সমাপ্ত

সকল অধ্যায়
১.
ভাদ্র মাসের লক্ষ্মীপূজার কথা
২.
কার্তিক মাসের লক্ষ্মীপূজার কথা
৩.
পৌষ মাসের লক্ষ্মীপূজার কথা
৪.
চৈত্র মাসের লক্ষ্মীপূজার কথা
৫.
কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার কথা
৬.
ক্ষেত্র ব্রতকথা
৭.
মঙ্গলচন্ডী
৮.
বারোমেসে মঙ্গলচন্ডী
৯.
হরিষ মঙ্গলচন্ডী
১০.
জয় মঙ্গলবারের ব্রতকথা
১১.
অগ্রহায়ণ মাসের কুলুই মঙ্গলবারের কথা
১২.
সংকট মঙ্গলবারের কথা
১৩.
সংকটার কথা
১৪.
সুয়ো দুয়োর কথা
১৫.
নাটাই ব্রতকথা
১৬.
মঙ্গল সংক্রান্তির কথা
১৭.
ষষ্ঠীর কথা
১৮.
অরণ্য ষষ্ঠীর কথা
১৯.
লোটন ষষ্ঠীর কথা
২০.
চাপড়া ষষ্ঠীর কথা
২১.
দুর্গা ষষ্ঠীর কথা
২২.
মুলা ষষ্ঠীর কথা
২৩.
পাটাই ষষ্ঠীর কথা
২৪.
শীতল ষষ্ঠীর কথা
২৫.
অশোক ষষ্ঠীর কথা
২৬.
নীল ষষ্ঠীর কথা
২৭.
মনসার কথা
২৮.
ইতুর কথা
২৯.
রালদুর্গার ব্রতকথা
৩০.
মৌনী অমাবস্যার ব্রতকথা
৩১.
জিতাষ্টমীর ব্রতকথা
৩২.
বারমেসে অমাবস্যার কথা
৩৩.
সাবিত্রী চতুর্দশী ব্রতকথা
৩৪.
শিবব্রত
৩৫.
পুণ্যি-পুকুর ব্রত
৩৬.
দশ-পুত্তল ব্রত
৩৭.
হরির চরণ ব্রত
৩৮.
অশ্বত্থ পাতা ব্রত
৩৯.
গো-কল ব্রত
৪০.
পৃথিবী ব্রত
৪১.
যমপুকুর ব্রত
৪২.
যমপুকুর ব্রতকথা
৪৩.
সেঁজুতি ব্রত
৪৪.
তুঁষ-তুঁষুলি ব্রত
৪৫.
এয়ো-সংক্রান্তি ব্রত
৪৬.
গুপ্তধন ব্রত
৪৭.
ষোলো-কলা ব্রত
৪৮.
রূপ-হলুদ ব্রত
৪৯.
অক্ষয়-সিঁদুর ব্রত
৫০.
অক্ষয়-ফল ব্রত
৫১.
অক্ষয়-কুমারী ব্রত
৫২.
মধু-সংক্রান্তি ব্রত
৫৩.
ফল-গছানো ব্রত
৫৪.
নিত্য-সিঁদুর ব্রত
৫৫.
নিৎ-সিঁদুর ব্রত
৫৬.
নখছুটের ব্রত
৫৭.
সন্ধ্যামণির ব্রত
৫৮.
কলাছড়া ব্রত
৫৯.
আদা-হলুদ ব্রত
৬০.
অক্ষয়-ঘট ব্রত
৬১.
সৌভাগ্য-চতুর্থী ব্রত
৬২.
আদর-সিংহাসন ব্রত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%