ফেরিঘাট

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সিঁড়ির তলা থেকে স্কুটারটা টেনে নিয়ে রাস্তার পাশে ফুটপাথ ঘেঁসে দাঁড় করাল মধু, তার হাতে পালকের ঝাড়ন। মুছবে। মুছলেও খুব একটা চকচকে হয় না আজকাল। রংটা জ্বলে গেছে, এখানে—ওখানে চটা উঠে গেছে। বেশ পুরনো হয়ে গেল স্কুটারটা।

জানালা দিয়ে নীচের রাস্তায় স্কুটারটা একটুক্ষণ অন্যমনে দেখল অমিয়। বহুকালের সঙ্গী। মায়া পড়ে গেছে। কল্যাণ তিন হাজার টাকা দর দিতে চেয়েছিল। জিনিসটা ইটালিয়ান বলে নয়, মায়া পড়ে গেছে বলেই বেচেনি অমিয়। তা ছাড়া একবার বেচে দিলে নতুন আর কেনা হবে না। অমিয়র দিন চলে গেছে।

মুখ ফিরিয়ে অমিয় টেবিলে সাজানো এক প্লেট টোস্ট, একটা আধসেদ্ধ ডিম, এক গ্লাস দুধ, নুন—মরিচের কৌটো, চামচ—এ—সব আবার দেখে। সকাল আটটা কি সোয়া আটটা এখন। সাড়ে আটটায় সে রোজ বেরোয়। বেরোবার আগে সে রোজ টোস্ট ডিম নুন—মরিচ দিয়ে খায়। দুধ পান করে। আজ কিন্তু খাবারগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখতেও তার অনিচ্ছা হচ্ছিল। খিদে নেই। বমি—বমি ভাব। রাতে ভালো ঘুম হয়নি, বারবার উঠে সিগারেট খেয়েছে। সকালে অনেকক্ষণ স্নান করেছে চৌবাচ্চা খালি করে। তবু শরীর ঠিকমতো ঠান্ডা হয়নি। খাওয়ার কথা এখন ভাবাই যাচ্ছে না।

টেবিলের ওপাশে মুখোমুখি রোজকার মতো হাসি বসে নেই। শোয়ার ঘরের দরজায় হাসি দাঁড়িয়ে আছে। কাল রাতে হাসিও বোধহয় ঘুমোয়নি। ঘুমোলে যে ছোট ছোট অবিরল শ্বাস পড়ে ওর, সেই শব্দ তো কই শোনেনি অমিয়। বেত আর বাঁশ দিয়ে তৈরি ভারী সুন্দর একটা খাট শখ করে কিনেছিল হাসি, যখন অমিয়র সুদিন ছিল। পুরনো বড় খাটটা বেচে দিয়ে অমিয় কিনে নিল একটা সোফা—কাম—বেড। সেই থেকে দুজনের বিছানা আলাদা। বেতের খাটে হাসি, সোফা—কাম—বেডে অমিয়। সেইটাই কি মারাত্মক ভুল হয়েছিল?

বস্তুত তো ছোটবেলা থেকেই অমিয় যৌথ পরিবারে মানুষ। সেখানে বড় খাটের সঙ্গে আর একখানা বড় খাট জোড়া দেওয়া। বিশাল মাঠের মতো বিছানা, শামিয়ানার মতো বড় মশারি। দাদু—ঠাকুমা শুত, আর সেই সঙ্গে তারা রাজ্যের ছেলেপুলে। পরিবারের অর্ধেক এক বিছানায়। যারা সেই বিছানায় শুয়ে বড় হয়েছে তারা আজও কেউ একে অন্যের সঙ্গে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি, যে যার কাজের ধান্দায় আলাদা হয়ে ভিন্ন সংসার করেছে, দাদু—ঠাকুমা মরে গেছে কবে। তবু সেই প্রকাণ্ড বিছানার স্মৃতি আজও অমিয়র পিসতুতো, জ্যাঠতুতো, খুড়তুতো ভাই আর বোনদের কাছ থেকে খুব দূরে সরাতে পারেনি। দেখা হলে সবাই অকৃত্রিম খুশি হয়, এক—আধবেলা জোর করে ধরে রাখে, প্রাণপণে খাওয়ায়, কত পুরনো দিনের গল্প হয়।

অমিয় খেতে পারছে না। একদম না। একটা টোস্ট মুখে তুলে দেখল। ভালো টোস্ট হয়েছে, মুড়মুড় করে ভেঙে যাচ্ছে দাঁতের চাপে। তবু অমিয়র কাছে কাঠের গুঁড়োর মতো বিস্বাদ লাগে। ডিমটা থেকে আঁশটে গন্ধ আসে। দুধটাকে খড়িগোলা মনে হয়। অমিয় টোস্ট হাতে ধরে রেখে এক বার চেষ্টা করে হাসির দিকে তাকায়। আসলে তাকাতে তার ভয় করছিল।

চোখে চোখ পড়ে। হাসির কোনও দ্বিধা নেই, ভয় নেই। এমন নিষ্ঠুর মেয়ে অমিয় খুব কমই দেখেছে। অমিয়কে কখনও হাসি সমীহ করেনি। আজ পর্যন্ত বলতে গেলে হাসি সঠিক বউ হয়নি অমিয়র। ইচ্ছে হয়নি বলে হাসি সন্তান—ধারণ করল না আজ পর্যন্ত। না করে ভালোই করেছে। তা হলে এখন অসুবিধে হত। হাসি তাই অমিয়র চোখে সোজা চোখ রাখতে পারে। ভয় পায় না। অমিয়র কাছে তার কোনও দায় নেই।

আমি কিন্তু কয়েকটা জিনিস নিয়ে যাব। হাসি সকালে এই প্রথম কথা বলে।

অমিয় ভ্রূ তুলে বলে, কী বললে?

হাসি বলে, আমি কয়েকটা জিনিস নিয়ে যাব। এখানে তো আমার নিজস্ব কিছু নেই।

কী নেবে?

এই কয়েকটা শাড়ি—ব্লাউজ, সাজগোজের জিনিস, একটা সুটকেস, কয়েকটা টাকা...

অমিয় শান্ত গলায় বলে, নিয়ো। বলার দরকার ছিল না।

বলেই নেওয়া ভালো। দরকারে নিয়ে যাচ্ছি। দরকার ফুরোলে ফিরিয়ে দেব।

শরীরের ভিতরটা তিড়বিড় করে অমিয়র। কিন্তু কিছু বলে না। বলা মানেই আবার অশান্তি। ছোট কথার ঢিল ছুড়ে হাসি দেখতে চায় মজা পুকুরটায় কীরকম ঢেউ ওঠে। মজা পুকুর ছাড়া অমিয় নিজেকে আর কিছু ভাবতে পারে না।

হাসি আবার বলে, এ সংসারে আমি তো কিছু নিয়ে আসিনি, কাজেই নিয়ে যাওয়া উচিত নয়।

অমিয় উঠল। টেবিলে তার টোস্ট ডিম আর দুধের ওপর মাছি উড়তে লাগল, বসতে লাগল।

স্কুটারটা রোদে দাঁড়িয়ে আছে। অমিয় জানালা দিয়ে এক বার দেখে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করে নেয়। দরজার উপর একটা ছবি টাঙানো আছে। ছবির চারধারে একটা মালা কবে টাঙানো হয়েছিল, মালাটা গত বছরখানেক ধরে শুকিয়ে এখন রুদ্রাক্ষের মালার মতো দেখায়। ছবিতে ধুলো পড়েছে। বেরোবার সময় রোজই এক বার ছবিটার দিকে অভ্যাসবশত তাকিয়ে বেরোয় সে। এক বার হাতজোড় করার ভঙ্গি করে বেরিয়ে যায়।

আজও তাকাল।

বেরোবার মুখে দরজা থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, যা খুশি নিয়ে যেয়ো।

হাসি বলল, যা খুশি নেব কেন? যা না হলে চলবে না সে—রকম দু'—একটা জিনিস ধার নেব। আবার ফিরিয়ে দেব।

অমিয় বলল, আচ্ছা।

রাস্তায় বেরিয়ে এসে আর হাসির কথা মনে থাকে না। দু'চার দিন বৃষ্টির পর গরম কমে গেছে। আকাশ গভীর নীল। বাতাস পরিষ্কার। স্কুটারটা মৃদু গোঙানির শব্দ করে ছুটছে। ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা এসে যত অপ্রীতিকর কথা ভুলিয়ে দিয়ে মাথা পরিষ্কার করে দেয়। পরতে পরতে খুলে যাচ্ছে কালো রাস্তা। কলকাতার এক রকম সুন্দর গন্ধ আছে। বর্ষার পর রোদ উঠলে প্রায়ই গন্ধটা পায় সে। রাস্তার পর রাস্তা পার হয় অন্যমনে।

ত্রিশ নম্বর ধর্মতলায় তার অফিস। ফুটপাথ থেকে সোজা কাঠের সিঁড়ি উঠে গেছে খাড়া। সিঁড়ির পাশেই ফুটপাথে একটা গেঞ্জি, ব্রেসিয়ার, রুমাল, আন্ডারওয়্যারের স্টল চালায় আহমদ। অমিয়র স্কুটারটা সারা দিন সে—ই পাহারা দেয়। রুমালটা আন্ডারওয়্যারটা আহমদের কাছ থেকেই নেয় অমিয়। বদলে আহমদ স্কুটারটা নজরে রাখে। দরকারে অল্প—স্বল্প টাকা ধার দেয়। অমিয়র দু'—চারজন পাওনাদারকেও সে চিনে রেখেছে। নীচের তলা থেকেই তাদের তাড়ায়, বলে, তিনতলার সিঁড়ি খামোখা ভাঙবেন কেন, একটু আগেই বেরিয়ে গেছেন।

সিঁড়িটা সত্যিই খাড়া। উঠতে জান বেরিয়ে যায়। সিঁড়ির আট ধাপে একটা ছোট্ট চাতাল। সেই চাতালটা আহমদের একটা সংসার। দুপুরে তার ভাত আসে, কাছেই কোনও স্কুলে পড়ে তার দুই ছেলে, টিফিনে তারাও এসে হাজির হয়। চাতালে বসে অন্ধকারে বাপ—ব্যাটারা ভাত খায়। গা ঘেঁষে লোকজন ওঠানামা করে, ধুলো ওড়ে, কাঠের সিঁড়ি কাঁপে, তবু তাদের ভ্রূক্ষেপ নেই। চাতালের এক দিকে আহমদের পোঁটলা—পুঁটলি, দেয়ালের পেরেকে ঝোলানো জামা—কাপড়, জুতো।

তিনতলায় উঠতে আজ বেশ কষ্ট হল। অফিস বলতে যা বোঝায় তা তো নয়। ঘরটা বড়ই, তার তিন অংশীদার। আসলে ঘরটার মূল ভাড়াটে কল্যাণ। দশ—বারো বছর আগে এই ঘর ভাড়া নিয়ে তৃষ্ণা অ্যান্ড কোং খুলেছিল। আজও কোম্পানি আছে, কল্যাণও আছে। তফাতের মধ্যে এই যে, সেই ঘরে পাশাপাশি টেবিলে আরও দুটো কোম্পানি চালু হয়েছে। একটা রজতের, একটা অমিয়র। তারা দুজন কল্যাণের সাবলেটের ভাড়াটে। একই ঘরে এ রকম চার—পাঁচটা কোম্পানিও চলে। একটা টেলিফোন আর একটা ঠিকানা থাকলেই কলকাতায় ব্যবসায় নামা যায়।

মিশ্রিলাল বসে আছে। একমাত্র মিশ্রিলালকেই আহমদ কখনও ঠেকাতে পারেনি। ধৈর্যশীল মিশ্রিলাল ঠিক তিনতলা পর্যন্ত উঠবেই, উঠে অমিয়কে না দেখলে বসে থাকে, বসে থাকতে থাকতে ঝিমোয়। বিকেল পর্যন্তও বসে থাকে সে। অমিয়কে দেখে মিশ্রি এক বার চোখ তুলে নামিয়ে নিল। হাতে একটা টেন্ডারের চিঠি।

রাজেন গ্লাসে ঢেকে জল রেখে গেছে। টেবিলে কাগজপত্র প্রায় কিছুই নেই। দুটো চিঠি। টেন্ডার। চিঠি দুটো দেখে রেখে দিল সে। চেয়ার টেনে বসল। রাস্তার ওপারে গভর্নমেন্টের একটা স্টোর। লরি থেকে মাল খালাস করছে। রাস্তায় ট্রামের শব্দ হচ্ছে, বাস যাচ্ছে। কাচের পাল্লাটা বন্ধ করে দিয়ে শব্দ আটকাল অমিয়।

মিশ্রি বলল, কিছু দেবেন নাকি?

ও—সপ্তাহে।

ও বাবাঃ, তিন মাস হয়ে গেল। আমিও মাল তুলতে পারছি না, একজনকে নিয়ে তো আমার কারবার নয়!

ও—সপ্তাহে এসো।

পুরো চাইছি না, কিছু দিন।

কোত্থেকে দেব? পেমেন্ট চার মাস আটকে আছে।

কেন?

সেনগুপ্ত চারটে এয়ারকন্ডিশনিং মেশিন কিনেছিল, চারটে স্ক্র্যাপ। মেশিন আমার অর্ডারে খাইয়ে ঝগড়া করে ক্যাপিটাল তুলে নিয়ে গেল! তখনও জানতাম না যে স্ক্র্যাপ মেশিন খাইয়ে গেছে প্যাটারসনে। প্যাটারসন থেকে সেদিন চিঠি এসেছে, মেসিন স্ক্র্যাপ, পেমেন্ট হবে না। সব বিল আটকে রেখেছে। সাত হাজার টাকার।

চুক চুক করে জিভে একটা ক্ষোভের শব্দ করে মিশ্রিলাল।

সেনগুপ্ত ডুবিয়ে গেল একেবারে!

অমিয় একটু হাসে। বলে, ডুবিয়ে যাবে কোথায়? ঠিক পেয়ে যাব।

বিলটার জন্য কবে আসব? আমার তো বেশি নয়, মোটে ন'শো টাকা। আমি গরিব মানুষ।

মিশ্রি, বিলের আশা ছাড়ো। বরং আমাকে আরও কিছু ধার দাও। নগদ না দিলে মাল দাও। আমার হাতে তিনটে টেন্ডার। দুটো লোয়েস্ট হয়েছে, আর একটাও পেয়ে যাবে। এখন সেনগুপ্ত নেই, আমি একা। টাকা মার যাবে না।

মিশ্রি গলা চুলকোয়। বলে, তিন মাসে পেমেন্ট পাচ্ছি না। কী যে বলেন। পুরনো লোক বলে ছাড়ছি না আপনাকে। কিন্তু কম্প্রেসারের পার্টসের জন্য লোকে ছিঁড়ে ফেলছে আমাকে। নগদ টাকার ছড়াছড়ি। এ—সব মাল এখন ক্রেডিটে দেয় কোন বুদ্ধু?

অমিয় জলটা একটু একটু করে খায়। স্বাদটা ভালো লাগে। তেষ্টা পেয়েছে খুব। গ্লাসটা আবার ঢেকে রেখে বলে, এবার কাটো তা হলে।

সামনের সপ্তাহে আবার আসব।

রোজ আসতে পারো। কিন্তু লাভ নেই।

বললেন যে আসতে। কিছু দেবেন। মোটে তো ন'শো টাকা।

ধৈর্যশীল মিশ্রিলাল ঝগড়া করে না। করলে করতে পারত। কিন্তু শান্ত মুখেই উঠে যায়। আবার ঠিক আসবে।

অমিয় নতুন টেন্ডারের চিঠি দুটো টুকরো টুকরো করে ছেঁড়ে অন্যমনস্কভাবে; ছেঁড়া টুকরোগুলো টেবিলের ওপর সাজায় তাসের মতো। চেয়ে থাকে। সেনগুপ্ত কোথাও না কোথাও আছে ঠিক। কলকাতা হচ্ছে একটি প্রকাণ্ড জলাশয়, তাতে ডুবসাঁতার কাটা যায়। কিন্তু একদিন না একদিন দেখা হবেই।

আজ—কালের মধ্যেই হাসি চলে যাবে। আজ বিকেলে বাসায় ফিরবার ইচ্ছে নেই অমিয়র। ফিরে খুব খারাপ লাগবে। হাসি যে কোথায় যাচ্ছে তা অমিয় জানে না। বোধহয় প্রথমে বাপের বাড়ি যাবে আসামে। তারপর বাগনানের কাছে এক গ্রামে, যেখানে ও চাকরি পেয়েছে, আগামী মাস থেকে চাকরি শুরু করবে। তারপর কী করবে হাসি? চাকরি করবে? তারপর? চাকরিই করবে! চাকরিই করে যাবে বরাবর! কিছু মনে পড়বে না! একা লাগবে না! খারাপ লাগবে না!

কল্যাণ টেবিলের ওপর পা তুলে চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুমোচ্ছে! তৃষ্ণা কোম্পানি দাঁড়িয়ে গেছে। দুজন কর্মচারী আউটডোরে ঘুরে বেড়ায়, কল্যাণকে কেবল অফিসটা দেখতে হয় আর ইনকাম—ট্যাক্স। কোম্পানি দাঁড়িয়ে গেলে আর তেমন ভাবনা নেই। রজতের টেবিল খালি। বড় একটা থাকে না রজত, প্রচণ্ড খাটে আর ঘোরে। দাঁড়িয়ে যাবে।

অমিয় নিঃশব্দে বসে থাকে কিছুক্ষণ। ভাবনা—চিন্তা করার মতো মাথার অবস্থা নয়। মনে হয় বেশি ভাবতে গেলেই মাথায় সমুদ্রের মতো বিশাল ঢেউ উঠে সে পাগল হয়ে যাবে।

বসে থাকলে এ—রকম হবেই, অমিয় তাই উঠল।

কল্যাণ এক বার তাকিয়ে বলল, কোন দিকে যাচ্ছেন?

যাই এক বার প্যাটারসনে। ওদের কাল মিটিং গেছে। লাহিড়ী বলছিল একটা ডিসিশন হবেই। যদি কিছু হয়ে থাকে দেখে আসি।

মিশ্রিলাল কত পায়?

ন'শো।

গতকাল আমি একটা পেমেন্ট পেয়েছি। শ'চারেক দিতে পারি। মিশ্রিকে আপাতত কাটাবেন না, কিছু দিয়ে হাতে রাখুন।

কেন?

ফুড সাপ্লাইয়ের টেন্ডারটা ধরে রাখুন। মিশ্রিকে কিছু খাওয়ালে ক্রেডিটে আবার মাল দেবে।

আপনি তো দু'শো অলরেডি পান।

দেবেন এক সময়ে। পালাবেন কোথায়?

আবার চোখ বোজে। কল্যাণ ও—রকমই। খুব মহৎ কাজও খুব অবহেলার সঙ্গে করে। অমিয় ঠিক কৃতজ্ঞতা বোধ করতে পারে না। মনটা সে—রকম নেই। সেনগুপ্ত পালিয়েছে, হাসি চলে যাচ্ছে। ব্যবসা ঝুল।

নীচে এসে স্কুটারটা চালু করে সে। ভিড় কাটিয়ে ধীরগতিতে এগোয়।

কাচের টেবিলে ছায়া পড়তেই লাহিড়ী মুখ তোলে।

ভালো খবর মশাই।

কী?

আবার অর্ডার পাবেন। আপনার টেন্ডার আমরা নেব। কাল খুব লড়ালড়ি হল আপনার জন্য।

কত টাকার অর্ডার?

কম। হাজার পাঁচেক। কিন্তু ব্যাড বুকে আছেন এখন, এই অর্ডারই আপাতত পাঁচলাখের সমান। মেশিনগুলো যদি পালটাতে না পারেন তবে অন্তত মেরামত করে দেবেন, বিল কিছু ছাঁটকাট হবে। সাত হাজারের জায়গায় হাজার চারেক পেয়ে যাবেন কিন্তু সেটা পাবেন মেশিন মেরামতের পর।

অমিয় ম্লান মুখে বসে থাকে। খবরটা ভালোই। খুব ভালো। কিন্তু পাঁচ হাজারের অর্ডার ধরাও মুশকিল। পেমেন্টটা আটকে রইল।

লাহিড়ী চা বলল। তারপর জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে, খারাপ দেখছি যে।

কিছু না। শরীরটা ভালো নেই।

বয়স কত?

পঁয়ত্রিশ—ছত্রিশ।

লাহিড়ী গম্ভীর ভাবে বলে, ড্রিঙ্কস?

একটু—আধটু।

মেয়েছেলে?

নীল।

স্মোক?

দিনে চল্লিশ—পঞ্চাশটা।

চেক আপ করান। হার্ট, ব্লাড, ইউরিন।

চা এসে যায়। দামি চায়ের গন্ধ। ভালো লাগে অমিয়র। আস্তে আস্তে চেখে চেখে খায়। প্যাটারসন ওগিলভি অ্যামালগামেশান পুরনো কোম্পানি। ব্রিটিশারদের হাত থেকে গত বছর কিনল এক পাঞ্জাবি। দশ বছর ধরে প্যাটারসনের সঙ্গে ব্যবসা করছে অমিয়। সকলের সঙ্গেই চেনা হয়ে গিয়েছিল, গুডউইল তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সেনগুপ্ত ডুবিয়ে দিয়ে গেল। পুরনো সাপ্লায়ার বলে প্যাটারসন অমিয়কে ছাড়াল না, কিন্তু নিচু নজরে দেখবে এখন, বেশি টাকার অর্ডার দিতে ভয় পাবে।

লাহিড়ীর খাঁই বেশি নয়। ওয়ান পার্সেন্ট নেয় বিল থেকে। অন্য পারচেজ—অফিসারদের বায়নাক্কা অনেক। সেই তুলনায় লাহিড়ী দেবতা।

অমিয় উঠে বলল, অনেক ধন্যবাদ।

লাহিড়ী হাসল। বলল, সেনগুপ্তর খবর কী?

খবর নেই।

ক্যাপিটাল তুলে নিয়ে গেছে?

হ্যাঁ।

ও—সব মাল আমরা চিনি। আপনিই চিনতে পারেননি।

অমিয় দীর্ঘশ্বাসটা চেপে রাখে।

নীচে এসে আবার স্কুটার চালু করে অমিয়। কোথাও যাওয়ার নেই। সব জায়গায় পাওনাদার বসে আছে। হাজার দশ—বারো টাকার ক্রেডিট বাজারে। গোটা দুই বিলের পেমেন্ট সামনের সপ্তাহে পাওয়া যাবে। তার আগে অমিয়র কোথাও যাওয়া হবে না। পেমেন্ট পেলেই কিছু ধার শোধ হবে। হাতে কিছু থাকবে না।

প্যাটারসন ওগিলভি অ্যামালগামেশন পিছনে ফেলে অমিয়র স্কুটার ধীরগতিতে, ভ্রমরের গুঞ্জন তুলে চলতে থাকে। উদ্দেশ্যহীন।

চললে বাতাস লাগে। থেমে থাকলে গুমোট। একটা পেট্রল পাম্পে থামতেই গুমোটটা টের পায় সে। তিনটে গাড়ি তেল নিচ্ছে কাজেই একটু অপেক্ষা করতে হয় তাকে। কাঁচা পেট্রলের গন্ধে একটা মাদকতা আছে। গন্ধটা বরাবর ভালো লাগে তার। মন চনমন করে ওঠে। বুক ভরে সে পেট্রলের গন্ধ নেয়। ঝিমোয়। কয়েক মুহূর্তেই শার্টের নীচে ঘাম কেঁচোর মতো শরীর বেয়ে নামে। হাতের তেলো ভিজে যায়।

পিছনে একটা গাড়ি তীব্র হর্ন দেয়। অমিয় ঝাঁকুনি খেয়ে চোখ চায়। সামনের গাড়ি চলে গেছে। অমিয় এগোয়। ট্যাঙ্ক—ভরতি তেল নেয়। আবার স্কুটার ছাড়ে। উদ্দেশ্যহীন ঘুরতে থাকে।

মধ্য কলকাতার অফিসপাড়ায় কত বাড়ি তৈরি হচ্ছে। দারুণ দারুণ বাড়ি, লাখ লাখ টাকা খরচ। ভিতরে কোটি কোটি টাকার লেনদেন।

অফিস, কোম্পানি, ব্যাঙ্ক, জীবনবিমার বাড়ির ছায়ায় ছায়ায় অমিয় তার স্কুটার চালায়। শরীরের ঘাম মরে আসে। হাসি কিছু টাকা চেয়েছে। কত টাকা তা বলেনি। স্টিলের আলমারিতে শ'তিনেক আছে মনে হয়। অমিয়র পকেটে বড় জোর শ'খানেক। হাসি জানে, অমিয় এখন দড়ির ওপর হাঁটছে, তাই বেশি নেবে না বোধহয়। হাসি টাকা চায় না। মুক্তি চায়। কিন্তু ওকে এ সময়ে কিছু টাকা দিতে পারলে অমিয় খুশি হত।

সোনাদা যে—ব্যাঙ্কে চাকরি করে সেই ব্যাঙ্কটা পেরিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ থামে অমিয়। বছর তিনেক আগেই সোনাদা অ্যাকাউন্টস অফিসার ছিল। এখন কি আর—একটু ওপরে উঠেছে? সাহেবি ব্যাঙ্ক, একগাদা মাইনে পায় সোনাদা। কপালটা বড় হয়ে হয়ে অনেকটা মাথা জুড়ে টাক পড়েছিল। এখন বোধহয় টাকটা পুরো হয়ে গেছে। সোনাদা বরাবর গম্ভীর। দেখা হলে হাসে না, কথাও বেশি বলে না। পাত্তা না দেওয়ার ভাব। কিন্তু অমিয় জানে, সোনাদা মানুষটা বাইরে ওইরকম, ওর মুখে কথা কম, ভাবের প্রকাশ কম। কিন্তু এখনও অমিয়কে দেখলে ওর চোখের পাতা কাঁপে। স্নেহে, মমতায়। কত কষ্ট করেছে সোনাদা! বড় কষ্টে মানুষ।

অমিয় স্কুটার থেকে নেমে শীতাতপ—নিয়ন্ত্রিত ব্যাঙ্কটায় ঢুকে যায়। সোনাদার কাছে কোনও কাজ নেই। তবু এক বার অনেক দিন বাদে দেখা করে যেতে বড্ড ইচ্ছে করছে। মনটা ভালো নেই।

কাউন্টারে ভিড়। অজস্র সুন্দর কাউন্টারে ছাওয়া চার দিক। রঙিন দেওয়াল, টিউব—লাইট— সব মিলিয়ে ব্যাঙ্কটার ভিতরটা বড় চমৎকার।

জিজ্ঞেস করতেই একজন পিয়ন সোনাদার ঘর দেখিয়ে দেয়। ঘষা কাচের পাল্লা। বাইরে টুলে বেয়ারা বসে আছে। একটা টেবিলের ওপর সাজানো স্লিপ, ডটপেন।

নিজের নাম লিখে অমিয় স্লিপ পাঠায়। একটু পরে বেয়ারা এসে ডাকে।

প্রকাণ্ড টেবিলের ও—পাশে সুন্দর পোশাকের সোনাদাকে প্রথমটায় আত্মীয় বলে ভাবতে কষ্ট তার। গোলাপি রঙের টাক মাথায়, নীলাভ কামানো গাল, খুব ব্যস্ত।

এক বার চোখ তুলে আবার কাগজপত্রে ডুবে গেল। বসতেও বলল না। অমিয় একটু হেসে নিজেই বসে।

সোনাদা ওইরকমই। বসতে বলে না। জানে, বসতে বলার কিছু নেই। অমিয় তো বসবেই। এটা তার সোনাদার ঘর নয় কি?

ছোটবেলা থেকে তারা ভাইবোনেরা একে অন্যকে আপন বলে ভাবতে শিখেছিল। যৌথ পরিবার ওই একটা রক্তের গূঢ় সম্পর্ক তৈরি করে দিয়ে গেছে। এ জীবনে ওটা আর ভাঙবে না।

সোনাদা এক বার একফাঁকে প্রশ্ন করে, শরীরটা দেখছি শেষ করেছিস?

হুঁ।

কেন?

শরীরটা ভালো নেই।

কোম্পানি লালবাতি জ্বালেনি তো?

জ্বালছে।

জ্বালাই উচিত। তখন যদি ব্যাঙ্কের চাকরিটা নিতিস, আজ কত মাইনে হত জানিস?

কত?

হাজার খানেকের ওপরে। গর্দভ।

মাসে ওর চেয়ে অনেক রোজগার আমি করেছি। ব্যবসা বলে তোমরা গুরুত্ব দাও না। বাঁধা মাইনের লোকেরা ব্যবসাকে ভয় পায়।

সোনাদা ভ্রূ কুঁচকে একটু তাকায়। কোথায় একটা গোপন বোতাম টেপে, বাইরে রি রি করে বেল বাজে। বেয়ারা এলে সোনাদা চা আনতে বলে। তারপর আবার কাজেকর্মে ডুবে যায়।

ঠান্ডা ঘরখানা। অমিয়র ঝিমুনি আসে।

সোনাদা আবার চোখ তুলে তাকে দেখে, হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, প্রবলেমটা কী?

তুমি বুঝবে না। অমিয় শ্বাস ছাড়ে, তারপর বলে, সোনাদা, তুমি কি প্রমোশন পেয়েছ?

চাকরিতে থাকলে প্রমোশন হয়। তোর মতো ব্যবসাদাররা চিরকাল ব্যবসাদার থেকে যায়।

তুমি কি খুব বড় পোস্টে আছ?

সোনাদা হাসে। মাথা নাড়ে।

তা হলে আমার ব্যবসার জন্য তোমার ব্যাঙ্ক থেকে কিছু ধার পাইয়ে দাও না!

তোকে ধার দেবে কেন? ইন্ডাস্ট্রি বা এগ্রিকালচার হলেও না হয় কথা ছিল।

যদি সিকিউরিটি দেখাই, যদি হাই ইন্টারেস্ট দিই?

সোনাদা ভ্রূ কুঁচকে বলে, তোর আবার সিকিউরিটি কী? একটা পুরনো স্কুটার, ত্রিশ নম্বর ধর্মতলায় একখানা ভাগের অফিস। আর কী আছে তোর? বড়জোর একখানা রিফিউজি সার্টিফিকেট, তা সেখানাও বোধহয় হারিয়ে ফেলেছিস! কাজে লাগাতে জানলে রিফিউজি সার্টিফিকেটও মস্ত অ্যাসেট—কিন্তু তা তুই লাগালি কোথায়?

অমিয় চুপ করে থাকে।

সোনাদা আবার জিজ্ঞেস করে, প্রবলেমটা কী?

অমিয় উত্তর দেয়, তুমি বুঝবে না। মানুষ কত রকম গাড্ডায় যে পড়ে সোনাদা!

তোর গাড্ডাটা কী রকম?

অমিয় শুধু হাসে। চার দিকে এক বার তাকায়। যে চেয়ারে সে বসে আছে তা ফোম রাবারের গদিওয়ালা, টানলে শব্দ হয় না, ভীষণ ভারী। টেবিলখানা লম্বা এল—এর মতো। ঘসা কাচের দরজা, ঢেউখেলানো কাচ দিয়ে তৈরি ঘরের পার্টিশন। ও—পাশে লোকজন চললে কাচের ঢেউয়ে বিচিত্র প্রতিবিম্ব দেখা যায়। এই একখানা চেম্বার করতেই ইন্টিরিয়র ডেকরেটর অন্তত দশ—বিশ হাজার কি তারও বেশি নিয়েছে। এ—রকম একখানা অফিসঘর বানাবার ইচ্ছে তার অনেক দিনের। হবে না আর। এ—রকম নিস্তব্ধ কাচের ঘর, মাছি উড়লে যেখানে শব্দ পাওয়া যায়, এ—রকম ঠান্ডা ঘর, ফোম রাবারের গভীর তলিয়ে যাওয়া গদি, বিচিত্র ডিজাইনের সেক্রেটারিয়েট টেবিল, আলো—এইসব আর কোনও দিন হবে না।

লাঞ্চে তুমি কী খাও সোনাদা?

তোর মুণ্ডু।

এই ঘরটা সাজাতে কত খরচ পড়েছে?

তোর মতো দশটা ব্যবসাদারকে বিক্রি করলে যত ওঠে।

এরা তোমার বাড়ি—ভাড়া দেয়? গাড়ি?

সোনাদা তাকে গ্রাহ্য না করে কাজ করে যায়। কিন্তু সোনাদার কপালে কয়েকটা দুশ্চিন্তার রেখা দেখা দেয়। কাজ করতে করতেও এক—আধবার চোরা চোখে অমিয়কে দেখে নেয়।

অমিয় বলে, উঠি।

বোস। প্রবলেমটা কী বলে যা।

কিছু না।

টাকা সত্যিই চাস?

অমিয় মাথা নাড়ে, না।

দরকার হলে ম্যাক্সিমাম হাজারখানেক নিতে পারিস। ব্যাঙ্কের টাকা নয়, আমার টাকা।

কোনও দিন নিয়েছি?

সোনাদা চুপ করে থাকে।

অমিয় বলে, তুমি যদি সাপ্লায়ার হতে, কিংবা সুদখোর মহাজন, কি আমার ক্লায়েন্ট, তো নিতাম। তুমি আমার সোনাদা, কিন্তু আমার ব্যবসার কেউ নও। তোমার কাছ থেকে নিলে আমি তোমার আর পাঁচজন আত্মীয়ের মতো নিচু হয়ে যাব।

তার মানে?

অমিয় হাসে, আমাদের আত্মীয়দের মধ্যে তুমিই সবচেয়ে সাকসেসফুল। তোমার কাছ ঘেঁষে বহু আত্মীয় ঘোরাফেরা করে, আমি জানি। কিন্তু তুমি জেনে রেখো, আমি তাদের দলে নই।

সোনাদা একটু হাসে।

সোনাদা, আমার একটা প্রবলেমের কথা তোমাকে বলব? শুনবে ঠিক?

সোনাদা ভ্রূ কুঁচকে তাকায়। ছোট্ট একটা নড করে।

আমি প্রায়ই একটা স্টিমারঘাটকে দেখতে পাই।

সোনাদা নড়েচড়ে বসে বলে, কী রকম?

আমি যেন উঁচু বালির চড়ায় বসে আছি। অনেক দূর পর্যন্ত বালিয়াড়ি গড়িয়ে গেছে—আধমাইল—একমাইল—তারপর ঘোলা জল—একটা জেটি—প্রকাণ্ড নদী দিগন্ত পর্যন্ত। কখনও কখনও দেখি, রাতের স্টিমারঘাট—কেবল বিন্দু বিন্দু আলো জ্বলে, জেটির গায়ে জলের শব্দ—ও—পারে ভীষণ অন্ধকার। কেন দেখি বলো তো?

সোনাদা তাকিয়ে থাকে।

এ কি মৃত্যুর প্রতীক নাকি? অমিয় বলে।

ইয়ারকি হচ্ছে?

ইয়ারকি নয় সোনাদা। কাজকর্মে, ঘুরতে—ফিরতে হঠাৎ হঠাৎ চোখের সামনে ওই বালিয়াড়ি, আর বালিয়াড়ির পর জেটি, জল—এইসব ভেসে ওঠে।

সোনাদার চোখ হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে যায়। ব্যস্ত সোনাদা একটু হেলান দিয়ে বসে। টেবিলের ওপর থেকে হাতড়ে ইন্ডিয়া কিংসের সোনালি প্যাকেটটা তুলে নিয়ে একটা সিগারেট ধরায়। মৃদু ধোঁয়ার গন্ধ অমিয়র নাকে এসে লাগে। সোনাদার সামনে খায় না, নইলে এই মুহূর্তে তারও একটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু যৌথ পরিবারের শিকড়—বাকড় সব রয়ে গেছে ভিতরে। সোনাদার সামনে কোনও দিনই আর সিগারেট খাওয়া যাবে না।

সোনাদা বলে, এ—সবই নস্ট্যালজিয়া। আমারও হয়। দেশের বাড়িতে করমচা তলার ছায়ায় মাটির ওপর শ্যাওলা গজাত। সেই ঠান্ডা জায়গাটার কথা হঠাৎ কেন যে মনে পড়ে।

অমিয় মাথা নাড়ে, না এটা শৈশব স্মৃতি নয়। স্টিমারঘাট আমি আর ক'বার দেখেছি। দু'তিন বার বড় জোর। তারপরই তো কলকাতায় পার্মানেন্ট চলে এলাম। তাছাড়া সেই স্টিমারঘাট তো দেশে যাওয়ার গোয়ালন্দি ঘাট নয়। এটা কেমন যেন ধু ধু বালুর চর, নির্জন অথৈ ঘোলাজল, ও—পারটা দেখা যায় না।

সোনাদা হাসে। বলে, ভালো খাওয়া—দাওয়া কর। হাসিকে নিয়ে কিছুদিন বাইরে—টাইরে ঘুরে আয়।

অমিয় অবাক হয়ে বলে, কেন?

তা হলে ও—সব সেরে যাবে।

সারাতে চাইছে কে? আমার তো খারাপ লাগে না। কলকাতার ভিড়ভাট্টা গরম, ঘাম, কাজকর্মের ভিতরে মাঝে মাঝে হঠাৎ ছুটি পেয়ে একটা অচেনা স্টিমারঘাটে চলে যাই, বালিয়াড়িতে বসে থাকি, বেশ লাগে। একে সারাব কেন? শুধু জানতে চাইছি, ব্যাপারটা কী। তুমি জান?

উত্তর দেওয়ার সময় পান না সোনাদা। স্টেনোগ্রাফার পারশি মেয়েটি ঘরে ঢোকে। লম্বা ফরসা, ভাঙাচোরা মুখ। তবু মুখে একটা অদ্ভুত শ্রী আছে। দারুণ একখানা বাটিকের শাড়ি পরনে। মেয়েটা সোনাদার ডান দিকে গিয়ে নিচু হয়ে একটা টাইপ করা চিঠি দেখায়। কথা বলাবলি হয়। ততক্ষণ অমিয় মেয়েটার শাড়ি দেখে। হয়তো বা এ—রকম শাড়িতে হাসিকে ভালো মানাত। হাসির কথা মনে পড়তেই অমিয়র এক ধরনের শারীরিক কষ্ট হয়। বুক—পেট জুড়ে একটা তীক্ষ্ন বেদনার আভাস পাওয়া যায়। দম বন্ধ হয়ে আসে। বুক ধড়ফড় করে। একটা চেক—আপ বোধহয় অমিয়র দরকার ছিল। বয়স পঁয়ত্রিশ—ছত্রিশ, ইররেগুলার জীবন, অতিরিক্ত চা আর সিগারেট, ব্যবসার উত্তেজনা, শক, সব মিলিয়ে ভিতরটা ভালো থাকার কথা নয়। হাসিকে এই শাড়িটায় বোধহয় এখনও মানায়। নীলের ওপর হলুদ বাটিকের কাজ। পকেটে একশোর কাছাকাছি টাকা আছে। বাজার ঘুরে এক বার খুঁজে দেখবে নাকি শাড়িটা। অবশ্য তা আর হয় না। হাসি বড় অবাক হবে, তাকিয়ে থাকবে, বা দু'—একটা বিদ্রূপাত্মক কথাও বলতে পারে। দরকার নেই। হাসি নিষ্ঠুর। তার হৃদয় নেই।

মেয়েটা ফাইলিং ক্যাবিনেটে কাগজপত্র ঘাঁটে। সোনাদা আবার কাজকর্মে ডুবে যায়। একজন—দুজন করে অফিসে লোকজন আসে। সুন্দর পোশাকের চটপটে লোকেরা। সোনাদা হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে, চমৎকার ইংরেজিতে কথা বলে। বিজনেসের পিক—আওয়ার। সোনাদার দম ফেলার সময় নেই।

এক ফাঁকে অমিয় বলে, সোনাদা, উঠি।

কাগজপত্র ঘেঁটে কী একটা খুঁজে পায় সোনাদা। সেটা দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখ তুলে অমিয়কে বলে, সামনের সোমবার মিন্টুর জন্মদিন। তোর বউদি হয়তো হাসিকে খবর দিয়েছে। তবু বলে রাখছি, বিকেলের দিকে হাসিকে নিয়ে চলে যাস, রাতে খেয়ে একেবারে ফিরবি।

আচ্ছা।

তোর স্টিমারঘাটের ব্যাপারটা আমি ভেবে দেখব।

অমিয় হাসে। জন্মদিনে যাওয়া হবে না। স্টিমারঘাটের কথা সোনাদা ভুলে যাবে।

ব্যাঙ্কটা থেকে বেরোতেই জ্বরো কলকাতা চেপে ধরে। কী তাপ রোদের। গুমোট।

অমিয় তার স্কুটার চালু করে। কোথায় যাবে, ভেবে পায় না, তবু যায়। যেতে থাকে।

টিফিন। কিন্তু টিফিনের সময়েও সোমাদি বাইরে যায় না, আড্ডা মারে না। নিজের জায়গায় বসে থাকে। প্রকাণ্ড হলঘরের একধারে টাইপিস্টদের সারি সারি মেশিন। সব খালি। কেবল সোমাদি ঠিক বসে আছে। ডান হাতে একখানা এককামড় খাওয়া টোস্ট, আলতো ভাবে ধরা, বাঁ হাত মেশিনে ছোবল মারার জন্য উদ্যত। অমিয় এগিয়ে যেতে শুনল টুক করে মেশিনের একটা অক্ষর লাফিয়ে উঠল। অমিয়র করুণা হয়।

সোমাদির বয়স পঁয়তাল্লিশের নীচে নয়। সিঁথির কাছে চুল পাতলা হয়ে এসেছে। চোখে প্লাস পাওয়ারের চশমা। রোগা গড়নের বলে বয়স খুব বেশি দেখায় না, কিন্তু দীর্ঘদিনের ক্লান্তির ছাপ আছেই। নাকের দু'ধার দিয়ে গভীর রেখা নেমে গেছে, মেচেতার ছোপ ধরেছে মুখে। বছরে বড়জোর এক—দু'দিন ছুটি নেয়। চোদ্দো বছর টানা চাকরি করছে আয়রন অ্যান্ড স্টিল কন্ট্রোলে, তবু চাকরি পাকা হয়নি। কন্ট্রোল উঠে যাবে চাকরি কারওই পাকা নয় এখানে। ওর বিয়ের জন্য কেউ তেমন করে চেষ্টাই করল না। পিসেমশাই মারা যাওয়ার পর একটা চাকরিতে ঢুকেছিল, তারপর চাকরিই করে গেল। বার দুই দুটি ছেলেকে বোধহয় ভালো লেগেছিল। তাদের একজন ছিল ভিন্ন জাতের, অন্যজনের ছিল কম বয়স। হল না। হবেও না। সোমাদি তা জানে বলেই কোথাও আর যায় না। মনপ্রাণ দিয়ে চাকরি করে। ছুটি পেলে হাঁফ ধরে যায়।

টোস্টটা আর—এক কামড় খাওয়ার জন্য মুখের কাছে এনে সোমাদি তাকায়। প্রথমটায় বোধহয় চিনতেই পারে না। তাকিয়ে থাকে।

সোমাদি, কেমন আছ?

সোমাদি টোস্টটা রেখে দিয়ে একটু চেয়ে থেকে বলে, বেরো বেরিয়ে যা।

কেন?

লজ্জা করে না? এক বছরের মধ্যে এক বার মাকে দেখতে যাওয়ার সময় হয়নি। কতবড় অসুখ গেল মা'র, তোকে দেখার জন্য আকুলি—বিকুলি, তিনটে চিঠি দিলাম, একটা উত্তরও দিসনি। বেরো—কেন এসেছিস?

তুমি কত মাইনে পাও?

তাতে কী দরকার? চালাকি ছাড়।

চালাকি না। সত্যিই জিজ্ঞেস করছি।

ভারী তো ব্যবসা। অফিসে মাছি ওড়ে, সেই ব্যবসা করেই তোর সময় হয় না? অমানুষ!

একটা চেয়ার টেনে অমিয় বসে নিজের থেকেই। মাঝখানে মেশিন, ও—পাশে সোমাদি। বলে, এর পরের জেনারেশনে আর এইসব চোটপাট শোনা যাবে না সোমাদি। যা বকাবকি করার তা তোমরাই করে নিলে।

তার মানে?

আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে একটা ফ্যামিলি আছে। স্বামী স্ত্রী আর বাচ্চা ছেলে একটা। একদিন সাজগোজ করে বিকেলে কোথায় বেরোচ্ছে, ছেলেটার গাল টিপে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাচ্ছ বাবু? সে উত্তর দিল—ঠাকুমার বাড়ি। বুঝলে সোমাদি,—কথাটা সেই থেকে বুকে মাঝে মাঝে ধাক্কা দেয়। ঠাকুমার বাড়ি! মাই গড, ঠাকুমার বাড়ি যে একটা আলাদা বাড়ি, সেখানে যে মাঝে মাঝে বেড়াতে যাওয়া যায় তা আমরা ভাবতেই পারি না এখনও। ঠাকুমার বাড়ি আবার কী? ঠাকুমা যে আমাদের রক্ত—মাংস মজ্জায় মিশে আছে—তার বাড়ি কী করে আলাদা বাড়ি হয়। এই যে তুমি আমাকে বকছ, পিসিমাকে দেখতে যাইনি বলে, এ—সব সম্পর্কের টান আমাদের সময়েই শেষ। এরপর পিসতুতো মামাতো ভাইবোনে দেখা হলে হয়তো হাতজোড় করে নমস্কার করবে, আপনি আপনি করে কথা বলবে। বলবে, এক দিন কিন্তু আমাদের বাড়িতে যাবেন, কেমন। খুব খুশি হব।

সোমাদি একটু হাসে। বলে, তোর সঙ্গে তো আমাদের সম্পর্ক তা—ই দাঁড়িয়ে গেছে। এক বছরে ঢাকুরিয়া থেকে বেহালা যাওয়ার সময় হয় না, কী করে বুঝব যে সম্পর্ক রাখতে চাস?

গত এক বছর ধরে আমি ভালো নেই সোমাদি।

কী হয়েছে?

তুমি কত মাইনে পাও বললে না?

জেনে কী হবে?

এমনিই। কৌতূহল। বলো না।

সব কেটে—ছেঁটে পৌনে আটশো। হাসি কেমন আছে?

ভালো। গত বছর তুমি একটা স্টিলের আলমারি কিনেছ আর একটা সিলিং ফ্যান, না?

সোমাদি হাসে, এ বছর একটা সুতোর কার্পেট কিনেছি, ড্রেসিং টেবিল করেছি, গ্যাসের উনুন কিনেছি। দেখে আসিস।

পৌনে আটশোর মধ্যে কী করে ম্যানেজ করো? তোমার তো উপরিরও রাস্তা নেই।

এইসব জানতেই এসেছিস? হাসিকে নিয়ে কবে যাবি বল?

তোমার পোষ্যও তো কম নয়। পিসিমা, নীতা তোমার এক জ্যাঠতুতো ভাই তোমার কাছেই থাকে, কী করে ম্যানেজ করো?

কী করব! তোরা ভাইরা তো আর মাসোহারা দিস না, ওতেই কষ্টে সৃষ্টে ম্যানেজ করে নিই। একটা টোস্ট দিয়ে টিফিন সারি, বিড়ি—সিগারেট খাই না, সাদামাটা পোশাক করি, সিনেমা দেখি কালেভদ্রে, কোথাও বেড়াতেও যাই না। তোদের তো তা নয়। হাসির খবর কিছু বললি না, বাচ্চাকাচ্চা হবে নাকি?

তুমি খুব কষ্ট করো, না সোমাদি?

দূর পাগলা, তোর হয়েছে কী? এ—সব বলছিস কেন?

তুমি এত কষ্ট করছ কেন?

কেন আবার, নিজের জন্য।

দূর। নিজের জন্য কষ্ট করে সুখ কী। কষ্ট করলে করতে হয় ভালোবাসার মানুষের জন্য। তুমি সবচেয়ে বেশি কাকে ভালবাসো সোমাদি?

কী জানি? তোর হয়েছে কী?

কিছু না!

হাসিকে নিয়ে কবে যাবি? হাসি তো আমাদের ভালো করে চিনলই না।

যাব একদিন ঠিক। আগে বলো, তুমি কার জন্য এত কষ্ট করছ?

বললাম তো, নিজের জন্য।

তবে তো তুমি নিজেকে ভালোবাসো।

বললাম তো, বাসি।

আমি বাসি না।

তুই হাসিকে বাসিস। ভালোবাসলেই হল।

নিজেকে ভালোবাসলে হাসিকেও ভালোবাসা যায়। এই যে তুমি নিজেকে ভালোবাসো বললে, স্বামী—পুত্র হলে তাদেরও বাসতে, বাধা হত না। ভালোবাসা তো মাস—মাইনে নয় যে টান পড়বে।

হাসির সঙ্গে ঝগড়া করেছিস নাকি? কী হয়েছে বল? দরকার হলে আমি না হয় গিয়ে হাসিকে বুঝিয়ে—সুঝিয়ে মিটমাট করে আসি। মাত্র তিন বছর হল বিয়ে, এখনই ঝগড়াঝাটি হলে—

পাকামি কোরো না। ম্যারেড লাইফ সম্পর্কে তুমি কী জানো? ওই ব্যাপারে আমি তোমার সিনিয়র।

তা হলে এই গরম দুপুরে ঘামে নেয়ে এসে ভালোবাসা ভালোবাসা করছিস কেন? কিছু খাবি? বেয়ারা ডেকে কিছু আনিয়ে দিই। একটা ডিমভাজা—না গরমে একটু দই খাবি?

আমার মুশকিল কী জানো?

কী?

আমি হাসিকে ভালোবাসতাম, ব্যবসাকে ভালোবাসতাম, স্কুটারকে ভালোবাসতাম, কিন্তু এইসব ভালোবাসার মাঝে মাঝে একটা স্টিমারঘাট এসে পড়ছে।

স্টিমারঘাট?

হুঁ।

সোমাদি চেয়ে থাকে। বলে, কী বলছিস?

খুব উঁচু বালিয়াড়ি থেকে তুমি কখনও কোনও নির্জন ফেরিঘাট দেখেছ? একটা জেটি—তারপর বিশাল ঘোলা জলের নদী... ও—পারটা ধু ধু করে... দেখা যায় না। দেখেছ? আমি চোখ বুজলেই দেখি।

সোমাদির মুখটা কেমন হয়ে যায় যেন। বয়েস হয়ে যাওয়া, কৃচ্ছ্বসাধনের ছাপওলা নীরস মুখ সোমাদির। তবু কয়েক পলকের জন্য যেন একটা কোমলতা গাছের ছায়ার মতো মুখে খেলা করে। মুখের কর্কশ রেখাগুলি লাবণ্যের সঞ্চারে হঠাৎ ডুবে যায়।

কোন স্টিমারঘাটের কথা বলছিস? কলকাতার গঙ্গা, না কি গোয়ালন্দ, আমিনগাঁতেও ফেরিঘাট দেখেছিলাম।

ও—সব নয়। এ একটা অন্য রকম ফেরিঘাট। বহ দূর পর্যন্ত বালিয়াড়ি, তারপর ঘোলা জল—চোখ বুজলেই দেখতে পাই। ভীষণ ভয় করে, আবার ভীষণ ভালোও লাগে।

আমি ঠিক জানি, তুই হাসির সঙ্গে ঝগড়া করেছিস। কিংবা ব্যবসাতে মার খেয়েছিস। কত টাকা রেখে গিয়েছিল মামা?

হাজার দশেক।

সেটাই ভুল হয়েছিল। কে যে তোর মাথায় ব্যবসা ঢুকিয়েছিল। বাঙালি ছেলে আবার কবে ব্যবসা করতে শিখেছে। তার চেয়ে একটা বাড়ি করে ভাড়াটে বসিয়ে গেলে—

স্টিমারঘাটটার কথা তুমি কিছু জানো না, না?

কী জানব? তোর মাথায় যত সব পাগলামির পোকা। হাসিকে নিয়ে কবে আসবি বল?

তোমার কিছু মনে হয় না? স্টিমারঘাট বা ও—রকম কিছু?

সোমাদি হাসে। বলে, আচ্ছা জ্বালাতন! ভাবনা—চিন্তা করার সময় কোথায় আমার বল তো? সকাল সাড়ে আটটার লেডিজ স্পেশাল ধরতে বেরোই, মাইলখানেক হেঁটে বাস রাস্তা, অফিসে সারাক্ষণ কাজ, ফিরতে ফিরতে আটটা হয়ে যায়। তখন শরীরে থাকে কী? খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি, স্বপ্নও দেখি না।

অমিয় শ্বাস ফেলে। বলে, তুমি কাঠ হয়ে গেছ।

একটু ইতস্তত করে সোমাদি বলে, তোর দেশের পুকুরঘাটের কথা মনে পড়ে। খুব বড় বড় কচুপাতা বাতাসে নড়ত। মাছ ফুট কাটত জলে। কদমগাছের ছায়ায় আমরা গঙ্গা যমুনা খেলতাম। মনে হওয়ার কি শেষ আছে! কত কী মনে হয়। ও—সব নিয়ে ভাবনার কী। হাসির সঙ্গে ভাব করে ফেল। ফেরার সময় একখানা শাড়ি আর দুটো সিনেমার টিকিট কিনে নিয়ে যা। কালকের দিনটা হোটেল—রেস্টুরেন্টে খাস। এ—রকম একটু—আধটু করলেই দেখিস আর ঝগড়া হবে না।

তুমি এ—সব কবে থেকে ভেবে রেখেছ সোমাদি! বিয়ে হলে বরের সঙ্গে কীরকম সব মান—অভিমান হবে, সব ভেবে রেখেছিলে। আর বলছ, ভাববার সময় পাও না!

সোমাদি হেসে ওঠে। বলে, ঠিক বলেছিস।

একজন—দুজন করে মেশিনগুলোর সামনে মেয়েরা এসে বসছে। টিফিন শেষ।

অমিয় উঠে দাঁড়ায়।

চলি।

সোমাদি প্লাস পাওয়ারের চশমার ভিতর দিয়ে তাকায়। চোখে অন্যমনস্কতা। বলে, সম্পর্কটা রাখিস অমিয়। মাকে গিয়ে দেখে আসিস। হার্ট ভালো না, কখন কী হয়ে যায়।

যাব।

অফিসে এসে অমিয় দেখে, কেউ নেই। দুপুরের ডাকে ইনশিওরেন্সের একটা চিঠি এসেছে। গত বছরের প্রিমিয়াম বাকি। বছর তিনেক আগে, বিয়ের পরই দশ হাজার টাকার একটা পলিসি করিয়েছিল। দু'বছর প্রিমিয়াম টেনেছে। যাকগে, পেইড আপ হয়ে যাবে।

গ্লাসের নীচে চাপা দিয়ে কল্যাণ একটা চিঠি রেখে গেছে—বাগচী, হায়দার তাগাদায় এসেছিল। ভুজুং ভাজুং দিয়ে বিদায় করেছি। ইনকাম—ট্যাক্সের অজিতকে এক বার ফোন করবেন, ওকে আপনার কথা বলা আছে। ওর দাদা একটা লোন সোসাইটির মেম্বার, একটা লোন পাইয়ে দিতে পারে। আমি সিনেমায় যাচ্ছি, আজ ফিরব না। রাজেনের কাছে চারশো টাকা রাখা আছে। কাল সকালেই গিয়ে মিশ্রিলালকে দিয়ে আসবেন। ফুড—সাপ্লাইটা ছাড়বেন না—

চোখটা একটু ঝাপসা লাগে। চিঠিটা রেখে দেয় অমিয়। অফিস—ঘরটা নির্জন। পাখার হাওয়ায় কোথায় যেন একটা কাগজ উড়বার শব্দ হয় কেবল। অমিয় বসে হাই তোলে। তারপর টেবিলে মাথা রেখে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ে।

বিকেলের দিকে রজত ফিরে এসে ডাকে, বাগচী—

উঁ।

আমার কাছে কেউ এসেছিল?

না।

দূর! কেউ আসেনি!

রাজেনকে জিজ্ঞেস করুন তো।

করেছি। ও তো বিশ বার বাইরে যাচ্ছে চা খাবার সিগারেট আনতে। আমার মোটর পার্টসটা দিয়ে গেল না শালা রায়চৌধুরী। কাল ডেলিভারি নিতে আসবে।

অমিয় আড়মোড়া ভাঙে। ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটা। বাইরে এখনও ফরসা রোদ।

রজত তার চেয়ার টেনে বলে, ব্যবসার মুখে পেচ্ছাপ। ভিসা পেয়ে যাচ্ছি কাল।

কবে রওনা?

দিন পনেরোর মধ্যে। প্রথমে ডুসেলডর্ফে যাব মাধুর কাছে। সেখান থেকে বন হয়ে কাজের জায়গায়। দাঁড়ান, আজ আমি চা খাওয়াব, সন্দেশ খাবেন?

খাব। খুব খিদে পেয়েছে। অমিয় বলে।

বেল বাজায় রজত। রাজেন এলে চা সন্দেশ আনবার পয়সা দেয়। তারপর অমিয়কে বলে, খুব দামি সিগারেট কী আছে বলুন তো?

আপনি তো খান না।

আজ খাব।

ইন্ডিয়া কিংস।

রাজেনের দিকে ফিরে রজত বলে, ইন্ডিয়া কিংস এনো এক প্যাকেট, আর দেশলাই। বাগচী, যাওয়ার আগে একটা পার্টি দেব।

অমিয় হাসে।

শুধু একটা ভয়, বুঝলেন বাগচী!

কী?

এর আগে গুরুপদ গিয়েছিল। ল্যাংগুয়েজ জানত না বলে ওকে ফেরত পাঠিয়েছে। আমিও ভালো জানি না। ওদিকে ব্রজগোপালদাকে দিয়ে জার্মান ভাষায় করেসপন্ডেস করেছি, নিজে শেখবার সময়ই পেলাম না। শেষে গুরুপদর মতো ফেরত পাঠাবে না তো?

সকলের কপাল সমান না।

চেয়ারটা পিছনে হেলিয়ে একটু দোল খায় রজত। ভাবে। বলে, অবশ্য মাধুও জানত না। কোম্পানি ওকে তবু রেখে দিয়েছে।

অমিয় রজতকে একটু দেখে। অন্তত দশ বছরের ছোট রজত। বাচ্চা ছেলে। কোনও জমিতেই শেকড় নেই। কলকাতায় জন্ম—কর্ম। অমিয়র মনে হয়, কলকাতায় জন্মালে মাটির টান থাকে না। রজতের খুব ইচ্ছে, আর ফিরবে না। একটা আবছায়া স্টিমারঘাট চোখের সামনে ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। অমিল ক্যালেন্ডারের ছবিটা দেখে। একজন মেয়ে বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে, মাথায় একটা কলসি, কোমরের কলসিটা কাত করে ধরা তা থেকে অঝোরে জল পড়ে যাচ্ছে।

রজত মুখ তুলে বলে, আমার একটা লাভ অ্যাফেয়ার প্রায় ম্যাচিওর করে এসেছিল বুঝলেন বাগচী!

হুঁ।

সেটার কী করব বলুন তো?

আপনার কী ইচ্ছে?

ইচ্ছে নেই।

অমিয় চেয়ে থাকে।

রজত আবার বলে, চলেই যাচ্ছি যখন, তখন আবার এখানে একটা ফ্যাকড়া রেখে যাই কেন! মেয়েটা হয়তো অপেক্ষা করবে। করতে করতে বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাবে। এক ফাঁকে এসে অবশ্য বিয়ে করে নিয়ে যাওয়া যেত। কিন্তু তার আর কী দরকার! ওখানেই যখন বরাবর থাকব তখন ওদিকেই বিয়ের সুবিধে। তাই মেয়েটাকে সব বুঝিয়ে কাটিয়ে দিয়ে যাব। ভালো হবে না?

অমিয় মাথা নেড়ে বলে, হবে।

রজতকে খুশি দেখায়। সে এক বার শিস দেয়, দু'কলি গান গুন গুন করে গায়।

কাঠের সিঁড়িতে পায়ের শব্দ হচ্ছে। কেউ আসছে। টপ করে নিজের অজান্তেই উঠে পড়ে অমিয়।

রজতবাবু, কেউ এলে কাটিয়ে দেবেন। আমি বোসের ঘরে ফোন করতে যাচ্ছি।

রজতের অভ্যাস আছে। অনেক দিন ধরেই অমিয়র সময় ভালো যাচ্ছে না। রজত মাথাটা হেলিয়ে একটু হাসল, ঠিক আছে ঠিক আছে। বাগচী, উই আর কমরেডস আফটার অল—

সিঁড়ি দিয়ে যে উঠেছে সে যে—ই হোক অল্পের জন্য অমিয়কে ধরতে পারল না। অন্ধকার প্যাসেজটা প্রায় লাফিয়ে পার হয়ে এল অমিয়।

বোস বুড়ো মানুষ। দুই ভাই পাশাপাশি চেয়ারে বসে থাকে। এক সময়ে ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটার হিসাবে একটু নাম ছিল। এখন কিছু নেই। অফিস আছে। এই পুরো তিনতলাটা তাদের লিজ নেওয়া। লিজ নিয়ে কল্যাণের তৃষ্ণা এবং আরও কয়েকজনকে অফিস ভাড়া দিয়েছে। ওইটাই আয় এখন। জটাওয়ালা একজন তান্ত্রিক এসে প্রায়ই দুই ভায়ের মুখোমুখি বসে থাকে। আজও আছে। ঠান্ডা অন্ধকার ঘরে তিনজন বয়স্ক, নিস্তব্ধ মানুষ। কোনও কাজ নেই।

টেলিফোনটার সামনে একটু দাঁড়ায় অমিয়। কাকে ফোন করবে বুঝতে পারে না। কোনও নম্বর মনে আসে না। তবু হাত বাড়িয়ে রিসিভার তুলে নেয়, ডায়াল টোন শোনে। কিড়—কিড় শব্দ হয়। কোনও নম্বর মনে আসে না। তবু অমিয় আঙুল বাড়ায়। দুইয়ের গর্তে আঙুল ঢুকিয়ে ডায়াল ঘোরায়। তারপর তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত—। অপেক্ষা করে। টেলিফোন একটু নিস্তব্ধ থাকে। তারপর খুট করে একটা শব্দ হয়। পরমুহূর্তে হঠাৎ অমিয়কে চমকে দিয়ে ওপাশে একটা দীর্ঘ টানা মুমূর্ষু চিৎকার শোনা যায়—অমিয়—ও—ও, অমিয়—ও—ও—

অমিয় কেঁপে ওঠে প্রথমে। 'কে?' বলে চিৎকার করতে গিয়েও থেমে যায়। তারপর বুঝতে পারে, ওটা এনগেজড সাউন্ড। ধীর কান্নার মতো বিষণ্ণ শব্দ। কত বার শুনেছে সে। আসলে মনটা ঠিক জায়গায় নেই। ফোনটা আবার রেখে দেয় অমিয়। দাঁড়িয়ে থাকে। একটু আগে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে কে উঠে এল তা ভাবতে চেষ্টা করে। অন্ধকার সিঁড়িতে আবছায়া নতমুখ একটা অবয়বকে এক ঝলক দেখেছিল। একটু সময় কাটানো দরকার।

আবার ডায়াল ঘোরায় অমিয়। সম্পূর্ণ আন্দাজে। কোন নম্বরে আঙুল তা তাকিয়ে দেখে না। খুব খিদে পেয়েছে অমিয়র। মুখটা তেতো—তেতো। বোধহয় পিত্তি পড়েছে। সকাল থেকে সে প্রায় কিছুই খায়নি। মাথাটা ঘোরে। শরীর দুর্বল লাগে। এর পর থেকে অফিসের নীচে, খোলা রাস্তায় আর স্কুটারটা রাখা যাবে না। নীচে স্কুটারটা দেখে সবাই বুঝতে পারে, অমিয় অফিসে আছে। আহমদকে বলবে একটা গোপন জায়গায় বন্দোবস্ত করতে। ঘড়ির দোকানের পাশে একটা এঁদো গলি আছে—সেখানে রাখলে কেমন হয়?

ফোনটা কানে চেপে ধরে থাকে অমিয়। ডায়াল টোন থেমে গেছে। এইবার নম্বর আসবে। অমিয় অপেক্ষা করে। স্পষ্ট শুনতে পায় ওপাশে দু'—একটা কলকবজা নড়ছে, লিভার উঠছে। প্রথমে ভার্টিকাল তারপর হরাইজন্টাল খোঁজ শুরু করে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র! কিন্তু নম্বরটা খুঁজে পাচ্ছে না। খুঁজছে—প্রাণপণে খুঁজছে যন্ত্রটা। খুঁজে পাচ্ছে না। অমিয় অপেক্ষা করে। যন্ত্রের শব্দ থেমে যায়। নম্বরটা কি পাবে না অমিয়? সে অপেক্ষা করে।

যন্ত্রটা অস্ফুট শব্দ করে, তারপর প্লাগ দেয়। রিং করার শব্দ হয় না, এনগেজড থাকারও শব্দ হয় না। কিন্তু তবু কানেকশন ঠিকই পায় অমিয়। স্পষ্ট বুঝতে পারে, ও—পাশে টেলিফোন হাতে নিয়েছে এক গভীর নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতায় খুব উঁচু থেকে বালিয়াড়ি নেমে গেছে বহু দূর। ধু ধু বালিতে শব্দহীন জ্যোৎস্না পড়ে আছে। হাড়ের মতন সাদা বালি—গড়ানে—তারপর অন্ধকার জেটি, ঘোলা জল। শেয়ালের চোখের মতো চকচক করে ওঠে জোনাকিপোকা। এ—পারে দিনের আলো থেকে ও—পারে গভীর রাতের মধ্যে চলে যায় টেলিফোন। সেখানে বাতাসের শব্দ নেই, জলের শব্দ নেই। বালির ওপরে একটা সাপের খোলস উলটে পড়ে আছে। বালিতে ঢেউয়ের দাগ। বহু দূর—দিগন্তব্যাপী সেই নিস্তব্ধতা টেলিফোন ধরে থাকে ও—পাশে। অমিয় সেই নিস্তব্ধতাকে শোনে।

ক'দিন ধরেই ইঁদুরের খুটখাট সারা বাড়িময় শুনছে হাসি। কখনও ওয়ার্ডরোবে, কখনও খাটের তলায়, জুতোর র‍্যাকে, রান্নাঘরে। অবিরল দাঁতে কেটে দিচ্ছে সংসার। নিশুতি রাতে ঘুম ভেঙে মাঝে মাঝে শুনেছে এক ঘর থেকে আর—এক ঘরে চিঁ—চিক—চিক আনন্দিত চিৎকার ছুটে যাচ্ছে। কুড়—কুড়—কুড়—কুড় কাটার শব্দ হয়েছে। হাসি তেমন গা করেনি। কাটছে কাটুক।

সকালে অমিয় বেরিয়ে যাওয়ার পরই হাসি গোছগাছ করতে বসেছে। থাকে থাকে সায়া, ব্লাউজ, ব্রেসিয়ার জমে গেছে। এতসব পরার সময় হয়নি। ট্রাঙ্ক ভরতি রয়েছে শাড়ি, র‌্যাকে নানা রকমের জুতো, ড্রেসিং টেবিলে সাজগোজের অসংখ্য টুকিটাকি। এ—সব কিছুই নেবে না সে। দু'—চারটে মাত্র নেবে... যা না হলে নয়।

নীচের থাক নাড়া দিতেই হাসি দেখতে পায় ইঁদুরের কাটার চিহ্ন। তার সায়া, ব্লাউজ, ব্রেসিয়ারের এখানে—সেখানে ফুটো। গরম—জামার থাক ভরতি জামা—কাপড় কেটে রেখেছে। কত কী কেটেছে দেখার জন্য হাসি সব জামা—কাপড় নামিয়ে মেঝেতে স্তূপ করে। একটা পুরনো ফুলহাতা সোয়েটারে জড়ানো দু' বান্ডিল চিঠি। চিঠির বান্ডিল তুলতেই ঝুরঝুর করে কাগজের টুকরো ঝরে পড়ে। অমিয় দু' দফায় দিল্লি আর কানপুর গিয়েছিল। প্রথমবার দু' মাস, দ্বিতীয়বার মাসখানেকের জন্য। আর দু'বার বাপের বাড়িতে গিয়ে কিছুদিন করে ছিল হাসি। সেইসব সময়ে অমিয় লিখেছিল এইসব চিঠি। ইঁদুর নষ্ট করে গেছে। সবচেয়ে ওপরের চিঠিটা খুলে কয়েক পলক দেখে হাসি। ছিদ্রময় প্রেমপত্র। 'প্রিয়তমাসু...' হাসি পড়তে থাকে... 'তোমার জন্য ভীষণ (ফুটো) হয়ে আছি। কবে আসছ? তোমার জন্য এমন (ফুটো) লাগছে যে কী বলব। আমার (ফুটো) ভিতরটা তো তুমি (ফুটো) পাও না... রানি আমার, আমার (ফুটো), কবে (ফুটো)? তোমার জন্য আমি সব (ফুটো) পারি। তাড়াতাড়ি চলে (ফুটো)...'

হাসি একটু হাসে। চিঠিটা দেখে নয়। প্রেমপত্র লিখতে অমিয় জানে না। দু'—চারটে দুর্দান্ত এলোমেলো আবেগের লাইন লিখেই তার সব কথা ফুরিয়ে যায়। কোনও ইনল্যান্ডের একটার বেশি ফ্ল্যাপ ভরতি করতে পারেনি সে।

ছিদ্রময় এই চিঠিগুলো নিয়ে কী করবে তা ঠিক করতে পারে না সে। নিয়ে যাবে? না কি পুড়িয়ে ফেলবে? ভাবতে ভাবতেই আবার পুরনো পুলওভারে চিঠিগুলো জড়িয়ে ওয়ার্ডরোবে আগের জায়গায় রেখে দেয়। থাকগে। থাকতে থাকতে একদিন পুরনো হয়ে হয়ে ধুলো হয়ে যাবে আপনা থেকে।

মধূকে ডেকে হাসি ন্যাপথলিন আনতে বলে, আর ইঁদুর—মারা বিষ। তারপর একে একে ট্রাঙ্ক বাক্স, স্টিলের আলমারি—সবই খুলে ফেলে সে। জামা—কাপড় নামায়, ছিদ্র খুঁজে দেখে। সব জায়গাতেই হয়েছে ইঁদুরের দাঁতের দাগ। ভিতরে ভিতরে সব ফোঁপরা করে দিয়ে গেছে। আবার সব গোছ করে তুলতে বেলা গড়িয়ে যায়। সঙ্গে নেওয়ার জন্য সাদামাটা কয়েকটা জামা—কাপড় আলাদা করে রাখে হাসি। দু'—একটা প্রসাধন। কিছু টাকা। কবে যাওয়া হবে তার কিছু ঠিক নেই। দার্জিলিং মেলে এখন সামার—রাশ। জামাইবাবুকে রিজার্ভেশন করতে বলা আছে।

ঘর—দোর আবার ঝাঁট দেয় হাসি, আটার গুলিতে বিষ মিশিয়ে রাখে ওয়ার্ডরোবে, খাটের তলায় রান্নাঘরে। স্নান করে খেয়ে উঠতে বেলা দুটো বাজে।

মেঝেয় শতরঞ্জি পেতে একটু গড়িয়ে নেয় হাসি। মেঝে থেকে শীতভাব উঠে আসে শরীরে। বাইরে রোদের মুখে ছায়া পড়েছে। মেঘ করল নাকি! বুকের ওপর সিলিং ফ্যানটার ঝকঝকে ইস্পাতের রঙের ব্লেডগুলো একটা প্রকাণ্ড স্থির বৃত্ত তৈরি করেছে। ঘূর্ণিঝড়ের মতো। বাতাস নেমে এসে মেঝেতে চেপে ধরে হাসিকে! মধু রান্নাঘর ধোলাই করছে। কলঘরে জলের শব্দ। দূরে মেঘ ডাকছে। জানালা—দরজায় সবুজ পরদা ফেলা। ঘরে একটা সবুজ আভা। হাসি একটু চেয়ে থাকে, কিন্তু কিছুই দেখে না। দেখার জন্য সে চেয়েও নেই। দুই ঘরের এই যে ছোট্ট বাসা, এই কি সংসার? খাট আলমারি, খাওয়ার টেবিল, ড্রেসিং টেবিলের আয়না—দৃশ্যমান যা—কিছু আছে, যা ধরা—ছোঁয়া যায় তার কোনওটাই কি মানুষের সঙ্গে আর—একটা মানুষকে আটকে রাখতে পারে? ঘরে দরজা দিয়ে দাও, শরীরে শরীর মিশিয়ে ফেলো, সারাবেলা বলো ভালোবাসার কথা পোষা পাখির মতো, ওয়ার্ডরোবে জমে উঠুক প্রেমপত্র—তবু কিছুই প্রমাণ হয় না। সরকারি দপ্তরে হাসি আর অমিয়র বিয়ের দলিল নব্বই—একশো বছর ধরে জমা থাকবে, অত দিন ধরে তাতে লেখা থাকবে যে তারা আইনগতভাবে স্বামী—স্ত্রী। তবু কিছুই প্রমাণ হয় না। হাসি পাশ ফিরে শোয়।

খামের ওপর সাঁটা একটা ডাকটিকিট জলে ভিজিয়ে খুব সাবধানে তুলে নিচ্ছে হাসি। খামের ওপর টিকিটের চৌকো চিহ্ন একটা থেকে যাবে— থাকগে। না কি কোনও দিনই টিকিটটা ঠিকমতো সাঁটা ছিল না খামের গায়ে? দুটো শরীর কেবল পরস্পরকে ডাকাডাকি করেছে এতকাল? মন নয়, বিশ্বাস নয়, নির্ভরতা নয়।

ছেলেবেলা থেকেই তার মন বলত—কলকাতা কলকাতা!

গরিব ঘরেই জন্ম হয়েছে হাসির। তার বাবা কাছাড়ের এক ছোট্ট চা—বাগানের কেরানি। তারা ছয় ভাইবোন। হাসি চতুর্থ। লেখাপড়ার কোনও সুযোগ ছিল না। শিলচরে থাকত এক মাসি, তার ছেলেমেয়ে নেই। সেই মাসিই নিয়ে গেল হাসিকে, পালত পুষত। শিলচর কলেজ থেকেই সে বি এ পাশ করে, শিলচরেই শেখে মণিপুরি নাচ। লেখাপড়া, নাচ, গান—বাজনা—এ—সবই হাসি শিখত প্রাণ দিয়ে। এইসব লোকে শেখে কত কারণে। হাসির কারণ ছিল ভিন্ন। হাস্যকর সে কারণ, তবু কত সত্য।

ছেলেবেলা থেকেই তার মন বলত—কলকাতা, কলকাতা! চা—বাগানে তার ছেলেবেলা কেটেছে। চার দিকে ঘন গাছের বেড়াজাল, বৃষ্টি পড়ত খুব, আবার রোদ উঠলে চা—পাতার মাতলা গন্ধে ম—ম করত বাতাস। রাতে ফেউ ডাকত, শেয়াল কাঁদত, তাদের বাড়ির আনাচে—কানাচে এঁটোকাঁটা খেতে আসত শুয়োরের মতো মুখওয়ালা বাগডাশা। ঝিঁঝির ডাক রাতে অরণ্যকে গভীর করে তুলত। শীতকালে পড়ত অসহ্য শীত, মাটির ভাপ কুয়াশার মতো হয়ে বর্ষাকালে চরাচর আড়াল করত। পাহাড়ি পথ হঠাৎ বাঁক ঘুরে রহস্যে হারিয়ে যেত। তারা ভাইবোনেরা উতরাই ভেঙে দৌড়ে দৌড়ে খেলত ছোঁয়াছুঁয়ির খেলা। দীনদরিদ্র ছিল তাদের পোশাক, আসবাব। তাদের ছোট্ট বাড়িটিতে তাদের অতজনের ঠিক আঁটত না। সেই বাগানে তার ছেলেবেলায় প্রথম বাবার কাছে কলকাতার গল্প শোনে। বেশিরভাগই কলকাতার দৃশ্যের গল্প। গাড়িঘোড়া আলো দোকান আর লোকজনের গল্প। বাবা গল্প বলতেন সুন্দর, আস্তে আস্তে, সময় নিয়ে, প্রতিটি দৃশ্য যেন নিজেও প্রত্যক্ষ করতেন। সেইসব গল্পে তাঁর যৌবনকালে কলকাতার ছাত্রজীবনের নানা দীর্ঘশ্বাস মিশে থাকত। আর থাকত কলকাতা ছেড়ে আসবার বিরহ—যন্ত্রণা। হাসির মনে সেই প্রথম কলকাতার নাম বীজের মতো ঢুকে যায়। সে বাবাকে বলত, চলো না বাবা, কলকাতা যাই। বাবা স্থির থেকে বলত, দূর! আর যাওয়া হবে না। সেখানে আমাদের আত্মীয়—স্বজন কেউ নেই, কোনও কাজ নেই সেখানে, খামোখা টাকা—পয়সা খরচ করে চার দিনের রাস্তার ধকল সয়ে কার কাছে যাব? হাসির মন বলত—কেন, কলকাতার কাছে।

শিলচর ছিল সুন্দর ছিমছাম শহর। লোকজন বেশি না, গাড়িঘোড়া বেশি না, চার দিকে জঙ্গল—ঘেরা ছোট্ট শহর। সেখানে মাসির বাড়িতে এসে সে প্রথম শহরের স্বাদ পায়। সুন্দর সেই স্বাদ। তখন তার মনে কলকাতার বীজটি ফেটে অঙ্কুর দেখা দিয়েছে। সে বুঝতে পারে—শহর—শহরের মতো জায়গা নেই। সাত বছর সে শিলচরে কলকাতার আরও বিচিত্র গল্প শোনে বন্ধুবান্ধবীর কাছে। মাসিদের আত্মীয় হারুকাকার ক্যানসার হয়েছিল, সে গেল চিকিৎসার জন্য কলকাতায়। শচীন নামে কলেজের একটি ছেলে বেশ কবিতা লিখত, সে গেল কলকাতায় বড় কবি হওয়ার জন্য। অনুরাধা ক্লাসিকাল গাইত গৌহাটি রেডিয়ো থেকে। সে প্রায়ই বলত, মফসসলে কিছু হয় না, শিখতে হলে যেতে হবে কলকাতা। হাসির মন বলতে থাকে—কলকাতা, কলকাতা। তুমি গান গাও? নাচো? কবিতা লেখো? তুমি চাকরি চাও? উন্নতি চাও? তোমার মরণাপন্ন অসুখ! তবে কলকাতা যাও। যাও কলকাতায়। এক বার কলকাতা থেকে ঘুরে এসো। মানুষকে কলকাতা সব দিতে পারে। খ্যাতি, টাকা, প্রাণ পর্যন্ত। কলকাতা থেকে যারা শিলচরে ফিরে যায় সেইসব বন্ধুদের কাছ ঘেঁষে কলেজে বসত হাসি। দেখত—ঠিক। ওদের মুখে—চোখে আলাদা দীপ্তি, ঝলমলে আনন্দিত ওদের পোশাক, গায়ে কলকাতার মিষ্টি গন্ধ। মাসিকে বলত, মেসোকে বলত, কী গো তোমরা! ভারী ঘরকুনো, চলো এক বার কলকাতা যাই। মাসি—মেসো সমস্বরে বলত, সে ভারী দূরের রাস্তা, পথের কষ্ট খুব, একগাদা টাকা খরচ, তা সেখানে গিয়েই বা হবে কী? যা ভিড়, গণ্ডগোল, মারপিট—আমাদের মতো সুন্দর নিরিবিলি শহর নাকি সেটা? চোর পকেটমার, রকবাজ ছেলে, রাজনীতি—দূর দূর—

যাওয়া হত না। হত না বলেই হাসির কল্পনায় কলকাতা ক্রমে ক্রমে এক বিশাল ব্যাপক রাজত্ব স্থাপন করে। কলকাতায় যেন বা আলাদা সূর্য ওঠে, আলাদা চাঁদ, কলকাতা শূন্যে ভাসমান বুঝি বা। কলকাতাকে ঘিরে যে—সব কল্পনা হাসির—সে—সব কল্পনা কলকাতার দিগ্বিজয়ী সৈন্যদলের মতো তার ভিতরটা তছনছ করে দিয়ে যেত। কলকাতা কল্পনা—লতা তার ওপর দু'চোখের পল্লবের ছায়া ফেলেছিল। কলকাতা বলে বোধহয় কিছু নেই তবে। লোকে কেউ কখনও যায়নি। সবাই মিলে যোগাযোগ করে বানিয়েছে গল্প। যারা কলকাতার কথা জানে তারা, নিজেদের মধ্যে চোখ—টেপাটেপি করে, কানাকানি করে, যুক্তি করে, হাসিকে এক কাল্পনিক শহরের কথা শোনায়। কলকাতার খণ্ডিত ছবি সে অনেক দেখেছে ভূগোলের বইতে, খবরের কাগজে, ক্যালেন্ডারে। কখনও জি—পি—ও—র ঘড়ি, হাওড়া ব্রিজ, ভিক্টোরিয়া, মনুমেন্ট, তা থেকে কিছুই বোঝা যায় না। ক্রমে সে বুঝতে পারে, কলকাতার দৃশ্য নয়, রাস্তা—ঘাট আলো নয়; নয় তার দোকান—পাট কিংবা বিচিত্র পসরা—এ—সবের অতীত, কিংবা এ—সব মিলিয়ে কলকাতা এক মন্ত্রের মতো। কিংবা কলকাতা কি জ্বলন্ত পুরুষ তার বুকে রহস্যের শেষ নেই, সীমাহীন তার নিষ্ঠুর উদাসীনতা, চুম্বকের মতো তার আকর্ষণ! দূরদূরান্ত থেকে, প্রেমিকারা চলেছে কলকাতার দিকে! কেবলই চলেছে!

কলকাতা এক প্রেমিকেরই নাম। জ্বলন্ত দুর্বার এক প্রেমিক পুরুষ। কলকাতায় এক বার গেলে আমি আর ফিরব না, ভাবত হাসি।

হাসি লেখাপড়া শিখত কলকাতায় যাবে বলে। গান শিখত, নাচ শিখত—কলকাতায় যেতে হলে কোনটা যে দরকার হবে, কোনটার সূত্রে কলকাতায় যাওয়া হবে তা বুঝতে পারত না। কিন্তু হাস্যকর হলেও এ—কথা খুবই সত্য যে তার সবকিছুর পিছনেই ছিল কলকাতা, কলকাতা। বিয়ের সম্বন্ধ মাসিই খুঁজছিল। হাসি একদিন খুব লজ্জার সঙ্গে তাকে বলে, যদি বিয়ে দাও তো কলকাতায় দিয়ো। মাসি অরাজি ছিল না। কিন্তু অত দূরের পাল্লায় ঠিকমতো যোগাযোগ কে করে!

সেই সময়ে ডিগবয়ের তেল কোম্পানির এক ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে চমৎকার সম্বন্ধ এসে গেল হাসির। বিলেত—ফেরত ছেলে, বেশ স্মার্ট চেহারা, দেড়—দুই হাজার মাইনে। হাসিকে পাত্রপক্ষ পছন্দও করে গেল। মণিপুরি নাচে, রবীন্দ্রসংগীতে শিলচরে তখন হাসির বেশ নাম। রং চাপা হলেও বড় সুশ্রী ছিল হাসি। সবাই জানত হাসির ভালোই বিয়ে হবে। হয়েও যাচ্ছিল। পাত্রের ঠাকুমা মারা গিয়েছিল মাস আষ্টেক আগে, চার মাস পর কালাশৌচ কাটবে। তখন অস্থি বিসর্জন দিয়ে বিয়ে হবে—ঠিক হয়েছিল। হয়ে গেল পাটিপত্র। এমনকী আশীর্বাদের ব্যাপারে কালাশৌচ ওঁরা মানেননি। হাতে তখন চার মাস সময়। মাসির অ্যালবামে পাত্রের ফোটো সাঁটা হয়ে গেছে, পাশে হাসির ফোটো। মাসি মাঝে মাঝে হাসিকে অ্যালবামের সেই পাতাটা খুলে দেখাত—দ্যাখ হাসি!

হাসির মন বলত, কলকাতা, কলকাতা। বহু দূরে এক বিশাল পর্বতের মতো বহ্নিমান পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। চতুর্দিককে কেন্দ্রাভিগ আকর্ষণে টানছে চুম্বক পাহাড়ের মতো। সেখানে গেলে ফিরত না হাসি। যাওয়া হবে না কি!

কাছাড়ের এক লোকনাট্য দল সেবার কলকাতায় যাচ্ছে। তারা হাসিকে দলে নিতে রাজি। হাসি মাসিকে গিয়ে ধরল, এখনও চার মাস বাকি। এক বার ঘুরে আসি মাসি। মাত্র তো পনেরোটা দিন।

বিয়ের আগে কলকাতায় গিয়ে নাচবি—গাইবি, সেটা কি ভালো দেখাবে? পাত্রপক্ষ যদি কিছু মনে করে!

হাসি হাসে, কলকাতার জলে রং ফরসা হয়, জানো না?

অনেক বলা—কওয়ায় মাসি রাজি হল।

কলকাতা কীরকম দেখতে, তা আজও হাসি সঠিক জানে না। প্রথম দিনের মতোই। বহু দূর থেকে একটা যৌবনকালের প্রতীক্ষা নিয়ে সে যখন কলকাতায় নামল তখন আর রাস্তার কষ্টের কথা মনেও ছিল না, খুব পিপাসা পেয়েছিল, বিবেকানন্দ ব্রিজ পেরিয়ে আসার সময়ে যে গুমগুম আওয়াজ করেছিল রেলগাড়ি, সেই আওয়াজ শিয়ালদা পর্যন্ত তার বুকের ভিতরে কলকাতার শব্দতরঙ্গ তুলেছিল। শিয়ালদার ঘিঞ্জি কলকাতা সে তো চোখে দেখেনি। শুভদৃষ্টির সময়ে কেউ কি বরের মুখ ঠিকঠাক দেখতে পায়, নির্লজ্জ ছাড়া? সে গাড়ি থেকে প্লাটফর্মে পা দিতেই এক দুরন্ত পুরুষের প্রকাণ্ড উষ্ণ বুকের মধ্যে চলে এল। গর্জমান এক কামুক পুরুষ যার শিরা—উপশিরায় প্রাণস্রোত, যার আদরে অবহেলায় সর্বক্ষণ জীবন বয়ে যাচ্ছে। সেই প্রথম পুরুষটির আদরে লজ্জায় চোখ বুজেছিল বুঝি হাসি। চোখ আর খোলা হল না। কলকাতা তার চার দিকে সর্বক্ষণ এক শিশু বয়সের বিস্তৃত রঙিন মেলার মতো কাল্পনিক হয়ে রইল।

জ্যাঠতুতো দিদির বাড়িতে উঠেছিল হাসি, চিৎপুরের এক ফ্ল্যাটবাড়িতে। বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনে সে একদিন লোকনৃত্যের অনুষ্ঠানও করল। কিন্তু সারাক্ষণ সে কেবলই তার শিরায় শিরায় উল্লসিত রক্তের স্পন্দনে কলকাতার শব্দ শুনল। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে থেকে টের পেল তার যুবতী বুক কলকাতার পাথুরে বুকের সঙ্গে মিশে আছে। একের হৃদস্পন্দন মিশে যাচ্ছে আর একজনের সঙ্গে। আমি তোমাকে ছেড়ে কী করে আবার ফিরে যাব—মনে মনে বলত হাসি।

পাশের ফ্ল্যাটে এক দম্পতি ছিলেন, আর ছিল অমিয়। দম্পতি অমিয়রই দিদি—জামাইবাবু। এ ফ্ল্যাটে হাসিরও দিদি—জামাইবাবু। দুই পরিবারে যাতায়াত ছিল। সামনের বারান্দাটা কমন। সেইখানে দাঁড়িয়ে কলকাতা দেখতে দেখতে হাসি কত দিন দেখেছে পাশের ফ্ল্যাট থেকে সুন্দর পোশাক পরে অমিয় বেরোচ্ছে, নীচে রাস্তায় রাখা তার স্কুটার। স্কুটারে চলে যেত ছেলেটা, যাওয়ার আগে তাকে লক্ষ করত। কিন্তু অমিয়কে কেন লক্ষ করবে হাসি? কলকাতার প্রেমিকা কেন গ্রাহ্য করবে অন্য পুরুষকে?

দুই পক্ষের দিদি—জামাইবাবুরা প্রায় রাতেই খাওয়ার পর কিছুক্ষণ ফিশ খেলার আসর বসাতেন। হাসি থাকত, অমিয়ও। দু'পক্ষের কথাবার্তা মাঝে মাঝে হাসি আর অমিয়কে ঘেঁষে যেত। সে—সব ঠাট্টার গুরুত্ব ছিল না। হাসির দিদি—জামাইবাবু জানতেন হাসির বিয়ে ঠিক হয়ে আছে।

হাসি অমিয়কে তেমন করে লক্ষ করত না ঠিকই, কিন্তু তার মন বলত—কলকাতা, কলকাতা।

অমিয় খুব বেশিমাত্রায় লক্ষ করেছিল হাসিকে। কতটা তা হাসি টের পায়নি। কিন্তু একদিন অমিয় খুব দুঃসাহসের সঙ্গে প্রস্তাব করেছিল, চলুন, আমার স্কুটারে আপনাকে কলকাতা দেখিয়ে আনি। প্রথমদিন হাসি রাজি হয়নি। কিন্তু কয়েক দিন পরে হয়েছিল। কলকাতার মেয়াদ তখন শেষ হয়ে এসেছে। কয়েক দিন পরই হাসি চলে যাবে।

মসৃণ, সুন্দর ক্যাথিড্রাল রোড হয়ে ময়দানের দিকে স্কুটার ছুটিয়ে অমিয় প্রস্তাব দিয়েছিল, যদি কিছু মনে না করেন—

কলকাতা—কেবলমাত্র কলকাতার জন্য হাসি থেকে গেল। কয়েকটা কাগজপত্রে সই করে বিয়ে, বাড়িতে চিঠি লিখে ব্যাপারটা জানানো, তারপরই ঢাকুরিয়ার ফ্ল্যাট।

হাসির মন বলত—কলকাতা, কলকাতা!

হাসির জীবনে অমিয় কোথাও ছিল না। যৌবনকালে একশো ছেলে ভালোবেসেছে হাসিকে। শিলচর জুড়ে ছিল তার প্রেমিকেরা। তাদের মধ্যে ছিল আসামের রঞ্জি ট্রফির ক্রিকেট খেলোয়াড়, কবি, অধ্যাপক, ছাত্রনেতা, ভবঘুরে। তাদের অনেকের সঙ্গে হাসির দীর্ঘকালের সম্পর্ক। কোথায় ছিল অমিয়! পাত্র হিসেবেও অমিয় তো কিছুই না। সদ্য ব্যবসা শুরু করেছে! কয়েকটা অর্ডারে লাভ পেয়ে কিনেছে স্কুটার, দু'হাতে টাকা ওড়ায়, পোশাক কেনে। সেই অমিয় হাসির জীবনে এসে গেল! এসে গেল, আবার এলও না। সারা দিন টাটা—বিড়লা হওয়ার আশায় সারা কলকাতা দৌড়ঝাঁপ করে যখন অমিয় ফিরত, তখন সদর খুলে অমিয়কে দেখে একটু অবাক হয়ে এক পলকের জন্য হাসি ভাবত—আরে এ লোকটা কে? স্বামী? তার মনে পড়ত, সারা দিন সে অমিয়র কথা ভাবেইনি!

শরীরে শরীরে কথা হত ঠিকই। অমিয়র প্রথম দিকের ভালোবাসা ছিল তীব্র, শরীরময়, আক্রমণাত্মক। হাসি সেই খেলায় আগ্রহভরে অংশ নিয়েছে। কিন্তু সে কতটুকু সময়ের ভালোবাসা? শরীর জুড়োলেই তা ফুরোয়। তারপর আর আগ্রহ থাকে না অচেনা পুরুষটির প্রতি। হাসি তখন থেকে নিষ্ঠুর।

চিৎপুরের দিদি—জামাইবাবু এসে বলতেন, হাসি, তোমার বাবা—মা আমাদের দোষ দিয়ে চিঠি লিখেছেন, আমরা কি লিখব ওদের?

দোষ! আপনাদের দোষ কী?

দোষ নেই ঠিকই, তুমি ভালোবেসে বিয়ে করেছ, কিন্তু আমাদের বাসায় থেকেই তো ব্যাপারটা ঘটল!

ভালোবাসা! হাসি ভারী অবাক হত। ভালোবাসা কীসের! কাকে! অমিয়কে? অমিয়কে তো সে কোনওকালে ভালোবাসেনি। সে ভালোবেসেছিল কলকাতাকে। বিশাল কলকাতার কতটুকু প্রতিদ্বন্দ্বী অমিয়? অমিয়কে জানালায় এসে বসা চড়াইপাখির মতো তুচ্ছ মনে হত তার। যার সঙ্গে হাসির বিয়ে ঠিক হয়েছিল, বা তার শিলচরের অন্য প্রেমিকেরা—তাদের তুলনাতেও অমিয় কিছুই না। কিছুই না। অমিয় কেবল কলকাতায় হাসিকে আশ্রয় দিয়েছে।

বিয়ের ছ' মাস পরে মাসি আর মেসোমশাই এসেছিলেন।

এটা কী করলি হাসি? সেই ডিগবয়ের ছেলেটা বিয়েই করল না।

হাসি উত্তর দেয়, আমি যা চেয়েছিলাম, পেয়েছি।

কী চেয়েছিলি?

হাসি মুখে কিছু বলল না। মনে মনে বলল, কলকাতা।

তিন বছরে ডাকটিকিটটা ভিজে ভিজে আলগা হয়ে এসেছে। খামের গা থেকে এবার সাবধানে তুলে নেবে হাসি, একটা চৌকো দাগ থেকে যাবে কি? থাক। শরীর বহতা নদীর মতো, শরীরে কোনও চিহ্ন থাকে না। অমিয়কে শরীরের বেশি দেয়নি হাসি।

সিলিংফ্যানের ঝকঝকে ইস্পাতের রঙের ঘূর্ণি বৃত্তটা দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল হাসি। উঠে দেখল রোদের মুখে বসেছে কালো মেঘ। গুড় গুড় শব্দ হচ্ছে। পুবের বাতাসে পরদা উড়ে আসছে। উদ্ভিদহীন কলকাতায় প্রকৃতির বন্য গন্ধ নিয়ে আসে বৃষ্টি।

পাশ ফিরতেই খুব অবাক হয়ে হাসি দেখে, শতরঞ্জির একধারে তার মাথার কাছেই একটা ছোট্ট লালচে ইঁদুর মরে পড়ে আছে। শিশু শরীর ইঁদুরটার, উদোম ন্যাংটো, মুখে নির্দোষ একখানা ভাব, চুপ করে মরে গেছে কখন। আহা রে! এত দূর এসেছিলি কেন? কিছু বলতে চেয়েছিলি আমাকে? লাল টুকটুকে হাত—পা, সুন্দর সতেজ লেজ, রেশমের মতো রোমরাজি, ঠোঁটে গোঁফের নরম সাদাটে চুল। আস্তে আস্তে উঠে বসে হাসি। তার একটু কষ্ট হয়। বিষ সে নিজে মিশিয়েছিল।

উঠে মধুকে ডাকে হাসি, ঘরগুলো খুঁজে দেখ মধু, ইঁদুরগুলো কোথায় কোথায় মরে পড়ে আছে। পচে গন্ধ বেরোবে।

চারটে বেজে গেছে। জামাইবাবুকে একটা ফোন করা দরকার। রিজার্ভেশনটা যদি পাওয়া যায়!

জলে কলকাতার ভঙ্গুর প্রতিবিম্ব পড়েছে, ভেঙে যাচ্ছে। জল হলে এক কলকাতা অনেক কলকাতা হয়ে যায়। ঢাকুরিয়া থেকে বাস ধরে হাসি গড়িয়াহাটায় এসে পেট্রল পাম্প থেকে জামাইবাবুর অফিসে টেলিফোন করে।

জামাইবাবু, আমি হাসি।

বলো।

আমার রিজার্ভেশনের কী হল?

হয়নি। দার্জিলিং মেলে ভীষণ ভিড় হচ্ছে। এখন সামার রাশ।

রেলে যে কে আপনার বন্ধু আছে চেকার?

থাকলেই বা, সিটি বুকিংগুলো দেখে এসো না। তিন দিন ধরে লাইন দিয়ে বসে আছে লোক—কোথায় কত টিকিটের কোটা আছে সব তাদের মুখস্থ, একটা টিকিট কম পড়লে আস্ত রাখবে?

এত লোক যাচ্ছে কোথায়?

কলকাতা থেকে পালাচ্ছে; আবার কলকাতায় পালিয়ে আসবে বলে।

আমার মনে হয়, আপনি গা করছেন না।

তা তো করছিই না।

কেন?

তুমি সুখের পাখি উড়ে যাবে, আর আমরা পড়ে থাকব হাঁফিয়ে ওঠা ভ্যাপসা কলকাতায়—তা কি হয়!

আমার যে যাওয়াটা দরকার।

কেন?

যাব না কেন?

ওপাশে জামাইবাবু একটা শ্বাস ফেলে।

হাসি, গতকাল অমিয় আমার কাছে এসেছিল।

হাসি তীক্ষ্ন গলায় বলে, কেন?

ভয় পেয়ো না। সে তোমার চলে যাওয়া আটকানোর ষড়যন্ত্র করতে আসেনি।

হাসি চুপ করে থাকে।

ও এসেছিল একটা স্টিমারঘাটের কথা বলতে।

স্টিমারঘাট!

স্টিমারঘাট। ও আজকাল মাঝে মাঝে একটা স্টিমারঘাট দেখতে পায়।

তার মানে?

তার মানে তোমাকেই আমরা জিজ্ঞেস করব ভাবছিলাম।

স্টিমারঘাটের কথা আমি কী জানি। কোথাকার স্টিমারঘাট?

তার আগে বলো, ওর ব্যবসার অবস্থা কী?

হাসি একটু চুপ করে থাকে। তারপর বলে, বোধহয় ভালো না। বাজারে অনেক ধার জমে গেছে।

আর এ—সময়ে তুমি সুখের পাখি উড়ে যাচ্ছ?

আমি কী করব জামাইবাবু?

ওপাশে জামাইবাবু আবার চুপ।

আমার রিজার্ভেশনের কী করবেন বলুন? কাছে—পিঠের রাস্তা হলে আমি রিজার্ভেশন ছাড়াই চলে যেতাম। কিন্তু চার দিন ধরে যাওয়া তো সেভাবে সম্ভব না।

দেখছি।

আমার কিন্তু সময় নেই। আর পনেরো দিনের মাথায় খুশির বিয়ে। তারপর ফিরে এসে স্কুলে জয়েন করব। বুঝলেন?

বুঝেছি। কিন্তু অমিয়র স্টিমারঘাটের কী হবে?

আমি কী জানি।

হাসি, অমিয়র ওজন কত?

হাসি হেসে ফেলে। বলে, আমি কি দাঁড়িপাল্লা?

না। কিন্তু বউরা তো স্বামীর ওজন জানে। জানা উচিত।

ফোন রেখে দেব কিন্তু।

আমি ইয়ারকি করছি না। অমিয়কে দেখে মনে হয় অন্তত কুড়ি কেজি ওজন কমে গেছে।

হাসি একটা শ্বাস ফেলে। অমিয় বোধহয় তাকে ভালোবেসেছিল। কিন্তু তাতে হাসির কিছু যায় আসে না।

জামাইবাবু, আমি ওর সঙ্গে ঝগড়া করিনি। আমাদের মধ্যে কোনও ভুল—বোঝাবুঝি নেই।

তোমার দিদির সঙ্গে আমার রোজ চার বার করে ঝগড়া হয়, আর ভুল—বোঝাবুঝি? আমরা জীবনে কেউ কাউকে বুঝব না। কিন্তু চার মাসেও আমার ওজন দুই কেজি বেড়েছে।

ওজনের কথা বলছি না।

আমি ওজনের পয়েন্টেই স্টিক করতে চাই। হাসি, অমিয়র ওজন কমে যাচ্ছে কেন?

আমার রিজার্ভেশনের কথাটা মনে রাখবেন। ছেড়ে দিচ্ছি—

ছেড়ো না। শোনো, স্টিমারঘাটের কথা ও তোমাকে কখনও বলেনি?

না।

আশ্চর্য!

আশ্চর্যের কী? ও আমাকে অনেক কথাই বলে না।

কিন্তু স্টিমারঘাটের ব্যাপারটা বলা উচিত ছিল।

কেন?

স্টিমারঘাটটা ও খুব স্পষ্ট দেখতে পায়, আর এমনভাবে বলে যে আমিও যেন সেটা দেখতে পাই। শুনতে শুনতে কেমন যেন অদ্ভুত লাগছিল।

কীরকম স্টিমারঘাট সেটা?

খুব উঁচু একটা বালিয়াড়ি বহু দূর গড়িয়ে নেমে গেছে.... কিন্তু ফোনে অতসব বলা যায় না। তুমি ওর কাছে শুনো।

আমি শুনব কেন জামাইবাবু? আমার কৌতূহল নেই।

তুমি আসাম থেকে কবে ফিরবে হাসি?

বললাম তো, খুশির বিয়ে হয়ে গেলেই। ফিরে এসে স্কুলে জয়েন করব।

সেটা তো ফেরা নয়। স্কুলে মানে বাগনানের কাছে যাবে, গ্রামে। কিন্তু তুমি অমিয়র কাছে কবে ফিরবে হাসি?

হাসি উত্তর দেয় না। ফোনটা খুব আস্তে ক্রাডলে নামিয়ে রাখে।

আজ কলকাতা বৃষ্টির পর বড় সুন্দর সেজেছে। সূর্যের শেষ আলো সিঁদুরগোলা রং ঢেলেছে রাস্তায় রাস্তায়। গড়িয়াহাটার বাড়িগুলোর গায়ে সেই অপার্থিব রং। জলে ছায়াছবি। রাস্তাগুলো ভেজা, রাস্তার নিচু অংশে পাতলা জলের স্তর জমে আছে। সেই জল থেকে আলোর অজস্র প্রতিবিম্ব উঠে আসে। একা একা হাঁটতে বড় ভালো লাগছে হাসির। মোড়ের দোকানগুলোর শো—কেসে সে সুন্দর শাড়িগুলো ঘুরে ঘুরে দেখল একটু। পায়ে পায়ে হাঁটতে লাগল। কী ভিড় চার দিকে! তবু এ ভিড় বড় রঙিন। বাগনান থেকে হয়তো প্রায়ই আসা হবে না, কিন্তু পুরনো ভালোবাসার টানে ছুটিছাটায় ঠিক চলে আসবে হাসি, উঠবে চিৎপুরে দিদি—জামাইবাবুর কাছে। একা একা ঘুরবে কলকাতায় যেমন সে গত তিন বছর ধরে ঘুরেছে এবং ক্লান্ত হয়নি। কলকাতার রূপ কখনও ফুরোয় না।

একটা মরা বেড়াল পড়ে আছে বৃষ্টিতে কাদায় মাখামাখি হয়ে। ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নামতে বেড়ালটাকে ডিঙিয়ে গেল হাসি। পচা গন্ধ, কাছেই বসে কোনও নেমন্তন্ন—বাড়ির এঁটো—কাটার রাশ খবরের কাগজে জড়ো করে বসেছে এক ভিখিরি মেয়ে তার বাচ্চা—কাচ্চা নিয়ে। হাসি ট্রামলাইন পেরিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে থাকে। তার মন বলে, আজও বলে—কলকাতা, কলকাতা।

চলে যাবে বলে উঠে দাঁড়িয়েছিল অমিয়, ঠিক সে সময়ে নিঃশব্দ পায়ে কালীচরণ এল। সিঁড়িতে ওর পায়ের শব্দ হয়নি। অমিয় একটু অবাক হয়ে চেয়ে থাকে।

চলে যাচ্ছিলেন? কালীচরণ জিজ্ঞেস করে। তার মুখে ঘাম, উৎকণ্ঠা।

হুঁ।

আমি আপনার কাছেই এসেছিলাম।

অমিয় চুপ করে থাকে।

গত দু' মাস কিছু চাইনি। জানতাম আপনি অসুবিধেয় আছেন। কিন্তু এখন আমার বড় ঠেকা। পেমেন্টের একটা তারিখ দিন এবার।

অমিয় জিজ্ঞেস করে, সিঁড়িতে তোমার পায়ের শব্দ হয়নি কেন কালীচরণ?

কালীচরণ একটু থমকে যায়। চেয়ে থাকে। অমিয় হাত বাড়িয়ে ওর ঘেমো হাতখানা ছুঁয়ে বলে, কাঠের সিঁড়িটা বড় পুরনো হয়েছে, বেড়াল বাইলেও শব্দ হয়। তুমি কী করে শব্দ না করে উঠলে? তুমি বেঁচে আছ তো! ভূত হয়ে আসোনি তো কালীচরণ? কিংবা পাখায় ভর করে?

কালীচরণ একটু হেসে একটা ময়লা রুমালে মুখ মোছে। তার গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। হার্ডওয়ার বাজার যদিও কালীচরণের পায়ের তলায়, কিন্তু তবু বাইরের চেহারায় সে ভদ্রলোক থাকেনি। ময়লা মোটা ধুতি, গায়ে লংক্লথের হাফ—হাতা জামা, পায়ে টায়ারের চটি।

বাগচীবাবু, আমার মেয়ের বিয়ে। তিন হাজার যদি আপনার কাছে আটকে থাকে তো আমি গরিব, কী দিয়ে কী করব?

অমিয় একটু চুপ করে থাকে। তারপর হঠাৎ বলে, দুটো সরকারি অর্ডার আছে কালীচরণ, পনেরো হাজার টাকার। করবে?

আপনি পেয়েছেন?

অমিয় মাথা নাড়ে, আমারই। কিন্তু আমি করব না। তুমি করো তো তোমাকেই ছেড়ে দিই।

কালীচরণ সতর্ক গলায় জিজ্ঞেস করে, আপনি কত পার্সেন্ট নেবেন?

এক পয়সাও না। শুধু পেমেন্টের জন্য আমাকে একটু সময় দাও।

অর্ডার দেখি, বলে কালীচরণ হাত বাড়ায়।

অমিয় অর্ডারের কাগজপত্র বার করে দেয়।

কালীচরণ কয়েক পলক অর্ডারের কাগজপত্র দেখে বলে, মাত্র আট পার্সেন্ট উঁচু দর দিয়েছেন! তাও হচ্ছে একমাস—দেড়মাস আগেকার দর। গত এক মাসে মেশিন পার্টস, কয়েল আর স্প্রিংয়ের দর দশ থেকে কুড়ি পার্সেন্ট বেড়েছে। পনেরো হাজার টাকার অর্ডার, অফিসার আর বিল ডিপার্টমেন্টকে খাইয়ে হাজারখানেকও ঘরে তোলা যাবে না। পরিশ্রম পোষায়?

তুমি করবে না?

কালীচরণ একটু হাসে, করব না কেন? ব্যবসা চালু রাখতে হলে কাজ ধরতেই হবে, লোকসান হলেও।

গায়ের জামা খুলে স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে রজত টেবিলের উপর শুয়ে ছিল। তার রায়চৌধুরী এখনও আসেনি। শুয়ে থেকেই মুখ ফিরিয়ে বলল, কালীচরণ, বাগচীর জায়গায় আমি হলে অর্ডার দুটো কেড়ে নিয়ে তোমাকে ঘাড়—ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতাম।

কেন?

সরকারি অর্ডারের জন্য হাজারটা লোক হন্যে হয়ে ঘুরছে। তুমি ভদ্রলোক হলে লোকসানের কথা বলতে না। পনেরো হাজারে তোমার অন্তত ছ' হাজার মার্জিন থাকবে।

কালীচরণ বিড়বিড় করে বলে, দেনা—পাওনার কথা উঠলেই সব জায়গায় খিচাং—

রজত ধমক দিয়ে বলে, দেনা—পাওনা আবার কী। বাগচীর তিন হাজার ওই অর্ডারে শোধ হয়ে গেল। আর এসো না।

তার মানে? তিন হাজার টাকা আমি এখনও পাই—

না পাও না। তোমাকে সেনগুপ্ত এনেছিল, তার আমলে তুমি সাপ্লায়ার ছিলে। পারো তো তাকে খুঁজে বের করো।

তাকে পাব কোথায়?

বাগচী তার কী জানে কালীচরণ? ছোট কোম্পানি, আট—দশ হাজার টাকা ক্যাপিটাল তুলে নিয়ে গেল, আর লায়াবিলিটি সব রেখে গেল—এটা কি মগের মুল্লুক?

আমি তার কী জানি!

তোমাদের সঙ্গে সেনগুপ্তর সাট আছে, আমি জানি! সে—ই তোমাদের পাঠাচ্ছে তাগাদায়। যাতে বাগচী বিপদে পড়ে। বাগচী ভালো লোক কালীচরণ, দেনা সে সব মেনে নিচ্ছে, সরকারি অর্ডার বিলিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু মনে রেখো গড়বড় করলে ঝামেলা হবে।

কালীচরণ চুপ করে থাকে।

রজত হাই তুলে বলে, সকলের দিন সমান যায় না। বাগচী তোমাদের অনেক বিজনেস দিয়েছে এখন বেরোও—

কেউ তার হয়ে বোঝাপড়া করুক, কিংবা তাকে করুণা করুক, এটা আজও পছন্দ করে না অমিয়। সেইটুকু অহংকার তার এখনও আছে। তবু সে কিছুই বলে না। চেয়ে থাকে।

দুর্বল চোখে একটু চেয়ে থেকে কালীচরণ উঠে পড়ে।

শ্লথ ভঙ্গিতে টেবিল থেকে রজত তার চেয়ারে নেমে বসে। অলস ভঙ্গীতে বুশশার্টটা চেয়ারের পিঠ থেকে খুলে নিয়ে গলায় দিতে দিতে অমিয়র দিকে তাকায়। চোখে ভর্ৎসনা।

কেমন লজ্জা করে অমিয়র। চোখ সরিয়ে নেয়। অর্ডার দুটো রাখবার জন্য তাকে অনেক বার কল্যাণ বলেছিল। তিন—চার মাস কোনও অর্ডার পায়নি অমিয়, এই দুটো পাওয়াতে দিন সাতেক আগে তারা তিনজন অফিসঘরে একটা ছোট উৎসব করেছিল। সবীর থেকে রেজালা আর তন্দুরি রুটি এনেছিল, আর কে সি দাসের সন্দেশ। কল্যাণ মুখার্জি, রজত সেন আর অমিয় বাগচী—তারা কেউ কারও বন্ধু নয়। একটা ঘরে তিনটে টেবিলে তাদের তিনটে আলাদা কোম্পানি। যে যার ব্যবসার ধান্দায় ঘোরে। রোজ দেখাও হয় না। কিংবা খুব কম সময়ের জন্য দেখা হয়। তবু কী করে যেন তাদের মধ্যে বুনো মোষের মতো পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ততা এসে গেছে। তারা কেউ কখনও তিনটে কোম্পানিকে এক করার কথা বলেনি। তারা বন্ধুও নয়, তা হলে কী? তা ঠিক ব্যাখ্যা করা যায় না। কিন্তু বাগচীর কিছু হলে আপনা থেকেই রুখে দাঁড়ায় মুখার্জি আর সেন, যেমন সেনের কিছু হলে রুখে ওঠে বাগচী আর মুখার্জি। বোধহয় এই ঘরটাই তাদের এই সম্পর্ক তৈরি করে দিয়েছে।

সেনের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে অমিয় মাথা নিচু করে ছিল।

রজত ইন্ডিয়া কিংসের প্যাকেটটা ছুড়ে দেয় অমিয়র টেবিলে। বলে, আপনার ঠোঁটে সন্দেশের গুঁড়ো লেগে আছে বাগচী, মুছে নিন।

অমিয় একটু হাসে। সহজ হতে চেষ্টা করে। বলে, আমার দ্বারা সাপ্লাইটা হত না সেন।

রজত ভ্রূ কুঁচকে একটু তাকিয়ে থেকে বলে, গত তিন মাস আপনি বিজনেস পাননি বাগচী। এই অর্ডারটা ছাড়তে আপনাকে আমরা বারণ করেছিলাম।

আমি পারতাম না।

আমরা চালিয়ে দিতাম। আফটার অল উই আর কমরেডস।

রজত ওঠে। তার ডেস্ক, আলমারি বন্ধ করতে করতে হঠাৎ একটু হেসে বলে, জার্মানি থেকে আপনাকে কী পাঠাব বলুন তো! ঘড়ি? শেভার? না কি কলম? তার চেয়ে জব ভাউচার একটা পাঠিয়ে দেব বরং—কী বলেন?

রজত নিজেই হাসে, কিন্তু মিসেসকে রেখে আপনি তো যাবেন না। গিয়েও শান্তি পাবেন না। ম্যারেডদের ওই এক বিপদ।

সে—কথার উত্তর না দিয়ে অমিয় তার গভীর অন্যমনস্ক মুখ তুলে বলে, সেন, লক্ষ করেছেন কালীচরণের পায়ের কোনও শব্দ হয় না!

কী বলছেন? রজত ঝুঁকে জিজ্ঞেস করে।

বলছি, যাদের পায়ের শব্দ হয় না তারা খুব ডেঞ্জারাস। সেনগুপ্তরও হত না।

সেনগুপ্তর উল্লেখে রজতের মুখটা ঝুলে পড়ে। চাপা গলায় সে বলে, বাস্টার্ড। আপনাকে কি সেনগুপ্ত হিপনোটাইজ করেছিল বাগচী? কী করে তবে সে জয়েন্ট অ্যাকাউন্টের টাকা তুলে নিল, আদায় করে নিল চার—চারটে বিল—পেমেন্ট, সমস্ত লায়াবিলিটি কী করে আপনার ঘাড়ে ফেলে গেল?

অমিয় এক বার হাত উলটে তার অসহায়তা প্রকাশ করে মাত্র। কথা বলে না। হতাশ গলায় রজত বলে, ব্যবসা আপনার কর্ম নয় বাগচী। আপনি ভীতু হয়ে যাচ্ছেন, লোককে দাবড়াতে পারেন না।

সেনগুপ্তর পায়ের কোনও শব্দ হত না—সত্যটা আবিষ্কার করে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে অমিয়। কালো ছিপছিপে সুপুরুষ এবং হিংস্র সেনগুপ্ত ছিল বার্ড কোম্পানির চাকরে। চাকরি নামে মাত্র, সে ছিল কোম্পানির টিমের নামকরা গোলকিপার। খেলার জন্যই চাকরি পেয়েছিল। পোস্ট থেকে পোস্টে উড়ে শট আটকাত, বহুবার পেনাল্টি ধরেছে। অবধারিত একটা লিফট পেত, কিন্তু সেবার হাঁটুর মালাইচাকি ভেঙে পড়ে রইল ছ' মাস। উন্নতির আর আশা নেই দেখে চাকরি ছেড়ে ব্যবসা করতে এল অমিয়র সঙ্গে।

তখন অমিয় মারাত্মক পোশাক পরত, দারুণ হাসত, পিচের রাস্তার মতো গড়গড়ে ইংরেজি বলত। সাপের মতো সাবলীল ছিল তার নড়াচড়া, ক্রুর চোখ, ঘন ভ্রূ। সেনগুপ্ত তার দিকে সম্মোহিতের মতো চেয়ে থাকত। একটা সময় ছিল তখন সেনগুপ্তর মতো বিপজ্জনক ছেলেকে নিপুণভাবে চালাত অমিয়। তখন সাপ্লায়ারেরা সাবধানে মাল দিত, ছ'মাস ন'মাস তাগাদা করত না। অর্ডার আসত ঝাঁকে ঝাঁকে। চোখা, চালাক, সাহসী অমিয় হিংস্র মারকুট্টা সেনগুপ্তকে ব্যবহার করত ব্যবসার ডেকর হিসেবে, কখনও তাকে বানাত দেহরক্ষী, কখনও তাকে আউটডোরে ঘুরিয়ে আনত সেলসম্যান হিসেবে! সেনগুপ্তকে তৈরি করেছিল সে—ই। তারপর কবে থেকে—কবে থেকে যেন—বহু দূরের এক অচেনা নির্জন ফেরিঘাট জাহাজের মতো ধীরে অমিয়র কাছাকাছি চলে আসতে থাকে। তখন থেকেই সে মাঝে মাঝে সেনগুপ্তর দিকে চেয়ে ভয় পেয়ে চমকে উঠত। সে দেখতে পেত, তার সামনে স্বাভাবিক পোশাক পরা সেনগুপ্ত নয়, সেনগুপ্তর পরনে কালো শর্টস, লাল টকটকে গেঞ্জি, দস্তানা পরা দুটো হাত থাবার মতো উদ্যত হয়ে আছে, মাথায় টুপি, টুপির ছায়ায় দুটো আলপিনের মতো চোখ, ফণা তুলে দুলছে এক হিংস্র গোলকিপার, অমিয়র সব রাস্তা বন্ধ করে সে দাঁড়িয়ে।

মানুষের পতনের কোনও শব্দ হয় না। তবু আশপাশের কিছু লোক ঠিক কেমন করে টের পায়, এ লোকটার দিন শেষ হয়ে এসেছে। কোনও দিন দীর্ঘ টেন্ডার টাইপ করতে করতে হঠাৎ চোখ তুলে সেনগুপ্ত হয়তো দেখেছিল, অমিয় ভীত চোখে তার দিকে চেয়ে আছে। কিংবা হয়তো কোনও দিন অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করে দুজনে বেরোনোর সময় অন্ধকার সিঁড়িতে সেনগুপ্তর আগে আগে নামতে দ্বিধা করেছে। কিংবা এ—রকমই কোনও তুচ্ছ কিছু লক্ষণ দেখেছিল সেনগুপ্ত। বুঝেছিল ব্যবসাতে অমিয়র দিন শেষ, তার শুরু। বুঝেছিল সাপ্লায়াররা, পারচেজাররা। বুঝেছিল আরও অনেকে। সবার শেষে বুঝেছে অমিয়। স্পষ্টই নিজের ভেতরে সে এখন এক দিনাবসান টের পায়, প্রত্যক্ষ করে সূর্যাস্ত। বহু দূর থেকে নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে এক নির্জন ফেরিঘাট আর জেটি, তার অতলান্ত জল। অমিয় মুখ তোলে, কিছু বলছেন সেন?

একটা মেয়েকে কী করে রিফিউজ করতে হয় বাগচী? আমি কোনও ল্যাঙ্গুয়েজ খুঁজে পাচ্ছি না। না কি জার্মানিতে গিয়ে চিঠি দেব?

অমিয় একটু হাসে, ল্যাঙ্গুয়েজের দরকার হয় না সেন। রিফিউজাল মনে থাকলেও লোকে ঠিক বুঝে নেয়। ডোন্ট বদার।

মাইরি! তা হলে বেঁচে যাই।

অমিয় হাসে।

চলি বাগচী। সিগারেটের প্যাকেটটা আপনি রেখে দিন। যদি রায়চৌধুরী আমার মোটর পার্টস নিয়ে আসে তবে আমার হয়ে ওর পাছায় তিনটে লাথি কষবেন, তিনটে—ভুলবেন না—

অমিয় অনেকক্ষণ বসে থাকে। অফিসঘরটা অন্ধকার হয়ে আসে। অমিয় আলো জ্বালে না। রাস্তার নানা আলোর ছায়াছবি এসে সিলিংয়ে কাঁপতে থাকে, দেয়ালে চমকায়। কাকের পাখার মতো অবসাদ নেমে আসে অমিয়র শরীর জুড়ে।

বাড়ির দেয়ালের কোনও গোপন কোণে হঠাৎ উঁকি দেয় এক অশ্বত্থ চারা। কেউ লক্ষ করে না। কলকাতায় শ্যাওলা জমে, দেয়ালের চাপড়া খসে পড়ে। কেউ লক্ষ করে না। কিন্তু ওইভাবেই অলক্ষিতে শুরু হয় একটা বাড়ির ক্ষয়। অমিয় নিজের ভিতরে সেই অশ্বত্থের গোপন চারাটিকে খুঁজছে। অনুসন্ধান করছে। শ্যাওলা জমল কোথায়, কোথায়ই বা খসে পড়ছে চাপড়া। খুঁজে পাচ্ছে না। কিন্তু এ তো ঠিকই যে, সে সেনগুপ্তকে ভয় পেতে শুরু করেছিল একদিন। অথচ ভয়ের তেমন কারণ ছিল না। গোলকিপারের পোশাক বহুকাল আগেই ছেড়ে ফেলেছিল সেনগুপ্ত, খুলে রেখেছিল দস্তানা, ক্রমে হয়ে আসছিল অমিয়র বশংবদ। সাপুড়ে কবে আবার তার ঝাঁপির সাপকে ভয় পেয়েছে?

কিন্তু এর জন্য তো সেনগুপ্ত দায়ী নয়।

সারা কলকাতা দৌড়—ঝাঁপ করত অমিয়, আর তার স্কুটার। সন্ধ্যাবেলা বাড়ির সামনে থেকে ভারী স্কুটারটা অবলীলায় টেনে তুলত সিঁড়ির তলায়, শিস দিয়ে সিঁড়ি ভাঙত অমিয়। ভাবত দরজা বন্ধ করেই সে এক সুন্দর জগতে চলে যাবে। কিন্তু প্রায়দিনই সে অর্গলহীন দরজা ঠেলে এক আবছা অন্ধকার ঘরে ঢুকত। পরিত্যক্ত বাড়ির মতো ঘর। দেখত, হাসি তার জন্য প্রস্তুত হয়ে নেই। হয়তো শুয়ে আছে, কিংবা দাঁড়িয়ে আছে ব্যালকনিতে। মুখোমুখি হতে হাসির চোখে সে বিস্ময় দেখতে পেত। কোনও দিন বা দেখত, হাসি ঘরে নেই।

পরস্পর আশ্লিষ্ট রতিক্রিয়ার সময়ে সে কি দেহসংলগ্ন হাসির শীৎকার শোনেনি? অনুভব করেনি তার শিহরন, বুকের ভিতরে হৃৎপিণ্ডের উত্তেজনা? লক্ষ করেনি মুখমণ্ডলে মুক্তোর মতো স্বেদবিন্দু? করেছিল। হাসির শরীরে অর্গলহীন দরজা খুলে ফেলে অমিয় দেখেছে, সেখানেও এক আবছা অন্ধকার ঘর—পরিত্যক্ত ঘরের মতো নিরিবিলি—সেখানে হাসি সাজেগোজে চুল বাঁধে, আয়নায় দেখে মুখ, প্রতীক্ষা করে—অমিয় সেই ঘরে ঢুকলে হাসি যেন অবাক মুখ তুলে নীরব প্রশ্ন করে, তুমি কে?

মারাত্মক ঘটনা ঘটেছিল একদিন। গতবারে। জ্যাঠামশাইয়ের মেয়ে অনুর বিয়েতে যাবে তারা। সে আর হাসি। ধুতি—পাঞ্জাবি কোনও দিনই পরে না অমিয়। ধুতি—পাঞ্জাবিতে কোনও দিন অমিয়কে দেখেনি হাসি। বিয়েতে যাওয়ার সময়ে অমিয় সেদিন ওয়ার্ডরোব খুঁজে হাঁটকে বের করেছিল পাঞ্জাবি আর ধুতি। বহু যত্নে পরিশ্রমে ধুতির কোঁচা কুঁচিয়েছিল সে। অন্য ঘরে তখন হাসি সাজগোজ শেষ করে সবশেষে তার বেনারসি পরছে। হাসি বেরিয়ে এসে ধুতি—পাঞ্জাবি পরা অমিয়কে দেখে ভ্রূ ওপরে তুলে হেসে ফেলবে, বলবে, ওমা, তোমাকে যে চেনা যাচ্ছে না। এ—রকমই হবে বলে ভেবেছিল অমিয়। ধুতি—পাঞ্জাবি পরে সে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল এ—ঘরে, ও—ঘরের দরজার দিকে মুখ, মুখে অপ্রতিভ হাসি। হাসি বেরিয়ে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু একটুও অবাক হয়নি। ঘড়ি দেখে কেবল বলেছিল, বড় দেরি হয়ে গেল, বর এসে গেছে বোধহয়—তোমার হল? একসঙ্গে তারা বেরোল, ট্যাক্সিতে উঠল, গেল বিয়েবাড়ি। সেখানে অমিয়কে পরিবেশন করতে হয়েছিল, বরযাত্রীদের তদারকও। দৌড়—ঝাঁপে পাঞ্জাবির ভাঁজ গেল নষ্ট হয়ে, ধুতি গেল দুমড়ে—মুচড়ে, ঝোল—তেলের দাগ ধরল তাতে। ফেরার সময়ে আবার ট্যাক্সিতে পাশাপাশি বসে আসছিল তারা। অমিয়র মুখে বিকেলের প্রথম ধুতি—পাঞ্জাবি পরে হাসির সামনে দাঁড়ানোর সেই অপ্রতিভ হাসিটি কখন বিষণ্ণ ক্লান্তিতে ডুবে গেছে। শরীরের ঘামে, ঝোলে, তেলে ন্যাকড়া হয়ে গেছে তার পোশাক। হাসি তবু লক্ষ করেনি। ট্যাক্সিতে হাসির খোঁপা থেকে বেলফুলের মালার গন্ধ আসছিল, আর প্রসাধনের সুবাস, গয়নার টুং—টাং শব্দ। অভিজাত মহিলাকে ভিখিরি যেমন দেখে, তেমনই হাসির দিকে ভয়ে ভয়ে এক বার চেয়েছিল অমিয়। বলেছিল, হাসি, আমি আজ অন্য পোশাক পরেছিলাম। তুমি দেখোনি।

হাসি চমকে বলল, কই?

অমিয় হাসল, দেখছ না?

হাসি ভ্রূ কুঁচকে বলল, নতুন পোশাক কোথায়, এ তো ধুতি আর পাঞ্জাবি, তুমি তো প্রায়ই পরো।

পরি! কবে পরেছি?

পরোনি? হাসি একটু ভেবেটেবে বলে, গতবার মিঠুর কাকার শ্রাদ্ধের সময়ে পরেছিলে না?

না। অফিস থেকে এসেই তো তোমাকে নিয়ে বেরোলাম, পোশাক পালটানোর সময় ছিল না।

তা হলে বোধহয় জামাইবাবুদের ম্যারেজ অ্যানিভারসারিতে।

না।

তবে নিশ্চয়ই দীপালির বিয়ের সময়ে—

তাও নয় হাসি।

কী জানি! আমার তো মনে হচ্ছে তুমি পরেছ, আমি দেখেছি।

না হাসি, তুমি দেখনি।

হাসি একটু হাসল, তারপর বলল, দেখি, কেমন দেখাচ্ছে। বাঃ বেশ তো, একদম নতুন মানুষ! তোমাকে চেনাই যাচ্ছে না!

শুনে কেমন একটু ভয় এসে ধরেছিল অমিয়কে।

এইসব তুচ্ছ ঘটনা থেকেই কি মানুষের ভয় জন্ম নেয়! মূল্যহীন হয়ে যাওয়ার ভয়! গুরুত্ব না পাওয়ার ভয়!

গির অরণ্যে এক বার সিংহ দেখতে গিয়েছিল অমিয়। বহুকাল আগে। দেখেছিল পিঙ্গল জটার মাঝখানে রাজকীয় গম্ভীর মুখে সিংহ বসে আছে, তার চার দিকে কয়েকটা সিংহী ঘুরঘুর করে কাছে আসছে, গা শুঁকছে, গরগর শব্দ করে জানাচ্ছে তাদের প্রেম। পিঙ্গল জটার সিংহ গ্রাহ্যই করছে না। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে সেই অপরূপ, উদাসী, নির্মম সিংহকে দেখেছিল অমিয়, দেখেছিল তার ভয়ংকর পিঙ্গল কেশর, পঞ্জরসার দেহটিতে স্তম্ভিত বিদ্যুৎ, নিষ্ঠুরতা। বারে বারে তার পায়ের কাছে মাথা নত করে দিচ্ছে প্রেমিকরা, সে ফিরেও দেখছে না।

সেই সিংহটির কথা ভাবলে নিজের তুচ্ছতাকে বুঝতে পারে অমিয়, আজ। সে স্কুটারের পিছনে হাসিকে বসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ক্যাথিড্রাল রোডে, উপযুক্ত পরিবেশ খুঁজে বের করেছিল, মিষ্টি মোলায়েম কয়েকটা কথা মনে মনে তৈরি করেছিল আগে থেকে। বিয়ের পর সে কত খুশি করতে চেয়েছে হাসিকে, নিজেকে বারবার নানা পোশাকে সাজিয়ে ডামির মতো দাঁড়িয়েছে হাসির সামনে। হাসি তাকে ভালোবাসেনি।

গিরের প্রায়ান্ধকার অরণ্যে একটা সিংহকে প্রায়ই ভাবে অমিয়। সেই সিংহকে কেউ নারীপ্রেম শেখায়নি। প্রকৃতিদত্ত পুরুষকার বলে সে উদাসী নির্মম! মানুষেরাও কি নয় সিংহের মতো! পঞ্জরসার দেহে স্তম্ভিত বিদ্যুৎ, পিঙ্গল কেশর—ঘেরা মুখে বৈরাগ্য, চোখে দূরের প্রসার—পুরুষ এ—রকমই ছিল বহুকাল থেকে। কে তাকে শেখাল নারীপ্রেম, হাঁটু গেড়ে প্রেমভিক্ষা, মোলায়েম ভালোবাসার কথা!

বলতে গেলে তখন থেকেই অমিয়র পতনের শুরু, যখন সে হাসির কাছে ক্যাথিড্রাল রোডে, ময়দানের সুন্দর বাতাসে স্কুটারে ভেসে যেতে যেতে ভিক্ষা চেয়েছিল হাসিকে। তখনই তার পতনের, ক্ষয়ের প্রথম অশ্বত্থ চারাটি উঁকি দিয়েছিল অলক্ষ্যে।

সেই পতনের প্রথম চিহ্ন ছিল এই, সে সারা দিন হাসির কথা ভাবত। নির্বিকার হাসির কথা, তার নিষ্ঠুরতা, উপেক্ষা—ভাবতে ভাবতে তার ঘুম হত না। ডিগবয়ের তেল কোম্পানির বিলেত—ফেরত ইঞ্জিনিয়ারটির কথা বলত হাসি, বলত তার শিলচরের প্রেমিকদের কথা, তার মণিপুরি নাচের কথা। শুনতে শুনতে ভিতরে ভিতরে উন্মাদ হয়ে যেত অমিয়। কিনে আনত পোশাক প্রসাধন—হাসির মনের মতো সাজত, হাসিকে খুশি করার জন্য সুন্দর কথা ভেবে রাখত সারাদিন, অন্যমনস্ক হাসির কাছে অনর্গল বলত, সে একদিন বড় হবে, খুব বড় ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট, বিজনেস ম্যাগনেট। সে হাসির জন্য শাড়ি কিনেছিল, গয়না, চমৎকার সব আসবাব, একটা ফ্রিজও। হাসি কিছুই তেমন আদর করে নেয়নি। অমিয়কেও না। রাতে শরীরে শরীর মিশিয়ে দিত অমিয়, মিশিয়ে ভাবত—পেয়েছি, পেয়েছি তোমাকে। তারপর মুখের স্বেদবিন্দু মুছে তৃপ্ত হাসি যখন পাশ ফিরে ঘুমোত, তখন উত্তপ্ত মাথায় সারা রাত ছিল অমিয়র জেগে থাকা। নিজের সেই পতন তখনও টের পায়নি অমিয়, তখনও গির অরণ্যে দেখা পঞ্জরসার দেহে স্তম্ভিত—বিদ্যুৎ সেই সিংহের ছায়া তার চোখে পড়ত না। সে আধোঘুম থেকে চমকে জেগে উঠে দীর্ঘশ্বাস ফেলত তখন, খুব জোরে স্কুটার চালাতে ভয় পেত, তখন থেকেই তার নিজের ভবিষ্যৎ এবং কর্মক্ষমতার ওপর সন্দেহ জন্মাতে থাকে। আর জন্ম নেয় ভয়।

ব্যবসা হচ্ছে তারের ওপর হাঁটা। সবাই লক্ষ রাখে, মানুষ কখন টলছে, পড়ো—পড়ো হচ্ছে, কখন পা ফেলছে না ঠিক জায়গায়। লক্ষ রেখেছিল তার সাপ্লায়াররা, পারচেজাররা, প্রতিদ্বন্দ্বীরা আর সেনগুপ্ত। সি এম ডি—এর একটা বিল—পেমেন্ট গোপনে আদায় করেছিল সেনগুপ্ত, চেক ক্যাশ করেছিল। অমিয় টের পেয়েছিল দেরিতে। দুর্দান্ত সেনগুপ্তর সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেল খুব। সেনগুপ্ত তার ক্যাপিটাল তুলে নিয়ে গেল। আর অন্যমনস্ক, দুঃখিত অমিয়র চোখের আড়ালে আদায় করে নিয়ে গেল আরও তিনটে বিল—পেমেন্ট। সেগুলো টের পেতে আরও অনেক দেরি হয়েছিল তার। কলকাতার রাস্তার ভিড়ে আজও সেনগুপ্তকে খুঁজে বেড়ায় অমিয়। কিন্তু দেখা হলে কী করবে তা বুঝতে পারে না। চোখ বুজলেই সে দেখতে পায়, কালো শর্ট, টুকটুকে গেঞ্জি, দস্তানা পরা দুটি উদ্যত হাত, টুপির ছায়ায় আলপিনের মতো দুটি হিংস্র চোখ—সেনগুপ্ত ফণা তুলে দুলছে। পোস্টে পোস্টে উড়ে যাচ্ছে সেনগুপ্ত, পেনালটি আটকাচ্ছে বেতের মতো শরীর বেঁকিয়ে। আশ্চর্য! সেনগুপ্তর খেলা কোনওদিনই দেখেনি অমিয়, তবু চোখ বুজলেই ওই কাল্পনিক ভয়ংকর দৃশ্যটিই সে দেখতে পায়।

বাইরের লড়াইয়ে যে হারতে থাকে, সে তত ভিতরে ঢুকে কল্পনার দৃশ্য দেখে। কল্পনায় প্রতিশোধ নেয়; কল্পনায় ভয় পায়। হাসির জন্যই কি? কে জানে!

অমিয় আলো জ্বালল না। অন্ধকারেই উঠল। দু'—একটা কাগজ গুছিয়ে রাখল, বন্ধ করল ডেস্ক, চাবি কুড়িয়ে নিল। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ওপর থেকেই বৃষ্টির গন্ধ পায় অমিয়। ঠান্ডা বাতাস গায়ে এসে লাগে।

গাড়ি—বারান্দার তলায়, এক—ভিড় লোক বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচাতে দাঁড়িয়ে আছে। স্কুটারটা ফুটপাথে তুলে রেখেছে আহমদ। স্কুটারটা ছুঁয়ে বাইরের ঝিরঝিরে বৃষ্টি একটুক্ষণ দেখে অমিয়। তারপর স্কুটারটা টেনে বৃষ্টিতে রাস্তায় নেমে পড়ে। বৃষ্টির ঝরোখার ভিতর দিয়ে তার প্রিয় স্কুটার চলে লঞ্চের মতো জল ভেঙে। অমিয় ভিজতে থাকে। কপালের ঘামের নোনা স্বাদ জলে ভিজে গড়িয়ে এসে স্পর্শ করে তার জিভ। একটা সুন্দর কাচের বাসন ভেঙে ছড়িয়ে পড়লে যেমন দেখায়, বৃষ্টির ভিতর তেমনি শতধা বিদীর্ণ কলকাতার প্রতিবিম্ব দেখা যায়। চার দিকের কাচের টুকরোর মতো ধারালো, রঙিন, ভঙ্গুর কলকাতা ছড়িয়ে পড়ে আছে।

গড়িয়াহাটা পর্যন্ত একটানা চলে এল সে। তারপর খাড়াই ভেঙে স্কুটার উঠতে থাকে গড়িয়াহাটা ব্রিজের ওপর, ধনুকের পিঠের মতো সম্মুখ আড়াল করে উঠে গেছে রাস্তা। স্কুটারের মেশিন গোঙাতে থাকে ভয়ংকর। বরাবর এইটুকু উঠতে ভালো লাগে তার। ঝড় তুলে স্কুটার উঠতে থাকে। ব্রিজের সবচেয়ে উঁচু বিন্দুতে উঠে এলে হঠাৎ দিগ—দিগন্তের বাতাস ঝাপটা মারে এসে, চার দিকে বহু দূরের বিস্তর ডানা মেলে দেয়। সামনে স্বচ্ছন্দ উতরাইয়ের শেষে তার বাসা। বাসায় হাসি।

প্রবল বৃষ্টির ফোঁটা বর্শাফলকের মতো ঝকঝকে হয়ে ছুটে আসে। মুখের চামড়া ফেটে যায়। ব্রিজের সবচেয়ে উঁচু বিন্দুটিতে বাতাস—পাগল বৃষ্টির ফোঁটা খরশান। স্কুটার টাল খায় এখানে। ডান দিকে একটা অন্ধকার মাঠে বিস্ফোরকের মতো বিদ্যুৎ ফেটে পড়ে। এমন বাদলার দিন—এই দিনে হাসির কাছে ফিরে গিয়ে কী হবে অমিয়র?

অমিয় উতরাই ভেঙে নেমে আসে। বড় রাস্তার ওপর ওই দেখা যায় অমিয়র বাসা। দোতলায় আলো জ্বলছে, উড়ছে সবুজ পরদা। বাইরের দিকে একটা ঝুল—বারান্দা। অমিয় একপলক তাকায়। তারপর অচেনা বাড়ির দিকে চেয়ে যেমন চলে যায় রাস্তার লোক, তেমনিই না থেমে চলতে থাকে অমিয়। স্কুটার ভেসে যায়।

বহু দূর পর্যন্ত সোজা চলে তার স্কুটার। তারপর বাঁক নেয়। রাস্তার আলো এখানে ক্ষীণ, বহু দূরে দূরে। দু'ধারে গাছ—গাছালি, ব্যাঙের ডাক শোনা যায়, রাস্তায় লোকজন বিরল। এক—আধটা দোকান খদ্দেরহীন, আলো জ্বেলে বসে আছে দোকানি। এইসব রাস্তা পার হয়ে অমিয়র স্কুটারের আলো পড়ে একটা লেভেল ক্রসিংয়ের সাদা লোহার গেটে। এবড়ো—খেবড়ো রাস্তায় লাফায় হালকা স্কুটার, ভেঙে পড়তে চায়। অমিয় দাঁতে দাঁত চেপে হাতল সোজা রাখে। লেভেল ক্রসিংয়ে লাইনের মাঝখানে গভীর খন্দ, তাতে জল জমে আছে। ঝাঁকুনিতে ঘাড়ের রগ ছিঁড়ে পড়তে চায়। গর্তে পড়ে জলে ঢেউ তোলে স্কুটার। অমিয়র জুতো—মোজা ভিজে যায়। লেভেল—ক্রসিং পার হয়ে অন্ধকার কাঁচা রাস্তা। রাস্তার দু'ধারে ফাঁকা জমিতে দু'—একটা ঘুমন্ত বাড়ি চোখে পড়ে। স্কুটার গোঙায়, তবু এগোয় ঠিক। বহুকাল আসা হয় না এদিকে। রাস্তাটা একটু গোলমেলে লাগে। স্কুটার থামিয়ে হেড লাইটটা বার কয়েক চারধারে ফেলে অমিয় স্কুটার ছাড়ে। এগোয়। অনেকটা গিয়ে ডান ধারে ইটখোলাটা দেখতে পায় অমিয়। নাবাল মাঠে জল জমে গেছে। কী গম্ভীর ব্যাঙের ডাক। মনে হয় রাত নিশুতি হয়ে গেছে। ইটখোলার গা বেয়ে একটা শুঁড়ি পথ। দু'ধারে এই বর্ষায় আগাছা জন্মেছে খুব। পিছল হয়েছে রাস্তা, ক্ষয়ে গেছে। সেই রাস্তায় স্কুটার এগোয় না। এঁটেল মাটিতে চাকা পড়ে একই জায়গায় ঘুরতে থাকে। অমিয় টেনে তোলে। আবার এগোয়।

একটা নিমগাছ ছিল এখানে, আর কলার ঝাড়। সামনে উঠোন। মনে করতে চেষ্টা করে অমিয়। স্কুটার অনিচ্ছায় বহন করে তাকে। অনেকটা ভিতর ঢুকে যায় সে। চার দিকে বাড়িঘর নেই। আলো নেই। কোনও মানুষ চোখে পড়ে না। অমিয় এগুতে থাকে। আঁকাবাঁকা পথে স্কুটার ঘোরে। কাদা ছিটকে আসে, ব্যাঙ লাফায়, জলের কল কল শব্দ হতে থাকে। বিদ্যুৎ চমকায় জলে—স্থলে। অমিয় প্রাণপণে চেয়ে দেখে, চিনতে চেষ্টা করে জায়গাটা। বহুকাল আসা হয়নি। বহুকাল।

স্কুটার লাফিয়ে উঠে একটা কলার ঝাড়ে আলো ফেলে এক মুহূর্তের জন্য। আভাসে একটা নিমগাছ দেখা যায় অবশেষে। উঠোন জলে ভাসছে। একটা অন্ধকার বেড়ার ঘর, টিনের চালে অবিরল বৃষ্টির শব্দ উঠছে। অমিয় স্কুটার থেকে নেমে উঠোনের আগল ঠেলে গোড়ালি—ডুব জলে পা দেয়। ডাক দেয়, খুড়িমা! ও খুড়িমা!

দরজা খুলতেই একটা হারিকেনের ম্লান হলুদ আলো দেখা যায়।

কে?

অমিয় বারান্দায় উঠে আসে। একটা স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে বোকা চেহারার ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। শোভনাদির ছেলে ভাসান। অমিয় চিনতে পারে।

ভাসান, আমি অমিয়মামা। খুড়িমা কেমন আছে?

ছেলেটা ঠিক চিনতে পারে না প্রথমে, বিশ্বাস করতে পারে না। বোকা চোখে চেয়ে থেকে একটু সময় নেয় বুঝতে। তারপর বলে, অমিয়মামা? তুমি এই রাতে? কী হয়েছে?

অমিয়র হঠাৎ লজ্জা করতে থাকে। কী বলবে সে! এত রাত্রে মানুষ বড়জোর বাড়ি ফেরে। কোথাও যায় না।

ভিতর থেকে ঘুম—ভাঙা বুড়ি—গলায় কে জিজ্ঞেস করে, কে রে? কে এল রে ভাসান?

অমিয়মামা।

কে অমিয়?

ভাসান আলোটা সরিয়ে দরজা ছেড়ে বলে, ভিতরে এসো অমিয়মামা। দিদিমা ভালো নেই। হার্ট খুব খারাপ।

অমিয় তার ভেজা জুতো ছাড়ে। জামা—প্যান্ট থেকে যত দূর সম্ভব জল ঝেড়ে ফেলবার চেষ্টা করে। ঘরে ঢুকতেই ম্লান আলোয় বহুদিন আগেকার সেই ঘরখানা দেখে। হারিকেনের গন্ধে ঘর ভরা, বিছানায় মশারি ফেলা! মশারির ভিতর হাতপাখা নড়ার শব্দ। খুড়িমার কাছে মা মরার পর বহুদিন শুয়েছিল অমিয়। ঘুমের মধ্যেও খুড়িমার পাখা নড়ত নির্ভুলভাবে।

কে এলি রে? মশারির ভিতর থেকে প্রশ্ন আসে।

আমি খুড়িমা, আমি অমিয়।

একটা অস্ফুট শব্দ করে খুড়িমা, গোঁজা মশারির এক দিক তুলে বুড়ো মুখখানা বের করে। চোখে আলো লাগতে মিটমিট করে তাকিয়ে বলে, অমিয় মানে মেজোঠাকুরের ছেলে?

ভাসান ধমক দেয়, তো আর কে অমিয় আছে?

হারিকেনটা তোল তো ভাসান, দেখি। অমিয়, কাছে আয়। দেখি তোর গা। ঠিক তুই তো?

ভাসান বলে, শার্টটা ছেড়ে ফেলো অমিয়মামা। ইস! তুমি খুব ভিজে গেছ।

অমিয় বিছানার ওপর ঝুঁকে পড়ে বলে, খুড়িমা, তুমি এত বুড়ো হলে কবে? এত বুড়িয়ে যাওয়ার কথা তো ছিল না তোমার!

তুই কি এই বৃষ্টিতে এলি? কী হয়েছে তোর? খারাপ খবর আছে কিছু? কাছে আয় না, দূরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?

তুমি কাকার থেকে চোদ্দো বছরের ছোট ছিলে, তবে বুড়ো হলে কী করে?

মশারি তুলে খুড়িমা উঠে বসে। গা উদোম। কাপড় খসে গেছে। কোমরের কাপড় ঠিক করতে করতে বলে, তোর কাকা গেছে বিশ বছর আগে, তখনই আমার পঞ্চাশ পুরে গেছে। বয়সের হিসেব তুই কী জানবি? মেজোঠাকুরের বুড়ো বয়সের সন্তান তুই! তোর জন্মের সময়ে মেজোঠাকুরের বয়স পঞ্চাশ—বাহান্ন, তোর মা'র চল্লিশ। তোর এখন বয়স কত?

পঁয়ত্রিশ—ছত্রিশ।

তবে? বয়সের হিসেব ঠিক রাখতে পারিস না তোরা। কাছে আয় তো দেখি, কী—রকম ভিজেছিস!

খুড়িমা হাত বাড়িয়ে অমিয়কে ধরে কাছে টেনে নেয়। সমস্ত শরীরে মরা হাতখানা দিয়ে সেঁক দেওয়ার মতো চেপে চেপে ধরে তার শরীর দেখে।

তুই কি পাগল? এমন কাক—ভেজা কেউ ভেজে? ভাসান, জামা—কাপড় দে এক্ষুনি, তার আগে গামছা দে। রাখুকে বল এক পাতিল আগুন করতে, সেঁক না—দিলে ও মরে যাবে।

খুড়িমা, তুমি কেমন আছ?

কী জানি! ডাক্তার বলছে, ভালো না। কাপড়ে—চোপড়ে হেগে—মুতে ফেলি, আর বুকে একটা চাপ ব্যথা হয়। কতকাল আসিস না।

আজ তো এলাম।

এটা কী—রকম আসা। তোর মাকে আমি রোজ স্বপ্নে দেখি। আমার ভরসায় তোকে ছেড়ে গিয়েছিল, তাই রোজ এসে খবর নিয়ে যায়। বাইরের নিমগাছতলায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে, ডাকে। বহুকালের পুরনো ঝগড়া শত্রুতা তার সঙ্গে। ক'দিন পর আমিও তো তার কাছে যাব, এখন যদি তোর কিছু হয় তো সে আমাকে আস্ত রাখবে? এই বৃষ্টিতে ভিজে এলি, তুই কেমন পাগল? ও ভাসান—

দিই।

তাড়াতাড়ি দে।

খুড়িমা, আমি তোমাকে দেখতে এসেছি, চলে যাব। এখন আর জামা—কাপড় ছেড়ে কী হবে?

তোর বর্ষাতি নেই? ছাতা কিনিসনি? ওর তোরা ওঠ, ও ভাসান, পাখিকে বল চা করবে, রাখুকে ঠেলে তুলে দে, পাতিলের আগুনটা করে দিক, আমি ওকে সেঁক দেব। অমিয়, কেন এসেছিস? অমিয়র বলতে ইচ্ছা করে, এইজন্যই। কিন্তু তা বলে না অমিয়, বলতে নেই। চুপ করে থেকে তার বুকে—পিঠে মাথায় কঙ্কালসার হাতখানা অনুভব করে সে। এইটুকুর জন্য এত রাতে, দীর্ঘ পথ জল কাদা ঝোড়ো বাতাস ভেদ করে এসেছে সে।

কেন এসেছিস? আমাকে দেখতে? আমি মরে গেলাম কি না দেখতে এসেছিস? বলতে বলতে খুড়িমা একটু কাঁদে। বলে, সত্যিই খুড়িমাকে ভালোবাসিস অমিয়? তোর বউ বাপের বাড়িতে গেছে নাকি? বাচ্চা—কাচ্চা হবে না তো?

না।

তোর বাচ্চা হয় না কেন রে? অ্যাঁ! কী করিস তোরা? আঁট—বাঁধ দিয়ে রেখেছিস নাকি? বুড়ো বয়সে হলে মানুষ করার সময় পাবি না। এখন হইয়ে ফেল।

চুপ করো খুড়িমা।

আমার তো ছেলে নেই। ভাসানকে বলি তোর খবর আনতে। তা সে তোর দোরগোড়ায় গিয়ে গিয়ে ফিরে আসে, ভিতরে ঢোকে না, এসে বলে—মামা বাড়িতে থাকে না, মামিকে চিনি না, লজ্জা করে। আমি অবাক হই। মামিকে আবার চেনার কী আছে। গিয়ে কোলে বসে পড়বি, আবদার করবি, জ্বালাবি—তাতেই চিনবে।

চুপ করো, তুমি চুপ করো।

চুপ করব কেন? অমিয়, কেন এসেছিস?

তোমাকে দেখতে।

ঘুম ভেঙে উঠে এসেছে রাখী আর পাখী। কেটলিতে জল ফোটে। পাতিলে কাঠকয়লার আগুন জ্বালে রাখী। অমিয় খালি গায়ে, ধুতি পেঁচিয়ে বসে। তাকে ঘিরে হারিকেনের আলোয় একটা ছোট উৎসব শুরু হয়।

আমার কেউ নেই অমিয়। শোভনা তার তিন ছেলেমেয়ে রেখেছে আমার কাছে, রক্ষা। ভেবেছিলাম, শোভনা আমার মেয়ে আর তুই ছেলে?

পাতিলের আগুনের ওপর দুই হাত মেলে ধরে খুড়িমা। গরম হাত দু'খানা এনে তার গায়ে চেপে চেপে ধরে। কতকালের পুরনো এক রক্তস্রোত আর—এক রক্তস্রোতের খবর নিতে থাকে।

রাখু, ভাত চড়াসনি?

না তো! মামা কি খেয়ে যাবে?

খেয়ে যাবে না তো কী? কোথায় খাবে?

আমি খাব না খুড়িমা।

কেন খাবি না? বউ রেঁধে রেখেছে বলে? গেরস্তর ঘরে কখনও ভাত নষ্ট হয় না। খেয়ে যা। আপিস থেকে এলি তো?

হ্যাঁ।

পাখী, তুই একটু হাত গরম করে সেঁক দে। আমি একটু শুই, বুকটা কেমন করে।

কথা বোলো না।

বলব না! কেন? কাছে এসে বোস আরও। তোর বউকে বিয়েতে আমি গয়না দিইনি, না? কী দিয়েছিলাম যেন?

পাখী মুখ তুলে বলে, দিয়েছিলে। নাকছাবি।

ওঃ। নাকছাবি আবার গয়না! অমিয়, তোর ছেলেমেয়ে হলে একছড়া গোঠ দেব। তিন ভরি সোনা। তুই কোথায় থাকিস যেন?

ঢাকুরিয়া।

সে কি অনেক দূর? যদি দূর না হয় তো তোর বউ, কী নাম যেন, তাকে নিয়ে আসিস। ভাসান, পাখী, তোরা ওর সঙ্গে কথা বলছিস না কেন? কথা বল।

তুমি অত তাড়া দিলে কথা বলবে কখন? চা করছে, গা সেঁকছে, ভাত রাঁধছে, ওদের তো বসতেই দিচ্ছ না।

তাড়া কি সাধে দিই! তোর মাকেই আমার ভয়। তার মুখের বড় ধার ছিল। এখনও এ বাড়ির আনাচে—কানাচে ঘুরে জিভ শানাচ্ছে, আমি গেলেই ধরবে আমাকে। হ্যাঁ রে, পরের মেয়ে বউ হয়ে এসে আপনজন হয়ে যায়, আর পরের মা কিছুতেই কি মা হতে পারে না? কেন এসেছিস অমিয়?

খুড়িমা, তুমি আমাকে গল্প বলো।

কীসের গল্প শুনবি?

আমার গল্প বলো। আমি কেমন ছিলাম?

তুই? তুই আবার আলাদা কী ছিলি! আর পাঁচজনের মতোই ছিলি তুই। শিশুকালে সবাই এক থাকে, বড় হয়ে আলাদা রকমের হয়।

তবু বলো।

খুব দুষ্টু ছিলি। ভীষণ। মা ছিল না বলে তোর আদর ছিল সবচেয়ে বেশি। আশকারা পেয়ে মাথায় উঠেছিলি। তোর দিদি নানি সেই তুলনায় ঠান্ডা ছিল। পারুলিয়ার বাড়িতে একটা মস্ত দিঘি ছিল—তার এপার—ওপার দেখা যায় না, তার কালো জল খুব গভীর, বড় বড় মাছ ছিল। দিঘির পারে একটা ডিঙিনৌকো বাঁধা থাকত—তাতে চড়ে মাঝদিঘিতে শ্বশুরমশাই মাছ ধরতে যেতেন। সেই ডিঙিনৌকোয় চড়ে এক দুপুরে তুই আর নানি চুপি চুপি দিঘির মাঝখানে চলে গিয়েছিলি। চিৎকার শুনে আমরা দিঘির পাড়ে গিয়ে দেখি, নানি উঠে দাঁড়িয়ে বৈঠা তুলে চেঁচাচ্ছে, তুই নৌকোর এক ধারে ঝুঁকে আছিস। কেতরে নৌকোটা ভেসে আছে। সে যে কত দূর চলে গিয়েছিলি তোরা—এই টুকু টুকু দেখাচ্ছিল তোদের। চার দিক থেকে লোকজন ঝাঁপিয়ে পড়ল জলে কিন্তু তোরা এত দূরে যে পৌঁছতে পারছিল না। নৌকোটা কেবলই কাত হচ্ছিল তখন, তুই ঝুলে ছিলি, পড়ে যাচ্ছিলি। কী ভয় আমাদের!

তুমি কী করেছিলে?

আমি! আমি কী করব? বোধহয় খুব চেঁচিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। তোরা মা—মরা দুটো ভাইবোন কেন যে ওই বিদঘুটে খেলা করতে গিয়েছিলি! লোকে বলাবলি করেছিল যে তোদের ভূতে পেয়েছে। কেন গিয়েছিলি অমিয়?

আমরা কী করে ফিরে এলাম আবার?

কেউ ধরার আগেই তুই ঝাঁপ দিয়েছিলি জলে। তোকে কেউ ধরতে পারেনি। একা সাঁতরে এলি পাড়ে। খুব রোখ ছিল তোর।

খুড়িমা, আমি একটা জলের স্বপ্ন খুব দেখি।

কী—রকম জল?

অনেক জল, অথৈ জল। একটা খুব বড় নদী, তার ও—পার দেখা যায় না। তার একধারে একটা বিরাট বালিয়াড়ি, আর একটা স্টিমার বাঁধার জেটি। সেখানে কেউ নেই। বালির ওপর একটা কেবল সাপের খোলস পড়ে আছে।

খুড়িমা হঠাৎ রোগা, মরা হাত বাড়িয়ে অমিয়র হাত ধরে। বলে, অমিয়, কী বলছিস?

একটা স্টিমারঘাটের কথা। একটা বালিয়াড়ির কথা।

খুড়িমা একটু চুপ করে থাকে।

খুড়িমা তুমি এই স্টিমারঘাটের কথা কিছু জানো?

খুড়িমা, আস্তে আস্তে একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায়। বলে, না তো! স্টিমারঘাটের কথা কী জানব! তুই কবে থেকে এটা দেখিস?

অমিয় একটু ভাবে। তারপর বলে, অনেক দিন থেকে। এক দিন ঘুমের মধ্যে ওই স্বপ্ন দেখে জেগে উঠি। তারপর আবার ঘুমোই, আবার সেই স্বপ্ন। তিন বার করে স্বপ্নটা দেখে আর ঘুম হল না। একা একা শুয়ে খুব ভয় করতে লাগল। মনে হল, কেউ পাশে থাকলে খুব ভালো হত।

বউয়ের সঙ্গে কি তোর ঝগড়া অমিয়?

কেন, ও—কথা জিজ্ঞেস করছ কেন?

এই যে বললি—তুই একা শুস। একা শুবি কেন অমিয়? বউ বিছানায় নেয় না? আলাদা শোয়? তা তার এত গুমোর কীসের? ওই জন্যই তোদের বাচ্চা হয় না—

খুড়িমা স্টিমারঘাটের কথাটা আগে শোনো।

কী শুনব! স্টিমারঘাটের কথা আমি কিছু জানি না। রাখু ভাতটা টিপে দ্যাখ, হাঁ করে গল্প শুনছিস, ভাত গলে যাবে। একটু ডাঁটো থাকতে নামাস, অমিয় ঝরঝরে ভাত ভালোবাসে। ভাসান, কত রাত হল রে?

ন'টা।

অমিয় যাওয়ার সময়ে টর্চ জ্বেলে বড় রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিস। আমি একটু চোখ বুজে থাকি। আমার মনটা ভালো লাগছে না।

কেন খুড়িমা?

তুই কেন স্টিমারঘাটের কথা বললি? ও—সব অলক্ষুণে কথা, মন বড় খারাপ হয়ে যায়।

খুড়িমা মশারির মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে নেয়, হাতপাখার মৃদু শব্দ হতে থাকে। রাখু এসে বলে, মামা, রান্না হয়ে গেছে। বসবেন না?

অন্যমনস্ক অমিয় ওঠে।

খেয়ে উঠে পোশাক পরছিল অমিয়। খুড়িমা ঘুমচোখে বলে, ভেজা পোশাক আবার পরছিস অমিয়, ঠান্ডা লাগবে না? ওগুলো ছেড়ে রেখে যা—

রাখু বলে, উনুনে ধরে শুকিয়ে দিয়েছি দিদিমা।

ওতে কি শুকোয়? সেলাইয়ের জল থেকে যায়। স্টিমারঘাটের কথা যেন কী বলছিলি অমিয়?

তুমি তো শুনতেই চাইলে না।

খুড়িমা একটু অস্ফুট শব্দ করে। তারপর বলে, ছেলেবেলা থেকে তুই বড় একা। সেই জন্যে তোর দুঃখ নেই তো অমিয়? তোর মা—বাপ নেই—সে বড় দুঃখ। আমি তোর মা হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু চাইলেই কি হওয়া যায়! নিজের মেয়েটা, এই যে সব নাতি—নাতনি—এ—সব থেকেও তো কেমন একা লাগে। রাত—বিরেতে ঘুম ভাঙলে কারও নাম মনে পড়ে না। ডাকতে গিয়ে দেখি, মাথা অন্ধকার লাগে। মনে হয় কেউ নেই আমার। সে বড় কষ্ট। ভাবি মানুষের আপনজন কে—ই বা আছে! তুই কেন এসেছিলি যেন অমিয়?

তোমাকে দেখতে।

একটা শ্বাসের শব্দ হয়। খুড়িমা বিছানায় পাশ ফিরে শোয়। তারপর বলে, স্টিমারঘাটের কথা কেন বললি? কী জানি কেন, আমিও ঠিক একটা ধু ধু বালির চর দেখতে পাই এখন, অনেক দূরে একটা ঘাট, তারপর অথৈ জল... সাবধানে যাস অমিয়, উঠোনটা পিছল, রাস্তা ভালো না, অনেক রাত হয়েছে!

খুড়িমা, তুমি ঘুমোও।

ঘুম কি আসে। ভাসান টর্চটা ধর। অমিয় তোর বউয়ের নাম যেন কী?

হাসি।

হাসি! হাসির কেন বাচ্চা হয় না রে? আঁট—বাঁধ দিয়ে রেখেছিস নাকি?

অমিয় চুপ করে থাকে।

বাচ্চা না হলে বউ আপন হয় না। আঁটকুড়ি নয় তো? ডাক্তার দেখাস। তোর কেউ নেই অমিয়, বাচ্চা—কাচ্চা হলে একটু বাঁধা পড়বি। কিন্তু বয়স হলে আবার সেই—

কী?

সেই যে কী যেন বললি! সেই স্টিমারঘাট—অথৈ জল... অমিয় সাবধানে যাস—

মেঘ কেটে ভয়ংকর জ্যোৎস্না পড়েছে। অমিয় নির্জন রাস্তায় তার স্কুটার চালায়। বাতাস লাগে, জল—মাটির গন্ধ পায় সে। চলতে থাকে। হাসি এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। অমিয়র ঘুম হয় না আজকাল।

দূরে সিংহের ডাকের মতো মেঘগর্জন শোনা যায়। গির—অরণ্যে দেখা এক সিংহের অবয়বের ছায়া পড়ে অমিয়র চোখে। সে চলতে থাকে!

স্কুটারের শব্দ ঠিক শুনতে পেল হাসি। আধো—ঘুমের মধ্যেও। যেন এতক্ষণ সে এই শব্দের অপেক্ষায় ছিল। উঠে ঘড়ি দেখল সে। রাত এগারোটা বেজে গেছে। অমিয়র জন্য তার কোনও কৌতূহল নেই। সে শুধু আধো জেগে ছিল বলে মাঝে মাঝে রাস্তার চলমান স্কুটারগুলির শব্দ শুনে উঠে এক বার ঘড়ি দেখেছে। কোনও স্কুটারের শব্দই এতক্ষণ থামেনি।

হাসি শুনতে পেল, অমিয় স্কুটার টেনে সিঁড়ির নীচে নামিয়ে রাখছে। আবার বিছানায় এসে শুয়ে থাকল হাসি। আগে আগে অমিয় এলে অন্তত খাওয়ার টেবিলে গিয়ে বসত সে। মুখোমুখি দু'চারটে কথা হত। খাওয়ার পর ছিল তাদের বাঁধা রতিক্রিয়া। এখন আর হাসি খাওয়ার টেবিলে যায় না।

সিঁড়ি ভেঙে উঠে আসে অমিয়র পায়ের শব্দ, ভেজানো দরজা ঠেলে ও—ঘরে ঢোকে। জামা—কাপড় ছাড়ে। বাথরুমে যায়।

ও—ঘর থেকে একটা চৌকো আলো এসে এ—ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকে অনেকক্ষণ। অমিয়র রাত্রে ভালো ঘুম হয় না—হাসি জানে। অনেক রাত জেগে ও বই পড়ে। সিগারেট ধরানোর শব্দ হয় রাতে, পায়চারির শব্দ, কাশির।

চৌকো আলোটাতে একটা মানুষের ছায়া পড়ে। বাঁকা ছায়াটা, একটা কাঁধ উঁচু দেখায়, মাথাটা বেঁকে পড়ে আছে।

হাসি চেয়ে থাকে।

দরজার কাছ থেকে অমিয় বলে, কেউ এসেছিল?

হাসি মৃদুগলায় বলে, টেলিফোনের লোক। কাল তোমার টেলিফোন দিয়ে যাবে।

টেলিফোন! একটু অবাক হয় অমিয়।

বলল, তুমি তিন বছর আগে অ্যাপ্লাই করেছিলে, এত দিনে মঞ্জুর হয়েছে।

টেলিফোন দিয়ে আমি এখন কী করব?

হাসি একটু হাসে। বলে, লোকের সঙ্গে কথা বলবে। কত কথা আছে মানুষের, শোনার লোকেরও অভাব নেই।

আমার কোনও কথা নেই।

কে বলল নেই! শুনতে পাই, তুমি লোককে একটা স্টিমারঘাটের কথা বলো।

সে—কথা থাক হাসি। আর কে এসেছিল?

এক বুড়োমতো ভদ্রলোক, তোমার পিসেমশাই। তাঁর মেয়ের বিয়ের চিঠি রেখে গেছেন।

চিঠি দেখেছি। তিনি কিছু বলেননি?

বলেছেন। পরশু বিয়ে, আমি যেন অবশ্যই তোমাকে নিয়ে বিয়েতে যাই। অনেক বার বললেন। আমি বলেছি, যাব। চা করে খাইয়েছি। অনেকক্ষণ বসে ছিলেন তোমার জন্য।

আর কিছু বলেননি?

না। বোধহয় কিছু বলার ছিল, তোমাকে বলতেন। আমাকে কিছু বলেননি।

বলেছিলাম, রেখার বিয়েতে এক হাজার টাকা দেব। এত তাড়াতাড়ি বিয়ে ঠিক হয়ে যাবে ভাবিনি।

দেবে যখন বলেছিলে তখন তো দেওয়াই উচিত। তাঁর পোশাক দেখেই মনে হয় অবস্থা ভালো না।

কোথা থেকে দেব?

তুমি আমাকে যে—সব গয়না দিয়েছিলে সব স্টিলের আলমারিতে আছে। দরকার হলে নিতে পারো, আমি তো নিচ্ছি না।

আমাদের বংশের কেউ কখনও ঘরের জিনিস বেচেনি।

তা হলে কী করবে?

বুঝতে পারছি না।

হাসি লক্ষ করে একটা ধুতি জড়িয়ে অমিয় দাঁড়িয়ে আছে। কোমরের ওপর ওর খালি গা। পিছন থেকে আলো এসে পড়েছে ওর গায়ে। মাথাটা বোধহয় ভেজা, পাট—করা চুল থেকে আলো পিছলে আসছে। লম্বাটে হাড়সার দেহ অমিয়র। অমিয় রোগা হয়ে গেছে কি না তা ঠিক বুঝতে পারে না হাসি। এ—সব বোঝা খুব মুশকিল। ওই দেহটির স্বাদ সে বহু বার পেয়েছে। তার দুই হাতে, নগ্ন শরীরের আনাচে—কানাচে আজও ছড়িয়ে আছে সেই স্বাদ। কত বার সে বেষ্টন করেছে ওই শরীর, মথিত হয়েছে। তবু ওই শরীরের সব খবর তার জানা নেই।

অমিয়র ঠোঁটে একটা সিগারেট একটু জ্বলে উঠল। সেই আগুনটাই বোধহয় একটা আশ্লেষ তৈরি করে হাসির শরীরে। সে শরীরের ভঙ্গি বদলায়। হঠাৎ প্রশ্ন করে, তোমার ওজন কত?

অমিয় একটু থমকে থাকে। প্রশ্নটা বুঝতে না—পেরে জিজ্ঞেস করে, কী বলছ?

তোমার ওজন কত?

কেন?

এমনিই জিজ্ঞেস করছি। জামাইবাবু বলছিল, তুমি নাকি রোগা হয়ে গেছ। তোমার কি ওজন কমে গেছে?

কী জানি।

তুমি ওজন নাও না?

না।

হাসি একটু শ্বাস ফেলে বলে, আমার রিজার্ভেশন পাওয়া যায়নি। কলকাতায় আমাকে আরও কয়েক দিন থাকতে হবে।

থাকবে। তাতে কী?

আমি দিদি—জামাইবাবুর কাছে চলে যেতে পারতাম এ ক'দিনের জন্য। কিন্তু সেখানে পাশের ফ্ল্যাটে তোমার দিদি—জামাইবাবু থাকেন। গেলে ওঁরা নানা রকম সন্দেহ করতে পারেন বলে যাইনি।

যেমন তোমার ইচ্ছে।

খুশির বিয়ের তারিখ এসে গেল। রিজার্ভেশন পাওয়া যাচ্ছে না। কী যে করব!

প্লেনে চলে যাও।

তুমি ভাড়া দেবে? অনেক ভাড়া কিন্তু।

দেব।

তুমি আমাকে অনেক দিয়েছ।

প্লেনের ভাড়া কত?

দু'—তিনশো হবে বোধহয়। আমি ঠিক জানি না। তোমার ব্যবসার অবস্থা কী?

ভালো নয়।

খুব খারাপ।

হুঁ।

কী—রকম খারাপ?

উঠে যাওয়ার মতো।

কেন?

হাসি, আমি প্লেনের ভাড়া ঠিক দেব।

হাসির ঘুম পায়। সে হাই তুলে বলে, দরজার পরদাটা টেনে দেবে? চোখে আলো লাগছে।

পরদিন দুপুরবেলা জামাইবাবুকে ফোন করে হাসি।

জামাইবাবু, রিজার্ভেশন যদি না পাওয়া যায় তো আমি প্লেনে যাব।

তার দরকার নেই, তেরো তারিখের একটা স্লিপার বার্থ পাওয়া গেছে।

পাওয়া গেছে? সত্যি?

সত্যি। সুখের পাখি এবার উড়ে যাও।

হাসি চুপ করে থাকে।

ফোন কি ছেড়ে দিয়েছ হাসি?

না।

কাল ছেড়ে দিয়েছিলে। একটা প্রশ্নের জবাব দাওনি।

জামাইবাবু, আমাদের মধ্যে কোনও ঝগড়াঝাটি হয়নি। কথাবার্তা বন্ধ হয়নি। কাল রাতেও অনেকক্ষণ আড্ডা মেরেছি। আমরা সম্পূর্ণ নরমাল। এমনকী কোর্ট—কাছারির কথাও ভাবছি না।

তবে কি ফিরে আসার কথাও ভাবছ?

না!

তুমি কোথা থেকে ফোন করছ হাসি?

কেন?

ফ্রিলি কথা বলতে পারবে?

আমি বাসা থেকে ফোন করছি।

বাসা থেকে! বাসায় কবে ফোন এল?

আজ। বছর তিনেক আগে অ্যাপ্লাই করেছিল, আজ কানেকশান দিয়ে গেছে।

ফোন কেন নিতে গিয়েছিল অমিয়? দুপুরে অফিস থেকে তোমার সঙ্গে প্রেম করার জন্য?

হবে হয়তো।

ফোন কোম্পানির মতো বেরসিক দেখিনি। যখন পাখি উড়ে যাচ্ছে তখন এল ফোন! এখন দুপুরে কার সঙ্গে কথা বলবে অমিয়? বেচারা!

কী বলছিলেন বলুন।

ডিগবয়ের তেল কোম্পানির সেই ইঞ্জিনিয়ার, সে এখনও বিয়ে করেনি শুনেছি। সত্যি?

সত্যি।

সে কখনও তোমার সঙ্গে দেখা করেছিল হাসি?

হাসি একটু দ্বিধা করে বলে, না না।

তবে কী করেছিল?

একটা দীর্ঘ চিঠি দিয়েছিল। তাতে বারবার একটা প্রশ্ন করেছিল—আমার কী দোষ? আমাদের অপরাধ কী? আপনি কেন এমন করলেন? আরও লিখেছিল, যদি কখনও নিজের ভুল বুঝতে পারি তবে যেন তাকে জানাই, সে সারা জীবন অপেক্ষা করবে, নিঃশর্তে গ্রহণ করবে আমাকে... জামাইবাবু, আপনি কি শুনছেন? আপনার শ্বাস—প্রশ্বাসও যে শোনা যাচ্ছে না।

শুনছি। বলো।

সে এই কথা লিখেছিল। আরও লিখেছিল, তাদের কালাশৌচের মধ্যেই যে তারা আমাকে আশীর্বাদ করে রেখেছিল, সেটাও তারই আগ্রহে। তার ভয় ছিল, আশীর্বাদ করে না রাখলে ওই সময়ের মধ্যে আর—কেউ এসে আমাকে বিয়ে করে ফেলবে। তখন শিলচরে আমার স্যুটার অনেক, ঝাঁকে ঝাঁকে চিঠি পেতুম... শুনছেন?

শুনছি।

কালো হলেও তো আমি সুন্দরী—ই। তার ওপর দারুণ নাচতাম, গাইতাম। আমার পায়ে পুরুষদের মাথা নূপুরের মতো বাজত।

ও—পাশে জামাইবাবু বহুক্ষণ শ্বাস ধরে রেখে আবার অনেকক্ষণ ধরে শ্বাস ছাড়ে। হাসি হাসে।

কিছু বুঝলেন জামাইবাবু?

বুঝলাম।

কী?

তুমি আর ফিরবে না হাসি।

ও—পাশে জামাইবাবু একটুক্ষণ চুপ করে থাকে। হাসি অপেক্ষা করে।

হাসি, স্টিমারঘাটটা সাবধানে পার হয়ো। ও—জায়গাটা ডেঞ্জারাস।

হাসি চমকে উঠে বলে, স্টিমারঘাট! কোন স্টিমারঘাট?

বাঃ, ফারাক্কায় তোমাকে ঘাট পেরোতে হবে না?

ওঃ। বলে স্তব্ধ হয়ে থাকে হাসি।

একা যাচ্ছ, আমরা চিন্তায় থাকব। ও—পারে বঙ্গাইগাঁও এক্সপ্রেসে তোমার রিজার্ভেশন আছে, ভুল করে দার্জিলিং মেলে উঠো না।

ভুল ট্রেনে ওঠাই কি আমার স্বভাব জামাইবাবু?

জামাইবাবু একটু চুপ করে থেকে বলে, ভুল ট্রেনের কথা বলছ হাসি! কিছু ইঙ্গিত করছ কি? তবে বলি, আমাদের আমলে ভুল ট্রেনে উঠলেও শেষ পর্যন্ত যেতে হত। হয়তো ভুল জায়গায় গিয়ে পৌঁছোতাম। কিন্তু তবু যেতে হত। তোমাদের আমল আলাদা। তোমরা ভুল ট্রেন বুঝতে পারলেই চেন টেনে নেমে পড়তে পারো।

আমরা ভাগ্যবান।

দেখা যাক। আমি আরও কিছুদিন বাঁচব হাসি।

হাসি হাসে।

এখনও সাত—আট দিন সময় আছে, এ ক'দিন কী করবে হাসি?

কী করব! ঘুরব, ঘুরে বেড়াব!

কোথায় যাবে?

কোথাও না। কলকাতা—কেবল কলকাতায় ঘুরব—ইচ্ছেমতো।

কলকাতায় আর কোথায় ঘুরবে, কী আছে কলকাতায়?

কী আছে? কী জানি! আমি তো বিশেষ কোথাও যাব না। আমি ঘুরে বেড়াব রাস্তায় রাস্তায়। রঙিন দোকান দেখব, আলো দেখব, পার্কে বসে থাকব, কলকাতা পুরনো হয় না।

কলকাতায় তুমি কী পেয়েছ হাসি?

কী পেয়েছি! হাসি তা ভেবে পায় না। সে চোখ বুজে থাকে। মনে মনে বলে, কলকাতা! কলকাতা আমার প্রেমিক। জ্বলন্ত এক পুরুষ কলকাতা। সে আমাকে সব সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত করে টেনে এনেছিল, সুখী হতে দেয়নি। সে আমাকে নিয়ে আরও কত খেলা খেলবে, তোমরা দেখো।

হাসি, ফোন কি ছেড়ে দিয়েছ?

না তো।

তোমার শ্বাস—প্রশ্বাসও যে শোনা যাচ্ছে না।

শুনছি। বলুন।

এ কয়দিন অমিয়কে সঙ্গে নিয়ে ঘুরো।

ও—মা! ওকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরব না কেন? এই তো ওর পিসতুতো বোনের বিয়েতে যাচ্ছি একসঙ্গে। ওর স্কুটারে বহুদিন চড়িনি। ভাবছি ওর স্কুটারের পিছনে বসে এ—ক'দিন ঘুরে বেড়াব। অফিসপাড়া, কলেজ স্ট্রিট, পার্ক স্ট্রিটের রেস্টুরেন্ট দেখে বেড়াব দুজনে। জামাইবাবু, আপনি কি ভাবছেন আমার প্রেজুডিস আছে? একদম নেই। আমরা দুজনে কথা বলি, হাসি—ঠাট্টা করি, কখনও ঝগড়া করি না। এমনকী মাঝে মাঝে এক বিছানায়... জামাইবাবু, শুনছেন?

কী ভয়ংকর!

কী?

তোমার নিষ্ঠুরতা।

মাথা আস্তে আস্তে পিছনে হেলিয়ে দিচ্ছিল হাসি। ক্রমে পিঠ বেঁকে গেল পিছনে, মাথা প্রায় স্পর্শ করল পিঠ। কত উঁচু বাড়ি। উঠে গেছে তো উঠেই গেছে। কী বিশাল বাড়িটার বুক, কী পাথুরে গড়ন! দেখতে দেখতে নেশা ধরে যায়। হ্যারিংটন স্ট্রিটের মোড়ে দাঁড়িয়ে বাড়িটার ঠিক পায়ের তলা থেকে চূড়া দেখার চেষ্টা করল হাসি, তার মুখে ঘাম জমে গেল বেদনায়।

বাব্বাঃ! আপনমনে বলল সে। হেসে আঁচলে এক বার মুখ মুছে নিল। কলকাতার প্রোথিত ইমারত চার দিকে, তার মাঝখানে নিজেকে ধূলিকণার মতো লাগে তার। কান পাতলে—পাতালের খরস্রোতা নদীর গর্জনের মতো উতরোল কলকাতার গম্ভীর শব্দ শোনা যায়। কী রোমাঞ্চ জাগে শরীরে! কলকাতা—তার চারদিকে উষ্ণ কল্লোলিত কলকাতা!

হাসি পায়ে পায়ে পার হয় রাস্তা। ময়দানের দিকে ট্রাম লাইন পেরোলে দেখা যায় সারি সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এলোমেলো পড়ে আছে—যেন—বা যে খুশি নিয়ে যেতে পারে। ঘনপত্র গাছের ছায়া। পাতা ঝরে পড়ছে। পাখিরা ফেলে দিচ্ছে কুটোকাটা। নিবিড় ছায়া এখানে। পায়ের নীচে ঘাস, পাতা। নির্জনতা। হাসি পায়ে পায়ে উদ্দেশ্যহীন হাঁটে। কিছুই দেখে না, অথচ সবকিছু অনুভব করে তার সর্বগ্রাসী মন।

সামনেই একটা কালো হেরাল্ড গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। নতুন চকচকে গাড়ি। গাড়ির বনেটে হাত রেখে একজন পুরুষ দাঁড়িয়ে। ফরসা, মজবুত চেহারা, লম্বা জুলপি, ঘন বড় চুল, চৌকো মুখ। রঙিন চৌখুপিওলা শার্ট তার পরনে, আর জলপাই—রঙা সরু চাপা প্যান্ট, পায়ে চোখা জুতো, কোমরের চওড়া বেল্টের বকলেশে একটা ইস্পাত রঙের ইংরেজি 'ডি' অক্ষর ঝলসে ওঠে। কবজির ঘড়িতে মোটা সোনারঙের চেন। মানুষটা হাসিকে দূর থেকেই লক্ষ করে। অন্যমনে একটা ঘাসের ডাঁটি তুলে আলস্যভরে চিবোয়। হাসি এগিয়ে যায় ধীরে ধীরে। সেই হাঁটা দেখে লোকটা। দেখে তার পোশাক, মুখশ্রী, তার বুক, চোখ। চোখই বেশি লক্ষ করে। চেয়ে থাকে। একটা লক্ষণ খুঁজে দেখে। বোধহয় লক্ষণটা মিলে যায়। মিলিয়ে লোকটা হাসে। একটু বড় এবং মসৃণ দাঁত তার। ধারালো। হাসির একটুও ভয় করে না। সে এগোতে থাকে। লোকটা হাসে। হাসি এগোয়। হেরাল্ড গাড়িটার গায়ের পালিশে হাসির ছায়া পড়ে। লোকটা বনেট থেকে হাতের ভর তুলে নেয়। ঝুলে—পড়া শার্ট, কোমরে গুঁজে এক পা এগিয়ে আসে। আর এক—পা। আর—এক পা এগুলেই হাসির পথ আটকাতে পারে, ছুঁয়ে ফেলতে পারে হাসিকে। ডাক দেয়—মিস—ও মিস—

হাসি ছেলেটার দিকে মুখ ফিরিয়ে একটু হাসে। প্রশ্রয়ের হাসি। ছেলেটা লক লক করে ওঠে লোভে। দাঁতাল হাসি হাসে। বেল্টের 'ডি' অক্ষরটা ঝলসায়। ভাঙা গলায় ডেকে বলে, আই হ্যাভ এ কার মিস—

হাসি বড় বড় চোখে ছেলেটাকে দেখে। ছেলেটা টেরও পায় না, ঠিক তার পিছনেই উদ্যত আঠারো তলা উঁচু এক হিংস্র ইমারত। সেই ইমারতের সামনে তাকে কত তুচ্ছ, এইটুকু পতঙ্গের মতো দেখায়। হাসি সেই ইমারতের ফ্রেমে ছেলেটার ক্ষুদ্রতা মাত্র একপলক অবাক হয়ে দেখে। ছেলেটা ঝুঁকে ফিস ফিস করে কী যেন বলে। অমনি ময়দান থেকে মার মার করে ছুটে আসে বাতাস, তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে যায়। হাসির করুণা হয়। তার প্রেমিক কলকাতা চার দিকে জেগে আছে সহস্র চোখে। উদাসী, নির্মম, আবার ঈর্ষায় কাতর। যদি ইঙ্গিত করে হাসি তবে অমনি তার প্রেমিক কলকাতা পিছনের ওই আঠারোতলা বাড়িটার চূড়া হয়ে মড় মড় করে ভেঙে পড়বে ছেলেটার মাথায়। গুঁড়ো করে মিশিয়ে দেবে মাটিতে। কিন্তু করে না হাসি। শুধু মুখটা ফিরিয়ে নেয় অবহেলায়। একা একা ঘোরে বলে এ—রকম কত মানুষ কত বার তার পিছু নিয়েছে, ডাকাডাকি করেছে ইঙ্গিতে, কীটপতঙ্গের মতো সব ছোট মাপের জীব। কলকাতার গায়ে উড়ে এসে বসে, আবার উড়ে যায়।

হাসি হাঁটতে থাকে। কত দূর দূর হেঁটে যায় হাসি। কখনও ট্রামে ওঠে। কিছু দূর যায় আবার নেমে পড়ে। ধ্বংসাবশেষ দুর্গের শেষ একটি মাত্র স্তম্ভের মতো মনুমেন্ট দাঁড়িয়ে আছে দেখে। দেখে, গঙ্গার কোল জুড়ে শুয়ে আছে হাওড়ার পোল। তার চোখের পাশ দিয়ে ভেসে যায় ভাঙা টুকরো সব দৃশ্যাবলী, ছায়া পড়ে, ভেঙে যায়। চকিতে মানুষের চোখ ঝলসে ওঠে। কানাগলির মুখ সরে যায়। গভীর গভীর অগাধ কলকাতার ভিতর হারিয়ে যায় হাসি। ভোগবতীর গম্ভীর নিনাদের মতো কলকাতার কত শব্দ হয়।

জাহাজঘাট! হাসি থমকে দাঁড়ায়। মাস্তুল। জল। না এখানে নয়। এ তো কলকাতা থেকে বিদায়ের বন্দর। এর অর্থ তো ছেড়ে যাওয়া। মাস্তুল অদৃশ্য রুমাল উড়িয়ে বিদায় জানায়। জাহাজ ভেসে যাবে দূর সমুদ্রে। হাসি ফিরে দাঁড়ায়। এখানে নয়, এখানে নয়। এখানে কলকাতার শেষ। জীবনের শেষ, এখানে অচেনার শুরু। হাসি ফিরে আসে।

সেনগুপ্ত নিয়ে গেছে অনেক। হিসেব করলে কত দাঁড়াবে তা ভেবে দেখেনি অমিয়। হিসেব করা সে প্রায় ছেড়ে দিয়েছে। ক্যাপিটাল শেয়ার আর সেই সঙ্গে লভ্যাংশ মিলে একটা বেশ বড় অঙ্কের টাকা। অমিয় আটকাতে পারেনি। কিন্তু তবু সেটা কিছু নয়। সেনগুপ্ত বা তার টাকা কোনওটার অভাবেই ব্যবসা আটকাত না। যদি অমিয় খাড়া থাকত। তরতরে তাজা জোয়ান বয়সের মানুষের কাছে এ আবার একটা সমস্যা ছিল নাকি। ছিল না—অমিয় তা জানে, কিন্তু সে কেমনধারা মেঘলা মানুষ হয়ে গেল। দিন না ফুরোতেই আলো মরে গিয়ে ঘনিয়ে এল দিনশেষ।

দুপুরে অমিয় আজকাল কিছুই খায় না। লাঞ্চ সে প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। কল্যাণ বা রজত সবাই এ সময়টায় বাইরে থাকে, পাঞ্জাবি হোটেল বা গাঙ্গুরামে টিফিন সারে। ডিউক রেস্টুরেন্টে নতুন একটা আড্ডা হয়েছে কল্যাণের। সেখানে সারাটা দুপুর কাটায় কখনও কখনও। অমিয় একসময়ে যেত। এখন টিফিনের সময়টায় বসে থাকে চুপচাপ। রাজেন এক কাপ চা রেখে যায় না—বলতে। আজ চায়ের সঙ্গে একটা শালপাতার ঠোঙায় কয়েকটা দেওঘরের প্যাঁড়া রেখে গেছে। কোন ভাই যেন এনেছে দেশ থেকে।

চা—টা খেল অমিয়, প্যাঁড়া ছুঁতে ইচ্ছে করল না। পেটে খিদে মরে একটা গুলিয়ে ওঠা ভাব। সবাই তাকে লক্ষ করে আজকাল। সে যে খায়নি, সে যে বিপাকে পড়েছে। ভাবতে চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আসে। রাত্তিরে অফিস—বাড়িটা ফাঁকা থাকে। তখন রাজ্যের দেশওয়ালি মুটে মজুর রিকশা বা ঠেলাওয়ালাকে এখানে এনে তোলে রাজেন। এক রাত্তির বসবাসের জন্য মাথাপিছু দু'চার আনা করে নেয়। তারা দিব্যি ফ্যানের হাওয়া খায়। অনেক রাত অবধি বাতি জ্বেলে গল্পসল্প করে। মাসের শেষে মস্ত অঙ্কের ইলেকট্রিক বিল আসে। তাই রাজেনকে তার সাইড বিজনেসের জন্য বিস্তর বকাবকি করেছে অমিয়, কল্যাণ আর রজত। সেই খারাপ ব্যবহারটুকুর জন্য এখন প্যাঁড়াগুলির দিকে চেয়ে একটু বুকটা টনটন করে। রাজেন আজকাল না বলতেই টিফিনের সময়ে কোনও কোনওদিন একঠোঙা মুড়ি বাদাম হাতের কাছে রেখে যায় নিঃশব্দে। এ—সবই সহৃদয়তার নিদর্শন। কিন্তু অমিয়র ভিতরটা জ্বালা করে।

দুপুরের দিকে পিসেমশাই ফোন করলেন।

অমিয়, আমি সেদিন তোর বাসায় গিয়েছিলাম। রেখার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে রে!

শুনেছি পিসেমশাই, পাত্র কেমন?

খুব ভালো। টাটার ইঞ্জিনিয়ার, তবে দাবি—দাওয়া অনেক।

অমিয়, একটা শ্বাস ছাড়ল। পিসেমশাই আবার বললেন, মেয়েটার সুন্দর মুখ দেখে পছন্দ করেছে, নইলে গরিব ঘরের সঙ্গে সম্বন্ধ করার মতো পাত্র তো নয়।

পিসেমশাই আপনার কত দরকার?

পিসেমশাই লজ্জিত হন বোধহয়। একটু নীরব থাকেন। তারপর আস্তে করে বলেন, দরকারের কি শেষ আছে অমিয়! প্রভিডেন্ড ফান্ডের টাকা যা অবশিষ্ট ছিল সবই প্রায় তুলেছি। কিছু ধার—কর্জ করেছি। এখনও দু'—তিন হাজার কম পড়বে। আলমারিটা এখনও কেনা হয়নি, সোনার দোকানেও যা আন্দাজ করেছিলাম তার বেশি পড়ে গেল।

ঠিক আছে, আমি হাজারখানেক দেব।

দিতে তোর কষ্ট হবে না তো?

কষ্ট কি পিসেমশাই? রেখার বিয়েতে আমার তো দেওয়ার কথাই ছিল।

পিসেমশাই হাসলেন ফোনে। বললেন, কথা দিয়েছিস বলেই আবার কষ্ট করে দিস না।

অমিয় একটু আহত হল। সে দিতে পারবে না—এমন যদি কেউ ধরে নেয় তবে তার আহত হওয়ারই কথা।

সে একটু নিচু স্বরে বলল, পিসিমা বেঁচে থাকতে, সেই কবে ছেলেবেলায় আমি পিসিমাকে প্রায় সময়েই বলতাম, রেখার বিয়ে আমি দেব, সে—কথা তো রাখতে পারলাম না পিসেমশাই।

পিসিমার উল্লেখে পিসেমশাই নীরব হয়ে গেলেন। অনেকটা পরে যখন কথা বললেন তখন টেলিফোনেও বোঝা গেল, গলাটা ধরে গেছে।

বললেন, তা হোক, ছেলেবেলায় মানুষ কত কী বলে। যা দিতে পারিস দিস।

আচ্ছা পিসেমশাই।

শোন, বউমাকে বিয়ের দু'—এক দিন আগে আমাদের এখানে পাঠাতে পারবি না? বিয়ের কাজকর্ম মেয়েছেলে ছাড়া কে বুঝবে!

হাসিকে বললে হাসি রাজি হবে কি না তা কে জানে। তাই অমিয় উত্তরটা ঘুরিয়ে দিল, সেদিন যখন গিয়েছিলেন তখন নিজেই তো বউমাকে বলে আসতে পারতেন।

লজ্জা করল। বউমা তো আমাকে খুব ভালো চেনেন না, দু'—এক বার মাত্র দেখেছেন, তুইও সাহেবি কায়দায় বিয়ে করলি, সামাজিক অনুষ্ঠান হল না!

অমিয় লজ্জা পায়। বলে, তাতে কী?

সামাজিক বিয়ে হলে সেই অনুষ্ঠানে সব আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে নতুন বউয়ের চেনাচিনি হয়ে যায়। তোর বেলায় তো সে—রকম হয়নি, তাই একটু দূরের মানুষ হয়ে আছি আমরা। তবে তোকে বলি অমিয়, বউমা ভারী ভালো হয়েছে। পরিচয় দিতে কত যত্নআত্তি করল। আজকালকার মেয়েদের মতো নয়।

অমিয় উত্তর দিল না।

অমিয়।

বলুন পিসেমশাই।

পারিস তো বিয়ের আগে হাসিকে পাঠিয়ে দিস।

দেখি।

দেখিটেখি নয়, এয়োর কাজ করার লোক নেই।

আচ্ছা।

ছাড়ছি, বলে পিসেমশাই ফোন রাখলেন।

ফোনটা রেখে অমিয় তিন বুড়োর দিকে তাকাল, তিনজনই পাথর হয়ে বসে আছে।

একেই কি স্থবিরতা বলে! তান্ত্রিক লোকটা এক বার চোখ তুলে অমিয়র দিকে তাকায়, মাথায় জটা, কপালে মস্ত লাল একটা ফোঁটা, চোখ দুটোয় বেশ তীব্র চাউনি। হেসে এবং তাকিয়ে হঠাৎ শ্বাস ছেড়ে বলল, টাকা!

অমিয় হাসে। উলটো দিকের দুই বুড়ো খুব আগ্রহের সঙ্গে তান্ত্রিকের দিকে ঝুঁকে বসল, বাবা যদি এবার কিছু বাণী দেন।

অমিয় মাথা নেড়ে বলল, টাকা।

তান্ত্রিক তার দুই ভক্তের দিকে চেয়ে আস্তে করে বলল, টাকা।

ভক্ত দুজন কী বুঝল কে জানে। জুল জুল করে চেয়ে থাকে।

অফিসঘরে এসে অমিয় ফাঁকা ঘরটার চার দিকে চাইল। কেউ নেই। কাগজপত্র হাওয়ায় নড়ে শব্দ করছে। পুরনো ফ্যান থেকে একটা ঘট—ঘটাং শব্দ উঠছে।

কিছুক্ষণ বসে থাকল অমিয়। রেখার বিয়ে, এক হাজার টাকা দিতে হবে।

অমিয় বেরিয়ে এল।

স্কুটারটা এখনও তার আছে। বেশিদিন থাকবে না। কল্যাণকে সে দিয়ে দিয়েছে, যতদিন ও না নেয় তত দিন তার। আহমদ একটা মফস্বলের লোককে জাঙ্গিয়া গছানোর চেষ্টা করছে। অমিয়কে দেখে নিচু গলায় বলল, সাহা ব্রাদার্স থেকে লোক এসেছিল তাগাদায়, হটিয়ে দিয়েছি। আবার তিনটের পর আসবে।

অমিয় উত্তর না—দিয়ে গিয়ে স্কুটার চালু করে।

যে—ব্যাঙ্কে অমিয়র অ্যাকাউন্ট আছে তা অনেকটা তার ঘরবাড়ির মতো হয়ে গেছে, বহুকাল ধরে একই ব্যাঙ্কে সে টাকা রাখছে, তুলছে, চেক বা ড্রাফট ভাঙাচ্ছে। সবাই মুখ—চেনা হয়ে গেছে। কেউ কেউ একটু বেশি চেনা। এবং একজনের সঙ্গে পরিচয় আরও একটু গভীর।

ব্যাঙ্কের বাইরে স্কুটার রেখে অমিয় ভিতরে আসে! সোনাদার ব্যাঙ্ক যেমন বড়, আর হালফ্যাশানের এ—ব্যাঙ্কটা তেমন নয়। প্রাইভেট আমল থেকেই এর মলিন দশা, কাউন্টারের পুরনো কাঠ গাঢ় খয়েরি রং ধরেছে, দেয়ালের রং বিবর্ণ, কাঠের পার্টিশনগুলো নড়বড় করে।

কারেন্ট অ্যাকাউন্টটা অমিয় বহু দিন হল বন্ধ করে দিয়েছে। সেভিংসে কিছু টাকা থাকা সম্ভব, পাশবইটা বহুকাল এন্ট্রি করানো হয়নি। কত টাকা আছে কে জানে!

টোকেন ইসু করার কাউন্টারে এক সময়ে নীপা চক্রবর্তী বসত। ভিতরের দিককার একটা ঘরে বসে আপন মনে কাজ করে। পাবলিকের সামনে আর থাকে না।

কাউন্টারের মেয়েটি ফোর ওয়ান নাইন নাইন অ্যাকাউন্ট লেজার খুলে দেখে বলল, না, হাজার টাকা তো নেই। দুশো পঁয়ত্রিশ টাকা আছে!

অমিয় যন্ত্রের মতো শব্দ করে—ও।

আরও দুটো ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট আছে অমিয়র। কিন্তু সেখানে আর যাওয়ার আগ্রহ হয় না। খুব বেশি নেই। যা আছে তাতে হাত দেওয়া যায় না। হাসি চলে যাবে। অনেক পেমেন্ট বাকি। একটা হতাশা ভর করে তাকে। মুখটা বিস্বাদ। খালি পেটে সম্ভবত পিত্ত পড়েছে। মাথার মধ্যে একটা রিমঝিম। চোখের সামনে একটু অন্ধকার, অন্ধকারে উজ্জ্বল কয়েকটি তারা খেলা করে মিলিয়ে গেল। দুর্বলতা থেকে এ—রকম হয়।

দুটো বাজতে আর খুব বেশি দেরি নেই। বেলা দুটোয় সব জায়গায় টাকা—পয়সার ওপর ঝাঁপ পড়ে যায়।

ভিতরের দিকে একটা করিডোর গেছে। ওদিকে একটা বাইরে যাওয়ার দরজা আছে। ব্যাঙ্কের সামনের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে ওদিক দিয়ে যাতায়াত করে লোক। ব্যাঙ্ক আওয়ারের পরে এসেও বহু দিন ওই দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকেছে অমিয়, চেক ক্যাশ করে নিয়ে গেছে। নীপা চক্রবর্তী ওইটুকু ভালোবাসা দেখাত।

দুশো পঁয়ত্রিশ টাকায় হাত দিল না অমিয়। থাকগে। সে করিডোর ধরে ভিতরের পার্টিশনের কাছে এসে দাঁড়ায়। কাঠের পার্টিশনে কাচ লাগিয়ে বাহার করার চেষ্টা হয়েছে। ময়লা ঘোলা কাচের ভেতর দিয়ে দেখা যায় লম্বা লম্বা টেবিলের ওপর ঝুঁকে কয়েকজন কাজ করছে। তৃতীয়জন নীপা। শ্যামলা রং রোগা শরীরে ইদানীং একটু মাংস লগেছে। মুখখানা নোয়ানো বলে ভালো দেখা যায় না। কিন্তু অমিয় জানে মুখখানা ভালোই নীপার। টসটসে মুখ বলতে যা বোঝায় তা—ই। বড় বড় দুখানা চোখ ভরে একটা নরম সৌন্দর্য ছড়িয়ে থাকে। চোখে কাজল দেয় নীপা, কপালে টিপ পরে, সাদা খোলের শাড়ি পরে বেশির ভাগ সময়ে। রঙিন পরলে হালকা রঙা। গায়ের রং চাপা বলে চড়া সাজ কখনও করে না। তাতে ও ফুটে ওঠে বেশি।

অমিয়র সঙ্গে নীপার এমনিতে কোনও সম্পর্ক ছিল না।

চেক জমা দিয়ে টোকেন নেওয়ার সময়ে, বা অ্যাকাউন্টের টাকার অঙ্ক জানতে এসে, মুখোমুখি একটু বেশিক্ষণ কি দাঁড়াত অমিয়?

চোখে চোখ পড়লে সহজে চোখ সরাত না বোধহয়? মাঝে মাঝে একটু—আধটু হাসত কি? সে যাই হোক, তাদের চেনাজানা ছিল খুব সহৃদয়তায় ভরা। ব্যাঙ্ক—আওয়ার্সের পরে এসে অমিয় বলত, একটু জ্বালাতে এলাম।

নীপা মৃদু অহংকারী হাসি হেসে বলেছে, কে না জ্বালায়! জ্বলে যাচ্ছি। দিন কী আছে... বলে হাত বাড়িয়ে চেক নিত।

রোগা মেয়ে পছন্দ করত অমিয়। মোটা বা বেশি স্বাস্থ্যবতী তার পছন্দের নয়। বুকের স্নিগ্ধ ফল দুটি মুখ তুলে চেয়ে থেকেছে পুরুষের দিকে। কনুই বা কবজির হাড় তেকোনা হয়ে চামড়া ফুঁড়ে উঠে থাকত না। শরীরের চেয়ে অনেক আকর্ষক ছিল গলার স্বরে নম্রতা। অমিয় ছাড়া আর কাউকে কখনও ঠাট্টা করে কথার উত্তর দিয়েছে এমনটা অমিয় দেখেনি। খুব সিরিয়াস ভাবে কাজ করত। মেয়েরা অফিসের কর্মচারী হিসেবে বেশির ভাগই ভালো হয় না। যেখানে তিন—চারটে মেয়ে জোটে সেখানে কাজ হওয়া আরও মুশকিল! কিন্তু নীপা ছিল অন্যরকম। শনিবার যখন প্রচণ্ড রাশ হয়, কিংবা কোনও ছুটির আগে যখন টাকা তোলার ধুম পড়ে যায় তখনও নীপাকে বরাবর নিচু গলায় লোকের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছে অমিয়, দেখেছে মুখে স্নিগ্ধ হাসি, অবিরল ব্যস্ততার মধ্যেও নানা লোকের অপ্রয়োজনীয় বোকা প্রশ্নের উত্তর দিতে। একদিন দুজন অল্পবয়সি ছোকরা স্রেফ ইয়ার্কি দিতে ব্যাঙ্কে ঢুকে পড়েছিল। তারা উইথড্রয়াল স্লিপ নিয়ে মোট অঙ্কের টাকা লিখে জমা দিয়ে টোকেন নিল। ব্যাপারটা ধরতে দু'মিনিটের বেশি লাগেনি নীপার। লেজার বইটা খুলে অ্যাকাউন্ট দেখে যখন তার উচিত ছিল দারোয়ান ডেকে ছোঁড়া দুটোকে বের করে দেওয়া, তখনও সে বিনীত ভাবে তাদের ডেকে বলেছিল—সইয়ে যে নাম লিখেছেন তার সঙ্গে অ্যাকাউন্টের নাম মিলছে না। ছেলে দুটো সাহস পেয়ে আরও কিছু ইয়ারকি দেয়, একজন বলে, তা হলে অ্যাকাউন্ট খুলব। ফর্ম দিন। নীপা আশ্চর্য, ধৈর্য ধরে রেখে ওদের ফর্মও দিয়েছিল যেটা ওরা কিছুক্ষণ কাটাকুটি করে ছিঁড়ে ফেলে চলে যায়। দৃশ্যটা অমিয়র চোখের সামনে ঘটে। নীপা স্বাভাবিক হাসি হেসে বলেছিল তাকে, এ—রকম প্রায়ই হয়। আমরা কিছু মনে করি না।

তখনও হাসির সঙ্গে দেখা হয়নি। এ হচ্ছে প্রাক—হাসিতিক ঘটনা। তখন অমিয় মাঝে মাঝে নীপার কথা ভাবত বিরলে। মনে—পড়া শুরু হয়েছিল, ভাবতে ভালো লাগত। ঘন ঘন তখন ব্যাঙ্কে যাওয়ার দরকার পড়ত তার। রাজেন বা সেনগুপ্তকে পাঠালেও যখন কাজ চলে তখনও নিজেই যেত। নীপা যেদিন আসত না সেদিন ক্ষুণ্ণ হত সে। পরদিন এলে অনুযোগ করত, কাল আসেননি কেন? কাল আমার পেমেন্ট পেতে অনেক দেরি হয়েছে।

নীপা সে—অনুযোগের সহৃদয় উত্তর দিত। বলত, রোজ তো আসি। এক—আধদিন না এলে বুঝি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়। যন্ত্র তো নই।

এ—ধরনের কথা নীপা একমাত্র তার সঙ্গেই বলত এবং তখন চোখে চোখে মানুষের গভীর হৃদয় গোপন বার্তা পাঠাত না কি।

ব্যাঙ্কের বাইরে দেখা হয়েছিল মোটে এক দিন। গ্র্যান্ট স্ট্রিটের একটা দোকানে নীপা পুজোর জামা—কাপড় কিনতে ঢুকেছিল। অফিসের পাড়া। অমিয় ডাব খাচ্ছিল পাশের পানের দোকানটায়। নীপা দেখেনি। অমিয় ভিতরে ঢুকে নীপাকে ধরল, এই যে!

নীপার সঙ্গে অফিসের আরও দুটি মেয়ে ছিল। তারা একটু ভ্রূ—কুঁচকে চেয়ে দেখল অমিয়কে। নীপারই ভ্রূ সহজ ছিল। মুখে হাসি ফুটল সহৃদয়তার। অনেক কিছু এড়িয়ে যাওয়ার কথা বলতে পারত। কিন্তু খুব আন্তরিক লাজুক গলায় একটা ঘন নীল পাছাপেড়ে শাড়ি তুলে দেখিয়ে বলল, দেখুন তো, এটা অদিতিকে মানাবে না? অদিতি সঙ্গী মেয়েদের একজন। ফরসা। অমিয় হেসে বলে, নীল শাড়ি সবাইকে মানায়।

যতক্ষণ শাড়ি কিনেছিল ওরা ততক্ষণ নীপা চোখের শাসনে আটকে রাখল অমিয়কে। অমিয় যত বার বলে, এবার যাই, কাজ আছে। তত বার নীপা বলে, দাঁড়ান। মেয়েরা ঠিক ঠিক শাড়ি পছন্দ করতে পারে না। পুরুষেরা অনেকে পারে। আমাদের শাড়ি পছন্দ করা হয়ে গেলে যাবেন।

শাড়ি কেনা হলে সঙ্গিনীরা চলে গেল। বোধহয় একটা ষড়যন্ত্র করেই। নীপা একা হয়ে বলল, এবার আমাকে সাউথের বাসে তুলে দিন তো।

অমিয় তার স্কুটার দেখিয়ে বলে, বাসের দরকার কী! যদি সাহস থাকে তো উঠে পড়ুন। পৌঁছে দিয়ে আসি।

ও বাবা! স্কুটার! পড়ে—টড়ে যাব, কখনও চড়িনি।

অবশেষে উঠেছিল নীপা স্কুটারেই। মাঝপথে একটা রেস্টুরেন্টে চা খেয়ে নিয়েছিল তারা। অনেক কথাও হয়েছিল। এলোমেলো কথা। আর কথার মাঝখানে লজ্জার সংকোচের এবং আকর্ষণের ঝাপটা এসে লাগছিল। মাঝে মাঝে কথা বন্ধ হয়ে যায়। নীরবতা নৈকট্যকে অদ্ভুতভাবে টের পায় তারা।

শেষ পর্যন্ত কিছুই বলা হয়নি। টালিগঞ্জের খাল পাড় পর্যন্ত নীপাকে পৌঁছে দিল অমিয়। তারপর সিগারেট জ্বেলে থেমে—থাকা স্কুটারে বসে দেখল নীপা নড়বড়ে সাঁকো পেরিয়ে ওপারে চলে যাচ্ছে। যাওয়ার সময়ে অনেক বার পিছু ফিরে চেয়ে দেখল তাকে। মুখটায় স্মিত গভীর একটা বিশ্বস্ততা।

না, কিছু হয়নি শেষ পর্যন্ত। হয়তো হতে পারত। মাঝপথে হাসি এসে সব তছনছ করে দিল। তুলে নিল তাকে। নিল, আবার নিলও না। বড়ঘরের মেয়েরা যেমন নিত্য নূতন জিনিস কিনে সে—সব জিনিসের কথা ভুলে যায় দু'দিন পর। অবহেলায় ফেলে রেখে দেয়। তেমনি অমিয়কে কবে ভুলে গেছে হাসি।

ঘোলা ময়লা কাচের ভিতর দিয়ে কয়েক পলক চেয়ে থাকে অমিয়। নীপা টের পায়। মুখ তোলে।

অমিয় একটু হাসে। নীপাও একটু হাসে। ওর সিঁথিতে সিঁদুর। হাসিটা তেমনি। সহৃদয়তায় ভরা। দেখে ভিতরে একরকম ছুঁচ ফোটার যন্ত্রণা হয়। ঘোলা ময়লা কাচের ভিতর দিয়ে প্রায়ান্ধকার করিডোরে দাঁড়ানো অমিয়কে চিনতে পেরেছে নীপা।

চেয়ারটা ঠেলে সরিয়ে উঠে এল।

কী খবর? আবার বুঝি জ্বালাতে এসেছেন? নীপা করিডোরে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে।

অমিয় মাথা নাড়ল। বলল, না। কোনওদিন আপনাকে কাজ ছাড়া দেখি না। আজও দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।

কাজের জায়গায় দেখা হলে কাজ ছাড়া কী দেখবেন?

অমিয়র এখন আর সাহসের অভাব হয় না। সে বলে, অকাজের জায়গায় কেমন দেখাবে কে জানে!

আশেপাশে ব্যস্তসমস্ত লোকেরা যাচ্ছে—আসছে। নীপা বলে, বলুন না বাবা কী কাজ আছে। কোনও চেকের ক্লিয়ারেন্স আসেনি নাকি!

ও—সব নয়। অ্যাকাউন্টে টাকাই নেই। চেক জমা দিই না অনেক দিন।

সে তো জানি।

কী করে জানলেন?

আপনার অ্যাকাউন্টটা দেখি মাঝে মাঝে। আজকাল কেবল উইথড্রয়াল হচ্ছে, জমা পড়ে না। কী ব্যাপার?

অমিয় একটা শ্বাস ফেলে। মাথা নেড়ে বলে, আপনি আমাকে মনে রেখেছেন।

মনে রাখব না! ব্যাঙ্কের সব ক্লায়েন্টকে আমার মনে থাকে।

বানানো কথা। মিথ্যে।

অমিয় একটা বিষ—বোলতার কামড় খায় এই কথায়। বলে, কোনও পক্ষপাত নেই, না?

নীপার মুখে একটু দুঃখের ছায়া খোঁজে অমিয়। পায় না। হাসিকে বিয়ে করার পর মাস দুই বাদে নীপার বিয়ে হয়। কেউ কাউকে নিমন্ত্রণ করেনি। জানায়ওনি। কিন্তু জানাবার দরকার হয় না। অমিয় তখন বিয়ের পর দেদার টাকা ওড়াত। হাসিকে স্কুটারের পিছনে বসিয়ে নিয়ে আসত ব্যাঙ্কে। টাকা তুলত আর টোকেন নিয়ে অপেক্ষা করার সময় কলকলাত দুজনে। সে—সব কি দেখেনি নীপা? তেমনি আবার দু'মাস বাদে নীপার সিঁথিতে সিঁদুর দেখেছে অমিয়। কেউ কাউকে প্রশ্ন করেনি। জেনে গেছে।

নীপার মুখে তাই কোনও দুঃখের ছায়া নেই। কিন্তু তবু সে কেন অমিয়র অ্যাকাউন্টের খবর রাখে?

অমিয় বলে, আপনার টিফিনের সময় হয়নি?

হয়ে গেছে। কেন?

হতাশ অমিয় বলে, হয়ে গেছে! আমি ভাবছিলাম আজ আপনাকে খাওয়াব।

তাই বা কেন! কোনও খাওয়া কি পাওনা হয়েছে। নীপা দাঁতে ঠোঁট কামড়ে হাসল।

অমিয় মাথা নেড়ে বলল, খাওয়ার জন্য নয়।

তা হলে?

অমিয় বুঝল, নীপার সঙ্গে আসলে আর কোনও বোঝাবুঝি তৈরি হয়নি। এমন অধিকার তার নেই যে সে ইঙ্গিতে ডেকে নিয়ে যেতে পারে বিশ্বস্ত নীপাকে। এখন তার উচিত হবে ভদ্রতাসূচক দু'—একটি কথা বলে চলে যাওয়া।

কিন্তু চলে যেতে পারে না অমিয়। আস্তে করে বলে, আপনি মিস চক্রবর্তী ছিলেন, এখন কী হয়েছেন?

নীপা একটু তাকিয়ে থাকে তার দিকে। বোধহয় মনে মনে বলে, আর যা—ই হই, বাগচী হইনি। তাকিয়ে থেকে নীপা মৃদুস্বরে বলে, আমার বুঝি কাজ নেই। কী দরকার বললেই তো হয়।

আমার জানা দরকার, আপনি চক্রবর্তী ছেড়ে কী হয়েছেন!

নীপা মৃদু হাসল বটে, কিন্তু ভ্রূ কুঁচকে গেল একটু। বলল, চক্রবর্তীদের অনেক গোত্র হয় জানেন তো! আমি চক্রবর্তী থেকে চক্রবর্তীই হয়েছি। গোত্রটা আলাদা। জেনে হবে কী!

এমনি, কৌতূহল।

আপনার চেহারাটা খারাপ হয়ে গেছে। আনঅফিশিয়াল কথাটা বলে ফেলেই বোধহয় লজ্জা পায় নীপা। মুখ ফিরিয়ে বলে, চলি।

অমিয় মাথা নাড়ল, তারপর করিডোর ধরে হাঁটতে থাকে ধীরে ধীরে। দরজাটার কাছ বরাবর এসে ফিরে তাকায়। নীপা দাঁড়িয়ে আছে।

অন্য মেয়ে হলে এই অবস্থায় চোখে চোখ পড়তেই পালিয়ে যেত। নীপা পালাল না। হাতটা তুলে তাকে থামতে ইঙ্গিত করল। তারপর ঢুকে গেল ভিতরে।

অমিয় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। অপেক্ষা করে। একটু বাদেই নীপা আসে। হাতে ব্যাগ, ছোট ছাতা, মুখখানায় একটু রক্তাভা। কাছে এসে বলে, আজ ছুটি নিয়ে এলাম। বাড়ি যাব।

অমিয় অবাক হয়। বলে, বাড়ি যাবেন?

হ্যাঁ।

তা হলে আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখলেন যে!

নীপা উত্তর দিল না।

রাস্তায় এসে তারা ঝিরঝিরে একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়ায়। অদূরে অমিয়র স্কুটার। অমিয় স্কুটারটা দেখিয়ে বলে, আজ আপনাকে পৌঁছে দিতে পারি। যাবেন?

মুখ নিচু করে নীপা মাথা নেড়ে বলে, না। রাধাবাজারে আমার স্বামীর ঘড়ির দোকান আছে। কাছেই। এখন ওখানে যাব। সেখানে আমাদের গাড়ি আছে। তাতে ফিরব। এখন আমি নর্থ—এ থাকি। পাইকপাড়ায়।

ও। অমিয় বুঝতে একটু সময় নেয়। নীপাকে ছাড়া নীপার আর কিছুই জানত না অমিয়। এখনও জানে না। শুধু ঘড়ির দোকান, স্বামী, গাড়ি আর পাইকপাড়া শব্দগুলো তার ভিতরে খুচরো পয়সার মতো হাত খসে পড়ে গিয়ে গড়াতে থাকে।

আপনি কী যেন বলতে চেয়েছিলেন। বললেন না।

অমিয় কষ্টে হাসে। ঘড়ির দোকানে স্বামী। স্বামীর গাড়ি। আর গাড়িতে পাইকপাড়া। এ সবই খুব রহস্যময় লাগে তার কাছে। নীপার কেন স্বামী থাকবে। সে কেন স্বামীর গাড়িতে পাইকপাড়া যাবে।

কেন সে আজও অমিয়র নিজস্ব জিনিস নয়, তা ভেবে এক ধরনের ক্রোধ আর হতাশা মিশে যায় তার ভিতরে।

সে বলল, শুনুন।

কী?

আপনার সম্পর্কে কিছুই কোনও দিন জেনে নেওয়া হয়নি।

নীপা মৃদু হেসে বলে, জানাটা কি দরকার ছিল?

আমার সম্পর্কেও আপনি কিছু জানেন না।

না। তবে আপনার বউকে দেখেছি। খুব সুন্দর বউ।

অমিয় স্থির চোখে নীপাকে দেখে। ঠিক। হাসি নীপার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দরী। হাসিও কালো। নীপার মতোই। তবু হাসির মুখ—চোখ, শরীরের গঠন অনেক উঁচু জাতের। নীপার হিংসে হতে পারে।

অমিয় মুখটা ফিরিয়ে নিয়ে বলে, আমরা কেউ কারও সম্পর্কে জানলাম না কেন?

নীপা এ—কথার উত্তর দিল না। কারণ, এ বড় বিপজ্জনক কথা। উত্তর হয় না।

অমিয় বলল, স্কুটার থাক, চলুন আপনাকে রাধাবাজারের দিকে একটু এগিয়ে দিই। পথে বরং এক কাপ চা খেয়ে নেব।

তারা হাঁটতে থাকে। নীপা মাথা নত রাখে। অমিয়কে সে যে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দিচ্ছে সে—বিষয়ে সচেতন। দূরত্ব বজায় রাখছে। বোধহয় ভয়ও পাচ্ছে মনে মনে। আবার বোধহয় চাইছেও, অমিয় তাকে কিছু বলুক।

আজ এমন করছেন, কী হয়েছে আপনার? নীপা তার মস্ত চোখ তুলে হঠাৎ বলে।

আশপাশ দিয়ে কলকাতার দৃশ্যাবলী মিলিয়ে যাচ্ছে ডাইলিউশনে। রেলগাড়ির মতো বয়ে যাচ্ছে কলকাতা। সেই গতিশীলতার মধ্যে তারা ধীরে হাঁটে। অমিয় বলে, আমার ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট কী বলছে?

নীপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ও!

আবার হাঁটতে থাকে তারা। ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিট পার হতে হতে অমিয় বলে, আমি ভালো নেই নীপা।

নিজের নাম শুনে একটু চমকে ওঠে নীপা। চমকটা ঢাকা দিয়ে মৃদুস্বরে বলে, কেন? ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টের কথা ভেবে?

না। অমিয় বলে, আমি তোমাকে ভালোবাসতাম। কিন্তু সে—কথা কখনও বলা হয়নি। এই অপরাধে।

নীপা ঠোঁট কামড়ায়, মাথা নত করে।

কলকাতার প্রকাশ্য রাজপথে। চারদিকে মানুষ আর মানুষের মধ্যে, প্রবল গাড়ির আওয়াজের মধ্যে এক নিস্তব্ধতার ঘেরাটোপ নেমে আসে।

অমিয় হঠাৎ দাঁড়ায়। ভিতরে বিষবাষ্প জমে উঠেছে আজ।

নীপা তার দিকে মুখ তুলে তাকায়। দুটি চোখ বাঙ্ময়। কিছু বলতে চায়।

অমিয় আস্তে করে বলে, দেখা হবে। আবার।

কোথায়?

অমিয় তেমনি আস্তে টরে—টক্কার মতো মৃদু লয়ে বলে, একটা স্টিমারঘাট আছে। সেইখানে সকলের দেখা হয়।

কোথায়? নীপার কপালে ভাঁজ পড়ে।

ধু—ধু গড়ানে বালিয়াড়ি বহু দূর নেমে গেছে। তারপর কালো গভীর জল। একটা ফাঁকা শূন্য জেটি। অথৈ জল। ওপরে একটা কালো আকাশ ঝুঁকে আছে। বালির ওপরে পড়ে আছে একটা সাপের খোলস। হাহাকার করে বাতাস বয়ে যাচ্ছে সেখানে।

অবাক চোখে চেয়ে আছে মেয়েটা।

অমিয় বলে, দেখা হবে।

তারপর হেঁটে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল অমিয়।

নীপা খুব ধীরে ধীরে হাঁটে। ভাবে। মুখে কয়েকটা দুশ্চিন্তার রেখা খেলা করে যায়। তারপর কখন যেন চোখ ভরে জল আসে। জলভরা চোখে চেয়ে দেখে। কলকাতা শহরটা কেমন ভেঙেচুরে গেছে! আবছা, অস্পষ্ট আর অলীক হয়ে গেল চারধারে। অর্থহীন হয়ে গেল জীবন। বেলুনের মতো ফেটে গেল বাস্তবটা।

চোখের জল মুছে নেয় নীপা। ভুল রাস্তায় চলে যাচ্ছিল। সতর্ক হয়ে ফিরে এল সঠিক রাস্তায়। মানুষটা কেমন! খুব অদ্ভুত, না? ফের জল আসে চোখে। ওর অ্যাকাউন্টে মোটে দু'শো পঁয়ত্রিশ টাকা আছে, নীপা জানে।

স্বামীর দোকানের দিকে হাঁটতে থাকে নীপা। কলকাতা শহর চারদিকে, তবু কেবলই মনে হয়, বালিয়াড়ির ভিতরে ডুবে যাচ্ছে পা। সামনে জল। জলের শব্দ। কেউ কোথাও নেই, কেবল বাতাস ঝড়ের মতো বয়ে যায়। মাথার ওপর কালো আকাশ ঝুঁকে আছে।

টাপে টোপে প্যান্ডেলের ফাঁক—ফোঁকর দিয়ে উঁকি দেয় কুকুরের মুখ। তারা আসছে সতর্ক পায়ে। ক্রমে ক্রমে। বেড়ালেরা আসছে নিঃশব্দে, ভিখিরিরা বাইরের গাছতলায় অনেকক্ষণ বসে আছে। একটা ভিখিরির ছেলে ঢুকে গেছে প্যান্ডেলে। কুকুর—বেড়ালের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে পাতার ঠোঙায় কুড়িয়ে নিচ্ছে এঁটো—কাঁটা। মাংসের হাড়, লুচির টুকরো, মাছের কাঁটা জড়ো করছে এক জায়গায়। খাঁ খাঁ করছে প্যান্ডেল। স্টিক লাইট জ্বলছে, ঘুরছে পাখা, এঁটো পাতা উড়ে উড়ে পড়ছে মাটিতে। উৎসব—শেষের বীভৎসতা চার দিকে।

বর—বউ শোওয়ার ঘরে চলে গেল। নিয়ম নয়, কিন্তু আজকাল তো কেউ আর বাসর জাগে না। প্যান্ডেলের এক কোণে এখনও যজ্ঞের ছাই পড়ে আছে, দুটো রং করা চিত্রিত পিঁড়ি এখনও তোলা হয়নি, দেবদারু পাতায় সাজানো দরজায় মঙ্গল কলস, রঙিন কাগজের শিকল দুলছে হাওয়ায়।

একটা সিগারেট ধরিয়ে অমিয় দৃশ্যটা দেখে। সে এ—রকমভাবে বিয়ে করেনি। কয়েকটা সই করে তারা বিছানায় চলে গিয়েছিল।

পিসেমশাইয়ের হাতে এক হাজার টাকা দেওয়া গেছে অবশেষে। গতকাল সারা দিন ঘুরে বেড়িয়েছে অমিয়। টাকা—টাকা করে। প্যাটারসনের লাহিড়ী শুনে বলল, দূর মশাই, কে—বি ফিট করুন না।

কে—বি কী?

কাবলে। আপনার যদি জানাশুনো না থাকে আমি ফিট করে দিচ্ছি। কিন্তু সাবধানে ট্যাকল করবেন। এক হাজার ধার নিলে দু'হাজার লিখে দিতে হবে।

সে কী?

ভয় নেই, আসলে ওরা লাইসেন্স—ওলা মানিলেন্ডার, গভর্নমেন্টের বেঁধে—দেওয়া সুদের বেশি আইনত নিতে পারে না। আপনাকে লেখাবে ছয় পারসেন্ট সুদ, নেবে তার দ্বিগুণের বেশি। যদি বাইচান্স আপনি সুদ নিয়ে ঝামেলা করেন, তখন মামলা করবে দু'হাজার টাকার ওপর। আর যদি সুদ ঠিকমতো দিয়ে এক হাজার শোধ দেন তা হলে কাগজ ছিঁড়ে ফেলবে। কিন্তু সাবধানে ট্যাকল করবেন।

আজ সকালে টাকা পেয়ে গেছে অমিয়। এক হাজার। পিশেমশাইকে কথামতো দেওয়া গেল। রেখার বর ভালোই হল। টাটার ইঞ্জিনিয়ার। দু'হাজার নগদ, গোদরেজের আলমারি, সিঙ্গল খাট দুটো, সোফাসেট, পনেরো ভরি গয়না। পিসেমশাইয়ের বোধহয় আকাশ—বাতাস চাঁদ—সূর্যের আলো ছাড়া আর কিছু রইল না। অমিয়র জন্য সারা দিন হা—পিত্যেশ করে বসে ছিলেন বুড়ো মানুষ। অমিয় এসে টাকাটা হাতে দিতেই উদ্ভাসিত হয়ে গেল মুখখানা। চোখের কোলে জল। বললেন, ভাবলাম তুই বুঝি আর এলি না! ভয়ে তোর অফিসে ফোন করিনি, যদি খারাপ খবর শুনি!

অমিয় একটু হেসেছিল।

হাসি আজ কিছুতেই ট্যাক্সিতে উঠতে চায়নি। বলেছে, এত সুন্দর রাত আজ। বাতাস দিচ্ছে, চাঁদ উঠেছে, বন্ধ গাড়িতে বসে কেন যাব! আমাকে তোমার স্কুটারে নিয়ে চলো।

তা—ই এনেছে অমিয়। তার কোমর ধরে বসে এল হাসি। মেয়েদের দঙ্গলে মিশে গেছে এখন। উৎসবে হাসিকে চেনা যায় না।

রাস্তায় পার্ক—করা শেষ দুটো মার্ক টু গাড়ির একটা ছেড়ে গেল সোনাদাকে নিয়ে। যাওয়ার সময়ে সোনাদা মুখ বাড়িয়ে বলল, অমিয় তোর সঙ্গে কথা আছে।

কী কথা?

সেই যে, মনে নেই কী বলেছিলি?

কী সোনাদা?

তুই বড় পাজি অমিয়, চিরকাল পাজি ছিলি।

কেন?

আমার বয়স হচ্ছে না রে? এই বয়সে মানুষ একটু গুছিয়ে বসতে চায়, এই বয়সেই তো সংসারের ভোগ—সুখ, এই চল্লিশ—পঁয়তাল্লিশে।

অমিয় চেঁচিয়ে হেসে বলেছে, ঠিকই তো।

তবে তুই কেন আমাকে স্টিমারঘাটের কথা বলতে গেলি?

কেন, কী হয়েছে?

অমিয়, তুই কী বলিস তুই জানিস না! তুই চিরকালের পাজি। জানিস না, ওটা বলতে নেই! অমিয়, তুই চলে আসার পর থেকেই আমার বড় অস্থির লাগে। রাতে ঘুম হয় না। সারা দিন যখন—তখন অন্যমনস্ক হয়ে যাই। কেবলই মনে পড়ে—স্টিমারঘাট—স্টিমারঘাট।

শেষ মার্ক টু—টা দাঁড়িয়ে আছে। ওটা কার তা জানে না অমিয়। গাড়িটার আড়ালে তার স্কুটার হিম হয়ে আছে। হ্যান্ডেলটা এক দিকে বাঁকানো। দেখে মনে হয়, ক্লান্ত মানুষ যেমন বসে বসে ঘুমোয় তেমনি ঘুমোচ্ছে।

পরিবেশনের সময়ে এঁটো—আঁটার গন্ধে গা গুলিয়েছে বলে কিছু খায়নি অমিয়। হাসি কখন আসবে কে জানে! রাত অনেক হয়েছে। পায়ে পায়ে প্যান্ডেল ছেড়ে খোলা মাঠে আসে অমিয়। ঠান্ডা। দক্ষিণের বাতাস দিচ্ছে। সেই বাতাসে আকাশ—জোড়া এক বৃক্ষ নড়ে ওঠে, বকুলের মতো খসে পড়ে একটি তারা।

অন্ধকার বারান্দায় দুই বুড়ো বসে আছেন। বরের মামা, আর পিসেমশাই। বরের মামার দু'গালে পানের ঢিবি। তিনি পিসেমশাইয়ের দিকে ঝুঁকে বলছেন, পুরুতরা আজকাল বড় শর্টকার্ট শিখেছে বিয়াই, আধ ঘণ্টায় কুসুমডিঙে সেরে ফেলল। আমার বিয়ের সময়ে চার ঘণ্টা লেগেছিল যজ্ঞে। কনে ঘুমিয়ে পড়েছিল, তাকে ঢুলতে দেখে আমি চিমটি কেটে জাগিয়ে দিই।

পিসেমশাই মুখ তুলে বলে, তুই কিছু খাসনি অমিয়?

না। বমি—বমি করছে।

খুব খেটেছিস। সোমাকে বলি তোকে একটু শরবত করে দিক।

না, আমি এবার চলে যাই।

অমিয়, লোকজন খেয়ে কী বলল? কিছু দোষ ধরেনি তো?

বরের মামা পিচ ফেলে বললেন, আজকালকার বাজারে যা করেছেন যথেষ্ট।

ঘরে মেয়েদের ভিড়। অমিয় দরজায় দাঁড়িয়ে দেখে। হাসিকে দেখা যায় না।

সেই ভিড় থেকে সোমাদি এগিয়ে আসে, অমিয়, কী খাবি?

কিছু না।

আমি তো নেমন্তন্নের রান্না খেতে পারি না, তাই এ—ঘরে একটু ঝোল—ভাত রেঁধে রেখেছি। খাবি তো আয় ভাগ করে খাই।

হাসি কোথায় সোমাদি?

ওকে তো সব ঘিরে রেখেছে। বলছে, তুমি ফাঁকি দিয়ে রেজেস্ট্রি বিয়ে করেছ, আমাদের খাওয়া মার গেছে। এবার খাওয়াও। অমিয়, হাসি দেখতে কী সুন্দর হয়েছে।

রাত অনেক হয়ে গেল সোমাদি। হাসিকে ডাকো।

তোর তো স্কুটার আছে, ভুস করে চলে যাবি। রাত হলে ভয় কী? তোকে একটু দই—মিষ্টি এনে দিই?

সোমাদি, তুমি এত কষ্ট করো কেন?

কীসের কষ্ট?

খুব খাটো তুমি, টিফিনের পয়সা বাঁচাও, এত খেটে কী হবে সোমাদি?

তোকে তো বলেছি, আবার জিজ্ঞেস করছিস কেন?

সোমাদি, একটা স্টিমারঘাট—

অমিয়, আমার এখনও অনেক কিছু করা বাকি, টাকা জমাচ্ছি, আমার অনেক দিনের শখ, একটা রেকর্ড—চেঞ্জার কিনব। রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ, রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের গানের অনেক রেকর্ড। শোন অমিয়, তুই নাকি রেখার বিয়ের জন্য মেশোমশাইকে এক হাজার টাকা দিয়েছিস। সত্যি?

সোমাদি, তোমাকে সেদিন বলছিলাম—

কী বলছিলি?

একটা ফেরিঘাটের কথা—

অমিয়, মেসোমশাইকে এক হাজার টাকা দিয়ে খুব ভালো করেছিস। আমারও দেওয়ার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু কী করে দেব? জানিস তো, গত চোদ্দো—পনেরো বছর আমার চাকরির ওপরই সংসার চলছে। রেখাকে একটা আংটি দিলাম, তাতেই ধার হয়ে গেল। তুই টাকা দিয়ে ভালো করেছিস। মেসোমশাই সবাইকে ডেকে ডেকে তোর দেওয়া টাকার কথা বলছেন।

সোমাদি—

শোন অমিয়, এখন আর আমার চাকরি করতে ভালো লাগে না রে। তুই যে সেদিন গিয়ে বললি, ভালোবাসার লোক না থাকলে রোজগার করে সুখ নেই, সেটা বাজে কথা নয়। এখন আমি বুঝতে পারি সংসারে আমার যেটুকু আদর তা ওই চাকরিটার জন্য। এ—চাকরিটা যদি ছাড়ি তবে দেখব আমি কিছু নই, কেউ নই। আজকাল তাই ভীষণ টায়ার্ড লাগে। বাসায় ফিরে রাত্রে এমন মন খারাপ লাগে। একটা ইজিচেয়ার কিনেছি, সামনের মাসে কিনব একটা রেকর্ড—চেঞ্জার। বুঝলি অমিয়, বারান্দায় অন্ধকারে বসব। উঠোনে থাকবে অন্ধকার, চুপচাপ বসে চেঞ্জার চালিয়ে দেব—গান হবে—দুঃখের গান—বিরহের গান... শুনতে শুনতে কাঁদব হয়তো—আর মনে পড়বে... কী মনে পড়বে রে অমিয়...?

অমিয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, তুমি তো জানো, সোমাদি...

সোমাদি মাথা নেড়ে চাপা গলায় বলে, জানিই তো, জানব না কেন? মনে পড়বে...

পিসেমশাই সামনে এসে দাঁড়ান। কুঁজো দেখায় তাঁকে, বুড়ো দেখায়। অমিয়র দিকে অপলক একটু তাকিয়ে থেকে বলেন, আমি ভাবতাম ওর পিসিমা মরে গেছে বলেই বোধহয় অমিয় আর আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না, কিন্তু তা নয়। সোমা, অমিয় আমাকে—

জানি মেসোমশাই। অমিয় বড় ভালো ছেলে।

পিসেমশাই শ্বাস ছেড়ে বলেন, আমি বড় একা হয়ে গেলাম। শেষ মেয়ের বিয়ে হয়ে গেল। সোমা, মাঝে মাঝে আসবি তো? অমিয় তুই?

আসব না কেন!

কী কথা হচ্ছিল তোদের?

সোমাদি মাথা নিচু করে বলে, কিছু না মেসোমশাই, অমিয় মাঝে মাঝে একটা ফেরিঘাটের কথা বলছে—

ফেরিঘাট! কীসের ফেরিঘাট? কী রে অমিয়?

স্টিমার বাঁধার জেটি, জল...

ওঃ। পিসেমশাই হাসেন, স্টিমারঘাট মনে পড়তেই খালাসিদের মাংস রান্নার গন্ধ নাকে এসে লাগে এখনও। গোয়ালন্দে পারাপারের সময়ে ওই গন্ধ যে কী ভালো লাগত। বুঝলি, বাহাদুরাবাদে একবার কাজলি মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম—সরষেবাটা, কাঁচালঙ্কা দিয়ে ঝোল—তেমন আর কখনও কি খাওয়া হবে? এক কাঠা চালের ভাত তুলে ফেলেছিলাম। তুই কোন ফেরিঘাটের কথা বলছিস অমিয়? গোয়ালন্দ? না কি...

কী জানি? আমি ঠিক জানি না। খুব উঁচু একটা বালিয়াড়ি গড়িয়ে নেমে গেছে বহু দূর পর্যন্ত... কালো ছোট্ট একটা জেটি...নির্জন...বালিতে একটা সাপের খোলস পড়ে আছে কেবল...আবছায়ায় জল দেখা যায়...সে কী জল...অনন্ত, অথৈ এক নদী বয়ে যাচ্ছে...

পিসেমশাই আর একটু কুঁজো হয়ে যান। একটা শ্বাস ফেলে বলেন, এখন এই বাড়িতে আমার একা কাটবে, বাদবাকি যে ক'টা দিন আছি। অমিয়, রাত হল যে, বউমাকে নিয়ে যাবি, অনেকটা রাস্তা, এইবার বেরিয়ে পড়। সোমা, তুই তো আজ যাবি না, না?

না।

অমিয় আর দেরি করিস না। সোমা, বউমাকে ডেকে দে।

দিই।

বড় একা লাগবে, বুঝলি অমিয়? মাঝে মাঝে বউমাকে নিয়ে চলে আসবি। দু'—চার দিন করে থেকে যাবি। মনে করিস, আমি তোর এক বুড়ো ছেলে, আমার তো কেউ রইল না...

অমিয়র স্কুটার ডাকছে। গুড় গুড় গুড় গুড়। পিছনে হাসি। বাতাস সামনে থেকে পিছনে বয়ে যাচ্ছে। তবু মাঝে মাঝে এক এক ঝলক হাসির গন্ধ এসে নাকে লাগে। হাসির গন্ধ! তা তো নয় হাসির আবার গন্ধ কী? ও তো ওর খোঁপার বেলফুলের গন্ধ, সেন্ট আর প্রসাধনের গন্ধ।

হাসির মুখ দেখতে পাচ্ছে না অমিয়। কেবল তার দু'খানা হাত অমিয়র কোমর বেষ্টন করে আছে। এক বার ঝুঁকে নিজের পেটের কাছে হাসির জড়িয়ে থাকা হাতের পাতাদু'টি দেখল অমিয়। আঙুলে আংটি ঝলসে ওঠে। মোমে মাজা আঙুলগুলি কী নরম হয়ে লেগে আছে তার পেটে।

হাসি দুরন্ত শ্বাসের সঙ্গে বলে, আরও জোরে চালাও না।

কেন?

জোরে না চালালে স্কুটারে ওঠার আনন্দ কী!

হাসি, আমার স্কুটারটা পুরনো হয়েছে। স্পিড নেয় না।

পচা, তোমার স্কুটারটা পচা।

অমিয় হাসে। তিন, সাড়ে তিন বছর আগে ক্যাথিড্রাল রোডে, এই স্কুটারে...

জ্যোৎস্না ফুটেছে কেমন, দেখছ?

হুঁ।

ঠিক দুধভাতের মতো জ্যোৎস্না, আমার খেতে ইচ্ছে করে।

হাসি, তুমি কবে যাচ্ছ?

তেরোই।

তোমার যদি টাকার দরকার থাকে...

সামনে ওটা কী, ওই উঁচু মতো?

গড়িয়াহাটা ব্রিজ।

ওমা! ওর ওপর দিয়ে তো রোজ যাই—আসি, কই অত উঁচু বলে তো মনে হয় না, ঠিক টিলার মতো দেখাচ্ছে দেখো। চা—বাগানে আমরা ছেলেবেলায় টিলা থেকে ছুটে নামতাম...একবার দৌড় শুরু করলে আর থামা যায় না, কেবলই গতি বেড়ে যায়।

হুঁ।

তোমার স্কুটারটা পচা। আর একটু জোরে চালাও না।

কেন?

আমার স্পিড ভালো লাগে।

গুড় গুড় করে স্কুটার ডাকে। গড়িয়াহাটা ব্রিজের গোড়া থেকে চড়াই ভাঙে। অমিয় স্পষ্টই টের পায় তার বয়স্ক স্কুটারটার এই চড়াই ভাঙতে কষ্ট হচ্ছে। খুব বেশি দূর নয় আর, সে মনে মনে তার স্কুটারকে বলে, 'আর একটু কষ্ট করো স্কুটার। তারপর অন্ধকার সিঁড়ির নীচে তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমোবে।'

ব্রিজের ওপর ঠিক মাঝখানটায় দাঁড়াবে?

হাসি, অনেক রাত হয়েছে।

ক'টা বাজে?

বারোটা চল্লিশ।

হোকগে। তুমি দাঁড়াও।

ব্রিজের ঠিক ওপরটায় বাতাসের জোর বেশি। আকাশের কাছাকাছি উঠে তারা দাঁড়ায়। হাসি রেলিঙের কাছে চলে যায়। ডেকে বলে, দেখো, কত দূর পর্যন্ত কী ভীষণ জ্যোৎস্না। সব দেখা যাচ্ছে। এত রাতে কলকাতা কখনও দেখিনি।

অমিয় বাতাসে সিগারেট ধরাতে পারছিল না। বার বার দেশলাইয়ের কাঠি নিভে যাচ্ছে। সে স্কুটারের ওপর না—ধরানো সিগারেট মুখে নিয়ে বসে রইল। হাসি তাকে ডাকে না। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে হাসি একা জ্যোৎস্নায় প্লাবিত অনন্ত শহরটি দেখে মুগ্ধ চোখে। এখন যদি নিঃশব্দে অমিয় তার স্কুটারকে ব্রিজের ঢালুর ওপর দিয়ে গড়িয়ে দেয়, যদি চলে যায়, তা হলে হাসি অনেকক্ষণ টেরই পাবে না। যে অমিয় চলে গেছে। কিছুক্ষণ পরে মুখ ফিরিয়ে এবং অমিয়কে না—দেখে একটুও অবাক হবে না হাসি। তার মনেও পড়বে না যে, এই ব্রিজের ওপর সে অমিয়র সঙ্গে এসেছিল, তার স্কুটারে। হাসির মনেই পড়বে না।

না—ধরানো সিগারেট মুখে অমিয় অপেক্ষা করে। বাতাসে আকাশজোড়া এক বৃক্ষ নড়ে। বকুলের মতো খসে পড়ে তারা। অমিয় অপেক্ষা করে।

এক দিন যায় দু'দিন যায়।

দীর্ঘ টেন্ডার টাইপ করতে করতে অমিয়র কাঁধ ব্যথা করে। চোখে ঝাপসা দেখে। সিগারেটে—সিগারেটে জিভ বিস্বাদ। রাজেন চা এনে রেখে গেছে। খাওয়া হয়নি।

বাগচী। কল্যাণ ডাকে।

উঁ?

আপনার কি কিছু টাকার দরকার?

অমিয় হাসে।

রাজেনের কাছে আমি আরও ছ'শো টাকা রেখে দিয়েছি। আমি থাকি বা না—থাকি, যখন দরকার হয় নেবেন।

অনেক ধার হয়ে গেল মুখার্জি।

আপনার সময়টা ভালো যাচ্ছে না। সেনগুপ্তের কোনও পাত্তা পেলেন?

না।

কত টাকার বিল পেমেন্ট নিয়ে গেছে?

প্রায় সাত হাজার।

ওকে খুঁজে পেলে কী করবেন—

কিছুই না। কেবল একটা কথা বলব—

কী কথা?

বলব...

অমিয় আর বলে না। বলতে পারে না। টাইপরাইটারের ওপর ঝুঁকে পড়ে তার মুখ। চোখে মেঘ। বাষ্পরাশি জমে ওঠে। সে দেখে, টাইপ করা লাইনের অক্ষরগুলো কে যেন আঙুলের টানে লেপে দিয়ে গেছে। কালো রেখার মতো দেখায়। লাইনগুলো ধীরে আঁকাবাঁকা হয়ে যেতে থাকে। দুলতে থাকে। অমিয় দেখতে পায়, লাইনগুলো দুলতে দুলতে ঢেউ হয়ে যাচ্ছে।...ঢেউ আর ঢেউ। ফুলে উঠছে জল—অনন্ত অথৈ মহাসমুদ্রের মতো জল। কালো মহা আকাশ ঝুঁকে আছে তার ওপর। বালিয়াড়ি ধু—ধু করে সাদা হাড়ের মতো। গড়ানে বালি, বালির ওপর ঢেউয়ের দাগ। সাপের খোলাস উলটে পড়ে আছে।

মুখার্জি, আমি আপনাকে একটা জিনিস প্রেজেন্ট করব।

কী?

আমার স্কুটারটা।

তা কেন বাগচী। এখন আপনার সময় ভালো যাচ্ছে না। প্রেজেন্ট সুসময়ে করবেন।

এই ঠিক সময় মুখার্জি। স্কুটারটার আর আমার দরকার নেই।

কল্যাণ একটু চুপ করে থাকে, যদি দরকার না থাকে তো ওটা আমি কিনে নিতে পারি।

না মুখার্জি, আমাদের বংশে কেউ কখনও ঘরের জিনিস বেচেনি। আমি ওটা আপনাকে দিয়ে দেব। অভাবের সময়েই দেওয়া ভালো, সুসময়ে দেওয়া হয় না।

কল্যাণ চুপ করে থাকে।

রাজেনের কাছে টাকাটা আছে বাগচী, দরকার হলে নেবেন।

আচ্ছা।

টেন্ডার সিল করে অমিয় বেরোয়। মেঘ কেটে রোদ উঠছে। চার দিকে পাথুরে শহর। প্রতিদ্বন্দ্বী কলকাতা। নীচে স্কুটারটা দাঁড়িয়ে আছে। অমিয় চেয়ে থাকে। তারপর স্কুটার ছাড়ে।

লাহিড়ী।

উঁ।

টেন্ডার দিয়ে গেলাম।

আচ্ছা। দেখব।

লাহিড়ী, প্যাটারসন কি এখনও আমাকে বিশ্বাস করে?

লাহিড়ী হাসে। বলে, ও—সব রোমান্টিক কথা ছাড়ুন। কে কাকে বিশ্বাস করে! অর্ডার আপনি পাবেন। ঠিকমতো রেট দিয়েছেন তো, যেমন বলেছিলাম?

দিয়েছি।

ঠিক আছে।

অমিয় বেরোয়। ঘুরতে থাকে। মাঝে মাঝে নিজের অফিস ছুঁয়ে যায়।

বাগচী।

উঁ?

ল্যাংগুয়েজ নিয়েই সবচেয়ে মুশকিল।

অমিয় হাসে। বলে, কেন?

রজত হাই তুলে বলে, কিছুতেই ল্যাংগুয়েজ খুঁজে পাচ্ছি না। অথচ মেয়েটা রোজই মুখের দিকে চেয়ে থাকে। ভারী অস্বস্তি।

চেয়ে থাকে কেন?

বোধহয় এক্সপেক্ট করে, জার্মানি যাওয়ার আগে আমি তাকে ফাইনাল কিছু বলে যাব। বাঙালি মেয়েদের জীবন খুব অনিশ্চিত তো। অথচ আমি কিছু বলতে পারছি না। ল্যাংগুয়েজ নিয়েই মুশকিল।

কবে যাচ্ছেন?

হরি সিং—এর সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করেছি। দিন কুড়ির মধ্যেই চলে যাব।

আমাদের একা লাগবে।

জানি। আফটার অল উই ওয়্যর কমরেডস। বাগচী, আপনার জন্য কী পাঠাব বললেন না?

ভেবে দেখি।

সেনগুপ্তকে যদি কখনও খুঁজে পান বাগচী, গিভ হিম অ্যান এক্সট্রা কিক ফর মি। মনে রাখবেন।

অমিয় হাসে।

মিশ্রিলাল এসে চুপ করে বসে থাকে, ধৈর্য ধরে।

বাগচীবাবু।

জানি মিশ্রিলাল।

আপনি তো আর কোনও অর্ডার পেলেন না। বিজনেসের কী হবে? আমি ডুবে যাব না তো।

বোধহয় দূরে কোথাও মেঘ—গর্জনের মতো একটা শব্দ হয়। অমিয় কান পেতে শোনে। শার্সির বাইরে আজ প্রবল রোদ। কোথাও মেঘ নেই, তবুও শব্দটা কোথা থেকে শোনে অমিয়? একবার চোখ বোজে সে। অমনি এক পঞ্জরসার দেহে স্তম্ভিত—বিদ্যুৎ সিংহ তার চোখে ছায়া ফেলে দাঁড়ায়। গভীর অরণ্যের ছায়ায় বহু দূরের সিংহ ডাকে—মেঘ—মাটি কেঁপে ওঠে।

সে বলে, ডুববে না মিশ্রিলাল। আমি আছি। থাকব।

হাসির সঙ্গে বড় একটা দেখা হয় না আজকাল। রাত পর্যন্ত সে বাইরে থাকে। ফিরে এসে দেখে, হাসির ঘর ফাঁকা। বোধহয় হাসি কলকাতায় তার চেনাশোনা মানুষদের সঙ্গে দেখা করতে যায়, দেখে সিনেমা—থিয়েটার, বোধহয় তার নেমন্তন্ন থাকে খাওয়ার। কে জানে! মধু তাকে চা করে দেয়। জিজ্ঞেস করে, বাবু, আপনার গাড়ি!

দিয়ে দিয়েছি একজনকে।

বুড়ো মধু বিড় বিড় করে কী যেন বলে। বোধহয় জীবনের অনিত্যতার কথা নিজেকে শোনায়।

রাত বেড়ে যায়। ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসে। ঘুম হয় না। উঠে বসে অমিয় আলো জ্বালে। অফিসের কাগজপত্র দেখে। টেন্ডারের খসড়া তৈরি করে। সে—সময়ে ভেজানো দরজা ঠেলে হাসি আসে। নিঃশব্দে ঘরে চলে যায়। কাপড় ছেড়ে কলঘরে ঢোকে। বেরিয়ে আসে, জল খায়। শুয়ে পড়ে।

তাদের মধ্যে কোনও কথা হয় না। হাসির যাওয়ার দিন এসে গেল।

রোদের তাপ আজকাল খুব বেড়ে গেছে। অমিয়র তাই কষ্ট হয় খুব। অনেকটা হাঁটতে হয়। কল্যাণ প্রায়ই বলে, বাগচী, স্কুটারটা নিয়ে বেরোবেন।

অমিয় হাসে। নেয় না। কল্যাণ কয়েকদিনে ভালোই শিখে গেছে চালাতে। ও যখন স্কুটার চালায় তখন মুগ্ধ হয়ে দেখে অমিয়। ভালো লাগে। হিংসে হয় না।

রজতের কোনও কাজ নেই আজকাল। ব্যবসা সিল করে দিয়েছে। তবু রোজ এসে দেখা করে যায়।

কবে ফ্লাই করছেন সেন?

বলিনি আপনাকে? বিশ তারিখ, টিকিট পেয়ে গেছি।

বাঃ। ভালো খবর।

বাগচী ইউ আর সাফারিং টু মাচ।

ধারগুলো শোধ করতে হবে সেন।

পালিয়ে যান না। সেনগুপ্তকে কে আর ধরতে পেরেছে।

ঠিক দেখা হবে একদিন—তখন? অমিয় হাসে।

বাগচী, যদি সত্যিই কেটে পড়তে চান তো ব্যবস্থা করতে পারি।

কী রকম ব্যবস্থা?

জব ভাউচার। তিন মাসের মধ্যে আপনাকে নিয়ে যাব।

অমিয় হাসে।

কখনও কখনও শূন্য ঘরে, তার টেবিলের ওপর বিশাল সিংহ এক লাফ দিয়ে উঠে আসে। ধক ধক করে জ্বলে তার শরীর, পঞ্জরসার দেহ, পিঙ্গল কেশর। মুখে বৈরাগ্য, চোখে দূরের প্রসার। পুরুষের এ—রকমই হওয়ার কথা ছিল। কে তাকে শেখাল নারী—প্রেম, হাঁটু গেড়ে প্রণয়ভিক্ষা, মোলায়েম ভালোবাসার কথা! অপরূপ মগ্ন হয়ে দেখে অমিয়।

তারপর টাইপরাইটার টেনে নিয়ে বসে।

আপনি বার বার কেন একটা স্টিমারঘাটের কথা বলেন জামাইবাবু?

আমি বলি না। অমিয় বলে। তুমি ওর কাছ থেকে কখনও শুনে নিয়ো।

কী করে শুনব! আমি কাল চলে যাচ্ছি।

শুনলে ভালো করতে।

কেন?

জামাইবাবু টেলিফোনের অন্য প্রান্তে শ্বাস ফেলে।

হাসি, আমাদের বয়স হয়ে গেল।

হঠাৎ এ—কথা কেন?

কী জানি! আজকাল হঠাৎ কাজকর্মের মাঝখানে বয়সের কথা মনে পড়ে। আর মনে পড়ে—

কী?

স্টিমারঘাট—তুমি সাবধানে যেয়ো হাসি। গঙ্গার ওপরে ব্রিজটা যে কবে ওরা শেষ করবে!

আমি পাগল হয়ে যাব জামাইবাবু, স্টিমারঘাটের কথাটা আগে বলুন। কোন স্টিমারঘাট?

ফরাক্কা।

না, ফরাক্কার কথা আপনি বলছেন না।

জামাইবাবু চুপ করে থাকে।

বলবেন না?

তুমি অমিয়র কাছে শুনো।

ওর সঙ্গে আমার দেখা হবে কখন? ও অনেক রাতে ফেরে, খুব সকালে বেরিয়ে যায়।

কাল স্টেশনে অমিয় যাবে না?

বলেছিল তো যাবে। অফিসে কাজ আছে, সেখান থেকেই সম্ভব হলে স্টেশনে যাবে।

তবে আর সময় হবে না।

কীসের?

স্টিমারঘাটের কথা শোনার। ফোন রেখে দিচ্ছি হাসি—

হাসি রিসিভার রেখে দেয়।

পরমুহূর্তেই আবার তুলে দ্রুত ডায়াল করে।

হ্যালো আমি অমিয় বাগচীর সঙ্গে কথা বলতে চাই। এক্ষুনি, জরুরি দরকার। একটু অপেক্ষা করতে হয়। তারপর অমিয়র গলা ভেসে আসে, বাগচী বলছি।

শোনো, তোমার সঙ্গে আমার একটা জরুরি কথা আছে।

কী কথা?

তুমি আমাকে একটা কথা কোনও দিন বলোনি।

কী?

স্টিমারঘাটের কথা। সবাইকে বলেছ, আমায় ছাড়া। এক বার আমাকে বলবে?

আমার সময় নেই হাসি।

কেন?

আমি খুব ব্যস্ত।

কেন ব্যস্ত?

অনেক কাজ হাসি। আমাদের সময় তো বেশি নয়।

বলবে না?

সময় বড় কম হাসি।

স্টিমারঘাটের অর্থ কী?

কী করে বলব। আমিই কি জানি?

কী আছে সেখানে?

কিছু নেই। শুধু একটা উঁচু বালিয়াড়ি, ধু ধু বালি গড়িয়ে নেমে গেছে, একটা সাপের খোলস উলটে পড়ে আছে। বালির শেষে দূর থেকে একটা কালো জেটি দেখা যায়। তারপর জল। সে খুব অথৈ জল, অনন্ত জল, প্রকাণ্ড এক নদী, তার ওপর কালো আকাশ ঝুঁকে আছে...

হাসি স্তব্ধ হয়ে থাকে।

এর মানে কী?

আমি জানি না। তবে মনে হয়, এখানে এক দিন সকলের দেখা হবে।

কেন?

...

কেন?

...

কেন?

...

কেন?

প্যাটারসনের অর্ডারটা আজ বেরিয়েছে।

সকাল থেকেই অমিয় ঘুরছে বাজারে। ভাদ্র মাস পড়ে গেল প্রায়। রোদের তাপ অসম্ভব। মাঝে মাঝে ধুলোর ঝড় ওঠে। ঘূর্ণি হাওয়ার মতো হাওয়া দেয়। হাঁটতে খুবই কষ্ট হয় অমিয়র। তবু সে হাঁটে। মাঝে মাঝে স্পষ্ট দেখতে পায় সামনে, ভিড় ভেদ করে চলেছে এক প্রকাণ্ড সিংহ। পিঙ্গল কেশর, পঞ্জরসার দেহটিতে স্তম্ভিত বিদ্যুৎ, গায়ে বৈরাগ্যের ধূসর রং, চোখে দূরের প্রসার। সিংহ মাঝে মাঝে মুখ ফিরিয়ে দেখে নেয়। দেখে নেয়, অমিয় ঠিকঠাক চলছে কি না।

অমিয় চলে। সাপ্লায়ারদের কাছে ঘোরে। দোকান যাচাই করে। সে আছে। থাকবে।

স্টিমারঘাটের ছায়াটা চকিতে ভেসে ওঠে চোখে। মিলিয়ে যায়। দেখা হবে, একদিন সকলের সাথে দেখা হবে।

দুপুরের দিকে অফিসে ফিরে একটা সিগারেট মুখে টাইপরাইটারের সামনে বসে অমিয়। টাইপ করতে থাকে।

কল্যাণ ঘরে ঢুকেই বলে, এ কী বাগচী?

কী?

আপনি এখনও যাননি?

কোথায়?

কাল যে বলছিলেন আজ দার্জিলিং মেলে আপনার স্ত্রী চলে যাচ্ছেন!

ওঃ।

ভুলে গিয়েছিলেন?

অমিয় লজ্জিত হয়ে হাসে। সে ভুলে গিয়েছিল। হাসির কথা তার মনেই ছিল না।

ক'টা বাজে মুখার্জি?

বারোটা চল্লিশ। পঞ্চাশে ট্রেন ছেড়ে যাবে।

তা হলে আর গিয়ে কী হবে!

উঠুন তো। নীচে স্কুটার রয়েছে—তাড়াতাড়ি করুন, হার্ড লাক—পেতে পারেন। উঠুন, উঠুন—

দেরিই হয়ে গেল অমিয়র।

স্কুটার থেকে নেমে সে দ্রুত পায়ে উঠে এল স্টেশনের হলঘরে। আট নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে আসছে মানুষ—যারা প্রিয়জনদের বিদায় জানাতে এসেছিল। কোলাপসিবল গেটের কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে অমিয় শূন্য রেল লাইনটা দেখে। বহু দূর পর্যন্ত দেখা যায়, লাইনটা চকচক করছে। কয়েকজন লোক বেরিয়ে আসছিল। তারা সরে যেতেই অমিয় দেখতে পেল হাসি দাঁড়িয়ে আছে, তার হাতে সুটকেস। সে একা।

কী হল?

হাসির মুখ চিন্তান্বিত। কপালে ভ্রূকুটি। কেমন যেন আস্তে আস্তে চিন্তা করে বলল, আমি ট্রেনটা ধরতে পারিনি।

কেন?

পারলাম না।

কেন?

হাসি খুব বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে। বলে, কী জানি। আমাকে কখনও জিজ্ঞেস কোরো না।

অমিয় একটু হাসে।

আজকাল অমিয় যখন সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর ঘুমোয় তখন তার স্বপ্নের মধ্যে উপর্যুপরি সিংহের ডাক শোনা যায়।

মেঘ—গর্জনের মতো সেই ডাক। মাটিতে লেজ আছড়ানোর শব্দ হয়। পিঙ্গল কেশর, পঞ্জরসার দেহে স্তম্ভিত বিদ্যুৎ, গায়ের ধূসর রঙের বৈরাগ্য, চোখে দূরের প্রসার—সিংহেরা তার ভিতরে ঘুরে বেড়ায়। উপর্যুপরি ডাক দেয়, মেঘ—মাটি কেঁপে ওঠে। ঘুমের মধ্যে অমিয় হাসে।

অন্য ঘরে হাসির তেমন ঘুম হয় না। বহু দূর থেকে এক অচেনা রহস্যময় স্টিমারঘাট এগিয়ে আসে। সে দেখে ধু ধু বালিয়াড়িতে চাঁদের আলো পড়েছে। পড়ে আছে সাপের খোলস। উঁচু থেকে দেখা যায়—গড়ানো বালিয়াড়ির শেষে জেটি, তারপর অনন্ত নিঃশব্দ জলরাশি—অথৈ। সেই স্রোতের ওপর আবহমান কাল ধরে ঝুঁকে আছে কালো আকাশ। ওইখানে সকলের দেখা হবে। কেন না, তারা বিশ্বস্ত থাকেনি নিজের প্রতি, এই দুর্লভ পার্থিব জীবন নিয়ে তারা হেলাফেলা করেছিল।

এ—সব সে নিজেই ভাবে। ভাবতে ভাবতে ভাবনা পালটে ফেলে। বারংবার সে ওই স্টিমারঘাটের অর্থ খুঁজতে থাকে। খুঁজে পায় না। কিন্তু না—বুঝেও সে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে অপলক চেয়ে থাকে। জলে চোখ আপনি ভেসে যায়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%