দেখা হবে – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

দেখা হবে

নকশি কাঁথার মতো বিচিত্র এক পৃথিবী ছিল আমাদের শৈশবে। এখনও পায়ের তলায় পৃথিবীর মাটি, চারিদিকে গাছপালা, মাথার ওপর আকাশ। বুক ভরে শ্বাস টেনে দেখি। না, শীতের সকালে কুয়াশায় ভেজা বাগান থেকে যে রহস্যময় বন্য গন্ধটি পাওয়া যেত তা আর পাওয়া যায় না। আমাদের সাঁওতাল মালি বিকেলের দিকে পাতা পুড়িয়ে আগুন জ্বালত। সেই গন্ধ কতবার আমাকে ভিন্ন এক জন্মের স্মৃতির দিকে টেনে নিয়ে গেছে। আর মনে আছে মায়ের গায়ের ঘ্রাণ। সে গন্ধে ঘুমের ভেতরেও টের পেতাম, মা অনেক রাতে বিছানায় এল। মা’র দিকে পাশ ফিরে শুতাম ঠিক। তখন নতুন ক্লাসে উঠে নতুন বই পেতাম ফি বছর। কী সুঘ্রাণ ছিল সেই নতুন বইয়ের পাতায়। মনে পড়ে বর্ষার কদম ফুল কুড়িয়ে এনে বল খেলা। হাতে পায়ে কদমের রেণু লেগে থাকত বুঝি। কী ছিল! কী থাকে মানুষের শৈশবে! বিকেলের আলো মরে এল যেই অমনি পৃথিবীটা চলে যেত ভূতেদের হাতে। এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যাওয়া ছিল ভারী শক্ত। বিশাল বাড়িতে কয়েকটি প্রাণী আমরা গায়ে-গায়ে ঘেঁষে থাকতাম। ভোরের আলোটি ফুটতে–না-ফুটতে ঘুম ভেঙে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে ছুটতাম বাইরে। বাইরেটাই ছিল বিস্ময়ের। সূর্য উঠছে, আকাশটা নীল, গাছপালা সবুজ। সব ঠিক আগের দিনের মতোই। তবু অবাক হয়ে দেখতাম, মনে হত, গতকাল ঠিক এরকম দেখিনি তো! সেই আনন্দিত ছেলেবেলায় একটা দুঃখের ঘটনা ঘটে গেল। আমার ছোটকাকা মৃত্যুশয্যায়। মাত্র দেড় বছর আগে কাকিমা এসেছেন ঘরে। একটি ফুটফুটে মেয়েও হয়েছে। সে তখন হাত পা নেড়ে উপুড় হয়, কত আহ্লাদের শব্দ করে। তবু বউ মেয়ে রেখে ছোটকাকার মরণ ঘনিয়ে এল। বিকেলে শ্বাস উঠে গেছে। দাদু তখন বাইরের বারান্দায় বসে আছেন। বাঁ-হাতে ধরা তামাকের নল, কল্কেতে আগুন নিবে গেছে কখন। সন্ধের পর জ্যোৎস্না উঠেছে সেদিন। দাদু সেই জ্যোৎস্নায় পা মেলে বসে আছেন। ভিতর বাড়িতে কান্নার। শব্দ উঠেছে। বাবা আর জ্যাঠামশাইরা এসে দাদুকে ডাকলেন।

–আসুন, প্রিয়নাথকে একবার দেখবেন না?

দাদু খড়মের শব্দ তুলে ভিতর বাড়িতে এলেন। তার মুখখানা একটু ভার দেখাচ্ছিল, আর কিছু নয়। ছোটকাকা তখন বড়-বড় চোখে চারিদিকে তাকাচ্ছেন। কাকে যেন খুঁজছেন। কী যেন খুঁজে পাচ্ছেন না। বারবার বলছেন–তোমরা সব চুপ করে আছ কেন? কিছু বলল , আমাকে কিছু বলো।

জ্যাঠামশাই নীচু হয়ে বললেন–কী শুনতে চাও প্রিয়নাথ?

ছোটকাকা ক্লান্ত, বিরক্ত হয়ে বললেন–আমি কী জানি। একটা ভালো কথা, একটা সুন্দর কথা কিছু আমাকে বলল , আমার কষ্ট ভুলিয়ে দাও। আমি কেন এই বয়সে সবাইকে ছেড়ে যাচ্ছি –আমার মেয়ে রইল, বউ রইল–আমার এই কষ্টের সময় কেউ কোনও সুখের কথা বলতে পারো না!

বড় কঠিন সেই পরীক্ষা। কেউ কিছু বলতে পারে না। সবাই কেবল মরণোন্মুখ মানুষটার মুখের দিকে চেয়ে থাকে, কথা খুঁজে পায় না। কিন্তু প্রত্যেকেরই ঠোঁট কাঁপে।

একজন অতি কষ্টে বলল –তুমি ভালো হয়ে যাবে প্রিয়নাথ।

শুনে ছোটকাকা ধমকে বললেন–যাও যাও-।

আর একজন বলল  তোমার মেয়ে বউকে আমরা দেখব, ভয় নেই।

শুনে ছোটকাকা মুখ বিকৃত করে বললেন–আঃ, তা তো জানিই, অন্যকিছু বলো।

কেউ কথা খুঁজে পাচ্ছিল না।

সেই সময়ে দাদু ঘরে এলেন। স্বাভাবিক ধীর পায়ে এসে বসলেন ছোটকাকার বিছানার। পাশে। ছোটকাকা মুখ ফিরিয়ে তাঁকে দেখে বললেন বাবা, সারাজীবন আপনি কোনও ভালো কথা বলেননি, কেবল শাসন করেছেন। এবার বলুন।

সবাই নিস্তব্ধ। সেই নিস্তব্ধতায় একটা পাহাড়প্রমাণ ঢেউ অদৃশ্য থেকে এগিয়ে আসছে। ছোটকাকাকে জীবনের তীরভূমি থেকে অথই অন্ধকারের এক সমুদ্রের দিকে নিয়ে যাবে বলে ঢেউটা আসছে, আসছে। আর সময় নেই। ছোটকাকার জিভটা এলিয়ে পড়েছে, বারবার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে, মুখ প্রবল ব্যথায় বিকৃত!

দাদু একটু ঝুঁকে শান্তস্বরে বললেন–প্রিয়নাথ, আবার দেখা হবে।

কী ছিল সেই কথায়! কিছুই না। অতিথি অভ্যাগত বিদায় দেওয়ার সময় মানুষ যেমন বলে, তেমনি সাধারণভাবে বলা। তবু সেই কথা শুনে মৃত্যুপথযাত্রী ছোটকাকার মুখ হঠাৎ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে গেল। তিনি শান্তভাবে চোখ বুজলেন। ঘুমিয়ে পড়লেন।

এসব অনেকদিন আগের কথা। নকশিকাঁথার মতো বিচিত্র সুন্দর শৈশবের পৃথিবী কোথায় হারিয়ে গেছে। সেই সুন্দর গন্ধগুলো আর পাই না, তেমন ভোর আর আসে না। মায়ের গায়ের

সুঘ্রাণের জন্য প্রাণ আনচান করে! পৃথিবী বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে ক্রমে! বুড়ো গাছের মতো শুকিয়ে যাচ্ছে আমার ডালপালা। খসে যাচ্ছে পাতা। মহাকালের অন্তঃস্থলে তৈরি হচ্ছে একটি ঢেউ। একদিন সে এই পৃথিবীর তীরভূমি থেকে আমাকে নিয়ে যাবে। বুকের মধ্যে শৈশবের একটি কথা তীরের মতো বিঁধে থরথর করে কাঁপছে আজও। সেই অমোঘ ঢেউটিকে যখনই প্রত্যক্ষ করি, মনে-মনে তখনই ওই কথাটি বুকের মধ্যে কেঁপে ওঠে। শৈশবের সব ঘ্রাণ, শব্দ ও স্পর্শ ফিরিয়ে আনে। মায়ের গায়ের ঘ্রাণ পেয়ে যেমন ছেলেবেলায় পাশ ফিরতাম তেমনি আবার পৃথিবীর দিকে পাশ ফিরে শুই। মনে হয়, দেখা হবে। আবার আমাদের দেখা হবে।

সকল অধ্যায়
১.
মুনিয়ার চারদিক – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
২.
আশ্চর্য প্রদীপ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৩.
হারানো জিনিস – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৪.
অনুভব – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৫.
ঘণ্টাধ্বনি – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৬.
মশা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৭.
একটা দুটো বেড়াল – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৮.
বনমালীর বিষয় – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৯.
ক্রিকেট – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
১০.
খানাতল্লাশ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
১১.
চিড়িয়াখানা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
১২.
শুক্লপক্ষ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
১৩.
পুনশ্চ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
১৪.
সূত্রসন্ধান – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
১৫.
হরীতকী – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
১৬.
ঘরের পথ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
১৭.
ট্যাংকি সাফ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
১৮.
দৈত্যের বাগানে শিশু – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
১৯.
লুলু – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
২০.
জমা খরচ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
২১.
ক্রীড়াভূমি – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
২২.
সুখের দিন – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
২৩.
গর্ভনগরের কথা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
২৪.
দেখা হবে – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
২৫.
ভাগের অংশ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
২৬.
সাঁঝের বেলা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
২৭.
সংবাদ : ১৯৭৬ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
২৮.
খেলা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
২৯.
বৃষ্টিতে নিশিকান্ত – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৩০.
চিঠি – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৩১.
জ্যোৎস্নায় – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৩২.
মাসি – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৩৩.
মৃণালকান্তির আত্মচরিত – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৩৪.
চারুলালের আত্মহত্যা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৩৫.
পটুয়া নিবারণ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৩৬.
প্রতীক্ষার ঘর – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৩৭.
হলুদ আলোটি – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৩৮.
সাপ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৩৯.
আমাকে দেখুন – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৪০.
ভুল – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৪১.
সেই আমি, সেই আমি – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৪২.
অবেলায় – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৪৩.
সাদা ঘুড়ি – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৪৪.
উড়োজাহাজ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৪৫.
রাজার গল্প – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৪৬.
আমার মেয়ের পুতুল – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৪৭.
সোনার ঘোড়া – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৪৮.
ডুবুরি – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৪৯.
সুখদুঃখ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৫০.
শেষ বেলায় – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৫১.
পুরোনো দেওয়াল – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৫২.
বন্ধুর অসুখ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৫৩.
ছবি – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৫৪.
সাধুর ঘর – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৫৫.
ঝুমকোলতার স্নানের দৃশ্য ও লম্বোদরের ঘাটখরচ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৫৬.
আমেরিকা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৫৭.
আরোগ্য – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৫৮.
সম্পর্ক – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৫৯.
পোকা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৬০.
বাবা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৬১.
দোলা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৬২.
ছেলেটা কাঁদছে – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৬৩.
লামডিঙের আশ্চর্য লোকেরা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৬৪.
গণ্ডগোল – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৬৫.
স্বপ্নের ভিতরে মৃত্যু – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%