১.০৪ রান্নাবান্না শেষ হতে দুপুর

প্রফুল্ল রায়

রান্নাবান্না শেষ হতে দুপুর পেরিয়ে গেল। তখনও হেমনাথ ফিরলেন না।

সবার চান হয়ে গিয়েছিল। সুরমা-সুধা-সুনীতি-ঝিনুক বাড়িতেই ভোলা জলে চান সেরেছে। অবনীমোহন বিনু আর হিরণ গিয়েছিল পুকুরে। সঙ্গে যুগলও ছিল। আজ থেকেই যুগলের কাছে। সাঁতারের তালিম নিতে শুরু করেছে বিনু।

নতুন জায়গা, নতুন জল বলে বেশিক্ষণ পুকুরে হুটোপাটি করতে দেন নি অবনীমোহন। সে জন্য মুখখানা ভারী হয়ে আছে বিনুর।

যাই হোক, রান্নাঘরে বড় বড় কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ি পেতে থালা সাজিয়ে স্নেহলতা খেতে ডাকলেন।

অবনীমোহন বললেন, মামাবাবুর জন্যে আরেকটু অপেক্ষা করি। তারপর না হয়

অপেক্ষা করে লাভ নেই বাবা। হয়তো আজ ফিরবেনই না।

এরকম হয় নাকি?

স্নেহলতা হাসলেন, প্রায়ই হয়। এই যে গেলেন, ফিরতে ফিরতে দু’চারদিনও লেগে যেতে পারে। ওঁর আশায় বসে থাকলে উপোস দিতে হবে।

অগত্যা কী আর করা, খেতে বসতে হল।

ওবেলার মতো এবারও মাছের ভাগ নিয়ে বায়না করল ঝিনুক, এবং কেঁদে কেটে সব কিছু বিনুর সমান আদায় করে ছাড়ল।

খাওয়া দাওয়ার পর বিশ্রামের সুযোগ মিলল না। তার আগেই রাজদিয়ার এপাড়া ওপাড়া থেকে দলে দলে মানুষ আসতে লাগল। তারা স্নেহলতাকে হেঁকে ধরল। মেয়ে-জামাই দেখাও, নাতিনাতনী দেখাও।

স্নেহলতা সকলের সঙ্গে অবনীমোহনদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাদের কেউ প্রণাম করে, কেউ প্রণাম নিয়ে পানের রসে ঠোঁট টুকটুকে করে বিদায় নিল। যাবার আগে সবাই নিমন্ত্রণ করে গেল, তাদের বাড়ি অন্তত একদিন করে যেতেই হবে।

অবনীমোহন অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন। বললেন, শুধু আমাদের দেখবার জন্যে এত লোক এসেছে!

স্নেহলতা হাসলেন, হ্যাঁ। এখানে কারোর বাড়িতে লোকজন এলে রাজ্যের মানুষ ছুটে আসে। এক বাড়িতে উৎসব লাগলে সারা রাজদিয়ায় উৎসব লাগে। কোনও বাড়িতে কেউ মরলে টরলে সবার মন খারাপ হয়ে যায়।

চমৎকার জায়গা তো। অথচ কলকাতায়– বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গেলেন অবনীমোহন। তুলনামূলকভাবে কলকাতা নামে এক উদাসীন, আত্মকেন্দ্রিক নগরীর কথা তার মনে পড়ে যাচ্ছিল।

স্নেহলতা মনে করিয়ে দিলেন, কলকাতার কথা কী বলেছিলে অবনী?

অবনীমোহনের দূরমনস্কতা কেটে গেল। বললেন, পাড়া দূরে থাক, এক বাড়িতে তিন ভাড়াটে থাকলে একজনের নাম আরেকজনের জানতে হয়তো বছর কেটে যায়।

বল কি অবনী!

স্নেহলতা বললেন, ওখানকার লোক থাকে কী করে! আমি হলে দম বন্ধ হয়ে মরে যেতাম। সেদিক থেকে রাজদিয়ায় আমরা বেশ আছি।

লোকজনের ভিড় কাটতে কাটতে বেলা পড়ে এসেছিল। আকাশে এখন মেঘ আছে, রোদও আছে–বেলাশেষের নরম সোনালি রোদ। খানিক আগে ঝিরঝির করে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, এখন ছাটটা জোরাল নয়। কদমফুলের রেণুর মতো বাতাসে গুঁড়ো গুড়ো ইলশেগুঁড়ি উড়ছে।

অবনীমোহনেরা সেই পুবদুয়ারী ঘরটায় আবার আসর জমিয়ে বসেছেন। এ বাড়িতে কেউ চা খায় না, অথচ অবনীমোহনের দুবেলা চা না হলে পৃথিবী অন্ধকার। কাজেই কলকাতার এই চা চাতকদের জন্য খেয়ে উঠেই রাজদিয়ার বাজার থেকে চা নিয়ে এসেছে হিরণ।

পেয়ালায় ধূমায়িত সোনালি তরল সামনে সাজিয়ে গল্প হচ্ছিল। ওবেলা অবনীমোহন সুধা আর হিরণ ছিল শুধু। এ বেলা সুনীতি সুরমা বিনু ঝিনুক স্নেহলতা, এমনকি শিবানীও এসে যোগ দিয়েছেন।

এলোমেলো, অসংলগ্ন নানা কথার পর হিরণের প্রসঙ্গ এসে পড়ল।

অবনীমোহন শুধোলেন, তুমি কোন ইউনিভার্সিটিতে পড় হিরণ?

হিরণ বলল, ঢাকা।

তা হলে তো ঢাকাতেই থাকতে হয়।

আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি হোস্টেলে থাকি।

পুজোর ছুটিতে বাড়ি এসেছ বুঝি?

আজ্ঞে হ্যাঁ। ছুটি শেষ হলেই ফিরে যাব। বলে, একটু থেমে হিরণ ফের শুরু করে, ছুটিছাটা পেলেই আমি বাড়ি চলে আসি। ঢাকা আর কতক্ষণের পথ, স্টিমারে ঘন্টা পাঁচেক লাগে।

অবনীমোহন বললেন, তোমার কোন ইয়ার যেন?

ফিফথ।

এম, এতে বি. এর মতো রেজাল্ট হবে তো?

উত্তর দিতে গিয়ে সুধার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। পরিপূর্ণ উজ্জ্বল দৃষ্টিতে সুধা তাকিয়ে আছে। এক মুহূর্ত। তাড়াতাড়ি অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে সলজ্জ সুরে হিরণ বলল, দেখি।

অবনীমোহন কী বলতে যাচ্ছিলেন, সেই সময়ে ঝুমঝুম বাজনার মতো শব্দ ভেসে এল, তার সঙ্গে ঘোড়র পায়ের খটখট আওয়াজ।

সবাই একসঙ্গে জানালার বাইরে তাকাল। বিনুরা দেখতে পেল, সেই চমৎকার ফিটনটা আবার ফিরে এসেছে। এটায় করেই তারা স্টিমারঘাট থেকে এখানে এসেছিল।

সোজা উঠোনের মাঝখানে এসে গাড়িটা থামল। স্নেহলতা উদগ্রীব হয়ে ছিলেন। বললেন, ভবতোষ মনে হচ্ছে–

ঠিক সেই সময় ফিটনের ভেতর থেকে যিনি নামলেন তাঁকে যুবকও বলা যায় না, আবার প্রৌঢ়ও না। দুইয়ের মাঝামাঝি তার বয়স থমকে আছে।

ঝিনুক হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, বাবা এসেছে, বাবা এসেছে– তারপর ঊর্ধ্বশ্বাসে উঠোনের দিকে ছুটল।

সকল অধ্যায়
১.
১.০২ স্টিমারঘাটের বাইরে
২.
১.০৩ হেমনাথের নৌকো
৩.
১.০৪ রান্নাবান্না শেষ হতে দুপুর
৪.
১.০৫ স্নেহলতা ঝিনুকের পিছু পিছু
৫.
১.০৬ বাড়ির ভেতরে এসে
৬.
১.০৭ ঘুমটা ভাঙে নি
৭.
১.০৮ অবনীমোহনের সঙ্গে কথা
৮.
১.০৯ ভেতর-বাড়ির উঠোনে
৯.
১.১০ হিরণ আর সুধা
১০.
১.১১ কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল
১১.
১.১২ কাল শুতে শুতে অনেক দেরি
১২.
১.১৩ খুব বেশিক্ষণ ঝিনুকের কথা
১৩.
১.১৪ সামনের একখানা ঘর
১৪.
১.১৫ পদ্ম আর শাপলার বনে
১৫.
১.১৬ নৌকোঘাট থেকে যুগলের সঙ্গে
১৬.
১.১৭ আগে আগে চলেছেন অবনীমোহন
১৭.
১.১৮ লারমোর বললেন
১৮.
১.১৯ কানের কাছে মুখ এনে
১৯.
১.২১ একা একা জল ঠেলে
২০.
১.২২ পুকুরের মাঝখান থেকে
২১.
১.২৩ শিশিররা যখন যান
২২.
১.২৪ কাল রাত্তিরেই বই বার করে
২৩.
১.২৫ রঙিন প্রজাপতি হয়ে
২৪.
১.২৬ প্রথম ঘটনাটির কথা
২৫.
১.২৭ মহালয়ার পর থেকেই পড়াশোনা
২৬.
১.২৮ কমলাঘাটের বন্দর
২৭.
১.২৯ মহালয়ার পর থেকে দিনগুলো
২৮.
১.৩০ গ্রীনরুমের ডানদিকে
২৯.
১.৩১ কিছুক্ষণ থ হয়ে দাঁড়িয়ে
৩০.
১.৩২ দশমীর পর একাদশী
৩১.
১.৩৩ রাজদিয়ায় দুর্গাপুজো
৩২.
১.৩৪ লক্ষ্মীপুজোর পরদিন
৩৩.
১.৩৫ লক্ষ্মীপুজোর পর থেকে
৩৪.
১.৩৬ দুর্গাপুজোর পর কোজাগরী
৩৫.
১.৩৭ ঝিনুক আর বিনুও সেদিকে
৩৬.
১.৩৮ ভবতোষ চলে গেছেন
৩৭.
১.২০ অপটু হাতে নৌকো
৩৮.
১.০১ ভাল করে সকাল হয় নি
৩৯.
২.০১-০৫ অবনীমোহনের ধারণা
৪০.
২.০৬-১০ অবনীমোহন কলকাতা থেকে ফিরে
৪১.
২.১১-১৫ ধানকাটার মধ্যে
৪২.
২.১৬-২০ কাল হেমনাথ বলে গিয়েছিলেন
৪৩.
২.২১-২৫ গত বছর পুজোর ছুটির পর
৪৪.
২.২৬-৩০ সেটেলমেন্ট অফিস
৪৫.
২.৩১-৩৫ আমেরিকান টমি
৪৬.
২.৩৬-৪০ চিনি কেরোসিন আর কাপড়
৪৭.
২.৪১-৪৫ অবনীমোহনের সঙ্গে একদিন হাটে
৪৮.
২.৪৬-৫০ মাঘের শেষ তারিখে
৪৯.
২.৫১-৫৬ তামাকহাটা মরিচহাটা আনাজহাটা
৫০.
৩.০১-০৫ আশ্বিনের মাঝামাঝি
৫১.
৩.০৬-১০ ভোরে সূর্যোদয়ের আগে
৫২.
৩.১১-১৫ সূর্য এখন সোজাসুজি
৫৩.
৩.১৬-২০ উদ্বাস্তুদের নিয়ে স্পেশাল ট্রেন
৫৪.
৩.২১-২৫ সুনীতির শ্বশুরবাড়ি
৫৫.
৩.২৬-৩০ পুরো দুটো দিন ভুগিয়ে
৫৬.
৩.৩১-৩৫ দু’আড়াই বছর কলকাতায়
৫৭.
৩.৩৬-৪০ খাওয়াদাওয়ার পালা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%