২০. হাসু, হাসনু, হাসুরে

সৈয়দ শামসুল হক

হাসু, হাসনু, হাসুরে।

তীব্র আর্তনাদের মত তার নিজেরই সে ডাক যেন কানে শুনতে পায় বাবর।

হাসুরে।

মুখ খানা কেমন ছিল হাসনুর? পথের দিকে চোখ রেখেই চোখ তীক্ষ্ণ করে বাবর ভাবতে চেষ্টা করে। যেন নিজেরই সঙ্গে একটা মল্লযুদ্ধ চলতে থাকে তার। কিছুতেই সে পারছে না জয়ী হতে, কিছুতেই পারছে না। মনে করতে, কেমন ছিল দেখতে হাসু।

হাসু সন্ধেবেলায় পড়তে বসে বড় বিরক্ত করত।

পড়া বলে দেনা দাদা।

চুপ কর।

দেনা তোর পায়ে পড়ি।

যাবি তুই।

একটুখানি বলে দে।

মারব এক চাপড়।

তখন মুখ ভেংচে দৌড় দিত হাসনু।

হ্যাঁ, মনে পড়ছে। মুখ ভেংচালে ভারি মিষ্টি লাগত হাসনুকে। আদর করতে ইচ্ছে করত। কিন্তু তখন আদর করলে একটু আগে রাগ করবার মানে থাকে না নিজের। তাই সে পেছনে থেকে চেঁচিয়ে বলত, আবার আসবি তো তোর বেণি কেটে দেব; তখন মজা টের পাবি।

বাবরের চোখ যেন ভিজে আসে।

জাহেদাই এবার বলে, আপনি চুপ করে যে!

এটা বিশ্বের কি খুব অস্পষ্ট ঘটনা?

মানে?

আমার চুপ করে থাকাটা?

জাহেদা অবাক হয়। কেমন যেন টের পায় কোথায় একটা তার ছিঁড়ে গেছে।

বাবর যেন এখানে থেকেও নেই। সাহস হয় না ঘাটাতে। কাল রাতের পর এই প্ৰথম জাহেদা টের পায়, তার শক্তি যেন কে শুষে নিয়েছে। আগে যেমন চট করে একটা কিছু করবার কথা ভাবতে পারত, এখন যেন সেই ঝোঁকটা নেই। বরং খানিক ভেবে দেখার টিলেমি এসেছে।

জাহেদা বলল, যাচ্ছি কোথায়?

বর্ধমানে।

বলেই সামলে নিল বাবর। বলল, ঠাট্টা করছিলাম। যাচ্ছি কান্তনগরের মন্দিরে দেখতে।

তোমায় নিয়ে যাব বলছিলাম। এই তো প্ৰায় এসে গেছি।

খানিক পরেই হাতের বাঁয়ে লাল মাটির কাঁচা রাস্তা।

বাবর নেমে এক লোককে জিগ্যেস করল, এই পথেই তো মন্দির?

হ্যাঁ, সোজা চলে যান।

গাড়িতে এসে আবার স্টার্ট দিতে দিতে বাবর বলল, এখনো পথটা মনে আছে। ভুলিনি। চমৎকার মন্দির। পোড়া মাটির ফলকে তৈরি। এমনটি আর কোথাও নেই। অথচ জান, দেশের এত পুরনো, এত বিশিষ্ট একটা জিনিস, কারো খোঁজ নেই। খোঁজ নিতে গেলে ইনফরমেশনের লোকেরা বলবে, মুসলমান হয়ে হিন্দুর জিনিসে অতি উৎসাহ কেন? লাগাও টিকটিকি। ভারতের দালাল নয় তো!

দালাল মানে?

তাও জান না। বাংলায় জন্ম, থাক এদেশে, দালাল চেন না? ঐ ইংরেজিতে যাকে বলে এজেন্ট। ধান-চাল ওষুধ পত্তরের এজেন্ট নয়–এজেন্ট।

জিরো জিরো সেভেন? জেমস বণ্ড।

হা হা করে হেসে উঠল বাবর।

ধরেছ ঠিকই। তবে পদমর্যাদা অতটা নয়! এদেশে দালাল বড় কুৎসিত কথা; আর যে বলে, তার মনটাও কিছু কম কুৎসিত নয়। সবচেয়ে সহজ গাল, দালাল। এক সময় ছিল, বাংলা ভাষায় নেড়ে বা যবন বলাটা ছিল গালের চূড়ান্ত। এখন তার বদলে নতুন কথা এসেছে, দালাল।

আপনি আবার মাস্টারি করছেন! জাহেদা কত্রিম অনুযোগ করল।

তোমার বাংলার মাষ্টার।

বাবর তাকিয়ে দেখল সামনে খাল। সেই খালের উপর চওড়া কাঁচা সাঁকো। মানুষজন পার হচ্ছে। এর উপর দিয়ে তো গাড়ি যাবে না। অতএব গাড়ি রাখতে হলো।

নেমে এসো জাহেদা, হাঁটতে হবে।

গাড়ির চারপাশে এরি মধ্যে বেশ ভিড় জমে গেল। এক হাঁটু ধুলোপায়ে লোকেরা হাঁ করে দেখতে লাগল গাড়ি। জাহেদা বেরিয়ে আসতেই গাড়ির বদলে চোখ পড়ল তার দিকে। গাড়ি ছেড়ে তারা দেখতে লাগল জাহেদাকে।

ধুলোর গন্ধ হঠাৎ যেন নতুন মনে হলো বাবরের। অনেকদিন এমন গাঢ় গন্ধ পায়নি সে। যেন কীসের কথা মনে পড়তে চায়, স্মৃতিটা একেবারে দরোজার ওপারে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।

জাহেদা বলল, এর উপর দিয়ে হাঁটতে হবে নাকি?

সাঁকোটা এতই নিচু যে পানি ছুঁয়ে আছে। সাঁকোর ওপরে খড় বিছান। পায়ের চাপে পানি ফুটে বেরুচ্ছে। পা ভিজে যাচ্ছে। বাবর বলল, স্যাণ্ডেল জোড়া হাতে করে নাও। আর নইলে চল গাড়িতে রেখে আসি।

ইতস্তত করতে লাগল জাহেদা।

থাক না, মন্দির থাক।

কী বলছ? এতদূর এসে দেখে যাবে না?

আপনি তো মন্দির দেখতে আসেননি।

নিশ্চয় এসেছি।

হাতি! কী জন্যে এসেছেন, নিজেকেই জিগ্যেস করুন।

এতক্ষণে বাবর বুঝল। মেয়েটা ভেবেছে তার এই আসা শুধু তাকে জয় করার জন্যে। আপন মনেই হাসল সে। কথাটা মিথ্যে বলেনি। যতক্ষণ জাহেদা ছিল হাতের বাইরে, তাকে পাওয়াটা ছিল মুখ্য। যেই পাওয়া হয়েছে, তখন সেটা যেন পেছনে পড়ে গেছে। নিজেই সে বুঝতে পারেনি, কখন এই বদল হয়েছে তার মনের মধ্যে। এতক্ষণ, এই আজ সকাল থেকে, যেন তার মনে হচ্ছিল, আসবার একমাত্র উদ্দেশ্য কান্তনগরের মন্দির দেখা। আর কোনো উদ্দেশ্য নেই যেন তার। ছিলও না।

আবার হাসল বাবর। এবারে হাসিটা ফুটে উঠল। ঠোঁটের কোণায়। আর তো লক্ষ করল জাহেদা। বলল, চলুন গাড়িতেই রেখে আসি।

স্যাণ্ডেল রেখে এসে ওরা সাঁকো পেরুতে যাবে, একটা লোক হাত পেতে দাঁড়াল। কী ব্যাপার? জানেন না বুঝি? সাঁকো পেরুতে পাঁচ পয়সা করে শুনে দিতে হবে। কারণ? তাও জানেন না। কাল গেছে মেলা। মেলার লোকের সুবিধের জন্যে এরা সাঁকো করেছে। নইলে নৌকোয় করে, নয়ত কোমর পানিতে গা ড়ুবিয়ে পার হতে হতো। পয়সা দিল বাবর। কিন্তু ভারি দুঃখ হলো, আগে জানলে কালকেই আসা যেত। কতদিন মেলায় যায়নি সে।

হ্যাঁ, মনে পড়েছে। হাসনুকে নিয়ে মেলা দেখতে গিয়েছিল বাবর। মহররমের মেলা। বড় বড় তাজিয়া বানিয়েছিল। সেই তাজিয়া মিছিল করে গেছে মেলার দিকে। তারপর ভাল করে মনে নেই। মেলা পর্যন্ত পৌঁছিয়েছিল। কিনা তাও আজ মনে নেই। কেবল মনে আছে লোকজন সব লম্বা লম্বা পা ফেলে সরে পড়েছে। কেমন একটা থমথমে ভাব। বুকের কাছে অস্পষ্ট আতঙ্ক।

বাড়ি যাও খোকা, বাড়ি যাও।

কেন?

শিগগিারে বাড়ি যাও।

ভারি অবাক হয়েছিল বাবর। এ-কী কাণ্ড! সেই কবে থেকে বসে আছে সে, একটা একটা করে পয়সা জমিয়েছে, মেলায় যাবে বলে। আর এখন বলে কিনা, বাড়ি যাও।

মেলা হবে না?

মেলা? হ্যাঁ মেলাই হবে। রক্তগঙ্গার মেলা।

বুকের মধ্যে শিরশির করে উঠেছিল বাবরের।

হাসু, হাসনু, হাসুরে।

হাসু কে?

জাহেদা হঠাৎ প্রশ্ন করল। আর প্রশ্নটা যেন হতবিহ্বল করে দিল বাবরকে। এক মুহূর্তের জন্যে বুঝতে পারল না। কার কথা বলছে জাহেদা।

হাসু কে?

সামলে নিল বাবর। মাথা নাড়ল। বলল, কেউ না।

নিশ্চয়ই কেউ।

বলেছি কেউ না।

তাহলে নাম ধরে ডাকলেন যে!

কখন?

এই তো এক্ষুণি।

ভুল শুনেছ।

না বলুন, হাসু কে?

বললাম তো কেউ নয়।

নিশ্চয় কোনো মেয়ে।

হাসু ছেলের নামও হয়।

আমাকে ফাঁকি দিচ্ছেন। বলুন না কে? আমি তো জানি, আপনার একগাদা মেয়ে বন্ধু। নাম বললে তো আর খেয়ে ফেলব না!

মিছেমিছে হিংসে করছ।

বলুন আপনার একগাদা মেয়ে জানাশোনা নয়?

তুমি ঝগড়া করছি।

মোটেই না।

মাথা ঝাড়া দিয়ে জাহেদা এমন মুখভঙ্গি করল, তারপর নিশ্চল নিস্তরঙ্গ করল চেহারা, যেন পাথর দিয়ে এক্ষুণি সেটা তৈরি হলো।

বাবর হাসল।

আবার হাসছেন? লজ্জা করে না একশ মেয়ের সঙ্গে থাকতে? হাসু কে তা না বললেও জানি। সত্যি কখনো চাপা থাকে না।

না, থাকে না।

বাবরের নিজের কথাই চমকে দিল নিজেকে। কিছু না ভেবেই বলার জন্যে যেটা সে বলেছিল, বলা হবার পর সে অবাক হয়ে দেখল তার মধ্যে বিশ্বজোড়া অর্থের ভার।

বাবর বলল, চল, পা চলিয়ে চল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%