দীনহীনের গান

সুমনকুমার দাশ

অধিনী রে ও বন্ধু অধিনী রে
অধিনী রে কাঙাল জেনে অন্তপুরে হও উদয়
কৃপা করো দয়াময় ॥

বন্ধুও তুমি পতিতপাবন, নির্ধনিয়ার ধন
তুমি বাঞ্ছা কল্পতরু জীবনের জীবন,
তুমি বিনে ওহে বন্ধু তুমি বিনে
তুমি বিনে কাল শমনে কে কোথায় করিয়াছে জয়
কৃপা করো দয়াময় ॥

বন্ধু হে আমি কি বলিব আর, তুমি সর্বসার
তুমি বিনে ভবার্ণবে কে আছে আমার
আমি কার ওহে বন্ধু আমি কাহার
তুমি জানো আমি তোমা বৈ তো নয়
কৃপা করো দয়াময় ॥

বন্ধু হে তোমার হীনহীন পামরে অন্ধকার ঘরে
বন্ধু বন্ধু বন্ধু বইলে ডাকছে বিনয় কইরে,
নিজ গুণে ওহে বন্ধু নিজ গুণে
নিজ গুণে দাস জানিয়ে শ্রীচরণে দেও আশ্রয়
কৃপা করো দয়াময় ॥

আমি আগে তো জানি না
প্রাণবন্ধের মনে গো সখি এত যে ছলনা
আমি আগে তো জানি না ॥

আমি জানি আমার বন্ধু আমারই আপনা
সামান্য আপনার মতো, বন্ধের মন মিলে না গো সখি
আমি আগে তো জানি না ॥

ঘরবাড়ি আছে বন্ধের আর থানাপিনা
পরিবাড়ি রঙ্গ করে, ঘরেতে আসে না গো সখি
আমি আগে তো জানি না ॥

দীনহীনে বলে বন্ধের পিরিত হইল না
দিনে দিনে ঝরিয়া পড়ে প্রেমের বালখানা গো সখি
আমি আগে তো জানি না ॥

আমি আর কি গো মা বলমু তোরে
তোর অধীনে তোর পুত্র আমার ॥

পুত্র বইলে দয়া মায়া নাই বুঝি মা তোর অন্তরে
তা হইলে হইতে পারে অনেক পুত্র জন্মিয়াছে তোর উদরে ॥

তোর সুপুত্র কে তুলিয়া নিলে কুপুত্র পরাণে মরে
মা গো তুমি বিনে কুসন্তানে মা বলিয়া আর ডাকব কারে ॥

দীনহীনে বলে রে পাগল মাকে বলিস না রে
কার মায় কান্দে না বলো, যদি কোলের ছেলে কোলে মরে ॥

আমি চাই না যাইতে কারো কাছে, আমার মুখ দেখিয়া লোকে হাসে ॥

আমি যার লাগিয়া দেশ ছাড়িয়া ভ্রমিতেছি দেশ-বিদেশে
সে আমায় বাসে না ভালো, অন্যে ভালোবাসবে কিসে ॥

দোষের দোষী দেখে আমায়, আপন বন্ধে পরবাসে
আমার কর্মে বুঝি এই ছিল, জানা গেল মানব দেশে ॥

কইলে দুঃখ হয় না বারণ, দীনহীন কাঙালে বলে
যার কর্ম সেই জানে বিন কলমে কি লেখিয়াছে ॥

আমি তোর অভাবে ত্যজিব পরানী রে
ও পরাণের বন্ধু তোর অভাবে রে ॥

তুমি হর তুমি হরি, তুমি সবের অধি করো
তুমি বিহনে কার বন্ধু কে হবে রে ॥

তুমি আমার যজ্ঞেশ্বর, তুমিই আপন তুমিই পর
আমি মইলে প্রাণী তোমার পদে যাবে রে ॥

কোরানে শুনিয়াছি আমি, পতিতের বন্ধু তুমি
তোমার দয়াল নামে সরাল উদ্ধারিবে রে ॥

দীনহীনের যত আশা মুর্শিদের চরণ ভরসা
তোমার পাগল আর কে বান্ধিবে রে ॥

আমি তোরে ডাকি রে বন্ধু, ডাকি রইয়া
রইয়া অভাগীরে করো পার দিন তো যায় মোর গইয়া রে ॥

কি ধন আছে আমার কাছে কি দিব তোমারে
কি দায় ঠেকিয়ে তুমি পার করিবায় মোরে রে ॥

সিনান করিয়া কেহ চন্দন দিলো গায়
তোমার নায় বসিয়া কেহ প্রেমের বৈঠা বায় রে ॥

বসতি সিনান ঘাটে আমার সিনান না হইল
ভবনদীর পারে কেবলরে তোমার দীনহীন রহিল ॥

আমি তোরে পর তো জানি না রে বন্ধু
তুমি কেমন আপন ॥

ধেনু চড়াইতে রে বন্ধু রঙ্গে মাঠে যাও
আপন ভেসে তুমি সব রাখালে আপনে সাজাও রে ॥

মাঠে গিয়াছিলাম রে বন্ধু তোমারে দেখিতে
সব দেখি রাখালের বেশ আমি না পাইলাম চিনিতে রে ॥

সকলই দিয়াছ রে বন্ধু কহিয়া বুঝাও
আমি যদি চাই দেখিতে তুমি পলকে লুকাও রে ॥

চঞ্চল স্বভাব তোমার দেইখে বুক ফাটে
ভাব রাখা কঠিন দেখে প্রাণে কান্দি ওঠে রে ॥

আমি দুঃখিনী রে মনে যেন রয়
সোনাবন্ধুও আমি অভাগীরে মনে যেন রয় ॥

তোমার লাগিয়া আমার মরণ নিশ্চয়
সোনাবন্ধুও আমি দুঃখিনীরে মনে যেন রয় ॥

ও বন্ধুও দুই দিনের পিরিতির লাগি মোরে কতই দিলায় আশা
হায় রে চিরদিনের মনের আশা তোমার চরণে ভরসা ॥

বন্ধুও ভালোবাসো কি না বাসো তোমার মনে যাহা লয়
হায় রে তোমারে যে ভালোবাসে আমার হৃদয় ॥

বন্ধু তোমার চরণে যেন দীনহীন রয়
হায় রে তোমার লাগি কলংকিনী মোরে লোকে যেন কয় ॥

আমি দেখব এবার কি করো গো মা
তোমার দয়া-মায়া সব জানা ॥

মা গো মায়া থাকলে দয়া হবে, যদি তোর উদরের হই মা
তুমি মা হইয়া দেখা দিলে, তোমার মুখ দেখলে দুঃখ রবে না ॥

আমার শমনে বান্ধিয়া নিতে তুমি রাখো বলিয়া বলো কি না
ও প্রাণ যাবার কালে দয়াময় নাম আমি যে ভুলিয়া থাকি না ॥

আমার পাপের সাজা না দিলে মা, তোমার আদালত থাকে না
দীনহীনে কয় মায় মারিলে কখন প্রাণে মারে না ॥

১০

আমি পাগলরে ঘোরাবে কত
ডেকে নেও মা মায়ের মতো ॥

দেখতেছি ব্ৰহ্মাণ্ড জুড়ে, মায়ে যে ডাকে আদর কইরে
আয় রে বলিয়া ডাকলে শুনতে লাগে মধুর মতো ॥

শতগুণের পুত্র আমি, জানত জানাব কত
রজঃগুণে পাইয়ে ছিলে, কোলে না মা জন্মের মতো ॥

তুমি বিনে নাই আর এ ভুবনে, দিলে না চরণ দীনহীনে
দীনহীনের দিন ফুরালো, দীনহীন আর বলব কত ॥

১১

আমি পাপীর আশা নিরাশ করিও না
ও সাহেব নবিজি, আমি পাপীর আশা নিরাশ করিও না
চান্দমুখে মধুর বাণী আমার অন্তরে ভোলে না ॥

হবিবও ডাকার মতো ডাক জানি না
শুনিয়া আসিবে ও দয়াল হইয়া তুমি পার করিয়া নিবে।
শুনিলায় না আসিলায় না ভাসি নদীর জলে
এমন বান্দন নাই রে ধরিয়া নিব কূলেও ॥

হবিবও হুঁশহারা হইয়াছি আমি, ভবেরই ত্রিতাপে
দয়াল হইয়া তুমি নেও যদি আপে।
নইলে আমার যাওয়া লয়া হইল না এবার
আলী পাঞ্জাতন বিহনে লক্ষ্য নাই আমারও ॥

হবিবও তোমার জাহির দীনহীনে জাহির করিলায়
মাতা-পিতা দিয়া ভবে যতনে রাখিলা
এখন আমি মরি তুমি দেখো বসিয়ে নদীর কূলে
তুমি উম্মতি উম্মতি বলিয়ে ভাসো নয়ন জলেও ॥

১২

আমি পারতাম নায়রে তোর পিরিতি রাখিতে
অভাগিনী একাকিনী ছয়টি রিপু সাথে ॥

বড়ো আশা ছিল রে বন্ধু মানুষ জীবনে
অধরা ধরিয়া নিব স্বরূপে সাধনে রে ॥

রিপুর বেশে কেবা আইসে করে অত্যাচার
দেখিয়া হৃদয় বিদুরে কলিজা আঙ্গার রে ॥

আমার গুণে কি করিব রে বন্ধু তোমার দয়া বিহনে
নায় ডুবিবে নৌকা বলে দীনহীনে ॥

১৩

আমি বুঝলাম না রে ও পাগল মন
আমি কার অধীনে থাকি
কার কর্ম কেবা করে, কি করিতে হয় বা কি ॥

যারে বলি আপন আপন সে যেন পর হয় না কখন
কেবা শমন কেবা দমন কেউর অধীনে কেউ না দেখি ॥

নিরাঞ্জন নৈরাকারে, স্বীকারে, সৃজিল তোরে
ধরতে আইল তারে তোরে কখন জিয়ন মরণ দেখি ॥

দীনহীন তুই ভূত কি বোখাল, পাইলাম না রে তোর তালাতাল
তার লাগি হইল কালা কাল, নইলে কালা কাল বাকি ॥

১৪

আমার পাগল হওয়ার আর বাকি নাই
কেবল লোকের কাছে হইয়াছি গোসাই ॥

দুবেলা খাই সুখে ঘুম যাই, ইহতে সাধন লোক রে বুঝাই
সাধু বেলা পাইলে দুবেলা, হাত নাড়িয়ে গান দুইটা গাই ॥

নিজে বুঝি নাই, পরকে বুঝাই, চক্ষের জল মুছিয়া দেখাই
সাধু বইলে না মানিলে, হাস্য করে ভাবটা দেখাই ॥

দীনহীন বলে মন পাগল, মুখ খাটিয়ে কথা শিখলে নাই
রহিম চান্দ উজ্জ্বল দেখ রে পাগল, যেমন বলার চাকে মধু খাইতে যাই ॥

১৫

আমার বন্ধুরা আইল গো ঘরে
আদর করিতে মুই না জানিলাম গো, তোমরা রাখিও তারে ॥

এই চুয়া-চন্দন গেল অকারণ সকলই রহিল ঘরে
শাশুড়ী ননদী তারা হইল বাদী ফকারিয়া কান্দি না ডরে ॥

রজনী পোহাইলে, বন্ধু যাবে চলিয়ে, কেমনে রাখিমু তারে
তোমরা সবে নিয়া, ভঞ্জ গো কালিয়া, দিনান্তে দেখাইও মোরে ॥

ধরিয়া চরণে বলে দীনহীনে, ছাড়িয়া যাইও না মোরে
আমার হিয়ার মাঝারে রাখিমু প্রাণবন্ধুরে, কেহই না দেখিব তারে ॥

১৬

আমার হইয়ে দুইটি কথা বলব বন্ধের কাছে গো
ও প্রাণসজনী এমন সুহৃদয় কে বা আছে গো ॥

সখি গো কার কাছে কে বা না যায়, আসা-যাওয়া আছে
আমি অভাগিনী যাইতে মানা কেন বা হইয়াছে গো ॥

সখি গো যদি আমার প্রাণ থাকিতে যাওয়া না হইল
মরণকালে বন্ধু পাইবার আশা কি রহিল গো ॥

সখি গো দীনহীনের কর্মে যদি এই লেখা আছিল
করিম-রহিম নামটি বন্ধের কেন বা শুনাইল গো ॥

১৭

আয় গো তোরা জলের ছলে গিয়ে বন্ধু নিরখিয়া
হইলে প্রাণবন্ধুরে পাবো, নাইলে প্রাণ দিব সখী ॥

নব জলধর রূপ বাঁকা দুইটি আঁখি
রূপ দেখিয়া নয়ন ভুলে গো প্ৰাণপাখি ॥

গাগরী লইয়া চলে জলে চলো সব সখি
পন্থে শ্যাম দাঁড়াইলে তোমরা চাইও না প্রাণসখি ॥

দীনহীনে বলে জল ভরিও কৌশলে
ঢেউ লাগিলে শ্যামের অঙ্গে জলেতে দিব লুকি ॥

১৮

আর দুইজনে বই সে থাকি, তুমি দেখো আমি দেখি ॥

তুমি আমি দুইজন বিনে আর কেহ নাই ত্রিভুবনে
দুইজন বই সে একাসনে রূপেতে স্বরূপ দেখি ॥

রূপরস আরাধনে সাধন করে ব্রহ্ম জ্ঞানে
পঞ্চ রসে প্রেম দানে হৃদয়ে যতনে রাখি ॥

দেখতে গেলে চিনতে হবে চিনতে পারলে জানা যাবে
রহিম চান্দের উদয় হইলে দীনহীন আর রবে না কি ॥

১৯

আর নি সখি আছে আমার বঞ্চিতে ঐ ঘরে গো
প্রাণনাথ ছাড়িয়া যাইতে চায় মোরে ॥

বুঝি বা না-বুঝি বন্ধু ছিল আমার ঘরে
আমি অভাগী গৌরবিনী ছিলাম ঐ গৌরবে গো ॥

আমি কার চিরদাসী বন্ধে জানে তারে
কে বা আছে কার বা কাছে বন্ধে রাখিয়া যায় আমারে গো ॥

হয়তো প্রাণবন্ধুরে রাখো শিখাইয়া বুঝাইয়া
নইলে শ্রীচরণে দেও আমারে বান্ধিয়া গো ॥

বন্ধের সনে থাকিতে মোর বড়ো ছিল আশা
দীনহীনের ঐ চরণে রইল পিপাসা গো ॥

২০

আরে মন-পাগলা পরার রঙ্গে হইয়াছ রঙিলা
নিত্যধামে যাবার কালে ঘটবে রে তোর বিষম জ্বালা ॥

সদায় পরের বিচার করো, আপন ঘরে রইতে না পারো
পরের সঙ্গ তেজ্য করে, যাইতে হবে রে একেলা ॥

মহাজনের কানে কানে মহামন্ত্র বিতরণের
তোরে বলিয়া ছিল রে সন্ধানে, তুই একেলা সে একেলা ॥

মহাজনের কানে কানে মহামন্ত্র বিতরণের
তোরে বলিয়া ছিল রে সন্ধানে, তুই একেলা সে একেলা ॥

দীনহীন তোর কর্মদোষে, পরের সঙ্গে পরবাসে
তুমি ভ্রমিতেছ দেশ-বিদেশে ও তোর জীবন হতে মরণ ভালা ॥

২১

আসব বলিয়ে বন্ধু আসলো কই
আমি অনাথ অধিনী হইয়ে আর কতদিন রই গো ॥

ললিতা-বিসখা সখি, তারা সবে দিল ফাঁকি গো
আসব বইলে কুঞ্জে না আসিল গো ॥

রজনী প্রভাত হইল, আমার বন্ধু না আসিল গো
আমার দয়ার বন্ধু নিদয়া হইল গো ॥

কত পাষাণ মানুষ হইল, আমার দয়া না হইল গো
আমার কর্মে বুঝি এই ছিল লেখা গো ॥

ভাবিয়ে দীনহীন বলে, সব দুঃখ রইল মনে গো
জিতে না পাইলাম শ্যামকে পাইব নি মরিলে গো ॥

২২

এই কি ছিল মনে রে বন্ধু, এই কি ছিল মনে
ওগো বাড়াইয়া নবীন পিরিতি ভাঙিলায় কেমন রে ॥

হস্ত সোনা পদ সোনা, সোনা সারি সারি
ওগো দত্তহীন জনাব কাছে দিয়াছ কুশিয়ারী রে ॥

চক্ষুহীন জনার কাছে দর্পণ দিলায় হাতে
ওগো আচম্বিত বজ্রাঘাত পড়িল আমার মাথে রে ॥

দীনহীনে বলে রে বন্ধু দোষি না তোমারে
ওগো অমূল্য ধন নিল চোরে আছিল আমার ঘরে রে ॥

২৩

এই বুঝি তুমি বন্ধের মনে
অবলা বধিতে চাও জানিলাম এতদিনে রে পরাণের বন্ধু ॥

বন্ধু হে একত্রে জনম গেল, তবু দেখা না হইল
ধরব বইলে অধরা হইলায় হে
আমি তোমার পর নয় কোরানে-পুরাণে কয়
আপনারে কে যাবে পরাণে রে পরাণের বন্ধু, এই বুঝি বন্ধের মনে ॥

বন্ধু হে আশা পুরাইতে মারে হইলায় ভিন্ন কলেবর
দেখিয়ে প্রাণী আকুল হইল হে
বাড়াইতে পিরিতি নবরঙ্গে সাজো নিত্তি
রহিতে না দিলে শ্রীচরণে রে ॥

বন্ধু হে কি আর বলিব মুখে, মনের দুঃখ রইল বুকে
ও সেই দুঃখ মরমে বিন্দিল হে
দীনহীন পাগলে বয়, পর কি আপনা হয়
দুঃখ নিবারণ হইব আমি মরিলে রে পরাণের বন্ধু ॥

২৮

এনে বন্ধুরে কেউ দিল না গো
নিল না প্রাণবন্ধের বাড়ি মোরে
এমন আমার কেউ হলো না এ সংসারে ॥

যদি বলো বন্ধের কথা শুনলে প্রাণে হয় গো ব্যথা
বন্ধু যথা-তথায় নেও আমারে
প্রাণনাথ বন্ধুয়ার কথা সন্ধানে বলিও মোরে ॥

নেওয়া-দেওয়া না হইল, কেমনে যাইব বলো
সাধন-ভজন নাই মোর অন্তরে
কেবলমাত্র রইল আশা আমার বন্ধে যদি দয়া করে ॥

দীনহীন তোর কি ভরসা, শ্রীগুরু পাইবার আশা
নিজ গুণে চাইল বন্ধে যারে
তারে বন্ধে দয়া করে, বন্ধু বইলে নয়ন ঝুরে ॥

২৫

এবার হইল রে বন্ধু তোর মনে যাহা ছিল
আমার সর্বব্যথা গেল রে বন্ধু তোর মনে যাহা ছিল ॥

তুমি রাজা, রাজ্য তোমার, তুমি অধিকারী
তুমি ধনী তুমি দানী আমি হই ভিখারি রে বন্ধু ॥

কোরান-কেতাব ভেদশাস্ত্র সব লীলাখেলা
বুঝি মোরে দিয়া সাজাইয়াছ পঞ্চভূতের মেলা রে বন্ধু ॥

ভাবিয়া চিন্তিয়া আমার শরীর কইলাম কালা
এমন জিন্দেগী হইতে মরণ ভালা রে বন্ধু ॥

তোমারই স্থাবর প্রতিবাদী বলো কে বা হইল
তোর কারণে দীনহীনের ফল কি রইল রে ॥

২৬

ঐ যে দয়ালগুরু গুরু বইলে কে দাঁড়াল
সেজে বিপদ ভঞ্জন হইয়ে ভবের জীব উদ্ধারিল ॥

বৃক্ষে পঞ্চ ফুল ভবে বিকশিত হইল
ভক্ত অলি মধুপানে অকুলেতে কুল পাইল ॥

জীবের অসাধ্য সাধনা, যে করিয়াছে উপাসনা
সেই ফুলে হার গাঁথিয়া মনের সাধে গলে দিল ॥

দীনহীন বলে পামর রে তোর মনের ভ্রান্তি গেল না রে
পঞ্চ তত্ত্বে পরম আত্মা দেহাতে বিহেদা হইল ॥

২৭

ও প্রাণে কান্দে রে, কান্দে প্রাণে নবিজির লাগিয়া
তুষেরই অনলের মতো জ্বলে মোর হিয়া রে ॥

মন রে এই তনে হেরিলাম যত ভবেতে আসিয়া
নিশির স্বপনের মতো না পাইলাম জাগিয়া রে ॥

মন রে মাতাপিতা যত ছিল ভাই বন্ধুগণ
সকলই ছাড়িয়া গেল খেদ নাই আপন রে ॥

মন রে দীনহীনের যে ধন ছিল, সে ধন নিল চোরে
দয়া করিয়ে সে ধন আনিয়ে কে দিব আমারে রে ॥

২৮

ও বন্ধু আইলায় না রে রজনী যায় মোর গইয়া
শুইয়ে ছিল কাল ননদী উঠিব জাগিয়া রে ॥

শশুড়ি-ননদী ঘরে শুইয়া নিদ্রা যায়
এমন সময় বন্ধু রইলায় কোথায়, বন্ধু আইলায় না রে ॥

সু-স্বামী জাগিব পাছে আরসি পড়শি
দিতে না পারিব আমি চন্দন তুলসী রে ॥

রজনী প্রভাত হইল উদয় দিনমণি
দীনহীনরে আর নি দিবায় চরণ দুখানি রে ॥

২৯

ও বন্ধু আয় রে আয়
নিরলে বসিয়া তোরে আমার প্রাণে দেখিতে চায় রে ॥

দেখা দিয়া প্রাণের বন্ধু রাখবে জীবন
পাতকীর পরাণ তুমি নিন্ধনিয়ার ধন রে বন্ধু ॥

এবার না আসিলেরে বন্ধু আর কবে আসিবে
মানুষ দুর্লভ জনম আমার আর নি হইবে রে বন্ধু ॥

সয়ালের দয়াল তুমি মোহাম্মদ রসুল
মোনাজাত মাঙ্গি দরগায় করবায় নি কবুল ॥

দীনহীনের কি ধন আছে তোমার চরণ বিনে
আমি কার বা কাছে দাঁড়াইব জীবন-মরণে রে বন্ধু ॥

৩০

ও মন ছাড়লে না তোর ধুলাখেলা
গেল বেলা গেল বেলা গেল বেলা গেল বেলা
ও মন ছাড়লে না তোর ধুলাখেলা ॥

যতই খেলা খেলো ভবে, খেলা কি তোর সঙ্গে যাবে
সব খেলা ভাঙিয়া নিবে তাই কি মন হইয়াছে ভুলা ॥

ভবে যার জন্যেতে আসা হইল, বলো শুনি রে তার কি হইল
ও তোর শয়নেতে রাত্রি গেল দিবা হইলে কামের জ্বালা ॥

দীনহীন করছ কি ফন্দি, মায়াতে হইয়াছ বন্দি
ছাড়ো মনের ফন্দি বন্দি অন্তরে নেও নামের মালা ॥

৩১

ও মন ভালো তো বাউল হয়েছে
কোথায় যাইবার কথা ছিল
দেখো চাইয়া মন কোথায় গেছো ॥

বাউল হয়ে করো কীর্তন, দেখি না মন সেই আরাধন
কেবল খোল-করতালে তাল বাজাইয়ে পরের তালে নাচিতেছো ॥

সাধুর বেশ করিয়া ধারণ, ঐহ্যিক দেশে করো ভ্রমণ
রস বিলাইতে বিষ করো পান, এই কি ধর্ম শিখেছো ॥

শুনিয়াছিলে মন যেই সব কথা, হৃদয়ে তোর নাই রে গাথা
তোরে বলব কিরে আমার মাথা, আসল তালের বোল ভুলিয়াছো ॥

দীনহীনের কর্ম দোষে ভ্ৰমিয়া বেড়াই দেশ-বিদেশে
ছাড়িয়া কার উদ্দেশে অরণ্যে রোদন করিতেছো ॥

৩২

ও সখি কি হইল আমার
হেরিতে বাগিচার রঙ্গ কলিজা আঙ্গার সখি ॥

স্থানে স্থানে ডাল বৃক্ষ একই স্থানে মূল
ডালে ডালে ধরে কলি, ফুটিলে হয় ফুল সখি ॥

সেই ফুলের গন্ধ পেইয়ে জগত আকুল
কেহ ডোবে কেহ ভাসে, কেহ হয় বেভুল সখি ॥

দীনহীন মরিয়া যাইতাম রূপের বলাই হইয়া
এক বৃক্ষের পঞ্চফুল, আমি পাইমুনি মরিয়া গো সখি ॥

৩৩

ওগো রাই জলেতে আসিয়া
আকুল হইল প্রাণী আমার বন্ধের রূপ হেরিয়া ॥

একে তো কলসি গো কাঙ্খে সহিতে না পারি
বিজলী চটকের মতো বন্ধের রূপের মাধুরী গো ॥

জল না ভরিতে গো পাইলাম প্রাণী কাম্পে ডরে
ঘরে গুরুজনা বৈরী আমি বঞ্চিমু কেমনে গো ॥

দীনহীন বিকাবো গো রাই ঐ রূপের লাগিয়া
দয়ানি করিবা বন্ধে মনে রহিম হইরা গো ॥

৩৪

ওহে প্রভু কে আনিল কাননে
আমি ছিলাম শয়নে ॥

প্রভু ছিলাম বা কই, আইলাম বা কই, কি করি উপায়
আমার সঙ্গিনী সব রইল কোথায়
একি ঘটিল আমার প্রাণে বাঁচা হইল দায়
এখন কোথায় যাব কারে পাব, এ ঘোর বনে ॥

শোক পেলে দগ্ধ হবে আমারই কারণ
সদায় পুত্র বলি রে মা দুঃখিনী করিবে রোদন
যখন হইবে শরণ, তখন ত্যাজিব জীবন
হায় রে কেমনে বঞ্চিব আমার না হেরিয়ে নয়নে ॥

প্রভু সত্ত্বঃ, রজঃ, তমঃ, গুণ হইয়াছে
তোমার হেরি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব তুমি রহিমা অপার
তুমি বিনে বিপদ তারণ
যদি দয়া করো নিজ গুণে এ দীনহীনে ॥

৩৫

কইব দুঃখ বন্ধের লাগাল পাইলে গো সখি নিরলে
কইব দুঃখ বন্ধের লাগাল পাইলে ॥

বন্ধে হস্ত আমার মাথে তুলিয়া গো সখি নিরলে
আমার নি আর কেউ আছে, যাব আমি কার কাছে গো ॥

আমার বন্ধু বিনে কে আছে আপনা গো সখি
আমি অকূলে ভাসিয়া বেড়াই, আমার বাঁচিবার আশা নাই ॥

আমায় দেখিয়ে বন্ধে কূলেতে নিল না গো সখি
দীনহীন হইলাম দোষী, জগতে রইল হাসি গো
আমি মরিলে বন্ধের কলংক হবে না গো সখি ॥

৩৬

কথা রইল রে জনম ভরিয়া কথা রইল রে ॥

শিশুকালে প্রাণের বন্ধে কি জানি কি কইল
সই গো কি জানি কি কইল
নিজ গুণে রূপ দেখাইয়া প্রেম বাড়াইল রে
কথা রইল রে জনম ভরিয়া কথা রইল রে ॥

যৌবনকালে প্রাণের বন্ধে মারে দোষ দিয়া
সই গো মারে দোষ দিয়া
যাইবার কালে প্রাণের বন্ধে না গেল জিজ্ঞাসিয়া
কথা রইল রে জনম ভরিয়া কথা রইল রে ॥

দীনহীনে বলে বন্ধের এই কি ছিল মনে
সই গো এই কি ছিল মনে
ভাঙিল সাধের পিরিতি বাড়াইল কেনে
কথা রইল রে জনম ভরিয়া কথা রইল রে ॥

৩৭

করিস মা দাগাদারি, পুত্র সনে ঝাক ঝুরি ॥

তরি তোমার মাঝি তোমার, তুমি হও নায়ের কাণ্ডারি
লাভ লোকসানের ভাগী আমি, বলো কে ছিল বেপারী ॥

শমন তরি লাগবে ঘাটে, নিবে এসে হিসাব করি
ক্ষতি পূরণ না করিলে, সব নিবে মা নিলাম করি ॥

দীনহীন বলে কি কৌশলে, অকূলে ভাসাইলায় তরি
লাভ যে নিবে লোকসান দিবে, তার উপর ডিক্রি জারি ॥

৩৮

কাঁচা সোনা গৌর রূপ রে তনুখানি একি বলো গো সজনী ॥

তারা বলো গো সজনী সজনী
হায় গো গৌরার রূপের কথা তোমরা বলো আমরা শুনি
এ কি বলো গো সজনী ॥

গৌরার হাতে চান কপালে চান
হায় গো গৌরার চান্দের মালা চান্দের মালা চীন গাঁথমু নি
এ কি বলো গো সজনী ॥

মনে লয় তার সঙ্গে যাইতাম
হায় গো গৌরার রহিম চান্দের রহিম চান্দের ঐ নিচুনি
এ কি বলো গো সজনী ॥

৩৯

কারে কি দোষ দিমু রে বন্ধু আমার কপালেরই দোষ
আমার মতো এমন দোষী ত্রিজগতে নাই রে ॥

পঙ্ক আস্বাদনেরে আমায় বিন্দিল আমারে
আমারে রাখিয়াছ রে জানলাম না কোন গুণে রে ॥

সাধু বইলে পাড়ার লোকে সবে জানে মনে মনে
আমি কেমন সাধু হইলাম তুমি দেখো তো নয়নে রে ॥

দীনহীন ভাবে আইসে এই লাভ করিল
এমন হিয়া মইন-মানিকের ভরা পাইয়ে গাঙে ডুবাইলে রে ॥

৬৫

কারে বা বলিমু গো মনেরই বেদনা
ও মন জানে আর বন্ধে গো জানে অন্যে তো জানে না গো
কারে বা বলিমু গো মনেরই বেদনা ॥

কুক্ষণে জল ভরতে গেলাম গো আইলাম সখী সঙ্গে লইয়া
কিবা প্রেম বাড়াইল গো বন্ধে জ্বলে দেখা দিয়া গো
কারে বা বলিমু গো মনেরই বেদনা ॥

দয়া না করিলে গো বন্ধে অবলা জানিয়া
বুঝি প্রেমজুরে বাড়াইল গো বন্ধে বধিবার লাগিয়া গো
কারে বা বলিমু গো মনেরই বেদনা ॥

দীনহীনের মনের আশা জল দিলে নিবে না
যার লাগি কলংকিনী গো হইলাম সে ভালোবাসে না গো
কারে বা বলিমু গো মনেরই বেদনা ॥

৪১

কালা তোর লাগি রে
তোর লাগি এ নগরে আমার বসতি রে ॥

স্বদেশ ছাড়িয়া কালা রে ও কালা বিদেশে করিলাম ঘর
তবু না চিনিতে পাইলাম তুমি আপনা কি পর ॥

নগর ভ্রমিয়া চাইলাম রে ও কালা কেহ নাই আপন
আপনা কহিলাম যারে পাইলাম না তার মন ॥

পাপ-পুণ্য যত দেখি দেখি রে ও কালা তোমার চরণ তলে
কালা আমার গলার মালা দীনহীনে বলে রে কালা ॥

৪২

কালা রে হায় রে কালা, কেন আইলে রজনী পোষাইতে,
তুমি জ্বালারই ওপরে জ্বালা, আমি অবলা রে দিতে ॥

সত্য করি বলো রে বন্ধু হস্ত দিয়ে মাথে
তুমি সারা নিশি পোষাইলায় কাহার কুঞ্জেতে ॥

রজনী পোষাইয়া গেল, কোকিল ডাকে ডালে
তুমি নিজে আসিয়ে দিলায় দেখা আমার পিরিতি ভাঙিতে ॥

মইলার মইলার মইলা রে বন্ধু মইলার নিজ হাতে
তোমার দীনহীন মরিলে রবে কলংক জগতে ॥

৪৩

কি প্রেম আনিল গৌরাচান্দে
তারে দেখিলে নয়ন জুড়ে, না দেখলে প্রাণ কান্দে সই ॥

গৌরায় কেউ রে হাসায় কেউ রে কান্দায় মধুর বচনে
শুনিল গৌরর কথা ঠেকিল প্রেমফান্দে স‍ই ॥

ঘরে না বঞ্চিতে পারে, পুরুষ কি রমণী
ভাবেতে আকুল হইতে নাচে গৌর নিত্যানন্দে সই ॥

দীনহীন বিকাইব কুলমান দিয়া
আমার মরণ মঙ্গল হবে, যদি চায় গৌরাচান্দে সই ॥

৪৪

কি ভাবিয়া মনে রে বন্ধু, কি ভাবিয়া মনে
এগো বাড়াইয়া সাধের পিরিতি ছাড়াইলায় কেনে রে ॥

প্রেম বাড়াইতে রে বন্ধু কত আশা দিলে
এগো না জানি কি দোষ দেখিয়া সব ভাঙিয়া নিলে রে ॥

পরবাগে আনিয়া মোরে করিলায় কুলুটা
তুমি আমার বন্ধু বইলা ভবে রইল খুটা রে ॥

রহিম বলিয়া তুমি জানে সর্বজনে
আমি অনাথ বালকের ভাবে লুকাইলায় কেনে রে ॥

দীনহীন পড়িল মারা তোমার পিরিতে
আমার মরণ বুঝি ছিল তোমার হাতে রে ॥

৪৫

কেন আইলাম কেন আইলাম জলের লাগিয়া
এখন যাইতে না চলে প্রাণবন্ধু রে থইয়া গো ॥

জলের ছলে আইলাম জলে তোদের সঙ্গী হইয়া
ওগো একা আইলে ছিল ভালো, যাইতাম না ফিরিয়া গো ॥

আগে তো জানি না গো আমি নাগর কলিয়া
ওগো প্রেম ফান্দ পাতিয়াছে জলে বধিবার লাগিয়া গো ॥

আসা-যাওয়া জলের ঘাটে যাহার লাগিয়া
ওগো তারে পাইলে দীনহীন আর যাবে কি লাগিয়া গো ॥

৪৬

কেন বন্ধু ভিন্ন বাসো মোরে
আমি দেখতে চাইলে দেখি না তোমারেও
কেন বন্ধু ভিন্ন বাসো মোরে ॥

ছাল্লিআলা মোহাম্মদ বলো চান্দ বদনে
তোমার নামে ছাল্লিআলা বলইন নিরাঞ্জনেও
কেন বন্ধু ভিন্ন বাসো মোরে ॥

ছামিউন বছির খোদা, জাহির বাতিনে
পাঞ্জাতনে করিলা জাহির তোমার নামের গুণেও
কেন বন্ধু ভিন্ন বাসো মোরে ॥

তোমার সানেতে হইল নাজিল কোরান
আকাশ-পাতাল জিন বাসর আদম ইনসান ও
কেন বন্ধু ভিন্ন বাসো মোরে ॥

আসা-যাওয়া হইল আমার কিসের কারণ
কার লাগি লইলাম গলে জিয়ন-মরণও
কেন বন্ধু ভিন্ন বাসো মোরে ॥

আদম উদ্ধার হইল তোমার নামের গুণে
নিজ গুণে করো দয়া দারুণ পাষাণে ও
কেন বন্ধু ভিন্ন বাসো মোরে ॥

বারেক দীনহীন পানে চাও নিরকিয়া
মরা কাষ্ঠে পাইল জীবন অঙ্গ পরশিয়া
কেন বন্ধু ভিন্ন বাসো মোরে ॥

৪৭

কেবা জানে ও দীননাথ কি বা তোমার মনে
তোমায় কেউ দেখে না চোখ থাকিতে, তুমি অন্ধ রে দেখাও ত্রিভুবনে ॥

দশ মুণ্ডে কইল সাধন লংকারই রাবণে
তারে কুল দিলায় না ভাসাইলায়, ও তার কুল মজাইল হনুমানে ॥

বলি গেল পাতালেতে কি করল সাধনে
রামচন্দ্র কই রাজা হবে, তারে তুমি পাঠাও বনে ॥

প্ৰহ্লাদ ছাইলা ভক্ত ছিল কি গুণ সে জানে
যারি ঔরসে প্রহ্লাদ জন্মে, তারে তুমি মাইলায় প্ৰাণে ॥

কাষ্ঠের তরি হইল সোনা তোমারই চরণে
তোমায় মারিয়াছিল জগাই-মাধাই, তারে উদ্ধারিলায় নিজ গুণে ॥

তুমি দয়া কইলে আছি এবার, নইলে গেছি প্ৰাণে
কি করিবায় তুমি জানো, তোমার কুসন্তান দীনহীনে ॥

৪৮

কোথায় রাখিলে আমার পরাণ জুড়াব রে বন্ধু
বন্ধু তোরে কেমনে রাখিব ॥

নয়নে হেরিতে রে বন্ধু পরাণ বিদুরে
কেমনে যতন করিয়ে রাখিব তোমারে রে বন্ধু
বন্ধু তোরে কেমনে রাখিব ॥

বসন্ত সময়রে বন্ধু আইলায় তুমি রঙ্গে
জীবন সাফল্য করিয়ে নেও আমারে সঙ্গে রে বন্ধু
বন্ধু তোরে কেমনে রাখিব ॥

তুমি তো নাইওর রে বন্ধু আমি পরবাসী
বিদেশে আনিয়া মোরে বানাইলায় সন্ন্যাসী রে বন্ধু
বন্ধু তোরে কেমনে রাখিব ॥

দীনহীনে বলে রে বন্ধু আশা ছিল মনে
অন্তিমকালে যোগাল চরণ হেরিতাম নয়নে রে বন্ধু
বন্ধু তোরে কেমনে রাখিব ॥

৪৯

গুরুচরণ ভরি দেও আমারে, নইলে প্রাণে ভয় যে করে ॥

একা হইয়া দয়াল গুরু যাবো কিসে ভবপারে
তুমি হইয়া তরি হও কাণ্ডারি পার, করিয়া নেও যাই সে পারে ॥

তুমি পাইয়ে কাল, হইয়ে কাল, কালা আর ডাকিও না মোরে কালশশী গোকুল বাঁশি স্বরূপে নেও রূপের ঘরে ॥

জগত-সংসার দীনহীন তোমার, কে আছে আর বলব কারে
রহিম নাম ধরিয়া ফেলে গেলে আদরে নেও আদর করিয়ে ॥

৫০

চলো বন্ধু সঙ্গে চলো, একমাত্র তুমি সম্বল
চলো বন্ধু সঙ্গে চলো ॥

তুমি আমার আমার বইলে, ভাবিয়া জনম গেল
এখন ডাকছে কালে, যাব সে কূলে, কার সঙ্গে যাইমু বলো ॥

ভাব ভক্তি যত ছিল কালের ভয়ে সব পলাইল
আমার জ্ঞানের ভরা পড়িল মারা, পারাপারের ভেদ না রইল ॥

তুমি ভিন্ন নহে বন্ধু, দীনহীনকে বলিয়া ছিলে
যাবেন বৃথা তোমার কথা, সাপের রাজ্য কি বেঙে খাইল ॥

৫১

চিনি চিনি করে মনে, চিনিতে না পারি কেনে
কখন জানি দেখিয়াছি তোমারই চন্দ্র বদনে ॥

শিবে সতী নিল মাথে কৈশব মইল সিংহের হাতে
বনবাসী হইল সীতা প্রেম করিয়ে রামচন্দ্রের সনে ॥

দ্বাপরেতে চিকন কালা করল ব্রজে কত খেলা
শত গোপী শ্যাম একেলা ধেনু চড়ায় বনে বনে ॥

সত্য ত্রেতা দ্বাপর গেল, আর কি চিনার বাকি রইল
রাই রূপে গৌরাঙ্গ আইল দেখল পাগল দীনহীনে ॥

৫২

জানে রে পাগলের মনে জানে
ও তার প্রাণধন হইলে হারা, পাগল বঞ্চিবে কেমনে রে ॥

দিবানিশি অবিরত জাগে পাগল মনে
ও তার প্রাণ গেলে দেচার বসতি থাকে না ভুবনে রে ॥

ছেড়ে যাবে প্রাণের বন্ধে জানায় রাত্র-দিনে
ও আমার ঘরবাড়ি না লয় মনে, শয়নে জাগরণে রে ॥

আর জানে রহিম চান্দে নিজ দয়া গুণে
নিজ দাস বলিয়া দীনহীনে, ডাকে নিশি-দিনে রে ॥

৫৩

টানে রে স্বভাবে টানে
কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদনাদি পঞ্চবাণে ॥

ভক্তি বাদি পঞ্চকাঁটা বিন্ধিল যার মনেপ্রাণে
ও তার সাধনে সিদ্ধি হবে না রে বলে হিন্দু-মুসলমানে ॥

ছিল সাগরেতে জলের প্রভা সে জন আইল ত্রিভুবনে
বর্ষাকালে জল শুকালে মীন মরিবে সে জন বিনে ॥

জলের সঙ্গে খেয়ে পরে দীনহীন আর মরবে না রে
শুকনায় পড়িয়া রইছে বেন্ধে নিবে কাল শমনে ॥

৫৪

তুই বড়ো দয়াল রে বন্ধু তুই বড়ো দয়াল
বন্ধুও তুই বড়ো দয়াল বন্ধুও ॥

আপনার নুর দিয়া মোহাম্মদ করিলায় পয়দা
সেই নুরেতে সয়াল সংসার বন্ধুও ॥

কোরানে শুনিয়াছি আমি, এই দেহাতে আছো তুমি
দেখা দিয়া রাখো মোর জীবন বন্ধুও ॥

বারেক দীনহীন পানে চাও বন্ধু দুই নয়নে
তোমার নাম শুনিয়াছি করিম-রহিম বন্ধুও ॥

৫৫

তুমি তো সুজন বন্ধু রে আমি তো কুজনা
আমি কুজনে কি রাখতে পারি তুমি সুজন বন্ধের মন রে ॥

কুজনায় তরণী নায়ের, তুমি সুজন কাণ্ডারি
নামেতে কলংক রবে যদি আমি ডুবিয়া মরি রে ॥

দুর্লভ চরণ তোমার কত সাধুজনায় সাথে
আমি না সাধিতে পাইলাম নবদীর বিবাদে রে ॥

কুজনার আর লক্ষ্য নাই, তুমি সুজন বন্ধু বিহনে
দয়া করিয়া রাখিও তোমার পাগল দীনহীনে রে ॥

৫৬

তুমি বৈ আর কেহ নাই যখন বলিয়াছ আমারে
কোথায় গেলে কি হেরিলে ভুলিব তোমারে ॥

তুমি দেহের দেহা প্রাণের প্রাণ জীবের জীবন
তুমি ধ্যানের ট্যানী জ্ঞানের জ্ঞানী শ্রবণের শ্রবণ ॥

আকাশে আকাশ তুমি, পাতালের পাতাল
তুমি বীজ তুমি বৃক্ষ, তুমি ফুল ফল ॥

দীনহীন আর যাব কোথা তুমি সর্বস্থানে
কখন অনুমানে তুমি কখন বর্তমানে ॥

৫৭

তুমি নি আমার প্রাণধন ও দয়ার বন্ধু তুমি নি আমার ॥

বন্ধুও সয়ালের দয়াল তুমি জানে ত্রিভুবনে
আমার প্রতি নিদয় হইলায় কিশোরী কারণে ॥

বন্ধুও তৃণ আদি তরুলতা আছে দয়া গুণে
তোমার দয়া ছাড়া হইলে বলো কে বাঁচে পরাণে ॥

বন্ধুও সকলের সম্বল আছে সাধন-ভজনে
আমি পাপীর কি ধন আছে তোমার দয়া বিহনে ॥

বন্ধুও নিদয়া নিষ্ঠুর নাম শুনি না শ্রবণে
দীনহীনের মনের ভ্রান্তি যায় না তুমি বিহনে ॥

৫৮

তুমি নি আমার রে বন্ধু বলো সারাসার
আমি কি তোমার নয় তুমি নয় আমার রে বন্ধু ॥

মানুষ জনম আর হবে নি আমার
এবার তুমি ছাড়িয়া গেলে আসিবায় নি আর রে বন্ধু ॥

তুমি যদি না হও আমার আমি তো তোমার
তুমি বিহনে ত্রিভুবনে কে আছে আমার রে ॥

দীনহীনের দেহা প্রাণী সকলই তোমার
কি ধন তোমারে দিব কি আছে আমার রে ॥

৫৯

তোমরা পাইলে কইও গো
অভাগীর বন্ধু রে তোমরা কইও গো ॥

তোমরা বইলায় বন্ধের ভাগী
আমি অভাগীরে চাইও গো ॥

আমি বলি বন্ধু বন্ধু বন্ধু মরইন লাজে
আর না বলিমু আমি গোপীর সমাজে গো ॥

আমারে চাইতে বন্ধে ভালো নাই বাসে
অভাগীর বন্ধুয়া বইলে লোকে যেন ঘোষে গো ॥

আমারে মারিতে বন্ধে মারে নানান বেশে
বলে না প্রাণের বন্ধু পাড়ার লোকে হাসে গো ॥

মিনতি করিয়া কইও বন্ধুয়ার চরণে
দয়া করি রাখে যেন পাগল দীনহীনে গো ॥

৬০

তোর ঘাটে বান্দা তরি, মন তুমি কেমন বেপারি
কেবল ঘাটে বইসে মাঝির সনে, করতেছ মন গফ গুজারি ॥

যথায় গেলে জিনিস মিলে, যাও না রে মন শীঘ্র করি
বর্ষাকালে জল শুকাবে শুকনায় পড়িবে তরি ॥

বেপার করিবার আশে, অকূলে ভাসাইলায় তরি
নদীর ঢেউ দেখিয়ে ভয় পাইলে ফিরে যা তোর আপন বাড়ি ॥

দীনহীন পাগলে বলে করিও না মন ঝাকা ঝুরি
জলে ভাসিয়ে যাও সে দেশে, লাভের লাগি ডুবাও তরি ॥

৬১

তোরা কে যাবে গো আয়
কালিন্দির তীরে বন্ধে বাঁশিটি বাজায়
ত্বরাই করি চল সখি দেখবার সময় গইয়া যায় ॥

চল চল সব সখি যমুনার ঘাটে
জলে গেলে হবে দেখা নইলে ঘটে কি না ঘটে ॥

চল চল সব সখি রাধার সঙ্গী হইয়া
আমার প্রাণবন্ধে বাজায় বাঁশি বাজায় রাধারে বিনাইয়া ॥

দীনহীনে বলে বন্ধুরে রাখিও ঘিরিয়া
তারে প্রেমডোরে বান্ধিয়া রাখিও রাধার বসন দিয়া ॥

৬২

তোরা কে যাবে গো আয়
দয়াল চান্দের হাটে যাব আমি, মুর্শিদ চান্দের বাড়ি
ওগো পথ চিনি না চিনাইয়া নেও আমার বেলা আছে দণ্ডচারি ॥

জন্ম লইয়া মায়ের কুলে, মায়াতে রইলাম ভুলিয়ে গো
যৌবন আসিয়ে দেখা দিলে, হবে রূপ চান্দের ডিগ্রি জারি ॥

মাল কুটাতে যে ধন ছিল ডিগ্রিতে সব নিলাম হইল গো
সুধা তনু পড়িয়া রইল দেখিয়া কান্দে মন বেপারি ॥

দীনহীন আর কতদিন, থাকব হইয়ে গুণাধীন গো
রহিম রূপের বাদাম টাইনে হাইলে দেও শমন কাণ্ডারি ॥

৬৩

তোরা চাও গো নিরকিয়া
নিকুঞ্জেতে আইল আমার নাগর কালিয়া ॥

চোরাধরা নাই গো বন্ধের হাতে নাই গো বাঁশি
পীতাম্বর নাই গো অঙ্গে, মুখে নাই গো হাসি
তোরা চাও গো নিরকিয়া ॥

নূপুর না বাজে সেই গো রুনুর ঝুনুর রবে
এগো রাধার কুঞ্জে আইলা কানু না জানি কি হবে
তোরা চাও গো নিরকিয়া ॥

দীনহীনে বলে সই গো নীরব হইয়া চাইও
মনেতে মিশাইয়া মনের দুঃখ কইও
তোরা চাও গো নিরকিয়া ॥

৬৪

দয়া করো হে নাথ
আমি তোমার রূপসাগরে ডুবিয়ে থাকি
নয়ন যাউক না কেন যথাতথা, তোমারই যে আর না দেখি ॥

একে তো অনন্ত হলো, বায়ু আদি অগ্নি জল
তুমি হও সবেরই বল, কীট পতঙ্গ পশু পাখি
অনন্তে রাখিয়া আমায় দিও না দিও না ফাঁকি ॥

তোমার অঙ্গে তোমার ছায়া তোমার ধনে তোমার মায়া
তোমার প্রেমে আসা-যাওয়া নইলে আসা-যাওয়া বাকি
জীবে কখন কান্দে কখন হাসে দেখিয়ে তোমার লুকালুকি ॥

দীনহীনকে যাহা করো না করো
আমি জানি না তুমি জানতে পারো, দীনজনকে কোনো দীনে কেউ মারে না
আড়ালে থাকি তোমার নিজ দাসকে দয়া করো, কে আছে আর দুঃখের দুখী ॥

৬৫

দয়া হলো না হলো না ওহে দয়াময়
জগতে দয়াল বলিয়ে কেবা তোমায় নাহি কয় ॥

দয়া করিয়ে নিজ গুণে, দিলে মানুষ জীবনে
না হেরিলে চান্দ বদনে, এ জীবনে কি বা হয়।
সাধ করিয়ে অতি যতনে, ফেলিয়ে ছিলে অভাজনে
দেখো বন্ধু দয়া বিনে সকলই বিনাশ হয় ॥

তোমার করুণা গুণে, আসিয়াছিলাম এই ভুবনে
বলো কিসে বাঁচি প্ৰাণে দয়া যদি নাহি হয়।
তুমি হে জগতের বন্ধু, অপার করুণা সিন্ধু
দিলে আমার এক বিন্দু সিন্ধু শুকাবিত নয় ॥

দীনহীন অভাজনে রাখো যুগল চরণে
চাও বন্ধু দুই নয়নে আমি অতি নিরাশ্রয়।
সাধন ভজন হীনে পতিত রে মারিও না প্ৰাণে
তুমি ত্রাণ করো নিজ গুণে কোরানে পুরাণে কয় ॥

৬৬

দয়ার মা গো জগতে তোমার নামের ধন্যি
তুমি মার কারণে পাতকী উদ্ধার হইবা শুনি
মার মতো ডাকিয়া নি মোরে নিবায় গো জননী ॥

সাহেব আল্লা দয়া ফরমাইলা নবিজির হুজুরে
তুমি যারে করো দয়া করো আল্লা দয়া কারে
তুমি মা নিদয়া হইলে আল্লা চায় না তারে ॥

মাগো তোমার সিফত গো মা জানইন পেগাম্বরে
আর পাক পঞ্জাতন আল্লা পরওয়ারে
নবির উম্মত উদ্ধার হইবা তুমি মার খাতিরে ॥

মাগো শাহ আলি মুসকিল কুশা লাগইন কহিবারে
আমার ইজ্জত তুমি ফাতেমার হাতে
বে-ইজ্জত করিও না মোরে নবিজির সাক্ষাতে ॥

মাগো কোরানে শুনিয়াছি গো মা তোমার নামের ধ্বনি
সত্তর মার মায়া তুমি করো গো জননী
জীবের জীবন তুমি দেহার পরাণী ॥

মাগো আউলিয়ার মউত নাই মা কোরানেতে শুনি
তোমার মরণ কিসে বলো গো জননী
তুমি মা ছাড়িয়া গেলে যাইবে পরাণি ॥

মাগো জাহিরে জহর হইলায় মক্কা শহরে
বায়তহুজি বানাইলায় মদিনার ঘরে
তিছিরা রমজানে বুঝি ভাসাইলায় সায়রে ॥

মাগো কুপুত্র মইলে কি গো মা মায়ের মন ফুরে না
অন্ধল আতুর মইলে মায় কান্দে না
দীনহীন পাপী জানিয়ে পরানে মারিও না ॥

৬৭

দীনহীন হইল কানা, সব দেখে তারে দেখে না ॥

আসা-যাওয়া নেওয়া দেওয়া, দেখে তো চক্ষে দেখে না
তার মনের মতো হয় না বিলাস, ব্যর্থ গেল আনা কানা ॥

আপনাকে পর জানি না, পরকে আপন জানে না
আপন পরের কিবা প্রভেদ, তার কিছু সে টের পাইল না ॥

দিশাহারা হলো পাগল, সার হলো তার আনা জানা
যেমন বলদ ঘুরে বান্দা গাছে, বলদে তো গাছ দেখে না ॥

৬৮

নয়ন তুলিয়া চাও গো কিশোরী
মান ভঙ্গ করো রাধে আমি তোমার পায় ধরি ॥

কিশোরী গো অপার মহিমা তোমার বুঝিতে না পারি
কখন রাজার নন্দিনী কখন ওগো পরনারী
নয়ন তুলিয়া চাও গো কিশোরী ॥

কিশোরী গো চোরাধরা মোহনবাঁশি দিয়া বিনয় করি
ভবনদী পার হইতে দেও তোমার চরণখানি
নয়ন তুলিয়া চাও গো কিশোরী ॥

কিশোরী গো মানব জীবন উদ্ধারিলায় হইয়া কাণ্ডারি
সয়ালকে করিলায় পার আমি দীনহীন কত ভারি
নয়ন তুলিয়া চাও গো কিশোরী ॥

৬৯

না-মরিলে রূপের ঘাটে যাইও না রে মন
নয়ন দুইটি ঠিক রবে না হবে না তোর সাধন ভজন ॥

সেই রূপ নেহার করো, দেহার বিলাস আগে ছাড়ো
তারপরে অধরা ধরো, হবে রে সাধন
দর্শন নির্মল হবে, তবে সেই রূপ দেখতে পারে
রূপে রূপ না মিশিলে হয় না রে স্বরূপে সাধন ॥

ধর্মাধর্ম পাপপুণ্য সব দ্বারে গিয়ে শূন্য করিবে
অঙ্গের ভুবন ভুবনমোহন
জল পিপাসার জলে ভেসে অবশ হইও সেই বসে জলে
না মিশিলে দেখবে রে শমনের ভুবন ॥

দীনহীন পাগলে বলে সেই দেশে যাইতে হলে
কাম-সিন্ধুকে তালা দিয়া করিবে বন্ধন
প্রেমসিন্দুকের খুলিয়ে তালা দিবানিশি করো খেলা
ঠিক রাখিও নিত্তির কাটা নইলে যাবে বৃথা জীবন ॥

৭০

নিদয়া বলিও না তারে গো সই, নিদয়া বলিও না তারে
সেজে দয়াময় শ্যাম আছে ব্রজধামে, ভ্রমিয়া বেড়ায় গোপীর ঘরে ঘরে ॥

যাহারই অন্তরে স্থান দিল তারে, সেজন কি আর গৃহে রইতে পারে
নেত্র জলধারা অবিরত ঝরে প্রেমদান করে বসিয়া নিরলে ॥

পাতকী দেখিয়া বাহু পাসরিয়া, আয় আয় বইলে ডাকে সমাদরে
সে যে দয়ারই ভাণ্ডার না করে বিচার, যাচিয়া প্রেম বিলায় যারে-তারে ॥

৭১

নিদয়া হইও না তুমি মোর দয়াল বন্ধু বন্ধু
ও নিদয়া হইও না তুমি মোর ॥

বন্ধু ও পরাণের পাবন তুমি দেহার জীবন
তুমি বন্ধু নিদয়া হইলে কেমনে বাঁচে প্রাণ
ও দয়াল বন্ধু, বন্ধু ও নিদয়া হইও না তুমি মোর ॥

কহিলে না ফুরাইবে আমার কাহিনি
দোষের দোষী আমি রে বন্ধু
তুমি গুণের গুণী ও দয়াল বন্ধু, নিদয়া হইও না তুমি মোর ॥

দীনহীন তোমার বইলে জানে ত্রিভুবনে
তোমার নামেতে কলংক রবে
যদি আমি মরি প্রাণে ও দয়াল বন্ধু, নিদয়া হইও না তুমি মোর ॥

৭২

পর তো জানি না রে বন্ধু, পর তো জানি না
হায় রে জন্মে জন্মে আমি তোমার বিনা মূলের কিনা রে বন্ধু ॥

উজান বাঁকে থাকো রে বন্ধু, ভাটিয়াল বাঁকে থানা
অভাগীরে দিতে দেখা কে করিয়াছে মানা বন্ধু ॥

পর যদি জানতাম রে বন্ধু থাকতাম পরের মতো
তে কেনে সপিয়া দিতাম দেহাপ্রাণ যৌবন রে বন্ধু ॥

করিম নামটি রে বন্ধু জগতে ঘোষণা
লাতাক লাত্‌ আশা দিয়া নৈরাশা করিও না রে বন্ধু ॥

দীনহীনে বলে রে বন্ধু আমার মনেরই বেদনা
আমি কি বলিব রে বন্ধু তুমি কি জানো না রে বন্ধু ॥

৭৩

প্রেম হইয়াছিল কি গুণে, ছিল প্রেম গেল কেমনে
ওগো নিত্য প্রেম হইলে কি যাইত বাড়িত দিনে ॥

অনিত্য প্রেমে রে ধর্ম জন্ম লয় পঞ্চ গুণে
কাম হাতুরে কর্মকারে তাদের প্রেম অল্পদিনে ॥

লীলা হইতে নিত্য প্রাপ্তি বলিয়া গেছে মহাজনে
অহিংসা পরম ধর্ম সাধন করে জনে ॥

দীনহীনে বলে জলে দুগ্ধ ভাসে সন্ধানে
হংস রূপে রসিক জলে পান করে রাত্র দিনে ॥

৭৪

বন্ধু আমি দোষি না তোমারে
যাহ হবার হইয়া গেল রে বন্ধু, মোর কপালে করে রে ॥

জন্মান্তরে প্রাণের বন্ধু পাইয়াছিলাম তোরে
আমার কর্মদোষে হারাইলাম রে বন্ধু দোষ দিমু কারে রে ॥

তোমারে পাইব বলিয়ে ছিলাম রে ভরসা
জনম গইয়া গেল রে বন্ধু না পুরাইলায় আশা রে ॥

দীনহীনের কর্মে এই ছিল লেখা
দেখা দিয়া প্রাণের নাথ বুঝি হইলায় অদেখা রে ॥

৭৫

বন্ধু আমি নি তোর দাস রে বলো রে পরাণের বন্ধু
অনাথ জানিয়া তুমি রে বন্ধু, বন্ধু আমার করিও না নৈরাশ্য রে ॥

গোপজাতি দেখিয়া মোরে রে বন্ধু ভিন্ন নাহি বাসো
কার লাগি ব্রজে আইলায় রে বন্ধু লিয়ে রাখালেরই বেশ রে ॥

আমার ভাবে তুমি দেখি রে বন্ধু হইলায় অধরা
নিজ গুণে রাধার কুঞ্জে রে বন্ধু আসিয়া দিলায় ধরা রে ॥

চরণ দেও, দেও রে বন্ধু তুলিয়া রাখিরে মাথে
তোমার নিজ দয়াগুণে মরে রে বন্ধু ধরিয়া নেও হাতে রে ॥

দীনহীন মরিয়া যাইতাম রে বন্ধু তোমার দয়ায় নিচুনি
করিম-রহিম নামটি তোমা রে বন্ধু আমি কোরানেতে শুনি রে ॥

৭৬

বন্ধু আর করিও না লুকালুকি, দীনহীনের দিন কি বাকি ॥

একে দুই যে তিন, তিনে দীনহীন আর যত সব ফাঁকি ঝুকি
আগম, নিগম, ভেদ পুরাণে দিয়াছে ভিনজনা সাক্ষী ॥

ভূত ভবিষ্যত বর্তমানে তুমি বিনে আর কে আছে বাকি
সত্ত্বঃ, রজঃ, তমঃ, গুণে ত্রিভুবনে আর না দেখি ॥

বৃথা বলে নাই শোনো সাধু ভাই, ঠিক রাখা চাই মনপাখি
খেলে পঞ্চ রস হইবে পরশ, ভুলে যাবে সব দেখাদেখি ॥

৭৭

বন্ধু কইলায় না রে মরম ভাঙিয়া
রইল দুঃখ জনম ভরিয়া, বন্ধু কইলায় না রে ॥

বন্ধুও নহে দিবা নহে রাত্র নহে অন্ধকার
হেনকালে কি অভাবে গমন তোমার, বন্ধু কইলায় না রে ॥

গৃহবাসী না হও তুমি, না হও বনচারী
অঙ্গীকার সঙ্গে তুমি নিকুঞ্জ বিহারী, বন্ধু কইলায় না রে ॥

বন্ধুও দীনহীনে বলে রে বন্ধু এবার এবার
আমি মইলে কইলে কথা কে শুনিবে আর, বন্ধু কইলায় না রে ॥

৭৮

বন্ধু তোমার গুণের কথা থাকে যে আমার মনে
ভুলি না যে আমার এ জীবনে ॥

বন্ধু ও অমৃত জানিয়া রে বন্ধু তোমার মুখের বাণী রে
বন্ধু তোমার মুখের বাণী
মনে লয় হৃদয়ে রাখি চরণ দুইখানি রে বন্ধু
ভুলি না যে আমার এ জীবনে ॥

বন্ধু ও যথায়-তথায় যাই রে বন্ধু
তোমার গুণ গাই রে বন্ধু, তোমার গুণ গাই
তোমার অধীন হইয়া ভ্রমিয়া বেড়াই রে বন্ধু
ভুলি না যে আমার এ জীবনে ॥

বন্ধু রে দীনহীন পাগলে বলে
আমি কয়দিন রে বন্ধু আছি কয়দিন
আজ কাল বলিয়া রে শমনে গণে দিন রে বন্ধু
ভুলি না যে আমার এ জীবনে ॥

৭৯

বন্ধু বলিয়া যাও আমারে
আর নি চান মুখের বুলি শুনাইবায় আমারে ॥

দুই দিনের পিরিতির লাগি বন্ধুয়ারে মন কইলায় রে ভারি
রাখিতে না পাইলাম আমি অভাগিনী নারী
বন্ধু বলিয়া যাও আমারে ॥

দোষ-গুণ যত ইতি রে বন্ধু দিয়ে গেলায় রে মোরে
আমি দোষের দোষী হইয়া রে বন্ধু পাইমু নি তোমারে রে
বন্ধু বলিয়া যাও আমারে ॥

দীনহীনে বলে রে বন্ধু আমার স্বামী হইল রে দড়
নিজ গুণে দাস জানিয়ে রে বন্ধু যদি দয়া করো ॥

৮০

বহুদিনের পরে দেখা হইল তোমার সনে
বলছে বন্ধু এমন দেখা পুনঃ হবে কি আমার ॥

যদি বলো হেরি আবার দেখা হবে
বলো এমন দেখা হয়েছিল কবে
হইয়াছে না হবে, দিয়াছ না দিবে
বন্ধু অদেখার দেখা হইল এবার ॥

আমা হইতে তোমার কিবা হবে ক্ষতি
তোমা হইতে আমার হবে না দুর্গতি
দ্রোহের আনন্দে বাড়ে প্রেমরতি
বন্ধু নানান ফুল গেঁথে গলে দিব হার ॥

গুরু গো স্বরূপ তত্ত্বে শুনাইলে
হৃদয়ের রূপ হৃদয় ঢাকিলে
দেখা দিতে বলে দেখা নাই রে দিলে
ও বন্ধু তুমি আমার হইলে হবে কি আমার ॥

দীনহীনরে তুমি ছাড়িয়া যাবে শুনি
বলো এমন দিন কোনদিন রে গনি
কাসতে আইলে তুমি যাইতে যাবে প্রাণি
আসা-যাওয়া তোমার প্রেমের অলংকার ॥

৮১

ভবে কি সুখে পাইয়া ভুলিয়া রে মন
পাহারা তোলো নৌকা খোলো পলাইল তোর ভাই-বন্ধুগণ ॥

যে তোরে শিখাইল বুঝাইল, সেও তো চলিয়া গেল
এখন কি করিবে বলো, নাই রে মহাজন।
সে ছিল তোর গুণের গুণি নিকুঞ্জে তার রব শুনি
যদি চাও জুড়াইতে প্রাণী, শীঘ্র তথায় করো গমন ॥

সেই দেশে যাইতে হবে, নইলে কি তার দেখা পাবে
ওই দেশে তোর বন্ধু কে রে মিছা কেন করো ভ্রমণ।
যার যার রঙ্গে হইল রঙ্গি কেউ হবে না সঙ্গের সঙ্গী
রঙ্গ ভঙ্গ দিয়া চলে গেলে পাবে তার দরশন ॥

দীনহীন তার কাছে চলো, বিলম্বের আর কাজ কি বলো
যা হবার তা হয়ে গেল আর কইর না কালযাপন।
দিন গেল তোর হেলে ফেলে ঐ শোনো ডাকছে কালে
কালে কাল মিশাইলে কাল হবে কালিয়ার বরণ ॥

৮২

মন জাগবে কি ধন চোরে নিলে, মন রে ঘুমাইয়া রইলে
মন রে ঘুমাইয়া রইলে, মন রে ঘুমাইয়া রইলে ॥

পাইয়া ধন তুই হইয়া চেতন কেন চৌকি নাহি দিলে
ওর অমূল্য ধন মানব জীবন নিবো রে পাটপারে পাইলে ॥

ও তোর ঘুমের ঘরে দশ চোরায় নীরব পাইলে যুক্তি করে
ও তুই দেখলে না রে চিনলে না রে পাইবে না ধন আর কান্দিলে ॥

দীনহীন পাগলে বলে মিছা মায়ায় ভুলিয়া রইলে
ও তুই সুখের সময় শুইয়া রইলে স্বভাব দোষে হারাইলে ॥

৮৩

মন তোরে বুঝাব কত, তুমি হয়েছ অন্ধলের মতো
মন তোরে বুঝাব কত ॥

রূপসাগর নিকটে তোর, ডুবিয়া থাকবে অবিরত
ডুব দিলে আর ভাসিছ নারে রিপু তোরে করবে কত ॥

দীনহীন পাগলে বলে রূপের অনল সদায় জ্বলে
মন রে তুই সরল হলে দেখবে রূপ অবিরত ॥

৮৪

মন বেভুলা রে, তোমার স্বভাবে আমি হইয়াছি আকুলা রে মন ॥

তোমার পিরিতের লাগিয়ে ও মন সবে সব ছাড়ে
ধর্মাধর্ম পাপপুণ্য কিছু না বিচারে রে মন, বেভুল রে মন ॥

এই ত্রিভুবনে বলে রে ও মন তুমি হও রাজা
ত্রিসংসারে করে তোমার পূজা রে মন ॥

যে দেশেতে রাজা থাকবে ও মন সর্ব অধিকারী
ঐ রাজ্যেতে অবিচার হইলে রাজা হয় বিচারি রে মন ॥

সুমতি-কুমতি দুইটারে ও মন মন্ত্রী তোমার হইয়া
আমারে বধিল তোমার সামনে থাকিয়ারে মন ॥

দীনহীন পড়িল মারা রে, ও মন মহারাজার হাতে
আমার মরা তনু দিও নিয়া শ্রীগুরুর সাক্ষাতে রে মন ॥

৮৫

মনা তুমি ভজো পাঞ্জাতন
এবার দেহ-প্রাণ সঁপিয়া দেও ঐ রাঙা চরণে ॥

একা আল্লা নিরাধন, নবি হইলা পাঞ্জাতন
পাঞ্জাতন রইলা দেহা প্রাণী যাহার ধন তাহারে দিয়া
আনন্দে ভিখারি হইয়া শিরে তুলিয়া রাখো চরণখানি রে মনা ॥

আর নাই ভবের হাটে
সেই রূপ ঘটে ঘটে যার ঘটিয়াছে, জানে সেই জানে
গুণাধীন ভক্তগণে হেরিতেছে রাত্র দিনে
সেই রূপ বাসাইয়া একাসনে রে মনা ॥

দীনহীন পাগলে কয় এত কহিবার কথা নয়
বুঝাইলে না বোঝে অবোধ মনে
হেন রূপ না হেরিলাম হেন গুণ না গাইলাম
ধিক আমার মানুষ জীবনে রে মনা ॥

৮৬

মনা তোমার ঘটিব দুৰ্গতি
বয়স বলো যৌবন গেল, কি লইয়া বসতি রে মনা ॥

মনা রে সঙ্গের সঙ্গী ছিল তোমার ইন্দ্র আদি দশ
দিনে তনু হীন, হইল অবশ রে মনা ॥

মনা রে জীবনে আয়ু অতি অল্প, কি করিবে বলো
নিকুঞ্জ মন্দিরের কপাট, শীঘ্র গিয়ে খোলো রে মনা ॥

মনা রে রহিম তোমার নাম, নিকুঞ্জেতে থানা
তোমার দীনহীন যাইতে আর কইরো না মনা রে মনা ॥

৮৭

মা হইয়ে মা এই করিলে
মোরে কালের হাতে সঁপিয়া দিলে ॥

মাগো তাল সমনে মারে প্রাণে, প্রকৃতে রঙ সাজালে
সামান্য মার বুকে সয় না তুমি কেমনে সইলে ॥

মাগো আর কইর না রঙের খেলা, ঝারিয়া ধূলা নেও ভুলিয়ে
মাগো তোমার পুত্র তোমার হাতে মরিতেছে মা মা বলিয়ে ॥

জগত-সংসার দীনহীন তোমার কে আছে আর বলমু কারে
রহিম নাম ধরিয়া ফেলিয়া ছিলে, উদরে নে মা আদর করিয়ে ॥

৮৮

যাইও না পরাণের বন্ধু মোরে অনাথ করিয়া
তুমি যাইতে চাইলে আমি থাকিব কি করিয়া রে ॥

তবে যদি যাইতে বলো, আগে মারো মোরে
আমি মরিলে থাকো বইলে কে বলব তোমারে রে ॥

অপরাধী জানিয়া মোরে, না যাইও ছাড়িয়া
তোমার যুগল চরণে রাখো মোরে উচিত সাজা দিয়া রে ॥

দীনহীনে বলে রে বন্ধু তুমি বুঝাইলে না বোঝো
তোমার পিরিতি ভাঙিবার লাগি তুমি নবরঙ্গে সাজো রে ॥

৮৯

রাখিতে অসাধ্য হইল রাই আমি কি করি উপায় গো
বন্ধে মোরে পলকে ভুলায় ॥

পঞ্চামৃত বন্ধের অঙ্গি শ্রীঅঙ্গে বিহীন
ভুবন মোহিয়া বন্ধে মোরে করিয়াছে অধীন গো ॥

নিশাকালে প্রাণের বন্ধু শুইয়া নিদ্ৰা যায়
রজনী প্রভাত হইলে বন্ধে নগরে বেড়ায় গো ॥

যার কাছে যায় বন্ধু তার গুণ গায়
দিশাহারা দীনহীনে ডুরিয়া না গায় গো ॥

৯০

শিখাইয়া বুঝাইয়া প্রেম রাখিমু কতদিনে রে বন্ধু
বন্ধু তুমি মোরে বাসো ভিন ॥

আমি তোমার না হইলে রে বন্ধু তুমি হও মোর
আমি তোমার না হইলে তুমি বাসো পর রে বন্ধু ॥

প্রেম বাড়াইতে রে বন্ধু কতই আশা দিলে
ছাড়বে ছাড়বে না ছাড়বে না বইলে কহিলে রে বন্ধু ॥

আগে যদি জানতাম রে বন্ধু তুমি আমার নয়
পরকে আপনা বলিয়ে কোন পাগলে কয় রে বন্ধু ॥

আমি মরি তুমিরে বন্ধু দেখো ফুলে রইয়া
দীনহীন দোষী হইল ঐ প্রেমের লাগিয়া রে বন্ধু ॥

৯১

শুনিতে শ্রবণ তুমি হেরিতে নয়ন শ্যাম
বন্ধুয়াও তুমি আমার দেহার জীবন শ্যাম বন্ধুয়াও ॥

আকাশে-পাতালেরে শুনি বন্ধুয়া রে তোমার নামের ধ্বনি
তবে কেন ব্রজপুরে রাধা কলংকিনী শ্যাম বন্ধুয়াও ॥

আসা-যাওয়া নাই রে তোমার, নাই জিয়ন-মরণ
অনুমান কি বর্তমান আছো সর্বক্ষণ শ্যাম বন্ধুয়াও ॥

সর্ব অধিকারী রে তুমি, তোমার এই ত্রিসংসারে
ভালোবাসো কিনা বাসো দীনহীন তোমার শ্যাম বন্ধুয়াও ॥

৯২

শোনো নিবেদন বন্ধু রে এই নিবেদন
কি অনল জ্বালাইয়া দিলায় রে বন্ধু, জ্বালা না হয় নিবারণ রে ॥

পিরিতি কেমন ধন অভাগী না জানি
তুষেরই অনলে অন্তরে বন্ধু জ্বলে মোর পরাণি রে ॥

যথায়-তথায় যাও রে বন্ধু দাসী রাখিও মনে
তোমার চান্দ মুখ মলিন দেখলে রে বন্ধু আমার কতই ওঠে মনে রে ॥

তোমার লাগিয়া রে বন্ধু কলংক জগতে
তুমি নি আমার বলো রে বন্ধু হস্ত দিয়া মাথে রে ॥

দীনহীনে বলে রে বন্ধু নির্বোধ চরণে
নিজ দাস বলিয়ে বলো বন্ধু রে হইব নি তোমার মনে রে ॥

৯৩

শোনো বলি পাগলের কথা
আমার কইতে প্রাণে লাগে ব্যথা ॥

আমারই মনে সেই সে জানে, অন্যে বলতে মুখের কথা
আমি যারে চাই, দেখিতে না পাই, আর কি আমার ভালোবাসা ॥

শুনিয়াছি কোরানে মনপ্রাণে ছাড়িয়া না যাবে কোথা
তোমার রহিম চান্দের বল আমি দীনহীন পাগল, কখনও যাবে না বৃথা ॥

৯৪

শোনো বলি মন মুটের ঘোড়া, তোরে শিক্ষা দিলে শিক্ষা লছ না
বুঝিয়াছি তুই কর্মপোড়া ॥

পৃষ্ঠে তোমার চিনির বস্তা, চাকলে না তার আস্বাদ মজা
সদার পরের বোঝা নিয়ে হাঁটো, এই ছিল তোর লেখাপড়া ॥

ভবে কেন আইলে কি কাজ করিলে, বুঝলে না তার আসা গোরা
ও তুই বুঝবে তখন ও পাগল মন যখন লাগবে লোড়া বুড়া ॥

দীনহীন পাগলে বলে বুঝিয়াছি তোর আকল থুরা
কামিনীর কামানলে অল্প দিনে হইলে বুড়া ॥

৯৫

সখি গো দেখি বন্ধু আসে কি না আসে
পন্থপানে চাইয়া রইলাম মনের বিলাসে গো ॥

সখি গো আসিলে পরাণের বন্ধু নিরলে বসিয়া
কহিব জনমের দুঃখ চরণে ধরিয়া
কেবা প্রেম বাড়াইল রূপ দেখাইয়া
এখন কেন ছাড়িয়া যাও আমার পিরিতি ভাঙিয়া ॥

সখি গো না আসিলে প্রাণের বন্ধু বিরস হইয়া
আদিঅন্তে যত দুঃখ না কইলাম ভাঙিয়া
আসা-যাওয়া হইল আমার কিসের কারণ
কার লাগি লইলাম গলে জিয়ন আর মরণ গো ॥

সখি গো দীনহীনে যতদিন বসতি করিল
বন্ধুহারা জীবন কিসে দেহাতে রহিল
ছাড়িব না প্রাণের বন্ধে বলিয়া ছিল মোরে
দারুণ পিরিতি বুঝি বধিল আমারে গো ॥

৯৬

সোনা বন্ধের মন রাখা হইল বিষম দায় গো
এগো প্রাণসজনী করি কি উপায়
সাধন ভজনহীন আমি দিব তার পায় গো ॥

আমি যদি চাই দেখিতে ননদী হয় বাদী
দারুণ শাশুড়ির ডরে বন্ধের চরণ না সেবি গো ॥

যদি বন্ধে দয়া কইরে চরণ দেয় আমারে
রাখিতে না পারি চরণ আমার সু-স্বামীর ডরে গো ॥

দীনহীনের কর্ম দোষে ভাসিলাম সায়রে
কারে দোষ দিব আমি, আমার কপালে সব করে গো ॥

৯৭

সোনা মায়ের ঠাঁই কইও, কইও গো একবার নাইওর নিতাম রে
চান্দমুখ দেখাইয়া নিশায় মারিবা পরানে গো ॥

দশ মাস দশ দিন মায় রাখিলা উদরে
পালিয়া পোষিয়া নিমারে দিলা যমের ঘরে গো ॥

বসতি করিতে দিলা ননদীর বাসরে
নিদাগেতে দাগ লাগাইলাম সুস্বামীর অন্তরে গো ॥

পোড়া মুখে দীনহীনে আর কত বলিব
কুপুত্র বিদেশে মইলে মার পরাণে জানে গো ॥

৯৮

স্বপনের ফোয়ারা বন্ধু রে তুমি, নিত্তি আইসো-যাও
আমি যদি চাই দেখিতে তুমি পলকে পলাও রে ॥

এই কি ধর্ম তোমার বুঝিতে না পারি
সর্ব ধনের ধনী তুমি, আমি দর্পণের ভিখারি রে ॥

অভাগী রে দেখা দিতে কে করিল মানা
বসলাম আমি তোমার দাসী হইলাম না হইলাম না রে ॥

দীনহীন রে ফাঁকি দিয়া না যাইও ছাড়িয়া
কি লাভ হইবে তোমার অবলা বধিয়া রে ॥

১৯

হায় রে বন্ধু তুমি নি আমার বলো শুনি রে
হৃদয় অনল যাউক দূরেতে
বহুদিনে পাইছি রে বন্ধু তোমার দরশন রে ॥

প্রেমময়ী নামটি রে বন্ধু জানে সর্বজনে
তবে কেন অভাগী রে ভাসাইলায় সায়রে রে ॥

যে তোমারে ভজে রে বন্ধু সাধু বলো তারে
তবে কেন দীন-দুঃখিনীর কলংকী নাম জাগে রে ॥

দীনহীনে বলো রে বন্ধু আমায় রাখিও মনে
হায় রে মরণকালে দিও দেখা রহিম সুরতে রে ॥

১০০

হলো না আমার মানুষ-সঙ্গ
যারে দেখলে পরে সব ভোলা যায়, বাড়ে প্রেমতরঙ্গ ॥

মানুষ হইল হরি, জগতের অধিকারী
হইয়া প্রেমের ভিখারি করে নেয় কুরঙ্গ ॥

শুনিলাম মানুষের বেশে মানুষ আইল পরবাসে
মানুষ হইয়া মানুষ তারে হইয়া ত্রিভঙ্গ ॥

দীনহীন মানুষ না হইল, পেয়ে মানুষ না চিনিল
যেমন আতসে প্রবেশ করি মরিল পতঙ্গ ॥

***

অধ্যায় ২ / ২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%