আলোচনার আগে তুলনা করা যাক রাজা রামমোহন রায়ের সময়কালীন অবস্থার কথা। রামমোহন সতীদাহ প্রথা দূর করবার কথা ভাবছেন, গোঁড়া হিন্দুরা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন রামমোহনের কাজের। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯-এ সতীদাহ প্রথা তুলে দেবার জন্য আইন জারী করার পরিবর্তে ভাবছেন ইংরেজদের মাথা ব্যথার কারণ কি? সতীদাহ তো আর ইংরেজ মহিলাদের ক্ষতি করছে না। কল্পনা করুন তাহলে কি হতো বিধবাদের?
তবুও ইংরেজরা ভারতীয় সমাজের অংশ ছিলেন না, থাকবার দাবিও করেননি তারা।
কাজেই অম্লান দত্তের মতের পরিপ্রেক্ষিতে কি এই কথাই বলা চলে না যে অম্লানবাবু নিজে যে সমাজের মানুষ, মুসলমানকে সে সমাজের মানুষ হিসেবে দেখেন নি, মুসলমান হিসেবে দেখেছেন। কিংবা এমনও হওয়া সম্ভব অম্লান দত্ত নিজে যে সমাজের অন্তর্ভুক্ত, সেই সমাজের বাইরে কাউকে পরামর্শ দেওয়া শিষ্টাচার বহির্ভুত মনে করেছেন। প্রতিবেশীর ছেলের সাথে ঘরের ছেলের ঝগড়ায় প্রতিবেশীর ছেলেকে প্রকাশ্যে দোষারোপ করার চাইতে নিজের ছেলেকে শাসন করাই যেমন ভদ্রলোকের রীতি। অম্লানবাবু সে নীতিতে মুসলমান সমাজকে কিছু বলতে না চাইলেও প্রশ্ন ওঠে দেশভাগের অর্ধশককাল পরেও মুসলমানরা ঘরের ছেলে হলেন না কেন? অম্লানবাবু ভেবেছেন কি?
অতি সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশে সংঘটিত ইমরানা’ কাণ্ড নিয়ে এদেশের তাবৎ বুদ্ধিজীবীরা বোবা হয়ে রইলেন এরা সকলে নিশ্চিতভাবে অম্লানবাবুর মতের অনুসারী।
আসলে মুসলমান মৌলবাদের ভ্রূকুটিকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা বুদ্ধিজীবীদের নেই। এরাই লড়াই করবেন হিন্দু মৌলবাদের (?) বিরুদ্ধে?
রাজনৈতিক নেতৃত্বেও সেই একই সমস্যা। অহেতুক ভোট হারাবেন কে?
যে সমস্ত বুদ্ধিজীবীর কিছুটা চক্ষুলজ্জা রয়েছে তাঁরা মুসলমান সমাজ থেকেই প্রতিবাদ ওঠার অপেক্ষায় থাকবার পক্ষে ওকালতি করছেন।
রাজা রামমোহন রায় যে কারণে সতীদাহ প্রথার বিরোধিতা করা সত্ত্বেও আইনের চাইতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরী করে সমস্যা মোকাবিলা করার ওপর জোর দিতে চেয়েছিলেন, সেই কারণে মুসলমান সমাজের মধ্যে থেকেই শাহবানু বা ইমরানাকাণ্ডের প্রতিবাদ ধ্বনিত হবার অপেক্ষায় থাকবার পক্ষে কথা বলবার সময় এদেশীয় তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা ভুলে যাচ্ছেন যে রামমোহন সতীদাহের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ণের দাবি না জানালেও আইন প্রণয়ণের বিরোধিতা করেননি। বরং সতীদাহ প্রথা তুলে দেওয়া অশাস্ত্রীয় কিনা তা জানতে চাইলে লর্ড বেন্টিঙ্ককে রামমোহন জানিয়েছিলেন :-“The Practice might be supressed quietly unobservedly by increasing the difficulties and by the indirect agency of police.”
একথা আজ আর কেউ অস্বীকার করতে পারছেন না (এমনকী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও অনুপ্রবেশের বিপদ সম্পর্কে বলছেন।) যে এদেশে ক্রমবর্ধমান মুসলমান জনসংখ্যা দেশের সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে এক অগ্নিগর্ভ অবস্থার সৃষ্টি করেছে।
মুসলমান জনসংখ্যা বাড়ছে এবিষয়টি আদমসুমারীতে ধরা পড়লেও এদেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা তা মানতে নারাজ।
প্রবীর গঙ্গোপাধ্যায় নামে একজন তথাকথিত প্রগতিবাদী আরও কয়েকজন এবং তার নয় বছরের কন্যার (?) গবেষণার ভিত্তিতে একটি পুস্তিকা লিখে প্রমাণ করতে চেয়েছেন মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধির তত্ব হিন্দু মৌলবাদীদের স্বকপোলকল্পিত প্রচার ছাড়া অন্য কিছু নয়। মুসলমনরা চারটে বিয়ে করেনা, তাদের সন্তান-সন্ততির সংখ্যা অধিক, একথা ভুল।
আরও বহু তথাকথিত সংখ্যাতত্ববাদী (!) নানা যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চাইছেন মুসলমান জনসংখ্যা বাড়ছে একথা সঠিক নয়। যুক্তি হিসেবে তারা যা বলছেন তা-ও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন একজন (স্বাতী ভট্টাচার্য) লিখলেন যে মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ঠিক কথা, মুসলমানদের অনুপাতও বৃদ্ধি পেয়েছে সে কথা সত্য হলেও বিষয়টিকে এভাবে দেখা উচিত হবেনা কারণ হিন্দু মহিলাদের তুলনায় মুসলমান মহিলাদের সাক্ষরতার হার ১৪শতাংশ কম। অর্থাৎ লেখিকা বলতে চাইছেন যে শিক্ষার সঙ্গে জন্মনিয়ন্ত্রণের একটি সারাসরি সম্পর্ক রয়েছে। লেখিকা এমনভাবে লিখলেন যে মনে হচ্ছে একটি নতুন তত্ত্ব আবিস্কার করেছেন।
যদি লেখিকার বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া যায় তাহলেও মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি কি মিথ্যে প্রমাণিত হয়?
প্রবীরবাবু কিংবা স্বাতী ভট্টাচার্যের মতো মানুষদের সঙ্গে খামোখা বিবাদে না গিয়ে ২রা সেপ্টেম্বর, ২০০৩-এর ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘সন্তান উৎপাদনের অধিকার প্রতিবেদনটিতে কি বলা হয়েছে দেখা যাক্
লেখক লিখছেন :-“………… হরিয়ানা রাজ্য আইন করেছে যে দুটির বেশী সন্তান থাকলে, পঞ্চায়েতে প্রার্থী হওয়া যাবেনা। এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করেছিল কিছু মুসলমান গোষ্ঠী, যারা দাবি করেছিল, যেহেতু তারা চারটি পর্যন্ত বিয়ে করতে পারে, তাই দুটির বেশী সন্তান হতেই পারে। অতএব, আইনটি পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার কারণে অসাংবিধানিক। সুপ্রিম কোর্টের রায় হল, মুসলমান ধর্মীয় আইন চারটি পর্যন্ত বিয়ের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু বাধ্যতামূলক করেনি। অতএব, এই আইন মৌলিক অধিকার কাড়েনি, পক্ষপাতদুষ্টও নয়, বরং রাষ্ট্রের স্বার্থের অনুকূল।”
লেখক আরও লিখছেন :-“বিস্ময়ের ব্যাপার হল, আমাদের প্রধান বামপন্থী দলের দিল্লীস্থিত ভ্যাটিকান প্রাতিটি রাজনৈতিক ব্যাপারে তাৎক্ষণিক প্ৰতিক্ৰিয়া জানাতে অভ্যস্ত হলেও, এ ব্যাপারে একেবারে মুখে কুলুপ।”
পরে লেখক প্রশ্ন করেছেন :-“খুশিমতো সন্তান উৎপাদনের অধিকারের দাবি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সমর্থন করে মুসলিম ভোট কব্জা করার চেষ্টা?”
প্রবীরবাবু এবং তাঁর গবেষণার সঙ্গী আবদুর রউফ, কমলেন্দু ধর এবং এতদিনে অনেক বড় হয়ে যাওয়া ‘নয় বছরের গবেষিকা কন্যা’র অবগতির জন্য জানাই ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রতিবেদনটি লিখেছিলেন শ্রী সন্তোষ ভট্টাচার্য। একদা বিশিষ্ট বামপন্থী হিসেবে পরিচিত সন্তোষবাবু এখন প্রবীরবাবুদের কাছে সাম্প্রদায়িক আখ্যায় ভূষিত হবেন কিনা জানিনা, তবে মুসলমানদের চারটি বিয়ে, তাদের অধিক সন্তান এই সমস্ত যদি মিথ্যা ও নিছক হিন্দুত্ববাদীরে প্রচার হবে তাহলে সুপ্রীম কোর্টে মামলা কেন? তথাকথিত প্রগতিবাদীরাই বা কি বলেন? দেশজুড়ে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের এহেন আচরণ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে সহজেই বলা চলে “এহ বাহ্য, আগে কহ আর।”
স্বাধীনতা এবং দেশভাগের পর থেকে প্রতিটি আদমসুমারীর প্রতিবেদনে স্পষ্ট এদেশে মুসলমান জনসংখ্যা ক্রমশঃ বাড়ছে, হিন্দু জনসংখ্যা কমে চলেছে।
২০০১ সালের জনগণনাতেও তা ধরা পড়েছে। হিসেবটা দেখা যাক। নানা বিতর্ক তুলেও এ বিষয়ে প্রদত্ত তথ্য মিথ্যে প্রমাণ করা যাচ্ছে না।
এই বিষয়ে পরলোকগত বুদ্ধিজীবী অন্নদাশঙ্কর রায় হিন্দুদের আশ্বস্ত করে বলেছেন যে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে একশতাব্দী পার হয়ে যাবে এবং ততদিনে শিক্ষার অগ্রগতির ফলে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি লোপ পেয়ে যাবে।
অন্নদাশঙ্কর রায়ের দুটি বক্তব্যের মধ্যে দ্বিতীয়টির বিষয়ে বলতে গিয়ে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ধ্বংসকাণ্ডের বিষয়টিকে স্মরণ করা যেতে পারে। অন্নদাশঙ্কর রায় এই ধ্বংসকাণ্ড দেখে যেতে পারেননি। কাজেই তাঁর জানা সম্ভব হয়নি যে, যে সন্ত্রাসবাদীর পরিচালনায় ঐ ধ্বংসকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তার মূল পাণ্ডা মুহম্মদ আত্তা ছিলেন একজন পেশাদার স্থপতি ও নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ।
আল কায়দা নেতা ওসামা বিন লাদেনের ঠিক পরবর্তী নেতা ও মিশরের মানুষ আয়মান আল-জায়াহিরি একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও শল্য চিকিৎসাবিদ্ ‘ওয়াল স্ট্রিট’ জার্নালের সাংবাদিক ড্যানিয়েল পার্ল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত তালিবান নেতা ওমর শেখ লণ্ডন স্কুল অফ ইকনিমিক্সের ছাত্র। তার ইস্কুলজীবনও ব্রিটেনেই শুরু হয়েছিল। মার্কিন দেশে বসবাস করেও আত্তা তাঁর ডাইরীতে এই বিশ্বাসই ব্যক্ত করে গেছেন যে ঐ ধ্বংসকাণ্ড ঘটিয়ে তিনি ‘কোরাণ শরীফ’-এর বিশ্বাস অনুযায়ী মৃত্যুর পর বেহতে বসবাস করার অধিকারী হবেন।
স্বভাবতই অন্নদাশঙ্কর রায় যেমন বলেছেন যে, শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানদের গোঁড়ামী দূর হয়ে যাবে তা নিতান্তই দূরাশা ছাড়া কিছু নয়।
এদেশের বহু মানুষই ‘কোরাণ শরীফ’ পড়েননি। কাজেই ‘কোরাণ শরীফ এ বর্ণিত বেহস্ত অর্থাৎ স্বর্গের সুখের বিবরণ তাদের জানা সম্ভব নয়। বেহতের যে বিবরণ আছে তা জানলে শুধু মুসলমান কেন অন্যান্য অনেকেই আকৃষ্ট হতে পারেন।
কি আছে ‘কোরাণ শরীফ’-এ বর্ণিত বেহস্তে—
সূরা। রুকূ। অয়াত
নাবা। ২। ৩২-উদ্যান, দ্রাক্ষা
৩৩-সমবয়স্কা উদ্ভিন্ন যৌবনা তরুণী
৩৪-পূর্ণ পানপাত্র *
রাহ্মান। ৩। ৫৬-আয়তনয়না তরুণীগণ, যাদের পূর্বে মানুষ অথবা জিন স্পর্শ করেনি।
৭০-সুশীলা ও সুন্দরী রমণীগণ
ওয়াকিয়া। ১। ৩২-পর্যাপ্ত ফলমুল
৩৪-সম্ভ্রান্ত শয্যাসঙ্গিনী
৩৬-ঐ, চিরকুমারী
৩৭-ঐ, সোহাগিনী ও সমবয়স্কা
দাহর। ১। ১৯ ………. সেবায় নিয়োজিত থাকবে চিরকিশোরগণ, ওদের দেখে মনে হবে ওরা যেন বিক্ষিপ্ত মুক্তা
২০-ভোগবিলাসের উপকরণ…
বলার অপেক্ষা রাখে না শিক্ষার অগ্রগতি বেহতের আকর্ষণকে কমাতে আদৌ সক্ষম হবেনা। আবার ‘কোরণ শরীফ’-এর মতে বেহতে যাবার সর্বোত্তম পন্থা ইসলামের প্রতি আস্থাহীনকে হত্যা এবং জেহাদ্ এ যোগদান করা।
এই প্রসঙ্গে গান্ধীজীকে একবার প্রশ্ন করায় গান্ধীজী উত্তর দিয়েছিলেন যে তাঁকে তাঁর মুসলমান বন্ধুরা জানিয়েছেন কোরণে যে কাফেরকে হত্যা করার কথা বলা হয়েছে, তারা হিন্দু নন, অবিশ্বাসী অর্থাৎ নাস্তিক।
তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নেওয়া যায় যে কাফের বলতে হিন্দুদের বোঝানো হয় নি তাহলেও দাঁড়ালো এই ঈশ্বরে অবিশ্বাসী হলে যে কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করার সমর্থন কোরণ শরীফ-এ রয়েছে। অহিংসার পূজারী গান্ধীজীও এই যুক্তি মেনে নিয়েছিলেন এবং এতে তিনি সন্তুষ্ট হয়েছিলেন! অন্তত কোন ধর্মগ্রন্থ মানুষকে হত্যা করার বিধান দিচ্ছে জেনেও অসন্তোষ প্রকাশ করেন নি!
মূর্তিপূজা কিংবা কাফেরদের কথা বাদই দেওয়া গেল গান্ধীজী নিজে কোরান শরীফ পড়েছেন বললেও কিভাবে তাঁর চোখ এড়িয়ে গেল কোরণ পরীফভূ সূরা ‘মায়েদাহ’-এর সেই আয়াতটি, যেখানে স্পষ্ট নামোল্লেখ করে বলা হয়েছে :-”ইহুদী ও খৃষ্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, তারা পরস্পরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেউ তাদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে সে তাদেরই একজন হবে।” (রুকূ-৮, আয়াত-৫১)
মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে হিন্দুধর্মের আচার অনুষ্ঠান ব্যহত হলো কিনা তা বড় কথা নয়। বড় কথা ভারতবর্ষকে ইসলামের বিশ্বাস অনুযায়ী দার-উল-হারাব্ থেকে দার-উল-ইসলামে পরিবর্তন করতে গিয়ে অবশ্যম্ভাবী গৃহযুদ্ধ দেশভাগ করার মধ্যে দিয়ে সে সম্ভাবনাকে কিছু পরিমাণে দূরে ঠেলে দেওয়া গেলেও ব্যপক অনুপ্রবেশ আর জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবার ফলে বিপদ তরান্বিত হচ্ছে।
অন্নদাশঙ্কর রায় এদেশে বাংলাদেশ থেকে মুসলমান জনসাধারণের অনুপ্রবেশকে মানবিক দৃষ্টি দিয়ে বিচার করতে বলেছিলেন। অন্নদাশঙ্কর রায় একসময় সরকারী উচ্চপদে ছিলেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুনকে সম্মান জানাতে হয়;রাষ্ট্রের নিরাত্তার বিষয়টি নিয়েও অবহেলা করা চলেনা শ্রীরায় সেসব ভালো করেই জানতেন। উপরন্তু তিনি মার্কসীয় দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন এমন নয়, কাজেই কার্ল মার্কস বর্ণিত রাষ্ট্রের শুকিয়ে যাবার তত্বে (State will be wither away) বিশ্বাসের কারণে রাষ্ট্র বিলুপ্ত হয়ে সকল দেশের সকল মানুষ একাকার হয়ে যাবেন এমন ভাবনা থেকে অন্নদাশঙ্কর রায় অনুপ্রবেশকে গুরুত্ব দিয়ে চাননি এমনও নয়।
মানবিক দৃষ্টি দিয়ে সমস্যাকে দেখবার যে কথা অন্নদাশঙ্কর বলেছেন তা একেবারে উড়িয়ে দেবার বিষয় না হলেও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক নয় কি মরিচঝাপিতে অবস্থানকারী উদ্বাস্তুদের যখন রাষ্ট্রের প্ররোচনায় গুলিবর্ষণ করে উচ্ছেদ করা হলো, তখন আমাদের মানবিকতাকে আমরা কোথায় এবং কোন মোহের পদমূলে বন্ধক দিয়ে রেখেছিলাম?
১৯৭১ সালে যুগান্তর পত্রিকায় অন্নদাশঙ্কর রায় ‘এই প্লেগ’ নামে একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন :-
“এদেশে মুসলমান বিদ্বেষ এপিডেমিক হয়ে গেছে। এখানে এমন একটি দল আছে যারা পারলে মুসলমানদের তাড়িয়ে দেবে, না পারলে ভারত সংস্কৃতির আওতায় আনবে।
মুসলমান জনসংখ্যা এদেশে ১৯৭১ সালে ছিল মোট জনসংখ্যার ১১.২০ শতাংশ, ২০০১ সালে দাঁড়িয়েছে ১৩.৪০ শতাংশ। অর্থাৎ ভারতবর্ষ থেকে একজন মুসলমানকেও কেউ তাড়িয়ে দেয়নি। অন্নদাশঙ্কর যে দলটির প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন, গত কয়েকবছর সেটি ভিন্ন নামে ভারতবর্ষের শাসনক্ষমতায় ছিল, একাধিক রাজ্যে আজও সে দলটি নিরঙ্কুশ। ১৫কোটি মুসলমানকে তাড়িয়ে দেবার আবস্তবতার কথা বাদই দেওয়া গেল।
মুসলমানদের ভারতীয় হতে বলার প্রসঙ্গে অন্নদাশঙ্কর রায় নিজে একসময় কি বলেছিলেন তা দেখা যাক।
১৩৪৩ বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসের ‘বুলবুল’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘অবাঞ্ছিত ব্যবধান শীর্ষক রচনা প্রসঙ্গে অন্নদাশঙ্কর রায়ের মন্তব্য :-“যাঁরা বিদেশ থেকে এসেছেন ও আজও মনে রেখেছেন, যাঁরা জলের উপর তেলের মতন থাকবেন বলে স্থির করেছেন আবহমান কাল, দেশের অতীত সম্বন্ধে যাঁদের অনুসন্ধিৎসা ও বর্তমান সম্বন্ধে যাঁদের বেদনাবোধ নেই, রাষ্ট্রের ভিতর একটি রাষ্ট্র রচনাই যাঁদের স্বপ্ন, আমরা তাঁদের কে, যে গায়ে পড়ে তাঁদের অপ্রিয় সত্য শোনাতে যাব?”
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একসময় আশা ব্যক্ত করেছিলেন যে হিন্দু ও মুসলমানের সহিত্য সাধনা যদি সত্য হয়, সেই সত্যের মধ্যে দিয়েই ঐক্য একদিন আসবেই কারণ সাহিত্য সেবকরা পরস্পরের পরমাত্মীয়। এই প্রসঙ্গে অন্নদাশঙ্কর লিখেছিলেন :-“প্রতিকার যদি থাকে, তবে সাহিত্যে নয় তা স্বজাত্যে।”
লিখেছিলেন :-“ঐক্য জিনিসটা organic;হাড়ের সঙ্গে মাংস জুড়লে যেমন মানুষ হয়না, তেমনি হিন্দুর সঙ্গে মুসলমান জুড়লে বাঙালী হয়না, ভারতীয় হয়না।”
পরে আর এক স্থানে লিখেছেন :-“হিন্দু-মুসলমানে আপস ছাড়া আর কিছু করবার নেই। সুতরাং ব্যবধান থেকে যাবে, জাতীয়তাও হবেনা, আত্মীয়তাও নয়।”
অন্নদাশঙ্কর রায় কোথাও বলেন নি মুসলমানরা অধিকাংশই যথার্থই ভারতীয় হয়ে উঠেছেন কিনা। বরং পাকিস্তান রাষ্ট্রটি তৈরী হয়ে যাবার পর সে সম্ভাবনা যে একান্তই লুপ্ত হয়েছে, অন্নদাশঙ্কর তা অনুভব করেছেন কি না জানা না গেলেও দেশ দ্বিখণ্ডিত হবার জন্য অন্নদাশঙ্কর রায়ের দুঃখকে মুসলমানরা কি চোখে দেখেছেন সে বিষয়ে কিঞ্চিৎ আলোকপাত নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিক হবেনা।
‘মাহেনও’নামে পাকিস্তানের একটি সরকারী পত্রিকায় জুলাই ১৯৫০ সালের একটি সংখ্যায় করাচি শহরে বাঙ্গালীদের দ্বারা আয়োজিত নজরুল জয়ন্তীর একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। শিরোনাম –’করাচিতে পহেলা নজরুল জয়ন্তী’
ঐ প্রতিবেদনে নজরুলের ছবির পাশে অন্নদাশঙ্কর রায়ের একটি ছড়া ছাপানো হয়। অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছড়ার বই ‘উড়কি ধানের মুড়কি’ থেকে সংকলিত সেই ছড়া :-
“ভুল হয়ে গেছে
বিলকুল
আর সব কিছু
ভাগ হয়ে গেছে
ভাগ হয়নিকো
নজরুল।”
‘মাহেনও’-তে প্রতিবদেনটি প্রকাশিত হলে পূর্ববাংলার মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান।
‘তাহজীব’পত্রিকায় ১৩৫৭ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ সংখ্যায় সম্পাদকীয় লিখে সরকারী পত্রিকায় কোনো হিন্দুর লেখা পাকিস্তানের প্রতি ব্যাঙ্গোক্তিচিত ছড়া প্ৰকাশ করে সরকারী অর্থ ধ্বংস করার জন্য ‘মাহেনও’ পত্রিকার কর্তৃপক্ষকে একহাত নেওয়া হয়।
দেশভাগের জন্য দুঃখপ্রকাশ যে পাকিস্তান সৃষ্টির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের নামান্তর তা ধরে নিয়ে পূর্ববাংলার মুসলমান সাহিত্যিকরা বিভিন্ন লেখায় অন্নদাশঙ্করের নিন্দা করেন।
এখনও মুসলমানরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভারতীয় হয়ে উঠতেপারেন নি, সে সত্য উপলব্ধি করার জন্য দেশের মানুষ কোনো বিশেষ দলের তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে নেই।
দেশের বিশিষ্ট মানুষেরা জাতিধর্ম নির্বিশেষে, এ বিষয়ে কি বলেছেন খোঁজ নিয়ে শুধু তাঁদের কয়েকজনের মন্তব্য পরপর সাজিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন