মরণোত্তম – ৪

সাদাত হোসাইন

চিলেকোঠার ঘরটার বাইরে খোলা ছাদ। সেখানে ফুরফুরে হাওয়া বইছে। পাশাপাশি দুখানা চেয়ার পাতা। আকাশে অজস্র নক্ষত্র। সেই নক্ষত্রখচিত আকাশের নিচে বসে আজিজ মাস্টার কথা শুরু করলেন, ‘আমার আব্বা মারা গেছেন আজ প্রায় তিরিশ বছর।’

‘দবির উদ্দিন খাঁ ?’

‘হুম। আব্বার খুব শখ ছিল একটা স্কুল হবে ওই এলাকায়। কিন্তু কে করবে স্কুল ? দোকানপাট, হাটবাজার, ক্লাব কাচারি করার সময় আছে সবার। কিন্তু একখান স্কুল করার সময় নেই কারও। টাকাও নেই। আমার আব্বা যে অনেক ধনী মানুষ ছিলেন এমন না। তবে পৈতৃকসূত্রে জমিজমা পেয়েছিলেন ভালোই। একদিন কী পাগলামি যে চাপল তাঁর মাথায়, হঠাৎ জমিজমা বিক্রি শুরু করলেন। বিঘার পর বিঘা।’

‘তারপর ?’

‘তারপর আর কী! সেই জমি বেচা টাকায় স্কুলের কাজ শুরু হলো। কিন্তু এদিক সেদিক থেকে নানান বাধা আসা শুরু করল।’

‘বাধা কেন ?’

‘মানুষের মনস্তত্ত¡ বড় জটিল আসাদ সাব। তারা নিজেরা অন্যের জন্য কিছু করবে না। করবে নিজেদের আখের গোছানোর জন্য। কিন্তু কেউ যখন সমাজের জন্য কিছু করা শুরু করবে, সঙ্গে সঙ্গে সেইখানে দুরভিসন্ধি খোঁজার চেষ্টা করবে।’

‘এখানে দুরভিসন্ধির কী আছে ? স্কুলের সঙ্গে দুরভিসন্ধির কী সম্পর্ক ?’

‘আছে না, অনেকে রাজনীতি করেন। তাদের বাপ-দাদারাও রাজনীতি করতেন। সেই সূত্রে এলাকায় বিরাট প্রভাব। তারা হঠাৎ ভাবল, আমার আব্বার কি কোনো রাজনৈতিক খায়েশ আছে নাকি! নিশ্চয়ই আছে। না হলে নিজের বাপ-দাদার জমি বেচে কেন সে স্কুল দিচ্ছে ? স্কুলে তো আর ব্যবসা বাণিজ্য হবে না। নিশ্চয়ই অন্য কোনো উদ্দেশ্য তাঁর আছে।’

‘ওহ।’ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল আসাদ। ‘তো তারা ঝামেলা করা শুরু করল ?’

‘হুম। কিন্তু তাতে অবশ্য আব্বা দমলেন না। তিনি কাজ শুরু করে দিলেন। তবে তাঁর ভাগ্যটা খারাপ। কিছুই গুছিয়ে আনতে পারলেন না।’

‘কেন ?’

‘তার আগেই মারা গেলেন।’

আসাদ খানিক থমকে গেল। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘স্বাভাবিক মৃত্যু ? না অন্য কোনো ঘটনা আছে ?’

‘নাহ, স্বাভাবিক মৃত্যু। আব্বার মৃত্যুর পর অনেক কষ্টে আমি স্কুলটা শুরু করি। আব্বার নামেই নাম দেই স্কুলের, দবির খাঁ মেমোরিয়াল হাই স্কুল। আব্বার রেখে যাওয়া যত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ছিল, তার সবই মনে করেন এই তিরিশ বছরে স্কুলের পেছনে খরচ করেছি। কিন্তু স্কুল এমপিওভুক্ত করতে পারি নাই।’

‘কেন ? এত বছরে তো হয়ে যাওয়ার কথা!’

‘কারণ নুরুল মোল্লা।’

‘নুরুল মোল্লা কে ?’

‘দবির খাঁ মেমোরিয়াল হাই স্কুলের সভাপতি। স্থানীয় চেয়ারম্যানও উনি। রাজনীতিতে ভালো নামডাক। ভবিষ্যতে এমপি হওয়ার সম্ভাবনাও তাঁর আছে।’

‘স্কুল এমপিওভুক্ত হলে তাঁর সমস্যা কী ?’

আজিজ মাস্টার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সমস্যা তেমন কিছু না। আবার অনেক কিছুও।’

‘তার মানে কী ?’

‘মানে হলো, উনি চান স্কুলের নামকরণটা ওনার নামে হোক। ওনার নামে হলেই উনি বাদবাকি সব ব্যবস্থা করে দিবেন।’

‘কিন্তু আপনি রাজি হন নি। তাই তো ?’

‘হুম। এত কষ্ট করে এত বছর, নিজের সব সহায়সম্পত্তি শেষ করে স্কুলটা করলাম। আর এখন সেইটার নাম হবে অন্য একজনের নামে। বিষয়টা মেনে নিতে পারি নাই আমি।’

‘পারার কথাও না।’

‘এই নিয়েই সমস্যা। তো আমাকে রাজি করাতে না পেরে শুরু হলো তাঁর নানামুখী ষড়যন্ত্র। সরাসরি কিছু না বললেও আড়ালে আবডালে থেকে প্রায় সব উপায়েই তিনি চেষ্টা করতে থাকলেন যাতে কোনোভাবেই স্কুলটা সরকারি না হয়। আমিও অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। কারণ কোনো বড় নেতা বা কোনো মন্ত্রী-মিনিস্টারের সাথে আমার পরিচয় নাই।’

আজিজ মাস্টার একটু থামলেন। আসাদ বলল, ‘তারপর ?’

‘তারপর আর কী। একটা সময় এসে আমি তাঁর প্রস্তাব মেনে নিলাম।’

‘মেনে নিলেন!’

‘হুম।’ অসহায় গলায় বললেন আজিজ মাস্টার।

‘তাহলে আর কী ? সমস্যা তো মিটেই গেল।’

‘উঁহু। মিটল না। আমি আসলে তখনো তাঁকে কিছু জানাই নি। তবে মনে মনে নিজেই নিজেকে বোঝালাম যে শুধু নামের কারণে স্কুলটা বন্ধ হয়ে যাবে ? আমি তো আর একা একা চালাতে পারছিলাম না। তো স্কুলটা বন্ধ হয়ে গেলে ওই এলাকার হাজার হাজার ছেলেমেয়ের পড়াশোনার সুযোগটা নষ্ট হয়ে যাবে। তারচেয়ে তাঁর প্রস্তাবটা মেনে নেই। নামে আর কী এসে যায়! নামের চেয়ে এই ছেলেমেয়েগুলোর ভবিষ্যৎ অনেক গুরুত্বপূর্ণ।’

‘তো প্রস্তাব শুনে উনি কী বললেন ?’

‘উনাকে প্রস্তাবটা দেওয়ার আগেই একটা ঘটনা ঘটে গেল। তখনো আমি পুরোপুরি সিদ্ধান্তটা নিতে পারি নি। নিজের সঙ্গে নিজে যুদ্ধ করছিলাম। কিন্তু একটা ভয়াবহ ঘটনা সব ওলটপালট করে দিল।’

‘ভয়াবহ ঘটনা ?’

‘হুম।’

‘কী ঘটনা ? কোহিনুর সংক্রান্ত ?’

‘হুম।’ বলে খানিক থমকালেন আজিজ মাস্টার। তারপর ধীরস্থির ভঙ্গিতে বললেন, ‘স্কুলে ক্লাস টেনের এক ছাত্রী, নাম কোহিনুর। সে একদিন স্কুল লাইব্রেরিতে এসে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।’

‘কেন ?’

‘স্কুলের সামনের রাস্তায় কতকগুলো বখাটে ছেলে মিলে রোজ তাকে উত্যক্ত করত। শুধু যে তাকেই করত, তাও না। অন্যদেরও করত। কিন্তু অন্য মেয়েগুলো এসে কখনোই কোনো অভিযোগ করে নি। কিন্তু কোহিনুর যেদিন এসে ওভাবে কান্নাকাটি শুরু করল, সেদিনই আমি বুঝেছিলাম, ঘটনা নিশ্চয়ই গুরুতর কিছু। ছোটখাটো কোনো ঘটনা হলে সে ওভাবে আসত না। সমস্যাটা হচ্ছে ওই ছেলেগুলোর মধ্যে চেয়ারম্যানের ছেলেও ছিল। সেই ছেলের নাম রাকিব। তো আসল ঘটনা হলো ওই বখাটে ছেলেগুলোর নেতৃত্ব দিত রাকিব। আর এ কারণেই কেউ তাদের কিছু বলার সাহস পেত না। দলবল নিয়ে প্রায়ই স্কুলের নানান মেয়েকে উত্যক্ত করত সে। কাউকেই ভয় পেত না। যা হয় আর কী, চেয়ারম্যান বাবার অনেক ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি। বাধা দেওয়ারও কেউ নেই। আবার পরিবার থেকেও কোনো শাসন-বারণ ছিল না। ফলে দিন দিন খুব বেপরোয়া হয়ে উঠছিল সে। তার বাবা নুরুল মোল্লার ভয়ে তাকে কেউ কিছু বলতেও সাহস পেত না। স্কুলে আসার পথে সে প্রায়ই কোহিনুরকে বিরক্ত করত। বিষয়টা দিন দিন বাড়ছিল।’

‘আচ্ছা।’

‘কোহিনুরকে ওভাবে কাঁদতে দেখে আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু করারও তেমন কিছু ছিল না। ওই এক স্কুলের জন্য খাটতে খাটতেই মনে হয় সাহস, শক্তি, আত্মবিশ্বাস যা ছিল সব হারিয়ে ফেলেছিলাম। বড়গলায় যে কাউকে কিছু বলব, সেই অবস্থাও আর নেই। তারপরও সাহস করে নুরুল মোল্লার কাছে গেলাম। গিয়ে পুরো ঘটনা খুলে বললাম। ভেবেছিলাম বিষয়টা শুনে তিনি উদ্বিগ্ন হবেন।’

‘হন নি ?’

আজিজ মাস্টার ম্লান হাসলেন। তারপর অসহায় গলায় বললেন, ‘তিনি আমাকে চমকে দিয়ে বললেন, এই বয়সের পোলাপান এমন একটু-আধটু করেই। এইটা নিয়া এত সিরিয়াস হওয়ার কিছু নাই। কী মাস্টার সাব, বয়সকালে আপনে এমন কিছু করেন নাই ?’

‘কী বলেন!’

‘হুম।’

‘শুনে আপনি কিছু বলেন নি ?’

‘বলেছি। আমার হঠাৎ খুব রাগ লেগে গেল। কিন্তু তারপরও রাগলাম না। যতটা সম্ভব নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, চেয়ারম্যান সাব, মেয়ে কিন্তু আমাদের সবার ঘরেই আছে। আপনার ঘরেও আছে, আমার ঘরেও আছে। এখন আমরা যদি এগুলোরে গুরুত্ব না দেই, তাহলে আমাদের মেয়েদের বেলায় কি অন্যরা গুরুত্ব দিবে ?’

‘শুনে কী বললেন তিনি ?’

‘একটু যেন থতমত খেয়ে গেলেন। কারণ তাঁর ঘরেও দুজন বিবাহযোগ্যা মেয়ে আছে। তাদের একজন তখন কেবল বাইরে থেকে ঘরে ফিরছিল। তো চেয়ারম্যান সাব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে গম্ভীর গলায় বললেন, এইটা একটা জ্ঞানী মানুষের মতো কথা বলেছেন মাস্টার সাব। ঘর শাসন না করলে আমি পর শাসন করব কেমনে! মেয়ে তো আমার ঘরেও আছে। আপনার ঘরেও আছে। মেয়ের বাপ হিসেবে সবার আগে নিজের ছেলেকে শাসন করাটা জরুরি। আজই আমি ছেলেকে ডেকে শাসিয়ে দিব।’

আসাদ উচ্ছ্বাসিত গলায় বলল, ‘উনি এই কথা বললেন ?’

‘হ্যাঁ। আর তাঁর এই কথা শুনে আমি এতটাই খুশি হয়েছিলাম যে খুব নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম।’

‘তারপর ? কাজ হয়েছিল ?’

আজিজ মাস্টার ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, ‘উঁহু। ছেলেকে তিনি কী বলেছিলেন জানি না। কিন্তু এরপর থেকে রাকিব আরও বেপরোয়া হয়ে উঠল। পরদিন বিকেলেই কোহিনুরের গায়ের ওড়না টেনে ছিঁড়ে ফেলল সে।’

‘কী বলছেন স্যার ?’

‘হুম’।

‘শুধু তা-ই না।’ আজিজ মাস্টারের গলা যেন ভারী হয়ে উঠল। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, ‘রাস্তার মাঝখানে তাকে জাপটে ধরে চুমুও খেল সে। তারপর সেই দৃশ্য আবার মোবাইল ফোনেও ভিডিও করে রাখল তার সাঙ্গপাঙ্গরা।’

‘কেউ ছিল না সেখানে ? কেউ কিছু বলল না ?’

‘উঁহু। নুরুল মোল্লা ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি করেন। কে কী বলবে ?’

‘তাই বলে প্রকাশ্য রাস্তায় ?’

‘হুম।’ আজিজ মাস্টার করুণ ভঙ্গিতে হাসলেন, ‘এই ঘটনা তো আর এই দেশে নতুন কিছু না। অহরহ হয়, হচ্ছে। হচ্ছে না ?’

আসাদ সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিল না। সামান্য চুপ করে থেকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। তারপর বলল, ‘হ্যাঁ, হচ্ছে। পত্রিকা খুললেই এই খবর। টেলিভিশন ছাড়লেই এই খবর। যেন এর বাইরে আর কোনো খবর নেই।’

আজিজ মাস্টার বললেন, ‘সেটাই। এবং কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। কেন যাচ্ছে না জানেন ?’

‘জানি।’

‘কেন ?’

‘অনেক কারণই আছে। তবে সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই ধরনের অপরাধের বিচার হয় না। হলেও নামে মাত্র বিচার হয়। অপরাধী নানা কারণে ছাড়া পেয়ে যায়। যেন অপরাধ করামাত্রই অপরাধী শক্তিশালী হয়ে যায়। সে চলে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই বিচারহীনতাটাই অন্যতম প্রধান কারণ।’

আজিজ মাস্টার অবশ্য হ্যাঁ-না কিছু বললেন না। তিনি বললেন কোহিনুরের গল্প, ‘এরপর থেকে কোহিনুরের জীবনটা সত্যিকার অর্থেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। রাকিবের সাঙ্গপাঙ্গরা সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া শুরু করল। সঙ্গে নানান কুপ্রস্তাব তো রয়েছেই। কোহিনুর যদি তাদের প্রস্তাবে রাজি না হয়, তাহলে তারা সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দিবে। এক সন্ধ্যায় কোহিনুর তার মাকে নিয়ে আমার বাড়িতে এল। তারপর হঠাৎ আমার পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।’

আজিজ মাস্টারের গলাটা ভারী হয়ে এল। তিনি খানিক থামলেও আসাদ কোনো কথা বলল না। আজিজ মাস্টার বললেন, ‘কোহিনুরের কাছে সব কথা শুনে আমি মোটামুটি বোবা হয়ে রইলাম। এতকিছু ঘটতে পারে, এটা আমি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারি নি। কিন্তু কোহিনুরের কান্নাকাটি দেখেও আমি তাকে কিছুই বলতে পারলাম না। কী বলব ? আমার তো কিছু করার ক্ষমতা নেই। একটা অক্ষম অসহায় মানুষ আমি। সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। কিন্তু তারপরও সারাটা রাত আমি ঘুমাতে পারলাম না। নিজেকে খুব অথর্ব আর মেরুদণ্ডহীন মনে হতে লাগল। পরদিন খুব ভোরে ফজরের নামাজ পড়েই চেয়ারম্যান-বাড়িতে গেলাম। গিয়ে চেয়ারম্যান সাহেবকে সব খুলে বললাম। শুনে তিনি আর আগের মতো হেসে উড়িয়ে দিলেন না। এবার যারপরনাই চিন্তিত হলেন। রেগেও গেলেন সঙ্গে সঙ্গে। তারপর বললেন, এরকম হইলে তো ঝামেলা মাস্টার সাব। এটা তো হতে দেওয়া যায় না। চেয়ারম্যানের কথা শুনেও আমি কিছু বললাম না। বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম, উনি কতটা মন থেকে কথাগুলো বলছেন। কারণ এর আগেরবারও উনি কথা দিয়েছিলেন। তো চেয়ারম্যান সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজ থেকেই আগের ঘটনার কথা তুললেন। বললেন, আগের ঘটনা পর্যন্ত তাও মেনে নেওয়া যেত। এই বয়সের পোলাপান, একটু এদিক সেদিক করেই। কিন্তু তাই বলে এমন জঘন্য ঘটনা ? আমি এই এলাকার চারবারের চেয়ারম্যান। আমার বংশের একটা মানমর্যাদা আছে। আর সেই আমার এলাকায়, আমার এলাকার মেয়েছেলেরা রাস্তাঘাটে এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়বো! আমার জন্য এর চেয়ে আর লজ্জার কী হইতে পারে! আমার একটা মানসম্মান আছে। মোল্লাবাড়িরও আছে। সেই বাড়ির সন্তান হয়ে আমার ছেলে…! চেয়ারম্যান সাহেব নিজে খুবই আপসেট হয়ে গেলেন। যেন ভেঙে পড়লেন একভাবে। বিষয়টা দেখে তাঁর জন্য আমার খারাপও লাগতে শুরু করল। আবার ভালোও লাগল এটা ভেবে যে লোকটাকে যতটা খারাপ মনে করেছি, ততটা খারাপ সে নয়। বরং ভেতরে ভেতরে একটা ভালো মনও তাঁর আছে। এবার নিশ্চয়ই তিনি কিছু একটা করবেন। আমি আর কিছু বললাম না। বরং তাঁকে ওইরকম ভেঙে পড়তে দেখে আমি নিজেই তাঁকে নানাভাবে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম।’

‘তারপর ? কী করলেন তিনি ?’

‘বললেন, এইবার এর একটা বিহিত তিনি করবেনই। তাঁর ছেলে কেন, গ্রামে কেউ আর কোনোদিন এইরকম কিছু করবে না। নিজের ছেলেকে শাস্তি দিয়ে তিনি অন্য সবাইকে শিক্ষা দিবেন।’

‘বাহ! তাহলে তো লোক তিনি খারাপ না।’

‘হুম। ভালো লোক। এর এক সপ্তাহর মাথায় আত্মহত্যা করল কোহিনুর।’

‘কী!’ রীতিমতো ধাক্কা খেলো আসাদ, ‘কী বলছেন স্যার ? কী হয়েছিল ?’

আজিজ মাস্টার শান্ত গলায় বললেন, ‘যেদিন রাতে সে আত্মহত্যা করে, সেদিন সন্ধ্যার পরপর সে আমার বাড়িও এসেছিল।’

‘কেন ?’

‘তখনো আমি জানতাম না কেন। কারণ, আমি সেদিন বাড়িতে ছিলাম না। স্কুলের বিষয়ে জরুরি এক কাজে থানা শহরে ছিলাম সেদিন। সন্ধ্যার দিকে আমার মেজ মেয়ে রুমুর কাছে একটা বই দিয়ে গিয়েছিল কোহিনুর। বলেছিল, আমি ফিরলে যেন বইটা আমাকে দেয়।’

‘কী ছিল সেই বইতে ?’

‘সেটা তা পরদিন আর জানা যায় নাই। কারণ পরদিন ভোরেই কোহিনুরের লাশ পাওয়া যায় তার ঘরে। সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝোলানো লাশ। পুরো গ্রামে একটা হুলস্থুল পড়ে গেল। তার লাশ, থানা, পুলিশ এই সব নিয়েই সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল। সেই বইয়ের কথা আর মনেই রইল না কারও। খবর শোনার পর থেকে আমার অবস্থা পাগলপ্রায়। জানি না কেন, আমার মনের মধ্যে একটা সন্দেহ খচখচ করতে লাগল। আমি তার পরদিন থেকে চেষ্টা করলাম কোহিনুরের বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো তারা কেউই আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইল না। কথা তো দূরের কথা, দেখাই করতে চাইল না আমার সাথে। যেন কোহিনুরের এই আত্মহত্যার পেছনে আমিই দায়ী।’

‘কী বলেন!’

‘হুম।’

‘কিন্তু তারা কেন আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইল না ?’

‘জানি না কেন! তবে পরদিন আমি বিষয়টা নিয়ে চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে গেলাম। আমাকে দেখেই চেয়ারম্যান সাহেব একদম কেঁদে ফেললেন। হাউমাউ করে কান্না। কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, এই বয়সের একটা মেয়ে, কী এমন দুঃখে এইভাবে গলায় দড়ি দিয়ে মারা গেল মাস্টার সাব ? আপনারা স্কুলে বাচ্চাকাচ্চাদের পড়ান। এত এত হোমওয়ার্ক দেন। পরীক্ষা নেন। কে কত নম্বর পায় পরীক্ষায়, সেইটা দেখেন। কিন্তু তাদের কার মনে কী চলতেছে, সেইটা দেখেন না। এমন হইলে হবে বলেন ? খালি ক্লাসের বই পড়ালেই তো হবে না। সঙ্গে তাদের মানসিক অবস্থাটাও দেখতে হবে। কে কী ভাবছে, কে কী করছে, এইগুলা খেয়াল না রাখলে হবে ? হবে না। তাছাড়া শিক্ষক তো শুধু শিক্ষকই না, সে ছাত্র-ছাত্রীর গার্ডিয়ানও। গার্ডিয়ান না ?’

‘আপনি কী বললেন ?’ আসাদ জিজ্ঞেস করল।

আজিজ মাস্টার বললেন, ‘আমি কোহিনুরের আর রাকিবের প্রসঙ্গটা তুললাম। আর সঙ্গে সাথেই তিনি ক্ষেপে গেলেন। সেই প্রথম আমি নুরুল মোল্লার আসল চেহারাটা দেখলাম। তিনি প্রায় সরাসরিই হুমকিটা দিলেন আমাকে। স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, এই ঘটনায় রাকিবের বিষয়ে যেন আর কোনো কথা আমি না বলি। তিনি এ নিয়ে একটা শব্দও শুনতে চান না। কোনো উচ্চবাচ্যও না। এমনিতেই নাকি পুলিশ বিষয়টি নিয়ে নানান সন্দেহ করছে। নানাভাবে খোঁজখবরও নেওয়ার চেষ্টা করছে। এখন কোহিনুরের সঙ্গে রাকিবের ঘটনাটা পুলিশের কানে গেলে বিপদ। তিনি চান না এ বিষয়ে পুলিশ কিছু জানুক।’

‘আপনি কী করলেন তারপর ?’

‘আমি আর কী করব ?’ অসহায় ভঙ্গিতে বললেন আজিজ মাস্টার, ‘আমি তো ওই একটা কাজই পারি। মন খারাপ করা। উল্টাপাল্টা কিছু ঘটলেই রাতের পর রাত ঘুম হয় না আমার। কিছু খেতে পারি না। গলার কাছটায় কী যেন দলা পাকিয়ে আটকে থাকে। এবারও তেমন হতে শুরু করল। চোখ বন্ধ করলেই কোহিনুরের কান্নাজড়ানো অসহায় মুখটা চোখের সামনে ভাসতে থাকে। আর মনে হয়, ওইটুকু একটা মেয়ে কোন সাহসে, কতটা কষ্টে এইভাবে নিজেকে নিজে শেষ করে ফেলল ? আমি তো পারি না। অত সাহস তো আমার নাই।’

‘ওটা সাহস না, দুঃসাহস। মানুষ দুই কারণে দুঃসাহসী হয়ে ওঠে। ভয়ে আর শক্তিতে। সে ভয়ে দুঃসাহসী হয়ে উঠেছিল।’

‘হুম। আমিও এটা ভেবেছি। কতটুক ভয় পেলে, লজ্জায়, অপমানে ওইটুকু বাচ্চা একটা মেয়ে নিজের জীবনটা এইভাবে শেষ করে দিতে পারে ? এই এত বছরের জীবনেও তো আমি কোনোদিন কোনো সাহসে বা ভয়ে আত্মহত্যা করার কথা ভাবতে পারি নাই। এই বৃদ্ধ বয়সেও এখনো বাঁচতে ইচ্ছে করে। মৃত্যুকে ভয় লাগে। অথচ ওইটুকু একটা মেয়ে! আহারে, আহারে!’

আজিজ মাস্টারের গলা যেন ধরে এল। তিনি সেই ধরে আসা গলাতেই বললেন, ‘পরদিন ভোরে উঠে আমি স্থানীয় থানায় গেলাম। থানার ওসি সাহেবকে আমি কোহিনুরের সঙ্গে ঘটা ঘটনার কথা খুলে বললাম। রাকিবের কথাও বললাম। আমি ভেবেছিলাম সব শুনে ওসি সাহেব খুশি হবেন। নতুন করে ইনভেস্টিগেশন করতে চাইবেন। কিন্তু আমার কথা শুনে তিনি হাসলেন। বললেন, মাস্টার সাব, আপনি মান্যগণ্য লোক। এমন কিছু করবেন না, যাতে আপনার মানসম্মান না থাকে।’

‘মানে ? আপনার মানসম্মানের কী আছে এখানে ?’ আসাদ একটু অবাকই হলো।

আজিজ মাস্টার অসহায় ভঙ্গিতে বললেন, ‘ওসি সাহেব সব শুনে আমাকে বললেন, এই এলাকায় নুরুল মোল্লা সাব মান্যগণ্য লোক না ? আমি বললাম, হ্যাঁ। উনি বললেন, আপনিও তো গণ্যমান্য লোক, তাই না ? আমি কোনো কথা বললাম না। ওনার উদ্দেশ্য বুঝতে চাইলাম। তখন উনি আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, এখন তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে যদি এই সময়ে আপনি এমন একটা অভিযোগ করেন, তাহলে কি বিষয়টা ভালো দেখায় ? দেখায় না। বিষয়টা নুরুল মোল্লা সাবের জন্য একদিকে যেমন বিপদের, তেমনি আরেকদিকে মানসম্মানেরও। তাই না ? এখন আপনারা যারা সমাজে মান্যগণ্য লোক আছেন, তাদের একজনের উচিত আরেকজনের মানসম্মান রক্ষা করা। আর আপনারাই যদি একজন আরেকজনের পিছনে লেগে থাকেন, তাহলে আমরা কী করব বলেন ?’

‘আচ্ছা, এই হলো ঘটনা ?’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল আসাদ। ‘তারপর আপনি কী করলেন ?’

‘আমি তাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু লাভ হলো না। বরং শেষের দিকে যেন খানিক উগ্রই হয়ে উঠলেন ওসি সাহেব। আমাকে একভাবে ধমকের গলাতেই বললেন, আজ যান তো স্যার। বহুত কাজ জমে আছে হাতে। আপনাদের মতো ক্লাসে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আরামের জীবন পার করলে তো আমাদের চলে না। আমাদের দিন রাত জেগে চোর-ডাকাত ধরে আপনাদের আরামের ঘুমের ব্যবস্থা করে দিতে হয়। আমি তারপরও বললাম, আপনি আমার কথা বিশ্বাস করেন ওসি সাব। আপনি চাইলে আমি দু-একজন সাক্ষীও হাজির করতে পারব। সে যে শুধু কোহিনুরের একার জীবনটাই অতিষ্ঠ করে দিয়েছে ব্যাপারটা এমন না। আরও অনেক মেয়ের সাথেই সে রেগুলার এমন করত। কিন্তু তারা কেউ সাহস করে নি অভিযোগ করার। কেবল কোহিনুরই করেছিল। আর আমার ধারণা, সেটার কারণেই আজ তার এই পরিণতি। নুরুল মোল্লার ছেলেটার কারণেই মেয়েটার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছিল। আর এখানে নিশ্চয়ই এমন কিছু ঘটেছে যেটা আমরা পুরোপুরি জানি না। যে কারণে মেয়েটা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। আপনি একটু সিরিয়াসলি বিষয়টা দেখেন। আমি প্রয়োজনে সাক্ষীর ব্যবস্থা করব। এবার ক্ষেপে গেলেন ওসি সাহেব। তিনি ঠান্ডা গলায় বললেন, সাক্ষী সাবুদ জোগাড় করা তেমন কঠিন কোনো কাজ না। দুই চারটা পয়সা ছিটালেই সাক্ষীর অভাব হয় না। কঠিন হলো অকাট্য তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করা। আছে আপনার কাছে কোনো তথ্যপ্রমাণ ? আজকাল অডি ভিডিওর যুগ। ছবির যুগ। আছে এগুলা কিছু ? থাকলে নিয়া আসেন। তখন আমি দেখব। এখন যান। বিরক্ত কইরেন না প্লিজ।’

আজিজ মাস্টার একটু থেমে আবার বললেন, ‘আমি তারপরও কিছু বলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু তিনি সেই সুযোগ দিলেন না। একপ্রকার জোর করে থানা থেকে আমাকে বেরই করে দিলেন। প্রচন্ড মন খারাপ হলো। ভেঙেও পড়লাম। কিন্তু হাল ছাড়লাম না। কী করা যায়, কী করা যায়, এই ভাবনা চলতে লাগল দিনরাত। আশপাশে কারও কাছে যে বলব, বুদ্ধি পরামর্শ নিব, সেই সাহসও হচ্ছিল না। কোন ঘটনাকে কে কীভাবে নেয়, কে জানে! তবে অনেক ভেবেচিন্তে শেষে একটা বুদ্ধি এল মাথায়। যদি সাংবাদিকদের ঘটনাটা জানানো যায়, তাহলে কিছু না কিছু একটা হতেও পারে। তখন পুলিশও ঘটনা এড়াতে পারবে না। বাধ্য হয়েই সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। এই ভাবনায় বড় আশা নিয়েই গেলাম থানা শহরের স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে। আমার বিশ্বাস ছিল, এখানে কিছু না কিছু হবেই। কারণ রোজ রোজ দেশের আনাচে-কানাচে এই ধরনের ঘটনা একের পর এক ঘটেই চলছে। তাদের বললাম ঘটনা, কিন্তু কিছুই হলো না। তারা বরং আমাকেই উল্টাপাল্টা কথা শোনানো শুরু করল। তাদের কথাবার্তা শুনে অবাক হয়ে গেলাম আমি। সাংবাদিকদের কেউ কেউ উল্টো আমার দিকেই আঙুল তুলল। বলল, স্কুলের নামকরণ নিয়ে নুরুল মোল্লার সঙ্গে দ্বন্দ্বের জের ধরেই নাকি আমি কোহিনুরের ঘটনায় নুরুল মোল্লার ছেলেকে জড়াতে চাইছি! এটা নাকি আমার ষড়যন্ত্র। এমন আরও নানান কথা। কোনো সহযোগিতা তো তারা করলেনই না, উল্টো আমাকেই দোষারোপ করা শুরু করলেন। বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, আমার মনটাই ভেঙে গেল। প্রচন্ড হতাশা নিয়ে সেই রাতে বাড়ি ফিরলাম আমি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এত অসহায় লাগছিল! পুলিশ না হয় অমন করেছে, কিন্তু সাংবাদিকদের কাছ থেকে অন্তত এমন আচরণ আশা করি নাই আমি।’

হাত বাড়িয়ে আজিজ মাস্টারের একটা হাত চেপে ধরল আসাদ। আজিজ মাস্টার কাঁপছেন। তার চোখে অশ্রু কি না অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না।

আজিজ মাস্টার ভেজা গলায় বললেন, ‘তবে ঘটনা পরিষ্কার হলো তার পরদিন। আমাদের স্কুলের দপ্তরি জয়নালের কাছে শুনলাম, কোহিনুরের ঘটনার দিন কয়েক পরেই নাকি নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের দাওয়াত দিয়ে ভুঁড়িভোজ করিয়েছেন নুরুল মোল্লা। সঙ্গে হাতখরচ তো ছিলই। যাতে কোহিনুরের ঘটনা নিয়ে এদিক সেদিক কিছু না লেখে তারা। শুধু তা-ই না, কোহিনুরের আত্মহত্যার ঘটনা নিয়েই সাংবাদিকদের কাছে তিনি তাঁর মতামত ব্যক্ত করেছেন। আবেগঘন বিবৃতি দিয়েছেন। কোহিনুরের পরিবারের প্রতি গভীর শোক, সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। জ্ঞানগর্ভ বাণীও দিয়েছেন। বলেছেন, পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের মানসিক ভাবনা বিকাশে শিক্ষক ও অভিভাবকদের বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে। আরও যত্নবান হতে হবে। কারণ এই বয়সের ছেলেমেয়ে অনেক সংবেদনশীল হয়, অভিমানী হয়। সুতরাং কথায় কথায় তাদের শারীরিক বা মানসিক আঘাত করা যাবে না। তাদের মানসিক অবস্থা বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। বোঝাতে চেষ্টা করতে হবে। শিক্ষকদেরও স্কুলে আরও সাপোর্টিভ ভূমিকা রাখতে হবে। এমন নানান বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনাও করেছেন তিনি। পরদিন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার ছবিসহ সেসব ফলাও করে ছাপাও হয়েছিল।’

‘বাহ!’ অস্ফুটে আসাদের মুখ থেকে যেন আপনা-আপনিই ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে শব্দটা বের হয়ে গেল।

‘এই ঘটনায় পুরোপুরি হতাশ হয়ে গেলাম আমি। মনে হলো পৃথিবীতে আমার মতো অথর্ব, অসহায়, অক্ষম মানুষ বুঝি আর নেই। চোখের সামনে এসব ঘটছে আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। কিন্তু কী করা যায় ? আমি সহসা হাল ছেড়ে দেওয়ার মানুষ না। অন্য কোনো উপায় খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু কিছুই মাথায় এল না। একটা তীব্র দ্বিধা, সংশয় কাজ করতে লাগল নিজের মধ্যে। মনে হতে লাগল যেখানেই যাব, কেউ না কেউ উল্টো আমাকেই ভয় দেখাবে। হঠাৎ করেই মাথায় আরেকটা বুদ্ধি এল। আমাদের এলাকায় তরুণদের একটা সমাজকল্যাণমূলক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আছে। ক্লাবের মতো। সেই সংগঠন বিভিন্ন সময়ে এলাকার নানা অনিয়ম-অপরাধের প্রতিবাদ করে। ফিলিস্তিনে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইজরায়েলের হামলার প্রতিবাদে মিছিল, মিটিং, মানববন্ধনও করেছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মায়ানমার সরকারের অত্যাচারের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ভূমিকা রেখেছিল তারা। এগুলো বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপাও হয়েছিল। কোনো উপায় না দেখে শেষ পর্যন্ত আমি তাদের কাছেও গেলাম। মনে হয়েছিল, তারা নিশ্চয়ই এমন একটা ঘটনায় রুখে দাঁড়বে। প্রতিবাদ করবে। যেহেতু এই সময়ের তরুণ তারা।’ বলে থামলেন আজিজ মাস্টার। যেন একসঙ্গে এত কথা বলে হাঁপিয়ে গেছেন তিনি।

কিন্তু আসাদের আর তর সইছিল না। সে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল, ‘তারপর ? কী করল তারা ?’

‘কিছুই করল না।’

‘মানে ?’

‘মানে এরা সরাসরি জানিয়ে দিল এই বিষয়ে যেন কোথাও আর কোনো কথা না বলি আমি!’

‘মানে ?’ খুবই অবাক হলো আসাদ।

আজিজ মাস্টার অন্ধকারেই ম্লান হাসলেন। তার সেই হাসি কান্নার চেয়েও করুণ। তিনি বললেন, ‘মানে ওই ক্লাবটিও রাজনৈতিক। পেছন থেকে নুরুল মোল্লাই ওটার ব্যাকআপ দিচ্ছেন। আসলে আজকাল বোধহয় আর লাভ-লোকসানের হিসাবনিকাশ ছাড়া কেউ কিছু করে না। ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়ও ঠিক হয় লাভ-লোকসানের হিসাবের উপর ভিত্তি করে। বাইরে বাইরে ওই ক্লাবটাকে অরাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন বলা হলেও আসলে ভেতরের ঘটনা অন্য। নুরুল মোল্লা নিজে এই ক্লাবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। প্রতিবছর ঈদ-কুরবানি, পূজা-পার্বণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মীয়, জাতীয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এলাকার তরুণরা খুব আয়োজন করে পালন করে। আর এসব আয়োজন করতে এই ক্লাবে মোটা অঙ্কের ডোনেশন দেয় নুরুল মোল্লা। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই এলাকার ছেলেপুলেরা নুরুল মোল্লার বিরুদ্ধে কখনোই কোনো কথা বলবে না। তা উনি যা-ই করুন না কেন! উপরন্তু নুরুল মোল্লার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে বা করলে তারা সবাই মিলে সেটা ঠেকাবে।’

আজিজ মাস্টার থামলেন। আসাদও চুপ। কেবল অন্ধকারে দূর থেকে ভেসে আসছে গাড়ির হর্নের শব্দ। রিকশার টুং টাং ধ্বনি। তারা দুজন চুপচাপ সেই শব্দ শুনতে লাগল। যেন আর কিছু বলার নেই কারোই। যেন তারা জানে, সবখানে এই একই চিত্র। এই একই গল্প। এই গল্পের বাইরে আর কোনো গল্প নেই। অনেকক্ষণ পর আসাদ বলল, ‘তারপর কী করলেন আপনি ?’

আজিজ মাস্টার কাঁপা গলায় বললেন, ‘কী আর করব ? কী করার আছে আমার ? পুরোপুরি ভেঙে পড়লাম। বুঝতে পারছিলাম কিছুই করতে পারব না। মনে মনে নিজের অসহায়ত্ব মেনে নিলাম। কিন্তু মনটাকে মানাতে পারলাম না। মাথা থেকে কিছুতেই বিষয়টা তাড়াতে পারি না। সারাক্ষণ নানান দুশ্চিন্তা। রাতভর ঘুমাতে পারি না। খানিক তন্দ্রার মতো হলেও পরক্ষণেই ভয়ঙ্কর সব দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যায়। কতভাবে যে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করি, কিন্তু পারি না। সারাক্ষণ অস্থির লাগে। নিজেকেই নিজের অসহ্য লাগতে থাকে। এমন সময় একদিন আমার মেজ মেয়ে রুমু হঠাৎ কোহিনুরের দেওয়া সেই বাংলা বইখানা আমাকে দিয়ে গেল। এতদিন বইখানার কথা সে ভুলেই গিয়েছিল। এই ঘটনা এতদিন পর আমাকে জানানোর কারণে রুমুকে আমি গালমন্দও কম করলাম না। রাগও হলো ওর ওপর খুব। কিন্তু আমার সকল রাগ, হতাশা, ক্রোধ, ক্ষোভ সকলই উড়ে গেল বইটা খোলার পর। মনে হলো আমার কোনো অনুভূতি নেই। শরীরে যেন সাড় নেই। একটা লাশ যেন আমি। অথচ সবকিছুই দেখতে পাচ্ছি, শুনতে পাচ্ছি, বুঝতে পারছি। কিন্তু কিছু করতে পারছি না।’

‘কী ছিল সেই বইয়ের ভেতর ?’ শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল আসাদ।

‘একটা চিঠি’।

‘চিঠি ?’

‘হুম। কোহিনুরের নিজের হাতে লেখা একটা চিঠি। মাত্র তিন লাইনের চিঠিটা লিখেছিল সে। তারপর আত্মহত্যা করার আগে দিয়ে গিয়েছিল আমাকে। কিন্তু সেই চিঠি আমি দেখলাম অতদিন পর।’

‘কী লেখা ছিল চিঠিতে ?’

সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিলেন না আজিজ মাস্টার। দীর্ঘসময় চুপ করে রইলেন। তারপর অকস্মাৎ মুখ তুলে তাকালেন আকাশের দিকে। তারপর চোখ বন্ধ করে স্থির, নিস্তব্ধ বসে রইলেন। যেন বয়ে যাচ্ছে অনন্ত সময়। তারপর বললেন, ‘তাকে ধর্ষণ করেছে নুরুল মোল্লা!’

‘নুরুল মোল্লা! মানে চেয়ারম্যান নিজে! কী বলছেন আপনি ?’ আসাদ যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না।

‘হুম।’ শান্ত গলায় বললেন আজিজ মাস্টার। খানিক থেমে তারপর আবার বললেন, সে লিখেছে—‘স্যার, আপনে আমারে কার কাছে বিচারের জন্য পাঠাইলেন স্যার ? সে তো মানুষ না, সে তো তার ছেলের চাইতেও খারাপ। আস্ত জানোয়ার। সে একটা বুড়া শয়তান, একটা পশু। এই রকম অমানুষের পৃথিবীতে এই নোংরা জীবন নিয়া আমি আর বাঁচতে চাই না স্যার…।’

আজিজ মাস্টার থামলেন। আসাদ কোনো কথা বলল না। আজিজ মাস্টার কাঁদছেন। নিঃশব্দ কান্নার তীব্রতায় তাঁর শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। আসাদ দুহাতে শক্ত করে তাঁকে জড়িয়ে ধরল। দীর্ঘসময়। তারপর নিজেকে সামলে নিলেন আজিজ মাস্টার। তারপর ভেজা গলায় বললেন, ‘চিঠিখানা হাতে পেয়ে আমি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। কতক্ষণ বসে ছিলাম আমি জানি না। তবে পুরো ঘটনার জন্য তখন আমার নিজেকেই অপরাধী মনে হতে লাগল। মনে হলো কোহিনুরকে আমি নিজে খুন করেছি। তার এই মৃত্যুর জন্য আর কেউ না, আমি নিজে দায়ী। কারণ, নুরুল মোল্লার কাছে আমিই তাকে যেতে বলেছিলাম।’

‘কেন ?’

‘কারণ, রাকিবের বিরুদ্ধে নুরুল মোল্লার কাছে দ্বিতীয়বার বিচার দেওয়ার পর তিনি নিজে আমাকে বলেছিলেন কোহিনুরের কাছ থেকে সরাসরি সব ঘটনা শুনতে চান তিনি। এমনকি রাকিবকে কোহিনুরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে মাফ চাওয়ানোর কথাও বলেছিলেন তিনি। আমাকে এটাও নিশ্চিত করেছিলেন যে, বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথেই দেখবেন তিনি। কারণ এর সঙ্গে তাঁর মানসম্মান জড়িত। তাঁর কথা শুনে আমারও কেন যেন বিশ্বাস হয়েছিল। আমি তাই কোহিনুরের মাকে বলেছিলাম, কোহিনুরকে তাঁর কাছে নিয়ে যেতে। কিন্তু এরপর কী হয়েছিল সেই খবর আর নেওয়া হয় নি আমার। স্কুলের একটা কাজ নিয়ে কয়েকটা দিন খুব ব্যস্ত ছিলাম তখন। বাড়িতে ছিলাম না টানা কয়েকদিন। থানা শহরে থাকতে হয়েছিল।’

‘কিন্তু চিঠিতে তো ধর্ষণের ঘটনা কিছু স্পষ্ট লেখা ছিল না।’

‘তা ছিল না। এমনকি ওরকম জঘন্য, নোংরা কথা চিন্তা করতে আমার মনও সায় দিচ্ছিল না। কিন্তু কোহিনুরের চিঠিতে ঘটনা স্পষ্ট। নুরুল মোল্লার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর এমন জঘন্য কিছুই ঘটেছিল, যার কারণেই সে আত্মহত্যা করেছিল।’

‘কিন্তু ওই চিঠি দিয়ে কি আপনি তা প্রমাণ করতে পারবেন ?’

‘নাহ, পারব না। যেখানে থানা-পুলিশই নুরুল মোল্লার পক্ষে, সেখানে ওই চিঠির চেয়ে শক্ত প্রমাণ থাকলেও কিছু প্রমাণ করা যেত না…।’

‘একটা কথা।’ আসাদ মাঝপথে থামাল আজিজ মাস্টারকে।

‘লাশের ময়নাতদন্ত করা হয় নি ? সেখানে ধর্ষণের কোনো আলামত ?’

‘কিছুই হয় নি। কোনো ময়নাতদন্ত টদন্ত কিচ্ছু না। প্রথমে একটু উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল পরিস্থিতি। কিন্তু তারপর পুলিশ স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবেই লাশ দাফন করেছে। বুঝতেই পারছেন, সবকিছু চেয়ারম্যানের নিয়ন্ত্রণে। সুতরাং যা করার তিনি নিজের ইচ্ছেমতোই করেছেন।’

‘ওহ।’ যেন দমে গেল আসাদ, ‘তারপর কী হলো ?’

‘কোহিনুরের চিঠিটা পড়ার পর থেকে আমার মাথা খারাপের মতো অবস্থা হয়ে গেল। পরের কয়েকটা দিন পাগলের মতো এখানে সেখানে ছুটলাম আমি। জানতাম, শুধু এই চিঠি দিয়ে নুরুল মোল্লার বিরুদ্ধে শক্ত কোনো তথ্যপ্রমাণ হাজির করতে পারব না। চিঠিতে কারও নাম নেই, পরিচয় নেই, ঘটনার বিবরণ নেই। আর স্থানীয় প্রশাসন তো এমনিতেই নুরুল মোল্লার পক্ষে। তারপরও অনেক কষ্টে কোহিনুরের বাবা-মার সঙ্গে দেখা করলাম। তাঁদের সঙ্গে কথা বললাম। বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে এই ঘটনার একটা বিহিত হওয়া দরকার। কিংবা আসল ঘটনা কী ঘটেছিল, তাঁরা যেন আমাকে খুলে বলেন। কিন্তু তাঁরা আমাকে কিছুই বলতে চাইলেন না। কোনো সহযোগিতাও করতে চাইলেন না। তাঁদের চোখে মুখে স্পষ্ট আতঙ্ক। কারণ, আরও দুটো মেয়ে রয়েছে তাঁদের। ফলে ভয়ে কোনোভাবেই মুখ খুলতে চাইছিলেন না তাঁরা।’

‘তাঁরা তো আসল ঘটনা জানতেন ?’

‘হুম, জানতেন। আর জানতেন বলেই ভয় পাচ্ছিলেন তাঁরা। তবে অনেক কষ্টে কোহিনুরের মাকে কিছুটা হলেও বোঝাতে পারলাম আমি। দিন কয়েকের টানা চেষ্টায় অবশেষে তিনি আমার কাছে মুখ খুললেন। ভয়ে ভয়ে কোহিনুরের সঙ্গে ঘটা আসল ঘটনা আমাকে খুলে বললেন।’

‘কী ঘটনা ?’

‘কোহিনুরের মাকে যেদিন আমি কোহিনুরকে নিয়ে নুরুল মোল্লার কাছে যেতে বলেছিলাম, সেদিনই তিনি কোহিনুর আর কোহিনুরের বাবাকে নিয়ে নুরুল মোল্লার কাছে গিয়েছিলেন। নুরুল মোল্লা তাঁদের সঙ্গে অসম্ভব ভালো ব্যবহারও করেছিলেন সেদিন। এমনকি কোহিনুরের পড়াশোনার খোঁজখবর পর্যন্ত নিয়েছিলেন। অন্য কোনো সমস্যা থাকলে সেগুলোও নির্দ্বিধায় জানাতে বললেন। তিনি কোহিনুরের সব সমস্যা দেখার আশ্বাস দিলেন। তবে জরুরি একটা মিটিং থাকায় রাকিবের বিষয়ে সেদিন আর খুব একটা কথাবার্তা এগুলো না। অন্য একদিন আসতে বলে তাঁদের বিদায় দিয়ে দিলেন নুরুল মোল্লা। তবে আসার সময় বলে দিলেন যে, রাকিব আর কোহিনুরকে তিনি মুখোমুখি বসাতে চান। যাতে কোহিনুরের কাছে সেদিনের ঘটনার জন্য ক্ষমা চায় রাকিব। এই ঘটনায় একটা যথাযথ শাস্তি দরকার রাকিবের। আর এ কারণেই পরেরদিন কোহিনুরকে একা দেখা করতে বললেন নুরুল মোল্লা।’

‘ওহ, গড! তার মানে সেদিনই ঘটনা ঘটিয়েছে সে ?’

‘হুম। দুর্ঘটনাটা ঘটল সেদিনই। নুরুল মোল্লার প্রথম দিনের আচরণে মুগ্ধ হয়ে কোহিনুরের বাবা-মা সরলমনেই মেয়েকে পাঠিয়ে দিলেন। কোহিনুর গেল দুপুরবেলা। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেও কোহিনুরের কোনো খবর পাওয়া গেল না। ফিরল না সন্ধ্যাবেলায়ও। সন্ধ্যার পরপর কোহিনুরের বাবা তাকে খুঁজতে গেলেন নুরুল মোল্লার বাড়ি। বাড়ির কেয়ারটেকার অবশ্য জানাল নুরুল মোল্লা বাড়িতে নেই। তিনি জরুরি মিটিংয়ে জেলা শহরে গেছেন। চিন্তিত কোহিনুরের বাবা কেয়ারটেকারের কাছেই কোহিনুরের কথা জানতে চাইলেন। কিন্তু কেয়ারটেকার জানাল, সে কোহিনুরকে দেখে নি। রাজ্যের দুশ্চিন্তা নিয়ে তিনি বাড়ি ফিরলেন। ঘড়িতে তখন রাত দশটা। বাড়ি ফিরে দেখেন কোহিনুর ফিরে এসেছে। কিন্তু সেই কোহিনুর ফিরে না এলেই বোধহয় ভালো ছিল।’

আজিজ মাস্টার থামলেন। আসাদ বলল, ‘সেই রাতেই সে আত্মহত্যা করে ?’

‘নাহ। টানা বারো ঘণ্টা শুধু মা ছাড়া আর কারও সাথেই কোনো কথা বলে নি কোহিনুর। শূন্যচোখে তাকিয়ে ছিল সারা রাত। মাকে সে তীব্র আতঙ্ক নিয়ে ঘটনা খুলে বলেছিল। একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল সে। তার মা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে মরাকান্না কাঁদলেন। কিন্তু পরদিন দিনের আলো যত বাড়তে থাকল, কোহিনুরও যেন ততই স্বাভাবিক হয়ে উঠতে লাগল। বিষয়টি অস্বাভাবিক ঠেকলেও কিছু বললেন না কোহিনুরের মা। বিকেলের দিকে হঠাৎ আমার বাড়িতে আসতে চাইল সে। তার মা নিজেই নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তখনো তিনি জানতেন না, অমন ঘটনার পরও এমন শান্ত, স্বাভাবিক কোহিনুর আসলে ঠান্ডা মাথায় কী ঘটাতে যাচ্ছে! সেই রাতেই নিজের ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে সে!’

আজিজ মাস্টার একটু দম নিয়ে যেন শক্তি সঞ্চয় করলেন। আসাদ উদ্বিগ্ন গলায় বলল, ‘তারপর ?’

আজিজ মাস্টার ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি খেলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘এরপর আর কী! কোহিনুরের মায়ের কাছে এই ঘটনা শোনার পর আমি যেন আবার নতুন করে মাঠে নামলাম। সেদিনই আবার পুলিশের কাছে গেলাম আমি। সরাসরি ধর্ষণ ও হত্যা মামলা করতে চাইলাম নুরুল মোল্লার বিরুদ্ধে। কিন্তু পুলিশ আমার মামলা নিল না।’

‘কেন ?’

‘কারণ আমি ধর্ষিতার কেউ হই না।’

‘কেউ না হলে মামলা করা যায় না ?’

‘যাবে না কেন ? যায়। কিন্তু এটা একটা বাহানা। তারা আসলে মামলা নিবে না।’

‘তারপর ?’

‘তারপর আমি থানা থেকে কোহিনুরের মাকে বললাম নুরুল মোল্লার বিরুদ্ধে মামলা করতে।’

‘তিনি রাজি হলেন ?’

‘প্রথমে হয় নি। কিন্তু আমি তো ছাড়ার বান্দা না। অনেক পীড়াপীড়িতে অবশেষে তিনি গেলেন মামলা করতে।’

‘মামলা হলো ?’

‘উঁহু।’

‘এবার হলো না কেন ? এবার তো কোহিনুরের মা নিজে বাদী হয়ে মামলা করতে গিয়েছেন। তাহলে ?’

‘পুলিশ বলল, এই মামলার কোনো ভবিষ্যৎ নাই। কোনোভাবেই প্রমাণ করা যাবে না যে কোহিনুর ধর্ষিতা ছিল। সে মারা গেছে ততদিনে মাস পেরিয়েছে। শুধু মুখের কথায় তো হবে না, প্রমাণ থাকতে হবে। এতদিন পরে কি আর ধর্ষণের আলামত পাওয়া যাবে ?’

‘আপনাদের কাছে তো প্রমাণ ছিলই। কোহিনুরের মায়ের স্টেটমেন্ট আর তার সঙ্গে সেই চিঠিটা!’

‘চিঠিটা আর নেই।

‘নেই মানে ?’

‘সেদিনই আমি ওসিকে বললাম যে আমার কাছে প্রমাণ আছে। তিনি জানতে চাইলেন কী প্রমাণ। আমি তাঁকে চিঠিটা দেখালাম। তিনি চিঠিটা হাতে নিয়ে দেখলেন। দীর্ঘসময় পর জিজ্ঞেস করলেন, এই চিঠি যে কোহিনুর লিখছে তার প্রমাণ কী ? আমি বললাম, কোহিনুরের হাতের লেখা সবাই চেনে। তিনি বললেন, আচ্ছা, এটা চেক করে দেখতে হবে। ততদিন পর্যন্ত চিঠি আমার কাছে থাকুক।’

‘কিন্তু এই কাজ তো তার না! এই কাজ কোর্টের। কোর্টের কাজ কি পুলিশের ওসি করতে পারে ? পুলিশের কাজ মামলা নেওয়া। সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের ভার আদালতের।’

আজিজ মাস্টার ম্লান হাসলেন, ‘চিঠিটা আর আমাকে ফেরত দিলেন না তিনি। মামলাও নিলেন না। উল্টো ভয় দেখালেন।’

‘কিসের ভয় ?’

‘সেটা আমি মুখে বলতে পারব না। এত নোংরা, এত জঘন্য!’

‘বলুন, আমাকে শুনতে হবে’।

আজিজ মাস্টার খানিক সময় নিলেন বলতে। তারপর রাজ্যের লজ্জা, সঙ্কোচ, দ্বিধা নিয়ে তিনি বললেন, ‘ওসি সরাসরি হুমকি দিয়ে বললেন, কোহিনুরের মা আর আমার মধ্যে নাকি আপত্তিকর সম্পর্ক আছে, আর সেই সম্পর্কের কারণেই লজ্জায়, অপমানে আত্মহত্যা করেছে কোহিনুর! নুরুল মোল্লার কাছে নাকি এই বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ আছে। এখন আমি যদি বেশি বাড়াবাড়ি করি, তবে আমাদের দুজনের মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক আছে, আর এ কারণেই কোহিনুর আত্মহত্যা করেছে, এই কারণ দেখিয়ে কোহিনুরের মা আর আমার বিরুদ্ধে মামলা দিবে পুলিশ।’

‘কী বলছেন আপনি!’

‘হুম।’

‘তারপর ?’

‘তারপর আর কী!’ খানিক চুপ করে থেকে আজিজ মাস্টার আবার বললেন, ‘এরপর আর কখনো কোহিনুরের মা আমার সঙ্গে দেখা দিলেন না।’

আজিজ মাস্টার তাঁর কথা শেষ করলেও কথা বলল না আসাদ। চুপ করে রইলেন আজিজ মাস্টারও। ঘড়িতে তখন রাত তিনটা। দূরে কোথাও করুণ সুরে একটা কুকুর ডেকে যাচ্ছে। সেই ডাকে ভারী হয়ে উঠছে রাতের বাতাস।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%