পাঞ্জু শাহের গান

সুমনকুমার দাশ

অধর চাঁদ মেলে মুর্শিদ আঁধার ঘুচালে ॥
দেখবি লীলা, চাঁদের খেলা, খেলা দ্বিদলে
চাঁদের সিংহাসন উদয়,
তিল পরিমাণ জায়গা বুঝায়,
রঙমহল তাই।
পাঞ্জাতন সে আসন ঘেরে সকলে ॥
অমাবস্যা সে চাঁদের নাই,
দিবানিশি হচ্ছে উদয়,
দেখলে দেখা যায়।
মানব-জনম সফল হবে, সে চাঁদ দেখিলে ॥
দেখে শুনে সাধন করে,
সে জন যাবে ভবপারে,
সে চরণ ধরে।
পাঞ্জু বলে সাধের জনম গেল বিফলে ॥

অধর মানুষ নদীর কূলে ঘাট বাঁধিয়াছে ॥
তাহে মণিমুক্তা ভিয়ান করে ঘাটে শান বেঁধে দিয়াছে ॥
পদ্মা যমুনা মিলে,
ভাগীরথীর লোনা জোয়ারে,
তিন ধারে তিন নদীর জলে জোয়ার-ভাটা খেলিতেছে ॥
আদ্য মানুষ অধর চাঁদে,
এক রূপে তিন রূপ ধরেছে,
তিন ধারে তিন রসে মিশে বারাম দিতেছে।
মানুষ তিন রতি হয়ে
তিন রসে সোয়ার দিয়ে,
সাধারণী, সামঞ্জসা, সামর্থা তিন নাম ধরেছে
গরল রসে সাধারণী,
সামঞ্জসা শাস্ত্র শুনি,
সামর্থা অমৃত রসে বিরাজ করতেছে।
যে জন রসিক হয়েছে,
রসের ভিয়ান জেনেছে,
গুরুর কৃপায় ঘাটে নেমে তিন রতি উজান করেছে ॥
রস-রতি উজান হলে
গোপী-কৃপা তাইরি মেলে,
সহজ রূপে নয়ন দিয়ে জেন্দা মরেছে।
হিরুচাঁদ কয়, ভাব না জেনে পাঞ্জু ঘুরে মলি মিছে ॥

অযোগ্য বলে গুরু ফেলো না আমায় ॥
আমি চরণ-দাসের যোগ্য নয় ॥
যোগ্য লোকের দয়া গুরু, করে জগতে সবাই,
তোমা বিনে অধম জনে কেহ না সুধায় ॥
দয়াল, সাধু-মুখে শুনি,
পাষাণ-দলন পতিত পাবন তোমার নামের ধ্বনি,
তাই শুনিয়ে স্মরণ নিলাম যদি দয়া হয়,
এ জগতে আমা বলতে আর তো কেহ নাই ॥
গুরু, শুনি তোমার রায়,
জগাই-মাধাই মেরেছিল কাদা ফেলে গায়,
বুকে বহে রুধির-ধারা, তবু হয়ে দয়াময়,
হরিনাম দিয়ে তারে কোল দিলে নিতাই ॥
শুনি অহল্যা এক নারী,
মুনি-পত্নী স্বামীর বাক্যে পাষাণ হলেন তিনি,
চরণ-ধূলা দিয়ে তারে মানবি করলে তাই,
অধীন পাঞ্জু চেয়ে আছে ঐ ধূলার আশায় ॥

আগে দেহের খবর জানো রে আমার মন ॥
দেহতত্ত্ব না জানিলে জনম যাবে অকারণ ॥
দেহবৃক্ষের পাঁচটি শাখা,
দশ ডালে তার দশটি পাতা,
সেই বৃক্ষে বসে আছে মহানন্দ মহাজন ॥
বিষয় বিষে মন-চঞ্চলা,
বিবাদী করে ছলা-কলা,
মন বিবাগী, বাগ মানে না, নষ্ট করে পিতৃধন ॥
গুরুর দাসী হও আগে,
প্রেমতরি বাও অনুরাগে,
পাঞ্জু বলে তবেই হবে মহাসুখের আগমন ॥

আজব কারখানা বোঝা সাধ্য কার ॥
সাঁই করেন লীলা ভবের পর ॥
এই মানুষে রঙ্গরসে বিরাজ করেন সাঁই আমার ॥
একটি ছিলেন, দুটি হলেন, নীরে-ক্ষীরে যুগল তার,
পুরুষ-প্রকৃতি ঘটে হরেক রঙে দেন বাহার ॥
পাপির ঘটে রঙ্গ দেখে হাকিম ঘটে দেন বিচার,
দরিদ্রের ঘটে বসে ফিরতেছেন সাঁই দ্বার বে দ্বার ॥
পাঞ্জু বলে, মানব-লীলা করেছেন সাঁই চমৎকার,
মানুষ ধরো, মানুষ ভজো, মন যাবি তুই ভবপার ॥

আমি কি হলাম তোমার ভিন ॥
কত পাষণ্ড পামর, গুরু তারে দিলে শুভদিন ॥
এ ভব-সাগরে গুরু ঘুরে মলো দীনহীন ॥
বানায়ে সাধের তরি বোঝায় দিয়ে নীর ও ক্ষীর,
হেন তরি সঁপে দিলে কু-মতি এক মাঝির টিন ॥
তোমার তরি তুমি মাঝি হলে বাঁচে দীনহীন,
কোনো রিপু ইন্দ্র মায়ার হাতে দিয়ে ধুলে চিরদিন ॥
যা করাও তাই করি গুরু, এ তরির তুমি স্বাধীন,
স্বাধীন হয়ে সাধ্য পথে আমায় করলে পরাধীন ॥
ভব-নদীর মাঝে পড়ে পালাম না কূলের চিন,
দয়াল নাম প্রকাশে গুরু, অধীন পাপ্পুর দাও গো দিন ॥

আমার কপালে এই ছিল ॥
গোনাগার হয়ে জনম বিফলেতে গেল
সময়ে যে মন্দ হলে,
দোস্ত-বন্ধু যায় ফেলে
সাঁই গো।
নিদানের বন্ধু-গুরু দয়া না করিল ॥
কুয়া হতে ইউসুফেরে, খালাস করিলে তারে,
সাঁই গো।
এই অধমের দয়া তোর নাহি হলো
কত কত পাপী লোকে,
দয়া যে করিলে তাকে,
সাঁই গো।
আমার কি পাপ আল্লা মাপ না হইল
বড়ো সাধ মনে করে, ধরেছিনু মুর্শিদেরে,
সাঁই গো।
তাহার কদম মোর কপালে না হলো।
পাঞ্জু বলে ওহে বারি, আমি তো অবলা নারী,
সাঁই গো।
দেও গো চরণতরি দিন বয়ে গেল ॥

আমার কি এত দয়া হবে।
জগতের স্বামী এই কপালে মিলিবে ॥
জনম নাপাকে যায়,
পাক দেহ হলো নাই,
সাঁই গো।
ভক্তিহীন জীবের দয়া, কিসে বা হইবে ॥
জীবের জীবন ধন,
আহা রে সে নিরাঞ্জন,
সাঁই গো।
এমন অধম জনে কেনো দেখা দিবে ॥
ভজন নাহিক জানি
কোন গুণে গুণমণি,
সাঁই গো।
এমন যে অভাগিনী দাসী বানাইবে ॥
গেল জনম বিফলে
ঘিরে নিল মায়াজালে
সাঁই গো।
পাঞ্জু বলে অন্তিম কালে, বাম না হইবে।

আমার মন আপন দেহ চেনো ॥
দেহের খবর না জানিয়ে মিছে কাটকাছারি করছো কেনো ॥
কুল দুনিয়ার খবর আছে,
আঠারো মোকামের মাঝে,
কোন মোকামে সাঁই বিরাজে, হুঁশিয়ার হয়ে অর্থ জানো ॥
লাহুত নাছুত মলকুত জবরুত,
কালের রুহু দেলদম ধরো,
চার মোকামে চারি ধরো, লা মোকামে সাঁইর আসন ॥
হাহুত মোকামের ধারা,
জানলে যাবে অধর ধরা,
তবে পাবি কূল-কিনারা, তাই জেনে ভজো গুরু-ধন
আত্মতত্ত্ব, পরতত্ত্ব,
গুরুতত্ত্ব, জানো সত্য,
অধীন পাঞ্জু পায় না অর্থ, ফকির হলো লোক জানানো ॥

১০

আমার মনের কথা এ জগতে গো,
আমি বলিব আর কার কাছে ॥
গুরু বিনে এ জগতে আমা বলতে কে আছে ॥
দয়া করে রূপ দেখায়ে গো বেহাল বানাইলে,
কু-স্বভাব এই দেহে কেনো বা রাখিলে,
এ-কূল ও-কূল দু-কূল গেল, কলঙ্ক হলো মিছে ॥
ষোল আনা এনেছিলাম গো ব্যাম্পারের আশে,
সাধের তরি বোঝায় করে যাব রে দেশে,
ত্রিবেণীর তিরধারে তরি মারা গিয়াছে
মণিহারা ফণী করে গো ভবে ঘুরাইলে,
চৌরাশির কোপে পলাম শ্রীচরণ ভুলে,
পাঞ্জু কাঁদে কর্ম-ফাঁদে মানব-জনম যায় মিছে ॥

১১

আল্লা খুশি হবে কোন কামে
সাধু-গুরু দয়া করে বলো এ গোলামে
রোজা ও নমাজ করি,
ভালো হয় আপনারি,
সাঁই গো।
নেকি কামে বেহেস্ত যে দিবেন আদমে ॥
খয়রাত যাহা করি,
সেই নেকি আপনারি,
সাঁই গো।
আত্মসুখ জন্য আল্লা ডাকি দমে দমে ॥
সাধনে অটল হই,
খোদা সঙ্গে মিশে যাই,
সাঁই গো।
গোলামি কি তাতে হয় খোদার কদমে ॥
যেই হয় গুরু-কাজি,
আল্লা তাহে হবে রাজি,
সাঁই গো।
পাঞ্জু বলে মন তুমি মজো গুরু-প্রেমে ॥

১২

আল্লার নাম করো দম-বদমে ॥
হলো নাফি এজবাত নিজ নামে ॥
নাম করিলে উদ্ধার পাব, আল্লা পাব কোন কামে ॥
শুনি বারো বুরুজে
কোন বুরুজে কিসে থাকে, কি নাম ধরে।
বরজোখ ধ্যানে রূপ দেখা যায়, মঞ্জিল আর মোকামে ॥
মালাকুত মোকামে,
সিয়া সফেদ লাল জরদ চার রঙ ধরে।
অতুলনা মুর্শিদের রূপ মাখা আছে আদমে ॥
রঙ দেখি ধ্যানে,
অধর চাঁদকে ধরা যাবে বলো কোন সাধনে।
সাধন-সন্ধান জানো বলি সাধুর কদমে ॥
সিদ্ধি হবে সাধনে,
খোদা-প্রাপ্তি কিসে হবে ভজন বিনে।
পাঞ্জু বলে ভজন আল্লার আলমে আর কলমে ॥

১৩

আল্লা পাওয়া যায় ভবে মুর্শিদ ভজিলে ॥
সত্য সত্য সত্য শুনি কোরানে বলে ॥
অলিয়েম মোরশেদা বলে,
কোরানে সাঁই খবর দিলে,
মালেক মোক্তার,
ধরো মুর্শিদ ভজো মুর্শিদ আছে ঐ কলে ॥
আসমান সপ্ত তালা পরে,
আছে সত্তর পরদা ঘিরে,
সিংহাসন পরে,
এমন অমূল্য ধন মেলে বান্দার কপালে ॥
খালাকা আদামা বলে, আল্লা ছুরাতিহি লেখে,
আদম রূপে সাঁই,
পাঞ্জু বলে ঝলক দিচ্ছে এসে দ্বিদলে ॥

১৪

আল্লা পাবে সত্য প্রেমি হলে ॥
সূর্যের ধিয়ানে যেমন রয়েছে কমলে ॥
জলেতে কমল রয়,
স্বভাব তাহার হয়,
সাঁই গো।
বিকশিত সূর্যোদয়ে মুদিতাস্ত গেলো।
যে দিকে সুরুয চলে,
কমল সে দিকে হেলে,
সাঁই গো।
ফেরে না সে কোনোকালে ঝাড়ি-তুফান হলে ॥
তেমনি আশকদার,
পতিকে করেছে সার, সাঁই গো।
যদি হয় ছারেখার তবু নাহি টলে ॥
মন রে কমল হও,
গুরুপদে মন দাও,
সাঁই গো।
ভবকুলে কালি দাও, ভুলো না করো ভোলে ॥
হীন পাঞ্জু আলাঝালা,
না জানে পিরিতি জ্বালা,
সাঁই গো।
মেলে কি মালেক আল্লা মূঢ়ার কপালে ॥

১৫

আল্লার বান্দা কিসে হয় ॥
নবির উম্মত হলে জানা যায়।
আল্লার বান্দা নবির উম্মত
এ জগতে সবাই কয় ॥
আঠারো হাজার আলমে আছে
নব্বই হাজার কালাম তার
সিনা, সফিনা দুই ভাগে রয়
তিরিশ হাজার এই দুনিয়ায়,
ষাট হাজার কালামে আহাদ
তার খবর আর কেবা পায় ॥
জেন্দেগি ভর বন্দেগি করিতে
মোরে সবাই কয়,
গোলামি করিলে বান্দা
হাদিসে তা জানা যায়,
কিসে হয় আল্লার গোলামি
খোলা নাই ভেদ সফিনায় ॥
ভেদ জানিয়া নুর সাধিলে
কালাম-সিনা হয় আদায়,
সাধন বর্ত নুরে-নীরে
বরজোখ-ভজন তাই,
পাঞ্জু বলে আহাদ কালামে
দয়া করবেন দয়াময় ॥

১৬

এ জামানায় নবির তরিক ঠিক রাখা দায় ॥
ধোঁকাবাজি ছন্দি কথায় মন ভুলে যায় ॥
নবিজির আইন মতো
রাসুলউল্লার অনুগত
হয়ে থাকো মোমিন সবাই,
পড়ো না পড়ো না কেহ কাহারও ধোঁকায় ॥
মিথ্যাবাদীর নেকি যত
হয়ে যাবে বরবাদ,
দলিলে লেখা আছে তাই,
ভেবে দেখি সত্যবাদী ভবিষ্যত হয় ॥
সন্ন্যাসী উদাসী যত,
আলেম ফাজেল মোল্লা কত,
ছলকথা সকলে তো কয়,
ভেবে মলো উর্মি লোকে কি করি প্রত্যয় ॥
দিন গেল দুনিয়ার লোভে,
নিকাশের দিন কি বা হবে,
অধীন পাঞ্জু ভেবে ইহা কয়,
তরিককে ঠিক রাখো মুর্শিদ যা দেখায় ॥

১৭

এমন দুর্লভ জনম হারাইও না ॥
পাথরে ঠুকিলে মাথা, এমন জনম আর হবে না ॥
চৌরাশি লক্ষ যোনী,
পশু আদি শৃগাল গৃধিনী,
ব্রহ্ম দরেন্দা।
জনম পেয়ে মানব হয়ে,
মানুষ কেনে চেনো না ॥
সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি,
চার যুগে মন কোথায়ি ছিলি,
ডুবে দেখতে হয়।
মিছে দুদিনের দায় দুকূল হারায়,
শেষ ভাবনা ভাবো না ॥
ধন পুত্র জরু মালে
কে ঠেকাবে অন্তিম কালে,
কি হবে উপায়।
সেদিন আপনার জন্যে কাঁদবে সবাই,
তোর জন্যে কেউ কাঁদবে না ॥
ব্যথার ব্যথিত কে আছে মন,
কারে বলো আপন আপন,
হিরুচাঁদে কয়।
অধীন পাঞ্জু বলে মায়াজালে,
গুরুর চরণ ভুলো না ॥

১৮

ও মন রে, গুরু বিনে কে তরাবে অপারে ॥
যেদিন দেহ ছেড়ে মনরায়ে যাবে রে ফাঁকি মেরে ॥
কোনদিন ভোজের বাজী করে,
সুখের পাখি যাবে উড়ে,
আদরিণী ছেড়ে গেলে আদর কে করবে তোরে,
ভাই-বন্ধু প্রিয়জনে দেবে রে বাহির করে ॥
সাধের খাট-পালঙ্ক ছেড়ে,
মন তোর বিষয় রবে পড়ে,
খালি হাতে একা পথে যেতে হবে রে তোরে,
চৌরাশির কোপে পড়ে মরবি রে ঘুরে ঘুরে ॥
এমন সাধের জনম পেয়ে,
মিছে রইলি মন তুই ভুলে,
দিন থাকিতে গুরুর চরণ আগে লও সাধ্য করে,
পাঞ্জু বলে সাধের জনম হারালাম হেলা করে ॥

১৯

কি আশ্চর্য হায় রে, ত্রিভঙ্গ সিন্ধু-নীরে ॥
জলের মধ্যে ফুল ফুটেছে, জগত মাতায় রে ॥
ক্ষণে ক্ষণে ঝলক মারে,
ক্ষণে লুকায় নিরন্তরে,
নিরাকার নিরঞ্জন ফুলে বারাম দেয় রে ॥
গগনের পারাপারে,
ফুলের মূল নিগুম শহরে,
দৈবযোগে বিকশিত পাতালে উদয় রে ॥
চতুর্দলে কিরণ উদয়,
ষড়োদলে হয় গন্ধময়,
অমাবস্যায় পূর্ণচন্দ্র সে ফুলে দেখায় রে ॥
ফুলেতে উৎপত্তি প্রলয়,
অমূল্য গুণ প্রকাশে তাই,
যে রসিকে সে ফুল ধরে, শমন জ্বালা নাই রে ॥
ফুলের মধুরত্ন কিরণ,
দ্বিতীয়ার প্রথম নিরুপণ,
সাধু জনে করে সাধন, পাঞ্জুর ভাগ্যে নাই রে ॥

২০

কি সাধনে আল্লাতালা পাই ॥
সাধন-ভজন ভুলে দিন গেল ভাই ॥
সন্ন্যাসী হইয়া কেউ,
সর্বত্যাগী হলো সেও,
সাঁই গো।
শুনি সেহ ভ্রমে ভুলে ফিরিছে সদাই ॥
ঘর ছেড়ে বনে যায়,
রিপু তার সঙ্গে রয়,
সাঁই গো।
বনে গেলে আল্লা পাব এখানে কি নাই ॥
আমি কোথা সে কোথায়,
কোথা গেলে তারে পাই,
সাঁই গো।
ভেবে দেখি দেহ ছাড়া নাহি কোনো ঠাঁই ॥
নুরে আছে নিরাকার,
জেনে সাধ্য করো তার,
সাঁই গো।
পাঞ্জু বলে দিন গেলে আর হবে নাই ॥

২১

কোন গুণেতে ধরবো গুরু মনের বিকার সারে না ॥
মহামায়ার ঘোরে পড়ে আমার স্বভাব ফেরে না ॥
জানি কোন অপরাধে,
ভুলে এই মায়াবাদে,
অপারের কাণ্ডারি গুরু-পদে নয়ন থাকে না ॥
গুরুর মন না জেনে ভজন করতে চায়,
যেমন শিশু হয়ে চাঁদ ধরা তার হয়,
সদা করে সে আয় আয়,
সে চাঁদ অমনি সরে যায়,
অমন অবলা শিশুর মতন গুরুর চরণ চেয়ো না ॥
মরার ভাব না জেনে যোগী হয়েছি,
সাধুজনে বলে রে ছি ছি,
এই দেহে থেকে
জ্ঞান হলো না দেখে,
সাধুজনে গুরু পাবো বলে কুলমান রাখে না ॥
যে প্রেমেতে গুরু ধরা যায়,
সামান্যে কি সে প্রেম জানা যায়,
যদি সাধু-কৃপা হয়,
সে প্রেম জানা যায়,
পাঞ্জু বলে গোপী-কৃপায় গুরু ফেলে যাবে না ॥

২২

ক্ষমো হে অপরাধে
দাসী করে অনুরোধে ॥
তুমি দীনবন্ধু করুণাসিন্ধু,
আমারে দিও না বাদ ॥
গগনচন্দ্র উদয় করো,
তিমির অন্ধকার হরো,
পাপী-তাপী সবাকার
জ্যোতি লাগে গায়।
কোটি চন্দ্র যিনি কিরণ,
নামটি শুনি দয়াল চাঁদ ॥
সৃষ্টিকর্তা তোমায় দেখি,
কেনো করো দুখীতাপী,
ভক্তের করো দীপ্ত আঁখি,
পাপীর অন্ধকার।
করো, কারো দীপ্ত, করো অন্ধ,
তুমি আবার কেমন চাঁদ
তুমি বাঞ্ছা কল্পতরু,
পতিত পাবন জগত-গুরু,
পাঞ্জু বল করে না কার,
যা করো এবার।
তোমার নামের জোরে পাষাণ গলে,
আমায় গলায় মায়াফাঁদ।

২৩

খুঁজে কি আর পাবি সে অধরা, সে নয়ন তারা ॥
এই মানুষে মিশে আছে, গোপীর মনচোরা
লীলা সাঙ্গ করে গোরা,
স্বরূপেতে মিশে আছে,
মায়া পাশরা।
স্বরূপ-রূপ রসে মিশে রসে হয়ে ভোরা
রসের আলো হয় ছেতারা,
রসেতে রূপ গিলটি করা,
দর্পণের পারা।
রসের নদী জোয়ার এসে বহে তিনটি ধারা ॥
কারুণ্যে তারুণ্যামৃত
লাবণ্যে তার তিনটি অর্থ,
রসিক জানে তা।
তারা নদীর কূলে ভ্রমর ধরে, পাঞ্জু মণিহারা ॥

২৪

খোদার আশকি যেই হবে ॥
ষোল আনা এক তোলা ওজন হইবে ॥
ভবের ওজন ভাই,
রতি হতে ঠিক তাই,
হায় গো।
বে-ওজন মাল সেই খোদা নাহি লবে ॥
ওজনের মূল এই,
এক তোলা জানো ভাই,
হায় গো।
কিসে হয় তোলা ঠিক জানিয়া লইবে
এক তোলা বাটখারা
দেখ সে কেমন ধারা,
হায় গো।
সের মন কাঁচা পাকা তোলা ঠিক রবে
যথায় যে ওজন হয়,
তোলা কভু নড়ে নাই,
হায় গো।
শরিয়ত, মারফত তাহাতে জানিবে ॥
ভবে যত কারবার,
করিবারে পরোয়ার,
হায় গো।
খাস ভাণ্ডারের তোলা ভেজে দেয় সবে ॥
অচিন সে তোলা ভাই,
এমান আমান তাই,
হায় গো।
তাহার ওজনে সাঁই কবুল পড়িবে ॥
হীন পাঞ্জু কেন্দে কয়,
সত্য করে বলি তাই,
হায় গো।
ভজন-সাধন ভাই তোলাতে হইবে ॥

২৫

গুরু তুমি ফেলো না অধমে ॥
বাঞ্ছা আছে গোলাম হবো তোমার কদমে
অযোগ্য হয়ে মুই,
কদমেতে ছায়া চাই,
সাঁই গো।
বাঞ্ছা হয় তব রূপ, ভাবি দমে দমে ॥
তোমা পানে যে চায়,
রিপু তার বাঁদী হয়,
সাঁই গো।
রিপু শান্ত করি আমি বলো কোন কামে ॥
দয়া করো দয়াময়,
ভেবে দেখি বেলা নাই,
সাঁই গো।
কোন ঘড়ি এসে মোরে ধরে নিবে যমে ॥
চালাও সিদা রাহে সাঁই
তোমায় যেন ভুলি নাই,
সাঁই গো।
পাঞ্জু বলে এমান যে হয় আল্লার নামে ॥

২৬

গুরু বস্তু না জেনে
এমন সাধের জনম
যায় রে যমের ভুবনে ॥
স্বভাবের গুণে,
কু-পথে গমনে,
সে ধন সাধনে,
বঞ্চিত হলি মন।
সেবা অপরাধী
নামে হলি বাদী,
ঘিরে এলো শমনে ॥
মন করিলি হেলা,
ডুবে এলো বেলা,
ভবপাড়ের ভেলা,
শ্রীগুরুর চরণ।
ভজনবিহীন
হলি চিরদিন
চরণ পাবি কোন গুণে ॥
করে ভবের খেলা,
সুখে হলি ভোলা,
ঘটে এলো জ্বালা,
অন্তিম সামনে।
সাধনশূন্য দেহ,
সুধাবে না কেহ,
বোঝে না পাণ্ডুর মনে ॥

২৭

গুরু যার মনে তব রূপ লেগেছে ॥
এই তো ব্ৰহ্মাণ্ড মাঝে তার চক্ষুদানী হয়েছে ॥
পুত্র-পিতা দারা সূত
ভবের বন্ধু আছে যত
তুচ্ছ জ্ঞান করে।
তীর্থযাত্রা পর্যটন গুরুর চরণে সব জেনেছে ॥
গোবিন্দ হয় গৌরাঙ্গ চাঁদ,
জগন্নাথ আর নিত্যানন্দ,
গুরু সব জানে।
নিষ্ঠারতি গুরুপদে অন্য রূপ সে ছেড়েছে ॥
গৌর কি আর গাছে ধরে,
গুরু রূপে গৌর ফেরে
এই সংসারে।
গুরু-সুখে সুখী হলে পারের ভয় কি তার আছে ॥
গুরু যার সদয় আছে,
তার যম-যাতনা দূরে গেছে,
সাধু হয়েছে।
হিরুচাঁদের চরণ ভুলে পাপ্পুর মানব-জনম যায় মিছে ॥

২৮

গুরুপদে নিষ্ঠারিত হয় না মতি,
আমার গতি হবে কিসে ॥
মন আমার মূঢ়মতি সাধন-ভক্তি
হলো না মোর স্বভাব দোষে ॥
মন আমার দিবারাতি গুরু প্রতি,
থাকতো যদি চরণ আশে,
তবে চরণ-দাসী হতাম, ব্রজে যেতাম,
থাকতাম ঐ চরণ মিশে ॥
পেতাম যদি সাধুবৈদ্য, মনের বেয়াদ্য
সেরে দিত সেই মানুষে,
লেগে চরণের জ্যোতি, জ্ঞানের মতি
সদায় হয়ে উঠতো ভেসে ॥
দীনহীন পাপ্পুর উক্তি চরণ-রতি
পান করিতাম ঘরে বসে,
বাঁচতাম শমনের হাতে অন্তিমেতে
সদয় হতেন গুরু এসে ॥

২৯

গুরুর চরণ ধরে পারে যাব গো, মনে ছিল বাসনা ॥
আমার স্বভাব দোষে রিপুর বশে হারালাম ষোল আনা ॥
ভব-সাগর বিষম নদী গো, নদীর কূল বহু দূর,
তুফান দেখে হত হলাম, কিসে পাব কূল,
কপাল দোষে পারের তরি ভবে চেনা গেল না ॥
দুখী-তাপী দেখে ভবে গো, ভালো তরি সাজায়েছে,
তাতে রাধা নামের বাদাম তুলে ঘাটে এসেছে,
ঐ নামের সুধায় জগত ভাসে, মন কেনো তাই ডোবে না ॥
বেহাল বেশে দয়াল চাঁদ গো ঘাটে এসেছে,
কত পাপী-তাপী অনায়াসে পারে নিতেছে,
সাঁই হিরুচাঁদ কয় অধীন পাঞ্জু ঘাটে কেনো বসো না ॥

৩০

ঘুমায়ে থেকো না রে মনা নয়ন খোলো ॥
চক্ষু মেলে দেখো, দীনবন্ধু রূপে করে আলো ॥
দেখো, স্বরূপ রূপে করে আলা,
গুরু খোলে রূপের গোলা,
চোখে উদয় চিকনকালা,
তারে দেখলে ভালো একাল পরকাল ॥
সিংহাসনে বসে কালা,
করে সখীর সঙ্গে লীলাখেলা,
তার গলায় দোলে তারায় মালা,
দেখে কুলবতীর কুল গেল ॥
তারে দেখলে যাবে জঠরজ্বালা,
খেলবি তখন সখের খেলা,
অধীন পাঞ্জু বলে ও মন ভোলা,
তোরে ধন্য হিরুচাঁদে জাগাইল ॥

৩১

চতুর্দলের ফল পাবি মন গাঁজা খেলে ॥
নেশা বড়ো ধন দেখো রঙমহলে ॥
আমার হুশার খোল, ব্রহ্মার কমণ্ডল,
কৃষ্ণ দিলেন বাঁশি নৈচা করে,
মহাদেবের বরে রে।
কলকে দিলেন মোর ধুতরা ফুলে ॥
মদন-মোহন গন্ধমাদন,
পাতাল-ভুবন ফিরছে রথে চড়ে
জগতের হরি রে।
তাই গাঁজাখোরের কপালে মেলে ॥
কৈলাসের ভবানী, গোকুলের গোপিনী,
শক্তি-আহলাদিনী,
দেখা হলে তখন বৃন্দাবন তমালে রে,
পেড়ো কি মন্দিরে।
কাশী-মক্কা দোলে হৃদ-কমলে ॥
গাঁজাখোর পেলে সকালে বৈকালে,
ঝিনুকেরই গড়ে যেমন মতি জ্বলে,
অধীন পাঞ্জু বলে ছলে রে,
মর্ম নাহি পেলে, পণ্ডিতের দলে মিথ্যা বলে ॥

৩২

চরণ ভিক্ষা দাও সাঁই মোরে ॥
ফেলো না ফেলো না আল্লা এই অধমে রে ॥
মাতাপিতা বন্ধু ভাই,
তোমা বিনা কেহ নাই,
সাঁই গো।
পাপী বলে দয়া আল্লা করো কাঙালে রে ॥
এই ভবে আসা কালে, আসিয়াছি খুশি হালে,
সাঁই গো।
নেক বান্দা ভালো তেরা, বধির কি তুই নয় রে ॥
পাপীর দয়াল তুমি,
শুনে বলো করি আমি
সাঁই গো।
নেকে রে করিলে দয়া, ডাকি কেনো তোরে ॥
হীন পাঞ্জু কেঁদে বলে,
গুরুর চরণ তলে,
সাঁই গো।
আন্তিম কালেতে ফাঁকি দিও না আমারে ॥

৩৩

চলো রে মন সাধু বাজারে।
সাধুসঙ্গ করলে পাবো অমূল্য বন্ধু রে ॥
হেলায় জনম গেল,
গুণাদিন ফুরাইল,
মন রে।
বেলা তো ডুবিয়া এলো, রলি ভবঘোরে ॥
সাধু সবে আশকদার,
গুরুপদে মতি তার,
মন রে।
সাধু কৃপা হলে গুরু সদয় হবে মোরে ॥
চেনো রে মুর্শিদ ধন,
দিন গেল অকারণ,
মন রে।
গুরু বিনা নিদানকালে কে সুধাবে তোরে ॥
অধীন পাঞ্জু কেঁদে কয়,
দিন গেল হায় রে, হায়,
মন রে।
গুরু পদে মতি আমার কবে হবে হায় রে ॥

৩৪

চিনলি না মুর্শিদ রতন, করলি না যতন,
কিসে মন তুই হবি তারণ ॥
তোরে আর কি বলব মন, গেল জনম,
না করলি সে চরণ-সাধন ॥
বলি মন ভবের কারণ,
করে গুমান আর কত কাল রবে জীবন।
যেদিন আসবে শমন, করবে দমন,
লুটে নিবে মহারতন ॥
সরলকে করলে গরল,
গরলকে করলে সরল, ওরে মনা।
চৌদিকে মহাগরল ও পাপী মন,
কিসে পাবি চাঁদের কিরণ ॥
পাঞ্জু কাঁদে পড়ে ফাঁদে
ভব নদীর বিষম যাতন।
হিরুচাঁদ কাট এ ফাঁদ, খোল নয়ন,
নিজ গুণে দিয়ে চরণ ॥

৩৫

জাতির বড়াই কি ॥
ইহকাল পরকাল জাতে করে কি ॥
মনে বলে অগ্নি জ্বেলে দিব রে জাতির মুখি ॥
এক জাতির বোঝা লয়ে মিছে হলাম বয়ে,
চিরকাল কাটালাম আমি মানী মানুষ হয়ে,
মানের গৌরব কুলের গৌরব ধন্ধবাজী সব দেখি ॥
যত লোক সব পেটের জ্বালায় দেশান্তরী হয়,
হিন্দু-মুসলমানের বোঝা মাথায় করে বয়,
কারবা জাতি কেবা দেখে ঘরে এলে চিহ্ন কি ॥
জাতে অন্ন নাহি দিবে রোগে না ছাড়িবে,
পাপ করিলে কোম্পানী-জাত ধরে নিয়ে যাবে,
মৃত্যু হলে যাবো চলে জাতির উপায় হবে কি ॥
মন ডাকো আল্লা বলে, কুলের গৌরব ফেলে,
অকূলের কূল মালেক আল্লা তারে লেহ চিনে,
পাঞ্জু বলে, যত করলাম সকলই ফাঁকিঝুকি ॥

৩৬

জানতে হয় সেই মর্ম, যে ফুলে আছে ধর্ম ॥
গরল হয় সুধামৃত সাধন অতি গৰ্ম ॥
সে ফুল ত্রিজগতের মূল,
মায়ামুগ্ধ জীবের হয় ভুল,
না চিনে তার পাবে না কুল,
বৃথা যাবে জন্ম ॥
কমল-পুষ্প হিঙ্গুল বৰ্ণ,
জীবের কাছে হয় অগণ্য,
মহাদেবের বলি ধন্য,
ধ্যানে পায় স্বধৰ্ম ॥
সাধন বলে সে রত্নধন,
বুকে দিলো শক্তির আসন,
যুগলে নিরিখ নিরূপণ,
জীবের চক্ষু চর্ম ॥
ছেড়ে পাঞ্জু কুটিনাটি,
নিষ্ঠা করি ধরো আঁটি,
হিরুচাঁদে বলে খাঁটি,
সেই ফুলে ধৰ্ম ॥

৩৭

জীব তরাতে তরিকের কিস্তি নবি ঘাটে এনেছে ॥
গোনাগারে নিবেন পারে, তরিক সে ধরেছে ॥
নবি দিচ্ছে তরিক জাহেরার,
পুশিদাতে ভেদ হয় খোদার,
পুশিদা তরিক রাসুল সিনাতে দিয়েছে ॥
বেহেস্ত পাবে তরিক জাহেরা,
পুশিদাতে পাবে খোদা,
আশকদারে খোদার জন্য বেহাল হয়েছে ॥
বেহেস্তের আশা দোজখের ভয়,
আশকদারের মনে না হয়,
সে যে আল্লা পানে আহোনিশি চাহিয়া রয়েছে ॥
মজবুত তরিক এই হয়,
তরিক কিস্তি আশেকে পায়,
অধীন পাঞ্জু ভাব না জেনে ভ্রমেতে ভুলেছে ॥

৩৮

ঠিক রাখবি যদি সাধের ঘর ॥
ভবের হাটে খুঁজে দেখে ভালো এক ঘরামি ধরো ॥
অনুরাগের আড়া করো
আল্লার নামে খুঁটি গাড়ো, রূপের প্যালা মারো।
ঝড়ি-ঝটকা কি করবে তোর, মহাসুখে বসত করো ॥
ধরো রে ঘরামির চরণ,
হৃদ-পদ্মে করো ধারণ, চিন্তা নাহি আর।
দুষ্ট যত আপন হবে, কেউ রবে না পর ॥
পঞ্চবাণের ছিলে ধরে
খান্ত করো কাম-অসুরে, মাল যাবে না আর।
ঘরামিকে স্বামী করে মহাসুখে বিরাজ করো
ঘরের মালেক মটকায় আছে,
মনায় তারই কাছে, রাখো হুঁশিয়ার।
হিরুচাঁদ কয় পাঞ্জু যাবি চরণ ধরে ভবপার ॥

৩৯

ঠিক রেখো মন নবির তরিক সই ষোল আনা ॥
দর্জালের আমলে তরিক ঠিক রবে না
দর্জালের আমল হবে,
বলেছে মুরব্বি সবে,
হবে তা আখেরি জামানায়,
আখেরি জামানার কিছু হচ্ছে নমুনা ॥
দরবেশের চেলা যত,
বিচার করে আত্মমতো,
সাধু-গুরুর বাক্য মানে না,
নিজ-বুদ্ধি বড়ো জেনে দেয় উপাসনা ॥
হাদিস পড়ে আলেম হলো, এলেমের জোর সে করিল
তম করে মুর্শিদ ভজে না,
মুর্শিদ বিনে নবির তরিক ঠিক রবে না ॥
নবির তরিক ভুলে গেল,
হিংসা-নিন্দা বৃদ্ধি হলো,
খোদার বান্দা ভেবে দেখো না,
পাঞ্জু বলে দীনের বাতি আঁধার করো না ॥

৪০

ডোর-কৌপীন দাও গো মুর্শিদ আমারে ॥
কাঙাল হবো, মেঙে খাবো, আল্লাজির দ্বারে ॥
সুখের শয্যা ত্যাজ্য করে এসেছি সাধুর দ্বারে ॥
পূর্ণ হলো ভবের খেলা,
ভেবে দেখি গেল বেলা,
ঘিরে এলো শমন-জ্বালা,
থাকি মরার হাল পরে ॥
স্কন্ধে লয়ে আচলা-ঝোলা,
ভিক্ষার ছলে বলবো আল্লা,
তাতে যদি বারিতালা,
অধমের দয়া করে ॥
কোথায় ছিলাম ভবে এলাম,
কুল বলে মুই ভুলে রলাম,
ভোজের বাজি করে গেলাম,
কোন গুণে পাব তারে ॥
কি করিবে ভবের কুলে,
সঙ্গে নাহি যাবে মলে,
পাঞ্জু বলে, চরণ ভিক্ষা,
দাও সাঁই মোরে ॥

৪১

তারে ধরবো কি সাধনে।
ব্ৰহ্মা-আদি না পায় যারে যুগ-যুগান্তর বসে ধ্যানে ॥
বেদ-পুরাণে পাবে না রে নীরূপ নিরাকারে,
নিরাকারে জ্যোতির্ময়ে বসে আছে নিত্যস্থানে ॥
অনাদির আদি মানুষ,
আছে সে অতি গোপনে,
সেই মানুষে সাধ্য করে রাধাকৃষ্ণ বৃন্দাবনে ॥
চিন্তামণি ভূমি-বৃক্ষ,
সেই কল্পমহী বনে,
গোপীকৃপা যার হয়েছে, সেই পেয়েছে রত্ন-ধনে
সখি-রূপ যে দেখেছে,
সেই গুরুর ধিয়ানে,
পাঞ্জু বলে সেই রসিকের দাসী হবো শ্রীচরণে ॥

৪২

তিনটি রসের ভিয়ান যে জানে
সেই পাবে নিরঞ্জনে
শাম্ভু গরল সাধ্য করে
সেই সুধার মিলনে ॥
যেমন দুগ্ধ-জলে মিলন করিলে,
হংস পাখি পান করে বেছে,
রসিকজনা হংস হয়
সেই সুধার মিলনে ॥
অমাবস্যায় গরল প্রকাশে
অমূল্য হয় সাঁই আগমনে,
অতি সাবধানে সাধন করে
প্রেমের রসিকগণে ॥
পদের শেষ দ্বিতীয়ার প্রথমে
রত্ন মেলে তিন রস মিলনে,
অধীন পাঞ্জু বলে রত্ন পেলে
তারে ছোঁবে না শমনে ॥

৪৩

ত্রিবেণীর তিনধারে সুধার জোয়ারে ভাসে ॥
সুখ-সাগরে মানুষ খেলে বেহাল বেশে ॥
উতালে সুধাসিন্ধু,
সুধারে সুধাবিন্দু,
সুখময় সিন্ধুজলে ছলে সাঁতার খেলে।
জীব নিস্তারিতে জোয়ার এসে ভ্রমর মানুষ যায় গো ভেসে ॥
অমাবস্যায় তিথি নাস্তি,
জোয়ারে তিথি উক্তি,
অমাবস্যা, প্রতিপদ, দ্বিতীয়া তিন দিন চলে।
ধরবি যদি অধর মানুষ, থাকো নদীর কূলে বসে
জোয়ারের ভাটা শেষে,
মানুষ যায় অচিন দেশে,
কিছুকাল গুমান করে গোপনে তিন মৌজা ফোটে,
সেদিন স্বরূপেতে কিরণ দিয়ে মানুষ যায় গোলকে মিশে ॥
অনুরাগী যে হইবে,
ত্রিবেণীর রূপ দেখিবে,
সহজে অধর ধরে যাবে ঐ চরণে মিশে,
হিরুচাঁদ কয় মানুষ খুঁজে পাঞ্জু মলি দেশ-বিদেশে ॥

৪৪

দম জেনে লও দমের মালা গলে ॥
আল্লা-মুহম্মদ-আদমে এক দমে তিন মেলে ॥
আদমে সাঁইজির খেলা
জপ দম দমের মালা
দূর করো তসবি-মালা
মন-মালায় ধন মেলে।
মনের মানুষ দমে জপে বসাও হৃদ-কমলে ॥
আদমে দমের শুমার
এক লাখ চৌত্রিশ হাজার
রাতদিন জ্ঞান খবর
চব্বিশ হাজার মূলে।
ভুলে আল্লা এক দম ফেলা
মানা হয় দলিলে ॥
যে জপে দমের মালা
জানে সে কাবাতুল্লা
বায়তুল্লার ঘর আল্লাতালা
দিবেন তার দেলে।
তাই জানিতে অধীন পাঞ্জু
ফিরতেছে বদ্‌হালে ॥

৪৫

দয়া করিলেন যারে সাঁই ॥
ত্রিপিনীর ঘাটে নৌকা তার বাঁচে ভাই
কাণ্ডারি চড়ায়ে নায়,
পঞ্চদাঁড়ে বেয়ে যায়;
সাঁই গো।
ভবনদী পাড়ি দিতে চিন্তা নাহি তাই ॥
ছয় রিপু করে বশ,
সাধনে পেয়েছে যশ, সাঁই গো।
কাটিয়াছে মায়াফাঁস, বলিহারি যাই ॥
মাশুকের ভাবে সেই,
হাসে খেলে সর্বদায়,
সাঁই গো
লোকেতে কলঙ্ক গায়, তাহে ডৱ নাই ॥
ভাবেতে হয়েছে ভোর,
পরিয়া কোপিনী ডোর,
সাঁই গো ॥
আনন্দের নাহি ওর, সদাসর্বদায় ॥
পাঞ্জু বলে মন আমার,
মুর্শিদের কদম সার,
সাঁই গো।
করিলে হইবে পার, ফেলে যাবে নাই ॥

৪৬

দয়াল গুরু বিনে পারের উপায় কি তোমার রে,
সে ঘোর তুফানে
দিনে দিনে দিন ফুরালো মৃত্যু আছে সামনে রে,
তাই ভাবো না মনে ॥
ভব-নদীর তুফান দেখে, মরবি হুতাশে,
কেউ হবে না সঙ্গের সাথী,
পারে যাবি কেমন করে রে,
সে কঠিন দিনে ॥
ভবনদী বলো যারে কূলে যাওয়া ভার,
চক্ষু হবে ঘোর অন্ধকার,
সেদিন কে তরাবে আর ওরে,
সেহি নিদানে ॥
কেবা আমার কারবা আমি,
কে আমার আছে,
ভবপারে যাবি যেদিন, সকল হবে মিছে রে,
দেখো না জেনে
করো ভবপারের সম্বল, শোন আমার মন,
গুরুতে সম্বন্ধ হলে,
অধীন পাঞ্জু কেঁদে বলে রে,
তরবি সেখানে ॥

৪৭

দয়াল গুরু ভুলে
জনম মায়ার ভোলে পড়ে রে,
গেল বিফলে।
ভুল হলো মোর মূল সাধনে,
কি বলে জবাব দিবো রে,
নিকাশে কালে ॥
ভবনদী পারের বিধি
কি আমার আছে,
ভজনশূন্য দেহ গুরু
ছোঁবে কোন গুণে রে,
অন্তিমকালে ॥
গুরুর চরণ পারের সম্বল,
ভব-নদীতে,
মন হলি তুই ভক্তিহীন
চরণ মেলে কিসে রে,
আমার কপালে।
ভুলে রলাম ভবের কূলে,
কূল পাবো কিসে,
ভেবে দেখ রে অবোধ মন তুই,
হারা হলি দিশে রে,
কূল গেল কূলে ॥
মনপ্রাণ দিন থাকিতে
সঁপো গুরুতে,
এ দিন গেলে সে দিন পাবো
গুরু সখা হলে রে,
পাঞ্জু তাই বলে ॥

৪৮

দয়াল দরদী, কাঙাল এলো তোমার দ্বারে ॥
অক্ষয় ভাণ্ডার গো তোমার, কেউ যাবে না ফিরে ॥
সর্বধনের দাতা তুমি ত্রিমহীমণ্ডলে,
বিনামাঙ্গায় কত ধন মোরে দিয়াছিলে,
আর কোনো ধন চাইনে দয়াল, চরণ দাও আমারে ॥
কুলের বাহির হলাম আমি চরণ পাব বলে,
কত মহাপাপীর দিলে চরণ, তাই এসেছি শুনে,
দাঁড়ালাম দরজায় এসে স্কন্ধে ঝুলি করে ॥
দাও কি না দাও রাঙা চরণ, বেলা গেল চলে,
দাতার চেয়ে বখিল ভালো, তুডুক জবাব দিলে,
পাঞ্জু বলে জবাব পেলে যাই আমি চুপ মেরে ॥

৪৯

দয়াল ধনী, আমি ডাকি ঐ নাম শুনে ॥
হেলায় চরণ দিতে পার, দিবা না সাঁই কেনে ॥
যা করো তাই করতে পারো এ তিন ভুবনে,
ভক্ত রক্ষা করলে যে স্ফটিক স্তম্ভনে,
তোমার স্মরণে প্রহলাদ মলো না বিষপানে ॥
তাই শুনে হয়েছি পাগল, পাপ-পুণ্য জানি নে,
সুধা বলে গরল খেলাম তোমার ধিয়ানে,
আমারে দিবা না চরণ কিসের কারণে
প্রাণ সঁপেছি, মন সঁপেছি, চরণ পাব বলে,
পাঞ্জু বলে, দাও না চরণ, ভেবেছ কি মনে,
ধর্মেতে সবে না তোমার বলছে দীনহীনে ॥

৫০

দয়াল মুর্শিদ ধন, আমি, কোথায় যেয়ে তোরে পাবো ॥
ও তোর রূপ রয়েছে কার বাসরে, আমি কিরূপে দেখিবো ॥
হলাম হাল ছে বেহাল দীনের কাঙাল
আর বাঁচবো কত কাল,
আমার সাধের জনম বিফল হলো
আমি কোন গুণে তরিবো ॥
আমার হৃদয়-পালঙ্ক পাতি
আর জাগবো কত রাত,
আমার সুখের নিশি দুখে গেল,
আমি কার পানে চাহিবো ॥
যেমন ভ্রষ্টামতি নারীর গতি
খেয়ে না পুরিল আশ,
আমার কলঙ্কে ভরিল দেশ
আমি কোন কূলে দাঁড়াবো ॥
আমি হই উদাসী বনবাসী
আমার পথের সম্বল নাই,
পাঞ্জুর বাঞ্ছা ছিল চরণ পেলে
আমি তাপিত প্রাণ জুড়াবো ॥

৫১

দিন আমার গিয়াছে, দিনমণি লুকাইয়াছে ॥
দীনবন্ধু গুরু কোথায় রয়েছে ॥
মন আমার হয় উদাসী,
কার সনে পোহাবো নিশি,
মনের বাসনা মনে বসে রয়েছে,
জানি কার বাসরে বন্ধু পালিয়েছে ॥
মন একা ভবে এলো,
গুরু এসে দোসর হলো,
পাষণ্ড মন আমার দোসর ছেড়েছে,
তাইতো আশাবৃক্ষ ছেদন হয়েছে।
ঘোর নিশি চোখে ছানি,
আমি হলাম একাকিনী,
কিসে পোহাই রজনী, কম্প হয়েছে,
অধীন পাঞ্জু গুরুর দোহাই দিতেছে ॥

৫২

দিন থাকিতে গুরুর চরণ সত্য বলে ধরো ॥
গুরুর চরণ ধরে ভবপারের উপায় কিছু করো ॥
আসতে গুরু যাইতে গুরু,
একাল পরকাল,
সুখ পেয়ে আনন্দে ভোলো,
দুঃখে ডেকে মরো ॥
সুখের সময় আনন্দেতে
নিত্য সেবা করো,
ঐ রূপ হৃদ-কমলে উদয় করে,
নামে ডঙ্কা মারো ॥
যত্ন করলে রত্ন মেলে
শুনি সাধুর দ্বারে,
গুরুর যত্ন করে কত অধম
পেয়েছে কিনারো
অধীন পাঞ্জু বলে মোর কপালে
এত ছিল ফ্যার,
হিরুচাঁদ নিজ গুণে ভজনহীনে
মনোবাঞ্ছা পোরো ॥

৫৩

দীনের রাসুল এসে আরব শহরে দীনের বাতি জ্বেলেছে ॥
দীনের বাতি রাসুলের রূপ উজালা করেছে
মুহম্মদ নাম নুরুতে হয়
নবুয়তে নবি নাম কয়,
রাসুলউল্লা ফানাফিল্লা আল্লাতে মিশেছে ॥
মুহম্মদ হন সৃষ্টিকর্তা,
নবি নামে ধর্মদত্তা,
শরিয়তের ভেদ ওতে রেখে শরা বুঝায়েছে ॥
জাহেরা ভেদ জাহেরাতে,
আশেকের ভেদ পুশিদাতে,
মহর-নবুয়ত আশকদারকে দেখায়ে দিয়েছে ॥
রাসুল-রূপ যার মনে আছে,
তার মনের আঁধার ঘুচে গেছে,
অধীন পাঞ্জু ভাব না জেনে ভ্রমেতে ভুলেছে ॥

৫৪

ধরা যায় রে অধরে, যদি নিষ্ঠা হয় স্বরূপ-দ্বারে ॥
মূলাধার সেই অটল বৃক্ষ, আছে দুটি ফল ধরে ॥
লাল শ্বেত দুটি ফুল, মাতাপিতা নাম ধরে,
অটলের বরাতি মানুষ গড়েছে ফল মৈথুন করে ॥
অটল মানুষ নিজ রূপ, স্বরূপে সে রঙ ধরে,
পিতামাতা পদ্মফুলে, ভাসিছে সমুদ্দুরে ॥
মহাযোগ সমুদ্দুরে, অটল রূপ ঝলক মারে,
পাঞ্জু বলে তিরধারে ধরো ভাটা জোয়ারে ॥

৫৫

নবিকে চিনে করো ধ্যান ॥
আহাম্মদে আহাদ মেলে, আহাদ মানে ছব্বহান ॥
আতিউল্লাহ আতিয়র রাসুল দলিলে আছে প্ৰমাণ ॥
আল্লার নুরে নবির জন্ম, নবির নুরে সারেজাহান,
নুরেজানে আদমতনে বসত করে বর্তমান আওল ॥
আখের জাহের বাতেন চারি রূপে বিরাজমান,
বাতেনে গোপনে থেকে জাহেরে দেন তরিক দান ॥
তরিক ধরো, সাধন করো, আখেরে পাবা আসান,
বর্তমানে নাহি জেনে পাঞ্জু হলো হতজ্ঞান ॥

৫৬

নবিকে চেনা হলো ভার ॥
নবি না চিনিলে ভবে কেমনে হইবা পার ॥
জেন্দা থেকে না পাইলে মলে তো পাবা না আর ॥
খবর শুনি মদিনাতে নবি হলেন এন্তেকাল,
হায়াতুল মোরসালিন বলে কেনো লিখলেন পরোয়ার ॥
দেখে শুনে অনুমানে দেলে ধাঁধা হয় আমার,
মনে বলে নবি মলে দুনিয়া রইত না আর ॥
আছে সত্য নবি বর্ত, চিনে করো রূপ নিহার,
হিরচাঁদের চরণ ভুলে পাঞ্জু হলো ছারেখার ॥

৫৭

না ভজে সাধের জনম বিফলে যায় ॥
গুরু আমার সত্য দয়াময়।
দয়া করে দীনবন্ধু গুরু রূপে এসে,
কিবা যবন কিবা হিন্দু চক্ষুদানী দেয় ॥
ও মন, যখন ভবে এলে,
বলেছিলে গুরুর চরণ সাধবো মনের সাধে
জননী জঠরে জন্মে নিল মহামায়ায় ঘিরে
ভুলে গেলাম পূর্বকথা পেটের জ্বালায় ॥
ও মন জনম গেল হেরে,
শমনভুবন যেতে হবে, সেদিন এলো ঘুরে
এ ভবের বন্ধু যারা, পর হয়ে যাবে তারা,
পাপ্পু কেঁদে বলে সেদিন কি হবে উপায় ॥

৫৮

নিগূঢ় লীলা রসিকজনা জানে ॥
যে অধিকারী হয় ভজনে ॥
অবতারে হয় কাণ্ডারি জীবের নিস্তার-কারণে ॥
দয়া করো নিতাই রূপে,
কারো কাছে হজরত নবি,
সাঁই একা একেশ্বর।
কাহে হিন্দু কাহে মুসলমান,
মিলজুল হও সাঁই সেবনে ॥
কেহ পুরুষ, কেহ প্রকৃতি,
সর্ব ঘটে সাঁইর বসতি,
করছে খেলা রসরতি,
দেখি জগতময়।
এক দিকে হয় ব্রহ্মার সৃষ্টি,
আর দিকে প্রেম সাধু জানে ॥
নিত্যলীলা যত ইতি
গুরু-দেহে করে স্থিতি,
যোগ্য দেহ তার।
শুদ্ধ ভক্তি, অহৈতুকী
মূঢ় পাঞ্জুর ঘটবে কেনে ॥

৭৮

নিজ গুণে দয়া করো গুরু ভজন না জানি ॥
ভজনহীন হয়ে ডাকি দয়াল নাম শুনি ॥
তুমি দীনের ধনী,
আমি হই দীনহিনী,
চাতকিনী হয়ে ডাকি, পাবো চরণ দু-খানি ॥
আমি নিগুণে এক দাসী হয়েছি,
তোমরা নামের জোরে ডক্কা মারতেছি,
নামে ভাসালাম তরি,
যদি ডুবিয়ে মরি,
তবে আমা হতে নামের গৌরব যাবে ও গুণমণি ॥
তোমার নামের জোরে অধম তরে যায়,
আমি চেয়ে আছি ঐ নামের আশায়,
আমি বড়ো অভাগী,
কোনো উপায় না দেখি,
ভরসা করি তরে যাব নামে এ ঘোর তুফানে ॥
এবার যা করো এই দীনহীনে রে,
পড়ে রইলাম চরণের আশা করে,
অধীন পাঞ্জু কয় বাণী,
আমি এই ভিক্ষা মাগি,
তোমার রূপে নয়ন থাকে যেন এ দিন-রজনী ॥

৬০

নুরের খবর জানি নাই ॥
আল্লার নুরে নবির জন্ম শুনতে পাই ॥
নবির নুরে সারেজাহান, নুর ছাড়া আর কিছুই নাই ॥
নুর কোন পাত্তরে খণ্ড করলেন দয়াময়,
খণ্ড করে আঠারো হাজার আল্লার আলম গঠলেন তায়,
ইনসান হায়ান বৃক্ষ অদি নুরে পয়দা করেন সাঁই ॥
আদমের দেহে নবির নুর সব পয়দা হয়,
কোন নুরেতে কোহতুরে মুসা নবি দিদার পায়,
নুর তাজেল্লার তাপে জ্বলে কোহতুর পাহাড় পুড়ে যায় ॥
নুর চিনিলে আল্লা নবি পাওয়া যায়,
এই দেহের মাঝে সেই নুর আছে, মুর্শিদ ধরে জানতে হয়,
হিরুচাঁদ কয় অধীন পাঞ্জু নুর বিনে তোর উপায় নাই ॥

৬১

পাপের কারখানা ॥
গুরুর বাক্য কেটে সাধু হবা
মনে ভেবো না
গুরু সুখের সুখী হবা
অন্তিমে শ্রীচরণ পাবা,
মন রে।
তাই বলে কুল নাশ করিলে,
মদনজ্বালা গেল না ॥
রস না জেনে রসিক হলে
গুরুনিষ্ঠা না করিলে
মন রে।
মদ-খাওয়া মাতালের মতো
মাতালে চরণ পাবা না ॥
বাঞ্ছা ছিল ভজন করে
ভবসিন্ধু যাব তরে
মন রে।
পাঞ্জু বলে রিপুর দোষে
হয়ে গেল দিনকানা ॥

৬২

পেয়েছো মানব-জনম ভুলো না রে আর ॥
আসা-যাওয়া যে যাতনা পেয়েছে মন বারেবার ॥
মানব-জনম আল্লা দেয় যখন,
করার করেছিলে করবো ভজন-সাধন,
করার মতো কার্য হলে জনম সারা হবে তার ॥
মহামায়ার সংসারে এসে,
একদিনও পলো না মনে যাবো রে দেশে,
জীবের ভুল সারিবো বলে গুরু ফেরে ঘরে ঘর ॥
পুণ্য-মুক্তি যতই করো মন,
কোনো কার্যে হয় না জন্ম-মৃত্যু যে খণ্ডন,
পাঞ্জু বলে গুরু-প্রাপ্তি হলে যাব ভবপার ॥

৬৩

প্রেম-নদীতে ডুবে দেখো না মন ॥
ভবে প্রেম হয়েছে ধন ॥
জগত জোড়া প্রেমের বরিষণ,
প্রেম ধর্ম, প্রেম কর্ম, প্রেম অমূল্য রতন,
যেমন সিংহীর দুগ্ধ মেটে পাত্রে নাহি রয়,
স্বর্ণ পাত্রে হয় যতন
চণ্ডীদাস আর রজকিনী মন,
প্রেমে ডুবে এহি ভবে জয় করে সমন,
তারা সহজ প্রেমের প্রেমিক হয়ে
স্বধামে করে গমন ॥
প্রেম করেছে শ্রীরূপ সনাতন,
পরশ ফেলে সুরস চিনে ভ্রমে বনে বন,
তাকি সামান্য এই জীবে জানে,
জেনে সাধুজনে হয় চেতন ॥
দীনহীন না পায় প্রেমের দিশে,
হিরুচাঁদ কয় বাহু তুলে, পাঞ্জু প্রেম নিসে,
আমার ঐ দুরদৃষ্টক্রমে,
মিছে মায়ায় ভুলে যায় জীবন ॥

৬৪

বড়ো চিন্তাঘুণ লেগেছে আমার অন্তরে ॥
মুর্শিদ কোন গুণে পাবো তোরে ॥
আমার দুই নয়ন ঝরে,
দুঃখ বলবো আর কারে,
কে আছে মোর ব্যথার ব্যথিত, আমায় কেবা আদরে।
আমি প্রেমসাগরে ভাসাই তরি রে,
আমার ডুবলো ভারা কিনারে ॥
আমার মন পাগলপারা,
হয় না নিহারা,
বনে বনে কেঁদে ফিরি, আমি পাই না অধরা।
যেমন কলমিলতা জলে ভাসে রে,
তেমনি ফিরতেছি দ্বারে দ্বারে ॥
দুঃখ কই যারে তারে,
এই ভব সংসারে,
তো বিনে ভরসা নাই, গুরু চরণ দাও মোরে।
অধীন পাঞ্জু বলে মুর্শিদ বিনে রে,
কেঁদে ফিরতেছি দ্বারে দ্বারে ॥

৬৫

বসে করো কি, বলি শীঘ্র বুলি ধরো ও মন পাখি ॥
মানব-রঙেরই খাঁচা, তাতে পাতিয়ে মাঁচা,
সাঁই যত্ন করে দিল তোরে ক্ষীর-লোনী খোরাকি ॥
পাখি লোনী খাও সুখি
আল্লা নবির দুটি নাম, তাই বলো মুখি,
লোভের চার দেখি, মেরো না ঝুঁকি,
ক্ষীর লোনী ঢেলে পলে তোমার উপায় হবে কি ॥
পাখির ভালো খাঁচাটি
আট কুঠরি, নয় দরজা, ফুলেরই সাঁজি,
খাঁচার উপরে কাজল কোঠাতে,
সাঁই বসে দিচ্ছে বারাম পাখি তোমার রঙ দেখি ॥
কাঁচা স্বর আর নৃত্য করো, মালেকের সম্মুখি,
মালেক না দেখি পলে বিড়ালের মুখি,
পাঞ্জু বলে সাধের জনম হলো রে ফাঁকিঝুকি ॥

৬৬

বিনা সাধনে তার কি ধরা যায় ॥
বেদ-পুরাণে যার চিহ্ন নাই ॥
আসমান-জমিন জোড়া মানুষ,
মাকড়ার জালে ছাপিয়ে রয় ॥
কিঞ্চিৎ রূপে জগত আলো
চর্মচোখে টের না পায়,
দিব্য নয়ন হলে পরে,
দেখতে পায় সে জ্যোতির্ময় ॥
নিরাকারে জ্যোতির্ময় সে
তারই আকার জগতময়,
নীরের হিল্লোলে মানুষ
স্বরূপ দ্বারে বারাম দেয় ॥
দেখলে সে দ্বার হয় চমৎকার,
জীবে কি তার মর্ম পায়,
পাঞ্জু বলে সাধুজনে
যোগ-সাধনে ধরে তাই ॥

৬৭

বিন্তি খেলা করবি যদি শোন ওরে মন আমার ॥
হাতের পাঁচ পঞ্চ ভাব তা হাতে রেখে রঙ ফেরাই নে ঘর
টিকা সাহেব হাতে নিয়ে
ইস্তক বিন্তি ডেকে দিয়ে,
বিপক্ষের ঘাড়ে দেও মন সাতা-আশির ফ্যার ॥
বামে যদি পঞ্চাশ ডাকে,
ইস্তক রয় মোদের হাতে,
ষাট ফোঁটায় কাবার করা হবে ওদের ভার ॥
মহামায়া শ করে
দাও খেলা রঙের জোরে,
দু-কড়ি সাতের ফ্যারে জোরে কাগজ ধরো ॥
ওরা যদি ফেরাই করে,
নাও গো রঙ তুরুপ মেরে,
পাঞ্জু কয় মোর কপালে ঘটে না তো আর ॥

৬৮

ভজন সাধন যার হবে ॥
অন্ধকার ঘরে বাতি তাহার জ্বলিবে ॥
গুরু যার বশ হয়,
তার নাহি কোনো ভয়,
সাঁই গো।
সুফল কু-বৃক্ষে তার অবশ্য ফলিবে ॥
মাকড়ার জালে সেই,
হস্তীকে বান্ধিল ভাই,
সাঁই গো।
জঠর যাতনা তায় আর নাহি রবে ॥
দিন দুনিয়াতে সেই,
মশাল হইবে ভাই,
সাঁই গো।
মূঢ়াতে চিনিবে নাই অলি হয়ে যাবে ॥
নবির খান্দানে সেই,
মাশুক পাইবে ভাই,
সাঁই গো।
শমনেতে ছোবে নাই, আল্লারে পাইবে।
হীন পাঞ্জু কেন্দে কয়,
গুরুবাক্য মানি নাই,
সাঁই গো।
আমারে মালেক সাঁই কি জানি করিবে ॥

৬৯

ভজো নিরঞ্জন, লা ইলাহা ইল্লালা পড়ো আমার মন ॥
বড়ো অমূল্য রতন, এ নাম নিদানের ধন ॥
যখন নাহি ছিল আসমান জমিন রে, ছিলেন একা মওলা-ধন,
বড়ো সাধ করিয়ে গঠলেন আল্লা থাকি আদমতন ॥
কে বুঝিতে পারে আল্লা রে, তোমারই মক্কর,
বড়ো দোস্ত ছিল তোমার আজাজিল খাসতন,
তাবেদার ছিল তারে ফেরেশতা যত জন,
সেই আজাজিল দোষী হলো আদমের কারণ ॥
খাক হতে খাকি আদম রে, গঠলেন আদমতন,
কোন চিজেতে হাওয়া বিবি করিলেন সৃজন,
মক্কর মাকারুল্লা আল্লারে, তারে খাওয়ালে গন্দম,
গন্দম খেয়ে আশক জ্বালায় জ্বলে দুই জন ॥
আরাফার মাঠে দোহায় রে, করিলে মিলন,
নুর-নীরেতে করলে আল্লা সৃষ্টিরই পত্তন,
কে বুঝিতে পারে আল্লা রে, কুদরতের বিবরণ,
পাঞ্জু বলে নুর সাধিলে পাইতাম তার চরণ ॥

৭০

ভাবিনীর ভাবে মনা, কাণ্ডারি লও বশ করে
অনুরাগের চরায় তুলে জ্বরা তরি লও সেরে ॥
সাঁই নামে গাউনি করে, গাবকালি দাও নীরে-ক্ষীরে ॥
ছয় দাঁড়ি মাঝির কাজে,
দাওগা মন যার যা সাজে,
শ্রীরূপের বাদাম তুলে তরি ভাসাও সাগরে ॥
ভক্তি-শিলারী মন রে,
এঁটে ধরো না তারে,
দাঁড়াইবে মেঘের আড়ে, তম-ঝড় যাবে দূরে ॥
হিংসা নিন্দা দে-বংশে ধন,
ক্ষমা ধৈর্যে ফেলবে যখন,
পাঞ্জু বলে যাবে তুফান, হিরুচাঁদ নিবেন পারে ॥

৭১

ভুলেছ মন যার ভোলায়, সে বিষম জুয়াচোর
গুরু পথ দেখাবে দেখবি, কেনো রইলি কোলের ঘোর ॥
কীটপতঙ্গ স্থাবর জনম চৌরাশির ফ্যার,
ফ্যার ঘুচাতে সাধের জনম দিয়েছে তোমার ॥
সাধের জনম সাধ্য বিনা হবে না উদ্ধার,
এবার তেধারা ত্রিবেণীর ঘাটে মরার আগে মরো ॥
জলের জোড়া পথের গোড়া যে দেখাবে তোর,
সত্য গুরু জেনে তার সঙ্গে সঙ্গে ফের ॥
আছে গুণমণি গুরু তিনি তাঁরই চরণ ধরো,
পাঞ্জু বলে তারে ভুলে ফ্যার হলো আমার ॥

৭২

মন তোর ঘরে বসে মহাজন ॥
খুঁজে মরিস কেনে তীর্থ-বৃন্দাবন ॥
স্বরূপ-নিষ্ঠা যার হয়েছে, সে পায় দরশন।
আঠারো মোকাম আট কুঠরি মন, মধ্যে ত্রিভুবন,
পাহাড়াদি সপ্ত নদী দেহে বিরাজন,
সিংহদরজায় দ্বিদল পদ্মে কালার সিংহাসন ॥
স্থির বিজরী রূপের জ্যোতি মন, সঙ্গে পঞ্চজন,
সিয়া সফেদ লাল জরদে ঘোরে সে আসন,
ভক্তের হৃদয় আলো করে সে রূপের কিরণ ॥
তিল প্রমাণ জায়গায় বসে মন, কোটি তীর্থের ধন,
সাধু সঙ্গে মহারঙ্গে পাবি অন্বেষণ,
পাঞ্জু বলে চিনে নে না জীবনের জীবন ॥

৭৩

মন দেখি আজব নদী, মায়াবাদী,
ইন্দ্ৰ আদি সব সাজিল ॥
জীবাত্মা বাঁচবো বলে রিপুর ভোলে
আনন্দে স্নান করতে গেল ॥
নদী ভয়ানক অতি, তিন দিকেতে
তিন ভাবে জল বেগ ধরিল ॥
পঞ্চবাণ হারায়ে পথে, স্নান করিতে
জীবাত্মা পাকে পড়িল,
আত্মার যা সম্বল ছিল, সব হারাল,
চৌরাশি ঘুরে মল ॥
কেঁদে তাই পাঞ্জু বলে, একেকালে,
শমন-ভুবন যেতে হলো,
হিরুচাঁদ নিজ গুণে, দয়া করে
কেশে ধরে আমায় তোলো ॥

মন রে, দীনের কথা করো মনে ॥
এ দিন গেলে অন্তিমকালে, গতি নাই গুরু বিনে ॥
গুরু ভবপারের কর্তা
সত্য সত্য সাধুবার্তা
গুরু যিনি পরম-আত্মা,
ভজো বর্তমানে ॥
ভবপারে যাবি যদি,
গুরু পদে করো মতি,
যদি হয় মন নিষ্ঠারতি,
ভাবনা কি সেই দিনে
যে সাধনে গুরু বর্ত,
দিন থাকিতে জানো অর্থ
অধীন পাঞ্জু অপদার্থ,
ভজন-সাধনে ॥

৭৫

মবুদ আল্লার খবর না জানি ॥
আছে নির্জনে সাঁই নিরঞ্জন-মণি ॥
অতি নিগুম ঘরে বিরাজ করে সাঁই গুণমণি,
তথা নাহি দিবা-রজনী
যখন নাহি ছিল আসমান আর জমিন,
অন্ধকারে হেমন্ত বাও বইছিল আপনি,
সেই বাতাসে গায়বি আওয়াজ হলো তখনি,
তা জানেন জগত-জননী ॥
সেই আওয়াজ ভরে ডিম্ব হয় শুনি,
ডিম্ব ভেঙে আসমান-জমিন গঠনের রব্বানি,
শুনি সাততালা আসমানের পরে রয়েছেন তিনি,
আছে অচিন মানুষ অচিনি ॥
সেই ডিম্বের খেলা আদমে খেলে,
চেতন মুর্শিদ চিনে ধরলে সে ভেদ জানাবে,
পাঞ্জু বলে না ডুবিলে রতন কি মেলে,
ডুবলে হবি ধনী ॥

৭৬

মানুষ-গুরু কল্পতরু বিশ্বাস হবে যার অন্তরে ॥
গুরুকে গৌরাঙ্গ জেনে সদায় ঐ রূপ নিহার করে ॥
অনুরাগে ধরেছে যারে,
মন-প্রাণে, দেহ-ধন, অর্পণ করে,
কুলশীলের ভয় রাখে না, ব্রজ গোপীর ভাবে ফেরে ॥
মানবরূপে ফিরতেছে হরি,
নিষ্ঠারতি যার হয়েছে, হরি হয় তারি,
রসিক ভক্ত হরি-প্রাপ্ত করতেছে ভজন করে ॥
ব্রজগোপীর মহাভাব ধরে,
পঞ্চ ভাবের পঞ্চগুণে বেঁধেছে তারে,
নিত্য সেবায় বর্ত থাকে, আত্মসুখে পাঞ্জু ফেরে ॥

৭৭

মিলবে গুরু কল্পতরু যে করে ধিয়ান ॥
ছত্রিশ জাতির কত গুরু হিন্দু-মুসলমান ॥
হিন্দু তরায় হরিনামে,
হজরত নামে মুসলমান,
হরি-হজরত একই রূপ, দেখো না বিধান ॥
গৌরব হলো কুলমানে,
যার জাত সেই বড়ো জানে,
যার নাই কুলবালা, তারে করো না সন্ধান ॥
কেউ বলে নীরদ আহলাদিনী,
কেউ বলে নবি আল্লা-গনি,
কেউ সুন্নতে ছাপ করে তনু, কেউ ফোঁড়ে দুই কান ॥
এ সকল বিধির কাহিনি,
দরগা দুর্গা চূড়ামণি,
পাঞ্জু করে ঠেনাঠেনি হইল না জ্ঞান ॥

৭৮

মুখে বললে কি হয় ॥
গুরু ধরে সাধন জানতে হয় ॥
ডুবে দেখো মনরায়
নিষ্ঠারতি যার হয়েছে,
রস-রতি সেই চিনেছে,
এ ভবে উজানে সে তরি বেয়ে যায় ॥
তিন রতি তিন রসের খেলা,
জানিলে মন যায় রে জ্বালা,
এ সাধনা দয়া করে গুরু যারে কয় ॥
আসমানে তিন রতি রয়,
জমিনে তিন রসের উদয়,
সুরসিক শুভযোগে মিলন করে তায় ॥
অধীন পাঞ্জু কেঁদে বলে,
গুরু সুখের সুখী হলে,
সে জন সহজ মানুষ ধরেছে নিশ্চয় ॥

৭৯

মুর্শিদ চাঁদ কি ধরা যায় রে ॥
আগে জেন্দা মরা নাহি মরে ॥
মরার সঙ্গে সঙ্গ ধরে মরতে হয় স্বরূপ- দ্বারে ॥
দু-জনা মরা জেন্দা মরা রে, সদায় মরে বাঁচে,
দু-জন মরার মূল রয়েছে অধর মানুষের কাছে,
মরা ধরে সিদ্ধি করে, থাকো মরার ভাবে মরে ॥
এমন মরা কে দেখেছে রে, আপনি মরে আছে,
যমে এসে যখন ধরে তখন মরা বাঁচে,
যমের সঙ্গে যুদ্ধ করে দু-জনা যায় দুদিক সরে ॥
মরা ধরে ভজন-সাধন রে, করো অনুরাগে,
রাগে রাগে মরার ফাঁদে ধরো মুর্শিদ চাঁদে,
অধীন পাঞ্জু বলে অবহেলে পারে যাবে চরণ ধরে ॥

৮০

মুর্শিদতত্ত্ব কে সুধায় তা চিনতে না রে ॥
যে সুধায় জ্ঞান পাবার আশে,
সে কি পুরাতন নহে রে ॥
রুহু ইনসানি হায়ানি,
মুর্শিদ বাল্‌কা এই দুই গুণি,
লেখে ফোরকানে।
মহামায়া রিপুর ভোলে হায়ানি পড়ে গোলমালে,
আপন মুর্শিদ ইনসানিরে
না চিনে পড়েছে ফ্যারে ॥
হাওয়া লতিফা রুহানি,
সবের মুর্শিদ হয় ইনসানি পূর্ব-পরে তাই।
মুহম্মদি রুহু রহে
ইনসানি লা-মোকাম নুরে,
হায়ানি কালেবে থেকে না চিনে
ফের মুরিদ হয় রে ॥
বে-মুরিদ এই অজুদেতে
কেহ নাই তা সত্য বটে,
চিনারই দরকার।
দয়া করে যে পথ দেখায়,
তারে মুর্শিদ বলিতে হয়,
পাঞ্জু বলে আঁধার ঘুচায়
থাকবো তাঁর চরণ ধরে ॥

৮১

যা করো হে এবার ॥
গুরু দিলাম তোমায় ভার ॥
ভবে মাতাপিতা জ্ঞাতি বন্ধু,
সঙ্গের সাথী কেউ নাই আর ॥
মুচির ছেলে রামদাস ছিল,
গুরু ভজে সাধু হলো,
কেঠোয় গঙ্গা সে দেখালো,
জগতে প্রচার।
শুনি গ্রাসে ঘণ্টা স্বর্গে বাজে,
এতই দয়া করলে তার ॥
জোলার ছেলে কবির ছিল,
গুরু-সেবা সে করিলো,
ছত্রিশ জাত তুড়ানি খেলো,
জগন্নাথে তার।
ভবে জানা গেল তীৰ্থ-ধৰ্ম,
গুরুর চরণ হলো সার
গুরু-সেবা যে করিল,
তার শমন জ্বালা দূরে গেল,
জগতে নাম প্রকাশিল,
দাস হলো তোমার।
পাঞ্জু কেঁদে বলে গুরু,
ফাঁকি দিও না আমার ॥

৮২

যার জ্ঞান আছে,
সে না গুরুপদে নিহার দিয়ে রয়েছে ॥
সর্বস্বধন গুরু-পদে সমর্পণ করেছে ॥
অনুরাগের বাতি জ্বেলে নয়নে রেখেছে,
তীর্থধর্ম ত্যাজ্য করে স্বরূপ নিষ্ঠা করেছে,
গরল খেয়ে সরল হয়ে জেন্দামরা মরেছে ॥
অধর চাঁদের ভাবে রতি শান্ত করেছে,
ছয় রিপু ছয় কাজে দিয়ে প্রেমের রসিক হয়েছে,
রসামৃত পান করে শমন ফাঁকি দিয়েছে ॥
গুরু সুখের সুখী হয়ে সেবাদাসী হয়েছে,
অন্ধকারে বাতি জ্বেলে নিত্যধামে গিয়েছে,
পাঞ্জু বলে মায়াজালে আমায় ঘিরে রেখেছে ॥

৮৩

যার হয়েছে নিষ্ঠারতি ॥
গুরু প্রতি সদায় মতি, গুরু ভিন্ন নাই গতি ॥
তার সাক্ষী দেখো রাম-অবতারে,
হনু-শিষ্য রাম নিষ্ঠা করে,
কৃষ্ণ-প্রাপ্তি পশুর হলো নিষ্ঠাপ্রেমের এই রীতি ॥
গুরুনিষ্ঠা হলে ভজনের উপায়,
আছে সত্য সর্ব শাস্ত্রে কয়,
সত্য প্রেমি গণ্য হয় তার, শমন পারে না ছুঁতি ॥
যার বাঞ্ছা আছে শ্রীচরণ বলে,
পরের কথায় সে কি যায় টলে,
ভুলো না মন কারো ভোলে, করি তোমায় মিনতি ॥
গোবরে পোকা ভ্রমরের সাথে
পিরিত করেছিল জগতে,
পাঞ্জু বলে সতের সঙ্গে মলেও হয় গঙ্গাপ্ৰাপ্তি ॥

৮৪

যে দ্বারেতে ধরা যায় সেই মূলাধার, শুনে চমৎকার ॥
সে দ্বার ভুজঙ্গ, জীবের প্রাণে বাঁচা হয় ভার ॥
ব্রহ্মাণ্ড পর মণিকোঠা,
পাতালে দ্বার কপাট আঁটা,
যে দেখে সে দ্বার।
কামভুজঙ্গে দংশে মারে, মায়া বিষে জারে তার ॥
সাধুগুরু গুণীন বটে, তারই চরণ ধরো এঁটে,
গুণ শিখাবে তার।
কাম-ভুজঙ্গ শান্ত করো, মায়া বিষে নাহি ডর ॥
দ্বারে বসে করো নিহার,
শুভ যোগে কপাট খোলে,
সেহি মূলাধার।
তারে রসিক জনে ধরে চিনে, পাঞ্জু হলো দুরাচার ॥

৮৫

যে মানুষে মানুষের মন-প্রাণ হরে ॥
সে রয়েছে জগত ঘিরে ॥
যে মন হরে, প্রাণ হরে রে,
সে পরকাল দিতেও পারে।
দেখে লাগে চমৎকার, চার যুগের অবতার,
আসামির কাছে মহাজন হচ্ছে তাবেদার,
বাপ-বেটায় পুরুষ পুরুষ রে,
যার বেঁধেছে দেনমোহরে ॥
বোঝার সাধ্য নাই আমার, এ কেমন বিচার,
চার যুগে মা বাবার আগে চাতকের প্রকার,
পুরুষ-মণি পরশ-ধনী রে,
তবু দেনা করে মা বাবারে ॥
কি ধন আছে তার, কিসে করে দেনাদার,
না বুঝিয়ে ঘটলো বুঝি চৌরাশির ফ্যার,
তুই উদ্ধার হবি ফ্যার ঘুচাবি রে,
আগে চিনো মহাজনেরে ॥
এই ভব-সাগরে মহাজনের ধন মেরে,
আমি দায়মালী আসামি হলাম, কেবা উদ্ধারে,
মুর্শিদ হিরুচাঁদ কয়, জেন্দা মরে রে,
পাপ্পু থাকগে ঐ চরণ ধরে ॥

৮৬

রতির জন্ম হয় রে মন কিসে ॥
ভেবে পাই না রে মন, রতির দিশে ॥
সাধু-গুরুর বাক্যে শুনি গো, সাড়ে তিন রতি হয় ভজন-দেশে ॥
নিষ্ঠারতি, আনন্দরতি
প্রেমরতি আর আদ্যরতি,
জেনে করো সাধনে মতি,
সাড়ে তিন রতি মন, হয় নিরুপণ, বর্ত হয় কোন রঙে মিশে ॥
গুরুতে করো নিষ্ঠারতি,
সাধুতে আনন্দ রতি,
বৈষ্ণবে হয় প্রেমের বসতী
কাজের বেলায় একাদশী, কথায় বলি রঙ্গ-রসে
ঐশ্বর্য মাধুৰ্য কথা,
রতিতে মূল ওজন যথা,
অধীন পাঞ্জু যায় না সেথা,
যদি সাধ করো মন সাধন-পথে, রতিতে মন লও গো কষে ॥

৮৭

রসিক মানুষ রসের ঘাটে প্রেম এনেছে ॥
গোলকের যুগল প্রেম নদীয়ায় এসেছে ॥
বৃন্দাবনেরই লীলা,
রাই অঙ্গ শ্যাম অঙ্গেরই খেলা,
যুগল রূপে নবদ্বীপে গৌরাঙ্গ নামে চাঁদ উঠেছে ॥
আয় নাগরী দেখসে তোরা,
অধর চাঁদ হয়েছে ভোরা,
যুগল প্রেমে রসে গোরা গৌর হয়েছে।
প্রেমের গাগরী লয়ে
কাঙাল বেশে বেহাল হয়ে,
দুখী-তাপী পতিত জনে অমূল্য প্রেম দান করিছে ॥
যারে দিলো প্রেম গোরা,
তারই হাতে পলো ধরা,
পেয়েছে রূপ নিহারা, প্রেমের হিল্লোলে।
রূপে নয়ন দিয়াছে,
ব্রজগোপীর ভাব জেনেছে,
নিত্যবাসে প্রেমরসে গোরাচাঁদে সেই বেঁধেছে।
গৌর প্রেমে হয় উদাসী,
সে হয়েছে সেবাদাসী,
অনিত্যকে করে দোষী নিত্য পেয়েছে।
অধীন পাঞ্জু কেঁদে কয়,
জানি না প্রেম কিসে পাওয়া যায়,
আমি না জেনে পড়েছি ফ্যারে, হিরুচাঁদ সেধে গেছে ॥

৮৮

রসের কথা অরসিকে বলো না ॥
যেমন কয়লাকে দুগ্ধে ডুবালে দুগ্ধের বরণ ধরে না ॥
এক মহারাজা বাঞ্ছা করলে,
তিতো মিঠা করবে বলে,
শত ভারা চিনি দিয়ে নিম্ব বৃক্ষ রোপনা।
তাতে তিন গুণ তিতো বৃদ্ধি হলো,
মিঠা গুণ তার হলো না ॥
কাকা তোতা এক খাঁচাতে
যত্ন করে পোষ মানাতে
বুলি ধরাইব বলে খেতে দেয় মাখন-ছানা
তোতা বুলি ধরে নিবে কাকের বুলি হবে না
দরিদ্র এক জংলা হতে,
দাঁড়ায় বাদশার দ্বারেতে,
বাদশা তারে দয়া করে খেতে দেয় ডাব চিনি-পানা।
ডাব কামড়ে খেয়ে দন্ত ভাঙে, ছুলে খেতে জানে না ॥
রস-নগরে বিষম নদী,
ডুবলি না মন নিরবধি,
হিরুচাঁদের বাক্য ভুলে, মন হলি টোপাপানা
পাঞ্জু বলে ডুবে দ্যাখ মন, পাবি লালমতি দানা ॥

৮৯

রসের ভাব জেনে না নিলে, সাধন যাবে রে বিফলে ॥
সুধা বলে গরল খেলে, মরবি রে প্রাণে জ্বলে
যে রসে সাঁই বিরাজ করে,
তার ভেদ আছে অতি গভীরে,
ভেদ জেনে রস সাধলে পরে, রসিক তারে বলে
সাঁই গুপ্ত বেশে গোপনে বসে,
বিরাজ করে অমৃত রসে, অমাবস্যা দ্বিতীয়াতে,
বর্ত হয় কমলে ॥
যোগ ছেড়ে অযোগে সাধিলে,
বিপদ ঘটে জীবের কপালে,
পাঞ্জু বলে গোলেমালে,
সাধন গেলাম ভুলে ॥

৯০

শুধু কি আল্লা বলে ডাকলে তারে
পাবি ওরে মন পাগেলা ॥
যে ভাবে আল্লাতালা বিষম লীলা
ত্রিজগতে করছে খেলা ॥
কতজন জপে মালা তুলসীতলা
হাতে ঝোলে মালার ঝোলা,
আরো কত হরি বলি মারে তালি
নেচে গেয়ে হয় মাতেলা ॥
কত জন হয় উদাসী তীর্থবাসী
মক্কাতে দিয়েছে মেলা,
কেউবা মসজিদে বসে তাঁর উদ্দেশ্যে
সদায় করছে আল্লা আল্লা ॥
স্বরূপে মানুষ মিশে স্বরূপ দেশে
বোবায় কালায় নিত্য লীলা,
স্বরূপের ভাব না জেনে চাম কিনে
হচ্ছে কত গাজির চেলা
নিত্য সেবায় নিত্য লীলা চরণ-মালা
ধরা দিবে অধর কালা,
পাঞ্জু তাই করে হেলা ঘটলো জ্বালা,
কি হবে নিকাশের বেলা ॥

৯১

শুধু কথায় রতন কি মিলে ॥
চেতন মানুষের সঙ্গ না নিলে ॥
আল্লা নবি আদমসফি করেছে লীলে,
দেখো কে আছে মন কি কলে ॥
সিংহাসনে বসে একেলা,
সাদেকি এশকো পয়দা করলেন মালেক আল্লা,
সেই এশকো জোরে নুরে পয়দা করলেন রাসুলে,
এসে দোস্তি করলেন দ্বিদলে ॥
সেই মহব্বতে আদম গঠিলে,
হাওয়া আদম আল্লা নবির ভেদ কেবা বলে,
ভেদ জানিলে অধর মেলে এ ত্রিভুবনে।
জানা যাবে মুর্শিদ ভজিলে ॥
বেহেস্তে যাওয়ার আশা করিলে,
দোজখ-বেহেস্তের মালেক যে জন তারে না চিনিলে,
অধীন পাঞ্জু বলে ভেদ না জেনে কলমা পড়িলে
শেষে পড়বি রে গোলমালে ॥

৯২

শোনো রে মন-রসনা, যদি করো প্রেমের বাসনা ॥
ভক্তিমূল্যে না কিনিলে অমূল্য প্রেম পাবা না ॥
সাধুশাস্ত্রে গেল জানা,
প্রেম-প্রাপ্তির উপায় ভক্তি, ভক্তি চেনা গেল না।
কিরূপ ভক্তি কি আকৃতি জানলে হয় উপাসনা ॥
শুনি ভক্তি এই পদাৰ্থ,
অহং না থাকিলে তিনি এ ব্রহ্মাণ্ড শোষিত।
কি জন্য অহং মাৎসর্য করে তার প্রবঞ্চনা ॥
ভক্তি কোথায় উৎপত্তি
ঊর্ধ্ব কি হয় অধোগতি, কোথায় বারামখানা।
ভক্তির সৃষ্টিকর্তা যে জন, সে বা হয় কেমন জনা ॥
ভক্তি চিনে করো সাধ্য,
ভক্তি-দেশে সাঁইজি এসে প্রেম-রসে হয় বাধ্য।
হিরুচাঁদ কয়, অধীন পাঞ্জু মানব-দেহে দেখো না ॥

৯৩

শ্রীচরণ পাব বলে ভবকূলে
ডাকে দীনহীন কাঙালে
পড়ে এই ঘোর সাগরে, কেউ নাই মোরে,
ঘিরে নিলো মায়াজালে ॥
সৃষ্টি করে আপ্ত রসে, কোন বা দোষে,
কালের বশে ফেলাইলে,
কার ভাবে ভবে এসে বেহাল বেশে
দয়াল নামটি প্রকাশিলে ॥
পতিত পাষণ্ড যারা, পেল তারা,
মার খেয়ে তাই চরণ দিলে,
আমি হলাম এতই পাপী, দুখী-তাপী,
আমার ভাগ্যে লুকাইলে ॥
কল্পতরু নামটি ধরো, বাম নাই কারো,
শুনে এলাম সাধুকুলে,
দয়াল নামের মহিমা যাবে জানা,
এই অধীনের চরণ দিলে ॥
সাঁই হিরুচাঁদের চরণ হয় না স্মরণ,
ভজনহীন তাই পাঞ্জু বলে,
আমায় না চরণ দিলে একই কালে
মানব-জনম যার বিফলে ॥

৯৪

শ্রীরূপ দেখবি যদি মন-বিবাদী ত্রিবেণীর ওই পারে চলো ॥
ষাটের উপরে আছে হাটের মাঝে শ্রীরূপের এক রঙমহল ॥
শ্রীগুরু কাণ্ডারি করো, নৌকায় চড়ো,
পঞ্চদাড়ে বেয়ে চলো,
পাড়াতে নিশান করো, জেন্দা মরো,
স্থির হবে বেগবতীর জল।
পার হয়ে নামের জোরে, পাড়া ধরে
নৌকা বেঁধে নিহার করো,
দেখো রঙমহলে শ্রীরূপ বসে
নিজ রূপে করছে উজল ॥
নিবে তোরে কেশে ধরে,
সহচরী দিবে সেই চরণ-কমল।
পাঞ্জু তাই কেঁদে বলে, মোর কপালে,
এমন দিন কি হবে বলো ॥

৯৫

সহজে কি আল্লাতালা পাবে ॥
মায়া কেটে দয়ার দেল আগে বানাইবে
আল্লাতালা মায়াময়,
দয়া ভিন্ন পাবা নয়,
হায় গো।
মায়াতে খারাবি হবে, দয়াতে তরিবে ॥
দয়ামায়া দুই বলে, ভালো হয় বুঝে নিলে,
হায় গো।
মায়াতে খারাবি হবে, দয়াতে তরিবে ॥
মাতাপিতা দেখো ভাই,
মেরে ধরে বিদ্যা দেয়,
হায় গো।
মায়া করি নাহি মারে, বিদ্যা কোথা পারে
আল্লাতালা সেই মতে,
এমান বুঝিয়া লিতে,
হায় গো।
কুলমান মেরে তাকে বেহাল বানাবে
জানে-মালে কষ্ট দিয়ে,
এমান বুঝিবে ভেয়ে,
হায় গো।
থাকে যদি সই হয়ে তারে ধরা দিবে ॥
পাঞ্জু বলে ওহে সাঁই,
দয়া দেলে আগে চাই,
হায় গো।
যাহা করো হবে তাই আমার কপালে ॥

৯৬

সাঁই রূপে গঠে গঠে কত লীলা করলে আল্লা সব ঘটে ঘটে ॥
সাঁইর লীলা খেলার কথা শুনলাম ঘাটে মাঠে হাটে ॥
বিষম লীলা দেখে এলাম রে, ত্রিবেণীর ঘাটে,
কত জোয়ান বুড়ো ডুবে মলো, বালক ভেসে ওঠে ॥
এক নীরে দুই ভাগ হয়ে রে, একটি জীবাত্মা লয় গঠে,
সেই আত্মার ঘাড়ে কর্তা হয়ে সাঁতার খেলতে জোটে,
ত্রিবেণীতে সাঁতার খেলে রে, গেল শূন্যদার ওই মাঠে,
জীবত্মারে বন্ধক থুয়ে গেল মায়ালাটে ॥
মায়ালাটে পড়ে আত্মা রে, বড়ো ত্রিতাপ-জ্বালা ঘটে,
আশি লক্ষ জনম ঘুরে মলে, জ্বালা নাহি মেটে,
গড়নদারের ভুলে আত্মা রে, বেড়ায় দেশ-বিদেশে ছুটে,
কর্তা চিনলে আত্মার জ্বালা মিটে যেত বটে ॥
আত্মা উদ্ধার করবো বলে রে, সাঁই গুরু রূপে এসে,
যুগল নামের মুক্তি দিয়ে ফিরছে দেশে দেশে,
যুগল নামের করণ জানলে রে, মায়াজাল তো যেত কেটে,
অধীন পাঞ্জু বলে গুরুর চরণ ধরো রে মন এঁটে ॥

৯৭

সাধ করে শিখেছো তাসের খেলা ॥
চার রঙ তাসে মন তাই মিশে হয়েছ উতলা ॥
মন-মোহিনী বন্ধুর সাথে,
কাম রিপু আর মায়ার সাথে,
চার রঙে রঙ্গরসে, তাস খেলে যায় বেলা ॥
বত্রিশ তাসে বিন্তি খেল,
রঙ কাটিলে গোলাম ভালো,
সাহেব বিবির মান মারিল, গোলাম একেলা
বড়ো রঙ যা কামে নিল,
মহামায়ার ফেরাই ভালো,
ছক্কা পাঞ্জা ধরে মোদের করলো আলাঝালা।
পাঞ্জু মনে রঙ পাইত,
বন্ধুর হাতে ফেরাই হতো
ছক্কা-পাঞ্জা তুলে ওদের দেখাইতাম ঠেলা ॥

৯৮

সাধন করো রে জেনে শুনে ॥
সাধনেতে দেখা দিবে আপে নিরাঞ্জনে
কোথায় সাধ্বি তাই,
কি সাধনে পাব ভাই,
হায় গো।
সাধনে গোপনে তারে পাবা না ধিয়ানে ॥
আসা-যাওয়া রাহা থুয়ে,
সাধিবেন কোথা যেয়ে
হায় গো।
আরফার মাঠে যেয়ে দেখো তা নয়নে ॥
আরফার মাঠ যেই, হজ করা জাগা সেই,
হায় গো।
সারেজাহানের ভাই, জন্ম সেইখানে
হাওয়া আদম দুয়ে,
মিল হয় তথা যেয়ে,
হায় গো।
পয়দা হইল সেথা যত মোমিনানে ॥
সেহি ময়দান ভাই
দেহেতে দিয়াছে সাঁই,
হায় গো।
নুরের সাধন তাই চালাও উজানে ॥
সত্য সত্য জানো এই,
মিথ্যা না জানিও ভাই,
হায় গো।
পাঞ্জু বলে হাদিসে না পাবা গুরু বিনে ॥

৯৯

সৃষ্টিতত্ত্ব নিগূঢ়তত্ত্ব, আছে বৰ্ত আদমে ॥
হাওয়া এসে মায়ার বসে সেজদা করে কদমে ॥
জেদ্দার মাটি নিয়ে খাঁটি,
গঠলেন বোরখা পরিপাটি,
কুদরতি নুরে দেহঘরে ইল্লিল্লা কয় হরদমে ॥
আদম পয়দা বড়োই কষ্টে,
হাওয়া পয়দা মষ্টে মষ্টে,
ঘুমন্ত আদম জেগে দেখে মনমোহিনী বামে ॥
এ বড়ো আজব কুদরতি,
সামান্য নয়, ভেদ গভীরে অতি,
হাওয়ার মর্ম না জেনে পাঞ্জু মজে কামে ॥

১০০

হায় আল্লার কুদরতে ॥
সব পয়দা করলেন জগতে ॥
কুদরতে কুদরত সবাই বলে,
পারলাম না তাই জানিতে ॥
কুদরত কয় কারে,
কিসে থাকে আল্লার কুদরত কি রঙ ধরে,
চরণ ধরি বিনয় করি,
যে পারো ভাই বলিতে ॥
যখন সাঁই নিরাকারে
ভেসেছিলেন বারিতালা একটি ডিম্বভরে,
আসমান জমিন কুদরতে হয়,
ডিম্ব হলো কিসেতে
নিরঞ্জন হয় নীরে,
হযরত নবি পয়দা হলেন আল্লার নুরে,
নুর-নীরেতে মালেক আছে,
কুদরত আছে কার সাথে ॥
সাঁই হিরুচাঁদ বলে,
আল্লার কুদরত না চিনে ভজলি কারে,
পাঞ্জু বলে ভ্রমে ভুলে,
তুই বেড়ালি পথে পথে ॥

***

অধ্যায় ২ / ২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%