বুদ্ধদেব গুহ
আমার নাম টিকলু।
জীবনে যারা সফল, আমি অনেকের-ই মতো; তাদের দলের নই। পড়াশুনোয় আমি মাঝামাঝি ছিলাম। চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে যে, লক্ষ লক্ষ লোক পে-অর্ডার ভরে, অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম জমা দিয়ে এ দরজা থেকে ও দরজায় ঘুরে বেড়িয়ে যৌবনের জীবনীশক্তির প্রায় সবটাই অলক্ষ্যে ও নি:শেষে খরচ করে ফেলে আমি তাদের-ই একজন। আমার স্টেট ব্যাঙ্কে চাকরি হয়নি, হয়নি ইনকাম ট্যাক্সে। সরকারি, আধা-সরকারি এমনকী বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানেও কোনো চাকরির মতো চাকরি আমার আজ অবধি হয়নি।
আমার বয়স প্রায় তিরিশ হতে চলল।
আমরা তিন ভাই এক বোন। দিদি বড়ো—জামাইবাবু কৃতী পুরুষ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বড়োচাকরি করেন তিনি, উর্দিপরা টুপি-চড়ানো ড্রাইভার তাঁর গাড়ি চালায়। দিদির একমাত্র কাজ শপিং করা। এবং দু-জনেরই কাজ আমি যে, একটা অপদার্থ, কুঁড়ে, হতভাগা এ সম্বন্ধে আমাকে অবহিত করা।
আমার বড়োদাদা প্রায় আমার-ই মতো কুঁড়ে। আমি যে, কুঁড়ে— একথা আমি অস্বীকার করি না। কিন্তু এই কুঁড়েমিটা কিছু করতে চেয়েও কিছু করতে না পারার কারণে। অব্যবহৃত তানপুরার ওপরে যেমন পরতে পরতে ধুলো জমে, তেমনি করে পরতে পরতে আমার অস্তিত্বর ওপর কুঁড়েমি বসে গেছে। একদিন বা এক-শো বছরের চেষ্টাতেও সে-ধুলো, সে-আস্তরণ আর উঠবে না।
আমি যদি তানপুরা হতাম, তবে দোকানে দিয়ে আমরা খোলনলচে বদলে, নতুন করে রং করে, মরচে-পড়া তার-টার সব বদলে নিলে আমি হয়তো আবার কোনো সুন্দর সুর-সোহাগি আঙুলে দারুণ বাজতাম। কিন্তু আমি যে, একজন মানুষ। আমার খোলনলচে বদলাবার, নিজেকে নতুন করে রং বা বার্নিশ করার উপায় নেই কোনো।
বাবা অবস্থাপন্ন ছিলেন। ছেলেবেলায় বড়োলোকির মধ্যে মানুষ হয়েছিলাম। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর আমরা গরিব। বাবার অন্য অনেক ব্যাবসার মধ্যে একটা চা-এর দোকান ছিল, ভালো রাস্তায়, ভালো পাড়ায়; দাদা সেই দোকানে সকাল-বিকেল যায়—দুপুরে পড়ে পড়ে ঘুমোয়। দোকানদারিতে যে, ব্যবহারের চাকচিক্য লাগে ও সদাসর্বদা জাগ্রত দৃষ্টির দরকার হয় আমার ঘুমকাতুরে দাদার তার কিছুই ছিল না।
আমার বউদি খুব ভালো। সুন্দরী, সুরচিসম্পন্না; ভারি ভালো মেয়ে। আমার দাদার হাতে পড়ে বউদির বড়োই হেনস্থা। তার কোনো শখ-ই এ জীবনে পূরণ হয়নি। হবে না। আমার বউদির সঙ্গে আমার একটা বাবদে মিল ছিল। রুচির বাবদে। চরিত্রের নরম দিকটার বাবদে। ফলে, ভ্যাগাবণ্ড আমি ও আমার বউদির মধ্যে কখন যে, অনবধানে একটা সখ্যতা গড়ে উঠেছিল; একে অন্যের প্রতি সহানুভূতি, সমবেদনা সব মিলেমিশে কবে কখন কোন মুহূর্তে যে, বউদিকে আমি এবং বউদি আমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম ও ভালোবেসেছিল তা আমরা কেউ-ই বুঝতে পারিনি।
আমাদের পরিবারে আমার ছোটোভাই একমাত্র তালেবর। সে বিদেশি কোম্পানিতে একটা মোটামুটি চাকরি করত, ছেলেবেলা থেকেই ফটফট করে ইংরিজি বলত, ইংরিজি গান গাইত। আমাদের পরিবারের সেই কর্তা ছিল বলতে গেলে।
আমার সঙ্গে বউদির সম্পর্কটা আত্মীয়স্বজন সকলেই জানতেন—কিন্তু বেচারি-বউদি ও হতভাগা-আমি জীবনের আর সমস্তক্ষেত্রে এমন-ই বঞ্চিত ছিলাম যে, আমাদের একে অন্যের কাছে থেকে এই সামান্য প্রাপ্তিতে কেউই আপত্তি করত না। দাদার মানসিকতায় ভালোবাসা, শখ, রুচি এইসমস্ত ব্যাপারগুলোই সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। তাই আমাদের দু-জনের সম্পর্ক নিয়ে মাথা ঘামাবার মতো মস্তিষ্ক ও হৃদয় কোনোটাই তার ছিল না। দিনে-রাতে চোদ্দো ঘণ্টা ঘুম এবং খাওয়ার সময় খাওয়া পেলেই সে সুখী ছিল। জীবনে ডাল-ভাত শাড়ি-শায়া ছাড়াও যে, বেঁচে থাকতে হলে একজন নারীর অন্যকিছুর প্রয়োজন হয়, প্রয়োজন থাকে; তা বোঝার মতো ক্ষমতা দাদার ছিল না।
মনে হয়, বোঝার ইচ্ছেও ছিল না।
বউদির ছেলে-পিলে হয়নি। ডাক্তাররা বলেছেন, হবেও না। তাই আমার ওপরে বউদির মনের অপত্য স্নেহ ও প্রেম সমস্তই বড়ো নরমভাবে বর্ষিত হত। আমার জীবনে বউদিই একমাত্র আনন্দ ছিল।
যখন-ই মাঝেমধ্যে একমাস দু-মাসের জন্যে কোনো একটা কাজ পেতাম—যে-কাজকে ‘অ্যান অ্যাপলজি ফর আ জব’ বলাই ভালো—সেই টাকা দিয়ে বউদিকে শাড়ি কিনে দিতাম। কোনো হুহু-হাওয়া গরমের সন্ধেয় হয়তো বউদির জন্যে এক প্যাকেট ধূপকাঠি বা একগোছা রজনিগন্ধা নিয়ে আসতাম।
আমার কাছ থেকে বউদির কোনো দাবি ছিল না, আশাও না। আমারও একটু সমবেদনা বা ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই পাওনা ছিল না বউদির কাছ থেকে। আমাদের সম্পর্কটা আশ্চর্যরকম পবিত্র ছিল, যদিও তা যেকোনো মুহূর্তে অপবিত্র হতে পারত। হতে পারত, অথচ হয়নি বলেই যেন, সেই সম্পর্কের একটা আলাদা দাম ছিল, মোহ ছিল আমাদের দু-জনেরই কাছে।
শরীর বড়োস্থূল। শরীর এসে পড়লেই বোধ হয় অধিকাংশক্ষেত্রে ভালোবাসার সূক্ষ্মতা মরে যায়। বউদির যে, কিছু অদেয় ছিল আমাকে এমন নয়। কিন্তু সে-কথা দু-জনেই মনে মনে জানতাম বলেই হয়তো কেউই তা পাওয়ার বা দেওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করিনি।
আমার তালেবর ছোটোভাইয়ের বিয়ে হল এক বড়োলোকের মেয়ের সঙ্গে। তার বিয়ের পর-ই আমার ভাদ্র-বউ, ভ্যাগাবণ্ড ভাসুরঠাকুর ও তার বউদির মধ্যে এমন ভাবটা ভালো চোখে দেখল না। নানারকম কথা উঠতে লাগল। সেই থেকেই, নিজের ও বউদির দু-জনের সম্মানের জন্যেই আমি কলকাতার বাইরে বাইরে কাটাতে লাগলাম। যেকোনো একটা কাজ পেলেই তা নিয়ে কিছুদিন কাটিয়ে আসতাম বাইরে। কানা-ঘুসো থেকেও বাঁচতাম; আবার অনেক অনেক দিন পর, বাইরে থেকে ফিরে এসে, বউদির সঙ্গ, বউদিকে দেখতে পেয়ে খুব ভালোও লাগত।
পাটনায় কাটালাম কিছুদিন। শিলিগুড়ি, মাল, কৃষ্ণনগর—বাঁকুড়া, যেকোনো কাজে যে-কেউর ডাকে অমনি চলে যেতাম, যেকোনো মাইনেয়! এমনকী বেগার খাটতেও!
সবে বাঁকুড়া থেকে ফিরেছি দিনকয় হল, এমন সময় আমার মামাতো ভাই শশী একদিন এসে হাজির।
শশীর চেহারাটা খুব সুন্দর ছিল। আমার বড়োমামা একসময় কলকাতার শীর্ষস্থানীয় ক্লাবের হর্তাকর্তা ছিলেন, তারপর ফুটানির অনেক ফোটো ও বাড়ি মর্টগেজ রেখে তিনি মারা যান। শশী তার পিতৃবন্ধুদের ধরে সেই ক্লাবেই স্টুয়ার্ডের চাকরি পায় সুন্দর চেহারার গুণে। আমরা দু-জনে একসঙ্গে পড়তাম। শশী আমাকে খুব পছন্দ করত। ও সিরিয়াসলি নানারকম চাকরির চেষ্টা করত আমার জন্যে।
শশী একদিন সকালে এসে বলল, তোর একটা দারুণ চাকরি ঠিক করেছি— তোকে আইডিয়ালি স্যুট করবে।
—কীসের চাকরি?
সন্দিগ্ধ গলায় শুধোলাম আমি।
কারণ এর আগে অনেক চাকরি-চাকরি খেলা খেললাম, পঞ্চাশ-একশো টাকা মাইনেতেও—। কিন্তু হয় মাইনে কম, নয় মালিক মনোমতো নয়, নয়তো নিজের কুঁড়েমির জন্যে কোনো চাকরিও টেকাতে পারলাম না। আমার কুষ্ঠিতে কোথাও স্থির হয়ে বসা লেখা ছিল না।
আমি কিছু বলার আগেই শশী বলল, এমন মালিক পাবি না। একেবারে রাজা লোক। অংশুমান মিত্তিরকে কলকাতায় সবাই চেনে। সকলে ডাকে ‘স্যার এ এম’।
—‘স্যার’ মানে? নাইটেড নাকি? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
তারপর বললাম, বাহাত্তুরে বুড়ো বুঝি? পুরোনো স্যারেরা কি আজও আছেন? ভারতীয় গন্ডারের মতো তাঁরাও তো নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।
শশী একটা সিগারেট এগিয়ে দিয়ে বলল, আরে না, না, ‘স্যার’ ঠাট্টা করে বলে লোকে। বয়স কত হবে? বড়োজোর পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ। কিন্তু এমন সত্যি ঠাট্টা আর হয় না। ক্লাবে তো কত অ্যান্টিক হয়ে-যাওয়া রাজা-মহারাজা,রায়-সাহেব, রায়-বাহাদুর দেখি, কিন্তু এমন দিলদার লোক আর কখনো দেখিনি।
আমি বললাম, লোকে বলে, বড়োমামাও এমনিই দিলদার ছিলেন।
শশী সিগারেটে একটা জোরে টান দিয়ে আমাকে তার চোখের চাবুক মেরে বলল, ছিলেন। কিন্তু দিলদারি করতে গিয়ে গুচ্ছের ছেলে-মেয়েকে পথের ভিখিরি করে রেখে স্বর্গে যান তিনি। স্যার এ এম-এর সঙ্গে আমার স্বর্গত পিতৃদেবের তফাত এইটুকুই।
আমি শুধোলাম, চাকরিটা কীসের?
শশী চোখে-মুখে উৎসাহ ঝরিয়ে বলল, হাউসকিপিং-ম্যানেজারের।
অবাক হয়ে শুধোলাম, সেটা আবার কী?
—মানে বুঝলি না? মানে ঘর-গেরস্থালি দেখাশোনার চাকরি।—কলকাতায় নয়, সাঁওতাল পরগনায়।
আমি তখনও ভাবছিলাম।
বললাম, অংশুমান মিত্তিরের স্ত্রী নেই?
—থাকবেন না কেন?
জোরের সঙ্গে বলল শশী।
তারপর বলল, নিশ্চয়ই ওঁর ঘর-গেরস্থালির ব্যাপারটা এমন-ই কমপ্লিকেটেড যে, মেমসাহেবের পক্ষে এটা সেটা ম্যানেজ করে ওঠা মুশকিল।
যাই-ই হোক আজ সন্ধে সাতটার সময় সাহেবের সঙ্গে তোর অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছি। তোকে সাড়ে ছ-টায় নিয়ে যাব। আজ আমার অফ-ডে। তৈরি হয়ে থাকিস কিন্তু।
এই অবধি বলে, সিগারেটটা শেষ করেই শশী বলল, এবার পালাই, নমিতার সঙ্গে দুপুরে সিনেমা যাব।
আমি হাসলাম। বললাম এবার শাঁখা-সিঁদুর লাগা—। কতদিন আর ছুপকে-ছুপকে চালাবি?
শশী বলল, শাঁখা-সিঁদুর লাগালেই তো থোড়-বড়ি-খাড়া খাড়া-বড়ি-থোড়। যতদিন ছুপকে-ছুপকে চলে, ততদিন-ই তো মজা। আমি বাবা ছুপা-রুস্তম-ই থাকতে চাই— যে-ক-দিন পারি।
শশী ঠিক কাঁটায়-কাঁটায় ওর স্কুটার নিয়ে এসে হাজির।
আমিও তৈরি ছিলাম। শশী স্যুট পরতে মানা করেছিল। বেঁচে গেলাম। ইন্টারভ্যুর জন্যে সেজোকাকার কাছ থেকে চেয়ে-আনা, পুরোনো একটা স্যুট অল্টার-টল্টার করে নিয়ে ইস্ত্রি করিয়ে রাখতাম। কিন্তু এই পুরোনো স্যুটটাও বোধ হয় সেজোকাকা ভালো মনে দেননি। এ স্যুট পরে গিয়ে একটা চাকরিও আমার এপর্যন্ত হয়নি। তাই স্যুটটা পরতে হবে না জেনে আশ্বস্ত হলাম।
শশীর স্কুটার মে-ফেয়ারে একটা বিরাট মালটি-স্টোরিড বাড়ির সামনে গিয়ে থামল।
স্কুটারটা পার্ক করিয়ে, ঘড়ি দেখে নিল শশী একবার। একেবারে রাইট-অন-টাইমে। তারপর লিফটের সামনে গিয়ে বোতাম টিপল।
লিফটটা নামতে-না-নামতে, আমাদের পাশ থেকে কে যেন বলে উঠলেন, একেবারে কাঁটায়-কাঁটায় এসেছ দেখছি।
পাশে তাকিয়েই চমকে উঠলাম আমি।
গ্রেগরি পেক কবে থেকে বাংলা শিখলেন?
অপলকে তাকিয়ে রইলাম—ভদ্রলোকের দিকে। হুবহু গ্রেগরি পেকের মতো দেখতে— এমনকী চুলটা পর্যন্ত—শুধু গায়ের রংটা অতখানি ফর্সা নয়। সাড়ে ছ-ফুট লম্বা। এমন বাঙালি তো আগে দেখিনি।
ভদ্রলোককে দেখেই, শশী হাতজোড় করে নমস্কার করে নিল, এই আমার ভাই স্যার!
স্যার এ.এম, প্রতিনমস্কার করলেন আমার নমস্কারে।
ইতিমধ্যে লিফট এসে গেল। লিফটে উঠে দশতলায় পৌঁছোলাম।
দশতলায় পৌঁছে সাহেব নিজের ফ্ল্যাটের সামনে এসে বেল টিপলেন।
বেয়ারা এসে দরজা খুলল—পেছন-পেছন বাঘের মতো দেখতে একটা ফিকে-হলুদ অ্যালসেশিয়ান কুকুর।
টাইয়ের নটটা ঢিলে করে কোটটা বেয়ারার হাতে দিয়ে সাহেব বললেন, বলো শশী।
শশী ও আমি দাঁড়িয়েছিলাম।
সাহেব বললেন, বোসো বোসো। কী খাবে বলো? গরম না ঠাণ্ডা?
শশী বলল, ঠাণ্ডা।
সাহেব বেয়ারাকে বললেন, বউরানিকে খবর দে, কোকাকোলা মিষ্টি সব নিয়ে আয়।
তারপর বউরানি আসার আগে সাহেব আমার দিকে চেয়ে বললেন, কাজটা কী শুনেছ তো?
ভদ্রলোকের আত্মবিশ্বাস আছে পুরোপুরি—বিধান রায়ের মতো—অচেনা লোককে ‘তুমি’ বলতে একটুও আটকায় না এবং এমনভাবে তা বলেন যে, যাকে বলা হল তার কিছু মনে করারও থাকে না।
আমি বললাম, পুরোটা শুনিনি।
—তবে শোনো।
বলেই, সাহেব বললেন, ঝোলে-ঝালে-অম্বলে সবকিছু করতে হবে। দরকার হলে মালও বইতে হবে। কখনো-কখনো সারারাত কাজ করতে হবে। একসঙ্গে আটচল্লিশ ঘণ্টা ননস্টপও কাজ করতে হতে পারে যখন আমার গেস্ট-টেস্ট থাকবেন। যখন কাজ থাকবে না, তখন ঘুমোতে পারো। মানে নিয়মকানুন কিছু নেই। য্যায়সা কাজ ত্যায়সা ডিউটি। তোমাকে কতগুলো দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হবে—কেউ খবরদারি করবে না তোমার ওপর—এক বউরানি ছাড়া। নিজের দায়িত্ব বুঝে সব কাজ নিজেকে করতে হবে—নিজের ইনিসিয়েটিভে।
মাথা নাড়ছিলাম। আর মনে মনে ভাবছিলাম, কাজের ফিরিস্তি তো শুনছি, এখন মাইনের কথাটা শুনি। এরকম বড়ো বড়ো সাহেব আমি এপর্যন্ত অনেক দেখেছি। কাজের বেলা ‘শোলে’ আর মাইনের বেলা ‘অ্যাড-শর্টস।’
আমার চোখের ভাষা হয়তো সাহেব বুঝে থাকবেন। ভদ্রলোককে দেখেই অত্যন্ত বুদ্ধিমান বলে মনে হল।
সাহেব বললেন, পাঁচ-শো টাকা মাইনে পাবে—তার সঙ্গে খাওয়া পাবে, থাকার কোয়ার্টাস। মাসে তিনদিনের জন্যে কলকাতায় আসার ছুটি পাবে। ট্যাঁ-ফো করলে চলবে না, কোনো অজুহাত চলবে না। খাটতে পারবে কি না ভালো করে চিন্তা করে নিয়ে জানিয়ো। কাজের বেলা কোনো ফাঁকি বরদাস্ত করব না আমি।
খাওয়া-দাওয়া সমেত পাঁচ-শো টাকা আমার কাছে অনেক টাকা—কিন্তু আমি বাঙালির ছেলে—খাটনিটা জোর হলে আমার একটু অসুবিধে। হালকা খাটুনি, ফাঁকি মারার সুযোগ বেশি অথচ মাইনে ভালো এমনি চাকরি হলে আমার পোষায় কিন্তু ভদ্রলোকের ব্যক্তিত্বটা এমন-ই ও মাইনের অঙ্কটা এতই লোভের যে, বার বার মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানানো ছাড়া তখন আমার আর কিছুই করণীয় রইল না।
এমন সময় বউরানি এলেন। বউরানির মতোই দেখতে। চাঁপাফুলের রং যেন ফুটে বেরোচ্ছে। মুখে একটি প্রশান্ত অথচ ভাবিত ভাব। খুব আস্তে কথা বলেন, আস্তে হাঁটেন, নরম করে তাকান। রানির মতোই নরম মোম-মোম। একটু মোটার দিকে চেহারা।
বউরানি আসতেই স্যার এ. এম বললেন, এই যে ভ্রমর, তোমাকে যে ছেলেটির কথা বলেছিলাম, এই-ই সেই শশী—আর শশীর কাজিন—হ্যাঁ, তোমার নাম কী যেন?
আমি বললাম, যবন-দমন দত্ত।
বড্ড বড়োনাম। সাহেব বললেন।
তারপর বললেন, বাড়ির নাম কী?
টিকলু। বললাম আমি।
ফার্স্ট-ক্লাস। সাহেব বললেন।
তারপর বউরানির দিকে চেয়ে আমার সামনেই বললেন, পছন্দ ভ্রমর?
বউরানি মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানালেন।
সাহেব বললেন, চিন্তার কোনো কারণ নেই। ওখানে গিয়ে পৌঁছোলেই কাজকর্ম—মানে জুতো-সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ সব-ই একে একে শিখে নেবে। আরও অনেক লোকজন আছেন। সব ঠিক হয়ে যাবে।
তারপর বললেন, ভালো করে কাজ করে— ‘আমরা বাঙালিরা যে কুঁড়ে ফাঁকিবাজ’, এই অপবাদটা ঘুচাও তো দেখি সকলে মিলে।
আমি চুপ করে রইলাম।
তারপর কোকাকোলা আর মিষ্টি খেয়ে আমরা যখন উঠলাম, তখন সাহেব বললেন, আগামী শুক্রবার রাতে এখান থেকে রওনা হবে। রাত দশটা পনেরোতে গাড়ি। হাওড়া থেকে। আমিও ওই গাড়িতেই যাব। আর যা কথা হওয়ার তা ওখানেই হবে। তোমার টিকিট আমি শশীর হাতে দিয়ে দেব। মঙ্গল বুধের মধ্যেই, ক্লাবে।
তারপর বললেন, ঠিক আছে?
—হ্যাঁ স্যার।
নমস্কার করে বললাম আমি। তারপর বউরানিকে নমস্কার করলাম।
শশী বলল, চললাম স্যার।
এসো। বলেই, সাহেব ভেতরে চলে গেলেন জামাকাপড় ছাড়তে।
লিফটে শশী বলল, কেমন বুঝলি?
—কাজটা খুব ইন্টারেস্টিং বলে মনে হচ্ছে।
শশী বলল, তোর বসকে আমি চিনি। তোর ঝামেলা বসকে নিয়ে হবে না; হবে বউরানিকে নিয়ে।
আমি চমকে উঠে বললাম, কেন একথা বলছিস?
শশী বলল, একে রাজার মেয়ে, রাজার স্ত্রী, তার ওপর কেমন মুডি-মুডি দেখলি না। ওঁর মন বুঝে চলতে পারলেই তোর চাকরি খায় কোন শালা। কিন্তু আমরা চাষাভুসো লোক; রাজা-রাজড়াদের মুড বোঝা মুশকিল।
দেখাই যাক। বললাম আমি।
শশী বলল, জয় সাঁইরাম।
ইদানীং শশী এবং মামাবাড়ির সকলে সাঁইবাবার খুব ভক্ত হয়ে উঠেছে। ওর চাকরিতে উন্নতি হয়েছে, নমিতার সঙ্গে প্রেম গাঢ় হয়েছে, ওদের বাড়িতে মাসিমার ঘরে সাঁইবাবার ফোটোর ওপর বিভূতি জমেছে।
আমিও সঙ্গে সঙ্গে বললাম, জয় সাঁইরাম।
চাকরিটা এ যাত্রা টিকে গেলে সাঁইবাবার দয়াতে টিকবে—ভাবলাম আমি।
সবে পুব আকাশে আলোর রেখা ফুটেছে। চারদিক দেখা যায়। কিন্তু সূর্য ওঠেনি। এমন সময় ‘মিথিলা’ এক্সপ্রেস ট্রেনটা স্টেশনটাতে ঢুকল।
থ্রি-টায়ারের ওপরতলা থেকে রবারের বালিশটা ফাঁপিয়ে নিয়ে, সুজনি সমেত সড়াৎ করে নেমে এলাম। তারপর সুটকেসের মধ্যে ফেঁসে-যাওয়া বালিশ ও সুজনি পুরে নিয়ে, সুটকেসটা হাতে নিয়ে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ালাম।
তাকিয়ে দেখি, ফার্স্টক্লাসের সামনে গন্ধমাদন পর্বত নেমেছে। বিরাট-বিরাট চ্যাপটা করে ভাঁজ করে রাখা পিচবোর্ডের প্যাকিং বক্স, টিউব লাইট, বাক্স, প্যাঁটরা, পোঁটলা-পুঁটলি, সাহেব, মেমসাহেব এবং আরও একটি দম্পতি।
এমন মালিকের চাকরি করে আরাম। ভিড়ের মধ্যেও এ মালিক কখনো হারিয়ে যাওয়ার নয়। লক্ষ লোকের মধ্যেও সাহেবের সাড়ে ছ-ফিট চেহারা সকলের মাথা ছাড়িয়ে থাকবে।
কুলির প্রসেশানের পেছনে পেছনে ওভারব্রিজ পেরিয়ে দেখি একটা অ্যাম্বাসাডর গাড়ি, একটা স্কুটার-টেম্পো এবং টাঙার সারি দাঁড়িয়ে।
সাহেব একজন রোগা-সোগা কালো-কালো ভদ্রলোককে ডাকছিলেন, ‘ভজন’, ‘ভজন’ বলে। বোঝা গেল, সেই ভজনবাবু মালপত্র তদারকি করে সামলে-সুমলে নিয়ে আসবেন।
সাহেবরা আগেই চলে গেলেন গাড়িতে। যাওয়ার আগে ভজনবাবুর সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিয়ে গেলেন সাহেব।
বললেন, এর নাম টিকলু। আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট।
স্কুটার-টেম্পো এবং টাঙাবাহিনী আগে রওনা করিয়ে দিয়ে শেষের টাঙায় আমাকে নিয়ে ভজনবাবু উঠলেন।
টাঙা ছাড়তেই বললেন, সামনের দিকে চোখ রাখবেন একটু—টাঙাগুলো মাল ছড়াতে-ছড়াতে যাবে—প্রতিবার-ই এমন-ই হয়। আর আমরা সেগুলো কুড়োতে কুড়োতে যাব— সেজন্যেই আমাদের টাঙায় মাল বলতে আমরা শুধু দু-জনই আছি।
বলেই, পকেট থেকে নস্যির ডিবে বের করে একটিপ নস্যি নিলেন।
বললেন, বে-শাদি হয়েছে?
—আজ্ঞে না।
—তবে তো মুশকিলে ফেললেন। দেখবেন, পানুই-এর ক্যাজুয়ালটি হবেন না আবার।
—আজ্ঞে?
আমি না বুঝতে পেরে শুধোলাম।
ভজনবাবু উত্তর দিলেন না।
টাঙা একটা মিষ্টির দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, ভজনবাবু বললেন, জিলিপি-শিঙাড়া খাবেন। গরম-গরম ভাজছে।
বলেই, টাঙা থেকে একলাফে নেমে গিয়ে একঠোঙা জিলিপি-শিঙাড়া নিয়ে এলেন।
আমার সামনে ধরে বললেন, খান।
বললাম, মুখ ধুইনি।
ধমক দিয়ে ভজনবাবু বললেন, থামুন তো মশাই। জীবনে কখনো কি মুখ না ধুয়ে কিছু খাননি? যা-কিছু খেয়েছেন, সব-ই মুখ ধুয়ে? খান, খান, এমন স্বাদের জিলিপি-শিঙাড়া হয় না আর।
—ভজনবাবু আমার ইমিডিয়েট বস। কিছু কথাবার্তা বলতে হয়—তাই-ই বললাম, আপনি কি এখানে অনেকদিন?
—ইয়েস। জন্ম থেকে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন ভজনবাবু।
আমি আবার শুধোলাম, পরিবার-টরিবার এখানেই?
—ইয়েস। ঝামেলা এড়াবার জন্যে আমি ডি-অ-এস বিয়ে করেছি।
—মানে?
জিলিপি-মুখে আমি বোকার মতো শুধোলাম।
ভজনবাবু বললেন, ইয়েস, ডটার অব দ্য সয়েল। আমি সাঁওতাল মেয়ে বিয়ে করেছি। থার্ড ওয়াইফ। ফার্স্টক্লাস আছি মশাই। আমার বিধবা মা আমার কাছে এসে রয়েছেন, আমার ওয়াইফ তাঁর যা সেবাযত্ন করছে তা দেখলে বামুনের মেয়ে ভিরমি খাবে।
বলেই, বললেন, আজকাল অবশ্য শহরের শিক্ষিত লোকেদের ঘরেই এসব উঠে গেছে বরং গ্রামের লোক, উপজাতিদের মধ্যে এখনও ভালোটুকু আছে।
আমি শুধোলাম, ছেলে-পেলে?
—নান। ভবিষ্যতে মে বি।
তারপর জিলিপি খেতে খেতে শুধোলেন, আমাদের সাহেবকে কতদিন জানেন?
বললাম, পাঁচদিন আগে পাঁচ মিনিটের জন্যে প্রথম দেখা।
এ্যাই সেরেছে। বললেন, ভজনবাবু।
তারপর বললেন, কোথায় কাজ করতে এয়েছেন জানেন কি?
আজ্ঞে না। আমি বললাম।
তারপর ভয় পাওয়া গলায় বললাম, ভালো করিনি?
—মোটেই না মশায়। পাগল হয়ে যাবেন, বে-থা করেননি, এখনও খাদ্য-খাদক ভূত-ভবিষ্যৎ আছে, পাগলের পাল্লায় পড়ে নির্ঘাত পাগল হয়ে যাবেন। এ তো একটা পাগলাগারদ। এই ভজন ভড় বলেই কোনোক্রমে টিকে রয়েছে এখানে।
ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, কেন, উনি কি পাগল নাকি?
—সার্টেনলি ইয়েস। কোনো সন্দেহই নেই তাতে। আমি যে এখনও পাগল হইনি, তার কারণ আমার বাবা পাগল ছিলেন। আমারও পাগল হওয়ার কথা ছিল। পাগলে-পাগলে কাটাকুটি হয়ে গিয়ে আমি বেঁচে গেছি। কিন্তু আপনার বাঁচার কোনোই চান্স নেই।
টাঙাটা একটা লেভেল ক্রশিং পেরোল।
ভজনবাবু তারস্বরে চেঁচালেন, ওরে ও জংলি, সামান গিড় গিঁয়া।
সামনের টাঙা থেকে একটা পুঁটলি গড়িয়ে রেললাইনের ওপর পড়েছিল। জংলি নামক একটি খোঁড়া ছেলে খুঁড়িয়ে নেমে সেটাকে উদ্ধার করে আবার যথাস্থানে রাখল।
রেললাইনটা পেরোলে পর আমি বললাম, ‘আচ্ছা! আমার কাজট কী?’
ভজনবাবু প্রচন্ড শক পেলেন।
বললেন, কাজটা কি এখনও জানেন না? আজব লোক মশায় আপনি।
তারপর একটু থেমে বললেন, আপনি কি জানেন যে,সাহেবের একটি চিড়িয়াখানা আছে। তাতে নেই, এ হেন জানোয়ার, পাখি নেই। গ্রিনহাউস আছে—তাতে রকমারি গাছগাছালি। ডেয়ারি আছে, পোলট্রি আছে। সে-পোলট্রিতে দিনে দু-হাজার ডিম হয়। সাহেবের নিজের বাড়ির মধ্যে আবার জাপানি-বাড়ি, হাওয়াইয়ান বাড়ি, কামাচ কাটকান-বাড়ি, শান্তিনিকেতনি-বাড়ি আছে। গাছে গাছে হ্যামক আছে, গাছে চড়ে জিরোবার জায়গা আছে, আফ্রিকায় চিতাবাঘেরা যেমন জিরোয়। ব্যাপার-স্যাপার দেখে আপনার জামগাছে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে যেতে ইচ্ছা হবে। আর লোকজন? প্রায় জনা তিরিশ লোক কাজ-ই করে এই কুরুক্ষেত্রে। তাও একটি চিড়িয়াখানা।
আমি রীতিমতো ঘাবড়ে গেলাম। হাউস-কিপিং ম্যানেজারের যে, চিড়িয়াখানার ম্যানেজারি করতে হবে, তা ঘুণাক্ষরেও জানা যায়নি। এ আমার কী সর্বনাশ করল শশী!
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, তাহলে তো সর্বনাশ হল!
জিলিপির ঠোঙাটা সজোরে ছুড়ে ফেলে ভজনবাবু বললেন, ইয়েস। সার্টেনলি। এতবড়ো সর্বনাশ যেন কারোর-ই না হয়।
কিছুক্ষণ বাদে টাঙার প্রসেশন একটি বন্ধ লোহার গেটের সামনে এসে দাঁড়াল।
দেখলাম হিন্দিতে লেখা আছে ‘চিড়িয়াখানা শনিচ্চর ঔর এতোয়ার কি দিন বন্ধ রহেগি।’
ভজনবাবু টাঙা থেকে লাফিয়ে নেমে চিৎকার করতে লাগলেন, রামস্বরূপ গেট খোলো; গেট খোলো।
লম্বা-চওড়া এক গুঁফো দারোয়ান এসে ঠেঁট হিন্দিতে শুধোল, ‘গেটপাস’?
ভজনবাবু বললেন, তুমহারি গুষ্টিনাশ। সাহাবকা সামান লে আয়া হ্যায়, হামকা শ্বশুরাল মে ঘুষতা হ্যায়? জলদি খোল গেট।
আমি অবাক গলায় বলাম, গেট-পাস কীসের?
—আরে গেট দিয়ে মোরগা, আণ্ডা, মায় গোরু-বাছুর অবধি হাওয়া হয়ে যাচ্ছিল, সাহেবের পেয়ারের লোকেরাই করছিল। তারপর একবার রাস্তার ষাঁড়েরা প্রসেশান করে ঢুকে পড়েছিল।
আমি অবাক হয়ে শুধোলাম, কেন?
ভজনবাবু বললেন, আরে এখানে লাল লাল বিলিতি মেম-সাহেব গোরু আছে কত্ত ডেয়ারিতে! তবে? বিপত্তি কি একটা? তাই সাহেব এই ব্যবস্থা করেছেন। যতবার ঢুকবে বেরুবে ততবার-ই গেটপাস। এ ব্যাটা দারোয়ান অবশ্য নতুন, এখনও ভজন ভড়ের স্ট্যাটাস সম্বন্ধে জ্ঞান হয়নি।
ব্যাপার-স্যাপার দেখে আমি তক্ষুনি মনস্থির করে ফেললাম, এই যে ঢুকলাম, আর বেরুচ্ছি না।
গেট খুলতেই, সামান নামিয়ে নেওয়া হল। ভাড়াগাড়ির ভেতরে ঢোকা নিষেধ। গেটে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারলাম যে, এ একটা যে-সে জায়গা নয়। লাল মোরামের পথ চলে গেছে অনেক দূরে—ভেতরে। দু-পাশে কত যে গাছ, কত যে লতা, কত পাথরের মূর্তি, কাঠের কাজ, গাছে-গাছে বাতি ঝুলছে, পথের দু-পাশে—সবুজ বালব লাগানো আছে তাতে।
দূর থেকে বাড়িটা দেখা যাচ্ছে। সামনের দিকে রঙিন টাইল বসিয়ে ফ্রেসকো করা হয়েছে—। বাড়ির মাথায় লাল খাপরার সুন্দর ডিজাইন। সৌন্দর্যবোধ ও সুরুচির ছাপ চারদিকে পরিপুষ্ট।
চোখ জুড়িয়ে গেল।
আস্তে আস্তে ভেতরে এগিয়ে গেলাম।
বাড়ির কাছে আসতেই দেখি মেমসাহেব ইতিমধ্যে একপাল দেহাতি ছেলে নিয়ে পাঠশালা বসিয়েছেন। গোলাকৃতি মার্বেলের টেবিলে আমগাছের ছায়ায়—চতুর্দিকে বসার বেতের চেয়ার—তাতে নানারঙা গদি আঁটা।
মেমসাহেব বলছেন, বোলো, অ। বোলো আ। বোল্লো বাচ্চে।
পড়াশুনা এগোতে-না-এগোতেই দেখি বালতি করে একজন লোক গরম দুধ আর ডিমসেদ্ধ এনে ছেলেগুলোকে খাওয়াতে আরম্ভ করল।
তারা ডিমসেদ্ধ-ভরা মুখে গবগবে গলায় বলতে লাগল, ‘অ, আ’। ডিমের হলুদ-কুসুম লাগা দাঁত বের করে বলল, ই—ই।
এমন সময় সাহেবের গলা শোনা গেল।
বাড়ির সামনে ধাপে ধাপে সিঁড়ি উঠে গেছে। ঝোলানো টবে-টবে অর্কিড ঝুলছে। তার সামনে মিউজিক্যাল টাইম। বাজনা। হাওয়ায় দোলাদুলি করে ‘টুংটাং’ শব্দ হয়। সেই বাজনাগুলো সারি করে লাগানো আছে।
সাহেব বলছেন, মধ্যের অতগুলো বাজনা কোথায় গেল?
ভজনবাবু স্মার্টলি উত্তর দিলেন, চুরি হয়ে গেছে সাহেব।
সাহেব বললেন, নাইট-গার্ড কী করছিল?
ভজনবাবু বললেন, সে তো নিজেকেই নিজে ধমকে বেড়ায় সারারাত। চোরেরা তার ধমক শুনলে তো! তা ছাড়া, চুরি নাইটে হয়নি স্যার ডে-তে হয়েছে। কিন্তু চোর ধরা পড়েছে। রোহিণী বস্তির দুটো ছেলে। তাদের ধরে রামস্বরূপ গাছে বেঁধে রেখেছে। কাল-ই বিকেলে ধরা পড়েছে।
সাহেব বললেন, কখন থেকে বেঁধে রেখেছে?
কাল বিকেল থেকে।
কী অন্যায়। কী অন্যায়। সাহেব বললেন।
তারপর বারান্দার সামনে একটা চেয়ারে বসে পড়ে বললেন, এখুনি তাদের নিয়ে এসো, দুধ খাওয়াও। আহা! বেচারিদের এমন করে কষ্ট দেয়?
সাহেবের গলার স্বরে চুরির দায়ে ধরা-পড়া বজ্রসেনের প্রতি শ্যামার যে দরদ, সেই দরদ-ই যেন ঝরে পড়ল।
আমি স্থাণুর মতো দাঁড়িয়েছিলাম।
সাহেব ডাকলেন, মেহবুব, মেহবুব।
একটি অল্পবয়সি ছেলে আমার চেয়ে অনেক ভালো পোশাক পরে বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। ছেলেটি খুব স্মার্ট। পরে জেনেছিলাম, সাহেবের খাস বেয়ারা।
সাহেব বললেন, মেহবুব, চোররা কোথায়? নিয়ে এসো।
পরক্ষণেই আমাকে বললেন, টিকলু যাও তো ভাইডি, মেহবুবের সঙ্গে নিয়ে চোরদের নিয়ে এসো।
মেহবুবের পেছন-পেছন গিয়ে দেখি ইউক্যালিপটাস গাছের গুঁড়িতে বাঁধা দুটি বছর বারো- তেরোর ছেলে মাথা নুইয়ে আধ-ঘুমন্ত অবস্থায় লেপটে আছে গাছের সঙ্গে।
দড়ি খুলে আমি ও মেহবুব যখন সাহেবের কাছে তাদের নিয়ে এলাম, তখন সাহেবের রাগ কে দেখে? চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করলেন উনি।
বললেন, এক্ষুনি এদের দুধ খাওয়াও।
তারপর মেমসাহেবকে বললেন, ভ্রমর, এদের একটু ওমলেট আর টোস্ট করে দিতে বলো রামকে।
মেমসাহেব সাহেবের মুখের দিকে একবার অপাঙ্গে চেয়ে, পড়ুয়াদের ছেড়ে উঠে গেলেন ভেতরে।
দুধ এবং খাবার খাইয়ে চোরদের গায়ে জোর করিয়ে নেওয়ার পর সাহেব বললেন, ভাই, কাজটা কি তোমরা ভালো করলে? চুরিই যদি করলে তো সবগুলো বাজনাই চুরি করলে না কেন? অর্ধেক নিয়ে গেলে,—তোমাদের বাড়িতেও ভালো বাজবে না, আমার বাড়িতেও তাই। তার চেয়ে বাকিগুলোও খুলে দিচ্ছি, নিয়ে যাও। নয়তো যেগুলো নিয়ে গেছ, সেগুলো ফেরত দিয়ে দাও আমাকে। বাজনা বাজা নিয়ে কথা—তোমাদের ঘরেই বাজুক, কী আমার ঘরেই বাজুক, ভালো করে বাজবে তো?
চোরেদের মধ্যে একটি ছেলে পায়ের নখ দিয়ে মাটি খুঁটতে-খুঁটতে বলল, বাজনা শোনার জন্যে আমরা চুরি করিনি—টাকার জন্যে করেছিলাম। গাঁয়ের এক দোকানে দশ টাকা দিয়ে ওগুলোবেচে দিয়েছি।
—টাকা দিয়ে কী করলে?
—খেলাম সাহেব। বাড়িতে বাবা-মায়ের বেমার। নোকরি-ধান্দা নেই। তাই চুরি করেছিলাম।
সাহেব ডাকলেন, ভজন।
ভজনবাবু এগিয়ে এলেন।
সাহেব বললেন, এক্ষুনি পনেরা টাকা দিয়ে কাউকে ওদের সঙ্গে পাঠাও। আমার বাজনাগুলোযার কাছে বিক্রি করেছে ওরা, তার কাছ থেকে আবার কিনে নিয়ে আসুক। আর এ ছেলে দুটোর কাজের দরকার—আজ থেকে এদের চাকরির বন্দোবস্ত করো।
চাকরি খালি নেই। ভজনবাবু বললেন।
—খালি করো।
—কাকে ছাড়াব?
—আহা ছাড়াবে কেন?
—তাহলে ওদের কোন কাজের জন্যে বহাল করব?
—কোনো কাজ নেই?
—না সাহেব।
—তাহলে ওরা আমার লনে জল দেবে। গরম পড়ে গেল—এখন জল দেওয়ার লোকের দরকার। মালিরা ফুলগাছ দেখাশোনা করেই সময় পায় না—এরা লন দেখাশোনা করবে। দিনমজুর হিসেবে এরা আজ থেকে বহাল হল।
ভজনবাবু বললেন, আচ্ছা স্যার।
সাহেব এই বন্দোবস্ত করে, বাড়ির ভেতরে গেলেন।
ভজনবাবু বললেন, টিকলুবাবু, আপনি এদের সঙ্গে যান। নিজকানে সব শুনলেন তো! এই নিন পনেরো টাকা।
বলেই, বুকপকেট থেকে পনেরো টাকা বের করে আমায় দিলেন।
তারপর গলা নামিয়ে বললেন, কেমন বুঝছেন? চোরের এমন শাস্তি কোথাও শুনেছেন, না পড়েছেন?
আমি জবাব না দিয়ে ছেলে দুটোকে নিয়ে চললাম।
এই হল আমার নতুন চাকরির প্রথম অফিসিয়াল অ্যাসাইনমেন্ট।
টাঁড় পেরিয়ে ধুলোভরা রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে ছেলে দুটো বলল, নেহাত-ই পেটের দায়ে চুরি করেছি। নইলে এ পাগলাসাহেবের বাড়ির কোনো জিনিস বাইরে পড়ে থাকলেও আমরা কেউ নিই না। পাগলা সাহেব মানুষ নয়; দেবতা।
মানুষ যে নন মনে মনে, আমারও তেমন একটা সন্দেহ হচ্ছিল। তবে ভূত-প্রেত না দেবতা সে-বিষয়ে এখনও নি:সংশয় নই।
ভাগ্যি ভালো, বাজনা যার কাছে বিক্রি করেছিল, সে পেতল ভেবে কিনেছিল। পনেরো টাকা পেয়ে সে খুশি হয়েই সেগুলো দিয়ে দিল।
ছেলে দুটোকে নিয়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ফিরে আসতেই দেখি সাহেব একটা লালরঙা স্যুট-প্যান্ট পরা বাঁদরের হাত ধরে বাড়ির সামনের বাগানে পায়চারি করছেন আর তার সঙ্গে অনর্গল গল্প করছেন।
আমি ব্যাপার দেখে ‘থ’ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
হঠাৎ সাহেব আমাকে দেখেই মেহবুবের ওপর রেগে উঠে হুংকার দিয়ে বললেন, এ্যাই! টিকলুবাবুকে কোয়ার্টার দেখিয়ে দাও, নাস্তা-পানির বন্দোবস্ত করো।
তারপর আমাকে বললেন, যাও টিকলু, হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে-দেয়ে ঠিক ন-টার সময় এসে আমার সঙ্গে দেখা করবে।
মেহবুবের সঙ্গে আমার কোয়ার্টারে যাওয়ার সময় পথে ভজনবাবুর সঙ্গে দেখা। একটা ছোট্ট টবে-লাগানো অর্কিডকে প্রেমিকার মতো বুকে আঁকড়ে ধরে কোথায় যেন চলেছেন।
ভজনবাবু বললেন, বুদ্ধুকে দেখেছেন?
—কে বুদ্ধু?
আমি অবাক হয়ে শুধোলাম।
—ওই যে বাঁদরটা। ওর বউয়ের নাম ছিল গোপা। গোপা মারা যাওয়ার পর বউয়ের শোকে ওর টি-বি হয়েছে। তাই সাহেব ওকে নিজে অতযত্ন করেন।
আমি বললাম, কিন্তু বাঁদরের গায়ে স্যুট কেন? এ কি সাহেবের শখ?
ভজনবাবু আমার দিকে এমন মুখ করে তাকালেন যেন, আমি একেবারেই অর্বাচীন।
বললেন, কখনো কোনো বাঁদরকে দন্ডায়মান অবস্থায় দেখেছেন? ওদের যন্ত্রপাতি তো সব মানুষের মতো। বড়োঅশ্লীল দেখায়। স্যুটটা শখে নয়, প্রয়োজনে। আমরা তো চিরদিন বাঁদরদের চার পায়ে বুকে হাঁটতেই দেখেছি—বাঁদর মানুষের হাতে-হাত রেখে হাঁটলে এইসব ডিফিকাল্টি হয়।
তারপর একটু থেমে বললেন, এখানে মেমসাহেব থাকেন, সাহেবের গেস্টদের মধ্যে কত মহিলা থাকেন—তাদের সামনে বাঁদরকে অমন বেলেল্লাপনা করে ঝুলঝুল করে ঘুরতে দেওয়া যায় না।
বাঁদরকে স্যুট পরাবার অকাট্য যুক্তিটা মানতেই হল।
মেহবুব আমার কোয়ার্টারে এনে আমাকে পৌঁছে দিল।
ছিমছাম, দুটো ঘর, বাড়ির সামনে পেঁপে গাছ কয়েকটা, চারধারে বড়ো বড়ো গাছ— নানারকম পাখি ডাকছে। বেশ পছন্দ হল কোয়ার্টার।
আমি বললাম, রান্না-বান্না করার জায়গা নেই?
মেহবুব বলল, সাহেব তো বলেছেন আপনি বাড়িতেই খাবেন চারবেলা। রাম বাবুর্চি আছে, অশোক আছে—সাহেব মেম-সাহেবদের জন্যে যা রান্না হয় আপনিও তাই-ই খাবেন। আমি বেয়ারা। সাহেবের খাস-বেয়ারা।
বুঝলাম, কমিশনারের পি-এর মতো মেহবুবকেও একটু খাতিরে রাখতে হবে। নইলে এই পাগলাসাহেবের কাছে কখন চাকরি নট হয়ে যায় কে জানে!
বাথরুমে গিয়ে, হাত-মুখ ধুয়ে, জামা-কাপড় ছেড়ে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলাম, রাতে ট্রেনে ভালো করে ঘুম হয়নি, এমন সময় একটা কালো-কালো পনেরো-ষোলো বছরের ছেলে এসে ডাকল আমাকে। বলল, নাস্তা লাগা দিয়া।
তারপর বলল, রোজ সকালে আপনাকে এখানে বেড-টি দিয়ে যাব। সকাল ন-টায় বাড়িতে এসে বাবুর্চিখানায় নাস্তা করে নেবেন, দুটোয় দুপুরের খাওয়া, বিকেলে পাঁচটায় চা, রাত দশটায় রাতের খাওয়া।
তারপর বলল, চলুন।
আমি শুধোলাম, তোমার নাম কী?
—আমার নাম অশোক।
বেশ মিষ্টি কাটা-কাটা চোখ-মুখ।
শুধোলাম, তুমি কি সাঁওতালি?
—না আমি বিহারি।
—কী যেন বললে, তোমার নাম? অশোক?
—না, আমার আসল নাম আসোয়া, রানিমা আমার নাম দিয়েছেন অশোক। এখানে সকলের নাম রানিমাই দিয়েছেন। আপনার নামও দেবেন।
—মানে? আমার নাম আমার থাকবে না?
অশোক হাসল মিষ্টি করে। বলল, বোধ হয় না। সাহেব ঠিক-ই আপনার নামেই ডাকবেন। কিন্তু মেমসাহেব আড়ালে অন্য নামে ডাকবেন।
আমি নার্ভাস হয়ে গিয়ে বললাম, ভজনবাবুর কী নাম?
দাঁড়কাক। অশোক বলল।
অ্যাঁ? আমি আতঙ্কিত গলায় বললাম।
আর আমার নামও দিয়ে ফেলেছেন নাকি?
অশোক হাসল। বলল, হ্যাঁ।
কী? কী? আমি উদগ্রীব গলায় শুধোলাম।
অশোক বলল, পাতিকাক।
—কেন? পাতিকাক কেন?
—দাঁড়কাকের অ্যাসিস্ট্যান্ট বলে।
অশোক বলল।
—আহা! বউদি আমার এমন হেনস্থা জানলে হয়তো আমাকে এক্ষুনি চাকরি ছেড়ে চলে আসতে বলত কলকাতায়। কিন্তু এসে-অবধি এই চিড়িয়াখানার ব্যাপার-স্যাপার এতই ইন্টারেস্টিং লাগছে যে, এই আমার তিরিশ বছরের জীবনে এই-ই প্রথমবার মনে হচ্ছে যে, চাকরিতে এবার আমার মন লেগেছে। আমি হলাম গিয়ে ভার্সেটাইল জিনিয়াস—কোনো এক-ই কাজ কি আমার ভালো লাগে? এইরকম বিভিন্নমুখী কাজ তো আমার-ই জন্যে!
নাস্তা করা হলে সাহেব ডেকে পাঠালেন।
বললেন, চলো টিকলু, তোমাকে তোমার কাজের জায়গা ঘুরিয়ে দেখাই।
সাহেবের সঙ্গে যে দম্পতি এসেছিলেন, তাঁরা বাঙালি নন। কোথাকার মহারাজ আর মহারানি। ভদ্রমহিলা দেখতে পাঞ্জাবি-পাঞ্জাবি। ভদ্রলোককে সাহেব ‘গ্রেগরি’ বলে ডাকছিলেন; আর ভদ্রমহিলাকে ‘পম্পা’।
গ্রেগরি সাহেব আমাদের সঙ্গে চললেন।
বললেন, লেট মি হ্যাভ আ স্ট্রল উইথ ইউ—।
সাহেব বললেন, কাম এলং।
প্রথমে-ই আমরা বাড়ির সামনেই একটা জায়গায় এলাম। ওই পাথুরে জমিতে ডিনামাইট দিয়ে পুকুর খোঁড়া হয়েছে ঘোড়ার খুরের আকৃতির। তার ওপর হ্যাঙ্গিং ব্রিজ। অর্কিডে-অর্কিডে ও নানা লতা ও ঝোপে ছেয়ে রয়েছে জায়গাটা। সেই জায়গাটার ওপরে, জলের ওপরে বাঁশ দিয়ে তৈরি একটা জাপানি কায়দার বিরাট ঘর। কাঠের টুকরো রং করে দু-পাশের পর্দা বানানো হয়েছে। বাঁশের গায়ে হলুদ রং করা। ঘরটাতে উঠতে হলে বাঁশের মজবুত সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। ঘরের মধ্যে মোটা-মোটা ডানলপিলো মাইসোরিয়ান মিহি মাদুর দিয়ে ঢাকা। জাপানিজ কায়দায় বাঁশের মেঝে।
সাহেব বললেন, জাপানে এইরকম মেঝেকে বলে ‘টাটামি’-ফ্লোর। এটা হচ্ছে জাপানিজ টি-হাউস। তবে এখানে চা খাওয়া হয় না, আমার গেস্টরা দুপুরে বিয়ার খান। গরমের দিনে রাতে গল্প-টল্প করেন। হানি-মুনিং কাপল এলে রাতে শোন।
দেখলাম, দু-দিকে, বিশেষ করে, পশ্চিমের দিকে চিক ফেলা আছে। সুন্দর রং করা। যাতে পশ্চিমি লু না ঢুকতে পারে ঘরে। দেওয়াল থেকে টেবিলফ্যানও ঝুলছে দু-পাশে। আলোও আছে। কোনোকিছুর-ই ত্রুটি নেই।
সাহেব বললেন, এই ঘর ভালো করে যত্ন করে রাখবে। বাঁশের মিস্ত্রি এখানে আছে। পার্মানেন্ট স্টাফ। যখন যা মেরামতের দরকার তাকে দিয়ে করিয়ে নেবে। তার নাম নীলমোহন।
জাপানিজ টি-হাউসের পাশেই একটা ম্যাগনোলিয়া গ্ল্যাণ্ডিফোরা গাছের গুঁড়ির চারদিকে লাগানো সাদা রট-আয়রনের গ্লাসটপের টেবিল, রট-আয়রনের চেয়ার। লেখাপড়ার করার জন্যে।
বাগানের মাঝে মাঝেই গাছগাছালির তলায় নানান বসার জায়গা—নানা ধাঁচের, নানা মাপের, নানা রঙের। গাছে-গাছে হ্যামক ঝুলছে, হ্যামকের সঙ্গে বেঁধে-রাখা বালিশ, যাতে হাওয়ায় উড়ে না পড়ে যায়।
বাঁদিকে আরও কিছুদূর গিয়ে সাহেবের লাইব্রেরি তৈরি হচ্ছে। একটা বড়ো জামগাছের একটা ডালও না কেটে—তার নীচে দোতলা বাড়ি। ছাদটা পুরো কাচের। এখনও শেষ হয়নি।
সাহেব বললেন, কার্পেন্টার, রাজমিস্ত্রি সব এখানে পার্মানেন্ট স্টাফ—তুমি শুধু একটু দেখাশোনা করবে—ভজনবাবু একা সময় পান না সব দেখাশোনা করবার। তা ছাড়া চিড়িয়াখানাটা তাঁর-ই দায়িত্বে।
লাইব্রেরি ছাড়িয়ে আর একটু এগোলেই, বাঁদিকে নীল রঙা সুইমিং পুল। সুইমিং পুলের পাশেই একটা মাটির ঘর। তার বারান্দায় বসে একজন দর্জি পা-মেশিন চালিয়ে ঝাঁই-ঝাঁই করে গদির নানা রঙা নতুন কুশানের কভার সেলাই করে চলেছে। এবং ছিঁড়ে-যাওয়া কুশানেরও কভার মেরামতি করছে।
সাহেব বললেন, যখন-ই যে কুশান-এর কভার ছিঁড়ে যাবে, একে বলবে, এ খুলে সেলাই করে দেবে। যেখানে নতুন বানাতে হবে তাও একেই বলবে। এর নাম হামিদ।
আরও একটু এগিয়ে গিয়ে একটা বিরাট গভীর কুয়ো। তার ওপর লোহার জাল বিছানো। সেই কুয়োর ওপরে বাঁশের সাঁকো। সেই সাঁকো বেয়ে গিয়ে একটা মাটির বাড়ি। সাঁওতালদের বাড়ির মতো দেখতে—কিন্তু দোতলা—মধ্যে স্যানিটারি বাথরুম-টাথরুম সব আছে। বাড়িটা একটা বড়ো তালগাছকে ঘিরে তৈরি করা হয়েছে। সিঁড়ি তৈরি হয়েছে কাঠের তক্তা দিয়ে তালগাছটিকে ঘিরে ঘিরে।
এক-একটা জিনিস দেখছি, আর এই মানুষটার, আমরা নতুন মালিকের শখ, রুচি, ক্ষমতা দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি। আমার সেজোকাকা, যিনি ইন্টারভিউর জন্যে আমাকে অপয়া পুরোনো স্যুট দিয়েছিলেন, এবার আমেরিকায় ডিজনিল্যাণ্ডে গেছিলেন—ফিরে এসে গল্প করেছিলেন যে, মানুষের পয়সা, বিজ্ঞান আর কল্পনা এবং পরিশ্রম একসঙ্গে মিললে যে, কী অসাধ্য সাধন করা যায়, তা নাকি ‘ডিজনিল্যাণ্ড’-এ না গেলে অনুমান করা মুশকিল। আমি কিন্তু আমার সাহেবের এই চিড়িয়াখানায় এসে ডিজনিল্যাণ্ডের আস্বাদ পেলাম। মানুষটার প্রতি ভক্তি আমার শতগুণে বেড়ে গেল।
হঠাৎ সাহেব আমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, তুমি ভাবছ, আমার পয়সা আছে, তাই বাপ-ঠাকুরদার উপার্জন করা পয়সায় আমি ফুটানি করছি। তা কিন্তু নয়। পরে তোমাকে আমার ডেয়ারি, পোলট্রি, এগ্রিকালচারাল ফার্ম সব সময়মতো ঘুরে দেখাব। অত্যন্ত কমপিটেন্ট সব লোক নিয়ে পার্টনারশিপ করেছি তাঁদের সঙ্গে। তাঁরা প্রত্যেকে নিজের নিজের ক্ষেত্রে খুব দক্ষ ও কৃতী লোক। পুরো ব্যাপারটার সাকসেসের মূলে তাঁদের কন্ট্রিবিউশন-ই অনেকখানি। শতকরা ষাটভাগ প্রফিট তাঁরা পান—আমি পাই চল্লিশ ভাগ। ডেয়ারির আলাদা পার্টনার, পোলট্রির আলাদা পার্টনার, এগ্রিকালচারের আলাদা পার্টনার। আমি নিজে যদিও অ্যাকাউন্টেন্ট, তবু নিজের হিসেব আমি নিজে রাখি না তাতে ভুলভ্রান্তি হতে পারে। সবচেয়ে বড়োকথা মানুষ নিজের চিকিৎসা নিজে করলে বায়াসড হয়ে যায়। তাই কলকাতার এক প্রসিদ্ধ অডিটর ফার্ম থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টটেন্ট এসে প্রতি উইক-এণ্ডে আমার সমস্তকিছুর অ্যাকাউন্টস চেক করে যান। উইকলি ট্রায়াল-ব্যালান্স ও প্রফিট-অ্যাণ্ড-লস অ্যাকাউন্ট বানানো হয়। কোথায় কত লাভ হচ্ছে, কী হচ্ছে না, তা ধরা পড়ে। আমার পার্টনারেরা সকলেই দেড় দু-হাজার টাকা মাসে ড্রইং করেন প্রফিটের এগেইনস্টে।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বললেন, বুঝলে টিকলু, সব-ই নিজে খাব, অন্য কাউকে কিছু দেব না এবং সব-ই একাই করতে পারব এই ভুল ধারণার জন্যেই আমাদের কিছু হয় না।
আমি বললাম, স্যার, কতদিন আগে আপনি এসব আরম্ভ করেছিলেন?
স্যার এ এম বললেন, তুমি আমাকে অংশুদা বলেই ডেকো। ‘স্যার স্যার’ কোরো না।
তারপর বললেন, আজ থেকে ন-বছর আগে আরম্ভ করেছিলাম। তখন আমার বয়স চৌত্রিশ-পঁয়ত্রিশ।
কথাটা শুনে আমার থুথু ফেলে মরতে ইচ্ছে করল। মানে আজ আমার যে বয়স, প্রায় সে-বয়সে এই মানুষটা একটা এতবড়ো প্রোজেক্ট ভিজুয়ালাইজ করে, ভেবে, নিজে হাতে সব করেছেন। বড়োলোকের শখ হিসেবে নয়, অ্যামেচারিশভাবে নয়, একেবারে প্রফেশনাল কায়দায়। তার ফল: আজ অতলোকের চাকরি হয়েছে এখানে, এতকিছু উৎপাদন হচ্ছে, পাথুরে মাটিতে বছরে দুটো করে ফসল ফলছে।
সাহেব বললেন, তিনটে ক্রপ করার চেষ্টা করছি, কিন্তু মাটি তো নয় যেন পাথর; কিছুতেই করতে পারছি না। এই পুরো ব্যাপারটা আমি কো-অপারেটিভ বেসিসে ডেভালাপ করছি— সত্যিকারের কালেকটিভ প্রচেষ্টা—বুঝেছ টিকলু। আমি দেখিয়ে দেব যে, কাজ করার ইচ্ছা থাকলে করা যায়, অসুবিধে, পাথুরে মাটি, জলকষ্ট, এসব কোনো বাধাই নয়।
তারপর একটু থেমে বললেন, জানো ভাইডি, একবার ইজরায়েলে গেছিলাম, দেখে এলাম ওরা মরুভূমিতে ফসল ফলাচ্ছে। আমাদের এতবড়ো দেশ, এত সুন্দর দেশ, আমরা সকলে মিলে যদি মাথা লাগাতাম, হাত লাগাতাম, তবে এদেশ নিয়ে আমরা কীই-না করতে পারতাম!
আমার নতুন মালিকের কথা শুনতে শুনতে আমার ইচ্ছে করল তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করি। মনে মনে বললাম, শশী! তোর কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এখানে আমি বিনি-মায়নাতেও কাজ করতে পারি। আমার তিরিশ বছরের জীবনে আমি এমন একটা মানুষের মতো মানুষ দেখিনি। আমার বন্ধ্যা, অসফল ভ্যাগাবণ্ড কালো মেঘাচ্ছন্ন জীবনে এই কাজ-ই যেন প্রথম একটা রুপোলি আলোর রেখা। হঠাৎ করে এতদিন বাদে, যৌবন প্রায় শেষ করে এনে বুঝলাম যে, অন্য কেউই কারও জন্যে কিছু করতে পারে না। একজন মানুষ নিজে, সে যদি মানুষের মতো মানুষ হয়, তবে শুধু তার নিজের জন্যেই নয়, নিজের জন্যে করেও, আরও দশজনের বোঝা ও দায়িত্ব সে হাসিমুখে বইতে পারে। ভাবছিলাম, অনেক নোটবই পড়ে ইউনিভার্সিটির পরীক্ষা পাশ করেছি, মরা পাঁঠার গায়ে কর্পোরেশনের ছাপের মতো ইউনিভার্সিটির ছাপ পেয়ে ভেবেছি, কত কীই-না শিখলাম, জানলাম। কেন জানি না, আজ আমার হঠাৎ মনে হল, আজ যা শিখলাম, বুঝলাম, তেমন শেখা, বোঝা বা জানা এতদিনে কখনো জানিনি। আমার বুকের মধ্যে কী যেন একটা অপ্রকাশ্য, অনামা অনুপ্রেরণার অনুরণন শুনতে পেলাম, রক্তের মধ্যে নদীর ঢেউয়ের মতো হঠাৎ ছলাৎ ছলাৎ করে বাজছিল।
সাহেব বললেন, ডেয়ারি, পোলট্রি বা চিড়িয়াখানা নিয়ে তোমার দায়িত্ব বা মাথাব্যথা নেই—তুমি আমার এই বাড়িঘরগুলো ঠিক করে রাখবে। অতিথিদের স্টেশনে গিয়ে রিসিভ করবে, স্টেশনে তুলে দিয়ে আসবে, কোনোরকমের খাতির-যত্নর কমতি না হয় দেখবে। হুইস্কি ফুরিয়ে গেলে, বিয়ার ফুরিয়ে গেলে আমাকে জানাবে। আমার স্টোররুমের চাবি আজ থেকে তোমার হাতে। আমি নিজে থাকলে সব যেমনটি চলে, আমি এখানে না থাকলেও আমার অবর্তমানে সবকিছু ঠিক তেমনটিই চালিয়ো। এই তোমার কাজ। তা ছাড়া তোমার কাছে আমার কিছুই চাইবার নেই।
তারপর একটু থেমে বললেন, এ কাজ তোমার পছন্দ হয়েছে তো? আমাকে, বউরানিকে, পছন্দ হয়েছে তো? কারণ আমাদের পছন্দ না হলে, তুমি কাজ করে আনন্দ পাবে না।
আমি অনেকক্ষণ সাহেবের মুখের দিকে মুখ উঁচু করে চেয়ে রইলাম।
তারপর আস্তে বললাম, খু-উ-ব।
সব দেখানো হয়ে গেলে সাহেব আমাকে বউরানির জিম্মায় দিয়ে অফিসে চলে গেলেন। রীতিমতো অফিস আছে এখানে। টাইপিস্ট, অ্যাকাউন্ট্যান্ট, ক্লার্ক সব নিয়মমাফিক কাজ করছে। এখন সাহেব লাঞ্চ অবধি অফিসে বসেই কাজ করবেন। তারপর বিকেলে পোলট্রি, ডেয়ারি ও এগ্রিকালচারাল ফার্ম দেখতে বেরোবেন।
সাহেব চলে গেলেন।
বউরানি ছায়াঢাকা বারান্দায় বসে কী যেন লেখাপড়া করছিলেন।
বললেন, প্রথম দিন-ই বেশি রোদ লাগিয়ো না, আগুনে পুড়ে যাবে, লু-ও লাগতে পারে। চা খাবে নাকি এককাপ?
আমি উত্তর দেওয়ার আগেই মেহবুব ট্রেতে বসিয়ে টি-পটে করে চা নিয়ে এল।
বউরানি নিজে হাতে চা বানিয়ে দিলেন।
চা খেতে খেতে বউরানি বললেন, চলো, চা খেয়ে নিয়ে ঘরগেরস্থালি তোমাকে বুঝিয়ে দিই।
আমি বললাম, তার আগে আপনাকে বলি, আপনার দেওয়া নামটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে।
কী নাম?
বউরানি সন্দিগ্ধ চোখে তাকালেন।
আমি বললাম, পাতিকাক।
বউরানির যে-ধরনের সেন্স অব হিউমার, তা বোঝা সাধারণ লোকের কর্ম নয়। নিজে অত্যন্ত রসিক হলে তবেই বউরানির ফল্গুধারার মতো অন্তঃসলিলা রসবোধের হদিশ পাওয়া যায়।
এমন সময় ভেতর থেকে চান-টান সেরে সাহেবের গেস্ট—মহারানি এলেন। একটা ফিকে হলুদ-রঙা বেল-বটস পরেছেন। ওপরে হালকা সবুজ পাঞ্জাবি। দারুণ ভালো ফিগার, খুব বুদ্ধিমতী, সুশ্রী চেহারা।
উঠে দাঁড়ালাম।
বউরানি হাসলেন না। গম্ভীর মুখে বললেন, বিশ্বাসঘাতককে খুঁজে বের করতে হবে।
বউরানি বললেন, পম্পা, চা খাবে এককাপ?
—নো, থ্যাঙ্ক ইউ।
বলেই, চুল-ভরা কাঁধ ঝাঁকিয়ে মহারানিকে ধন্যবাদ জানালেন।
তারপর আমাকে বসতে বললেন।
ভদ্রমহিলা খুব ছটফটে স্বভাবের। একটু পরেই বললেন, হোয়ারস আওয়ার হাজব্যাণ্ডস গান? লেট মি গো অ্যাণ্ড হ্যাভ আ লুক।
বলেই, মহারানি দুড়দাড় করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গিয়ে বাগানে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
বউরানি অপলকে অপস্রিয়মাণ মহারানির দিকে চেয়ে রইলেন।
তারপর অস্ফুটে বললেন, ‘খুনি’।
মানে? আমি আঁতকে উঠে বললাম।
বউরানি বললেন, আমাকে একবার প্রায় খুন-ই করে ফেলেছিল একটু হলে।
আমি উত্তেজিত বোধ করলাম। রাজা-মহারাজাদের ব্যাপার খুন-খারাবি হলেই হল আর কী? কিন্তু আর ঔৎসুক্য দেখানো ঠিক কি না বুঝলাম না।
চায়ের পেয়ালা নামিয়ে রেখে বউরানি নিজেই বললেন, তবে শোনো সে-গল্প।
এমন সময় বউরানির পাঠশালার এক পোড়ো এসে অন্য পোড়োদের বিরুদ্ধে নালিশ জানাল—তারা তাকে মেরেছে, তার শ্লেট ভেঙে দিয়েছে, তার পেনসিল কেড়ে নিয়েছে।
বউরানি মেহবুবকে সরজমিনে তদন্ত করতে পাঠিয়ে বললেন, সে প্রায় বছর পাঁচেক আগেকার কথা। আমার দু-ছেলে জানো তো? বড়োছেলের বয়স একুশ। সে লানডান স্কুল অফ ইকনমিক্সে পড়ে লানডানে—আর ছোটোছেলের বয়স, এগারো—সে পড়ে আজমীরের পাবলিক স্কুলে। আমার বড়োছেলে তখন পরীক্ষার পর এখানে এসে রয়েছে। তোমার দাদা তো তাকে একটা ঘোড়া কিনে দিয়েছেন। ঘোড়া সহিস সব-ই আছে। সে তো ঘোড়া দাপিয়ে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ায় পাঁচ-দশ মাইল। এমনি সময়, গ্রেগরি আর পম্পা এল এখানে বেড়াতে।
তারপর একটু থেমে বললেন, দেখতেই পাচ্ছ আমার শরীরে মজ্জার চেয়ে মেদ একটু বেশি। বরাবর-ই বেশি। পম্পা গলফ খেলে, রাইডিং করে, ঘোড়া দেখে পম্পা তো খোঁড়া সাজল। দিনরাত ঘোড়া চেপে বেড়ায়। দু-দিন পর চলে যাওয়ার সময় আমায় বিশেষ করে বলে গেল যে, তুমি রাইডিং কোরো, নির্ঘাত রোগা হয়ে যাবে। বুঝলে টিকলু...
আমি থামিয়ে দিয়ে বললাম, পাতিকাক।
বউরানি বললেন, ওই হল। পম্পা চলে যাওয়ার পর আমি ছেলেকে বললাম, হ্যাঁরে, তোর ঘোড়াটা একটু দিবি। আমি রোগা হতাম!
ছেলে বলল, নিশ্চয়ই দেব মা। ঘোড়া চড়ে দ্যাখো। খুব সোজা চড়া। সহিস তোমাকে শিখিয়ে দেবে।
ইতিমধ্যে তোমার সাহেবের দু-জন গেস্ট এসে হাজির। একটু যে, নিরিবিলিতে ঘোড়া চাপব বা কিছু করব, তা এ-বাড়িতে হওয়ার উপায় নেই। একদিন সকালে সহিস তো ঘোড়াকে সাজিয়ে-টাজিয়ে এনে সিঁড়ির সামনে দাঁড় করাল। ভেবেছিলাম, সে-সময়ে গেস্টরা ঘরের ভেতরে থাকবেন। সে-সময় তাঁরা স্নানও করতে পারতেন, ঘরে বসে দাড়িও কামাতে পারতেন, তা না, তাঁরা চেয়ার নিয়ে বারান্দায় বসলেন। বসে, দাঁড়িয়ে-থাকা ঘোড়াটির দিকে আগ্রহের চোখে চেয়ে রইলেন। কিন্তু, তখন আমি রোগা হব বলে বদ্ধপরিকর। ছোটোবেলায় ঠাকুরের বাণী পড়েছিলুম, ‘লজ্জা মান ভয়—তিন থাকতে নয়’। অতএব ঘোড়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। কিন্তু উঠি কী করে? ছেলে ও সহিস দু-ধারে দাঁড়িয়ে ছিল ঠায়। আমার ঘোড়ার প্রতি যত না মনোযোগ ছিল তাদের; আমার প্রতি মনোযোগ ছিল তার চেয়েও বেশি।
আমি বললুম ছেলেকে, একটা চেয়ার আন তো বাবা, উঠি কী করে?
ছেলে একটা চেয়ার নিয়ে এল।
চেয়ারে উঠেও দেখি পা পাই না। তখন তাকে বললুম, একটা পিঁড়ে নিয়ে আয়। ছেলে দৌড়ে বাবুর্চিখানা থেকে পিঁড়ে নিয়ে এল।
সেই চেয়ারের ওপর পিঁড়ে রেখে, অনেক কষ্টে তো ঘোড়ার ওপর চেপে বসলাম।
কিন্তু আমি যেই তার পিঠে বসলাম, ঘোড়া সেই সটান বসে পড়ল। চার-পা মুড়ে।
ছেলে ও সহিস হাঁ-হাঁ করে উঠল।
পাছে আমি আমার পাখির মতো হালকা শরীরের কারণে লজ্জা পাই, তাই সহিস সঙ্গে সঙ্গে বলল, মেমসাব ইয়ে তো পাঁচ-পাঁচ মন সওয়ারি ইতনি নানসে লে লেতা, আপ তো পাঁচ মন নেহি হ্যায়, আপকো জরুর উঠানে শেকেগা। ভেবে দ্যাখো, বারান্দায় বসা, গেস্টদের সামনে কী হেনস্থা আমার!
তারপর সহিস সান্ত্বনা দিয়ে বলল, আপ জেরা লাগাম খিঁচিয়ে, ঘোড়া বিলকুল খাড়া হো যায়গা।
ঠাকুরের নাম স্মরণ করেই যেই-না লাগাম টেনেছি, সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া উঠে তো দাঁড়াল, কিন্তু দাঁড়িয়ে খ্যামা দিল না। সামনের পা-দুটো সটান শূন্যে তুলে দিয়ে ‘চিঁহি চিঁহি’ রবে প্রবল প্রতিবাদ করে পেছনের দু-পায়ে ভর করে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
তারপর? আমি উত্তেজিত হয়ে শুধোলাম।
বউরানি বললেন, তারপর আর কী? ঘোড়াও স্ট্রেট লাইন হয়ে গেল আর আমিও অতউঁচু ওয়েলার ঘোড়ার ল্যাজ গড়িয়ে স্ট্রেট পপাতঃ ধরণিতলে।
ব্যাপারটা পুরো হৃদয়ংগম করার আগেই বউরানি বললেন, বুঝেছ, শাড়ি পরেছিলুম আমি। এমন পড়া পড়লুম যে, কী বলব।
তারপর একটু থেমে বললেন, কিন্তু সেই মেদ, যে মেদ ঝরাবার জন্য ঘোড়ায় চড়তে গেছিলুম, সেই মেদ-ই শেষপর্যন্ত বাঁচাল আমায়। আমার শরীরে মেদ না থাকলে সেদিন আমার হাড়গোড় ভেঙে চুরচুর হয়ে যেত।
একটু থেমে বউরানি বললেন, সেই রোগা হওয়ার প্রথম ও শেষ চেষ্টা।
এই গল্প শেষ হওয়ার পর আমার ওপর গল্পের প্রতিক্রিয়া কী তা না দেখেই বউরানি বললেন, চলো, বাড়িটা তোমাকে ঘুরে দেখাই। আমি আর তোমার দাদার অনুপস্থিতিতে অনেক অতিথি যাবেন-আসবেন, তাঁদের যেন কোনোরকম অসুবিধা না হয়।
একতলায় অনেকগুলো ঘর। দুটো এয়ার-কণ্ডিশানড। অন্যগুলো গুলমার্গ এয়ারকুলার লাগানো। নীচে দু-টি বাথরুম। বাথরুমে ফ্লোর লেভেলের নীচে বাথ-টাব-কমোড, মায় বিদে পর্যন্ত। আগে আমাদের দেশে বিদে তৈরি হত। আজকাল হচ্ছে।
বাবুর্চিখানা। চাকর-বেয়ারাদের থাকার ঘর—দু-দুটো ফ্রিজ, স্টোর।
বউরানি স্টোররুম খুলে দেখালেন, বিলিতি হুইস্কি, নানারকম দেশি-বিদেশি মদ, সিগার, সিগারেট ও আরও নানারকম জিনিস ভরতি। ফ্রিজের মধ্যে চিজ, মাখন, ডিম, হ্যাম, সসেজ—সেই হেন জিনিস নেই।
বউরানি আমাকে নিয়ে তারপর দোতলায় উঠলেন।
দোতলা থেকে বহুদূর অবধি দেখা যায়। বাড়ির সামনে দিয়ে মেইন লাইন। ক্ষণে ক্ষণে ট্রেন যাচ্ছে। রেললাইনের ওপারে লাল মাটির খোয়াই চলে গেছে। মাঝে মাঝে সবুজের ছোপ, শালের চারা, ঝাঁটি জঙ্গল, মিলিয়ে গেছে দূরের ছায়াঘেরা সাঁওতালদের গ্রামে, তারপর টিগরিয়া পাহাড়। একটা নদী গেরুয়া শরীরে গরমের সকালে ন্যাতানো সাপের মতো পড়ে আছে।
বউরানি নাম বললেন নদীর; কুতনিয়া।
ওই গ্রামগুলোর নাম কী? শুধোলাম আমি।
বউরানি বললেন, সুজানী। বড়োগ্রামটা। তার চারপাশে ছড়ানো আছে কুকরিবাগ, বদলাডি, বাবুডি সব টিগরিয়া পাহাড়ের কোলে-কোলে।
তারপর বললেন, জানো তো, ওইসব গ্রাম থেকে ছেলে-মেয়েরা রোজ কাজ করতে আসে। ওই সুজানী গ্রামে একটা খুবসুন্দর মেয়ে আছে, সে এখানে কাজ করে। তার নাম পানুই।
‘পানুই’ নামটা শুনেই আমার বুকটা ধক করে উঠল।
স্টেশন থেকে আসবার সময় ভজনবাবু যেন কী বলেছিলেন? ‘বে-শাদি করেননি, পানুই-এর ক্যাজুয়ালটি না হয়ে যান।’
কথাটা মনে পড়ে এতক্ষণে তার মানে বুঝলাম।
মেমসাহেব বললেন, এই পানুইকে নিয়ে তোমার সাহেবের চিন্তা। এতলোকে মেয়েটার পেছনে লাগছে যে, মেয়েটা খারাপ না হয়ে যায়। মেয়েটা নিজে পাজি—তো লোক কী করবে? তোমার সাহেব বর ঠিক করে লোক খাইয়ে শাড়ি-গয়না দিয়ে পানুই-এর বিয়ে দিলেন। কিন্তু হলে কী হয়— সে বরকে ছেড়ে চলে এল।
ওপরেও অনেকগুলো বেডরুম—দু-টি বারান্দা। মানে এই বাড়ির একতলা, দোতলা, জাপানি টি-হাউস, শান্তিনিকেতনি শ্যামলীর মতো মাটির বাড়ি, কামাচ কাটকান, হাওয়াইয়ান সব মিলিয়ে এখানে একসঙ্গে একশো-জন অতিথিও অনায়াসে থাকতে পারেন।
আমি বউরানিকে বললাম, সেকথা।
বউরানি বললেন, থাকতে পারে মানে? থাকেও অনেক সময়।
তারপর বললেন, তোমার চাকরিটা যত সহজ ভেবেছ তত সহজ নয়। তুমি এখানে তিষ্ঠোতে পারলে হয়। তোমার সাহেবের গেস্টদের তো দ্যাখোনি। কতরকম চিজ-ই যে আসে, এই চিড়িয়াখানার জন্তুরাও হার মানে তাদের কাছে।
আমার মনে হল, ইতিমধ্যেই যেন একটু পাগল-পাগল ভাব লাগছে। চাকরিটা টিকিয়ে রাখতে পারলে হয় শেষপর্যন্ত।
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেছে।
সাহেব তাঁর মহারাজা-মহারানি অতিথিদের নিয়ে লাইব্রেরির পাশের গাছতলায় বসবার জায়গায় বসে, অফিসের কাজ শেষ করে এসে কোল্ড বিয়ার খেয়েছেন। পম্পা, মেমসাহেব শ্যাণ্ডি।
বউরানি সাহেব ও সাহেবের অতিথিদের সচরাচর এড়িয়ে চলেন।
তারপর যখন ওঁরা খাওয়ার ঘরে খেতে বসেছেন, আমি রংরুটের মতো দাঁড়িয়ে থেকেছি পাশে, ব্যাপার-স্যাপার দেখবার-বোঝবার জন্যে। কার কী লাগবে না লাগবে তদারকি করার জন্যে।
আজ আমার করার কিছু নেই। কারণ মালকিন ও মালিক উপস্থিত।
ফিজিক্স নিয়ে পড়াশুনা করে, কলেজ-ম্যাগাজিনে বিস্তর কবিতা-টবিতা লিখে শেষকালে খাওয়া-দাওয়ার তদারকির চাকরিতে বহাল হলাম বলে হঠাৎ একবার মনে বড়ো খোঁচা লাগল। পরক্ষণেই সাহেবের উজ্জ্বল দু-টি বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রতিভাময় চোখে চোখ পড়েই সব ভুলে গেলাম। সত্যিই মনে হল, এ আমার অনেক ভাগ্য যে, এমন যোগাযোগ শশীর মাধ্যমে ঘটেছে।
অবাক লাগল বউরানির খাওয়া দেখে। বউরানি শুধু ছানা খাচ্ছেন একটু।
রাম বাবুর্চিকে কারণ শুধোলাম ফিসফিস করে। জানা গেল মেদবৃদ্ধির ভয়ে বউরানি আর কিছুই খান না।
খাওয়া-দাওয়ার পর আমি বউ-রানিকে বললাম যে, আপনি যদি ছানা ছাড়া কিছুই না খান, তাহলে আমিও কিছুই খাব না। আপনি ভাত খেলেই আমি ভাত খাব। আপনি যা খাবেন আমিও তাই-ই খাব। এসব একেবারে ভুল ধারণা। রোগা-মোটা সব উত্তরাধিকারের ব্যাপার। কই সাহেব তো মোটা নন। কিন্তু আপনি মোটা। আমি চেষ্টা করেও মোটা হতে পারি না। যার যেরকম স্বাস্থ্য। খোদার ওপর খোদকারি করে লাভ কী?
আবারও বললাম, আজ রাত থেকে দেখবেন বউরানি, আপনি যা খাবেন, আমিও তাই-ই খাব। আমার তাহলে চাকরি করতে এসে কিন্তু না খেয়ে থাকতে হবে।
বউরানি বললেন, এ কী অলুক্ষুণে কথা!
আমি বললাম, অতসব জানি না। যা বললাম, তাই-ই হবে।
প্রথম দিন-ই চাকরিতে বহাল হয়ে এমন মাতব্বরি ও মালকিনের ছানাগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করাটা ঠিক হল কী হল না ভেবে দেখলাম না একবারও। মাতব্বরিটা করে ফেলার পর মনে হল কাজটা ভালো করলাম না।
সাহেব বোধ হয় রাম বাবুর্চি, অশোক ও মেহবুবের কাছে কানাঘুসায় পাতিকাক-বউরানি সংবাদটি শুনে থাকবেন। রাতে আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বললেন, তোমার হবে হে। তুমি বউরানিকে ছানা ছাড়াতে যদি পারো, তবে তোমার অনেক কিছু হবে।
সাহেবকে ঠিক বুঝতে পারছি না। কথাটা কী ভেবে বললেন ও কীভাবে আমার নেওয়া উচিত তা বোধগম্য হল না। তবে ঠিক করলাম, এ ব্যাপার নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করব না।
খাওয়া-দাওয়ার পর বারন্দায় বসে, বেতের তৈরি সাদা রং করা পা-রাখার জায়গায় পা রেখে সাহেব একটা সিগার খেলেন সকলের সঙ্গে গল্প করতে করতে। তারপর সকলে বিশ্রাম নেওয়ার জন্যে ঘরে গেলে, নিজে উঠে চললেন লাইব্রেরির কাজ তদারক করতে। যাওয়ার সময় আমাকে বললেন, টিকলু, এবার খেয়ে নিয়ে বিশ্রাম নিয়ে নাও একটু। পাঁচটার সময় আবার চলে এসো।
তারপর বললেন, বউ-রানি ও মেহবুবের কাছে থেকে যা বোঝার সব বুঝে নিয়েছ তো?
মাথা নাড়লাম আমি।
বাবুর্চিখানার-ই এককোণের একটা টেবিলে আমাকে খেতে দিয়েছিল রাম বাবুর্চি। চমৎকার রান্না। বাড়িতে উড়ে ঠাকুর রাঁধে, মুসুরির ডালে যেন তেলাপোকা-তেলাপোকা গন্ধ বেরোয়। আর রাম বাবুর্চি ভালো রেঁধেছে, সে-যেন মনে হচ্ছে কী একটা অনাস্বাদিতপূর্ব পদ খাচ্ছি।
খেতে খেতে হঠাৎ সিগারেটের উগ্র গন্ধ নাকে এল।
চমকে তাকিয়ে দেখি, সাহেব এসে বাবুর্চিখানার দরজায় দাঁড়িয়েছেন।
এক পলক আমার থালার দিকে চেয়ে থেকে বললেন, মেহবুব, টিকলুবাবুকে আর একটু মাংস দে। মাংস কি তোদের কম পড়েছে?
তারপর বললেন, তোদের জন্য রেখেছিস তো? দেখি হাঁড়ি।
বলে, নিজেই সটান বাবুর্চিখানায় ঢুকে হাঁড়ি পরীক্ষা করে খুশি হয়ে বললেন, ঠিক আছে। এখন থেকে টিকলুবাবুই বাড়ির ম্যানেজার।
প্রথম-প্রথম ওঁকে একটু দেখিয়ে-শুনিয়ে দিবি—ওঁর কথা মেনে চলবি তোরা। কোনো ঝামেলা যেন না হয়।
তারপর বললেন, ভালো করে খাও। তুমি বড়ো রোগা টিকলু। স্বাস্থ্য ভালো করো। এখানের জল-হাওয়াও ভালো। খাও-দাও-খাটো— দেখবে দু-দিনে চেহারা ফিরে যাবে।
বলেই, সাহেব চলে গেলেন আবার অফিসে। এরপর নাকি উনি এগ্রিকালচারাল ফার্মে যাবেন, একটা খুববড়ো মজা-পুকুর নিয়েছেন লিজে, সেই পুকুর কাটা শুরু হবে শিগগির—তার তদারকি করে আসবেন একবার।
সব কাজ-ই করে অন্যরা, সাহেব শুধু তদারকি করেন আর ডিসিশান নেন।
এতদিনে বোধগম্য হল কী করে টাটা কী বিড়লা কী আই-সি-আই কোম্পানি বাণিজ্য করে। সব-ই একটা লোক করলে কেউ-ই জীবনে বড়ো হতে পারে না। না, খাটলেও না। ঠিকমতো লোক খুঁজে নিয়ে যার যার হাতে তার তার দাঁড় বুঝিয়ে দিয়ে নিজে হাল ধরে বসে থাকতে হয় শুধু। তবেই জীবনের জলে সাফল্যর নৌকো চলে তরতর করে।
খাওয়া-দাওয়ার পর একটা সিগারেট ধরিয়ে বাবুর্চিখানার পেছনের পথ দিয়ে কোয়ার্টারে গিয়ে পৌঁছোলাম। বারান্দায় একটা ইজিচেয়ার ছিল—তাতে পাতুলে বসলাম। কেন—জানি না, এখানে এসে অবধি এই সমস্ত ব্যাপার-স্যাপার দেখে ভারী ভালো লাগছে। এ জীবনে আমরা কেউই যে ফালতু নই, ইচ্ছে থাকলে, কল্পনাশক্তি থাকলে বা তা বাস্তবে রূপায়িত করার জেদ থাকলে আমরা সকলেই যে, কিছু-না-কিছু করতে পারি জীবনে কমবেশি, এ কথাটা বোধ হয় এখানে না এলে এমন করে বুঝতে পারতাম না।
সাহেব কলকাতায় এক বিরাট অফিসে পাঁচ হাজারি চাকরি করেন। শশীর কাছে শুনেছি অ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে সাহেবের কলকাতার মহলে রীতিমতো নাম আছে। অতবড়ো দায়িত্বশীল কাজ করেও অবসর সময়ে এতবড়ো একটা দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার করা, শুধু তাই-ই নয়, এটা লাভজনকভাবে চালানো, এত লোককে চাকরি দিয়ে, প্রোভাইড করে; যে-সে কথা নয়।
হু-হু করে হাওয়া আসছে টিগরিয়া পাহাড়ের দিক থেকে। হাওয়াটা যেন এক্সপ্রেস ট্রেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বইছে। সঙ্গে বয়ে আনছে শুকনো পাতা, লাল ধুলো, খড়কুটো, পাহাড়ের, মহুয়ার, সাঁওতালি মেয়ের গায়ের গন্ধ। এই হাওয়ায় বসে থাকতে-থাকতে চোখ-মুখ শুকিয়ে ওঠে, ঠোঁট ফেটে যায়, কিন্তু কেমন নেশা-নেশা লাগে।
রাতে ভালো ঘুম হয়নি, ঘুম ঘুম পাচ্ছিল; কিন্তু তবুও এই নতুন চাকরি এবং আমার মালিকের আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব, এবং রুখু হাওয়াটা আমার ঘুম চুরি করে নিয়েছে। বুঝতে পারছি আমি, ভ্যাগাবণ্ড ছেলেটা, যে রোজ দুপুরে কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে তিন ঘণ্টা ঘুমোত কলকাতায়— সে আর কখনো দুপুরে ঘুমোবে না।
আর একটা সিগারেট শেষ করলাম, এমন সময় দেখি দূর থেকে ভজনবাবু আসছেন।
আমাকে দেখেই বললেন, কী মশাই? কেমন বুঝছেন?
ফার্স্ট ক্লাস। আমি বললাম।
তারপর শুধোলাম, এই দুপুরবেলায় কোথায় চললেন?
কোথায় আবার? আমার পুষ্যিদের দেখতে। এখন কার তেষ্টা পেল-না-পেল দেখতে হবে, জল খাওয়াতে হবে, এই গরমে দুপুরের কষ্ট কার কতটুকু কী করে কমানো যায়, তার তদবির তদারকি করতে হবে।
তারপর বললেন, আসবেন নাকি? চলুন আমার পুষ্যিদের দেখিয়ে আনি।
উঠে পড়ে বললাম, চলুন।
একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, খাবেন? বাজে সিগারেট।
না:। ভজনবাবু বললেন। ভুসিমাল আমার চলে না। এসব বিষ। সন্ধেবেলা কাজকর্ম সেরে কুয়োর ঠাণ্ডাজলে চান করে এক বোতল মৃতসঞ্জীবনী সুরা পান করি।
আমি বললাম, সেটা কী? কবিরাজি ওষুধ? ‘ডাবর’ কোম্পানির? না ‘সাধনা’ ঔষধালয়ের?
ভজনবাবু বললেন, না না মশায়, ‘লি-অ-এস’।
অবাক হয়ে শুধোলাম, সেটা আবার কী?
—লিকার অব-দ্য-সয়েল। মহুয়া।
বলেই হাসলেন।
ভজনবাবুর সঙ্গে চিড়িয়াখানার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বললাম, আপনারা সকলেই কি এখানে সেটলড। ক-ভাই আপনারা?
উনি বললেন, না, না। আমি একাই এখানে সেটলড কী আনসেটলড যাই-ই বলুন। আমাদের দেশ জয়নগর-মজিলপুর। মোয়া খেয়েছেন? জয়নগরের মোয়া?
বললাম, নিশ্চয়ই।
সেই। আমি সেই মোয়ার দেশের লোক। আমরা তিন ভাই এক বোন। ভজন, পূজন, সাধন। বোনের নাম আরাধনা।
আমি বললাম, এ তো রবিঠাকুরের কবিতা।
উনি বললেন, আজ্ঞে।
তারপর বললেন, ওয়াইফের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। ফ্যামিলি প্ল্যানিং কমপ্লিট করব তিন ছেলে-মেয়ে দিয়ে। রবিঠাকুরের কবিতাও কমপ্লিট করে দেব। তিন ছেলের অথবা মেয়ের নাম রাখব; সমস্ত, থাক এবং পড়ে।
আমি হেসে উঠলাম। বললাম, চমৎকার।
আজ্ঞে, ইয়েস। বলেই, একটিপ বড়ো নস্যি নিলেন।
ভজনবাবু বললেন, আমার সবকিছুই চমৎকার।
ভজনবাবুর সঙ্গে চিড়িয়াখানায় ঢুকলাম।
দু-পাশে সারি সারি ঘর। তাতে নানারকম পাখি আর জানোয়ার। ভজনবাবু চেনাতে চেনাতে চললেন।
একটা সাঁওতালি মেয়ে পশুপাখিদের জল দিচ্ছিল। ভজনবাবু ডাকলেন, ফুলমণি—।
ফুলমণি বলে মিষ্টি ছিপছিপে মেয়েটি বলল, কী বলছিস রে বাবু?
একটু বেশি করে জল দাও মা। তোমরা আমাদের পিয়াসি রাখো রাখো, বাঁদর, পাখিদের বেলা তো একটু হাত খুলতে পারো।
ফুলমণি কথাটা বুঝল না, তবে বুঝল যে, তাকে নিয়ে রসিকতা করা হচ্ছে।
বলল, ইয়ার্কি করিস কেনে রে সবসময়?
ভজনবাবু বললেন, এই বাবু নতুন। আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট।
পরক্ষণেই বললেন, গোরুরগাড়ির হেডলাইট।
আমি শুধোলাম, এতগুলো বাঁদর কেন?
ভজনবাবু বললেন, মানুষের মতো দেখতে হলেই যেমন মানুষ হয় না, বাঁদরের মতো দেখতে হলেই বাঁদর হয় না। বুঝছেন মশায়। এই যে সামনে দেখছেন...
আমি বললাম, ভজনদা, আর ‘আপনি’ চালাবেন না, ‘তুমি’ করেই বলুন।
—বেশ। তথাস্তু—কিন্তু তোমার নামটা যেন কী?
—টিকলু।
—‘টিকলু’ কথার কোনো মানে আছে? না প্রপার নাউন?
—প্রপার নাউন।
—তবে তোমার একটা নাম দেওয়া যাবে।
ভালো। আমি বললাম, বউরানি তো ইতিমধ্যেই নাম দিয়েছেন পাতিকাক।
—আমার নাম দাঁড়কাক। আমি জানি।
ভজনদা বললেন।
—জানেন?
আমি অবাক গলায় শুধোলাম।
তারপরেই ভজনদা আবার বললেন, এই যে সামনে দেখছ, এটা আফ্রিকান গিব্বন—তার পাশের খাঁচায়—এটা উল্লুক—বাঁদর নয়।
আমি অবাক গলায় বললাম, ওঃ ওটা উল্লুক?
ভজনদা বললেন, ইয়েস।
ডালহাউসি স্কোয়ারে চোখ খুলে চললে দেখবে অনেক উল্লুক প্যান্ট-হাওয়াই শার্ট পরে চলে যাচ্ছে।
তারপর বললেন, তার পাশের খাঁচায় দিশি বাঁদর।
পরক্ষণেই ভজনদা বললেন, এই বাঁদরটা ভারি অসভ্য। এমন করে দু-পা ফাঁক করে কোনো মহিলার বসা উচিত? এ শালিকেও একটা নাইটি বানিয়ে দিতে হবে সাহেবকে বলে। আচ্ছা তুমিই বলো। যত লজ্জা কি মহিলাদেরই? আমরা ব্যাটাছেলেরা কি লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে বসে আছি?
তারপর বললেন, ওই দ্যাখো, তার ওপাশের ঘরে লায়ন-টেইলড বাঁদর, তার পাশের ঘরে স্টাম্পড-টেইল বাঁদর। বাঁদরে-বাঁদরে একাকার।
পাখিরা যেদিকে আছে সেদিকে গিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল কতরকম রং-বেরঙের ম্যাকাও, প্যারাকিট, ফোজেন্ট, ক্যানারি, বদ্রী, কাকাতুয়া যে, তার ইয়ত্তা নেই।
ভজনদা বললেন, প্যারাকিট কতরকম হয় জানো?
না:। আমি বললাম।
হয় আরও অনেকরকম। আমাদের কাছে আছে রোজেলা—এগুলো নানা রং হয়। ‘রেড-রাম্প’—এদের কোমরের কাছটা লাল। কালো ঠোঁট। ‘ব্রুক’—দ্যাখো গা-টা খয়েরি, বুকের কাছটা লাল। আর ওই দ্যাখো ‘ককলেট’—এগুলো সাদাও হয়, ছাই রঙাও হয়—।
তারপর দম নিয়ে বললেন, এবারে চলো ফেজেন্টস দেখাই। এগুলো সিয়ামিজ ফায়ার-ব্যাক—গাটা কালো, পেছনটা লাল। মাদিগুলোর গায়ে খয়েরি ছিট ছিট হয়। আর ওই দ্যাখো সোনালি ফেজেন্টটা ওদের নাম গোল্ড ফেজেন্ট।
আমি বললাম, ওই কোণায় যে, বিরাট বাদামি রঙা কাঠবিড়ালিটা শুয়ে আছে ওটা কি কাঠবিড়ালি?
হ্যাঁ, কাঠবিড়ালি। ওগুলো এর চেয়েও বড়ো হয়। এদের নাম হিমালয়ান স্কুইরেল। উড়িষ্যার গভীর জঙ্গলেও পাওয়া যায় শুনেছি।
কচ্ছপের খাঁচাটার সামনে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে আমি বললাম যে, এতবড়ো কচ্ছপ? এ তো কলকাতার চিড়িয়াখানাতেও দেখেছি বলে মনে হয় না।
ভজনদা বললেন, এদের বলে, সাউথ ইণ্ডিয়ান লায়ন-টরটয়েস। গায়ের ওপর কেমন চৌকো চৌকো সন্দেশের ছাঁচের মতো ছাঁচ দেখেছ?
সবিস্ময়ে আমি বললাম, এই স-ব পশুপাখির দায়িত্ব আপনার?
—ইয়েস। সব আমার। শুধু কি তাই? কত যে কমপ্লিকেশান হয় তা কী বলব। এই তো গত সপ্তাহে ক্যানারির ডিম হবে—ডিম আর বেরোয় না— সে কী গব্ব-যন্ত্রণা—ক্যানারির যত-না কষ্ট, সাহেবের কষ্ট যেন তার চেয়েও বেশি। যেন সাহেব-ই ছেলে বিয়োবেন এমন করে পেটে হাত দিয়ে আথালি-পাতালি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এদিকে পাখিও কষ্টে মারা যায় আর কী! শেষে কলকাতায় ট্রাঙ্ককল হল। ভেট এল। ক্যানারির সিজারিয়ান-সেক্সন অপারেশন হল। তারপর ডিম বেরুল। সাহেব ঠাণ্ডা হলেন। তারপর বললেন, ঝামেলা কি কম! এই চিড়িয়াখানায় বেঁচে থাকাটাই একটা দারুণ ঝামেলা।
আমি বললাম, আপনি এতসব শিখলেন কী করে?
—ইচ্ছা থাকলেই শেখা যায়। সাহেবের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দেখে দেখে শিখলাম।
—সাহেব-ই বা এসব শিখলেন কোথায়? তিনি তো অ্যাকাউন্টটেন্ট।
—ওঁর শখ ছিল, ইচ্ছা ছিল। শখ আর ইচ্ছা থাকলে কিনা শেখা যায়?
চিড়িয়াখানায় ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে কখন যে, পাঁচটা বাজতে চলল খেয়াল-ই ছিল না।
ভজনদার কাছ থেকে ছুটি নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে এগোলাম।
বাড়ির কাছে পৌঁছেই দেখি, একটি সাঁওতালি মেয়ে পড়ন্ত রোদ্দুরে লনঝাঁট দিয়ে উড়ে-পড়া শুকনো পাতা, ফুল, ধুলো সব সরাচ্ছে।
মেয়েটি আমাকে দেখেনি। সে আমার দিকে পাশ ফিরে কোমর বেঁকিয়ে ঝাঁট দিচ্ছিল।
ভারি সুন্দর লাগছিল তার সেই ঝাঁট দেওয়ার ভঙ্গিটি। সুন্দর মরালী গ্রীবা, কাটা-কাটা নাক-মুখ, একটা রঙিন ছাপা শাড়ি পরেছে, হলুদের মধ্যে লাল ফুল-ফুল, সঙ্গে হলুদ ব্লাউজ, মাথায় হলুদ ফুল গুঁজেছে, তার গায়ের চিকন কালো রঙে সেই হলুদ-লালের যে কী বাহার খুলেছে তা কী বলব!
আমি বাড়ির কাছে যেতেই ও আমাকে দেখল।
দেখেই এমন করে আমার দিকে তাকাল যে, আমার প্রায় ভিরমি খাওয়ার অবস্থা হল। মনে হল বুকের মধ্যে চাসনালার দুর্ঘটনা ঘটে গেল। হু হু করে হৃদয়ে শ্বাসরোধকারী গ্যাসী-জল ঢুকতে লাগল চতুর্দিক থেকে।
আমি ওর দিকে আর না তাকিয়ে সোজা বাড়ির দিকে চললাম।
সাহেব সবে বুদ্ধুর হাত ধরে বেড়াতে বেরিয়েছেন।
সাড়ে ছ-ফিট লম্বা অতবড়ো সাহেবের পাশে বাঁদরটাকে লিলিপুটের দেশের লোক বলে মনে হচ্ছিল। সাহেবের হাঁটুরও অনেক নীচে ছিল বুদ্ধুর মাথা।
আমাকে দেখেই বললেন, শোনো টিকলু, একটু আগেই ট্রাঙ্ককল এসেছিল। মুম্বাইতে আমার একটা কনফারেন্স আছে—কাল সকাল দশটা-পঁয়তাল্লিশের ফ্লাইটে আমায় মুম্বাই যেতে হবে। তাই আমি আজ পাঞ্জাব মেলে চলে যাব রাত দুটোয়। পরশু সকালে ‘মিথিলা’ এক্সপ্রেসে আমার কয়েক-জন গেস্ট আসবেন। কলকাতা থেকে। পাঁচ-জন অ্যাডাল্ট, দু-জন বাচ্চা। গোমিয়া থেকে একটি কাপল—তিনটি বাচ্চা। তাঁরা গাড়িতে আসবেন।
তারপর একটু থেমে বললেন, বউরানি অবশ্য থাকবেন। যাঁরা আসছেন, তাঁরা আমার বিশেষ বন্ধু। যত্ন-আত্তির ত্রুটি কোরো না কোনো। ভালোই হল, চাকরিতে বহাল হতে-না-হতেই ইণ্ডিপেণ্ডেন্টলি কাজ করার সুযোগ এল তোমার।
তারপর বললেন, প্রুভ ইয়োর ওয়ার্থ।
আমি মুখ নীচু করেছিলাম।
বললাম, চেষ্টা করব।
তারপর বললাম, বুদ্ধুর তো টিবি হয়েছে আর আপনি ওর সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠতা করছেন, আপনার কিছু হবে না তো?
সাহেব হাসলেন। বললেন, দুর, বাঁদরের টি বি আর মানুষের টি বি এক নয়। কিন্তু টি বি রোগটা অরিজিন্যালি গোরুর থেকে মানুষে এসেছিল। একথা জানো কি?
আমি মাথা নাড়লাম।
মনে মনে বললাম, বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি?
হঠাৎ গম্ভীর মুখে সাহেব বললেন, বুদ্ধুটা আর বেশিদিন বাঁচবে না। মনে হয় ও কিছুদিনের মধ্যেই মারা যাবে। তোমাকে বলে যাই, ও যদি আমার অনুপস্থিতিতে মারা যায়, তাহলে ওকে ওই লাইব্রেরির কাছে জামগাছের নীচে কবর দিয়ো। ওর জন্যে চন্দনকাঠের কফিন তৈরি করা আছে। বাঁদরদের কী ধর্ম জানি না। তাই সাঁওতাল পুরোহিতকে বলে রেখেছি, সে এসে বুদ্ধুর লাস্ট রাইটস পারফর্ম করবে।
ওকে কবর দেওয়ার পর থেকে, মালিকে বলবে কবরের ওপরে সন্ধেবেলায় ধূপ আর ইউক্যালিপটাসের পাতা পুড়বে।
তারপর বললেন, আর শোনো, রোজ সকালে একছড়া পাকা কলা দেবে ওর কবরের ওপরে।
মনে মনে ভাবলাম, আহা! সাহেবের বাঁদর হলেও এ জন্মের মতো বেঁচে যেতাম।
সাহেব বুদ্ধুর গাল টিপে আদর করে বললেন, এরকম পত্নী-প্রেম আমি মানুষের মধ্যেও দেখিনি। ওর স্ত্রী গোপা খুব সুন্দরী মহিলা ছিল এবং প্রচন্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্না। প্রেমও ছিল দু-জনের ভীষণ। গোপা মারা যেতেই বুদ্ধু খাওয়া-দাওয়া একেবারে বন্ধ করে দিল—এই টি বি বাধাল স্রেফ না খেয়ে।
ওই জামগাছের নীচেই গোপারও কবর আছে। তার পাশেই যেন বুদ্ধুকে কবর দেওয়া হয়। অবশ্য ভজনকে এ সম্বন্ধে আগেই বলে রেখেছি। তোমাকেও বললাম।
সাহেবের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছিলাম।
সাহেব বললেন, সব ক-টা বাড়ি ঠিকমতো ঝাড়পোছ হল কি না দেখে এসো। টি-হাউসের ভেতরের ঘরের আলো জ্বলছে না। ইলেকট্রিসিয়ান আছেন আমার পার্মানেন্ট স্টাফ। তাঁকে খবর দিয়ে কাল সকালের মধ্যেই ওগুলো ঠিক করে নিয়ো।
তারপর বললেন, আমার সঙ্গে থাকার দরকার নেই এখন তোমার। তুমি বউরানির কাছে যাও। উনি ছুটি দিলে তোমার ছুটি। প্রথম দিনেই বেশি খাটুনি করতে হবে না।
বউরানির কাছে গিয়ে হাজির হলাম। দেখলাম, বউরানি মেঝেতে বসে পান সাজছেন। পাশে একটা রুপোর হাঁস রাখা আছে। এক-একটা পান সাজছেন, আর সেই হাঁসের পেটে ঢোকাচ্ছেন। হাঁসের পেটে ডিমের বদলে পেট-ভরতি পান হয়ে যাওয়ার পর হাঁসের ডানা খুলে বউরানি গোলাপজল ছিটিয়ে দিয়ে হাঁসটাকে সটান ফ্রিজের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন।
এতক্ষণ এমন মনোযোগের সঙ্গে পান সাজছিলেন উনি যে, আমার অস্তিত্ব টের-ই পাননি।
হঠাৎ মুখ তুলে আমাকে দেখতে পেয়ে বললেন, কী চাও টিকলু!
বললাম, আমি কিছু চাই না। সাহেব বললেন, আপনার কাছে আসতে।
বউরানি বললেন, তোমার সাহেবের বাঁদর-পাখির ওপর যেটুকু দরদ ও মানুষের ওপরে, আমি—সুদ্ধু; তার ছিটেফোঁটাও নেই। জান তো, তোমার সাহেবের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়নি।
—মানে?
আমি অবাক হয়ে শুধোলাম।
মেমসাহেব বললেন, বিয়ের সময় নাপিত তোমার সাহেবকে মালাটা এগিয়ে দিতে গিয়ে ভুল করে সে নিজেই সেটা আমার গলায় পরিয়ে দিয়েছিল। যে আসল বর সে কোথায় হারিয়ে গেল—আর সারাজীবন কাটল এই উন্মাদের সঙ্গে।
তারপর একটু থেমে বললেন, আজ-ই তো তোমার প্রথম দিন—রাতেও তো ঘুম হয়নি। প্রথম দিন-ই কি তোমার সাহেব তোমার পরীক্ষা করেছেন?
তারপর বললেন, যাও এখন আর কী কাজ? রাতে খেয়ে নিয়ে কাল সকালে এসো।
আমি ছুটি পেয়ে বাড়ির হাতার মধ্যে একা একা পায়চারি করে বেড়াতে লাগলাম। এতবড়ো কম্পাউণ্ড যে, বাড়ির মধ্যে ঘুরে বেড়ালেই পায়ে ব্যথা ধরে যায়।
এখন বেলাশেষের ম্লান রোদে টিগরিয়া পাহাড়টা ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে। বেলা পড়ে এল, কিন্তু হাওয়ার বিরাম নেই। হাওয়াটা যেন আরও জোর হয়েছে দুপুরের চেয়েও। এখন হাওয়াটা আগুনের মতো গরম। এখনও পাতা-ফুল উড়ে আসছে লাল ধুলোর সঙ্গে মাইলের পর মাইল দূর থেকে।
চিড়িয়াখানা থেকে ময়ূর ডাকছে, ম্যাকাও ডাকছে, সন্ধের আগে সব পাখিরা ডাকাডাকি শুরু করেছে। উল্লুক, উক-উক-উক-উক করে উঠল।
ধীরে ধীরে বেলা পড়ে আসতে লাগল। রাধাচূড়া গাছে গাছে ফুল ছেয়ে আছে। চিড়িয়াখানার কোকিলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে জংলি কোকিল কৃষ্ণচূড়া গাছের মগডালে লালের মধ্যে তার কালো শরীর লুকিয়ে বসে গলা-ফুলিয়ে ডাকছে ‘কুহু-কুহু-কুহু’। আহা! এমন ডাক যে, আমার মতো বাউণ্ডুলে, ছন্নছাড়া, একলা লোকের বুকের মধ্যেটাও উহু-উহু করে ওঠে।
কিছুক্ষণ পায়চারি করার পর আমার কোয়ার্টারে এলাম। কুঁজো থেকে গড়িয়ে ঠাণ্ডা জল খেলাম একগ্লাস। বিকেলে চা খেয়েছি, আর এককাপ চা হলে বড়ো ভালো হত। বউদি বাড়িতে আদরে-আদরে আমার মাথাটি খেয়েছে একেবারে।
বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে সাতপাঁচ ভাবছি, ইউক্যালিপট্যাস গাছের ডালের ফাঁক দিয়ে সবে দ্বাদশীর চাঁদ উঠেছে, এমন সময় মেহবুব হঠাৎ ট্রেতে করে চা এনে হাজির।
বলল, মেমসাহেব আপনার জন্যে পাঠিয়ে দিলেন।
দেখি ট্রের ওপরে টি-পটে চা, সঙ্গে নোনতা মাঠরি।
বউরানিকে মনে মনে কী যে ধন্যবাদ দিলাম, তা আমিই জানি।
বউরানি যেন আমার মায়ের মতো, মনের কথা না বলতেই বুঝে ফেলেন।
চা খেতে খেতে অন্ধকার হয়ে এল। কাছেই কোথাও হাসনুহানা ফুটেছে। কী সুন্দর গন্ধ। হাওয়ার সঙ্গে ঝলক ঝলক, মহুয়ার গন্ধও আসছে।
ইজিচেয়ারে বসে সেই অন্ধকারের হাওয়ার শব্দটা সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ বলে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন কোন অচেনা সমুদ্রের পারে চাঁদ-ওঠা বালিয়াড়িতে বসে আছি আমি। একা একা বসে হাওয়ার সঙ্গে চাঁদের সঙ্গে, ফুলের গন্ধের সঙ্গে, নিরুচ্চারে কত কী কথা বলছি।
এমন সময় হঠাৎ আমার-ই সমবয়সি একটি ছেলে কাঁকরের ওপর চটিতে কিরকির শব্দ তুলে বারান্দায় এসে উঠল।
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম।
ভদ্রলোক বললেন, বসুন মশাই, বসুন। আমি কি আর সাহেব যে, আমাকে এত সম্মান করতে হবে?
আমি তখনও দাঁড়িয়েই বললাম, আপনি?
ভদ্রলোক বারান্দার আলসেতে বসে পড়ে বললেন, আমার নাম নবীন রায়, আমি চিড়িয়াখানার গ্রিনহাউসের দেখাশোনা করি।
তারপর বলল, গ্রিনহাউস দেখেছেন?
আমি বললাম, না তো!
নবীনবাবু বললেন, ঠিক আছে, সব দেখবেন। তাড়া কীসের?
তারপর-ই বললেন, এখন ছুটি?
হ্যাঁ। আমি বললাম।
নবীনবাবু বললেন, চলুন একটু বেড়িয়ে আসি।
তারপর-ই বললেন, কাল থেকে শালার সাইকেলটার টায়ারটা পাথর লেগে চিরে রয়েছে—। চলুন হেঁটেই যাই।
—কোথায়?
—আরে চলুন-ই না!
নবীনবাবুর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে গেটে এলাম।
দারোয়ান আমাদের ছেড়ে দিল স্টাফ বলে।
দেখলাম, দারোয়ানের সঙ্গে নবীনবাবুর বেশ সদ্ভাব।
নবীনবাবু গেট পেরোতে পেরোতে বললেন, কেয়া? লায়গা রামস্বরূপ।
—লাইয়ে একঠো।
আমি শুধোলাম, কী?
নবীনবাবু হাসলেন। বললেন, মহুয়া।
বেশ অনেকক্ষণ জ্যোৎস্নালোকিত পথে ধুলো মাড়িয়ে, গাছগাছালির পাতায় পাতায়, ঝরনা ঝরানো হাওয়ায় ভেসে চললাম আমরা। দু-পাশে চন্দ্রালোকিত লালমাটির ধু-ধু টাঁড়, খোওয়াই; ক্বচিৎ শাল ও মহুয়া। পথের পাশের একটা বাড়িতে নাম-না-জানা লতায় ফুল ধরেছে। পথের সে জায়গাটা গন্ধে ম ম করছে।
বেশ অনেকক্ষণ হেঁটে যাওয়ার পর আমরা একটা জায়গায় এসে পৌঁছোলাম।
দূর থেকেই মনে হল যে, এটা একটা ভাঁটিখানা।
নবীনবাবু চোখ নাচিয়ে শুধোলেন, চলে?
আমি বললাম, না, নবীনবাবু।
নবীনবাবু বললেন, সে কী মশায়? কলকাতার ছেলে এসব চলে না কীরকম?
লজ্জিত মুখে বললাম, চলে না মানে, কোনোদিনও চলেনি তাই।
ডোবালেন মশাই। নবীনবাবু বললেন।
তারপর স্বগতোক্তির মতো বললেন, সারাজীবন কি আমাকে ভজনদার শাগরেদ হয়েই কাটাতে হবে নাকি।
ভাঁটিখানায় আলো জ্বলছিল হ্যারিকেনের। শালকাঠের খুঁটি দেওয়া মাটির বাড়ি, নিরিবিলি শালগাছের নীচে। চারধারে শালপাতার দোনা ছড়ানো-ছিটোনো ছিল। কিছু মেয়ে-পুরুষ ভাঁটিখানার সামনে ও ভেতরে, দাঁড়িয়ে-বসে ছিল। একটা অলস, মন্থর, পরিবেশে সমস্ত জায়গাটিতে।
আমি শুধোলাম, জায়গাটার নাম কী?
মিরিডি! নবীনবাবু বললেন।
বললাম, আচ্ছা এখানের বেশিরভাগ জায়গায় নামের শেষে এমন ‘ডি’ কেন? এই ‘ডি’-র কোনো মানে আছে?
নবীনবাবু হাসলেন। বললেন, ‘ডি’ হচ্ছে ‘ডিহ’। ডিহ হল সাঁওতালি ভাষায় বাড়ি বা গ্রাম।
এমন সময় ভাঁটিখানার ভেতর থেকে জড়ানো-গলায় কে যেন হঠাৎ বাংলায় গান গেয়ে উঠলেন—
শ্যামা মা যে, আমার কালোকালো রূপে দিগম্বরী;হৃদিপদ্ম করে যে আলো রে—শ্যামা মা যে, আমার কালো।
নবীনবাবু খরগোশের মতো কান খাড়া করে শুনলেন একমুহূর্ত, তারপর-ই বললেন, ভজনদা।
বলতে-না-বলতেই ভজনদা বাইরে বেরিয়ে এলেন, হাতে মহুয়ার বোতল নিয়ে।
আমাকে দেখেই বললেন, এ কী! হাউস-কিপিং ম্যানেজার হাউসের বাইরে কেন?
আমি উত্তর করার আগেই ভজনদা বললেন, আমিও আজ চলে এলুম। আজ সাহেব মনে বড়োদুক্কু দিলেন। সেই দুক্কু ভোলার জন্যেই চলে এলুম।
নবীনবাবু গলা নীচু করে বললেন, মাল খাবে খাবে, তারজন্যে এত দুঃখের দোহাই কেন রে বাবা? মাল কি বাপের পয়সায় খাচ্ছ না, শ্বশুরের পয়সায় খাচ্ছ?
আমি বললাম, আহা! বেচারা সত্যিই হয়তো দুঃখ পেয়েছেন কোনো কথায়।
নবীনবাবু বললেন, রাখুন ভজনদার দুঃখ। রোজ-ই উনি দুঃখ পান। কোনোদিন সাহেব দেন, কোনোদিন মেমসাহেব দেন। কোনোদিন বাঁদর, কোনোদিন উল্লুক, কোনোদিন কচ্ছপ—ওঁর দুঃখ পেতেই হবে কারও-না-কারও কাছ থেকে সন্ধেবেলায়।
ভজনদা আমাদের ওভারহিয়ার করে বললেন, কীরে নবনে, আমার সম্বন্ধে টিঙ্কুকে কিছু বলেছিস? এখন থেকেই মন বিগড়োচ্ছিস?
তারপর-ই আমার দিকে বোতলসুদ্ধু হাত তুলে বললেন, এই নবনেটার সঙ্গে মিশো না হে টিঙ্কু।
আমি বললাম, আমার নাম টিকলু!
ওই হল। আমি টিঙ্কুই বলব। কিন্তু ওই ছোঁড়ার সঙ্গে মিশলে আমি সাহেবকে বলে দেব।
আমি তখন সিরিয়াসলি ভাবছিলাম, কার সঙ্গে মিশব তা ঠিক করার সময় হয়েছে। যা সব স্যাম্পেল দেখছি, তাতে বোধ হয় বুদ্ধুর সঙ্গে মেশাই সেফ।
তারপর-ই নবীনবাবুর দিকে ফিরে বললেন, আজ এলি কেন বাপ? আজ যে, তোর পানুই তুই আসার আগেই এক ব্যাটাকে সঙ্গে নিয়ে হেই উদোম টাঁড়ে চলে গেছে। পানুই কি তোর বাঁধা মাগ, না গোয়ালের গাই যে, তোর খুঁটোয় দিনরাত শুয়ে-বসে জাবর কাটবে?
তারপর একটা হেঁচকি তুলে, গলায় ঢেউ খেলিয়ে বললেন, বনকে চিঁড়িয়া, বনমে গিয়া।
নবীনবাবু ফিসফিস করে বললেন, ভজনদা আজ একদম তৈরি।
তারপর বললেন, না:, আজ চলুন ফিরেই যাই। আজ যাত্রা অশুভ। পানুই নেই, তার ওপরে ভজনদা একেবারে ‘হাই’।
আমি বললাম, ‘হাই’ হলে কী করেন উনি?
নবীনবাবু বললেন, উনি কী করেন তার ঠিক কী? অনেক কিছুই করেন। কিন্তু আমার গুরু বলে দিয়েছেন—অন্যে ‘হাই’ হলেই নিজে ‘লো’ হয়ে যাবে। এর চেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ আর নেই।
ভজনদার খ্যানখেনে গলায় গান শুনতে পাচ্ছিলাম—
এসো প্রিয়া হবে মোর রানি,তোমার খোঁপায় পরাব ফুল।কানে ঝুমকো তারার দুল।।
ফিরে আসতে আসতে শুধোলাম, পানুইটি কে? যে চিড়িয়াখানায় কাজ করে, সেই মেয়েটি?
হ্যাঁ। নবীনবাবু বললেন।
তারপর বললেন, চালুপুরিয়া।
আমি শুধোলাম, কেন একথা বলছেন?
নবীনবাবু বললেন, কী বোঝাই জানি না। মানে, ঠাকুমারা যেমন করে নাতি-পুতি হ্যাণ্ডেল করে-না, ও তেমনি করে অ্যাডাল্ট পুরুষ মানুষ হ্যাণ্ডেল করে। ঘুঘুর-সই, ঘুঘুর-সই খেলে—
‘হাত ঘোরালে নাড়ু পাবে নইলে নাড়ু পাবে না’ —বলে, কেউ আবার বেশি কান্নাকাটি করলে দুদু খাইয়ে দেয়। এমন ছেলে-ভুলোনো পাড়াজুড়োনো ঘুম-পাড়ানো মাসি-পিসি আর হয় না।
হাওয়ার তেজটা আস্তে আস্তে কমছে। আমরা দু-জন পাশাপাশি হাঁটছি। পথটার দু-পাশে ছোটো ছোটো ঝোপঝাড়। এদিকে গাছপালা কম। জঙ্গল কেটে প্রায় শেষ করে এনেছে। মাঝে মাঝে দুটো-একটা হরজাই গাছ—বেশিরভাগ-ই ঝাঁটি-জঙ্গল। বাঁ-দিকে একটা পুরোনো ইটের পাঁজা। কখনো বোধ হয় এখানে ইট বানানো হয়েছিল।
ইটের ভাঁটাটার পাশ দিয়ে যখন যাচ্ছি, হঠাৎ নবীনবাবু আমার হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান লাগালেন।
আমি একটা ঝটকায় পেছনে চলে এলাম।
চাঁদের আলোয় দেখলাম, আমার পায়ের সামনে দিয়ে একটা কালো মোটা দড়ি আস্তে আস্তে বাঁ-দিক থেকে ডানদিকে চলে যাচ্ছে।
হঠাৎ নবীনবাবু খেপে গেলেন। দৌড়ে, বাঁ-দিকে গিয়ে পাঁজা থেকে একটা ইট তুলে নিয়ে সেই ধীরে অপস্রিয়মাণ দড়িটার পেছন পেছন দৌড়ে গেলেন, তখন-ই প্রথম বুঝলাম যে, ওটা একটা সাপ!
আমি স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। সাপ দেখলেই আমার গা ঘিনঘিন করে ওঠে। ছোটোবেলা থেকে। শুধু সাপ, কেন? নরম তুলতুলে কোনো কিছু দেখলেই অমন হয়।
নবীনবাবু ততক্ষণে, পথ ছেড়ে মাঠে নেমে গেছেন। যে-সাপ কামড়ায়নি, ফোঁস করেনি, থুথু ছিটোয়নি, নির্বিবাদে পথ দিয়ে চলে গেছে কিছুই না করে—তাকে হঠাৎ তাড়া করে যাওয়ার কী দরকার বুঝলাম না।
একটু পর শক্ত মাটিতে ‘ফটাং ফটাং’ করে ইটের আঘাতের শব্দ শুনে একটু সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে গেলাম ওদিকে।
সবিস্ময়ে দেখলাম, নবীনবাবু উবু হয়ে বসে ইটটা দিয়ে সাপটার মাথাটা বাড়ির পর বাড়ি মেরে একেবারে থেঁতলে দিচ্ছেন।
সাপটা তখনও নড়ছিল।
মাথাটা ঘা মেরে মেরে একেবারে সম্পূর্ণ থেঁতলে দেওয়ার পর নবীনবাবু প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে উঠলেন।
তারপর হঠাৎ সাপটার ল্যাজ ধরে হাতে ঝুলিয়ে আমার দিকে আসতে লাগলেন।
আমি আতঙ্কিত গলায় শুধোলাম, বিষ আছে? বিষ নেই?
—কে জানে?
তাচ্ছিল্যর গলায় নবীনবাবু বললেন।
তারপর বললেন, থাকতেও পারে না-ও থাকতে পারে। আসলে সাপেরা মেয়েদের মতো—। ছোবল না-মারার আগে সব সাপকেই নির্বিষ বলে মনে হয়।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, আপনার আত্মীয়স্বজন কাউকে কি সাপে কামড়িয়েছিল? সাপের ওপর আপনার এরকম তীব্র আক্রোশ কেন?
নবীনবাবু সেই চাঁদের আলোয় লাল ধুলোয় ধূসরিত পথে অনেকক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থাকলেন—যেন আমার মতো ইনকুইজিটিভ লোক এ জন্মে আর দ্বিতীয়টি দেখেননি।
তারপর বললেন, না তা নয়। তবে গুরুবাক্য আমি কখনো অমান্য করি না।
আমি উৎসুক হয়ে শুধোলাম, ‘গুরুবাক্যটা’ কী?
নবীনবাবু বললেন, ‘দেকেচো কী মেরেচো!’
তারপর নিজেই আমাকে শুধোলেন, কি? বুঝলেন কিছু?
আমি বললাম, সাপ?
নবীনবাবু হাসলেন।
সেই চাঁদের আলোতেও তাঁর সাদা দাঁত ঝিকঝিক করে উঠল।
—শুধু সাপ নয়। দেকেচো কী মেরেচো। ফণী—আর.........।
আমি বললাম, থাক থাক। বলতে হবে না। বুঝেছি।
উনি আবার বললেন, আমার গুরু বলেছিলেন।
কথাটার অর্থ হৃদয়ংগম করতে এবং হৃদয়ংগম করে সামলে নিতে আমার অনেকক্ষণ সময় লাগল।
ততক্ষণ নবীনবাবু মরা সাপটাকে ডান হাতে নিয়ে এগিয়ে গেছেন। সাপের ল্যাজটা ধরে আছেন, থ্যাঁতলানো মাথাটা মাটিতে সড়সড় শব্দ করে ধুলোর ওপরে লম্বা দাগ টেনে দিয়ে চলেছে।
সাপটা বেশ লম্বা আর বড়ো ছিল।
আমি তাড়াতাড়ি নবীনবাবুর বাঁ-দিকে চলে গেলাম, মরা সাপকেও বিশ্বাস নেই।
তারপর ওঁর পাশে হাঁটতে হাঁটতে বললাম, গুরুবাক্য তো মানলেন। ফণী তো মারলেন। কিন্তু গুরু কি মরা সাপ হাতে করে নিয়েও যেতে বলেছেন?
নবীনবাবু এবার হেসে ফেললেন।
বললেন, আমার ডানহাত আটকা। একটা সিগারেট ধরিয়ে আমার মুখে পুরে দিন তো?
আমি দাঁড়িয়ে পড়ে, হাওয়া আড়াল করে সিগারেট ধরালাম, তারপর সেই সিগারেট থেকে আরও একটা ধরিয়ে নিয়ে নবীনবাবুকে দিলাম।
নবীনবাবু একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বাঁ-হাতে সিগারেটটাকে মুখ থেকে নামিয়ে বললেন, সাপটি নিয়ে যাচ্ছি চুমকির জন্যে।
সে কে? অবাক হয়ে শুধোলাম আমি।
চুমকির সঙ্গে ভজনদা এখনও আলাপ করিয়ে দেননি? আশ্চর্য।
তারপরেই বললেন, চিড়িয়াখানার পরি, হুরি, সরি—ময়ূরী। সাহেবের গার্লফ্রেণ্ড। চুমকি সাপ খেতে বড়ো ভালোবাসে। রোজ রোজ তো ফণী দেখা যায় না; অন্যকিছুও অবশ্য না। তবে যখন দেখা যায়, তখন আমি চুমকির জন্যে। আর.........
আমি নবীনবাবুকে তাড়াতাড়ি থামিয়ে দিয়ে বললাম, আর আমি শুনতে চাই না।
নবীনবাবু দাঁড়িয়ে পড়ে আমার মুখের দিকে অপলকে চেয়ে থেকে বললেন, আপনি মশাই একটি মহান্যাকা লোক।
আমি ব্লাশ করলাম।
অস্ফুটে বললাম, যা বলেন।
ভোর চারটেয় উঠলাম। তারপর তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিয়ে গেটে এলাম।
ট্রেনটা স্টেশনে পৌঁছোয় সকাল পাঁচটার পর পর-ই। যে-ট্রেনে আমি সাহেবের সঙ্গে এসেছিলাম।
পান্ডে ড্রাইভার গাড়ি বের করে তৈরি হয়েছিল। যে স্কুটার-টেম্পো চালায়, সেও তার হলুদরঙা টেম্পো নিয়ে তৈরি।
যখন আমরা সাড়ে চারটের সময় বেরোলাম গেট খুলে, তখন পুবে সবে একটু লালের ছোপ লেগেছে। কোকিল ডাকছে, টিগরিয়ার টাঁড় থেকে, দূর কুকরিবাগ গ্রামের দিক থেকে মুহুর্মুহু—কুহু-কুহু-কুহু করে।
ফুর-ফুর করে হাওয়া বইছে ভারি মিষ্টি। এই সাঁওতাল পরগনার বৈশাখী ভোরগুলো ভারি সুন্দর। ‘বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া’ এই গানটা আমার কলকাতার বউদি ভারি ভালো গান।
হঠাৎ-ই গাড়ির সামনের সিটের দরজায় বাঁ-হাত রেখে বসে এই আধো-আলো আধো-অন্ধকারে বউদিকে ভীষণ মনে পড়তে লাগল। আমি কাঠখোট্টা মানুষ, ভাব-টাব কবিত্ব-টবিত্ব প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই—কিন্তু মাঝে মাঝে বুকের মধ্যে কত কী যে, কুরকুর করে উঠে—নিজেকে কুরে কুরে খায়—। একবার ভালো লাগে, পরক্ষণেই দুঃখ লাগে—কারও কথা ভেবে ভীষণ খুশি খুশি লাগে—কাউকে ভালোবাসতে পেরে নিজের পিগমি সাইজের মনটা অনেক বড়ো হয়ে গেছে বলে মনে হয়।
বুঝি না। কেন এমন হয়। হয়তো সকলের-ই হয়—যদি কেউ কখনো কাউকে ভালোবেসে থাকে। কিন্তু হয়।
ভালোবাসার মতো দাগ ভগবান যেন কাউকে না দেন। খালি চুলকোয়—আর চুলকোলেই চুলকোনি বেড়ে যায়। ‘ঢোল’ কোম্পানির মলম আছে দাদের। কোনো কোম্পানি এই দারুণ দাদের মলম যে, কেন বের করে না জানি না। এই জ্বালা, এই আরাম; এ আর সহ্য হয় না।
স্টেশনে পৌঁছে ওভারব্রিজ পেরিয়ে ওপাশের প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দাঁড়ালাম। এমার্জেন্সির পর ট্রেনগুলোএমন টাইমে যাতায়াত আরম্ভ করেছে যে, প্রায়-ই মনে হয় নিজের ঘড়ি খারাপ হয়ে গেছে। কাঁটায় কাঁটায় ভোর পাঁচটা ন-মিনিটে ধুয়ো উড়িয়ে ‘মিথিলা’ এক্সপ্রেস এসে ঢুকল স্টেশনে।
ফার্স্টক্লাসের সামনে জোড়হাতে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি—পবননন্দন যেমন করে রামচন্দ্রকে অভ্যর্থনা করেছিলেন, তেমন করে সাহেবের অতিথিদের আপ্যায়ন করার জন্যে।
আমার চাকরির সেকেণ্ড স্পেসিফিক অ্যাসাইনমেন্ট।
ট্রেন থেকে যাঁরা নামলেন তাঁদের চেহারা ও হাবভাব মোটেই প্রকৃতিস্থ বলে মনে হল না। একজন লম্বা-চওড়া। চাণ্ডিলের বেগুনের মতো গায়ের রং, মাথা-মোটা, হুবহু কাতলা মাছের মতো দেখতে—পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা, পায়ে শুঁড়তোলা নাগরা জুতো। সারারাত বোধ হয় পান চিবিয়েছিলেন—ঠোঁট দাঁত সব লালে লাল।
আর একজন বেঁটে-খাটো, ছিপছিপে, কালো। থুতনিতে একমুঠো ছাগলদাড়ি—তিনি পান খাননি,—কিন্তু তাঁর নীচের ঠোঁটটা এমনিতেই বুলবুলির পশ্চাৎদেশের মতো লাল।
আর একজন যিনি, তাঁকেই একমাত্র ভদ্রলোকের মতো দেখতে—কাঁধে ঝুলোনো কালো চামড়ার একটি বাক্স। সঙ্গে দু-জন মিষ্টি, নেকু নেকু মহিলা ও দু-টি বাচ্চা দেখলাম। এঁরা কার-কার স্ত্রী বুঝলাম না।
সাহেবের অতিথিদের ওভারব্রিজ পেরিয়ে প্রশেসান করে এসকর্ট করে নিয়ে যেতে লাগলাম। এঁদের সঙ্গেও লটবহর কম নয়। কাতলা মাছ ছাড়া আর দু-জনের কাঁধেই ভেড়ার ঠ্যাং-এর মতো কী একটা করে চামড়ার যন্তর ঝুলছে। কোনো বাজনা-টাজনা হবে বোধ হয়। বড়োলোকদের কারবার—আমি কতটুকু আর জানি। তবে এটুকু বুঝলাম ভদ্রলোকদের দেখেশুনে যে, চিড়িয়াখানায় আরও কিছু জন্তু, জানোয়ার তিন-চারদিনের জন্যে অতিথি হলেন।
সকলকে গাড়িতে তুলে দিলাম। লটবহর সব গাড়ির ক্যারিয়ারে, বুটে ও স্কুটার-টেম্পোতে এঁটে গেল।
স্টেশন থেকে বেরোতে বেরোতেই রোদ উঠল। সকাল থেকেই যা রোদের তাপ, কলকাতার মাখন-মাখন সুন্দরীরা যে, কী গলান গলবেন দুপুরে তা ভেবেই আনন্দ হল।
পান্ডে আগে সাহেব মেমসাহেবদের নিয়ে চলে গেল। আমি স্কুটার-টেম্পোতে সাহেবের বন্ধুর ছোটোমেয়ের হিসিকরা কাঁথার বাণ্ডিল, আধ-কামড় দেওয়া সন্দেশের বাক্স, কল-লাগানো গরম কাপড়-জড়ানো রুপোর জলের বোতল এসব সামলাতে সামলাতে পাথর-ছড়ানো পথে ‘হিক্কা’ তুলতে তুলতে সামনের গাড়ির চাকায়-ওড়া কিলোখানেক ধুলো খেয়ে ব্রেকফাস্ট করে যখন চিড়িয়াখানায় এসে পৌঁছোলাম, তখন দেখলাম আসর জমে গেছে।
মেমসাহেব নিজে আমগাছের নীচের গোল শ্বেতপাথরের টেবিলে চা ও খাবার নিয়ে বসে অতিথিদের আপ্যায়ন করছেন।
চা, নোনতা মাঠরি, রসকদম, চকোলেট, সন্দেশ ইত্যাদি দিয়ে সাহেবের অতিথিরা ব্রেকফাস্ট করছেন।
মুখের ধুলোগুলো নামাবার জন্যে আমি বাবুর্চিখানায় গিয়ে রামকে বলে একগ্লাস চা নিয়ে তাড়াতাড়ি গিলে ফেললাম।
কাতলা মাছ ভারি ইন্টারেস্টিং বলে মনে হল। ইতিমধ্যেই গান জুড়ে দিয়েছেন তিনি। রবীন্দ্রসংগীত। রবীন্দ্রনাথের গানের কথা এবং সুরের সঙ্গে সেই রবীন্দ্রসংগীতের কোনো মিল নেই। রবীন্দ্রনাথ ও দীনুঠাকুর যদি চিরদিন মেইন লাইনে গিয়ে থাকেন তো কাতলা মাছ বরাবর কর্ড লাইনে। গলার স্বরটা হাঁড়ির মধ্যে মুখ করে কথা বললে যেমন আওয়াজ হয়, অনেকটা তেমন।
ভাবলাম, চাকরি করতে হলে মানুষের কতরকম অত্যাচার-ই না সহ্য করতে হয়!
ইতিমধ্যে সেই ছাগল-দাড়ি ভদ্রলোক কাঁধের ভেড়ার ঠ্যাংটা খুলে ফেললেন।
ওমা:, বাজনা নয়; দেখি একটা বে-জোড় বন্দুক।
খুলে ফেলেই বন্দুকটা জোড়া লাগিয়ে ফেললেন—লক-স্টক ব্যারেল।
তাহলে সবগুলোই বন্দুক!
মেমসাহেব বললেন, টিকলু, এঁরা সব বিখ্যাত শিকারি। তুমি পান্ডের সঙ্গে এঁদের বিকেলে টিগরিয়া পাহাড়ের নীচে নিয়ে যাবে তিতির মারবার জন্য। পান্ডে জানে, কোথায় তিতির থাকে বিকেলে।
আমি মাথা নাড়লাম।
একটু পরেই একটি নতুন কচি-কলা-পাতা রঙা অ্যাম্বাসাডর গাড়ি এসে উপস্থিত হল।
তা থেকে ফুটফুটে তিনটি বাচ্চা ও হেমামালিনী ও সিম্মিকে একসঙ্গে ব্রাহ্মীশাক দিয়ে হাঁড়িতে সেদ্ধ করলে যেরকম সৌন্দর্য হয় তেমন-ই সুন্দরী এক মহিলা বাঁ-দিকের দরজা দিয়ে নেমে ফিক করে হাসলেন। ডান দিকে দেড়খানি গজদন্ত।
তারপরে তাঁর স্বামী নামলেন।
একটা শেতলপাটিকে গোল করে পাকিয়ে মাটিতে শুইয়ে তার ওপর দিয়ে স্টিম-রোলার চালিয়ে দিলে যেমন চ্যাপটা, ফ্যাকাশে, লেন্থ-উইদাউট-ব্রেথ একটা ব্যাপার হয়, ভদ্রলোক ঠিক তেমন দেখতে। উনিও হাসলেন। হাসিটাও চ্যাপটা দেখাল। এবারে নরক গুলজার।
হঠাৎ মেমসাহেব বললেন, টিকলু, ডেয়ারি আর পোলট্রি থেকে ডিম আর দুধের রিকুইজিশন স্লিপ পাঠিয়ে ওগুলো আনিয়ে নাও। বাজারের লিস্ট আমি করে রেখেছি। পানটা লিখতে ভুলে গেছি। তুমি তিনশো পান আনবে।
ছাগল-দাড়ি আঁতকে উঠে বললেন, তিনশো পান কে খাবে?
মেমসাহেব একটু হাসলেন। বললেন, এখানে অনেক ছাগলের সমাবেশ—ভাববেন না। দেখতে দেখতে সব পান উড়ে যাবে। আমি ভালো করে পান সাজি তারপর দেখবেন পান কোথায় থাকে।
কাতলা মাছ সন্দেশ মুখে জবজবে গলায় বললেন, বা: বা:। আমি একাই আদ্ধেক খাব।
ভাবলাম বলি, রামছাগলে তাই-ই খায়।
আমি চলে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ মেমসাহেব ডেকে বললেন, শোনো আজ আমি এদের নিয়ে থাকব। তুমি ভাই আজ পাঠশালা চালাবে।
আমি মাথা নাড়লাম। আমার মুখটা কেমন দেখাল তা ওঁরাই বলতে পারতেন।
আমার কাজকর্ম শেষ হতে না হতেই, মেমসাহেব তলব করলেন। বললেন, পোড়োরা এসে গেছে, এইবার তুমি ওদের নিয়ে পড়ো।
চিড়িয়াখানা আর গ্রিনহাউসের মাঝামাঝি একটা বড়ো চাঁপাগাছের নীচে গোল সিমেন্টের বেদি। তার নীচে গোটা বারো-সাত থেকে দশ বছরের বাচ্চা ছেলে জমায়েত হয়েছে। সকলেই প্যান্ট-শার্ট পরে আছে; সব একরকম। সবুজ রঙের। বুঝলাম, মেমসাহেবের-ই দান।
সংস্কৃততে আমি পনেরো পেয়েছিলাম—স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায়। ফলে ফেল করেছিলাম। আমি হিন্দি সিনেমা দেখে হিন্দি একটু বলতে শিখেছি কিন্তু পড়তে পারি না। ছেলেগুলোর সকলের হাতেই দেখলাম হিন্দি ‘অ আ ক খ’-র বই।
ছেলেবেলা থেকে একটা সাধ ছিল যে, শান্তিনিকেতনে বাংলার অধ্যাপক হব। আম্রকুঞ্জে, এমন-ইবৈশাখী ভোরের হাওয়ায় আমি ধুতি-পাঞ্জাবি পরে, কাঁধে পাট করে চাদর ঝুলিয়ে বসব—আমার সামনে গোল হয়ে বসে থাকবে একগুচ্ছ রজনিগন্ধার মতো সুন্দরী, সুরুচিসম্পন্না যুবতীরা, আর আমি তাদের ‘শেষের কবিতা’ পড়াব।
কিন্তু কী অ্যান্টিক্লাইম্যাক্স! আজ সেই বৈশাখী ভোরেই আমি বসে আছি। ফুটন্ত জীবন্ত চাঁপারা নেই—বসে আছি একটা কেঠো কাঁঠালিচাঁপা গাছের নীচে—আর হাতে উলটো করে ধরা একটা হিন্দি বই।
আমি বললাম, বোলো বাচ্চে, ‘অ’।
ওরা বলল, ‘ও’।
বললাম, বোলো, ‘আ’।
ওরা বলল, ‘ইয়া’।
বুঝলাম, আমার চাকরিটা থাকবে না।
ইতিমধ্যে মেহবুবকে হন্তদন্ত হয়ে এদিকেই আসতে দেখা গেল।
মেহবুব এসে বলল, মেমসাহেব বলেছেন আপনাকে এক্ষুনি বাজার যেতে—আমিই পাঠশালা চালাব এখনকার মতো।
ছেলেগুলো ও মেহবুবের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে নি:সংশয় হয়ে আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
বাজার থেকে ফিরতে বেলা হল। রামকে বাজারের জিম্মা ও মেমসাহেবকে পানের জিম্মা দিয়ে আমি চান-টান সারতে আমার কোয়ার্টারের দিকে এগোচ্ছি, এমন সময় ভজনদার সঙ্গে দেখা।
ভজনদা খুব ব্যস্তসমস্ত দেখা গেল।
বললাম, কী ব্যাপার?
—আরে, ব্যাপার আবার কী? সাহেব-মেমসাহেবের আর কী? ‘উঠল বাই তো কটক যাই।’ আজ তোমাকে এবং আমাকে ওঁদের তিতির মারতে নিয়ে যেতে হবে বিকেলে। কাল পূর্ণিমার রাতে সুজানী গ্রামে সাঁওতালি নাচের বন্দোবস্ত করতে হবে। কুকরিবাগ, বদলাডি ও সুজানী তিন গ্রামে মেয়ে-মদ্দ জড়ো করতে হবে সুজানীর বড়ো অশ্বত্থ গাছতলায়। তাদের জন্যে বিস্তর মহুয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে। সেখানে নাচ-গান হবে সারারাত।
তারপর বললেন, আরে অর্ডার দিলেই তো হল না, যে ইন্তেজাম করে, সেই বোঝে কী ঝকমারি!
আমি নার্ভাস হয়ে গিয়ে বললাম, বিকেলে তিতির বেরোবে তো ভজনদা? না বেরোলে?
ভজনদা চটে উঠে বললেন, তিতির কি আমার পুষ্যি, যে, আমার কথায় উঠবে বসবে? তাদের ইচ্ছে হলে বেরোবে, ইচ্ছে না হলে বেরোবে না।
যদি না বেরোয়, তাহলে সাহেবরা কী মারবেন?
ভজনদা রেগে গিয়ে বললেন, না বেরোলে আমরাই পেছন ফিরে দাঁড়াব। আমাদের-ই মারবেন। আর কী করতে পারি?
তারপর একটু ঠাণ্ডা হয়ে বললেন, তুমি চললে কোথায়?
বললাম, স্নান করতে।
—অ্যাই দ্যাখো! এ কী তোমার কলকাতা নাকি? চান করে নেবে সকাল-সকাল, জল তখন ঠাণ্ডা থাকে। এখন চান করা-না করা সমান। একেবারে বিকেলে সাহেবদের তিতির-মিতির মারিয়ে ক্লান্ত হয়ে ফিরে এসে সন্ধের সময় চান কোরো। এখন চলো আমার সঙ্গে—পোলট্রিতে একটু কাজ আছে—ঘুরে আসি।
কাল এসে পর্যন্ত পোলট্রিটা দেখা হয়নি। ভাবলাম, ভজনদার সঙ্গে দেখে আসি।
অনেক দূর হেঁটে গেলাম রোদে। হঠাৎ দূর থেকে দূরাগত অদ্ভুত একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম। আওয়াজটা একটা ঝিমধরা সম্মিলিত কাকলি। ওই গমগমে সমুদ্রের হালকা ঢেউ-ভাঙার আওয়াজের মতো আওয়াজ যে, মুরগির আওয়াজ তা অনুমান করার ক্ষমতাও আমার ছিল না।
যতই এগোতে লাগলাম, ততই আওয়াজটা বাড়তে লাগল। একেবারে কাছে যেতে—ভজনদা আমায় কী বলছিলেন, তা শুনতে পর্যন্ত পাচ্ছিলাম না।
পোলট্রির সামনে পৌঁছে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আধুনিকতম কায়দায় লাইটরুফ-এর ছাদ দেওয়া মুরগির লম্বা শেডের পর শেড। সমস্ত সাদা ধবধবে লেগ-হর্ন মুরগি। একটা শেডের কোণায় দাঁড়িয়ে দেখলাম, প্রায় কোয়ার্টার মাইল লম্বা মুরগির খাঁচাগুলোর নীচে লাগানো টিনের স্লিপে ডিম গড়িয়ে আসছে আর খাকি হাফপ্যান্ট ও শার্ট পরা তিনটে লোক ক্রমান্বয়ে সেই ডিম কুড়িয়ে নিয়ে চলেছে একটা ঝুড়ির মধ্যে।
ভজনদা আমার কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, ওরা হচ্ছে কালেক্টর।
—দিনে কত ডিম হয়?
আমি বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে শুধোলাম।
ভজনদা বললেন, এখন গরমের সময়, এখন কম পাই আমরা—তা এখনও প্রায় পনেরোশো থেকে আঠেরোশো হয়। শীতকালে আড়াই থেকে তিন হাজার।
তি-ন-হা-জা-র-? আমি নাভি থেকে শ্বাস টেনে বললাম।
ভজনদা নন-চ্যালান্টলি বললেন, ইয়েস।
হঠাৎ আমার খেয়াল হল যে, শেডের মধ্যে কেবল-ই মুরগি। মোরগ নেই একটাতেও।
ব্যাপারটা আমার পশুপাখির প্রজননবিদ্যা সম্বন্ধে যেটুকু জ্ঞান ছিল, তাতে পরিষ্কার হল না। এই ম্যাজিকটা কী করে সম্ভব হচ্ছে আমার মাথায় ঢুকল না।
ভজনদাকে ভয়ে ভয়ে শুধোতেই উনি আমার দিকে বিস্ময়ের চোখে তাকালেন।
তারপরেই বললেন, ও সরি! তোমার তো বিয়ে-থা হয়নি।
তার পরমুহূর্তেই বললেন, বিয়ে না হলেই বা কী? মেয়ে-ছেলেদের যেমন শীতের সকালে দাড়ি কামাবার কষ্ট ভগবান দেননি তেমন আবার অন্য কিছু কিছু কষ্ট এবং কমপ্লিকেশান ভগবান তাদের দিয়েছেন তা জানো তো? মানে যা পুরুষদের দেননি।
অস্বস্তিতে আমার কান লাল হল।
মুরগিগুলোর দিকে অনেকক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে থেকে বললেন, এই মুরগিগুলো মানুষের মেয়েদের চেয়ে অনেক স্বাধীন। এরা মোরগ ছাড়াই, অন্য কারও কোনো কষ্টকর ও ক্লান্তিকর সহযোগিতা ছাড়াই অবলীলায় মা হয়ে যায়। শশীকলা যেমন আকাশে ক্যালেণ্ডারের তারিখ মতো বৃদ্ধি পায়, এরাও তেমনি ক্যালেণ্ডারের তারিখমতো ডিম দিয়ে যায় সাহেবকে। সব-ই সাহেবের কপাল!
তারপর হঠাৎ বলে উঠলেন ভজনদা, ব্যাপারটা কী ইন-হিউম্যান ভেবে দ্যাখো! এরা জীবনের একটা কী ভাইটাল আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাহেবকে ডিম জোগানোর জন্য। মাঝে মাঝে যখন আমার সাহেবের ওপর রাগ হয়, তখন আমার খুব বিদ্রোহ করতে ইচ্ছে হয়।
আমি বললাম, কলকাতার কিড স্ট্রিটে একটা অর্গানাইজেশন আছে, তার নাম অ্যানিমাল লাভারস সোসাইটি। তাদের একটা ‘বার্ড লাভিং উইং’ খুলতে বলে আপনার কেসটা সেখানে পুট-আপ করে দিলে মন্দ হয় না!
ভজনদা অবাক হয়ে বললেন, আছে নাকি? সত্যি!
তারপর ভজনদা পোলট্রির যিনি ইনচার্জ—সাহেবের পার্টনার—মল্লিকবাবু তাঁর সঙ্গে কীসব কাজের কথাবার্তা বলার পর দূরে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন, ওই যে দেখছ ওই শেডটা—ওইখানে এগলেয়িং বার্ডস নয়, টেবল-বার্ডস ডেভেলাপ করা হয়।
মানে? আমি শুধোলাম।
—মানে, খাওয়ার মুরগি। মুরগির বেলায় মানুষের মেয়েদের নিয়ম খাটে না। এখানে যে রাঁধে, সে রাঁধেই; যে চুল বাঁধে সে তাই-ই বাঁধে। বুজেচো?
—বুঝলাম।
আমি বললাম।
একটা লোক ডিম কুড়োচ্ছিল এবং অন্য একটা লোক বালতি করে গুঁড়ো গুঁড়ো কী যেন খাবার এনে মগে করে করে সব ছোটো ছোটো খোপে দিচ্ছিল।
আমি শুধোলাম, এগুলো ওরা কী খাচ্ছে ভজনদা?
ভজনদা বললেন, একে বলে চিকেন-ফিড। আমরা এখানেই তৈরি করি।
—কী দিয়ে তৈরি করেন?
—আরে আমি কী ছাই করি! এসব মল্লিক সাহেবের কাজ। পন্ডিত লোক—মুরগি সম্বন্ধে স্বয়ং ব্রহ্মার চেয়েও বেশি জ্ঞান রাখেন।
বললাম, কী দিয়ে চিকেন-ফিড বানানো হয়, একেবারেই জানেন না?
একটু একটু জানি। ভজনদা বললেন।
বললাম, সেই একটু একটুই বলুন শুনি।
ভজনদা বললেন, ভুট্টার গুঁড়ো, গমের গুঁড়ো, অয়েল রাইস ব্র্যান, বাদাম খোল, ফিশ মিল অর্থাৎ মাছের গুঁড়ো, অস্টার-শেল ক্রাশ, মানে শামুকের খোলের গুঁড়ো, ভিটামিন রুবি মিক্স, পোলট্রি মিনারাল সল্ট এইসব মিলিয়ে-টিলিয়ে চিকেন-ফিড তৈরি হয় আর কী।
আমি বললাম, এ তো এলাহি কান্ড।
ভজনদা বললেন, চার হাজার মুরগি পোষা এবং দিনে আড়াই হাজার ডিম পয়দা করা এবং তার থেকে ফায়দা করাও তো এলাহি কান্ড। আমার সাহেব নিজে যেমন সাড়ে ছ-ফুটি, সাহেবের কান্ড-মান্ডও সব এলাহি।
তারপর ভজনদা পোলট্রির পাশে একটা ছোট্ট পাকা দোতলা বাড়িতে নিয়ে এলেন। এই বাড়িতে পৌঁছোবার আগেই ‘চিঁউ চিঁউ’ শব্দ শুনতে পেলাম।
আমি অবাক হয়ে বললাম, এখানে কী?
ভজনদা বললেন, এখানে সব ডে-ওল্ড চিকস রাখা আছে। মুম্বাই আরবার-এফারস ফার্মের মতো সাহেবেরও ইচ্ছে লেগহর্নের ডে-ওল্ডের চিকের ব্যাবসা করার।
দেখলাম একটা কালো অ্যালসেশিয়ান কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে বাড়িটাতে।
আমি শুধোলাম, কুকুরে মুরগির বাচ্চা খেয়ে ফেলে না?
ভজনদা বললেন, এর নাম কী জানো? এর নাম রেখেছেন সাহেব, ‘বিবেক’। যাত্রা দেখেছ কখনো? আধুনিক যাত্রা নয়, পুরোনো যাত্রা। যাত্রা-দলে একজন করে বিবেক থাকত। সে মাঝে মাঝেই এসে একটা করে গান গেয়ে নায়ক-নায়িকার বিবেক জাগিয়ে দিয়ে চলে যেত। বিবেক-ই তো এই ডে-ওল্ড চিকসদের শেয়াল, ভাম, সাপ এদের হাত থেকে রক্ষা করে। রক্ষক কখনো ভক্ষক হয়? হয় হয়তো। কিন্তু হওয়া অনুচিত।
একটা বছর বারো-তেরোর সুন্দর ছেলে উলের ব্যাডমিন্টন বলের মতো গোল গাল হলুদ হলুদ বাচ্চাগুলোর দেখাশোনা করছিল। খাবার ও জল দিচ্ছিল।
সে ভজনদাকে আতঙ্কিত গলায় বলল, বাবু হিঁয়া বড়কা বড়কা বহত চুঁহা আয়া হ্যায়।
ভজনদা বললেন, বলিস কীরে? মল্লিক সাহেবকে খবর দিয়েছিস?
তারপর বললেন, আহা! খুব চিন্তার কথা। আমিও এক্ষুনি খবর দিচ্ছি।
তারপর তার দিকে ফিরে হঠাৎ বললেন, আরে ও ছোটুয়া, মুরগির বাচ্চা যদি বড়কা বড়কা ছুঁচোয় খেয়ে যায় তাহলে সাহেবের কিছু ক্ষতি হবে—কিন্তু মুরগি আবারও ডিম পাড়বে, ডিম ফুটে আবারও বাচ্চা হবে। কিন্তু তুই তো রাতে এখানেই শুয়ে থাকিস; খুব সাবধানে থাকিস।
ছোটুয়া অবাক হয়ে বলল, কাহে বাবু?
আমিও ভজনদার কথা শুনে অবাক হলাম। ছুঁচোয় তো আর মানুষ খাবে না। মুরগির বাচ্চা খেলেও খেতে পারে।
আমিই ভজনদাকে শুধোলাম, একথা কেন বলছেন ভজনদা?
ভজনদা বললেন, তুমি একেবারে বালখিল্য।
কেন? আমি বোকার মতো শুধোলাম।
ভজনদা গম্ভীর চিন্তান্বিত মুখে বললেন, ছুঁচোয় মানুষের শরীরের সবচেয়ে নরম জায়গা খেতে খুব ভালোবাসে।
ছোটুয়া আতঙ্কিত গলায় বলল, হামারা নাক খা লেগা?
ভজনবাবু বললেন, আরে হতভাগা! নাক গেলে না হয় সাহেব প্লাস্টিক-সার্জারি করে তোর নাক গজিয়ে দেবেন। নাকের চেয়েও নরম জায়গা কি পুরুষের শরীরে নেই? হতভাগা! সে-জায়গা খেয়ে গেলে গেল—চিরদিনের মতোই গেল। পৃথিবীর কোনো দোকানেই স্পেয়ার-পার্টস পাওয়া যাবে না।
ছোটুয়া কথাটার তাৎপর্য ভালো করে হৃদয়ংগম করার আগেই ভজনদা আমার দিকে ফিরে বললেন, টিংকু, তুমিও সাবধানে থেকো—বড়োই চিন্তার বিষয়।
ছোটুয়া অত্যন্ত উত্তেজিত ও বিচলিত হয়ে শুধোল, তব বাবু ম্যায় কা করে?
ভজনদা একটু ভেবেই বললেন, তারের জাল দিয়ে একটা জাঙিয়া বানিয়ে নে। আমাকে বললেন, তুমিও একটা বানিয়ে নিয়ো।
তারপর-ই আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা থেকে উত্তিষ্ঠিত হওয়ার আগেই বললেন, চলো চলো, অনেক বেলা হল। এবার যাওয়া যাক। তুমি তো আবার সাহেবদের খাওয়া-দাওয়ার দেখাশোনা করবে।
তখনও বিকেলের রোদ ছিল। বেশ কড়া রোদ। ভজনদা সাহেবদের বলে রেখেছিলেন যে, তিতিরের জায়গায় পৌঁছোতে প্রায় কুড়ি মিনিট কী আধঘণ্টা লাগবে। অতএব বেলা থাকতে থাকতে না গেলে তিতির পাওয়া যাবে না।
আমি, ভজনদা, পান্ডে ড্রাইভার সব বাংলোর কাছে ঠা ঠা রোদে চারটের থেকে দাঁড়িয়ে আছি। সাহেবের অতিথিদের সাড়াশব্দ নেই। পান্ডে নিজে শিকারি না হলে কী হয় তার উৎসাহ দেখলাম শিকারিদের চেয়েও বেশি। সে কেবল-ই বলছে, বড়ি দের হো রহা হ্যায়। ইতনা দের করনেসে চিড়িয়া মিলেগা নেহি।
ভজনদা দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বললেন, তা আমাকে বলছিস কেন? সাহেবের মেহমানদের ঘুম ভাঙিয়ে কি চাকরিটা খাব?
একটা ঘর থেকে ফোঁ-ফোঁ, ফোঁ-ফোঁৎ করে নাক ডাকার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল।
ভজনদা আঙুল দিয়ে ঘরটা দেখিয়ে আমার দিকে চেয়ে চোখের ভুরুতে নীরব প্রশ্নবোধক চিহ্ন আঁকলেন।
বললেন, এ কোন জানোয়ার?
আমি বললাম, ওটা কাতলামাছের ঘর।
কাতলামাছ?
ভজনদা অবাক হয়ে শুধোলেন।
আমি বললাম, হ্যাঁ। একজন কাতলামাছ, একজন ছাগলদাড়ি, একজন শেতলপাটি এবং একজন মাত্র ভদ্রলোক। তিনি ফোটোগ্রাফার।
ভজনদা বললেন, কম্বিনেশনটা দারুণ। তার সঙ্গে দাঁড়কাক পাতিকাক। আজকে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারলে হয়।
ঠায় আধঘণ্টা আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম সেখানে। চা পর্যন্ত খাইনি কেউ। কিন্তু বাড়ির মধ্যে যে, কেউ জেগেছেন এমন লক্ষণ দেখলাম না কোনো। ওপাশের ঘর দুটো থেকে এয়ার-কণ্ডিশনারের মৃদু ঝিরঝির শব্দ ভেসে আসছে শুধু।
প্রায় পৌনে পাঁচটা নাগাদ কাতলামাছ হেঁড়েগলায় চিৎকার করলেন, মেহবুব, চায়ে.....।
ভজনদা বললেন, যাক তাও নড়াচড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
সাহেবরা প্রায় সোয়া-পাঁচটা নাগাদ বেরোলেন। তাদের পোশাক-আশাক দেখে আমরা ‘থ’।
ছাগল-দাড়ি এসে অবধি একটা হাফ-প্যান্ট পরেছেন, যেটাকে হাফ-প্যান্ট না বলে সুইমিং ট্রাঙ্ক বলাই ভালো। কোনোক্রমে লজ্জা নিবারণ হয়। ওপরে নীলরঙা ব্যাংলনের গেঞ্জি। কাতলামাছও এসে অবধি একটা লাল জিনের ফ্লেয়ার গলিয়ে নিয়েছেন, ওপরে জিনের লাল শার্ট—দারুণ দেখাচ্ছে। শেতলপাটির পরনে খাকি প্যান্ট, সঙ্গে লাল মোজা, কালো জুতো, গায়ে খালিজ-ফেজেন্টের মতো ছিটছিট খয়েরি জামা। ফোটোগ্রাফার ভদ্রলোকের গায়ে হলুদ ব্যাংলনের গেঞ্জি—টেরিকটের কালো প্যান্ট। সকলের হাতেই গুপী-যন্তর। শুধু কাতলামাছের হাত খালি। সকলের চোখ-মুখ-ই দুপুরে জাপানিজ টি-হাউসে বসে বিস্তর বিয়ার পানের পর চোব্য-চোষ্য খেয়ে ও ঘুমিয়ে, ফুলে উঠেছে।
সকলে একে একে গাড়িতে এসে উঠলেন। মেমসাহেবরা এসে তাঁদের আঙুল-নেড়ে সি-অফ করে গেলেন। কাতলামাছের বউ নেই। থাকার কোনো সম্ভাবনাও নেই বলে মনে হল। এরকম লোককে বিয়ে করে কোন মহিলা জীবনের ওপর ট্রাক্টর চষবেন?
সামনের সিটে পান্ডে, আমি, ভজনদা ও কাতলা মাছ, পেছনে বাকি তিনজন, কাতলা মাছ একাই অর্ধেক সিট জুড়ে বসেছেন, আমি, ভজনদা ও পান্ডে শুঁটকি মাছের মতো গায়ে গায়ে সেঁটে বসে আছি। পান্ডের শরীরটা প্রায় সিটের বাইরে। পশ্চাৎদেশের পাঁচশো গ্রাম মাংস কোনোক্রমে সিটে ঠেকিয়ে সে যে, কী করে স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছে, গিয়ার চেঞ্জ করছে! সেই-ই জানে।
বাজারের কাছের ঘড়িঘরের পাশের রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে আমরা দুমকা রোডে পৌঁছালাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফাঁকা জায়গায় এসে পড়লাম।
বেশ লাগছে—। গরম হলেও হু-হু শুকনো হাওয়া। মনের মধ্যের সব আদ্রতা শুষে নেয়।
যখন আমরা মেন লাইনের লেভেল-ক্রসিং পেরিয়ে টিগরিয়া পাহাড়ের কোলে এসে পৌঁছোলাম তখন তিতিররা প্রত্যেকেই রাতের মতো শোয়ার বন্দোবস্ত করছে। আলো বিশেষ নেই-ই বলতে গেলে।
কিন্তু এখানের তিতিরদের মধ্যে আত্মহত্যাপ্রবণতা যে, এমন বেশি আমার তা জানা ছিল না।
দু-পাশে ঝাঁটি-জঙ্গল—খোলা টাঁড়—লাল খোওয়াই—।
কাতলামাছ স্বগতোক্তি করলেন, খরগোশ, তিতির ও ক্যাজুয়াল লেপার্ডের আইডিয়াল জায়গা।
এমন সময় পান্ডে জোরে ব্রেক কষল।
দেখলাম বাঁ-দিকে পথের পাশেই একটা বড়কা তিতির দাঁড়িয়ে পড়ে মুখ হাঁ-করে কাতলামাছকে দেখছে।
মুহূর্তের মধ্যে শেতলপাটি পেছন থেকে গাড়ির জানলা দিয়ে বন্দুকের নল বের করে দেগে দিলেন।
তিতিরটার চোখে কাতলামাছের ছবিটা ফিল্টারড হয়ে তার ব্রেনে পৌঁছোবার আগেই তিতিরটা দু-ঠ্যাং ওপরে তুলে উলটে গেল।
প্রায় নল ঠেকিয়েই মারা হয়েছিল। ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়নি এই-ই যথেষ্ট।
পান্ডে মুহূর্তের মধ্যে নেমে দৌড়ে গিয়ে তিতিরটা তুলে এনে বুটে রাখল।
গাড়ির মধ্যে ‘কনগ্রাচুলেশানস, গুড শট’ ইত্যাদি শোনা গেল।
কাতলামাছ উত্তেজনায় ভুরুক-ভুরুক করে পাইপ খেতে লাগলেন।
পাইপের মধ্যে এত নিকোটিন আর থুতু জমেছে যে, থেলো-হুঁকোর মতো আওয়াজ করছে পাইপটা। লোকটা থ্রোট বা টাঙ ক্যান্সার হয়ে মরল বলে, মরার আর দেরি নেই; মনে হল আমার।
আর একটু এগিয়ে যেতেই পথের ডানদিকের টাঁড় থেকে দুটো বড়ো তিতির ‘ভরররর’ আওয়াজ করে উঠল।
উড়তেই দেখি, অর্ধ-নগ্ন ছাগল-দাড়ি নেমে পড়ে বন্দুকের নল ঘুরিয়ে একবার এদিকে আর একবার ওদিক করে দুটো গুলি করলেন।
উড়োপাখি দুটোই ঝুপ ঝুপ করে পড়ে গেল।
এবার আমার-ই তারিফ করতে ইচ্ছে হল। শিকারি বটে। ইচ্ছে হল, ছাগল-দাড়ির দাড়িতে চুমু খেয়ে দিই।
পরক্ষণেই ভাবলাম, আমার কপালে চুমু খাওয়ার এ ছাড়া আর কোন জায়গা জুটবে? একটা হীনম্মন্যতা আমাকে ছেয়ে ফেলল। নিজের বাসানার সুতো মনের লাটাইয়ে গুটিয়ে নিলাম।
পান্ডে গিয়ে পাখি দুটোকে আবারও নিয়ে এল।
এখন পরিবেশটা বড়ো মনোরম হয়ে এল। কুয়াশার মতো সদ্যোজাত নরম অন্ধকার। প্রসন্ন চাঁদটা ইতিমধ্যেই পাহাড়ের গা বেয়ে উঠেছে। পশ্চিমাকাশে সন্ধ্যাতারাটা নীল স্নিগ্ধ শান্ত শরীরে ফুটে উঠেছে।
আমি বাঙালির ছেলে। সাঁওতাল পরগনায় এই-ই প্রথম। ভারি ভালো লাগছে। দুমকার পথটা নরম সবুজ ঝাঁটি-জঙ্গলের আর পাহাড়ের মাঝ দিয়ে গিয়ে সামনেই একটা হঠাৎ বাঁক নিয়েছে। মাঝে মাঝে লাল মাটির খোওয়াই। পূর্ণিমার চাঁদ, সন্ধ্যাতারা, বনের সবুজ আর লাল এবং পিচ-ঢালা পথের কালো মিলে-মিশে একটা দারুণ সুন্দর কম্পোজিশনের সৃষ্টি হয়েছে।
এমন সময় বাঁ-দিকে প্রায় পঁচিশ-তিরিশ গজ দূরে একটা একলা দার্শনিক তিতিরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। ভজনদার কাছে শুনেছিলাম যে, তিতির সাধারণত দলে থাকে অথবা জোড়ায় থাকে। মনে হল, এখানের তিতিরগুলোর দাম্পত্যজীবন বিশেষ সুখের নয়। নইলে এরা এমনভাবে এই আধো-অন্ধকারে গুলিখোর হওয়ার অভিপ্রায়ে আত্মহত্যা করার জন্যে একা একা দাঁড়িয়ে থাকবে কেন?
এবার ফোটোগ্রাফার ভদ্রলোক নামলেন। হাতে বন্দুক নিয়ে।
ভদ্রলোকের শিকারের প্রক্রিয়াটা অদ্ভুত লাগল। উনি গাড়ি থেকে বসেই গুলি করতে পারতেন, তিতিরটা কাছেই ছিল, কিন্তু তা না করে বন্দুকটা বাগিয়ে ধরেই তিনি তিতিরটার পেছনে দৌড় লাগালেন।
তিতিরটা প্রথমে এই ‘চোর চোর’ খেলাটা খেলতে চায়নি। অবাক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
যখন শিকারি তার পাঁচ হাতের মধ্যে দৌড়ে গেলেন, তখন বোধ হয় ওর মনে বেঁচে-থাকার ইচ্ছেটা হঠাৎ জাগরূক হয়ে উঠে থাকবে।
সেও এই অদ্ভুত শিকারির কারবার দেখে ঝেড়ে দৌড় লাগাল।
তিতিরের দৌড় দেখতে ভারি মজার। ওয়াল্ট-ডিজনির ছবির হাঁসের মতো দৌড়োয় এরা।
তিতিরও দৌড়োচ্ছে, হলুদ গেঞ্জিও দৌড়োচ্ছেন। বন্দুকের কথা বেমালুম ভুলে গেছেন শিকারি। তাঁর মনে বন্দুকটা হঠাৎ লাঠি হয়ে গেছে বোধ হয়।
দেখতে দেখতে দু-মিনিটের মধ্যে শিকারি ও শিকার আমাদের সকলের চোখের সামনে থেকে খোওয়াই-এর মধ্যে জঙ্গলের গভীরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
কাতলামাছ, শেতলপাটি এবং ছাগল-দাড়িকে চিন্তিত দেখাচ্ছিল। চিন্তায় দাঁড়কাকের অবস্থা ঝোড়োকাকের মতো হয়ে গেল।
ভজনদা একেবারে গরম দুধে মুড়ির মতো চুপসে গেলেন। যদি সাহেবের একজন অতিথিকেও এখানে রেখে যেতে হয়, তাহলে ভজনদাকেও চাকরি এখানে রেখে চিরদিনের মতো জয়নগর-মজিলপুরে গিয়ে মোয়া খেয়ে বাদবাকি জীবন কাটাতে হবে।
যখন দশ-পনেরো মিনিট হয়ে গেল তখন সাহেবরা সমস্বরে ‘বামাপদ বামাপদ’ বলে চেঁচাতে লাগলেন। ওঁরা এমন সুরে ও পর্দায় বামাপদকে ডাকছিলেন যে, হঠাৎ আমার মনে হয় ‘বাল্মীকি প্রতিভা’-র বাল্মীকি—‘রাঙাপদ, পদযুগে প্রণমি হে ভবদারা’ গাইছেন। ‘বামাপদ’ কথাটাকে হুবহু সেই গানের ‘রাঙাপদ’ বলে মনে হচ্ছিল।
কিন্তু আসন্ন রাতের জঙ্গল থেকে, পাহাড় থেকে বামাপদর কোনো আওয়াজ শোনা গেল না।
সকলে চিন্তিত হয়ে উঠলেন। নীল ছাগল-দাড়ি ওইদিকে হলুদ বামাপদকে খুঁজতে গেলেন।
এমন সময় গাড়ির একেবারে গায়ের পাশ থেখে ‘কুঁই কুঁই’ আওয়াজ শোনা গেল।
আমরা তাকিয়ে দেখি, চারটে তিতির আর তাদের সঙ্গে একপাল একশোগ্রাম ওজনের সুনটুনি-মুনটুনি বাচ্চা।
বিনা বাক্যব্যয়ে কাতলামাছ শেতলপাটির হাত থেকে বন্দুকটা ছিনিয়ে নিয়ে গদাম করে মা-বাচ্চাদের ওপর কসাইয়ের মতো দেগে দিলেন। দুটো তিতির পড়ে গেল, দুটো উড়ে গেল; আর বাচ্চাগুলো মিনি লাট্টুর মতো চতুর্দিকে ছড়িয়ে গেল।
শেতলপাটি বললেন, পাকড়ো, পাকড়ো।
আদেশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি, ভজনদা আর পান্ডে বাচ্চাগুলোর পেছনে পেছনে দৌড়োতে লাগলাম। এবং বারংবার বডি-থ্রো করতে লাগলাম। সে-এক হাসির ব্যাপার। দৌড়োতে গিয়ে ভজনদা পাথরে হোঁচট খেয়ে আছড়ে পড়লেন। কিন্তু পরক্ষণেই উঠে পড়ে আবার দৌড়োলেন।
চাকরি রাখতে যে, এমন সার্কাসও করতে হবে তা কোনোদিন ভাবিনি।
যখন আমরা তিনজন ফিরলাম, তখন ভজনদা বুক-পকেটের ওপর থেকে দুটো বাচ্চা উঁকি মারছিল আর আমার আর পান্ডের দু-হাতের তেলোর মধ্যে আরও চারটে করে বাচ্চা।
ভজনদা হুংকার ছাড়লেন। খবরদার। সাহেব যদি জানতে পারেন যে, একটা বাচ্চাও মরে গেছে তো সর্বনাশ হবে। এদের যত্ন করে গাড়ির বুটের মধ্যে রাখো।
শেতলপাটি মৃদু ভর্ৎসনা করলেন। বললেন, বাচ্চাসুদ্ধু মারলে?
কাতলামাছ লাজুক মুখে বললেন, কী করব বলো? ‘সংযম’ ব্যাপারটা যে, আয়ত্ত হল না জীবনের কোনোক্ষেত্রেই।
ইতিমধ্যেই হলুদ বামাপদ ও নীল ছাগল-দাড়ি এসে হাজির হলেন প্রায় অন্ধকার ফুঁড়ে।
ছাগল-দাড়ি শুধোলেন ভজনবাবুকে, ভজনবাবু এতটুকু-টুকু বাচ্চাদের বাঁচাবেন কী করে?
ভজনদা গর্বিত গলায় বললেন, তাহলে আর এতদিন চিড়িয়াখানার ম্যানেজারি কী করলাম।
কী খাওয়াবেন ওদের? শেতলপাটি প্রশ্ন করলেন।
ভজনদা উত্তর দিলেন, উই পোকা, পোস্ত দানা আর জল। দেখবেন, সব ক-টাকে ঠিক বাঁচিয়ে তুলব।
রাতে তিতির শিকার করে ফিরে আসার পর ছাগল-দাড়ি, শেতলপাটি ও ভদ্রলোকের মেমসাহেবরা মিলে লনে বসে গান-বাজনা করবেন বলে ঠিক করলেন। বউরানিও ছিলেন। কাতলামাছ যেন কোর্ট জেস্টার। আগের দিনের রাজরাজড়ার বিদূষকের মতো। যাই-ই হোক, সবসময় হেঁড়েগলায় রসিকতা করে গান করে সকলকে আনন্দ দান করছেন তিনি। তিনি নিজে জানেন না যে, তাঁর চেহারাটাই এমন যে, তাঁকে দেখলে লোকের এমনিই হাসি আসে।
ভাগ্যিস জানেন না।
বউরানি বড়ো ভালো গান গাইলেন। ছেলেবেলায় উনি বেনারসে মানুষ হয়েছিলেন। গজল ও ঠুংরির গায়কি। ডান হাতের পাঁচখানা আঙুল নাড়িয়ে তিনি যখন গজল গান তখন না-দেখে গহরজান বা মালককা-জান বাইজিদের গায়কির কথা মনে পড়ে যায়। পড়েছিলাম যে, গহরজান যখন পান খেয়ে পানের পিক গিলতেন তখন নাকি তাঁর ধবধবে ফর্সা গলা দিয়ে পানের পিকের রক্তিমাভাকে নামতে দেখা যেত। মেমসাহেব পান খেয়ে পিক গিললেও বোধ হয় তেমন-ই দেখা যায়। চাঁদের আলোয় বোঝা যাচ্ছিল না। ভাবলাম, একদিন দিনের আলোয় ভালো করে লক্ষ করতে হবে।
শেতলপাটি মেমসাহেব বললেন, আমি তবলা ছাড়া গাইতে পারি না।
অমনি বউরানি বললেন, টিকলু, লেডকেনিকে ডাকো।
আমি না বুঝে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।
বউরানি বুঝতে পেরে বললেন, সরি। লালমোহনকে।
আমি আরও অবাক হয়ে বললাম, যিনি বাঁশের কাজ করেন?
—নীলমোহনবাবু?
—হ্যাঁ।
আমি আর সময় নষ্ট না করে নীলমোহনবাবুকে ডাকতে চললাম।
দাঁড়িয়ে পড়ে যে, ব্যাপারটা নিয়ে একটু ভাবব, তারও সময় নেই। চলতে চলতেই ভাবতে লাগলাম। কিন্তু ভেবেও বাঁশের মিস্ত্রির সঙ্গে তবলার কী সম্পর্ক বুঝতে পারলাম না।
নীলমোহনবাবু তাঁর কোয়ার্টার্সের সামনে একটা চৌপাইয়ের ওপর লুঙ্গি পরে আসন-পিঁড়ি হয়ে উত্তরমুখো বসে ঠাকুরের নাম করছিলেন।
ওঁকে বললাম, আপনাকে বউরানি ডাকছেন।
উনি ঠাকুরের নাম থামিয়ে কিছুক্ষণ আমার দিকে স্থিরনেত্রে তাকিয়ে থাকলেন।
তারপর হঠাৎ বললেন, গান-বাজনার আসর বসেছে বুঝি?
আজ্ঞে। আমি বললাম।
নীলমোহনবাবু আমায় বললেন, একটু ভেতরে আসুন।
ওঁর কোয়ার্টার্সে ঢুকেই উনি একজোড়া পেতলের তবলা দেখিয়ে আমাকে বললেন, উঠিয়ে নিন।
আমি বাঁয়াটার কান ধরে তুললাম। উনি তবলাটার কান।
তারপর-ই পাশের ঘরের কাকে যেন ডাকলেন নীলমোহনবাবু, ‘ছোটুয়া’ বলে।
ওঘরে গিয়ে দেখলাম, একটি বছর বারো-তেরোর ছেলে ভেক-কুম্ভস্য আসনে উবু হয়ে বসে দু-হাত দিয়ে কাঁসার থালাতে আটা মাখছে—রুটি বানাবে বলে।
সে চমকে উঠে বলল, ক্যা হুয়া?
নীলমোহনবাবু বললেন, কুচ্ছু হুয়া নেই; আভি হোয়েগা।
তারপর-ই আমাকে হতবাক করে দিয়ে দারুণ হিন্দিতে বললেন, ‘‘তুমহারা বাঁশিটা লেকে আভভি হামারা ল্যাজমে ল্যাজমে আও।’
ছোটুয়া তার দু-হাতের আঙুলে লেগে থাকা ভিজে আটার দিকে তাকাল।
নীলমোহনবাবু বললেন, সময় নেহি হ্যায়, যেইসা হ্যায়, অইসাই আও।
তারপর আমরা শোভাযাত্রা করে লনের দিকে এগোতে লাগলাম।
নীলমোহনবাবু দৈর্ঘ্যে চার ফিট দশ ইঞ্চি, ব্যাসে তিন ফিট। গায়ের রং কুচকুচে কালো, তার ওপর একটা খয়েরি-রঙা লুঙ্গি ও হাতকাটা গেঞ্জি পরেছেন। তাও খয়েরি। উনি আমার সামনে সামনে হেঁটে যাচ্ছিলেন।
মনে হল, বউরানি ‘লেডিকেনি’ নামকরণটা নেহাত খারাপ করেননি।
পরক্ষণেই মনে হল, আমার চেহারাটাও কি তাহলে হুবহু পাতিকাকের মতো? আজ-ই রাতে কোয়ার্টারে গিয়ে আয়নায় ভালো করে দেখতে হবে নিজেকে। আত্মদর্শন করতে হবে।
আমরা যখন গিয়ে পৌঁছোলাম, তখন বউরানি বললেন, বা:, ছোটুয়াও এসেছ?
ছোটুয়ার হাতের ভিজেআটা তখন পুরো শুকিয়ে গিয়ে হাত দিয়ে চষি বেরোচ্ছে। ইমিডিয়েটলি চষি-পিঠে করা যায়।
ছোটুয়া আড়ষ্ট হাত তুলে সেলাম ঠুকে বলল, জি হাঁ মেমসাব।
বউরানি শেতলপাটির মেমসাহেবের দিকে তাকালেন। তাঁর নাম ততক্ষণে জানা গেল, লিচি।
পরে ওভার-হিয়ার করে জেনেছিলাম যে, তাঁদের বাড়ি নাকি মুজফফরপুরে। তাই তাঁর দিদিমা মুজফফরপুরের বিখ্যাত লিচুর নামে নাম রাখেন তাঁর। চেহারাটাও লিচু-লিচু। ভালো মানিয়েছে।
মেমসাহেব বললেন, লিচি, সোলো গাইবে না কোরাস?
লিচি লজ্জা লজ্জা গলায় বললেন, না সঙ্গে ছুপকি ও নিনির গাইতে হবে।
কাতলামাছ বিনা রিকোয়েস্টেই বললেন, আমিও গাইব।
কোন গান গাওয়া হবে, তাই আলোচনা করে প্রথমে দশ মিনিট কেটে গেল। ততক্ষণে ছোটুয়ার হাতের ভিজে আটা স্টিকিং-প্লাস্টারের মতো তার দু-হাতে সেঁটে গেছে।
যখন গান ঠিক হল তখন দেখা গেল লিচি আর মিনি গানটা জানেন, কিন্তু ছুপকি ও কাতলামাছ জানেন না। তারপর অনেক ন্যাকামি, এমা:, তা হবে না, পারব না ওরে বাবা রে-র পরে ওঁরা ঠিক করলেন যে, রবীন্দ্রসংগীত-ই গাইবেন—‘পুরানো সেই দিনের কথা শুনবি যদি আয়।’
কাতলামাছ বললেন, দেবব্রত বিশ্বাস বড়ো ভালো গান, এই গানটা।
তারপরে আরও পাঁচ মিনিট গেল ‘রেডি গেট-সেট গো’-তে।
হঠাৎ আমার বউরানি ফোর-ফরটি ইয়ার্ডস রেসের স্টার্টার-এর মতো পিস্তলের বিকল্পে পানের সেই রুপোর বটুয়া দিয়ে টেবিলে ফটাস করে আওয়াজ করে বললেন, স্টার্ট।
তারপর গান আরম্ভ হল।
লিচি ধরলেন বি-ফ্ল্যাটে, ছুপকি ও নিনি আরও খাদে আর কাতলামাছ বি-ফ্ল্যাটে শুরু করে মুহূর্তের মধ্যে ব্যালিস্টিক মিসিলের মতো চলে গেলেন হারমোনিয়ামের একেবারে শেষ দক্ষিণ প্রান্তে।
সে যে কী কোরাস কী বলব!
এদিকে লেডিকেনি লনের মধ্যে লুঙ্গি পরে হাঁটু-গেড়ে বসে পেতলের তবলায় উড়ন-চাঁটি দিয়ে যেতে লাগলেন। এ তবলা-বাঁয়া বোধ হয় বাঁধতে-টাধতে হয় না, সেজন্যেই পেতল দিয়ে চামড়া চিরতরে সিল করা আছে।
তবলাটা থেকে অনেকদিনের পুরোনো ব্রংকাইটিসের রুগি যেমন করে কাশে, তেমন একটা ‘ঠং-ঠং’ আওয়াজ বেরোতে লাগল, আর বাঁয়া থেকে চ্যবনপ্রাশ আর ছাগলাদ্য মিশিয়ে খল-নোড়ায় মকরধ্বজ দিয়ে মারলে যেরকম ঢ্যাবঢেবে আওয়াজ হয় তেমন আওয়াজ।
ছোটুয়া কেষ্ট ঠাকুরের মতো বাঁ-পায়ের মধ্যে ডান পাটা সড়াৎ করে ঢুকিয়ে দিয়ে এমন বিপজ্জনকভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে বাঁশি তুলল ঠোঁটে যে, আমার মনে হল, এই ঝোড়ো-হাওয়ায় যেকোনো সময়ে ও ছাগল-দাড়ির ঘাড়ে পড়ে যেতে পারে।
ছোটুয়ার বাঁশিটা ও ওর দেশ হাজারিবাগ জেলা থেকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল চাকরিতে বহাল হওয়ার সময়। ওই বাঁশি ওর বাবা হাজারিবাগের জঙ্গলের মধ্যে বাজরার খেতে রাতে বুনো শুয়োর যাতে বাজরা না খায় সেজন্যে মাচার ওপরে বসে বসে বাজাত।
যে-বাঁশির সুর ও স্বরের উদ্ভব হয়েছিল, দাঁতাল বুনো শুয়োরদের ভিরমি লাগানোর জন্যে সেই বাঁশি ‘পুরানো সেই দিনের কথার’ প্রতি কী করে জাস্টিস করবে?
এতক্ষণে গায়ক-গায়িকাদের মুড এসে গেছে। একেবারে হইহই ব্যাপার। উত্তেজনায় আমার পা থরথর করে কাঁপতে লাগল। আমি আর সহ্য করতে না পেরে লনের মধ্যে বসে পড়লাম।
গায়ক-গায়িকার গলা বিভিন্ন স্কেলে, বিভিন্ন দিকে চলেছে কলকাতার দিকে গ্যালোপিং, লোকাল, এক্সপ্রেস ট্রেন ও মালগাড়িতে। বাঁশি ছুটেছে টিগরিয়া পাহাড়ের দিকে। তবলা পরেশনাথ পাহাড়ে।
আমার যে, কখনো এমন সুপারসনিক বিটোফেনিক অর্কেস্ট্রা শোনার সৌভাগ্য হবে, একথা স্বপ্নেও ভাবিনি।
মনে মনে বললাম, পাগল ভালো করো মা।
ছয়
সাহেব আজ ভোরের ট্রেনে এলেন।
আমি আর পান্ডে ড্রাইভার, স্কুটার-টেম্পো সঙ্গে নিয়ে গেছিলাম।
এবারও সাহেবের সঙ্গে গন্ধমাদন পর্বত। প্রতিবার-ই চ্যাপটা করে ভাঁজ করা পিচবোর্ডের বাক্স নিয়ে আসেন আর যাওয়ার সময় কূপে ভরতি করে ডিম নিয়ে যান কলকাতায়। কলকাতায় দাম ভালো পাওয়া যায়—তাই যতটুকু পারেন কলকাতাতেই বিক্রি করেন— বাদবাকি লোকালি।
শহরের প্যাঁড়াওয়ালারা দুধ কেনেন সাহেবের ডেয়ারি থেকে। বাজারের হোল-সেলাররা টেবল-বার্ডস ও ডিম কেনেন।
সাহেব নেমেই আমাকে বললেন, কেমন আছ গজেন?
আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম।
তারপর বললাম, ভালো।
আমার গেস্টরা সব ভালো মুডে? যত্ন-আত্তি করছ তো?
হ্যাঁ স্যার। কাল বিকেলে তিতির মেরেছেন। রাতে লনে গান-বাজনা হয়েছে। তারপর লোডশেডিং হয়েছিল বলে, বাইরের চাঁদের আলোয় লনে বসে ডিনার খেয়েছিলেন!
মেহবুব হুইস্কি-টুইস্কি সব দিয়েছিল তো? কোনো অসুবিধা হয়নি তো?
—না স্যার।
তারপর ওভারব্রিজ পেরোতে পেরোতে বললেন, তোমার স্টকে কী কী কমে গেছে একটা লিস্ট করে দিয়ো। বুঝলে গজেন।
বললাম, হ্যাঁ স্যার!
সাহেব একটু এগিয়ে যেতেই দেখি পান্ডে আমার পাশে এসে আমার মুখে চেয়ে মিটিমিটি হাসছে।
অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, কী ব্যাপার?
পান্ডে বলল, ব্যাপার কিছু না, সাহেব নাম ভুলে যান মাঝে মাঝে সকলের-ই। তাই আপনাকে গজেন বললেন। দেখবেন, পরে আবার মনে পড়ে যাবে। আমাকেও মাঝে মাঝে দুখিরাম, খান্ডেলওয়াল, যোধ সিং এরকম নানা উলটোপালটা নামে ডাকেন।
এ ক-দিনে চিড়িয়াখানার কান্ড-কারখানায় অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এখন আর কিছুতেই অবাক লাগে না।
সাহেব বাড়ি ফিরতেই বাড়ির চেহারা পালটে গেল। বোধ হয় সবসময়েই পালটে যায়।
সাহেব বললেন, ব্রেকফাস্টের পর তুমি আমার সঙ্গে হানিফ সাহেবের বাড়ি যাবে। আমার বন্ধুদের জন্যে একদিন বিরিয়ানি পোলাও আর গুলহার কাবাবের আয়োজন করতে হবে। বউরানি আবার লোকটাকে দেখতে পারেন না। কিন্তু ভদ্রলোক ভারি ভালো রান্না করেন, বড়ো শৌখিন লোক, বয়স হয়েছে বিস্তর, কিন্তু এভার ইয়াং।
বললাম, আচ্ছা স্যার।
গেস্টরা সবাই তখনও ঘুমোচ্ছিলেন। রাতে অবশ্য শুয়েছেন সকলে প্রায় দুটো নাগাদ। লনে সকলেই চাঁদের আলোয় ইজিচেয়ারে বসেছিলেন। লনের সামনের বড়ো চাঁপাগাছটা থেকে ঝোড়ো হাওয়ায় চাঁপাফুল উড়ে উড়ে লনময় ছড়িয়ে পড়ছিল। চাঁপাফুলের গন্ধ, মেমসাহেবদের গায়ের বিভিন্ন পারফিউমের গন্ধে মিলে-মিশে কেমন নেশা-নেশা লাগছিল।
ভাবছিলাম চাকরিটা টিকে গেলে, বউদিকে একবার আমার কোয়ার্টার্সে এনে দিনকতক রাখব। বউদির শখ ও রুচি আছে। এমন জায়গা বউদি দারুণ অ্যাপ্রিসিয়েট করবে। চাঁপাফুল বউদির দারুণ প্রিয়। কলকাতার রাস্তায় চাঁপাফুলওয়ালার কাছ থেকে কাঠিতে গোঁজা একটা-দুটো চাঁপাফুল কিনে দিয়েছি বউদিকে। বউদি চাঁপাফুল বালিশের নীচে নিয়ে ঘুমোতে ভালোবাসে। এত চাঁপাফুল, মানে চাঁপাফুলের গালচে-বিছানো আছে দেখলে কী যে, করবেন জানি না।
সাহেবের ঘুম বড়োকম। লোকটার এনার্জি দেখে অবাক হয়ে যাই। দিনে-রাতে বড়োজোর চার-পাঁচ ঘণ্টা ঘুমোন।
সাহেব এসেই এককাপ চা খেয়ে যে, জামাকাপড় পরে ট্রেনে এসেছিলেন, সেই বাথরুম স্লিপার, মোটা কাপড়ের পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে বেরিয়ে পড়লেন কাজকর্ম দেখাশোনা করতে। তা কম্পাউণ্ডের মধ্যের ডেয়ারি, পোলট্রি, সামান্য চাষবাস দেখাশোনা করলেই প্রায় মাইল খানেকের চক্কর। তারপর কম্পাউণ্ডের বাইরে কো-অপারেটিভ বেসিসে যেসব জায়গায় চাষবাস হবে, পুকুর কাটা হবে, কর্মচারীদের কোয়ার্টার হবে সেইসব দেখাশোনা করলে তো দু-মাইলের চক্কর।
চলে যাওয়ার আগে সাহেব শুধোলেন, সাঁওতাল নাচের সব বন্দোবস্ত পাকা আছে তো? ভজনকে জিজ্ঞেস করেছিলে?
হ্যাঁ সাহেব। কাল দুপুর থেকে তো ভজনদা ওই ব্যাপার নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন।
সাহেব বললেন, ভজনকে বলে দিয়ো যে, আমরা সাড়ে আটটা নাগাদ সুজানী গ্রামের অশ্বত্থ গাছতলায় গিয়ে পৌঁছোব। তার আগেই যেন সব বন্দোবস্ত পাকা করে রাখে।
আচ্ছা স্যার। বললাম আমি।
ভেতরে ভেতরে আমারও কম উত্তেজনা হচ্ছিল না। ছেলেবেলা থেকে সাঁওতালি নাচ সম্বন্ধে পড়েছি, শুনেছি। জীবনে এই প্রথম আমিও তা দেখব। তাই বন্দোবস্তে যেন ত্রুটি না হয়, সেজন্যে ভজনদার পেছনে আমিও ছিনে-জোঁকের মতো লেগেছিলাম।
সাহেব চলে যেতেই ভজনদা এলেন।
বললেন সাহেব কই?
আমি বললাম, ডেয়ারির দিকে গেলেন।
বললেন, তুমি তো এসে অবধি ডেয়ারিতে একবারেও গেলে না। খুব চাকরি করছ বাছা! চলো আমার সঙ্গে। তোমাকে গোরু ও ষাঁড় চেনাই।
আমি বললাম, এক্ষুনি সাহেবের গেস্টরা উঠে পড়বেন। কার কী প্রয়োজন হয়। এখন আমি যেতে পারব না।
ভজনদা বললেন, তা অবশ্য ঠিক।
তারপর বললেন, সাহেবের যেন প্রত্যেক উইক-এণ্ডে গেস্ট না আসলে চলে না। এত বন্ধু যে, সাহেবের কবে হল, কী করে হল, তাই-ই ভাবি। আসলে বুঝেছ টিঙ্কু, বন্ধু-ফন্ধু কেউ নয়, সব স্যার এ এম-এর হোটেলে বডি-ফেলে দিব্যি খানা-পিনা করে চলে যায়। এমনিতেই গোদ নিয়ে বেঁচে আছি আমরা। তার ওপর প্রতি সপ্তাহে-সপ্তাহে বিষ-ফোঁড়া।
পরক্ষণেই বললেন, আচ্ছা। চললুম তাহলে।
বললাম, আচ্ছা।
ভজনদা চিড়িয়খানার দিকে চলে গেলেন।
দেখতে দেখতে সাহেবের গেস্টরা ঘুম ভেঙে উঠলেন। বারান্দায় চায়ের আসর বসল। বউরানি মুখ-টুখ ধুয়ে যখন বারান্দায় এলেন, তখন আমার সাময়িকভাবে ছুটি মিলল। আমিও বাবুর্চিখানায় গিয়ে আরও এককাপ চা খেয়ে নিয়ে স্কুটার-টেম্পো চড়ে বাজারে বেরোলাম।
বাজার থেকে ফিরে এলাম ন-টার মধ্যে। এসে দেখি সাহেবও বারান্দায় বসে আছেন। সাহেবের গেস্টদের সব চান-টান হয়ে গেছে। লিচু একটা হলুদ লুঙ্গি পরেছেন। খাসা দেখাচ্ছে। চলমান এককাঁদি হলুদ সবরিকলার মতো।
ব্রেকফাস্ট হয়েছে টিঙ্কু? সাহেব শুধোলেন।
—না স্যার।
আমি বললাম।
—শিগগিরি খেয়ে নাও। চলো, হানিফ সাহেবের বাড়ি যাব।
মেমসাহেবরা সমস্বরে বলে উঠলেন, আমরাও যাব।
চলো। সাহেব বললেন, প্রশ্রয়ের সুরে।
আমি তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম। তারপর শেতলপাটির গাড়ি ও আমাদের গাড়ি নিয়ে আমরা হানিফ সাহেবের বাড়ি গেলাম।
বিরাট কম্পাউণ্ড। গোলাপের চাষ করেন ভদ্রলোক। বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি। কিন্তু খুব শক্ত-সমর্থ ডাঁশা পেয়ারার মতো চেহারা।
গোলাপের চাষ সাহেবেরও কিছু আছে। নবীন রায় বলছিলেন।
আমরা যেতেই সাহেব সকলের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করিয়ে দিলেন হানিফ সাহেবের। বিরাট সিটিং রুমের একপাশে ফায়ার প্লেস, অন্যপাশে সেলার—আর একপাশে একটা দারুণ রাইটিং টেবিল। টেবিলটা দেখে বড়ো লোভ হল। আহা! আমার যদি এমন একটা টেবিল থাকত, তবে আমিও হয়তো লেখক হতে পারতাম একদিন ওই টেবিলে কাগজ-কলম নিয়ে কসরত করতে করতে।
হানিফ সাহেব মেয়েদের কোকাকোলা, ছেলেদের রাম অফার করলেন।
শেতলপাটি ও আমি মেয়েদের মতো কোকাকোলা খেলাম।
সাহেবরা রাম।
হানিফ সাহেবের গোলাপ-বাগানে বাডিং করতে আসত একটি মেয়ে দূরের গ্রাম থেকে। হানিফ সাহেব তাকেই বাডিং করে দিলেন। শেষে বিয়ে করতে হল রীতিমতো ধর্মীয় অনুষ্ঠান-টনুষ্ঠান করে—আমার সাহেবের মধ্যস্থতায়। চারশো টাকা খরচ করে, শ্বশুরকে গোরু-বলদ, ধুতি এবং গাঁয়ের লোককে প্রচুর মহুয়া খাইয়ে। হানিফ সাহেবের বউও ভজনদার স্ত্রীর মতোই ‘ডি অ-স’—ভার্সেটাইল বউ। সকালে বাগানে গোলাপের বাডিং করেন, দুপুরে রান্না-বান্না; বিকেলে বাগানে জল দেওয়া। রাতে তাঁকেই আবার হানিফ সাহেব বাডিং করেন। সিস্টেমটা সম্মানজনক, লিস্ট এক্সপেনসিভ ও অত্যন্ত কনভিনিয়েন্ট।
দেখেশুনে কাতলামাছ খেপে গেলেন যে, তিনিও এখানে একটা বাড়ি করে লাল গোলাপ ফুলের বাডিং ও অন্য ফুলের বাডিং একসঙ্গে চালু করে দেবেন।
কাতলামাছের মুখটার কোনো রাখ-ঢাক নেই।
সাহেব আনকম্ফর্টেবল ফিল করতে লাগলেন, যদিও কথাবার্তা সব ইংরিজিতেই হচ্ছিল কিন্তু পর্দার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিসেস হানিফ কাতলামাছের চোখ-মুখের উত্তেজনা দেখে কিছুটা অনুমান করতে নিশ্চয়ই পারছিলেন।
বিরিয়ানি পোলাও রান্না হবে আগামীকাল রাতে—সঙ্গে গুলহার কাবাব। কতজনের মতে হবে, কখন হবে, সব জেনে নিয়ে সাহেবের নির্দেশানুসারে হানিফ সাহেব আমাকে বুঝিয়ে দিলেন প্রস্তুতি পর্বে কী কী লাগবে। নধর এবং মাঝবয়সি খাসির কোন কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে কতখানি করে মাংস কিনতে হবে কাটিয়ে নেয়ে, কতখানি জাফরান, গরম মশলা, বড়ো নৈনিতাল আলু ইত্যাদি ইত্যাদি। গুলহার কাবাবের মাংস সেদ্ধ করার জন্যে পেঁপে, ভাঙা কাপ-ডিশ (ভাঙা কাপ-ডিশে নাকি তাড়াতাড়ি মাংস-সেদ্ধ হয়) ইত্যাদিরও রিকুইজিশন দিলেন। লিস্টের শেষে লিখলেন—এক বোতল রাম—।
এই ব্যাপারটা আমার জানা ছিল। মামাদের জমিদারিতে যখন যজ্ঞির ঠাকুর আসত—হয়তো পাঁচ-শো লোকের খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত হচ্ছে কোনো পালা-পার্বণে—তখন বাজারের লিস্টের শেষ আইটেমে থাকত; ‘শরীর মেরামতি খাতে’—দুই টাকা। অর্থাৎ যজ্ঞির ঠাকুরদের আফিং-এর খরচা।
সেইরকম এই হানিফ সাহেবও বডি রিপেয়ারিং-এর জন্য ওষুধের বন্দোবস্ত করে রাখলেন। ভাবলাম, ষাট বছর বয়সেও এত বাডিং করলে শরীরের দোষ কী?
হানিফ সাহেবের কাছ থেকে আমরা যখন বাড়ি ফিরে এলাম, তখন বউরানিকে দেখা গেল না কোথাওই।
সাহেব শুধোতে, মেহবুব বলল, মেমসাহেব স্লিপিং ট্যাবলেট খেয়ে শুয়ে পড়েছেন আর আপনাকে এই চিঠিটা দিয়ে গেছেন।
ছাগল-দাড়ি মুখ কালো করে দাড়ি চুলকে বললেন, বেলা এগারোটায় স্লিপিং ট্যাবলেট খেয়ে শুয়ে পড়ার মানে? কী গো অংশুমান? শেষে কি তোমার বউ আত্মহত্যা-টত্যা করে আমাদের খুনের মামলায় জড়াবে?
সাহেব বললেন, ও কিছু না, ভ্রমরের যে, রাগ হয়েছে এটা তার সিমটম। এ নিয়ে তোমরা মাথা ঘামিয়ো না।
সাহেব বাইরের বারান্দাতেই মেমসাহেবের চিঠিটা অ্যাশট্রে চাপা দিয়ে রেখে দিয়েছিলেন, এক নজর চোখ বুলিয়ে।
টি-হাউসে ওঁরা সকলে মিলে বসলেন গিয়ে।
সাহেব বন্ধুদের বললেন, তোমরা গল্প-সল্প করো, ততক্ষণে আমি একটু কাজ সেরে আসি। নিনি বললেন, আমি যাই ভ্রমর বউদিকে একটু দেখে আসি।
সাহেব বললেন, ওর দু-চারটে স্লিপিং পিলে আজকাল কিছু হয় না। ঠিক লাঞ্চ-টাইমে ঘুম ভেঙে যাবে। এখন ওকে বিরক্ত না করাই সেফ সকলের পক্ষে।
বলেই, সাহেব চলে গেলেন।
সাহেব চলে যেতেই ওই চিঠিতে মেমসাহেব কী এমন রাগের কথা লিখলেন জানতে বড়ো ইচ্ছে হল। সাহেব আমাকে সকালেই বলেছিলেন যে, বউরানি হানিফকে পছন্দ করেন না।
আমি মেহবুবকে টি-হাউসের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে এবং ওঁদের খিদমদগারি করতে বলে বারান্দায় এসে চিঠিটা উঠিয়ে নিলাম।
চিঠিটা এত সংক্ষিপ্ত সাংকেতিক ভাষায় লেখা যে, তার মর্মোদ্ধার করা আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল।
চিঠিটায় কোনো সম্বোধন অথবা লেখিকার নাম ছিল না। ওপরে তারিখ ছিল শুধু, আর লেখা—
‘মি. হানিফকে যখন ডেকেছে, তখন তুমিই সমস্ত রাত ধরে রান্না শিখবে। মির্জা গালিবের প্রেমপত্রর ব্যবস্থা করো। আমার শরীর তখন খারাপ হবে। একশোবার কথা দিয়ে কথা রাখো না।
ঝাঁকি দর্শনে কথা হল না বলে, এতখানি কালি খরচ হল।’
কিছুই না-বুঝতে পেরে চিঠিটা যেমন অ্যাশট্রে চাপা দেওয়া ছিল তেমন-ই চাপা দিয়ে রেখে আমি কোয়ার্টারের দিকে এগোলাম।
আধাআধি গেছি, এমন সময় চিড়িয়াখানার দিক থেকে একটা প্রচন্ড ও উত্তেজিত চিৎকার ভেসে এল। ‘হয়েছে; হয়েছে; হয়েছে রে, হয়েছে।’
কী হয়েছে, বুঝলাম না, কিন্তু প্রচন্ড উত্তেজনাকর কিছু যে, একটা হয়েছে তা বুঝলাম।
চিড়িয়াখানার দিকে দৌড়ে গেলাম।
প্রায় আমার পাশে পাশেই গ্রিনহাউসের দরজা খুলে হঠাৎ বেরিয়ে নবীন রায়ও দৌড়ে চললেন ওদিকে।
গিয়ে দেখি, মুখে হঠাৎ গরম আলু পড়লে লোকে যেমন এক ঠ্যাং-এ নাচে, তেমনি করে ভজনদা একঠ্যাং-এ লাফিয়ে নাচছেন আর চিৎকার করছেন, ‘হয়েছে রে হয়েছে; অবশেষে হয়েছে।’
নাচতে নাচতে হঠাৎ-ই নবীনকে দেখতে পেয়েই ভজনদা আরও চেঁচিয়ে উঠে বললেন, নবনে রে নবনে হয়েছে রে হয়েছে।
যাই হয়ে থাকুক, খারাপ কিছু যে, হয়নি তা বুঝলাম।
কিন্তু কী হয়েছে সেটা এখন জানা দরকার।
হঠাৎ নবীনবাবু আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, টিকলুবাবু দৌড়ে যান অফিসঘরে, সাহেবকে গিয়ে খবর দিন যে, হয়েছে।
কী হয়েছে? আমি তাড়াতাড়ি শুধোলাম।
কিন্তু আমার কথার উত্তর কে দেবে?
দেখি, ভজনদা আর নবীন রায়ে জড়াজড়ি করে ঘুরে ঘুরে নাচছেন আরও জোরে চিৎকার করছেন, ‘ওরে নবনে হয়েছে, এতদিনে হয়েছে।’ আর নবনেও সমান উল্লসিত হয়ে বলছেন, ‘ধন্যি তুই ভজনদা, হয়েছে রে হয়েছে।’
স্কুলের স্পোর্টস-এর পর এতজোরে আমি আর দৌড়োইনি।
দৌড়ে অফিসঘরের দিকে যেতে যেতে দেখি সাহেবের গেস্টরাও সকলে পড়ি-কী-মরি করে চিড়িয়াখানার দিকে সেই চিৎকার শুনে দৌড়ে আসছেন।
লিচুর লুঙ্গি খুলে যার আর কী।
এমন বিপজ্জনকভাবে তিনি দৌড়োচ্ছেন।
ছুটন্ত আমি যখন বিপরীত দিকে ছুটন্ত গেস্টদের ডেলিগেশনকে মাঝপথে মিট করলাম, তখন কাতলামাছ হাঁফাতে হাঁফাতে দৌড়োতে দৌড়োতে শুধোলেন, কী হয়েছে?
আমি হাত তুলে বললাম, হয়েছে।
ওঁরা ঘাবড়ে গিয়ে জোরে দৌড়োলেন।
ওঁদের ঘাবড়ে যেতে দেখে আমিও ঘাবড়ে গিয়ে আরও জোরে দৌড়োলাম।
সাহেব টেবিলে বসে একটা ফাইলের কাগজ দেখছিলেন।
আমাকে ওইভাবে দৌড়ে ঘরে ঢুকতে দেখেই সাহেব উদবেগে ভুরু কুঁচকে বললেন, কী হল গজেন?
আমি বললাম, স্যার হয়েছে।
বলেই, চিড়িয়াখানার দিকে আঙুল দিয়ে দেখালাম।
সাহেব একলাফে উঠে দাঁড়ালেন। সেই হঠাৎ উঠে দাঁড়ানোতে হালকা অ্যালুমিনিয়ামের চোয়ারটা ফটাস করে উলটে গেল।
সাহেব তক্ষুনি দু-হাত ওপরে তুলে তেড়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেলেন অফিস থেকে—দৌড়োতে দৌড়োতে চেঁচিয়ে বললেন, আসছি, ভজন আসছি।
মনে হল, কাউকে জলে ডুবে যেতে দেখলে বা কারও বাড়ি ডাকাত পড়লে বন্ধুরা যেমনভাবে দৌড়ে যান, তেমনভাবেই যেন উনি দৌড়ে গেলেন।
আমিও পেছন পেছন। ভাবনা বেড়ে গেল।
কিন্তু আমার সাধ্য কী, সাড়ে ছ-ফিট সাহেবের ক্যাঙারুর মতো পায়ের সঙ্গে পাল্লা দিই আমি?
আমি আধ-রাস্তা যেতে-না-যেতেই দেখলাম সাহেব পৌঁছে গেছেন ভজনদার কাছে।
আমি যখন পৌঁছোলাম, তখন দেখি সাহেব ভজনদার হাতে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন; আর ভজনদার দু-চোখে জল।
সমবেত জনমন্ডলী নির্বাক, নিস্তব্ধ। ছাগল-দাড়ির দাড়ি উড়ছে না, কাতলামাছের মুখ আরও ফাঁক হয়েছে; শেতলপাটি স্ট্যাচু হয়ে গেছেন।
আমি ফিসফিস করে ওঁদের বললাম, কী হয়েছে স্যার?
তিনি আমাকে আরও ফিসফিস করে বললেন, ময়ূরীর ডিম হয়েছে। চুমকির।
এরপর আর এক নতুন বিপত্তি হল।
দেখি, খাঁচার দরজা খুলে সাহেব চুমকির ঘরে ঢুকে পড়লেন।
চুমকি তার সদ্যোজাত ঐতিহাসিক ডিম্ব প্রসব করতে যা-না উত্তেজনা বোধ করেছিল, প্রসবের পর প্রসবিনীর মতো ঘটনা-পরম্পরায় সে হতচকিত হয়ে খাঁচার এককোনায় গিয়ে চুপ করে মুখ নীচু করে দাঁড়িয়েছিল। যেন মহা অন্যায় কিছু করে ফেলেছে। তার সামনে আড়াইশো গ্রাম ওজনের ডিমটা খাঁচার মধ্যে খড়ের ওপর লজ্জায় নীল হয়ে নট নড়ন-চড়ন নট-কিচ্ছু হয়ে পড়েছিল।
খাঁচাটা উচ্চতায় বড়োজোর পাঁচ ফিট। সাড়ে ছ-ফিট সাহেব তারমধ্যে কুঁজো হয়ে ঢুকলেন। ঢুকেই বললেন, মা গো। বোস মা লক্ষ্মীটি।
শেতলপাটি হাতের সিগারেটটা উত্তেজনায় ছুড়ে ফেলে বললেন, ব্যাপারটা কী? এখন কী হবে?
ভজনদা এই অর্বাচীন প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে বললেন, আপনারা এবার যান স্যার—এখানে ভিড় করলে বোধ হয় চুমকি তা দিতে বসবে না।
তারপর একটু থেমে বললেন, আপনারা বোধ হয় জানেন না যে, ক্যাপ্টিভিটিতে ময়ূরের বাচ্চা করানো অত্যন্ত কঠিন। আমরা, আপনারা কো-অপারেট করলে, সেই অসাধ্যসাধন করতে পারি।
সাহেবও খাঁচায় মধ্যে থেকে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, যাও হে, তোমরা গিয়ে বিয়ার খেয়ে চুমকির ডিম-হওয়া সেলিব্রেট করো।
আমরা ওখান থেকে চলে আসার সময় দেখলাম, চুমকি সুন্দরী গর্বিতা মেয়ের মতো এক-পা এক-পা করে খাঁচাটার চারপাশে ঘুরে ডিমটাকে প্রদক্ষিণ করছে আর সাহেব পেছনে পেছনে—অদ্ভুত ভঙ্গিমায় না দাঁড়িয়ে, না বসে তার পেছনে ঘুরতে ঘুরতে বলছেন, ‘বোসো মা, মা আমার লক্ষ্মী সোনা তা-য়ে বোসো মা।’
সাহেবের বন্ধুরা আগেই চলে এলেন।
নবীনবাবুর সঙ্গে আমি ফিরছিলাম।
গ্রিনহাউসের পাশে আসতেই নবীনবাবু বললেন, চলুন, আমার গ্রিনহাউসটা আপনাকে দেখাই। এসে অবধি তো আপনার সময় হল না।
গ্রিনহাউসের ভেতর ঢুকেই চোখ জুড়িয়ে গেল।
কতরকম যে, গাছ আর ফুল আর অর্কিড। মধ্যে একটা জাপানিজ কায়দায় খোঁড়া পুকুরের মতো ছোট্ট পাথর-খোঁড়া জল। তারমধ্যে ফোয়ারা। চারপাশে হেঁটে বেড়াবার জায়গা। আর পথের পাশে পাশে গ্যালারির ওপরে টবে সাজিয়ে রাখা পাতা, অর্কিড, ফুল। গ্রিনহাউসের ছাদ থেকেও অনেক অর্কিড ঝুলছে। সেই অর্কিডের মাটির টবগুলো সুন্দর রং-করা পাট দিয়ে তৈরি শিকে থেকে ঝুলছে। শিকেগুলোতে ফুল তোলা। ফুলগুলো আবার রং করা।
এমন একটিও তুচ্ছ জিনিস নেই, যাতে চিন্তা, কল্পনা ও সুরুচির ছাপ নেই। কত মাথা খাটিয়ে, কতদিনের পরিশ্রমে ও কত যত্নে যে, এই গ্রিনহাউসের প্রতিটি টুকরোকে গড়ে তোলা হয়েছে তা ভেবেই আশ্চর্য হয়ে গেলাম আমি।
আমি স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে নবীনবাবুকে শুধোলাম, ওই যে নানারঙা সুন্দর লতাগুলো, ওগুলোরকী নাম?
—কোনগুলো?
—ওইগুলো।
বলে আঙুল দিয়ে দেখালাম আমি।
নবীনবাবু বললেন, ওগুলো ‘ফিলোডেন-ড্রন’। নানারকম হয় ওগুলো। বাই-কালার হয়, মনো-কালারও হয়। সবুজ। ডেকরেটিভ পাতাগুলো দেখছেন না লতার সঙ্গে। এইগুলোই বিশেষত্ব।
আমি শুধোলাম, ওই যে পানপাতার মতো বড়ো বড়ো পাতাঅলা লতা, ওগুলো কী?
নবীনবাবুর চোখে-মুখে গর্ব ঝরে পড়ছিল। এত কষ্ট করে, যত্ন করে এগুলো পরিচর্যা করেন, কেউ দেখে তারিফ করলে তবে না আনন্দ।
উনি বললেন, ওগুলোকে বলে ‘অ্যান্থোরিয়াম’। ‘ওরোকুইনাম’ও আছে। সাদা সাদা শিরা বের করা ডেকরেটিভ।
আমি অবাক গলায় বললাম, এত বিভিন্নরকম কচুগাছ রেখেছেন কেন?
নবীনবাবু হাসলেন। বললেন, কচু তো মাটির তলায় হয়। কিন্তু তাদের পাতার বাহারের কি শেষ আছে? আমার এখানেই তো কতরকমের কচু আছে। যেমন দেখুন ওইটা।
আমি বললাম, কোনটা।
ওই যে ওইটা, বলে বাঁ-দিকের কোনায় দেখালেন।
বললেন, ওগুলোকে বলে ‘এলোকেশিয়া’।
বললাম, বা: বেশ বাংলা এলোকেশী-এলোকেশী গন্ধ আছে তো নামটাতে।
নবীনবাবু বললেন, ‘এলোকেশিয়া’র মধ্যে আবার নানারকম ভ্যারাইটি আছে। যেমন ‘সানড্রিয়ানা’—কালো, ওই দেখুন, তারপর ‘মেটালিকা’—একেবারে ব্রোঞ্জের রং। সানড্রিয়ানার কালোর মধ্যে সাদা শিরা আছে।
হঠাৎ চোখ পড়ল ডানদিকে—ছোটো ছোটো পানপাতার মতো লতা।
আমি শুধোলাম, ওগুলো কী? পানগাছ কি?
নবীনবাবু হেসে বললেন, না ওগুলো ‘এগ্লোনিয়া—ডোয়ার্ফ’—পানপাতার-ই মতো; কিন্তু ডেকরেটিভ।
সব দেখেশুনে রীতিমতো উত্তেজিত বোধ করছিলাম।
নবীনবাবু বললেন, ওই যে, ভেলভেটি বড়ো পাতাগুলোতে সাদা ফুল—নানারঙা পাতায় ছাওয়া—ওইগুলোর নাম ‘বিগোনিয়া রেক্স’।
আমি বললাম, কলাপাতার মতো পাতাগুলো কোন গাছের?
নবীনবাবু হাসলেন। বললেন ওগুলোকে বলে ‘ডিফিয়োনবিচিয়া’। কলাপাতার মতোই ছোটো ছোটো হয়—অনেকরকম পাতা হয় এদের। এদের মধ্যে একটা বিশেষ ভ্যারাইটির ডাঁটি হয়—তাদের রং সাদা। ‘সাদা’ মানে, একেবারে মার্বল হোয়াইট।
হঠাৎ জলের পাশে একটা এগ্লোনিমা প্ল্যান্টের গায়ে চোখ পড়ল। দেখি একটা ছোটো ব্যাং হাত-পা ছড়িয়ে তার ওপর বসে আছে। গ্রিনহাউসের ওপরের ফাঁকফোকর দিয়ে সূর্যের আলো এসে জলে পড়েছে। পড়ে, সেই আলো প্রতিফলিত হয়ে নানারঙা পাতা ও প্ল্যান্টের ওপর, অর্কিডের ওপর বিচ্ছুরিত হচ্ছে। সেই আলোর প্রতিফলনে, বিভিন্ন রঙে, জলের ঝিকিমিকিতে পুরো জায়গাটাকে একটা স্বর্গরাজ্য বলে মনে হচ্ছে।
এমন সময়ে হঠাৎ পেছনে গ্রিনহাউসের দরজা খোলার আওয়াজ শোনা গেল। এবং তার সঙ্গে সঙ্গে একসঙ্গে অনেক পুরুষ ও নারীকন্ঠে ‘হাউ লাভলি, হাউ সুইট’ ইত্যাদি আওয়াজ।
তাকিয়ে দেখলাম, সাহেবের অতিথিরা।
প্রত্যেকের হাতেই একাধিক ক্যামেরা। স্টিল ক্যামেরা। টেলিফোটো ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স লাগানো স্টিল ক্যামেরা; মুভি ক্যামেরা—এইট মিলিমিটারের।
হঠাৎ ফোটোগ্রাফার বামাপদ ব্যাংটাকে আবিষ্কার করল। তারপর বেচারা ব্যাংটার যে, কী হেনস্থা হল সে চোখে দেখা যায় না। কে যেন দৌড়ে গিয়ে চেয়ে-চিন্তে কোথা থেকে একটা আয়না জোগাড় করে আনল। রোদের যেটুকু ফালি গ্রিনহাউসের মধ্যে এসে পড়েছিল, সেই ফালিতে আয়না ধরে আলোর প্রতিফলন ফেলা হল ব্যাংটার গায়ে। তিনি মাটিতে থেবড়ে বসে সেই আয়নাটা ধরে ফোকাস করে থাকলেন। আর চতুর্দিকে ক্যামেরাম্যানরা কখনো শুয়ে, কখনো থেবড়ে বসে, কখনো দাঁড়িয়ে, কখনো হাঁটু গেড়ে বসে কির-কির, খুট-খটাস, ক্লিক-ক্লিক করে ছবি তুলতে লাগলেন।
পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো কটকটি ব্যাং এতবড়ো ইম্পর্টেন্স পেয়েছে বলে মনে হল না আমার।
ভালো করে ফোটো তুলতে গিয়ে কাতলামাছ একটা ‘ডিফিয়োন-বিচিয়া’র ওপরে হেলান দিয়ে ফেলেছিলেন একটু হলে।
সঙ্গে সঙ্গে নবীনবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, আমার গাছ; আমার গাছ।
ওঁর আর্তনাদ শুনে মনে হল কেউ জুতোসুদ্ধু ওঁর নাক-ই মাড়িয়ে দিয়েছে বুঝি।
ভাবছিলাম, ভালোবাসা, ডেডিকেশন এসব-ই একটা অনুপ্রেরণার ব্যাপার। এই চিড়িয়াখানার প্রতিটি লোক সাহেবের সংস্পর্শে এসে এমন-ই অনুপ্রাণিত হয়েছেন যে, সে নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। শুধু টাকার জন্যে কোনো কর্মচারী কখনো এমন করতে পারেন না। ময়ূরের বাচ্চা হলে পাথুরে ভজনদার চোখফেটে আনন্দাশ্রু গড়ায়, নবীনবাবু সাপ মেরে সে সাপ দু-মাইল বয়ে আনেন, চুমকি সাপ খেতে ভালোবাসে বলে, গ্রিনহাউসের গাছ-পাতায় কেউ হাত ছোঁয়ালে মনে হয় কেউ নবীনবাবুর বিষফোঁড়ায় হাত ছোঁওয়াল।
সেই মুহূর্তে বুঝতে পারলাম যে, ভালোবাসা, অনুপ্রেরণা, সৎসঙ্গ, এই ব্যাপারগুলো নিশ্চয়ই খুব ছোঁয়াচে—নইলে সাহেবের কাছ থেকে একজন লোকের মধ্যে এ ব্যাপারগুলো এমনভাবে সংক্রমিত হত না।
সন্ধে সাতটা সাড়ে সাতটা নাগাদ আমি আর ভজনদা, মেহবুবকে সঙ্গে নিয়ে, আইসবক্সে বরফ, সোডা, কোকাকোলা, ফান্টা এবং আলাদা করে হুইস্কি-টুইস্কি নিয়ে আমাদের গাড়িতে সুজানী গ্রামের দিকে রওনা হলাম। অ্যাডভান্স টিম আমরা। গিয়ে সব ইন্তেজাম করে রাখব।
ফুটফুট করছিল জোৎস্না। কুতনিয়া নদীটার বালি চাঁদের আলোতে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছিল। কুতনিয়া পেরিয়ে টাঁড়ের মধ্যে পায়েচলা সুঁড়িপথ লক্ষ্য করে পান্ডে গাড়ি চালাতে লাগল টিগরিয়া পাহাড়ের কোলের সুজানী গ্রামের উদ্দেশে।
পথে বড়ো বড়ো পাথরের চাঁই ছিল। গাড়ি চালাতে রীতিমতো কসরত করতে হচ্ছিল।
প্রায় আধঘণ্টা লাগল পৌঁছোতে। গাড়ি বেশিরভাগ-ই সেকেণ্ড কী থার্ড গিয়ারে যাচ্ছিল। দূর থেকে বিরাট অশ্বত্থগাছটা দেখা যাচ্ছিল। চাঁদের আলোয় তার পাতা ঝিলমিল করছিল হাওয়া লেগে। গাছের নীচে অনেক মেয়ে-পুরুষ জমা হয়েছে ইতিমধ্যেই দেখলাম। মাদলে ও কাঁসরে চাঁটি ও কাঠি পড়ছে এলোমেলো। দূর থেকেই তাদের ‘দ্রিম দ্রিম’ আওয়াজ কানে আসছিল।
আমরা পৌঁছে গাড়ির বুট খুলে ফোল্ডিং ইজিচেয়ারগুলো নামালাম। চৌপাইও জোগাড় হল। আইস-বক্স নামিয়ে মেহবুবের জিম্মায় দেওয়া হল। আইস-বক্সে জলও ছিল। কোনো সাহেব সোডা দিয়ে হুইস্কি খাবেন, কেউ বা জল দিয়ে। অনুষ্ঠানের কোনো ত্রুটি নেই।
মানুদি, ফুলমণি, ও আরও অনেক মেয়ে, যারা চিড়িয়াখানায় কাজ করে সবাই সেজেগুজে এসেছে। তার মধ্যে পানুই-এর সাজ আজ দেখে কে? পানুই-এর চলায়, তাকানোতে, ইংরিজিতে যাকে আমরা ডিমেন্যুর বা গেইট বলি, তা এমন মাত্রায় ছিল যে, তা বলার নয়।
আমার হৃদয়ে আবারও বিস্ফোরণ হল। চাসনালায় আবার দুর্ঘটনা।
আমরা নেমেই গাড়ি ছেড়ে দিলাম। সাহেবরা মেমসাহেবদের সঙ্গে নিয়ে আবার দু-গাড়ি বোঝাই হয়ে আসবেন নাচ দেখতে।
ভজনদা বললেন, আর্মিতে একটা কথা আছে জানো?
কী কথা? আমি শুধোলাম।
—ওয়ার্মিং-আপ দ্যা ব্যারেলস। অবশ্য কথাটা সাহেবদের। তাই বলছি, এসো ভায়া, আসল যাত্রা আরম্ভ হওয়ার আগেই আমরা একটু ওয়ার্মিং আপ করে নিই। এসো, একটু মহুয়া খাবে।
আমি বললাম, আমার ওসব চলে না দাদা। কখনো খাইনি।
ভজনদা বললেন, এই ‘কখনো খাইনি, কখনো করিনি’ কথাগুলো আমি ঘেন্না করি। ফুলশয্যার রাতে কি খাটের বাজুতে পা-ঝুলিয়ে বসে বউকে বলবে লাল মুখ করে যে, কখনো......। সব জিনিস-ই কোনো-না-কোনোদিন আরম্ভ করতে হয়। সুনার দ্যা বেটার। বুজেচো।
আমি বললাম, আমাকে মাপ করুন দাদা।
ভজনবাবু বললেন, ঠিক আছে। তোমার শেয়ারটাও আমিই খাব।
তারপর বললেন, তোমাকে সঙ্গে না এনে নবনেকে আনা উচিত ছিল। আজকে দু-জনে মিলেচুমকির ডিম-হওয়াটা সেলিব্রেট করা যেত।
তারপর আবারও বললেন, সাহেব বেছে বেছে সব মেয়েছেলে মার্কা তোমার মতো ব্যাটাছেলে যে, কোত্থেকে রিক্রুট করে আনেন, তা সাহেব-ই জানেন।
সাঁওতাল ছেলেরা ও মেয়েরা ততক্ষণে পুরোপুরি ওয়ার্মড হয়ে গেছে সূর্য ডোবার পর থেকে মহুয়া খেয়ে। ছেলেরা হাত ধরে একলাইনে দাঁড়িয়ে একটা গান গাইছিল। ওদের গানের সুরে ঘুম পেয়ে যায়—সুরে ভারি একটা মহুয়ার গন্ধ—‘ভরা মনোটোনি’—সেটাই বুঝি ওদের গানের বিশেষত্ব।
ওরা যে গানটা গাইছিল এগিয়ে-পেছিয়ে সে-গানের কথাগুলো এইরকম :
আইলে না গলে পুতাআইলে না গলে হো—কঁহা পাবলো হো পুতাকানেকা সোনা বাহামরা গোঙ্গো শাসুরযায়সে না তৈসে হো—হামরা গোঙ্গো শাসুরবোড়োরে বিলাতে হো... ইত্যাদি ইত্যাদি
ভজনদাকে বললাম, ভজনদা এই গানটার মানে কী?
ভজনদা বললেন, বিরক্ত কোরো না তো, সবে নেশাটা চড়েছে।
তারপর বললেন, আমি সাঁওতালি ভাষা জানি না। কয়েকটা কথা ম্যানেজ করতে পারি এইপর্যন্ত।
আমি অবাক হয়ে বললাম সে কী? বউদি সাঁওতালি বলেন, আমি ভেবেছিলাম আপনি বুঝি জানেন।
তারপর অবাক হয়ে শুধোলাম, বউদির সঙ্গে তাহলে কথাবার্তা চালান কী করে?
ভজনদা বললেন, কথাবার্তা যা দু-একটা দরকার হয়, যেমন ‘একগ্লাস জল দাও, আর একটু ভাত দাও’ এসব শিখে নিয়েছি। এ ছাড়া কথার দরকার কী? বাদবাকি তো ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অফ দ্য বডি’—সারাপৃথিবীতে এক-ই ভাষা চলে। বে-শাদি করো, তখন জানবে।
কিছুক্ষণ পর তিন-চার মাইল দূর থেকে ফাঁকা ফাঁকা চাঁদের আলো ছমছম করা টাঁড়ে দুটো হেডলাইটকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল।
গাড়িগুলো আসছে দেখে আমাদের মধ্যে এবং যারা নাচবে তাদের মধ্যেও সাজ-সাজ রব পড়ে গেল।
পাগলা সাহেব আসছে। পাগলাসাহেবকে মান্যি-গণ্যি করে না, এমন লোক এ তল্লাটে নেই।
সাহেব মেমসাহেবরা এসে পৌঁছোতেই, চেয়ারে বসতে-না-বসতেই যার যার হুইস্কি, মেমসাহেবদের কোকাকোলা, ফান্টা, সব মেহবুব হাতে হাতে ধরিয়ে দিল।
এবার মেয়েরা হাতে—হাত রেখে ছেলেদের সামনে মুখোমুখি নাচতে আরম্ভ করল।
এবারে মেয়েরাই গাইতে লাগল। চার লাইনের গানটা—কিন্তু পরে দেখলাম দু-ঘণ্টা ধরে সেই একটাই গান গেয়ে চলল ওরা—অথচ ওই মনোটোনির মধ্যেই, একঘেয়েমির মধ্যেই ওদের গানের পুরো মজাটা লুকোনো ছিল:
রাজা চলে সড়কে সড়কেরানি চলে বিন সড়কে—রাজা হাতে সোনা ছাতাটুকুরি জো উড়ে গেরানি হাসে মনে মনে......
এ গান বোঝার জন্যে ভজনদার হেল্পের দরকার হল না। নিজেই আন্দাজে বুঝে নিলাম—রাজা পথে পথে চলেছেন, রানি পথ ছেড়ে চলেছেন—রাজার হাতে সোনার ছাতা—হাওয়ায় ছাতা উড়ে গেল। রানি দেখে হাসেন মনে মনে।
জানি না, মানেটা ঠিক হল কি না।
শেতলপাটি হাতে একটি টেপ-রেকর্ডার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর গান-বাজনা, কথাবার্তা সব টেপ করে যাচ্ছেন।
যাত্রা জমল সাহেবরা সব চার-পাঁচটা করে হুইস্কি খাওয়ার পর।
আমার সাহেব—নীলকন্ঠ—হুইস্কি খেলেও যা, না খেলেও তা—মহাস্থবির—কোনোই চাপল্য নেই—মাথা ঠাণ্ডা—চোখ সজাগ।
অন্য সাহেবরা যত হুইস্কি খান, ভজনবাবু তত মহুয়া।
পৌনে-এক ঘণ্টা পরে ‘নরক গুলজার’ হল। মেমসাহেবরা সকলে মেয়েদের হাতে হাত দিয়ে নাচতে আরম্ভ করলেন।
সাহেব আর বউরানি ইজিচেয়ারে পাশাপাশি বসে অতিথিদের কান্ড দেখতে লাগলেন।
হঠাৎ কাতলামাছ খেপে উঠলেন। আসলে সকালে হানিফ সাহেবের বাড়িতেই খেপে ছিলেন। এখন গোটা পাঁচ-ছয় হুইস্কি পেটে পড়াতে লিচুকে বললেন, লিচু তুমি পছন্দ করো, এখুনি আমি আমার বউ ঠিক করব।
লিচু মেমসাহেবদের মধ্যে সবচেয়ে সরল আর স্পোর্টিং। তিনি বললেন, আপনি পছন্দ করুন আমি আলাপ করিয়ে দিচ্ছি।
তারপর পানুইকে দেখিয়ে বললেন, ওই তো বিউটি-কুইন।
কাতলামাছ বললেন, ও বড়োবেশি সুন্দরী, তাই আনইন্টারেস্টিং।
কাতলামাছের কথা শুনে ভক্তি হল আমার।
কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা গেল কাতলামাছও মেয়েদের হাত ধরে নাচছেন। সে কী নাচ! একদল সুন্দরী মেয়ের মধ্যে একটা হিপোপটেমাসকে নীল জিনের ফ্লেয়ার আর লাল জিনের শার্ট পরিয়ে ছেড়ে দিলে যেমন দেখতে হয় তেমন আর কী!
কাতলামাছের ফুলমণি আর মানুদিকে পছন্দ হল। নিজেই গিয়ে দু-জনকে বললেন, আমাকে বিয়ে করবি?
মানুদি স্ট্রেট মুখের ওপর ‘না’ করে দিল।
বলল, তুই বড়ো মোটা আছিস।
ফুলমণিও একেবারে গররাজি। এমনকী নিমরাজিও নয়।
কাতলামাছ ওদের বললেন তোদের সসম্মানে বিয়ে করব, বউয়ের সম্মান দেব, গাই দেব—বলদ দেব, ছেলে হলে ছেলেকে নিজের সাকসেসর বলে স্বীকার করব।
ওরা সাকসেসর-টাকসেসর কখনো শোনেনি।
ঠোঁট উলটে বলল, কিছু লিব্ব না—তোকে বিয়া করব নারে বাবু।
কাতলামাছ ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে পড়লেন।
ছাগল-দাড়ি আর বামাপদ সমানে ফ্ল্যাশ-লাইট দিয়ে ছবি তুলে যাচ্ছিলেন।
এমন সময় মেয়েরা একটা নতুন গান ধরল।
তার প্রথম লাইনটা ছিল ‘কলকাতা-হাবড়া’ এইসব।
সেই গান শুরু হতেই ছাগল-দাড়ি হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই, গায়ে আসা ইস্তক পরে থাকা নীল ব্যাংলনের গেঞ্জিটা খুলে ফেললেন। এমনিতেই তো নিম্নাঙ্গে যা পরেছিলেন তা না পরার-ই মতো। কেন খুললেন, বুঝলাম না।
হাঠাৎ তাঁকে এমনভাবে বস্ত্র-হৃত দেখে কাতলামাছের সংগীত প্রতিভা—আট-দশটা হুইস্কির কল্যাণে প্রবলভাবে জাগরূক হল।
তিনি নাচ ছেড়ে গান ধরলেন চৌপাইতে বসে।
এতক্ষণে একটা কাজ করে ফেলেছিলেন কাতলামাছ—। ওদের সোজা দোলানি সুরের মেজাজটা ধরে ফেলেছিলেন। আসলে ওঁর উচিত ছিল এমন সব সিম্পল টিউনের ‘কলকাতা-হাবড়ার’ মতো গান শেখা। রবিঠাকুর দীনুঠাকুরের অকল্যাণে উনি কেন যে, লাগেন উনিই জানেন।
তাই, যেই কাতলামাছের গান শুরু হল অমনি তিন-জন মেমসাহেব কাতলামাছকে চৌপাই-এর দু-পাশে বসে একদম চেপটে রাখলেন, পাছে আবারও উঠে গিয়ে কোনো বেলেল্লাপনা করেন।
ছাগল-দাড়ির ডাকনাম ‘কপাল’।
কাতলামাছ যে, স্বভাব-কবি তা এতক্ষণে জানলাম। তিনি এখন ওদের গানের ও বাজনার সঙ্গে সঙ্গে ওই তালে ও লয়ে মিলিয়ে গান শুরু করলেন। স্বরচিত।
শেতলপাটি টেপ বাগিয়ে ধরলেন সামনে।
কাতলামাছ টেনে টেনে গাইতে লাগলেন—।
‘কপালবাবু কপালবাবু, তুমি বড়ো চালাক হয়েছে—ও-ও-ও-ও-চালাকেরও বাবা থাকে গ্ব-ও-ও-ও-ও।বাবারও বাবা থাকে গ্ব-ও-ও-ও-ও।ন্যাংটা হয়ে এসেছ, যেটুকু বা বাকি আছে—আমি খুলে লিব্ব গ্ব—ও-ও-ও-ও।’
যাত্রা পুরোপুরি জমে গেল।
এমনি স্বরচিত গান প্যারাগ্রাফের পর প্যারাগ্রাফ চলতে লাগল। ব্যাপারটাতে যারা গাইছিল, নাচছিল তারা প্রথমটাতে হকচকিয়ে গেলেও পরে সকলেই মজা পেল। এমন মজা পেল যে, ওরা নাচ-গান থামিয়ে সব কাতলামাছের ও মেমসাহেবদের সামনে এসে জড়ো হল।
আমার ইচ্ছে হল বলি কাতলামাছকে, ‘বাহা, বাহা, বাহারে, ঘুরে ফিরে, ঘুরে ফিরে।’ নেহাত চাকরি যাওয়ার ভয়ে বলা গেল না।
হঠাৎ-ই সকলের খেয়াল হল রাত বারোটা বাজে।
রসভঙ্গ ও সভাভঙ্গ করতে হল।
আসর ভঙ্গ হতেই কাতলামাছ দৌড়ে গিয়ে ফুলমণি আর পানুইকে জড়িয়ে ধরে গালে দু-দুটো করে চুমো দিয়ে দিলেন।
বললেন, কাল আসিস কেনে, শাড়ি দিব তুদের।
আমি ভাবলাম, এবার তির খেয়ে মরতে হবে।
ভজনদা নার্ভাস। পুরো গ্রামের লোকের চোখের সামনে এমন কান্ড।
সাহেবের চোখ দেখে মনে হল সাহেবও নার্ভাস।
ভজনদা তাড়াতাড়ি ওদের মধ্যে গিয়ে পড়ে বললেন, আরে সাহেবরা মজা করতে এসেছে—না হলে কেউ নিজের বউয়ের সামনে ওদের চুমু খায়—দেখছিস না বউগুলোও কেমন হাসছে।
এই অকাট্য যুক্তিতে সকলেই ব্যাপারটাকে স্পোর্টিংলি নিল। কোনো অঘটন ঘটল না শেষপর্যন্ত। ঘটতে পারত! অবশ্য সাহেবরা যে, নির্দোষ মজা করতেই এসেছেন ও তাঁরা সকলেই ওয়েল-মিনিং, এ সম্বন্ধে সত্যিই ওদের কারও সন্দেহ থাকার কথা ছিল না।
যাই-ই হোক, যখন সমস্ত গুছিয়ে-গাছিয়ে সাহেবরা ও আমরা গাদাগাদি করে একইসঙ্গে গাড়িতে উঠলাম তখন রাত সাড়ে বারোটা বাজে।
এ আমার কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা। এই চাঁদনি রাত, ঝাঁকড়া অশ্বত্থগাছ, চাঁদের আলোয় দেখা টিকরিয়া পাহাড়, সাঁওতালদের নাচ, গান, এই আশ্চর্য উন্মুক্ত নিষ্কলুষ পরিবেশ—এবং লাস্ট বাট নট দ্যা লিস্ট—কাতলামাছ—সব মিলিয়ে একটি অভিজ্ঞতার মতো অভিজ্ঞতা।
ফেরার পথে সারারাস্তা শেতলপাটি টেপ বাজাতে বাজাতে এলেন।
আমার মনে হল, কাতলামাছ এখানে এসে পর্যন্ত একমাত্র এই গানগুলিই সুরে গেয়েছেন।
চাঁদের আলোয় ভরা নিশুতি রাতে টাঁড়ের মধ্যে দিয়ে গাড়িতে আসতে আসতে— সাঁওতালদের নাচ ও গানের ও কাতলামাছের গানের টেপ বাজছিল। ভারি ভালো লাগছিল। সকলেই একেবারে খোলামনে খুব হইচই করলেন।
ভজনদা ও আমার চাকরিটা রইল।
হুইস্কি বা মহুয়া কিছু না খেয়েও ওই পরিবেশের জন্যে আমারও নেশা নেশা, ঘোর ঘোর মনে হচ্ছিল।
বাড়ি পৌঁছোলাম যখন সকলে, তখন রাত প্রায় একটা বাজে।
সাহেব বললেন, টিকলু, তোমায় কাল ভোরে স্টেশনে যেতে হবে। মি. রায় বলে এক ভদ্রলোক আসবেন। একটু ডেসক্রিপশান দিচ্ছি, যাতে চিনতে ভুল না হয়—বয়স ষাটের ওপর—বেঁটে—পেট-মোটা—সাদা চুল—পরনে অলিভ গ্রিন মিলিটারির মতো পোশাক। দেখে মনে হবে রিটায়ার্ড জেনারাল। চিনতে ভুল কোরো না। ওঁকে রিসিভ করে নিয়ে আসবে। উনি এগ্রিকালচার, হর্টিকালচার, ডেয়ারি, পোলট্রি, ফিশারি, জন্তুজানোয়ার ইত্যাদি সব বিষয়ে অথরিটি। খুব সম্ভব ওঁকে এখানে আমার অ্যাডভাইসার করে পার্মানেন্টলি রাখা হবে।
তারপর বললেন, দেখো, ওঁর কোনো কষ্ট না হয়। গাড়ি নিয়ে যেয়ো। আমি উঠে তৈরি হয়ে থাকব ওঁর জন্য। তুমি সোজা আমার কাছে নিয়ে আসবে।
অথিতিদের খাওয়া-দাওয়ার তদারক করলাম। তাঁরা সবাই লনে চাঁদের আলোতে বসেই খেলেন। প্রত্যেকের সামনে মেহবুব আর অশোক ছোটো ছোটো টেবিল লাগিয়ে দিল। সেদিন বাড়িতে রান্না হয়নি। বউরানির অর্ডারে শহর থেকে নান আর তন্দুরি চিকেন আনা হয়েছিল। সঙ্গে খাসির রেজালা।
ওঁদের খাওয়া হয়ে গেলে নিজের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে কোয়ার্টারে গিয়ে শুতে শুতে রাত সোয়া-দুটো বাজল। বেশি হলে আড়াই ঘণ্টা ঘুমিয়েছিলাম সে-রাতে।
অশোককে বলে রেখেছিলাম।
অশোক এসে দরজা ধাক্কা দিয়ে চা দিয়ে গেল। ঠিক সাড়ে চারটের সময়।
অশোক, মেহবুব ওরাও নিশ্চয়ই আড়াই ঘণ্টার বেশি কেউ ঘুমোয়নি। পান্ডেও তিনঘণ্টা ঘুমিয়েছে বেশি হলে। কিন্তু তাতে কারও কোনো অনুযোগ, অভিযোগ নেই। সকলের-ই হাসি মুখ।
আমি যখন তৈরি হয়ে, পান্ডের পাশে সামনের সিটে পৌনে পাঁচটার সময় এসে বসলাম গাড়িতে, তখন আমার এনার্জি দেখে আমি নিজেই চমৎকৃত হয়ে যাচ্ছিলাম। এ ক-দিনেই সাহেবের পাল্লায় পড়ে কত বদলে গেছি। কলকাতায় দুপুরে তিনঘণ্টা ও রাতে কম করে আটঘণ্টা ঘুমোতাম, অথচ এখানে এত কম ঘুমিয়েও মেজাজ বা শরীর কিছুই খারাপ লাগছে না। আসলে আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করেছিলাম যে, পুরুষ কাজে থাকলেই বা কিছু একটা নিয়ে থাকলেই সবচেয়ে ভালো থাকে—নইলে তার জীবনীশক্তিতে ভাঙন ধরতে থাকে।
মি. রায় দৈর্ঘ্যে কম, প্রস্থে বেশি, কিন্তু খুব রাশভারী লোক। মনে হল খুব রাগিও। আমাকে মানুষ বলেই গণ্য করলেন না। গট গট ছোটো ছোটো পা বড়ো বড়ো করে ফেলে হেঁটে এসে গাড়িতে উঠলেন।
বাড়ি পৌঁছেই মি. রায়কে সাহেবের কাছে নিয়ে গেলাম।
সাহেব মার্বেলের গোলটেবিলে মি. রায়ের জন্যে চা সাজিয়ে নিয়ে বসেছিলেন।
মি. রায় চা খেতে খেতেই আশ-পাশের সমস্ত গাছগুলোর কী কী ডেফিসিয়েন্সি তা বলে দিলেন। কোনটায় অর্গানিক ম্যানিয়োর দিতে হবে, কোনটায় ইনসেক্টিসাইডস স্প্রে করতে হবে; ইত্যাদি ইত্যাদি। এগ্রিকালচারের কথাবার্তাও হল সাহেবের ওঁর সঙ্গে। ভদ্রলোককে দেখে রীতিমতো চমৎকৃত হয়ে গেলাম। এমন সর্বজ্ঞ লোক আর দেখেছি বলে মনে হল না। একেবারে ইনস্ট্যান্ট কফির মতো ইনস্ট্যান্ট জিনিয়াস। সে-কারণেই এ প্রতিভার মধ্যে কনসিসটেন্সি আছে কী নেই সে-বিষয়ে সন্দেহ জাগছিল।
সাহেব আমাকে অর্ডার করলেন, ওঁর মালপত্র নিয়ে দোতলার সবচেয়ে ভালো ঘরটাতে ওঁকে সেটলড করে দিতে।
চা খেয়ে উনি বললেন, আমি তাহলে স্নান করে, পুজো সেরে আসি। পুজো না করে আমি কিছু খাই না। সংসারের সঙ্গে তো কোনো সংস্রব নেই—এখন আমি সন্ন্যাসী—বাণপ্রস্থ অবলম্বন করেছি—নেহাত আপনি বললেন এত করে, তাই না এসে পারলাম না। আমি জীবনে অনেক ভোগ করেছি, টাকাপয়সা, মানসম্মান কিছুর-ই মোহ নেই—এখনও শুধু কর্মের জন্যে—কর্মযোগে বিশ্বাস করি বলেই কাজ করি।
তারপরেই একটু থেমে বললেন, আপনার কথাটা ভেবে দেখলাম। আমার দু-হাজার হলেই চলবে মাসে। আর খাওয়া-দাওয়া অন দ্যা হাউস।
সাহেব বললেন, তা তো নিশ্চয়ই! এ তো আমার সৌভাগ্য। আপনার হেল্প যদি পাই তবে...।
মি. রায় বললেন, ডোন্ট ইউ ওয়ারি। আমি আজ থেকে আপনার লোকাল গার্জেন অ্যাপয়েন্ট করলাম নিজেকে।
কথাটা শুনে আমি একটু অবাক ও ভীতও হলাম। সাহেব কি হস্টেলে-থাকা নাবালক যে, লোকাল গার্জেনের প্রয়োজন হল হঠাৎ।
আমি মি. রায়ের মালপত্র সব গুছিয়ে-গাছিয়ে দিয়ে, ওঁকে নিয়ে এলাম ওপরে ঘর দেখিয়ে দেওয়ার জন্যে।
উনি বললেন, শোনো ছোকরা, আমার জন্যে কিছু ফল আর গরম দুধ, বেশি নয়; এই এককেজি মতো; পাঠিয়ে দিয়ো ওপরে।
আমি বললাম, আচ্ছা স্যার।
কেন জানি না। ভদ্রলোককে আমার একেবারেই পছন্দ হল না। এই চিড়িয়াখানার পরিবেশে, সকলের এই আন্তরিক ঘরোয়া প্রায়-পারিবারিক সম্পর্কের পটভূমিতে এই লোকটা হঠাৎ হামবাগ ইম্পসটারের মতো এসেই যেন নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করতে লাগল।
কিন্তু আমার ভালো লাগা না-লাগা দিয়ে আর কী হবে। সাহেব তাঁকে গুণী-জ্ঞানী জ্ঞান করেন তাহলেই হল।
নীচে নেমে দেখলাম অতিথিরা সকলেই উঠে গেছেন। বারান্দায় চায়ের আসর বসেছে। কাল রাতের টেপ বাজছে সকাল থেকে।
কাতলামাছ, ছাগল-দাড়ি, নিনি-ছুপকি সকলে বসে আছেন। একটু পর মেমসাহেবও এলেন।
এমন সময় দেখি ফুলমণি আর পানুই এসে বারান্দার সামনে দাঁড়িয়েছে।
সাহেব ওদের দেখতে পেয়েই বললেন, কী রে? কী চাই?
ফুলমণি লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে বলল, উ বাবুটা বলেছিল শাড়ি দেবে।
কাতলামাছের মুখ হাঁ হয়ে গেল।
কাল রাতে নেশার ঝোঁকে যে, ওদের শাড়ি দেবেন বলেছিলেন, সে-কথা বোধ হয় বেমালুম ভুলে গেছেন উনি।
ওদের দেখে তাড়াতাড়ি হিপ-পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে কুড়ি কুড়ি চল্লিশ টাকা দিলেন ওদের।
পানুই বললেন, এতে হবেক নাই।
মেমসাহেব বললেন, হবে রে বাবা, হবে।
ওরা চলে যেতেই কাতলামাছ বললেন, আগে যদি জানতাম এরকম গচ্চা যাবে, তবে ভালো করে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটেই চুমু খেতাম। গালে চুমু খেয়ে—তাও এক সেকেণ্ডের জন্যে—এতগুলো টাকা গচ্চা দেওয়া বড়োবেশি এক্সপেনসিভ হয়ে গেল।
ছাগল-দাড়ি আমায় শুধোলেন, চল্লিশ টাকায় কতখানি পাঁঠার মাংস পাওয়া যায় এখানে?
আমি বললাম, তিনকেজি ছ-শো।
ছাগল-দাড়ি কাতলামাছকে বললেন, দ্যাখ, টাকার কী ওয়েস্টেজ করলি তুই! সকলে মিলে খাসির রেজালা কী চাপ খাওয়া যেত।
মেমসাহেব বললেন, টিকলু, মেহবুবকে বলো আরও চা নিয়ে আসতে, আর তারপর তুমি বাজারে যাবে।
আরও চায়ের পরে আরও গল্প-গুজব করলেন ওঁরা, এমন সময় ওপরের সিঁড়িতে ‘থপ-থপ-থপ’ আওয়াজ হল কারও নামার।
মেমসাহেব সবে ঘুম থেকে উঠেছেন। সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমার কচ্ছপটা কি কাল ওপরে ঘুমিয়েছিল?
সাহেব ঠোঁটে আঙুল দিয়ে শ-স-স-স করে বললেন, মি. রায় আসছেন!
মেমসাহেব ভুরু তুলে অবাক হয়ে বললেন, তিনি কে?
মেমসাহেব মি. রায় সম্বন্ধে জানতেন না।
মি. রায় টান-টান করে অলিভ-গ্রিন শিকারের পোশাক ও তারসঙ্গে লাল রঙা একটা যোধপুরি বুট পরে এসে দাঁড়ালেন বারান্দায়। আত্মপ্রত্যয় ঝরিয়ে বললেন, গুড মর্নিং টু ইউ অল।
সাহেব প্রথমে বউরানি ও পরে তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে ও মেমসাহেবদের সঙ্গে মি. রায়ের আলাপ করিয়ে দিয়ে তাঁর সম্বন্ধে বিস্তারিত বললেন।
তারপর বললেন যে, উনি খুব বড়ো শিকারিও। সুন্দরবনের ওপর অথরিটি।
ছাগল-দাড়ি নিজে শিকারি বলে শিকারির চোখ দিয়ে মি. রায়কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখছিলেন।
হঠাৎ বউরানি মি. রায়কে বললেন, আচ্ছা মি. রায়, আপনি কি সব সময়ই শিকারের পোশাক পরে থাকেন?
মি. রায় আমার মুখের দিকে তাঁর মাংসল-পশ্চাৎদেশ সবেগে ঘুরিয়ে বউরানির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পা ফাঁক করে দুটো হাত কোমরের সমান্তরালে দু-পাশে ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, কে জানে? কখন ডাক আসে?
বউরানি তাঁর অভিব্যক্তিহীন চোখে কিছুক্ষণ অপলকে মি. রায়ের হাসি হাসি আত্মবিশ্বাসী মুখের দিকে চেয়ে রইলেন!
তারপর হঠাৎ, একেবারে হঠাৎ-ই বললেন : কিছু মনে করবেন না মি. রায়, বাঘ মারার ডাক এলে কি পেন্টুলুনটা বদলাবার সময়ও পাবেন না?
কথাটাতে সকলে হো-হো করে হেসে উঠলেন।
মি. গদাধর রায় আলপিন-ফোটানো বেলুনের মতো চুপসে গেলেন।
সাহেব তাড়াতাড়ি সিচুয়েশন সেভ করার জন্য চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েই মি. রায়কে বললেন যে, চলুন চলুন রায়সাহেব, আমরা গিয়ে টি-হাউসে বসি। আমার বন্ধুরা এসেছে ছুটি কাটাতে—এখানে আড্ডা-গুলতানি হচ্ছে, এখানে আমাদের কাজ হবে না।
মি. রায় যেতে পেরে বেঁচে গেলেন।
সাহেব বললেন, মেহবুব রায়সাহেবের ব্রেকফাস্ট টি-হাউসে পাঠিয়ে দাও।
ওঁরা চলে যেতেই হাসির ফোয়ারা উঠল।
ছাগল-দাড়ি বললেন, বউদি, আপনার মতো ঠোঁটকাটা লোক দেখেনি। কথাটা বলতে আমিও চেয়েছিলাম, কিন্তু বলতে পারতাম না।
বউরানি বললেন, আপনাদের বন্ধু মানুষ চেনে না, এ ভদ্রলোক মোটেই ভালো লোক নন, কাজের তো নন-ই; তা আমি চেহারা দেখেই বুঝেছি। চ্যাম্পিয়ন মেমসাহেব! ইনি এখানে থাকলে আমার চিড়িয়াখানার সোনার সংসারে আগুন লেগে যাবে।
একসঙ্গে বউরানিকে এতগুলো কথা বলতে কখনো শুনিনি। তাই অবাক হলাম শুনে।
এমন সময় লিচু বারান্দায় এলেন। উনি এতক্ষণ বোধ হয় হেয়ার ডু করছিলেন। মাথার ওপরে একটা হিমালয়ান স্কুইরেলের বাসার মতো প্রকান্ড বাসা বানিয়ে এসে বললেন।
ছাগল-দাড়ি বললেন, করেছ কী লিচু!
লিচু চোখ ঘুরিয়ে কটাক্ষ করলেন, স্বামীর বন্ধুকে, তারপর বউরানিকে বললেন, আচ্ছা বউদি, আপনার এমন কেশবতী কন্যার মতো চুল, আপনি কেন মাঝে মাঝে হেয়ার ডু করেন না! আপনার মতো যদি আমার চুল থাকত!
বউরানি চায়ের পেয়ালাটা নামিয়ে রেখে বললেন, একবার করেছিলাম ভাই, সেই প্রথম ও সেই শেষ সুন্দরী হওয়ার চেষ্টা।
সমবেত সকলে নড়েচড়ে বসলেন।
তিনি বললেন, বলুন বউদি, বলুন।
বউরানি আস্তে আস্তে তাঁর স্বভাবসিদ্ধ কাটাকাটা ডায়ালগে বলতে আরম্ভ করলেন।
ইতিমধ্যে আমি চট করে ভেতরে গিয়ে অশোককে আবারও চা আনতে বলে এলাম। সাহেব-মেমসাহেবদের এখন মুড এসেছে। মুড যাতে ঠিক থাকে, তার বন্দোবস্ত করাই তো আমার কাজ।
বউরানি সাহেবের বন্ধু ও বন্ধুর স্ত্রীদের বলছিলেন, তোমাদের বন্ধুর সঙ্গে দিল্লি গেছি। ওবেরয় ইন্টারকন্টিনেনটালে উঠেছি। সঙ্গে আমার বড়োছেলে। তখন ওর বয়স এগারো বারো বছর।
স্বামী বললেন আজ সন্ধেয় কয়েকজনকে আসতে বলেছি—একটা ককটেল পার্টি দেব। আমাদের সুইটেই। তুমি যাও-না ভ্রমর, নীচের বিউটি-পার্লার থেকে চুলটা বেঁধে এসো।
আমি বললাম, আমি ওসবের মধ্যেই নেই, তা ছাড়া চিনিও না কোথায় কী আছে। কখনো করিনি ওসব!
স্বামী বললেন, তুমি ছেলেকে নিয়ে যাও, ও চিনিয়ে নিয়ে যাবে।
তারপর বললেন, যাও-ই না বাবা—জীবনে একদিন চুল বেঁধেই দ্যাখো কেমন দেখায়।
পার্টি আরম্ভ হওয়ার ঘণ্টা দুই আগে, অতএব ছেলের সঙ্গে গেলুম।
দু-জন মেয়ে মিলে তো আমাকে নিয়ে পড়ল। আমরা যেমন করে চিংড়ি মাছের কাটলেট বানাবার সময় চিংড়ি মাছ থুরি, তেমন করে আমার চুল থুরছে তো থুরছেই—যতক্ষণ ধরে থুরল, ততক্ষণে আড়াইশো চিংড়ি মাছের কাটলেট বানিয়ে ভাজা হয়ে যেত।
ছেলের অতধৈর্য ছিল না। সে আধঘণ্টা মতো বসে বলল, মা আমি চললুম, তুমি চুল বেঁধে এসো।
কিছুক্ষণ পর ঘুম পেয়ে গেল। আমি চোখ বুজে ফেললুম। আমি রক্ষণশীল ঘরের মেয়ে— নাপতেনি ও দাইয়েরা চিরদিন পিঁড়েতে বসিয়ে চুল বেঁধে দিয়েছে। এমন অদ্ভুত চেয়ারে বসে, হাসপাতালের নার্সের মতো পোশাকপরা মেয়েরা যে, কী করবে আমাকে নিয়ে শেষপর্যন্ত তাই ভেবেই আমার আতঙ্ক হল।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বললেন, এদেরও উচিত এনেস্থেসিয়া দিয়ে নেওয়া চুল বাঁধার আগে।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম জানি না।
কে যেন আমার ঘাড়ে মিষ্টি করে নরম আঙুলে একটি চাঁটি মেরে ইংরিজিতে কীসব বলল।
আমি তাকিয়ে দেখি, আমি যে চেয়ারে ছিলুম, সেখানে নারদমুনি বসে আছে। ভয়ে আমার কেঁদে ফেলার অবস্থা।
যাই-ই হোক, গুচ্ছের টাকা দিয়ে তো সেখান থেকে বেরোলাম, কিন্তু এখন ঘরে যাব কী করে?
শেতলপাটি ইন্টারাপ্ট করে বললেন যে, তা ঠিক ওবেরয় ইন্টারকন্টিনেন্টালে গেলে মনে হয় শহর-ই একটা ছোটোখাটো।
অশোক আবার চা নিয়ে এল।
লিচু বললেন, বলুন বউদি।
বউরানি বললেন, ঘরের নম্বর জানি না, কোন তলায় ঘর তা জানি না, ছেলে তো আমায় ফেলে চলে এল—। এখন আমি কী করি?
লাউঞ্জে দেখলাম, অনেক সাহেব-মেম বসে আছেন। আমিও তাদের পাশে বসে পড়ে কী করি তাই ভাবতে লাগলাম।
ওরা ড্যাবড্যাব করে আমার মাথার দিকে চাইতে লাগল।
সামনেই পাশাপাশি দুটো লিফট উঠছিল-নামছিল। অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে নিয়ে আমি একটা বোতাম টিপে দিলুম। লিফটের দরজা খুলে গেল। আমি ঢুকতেই বন্ধ হয়ে গেল। বোতাম টিপলুম। লিফটটা সড়াৎ করে নীচে নেমে গেল।
দরজা খুলতেই দেখি, দু-জন কালো শেরওয়ানিপরা মুসলমান লোক দৌড়ে এসে আমার দু-কানে আতর-দেওয়া তুলো গুঁজে দিয়ে কুর্নিশ করল।
আমি ভয় পেয়ে আবার দৌড়ে লিফটে ঢুকে গেলুম। আবার বোতাম টিপলুম।
দরজা খুলতেই দেখি সাহেব-মেমরা যেখানে বসেছিলেন, সেই তলাতেই আবার এসে পৌঁছোলুম।
তখন আমার কী যে অবস্থা!
ছাগল-দাড়ি বাঁ-হাতে দাড়ি চুলকে বললেন, শেষে স্বামীর কাছে পৌঁছোলেন কী করে?
বউরানি বললেন, একে-তাকে জিজ্ঞেস করে-করে রিসেপশান না কী বলে, যেখানে অনেক ছেলে-মেয়েরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নীচুগলায় গল্প করে, সেখানে গিয়ে শুধোলাম, এখানে কলকাতার এ এম মিত্তির কোন ঘরে উঠেছেন, কোন তলায়?
রিসেপশনের মেয়েগুলো এমনভাবে আমার দিকে তাকাল যেন, আমি খারাপ মেয়ে-টেয়ে হব।
এদিকে বলতেও পারছি না যে, আমি তাঁর স্ত্রী। বললে তো আবার বোকা ভাববে।
ওরা বলল আমি কী চাই?
আমি বললুম, মি. মিত্তিরের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে আমার।
ওরা ঘর ও তলা বলে দিল।
কিন্তু আমি রিস্ক নিলুম না। বললুম, কাউকে সঙ্গে দিন।
একটি মেয়ে ঢঙি-ঢঙি গলায় ‘পে-এ-এ-এ-জ’ বলে ডাকল।
হলুদ জামা পরা একটা বেয়ারা এসে আমায় যখন স্বামীর ঘরের সামনে পৌঁছে দিল, তখন পার্টি বেশ জমে গেছে।
দরজা খুলতেই, আমি ঢুকতেই ছেলে আবার আমাকে দেখে ‘হাঁউ মাঁউ’ করে কাঁদতে শুরু করে দিল।
পার্টির সমস্ত লোক, সকলেই পাঞ্জাবি, আমার অচেনা; আমার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। ছেলে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, ও মা:, তোমার মাথায় ওটা কী? খুলে ফ্যালো মা, এক্ষুনি খুলে ফ্যালো—ওমা খুলে ফ্যালো।
সব অপরিচিত পাঞ্জাবি ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা, তাদের সামনে কী হেনস্থা!
স্বামী আমাকে চোখ দিয়ে ইশারা করলেন, বাথরুমে গিয়ে ওটাকে খুলে আসতে।
বাথরুমে ঢুকে তো খোলা আরম্ভ করলাম—কিন্তু যে-নারদ ঋষি তৈরি হতে এত সময় লাগল, তা কি অতসহজে খোলা যায়?
বেসিনের সামনে ঘাড় কুঁজো করে থেকে ঘাড়ে ব্যথা ধরে গেল। ওই ঠাণ্ডা এয়ার-কণ্ডিশানড ঘরে মাথার জল লাগিয়ে লাগিয়ে সর্দি ধরে গেল। যখন নারদ ঋষিকে সম্পূর্ণ গলিয়ে মা-বাবার দেওয়া চুল নিয়ে বাথরুম থেকে ঘরে এলুম, তখন দেখলুম পার্টি শেষ।
ছেলে ততক্ষণে কেঁদে কেঁদে বেডরুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
আমার স্বামী আমাকে কাছে টেনে বললেন, ভ্রমর, তোমাকে আর কখনো হেয়ার-ডু করতে বলব না।
বউরানি একটু চুপ করে বললেন, বললেই যেন আমি আবার করতাম!
ছাগল-দাড়ি বললেন, ওই শেরওয়ানি পরা লোক দুটোর কি কোনো মতলব ছিল?
শেতলপাটি বললেন, আরে না না মোগল রেস্তরাঁয় ঢুকলে ওরা ওইরকম করে কাস্টমারদের ট্রিট করে। ওটা একটা রিচুয়াল।
হঠাৎ সকলের খেয়াল হল বামাপদকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। লিচু, নিনি ও ছুপকি তিনজনেই এখানে। কাতলামাছ, ছাগল-দাড়ি শেতলপাটিও, শুধু তিনি-ই অনুপস্থিত।
ছাগল-দাড়ি বাঁ-হাতের তর্জনী ও মধ্যমার মধ্যে একটা জ্বলন্ত সিগারেট ধরে বাঁ-হাতটা আমার নাকের কাছে তুলে ধরে অনুনয় করে বললেন দেখুন-না টিকলুবাবু, বামাপদর ঘরে বামাপদ আছে কি না? থাকলে একটু ডেকে দিন।
ছাগল-দাড়ির কায়দাটা অদ্ভুত—লক্ষ করছিলাম, কাউকে কিছু অনুরোধ করতে হলেই, বক্সারের মতো খোলা বাঁ-হাতের কেলে-কেলে আঙুলঅলা পাতাটা সোজা, যাকে অনুরোধ করা হচ্ছে তার নাকের সামনে চলে যাবে।
আমি উঠে যে-ঘরে বামাপদর থাকার কথা, সে-ঘরের সামনে গিয়ে শুধোলাম, আছেন নাকি স্যার।
ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত ‘হুম-হাম’ শব্দ আসতে লাগল। এয়ার-কণ্ডিশনার বন্ধ; বাইরের দরজা ভেজানো।
এখানে এসে ইস্তক এমন এমন অভিজ্ঞতা হচ্ছে যে, এখন তার কোনো কিছুতেই আমি চমৎকৃত হই না। ভেজানো দরজা পাল্লায় কান লাগিয়ে মনে হল ঘরের মধ্যে একটা পালকি চলছে ঘুরে-ঘুরে। হুম-হুমানি তুলে।
আবারও বললাম, স্যার আসব?
এবার উত্তর পাওয়া গেল। কিন্তু ভৌতিকভাবে।
বামাপদ ঝাঁকি দিয়ে বললেন, কাম। তারপর, ইন। কিন্তু ‘কাম’ কথাটা একেবারে দরজার কাছ থেকে এল আর ‘ইন’ কথাটা, একটু পর; দূর থেকে। এবং দুটোই ঝাঁকি দিয়ে।
ভয়ে ভয়ে আস্তে করে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখি বামাপদ নীল গেঞ্জির ওপর নীল ফুল-হাতা সোয়েটার ও ছাগল-দাড়ির মতো একটা শর্টস পরে সারাঘরে ব্যাঙের মতো লাফিয়ে বেড়াচ্ছেন—দু-কোমরে দু-হাত দিয়ে। চোখ লাল, মুখ লাল, ঘরের মেঝে ঘামে ভিজে গেছে।
উনি আমাকে দেখেও থামলেন না।
আমি বললাম, আপনাকে ওঁরা ডাকছেন।
উনি তেমন-ই লম্ফ দিতে দিতে, ঝাঁকি দিয়ে বললেন, জগিং।....শেষ ফ্রগিং....। আরম্ভ....।
এটুকু বলতেই ঘরটা দু-বার পরিক্রমা করে ফেললেন।
তারপর বললেন, যা....। ....চ্ছি...।
আমি তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে বাইরে এলাম।
আমার ওঁকে দেখেই কপাল ঘেমে গেল, আর উনি না জানি কী ঘামান ঘেমেছেন।
আমি ফিরতেই ছাগল-দাড়ি শুধোলেন, কী করছে?
আমি বললাম, জগিং শেষ; ফ্রগিং আরম্ভ। বললেন যে, আসছেন।
বউরানি বললেন, টিকলু এবার বাজারে যাও। আজকে তো রাতে তোমাদের হানিফ সাহেব আসবেন বিরিয়ানি বানাতে।
আমি বললাম, হ্যাঁ, তার ফর্দ আমার পকেটে।
স্কুটার-টেম্পো নিয়ে আমি চলে গেলাম বাজারে।
বাজার থেকে ফিরে আসতে অনেক সময় নিল। হানিফ সাহেব খাসির অঙ্গপ্রত্যঙ্গের যেরকম বিবরণ দিয়ে বলেছিলেন, ডা. নৃপেন দাসের মতো সার্জন হলেও তাঁরও অনেক সময় লাগত কাটা-কুটি করতে কলিজা, কবুরা, সিনা, রাং, প্রভৃতি জায়গা থেকে বিভিন্ন ওজনের রিকুইজিশান। রাং-এরও আবার ক্লাসিফিকেশন আছে, সামনাওয়ালা; পিছলাওয়ালা।
যা-ই হোক, বাজার করে ফিরতেই ভজনদার সঙ্গে দেখা। গেটের কাছে।
ভজনদা বললেন, ভেরি বিজি?
আমি বললাম, না।
উনি বললেন, বাবুর্চিখানায় বাজারের জিম্মা দিয়েই চলে এসো। কেস গড়বড়। চিড়িয়াখানার একজিসটেন্টস নিয়ে ঝামেলা হয়ে গেছে।
তাড়াতাড়ি আমি ফিরে এলাম।
ভজনদা বললেন, মিস্টার রায়কে তুমি-ই নিয়ে এসেছ আপ্যায়ন করে?
আমি বললাম, সে তো শুধু স্টেশান থেকে! আসলে সাহেব-ই ওঁকে আনিয়েছেন।
তা তো আনিয়েছেন কিন্তু এসে অবধি, উনি যা শুরু করেছেন তাতে পোলট্রির মল্লিক সাহেব ও ডেয়ারির ঘোষ সাহেব রীতিমতো ক্ষুণ্ণ। ডেয়ারিতে গিয়ে উনি বলেছেন সমস্ত গোরুর ভিটামিন ডেফিসিয়েন্সি আছে। ষাঁড়গুলোকে আরও অনেক বীর্যবান হতে হবে যদি স্বাস্থ্যবান বাচ্চা পয়দা করতে হয়। পোলট্রিতে গিয়ে বলেছেন এর দেড়গুণ ডিম হওয়া উচিত। এখনও চিড়িয়াখানায় ও গ্রিনহাউসে আসেননি। শুনলাম নাকি তিনি এগ্রিকালচারারিস্ট, বটানিস্ট, ডেয়ারি এক্সপার্ট, পোলট্রি এক্সপার্ট, জিয়োলজিস্ট, বিজনেস ম্যানেজম্যান্ট এক্সপার্ট মানে, হোয়াট নট?
তারপর একটু থেমে বললেন, ডেয়ারির ঘোষ সাহেব বলেছেন আসলে মি. রায় একটি বুল-শিট।
মানে? আমি অবাক হয়ে শুধোলাম।
বুল-শিট মানে জানো না? ভজনদা অবাক হয়ে শুধোলেন।
তারপর বললেন, ষাঁড়ের গোবর।
তারপর আবার বললেন, আমি নবনেকে বলে দিয়েছি, ওকে একটা লাউডগা সাপ এনে দেবে, গ্রিনহাউসের ডিফিয়োনবিচিয়ার গায়ে জড়িয়ে রেখে দেবে। যেই উনি গ্রিন-হাউসে ঢুকবেন তখন নবনে বলবে, স্যার এই ডিফিওনবিচিয়াটা ভালো বাড়ছে না। তারপর যেই মি. রায় হাত বাড়িয়ে ডিফিওনবিচিয়া ধরতে যাবেন সাপ দেবে কিটুং করে। মাস্তানি বেরিয়ে যাবে। সাহেবের এ কী ভীমরতি হল।
আমি বললাম, সাহেবকে বলুন, আপনারা সবাই মিলে।
ভজনদা আঁতকে উঠলেন।
বললেন, মাথা খারাপ! সাহেবকে বলার সাহস নেই কারও। তবে ব্যাপারটা এমন সিরিয়াস টার্ন নেবে যে, ভাবা যায় না। ঘোষ সাহেব ও মল্লিক সাহেব দু-জনেই আমাকে বলেছেন যে, তাঁরা প্রফেশনালি অপমানিত বোধ করছেন—তাঁরা দু-জনেই পার্টনারশিপ থেকে রেজিগনেশান দেবেন।
হাঁটতে-হাঁটতে আমরা ডেয়ারির কাছে গিয়ে পৌঁছোলাম।
আমি বললাম, মেমসাহেব কিন্তু ওই ভদ্রলোককে একেবারেই পছন্দ করেননি। উনি বলেছেন যে, সাহেব মানুষ চেনেন না, ওই ভদ্রলোক নাকি মোসাহেবি ছাড়া আর কিছুই জানেন না।
—সত্যি?
ভজনদা যেন হাতে চাঁদ পেলেন।
তারপর বললেন, তাহলে একটা বুদ্ধি করতে হবে।
আমি বললাম, কী বুদ্ধি?
ভজনদা বললেন, সাহেব আজ-ই রাতে আবার কলকাতা যাচ্ছেন। পরশু ফিরবেন। কালকের মধ্যে ব্যাপারটার একটা ফয়সালা করতে হবে।
ঘোষ সাহেব মন খারাপ করে তাঁর কোয়ার্টারে চলে গেছিলেন। তাঁর সঙ্গে দেখা হল না।
দেখলাম সারে সারে গোরু দাঁড়িয়ে। এখানেও এক দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার। আমি শুধোলাম, এগুলো কি সব-ই দিশি গোরু? দিশি গোরুর মতো তো দেখতে নয়?
ভজনদা বললেন, অনেকরকম গোরু আছে। এসো তোমাকে চিনিয়ে দিই। ওই দ্যাখো, ওইদিকে সব দিশি গোরু। আর তার পাশে পাঞ্জাবি গোরু—এদের নাম সহিওয়াল। গায়ের রং দেখছ মেশানো—কালো-সাদা, লাল-সাদা ইত্যাদি। তার পাশে লাল বড়ো বড়ো গোরুগুলো দেখছ ওগুলোর নাম—‘রেড সিন্ধি’। তার পাশে ‘ক্রসড জার্সি’; এগুলো ইংলিশ। আরও ইংলিশ গোরু আছে, চলো দেখাই। ওইগুলো হচ্ছে ‘হলস্টাইন’ তাদের পাশে ‘রেড ডেন’। ওগুলো সব বিরাট বিরাট। কালো হয়, লাল হয়।
তারপর বললেন, দুধ কিন্তু সকলের-ই সাদা।
আমি শুধোলাম, ওরা জাবনা করে খাচ্ছে কী?
আসলে জাবনা নয়—সারি করা গোরুর সামনে একেবারে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো পারমানেন্ট সিস্টেম।
ভজনদা বললেন, ক্যাটল-ফিড খাচ্ছে ওরা।
চিকেন-ফিডের মতো? আমি শুধোলাম।
ভজনদা বললেন, বা:, এই তো শিখে গেছ।
কী কী খায় গোরুরা?
ভজনদা বিরক্ত হয়ে বললেন, এই ক্যালকেশিয়ান সাহেব নিয়ে তো মহামুশকিলে পড়লাম। গোরু কী খায় তাও জান না? ধানগাছ চেন তো?
তারপর নিজেই বললেন, চূণী, ভুসি, অড়হর চূণী, জোয়ার চূণী, বাদাম-খোল, সরষে-খোল, তিসি-খোল, খড়। গুড়ও খায় মাঝে মাঝে।
আমি বললাম, এতরকম তেলের খোল খায়, গোরুর দুধ তৈলাক্ত হয়ে যায় না?
ভজনদা আমার উৎসাহে ভাটা দিয়ে বললেন, গোরুর দুধও খাওনি নাকি? আর বিরক্ত কোরো না তো আমাকে—এখন আমার মেজাজ খারাপ।
তারপরে আমাকে নিয়ে ঘোষ সাহেবের কোয়ার্টারে গেলেন।
ঘোষ সাহেব পায়জামা পরে, তোয়ালে হাতে চান করতে যাচ্ছিলেন।
বললেন, কী ব্যাপার?
ভজনদা বললেন, একটা আশার আলো দেখতে পাওয়া গেছে ঘোষ সাহেব।
বিরক্তমুখে ঘোষ সাহেব বললেন, কী?
ভজনদা আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, টিকলু বলছিল যে, মেমসাহেব নাকি মি. রায়কে একেবারেই পছন্দ করেননি। আমার মনে হয় আজ সাহেব চলে গেলেই কাল ভোরে আমরা মেমসাহেবের কাছে সকলে একসঙ্গে ডেলিগেশান নিয়ে যাব।
ভজনদা আমাকে নিয়ে ডেয়ারির দিকে যেতে যেতে বললেন, গজকচ্ছপ রায়কে ঢ্ঢি করতে পারলে মেমসাহেব-ই পারবেন।
ঘোষ সাহেবের কুঁচকোনো ভুরু সোজা হয়ে গেল।
বললেন, কথাটা মন্দ বলেনি ভজন।
তারপর বললেন, একটা বন্দোবস্ত করো। তুমিই ইনিসিয়েটিভ নাও।
ভজনদা বললেন, ঠিক আছে।
ভজনদা আর আমি অন্যদিক দিয়ে ফিরলাম। সেখানে গোলাপ-বাগান, চাষ হচ্ছে গোলাপের। অনেকখানি জায়গা বেড়া দিয়ে ঘেরা। অনেক সাঁওতালি মেয়ে সেখানে বাডিং করছে আর নবীনবাবু তদারকি করছেন।
আমি অবাক হয়ে বললাম, কতরকম গোলাপ?
—হ্যাঁ। অনেকরকম।
নবীনবাবুকেও খুব পারটার্বড দেখলাম, তবুও আমাকে কিছু কিছু গোলাপ চিনিয়ে দিলেন। ব্ল্যাক প্রিন্স, ক্লিওপেট্রা—পিঙ্ক রঙা। সুপারস্টারও পিঙ্ক। ডা. ভ্যালোস—এগুলো বাই-কালার ডোরাকাটা—লালের ওপর হলদের স্ট্রাইপসও হয়। ‘গার্ডেন পার্টি’—সাদা রঙা। তা ছাড়া বহুরকম মিনিয়েচার গোলাপ—লাল, সাদা, চুন-হলুদ রঙা। বহুরকমের লতানো গোলাপ।
নবীনবাবু তখন অফ-মুড। উনি ভজনদার সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। মুশকিল হচ্ছে যে, মি. রায়,সাহেবের বাড়িতেই আছেন।
ভজনদা বললেন, টিকলু তুমি কাল ভোরে মেমসাহেবকে নিয়ে গ্রিন হাউসে চলে আসবে—সাহেবের বন্ধুরা ওঠার আগেই। আমরা সকলে ওখানে জমায়েত হব ছ-টার সময়। তারপর দরজা বন্ধ করে কনফারেন্স হবে।
আমি বললাম, ঠিক আছে।
সে-রাতে লনে খুব হই-হল্লা হল। হানিফ সাহেব জব্বর রেঁধেছিলেন বিরিয়ানি। বাবুর্চিখানা একবারে সরগরম। বিকেল থেকে গুলহার কাবাব বানানোর তোড়জোড়। তখন থেকেই বাবুর্চিখানাতে বসেই হানিফ সাহেব রাম খেতে শুরু করেছিলেন ওই গরমে। তাই যখন রান্না-বান্না শেষ করে উনি লক্ষ্ণৌ-এর কাজ করা চিকনের পাঞ্জাবি, কলিদার পায়জামা, ফুলতোলা নাগরা জুতো, বগলে খস আতর লাগিয়ে লনে এসে দাঁড়ালেন তখন শুধু মির্জা গালিব নন, জিগর মোরাদাবাদি, জাফফর এবং অন্যান্য তাবৎ উর্দু, ফারসি, পুশতু, আরবি কবিদের ভূত ওঁর কাঁধে ভর করছিলেন। শায়েরের ফুলঝুরি ফুটছিল আর অতিথিরা মুখ-ভরতি গুলহার কাবাব নিয়ে ক্রমান্বয়ে ‘ওয়াহ, ওয়াহ’ করছিলেন।
বউরানি সাহেবকে চিঠিতে যেমনটি বলেছিলেন, তেমন-ই করলেন। তখন তাঁর শরীর খারাপ হল। তিনি বিরিয়ানি ছুঁলেন তো নাই-ই; দেখলেন পর্যন্ত না। একবাটি জল-দেওয়া পান্তাভাতে একটা শুকনো-লঙ্কা পোড়া গুলে খেয়েদেয়ে তিনি শয্যা নিলেন।
সাহেব বহুবার ‘ভ্রমর-ভ্রমর’ করলেন। কিন্তু কখন থামতে হবে তা সাহেব জানতেন। অনেক বছর যিনি ভ্রমরের সঙ্গে একঘরে কাটালেন, তিনি ভ্রমর কখন হুল ফোটাতে পারে আর কখন পারে না, তা বিলক্ষণ জানতেন।
সেই রাতে শুধু দু-জন হিরো। হানিফ সাহেব আর নবাগত সর্বজ্ঞা মিস্টার রায়। এমনটি তাদের বক্তৃতার চোটে খল-বলে কাতলামাছও ভাবনার পুকুরের নীচে গভীর পাঁকে মুখ লুকিয়ে রইলেন।
মি. রায় গন্ডায় গন্ডায় নরখাদক মেরেছেন, উনি লেডিকিলার; ইনি কি নন? তাঁর নানারকম গল্প শুনে সকলের চোখ বড়ো বড়ো।
গোলমালের মধ্যে ভজনদা আমাকে ইউক্যালিপটাস গাছের তলায় ডেকে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন, শালা বড়ো কপচাচ্ছে। জানো না বাছা তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে।
আমি বললাম, সে এখন পান্তাভাত খেয়ে ঘুমোচ্ছে। কাল বুঝবেন মি. রায়, কত ধানে কত চাল!
বউ-রানিকে আমি বলে রেখেছিলাম।
সকালে উঠেই ওঁর ভীষণ রাগ। ভজনদা ওঁর হাউস-হোল্ড স্টাফের দু-জন লোককে নিয়ে গেছেন কী কাজে সাহেবের হুকুম। তাই মেমসাহেবের ঝোঁক উঠেছে, এক্ষুনি ওঁর চারজন লোক চাই। যেহেতু সাহেব ওঁকে না বলে ওঁর দু-জন লোক নিয়েছেন, সুতরাং উনি এক্ষুনি সাহেবের অর্ডার সুপারসিড করে ডেয়ারি, পোলট্রি, চিড়িয়াখানার চার-জন লোক চান।
এদিকে বউরানিই এখন মি. রায়ের হাত থেকে পুরো চিড়িয়াখানা বাঁচানোর একমাত্র উপায়।
আমি বললাম, ওঁরা তো সকলেই গ্রিনহাউসে আসছেন; আপনি নিজেই ভজনদাকে বলবেন।
তখনও বাড়ির সকলেই ঘুমোচ্ছেন, খিদমদগাররা ছাড়া।
আমি বউরানিকে নিয়ে গ্রিনহাউসের দরজা ঠেলে ঢুকলাম।
ঢুকতেই ওঁরা সকলে দাঁড়িয়ে উঠলেন।
প্রথমে আমি বউরানির অভিযোগের কথা বললাম।
সঙ্গে সঙ্গে চার-জনের বদলে আট-জন লোকের বন্দোবস্ত হয়ে গেল।
বউ-রানি ভজনদাকে বললেন যে, আপনাদের সাহেবকে বলে দেবেন যে, ভবিষ্যতে আমার পারমিশান ছাড়া একজনও লোক নিলে, আপনারা ওঁকে না জানিয়েই একজন লোকের বদলে আমাকে আট-জন করে লোক দেবেন।
ভজনদা বললেন, বলব মেমসাহেব।
তারপর ওঁদের সকলের কথা চুপ করে আধ ঘণ্টা শুনলেন বউরানি।
তারপর বললেন, আপনাদের সাহেবের ভীমরতি ধরেছে। থাকগে, আপনারা আজ সকালে সন্ধেয় আমার এখানে খাবেন। তখন খাওয়া-দাওয়ার পর আমি যা বন্দোবস্ত করার করব।
তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, টিকলু আমরা যখন খাওয়া-দাওয়ার পর লনে বসব, তখন তুমি অশোককে দিয়ে মি. রায়ের স্যুটকেস গুছিয়ে হোল্ডঅল বাঁধিয়ে রেডি করে রাখতে বলবে। ছোটুয়া লন থেকে বাঁশি বাজালেই যেন অশোক আর মেহবুব ওঁর মালপত্র নিয়ে লনে নেমে আসে। পান্ডেকে বলে রাখবে, গাড়ি নিয়ে রাত ন-টার থেকে যেন বাড়ির কাছে থাকে। মি. রায়কে স্টেশনে পৌঁছোতে হবে।
তারপর ভজনদার দিকে ফিরে বললেন, ভজনবাবু, আপনি কাউকে স্টেশনে পাঠিয়ে মি. রায়ের জন্যে ট্রেনের টিকিট কাটিয়ে রাখবেন মিথিলা এক্সপ্রেসের।
তারপর আগেকার দিনের রাজা-রানিরা যেমন হাততালি দিয়ে সকলকে ডিসমিস করতেন, তেমন করে নরম হাতে হাততালি দিয়ে বললেন, আপনারা কাজে যান। এ ব্যাপারটা আমার ওপর-ই ছেড়ে দিন। আপনাদের সাহেব কাল ভোরেই এসে যাবেন। সাহেব আসার আগে ওঁকে তাড়াতে না পারলে ঘোর অশান্তি হবে।
মি. ঘোষ বললেন, তা যা বলেছেন মিসেস মিত্র।
সেই সকালের পর থেকে সারাদিন বাড়ি, চিড়িয়াখানা, পোলট্রি, ডেয়ারি, গ্রিনহাউস এবং অন্যান্য সব জায়গায় সকলেই আমরা যে-যার কাজ করে যাচ্ছিলাম বটে, কিন্তু ভেতরে-ভেতরে দারুণ একটা টেনশান গড়ে উঠছিল। ‘কখন দিন ফুরাবে, সন্ধে হবে’ এই ভরসায় আমরা ক্ষণ গুনছিলাম।
ভজনদার সঙ্গে দুপুরে একবার দেখা হল। খুব ব্যস্ত ছিলেন। উল্লুকটার কনস্টিপেশন হয়েছে। তার জন্য কী একটা ওষুধ বানিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
যেতে যেতে বললেন, উল্লুকের কী দোষ? এই লোকটা একদিনে আমার-ই কনস্টিপেশান করে ছেড়ে দিল।
পরিস্থিতি তুঙ্গে এল যখন বিকেলে তাঁর ইন্সপেকশন ট্যুর শেষ করে এসে মি. রায় বউরানির হাতে একটা লিস্ট দিয়ে বললেন, মিসেস মিত্র, মিস্টার মিত্র কাল ভোরে এলেই এটা ওঁকে দেবেন।
আমি আর বউরানি শুধু ছিলাম। সাহেব-মেমসাহেবরা সব কাছেই এক মন্দির দেখতে গেছিলেন দু-গাড়ি বোঝাই করে ক্যামেরা-ট্যামেরা নিয়ে।
বউরানি লিস্টটা হাতে নিয়ে বললেন, এটা কীসের লিস্ট?
মি. রায় চিজ-স্ট্র চিবোতে চিবোতে বললেন, স্যাকিং-লিস্ট। কাকে কাকে ইমিডিয়েটলি স্যাক করতে হবে, তার-ই একটা লিস্ট তৈরি করে ফেললাম।
বউরানি ধীরেসুস্থে লিস্টটাতে চোখ বুলিয়ে বললেন, এতে দেখছি ঘোষ সাহেব, মল্লিক সাহেব, ভজনবাবু, নবীন সকলের-ই নাম আছে। সকলকেই আপনি একসঙ্গে বরখাস্ত করলে এতবড়ো ব্যাপার চালাবে কে?
মি. রায় বললেন, আমি একাই চালাব। মি. মিত্রর অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বড়োই টপ—হেভি হয়ে গেছে। এক্ষুনি ছাঁটাই না করলে উনি ডুবে যাবেন।
বউরানি বললেন, এতে একটা নাম ঢোকতে আপনি ভুলে গেছেন!
—কার নাম?
বলে, মি. রায় একবার বউরানির দিকে আর একবার আমার দিকে চাইলেন। ভাবলেন, আমার নামের কথাই বলছেন বুঝি তিনি।
বউরানি আস্তে বললেন, আমার নাম।
মি. রায় বললেন, কী যে বলেন! আপনি আমার মালিক, আমি সামান্য কর্মচারী— আপনাদের ভালোর জন্যেই যা-কিছু করছি।
আমি ভাবলাম, বুড়ো লোকটার আত্মসম্মান জ্ঞান পর্যন্ত নেই। সত্যিই একটা আকাট মোসাহেব।
সন্ধে হওয়ার আগেই সাহেব-মেমসাহেবরা ফিরে এলেন। তখন আমি একদৌড়ে গিয়ে ভজনদা, নবীনবাবুকে বললাম, স্যাকিং-লিস্টটার কথা।
ভজনবাবু বললেন, দাঁড়াও। শালা আজ এমনি না গেলে চ্যালাকাঠ মেরে তাড়াব।
সন্ধেবেলা লনে সকলে এসেছেন। ঘোষ সাহেব, মল্লিক সাহেব, ভজনদা, নবীনবাবু আর সাহেব-মেমসাহেবরা তো আছেন-ই।
কাতলামাছ ও ছুপকি ডুয়েট রবীন্দ্রসংগীত ধরল। লেডিকেনিবাবু ও ছোটুয়ার তবলা ও বাঁশি সহযোগে।
মি. রায় বললেন, এই দাড়িঅলা লোকটাই বাঙালি জাতের সর্বনাশ করল।
ছাগল-দাড়ি উদবেগের সঙ্গে তাকালেন।
কাতলামাছ বললেন, কোন দাড়িঅলা লোক?
মি. রায় বললেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
এই কথাতে সমবেত সকলে মনে মনে খুব ক্ষুব্ধ হলেন।
শেতলপাটি শুধোলেন, আপনি রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন?
মি. রায় বললেন, না। আমি ট্র্যাশ পড়ি না।
তখন মনে হল, শুধু এখানের পার্টনার-কর্মচারীরাই নন, প্রতিটি লোক-ই এ লোকটা এখান থেকে বিদেয় হলে খুশি হন। একটা ধেড়ে, বুড়ো পরগাছা।
তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়ার পর সকলে আবার লনে গিয়ে জমা হল। তখন রাত সাড়ে ন-টা বেজেছে।
আমরা সকলেই ঘড়ি দেখছি। ‘মিথিলা’ এক্সপ্রেস ছেড়ে যায় এগারোটায়। তখনও বউরানির মতলব বোঝা যাচ্ছে না।
সাহেব-মেমসাহেবরাও একটা দুর্যোগের আশঙ্কা করেছেন। এখানকার সকলের, এমনকী তাদের স্ত্রীদের মুখগুলোও থমথমে।
এমন সময় বউরানি পান-ভরতি রুপোর হাঁসটা এনে রাখলেন। সবাইকে পান দিয়ে, নিজে দুটো পান মুখে দিয়ে বললেন, মি. রায়, আপনি আমার সামনে এসে বসুন। আপনার সঙ্গে কথা আছে কয়েকটা।
এতক্ষণ নির্লজ্জ ভদ্রলোক যাদের চাকরি খাওয়ার লিস্ট বানিয়েছেন তাঁদের সঙ্গেও কেমন হৃদ্যতার সঙ্গে গল্প করে যাচ্ছিলেন ও নিজের জ্ঞান ছড়াচ্ছিলেন, তা দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম।
মি. রায় ইম্পরট্যান্স পেয়ে খুশিতে রগরগে হয়ে উঠলেন।
বউরানির সামনে এসে চেয়ারে বসে বললেন, বলুন।
খাওয়ার পর-ই আমি অশোককে নিয়ে তাঁর ঘরে ঢুকে কাপড়-চোপড় বাক্সে ভরে, হোল্ডঅল বাঁধিয়ে রেখে এসেছিলাম।
বউরানি বললেন, আপনি তো ডেয়ারির গোরু সম্বন্ধে অথরিটি তাই না?
মি. রায় আবার দুটো হাত দু-দিকে ছুড়ে বললেন, লোকে তো সেইরকম-ই জানে।
বউরানি পরক্ষণেই বললেন আপনাকে আমি কয়েকটা প্রশ্ন করব। তার জবাব দিতে পারা-না-পারার ওপর আপনার এখানকার চাকরি নির্ভর করছে। যদি দিতে পারেন, তাহলে আপনি এখানে থাকবেন, যদি না পারেন, তাহলে আজ-ই রাতের গাড়িতে আপনি কলকাতা চলে যাবেন।
মি. রায় এতজন লোকের সামনে এমন কথা শুনে ঘাবড়ে গেলেন।
হাসলেন। ব্যাপারটা লঘু করার জন্যে বললেন, আপনি খুব রসিকা মহিলা, কিন্তু আমি আপনার কথায় তো এখানে আসিনি, এসেছি মিস্টার মিত্রের কথায়। উনি প্রায় জোর করেই আমাকে এনেছেন।
তা ঠিক। বউরানি বললেন।
তারপর বললেন, আপনি ওঁর কথায় এসে থাকতে পারেন, কিন্তু যাবেন আমার কথায়। উনি যেমন জোর করে এনেছেন, প্রয়োজন হলে আমিও তেমন-ই জোর করেই আপনাকে ফেরত পাঠাব।
মি. রায় চমকে উঠলেন। বললেন, এসব কী ইনসাল্টিং কথা, এতজন অপরিচিত লোকের সামনে?
পরক্ষণেই বললেন, আমি শুতে যাচ্ছি—আই গো টু বেড আর্লি।
বউরানি বললেন, দাঁড়ান, একটু দাঁড়ান। শোবেন এখন। পুরো রাত তো পড়ে আছে।
তারপর বললেন, যা বলছিলাম, আপনি তো ডেয়ারির গোরুর ওপর অথরিটি। এখন আমাকে বলুন দেখি, আপনাকে রাস্তার গোরু গুঁতোলে কী করবেন?
—মানে?
মি. রায় প্রশ্নটার অভাবনীয়তায় একেবারে হকচকিয়ে গেলেন।
বউরানি বললেন, পাঁচ মিনিট সময় দিলাম। ভেবে বলুন।
মি. রায় মাথায় হাত দিয়ে পড়লেন। দেখতে দেখতে পাঁচ মিনিট হয়ে গেল।
বউরানি বললেন, পারলেন না।
তারপর ডেয়ারির পার্টনার ঘোষ সাহেবকে বললেন, মিস্টার ঘোষ আপনি কী করতেন?
ঘোষ সাহেব সপ্রতিভভাবে বললেন, আমি হলে, মিসেস মিত্র, কাউকে বলতাম আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে।
চমৎকার। বললেন বউরানি।
তারপর আবার মিস্টার রায়কে বললেন, দ্বিতীয় প্রশ্ন মি. রায়—আপনি দেখে থাকবেন ডেয়ারিতে বড়ো বড়ো গোবরের চৌবাচ্চা আছে।
বলেই, থেমে গিয়ে আমাকে বললেন, টিকলু, একটু কাগজ পেনসিল।
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে একদৌড়ে কাগজ পেনসিল নিয়ে এলাম।
বউরানি বললেন, আমায় নয়, ওঁকে দাও।
চোখের কোণে দেখলাম, ভজনদা সত্যিই দাঁড়কাকের মতো গলা উঁচু করে ইজিচেয়ারে বসে মি. রায়কে দেখছেন।
বউরানি বললেন, গোবরের চৌবাচ্চাগুলোর সাইজ বারো ফিট বাই বারো ফিট বাই আট ফিট। সেই চৌবাচ্চার গোবর দিয়ে চার ইঞ্চি বাই দু-ইঞ্চি বাই হাফ ইঞ্চি কতগুলো ঘুঁটে হবে? টেন পারসেন্ট হ্যাণ্ডলিং শর্টেজ।
তারপরেই, কাগজ পেনসিল এগিয়ে দিয়ে বললেন, নিন। কষে ফেলুন।
আজ্ঞে। বলে, মি. রায় প্রায় আঁতকে উঠলেন।
বউরানি বললেন, পাঁচ মিনিট সময়।
মি. রায় কাগজ পেনসিল টেনে নিয়ে আঁকা কষা আরম্ভ করলেন, এমন সময় ছুপকি হাসি চাপতে না পেরে ফিক করে হেসে ফেললেন। হাসি বড়ো সংক্রামক। ছুপকির হাসি শুনে এদিকে-ওদিকে অনেকেই হাসতে লাগলেন।
হঠাৎ নবীনবাবু হো হো করে হেসে উঠলেন।
সবাই চোখ তুলে তাকালেন সেদিকে।
মি. রায় নবীনবাবুর দিকে চেয়ে বললেন, ভেরি ব্যাড ম্যানার্স।
তারপর বউরানিকে বললেন, আপনি আমাকে তাড়াতে চান, এখন-ই তো তাড়ালে পারতেন। আমাকে এমন এম্বারাস করছেন কেন? তা-ছাড়া এটা হাইলি ইমপ্রপার। আমাকে মিস্টার মিত্র খাতির করে এনেছেন।
বউরানি বললেন, সেজন্যেই মিসেস মিত্র খাতির করে তাড়াবেন।
মি. রায় বললেন, আপনাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এমন সম্পর্ক.....।
বউরানি বললেন, আপাতত আপনি গোবরের সঙ্গে ঘুঁটের সম্পর্কটা নির্ধারণ করে ফেলুন। দু-মিনিট গ্রেস দেওয়া গেল।
রেগে উঠে মিস্টার রায় সত্যিই ক্যালকুলেশন করলেন। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেল।
বউরানি ছাগল-দাড়িকে বললেন, কপালবাবু, আপনি তো অ্যাকাউন্টেন্ট—এই নিন কাগজ পেনসিল। পাঁচ মিনিট সময়।
ছাগল-দাড়ি তিন মিনিট পর বললেন, চার লক্ষ পঁয়ষট্টি হাজার নশো চুরাশিটা ঘুঁটে হবে।
বউরানি বললেন, কারেক্ট।
তারপর মি. রায়ের দিকে ফিরে বললেন, পারলেন না।
তারপর আবার বললেন, এবার গাছগাছালি। আপনি তো এসবেও অথরিটি। আচ্ছা, বলুন তো মিস্টার রায়, পুরুষ পেঁপেগাছ ও মেয়ে পেঁপেগাছে তফাত কী?
—কী যে বলেন?
মি. রায় হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন।
—পাঁচ মিনিট সময়।
বউ-রানি বললেন।
মি. রায় দু-হাতে কপাল চেপে মুখ নীচু করে বসেছিলেন! মনে মনে সাহেব যে, তাঁকে কার হাতে ছেড়ে দিয়ে গেলেন সে-কথা ভাবছিলেন বোধ হয়।
বউরানি বললেন, পাঁচ মিনিট পেরিয়ে গেল।
তারপর বললেন, নবীন—তুমি জান?
নবীনবাবু কিণ্ডারগার্টেন ক্লাসের ছেলেরা যেমন করে ‘ইয়েস মিস’ বলে হাত তুলে উঠে দাঁড়ায়, তেমনি করে হাত তুলে দাঁড়িয়ে রইলেন, পুরুষ পেঁপেগাছে খালি ফুল হয়, মেয়ে-গাছেই শুধু ফল হয়। এই-ই তফাত।
বউরানি বললেন, গুড।
মি. রায় মুখ নীচু করেই ছিলেন।
কিন্তু বউরানি তবুও বললেন যে, গোলাপগাছও তো আপনি গুলে খেয়েছেন শুনলাম, বলুন তো ক্লিয়োপেট্রার স্বামী কে?
মি. রায় সোজা দাঁড়িয়ে উঠলেন।
মনে হল উনি দৌড়ে দোতলায় নিজের শোয়ার ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করবেন।
বউরানি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, টিকলু।
আমি বললাম, রেডি।
মেমসাহেব বললেন, ছোটুয়া।
অমনি ছোটুয়া তার সেই শুয়োর-ভয়-পাওয়ানো বাঁশিতে ফুঁ দিল।
সঙ্গে সঙ্গে অশোক ও মেহবুব রায় সাহেবের স্যুটকেস ও হোল্ডঅল নিয়ে ওপর থেকে নেমে এল দৌড়ে।
মি. রায় বললেন, এ কী, এ কী?
ওঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই পান্ডে গাড়িটাতে কোঁ-ও-ও-ও-ও করে ব্যাক করে এনে একেবারে লনের সামনে দাঁড় করাল।
আমি পকেট থেকে বের করে বললাম, এই আপনার টিকিট, আমি সঙ্গে যাব তুলে দিতে, ‘মিথিলা’ এক্সপ্রেস। এগারোটা।
মি. রায় টলতে টলতে উঠলেন।
কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা গিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে বসলেন।
মেহবুব মাল তুলে দিল বুটে।
আমি গিয়ে পান্ডের পাশে বসলাম।
বউরানি একা এগিয়ে এলেন গাড়ির কাছে।
তারপর জানলা দিয়ে মুখ ঢুকিয়ে বললেন, আরও একটি প্রশ্ন করছি আপনাকে—ট্রেনে ভাবতে ভাবতে যাবেন।
কী? কী? মি. রায় তুতলে বললেন!
বউরানি বললেন, সীতা হরণের সঙ্গে দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের তফাত কী?
পান্ডে অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিল।
গাড়ি এগিয়ে চলল।
আমি পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, ভজনদার চিড়িয়াখানার সব ক-টা জানোয়ার লনের মধ্যে লাফাচ্ছে, উঠছে পড়ছে, ডিগবাজি খাচ্ছে, চিৎকার করছে, আর মাঝখানে বউরানি স্থির মর্মরমূর্তির মতো শান্ত হয়ে বসে—। গরম ঝোড়োহাওয়ায় ঝুর ঝুর করে চাঁপাফুল ঝরছে তাঁর মাথায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন