০৭. বি.এ. পাশ করিবার পর

তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

সপ্তম পরিচ্ছেদ

বি.এ. পাশ করিবার পর প্রথমে কাজল ভাবিয়াছিল আর পড়াশুনা করিবে না। খামোকা দুই বৎসর এম.এ. পড়িয়া বয়েস বাড়াইয়া লাভ কী? বরং যে পেশায় সারাজীবন কাটাইতে হইবে সেটা খুঁজিয়া লওযা ভালো। কিন্তু বাধা দিল হৈমন্তী।

মার্কশিট হাতে বাড়ি আসিয়া মাকে প্রণাম করিতেই হৈমন্তী কাঁদিয়া ফেলিল। কাজল বলিলকঁদছো কেন মা? এই দেখো, এগুলো অনার্স পেপারের নম্বর, আর এগুলো পাস কোর্সে

হৈমন্তী কাঁদিতেই থাকিল।

একটিমাত্র মানুষের অনুপস্থিতি তাহার মা ও ছেলের সংসাবে একটা অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করিয়াছে। আজ বাবা বাঁচিয়া থাকিলে সবদিক দিয়া আনন্দটা সম্পূর্ণতর হইত। অবশ্য চিন্তা ও জীবনচর্যার ভিতর দিয়া বাবা তাহার কাছে অনেক জীবিত মানুষেব চেয়ে বেশি করিয়া বাঁচিয়া আছে। গভীর চিন্তার মুহূর্তে অপুর স্মৃতি এবং সাহিত্য তাহাকে যে সাহচর্য দেয়, অনেকের জীবিত জনকও ততখানি দিতে পারে না। কিন্তু কাজলের পৃথিবী অনেক বড়ো, প্রান্তর পর্বত আকাশ গ্রহ-নক্ষত্র লইয়া তাহার দুনিয়াটা আপন সংকীর্ণ গৃহাঙ্গন ছাড়াইয়া অনেকদূর অবধি বিস্তৃত। মৃত্যুর কঠোর বিচ্ছেদ সে দার্শনিক ঔদাসীন্যকে কিছুটা সহনীয় করিয়া আনিতে পারে। হৈমন্তীর জগৎ অত বড়ো নহে, তাহার যাহা যায় তাহা যায়।

বিকালের দিকে হৈমন্তী জিজ্ঞাসা করিল—তা এবার এম এ.-তে ভর্তি হবি তো?

—ভাবছি মা। দুটো বছর নষ্ট না করে একটা কাজ খুঁজে নিলে হয় না?

কথাটা হৈমন্তীর পছন্দ হইল না। সে বলিল—তোর বাবার খুব ইচ্ছে ছিল তুই এম.এ. পাস করিস। প্রায়ই বলত। তাছাড়া আমাদের টাকার এমন কী প্রয়োজন যে তোকে এখনই চাকরি করতে হবে! না, তুই এম.এ. পড়

প্রভাতও সেই পরামর্শ দিল। বলিল—বয়েস বাড়লে জীবনে নানা জটিলতা আসবে, ইচ্ছে হলেও তখন আর পড়বার সুযোগ থাকবে না। ভর্তি হয়ে যাও দেখি

-তুমি পড়বে?

—হ্যাঁ। তোমার চেয়ে আমার বরং একটা চাকরি পাওয়ার দরকার অনেক বেশি। তবু আমি পড়ব-যাতে জীবনে কোনও আফসোস না থাকে। কলেজের চেয়ে ইউনিভার্সিটির পরিধি অনেক বড়ো, সে লাইফটা একটু চেখে দেখবো না?

প্রভাতের সঙ্গে একদিনেই কাজল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হইয়া আসিতেছে। হিটলারের দুর্মদ বাহিনীসহ অক্ষশক্তি সর্বত্রই কোণঠাসা। সুদীর্ঘ চারবৎসরব্যাপী প্যারিস অবরোধের অবসান ঘটাইয়া জেনারেল দ্য গলের রেজিস্ট্যান বাহিনী প্যারিসকে মুক্ত করিয়াছে। যুদ্ধ শেষ হইলেই ভারত স্বাধীনতা পাইবে এমন গুজবও বাতাসে ভাসমান। রাজনীতি সম্বন্ধে কাজলের ততটা আগ্রহ না থাকিলেও বেশ অনুমান করিতে পারে মানবেতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কট ও ক্রান্তিকালের সে সাক্ষী।

একদিন একটা মজার কাণ্ড হইল।

দুপুর আড়াইটার পর ইউনিভার্সিটিতে আর কোনও ক্লাস ছিল না। কাজল বইখানা হাতে ট্রামে চাপিয়া এপ্ল্যানেডে গিয়া নামিল। হাঁটিতে হাঁটিতে ময়দানে একটা কাঠবাদামের গাছ দেখিয়া তাহার নিচে বসিয়া পড়িল। দূরে পশ্চিমদিকে গঙ্গাবক্ষে সারি সারি জাহাজ বাঁধা, তাহাদের মাস্তুলগুলির ঊর্ধ্বমুখ স্পর্ধায় আকাশকে বিদ্ধ করিতেছে। দুপুরে শেষ ক্লাসে ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রেড পড়ানো হইতেছিল। তাহার কয়েকটা লাইন মনে আসিল কাজলের। হাতে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসের কবিতার সংকলনখানা ছিল, সেটার পাতা উল্টাইয়া সে প্রেলড-এর নির্বাচিত অংশ বাহির করিয়া পড়িতে লাগিল। জীবনের এইসব একান্ত মুহূর্তগুলি বড়ো সুন্দর। ঘাসের উপর দিনান্তের রৌদ্র আসিয়া এলাইয়া পড়িয়াছে, আপনমনে বসিয়া কেমন কবিতা পড়া।

কাছেই কেহ কী বলিয়া যেন চেঁচাইতেছে। তাহার কর্কশ স্বরে বিরক্ত হইয়া কাজল মুখ তুলিয়া তাকাইল।

একজন হিন্দুস্থানী গাড়োয়ান শ্রেণীর লোক কিছুদূরে গামছা পাতিয়া ঘুমাইতেছিল। একটা লালমুখো সার্জেন্ট আসিয়া তাহাকে ঠেলিয়া তুলিয়া গালিগালাজ করিতেছে। গভীর নিদ্রা হইতে অকস্মাৎ জাগিয়া এই নিদারুণ বিপৎপাতে লোকটা হতচকিত হইয়া পড়িয়াছে। সার্জেন্ট তিবস্কারে ক্ষান্তি দিয়া নির্যাতন পর্বের সমাপ্তি-অনুষ্ঠান হিসাবে লোকটিকে একটা রদ্দা মারিল। নীরবে অপমান পরিপাক করাই এক্ষেত্রে দুর্বলের একমাত্র পন্থা, লোকটা মাবের চোটে মাটিতে বসিয়া পড়িল, তারপর ম্লানমুখে ধীরে ধীরে নিজের গামছাটা পাট করিয়া কঁাধে লইয়া যাইবার জন্য উঠিয়া দাঁড়াইল।

কাজলের হঠাৎ খুব রাগ হইল। অকস্মাৎ সে উঠিয়া হিন্দুস্থানী লোকটার সামনে গিয়া বলিল—দাঁড়াও, কোথায় যাচ্ছো? শ্বেতাঙ্গ সার্জেন্ট কোমরে হাত দিয়া দাঁড়াইয়া ব্যাপার দেখিতেছিল, তাহাকে বলিল–তুমি এ লোকটাকে অকারণে মারলে কেন?

বিজিত দেশের নাগরিকের নিকট হইতে শাসকজাতির প্রতিনিধি এ ধরনের প্রশ্ন আশা করে। সার্জেন্ট বিস্মিত হইয়া বলিল—আমি কী তোমার কাছে আমার কাজের কৈফিয়ৎ দেব? তুমি কে?

—আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র। না, তুমি পুলিশ, তোমার কর্তব্যের জন্য আমার কাছে কৈফিয়ৎ দিতে বাধ্য নও। কিন্তু আমি লক্ষ করেছি এই লোকটা কোনও অপরাধ করেনি, অথচ তুমি একে শারীরিক নির্যাতন করলে।

সার্জেন্টের মুখ লাল হইয়া উঠিল।—তুমি কী আমাকে চ্যালেঞ্জ করছো?

কাজল বলিল–আদৌ না। আমি শুধু এই কথা বলছি যে, ভাগ্যক্রমে আমরা পরাধীন, তোমরা শাসক। কিন্তু চিরকাল কোনও জাতি পরাধীন থাকে না, যদি কোনওদিন তোমাদের চলে যেতে হয়, তাহলে পেছনে কিছু সুন্দর স্মৃতি রেখে যাওয়াই কী ভালো নয়?

—মাঠের এই অংশ জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য নয়। এখানে শুয়ে থাকা বেআইনি—

–সেই কথাটা তুমি একে বুঝিয়ে বলতে পারতে। পশুশক্তির প্রকাশে কোনও মহত্ত্ব নেই।

–তোমাকে কর্তব্যে বাধাদানের জন্য আমি এখনই গ্রেপ্তার করতে পারি জানো?

সরাসরি এ কথার উত্তর না দিয়া কাজল বলিল—আমার হাতে এই বইটা দেখছো? এখানা তোমাদের বিখ্যাত কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের লেখা, এক্ষুনি বসে বসে পড়ছিলাম। একে আমি একজন মহাকবি বলে মনে করি। যে জাতি এমন মহাপুরুষের জন্ম দিয়েছে সেই জাতির লোকের কাছে কী আমরা এর চেয়ে ভালো ব্যবহার আশা করতে পারি না?

সার্জেন্টটি একেবারে run of the mil নহে। বয়সেও তরুণ, এখনও কঠিন হৃদয় পুলিশে পরিণত হইতে পারে নাই। তাহার মুখের রাগত ভাব একটু একটু করিয়া কমিয়া আসিল। সে বলিল—তুমি কী সত্যিই বিশ্বাস করে একদিন ব্রিটিশরা ভারত থেকে চলে যাবে? একদিন এ দেশ আর আমাদের সাম্রাজ্যের অধিকারে থাকবে না?

আমি সত্যিই একথা বিশ্বাস করি। ইতিহাস কী সেই সাক্ষ্যই দেয় না? কোনও জাতি কখনও চিরকাল পরাধীন থেকেছে? আর প্রকৃত বীর এবং সভ্যজাতের লক্ষণ হল দুর্বলের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করা।

শ্বেতাঙ্গ সার্জেন্ট কয়েক মুহূর্ত কী ভাবিল, তারপর হঠাৎ কাজলের দিকে হাত বাড়াইয়া বলিল–অ রাইট, আই অ্যাম সিনসিয়ারলি সরি। কাম, জয়েন হ্যান্ডস্‌–

এতদুর হইবে তাহা কাজল ভাবে নাই। সে হাসিমুখে করমর্দন করিল।

–আমার নাম হ্যারল্ড ওগডেন, শতকরা একশো ভাগ ব্রিটিশ রক্ত বইছে আমার শরীরে। তবু বলি, তোমরা স্বাধীনতা পেলে আমি খুশি হব

তারপর হাসিতে হাসিতে বলিল—তুমি আবার আমার এ কথা ওপরওয়ালাদের বলে দিয়ে, তাহলে গরিবের চাকরিটি যাবে!

ওগডেন চলিয়া গেলে কাজলও ট্রাম ধরিবার জন্য পা বাড়াইল। সমস্ত ঘটনার কেন্দ্র সেই হিন্দুস্থানী লোকটি একটু দুরে দাঁড়াইয়া ব্যাপার দেখিতেছিল। সে এবার আগাইয়া আসিয়া বলিল–আরে বাপ! আপ তো বহোৎ তেজি আদমি বাবুসাহেব! গোরা পুলিশ ভি আপনাকে কুছু বলল না!

—ও কিছু না ভাই, সাহস করে কথা বললে একটু তো ফল হয়ই–

লোকটির মুখে অকৃত্রিম বিস্ময় ও শ্রদ্ধা ফুটিয়া উঠিয়াছে। সে বলিল—ওফ! বাবুজির আংগ্রেজি যেন মিশিনগানের গুলি–

মনের মধ্যে কীসের একটা অতৃপ্তি, একটা অপূর্ণতার ভাব। কী যেন করিবার ছিল, যাহা করিতে পারিলে জীবনটা সার্থকতা লাভ করিত—সেটা ক্রমাগতই স্বর্ণমৃগের মতো জীবন-অরণ্যের বিশাল বৃক্ষের ফাঁকে ফাঁকে সরিয়া বেড়াইতেছে। জন্ম-কর্ম-প্রেম-মৃত্যুর সমস্ত স্বাভাবিক পর্যায়ের মধ্য দিয়া আর এক অলৌকিক জগৎ পরিব্যাপ্ত, শেষরাত্রির নিবিড় সুষুপ্তির ভিতরে যে জগৎটার আবছা তীরভূমি ব্যবধানের সমুদ্রপারে ক্ষণমুহূর্তের জন্য দেখা দিয়াই আবার দেশ-কালের জটিল গোলকধাঁধায় হারাইয়া যায়। রিটায়ার করিবার কিছুদিন আগে সুরপতি একটা হিজ মাস্টার্স ভয়েস কোম্পানির গ্রামোফোন কিনিয়াছিলেন। মামাবাড়ি হইতে সেটি কাজল লইয়া আসিয়াছে। ওয়েলিংটনের মোড়ের পুরোনো রেকর্ডের দোকান হইতে সংগ্রহ করা একসেট মোজার্ট, বিঠোফেন, শুম্যান, শোপার রেকর্ড হাতে বাজাইয়া মাঝে মাঝে কাজল শোনে। আনফিনিশড সিম্ফনি বা পেজ্যান্টস মেরিমকিং-এর নরম পর্দার স্বরগুলি ওবো-র বিষণ্ণ উদাস করা আওয়াজে বুকের গভীর গোপন হইতে ভুলিয়া যাওয়া হারানো ব্যথা তুলিয়া আনে, পিয়ানোর শব্দে পাইনবন হইতে বরফগলা জলের ঝরনা নামিয়া আসে। চোখের সামনে ভাসিয়া ওঠে বাৰ্চ, বিচ আর অ্যাসপেন অরণ্য। তাহার ফাঁকে ফাঁকে উত্তরসমুদ্র হইতে বহিয়া আসা হিমশীতল বাতাস সারাদিন খেলা করে। কোথায় রহিয়াছে সাহারা মরুভূমির মধ্যবর্তী তাসিলি পাহাড়, যাহার গুহায় বহুসহস্র বৎসর পূর্বে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের আঁকা চিত্র অন্ধকারে গোপন আছে একদিন প্রকৃত রসিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার আশায়। কোথায় আমাজন অববাহিকার উন্নতশীর্ষ বৃক্ষের ডালে বসিয়া তীক্ষ্ণস্বরে ডাকে টুকান পাখি, তাহার বিচিত্রবর্ণের শরীর বেলাশেষের সূর্যালোকে ক্ৰমে নিষ্প্রভ হইয়া আসে। ইস্টার দ্বীপের প্রস্তরময় তটভূমিতে লাফাইয়া পড়ে প্রশান্ত মহাসাগরের ব্যস্ত তরঙ্গমালা। জাপান সমুদ্র পার হইয়া যায় বিধ্বংসী শক্তিসম্পন্ন সুনামী প্রবাহ। ট্রঘোনের স্বরে যেন শতবৎসরের বিস্মৃতির পর্দাটা সরিয়া যায়, কাজলের মনে হয় কবে যেন সে ওইসব দেশে একবার করিয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছিল। কতবার সে বলগাহরিণের স্নেজে চাপিয়া বিভার শিকার করিতে গিয়াছে, দেখিয়াছে নরম তুষারের উপর ভালুকের সদ্যসৃষ্ট পদচিহ্ন। কতবার ইউফ্রেটিস নদীর জলে সাঁতার কাটিয়া নলখাগড়ার বনের ধারে কাপড় শুকাইতে দিয়া তাকাইয়া থাকিয়াছে নীল আকাশের দিকে। দুর্গের চূড়া হইতে রাজকুমারীকে একহাতে ধরিয়া লাফাইয়া পড়িয়াছে পরিখার জলে। হানিবলের আল্পস পর্বত পার হইবার সময় সে ছিল সশস্ত্র সৈনিক, ফিনিশীয় নৌবাণিজ্যের যুগে সে ছিল একজন সার্থবাহ। তারসপ্তকে বেহালার সম্মিলিত করুণ-মধুর স্বরে বুকের মধ্যে হারানো সেই সব দিনের জন্য একটা অদ্ভুত হাহাকার মাথা কুটিয়া মরে।

কিন্তু ভারতীয় রাগসঙ্গীতের প্রভাব অন্যরকম। সুরের জগতের এই অদ্ভুত দিকটা কাজল বিস্ময়ের সহিত লক্ষ্য করিয়াছে। দেশী গান বা ওস্তাদের বাজনা শুনিলে মন দিগবিদিকে ছড়াইয়া পড়ে না, বরং আত্মস্থ হইয়া নিজেরই হৃদয়ের গভীরে ডুব দিয়া ধ্যানমগ্ন হইয়া পড়ে। ভাবিলে তাহার অবাক লাগে, একই তো স্বরসপ্তক—তাহারই হেরফেরে কত বৈচিত্র্য!

কে জানে মৃত্যুর পর আর কোথাও নতুন করিয়া জীবন শুরু হয় কিনা, কোথাও আবার মায়ের কোল, স্বপ্নমাখা শৈশব অপেক্ষা করিয়া থাকে কিনা। হয়তো অনন্ত কালসমুদ্রে বর্তমান জীবনই একমাত্র সবুজ দ্বীপ। কিছু একটা করিতে হইবে। সময় বৃথা বহিয়া যাইতেছে।

একদিন বিকালে ইউনিভার্সিটি হইতে বাহির হইয়া কাজল ও প্রভাত গোলদিঘির একটা বেঞ্চে গিয়া বসিল। অপরাহের বৌদ্র রাঙা হইয়া মহাবোধি সোসাইটির বাড়ির গায়ে পডিযাছে। কতকগুলি অল্পবয়স্ক ছেলে জল ছোঁড়াছুড়ি করিযা স্নান কবিতেছে। কিছুক্ষণ নানা বিষয়ে আলোচনা কবিবাব পর কাজল বলিল–প্রভাত, একটা কথা তোমাকে বলব বলে কদিন ভেবে রেখেছি, কিন্তু ঠিকমতো সুযোগ না পাওয়ায় আর বলা হয়ে উঠছে না। বিষয়টা আমার কাছে খুব জরুরি

প্রভাত কাজলের গলাব স্ববে একটু বিস্মিত হইয়া বলিল–খুব জবুবি? কী বিষয়ে?

-দেখ, কিছুদিন ধবেই মনে হচ্ছে জীবনটা যেন বৃথা কাটিয়ে দিচ্ছি। প্রত্যেকেই একটা না একটা কিছু করার জন্য পৃথিবীতে আসে। আমার পড়াশুনো তো শেষ হয়ে এল, কিন্তু সামনে আমার কোনও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নেই। এবার কী করব প্রভাত?

প্রভাত কিছুক্ষণ ভাবিয়া বলিল—খুব শক্ত প্রশ্ন। এখুনি আমি তোমাকে এব জবাব দিতে পারবো না। তবে একটা কথা বলি, তোমাকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে বিচার করার সুযোগ আমার হয়েছে তাতে মনে হয় শিল্পই তোমার পথ।

—শিল্প? কী ধরনের শিল্পের কথা বলছো?

-বৃহত্তরভাবে শিল্প বলতে যা বোঝায়। তোমার মধ্যে অনেক বলবার কথা রয়েছে, শিল্পের মাধ্যমে তা প্রকাশের চেষ্টা করে দেখছো না কেন?

কাজল বলিল–যেমন?

—যেমন তুমি সাহিত্যিক হবার চেষ্টা করে দেখতে পাবো। শিল্পের অন্য কোনও শাখায় এমন নিভৃত চর্চার সুযোগ আর নেই।

কাজল হাসিয়া বলিল—এ কথাটা আমি নিজেও ভেবেছি, কিন্তু এতে অনেক অসুবিধা আছে।

-কিসের অসুবিধে?

—অনেক রকম। প্রধান দুটোব কথা বলছি, শোনন। প্রথমতঃ, সাহিত্যে আমার সত্যিকারের কোনো প্রবণতা আছে কিনা তা বোঝা দরকার। নইলে কেবলমাত্র আমার খেয়াল হয়েছে বলেই লিখতে শুরু করার কোনও মনে হয় না। সাহিত্য চার পয়সার চানাচুর নয়, যে ইচ্ছে কিনে এনে চিবোতে পারে না

প্রভাত বলিল—এর সমাধান এই সমস্যার মধ্যেই নিহিত আছে। তোমার মধ্যে সাহিত্যিক প্রতিভা রয়েছে কিনা জানাবার জন্য তোমাকে আগে তা লিখতে হবে। আর একটা কী?

আমার বাবা লেখক ছিলেন। নিজের মুখে বলছি বলে কিছু মনে কোরো না, বর্তমান কালের পাঠকেরা বাবাকে বাংলা সাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ লেখক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এক্ষেত্রে আমাকে লিখতে হলে খুব বিরাট বাধা ঠেলে এগুতে হবে–

—এ কথা আমার ঠিক বলে মনে হয় না।

-নাও হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয় পাঠকেরা আমার লেখাকে আমার বাবার লেখাব সঙ্গে মনে মনে তুলনা করবে। সেটা নতুন লেখকের পক্ষে কাম্য নয়। বিখ্যাত মানুষের ছেলের পক্ষে বড়ো কাজ করা খুব কঠিন।

প্রভাত সামান্য ভাবিয়া বলিল হতে পারে, জোর করে না বলব না। কারণ সত্যিই বৃড়ো মানুষের ছেলেকে বড়ো হতে দেখা যায় না। কিন্তু এটাও তো পরীক্ষাসাপেক্ষ অমিতাভ। তাছাড়া গত তিন-চার বছরে তোমার কিছু লেখা আমি পড়েছি, তাতে প্রকৃতই সৎ সাহিত্যের উপাদান রয়েছে। তুমি লেখো।

দুই বন্ধুতে আরও অনেক আলোচনা হইল। ফিরিবার সময় প্রভাত বলিল—তুমি এবার কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করো, বুঝলে? শুধুমাত্র ভেতরে অনেক বলবার কথা থাকলেই তা দিয়ে সাহিত্য হয় না। বলার কথাটা হচ্ছে পাখি, কিন্তু সে পাখির জন্য একটা ভালো খাচা দরকার। খাচা বানাবার মালমশলা জোগাড় করতে শুরু করো–

রাত্রিতে শুইয়া কাজল অনেক চিন্তা করিল। জীবনকে সম্যকভাবে জানিতে হইলে এই চার দেওয়ালের মধ্যে বসিয়া থাকিলে চলিবে না। কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য ছাড়াই কিছুদিন ঘুরিয়া বেড়াইলে কেমন হয়? সামনে পূজা আসিতেছে, সে সময় ইচ্ছা করিলে মাসখানেক বেড়ানো চলে। অবশ্য পূজার পর তিন-চার মাসের মধ্যেই এম.এ. পরীক্ষা, পড়াশুনার ক্ষতি হইবার সম্ভাবনা আছে। তবে বইপত্র কিছু সঙ্গে লওয়া যাইতে পারে। আর ফিরিবার পর বেশি করিয়া পড়াশুনা করিলে ক্ষতি সামলাইয়া লওয়া যাইবে।

এবার বাহির হইবে সম্পূর্ণ একা। বন্ধুদের সঙ্গে নহে।

সিদ্ধান্ত লইবার সঙ্গে সঙ্গে কাজল সমস্ত মনে একটা অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করিল। প্রকৃত জীবনানন্দ স্থাণুত্বের পরিপন্থী—সবরকম বন্ধনকে অগ্রাহ্য করিয়া পৃথিবীর মূক্ত প্রসাবে ইচ্ছামতো বিচরণের একটা নেশা আছে। মানুষ মূলতঃ প্রকৃতির সন্তান, প্রকৃতিব সন্তান, অবণ্যে-প্রান্তরে ছিল তাহার নিবাস। সভ্যতার প্রয়োজনে পরে সে নগর গড়িয়াছে, যন্ত্র বানাইয়াছে বটে, কিন্তু ইট কাঠলৌহে প্রস্তুত মহানগর তাহার প্রকৃত আশ্রয় নহে। মানুষের মস্তিষ্কের কোনও এক গোপন কোণে তাহার অরণ্যচারী মুক্ত জীবনের প্রাগৈতিহাসিক স্মৃতি লুকাইয়া আছে, যে কারণে সামান্য সুযোগ পাইলেই লোকে তল্পিতল্পা বাঁধিযা বেড়াইতে বাহির হয়, হারাইয়া যাওয়া সেই আনন্দময় স্বাধীনতাকে আর একবার আস্বাদন করিতে চায়। তাহা না হইলে কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করিয়া, পথের কষ্ট ভোগ করিয়া অচেনা বিদেশে ঘুরিবার অন্য কী সার্থকতা আছে?

দেশভ্রমণের অনুমতি আদায় করিতে কাজলকে বেশ বেগ পাইতে হইল। প্রস্তাব শুনিয়াই হৈমন্তী বলিল—সে কী কথা! সামনে তোর একজামিন, এখন বেড়াতে বেরুলে পাশ করতে পারবি?

—আমি ঠিক সে অর্থে বেড়াতে যাচ্ছি না মা। কলকাতা আর আমাদের এই শহর বড় একঘেয়ে হয়ে উঠেছে, পড়াতেও তো মন বসছে না। বরং কদিন কোথাও ঘুরে এলে মনটা হাল্কা হবে। বইপত্র সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি, যেখানেই থাকি না কেন রোজ পড়াশুনা করব।

-কোথায় যাবি কিছু ভেবেছিস?

সহজে অনুমতি পাইবার জন্য কাজল এইখানে মায়ের সঙ্গে সামান্য তঞ্চকতা করিল। সে বলিল–না, তা এখনও ঠিক হয়নি। আমি তো একা যাচ্ছি না, প্রভাতও যাচ্ছে আমার সঙ্গে। দু-জনে মিলে ঠিক করব।

হৈমন্তী কিঞ্চিৎ আশ্বস্ত হইয়া বলিল—প্রভাতও যাচ্ছে? তাহলে অবশ্য—

-হ্যাঁ মা, তুমি কিছু ভেবো না। আমরা খুব সাবধানে থাকব।

জিনিসপত্র কাজল বেশি কিছু সঙ্গে লইল না। একটা মাঝারি সুটকেসে কিছু পাঠ্য এবং কিছু অ-পাঠ্য বই, ডায়েরি, কলম-পেনসিল, কিছু লিখিবার কাগজ এবং কয়েক প্রস্থ জামাকাপড় ভরিল। কাঁধের একটা ঝোলায় লইল চাদর, ফু দিয়া ফোলানো যায় এমন একটা বালিশ, তোয়ালে আর দাড়ি কাটিবার সরঞ্জাম। নিজে বওয়া চলিবে না এমন কোনও জিনিস সে সইল না। বইপত্রের দরুন সুটকেসটা কিঞ্চিৎ বেশি ভারি হইয়া পড়িল বটে, কিন্তু রওনা হইবার আগের দিন রাত্রে কাজল অনেক হিসাব করিয়াও তাহা হইতে একখানা বইও কমাইতে পারিল না। বরং মনে হইল—উপায় থাকিলে আর কখানা বই নিতাম। সবরকম মুডের জন্য সঙ্গে বই নেওয়া ভালো, কখন কী পড়িতে ইচ্ছে করে তার ঠিক আছে কিছু?

কাজল কোথায় যেন পড়িয়াছিল, বাঙালি বেড়াইতে খুব ভালোবাসে বটে–কিন্তু রওনা হইবার সময় দরজায় তালা দিতে গিয়া মনটা একবার কেমন করিয়া ওঠে। মনে হয় না গেলেই যেন ভালো হইত।

সুটকেস আর ঝোলাটা গুছাইয়া ঘরের কোণে রাখা আছে। শুইয়া কাজলের ঘুম আসিতেছিল না। আগামীকাল এইসময় তাহার ট্রেন সগর্জনে ছুটিতেছে। বাহিরের পৃথিবীর যেমন একটা রহস্যময় আকর্ষণ আছে, তেমনি সেই অপরিচিত জগৎটা সম্বন্ধে ভয়মিশ্রিত শঙ্কাও মানুষের মজ্জাগত। নিজের গৃহকোণ শতরকমের প্রীতি ও ঘনিষ্ঠ মমতার আয়োজন সাজাইয়া লইয়া বসিয়া আছে। বৃহত্তর জগতে অজানার আকর্ষণ আছে বটে, কিন্তু নিকটজনের প্রতিপূর্ণ আহ্বান নাই। তবুও সে কেন বাহির হইতেছে?

কল্পনায় রেলগাড়ির চাকার শব্দ শুনিতে শুনিতে সে ঘুমাইয়া পড়িল।

পরদিন সন্ধ্যায় হাওড়া স্টেশনে পৌঁছাইয়া কাজল দেখিল মনের মধ্যে আশঙ্কা আর দ্বিধার ভাবটা আর নাই। চারিদিকে লোজ্জন ব্যস্ত হইয়া ছুটিতেছে, কুলিদের কোলাহল, ক্যানাডিয়ান এঞ্জিন হইতে তীক্ষশব্দে স্টিম ছাড়িবার উচ্চনিনাদ, কিছু যাত্রী লাইন দিয়া কুঁজায় জল ভরিয়া লইতেছে— ইহারই মধ্যে কী একটা ট্রেন হুইল দিয়া ছাড়িয়া গেল। সব মিলাইয়া বেশ একটা রোমাঞ্চকর পরিবেশ। কিছুক্ষণ থাকিলেই সুদূরে কোথাও যাত্রা করিবার সম্ভাবনায় মন উৎফুল্ল হইয়া উঠে।

আজ বাড়ি হইতে বাহির হইবার সময় পর্যন্ত কাজল কোথায় যাইবে কিছু ঠিক করে নাই। তাহাদের বাড়ির মাঝখানের ঘরটায় বনমালী মিস্ত্রির তৈয়ারি কাঁঠাল কাঠের আলমারিতে তাহার বাবার অনেক বছরের ডায়েরি বহিয়াছে। কলেজ জীবনের কিছুদিন পর হইতে মৃত্যুর পূর্ব অবধি অপু নিয়মিত দিনলিপি লিখিত। অবসর পাইলেই কাজল সেগুলি লইয়া পড়ে। বিশেষ করিয়া বাবাব জীবনের কোনও কিছু জানিবার জন্য নহে—আসলে ডায়েরি পড়িতে বসিলেই বহুদিন আগে বিদায় লওয়া প্রিয় মানুষটা যেন সম্পূর্ণভাবে সজীব হইয়া আবার সামনে আসিয়া দাঁড়ায়। বাবার সহিত আবার একটা যোগসূত্র স্থাপিত হয়।

বাবার একটা ডায়েরিতে সে পড়িয়াছে বাবাও একবার কিছু ঠিক না করিয়া হাওড়া স্টেশনে আসিয়া প্রথম যে গাড়িটা ছাড়িতেছে টিকিট কাটিয়া সেটায় উঠিয়া বসিয়াছিল। সে অবশ্য অতটা করিবে না, কারণ হাওড়া ব্রিজ পার হইবার সময় গঙ্গার ওপারে সমস্ত পশ্চিম দিগন্তব্যাপী সিন্দুরবর্ণ আশ্চর্য সুন্দর সন্ধ্যার দিকে তাকাইয়া থাকিতে থাকিতে অকস্মাৎ সে কোথায় যাইবে ঠিক করিয়া ফেলিয়াছে।

সে কাশী যাইবে, যেমন বাবা গিয়াছিলেন।

কালো কোট পরা একজন টিকিট কালেকটরকে সে জিজ্ঞাসা করিল–কাশীতে যাবার ট্রেন এখন কী পাব বলতে পারেন?

লোকটা বোধহয় কী জরুরি কাজে যাইতেছিল, থামিবার সময় নাই। চলিতে চলিতেই বলিয়া গেল–কাশী? ভালো ট্রেন পাবেন দিল্লি মেল–

বাকিটা ভালো শোনা গেল না।

কাউন্টারে গিয়া কাজল প্রথমে বেনারস সিটির একখানা টিকিট কিনিল। তাহার পর এনকোয়ারিতে খোঁজ করিয়া জানিল দিল্লি মেল আরও দেড়ঘণ্টা পরে চারনম্বর প্ল্যাটফর্ম হইতে ছাড়িবে। তবে দিল্লি মেল বেনারস সিটির উপর দিয়া যায় না। মোগলসরাই নামিয়া ট্রেন বদলাইয়া অথবা টাঙায় যাইতে হইবে। টাঙাই ভালো, সে কখনও টাঙায় চড়ে নাই।

ট্রেনে উঠিয়া একটা বাঙ্কে সে বিছানা পাতিয়া ফেলিল। দূরভ্রমণের সময় সহযাত্রীদের সঙ্গে খুব সহজেই আলাপ জমিয়া যাওয়াটা নিয়ম, কিন্তু এই কামরায় দুইজন অবাঙালি স্বল্পবাক প্রৌঢ় এবং অনেকগুলি বৃদ্ধ-বৃদ্ধা রহিয়াছে। অবাঙালি সহযাত্রীদ্বয় ট্রেন ছাড়িবার পূর্বেই পুঁটুলি হইতে চাপাটি ও ভাজি বাহির করিয়া নৈশাহার সম্পন্ন করিল এবং পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উপেক্ষা প্রকাশ করিয়া ঘুমাইতে আরম্ভ করিল। বয়স্কদের দলটি বাঙালি বটে, তাহারাও বাবা বিশ্বনাথের মাথায় জল দিতে কাশী চলিয়াছে এমনও জানা গেল, কিন্তু বর্ধমান ছাড়াইবার পরও তাহাদের সম্মিলিত এবং সরব বৈষয়িক আলোচনায় কাজলের প্রাণ অতিষ্ঠ হইয়া উঠিল। যাইতেছে কাশীতে, সেটেলমেন্টের খাজনার রসিদ, আমমোক্তারনামা এবং খুড়তুতো ভাইকে জব্দ করিবার জন্য উকিলের আবিষ্কৃত কূটবুদ্ধির বিষয়ে আলোচনা এখন কোন কাজে আসিবে? কাজলের হাসি পাইল। মূর্খের দল! ধর্ম করিতে চলিয়াছে, ধর্মের মূল উপদেশটিই গ্রহণ করে নাই।

একটা পোকা উড়িয়া উড়িয়া আলোর বাবে ঠোক্কর খাইতেছে। সেদিকে তাকাইয়া থাকিতে থাকিতে কাজল ঘুমাইয়া পড়িল।

ঘুম ভাঙিল খুব সকালে। ট্রেন গুমগুম শব্দ করিয়া একটা বিশাল নদী পার হইতেছে। বাঙ্ক হইতে নামিয়া কাজল জানালা দিয়া বাহিরে তাকাইল। চওড়া নদীগর্ভে ইতস্তত দু-একটা বড়ো পাথর পড়িয়া আছে। বালুকাপূর্ণ নদীখাতের অধিকাংশই শুষ্ক, দু-এক স্থান দিয়া জলধারা বহিয়া চলিয়াছে। এখনও সূর্য ওঠে নাই, প্রভাতের স্নিগ্ধ মাধুর্যে সমস্ত দৃশ্যটি ভরিয়া আছে। দুই অবাঙালি সহযাত্রী উঠিয়া পড়িয়াছিল, তাহাদের একজন কাজলের দিকে তাকাইয়া হাসিয়া বলিল—ইয়ে শান নদ হ্যায় বাবুজি

দেখিতে দেখিতে শোনের দৃশ্য পিছাইয়া পড়িল।

সূর্য উঠিবার কিছু পরেই মোগলসরাই। কাজল দেখিল তাহার দুই অবাঙালি সহযাত্রীও নামিয়াছে। সে কাছে গিয়া জিজ্ঞাসা করিল—আপনারা কী কাশী যাচ্ছেন?

-হ্যাঁ বাবুজি, কেন?

—আমিও কাশী যাব। যদি টাঙায় যান তাহলে আমি সঙ্গে যেতে পারি। যা ভাড়া লাগবে তার অর্ধেক আমি দেব

নিশ্চয়, আসুন বাবু আমাদের সঙ্গে। ভাড়া কিছু দিতে হবে না। আমরা তো যাচ্ছিই, বাবুজি কী তীর্থ করতে চলেছেন?

কাজল জানাইল সে তীর্থ করিতে যাইতেছে না বটে, কিন্তু যাহারা তীর্থ করিতে যায় তাহাদের প্রতি তাহার প্রগাঢ় শ্রদ্ধা আছে।

—আমরা বাবা বিশ্বনাথের মাথায় জল দেব বলে যাচ্ছি বাবু। আমার নাম ধরমদাস, এ আমার চাচেরা ভাই, এর নাম রামচরণ। আমরা বিহারের পূর্ণিয়া জেলার লোক, দুভাই মিলে কলকাতায় ব্যবসা করি। এই প্রথম কাশী আসছি।

প্ল্যাটফর্মের কলে কাজল ও তাহার সঙ্গীয় মুখহাত ধুইয়া লইল। ধরমদাস বলিল—চলুন বাবুজি, কিছু নাস্তা করে নিয়ে টাঙায় উঠব।

মোগলসরাই বেশ বড়ো শহর। স্টেশনের বাহিরেই কিছুদূরে রাস্তার উপর হালুইকরের দোকান। তাহারা তিনজনে ঢুকিয়া পুরী-তরকারি, পেঁড়া ও জিলাপি খাইল। কাজল রাবড়িও সইতে চাহিয়াছিল, ধরমদাস ও তাহার সঙ্গী বারণ করিয়া বলিল—এখানে রাবড়ি খাবেন না বাবুজি, কাশীতে রাবড়ি বিখ্যাত—খেলে সেখানেই খাবেন।

খাওয়া হইলে কাজল সঙ্গীদের বারণ না শুনিয়া তিনজনেরই খাবারের দাম মিটাইয়া দিল। ধরমদাস দুঃখিতমুখে বলিল—এ বড়ো জুলুম করলেন বাবুজি, খেলাম তিনজনে মিলে, তাহলে আপনি একা পয়সা দেবেন কেন?

—তাতে কী হয়েছে ধরমদাস ভাই? বাইরে বেরিয়ে অত চুলচেরা হিসেব করলে চলে না। আপনারা তো টাঙার ভাড়া দিয়ে দেবেন বলেছেন, আমি কী তাতে আপত্তি করেছি?

টাঙায় উঠিয়া কাজল বলিল–আপনারা কোথায় উঠবেন কিছু ঠিক করেছেন?

—না। ভালো কোন ধর্মশালায় উঠব ইচ্ছে আছে।

–আমি আপনাদের সঙ্গে থাকলে আপত্তি নেই তো? ভয় নেই, বিরক্ত করব না—

ধরমদাস বলিল–কী বলছেন বাবুজি! বেফিকর চলে আসুন, আমরা খুব খুশি হব—

এবার দূর হইতে বেণীমাধবের ধ্বজাটা দেখিতে পাওয়া মাত্র কাজলের মন কেমন করিয়া উঠিল। এই কাশী! এখানে তাহার বাবার শৈশবের অনেকখানি কাটিয়াছে, ঠাকুরদার স্মৃতি মাখানো রহিয়াছে। ঠাকুমার মমতা এখানকার বাতাস যেন এখনও বহিয়া ফেবে। ধরমদাসকে সে বলিল বটে যে সে তীর্থ করিতে আসে নাই, কিন্তু এও একপ্রকার তীর্থেই আসা।

বাবাব ডায়েরি হইতে ঠাকুরদার বাসার ঠিকানা সে লিখিয়া আনিয়াছে। সম্ভব হইলে আজই একবার জায়গাটা দেখিতে যাইবে।

যে ধর্মশালায় টাঙাওয়ালা তাহাদেব আনিয়া হাজির করিল তাহা খুব বড়ো না হইলেও বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। প্রথমেই কাজল ভালো করিয়া স্নান করিল। সকালে হালুইকরদের দোকানে যে পরিমাণ খাওয়া হইয়াছে তাহাতে এবেলা আর না খাইলেও চলিবে। কিন্তু বর্তমানে একটু ঘুমাইয়া লওয়া প্রয়োজন। ট্রেনে সারারাত ভালো ঘুম হয় নাই, বিকালে ঘুরিতে হইলে শরীরটা ঝরঝরে করিয়া লইলে ভালো হয়।

ঘূম হইতে উঠিয়া কাজল দেখিল বেলা পড়িয়া আসিতেছে। জিনিসপত্র ঘরে রাখিয়া কেবলমাত্র টাকার ব্যাগটি সঙ্গে লইয়া সে বাহির হইল। প্রথমে তো কেহই ঠিকানা শুনিয়া কোনও সন্ধান দিতে পারে না, পরে অনেককে জিজ্ঞাসা করিয়া এবং অনেক ঘুরিয়া মোটামুটি অঞ্চলটা বাহির হইল। কাশীর গলি সম্বন্ধে তাহার কোনও ধারণা ছিল না, পথের সংকীর্ণতা বিষয়ে কলিকাতার সরু গলিই তাহার ধারণার চরম সীমা। মাকড়সার জালের মতো এতগুলি সরু গলি একসঙ্গে কোনও শহরে থাকিতে পারে তাহা সে জানিত না। রাস্তায় সাইনবোর্ডও নাই যে পথের নাম ও নম্বর দেখিয়া লইবে। শেষে একটি সরু গলির মুখে সিমেন্ট বাঁধানো বোয়াকে বসিয়া তাম্রকূট সেবনরত এক বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করিতে বাড়িটার সন্ধান পাওয়া গেল। লোকটি নিতান্ত বৃদ্ধ এবং নিতান্ত শীর্ণ। বিকট একটা কাশির দমক সামলাইয়া লইয়া বলিল—কেন, সে বাড়িতে কী?

-এই, এমনি একটু দরকার আছে

–রামধন মুখুজ্যের কেউ হও নাকি? তাদের এক ভাগ্নে শুনেছি কলকাতায় থাকে।

কাজল সবিনয়ে জানাইল সে রামধন মুখুজ্যের ভাগ্নে নহে।

–আচ্ছা, এগিয়ে যাও, ডাইনে চারখানা দরজা ছাড়িয়ে পাঁচ নম্বরেরটা-বুঝেছো?

কাজল ঘাড় নাড়িয়া সায় দিয়া গলিতে ঢুকিল। সন্ধ্যার অন্ধকার তখন প্রায় ঘনাইয়া আসিয়াছে। ইট বাঁধানো পথে নানা ধরনের বর্জ্যদ্রব্য জমিয়া পরিবেশে একটা স্থায়ী অপ্রীতিকর গন্ধের জন্ম দিয়াছে। এমন সময় বোধহয় না আসিলেই ভালো হইত। সম্পূর্ণ অপরিচিত স্থান, যে বাড়িতে যাইতেছে সেখানেও তাহাকে কেহ চেনে না। সঙ্গে বেশ কিছু টাকাপয়সাও রহিয়াছে। কে জানে, কাশীর গুণ্ডার গুজবটা যদি হঠাৎ সত্য হইয়া পড়ে। একবার মনে হইল ফিরিয়া যায়, কাল সকালে আসিলেই হইবে। তারপরই ভাবিল—দুর ছাই! ভয়ের কী আছে? দেখিই না কী হয়—

ডানদিকে পঞ্চম দরজাটা খোলা। ভিতরে ছোট্ট একটু বাঁধানো উঠানমতে। উঠানের চারদিক ঘিরিয়া দু-তিনটি খুব ছোট ছোট খুপরির মতো ঘর। উঠানের একপ্রান্তে জলের কল (বাবার ডায়েরিতে আছে বাবা কাশীতে প্রথম জলের কল দেখে, এই কলটাই নাকি?) আর ঠিক মাঝখানে একটি তুলসীমঞ্চ। দুইজন বৃদ্ধা একটি ঘরের সামনে বারান্দায় বসিয়া মালা জপ করিতেছে। ঘরের মধ্যে কথাবার্তার আওয়াজ কানে যাইতেছে বটে, কিন্তু কাহাকেও দেখা যাইতেছে না। বারান্দার বৃদ্ধা দুইজন সম্ভবতঃ চোখে খুবই কম দেখে, কাজলের উপস্থিতি গ্রাহ্য না করিয়া তাহারা মালা জপ করিয়া চলিল।

কাজল দাঁড়াইয়া কী করিবে ভাবিতেছে, এমন সময় তুলসীমঞ্চে সন্ধ্যা দিবার জন্য একজন প্রৌঢ়া মহিলা প্রদীপ হাতে বাহির হইয়া কাজলকে দেখিয়া বিস্মিত হইয়া বলিলেন–কে? কে ওখানে? কী চাই?

কাজল বলিল—আজ্ঞে আমি, একটু প্রয়োজন ছিল—

—কী প্রয়োজন? কার কাছে এসেছেন?

-আপনি বরং সন্ধেটা দেখিয়ে নিন, তারপর বলছি। ব্যাপারটা বোঝাতে আমার একটু সময় লাগবে।

প্রৌঢ়টি অবাক হইয়া কাজলের দিকে একবার তাকাইয়া তুলসীতলায় প্রদীপ নামাইয়া প্রণাম করিল। এব মধ্যে তাহাদের গলার শব্দ পাইয়া এক ভদ্রলোক ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছেন। কাজল আন্দাজে বুঝিল-ইনিই রামধন মুখুজ্যে। ভদ্রলোক বলিলেন–কী চাই মশাই? এদিকে আসুন—

কাজল রোযাকের কাছে গিয়া বলিল—আমার নাম অমিতাভ রায়। আমি কলকাতা থেকে আসছি। আপনার সঙ্গে একটু দরকার ছিল—

-আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না তো! কী দরকার?

–দরকার তেমন কিছু নয়। আসলে এই বাড়িতে অনেকদিন আগে আমার ঠাকুরদা আর ঠাকুমা ভাড়া থাকতেন। বাবা তখন খুব ছোট। এই বাড়িতেই আমার ঠাকুরদা মারা যান। আমি আজ সকালে কাশী এসেছি, এমনি বেড়াতে—ভাবলাম বাবার ছোটবেলা কেটেছে যেখানে সে বাড়িটা দেখে যাই।

সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাইয়া রামধন মুখুজ্যে বলিলেন–ব্যস, এই কারণে এসেছেন?

–আজ্ঞে হ্যাঁ।

সন্ধ্যা দেখাইতে আসা প্রৌঢ়াটিও অবাক হইয়া তাকাইয়া আছেন। কাজল ইহাদের দোষ দিতে পারিল না। সন্ধ্যার অন্ধকারে একজন অপরিচিত লোক এমন অদ্ভুত অনুরোধ লইয়া উপস্থিত হইল, যা দিনকাল পড়িয়াছে, সন্ত্রস্ত না হইয়া উপায় থাকে না।

রামধন বলিলেন—বাড়িটা দেখতে এসেছেন মানে বুঝলাম না! কীভাবে বাড়ি দেখবেন?

বাড়িটা সে অতসী কাচ হাতে লইয়া গল্পের গোয়েন্দার মতো হামাগুড়ি দিয়া দেখিবে না। কিন্তু অতীতের স্মৃতির সঙ্গে জড়িত স্থানের প্রতি যে গভীর আকর্ষণ তাহা অন্যকে বোঝানো দুরুহ। বোধটা যাহার মধ্যে আছে, তাহার আছে। যাহাব নাই, নাই।

কাজল বলিল—আজ্ঞে বিশেষ করে দেখার তো কিছু নেই। তবে ঠাকুরদা কোন ঘরটায় থাকতেন সেটা যদি একবার জানতে পারতাম–

ঘরের মধ্যে ঢুকিতে চায় যে! রামধন মুখুজ্যে ভাবিতেছিলেন লোকটাকে আর প্রশ্রয় দেওয়া উচিত হইবে কিনা, এমন সময় বাহিরের দরজা দিয়া একজন সুবেশ স্মিতদর্শন যুবক ঢুকিয়া উঠানে দাঁড়াইল। তাহাকে দেখিয়া রামধন যেন গুরুতর সমস্যার হাত হইতে মুক্তি পাইলেন। বলিলেন–এই যে নির্মল, বেড়ানো হল? তুমি একবার কথা বল তো এর সঙ্গে। আমি ব্যাপার ঠিক বুঝতে পারছি নে–

পরে কাজলের দিকে ফিরিয়া ঈষৎ গর্বের সুরে বলিলেন–আমার ভাগ্নে, কলকাতায় ইংরিজি খবরের কাগজের অফিসে চাকরি করে শহরের বড়ো বড়ো সব লোকের সঙ্গে জানাশোনা। আপনি বরং এর সঙ্গে কথা বলুন। কাল এসেছে আমার কাছে বেড়াতে–

যুবকটির বয়েস বছর আটাশ-ঊনত্রিশ, পরনে পায়জামা ও পাঞ্জাবি, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। ছিপছিপে চেহারা, রঙ ফরসা। মুখেচোখে বুদ্ধির ছাপ। সে কাজলের দিকে ফিরিয়া বলিল–কী ব্যাপার ভাই? আপনি কোথা থেকে আসছেন?

যুবকটির আবির্ভাবে কাজল খুশি হইয়াছিল। ইহাকে বিষয়টা বোঝানো সহজ হইবে। নিজের আগমনের কারণ সে পুনরায় খুলিয়া বলিল। তাহার পর হাসিয়া বলিল—কিছুটা নস্টালজিয়া, কিছুটা নিজের ফ্যামিলির ইতিহাসের প্রতি মোহ—এই আর কী! আপনাদের অবশ্য বড়োই কষ্ট দেওয়া হল–

-কিছু নয়। কিন্তু মামা কী বলতে পারবেন এঁরা কোন ঘরে থাকতেন? পুরোনো ভাড়াটেরা এখন আর কেউ নেই। মামাই নিচের সবটা নিয়ে থাকেন।

রামধন বলিলেন—না, আমি বলতে পারব বলে মনে হচ্ছে। কাবণ এদিকের ঘর দুটো বাড়িওয়ালা কখনওই ভাড়া দিত না, নিজেই থাকত। ওপাশের দুটো ঘরের মধ্যে ডানদিকেরটায় পুরোনো ভাড়াটেরা বহুদিন ছিল, আমরা আসায় উঠে গিয়েছে। কাজেই হলে ওই বাঁদিকের কোণের ঘরটাই হবে। দেখবেন? যাও না নির্মল, একবার দেখিয়ে দাও

মোটা দেওয়াল আর নিচু ছাদওয়ালা পুরাতন ঘর। বাতাস ঢুকিবার পথ নাই। উঃ, এই ঘরের মধ্যে তাহার বাবা ছোটবেলায় থাকত! ঘরের মধ্যে গত পঞ্চাশ বছরে একবারও বোধহয় চুনকাম হয় নাই। বিবর্ণ, ধূসর দেওয়ালে সঁাতাধরা দাগ। বর্তমানে ঘরটি বোধহয় বিশেষ ব্যবহার হয় না, কারণ কয়েকটি টিনের তোরঙ্গ এবং এককোণে দাঁড় করানো একটি গোটানো মাদুর ছাড়া ঘরে আর কোনও আসবাব নাই। কড়িকাঠ হইতে ঝুলন্ত তারের ডগায় একটি অল্প পাওয়ারের ইলেকট্রিক বাল্ব জ্বলিতেছে। তাহার বাবার সময় নিশ্চয়ই বিদ্যুতের আলো ছিল না, পরে হইয়াছে।

বাবার শৈশব, ঠাকুরদার মৃত্যু, ঠাকুমার কত দুঃখ ও সংগ্রাম–এই ঘরে। কাজল অনেকক্ষণ অবাক হইয়া তাকাইয়া রহিল, যদিও ঘরের শ্রীহীন অভ্যন্তরে বিশেষ করিয়া দেখিবার কিছু ছিল না। নির্মল ছেলেটি বিবেচক, কাজলের মনের অবস্থা অনুমান করিয়া সে চুপ করিয়া অপেক্ষা করিতে লাগিল।

কিছুক্ষণ পরে কাজল বলিল–চলুন এবার যাই—

ফিরিতে গিয়া চোখ পড়িল দরজার পাশে। সেখানে দেওয়ালের গায়ে একটা কুলুঙ্গি। কুলুঙ্গির নিচের দিকটায় ইঞ্চি দেড়েক জায়গা সিমেন্ট দিয়া বাঁধানো। সেই সিমেন্টের উপর তীক্ষাগ্র কোনো কিছু দ্বারা কী যেন লেখা রহিয়াছে। কৌতূহল হওয়ায় কাজল ঝুঁকিয়া লেখাটা পড়িবার চেষ্টা করিল। পরক্ষণেই সে বুঝিতে পারিল কী লেখা আছে! মুহূর্তের মধ্যে বুকের ভিতর কেমন করিয়া উঠিল। অনেকক্ষণ হইতে বুকের গভীরে জমিয়া থাকা কান্নাটা হঠাৎ বাধা না মানিয়া বাহির হইয়া আসিল। অক্ষর কয়টার উপর হাত রাখিয়া কাজল নিঃশব্দে কাঁদিতে লাগিল।

নির্মল প্রথমটা খেয়াল করে নাই, সে দরজা দিয়া বাহিরে চলিয়া গিয়াছিল। কাজলকে পেছনে দেখিয়া আবার ঘরে ঢুকিয়া বলিল–কোথায় গেলেন, আসুন—এ কী! কী হল আপনার! কাদছেন কেন?

পকেট হইতে রুমাল বাহির করিয়া কাজল চোখ মুছিয়া বলিল—আমার বাবার নাম—বাবাই ছোটবেলায় এখানটায় লিখে রেখেছিলেন। এখনও রয়েছে–

সরিয়া আসিয়া নির্মল লেখাটা দেখিল।

—অপূর্বকুমার রায়। আপনার বাবার নাম? তা আপসেট হয়ে পড়া খুবই স্বাভাবিক। আপনার বাবা কী—

–মারা গিয়েছেন। আমার ছোটবেলাতেই।

–ওঃ।

কী ভাবিয়া কাজল বলিল—আমার বাবাকে হয়তো আপনি চিনবেন। উনি লেখক ছিলেন।

নির্মল একটু অবাক হইয়া কাজলের দিকে তাকাইল, বলিল—লেখক ছিলেন? আপনি কী বিখ্যাত সাহিত্যিক অপূর্বকুমার রায়ের কথা বলছেন? যাকে আজকাল প্রকৃতির পূজারী বলা হয়?

কাজল ঘাড় কাত করিয়া জানাইল–হ্যাঁ।

-বাট অফ কোর্স। তাকে চিনতে পারব না মানে! এই গত হপ্তাতেও অমৃতবাজারে অপূর্ববাবুকে নিয়ে আমার আর্টিকেল বেরিয়েছে-প্রিস্ট অফ নেচার, আপনি তার ছেলে?

কাজল চুপ করিয়া রহিল।

নির্মল কাজলের দুই হাত ধরিয়া বলিল—আসুন, বাইরে আসুন—আপনার সঙ্গে কথা বলি। আমি তো জানতাম না কোনও সময় এই বাড়িতে অপূর্ব রায় থাকতেন! কী আশ্চর্য যোগাযোগ।

বারান্দায় মাদুর পাতিয়া সে ও নির্মল বসিল। ঘটনাটা ততক্ষণে বাড়িতে রাষ্ট্র হইয়া গিয়াছে। রামধন মুখুজ্যে এবং তার স্ত্রী সাহিত্যের খুব একটা ধার ধারেন না বা প্রিন্ট অফ নেচার অপূর্ব রায়ের নামও শোনেন নাই। কিন্তু নির্মলের বিচারবুদ্ধির উপর তাঁহাদের গভীর আস্থা আছে। তাহারা মোটামুটি আন্দাজ করিয়া লইয়াছিলেন কাজলের বাবা কোনও একটা কারণে বিখ্যাত লোক এবং তিনি শৈশবে এই বাড়িতে থাকিতেন। অবিলম্বে কাজলের জন্য কিছু জলখাবার এবং চা আসিল।

নির্মল বলিতেছিল—গ্রাজুয়েট হয়েই খবরের কাগজে ঢুকি। সেই কলেজ লাইফ থেকেই আপনার বাবা আমার মানসগুরু। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা পরাধীন দেশে বাস করি আমাদের ভাষার প্রচার নেই, অনুবাদ হয় না। ইউরোপ অথবা আমেরিকার লেখক হলে অপূর্ববাবু নোবেল প্রাইজ পেতেন। মজার কথা কী জানেন, পরশু রাত্তিরে ট্রেনে আসবার সময় এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হল—তিনিও কাশীতেই আসছিলেন। সাহিত্য ভালোবাসেন। আধুনিক লেখকদের নিয়ে আলোচনা হতে হতে অপূর্ববাবুর কথা উঠল। তিনি বললেন, তিনি আপনার বাবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিলেন—

কাজল জিজ্ঞাসা করিল–কে বলুন তো? কলকাতার নোক–

–কলকাতার তো বটেই। তবে এখন ভারতের বাইরে থাকেন, কে আত্মীয়া মারা যাওযায় কিছুদিনের জন্য ফিরেছেন বললেন। দিনদশেক কাশীতে থাকবেন, নিজের বাড়ি আছে। ভদ্রলোকের নাম বি. রায়চৌধুরী। আমি কাশীর ঠিকানাও নিয়ে নিয়েছি। আপনি তো দেখছি ফ্যামিলির পুরোনো ইতিহাস খুঁজে বেড়াতে ভালোবাসেন। আমার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে একবার গিয়ে দেখুন না চিনতে পারেন কিনা! নারদ ঘাটের কাছে বাড়ি–

ঠিকানা লইয়া কাজল উঠিল। কথা রহিল কলিকাতায় ফিরিয়া খবরের কাগজের অফিসে সে নির্মলের সঙ্গে যোগাযোগ করিবে। নিজের ঠিকানাও তাহাকে দিল। বামধন মুখুজ্যে বলিয়া দিলেন, কাশীতে আসিলেই যখন ইচ্ছা সে বাড়িটা দেখিয়া যাইতে পারে।

গলির মুখে সেই অতিবৃদ্ধ লোকটি এখনও বোয়াকে বসিয়া আছে। তাহাকে দেখিয়া বলিলতুমিই রামধন মুখুজ্যের বাড়ি খোঁজ করছিলে না?

-আজ্ঞে হ্যাঁ।

–পেলে?

–হ্যাঁ।

বৃদ্ধ আপনমনে বিড়বিড় করিয়া বলিল—আমিও ওই বাড়িতে ছিলাম, বুঝলে? ছত্তিশ বচ্ছর থাকবার পর রামধন হারামজাদা আমায় উঠিয়ে, অন্য সব ভাড়াটে উঠিয়ে একা একা ভোগদখল করছে। বাড়িওয়ালাকে কী জাদুই যে করল! এই বুড়োবয়সে আমার কী কষ্ট! তারপর আবার হয়েছে হাঁপের ব্যারাম–

কাজল বলিল–হাঁপানির কষ্ট থাকলে তামাকটা কিন্তু না খাওয়াই ভালো—

বৃদ্ধ বলিল–জানি, কিন্তু ছাড়তে পারিনে। তা ও বাড়িতে কী দরকার ছিল?

—ওই বাড়িতে আমার ঠাকুরদা ভাড়া থাকতেন অনেকদিন আগে। বাবা তখন খুব ছোট। তাই একবার জায়গাটা দেখতে এসেছিলাম।

–ভাড়া থাকতেন? কতদিন আগে? কী নাম ছিল তোমার ঠাকুরদার?

তা বছর চল্লিশ আগে তো বটেই। ঠাকুরদার নাম ছিল হরিহর রায়।

বৃদ্ধের ঘোলাটে চোখ মুহূর্তের জন্য উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। সে বলিল–হরিহর রায়? খোকা, তোমার বাবার নাম কী–অপু? অপূর্ব?

কাজল অবাক হইয়া বলিল—আপনি বুঝি বাবাকে চিনতেন? ঠাকুরদাকে দেখেছেন?

—তোমার ঠাকুরদা মারা যাবার সময় আমি ওবাড়ির ওপরের ঘরে ভাড়া থাকতাম। আমিই গিয়ে লোকজন ডেকে সৎকারের ব্যবস্থা করি। তোমার ঠাকুমা কী

–অনেকদিন মারা গিয়েছেন। বাবা তখন কলেজে পড়েন।

–আর তোমার বাবা? সে কোথায় আছে?

কাজল বলিল–বাবাও বেঁচে নেই, আমার ছোটবেলাতেই মারা গিয়েছেন।

বৃদ্ধ কেমন একটা অসহায় না-বুঝিবার ভঙ্গিতে তাকাইয়া বলিল–কেউ বেঁচে নেই? তোমার বাবাও মারা গিয়েছে? তার তো মরার বয়েস হয়নি

তারপর কাজলকে বলিল—কাছে এসে দেখি, পড়াশুনা করো?

–আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি এবার এম.এ. দেব—

বৃদ্ধ সস্নেহে তাহার গায়ে হাত বুলাইয়া বলিল—ভাল। মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া কববে।

কাজল বলিল–আপনার নামটা তো জানা হল না–

—সে জেনে আর কী হবে? আমাকে যারা চিনতে পাবত তারা তো আর কেউ বেঁচে নেই বল্পে। তোমার বাবা থাকলে নন্দবাবু বললে চিনত—

—আমি কিন্তু আপনার নাম জানি—

বৃদ্ধ বলিল—তুমি কীভাবে আমার নাম জানবে? কে বলেছে তোমাকে?

—কেউ বলেনি। কয়েকখানা বই লিখে মারা যাবার আগে বাবা খুব নাম করেছিলেন। তার মধ্যে একখানা বই বাবার নিজের জীবন নিয়ে লেখা। সেই বইতে আপনার নাম আছে

নন্দবাবু একটু থতমত খাইয়া বলিল—আমার কথা? কী লেখা আছে তাতে?

প্রকৃত কথা বলিতে গেলে নন্দবাবুর মদ্যপান ও আনুষঙ্গিক দুশ্চরিত্রতার কথা বলিতে হয়। কাজল বলিল—ওই আপনি যা বললেন, ঠাকুরদার মৃত্যুর সময়ে আপনার সাহায্যের কথা।

—শুধু ওই?

—আর কী থাকবে?

বৃদ্ধ একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল–নাঃ, কিছু না—আর কী থাকবে।

বিদায় লইয়া কিছুদুর আসিয়া পিছন ফিরিয়া কাজল দেখিল নন্দবাবু প্রস্তরমূর্তির মতো বোয়াকে বসিয়া আছে। আবার সে হয়তো কাশী আসিবে, এই বাড়িটা দেখিতে আসিবে-কিন্তু তখন নন্দবাবু বোধহয় আর থাকিবে না।

মহাকালের ঘটিকাযন্ত্র নিপে কাজ করিয়া চলিয়াছে। আগ্রহী জন ছাড়া কে তার নিঃশব্দ প্রহর ঘোষণা শুনিতে পায়?

সকল অধ্যায়
১.
০১. হেমন্তের পড়ন্ত হলুদ রৌদ্র বেলা
২.
০২. অপুর বইগুলি বিক্রি হইতেছে
৩.
০৩. পিকনিক করিতে গিয়া
৪.
০৪. সেদিন কী কারণে ছুটি ছিল
৫.
০৫. কাজলের মনের মধ্যে একটা বিচিত্র অস্থিরতা
৬.
০৬. জনার্দন গাঙ্গুলী
৭.
০৭. বি.এ. পাশ করিবার পর
৮.
০৮. পরের দিন সকালের দিকে
৯.
০৯. কাজল মনসাপোতা পৌঁছিল
১০.
১০. এম.এ. পরীক্ষা হইয়া গেল
১১.
১১. জলাশয়ের কেন্দ্রে ঢেউ উঠিলে
১২.
১২. এ বছর ঘোর বর্ষা নামিয়াছিল
১৩.
১৩. নারায়ণশিলা গ্রামটি বনেজঙ্গলে পূর্ণ
১৪.
১৪. বারান্দায় রোদ্দুরে বসিয়া
১৫.
১৫. প্রগাঢ় বসন্তে কাজল
১৬.
১৬. অপুর প্রথম উপন্যাসটির খ্যাতি
১৭.
১৭. এক ছুটির দিন সকালে
১৮.
১৮. একদিন সকালের ডাকে
১৯.
১৯. যেজন্য মৌপাহাড়িতে আসা
২০.
২০. অল্পবয়েসে জীবনটা একরকম বেশ সুখে
২১.
২১. ঋতুর বদলের সময়
২২.
২২. সময় কাটিতে থাকে
২৩.
২৩. সেদিন স্নান করিয়া আয়নার সামনে দাঁড়াইয়া
২৪.
২৪. শ্রাবণমাসের প্রথম সপ্তাহে
২৫.
২৫. বিসর্জনের বাজনা বাজিতে শুরু করিয়াছে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%