বসন্তবিলাপ

বিমল কর

অতি তুচ্ছ ঘটনা থেকে অনেক বৃহৎ কাণ্ড ঘটে যায়। শ্যামের বেলায়ও ব্যাপারটা সেই রকম ঘটেছিল। রেল স্টেশনের বাইরে সিঁড়ির কাছে শ্যাম দাঁড়িয়ে ছিল। মুখে প্রায়-ফুরিয়ে-আসা সিগারেট। ভিড়-টিড় বলতে আশেপাশে তখন বিশেষ কিছু ছিল না, শাট্‌ল ট্রেনের যাত্রীরা সকলেই চলে গেছে একরকম। শ্যাম সামনের দিকে তাকিয়ে একটা সাইকেল রিকশা খুঁজছিল। রিকশার জন্যে চোখ চঞ্চল হলেও সে বেশ অন্যমনস্ক ছিল। অন্যমনস্কতার মধ্যেই শ্যাম দূরের একটা রিকশাকে ডান হাত তুলে ইশারায় কাছে ডাকল। এবং অন্যমনস্কভাবেই বাঁ হাতের আঙুলের টোকায় সিগারেটের অতিক্ষুদ্র অংশটা বাঁ দিকে ছুড়ে দিল। ছুড়ে দেবার সময় বেঠিক আঙুলের টোকার জন্যে টুকরোটা তার হাতের পাশ দিয়ে টপকে একটু পেছন দিকে গিয়ে পড়ল। শ্যাম সামনের রিকশা দেখছিল—আশপাশ দেখেনি। রিকশার জন্যে এগোতে যাচ্ছে, আচমকা তার জামা ধরে কেউ বেজায় জোরে টান মারল। মুখ ফিরিয়ে শ্যাম দেখল ‘বসন্তবিলাপ’-এর সেই সিংহবাহিনী, পাশে তার অন্য এক সঙ্গিনী।

একেবারে প্রথমটায় শ্যাম কিছু না বুঝে চমকে ওঠার মতন হলেও পরের কয়েকটি মুহূর্তের মধ্যে সব বুঝে নিয়ে হতভম্ব হয়ে গেল। তার সিগারেটের টুকরোটা মেয়েটির—অর্থাৎ সেই সিংহবাহিনীর শাড়ির সামনে কুঁচির মধ্যে ছুঁচোবাজির মতন ঢুকে গিয়েছিল। স্টেশনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে, দিবালোকে শাড়ির পায়ের কাছটা দুলিয়ে নাচিয়ে, কিছুটা বা সামনে বাড়িয়ে মেয়েটি অগ্নিমূর্তি হয়ে শ্যামকে সগর্জনে ধমকাতে ও গালিগালাজ করতে শুরু করল। মেয়েদের আরক্ত মুখ, রাঙা চোখ, সঙ্কুচিত ভ্রূ, স্ফুরিত নাসা, দন্তপঙক্তি—কোনোটাই শ্যামের অপ্রিয় বস্তু নয়, কেননা শ্যামের মাত্র চৌত্রিশ বছর চলেছে, একটু-আধটু শৌখিন কাব্যচর্চাও করে থাকে এবং এখনও অবিবাহিত। কিন্তু এই মুহুর্তে শ্যাম চোখে অন্ধকার দেখছিল, তার সম্মুখস্থ মেয়েটির তর্জনগর্জনে তার হুঁশ প্রায় ছিল না, আর গালিগালাজ যেটুকু মরমে প্রবেশ করছিল তাতে অপমানে শ্যাম একেবারে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ হয়ে যাচ্ছিল।

ইডিয়েট, অসভ্য, জন্তু, অভদ্র—ইত্যাদি শব্দগুলো ছুরির মতন শ্যামের আত্মসম্মানে যত্রতত্র বিদ্ধ হলেও সে শুধু তোতলাবার চেষ্টা করছিল, কথা বলতে পারছিল না। অবশেষে মেয়েটি যখন শ্যামকে বাঁদর বলল এবং শ্যামের কান ধরে ছিঁড়ে দেবার অভিপ্রায় জানিয়ে কান ধরার একটা ভঙ্গিও করল, তখন শ্যাম আর সহ্য করতে পারল না। চড়া গলায় বলল, “এটা ইনটেনশ্যনাল নয়।”

সঙ্গে সঙ্গে আরও গর্জন করে মেয়েটি বলল, “নিশ্চয় ইনটেনশ্যনাল। চিনি না আপনাদের। যত ফেউয়ের দল।”

অগত্যা শ্যাম চুপ। কিছু লোকজন, মুটেমজুর জমে গেছে আশেপাশে।

অবশেষে সঙ্গিনীকে টেনে নিয়ে গিয়ে সিংহবাহিনী সামনের রিকশায় উঠল। শ্যামেরই ডাকা সেই রিকশাটায়। যাবার সময় গর্জিতা তার গলা বাজিয়ে বলে গেল, “এ-রকম নচ্ছারদের ধরে নিয়ে গিয়ে পুলিশে দিতে হয়। যত সব বকাটে, হতচ্ছাড়া, বাঁদর!”

শ্যাম অসহায়ের মতন দাঁড়িয়ে থাকল, তার অবস্থাটা বজ্রাহতের মতন।

কী দুর্দৈব। শ্যাম ভদ্রলোক। সে অশিক্ষিত, বেকার, বকাটে নয়। তার চেহারা বা চালচলনে বাঁদরামি করার কোনো লক্ষণ নেই। পুলিশে দেবার মতন লোক শ্যাম নয়। সেই শ্যামকে আজ এই হাটের মধ্যে মেয়েটা অপমানের একশেষ করে গেল। ছি ছি! শ্যাম শুধু আহত হল না, বেচারির প্রায় চোখে জল এসে গেল।

সন্ধেবেলায় শ্যাম বিরক্ত, বিমর্ষ ও উত্তেজিত হয়ে তাদের আড্ডায় এসে বলল, “সিধু, আমি সুসাইড করব।”

সিধু চওড়া চৌকির ওপর পাতা মোটা সতরঞ্জির ওপর কাত হয়ে শুয়ে ফুটবলের লিগ-টেবল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। দত্তগুপ্ত একটা তাকিয়া মাথায় দিয়ে শুয়ে শুয়ে কড়িকাঠ দেখতে দেখতে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সুর ভাঁজছিল নিচু গলায়। আর ললিত—এই বাড়ির হাফ-মালিক—তাস, কাগজ-কলম বের করে নিচ্ছিল।

শ্যামের প্রবেশ এবং ক্ষোভ প্রকাশ বন্ধুদের মধ্যে তেমন উৎসাহ সঞ্চার করল না। সিধু লিগ-টেবল থেকে মনে মনে একটা অঙ্ক কষতে লাগল, দত্তগুপ্ত নির্বিকারচিত্তে সুর সাধনা করে যেতে থাকল।

ললিত শুধু বলল, “কী করবি?”

“সুইসাইড।”

“বাঃ! ভাল জিনিস! জাপানিরা হরদম করে।”

বন্ধুদের এরকম পরিহাস, ঠাণ্ডা মনোভাব শ্যাম বরদাস্ত করতে পারল না। চৌকিতে না বসেই সে বার দুই পায়চারি করল, দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর তিক্ত গলায় বলল, “আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে! লাইফে এরকম বেইজ্জতি আর হইনি!…বসন্তবিলাপের সেই মেয়েটা—সিংহবাহিনীটা পাবলিক প্লেসে দাঁড়িয়ে আমায় ইনসাল্ট করল। বলে কিনা বাঁদর! আমার কান ছিড়ে দেবে বলেছে!..” শ্যাম আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, চিৎকারের চোটে গলা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় থেমে গেল!

বসন্তবিলাপের নামেই হোক বা সিংহবাহিনীর টানেই হোক সিধু এবার মুখ ওঠাল। ললিত ভাল করে নজর করতে লাগল শ্যামকে। সুরচর্চা থামিয়ে দত্তগুপ্ত উঠে বসতে বসতে বলল, “কস্‌ কি রে শ্যাম? মাইয়া মাইনষে তরে ইনসাল্ট করল?”

ললিত বলল, “ব্যাপারটা কি?”

সিধু পকেট থেকে পানের মোড়াটা বের করে পাশে রাখল। বলল, “তোকে বেইজ্জত করল কেন? চোখফোক টিপেছিলি নাকি?”

শ্যাম আগুন হয়ে উঠল। “হোয়াট ডু ইউ মিন? আমি কি শালা লোফার লোচ্ছা?”

হেসে উঠে সিধু বলল, “তুই চটছিস কেন? আমি কি গালটাল টেপার কথা বলেছি। চোখ টেপা কোনো ক্রাইম নয়। …আয়, বোস কী হয়েছে বল সব…”

শ্যাম সিধুর “টাল” শব্দটার প্রয়োগ বরদাস্ত করতে পারল না। চটে গিয়ে বলল, “রসিকতা করিস না সিধু। এই সিচ্যুয়েশানে তোর রসিকতা মানায় না।”

বন্ধুরা এবার আর ঠাণ্ডা থাকতে পারল না, রীতিমত চঞ্চল ও উত্তেজিত হয়ে উঠল।

দত্তগুপ্ত স্কুলে পড়ার সময় কোথায় যেন বক্সিং শিখেছিল, ঘুঁসি পাকিয়ে বলল, “একটা ঘুঁসি দিলি না ক্যান?”

এমন সময় ললিতের বউদি মণিমালা ভেতরের দরজা দিয়ে আবির্ভূত হল। মণিমালার বয়স বেশি নয়, ললিতের সমবয়সীই হবে হয়ত, এবং এই আড্ডায় চার-আনা সদস্য। অর্থাৎ সে এখানকার গল্পগুজবে কখনো-সখনো থাকে, এবং মাঝে মাঝে তাস খেলায়। পরিবর্তে তাকে এই চার দেবরকে নিয়মিত চা এবং মাঝে মধ্যে খাবার-টাবার খাওয়াতে হয়।

মণিমালা বরাবরই হাসিখুশি মানুষ। তামাশা রসিকতায় কিছু কম যায় না। দেখতে সুশ্রী, সামান্য গোলগাল ধরনের চেহারা।

মণিমালা এসে বলল, “কি, এখনও তাস পাড়োনি?”

শ্যামরা কেউ কোনো জবাব দিল না।

মণিমালা চারজনের ভাবসাব দেখতে লাগল। তার চোখ বুঝল, ভাবটা ভাল নয়। চার ইয়ার একত্র হয়েছে, তবু তাস পড়েনি, চারজনের চোখমুখেই কেমন একটা গোপনতার ভাব। মণিমালা খুঁচিয়ে দেখছিল সকলকে।

সামান্য পরে ললিত বলল, “আজ আমরা তাস খেলছি না। …একটা ব্যাপার ভাবছি। তুমি বরং স্ট্রং করে চা পাঠিয়ে দাও।”

মণিমালা যেন কোনো কিছুর গন্ধ শুঁকতে পেয়েছে। সন্দিগ্ধ গলায় বলল, “তা ব্যাপারটা কি শুনতে পারি না?”

বন্ধুদের মধ্যে চোখাচোখি হবার আগেই দত্তগুপ্ত বলল, “একটা মাইয়া মাইনষে শ্যামচাঁদের কান…।” কথাটা দত্তগুপ্ত শেষ করতে পারল না, তার আগেই শ্যাম জোরে একটা কনুইয়ের গুতো দিল গর্দভটাকে। উঃ শব্দ করে দত্তগুপ্ত থেমে গেল।

ললিত বলল, “ব্যাপারটা এখন তোমায় বলতে পারছি না। …না কি রে? কি বলিস?” ললিত বন্ধুদের দিকে চোখ ছোট করে তাকাল। “পরে বলব। একটু চা-ফা খাওয়াও আগে।”

মণিমালা শ্যামের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। হেসে চলে গেল।

মণিমালা চলে যেতেই শ্যাম দত্তগুপ্তকে খেঁকিয়ে উঠল, “রাস্কেল কোথাকার। শালা বাঙাল বুদ্ধু! এখনি ডুবিয়ে ছেড়েছিল! বউদির কাছে তুই আমার বেইজ্জতির কথা বলছিলি! কেলেঙ্কারি হয়ে যেত।”

দত্তগুপ্ত বলল, “বউদিরে কইতে দোষ কী?” সে বলল বটে, কিন্তু তার বোকামিটা ততক্ষণে বুঝতে পেরেছে।

সিধু বলল, “দোষ কিছু নয়, প্রেস্টিজ আরও পাঞ্চার হত।”

ললিত বলল, “বাজে কথা থাক। এখন কী হবে? লেট আস ডিসাইড। ব্যাপারটা এভাবে ছেড়ে দেওয়া যায় না। স্পেশালি বসন্তবিলাপের সঙ্গে আমাদের এটা থার্ড রাউন্ড। আগের দু’বার মেয়েছেলে বলে ছেড়ে দিলাম। বাট নট দিস টাইম।”

আগের দু’বার—অর্থাৎ একবার বসন্তবিলাপের বাড়ি থেকে একরাজ্যি ময়লা সিধুর মাথায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল। অন্যবার—অবশ্য সেটা প্রত্যক্ষ নয়, পরোক্ষভাবেই বসন্তবিলাপ ললিতদের বেইজ্জত করেছিল, সরস্বতী পুজোর নিমন্ত্রণপত্রের খাম পাঠিয়ে। ডাক মারফত এই ঠিকানায় খোলা খাম পাঠিয়ে দিয়েছিল, ভেতরে কার্ড বা ছাপা চিঠি কিছু ছিল না।

দত্তগুপ্তর কাছ থেকে একটা সিগারেট চেয়ে নিয়ে সিধু ততক্ষণে ধরিয়ে ফেলেছে। লম্বা ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “না, আর টলারেট করা যায় না। আমাদের এই রাউন্ডে স্ট্রেট ফাইট দিতে হবে।”

দত্তগুপ্ত রসিকতা করে হেসে বলল, “ফাইটে কাম নাই রে, টাইটেই চলবে।”

শ্যাম ধমক দিয়ে বলল, “ডোন্ট লাফ; এটা হাসির ব্যাপার নয়।”

দত্তগুপ্ত একান্ত অনুগতের মতন মুখভাব গম্ভীর করে নিল।

অতঃপর চার বন্ধু গভীর মনোযোগ সহকারে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে বসল।

বসন্তবিলাপ সম্পর্কে এবার কিছু বলতে হয়। সংক্ষেপে বললে এই দাঁড়ায় যে, ললিতদের পাড়ায়, এমন কি এই রাস্তার ওপরই বসন্তবিলাপের অবস্থান। বেশি নয়, এই বাড়ি থেকে মাত্র মিনিট দুই হাঁটলেই বাড়িটা দেখা যায়। লালচে রঙের ছোটখাটো দোতলা বাড়ি, নীচে উপেন স্যাকরার দোকান। উপেনের পাশে হোমিও ডাক্তার গিরিজাবাবুর ডিসপেনসারি। আজ প্রায় বছরখানেক হতে চলল, কয়েকটি মেয়ে এসে ওই বাড়িটা ভাড়া নিয়ে একটা মেয়ে-মেস বা মেয়ে-হোস্টেল তৈরি করে দিব্যি আছে। হই-হল্লা, চেঁচামেচি করে, নেচে গেয়ে বেশ আছে সব। মনেই হয় না মেয়েদের বয়েস হয়েছে। সবাই চাকরি-বাকরি করে। কেউ বা রেলে, কেউ মেয়েকলেজে, কেউ বা হাসপাতালে। স্কুলে চাকরি করা মেয়েও আছে জনা দুই-তিন। সবচেয়ে আশ্চর্য এই মেয়েদের মধ্যে বিবাহিতা বলতে মাত্র একজন, প্রতিমা, হাসপাতালের মেট্রন; বয়স একটু বেশিই হবে। অন্য কোনো মেয়ের মাথাতেই এখন পর্যন্ত সিঁদুরের দাগ ধরেনি।

বাড়িটার একটা নম্বর আছে কিন্তু নাম নেই। নামটা শ্যামদের দেওয়া, শ্যামেরই। জনা বারো মেয়ে যে বাড়িতে থাকে, এবং যেখানে সকলেই প্রায় কুমারী, সেই বাড়ির নাম ‘বসন্তবিলাপ’ হলে খুব বেমানান নিশ্চয় হয় না। শ্যামের যুক্তিতে, এতগুলি যুবতীর কৌমার্য অবলম্বন—বসন্তের বিলাপ ছাড়া আর কিই বা! শ্যাম এবং শ্যামের বন্ধুদের কাছে বসন্তবিলাপের গোড়াপত্তন থেকেই বাড়ি এবং বাসিন্দারা প্রবল কৌতুহল ও রহস্যের বিষয়। এই এক বছরে বসন্তবিলাপের পরিবর্তন অল্পস্বল্প হয়েছে, নতুন কেউ এসেছে, পুরনো কেউ চলে গেছে, ওদের ঝি বদলেছে—তবু মোটামুটি চেহারাটা সেই রকমই আছে। আর শ্যামরা বসন্তবিলাপের অধিবাসীদের নামধাম, কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল হয়েছে। মেয়েদের রূপগুণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিচার করে তারা আবার নিজেদের মধ্যে এক-একজনের এক-একটা নামও দিয়ে নিয়েছেন। যেমন সিংহবাহিনী। সিংহবাহিনীর আসল নাম অনুরাধা সিংহ, বয়স বছর ত্রিশের সামান্য বেশি বলেই মনে হয়, মাথায় সামান্য খাটো, বেশ পুষ্ট চেহারা, মেজাজ খুব কড়া ধরনের, রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় মিলিটারি মেজাজে হাঁটে, গলার স্বর শুনলে মনে হয় ভগবান যেন তার আলজিবের কাছে একটি বিশেষ ধরনের টিনিমাইক লাগিয়ে দিয়েছেন। চালচলনে, ব্যবহারে যার এত দাপটের ভাব তাকে দত্তগুপ্ত ‘মহিষমর্দিনী’ বলতে চেয়েছিল, কিন্তু শ্যাম বা ললিত এতটা নির্দয় হতে রাজি হয়নি; বরং অনুরাধা সিংহকে সিংহবাহিনী বলাই তাদের মতে সঙ্গত, তা ছাড়া এটা তো ঠিকই মেয়েটিকে তার চারিত্রিক সিংহটিই বহন করছে।

মণিমালা চা নিয়ে এসে ললিতদের কাছে একটা বেতের মোড়া টেনে নিয়ে বসল।

ললিত প্রথমে হালকাভাবে বলল, “দাদা কোথায়?”

“কোথায় আর, যেখানে যার দৌড়—কোলিয়ারির কোন মক্কেল এসে নিয়ে গেছে।”

সিধু চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “আজ পল্টনকে একবারও তো দেখলাম না বউদি? কোথায় গেছে?”

মণিমালা হেসে বলল, “বাপের সঙ্গে গেছে। যা বায়না।”

শ্যাম, ললিত, দত্তগুপ্তর মধ্যে গোপনে চোখ চাওয়া-চাওয়ি হয়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ললিত গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বলল, “বউদি, আমরা একটা সিরিয়াস ম্যাটার নিয়ে আলোচনা করছিলাম। ব্যাপারটা খুব সিকরেট। … এখন ব্যাপার হচ্ছে কি, মানে—তুমি এমন একটি পার্টি—না ঠিক পার্টি নয়—ধরো সম্প্রদায়ের লোক যার কাছে আমরা—পুরুষরা কিছু বলতে পারি না। ব্যাপারটা মেয়েদের নিয়ে। তবু তোমাকে আমরা বলব। তোমাকে কনফিডেন্সে নেওয়া গেল।”

মণিমালা ঘাড় হেলিয়ে বলল, “বড় ভনিতা করছ। ব্যাপারটা বলল শুনি।”

শ্যাম বলল, “আপনি আমাদের দলে, এটা কিন্তু প্রমিস করতে হবে।”

মণিমালা সঙ্গে সঙ্গে মাথা দুলিয়ে তিন সত্যি করল।

ললিত বলল, “ব্যাপারটা বসন্তবিলাপ নিয়ে। আজ সেই সিংহীটা শ্যামকে দশজনের সামনে যাচ্ছেতাই করে অপমান করেছে। আমরা এর শোধ নেব।”

দত্তগুপ্ত ইংরিজি করে বলল, “রিভেনজ। বুজলেন না বউদিদি, সিংহীরে টাইট করমু।” দত্তগুপ্তর বাড়ি কোনো কালেই পূর্ববঙ্গে ছিল না, অথচ সে এই ভাবে কথা বলে, এটা নিছক রঙ্গ করেই। বাড়িতে তার নিজের বউদিদি পূর্ববঙ্গীয়, দাদা খাস শান্তিপুরি বাংলায় কথা বলে। নিতান্ত যেন বউদিদিকে সান্ত্বনা ও সখ্যতা দেবার জন্যে দত্তগুপ্ত ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাসের মতন পূর্ববঙ্গীয় ভাষাটা রপ্ত করছে।

স্টেশনের ঘটনাটা সিধু সংক্ষেপে বলল। শুনতে শুনতে মণিমালা হেসে অস্থির।

শ্যাম ক্ষুব্ধ হয়ে বলল, “বউদি আপনি হাসছেন, ব্যাপারটা কিন্তু হাসির নয়। আমি সত্যিই বড় অপদস্থ হয়েছি।”

মণিমালা আঁচলের আগায় মুখের ওপচানো হাসিটা মুছে খানিকটা শান্ত হয়ে বললে, “সত্যিই ভাই ব্যাপারটা খারাপ। কিন্তু আপনিই বা অত কথা শুনলেন কেন, দু-চারটে কড়া কথা শুনিয়ে দিতে পারলেন না!”

“পাগল! তা হলে সিংহবাহিনী শ্যামের কান কেটে ছেড়ে দিত।” সিধু বলল, “রিট্রিট ইন ডেনজারই বেস্ট পলিসি।”

ললিত সকলকে থামিয়ে দিয়ে মণিমালাকে বলল, “আমরা একটা প্ল্যান করে ফেলেছি। এটায় আনসাকসেসফুল হলে অন্য পথ বেছে নেব। আমাদের প্ল্যানটা তুমি শুনবে?”

“বলো শুনি।”

ললিত তাদের মতলবটা বলল।

শুনে মণিমালা শান্ত, মিষ্টি হাসি হেসে বলল, “ও-সব ছাই কোনো কাজে আসবে না। বাড়িটার গায়ে শুধু দাদের মতন দাগ ধরবে। তা ছাড়া পাড়ার পাঁচ জনের চোখে পড়বে, তোমরাও ধরা পড়বে।”

সিধু বলল, “কিন্তু বউদিদি পোস্টারিংটা খুব এফেকটিভ হবে। আজকাল পোস্টারিং-ই সব; এক রাত্রেই ডুবিয়ে দেওয়া যায়। আমরা শুধু ছড়া লিখব। কিংবা সিনেমার কিছু হাল কায়দার বিজ্ঞাপনের মতন প্রথম দিন শুধু এক লাইন যেমন ‘বসন্ত জাগ্রত…’ পরের দিন আরও এক লাইন…”

মণিমালা মাথা নাড়ল, “না না, এসব কি?”

“তা হলে ছড়া?…শ্যাম লিখবে। আমরা ফুলস্কেপ কাগজে রঙিন কালি দিয়ে বেশ ডিজাইন করে চন্দরকে দিয়ে লিখিয়ে নেব।”

“দেওয়ালে আঁটবে কে?”

“পয়সা দিলে কাগজ আঁটার লোক পাওয়া যায়।”

“তা যাক। এটা কিন্তু খারাপ—। এভাবে কারও পেছনে লাগা ভাল নয়।”

“এই তো তুমি তোমার কমিউনিটির ইন্টারেস্ট দেখতে লাগলে—” ললিত বলল, “শ্যামের বা আমাদের পেছনে লাগতে বসন্তবিলাপের মেয়েদের তো খারাপ লাগেনি। গোলমালটা ওরা পাকিয়েছে, আমরা নয়।”

মণিমালা ওদের মাথা ঠাণ্ডা করার জন্যে নরম গলায় বলল, “কে কার পেছনে লেগেছে সেটা অন্য কথা। তা বলে তোমরা মেয়েদের পেছনে এভাবে লাগবে কেন? অন্যভাবে লাগো।”

“অন্যভাবে লাগা মানে তো ঢিল ছোড়া” শ্যাম অপ্রসন্ন গলায় বলল।

“দু-চারটে বোমাও মারা যায়— কিন্তু সেটা কি উচিত হবে। আমরা ভদ্দরলোকের মতন অহিংস সংগ্রাম করতে চাই। ওদের ঝাড়সুদ্দু এ পাড়া থেকে ওঠাতে চাই। বেজায় পাজি হয়ে গেছে—সব ক’টা। জটলা করে দাঁড়ায়, দোতলার বারান্দা থেকে মুখ বাড়িয়ে টিটকিরি মারে। আমাদের বাঁদরটাঁদরই ভাবে।” ললিত বলল।

মণিমালা যথেষ্ট চালাক। আবহাওয়া বুঝে নিয়ে বলল, “তোমরা লাগতে চাও লাগো। তবে, আমি বলছিলাম কি, খুব চুপচাপ—কাউকে কিছু জানতে না দিয়ে পেছনে লাগো।”

চার বন্ধুই একসঙ্গে বলল, “কী রকম?”

মণিমালা জবাব দিল না।

ললিতা বলল, “তোমার আইডিয়াটা কী রকম?”

“দাঁড়াও ভাবি একটু।”

মণিমালা ভাবতে লাগল। চার বন্ধুই মণিমালার মুখের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল নীরবে।

শেষ পর্যন্ত মণিমালা বলল, “আমি একটা উপায় ভেবেছি।”

“কি?”

মণিমালা তার উপায়টি ব্যক্ত করল। সঙ্গে সঙ্গে নানান জটিল প্রশ্ন। মণিমালা সব প্রশ্নেরই জবাব দিল যতটা সাধ্য।

দেখা গেল মণিমালার সিদ্ধান্ত ওরা মেনে নিয়েছে।

দুই

সপ্তাহ দুই পরে সিধুই একদিন কীর্তনের ঢঙে দু-হাত কাঁধের উপর তুলে নাচতে নাচতে এসে বলল, “লেগেছে রে, লেগেছে।”

ললিত যদিও আঁচ করতে পারল, তবু শুধাল, “কী লেগেছে?”

“হুলুস্থূল। বসন্তবিলাপে ফায়ার লেগে গেছে।”

শ্যাম হাতের কাগজটা ফেলে দিয়ে সহর্ষে চিৎকার করে উঠল, “লেগে যাক—লেগে যাক; লাগিয়ে দে মা জগদম্বা…”

দত্তগুপ্ত বলল, “ফায়ার স্পেরেড করলে আমারে কল দিস রে সিধু।”

বাইরে আজ বিকেল থেকে খানিকটা ঝোড়ো ভাব হয়েছে। আকাশে মেঘ জুটেছে দুপুর থেকে, বৃষ্টি নেই, মাঝে মাঝে মেঘ ডেকে উঠেছে। হয়ত মাঝরাত থেকে বৃষ্টি নামবে।

ললিত সিধুকে জিজ্ঞেস করল, “লেগেছে তুই বুঝলি কি করে?”

“সিকরেট মিশন ভাই; বলেছিলাম না—আমি ওটা ক্যাচ করে ফেলব। এইবার জমবে।”

“বউদিকে ডাক”—শ্যাম অধৈর্য হয়ে বলল, “ডাক বউদিকে ললিত শীঘ্রি।”

ললিতকে উঠতে হল না, দত্তগুপ্তই উঠে ভেতর দরজায় গিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে মণিমালাকে ডাকল।

সিধু বলল, “আমি ভাবছি আর-একবার ওষুধটা রিপিট করে দেওয়া যাক। প্রথমটাতেই বেশ ধরেছে যখন তখন রিপিট করলে আরও ফাস্ট ক্লাস হবে। কি বল?”

বলে সিধু আনন্দের আতিশয্যে দাঁতে দাঁত চেপে ঠোঁটে চপ চপ শব্দ করতে করতে শ্যামের থুতনি ধরে নেড়ে দিল। “জমে যা শালা, জমাজ্জম।”

শ্যাম বলল, “গুড আইডিয়া। এবার ডোজ আরও একটু কড়া করে দেওয়া যেতে পারে।”

ললিত বলল, “তা হলে এবার শ্যামই খরচটা দিক।”

“আমি একলা কেন?” শ্যাম আপত্তির গলায় বলল।

“তোর জন্যেই লড়াই। তোকে নিয়েই আমাদের লড়তে হচ্ছে। তুই শালা চ্যাম্পিয়ন হবি।”

শ্যাম কী যেন ভেবে বলল, “আমার একলার সঙ্গে লড়াই হচ্ছে না, হচ্ছে আমাদের সঙ্গে; তা হলেও তোরা বলছিস যখন আমি দেব, টাকা দেব। …যা অপমান সয়েছি সেদিন।”

সামান্য পরেই মণিমালা এল।

মণিমালা আসতেই সিধুরা সহর্ষে হুররে দিয়ে উঠল।

মণিমালা হেসে বলল, “হল কী তোমাদের? এত ফূর্তি?”

সিধু বলল, “বউদি, ওষুধ ধরেছে। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।”

ললিত বলল, “তোমার চাল টেরিফিক লেগে গেছে বউদি, এতটা আমরা ভাবিনি। তোমায় একটা মিনিস্ট্রি দেওয়া উচিত।”

মণিমালা উৎসাহিত হয়ে বসে পড়ে বলল, “শুনি শুনি, ব্যাপারটা বলো।”

সিধু বলল, “আর কোনো ব্যাপার নেই বউদি, আমি আসল গোয়েন্দা লাগিয়ে ছিলাম, বসন্তবিলাপে রোজ দশ-পনেরোখানা করে আসছে।”

দত্তগুপ্ত বলল, “আরো আসবো গো বউদিদি; শ্যামচাঁদের পয়সায় রিপিট ডোজ ঝাড়নের কথা ফাইন্যাল হইছে না।”

ললিত বলল, “হ্যাঁ; আমরা ভাবছি—আর একবার—রোববারেই আর-একটা ঝেড়ে দি। ব্যাপারটা বেশ পোক্ত হবে। তুমি কি বল?”

শ্যাম বলল, “আপনার কনসেন্ট পেলেই আমরা দিয়ে দি।”

মাথা হেলিয়ে হেসে মণিমালা বলল, “বেশ ভাল কথাই তো। দিয়ে দিন।”

চার বন্ধু আবার সহর্ষে চৌকি চাপড়াল।

শ্যাম বলল, “বউদি, আপনি সত্যিই গ্রেট।”

সিধু বলল, “আপনার কি মাথা। আমাদের ঘোল খাইয়ে দিতে পারেন।”

দত্তগুপ্ত বলল, “আপনাদের অবশ্য আমাগো রসোগুল্লা খাওয়ানো দরকার। …খাইবেন নাকি!”

হাসির চোটে ফেটে পড়তে পড়তে মণিমালা বলল, “মাঝপথে নয়, একেবারে শেষে। আগে আপনারা সত্যি সত্যিই জিতুন, তারপর।”

ললিত রঙ্গ করে বলল, “ফাইন্যাল ভিক্টরির পর তোমায় আমরা এক মাস সিনেমা দেখাব, যে ছবি আসবে; চপ-কাটলেট মিঠে পান খাওয়াব, যত খেতে পার। যদি বলো তো আমাদের আড্ডার নামটাও তোমার নামে রেজেস্ট্রি করে দিতে পারি। …কিন্তু বউদি, মেয়ে বলেই তোমার এরকম প্যাঁচালো বুদ্ধি, ভীষণ অরিজিন্যাল এবং সূক্ষ্ম। আমার ফিউচার যে কী ভগবানই জানেন।”

মণিমালা হাসতে হাসতেই জবাব দিল। “তোমার বেলায় আরও সূক্ষ্ম হব।”

চার বন্ধুই হাসতে লাগল।

মণিমালা চলে গেলে ললিত তাস নামিয়ে বসল।

সিধু শ্যামের উরুতে থাপ্পড় মেরে বলল, “শ্যাম রে, বসন্তবিলাপে কী জিনিস চলছে মাইরি তুই একবার ভেবে দেখ। মেয়েগুলো খেপে গেছে। সিংহী কেশর ফোলাচ্ছে।”

ললিত তাস শাফ্‌ল করে বাঁটতে শুরু করে দিল। বলল, “ফুলিয়ে যাক। তারপর শ্যাম দেখবে।”

দত্তগুপ্ত হেসে বলল, “আমাগো কাম শ্যাষে, না কিরে শ্যাম।”

শ্যাম নিজের হাতের তাস তুলে নিতে নিতে হঠাৎ বলল, “আচ্ছা ললিত, যদি বসন্তবিলাপ হেরে গিয়ে আমাদের সঙ্গে ফয়সালা করতে চায়। ট্রুস করতে চায়। ধর সন্ধি, কো-একজিস্টেন্ট চাইল। তা হলে?”

ললিত নিজের তাস গুছোতে গুছোতে জবাব দিল, “সেটা পরের ব্যাপার।”

“না, যদি চায়; ধর না, ওরা চাইল। তা হলে?”

“তা হলে আমি ভাই আমার ফেভারিট—সেই ফ্লুরোসেন্ট মেয়েটাকে চাই—আলো চ্যাটার্জি।”

দত্তগুপ্ত বলল, “তোর চাওয়নে আলো জ্বলব কি সিধু?”

“আলবাত জ্বলবে। নয়ত কি তুই জ্বালাবি শালা?”

“আমার”— দত্তগুপ্ত বাঁ দিকের একটা তাস ডান দিকে টেনে নিল; বলল, “আমার আলোয় কাম নাই, আমি ভূগোলরে বড়ই ভালবাসি রে সিধু, ভূগোলের ম্যাপখান দেখছস নাকি? আহা রে, চক্ষু সার্থক করে।” দত্তগুপ্ত যাকে ভূগোল বলল, তার নাম পার্বতী সেন, স্কুলের ভূগোল-দিদি।

ললিত অবশ্য তার অভিমত স্পষ্ট করে ব্যক্ত করল না তবু বোঝা গেল তার পছন্দ কলেজের টিচার নবনীতাকে—যাকে ললিতরা বলে, কুলপি দিদি। কুলপি মালাইয়ের খোলের মধ্যে মালাই থাকলে যেমন হয় আর কি! ঠাণ্ডা, আঁট-সাঁট দিদি। এক্কেবারে কোল্ড নার্ভ।

শ্যাম তার মতামত প্রকাশ করল না।

দেখতে দেখতে আরও কিছুদিন কেটে গেল, দিন পনেরো, শ্রাবণের শেষাশেষি প্রবল বর্ষণ নামল। আকাশ যখন সঞ্চিত সব জল ঢেলে দিয়ে একটু ফাঁকা, ঈষৎ কৃপণ, মেঘলা ভাবটা আছে অথচ সারাক্ষণ বৃষ্টি নেই, ঝিপঝিপ করে জল আসছে, পালাচ্ছে, মাঝে মাঝে ইলশেগুঁড়ি ঝরছে তখন আবার এই ঘটনাটি ঘটল।

শ্যাম নিত্যকার মতন সন্ধ্যাবেলায় ললিতের বাড়ি আড্ডা দিতে যাচ্ছিল। এখন আড্ডাটা আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, কেননা সিধু রোজই বসন্তবিলাপের নব নব খবর আনছে। আগে বসন্তবিলাপের অবস্থা যেমন ছিল এখন তার চেয়েও খারাপ। বসন্তের কুসুমগুলি এখন—এই সুন্দর বর্ষাতেও রীতিমত নির্জীব হয়ে পড়েছে। ক’দিন ধরে আর টুঁ শব্দ শোনা যাচ্ছে না ওখানে, শ্যামদের আসা যাওয়ার পথে দোতলায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে চার পাঁচজনে জটলা বাঁধিয়ে আর প্রচ্ছন্ন টিটকিরিও দিচ্ছে না। রাস্তাঘাটে চোখাচোখি হলে চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। শ্যামরা সবাই খুশি। কতকগুলো মেয়ে পাড়ায় এসে জুড়ে বসে তাদের নাকাল করবে—এ হয় না। শত হলেও তোমরা মেয়ে। আস্কারা না দিলে তোমরা বাবা গাছে উঠতে পারো না।

বোনের ছাতা মাথায় দিয়ে শ্যাম আস্তে আস্তে হেঁটে আসছিল। বিকেলের পর থেকে আবার ঝিপঝিপ বৃষ্টি চলছে। নেমেছিল জোরে, তবে প্রথম পশলাটা জোরে হবার পর ঝিপঝিপ করে চলেছে। শ্যামের আজ মনটাও বেশ ভাল। তার হয়ত একটা প্রমোশান হতে পারে, অফিসে শুনছিল। ছোট প্রমোশান, তবু প্রমোশান তো।

ললিতদের বাড়ির রাস্তাটা আজ তিন-চার দিন ধরে অন্ধকার হয়ে আছে। মিউনিসিপ্যালিটির আলো; জল ঝড় বৃষ্টিতে কোথায় কী গণ্ডগোল হওয়ায় তা আর এখনও সারানো হয়ে উঠল না। না উঠুক, চোখ বেঁধে দিলেও শ্যামরা এ-গলি দিয়ে চলে যেতে পারবে।

বেশ খানিকটা অন্ধকারের মধ্যে দিয়েই শ্যাম টিপটিপে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটছিল। বসন্তবিলাপের কাছে আসতেই শ্যাম তার সামান্য তফাতে কাকে যেন রাস্তায় প্রায় উবু হয়ে পড়ে যেতে এবং ককিয়ে উঠতে শুনল।

উপেন স্যাকরার দোকান বন্ধ। হোমিও গিরিজার ডিসপেনসারিতে আলো জ্বলছে অবশ্য, কিন্তু সে আলো এতটা পৌঁছচ্ছে না। হোমিও গিরিজার আলোও হোমি—একরত্তি, জ্বলে কি জ্বলে না বোঝা যায় না।

শ্যাম তাকাল—মাথায় কাপড় তোলা এক মহিলা। একেবারে রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। পড়ে হাত দিয়ে পা চেপে যেন ককিয়ে ককিয়ে যন্ত্রণা প্রকাশ করছে।

বৃষ্টিটাও এ-সময় একটু বড় বড় ফোঁটায় পড়ছিল। মেয়েটি ছটফট করছে যন্ত্রণায়। নিশ্চয় অন্ধকারে আচমকা হোঁচট খেয়ে পড়েছে, কিংবা কোনো গর্তে পা দিয়ে ফেলেছে।

শ্যাম অবিবেচক হতে পারে না। পাড়ারই জানাশোনা কোনো বাড়ির বউ হবে।

এগিয়ে গিয়ে শ্যাম বলল, “কি হল, পড়ে গেলেন?”

যন্ত্রণা বোধহয় অতি তীব্র, অসহ্য; মাথা নাড়িয়ে ছটফট করতে করতে আকারে প্রকারে এবং যন্ত্রণা-কাতর গলায় মেয়েটি যেন কী বলল; শ্যামের মনে হল ওকে তুলে ধরতে বলছে। পায়ে বোধহয় জোর চোট পেয়েছে মেয়েটি।

শ্যাম উদ্বেগের গলায় বলল, “আপনাকে ধরব নাকি? উঠে দাঁড়াতে পারছেন না?”

মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দিল সামান্য, শ্যামকে হাত ধরে উঠিয়ে দিতে বলছে।

শ্যামের এক হাতে ছাতা, অন্য হাত দিয়ে সে মেয়েটিকে সাহায্য করল উঠতে। বেচারি মেয়েটির গা হাত ভিজে, মাথার খোঁপা থেকে কাপড়ও কাঁধে খসে পড়েছে। মুখ তুলতে পারছিল না, তুলছিলও না। যন্ত্রণার চোটে বিকৃত কান্নার গলায় বলল, “আমি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছি না, ওপাশটায় একটু পৌছে দিন।”

শ্যাম হাত ধরে থাকল, সাহায্য করল, আর মেয়েটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রাস্তার পাশে বাড়িটার চৌকাঠের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

শ্যাম গোলমালে একেবারেই লক্ষ করেনি, মেয়েটি বসন্তবিলাপের চৌকাঠে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বরং শ্যাম জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, “গোড়ালি মচকে ফেলেছেন নাকি? কোথায় লেগেছে? একটা রিকশা ডেকে দেব?” শ্যাম বুঝি মাত্র দু-তিনটি শব্দ উচ্চারণ করেছে—হঠাৎ বুকের ওপর পিস্তল ধরে শাসাবার মতন করে সেই মেয়েটি শ্যামের পাঞ্জাবির বুকের কাছটায় ভীষণ জোরে মুঠো করে চেপে ধরে গর্জন করে বলল, “শীঘ্রি ভেতরে ঢুকুন, নয়ত চেঁচাব। ঢুকুন শীঘ্রি…।”

শ্যাম কিছু বোঝার আগেই মেয়েটি তাকে ঠেলে সদরের ওপারে ঢুকিয়ে দিল। আর শ্যাম দেখল দরজার পাশ থেকে সদরের গলি থেকে জনা চার পাঁচ মেয়ে বেরিয়ে এসে তাকে ঘিরে ফেলেছে।

একেবারেই বিমূঢ় বিহ্বল শ্যাম। তার পালাবার পথ নেই। ওই মেয়েটা, যেটা রাস্তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে ককাচ্ছিল সে এখন দিব্যি সোজা পায়ে দাঁড়িয়ে দু-চার বার যেন লাফও মারল, গলার স্বরে পিঁপড়ে কামড়াবার কষ্টও নেই।

ভ্যাবাচাকা খেয়ে শ্যাম বলল, “মানে? আমাকে এ-ভাবে—”

সেই রাস্তার মেয়েটি বলল, “মানে বোঝাচ্ছি। এই লিলি তোর হাতে কী আছে?”

“জিওমেট্রি বাক্সের কাঁটা।”

“ঠিক আছে। ও বেশি টেণ্ডাই-মেণ্ডাই করলে প্যাঁক করে ফুটিয়ে দিবি।”

“মানে ব্যাপারটা কি, আপনার” …শ্যাম কি স্বপ্ন দেখছে নাকি?

“শাট আপ। কথা বললে ছুঁচ দিয়ে মুখ সেলাই করে দেব। এই অনিমা তোর হাতে কি আছে?”

“স্কেল।”

“শুভ্রা তোর কাছে কী আছে?’

“কঁচি।”

“আর কিছু বললেই ওর মাথার চুল কেটে দিবি ক্যাঁচ করে।”

শ্যাম আত্মরক্ষার জন্যে মাথার ছাতাটা গুটিয়ে ফেলল। একটা মাত্র দৌড়। পাঁচ পা দূরে চৌকাঠ, এদের ঝটকা মেরে ঠেলে ঠুলে পাঁচ পা এগুতে পারলেই শ্যাম বেঁচে যাবে। দেবে নাকি ধাক্কা? দু-চারটে ঘুষি চালাবে? ছাতা পেটা করে পালাবে?

কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। কম্পাসের কাঁটা, স্কেল, রুল, কাঁচি—এবং না জানি আরও কি অস্ত্রশস্ত্র হাতে এই নারী বাহিনী তাকে ব্যূহ রচনা করে রয়েছে। শ্যাম পালাবার চেষ্টা করলেই এরা আক্রমণ করবে। সেই আক্রমণে শ্যামের ধুতি জামা, গায়ের চামড়া মাথার চুল, পিতৃদত্ত নাক কান—থাকবে কি থাকবে না শ্যাম বুঝতে পারল না।

সেই মেয়েটা—যার পাকা অভিনয়ে ভুলে শ্যাম একেবারে বুদ্ধুর মতন বসন্তবিলাপে পা দিয়ে ফেলেছে, সে সঙ্গিনীদের বলল, “ওকে দোতলায় নিয়ে চল।” বলে শ্যামকে উদ্দেশ করে টিটকিরি মেরে হুকুম করল “শুনুন শ্যামচন্দরবাবু আপনাকে দোতলায় যেতে হবে। লক্ষ্মী ছেলের মতন চলুন। লিলি, দরজা বন্ধ করে দে।”

শব্দ করে সদর বন্ধ হল। শব্দটা শ্যামের বুকের ওপর এমনই জোরে লাগল যে শ্যামের বুক ধকধক করতে লাগল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে শ্যামের, পা কাঁপছিল। শ্যাম ঠোঁট ভেজাচ্ছিল বার বার। ছি ছি, শ্যাম একটা মেয়ের চালাকির কাছে হেরে গেল। রাস্তার মধ্যে একবারও শ্যাম কেন মেয়েটার মুখ নজর করে দেখল না, কেন বুঝল না—ওই মাথার কাপড় তুলে রাখার ব্যাপারটা পুরোপুরি ফল্‌স, শ্যামকে ভাঁওতা মারা, এবং বৃষ্টির জল বাঁচানো। এখন শ্যাম মেয়েটাকে চিনতে পারছে, বিজয়া চৌধুরী, সোশ্যাল ওয়েলফেয়ারে চাকরি করে।

শ্যামকে ওরা ঠেলছিল। শ্যাম বলল, “ব্যাপারটা কি হচ্ছে আমি বুঝতে পারছি না। কী করছেন আপনারা? দোতলায় আমি কেন যাব?”।

শ্যামের কথায় সমস্বর একটা হাসি উঠল। বিজয়া বলল, “কেন যাবেন গিয়েই বুঝতে পারবেন। …কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, চলুন। আপনার জন্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আর বৃষ্টিতে ভিজতে পারছি না।”

শ্যাম শেষবার প্রতিবাদ করে বলল, “যদি না যাই কী করবেন?”

“পুলিশ ডেকে আনব। বৃষ্টির মধ্যে সন্ধেবেলায় মেয়েদের হোস্টেলে ঢোকার জন্যে পুলিশে ধরিয়ে দেব।”

পুলিশের নামে শ্যামের সমস্ত পেটটা আমাশার ব্যথার মতন মোচড় দিতে লাগল। সর্বনাশ! এরা সব ছকে রেখেছে যে।

অগত্যা শ্যাম এগোতে বাধ্য হল। বিজয়া শ্যামের আগে; বাকি মেয়েরা শ্যামের পেছনে। সদ্য বন্দি-করা শত্রুর মতন মেয়েরা শ্যামকে আগলে নিয়ে দোতলায় উঠে এল।

লিলি বলল, “প্রতিমাদির ডিউটি, আজ ফিরবে না। রাধাদি বলেছে প্রতিমাদিদিদের ঘরেই নিয়ে যেতে।”

বিজয়া বলল, “রাধাদিকে ডাক। আর সবাইকে।”

শ্যামকে ঠেলে নিয়েই ওরা একেবারে শেষ প্রান্তের ঘরে ঢোকাল। ঘরে বাতি জ্বলছিল।

শ্যাম ঘরটা একবার দেখল: গোটা তিনেক তক্তাপোশ, বিছানা পাতা; কাঠের আলনা, দড়ির আলনা, শাড়ি সায়া জামা ঝুলছে; কাঠের সস্তা র‍্যাক আর টেবিল—বইপত্র, কাগজ, মাথার তেল, ক্রিম পাউডার, চুলের ফিতে, ওষুধের শিশি আরও কত কি।

শ্যামকে কেউ বসতে বলল না। বেচারি দাঁড়িয়ে থাকল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আলোতে সে তার শত্রুপক্ষকে দেখতে লাগল। সবকটার মুখে চাপা হাসি, বিজয় গর্বের হাসি তো বটেই, তার সঙ্গে বাঁকা হাসিও মেশানো। প্রচ্ছন্ন একটা কৌশলের আভাসও যেন ওদের চোখে মুখে ফুটে আছে।

লিলি খোঁচা মেরে বলল, “তোয়ালে এনে দেব নাকি? গা-মাথা মুছবেন?”

শ্যাম মাথা নাড়ল, “না।”

অনিমা বলল, “একটা ময়লা গামছা এনে দে বরং, ওই মাথা আর তোয়ালে দিয়ে মোছে না।”

আবার এক দফা হাসি উঠল। শ্যাম দেখল নীচে থেকে তাকে যারা ধরে এনেছিল দোতলায় এসে তাদের দল আরও ভারি হয়ে উঠেছে। আলো চ্যাটার্জি, পার্বতী সেন, মীনা গুপ্ত—সবাই আছে। শ্যামের কান্না পাচ্ছিল।

এমন সময় পায়ে শব্দ তুলে এবং গলায় আওয়াজ দিয়ে সিংহবাহিনী—অর্থাৎ সেই অনুরাধা সিংহ এল। মেয়েরা সবাই গা সরিয়ে তাদের রাধাদি—অর্থাৎ বাহিনীর সর্বাধিনায়িকার জায়গা করে দিল। রাধার হাতে একটা ফাইল, আর চোখে চশমা।

সিংহবাহিনী তার নাক কোঁচকাল, ঠোঁট ওলটাল তারপর ঘরে ঢুকে শ্যামকে একবার আপাদমস্তক তির্যক চোখে, সঘৃণায় লক্ষ করল, এগিয়ে গিয়ে জানলার দিকে দাঁড়াল। শ্যামের পা তখন রীতিমত থরথর করে কাঁপছে, গলার কাছে সোডার গুলির মতন ভয়ের একটা শক্ত বল আটকে আছে। শ্যামের মনে হল, সে একেবারে অনুরাধার পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে পা জড়িয়ে ধরে।

একটা চেয়ার টেনে অনুরাধা—বা রাধা বসল। বসেই হুকুম করল, “ওকে একটা টুল দে বসার।”

কে যেন একটা টুল এনে দিল।

রাধা গম্ভীর গলায় বলল, “দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলির পাঁঠার মতন কাঁপতে হবে না। ওই টুলে বসা হোক।”

দাঁড়িয়ে থাকার অবস্থা শ্যামের ছিল না। সে সত্যিই বলির পাঁঠা। শ্যাম নিজেকেও নিজে পাঁঠা বলল। এবং অসহায়ের মতন বসল।

শ্যামকে আবার ভাল করে দেখে রাধা বলল, “মাথাটাথা মোছা হবে নাকি?”

মাথা নাড়াল শ্যাম। না।

“ভাল। …তা মশায়ের নাম কি শ্যামচন্দ্র?”

“না, শুধু শ্যাম।”

“শ্যামের পর কিছু নেই?”

“না, শ্যাম বলল, বলেই সে এত বিপদের মধ্যে একটা বিদ্বেষপূর্ণ রসিকতা করে বললে, “শ্যামের পাশে মানাবার মতন কিছু এখনও খুঁজে পাইনি।”

রাধা ইঙ্গিতটা বুঝল। মেয়েরাও ঠোঁটের ফাঁকে হেসে ফেলেছে। খানিকটা যেন ব্যঙ্গ করেই রাধা বলল, “টিকটিকির আবার পাখা গজাবার সাধ। …তা, কেষ্ট ঠাকুরের বাবার নাম কি অনাদিচরণ বাবু?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ।”

“পলাশ পাড়ার দিকে থাকা হয়?”

“হ্যাঁ।”

“বয়স কত?”

“চৌত্রিশ।”

“চাকরি-বাকরি তো মোটামুটি ভালই করা হয়।”

“চাকরি একটা করা হয়!”

রাধা এবার মুহুর্ত কয়েক চুপ করে থেকে সঙ্গিনীদের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে যেন কি কথা বলে নিল। পরে বলল শ্যামকেই, “সেদিন স্টেশনে আমার কাপড় পুড়িয়েছিল কে?”

শ্যাম এভাবে চোরা মার খাওয়া বরদাস্ত করতে পারছিল না। বলল, “আমি সেদিন ইচ্ছে করে আপনার শাড়ি পোড়াইনি। অ্যাকসিডেন্টালি হয়ে গেছে। আমার অবশ্য কেয়ারফুল হওয়া উচিত ছিল। আর তার জন্যে ক্ষমা চেয়েছি। …যদি তাতেও না হয়ে থাকে শাড়ির দাম দিতে রাজি।”

আলো টিটকিরি দিয়ে বলল, “ইস্‌…খুব যে টাকার তেজ।”

পার্বতী বলল, “তেজস্ক্রিয় না কি বলে যেন একেবারে তাই, না রে আলো!”

খিল খিল হাসি উঠল মেয়েদের মধ্যে।

শ্যামের আর সহ্য হচ্ছিল না। কান, নাক, চোখ জ্বালা করছিল। শ্যাম রাধার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমায় এখানে এভাবে কেন ধরে আনা হয়েছে আমি জানতে চাই।”

লিলি ঘাড় মুখ হেলিয়ে দুলিয়ে মন্তব্য করল: “আহা রে কচি থোকা…।”

রাধা বলল, “কেন ধরে আনা হয়েছে আপনি জানেন না?”

“না। এটা অন্যায়।”

রাধা যেন সাঁড়াশির মতন চোখ করে শ্যামের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনাকে কি জামাই আদর করার জন্যে ধরে আনা হয়েছে ভাবছেন?”

“না, তা তো নয়ই। দেখতেই পাচ্ছি।” বলে শ্যাম কাঁটা কম্পাস, স্কেল, কাঁচি-সজ্জিত মেয়েদের দিকে তাকাল।

রাধা বলল, “এ বাঁদরামি কে করেছে?”

“কি?”

“জানেন না। …এই লিলি দে তো তোর হাতের কাঁটা দুটো। দেখছি জানে কি না।” বলে রাধা হাতের ফাইলটা নাড়ল। “বলি, কাগজে—বাংলা কাগজে—কে আমাদের ঠিকানা দিয়ে বিয়ের বিজ্ঞাপন ছেপেছে?”

শ্যাম একেবারেই চুপসানো ফানুসের মতন হয়ে গেল। তার অবশ্য মনে মনে এরকম একটা সন্দেহ হচ্ছিল, কিন্তু ব্যাপারটা এত গোপনে করা হয়েছে যে বসন্তবিলাপের মেয়েদের জানার কথা নয়। কোথায় কলকাতায় কাগজে টাকা পাঠিয়ে বিজ্ঞাপন ছাপার ব্যবস্থা করা আর কোথায় এরা? কী করে জানবে?

রাধা ততক্ষণে আবার জোরে ধমকে উঠেছে। “কে দিয়েছে বিজ্ঞাপন?”

শ্যাম আত্মরক্ষার জন্য দিশেহারা হয়ে গেল। সর্বনাশ, তাদের কীর্তি যে ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটা শাড়ি পোড়ানোর চেয়ে মারাত্মক, সহস্রগুণ বিপজ্জনক। শ্যাম যদি স্বীকার করে নেয় তবে এই বসন্তবিলাপের দল তার ছালচামড়া ছিঁড়ে নিয়ে ডুগডুগি বাজাতে বসবে।

চুপসানো মুখে গোঁ গোঁ শব্দ করতে করতে শ্যাম খানিকটা থুথুই গিলে ফেলল। অসহায়ভাবে মাথা নেড়ে বলল, “আজ্ঞে আমি কিছু জানি না। কিসের বিজ্ঞাপন?”

রাধা চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল। “জানেন না?…মিথ্যেবাদী, লায়ার, চোর…।”

শ্যাম হাতজোড় করে ফেলল, “সত্যি বলছি, বিশ্বাস করুন।”

“এই আলো…” রাধা রক্তচক্ষু হয়ে হাত বাড়াল, “ওই পাখাটা দে তো, আজ আমি ওর মাথায় পাখার বাঁট ভাঙব।”

আলো বিছানার পাশ থেকে একটা পাখা তুলে নিল।

শ্যাম বলল, “আপনারা সবাই মিলে আমার ওপর অত্যাচার করছেন।” বলার সময় দেখল আলো পাখাটা সিংহবাহিনীর হাতের কাছে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

কাগজে বিয়ের বিজ্ঞাপন আপনারা দেননি?” রাধা ধমকেই বলল, “আমাদের বাড়ির ঠিকানা দিয়ে পাত্র চাই বলে কে তা হলে বিজ্ঞাপন দিয়েছে?”

শ্যাম গোবেচারি ও ন্যাকা বোকার মতন করে বলল, “আমি কি করে জানব। কী আশ্চর্য। কিসের বিজ্ঞাপন?”

রাধা হাতের ছোট ফাইল খুলে কিছু কাগজপত্র সরিয়ে দুটো কাগজ বের করল। শ্যামের কাছে এগিয়ে এসে ভাঁজ করা কাগজের একটা জায়গা দেখাল, লাল পেনসিলের ঘেরা দেওয়া। শ্যাম দেখার ভান করল।

“এই বিজ্ঞাপন কে দিয়েছে?” রাধা জেরা শুরু করল।

“আমি জানি না।”

“মিথ্যুক, বেয়াদব। …এই বিজ্ঞাপনে কী লেখা হয়েছে জানেন না আপনি?”

“কেমন করে জানব?”

“লেখা হয়েছে যে এই ঠিকানায় বামুন, কায়স্থ, বদ্যি, উজ্জ্বল শ্যাম, গৌরাঙ্গী, বয়স্কা, কম বয়স্কা, চাকরি করা বহু পাত্রী আছে। বিবাহ-যোগ্য এই মেয়েদের জন্যে পাত্র চাই।”

শ্যাম পর পর দুবার ঢোক গিলল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।

“বিজ্ঞাপনটা ক’বার বেরিয়েছে জানেন?” রাধা জেরা চালাতে লাগল।

“আজ্ঞে না।”

“দু বার। দ্বিতীয়বার আরও নতুন নতুন কথা আছে।”

“ও।”

“কত চিঠি এসেছে জানেন এই ঠিকানায়?…কত চিঠি এসেছে অণিমা?”

“অনেক—প্রায় দুশো তো হবেই। এখনও আসছে।”

“তা হলে?” রাধা শ্যামের দিকে ছুরির মতন ধারালো চোখে তাকাল। “কী বলার আছে আপনার?”

বলার বাস্তবিকই কিছু নেই। ভেজা মাথায় বসে থাকতে থাকতে শ্যাম হাঁচল।

বিজয়া লিলির হাত থেকে জ্যামিতি বাক্সর দু’মুখো ছুঁচলো কাঁটা কেড়ে নিয়ে এসে শ্যামের একেবারে হাতের কাছে দাঁড়াল, দাঁড়িয়ে কাঁটাটা শ্যামের মুখের কাছে তুলে বলল, “ক্যাবলার মতন করে তাকাবেন না, চোখে ফুটিয়ে দেব প্যাঁক করে।”

শ্যাম ভয়ে চোখের পাতা বুজে ফেলল।

“ওই মাথায় এত বুদ্ধি আসে কি করে।” রাধা টেরা চোখ করে সেয়ানা উকিলের মতন জিজ্ঞেস করল।

“আজ্ঞে—”

“বলছি, ওই তো মাথা”

“ছাগলের শেপ…” বিজয়া বলল।

মেয়েরা হেসে উঠল হিহি করে।

একজন বললে, “মাথার চুল কামিয়ে ন্যাড়া করে দাও রাধাদি, শেপটা ফুটবে ভাল।”

শ্যাম অপমানে ক্রমশই যেন বেপরোয়া হয়ে উঠছিল। বলল, “আপনারা আমায় পেয়েছেন কী? এভাবে জোর জবরদস্তি করে ধরে আনা বেআইনি।”

আলো মুখ ভেঙিয়ে বলল, “আহা, বেআইনি! দেখাচ্ছি। ও বিজয়া—”

“অত দরকার কী, ওকে পুলিশে দিয়ে দে না। পুলিশের জিম্মায় দিয়ে দে। আর সঙ্গে সঙ্গে সম্ভ্রমহানির একটা মামলা সবাই মিলে ঠুকে দি। দেখি ধর্মের ষাঁড় কোথায় পালায়?”

শ্যাম ভয়ে আঁতকে উঠে বলল, “মামলা?”

“বাঃ মামলা করব না”—আলো বলল, “আমাদের মান সম্মান সম্রম, আমাদের পারিবারিক সুনাম নষ্ট করে যারা আমাদের সম্মানহানি করছে তাদের নামে মামলা করব না। …এতগুলো মেয়ের একসঙ্গে মামলা, দেখি কোর্ট কী করে ছাড়ে আপনাদের।”

শ্যাম আর কোথাও কোনো পথ দেখতে পেল না। শালা শেষ পর্যন্ত মেয়েছেলেদের ব্যাপার নিয়ে মামলা? ক্রিমিন্যাল কেস হবে নাকি? হতে পারে। বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে, সারা শহরে রইরই পড়ে যাবে, জেলে গিয়ে ঘানি ঘোরাতে হবে। শ্যাম যেন ঘামতে লাগল। “আপনারা আমায় একা পেয়ে যা খুশি বলছেন।”

ভিড়ের মধ্যে থেকে কলেজের টিচার নবনীতা এগিয়ে এসে বলল, “রাধা, উনি যদি এ-সময় কাউকে ডাকতে চান ডাকতে পারেন। ওদের তরফে যদি কিছু বলার থাকে শুনে নেওয়া যাক।”

রাধা বলল, “বেশ। একজনকে ডাকতে পারেন। যে কোনো একজনকে।”

“কী করে ডাকব। আমি এখানে?”

“দু লাইন লিখে দিন, আমরা আনিয়ে নিচ্ছি। …ও বাড়িতে আড্ডায় নিশ্চয় পাব।”

লিলি সঙ্গে সঙ্গে কাগজ কলম এনে দিল।

রাধা বলল, “কোনো আজে বাজে কথা লেখা চলবে না। কোথায় আছেন তাও নয়। শুধু লিখবেন—বিশেষ জরুরি, একবার আসতে। লেখাটা আমরা দেখে নেব।”

শ্যাম সামান্য ভাবল। কাকে এ-সময় আসতে লেখা যায়? সিধুকেই লেখা যাক। সিধু নিশ্চয় আড্ডায় এসে গেছে। সিধুটা একটু গুণ্ডাগোছের। দত্তগুপ্ত কিছু করতে পারবে না। ললিতটা আরও নার্ভাস। শ্যাম লিখল: “সিধু, পত্রপাঠ চলে আসবি। ভীষণ বিপদ।”

লেখাটা রাধা পড়ে দেখল, তারপর বিজয়াকে দিয়ে বলল, “যা আর একটাকে ধরে আন। ওবাড়িতে কেউ যাবি না তোরা, নীচে থাকবি। ঝিয়ের ছেলেটাকে পাঠিয়ে দে। বলে দিস, কিছু না বলে যেন।”

বিজয়ারা একদল দৌড়ে ঘর ছেড়ে চলে গেল।

ঘরে শ্যাম, টুলে বসে। আর ওদিকে রাধা, চেয়ারে ফিরে বসেছে। নবনীতা বিছানায় বসে আস্তে আস্তে পায়ের পাতা কাঁপাচ্ছিল; আলো দরজার দিকে একটা টেবিলের কোণায় আধ-বসা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রায় চুপচাপ। শ্যাম আটক-করা চোরের মতন হতাশ, হতোদ্যম হয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল। ঘরের জানলায় মোটা শিক, রাস্তার বারান্দার দিকে দরজাটা বন্ধ। ঝিপঝিপে বৃষ্টি পড়েই চলেছে। শ্যাম যে বারান্দা থেকে নীচে রাস্তায় লাফ মারবে তার সাহস নেই, উপায়ও নেই। দৌড় মেরে নীচে পালানোও অনর্থক, নীচে পুরো ফৌজ দাঁড়িয়ে আছে সিধুকে ধরে আনার জন্যে। অগত্যা শ্যাম ঘরের জিনিসপত্র, বিছানা, শাড়ি জামা, এটা-সেটা লক্ষ করতে লাগল। করতে করতে সে দেখল, কোণের দিকে দড়ির আলনায় বেশ বাহারি একটা ব্রেসিয়ার ঝুলছে। এই ঘরে কে কে থাকে শ্যাম জানে না; প্রতিমাদি থাকে শুনেছে; আর কে? শ্যাম আড়চোখে ব্রেসিয়ার দেখতে লাগল এবং নানা রকম অনুমান করছিল।

সিধু শালা আসবে তো? নাকি ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে এ-পথ আর মাড়াবে না। বন্ধুর বিপদে সিধু যদি না আসে তবে শ্যাম তার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখবে না। সিধু, ললিত, দত্তগুপ্ত—সকলেরই এখানে এসে দেখে যাওয়া উচিত শ্যাম কেমন করে কাদায় ডুবে গেছে। একা শ্যাম কেন—ওই তিনটেরও একই হাল হওয়া দরকার, শ্যাম একা জেলে যেতে পারবে না। মণিমালাবউদির কথায় খুব নেচে ছিল সবাই। এবার ঠেলা সামলাও। বউদির ওপর শ্যামের রাগ হচ্ছিল, স্ত্রীবুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী।

শ্যাম আবার হাঁচল, একসঙ্গে বার পাঁচেক।

রাধা ভুরু কুঁচকে ধমকে উঠে বলল, “হাঁচির হাট বসিয়ে দিচ্ছেন যে! হচিতে রোগ ছড়ায় সে জ্ঞান নেই। হাঁদা কোথাকার!”

শ্যাম তাড়াতাড়ি নাকে মুখে রুমাল চাপা দিল।

নবনীতা রসিকতা করে বলল, “শ্যামবাবুর জন্যে একটু আদা-চা এনে দে, আলো।”

আলো গা দুলিয়ে ঘাড় হেলিয়ে বলল, “চা খাবেন নাকি শ্যামবাবু?”

মাথা নাড়ল শ্যাম; না খাবে না। আলো—সিধুর ফ্লুরোসেন্ট ল্যাম্প—সত্যিই বেশ জ্বলজ্বলে। বড় বড় চোখ, ডাসা নাক, বেশ শ্লিপমারা চেহারা।

নবনীতা আর রাধা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে যদিও তবু শ্যাম বুঝতে পারছে—কথাটা শ্যামদের নিয়ে, পুলিশ ডাকা মামলা করা এইসব সংক্রান্ত। শ্যামের মাথা ধরে উঠছিল।

এমন সময় নীচের দিকে হইহই। সিঁড়িতে দূপদাপ। তারপর সিধুর গলা।

সিধুকে চারপাশ থেকে ঘিরে মেয়েরা ঘরে ঢুকল। সিধুর অবস্থা ভাল নয়, একেবারে ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে, মাথার চুল এলোমেলো, জামার একটা পকেট ছিঁড়ে গেছে, সিধু জড়সড়, কাঠ।

সিধু ঢুকতেই শ্যাম প্রায় ছেলেমানুষের মতন ডুকরে উঠল, “সিধু!”

সিধু সিংহবাহিনীর মুখোমুখি হয়ে একেবারে ভূত দেখার মতন আঁতকে উঠল। তার গলায় আর শব্দ বেরোচ্ছে না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিধু কিম্ভূত ধরনের একটা শব্দ করল।

রাধা মেয়েদের বলল, “আর একটা টুলফুল এনে দে ওকে। ভিরমি খেয়ে না পড়ে যায়!”

শ্যাম আবার ডাকল, “সিধু।”

ধাতস্থ হতে সিধুর একটু সময় লাগল। কিন্তু ধাতস্থ হবার পর সিধু বেশ তাড়াতাড়ি সাহস সংগ্রহ করতে লাগল। একটা ভাঙা মোড়া এনে দেওয়া হয়েছিল সিধুকে বসতে! সিধু শ্যামের পাশে বসল।

রাধা বলল, “নামটা কি সিদ্ধেশ্বর গাঙ্গুলি?”

সিধু মাথা হেলিয়ে সায় দিল। বলল, “আমাকে এখানে আনার মানেটা কি?” বলে শ্যামের দিকে তাকাল। “কী হয়েছে রে?”

শ্যাম অসহায়ের মত বলল, “আমাকে এঁরা রাস্তা থেকে ধরে এনেছেন।”

“ধরে এনেছে! কচি খোকা!” আলো টিটকিরি মেরে মন্তব্য করল।

সিধু আলোর দিকে তাকাল। “শ্যাম নিজে এখানে আসতেই পারে না।”

লিলি বলল, “আসবে কী করে? এলে যে পা খোঁড়া করে দেব।”

রাধা বলল, “চুপ! তোরা চুপ করে থাক।”

মেয়েরা চুপ করে গেল।

রাধা সিধুকে বলল, বেশ গম্ভীর পরিষ্কার গলায়, “আপনার বন্ধুকে আমরা রাস্তা থেকে ধরে এনেছি। হ্যাঁ—এনেছি।”

“এটা কিডন্যাপিং…”

নবনীতা হাসল। বলল, “কেন এনেছি জানেন?”

“না।”

রাধা বলল, “আপনারা ইতর, অসভ্য, জন্তু…।”

সিধু চোখ বড় বড় করে চেয়ে থাকল।

রাধা বলল, “ধরে আনার কারণ আপনার পেয়ারের বন্ধু শ্যামচন্দরকে বলা হয়েছে। শুনে নিন।”

সিধু শ্যামের দিকে তাকাল। অবশ্য সিধু এতক্ষণে সবটাই বুঝতে পেরেছে।

শ্যাম বলল, “খবরের কাগজে—রবিবারের কাগজে—একটা বিয়ের বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে ভাই। এখানকার, এ বাড়ির ঠিকানা দিয়ে। তাতে নাকি লেখা আছে—এখানে নানারকম—ভেরিয়াস টাইপের মেয়ে পাত্রী আছে, বিয়ের যুগ্যি।…সেই বিজ্ঞাপন বেরুবার পর চিঠি এসেছে অনেক…।”

বাধা দিয়ে কে একজন বলল, “ঘটকও এসেছে।”

শ্যাম নিজের কথা শেষ করল। “এঁরা বলছেন বিজ্ঞাপনটা আমরা দিয়ে দিয়েছি। দেখ তো ভাই, কী রকম খারাপ অ্যালিগেশান!”

সিধু হঠাৎ বলল, “মাইরি আর কি।”

সঙ্গে সঙ্গে আলো জিভ ভেঙিয়ে বলল, “আহ, ইললি রে…”

রাধা চেয়ারে বসে সিধুকে ধমকে উঠল জোরে, “ছোটলোকের আড্ডা নাকি এটা? মাইরি-ফাইরি চলবে না। ভদ্র ভাষায় কথা বলুন।”

সিধু বলল, “ইললি বললে দোষ নেই?”

“বাজে কথা থাক। কাজের কথার জবাব দিন।”

“বলুন।”

“বিজ্ঞাপনটা আপনারা দিয়েছেন।”

“আপনারাও দিতে পারেন।”

আলো ছুটে এল, যেন সিধুর মাথার চুলের ঝুঁটি ধরেই নেড়ে দেবে। বলল, “আমরা বিজ্ঞাপন দিয়েছি! মিথ্যেবাদী, পাজি…”

সিধু বলল, “আমরাই বা দেব কেন? বিজ্ঞাপন দিতে পয়সা লাগে। আপনাদের জন্যে আমরা চ্যারিটি করব কেন?”

একটু চুপ। নবনীতা মৃদু হেসে বলল, “তা ঠিক। তবে এখানে সেটা করা হয়েছে। বিজ্ঞাপনের টাকা আপনারা দিয়েছেন।”

সিধু এবার সন্দিগ্ধ হল। “বাজে কথা, মিথ্যে কথা। আমাদের এতে স্বার্থ কী?”

আলো বলল, “ষোলো আনা স্বার্থ।”

সিধু বলল, “এক আনাও নয়!”

রাধা বলল, “বেশ। কিন্তু সিধুবাবু, গোঁসাই-মশাই, যদি আমরা দেখাই যে এই বিজ্ঞাপন আপনারা দিয়েছেন, তা হলে?”

সিধু ভেতরে ভেতরে ভয় পেলেও মুখে প্রকাশ করল না। বলল, “প্রমাণ থাকলে অন্য কথা।”

“থাকলে কী হবে আগে বলুন?”

“কী আর—” সিধু ঘাবড়ে গেল, “আমাদের যা খুশি করবেন আপনারা।”

“আমরা প্রথমে পুলিশে যাব। শ্যামচন্দরকে আজই হাজতে ঢোকাব। আর আপনাদের নামে মামলা করব। আমাদের এতগুলো মেয়ের সামাজিক ও পারিবারিক মান, সম্মান, সম্ভ্রম নষ্ট করার জন্যে। বুঝলেন?”

সিধু সবই বুঝতে পেরে গেছে, এতক্ষণে শ্যামের দিকে ঘাবড়ানো চোখে চাইল। নিচু গলায় বলল, “আলোর সুইচ কোথায় রে?”

শ্যাম ফিসফিস করে বলল, “কোন আলো?”

রাধা চিৎকার করে বলল, “কানে কানে কথা বলার কিছু নেই। আমরা যা বললাম তাই করব।”

সিধু কাষ্ঠ হাসি হেসে বলল, “আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনারা যা ভাল বোঝেন করবেন। কিন্তু প্রমাণটা…?”

রাধা তার হাতের ছোট ফাইল ওলটাল। বলল, “আমরা কলকাতার কাগজের অফিস থেকে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এখান থেকে মনি অর্ডারে টাকা পাঠানো হয়েছে, শ্যামচন্দ্রর নামে। কলকাতায় আমাদের লোক আছে। …কবে কত টাকা পাঠানো হয়েছে তাও বলতে পারি। এগারোই জুন, আর পয়লা জুলাই। কাগজের অফিসে আমরা চিঠি লিখেছিলাম, তার জবাবও এখানে আছে—, দেখতে চান?”

শ্যাম টুল সমেত মাটিতে হাঁটু গেড়ে পড়ল। সিধু একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তড়াক করে দাঁড়িয়ে উঠে হাত জোড় করে কিছু বলতে গেল। কেউ কোনো কথা শুনল না। আলো সিধুকে চিমটি কাটল বেজায় জোরে, লিলি সিধুর ছেড়া পকেট ধরে টান মেরে পুরোটাই ছিঁড়ে দিল। অনিমা শ্যামের পিঠে গুম করে দুটো কিল বসিয়ে দিল, আর পার্বতী কুঁজোর জল শ্যামের মাথায় ঢেলে দিল। ওরই মধ্যে কে যেন সিধু এবং শ্যামকে সেফটিপিন ফোটাল, জ্যামিতি বাক্সের দু-মুখো কাঁটা দিয়ে খুঁচিয়ে দিল, দু-চারবার স্কেলের বাড়ি পড়ল।

শ্যাম এবং সিধু পাশাপাশি মাটিতে বসে জোড় হাতে ক্ষমা ভিক্ষা করতে করতে বলল, “আর না, প্লিজ, মরে যাব।”

রাধা হুকুম করল কড়া গলায়। “এই, ওদের ছেড়ে দে।”

মেয়েরা সরে দাঁড়াল।

রাধা বলল, “দোষ স্বীকার করছেন?”

শ্যাম বলল, “আজ্ঞে হ্যাঁ, করছি। …পায়ে পড়ছি…”

সিধু বলল, “আমাদের মাপ করুন।”

রাধা বলল, “কিন্তু এই যে আমাদের ইজ্জত নষ্ট করা হয়েছে, এর কি হবে?”

শ্যাম বলল, “যা বলবেন তাতেই রাজি। আমাকে প্লিজ পুলিশে দেবেন না। পুলিশের নাম শুনলেই আমার ডিসেন্ট্রি হয়। মামলা যদি করেন—সে স্ক্যান্ডেলাস হবে। শহরে টিকতে পারব না। বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে। চাকরি যাবে।”

নবনীতা বলল, “এ জ্ঞান আগে হয়নি।”

সিধু বলল, “আজ্ঞে আগে হলে কি এ পথ মাড়াই।”

রাধা বলল, “অত সস্তায় চিঁড়ে ভেজে না। এই অপমান, দুর্নাম সম্ভ্রমহানির ক্ষতিপূরণ কে দেবে?”

শ্যাম এবং সিধু মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।

শ্যাম বলল, “যৎসামান্য মানুষ আমরা, ক্ষতিপূরণ কী করেই বা দিতে পারি?”

রাধা বলল, “তা হয় না। শুধু হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না।”

“মুচলেকা দিচ্ছি।” সিধু বলল।

“তার আগে নাকে খত দশ হাত। কান ধরে উঠ বোস পঞ্চাশ বার।” আলো বলল।

“জিভ বের করে ভেড়া ডাকতে হবে পাঁচ মিনিট—” অন্য কেউ বলল।

শ্যাম নিজের নাকে হাত দিয়ে করুণভাবে সিধুর দিকে চাইল। সিধু ফিসফিস করে বলল, “বিচ্ছুর গর্ত মাইরি।”

এমন সময় ঘরের মধ্যে একটা হইহই শুরু হয়ে হাসির অট্টরোল পড়ে গেল। মেয়েদের ভিড় সরিয়ে মণিমালা কোথা থেকে এসে হাজির। পেছনে হন্তদন্ত ললিত আর দত্তগুপ্ত।

রাধা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে একেবারে অন্য মূর্তি হয়ে গেল। হেসে, গড়িয়ে আহ্লাদে আটখানা হয়ে বলল, “একেবারে কাঁটায় কাঁটায় এসে পড়েছ, মণিদি, ব্যাঙ কুয়োয় পড়েছে।”

মণিমালা হাসি চাপতে পারছিল না। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে বলল, “এ কি করছিস রে ওদের? ওমা ছিছি। আপনারা ভাই উঠে বসুন।”

শ্যাম সিধুর দিকে তাকাল, সিধু শ্যামের দিকে, তারপর দুজনেই ললিত ও দত্তগুপ্তর দিকে তাকাল। ললিতরাও কিছু কম হতবাক নয়।

সিধু মণিমালার দিকে খানিকটা তাকিয়ে শেষে বলল, “বউদি, এটা খুব আনফেয়ার কাজ হল। আপনি ট্রেচারি করলেন আমাদের সঙ্গে!”

শ্যাম বলল, ‘কনসপিরেসি!”

ললিত ক্ষুব্ধ গলায় বলল, “তুমি আমাদের গাছে চড়িয়ে মই কেড়ে নিলে বউদি, এখন বুঝতে পারছি তোমার চালটা কাদের তরফের ছিল।”

দত্তগুপ্ত বলল, “আমাগো খুব খেলাইলেন, বউদিদি। আপনেরে দণ্ডবৎ।”

মেয়ের দল অট্টহাসি হেসে উঠল। নানা গলার, নানা সুরের হাসি। হাসির চোটে ঘরটা ফেটে যাবার যোগাড়।

মণিমালার নাক-চোখে জল এসে গেছে হাসতে হাসতে। নাক-চোখ মুছে হাসি সামলে বলল, “কেন ভাই, দোষটা কী করলাম। আপনাদের কত হা-হুতোশ ছিল! আমি বরং বসন্তবিলাপের ঘরে এনে বসিয়ে দিলাম, এরপর যার যেমন কপাল…”

আলো বলল, “কপাল কেন বলছেন মণিদি, বলুন কেরামতি। কার কত কেরামতি।”

সিধু আলোর দিকে তাকাল। ওরা উঠে দাঁড়িয়েছে। সিধু দেখল, আলোর সুইচটা হাতের কাছেই। কেরামতি দেখাতে অবশ্য সাহস করল না।

ললিত একপলক নবনীতার দিকে তাকাল। তাকিয়েই কী রকম লজ্জা পেল।

দত্তগুপ্ত ঝট করে ভূগোলদিদি পার্বতীকে চোখ টিপে দিয়েই গম্ভীর হয়ে গেল।

মণিমালা বলল, “রাধা, এদের তা হলে…”

রাধা বলল, “এখন তুমিই তো জামিন দাঁড়াচ্ছ মণিদি, আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে ক্ষতিপূরণ তো দিতেই হবে। পরে দেবে। আমরাও ভেবে দেখি।”

সিধু বলল, “তেমন তেমন হলে পতিপূরণও হতে পারে। মুচলেকাও।”

শ্যাম বলল, “ওয়ার্ড অফ অনার বউদি।”

মেয়েরা তেড়ে মারতে আসে আর কি সিধুকে। আলো কনুই দিয়ে সিধুকে গুঁতোও মেরে দিল।

মণিমালা বলল, “থাক থাক, ওসব পরে দেখা যাবে। ছেড়ে দে ওদের।”

“যান।” রাধা তর্জনী তুলে দরজা দেখিয়ে দিল ওদের।

শ্যামসুন্দর যাবার সময় মেয়েরা রসিকতা করে একটু উলু দিয়ে নিল।

মাসখানেকও হয়নি, ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে সন্ধ্যেবেলায় শ্যাম আর রাধা একই সঙ্গে একটা রিকশা করে স্টেশন থেকে ফিরছিল।

রেল অফিসের সামনে জোড়া কদমগাছের তলায় এসে শ্যাম বলল, “তোমার পদবিটা বড় ফেরোসাস রাধা, সিংহী। ওটা বদলে নিলে কেমন হয়?”

রাধা শ্যামের কাঁধের কাছে আলগা ঠেলা দিয়ে বলল, “বদলে নিলেও কি তোমার লাভ হবে কিছু, আমি সিংহীর মতনই থাকব।”

“তা থাকো। তাতে আমার আপত্তি নেই।”

“নেই?”

“না, আপত্তি কিসের। আমি তো তোমার খাঁচায় ঢুকেই পড়েছি। …তবে পদবিটা পালটে নাও…আ, ফার্স্ট ক্লাস কদমফুলের গন্ধ দিয়েছে।”

রাধা বললে, “শুধুই কি গন্ধ। কদমতলায় একেবারে শ্যাম রয়েছেন যে।”

“রাধাও!” শ্যাম হেসে বলল।

দুজনেই ঘন হয়ে বসে হাসতে লাগল হঠাৎ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%