সাইলেনটিয়াম

সুদীপ চ্যাটার্জি

২০১৯ (হিউস্টন মহাকাশ কন্ট্রোল সেন্টার, নাসা)

আর কয়েক মুহূর্ত। হিউস্টন মহাকাশ কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে তিনশজন বিজ্ঞানী একদৃষ্টে চেয়ে আছেন সামনের পর্দার দিকে। অয়ন নীরবে তার কম্পিউটারের মনিটারে চোখ রাখল। কেউ কোন কথা না বললেও তাদের হৃদপিণ্ডের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই মহাকাশযান “সর্সারার-১” মানুষের চেনা সৌরজগতের সীমানার বাইরে চলে যাবে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকাটা তাদের প্রত্যেকের কাছে যত না আনন্দের, তার চেয়ে অনেক বেশি উৎকণ্ঠার।

মানুষের তৈরি কোনো মহাকাশযান আজ পর্যন্ত যাত্রীসহ সৌরজগতের বাইরে পৌঁছতে পারেনি এর আগে। অনেক গবেষণা, অনেক ঝুঁকি, অনেক মানুষের সারাজীবনের পরিশ্রমের পরিণতি ঠিক করে দেবে আজকের এই মুহূর্ত। “সর্সারার-১” মহাকাশযানের পাঁচজন অভিযাত্রীর ভবিষ্যৎও নির্ভর করছে এই মুহূর্তের ওপর।

জ্বালানি প্রসারণ টিমের প্রধান ড্যানের উত্তেজিত গলা শোনা গেল, “সব ঠিকঠাক চলছে। হিসেবমতো সর্সারার-১ আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই হেলিওস্ফেয়ার ছাড়িয়ে আন্তর্নক্ষত্র অঞ্চলে চলে যাবে। ইঞ্জিনের পারমাণবিক অনুরণন চালু করে দেওয়া হয়েছে এতক্ষণে। কম্পন নিয়ন্ত্রক আবরণগুলো ঠিকঠাক কাজ করছে এখনও।

ফিলিপ বলল, “সর্সারার-১ এর শেষতম বার্তা বলছে সব ঠিক আছে। তারা এতক্ষণে নিশ্চয়ই মানসিক ভাবে তৈরি হয়ে নিয়েছে।”

ফিলিপের টিম সারাক্ষণ সর্সারার-১ এর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে। সঙ্কেত বিশ্লেষণ চলছে বিরামহীনভাবে। শুধু মানবসভ্যতাকে গভীর মহাকাশে পাঠানোই তাদের লক্ষ্য নয়, এই অভিযানের আসল কাজ আরম্ভ হবে সর্সারার-১-এর সৌরজগতের সীমানার বাইরে পৌঁছোবার পর।

আর এক মিনিট। কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। অয়ন উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে। গত উনিশ বছরের অপেক্ষা। নিজেদের জীবন আর বিপদের তোয়াক্কা না করে মানুষের ভবিষ্যৎ এর স্বপ্ন দেখা কয়েকটা মানুষের সাফল্য। এই পদক্ষেপ হয় তাদের সন্ধান দেবে নতুন জগতের অথবা সর্সারার-১ চিরকালের মতো হারিয়ে যাবে অন্তরীক্ষের অপরিসীম অন্ধকারে।

“দশ নয় আট সাত ছয় পাঁচ চার তিন দুই এক শূন্য...নিশ্চয়ই সীমানা ছেড়ে বেরিয়ে গেছে মহাকাশযান।”

অয়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এবার অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। সতেরো ঘন্টার আগে সর্সারার এর পাঠানো সংকেত পাওয়ার কোনো উপায় নেই। লক্ষ লক্ষ মাইল দূর থেকে আসা সংকেত আসতে সময় লাগে।

ক্রমে সময় কাটতে লাগল। একসময় পেরিয়ে গেল সতেরো ঘন্টা। প্রজেক্ট ম্যানেজার মার্ক অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। বাড়তি সময়ের প্রত্যেক ঘন্টার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে সকলে আস্তে আস্তে অধৈর্য হয়ে উঠছে। এখনো ফিলিপের টিম কোন রকম আপডেট দেয়নি। হঠাৎ মার্কের গলার স্বরে সচকিত হয়ে উঠল সবাই।

মার্ক সকলের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত কণ্ঠে বলল, “সর্সারার-১ এর সঙ্গে কোনোরকম যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। যতদূর মনে হচ্ছে সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার সময়ে মহাকাশযানের এর যন্ত্রপাতি কোনভাবে খারাপ হয়ে গেছে...অথবা...অথবা কোন বিস্ফোরণে সর্সারার-১…” কথা শেষ করতে পারলেন না মার্ক। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। ভাঙা কণ্ঠে মাটির দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, “আমরা হেরে গেছি। আমরা হেরে গেছি।”

অয়ন অস্ফুটে বলে উঠল, “বাবা! ”

১৯৮৫, ইসরো, ব্যাঙ্গালোর

মিটিং শেষ হতেই অমল দ্রুত পায়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল। ততক্ষণে প্রফেসর নারায়ণন সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করেছেন। তার পিছনে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে অমল বলল, “কিন্তু স্যার, আমার মনে হয় এই প্রকল্পটায় সময় দেওয়া উচিত। ভৌতবিজ্ঞানের নিয়ম ঠিক হলে আমরা এইভাবে অনেক তাড়াতাড়ি গভীর মহাকাশে পৌঁছতে পারি।”

তার কথা শুনে প্রফেসর নারায়ণন দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর অমলের দিকে তাকিয়ে তার মাথায় হাত রেখে বললেন, “অমল, আমি জানি তুমি কতদিন ধরে গবেষণা করছ এই বিষয়টার ওপরে। কিন্তু তোমাকে বাস্তববাদী হতে হবে। আমরা সরকারি অনুদানে কাজ করি। সেখানে এরকম একটা গবেষণায় আমাদের কখনই টাকাপয়সা দেওয়া হবে না যার কাগজ-কলমে কোনো প্রমাণ নেই।”

অমল উত্তেজিত হয়ে বলল, “কিন্তু স্যার, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ তো অবশ্যই আছে। আইনস্টাইনের গাণিতিক তত্ত্ব ঠিক হলে কৃষ্ণগহ্বর, ওয়ার্মহোল, সময়কে অতিক্রম করা...সবই সম্ভব। গতানুগতিক জ্বালানির রকেট বানিয়ে আমরা কোনদিনই মহাকাশের রহস্য ভেদ করতে পারব না। এখন এই গবেষণা শুরু না করলে আমাদের আরো কয়েক শতাব্দী লেগে যাবে সৌরজগতের সীমানা ছাড়িয়ে যেতে।”

“অমল, সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছে। নাসার তৈরি “ভয়েজার” তো সৌরজগত পেরিয়ে এগিয়ে যাবে আর কয়েক বছরে। চেষ্টা করলে আমরাও পারব।”

“স্যার, ভয়েজার অভিযানে প্রায় নশো মিলিয়ান ডলার খরচ হয়েছে। এত টাকা আমরা খরচ করার কথা ভাবতেও পারি না। আর সৌরজগতের গণ্ডি পেরোতে ভয়েজার এর প্রায় সাতাশ বছর আরো লাগবে। হাবল টেলিস্কোপে দেখা নক্ষত্রমন্ডল আর গ্ল্যালাক্সিগুলো প্রায় লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে। হাজার হাজার বছর লেগে যাবে যদি বা কোনদিন কোনো রকেট সেখানকার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়। মানুষ সশরীরে কোনদিনই আমাদের গ্যালাক্সির সীমানা ছাড়াতে পারবে না। অন্য রাস্তায় এগোতে হবে আমাদের স্যার, মানবসভ্যতার স্বার্থে।”

“তুমি অধৈর্য হচ্ছ। মহাকাশ বিজ্ঞান ছেলের হাতের মোয়া নয় এটা তোমার বোঝা দরকার। ধৈর্য রাখতে হবে। তোমার বয়স কম, তোমার কাছে অনেক সময় আছে। আমরা নিশ্চয়ই কোন একটা রাস্তা বের করে ফেলব।”

অমল মাথা নিচু করে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াল। তারপর বলল, “আমাদের হাতে সময়ই তো নেই স্যার। ‘প্রজেক্ট লংশট’ বলছে আদৌ কোনদিন যদি আমরা আমাদের সবচেয়ে কাছের গ্যালাক্সিতে পৌঁছতে পাওয়ার মতো রকেট আর ইন্ধন তৈরি করতে পারি, আমাদের সেখানে পৌঁছতে সময় লাগবে এক লক্ষ বছর। সেটা অর্থহীন চেষ্টা হবে স্যর। না। আমাদের কাছে তত সময় নেই।”

প্রফেসর নারায়ণন কোন উত্তর দিলেন না। অমলের কাঁধ চাপড়ে ম্লান হেসে হাঁটতে শুরু করলেন। অমল শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে রইল করিডরে।

ব্যাঙ্গালোরে এসে অমলের প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেছে। ইসরোর গবেষণা ডিভিশনে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই সে এস্ট্রোফিজিক্স নিয়ে কাজ করে এসেছে। মহাকাশের রহস্য ছোটোবেলা থেকেই তাকে টানে। কত ক্ষুদ্র আমাদের এই পৃথিবী! সৌরজগতের নটা গ্রহের একটা। আমাদের সূর্যের মতো আরো কুড়ি হাজার কোটি সূর্য আছে আমাদের আকাশগঙ্গা বা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে। আছে তাদের নিজস্ব গ্রহমন্ডল। এরকম আরো দশ হাজার কোটি গ্যালাক্সি আছে, হয়তো বা তারও বেশি। কোটি কোটি গ্রহ, উপগ্রহ, তারা, নক্ষত্রমন্ডল। মানুষ আর কতটুকু জানতে পেরেছে!

প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে মহাকাশচর্চা করেও মানুষ সবচেয়ে নিকটবর্তী গ্রহে পৌঁছতে পারেনি এখনো। সৌরজগতের বাইরের জগতের অনুসন্ধান তো চিন্তার বাইরের ব্যাপার। অমল ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছে যে মহাকাশ নিয়ে গবেষণার ব্যাপারে তারা অনেক পিছিয়ে আছে। অসম্ভব মেধাসম্পন্ন বৈজ্ঞানিক আর শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও অনেক গবেষণা আটকে যায় শুধুমাত্র আর্থিক সাহায্যের অভাবে। মহাকাশ স্টেশন তৈরি করা অথবা অন্যগ্রহে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন অনেক পরের কথা, পৃথিবীর কক্ষে উপগ্রহ পাঠানোর জন্যেই অনেক ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয় তাদের। অমল প্রায় বছরতিনেক আগে থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছে তার একটা গবেষণা প্রকল্পের অনুদানের জন্যে। কিন্তু প্রতিবারেই তাকে হতাশ হতে হয়। আস্তে আস্তে সে বেরিয়ে এল ক্যাম্পাসের বাইরে।

পার্কের কাছে এসে একটা বেঞ্চিতে এসে বসল অমল। ইসরোর ক্যাম্পাসটা সুন্দর। অনেক বাগান আর ফুলগাছ রয়েছে। পার্কের জমিতে নতুন ঘাস লাগানো হয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে রইল সে। সবুজের ছোঁয়া লেগে ধীরে ধীরে তার মনটা হালকা হয়ে গেল। অমল অনেকক্ষণ ধরে বসে রইল সেখানে। তারপর উঠে নিজের কোয়ার্টারের দিকে এগিয়ে গেল। নিজের ঘরে পৌঁছে দেরাজ খুলে নাসা থেকে পাঠানো নীল রঙের খামটা বের করল অমল। এবারে সে মনস্থির করে ফেলেছে।

২০২৬, হাথ্রন, ক্যালিফোর্নিয়া, স্পেসএক্স হেডকোয়ার্টার

ক্লাস থেকে বেরিয়ে নিজের অফিসে চলে এল অয়ন। খানিকক্ষণ দরজা বন্ধ করে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর দেরাজের দরজা খুলে বের করে আনল একটা কার্ডবোর্ডের বাক্স। আজকে ১৭ই নভেম্বর। ছাব্বিশ বছর হয়ে গেল। বাবার চিঠিগুলো হাতে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অয়ন।

সাত বছর আগে সর্সারার প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার পর আর বেশিদিন নাসাতে কাজ করতে পারেনি অয়ন। হিউস্টন ছেড়ে এখানে এসে স্পেসএক্স কোম্পানিতে শিক্ষক ও বৈজ্ঞানিক হিসেবে জয়েন করেছে সে। বাবা নাসাতে আসার আগে থেকেই সর্সারার প্রকল্পের গবেষণা শুরু করেছিলেন। ন্যানোটেকনোলজি আর পারমাণবিক বিদারণের শক্তি কে কাজে লাগিয়ে কী করে মহাকাশযান তৈরি করা যায়, যাতে মানুষ সৌরজগতের বাইরে অভিযান চালাতে পারে। মানুষের তৈরি কোনো রকেটের ইন্ধনে আগে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়নি। সৌরজগতের বাইরে গিয়ে অভিযান করতে গেলে যত জ্বালানি দরকার হয়, পৃথিবীতে তত জ্বালানিই নেই। যদি কোনোক্রমে সেই জ্বালানি তৈরিও করা যায়, হাজার হাজার বছর লেগে যাবে সৌরজগতের সীমানা ছাড়াতে। যারা মহাকাশযানের যাত্রী হয়ে অন্য জগতে অন্বেষণ করতে যাবে, তারা জীবিতকালে কোনোদিন ফিরে আসতে পারবে না এই পৃথিবীতে।

অয়নের বাবা গবেষণা করে সিদ্ধান্ত নেন যে ন্যানোটেকনোলজির মাধ্যমে যদি লেজার রশ্মিকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায় তাহলে রকেটের গতিবেগ অনেকটাই বেড়ে যাবে, কিন্তু সেই গতিবেগ এতটাই বেশি হবে যে মহাকাশ যাত্রীদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে, মহাকাশ বিকিরণে তাদের শরীরে সমস্যা তো হবেই, তাছাড়া রকেটের যন্ত্রপাতি খারাপ হয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়, তাই মাঝে মাঝে ন্যানোচিপযুক্ত লেজার ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়ে পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহার করে যানকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ।

প্রোটোটাইপ ঠিক মতন কাজ করলেও নাসার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার কয়েক বছর ধরে কথা কাটাকাটি চলেছে। এত বিপজ্জনক অভিযানে অভিযাত্রীদের প্রাণের ঝুঁকি তো আছেই, তার চেয়েও বড়ো ব্যাপার হলো এরকম অভিযানের জন্যে যে বিশাল অঙ্কের টাকা দরকার, সেজন্য সরকারকে রাজি করানো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নাসা তার কথা শুনেছিল। তখনই এরকম বড়ো পদক্ষেপ না নিলে সৌরজগতের বাইরের রহস্য যে মানুষের কাছে ধাঁধা হয়েই থাকবে, সে বিষয়ে সকলেই একমত হয়েছিল। কিন্তু কে ভেবেছিল সর্সারার অভিযানের এই পরিণতির কথা?

নাসার কাছ থেকে পাওয়া বাবার কাগজপত্রগুলো কোনদিন খুলেও দেখেনি সে। দেখার ইচ্ছেও হয়নি। বাবার সঙ্গে তার পরিচয় বলতে কয়েকটা পুরোনো ছবি আর ভিডিও। ২০০০ সালে যখন বাবা সর্সারার-এর দায়িত্ব নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন মহাকাশে, তখন তার হাতেখড়িও হয়নি। তারপর একে একে পেরিয়ে গেছে উনিশটা বছর। মায়ের কাছ থেকেই বাবার গবেষণা আর কাজের কথা শুনেছিল, একসময় নিজে থেকেই সে উৎসাহী হয়ে উঠেছিল মহাকাশ সম্পর্কে। তারপর পড়াশুনা, বৃত্তি পেয়ে মার্কিন রাষ্ট্রে গিয়ে উচ্চশিক্ষা, নাসাতে যোগ দেওয়া সব কিছুতেই বাবার অনুপস্থিতিটা একরকম সয়ে গিয়েছিল তার। খালি রাতে কোনো কোনো দিন আকাশের দিকে তাকিয়ে তার মনে হত, বাবা মহাকাশের কোন প্রান্তে সর্সারারকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নতুন কোনো পৃথিবীর উদ্দেশ্যে।

বাবার কাগজপত্রগুলো উল্টেপাল্টে দেখছিল সে। এমন সময় একটা নীল রঙের খাম তার হাত থেকে পড়ে গেল। সেটা তুলে অয়ন দেখল যে সেটা প্রায় তিরিশ বছর আগেকার চিঠি, বাবার নাম আর ব্যাঙ্গালোর ইসরোর ঠিকানা লেখা আছে খামের ওপরে, কিন্তু যে পাঠিয়েছে তার কোন ঠিকানা নেই। কৌতুহলবশত খামটা খুলে ভিতরের চিঠিটা বের করল সে। চিঠিটা পড়তে পড়তে অয়নের ভুঁরু কুঁচকে গেল, মাথা দপদপ করতে লাগল। চিঠি শেষ করে সে কিছুক্ষণ স্থাণু হয়ে বসে রইল, তারপর নেট থেকে একটা নম্বর বের করে মোবাইলে ডায়াল করল।

১৯৯৯, তিয়ানজিন, চায়না

টিপ টিপ করে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। ল্যাম্পপোস্টের আলো যেন উজ্জ্বলতা হারিয়েছে আজ। রাস্তাঘাটে মানুষজনের আনাগোনা কমে এসেছে গভীর রাতে। সিগারেটে একটা টান দিয়ে হাতের ঘড়ির দিকে তাকালেন প্রফেসর ওয়াং। বিরক্তিতে তার ভুঁরু কুঁচকে গেছে। অনেকক্ষণ ধরে নির্দিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা করছেন তিনি। কিন্তু এখনো কারো পাত্তা নেই।

সিগারেটে শেষ টান নিয়ে মাটিতে ফেলতেই একটা কালো গাড়ি রাস্তার মোড় থেকে এগিয়ে এল তাঁর দিকে। তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়তেই গাড়ির দরজা খুলে গেলে। ভিতর থেকে লেদার জ্যাকেট পরা একজন মানুষ তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “প্রফেসর, ভিতরে উঠে আসুন।”

প্রফেসর ওয়াং বাক্যব্যয় না করে গাড়িতে উঠে বসলেন। গাড়ি ছেড়ে দিল। তিনি বিরক্তির গলায় বললেন, “মিগুয়েল, আমি এখানে প্রায় দেড়ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছি। তোমাদের কথার দাম না থাকতে পারে, কিন্তু আমার কাছে এখন প্রত্যেকটা মুহূর্ত অমূল্য।”

মিগুয়েল বলে লোকটা মাঝবয়সী। লম্বা চুল মাথার পিছনে টেনে বাঁধা, গালে একটা কাটা দাগ আছে। সে শান্ত স্বরে উত্তর দিল, “প্রফেসর, সরকারের নজর বাঁচিয়ে কাজ করা সোজা নয়। আপনি কি মনে করছেন সিআইএ আপনার গতিবিধি লক্ষ করছে না? একটু অসাবধান হলেই আমাদের এত বছরের পরিশ্রম এক মুহূর্তে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।”

প্রফেসর ওয়াং চশমাটা খুলে কাঁচ মুছতে মুছতে বললেন, “আমি জানি মিগুয়েল। কিন্তু ঝুঁকি আমাদের নিতেই হবে। আর কয়েকদিনের ব্যাপার, ঝামেলাটা আমি প্রায় মিটিয়ে এনেছি। ছাড়ো ওই কথা, নন্দিনী তোমাকে কি খবর পাঠিয়েছে সেটি(SETI) থেকে?”

মিগুয়েল পকেট একটা পেজার বের করল। সেটা চালু করতে করতে বলল, “ক্রাইমিয়া আর টি ৭০ টেলিস্কোপ থেকে নিকটবর্তী নক্ষত্রমণ্ডলের উদ্দেশ্যে ‘কসমিক কল’ বলে যে বেতার সংকেত নন্দিনীরা পাঠিয়েছিল, তার কোনো উত্তর তারা পায়নি। কিন্তু কয়েক বছর আগে পাঠানো একটা ন্যারো ব্যান্ড সংকেতের খুব ক্ষীণ একটা উত্তর তারা পেয়েছে…”

“কোথা থেকে?” প্রফেসর ওয়াং উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করলেন।

“হাবল টেলিস্কোপে অদ্ভূত কয়েকটা ছবি তারা দেখতে পেয়েছিল বছর দশেক আগে। প্রায় আড়াই মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে। সেই দিকে লক্ষ্য করেই তারা একটা ন্যারো ব্যান্ড সংকেত পাঠিয়েছিল। আপনি তো জানেন, ন্যারো ব্যান্ডে তথ্য স্থানান্তর করা হয় খুব ধীরে। বেশ কয়েক বছর ধরে সংকেত পাঠিয়ে গেছে তারা। সেই বিন্দুতেই তারা একটা অদ্ভুত আলোক বিকিরণের নকশা দেখতে পাচ্ছে…”

প্রফেসর ওয়াং মিগুয়েলকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বলে উঠলেন, “কোন নকশা মিগুয়েল? আলফা সেন্টরির কাছ থেকে আমরা যা নকশা দেখতে পেয়েছিলাম বারদুয়েক...”

“হ্যাঁ প্রফেসর, সেই একই নকশা। আলোর জ্যামিতিক নকশাগুলো একই কিন্তু এখানে কালো বিন্দুগুলো আকারে অনেক বড়ো।”

মিগুয়েলের হাত থেকে নন্দিনীর পাঠানো ছবির কপিগুলো হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে প্রফেসর ওয়াং-এর চোখ মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। তিনি উত্তেজিত স্বরে বললেন, “এগুলো কী বুঝতে পেরেছ মিগুয়েল? এই দেখ, এই ছবিটা দশ বছর আগেকার। এগুলো সব পৃথক গ্যালাক্সি। আর এইবার এখনকার ছবিগুলো দেখো, এই দুটো গ্যালাক্সি এক হয়ে গেছে। দুটো গ্যালাক্সির সংযোগের আগের এই আলোর নকশাগুলো মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভস। কিন্তু দশ বছরে এই ঘটনা সম্ভব নয়। যদিও বা কোনো সুপারনোভা বিস্ফোরণের ফলে এরকম কিছু হয়, সেই ছবি আমরা দেখতে পাব কয়েক হাজার বছর পর। কিন্তু এখানে প্রায় লক্ষ লক্ষ বছরের দূরত্বে থাকা দুটো মহাকাশীয় ঘটনা দেখতে পাচ্ছি একই সঙ্গে আমরা। কিন্তু একটা জিনিস উভয় ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান, দুটো ছবিতেই এই কালো বিন্দুগুলো অবস্থিত।

মিগুয়েল হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে দেখে প্রফেসর ওয়াং অধৈর্য হয়ে বললেন, “তুমি বুঝতে পারছ না? কীসের টানে এই দুটো গ্যালাক্সি এক হয়ে গেল এত কম সময়ের ব্যবধানে? একটা গ্যালাক্সিতে লক্ষ কোটি তারা গ্রহ উপগ্রহ থাকে। দুটো গ্যালাক্সি এক হয়ে গেল কিন্তু একটা সংঘর্ষ হলো না কোনো তারা বা গ্রহের মধ্যে! কতটা শক্তিশালী আর সুনিয়ন্ত্রিত এই অভিকর্ষ তা বুঝতে পারছ? এ নিঃসন্দেহে ডার্ক এনার্জি মিগুয়েল। তুমি এখনো বুঝতে পারছ না ওই কালো বিন্দুগুলো কী?”

মিগুয়েল হতবাক হয়ে বলল, “কাল সেতু?”

প্রফেসর ওয়াং দু’হাতে তালি দিয়ে বললেন, “ইয়েস মিগুয়েল। কাল সেতু। টাইম ব্রিজ। অথবা প্রচলিত ভাষায় ওয়ার্মহোল। এই কালো বিন্দুগুলো ডার্ক এনার্জি দিয়ে তৈরি ওয়ার্মহোল। মহাকর্ষের জোরে দুটো পৃথক গ্যালাক্সিকে এই ওয়ার্মহোল নিজের মধ্যে টেনে এনে একটা নতুন গ্যালাক্সি রচনা করেছে। একটা ওয়ার্মহোল দিয়ে যদি পুরো একটা গ্যালাক্সি এক সময় থেকে অন্য সময়ে চলে যেতে পারে, তাহলে বুঝতে পারছ কতটা বড়ো সেই ওয়ার্মহোল?”

মিগুয়েল হাঁ হয়ে প্রফেসর ওয়াং এর দিকে তাকিয়ে ছিল। সে এবার কিন্তু কিন্তু করে প্রশ্ন করল, “কিন্তু প্রফেসর, ডার্ক এনার্জি আর ওয়ার্মহোল কি বাস্তবে সম্ভব? আমরা এত চেষ্টা করেও ‘ডার্ক ম্যাটার’ বা ‘ডার্ক এনার্জি’ তৈরি করতে পারিনি।”

“আমরা বাস্তবে পারিনি বলেই যে সম্ভব নয় তা তো নয় মিগুয়েল। কোনো আলো বা বিকিরণ নির্গত না করলেই সেটা ডার্ক ম্যাটার, হয়তো তারা এমন কোনো শক্তি নির্গত করে যা সম্পর্কে আমাদের ধারণা নেই। হয়তো কেন, আমার বিশ্বাস এরকম কোন শক্তিই বেঁধে রেখেছে সারা ব্রহ্মান্ডকে। ডার্ক এনার্জি মহাকর্ষকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে, আলোকে বিকৃত করতে পারে। মহাশূন্য দ্রুত সম্প্রসারণ হয়ে চলেছে, তার একমাত্র কারণ হতে পারে এই বিস্ময়কর শক্তি। আমাদের পরিচিত মাধ্যকর্ষণ তত্ত্ব দিয়ে যে এই ব্যাখ্যা সম্ভব নয় সে তো এতদিনে বোঝাই গেছে।”

প্রফেসর ওয়াংএর চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন, “অমল ঠিক বলেছিল মিগুয়েল। আলফা সেন্টরির কাছে এই নকশা দেখার প্রায় পাঁচ বছর পর আমরা আমাদের পাঠানো বেতার তরঙ্গের উত্তর পেয়েছিলাম। একবার, নয় বারবার। আমাদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করতে চাইছে, কিন্তু পৃথিবীতে বসে আমাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা কিছুতেই ওদের সঙ্গে কথা বলতে পারব না। আলোর গতিবেগে চললেও তাদের সংকেত পেতে আমাদের অনেক দেরি হয়ে যাবে। আমাদের এই সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।”

২০২৬, SETI হেডকোয়ার্টার, ক্যালিফোর্নিয়া

“অয়ন?”

অয়ন চমকে উঠে দেখল তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন এক মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা। সে উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়ে বলল, “হ্যাঁ। আমি অয়ন।”

তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ভদ্রমহিলা বললেন, “আমি নন্দিনী। এস।”

নন্দিনীর পিছনে হাঁটতে হাঁটতে অয়নের মনে নানা প্রশ্ন খেলা করছিল। গত দুদিনে এমন অনেক কথা সে জানতে পেরেছে যা সম্পর্কে তার আগে কোন ধারনাই ছিল না। SETI সম্পর্কে সে আগে জানত ঠিকই কিন্তু তার বাবার কাজের সঙ্গে ভিন্নগ্রহী গবেষণার যে কোন যোগাযোগ আছে, সেসম্পর্কে সে কিছু জানতে পারেনি কোনোদিন।

সিকিউরিটি পেরিয়ে একটা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে এসে বসলো তারা। নন্দিনী অয়নের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি নাসাতে সর্সারার প্রকল্পে ছিলে?”

অয়ন ঘাড় নাড়ল। নন্দিনী কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করলেন, “কোন টিমে?”

“জ্বালানি বিদারণ এবং তথ্য সিমুলেশন।”

নন্দিনী চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে প্রশ্ন করলেন, “তোমার ফোন পেয়ে আমি সত্যি অবাক হয়েছিলাম অয়ন। তুমি যে অমলের মতনই মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করছ, এটা কাকতালীয় নিশ্চয়ই নয়। জিনের একটা ব্যাপার থাকেই। কী জানতে চাও তুমি?”

অয়ন বলল, “আমি বাবার কাজ সম্পর্কে যতটা জানি, সেটা তার নাসার গবেষণা জড়িত। একটা বেসরকারী সংগঠনের সঙ্গে যে তার যোগাযোগ ছিল আমার কোনো ধারণা ছিল না। আর চিঠিতে লেখা যোগাযোগের নামটা তো আপনার। আপনি তো SETI তে কাজ করেন। এটা সরকারী সংগঠন বলেই জানি। আমার সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে…”

নন্দিনী ঠান্ডা গলায় বললেন, “আমি এখন আর এখানে কাজ করি না অয়ন, আমি স্বাধীনভাবে কয়েকটা প্রকল্পে এদের সাহায্য করি মাত্র। তোমার অনেক কিছুই জানার কথা নয়। আমি তোমাকে বলতামও না, যদি তুমি মহাকাশ বিজ্ঞানী না হয়ে শুধুমাত্র ওর ছেলে হতে। কিন্তু এই জগতের মানুষ বলেই হয়তো তোমার জানা দরকার। কিন্তু তোমাকে আমায় কথা দিতে হবে, তুমি কাউকেই এই কথা বলতে পারবে না।”

অয়ন মাথা নাড়ল। নন্দিনী বললেন, “নব্বই এর দশকে যখন আমি SETI-তে কাজ করতে শুরু করি, আমাদের অনেক কাজেই নাসার সাহায্য নিতে হত। অনেক সময় আমরা নাসার জনসন মহাকাশ সেন্টার থেকেই কাজ করতাম। বহু লোকের সঙ্গেই আমাদের চেনাজানা ছিল। প্রফেসর ওয়াং বলে একজন আমার মেন্টরই হয়ে উঠেছিলেন সেই সময়। তখন হাবল টেলিস্কোপে নতুন নতুন গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথের ছবি উঠছে রোজ। নানান দৈর্ঘ্যের ন্যারো ব্যান্ড সংকেত পাঠিয়ে দেখা হত যদি কোনদিন কোনো সংকেতের উত্তর আসে।

এমন সময় নাসাতে সর্সারার নামে একটা প্রকল্প আরম্ভ করা হল ১৯৯২ সালে। লক্ষ্য, মানুষকে সৌরজগতের বাইরে পাঠানো। প্রফেসর ওয়াং সেই প্রকল্পের প্রধান বৈজ্ঞানিক ছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই তাঁর সঙ্গে মতের পার্থক্য শুরু হয় নাসার ম্যানেজমেন্টের।”

“কেন?” অয়ন প্রশ্ন করল।

“সেটা বলা কঠিন। তিনি ন্যানোটেকনোলজি নিয়ে কাজ করছিলেন। প্রফেসর ওয়াং নাসা ম্যানেজমেন্টকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ন্যানোটেকনোলোজি চালিত বেশ কয়েক হাজার ছোটো পরীক্ষামূলক যান বা ‘ন্যানো প্রোব’ বানিয়ে রওনা করে দিতে। তার সঙ্গে পুরোদস্তুর ভাবে কাজ করা হোক ‘ওয়ার্প ড্রাইভ’ নিয়ে, যাতে মানুষ আলোর গতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। তিনি আগেই বেশ কয়েকটা অভিনব পরীক্ষামূলক মডেল তৈরি করেছেন। তিনি যুক্তি দিলেন যে এত ধীর গতিতে গবেষণা আর রকেট লঞ্চ চলতে থাকলে মানুষ কোনদিনই পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সন্ধান খুঁজে পাবে না। একটা প্রকল্পে কোটি কোটি ডলার খরচ হওয়ার প্রধান কারণ নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে না চাওয়া। অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্যেই সময় আর পয়সা যত যাচ্ছে, তত কাজ হচ্ছে না। তার সঙ্গে নাসার ঠোকাঠুকি ক্রমেই বাড়তে লাগল। শেষ পর্যন্ত তিনি সেখান থেকে ইস্তফা দিয়ে দেন। সর্সারার প্রকল্পের সঙ্গেও তার কোন সম্পর্ক

থাকে না।”

“তারপর?”

“প্রফেসর ওয়াং পৃথিবীর নানা বৈজ্ঞানিককে নিয়ে একটা বেসরকারী মহাকাশ গবেষণা সংগঠন আরম্ভ করেন। ভালো ভালো বৈজ্ঞানিক, মেধাবী ছাত্রদের নিয়ে শুরু করেন গবেষণা। পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা মহাকাশ সংস্থা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করে। কিন্তু আদতে তিনি বৈজ্ঞানিক। তাঁর মাথায় তখন ঘুরছে কী করে সৌরজগতের বাইরে গিয়ে প্রাণের সন্ধান করা যায়। কয়েকবছর পরেই তিনি আড়ালে চলে গিয়ে কয়েকজন সহকারীকে নিয়ে গোপনে একটা গবেষণা শুরু করেন।”

“কী গবেষণা?”

“সেটা আমিও ঠিক জানি না, তবে আমার মনে হয় তিনি অত্যাধুনিক ওয়ার্প যান পাঠিয়ে গভীর মহাকাশে অনুসন্ধান করতে চাইছিলেন এলিয়েন ইন্টেলিজেন্স বা ভিন্নগ্রহীদের সঙ্গে।”

অয়ন ভুঁরু কুঁচকে বলল, “ভিন্নগ্রহী? আপনার এরকম মনে হয় কেন?”

“কারণ তিনি নাসা আর SETI থেকে মহাকাশে পাঠানো বেতার সংকেত অভিগ্রহণ করতে চেষ্টা করছিলেন। উপগ্রহের নেটওয়ার্ক হ্যাক করে নিতে পারলে সেটা কোনো ব্যাপারই নয়। কিন্তু ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যায়। তার সঙ্গে সবরকম সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলে বেশিরভাগ সরকারি সংগঠন।

রটে যায় প্রফেসর ওয়াং রাশিয়ার সঙ্গে চক্রান্ত করে মারাত্মক কোন অস্ত্র বানানোর পরিকল্পনা করছেন, যাতে পৃথিবীর যাবতীয় তথ্যপ্রণালী মুহুর্তে হ্যাক করে ফেলা যাবে। সামরিক নিরাপত্তার খাতিরে তাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করার আদেশ দেয় মার্কিন সরকার। প্রফেসর ওয়াং এর খোঁজ শুরু করে সিআইএ আর এফবিআই এর লোকেরা, কিন্তু তিনি ততদিনে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন।”

“কিন্তু আপনার সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল?”

নন্দিনী মৃদু হেসে বলেন, “হ্যাঁ। কাজটা যদিও বিপজ্জনক ছিল। আমি প্রফেসরকে ভালো করেই চিনতাম। আমার বিশ্বাস ছিল তিনি লুকিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন মানুষের ভবিষ্যতের খাতিরে। মহাকাশ থেকে পাঠানো বিশেষ কোনো সংকেত বা ছবি পেলে আমি তাকে জানাতাম। এমন সময় তিনি আমাকে বলেন অমলের কথা। তার সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করতে চান। আমিই অমলের সঙ্গে তার যোগাযোগ করিয়ে দিই।”

“তখন তো বাবা নাসায় কাজ করছে।”

“না, নাসার কাছ থেকে চাকরির প্রস্তাব পাওয়া সত্ত্বেও সে মনস্থির করে উঠতে পারেনি। তখন সে কাজ করছে ইসরোতে। অমলও তখন ন্যানোটেকনোলজি আর নিউক্লীয় বিদারণ আর প্রসারণ নিয়ে কাজ করছে, কিন্তু কোথাও না কোথাও অমল মনে মনে জানত যে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে যে বিশাল অর্থের প্রযোজন পড়বে তাতে একটা অভিযান সফল না হলে এই প্রযুক্তির ভবিষ্যত নিয়ে বিশাল একটা প্রশ্নচিহ্ন লেগে যাবে। মহাকাশের রহস্য আমরা কোনদিনই জানতে পারব না। আর একটা উপায় আছে, কিন্তু বাস্তবে সেটা সম্ভব কি না, সেটা কেউই হাতে কলমে করে দেখাতে পারেনি।”

“কোন উপায়ের কথা বলছেন?”

“কাল সেতু। তুমি নিশ্চয়ই দেশকাল আর আইনস্টাইন রোসেন সেতু সম্পর্কে জানো!”

অয়ন মাথা নাড়ল। কোয়ান্টাম ফিজিক্সে দেশকাল বা স্পেসটাইম একটা গোড়ার ধারনা, কিন্তু অনেকেই সেটা বুঝতে পারে না। খুব সহজ করে বলতে গেলে আমরা মহাকাশ বলতে কোন অবস্থানের বিন্দুকেই বুঝি, কিন্তু যেকোন দূরত্ব অতিক্রম করতে গেলেই একটা সময় লাগে। সেটা হেঁটে গেলে একরকম, গাড়িতে করে গেলে একরকম। আমাদের যদি কোনো দূরত্ব কোনোদিন অতিক্রম করতেই না হয়, সময়ের কোন দরকারও পড়বে না। কিন্তু যদি আমরা একটা জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে চাই, আমাদের সময়কেও অতিক্রম করতে হয় অবস্থানের সঙ্গে। পৃথিবী আসলে এতটাই ছোটো যে দূরত্বকে আমরা আমাদের নিজেদের মতো ঘড়ির সময় দিয়ে মেপে দিয়েছি। কিন্তু মহাকাশে যে কোনো দুটো বিন্দু এতটাই দূরত্ব থাকে যে প্রতিটা বিন্দুর সঙ্গে একটা সময় জড়িয়ে থাকে। হয়তো মহাকাশে পৃথিবী আর অন্য কোনো গ্যালাক্সির গ্রহ কোটি কোটি বছরের সময়ের অন্তরালে আছে। সময় এখানে পুরোটাই আপেক্ষিক। সে চোখ ছোটো করে নন্দিনীকে বলল, “আপনি কি ওয়ার্মহোলের কথা বলছেন?”

নন্দিনী বললেন, “ঠিক বলেছ। যদি দেশকালের মধ্যে একটা সুড়ঙ্গ তৈরি করা যায় হয়তো আমরা অনেক কম সময়ে গভীর মহাকাশে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যেতে পারি। অমলের বিশ্বাস ছিল সে সত্যিকারের একটা ওয়ার্মহোল তৈরি করতে পারবে সময় পেলে। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য, সেই গবেষণা করার জন্যে কোনো রকম সাহায্যই সে পায়নি।”

অয়ন চুপ করে শুনছিল। সে বলল, “তারপর?”

“প্রফেসর ওয়াং অমলের কাজের সম্পর্কে জানতেন। একটা বিশেষ উদ্দেশ্যে তিনি অমলের সঙ্গে দেখা করেন। দুজনে একে অপরের সঙ্গে কথা বলেই বুঝতে পারে যে তারা একই স্বপ্নের পিছনে দৌড়চ্ছে। এর পরেই অমল ইসরো ছেড়ে নাসায় কাজ করতে শুরু করে, কিন্তু আসলে তারা দুজনেই কয়েকটা গোপন গবেষণার অংশীদার ছিল বলে আমার বিশ্বাস।

“কিন্তু বাবা নাসায় কাজ করার সময় অন্য কোনো গবেষণা চালাবে কী করে? সর্সারার অভিযানের মতো দায়িত্বপূর্ণ কাজে সেটা কি সম্ভব?” অয়ন অবিশ্বাসের কন্ঠে বলল।

নন্দিনী তার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, “বাকিটা তুমি প্রফেসর ওয়াং এর কাছেই শুনো। তোমাকে ওঁর ঠিকানা দিচ্ছি, উনি হয়তো তোমার জন্যেই অপেক্ষা করে আছেন অনেক বছর ধরে।”

অয়ন হতভম্বের মতো তার দিকে তাকিয়ে রইল।

২০০০, প্রিন্সেপ ঘাট, কলকাতা, ভারতবর্ষ

বিকেলের পড়ন্ত আলোতে অপলক দৃষ্টিতে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে ছিল অমল। দিনের শেষ পাখির ঝাঁক ঘরে ফেরার পথে। অনেক, অনেক বছর পর এই শহরে এসেছে সে। হয়তো বা শেষবারের জন্যে।

পিছনে একটা শব্দ হতেই অমল পিছনে ফিরল। প্রফেসর ওয়াং নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে একটা হাসি টেনে এনে অমল বলল, “কেউ ফলো করেনি তো?”

প্রফেসর হেসে মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, “ছেলেকে দেখলে? কত বয়স হল?”

অমল চোখ থেকে চশমাটা নামিয়ে রেখে বলল, “তিন।”

“অমল, তুমি নিশ্চিত এছাড়া আর কোনো উপায় নেই? যদি আমরা ব্যর্থ হই, সব শেষ হয়ে যাবে। আমাদের সারাজীবনের গবেষণা, তোমার আত্মত্যাগ, কোনো কিছুর মূল্য থাকবে না।”

“আর কোনো উপায় নেই প্রফেসর। একমাস পরে লঞ্চ। নাসার কথামতো আমার কাছে মাত্র পাঁচ বছর সময় আছে রজগতের সীমানা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর। যদি আদৌ সবকিছু ঠিকঠাক ভাবে হয়, সর্সারার ফিরে আসতে পঁয়তাল্লিশ বছরেরও বেশি লেগে যাবে পৃথিবীর সময়ের হিসেবে। আমাদের অভিজ্ঞতার কথা হয়তো মানুষকে খানিকটা উদ্বুদ্ধ করবে কিন্তু বাস্তবে মহাকাশচর্চায় মানুষ যেখানে ছিল সেখানেই থেকে যাবে।”

“কিন্তু অমল, আলোর চেয়ে বেশি গতির কথা ‘ওয়ার্প ড্রাইভে’ আছে। ধরো কয়েক বছরের মধ্যে আমরা জেনে ফেললাম সেই রহস্য...”

অমল প্রফেসর ওয়াং এর কাঁধে হাত রেখে বলল, “প্রফেসর আপনি তো জানেন, ওয়ার্প ড্রাইভ বানানোর জন্যে দেশকালকে বাঁকাতে হয়। আসলে আলোর কোনো গতি নেই, কোনো এক অদৃশ্য শক্তি বাস্তবে সারা মহাকাশের দেশকালকে পরিচালনা করছে। অনন্ত গতিতে বয়ে চলেছে এই মহাবিশ্ব। অনেকটা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো বয়ে চলেছে অনন্ত সময়, ওয়ার্প ড্রাইভ তাকে পরিচালনা করে এগিয়ে যাওয়ার একটা পথ। কিন্তু সেটা জানতে হলে আমাদের ‘নেগেটিভ এনার্জি’ তৈরি করতে হবে। হয়তো সম্ভব, কিন্তু আমাদের হাতে যে সময় নেই প্রফেসর! ”

“অমল, এটা তুমি কোরো না। তোমার পরিবার আছে। ছেলে আছে। মিগুয়েলকে এই দায়িত্বটা নিতে দাও। সে একা। সে পারবে।”

অমল আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “মিগুয়েল যে দায়িত্বটা নিয়েছে সেটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয় প্রফেসর। ভুলে যাবেন না, সে একসঙ্গে বায়োকেমিস্ট এবং নিউরোবায়োলজিস্ট। তার ভরসাতেই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি। এটা রিলে রেস প্রফেসর, সকলকে নিজের কাজটা ঠিক করে করতে হবে। অনেকটা পথ এখনো বাকি আছে আমাদের সামনে।”

প্রফেসর ওয়াং ইতস্তত করে বললেন, “কিন্তু অমল…”

অমল তাঁকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে জড়িয়ে ধরল। তারপর গঙ্গার জলস্রোতের দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখা হবে...”

২০২৭, বার্সেলোনা অটোনমা ইউনিভার্সিটি, স্পেন

“তুমিই অয়ন?” অয়ন চমকে উঠে দেখল তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে লম্বা বয়স্ক একজন মানুষ। মাথার চুল পিছনে পনিটেল করে বাঁধা, গালে একটা কাটা দাগ। অয়ন মাথা নাড়তেই লোকটা তার হাত ধরে বলল, “আমি প্রফেসর মিগুয়েল। তোমাকে দেখছি একেবারেই তোমার বাবার মতো দেখতে। এস, প্রফেসর ওয়াং তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।”

বার্সেলোনা অটোনমা ইউনিভার্সিটিতে যে এতবড়ো গবেষণার পরিকাঠামো আছে অয়নের সে সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। সে গ্র্যাজুয়েশন অবধি ভারতে পড়াশুনা করেছে। সেও অনেক বছর হয়ে গেল। আজকাল বেশিরভাগ ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরণের গবেষণা করার ব্যবস্থা থাকে। পৃথিবীর নানান সংগঠনের সঙ্গে চুক্তি করা থাকে বলে গবেষণার পাশাপাশি ছাত্ররা অর্থ উপার্জন করতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকেই।

প্রফেসর ওয়াং যে তার পুরো গবেষণা ইউনিটকে বার্সেলোনাতে নিয়ে এসেছেন, সেই সম্পর্কে নন্দিনী তাকে জানিয়েছিল। পুরোনো ঝামেলা কাটিয়ে উঠে তার সংগঠন আজকাল নানান দেশের মহাকাশ সংস্থাদের সঙ্গে একজোট হয়ে গবেষণা করছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে। তার কথা মতো প্রফেসর মিগুয়েলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল সে। কিছুদিন পরেই এখানে আসার নিমন্ত্রণ পায় সে।

একটা লম্বা প্যাসেজ পার হয়ে, ভৌতবিজ্ঞান ডিপার্টমেন্টের ঝাঁ চকচকে ভবনের পাশ দিয়ে তারা চলে এল বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে। সামনের ঘরে তার জন্যে দাঁড়িয়েছিলেন প্রফেসর ওয়াং। বয়সের দরুন তাঁর চেহারা একটু খারাপ হয়ে গেলেও হাসিটা একইরকম আছে। তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে প্রফেসর ওয়াং আর্দ্রকন্ঠে বললেন,

“ওয়েলকম মাই সন, ওয়েলকম।”

প্রফেসর ওয়াং আর মিগুয়েলের সঙ্গে মিনিট দশেক কথা বলেই অয়নের প্রাথমিক দ্বিধাভাবটা চলে গেল। অয়ন বুঝতে পারল, তাকে দেখে নিজের অজান্তেই বাবার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে এঁদের। প্রফেসর ওয়াং তো কয়েকবার তাকে ভুল করে “অমল” বলে ডেকেই ফেললেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর প্রফেসর ওয়াং অয়নকে বললেন, “তোমার বাবার কাজের সম্পর্কে তুমি কী জানো অয়ন?”

অয়ন দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি নন্দিনীর কাছে শুধু এইটুকুই জেনেছি যে বাবা আপনাদের সঙ্গে একটা গোপন গবেষণায় জড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু এর চেয়ে বেশি আমি আর কিছুই জানি না।”

প্রফেসর ওয়াং চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর শূন্যে দৃষ্টি রেখে বললেন, “ইউ ডিজার্ভ টু নো এভরিথিং অয়ন। তোমার বাবা যা স্বপ্ন দেখেছিল, সেই স্বপ্নের জন্যে যে কতটা ত্যাগ স্বীকার করেছে, সেই কথা আমরা কয়েকজন ছাড়া কেউই জানে না। জানানোর উপায়ও ছিল না।”

অয়ন কোন কথা না বলে তাঁর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। নিজেকে সংযত রাখলেও তার মনে তোলপাড় চলছে। একগাদা প্রশ্ন ভিড় করে আছে সেখানে। বাবার জগৎ সম্পর্কে যে সে প্রায় কিছুই জানত না, সেই বোধটা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে কয়েক মাস ধরে।

প্রফেসর ওয়াং তার চোখে চোখ রেখে বললেন, “তুমি জানো সর্সারার প্রজেক্টের উদ্দেশ্য কী ছিল?”

“আন্তর্নক্ষত্র অঞ্চলে মানুষকে পাঠিয়ে গভীর মহাকাশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। সৌরজগতের বাইরে ভয়েজার বা হরাইজনের মতন যান গেছে ঠিকই কিন্তু মানুষ নিজে এর আগে এই সীমানা ছাড়ায়নি। সর্সারার প্রকল্পের মাধ্যমে নাসা চেষ্টা করেছিল যাতে অন্তত কয়েকজন মানুষ সেই কাজ করতে পারে।”

“কিন্তু তারপর? কতদিন তাদের থাকার কথা ছিল গভীর মহাকাশে?”

অয়ন বলল, “সেটা আমি ঠিক জানি না। আমাদের জানানো হয়েছিল সেখানে একটা নির্ধারিত সময় কাটানোর পর সর্সারার এর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে ফিরে আসতে বলা হবে।”

প্রফেসর ওয়াং বললেন, “পাঁচ বছর অয়ন। পাঁচ বছর সময় ছিল অমলের কাছে। তুমি হয়তো জানো না, এই অভিযান সৌরজগতের বাইরে মানুষকে পাঠানোর উদ্দেশ্যে ছিল না, অমলের তৈরি করা ন্যানোটেক রকেট আর পারমাণবিক প্রসারণ প্রযুক্তি সেখানে ঠিক করে কাজ করছে কি না, সেটা যাচাই করাই আসল উদ্দেশ্য ছিল তাদের।”

অয়ন মাথা নেড়ে বলল, “না না! তা হতে পারে না। তাহলে তো আগেই সেই পরীক্ষা করা যেত মহাকাশে রকেট পাঠিয়ে….”

“না, অয়ন। যেত না। তুমি নিজে পারমাণবিক জ্বালানি নিয়ে কাজ করেছ, তুমি জানো কতটা সময় আর অর্থ ব্যয় হয় এরকম একটা অত্যাধুনিক নিউক্লীয় ইঞ্জিন তৈরি করতে। কেমিকাল রাসায়নিক ইন্ধনের রকেটে সেটা সম্ভব। যতটা অর্থ ব্যয় করে সর্সারার তৈরি করা হয়েছিল, একবার ব্যর্থ হলে এই প্রযুক্তি চিরকালের মতো বর্জন করতে হত। আমিই অমলকে নাসাতে বৈজ্ঞানিক হয়ে যোগ দিতে বলেছিলাম। আমি একসময় নিজে এই নিয়ে অনেক কাজ করেছি সেখানে, কিন্তু অমল আমার গবেষণাকে যেভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছে সেটা আমি নিজে কোনদিনই পারতাম না। সে ন্যানোটেকনোলজির সঙ্গে পারমাণবিক জ্বালানির যেভাবে সংযোগ ঘটিয়েছে, আমার মনে হয় আজও কেউ সেটা পারবে না। অমল নিজে এই প্রযুক্তির আবিষ্কর্তা বলেই তাকে সর্সারার এ রাখতে বাধ্য হয়েছিল সকলে, যাতে ইঞ্জিনে কোনো ত্রুটি হলে সেটা সে মেরামত করতে পারে।”

“কিন্তু…”

“অমলের পরিকল্পনামাফিক সৌরজগতের গণ্ডির ভিতরে সে আশি শতাংশ ন্যানো লেজার ব্যবহার করে রকেট চালাবে, নিউক্লীয় জ্বালানি ব্যবহার করবে সৌরজগত থেকে বেরোবার পর। পারমাণবিক ইন্ধনের বিদারণে যতটা গতিবেগ অর্জন করা যাবে, তাতে অনেক বেশি দূরত্ব অতিক্রম করবে তারা। কিন্তু পৃথিবীর সময়ের নিয়মমাফিক যদি সে পাঁচ বছর সেই গতিতে মহাকাশে থাকত, সেই সময়ে আসলে পৃথিবীতে কয়েকশো বছর কেটে যেত, হয়তো তারও বেশি।”

অয়ন মুহ্যমান হয়ে বসে রইল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, “টাইম ডিলেশান! …কিন্তু তাহলে এরকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ কী? পাঁচজন অভিযাত্রীর জীবন….”

প্রফেসর ওয়াং নিস্তব্ধতা ভেদ করে বললেন, “পাঁচজন নয় অয়ন। একজন। শুধু অমল। কেউ যায়নি তার সঙ্গে। যারা এই অভিযানের কথা জানত তারা সকলেই বুঝেছিল যে অমল কোনদিনই ফিরবে না। সে নিজেও এই কথা জানত। তার কথাতেই এই মিথ্যে রটানো হয়েছিল, কয়েকজন নকল অভিযাত্রীর পরিলেখ তৈরি করে, তাদের আওয়াজ রেকর্ড করে সকলকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে অমল একা নেই, তার সঙ্গে আরো চারজন আছে। অমল স্বেচ্ছায় মহাকাশে চিরনির্বাসন নিয়েছিল।”

অয়নের চোখ থেকে কখন যেন জল গড়াতে শুরু করেছে। সে জামার আস্তিনে চোখ মুছে ধরা গলায় বলল, “বাবা …বাবা জানত? সব জানা সত্ত্বেও….”

“হ্যাঁ অয়ন। সব জেনেই সে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তার বাড়ি, আত্মীয়, ছেলে সবাইকে ছেড়ে অনন্তে পাড়ি দিয়েছিল অজানার রহস্য জানতে।”

অয়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “কিন্তু কী লাভ হল এতে ডক্টর? অনিবার্য মৃত্যর পথে এগিয়ে গিয়েও সর্সারার চিরকালের মতো হারিয়ে গেল মহাকাশে। বিস্ফোরণের পর আমরা বহু চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি…”

প্রফেসর ওয়াং অয়নের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “সর্সারারে কোনরকম বিস্ফোরণ হয়নি অয়ন। অমল ইচ্ছে করেই পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।”

“কী বলছেন আপনি? বাবা এমন কেন করবে?” অয়ন উত্তেজিত হয়ে বলল।

“কারণ এই পরিকল্পনা আমরা সকলে একসঙ্গেই করেছিলাম। নাসার সাহায্য না নিলে এই অভিযান আমরা কোনদিনই করতে পারতাম না। অথচ তাদের কথামতো চলতে হলে আমাদের উদ্দেশ্য সফল হত না।”

“কী উদ্দেশ্য?”

প্রফেসর ওয়াং একটা চেয়ার টেনে বসলেন। তারপর বললেন, “তুমি ভিন্নগ্রহী বা এলিয়েন ইন্টেলিজেন্স সম্পর্কে কী জানো অয়ন?”

“তেমন কিছুই নয়, এইটুকুই জানি যে এত বছর ধরে মহাকাশে নানান কম্পাঙ্কের বেতার তরঙ্গ পাঠিয়েও আমরা সেরকম কোনো উত্তর পাইনি। যতদুর মনে হয় “ফার্মি প্যারাডক্স” ঠিকই বলেছিল। হাজার হাজার কোটি গ্যালাক্সিতে যদি একাংশেও প্রাণের সঞ্চার হয়ে থাকে, আর তাদের মধ্যে অন্তত কয়েকজন প্রজাতিও প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকে আমাদের চেয়ে তাহলে কোনো না কোনো ভাবে তারা আমাদের সঙ্গে দেখা করত, নাহয় তাদের যান দেখতে পাওয়া যেত মহাকাশে। হাবল টেলিস্কোপের মাধ্যমে এখন লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দুরের ছবিও পাওয়া যায়। যতদুর মনে হয় পৃথিবী ছাড়া ব্রহ্মাণ্ডে আর কোথাও প্রাণীজগত নেই।”

অনেকক্ষণ পর প্রফেসর ওয়াং-এর মুখে হাসি দেখতে পেল অয়ন। তিনি বললেন, “কিন্তু অয়ন, তুমি এরকম ভাবছ কেন যে আমরা বিজ্ঞানকে যেভাবে দেখি, ভিনগ্রহীরাও সেইভাবেই দেখবে, বেতার তরঙ্গ আর সংখ্যার সাহায্যে আমাদের সংকেত পাঠাবে, আমাদের মতো মহাকাশযানে করেই মহাকাশচারণ করবে! হয়তো তাদের শরীর, তাদের প্রযুক্তি একেবারে অন্যরকম, যা সম্পর্কে আমাদের কোন ধারনাই নেই! হয়তো তাদের শরীরের উপাদান, তাদের ব্যবহৃত শক্তি আমাদের জ্ঞানের পরিধির বাইরে! আর সেইজন্যেই হয়তো তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ তৈরি হয়নি।”

অয়ন এবার অস্ফুটে বলে উঠল, “আপনি ডার্ক এনার্জির কথা বলছেন? আপনি বলছেন পৃথিবীর বাইরের জীবরা ডার্ক ম্যাটার দিয়ে তৈরি? কিন্তু …বাস্তবে সেটা কী করে সম্ভব প্রফেসর?”

প্রফেসর ওয়াং এইবার উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, “এইখানেই তো আমরা মাত খেয়েছি অয়ন। এত বছর ধরে মহাকাশ গবেষণা করলেও মানুষের বিশ্বাস করতে আত্মসম্মানে লাগে যে যতটা আমরা জানি, তার চেয়ে অনেক বেশি জিনিস জানি না। যতটা আমরা জানতে পেরেছি, সেই দৃশ্যমান ব্রহ্মাণ্ডের ব্যাসই হল বিরানব্বই বিলিয়ান আলোকবর্ষ। তার বাইরে তো আমরা কল্পনাও করতে পারি না। সকলেই জানে অয়ন যে মহাকাশের সীমানা আরো ছড়াচ্ছে। কোন একটা অদৃশ্য শক্তি চালিত করছে কোটি কোটি গ্যালাক্সি, গ্রহ, সূর্য, উপগ্রহকে… প্রতি মুহুর্তে কোথাও একটা সৌরজগত তৈরি হচ্ছে, কোথাও হয়তো বা মহাবিস্ফোরণ হয়ে তৈরি হচ্ছে অন্য ব্রহ্মান্ড। এই সবই ডার্ক এনার্জির জোরে। ‘ডার্ক ম্যাটার’ আমাদের চেনা কোনো চেহারার শক্তি বিকিরণ করে না। একমাত্র মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে ডার্ক এনার্জির একটা যোগাযোগ আছে। আর তার ফলে তারা আলোকে চালনা করতে পারে।”

অয়ন ঘামতে শুরু করেছে। সে বলল, “আমার সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে প্রফেসর। আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না….”

প্রফেসর ওয়াং মিগুয়েলের দিকে তাকালেন। সে এবার বলল, “তোমাকে খুব সংক্ষেপে ব্যাপারটা বলছি অয়ন। আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রমণ্ডল প্রক্সিমা সেন্টরিতে তিনটে সূর্য আছে। আলফা সেন্টরি বি সূর্যের সৌরজগতে কোন গ্রহ না থাকলেও সেখান থেকে আমরা অনেকদিন ধরে একটা আলোর নকশা লক্ষ করছিলাম। আমাদের দিক থেকে বেতার সঙ্কেত পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গেই সেই আলোর নকশা দেখতে পাওয়া যায়। প্রায় তিরিশ বছর ধরে এই একই ঘটনা লক্ষ করেছি আমরা। এই একই নকশা দেখতে পেয়েছি আমরা মহাকাশের অন্যান্য জায়গা থেকেও। প্রফেসর ওয়াং এর ধারণা এই নকশাগুলো আসলে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। কোনো একটা বিশেষ ডার্ক এনার্জি আলোকে আকর্ষিত করে এই নকশা তৈরি করে আমাদের কিছু জানাতে চাইছে।

“প্রক্সিমা সেন্টরিতে মানুষের সশরীরে পৌঁছনোর কোনো সম্ভাবনাই ছিল না তিরিশ বছর আগে। এখনো নেই। এই রহস্যের সমাধানের জন্যে দরকার দিনের পর দিন এই এনার্জি ফর্মের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাওয়ার। কিন্তু তাহলে প্রক্সিমা সেন্টরিতে একটা যান পাঠাতে হয়। সেটা অবাস্তব। নাসা কিংবা অন্য কোনো দেশের কোনো মহাকাশ দফতর এ-রকম কোনো অভিযানে সায় দেবে না।

কিন্তু অমল ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিল। সে আমাদের প্রস্তাব দেয় যে সে একাই সর্সারার নিয়ে এগিয়ে যাবে প্রক্সিমা সেন্টরিতে আর সেখানে থেকে সংকেত পাঠিয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে সেই এনার্জি ফর্মের সঙ্গে, সে তারা এলিয়েনই হোক বা অন্য কিছুই হোক! কিন্তু নাসার সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে এই কাজ করা অসম্ভব। অতএব এই অভিযান সেই অর্থে আইন মেনে করা হবে না। অমল তখন সিদ্ধান্ত নেয়, সৌরজগতের সীমানা ছাড়িয়ে গেলেই সে পৃথিবীর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবে। আমরা তাকে অনেক বুঝিয়েছিলাম এই পাগলামি না করতে। কিন্তু ছেলেটা কারো কথাই শোনেনি। তার মতে এটাই একমাত্র পথ।”

“তারপর?”

এবারে প্রফেসর ওয়াং বললেন, “কিন্তু তাতেও আমাদের উদ্দেশ্য সফল হত না। অমল যদি সেখানে গিয়ে ডার্ক এনার্জির রহস্য জানতেও পারে, আমরা সেই তথ্য কোনোদিন জানতে পারব না। অমল যদি বা কোনোদিন ফিরে আসে, ততদিনে পৃথিবীতে কেটে যাবে অনেক বছর। সেই জন্যে আমরা একটা নিউক্রোবায়োলজিকাল এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে কাজ করতে আরম্ভ করি। মিগুয়েল এটা আবিষ্কার করার জন্যে প্রায় চল্লিশ বছর ধরে কাজ করেছে। তুমিই ব্যাপারটা বল, মিগুয়েল।”

মিগুয়েল বলল, “আমি খুব সহজে তোমাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিচ্ছি। মহাকাশে হাজার হাজার বছর ধরে আলোর কাছাকাছি গতিতে যদি কেউ ছোটে, তাহলে তার নিজের বয়স হয়তো একশও হবে না। এই ধর গিলেস-৮৭৬, আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র যার নিজের একটা গ্রহমন্ডল আছে আমাদের সৌরজগতের মতো, তার দূরত্ব ১৫ আলোকবর্ষ। কোন অভিযাত্রী যদি সেখানে যেতে চায়, জীবিত অবস্থায় সে কোনদিন পৃথিবীতে ফিরতে পারবে না। সেই প্রযুক্তি আমরা এখন তৈরি করতে পারিনি। কিন্তু ধর তার প্রত্যেকটা অভিজ্ঞতা ধরে রাখা থাকে একটা কম্পিউটারে, তাহলে পাঁচশ বছর পর ফিরলেও সেটা আগামী প্রজন্মকে গবেষণার একটা রাস্তা দেখাবে। অনেক চেষ্টা করে আমরা একটা উপায় বের করেছি। তুমি নিশ্চয়ই ক্রায়জেনিক স্লিপ-এর কথা জানো?”

‘ক্রায়জেনিক স্লিপ’ অথবা ‘হাইপার স্লিপ’ সম্পর্কে আয়নের জানা ছিল। বিশেষ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতিতে দেহকে বহুবছর ধরে শীতঘুমে শুইয়ে রাখা হয়। কৃত্তিম উপায় রক্তসঞ্চার করার ফলে দেহের কোষগুলো বেঁচে থাকে কিন্ত বয়স থেমে থাকে একই জায়গায়।

মাথা নেড়ে অয়ন উত্তর দিল, “হ্যাঁ, যাতে ধমনীর ভিতর থেকে জল বের করে বিশেষ কয়েকটা রাসায়নিকের সাহায্যে অনেক বছর ধরে মানুষের দেহকে একই অবস্থায় ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায়। কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।”

মিগুয়েল বলল, “ঠিক। আমরা মস্তিস্কের কৃত্রিম স্নায়ুতন্ত্রের সাহায্যে একটা সফ্টওয়্যার প্রোগ্রাম তৈরি করেছি যেটা একটা ছোট্ট যন্ত্রের মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্কের হুবহু একটা প্রতিকৃতি তৈরি করতে পারে কম্পিউটারে। মনে কর, তোমার মাথায় একটা যন্ত্র পরিয়ে দিলাম আর সেই যন্ত্রে তোমার মস্তিষ্কের প্রতিটা গতিবিধি নথিভূক্ত হতে থাকল। কয়েক মাসের মধ্যেই এই প্রোগ্রাম সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখবে যে বিশেষ কোনো অবস্থায় তোমার মস্তিষ্ক কী সিদ্ধান্ত নেয়! দরকার পড়লে তুমি যন্ত্রের একটা বিশেষ অংশ সক্রিয় করে সেটাকে ক্রায়জনিক অবস্থায় নিয়ে যেতে পারবে। সেক্ষেত্রে যতক্ষণ তুমি এই যন্ত্রটা পরে থাকবে তোমার মস্তিষ্ক ঠিক ভাবে চললেও তোমার শরীর আংশিক ভাবে ক্রায়জনিক অবস্থায় থাকবে, মানে তোমার বয়স বাড়বে খুব ধীরে। দরকার পড়লে দেহের মৃত্যুর পর এই প্রোগ্রাম সেই ব্যক্তির নিজস্ব মস্তিষ্কের মতনই এগিয়ে নিয়ে যাবে মহাকাশযানকে। নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছনোর পর সেই যন্ত্রের মাধ্যমে লোকে জানতে পারবে অভিযানের যাবতীয় তথ্য আর অভিজ্ঞতা যা সঞ্চিত আছে সেই ব্যক্তির মাথায়। আবার অন্য কোন অভিযাত্রী সেই একই যন্ত্রের মাধ্যমে তার পূর্ববর্তী অভিযাত্রীর অভিজ্ঞতা গ্রহণ করতে পারবে তার মস্তিষ্কে।”

এইবার প্রফেসর ওয়াং অয়নের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই যন্ত্রের একটা প্রোটোটাইপ অমলের কাছে ছিল। হয়তো প্রক্সিমা সেন্টরিতে পৌঁছে সে যোগাযোগ করতে পেরেছে সেই ডার্ক এনার্জির সঙ্গে, হয়তো অনুসন্ধান করেছে প্রাণের, রহস্য উদঘাটন করেছে অন্য কোনো পৃথিবীর…কিন্তু আমাদের সঙ্গে সে যোগাযোগ করতে পারবে না।”

অয়ন প্রফেসর ওয়াংয়ের চোখে চোখ রেখে বলল, “আপনি কী বলতে চাইছেন যে বাবা..”

প্রফেসর ওয়াং শান্ত কন্ঠে বললেন, “আমার বিশ্বাস অয়ন, অমল আজও মহাকাশে অপেক্ষা করে আছে। তার সারা জীবনের গবেষণা যাতে মানুষের কাজে লাগে। আমরা স্থির করেছিলাম তিরিশ বছর পর গিয়ে আমরা তার সঞ্চিত অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজটাকে এগিয়ে নিয়ে যাব। এই অভাবনীয় দায়িত্ব সে পালন করছে আজও। অনন্ত মহাকাশের কোনো প্রান্তে, একা…

অয়ন আর কোনো কথা শুনতে পেল না। শুধু একটা কথা তার মাথায় বেজে যেতে লাগল, “বাবা বেঁচে আছে, বাবা বেঁচে আছে…..”

২০২৯, তিয়াংঅং২১ আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন

“পিসিএ১ থেকে বেস! আমার কথা শুনতে পাচ্ছ? স্পেসস্যুট ঠিক মতো কাজ করছে, পোশাকের স্বয়ংক্রিয় যোগাযোগ নেটওয়ার্কেও সমস্যা নেই। ”

“পিসিএ১, বেস থেকে বলছি। সব ঠিক আছে। তুমি এগিয়ে যেতে পার।”

“পিসিএ১ থেকে বেসকে! তোমরা এবার ক্যাপসুলের দায়িত্ব নাও। আমি বাইরে যাচ্ছি।”

“বেস থেকে বলছি। অনুমতি দেয়া হল। কুড়ি মিনিট সময় পাবে অয়ন। শুভযাত্রা।”

পিসিএ১ ক্যাপসুলের দরজা খুলে রোভারে লাগানো সিঁড়ি ধরে বেরিয়ে এল অয়ন। স্পেস স্যুট আর ফিল্ড হেলমেট পরে নিয়েছে। কোমরে আটকানো দড়ি ছাড়তেই সে এক লাফে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেল রোভারের পিছনের দিকে। তাকে যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব ক্যাপসুলের জ্বালানির সমস্যাটা ঠিক করতে হবে। যতদুর মনে হচ্ছে ইঞ্জিনের কম্পন নিয়ন্ত্রক আবরণের যন্ত্রপাতিতে কিছু অসুবিধে হওয়ায় তাপ-পারমাণবিক শক্তি তরঙ্গ তৈরি করলেও ইঞ্জিন সেটা ব্যবহার করে এগিয়ে যেতে পারছে না।

মহাকাশে হাঁটবার সময় যেটা সবচেয়ে বেশি অনুভব করে অয়ন, সেটা হল এখানকার নিস্তব্ধতা। মহাকাশ স্টেশন বা বন্ধ জায়গায় থাকার সময় সেই শূন্যতাটা বুঝতে পারা যায় না, কিন্তু মেরামতির কাজে যখন স্পেসস্যুট পরে নিকষ কালো আকাশে বেরিয়ে আসে সে, নিজের নিঃশ্বাসের শব্দেরও অনুরণন হয় তার কানে।

মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করলেও কোনোদিন মহাকাশচারণের প্রশিক্ষণ নেওয়ার দরকার পড়েনি অয়নের। দু’বছর আগে প্রফেসর ওয়াং আর প্রফেসর মিগুয়েলের সঙ্গে দেখা করার পর থেকে এই অভিযানে থাকার জন্যে তার প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল। যদিও তারা দুজনেই তাকে বহুবার বারণ করেছিল আসন্ন এই অভিযানের বিপদ আর অনিশ্চয়তার কথা বলে, কিন্তু অয়ন আগাগোড়া জেদ ধরে বসেছিল। কিছুতেই তাকে টলাতে পারা যায়নি। সব কিছু জানার পর সে হাতের ওপর হাত দিয়ে বসে থাকতে পারবে না।

প্রথমদিকের উত্তেজনা আর আবেগ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে থিতিয়ে এসেছিল, তার জায়গা নিয়েছিল অদ্ভুত একটা জেদ আর দায়িত্ববোধ। এই অভিযান শুধু অমলের জন্যে নয়, এর উদ্দেশ্য অনেক বড়ো। একসময় অয়নের মনে হয়েছিল, এই অভিযানের মধ্যে দিয়ে সে রোজ বাবাকে একটু একটু করে চিনতে পারছে।

অয়নের প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল পৃথিবীতেই। প্রচন্ড মানসিক চাপের মধ্যেও যেন সিদ্ধান্তে একচুল ভুল না হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অয়নের নার্ভ শক্ত হয়েছে, শারীরিক ক্ষমতা বেড়েছে, কাজ হয়েছে নির্ভুল।

প্রফেসর ওয়াং যে গত পঁচিশ বছর ধরে এই অভিযানের প্রস্তুতি নিতে কোনরকম খামতি রাখেননি সেটা একটু একটু করে বুঝেছে অয়ন। চায়না সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তৈরি করেছেন পারমাণবিক জ্বালানির মহাকাশযান, আবিষ্কার করেছেন নানা অত্যাধুনিক যন্ত্র। তিয়াংঅং২১ আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে অয়নদের যান রওনা হতে আর মাত্র দু’দিন বাকি।

জ্বালানি ক্যাপসুলের প্যানেলের কাছে গিয়ে সার্কিট বোর্ডটা খুলল অয়ন। ভিতরে গিজগিজ করছে যন্ত্রপাতি। শেষ মুহুর্তে ইঞ্জিনের এই গন্ডগোল তার মোটেই ভালো লাগছে না। মন দিয়ে হাতের কব্জিতে লাগানো যন্ত্রের সাহায্যে বোর্ডটা পরীক্ষা করতে লাগল সে। তারপর মাইক অন করে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে কথা বলতে লাগল।

“পিসিএ১ থেকে বেসকে বলছি! আমি অয়ন। বিদ্যুৎবাহী গ্রিডটা কাজ করছে না। ডেটাবেসে ইঞ্জিনিয়ারিং ডায়াগ্রামের ছবিটা পাঠাও।”

“বেস থেকে বলছি। তোমার কথা শুনতে পেয়েছি। এখনি ছবি পাঠানো হচ্ছে।”

কব্জিতে খোলা বোর্ডের ছবি দেখে ঝামেলাটা ধরতে পারল অয়ন। আইসির চাপে তারগুলো ছিঁড়ে কয়েকটা ছোটো যন্ত্র খারাপ হয়ে গেছে। বেশিক্ষণ সময় লাগবে না।

“পিসিএ১, বেস থেকে বলছি। শুনতে পাচ্ছ আমার কথা?”

“ঝামেলাটা ধরতে পেরেছি। তারগুলো লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। গ্রিডে আপডেট ইনস্টল করছি আমি।”

“এক্ষুনি ফিরে এস। স্পেস ডেবরিস আলফা ছুটে আসছে বেসের দিকেই। এক্ষুনি ফিরে এস অয়ন।” বেস থেকে অলিভারের গলা শোনা গেল।”

এক সেকেন্ডের জন্যে অয়ন আতঙ্কে কেঁপে উঠল। আপডেট ইনস্টল হতে এখনো তিরিশ সেকেন্ড বাকি। গত তিরিশ বছরে পৃথিবীর কক্ষে কয়েক লক্ষ মানব নির্মিত উপগ্রহ স্থাপন করা হয়েছে। একটা সময়ের পর বাতিল আর অকেজো উপগ্রহের ভাঙা অংশগুলো পৃথিবীকে পাক দিতে থাকে একইভাবে, বছরের পর বছর। বৈজ্ঞানিকরা এদের নাম দিয়েছে স্পেস ডেবরিস।

অনেক বছর আগে “গ্র্যাভিটি” বলে একটা সিনেমা দেখেছিল অয়ন, সেখানে অকেজো উপগ্রহের ভাঙা টুকরোগুলো ছুটে এসে আঘাত করেছিল মহাকাশচারীদের। আজকাল অবশ্য সে ভয় অনেক কম, ২০২০ সালে অ্যাম্বার ইয়ং বলে উনিশ বছরের মেয়ে ‘সিয়ার ট্র্যাক’ বলে একটা ‘আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রোগ্রাম’ তৈরি করে যার ফলে উপগ্রহের ভাঙ্গা টুকরোগুলোর গতিপথ আগে থেকেই অনুমান করা যায়।

অয়ন মাথা তুলে দেখল অন্ধকার আকাশে ঝড়ের গতিতে ধেয়ে আসছে হাজার হাজার ধাতুর ছোটো বড়ো টুকরো, কিন্ত এই ঝড়ের কোনো শব্দ নেই।

“অয়ন, আড়াল নাও এক্ষুনি। ২২৫১ জাঙ্কইটার মেশিন চালাবো আমি... ”

“শুনতে পেয়েছি।”

একটানে প্যানেল থেকে কার্ডটা বের করে বড়ো বড়ো লাফে দরজার দিকে এগিয়ে গেল অয়ন। ততক্ষণে তার মাথার পাশ থেকে অসম্ভব গতিতে ছোটোবড়ো ভাঙা উপগ্রহের টুকরো বেরিয়ে যাচ্ছে। একটা বড়ো টুকরোর সঙ্গে ধাক্কা লাগলেই সে অবাধ গতিতে এই ঝড়ের টানে মহাকাশের অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পিসিএ১ ক্যাপসুলের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে গেল অয়ন।

“পিসিএ১ থেকে বেসকে বলছি। আমি সুরক্ষিত। চালিয়ে দাও জাঙ্কইটার।”

পরক্ষণেই একটা ঝাঁকুনির শব্দের সঙ্গে অয়ন দেখল হাজার হাজার উপগ্রহের ভাঙা টুকরো দিক পরিবর্তন করে মহাকাশ স্টেশনের এর পিছন দিকে ছুটে গেল। অয়ন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। জাঙ্কইটার ইঞ্জিন আবিষ্কার করার কৃতিত্ব লেই ল্যাং বলে চায়নার এক বৈজ্ঞানিকের। এই ইঞ্জিন বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় আকর্ষণে মহাকাশে ঘুরতে থাকা উপগ্রহের ভাঙ্গা টুকরো অর্থাৎ ‘জাঙ্ক’ খেয়ে ফেলে তাদের রকেটের জ্বালানিতে পরিণত করে।

কিছুক্ষণ পর আবার ক্যাপসুল থেকে বেরিয়ে অয়ন কালো আকাশের দিকে তাকাল। গত দেড় মাসে এই এক দৃশ্য সে বহুবার দেখেছে, কিন্তু প্রতিবারই সে সামনে থেকে চোখ ফেরাতে পারে না। তার চোখের সামনে ঝলমল করছে বিশাল পৃথিবী। সহসা অয়নের মনে পড়ল, আর একদিন বাকি! তার পর এই দৃশ্য সে আদৌ কোনদিন দেখতে পাবে কি না তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

২০২৯, ট্রেলব্লেজার মহাকাশযান, মহাকাশ

অয়নরা যাত্রা শুরু করেছে চার দিন আগে। তার সঙ্গে আরো তিনজন এই মহাকাশযানে চেপে চলেছে তার সঙ্গে। রকেটের ক্যাপসুল কম্যুনিকেটর (ক্যাপকম) অলিভর, রোবটিক্স ইঞ্জিনিয়ার ইচিকা আর ডক্টর জস। ডক্টর জস এর আগেও মহাকাশে অভিযান করেছেন। অয়নের কাজ হল জ্বালানি, ইঞ্জিন আর গতিপথের হিসেব রাখা।

প্রফেসর ওয়াং আর প্রফেসর মিগুয়েল তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলবেন প্রতি মুহূর্তে। বিদায় নেওয়ার মুহুর্তে অয়নের কোন ভাবান্তর না হলেও প্রফেসর ওয়াং আর মিগুয়েল দুজনেই চোখের জল আটকাতে পারেনি। প্রফেসর ওয়াং তাকে বুকে জড়িয়ে শুধু বললেন, “ঈশ্বর তোমায় রক্ষা করুন। আমার বিশ্বাস, তোমরা পারবে।”

মিগুয়েল প্রত্যেকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বললেন, “ট্রেলব্লেজারে যেরকম প্রযুক্তি আমরা ব্যবহার করেছি, আগে কোন রকেটে কেউ ব্যবহার করেনি। তোমাদের প্রত্যেকের কানের পিছনে একটা করে ছোটো চিপ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, মস্তিস্কের সিমুলেশন যন্ত্রের সঙ্গে এর যোগাযোগ আছে। যতদিন না তোমরা ক্রায়জেনিক ঘুমে যাচ্ছ, এই চিপ কখনো খুলবে না। আর একটা দরকারি কথা… তোমরা আলোর অর্ধেক গতিতে এগিয়ে যাবে এমনিতে। দরকার পড়লে তোমরা গতি অনেক বেশি বাড়িয়ে দিতে পার, কিন্তু মনে রেখো আলোর গতির যত কাছাকাছি তোমরা যাবে, তোমাদের সময়ের তুলনায় পৃথিবীতে অনেক বেশি সময় কেটে যাবে। হয়তো তুমি কুড়ি বছর পর ফিরে এসে দেখলে পৃথিবীতে কেটে গেছে পাঁচশ বছর।”

কাল দীর্ঘায়ণ অথবা টাইমল্যাপ্সের কথা অয়নদের কারোরই অজানা নয়। আলোর অর্ধেক গতিতে সময়ের ফারাক ততটা বেশি হবে না যতটা হবে আলোর গতির নব্বই শতাংশ গতিতে এগিয়ে গেলে। এই অভিযানে যতটা সাহস দরকার, তার চেয়েও অনেক বেশি দরকার ধৈর্য। সময় খোয়াতে তারা কেউই রাজি নয়।

রকেটের সবাই একে অপরের সঙ্গে আগে থেকে পরিচিত। পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে তারা এখন মঙ্গল গ্রহের দিকে এগোচ্ছে। আলোর অর্ধেক গতি অর্জন করতে এখনো তাদের দিন দশেক সময় লাগবে। ক্যাপকম অলিভার পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে। তাদের অভিযানের জন্যে বিশেষ একটা দল গঠন করা হয়েছে পৃথিবীতে। এই দলের নাম PCEPAG (Proxima Centauri Exploration Program Analysis Group) প্রফেসর মিগুয়েলের তত্বাবধানে এই বিশেষ কমিটি কাজ করবে।

পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়াতে তেমন কোন অসুবিধে হয়নি তাদের। ডক্টর জস ইতিমধ্যে তাদের সকলের জৈব-চিকিৎসীয় তথ্য নিয়ে নিয়েছেন। মহাকাশে আরো এগিয়ে গেলে মহাকাশীয় বিকিরণের ফলে অনেক সময় মানুষের শরীরে নানা সমস্যা দেখা যায়। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে দিনের পর দিন ধরে একইভাবে একটা সীমিত জায়গার মধ্যে বন্ধ থাকা। অনেক সময় প্রিয় বন্ধুর মুখও দেখতে ভালো লাগে না। এই একাকিত্ব স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের কর্মক্ষমতাকে আঘাত করে, মানসিক ভাবে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই একঘেয়েমি এড়ানোর জন্যে মহাকাশচারীরা গান শোনে, সিনেমা দেখে, বই পড়ে, নানারকম গেমস খেলে নিজের মধ্যে।

এই ক’দিনে অবশ্য সেরকম কোন অসুবিধে কারোই হয়নি। তারা সকলেই বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছে বাইরের দৃশ্যের দিকে চেয়ে থেকে। ছবি দেখা আর নিজের চোখের দেখার মধ্যে একটা পার্থক্য তো থাকেই। কুচকুচে কালো আকাশ, তার মধ্যে অগুনতি গ্রহনক্ষত্র জ্বলছে। এ ছাড়াও পৃথিবীর নানান দেশ থেকে আসা উপগ্রহ দেখতে পাওয়া যায়। এই দৃশ্য যে নিজে না দেখেছে, তাকে লিখে বোঝানো মুস্কিল। ঘন্টার পর ঘন্টা সময় যে কোথা থেকে চলে যায়, বুঝতে পারা যায় না।

কাজকর্ম অবশ্য বেশ গতিতেই এগোচ্ছে। রকেটের গতিপথ ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তারা মঙ্গল গ্রহকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যাবে বৃহস্পতির দিকে। চারটের কোন ইঞ্জিনে এখনো অবধি কোন গোলমাল হয়নি। কোন দরকার পড়লে ইচিকার সাহায্য নিতে হবে। যাত্রার মাঝপথে রোবটের সাহায্য না নিয়ে ইঞ্জিনের যন্ত্রপাতি মেরামত করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার, যখন তারা প্রচন্ড গতিতে এগিয়ে চলেছে সামনে। স্বয়ংক্রিয় রোবটের সাহায্যে রকেট চলাকালীন অবস্থাতেও সব ধরণের ‘প্যাচ’ বা মেরামত করা আজকাল সহজ হয়ে গেছে। ইঞ্জিন থামিয়ে স্পেস স্যুট পরে নিজেরা বেরিয়েও কাজ করা যায় বটে, কিন্তু তাতে সেই এক গতি অর্জন করতে আবার বেশ খানিকটা সময় লেগে যায়।

ইচিকা দলের একমাত্র মেয়ে, বয়স চব্বিশ হলেও সে রোবটিক্স নিয়ে কাজ করছে গত পনেরো বছর ধরে। তার হাসিমুখ দেখে মনেই হয় না সে এরকম বিপজ্জনক একটা অভিযানে চলেছে। দলের বাকিদের মধ্যে অলিভারের সঙ্গে অয়নের অনেকদিন থেকেই পরিচয়। অলিভার ফিলিপিন্সের ছেলে। মহাকাশীয় যোগাযোগ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছে বহুদিন। তার মতো যোগ্য ক্যাপকম পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। কাজের ব্যাপারে সে করিত্কর্মা তো বটেই, তাছাড়াও অলিভার প্রচন্ড সাহসী। দলের শেষ সদস্য ডক্টর জস বয়সে তাদের চেয়ে খানিকটা বড়ো হলেও চেহারা দেখে তেমন মনে হয় না। মাঝে মাঝেই অয়ন তাকে গম্ভীর হয়ে চোখ বন্ধ করে চিন্তা করতে দেখেছে, কিন্তু কথা বলার সময় তার মুখে হাসি লেগেই আছে।

অয়ন খেয়াল করেছে এই কদিনেই ট্রেলব্লেজারের অন্তরে থাকা ক্যাপসুলটাকে তার নিজের বাড়ির মতো মনে হতে শুরু করেছে। এই জায়গাটিকে বলা হয় হ্যাবিটেট কন্টেনার। কৃত্তিম বাস্তব বা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার করে এই ক্যাপসুলটাকে এরকম ভাবে তৈরি করে হয়েছে যে অনেকটা পৃথিবীর বাড়ির মতনই বই রাখার জায়গা, রান্নাঘর, ফ্রিজ, টিভি সবই আছে।

সেদিন লাঞ্চের পর সময় কাটানোর জন্যে সে একটা বই খুলে পড়তে শুরু করেছে মাত্র। কয়েক পাতা পড়তেই তার কানে লাগানো মাইক্রোফোন রিসিভারে ইচিকার উত্তেজিত গলা শুনতে পেল অয়ন, “এক্ষুণি একবার নিয়ন্ত্রণ কক্ষে এস অয়ন। কুইক! ”

তাড়াতাড়ি কোমর থেকে বেল্ট খুলে উঠে পড়ল অয়ন। ক্যাপসুলের মাধ্যাকর্ষণ কিছুক্ষণের জন্যে বন্ধ রাখা হয়েছে। শূন্যে ভেসে ভেসে সে এগিয়ে গেল নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দিকে। সেখানে পৌঁছতেই ইচিকা উত্তেজিত হয়ে বলল, “টেলিস্কোপে চোখ দিয়ে দেখ।”

টেলিস্কোপে চোখ লাগাতেই অয়নের হৃদস্পন্দনের গতি কয়েক গুণ বেড়ে গেল। তার চোখের সামনে লক্ষ লক্ষ রঙিন আলো ছোটাছুটি করছে, দেখে মনে হচ্ছে যেন দুটো জ্বলন্ত হরিণের ওপর বসে দুই ধনুর্ধর আর হরিণদুটো শিং উঁচিয়ে লড়াই করছে একে অপরের সঙ্গে। আলোর ফুলকি ঠিকরে বেরোচ্ছে তাদের শরীরের নানান জায়গা থেকে। শুধু হরিণদের শিঙের মধ্যে একটা জায়গায় ঘন কালো অন্ধকার। নানা নক্ষত্র তীরবেগে ছুটে যাচ্ছে সেই অন্ধকারে। দৃশ্যটা ক্রমে ছোটো হয়ে আসছে। সহসা অয়নের দম বন্ধ হয়ে গেল উত্তেজনায়। সে যা ভাবছে সেটা কি সত্যি হতে পারে?

“তুমি যা ভাবছ তাই ঠিক অয়ন।” পিছন থেকে অলিভরের কন্ঠস্বরে সে চমকে পিছনে তাকাল।

“স্যাগেটেরিয়াস ডোয়ার্ফ…” অস্ফূটে বলতে পারল অয়ন।

“হ্যাঁ। আমি পৃথিবীতে এই ছবি পাঠিয়েছিলাম। তাদেরও একই মত। আমাদের আকাশগঙ্গার সঙ্গে সংঘর্ষের ফলেই এই অভিকর্ষ তরঙ্গের আলোর রোশনাই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।”

অয়নের বুকের মধ্যে একটা দামামা বাজছে। স্যাগেটেরিয়াস ডোয়ার্ফ উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সি যে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ধরে আমাদের আকাশগঙ্গা অথবা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে বৈজ্ঞানিকেরা সেটার একটা হালকা আভাস পেলেও প্রমাণ পায়নি। অয়নেরা যেই দৃশ্য দেখেছে সেটা লক্ষ লক্ষ বছরের মধ্যে একবার হয়। স্যাগেটেরিয়াস ডোয়ার্ফ আকারে অনেক ছোটো হওয়ায় তার সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে আকাশগঙ্গার কোন পরিবর্তন হবে না ঠিকই কিন্তু আবহমান মুহুর্তে একটা নতুন মহাবিশ্ব তৈরি হচ্ছে। ইচিকা উত্তেজিত হয়ে বলল, “তার মানে, তার মানে ওই কালো কেন্দ্রবিন্দুটা…”

“বলা মুশকিল। হয়তো কৃষ্ণগহ্বর। স্যাগেটেরিযাস ডোয়ার্ফ গ্যালাক্সির কৃষ্ণগহ্বর।” অয়ন উত্তর দিল।

২০২৯, ইউরোপা থেকে ৫০০০০ মাইল দূরে

গত আট দিন কেটে গেছে ঝড়ের বেগে। অবিরাম কাজ করতে হয়েছে অয়নদের সকলকেই। প্রক্সিমা সেন্টরিতে পৌঁছোনো প্রধান উদ্দেশ্য হলেও অয়নদের আরো কয়েকটা লক্ষ্য আছে। মঙ্গল গ্রহে অভিযান চালালেও মানুষ বৃহস্পতি, শনি আর অন্যান্য জায়গায় পৌঁছতে পারেনি। অনেক জায়গায় রোবট পাঠিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের নিজের বুদ্ধি আর যন্ত্রের তফাতটা নাকচ করে দেওয়া চলে না। কিন্তু প্রতিটা জায়গায় অভিযান চালানোও সম্ভব হবে না, ট্রেলব্লেজার এর ইঞ্জিন এর গতিবেগ কমিয়ে আনতে যতটা সময় লাগে, বার বার ইঞ্জিন থামালে আলোর অর্ধেক গতিতে পৌঁছনোয় অনেক সময় লেগে যাবে, সে ক্ষেত্রে নিউক্লীয় প্রসারণ যন্ত্রের ওপর চাপ পড়বে অনেক বেশি।

প্রফেসর ওয়াং সেজন্যে খুব হিসেব করে মাত্র কয়েকটা জায়গা সার্ভে করতে বলেছেন অয়নদের দলকে। সেই সমস্ত জায়গাই এই সূচিতে জায়গা পেয়েছে যেখানে প্রাণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তার মধ্যে অন্যতম হল বৃহস্পতি গ্রহের উপগ্রহ ইউরোপা। যতদুর জানা গেছে আমাদের সৌরজগতে একমাত্র এই উপগ্রহে দাঁড়াবার মতন জমি আছে। সিলিকেট শিলা দিয়ে তৈরি এই জমি, তাছাড়াও জল পাওয়ার সম্ভাবনা আছে ইউরোপাতে। যতদূর মনে হয়, ইউরোপায় একটা সমুদ্র আছে।

ইচিকা রোভারের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে তুলে নিয়েছে। তিনটে রোভার নামানো হবে ইউরোপার মাটিতে। তার মধ্যে নানাধরনের রোবট আছে। ঠিক করা হয়েছে অয়ন আর ইচিকা নামবে ইউরোপাতে আর বাকি দুজন নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে যোগাযোগ রাখবে ওদের রোভার প্রোবের সঙ্গে।

ডক্টর জোস ইচিকা আর অয়নকে সাবধান করে দিলেন, “কোন অবস্থাতেই বিকিরণ নিরোধী পোশাক খুলবে না।”

অয়ন আর ইচিকা মাথা নাড়ল। বৃহস্পতির পরিবেশ এখনো ঠান্ডা হয়নি, মাটির নীচে টগবগ করে ফুটতে থাকা লাভা আর তেজস্ক্রিয় পদার্থের ক্ষয়ের ফলে ক্রমাগত বিকিরণ নির্গত হতে থাকে এর পরিবেশে। তার সঙ্গে আছে বিশাল বিশাল আগ্নেয়গিরি। বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার না করলে বৃহস্পতির কাছাকাছি এলেই তাদের রকেট ছাই হয়ে যেত।

অয়ন আর ইচিকা গিয়ে তাদের নির্দিষ্ট রোভারে গিয়ে উঠল। সামনে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে বিশাল এক গ্যাসের আবরণ।

“অয়ন, আমরা গ্যালিলিয়ান উপগ্রহের ব্যাসার্ধে এসে গেছি। তৈরি হয়ে নাও।”

বলার সঙ্গে সঙ্গেই সাঁই সাঁই করে ট্রেলব্লেজারের ডান পাশে বিশাল একটা উপগ্রহ দেখতে পাওয়া গেল। ইচিকা মুগ্ধদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “ক্যালিসটো।” অয়ন দেখল উপগ্রহটাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন উৎসব হচ্ছে। সারা উপগ্রহটা ঝকমক করছে আলোর রোশনাইতে। ইচিকা তাকে প্রশ্ন করল, “ওই আলোগুলো কীসের?”

অয়ন ততক্ষণে ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে। সে বলল, “ওগুলো আলো নয়, আগ্নেয়গিরি।”

“ও মাই গড।” ইচিকা ভয়ার্ত গলায় বলল।

বৃহস্পতির উনসত্তরটা উপগ্রহের মধ্যে বেশিরভাগ উপগ্রহতেই সর্বক্ষণ অগ্ন্যুৎপাত হচ্ছে আগ্নেয়গিরি থেকে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো হল গ্যালিলিয়ান পরিবারের চারটে উপগ্রহ, আইও, ইউরোপা, গেনিমেড আর ক্যালিসটো।

ইচিকা আর অয়ন হেলমেট পরে তৈরি হয়ে নিল। তারপর মাইকের বোতাম টিপে অলিভারকে বলল, “আর সেভেন ডেল্টা নামার জন্যে তৈরি। অবস্থান নিশ্চিত কর।”

ওদিক থেকে অলিভারের গলা শুনতে পেল তারা, “অবস্থান যাচাই করে নেওয়া হয়েছে। আমরা গেনিমেড এর কক্ষপথ পেরিয়ে গেছি। তৈরি থাক। কাউন্টডাউন আরম্ভ হতে এক মিনিট বাকি।”

নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল তারা। এরপর কী হবে সেটা শুধু অনুমান করা যায়, কিন্তু জোর করে কিছু বলা যায় না। চাঁদ ছাড়া আজ পর্যন্ত কোন গ্রহে উপগ্রহে মানুষের পা পড়েনি। সেই অর্থে তারা প্রথম। এমনও হতে পারে ইউরোপাতে নামামাত্র তাদের যন্ত্রপাতি খারাপ হয়ে গেল, অথবা বিকিরণ পোশাক কাজ করল না। না জানা যে কোনো বিপদের মোকাবিলা করার জন্যে এত দিন ধরে তারা তৈরি হয়েছে, আজ পরীক্ষার পালা।

“কাউন্টডাউন শুরু। দশ নয় আট সাত ছয় …”

অয়ন এক মুহুর্তের জন্যে চোখ বন্ধ করল। তারপর চোখ খুলে ইচিকার দিকে তাকালো।

“…তিন দুই এক ….”

একটা ঝাঁকুনির সঙ্গে অয়ন বুঝতে পারল রকেট থেকে বেরিয়ে তাদের ছোটো রোভারটা এগিয়ে চলেছে সামনের উপগ্রহের দিকে। এখন ইউরোপাকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে তারা। মনে হচ্ছে সাদা বিশাল গোলকের মধ্যে খয়েরি রং দিয়ে কেউ আঁকিবুঁকি কেটেছে। যতটা সামনে এগোতে লাগল তারা বিস্ময়ে তাদের চোখ বড়ো হতে লাগল। নিজের গ্রহ ছাড়া আর কোন মহাকাশীয় গ্রহ উপগ্রহ তারা এত কাছ থেকে দেখেনি। সাদা আস্তরণটা কি জমি আর সারা উপগ্রহ জুড়ে বরফের চাদর পাতা আছে?

ইচিকার দিকে তাকিয়ে অয়ন বলল, “আমাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রোভার আর ফাইভ আর আর সিক্স এর গতিপথ ঠিক করে দেওয়া উচিত। তাহলে জায়গাটা নিরীক্ষণ করতে সময় অনেক কম লাগবে। তিনটে রোভার এক জায়গায় ল্যান্ড করানোর কোনো মানে হয় না।” ইচিকা ঘাড় নেড়ে তার কথায় সায় দিল। তারপর মাইকে অলিভারকে বলল, “আর সেভেন ডেল্টা থেকে বেসকে বলছি। আর ফাইভ এবং আর সিক্স রোভারের গতিপথ পরিবর্তন করছি আমরা। গতিপথ বদলের নির্দেশ দিতে হবে।”

“কপি। সম্মতি দেওয়া হল।”

খট খট করে বোতাম টিপে ইচিকা কাজ শুরু করে দিল। দুটো রোভারের গতিপথ আর উপগ্রহের জমিতে নামার নির্দেশ ঠিক করে ইচিকা অয়নকে বলল, “এবার নামার জন্যে তৈরি হতে হবে আমাদের।”

অয়ন মাথা নেড়ে অলিভারকে জানিয়ে দিল সেই কথা। রোভারের সামনে থেকে ঘন গ্যাসের আস্তরণ সরে গেছে। এখন ইউরোপার জমিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ধবধবে সাদা সেই জমি। আর মিনিট পাঁচেক।

“আর সেভেন ডেল্টা থেকে বেস। আমরা ল্যান্ডিং এর জন্যে তৈরি।”

অলিভারের গলা শুনতে পাওয়া গেল, “রজার দ্যাট। গুড লাক।”

ইঞ্জিনের থ্রাস্টার চালিয়ে নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিল অয়ন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা নামতে শুরু করল। সামনে প্রশস্ত উঁচুনিচু প্রান্তর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ইচিকা দরকারি নির্দেশ দিয়ে ততক্ষণে বাকি দুটো রোভারকে মাটিতে নামিয়ে দিয়েছে। আরেকটা ঝাঁকুনির সঙ্গে তারা বুঝতে পারল, তাদের রোভারও ইউরোপার মাটি স্পর্শ করেছে।

সিট বেল্ট খুলে দরকারি সব জিনিস দেখে নিল তারা দুজন। তারপর রকেটের উদ্দেশ্যে মেসেজ পাঠাল।

“আর সেভেন ডেল্টা থেকে বেস। প্রত্যেকটা রোভারই ঠিকঠাক নেমে গেছে। আমরা এখন জায়গাটা জরিপ করার জন্যে তৈরি হচ্ছি।”

উলটোদিক থেকে অলিভারের উচ্ছ্বসিত গলা শোনা গেল, “শুনতে পেয়েছি। দারুণ খবর। সব যন্ত্রপাতি চেক করে নিয়েছ?”

“সব ঠিক আছে। আর সেভেন এখন পূর্বনির্ধারিত অবস্থানে দাঁড়িয়ে। স্বয়ংক্রিয় রোভারগুলো নির্দেশ মতো জায়গাটা স্ক্যান করতে শুরু করবে এইবার। আর সেভেনের হিউমোনয়েড রোবোটিক ইউনিটকে সঙ্গে নিয়ে আমরা এগোচ্ছি।”

“এগিয়ে যাও। আমাদের শুভকামনা রইল।”

বিকিরণনিরোধী পোশাক আর ফিল্ড হেলমেট পরাই ছিল। ইচিকা আগেই তৈরি হয়ে তাদের হিউমোনয়েড রোবটদের সক্রিয় করছে। দরকার পড়লে এরা অনেকটা দূরত্ব অতিক্রম করে অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে সাহায্য করবে। হাতল ঘুরিয়ে রোভারের দরজা খুলল অয়ন। তারপর বাইরে পা রাখল।

কয়েক পা হেঁটে গেল সে। ইচিকা ততক্ষণে বেরিয়ে এসেছে। হেলমেটের ভিতরে থাকা ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে ও অয়নকে বলল, “রোবট চারটেকে কোন দিকে পাঠাব সাইট স্ক্যান করতে?”

অয়ন কোনো কথা না বলে আঙুল দিয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল আকাশের দিকে। সেদিকে তাকিয়ে ইচিকার চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল, সে কোন কথাই বলতে পারল না।

পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের মাত্র তের শতাংশ থাকার দরুণ ইউরোপাতে আকাশের কোন রং নেই, এখানে হাওয়া চলে না। কিন্তু প্রায় সারা আকাশ জুড়ে বৃহস্পতি গ্রহ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে প্রকান্ড একটা জ্বলন্ত নক্ষত্রের মধ্যে বালির ঝড় উঠেছে। ঘন গ্যাসের আস্তরণের কারণে মায়াবী এক রূপকথার দৃশ্য তৈরি হয়েছে আকাশে। কিন্তু জমি বলতে শুধু সাদা বরফের অসমতল প্রান্তর দিগন্ত অবধি চলে গেছে।

কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে অয়ন ইচিকাকে বলল, “নাসার কথামতো সর্সারার অভিযানের সময় বাবা এখানে নামেনি ঠিকই, কিন্তু এখানে অনুসন্ধান করার জন্যে একটা প্রোব নামানো হয়েছিল। সময়ের অভাবে বেশি কিছু জানা যায়নি। আর ফাইভ আর আর সিক্স জমির ওপরে সমীক্ষা চালাবে। আমার মনে হয় রোবটগুলোকে ওই পশ্চিমের নীচু জায়গাটায় ড্রিল করতে বলা হোক।”

ইচিকা ভুঁরু কুঁচকে বলল, “নাসা ২০২০ সালে যে ইউরোপা ক্লিপার অভিযান শুরু করেছিল তারা এখনো এখানে পৌঁছতেই পারেনি। জমির ওপরে অনেক ছবি অবশ্য আগেই নেওয়া হয়ে গেছে। তুমি কী করতে চাইছ সেটা বোধহয় বুঝতে পারছি।” রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে নির্দেশ দিয়ে রোবট চারটেকে নিয়ে এগিয়ে চলল তারা।

ততক্ষণে উপগ্রহের অন্য প্রান্ত থেকে অন্য দুটো অনুসন্ধানকারী প্রোব ক্যামেরা আর অন্যান্য যন্ত্রের সাহায্যে তথ্য পাঠাতে শুরু করেছে। অয়ন অনুভব করল মাধ্যাকর্ষণ কম হওয়া সত্ত্বেও হাঁটতে যে খুব একটা সুবিধে হচ্ছে তা নয়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বরফের টিলাগুলো পেরিয়ে কাজ শুরু করে দিল তারা। রোবট চারটে যথেষ্ট উন্নত, আগে থেকে নির্দেশ দেওয়াই আছে। জায়গা মেপে নিয়ে চারটে ভিন্ন বিন্দুতে গর্ত খোঁড়া করা শুরু হল। অয়ন ইচিকাকে বলল, “চল, আমরা একটু জায়গাটা মেপে আসি।” ইচিকা সায় দিল।

বরফের টিলাগুলো খুব একটা উঁচু নয়। অনেক জায়গায় বরফের ওপর ফাটল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো জায়গায় সেই ফাটল পাতাল পর্যন্ত চলে গেছে। ইচিকা হাঁটতে হাঁটতে বলল, “অনেকটা আন্টার্কটিকার মতো, তাই না?” অয়ন পিছন থেকে হেসে বলল, “যদি না আকাশের কথাটা ভুলে যাও?”

সত্যিই তাই। এখানকার কুচকুচে কালো আকাশ জুড়ে থাকা বৃহস্পতির দিকে তাকালেই স্পষ্ট বোঝা যায় এ আমাদের পৃথিবী নয়। এই দৃশ্য যতটা সুন্দর, ততটাই ভয়াবহ।

কিছুক্ষণ পরে মাইকে অলিভারের গলা শোনা গেল, “বেস থেকে বলছি। আর ফাইভ আর আর সিক্স তাদের যাবতীয় তথ্য পাঠিয়ে দিয়েছে। প্রায় তিরিশ ফুট অবধি খুঁড়ে দেখা হয়েছে। তোমরা আরো কোন পরিসীমা নির্ধারিত করতে চাও?”

অয়ন মাইকে বলল, “অবশ্যই। আর সিক্স চার্লিকে বর্তমান অবস্থান থেকে একশ মিটার ডানদিকে পাঠাও। হিউমনোয়েড রোবটগুলো বরং তাদের কাছাকাছি গিয়ে ছবি তুলতে আরম্ভ করুক। আর ফাইভ ডেল্টা, তাকে উপগ্রহের অন্তস্তল পরীক্ষা করতে বলা হোক।”

“ঠিক আছে। অয়ন, ইচিকা, তোমরা আর কতক্ষণ থাকতে চাও। আমরা এইখানে অনেক বেশি সময় দিতে পারব না।”

“খুব বেশি নয়। আর দু’ঘণ্টা। আর সেভেন রোবটরা স্ক্যান করার জন্যে মাটি খুঁড়ছে। আমাদের এই জায়গাটার একটা ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করতে হবে। সেটা করতে যতটুকু সময় লাগবে সেইটুকুই আমরা এখানে থাকব।” ইচিকা জানাল।

অলিভারের সঙ্গে কথা বলে কয়েক পা এগোতে না এগোতেই অয়নের পায়ের নীচে মাটি কাঁপতে লাগল প্রচন্ড জোরে।

ইচিকার দিকে চেয়ে উদিগ্ন হয়ে সে বলল, “ভূমিকম্প! এক্ষুণি ফিরতে হবে।”

তিন লাফে দুজনেই বরফের টিলা থেকে নেমে এসে দাঁড়িয়ে থাকা রোভারের উদ্দেশ্যে দৌড়তে শুরু করল। ততক্ষণে সামনের জমিগুলোর ফাটল থেকে প্রচন্ড গতিতে জল বেরোতে শুরু করেছে। ভয়ার্ত চোখে তারা দেখল জল ফুটছে, ধোঁয়া বেরোচ্ছে জলের গা থেকে। আগ্নেয়গিরির লাভার মতো লাফিয়ে সেই জল কয়েকশো ফুট ওপর অবধি পৌছে যাচ্ছে। দৌড়তে দৌড়তে ইচিকা বলল, “ইটস দ্য ড্রিল। আমাদের নিশ্চয়ই মাটি খোঁড়ার সময় কোন আটকে থাকা জলের স্রোতে আঘাত করেছে।” অয়ন ও দৌড়তে দৌড়তে উত্তর দিল, “ইচিকা, এটা মাটি খোঁড়ার জন্যে হয়নি। একটা জায়গায় আঘাত হলে সেখান থেকে জল বেরোত, এখন সারা প্রান্তর জুড়ে এই তান্ডব হত না। এখনই এখান থেকে পালাতে হবে। এই জলে নানা রকম তেজস্ক্রিয় ধাতু মিশে আছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই জায়গা ছেড়ে বেরোনো দরকার।”

টিলা থেকে নামতে নামতে ইচিকা মাইকে চিৎকার করে বলল, “অলিভার। রোভার আর ফাইভ আর আর সিক্সকে নির্দেশ দাও ফিরে যেতে। আমি এখন নির্দেশ টাইপ করতে পারছি না।”

অভিজ্ঞ অলিভার কোনো প্রশ্ন করল না। শুধু উত্তর এল, “রজার। নির্দেশ দিয়েছি। রোভাররা মাটি ছেড়ে দিয়েছে। তোমরা তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।”

ততক্ষণে অয়ন হিউমোনয়েড রোবটদের তাদের রোভারে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে কব্জির যন্ত্রে থাকা বোতামে নির্দেশ দিয়ে। তাদের পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ততক্ষণে জল বইতে শুরু করেছে। বরফের প্রান্তর আর বোঝা যাচ্ছে না জলে। মনে হচ্ছে তারা সমুদ্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আর টাইফুনের মতন অসংখ্য ফুটন্ত জলস্তম্ভ তাদের ঘিরে ধরেছে। দৌড়তে দৌড়তে আতঙ্কিত চোখে অয়ন দেখল সহসা তাদের পায়ের তলায় জল জমতে শুরু করেছে। রোভার এখনো খানিকটা দুরে। ইচিকা চিৎকার করে অয়নকে বলল, “অয়ন, আমি এগোতে পারছি না।”

অয়ন দেখল ইচিকার গোড়ালি অবধি শক্ত পাথরের মতো বরফ জমে গেছে মুহুর্তের মধ্যে। শত চেষ্টা করেও সে এগোতে পারছে না। সে কোমর থেকে আইস এক্স বের করে ঘা মারতে লাগল সেখানে। বরফ খানিকটা আলগা হতেই অয়ন ইচিকাকে বলল, “যত জোরে পারো দৌড়োও। রোভারে গিয়ে ইঞ্জিন স্টার্ট কর।”

ইচিকা দৌড় লাগাল। ততক্ষণে হাঁটু অবধি জমা শক্ত বরফে আটকে গেছে অয়ন। আইস এক্স কোমরে রেখে এবার সে আরেকটা যন্ত্র বের করল। সেটায় চাপ দিতেই নীল রঙের আগুনের একটা শিখা বেরিয়ে তার পায়ের চারদিকের বরফকে গলাতে শুরু করল। দুর্গম স্থানে এই যন্ত্র নিয়ন্ত্রিত আগুনের শিখা জ্বালিয়ে পরিমাণ মতো তাপ সরবরাহ করে। চলতি ভাষায় এর নাম ফ্লেম থ্রোয়ার।

কয়েক মুহুর্তের মধ্যে অয়ন বেরিয়ে আসতে পারল বটে কিন্তু ততক্ষণে চারদিকে অদ্ভুত এক কান্ড শুরু হয়েছে। অয়নের কানে ইচিকার চিৎকার ভেসে এল, “দৌড়োও….”

অয়ন কোনদিকে না তাকিয়ে রোভারের দিকে দৌড়তে শুরু করল। রোভারের পায়াগুলো শক্ত বরফে আটকে গেছে। সে ভিতরে পৌছতেই ইচিকা এক মুহুর্তের মধ্যে দরজা বন্ধ করে দিয়ে ইঞ্জিনের তাপ বিদারণ চালু করার নির্দেশ দিল মেশিনে। আগুনের তাপে বরফ গলিয়ে যখন অয়নদের রোভার জমি ছাড়ল ততক্ষণে ইউরোপার শুভ্র প্রান্তর জুড়ে একটা রঙিন আগুন খেলা করছে। অয়নের যন্ত্র থেকে বেরোনো আগুনের নীল রশ্মি বরফের নীচে ছড়িয়ে গেছে যতদুর চোখ যায়, কিন্তু তাতে বরফ গলছে না। বরং মনে হচ্ছে বরফের নীচে দিয়ে একটা নীলরঙা ড্রাগন ঘুরপাক খাচ্ছে। জলস্তম্ভগুলো জমে নারকেল গাছের মতো উঁচু হয়ে গেছে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অয়ন বলল, “ইচিকা, তুমি ঠিক আছ?”

ইচিকা সেই কথার উত্তর না দিয়ে উত্তেজিত স্বরে অয়নকে বলল, “এটা কী হল অয়ন?”

অয়ন ছোটো হতে থাকা ইউরোপার দিকে তাকিয়ে ছিল। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে সে বলল, “পুরো ইউরোপা জুড়ে বরফের তলায় একটা ফুটন্ত সমুদ্র আছে। আমার মনে হয় আমাদের সমুদ্রের জোয়ার ভাটার মতন এখানেও যখন জোয়ার হয়, সেই ফুটন্ত জল ওপরে উঠে আসতে চায় কিন্তু সমুদ্রের ওপরের স্তর আগেই বরফাবৃত। তাই ফোয়ারার মতো অনেক জায়গা থেকে জল উঠে আসে। এখানকার তাপমাত্রা এতটাই কম যে জল কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই বরফে পরিণত হয়। এই জমে যাওয়া জলস্তম্ভগুলোই পরে বরফের টিলাতে রূপান্তরিত হয়। প্রতিদিন এই ভাবে ইউরোপার ওপরের প্রান্তর বদলে যাচ্ছে।”

ইচিকা মাথায় হাত দিয়ে বলল, “তোমার কথাই ঠিক। যতদুর মনে হয় ভূমিগত জলে নানা রকম জ্বলনশীল গ্যাস মিশে আছে, সেই জন্যেই তোমার আগুনের ছোঁয়া লেগে সেই আগুন বরফের প্রান্তরের নীচে ছড়িয়ে গেছে।”

অয়ন ভেবে দেখল কথাটা ঠিকই। তার ভাগ্য ভালই বলতে হবে। আগুনের ছোঁয়া লেগে যদি বরফে বিস্ফোরণ হত তাহলে আর দেখতে হত না। ইচিকার দিকে তাকিয়ে সে দেখল সে হতাশ হয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে আছে। অয়ন প্রশ্ন করল, “কী হল ইচিকা?”

ইচিকা আস্তে আস্তে বলল, “ছোটোবেলা থেকে শুনে আসছি যে আমাদের সৌরজগতে ইউরোপাতেই প্রাণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। জল আছে, জমি আছে। আজকের অভিজ্ঞতার পর ইউরোপাতে মানুষের বসতির সম্ভাবনা চিরকালের মতো মুছে গেল। এখানে কোন প্রাণ থাকতে পারে না। হয়তো ভবিষ্যতে কোনো সময়ে এখানে কোনোভাবে মানব বসতি হতে পারে, কিন্তু এই মুহুর্তে সেটা সম্ভব নয়।”

২০২৯, টাইটান, শনিগ্রহের উপগ্রহ

দুদিন হল অয়নরা এসে ক্যাম্প করেছে টাইটানে। ইউরোপার বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা তারা একটু একটু করে কাটিয়ে উঠেছে। প্রফেসর ওয়াং এর পাঠানো বার্তা পড়ে তারা একটু হলেও সান্ত্বনা পেয়েছে। তিনি সকলকে বলেছেন যে কোনক্রমেই নিরুৎসাহ না হতে। তাদের উদ্দেশ্য অনেক মহৎ, অনেকটা পথ বাকি আছে। ইউরোপা এই যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ, এখন জানা অজানা কত বিপদ, কত সাফল্য, কত ব্যার্থতা তাদের অপেক্ষায় আছে। মানুষের ভবিষ্যৎ লিখতে চলেছে তারা, এখনি হতাশ হওয়া কোনোমতেই চলবে না।

ইউরোপার পর তাদের গন্তব্য টাইটান। শনিগ্রহের এই উপগ্রহকে নিয়ে ছোটোবেলা থেকে নানা মাইথলজিকাল গল্প শুনে আসছে সকলেই। প্রচন্ড শীত থাকা সত্ত্বেও টাইটানে অনুকুল আবহাওয়া আছে মানববসতির জন্যে। আছে জল, হাইড্রোকার্বন আর প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন। মহাকাশ বিকিরণ ও মাধ্যাকর্ষণ অনেক কম। তাই সহজেই টাইটানে মানুষ উড়ে বেড়াতে পারে। সেই স্বাদ অবশ্য এই দুদিনে অয়নরাও পেয়েছে। দুটো রোভারে নেমে এসে তারা টাইটানের ওপর একটা অস্থায়ী তাঁবু ফেলেছে দিন কয়েকের জন্যে। সৌরজগতের সীমানার ভিতর এটাই তাদের শেষ ঠিকানা। এরপর থেকে আরম্ভ হবে অবিরাম যাত্রা, যা চলতে থাকবে বছরের পর বছর।

এখানের তিনদিনের ছুটি যতটা টাইটানের মাটি জরিপ ও সমীক্ষা করার জন্যে, ততটাই মন ও মাথাকে খানিকটার জন্যে হলেও বিশ্রাম দেওয়ার জন্যে।

অলিভার তাদের জন্যে তৈরি হাওয়া দিয়ে ফোলানো থাকার জায়গায় ঢুকে টিনের স্যামন মাছ রান্না করছে। ও রান্না করতে ভালোবাসে। কিন্তু এযাত্রায় তাদের রান্নার সুযোগ হয়তো কমই আসবে। ডক্টর জস আর ইচিকা তাদের রোবটদের নিয়ে বেরিয়েছে উত্তর দিকে।

কাল টাইটানের মাটিতে পা দিয়েই তারা বুঝেছিল, এখানকার মাটি হল নরম বালির মতন। পায়ের চাপে অনেকটা গর্ত হয়ে যায় প্রতিবার। কাছাকাছির মধ্যে তিনটে তরল মিথেনের হ্রদও দেখতে পেয়েছে তারা। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল এখানকার অভিকর্ষ। এক লাফে হনুমানের মতো উড়ে যাওয়া যায় সহজেই। প্রথমদিন এসে তাদের মধ্যে লাফালাফির হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। ছোটোদের মতন আনন্দে হাওয়ায় পাক দিতে দিতে হেসে ফেলেছিল অয়ন। এখন তাদের দেখলে কে বলবে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মহাকাশ অভিযানে বেরিয়েছে?

অয়ন ক্যাম্পের বাইরে বেরিয়ে হাঁটাহাঁটি করছিল। গাব্দা গোব্দা মহাকাশের পোশাক পরেও হাঁটতে খারাপ লাগে না তার। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে তাদের সঙ্গে থাকা হিউমোনয়েড সাবমেরিন রোবট আজ অনুসন্ধান শুরু করবে মিথেন হ্রদের গভীরে নেমে। একটা ব্যাপারে তাদের কোনো সন্দেহ নেই। টাইটানে প্রাণ যদি নাও থেকে থাকে, এই পরিবেশে প্রচুর পরিমাণে জ্বলনশীল গ্যাস আর জীবাশ্ম নির্ভর ইন্ধন পাওয়া যায়। পৃথিবীতে যেভাবে জ্বালানির অভাব দেখা দিচ্ছে, ভবিষ্যতে এখান থেকে পৃথিবীতে জ্বালানি সরবরাহ করলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। জ্বলনশীল গ্যাস থাকলেও অক্সিজেন না থাকার কারণে আগুন জ্বালানোর কোন উপায়ই এখানে নেই।

এমন সময় অয়নের কানে লাগানো মাইকে ডক্টর জসের গলা শোনা গেল, “দিস ইস আর ফাইভ। অয়ন, অলিভার, আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?”

অয়ন বলল, “কপি ডক্টর জস। আপনার কথা শুনতে পারছি। ওখানে সব ঠিক আছে?”

“ইস্টপ সাবমেরিনগুলো জলের তলায় পাঠানো হয়েছে। অবস্থান পরিবর্তন করার পর ছবি তুলতে শুরু করেছে তারা। আমরা একটা আশ্চর্য জিনিস দেখতে পাচ্ছি হ্রদের গভীরে অয়ন। তুমি আর অলিভার এক্ষুণি এখানে চলে এস।”

“কী দেখতে পাচ্ছেন ডক্টর?” অলিভারের গলা শুনতে পেল অয়ন।

“ঠিক বোঝাতে পারব না। তোমরা এখনি চলে এস।”

অলিভারকে নিয়ে চার লাফে হাওয়া কেটে অয়ন যখন উত্তরের মিথেন হ্রদ লিগেরিয়া মারের সামনে পৌঁছলো তখন আকাশে শনিগ্রহের বলয়গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

হ্রদটা বিশাল, এপার ওপার দেখা যায় না, হ্রদ না বলে সমুদ্র বললে খুব একটা বাড়াবাড়ি হবে না। ইচিকা আর ফাইভ রোভারের নিয়ন্ত্রক পর্দার সামনে বসে চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সামনে। ওদের দুজনকে আসতে দেখেই সে উঠে দাঁড়াল। প্রফেসর জস তাদের বললেন, “স্ক্রিনে একটু দেখে বলবে এই জিনিসটা দেখে তোমাদের কী মনে হচ্ছে?”

ইচিকা অলিভারের দিকে তাকিয়ে বলল, “ইস্টপ প্রায় ঘন্টা দুয়েক আগে লিগেরিয়ার গভীরে নেমেছে, তারপর থেকে ক্রমাগত রেডার ছবি পাঠাচ্ছে আমাদের। কয়েকটা স্টিল ছবিও পাঠিয়েছে। আমরা বুঝে উঠতে পারছি না হ্রদের মধ্যে এই জিনিসটা কী? কোনো কোনো ছবিতে দেখা যাচ্ছে কিন্তু কোনো কোনো ছবিতে এটার কোনো চিহ্ন নেই। তোমাদের কী মনে হয়?”

অয়ন আর অলিভার স্ক্রিনের ওপর ঝুঁকে পড়ল। ইচিকা ঠিকই বলেছে। একের পর এক ছবিতে দেখে ব্যাপারটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, একটা আকৃতি কয়েকটা ছবিতে আছে, আবার কয়েকটাতে একেবারে উবে গেছে।

অলিভার মন দিয়ে দেখে বলল, “আইসবার্গ বা হিমশৈল জাতীয় কিছু কি হতে পারে?

ডক্টর জস চিন্তিত মুখে বললেন, “লেকের গভীরে হিমশৈল? কোনো কিছুর সম্ভাবনাই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু এই ব্যাপার টাইটানে নতুন নয়।”

সকলে অবাক হয়ে তার দিকে তাকালো। অয়ন প্রশ্ন করল, “কী বলতে চাইছেন ডক্টর জস?”

ডক্টর জস একটু সময় নিয়ে বললেন, “ব্যাপারটা বোধহয় তোমাদের জানা নেই। ২০১৩ সালে ক্যাসিনো প্রোব বলে যন্ত্রচালিত রোভার যখন টাইটানের অনেক ছবি তুলে নিয়ে গিয়েছিল তখনও নাসাতে এই ব্যাপারটা লক্ষ করেছিল বৈজ্ঞানিকেরা। ক্রাকেন, লিগেরিয়া আর পুঙ্গা এই তিনটে হ্রদেই একই ব্যাপার। কয়েকটা ছবিতে একটা আকৃতি দেখা যাচ্ছে, কিন্তু কয়েকটাতে সেই জিনিসটা বেমালুম হাপিস হয়ে গেছে। যদিও ক্যাসিনো প্রোব হ্রদের গভীরে না নেমে শুধু ওপর থেকেই ছবি তুলেছে কিন্তু তাও এই ব্যাপারটা নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে হইচই হয়েছিল বেশ কয়েকদিন। জেসন হাফগার্টনর বলে যে বৈজ্ঞানিক এই নিয়ে গবেষণা করছিলেন, তিনি ওই বিন্দুটাকে নাম দেন ম্যাজিক আইল্যান্ড বা ম্যাজিক ব্লব।”

ইচিকা উত্তেজিত কন্ঠে বলল, “কিন্তু তাহলে আসলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? জিনিসটা আসলে কী?”

কিছুক্ষণের জন্যে কেউই কথা বলল না। যে সম্ভাবনাটা মাথায় আসছে সেটা সত্যি হলে কী কী হতে পারে সেই ভেবেই হয়তো কথাটা সবার সামনে বলতে কিন্তু কিন্তু করছিল সকলেই। শেষ পর্যন্ত অয়ন নীরবতা ভেঙে বলল, “জিনিসটা যদি জীবন্ত কোন কিছু হয়?”সকলের মনে এই কথাটাই ঘুরছিল। দলের মধ্যে একটা উত্তেজনা ছড়িয়ে গেছে। ডক্টর জস ঘন ঘন আঙুল মটকাচ্ছেন। ইচিকার মুখ হাঁ হয়ে আছে। অবশেষে অলিভার বলল, “পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সন্ধান করা আমাদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। কোন জীবন্ত প্রাণীর পক্ষেই এরকম জায়গা বদলানো সম্ভব। এখনো যদিও জোর দিয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না, তবে ব্যাপারটা আমাদের ভালো করে খতিয়ে দেখতে হবে।”

সকলেই সায় দিল তার কথায়। ইচিকা বলল, “যদি সত্যি এটা কোন প্রাণী হয়ে থাকে তাহলে আমাদের অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।” অয়ন মাথা নাড়ল। মহাকাশে প্রাণের সন্ধান পাওয়া যতটা উত্তেজনার, ততটাই ভীতিকর। যতক্ষণ না অনুসন্ধান শেষ হচ্ছে, কোন কিছুই জোর দিয়ে বলা ঠিক হবে না।

ইস্টপ বলে মাত্র একটা হিউমোনয়েড সাবম্যারিন প্রোব আছে তাদের সঙ্গে। তিনটে হ্রদের জলে একটা সাবমেরিনের সাহায্যে অনুসন্ধান করা অসম্ভব। আলোচনা করে ঠিক করা হয় শুধু লেক লিগেরিয়ার জলেই সন্ধান করা হবে। বেসক্যাম্প থেকে ছোটো একটা বাতাস দিয়ে ফোলানো তাঁবু আর দরকারি জিনিসপত্র নিয়ে এল অয়ন আর ইচিকা। ততক্ষণে ক্যাপকম অলিভার পিসিপিএজি-কে বার্তা পাঠিয়ে দিয়েছে।

ইচিকা বলল, “তিন ঘন্টার বেশি একসঙ্গে ইস্টপ কাজ করতে পারবে না। বাকি রোবটরা ততক্ষণে জমি খুঁড়ে স্ক্যানের কাজ করে নিক। এরপর কী হতে পারে কেউ জানে না।”

প্রথম ধাপে সাবমেরিন জলে নামিয়ে রেডার ছবির পাশাপাশি নানা ধরনের তরঙ্গ পাঠানো শুরু করল তারা। একশ পঞ্চাশ কিলোমিটার গভীর এই বিরাট হ্রদের সমস্তটা ধরে অনুসন্ধান করা তাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়, একটা বিশেষ জায়গা বেছে নিয়ে সেই চৌহদ্দিতেই শুরু হলো অনুসন্ধান। যদি কোনো জীবিত প্রাণী সত্যি থেকে থাকে, আগামী চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে কোনো না কোনো ভাবে এই পরিধির মধ্যে তাদের যাওয়া আসা ঘটতেই পারে।

সময় কাটতে লাগল। ইচিকা ঠায় রোবট কন্ট্রোল হাতে নিয়ে বসে আছে। প্রফেসর জস আর অলিভার উদ্বিগ্ন মুখে চেয়ে আছে জলের দিকে, যেন এই কোন বিশালাকায় দৈত্যের মতো প্রাণী উঠে আসবে হ্রদের তলা থেকে।

অলিভার বলল, “পরজীবী অর্থাৎ মাইক্রো অর্গানিজমের কারণেও মিথেন তৈরি হয়। তাহলে পরজীবীর মতো ছোটো ছোটো জীব এখানে থাকা অসম্ভব নয়।”

ডক্টর জস বললেন, “সেই সম্ভাবনা টাইটানে অনেকটাই কম। পৃথিবীর মাইক্রোঅর্গানিজমের অনেকটাই সেখানে পাওয়া অক্সিজেনের কারণে। এই লেকে জল নেই, অক্সিজেনও নেই। ভেবে দেখ, তোমার সামনে একটা জ্বলনশীল তরলের সমুদ্র, কিন্তু তুমি দেশলাই কাঠি ফেললেও এখানে আগুন জ্বালাতে

পারবে না অক্সিজেনের অভাবে।”

ডক্টর জসের কথা শুনে হঠাৎ অয়নের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। এক লাফে ইচিকার কাছে পৌঁছে সে বলল, “আমাদের কাছে তো অক্সিজেন ফ্লেয়ার আছে?”

ইচিকা কিছু বুঝতে না পেরেও মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। ততক্ষণে তার পিছনে অলিভার আর ডক্টর জস এসে দাঁড়িয়েছে। ডক্টর জস প্রশ্ন করলেন, “কী হয়েছে অয়ন? অক্সিজেন ফ্লেয়ার লাগবে কেন?”

অয়ন তাদের দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত গলায় বলল, “ভেবে দেখুন ডক্টর জস, রেডার ছবি ছাড়া আমাদের কাছে কিছুই নেই। যদি সত্যি এটা কোন প্রাণী হয়ে থাকে, তাহলে তার চলাফেরা আমাদের যন্ত্রে ধরা পড়ছে না। একমাত্র উপায় যদি আমরা লেকের পরিসীমায় আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারি। সেই আগুনে প্রাণীটা পালানোর চেষ্টা করবে, অথবা উঠে আসবে ডাঙায়। আর কিছু না হলেও স্টিল ক্যামেরাতে পরিষ্কার দেখা যাবে তাকে!”

ইচিকা আতঙ্কিত স্বরে বলল, “তুমি জানো অয়ন তুমি কী বলছ? মিথেনের হ্রদে আগুন জ্বালালে এক মুহুর্তে সমস্ত সমুদ্র জ্বলতে শুরু করবে। যদি কোন অন্য প্রাণী থেকেই থাকে মুহুর্তের মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। তা যদি নাও হয়, যদি সেই প্রাণী ভয় পেয়ে আরো গভীরে চলে যায়, আমাদের পরিধির বাইরে চলে গেলে তার কোনো প্রমাণই পাওয়া যাবে না।”

অয়ন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “ইচিকা, তুমি আসল কথাটাই ভুলে যাচ্ছ উত্তেজনাতে। এখানে অক্সিজেন নেই, আগুন ছড়িয়ে যাওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না। আমরা একটা বিশেষ জায়গায় অক্সিজেন ফ্লেয়ার দিয়ে সেখানে নিয়ন্ত্রিত আগুন জ্বালাব। কোন ঝামেলা হলে অক্সিজেন ফ্লেয়ার বন্ধ করে দিলেই আগুন অক্সিজেন না পেয়ে আগুন নিজেই নিভে যাবে।”

অলিভার এবার বলল, “অয়নের কথায় যুক্তি আছে, কিন্তু আগুন জ্বালালেই যে সেই প্রাণীকে দেখা যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এত বড়ো হ্রদে সে যেকোনো জায়গায় থাকতে পারে। সেক্ষত্রে আমরা কী করব?”

ডক্টর জস উত্তর দিলেন, “সেই সম্ভাবনা কম। আমরা সকালে প্রায় চার ঘণ্টা ধরে হ্রদের তলায় রেডারে ছবি তুলেছি। জিনিসটা যাই হোক, সে একটা বিশেষ জায়গার ভিতরেই আছে বলে আমার ধারণা। আমাদের হাতে বিশেষ সময় নেই। কাজ শুরু করে দেওয়া যাক, কী বল?”

সকলেই সম্মতি দিল। ইচিকা রোভারের ভিতর থেকে সাবমেরিনের নির্দেশ ঠিক করতে লাগল। অয়ন হাতঘড়ি দেখল, দেড় ঘণ্টা হয়ে গেছে। আগামী দেড় ঘণ্টায় কোনো ফল না হলে সাবমেরিনকে ওপরে আসতেই হবে। এমনিতে অক্সিজেন ফ্লেয়ার আকস্মিক মহাকাশ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযাত্রীদের প্রাণ বাঁচানোর জন্যে ব্যবহার করা হয়। একবারে কাজ না হলে অবশিষ্ট ফ্লেয়ারগুলো এই কাজে কোনমতেই ব্যবহার করা যাবে না।

“ইস্টপ থেকে মাটি খোদাইয়ের ঘূর্ণনশীল চাকাটি পৃথক করে দেওয়া হয়েছে। সাবমেরিনকে লিগেরিয়ার গভীরে তিনশ মিটার নামানো হচ্ছে ছবি তোলার জন্যে। পরিসীমা নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে। ফ্লেয়ার্স প্রস্তুত। প্রজ্জ্বলন অনুক্রম প্রস্তুত। প্রতিক্রিয়া অবিলম্বে।”

অয়নদের দিকে একবার তাকিয়ে ইচিকা সাবমেরিন সংযুক্ত অক্সিজেন ফ্লেয়ার শুরু করে দিল। সকলে সাবমেরিন থেকে সরাসরি পাঠানো ভিডিওর ওপর ঝুঁকে পড়েছে। ইচিকা বোতাম টিপতেই লেকের ভিতরে আগুন জ্বলে জায়গাটাকে আলোকিত করে দিল। কিন্তু এই আগুন পৃথিবীর মতন নয়, এতে একটা নীলাভ সবুজ ভাব আছে। ইচিকা একদৃষ্টিতে ভিডিও স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অক্সিজেনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে।

এখন হ্রদের তলাটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। কোন বুদ্বুদ নেই, গাছপালা নেই, শ্যাওলা নেই, উদ্ভিদ নেই, শুধু মিথেনের সমুদ্র। অয়ন ইচিকাকে বলল, “সাবমেরিন আরেকটু এগিয়ে নিয়ে যাও। কোন গতিবিধি দেখলেই অক্সিজেনের মাত্রা বাড়িয়ে দিও।”

ইচিকা সেইমতো এগিয়ে নিয়ে গেল সাবমেরিন। ক্রমে তারা সকলেই দেখতে পেল লেকের তলায় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে একটা পাহাড়। সেই পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য ছোটো বড়ো গর্ত।

ডক্টর জস চেঁচিয়ে উঠে বললেন, “ও মাই গড। এখানে তো দেখছি বিশাল এক ইকোসিসস্টেম! ”

সুড়ঙ্গ! ছোটো বড়ো নানা সুড়ঙ্গ বুঝতে পারা যাচ্ছে হালকা আগুনের আভায়। তার একেকটা এত বড়ো যে দুজন তিনজন মানুষ একসঙ্গে ঢুকতে পারে। অধীর আগ্রহ আর উত্তেজনার মধ্যেও ইচিকার হাত একবারের জন্যেও কাঁপেনি। অয়ন ইচিকার উদ্দেশ্যে বলল, “ওই সুড়ঙ্গের মুখে আগুনটা দাও। আগুনের তেজটা আরেকটু বাড়িয়ে দাও।”

ইচিকা সেই কথা মতো সুড়ঙ্গের মুখে আগুন ফেলতেই একটা গুম গুম করে আওয়াজ শুরু হলো। সঙ্গে সঙ্গে একটার পর একটা বিস্ফোরণ শুরু হলো সুড়ঙ্গের ভিতরে। লাল নীল সবুজ আলোর ছটার বিচ্ছুরণে অয়নদের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সহসা ঝড়ের মতো একটা অদৃশ্য কিছু এসে ধাক্কা মারলো সাবমেরিনে। ভিডিও আবছা হতে শুরু করেছে। ইচিকা এর মধ্যেই চিৎকার করে বলল, “ওটা কী?”

আলোর বিচ্ছুরণের মধ্যে কালো রঙের একটা লম্বা শরীর ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে সাবমেরিনটাকে ঘুরে। এই কি সেই প্রাণী? উত্তেজনায় অয়নদের দমবন্ধ হয়ে গেছে। প্রাণীটার মুখ চোখ কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু তার শরীরের নানান জায়গা থেকে বিভিন্ন রঙের আলোর বিচ্ছুরণ হচ্ছে।

এমন সময় ইচিকা আবার চেঁচিয়ে বলল, “আমি সাবমেরিনটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না, কিছুতেই পারছি না।”

সাবমেরিনের চারধারে ঝড়ের বেগে ঘুরপাক খেতে খেতে একসময় প্রাণীটা অদৃশ্য হয়ে গেল। অয়নদের চার জোড়া হতভম্ব চোখের সামনের পর্দা জুড়ে পড়ে রইল অন্ধকার।

২০৩০, নেপচুন থেকে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দুরে

আজ আট মাস হল অয়নরা এগিয়ে চলেছে সৌরজগতের শেষ বিন্দুর দিকে। টাইটানের অভিজ্ঞতার জের তাদের এখনো কাটেনি। টাইটানের বুকে কি তারা সত্যি কোন প্রাণীর সাক্ষাত পেয়েছিল? হ্রদের গভীরে কোন অজানা কারণে তাদের অত্যাধুনিক সাবমেরিন ভোজবাজির মতো লোপাট হয়ে গেল সেটা তারা আজও বুঝে উঠতে পারেনি।

সাবমেরিনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর কোনো নিয়ন্ত্রণই আর কাজ করেনি। পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সন্ধান অদ্ভূতভাবে তাদের মনে কোনো আনন্দের সঞ্চার করতে পারেনি। হয়তো অয়ন, ইচিকা, অলিভাররা মনে মনে বিশ্বাস করবে যে সত্যি কোন প্রাণী থাকে টাইটানের হ্রদের তলায় কিন্তু পৃথিবীর মানুষকে বিশ্বাস করানোর মতো প্রমাণ তাদের কাছে নেই।

প্রফেসর মিগুয়েল আর প্রফেসের ওয়াং এর সঙ্গে এই নিয়ে বহুবার আলোচনা হয়েছে তাদের। তাদের মতে হ্রদের তলায় সুড়ঙ্গের মধ্যে খুব কম পরিমাণে অক্সিজেন রয়েছে। সেই অক্সিজেনের জোরেই সুক্ষ্ম কোন জৈবিক প্রক্রিয়ায় প্রাণের সঞ্চার হয়েছে সেখানে। সেই জন্যেই সুড়ঙ্গের মুখে আগুন দেওয়ার ফলে সেখানে আগে থেকে থাকা অক্সিজেন হ্রদের মিথেন আর অক্সিজেন ফ্লেয়ারের সংস্পর্শে এসে বিস্ফোরণ শুরু করে। এই সুড়ঙ্গগুলোই টাইটানের প্রাণীদের থাকার জায়গা, যদিও বিবর্তন চক্রে তারা অনেক পিছিয়ে আছে।

সময় থেমে থাকে না। একসময় আবার যাত্রা শুরু হয়েছিল। যত তারা এগিয়েছে, গতিপথের হিসেব করা হয়ে উঠেছে আরো কঠিন। ইউরেনাস আর নেপচুন সূর্যের পরিক্রমা করছে তাদের নিজস্ব কক্ষপথে। সোজা রকেট নিয়ে এগোলে কোন গ্রহ উপগ্রহই তাদের রাস্তায় পড়বে না। এই আট মাসে তারা সবসুদ্ধ তিনটে জায়গায় অনুসন্ধান চালিয়েছে প্রোব নামিয়ে। তার মধ্যে ইউরেনাস এর উপগ্রহ টিটানিয়া আর মিরান্ডা এবং নেপচুনের উপগ্রহ ট্রাইটিয়ম আছে। কোন গ্রহেই প্রাণের কোন চিহ্ণ পাওয়া যায়নি। সূর্য থেকে অনেক দুরে থাকার ফলে হয় এই সব গ্রহ আর উপগ্রহ প্রচন্ড ঠান্ডা, অথবা এখানে সারাক্ষণ হাজার হাজার জীবন্ত আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুত্পাত হয়ে চলেছে।

গত কয়েকদিন আগে সৌরজগতের শেষ অভিযানের পর এখন শুধু অপেক্ষার পালা। আর কিছুদিন পরেই তারা প্লুটো ছাড়িয়ে সৌরজগতের বাইরে উড়ে চলবে কয়েক বছর ধরে। সেই অভিজ্ঞতার জন্যে সকলে উদগ্রীব হয়ে থাকলেও, ভয়ের একটা অনুভূতি মনকে আনচান করছে। ডক্টর জসের কাজ হয়ে উঠেছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন শরীর ঠিক রাখার জন্যে নানা ধরনের ওষুধ খেতে হয়। অয়ন সকালে বাড়ির মতনই চা খেয়ে খবরের কাগজ নিয়ে বসে। সবই অবশ্য পুরোনো কাগজ, অনেকগুলো রবিবাসরীয় সংখ্যা নিয়ে এসেছে সে। পৃথিবীতে থাকার সময়ও কাজের চাপে সে বাংলা প্রায় ভুলতে বসেছিল। এখন অবশ্য তার হাতে অঢেল সময়, কাজকর্ম আর প্রতিদিনের লগবুক লেখার ফাঁকে সময় পেলেই সে কোনো না কোনো বই মুখে দিয়ে বসে পড়ছে।

সব সময় অবশ্য বই পড়া হয় না। রান্নার কাজে হাত লাগাতে হয় ইচিকা আর অলিভারের সঙ্গে। অলিভার পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার প্রধান দায়িত্বের পাশাপাশি তাদের রাঁধুনি হওয়ার কাজটাও ঘাড়ে নিয়েছে। ইচ্ছে করেই তাদের রকেটে টিনের খাবারের সঙ্গে সঙ্গে কত ছোটো রান্নাঘর তৈরি করা হয়েছে যাতে রান্না করার অছিলায় রোজ তাদের কিছু কাজ করতে হয়। তাতে মন ভালো থাকে। বাইরে থেকে থেকে রান্নার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল অয়নের। কিছুদিন অনুশীলনের ফলে সে আজকাল ভালই রান্না করছে। ইচিকা একদিন তার সঙ্গে অলিভারের রান্নার কম্পিটিশন করবে বলে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে।

বিকেলে রান্নার পাশাপাশি চলে গান। সারাক্ষণ নানা ধরনের গান চলছে। কখনো জ্যাজ, কখনো ক্লাসিকাল, কখনো আবার কান্ট্রি সঙ। অয়ন একদিন রবীন্দ্রসঙ্গীতও চালিয়েছিল। তার সঙ্গে কোনদিন দাবা, কোনোদিন মেমরি গেম, কোনোদিন ক্যারম খেলা হয়। এর মধ্যে বাইরে কিছু দেখতে পাওয়া গেলে সকলে সব কাজ ছেড়ে ছুটে আসে মনিটরের সামনে। অয়নের মনে আছে, প্রথমবার নেপচুনের ঘন নীল রং দেখে তার যেরকম অনুভূতি হয়েছিল, ঠিক সেইরকম অনুভূতি হয়েছিল ছোটোবেলায় মায়ের হাত ধরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সময়। এমন সুন্দর সেই দৃশ্য যে চোখ বন্ধ করা যায় না, নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।

আজকের দিনটা অবশ্য অন্যরকম। আজ অয়নের জন্মদিন। মহাকাশে চলমান অবস্থার মধ্যেও আয়োজনের ত্রুটি রাখেনি ইচিকারা। অলিভার যে এখানে কেক কী করে বানাল সেটা অনেক মাথা ঘামিয়েও অয়ন বুঝে উঠতে পারল না। প্রায় এক দশক পর মোমবাতিতে ফুঁ দিয়ে কেক কাটল অয়ন। কেকের টুকরো সকলের মুখে তুলে দিতে দিতে তার খেয়াল হল, পরের বছর সে পৃথিবী থেকে অনেক অনেক দুরে চলে যাবে। ফিরে আসতে যে পারবেই, সে নিশ্চয়তাও নেই।

ডিনার করার পর ডক্টর জস সকলকে বললেন, “আর দুমাসের মধ্যেই আমরা সৌরজগত বহির্ভূত আন্তনক্ষত্র মহাকাশে গিয়ে পড়ব। প্রক্সিমা সেন্টরি পৌঁছতে মোটামুটি আট বছর লাগবে। এই যাত্রাপথের কোন ধারনাই আমাদের নেই। কোন গ্রহ, নক্ষত্র, উপগ্রহ নেই এর মাঝে। তাই যদি হয়, আমার মনে হয় প্রফেসর মিগুয়েলের সিমুলেশন হেলমেট ব্যবহার করার সময় এসে গেছে।”

অয়ন বলল, “আমার একটা প্রশ্ন মনে উঁকি দিচ্ছে। ক্রায়জেনিক অবস্থায় থাকার সময়ে আমাদের মস্তিস্ক হয়তো সজাগ থাকবে, রকেটের যন্ত্রপাতি, গতিপথ বা অন্য কোন যান্ত্রিক গোলমাল রোবটদের নির্দেশ দিয়ে হয়তো ঠিক করে ফেলা যাবে। কিন্তু যারা ক্রায়জেনিক অবস্থায় থাকবে না, তাদের যদি কোন রকম সাহায্যের দরকার হয়? আমাদের শরীর নিষ্ক্রিয় থাকলে আমরা কোনভাবেই তাকে সাহায্য করতে পারব না।”

ডক্টর জস মাথা নেড়ে বললেন, “তুমি ঠিক বলেছ অয়ন। সেই জন্যেই আমরা সকলে একসঙ্গে এই হেলমেট পরব না। আমার প্রস্তাব, চার বছর করে দুজন এই হেলমেট ব্যবহার করুক। যারা প্রথমে ক্রায়জেনিক অবস্থায় যাবে, জেগে উঠে তারা এই চার বছরের অভিজ্ঞতা তাদের মাথার চিপে ট্রান্সফার করতে পারবে।”

সকলেই এই কথায় সায় দিল। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। অয়ন তার নিজের জায়গায় গিয়ে চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ, তারপর একটা বাংলা বই খুলে বসল।

২০৩৪, প্রক্সিমা সেন্টরির পথে

ট্রেলব্লেজার মহাকাশযান, আন্তনক্ষত্র মহাকাশ

মাথার মধ্যে একটা চিনচিনে যন্ত্রণা হচ্ছে। অয়নের ইচ্ছে করছে আরো খানিকটা ঘুমিয়ে নেয়। কিন্তু কে যেন তার কাঁধ ধরে ঠেলা দিচ্ছে ক্রমাগত। অনেক কষ্টে চোখ খুলল অয়ন। কিন্তু মাথায় এখনো যন্ত্রণা হচ্ছে। অয়ন আবার চোখ বন্ধ করল।

“অয়ন, অয়ন।” কে যেন তার নাম ধরে ডাকছে। কষ্ট করে আবার চোখ খোলার চেষ্টা করল অয়ন। সামনে একজন দাঁড়িয়ে আছে। কিছু বোঝার আগেই কে যেন ইনজেকশনের একটা সিরিঞ্জ তার হাতে ফুটিয়ে দিল। একটা চিনচিনে ব্যথা, তারপর কয়েক মুহূর্ত পর সে সামনের লোকটিকে চিনতে পেরে বলে উঠল, “ডক্টর জস।”

ডক্টর জস স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। অয়নের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “আর ইউ অল রাইট মাই সন? কেমন লাগছে তোমার?”

“মাথায় একটু ব্যথা।” অয়ন সত্যি কথাটাই বলল। প্রায় মিনিট পনেরো লাগল অয়নের সহজ হতে। ধীরে ধীরে তার মনে পড়ল সব কথা। ২০৩০ সালে সৌরজগত পেরোনোর পর অয়ন আর ইচিকা হেলমেট পরে ক্রায়জেনিক ঘুমে চলে গিয়েছিল চার বছরের জন্যে। তারা জেগে উঠলে ডক্টর জস আর অলিভার হেলমেট পরবে।

সব কথা মনে পড়তেই অয়ন ধড়মড় করে উঠে বসল। চার বছর এত তাড়াতাড়ি কেটে গেল! তার মনে হচ্ছে গতরাতেই সে ঘুমাতে গেছে। সে উদ্বিগ্ন হয়ে ডক্টর জস কে প্রশ্ন করল, “ডক্টর জস? আমরা এখন কোথায়? সব কি হিসেব মতো চলছে? ইচিকার ঘুম ভাঙেনি? অলিভার কই?” ডক্টর জস গম্ভীর মুখে অয়নকে এক গেলাস জল খেতে দিলেন। তার স্বাভাবিক হাসি না দেখতে পেয়ে অয়নের মনে কু ডাকতে লাগল। সব ঠিক আছে তো?

“ডক্টর জস? কথা বলছেন না কেন? সব ঠিক আছে তো?” অয়ন আবার প্রশ্ন করল।

ডক্টর জস মাথা নেড়ে বললেন, “অয়ন, আমরা সকলেই এখনো বেঁচে আছি। প্রফেসর মিগুয়েলের প্রযুক্তি ঠিক মতই কাজ করেছে। ছোটোখাটো ত্রুটি আর রকেট পরিচালনা করতে রোবটদের কোন অসুবিধে হয়নি, তোমার আর ইচিকার মস্তিষ্কের যাবতীয় কার্যক্ষমতা ঠিক ভাবেই চলেছে এই চার বছরে।”

“তবে? আপনি এত গম্ভীর হয়ে আছেন কেন? আপনি কী এড়িয়ে যাচ্ছেন ডক্টর জস?” অয়নের এবার ভয় করতে শুরু করেছে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডক্টর জস উত্তর দিলেন, “তোমাকে তো সব বলতেই হবে অয়ন। আমি আর পারছি না। তোমাকে সব বলে আমি বিশ্রাম নেব। তোমাদের ক্রায়জেনিক ঘুমে পাঠানোর এক বছর পর অবধি কোনো ঝামেলাই হয়নি। শুধু মহাশূন্যের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলা। সব কিছুই হিসেব মতো চলছিল। অলিভার রান্না করছিল, পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছিল, আমি রকেটের গতিপথের নকশার রেখাচিত্র তৈরি করে আবক্র পথ ঠিক করছিলাম। রেডার টেলিস্কোপে আমরা দুজনেই নানা ধুমকেতু, উল্কাপিন্ড আর নক্ষত্রঘন আকাশের প্রচুর ছবি তুলেছি। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে সেই অভাবনীয় ব্যাপার শুরু হয়, যা আমাদের কল্পনাতেও ছিল না।”

“কী হয়েছে ডক্টর? মহাকাশীয় বিকিরণ? কোনো দুরারোগ্য অসুখ? কী হয়েছিল ডক্টর? বলুন আমাকে…” অয়ন অধৈর্য হয়ে উঠেছে।

“এসব কিছুই নয়, অয়ন,” ডক্টর জস আস্তে আস্তে বললেন, “একাকিত্ব। একাকিত্ব অয়ন। এর চেয়ে বড়ো ব্যাধি আর কিছু নেই। বছরের পর বছর ধরে মহাশূন্যে কাটাতে গিয়ে এই ব্যাধিই আক্রমণ করল আমাদের। ধীরে ধীরে নিঃসঙ্গতায় আমাদের শরীর আর মন খারাপ হতে শুরু করল। সে যে কী ভয়ানক অবস্থা আমি তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না। অলিভার ঘুমানো একদম বন্ধ করে দিল, খাওয়া কমিয়ে দিল। আমার মনে হতে লাগল আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। অলিভারকে দেখলে আমি মুখ ঘুরিয়ে নিতাম, সে আমার দিকে ফিরেও তাকাত না। “দিনের পর দিন ধরে একরকম ভাবে আমরা চলেছি অজানার খোঁজে, কেন? আমাদের কী দায়? পৃথিবীতে গবেষণা করেই কি আমরা সুখে ছিলাম না? ব্রহ্মান্ডে সৃষ্ট প্রতিটা বিন্দুর মৃত্য নিশ্চিত, সে ক্ষুদ্র কোন জীব হোক, মানুষ হোক, অথবা গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি হোক না কেন? কিন্তু এরকম জীবিত অবস্থায় তিলে তিলে মরার আমাদের কী দরকার ছিল?

“রকেটের ভিতরের জীবনযাপন আমাদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠল। অলিভার এক সময়ে পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করা বন্ধ করে দিল। আমার মনে হতে লাগল আত্মহত্যাই একমাত্র রাস্তা। আমার পরিচিতদের আত্মাদের আমি চোখের সামনে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। মাথা ঠিক রাখার জন্যে এত ওষুধ খেয়েছি যে সেই ওষুধ কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম অয়ন।

“তারপর একদিন সেই ঘটনা ঘটে গেল। অলিভার চুপ করে বসে ছিল কন্ট্রোল রুমে। হঠাৎ সে হা হা করে হেসে উঠে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘এইখান থেকে বেরোনোর পথ পেয়েছি।’ তার তখন অর্ধোন্মাদ দশা।

“আমি প্রশ্ন করলাম, ‘কী উপায়? অলিভার লাল চোখে আমার দিকে তাকাল, তারপর ছুটল ইঞ্জিন কক্ষের নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের দিকে। আমিও তার পিছনে ছুটলাম। অলিভার একটানে রকেটের গতির হ্যান্ডেল চেপে খটখট করে নির্দেশ দিতে লাগল। আমি চিৎকার করে বললাম, ‘কী করছ?’ অলিভার আমার দিকে না তাকিয়ে বলল, ‘গতি বাড়িয়ে দিচ্ছি রকেটের। মুহুর্তের মধ্যে অভিযান শেষ করে আমরা বাড়ি ফিরব। আমার বাড়ির সামনের বাগানে বিকেলে বসে কফি খাব..’

“তারপর সে আবার হেসে উঠল। ততক্ষণে আমার জ্ঞান হয়েছে। অলিভারকে এক ধমক দিয়ে বললাম, ‘তুমি পাগল হয়ে গেছ, গতি কমাও! ’

“কিন্তু সে আমার কথা শুনতেই পেল না। আমি এগোতে যেতেই সে এক ধাক্কায় আমাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে আমার গলা টিপে ধরল। তারপর শুরু হল ধ্বস্তাধস্তি। একসময় আমি হাতের কাছে একটা টুলবক্স নিয়ে আঘাত করলাম অলিভারকে। সে উল্টে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। কোন রকমে গতি কমিয়ে ফিরে এলাম। অলিভারকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে ওর মাথায় হেলমেট পরিয়ে চার বছরের জন্যে হেলমেটটাকে সক্রিয় করে দিলাম। কিন্তু ততক্ষণে যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেছে।”

অয়ন ততক্ষণে থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। আলোর গতির কাছাকাছি চলে গেলে পৃথিবীর সময় তাদের তুলনায় অনেক তাড়াতাড়ি কেটে যাবে। সেই অবস্থাতেই সে চিৎকার করে প্রশ্ন করল, “কতটা সময় পেরিয়ে গেছে পৃথিবীতে ডক্টর জস?”

ডক্টর জস মাথা নীচু করে বললেন, “খুব কম সময়ের জন্যে অলিভার রকেটের গতি বাড়িয়ে ছিল। কিন্তু ঐটুকুর মধ্যেই পৃথিবীতে কেটে গেছে একশ চল্লিশ বছর।”

অয়ন মাথা ধরে বসে পড়ল। তার মাথার ভিতরে খালি খালি মনে হচ্ছে। চিন্তা করার মতো অবস্থা তার নেই। অনেক কষ্টে সে প্রশ্ন করতে পারল, “আমরা কোথায়?”

“আগামী ছয়মাসের মধ্যেই আমরা প্রক্সিমা সেন্টারিতে পৌছে যাব। কিন্তু তারপর কী হবে ভাবতে পারছি না। আমার আর কিছু বলার নেই অয়ন। আমি ছয় মাসের জন্যে হেলমেট পরে ক্রায়জেনিক স্লিপে যাচ্ছি। ইচিকার ওঠার সময় হয়ে গেছে। তুমি ওকে জাগিয়ে দিও। গত চার বছরের সমস্ত অভিজ্ঞতা ইচিকার আর তোমার মাথায় লাগানো এই দুটো যন্ত্রে স্থানান্তরিত করে দিয়েছি। এটা পরে নাও। দশ মিনিটের মধ্যেই তুমি সব জানতে পেরে যাবে। বিদায়।”

ডক্টর জস অয়নের সামনে থেকে চলে গেলেন। অয়ন মাথা নীচু করে মুহ্যমান অবস্থায় বসে রইল মাটিতে। অনেকক্ষণ সে একইভাবে বসে রইল সেখানে। তার চোখ থেকে অবিরাম জল ঝরছে। একসময় মনের সমস্ত জোর একত্র করে সে উঠে দাঁড়াল। নিজের মনেই বলল, কাউকে দোষ দিয়ে কোন লাভ নেই। তারা তো আগে থেকে জানতই, যেকোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে যাত্রাপথে, যা তারা আগে থেকে ভেবে রাখেনি।

ডক্টর ওয়াং এর দেওয়া যন্ত্র কানের পিছনের চিপের নির্ধারিত খোপে লাগিয়ে সে বোতাম টিপল। এক মুহুর্তের মধ্যে অনেক রকম দৃশ্য, ছবি, আর শব্দ এসে তার মাথায় ভিড় করতে লাগল। স্বপ্নের মধ্যে ছবি দেখার মতো করে প্রত্যেকটা ফ্রেম সরে যাচ্ছে একের পর এক। অয়ন পরিষ্কার মনে করতে পারল তার অবর্তমানের সব ঘটনা। অলিভারের গুম হয়ে বসে থাকা, রোবটের সাহায্য নিয়ে ইঞ্জিনের সার্কিট ঠিক করা, পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যাওয়া – সব ঘটনা যেন সে নিজে অনুভব করেছে। মিনিট কুড়ি পর যখন সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, গত চার বছরের সব ঘটনা পুঙ্খাণুপুঙ্খভাবে তার জানা।

পৃথিবীর নিয়মে ২১৮৮ সাল। প্রক্সিমা সেন্টরির পথে

“প্রফেসর ওয়াং? প্রফেসর মিগুয়েল? আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল যে সেই কমিটি...?” ইচিকা ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করল। ইচিকাকে ক্রায়জেনিক ঘুম থেকে তুলে অয়ন প্রথমে কিছুই জানায়নি। হঠাৎ করে এরকম ধাক্কা পেলে ইচিকা কীভাবে ব্যাপারটা নেবে সেই নিয়ে ভয় ছিল অয়নের। মেয়েটার মাত্র চব্বিশ বছর বয়স। পৃথিবীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পৌঁছতে এসেছিলেন তার বাবা, মা। ছোটো একটা বোন ছিল তার। তারা আজ কেউই বেঁচে নেই পৃথিবীতে।

পৃথিবীর কথা মনে পড়তেই অয়নের বুকের মধ্যে টনটন করে উঠল। তার নিজের আত্মীয়রাও আর কেউ নেই। মায়ের কথা অনেকদিন পর মনে পড়ল তার। তার ছোটো ভাই কলকাতায় মায়ের কাছে থাকত বলেই সে মার্কিন মুলুকে গিয়ে গবেষণা করতে পেরেছিল নির্ভাবনায়। তাদের একলা ছেড়ে এই অভিযানে আসতে দুবার ভাবেনি অয়ন। নিজেকে তার প্রচন্ড দোষী মনে হতে লাগল। ইচিকাকে সব কথা খুলে বলতে চার পাঁচ দিন সময় নিয়েছিল সে। প্রথমদিকে মানসিকভাবে প্রচন্ড অভিঘাত পেয়ে ভেঙে পড়লেও মেয়েটা এই কদিনে ধীরে ধীরে সামলে উঠেছে। মনে মনে তার ইচ্ছাশক্তির তারিফ না করে পারেনি অয়ন। ইচিকার সঙ্গে বসে আজ অয়ন তাদের অভিযানের ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা করছিল। পৃথিবীর সঙ্গে এই মুহুর্তে তাদের সবরকম যোগাযোগ কেটে গেছে। কথার মাঝখানেই ইচিকা তার প্রশ্নটা করেছিল অয়নকে।

উত্তরটা ইচিকার নিজেরও জানা ছিল। অয়ন তার চোখের দিকে চেয়ে বলল, “একশ পঞ্চাশ বছর ধরে পৃথিবীতে কেউ বেঁচে থাকতে পারে না ইচিকা। কোনোভাবেই সেটা সম্ভব নয়।”

ইচিকা বলল, “পৃথিবী থেকে নিশ্চয়ই আগে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তুমি কি এর মধ্যে পরস্পর নির্দেশ বহনকারী যোগাযোগ প্রোগ্রামের সফ্টওয়্যার রিবুট করার চেষ্টা করেছ?”

অয়ন মাথা নাড়ল। নিশ্চয়ই অনেক বার্তা জমে আছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে নির্দেশ মডিউলে সাম্প্রতিক তথ্য সংযোজন করতেই তারা একের পর এক বার্তা পেতে শুরু করল। কয়েকশ বার্তা জমে আছে যন্ত্র-মস্তিস্কে। তাদের হাতে এখন কোন কাজ নেই। একটা একটা করে বার্তাগুলো পড়তে শুরু করল তারা।

প্রথম কয়েক বছর ধরে উত্তেজিত হয়ে তাদের খবর নেওয়ার সব রকম চেষ্টা করেছে প্রক্সিমা কমিটি। কিন্তু কোনোরকম উত্তর না পেয়ে তারা ধরে নিয়েছিল যে কোনো দুর্ঘটনার ফলে তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা বানচাল হয়ে গেছে। একটার পর একটা বার্তা দেখতে দেখতে একসময় থমকে গেল অয়ন। প্রফেসর ওয়াং-এর মৃত্যু সংবাদ! ২০৫১ সালে মারা গেছেন তিনি। অয়নদের দলের নামে একটা ছোট্ট চিঠি তিনি পাঠিয়েছেন তার আগে। ইচিকাকে সে কথা জানিয়ে চিঠিটা পড়ল অয়ন:

“গত আঠারো বছর ধরে ট্রেলব্লেজারের সঙ্গে পৃথিবীর যোগাযোগ হয়নি। সকলেরই ধারণা তোমরা আর বেঁচে নেই, অথবা বেঁচে থাকলেও এই অভিযান অনেক আগেই তোমাদের জন্যে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, তোমরা বেঁচে আছ। তোমাদের যাত্রা শেষ হয়নি। এই বিশ্বাসের কী কারণ, সেটা আমিও জানি না। আমার দুর্ভাগ্য, জীবন আমাকে আর সময় দিল না। হয়তো আমাদের কারো সঙ্গেই তোমাদের আর দেখা হবে না। কিন্তু কোনদিন যদি এই চিঠি তোমরা পাও, জেনো আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি। জীবনের প্রতি বিশ্বাস রেখো, এই বিশ্বাস নিয়ে অমল একা মহাশূন্যে নির্বাসন নিয়েছিল। তোমরা তো একা নও। অয়ন, ইচিকা, ডক্টর জস, অলিভার, হয়তো আমি দেখে যেতে পারব না, কিন্তু আমার আজও বিশ্বাস, তোমরা পারবে।”

চিঠিটা পড়ে বহুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল অয়ন আর ইচিকা। প্রফেসর ওয়াং এর চিঠির কথাগুলো কানে বাজছে তাদের। কোন কারণে এক মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধের তাদের ওপর এই অক্ষয় বিশ্বাস? তারা কি সত্যিই এই অভিযান শেষ করতে পারবে? ইচিকা অয়নকে বলল, “হিসেব করে দেখলে আমরা দুজন মাত্র একবছর জেগে কাটিয়েছি মহাকাশে। আমার মনে হচ্ছে এই সেদিন আমরা পৃথিবী ছেড়ে বেরিয়েছি।”

অয়ন বলল, “ইচিকা, তুমি পৃথিবীর সঙ্গে আবার যোগাযোগ করার চেষ্টা কর। অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে গেছে। যা হয়ে গেছে সেটা আমরা বদলাতে পারব না, কিন্তু ভবিষ্যৎ এখনো আমাদের হাতে। প্রক্সিমা সেন্টরি পৌঁছতে আমাদের মাত্র ছয় মাস সময় লাগবে। এই অভিযানের শেষ না দেখে আমি ছাড়ছি না।”

ইচিকা সোজা হয়ে বসে আবেগঘন স্বরে বলল, “আমিও না। পৃথিবীতে একশ পঞ্চাশ বছর কেটে গেছে ঠিকই, কিন্তু আমরা কাটিয়েছি মাত্র পাঁচ বছর। এটা যদি আমাদের চিন্তার কারণ হয়, তাহলে এর ভালো দিকও আছে। পৃথিবীতে এতদিনে নিশ্চয়ই অনেক উন্নততর প্রযুক্তি এসে গেছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলে আমরা অনেক কিছুই জানতে পারব। আমাদের আগের মতন স্বাভাবিক থাকা প্রয়োজন।”

পরের দিন থেকে আবার একটু একটু করে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরু হল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা দুজনেই বুঝতে পেরেছে যে অতীতের জন্যে মন খারাপ করে আর কোন লাভ নেই। শরীর ঠিক রাখতে হবে। তাদের অভিযান এখনো শেষ হয়নি। হ্যাবিটেট ক্যাপসুলের প্রতিটা অংশ ভালো করে গুছিয়ে রাখা হল। জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিল চারদিকে। রকেটের গতিপথের আবক্র পথ ঠিক করে নেওয়া হল। প্রায় সারাদিন ধরে সব যন্ত্রপাতি মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করল অয়ন আর ইচিকা। সব কিছুই ঠিক আছে। রান্নাঘরে গিয়ে অয়ন নিজে রান্না করল তার আর ইচিকার জন্যে। অবসর সময়ে অয়ন আবার বই পড়তে শুরু করেছে। ইচিকার আঁকার হাত ভালো, সে আজকাল তার ছোটোবেলার বাড়ির ছবি আঁকছে।

একটা একটা করে দিন কাটতে লাগল অয়ন আর ইচিকার। সেদিন নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে টেলিস্কোপের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের নীহারিকাগুলো দেখার চেষ্টা করছিল অয়ন। ছোটোবেলায় নীহারিকা কথাটা শুনতে খুব ভালো লাগত তার কিন্তু নীহারিকা অথবা ‘নেবুলা’ যে মৃত নক্ষত্র থেকে বেরিয়ে আসা ঘন আয়নযুক্ত গ্যাসের মেঘ, সেটা জানতে তার অনেকদিন লেগে গিয়েছিল। নক্ষত্রের মৃত্যুর ফলে যে সুপারনোভা বিস্ফোরন হয়, সেই বিস্ফোরণের কারণেই নীহারিকার সৃষ্টি হয়। বিকিরণ নির্গতকারী নীহারিকাগুলো থেকে রঙিন আলোর বিচ্ছুরণ বেরিয়ে এসে নানাধরনের আকৃতি রচনা করে।

কয়েকটা নীহারিকা দেখতে এতটাই অদ্ভুত সুন্দর হয় যে মনে হয় ম্যাজিক। কর্কট নীহারিকা, গ্যারেন নীহারিকা আর ইগল নীহারিকার বিখ্যাত আকৃতি “পিলার অফ ক্রিয়েশন” দেখে পৃথিবীতে শিল্পীরা নানান ছবি এঁকেছে তাদের নিয়ে।

অয়ন খেয়াল করেছে, কোন রকম গ্রহ নক্ষত্র না থাকলেও সৌরজগতের বাইরের মহাকাশ নিকষ কালো নয়, সব সময়ই নানান আলোর বিচ্ছুরণ দেখতে পাওয়া যায় এখানে। ঘন গ্যাসের আস্তরণ-এর ফলে ছড়িয়ে থাকা অম্বুদ রেণু অথবা ‘ক্লাউড ডাস্ট’ এর আলো আর শত শত ধুমকেতুর লেজ থেকে বিচ্ছুরিত হওয়া আলোর ঝিলিক তো আছেই, তা ছাড়াও দূরে আলেয়ার মতো অজানা আলোর নকশা চোখে পড়ে মাঝে মাঝে। এই আলোর নকশার কথাই কি প্রফেসর ওয়াং তাকে বলেছিলেন? মাধ্যাকর্ষনিক তরঙ্গ!

এই আলোর জ্যামিতির মধ্যে চেয়ে থাকলে একটা ঘোর লেগে যায়। টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে মহাকাশীয় নকশা দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে গিয়েছিল অয়ন। হঠাৎ চমকে উঠে সে টেলিস্কোপ থেকে চোখ সরিয়ে নিল। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নক্ষত্রের মানচিত্র দেখে সে একুয়ারিয়স নক্ষত্রমন্ডলের একটা বিশেষ বিন্দুতে টেলিস্কোপের লেন্স ফোকাস করল। টেলিস্কোপে আবার চোখ রেখে সে চমকে উঠল আবার। এটা কী করে সম্ভব? টেলিস্কোপের লেন্সের সাহায্যে ঝটপট কয়েকটা ছবি তুলে নিল সে, তারপর ঝট করে কমপিউটারে বিশেষ এক প্রোগ্রাম খুলে সেখানে মনোনিবেশ করল।

কিছুক্ষণ পরেই সে উত্তেজিত হয়ে ইচিকাকে ডাকতে শুরু করল। “ইচিকা, ইচিকা, এক্ষুণি একবার এখানে এস।” তার কপালে ঘাম জমে উঠেছে। ইচিকা “কী হয়েছে অয়ন?” বলে ঘরে ঢুকতেই অয়ন তাকে টেনে এনে টেলিস্কোপের সামনে বসিয়ে দিয়ে বলল, “দেখো তো চিনতে পার কিনা? ”

ইচিকা এক মুহূর্ত দেখেই বলল, “এটা তো হেলিক্স নীহারিকা। সাতশো আলোকবর্ষ দূরে। এই দৃশ্য কি ভোলার অয়ন? মহাশূন্যের সবচেয়ে সুন্দর কয়েকটা দৃশ্যের মধ্যে অন্যতম। একদম চোখের মতন, যেন ঈশ্বর নিজে দেখে চলেছেন এই সৃষ্টিকে।”

অয়ন তাকে বলল, “হেলিক্স নীহারিকা তো তুমি আগেও দেখেছ, তার মাঝে ব্যাঙাচির মতো গোল হয়ে ঘুরতে থাকা এই বিন্দুগুলো সম্পর্কেও তুমি নিশ্চয়ই জানো? ”

“সেগুলো তো কমেটেরি নটস। তাদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা না গেলেও মনে হয় বিশেষ কোনো মাধ্যাকর্ষণের ফলে তারা সুপারনোভার পর থেকে নেবুলার অম্বুদ রেণুতে চক্কর খেয়ে চলেছে।”

“ঠিক বলেছ ইচিকা।” অয়ন টেলিস্কোপের অন্য একটা বিন্দুতে ফোকাস করে বলল, “এইবার এইটা দেখো।”

ইচিকা আবার টেলিস্কোপে চোখ লাগল। তারপর অয়নকে প্রশ্ন করল, “এটা তো মনে হচ্ছে একটা সুপারনোভা, কোন গ্যালাক্সি এটা অয়ন? এটা তো আগে দেখিনি। এরকম দুর্লভ দৃশ্য দেখতে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।”

অয়ন বলল, “ইচিকা, ভুলে যেও না আমরা পৃথিবী থেকে প্রায় চার আলোকবর্ষ দুরে আছি, অনেক দৃশ্যই এখান থেকে দেখতে পাওয়া সম্ভব যা হয়তো পৃথিবীতে আমরা জানতে পারিনি। আমাদের সবচেয়ে কাছের গ্যালাক্সি এন্ড্রমিডার একটা তারার সুপারনোভা বিস্ফোরণ এটা, পৃথিবী থেকে যার দূরত্ব প্রায় আড়াই মিলিয়ন আলোকবর্ষ দুরে। এবার তুমি লক্ষ করে দেখো তো এখানে কোন কমেটেরি নটস দেখতে পাও কিনা? ”

ইচিকা আবার টেলিস্কোপে চোখ রাখল। কিছুক্ষণ লক্ষ করে চমকে উঠে সে বলল, “ঠিক বলেছ অয়ন। এইখানেও কমেটেরি নটস দেখতে পাওয়া যাচ্ছে হেলিক্স নীহারিকার মতনই, যদিও আকারে খানিকটা পার্থক্য আছে।”

অয়ন উত্তেজিত হয়ে বলল, “আমি এই সুপারনোভার ছবি নিয়ে তার একটা ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করেছি। এইবার আন্তনক্ষত্র জোতির্বিজ্ঞান গাণিতিক তত্ত্বের প্রোগ্রামের সাহায্যে আমি সময়টা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি কয়েক হাজার বছর। মানে আমি দেখতে চাইছি হাজার বছর পরে আমি যদি এই সুপারনোভা থেকে তৈরি নীহারিকাটিকে দেখতে পাই, তাহলে কেমন দেখতে হবে তাকে? তুমিও দেখ ইচিকা, কেমন হবে এন্ড্রমিডার গ্যালাক্সির এই নীহারিকা?”

ইচিকা এক ঝলক দেখে নিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “কী মাথামুন্ডু বলছ তুমি অয়ন, এইটা তো হেলিক্স নীহারিকা ছবি।”

অয়ন উত্তর দিল, “না ইচিকা, এই ছবি হেলিক্স নীহারিকার নয়, তুমি এন্ড্রমিডার গ্যালাক্সির যে সুপারনোভা বিস্ফোরণ দেখছ, সেই ছবিরই ভবিষ্যৎ সংস্করণ...”

“এটা কী করে সম্ভব? হেলিক্স নেবুলা প্রায় সাতশো আলোকবর্ষ দুরে, অন্তত কয়েক হাজার বছর আগে কোন মহাবিস্ফোরণের সময় সৃষ্ট হয়েছে, এদিকে এন্ড্রমিডার গ্যালাক্সির দূরত্ব আড়াই মিলিয়ন আলোকবর্ষ, আমরা যে সুপারনোভা দেখছি সেখানে, হয়তো কয়েক লক্ষ বছর আগে সেই ঘটনা ঘটেছে। সেখান থেকে আলো এসে পৌছতেই এতটা সময় লেগেছে। দুটো ঘটনার অবস্থান এবং সময়ে আকাশ পাতাল তফাৎ। তুমি কী বলতে চাইছ অয়ন আমি বুঝতে পারছি না।”

অয়ন গম্ভীর গলায় বলল, “আমি বলতে চাইছি যে মহাকাশে সময় আর অবস্থানের হিসেব আমরা যেভাবে দেখি, সেইভাবে বাস্তবে হচ্ছে না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে আমাদের না জানা কোনো মাধ্যমে দেশকালের নানান বিন্দু একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে চলেছে। একই মুহূর্তে আমরা লক্ষ লক্ষ বছরের তফাতে থাকা অনেকগুলো ঘটনা দেখতে পাচ্ছি।”

ইচিকা হতভম্ব হয়ে বলল, “তুমি কী বলছ অয়ন?”

“ভেবে দেখো ইচিকা, প্রায় চল্লিশ বছর ধরে হাবল টেলিস্কোপ মহাকাশে চিরুনি তল্লাশি চালিয়েছে। যতদুর পর্যন্ত আলোর নিয়মে আমরা দেখতে পাই, সব কিছুর ছবি তোলা প্রায় হয়ে গেছে। কিন্তু হেলিক্স নীহারিকা ছাড়া কোথাও কি আমরা ব্যাঙাচির আকৃতির কমেটেরি নটস দেখতে পেয়েছি?”

“মানে তুমি বলছ এন্ড্রমিডা গ্যালাক্সির এই সুপারনোভার ফলেই হেলিক্স নীহারিকার জন্ম, যা অজানা কোনো উপায়ে আড়াই মিলিয়ান আলোকবর্ষ থেকে সাতশো মিলিয়ান আলোকবর্ষে চলে এসেছে? তুমি কি বলতে চাও কোনো কালসেতু বা ওয়ার্মহোলের সাহায্যে তারা সময়কে অতিক্রম করেছে? প্রফেসর ওয়াংও তো আমাদের একই কথা বলেছিলেন।”

অয়ন ইচিকার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “জানি না ইচিকা। হয়তো ওয়ার্মহোল, হয়তো বা অন্য কিছু। কিন্তু দূরত্ব আর সময় অতিক্রম করার একটা বিকল্প থাকতে বাধ্য।”

পৃথিবীর নিয়মে ২১৮৯ সাল । প্রক্সিমা সেন্টরি তারামন্ডল

“দৃষ্টিক্ষেত্র সংশোধিত, ইঞ্জিনের গতিপথ নির্ধারিত, এভিওনিক্স সিস্টেম ঠিকঠাক, ভারমুক্ত মহাকর্ষের প্রতিক্রিয়া সরলরেখায়…”

ইঞ্জিন রুমে বসে কাজ করতে করতে অয়নের মনে অদ্ভুত একটা ভাবের উদয় হচ্ছিল। পৃথিবীর হিসেবে অনেকটা সময় কেটে গেলেও অয়ন আসলে বাবার সম্পর্কে জানতে পেরেছিল আট বছর আগে। এই প্রক্সিমা সেন্টরিতে আসার জন্যেই পৃথিবীর সঙ্গে সব সম্পর্ক ত্যাগ করে মানুষটা একা পাড়ি দিয়েছিল ‘সর্সারার’ নিয়ে। প্রফেসর ওয়াং এর সঙ্গে দেখা না হলে অয়ন কোনদিন জানতেও পারত না তার বাবার আসল পরিচয়। অসম্ভব মেধাসম্পন্ন বৈজ্ঞানিক অমল বিশ্বাস যে কতটা সাহসী আর একরোখা একজন মানুষ, সেই পরিচয় অজানাই রয়ে যেত তার কাছে।

প্রক্সিমা সেন্টরির সীমানায় পৌঁছেছে তারা চারদিন আগে। এ এক অদ্ভূত জায়গা। তিনটে সুর্য জ্বলজ্বল করছে আকাশে কিন্তু কোন গ্রহ নেই এই ত্রয়ী অথবা ট্রিনিটি তারামণ্ডলে। প্রক্সিমা সেন্টরি সি সূর্যটাকে দেখে মনে হয় জ্বলন্ত লাল একটা ফলের মতো। বৈজ্ঞানিকেরা এর নাম দিয়েছে ‘দ্য ডোয়ার্ফ’। এই সূর্য তিনটে মহাকর্ষের বিশেষ একটা নিয়ম মেনে একে অপরের পরিক্রমা করে চলে। অয়নদের লক্ষ্য হল এই নক্ষত্রজগতের মাঝের তারা আলফা সেন্টরি বি।

কয়েকদিন আগে অলিভার আর ডক্টর জস জেগে উঠেছে। তাদের সাহায্য ছাড়া এগিয়ে যেতে হলে অয়ন আর ইচিকা মুশকিলে পড়ে যেত। অলিভার এখন পুরোপুরি সুস্থ। সব ঘটনা জানতে পেরে সে বাচ্চা ছেলের মতো কেঁদে উঠেছিল, তারপর সে নিজেকে অপরাধী মনে করে বার বার ক্ষমা চেয়েছে সকলের কাছে। যেকোনো ব্যক্তির কাছেই এই অভাবনীয় মানসিক আঘাতের অভিঘাত সহ্য করা কষ্টকর। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে শান্ত করেছে অয়ন আর ইচিকা। ডক্টর জস তাকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন।

প্রক্সিমা সেন্টরিতে প্রবেশ করার আগে থেকেই নানা রেডার আর বেতার সংকেত পাঠাতে শুরু করেছিল তারা, যদি ‘সর্সারার’-এর সন্ধান পাওয়া যায় তাহলে তাদের অভিযান সফল হলেও হতে পারে। সকলের মনেই একটা দ্বিধার ভাব। অমল কি সত্যি আজও বেঁচে আছে? তাকে কি সত্যি ওরা খুঁজে পাবে? অয়ন বাইরে কোনো ভাব প্রকাশ না করলেও তার মনে একটা ঝড় বইছে সবসময়। এই অভিযানে সবকিছু হারিয়েছে সে, পৃথিবীতে কেউ আর অপেক্ষা করে নেই তার জন্য। কার জন্যেই আর ফিরবে সে? কিন্তু বাবা? বাবাকে কি সে সত্যি ফিরে পাবে?

“বিপ বিপ বিপ বিপ বিপ…….”

অয়ন চমকে উঠে দেখল নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের মধ্যে একটা লাল আলো জ্বলতে শুরু করেছে। ততক্ষণে সকলেই আওয়াজটা পেয়ে ছুটে এসেছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে। অলিভার উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে বলল, “আমরা সংকেত পাচ্ছি। নিশ্চয়ই এ সর্সারার।”

ততক্ষণে ইচিকা উত্তর পাঠাতে শুরু করেছে দক্ষ হাতে। অয়নের বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ করে শব্দ হচ্ছে। এখনও বিপ বিপ শব্দ হয়ে চলেছে। ইচিকা বলল, “এইট ও ক্লক অভিমুখে যান ঘোরাতে হবে অলিভার। সংকেত ঐদিক থেকেই আসছে।”

অয়ন নিয়ন্ত্রণ প্যানেল থেকে উঠে পড়ল, তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। কয়েকবার মাথা ঝাঁকিয়ে সে যেন সব চিন্তা উড়িয়ে দিতে চাইল। তারপর এক গেলাস জল নিয়ে তার জায়গায় চলে গেল। একটা বই খুলে নিয়ে সে শুয়ে পড়ল বিছানায়। ইচিকারা ততক্ষণে নির্দিষ্ট দিকে চালনা করছে ট্রেলব্লেজারকে।

এক সময় তারা দেখতে পেল আকাশে কুচকুচে কালোর মধ্যে একটা সাদা বিন্দু, একটু একটু করে সেটা বড়ো হতে শুরু করল। ডক্টর জস অস্ফুটে বললেন, “সর্সারার! ”

ইচিকা আর অলিভারের তখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। ইচিকা অলিভারকে বলল, “তুমি এবার যানের দায়িত্ব নাও। রোভার আর-সেভেনকে বেরোনোর জন্যে তৈরি কর। আমি আর ডক্টর জস গিয়ে দেখছি।”

অলিভার প্রশ্ন করল, “অয়ন?”

ডক্টর জস বললেন, “ওকে এখন না ডাকাই ভালো। আমরা আগে গিয়ে দেখি।”

অলিভার মাথা নেড়ে বলল সে বুঝেছে। আর সেভেন রোভারে বসে মহাকাশ স্যুট পরে ইচিকা আর ডক্টর জস এগিয়ে যেতে লাগল সর্সারার-এর দিকে। কাছাকাছি পৌছে ইচিকা একটা বিস্ময়ের শব্দ করে বলল, “২০০০ সালে এমন অত্যাধুনিক মহাকাশযান ডক্টর অমল কী করে তৈরি করেছিলেন? ”

ডক্টর জস বললেন, “সে-প্রশ্নটা সরাসরি তুমি ওকেই করে নিও।”

সর্সারার-এর প্ল্যাটফর্মের নির্দিষ্ট জায়গায় রোভারটি এয়ারলক করে দাঁড় করানো হল। ইচিকা আর ডক্টর জস এগিয়ে গেলেন ভিতরের দিকে।

***

অমলের কাঁধ ধরে কেউ ঝাঁকুনি দিচ্ছিল। চোখ খুলে দেখল ইচিকা এক গাল হাসি নিয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। ডক্টর জস তার পিছনে দাঁড়িয়ে। ততক্ষণে অলিভার এসে একটানে তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তার আপাদমস্তক দেখতে লাগল। তারপর মুচকি হেসে ইচিকাকে বলল, “ঠিক তো, ব্যাটাকে একেবারে ওর বাবার মতো দেখতে।” তারপর তারা একসঙ্গে হাসতে লাগল।

“অয়ন! সত্যি তুই এসেছিস?”

অনেক, অনেক বছর পর অয়ন বাংলা শুনল। এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়িয়ে সে দেখল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অমল।

“বাবা।”

অয়নের পঁয়ত্রিশ বছরের স্মৃতি এক মুহুর্তে তার চোখের সামনে দিয়ে বইতে লাগল। সেই সব স্মৃতি, যেখানে বিজ্ঞান নেই, জটিল গাণিতিক সংখ্যাতত্ত্ব নেই, শুধু কয়েকটা হাসি মাখা মুখ। ছোট্ট বেলায় দেখা বাবার আবছা মুখ, মায়ের হাসি, বাংলা গান, ভাই, স্কুল, কলকাতা, তার বন্ধুরা, সুখ আর দুঃখের শত শত স্মৃতি ভিড় করে এসেছে এক লহমায়। অয়ন আর থাকতে পারল না, অমলকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল।

পৃথিবীর নিয়মে ২১৮৯ সাল, সর্সারার মহাকাশযান, প্রক্সিমা সেন্টরি তারামন্ডল

“আমি এখনো বুঝতে পারছি না প্রফেসর।” ইচিকা মাথা ঝাঁকাল।

গত দু’দিন ধরে ক্রমাগত আলোচনা হয়ে চলেছে। কোন কোন উদ্বেগঘন মুহুর্তে ধৈর্য হারিয়েছে অয়ন, অলিভার, ইচিকারা। কিন্তু অমলের কোন ভাবান্তর হয়নি। এতটা সময় একা কাটানোর ফলে এত লোকের উত্তেজিত আলোচনা তার কাছে একটু বেমানান লাগছিল। মাঝে মাঝেই সে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল।

মহাশূন্যের সফর তার জন্যে বড়ো সোজা ছিল না। মানুষের প্রথম প্রতিনিধি হিসেবে সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে আসায় যতটা না গর্ব, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্ববোধ ছিল। তার ওপর নাসার অভিযান বানচাল করে সে নিজের মতো করে এগিয়ে গেছে মহাকাশের অনেক গভীরে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রফেসর ওয়াং এর সঙ্গে মাসের পর মাস আলোচনা চালিয়েছে সে। প্রক্সিমা সেন্টরিতে পৌছে গেলেও বেতার সংকেতের মাধ্যমে কী করে সেই ডার্ক এনার্জির রহস্য ভেদ করবে সেটা আগে থেকে পরিকল্পনা করা সম্ভব ছিল না কোনক্রমেই। হয়তো অনিশ্চয়তার পথেই তারা পা বাড়িয়েছিল। কিন্তু আজ এত বছর পরে অমল বুঝতে পেরেছে, তাদের সিদ্ধান্তে ভুল ছিল না। মানুষের পরের প্রজন্ম তার অভিজ্ঞতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। আর অয়ন, তার নিজের ছেলে…যতবার তার দিকে চোখ গেছে তার, এক অদ্ভুত ভালো লাগার আবেশ অনুভব করতে পারছে অমল। ইচিকা আর ডক্টর জস যখন অমলকে ক্রায়জেনিক অবস্থা থেকে জাগিয়ে তোলে, তখন সে সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে তাদের অভিবাদন করেছিল। যেন সে জানতই, কেউ না কেউ কোনদিন তার কাছে আসবেই! কিন্তু ডক্টর জসের কাছে অয়নের ব্যাপারে জানতে পেরে তার নিরাসক্ত ভাব মিলিয়ে গিয়েছিল। হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিল সে।

এই কয়েকদিনে অবশ্য অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে সে অয়নের সঙ্গে, ইচিকাদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াতেও কোনো অসুবিধে হয়নি। সে বয়সে এদের চেয়ে বড়ো হতেই পারে, কিন্তু এখানে তাদের একমাত্র পরিচয়, তারা অভিযাত্রী।

অমল একটু সময় নিয়ে ইচিকার দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখো, তোমরা সকলেই বৈজ্ঞানিক। বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বা নিয়ম নিয়ে তোমাদের যথেষ্ট ধারণা আছে বলেই আমার বিশ্বাস। তাই ভৌতবিজ্ঞানের প্রচলিত নিয়মে কী হতে পারে, কী পারে না তা নিয়ে গভীর আলোচনায় যাওয়ার কোন দরকার নেই। আমি শুধু সেটাই বলব, যেটা আমি নিজে অনুভব করেছি। তারপর তো আমার যাবতীয় অভিজ্ঞতার কথা তোমরা মস্তিস্ক সিমুলেশন হেলমেটের মাধ্যমে জানতেই পারবে।”

ডক্টর জস অমলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ঠিক আছে প্রফেসর। আপনি শুধু সেইটুকুই বলুন যেটুকু আপনার বলা দরকারি মনে হয়।”

অমল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোমরা হয়তো জান, আমাদের ধারণা ছিল মহাকর্ষীয় তরঙ্গের নকশার সাহায্যে ভিন্নগ্রহীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। ডার্ক এনার্জির পক্ষেই আলোকে আকর্ষিত করে এরকম জ্যামিতিক নকশা তৈরি করা সম্ভব, তাই আমাদের ধারণা হয়েছিল, যদি সত্যি ভিনগ্রহী বা এলিয়েন বলে কিছু থেকে থাকে, তারা ডার্ক ম্যাটার দিয়ে তৈরি প্রাণী। ডার্ক ম্যাটার কোনো আলো বা অন্য শক্তি বিকীরণ করে না, তাই সমসাময়িক প্রযুক্তি নিয়ে আমাদের চোখে তারা কোনদিনই ধরা পড়বে না।

পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে এখানে পৌঁছে যখন আমি কাজ শুরু করি, অনেকদিন ধরে কোন আশার আলো দেখতে পাইনি। বেতার সংকেত পাঠালে কোন উত্তর আসে না। রেডারে কোন ছবি দেখতে পাই না, শুধু টেলিস্কোপে আকাশের নানা জায়গায় রংবেরঙের আলোর ছটা আর জ্যামিতিক নকশা দেখতে পাওয়া যায়। এমন করে অনেক দিন কেটে গেল। একাকিত্বে, অবসাদে ধীরে ধীরে আমার শরীর খারাপ হতে শুরু করল।

সেই দিনটার কথা আমার পরিষ্কার মনে আছে। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল। চমকে উঠে বসলাম। সারা ঘরে আলোর রোশনাই, শূন্যে হিজিবিজি কেটে নানা রঙের আলোর রেখা এখানে সেখানে ছুটে বেড়াচ্ছে। আমি রীতিমতো ঘাবড়ে গেলাম। একি ভূতুড়ে কান্ড রে বাবা? এত আলো মহাকাশযানের ভিতরে এল কী করে? প্রায় তিন ঘন্টা ধরে সেই আলোর ছোটাছুটির মধ্যে সিঁটিয়ে রইলাম। তারপর একসময় সব আলো মিলিয়ে গেল কোথায়। সহসা আমার মাথা ঝনঝন করে উঠল। এত সোজা কথাটা আমি বুঝতে পারিনি! আলোর মাধ্যমে যে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চায়, তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে তার ভাষাতেই কথা বলতে হবে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষের আলোকছটার ভিডিও রেকর্ডিং নিয়ে বসলাম। তারপর অন্য অন্য রঙের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য আর কম্পাঙ্কের পরিসরে বেতার সংকেত পাঠাতে শুরু করলাম। চেষ্টা করলাম যাতে আলোর নাচানাচির সময়ে যেই রঙের ধারাবাহিকতা ছিল, তার সঙ্গে একটা সামঞ্জস্য থাকে। কিন্তু কাজটা শুনতে যতটা সোজা মনে হয়, বাস্তবে ততটাই কঠিন। বছরের পর বছর লেগে গেছে আমার। কিন্তু একদিন সাফল্য এসেছে, সংকেতের উত্তর পেয়েছি তাদের কাছ থেকে।”

অয়ন এতক্ষণ কোন কথা বলেনি। এবার সে অধীর হয়ে প্রশ্ন করল, “কারা? কেন যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিল আমাদের সঙ্গে?”

অমল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “অনেক কিছুই আমি জেনেছি অয়ন, কিন্তু সব কিছু যে জেনে গেছি সেটা বলতে পারছি না। আলোর মাধ্যম ব্যবহার করে আমি এতদিন ধরে ক্রমাগত কথা চালিয়ে গেছি, কিন্তু এই ভাষা ইংরেজি বা বাংলা তো নয়, সংকেতের মাধ্যমে কী বলার চেষ্টা করা হচ্ছে সেই সংকেতের অর্থোদ্ধার করতে অনেক সময় লাগে।”

অলিভার কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করল, “কীরকম? ”

“এই ধর লাল রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য হল সবচেয়ে বেশি, সবচেয়ে বেশি শক্তিও ধরে রাখতে পারে লাল রং। নিজেকে বোঝানোর জন্যে তারা সবসময় লাল রং ব্যবহার করে সংকেত পাঠায়, সেরকমই বেগুনি রঙের শক্তি সবচেয়ে কম, আমাদের সম্পর্কে বা মানুষের সম্পর্কে কথা বলার জন্যে বেগুনি রঙের ব্যবহার করে তারা। হয়তো তারা বলতে চাইছে, ‘আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই’ সেই সময় লাল আর বেগুনি রঙের দুটো আলোকরশ্মি মধ্যে একটা জ্যামিতিক নকশা তৈরি হবে, অনেকটা অঙ্কের মতো।”

“কিন্তু ভিনগ্রহীরা অঙ্ক জানবে কী করে? যদি সেরকম কিছু থাকেও তাদের অক্ষর, নম্বর, চিহ্ন অন্যরকম হবে না?”

“এই প্রশ্নটা আমার মাথাতেও এসেছিল। আমি প্রশ্নও করেছিলাম, কিন্তু কোন উত্তর আমি পাইনি। কিন্তু আমার বিশ্বাস অঙ্কের ব্যবহার ওরা জানে।”

ইচিকা প্রশ্ন করল, “আপনি ঠিক কী কী জানতে পেরেছেন প্রফেসর?”

অমল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর অনেকটা নিজের মনেই বলল, “আমার মনে হয় আমাদের কোনো প্রশ্নের উত্তর ওরা দিতে চায় না। ওরা খালি নিজেদের কয়েকটা কথা আমাদের বলার চেষ্টা করছে। যতদূর আমি বুঝেছি, আমাদের তারা মহাকাশের বিশেষ একটা অংশের কথা জানাতে চাইছে। প্রক্সিমা সেন্টরির একটা বিশেষ জায়গায় বার বার তাদের আলোকসংকেত দেখতে পেয়েছি আমি। সেখানেই ওরা আমায় নিয়ে যেতে চাইছে…”

চমকে উঠে সকলে একে অপরের দিকে তাকাল। ডক্টর জস নীচু গলায় অমলকে প্রশ্ন করলেন, “আপনি নিশ্চিত? হয়তো সেখানেই থাকে ওরা।”

অমল সে কথার উত্তর না দিয়ে বলল, “আমি অনেকবার সংকেতের মাধ্যমে অনেকরকম প্রশ্ন করেছি, তারা কি কোনো ভিন্ন গ্রহের প্রাণী? কোথায় থাকে তারা? আমাদের কথা তারা জানতে পারল কী করে? কী তাদের উদ্দেশ্য? কী করে আমরা ডার্ক এনার্জির রহস্য বুঝতে পারব? কিন্তু প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তরে শুধু একটা কথাই বলে গেছে তারা। শুধু একটা শব্দ! ”

“কী শব্দ?”

“সাইলেনটিয়াম।”

“সাইলেনটিয়াম? সেটা কী?” ইচিকা বলে উঠল। অয়ন অলিভার আর ডক্টর জসের দিকে তাকাল। সকলের মুখেই প্রশ্নচিহ্ন!

অমল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আক্ষরিক অর্থে সাইলেনটিয়াম মানে শান্তি বুদ্বুদ কিংবা দ্য বাবল অফ পিস। কিন্তু এর আরেকটা মানে আছে। কৃষ্ণগহ্বরের অদ্বৈত-বিন্দু অথবা সিঙ্গুল্যারিটি পয়েন্টকে বলা হয় সাইলেনটিয়াম।”

ঘরের মধ্যে একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল। অদ্বৈত-বিন্দু বা সিঙ্গুল্যারিটি সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান খুবই সীমিত। মহাকাশের সবচেয়ে বড়ো রহস্য সম্পর্কে তাদের কী জানাতে চায় ভিনগ্রহীরা? একসময় অয়ন উত্তেজিত হয়ে বলল, “অদ্বৈত-বিন্দু? কী বলছ বাবা? কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রে কোনো কিছুই তো থাকা সম্ভব নয়, প্রচণ্ড ঘনত্বের কারণে মহাকর্ষ বলের টান সেখানে এতটাই বেশি যে এই গহ্বরের সীমানা থেকে আলোও ফিরে আসতে পারে না, গহ্বরের অতল তলে হারিয়ে যায়। সেখানে জীবিত কোন প্রাণী থাকবে কী করে? ”

অলিভার বলে উঠল, “আর বিজ্ঞানের নিয়ম বলছে কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রে যে কোনো বস্তুর ওজন এতটাই বেড়ে যাবে যে, কোন শক্তিই সেখান থেকে তাকে স্থানান্তরিত করতে পারবে না…”

অমল অলিভারকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “অলিভার, হয়তো সেটাই ডার্ক এনার্জি! তুমি ভুলে যাচ্ছ, আমি বলেছিলাম যে পরিচিত বিজ্ঞানের নিয়ম নিয়ে আমরা আলোচনা করছি না। আমাদের জানা নিয়মে কী হতে পারে সেটা সবাই জানে, কিন্তু হয়তো অদ্বৈত-বিন্দুতে এমন কিছু আছে যা মানুষের অজানা। আজ পর্যন্ত কি কোন মানুষ কৃষ্ণগহ্বরে ঢুকেছে?”

অমলের কথা শুনে সবাই চুপ করে গেল। এই কথার উত্তর সবাই জানে। একসময় নীরবতা ভেদ করে ডক্টর জস বললেন, “কিন্তু যদি আপনার কথা ঠিকও হয়, আমরা কোনো কৃষ্ণগহ্বরে ঢুকে দেখব কী করে? প্রত্যেকটা গ্যালাক্সির কেন্দ্রে যে ‘সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল’ থাকে সেখানে যাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। সবচেয়ে কাছের গ্যালাক্সি এন্ড্রমিডা আড়াই মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে, এমনকী সুপারনোভার ফলে যে স্টেলার কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হয়, সেই মনোসেরোটিস ভি-৬১৬ এর দূরত্ব তিন হাজার আলোকবর্ষ।”

অমলের মুখে একটা হালকা হাসি দেখতে পাওয়া গেল। তার চোখ চকচক করছে। ডক্টর জসের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “সে কথা কি আমি ভাবিনি জস? মানুষের সমস্যা কী জানো, যেইটুকু সে জানতে পেরেছে সেটাকেই সে অন্তিম সত্য বলে ধরে নেয়। এত বছর ধরে পৃথিবী ছেড়ে এসে শুধু এইটুকু সত্যি আমি আবিষ্কার করতে পেরেছি। প্রক্সিমা সেন্টরির কেন্দ্রেই একটা কৃষ্ণগহ্বর আছে, যা সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারনাই ছিল না। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিয়ে কাজ করতে করতে আমি জানতে পারি এর কথা।”

“কিন্তু সেটা কি সম্ভব?” অয়ন জানতে চাইল।

“কৃষ্ণগহ্বরের মতো প্রচন্ড শক্তিশালী অভিকর্ষের সংস্পর্শে এলে কি আলফা সেন্টরি থেকে নির্গত আলো দিক পরিবর্তন করত না, মহাকর্ষ আলোকে বেঁকিয়ে চুরিয়ে দেয় বলেই পৃথিবী থেকে ‘মহাকর্ষীয় লেন্স এফেক্ট’ পরিষ্কার বুঝতে পারা যায়।”

“যায় অয়ন, কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে মহাকাশীয় উল্কা, গ্রহ, উপগ্রহের টুকরো ঘুরতে থাকে, আলোর রশ্মি বেঁকে গিয়ে ‘মহাকর্ষীয় লেন্স এফেক্ট’ তৈরি হয়, পৃথিবী থেকে বিকিরণের তীব্রতা পর্যন্ত যাচাই করা যায়, কিন্তু, যদি সেই কৃষ্ণগহ্বর নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে? তাহলে? যদি এরকম হয় যে, বিশেষ কোন কোন সময়ে কৃষ্ণগহ্বর সক্রিয় হয়ে ওঠে? তাহলে?”

অমলের কথা শুনে অয়ন মাথা নাড়ল। সে বুঝতে পেরেছে অমল কী বলতে চাইছে। ইচিকা বলল, “এরকম কি সম্ভব? ”

এইবার অমলের আগে অয়ন নিজেই উত্তর দিল ইচিকাকে, “বার্সেলোনা অটোনোমা ইউনিভার্সিটিতেই প্রফেসর ওয়াং এর বৈজ্ঞানিকরা গবেষণাগারে চুম্বকীয় ক্ষেত্রে ওয়ার্মহোল তৈরি করতে পেরেছেন। বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করলে সেই ওয়ার্মহোল নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। যদি সত্যি কোনো অজানা শক্তি বা ডার্ক এনার্জি নিয়ন্ত্রিত করে কৃষ্ণগহ্বরকে, এরকম হওয়া অসম্ভব নয়।”

সকলে চুপ করে গেল। বিশ্বাসে ধাক্কা লাগলে সামলে নিতে সময় লাগে। ইচিকা দাঁত দিয়ে আঙুল কামড়াচ্ছে। অলিভার খুব মনোযোগ দিয়ে দুটো হাত জড়ো করে সেদিকে তাকিয়ে আছে। ডক্টর জস একসময় বললেন, “এবার তাহলে আমাদের করণীয় কী?”

অমল সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি সেই কৃষ্ণগহ্বরের ভিতরে যাব। একা। এটাই একমাত্র পথ। আমাকে যেতেই হবে।”

পৃথিবীর নিয়মে ২১৯০ সাল । ট্রেলব্লেজার, প্রক্সিমা সেন্টরি

সময় যত এগিয়ে আসছে, সকলের উত্তেজনা তত বাড়ছে। গত চার মাসে অনেকটা পথ এগিয়েছে তারা প্রক্সিমা সেন্টারির কৃষ্ণগহ্বরের দিকে। কিন্তু পরিকল্পনা করা এক ব্যাপার আর সত্যি সত্যি সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করা অন্য ব্যাপার। এখানে অজানা বিপদের সঙ্গে মোকাবিলা করার মতো কিছুই নেই, আছে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে স্বেচ্ছায় অজানার বুকে নিজেকে সমর্পণ করা। চার মাস আগে অমলের কাছ থেকে শোনার পর প্রথমে সকলে একমত হতে পারেনি। কৃষ্ণগহ্বরের ভিতরে যাওয়া মনে সাক্ষাত মৃত্যুর দরজায় গিয়ে কড়া নাড়া। কিন্তু সিমুলেশন হেলমেট পরে নিয়ে অমলের অভিজ্ঞতার অংশীদার হতে পেরে সকলের মধ্যেই অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছিল। সেই অভিজ্ঞতা লিখে বোঝানো যায় না। অয়নের মনে হয়েছে সে নিজে বছরের পর বছর ধরে সংকেত পাঠিয়ে ভিন্নগ্রহীদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। প্রতিটা সংকেত পাঠানোর পিছনের অগাধ পরিশ্রম, সংকেতের উত্তর পেয়ে সেটা বুঝতে না পারার ছটফটানি, সাফল্য আর একাকিত্বের প্রতিটা মুহূর্ত যেন সে নিজে অনুভব করেছে। ইচিকা, অলিভার, আর ডক্টর জসও একই ভাবে এই ব্যাখ্যাতীত অভিজ্ঞতার ভাগীদার হয়ে মুহ্যমান হয়ে গিয়েছিল।

কেন অমল এই প্রচন্ড ঝুঁকি নিতে চাইছে, কারো বুঝতে অসুবিধে হয়নি। অমলের মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সংকেতের মাধ্যমে পাওয়া মহাকাশীয় স্থানাঙ্ক বা সেলেস্টিয়াল কো-অর্ডিনেট লক্ষ করে ট্রেলব্লেজার পাড়ি দিয়েছিল প্রক্সিমা সেন্টরির কৃষ্ণগহ্বরের উদ্দেশ্যে, যার নাম তারা দিয়েছে ‘কিউরিওসিটি’।

অয়নের মধ্যে আশ্চর্য এক ভাব এসেছিল এরপর থেকে। সে বুঝতে পেরেছে মস্তিস্ক সিমুলেশন হেলমেট শুধু মানুষের কাজের পারদর্শিতা আর অভিজ্ঞতা বহন করে না, আসলে সিমুলেশন হেলমেট পরে অন্যের অভিজ্ঞতা গ্রহণ করার সময় তার ব্যক্তিত্বের অনেকটাই অন্য মানুষের মধ্যে চলে আসে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অয়ন বুঝতে পেরেছে, সে আর ইচিকা একসঙ্গে তিনজন মানুষের পরিচয় বহন করছে। মানসিক ভাবে অয়নের নিজস্ব মস্তিস্কই তাকে পরিচালনা করছে, কিন্তু সময়ে সময়ে অমল আর ডক্টর জসের ব্যক্তিত্ব তাদের উপস্থিতির প্রমাণ দিচ্ছে।

এক এক বার অয়নের মনে হয়েছে কেন এতদিন পরে সে বাবাকে পেয়েও হারাবে? কেন তাকে সে এই ঝুঁকি নিতে দেবে? কিন্তু পর মুহুর্তেই অমলের ব্যক্তিত্ব তাকে বলেছে যে মানুষের কর্তব্য হল অজানাকে জানিয়ে যাওয়ার জন্যে ঝুঁকি নেওয়া। এই কয়েক মাসে বাবাকে নতুন করে চিনতে পেরেছে সে। বাবার চেয়ে বেশি অমলকে সে বন্ধুভাবেই পেয়েছে। মহাকাশীয় বিজ্ঞানে তো বটেই, অন্যান্য ব্যাপারেও অমলের মেধা তাদের সকলকেই অবাক করেছে। অয়নের সবচেয়ে মুগ্ধ করেছিল যে ব্যাপারটা সেটা হল সব ক্ষেত্রেই অমল মন খোলা রাখে। কোনো গান, সাহিত্য, ঘটনা শুনেই বাতিল করে দেওয়া তার স্বভাবে নেই।

অনেকদিন পর ট্রেলব্লেজারের বৈঠকখানা সরগরম হয়ে উঠেছিল মানুষজনের কন্ঠস্বরে। শেষ অভিযানের আগে তারা কিছুদিনের জন্যে স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে নিতে চায়। ‘কিওরিওসিটি’ নির্দিষ্ট কো-অর্ডিনেটে কাল এসে পৌঁছেছে তারা, কিন্তু সেখানে কিছুই নেই। বোঝাই যাচ্ছে কৃষ্ণগহ্বর থাকলেও এখন তা সক্রিয় অবস্থায় নেই।

অমল তুড়ি মেরে বলল, “বন্ধুরা, আপাতত কিছু করার নেই। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।”

সেইদিন রাত্রে অয়ন একলা বসেছিল বাবার সঙ্গে। তার মনের মধ্যে তোলপাড় চলছে। অবশষে মনের সব জোর একত্র করে সে বলল, “বাবা, আমিও তোমার সঙ্গে যাব।”

অমল ছেলের দিকে তাকাল। পৃথিবীর সময় হিসেবে আজ সে বৃদ্ধই বলা চলে, সাঁইতিরিশ বছর বয়সে সে পৃথিবী ছেড়েছে। কিন্তু তাকে দেখে পঁয়তাল্লিশ বলে মনে হয়। সেই হিসেবে অয়ন তার চেয়ে বছর আটেকের ছোটো মাত্র।

সে হেসে বলল, “না রে, সে হয় না, আমার বয়স হয়েছে, সারাজীবন অনেকটা স্বার্থপরের মতনই ঘর সংসারের কথা ভুলে মহাকাশের রহস্যের পিছনে ছুটেছি। তার জন্যে অনেক দামও দিতে হয়েছে আমায়। একজন বৈজ্ঞানিক হিসেবে মানবসভ্যতার ভবিষ্যতের জন্যে সেই দায়িত্ব নিতে দ্বিধা করিনি ঠিকই কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের পরিবারের জন্যে যে দায়িত্ব থাকে, তাকে অবহেলা করেছি বলা যায়।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অমল আবার বলল, “লক্ষ কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্রহেও প্রাণের সম্ভাবনা আছে, আমরা তো শুধু সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রে এসেছি, একজন মানুষের জীবনে এই রহস্য সমাধান করা সম্ভব নয়। কিন্তু তোর হাতে এখনো সময় আছে, তুই ফিরে গিয়ে আজও স্বাভাবিকভাবে তোর জীবন কাটাতে পারবি হয়তো। অনেক কিছু হয়তো বদলে যাবে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে।”

অয়ন তাকে বাধা দিয়ে বলল, “কী ঠিক হবে বাবা? আমাদের পৃথিবী ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর প্রায় দেড়শ বছর কেটে গেছে। কী আছে আমার জন্যে সেখানে? মা নেই, ভাইবোন নেই, আত্মীয়স্বজন কেউ বেঁচে নেই। অনেক চেষ্টা করেও আমরা পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি আর। কার জন্যে ফিরে যাব আমি? ”

অমল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর এগিয়ে এসে অয়নের কাঁধে হাত রেখে বলল, “তোর কাছে আমি একটা সত্যি কথা বলতে চাই অয়ন, যা হয়তো আমি অন্য কাউকেই বলতে পারব না। এত বছর মহাকাশে কাটিয়ে আমি আজ যখন পিছন ফিরে তাকাই, আমারও ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। আমি জানি কেউ অপেক্ষা করে নেই আমার জন্যে। কিন্তু তাও আমি ফিরতে চাই। জানিস কেন? ”

অয়ন দুদিকে মাথা নাড়ল। অমল ধরা গলায় বলল, “পৃথিবী থেকে সূর্য ওঠা দেখব বলে অয়ন। সূর্যাস্ত দেখব বলে, বৃষ্টিতে ভিজব বলে, ছবি আঁকব বলে। বিজ্ঞান ছাড়াও মানুষের অনেক কাজ আছে অয়ন। তুই কোনোদিন মিলেনিয়াম পার্ক থেকে গঙ্গার ওপরে সূর্যাস্ত দেখেছিস? কী অপূর্ব লাগে তখন আকাশটাকে? তোকে এই সবের জন্যেই ফিরতে হবে অয়ন, তোকে ফিরতেই হবে।”

২১৯০ সাল। ‘কিউরিওসিটি’ কৃষ্ণগহ্বর, প্রক্সিমা সেন্টরি

“ওঠ অয়ন। সময় হয়ে গেছে।” ইচিকার উত্তেজিত কন্ঠ শুনে ধড়মড় করে উঠে বসল অয়ন। দৌড়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে গিয়ে স্ক্রিনের সামনে দাঁড়াতেই তার চোখ ধাঁধিয়ে গেল আলোয়। আলোর ঝিকমিকি জ্যামিতিক নকশার মাঝে আকাশে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে বিশালাকায় একটা কালো বলয়, যাকে ঘিরে অসংখ্য আলোককণা পাক খেতে খেতে মিলিয়ে যাচ্ছে কুচকুচে কালো সেই গহ্বরে। অয়ন অস্ফূটে বলে উঠল, “কৃষ্ণগহ্বর? সত্যি তাহলে এরকম হয়? ”

ডক্টর জস সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আমরা ক্রমাগত সংকেত পাচ্ছি কিউরিওসিটির স্থানাঙ্ক থেকে। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের নকশা আগের মতনই আছে। আমাদের কাছে বেশি সময় নেই। ইচিকা, রোভার আর-সেভেনকে বেরোনোর জন্যে তৈরি কর। প্রফেসর অমল, আমরাও যাব আপনার সঙ্গে।”

অমল ততক্ষণে স্পেসস্যুট পরে নিয়েছে। সে বলল, “তোমরা যেতে পারবে না জস, কেন না তোমাদের দায়িত্ব অনেক বেশি। আমি দুটো সিমুলেশন হেলমেটের যন্ত্রপাতিতে খানিকটা বদল করেছি, যাতে আমার তাৎক্ষণিক অভিজ্ঞতা অবিলম্বে স্থানান্তর করা সম্ভব, অনেকটা ট্রান্সমিটারের মতনই। যতক্ষণ আমি কৃষ্ণগহ্বরে থাকব, আমি যা দেখব বা অনুভব করব, তোমাদের মধ্যে কোনো একজন সেই একই মুহূর্তে একই জিনিস দেখতে বা অনুভব করতে পারবে, এই হেলমেট পরে থাকলে। আমি ফিরে আসি অথবা না আসি, সেই তথ্যগুলোকে পৃথিবীর মানুষদের কাছে পৌছে দেওয়ার দায়িত্ব তোমাদের। হয়তো মানুষ এই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সত্যি কোনোদিন মহাকাশের রহস্য ভেদ করতে পারবে। পারবে তো?”

ডক্টর জস কোন কথা বলতে পারলেন না। শুধু ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিলেন। অমল সকলের দিকে তাকিয়ে বলল, “ইচিকা, অলিভার, তোমাদের ওপর আমার অনেক ভরসা। যা কিছুই হোক না কেন, কোনদিন নিজের ওপর থেকে বিশ্বাস হারাবে না। তোমরা ঠিক কর কার সঙ্গে আমার মানসিক যোগাযোগ থাকবে কৃষ্ণগহ্বরের ভিতরে?”

ইচিকা আর অলিভার দুজনেই অয়নের দিকে তাকাল। অয়ন অমলের হাত থেকে হেলমেটটা নিয়ে মাথায় পরে নিল। যাওয়ার আগে অয়নের দিকে তাকিয়ে অমল স্মিত হেসে বলল, “চলি রে। দেখা হবে।” তারপর কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে উঠে বসলো রোভারে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আর-সেভেন রোভার ট্রেলব্লেজার থেকে বেরিয়ে আলোর ঝিকমিকানির মধ্যে দিয়ে ছুটে গেল কিউরিওসিটির উদ্দেশ্যে। অয়ন বিহ্বল দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল সেদিকে। সিমুলেশন হেলমেট পরে অমলের ভাবনা স্পষ্ট বুঝতে পারছে সে। অয়ন বুঝল, অমল আর কোনদিনই ফিরবে না।

কিউরিওসিটি কৃষ্ণগহ্বর । প্রক্সিমা সেন্টরি তারামন্ডল

কৃষ্ণগহ্বরের ঘনকালো অন্ধকারের এগিয়ে যেতে যেতে অমল বুঝতে পারল, মাধ্যাকর্ষণ বেড়ে গেছে বহুগুণ। রোভারের আশপাশ থেকে আলোর ফুলকি অবিরাম ভাবে ছুটে চলে ঝাঁপিয়ে পড়ছে কুচকুচে কালো অন্ধকারে। রোভারের ইঞ্জিনের কন্ট্রোল প্যানেলে বিপ বিপ শব্দ হতে শুরু করেছে। আর হাতে সময় নেই। অমল মাইকে চেঁচিয়ে বলল, “অয়ন, তুই কি অনুভব করতে পারছিস মাধ্যকর্ষণ?”

অয়নের গলার স্বর শোনা গেল, “হ্যাঁ। আমি সব দেখতে পাচ্ছি, অনুভব করতে পারছি।”

অমল আশ্বস্ত হল। তার প্রচেষ্টা তাহলে বৃথা যায়নি। মস্তিস্ক সিমুলেশন প্রোগ্রামে খুব সুক্ষ্ম কয়েকটা বদল করে তার মস্তিস্কের স্নায়ু থেকে তৈরি হওয়া বিদ্যুৎ তরঙ্গ গিয়ে জড়ো হচ্ছে অয়নের হেলমেটের স্টোরেজ প্রোগ্রামে। সে ফিরে না এলেও অয়নের মস্তিষ্কে তার অভিজ্ঞতা ধরা থাকবে। তার ছেলে হয়তো কোনোদিন এগিয়ে নিয়ে যাবে এই গবেষণা। আর তাহলে দেরি নয়। অমল স্বয়ংক্রিয় চালনা বন্ধ করে নিজে রোভারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গতি বাড়িয়ে দিল। তারপর শেষ বারের মতো মাইকে বলল, “ভালো থাকিস অয়ন। ”

মুহুর্তের মধ্যে রোভার আর-সেভেন প্রচন্ড গতিতে কৃষ্ণগহ্বরের ভিতরে প্রবেশ করল। অমল অনুভব করল, মাধ্যাকর্ষণের জোরে তার শরীরের ওপরে প্রচন্ড চাপ পড়তে শুরু করেছে। রোভারের বাইরের আস্তরণ খসে পড়তে শুরু করছে শব্দ করে। ভাঙা টুকরোগুলো অতলে ছুটে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রক প্যানেলে অ্যালার্ম বাজতে শুরু করেছে, কোন যন্ত্রপাতি কাজ করছে না। অমল প্রাণপণ শক্তিতে দাঁতে দাঁত চেপে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সামনের দিকে। যতক্ষণ তার জ্ঞান থাকে, সে দেখবে, বোঝার চেষ্টা করবে।

ক্রমে মাধ্যাকর্ষণের চাপ বাড়তে বাড়তে অসহনীয় হয়ে এল। মনে হচ্ছে স্পেসস্যুট সহ তার শরীর কুঁকড়ে ছোটো হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কোনরকম ব্যথা অনুভব করতে পারছে না অমল। কোথায় তার রোভার? কোথায় হেলমেট? একসময় অমলের মনে হল সে অনন্তকাল ধরে আলোর গতিতে এগিয়ে চলেছে গহ্বরের ভিতর, তার শরীর বলতে কিছু নেই, কিন্তু কোনো অজানা কারণে সে এখনো সব দেখতে পাচ্ছে, সব বুঝতে পারছে।

বড়ো অদ্ভুত এই অনুভূতি। সমস্ত কিছু যেন ভেঙে ছড়িয়ে পড়ছে। কোথায় কৃষ্ণগহ্বর? কোথায় মাধ্যাকর্ষণ? সে তো কতকাল ধরে এখানেই আছে!

কোথায় এই জায়গা? অমল অনুভব করল কোটি কোটি আলোর জ্যামিতিক নকশার মাঝে সে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই আলোর নকশা হারিয়ে যাচ্ছে না, বিদ্যুতের তারের মতো, মাকড়সার জালের মতো সূক্ষ্ম বুননে অজানা কোনো শক্তি বয়ে চলেছে এই আলোর সুতোর মধ্যে দিয়ে। প্রতি মুহুর্তে রং বদলে যাচ্ছে এই আলোর। কোথায় সে? অমল রঙিন আলোর জালের মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল। সে কি জাগতিক জগত ছাড়িয়ে এসেছে? সে কি আদৌ বেঁচে আছে? এই কি তবে সাইলেনটিয়াম?

সহসা দপ করে সব আলো নিভে গেল। অমল টের পেল সে তার পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। নিজের শরীরটাকে আবার অনুভব করতে পারছে সে। কোথায় দাঁড়িয়ে আছে সেটা বোঝার কোন উপায় নেই। হঠাৎ তার চোখের সামনে ফুটে উঠল জ্যামিতিক একটা নকশা। এই নকশা অমলের চেনা।

কিছু বোঝার আগেই কয়েকটা আলোর ঝিলিক অমলকে বিদ্যুতের মতো ছুঁয়ে গেল। পর মুহুর্তেই সে তার মাথার ভিতরে পরিষ্কার শুনতে পেল, “সাইলেনটিয়ামে আপনাকে স্বাগত জানাই, অমল।”

বিস্মিত হলেও অমল ঘাবড়ে গেল না। হয় সে স্বপ্ন দেখছে, সেক্ষেত্রে ভয় পেয়ে কোন লাভ নেই। কিন্তু যদি সে সত্যি জেগে থাকে, তাহলে এই অপার্থিব কান্ডকারখানা তাকে মনে রাখতে হবে। মানুষের জানার বাইরেও অনেক কিছু আছে, এই প্রতিষ্ঠিত সত্যের ওপরে বিশ্বাস করে বলেই সে বহু কষ্টে মনকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারল। তারপর প্রশ্ন করল, “আপনি কে? ”

মুহুর্তের মধ্যে অমল উত্তর পেল তার মস্তিষ্কের অন্তরে। কিন্তু এই উত্তর আসলে প্রশ্ন!

“আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না?”

অমল প্রশ্ন করল, “আপনি কি সেই প্রাণী যারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে? যার সঙ্গে সংকেত বিনিময় করে এসেছি আমি এত বছর ধরে? ”

“আমিই সেই যার সঙ্গে আপনি কথা বলেছেন। আমিই সেই ডার্ক এনার্জি ফর্ম। কিন্তু আমি কোনো প্রাণী নই।”

“তাহলে? ভিনগ্রহীরা কি নিজেদের প্রাণী বলে না? কোন গ্রহে থাকেন আপনারা? ”

কিছুক্ষণ পর উত্তর এল, “অমল, আপনি ধৈর্য ধরুন। আপনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, সেটা সাইলেনটিয়াম। কৃষ্ণগহ্বরের-এর অদ্বৈত বিন্দু। একটা বিশেষ সময়ের পর এখানে কেউ থাকতে পারে না। আমি যতটা সম্ভব, আপনাকে বুঝিয়ে বলছি।”

অমল সাহস করে বলল, “মানে আপনি বলছেন এখান থেকে ফেরা সম্ভব! আমরা মনে করতাম কৃষ্ণগহ্বরের দিগন্ত সীমা থেকে ফিরে যাওয়া কোনমতেই সম্ভব নয়।”

“হয়তো আপনি খানিকটা সত্যি বলেছেন। ফেরা সম্ভব নয়, কিন্তু এগিয়ে তো যাওয়া যায়। আপনারাই তো বলেছেন কোয়ান্টাম তথ্য কোনদিন হারিয়ে যায় না, তাহলে কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রে গিয়েও কিছুই হারিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আপনি তো এই নিয়েই গবেষণা শুরু করেছিলেন?”

“এটা তো পৃথিবীর তথ্য আপাত-বৈপরীতা নিয়ম, আপনি এসব জানলেন কী করে? এক মিনিট...আমার গবেষণা...এটা কি তবে ওয়ার্মহোলের একটা পথ?” অমল অবাক হয়ে বলল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সে শুনতে পেল তার প্রশ্নের উত্তর। “আমি জানি, কেননা আপনারাই আমাকে তৈরি করেছেন। সত্যি বলতে আপনিই আমার জন্মদাতা।”

অমল হতভম্ব হয়ে বলল, “আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“অমল, সাইলেনটিয়াম আর কিছুই নয়, আপনার তৈরি করা একটা কমপিউটার সিমুলেশন প্রোগ্রাম। আপনিই আমার জন্মদাতা। পৃথিবীর মানুষ কোনদিনই লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ পেরিয়ে মহাকাশে অনুসন্ধান চালাতে পারত না। মানুষের আয়ু খুব সীমিত। এই সত্যিটা অনুভব করতে পেরেই আপনি এমন একটা সিমুলেশন প্রোগ্রাম তৈরি করার কথা ভেবেছিলেন, যার পক্ষে মহাকাশের অসংখ্য সিমুলেশন বা প্রতিলিপি তৈরি করা সম্ভব। মানুষ হয়তো এন্ড্রমিডা গ্যালাক্সিতে যেতে পারবে না, কিন্তু যদি এন্ড্রমিডা গ্যালাক্সির একটা প্রতিলিপি তৈরি করা যায়, সেখানে যাওয়া সম্ভব হতে পারে।”

অমলের ব্যাপারটা বোধগম্য হচ্ছিল না। সে কবে এই প্রোগ্রাম তৈরি করল? কম্পিউটারে তৈরি করা কোনো প্রোগ্রাম কি জড়জগতে কোনো ভূমিকা পালন করতে পারে? তার মনে আসা প্রশ্নের উত্তর পেতে সময় লাগল না অমলের।

“আপনার মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক অমল। আপনার মস্তিষ্ক যে জগৎ থেকে এসেছে, সেখানে প্রোগ্রাম বলতে শুধুই যন্ত্রের মাথায় পুরে দেওয়া কয়েকটা গাণিতিক পরিভাষা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি উন্নত হয়। আপনার সময়ে কৃত্রিম বাস্তব বা ভারচুয়াল রিয়ালিটি নিয়ে গবেষণা চলছিল। আজকাল প্রোগ্রাম মানে শুধুই যন্ত্রমগজের কার্যবিধি নয়, মানুষের তৈরি প্রোগ্রাম তৈরি করতে পারে আরেকটা বাস্তব জগতের প্রতিকৃতি। বাস্তব আর প্রতিকৃতিতে সংযোগ ঘটাতে পারে এই সিমুলেশন প্রোগ্রাম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আপনার গবেষণা অনেক উন্নত হয়েছে অমল। ভবিষ্যত প্রজন্ম নানা ভাবে আমাকে উন্নত থেকে উন্নততর করে চলেছে। আমি আপনার তৈরি করা প্রোগ্রামের ৫৬১তম ভার্শন। আমিই সাইলেনটিয়াম। অতীত আর ভবিষ্যত আমার কাছে কার্যকারণ বা হেতু আর ফলাফলের দুটো চেহারা মাত্র। আপনি আমার সঙ্গে আগেও কথা বলেছেন, হয়তো অন্য কোনো সময়, অন্য কোনো সমান্তরাল পৃথিবী থেকে মহাকাশ অভিযানে এসে।”

অমলের মাথা ঘুরতে শুরু করেছে ততক্ষণে। কন্ঠস্বর বলে চলেছে, “অমল, আপনি কর্মজীবনের প্রথমে ওয়ার্মহোল নিয়ে গবেষণা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই গবেষণা শেষ হয়নি। আপনার গবেষণায় ভুল ছিল না, একসময় মানুষ জানতে পারবে ওয়ার্মহোল আসলে বাস্তব, যেখান থেকে দুটো দেশকালের মাঝে একটা সেতু তৈরি হয়। এই সেতু তৈরি করার একমাত্র উপায় হলো কৃষ্ণগহ্বর। কৃষ্ণগহ্বরের অপর প্রান্ত দিয়ে দেশকাল অতিক্রম করা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সহজ গয়ে গিয়েছে। এখন সাইলেনটিয়াম প্রোগ্রামের মাধ্যমে এই ওয়ার্মহোলের সিমুলেশন তৈরি করাও সম্ভব। কয়েক হাজার সময়ের সেতু ছড়িয়ে আছে মহাকাশে, যার ফলে অতীত আর ভবিষ্যতের দূরত্ব মিটে গেছে। তৈরি হয়েছে হাজার হাজার সমান্তরাল পৃথিবী। কোনো পৃথিবীতে আপনি হয়তো গবেষণা করছিলেন রকেটের জ্বালানি প্রসারণ নিয়ে, কোন পৃথিবীতে হয়তো ওয়ার্মহোল অথবা সাইলেনটিয়াম প্রোগ্রামের গাণিতিক তথ্য নিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু একই মুহুর্তে দেশকালের অন্য কোথাও অন্য কোনো অমল হয়তো কাজ করে চলেছে সম্পূর্ণ অন্য আরেকটা বিষয় নিয়ে।

“আপনি যে কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন, সেটা একটা প্রতিকৃতি মাত্র। কিন্তু প্রতিকৃতি হলেও বিজ্ঞানের নিয়ম এখানেও একই। সেটা পাল্টানো অসম্ভব। এই মুহুর্তে প্রতিকৃতি আর বাস্তবে কোন তফাৎ নেই। আমার দায়িত্ব শুধু মানুষের ভবিষ্যতের কথা ভেবে কয়েকটা সমান্তরাল পৃথিবীর মধ্যে একটা যোগাযোগ তৈরি করা। মনে করুন একজন বৈজ্ঞানিক যিনি ক্যান্সারের ওষুধ আবিষ্কার করবেন, হয়তো হাজারটা সমান্তরাল পৃথিবীতে একজন মাত্র ওষুধ নিয়ে গবেষণা করছে। বাকিরা কেউ চাকরি করছে, কেউ সাহিত্যিক, কেউ দোকান চালাচ্ছে। কিন্তু অন্তত কোনো একজন তার জন্যে নির্দিষ্ট কাজটা করুক, সেই যোগাযোগ করিয়ে দেওয়াটাই আমার কাজ। অনেক সময় তার কোন দরকারই পড়ে না। মানুষেরা নিজের নির্দিষ্ট পথ নিজেই ঠিক করে নেয়। আপনার কথাই ঠিক, না জানা অনেক কিছুই সবসময় থেকে যায়। আমরা অনেক কিছুই জেনেছি কিন্তু সব কিছু জানতে পারিনি।”

অমল চুপচাপ শুনছিল। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে সে বলল, “আমার সঙ্গে যোগাযোগের কারণ কি? ”

“সেটা বলা কঠিন। অ্যালগরিদম অনুযায়ী কোনো কার্যকলাপের পিছনে অনেক কারণই থাকতে পারে। হয়তো কোনো না কোনো ভাবে আপনার এই অভিজ্ঞতা অন্য এক সমান্তরাল পৃথিবীতে কয়েকটা মানুষের জীবন আরো সুন্দর করে তুলবে। সেটাই তো বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য। কিন্তু আপনার হাতে আর সময় নেই। এবার আপনাকে যেতে হবে অমল। ভালো থাকবেন। বিদায়।”

সহসা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে অমলের সামনের দৃশ্য এলোমেলো হয়ে গেল। চমকে উঠে অমল দেখল সে আবার সুরঙ্গের ভিতর দিয়ে ছুটে চলেছে। সেই সাদা কালো হলুদ সবুজ জ্যামিতিক নকশাকে কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সে। আলোর ঝিকিমিকির মধ্যে একসময় অমল আবিষ্কার করল সে রোভারের মধ্যেই বসে আছে। অমলের মনে হতে লাগল তারা আলোর চেয়েও বেশি গতিতে এগিয়ে চলেছে। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে চলেছে নানা উল্কার টুকরো।

প্রচন্ড বেগে একসময় কম্পন শুরু হল। অমলের শরীর কাঁপতে শুরু করেছে, তারপর সে শুনতে পেল প্রচন্ড একটা শব্দ। তারপর আর তার কিছু মনে নেই।

উপসংহার

চোখ খুলতেই অমল দেখল সে শুয়ে আছে সাদা রঙের একটা বিছানায়। দেখে মনে হচ্ছে একটা হসপিটালের কামরা। আস্তে আস্তে উঠে বসল সে। কোথায় আছে সে? ধীরে ধীরে খাট থেকে নেমে দরজা খুলে দাঁড়াল অমল। মনে হচ্ছে এটা হসপিটালের করিডোর। এখানে কি করে এল সে? হঠাৎ একজন মহিলা নার্সকে দেখতে পেয়ে অমল প্রশ্ন করে, “শুনছেন? এক্সকিউজ মি! ”

মহিলা অমলের দিকে চেয়ে খুব সহজ ভাবে হেসে তার কাছে এগিয়ে এসে বলেন, “আপনি উঠে পড়েছেন প্রফেসর? এখন কেমন লাগছে?”

অমল তখনও ধন্ধে আছে। সে বলল, “আমি কোথায়? কী হয়েছিল? ”

“আপনি হিউস্টনে। এটা নাসার একটা হসপিটাল। আপনার স্পেসস্যুটের যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ভাগ্যিস মহাকাশ স্টেশন থেকে খুব দূরে যাননি! সেসব কথা থাক, আপনি এখন বিশ্রাম নিন। বাকি ঘটনা প্রফেসর ওয়াং এর মুখেই শুনবেন।”

অমল চমকে উঠে বলল, “প্রফেসর ওয়াং? তিনি বেঁচে আছেন? ”

মহিলা হেসে বললেন, “বেঁচে থাকবেন না কেন? আপনি প্রচন্ড শক পেয়েছেন, কিছুদিন বিশ্রাম নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”

অমলকে ঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলেন মহিলা। অমল ঘুমিয়ে পড়ল। তার খুব ঘুম পাচ্ছে। বিকেলে চোখ খুলে অমল দেখল তার বিছানার পাশে হাসিমুখে বসে আছেন প্রফেসর ওয়াং। বিস্মিত হয়ে অমল বলে উঠল, “আপনি?”

প্রফেসর ওয়াং এসে অমলের মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “চলে এলাম। ছাড়তে কি চায়? এদিকে পারমাণবিক প্রসারণ নিয়ে গবেষণা চলছে বলে ম্যানেজমেন্ট একেবারে মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। একের পর এক মিটিং। তুমি কেমন আছ?”

অমল ফ্যালফ্যাল করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল প্রফেসর ওয়াং এর দিকে। তারপর শুধু বলল, “ভালো।”

প্রফেসর ওয়াং আরো খানিকক্ষণ বসে উঠে পড়লেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, “তুমি ব্যাপারটা যেভাবে পরিচালনা করেছ অমল, আমার গর্ব হয় তোমাকে নিয়ে। সর্সারার প্রকল্প সফল হলে তোমাকেই আমি এই দায়িত্ব দেব।”

অমল কিছুই বুঝতে না পেরে ঘাড় নাড়ল। পুরো এক সপ্তাহ অমল হাসপাতালে শুয়ে বসে কাটিয়ে দিল। ততদিনে সে অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। জানতে পেরেছে যে প্রফেসর ওয়াং নাসাতে গবেষণা চালাচ্ছেন। সে তার সঙ্গেই কাজ করছে। কয়েকদিন আগেই মহাকাশে অবস্থিত হাবল টেলিস্কোপের কয়েকটা যন্ত্রপাতি আপগ্রেড করতে অমল আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে গিয়ে কয়েকদিন ছিল। একদিন মহাকাশে কাজ করার সময় হঠাৎ ছুটে আসা স্পেস ডেবরির ভাঙা একটা উপগ্রহের টুকরোর আঘাতে সে জ্ঞান হারায়। মহাকাশ স্টেশনে তার সঙ্গে থাকা প্রফেসর মিগুয়েল এসে তাকে উদ্ধার করেন।

এখন পৃথিবীতে ১৯৯৮ সাল। গত দু’বছর আগেই অমল ইসরো ছেড়ে নাসাতে জয়েন করেছে। প্রফেসর ওয়াং নাসা ছাড়েননি, এখান থেকেই মহাকাশের রহস্য ভেদ করার চেষ্টা করছেন। প্রফেসর মিগুয়েল বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে চর্চা করলেও প্রধানত তথ্য সিমুলেশন নিয়ে কাজ করেন।

নাসা থেকে দু’মাসের ছুটি নিয়ে বাড়ি যাচ্ছে অমল। তার ছেলে অয়নের বয়স এখন এক। কৃষ্ণগহ্বরের ব্যাপারটা নিয়ে অনেক ভেবেছে অমল। তার ধারণা সাইলেনটিয়াম কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রের উল্টো দিকে একটা শ্বেতগহ্বরের প্রতিকৃতি তৈরি করছে। কৃষ্ণগহ্বর যত কিছু আকর্ষণ করে টেনে নেয় মাধ্যাকর্ষণ এর কারণে, শ্বেতগহ্বর বা হোয়াইট হোল সব কিছুই দেশকালের অন্য এক বিন্দুতে নিক্ষেপ করে। অনেক অনেক বছর আগে এই ধারনা নিয়েই ইসরোতে গবেষণা করতে চেয়েছিল সে। সাইলেনটিয়ামের কথা কাউকে বলেনি অমল। বললেও কেউ তাকে বিশ্বাস করবে না। অনেক প্রশ্নের উত্তর সে নিজেও এখনো পায়নি, কিন্তু সে সব নিয়ে চিন্তা করতে তার আর ইচ্ছা করে না।

অমল লক্ষ করেছে, মহাকাশ অভিযান, তার নিজের অভিজ্ঞতা, অলিভার, ইচিকা, ডক্টর জস, তার আগের জীবনের সব কথা ধীরে ধীরে আবছা হতে শুরু করেছে তার স্মৃতি থেকে। হয়তো এরকমই হয়, একটা পৃথিবীতে সমান্তরাল পৃথিবীর স্মৃতি আবছা হয়ে একসময় মুছে যায়। কিন্তু অয়নের কথা পরিষ্কার মনে আছে তার। সে হয়তো তার পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে গবেষণা করবে অমলের মস্তিষ্ক সিমুলেশন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। না করলেও কিছু যায় আসে না।

মিলেনিয়াম পার্কের একটা বেঞ্চে অয়নের হাত ধরে বসে ছিল অমল। সূর্য ডুবে যাচ্ছে গঙ্গার জলে। সন্ধ্যা নামার আগে একটা কমলা আভা ছড়িয়ে গেছে চারদিকে। গাছের ওপর থেকে পাখিদের কলকল শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। শেষবেলায় পাখিরা ঘরে ফিরছে। একটা সুখের আভাস তার মন ভালো করে দিচ্ছে। আঙ্গুল জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট অয়ন। এখনো ভালো করে কথা বলতে শেখেনি। অমলের জামা ধরে আধো আধো গলায় অয়ন বলল, “বাবা! তুমি আবার চলে যাবে না তো?”

সহসা অমলের মনে অনেক না বোঝা, না জানা স্মৃতি ভিড় করে এল। বুঝতে না পারা কিছু সুখ আর দুঃখ একাকার হয়ে তার চোখদুটো ভিজিয়ে দিল। জামার হাতায় চোখ মুছে হাসতে হাসতে অমল ছেলেকে কোলে তুলে নিল। তারপর তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “না সোনা, কোনোদিন যাব না। কোনোদিন না।”

অধ্যায় ২ / ২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%