৮। কুরবানীর নবী ইসমাঈল (আঃ)

“এ কিতাবে ইসমাঈলকেও স্মরণ করো। সে ছিলো প্রতিশ্রুতি পালনকারী। ছিল একজন রাসূল ও নবী। সে তাঁর লোকজনকে সালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিতো। আর সে ছিলো তাঁর প্রভুর অবারিত সন্তোষ প্রাপ্ত।” – (আল কুরআন ১৯- ৫৪,৫৫)

কে এই ইসমাঈল?

আল্লাহর অবারিত সন্তোষ প্রাপ্ত এই মানুষটি কে? কী তাঁর পরিচয়? কেনইবা আল্লাহ্‌ তাঁর উপর নিজ সন্তোষের দুয়ার খুলে দিয়েছেন? হ্যাঁ, আসুন আমরা তাঁকে জানি, খুজে দেখি আল্লাহর কিতাবে তাঁর কি পরিচয় দেয়া হয়েছে?

ইনি হলেন বিশ্বনেতা আল্লাহর নবী ইব্রাহিম (আঃ) এর পুত্র। তাঁর মায়ের নাম হাজেরা। ফিলিস্তিনে জন্মগ্রহন করেন। পরে মক্কায় মায়ের কোলে লালিত- পালিত হন। একটু বড় হলে আল্লাহ্‌ তাঁর পিতাকে নির্দেশ দেন তাঁকে কুরবানী করবার জন্যে। পিতার মতই তিনি আল্লাহর হুকুমের কাছে মাথা নত করে দেন।

এরপর তিনি পিতা ইব্রাহিম (আঃ) এর সাথে কা’বা ঘর নির্মাণ করেন। আল্লাহ্‌ তাঁকে নবয়্যত দান করেন। তিনি আরবের হিজাযে সালাত এবং যাকাত ভিত্তিক একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণ করেন। ইনিই হলেন মহান আল্লাহর অবারিত সন্তোষ লাভকারী নবী হজরত ইসমাঈল (আঃ)।

মায়ের সাথে মক্কায় এলেন

ইব্রাহিম (আঃ) এর ছিলেন দু’জন স্ত্রী। বড়জন সারাহ আর ছোটজন হাজেরা। সারাহ বুড়ি হয়ে গেছেন, এখনো তাঁর কোন ছেলেমেয়ে হয়নি। কিন্তু আল্লাহ্‌ হাজেরাকে চাঁদের মতো ফুটফুটে একটি ছেলে দান করেন। বুড়ো বয়েসে ছেলে পেয়ে ইব্রাহীমের যে কি আনন্দ তা কি আর ভাষায় প্রকাশ করা যায়? তিনি ছেলের নাম রাখেন ইসমাঈল।

কিন্তু আল্লাহ্‌ ইব্রাহীমকে নিজের বন্ধু বানাবার জন্যে কতো যে পরীক্ষা করেছেন, তাঁর ইয়ত্তা নেই। শিশুপুত্রের ব্যাপারে তাঁকে পরীক্ষায় ফেললেন। বললেন- শিশু ইসমাঈল ও তাঁর মাকে মক্কার মরু প্রান্তরে রেখে এসো। ইব্রাহীমের কাছে আল্লাহর হুকুম শিরোধার্য। তিনি তাঁদের নিয়ে ফিলিস্তিন থেকে রওয়ানা করলেন মক্কার দিকে। সহীহ বুখারীতে এ ঘটনার বিবরন দিয়ে বড় একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে-

ইব্রাহিম হাজেরা ও শিশুপুত্র ইসমাঈলকে সাথে নিয়ে রওয়ানা করেন। পথে হজেরা শিশুকে দুধ পান করাতেন। অবশেষে একদিন তিনি তাদের নিয়ে মক্কায় এসে উপস্থিত হলেন। এখন যেখানে কা’বা ঘর ও যমযমের কূপ এখানেই একটি গাছের নিচে তাঁদের রাখেন। তখন মক্কায় কোন মানুষ ছিলোনা। পানিও ছিলো না। ইব্রাহিম তাঁদের এক থলে খেজুর আর এক মশক পানি দিয়ে ফিরে চললেন ফিলিস্তিনের দিকে। হাজেরা তাঁর পিছে পিছে দৌড়ে এলেন। বললেন- আপনি কি আল্লাহর হুকুমে আমাদের এখানে রেখে যাচ্ছেন? ইব্রাহিম জবাব দিলেন- হ্যাঁ। একথা শুনে হাজেরা বললেন- ‘ঠিক আছে, তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ আমাদের ধ্বংস করবেননা।’ একথা বলে তিনি ফিরে এলেন যথাস্থানে। এদিকে ইব্রাহিম যে প্রিয়তম পুত্র স্ত্রীকে রেখে ফিরে চলেছেন, তাঁর বুক তো ফেটে যাচ্ছিলো। তাঁর হৃদয়ের কান্না তখন আল্লাহ্‌ ছাড়া আর কেউ দেখেননি। কিন্তু এ যে আল্লাহর হুকুম। আর তাঁর হুকুম পালন করাতো অপরিহার্য। আল্লাহর হুকুমে ইব্রাহিম এতো বড় বিরহের কাজও করতে পারেন। বুকের মধ্যে মনকে চেপে ধরে নীরবে তিনি ফিরে চলেছেন। পিছনে ফিরে তাকাননি। তাকালে ওদের চেহারা তাঁকে আল্লাহর নির্দেশ পালনে বাধা দিতে পারে। তাঁর হৃদয় যেন সমুদ্রের মতো উদার আর হিমালয়ের মতো অবিচল। সামনে অগ্রসর হয়ে চলেছেন তিনি। কিছুদূর এসে একটি টিলার উপরে উঠে ফিরে দাঁড়ালেন। এখান থেকে আর ওদের দেখা যায়না। এখানে দাঁড়িয়ে ইব্রাহিম দয়াময় প্রভু মহান আল্লাহর দরবারে দুহাত তুলে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে দোয়া করলেন-

“আমার প্রভু, এই দানা-পানিহীন মরুভূমিতে তোমারই সম্মানিত ঘরের পাশে আমার সন্তানের বসতি স্থাপন করে গেলাম। প্রভু, ওদের এখানে রেখে গেলাম যাতে ওরা সালাত কায়েম করে। তাই তুমি মানুষের মনকে ওদের প্রতি আকৃষ্ট করে দিও আর ফলফলারি দ্বারা ওদের জীবিকার ব্যবস্থা করে দিও, যেন ওরা তোমার শুকোরগুজার হয়ে থাকে।” (সূরা ইব্রাহিম, আয়াত ৩৭)

অতঃপর আল্লাহর ইচ্ছার উপর মনকে অটল রেখে ধীরে ধীরে ইব্রাহিম চলে এলেন ফিলিস্তিনের দিকে। এ দিকে হাজেরা থলের খেজুর আর মশকের পানি খেয়ে দিন কাটাতে থাকেন। শিশু ইসমাঈল মায়ের বুকের দুধ পান করেন। কিন্তু অচিরেই মশকের পানি শেষ হয়ে গেলো। পিপাসায় তাঁর ছাতি ফেটে যায়। বুকে দুধ আসেনা। বাচ্চাও ক্ষুদায় পিপাসায় ধড়পড় করছে। মৃত্যু যেন হাতছানি দিয়ে তাঁদের ডাকছে। চোখের সামনে অনাহারে শিশুপুত্রের করুন মৃত্যু কোন মা কি সহ্য করতে পারে? পুত্রকে বাঁচানোর জন্যে তিনি পানির খোজে দৌড়ালেন। সামনেই একটি পাহাড়। এই পাহাড়ের নাম সাফা পাহাড়। তিনি দৌড়ে সাফা পাহাড়ের উপরে উঠে গেলেন। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলেন কোন মানুষ দেখতে পান কিনা? উদ্দেশ্য হলো মানুষ দেখতে পেলে কিছু পানি চেয়ে নেবেন। কিন্তু না কোথাও কোন মানুষ দেখা যায়না।

এবার দ্রুত পাহাড় থেকে নেমে পড়লেন। সামনে মাঠের ওপাশেই আর একটি পাহাড়। এর নাম মারওয়া পাহাড়। হাজেরা দৌড়ে এসে মারওয়া পাহাড়ের উপরে উঠলেন। দুই পাহাড়ের মাঝে সাত চক্কর দৌড়াদৌড়ী করলেন। চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন, কোন মানুষের সন্ধান পেলেন না। ছেলে মৃত প্রায় আর নিজের জীবন ওষ্ঠাগত। হাজেরা চোখের সামনে বাচার আর কোন উপায় দেখেন না। এখন তিনি সম্পূর্ণ অসহায়।

আল্লাহর উপহার যমযমের কূপ

কিন্তু আল্লাহ্‌ যে অসহায়ের সহায়, হাজেরা হঠাৎ একটি আওয়াজ শুনলেন। আশার আলো নিয়ে সেদিকে কান খাড়া করলেন। বললেন- তুমি যেই হওনা কেন, সম্ভব হলে আমাকে সাহায্য করো। হঠাৎ তিনি একজন ফেরেস্তাকে দেখতে পেলেন। এখন যেখানে যমযমের কুপ, ফেরেস্তা সেখানে দাঁড়িয়ে মাটির উপরে পায়ের গোড়ালি দিয়ে একটি আঘাত করলেন। সাথে সাথে মাটির নিচ থেকে উপচে উঠতে লাগলো পানি। হাজেরা দৌড়ে এসে চারপাশে বাধ দিলেন। অঞ্জলি ভরে পানি পান করলেন। মশকে পানি ভরে নিলেন। বুকে দুধ এলো। ইসমাঈলকে প্রান ভরে দুধ পান করালেন। এর নামই যমযম কূপ। সুপেয় অনাবিল পানির অবিরাম ধারা। ফেরেস্তা বলে গেলেন আপনার ভয়ের কোন কারন নেই। এখানেই আল্লাহর ঘর রয়েছে। আপনার পুত্র বড় হয়ে তাঁর পিতার সাথে আল্লাহর ঘর পুনর্নির্মাণ করবে। আপনারা নিরাপদ।

ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠেন

আল্লাহর অসীম সাহায্য পেয়ে হাজেরা আল্লাহর শোকর আদায় করলেন। দিন যায় রাত আসে। ইসমাঈল ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠেন। এদিকে পানির সন্ধান পেয়ে মক্কার আকাশে পাখি এলো। পানির সন্ধান পেয়ে ইয়েমেন দেশের জুরহুম গোত্রের একদল লোক মক্কায় বসবাস করার জন্যে হাজেরার অনুমতি চাইলো। তিনি তাঁদের অনুমতি দিলেন। ফলে মক্কায় জনবসতি গড়ে উঠলো। পানির ছোঁয়াচ পেয়ে মরুভূমিতে ফল ফলারি উৎপন্ন হতে থাকলো। আল্লাহ্‌ ইসমাঈল ও তাঁর মায়ের সব অসুবিধা দূর করে দিলেন। এখানে যে জনবসতি গড়ে উঠেছে তাঁর কৃতৃত্ব কিন্তু ইসমাঈলের মায়ের হাতেই থাকলো। ইব্রাহিম (আঃ) প্রায়ই প্রানপ্রিয় পুত্র ইসমাঈল ও স্ত্রী হাজেরাকে দেখার জন্যে মক্কায় আসেন। ইসমাঈলের হাঁটাহাঁটি দৌড়াদৌড়ি দেখে ইব্রাহীমের মন ভরে যায়। ফুটফুটে টুকটুকে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি আনন্দে আল্লাহর শোকর আদায় করেন। যখন আসে পাশের মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকার জন্যে বের হন, ইসমাঈলকে সাথে নিয়ে যান। এভাবে কিছু দিন মক্কায় থেকে আবার চলে যান ফিলিস্তিনে। আবার ফিরে আসেন মক্কায়। ইসমাঈল দিন দিন বেড়ে ওঠেন। পিতা তাঁকে মনের মতো সুন্দর করে গড়ে তোলেন। যেমন বাপ, তেমনি আল্লাহর অনুগত হয়ে গড়ে উঠে ইসমাঈল। ফলে পিতার মহব্বত বেড়ে যায় পুত্রের প্রতি। আল্লাহর প্রতি তাঁদের পিতা পুত্রের ভালোবাসাকে আল্লাহ্‌ পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।

যবাই হবার হুকুম পেলেন

ইব্রাহিম একদিন স্বপ্ন দেখেন তিনি তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্রের গলায় ছুরি চালাচ্ছেন। নবীদের স্বপ্নও একপ্রকার অহী বা আল্লাহর আদেশ। আল্লাহর হুকুম শিরোধার্য। কিন্তু ইসমাঈল কি এ হুকুম মেনে নেবে? আসলে আল্লাহ্‌ তো সে পরীক্ষাই নিতে চান। আল্লাহতো দেখতে চান ইসমাঈল আল্লাহর হুকুমের সামনে মাথা পেতে দেয় কিনা? নিজের জীবনের চাইতেও আল্লাহর হুকুম পালন করাকে বড় কর্তব্য মনে করে কিনা? আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে সে নিজের জীবনকে কুরবানী করতে প্রস্তুত আছে কিনা?

কিন্তু ইসমাঈলতো তাঁর পিতার মতই আল্লাহর অনুগত। আল্লাহর সন্তুষ্টির চাইতে বড় কোন কাম্য তাঁর নেই। পিতা ইব্রাহিম আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরবানী করার হুকুম জানিয়ে দেয়ার সাথে সাথে আল্লাহর অতি সম্মানিত দাস ইসমাঈল বলে উঠেন –

“আব্বা, আপনি আল্লাহর নির্দেশ পালন করুন। ইনশা’য়াল্লাহ আপনি আমাকে অটল অবিচল ও দ্রঢ় মনোবলের অধিকারী পাবেন।” (সূরা ৩৭ আসসাফফাত, আয়াত ১০২)

তারপর যখন পিতা পুত্র দুইজনই আল্লাহর হুকুমের সামনে মাথা নত করে দিলেন এবং ইব্রাহিম পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিয়ে ছুরি চালাতে উদ্যত হলেন, তখন নিজের দুই ‘প্রভু পাগল’ দাসের জন্যে আল্লাহর মহব্বতের দরিয়া উথলে উঠলো। সাথে সাথে তিনি ডাক দিয়ে বললেন-

‘ইব্রাহিম, থামো। স্বপ্নকে তুমি সত্য প্রমান করে দেখিয়েছ।” (সূরা ৩৭ আসসাফফাত, আয়াত ১০৫)

ব্যাস, বাপ বেটা দুইজনই আল্লাহর পরীক্ষায় পাশ করলেন। আর আল্লাহর পরীক্ষায় পাশ করার চাইতে বড় বিজয় কি হতে পারে? আল্লাহর ফেরেস্তারা ইব্রাহীমের সামনে একটি দুম্বা এনে রেখে দিলেন এবং সেটিকে কুরাবানী করে দিতে বললেন। ইব্রাহিম কৃতজ্ঞ মনে পুত্রের পরিবর্তে দুম্বাটি যবাই করে দিলেন। মহান আল্লাহ্‌ বলেন-

“আমরা একটি মহান কুরবানীর বিনিময়ে ইসমাঈলকে ছাড়িয়ে নিলাম।” (সূরা ৩৭ আসসাফফাত, আয়াত ১০৭)

সত্যি এটা ছিলো একটা বিরাট কুরবানী। আল্লাহর হুকুম মতো পিতা পুত্রকে কুরবানী করতে রাজি হয়ে যান। আবার পুত্রও আল্লাহর হুকুমে যবাই হবার জন্যে ছুরির নিচে গলা পেতে দেন। তাইতো এটা একটা বিরাট কুরবানী, বিরাট আত্মত্যাগ। সে জন্যই আল্লাহ্‌ তায়ালা এই বিরাট কুরবনীকে চিরদিন স্মরণীয় করে রাখার জন্যে সেই তারিখে যেনো মুমিনেরা আল্লাহর হুকুমে নিজেদের আত্মত্যাগের প্রমান স্বরূপ পশু কুরবানী করে, এ নিয়ম চালু রেখেছেন। বিগত প্রায় চার হাজার বছর থেকে মানুষ ইসমাঈল ও তাঁর পিতার সেই বিরাট কুরবানীকে স্মরণ করে। প্রতি বছর ঐ তারিখে মুসলিমরা আল্লাহর উদ্দেশে পশু কুরবানী করে। যারা মক্কায় হজ্জ পালন করতে যায়, ঐ তারিখে সেখানে কুরবানী করা তাঁদের জন্যে অবশ্য করনীয় কাজ। যারা আল্লাহর হুকুমের সামনে বিনীত হয়ে মাথা নত করে দেন, আল্লাহ্‌ তাঁদের এভাবেই পুরস্কৃত করেন। পরীক্ষায় পাশের পর আল্লাহ্‌ ইসমাঈলকে নবুয়্যত দান করেন।

এর আগে ইসমাঈলের মা পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করলেন মহান আল্লাহ্‌ সেই ঘটনাটিকেও চির স্মরণীয় করে রাখলেন। যারাই মক্কায় হজ্জ করতে যাবে, তাঁদের জন্যে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করার নিয়ম আল্লাহ্‌ চালু করে দিলেন। মা হাজেরার সেই কষ্টকে আল্লাহ্‌ স্মরণীয় করে রাখলেন কেন?

কারন তিনি যে আল্লাহর ইচ্ছায় মক্কার জনমানবহীন মরুভূমিতে বসবাস করতে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর স্বামী ইব্রাহিম যখন বললেন, আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁকে এই মরুভূমিতে রেখে যাচ্ছেন, তখন তিনি একমাত্র আল্লাহর উপরে ভরসা করে সেখানে থেকে গেলেন। তাঁর এই যে বিরাট আল্লাহ্‌নির্ভরতা, এরি বিনিময়ে আল্লাহ্‌ পাক তাঁকে চির স্মরণীয় ও সম্মানিত করে রাখলেন।

বিয়ে করলেন পিতা হলেন

দিন যায় রাত আসে। বছর ঘুরে আসে নতুন বছর। ইসমাঈল বড় হয়ে উঠেন। পাশেই বসবাস করছে জুরহুম গোত্রের লোকেরা। ইসমাঈল তাঁর সুন্দর ও চমৎকার মানবীয় গুনাবলীর জন্যে তাঁদের খুব প্রিয় হয়ে উঠেন। ইসমাঈল যৌবনপ্রাপ্ত হলে তারা তাঁদের এক মেয়েকে ইসমাঈলের কাছে বিয়ে দেয়। বিয়ের কিছুকাল পরেই তাঁর মা হাজেরা ইহলোক ত্যাগ করেন। আল্লাহ্‌ পাক ইসমাঈলের মাকে নিজ রহমতের ছায়াতলে স্থান দিন। এরই মাঝে ইব্রাহিম এলেন প্রিয় পুত্র ও স্ত্রীকে দেখার জন্যে। ইসমাঈল এসময় মক্কার বাইরে ছিলেন। ইব্রাহিম এসে পুত্রকে বাড়িতে পেলেননা। স্ত্রী হাজেরাও মৃত। ঘরে শুধু পুত্রবধু। কিন্তু পুত্রবধু একজন সত্যিকার মুমিন মহিলার মতো আচরন করেননি। একজন নবীর স্ত্রী আর একজন নবীর পুত্র বধু হিসেবে তো তাঁর আদর্শ মুসলিম মহিলা হওয়া উচিত ছিলো। ফলে পিতার নির্দেশে ইসমাঈল এ মহিলাকে তালাক দেন এবং আরেকজন সত্যিকার মুমিন মহিলাকে বিয়ে করেন। এ ঘরে তাঁর কয়েকটি ছেলেমেয়ে জন্ম হয়। তাঁরাও আদর্শ মুসলিম হিসেবে গড়ে উঠেন।

কা’বা নির্মাণে অংশ নিলেন

একদিন পিতা ইব্রাহিম ইসমাঈলকে ডেকে বললেন- ‘আল্লাহ্‌ আমাকে একটি কাজের হুকুম দিয়েছেন। তুমি কি আমাকে সে কাজে সাহায্য করবে? ইসমাঈল বললেন- হ্যাঁ, নিশ্চয়ই করবো।’ ইব্রাহিম সাম্নের উঁচু টিলাটি দেখিয়ে বললেন- ‘মহান আল্লাহ্‌ আমাকে এখানে একটি ঘর বানাবার নির্দেশ দিয়েছেন।’

অতঃপর বার বেটা দু’জন মিলে আল্লাহর ঘর কা’বা ঘর নির্মাণ কাজ শুরু করলেন। ইসমাঈল পাথর যোগান দেন আর ইব্রাহিম গাঁথুনি গেঁথে দেয়াল নির্মাণ করেন, ছাদ নির্মাণ করেন। গাঁথুনি যখন উপরে উঠছিলো, তখন ইসমাঈল একটি বড় পাথর এনে দিলেন। ইব্রাহিম সে পাথরের উপরে দাঁড়িয়ে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন। আজও সে পাথরটি কা’বা ঘরের সামনে বিদ্যমান আছে। আপনি যখন হজ্জ বা উমরা করতে যাবেন সে পাথরটি দেখতে পাবেন। ওখানে দু’রাকাত নামাজ পড়তে হয়। সে পাথরটির নাম মাকামে ইব্রাহিম। বাপ ছেলে মিলে যখন বাইতুল্লাহ (আল্লাহর ঘর) নির্মাণ শেষ করলেন, তখন দু’জনে প্রভু দয়াময় মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন, তিনি যেন তাঁদের এই খিদমত কবুল করে নেন। মহান আল্লাহ্‌ তাঁদের এই বিরাট খিদমত কবুল করে নেন। তাঁদের নির্মাণ করা ঐ ঘরকে চিরদিনের জন্যে হজ্জ ও তাওয়াফের কেন্দ্রে পরিনত করে দেন। সারা পৃথিবী থেকে মানুষ আল্লাহর এই ঘরকে তাওয়াফ করার জন্য মক্কায় ছুটে যায়। আপনি সেই ঘরের তাওয়াফ করার নিয়ত করে রাখুন। হয়তো আল্লাহ্‌ একদিন সুযোগ করে দিবেন। অতঃপর ঐ ঘরকে কেন্দ্র করে মক্কা একটি স্থায়ী শহরে পরিনত হয়। সারা পৃথিবী থেকে আল্লাহ্‌ ভক্ত লোকেরা ছুটে আসে সেখানে। আল্লাহর ঘর ধরে তারা রোনাজারি করে।

সালাত ও যাকাত ভিত্তিক সমাজ গড়লেন

ইসমাঈলের পিতা ইব্রাহিম (আঃ) মহান আল্লাহ্‌ তায়ালার দরবারে দোয়া করেছিলেন- ‘আমাকে নেক্কার সন্তান দান করো।’ সত্যিই আল্লাহ্‌ তাঁকে নেক পুত্র দান করেন। ইব্রাহিম আরো দোয়া করেছিলেন- ‘প্রভু, আমাকে সালাত কায়েমকারী বানাও, আমার সন্তানদেরকেও।’

ইসমাঈলকে আল্লাহ্‌ তায়ালা শুধু নেক্কারই বানাননি, শুধু সালাত কায়েমকারীই বানাননি, সেই সাথে একজন আদর্শ নবীও বানিয়েছিলেন। তাইতো মহান আল্লাহ্‌ বলেন-

“ইসমাঈল, আলয়াসা, ইউনুস, লুত এদের প্রত্যেককেই আমি বিশ্ববাসীর উপর মর্যাদা দান করেছি।” (সূরা আল আনাম, আয়াত ৮৬)

ইসমাঈল মক্কা ও হিজাযের লোকদেরকে আল্লাহর পথে ডাকেন। তাঁদের তিনি আল্লাহকে জানার, বুঝার ও আল্লাহর পথে চলার তা’লিম দেন। তিনি তাঁদের সালাত কায়েম করার নির্দেশ দেন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যাকাত ভিত্তিক সমাজ গড়ার শিক্ষা দেন। সালাত ও যাকাত ভিত্তিক একটি আদর্শ সমাজ গড়ার কাজ করতে গিয়ে তাঁকে অনেক বিপদ মুসিবত ও বাধার সম্মুখীন হতে হয়। তিনি সবার সাথে এসব কিছুর মোকাবেলা করেন। তাইতো আল্লাহ্‌ তাঁর প্রশংসা করে বলেন-

“ইসমাঈল, ইদ্রীস, যুলকিফল এরা সবাই ছিল সবর অবলম্বনকারী। আমি তাঁদেরকে আমার রহমতের ছায়াতলে স্থান দিয়েছি। তারা ছিলো যোগ্য লোক এবং সততার প্রতীক।” (সূরা ২১ আল আম্বিয়া, আয়াত ৮৫)

ইসমাঈল (আঃ) তাঁর লোকদেরকে নিয়ে কা’বা কেন্দ্রিক একটি আদর্শ ইসলামী সমাজ গড়েন। জানা যায়, তাঁর বারোজন পুত্র ছিলো এবং তারা সকলেই ছিলেন ইসলামী সমাজের কাণ্ডারি।

তাঁরই বংশে জন্ম নিলেন মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ

মহান আল্লাহ্‌ ইসমাঈল (আঃ) কে আরো একটি বড় মর্যাদা দান করেছেন। সেটা হলো, তাঁরই বংশে পাঠিয়েছেন শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে। কা’বা নির্মাণের পর ইসমাঈল পিতা ইব্রাহীমের সংগে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন।

“প্রভু, আমাদের বংশ থেকে তাঁদের মাঝে একজন রাসুল পাঠিও, যিনি ওদেরকে তোমার আয়াত পাঠ করে শোনাবেন, কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেবেন আর তাঁদের জীবনকে পরিশুদ্ধ পরিচ্ছন্ন করবেন।” (সূরা বাকারা, আয়াত ১২৯)

আল্লাহ্‌ ইসমাঈল ও তাঁর পিতার দোয়া কবুল করেন। ইসমাঈলের বংশেই মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহর আবির্ভাব ঘটান। মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ এসে পৃথিবীতে আবার ইব্রাহিম ও ইসমাঈল (আঃ) এর মতই কা’বা কেন্দ্রিক ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই কা’বা এবং কা’বা কেন্দ্রিক হজ্জ, কুরবানী, তাওয়াফ, সাফা মারওয়া দৌড়াদৌড়ি মাকামে ইব্রাহীমে সালাত আদায় ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহ্‌ পাক ইব্রাহিম (আঃ), ইসমাঈল (আঃ) ও তাঁর সম্মানিত মা হাজেরা আলাইহিস সালামকে চিরদিন পৃথিবীতে স্মরণীয় করে রাখার ব্যবস্থা করলেন। মহান আল্লাহ্‌ তাঁর অনুগত দাসদের এভাবেই পুরস্কৃত করেন।

কুরআনে ইসমাঈল (আঃ)

মহান আল্লাহ্‌ তাঁর প্রিয় নবী ইসমাঈল (আঃ)-কে বিরাট সম্মান ও মর্যাদা দান করেছেন। কুরআন মাজীদে মোট বারোটি স্থানে আল্লাহ্‌ পাক ইসমাঈলের নাম উল্লেখ করেন। কয়েকটি আয়াত তো আগেই উল্লেখ করেছি। আল্লাহ তায়ালা হজরত ইসমাঈল (আঃ) সম্পর্কে আরো বলেন-

“স্মরণ করো, ইসমাঈল, আলয়াসা, যুলকিফলকে। এরা সবাই ছিলো উত্তম আদর্শ।” (সূরা ৩৮ সোয়াদ, আয়াত ৪৮)

“হে মুহাম্মাদ, তোমার কাছে আমি অহী পাঠাচ্ছি, যেমন পাঠিয়েছিলাম নূহ এবং তাঁর পরবর্তী নবীদের কাছে, যেমন পাঠিয়েছিলাম ইব্রাহিম ও ইসমাঈলের কাছে।” (সূরা ২ আল বাকারা, আয়াত ১৩৬)

“হে মুহাম্মাদ, বলো- আমরা আল্লাহকে মানি আর ইসমাঈল ও ইব্রাহীমের কাছে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাও মানি।” (সূরা ২ আল বাকারা, আয়াত ১৩৬)

যেসব সুরায় ইসমাঈল (আঃ) এর কথা উল্লেখ হয়েছে, সেগুলো হলো- সূরা আল বাকারাঃ ১২৫-১৪০, আলে ইমরানঃ ৮৪, আন নিসাঃ ১৬৩, আল আনআমঃ ৮৬, ইব্রাহীমঃ ৩৯, মরিয়মঃ ৫৪, আল আম্বিয়াঃ ৮৫, সোয়াদঃ ৪৮।

সকল অধ্যায়
১.
১। প্রথম মানুষ প্রথম নবী আদম আলাইহিস সালাম
২.
২। উচ্চ মর্যাদার নবী ইদ্রীস (আঃ)
৩.
৩। হাজার বছরের সংগ্রামী নূহ (আঃ)
৪.
৪। আদ জাতির নবী হুদ (আঃ)
৫.
৫। সামুদ জাতির নবী সালেহ (আঃ)
৬.
৬। অগ্নী পরীক্ষায় বিজয়ী বীর ইবরাহীম (আঃ)
৭.
৭। জর্ডান অঞ্চলের নবী লুত (আঃ)
৮.
৮। কুরবানীর নবী ইসমাঈল (আঃ)
৯.
৯। ইবরাহীম পুত্র ইসহাক (আঃ)
১০.
১০। ইসরাইলিদের পিতৃপুরুষ ইয়াকুব (আঃ)
১১.
১১। মিশর শাসক ইউসুফ (আঃ)
১২.
১২। শুয়াইব (আঃ)
১৩.
১৩। ধৈর্যের পাহাড় আইয়ুব (আঃ)
১৪.
১৪। যুলকিফল (আঃ)
১৫.
১৫। মুসা কালিমুল্লাহ (আঃ)
১৬.
১৬। হারুন (আঃ)
১৭.
১৭। সম্রাট নবী দাউদ (আঃ)
১৮.
১৮। বিশ্বের অনন্য সম্রাট সুলাইমান (আঃ)
১৯.
১৯। ইলিয়াস (আঃ)
২০.
২০। আল ইয়াসা (আঃ)
২১.
২১। মাছওয়ালা নবী ইউনুস (আঃ)
২২.
২২। যাকারিয়া (আঃ)
২৩.
২৩। শহীদ ইয়াহইয়া (আঃ)
২৪.
২৪। ঈসা রুহুল্লাহ (আঃ)
২৫.
২৫। বিশ্বনবী মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ (ﷺ)

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%