দেবাশিস পাঠক
তাঁবুর ছাদে টুপটাপ করে বৃষ্টি পড়ছে। তাঁবুর ভেতর তার শব্দ শোনা যাচ্ছে। আবার কখনও কখনও শব্দ নেই। নিঃসীম নৈঃশব্দ্য।
সারারাত বিছানায় ছটফট করেছেন। অজানা অজ্ঞাত অনুনমেয় কোনও কারণে। এখনও বিছানা ছাড়ার সেরকম ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু উঠতেই হল। কাঁধের ওপর একটা হাতের ছোঁয়া। কানের কাছে ফিসফিসানি।
‘জাঁহাপনা! রাজপুতরা সব উধাও।'
প্রথমে ঠিকমতো বুঝতে পারেননি কথাটা। ভাবছিলেন, স্বপ্ন দেখছেন বুঝি। কিন্তু দ্বিতীয়বার একই কণ্ঠে একই কথার পুনরুচ্চারণ। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলেন আকবর।
আকবর মানে মহম্মদ আকবর। ভারত সম্রাট আলমগীরের চতুর্থ পুত্র। দিলারুস বানু বেগমের সন্তান। মুঘল সাম্রাজ্যের শাহজাদা ।
ঘুম ভেঙে উঠে বসে ভেবেছিলেন আধা ঘুম আধা জাগরণে যা দেখেছিলেন, যা শুনেছিলেন, যা অনুভব করেছিলেন, সব বুঝি ভুল। কিন্তু যে বান্দা তাঁকে ডাকতে এসেছিল, সে এই বিভ্রমটাকে স্থায়ী হতে দিল না।
বান্দা একজন তরুণ কোর্চি। কোর্চি আদতে তুর্কি শব্দ। অর্থ, সৈনিক। যুবা সৈনিকটি ফের বলল কথাটা, ‘জাঁহাপনা! রাজপুতরা সব উধাও।’
উধাও! মানে? বললেই হল, উধাও। সব রাজপুতরা বেবাক লাপতা! তা আবার হয় নাকি? অবিশ্বাসী মন নিয়ে শিবিরের বাইরে এলেন আকবর। সত্যিই তো! যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল যে রাজপুতরা, সত্যিই তাদের কাউকে দেখা যাচ্ছে না। চারদিক শুনশান। গেরুয়া পোশাক পরা রাজপুত সেনাদের এতদিন এখানেই অস্ত্র অনুশীলন, নানারকম কসরত করতে দেখা যেত। এখন তারা কেউ কোত্থাও নেই।
ব্যাপারটা কী, বোঝার চেষ্টা করছিলেন আকবর। তখনই দেখলেন, একজন গেরুয়া পোশাক পরা লোক এগিয়ে আসছে তাঁরই দিকে।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই গেরুয়া বসনধারী লুটিয়ে পড়ল মহম্মদ আকবরের পায়ে। এক লহমায় শাহজাদা চিনে ফেললেন লোকটাকে। লোকটা আর কেউ নয়। যোগীন্দর। অম্বরের রানার ছেলে।
‘এ সব ঢঙের দরকার নেই। ব্যাপারটা কী হয়েছে সাফ সাফ জানাও।' আকবরের গলায় রূঢ়তা।
শতবার দুঃখপ্রকাশ, সহস্রবার ক্ষমা প্রার্থনা, নিযুতবার তাকে মাফ করার আর্জি, এসবের ফাঁকে ফাঁকে যোগীন্দর যা জানাল, সেটা শুনে শাহজাদা আকবরের চক্ষু চড়কগাছ।
গত রাতে শিবিরের পাহারাদারদের হাতে দু'জন গুপ্তচর ধরা পড়েছে। জেরায় জানা গিয়েছে, দু'জনেই বাদশাহ আলমগীরের কর্মচারী। বাদশাহি সিলমোহর দিয়ে মুখ বন্ধ করা খাম মিলেছে তাদের কাছ থেকে। সেই খাম খুলে উদ্ধার হয়েছে একটি চিঠি। সেই চিঠি পড়ার পরই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র রাজপুত শিবিরে।
‘কী এমন চিঠি যা পড়ে সব্বাই একেবারে উত্তেজিত হয়ে উঠল?' কণ্ঠের কর্কশতা ফের আড়াল করতে পারলেন না আকবর। বিরক্তি ঝরে পড়ল তাঁর গলায়। বিরক্তিটা স্বাভাবিক। রাজপুতরা যা করেছে তা গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নিয়ে চম্পট দেওয়ার সমান।
১ জানুয়ারি, ১৬৬১। ২৯ রবি উলথানি, ১০৭১ হিজরি। শনিবার। বাবা বাদশাহ আলমগীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন আকবর। বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নতুন কোনও বিষয় নয় মুঘল খানদানেতে। আজ যিনি বাদশাহ আলমগীর, তিনিই যখন স্রেফ ঔরঙ্গজেব ছিলেন, তখন বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন বাবা শাহজাহানের বিরুদ্ধে। বাপ-ভাইদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলতেও ইতস্তত করেননি, স্রেফ মসনদ দখলের তাগিদে। সেদিক থেকে দেখলে, আকবরও বাপ কা বেটা। ব্যতিক্রমী খলনায়ক নন।
মেবারের রানার বিরুদ্ধে আকবরকে লড়তে পাঠিয়েছিলেন বাদশাহ ঔরঙ্গজেব। ময়ূর সিংহাসনে যিনি আলমগীর উপাধি নিয়ে বসেছেন। আকবরের সঙ্গে এসেছিল তহাবুর খান। তারাই পেয়েছিল একটা চিঠি। পাঠিয়েছিলেন মেবারের রানা।
তাতে লেখা ছিল:
‘আমরা যুযুধান পক্ষ, এ কথা ভাবলেও আমার কষ্ট হয়। এই যুদ্ধের জন্য, আপনিও জানেন, মেবার দায়ী নয়। দায়ী আপনার বাবার অহং। দায়ী আপনার বাবার আগ্রাসী মানসিকতা। যোধপুরকে কবজা করার জন্য তিনি যা যা করেছেন, একবার ভেবে দেখবেন, মহামতি আকবরের উত্তরপুরুষের পক্ষে তা আদৌ শোভা পায় কি না। মহামতি আকবর ধর্ম, বর্ণ, জাতি, সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার সঙ্গে সমান ব্যবহার করতেন। আমাদের, রাজপুতদের দিকে তিনি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমাদের তিনি বিশ্বাস করতেন। তাঁর দরবারে, তাঁর বাহিনীতে, আমাদের উঁচু জায়গায় পৌঁছতে অসুবিধা হয়নি। আপনার পিতামহ সম্রাট জাহাঙ্গির স্বয়ং রাজপুত বেগমের সন্তান ছিলেন।
‘আপনি সেই মহামতি আকবরের উত্তরসূরি। সেই মহামতির নামের সঙ্গে আপনার নাম এক। আপনি সেই মহান ব্যক্তির নামটিও বহন করছেন। তাই আপনার সুবুদ্ধির কাছে আমার নিবেদন, আমরা শত্রুতা ভুলে বন্ধুত্ব পুনরুদ্ধার করি। নিশ্চয় মানবেন, এই বিরাট সাম্রাজ্য রক্ষা করতে হলে আমাদের দু'জনকে হাত মেলাতেই হবে। তাছাড়া উপায় নেই।
‘সুতরাং আসুন! আমাদের উদ্যোগেই মুঘল-রাজপুতের বন্ধুতা পুনর্নির্মিত হোক।'
চিঠি পড়ে রক্তে ঝড় উঠেছিল আকবরের। রাজপুত রানারা সৈন্যসামন্ত নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ঔরঙ্গজেবের স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী যে তিনিই, সে কথা সোচ্চারে ঘোষণা করেন তাঁরা। মুহুর্মুহু আওয়াজ ওঠে, হিন্দুস্তানের নয়া বাদশা আকবরের জয় । আকবর বাদশা জিন্দাবাদ।
সেই জয়ধ্বনিতে এতদিন বুঁদ হয়েছিলেন আকবর। কোনও সাক্ষ্যপ্রমাণ রাখবেন না বলে মেবারের রানার চিঠিটা পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। আর সেই চিঠি পোড়া ছাই থেকে ডানা মেলা খোয়াব তাঁকে এতদিন আবিষ্ট করে রেখেছিল।
আজ স্বপ্নভঙ্গের পর প্রায় শুনশান খাঁ খাঁ শ্মশানের মতো জমিতে দাঁড়িয়ে আর একটা চিঠির কথা শুনছেন তিনি। সেই চিঠিতেই নাকি ভেঙে গিয়েছে মুঘল আর রাজপুতের পারস্পরিক বিশ্বাসের সেতু।
যোগীন্দর জানাল, গতরাতে পাকড়াও হওয়া দুই মুঘল সৈন্যের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া বাদশাহি খতে আকবরের উদ্দেশ্যে লেখা ছিল:
‘বহুৎ খুব আমার বীর বাচ্চা। বর্বর অসভ্য রাজপুতদের সবক শেখানোর জন্য তুমি যে ছক কষেছ, তার তারিফ না করে পারছি না। কী দুর্দান্ত পরিকল্পনার কথা তুমি আমাকে জানিয়েছ! পড়ে আমি তাজ্জব বনে গিয়েছি। আমার বিদ্রোহী সন্তান হিসেবে তুমি ধেয়ে আসবে আমার দিকে। বন্ধুত্বের নাটক করে রাজপুতদের রাখবে সামনে। আমার কামানের খাদ্য হবে রাজপুত বাহিনী। আজমেঢ়ের দুর্গে পৌঁছনোর আগে যে ঝোপঝাড়গুলো আছে, সেখানেই লুকানো থাকবে আমার কামানগুলো। তোমার তথাকথিত নতুন বন্ধুরা এগোলেই খতম করে দেওয়া হবে তাদের। দুর্দান্ত ছক! তোমার তারিফ আরও একবার না-করে পারছি না।'
উদ্ধার হওয়া চিঠির বক্তব্য শুনে আকবরের মাথা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরতে লাগল। এমন ছক তিনি তো কস্মিনকালেও কষেননি।
‘পুরোদস্তুর, মিথ্যে কথা। বাদশাকে আমি কোনও চিঠিই লিখিনি। আর উনি কিনা বলে দিলেন, আমি পত্র মারফত এতবড় ষড়যন্ত্রের কথা এঁকে জানিয়েছি!' রাগে ফেটে পড়লেন আকবর।
‘আমি বুঝতেই পেরেছি সেটা, আমতা আমতা করে বলে যোগীন্দর। ‘সে জন্যই তো রয়ে গিয়েছি। আমি যাইনি ওদের সঙ্গে। বাবারও যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। উনি কাছেপিঠেই আছেন। বললে তাঁকে খবর পাঠাতে পারি।'
‘অবশ্যই পাঠাও।' বলতে বলতে আকবর এগিয়ে গেলেন তহাবুর খানের তাঁবুর দিকে।
সেখানেও একটা চমক অপেক্ষা করছিল আলমগীরের পুত্রের জন্য।
গোটা তাঁবু জনশূন্য। পড়ে আছে একটা চিঠি। তহাবুর খান তো কেবল আকবরের বন্ধু বা সহযোদ্ধা নয়। তার মায়ের স্তন্যপান করেই আকবরের বড় হওয়া। তহাবুরের মা তাঁর ধাই-মা। সেই তহাবুর খানও পালিয়েছে আকবরকে ফেলে রেখে।
চিঠিতে বারবার ক্ষমা প্রার্থনা। আর সেই সঙ্গে কিছু কথা। এমন কিছু খবরাখবর যা দ্বিতীয় আকবরের জানা ছিল না, কিন্তু জানাটা ভয়ানক জরুরি ছিল।
চিঠিতে তহাবুর অকপটে কবুল করেছে, না-পালিয়ে তার উপায় ছিল না। আগের রাতে ওয়াজিম খান এসেছিলেন তহাবুরের কাছে। অবশ্যই ছদ্মবেশে। ওয়াজিম খান বাদশা আলমগীরের সবচেয়ে বিশ্বস্ত উজির। তহাবুর ভেবেছিল উজির-এ-আজম বুঝি আজমেঢ়ের দুর্গে রাজপুতদের আত্মসমর্পণের বিষয়ে কিছু বলবেন। কিন্তু ওয়াজিম খান সেসবের ধার দিয়েও যাননি। তিনি বাদশাহ আলমগীরের বার্তা স্পষ্ট ভাষায় জানাতে এসেছিলেন।
বাদশা আলমগীরের বিরুদ্ধে কার্যত বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন দ্বিতীয় আকবর আর সেই বিদ্রোহে তিনি পাশে পেয়েছেন তহাবুর খানকে। এই অপরাধে বাদশা ‘নিরুপায়’ হয়ে গ্রেফতার করেছেন তহাবুরের বাবা-মা, দুই ছেলে এবং স্ত্রীকে। তহাবুরের স্ত্রী যে অন্তঃসত্ত্বা, সেটাও ঔরঙ্গজেবের অজানা নয়। কিন্তু, ওই যে, তিনি অনন্যোপায়। তাই এমনটা করতে বাধ্য হয়েছেন। সে কথাটা পরিমার্জিত ভাষায় জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে বার্তা পাঠিয়েছেন তহাবুরের কাছে। যদি সে অবিলম্বে দ্বিতীয় আকবরের সঙ্গ ত্যাগ না করে, তবে বাদশা তার বংশ ধ্বংস করে দেবেন। বাপ-মা, ছেলে, পোয়াতি বউ তো মারা পড়বেই, বাদ যাবে না তহাবুরের একমাত্র ভাইও।
ওয়াজিম খানের কাছেই তহাবুর জানতে পারে, শুধু সে নয়, আলমগীর বাদশা রাজপুত রাজাদের নিয়েও একটা বড় চাল চেলেছেন। এমন চাল, যাতে মাত হয়ে দ্বিতীয় আকবরের পাশ থেকে সরে যেতে বাধ্য রাজপুত্র রানারা, সৈন্যসামন্ত সমেত। এমন চাল, যাতে দ্বিতীয় আকবরের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে যায়। সন্দেহ বুনোট বাঁধে।
একা পেয়ে গিয়েছিল তহাবুর ওয়াজিম খানকে। তাঁকে মেরে ফেলাটা অসম্ভব ছিল না তার পক্ষে। কিন্তু পারেনি। পারেনি, কারণ তার পরিবার-পরিজন। ওয়াজিম খানকে মেরে ফেললে আর যাই-ই হোক তার বাবা-মা, বউ, ছেলে, ভাই, কেউ বাঁচবে না। এটা ভেবেই সে পিছিয়ে আসে।
তহাবুর চিন্তিত ছিল দ্বিতীয় আকবরের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ওয়াজিম খান তাকে আশ্বস্ত করেন। তিনি নিজেও নাকি আকবরের ব্যাপারে ঔরঙ্গজেবের সঙ্গে কথা বলেছেন। বাদশা আলমগীর তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন, আকবর আত্মসমর্পণ করলেই তিনি তাকে মাফ করে দেবেন।
এই পরিস্থিতিতে দ্বিতীয়বার আর ভাবার সুযোগ ছিল না। তহাবুর ঠিক করে, আকবরের সঙ্গ ছেড়ে সে ঔরঙ্গজেবের কাছে ধরা দেবে।
একবার নয়, দু'বার নয়, তিন-চারবার চিঠিটা মন দিয়ে পড়লেন আকবর । খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অক্ষরের ওপর দৃষ্টি স্থাপন করে, আলাদা আলাদা ভাবে।
নিজের বাবাকে ভালমতোই চেনা আছে তাঁর। বিলকুল ঝুট বলেছেন ঔরঙ্গজেব। একবার আকবরকে নিজের কবজায় পেলে ছেড়ে দেওয়ার বান্দা তিনি নন। ‘ক্ষমা' শব্দটা তাঁর অভিধানে নেই। নিজের ভাই দারাশুকো কিংবা মুরাদকে ছাড়েননি। ছাড়েননি মুরাদের বড় ছেলেকেও। সুতরাং, ধরা দিলে আকবরকে তিনি ছেড়ে দেবেন, এমন আশা করাটা বৃথা।
আকবরকে অসহায় করে খতম করবেন বলেই মিথ্যে খবর ছড়িয়ে, সন্দেহের বীজ বুনে আকবরের থেকে সরিয়ে নিয়েছেন রাজপুত সেনাদের।
বিভেদ পন্থার বীজ বুনে নিজের তখত বজায় রাখা, বিদ্বেষের বিষ ছড়িয়ে নিজের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করা, এসব ঔরঙ্গজেবের স্বাভাবিক রাজনীতি।
এজন্যই তিনি রাজপুত আর মুঘলের মধ্যে ফাটল গড়েন। এজন্যই তিনি হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সংহতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ান।
মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন আকবর।
স্রেফ নিজের জন্য নয়। মুঘল সাম্রাজ্যকে বাঁচাতে, যে সংহতির ভিতের ওপর তাঁর পূর্বপুরুষ মহামতি আকবর মুঘল সাম্রাজ্যের বনিয়াদ পোক্ত করে গড়ে তুলেছিলেন, সেই সংহতি পুনরুদ্ধারের জন্যই আকবর ধরা দেবেন না।
বাদশা বাবর, বাদশা হুমায়ুনের কথা মনে পড়ল তাঁর।
এর থেকে অনেক বড় বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছিলেন তাঁরা। হাল ছাড়েননি। স্বপ্ন ছুঁয়ে তারপর থেমেছেন।
মহামতি আকবরের নামে তাঁর নাম। মহামতি আকবরের রক্ত বইছে তাঁর শরীরে। সংকটে দুর্বলতা তাঁকে মানায় না। সংকট থেকে উত্তরণের সংগ্রামেই লেখা হয়েছে তাঁর পূর্বজদের জীবন। তাঁরও তাই-ই হোক।
সংকল্পে দৃঢ়তর হলেন আকবর।
জেদটা জবরদস্তভাবে চেপে বসল তাঁর ওপর। অল্পবয়সি সেই কোর্চি, যে তাঁকে ঘুম থেকে তুলেছিল সে তখনও মহম্মদ আকবরের কাছে দাঁড়িয়ে। আকবর তাকে আদেশ করলেন, ‘যারা এখনও আছে ছেড়ে যায়নি আমাকে, তাদের সব্বাইকে জুটিয়ে আনো এক্ষুনি। অম্বরের রানার সঙ্গে দেখা করতে যাব আমি।'
তারপর ঘুরে তাকালেন যোগীন্দরের দিকে। বললেন, ‘অবশ্যই অম্বরের রানা যদি এখনও আমার পাশে থাকতে রাজি থাকেন, তবেই...।'
ইচ্ছা করেই বাক্যটা অসমাপ্ত রাখলেন আকবর।
যোগীন্দর বলে উঠল, 'তিনি আপনাকে নিরাশ করবেন না জাঁহাপনা। আপনি নিশ্চিত থাকুন।'
নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকা যোগীন্দরকে এখন ভীষণ ভরসা করতে ইচ্ছে করছে আকবরের।
কোর্চিকে ফের বললেন, 'যাও। এখনই নিয়ে এসো যে ক-জন আছে, তাদের সবাইকে। এক লহমাও দেরি করা চলবে না।'
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে ঝমঝমিয়ে। দুর্গের জানলা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন ঔরঙ্গজেব। একটা অস্বচ্ছ জল-চাদরে আড়াল বাইরের দুনিয়া। তারই ভেতর দিয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে ওয়াজিম খান। আকবরকে বন্দি করে আনার কথা তার। কিন্তু আকবরকে দেখতে পেলেন না বাদশা আলমগীর। ভাবলেন, বন্দিকে নিয়ে যে বাহিনী আসছে, সেটা হয়তো পিছনে পড়ে গিয়েছে। বৃষ্টির জন্য একটা শব্দ কানে এল। পিছন ঘুরে দেখলেন। জাহানারা আসছে। বাদশার দিদি। মোটে ৬৭ বছর বয়স। এখনই নুয়ে পড়েছে। শিরদাঁড়ায় জোর নেই। হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি লাঠিতে ভর দিয়ে চলাফেরা করে। ঔরঙ্গজেবের চেয়ে মোটে চার বছরের বড়। ঔরঙ্গজেব কিন্তু এখনও শিরদাঁড়া সোজা রেখে চলতে দাঁড়াতে বসতে পারেন।
জাহানারা ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করলেন, “কোনও খবর আছে নাকি?' ‘কার, কোন খবরের কথা জানতে চাইছ?'
‘আকবরের।’
‘এখনও জানি না। তবে ওয়াজিম খান এসে গিয়েছে।'
জাহানারা নিজের বুকের ধুকপুকুনি শুনতে পেলেন। আকবরের বিদ্রোহের খবর যবে থেকে পেয়েছেন, তবে থেকে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে মোটেই ভাল নেই । ঔরঙ্গজেবের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি যতটা চিন্তিত, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি চিন্তা তাঁর মুঘল সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
আকবর যখন বাপের বিরুদ্ধে গর্জে উঠল, রাজপুতদের ভরসায়, জাহানারা বুকে বল পেয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, ফের মুঘল-রাজপুত ঐক্যে বাবরের প্রতিষ্ঠিত শাসক বংশের ভিতটা আরও মজবুত হবে। নইলে, বেশ বুঝতে পারেন, ভিতে ঘুন ধরেছে। ভেতরে ভেতরে কাঁদেন। বাইরে চোখের জল বের হতে দেন না।
এখন আকবরকে নিয়ে ঔরঙ্গজেব কী করে, সেটাই দেখার। সেটাই আশঙ্কার। ওয়াজিম খান কক্ষে প্রবেশ করল। জানাল, বাদশার পরিকল্পনা সফল। বেশিরভাগ রাজপুত, তাহাবুর খান এবং আকবরের বহু সেনা তার সঙ্গে এসেছে। বাদশা আলমগীরের সঙ্গে দেখা করে তারা আত্মসমর্পণ করতে চায়। চায় ক্ষমা প্রার্থনা করতে।
এইটুকু শুনেই ঔরঙ্গজেব হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা করার ভঙ্গিতে বলে ওঠেন, 'আল্লা আমার আর্জি কবুল করেছেন। সামরিক শক্তির নয়, ন্যায়ের জয় নিশ্চিত করেছেন। তাঁকে অশেষ অসংখ্য ধন্যবাদ।'
জাহানারা আর ধৈর্য রাখতে পারেন না। বলে ওঠেন, “আর আকবর? সে কোথায়? তার কোনও খবর নেই?'
জাহানারার কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা গোপন থাকে না।
“আমার ধারণা, সে রাজপুতদের একাংশের কাছে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। তাই তো ওয়াজিম খান?' বাদশা জিজ্ঞেস করেন।
ওয়াজিম মুখে কিছু না বলে কেবল সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে।
উল্লসিত ঔরঙ্গজেব বলে ওঠেন, “খুব ভাল কথা। মুয়াজ্জাম দু-একদিনের মধ্যেই ফিরে আসছে। ওকেই পাঠিয়ে দেব আকবরকে ধরে আনার জন্য।'
আকবর আর আজম দিলরাস বানুর দুই ছেলে। ঔরঙ্গজেবের ঔরস।
তেমনই আর মুয়াজ্জাম আর মহম্মদ সুলতান নবাব বাইয়ের দুই ছেলে। ঔরঙ্গজেবেরই ঔরস।
জাহানারার স্মৃতিপটে তখন পুরনো দিনের ছবি। ছেঁড়া কাঁথার ওপর শায়িত দারা শুকোর মৃতদেহ। ঔরঙ্গজেবের সেনাদের হাতে ধরা পড়ার পর তাঁর ওই হাল হয়েছিল। সেই রক্তমাখা শব দিল্লির রাস্তায় হাতির পিঠে চাপিয়ে ঘুরিয়েছিল সদ্য ক্ষমতা দখল করা ঔরঙ্গজেব।
নিজের দাদার ওই হাল যে করেছিল সিংহাসন নিষ্কণ্টক করার জন্য, নিজের ছেলেকেও সে ছাড়বে না।
আগামীর কথা ভেবে শিউরে ওঠেন জাহানারা।
‘ঔরঙ্গজেব, এখনও পর্যন্ত তোমার পরিকল্পনায় বিনা রক্তপাতে সব বিদ্রোহ দমন করা সম্ভব হয়েছে। মনে হয়, আগামী দিনেও আমাদের রাজপুত বন্ধুরা, আমাদের পরিবারের সদস্যরা...'
বক্তব্য শেষ করতে পারেন না জাহানারা। ঔরঙ্গজেব বলে ওঠেন, ‘সবাই তোমার মতো উদার হৃদয় নয়। কতগুলো রাজপুত মরল তা নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই। আর যদি আকবরের কথা বল, তবে শুনে রাখো, আকবর আর আমার পরিবারের কেউ নয়। যারা আল্লাহ এবং বাদশাহের প্রতি অনুগত, তারা কেউ মারা যাবে না, এটুকু আমি তোমায় নিশ্চিত করে বলতে পারি।'
কী হতে চলেছে, টের পেয়ে চুপ করে গেলেন জাহানারা।
ভেবেছিলেন, মুঘল হারেমে যত অন্তঃপুরিকা আছে, তাদের সবার স্বাক্ষর করা দস্তখত দিয়ে বাদশা আলমগীরের কাছে আর্জি জানাবেন, আকবরকে প্রাণে না-মারার জন্য। জেবউন্নিসাকে তিনি এ ব্যাপারে পাশে পাবেন এবং তাতে ভালই হবে, এমনটাই ধারণা ছিল তাঁর।
কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টাও কাটল না। সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। ভেস্তে দিল ওয়াজিম খানের নয়া আবিষ্কার। আকবরের ফেলে যাওয়া সেনা ছাউনিতে একটা ছাইয়ের গাদা থেকে ওয়াজিম খানের বিশ্বস্ত সেনারা আবিষ্কার করেছে একটা আধপোড়া চিঠি। জেবউন্নিসা লিখেছিলেন আকবরকে।
ওয়াজিম খান সেই অর্ধদগ্ধ পত্রখানি তুলে দিল বাদশার হাতে। চোখের কাছে এনে চিঠিতে চোখ রাখলেন তিনি। ভ্রু কুঞ্চিত হল। জাহানারা টের পেলেন, আগ্নেয়গিরি এখন বিস্ফোরণের অপেক্ষায়।
জেবউন্নিসা ঔরঙ্গজেবেরই মেয়ে। তারও মা দিলরাস বানু। জেবউন্নিসা আকবরের সহোদরা। আকবরের সঙ্গে তার মানসিক নৈকট্যও প্রচুর।
বুঝতেই পেরেছিলেন, চিঠিতে কী থাকতে পারে। তবু জানতে চাইলেন। বিরক্ত মুখে জবাব দিলেন ঔরঙ্গজেব, ‘কী আবার! ওই একই ব্যাপার। বিশ্বাসঘাতকের দল যত। জেবউন্নিসা আকবরের বিদ্রোহকে সমর্থন করে চিঠি লিখেছিল।'
কতকিছুই না ভেবেছিলেন জাহানারা। ঠিক করেছিলেন অন্তঃপুরের জেনানাদের জোটবদ্ধ করে আর্জি পেশ করবেন বাদশার দরবারে। গৌহারারা, জানি, জেবউন্নিসা, এমনকী উদিপুরি মহলকেও পাশে পাওয়ার আশা করেছিলেন। ভেবেছিলেন, সকলে মিলে বললে বাদশাই আর ‘না' করতে পারবেন না। আকবর অন্তত এ যাত্রায় প্ৰাণে বেঁচে যাবে। কিন্তু এখন তেমনটা করলে পুরো জেনানা মহল বিদ্রোহীদের সঙ্গে, এমনটা ধরে নিয়ে সবাইকে কয়েদ করবেন ঔরঙ্গজেব। এটা ভালমতোই জানা আছে জাহানারার। ‘জেবউন্নিসাটা বড্ড বোকা। ভাইকে ভীষণ ভালবাসে। তাই এমন সব কথা লিখে ফেলেছে। ভাই-বোনের ভালবাসা যে কত শক্তিশালী হয়, সে তো তুমি জানই ঔরঙ্গজেব।'
আলমগীর একটু হাসলেন। ম্লান হাসি। তাতে দমলেন না জাহানারা। বলে চললেন, ‘আমাদের বাবা সম্রাট শাহজাহানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলে তুমি। তখন এই ভাইয়ের প্রতি টানেই রোশন-আরা তোমার পক্ষ নিয়েছিল, বাবাকে সমর্থন করেনি। তখন বাবার কতটা কষ্ট হয়েছিল, সেটা নিশ্চয় তোমার এখন মালুম হচ্ছে।'
ভাইবোনের ভালবাসা, পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ, এসব কথা যতক্ষণ জাহানারা বলছিলেন, ততক্ষণ ঔরঙ্গজেবের ঠোঁটের কোণে ম্লান হলেও টুকরো হাসি লেগেছিল। এখন, রোশন-আরার সঙ্গে জেবউন্নিসার তুলনা এবং তাঁর সঙ্গে শাহজাহানের, তাঁর কপালে ভাঁজগুলো ফিরিয়ে আনল।
জাহানারা বুঝলেন, তিনি ভুল তাস খেলেছেন। একেবারে মুখ ফসকে হলেও এরকম কথা বের না হলেই ভাল হত। তড়িঘড়ি ক্ষতে মলম দেওয়ার জন্য প্রসঙ্গ বদলালেন।
‘আমার মনে হয়, জেবউন্নিসা আর আকবরের ব্যাপারে দ্রুত কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ঠিক হবে না। মনে আছে, ইংরেজ বণিক নিকোলাস ব্যালেটাইনের সঙ্গে মিলে আমি মসনদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছি, এই অভিযোগে সম্রাট শাহজাহান আমাকে একবার কয়েদ করেছিলেন। আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই বন্দিশালায় পোরা হয়েছিল। পরে টের পান, বিরাট ভুল হয়ে গিয়েছে, সেরকম ভুল কিন্তু তুমি আবার করে বোসো না। জেবউন্নিসাকে অন্তত তোমার সামনে ডেকে এনে তার বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দাও। তারপর যেটা ঠিক মনে হয়, সেটাই কোরো।'
‘না।’ স্থির কণ্ঠে ধীরভাবে উচ্চারণ করলেন বাদশা আলমগীর। ‘এই পোড়া চিঠি থেকে যেটুকু পড়া যাচ্ছে। তাতেই বেশ স্পষ্ট, জেবউন্নিসা কী করতে চায়। ওকে চোখের সামনে ডেকে আনলে আমি দুর্বল হয়ে পড়ব। তার দরকার নেই। মৃত্যুদণ্ডই ওর প্রাপ্য । ওকে সেই শাস্তিই আমি দেব। তাতে অন্তত সব্বাই এটুকু বুঝে যাবে যে, ঔরঙ্গজেব নারী হোক বা পুরুষ, পরিবারের কেউ হোক বা অনাত্মীয়, কোনও বিশ্বাসঘাতককেই রেয়াত করে না।'
জাহানারার শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। তাঁর মনে হল, তিনি শীগগির জ্ঞান হারাবেন।
মূর্ছা যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে তাঁর কানে গেল, বাদশা আলমগীর আপন তনয়া জেবউন্নিসাকে আজমেঢ় থেকে নিয়ে গিয়ে গোয়ালিয়রে কয়েদ করার নির্দেশ দিচ্ছেন।
আর কানে গেল, মুয়াজ্জাম আজমেঢ়ের দুর্গে এসে পৌঁছেছে।
দিন দুই বাদে দেখা হল মুয়াজ্জামের সঙ্গে।
মুয়াজ্জাম আসামাত্র ঔরঙ্গজেব তাকে ধন্যবাদ জানালেন। বললেন, “যে দ্রুততায় তুমি মেবারে সাফল্য পাওয়ার পর এখানে এসে হাজির হলে, তা রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছে আমাকে।'
বাবার প্রশংসায় বিন্দুমাত্র উচ্ছ্বাস দেখাল না মুয়াজ্জাম। ম্লান হেসে শুধু বলল, ‘সুকরিয়া আব্বাজান।’
‘কিন্তু এটুকুতে তো আর আমার প্রতি তোমার আনুগত্য পুরো মাত্রায় প্রকাশ হচ্ছে না মুয়াজ্জাম।'
মুয়াজ্জাম চুপ করে পরবর্তী আদেশের অপেক্ষা করতে থাকে।
‘এবার যাও, বন্দি করে আনো আকবরকে। দিল্লিতে যদি নিয়ে আসতে না পারো তবে তাকে হত্যা করো। দ্বিধা কোরো না।'
‘আমি চেষ্টা করব আব্বাজান। ধরে আনতেই চেষ্টা করব। হাজার হোক ভাই আমার। তাই হত্যা না করার...।'
‘এ ভুল কোরো না, মুয়াজ্জাম। ও তোমার ভাই ছিল, এখন আর নেই। ঠিক যেভাবে জেবউন্নিসাও আর তোমার কেউ নয়। বিশ্বাসঘাতকতার একটাই শাস্তি,
মৃত্যু।' ‘আপনার আদেশ পালনের চেষ্টা করব জাঁহাপনা।' মুখ নামিয়ে বলে মুয়াজ্জাম । জেবউন্নিসাকে যখন আজমেঢ় দুর্গ থেকে সরিয়ে গোয়ালিয়রে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন গোপনে ভাইঝির কাছে একটা আশ্বাসবার্তা পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন জাহানারা জানিয়েছিলেন, ঔরঙ্গজেবের রোষ থেকে তাকে বাঁচানোর জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করবেন। তাঁর চেষ্টার পরিণতি যে ইতিবাচক হবে, সেকথাও তিনি অগোপন রাখেননি। কিন্তু এখন ঔরঙ্গজেবের ভাবগতিক দেখে বেশ বুঝতে পারলেন, জেবউন্নিসাকে বৃথা স্তোকবাক্য শুনিয়েছেন।
‘যাও মুয়াজ্জাম, আকবরকে ধাওয়া করতে দেরি কোরো না।'
ঔরঙ্গজেবের কথা শুনে মুয়াজ্জাম কক্ষ ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত হল। জাহানারাও উঠে দাঁড়ালেন হাতির দাঁতের তৈরি লাঠিতে ভর দিয়ে। তারপর মুয়াজ্জামকে চুমু খাওয়ার অছিলায় তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘তোমার, তোমার ভাইয়ের এবং এই মুঘল বংশের স্বার্থে তাড়াহুড়ো কোরো না। তৈরি হতে যত বিলম্ব করবে তত সবারই মঙ্গল।'
মুয়াজ্জামের মুখের কাঠিন্য আর চিন্তা নিমেষে উধাও। এতক্ষণ কী করবে সে, ভেবে পাচ্ছিল না। কোনও উপায় মাথায় আসছিল না। এখন ফুফার কথায় মনে হল, একটা সহজ উপায় সে খুঁজে পেয়েছে।
তার মুখের মুহূর্তের মধ্যে পরিবর্তন কিন্তু ঔরঙ্গজেবের সতর্ক দৃষ্টি এড়াল না । তিনি মনে মনে সামান্য একটু হাসলেন।
‘এই আলোতে তো আমাদের নদী পার হতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, তাই না যোগীন্দর?' কপাল থেকে ঘাম মুছতে মুছতে বললেন আকবর। একটা নদীর পাড়ে ঝোপের মধ্যে দাঁড়িয়ে দু'জনের ঘোড়া।
আকবরের কথায় সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল যোগীন্দর। তার বাবা অম্বরের রানা পাঁচশোর মতো রাজপুত সেনা দিয়েছেন। তাদের নিয়ে দক্ষিণ দিকে এগোচ্ছে আকবর। এই অশ্বারোহী বাহিনী সংখ্যায় বড় না হতে পারে, কিন্তু তাদের আনুগত্য নিয়ে কোনও তরফে কোনও সন্দেহ নেই। এদের পেয়ে আকবর ফের আশার আলো দেখতে শুরু
করেছেন।
তাঁর আশাবাদী হওয়ার আরও একটা কারণ আছে। শিবাজির পুত্র শম্ভুজির কাছে মিত্রতার প্রস্তাব দিয়ে দূত পাঠিয়েছিল আকবর। সেই দূত ফেরত এসেছে। শম্ভুজি জানিয়েছেন, যেহেতু তাঁর ও আকবরের শত্রু একজনই, ঔরঙ্গজেব, সেহেতু তাঁদের মিত্রতায় কোনও অসুবিধা নেই।
দক্ষিণে আকবর পৌঁছালে শম্ভুজি তাঁর বাহিনী নিয়ে আকবরের সঙ্গে যোগ দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মারাঠা-মুঘল-রাজপুত ঐক্য হিন্দুস্থানের বুকে নতুন সূর্যের উদয় ঘটাবে। এমন স্বপ্নে বুঁদ হয়ে যান আকবর। বারবার তাঁর মনে পড়ে যায় শম্ভুজির লেখা চিঠির কয়েকটা লাইন ৷
‘আমরা সবাই হাতে হাত মিলিয়ে বাদশা আলমগীরকে দেখিয়ে দেব, নানা ধর্ম ও জাতির লোকেরা জোটবদ্ধ হয়ে মহান হিন্দুস্থান নির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে পারে। এদেশ নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধানের দেশ, কিন্তু বিবিধের মাঝে মহান মিলনের আদর্শই এ দেশের প্রকৃত আদর্শ।'
যোগীন্দরকে পঞ্চাশজন রাজপুত ঘোড়সওয়ার সমেত আগে নদী পার হওয়ার নির্দেশ দিলেন আকবর। তারা নদী পার হওয়ার পর আকবর নিজের বাহিনী নিয়ে নদী পার হওয়ার জন্য তৈরি হলেন। ঝোপের মধ্যে ঘোড়ার লাগামটা চেপে ধরে নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগলেন অগভীর নদীটা পার হওয়ার জন্য।
হঠাৎ মনে হল ঘোড়াটার পা পিছলে গেল। আর নিজের উরুতে অনুভব করল যন্ত্রণা। হাত দিয়ে দেখলেন, রক্ত বের হচ্ছে। কী হল বুঝে ওঠার আগেই এক ঝাঁক তির। আকবর বোঝার চেষ্টা করলেন, যোগীন্দরের বাবার দেওয়া রাজপুত সেনারাই শেষ পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনও অজ্ঞাত কারণে বিদ্রোহ করে বসল কি না।
কিছু ঠাহর করতে পারার আগেই চোখে পড়ল, ঝোপ থেকে একজন দাড়িওলা ঘোড়সওয়ার বেরিয়ে এল। হাতে খোলা তলোয়ার। আকবর ততক্ষণে কোমরে রাখা তলোয়ার খাপ থেকে বের করে এনেছেন।
লোকটা শাঁ করে তলোয়ার চালাল। একেবারে আকবরের গলা লক্ষ্য করে। তলোয়ার চালানোর সময় হিসহিসিয়ে বলে উঠল, ‘বাদশা আলমগীর জিন্দাবাদ। তার দুশমনরা সব মুর্দাবাদ।'
ততক্ষণে আকবর নিজের তলোয়ার বসিয়ে দিয়েছে আগন্তুকের ডান বগলের নিচের দিকের অংশে। গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। তাও লোকটা আরও একবার আকবরকে আক্রমণ করার চেষ্টা চালাল। শরীর থেকে রক্ত বেরিয়ে যাওয়ায় দুর্বল হয়ে পড়ছে সে। তাই তেমন জুত করতে পারল না। উল্টে আকবর তার তলপেটে তলোয়ার গেঁথে দিলেন। লোকটা ঘোড়ার পিঠ থেকে নদীর জলে গিয়ে পড়ল।
এরমধ্যে আকবরের সেনারা এসে পড়েছে। আকবরের চারদিকে উভয় বাহিনীর তলোয়ারের ধাতব শব্দ শোনা যাচ্ছে। আর শোনা যাচ্ছে মাঝে মধ্যে গুলির শব্দ।
আচমকা আকবর জলে পড়ে গেলেন। কোমরে তলোয়ারের হাতলটা শক্ত করে ধরা। মনে হল, কী যেন পেছনে তাঁকে টানছে। পায়ের নীচে নদীর কাদায় ভরা পাড়। আকবর দেখতে পেলেন একজোড়া হলদেটে চোখ। আর একজোড়া ত্রিকোণ চোয়াল ।
কুমির! আঁতকে উঠলেন তিনি।
আকবর সর্বশক্তি দিয়ে তলোয়ারটা গেঁথে দিলেন কুমিরটার খোলা মুখে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল।
কুমিরটা বেদম জোরে ল্যাজ ঝাপটাল।
আকবরের তরবারি ততক্ষণে তার টাগরা ফালা করে ফেলেছেন।
কুমিরটা স্থির হয়ে গেল।
আকবর দেখলেন নদীর অন্য পাড় থেকে যোগীন্দর আর তার সেনারা তাঁর সঙ্গে কুমিরের লড়াই দেখতে পেয়ে হইহই করে এদিকেই এগিয়ে আসছে।
না ।
আকবরের মনে হল তাঁর সমস্ত শক্তি নিঃশেষিত। আর উঠে দাঁড়াতে পারবেন
এমন সময় একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার।
আর তার পরেই গুলির শব্দ।
আকবর দেখলেন আর একটা কুমির এগিয়ে এসে একজন সৈনিককে কামড়ে ধরেছে। গলগলিয়ে রক্ত পড়ছে সেই সৈনিকের পা বেয়ে। তার হাতটা এলিয়ে পড়ে আছে। আর, এই দৃশ্য দেখে আকবরের সেনাবাহিনীর কেউ কুমিরটাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে।
কুমিরটা যে সৈনিকটিকে কামড়ে ধরেছিল তার পোশাক দেখেই বোঝা গেল সে কোন পক্ষের। খানিকক্ষণ আগেই আকবরের ওপর তরবারি নিয়ে আক্রমণ চালিয়েছিল যে, এই ব্যক্তির পোশাক তারই অনুরূপ। অর্থাৎ সেও আক্রমণকারী দলটির সদস্য। কুমিরের দাঁত তার সাদা চর্বি ভেদ করে গোলাপি স্তরে পৌঁছে গিয়েছে। লোকটা হড় হড় করে খানিকটা বমি করল। জল কাদা রক্ত বমি, সব মিলেমিশে একাকার।
আকবর দেখলেন যে বাহিনী তাঁদের ওপর আক্রমণ করেছিল সেই বাহিনীর অনেকেরই লাশ এদিক ওদিক পড়ে আছে। বাকিরা তাঁর সেনাদের তাড়া খেয়ে চম্পট দিয়েছে। আকবর কুমিরে খাওয়া অর্ধমৃত শরীরটার কাছে এগিয়ে গেল। তাকে ব্যাপারটা বুঝতে হবে।
‘তোমরা কারা? হঠাৎ আমার ওপর হামলা চালালে কেন?”
লোকটা কোনওরকমে যা বলল তার থেকে বোঝা গেল, এরা স্থানীয় ফৌজদারের সেনা। এখান থেকে প্রায় দশ মাইল দূরে মুঘল দুর্গে এদের আস্তানা। ফৌজদারটি ঔরঙ্গজেবের ভয়ানক অনুগত। তীব্র আনুগত্যের বশেই সে তার বাহিনীকে পাঠিয়েছিল আকবরকে নিকেশ করার জন্য। দিল্লি থেকে যা খবরাখবর আসছে তাতে তারা নিশ্চিত বাদশাহ তাঁর বিদ্রোহী সন্তানকে খতম করতে চান। তাই আকবরকে মারতে পারলে দারুণ ইনাম জুটবে, এই আশাতেই এই হামলার পরিকল্পনা।
কথা বলার ফাঁকেই লোকটা আরও তিনবার বমি করল।
ঔরঙ্গজেবের অনুগত আহত সেনাটিকে নিজের পিঠে তুলে নিলেন আকবর। তারপর এগিয়ে চললেন নদী ছেড়ে শুকনো ডাঙার উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে বললেন, ‘আমি তোমাকে আমার হাকিমের কাছে নিয়ে যাচ্ছি। তিনি তোমাকে দাওয়াই দেবেন। ক্ষত সেলাই করে পট্টি বেঁধে দেবেন। তুমি প্রাণে বেঁচে যাবে।'
কথা বলতে পারছে না লোকটি। শুধু ফিসফিস করে বলল, ‘আমাকে বাঁচালেন কেন? আমি তো আপনাকে মারতে এসেছিলাম।'
‘বাঁচালাম, কারণ আমার নিজের জান বাঁচিয়েছেন দু'জন। একজন হিন্দু রাজপুত আর একজন মুসলমান। সে আমার অনুগত বিশ্বস্ত দেহরক্ষী। তুমি ফিরে গিয়ে সে কথাটা বোলো।
‘লোকটার কণ্ঠস্বরে বোঝা যাচ্ছে সে ক্রমশ দুর্বলতর হচ্ছে। প্রাণবায়ু প্রায় নিঃশেষিত । তবু, তবুও একে বাঁচাতেই হবে। আকবর আরও জোরে পা চালালেন। যেতে যেতেই বললেন, ‘বোলো তুমি যাকে মারতে এসেছিলে, তোমরা যাকে মারতে চাইছিলে, সে আর তার লোকজনই তোমার প্রাণ বাঁচিয়েছে। যে তোমার প্রাণ বাঁচিয়েছে, হিন্দু-মুসলমান মিলে তার প্রাণ বাঁচিয়েছিল। হিন্দু মুসলমান একযোগে কাম করলে, হাতে হাত মেলালে হিন্দুস্তানের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। যে তোমাকে বাঁচিয়েছে, হিন্দুস্থানকে বাঁচানোর জন্য, হিন্দু-মুসলমানের মৈত্রী ও সংহতিকে বাঁচানোর জন্যই সে হিন্দুস্তানের মসনদে বসতে চাইছে। নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার জন্য সে বাবার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেনি।' অনেকগুলো কথা। একনাগাড়ে বলার পর আকবরও অনুভব করলেন তাঁর শক্তিও কমছে। পা দিয়ে রক্ত ঝরছে। হাত দিয়েও। শরীরের আর কোথায় কোথায় তরবারির ঘা কিংরা কুমিরের দাঁত বসেছে, সে টেরও তিনি পাননি।
কাঁধ থেকে সৈনিকের দেহটা নামিয়ে মাটিতে শুইয়ে দিলেন আকবর। সৈন্যরা এগিয়ে এল। যোগীন্দরও এসে পড়েছে।
মাটিতে বসে পড়ে আকবর কোনওক্রমে নির্দেশ দিলেন, ‘একে এক্ষুনি হাকিমের কাছে নিয়ে যাও। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে এর প্রাণবায়ু প্রায় ফুরিয়ে যাওয়ার মুখে। কিন্তু একে বাঁচিয়ে রাখা দরকার। খুবই দরকার।'
‘আপনাকেও হাকিমের কাছে নিয়ে যাওয়াটা খুবই জরুরি ভারত সম্রাট।' যোগীন্দরের কথা শুনে তার দিকে তাকিয়ে আকবর একটু হাসলেন।
সূর্যদেব পাটে গেলেন। চরাচর জুড়ে আঁধার নামল। সেনারা সব মশাল জ্বালাল ।
আকাশে তারারা একটা দুটো করে জ্বলা শুরু করল।
আকবর মনে মনে ঠিক করলেন, আজ রাতেই নদী পার হতে হবে। অনুভব করলেন, শরীর জুড়ে ব্যথা বাসা বেঁধেছে।
‘জবাব তোমাকে দিতেই হবে মুয়াজ্জাম।'
রাগে ফেটে পড়ল বাদশা আলমগীরের কণ্ঠস্বর।
‘আমি ভাবতেও পারিনি আকবর আর তার সেনারা ঘুরে ঘুরে বেড়াবে আর তুমি তাকে না মেরে, না ধরে, আজমেঢ়ে ফিরে আসবে। তোমাকে কী দিইনি মুয়াজ্জাম ? প্রশিক্ষিত সেনাদল। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র। দেদার অর্থ। কী দিইনি! আর তুমি কী করলে? বিশ্বাসঘাতক আকবরের টিকিটাও ধরতে পারলে না। ধিক তোমাকে! তোমার ওপর আস্থা রাখাটাই আমার ভুল হয়েছিল।'
প্রকাশ্যে, সবার সামনে তাকে এভাবে অপমানিত হবে, সেটা দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি মুয়াজ্জাম।
এবং সেটা এত তাড়াতাড়ি হবে, এটাও তার কল্পনায় ছিল না।
যুদ্ধ থেকে ফিরে পোশাক বদলের সময়টুকুও সে পায়নি। পড়তে হল বাদশার তোপের মুখে।
পাঁচ মাস পর প্রত্যাবর্তন। ভেবেছিল, বাদশা তাকে একান্তে ডেকে পাঠাবেন। তিরস্কার করলেও একান্তে করবেন। কিন্তু এভাবে উজির এবং ফৌজদারদের সামনে এই ভাষায় তাকে অপমান করবেন, এটা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি।
‘জাঁহাপনা! আমি আপনাকে পত্রযোগেও ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলেছিলাম।'
আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য মুয়াজ্জাম কথা বলতে শুরু করল। ধীরে ধীরে এবং মিইয়ে যাওয়া গলায়। বাদশার হম্বিতম্বির উত্তরে সেটা আরও বেশি দুর্বল শোনাল।
‘আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করেছি। আমি ও আমার সেনারা। কিন্তু আকবর দৌড়টা শুরু করেছে তিন-চারদিন আগে। ওই তিন-চারদিনের ফারাকটা মেটানোর মতো গতি আমাদের ঘোড়াদের ছিল না। তা ছাড়া, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমাদের বাহিনীর মধ্যে আকবরের গুপ্তচরেরা ঢুকে ছিল। ওরা সব খবর আগেভাগে পেয়ে যাচ্ছিল।
‘এর পরেও আমরা মারাঠা পর্বতের ভেতর তাকে কোণঠাসা করে ফেলেছিলাম। কিন্তু প্রকৃতি বড্ড প্রতিকূল ছিল সেখানে। এই মরশুমের মতো গরম মারাঠা পর্বতে বোধ করি কস্মিনকালেও পড়েনি। সকালে ঘোড়া ছোটানোই দায় হয়ে দাঁড়াচ্ছিল।
‘তাও চেষ্টার কসুর করিনি। কিন্তু স্থানীয় লোকজন বাদ সাধল। গাঁয়ের পর গাঁয়ের মানুষ রাতারাতি গাঁ ছেড়ে পালাত। আমরা গ্রামে ঢুকে খাবার-দাবার তো দূর অস্ত্র, পানীয় জলটুকুও পেতাম না। লোকজন গাঁ ছাড়ার আগে পুকুর আর কুয়োর জলে বিষ মিশিয়ে দিত। ওই বিষাক্ত জল খেয়েই সৈয়দ আজিজ মরে গেল। আমার অন্যতম সেনাপতি আজিজ। রক্ত বমি করে মরল ও। আমাদের দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে হল। হাকিম সঙ্গে ছিলেন, কিন্তু কিস্যু করতে পারলেন না।
‘এর পর এল বর্ষা। সমস্যা আরও বাড়ল। কাদায় ঘোড়ার ছুটতে অসুবিধা। সেই সঙ্গে ছাউনিতে ছাউনিতে জ্বর আর পেটের রোগ ছড়িয়ে পড়ল। হাকিম সাহেবেরা জেরবার। কিছুই করতে পারলেন না। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে দিনে দু'-তিন মাইলের বেশি যেতে পারতাম না।
‘এর মধ্যে খবর পেলাম মারাঠারা আকবরের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। রাজপুত-মারাঠার মিলিত বাহিনীর মোকাবিলা করার মতো লোকবল আমাদের ততদিনে শেষ। বিষ জল আর বর্ষার ব্যাধিতে বহু সৈন্য মারা গিয়েছে। যারা বেঁচে তাদেরও অধিকাংশ ধুঁকছে। ‘সেজন্যই প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে হল। আকবরকে না মেরে কিংবা ধরেই ফিরে আসতে হল। বলা ভাল, ফেরত আসতে বাধ্য হলাম আমরা।'
ঔরঙ্গজেব সবটা শুনলেন। একটা কথাও বললেন না। তাঁর কপালের ভাঁজ গভীরতর হল।
মুয়াজ্জাম এত কথা বলল। কিন্তু সযত্নে গোপন করল একটা কথা। এই পাঁচ মাস ধরে নিরন্তর যে শব্দগুলো জলের মতো ঘুরে ঘুরে তার মস্তিষ্কে ঢেউ তুলে বেড়িয়েছে, সেই কথা। জাহানারার বলা কথাগুলো।
‘তোমার, তোমার ভাইয়ের এবং এই মুঘল বংশের স্বার্থে তাড়াহুড়ো কোরো না। ..যত বিলম্ব করবে তত সবারই মঙ্গল।'
এই শব্দপুঞ্জ প্রতিদিন তাকে শ্লথ করেছে।
এই শব্দপুঞ্জ রোজ তার রাশ টেনে ধরেছে।
এই শব্দপুঞ্জ আসলে তো তারই হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ।
সে জানে, আকবর রক্তপিপাসু নয়।
সে জানে, আকবর মুঘল সিংহাসনে বসার জন্য মরিয়া নয়।
সে জানে, আকবর তার ভাইদের আর বাবাকে মেরে ফেলে ক্ষমতা দখলের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েনি।
তবে কেন তার প্রাণ সাড়া দেবে আকবর নিধনের ডাকে?
আকবরের পরিকল্পনা যদি সফলও হত, তাহলেও যে আকবর মুয়াজ্জাম কিংবা সুলতান কিংবা কমবক্স কিংবা আজমকে মেরে ফেলত না, এ বিষয়ে মুয়াজ্জাম নিশ্চিত । তাই প্রখর গ্রীষ্ম আর প্রতিকূল বর্ষাকে ঢাল করে সে আকবরকে ধাওয়া করার অভিযান বিলম্বিত করেছে বারবার। সে কথা বুঝতে দেয়নি কারোকে।
গোটা সভা নিঃস্তব্ধ। একটা আলপিন পড়লেও বোধ হয় শব্দ শোনা যাবে। কেউ একজন গলা খাঁকারি দিল। মুয়াজ্জামের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ । আরও দু-একজন কেশে উঠল। বাদশা আলমগীর সিংহাসনে সামান্য একটু নড়লেন। তারপর আস্তে আস্তে কেটে কেটে উচ্চারণ করলেন, ‘মুয়াজ্জাম! তোমার সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ যে তুমি করনি, সেটা পরিষ্কার।'
একটু আগে গলায় যে ঝাঁছ ছিল, তা উধাও। সেখানে এখন অদ্ভুত এক শৈত্য। চিৎকৃত তিরস্কারের চেয়ে এই হিমশীতল আওয়াজ অনেক বেশি ভয়ানক।
মুয়াজ্জাম তাও আত্মপক্ষ সমর্থনে আরও কিছু সাজিয়ে গুছিয়ে বলার চেষ্টা করল। সে যে চেষ্টা করছে কথা বলতে, এটা নজরে আসামাত্র ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে ইশারায় বাদশা আলমগীর তাকে চুপ করিয়ে দিলেন। তারপর একইরকম শৈত্য বজায় রেখে বলতে শুরু করলেন। হাতের আঙুলে তাঁর তৈমুরের ভারী বাঘ-আংটির জহরত ঝলসে উঠল। ঝলসে উঠল বাদশাহের চোখের কৃষ্ণমণিও। মুয়াজ্জাম সেই উদ্ধত বিরক্তির সামনে ভয়ে ও আতঙ্কে নতশির হল। ঔরঙ্গজেব বললেন, ‘আমি আবারও বলছি, স্পষ্ট করে বলছি, ওসব ঋতুজনিত প্রতিবন্ধকতা, ভৌগোলিক অবস্থান জনিত বাধা, বিলম্বের কারণ ইত্যাদি সব কিছু বাজে কথা। বেকার অছিলা। তোমার অতি সতর্কতাই তোমার ব্যর্থতার কারণ। এই ত্রুটি আমি আমার কোনও সেনাধ্যক্ষের ক্ষেত্রে সহ্য করি না। সে আমার ঔরস হলেও নয়।'
বাদশাহ এবার কী করবেন? আকবরকে না পেয়ে তারই গর্দান নেবেন শেষে! ভয়ে কেঁপে উঠল মুয়াজ্জামের অন্তরাত্মা। ঔরঙ্গজেব তখন শোনালেন তাঁর আদেশ, ‘তোমাকে সেনাধ্যক্ষের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হল। পরবর্তী সিদ্ধান্ত না জানানো পর্যন্ত অবসরে চলে যাও। আকবরকে ধাওয়া করা, তাকে নিকেশ করার দায়িত্ব আমাকেই পালন করতে হবে। আল্লাহর এটাই বোধ হয় ইচ্ছা। বিশ্বাসীর জন্য তিনি বোধহয় এরকম কঠিন পরীক্ষাই রাখেন।'
মুয়াজ্জাম আর কোনও কথা না বলে বেরিয়ে গেল। বেরিয়ে যাওয়ার সময় তার মনে হল, পর্দার আড়াল থেকে পুরো ঘটনাটা অবলোকন করছেন এক গতযৌবনা নারী। তাঁর শ্বেত পাথরের মতো গালে মুক্তোর মতো অশ্রুবিন্দু ঝলক দিচ্ছে। তিনি জাহানারা। তাঁর অদৃশ্য নিরুচ্চারিত আশীর্বাদ মনের গহনে টের পেল মুয়াজ্জাম। তার মনটা ভাল হয়ে গেল নিমেষে।
সিদ্ধান্ত হল, পরদিনই অভিযানে বের হবেন ঔরঙ্গজেব। রাতে উদিপুরীর মহলের ঘরে গেলেন তিনি।
‘আপনি আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন জানতে পেরে ভীষণ খুশি হয়েছি জাঁহাপনা।’
উদিপুরী পিছন থেকে জড়িয়ে ধরেছেন বাদশাকে। বাদশা পিঠে উদিপুরী মহলের বুকের ছোঁয়া পেলেন। এই মহিলাকে যখন এনেছিলেন, তখন তাঁকে উপপত্নীর চেয়ে বেশি কিছু করার কথা ভাবেননি। এখন সেই উদিপুরীই তাঁর প্রধানা মহিষী। কমবক্সের মতো সন্তানের জননী। বয়স হয়েছে। তবু তাঁর আদরে আলমগীর এখনও আহ্লাদিত হন। টের পান, নিছক শরীরী ভালবাসা নয়, গভীরতর কিছু সংগুপ্ত আছে তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক-রসায়নে।
মনে পড়ে গেল, হারেমে ঢোকার সময় প্রহরারত খোজাটি বলেছিল, অন্দরমহল ত্যাগের আগে তিনি যেন একবার জাহানারার সঙ্গে দেখা করে যান। তাই উদিপুরীর কক্ষ ছেড়ে ঔরঙ্গজেব সরাসরি চলে গেলেন জাহানারার কক্ষে। তাঁকে দেখে হাতির দাঁতের তৈরি লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন জাহানারা। শশব্যস্ত হয়ে উঠলেন ঔরঙ্গজেব। বলে উঠলেন, ‘আরে থাক, থাক! তুমি আবার উঠছ কেন?' ‘এত ব্যস্ততার মধ্যেও তুমি যে মনে করে আমার ঘরে এসেছ, এতেই নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে।'
ঔরঙ্গজেব ঈষৎ হাসলেন।
‘যাচ্ছ কখন?'
‘ঘণ্টা তিন-চারের মধ্যে প্রস্তুতি পর্ব শেষ হয়ে যাবে বলেই মনে হচ্ছে।'
‘আল্লা তোমার কল্যাণ করুন। তুমি যুদ্ধে গেলেই আমি বসে বসে এখানে তোমার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। এবার আর তা পারব বলে মনে হচ্ছে না।'
'কেন ?'
‘শরীরটা ক-দিন হল ভাল যাচ্ছে না। কেবলই মনে হচ্ছে, এবার জীবন-বাতি নেভার সময় হয়েছে।'
‘হাকিমকে পাঠিয়ে দিচ্ছি এখনই।'
‘হাকিমের দাওয়াইতে বোধ হয় এ রোগ সারার নয়, জাঁহাপনা। আমি বড্ড ক্লান্ত। সকালে বিছানা ছাড়তেই ইচ্ছে করে না।'
‘অত ভেবো না। হাকিম আসছে। ও যা যা দাওয়াই দেবে, নিয়মমাফিক খাও। যুদ্ধ শেষ হতে বেশিদিন লাগবে না এবার। ফিরে এসে ফের আজমেঢ়ের দুর্গে আমরা দু'জন নিভৃতে মুঘল তখতের বিজয় উৎসব পালন করব।'
‘কিন্তু আমার মন যে অন্য কথা বলছে।'
'কী?'
‘বলছে, এই ধুলোর দুনিয়ায় আমাদের আর দেখা হবে না ভাই।'
ঔরঙ্গজেব জাহানারার হাত দুটো ধরলেন। চর্ম মাংস কোথায়! অস্থিসর্বস্ব সেই শীর্ণ হাতদুটো নিজের মুঠিতে ধরে নিজেই চমকে উঠলেন বাদশা। শুধু মুখে বললেন, ‘এবার উঠি তাহলে বোন ।
‘একটা অনুরোধ। পারলে আকবর আর জেবউন্নিসাকে ক্ষমা কোরো।' ‘ফিরে আসি। তারপর এসব নিয়ে কথা বলা যাবে।'
‘না, এখনই কথা দাও আমাকে।'
‘সত্যি বলব। সম্ভব নয়। আকবর আর জেবউন্নিসার বিশ্বাসঘাতকতা ক্ষমার অযোগ্য।'
‘হ্যাঁ! সে তো বটেই। তখত আর কফিনের মাঝামাঝি তুমি তো আর কিছু দেখতে পাও না। কোনওদিনই পাওনি। আজ আর পাবে কী করে? ছোটবেলায় তোমার কথা কেউ না শুনলেই তাকে ঘুসি মেরে শুইয়ে দিতে। মনে আছে আমার।
‘জাহানারা’, গর্জে উঠলেন বাদশাহ আলমগীর, ‘এখানে বসে বসে তোমার জ্ঞান আর বিলাপ শোনার সময় নেই আমার। আমি শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তুমি তাড়াতাড়ি সেরে ওঠো।'
মুখটা নামিয়ে জাহানারার কপালে চুম্বন করলেন ঔরঙ্গজেব।
‘আমি তোমার সাফল্য কামনা করি ভাই। আল্লাহ মুঘল বংশের কল্যাণ করুন।' আর কোনও কথা না বলে নিষ্ক্রান্ত হলেন ঔরঙ্গজেব। একবার পিছন ফিরে দেখতে ইচ্ছে করল জাহানারাকে। সে ইচ্ছায় আমল দিলেন না।
বাইরে তখন হাতির ডাক শোনা যাচ্ছে। বাহিনী প্রস্তুত হচ্ছে।
সদলবলে প্রাসাদ ছাড়ার সময় ঔরঙ্গজেব দেখলেন, অন্যবারের মতো এবারেও তাঁর দুই বোন জাহানারা আর গৌহারারা বারান্দায় দাঁড়িয়ে নীরবে তাঁকে বিদায় জানাচ্ছেন।
‘বিদায় আমার প্রিয় ভাই। তুমি একটু শান্তি পাও ।
জাহানারার ফিসফিসানি ঔরঙ্গজেবের কানে পৌঁছাল না। পৌঁছানো সম্ভবও ছিল না। বাদশার কানে তখন বৃংহন আর রণোল্লাস ৷ চোখে তখন শত্রুনাশের রক্তমাখা দৃশ্য ৷ বুকে জয়ের বাদ্যি। তার মধ্যে ব্যক্তিগত আবেগের কোনও জায়গা তিনি রাখেননি। কোনওদিনই রাখেন না ।
আকবরের কথা মনে পড়তেই তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে যাচ্ছে। শত জাহানারার কান্নার ছবিও তাতে শৈথিল্য আরোপে অক্ষম।
‘মৃত্যুদণ্ডই এদের একমাত্র শাস্তি। এই বেয়াদপরা আমার মালবাহী সেনাদের মেরেছে। এক্ষুনি এদের মেরে ফেলার বন্দোবস্ত করে ফেলা হোক।'
ঔরঙ্গজেব চিৎকার করে উঠলেন।
তাঁর সামনে ছয়জন মারাঠা সৈনিক হাঁটুমুড়ে বসে আছে। হাতগুলো পিছমোড়া করে বাঁধা। একজন দু'জন চেঁচামেচি করছিল। প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা করছিল। মুঘল সেনাদের লাথি খেয়ে তারা চুপ করতে বাধ্য হল। একজন বন্দুক তাক করল মারাঠাদের দিকে। ঔরঙ্গজেব তাকে নিবৃত্ত করলেন। বললেন, ‘আরে! আল্লাহর কাছে গুনাহ করেছে যারা আর যাদের ইন্তেকাল আসন্ন, তাদের জন্য বন্দুকের গুলি খরচ কোরো না। এগুলো নরকের কীট।'
‘আমরা নরকের কীট! আর তুমি কী? একটা শয়তান।' বলতে বলতে ঔরঙ্গজেবের মুখে থুথু ছিটিয়ে দিল এক মারাঠা সৈনিক। বলে উঠল, ‘শম্ভুজির নেতৃত্বে আমরা তোমাদের হিন্দুস্থান ছাড়া করব।'
শম্ভুজি। মানে শিবাজির ছেলে। গুপ্তচরেরা ঔরঙ্গজেবকে বলেছিল, শম্ভুজি তার বাবার মতো দাপুটে নন। তা যদি হবে তবে এরা শম্ভুজির প্রতি এত অনুগত কেন? তবে কি চরেরা তাঁকে ভুলভাল খবর দিয়েছে? নিজের মনেই প্রশ্ন করেন ঔরঙ্গজেব।
ঠিক তখনই লক্ষ করেন একটা হাতি এগিয়ে আসছে। একজন মাহুত সেটার পিঠে। ঔরঙ্গজেব জানেন, মারাঠা বন্দিদের পিষে মারার জন্য হাতিটিকে আনা হয়েছে। হাতির পেছন পেছন এল একটা গোরুর গাড়ি। সেটা থেকে ঔরঙ্গজেবের সেনারা নামাল একটা পাথরের চাঁই। সেটির চারটি কোণে চারটি লোহার শেকল। পাথরের গায়ে রক্তের দাগ। শুকিয়ে রং খয়েরি হয়ে গিয়েছে। এই পাথরের চাঁইয়ের ওপর শুইয়ে বন্দিদের হাতির পায়ের তলায় পিষে মারা হয়।
ঔরঙ্গজেব ইশারা করলেন সেই মারাঠা সৈনিকের দিকে যে একটু আগে তাঁর মুখে থুথু ছিটিয়েছিল।
‘ভুলেও ভেবো না, আমি তোমার আচরণের শোধ তুলছি। আসলে আমি তোমার সাহসের পুরস্কারস্বরূপ তোমাকেই প্রথম শহিদ হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছি।'
‘তাই না তাই', ব্যঙ্গভরে বলে উঠল সেই মারাঠা সৈনিক।
সেনারা দৌড়ে এসে সেই সৈনিকটিকে বিবস্ত্র করল। তাকে শুইয়ে দিল পাথরের চাঁইটার ওপর। কবজি আর গোড়ালি শেকল দিয়ে বেঁধে দিল।
আস্তে আস্তে এগিয়ে এল হাতি। তার ছায়া পড়ল পাথরে বাঁধা মারাঠার শরীরে। তবু সে ভাবলেশহীন ।
হাতির একটা পা উঠল মাহুতের নির্দেশে। পায়ের বিরাট ব্যাস দেখতে পেল লোকটা। হয়তো একটু শঙ্কিত। কিন্তু চুপচাপ অপেক্ষা করল অনিবার্য নিয়তির জন্য। অচিরেই হাতির পা নেমে এল লোকটার পেটে। পশুর মতো চিৎকার করে উঠল মানুষটা। নাড়িভুঁড়ির ওপর চাপ পড়তেই বেরিয়ে এল রক্ত, মল, মূত্র, পেটে জমে থাকা বায়ু।
দুর্গন্ধে ভরে গেল চারদিক।
ঔরঙ্গজেব পাশে থাকা এক অল্পবয়সি কোর্টির কাছ থেকে এক টুকরো কাপড় চেয়ে নিয়ে নাকে চাপা দিলেন। আর লক্ষ করলেন কাপড়টা কোনওরকমে তাঁকে এগিয়ে দিয়ে সেই কোর্চি বমি করছে হড় হড় করে। বোধহয় প্রথম এরকম হত্যাদৃশ্য দেখছে। সাক্ষী হচ্ছে এরকম অভিজ্ঞতার। অসুবিধা তো একটু হবেই। মনে মনে ভাবেন ঔরঙ্গজেব।
একে একে পাঁচজন একইভাবে হাতির পায়ের তলায় পিষে যায়। খ্যাতলানো বিকৃত লাশগুলো একটু দূরে খুঁড়ে রাখা গর্তে ছুঁড়ে ফেলা হয়।
ষষ্ঠজনকে টানতে টানতে নিয়ে আসে ঔরঙ্গজেবের সেনারা। মারাঠাটির বয়স খুবই কম। পা দুটো ঠক ঠক করে কাঁপছে। সেনারা তার কাপড় খুলে নিচ্ছিল। হাত দেখিয়ে ইশারায় তাদের থামতে বললেন ঔরঙ্গজেব। তারা কাজ বন্ধ করল।
‘তোমার বয়স কম। আমি তোমাকে বাঁচার সুযোগ দিতে চাই।'
বাদশা আলমগীরের কথায় হতবাক মারাঠা কিশোর। তার চোখে একই সঙ্গে ভয় ও জিজ্ঞাসা।
‘আমি তোমাকে মারব না। তার বদলে তোমাকে একটা কাজ করে দিতে হবে। শম্ভুজি সম্পর্কে যা যা জান সব আমাকে বলতে হবে। যা যা জান মানে সব কিছু । শম্ভুজি কী খায়, কী কথা শুনলে খুশি হয়, কী কথায় রেগে যায়, কখন ঘুমোতে যায়, কখন শরীরচর্চা করে, সব কিছু। পারবে বলতে?'
‘পারব... পারব।' বলে ওঠে কিশোর সৈনিক। তার গলায় তখন বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাসা বেঁধেছে।
‘তোমার নাম কী? '
‘মোহন।’
‘আচ্ছা মোহন! তুমি তো কখনও শম্ভুজিকে কাছ থেকে দেখনি। তাহলে এত কিছু তথ্য আমাকে দেবে কীভাবে?'
“কে বলল দেখিনি? আমি আর সন্তজি নামে দু'জন প্রায় দুবছর তাঁর দেহরক্ষী ছিলাম।'
‘সে কাজ গেল কেন?'
‘যায়নি তো। এবারের বর্ষার আগে দাদাটা জ্বরে মরে গেল। বাপ আর্জি জানাল শম্ভুজির কাছে, আমাকে ছুটি দেওয়ার জন্য, যাতে অন্তত রাতে ঘরে ফিরতে পারি। তাই দেহরক্ষী বাহিনী থেকে আমাকে সরিয়ে দেন শম্ভুজি।'
‘তোমার বাবা এখন কোথায়?’
ছেলেটি ইশারায় গণকবরটিকে দেখায়। ঔরঙ্গজেব বুঝতে পারেন যে পাঁচজন মারাঠাকে মেরে ফেলা হয়েছে তাদের মধ্যে মোহনের বাবাও ছিল। ছেলেটি সদ্য সদ্য বাবার মৃত্যু নিজের চোখে দেখেছে। সুতরাং, যে কোনও সময় প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তাই সতর্ক থাকতে হবে। সব সময়। ভুলভাল খবর দিয়ে, মনগড়া কথা বলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর সম্ভাবনাও প্রচুর। ঔরঙ্গজেব মনে মনে হিসেব করে নেন। তারপর মুখে বলেন, ‘শোনো। রোজ আমার লোকেরা তোমাকে জেরা করবে। তুমি কী বললে, না বললে, সে সব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানাবে আমাকে। যদি আমার মনে হয়, তুমি সব ঠিকঠাক বলছ, তাহলে তোমার বন্দিদশা খুব একটা দুঃসহ হবে না। কয়েদখানায় মোটামুটি ভালভাবেই কাটবে তোমার। আর না হলে,' একটু থামেন ঔরঙ্গজেব। তারপর বলেন, গলায় বেশ খানিকটা কঠোরতা কর্কশতা এনে, ‘দেখলে তো কী পরিণতি হল তোমার সহসৈনিকদের। সেই দশা তোমারও হবে।'
তারপর ঘোড়া ছুটিয়ে বেরিয়ে গেলেন বধ্যভূমি থেকে। আকাশে তখন শকুনের দল ওড়াওড়ি করছে।
সেদিন সন্ধেবেলায় খবর এল ইকবাল করিম এসেছে। ইকবাল গৌহারারার সেবাদাস। আজমেঢ় থেকে সে গৌহারারার চিঠি নিয়ে এসেছে।
ঔরঙ্গজেব ইকবালের কাছ থেকে চিঠিটা নিলেন। খুলে পড়তে শুরু করলেন। প্রথম লাইনটা পড়ার পরই তাঁর চোখ জলে ভরে গেল। আর পড়তে পারলেন না।
গৌহারারার চিঠির প্রথম বাক্যটিই ছিল এরকম: ‘প্রিয় ভাই আমার! আমাদের প্রিয় ভগিনী জাহানারা আর ইহলোকে নেই।'
আশ্চর্য এক অদৃশ্য তাগিদে হাঁটুমুড়ে বসে পড়লেন বাদশাহ আলমগীর। তাঁর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রুধারা। হৃদয়ের কোটর থেকে বেরিয়ে এল প্রার্থনা মন্ত্ৰ । জাহানারার আত্মার শান্তি কামনায় তিনি আল্লার কাছে দোয়া করলেন।
বাইরে তখন ঝরঝরিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। ধুয়ে যাচ্ছে সব তাপ ও ধুলো। ভিজে যাচ্ছে চরাচরের তাবৎ কাঠিন্য। শুদ্ধতায় আর্দ্র হচ্ছে পৃথিবী।
ভোররাতে খবর এল বন্দিশালায় কিশোর কয়েদি মোহন আত্মহত্যা করেছে।
কীভাবে সে আত্মহত্যার উপকরণ খুঁজে পেল, সবাইকে সেটা খুঁজতে ব্যস্ত করে দিয়ে আলমগীর ভাবতে বসলেন, প্রাণে বেঁচে গিয়েও কোন প্রণোদনায় নিজেরই জান নিয়ে বসল ছেলেটি।
সহজে কোনও উত্তর প্রতিভাসিত হল না তাঁর মনোলোকে ।
আকবর হলুদ পশমে ঢাকা বালিশে হেলান দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় শরাবের পাত্রে চুমুক দিচ্ছিলেন। শম্ভুজির আতিথ্য গ্রহণের পর থেকে তাঁর মেজাজটা ফুরফুরে। তাবৎ দুশ্চিন্তা আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। তৃপ্তির আকাশে। বাবার কবজা থেকে শেষ পর্যন্ত বোধহয় বেরিয়ে আসতে পারা গেল। ভাবামাত্রই তৃপ্তিতে, শান্তিতে চোখ বুজে এল
আকবরের।
আর একবার শরাবের পাত্রে চুমুক।
বেচারা মুয়াজ্জাম। জনসমক্ষে তাকে ভর্ৎসনা করে সেনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সে খবর চর মারফত কানে এসেছে আকবরের। একই সঙ্গে জেবউন্নিসার পরিণতির কথা ভেবেই কেঁপে উঠলেন আকবর। নিজেকে অপরাধী বলে মনে হতে লাগল। বাবা ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে অভিযান সফল হলেই তিনি ঘোড়া ছোটাবেন গোয়ালিয়রের উদ্দেশে। এমনটাই মনে মনে ঠিক করে নিলেন। আকবর যখন ভারতের মসনদে বসবেন তখন জেবউন্নিসাই হবেন সাম্রাজ্যের মুখ্য মহিলা। ঠিক যেমনটা একদা ছিলেন জাহানারা, তাঁর ফুফা।
শম্ভুজি ঘরে ঢুকলেন। সেই সঙ্গে দু'জন ব্যক্তি। বলিষ্ঠ চেহারা। তেল চকচকে। শম্ভুজি আসন গ্রহণ করা মাত্র দু'জনে আকবর আর শম্ভুজির সামনে এমন কসরত দেখাতে শুরু করল, মনে হল ওদের শরীরে হাড়গোড় বলে কোনও বস্তু নেই।
শম্ভুজি দু'জনকে একটা করে পুঁটলি দিলেন। তাতে সোনার মোহর।
তারপর আরও একটা লোক। ন্যাড়া মাথা। চারদিকে আগুন জ্বেলে নাচতে লাগল ৷ কখনও কখনও আগুনের শিখার ওপর পা ফেলে। আকবর চমৎকৃত। শম্ভুজির চোখে-মুখেও খুশির ঝরনা। খানিকক্ষণ পর লোকটা অদ্ভুত সব খেলা দেখাতে শুরু করল। জিভের ওপর ছুরির ডগা রেখে নাচ। কখনও আগুন গিলে ফেলা। কখনও আবার বর্শার ফলা মাটিতে রেখে নৃত্য। ঔরঙ্গজেবের জমানায় এসব মজার আসর মুঘল দরবারে আর বসে না। আকবর তখতে বসলে ফিরিয়ে আনবেন আনন্দ উৎসবের পরিবেশ। মনে মনে ভাবলেন।
ভাবতে ভাবতেই দেখলেন ঘরটা অন্ধকার হয়ে গেল। মশাল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল যারা তারা সব উধাও হয়ে গেল মুহূর্তে। আকবরের মনে হল, দিকচিহ্নহীন আঁধার গিলে খেতে আসছে তাঁকে। মনে হল, বাদশা আলমগীরের ছক। আকবরকে হত্যা করার জন্য তরবারির শানিত ফলা এখনই বুঝি ঝলসে উঠবে অন্ধকার ভেদ করে। ভয়ে সিঁটিয়ে গেলেন আকবর। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন। পা টলে গেল। শরাবের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। টলমল পায়ে কোনওরকম নিজেকে সামলালেন আকবর। পরক্ষণেই বুঝলেন, যাকে ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তিনি, তিনি আর কেউ নন। শম্ভুজি।
শম্ভুজি ধমক দেওয়ার মতো করে বললেন, ‘একটু সামলে।’
তারপর হাততালি দিলেন
অন্ধকার সরে গেল।
একটা দুটো করে চারটে মশাল উঠল জ্বলে।
ঘরে আলো আঁধারি লীলাময়।
তার মধ্যে, ঘরের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে এক নারী।
উদ্ভিন্ন যৌবনা। আলুলায়িত কেশ গুচ্ছ প্রায় হাঁটু পর্যন্ত নেমে এসেছে। পরনের বস্ত্রে ধাতুর পাত দিয়ে তৈরি তারাদের ঔজ্জ্বল্য। সেই বস্ত্রের নিম্নভাগ ধরে আছে দুটো বামনাকার মানুষ ।
আকবরের মনে হল, একটু আগে তাঁর যেরকম শ্বাসরোধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তার থেকে তিনি বাঁচতে পেরেছেন। হৃদস্পন্দন আবার স্বাভাবিক হচ্ছে। আস্তে আস্তে, কিন্তু অনিবার্যভাবে।
‘স্বাগত লায়লা। অতিথি ভারতেশ্বর হতে চলেছেন। তাঁকে আনন্দ দাও।' শম্ভুজি বলে উঠল।
লায়লা নাচ শুরু করল।
মনে হল, ঝড়ে যেন একটা গাছ দুলছে।
শম্ভুজি ফিসফিস করে বললে উঠলেন, ‘আনন্দ পাচ্ছেন তো?'
আকবর হাসলেন। মাতালের মতো। চোখেও তাঁর শরাবের রং ধরেছে। নিজেই বুঝতে পারলেন। লায়লা নাচছে। তার রূপ, তার যৌবন, তার নাচের ছন্দ, পদবিক্ষেপ, সব, সবই কাবু করে দিচ্ছে আকবরকে।
একটা সময় আকবরের মনে হল, তিনি যেন তলিয়ে যাচ্ছেন।
‘ভাল লাগলে, আজকের রাতটা ওর সঙ্গে কাটাতে পারেন,' শম্ভুজি বললেন। হাসতে হাসতে।
হ্যাঁ কিংবা না, কোনও কিছু বলার অবস্থায় নেই আকবর। তাঁর শরীর শিথিল হচ্ছে। মস্তিষ্ক অচল হচ্ছে।
একেবারে নিস্তেজ হয়ে পড়ে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে আকবর টের পেলেন, তিনি লায়লার কোলে শায়িত।
লায়লার সঙ্গে নিশিযাপনের পর সকালে প্রাতরাশের আসরে শম্ভুজির সঙ্গে আলোচনায় বসলেন আকবর।
‘আপনার কী মনে হয়? বাদশা আলমগীরকে এখনই আক্রমণ করাটা কি ঠিক হবে?' আকবর জানতে চান।
‘অবশ্যই। আমার বাবা শিবাজি মহারাজ জীবিত থাকলে তিনি কিন্তু দু'বার চিন্তা করতেন না।' শম্ভুজি হেসে জবাব দেন।
খবর এসেছে বুরহানপুরের শিবির ছেড়ে এগিয়ে আসছে ঔরঙ্গজেবের বাহিনী। এখনই তাদের আটকাতে হবে। নইলে ঔরঙ্গজেব সাপের চেয়েও নিঃসারে ও দ্রুতগতিতে খতম করে দিতে পারেন তাদের। সেটা আকবরের ভালমতোই জানা আছে ।
বয়ে চলেছে তাপ্তী নদী। তারই মাঝে একটা ছোট্ট দ্বীপ। সেই দ্বীপেই এখন শম্ভুজি ও আকবরের মিলিত বাহিনীর আস্তানা। এখানে নদী তেমন কিছু গভীর নয়। পার হওয়া আদৌ দুঃসাধ্য নয় প্রশিক্ষিত মুঘল বাহিনীর কাছে। সেটাই তাদের দু'জনের আশঙ্কার এবং ব্যস্ততার কারণ।
দুর্গটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত। এখান থেকে তিরন্দাজদের দিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলা যেতে পারে। কিন্তু এমন কোনও দেওয়াল নেই, যেটা বর্তমানে কামানের ভার সহ্য করতে পারে। কথাটা মনে হতেই আকবর একটা অস্থিরতা অনুভব করলেন।
‘আজ রাতেই কি তবে?' জিজ্ঞেস করে বসলেন পাশে থাকা শম্ভুজিকে। ‘অবশ্যই। আজ অমাবস্যা। রাতে ঘুটঘুটে আঁধার চারিধার। আমাদের সৈন্যসংখ্যাও আপনার বাবার বাহিনীর তুলনায় দ্বিগুণ। আজই তো তাই মোক্ষম সময়।' শম্ভুজি মৃদু হেসে বলেন।
এতদিন এত কথা হয়েছে। শম্ভুজি একবারও পাল্টা আক্রমণ শানাবার পক্ষে মত দেননি। এই প্রথম দিলেন।
এখন দুপুর । মাথার ওপর গনগনে সূর্য তাপ ছড়াচ্ছে। সন্ধ্যা নামতে এখনও অনেকটা সময় বাকি। তার মধ্যে আকবরের সেনারা আর মারাঠা বাহিনী যৌথভাবে প্রস্তুতি সেরে ফেলতে পারবে। দিনের আলোয় প্রস্তুতি পর্ব সারাটা সব সময় সুবিধাজনক।
সারাটা দুপুর উদ্বেগের মধ্যে কাটালেন আকবর। বারবার শম্ভুজির সঙ্গে বসে তৈরি করা আক্রমণ পরিকল্পনাটা ঝালিয়ে নিতে লাগলেন। কোথাও যেন এক ফোঁটা খামতি না থাকে। কোথাও যেন একটাও ভুল পদক্ষেপ করা না হয়।
রাত্রি নামল।
অন্ধকারের মধ্যে আকবর দেখলেন, সেনারা সব দুর্গ ত্যাগ করেছে। তাপ্তী নদীর আশপাশে, গাছের আড়ালে, সঙ্গোপনে তারা অপেক্ষা করছে ঔরঙ্গজেবের বাহিনীর জন্য। এই নেমে আসা অন্ধকারের মধ্যে বেশ বোঝা যাচ্ছে, যোগীন্দরের রাজপুত বাহিনীর সেনাদের লম্বা লম্বা পা। তারা পিঠে অস্ত্রশস্ত্র বেঁধে অপেক্ষা করছে। আর মারাঠা সৈন্যদের কাঁধে দড়ি, কিংবা মই, কিংবা বারুদের বস্তা। কারও কারও কাঁধে বন্দুক ঝুলছে।
আকবর যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন সেখানে খানিকক্ষণ পর এসে হাজির হলেন শম্ভুজি । একটা রুপোর কৌটো বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘পান খাবেন?’
আকবর সজোরে মাথা নাড়লেন। বললেন, “এখন পান খাওয়ার সময় নয়। বাবা কোনও এক সেনাপতিকে দিয়ে বাহিনী পাঠিয়ে দিয়েছেন। বিকেলেই খবর পেয়েছি চরের মুখে।'
‘আপনি কি আপনার বাবাকে ভয় পান? '
‘ভয়?” আকবরের গলায় ঝাঁজটা অগোপন রইল না।
‘হ্যাঁ, ভয়। আপনার কথাবার্তা শুনলে, আচার আচরণ দেখলে, তেমনটাই মনে হয়।'
‘ভয় নয় শম্ভুজি। আমার বাবা একটা জ্যান্ত আতঙ্ক। সর্বত্র তাঁর চোখ আর কান। আর এই দুটো ইন্দ্রিয় তাঁর সতত সজাগ।’
“তাই?'
‘হ্যাঁ । সেজন্যই দু’জন চরকে পাঠিয়েছিলাম ওদের বাহিনীতে মিশে গিয়ে খবরাখবর নিয়ে আসার জন্য। আর যাই হোক, আমি আর আলমগীরের পাতা ফাঁদে পড়তে রাজি নই। আর আপনাকেও বলছি। বাদশা আলমগীরের বুদ্ধিমত্তাকে হেলাফেলা করবেন না।’
‘করছি না তো। তবে এটাও ভুলছি না, কীভাবে আমার বাবা শিবাজি মহারাজ আপনার বাবাকে বোকা বানিয়েছিলেন।'
'মানে?'
সেই ঘনায়মান অন্ধকারের ভিতর মিশে যাওয়া দু'জন কিংবদন্তির পুত্র নিজেদের বাবাদের কাহিনি আলোচনা করতে লাগল।
তাপ্তীর বয়ে চলা জলের ছাড়া আর কোনও কিছুর শব্দ শোনা যাচ্ছিল না তখন প্রকৃতির কাছ থেকে। চাঁদহীন আকাশ আগামীর জন্য থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ফেলে আসা সময়ের কথা শুনতে লাগল।
তাপ্তীর স্রোতোধারার সঙ্গে প্রবহমান ছিল সময়ও ।
নিজস্ব ছন্দে নিজ নিজ গতিতে সবকিছু বহমান ছিল। অপেক্ষমান ছিল শুধু ভারতের নিয়তি। ইতিহাসের আগামী পটচিত্র।
আগ্রা দুর্গ। ময়ূর সিংহাসনে বসে আছেন ঔরঙ্গজেব। পাশে জাহানারা। আজ বাদশাহ আলমগীর তৃপ্ত। তিন মাস হল ভাই-বোনের মতান্তর মনোমালিন্যের অবসান হয়েছে। আর তিন মাস যাবৎ জাহানারাকে নিজের শৌর্য প্রমাণিত হতে পারে এরকম কোনও ঘটনা ঘটাতে পারেননি হিন্দুস্তানের মুঘল বাদশাহ।
একটা অতৃপ্তি বুকের কোটরে ঘুণপোকার মতো বাসা বেঁধে ছিল এই তিন মাস ধরে।
অবশেষে অবসান। সেই হতাশার। সেই খুঁতখুঁতানির।
সুরাট দখল করেছিলেন মারাঠা নায়ক শিবাজি। তাঁর দুরন্ত বাহিনীকে অবশেষে পর্যুদস্ত করতে সমর্থ হয়েছে মুঘল বাহিনী। বাদশাহ আলমগীরের বাহিনী। তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রায় দেড় লক্ষ মুঘল সৈন্য।
মাথা নিচু করে শিবাজি মেনে নিয়েছেন শান্তিচুক্তির যাবতীয় শর্ত। তেইশটা দুর্গ মারাঠাদের কবজা থেকে এখন মুঘলদের অধীনে। শুধু তাই নয়। চার লক্ষ মুদ্রা ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়েছে ওই মারাঠা গুন্ডা ।
আলমগীর আজ তৃপ্ত, কারণ আজ তাঁর সামনে হাজির হবেন ছত্রপতি শিবাজী এবং তাঁর পুত্র শম্ভুজি। দু'জনকে ভরা সভায় উপস্থিত হতে হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে।
আলমগীরের তৃপ্ত হৃদয় ডানা মেলতে চায়।
দু-দুটো মরু ইঁদুর আজ তাঁর কবজায়। জোড়া ইঁদুরকে এবার মুঘল দাপটের স্বাদটা ঠিক কেমন, তা বুঝিয়ে ছাড়বেন আলমগীর।
দাক্ষিণাত্যের নায়ক শিবাজি মহারাজ যখন দরবারে প্রবেশ করলেন, তখন উপস্থিত সবার চোখ তাঁর দিকে।
ঔরঙ্গজেবেরও।
একদৃষ্টে তাকিয়ে দু-দুটো জিনিস বুঝতে পারলেন ঔরঙ্গজেব।
এক, শিবাজি তাঁর চেয়ে কিছু না হলেও ছয় ইঞ্চি বেঁটে। দুই, তাঁর ওজন শিবাজির চেয়ে বেশি। বেশ খানিকটা বেশি। এক কথায়, শিবাজি ঔরঙ্গজেবের তুলনায় বেঁটে ও রোগা।
লোকটা এগিয়ে এল সিংহাসনের দিকে। পদক্ষেপে এতটুকু পরাজিত পক্ষের কাছে প্রত্যাশিত হতাশা কিংবা বিনম্রতা নেই। চোখে মুখে এখনও অহংকার ঝরে পড়ছে। চলনে ঔদ্ধত্য এখনও প্রকট।
সিংহাসনের কাছে এসে থামলেন শিবাজি মহারাজ।
অন্য কেউ হলে চোখটা নামিয়ে নিত।
কিন্তু এই মারাঠা দস্যুর সেসবের বালাই নেই। একেবারে সোজাসুজি তাকালেন ঔরঙ্গজেবের দিকে। যেন তিনি পরাজিত পক্ষ নন, বাদশারই সমকক্ষ।
লোকটার আস্পর্ধা দেখে যুগপৎ বিরক্ত ও বিস্মিত হলেন আলমগীর। সিংহাসন থেকে নেমে এসে এগিয়ে দিলেন একটা পাতা। তাতে আনুগত্য স্বীকারের বয়ান স্পষ্ট ভাষায় লেখা।
বাদশা আড়চোখে দেখলেন, মারাঠা ইঁদুরটা বয়ানটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ছে। এত পড়ার কী আছে, ভেবে পেলেন না বাদশা।
ততক্ষণে পড়া শেষ করে ফেলেছেন শিবাজি। চোখে চোখ রেখে বললেন, “এখানে শপথ বাক্য ফার্সিতে লেখা। ফার্সি আমি পড়তে পারি না বা বলতে পারি না, তা নয়। কিন্তু আমি এই ভাষায় এসব কথা পড়ব না। আমি শপথ যা নেওয়ার সেটা নেব আমার মাতৃভাষাতেই।
ঔরঙ্গজেবের চোয়াল শক্ত হল। টের পেলেন, পরাজয় এই অসভ্য বেয়াদপকে ভদ্রতার পাঠ শেখায়নি। গলায় যাবতীয় কর্কশতা ও কাঠিন্য এনে বাদশা বললেন, ‘এই দরবারের সরকারি ভাষা ফার্সি। আমরা দু'জনেই সেই ভাষাতেই শপথ নেব।'
শিবাজি আর কথা বাড়ালেন না। পড়তে শুরু করলেন।
‘আমি মারাঠা জাতির নেতা শিবাজি বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্যের শপথ নিচ্ছি। আমি এবং আমার পুত্র শম্ভুজি বিশ্বস্তভাবে ও সসম্মানে বাদশাহের সেবা করব...।'
শিবাজির কণ্ঠস্বর ভরাট। ফার্সি পাঠ সাবলীল। লোকটা পণ্ডিত সাজার ভান করছে। মনে মনে বললেন আলমগীর।
শিবাজির আনুগত্যের শপথবাক্য পাঠ শেষ হলে বাদশাহ আলমগীর সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। আনুগত্যের শপথ গ্রহণ পর্ব শেষ হল।
দরবারে সকলের সামনে এই ইঁদুরটাকে বুঝিয়ে দিতে হবে, বাদশাহ আলমগীরের কাছে তার কোনও বাড়তি গুরুত্ব নেই। মনে মনে ঠিক করেই রেখেছিলেন বাদশা। সেইমতো পেয়াদাকে আদেশ দিলেন, ‘এই নয়া দাসটিকে ওইখানে ওদের সঙ্গে দাঁড় করাও। ও দেখে নিক, আমার দরবারের কাজকর্ম কীভাবে চলে।'
কথাটা কানে যেতেই শিবাজি মহারাজ একবার দেখে নিলেন, বাদশা আলমগীর তাঁর এবং শম্ভুজির জন্য ঠিক কোন জায়গাটার কথা বলছেন। দেখলেন, দরবার কক্ষের শেষ প্রান্তে, বাদশার সবচেয়ে অধস্তন কর্মচারী আর সবচেয়ে অনাদৃত সামন্তদের ভিড়ে তাঁকে সপুত্র ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
অনেক হয়েছে আর নয়। এবার প্রতিবাদ করা দরকার। শিবাজি গর্জে উঠলেন, ‘বাদশাহ! আপনি শাসক। আমিও। আমাকে ভৃত্য আর কর্মচারীদের সঙ্গে একই আসনে বসাতে পারেন না আপনি। রাজা হয়ে রাজাকে অপমান করছেন কোন আক্কেলে?
শিবাজির কথায় এতটুকু মেজাজ হারালেন না বাদশাহ আলমগীর। প্রকাশ্যে অন্তত বুঝিয়ে দিতে চাইলেন শিবাজি তাঁর ক্রোধেরও যোগ্য নন। ধীর কণ্ঠে বললেন, ‘ভুল করবেন না। একটু আগেই আপনি আমার প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের শপথ নিয়েছেন। পূর্ণ আনুগত্য মানে প্রশ্নাতীত আনুগত্য, এটুকু বোঝার মতো বিদ্যাবুদ্ধি আশা করি আপনার আছে।'
‘আপনিও নিশ্চয় বোঝেন যে আপনার এসব অপমানের যোগ্য পাত্র আমি অন্তত নই। শম্ভুজি, চলো', বলেই শিবাজি শম্ভুজির হাত ধরে দরবার ত্যাগের জন্য তৈরি হলেন।
‘ফৌলাদ খান, ওদের বন্দি করো', আদেশ দিলেন আলমগীর। ফৌলাদ খান আগ্রা দুর্গের তত্ত্বাবধায়ক। সে আদেশ পাওয়ামাত্র সদলবলে ঝাঁপিয়ে পড়ল শিবাজী আর শম্ভুজির ওপর।
সবাই ভেবেছিল, শিবাজি অন্তত তরবারি বের করে ফৌলাদকে প্রতিহত করবেন। কিন্তু শিবাজি ফৌলাদকে বিনা বাধায় তাঁকে গ্রেফতার করতে দিলেন।
শিবাজি আর শম্ভুজিকে যখন ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন শিবাজি মহারাজের কানে গেল বাদশা আলমগীরের বিশেষ নির্দেশ, ‘পরবর্তী আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত এ দুটো ইঁদুরকে আগ্রা দুর্গে বন্দি করে রাখো।'
শিবাজি বুঝলেন, তিনি ফেঁসে গিয়েছেন।
তিন মাস আগ্রা দুর্গে। শিবাজি এবং শম্ভুজি। তিন মাস ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করেছেন চারপাশ। নজরদারি কোথায় তীক্ষ্ণ, আর কোথায় তার ফাঁকফোকড়, সবকিছু। তারপর পরিকল্পনা তৈরি করেছেন। আঁটঘাট বেঁধে।
সেই পরিকল্পনা রূপায়িত হতে লাগল প্রতিদিন।
তিনটে বিশাল বিশাল ঝুড়ি, একেবারে শিবাজি মহারাজের কাঁধ সমান উঁচু। রুটি, ফল, মেওয়া, চাল আর ডালে ঠাসা। প্রত্যেকটা ভাল করে দেখলেন শিবাজি। তারপর হাসলেন। বললেন, 'ঠিক আছে।'
একোজি সামনেই ছিল। সে শিবাজি মহারাজের খাস অনুচর। শেষ ঝুড়িটার ঢাকা বন্ধ করতে করতে বলল, 'দুর্ভাগা আগ্রা রোজ আপনার কথা মনে করবে মহারাজ।'
‘তাই?'
‘হ্যাঁ! আজই পাহারাদারদের সঙ্গে কথা হল। ওরা বলল, ঝুড়িগুলো পরীক্ষা করার পর বাহকদের কাঁধে চাপিয়ে সেগুলোকে গাড়িতে তোলা হবে।'
‘একদম ঠিক আছে। পাহারাদার, রক্ষী, সেপাই, যেখানে যে যে আছে তাদের রোজকার মতো মুদ্রা দিতে ভুলো না। আমি চাই আগ্রার গরিব মানুষ, প্রান্তিক মানুষ, ক্ষুধার্তদের কাছে এই খাবারগুলো পৌঁছাক। মনে রেখো, এদের মধ্যে হিন্দুর সংখ্যা বড় কম নয়।'
ঔরঙ্গজেবের চোখ আর কানকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য এই বন্দোবস্তই করেছেন শিবাজি। প্রতিদিন বিকেলে শিবাজি নিজে সবকিছু দেখেশুনে নিশ্চিত হন, ব্যবস্থাটা ঠিকঠাক আছে কি না। রোজ। রোজই।
রোজকার রুটিনটাই এরকম।
বন্দি শিবাজি অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন। আগ্রার হিন্দুদের মধ্যে, বিশেষত যারা গরিব তাদের মধ্যে খাবার দাবার বিতরণ করতে চান। সেই আর্জি মঞ্জুর হয়।
তখন থেকে রোজ একোজি বাজার করে আনে। ঝুড়ি ভর্তি হয়। তিন ঝুড়ি জিনিস যায় আগ্রার একটি মন্দিরে। সেখান থেকে গরিবগুর্বোদের মধ্যে সেগুলো বিতরণ করা হয়। গরিবগুর্বোর দল শিবাজি মহারাজের নামে জয়ধ্বনি দেয় । প্রতিদিন। সন্ধেবেলায় । টানা তিন মাস ধরে।
প্রথম প্রথম ফৌলাদ খান আর তার চ্যালাচামুন্ডারা আঁতিপাতি করে খুঁজে দেখত ঝুড়িগুলোতে কী আছে। রোজই দেখত এবং কিস্যুটি পেত না। না পেতে পেতে তারাও আস্তে আস্তে ধরে নিয়েছে শিবাজির অন্য কোনও মতলব নেই। খোঁজাখুঁজির উৎসাহে ভাটা। সেইসঙ্গে শিবাজির দেওয়া ঘুষ। রক্ষীদের হাতে হাতে মুদ্রা গুঁজে দেওয়ার বন্দোবস্ত। একেবারে ম্যাজিকের মতো কাজ করেছে।
আস্তে আস্তে ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে যে ঝুড়িগুলো ভর্তি করে পরীক্ষার জন্য পাহারাদের কাছে আনা হয়। তারা একবার ওপর ওপর দেখে নেয়। তারপর অলস ঘাড় হেলিয়ে অনুমতি দেয় ঝুড়িগুলোকে গাড়িতে তোলার। গাড়ি মানে গাধায় টানা গাড়ি। গাড়ি চলে যায় মন্দিরে। সেখানে খাবারদাবার বিলি হয়ে যায় উপস্থিত দরিদ্র জনতার মধ্যে। জনতা জয়ধ্বনি তোলে শিবাজি মহারাজের নামে।
আর এই ঢিলেমির ফাঁক দিয়ে চলে বার্তা দেওয়া নেওয়া। শিবাজি বার্তা পাঠান পুরোহিতদের কাছে। পুরোহিতরা শিবাজিকে।
শিবাজির বার্তা যায় মেওয়া, চাল, ডাল, ফল এসবের ফাঁকে একটুকরো চিরকুটে। আর পুরোহিতদের বার্তা আসে ঝুড়ির বেতের ফাঁকে, পাকানো চিরকুটে।
বার্তা দেওয়া নেওয়ার মধ্যে দিয়ে যেটা স্থির হল, সেটা এরকম:
শিবাজি বার্তা পাঠালেই আগ্রা শহরের বাইরে মারাঠা সেনানায়করা দ্রুতগামী অশ্ব নিয়ে অপেক্ষা করবেন। শিবাজি সুযোগমতো দুর্গের বাইরে এসে তাদের নিয়েই পালাবেন। ঔরঙ্গজেবের মুঘল সেনার নাগালের বাইরে চলে যাবেন।
সবই ঠিক।
কিন্তু শিবাজি এতদিন সেই নির্দিষ্ট বার্তাটি পাঠাননি। এবার পাঠালেন। পাঠালেন একোজি বাজার থেকে একটা খবর আনার পর।
একোজির আনা খবর মোতাবেক ঔরঙ্গজেব কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাঁর বাহিনীকে কান্দাহারে পাঠাবেন। আর তারপর মারাঠা বন্দিদের কাবুলে। তাঁদের মাতৃভূমি থেকে অনেক অনেক দূরে। আপদ বিদায়ের এরচেয়ে ভাল পরিকল্পনা আর কী-ই বা হতে পারে!
খবরটা শোনামাত্র শিবাজি বুঝতে পারলেন, হাতে আর বেশি সময় নেই। যা করতে হবে এক্ষুনি করতে হবে। ঔরঙ্গজেবের পুরো পরিকল্পনাটা তাঁর কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।
শিবাজি আর শম্ভুজিকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা কিংবা গর্দান নিয়ে কোতল করার মতো কোনও পরিকল্পনা ঔরঙ্গজেবের নেই। কারণ, সেরকম কিছু করলে শিবাজি শহিদের সম্মান পেয়ে যাবেন। আর শহিদের স্মৃতি আঁকড়ে মারাঠা জনসমাজ আরও বিদ্রোহী হয়ে উঠবে। ঔরঙ্গজেবের মারাঠা উৎপাত সেক্ষেত্রে কোনওভাবেই পুরোপুরি দমন হবে না।
তাই, তাই-ই, আগ্রা দুর্গে শিবাজি আর শম্ভুজিকে বাঁচিয়ে রাখবেন ঔরঙ্গজেব। তারপর আগ্রা থেকে কান্দাহার পাঠানোর সময় বন্দি শিবাজির চোখ উপড়ে নেবেন, কেটে নেবেন তাঁর হাত কিংবা পা, এমনকী জিভটাও কেটে নিতে পারেন ঔরঙ্গজেব তাঁর সৈন্যদের দিয়ে। সেক্ষেত্রে রটিয়ে দেওয়া হবে, দস্যুসংকুল আফগানিস্তানের মাটিতে শিবাজি ডাকাতের হাতে পড়ে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খুইয়েছেন। তারপর আগ্রায় শিবাজির বিকৃত শরীরটা নিয়ে এসে তাঁকে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবেন।
তেমনটা হলে, সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না।
খতম হবেন শিবাজি, কিন্তু পাবেন না শহিদের সম্মান।
ছকটা ধরে ফেলামাত্র বার্তা চলে গেল মন্দিরে, বেগবান অশ্ব ও ঘোড়াসওয়ার বাহিনীকে আগ্রা থেকে একটু দূরে খানিকটা ছড়িয়েছিটিয়ে অপেক্ষা করার জন্য।
রোজ ঝুড়িগুলো মন্দিরে পাঠানোর আগে নিজের গলায় ঝুলতে থাকা হারে ঝোলানো ছোট্ট গণেশ মূর্তিটাকে স্নান করান শিবাজি। তামার পাত্র থেকে জল ঢালেন লকেটটাতে। গলা থেকে হারটা খুলে ফেলার পর।
রোজই করেন এটা।
সেদিন করলেন না ।
বরং প্রবল শব্দ করে প্রস্রাব করলেন। প্রহরীরা ভাবল রোজকার মতো গণেশের লকেটটিকে স্নান করাচ্ছেন শিবাজি।
আসলে শিবাজি সেদিন লকেটটিকে আগেই স্নান করিয়েছিলেন এবং জল পড়ার কোনও শব্দ হতে দেননি।
শৌচালয়ের দেওয়াল। উঁচু কিন্তু অনতিক্রম্য নয়। প্রহরীর দল যখন ভাবছে, শিবাজি গণেশের লকেটটিকে স্নান করিয়ে রোজকার মতো সেটির আরতি করতে ব্যস্ত, তখনই প্রস্রাব সেরে শৌচাগারের পাঁচিল টপকালেন শিবাজি মহারাজ। সঙ্গে শম্ভুজিও।
আগেই খবর পেয়েছিলেন, সেদিন পানিপথে মুঘলদের বিজয় বার্ষিকী পালনের জন্য আতশবাজির প্রদর্শনী হবে আগ্রাতে। সেই আতশবাজির শব্দটাকেই ঢাল করলেন শিবাজি।
গোটা দুর্গ যখন আতশবাজির প্রদর্শনী দেখতে আকাশে চোখ রেখেছে তখনই শিবাজি নিজে আর শম্ভুজি ঢুকে পড়লেন বাইরে রাখা ফাঁকা দুটো ঝুড়িতে। ঝুড়িগুলো রোজকার মতোই বাইরে রাখা ছিল সকালে একোজির আনা ফল, মেওয়া আর চাল ডালে ভর্তি হবে বলে।
শিবাজি আর শম্ভুজি ঝুড়িতে লাফিয়ে পড়ার আওয়াজ আড়াল হয়ে গেল বাজির শব্দে। অন্য কোনও দিন হলে পাতা খসার শব্দ হলেও পাহারাদাররা সজাগ হয়ে যেত।
ঝুড়িগুলো ঝটাপট ভরতি করে ফেলল একোজি। একটায় শিবাজি। অন্যটায় শম্ভুজি । আর তৃতীয়টা ফাঁকাই ছিল। সব ক'টা ভরতি করে ঝুড়িগুলো বন্ধ করল একোজি। ভেতরে শিবাজি গুটিসুটি মেরে বসে রইলেন। শম্ভুজিও। বাবার নির্দেশ মতো।
শিবাজি অনুভব করলেন, ঝুড়িতে টান পড়ছে। শুনতে পেলেন, একোজি হাঁক ডাক করছে। বলছে,‘দেখেশুনে আস্তে আস্তে ঝুড়িগুলো টানো। যেন ভেতরকার জিনিসপত্রের কোনও ক্ষতি না হয়। শিবাজি মহারাজ তোমাদের বিনা পারিশ্রমিকে খাটিয়ে নিচ্ছেন, এমনটা নয়। মনে রেখো, রোজ তিনি তোমাদের পাওনা পারিশ্রমিক চুকিয়ে দেন।'
শিবাজি বোঝেন, একোজি এসব কথা মালবাহকদের বলে আসলে তাঁকেই বার্তা দিচ্ছে। নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখেন। যাতে শ্বাসের শব্দটুকুও কেউ টের না পায় । হাত-পা টেনে ধরে রাখেন। যাতে বাইরে থেকে এতটুকু বোঝা না যায় যে ঝুড়ির ভেতর কেউ আছে। একটু চিন্তা, কিংবা বলা ভাল, দুশ্চিন্তা হয় শম্ভুজির কথা ভেবে। সে কতটা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে, সে বিষয়ে আশঙ্কা থেকেই যায় তাঁর।
ধপাস ধপাস করে দড়ি দিয়ে টেনে বাহকেরা ঝুড়িগুলো পাথুরে মাটিতে ফেলে।
প্রতি মুহূর্তে শিবাজি আতঙ্কিত হন, এই বুঝি ঝুড়ির ঢাকনা খুলে গেল আর ভেতর থেকে সব জিনিসপত্র বেরিয়ে গিয়ে ধরা পড়ে গেলেন তিনি কিংবা শম্ভুজি।
তবে ঈশ্বর সহায়। সেসব কিছুই হয় না।
শিবাজি শুনতে পান, মালবাহকেরা বলাবলি করছে, ‘এই ঝুড়ি দুটো আজ বড্ড ভারী। এত ভারী অন্যদিন তো থাকে না ।'
অন্য আর একজনের কণ্ঠস্বর কানে আসে।
‘শিবাজি রোজ বেশি বেশি করে দানবীর হয়ে উঠছেন। রোজই বোধহয় দানের পরিমাণ বাড়ছে। তাই ঝুড়িগুলো আজ বেশি ভারী।’
ঝুড়িগুলো বাহকেরা নামায়। শিবাজি বুঝতে পারেন, পাহারাদারদের পরীক্ষার জন্য ঝুড়িগুলো নামানো হল। শুনতে পান একোজির গলার আওয়াজ, ‘হুজুররা, ভাল করে দেখে নিন ভেতরটা। তবে একটু তাড়াতাড়ি সারবেন। মন্দিরে পাঠানোর সময় পেরিয়ে যাচ্ছে কি না, তাই বলছিলাম।'
শিবাজি অপেক্ষা করতে থাকেন দম বন্ধ করে। অপেক্ষা করতে থাকেন, এই বুঝি কোনও আঙুলের ছোঁয়া এসে লাগল তাঁর মাথার চুলে কিংবা গালে।
কিন্তু সেসব কিছুই হয় না।
ঝুড়িতে আবার টান পড়ে। বুঝতে পারেন, ঝুড়ি এবার গাধার গাড়িতে উঠবে। শোনা যায় একোজির কণ্ঠস্বর। ‘হুজুরদের অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের ওপর আস্থা রাখার জন্য। পরীক্ষা করতেই পারতেন। তবু তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিলেন ভরসা রেখে, সেজন্য।'
গাড়িতে ঝুড়িগুলো রাখা হয়। শিবাজি শোনেন, একোজি বলছে, ‘একটু সাবধানে রাখিস বাবারা। দেখিস যেন ঝুড়ি পড়ে না যায়।”
শিবাজি বুঝতে পারেন, এমন জোরে জোরে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়ার পেছনে আসল উদ্দেশ্য হল, তাঁকেও সতর্ক করে দেওয়া যে ঝুড়িগুলো এখন কোথায় কীভাবে আছে বা যাচ্ছে। যাতে ঝুড়ির ভেতর শিবাজি বা শম্ভুজি আচমকা কোনও বিড়ম্বনায় পড়ে না যান, সেজন্যই এই সতর্কীকরণ ব্যবস্থা।
শিবাজি ঝুড়ির ভেতর থেকে ঘণ্টির ঝুমঝুম আওয়াজ শুনতে পান। গাড়ি টানবে যে গাধাগুলো, তাদেরই ঘণ্টির আওয়াজ এটা। বুঝতে অসুবিধা হয় না।
ঝুড়ি হেলে পড়ে। গাধারা গাড়ি টানতে শুরু করেছে। তাই ঝুড়ি হেলে পড়ছে। দুর্গ থেকে গাড়িগুলো বের হচ্ছে। তাই ঝুড়িগুলো দুলছে। অনুভব করেন শিবাজি। তাঁর বুকে তখন প্রিদিম দ্রিদিম। উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠা, মুক্তির সম্ভাবনা আর ধরা পড়ার আশঙ্কা, দুই-ই ক্রিয়াশীল।
নিজেই নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করেন তিনি। গাড়িগুলো মন্দিরে পৌঁছয়। পুরোহিতরা ঝুড়িগুলো নামিয়ে নেন। নিয়ে আসেন মন্দিরের পেছনে। রোজকার মতো ।
সামনে অপেক্ষমান দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয় খাবার। শিবাজির পাঠানো খাবার। ঝুড়িতে করে আসা জিনিসপত্র। জনতা জয়ধ্বনি দেয়। রোজকার মতো পুরোহিতরা শিবাজি আর শম্ভুজিকে সবার অলক্ষ্যে ঝুড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেন। পোশাক পরিবর্তন করেন দু'জন তাঁদেরই সহায়তায়। ভিখারির সাজে সাজেন শিবাজি আর শম্ভুজি। বাপ ভিখারি, ছেলেও।
তারপর মন্দির চত্বর ছেড়ে মিশে যান আগ্রার সরু অলিগলিতে। পুরোহিতদের বিশ্বস্ত দু'জন লোক আগে আগে তাঁদের রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যায়।
আগ্রার অদূরে আমবাগান। সেখানে অপেক্ষা করছে মারাঠা ঘোড়সওয়াররা। শিবাজি শম্ভুজি পৌঁছে যান সেখানে।
তারপর ঘোড়ায় উঠে পড়েন। ঘোড়া ছুটতে থাকে অন্ধকার পথ ধরে। আস্তে আস্তে পেছনে চলে যায় মুঘল সীমান্ত। ঘোড়ার ক্ষুরের আওয়াজ সচকিত করে তোলে দক্ষিণের পাহাড়ি এলাকার পাথুরে মাটি।
অশ্বের গতিতে লাগাম টানেন না কোনও আরোহীই। ঘোড়াগুলো ছুটতেই থাকে। সকালে আগ্রা দুর্গে হইচই। ঘুমচক্ষু খোলার পর সবার নজরে আসে ব্যাপারটা। কয়েদিরা পালিয়েছে। খবরটা জানানো হয় বাদশাহ আলমগীরকে।
রাগে ফেটে পড়তে ইচ্ছে করে ঔরঙ্গজেবের। একেবারে মুঠোয় পেয়েও হার মানতে তাঁকে বাধ্য করেছে শিবাজি। এই হার স্বীকার করতে তাঁর কষ্ট হয়। যেসব পাহারাদারের বেওকুফিতে এমন ঘটনা ঘটল, তাদের একশো যা করে চাবুক মারার হুকুম দেন। সবক টা প্রহরী, দ্বাররক্ষী, কারারক্ষীকে ধরে এনে শাঁই শাঁই করে চাবুক মারার ব্যবস্থা করা হয়। চাবুক মারার কাজে যাদের লাগানো হয়েছিল, তারা খানিকক্ষণ পর হাঁপিয়ে পড়ে। যাদের চাবুক মারা হচ্ছিল, তাদের চিৎকারে, কান্নায় ভারী হয়ে যায় আগ্রার বাতাস। কিন্তু চাবুক চালানো বন্ধ হয় না। আকাশে শকুনের ওড়াওড়ি শুরু হয়, লাশের অপেক্ষায়। সে দৃশ্য দেখেও তৃপ্ত হন না বাদশাহ আলমগীর।
শিবাজি তাঁকে বোকা বানিয়েছে, এ ব্যাপারটা হজম করতে কষ্ট হয় তাঁর। তারপর আস্তে আস্তে নিজেকে স্বাভাবিক করে তোলেন আলমগীর। ঝেড়ে ফেলেন সব রাগ। মোচন করেন সব হতাশা।
যোহরের নামাজ পড়ার সময় হল। সূর্য মধ্য গগনে পৌঁছয়। ঔরঙ্গজেব নিজের মুখোমুখি ৷
নিজেকেই জিজ্ঞেস করেন, কতটা ইমানদার সাচ্চা মুসলমান তিনি?
এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, দিকে দিকে মসজিদ নির্মাণ, গরিবদের জন্য জাকাতের পরিমাণ বৃদ্ধি, মক্কায় আরও বেশি বেশি অর্থ প্রেরণ, এসবেই কি স্থির হয় একজন মুসলমানের নিষ্ঠা? তাঁর পরিচয়?
এগুলো তাঁকে তৃপ্ত করে। এসব কাজ করে তিনি আনন্দ পান। কিন্তু নিজের কোনও প্রিয়জন বা প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর উদ্দেশে কুরবানি দিতে না পারলে কি সাচ্চা মুসলমান হওয়া যায়?
নিজের প্রশ্নে নিজেকেই বিদ্ধ করেন ঔরঙ্গজেব। তখনই মনে উদিত হয় সেই ধারণা। যখন প্রিয় কোনও বস্তুকে বা ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ নির্মোহ হয়ে আল্লাহর কাছে নিবেদন করতে পারবেন, তখনই তিনি হতে পারবেন সাচ্চা মুসলমান। আর সাচ্চা মুসলমান না-হয়ে ওঠা অবধি আল্লা তাঁকে চূড়ান্ত বিজয় থেকে বঞ্চিতই রাখবেন। ততদিন মারাঠা নায়ক শিবাজিকে পর্যুদস্ত করে পুরোপুরি নিজের কবজায় আনতে সমর্থ হবেন না তিনি । উলেমাদের ডেকে পাঠান। উলেমারাই তাঁকে সঠিক ধর্মীয় পথ দেখাতে পারবেন। এ তাঁর স্থির বিশ্বাস ।
তাঁরা আসেন। ঔরঙ্গজেব জানতে চান, তাঁর কোন অপরাধের কারণে পরমেশ্বর তাঁকে মারাঠাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় লাভ থেকে বঞ্চিত রাখলেন ?
আবু হাকিম উঠে দাঁড়ান। হিরাট থেকে এসেছেন তিনি। ইসলামি ধর্মশাস্ত্রে তাঁর ব্যুৎপত্তি প্রশ্নাতীত। তিনি বলেন, ‘শাহেনশাহ আকবর হিন্দুদের যে সম্মান আর অধিকার দিয়েছিলেন, তারই অপব্যবহার করে, সেগুলোর সুযোগ নিয়ে হিন্দুগুলো মুঘলদের বিরুদ্ধে বেয়াদপি চালিয়ে যাচ্ছে। এবং আপনি তাতে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। কাফেরদের প্রশ্রয়দান ধর্ম অনুমোদন করে না।'
ঔরঙ্গজেব সপ্রশ্ন চোখে হিরাট থেকে আগত ধর্মজ্ঞানী আবু হাকিমের দিকে তাকান ।
আবু হাকিম বলে চলেন, ‘আপনি যখন খবর পেয়েছিলেন বারাণসীতে হিন্দু মন্দির আর তার সেবায়েত ব্রাহ্মণদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন চলছে, তাদের সবক শেখানোর, তাদের শায়েস্তা করার সব আয়োজন সুষ্ঠুভাবে পালিত হচ্ছে, তখন আপনি কী করলেন? বারাণসীর শাসক আবুল হাসানকে কড়া নির্দেশ দিলেন, সেসব বন্ধ করার । আপনি বলেন, আপনি কট্টর সুন্নি। আর কাজে কী করেন? এলাহাবাদের সোমেশ্বর মহাদেব, কাশীর জঙ্গমবাড়ি শিব, উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর, গৌহাটির উমানন্দ, নানদেড় জেলার মোহনপুরের দত্তাত্রেয় গুরু মন্দির, আহমেদাবাদের জৈনদের শত্রুঞ্জয় মন্দির, সব ক'টা জায়গায় পুজো-আচ্চা যাতে বজায় থাকে সেজন্য সাহায্য পাঠান। কোথাও কোথাও আবার বাদশাহি ফরমান জারি করে জমির বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন আপনি। এগুলোকে আপনি সাচ্চা মুসলমানের কাজ বলে মনে করেন?'
ঔরঙ্গজেব চুপ করে থাকেন।
আবু হাকিম অনর্গল।
‘আর ওই মন্দিরগুলো থেকে কী প্রচার করা হয়? ওগুলো থেকে প্রচারিত হয় বিধর্মীদের বিদ্বেষ বিষ। ওখানকার পুরোহিত থেকে পুণ্যার্থী হিন্দুর দল, সবাই বলে বেড়ায়, মুঘলরা বিদেশি। হিন্দুস্তানে তাদের কোনও অধিকার নেই। হিন্দুদের কাছ থেকে কর কিংবা রাজস্ব আদায় করার কোনও নৈতিক এক্তিয়ার নেই আপনার।
ঔরঙ্গজেব গভীর চিন্তায় ডুবে যান। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার, তলিয়ে বোঝার প্রাণপণ চেষ্টা করেন।
আবু হাকিম সেই নীরবতার প্রশ্রয় পেয়ে আরও বাঙ্ময় হয়ে ওঠেন।
‘জাঁহাপনা! আপনার উচিত এদের সব্বাইকে বুঝিয়ে দেওয়া যে আপনি যেমন উদার তেমনই কঠোর। আপনারই দান ধ্যান দয়াধর্মের প্রশ্রয়ে লালিত হয়ে কেউ মুঘল জমানার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াবে, এটা চলতে দেওয়া যায় না। ব্যাপারটা যে আপনার না-পসন্দ সেটা বোঝানোর একটাই উপায়।'
ঔরঙ্গজেব আবার একরাশ জিজ্ঞাসা চোখে নিয়ে আবু হাকিমের দিকে তাকান। আবু হাকিম তখন প্রবল আত্মবিশ্বাসী। আবু হাকিম তখন ধরে ফেলেছেন ঔরঙ্গজেবের স্নায়ু। সুযোগ বুঝে মোক্ষম ঘা-টা হানলেন তিনি।
‘বিদ্রোহের সত্য বা কাল্পনিক কারণ দেখা দিলেই কী স্বধর্মী কী বিধর্মী, প্রজাদের কঠোরভাবে দমন করাটা শাসকের আবশ্যিক কর্তব্য। সেই প্রক্রিয়াতেই ওদের ধর্মস্থান ধ্বংস করতে হবে। করতেই হবে। নইলে এই বিদ্রোহের নামে নোংরামি চলতেই থাকবে। বারবার আপনি মুঠোতে পুরেও ধরে রাখতে পারবেন না বিদ্রোহীদের। শিবাজির মতো বিচ্ছু ইঁদুর যে আপনার খাঁচায় কয়েদ হয়েও শেষ পর্যন্ত পালাতে পারল, তার কারণটাও আপনি নিশ্চিতভাবে জেনে রাখুন। আগ্রার হিন্দু মন্দিরের পুরুতদের সাহায্য ছাড়া এ কাজ সে কিছুতেই করতে পারত না। ওই যে সে গরিবদের মধ্যে দানধ্যান করবে বলে আপনার সম্মতি চাইল, তদন্ত করলে দেখবেন, ওটাই ছিল আপনার চোখে ধুলো দেওয়ার কৌশল। আর সেই চাতুরি সফল হয়েছে হিন্দু মন্দিরের পুরোহিতদের সাহায্য পেয়েছে বলেই।'
ঔরঙ্গজেবের চোখের সামনে যেন পুরো ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর তখনই আবু হাকিম বলে ওঠেন, ‘বাদশাহ আলমগীর! ভাল কথা বলছি, শুনুন। নিজের তখত যদি বাঁচাতে চান, যদি চান মুঘল মসনদ টিকিয়ে রাখতে, তবে আর দেরি না করে বিধর্মীদের মন্দিরগুলো গুঁড়িয়ে দিন। ভেঙে দিন বিদ্রোহের আখড়াগুলো।'
ঔরঙ্গজেব ভেতরে ভেতরে জ্বলে উঠলেন।
আবু হাকিমের এক চ্যালা, কম বয়সি একজন ধর্মশাস্ত্রের ছাত্র, ভিড়ের মধ্যে থেকে বলে উঠল, “তাই বলে সব মন্দিরেই যে বিদ্রোহীরা ঘোঁট পাকাচ্ছে, এমনটা কিন্তু নয়। সুতরাং মন্দির ভাঙার আগে সেটার বিষয়ে ভালমতো খোঁজখবর নেওয়াটা দরকার। জাঁহাপনা! স্মরণে রাখবেন, আবুল ফজল আপনার পূর্বপুরুষ আকবর বাদশার আমলে প্রদেশে প্রদেশে শাসনকর্তাদের কাছে যে নির্দেশাবলি পাঠিয়েছিলেন, তাতে স্পষ্ট বলা ছিল, তোমরা কোনও ব্যক্তির ধর্মে হস্তক্ষেপ করবে না। কারণ, কোনও বিজ্ঞব্যক্তি যখন কারও অচিরস্থায়ী ঐহিক ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে তখন তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হন। কিন্তু তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কেন? কারণ, সে যদি সত্য পথে থেকে থাকে তাহলে তুমি তার ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ করে আসলে সত্যের বিরুদ্ধাচরণ করলে। আর, সত্য যদি তোমার দিকে থেকে থাকে আর ওই ব্যক্তি যদি স্বল্পবুদ্ধির কারণে অন্যায়ের বা অসত্যের পক্ষে থাকে, তবে সে-ই হবে অজ্ঞানতার শিকার। সেই অবস্থায় সেই ব্যক্তি তো তোমার সহৃদয়তা ও সাহায্যের অধিকারী, তোমার হস্তক্ষেপ ও প্রতিরোধের পাত্র নয়। তাই, শাসকের উচিত সবার প্রতি দয়ালু, উপকারী ও বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়া।’
ছেলেটি থামল। ঔরঙ্গজেব বলতে শুরু করলেন। এতক্ষণে তাঁর অন্তদৃষ্টি স্বচ্ছতা অর্জন করেছে। বুকের ভেতর সংশয়, সন্দেহ, হতাশা আর অনিশ্চয়তার যে মেঘ জমেছিল, তা অনেকটা কেটে গিয়েছে।
‘আপনি বয়সে ছোট হলেও আপনার কথা আদৌ উপেক্ষনীয় নয়, আমি স্বীকার করছি। একই সঙ্গে আবু হাকিমের মতো বরিষ্ঠ উলেমার পথ নির্দেশিকাও আমার শিরোধার্য। তাই আপনাদের সকলকে জানাই, আমি মনঃস্থির করে ফেলেছি।'
গোটা সভাগৃহ চুপ করে, যেন শ্বাস বন্ধ করে, শুনতে লাগল ভারতেশ্বর সম্রাট আলমগীরের কথা ।
‘শুরু করব মথুরা দিয়ে। ওখানে মুঘল বাদশার রাজস্ব সংগ্রহ করতে গিয়ে কর্মচারীরা হিন্দু প্রজাদের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন বলে খবর এসেছে। এখনই যদি না তাদের সবক শেখাই, এখনও যদি চুপ করে মেনে নিই এই বেয়াদপি, তবে সবাই বাদশাকে হেয় করার সাহস পেয়ে যাবে। পার্থিব প্রকাশে আমার ধর্মবিশ্বাস যে সর্বশ্রেষ্ঠ, মুঘল শাসন যে সর্বোত্তম, সেটা সব্বাইকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য, ঠিক করেছি মথুরায় হিন্দু ধর্মস্থান ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে তার ওপর নির্মাণ করব মসজিদ। সর্বত্র মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরির কর্মসূচি রূপায়িত হবে আমার শাসনে।'
আবু হাকিম মৃদু হাসলেন। উপস্থিত বাকি বিদ্বজনেরা উচ্ছ্বসিত, উল্লসিত। আবু হাকিমের মধ্যে কিন্তু সেই উচ্ছ্বাস, উল্লাস দেখতে না পেয়ে কিছুটা আশাহত হলেন বাদশা আলমগীর।
বললেন, ‘আপনি কি কিছু বলতে চাইছেন?'
'হ্যাঁ।'
‘স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন।'
‘দেখুন শাহেনশাহ! আপনার পূর্বজদের মধ্যে ইসলামের প্রতি আনুগত্যের অভাব ছিল। সেটা যেন আপনার মধ্যে না থাকে, সেদিকেও খেয়াল রাখবেন। এটা অনুরোধ।'
‘আমার পূর্বজরা ইসলামে অনুগত ছিলেন না, এ কেমন কথা!'
‘আকবর বাদশা তো আলাদা ধর্মমত প্রচার করেছিলেন। দীন-ই-ইলাহি। তাঁর কথা বাদই দিলাম।'
এ বক্তব্যে ঔরঙ্গজেব আপত্তির কোনও কারণ দেখলেন না। কারণ, তিনিও কমবেশি কথাটা বিশ্বাস করেন।
‘আপনার ঠাকুর্দা বাদশা জাহাঙ্গির। সম্রাজ্ঞী নূরজাহান তাঁকে আফিম মেশানো শরবত খাওয়াতেন। আর তিনি জেনেশুনে সেই শরবত তরিবৎ করে পান করতেন। নেশায় বেহুঁশ হয়ে থাকতেন। নেশাড়ু হওয়াটা ইসলাম ধর্ম পালন নয়। ইসলামে নেশা করাটা নিষিদ্ধ।’
এ বক্তব্যেও সহমত না হওয়ার কোনও কারণ খুঁজে পেলেন না ঔরঙ্গজেব। তাঁর বাবা শাহজাহানের সঙ্গে ঠাকুর্দা জাহাঙ্গিরের যুদ্ধের সময় দাদা দারা শুকোহ আর তাঁকে পণ বন্দি করেছিলেন জাহঙ্গির। তখন ঠাকুর্দা-ঠাকুমার কীর্তিকলাপ স্বচক্ষে দেখেছেন। বিষয়টা তাঁর মোটেও ভাল লাগেনি। তাই, এই বক্তব্যের বিরোধিতা করার কোনও যুক্তি খুঁজে পেলেন না বাদশা আলমগীর।
সেই সঙ্গে জেগে উঠল তাঁর অন্তরাত্মা। ইসলামি বিশ্বাস। ধর্মের প্রতি নিবন্ধ আনুগত্য। ভরা সভায়, প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন, ‘আজ থেকে আমি কোনওরকম গানবাজনার পৃষ্ঠপোষকতা করব না আমার দরবারে। পরব না কোনও জেল্লা দেওয়া দামি পোশাক কিংবা মণিমাণিক্য হিরে জহরত বসানো অলংকার যা স্রেফ দেমাক দেখানোর জন্য লোকে পরে। লিখব না কোনও আত্মজীবনী যা এতদিন ধরে লিখে আসছিলাম। আর উলেমাবর্গের প্রতি আমার বিনম্র অনুরোধ, ফের যদি দরকার পড়ে ডেকে পাঠাব আপনাদের। আসতে অস্বীকৃত হবেন না। এসে পথ দেখাবেন আমাকে। মোচন করবেন আমার ভ্রান্তি। কাটিয়ে দেবেন মনের ধোঁয়াশা।'
আবেগের বশে এত কথা সর্বসমক্ষে বলে ফেলে নিজেকে সংযত করলেন বাদশা আলমগীর। আর একটু হলেই আবেগের বশে বলে ফেলছিলেন, নারী সংসর্গ ত্যাগ করার কথাও। কিন্তু উদিপুরী মহলের রূপের ছটা মনোলোকে উদিত হতেই থামিয়ে দিলেন নিজেকে, রাশ টানলেন জিহ্বার।
শিবাজীর সঙ্গে লড়াই এখনও বাকি। নিজের সঙ্গে লড়াই অনেকটাই শেষ।
অদ্ভুত এক শান্তি অনুভব করলেন ঔরঙ্গজেব, নিজের মনে।
খুশিও নয়, দুঃখও নয়। হতাশা নয়, উল্লাসও নয়। বোধহীন এক নিস্তরঙ্গ বালুচরে নিজেকে শুইয়ে দিলেন সেদিন।
আলমগীর বাদশাহর বাহিনীর চোখে ধুলো দিয়ে শিবাজি মহারাজ যখন সপুত্র চম্পট দিয়েছিলেন, তখন শম্ভুজির বয়স ছিল মোটে নয় বছর। কিছুটা বাবার মুখে শুনে, কিছুটা অন্যদের কাছ থেকে জেনে এবং বেশিরভাগটা নিজের চোখে দেখে শম্ভুজি সেদিনকার সম্পর্কে যা কিছু জানে তা উগরে দেন আকবরের কাছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে। এখনও সেসব দিনের কথা বলতে গেলে তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সেই ঔজ্জ্বল্য আকবর দেখতেও পান না। তবে আকবর সেই মিশমিশে অন্ধকারের ভেতরেও টের পান, শম্ভুজির তাঁর প্রয়াত পিতার সম্পর্কে প্রবল শ্রদ্ধার কথা। আর অনুভব করেন, নিজে তাঁর আব্বাজানের সম্পর্কে ভক্তিতে আপ্লুত নন, ভয়ে ভীত। পিতৃস্মৃতি তাঁকে আহ্লাদিত করে না শম্ভুজির মতো, আতঙ্কিত করে।
মুহূর্তের জন্য হলেও, শম্ভুজির প্রতি হিংসে হয় আকবরের। ভাবেন, তাঁর বাবা যদি শিবাজি মহারাজের মতো হতেন, তবে তাঁকে পরিবার-পরিজন ছেড়ে, তহাবুর খানের মতো বন্ধুকে শত্রু বানিয়ে, পিতৃশত্রুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই বিজন প্রান্তরে মশার কামড় সহ্য করতে হত না । অপেক্ষা করতে হত না, বাবার বাহিনীকে বেকায়দায় ফেলার জন্য।
এ সব ভাবনা-চিন্তা যখন দাপাচ্ছিল মনের ভেতর তখনই অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এল একটা শরীর। গলার স্বর শুনে বোঝা গেল, সে অশোক। শম্ভুজি তাকে পাঠিয়েছিল শত্রু শিবিরের খবরাখবর জোগাড়ের জন্য।
‘কী খবর?”
‘সেরকম কোনও খবর নেই শম্ভুজি। মুঘল সেনারা রাতে এগোনোর চিন্তা ছেড়ে পথিমধ্যে শিবির পেতে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে।'
অন্ধকারে প্যাঁচা ডেকে উঠল।
আকবরকে শম্ভুজি বলল, ‘চলুন, অশোককে অনুসরণ করি। মুঘলরা দূর থেকে দেখলে ভাববে আমরা দুর্গে সুখনিদ্রা দিচ্ছি। এই ভুলটাকে কাজে লাগাতে হবে।'
আকবর কথা না বাড়িয়ে শম্ভুজির সঙ্গী হলেন। আধ ঘণ্টা পর তাপ্তী নদীর কিনারায় যৌথ বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হলো দুই সেনানায়ক। তারপর তাপ্তীর যে জায়গাটায় জল সবচেয়ে কম, সেই জায়গা দিয়ে সসৈন্যে নদী পার হলেন। পৌঁছে গেলেন মুঘল সেনা ছাউনির কাছে। আমবনে শিবির পেতেছে তারা।
শম্ভুজির দু'জন লোক চুপিসারে মুঘল শিবিরের দিকে এগোতে লাগল। তাদের দুজনের কাছেই আছে বারুদের বস্তা আর আগুন জ্বালানোর কাজে ব্যবহার করার জন্য এক বাক্স করে খড়কুটো। আরও দু'জন দাঁড়িয়ে রইল খানিকটা দূরে। তাদের কাছে একইরকম অস্ত্র সামগ্রী। কোনওরকম আশঙ্কাজনক কিছু দেখলেই তারা সতর্ক করবে বাকিদের।
আমবাগানের গাছগুলোতে নিঃসাড়ে দড়ির মই ঝুলিয়ে ফেলল জনাদশেক মারাঠা সৈনিক। তৎপরতার সঙ্গে সে কাজ করতে তারা অভ্যস্ত। কারণ, গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণে তারা প্রশিক্ষিত।
আকবরের ইশারা পাওয়া মাত্র বিকট শব্দে নিজের কাছে রাখা বারুদের বস্তায় খড়কুটো সমেত আগুন ধরিয়ে দিল সেই দু'জন যারা মুঘল শিবিরের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল।
দড়ির মই বেয়ে ত্বরিৎগতিতে গাছে গাছে উঠে গিয়েছিল তিরন্দাজরা। বারুদে অগ্নিসংযোগ মাত্র তারা তির ছোঁড়ার জন্য তৈরি হয়ে গেল।
আকবর সঙ্গে কয়েকজন রাজপুত সেনা নিয়ে খোলা তলোয়ার হাতে ঢুকে পড়লেন শত্রু শিবিরে। ত্রাহি ত্রাহি রব উঠল সেখানে।
আকবর করিম খানের মুখোমুখি।
এই লোকটা এক সময়ে তাঁর বাবার দেহরক্ষী ছিল। তখন দু'-একবার আকবর তার কোলেও উঠেছে। আজ সেই করিম আকবরের সামনে শমন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামান্য একটু ইতস্তত ভাব। তারপরেই কোমর থেকে ছোরাটা বের করে ছুঁড়লেন আকবর। নিখুঁত নিশানা। করিমের গলার নলি কেটে দিয়ে বেরিয়ে গেল ছুরিটা আড়াআড়িভাবে। করিম পড়ে গেল। হাত থেকে ছিটকে গিয়েছে তার বন্দুক। আকবরের সময়জ্ঞান ও লক্ষ্য একটু এদিক-ওদিক হলেই ওই বন্দুকের গুলিতে প্রাণ যেতে পারত তাঁর।
আকবর দেখতে পেলেন, করিম ওই অবস্থাতেও হামাগুড়ি দিয়ে বন্দুকটা টানার চেষ্টা করছে। দেখামাত্র পা বাড়িয়ে বন্দুকটাকে চেপে ধরেন আকবর। তারপর তুলে নেন বন্দুকটাকে। একটা গুলি। করিম খতম।
রক্তাক্ত লাশটাকে লাথি মেরে সরিয়ে এগিয়ে চলেন আকবর। রাজপুত-মারাঠা বাহিনী প্রবল সংঘর্ষে ততক্ষণে মুঘলদের কোণঠাসা করে ফেলেছে।
কোনও কিছু না দেখে, কোনও দিকে না তাকিয়ে, তরবারি চালিয়ে, একের পর এক মুঘল সৈন্যকে লাশ বানাতে বানাতে এগিয়ে চলেন আকবর। চারদিকে তখন তির বর্ষণ শুরু হয়ে গিয়েছে। তাতে আরও বেসামাল ঔরঙ্গজেবের মুঘল বাহিনী।
একটা তাঁবুর সামনে ভিড় দেখে এগিয়ে যান আকবর। শম্ভুজিও এগিয়ে আসেন। তাঁবু ঘিরে ফেলা সেনারা জানায়, ভেতরে মুঘল সেনাপতি আর তার কয়েকজন বাধ্য শাগরেদ আছে। সেনাপতি আকবরের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চায়। তার অবশিষ্ট সৈন্য আর গোলা-বারুদ তুলে দিতে চায় আকবরের হাতে। তবে মারাঠাদের কাছে হার স্বীকার করতে সে নারাজ।
শম্ভুজি আকবরের দিকে তাকান।
আকবর বলে ওঠেন, ‘ওকে বলে দাও, আমি আর শম্ভুজি এখন আর আলাদা আলাদা দু'জন নই। আমরা এখন এক। হিন্দু-মুসলমান, মারাঠা-মোঘল, আমরা সবাই এখন একাকার। ঔরঙ্গজেবের ঔদ্ধত্য আর অসহিষ্ণুতার জমানা খতম করতে বদ্ধ পরিকর।'
দাসখত লিখে দিতে হল মুঘল সেনাধ্যক্ষকে
তারপর বাদশা আলমগীরকে একটা চিঠি পাঠাল আকবর। চিঠিটা লেখা হল মুঘলদের একটা নিশানের ওপর। সামান্য কয়েকটা কথা। কিন্তু বক্তব্য সুস্পষ্ট।
‘আপনার সেনাবাহিনী আমাদের কাছে নাকখত দিচ্ছে। এই নিশানটাই তার প্রমাণ ।
আমিই এখন হিন্দুস্তানের বাদশা। সেটা মেনে নিন। জেনে রাখুন, আমার সঙ্গে রয়েছে সেইসব মানুষ, যারা আপনার অন্যায়ের শিকার। তাই তাদের সঙ্গে নিয়েই আমি লড়ছি ও লড়ব।'
বক্তব্যের নিচে রক্ত দিয়ে নিজের নাম স্বাক্ষর করলেন আকবর।
নিশানটা হাতে পেয়ে হেসে ফেললেন বাদশা আলমগীর। ছেলেটা এখনও বোকাই আছে। পাকাবুদ্ধি হয়নিকো। এক দল মুঘল সেনাকে কবজা করে ভাবছে হিন্দুস্তান দখল করে নিয়েছে। ভাবছে, আলমগীর নতশির হবে তার কাছে।
উদিপুরী কাছেই ছিলেন। জানতে চাইলেন, কী ব্যাপার। হঠাৎ হাসির কারণটা কী। হাসতে হাসতেই ঔরঙ্গজেব বললেন, ‘মুরগির বাচ্চার মতো কোঁকর কোঁ করছে ছানাটা, নিশান পাঠিয়ে শোনাচ্ছে সে-ই নাকি আমার মসনদের অধিকারী। ছোকরা জানে না, মৃত্যু
কী আর ঔরঙ্গজেব শত্রুদের জন্য কেমন মরণ পছন্দ করে।'
ভয়ে কেঁপে উঠল উদিপুরীর বুক। কেঁপে উঠল কমবক্সের কথা ভেবে। কমবক্স তাঁর গর্ভজাত সন্তান, ঔরঙ্গজেবের ঔরস। তিনি আজ দেখে ফেলেছেন, একজন বাবার নির্দয় কর্কশ রক্তলোলুপ মুখ। যে আচরণ আজ তিনি আকবরের সঙ্গে করছেন, আগামীতে সেটা কমবক্সের সঙ্গেও করতে পারেন। এটা ভেবেই কেঁপে ওঠে মায়ের হৃদয়। তারপর আস্তে আস্তে প্রস্তুত করেন এক বিশেষ শরবত। এই শরবত খেলে ঔরঙ্গজেব চাঙ্গা হয়ে ওঠেন। আজও উঠবেন, এই আশায় উদিপুরী শরবত বানান। ঔরঙ্গজেব প্রথম দিন থেকেই জানেন এই শরবতে শরাব মেশানো হয়। প্রথম প্রথম সে কথা জানতে চাইতেন না। শেষে একদিন, না থাকতে পেরে জিজ্ঞেস করেছিলেন, উদিপুরী শরবতে শরাব মেশান কি না।
জবাবে উদিপুরী হ্যাঁ কিংবা না, কোনওটাই স্পষ্ট করে বলেননি। শুধু বলেছিলেন, তার জন্মভূমি জর্জিয়াতে এই পানীয় তৈরি হয়। শরীর খারাপ করলে সেটা পান করার কথাই সে দেশের হাকিমরা বলে থাকেন। তাই, সেটা শরাব না দাওয়াই তা পরিষ্কারভাবে জানা নেই তাঁরও ।
তারপর থেকে ঔরঙ্গজেব এই বিষয়ে আর কোনও উচ্চবাচ্য করেননি।
আজও করলেন না।
আস্তে আস্তে চুমুকে চুমুকে শেষ করলেন পানপাত্র। তারপর সতেজ মস্তিষ্কে তাকালেন উদিপুরীর দিকে। বললেন, ‘চোখে তোমার ভয় দেখতে পাচ্ছি উদিপুরী। স্বাভাবিক। মনে হয়, আকবরকে আমি কী করতে চাই সেটা জেনে ফেলার পর তুমি কমবক্সকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। ওসব উলটোপালটা চিন্তা না করে দুটো কথা জেনে রাখো। এক, কমবক্সকে আমি খুবই ভালবাসি। সে নিঃসন্দেহে আমার স্নেহের পাত্র। দুই, কমবক্সের এখন থেকেই জেনে রাখা দরকার, নিজেকে এবং মাকে ভাল রাখতে হলে তাকে আমার প্রতি অনুগত থাকতে হবে। থাকতেই হবে। প্রত্যেকের নসিব সে নিজে তৈরি করে। এটা যেন সে ভুলেও না ভুলে যায়।’
উদিপুরী বুঝতে পারেন, ভারতেশ্বরের নিজের পরিবারের জন্য আলাদা কোনও আবেগের জায়গা নেই। যে সম্রাটের হাতে লক্ষ লোকের ভাগ্য নির্ভর করে, তাঁর নিজেকে নিয়ে, নিজেদের ভালবাসার ভাল লাগার পাত্রপাত্রী নিয়ে আদিখ্যেতা করা সাজে না।
আর জাহানারা কোনওদিন এই সোজা কথাটাই বুঝতে পারলেন না। পানপাত্রে আর একটা চুমুক দেন উদিপুরী।
‘জাঁহাপনা! মাফ করবেন। কোর্চিকে খবর দিয়ে আপনি জেগে ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারতাম। তেমনটাই করা উচিত ছিল। কিন্তু তার সময় ছিল না।'
কামরান বেগ তাঁর বহুদিনের সাথী । তাঁকে এতটা উত্তেজিত আগে কখনও দেখেছেন বলে মনে পড়ল না ঔরঙ্গজেবের। তবে তিনি জানেন ও বোঝেন, খুব জরুরি দরকার না হলে এমন অসময়ে কামরান তাঁকে ঘুম থেকে তুলত না আর কামরানকেও এতটা অস্থির, এতটা উত্তেজিত দেখাত না। তবু কণ্ঠস্বরে বিন্দুমাত্র উত্তেজনা বা ব্যগ্রতা ফুটিয়ে না তুলে বাদশা আলমগীর বললেন, ‘ব্যাপারটা কী, খুলে বল।’
‘হুজুর সঙ্গমেশ্বর।’
‘হ্যাঁ! তাতে কী? সেটা কোথায়?”
‘হুজুর ও এখন সঙ্গমেশ্বরে।'
‘ও মানে কে?’
‘হুজুর, শম্ভুজি।’
বাদশা আলমগীর এবার নড়েচড়ে বসলেন। শম্ভুজির খোঁজে চারদিকে চর পাঠিয়েছিলেন। গোলকুণ্ডা ও বিজাপুর তাঁর কব্জায় এসেছে। কিন্তু শম্ভুজি এখনও অধরা। তাই শিবাজি পুত্রের নামটা শুনেই কান সজাগ, দেহ টানটান, চোখ থেকে ঘুমের লেশ উধাও ।
‘সঙ্গমেশ্বর কি কোনও দুর্গ?'
‘না জাঁহাপনা। সাত্রী আর সোনাভি নদী দুটো যেখানে মিশেছে, সেটাই সঙ্গমেশ্বর। সেখানে একটা বাগানবাড়িতে আস্তানা পেতেছে শম্ভুজি। তেমনটাই খবর পেলাম, এইমাত্র।’
‘বাগানবাড়িটা কার?'
‘কবিকুলেশের।’
‘সে আবার কে?
‘জাঁহাপনা! কবিকুলেশ শম্ভুজির একজন সেনাপতি। তিনিই শম্ভুজিকে সেখানে অতিথি হিসেবে নিয়ে গিয়েছেন।' ‘সেখানে লোকলস্কর কত? খবর পেয়েছে?'
‘হ্যাঁ জাঁহাপনা। যতদূর জেনেছি খুব অল্প সংখ্যক সৈন্য আছে ওই বাগানবাড়িতে।' ‘অল্প সংখ্যক! কেন?” বাদশা সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চান।
‘জাঁহাপনা ! শয়তান ইঁদুরটা ওর বাহিনীর একটা বড় অংশ দেবরুকে রেখে গিয়েছে। সেখানে নাকি তারা নতুন নতুন অস্ত্রে রপ্ত হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।'
‘দেবরুক! সেটা আবার কোথায়?’
‘সঙ্গমেশ্বরের কাছেই। জাঁহাপনা ! যতদূর জানি, কবিকুলেশের বাগানবাড়িতে ক'দিন আরামে কাটাবে বলে মাসখানেক আগে সেখানে গিয়েছে শম্ভুজি। এখনও নড়ছে না সেখান থেকে। তবে আর বেশিদিন ওখানে থাকবে না বলেই মনে হচ্ছে।'
বাদশা আলমগীর চোখ বুজলেন। সব খবরাখবর ঠিকঠাক কি না মেপে নেওয়ার চেষ্টা করলেন মনে মনে। শম্ভুজি পুরোপুরি বাপ কা বেটা নয়। শিবাজি মহারাজ যুদ্ধ পরিকল্পনা, অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া, সবকিছু নিজে করতেন। আর শম্ভুজি সেসব অনুগত সৈন্যাধ্যক্ষদের ওপর ছেড়ে দিয়ে নিজে অবকাশ যাপন করছে।
আসলে ছেলেপুলেরা বাপের রক্ত পায় ঠিকই, কাজের ধরনটা বাবার মতো করে রপ্ত করে না। তিনি নিজেও বেয়াড়া সন্তান ছিলেন। তাঁর ছেলেরাও সেরকমই হয়েছে। তিন-তিনজন ছেলেকে হারিয়েছেন। হারিয়েছেন মানে তারা সরে গিয়েছে কিংবা নিজেই সরিয়ে দিয়েছেন তাদের।
খবরটা পেয়েছিলেন ফিরোজ বেগের কাছ থেকে। ফিরোজের বাবা মহম্মদ বেগ মুঘল দরবারে সহ-কোষাধ্যক্ষ ছিল। ফিরোজ আকবরের দলে নাম লিখিয়েছিল। ওয়াজিম খানের হাতে বন্দি হয়ে ভোল বদল করে। আলমগীরের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।
তার কাছ থেকে ঔরঙ্গজেব জানতে পারেন, আকবর আর শম্ভুজীর বনিবনা হচ্ছে না। মৈত্রীতে চিড় ধরেছে। আকবর ঔরঙ্গজেবের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তাড়াহুড়ো করছিল। শম্ভুজি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে, মারাঠা সৈন্যবাহিনী পার্বত্য এলাকায় দুর্ধর্ষ। কিন্তু সমতলে সংখ্যায় ও যুদ্ধের কেরামতিতে তারা মুঘল বাহিনীর মোকাবিলা করতে সমর্থ নয়।
আকবর বলেছিল, আবেগের বশে, হিন্দুস্তানের মানুষের কল্যাণের স্বার্থে ঔরঙ্গজেবকে সরিয়ে তার মসনদে বসাটা জরুরি। শম্ভুজি সে কথা হেসে উড়িয়ে দেয়। সাফ জানিয়ে দেয়, তার বাবা শিবাজি মুঘলদের বিরুদ্ধে একবার আক্রমণ শানিয়ে যেটুকু কবজা করেছিলেন, সেটাই তার জন্য রেখে গিয়েছেন। এখন আকবরের দিবাস্বপ্নে মদত দিতে গিয়ে সেই ভূখণ্ডের আধিপত্য সে খোয়াতে নারাজ।
শম্ভুজি দাক্ষিণাত্যের বাইরে গিয়ে মুঘল সৈন্যবাহিনীকে প্রতিহত করায় ঝুঁকি নিতে রাজি হয়নি এই যুক্তিতে যে ঔরঙ্গজেব আর বেশিদিন বাঁচবেন না আর ঔরঙ্গজেবের তুলনায় বয়স কম বলে শম্ভুজি নিজে ঔরঙ্গজেবের ইন্তেকালের পরেও বাঁচবে। সুতরাং মুঘল মসনদ দখলের ব্যাপারে তার কোনও তাড়া নেই। বাদশা আলমগীরের পর যারা মুঘল মসনদে বসবে তাদের কাবু করা অনেক সহজ হবে তার পক্ষে। এটাই তার যুক্তি।
আকবর সেসব যুক্তিতে কান দিতে নারাজ।
তর্কাতর্কি হতে হতে হাতাহাতি।
এরপরেই নাকি আকবর পারস্যে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে শুরু করে। পারস্যের শাহ যেমন হুমায়ুনকে মসনদে বসতে সাহায্য করেছিলেন, তেমন সাহায্য সেও পাবে, এটাই আকবরের আশা।
মুখে বলেছিলেন, ‘আকবর যদি পারস্যে যায় তবে বুঝতে হবে, আমি ওকে যতটা বিশ্বাসঘাতক ভেবেছিলাম, ও তার চেয়েও বেশি বিশ্বাসঘাতক।'
আর মনে মনে অনুভব করেছিলেন স্বস্তি। আকবর হিন্দুস্তান ছেড়ে পালালে পুত্র হন্তারক পিতার গ্লানি তাঁকে সহ্য করতে হবে না, এই ভাবনা তাঁকে আশ্বস্ত করে।
সেই সঙ্গে মাথায় এসেছিল অন্য চিন্তাও।
পারস্যে সাহায্য দেওয়ার জন্য শুধু শাহ আছেন, তা নয়। আকবরের মামার বাড়ির লোকজনও সেখানে যথেষ্ট শক্তিশালী। সফবিদ বংশের লোকজন সব।
সে যাই হোক, আকবর শেষমেশ পারস্যে পালিয়েছে। খবর পেয়েছেন, সেখানে সে নাকি রোজ বাবার মৃত্যুর জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে। শুনে মনে মনে হেসেছেন আর বলেছেন, ‘দেখা যাক! কার প্রার্থনায় জোর বেশি। কার আগে হয় ইন্তেকাল।'
আজও তাঁর দুঃখ, আকবর চিরটাকাল ছেলেমানুষ রয়ে গেল। ওর বোধবুদ্ধি আর পরিণত হল না।
এবং মুয়াজ্জাম।
গোলকুণ্ডা দুর্গে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয় মুঘল বাহিনী।
সেদিন বিকেলে পড়ন্ত সূর্যের আলোয় নিজের দেহরক্ষীদের মধ্যে ফিরে আসতে পেরেছিলেন ঔরঙ্গজেব। আর একটু হলেই মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। বাঁ পা আর বাহুতে ওষুধ দিয়ে পট্টি বাঁধার পর ডেকে পাঠিয়ে ছিলেন মুয়াজ্জামকে। সে-ই ছিল মুঘল বাহিনীর আক্রমণের দায়িত্বে।
‘তোমার সাহস আর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা আমাকে মুগ্ধ করেছে, মুয়াজ্জাম । আমাদের আক্রমণ যে শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি, সেজন্য তোমাকে দায়ী করা চলে না, এটা আমি ভালমতোই জানি।'
‘সুকরিয়া আব্বাজান।’ডান হাতে শরবতের পাত্র ধরে মুয়াজ্জাম বলেছিল। ‘আসলে আমার বাহিনী সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়েছে। অনেকেই মারা গিয়েছে। নিহত যোদ্ধাদের মধ্যে আমার দুধ-ভাই উমর খানও আছে। গোলকুণ্ডার দুর্গ থেকে ছোঁড়া মশালের আগুনে পুড়ে মরেছে উমর। মাথার চুল থেকে গায়ের চামড়া, ওর সব দাউদাউ করে জ্বলছে, এ দৃশ্য দেখাটাও একটা মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা জাঁহাপনা ৷
‘আজ রাতে ওর আত্মা বেহস্তে শান্তিলাভ করবে। শুধু উমর নয়, ওর মতো যারা যারা আজ অসীম সাহসিকতা দেখিয়েছে এবং মুঘল তখতের স্বার্থে জান কবুল করেছে, তাদের বউ-বাচ্চাদের দেখভাল করার দায়িত্ব যে আমি নিলাম, সে কথাটা ওদের জানিয়ে দিও।'
তারপর থেমেছিলেন বাদশা আলমগীর সেদিন। তারও পর বলেছিলেন, ‘একটা কথা বেশ বুঝেছি, সামনের দিক থেকে আক্রমণ চালিয়ে গোলকুণ্ডা দখল করা যাবে না। ওয়াজিম খানকে আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। ও এলে আলোচনা করে ঠিক করব, আর কী কী করা যায়।’
‘আচ্ছা, যদি সন্ধিচুক্তি করি?'
‘ওরা যদি ওদের দুর্গ আর ভূখণ্ড আমাদের হাতে তুলে দেয়, তবে সন্ধিতে কোনও আপত্তি নেই আমার। তবে মনে হচ্ছে না, ওদের তরফে তেমন কোনও ইচ্ছা আছে।'
‘না, মানে, ধরুন যদি সমানে-সমানে সন্ধি হয়।’
“মানে? কী বলতে চাইছ তুমি, মুয়াজ্জাম?'
‘আপনি হয়তো জানেন না জাঁহাপনা, আদিল হাসানের উজিরের পত্নী আমার স্ত্রীর আত্মীয়।' গলাটা নামিয়ে বলেছিল আকবর। আদিল হাসান গোলকুণ্ডার কুতুবশাহী বংশের শাসক।
‘তাতে কী হল?” জানতে চান বাদশা আলমগীর।
‘সেই উজির আমার সঙ্গে দু'জন মহিলার মাধ্যমে যোগাযোগ করেন। জানতে চান, মুসলমান হয়ে কেন আমরা মুসলমানকে কোতল করছি? কেন আমরা বিশ্বাসীরা, নিজেদের মধ্যে আপসে সমস্যাটা মিটিয়ে নিচ্ছি না?'
‘তা তুমি কী উত্তর দিয়েছ তাকে?'
‘বললাম, আমিও অযথা মৃত্যুর কারবারে বিশ্বাস করি না।'
‘আচ্ছা। আর কিছু বলেছ?'
‘জাঁহাপনা, আমি ভাবছিলাম, আর ক'দিনের মধ্যে সন্ধির শর্ত কী কী হবে সেটা ঠিক করে আপনার কাছে পেশ করব। সেইমতো সন্ধিপত্র তৈরির কাজেও হাত দিয়েছিলাম। কিন্তু উমর খানের মৃত্যু আমাকে বিহ্বল করে দিয়েছে। আর আজ আপনিও আমার প্রশংসা করলেন। তাই ভাবলাম, এটাই বিষয়টা আপনার গোচরে আনার উপযুক্ত সময়।'
রাগে ফেটে পড়লেন বাদশা আলমগীর। একটা ঘুসিতে থেঁতলে দিতে চাইলেন আকবরের মুখটা। আর একবার ইচ্ছে করল, ওর হাতের আঙুলগুলো সব কেটে নেবেন। কিন্তু সেসব কিছু না করে রক্ষীদের আদেশ দিয়েছিলেন, ‘আমার মুখের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে যাও এই বিশ্বাসঘাতককে।’
দু'ঘণ্টার মধ্যে বিচারসভা বসিয়েছিলেন। রক্ষীরা মুয়াজ্জামকে টানতে টানতে হাজির করেছিল সেই সভায়।
ঔরঙ্গজেব সেদিন দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিলেন, ‘আমার অনুমতি ছাড়াই তুমি গোলকুণ্ডায় শত্রুপক্ষের সঙ্গে সন্ধির জন্য আলাপ আলোচনা চালিয়েছ?”
‘হ্যাঁ জাঁহাপনা, চালিয়েছি। চালিয়েছি কারণ আমার মনে হয়েছে অযথা রক্তক্ষয় কিংবা সেনাক্ষয়ের চেয়ে সম্মানজনক শর্তে সন্ধি করলে সেটা বাদশাহের পক্ষে এবং মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষে ভাল।’
‘আমার কীসে ভাল হবে আর কীসে মন্দ হবে, মুঘল সাম্রাজ্যের ভালমন্দ কীসে হবে, সে কথা আমার চেয়েও তুমি বেশি বোঝ বলে তোমার মনে হয় ?
বাদশাহর গর্জনের সামনে মুয়াজ্জাম চুপ করে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। ‘আমার জীবদ্দশাতেই তোমার এত ঔদ্ধত্য মুয়াজ্জাম ?'
‘কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমার কোনও খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না। অবশ্য এখন বুঝতে পারছি, আমার ভুল হয়ে গেছে। আমাকে মাফ করবেন জাঁহাপনা। আমি ক্ষমাপ্রার্থী।’
‘তোমার উদ্দেশ্য কী ছিল, তোমার-আমার সম্পর্ক কী, তুমি ক্ষমা চাইছ না ভুল স্বীকার করছ, এসব ব্যাপার এখানে অপ্রাসঙ্গিক মুয়াজ্জাম। আমি শুধু জানতে চাই, শাস্তি ঘোষণার আগে তোমার আর কিছু বলার আছে কি না? আর তোমাকে মনে করিয়ে দিতে চাই, আমার আদালতে বিশ্বাসঘাতকতার একটাই শাস্তি। মৃত্যুদণ্ড।’
‘যদি তাই হয়, তবে নতশিরে মেনে নেব আপনার বিচার । আমি মরবার জন্য তৈরি।' মুয়াজ্জামের কণ্ঠস্বরের শীতলতা বাদশার পিতৃহৃদয়কে ছুঁয়ে যায়। কিন্তু শাসকের নৈর্ব্যক্তিক কাঠিন্য তাঁকে ছেড়ে যায় না ।
একটু ভাবতে হয় আলমগীরকে। চট করে রাগের বশে কোনও সিদ্ধান্ত কোনওদিন নেননি। সেদিনও নিলেন না।
মুয়াজ্জামকে প্রাণদণ্ড দেবেন কি না, তা নিয়ে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে, আর একটু ভাবার অবকাশ দরকার। তড়িঘড়ি যে কোনও সিদ্ধান্তই বিপদ বাড়ায়।
মহম্মদ সুলতান ছিল বড়। হাত মিলিয়েছিল সুজার সঙ্গে। মুঘল সিংহাসনের দাবিদার ছিল সুজাও। ঔরঙ্গজেবের প্রতিপক্ষ। সেই সুজার সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল সুলতান। তাকে কয়েদখানায় বন্দিদশা কাটাতে হচ্ছে। পাপের শাস্তি পেতে হচ্ছে।
আকবর সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। সেই প্রত্যক্ষ বিশ্বাসঘাতকতার একটাই শাস্তি হতে পারত। নিজের ছেলেকে সেরকম শাস্তি দেওয়ার হাত থেকে আকবর নিজেই ঔরঙ্গজেবকে বাঁচিয়েছে পারস্যে পালিয়ে গিয়ে।
এখন সামনে দাঁড়িয়ে মুয়াজ্জাম। ঔরঙ্গজেবের অনুমতি ছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাহস দেখিয়েছে, সত্যি। কিন্তু সরাসরি বিদ্রোহ করার বেয়াদপি করেনি। তবে আকবর বা মহম্মদ সুলতান যে বয়সে বিদ্রোহী হয়েছে তার তুলনায় মুয়াজ্জামের বয়স অনেকটা বেশি। এখনই সে চল্লিশের কোঠায়। বয়স বাড়লে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে পক্বতা বাড়ে। কম বয়সের চাঞ্চল্য তখন থাকে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরিপক্কতা আসে। সেই বয়সটা এখন মুয়াজ্জামের। সুলতান বা আকবরের তারল্য তার থাকার কথা নয়, উচিতও নয়। সেটাও বিচারের সময় মনে রাখা দরকার। নইলে ন্যায় রক্ষিত হয় না। ভাবেন আলমগীর।
আচমকা সেদিন মনে পড়ে যায় জাহানারার কথা। সে আকবরের প্রাণ ভিক্ষা করেছিল। বেঁচে থাকলে মুয়াজ্জামেরও প্রাণ ভিক্ষা করত। করতই।
এই ভাবনাটাই বদলে দেয় আলমগীর বাদশাহর সিদ্ধান্ত। প্রাণদণ্ড দেবেন না তিনি মুয়াজ্জামকে।
পরুষ কণ্ঠে আদেশ দেন রক্ষীদের, ‘ওকে আমার চোখের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে যাও। কয়েদ করে রাখো গোয়ালিয়রের বন্দিশালায় ।
আচমকা এক পশলা বৃষ্টি এসে বাঁচিয়ে দিয়েছিল ঔরঙ্গজেবকে। চোখের জল আড়াল করতে সুবিধা হয়েছিল তাঁর। সেদিন।
শম্ভুজির সঙ্গমেশ্বরে বিশ্রাম নেওয়ার প্রসঙ্গে এই এতগুলো কথা মনে ঢেউ তুলল আবার। নিজেকে সামলে নিলেন আলমগীর। তার পর জিজ্ঞেস করলেন কামরানকে, ‘তোমার লোকেরা শম্ভুজিকে সঙ্গমেশ্বর অবধি ধাওয়া করেছে নাকি?’
‘হ্যাঁ জাঁহাপনা, ওয়াজিম খানই প্রথমে আন্দাজ করেছিলেন, শম্ভুজি সঙ্গমেশ্বরে গা ঢাকা দিতে পারে। আমাদের হাতে বন্দি হওয়া এক মারাঠা কিশোর সৈন্য বলেছিল, সঙ্গমেশ্বর জায়গাটা শম্ভুজির খুব পছন্দের জায়গা।'
‘ওই মারাঠা সেনার নাম কি সন্তজি?’
‘হ্যাঁ জাঁহাপনা, ঠিক তাই।'
আলমগীরের স্মরণশক্তি দেখে কামরান রীতিমতো মুগ্ধ। এবং একথা জেনে যে, আলমগীর বাদশাহ তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়েরও খোঁজখবর এবং সেটা মনে রাখেন। একজন অল্পবয়সি মারাঠি সেনা বন্দি হয়েছে, সে খবর তো জানা আছেই, এমনকী বন্দির নামটাও মুখস্থ! কামরানের চোখে মুখে সেই মুগ্ধতা দেখে প্রসন্ন ঔরঙ্গজেব মৃদু হাসলেন শুধু। জিজ্ঞেস করলেন, “তারপর? থেমো না। বলতে থাকো।’
‘তারপরই আমাদের গুপ্তচররা সঙ্গমেশ্বর যায়।'
‘আচ্ছা, এখান থেকে সঙ্গমেশ্বর যাওয়ার রাস্তা তোমার জানা আছে?'
‘হ্যাঁ জাঁহাপনা । দক্ষিণ-পূর্ব দিকে একশো মাইলের মতো পথ। যেতে আসতে দু'দিন
লাগবে।'
‘যদি তোমার সঙ্গে সশস্ত্র ঘোড়সওয়ারদের একটা বাহিনী দিই, তুমি পারবে শম্ভুজিকে ধরে আনতে ?
‘জান কবুল জাঁহাপনা। ওই শয়তান ইঁদুরটাকে আমি নিয়ে আসবই।'
‘ছোট বাহিনীতেই কাজ চলে যাবে তো?'
‘হ্যাঁ জাঁহাপনা। ওখানে বেশি মারাঠা সৈন্য নেই। স্থানটি প্রায় অরক্ষিত।’ ‘তবে আজ এক্ষুনি তুমি সঙ্গমেশ্বরের উদ্দেশে রওনা দাও।’
কামরান সেলাম ঠুকে বেরিয়ে যেতে যাচ্ছিল। ডাকলেন আলমগীর বাদশা। ‘আর শোনো, ওই সন্তজিকে সঙ্গে নিও। কাজে আসবে।'
কামরান আর কোনও আদেশ সম্রাটের আছে কি না, তা শোনার জন্য অপেক্ষা করল। ভারতসম্রাট ঔরঙ্গজেব তাকে বললেন, ‘যদি কাজটায় সফল হও, তবে এমন পুরস্কার পাবে যা তুমি ভাবতেও পারছ না। তোমার বাকি জীবন চলে যাবে ওই পুরস্কারের অর্থে। আর যদি মরে যাও, তবে শহিদের সম্মান পাবে। যাই-ই হোক না কেন, তুমি লাভবান হচ্ছ। শুভেচ্ছা রইল।'
কামরান বেগ ঘোড়া ছুটিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
সঙ্গমেশ্বরে পৌঁছে মনে হল, সে বুঝি ভূস্বর্গে এসে পড়েছে। সত্যি, বিশ্রাম নেওয়ার জন্য উপযুক্ত জায়গাই বেছেছে মারাঠা ইঁদুরটা।
‘তাড়াতাড়ি হবে যে রাস্তা দিয়ে গেলে, সেটা দ্যাখা।' সন্তজিকে বলে কামরান। কিছুক্ষণের মধ্যে মুঘল বাহিনী ঢুকে পড়ে সেই বিশ্রামাগারে যেখানে আছে শম্ভুজি । সেখানে তখন ঢাক বাজছে আর সেটার তালে তালে বৃন্দগান। কামরান আকাশের দিকে তাকাল। চাঁদের অবস্থান দেখে বুঝে নিল সময়টা। সম্ভবত রাত ন'টা।
হঠাৎ লোহার চাকার পাথরে ঘষটানির শব্দ কানে আসে। ঘুরে দেখে একটা বিশাল গাড়ি টেনে আনছে একদল বলদ। গাড়িটাতে বোঝাই করা বস্তা। একটু পরেই বোঝা গেল, একটা বা দুটো নয়, বেশ কয়েকটা গাড়ি বস্তা বোঝাই অবস্থায় ঢুকল সেই প্রাসাদে। ‘এগুলো কী? কী থাকতে পারে ওই বস্তাগুলোয়?' সন্তজিকেই জিজ্ঞেস করে কামরান।
‘খুব সম্ভবত খাদ্যশস্য। কাছেই জেটি। সেখানে নৌকা করে এসেছে এগুলো। তারপর গাড়ি বোঝাই করে এখানে আনা হচ্ছে। প্রাসাদের বাসিন্দাদের উদরপূর্তির জন্য।'
‘এত রাতে কেন ? '
‘জোয়ার-ভাটা অনুসারে ঘাটে নৌকা ভিড়তে পারে। সেইমতো এখনই হয়তো নৌকা লাগানোর সঠিক সময়।'
‘কোথায় রাখা হবে এত জিনিস?’
‘মনে হয় কেন্দ্রীয় গুদামে। এই মাঠের পেছনেই সেটায় যাওয়ার রাস্তা। সিঁড়ি নেমে গিয়েছে মাটির নীচে, প্রাসাদের ভেতর।'
খানিকক্ষণ পরেই দেখা গেল বস্তা নামিয়ে গরুর গাড়িগুলো নদীর দিকে ফিরে যাচ্ছে।
‘পরিকল্পনাটা বদলে ফেলেছি। আমরা এখনই প্রাসাদের ভিতর ঢুকছি না। আমরা এখন জেটির দিকে যাব।' কামরান নির্দেশ দেয়।
মুঘল সৈন্যদল গতিপথ বদলাল। মিনিট পনেরোর মধ্যে ফিরতি গরুর গাড়িগুলোকে নিজেদের দখলে নিল মুঘলরা। গাড়ির চালক আর মুটেদের লাশ গাড়িতেই ঢুকিয়ে দিল তারা। কামরান বেগের নির্দেশে ঝটপট করে প্রতিটা গাড়িতে উঠে পড়ল দশজন করে মুঘল সৈন্য। চালকের আসনে বসল একজন। বাকিরা বস্তার ভেতর ঢুকে পড়ল। প্রথম গাড়িটাতেই চালকের আসনে সন্তজি। পেছনে কামরান।
তার পর যাওয়ার পথ বদলে ফের প্রাসাদের অভিমুখে।
দু'মিনিটও লাগল না। শম্ভুজির প্রাসাদে ঢুকে পড়ল মুঘল বাহিনী। একেবারেই অপ্রস্তুত অবস্থায় পেয়ে গেল মারাঠা প্রহরীদের। ছোরা বেঁধা অবস্থায় তাদের প্রাণহীন দেহগুলো পড়ে যেতে লাগল প্রসাদ সংলগ্ন মাঠে ও বাগানে, সেখানকার ঝোপঝাড়ে।
কামরান অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, এত ঠুনকো এদের পাহারা! এত অগোছালো এদের নজরদারি ব্যবস্থা! মুঘল সম্রাট যদি অন্যত্র বিশ্রাম করতেও যান, সেখানে এত ঢিলাঢালা থাকে না প্রহরা ব্যবস্থা, এত অসতর্ক থাকে না পাহারাদাররা।
হঠাৎ একজন মারাঠা প্রহরী ভীষণ জোরে চিৎকার করে উঠল। একজন মুঘল সেনা তার গলায় ছুরি টেনে দিয়েছে, কিন্তু কণ্ঠনালিটা পুরোপুরি কাটতে পারেনি। সাদা পাগড়ি পরা সেই মারাঠার চিল চিৎকার পৌঁছে গেল প্রাসাদের ভেতর। একদল সশস্ত্র সেনা বেরিয়ে এল। মুঘলরাও ততক্ষণে গাড়ি ছেড়ে মাটিতে।
তিনজন মারাঠার মোকাবিলা করছিল ইব্রাহিম আলি। মাথা নীচু করে কখনও, কখনও বা এগিয়ে পিছিয়ে নিজেকে বাঁচাচ্ছিল তাদের তরবারির আঘাত থেকে। মওকা বুঝে একজনকে মারল একটা লাথি। সে টাল হারিয়ে পড়ল বাকি দু'জনের ঘাড়ের ওপর। ইব্রাহিম এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে তরবারি বসিয়ে দিল তার বুকে। অন্যজনের বুকে গেঁথে দিল ছুরি। ততক্ষণে মুঘল সৈন্যদের মধ্যে থেকে একজন একটা গরুর গাড়ি থেকে উদ্ধার করে ফেলেছে কয়েক বস্তা কয়লা । বস্তাগুলো গাড়ি থেকে নামানো হয়নি কিংবা প্রাসাদ থেকে জেটিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য তোলা হয়েছিল। কয়লার টুকরোতে আগুন লাগিয়ে জ্বলন্ত কয়লা নিক্ষেপ করা শুরু করে দিয়েছিল মুঘলরা। তেমনই একটা জ্বলন্ত কয়লার টুকরো উড়ে এসে পড়ল তৃতীয় মারাঠার মাথায়। পাগড়ি দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। তার চুলও। পোড়া মাংসের গন্ধে ভরে গেল জায়গাটা। ইব্রাহিম অন্য সৈন্যদের দিকে মন দিল।
পিল পিল করে মুঘল সেনারা ঢুকতে লাগল প্রাসাদের ভেতর। কিন্তু কাউকে সেখানে দেখা গেল না ।
‘কিস্যু বুঝতে পারছি না। মারাঠাগুলো সব গেল কোথায়?' ইব্রাহিম খান বলল কামরান বেগকে। কামরান কিছু বলার আগেই সন্তজি বলল, ‘মনে হয় খবর পেয়ে সবাই চম্পট দিয়েছে।'
‘আরে পালাবে কোথায়? আমরা তো প্রাসাদ ঘিরে রেখেছিলাম।' কামরান বলে। ‘এখানে কি কোনও গুপ্তকক্ষ আছে?' জিজ্ঞেস করে ইব্রাহিম।
‘থাকতে পারে। আমি ঠিক বলতে পারব না', সন্তজি মাথা নেড়ে জবাব দেয়। তারপর তিনজন গুপ্তকক্ষের সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সঙ্গে জনা বিশেক মুঘল সৈন্য। শেষমেশ একটা ঘরের খোঁজ পায় তারা। দরজাটাই অন্যরকম। একটা নারীর শরীরের আকার সেটির। সন্তজি বলে, এটা কবিকুলেশের শয়নকক্ষ। এ বাড়িতে আগে একবার-দুবার আসার অভিজ্ঞতা আছে তার।
‘কোনও জানালা আছে ঘরটায়?' কামরান জানতে চায়।
‘মনে পড়ছে না । অনেকদিন আগে এসেছিলাম। তবে ঘরটার একটা বৈশিষ্ট্য আছে। এটা মোটেই চৌকো নয়। ডিমের মতো আকার ঘরটার।'
‘তার মানে তুমি ঘরটার চরিত্র চেন। ঢুকে পড়ো ভেতরে। এক্ষুনি। বিপদ বুঝলেই চেঁচাবে কিংবা অন্য কোনওভাবে সংকেত দেবে। আমরা কেউ ঘরে ঢুকে ফাঁদে পড়তে চাই না।'
কামরানের নির্দেশ মেনে কক্ষে প্রবেশ করে সন্তজি। ঠেলেঠুলে টেনেটুনে দরজাটা একটু ফাঁক করে। আর সেখান দিয়েই শরীরটাকে গলিয়ে দেয় সে। ঘরে ঢুকে কাউকে দেখতে পায় না। নজরে আসে পড়ে থাকা থালা আর পানপাত্র। ইতস্তত ছড়ানো । থালায় থালায় না-খাওয়া খাবারের টুকরো। পাত্রে পাত্রে পানীয়ের তলানি কিংবা অর্ধেক অংশ। সবাই যেন আচমকা সব ফেলে রেখে পালিয়েছে। সন্তজি ভেতর থেকে দরজাটা জোরে ঠেলতেই সেটা পুরো খুলে যায়। ভেতরে ঢুকে পড়ল কামরান আর ইব্রাহিম, সেনা সমেত।
তন্নতন্ন করে চারিদিক খুঁজেও কাউকে পাওয়া গেল না। কয়েকজন মহিলার সঙ্গে মোলাকাত হল মুঘলদের। তারা মারাঠি ভাষায় কী বলল কামরানরা বুঝতে পারল না। সন্তজি তাদের মারাঠি ভাষাতেই জিজ্ঞেস করল, শম্ভুজির কোনও খবর তাদের জানা আছে কিনা । তারা বলল, তারা শুনেছে শম্ভুজি মাসাধিক কাল এ বাড়িতেই বিশ্রাম নিচ্ছেন। কিন্তু তারা কেউ কখনও তাঁকে দেখেনি।
‘সত্যি কথা বলতে কী, শম্ভুজিকে এরা চেনেও না। তাই দেখে থাকলেও লোকটা কে, বুঝতে পেরেছে কি না সন্দেহ।' সন্তজী বলে। কামরান ও ইব্রাহিমের কথাটা মনে ধরে।
ফের শুরু হয় তল্লাশি। সেই সঙ্গে আসবাবপত্র ভাঙচুর। সারা প্রাসাদে ছড়িয়ে থাকে বাসনকোসন, বিছানার চাদর, বালিশের তুলো।
কিন্তু শম্ভুজি কিংবা কবিকুলেশের খোঁজ মেলে না।
শেষ পর্যন্ত খোঁজ পাওয়া গেল। কৃতিত্ব সন্তজিরই। একটা জলাশয় দেখে তাতে নেমে গিয়েছিল সন্তজি। সেই জলাশয়ের এক কোনায় একটা গোপন কুঠুরির দরজা। সেই দরজার হাতলে পা আটকে সন্তজি ডুবতে বসেছিল। আর তাতেই নজরে আসে দরজাটা। তারপর সবাই মিলে দরজাটা খোলা হল। বেরিয়ে এল দু'জন। হাতে খোলা তলোয়ার। একজন কবিকুলেশ, অপরজন শম্ভুজি। ধরা পড়ে গেছে বুঝে ফেলতে কোনও অসুবিধা হয়নি তাঁদের। তবু শান্তভাবেই জল থেকে উঠে এল।
উঠে আসার পর শম্ভুজির প্রথম প্রতিক্রিয়া, ‘আপনাদের ধন্যবাদ। সম্রাট ঔরঙ্গজেবকেও। মুঘল বাহিনী আমাদের খোঁজ পেতে আরও দেরি করলে মনে হয় দমবন্ধ হয়ে জলের মধ্যে চোরা কুঠুরিতেই মারা যেতাম। আপনারা কার্যত আমাদের বাঁচালেন।’
দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া সন্তজির ওপর চোখ পড়ার পর। ‘তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি মারাঠা। আমার বাহিনীতে ছিলে। কিন্তু কী আশ্চর্য! ওদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমাকে ধরিয়ে দিলে? কত টাকা পেয়েছ আমাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য?'
“ওঁরা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, এটাই আমার পুরস্কার। অন্য কোনও প্রত্যাশায় আমি ওঁদের সাহায্য করিনি। আর জলাশয়ের ভেতর এই গোপন কুঠুরির দরজা নজরে পড়তেই মনে হল, ভেতরে যে বা যারা আছে, তারা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা পড়বে। তাই খুলে ফেললাম। ভাবতেও পারিনি, আপনি এখানে লুকিয়েছেন।' সন্তজি শান্ত স্বরে বলল।
শম্ভুজি হেসে উঠল। সেই হাসিতে ঝরে পড়ল ঘৃণা, ঠিকরে বের হল অবজ্ঞা, প্রকট হল সন্তজির কথায় অবিশ্বাস।
আর নিজেকে সামলাতে পারল না সন্তজি। পাশেই দাঁড়িয়েছিল একজন মুঘল সৈন্য। তার কোমর থেকে ছুরিটা টেনে বের করে নিল। এগিয়ে গেল শম্ভুজির দিকে। শম্ভুজি তখন নিরস্ত্র। জলাশয় থেকে ওঠা মাত্র অস্ত্রত্যাগ করেছেন কামরানের নির্দেশ মেনে।
সন্তজি শম্ভুজির দিকে এগোল। আর তাঁর সামনে নতজানু হয়ে নিজের গলার নলিতে ছুরিটা টেনে দিল।
ফিনকি দিয়ে বের হল রক্ত। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল শরীর। একটু কাঁপল। তারপর স্থির।
শম্ভুজি বুঝতে পারলেন, তাঁর অনুগত সৈন্য বিশ্বাসঘাতকের অভিযোগ মোচন করতে চাইল নিজের জীবন দিয়ে।
কামরানের এসব আবেগ অনুভবের ইচ্ছা বা সময় ছিল না। সে ঔরঙ্গজেবের উদ্দেশ্যে দূতের মাধ্যমে বার্তা পাঠাল, ‘আল্লাহ আকবর। ঈশ্বরের শত্রু শম্ভুজি এখন আমাদের কবজায়।'
খবর পেয়ে বাদশা আলমগীর দূতের মাধ্যমে নির্দেশ পাঠালেন।
‘ধরে নিয়ে এসো কবিকুলেশ আর শম্ভুজিকে। আমি ওদের দু'জনকে দিল্লির ভরা রাস্তায় প্রকাশ্যে দিনের আলোয় উলঙ্গ করে হাঁটাব।'
ঔরঙ্গজেব যখন বাহাদুরগড়ের দুর্গে দু'জন মারাঠা নায়কের জন্য অপেক্ষা করছেন তখন সঙ্গমেশ্বরের প্রাসাদে সন্তজির পড়ে থাকা লাশের চারদিকে মাছিরা ভন ভন করছে।
সেদিকে তাকিয়ে কামরান ঠিক করে নিল, ঔরঙ্গজেবের হাতে শম্ভুজিকে তুলে না-দেওয়া অবধি তাকে প্রকাশ্যে দেখানোটা ঠিক হবে না। বন্দি অবস্থায় তাকে দেখলে জনগণ মনে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। সেটা কামরান হতে দিতে পারে না । আসলে সন্তজির ঘটনা থেকে সে বুঝতে পারছিল শম্ভুজিকে ঘিরে মারাঠা আবেগ কোন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।
ঔরঙ্গজেবের আদেশ ছিলই। তার সঙ্গে কামরান চারিদিকের অবস্থাটা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিল। ঠিক হল, মারাঠাদের বন্দি করে নিয়ে যাওয়ার সময় একফোঁটা জলও দেওয়া হবে না, খাবার তো দূর অস্ত। ফলে শুকনো ঠোঁট, বুভুক্ষু শরীর আর অপমানে অপমানে নিঃশেষিত মন নিয়ে শম্ভুজি আর কবিকুলেশ ঔরঙ্গজেবের সামনে হাজির হলেন। কিংবা, বলা ভাল, এভাবেই তাঁদের সম্রাট সমীপে হাজির হতে বাধ্য করা হল ।
দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে ঔরঙ্গজেব নিজে কামরান ও তার বাহিনীকে স্বাগত জানালেন। উটের পিঠে বাঁধা ছিল শম্ভুজি আর কবিকুলেশের দেহ। বাঁধন খুলে তাঁদের শরীরগুলো মাটিতে ফেলল মুঘল সৈন্যরা।
ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে শম্ভুজির দেহ। প্রাণ থেকেও যেন নেই সেই শরীর দুটোতে। দৃশ্যটা দেখে আলমগীর তৃপ্তি পেলেন। তারপর কেটে কেটে উচ্চারণ করলেন, ‘শম্ভুজি ! এটাই তোমার জায়গা। এসব সিংহাসন-টিংহাসনে তোমাকে মানায় না। সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর তোমাকে ঠিক জায়গায় এনে ফেলেছেন। এখন একটা কথা তোমাকে বুঝতে হবে।'
শম্ভুজি কী শুনছে আর কী-ই বা বুঝছে, তা তার চোখ দেখে ঠাহর করতে পারল না কেউ। ঔরঙ্গজেব তাঁর কথা বলে চললেন।
‘তুমি নিশ্চয় টের পাচ্ছ যে তোমার ওইসব দেবদেবীদের আশীর্বাদ আসলে কোনও কাজেই আসে না। যদি আসত তাহলে তোমার এই হাল হত না। তুমি নিশ্চয় অনুভব করছ যে আল্লাহই একমাত্র সত্য এবং তিনিই সর্বশক্তিমান। সুতরাং তাঁর হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়াটাই শ্রেয়।'
এবার শম্ভুজি মুখ খুলল।
‘কী বলতে চাইছেন সরাসরি বলুন।”
‘ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তুমি প্রাণে বাঁচবে।'
‘আপনি আপনার এইসব দুষ্কর্মের জন্য আল্লার কাছ থেকেই শাস্তি পাবেন। আমি মনে করি, হিন্দু দেবদেবী হোক বা ইসলামের আল্লা, সবই এক। সেই পরম ন্যায়বানের রোষ থেকে আপনি রেহাই পাবেন না।'
‘আচ্ছা, তবে তুমি মরো', ঔরঙ্গজেব বিদ্রুপের হাসি হেসে বললেন। ‘তবে মরার আগে কয়েকটা কথা শুধু বলে যাও।'
‘বলুন, কী জানতে চাইছেন।'
‘তোমাদের ধন সম্পদগুলো কোথায় লুকিয়ে রেখেছ? মারাঠাদের সম্পদের কথা সবাই জানে। সেটার হদিশ বলে যাও আমাকে। আর বলে দাও সেইসব বান্দার নাম, যারা আমার বেতনভুক্ত কর্মচারী কিন্তু তোমার কাছ থেকে নিয়মিত উৎকোচ পেয়ে তোমাদের সব খবরাখবর দিয়েছে। ফাঁস করে দাও সেইসব বিশ্বাসঘাতকের তালিকা।'
কথা বলার শক্তি নেই। তবু, তবুও শম্ভুজি গলায় জোর আনার চেষ্টা করেন। থেমে থেমে কিন্তু স্পষ্ট করে বলার চেষ্টা করে তার বক্তব্য।
‘আমার যাই-ই হোক না কেন, আমার লোকেরা হিন্দুস্তান থেকে আপনাদের জমানার অবসান ঘটাবে। ঘটাবেই। এটা আপনি বুঝতে পারছেন কিনা জানি না, কিন্তু আমি এটা খুব ভালভাবে এটা জানি, বুঝতেও পারছি। চারদিকে এত বিক্ষোভ, এত বিদ্রোহ, এসব কিছু গায়ের জোরে ঠেকানোর ক্ষমতা আপনার নেই বাদশাহ।’
শম্ভুজি দম নেওয়ার জন্য ছোট্ট একটু বিরতি নেন। ঔরঙ্গজেব বলে ওঠেন, ‘মরার আগে আমাকে জ্ঞান দিচ্ছ পাহাড়ি ইঁদুর?'
‘জ্ঞান নয়, সত্যি কথা সঠিক প্রত্যয়ে বলছি। দেখুন তো, কত্ত চেষ্টা করলেন। চেষ্টা করলেন আমার বাবাকে দমিয়ে রাখতে। আমার বাবা ছত্রপতি শিবাজি আজ আর ইহলোকে নেই। তবু, তবুও মানুষের কাছে তিনি যুগনায়ক। হাজার হাজার লোকের কাছে তিনি আজও অনুপ্রেরণা। তাঁকে ঘিরে এখনও মানুষের আবেগ কত তীব্র। আর আপনি? লোকে আপনার কথাও বলে। তবে আপনার শৌর্য-বীর্য ন্যায়পরায়ণতার কথা নয়। লোকে বলে, আলোচনা করে আপনার শঠতা, ধূর্তামি, নিষ্ঠুরতার কথা। এটাই তফাত। তফাত ছিল, তফাত থাকবেও।'
‘চুপ করো শয়তান!’ বাদশা ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে যান।
‘আপনি আজ আমার মুখ বন্ধ করতে পারবেন না। পারবেন না, কারণ আমি বুঝতে পারছি, আপনি এখনও আমাকে ভয় পান। আপনি ভয় পাচ্ছেন। অথচ আপনি ভাবছেন, আমি ভয় পাচ্ছি আপনাকে। কেন আপনাকে ভয় পাব? কেন ভয় পাব সেই লোকটাকে যে তার ভাইদের ভয় পেয়ে হত্যা করেছে? কেন ভয় পাব সেই বাবাকে যাকে তার ছেলেমেয়েরাও শ্রদ্ধা করে না?”
‘একদম চুপ করো বেয়াদপ।'
‘ধমকে লাভ নেই। আমি থামব না। জানেন, আকবর আমাকে কী বলত? বলত, আল্লার নাম নিয়ে আপনি যাবতীয় দুষ্কর্ম করেন। বলত, আসলে আপনি একটা পবিত্র ভণ্ড। আমিও আপনাকে তাই মনে করি। একটা পবিত্র ভণ্ড। এবং বিশ্বাস করি, যদি পরজন্ম বলে সত্যিই কিছু থাকে তাহলে আপনি পরের জন্মে মাছি কিংবা এঁটুলি পোকা গোছের কিছু হবেন। তার থেকে উন্নত কিছু হবেন না।'
ঢের হয়েছে! এবার থামো।’তারপর হাঁক দেন, ‘জল্লাদ ! একটা একটা করে শম্ভুজির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে নাও। আর দেরি কোরো না। কাজ শুরু করে দাও।'
জল্লাদ ধারালো হাত কুড়ুল নিয়ে এগিয়ে আসে। ঔরঙ্গজেব ফের আদেশ দেন, ‘তবে শোনো, ওর জিভটা সবার শেষে কেটো। ওকে বকতে দাও আরও খানিকক্ষণ। আমি শুনতে চাই কাকের বাচ্চা কা কা করে ডেকে মাফ চাইছে, প্রাণ ভিক্ষা করছে।' ‘আমি আপনার কাছে কোনওদিন কোনও কিছু ভিক্ষা করিনি। আজও করব না। আর জিভের কথা বলছেন! ওটা আমিই দাঁত দিয়ে কামড়ে ছিঁড়ে দেব।' শম্ভুজি জোর গলায় বলে ওঠেন।
‘অনেক হয়েছে। এবার শোনো। বাদশাহ আলমগীরের সুশাসন নষ্ট করে দেওয়ার জন্য তুমি বারবার যে চক্রান্ত করেছ, তারই শাস্তি হল এই মৃত্যুদণ্ড। তবে মরার আগে আমি যা যা জিজ্ঞেস করছি, সেগুলোর জবাব দাও। জবাব দিতে যত দেরি করবে তত বিলম্বিত আর বেদনাদায়ক হবে তোমার মৃত্যু।' ঔরঙ্গজেব বলেন।
‘আমি অপরাধী নই, দেশভক্ত। আর তোমাকে কিছুই বলব না। তোমার কোনও প্রশ্নের জবাব আমি দেব না।' দাঁড়িয়ে থাকতে অসুবিধা হচ্ছে। পা টলমল করছে। তবু শম্ভুজি ভয়ংকর জেদি, ভীষণ একরোখা।
ভীষণ জোরে পেটে একটা ঘুসি মারল জল্লাদ। মুখ থেকে বেরিয়ে এল লালা আর রক্ত। শম্ভুজিকে একটা ভাঙাচোরা পুতুলের মতো দেখাল। এলিয়ে পড়েছে তার শরীর। ‘প্রথম প্রশ্ন, মারাঠাদের মুখ্য রাজকোষটা কোথায়? আমার কাছে খবর আছে, কয়েক মাস আগেই তুমি নতুন কোনও গোপন জায়গায় তোমাদের সোনাদানা হীরে জহরত সরিয়েছ।'
‘সে খবর আমি তোমাদের কখনও দেব না আর তোমরাও কখনও সেই সম্পদের খোঁজ পাবে না।’
‘আবার জিজ্ঞেস করছি, সেই রত্নভাণ্ডার কোথায় লুকানো আছে?'
‘তুমি কি কানে কালা ঔরঙ্গজেব? কী বললাম, শুনতে পাওনি?’
শম্ভুজির জামাটা ছিঁড়ে ফেলল জল্লাদ। মুখ থুবড়ে পড়লেন শম্ভুজি। ঝটপট পিঠে ছুরি চালান জল্লাদ। চামড়া কেটে রক্ত বেরোতে লাগল। তাঁকে ধরে তুলল সেনারা। একটা কাঠের তক্তার গায়ে ঠেসান দিয়ে দাঁড় করানো হল তাকে। তারপর করা হল দ্বিতীয় প্রশ্ন।
‘আমরা জানতে পেরেছি, তুমি নিয়মিত ঘুষ দিয়ে বাদশাহের দরবারের অনেক কর্তাব্যক্তির কাছ থেকে খবরাখবর বের করতে। কাদের ঘুষ দাও তুমি? বলে ফেল তাদের নাম।'
‘আমি ঔরঙ্গজেবকে এখন ঘুষ দিতে চাই। এক টাকা দিচ্ছি। ও হিন্দুস্তান থেকে বিদায় হোক।'
জল ঢেলে দেওয়া হল শম্ভুজির শরীরে। তারপর ভিজে শরীরের চামড়া ফালা ফালা করে কেটে ফেলা হল। শম্ভুজি তখন চুপ। যন্ত্রণায় চিৎকার করার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে সে।
প্রশ্ন দুটো আরও একবার করা হল। এবার প্রশ্নকর্তা আর ঔরঙ্গজেব নন। তাঁর নির্দেশে কামরান বেগ জিজ্ঞেস করল প্রশ্ন দুটো। শম্ভুজি আপ্রাণ চেষ্টা করে মাথাটা দু'দিকে নাড়াল। সে কোনও জবাব দেবে না ।
ঔরঙ্গজেব জানেন, এসব প্রশ্নের উত্তরের খুব একটা দরকার তাঁর নেই। মারাঠাদের সম্পত্তির হদিশ জেনে তাঁর খুব একটা লাভ নেই। মুঘলদের বিপুল সম্পত্তির তুলনায় মারাঠাদের রত্নভাণ্ডার, তা সে যত বড়ই হোক না কেন, কিছুই নয়। সুতরাং ওই খোঁজে তাঁর বাস্তবে কোনও প্রয়োজন নেই ।
আর বিশ্বাসঘাতকদের নাম? সেটা জানার জন্য ঔরঙ্গজেবের গুপ্তচর বাহিনীই যথেষ্ট। শম্ভুজি কী বলল, সত্যি বলল না মিথ্যে, সেসবের খুব একটা গুরুত্ব নেই, অন্তত তাঁর কছে।
তবুও এই প্রশ্নগুলো রাখেন তিনি স্রেফ হত্যা করার আগে অত্যাচারের মাত্রা বাড়ানোর অছিলা হিসেবে।
প্রশ্ন করবেন। জবাব পাবেন না। পেলেও বলবেন, অভিযুক্ত কিংবা দোষী সাব্যস্ত হওয়া লোকটা মিথ্যে বলছে। সেই অজুহাতে অত্যাচারের মাত্রা বাড়তেই থাকে। এটা করা হয় স্রেফ সব্বাইকে এটা জানানোর জন্য যে, বাদশাহের শাসন কত কঠিন, কত নির্মম হতে পারে। এটা সব্বাইকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য যে বাদশাহের বিরুদ্ধাচরণ করলে মৃত্যুটাও ভীষণ মর্মান্তিক হতে পারে। সব্বাইয়ের শিরদাঁড়া দিয়ে যাতে ভয়ের হিমস্রোত বয়, সেটা নিশ্চিত করতে চান তিনি। এইভাবে।
লক্ষ করেন, শম্ভুজির অবস্থা দেখে কবিকুলেশ প্রস্রাব করে ফেলেছে। কামরান বেগের মতো যোদ্ধাও খানিকটা দূরে সরে গিয়ে বমি করছে। ঠোঁট কামড়ে কাঁপছে তাঁর প্রধান দেহরক্ষী উমর আলি।
শম্ভুজি আর কবিকুলেশের মাথা কেটে ফেলল জল্লাদ। দাক্ষিণাত্যের গ্রামে গ্রামে ঘোরানো হবে সেই কর্তিত মুন্ডু দুটো।
প্রাসাদের ভেতরে গেলেন ঔরঙ্গজেব।
মাদুর পেতে হাঁটু মুড়ে বসলেন আল্লার দোয়া মাঙবেন বলে। সেই পরমকর্তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করবেন বলে।
অননুভূতপূর্ব এক তৃপ্তি অনুভব করলেন তিনি। তবে স্রেফ মুহূর্তের জন্য। তারপরের মুহূর্তে একরাশ ভয় ঢেকে দিল তাঁর সব আনন্দ অনুভব। ঔরঙ্গজেবের হঠাৎ মনে হল, তিনি ভুল করলেন। নিজের অজান্তেই শিবাজির পর আর একজন মারাঠাকে বীরের সম্মান পাওয়ার সুযোগ করে দিলেন তিনি।
নব নায়কের আবির্ভাবের চিন্তা তাঁকে আতঙ্কিত করে তুলল। ভাবলেন, জাহানারার সঙ্গে কথা বলে একটু হালকা হবেন।
মনে পড়ল, জাহানারা আর নেই।
বড্ড ফাঁকা লাগল চারদিকটা।
খানিকক্ষণ পর ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন উদিপুরীর ঘরের দিকে।
শুয়ে আছেন ভারতসম্রাট ঔরঙ্গজেব। লোকজন সব তাঁর বিছানা বিছিয়ে দিয়েছে যেন অগাধ বিষণ্ণতায়। নিঃসঙ্গতা, একাকীত্ব, এসব শবগুলো এরকম প্রহরে যেন তেড়েফুঁড়ে আসে তাঁর কাছে। তাঁকে আঁচড়ায়, কামড়ায়, ক্ষতবিক্ষত করে দেয়।
এবং ঘিরে ফেলে তাঁকে।
ঘিরে ফেলে এবং কখনও-কখনও বা গিলে খেতে চায়।
আলমগীর তিনি। বিশ্ববিজেতা। তাই সহজে নিজেকে গলে যেতে দেন না, কোনওরকম আবেগের অজুহাতে।
তিনিই ঔরঙ্গজেব। মুঘল মসনদে তিনি গরিমা জুড়েছেন। যা গরিমাদায়ী নয়, তাতে তাঁর নেই কোনও অন্বয়।
সিংহাসনে বসার পর আলমগীর উপাধি নিয়েছিলেন। সাধারণ্যে তাঁর পরিচিতি ঔরঙ্গজেব হিসেবে। আদতে তো তিনি মুহি আল-দিন। বিশ্বাসের পুনর্জন্ম তাঁর প্রকাশে । ধর্মবিশ্বাসের পুনঃউদ্গাতা তিনি, তিনিই।
জীবনের অঙ্কের হিসাব মেলাতে বসে এই কথাগুলো বুকের কোটরে গুমরে ওঠে। জীবনের খতিয়ান আর জাবেদা খুলে বসে টের পান, তাঁর জীবন আদতে বিষাদ বিধুরতায় মেদুর এক যাপন । বৃথাই তিনি লড়াই করেছেন অদৃশ্য কিন্তু অনিবার্য নিয়তির সঙ্গে। কালের আঘাতে চুরমার হয়ে গিয়েছে তাঁর তাবৎ প্রয়াস। তিনি বিমূঢ়তার গর্ভে থিতু হয়েছেন।
পঞ্চাশ বছর ধরে তিনি ভারতের ভাগ্যবিধাতা । গোটা এশিয়ায় তাঁর মতো বুদ্ধিদীপ্ত, চরিত্রবান, উদ্যোগী শাসকের দেখা মিলবে না। কর্তব্যপরায়ণতার পরাকাষ্ঠা তিনি। নিজেকে স্বেচ্ছায় বঞ্চিত করেছেন তাবৎ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য থেকে। হৃদয়কে করেছেন লৌহ কঠিন, সামান্যতম কোমলতা সেই নির্মাণে প্রশ্রয় পায়নি। সমকালের সর্বোত্তম ধর্ম চেতনার তুলাদণ্ডে নিয়ত যাচাই করেছেন প্রতিটি কৃতকর্ম। অথচ আজ চোখের সামনে তাঁকে দেখতে হচ্ছে, তাঁর গড়ে তোলা সাম্রাজ্যের ভঙ্গুরতা।
জীবনের প্রথম চল্লিশটা বছর নিজেকে তৈরি করেছেন। শান দিয়ে, পান খসিয়ে, লোহা থেকে ইস্পাত তৈরির মতো করে। সংযমের বাঁধে নিজেকে বেঁধেছেন আল্লাহের মুখোমুখি হওয়ার জন্য। শস্ত্রের বলিষ্ঠতায় নিজেকে শক্তিমান করেছেন প্রতিপক্ষের সঙ্গে মোকাবিলার জন্য। তারপর তেইশটা বছর কেটেছে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধিশালী রাজত্ব নির্মাণের কাজে। উত্তর ভারতের বুকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন কৌশলী সামর্থ্যে ও শস্ত্রের বলে। একে একে অপসৃত হয়েছে শত্রুরা তাঁর পথ থেকে। মসৃণতর হয়েছে সিংহাসনের রাস্তা। ধীরে ধীরে সমগ্র ভারত সাম্রাজ্যকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেছেন। সম্পদে সংস্কৃতিতে ভারতবর্ষের বিকাশ পথ রচনা করেছেন অপরিসীম নিষ্ঠায় আর অমেয় সংকল্পে। মানবসম্পদের সুষ্ঠু সার্থক বিকাশকে নিশ্চিত করেছেন প্রজাদের সুখ ও শান্তির বৃত্ত তৈরির সৌজন্যে।
এরপরই গ্রিক ট্র্যাজেডির নেমেসিসের মতো জেগে উঠেছে বিদ্রোহের নিশান তাঁর বিরুদ্ধে তাঁরই অপত্য মহম্মদ আকবরের মুষ্টিতে।
জীবনের পড়ন্ত অথচ অপরাজেয় ছাব্বিশটা বছর কাটিয়েছেন দাক্ষিণাত্যে। সুরম্য প্রাসাদে নয়, সেনা ছাউনিতে। মারাঠাদের বিদ্রোহ দমনের জন্য। প্রথমে শিবাজি, তারপর শম্ভুজি। নষ্ট হয়েছে অর্জিত সম্পদ, সঞ্চিত রাজস্ব, প্রতিরক্ষা সম্পদ, ক্ষয় ধরেছে প্রশাসনিক সামর্থ্যেও, ওই মারাঠা বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে।
সে যেন এক মরীচিকার পিছু পিছু ধাওয়া করা। তার অনিবার্য ছায়াপাত বাদশাহের নিজের স্বাস্থ্যের ওপর। বুকের ভেতরকার মোচড় বারবার জানান দিয়েছে, বৃথা এ পণ্ডশ্রম। তবু, তবুও, এক অজানা আক্রোশ, এক না-ফুরানো রাগ, এক পিছলে যাওয়া সাফল্য, তাঁকে বারবার টেনে নিয়ে গিয়েছে ওই দাক্ষিণাত্যের মাটিতে।
বিজাপুর গোলকুণ্ডা অধিকার করেছেন । সাগরের অধিপতি বশ্যতা স্বীকার করেছে। শিবাজি মারা গিয়েছেন আর শম্ভুজিকে মেরে ফেলেছেন। তাও যেন বিষবৃক্ষের ছায়ায় তাঁর অন্তিম যাপন বিগত আঠারো বছর ধরে তিনি নিয়তি নির্যাতিত এক ইতিহাস পুরুষ। যাঁর সামর্থ্যের অভাব ছিল না কিন্তু সাফল্য সব সময় অলীক আকার নিয়েছে যাঁর জীবনে। চেষ্টার অভাব ছিল না, কিন্তু জয়ের পূর্ণ গৌরব অধরা থেকে গিয়েছে তাঁর জীবন বৃত্তে। বিরাশি বছরের বার্ধক্যেও যাঁকে অস্ত্রধারণ করতে হয়েছে রণক্ষেত্রে শত্রুনিধনের তাগিদে।
ঔরঙ্গজেব, বাদশাহ আলমগীর, আদতে এখন রণক্লান্ত এক যোদ্ধা। রণ-রক্ত -সফলতা তাঁকে বারংবার হাচানি দিয়ে ডেকেছে। কিন্তু মুঠোয় কোনওদিনই অন্তিম সত্য হয়ে সাফল্য ধরা দেয়নি।
‘খতম-উস-সফর।'
যাত্রার শেষে অন্তিম আশ্রয় হিসেবে নির্বাচন করেছেন আহমেদনগরকে।
যেখানেই এখন শায়িত সম্রাট। ভারতের জগৎপতি, মুঘল মসনদের অনন্য গৌরব, ইসলামি ধর্মবিশ্বাসে পুনঃ জোয়ার আনয়নক্ষম শক্তি। আসমুদ্র হিমাচল জুড়ে ভয়ে কিংবা ভক্তিতে, শ্রদ্ধায় কিংবা রোষে যাঁর নাম উচ্চারিত এবং আলোচিত হয়, সেই শাহেনশাহ এখন আহমেদনগরে। রণক্ষেত্রে নয়। শয্যায়। ব্যারামে আরাম দরকার। বার্ধক্যে বিশ্রাম জরুরি। সেই আবশ্যকতা থেকেই এই শয্যাগ্রহণ।
শুয়ে শুয়ে ভাবেন আর ভাবেন। স্মৃতি রোমন্থনে কাটে প্রহর।
গোলকুণ্ডার পতনের পর অধিগত হয়েছিল বিজাপুর। মনে হয়েছিল দাক্ষিণাত্য বিজয় সমাপ্ত। সম্রাট আকবরের সময় থেকে যে স্বপ্ন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছিল মুঘল বাদশাহদের, সেই স্বপ্ন বুঝি পূরণ হল। দাক্ষিণাত্যে রইল না কোনও মুঘল-বিরোধী মুসলমান শাসক। সমগ্র ভারত নতশির দিল্লির কাছে। একটা হিন্দু রাজা টিকে রইল বটে। মারাঠাদের সাম্রাজ্য। কিন্তু শিবাজি বা শম্ভুজির মতো তাদের এমন কেউ নেই যে বা যারা বলিষ্ঠ নেতৃত্বদানে সক্ষম।
মনে আছে, বিজাপুরে টিকতে পারেননি আলমগীর, কোনও রাজা বা সুলতানের দাপটে নয়, প্লেগের প্রকোপে। ইঁদুরবাহিত রোগ তাঁকে বাধ্য করেছিল বিজাপুর ছাড়তে। তখনই টের পেয়েছিলেন, আদিল শাহ আর কুতুব শাহের রাজধানী তিনি কবজায় এনেছেন বটে, তা বলে সেগুলোকে একেবারে মুঘল সাম্রাজ্যের স্থায়ী সুবাতে পরিণত করতে পারেননি।
তখনই টের পেয়েছিলেন, মারাঠাদের আর দস্যু জনগোষ্ঠী বলে তাচ্ছিল্য করা যাবে না। মুম্বই থেকে চেন্নাই, দক্ষিণ ভারতীয় উপদ্বীপ জুড়ে মুঘল বাদশাহের প্রতি অনানুগত্যের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলছে।
ফলে বারবার দিল্লি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর, বারবার সেই সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়েছে। ফেরত যাওয়ার দিনক্ষণ পিছিয়েছে। দাক্ষিণাত্য সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছেন। বিদ্রোহ দমনে ক্লান্ত হয়েছেন। দিল্লিতে আর ফেরা হয়নি।
তাই, তাই-ই, ‘খতম-উস-সফর' বলে শুয়েছেন আহমেদনগরে এসে। সেখানেও শান্তি নেই। নেই তৃপ্তি। নেই কোনও আরামের আদর। ভেতরে ভেতরে অস্থির ঔরঙ্গজেবের মাঝে মাঝে মনে পড়ে যায় একটা দিনের কথা। স্মৃতিপটে জেগে ওঠে সেদিনকার ছবি ।
তখন তিনি বারো বছরের বালক। থাকছেন বুরহানপুরে। সেখানেই দেখতেন, মা মুমতাজ মহল রুগ্ন। অসুস্থ সম্রাজ্ঞী যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। মায়ের ঘরের আধখোলা দরজার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেতেন খোলা চুলে কান্নাভেজা চোখে জাহানারা মায়ের কপালে গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মুমতাজ এত চিৎকার করছেন, এত ছটফট করছেন যে তাঁর মুখ্য পরিচারিকা সাত্তি আল-নিশা তাঁকে সামলাতে পারছে না। বাবা শাহজাহান ছুটে এসেছেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে।
হঠাৎ কান্না, চিৎকার, ছটফটানি, সব থেমে যায়। নিথর হয় মুমতাজের দেহ। শাহজাহান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। তাঁর চোদ্দোতম শিশু জন্ম নেয়। কন্যাসন্তান ৷ জাহানারা আর একটা বোন পেয়ে খুশি হয়। নাম রাখা হয় গৌহারারা।
খানিকক্ষণ। বড্ড অল্প সময়।
তারপরই শাহজাহান বুঝতে পারেন, মুমতাজের কান্নাকাটি, চিৎকার চেঁচামেচি, ছটফটানি, এসব থেমে যাওয়া কোনও স্বস্তিদায়ক লক্ষণ নয়।
প্রসব করার সময় মৃত্যু হয়েছে তাঁর।
শাহজাহান আর মুমতাজের ঘরে ঢোকেন না। রাতভর আবৃত্তি করতে থাকেন আকবর বাদশার আমল থেকে চলে আসা কয়েকটা কথা।
‘বুরহানপুর এক অশুভ জায়গা। এখানে নিত্য অমানিশা, সতত অন্ধকার। এখানে কেউ কোনওদিন পায় না দুঃখের থেকে নিস্তার ।
তাপ্তী নদীর তীরে মুমতাজকে সমাধিস্থ করা হয়। সাময়িক বন্দোবস্ত। তারপর সেই সমাধিস্থল সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় তাজমহলে। আগ্রায়। সেখানে বহুবার ঔরঙ্গজেব গিয়েছেন। মায়ের আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনা করেছেন। দোয়া মেঙেছেন আল্লাহর কাছে।
সেই থেকে বুরহানপুরের প্রাসাদ বন্ধ থেকেছে শাহজাহানের নির্দেশে। সেখানে কেউ যেত না। কেউই যায়নিকো আর। ঔরঙ্গজেবও।
সেবার গিয়েছিলেন। শম্ভুজীকে নিকেশ করার পর।
পরিত্যক্ত প্রাসাদ ঢুকেই মনে পড়েছিল মায়ের কথা। ঘিরে ফেলেছিল জাহানারার স্মৃতি। ভিড় জমিয়েছিল বালকবেলা মনের কোটরে কোটরে।
প্রাসাদে প্রবেশ করেছিলেন সাদা পোশাকে। ঢুকে দেখলেন সেটা এতদিনে উইপোকা আর ইঁদুরদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে।
বাতাসে লাল ধুলো উড়ছিল। সূর্য পাটে যেতে বসেছিল। ঔরঙ্গজেব এসেছেন বলে প্রহরীরা ঘরে ঘরে বাতি জ্বালানোর কাজ করছিল।
অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকিয়ে ঔরঙ্গজেবের মনে হয়েছিল, এই ভূমি তাজমহলের চেয়েও পূত, সেখানকার চেয়েও স্মৃতির ওম এখানে বেশি।
বসে পড়লেন হাঁটু মুড়ে। বসামাত্র নাকে একটা গন্ধ এল। বাতাসে ভেসে। গন্ধটা মায়ের চুলের। মমতাজের রেশমের মতো চুলে সাত্তি আল-নিশা একটা আতর লাগিয়ে দিত। সেই আতরের খুশবু এতদিন পর এসে লাগল আলমগীর বাদশার নাকে।
তিনি নিজের অজান্তেই দোয়া মাঙতে লাগলেন তাঁর মায়ের আত্মার জন্য, জাহানারার জন্য, রোশনারার জন্য, এমনকী দারা শুকো, মুরাদ, শাহ সুজার জন্যও।
কেন এমন করেছিলেন, সেটা আজও অস্পষ্ট, অজানা তাঁর কাছে। তবে করেছিলেন এমনটাই, সেই স্মৃতি স্পষ্ট জাগরূক তাঁর মনোলোকে। এতদিন পরেও।
স্মৃতির কুঠরি থেকে বেরিয়ে এসে চোখ বন্ধ করলেন। চোখের পাতা মুদ্রিত হওয়া মাত্র সহস্র চিন্তা ভয়ানক সব দৃশ্য হয়ে জেগে উঠল মনের গভীর থেকে।
দাক্ষিণাত্যে অন্তহীন লড়াই কুরে কুরে খেয়েছে তাঁর কোষাগার। বাদশাহি ভাণ্ডার দেউলিয়া হওয়ার মুখে।
সেনারা তিন বছরের বেশি সময় ধরে বেতন পাচ্ছে না। বকেয়া বেতনের দাবিতে তারা বিদ্রোহী হওয়ার পথে।
টের পেলেন, তিনি এখন তাকিয়ে আছেন বাংলার দিকে। বাংলার দেওয়ান মুর্শিদকুলি খাঁ। সে সৎ এবং কাজের লোক। তার পাঠানো অর্থেই সেনার বেতন আর নিজের পরিবারের খরচ সামলান ঔরঙ্গজেব। এখনও সেই রাজস্ব আসেনি। কবে আসবে, সঠিকভাবে সেটাও জানতে পারছেন না।
দাক্ষিণাত্যে মারাঠা নায়করা ফের মাথা চাড়া দিতে শুরু করেছে। উত্তর ও মধ্য ভারতের নানা জায়গা থেকে খবর আসছে, আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার উপক্রম। দাক্ষিণাত্যে আটকা পড়ে বাদশা বেশ বুঝতে পারছেন হিন্দুস্তানের মূল ভূখণ্ডে তাঁর মুঠি ক্রমশ আলগা হচ্ছে। দিকে দিকে সামন্তপ্রভু, জমিদাররা মুঘল বাদশার স্থানীয় প্রতিনিধিকে অগ্রাহ্য করে স্বেচ্ছাচারিতা শুরু করেছে। তারা যেন আর দিল্লির বাদশার পরোয়া করে না ।
এদিকে গোটা দাক্ষিণাত্য যেন এক বধ্যভূমি। মানুষের আর পশুপাখিদের কঙ্কাল আর করোটি জড়ো হচ্ছে সেখানে রোজ। মাইলের পর মাইল গাছপালা, শস্য, শ্যামলিমা, সব উধাও। চার-পাঁচদিনের পথেও সচরাচর চোখে পড়ে না কোনও পিদিমের আলো দূরের কোনও ঘর থেকে। চারিদিক যেন জনমানবশূন্য শ্মশান। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ। খেতি বারি বন্ধ। মাঠ ফুটিফাটা, ফসল শুকিয়ে খড়, আকাল ভয়ঙ্কর। ফলে বন্ধ রাজস্ব সংগ্রহও। লুটপাট করেও কিছু পায় না কেউ এই অঞ্চলে, এখন এমন অবস্থা। ঔরঙ্গজেব স্বচক্ষে সাক্ষী হয়েছেন এই অভিজ্ঞতার।
সে কথা মনে পড়লেই এক নিঃসীম আঁধার ঘিরে ফেলে তাঁর স্মৃতি-সত্তা -ভবিষ্যৎ। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পান তাঁর তিন জীবিত সন্তানের মধ্যে রক্তক্ষয়ী ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষের ছবি। আকবর, মুয়াজ্জাম আর কমবক্স নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করেই চলেছে স্থানীয় জমিদার, জোতদার, নবাবদের মদতে। ছিন্নমস্তা রাজনীতিতে আটকে গিয়েছে তারা তিনজনই। শাহজাহানের পুত্রদের পরিণতি ঔরঙ্গজেব কখনও নিজের ছেলেদের জন্য চাননি। ঠিক যেমন চাননি; শাহজাহান তাঁর পুত্রসন্তানদের কাছ থেকে শেষ জীবনে যেরকম ব্যবহার পেয়েছিলেন, সেরকমটা কিছু ঘটুক তাঁর জীবনের অন্তিম পর্বে। কিন্তু নসিবকে অস্বীকার সাধ্য তাঁর নেই। নিয়তির হাতে বন্দি বিশ্বজয়ী, আলমগীর চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চায়। বুক ফেটে কান্না। কিন্তু মন থেকে দেহে অশ্রু সংক্রম ভারতের বাদশাহর শোভা দেয় না।
ইসলামপুরী থেকে আহমেদনগরে এসেছিলেন প্রায় এক বছর আগে। ১৭০৬-এর ২০শে জানুয়ারিতে।
পান্ধারপুর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় বিশ মাইল গেলে ব্রহ্মপুরী। ভীমার দক্ষিণ তীর। সেই জায়গাটার ইসলামি নাম দিয়েছেন তিনি ইসলামপুরী। পাঁচ-পাঁচবার বিজাপুরে ফিরে যেতে হয়েছে তাঁকে। শেষবার যখন গিয়েছিলেন তখন ডেরা বেঁধেছিলেন এক বা দুই নয়, একেবারে টানা পাঁচ সপ্তাহের জন্য। সেখান থেকে ইসলামপুরীতে। এখানেও কেটেছে নয় নয় করে সাড়ে চার বছর। ফি বছর রমজান মাসে ছুটে ছুটে গিয়েছেন শোলাপুরে। প্রার্থনা, উপবাস আর আল্লার উপাসনায় কেটেছে সময় সেখানে।
তারপর এই আহমেদনগরে। বছর খানেক হল এখানেই বাস তাঁর। অশক্ত দুর্বল শরীর আর অবসন্ন বার্ধক্যের বিষাদে শেষ আশ্রয়।
খতম-উস-সফর।
সেই সঙ্গে মস্তিষ্কের কোষে কোষান্তরে পাক খায় কতিপয় পঙ্ক্তি। যব আপ আপনি আসসিওয়া ইয়া নওয়ায়ওয়া সাল
পহুঁছগে
আপকো ওয়ক্তকে হাত সে বহুৎ সে শকত ঝটকে লগে হ্যুয়ে
আউর যব উস মকানসে তুম শ সালকে মাকামপে পহুঁছগে
মৎ আপকে জিন্দেগি পর কবজা কর লেগি।
যখন তুমি হবে বুড়ো আশি কিংবা নব্বইয়ের
পরিচয় তোমার হয়েই যাবে সময়ের কঠিন ঘুসির সাথে
আর যখন সেই দশা ছেড়ে পৌঁছাবে শতায়ুর ঘরে
জীবন তখন হবেই কাবু মৃত্যুর অভিঘাতে।
সন্ধে নামে। জ্বর আসে।
রাত বাড়ে, বাড়ে শরীরের তাপ।
মনুষ্য শরীরে সহ্য করেছেন অনেক কিছু। স্রেফ কঙ্কাল, মাংস ও চামড়া আর কিছু সহ্য করার জায়গায় নেই।
শরীর সাথ দেয় না। মন সায় দেয় না। দেহে মনে এখন জরার উল্লাস। বাধ্য-যাপন।
২০ ফেব্রুয়ারি, ১৭০৭। জুম্মাবারের সকালে বাদশাহ আলমগীর আর ঘুম থেকে উঠলেন না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন