দীক্ষা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

একদিন যাঁর চেতনা বিলাসের আরামশয্যা থেকে হঠাৎ জেগে উঠেছিল–এই ৭ই পৌষ দিনটি সেই দেবেন্দ্রনাথের দিন। এই দিনটিকে তিনি আমাদের জন্যে দান করে গিয়েছেন। রত্ন যেমন করে দান করতে হয় তেমনি করে দান করেছেন। ওই দিনটিকে এই আশ্রমের কৌটোটির মধ্যে স্থাপন করে দিয়ে গেছেন। আজ কৌটো উদ্‌ঘাটন করে রত্নটিকে এই প্রান্তরের আকাশের মধ্যে তুলে ধরে দেখব–এখানকার ধূলিবিহীন নির্মল নিভৃত আকাশতলে যে নক্ষত্রমণ্ডলী দীপ্তি পাচ্ছে সেই তারাগুলির মাঝখানে তাকে তুলে ধরে দেখব। সেই সাধকের জীবনের ৭ই পৌষকে আজ উদ্‌ঘাটন করার দিন, সেই নিয়ে আমরা আজ উৎসব করি।

এই ৭ই পৌষের দিনে সেই ভক্ত তাঁর দীক্ষাগ্রহণ করেছিলেন, সেই দীক্ষার যে কতবড়ো অর্থ আজকের দিন কি সে-কথা আমাদের কাছে কিছু বলছে? সেই কথাটি না শুনে গেলে কী জন্যেই বা এসেছি আর কী নিয়েই বা যাব?

সেই যেদিন তাঁর জীবনে এই ৭ই পৌষের সূর্য একদিন উদিত হয়েছিল সেই দিনে আলোও জ্বলে নি, জনসমাগমও হয় নি–সেই শীতের নির্মল দিনটি শান্ত ছিল, স্তব্ধ ছিল। সেই দিনে যে কী ঘটছে তা তিনি নিজেও সম্পূর্ণ জানেন নি, কেবল অন্তর্যামী বিধাতা পুরুষ জানছিলেন।

সেই যে দীক্ষা সেদিন তিনি গ্রহণ করেছিলেন সেটি সহজ ব্যাপার নয়। সে শুধু শান্তির দীক্ষা নয়, সে অগ্নির দীক্ষা। তাঁর প্রভু সেদিন তাঁকে বলেছিলেন, “এই যে জিনিসটি তুমি আজ আমার হাত থেকে নিলে এটি যে সত্য–এর ভার যখন গ্রহণ করেছ তখন তোমার আর আরাম নেই, তোমাকে রাত্রিদিন জাগ্রত থাকতে হবে। এই সত্যকে রক্ষা করতে তোমার যদি সমস্তই যায় তো সমস্তই যাক। কিন্তু সাবধান, তোমার হাতে আমার সত্যের অসম্মান না ঘটে।’

তাঁর প্রভুর কাছ থেকে এই সত্যের দান নিয়ে তার পরে আর তো তিনি ঘুমোতে পারেন নি। তাঁর আত্মীয় গেল, ঘর গেল, সমাজ গেল, নিন্দায় দেশ ছেয়ে গেল–এতবড়ো বৃহৎ সংসার, এত মানী বন্ধু, এত ধনী আত্মীয়, এত তার সহায়, সমস্তের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে গেল এমন দীক্ষা তিনি নিয়েছিলেন। জগতের সমস্ত আনুকূল্যকে বিমুখ করে দিয়ে এই সত্যটি নিয়ে তিনি দেশে দেশে অরণ্যে পর্বতে ভ্রমণ করে বেড়িয়েছিলেন। এ যে প্রভুর সত্য। এই অগ্নি রক্ষার ভার নিয়ে আর আরাম নেই, আর নিদ্রা নেই। রুদ্রবেদের সেই অগ্নিদীক্ষা আজকের দিনের উৎসবের মাঝখানে আছে। কিন্তু সে কি প্রচ্ছন্নই থাকবে? এই গীত-বাদ্যকোলাহলের মাঝখানে প্রবেশ করে সেই “ভয়ানাং ভয়ং ভীষণং ভীষণানাং’ যিনি তাঁর দীপ্ত সত্যের বজ্রমূর্তি আজ প্রত্যক্ষ করে যাবে না? গুরুর হাত হতে সেই যে “বজ্রমুদ্যতং” তিনি গ্রহণ করেছিলেন এই ৭ই পৌষের মর্মস্থানে সেই বজ্রতেজ রয়েছে।

কিন্তু শুধু বজ্র নয়, শুধু পরীক্ষা নয়, সেই দীক্ষার মধ্যে যে কী বরাভয় আছে তাও দেখে যেতে হবে। সেই ধনিসন্তানের জীবনে যে সংকটের দিন এসেছিল তা তো সকলের জানা আছে। যে বিপুল ঐশ্বর্য রাজহর্ম্যের মতো একদিন তাঁর আশ্রয় ছিল সেইটে যখন অকস্মাৎ তাঁর মাথার উপরে ভেঙে পড়ে তাঁকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবার উদ্‌যোগ করেছিল তখন সেই ভয়ংকর বিপৎপতনের মাঝখানে একমাত্র এই সত্যদীক্ষা তাঁকে আবৃত করে রক্ষা করেছিল–সেইদিন তাঁর আর-কোনো পার্থিব সহায় ছিল না। এই দীক্ষা শুধু যে দুর্দিনের দারুণ অঘাত থেকে তাঁকে বাঁচিয়েছিল তা নয়–প্রলোভনের দারুণতর আক্রমণ থেকে তাঁকে রক্ষা করেছিল।

আজাকের এই ৭ই পৌষের মাঝখানে তাঁর সেই সত্যদীক্ষার রুদ্রদীপ্তি এবং রবাভয়রূপ দুইই রয়েছে–সেটি যদি আমরা দেখতে পাই এবং লেশমাত্রও গ্রহণ করতে পারি তবে ধন্য হব। সত্যের দীক্ষা যে কাকে বলে আজ যদি ভক্তির সঙ্গে তাই স্মরণ করে যেতে পারি তাহলে ধন্য হব। এর মধ্যে ফাঁকি নেই, লুকোচুরি নেই, দ্বিধা নেই, দুই দিক বজায় রেখে চলবার চাতুরী নেই, নিজেকে ভোলাবার জন্যে সুনিপুণ মিথ্যাযুক্তি নেই, সমাজকে প্রসন্ন করবার জন্যে বুদ্ধির দুই চক্ষু অন্ধ করা নেই, মানুষের হাটে বিকিয়ে দেবার জন্যে ভগবানের ধন চুরি করা নেই। সেই সত্যকে সমস্ত দুঃখপীড়নের মধ্যে স্বীকার করে নিলে তার পরে একেবারে নির্ভয়, ধূলিঘর ভেঙে দিয়ে একেবারে পিতৃভবনের অধিকার লাভ–চিরজীবনের যে গম্যস্থান, যে অমৃতনিকেতন, সেই পথের যিনি একমাত্র বন্ধু তাঁরই আশ্রয়প্রাপ্তি সত্যদীক্ষার এই অর্থ।

সেই সাধু সাধক তাঁর জীবনের সকলের চেয়ে বড়ো দিনটিকে, তাঁর দীক্ষার দিনটিকে, এই নির্জন প্রান্তরের মুক্ত আকাশ ও নির্মল আলোকের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে রেখে দিয়ে গেছেন। তাঁর সেই মহাদিনটির চারিদিকে এই মন্দির, এই আশ্রম, এই বিদ্যালয় প্রতিদিন আকার ধারণ করে উঠছে; আমাদের জীবন, আমাদের হৃদয়, আমাদের চেতনা একে বেষ্টন করে দাঁড়িয়েছে; এই দিনটিরই আহ্বানে কল্যাণ মূর্তিমান হয়ে এখানে আবির্ভূত হয়েছে; এবং তাঁর সেই সত্যদীক্ষার দিনটি ধনী ও দরিদ্রকে, বালক ও বৃদ্ধকে, জ্ঞানী ও মূর্খকে বর্ষে বর্ষে আনন্দ-উৎসবে আমন্ত্রণ করে আনছে। এই দিনটিকে যেন আমাদের অন্যমনস্ক জীবনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে না রাখি–একে ভক্তিপূর্বক সমাদর করে ভিতরে ডেকে নাও, আমাদের তুচ্ছ জীবনের প্রতিদিনের যে দৈন্য তাকে সম্পদে পূর্ণ করো।

হে দীক্ষাদাতা, হে গুরু, এখনও যদি প্রস্তুত হয়ে না থাকি তো প্রস্তুত করো, আঘাত করো, চেতনাকে সর্বত্র উদ্যত করো–ফিরিয়ে দিয়ো না, ফিরিয়ে দিয়ো না–দুর্বল ব’লে তোমার সভাসদ্‌দের সকলের পশ্চাতে ঠেলে রেখো না। এই জীবনে সত্যকে গ্রহণ করতেই হবে–নির্ভয়ে এবং অসংকোচে। অসত্যের স্তূপাকার আবর্জনার মধ্যে ব্যর্থ জীবনকে নিক্ষেপ করব না। দীক্ষা গ্রহণ করতে হবে–তুমি শক্তি দাও।

৭ পৌষ

সকল অধ্যায়
১.
সংশয়
২.
অভাব
৩.
আত্মার দৃষ্টি
৪.
পাপ
৫.
দুঃখ
৬.
ত্যাগ
৭.
ত্যাগের ফল
৮.
প্রেম
৯.
সামঞ্জস্য
১০.
কী চাই?
১১.
প্রার্থনা
১২.
বিকার-শঙ্কা
১৩.
দেখা
১৪.
শোনা
১৫.
হিসাব
১৬.
শান্তিনিকেতনে ৭ই পৌষের উৎসব
১৭.
দীক্ষা
১৮.
মানুষ
১৯.
ভাঙা হাট
২০.
উৎসবশেষ
২১.
সঞ্চয়তৃষ্ণা
২২.
পার করো
২৩.
এপার ওপার
২৪.
দিন
২৫.
রাত্রি
২৬.
প্রভাতে
২৭.
বিশেষ
২৮.
প্রেমের অধিকার
২৯.
ইচ্ছা
৩০.
সৌন্দর্য
৩১.
প্রার্থনার সত্য
৩২.
বিধান
৩৩.
তিন
৩৪.
পার্থক্য
৩৫.
প্রকৃতি
৩৬.
পাওয়া
৩৭.
সমগ্র
৩৮.
কর্ম
৩৯.
শক্তি
৪০.
প্রাণ
৪১.
জগতে মুক্তি
৪২.
সমাজে মুক্তি
৪৩.
মত
৪৪.
নির্বিশেষ
৪৫.
দুই
৪৬.
বিশ্বব্যাপী
৪৭.
মৃত্যুর প্রকাশ
৪৮.
নবযুগের উৎসব
৪৯.
ভাবুকতা ও পবিত্রতা
৫০.
অন্তর বাহির
৫১.
তীর্থ
৫২.
বিভাগ
৫৩.
দ্রষ্টা
৫৪.
নিত্যধাম
৫৫.
পরিণয়
৫৬.
তিনতলা
৫৭.
বাসনা ইচ্ছা মঙ্গল
৫৮.
স্বাভাবিকী ক্রিয়া
৫৯.
পরশরতন
৬০.
অভ্যাস
৬১.
প্রার্থনা
৬২.
বৈরাগ্য
৬৩.
বিশ্বাস
৬৪.
সংহরণ
৬৫.
নিষ্ঠা
৬৬.
নিষ্ঠার কাজ
৬৭.
মরণ
৬৮.
সত্যকে দেখা
৬৯.
সৃষ্টি
৭০.
মৃত্যু ও অমৃত
৭১.
তরী বোঝাই
৭২.
স্বভাবকে লাভ
৭৩.
অহং
৭৪.
নদী ও কূল
৭৫.
আত্মার প্রকাশ
৭৬.
আদেশ
৭৭.
সাধন
৭৮.
ব্রহ্মবিহার
৭৯.
পূর্ণতা
৮০.
নীড়ের শিক্ষা
৮১.
ভূমা
৮২.
ওঁ
৮৩.
স্বভাবলাভ
৮৪.
অখণ্ড পাওয়া
৮৫.
আত্মসমর্পণ
৮৬.
সমগ্র এক
৮৭.
আত্মপ্রত্যয়
৮৮.
ধীর যুক্তাত্মা
৮৯.
শক্ত ও সহজ
৯০.
নমস্তেহস্তু
৯১.
মন্ত্রের বাঁধন
৯২.
প্রাণ ও প্রেম
৯৩.
ভয় ও আনন্দ
৯৪.
নিয়ম ও মুক্তি
৯৫.
দশের ইচ্ছা
৯৬.
বর্ষশেষ
৯৭.
অনন্তের ইচ্ছা
৯৮.
পাওয়া ও না-পাওয়া
৯৯.
হওয়া
১০০.
মুক্তি
১০১.
মুক্তির পথ
১০২.
আশ্রম
১০৩.
ছুটির পর
১০৪.
বর্তমান যুগ
১০৫.
ভক্ত
১০৬.
চিরনবীনতা
১০৭.
বিশ্ববোধ
১০৮.
রসের ধর্ম
১০৯.
গুহাহিত
১১০.
দুর্লভ
১১১.
জন্মোৎসব
১১২.
শ্রাবণসন্ধ্যা
১১৩.
দ্বিধা
১১৪.
পূর্ণ
১১৫.
মাতৃশ্রাদ্ধ
১১৬.
শেষ
১১৭.
সামঞ্জস্য
১১৮.
জাগরণ
১১৯.
আত্মবোধ
১২০.
ব্রাহ্মসমাজের সার্থকতা
১২১.
বর্ষশেষ
১২২.
নববর্ষ
১২৩.
বৈশাখী ঝড়ের সন্ধ্যা
১২৪.
সত্যবোধ
১২৫.
সত্য হওয়া
১২৬.
সত্যকে দেখা
১২৭.
বিশেষত্ব ও বিশ্ব
১২৮.
পিতার বোধ
১২৯.
সৃষ্টির অধিকার
১৩০.
ছোটো ও বড়ো
১৩১.
সৌন্দর্যের সকরুণতা
১৩২.
অমৃতের পুত্র
১৩৩.
যাত্রীর উৎসব
১৩৪.
মাধুর্যের পরিচয়
১৩৫.
একটি মন্ত্র
১৩৬.
উদ্‌বোধন
১৩৭.
মুক্তির দীক্ষা
১৩৮.
প্রতীক্ষা
১৩৯.
অগ্রসর হওয়ার আহ্বান
১৪০.
মা মা হিংসীঃ
১৪১.
পাপের মার্জনা
১৪২.
সৃষ্টির ক্রিয়া
১৪৩.
দীক্ষার দিন
১৪৪.
আরো
১৪৫.
আবির্ভাব
১৪৬.
অন্তরতর শান্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%