মধুময়

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

তুমি আর কখনো এস না!

মধুময় টেবিলে কনুইয়ের ওপর থুতনি রেখে যেমনভাবে বসেছিল, সেইরকমই রইল, একটুও চমকে উঠল না, একটাও কথা বলল না। আসলে সে মনে মনে ব্যাকুলভাবে বলতে চাইল, আমি পারব না! স্বপ্না, কেন আমায় ফিরিয়ে দিচ্ছ?

সে, নি:শব্দে স্বপ্নার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল।

স্বপ্না বলল, তুমি কি চাও আমি আত্মহত্যা করি?

মধুময় এখনও চুপ।

কেন দিনের পর দিন, আমাকে এমন অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলছ? যে সম্পর্ক একবার ভেঙে যায়, তাকে আর জোর করে জোড়া লাগানো যায় না। আমি ওপরে গেলেই মা আমাকে বকুনি দিয়ে একেবারে ভাজা-ভাজা করবে। আমার দাদা-টাদারা শেষকালে যদি তোমাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়, সেটা কি ভালো হবে?

মধুময় একটা গভীর নি:শ্বাস ফেলল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, ঠিক আছে, আমি এখানে আর আসব না, কিন্তু বাইরে কোথাও—

না, তাও সম্ভব নয়। আমি ওরকমভাবে কিছু চাই না, বাড়ির লোককে কিছু না জানিয়ে, লুকিয়ে, গোপনে—ওটা আমার স্বভাব নয়।

মাসে অন্তত একবার?

কেন তুমি অবুঝের মতন কথা বলছ? আমি যা পারব না, সে-সম্পর্কে জোর করে কোনো লাভ আছে?

তুমি এক সময় বলেছিলে...

তারপর কত কী বদলে গেছে।

আবার সব কিছু বদলে নেওয়া যায় না, আমি যদি সেই আগের মতন—

তা হয় না। তুমিও জান, তা হয় না। সাড়ে চারটে বাজল, আমাকে এক্ষুনি বেরোতে হবে।

মধুময় উঠে দাঁড়াল। তার লম্বা শরীরটার জন্য সে বিব্রত, এইরকম মুখের ভাব। কাঁধ দুটো উঁচু হয়ে আছে। মাটির দিকে চোখ রেখে সে জিজ্ঞেস করল, তাহলে আর আমি কোনোদিন আসব না?

স্বপ্না বলল, তোমারও তো একটা আত্মসম্মান আছে, যেখানে কেউ তোমাকে চায় না, সেখানে কেন তুমি আসবে?

তুমিও চাও না?

স্বপ্না মধুময়ের ডান বাহুতে বাঁ-হাতটা ছোঁয়াল। এর আগে গত তিন সপ্তাহের মধ্যে মধুময় যে ক-বার স্বপ্নাকে ছুঁতে গেছে, সেই ক-বারই স্বপ্না এমনভাবে ছটফটিয়ে দূরে সরে গেছে যেন মধুময় একজন মেথর, এক্ষুনি কমোড পরিষ্কার করে এল।

আজ স্বপ্না নিজেই ছুঁয়ে দিল মধুময়কে। যেখানে সে হাত রেখেছে সেই জায়গাটা যেন জ্বলছে।

তোমাকে তো বুঝিয়ে বললাম, আমাদের পুরোনো সম্পর্ক আর নেই!

আচ্ছা, আমি আর আসব না।

স্বপ্না মধুময়ের বাহুতে আর একটু চাপ দিল, গলার আওয়াজ আরও নরম করে বলল, লক্ষ্মীটি, শুধু শুধু মনের মধ্যে রাগ পুষে রেখো না, আমাকে ছাড়াও তুমি জীবনে অনেক কিছু করতে পার—

মধুময় স্থিরচোখে তাকিয়ে রইল স্বপ্নার দিকে। এক সময় কোনো কথা না বলে শুধু চোখে চোখেই অনেক কথা হয়ে যেত। কিন্তু স্বপ্না চোখ ফিরিয়ে নিল। মধুময় জানে, স্বপ্নার মনটা ফুলের মতন কোমল। ফুলও এক সময় কঠিন হতে পারে।

মধুময় আর কিছু না বলে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। এই বৈঠকখানা ঘরের সামনেই একটা লম্বা বারান্দা। তার শেষপ্রান্তে, কয়েকটা সিঁড়ির পর বাইরের গেট। বারান্দা দিয়ে হেঁটে আসতে আসতে সে মনে মনে বলতে লাগল, আমি আর এখানে আসব না, আমি আর এখানে আসব না।

তার পিঠে যেন একটা গরম হাওয়া লাগছে। যেন কার নিশ্বাস। মধুময় তবু তাকাল না পেছন ফিরে। একথা ঠিক, স্বপ্না তাকে বিদায় দেওয়ার জন্য গেট পর্যন্ত আসবে না। সে নিশ্চয়ই দাঁড়িয়ে আছে বসবার ঘরের দরজার সামনে। অতদূর থেকে স্বপ্নার স্বস্তির নিশ্বাস কি তার পিঠে লাগতে পারে?

গেট থেকে বেরিয়ে মধুময় রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগল। সামনেই ট্রামস্টপ। মধুময়ের এখান থেকেই ওঠবার কথা। কিন্তু উঠল না, হাঁটতেই লাগল। দুটো হাতই কোটের পকেটে গোঁজা, মাটির দিকে মুখ, সে রাস্তার কিছুই দেখছে না।

বেশ খানিকটা গিয়ে মধুময় থমকে দাঁড়াল। মনে মনে বেশ পরিষ্কার উচ্চারণে সে বলল, আমি স্বপ্নার মাকে খুন করব। ওই ভদ্রমহিলা অনেকের জীবন নষ্ট করে দিচ্ছেন। আমি স্বপ্নার দাদাকেও খুন করব, কারণ সে আমাকে অপমান করার স্পর্ধা দেখিয়েছে। এমনকী, স্বপ্নার মেজোকাকা যদি উলটোপালটা কথা বলতে আসেন, তাহলে তাকেও খুন করা যেতে পারে।

তারপর মধুময় আবার স্বপ্নার বাড়িতে গিয়ে বলবে, আমি আবার এসেছি। এখন তো আর বারণ করার কেউ নেই!

কোটের পকেট থেকে মধুময় হাত দুটো বের করল। সে পারে, সে অনায়াসেই এই তিনজনকে খুন করে ফেলতে পারে।

তারপর মধুময় হাসল। সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? মাকে, দাদাকে, ছোটোকাকাকে খুন করলেই বা স্বপ্না তার কাছে আসবে কেন? একজন খুনিকে কেনই-বা সে ভালোবাসবে? ওইসব প্রিয়জনের চেয়ে কি তার আকর্ষণ বেশি?

তা ছাড়া, স্বপ্নার প্রতিটি ব্যবহারেই আজ ফুটে উঠেছিল যে, সে নিজেই আর মধুময়কে চায় না। বিশেষত ওই যে গায়ে হাত ছোঁয়ালে। চরম ন্যাকামি নয়! বাড়ির কুকুরকে বাইরে পাঠাবার সময় গায়ে হাত বুলিয়ে যেমন লোকে বলে, ‘—যা যা—’ সেরকমভাবেই স্বপ্না তাকে চলে যেতে বলেছে।

মধুময় আর কোনোদিন আসবে না স্বপ্নার বাড়িতে। রাসবিহারী মোড় থেকে লেক মার্কেট পর্যন্ত ট্রামরাস্তা, এই রাস্তাটুকুতে সে আর পায়ে হেঁটে যাবে না কোনোদিন। ট্রাম, বাস বা ট্যাক্সিতে যেতে হলে, সে এইটুকু পথ চোখ বুজে থাকবে। সারাজীবনের মতো এটা ঠিক হয়ে গেল।

—এইজন্যই স্বপ্না ক-দিন ধরে তার লেখা চিঠিগুলো ফেরত চাইছিল। আজ আর চায়নি। মধুময়কে তাড়াবার ব্যস্ততায় ভুলে গেছে বোধ হয়। স্বপ্না কি ভেবেছিল যে, সে অন্য কাউকে বিয়ে করলে মধুময় ওই চিঠিগুলো দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল করতে পারে? স্বপ্না এ-রকমও ভাবতে পারে তার সম্পর্কে?

হ্যাঁ, ভাবতে তো পারেই। মানুষ একবার খারাপ কাজ করলে দ্বিতীয়, তৃতীয়বার করাও তো তার পক্ষে স্বাভাবিক।

দেশপ্রিয় পার্কের রেলিং-এ হেলান দিয়ে মধুময় একটা সিগারেট ধরালো। এবার সে কী করবে? এখন মানে এই মুহূর্তে নয়—বাকি জীবনটা?

তাঁর চোখের সামনে যেন চলচ্ছবির মতন ফুটে উঠল তার গতকয়েক বছরের জীবনের ঘটনা। এই ঘটনাগুলো সে ভুলতে চায়, কিন্তু কেউ তাকে ভুলতে দেবে না। সে আশা করেছিল স্বপ্না অন্তত তাকে সব কিছু ভুলিয়ে দেবে। দু-জনে মিলে আবার একটা নতুন জীবন শুরু করবে।

পার্কের রেলিং-এর পাশে দাঁড়ানো মধুময় যেন একটা পাথরের মূর্তি।

গত দু-বছর মধুময় একটা দারুণ ভুলের মধ্যে ডুবেছিল। এরমধ্যে জেল খাটতে হয়েছে ছ-মাস। তাও কোনো রাজনৈতিক কারণে নয় যে গর্ব করে বলা যাবে।

সি.আই.টি. রোডে এক সময় স্বপ্নাদের বাড়ি আর তাদের বাড়ি ছিল পাশাপাশি। স্বপ্নার বাবা সরকারি চাকুরি ছেড়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ঢুকেই উন্নতি করতে লাগলেন হু-হু করে। তারপর ‘ঝাঁ’ করে একটা গোটাবাড়ি কিনে উঠে গেলেন রাসবিহারী অ্যাভিনিউতে। মধুময় ধরেই নিয়েছিল, স্বপ্নার সঙ্গে তার চিরকালের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। এই ধরে নেওয়াটাই তার প্রথম ভুল। সচরাচর এ-রকম হয় না।

বি এসসি পাশ করে মধুময় এম এসসি-তে ভরতি হওয়ার সুযোগ পেল না কলকাতায়। একটা সিট পাওয়া গিয়েছিল পাটনা ইউনিভার্সিটিতে। তার বাবা সেখানেই ভরতি করে দিয়ে এলেন মধুময়কে।

কোনোক্রমে দাঁতে দাঁত চেপে দু-বছর কাটিয়ে দিয়ে এম এসসি পরীক্ষা দেওয়া উচিত ছিল মধুময়ের। কিন্তু পাটনায় কিছুতেই মন টিকল না তার, ছ-মাসের মাথায় পড়াশুনো ছেড়ে দিয়ে ফিরে এল কলকাতায়। সেটা মধুময়ের দ্বিতীয় ভুল।

সে ভেবেছিল, শুধু শুধু এম এসসি-র জন্য দুটো বছর নষ্ট করে কী লাভ। আসল উদ্দেশ্য তো চাকরি! চাকরির জন্য বি এসসি-ও যা, এম এসসি-ও তাই। কলকাতায় ফিরে সে চাকরির জন্য উঠে পড়ে লাগল। অর্থাৎ এই শহরের আট-দশ লাখ বেকারদের মধ্যে ডুবে গেল সে।

বাড়ি বদল করলেও স্বপ্নার সঙ্গে তার দেখা হত প্রায় রোজই। গোড়ার দিকে পাটনা যাওয়ার পর স্বপ্না তাকে চিঠি লিখত নিয়মিত। মধুময়ের চিঠি লেখার ব্যাপারে বড়ো আলস্য। স্বপ্নার তিনখানা চিঠির উত্তরে সে লিখত একটা। স্বপ্নার চিঠি পাঁচ পাতা, তো মধুময়ের দেড় পাতা। কিংবা, চিঠিতে কিছু লেখার বদলে মধুময় একটা-দুটো ছবি এঁকে পাঠাত।

মধুময় ভেবেছিল, এক বছরের মধ্যে সে নিশ্চয়ই একটা চাকরি পেয়ে যাবে, তারপর আর এক বছর সময় লাগবে সব-কিছু ঠিকঠাক করে নিতে। তখন সে আলাদা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বিয়ে করবে স্বপ্নাকে।

কিন্তু চাকরি পাবে কি, কখনো কখনো ইন্টারভিউ পেলেও মধুময়ের যেতে ইচ্ছে করত না। বাবা-কাকা, মেসো-পিসের চেনাশুনো বা ধরাধরির সূত্রে কয়েকবার এরকম ইন্টারভিউ পেয়েছে মধুময়। কিন্তু সে বিরক্তিতে ঠোঁট উলটেছে। সাড়ে তিন-শো, চার-শো টাকা মাইনে—এই সামান্য টাকার চাকরি পেয়েই বা কী লাভ? এই টাকায় আজকাল দু-খানা ঘরের বাড়িও ভাড়া পাওয়া যায় না।

স্বপ্না বলেছে, প্রথমেই বুঝি কেউ বেশি মাইনে দেয়? চাকরিতে ঢুকলে দু-এক বছর পর নতুন গ্রেড, নতুন স্কেল দেবে।

স্বপ্নাদের বাড়ির বৈঠকখানায় দুপুর বেলা শুয়ে থেকেছে মধুময়, তার পকেটে ইন্টারভিউয়ের চিঠি। সে হাসতে হাসতে বলেছে, ‘জান ইন্টারভিউয়ের জন্য সকাল সাড়ে ন-টায় যেতে বলে, তারপর বসিয়ে রাখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। হয়তো ডাক পড়ে সেই চারটে সাড়ে চারটের সময়... আমার খুব খিদে পেয়ে যায়।’

স্বপ্না হেসে বলেছে, ঠিক আছে, আমি দুপুর বেলা টিফিন কৌটোয় করে তোমার জন্য খাবার নিয়ে যাব।

মধুময় বলেছিল, অন্য ক্যাণ্ডিডেটরা তোমাকে দেখে সিটি দেবে।

তাহলে—কথাটা শেষ না করে স্বপ্না তার ছোট্ট হাতব্যাগটা খুলে দুটো দশ টাকার নোট বের করে বলেছে, তোমার কাছে রাখো।

ওপাড়ার একটি বাচ্চাদের স্কুলে স্বপ্না তখন সকাল বেলা পড়াতে শুরু করেছে। তার নিজস্ব রোজগার আছে। স্বপ্নার কাছ থেকে ওই টাকা নেওয়াটা হয়েছিল তার তৃতীয় ভুল। স্বপ্না বলেছিল, তোমার উচিত ছিল আর্টিস্ট হওয়া। কেন তুমি সায়েন্স পড়তে গেলে?

এই কথাটা শুনলেই মধুময় লজ্জা পায়। মধুময়ের ছবি আঁকার হাত আছে। সে কোথাও শেখেনি। ছোটোবেলা থেকেই তার ছবি আঁকার শখ। আত্মীয়স্বজনরা সবাই প্রশংসা করেছে তার ছবি দেখে। স্বপ্নার ছবি সে এঁকেছে অনেকগুলো, কিন্তু মধুময় জানে, আত্মীয়স্বজনের বা বান্ধবীর প্রশংসা পেলেই কেউ আর্টিস্ট হয় না। এরজন্য প্রচুর পরিশ্রম করা দরকার। ছবি আঁকা সারাদিনের কাজ। খরচও অনেক। সব কিছু ছেড়েছুড়ে শিল্পী হওয়ার ঝুঁকি সে নিতে পারেনি। তাকে শখের শিল্পী হয়েই থাকতে হবে।

বেকার অবস্থায় বেশ বড়ো কয়েকটি প্রলোভনের মধ্যে পড়তে হয়। তারমধ্যে একটি হচ্ছে বখাটে হয়ে যাওয়া। মধুময় হঠাৎ পাড়ার বেকার বখাটেদের দলে ভিড়ে গেল। বখামির একটা দারুণ নেশা আছে তো। সবসময়ই কিছু-না-কিছু উত্তেজনা। এপাড়া, ওপাড়ায় ঝগড়া, মারামারি, রবারের কারখানার পেছনের মাঠে সন্ধ্যের পর লুকিয়ে লুকিয়ে মদ্যপান, নারীদের বিষয়ে জমকালো আলোচনা। প্রত্যেকটিই ধাপে ধাপে এগোয়।

আর্টস্কুলে ভরতি না হয়ে সায়েন্স পড়তে যাওয়া যেমন মধুময়ের চরিত্রবিরোধী কাজ হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি চরিত্রবিরোধী কাজ সে করতে লাগল এই নতুন বন্ধুদের সঙ্গে মিশে। যে মধুময় ছিল লাজুক, নম্র একটি ছেলে, সে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পাড়ার ছোটোখাটো গুণ্ডাদের মধ্যে বেশ নাম করে ফেলল। তার লম্বা চেহারা, চুল বড়ো বড়ো, পান খেয়ে ঠোঁট লাল করলে এবং গলায় একটা রুমাল বাঁধলে তাকে গুণ্ডার ভূমিকায় বেশ মানিয়েও যায়।

স্বপ্নার সঙ্গে এই সময়টায় কম দেখা হতে লাগল। দেখা হলেও স্বপ্না তার এই পরিবর্তিত ভূমিকা কিছু বুঝতে পারে না। স্বপ্না অভিমান করে। মধুময় তখন চমৎকার মিথ্যে বলতে শিখেছে, সেইসব মিথ্যে দিয়ে সে স্বপ্নাকে ভোলায়।

স্বপ্নার সঙ্গে তখন দেখা হত সকালে বা দুপুরে। সন্ধ্যের পর একদিনও নয়। সন্ধ্যের পর মধুময় অন্য মানুষ।

মধুময়ের সেই বখাটে দলের আর একজনেরও কোনো মেয়েবন্ধু ছিল না। কেউ ভালোবাসা পায়নি। তাই তারা সর্বক্ষণ মেয়ের শরীর নিয়ে আলোচনায় মেতে থাকত। মধুময়ের তো সেরকম কোনো অভাব ছিল না। তবু কেন সে ওই আলোচনায় বেশি মজা পেতে লাগল, সেটা একটা রহস্য। মেয়েদের বিষয়ে আলোচনা করার বদলে সে তো স্বপ্নার সঙ্গেই সময় কাটাতে পারত খুব সুন্দরভাবে। অথচ সে স্বপ্নার কাছে না গিয়ে বসে থাকত ওই বন্ধুদের সঙ্গে। হয়তো যেকোনো সুন্দর জিনিস সম্পর্কেই তার আক্রোশ জন্মে গিয়েছিল। ছবি আঁকা একদম ভুলে গিয়ে সে উপভোগ করত বন্ধুদের অশ্লীল রসিকতা।

মধুময় তখন ঠিক যেন, একটা দ্বিতীয় গুপ্ত জীবন কাটাচ্ছিল। সে সম্পর্কে স্বপ্না কিছু জানে না। তার বাড়ির কেউই কোনো সন্দেহ করেনি। মধুময়ের বাবা বাড়িতে থাকেন খুবই কম সময়, ছেলে-মেয়েদের ব্যাপারে তিনি মনোযোগ দিতে পারেন না। শুধু মাঝে মাঝে রাত্তির বেলা বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ার একটু আগে স্ত্রীকে বকাবকি করেন খানিকটা।

ছেলেটা লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে এ-রকম বেকার হয়েই থাকবে—সারাদিন কী করে সে?

মধুময়ের মা তাড়াতাড়ি ছেলের দোষ চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন নানা কথা বলে—চাকরির জন্যে তো হন্যে হয়ে ঘুরছে সারাদিন। চাকরি কি আজকাল গাছে ফলে?

এতগুলো জায়গায় আমি নিজে গিয়ে চেষ্টা করলাম ওর জন্য, কোথাও তো ইন্টারভিউয়ে ভালো করতে পারে না। এবার না হয় আমাদের অফিসেই বড়ো সাহেবকে বলে দেখব... মধুময়ের বাবা কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর নিজের অফিসে বড়ো সাহেবকে বলে একটা ছোটোখাটো চাকরির ব্যবস্থা করে ফেললেন। কিন্তু সে চাকরিও প্রত্যাখ্যান করল মধুময়।

সরাসরি বাবার সঙ্গে কথা না বলে, মাকে সে জানিয়ে দিল, বাবার সঙ্গে সে এক অফিসে চাকরি করবে না। তাতে বাবারও অসুবিধে হবে, তার নিজেরও অসুবিধে হবে। অফিসের লোকেরাও এব্যাপারটা ভালো চোখে দেখবে না।

মধুময়ের বাবা একথা শুনে আরও রাগ করলেন। স্ত্রীকে তিনি জানিয়ে দিলেন, ছেলে যা-খুশি করে করুক। দু-দিন বাদে আমি যখন চোখ বুজব আর সংসারটা ওর ঘাড়ে পড়বে, তখন বুঝবে ঠেলা।

মধুময় তার মাকে জানিয়ে দিল, তিন মাসের মধ্যেই যেকোনোভাবেই হোক, একটা উপার্জনের পথ সে খুঁজে নেবে। এজন্য বাবাকে চেষ্টা করতে হবে না। সে নিজেই পারবে।

বেকারেরও হাত-খরচ লাগে, আড্ডার সময় বেকারদেরও পয়সা খরচ হয়। মধুময় তখন যাদের সঙ্গে মিশছিল, তারা অনেকেই তার চেয়ে বয়সে যথেষ্ট বড়ো, এবং পাঁচ-ছ-বছর ধরে বেকার। তবু কোন অত্যাশ্চর্য উপায়ে তারা পয়সা জোগাড় করত তা মধুময় জানে না। কিন্তু তার নিজের বেশ অসুবিধে হচ্ছিল। মায়ের কাছ থেকে আর প্রত্যেক দিন পয়সা চাওয়া যায় না। স্বপ্নার সঙ্গে দেখা হলে মধুময় বলত, দেখি তুমি কত পয়সা জমালে—তারপর স্বপ্নার হাতব্যাগটা খুলে বলত, তোমার কাছ থেকে আবার পনেরো টাকা ধার নিলাম। সব শোধ করে দেব একসঙ্গে।

মধুময়ের ছোটোবোন রুমি শুধু একদিন তাকে বলেছিল, হ্যাঁ রে দাদা, তুই আজকাল রতনদের দলের সঙ্গে মিশছিস? আমাদের কলেজের সামনে দেখলাম তোরা একটা ট্যাক্সি করে যাচ্ছিস...

রুমি পড়ে লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে। গতকাল সত্যিই ওইখান দিয়ে মধুময়রা গিয়েছিল একটা ট্যাক্সিতে। মধুময় অস্বীকার করতে পারল না।

কেন, ওদের সঙ্গে মিশলে কী হয়েছে?

ওরা তো সব ক-টা বাজে ছেলে! তোর সঙ্গে রুচিতে মেলে?

কে বলেছে বাজে ছেলে?

ওরা সবসময় খারাপ খারাপ কথা বলে, মেয়েদের দেখলে সিটি দেয়...

তোকে দেখে কোনোদিন খারাপ কথা বলেছে কিছু?

বখাটে ছেলেদের মধ্যে এ-ব্যাপারে একটা অলিখিত নিয়ম আছে। তারা কখনো সেমসাইড করে না। নিজেদের দলের কারুর আত্মীয় বা চেনা মেয়েদের ওরা বলে ‘সেমসাইড’।

মধুময় বলল, লোকের সঙ্গে না মিশলে বোঝা যায় না, তারা ভালো কী খারাপ। ওরা মোটেই খারাপ ছেলে নয়, বেকার বলে সবাই ওদের অবজ্ঞা করে, ওরা কি ইচ্ছে করে বেকার হয়ে আছে?

বেকার হলেই বুঝি বখাটে হতে হবে? তুই ওদের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করলে স্বপ্নাদিকে বলে দেব।

স্বপ্না সম্পর্কে সবাই একটা কথা জানে। স্বপ্না একদম মিথ্যেকথা বা কোনোরকম খারাপ কথা সহ্য করতে পারে না। ছেলেরা দূরে থাক, কোনো মেয়েও স্বপ্নার সামনে কোনো অসভ্য কথা বললে, স্বপ্না সেখান থেকে রাগ করে উঠে যায়। মধুময়ের সঙ্গে স্বপ্নার এত দিনের পরিচয়, কিন্তু মধুময় এখন পর্যন্ত একবারও স্বপ্নাকে চুমু খায়নি। বিয়ের আগে স্বপ্না ওসব ব্যাপার কল্পনাই করতে পারে না।

মধুময় এমনভাবে রুমির দিকে তাকিয়েছিল যেন, রুমি যদি সত্যিই স্বপ্নার কাছে এ-ব্যাপারে কোনো নালিশ করে, তাহলে সে রুমিকে ভস্ম করে ফেলবে!

লম্বা চওড়া চেহারার জন্য মধুময়কে খুব পছন্দ করে রতন। প্রায়ই সে মধুময়ের পিঠ চাপড়ে বলে এ ছেলেটাকে দিয়ে অনেক কাজ হবে। এ-রকম একটা এক নম্বরি ছেলে কেরানিগিরির জন্য হন্যে হয়ে উঠেছিল, একথা ভাবা যায় মাইরি! এ ছেলের তো রাজা হওয়ার কথা!

মধুময়ের সাহস পরীক্ষা করবার জন্য একদিন সন্ধ্যে বেলা কার্জন পার্কের কোণে দাঁড়িয়ে রতন বলল, ওই যে মোটা মতন লোকটা যাচ্ছে, তুই ওকে ল্যাং মেরে ফেলে দিতে পারিস মধুময়?

মধুময় অবাক হয়ে বলেছিল, কেন? ওকে ফেলে দেব কেন?

রতন বলেছিল, সে-কথা জানবার তোর দরকার নেই। লোকটাকে ল্যাং মেরে ফেলে দিয়েই ইডেন গার্ডেনের দিকে ছুটে পালাবি। যদি ধরা না পড়িস, তাহলে বুঝব তুই বাহাদুর।

আর যদি ধরা পড়ি?

তখন উপস্থিত বুদ্ধি খাটাবি। এমনিতে লোকের সঙ্গে রাস্তাঘাটে ধাক্কা লেগে তো যায়ই। আর যদি পুলিশে ধরে নিয়ে যায়—

পুলিশে ধরবে কেন?

ধরবে না, কথার কথা বলছি। তবু যদি ধরে তুই তখন কিন্তু আমাদের কারুর নাম বলবি না। তাহলে বুঝব তোর হিম্মত।

লোকটির মুখভরতি পান, বাতাবি লেবুর মতন গোল মুখের মধ্যে চোখদুটো অতিলোভীর মতন। দেখলেই মনে হয়, লোকটা সারাদিন স্বার্থ চিন্তা করে। মানুষ ঠকানোই ওর পেশা। লোকটার হাতে একটা চামড়ার ব্যাগ।

উলটো দিক দিয়ে হেঁটে গিয়ে মধুময় লোকটির সামনে থমকে দাঁড়াল। অনেক সময় এ-রকম হয়, দু-জন লোক মুখোমুখি পড়ে যায়, একজন ডান দিকে সরলে অন্যজনও ডান দিকে সরে, আবার দু-জনই বাঁ দিকে। সেইরকম অবস্থায় মধুময় লোকটিকে ল্যাং মেরে ফেলে দিল। লোকটিকে দেখেই সে খুব অপছন্দ করেছিল বলে ল্যাংটা বেশ জোরেই কষালো।

লোকটা মুখ থুবড়ে পড়ল মাটিতে। হাতের ব্যাগটা ছিটকে গেল। মধুময় যেন দেখতেই পায়নি, এইভাবে এগিয়ে গেল। তারপর রাজভবনের পাশ দিয়ে অন্ধকার রাস্তা ধরে সে ছুটে গেল ইডেন গার্ডেনের দিকে।

পরের দিন রতন বলল, লোকটার ব্যাগে দেড় হাজার টাকা ছিল মাত্তর। এই নে তোর শেয়ার, চার-শো টাকা।

মধুময়ের হাত কাঁপছিল।

রতন বলেছিল, কী রে ভয় পাচ্ছিস? লোকটা বড়োবাজারে ব্যাবসা করে। এই দেড় হাজার টাকা তো ওর কাছে হাতের ময়লা। সরষের তেলের দাম কেজিতে আট আনা বাড়িয়ে দিলেই ওদের দিনে দশ হাজার টাকা রোজগার! জানিস!

অপরাধবোধকেও অতিক্রম করে গেল নিষিদ্ধ রোমাঞ্চ। একটা বদমাশ লোককে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, এই হিসেবে ব্যাপারটাকে নিল মধুময়। যেন সে একটা ছোটোখাটো রবিনহুড। গভর্নমেন্ট তো এইসব ব্যবসায়ীদের শাস্তি দেবে না। আমরাই দেব।

স্কুল-কলেজে পড়ার সময়েও মধুময় কখনো গুণ্ডামি মারামারি করেনি। তার স্বভাবটাই ছিল নরম। বলশালী চেহারা হলেও অনেকে তাই তাকে বলত ‘মেয়েলি ছেলে’। এখন মধুময় প্রমাণ করে দিল, সে মোটেই মেয়েলি নয়। এই নতুন ভূমিকায় সে বেশ উত্তেজনা বোধ করল।

টাকাটা পাওয়ার পর সে স্বপ্নার সঙ্গে দেখা করে বলেছিল, তোমার কাছ থেকে সবসুদ্ধু কত টাকা ধার নিয়েছিলাম যেন? পঁচাত্তর টাকা, না? এই নাও!

স্বপ্না অবাক হয়ে বলেছিল, তুমি চাকরি পেয়ে গেছ? কই, আমাকে বলনি তো!

মধুময় বলেছিল, না, চাকরি পাইনি এখনও। তবে শিগগিরই কিছু করব।

তাহলে কোথায় পেলে টাকা?

মধুময় চটেছিল। সে পুরুষমানুষ, সে কেন একটি মেয়ের কাছে কৈফিয়ত দেবে টাকা কোথা থেকে পেল? স্বপ্না রোজগার করতে পারে, আর সে পারে না? বেকার বলে কি স্বপ্নাও তাকে অবজ্ঞা দেখাতে শুরু করেছে?

সে জোর করে স্বপ্নার ব্যাগে গুঁজে দিল পঁচাত্তর টাকা। গঙ্গার ধারে রেস্তোরাঁয় গিয়ে আরও খরচ করে ফেলল কুড়ি টাকা, স্বপ্না খেতে চায় না, তবু সে জোর করে খাওয়াবেই।

স্বপ্না তবু বার বার জিজ্ঞেস করতে লাগল টাকাটার কথা। সে জানতে চায় মধুময় হঠাৎ এমন বড়োলোক হয়ে উঠল কী করে? তার কাছে মধুময় কোনো কিছুই গোপন করে না, স্বপ্নার এ-রকম ধারণা, সুতরাং টাকা পাওয়ার ব্যাপারটাই-বা বলবে না কেন? কিন্তু টাকার প্রসঙ্গ উঠলেই চটে যাচ্ছিল মধুময়।

দ্বিতীয় কাজটিও মধুময় বেশ সার্থকভাবেই করল। কাজ বেশ সোজা, কোনো একটি লোককে ল্যাং মেরে ফেলে দেওয়া। মধুময় নিজের হাতে টাকা পয়সা লুঠ করে না। সে ভার রতন আর দু-জন সঙ্গীর। সে শুধু একটি লোককে রাস্তায় ফেলে দেয় এবং দ্বিতীয়বারেও লোকটিকে দেখিয়ে দিয়েছিল রতন, তারও চেহারার মধ্যে একটা দারুণ নিষ্ঠুরতার ছাপ। মানুষের রক্ত নিংড়ে নেওয়াই যেন ওর কাজ। এইসব লোকের নিশ্চয়ই শাস্তি পাওয়া উচিত। তাই রীতিমতন ঘৃণার সঙ্গেই লোকটিকে ফেলে দিয়েছিল মধুময়।

দ্বিতীয়বার পেল সে মাত্র সাতাশ টাকা! রতন খুব আপশোসের সঙ্গে বলেছিল, ও শালা মহা কঞ্জুস। অত বড়ো পেটমোটা ব্যাগের মধ্যে রেখেছিল মাত্র একশো তিরিশ টাকা! শালা!

ব্যাগে সত্যিই কত টাকা ছিল, সেটা জানবার উপায় নেই মধুময়ের। সেটা রতন যা বলবে, তা-ই বিশ্বাস করতে হবে। কিন্তু মধুময় জানে, দলপতিকে অবিশ্বাস করতে নেই। তা ছাড়া, কাজটাই তার খুব ভালো লাগছে, সে কিছু খারাপ লোককে শাস্তি দিচ্ছে! টাকাটাই তো প্রধান উদ্দেশ্য নয়!

কিন্তু এই টাকাটা পকেটে রাখলেই যেন মধুময়ের পকেট জ্বলতে থাকে। তক্ষুনি ইচ্ছে করে খরচ করে ফেলতে। মধুময়ের অন্তত দুটো গেঞ্জি কেনার দরকার, সে-কথা মাকে মুখ ফুটে বলতে পারছে না। কিন্তু নিজের রোজগার করা টাকা দিয়েও সে গেঞ্জি কিনল না। ছুটে চলে গেল স্বপ্নার কাছে। যাওয়ার পথে একটা দোকান থেকে কিনে নিয়ে গেল রাজশেখর বসুর রচনাবলির একটি খন্ড। স্বপ্না একদিন বলেছিল, রাজশেখর বসুর বইগুলো পাওয়া যাচ্ছে না। খুব পড়তে ইচ্ছে করে।

উপহারটা পেয়ে খুশি হয়েছিল স্বপ্না। কিন্তু সেইসঙ্গে বলেছিল, তোমার কী যেন একটা পরিবর্তন হয়েছে আজকাল!

মধুময় চমকে উঠে বলেছিল, ‘কই না তো! তুমি কী পরিবর্তন দেখলে?’

কীরকম যেন একটা ছটফটে ভাব! এক জায়গায় চুপ করে বসে থাকতে পার না! আগে তো এ-রকম ছিলে না।

মধুময় হেসে বলেছিল, বেকাররা একটু ছটফটেই হয়।

নিজেকে সবসময় বেকার বোলো না তো! আমার শুনতে ভালো লাগে না!

আমি আর বেশিদিন বেকার থাকব না অবশ্য।

কোথাও চাকরি পাচ্ছ বুঝি?

চাকরি ছাড়া বুঝি পুরুষমানুষ আর অন্য কোনো কাজ করতে পারে না?

খেলাটা বেশ জমে উঠেছিল।

মধুময় আজকাল অধিকাংশ সময়েই বাড়িতে থাকে। আগে থাকত না। বেকার ছেলেদের পক্ষে বাড়িতে বসে থাকা একটা লজ্জার ব্যাপার। খেয়েদেয়ে রোজ দুপুরে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে মোটা হওয়া বেকার ছেলেদের পক্ষে বড়োই বেমানান। লোকে তাতে আরও বেশি উপহাস করে। বেকাররা রোগা হবে, তাদের চোখের কোণে কালি থাকবে, মেজাজ হবে খিটখিটে, এটাই যেন স্বাভাবিক। যেন দেখলেই বেকার বলে চিনতে পারা যায়। পরিচ্ছন্ন পোশাক, পরিপাটিভাবে চুল আঁচড়ানো, সুন্দর চেহারার বেকার দেখলে বাকি সব লোকেদের কেমন যেন অস্বস্তি হয়।

মধুময়ও আগে বোতাম খোলা শার্ট আর রবারের চটি পরে, চুল না আঁচড়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াত। দুপুর বেলা নাকেমুখে কোনোরকমে খানিকটা ভাত গুঁজে খুব ব্যস্ততার ভান দেখিয়ে বেরিয়ে গিয়ে কোনো পার্কে গিয়ে শুয়ে থাকত গাছের ছায়ায়।

চাকরি পাওয়াটাই বড়োকথা নয়, সবসময় এমন একটা ভাব দেখাতে হবে যেন চাকরির জন্য আন্তরিক চেষ্টা করা হচ্ছে। আর চাকরির চেষ্টা মানে তো শুধু দরখাস্ত লেখা নয়, গুরুত্বপূর্ণ লোকদের ধরাধরি কর।

কিন্তু মধুময় আর দুপুর রোদ্দুরে ঘোরাঘুরি করা ছেড়ে দিয়েছে। সে দুপুরে ঘুমোয় না অবশ্য, বই পড়ে কিংবা ছবি আঁকে।

মা মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করেন, কিছু সুবিধে হল রে, খোকা? তোর বাবা জিজ্ঞেস করছিলেন।

মধুময় করুণ মুখ করে বলে, দেখো মা, চাকরি নেই বলে রোজ লোকের কাছে অপমান সইতে পারব না। হাজার হোক ভদ্রলোকের ছেলে। চাকরি যেদিন হওয়ার সেদিন হবেই। তার আগে রোজ রোজ লোকের কাছে গিয়ে কাকুতি-মিনতি করা—

মা চুপ করে যান। এটা যে, মধুময়ের একটা নতুন কায়দা সেটা তিনি বুঝতে পারেন না। এমনকী ওই করুণ মুখভঙ্গিটাও অভিনয়। মধুময়ের নতুন খেলার পক্ষে এটা খুব দরকারি।

শতকরা নিরানব্বইজন প্রৌঢ়ার মতন মধুময়ের মা-ও নিয়তিতে বিশ্বাস করেন। সুতরাং, চাকরি যেদিন হওয়ার সেদিন হবেই, এইকথা তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। মধুময়ের বাবা এখনও ভালো চাকরি করছেন, সংসারে খুব একটা অনটন নেই। তবে ছেলে পড়াশোনা শেষ করে বেকার বসে আছে, এটাই যা লজ্জার ব্যাপার। তিন বছর হয়ে গেল।

বেকার ছেলেদের প্রেম করতে নেই। অন্তত প্রকাশ্যে। আগে মধুময় স্বপ্নার সঙ্গে দেখা করতে যেত গোপনে গোপনে। কিন্তু এখন সে ইচ্ছে করেই সবাইকে জানিয়ে দেয় স্বপ্নার কথা। এটাও তার নতুন কৌশল।

সকাল বেলা সে তার বোন রুমিকে বলে, তোর কাছে মেঘদূতের কোনো অনুবাদ বই আছে? একবার দিস তো, স্বপ্না চাইছিল। অর্থাৎ সে বাড়ির সবাইকে জানিয়ে দিতে চায় যে, আজ সে স্বপ্নার সঙ্গে দেখা করতে যাবে।

সপ্তাহে তিনদিন স্বপ্না গানের ক্লাসে যায়। ওর ক্লাস শেষ হয় আটটার সময়। সেই তিন দিন ঠিক আটটা দশে হাজরা মোড়ে দাঁড়ালে দেখা হয় স্বপ্নার সঙ্গে।

কিন্তু মধুময় বাড়ি থেকে বেরোয় দুটোর সময়। মাঝখানে ঘণ্টাপাঁচেক তার অন্য কাজ থাকে। মধুময়ের বাড়ির কেউ তো জানতে পারছে না যে, স্বপ্নার সঙ্গে ঠিক ক-টার সময় দেখা করতে যাবে। রাস্তায় কিংবা বাড়িতে।

সন্ধ্যে বেলা বেরিয়ে সে চলে আসে শিয়ালদা স্টেশনে। তার নতুন বন্ধুরা কাছাকাছি কোনো চায়ের দোকানে অপেক্ষা করে আগে থেকে। এক-একদিন এক-এক জায়গায়।

এই সময়টায় শিয়ালদা স্টেশনে সাংঘাতিক ভিড়। সবাই দারুণ ব্যস্ত হয়ে দৌড়োদৌড়ি করে। কারুর কোনো দিকে তাকাবার ফুরসত নেই। প্ল্যাটফর্ম টিকিট কেটে মধুময় তার বন্ধুদের সঙ্গে ভেতরে গিয়ে অলসভাবে ঘুরে বেড়ায়। আসলে তীক্ষ্ণচোখে নজর রাখে যাত্রীদের ওপর। তারপর বেছে বেছে একজনকে ঠিক করে। সেই লোকটির চেহারায় কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার। তাকে শুধু সচ্ছল হলেই চলবে না, তাকে নিষ্ঠুরও হতে হবে। দেখলেই যাতে বোঝা যায়, এই লোক অন্য অনেককে ঠকায়। অপরের রক্তশোষণ করেই সে বেঁচে আছে। কিংবা, এই লোক খাবারে ভেজাল মেশায়, কিংবা বেবিফুড ব্ল্যাক করে। শুধু চেহারা দেখেই এতখানি বুঝে নিতে হয়।

কোনো একটা ট্রেন যখন প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ায়, সেইসময় কাজ শুরু করে মধুময়। এই-সময় একটা দারুণ হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। মধুময়ের অন্য বন্ধুরা তখন আলাদা হয়ে গেছে, কেউ কারুর সঙ্গে কথা বলে না। মধুময় দৌড়ে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে সেই বেছে রাখা লোকটিকে খুবজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কাটা এমনভাবে দিতে হয়, যাতে সে ছিটকে পড়ে যায় মাটিতে।

প্রথম প্রথম মধুময় ধাক্কা মেরে নিজেও দৌড়ে পালাত। এখন আর তা করে না, সে নিজেই লোকটিকে টেনে তোলে। অন্য লোকেরাও সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। দু-এক মিনিট সময় লাগে। তারমধ্যেই লোকটির ব্যাগ হাওয়া। রতন কিংবা ধনা ব্যাগটা নিয়ে মিশে যায় ভিড়ের মধ্যে।

মধুময় লোকটিকে সমবেদনা জানায়। অন্যদের সঙ্গে মিলে সেও ব্যাগটা খোঁজবার ভান করে। তার আগে সে নিজেই লোকটিকে ধমক দেয়—আপনার চোখ নেই মশাই, ট্রেন এসেছে বলে এমন অন্ধের মতন ছুটতে হবে!

মধুময়কে সন্দেহ করার উপায় নেই। তার দুর্দান্ত সুন্দর চেহারা, প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার মতন সাজপোশাক। তার ব্যবহার কত ভদ্র।

স্টেশন থেকে ব্যাগ-ট্যাগ ছিনতাই করে ছিঁচকে চোরেরা। সকলেরই ধারণা, সেইসব ছিঁচকে চোরদের একটা টিপিক্যাল চেহারা আছে। তাদের মাথায় খোঁচা খোঁচা চুল, ইঁদুরের মতন লম্বাটে মুখ আর চঞ্চল চোখ। লোকেরা সেইরকম চেহারার কারুকেই ভিড়ের মধ্যে খোঁজে।

ট্রেন ছাড়ার সময় হলে মধুময় ট্রেনে উঠে পড়ে। উলটোডাঙা বা দমদম পর্যন্ত চলে যায়। তারপর সেখানে নেমে আবার উলটো দিকের ট্রেন ধরে শিয়ালদা ফিরে আসে। সব মিলিয়ে এক ঘণ্টা দেড় ঘণ্টার বেশি লাগে না।

মৌলালির মোড় থেকে একটু বাঁ-দিকে বেঁকলে যে-পার্কটা, সেখানে অপেক্ষা করে রতনরা। টাকাপয়সা তক্ষুনি ভাগ হয়ে যায়। লোক চিনতে খুব ভুল না হলে, রোজগার হয় বেশ ভালোই। এক-এক দিন চার-পাঁচ হাজার টাকাও থাকে ব্যাগে। দু-শো-আড়াই-শোর কমে কোনোদিন না।

সপ্তাহে একদিন শিয়ালদায়, পরের সপ্তাহে হাওড়ায়, তার পরের সপ্তাহে ডালহৌসিতে এবং তারপর একদিন চৌরঙ্গিতে সিনেমাপাড়ায়। মাসে মোট চার দিন কাজ। হাজার বারো-শো টাকা হেসে-খেলে পাওয়া যায়।

টাকা ভাগাভাগির পর রতন আর ধনারা যায় ফুর্তি করতে। মধুময় কিন্তু আর ওদের সঙ্গে থাকে না। তার অন্য কাজ আছে।

ঠিক আটটা দশে সে পৌঁছে যায় হাজরা মোড়ে। তার মুখে বিন্দুমাত্র উত্তেজনার চিহ্ন নেই।

স্বপ্না এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছ?

মধুময় হাসিমুখে বলে, অন্তত আধঘণ্টা।

স্বপ্না বলে, তুমি আচ্ছা পাগল! এরকমভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকার কী দরকার? বাড়িতে আসতে পার-না? আমি তো রোজ গানের স্কুলে আসি না।

মধুময় বলে, আমার এ-রকম অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেই ভালো লাগে, ঠিক নতুন প্রেমিকদের মতন মনে হয়।

সেই হাফপ্যান্ট পরা বয়েস থেকে স্বপ্না মধুময়ের বান্ধবী। সবাই জানে, মধুময় একদিন স্বপ্নাকে বিয়ে করবে। একটা ঠিকমতন চাকরি পেলেই হয়।

টাকাগুলো খরচ করাই এক ঝামেলা। স্বপ্না বেশ সচ্ছল পরিবারের মেয়ে হলেও শখ করে পাড়ার একটা মর্নিং স্কুলে পড়ায়। অর্থাৎ তার একটা বৈধ রোজগারের পথ আছে। নিজের খরচ সে নিজেই চালায় এবং যেহেতু তার প্রেমিক বেকার, তাই সে ধরেই নিয়েছে যে, দু-জনে কোনো রেস্তোরাঁয় যেতে গেলে স্বপ্নাই ব্যাগ থেকে টাকা বার করে দেবে।

মধুময় তাতে আপত্তি করে নিজে টাকা দিতে গেলেই স্বপ্না জিজ্ঞেস করে, তুমি টাকা কোথায় পেলে?

মধুময় নিজেই একসময় স্বপ্নার কাছ থেকে টাকা ধার করেছে। সুতরাং হঠাৎ তার পকেটে অনেক টাকা থাকার ব্যাখ্যা দেওয়া তার পক্ষে সত্যিই শক্ত। তাই সে একগাল হেসে বলল, আমার রিস্টওয়াচটা আজ বিক্রি করে দিলাম।

কেন?

বেকারের হাতে ঘড়ি মানায় না।

যা:, বাজে কথা বোলো না। আমাকে জিজ্ঞেস না করে কেন বিক্রি করলে?

জিজ্ঞেস করলে তুমি আপত্তি করতে, সেইজন্য।

আমি তোমাকে আর একটা ঘড়ি কিনে দেব।

অথচ মধুময়ের পকেটে তখন অনেক টাকা। একজন বেকারের তুলনায় তো বটেই, তার বয়েসি অনেক ছেলের তুলনাতেই সে বেশ সচ্ছল। পকেটে হাজার খানেকের বেশি টাকা রয়েছে। কিন্তু ইচ্ছেমতন খরচ করার উপায় নেই। একজন বেকার দু-হাতে টাকা ওড়াচ্ছে—এ কি কেউ কখনো দেখেছে?

স্বপ্না এত বেড়াতে ভালোবাসে, মধুময় ইচ্ছে করলেই ট্যাক্সি ভাড়া করে তাকে নিয়ে চলে যেতে পারে ব্যারাকপুরে বা ডায়মণ্ড হারবারে। কিংবা আরও দূরে। অবশ্য খুব বেশি দূরে নয়, কারণ সে-দিনের মধ্যেই ফিরতে হবে। কোথাও তার সঙ্গে স্বপ্না রাত্রে থাকবে, একথা কল্পনাই করা যায় না।

স্বপ্না এখনও ভাবে, বিয়ের আগে ছেলে-মেয়েদের সাধারণ আলিঙ্গন চুম্বনও পাপ। স্বপ্নার অসাধারণ সারল্য ও সততার জন্য তার কলেজের বান্ধবীরাও কখনো তাকে তাদের গোপন কথা বলেনি।

এত সরল বলেই স্বপ্নাকে কক্ষনো ঠকাতে ইচ্ছে করেনি মধুময়ের। কিন্তু সে যে কিছুদিন ধরে দু-রকম জীবনযাপন করছে, সে-কথা স্বপ্নাকে কিছুতেই জানাতে পারে না।

যদিও মধুময়ের মনে মনে যুক্তির অভাব নেই। সে তো কোনো অন্যায় করছে না। তার স্বাস্থ্য ভালো, পড়াশুনোয় মাঝারি, সে তো সৎভাবে থেকে এই দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু তাকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। ‘বেকার’ আখ্যা দিয়ে তাকে বসিয়ে রাখা হয়েছে বছরের পর বছর।

বাড়ির লোকের অনুরোধে মধুময় ডব্লু বি সি এস পরীক্ষা দিয়েছিল। পাশও করেছে। প্যানেলে নাম আছে তার। কিন্তু কবে চাকরি হবে কোনো ঠিক নেই। তার দু-বছর আগে যাদের প্যানেলে নাম উঠেছিল, তারাও অনেকে চাকরি পায়নি এখনও। এ কীরকম ব্যবস্থা, যেখানে পনেরো হাজার ছেলে-মেয়ে পরীক্ষা দেওয়ার পর চাকরি পায় মাত্র বাইশজন? বছরের পর বছর এই অদ্ভুত কান্ড চলছে। এরই ওপর দেশ টিকে আছে।

মধুময় কেন নিজেকে বঞ্চিত করবে? কেন চব্বিশ বছর বয়সেও তাকে বাবা-মায়ের কাছে হাত পেতে ট্রাম-বাস-ভাড়া কিংবা সিগারেটের খরচ চাইতে হবে? তাই সে কেড়ে নিচ্ছে। যাদের বেশি আছে, কেড়ে নিচ্ছে তাদের কাছ থেকে। চোরের ওপর বাটপাড়ি করাটা কি একটা অপরাধ? মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় যৌবন, সেই সময়টা তারা বঞ্চিত নি:স্ব হয়ে থাকবে কেন?

মধুময়ের এক কাকা বাড়িতে এসে একদিন বললেন, শোন, তোর জন্য একটা চাকরির ব্যবস্থা করেছি আমি। শুধু শুধু বাড়িতে বসে আছিস—

মধুময় অমনি একটু আড়ষ্ট হয়ে গেল। তার চাকরির জন্য আত্মীয়স্বজনেরা সবাই যেন খুব চিন্তিত। এই জিনিসটাই তার ভালো লাগে না। সে কি সবার করুণার পাত্র? তার জন্য অন্যরা ব্যবস্থা করে দেবে কেন? তার নিজের কি যোগ্যতা নেই?

কাকা বললেন, আমাদের পাড়ার স্কুলের আমি কমিটি-মেম্বার। তুই এ-স্কুলে ঢুকে পড়।

মধুময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, স্কুলে?

হ্যাঁ, বেশি খাটুনি নেই। স্কুলে তো প্রায়ই ছুটিছাটা থাকে। তার ওপর গ্রীষ্মের ছুটি, পুজোর ছুটি—

স্কুলে পড়ানো আমার পোষাবে না।

কেন—পোষাবে না কেন? তোকে তো আর বরাবর স্কুলের মাস্টারি করতে বলছি না। যত দিন তুই ভালো চাকরি না পাস... শুধু শুধু বসে থাকার চেয়ে এ অনেক ভালো... তারপর মাস গেলে শ-আড়াই টাকা, মন্দ কী।

আড়াই-শো টাকা?

মনে কর ওটা তোর হাত-খরচ।

আড়াই-শো টাকার জন্য রোজ সকালে স্নান করে ভাত খেয়ে বেরোতে হবে— থাকতে হবে দশটা থেকে চারটে পর্যন্ত। অথচ আমারই মতন বি এসসি পাশ করে যারা ব্যাঙ্কে বা এল আইসি-তে কিংবা কোনো কমার্শিয়াল ফার্মে ঢোকে, তারা দশটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করার জন্য অন্তত সাত-আট-শো টাকা পায়।

সেরকম চাকরি যতদিন না পাচ্ছিস... স্কুলে থাকতে থাকতেই অন্য জায়গায় ইন্টারভিউ দিতে পারিস... আজকাল তো অনেক ভালো ছেলেই বসে না থেকে স্কুলের চাকরিতে ঢুকে পড়ে। তারপর নানা জায়গায় দরখাস্ত পাঠায়, কিংবা পরীক্ষা দেয়। দু-এক বছরের মধ্যে কিছু একটা পেয়েও যায়।

মেজোকাকা, আমার স্কুলে পড়াবার যোগ্যতা নেই।

বি এসসি পাশ করেছিস, আর স্কুলের ছেলেদের তুই পড়াতে পারবি না?

সবাই কি পড়াতে পারে?

কেন পারবে না?

সেইজন্যই তো আজকাল স্কুলগুলোর এই অবস্থা!

মধুময়ের মাকে মেজোকাকা বললেন, ও বউদি, শুনুন, আপনার ছেলের কথা। ওর জন্য একটা স্কুলের কাজ জোগাড় করে আনলাম, ও তাতে রাজি নয়। শুধু শুধু বসে থাকার চেয়ে আড়াই-শো টাকা পেত।

মধুময়ের মা চট করে কোনো মন্তব্য করলেন না। ছেলের মেজাজ তিনি জানেন। একবার কোনো ব্যাপারে ‘না’ বললে সহজে আর ‘হ্যাঁ’ করানো যায় না।

মেজোকাকা বললেন, ‘স্কুলে তো আজকাল পড়াশুনো প্রায় হয়ই না। প্রায়ই স্ট্রাইক-ফাইক লেগেই থাকে। সেইজন্যই বলছিলাম, একবার ঢুকে পড়তে পারলে ঠায় বসে বসেই মাইনে পেত।’

মা আস্তে আস্তে বললেন, ও বোধ হয় স্কুলের কাজ পারবে না। একসঙ্গে অতগুলো ছেলেকে সামলানো...

মধুময় বলল, তুমি ঠিকই ধরেছ মা। সবাই কি সব জিনিস পারে? আমার দ্বারা মাস্টারি করা হবে না।

বাড়িতে থাকলে মেজোকাকার সঙ্গে আরও তর্কবিতর্ক করতে হবে বলে মধুময় একটা ছুতো দেখিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

ভেতরে ভেতরে রাগে সে ফুঁসছে।

কোনো চাকরি পাচ্ছে না বলেই সে স্কুলে পড়াবে? স্কুলে পড়ানোটা এতই সহজ কাজ? অযোগ্যতা নিয়ে কিংবা অযত্নের সঙ্গে স্কুলের ছেলেদের পড়ানোটা অন্যায় নয়? অন্য চাকরির চেষ্টা করতে করতে স্কুলে দু-এক বছর কাটিয়ে মাইনে নেওয়ার চেয়ে, একজন চোরাকারবারির টাকা ছিনিয়ে নেওয়া কি বেশি অন্যায়?

মঙ্গলবার রাত পৌনে এগারোটার সময় একটা ঘটনা ঘটল।

সন্ধ্যে থেকে একটা লোককে অনুসরণ করছিল মধুময় ও তার বন্ধুরা। লোকটা মেট্রো সিনেমা থেকে বেরিয়েছিল একটি মেয়ের সঙ্গে। মেয়েটির সঙ্গে লোকটার চেহারায় বা ব্যবহারে কোনো মিল নেই। লোকটার মুখখানা হিংস্র ধরনের, একটা দামি প্যান্ট ও সিল্কের হাওয়াই শার্ট পরা, হাতে সোনার ব্যাণ্ডের ঘড়ি। মেয়েটি পরে আছে সাধারণ একটা তাঁতের শাড়ি, মুখখানা লাজুক লাজুক। এই ধরনের মেয়েদের সঙ্গে ওই ধরনের পুরুষদের যোগাযোগ হয় একটিমাত্র উপায়েই। টাকার জোরে।

সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে লোকটি ওই মেয়েটিকে নিয়ে ঢুকল একটি বারে। এখানে পর্দাঘেরা কেবিন আছে। সেখানে ওরা বসে রইল দু-ঘণ্টা। মধুময়ের বন্ধু রতন আর ধনাও বারের মধ্যে গিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। মধুময় বাইরে ঘোরাঘুরি করতে লাগল।

সেই বার থেকে বেরিয়ে লোকটি আর মেয়েটি হাঁটতে লাগল। লোকটির চোখ লালচে হয়ে এসেছে, মুখের চামড়া চকচক করছে। মেয়েটি কিছু পান করেছে কি না বোঝা যায় না।

চৌরঙ্গি তখন আলোকোজ্জ্বল। প্রচুর লোকজন, এখানে কিছু করার উপায় নেই। ওরা যদি হাঁটতে হাঁটতে জাদুঘরের দিকে যায়, তাহলেই মধুময়ের সুবিধে। ওদিকটায় অন্ধকার থাকে।

কিন্তু ওরা গ্র্যাণ্ড হোটেল পেরিয়ে এসেও আবার ফিরল। গ্র্যাণ্ড হোটেলের গেটের কাছাকাছি এসে ওরা দাঁড়াল। লোকটি মেয়েটিকে হোটেলের মধ্যে নিয়ে যেতে চায়, অথচ মেয়েটি যাবে না। এত বড়ো হোটেলে ঢুকতে মেয়েটি বোধ হয় লজ্জা পাচ্ছে। লোকটি একটুক্ষণ হাত-পা নেড়ে মেয়েটিকে কিছু বোঝাবার চেষ্টা করল। মেয়েটি তবু যাবে না। তখন ওরা ঢুকল গ্র্যাণ্ড হোটেলের নীচেই আর একটা বারে। ওরা আরও খাবে। এবার বেরোল সাড়ে দশটার সময়। বেশি চেষ্টা করতে হল না, সহজেই পেয়ে গেল একটা ট্যাক্সি। দরজা খুলে মেয়েটি আগে উঠল, লোকটি কিন্তু উঠল না। জানলা দিয়ে মুখ ঢুকিয়ে অনেকক্ষণ ধরে মেয়েটিকে বলতে লাগল কী যেন সব। তারপর হাতের ঝোলানো ব্যাগ খুলে কিছু টাকা তুলে দিল মেয়েটির হাতে।

ট্যাক্সি চলে যাওয়ার পর লোকটি দু-হাত তুলে আড়মোড়া ভাঙল। ওকে যে, কেউ লক্ষ করছে, ও তা জানে না।

লোকটা রাস্তা পেরিয়ে চলে এল গ্র্যাণ্ড হোটেলের উলটো দিকে। যেখানে প্রাইভেট গাড়িগুলো পার্ক করা থাকে। লোকটা কি নিজের গাড়ি এখানে রেখে এতক্ষণ পায়ে হেঁটে ঘুরছিল? নিজের গাড়ি থাকতেও সে মেয়েটিকে ট্যাক্সিতে করে পাঠিয়ে দিল? মানুষ কেন এমন করে কে জানে!

এদিকটায় বেশ অন্ধকার।

হঠাৎ যেন মাটি ফুঁড়ে লোকটির সামনে এসে দাঁড়াল মধুময়। খুব ব্যস্তভাবে দৌড়োবার ভঙ্গি করে খুব জোরে ধাক্কা দিল লোকটাকে। কতটা জোরে ধাক্কা দিতে হবে, তা মধুময়ের এখন অভ্যেস হয়ে গেছে। লোকটা মাটিতে পড়ে যেতেই রতন আর ধনা এগিয়ে এসে নিপুণ হাতে ব্যাগটা তুলে নিয়ে অন্ধকারে মিশে গেল।

কিন্তু মধুময় চলে যাওয়ার আগেই লোকটি তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে দু-হাতে চেপে ধরল মধুময়কে। লোকটার গায়ে বেশ জোর।

চেঁচিয়ে উঠল, শালা, তুম ধাক্কা মারা! কা’হে মারা!

মধুময় নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও পারল না। কিন্তু একটুও দেরি করবার উপায় নেই। লোকটার চিৎকার শুনে এক্ষুনি লোক জড়ো হয়ে যাবে।

মধুময় প্রচন্ড জোরে দু-খানা ঘুসি মারল লোকটার থুতনিতে।

লোকটা ‘মার ডালা, মার ডালা’ বলে চেঁচিয়ে উঠল। ততক্ষণে কিছু লোক পৌঁছে গেছে সেখানে।

মধুময়ের বুক কাঁপছে, কিন্তু মুখখানা শান্ত। সে আদৌ পালাবার চেষ্টা করল না।

লোকটা হাউ মাউ করে বলতে লাগল, হামারা ব্যাগ—বহুত রুপিয়া থা—ইতনা বড়া হ্যাণ্ড- ব্যাগ!

মধুময় বিরক্তির সঙ্গে বলল, আচ্ছা মুশকিলে পড়া গেল তো? যতসব পেঁচি মাতাল?

অন্য লোকেরা এসে প্রশ্ন করতে লাগল, কী হয়েছে দাদা—কী হয়েছে?

লোকটি বলল তার ব্যাগ হারাবার কথা।

মধুময় চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞেস করল, কত বড়ো ব্যাগ?

লোকটা দু-হাত তুলে ব্যাগের মাপ দেখাল। লোকটার ঠোঁটের কোণ থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।

মধুময় হেসে অন্যদের বলল, দেখুন তো কী ঝামেলা! এসব লোকদের পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া উচিত!

লোকটা মাতাল। কথা বলছে জড়িয়ে জড়িয়ে। সবাই মাতালের বিপক্ষে যায়। তা ছাড়া অত বড়ো একটা হ্যাণ্ডব্যাগ যে মধুময় নেয়নি তা তো দেখাই যাচ্ছে। তা ছাড়া মধুময়কে কে সন্দেহ করবে? তার সুন্দর চেহারা, মাথার চুল নিপাটভাবে আঁচড়ানো, কন্ঠস্বরে ব্যক্তিত্ব আছে।

কাছাকাছি কোথাও ব্যাগটা নেই। সুতরাং পুরো ব্যাপারটাই মাতালের প্রলাপ হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। লোকটার জড়ানো কথার মধ্যে এইটুকু শুধু বোঝা গেল, এদিকে তার গাড়ি নেই, সে এদিকে এসেছিল হিসি করবার জন্য।

লোকটিকে ভিড়ের হাতে সঁপে দিয়ে মধুময় ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরল।

এই তার প্রথম বাধা। যদি পুলিশ আসত, পুলিশ অবশ্য কিছুই প্রমাণ করতে পারত না। কলকাতা শহরে চলতে চলতে তো মানুষের সঙ্গে মানুষের ধাক্কা লাগেই। আর মধুময় নিজে কোনোদিন ব্যাগ কেড়ে নেয় না।

পুলিশকে মধুময় ভয় পায় না। ভয়টা শুধু জানাজানি হয়ে যাওয়ার—যদি চেনাশোনা কোনো লোক হঠাৎ দেখে ফেলে? যদি ভিড়ের মধ্যে থেকে হঠাৎ কোনোদিন বেরিয়ে আসে স্বপ্নার দাদা? যদি সেই সময়েই রতনরা ব্যাগটা নিয়ে পালাতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে যায়?

কিন্তু এটুকু ঝুঁকি তো নিতেই হবে। ঝুঁকি না নিলে, জীবনে কোনো কাজই করা যায় না।

লোকটাকে ঘুসি মারার জন্য মধুময়ের একটুও অনুতাপ হয়নি। লোকটা যে একটা জাত শয়তান তাতে কোনো সন্দেহ নেই। লোকটা নিরীহ মেয়েদের সর্বনাশ করে টাকার জোরে। এসব টাকা ওরা পায় কোথায়? লোকটা ওই মেয়েটিকে গ্র্যাণ্ড হোটেলে নিয়ে যেতে চাইছিল। এক সন্ধ্যেতে গ্র্যাণ্ড হোটেলে কত টাকা খরচ হয়? অনেক কেরানির এক মাসের মাইনের চেয়েও বেশি।

পরদিন সকালে দেখা করার কথা ছিল স্বপ্নার সঙ্গে। স্বপ্না ন্যাশনাল লাইব্রেরির কার্ড করাবে, মধুময় সঙ্গে গেলে ভালো হয়।

পরদিন সকালে মধুময় অন্য মানুষ। সে স্বপ্নার প্রেমিক। রাসবিহারীর মোড়ে স্বপ্নার জন্য অপেক্ষা করতে করতে সে গুন গুন করে একটা গান গাইতে লাগল।

ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে কার্ড হয়ে গেল খুব সহজেই। বাইরে বেরিয়ে এসে স্বপ্না বলল, আজ এমন সুন্দর দিনটা, এক্ষুনি বাড়িতে ফিরতে ইচ্ছে করছে না।

ফিনফিনে হাওয়ার সঙ্গে গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টি পড়ছে। ওই বৃষ্টিতে ভিজতে বেশ ভালো লাগে। যেন বিদেশের তুষারপাতের মতন। গা ভেজে না। আকাশটা ছায়াময়, স্নিগ্ধ, সত্যিই একটা বেড়াবার মতন দিন।

স্বপ্না আবার বলল, ‘এইসব দিনে কী ইচ্ছে করে জানো তো? ইচ্ছে করে কোনো নদীর ধারে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে। চলো-না, গঙ্গার ধারে গিয়ে একটু বসি।

মধুময় বলল, গঙ্গার ধারে গিয়ে দেখবে, ঠিক কোনো-না-কোনো চেনালোক বেরিয়ে পড়বে।

স্বপ্না বলল, থাকুক গে চেনালোক। তবু এমন দিনটা নষ্ট করতে ইচ্ছে করছে না।

গঙ্গার ধারে গিয়ে বসলে ভিখিরিরা এসে জ্বালাবে। তোমার ভালো লাগবে না।

বুঝেছি, আসলে তুমি যেতে চাও না! তোমার আজ কোনো ইন্টারভিউ আছে?

না, বরং তোমাকে আর একটা কোনো নদীর ধারে নিয়ে যেতে পারি, যেখানে কোনো চেনা- লোক নেই, ভিখিরি নেই—

কোথায়?

চলোই না—

কত দূরে?

সন্ধ্যের মধ্যেই ফিরে আসব। বাড়িতে বরং একটা টেলিফোন করে দাও।

হাওড়া স্টেশনে এসে মধুময় একটা লোকাল ট্রেনের দুটো টিকিট কাটল। তার পকেটে যথেষ্ট টাকা, ইচ্ছে করলেই সে ফার্স্ট ক্লাসে যেতে পারে, কিন্তু বেশি টাকা খরচ করতে দেখলেই স্বপ্না প্রশ্ন তুলবে। সেইজন্যই আগেকার থার্ড ক্লাস, আজকাল যার নাম হয়েছে সেকেণ্ড ক্লাস—সেই টিকিটই কাটল!

ট্রেনে উঠেই বুঝল, ভুল করেছে।

স্বপ্নার জন্য কোনোক্রমে একটা বসবার জায়গা পাওয়া গেলেও মধুময়কে থাকতে হল দাঁড়িয়ে। অসম্ভব ভিড়। লোকেরা গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। স্বপ্নার পাশে সামান্য একটু জায়গা, মধুময় নিজে সেখানে বসেনি, কিন্তু আর একটি লোক নির্লজ্জের মতন সেখানেই বসে পড়ল ঠেসাঠেসি করে।

মধুময়ের রাগে গা জ্বলতে লাগল। স্বপ্নাকে অন্য কেউ ছোঁয়, সেটা সে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। কিন্তু উপায়ও কিছু নেই। ট্রেনে সবাই একটু জায়গার জন্য পাগল, সভ্যতা-ভব্যতা কেউ বড়ো একটা মানে না।

ভেবেছিল, জানলার ধারে বসে গল্প করতে করতে যাবে। কিন্তু এই ভিড়ের মধ্যে কথা বলাও যায় না।

স্বপ্না কিন্তু মজা পাচ্ছে। সকৌতুকে সে মাঝে মাঝে দেখছে মধুময়কে। মধুময়ের সঙ্গে এর আগে সে কখনো ট্রেনে চেপে কোথাও বেড়াতে যায়নি।

হঠাৎ খেয়াল হতেই মধুময় এক হাতে তার প্যান্টের পকেট চেপে ধরল। তার সব টাকা সে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। যদি কেউ পকেট মেরে নিয়ে যায়!

কথাটা ভেবেই অবশ্য হাসি পেয়ে গেল তার। এ-টাকা তার নিজস্ব নয়। সে নিজেই কোনো চোরের ওপর বাটপারি করেছে। এখন তার কাছ থেকেও যদি কেউ এ টাকা মারে, তবে সেই লোককে কী বলা যাবে?

ঘণ্টাখানেক পর ভিড় একটু ফাঁকা হতে মধুময় বসবার জায়গা পেল। স্বপ্না জিজ্ঞেস করল, আমরা কোথায় যাচ্ছি?

মধুময় বলল, আর আধঘণ্টা পরেই জানতে পারবে।

সেই আধঘণ্টা পরে ট্রেন ঝমঝমিয়ে পার হতে লাগল একটা ব্রিজের ওপর দিয়ে। নীচে বিরাট একটা নদী। বর্ষার সময় দু-কূল ছাপিয়ে গেছে।

স্বপ্না জিজ্ঞেস করল, এই নদীর নাম কী?

রূপনারায়ণ।

স্বপ্নার মুখটা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কত নাম শুনেছে এই নদীর। কত বইতে পড়েছে, কিন্তু আগে কখনো দেখেনি। কলকাতা থেকে এত কাছে? মাত্র দেড়ঘণ্টা।

উঠে দাঁড়িয়ে মধুময় বলল, আমরা এখানে নামব।

স্টেশনের নাম কোলাঘাট। নামটার সঙ্গে কেমন-যেন-একটা ‘ইলিশ ইলিশ’ গন্ধ আছে। কোলাঘাট শুনলেই ইলিশ মাছের কথা মনে পড়ে যায়।

মধুময় জিজ্ঞেস করল, তোমরা তো একবার পুরী গিয়েছিলে—তখন এই নদী দেখোনি?

তখন এর ওপর দিয়ে গেছি?

হ্যাঁ, রাত্তিরে গিয়েছিলে বোধ হয়, তাই খেয়াল করেনি।

স্টেশনটা বেশ উঁচুতে। সেখান থেকে সিঁড়ি দিয়ে ওরা নেমে এল নদীর ধারের রাস্তায়। সেই রাস্তা দিয়ে খানিকটা হাঁটবার পর একটা হোটেল পড়ল। প্রায় পৌনে দুটো বাজে। বেশ খিদে পেয়েছে।

মধুময় বলল, এসো, আগে খেয়ে নিই।

ভেতরে গিয়ে বসতেই একজন বেয়ারা এসে বলল, একটু আগেই নদী থেকে ধরা একদম টাটকা ইলিশ মাছ আছে বাবু!

মধুময় বলল, দাও। ভাত, ডাল আর মাছভাজা।

কলাপাতায় করে দেওয়া হল ভাত। হোটেলে তখন ওরা ছাড়া কেউ নেই। গরম গরম মাছ আর মাছের ডিমভাজা আনতে লাগল। ওরা খেয়ে ফেলল পাঁচ-ছখানা করে।

স্বপ্না বলল, আমি জীবনে কখনো একসঙ্গে এত মাছ খাইনি। তবে সত্যি খুব চমৎকার স্বাদ!

খেয়ে উঠে ওরা চলে এল নদীর ধারে। স্বপ্না বলল, আমরা একটু নৌকো করে ঘুরে বেড়াব না?

মধুময় বলল, বর্ষাকাল, যেকোনো সময় ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে।

তাতে কী হবে? উঠুক না ঝড়। আরও ভালো লাগবে।

যদি নৌকো উলটে যায়?

যাক-না। আমি ডুবে যাব? কেন তুমি আমায় বাঁচাতে পারবে না?

তা পারব অবশ্য।

স্বপ্না ঠোঁট উলটে বলল, ইস, তার দরকার হবে না মোটেই।

আমি খুব ভালো সাঁতার জানি।

কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও নৌকো পাওয়া গেল না। সব নৌকো চলে গেছে মাছ ধরতে।

তাকালেই দেখা যায়, নদীর বুকে এখানে-ওখানে মোচার খোলার মতন দুলছে মাছধরা নৌকো। সবাই জাল ফেলে বসে আছে। মাঝে মাঝে জাল টেনে তুলছে, তখন দেখা যাচ্ছে, চকচকে ইলিশের মৃত্যুর আগের শেষ দু-টি-তিনটি লাফ।

মধুময় জিজ্ঞেস করল, এর আগে তুমি কখনো ইলিশ মাছ লাফাতে দেখেছ?

সত্যি, আগে কখনো দেখিনি।

হঠাৎ বেশ জোরে বৃষ্টি এসে গেল। তাতে অবশ্য ভেজার ভয় নেই। ওরা দৌড়ে এসে দাঁড়াল একটা ব্রিজের নীচে। এখানে পাশাপাশি তিনটে ব্রিজ, দুটো ট্রেনের জন্য। একটা মানুষ ও গাড়ির।

ব্রিজের নীচে একেবারে নদীর ধারে দু-খানা সিমেন্টের চাঙড়ের ওপর বসল ওরা। নদীর বুকে বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে। অদ্ভুত মোহময় সেই দৃশ্য।

মধুময় তার একটা হাত রাখল স্বপ্নার কাঁধে।

স্বপ্না মধুময়ের দিকে তাকাল।

মধুময় অনুনয় করে বলল, আজ আপত্তি কোরো না, প্লিজ, খুব ইচ্ছে করছে তোমাকে একটু ছুঁয়ে থাকি।

স্বপ্না সরিয়ে দিল না হাতটা। বরঞ্চ মধুময়ের হাতে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।

মধুময় বলল, এই নদী দেখেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, রূপনারায়ণের কূলে জেগে উঠিলাম, জানিলাম এ জগৎ মিথ্যা নয়!

স্বপ্না হেসে বলল, হল না।

স্বপ্না সাহিত্যের ছাত্রী ছিল। মধুময়ের চেয়ে এসব সে অনেক ভালো জানে।

সে বলল, রূপনারায়ণের কূলে জেগে উঠিলাম, জানিলাম এ-জগৎ স্বপ্ন নয়।

মধুময় বলল, ওই একই হল। মিথ্যা আর স্বপ্ন তো একই।

স্বপ্না বলল, এক? মিথ্যা আর স্বপ্ন এক?

স্বপ্নটাও মিথ্যে নয়?

না। মোটেই না। মিথ্যেটা শুধুই মিথ্যে। আর স্বপ্নটা সত্যিও না, মিথ্যেও না, অন্যরকম কিছু।

মধুময় বলল, হ্যাঁ, ঠিকই তো। তোমার নাম স্বপ্না, তুমি মিথ্যেও নয়, সত্যিও নয়, তুমি সবকিছুর থেকে আলাদা!

স্বপ্না হাসল।

মধুময় হঠাৎ একটা কিছু দেখে দারুণ চমকে উঠল। তার জামাটার নীচের দিকে একটা লাল রঙের ফোঁটার দাগ। জামাটার রং হলদে বলে ভালো করে নজর না দিলে দেখা যায় না।

এটা কীসের দাগ? নিজের মনকে প্রশ্ন করবার আগেই মধুময় অবশ্য উত্তরটা জানে। এটা রক্তের দাগ। কালকের জামাটাই পরে এসেছে মধুময়। কাল রাত্তিরে লোকটাকে ঘুসি মারবার ফলে লোকটার ঠোঁট দিয়ে রক্ত বেরিয়ে গিয়েছিল। সেই রক্তেরই একটু ছিটে লেগেছে মধুময়ের জামায়।

মধুময়ের গা-টা ঘিন ঘিন করে উঠল। একটা নোংরা লোকের রক্ত লেগে আছে তার জামায়। লোকটার নিষ্ঠুর লোভী মুখখানা ভেসে উঠল তার চোখে।

সে স্বপ্নার কাঁধ থেকে উঠিয়ে নিল নিজের হাত। এইরকম নোংরা জামা পরে স্বপ্নাকে ছুঁয়ে থাকা উচিত নয়।

তুমি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলে যে! স্বপ্না বলল।

কই, না তো! এমনি বৃষ্টি দেখছি।

ওই দেখো, ব্রিজের ওপর দিয়ে একটা ট্রেন আসছে।

একটু দূরে একটা ইটের নৌকো দাঁড় করানো। দু-জন লোক মাথায় করে ইট নিয়ে আসছে পারে। নৌকোটা চওড়া করে রাখতে হয়েছে বলে, ওদের খানিকটা জলের মধ্যে নেমে গিয়ে আনতে হচ্ছে ইট। লোক দুটোরই বুকের পাঁজর বার করা। পুরো নৌকোর ইট নামাতে ওদের নিশ্চয়ই সারাদিন লেগে যাবে। সারাদিন এত পরিশ্রম করে ওরা ক-টাকা পায়? নিশ্চয়ই ভালো করে খেতে পায় না, নইলে অত রোগা হবে কেন? সারাদিন এত পরিশ্রম করেও মানুষ খেতে পায় না!

লোক দুটোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মধুময় বুঝতে পারল জোয়ার এসে গেছে, ক্রমশ নদীর জল বাড়ছে। কেন-না একটু আগে ওরা হাঁটুজল পর্যন্ত নামছিল, এখন ওদের ঊরু পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছে।

এসব নদীতে বান ডাকে না, তাই ভয় নেই। জোয়ারের সময় জল বাড়ে আস্তে আস্তে। বেলাভূমির ওপর জল কতটা এগিয়ে আসছে চট করে বোঝা যায় না।

মধুময়ের ইচ্ছে হল, সে এই নদীতে নেমে যায়। ডুব দিয়ে খুব ভালো করে স্নান করে। জামাটা ধুয়ে-মুছে তুলে ফেলে রক্তের দাগটা। কিন্তু তাতে কাল রাত্তিরের স্মৃতি মুছে যাবে?

বার বার মনে পড়ছে সেই লম্পট লোকটার মুখ। খেলাটা ভেঙে যাচ্ছে। মধুময় এ-রকম চায়নি। স্বপ্নার কাছে যখন আসবে, তখন সে অন্য মানুষ থাকতে চায়।

তার গোপন জীবনের কোনো ছাপ যেন না পড়ে।

কিন্তু জামায় এই রক্তের ছিটে!

মধুময় উঠে গিয়ে এক টুকরো ইট দিয়ে বালির ওপর একটা জাহাজ আঁকতে লাগল। প্রায় স্বপ্নার পায়ের কাছে। আঁকার হাত ছিল মধুময়ের, সে শিল্পী হতে হতে হল না, তার বদলে ছিনতাই দলের সদস্য হয়েছে।

স্বপ্না বলল, বা: বেশ সুন্দর হয়েছে তো জাহাজটা!

মধুময় বলল, এক্ষুনি আমরা একটা জাহাজডুবি দেখব।

স্বপ্না বলল, তার মানে?

বুঝতে পারলে না—জল বাড়তে বাড়তে এই জাহাজটাকে ডুবিয়ে দেবে।

জল বাড়ছে নাকি?

তাকিয়ে থাকো, এবার বুঝতে পারবে।

এবার সত্যিই জল বাড়ার ব্যাপারটা বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠল। একটু একটু করে এগিয়ে এসে নদীর রেখা প্রথমে ছুঁয়ে দিল জাহাজটার একটা প্রান্ত। তারপর এগোতে লাগল একটু একটু করে। মিনিট দশেকের মধ্যেই ডুবে গেল জাহাজটা। স্বচ্ছ টলটলে জলের নীচে বালির ওপর মধুময়ের আঁকা জাহাজটাকে পরিষ্কার দেখা যায়।

জল বেড়ে এসে ছলাৎ ছলাৎ করতে লাগল স্বপ্নার পায়ের কাছে। একটুক্ষণের মধ্যেই তার গোড়ালি পর্যন্ত এসে গেল।

স্বপ্না বলল, কী দারুণ ব্যাপার, না? নদীটা কতদূরে ছিল, আর কত কাছে এসে গেল— এ-রকম আগে কখনো দেখিনি।

আর এখানে বসা যায় না। জল আরও বাড়বে। এবার স্বপ্নার শাড়ি-টাড়ি ভিজে যাবে। দুপুর ঢলে এসেছে। এবার বাড়ি ফেরার কথাও মনে আসে।

উঠে স্টেশনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে স্বপ্না বলল, তুমি আমাকে নদী দেখাবে বলেছিলে, দেখালে না তো?

মধুময় অবাক হয়ে স্বপ্নার দিকে তাকাল।

স্বপ্না বলল, এটা তো নদী নয়, নদ। রূপনারায়ণ নদ। বলেই স্বপ্না ছেলেমানুষের মতো হেসে উঠল খিলখিল করে।

মধুময় বলল, ও পুরুষ, তাই বল! সেইজন্যই তোমার পা জড়িয়ে ধরবার জন্য এত তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসছিল!

স্টেশনে এসে মধুময় আর ভুল করল না। আর সে ভিড়ের কামরায় যেতে পারবে না। স্বপ্নার সঙ্গে এই প্রথম ট্রেনে বেড়ানো। সে টিকিট কাটল ফার্স্ট ক্লাসের।

যথারীতি স্বপ্না অবাক।

তুমি এত-টাকা খরচ করলে শুধু শুধু?

একটা আংটি বিক্রি করে দিলাম যে। সেই টাকা রয়েছে।

আবার আংটি বিক্রি করেছ? কেন? তোমার দরকার হলে আমার কাছ থেকে টাকা নিতে পারো না?

আংটি তো আমি পরিই না বলতে গেলে। আর কখনো পরবও না। শুধু শুধু রেখে লাভ কী?

তবু জিনিসপত্র বিক্রি করা আমি পছন্দ করি না।

শোনো স্বপ্না, এমন সুন্দর দিনগুলো আমরা টাকার অভাবে নষ্ট করব? অন্য লোকেরা আনন্দ করবে, আর আমরা করব না?

মধুময় আড়চোখে আর একবার তার জামার রক্তের ফোঁটাটার দিকে তাকাল। স্বপ্না দেখতে পায়নি। হলদে জামা, হয়তো স্বপ্না লক্ষও করবে না।

মধুময় মনে মনে তীব্রভাবে বলল, না, আমি কোনো অন্যায় করিনি। একটা বদমাশ লোক রাস্তা থেকে মেয়ে ধরে নিয়ে গিয়ে মদের দোকানে কিংবা হোটেলে একরাত্রে তিন-চারশো টাকা ওড়ায়। আর একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা ট্রেনে নিরিবিলিতে একটু ভ্রমণ করতে পারবে না? কোনটাতে টাকার সবচেয়ে ভালো ব্যবহার হয়?

ফার্স্ট ক্লাস কামরাটা একদম ফাঁকা। লোকাল ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাসে সাধারণত জায়গা পাওয়া যায় না। কলেজের ছাত্র, ভিখিরি আর হকাররা এসে খুব গোলমাল করে। কিন্তু এখন এই শেষবিকেলে তারা কেউ নেই।

চলন্ত ট্রেনের নির্জন কামরায় যেন একটা রোমান্টিকতার গন্ধমাখানো। মুখোমুখি বসে থাকা। বাইরে চলমান সবুজ মাঠ। সবকিছু বড়ো মোহময়।

হঠাৎ ঝুঁকে মধুময় তার দু-হাত রাখল স্বপ্নার কাঁধে। ভিখিরির মতন করুণ গলায় বলল, তোমায় একটু আদর করব?

স্বপ্না মধুময়ের হাতদুটো ধরে বলল, তুমি আর আমি এ-রকম একটা আলাদা জায়গায় বসে আছি—এই তো আমার দারুণ ভালো লাগছে!

তোমায় একবার চুমু খাই?

না, প্লিজ।

একবার। কেউ দেখবে না এখানে।

না। যখন সময় আসবে।

মধুময় একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল স্বপ্নার দিকে। তার বন্ধুরা সবাই বলে, মেয়েরা মুখে কখনো ‘হ্যাঁ’ বলে না। ইচ্ছে থাকলেও মুখে ‘না না’ বলে। একটু জোর করতে হয়। মেয়েরা ওই জোর করাটাই পছন্দ করে।

মধুময় কি স্বপ্নার ওপর জোর করবে? মধুময় নিজের হাতদুটো স্বপ্নার কাঁধ থেকে সরিয়ে নিল। জামায় ওই রক্তের ছিটেটুকু না থাকলে সে নিশ্চয়ই আজ স্বপ্নাকে জোর করে বুকে টেনে নিত। কোনো আপত্তিই শুনত না।

তুমি রাগ করলে?

না, রাগ করিনি।

প্লিজ, রাগ করে আজকের এই সুন্দর দিনটা নষ্ট করে দিয়ো না। আমার এত ভালো লাগছে আজ সবকিছু।

সত্যিই রাগ করিনি। কিন্তু তুমি যে বললে, যখন সময় আসবে... যদি কোনোদিনই আর সময় না আসে?

যা:, তাই কখনো হয়? আমরা একসঙ্গে থাকব না?

আমি চাকরি না পেলে, তোমায় বিয়ে করতে পারব না। যদি কোনোদিনই চাকরি না পাই?

নিশ্চয়ই পাবে।

তিন বছর তো হয়ে গেল... অনেকে শুনেছি আট-দশ বছর বেকার, যদি আমারও সেই অবস্থা হয়?

আমি ততদিনই অপেক্ষা করে থাকব। এমনকী যদি প্রয়োজন হয় তবে চিরকাল...

চিরকালের কথা বোলো না। শুনলেই আমার ভয় করে। চিরকাল কি কেউ কারুর জন্য অপেক্ষা করতে পারে?

তুমি চাকরি না পেলেই-বা, আমি তো চাকরি পেতে পারি। একবার তো একটা পেয়েওছিলাম, নিইনি। আবার যদি চেষ্টা করি, আমি ভালো একটা চাকরি পেলেই তারপর আমরা ...

একথা সত্যি যে, স্বপ্না চেষ্টা করলেই একটা চাকরি পেতে পারে। স্বপ্নার রেজাল্ট ভালো। তা ছাড়া মেয়ে বলেই কিনা কে জানে, সে দরখাস্ত পাঠালেই ইন্টারভিউ-এর ডাক আসে। আর মধুময়ের অধিকাংশ দরখাস্তের কোনো উত্তর আসে না।

মধুময় বলল, তুমি চাকরি করতে যাবে, আর আমি বাড়িতে বসে থাকব?

বসে থাকবে কেন—তুমি বাড়িতে বসে ছবি আঁকবে। সেটাই তোমার কাজ।

আমার ছবি আঁকা তো শখের কাজ। আমি তো শিল্পী নই। তারপর যদি আমাদের ছেলে মেয়ে হয়, তুমি অফিসে যাবে, আর আমি ঘরে থেকে বাচ্চাকে খাওয়াব, ঘুম পাড়াব, স্কুলে দিয়ে আসব—

বা:! ওরকমভাবে বোলো না।

মধুময় তিক্তভাবে ‘হা-হা’ করে হেসে উঠল।

শিয়ালদা স্টেশনে পরের কাজটা হল নিখুঁতভাবে। দারুণ ভিড় সেদিন। পর পর কয়েকটা ট্রেন বাতিল হওয়ার ফলে সাংঘাতিক হুড়োহুড়ি শুরু হয়েছিল। এইসব দিন মধুময়দের কাজের পক্ষে খুব চমৎকার।

একটা ট্রেন থামার সঙ্গে সঙ্গে একদল যাত্রী হুড়হুড়িয়ে নেমে আসছে, আর একদল তক্ষুনি সেই ট্রেনে ওঠবার জন্য ঠেলাঠেলি শুরু করছে—সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে মধুময় একজন বুড়োলোককে এমন সুকৌশলে ল্যাং মারল যে, সেই বুড়ো বুঝতেই পারল না, কে তাকে মেরেছে।

বুড়োটি পড়ে গেল চিতপাত হয়ে, মাটিতে মাথা ঠুকে অজ্ঞানের মতন হয়ে গেল কয়েক মুহূর্তের জন্য। রতন আর ধনা চোখের নিমেষে ব্যাগটা তুলে নিয়ে সরে পড়ল। পরিষ্কার কাজ।

বুড়োটি চোখ মেলে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল।

আমার ব্যাগ? আমার ব্যাগ কে নিল? ওর মধ্যে যে আমার যথাসর্বস্ব ছিল গো?

এ-রকম অনেকেই বলে, মধুময় বিশেষ মনোযোগ দিল না। বিশেষত বুড়োলোকেরা কান্নাকাটি করে নাটক সৃষ্টি করতে ভালোবাসে। বুড়োটির মুখখানা ঠিক একটা শকুনির মতন। নিশ্চয়ই এক নম্বরের ধড়িবাজ!

আমার মেয়ের বিয়ের টাকা... আমার শেষ সম্বল...

সবাই মহাব্যস্ত, তবু বুড়োটির কান্নাকাটি শুনে একটা ভিড় জমে গেল। মধুময় একপাশে সরে দাঁড়াল। কেউ তাকে ল্যাং মারতে দেখেনি।

বুড়োটি উঠে বসে দারুণভাবে মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে বলল, আমি এখন বাড়ি ফিরব কী করে? ওরা আমাকে মেরে ফেলে গেল না কেন? আমার মেয়ের বিয়ে আটকে যাবে... প্রভিডেন্ট ফাণ্ড থেকে আজই সাড়ে তিন হাজার টাকা তুলে আনলাম... সামান্য স্কুলমাস্টারি করি...।

মধুময় ভুরু কোঁচকাল। এই বুড়োটা তাহলে স্কুলমাস্টার! দেখে কিন্তু মনে হয়েছিল, লোকটি এক নম্বরের ঘুঘু। মানুষ ঠকানোই এর পেশা।

লোকটি এমন ডুকরে কাঁদতে লাগল যে, সহানুভূতি না জেগে উপায় নেই।

একজন বলল, ও দাদু, পুলিশে খবর দিন।

আর একজন বলল, পুলিশে খবর দিলে ঘোড়ার ডিম হবে। এ-রকম তো হামেশাই হচ্ছে।

মধুময় ভাবতে লাগল, সত্যিই কি এই বুড়োলোকটির মেয়ের বিয়ের টাকা? অনেকে সহানুভূতি আকর্ষণের জন্য এ-রকম মিথ্যেকথা বলে।

কয়েকজন লোক ধরাধরি করে বুড়োটিকে নিয়ে গেল রেলওয়ে পুলিশের কাছে। মধুময়ও কৌতূহলী হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে।

লোকটি সত্যিই নিজেকে স্কুলমাস্টার বলে পরিচয় দিল। রিটায়ারমেন্টের আর মাত্র এক বছর বাকি। মেয়ের বিয়ে আর পাঁচদিন বাদে। প্রভিডেন্ট ফাণ্ড থেকে আজই টাকা তুলে এনেছিল। মোট সাড়ে তিন হাজার টাকা।

দু-জন যাত্রী সাক্ষী দিল তারা লোকটিকে চেনে। উনি থাকেন বেলঘরিয়ায়। পড়ান শ্যামবাজারের এক স্কুলে। অতিনিরীহ মাটির মানুষ। পাড়ার সবাই খুব ভক্তিশ্রদ্ধা করে। ওঁর মেয়ের জন্য সবাইকে নেমন্তন্ন পর্যন্ত করা হয়ে গেছে।

মধুময় এদিক-ওদিক তাকাল। অবশ্য কোনো লাভ নেই। রতন আর ধনা ভদ্রলোকের ব্যাগটা নিয়ে অনেক দূরে চলে গেছে।

মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকায় বিয়ে হয়? সাড়ে তিন হাজার টাকার জন্য বিয়ে আটকে যাবে?

আজ আর মধুময়ের ট্রেন ধরে দূরে যাওয়ার দরকার নেই। কেউ তাকে দেখেনি। সে এখন স্বচ্ছন্দে ফিরে যেতে পারে। তবু সে ট্রেনে উঠে পড়ল। সেই বুড়োলোকটার সঙ্গে একই কামরায়।

বুড়োলোকটি ট্রেনে বসেও কাঁদতে লাগল অনবরত। আর তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার বদলে অন্য লোকেরা শোনাতে লাগল আরও নানারকম চুরি ও রাহাজানির গল্প।

মধুময় একদৃষ্টে চেয়ে রইল বুড়োলোকটির মুখের দিকে। মুখ দেখে সবসময় মানুষ চেনা যায় না। এই লোকটি যদি অতিবদমায়েশই হবে তাহলে বুড়োবয়েস পর্যন্ত ইস্কুলে মাস্টারি করে গেল কেন? মানুষ ঠকানোর তো আরও অনেক ভালো ভালো উপায় আছে। এর আগে যাদের কাছ থেকে ব্যাগ কাড়া হয়েছে, তারাও সবাই কি বদমাশ ছিল তাহলে?

বেলঘরিয়া স্টেশনে নেমে আবার আর একটা কান্ড হল। বুড়োলোকটি হাত-পা ছড়িয়ে বসে পড়ল প্ল্যাটফর্মে। কিছুতেই বাড়ি যাবে না। বাড়িতে গিয়ে কী করে সে মুখ দেখাবে।

একদল যুবক উৎসাহী হয়ে বলে উঠল, ‘চলুন দাদু, আমরা আপনাকে পৌঁছে দিচ্ছি। কী আর করবেন বলুন। আপনাকে যে প্রাণে মারেনি এই ঢের। ওরা অনেকসময় ছোরাছুরি চালায়।

মারল না কেন! ওরা আমাকে মেরে ফেললেই আমি বাঁচতাম! মেয়েটার বিয়ে হবে না, সর্বনাশ হবে।

মধুময়ও ভিড়ে গেল সেই যুবকদের দলে। একটা রিকশায় বুড়োমানুষটাকে চাপিয়ে ওরা চলল পেছন পেছন।

বাড়ি খুব বেশি দূরে নয়। স্টেশন থেকে সাত-আট মিনিটের পথ।

‘বাড়ি’ মানে খুবই সামান্য ব্যাপার। দু-খানা ঘর, পাকা দেওয়াল হলেও ওপরে টিনের চাল। সামনের জমিতে ঢ্যাঁড়স আর বেগুন ফলে আছে।

বাড়ির সামনে বৃদ্ধটি আর একপ্রস্থ কান্না শুরু করতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল অনেকে। তাদের মধ্যে একটি মেয়েকে দেখে মধুময়ের যেন হৃৎপিন্ড থমকে গেল। একুশ-বাইশ বছরের একটি মেয়ে, সাধারণ তাঁতের শাড়িপরা, লাজুক ধরনের মুখখানা। খুব সম্ভবত এই মেয়েটিরই বিয়ে—

কিন্তু এই মেয়েটিকে মধুময় সেদিন চৌরঙ্গিতে দেখেছিল না? সেই লম্পট লোকটির সঙ্গে? মধুময়ের খুব ভালো মনে নেই, কিন্তু এর সঙ্গে খুবই মিল, সেই একইরকম মুখের লাজুক ভাব। যদি এই মেয়েটি না-ও হয়, তবু ঠিক এরই মতন একটি মেয়ে, ভদ্র পরিবারের, কিন্তু টাকার অভাবে ওইসব জায়গায় গিয়ে লম্পট ধনীদের খপ্পরে পড়তে বাধ্য হয়।

আর যদি সত্যিই এই মেয়েটি হয়? গ্র্যাণ্ড হোটেলে ঢুকতে রাজি হচ্ছিল না কিছুতেই। হয়তো মেয়েটি পুরোপুরি পাপের জীবনে যেতে চায়নি। বিয়ে করে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চেয়েছিল।

সাড়ে তিন হাজার টাকার জন্য মেয়েটির বিয়ে হবে না। মেয়েটি আবার বাধ্য হয়ে ওইসব লম্পটদের কাছে যাবে। মধুময়ের মাথার মধ্যে আগুন জ্বলছে—ন্যায়-অন্যায়বোধ সব গুলিয়ে যাচ্ছে। সে আজ, চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে একটি পরিবারের সর্বনাশের জন্য সে নিজে দায়ী।

তার পকেটে আজ মাত্র চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা আছে। অবশ্য হুট করে এদের টাকা দিতে গেলেই বা এরা কী ভাববে।

উলটো দিকের ট্রেন ধরে মধুময় ফিরে এল শিয়ালদায়। সেখানে আবার মানুষজন যেমন দৌড়োচ্ছিল তেমনিই দৌড়োচ্ছে। খানিক আগে যে একজন বৃদ্ধলোক এখানে সর্বস্বান্ত হয়েছে, তার কোনো চিহ্নই নেই। একটা বেঞ্চে চার জন পুলিশ বসে নিশ্চিন্তভাবে সিগারেট টানছে।

নির্দিষ্ট জায়গায় রতন, ধনারা নেই। মধুময়ের আজ অনেক দেরি হয়েছে। ওরা থাকবেই বা কেন?

পরদিন মধুময় পাগলের মতন খুঁজতে লাগল রতনদের। কোথাও ওদের পাত্তা নেই। সন্ধ্যের দিকে ওদের পাড়ার ফ্যাক্টরির পেছনের জমিতে ওদের আড্ডা বসে, সেদিন ওখানেও কেউ আসেনি। রতনের বাড়িতে তিন বার গিয়েও তাকে পাওয়া গেল না।

সারারাত ঘুমোতে পারল না মধুময়। পরদিন ভোর বেলা রতনের বাড়িতে গিয়ে তাকে ধরল।

ঘুমচোখে বেরিয়ে এসে রতন চমকে উঠল মধুময়কে দেখে। চোখ দুটো লালচে, উসকো-খুসকো চুল মধুময়ের। এ-রকম চেহারায় তাকে দেখা যায় না কখনো।

রতন ফিসফিস করে বলল, কী হল! তুই ধরা পড়েছিলি? তোকে মেরেছে?

মধুময় গম্ভীর গলায় বলল, না।

সেদিন তুই এলি না দেখে দারুণ ভয়ে পেয়ে গিয়েছিলাম মাইরি! ভাবলাম, নির্ঘাত তুই ধরা পড়েছিস।

তবু তোরা আমাকে দেখতে যাসনি।

কোনো লাভ আছে? সবাই মিলে ধরা দিয়ে লাভ কী বল?

আমার সঙ্গে একটু আয় রতন, জরুরি কথা আছে।

দু-জনে হাঁটতে হাঁটতে এসে বসল একটা পার্কে। মধুময়ের ব্যবহার দেখে রতন একটু ঘাবড়ে গেছে। সে পুরোনো পাপী, তাই পুলিশে ধরা পড়ার ভয় তার বেশি। সে মনে মনে ঠিক করেছিল, কয়েক দিনের জন্য বাড়ি থেকে গা-ঢাকা দেবে। তার অন্য আস্তানা আছে।

মধুময় সরাসরি বলল, পরশু আমরা যে-টাকাটা পেয়েছি সেটা ফেরত দিয়ে আসতে হবে—

রতন আকাশ থেকে পড়ল। টাকা ফেরত দিয়ে আসতে হবে? ছিনতাইয়ের টাকা কেউ ফেরত দেয়? ছেলেটার মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি!

মধুময় বলল, আমরা বেছে বেছে বদমাশ লোকেদের টাকা কাড়ব ঠিক করেছিলাম। অন্তত আমি সেইজন্য এসেছিলাম তোদের দলে। যাতে আমার বিবেক পরিষ্কার থাকে। কিন্তু পরশু আমাদের ভুল হয়েছে। লোকটা একজন নিরীহ স্কুলমাস্টার। ওটা ওর মেয়ের বিয়ের টাকা।

এসব ভাবালুতায় রতনের মন গলে না। সে বলল, হ্যাট! কীসব আগডুম-বাগডুম বকছিস? টাকা ফেরত দিতে গেলেই তো ধরা পড়ে যাবি!

মধুময় বলল, না, ধরা পড়ব না। আমি লোকটার বাড়ি দেখে এসেছি। লোকটার নাম জেনেছি। বাড়ির নম্বর আর রাস্তার নামও জেনে এসেছি। টাকাটা ওকে মানিঅর্ডার করে পাঠালে এখনও ওর মেয়ের বিয়ে হতে পারে।

পোস্ট অফিস থেকে টাকা পাঠাবি? পুলিশ ঠিক খোঁজ করে বার করে ফেলবে তোকে।

সে-ঝুঁকি আমি একলা নিতে রাজি আছি। কিন্তু আমি জানি, পুলিশ আমার খোঁজ পাবে না।

যাক বাবা! এসব কী আজব কথা! কিন্তু টাকাটা তো আমার কাছে নেই।

তার মানে?

তুই সেদিন এলি না বলে, ভাগ বাঁটোয়ারা হল না। পুরো টাকাটা আমি ধনার কাছে রেখেছি।

ঠিক বলছিস? যদি মিথ্যেকথা বলিস রতন, তাহলে কিন্তু ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। আমি এ লাইন আজ থেকে ছেড়ে দিচ্ছি ... কিন্তু এ টাকাটা ফেরত না-দিলে আমি তোদের সব কটাকে ধরিয়ে দেব!

শোন মধুময়, মিথ্যে নিয়েই আমাদের কারবার। পথে-ঘাটে হাজাররকম মিথ্যে বলি। সেইজন্যই দলের লোকদের কাছে কখনো মিথ্যেকথা বলি না একটাও। ওতে দল টেকে না।

তবু মধুময় পরীক্ষা করার জন্য জিজ্ঞেস করল, ব্যাগে কত টাকা ছিল?

সাড়ে তিন হাজার।

ঠিক আছে, আমি ধনার কাছে এক্ষুনি যাচ্ছি। তুইও চল আমার সঙ্গে।

আমি যাব না ভাই! তুই যে-রকম কথাবার্তা বলছিস, তাতে আমার ভয় লেগে যাচ্ছে। একসঙ্গে তিন জন এখন না জোটাই ভালো। তুই ধনার কাছ থেকে সব টাকাটা নিতে চাস নে, আমি আপত্তি করব না। তারপর সেই টাকা নিয়ে তুই যা-খুশি কর। কিন্তু লোক জানাজানি করিস না।

আর একটু দেরি করলে ধনাকে বাড়িতে পাওয়া যেত না। সে জামাকাপড় পরে বেরোবার জন্য তৈরি হচ্ছিল।

মধুময়কে দেখে সেও বলল, তুই ধরা পড়িসনি তাহলে!

মধুময় বলল, কেন, আমি ধরা পড়লে তোরা খুশি হতিস?

ধনা অবাক হয়ে বলল, যা:, কী বলছিস! তুই ধরা পড়লে আমরা খুশি হব কেন? তুই আমাদের নাম বলে দিলে তো আমরাও ফেঁসে যেতাম।

হয়তো ভেবেছিলি, আমাকে আর ভাগ দিতে হবে না।

তোর বখরা নিতে এসেছিস বুঝি? কিন্তু তোকে ক-দিন সবুর করতে হবে ভাই।

কেন?

আমি টাকাটা সব খরচ করে ফেলেছি।

মধুময় সঙ্গে সঙ্গে ধনার গলা চেপে ধরে বলল, তোকে আমি খুন করে ফেলব। আমার সঙ্গে চালাকি করতে এসেছিস?

মধুময়ের তুলনায় ধনার গায়ের জোর অনেক কম। সে মধুময়ের সঙ্গে কিছুতেই পারবে না। অসহায়ভাবে মধুময়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, আমাকে মেরে ফেলতে চাস, মেরে ফেলিস। কিন্তু আজ নয়, আজ ছেড়ে দে। আজ আমার ভীষণ দরকার, আমাকে এক্ষুনি যেতে হবে।

তার চেয়েও অনেক বেশি দরকারি কাজে আমি এসেছি—পরশুর পুরো টাকাটা আমার চাই। রতনের সঙ্গে দেখা করে এসেছি, সে রাজি হয়েছে।

বললাম তো খরচ হয়ে গেছে। তোর ভাগটা আমি পরে শোধ করে দেব।

তোকে আমি শেষ করে দেব, ধনা!

আমার কথাটা আগে শোন। আমার গলাটা ছাড়। আমার মা নার্সিং হোমে, আমাকে এক্ষুনি সেখানে যেতে হবে। আমার মা কাল মরতে বসেছিলেন। কাল হঠাৎ মায়ের অ্যাপেনডিক্স বার্স্ট করেছে। তক্ষুনি অপারেশন না করালে বাঁচবার কোনো আশাই ছিল না। কোনো হাসপাতালে জায়গা পাইনি, তাই নার্সিং হোমে ভরতি করালাম। তিন জন বড়ো ডাক্তারের ফি, চোদ্দো বোতল রক্ত কিনতে হয়েছে বাইরে থেকে, ডবল দাম দিয়ে...

আমি তোর একটা কথাও বিশ্বাস করি না।

তুই চল আমার সঙ্গে নার্সিং হোমে ... আমি কোনোদিন বন্ধুবান্ধবকে বিট্রে করি না ... কাছে যদি টাকাটা না থাকত, তাহলে কিছু করার উপায় ছিল না। কিন্তু টাকা রয়েছে আমার কাছে, অথচ আমার মা বিনা চিকিৎসায় মারা যাবেন, এটা আমি সহ্য করতে পারি? তুই বল? আমার তিনটে ছোটো ভাই-বোন আছে। মা মারা গেলে ওদের নিয়ে আমি একেবারে পথে বসতাম!

মধুময়ের তুলনায় ধনার বাড়ির অবস্থা অনেক খারাপ। মধুময়ের তবু বাবা বেঁচে আছেন এবং চাকরি করেন, ধনার বাবা মারা গেছেন অনেক দিন।

মধুময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কিন্তু টাকাটা খরচ হয়ে গেল। জানিস, একটা মেয়ের বিয়ে বন্ধ হয়ে গেল এজন্য, হয়তো তার ভবিষ্যৎটাই—

কার বিয়ে?

মধুময় ঘটনাটা খুলে বলল। ধনারও মনের ভাব হল রতনের মতনই। সে ভাবল, মধুময় বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করছে।

সে মধুময়ের হাত চেপে ধরে অভিযোগের সুরে বলল, তুই এইকথা বলছিস? একটা মেয়ের বিয়ে আটকে যাওয়া কি আমার মায়ের মৃত্যুর চেয়ে বড়ো কথা? আমার মা মরলে তুই খুশি হতিস?

আঃ! বাজে বকিস না। এ-রকম কোনো তুলনা চলে না। তুই কাল এলে আমি টাকাটা দিয়ে দিতে পারতাম। তারপর আমার মা মরলে মরতেন!

আমি সে কথা বলিনি।

মেয়েটির পরে আবার বিয়ে হতে পারে।

কী করে হবে? ওর বাবার শেষ সম্বল ওই সাড়ে তিন হাজার টাকা।

আমরা আর চার-পাঁচটা কেস করে কিছু টাকা তুলে ওদের পাঠিয়ে দিতে পারি।

আমি এ লাইনে আর নেই। আর কোনোদিন যাব না আমি তোদের সঙ্গে।

দু-দিন একটু মাথা ঠাণ্ডা করে থাক। আমি নার্সিং হোমে যাচ্ছি রে।

সেদিন সন্ধ্যে বেলা স্বপ্নার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা। ভালো করে স্নান-টান সেরে কাচা জামা- কাপড় পরে বেরিয়ে পড়ল মধুময়। মুখখানা তার শুকনো বিষণ্ণ। সে নিজেই বুঝতে পারছে।

স্বপ্নার সামনে এসে সে হাসি ফোটাল জোর করে। প্রথমে দেখল একটা সিনেমা। তারপর বেরিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে খাবে।

স্বপ্না বলল, আজ আমি খাওয়াব কিন্তু, তুমি পয়সা খরচ করতে পারবে না।

মধুময় একটুও আপত্তি করল না।

ওরা বসল একটা কেবিনে। এখানেও ওরা মুখোমুখি দু-জন। কিন্তু ট্রেনের কামরার সঙ্গে কত তফাত। একটা পর্দা সরে গেলেই বাইরে থেকে একগাদা লোভী চোখ উঁকি মারে।

স্বপ্না যাতে কিছুতেই বুঝতে না পারে, সেইজন্য মধুময় মুখে হাসি ফুটিয়ে রেখে নানারকম আবোল-তাবোল কথা বলে যাচ্ছে। কিন্তু তার দুটো জীবন আর আলাদা নেই।

আজ আর মধুময়ের জামায় রক্তের ছিটে নেই, তবু তার সর্বাঙ্গ অশুচি বলে মনে হচ্ছে। সে স্বপ্নার হাতটাও ধরল না। বার বার মনে পড়ছে বেলঘরিয়ার সেই ছোট্টবাড়িটার মেয়েটির কথা। সে কত আশা করেছিল কয়েক দিন বাদে তার বিয়ে হবে... আর হবে না। মেয়েটি আবার চৌরঙ্গিতে এসে দাঁড়াবে, সংসার চালাবার দায়ে লোভী ধনীদের শিকারের জন্য। মধুময়ই এজন্য দায়ী। মধুময়ই দায়ী? মেয়েটির বিয়ে হওয়া বড়ো, না ধনার মায়ের চিকিৎসা? কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায়?

ওই মেয়েটি আর তার বাবাকে সাহায্য করার জন্য মধুময় কি আবার ছিনতাই-এর কাজে নামবে? ওদের সাহায্য করার জন্য অন্য লোকদের টাকা কেড়ে নেওয়া কি ঠিক? আবার যদি তাদের মধ্যে কেউ ওই বুড়োলোকটির মতন....

মধুময় ডাকল, স্বপ্না?

স্বপ্না বলল, কী?

মধুময় বুঝতে পারল, এই প্রশ্ন স্বপ্নার কানে তুলে কোনো লাভ নেই। স্বপ্না কিছুই বুঝতে পারবে না। তাই সে হাসিমুখে বলল, না, কিছু না।

তারপর মুখটা ফিরিয়ে নিয়েই কেঁপে উঠল। কিছুতেই সামলাতে পারল না নিজেকে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপেও আটকাতে পারল না। মধুময় নি:শব্দে কেঁদে উঠল। চোখ দিয়ে পড়তে লাগল বড়ো বড়ো জলের ফোঁটা।

স্বপ্না প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে গেল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে এসে মধুময়ের মুখখানা দু-হাতে তুলে ধরে বলল, এই এই, কী হয়েছে তোমার? কী হয়েছে বলো না। আমাকে বলো—

মধুময় মুখ নীচু করে বলল, কিছু না, কিছু না, এমনিই হঠাৎ বোকার মতন।

স্বপ্না বলল, ভেঙে পোড়ো না, লক্ষ্মীটি। একটা কিছু পেয়ে যাবে নিশ্চয়ই। আর না পেলেই- বা চাকরি! আমি তো রয়েছি। লক্ষীটি শোনো—

মধুময় চোখ মুছে ফেলল। সে যে, ন্যায়-অন্যায়ের দারুণ দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে, সে-কথা বলা যাবে না স্বপ্নাকে। কারুকেই বলা যাবে না। এই একটা ব্যাপারে মধুময় দারুণ একা।

রতন একদিন বলল, এবার একটা বড়োগোছের কাজে হাত দিতে হবে। তোরা রাজি আছিস?

দলের সবাই সঙ্গে সঙ্গে রাজি। শুধু চুপ করে ছিল মধুময়। কথা হচ্ছিল রবারের কারখানার পেছনের মাঠে। মধুময় ভাবছিল, এই দলে মেশা সে ছেড়ে দেবে। সে তার বিবেককে মোটেই বশ করতে পারছে না। তবু হঠাৎ সে বলে উঠল, যদি সত্যি খুব বড়ো কাজ হয়, তা হলে আমি রাজি আছি।

রতন মধুময়ের পিঠ চাপড়ে বলল, এই ছেলেটার হিম্মত আছে। এ একদম ভয় পায় না আমি দেখেছি।

কী কাজ রতনদা?

রাস্তাঘাটে লোকদের ল্যাং মারা বড়ো ছিঁচকে কাজ, ওতে আর আনন্দ নেই। এবার একটা বড়ো কাজ করলেই কয়েক মাস ফুর্তিতে কাটিয়ে দেওয়া যাবে। কাজটা হচ্ছে লোকাল ট্রেনে ডাকাতি। ট্রেনের কোনো একটা কামরায় উঠে দুটো খেলনা পিস্তল আর দুটো ছুরি নিয়ে ভয় দেখালেই বাঙালিরা ভয়ে কাঁপতে থাকে। তখন তাদের পকেটের মানিব্যাগ আর হাতঘড়ি-টরিগুলো খুলে নিতে বেশি সময় লাগে না। খুব সহজ কাজ। খবরের কাগজে এ-রকম প্রায়ই বেরোয়। কেউ ধরা পড়ে না।

রতনের শাগরেদ ধনা বলল, শুধু খেলনা পিস্তল কেন ওস্তাদ? আর কিছু থাকবে না?’

মধুময় বলল, রতনদা, আমার একটা কণ্ডিশান আছে, সেটা আগে থেকেই বলে রাখা দরকার।

কী?

এই কাজটা করার পর আমি তোমাদের দল একেবারে ছেড়ে দেব। আমার সঙ্গে তোমরা কেউ কোনোদিন আর যোগাযোগ করতে পারবে না। আর, এই কাজে যতই টাকা উঠুক, আমাকে অন্তত সাড়ে তিন হাজার টাকা দিতেই হবে।

ধনা বলল, তুই বুঝি এখনও সেই বুড়োলোকটাকে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা ভাবছিস? তুই পাগল নাকি রে?

মধুময় উত্তর দিল, সব মানুষেরই কিছু কিছু পাগলামি থাকে। ধরে নে, এটাই আমার পাগলামি।

রতন বলল, ঠিক আছে, মেনে নিলাম। তোকে আমি দেব ওটাকা।

ধনা ‘হুররে’ বলে লাফিয়ে উঠে বলল, আমি একটা পাইপগান জোগাড় করতে পারব।

রতন বলল, তাহলে তো আরও ভালো। দু-খানা বড়ো ছুরি আমার নিজের কাছে আছে। মধুটার বেশ ষন্ডা চেহারা আছে, তুই মধু একখানা ছুরি নিয়ে কামরায় দরজার কাছে দাঁড়াবি।

মধুময় আপত্তি তুলল। সে বলল, কিন্তু রতনদা, এ তো নিরীহ লোকেদের ওপরে ডাকাতি করা হবে। খারাপ লোকদের শাস্তি দেওয়া তো হবে না। ট্রেনের কামরায় তো আমাদের মতন লোকেই থাকে।

ধনা বলল, ফার্স্ট ক্লাস না সেকেণ্ড ক্লাস?

রতন বলল, ফার্স্ট ক্লাসে ঢুকে কোনো লাভ নেই। ফার্স্ট ক্লাসে আজকাল বেশিরভাগ লোকই পাসে যায় কিংবা বিনা টিকিটে। এ ছাড়া মাঝে দু-একজন মিলিটারি অফিসার থাকে, তাদের কাছে রিভলবার থাকতে পারে।

কথা থামিয়ে রতন মধুময়ের দিকে চেয়ে রইল। তারপর বলল, এ ছেলেটা ঠিকই বলেছে। নিরীহ লোকেদের ওপর আমরা হামলা করব না। তবে, তোকে একটা কথা বলছি মধু, তুই কাগজে দেখেছিস, ট্রেনের কামরায় এ-রকম ডাকাতি হলেই কোনো একটা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পাঁচ, সাত কী দশ হাজার টাকা খোওয়া যায়। লোকাল ট্রেনে একটা লোক এতটাকা নিয়ে যাতায়াত করে কেন? নিশ্চয়ই ব্ল্যাকমানি। গভর্নমেন্ট নিয়ম করেছে ব্যাবসার বড়ো বড়ো লেনদেন সব চেকে করতে হবে। তবু যারা পকেটে নোটের তাড়া নিয়ে ঘোরে, তাদের মতলব খারাপ নয়? তুই কী বলিস?

মধুময় বলল, তা ঠিক।

আমরা খবর রাখব ... ট্রেনে ট্রেনে ঘোরাঘুরি করে কিছু লোককে ওয়াচ করব।

সাঁতরাগাছির দিকটা রতনের খুব চেনা। ওখানকার লাইনে পালানোর সব ঘোঁতঘাত সে জানে। কাজ হাসিল করার পর এক জায়গায় চেন টেনে ওরা ঝপাঝপ লাফিয়ে নেমে পালাবে।

আগে তিনবার ওরা সাঁতরাগাছির লোকাল ট্রেনে ঘুরে এল। কোনোরকম অসুবিধে নেই। চাল-স্মাগলাররা যখন-তখন চেন টানে এ লাইনে। ট্রেনও দিব্যি ভালো ছেলের মতন থেমে যায়। আর্মড গার্ড-ফার্ড কিছু নেই। এদিকে কয়েকটা কোল্ড স্টোরেজ আছে। ব্যাগভরতি তাড়া তাড়া নোট নিয়ে এ লাইনে প্রায়ই ব্যবসায়ীরা ঘোরাফেরা করে।

দিন ঠিক হল মে মাসের তিন তারিখ। দুপুর একটা চল্লিশের ট্রেন। ওই সময় বেশিরভাগ লোকই ঝিমোয়। আর কামরায় গোলমাল হলেও পাশের কামরার লোকেরা শুনতে পাবে না।

দলে থাকবে পাঁচজন। রতন, ধনা, কল্যাণ, বিশু আর মধুময়।

দু-জন ব্যবসায়ীকে শেওড়াফুলিতে সকাল থেকে ফলো করবে রতন আর কল্যাণ। টাকা- পয়সার খবর ঠিকঠাক থাকলে তবেই কাজ শুরু হবে।

সবই ঠিকঠাক মিলে গিয়েছিল। একটা বড়ো কামরায় আলাদাভাবে ছড়িয়ে খুব নিরীহভাবে বসেছিল ওরা। যেন কেউ কাউকে চেনে না। সকলের হাতে একটা কোনো কাগজ কিংবা বই, যেন যে-যার পড়াশুনো নিয়ে মগ্ন হয়ে আছে।

তারপর একসময় দুটো স্টেশনের মাঝখানে হঠাৎ হুংকার দিয়ে উঠে দাঁড়াল ওরা পাঁচ জন। রতনের গলাটাই সবচেয়ে বাজখাঁই, সে হুংকার দিয়ে বলে উঠল, খবরদার, কেউ ‘টুঁ’ শব্দটি করবে না! মধুময়ের হাতে ঝলমল করে উঠল একটা মস্তবড়ো ভোজালি। সে দাঁড়াল দরজা আটকে।

কথা ছিল সাধারণের ঘড়ি, মানিব্যাগ নেওয়া হবে না। কিন্তু কিছু যাত্রী ভয় পেয়ে নিজের থেকে তাদের ঘড়ি আর মানিব্যাগ ছুড়ে দিতে লাগল ওদের পায়ের কাছে। একজন ভদ্রমহিলা হাউ হাউ করে কেঁদে উঠে নিজের হাতের চুড়ি খুলতে লাগলেন আর বলতে লাগলেন, আমার ছেলেকে কিছু বোলো না। আমার একমাত্র ছেলে—

ধনাটা লোভীর মতন কুড়িয়ে নিতে লাগল সেই সব ঘড়ি, মানিব্যাগ আর চুড়ি। রতন আর কল্যাণ দু-জন যাত্রীর হাতব্যাগ ধরে টানাটানি করছে। এই সময় একটা যাত্রী হঠাৎ তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে চেন টেনে দিল। আর চিৎকার করতে লাগল তারস্বরে।

বিশু তার বুকের কাছে খেলনা পিস্তল ঠেকিয়ে ধমকাতে লাগল, খবরদার! একদম চুপ! মেরে ফেলব একেবারে!

ট্রেন থেমে এল আস্তে আস্তে, দুটো বাচ্চাছেলে মধুময়ের বগলের ফাঁক দিয়ে গলে লাফিয়ে পড়ল মাটিতে।

মধুময় তাদের আটকাতে পারল না। ভেবেছিল, অত বড়ো ভোজালিটা দেখেই সবাই ভয় পাবে। কিন্তু কেউ ভয় না পেলে তার গায়ে ভোজালির কোপ বসাবার কথা মধুময় চিন্তাই করেনি। ছেলে দুটো মধুময়কে ভয় পেল না কেন? তার মুখ দেখেই কি ওরা বুঝে গিয়েছিল যে, সে কারুকে মারতে পারবে না? সে একজন শৌখিন ডাকাত?

রতন আর কল্যাণ তখনও ব্যাগ দুটো ছিনিয়ে নিতে পারেনি বলে, মধুময় বুঝতে পারছিল না কী করা উচিত।

এদিকে বাচ্চা দুটো মাটিতে নেমে চিৎকার করতে লাগল, ডাকাত! ডাকাত! মেরে ফেলল সবাইকে—মেরে ফেলল!

রতন হুকুম দিল, রিট্রিট!

পাশের কামরাগুলো থেকে যাত্রীরা বেরোবার আগেই ওরা দৌড়োল মাঠের মধ্যে দিয়ে। কিছু যাত্রী খানিকটা পথ তাড়া করে এল বটে কিন্তু ওদের কেউ ছুঁতে পারল না।

প্রায় তিন মাইল দূরে একটা বাঁশঝাড়ের পাশে ওরা একটু বিশ্রাম নিতে বসল। তখন দেখা গেল ওদের মধ্যে একজন কম। পাঁচ জনের মধ্যে চার জন এসেছে। বিশু নেই। বিশু কি তাহলে অন্য দিকে পালিয়ে গেল?

ধনা বলল, বিশেটাকে আমি কিন্তু মাইরি ট্রেন থেকে নামতে দেখিনি।

রতন তার কলার চেপে ধরে বলল, শালা, সে-কথা তুই আগে বলিসনি কেন?

ধনা বলল, বললেই-বা কী হত? তুই কি তাহলে ফিরে যেতিস তাকে আনতে?

বেচারা বিশু, খেলনা পিস্তল নিয়ে ধরা পড়ে গেছে।

রতন বলল, এখানে বসে থাকলে আরও ডেঞ্জার আছে। এক্ষুনি সার্চপার্টি আসতে পারে। চার জন চারদিকে ছড়িয়ে পড়। নিজের বাড়িতে ফিরে যাসনি এখন। বিশুটা প্যাঁদানি খেয়ে নির্ঘাত সবার নাম বলে দেবে।

মধুময়ের গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। সে বলল, বাড়ি ফিরব না? তাহলে আমি যাব কোথায়?

রতন জিজ্ঞেস করল, তোর কি অন্য কোথাও লুকোবার জায়গা নেই?

মধুময়ের চকিতে মনে পড়ে গেল স্বপ্নার কথা। নিজেদের বাড়িতে না ফিরে সে স্বপ্নার কাছে গিয়ে বলতে পারে, আমি ট্রেন ডাকাতি করে এসেছি। আমাকে তোমার কাছে লুকিয়ে রাখো।

সে ঘাড় নেড়ে বলল, না, নেই।

এই খেয়েছে! তাহলে কী হবে? বাড়ি ফিরলেই তো ধরা পড়ে যাবি। ঠিক আছে, তুই আয় আমার সঙ্গে।

তক্ষুনি উঠে ওরা ছড়িয়ে পড়ল বিভিন্ন দিকে। মধুময়ের বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ করছে। এর আগে সে কখনো রাত্রে বাড়ির বাইরে থাকেনি। ব্যাপারটার গুরুত্বও যেন সে বুঝতে পারেনি আগে। ধরা পড়া মানেই তো জানাজানি হয়ে যাওয়া। স্বপ্না জেনে যাবে যে, সে ট্রেনে ডাকাতি করতে গিয়েছিল।

সে রতনকে জিজ্ঞেস করল, কত দিন আমরা বাড়ির বাইরে থাকব? বাড়ির লোকই তো পুলিশে খবর দেবে।

রতন বলল, দু-তিন দিন ঘাপটি মেরে থাকলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ঘাবড়াসনি।

রতনের সঙ্গে মধুময় বড়োরাস্তায় এসে বাস ধরল। আধ ঘণ্টা বাদে সেই বাস থেকে নেমে আবার ধরল উলটো দিকের একটা বাস। এইরকম ভাবে, প্রায় পাঁচ বার গাড়ি বদল করে সন্ধ্যা নাগাদ তারা এসে পৌঁছোল হাওড়ায়।

ব্রিজ পেরিয়ে ওরা কিন্তু কলকাতায় এল না। একটা ট্যাক্সি নিয়ে হাওড়া শহরের মধ্যেই অনেক গলি ঘুরে ঘুরে থামল এসে একটা বাড়ির সামনে।

একটা খুব পুরোনো আমলের দো-তলা বাড়ি। সিঁড়ি দিয়ে দো-তলায় ওঠার পর রতন চেঁচিয়ে ডাকল, মুক্তো! ও মুক্তো—

তিরিশ বত্রিশ বছরের একটি স্ত্রীলোক বেরিয়ে এসে রতনকে বলল, কী ব্যাপার?

রতন একগাল হেসে বলল, তোমার এখানে থাকব আজ, সঙ্গে এক বন্ধুকে নিয়ে এসেছি। মুক্তো নামে সেই স্ত্রীলোকটি বলল, থাকবে কী গো! বলা নেই কওয়া নেই হুট করে এসে থাকব বললেই কী হয়? আমার ঘরে আজ লোক আছে।

মধুময় এসব কথার মানে কিছুই বুঝতে পারল না। এটা কি একটা হোটেল?

রতন বলল, তোমার ঘর আটকা? তাহলে ছাদে সেই যে ছোটো একটা ঘর ছিল?

সেখানে থাকবে? কেন বাপু? মুখ দিয়ে এখনও দুধের গন্ধ যায়নি, বাড়ি যাও না! মা-বাবা চিন্তা করবে না?

আঃ বাজে কথা ছাড়ো, থাকতে দেবে কি-না বল না?

মুক্তো ঘরের ভেতর ঢুকে গিয়ে একটা চাবি নিয়ে এল। সেটা রতনের হাতে দিয়ে বলল, যাও, ঘর খুলে বোসোগে! আমি যাব অখন একসময়।

সিঁড়ি দিয়ে রতন আর মধুময় উঠে এল ছাদে। একটা লম্বাটে ছোট্ট ঘর। চাবি খোলার পর দেখা গেল, সে ঘরের মেঝেতে একটা তেলচিটে মাদুর পাতা আছে শুধু, আর কিছু নেই।

মধুময় জিজ্ঞেস করল, এটা কার বাড়ি রতনদা? ওই মেয়েটি তোমার আত্মীয়?

রতন বলল, সব আস্তে আস্তে টের পাবি। এখন মুখ বুজে থাক, বেশি কথা জিজ্ঞেস করিস না। তুই বাড়িতে না ফিরলে তোর বাড়ির লোক চিন্তা করবে?

তা তো করবেই। আমি অবশ্য বলে এসেছি, তারকেশ্বরে এক বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছি ...আজ রাত্তিরে না ফিরলে ভাববে হয়তো সেখানে আটকে গেছি, কিন্তু কাল সকালে—

এখানে চার-পাঁচ দিন ঘাপটি মেরে থাকা দরকার... সব ব্যাপারটা কেঁচে গেল।

চার-পাঁচ দিন!

এ-লাইনে এলে একটু ঝুঁকি নিতেই হয়।

রতনদা, তুমি আগে বলনি।

আগে কী বলব? তুই কি কচি খোকা? কিছু বুঝিস না?

মধুময় সত্যিই তো কচিখোকা নয়। তার তো জানা উচিত ছিল যে, আগুনে হাত দিলে একবার-না-একবার হাত পুড়ে যেতেই পারে। মধুময় নিজের ডান হাতের পাঞ্জার দিকে তাকাল, সত্যিই যেন, সেখান থেকে পোড়া পোড়া গন্ধ বেরোচ্ছে।

রতন তার কাঁধে একটা চাপড় মেরে বলল, আরে, এখনই এত ঘাবড়াচ্ছিস কেন?

ব্যবসায়ীটির কাছ থেকে হাতব্যাগটা ছিনিয়ে আনতে না পারলেও কোনো এক ফাঁকে রতন ছ-গাছি সোনার চুড়ি, তিনটি মানিব্যাগ আর তিনটে হাতঘড়ি ঠিক হাতিয়ে আনতে পেরেছে।

দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে রতন মানিব্যাগগুলো খুলে মাদুরের ওপর ঝাড়তে লাগল। সব মিলিয়ে তিন-শো বারো টাকা আছে। একটা মানিব্যাগের মধ্যে একটি বাচ্চাছেলের ছবি। সেই ছবিটার দিকে তাকাতেই লজ্জা করল মধুময়ের।

রতন ছবিটা কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলল, আর যা-কাগজপত্র ছিল সবই ছিঁড়ে ফেলে লুকিয়ে রাখল মাদুরের তলায়। ব্যাগগুলো নিয়ে সে কী করবে ভেবে এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর বেরিয়ে গেল দরজা খুলে!

ছাদের কোণে একটা গঙ্গাজলের ট্যাঙ্ক। সেই ট্যাঙ্কের ঢাকনা খুলে অনেকখানি মুখ ঝুঁকিয়ে রতন ব্যাগ তিনটেকে গেঁথে রাখল জলের তলায় মাটিতে। তারপর নিশ্চিন্ত মুখ করে ফিরে এল ঘরে।

একটা ঘড়ি সে নিজের হাতে পরে অন্য আর একটা ঘড়ি মধুময়কে দিয়ে বলল, ‘পরে নে’।

মধুময় ঘড়িটা ফেরত দিয়ে বলল, আমার দরকার নেই। তুমিই রাখো।

রতন বলল, আমি এতগুলো ঘড়ি নিয়ে কী করব? একটা রাখ তোর কাছে—

ঘড়িটা সে ছুড়ে দিল মধুময়ের কোলের ওপর।

বাকি ঘড়িটা আর সোনার চুড়িগুলো সে নিজের পকেটে রাখল।

টাকাগুলো থেকে গুনে গুনে সে এক-শো টাকা তুলে নিয়ে মধুময়ের হাতে দিয়ে বলল, এই টাকাগুলো তোর পকেটে রাখ। আজ দুপুরের ব্যাপারটা নিয়ে তুই মুক্তোকে কিছু বলবি না। যা, বলার আমি বলব, তোকে আমি সাজাব একটা কয়লাখনির মালিকের ছেলে। আমি ওকে বলব— রতনের তুলনায় মধুময় বেশি পড়াশুনো করেছে, সে খবরও রাখে অনেক বেশি। সে বলল, কয়লাখনির আবার এখন কোনো মালিক আছে নাকি? সব খনি তো গভর্নমেন্ট নিয়ে নিয়েছে।

রতন তাতে একটুও থতোমতো খেল না, সে অবহেলার সঙ্গে বলল, তোর ওসব ফ্যাকড়া তুলতে হবে না। মুক্তো ওসব কিছু বোঝে না। আমি বলব, তোকে নিয়ে আমরা এখানে ফুর্তি করতে এসেছি। দেখিস, মুক্তো এইকথা শুনেই বলবে, ফুর্তি করতে এসেছ! এ লাইনে নতুন দেখছি! এই বলেই তোর থুতনিতে হাত দিয়ে একটু আদর করবে। তুই তখন ওই পুরো এক-শো টাকা তুলে দিবি মুক্তোর হাতে। ছ্যাঁচড়ামি করে দু-একটা দশ টাকার নোট লুকিয়ে রাখিস না যেন, পুরোটাই দিবি, তাহলে দেখবি খুব খাতির করবে।

মধুময়ের শরীরে একটা শিহরন লাগল। মুক্তোর জীবিকা কী, এখন তা বুঝতে আর কোনো অসুবিধে নেই। সে কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি যে, কোনোদিন এ-রকম কোনো বাড়িতে এসে সে রাত কাটাবে।

জায়গাটা রতনের বেশ পরিচিত দেখা যাচ্ছে। সে আবার ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির কাছে এগিয়ে গিয়ে ডাকতে লাগল, হরিয়া, এ হরিয়া!

একটু পরে একজন বেশ জোয়ান শক্তসমর্থ চেহারার বুড়োলোক উঠে এল ছাদে।

রতন তাকে প্রথমে একটা দশ টাকার নোট দিয়ে বলল, রুটি আর তড়কা এনে দাও তো হরিয়া। তারপর আরও একটা দশ টাকার নোট বার করে দিয়ে বলল, মুরগির মাংসও আনবে। আবার দুটো দশ টাকার নোট দিয়ে বলল, আর তিন চার বোতল বিয়ার!

লোকটি চলে যেতেই রতন উপুড় হয়ে মাথা গুঁজে শুয়ে পড়ল, আর একটু বাদেই তার নাক ডাকতে লাগল।

মধুময় বসে রইল গুম হয়ে। এক দিনের মধ্যেই এত কান্ড হয়ে গেল যে, সে খানিকটা দিশাহারা বোধ করছিল। সে কিন্তু ঠিক ভয়ও পায়নি। বরং এইসব নিষিদ্ধ ব্যাপারে খানিকটা রোমাঞ্চই অনুভব করছিল মনে মনে। তিন-চারদিন বাড়ি না ফিরলে, বাড়িতে কী ধরনের হই-চই হবে, কে জানে! সে যাই হোক, ফিরে গিয়ে মধুময় কোনো রকমে সব ঠিক ম্যানেজ করে নেবে। শুধু যেন, স্বপ্নার কানে কোনো কথা না যায়।

কিন্তু সেই সাড়ে তিন হাজার টাকা জোগাড় করা হল না। এ যাত্রায় যদি মধুময় বেঁচেও যায়, আর এরপর এই লাইন, একেবারে যদি ছেড়েও দেয়, তবু সারাজীবন তার মনের মধ্যে একটা গ্লানি থেকে যাবে। রাত্তির বেলার দিকে চৌরঙ্গিতে আবছা অন্ধকারে কোনো ধনী লম্পটের পাশাপাশি কোনো ভীরু লাজুক চেহারার বাঙালি মেয়েকে দেখলেই তার মনে হবে, সেই মেয়েটির দুর্ভাগ্যের জন্য মধুময়ই দায়ী।

হরিয়া খাবার নিয়ে এল প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে। দুটো ভাঁড়ে মাংস আর তড়কা, ঠোঙার মধ্যে রুটি আর পেঁয়াজ কাঁচা লঙ্কা, আর চার বোতল বিয়ার।

রতন প্রথমেই হরিয়াকে দুটো রুটি আর খানিকটা তড়কা আর মাংস তুলে দিয়ে বলল, এই নাও। খাও।

হরিয়া বলল, এ বাবু, হামাকে থোড়াসা বিয়ার পিলান!

যাও তোমার গেলাস নিয়ে এসো, আর আমাদের জন্যেও দুটো গেলাস এনো।

রতন নিজে খেতে শুরু করে দিল সঙ্গে সঙ্গে। মধুময় ঠিক শুরু করতে পারছে না। হাত-টাত ধোওয়া হয়নি। সারা গা ঘামে চিটচিট করছে। ভালো করে জল দিয়ে মুখ হাত না ধুতে পারলে তার খেতে রুচি হচ্ছে না।

রতন বলল, পেট ভরে খেয়ে নে মধু।’

মধুময় অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল রতনের দিকে।

রতন বলল, দেখছিস তো, পেট খালি রাখলেই নানারকম দুশ্চিন্তা আসে। দু-চারদিন আমরা এখানে খাব-দাব, ঘুমোবো, তারপর দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।

মধুময়েরও খুব খিদে পেয়েছিল। আর দেরি না করে সেও একটা রুটি তুলে নিয়ে মাংসের ঝোলে ডোবাল।

হরিয়া তিনটে গেলাস নিয়ে এসেছে। সে দরজার বাইরে বসে নিজের গেলাস থেকে চুক চুক করে বিয়ার খাচ্ছে।

কি—সব বিয়ার শেষ করে ফেললে? দরজা ফাঁক করে দাঁড়াল মুক্তো।

রতন বলল, না না, তোমার জন্যও রেখেছি। এই হরিয়া, আর একটা গেলাস।

মুক্তো বলল, গেলাস লাগবে না। বলে একটা বোতল তুলে নিয়ে ঢক ঢক করে ঢালল গলায়। তারপর তৃপ্তির সঙ্গে বলল, আঃ! আজ বড্ড খাটুনি গেছে।

মধুময় কিছুতেই বিস্ময় লুকোতে পারছে না মুক্তোকে দেখে। তার চোখ দু-টি বিস্ফারিত। জীবনে এটা তার একটা নতুন অভিজ্ঞতা।

মুক্তো পরে আছে শুধু একটা কালো শায়া আর একটা সাদা ব্রেসিয়ার। তার স্বাস্থ্য বেশ ভরাট, ব্রেসিয়ার উপছে বেরিয়ে আছে দুই স্তন। এইরকম পোশাকে কোনো মেয়ে যে পুরুষদের সামনে আসতে পারে, সিনেমায় নয়, বাস্তবজীবনে, এ-রকম ধারণাই ছিল না মধুময়ের। এজন্য বিন্দুমাত্র সংকোচ নেই মুক্তোর, এমনকী হরিয়ার মতন একজন ভৃত্যশ্রেণির লোক যে বসে আছে, তা-ও সে গ্রাহ্য করছে না।

আজ আবার এ কাকে নিয়ে এসেছ? মুক্তো প্রশ্ন করল রতনকে।

রতন বলল, এ আমার এক বন্ধু, একটা কয়লাখনির মালিকের ছেলে...

মুক্তো খিল খিল করে হেসে উঠল। হাসির সঙ্গে সঙ্গে, তার স্তন দু-টি কাঁপতে থাকে।

নতুন যে আসে, সে-ই তো শুনি কয়লারখনির মালিকের ছেলে! দেশে কত কয়লার খনি আছে গো?

মধুময় ততক্ষণে পকেট থেকে সেই এক-শোটা টাকা বার করে হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছে মুক্তোর দিকে।

বাপের পকেট মারা হয়েছে বুঝি? আসতে-না-আসতেই টাকা দিচ্ছ যে—

মধুময় এরপর আর কী কথা বলবে বুঝতে পারল না। সে মুক্তোর দিকে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতেও লজ্জা পাচ্ছে। সে চোখ নামিয়ে নিল।

সে মন দিয়ে দেখতে লাগল নিজের ডান হাতের পাঞ্জাটা। তার হাতের রং আগে তো এ-রকম ছিল না, ঠিক পোড়াটে কালো রং। সে স্পষ্ট অনুভব করছে চামড়াপোড়া গন্ধ!

মুক্তো বসে পড়ল ওদের গা ঘেঁসে। শায়াটা হাঁটু পর্যন্ত তুলে সে বলল, যা গরম, এঘরে তোমরা দু-জনে থাকবে কী করে? এই হরিয়া, এখানে বসে বসে বিয়ার গিলছিস, লজ্জা করে না? যা, আমার দো-তলার ঘরটা সাফ করে দে তাড়াতাড়ি। এমন একটা টেঁটিয়া লোক এসেছিল কিছুতেই যেতে চায় না, তার ওপর আবার বমি করে ঘর ভাসিয়েছে!

হরিয়া চলে যেতেই মুক্তো মধুময়কে জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী ভাই?

মধুময় রতনের দিকে তাকাল। এখানে সত্যি নাম বলতে হয় না, বানিয়ে বলতে হয়, তা সে জানে না।

মধুময়ের দ্বিধা দেখে মুক্তো বলল, ঠিক আছে, তোমার নাম বলতে হবে না, আমিই তোমার নাম দিয়ে দিচ্ছি। তোমার নাম দিলাম আমি নাড়ুগোপাল!

বলেই সে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল মধুময়ের বুকে। দু-হাত দিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, কি—আমাকে পছন্দ নয়?

মধুময়ের এইটুকু জীবনে কোনো নারী তার এত ঘনিষ্ঠ হয়নি।

কারও স্তনের স্পর্শ লাগেনি তার বুকে। কেউ তার গলা জড়িয়ে ধরেনি এমনভাবে।

স্বপ্না ছাড়া আর কোনো মেয়ের সঙ্গে মেশেনি সে। স্বপ্নার সঙ্গে এ-রকম শারীরিক ঘনিষ্ঠতার কথা কল্পনাই করা যায় না।

উত্তেজনায় তার চোখের কোণ চিবুক ও কানের লতিতে যেন জ্বালা করতে লাগল। সে কোনো কথা বলতে পারল না।

কি—তোমার বন্ধুটি বোবা নাকি গো?

রতন বলল, প্রথম দিন এসেছে তো, তাই লজ্জা পাচ্ছে।

রতন মুক্তোর কোমরে হাত দিয়ে তাকে আকর্ষণ করল নিজের দিকে। এবার মুক্তো মধুময়কে ছেড়ে অবলীলাক্রমে মাথা রাখল রতনের বুকে। তারপর বলল, একটা সিগারেট দাও-না মাইরি!

রতন মুক্তোর দিকে একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিতেই সে বলল, ধরিয়ে দাও।

এক হাতে সিগারেট আর এক হাতে বিয়ারের বোতল নিয়ে সে রতনের বুকে শুয়ে রইল খানিকক্ষণ। বিয়ার ও সিগারেট দুটোই শেষ করার পর সে উঠে বসল আবার। ব্যস্ত হয়ে বলল, অনেক রাত হয়ে গেল। তোমরা তো দিব্যি খেয়ে নিয়েছ। আমায় খেতে হবে না? খিদে পেয়েছে।

নিজের বুকের ওপর থেকে রতনের হাতটা সরিয়ে দিয়ে মুক্তো বলল, তোমরা সারারাত থাকবে তো? নীচে আমার ঘরে তোমাদের মধ্যে একজন চলো, আর একজন এখানেই ঘুমোও। একটা বালিশ পাঠিয়ে দিচ্ছি।

তারপর মধুময়ের দিকে চেয়ে বলল, এই নাড়ুগোপাল তো আজ নতুন এসেছে, ও-ই আমার সঙ্গে চলুক আজ।

রতন বলল, কেন আমরা তিনজনেই তোমার ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকি না?

মুক্তো বলল, উঁহু। ওসব চলবে না। বললুম না, আজ বড্ড খাটুনি গেছে, আজ আর ওসব পারব না।

রতন বলল, আমি চুপচাপ পাশে শুয়ে থাকব।

তোমাকে আমি চিনি না! তুমি মহা ফেরেব্বাজ!

মুক্তো উঠে দাঁড়িয়ে মধুময়ের হাত ধরে বলল, এসো নাড়ুগোপাল, চলো।

রতন বলল, ঠিক আছে, ও-ই যাক, আমরা কয়েকদিন থাকছি এখানে।

ঘর থেকে বেরোবার সময় মধুময় একবার অসহায়ভাবে তাকাল রতনের দিকে।

রতন হাসতে হাসতে বলল, দেখিস, সাবধান! মুক্তো যেন তোকে কাঁচাই খেয়ে না ফেলে! ও কিন্তু তা পারে।

মুক্তো বলল, মারব ঝ্যাঁটা!

ঠিক একটা বাচ্চাছেলের মতন মধুময়ের হাত ধরে টানতে টানতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল মুক্তো। মধুময় সম্পূর্ণ নির্বাক।

দো-তলার ঘরখানা জিনিসপত্রে ঠাসা। একটা আলমারি, একটা ড্রেসিং টেবিল একটা বড়ো খাট। ড্রেসিং টেবিলের কাচটা বাজে, মুখ লম্বা দেখায়।

মুক্তো মধুময়কে খাট দেখিয়ে বলল, একটু বোসো, আমি আসছি।

মধুময় আড়ষ্টভাবে বসে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে লাগল ঘরখানা। দেওয়ালে পুরোনো ক্যালেণ্ডারের অনেকগুলো ছবি আঠা দিয়ে সাঁটা। সবই শিব, দুর্গা, কালী—এইসব ঠাকুর দেবতার ছবি। ঘরে কীরকম যেন একটা আঁশটে গন্ধ, দুটো জানলা, দুটোই বন্ধ।

মুক্তো ফিরে এল একটু বাদেই। তারপর খাটের তলা থেকে টেনে বার করল কয়েকটা বাটি আর ডেকচি। সেগুলোর ঢাকা খুলতেই দেখা গেল, তাতে রয়েছে ভাত, ডাল, তরকারি আর মাছ।

মাটিতে বসে পড়ে মুক্তো বলল, ও নাড়ুগোপাল, একটু খাবে কিছু?

মধুময় বলল, না, আমি খেয়েছি। আপনি খান।

মুক্ত একগাল হেসে বলল, ও বাবা, আপনি, আজ্ঞে! শোনো বাবু এখানে ওসব চলে না। আমাকে তুমি বলো। অনেকে তো তুই তোকারি করে। খাবে না আমার সঙ্গে? আমার হাতের ছোঁয়া বুঝি খেতে নেই? তোমরা আর সব পার, শুধু হাতের ছোঁয়া খেলেই তোমাদের জাত যায়।

না, সেজন্য নয়। আমি সকলের ছোঁয়া খাই। কিন্তু একটু আগেই তো অনেক খেলাম।

তাও একটু খেয়ে দেখো, আমি কেমন রেঁধেছি। আমি বাপু নিজে রাঁধি, দোকানের কেনা জিনিস পারতপক্ষে খাই না।

ডাল, আলু-শজনেডাঁটার তরকারি আর পারসে মাছ। ঠিক মধুময়দের বাড়ির রান্নার মতন। ঠিক মাসি-পিসিদের মতনই মুক্তো জোর করে তাকে বলতে লাগল, আর একটু ভাত নাও। আর একটা মাছ দেব?

মুক্তো মধুময়ের চেয়ে অন্তত দশ-বারো বছরের বড়ো।

খাওয়া-দাওয়ার পর বারান্দাতেই বালতিতে রাখা জলে ওরা হাত ধুয়ে নিল।

মুক্তো জিজ্ঞেস করল, তুমি ওই সব পরেই শোবে নাকি? একটা শাড়ি দেব—লুঙির মতন করে জড়িয়ে নেবে।

মধুময় বলল, না না, তার দরকার নেই।

মধুময় পরে আছে প্যান্ট আর হাওয়াই শার্ট। সে জীবনে কখনো লুঙি পরেনি। একটি অচেনা মেয়ের শাড়ি পরে সে শোবে।

এই ধারণাটাই তার কাছে অদ্ভুত লাগে। এতক্ষণ বাদে মধুময় ভয় পাচ্ছে। যেন, এবার একটা সাংঘাতিক কিছু ঘটে যাবে।

এতক্ষণ তার অনুভূতি যেন সম্পূর্ণ অসাড় হয়েছিল। এখন সে হঠাৎ উপলব্ধি করল যে তাকে নীচে আনা হয়েছে এই মুক্তো নামের মেয়েটির সঙ্গে একঘরে শোয়ার জন্য। তা কি সম্ভব? এই স্ত্রীলোকটিকে সে কয়েক ঘণ্টা আগেও চিনত না!

মুক্তো একটু হাই তুলতে গিয়েও চেপে গেল। তারপর খানিকটা জোর করে হাসি টেনে বলল, এখন গল্প করবে, না শোবে?

মধুময় বলতে চাইল, আমি ওপরে চলে যাই! আমি রতনের পাশে শুয়ে থাকতে পারব। গরমে আমার কষ্ট হবে না। কিন্তু সে কিছুই বলতে পারল না।

তুমি পান খাও?

না।

আমিও খাব না। একটা সিগারেট দাও বরং।

আমার কাছে তো সিগারেট নেই! ওপর থেকে নিয়ে আসব?

না, থাক। আর আনতে হবে না। এবার তাহলে আলো নিভিয়ে দিই?

মধুময় হঠাৎ আড়ষ্ট গলায় বলে উঠল, আমি বাইরে শোব।

মুক্তো ভুরু দুটো তুলে জিজ্ঞেস করল, বাইরে শোবে? কেন?

মধুময় বলল, বাইরে শুতেই আমার ভালো লাগবে। বারান্দায় তো অনেক জায়গা আছে।

মুক্তো বলল, বারান্দায় শোবে? তাহলে মাঝরাত্তিরে কী হবে জান? তোমায় ভূতে ধরবে! বলেই হি হি করে খুব জোরে হেসে উঠল মুক্তো।

মধুময় তবুও দৃঢ়ভাবে বলল, না, আমি বাইরেই শোব, আমার কিছু হবে না।

মুক্তো হাসি থামিয়ে বলল, তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না? রাতদুপুরে তোমায় বারান্দায় দেখলে এ বাড়ির চাকররা ভাববে আমি তোমায় ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছি। তখন তারা তোমায় চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে রাস্তায় ফেলে দেবে। দুষ্টুমি কোরো না, লক্ষ্মীছেলের মতন শুয়ে পড়ো!

মধুময় অসহায়ভাবে, প্রায় মিনতির সুরে বলল, তাহলে আমি ঘরের মধ্যেই মাটিতে শুচ্ছি। আমার বিছানা লাগবে না।

মুক্তো এবার মধুময়ের মাথাটা দু-হাতে জড়িয়ে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, কেন গো নাড়ুগোপাল? আমায় ভয় পাচ্ছ? আমি কি সত্যি তোমায় খেয়ে ফেলব নাকি? আলো নিভিয়ে দিচ্ছি, আর দেরি করতে পারছি না।

কিন্তু আলো নেভাবার আগেই মুক্তো তার শায়া আর ব্রেসিয়ার খুলে ফেলল চট করে। মধুময় চোখ বুজে ফেলল। তার সমস্ত শরীর কাঁপছে।

সে আগে অনেক মেয়ের ছবি এঁকেছে। এমনকী নগ্ন মেয়েদের ছবিও এঁকেছে কয়েকখানা। কিন্তু কখনো বাস্তবে দেখেনি। বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা ছবিগুলো দেখে নকল করেছে সে। সেইগুলো আঁকবার সময়ই তার শরীর ঝিম ঝিম করত। বাথরুমে ছুটে গেছে অনেকবার। এখন চোখের সামনে বাস্তব একটি গোটা নগ্ন রমণী দেখে সে যেন ঠিক সহ্য করতে পারল না। ঘরের মধ্যে বড্ড চড়া আলো। এই আলোটা ঠিক নয়। একটা হালকা নীল আলো জ্বালা থাকলে সে মুক্তোর ছবি আঁকতে পারত।

মুক্তো আলনা থেকে একটা ছাপা শাড়ি টেনে জড়িয়ে নিল গায়ে। তারপর টুপ করে আলো নিভিয়ে খাটে উঠে এসে মধুময়কে জড়িয়ে ধরে বলল, আমার নাড়ুগোপাল, সত্যিই নাড়ুগোপাল!

মধুময় শুয়ে রইল কাঠ হয়ে। তার শরীর দাউ দাউ করে জ্বলছে। কিন্তু মুক্তোর শরীরটা খুব ঠাণ্ডা। সে যেন স্নেহের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে আছে মধুময়কে। এই অবস্থাতেও মধুময় মনে মনে ঠিক যেন জপ করার ভঙ্গিতে বলল, স্বপ্না, আমি কি পাপ করছি? তুমি আমাকে ক্ষমা করো। ক্ষমা করবে না? আমি এতটা বুঝতে পারিনি। বিশ্বাস করো, আমি বুঝতে পারিনি।

মধুময় খুব সন্তর্পণে নিজেকে মুক্তোর আলিঙ্গন থেকে ছাড়িয়ে নিল।

মুক্তো বলল, তোমার কিছু ইচ্ছে করছে না বুঝি? তাহলে বাপু আজ লক্ষ্মীছেলের মতন ঘুমিয়ে পড়ো। আমারও বড্ড ঘুম পাচ্ছে। যা খাটুনি গেছে সারাদিন!

একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়ল মুক্তো।

মধুময়ের চোখ খরখরে। যেন তার সারারাত ঘুম আসবে না কিছুতেই। শুয়ে শুয়ে সে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগল। রতনদের সঙ্গে মিশে সে কিছু কিছু নিষিদ্ধ কাজ ও কথাবার্তায় বেশ আনন্দই পেত। কারণ, তাদের বাড়ির আবহাওয়া বড়ো মার্জিত। মধুময় বাড়ির বাইরে এসে, একটা অন্যরকম স্বাদ পেয়েছিল এই প্রথম। ছোটোখাটো বেআইনি কাজেও সে কোনো অন্যায় দেখেনি। কারণ এতদিন বেকার থেকে সে বুঝেছিল, এই সমাজ বেকার তৈরি করে, কিন্তু বেকারদের সম্পর্কে কোনো দায়িত্ব নেয় না। যেকোনো উপায়েই হোক, এই সমাজকে একটা আঘাত দেওয়া দরকার। বাড়ির কড়া শাসনে মধুময় কখনো কোনো রাজনৈতিক দলে ভিড়তে পারেনি। সেইজন্য ও ব্যাপারে তার কোনো স্পষ্ট ধারণাও নেই।

রতনের দুর্দান্তপনা ও দুঃসাহস তার বেশ পছন্দ হয়েছিল, কিন্তু রতনের এদিকের জীবনটার কথা সে কোনোদিন ঘুণাক্ষরেও জানেনি। এ জীবনে সে আসতে চায়নি কখনো। রতনদের তো স্বপ্না নেই, তার আছে।

মধুময় একবার ভাবল, চুপি চুপি উঠে পড়ে সে এখান থেকে পালিয়ে যায়। এদিককার রাস্তা সে চেনে না, ঘুরতে ঘুরতে কোনোরকমে বাড়ি পৌঁছোতে পারবেই। তারপর সে আর রতনদের সঙ্গে মিশবে না। এই কয়েক মাসের ঘটনা সে তার জীবন থেকে মুছে ফেলবে।

কিন্তু বাড়িতে যদি পুলিশ আসে? পুলিশের নামেই মধুময়ের বুক কেঁপে ওঠে। পুলিশ তাকে মারবে কিংবা জেল খাটাবে, এজন্য সে ভয় পায় না। কিন্তু পুলিশে ধরা পড়া মানেই সব কিছু জানাজানি হয়ে যাওয়া। তাদের দলের একজন ধরা পড়ে গেছে, সে হয়তো অন্যদের নাম বলে দেবে। পুলিশ অমনি ঠিকানা পেয়ে যাবে মধুময়ের। এ ব্যাপারে রতনের অভিজ্ঞতা বেশি। রতনের কথা শুনেই চলা উচিত এখন। ঝোঁকের মাথায় একটা কিছু করতে গেলে মধুময় হয়তো আরও বেশি বিপদে পড়বে।

গঙ্গার ধারে বেড়াতে গিয়ে একদিন মধুময় স্বপ্নাকে নিয়ে অন্ধকার ময়দানে বসেছিল। অন্ধকারে বসার কারণ আর কিছুই নয়, শুধু একটু নিরিবিলি পাওয়া। সেখানে বসে বসে গল্প, ঘণ্টার পর ঘণ্টা। স্বপ্নার সঙ্গে গল্প করার জন্য কখনো কোনো বিষয়ের কথা চিন্তা করতে হয় না। হঠাৎ সামনে একটি পুলিশ এসে উপস্থিত।

সেই পুলিশটি বিশ্রী গলায় বলেছিল, এখানে বসে অসভ্যতা করা হচ্ছে, অ্যাঁ?

পুলিশ তো আর স্বপ্নাকে চেনে না, সেজন্যই ওরকম কথা বলতে পেরেছিল। স্বপ্নার সঙ্গে অসভ্যতা? মধুময়ের হাজার ইচ্ছে থাকলেও স্বপ্না একবারও তাকে জড়িয়ে ধরতে দেয়নি পর্যন্ত!

পুলিশ দেখে সেদিনও মধুময় বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিল। কিন্তু স্বপ্নার মনের মধ্যে তো কোনো অন্যায়বোধ নেই, তাই সে পুলিশকে গ্রাহ্য করেনি। সে বলেছিল, আজেবাজে কথা বলছেন কেন? মাঠের মধ্যে বসা কি অপরাধ?

পুলিশটি বলেছিল, সেকথা থানায় গিয়ে বড়োবাবুকেই জিজ্ঞেস করবেন। এখন চলুন থানায়।

স্বপ্না সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ঠিক আছে চলুন!

মাঠ পেরিয়ে বড়োরাস্তায় আসবার পর পুলিশটিই বলেছিল, আজ ছেড়ে দিলাম, বাড়ি যান। আর ওরকম করবেন না।

স্বপ্না বলেছিল, ছেড়ে দিলাম মানে? আমরা থানাতেই যেতে চাই। আমরা আপনার বড়োবাবুকেই জিজ্ঞেস করব, মাঠে বসা অপরাধ কিনা।

তখন পুলিশটিই পালিয়ে গিয়েছিল। সে নিশ্চয়ই আশা করেছিল ওদের কাছ থেকে কিছু ঘুস পাবে। নিশ্চয়ই ভেবেছিল থানায় যাওয়ার নাম শুনলেই ওরা ভয় পেয়ে তার কাছে কাকুতি-মিনতি করবে।

কিন্তু এখন তো মধুময় পুলিশ দেখলে জোর দিয়ে বলতে পারবে না, চলুন থানায়, আমি কোনো অন্যায় করিনি।

মুক্তোর মতন একটি বেশ্যার পাশে শুয়ে শুয়ে মধুময় স্বপ্নার কথা ভাবছে? ছি, ছি, এতে তো স্বপ্নাকেই অপমান করা হয়।

অবশ্য মুক্তো মেয়েটি এ-পর্যন্ত তার সঙ্গে কোনোরকম খারাপ ব্যবহার করেনি। তবু মধুময় ওর স্পর্শ বাঁচিয়ে আরও খানিকটা দূরে সরে গেল।

বহুক্ষণ পর্যন্ত জেগেই রইল মধুময়। শেষরাত্রের তন্দ্রায় সে একটা স্বপ্ন দেখল। মধুময় বাড়ি ফিরে গেছে, খুব হাসছে। মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করছেন, কীরে তুই লুকিয়ে লুকিয়ে এম এ পরীক্ষা দিলি কবে? আমরা কিছু জানতে পারিনি! একেবারে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিস! এবার তো তোর চাকরির জন্য চিন্তাই করতে হবে না। গভর্নমেন্ট তোকে ডেকে ডেকে চাকরি দেবে!

পরদিন ঘুম ভেঙেই ধড়ফড় করে উঠে বসল মধুময়। তার সত্যিই ধারণা ছিল, সে তার বাড়ি ফিরে গেছে। কিন্তু না, এটা মুক্তোর ঘর। মুক্তো উঠে গেছে বিছানা থেকে। চুল আঁচড়াচ্ছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, এরই মধ্যে স্নান হয়ে গেছে তার।

একটু পরেই নীচে নেমে এল রতন। পেছন থেকে মুক্তোকে জড়িয়ে ধরে বলল, কাল কেমন জমেছিল, অ্যাঁ? নাড়ুগোপালকে ঠিকমতন হাতেখড়ি দিয়েছ তো?

মুক্তো এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিয়ে রুদ্ধ গলায় বলেছিল, দিলে তো ছুঁয়ে? আবার আমায় চান করতে হবে। জানো না, সকাল বেলা পুজো না করে, আমি কোনো পুরুষমানুষ ছুঁই না!

রতন অপ্রস্তুত হয়ে বলল, মাফ চাইছি ভাই। একটু চা তো খাওয়াবে অন্তত। নাকি সেও পাব পুজোর পরে?

তারপর সবেমাত্র চা খেতে বসেছে ওরা তিন জনে, এমন সময় পুলিশ এল। পুলিশ ওদের মারধোর করেনি। রতনের পকেটে যা জিনিসপত্র পাওয়া গেছে তাইই যথেষ্ট। ওদের এনে পুরে দেওয়া হল লালবাজার লক-আপে।

পরদিন কাগজে বড়ো বড়ো করে ছাপা হল, পাঁচ জন কুখ্যাত ডাকাতের গ্রেফতার কাহিনি। এই দলটি নাকি ইতিমধ্যে সাত বার ট্রেন ডাকাতি করেও সকলের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল, এবার ধরা পড়েছে পুলিশের তৎপরতায়।

মধুময়ের বাবা খবর পেয়ে প্রথমে পুলিশকে বলেছিলেন, তাঁর ছেলে এ কাজ করেছে, এটা হতেই পারে না। পৃথিবী উলটে গেলেও তিনি একথা বিশ্বাস করবেন না।

পুলিশ তাঁকে নিয়ে এল আইডেন্টিফিকেশনের জন্য। বাবা মধুময়ের চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। একটাও কথা বললেন না। একটু পরে তাঁর চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। পুলিশকে তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমিই যে এ ছেলের জন্ম দিয়েছি, তা অস্বীকার করতে পারি না।

বাবা নাকি তারপর বাড়ি ফিরে বলেছিলেন, ও ছেলের যা শাস্তি হয় হোক, আমি ওকে মন থেকে মুছে ফেলতে চাই। আমি ওকে ছাড়াবার কোনো চেষ্টাই করব না।

কিন্তু মা কান্নাকাটি করতে লাগলেন। মধুময়ের এক মামা বেশ বড়ো উকিল। তিনি এলেন সাহায্য করবার জন্য।

মধুময় জামিন পেল না। কিছুদিন বাদে লালবাজার থেকে সরিয়ে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে।

মামলা চলল এগারো মাস। একই মামলার পাঁচজন আসামি হলেও মধুময়ের বড়োমামা লড়তে লাগলেন শুধু একা মধুময়ের হয়ে। তিনি প্রমাণ করবার চেষ্টা করলেন যে, ওই দিন সাঁতরাগাছির কাছে ডাকাতির সময়ে মধুময় ওই ট্রেনে থাকতেই পারে না, কারণ সে তখন একটি মারোয়াড়ি কোম্পানিতে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিল। সেই অনুযায়ী তিনি এগারোজন সাক্ষী হাজির করালেন। প্রত্যেকেই বলল, সেদিন তারা মধুময়কে ইন্টারভিউ দিতে দেখেছে। মধুময়ের নামে একটা ছাপানো ইন্টারভিউয়ের চিঠিও দাখিল করা হল কোর্টে।

বড়োমামা তীব্র ভাষায় বললেন, বাকি যে আরও ছ-টা ডাকাতির অভিযোগ এদের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে, তার মধ্যে তিনটি ডাকাতির সময় মধুময় কলকাতাতেই ছিল না, সে পাটনায় হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করত, তার অকাট্য প্রমাণ আছে। পুলিশ আসল অপরাধীদের ধরতে পারে না, শুধু শুধু নিরীহ ছেলেদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেয়।

পুলিশ-পক্ষ থেকে সাক্ষী ডাকা হয়েছিল মুক্তোকে।

মুক্তো বলেছিল, কে জানে বাপু, আমার ঘরে প্রতিদিনই দু-তিনজন করে লোকজন আসে, সকলকে চিনে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। একে আমি আগে দেখেছি কি না মনে করতে পারছি না।

মধুময়ের তখন একমুখ দাড়ি।

পুলিশ থেকে নানারকম ভয় দেখানো হয়েছিল, তবু মুক্তো কিছুতেই মচকায়নি। শেষপর্যন্ত বেশি জেরার উত্তরে সে দৃঢ়স্বরে বলেছিল, না, আমি একে চিনি না, একে কোনোদিন দেখিনি।

মধুময়ের দাড়ি কামানো আগেকার ছবি দেখানো হল, মুক্তো তখন হাসতে হাসতে বলেছিল, এইটুকু ছেলে? আমার ঘরে? আমার যে এর ডবল বয়েস, হি-হি-হি-হি।

বিচারক ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছিলেন তাকে।

জেলে থাকার সময় উৎকটরকম গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল মধুময়। কথা বলত না কারুর সঙ্গে। এমনকী রতন, প্রসাদের সঙ্গেও সে বাক্যালাপ বন্ধ করে দিয়েছিল, সর্বক্ষণ সে ভুরু কুঁচকে চিন্তা করত। সে যাচাই করে দেখত জীবনের ভুলগুলো।

প্রায় এগারো মাস বাদে, যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে গেল মধুময়।

প্রথম দিকে বাবা মধুময়ের আর মুখই দেখতে চাননি কিন্তু তিনি জেলের দরজা থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছিলেন মধুময়কে। তিনি সস্নেহে বলেছিলেন, যা হয়ে গেছে, ওসব আর মনে রাখিস না। সব ভুলে যা।

তার মা ও বোনেরা মধুময়ের প্রতি অতিরিক্ত খাতির দেখাতে লাগল। কেউ এমন একটা কথাও বলল না, যাতে করে মধুময় দুঃখ পেতে পারে। বরং সকলে তাকে সহানুভূতি দেখাতে লাগল এই বলে যে, এতদিন জেলখানায় থেকে কষ্ট পেয়ে মধুময়ের শরীর অনেক খারাপ হয়ে গেছে।

প্রথম কয়েক দিন মধুময় বাড়ি থেকে বেরোতে পারেনি লজ্জায়! মা বলেছিলেন, তুই কেন লজ্জা পাবি মধু? তোর কি শাস্তি হয়েছে? কোর্ট থেকে তোকে বেকসুর খালাস করে দিয়েছে! পুলিশ যা-তা একটা বদনাম দিয়ে লোককে ধরে নিয়ে গেলেই কি লোকে তা বিশ্বাস করবে?

আইনের চোখে মধুময় নিরপরাধ ঠিকই। তার কোনো শাস্তি হয়নি। সে, এইকথাটা বুক ফুলিয়ে বলতে পারে। কিন্তু তার বাড়ির সব লোক জানে, মধুময় সত্যিই ট্রেন-ডাকাতি করতে গিয়েছিল। সে ধরা পড়েছিল একটি কুখ্যাত বেশ্যাপল্লির মধ্যে, সকাল বেলা, একটি মেয়ের ঘরে। সে ছাড়া পেয়েছে, শুধু তার বড়ো মামার ওকালতি বুদ্ধির জোরে। স্বপ্নাও জানে।

মধুময় জেল থেকে বেরোবার পর প্রায় এক মাস যায়নি স্বপ্নার সঙ্গে দেখা করতে। তার মনে একটা ক্ষীণ আশা ছিল, স্বপ্না নিজে থেকেই বোধ হয় একবার আসবে। প্রায় এক বছর দেখা হয়নি স্বপ্নার সঙ্গে, ওর কি মন কেমন করে না?

স্বপ্না আসেনি, চিঠিও লেখেনি?

তারপর মধুময় নিজেই একদিন বেরিয়ে পড়েছিল। তাকে তো নতুনভাবে জীবন শুরু করতে হবে। দিনের পর দিন বাড়িতে বসে থাকলে তো আর চলবে না।

বড়োমামা একটা ভালো বুদ্ধি দিয়েছেন বাবাকে। মধুময়কে কিছুদিনের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হোক মুম্বাইতে। সেখানে আছেন মেজোমামা। তিনি চেষ্টা করলে মধুময়ের জন্য একটা চাকরি জোগাড় করে দিতে পারবেন। যতদিন চাকরি না জোটে, ততদিন মুম্বাইতে থাকলেও মধুময়ের অনেকটা উপকার হবে। এখানে সে লজ্জায় লোকজনের সঙ্গে মিশতে পারবে না হয়তো। কিন্তু মুম্বাইতে তো সেরকম কোনো অসুবিধে নেই!

মা মধুময়কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তুই মুম্বাইতে যাবি?

মধুময় বলেছিল, ভেবে দেখি।

নতুনভাবে জীবন শুরু করার আগে স্বপ্নার ব্যাপারটা ঠিকঠাক করা দরকার। জেলে বসে মধুময় অনেক চিন্তা করে দেখেছে, স্বপ্নাকে বাদ দিয়ে সে জীবন কাটাতে পারবে না। স্বপ্না আঘাত পায়, এমন কোনো কাজ করা উচিত নয় তার পক্ষে।

স্বপ্না কি তাকে ক্ষমা করবে না? একবার সে ভুলের পথে গিয়েছিল, এখন সে ফিরে আসতে চাইলে স্বপ্না কি মেনে নিতে পারবে না তাকে?

পর পর দু-দিন গিয়ে স্বপ্নার সঙ্গে দেখা হয়নি। দু-দিনই স্বপ্নার দাদার মুখোমুখি পড়ে গিয়েছিল মধুময়। স্বপ্নার দাদা আগে তার সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই কথা বলত, কিন্তু এখন গম্ভীর। অর্থাৎ এও-সব জানে।

স্বপ্নার দাদা বলেছিল, স্বপ্না তো বাড়িতে নেই—

তখনই মধুময়ের সন্দেহ হয়েছিল যে, স্বপ্নার দাদা মিথ্যেকথা বলছে। স্বপ্না বাড়িতে থাকলেও মধুময়ের সঙ্গে দেখা করতে দেবে না।

কিন্তু মধুময়কে তো দেখা করতেই হবে।

কয়েক দিনের মধ্যে দেখা হলও। প্রথমবার স্বপ্না ঠিক মুখের ওপর খারাপ ব্যবহার করতে পারেনি। বলেছিল, তোমার চেহারাটা অন্যরকম হয়ে গেছে। হঠাৎ রাস্তায় দেখা হলে চিনতেই পারতাম না!

মধুময় নিজেই প্রথমে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারেনি। এতদিন পর স্বপ্নাকে দেখামাত্র তার কান্না এসে গিয়েছিল। সে আবার টের পেয়েছিল, স্বপ্না তার ভুবনের কতখানি জুড়ে আছে। এ যেন, শুধু প্রেম ভালোবাসা নয়, স্বপ্নার কাছে গচ্ছিত আছে তার আত্মার একটা টুকরো। এ কথা মধুময় ভুলে গিয়েছিল।

মধুময়কে এড়াবার জন্য স্বপ্না বলেছিল, তুমি আজই এলে? আমায় যে, এক্ষুনি বেরোতে হবে—

প্লেন কিংবা ট্রেন ধরার ব্যাপার থাকলে দেরি করা যায় না। এ ছাড়া আর কোন কারণে এক্ষুনি বেরোতে হবে স্বপ্নাকে? কোনো সিনেমা থিয়েটারে যাওয়ার কথা থাকলে স্বপ্না কি তা সেদিনকার মতন বাতিল করতে পারে না? এমনকী, জরুরি কারুর সঙ্গে দেখা করার কথা থাকলেও মধুময়ের জন্য স্বপ্না কি থেকে যেতে পারে না?

তুমি কোথায় যাবে?

আমার একটা দরকার আছে।

স্বপ্না এর বেশি আর কিছু বলতে চায়নি।

মধুময়ও জিজ্ঞেস করেনি। কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া তার পক্ষে খুবই প্রয়োজনীয়। তাই বলেছিল, তুমি আমার চিঠি পেয়েছিলে?

কোন চিঠি?

জেল থেকে আমি তোমাকে লিখেছিলাম।

না তো!

জেলখানা থেকে চিঠি অনেক সময় সেন্সার করে থাকে। কিন্তু মধুময়ের চিঠিতে তো সেরকম কিছু ছিল না। সবই ব্যক্তিগত কথা।

একটা নয়, তিনখানা চিঠি লিখেছিল মধুময়! শুধু স্বপ্নাকেই। নিজের বাড়িতে সে কোনো চিঠি লেখেনি। সে চিঠি স্বপ্না পায়নি। স্বপ্না তো সহজে মিথ্যেকথা বলে না। তাহলে কি স্বপ্নার বাড়ির লোকেরা সে-চিঠি পেয়ে স্বপ্নাকে দেয়নি। জেলখানা থেকে পাঠানো চিঠি দেখলেই বোঝা যায়।

সেই তিনখানা চিঠিতেই মধুময় লিখেছিল, আমি আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে চাই। একবার ভুল করলে কি মানুষ ফিরতে পারে না?

সেদিন স্বপ্না বেশিক্ষণ থাকেনি, কিন্তু মধুময়কে বলেছিল, তুমি আর একদিন এসো। আর একদিন—বলেনি যে, কালই এসো। তবু মধুময় পর দিনই গিয়েছিল আবার। স্বপ্না সেদিন সত্যিই বাড়ি ছিল না।

স্বপ্না কী করে জানবে যে মধুময় তার পর দিনই আসবে!

আজ স্বপ্না স্পষ্ট মুখের ওপর বলে দিল, তুমি আর এসো না!

স্বপ্না তার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে দিতে চাইছে। দশ-বারো বছরের সম্পর্ক, মধুময় তখনও হাফপ্যান্ট ছাড়েনি। স্বপ্না তখনও ফ্রক পরে, সেই সময় থেকে ওরা পরস্পর বন্ধু থাকার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিল।

দেশপ্রিয় পার্কের রেলিং-এ হেলান দিয়ে অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল মধুময়। সে তখন কোন দিকে যাবে? তার সামনে এখন দুটো পথ খোলা আছে।

সে আবার অসামাজিক জীবনে ফিরে যেতে পারে। আগের বারের ভুল থেকে সে শিক্ষা নেবে। দ্বিতীয় বার ট্রেনে ডাকাতি করতে গেলে আর ভুল হবে না। না হয়, ধরা পড়ে দু-এক বছর জেল খাটবে। তবু ওই জীবনে রোমাঞ্চ আছে। ওই জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মুক্তোর মতন মেয়েরা।

অথবা সে যেতে পারে নতুন একটা সুন্দর জীবনের দিকে। মুম্বাইতে গিয়ে চাকরি। নতুন ফ্ল্যাট। কিছু টাকা জমিয়ে বিয়ে অথবা বিয়ে না করে ব্যাচেলারের সুখী জীবন, বন্ধুবান্ধব, আড্ডা, জুয়াখেলা, মদ।

স্বপ্নাকে ছাড়া আর কোনো মেয়েকে বিয়ে করা কি তার পক্ষে সম্ভব? কিংবা বিয়ে করা বা, না করারও প্রশ্ন নয়। স্বপ্না তাকে বাদ দিয়েও জীবন কাটাবার কথা চিন্তা করতে পারে। কিন্তু মধুময়ের পক্ষে তা কি সম্ভব? স্বপ্না জানে না যে, তার কাছে গচ্ছিত আছে মধুময়ের আত্মার খানিকটা অংশ।

এখন সব কিছুই নির্ভর করছে স্বপ্নার ওপরে।

রাত্তিরে খেতে বসার সময় বাবা রোজই জিজ্ঞেস করেন, খোকন কোথায়? বাড়ি ফিরেছে?

মা বলেন, হ্যাঁ, ও তো আজকাল সন্ধ্যের পর বাড়ির বাইরে থাকে না। খুব পড়াশুনো করে দেখি সবসময়। পড়াশুনোয় আবার মন বসেছে মনে হচ্ছে।

বাবা জিজ্ঞেস করেন, খেয়েছে না খায়নি? না খেয়ে থাকলে আমার সঙ্গেই ওর খাবার দিয়ে দাও-না।

ওর খাওয়া হয়ে গেছে কখন।

এক এক দিন মধুময় সত্যিই বাড়ি ফেরে সন্ধ্যের পর। একটা বই খুলে শুয়ে থাকে বিছানায়। অনেক রাত পর্যন্ত আলো জ্বলে তার ঘরে।

কিন্তু বইয়ের পাতা বেশি ওলটানো হয় না। খানিকটা পড়তে-না-পড়তেই মধুময় নিজের চিন্তার মধ্যে ডুবে যায়।

মা একদিন সকাল বেলা বললেন, তোর বাবা বলছিলেন—

চায়ের কাপ থেকে মুখ তুলে মধুময় জিজ্ঞেস করল, কী?

তুই এই সোমবার মুম্বাই যাবি? তোর জন্য টিকিট কাটবে?

কেন, এই সোমবারই কেন?

ওঁর এক বন্ধু ফাইজার কোম্পানির মিস্টার মিত্র... উনি যাচ্ছেন সোমবার... তাহলে ওঁর সঙ্গেই যেতে পারিস।

আবার চোখ নামিয়ে মধুময় বলল, কেন, আমি কি শিশু? ওর সঙ্গে যেতে হবে কেন? আমি একা যেতে পারি না?

তা পারবি না কেন? তবু একজন চেনা লোক সঙ্গে থাকলে সুবিধে হয়...

না।

তুই মুম্বাইতে যাবি না?

আর যেদিনই যাই, এই সোমবার যাব না। যেদিন যাব একাই যাব।

পর দিন সকালে মা আবার বললেন, আগের দিনের চেয়েও নরম গলায়, তোর বাবা জিজ্ঞেস করছিলেন...

আবার চায়ের কাপ থেকে মুখ তুলে মধুময় বলল, কী?

তুই এই সোমবার যদি না যেতে চাস, কবে যাবি, একটা দিন ঠিক কর। শুধু শুধু দেরি করে লাভ কী?

এখন দিন ঠিক করবার একটু মুশকিল আছে। অন্তত মাস দু-এক আমাকে এখানেই থাকতে হবে।

কেন! মাস দু-এক তুই এখানে কী করবি?

মধুময় মায়ের চোখের দিকে সোজা চেয়ে থেকে পরিষ্কার গলায় বলল, মা, এই জীবনটা আমার। এটাকে কীভাবে খরচ করব, সেটা আমাকেই ঠিক করতে হবে। আমি যদি বখে যেতে চাই, গুণ্ডা-বদমাইশ হয়ে যেতে চাই, তোমরা আমাকে আটকাতে পারবে? আমি একটা ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করছি, আমার অন্তত দু-মাস সময় চাই। সেই দু-মাস সময় দিতে যদি তোমরা রাজি না থাক, তাহলে আমি এবাড়ি ছেড়ে চলে যেতেও রাজি আছি।

মা চোখ কপালে তুলে বললেন, ও মা, বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা আবার কোথা থেকে আসছে? তোর কি আমাদের ওপর কোনো টান নেই?

মধুময় বলল, মা, আমার বয়সি অনেক ছেলেই চাকরি-বাকরি, পড়াশুনো বা অন্য অনেক কারণে বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় থাকে। তা বলে তাদের টান থাকে না বাবা-মা সম্পর্কে, আমি বেকার বলেই কি আমাকে বাধ্য হয়ে থাকতে হবে এবাড়িতে?

মা হঠাৎ চোখে আঁচল চাপা দিলেন।

মধুময়ের যেন আবেগ, অনুভূতি কিছুই নেই। আগে এ-রকম ছিল না, আগে মায়ের কান্না কিছুতেই সহ্য করতে পারত না সে। ছেলেবেলা থেকে যখন যতই অবাধ্যপনা করুক, মাকে একবার কাঁদতে দেখলেই সেও কাঁদতে শুরু করত। মায়ের গায়ে হাত বুলিয়ে বলত, তুমি কেঁদো না মা। তুমি যা বলবে, আমি সব শুনব। কেঁদো না...

এখন মধুময় টেবিলের ওপাশে বসে থেকে চুপ করে দেখতে লাগল মায়ের কান্না। তার মধ্যেই সে শেষ করে ফেলল তার চা, টোস্ট।

মধুময় টেবিল ছেড়ে উঠে যেতে যেতে বলল, তুমি শুধু শুধু কাঁদছ মা। মুম্বাইতে যাব না, সে-কথা আমি একবারও বলিনি। আমি শুধু দু-মাস সময় চেয়েছি।

দু-দিন পর মধুময় নিজেই একটা কথা বলে দারুণভাবে চমকে দিল মাকে।

মা, আমার অন্নপ্রাশনের সময়ে আমি সাতটা আংটি আর কয়েকটা রুপোর থালা গেলাস পেয়েছিলাম না?

হ্যাঁ, পেয়েছিলি তো—

সেগুলো সব আছে তোমার কাছে?

হ্যাঁ, থাকবে না কেন—

চোদ্দো বছর বয়েসে আমার যখন পইতে হয় তখন আত্মীয়স্বজনরা অনেকেই টাকা দিয়েছিল।

হ্যাঁ, প্রায় সাত-শো টাকা, সে টাকা তোর নামে ব্যাংকে জমা দেওয়া আছে।

সেই টাকাগুলো আমার চাই, আর ওই সোনার আংটিগুলো আর রুপোর থালা গেলাসও আমি বিক্রি করতে চাই।

মা বিস্ময়ে কোনো কথা বলতে পারলেন না।

মধুময় বলল, ওই টাকাগুলো আর ওই জিনিসগুলো যদি আমার বলেই ভেবে থাক তোমরা, তাহলে ওগুলো ইচ্ছেমতন ব্যবহার করার অধিকার আমার থাকবে না? আমার পঁচিশ বছর বয়েস, এখনও যদি আমার জিনিস আমি ইচ্ছেমতন ব্যবহার করতে না পারি, তাহলে আর কবে করব? অথবা বলে দাও, ওগুলো আমার নয়, আমি চাইব না।

কিন্তু ওগুলো বিক্রি করবি কেন?

মুম্বাই যাওয়ার ভাড়াটা আমি ওর থেকে সরিয়ে রাখব। বাকি টাকা আমার হাত-খরচ লাগবে।

হাত-খরচ ... আমার কাছে চাইলে কি আমি দিই না?

আমি আর চাইব না। এই দু-মাস অন্তত, আমি বাড়ি থেকে এক পয়সা নেব না, আবার চুরি-ডাকাতিও করতে যাব না।

ফের ওই সব কথা উচ্চারণ করছিস, খোকা?

মা, চুরি-ডাকাতি অনেকেই করে। কোটিপতি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে মন্দিরের পুরুতরা পর্যন্ত! সে যাই হোক, তুমি আমার জন্য চিন্তা কোরো না মা। আমার জন্য আর তোমাদের কক্ষনো লজ্জা পেতে হবে না।

মা বললেন, খোকা, তোর কথা শুনলে আমার আজকাল ভয় করে। তুই এত বদলে গেলি কেন রে?

ভাবলেশহীন গম্ভীর গলায় মধুময় বলল, মা, তোমার কোনো ভয় নেই। কিংবা তুমি যদি ভয় পেতে চাও, তাহলে তো প্রত্যেক দিনই ভয় পাওয়ার মতন কিছু-না-কিছু ঘটছে পৃথিবীতে!

এই ঘটনার পর আবার মধুময় অনিয়মিত সময়ে বাড়ি ফিরতে লাগল। কখনো কখনো অনেক রাত হয়ে যায়। মা সেকথা লুকিয়ে রাখে বাবার কাছে, মধুময় বাড়ি না ফিরলেও তিনি তার ঘরের আলো জ্বেলে রাখেন।

স্বপ্না তার দু-জন বান্ধবীকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিল ডায়মণ্ড হারবারে। ওর এক বান্ধবীর পিসতুতো দাদা ওখানকার এস ডি ও। আগে থেকে খবর দিয়ে যায়নি, তাই এস ডি ও সাহেব টুরে বেরিয়ে গেছেন। সেই বান্ধবীটির নাম এষা। সে বলেছিল, আমার দাদার লঞ্চে করে তোদের কাকদ্বীপ পর্যন্ত ঘুরিয়ে নিয়ে আসব।

কিন্তু এষার দাদাও নেই, লঞ্চও নেই। এষার বউদি অবশ্য ওদের খুব যত্ন-টত্ন করলেন, কিন্তু ওরা তিনজনেই গঙ্গার ওপরে লঞ্চে চড়ে বেড়াবে এই আশা করেছিল খুব।

একটা উপায় অবশ্য আছে। ডায়মণ্ড হারবার থেকে ফেরি লঞ্চ যায় ওদিকের কুঁকড়োহাটি পর্যন্ত। প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগে, সেই ফেরিতে করে বেড়িয়ে আসা যায়।

অগত্যা ওরা তিনটি মেয়ে সেই ফেরিরই টিকিট কেটে চড়ে বসল। এষার বউদি অবশ্য অনেক বারণ করেছিলেন, ওরা শুনল না। সঙ্গে পুরুষমানুষ নেই বলে কি ওরা বেড়াতে পারবে না?

শীতের মনোরম বিকেল, গঙ্গার ওপর চমৎকার বাতাস। খুবই ভালো লাগবার কথা, কিন্তু স্বপ্না একটু গম্ভীর হয়ে গেল। এষা আর বাসবী কিন্তু খুশিতে ঝলমল করছে। ওরা জিজ্ঞেস করল, কী রে স্বপ্না, তোর হঠাৎ মুখ ভার হয়ে গেল কেন?

স্বপ্না ফ্যাকাশেভাবে হেসে বলল, কই, না তো।

এদিক থেকে হলদিয়ায় প্রচুর লোক যাতায়াত করে বলে লঞ্চে বেশ ভিড়। ওরা বসবার জায়গা পায়নি, দাঁড়িয়ে ছিল রেলিং-এ ভর দিয়ে। তিনটি সুন্দরী যুবতী—ওদের দিকে অন্যদের দৃষ্টি পড়বেই। কয়েকটি যুবক বেশি উৎসাহী হয়ে পড়ল। তারা ভিড় ঠেলেঠুলে এসে দাঁড়াল ওদের পাশে।

স্বপ্না জলের দিকে চেয়ে আছে। লঞ্চের ঘটঘট শব্দ, জলের ঢেউয়ের শব্দ ছাপিয়ে সেই ছেলেদের কথা তার কানে আসে। এরা সেই বঞ্চিত যুবকের দল, যারা কোনো মেয়েকে বান্ধবী হিসেবে পায়নি বলে যেন, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই অন্য মেয়েদের দেখলে অপমান করার চেষ্টা করে। ওরা বুঝে গেছে, স্বপ্নাদের সঙ্গে কোনো পুরুষ দেহরক্ষী নেই। তাই ওরা অশ্লীল কথার বন্যা বইয়ে দিতে লাগল। বিশেষত ওদের চশমা পরা লম্বা শিড়িঙ্গে চেহারার একটি ছেলে এতসব কুৎসিত কথা বলতে লাগল যে সেসব কথা কেউ কখনো যে মুখে উচ্চারণ করতে পারে, স্বপ্না কল্পনাও করেনি।

স্বপ্না কোনো খারাপ কথা সহ্য করতে পারে না, তার গায়ে যেন বিষাক্ত তির ফুটতে লাগল। এষা আর বাসবী দু-একবার তাকাল কটমট করে সেই ছেলেগুলোর দিকে। তাতে যেন আরও বেড়ে গেল তাদের উৎসাহ।

ওরা দাঁড়িয়েছিল লঞ্চের ছাদে। স্বপ্না বলল, চল, নীচে যাই। নীচে যাওয়ার একটু পরেই সেখানেও হাজির হল ছেলেগুলো। আবার সেখানেও শুরু হল কুৎসিত কথার ফোয়ারা। অন্য কেউ ওদের বাধাও দিচ্ছে না। একসঙ্গে চার-পাঁচটি ছেলে যেকোনো অসভ্যতা করলেও অন্য কেউ বাধা দেওয়ার সাহস পায় না।

খেয়ালঞ্চের যাত্রী নানারকম হয়। কেউ কারুর ব্যাপারে মাথা ঘামায় না। অনেকে লঞ্চে উঠলেই ঘুমিয়ে পড়ে। কয়েকজন বিস্মিতভাবে যুবকদের দিকে চেয়ে রইল, কেউ কেউ দুঃখিত হল, কিন্তু একটি প্রতিবাদের বাক্যও উচ্চারণ করল না কেউ। স্বপ্না দু-হাতে কান চাপা দিয়ে রইল। সে ভাবতে লাগল কখন এই যাত্রাটা ফুরোবে।

গঙ্গা এখানে বেশ চওড়া। দু-পাশের উত্তাল ঢেউয়ের দিকে তাকালে মুগ্ধ হওয়া যায়। কিন্তু স্বপ্নার আর সেদিকে মন নেই। সে চোখ বুজে আছে। পঁয়তাল্লিশ মিনিটকে মনে হল পাঁচ ঘণ্টা, তারপর লঞ্চ এসে পৌঁছোল কুঁকড়োহাটিতে। মেয়ে তিনটি স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলল।

ভাটার সময় বলে লঞ্চটা ঠিকমতন জেটিতে ভিড়তে পারল না! একটা লম্বা তক্তা ফেলে দেওয়া হল। সেটার ওপর দিয়ে নামতে হবে খুব সাবধানে।

নামবার সময় একটা দুর্ঘটনা ঘটল। একজন হঠাৎ ঝপাস করে পড়ে গেল নীচে। বহুলোক হইহই করে উঠল একসঙ্গে। সেখানে অবশ্য জল বেশি নেই, থকথকে কাদা। সেই কাদায় মাখামাখি হয়ে লোকটি যখন উঠে দাঁড়াল, তখন স্বপ্নারা দেখল, এই সেই চশমাপরা লম্বা শিড়িঙ্গে ছেলেটা। সে ছিল প্রায় স্বপ্নাদের পেছনেই। তখনও খারাপ কথা চালিয়ে যাচ্ছিল। ওরা তিনজন প্রথমটায় শিউরে উঠেছিল ভয়ে। তাড়াতাড়ি নীচে নেমে গিয়ে বাসবী আর এষা কুলকুল করে হাসতে লাগল।

এষা বলল, বেশ হয়েছে! ঠিক শাস্তি হয়েছে! অসভ্য কোথাকার!

বাসবী বলল, আমার ইচ্ছে করছিল, লোকটাকে ঠেলে ফেলে দিতে!

স্বপ্নার মুখখানা আরও ম্লান হয়ে গেছে। সে একটুও খুশি হয়নি। সে মৃদুস্বরে বলল, ‘যদি লোকটা মরে যেত। হঠাৎ পড়ে গেলে, অনেক সময়—’

স্বপ্না অন্ধকারে চকিতে পেছনে একবার তাকিয়েই ঘুরিয়ে নিল মুখ। কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে সেই লোকটা তখনও চিৎকার করে কাকে যেন গালাগালি দিচ্ছে।

ফেরার লঞ্চ এক ঘণ্টা পরেই ছাড়বার কথা। কিন্তু কী-একটা যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য সেটা ছাড়ল তিন ঘণ্টা বাদে। বাসবী আর এষার ইচ্ছে ছিল হলদিয়া থেকে ঘুরে আসার। এখান থেকে খুব সহজেই বাসে হলদিয়া ঘুরে আসা যায়। তিন ঘণ্টা সময় তো হাতে আছেই। কিন্তু স্বপ্না রাজি হল না। সে আর বেশি দূর যেতে চায় না। খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরির পর ওরা তিনজন লঞ্চে এসেই বসেছিল।

এষা জিজ্ঞেস করল, কী রে স্বপ্না, তুই এখনও মুখ গোমড়া করে আছিস কেন?

স্বপ্না বলল, ফেরার সময় নিশ্চয়ই ওই ছেলেগুলো আর আসবে না। সত্যি বড্ড জ্বালাতন করছিল। ছেলেগুলো কী ভাবে বলত? ওরকম খারাপ কথা বললে, কোনো দিনই তো কোনো মেয়ে ওদের পছন্দ করবে না।

এষা বলল, আলাপ করার সৎ সাহস নেই। আমাদের সঙ্গে ভদ্রভাবে আলাপ করতে এলে কি আমরা কথা বলতুম না?

ফেরার সময় কোনো ঝঞ্ঝাট হল না। চমৎকার জ্যোৎস্নায় নদী সফর খুব সুন্দরই হল। কিন্তু ফেরার পর ওরা আবিষ্কার করল যে, লাস্ট ট্রেন ছাড়া ওদের কলকাতায় ফেরার আর কোনো উপায় নেই। লাস্ট ট্রেনে গেলে ওদের বাড়ি পৌঁছোতে পৌঁছোতে রাত প্রায় বারোটা বেজে যাবে।

এষার দাদা টুর থেকে ফেরেননি। সেদিনও ফিরবেন না খবর পাঠিয়েছেন। বউদি বললেন, রাত্তিরে ডায়মণ্ড হারবারেই থেকে যেতে। লাস্ট ট্রেনে ফেরা ওদের পক্ষে বিপজ্জনক। প্রায় সব কামরাই ফাঁকা থাকে। হঠাৎ হঠাৎ ডাকাতির উপদ্রব হয়। মেয়েরা কেউই প্রায় ওই ট্রেনে যায় না।

কিন্তু স্বপ্নাকে বাড়ি ফিরতেই হবে। সে কিছু বলে আসেনি। না জানিয়ে বাড়ির বাইরে সারারাত থাকা স্বপ্না চিন্তাও করতে পারে না। মা-বাবা দারুণ ব্যস্ত হয়ে থানায় হাসপাতালে খোঁজাখুঁজি শুরু করবেন। অথবা মাঝরাত্তিরে গাড়ি নিয়ে ছুটে আসবেন ডায়মণ্ড হারবারে।

এষার বউদি বললেন, ফোনে খবর দিয়ে দিতে।

ফোনে অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করা হল। কিন্তু টেলিফোন-দেবতার সে-দিন মেজাজ খারাপ। কিছুতেই লাইন পাওয়া গেল না। এদিকে লাস্ট ট্রেন ছেড়ে যাওয়ারও সময় হয়ে যাচ্ছে।

স্বপ্না উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমাকে যেতেই হবে। তোরা থেকে যা বরং, আমি তোদের বাড়িতে খবর দিয়ে দেব।

স্বপ্নাকে একা যেতে দেওয়া যায় না। এষা আর বাসবী বলল, না, আমরাও যাব। ট্রেনে যদি ডাকাত আসে মেরে তো ফেলবে না... দেখাই যাক-না, একটা নতুন অভিজ্ঞতা হবে।

স্বপ্না ওদের বার বার বলল যে, সে একা ঠিকই চলে যেতে পারবে। তার জন্য ওদের ভ্রমণ নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। কিন্তু স্বপ্নার দুই বান্ধবী অবশ্য তাতে রাজি হতে পারে না। এতরাত্রে স্বপ্না একা ট্রেনে যাবে, এটা কখনো সম্ভব!

এষার বউদি ওদের সঙ্গে তাঁর স্বামীর অফিসের একজন আর্দালিকে পাঠাতে চাইলেন। তাতে আপত্তি করল তিনজনেই। ওরা তেমন অবলা নয় যে, পুরুষসঙ্গী ছাড়া ঘোরাফেরা করতে পারবে না।

ওরা বেছে বেছে উঠল একটা ভিড়ের কামরায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন ছেড়ে দিল। কিন্তু দু-তিনটে স্টেশনের মধ্যে নেমে গেল অনেকে। বেঞ্চগুলো প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল। ওদের ভয় করতে লাগল একটু একটু।

মাঝে মাঝে গাড়ির গতি এমনি এমনিই আস্তে হয়ে আসে। হঠাৎ দু-তিন মিনিটের জন্য নিভে যায় আলো। মনে হয় যেকোনো মুহূর্তে হুড়মুড় করে উঠে আসবে ডাকাতের দল।

কিন্তু ডাকাতির বদলে শুরু হল সেই পুরোনো উৎপাত।

উলটো দিকের বেঞ্চ থেকে একটা লোক উঠে এসে ওদের ঠিক পাশে বসে পড়ে জিজ্ঞেস করল, আপনারা কোথায় যাবেন?

লোকটার চোখদুটো লাল। কথা জড়ানো, মুখ দিয়ে ভক ভক করে বেরোচ্ছে বিশ্রী গন্ধ।

স্বপ্নার যেমন অশ্লীল কথায় আপত্তি, এষার তেমনি আবার মাতালের ভয়। তার কাছে ভূত আর মাতাল প্রায় সমান। এষা শিউরে উঠে সরে গেল।

লোকটি বলল, ভয় পাচ্ছেন কেন? আমি থাকতে কোনো শালা এখানে আপনাদের ভয় দেখাতে আসবে না। আপনারা কোথায় যাবেন বলুন-না? আমি আছি, বডিগার্ড।

লোকটি পকেট থেকে একটা বাংলা মদের বোতল বার করে দিল একটা লম্বা চুমুক। অন্য বেঞ্চ থেকে একজন বলল, আমায় একটু দে। সবটা একাই মেরে দিস না শালা!

মেয়ে তিনটে আড়ষ্ট হয়ে বসে রইল, গায়ে গা ঘেঁষে। বোঝা গেল এই মাতালটি একা নয়, তার দলে আরও লোক আছে। কামরার সবাই একই দলের কিনা, তাই-বা কে জানে!

বাসবী একটু সাহস করে লোকটিকে বলল, আপনি একটু সরে বসুন-না। আরও তো অনেক জায়গা রয়েছে!

লোকটি বলল, কেন ভাই? যার যেখানে খুশি বসবে। রেলের সম্পত্তি কারুর কেনা নয়, এখানে সিট রিজার্ভ করাও নেই।

অন্য দিকের লোকগুলো হেসে উঠল বিশ্রীভাবে।

এইসব লোকের সঙ্গে তর্ক করে কোনো লাভ নেই বুঝে মেয়ে তিনটি জানলা দিয়ে তাকিয়ে রইল বাইরের দিকে।

কিন্তু মাতালরা নিস্তব্ধতা সহ্য করতে পারে না। লোকটি ওদের দিকে ঝুঁকে বলল, হ্যাঁ ভাই, আপনারা বুঝি ডায়মণ্ড হারবারে বেড়াতে এসেছিলেন?

ওরা কেউ উত্তর দিল না।

লোকটি আবার জড়ানো গলায় বলল, আমার নাম জগা। আমি থাকতে আপনাদের কোনো ভয় নেই। আমায় এ লাইনে সবাই চেনে। আপনারা কোথায় যাবেন বললেন না তো!

হঠাৎ এইসময়ে আর একবার আলো নিভে যেতেই এষা তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচিয়ে উঠল।

আলো আবার জ্বলে উঠল সঙ্গে সঙ্গে।

বাসবী জিজ্ঞেস করল, কী? কী হয়েছিল রে?

এষা বলল, ওই লোকটা আমার হাত ধরবার চেষ্টা করছিল।

লোকটার মুখে মিটিমিটি হাসি। নেশায় মাথাটা ঝুঁকে পড়ছে বুকের ওপর। সে বলল, হাত ধরব কেন ভাই? আমি পকেটে হাত দিয়ে বিড়ি বার করতে যাচ্ছিলাম... অন্ধকারের মধ্যে নিজের পকেট না অন্যের পকেট—

কামরার একেবারে শেষপ্রান্তে একটি লোক চাদরমুড়ি দিয়ে, এই শীতের মধ্যে জানলা খুলে সর্বক্ষণ তাকিয়ে ছিল বাইরে। এবার লোকটি চাদর খুলে উঠে দাঁড়াল। তারপর ওদের কাছে এগিয়ে এল। দীর্ঘকায় পুরুষ মধুময়।

বাসবী বা এষাকে যেন সে দেখতেই পেল না। স্বপ্নার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থেকে সে বেশ শান্ত গলায় বলল, আপনারা ওই দিকটায় গিয়ে বসুন, ফাঁকা আছে। আমি এখানে বসছি।

এষা এই লোকটিকেও অবিশ্বাস করে বলল, কেন আমরা উঠতে যাব? আমরা আগে এখানে এসে বসেছি, ওই লোকটাই ওদিকে চলে যাক-না।

মধুময় বলল, সেরকমভাবে বলে কোনো লাভ নেই। আপনারা আমার জায়গায় গিয়ে বসুন, আমি এর সঙ্গে কথাবার্তা বলছি।

এষা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, এই লোকটা অত্যন্ত অসভ্য, আমি চেন টানব।

মধুময় বলল, তাকিয়ে দেখুন, এদিককার লোকাল ট্রেনে চেন নেই। সেসব কবেই লোকে ছিঁড়ে-টিড়ে ফেলেছে।

এষা বলল, পরের স্টেশনে আমি পুলিশ ডাকব।

মধুময় বলল, এতরাত্রে কি আর স্টেশনে পুলিশ থাকবে? সন্দেহ আছে।

তারপর সে একটু হেসে বলল, আপনারা বিশ্বাস করুন, আমিই পুলিশ, আমি সব ব্যবস্থা করছি।

এষা তবু সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলল, আপনি পুলিশ?

মধুময় কামরার চতুর্দিকে প্রত্যেকটি লোকের মুখের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বেশ জোর দিয়ে বলল, হ্যাঁ, আমি পুলিশ। এরা সব সাধারণ হাটুরে লোক, এদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

স্বপ্না চোখ নামিয়েই ছিল। এবার একটুখানি তুলে বলল, ইয়ে... আপনি এদিকে কেন এসেছিলেন?

মধুময় বলল, এই একটু বেড়াবার জন্য এসেছিলাম! আপনাদের অসুবিধে হচ্ছে এখানে, আপনারা বরং ওই দিকে গিয়ে বসুন, আমি এখানে বসছি।

এষা ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। সে স্বপ্নার হাত ধরে টানল।

স্বপ্না আর কোনো কথা বলল না। ওরা তিন জনে চলে গেল কামরার অন্য দিকে।

স্বপ্নাদের পরিত্যক্ত জায়গায় মধুময় বেশ শব্দ করে বসল, তারপর মাতালটিকে বলল, আমি এখন ঘুমোব, সোনারপুর এসে গেলে আমাকে একটু ডেকে দিতে পারবেন দাদা?

মধুময়ের চেহারার মধ্যে এমন কিছু আছে, যেজন্য চট করে সাধারণ মস্তানরা তাকে ঘাঁটাতে সাহস করবে না।

বাসবী ফিসফিস করে স্বপ্নাকে জিজ্ঞেস করল, তুই ভদ্রলোককে চিনিস?

স্বপ্না জানলার বাইরে তাকিয়ে আছে। যেন শুনতেই পাচ্ছে না। বাসবী দু-তিন বার জিজ্ঞেস করার পর সে বলল, হ্যাঁ—চিনি—মানে আমরা আগে যে-পাড়ায় থাকতাম, সেখানে থাকেন।

এষা বলল, লঞ্চে যাওয়ার সময়ও ওই ভদ্রলোককে দেখেছিলাম মনে হচ্ছে। তুই তখন দেখিসনি?

স্বপ্না কোনো উত্তর দিল না।

বাসবী বলল, বেশ হ্যাণ্ডসাম চেহারা।

এষা বলল, ভদ্রলোক বললেন উনি পুলিশ, সত্যি তাই? দেখে কিন্তু বিশ্বাস হয় না।

স্বপ্না এবারও কোনো উত্তর দিল না।

বাসবী বলল, ওইরকম উপকারী পুলিশ আজকাল সহজে দেখাই যায় না।

এষা বলল, ভদ্রলোকের সঙ্গে ওরা আবার কোনো গোলমাল বাধাবে না তো!

মধুময় কিন্তু ঘুমের ভান করে চোখ বুজে আছে মাথা হেলান দিয়ে। মাতালটি চুপ মেরে গেছে।

স্বপ্নারা নামল বালিগঞ্জ স্টেশনে। অনেক রাত হয়ে গেছে।

ওরা ট্যাক্সি স্ট্যাণ্ডের দিকে এগিয়ে গেল।

এত রাতে ট্যাক্সি পাওয়া বেশ শক্ত। দু-তিনটে ট্যাক্সি রয়েছে, কিন্তু কোনো অনির্দিষ্ট কারণে ওদের নিতে চায় না। তারপর একটা ট্যাক্সি নিতে রাজি হল কোনো রকমে।

দরজা খুলে ট্যাক্সিতে ওঠার মুহূর্তে স্বপ্না একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল পেছনে।

একটা দোকানের পাশে মধুময় দাঁড়িয়ে আছে চুপ করে। তার মুখ দেখলেই বোঝা যায় স্বপ্নারা ট্যাক্সি না-পাওয়া পর্যন্ত সে ওখান থেকে নড়বে না।

স্বপ্নার মুখখানা তবু কঠিন হয়ে হইল। ট্যাক্সি চলতে শুরু করার পর বাসবী বলল, ভাগ্যিস ওই ভদ্রলোক ছিলেন... নইলে আজ কী যে হত...

এষা বলল, মাতালটা আমার হাত ধরার চেষ্টা করেছিল, ইস ভাবলেই গা ঘিন ঘিন করে...।

স্বপ্না যোগ দিল না ওদের কথাবার্তায়।

ট্যাক্সিটা চলে যাওয়ার পর মধুময় সিগারেট কেনবার জন্য দাঁড়াল আর একটা দোকানের সামনে। এতক্ষণ তার শরীরের সমস্ত স্নায়ু টান টান হয়েছিল। যেকোনো মুহূর্তে সে লাফিয়ে পড়ে ঘায়েল করে দিতে পারত সাত-আটজন লোককে। এমনকী শেষ ট্যাক্সিওয়ালাটিও যদি রাজি না হত, তাহলে মধুময় গিয়ে চেপে ধরত ওর টুঁটি। কিন্তু শেষপর্যন্ত সে-রকম কিছু ঘটেনি। তবু ভেতরে ভেতরে সে উত্তেজনা বোধ করছে এখনও। তার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। স্বপ্না তাকে ‘আপনি’ বলছে। লঞ্চে যাওয়ার সময় স্বপ্না তাকে দেখতে পেয়েও একটা কথা বলেনি।

স্বপ্না বলেছিল, তুমি আর আমাদের বাড়িতে কখনো এসো না। মধুময় তো স্বপ্নাদের বাড়িতে যায়নি। কিন্তু পথে বা নদীর বুকেও কি স্বপ্নার সঙ্গে তার দেখা করা নিষেধ? সেটা ভালো করে জেনে নিতে হবে।

রতনের দেড় বছর জেল হলেও আইনের নানান ফাঁকে ধনা ছাড়া পেয়ে গিয়েছিল। ধনার ভালো নাম ধনঞ্জয়। তার বাড়ির অবস্থা খুবই খারাপ। দু-তিন মাস ধরে ভবিষ্যতচিন্তা করার মতো বিলাসিতা সে করতে পারে না।

তাকে দু-বেলা খাদ্য সংস্থানের ব্যবস্থা করতেই হবে। শুধু তার নিজের জন্য নয়, পরিবারের সকলের জন্য। ধনার ছোটোভাইটি পড়াশুনোয় খুব ভালো। ধনা নিজে লেখাপড়া শিখতে পারেনি, তাই ছোটোভাইটিকে লেখাপড়া শেখাবার জন্য তার খুব আগ্রহ।

বেআইনি টাকা জমিয়ে রাখা যায় না। ধনা আগে যা রোজগার করেছিল, তা কিছুই নেই। ধনার মা আবার তার শেষ গয়নাটি পর্যন্ত বন্ধক দিয়ে ধনার জন্য উকিল ঠিক করেছিলেন।

জেল থেকে বেরিয়েই ধনা একটা গেঞ্জির কারখানায় কাজ জোগাড় করে ফেলল। কারখানায় শ্রমিক নয় অবশ্য, খানিকটা কেরানিগিরি আর খানিকটা মালিকের ফাইফরমাশ খাটা। মাইনে খুব-ই সামান্য।

ধনা স্কুল ফাইনাল পাশ করেছিল কোনো রকমে। ছেলেবেলা থেকেই ব্যায়াম করে তার চেহারা খুব তাগড়া, সে অসম্ভবরকম খেতে ভালোবাসে, সামান্য একটু তরকারি দিয়ে সে পনেরো- কুড়িখানা রুটি খেয়ে ফেলতে পারে অনায়াসে।

ধনা মাইনে পায় দু-শো চল্লিশ টাকা। ওদের পরিবারে পাঁচজন লোক। সুতরাং প্রত্যেক দিন পনেরো কুড়িখানা রুটি ধনার ভাগ্যে জোটার কথা নয়।

এক শনিবার বিকেলে পার্ক সার্কাস মাঠের কাছে ধনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল মধুময়ের। মধুময় তার পুরোনো সঙ্গীদের সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলছিল। ধনাকে দেখেও তাই মুখ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছিল অন্য দিকে, কিন্তু ধনাই এসে ধরল তাকে।

কীরে মধু, চিনতেই পারছিস না যে!

মধুময় লজ্জা পেয়ে গেল। এরা তো কেউ তাকে জোর করে খারাপ পথে নিয়ে যায়নি। সেই গিয়েছিল স্বেচ্ছায়। সুতরাং এদের তো দোষ দেওয়া উচিত নয়। মধুময় বলল, না রে, দেখতে পাইনি তোকে, কেমন আছিস?

ধনা বলল, আর আছি! রোজ দু-বেলা জুতো খাচ্ছি। একটা চাকরি জুটিয়েছি ভাই কোনো রকমে, কিন্তু মালিক যখন-তখন শোনায়, দাগি আসামি, তোমায় চাকরি দিয়েছি এই ঢের!

মধুময় এখনও কোনো কাজ-টাজ করে না শুনে ধনা অবাক হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, তাহলে তুই কী করবি ঠিক করেছিস? কিছু ভাবিসনি!

মধুময় দু-দিকে ঘাড় নাড়াল।

ধনা বলল, আমার ইচ্ছে করছে, এ শালার চাকরিতে লাথি মেরে বেরিয়ে আসি। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটিয়ে মাসে মাইনে দেবে মাত্র দু-শো চল্লিশ টাকা! আর মালিক দিন দিন মোটা হবে!

মধুময় সত্যি দুঃখবোধ করল ধনার জন্য। ছেলেটা খুব খেতে ভালোবাসে এত কম টাকায় ওর চলবে কী করে?

ধনা বলল, আয়, একটু বসি। দু-চারটে কথা বলি।

মধুময়ের ইচ্ছে নেই, তবু আপত্তি করতে পারল না। ওরা গিয়ে মাঠের মাঝখানে ফাঁকা জায়গায় বসল। কাছাকাছি কোনোও লোকজন নেই।

প্রথমে কিছুক্ষণ পুরোনো বন্ধুবান্ধবদের কথা হল। রতন নাকি ইতিমধ্যে জেল থেকে একবার পালাবার চেষ্টা করেছিল, ধরাও পড়ে যায়। সেজন্য রতনের মেয়াদ বেড়ে গেছে আরও।

বেচারা রতন! তাকে কখনো ঠিক ঝানু অপরাধী বলে মনে হয়নি মধুময়ের। এই সমাজের ওপরে রতনের একটা তীব্র রাগ আছে, সে রাজনীতি ঠিক বোঝে না, কোনো রাজনৈতিক দলে গিয়ে ভেড়েওনি, সে একা একাই কিংবা কয়েকজন মিলে এই সমাজকে ভেঙেচুরে দিতে চায়। এজন্য লোকে তাকে অসামাজিক বলবে ঠিকই। মধুময় এখন বুঝেছে যে এ ধরনের কাজ অসামাজিকতাই, যুক্তি দিয়ে এর কোনো সমর্থন করা যায় না।

ধনার সঙ্গে পার্কে বসে থাকতেও তার একটু লজ্জা লজ্জা করছে। কেউ দেখলে ভাববে, সে বুঝি আবার পুরানো দলে ভিড়তে চাইছে।

ধনা বলল, এই চাকরি আমার পোষাবে না। এটা আমায় ছাড়তেই হবে। আমি অন্য একটা কাজের কথা ভাবছি, তুই যদি সঙ্গে আসতে রাজি থাকিস—

মধুময় জিজ্ঞেস করল, কী কাজ?

দেখ, ডাকাতি-ফাকাতি আমাদের পোষাবে না। ওসব কাজে অনেক হ্যাপা। ওর জন্য আলাদা ট্রেনিং লাগে। তা ছাড়া বেশি লোক নিয়ে কাজ হয় না। দু-জনেই যথেষ্ট। তুই রাজি থাকলে লেগে পড়তে পারিস।

কী কাজ?

তুই তো গাড়ি চালাতে পারিস?

তা শিখেছিলাম একসময়।

ওতেই হবে। আয় তাহলে তোতে আমাতে মিলে একটা দোকান খুলি।

মধুময় হেসে বলল।—গাড়ি চালাবার সঙ্গে দোকান খোলার কী সম্পর্ক?

ধনা বলল, বড়ো ব্যাবসা করবার জন্য আমাদের ক্যাপিটাল কেউ দেবে না। ব্যাঙ্কে ধার নিতে গেলে সিকিউরিটি চাইবে কিংবা বলবে টুয়েন্টি পার্সেন্ট টাকা নিজেরা ইনভেস্ট করো—সেইজন্যই বলছি, আমরা ছোটোখাটো একটা দোকান খুলতে পারি অন্তত।

মধুময় খুব একটা উৎসাহ দেখাল না। ছোটোখাটো দোকানের দোকানদার হওয়ার ইচ্ছে তার নেই।

ধনা তার মনের ভাব বুঝেই বলল, আরে তা-বলে কি আমি তেলেভাজার দোকান কিংবা গেঞ্জির দোকান খুলতে বলছি তোকে? তুই ভালো ফ্যামিলির ছেলে, তোর প্রেস্টিজে লাগবে। কিন্তু ধর, যদি একটা ওষুধের দোকান খোলা যায়? কত বড়ো বড়ো লোক ওষুধের দোকান চালায়।

কিন্তু তাতে তো অনেক টাকা লাগে।

সে-টাকার ব্যবস্থা করতে হবে। তারও উপায় আছে।

অন্তত কুড়ি-পঁচিশ হাজার টাকার কমে কি ওষুধের দোকান হয়?

ঠিক তাই। আমিও ওইরকম হিসেব ধরেছি। টাকাটা কীভাবে জোগাড় হবে শোন। আমার সঙ্গে একটা লোকের আলাপ হয়েছে, তার মল্লিকবাজারে ব্যাবসা আছে। সে বলেছে, মোটামুটি ভালো কণ্ডিশানের গাড়ি যদি ওকে এনে ডেলিভারি দিতে পারি, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ক্যাশ চার হাজার টাকা দেবে।

গাড়ি? কী গাড়ি?

এই ফিয়াট, অ্যাম্বাসাডার। ফিয়াটের রেট একটু বেশি, পাঁচ হাজার।

ওসব গাড়ি আমরা পাব কোথায়?

ধনা হাত তুলে বলল, এই যে, রাস্তাঘাট দিয়ে এত গাড়ি যাচ্ছে। এর থেকে দু-একখানা আমরা তুলে নিতে পারব, না?

মধুময় ঠিক বুঝতে পারল না। ভুরু কুঁচকে ধনার দিকে তাকিয়ে রইল।

শোন, আমি সব প্ল্যান ছকে রেখেছি। আর কারুকে বলিনি, তোকেই বলছি। কেষ্ট গণেশ ওরাও আমাকে বলছিল, একটা কিছু কাজে নেমে পড়তে। কিন্তু ওদের আমি রিলাই করি না। তোর সঙ্গে আমার পটবে ভালো। এটা জেনে রাখিস আমি বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কখনো নেমকহারামি করি না।

সে তো বুঝলাম। কিন্তু আমরা গাড়ি কেনাবেচার ব্যাবসা করব কী করে?

আমরা গাড়ি কিনতে যাব না, বেচতেও যাব না। আমাদের কাজ শুধু, এক জায়গা থেকে গাড়ি নিয়ে গিয়ে আর এক জায়গায় ডেলিভারি দেওয়া। বাকি কাজ সেই মল্লিকবাজারের লোকটাই করবে। আমরা এক একটা গাড়ির জন্য চার-পাঁচ হাজার করে টাকা পাব।

তার মানে গাড়ি চুরি করব?

তুই একে চুরি বলছিস কেন? চুরি কথাটা শুনতে খুব খারাপ লাগে। এটা হচ্ছে ডেলিভারি কেস। এক জায়গায় গাড়ি আমরা অন্য জায়গায় ডেলিভারি দেব। কার গাড়ি, কীসের গাড়ি, সে সব তো আমাদের জানবার দরকার নেই। সেসব বুঝবে মল্লিকবাজারের সেই লোকটা।

মধুময় হেসে বলল, ধুৎ! তুই একটা পাগল নাকি!

ধনা বলল, বুঝতে পারলি না? ধর যদি আমরা পাঁচ ছ-খানা গাড়ি ডেলিভারি দিতে পারি—

মধুময় বলল, ডেলিভারি মানে কী? অন্য লোকের গাড়ি সরিয়ে মল্লিকবাজারে পাচার করে টাকা নেওয়া চুরি নয়?

এটাই সবচেয়ে মজার কাজ। অ্যাম্বাসাডার গাড়ির চাবি প্রায় সব এক। আর না হলেও তিন চার রকমের চাবি জোগাড় করা এমন শক্ত কিছুই না। রাত্তির বেলা নাইট শো সিনেমায় কিংবা অনেক মদের দোকানের সামনে যেসব গাড়ি থাকে, তার থেকে একখানা সরিয়ে ফেলতে কতক্ষণ লাগবে? আমি ঘাঁতঘোঁত সব জেনে নেব, তুই শুধু গাড়ি চালিয়ে সরে পড়বি।

মধুময় বিস্মিতভাবে ধনার দিকে তাকিয়ে রইল।

কি—রাজি?

তুই কেন গাড়ি চালানো শিখে নিচ্ছিস না? তাহলে তুই নিজেই তো—

এসব কাজ ঠিক একা একা করা যায় না। অন্ততপক্ষে দু-জন চাই। একজনকে নজর রাখতে হবে ... দেখ, আমরা যদি কুড়ি-পঁচিশ হাজার টাকা ক্যাপিটাল তুলতে পারি তাহলেই আমরা একটা ওষুধের দোকান খুলে ফেলতে পারব। তাহলে বাড়ির লোকও কিছু সন্দেহ করবে না।

বাড়ির লোকেরা জিজ্ঞেস করবে না, দোকান খোলার টাকা কোথা থেকে পেলাম?

তুই বলবি, আমি দিয়েছি ক্যাপিটাল। আমি বলব, তুই দিয়েছিস! সেই দোকান থেকে যদি প্রফিট হয় তো ভালোই, তাহলে আমরা অন্য লাইন একদম ছেড়ে দেব। আর যদি প্রফিট না হয় তাহলে দোকানটা চালু রেখে আমরা একখানা দু-খানা করে গাড়ি সরাব। একটা-কিছু ব্যাবসা বা ঠিক জায়গায় চাকরি জোগাড় করে নিতে পারলে, তারপর তুই তলায় তলায় চুরি কর, ডাকাতি কর, কেউ কিছু বলবে না। যত দোষ শালা শুধু বেকারদের। এদিকে অন্যরা যে চুরি করে ফাঁক করে দিচ্ছে... কি, রাজি?

মধুময় অনেকক্ষণ চুপ করে চিন্তা করল। একবার ভাবল, পুরো প্রস্তাবটাই হেসে উড়িয়ে দেয়। ধনা তার মুখের দিকে ব্যাগ্রভাবে চেয়ে আছে।

যদি আবার ধরা পড়ি?

কলকাতায় গাড়ি চুরি করতে গিয়ে কেউ কখনো ধরা পড়েছে, তুই শুনেছিস? কোনো রেকর্ড নেই। ছিঁচকে চোরেরা গাড়ির পার্টস-টার্টস চুরি করতে গিয়ে অনেকসময় ধরা পড়ে। আমরা এসবের মধ্যে নেই। আমরা দারুণ সেজেগুজে ফিটফাট হয়ে যাব। আর তোর এ-রকম সুন্দর চেহারা। তোকে কে সন্দেহ করবে? ধর বাইচান্স কেউ দেখে ফেলল, তাতেই বা কী, তুই বলবি, ভুল হয়ে গেছে। অ্যাম্বাসাডর গাড়িতে এ-রকম প্রায়ই ভুল হয়। কি—হয় না?

মধুময় বলল, তা হয়!

তাহলে? আমাদের একটু বেশি টাকা হলে আমরা নিজেরাই একটা গাড়ি কিনে পাশে রেখে দেব। কেউ যদি আমাদের ধরতে আসে, আমরা ফাঁটের ওপর বলব, আরে মশাই ভুল হয়ে গেছে, এই তো পাশেই আমাদের গাড়ি! কি বল, প্ল্যানটা খারাপ? তুই রাজি থাকিস তো—

মধুময় হাসতে হাসতে বলল, ‘এত সহজ?’

ধনা বলল, হ্যাঁ রে, সত্যি সহজ। একবার ট্রাই করেই দেখা যাক-না। যে ভদ্রলোক গাড়ি ডেলিভারি নেয়, তার আরও ক্লায়েন্ট আছে। প্রায়ই তারা গাড়ি ডেলিভারি দেয়। এ-পর্যন্ত কেউ ধরা পড়েনি!

আচ্ছা, ভেবে দেখি!

এরমধ্যে ভাবাভাবির কী আছে? আমাদের তো একটা-কিছু করে দাঁড়াতে হবে। কলকাতা শহরে যারা গাড়ি চড়ে ঘুড়ে বেড়ায় তাদের একটা গাড়ি হারিয়ে গেলেও আর একটা গাড়ি কিনে ফেলতে পারে অনায়াসে। আমরা বেশি লোভ করব না, মাসে দু-খানার বেশি গাড়ি ডেলিভারি দেব না। আর যদি দোকানটা ভালোভাবে চলে, আমরা পুরোপুরি ভদ্রলোক হয়ে যাব। তোকে দোকানের জন্য বেশি খাটতে হবে না, সব আমি ম্যানেজ করব।

ঠিক আছে, ভেবে দেখি ব্যাপারটা।

শোন মধু, তোকে একটা কথা বলব? দেরি করে লাভ কী?

‘শুভস্যশীঘ্রম’ বলে একটা কথা আছে-না? আজ শনিবার, আকাশটা মেঘলা মেঘলা, বৃষ্টি নামতে পারে, আজই আইডিয়াল দিন ... আজই কাজ শুরু করা যাক-না? একটা গাড়ি ডেলিভারি দিতে পারলেই তোর দু-হাজার, আমার দু-হাজার।

আজ পারব না আমি।

কেন? তোর আজ বিশেষ কিছু কাজ আছে?

সেজন্য নয়। আমি ঠিক এক মাস তেইশ দিন সময় চাই।

এক মাস তেইশ দিন? তার মানে?

এই সময়টা আমি একটা বিশেষ জিনিস নিয়ে চিন্তা করছি। এ ক-টা দিন কেটে গেলে তারপর আমি ঠিক করব, তোর সঙ্গে এই কাজে নামব কিনা। আমি না নামলেও তুই অন্য লোক পেয়ে যাবি।

যা বাবা:! তুই কি ব্রত-ট্রত নিয়েছিস নাকি? এক মাস তেইশ দিন ধরে চিন্তা? এ-রকম শুনিনি কক্ষনো!

মধুময় উঠে দাঁড়িয়ে বলল, হ্যাঁ, ব্রতই বলতে পারিস। তার আগে আমার অন্য কিছু করার উপায় নেই। এ লাইনে যদি আবার ফিরে আসি তাহলে তোর প্ল্যানটা খুবই ভালো সন্দেহ নেই। তোর সঙ্গেই নেমে পড়ব।

ধনা সেখানেই বসে রইল অবাক হয়ে। মধুময় হন হন করে হেঁটে মাঠ থেকে বেরিয়ে গেল।

দেশপ্রিয় পার্ক থেকে রাসবিহারীর মোড়। শুধু এই জায়গাটুকুতে মধুময় জীবনে আর কখনো যাবে না। এ ছাড়া কলকাতার বাকি অংশ বা কলকাতার বাইরে, কিংবা গোটা ভারতবর্ষ, সব জায়গাতেই মধুময়ের যাওয়ার অধিকার আছে। সে স্বাধীন, পুলিশও তার নামে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত করতে পারেনি।

মধুময় এখন প্রায় কোনো সময়েই বাড়িতে থাকে না। মা কোনো অভিযোগ করতে পারেন না। কারণ মধুময় মাকে খুব স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে যে, তাকে দু-মাস সময় দিতে হবে।

পা-জামা, পাঞ্জাবিপরা। আর একটা কালো রঙের শাল জড়ানো গায়, মধুময় যেন একজন সন্ন্যাসী, সে শহরের পথে পথে একলা একলা ঘুরে বেড়ায়। সামান্য চেনাশুনো কাউকে দেখলেই সে সরে যায় চট করে। কারুর সঙ্গে তার কথা বলতে ইচ্ছে করে না। সন্ন্যাসীরা সবসময় ভগবানের কথা চিন্তা করে কি না কে জানে, কিন্তু মধুময়ের বুকের মধ্যে, সবসময় একটিই ছবি, স্বপ্নার মুখ।

এজন্য এক-এক সময় নিজের ওপরেই খুব বিরক্ত হয়ে ওঠে মধুময়। পৃথিবীতে স্বপ্না ছাড়া কি আর কিছু নেই? সে কি অন্য কিছু নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না? ধরা যাক স্বপ্না মরে গেছে। জেল থেকে বেরিয়ে মধুময় যদি শুনত যে, হঠাৎ একটা অসুখে স্বপ্না মারা গেছে ইতিমধ্যে, তা হলে মধুময় কী করত? সে কি পাগল হয়ে যেত? কিংবা আত্মহত্যা করত? কতরকম কঠিন শোক সহ্য করেও তো মানুষ বেঁচে থাকে। ছেলের মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকে মা, এর চেয়ে বড়োশোক তো আর নেই।

চাকরি ছাড়াও কি একজন মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না? মধুময়ের গায়ে জোর আছে, শুধু শারীরিক শক্তি দিয়ে এখনও একজন মানুষ, এই শহরে নিজে বেঁচে থাকার মতন টাকা রোজগার করতে পারে।

রেলস্টেশনে কুলিরা কি বেঁচে নেই? সেইসব কুলিরাও কখনো কখনো হাসে, তারাও গান গায়, অর্থাৎ তাদের জীবনেও কিছু-না-কিছু সুখ আছে। কত বেকার ছেলে তো ফুটপাথে বসে ফ্রক কিংবা গেঞ্জি বিক্রি করে, মধুময় তাও পারে। সে পারে ট্রেনে ট্রেনে আশ্চর্যমলম কিংবা ডটপেন ফিরি করতে। এসব ব্যাপারে মধুময়ের কোনো লজ্জা নেই।

কিন্তু এগুলো করতে গেলে মধুময়কে একা হয়ে যেতে হবে। একা হলে সে যেভাবেই হোক নিজের জীবনটা কাটিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু সে একা নয়। তার দু-দিকে বাধা আছে। বাবা রিটায়ার করবেন শিগগিরই, সবাই আশা করে আছে, তারপর মধুময়ই সংসারের দায়িত্ব নেবে। মধ্যবিত্ত পরিবারে এ-রকমই নিয়ম।

সে এক ছেলে, তার দিদির বিয়ে হয়ে গেছে, ছোটবোন কলেজে পড়ে। এ-রকম সংসারে ছেলেটিকেই ঘাড় পেতে সংসারের দায়িত্ব নেবার জন্য তৈরি হতে হয়। সেইজন্যই তাকে শেখানো হয়েছে লেখাপড়া। সেই লেখাপড়া শেখার বিনিময়ে সরকার তাকে চাকরি দিতে অক্ষম, সেটাও কি মধুময়ের দোষ?

মধুময় স্টেশনের কুলি কিংবা ট্রেনের ফেরিওয়ালা হয়ে টাকা রোজগার করে সংসার চালাতে চাইলেও কেউ তা মেনে নেবে না। কারণ তারা ভদ্রলোক। ভদ্রলোকদের ওসব করতে নেই। সে স্টেশনের কুলি কিংবা ট্রেনের ফেরিওয়ালা হলে তার ছোটোবোনের ভালো জায়গায় বিয়ে হবে না পর্যন্ত! মা কেঁদে ভাসাবেন। মা তাঁর বড়োলোক ভাইদের কাছে কাকুতিমিনতি করবেন মধুময়ের যেকোনো একটা ভদ্রলোকের চাকরি জোগাড় করে দেওয়ার জন্য।

কারুকে ঘুস দিয়ে চাকরি জোগাড় করতেও মা-বাবাদের কোনো আপত্তি নেই। মধুময় গুণ্ডামি ডাকাতি করে টাকা রোজগার করলেই আপত্তি। ধরা না পড়লে বোধ হয় তাতেও আপত্তি থাকত না। যারা চোরাই মালের ব্যবসা করে, তারাও সবাই ভদ্রলোক।

স্বপ্নার প্রেমিক হিসেবেও সে কুলি কিংবা ফেরিওয়ালা হতে পারে না। স্বপ্নার প্রেমিক! মধুময়ের হাসি পায়।

স্বপ্না তাকে সারাজীবনের মতন তার সঙ্গে আর দেখা করতে বারণ করেছে। কখনো পথে দেখা হয়ে গেলেও মুখ ঘুরিয়ে নেয় সে। তবু মধুময়ের সন্দেহ হয়। স্বপ্না কি সত্যি সত্যিই তাকে ছেড়ে থাকতে পারবে?

মধুময় যেমন মনে করে, তার হৃদয়ের একটা টুকরো স্বপ্নার কাছে গচ্ছিত আছে, তেমনি স্বপ্নার হৃদয়েরও একটা টুকরো কি মধুময়ের কাছে গচ্ছিত নেই? হঠাৎ একসময় স্বপ্নারও কি মনে হবে না যে, মধুময়কে ছাড়া সে বাঁচতে পারবে না?

মধুময় একবার ভুল করেছে বলে কি স্বপ্না তাকে ক্ষমা করতে পারে না? মধুময়ের মুখ দেখে কি স্বপ্না বুঝতে পারে না যে, মধুময় জাত-অপরাধী নয়? মধুময় যদি প্রতিশ্রুতি দেয় তাও স্বপ্না মেনে নেবে না? মধুময় একবার বিশ্বাসভঙ্গ করেছে বলে স্বপ্না তাকে আর বিশ্বাস করবে না। খানিকটা অ্যাডভেঞ্চার আর সহজে টাকা রোজগারের লোভেই মধুময় রতনদের দলে গিয়ে ভিড়েছিল। সেজন্য মধুময় কখনো ঠিক অনুতাপ বোধ করে না। এই সমাজে যারা অন্যায়ভাবে টাকা রোজগার করে, তাদের অতিরিক্ত টাকা আছে, তাদের কাছ থেকে কিছু টাকা কেড়ে নেওয়াটা তেমন অন্যায় মনে করে না মধুময়। এই সমাজ যখন, সমানভাবে ভাগ করে দিতে পারছে না, তখন কেউ কেউ তো নিজেদের দাবি আদায় করার চেষ্টা করবেই।

তবু স্বপ্নার কথাই চিন্তা করেই মধুময় ওই দিকটা একেবারে ত্যাগ করতে প্রস্তুত আছে। সে চাকরি জোগাড় করে ভদ্রলোক সাজবে। মুম্বাইতে গেলে কিছু-একটা হয়ে যাবে মনে হয়। কিন্তু তার আগে জেনে নেওয়া দরকার, স্বপ্না তার কাছে ফিরে আসবে কি না। স্বপ্নার জন্যেই তো এতখানি আত্মত্যাগ। নইলে নিছক মধ্যবিত্তের মতন সে মুম্বাই গিয়ে চাকরির হ্যাংলামি করতে যাবে কেন?

যদি মধুময়ের বদলে স্বপ্না কোনো মারাত্মক ভুল করে ফেলত? না, স্বপ্না কোনো ভুল কিংবা অন্যায় করবে না, তার নীতিবোধ খুবই পরিচ্ছন্ন এবং গতানুগতিক। সততা আর সাফল্যের জন্যই স্বপ্না বেশি সুন্দর। তবু কোনো দুর্ঘটনাও তো ঘটতে পারে।

স্বপ্না খুব ট্যাক্সি চড়তে ভালোবাসে। স্বপ্না একা ট্যাক্সিতে যাওয়ার সময় স্বপ্নাকে হঠাৎ কেউ জোর করে ধরে নিয়ে যেতে পারত। তারপর স্বপ্নার ওপর বলাৎকার করে তাকে ছেড়ে দিল। হঠাৎ একদিন মধুময় জানতে পারল, স্বপ্না সন্তানসম্ভবা! তখন মধুময় কী করত? সে কি ঘৃণায় আর স্বপ্নার মুখ দেখতে চাইত না?

মধুময়ের পক্ষে তা কি সম্ভব? সেই বিপদের সময় সেই তো ছুটে গিয়ে স্বপ্নার পাশে দাঁড়াত। স্বপ্নার গর্ভের সন্তানের পিতৃত্ব দিত সে নিজে। সবচেয়ে বড়োকথা, স্বপ্নার মনে যাতে কোনো আঘাত না লাগে, সেটাই বেশি করে দেখত মধুময়।

কিংবা অন্যরকম কিছুও হতে পারত। স্বপ্না সবাইকে বিশ্বাস করে। মধুময় জানে, স্বপ্নার খুড়তুতো ভাই চাঁদু মোটেই ভালোছেলে নয়! অল্পবয়স থেকেই বখে গেছে। বাজে বাজে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মেশে চাঁদু—জুয়া-টুয়া খেলে, আরও অন্য কিছু করে কিনা কে জানে!

মধুময় দু-এক বার স্বপ্নাকে চাঁদুর কথা বলেছে, স্বপ্না তা উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, যা:, চাঁদু খুব ভালো ছেলে, লেখাপড়ায় মাথা নেই, কিন্তু পাড়ার কত লোককে সাহায্য করে।

ধরা যাক, সেই চাঁদু ভুলিয়ে-ভালিয়ে স্বপ্নাকে কোথাও নিয়ে গেল। তারপর কোনো পাপচক্রে জড়িয়ে ফেলল তাকে। এমনও তো হতে পারে চাঁদুর বন্ধুরা খেপে উঠল স্বপ্নার জন্য, তারা নিজেদের মধ্যে মারামারি করতে করতে একজন খুন হয়ে গেল ওদের মধ্যে। সেইসময় পুলিশ গিয়ে গ্রেফতার করল সবাইকে। খুনের ব্যাপার, নিশ্চয়ই স্বপ্নাকেও জেলে আটকে রাখবে। হঠাৎ সেই খবর শুনে মধুময় কি অমনি ভেবে বসবে যে, স্বপ্না তার চোখের আড়ালে উচ্ছন্নে গেছে, সে আর স্বপ্নার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখবে না!

রাস্তায় যেতে যেতে মধুময় থমকে দাঁড়ায়। যেন সে চোখের সামনে দেখতে পায় জেলখানার জেনানা ফাটকে বন্দিনি রয়েছে স্বপ্না। চোখের নীচে দুশ্চিন্তার কালি। ভিজিটার্স রুমে দেখা করতে গেছে মধুময়।

মধুময়কে দেখেই কেঁদে ফেলল স্বপ্না। মুখ ঢেকে সে বলছে, না না, আমি তোমার কাছে আর মুখ দেখাতে চাই না।

মধুময় স্বপ্নার হাতটা ছুঁয়ে বলল শান্ত হও!

স্বপ্না হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বললে, না তুমি আমায় ছুঁয়ো না, আমি নষ্ট হয়ে গেছি।

মধুময় বলল, স্বপ্না, মুখ তোলো, আমার দিকে তাকাও।

স্বপ্না বলল, আমার এখন মরে যাওয়াই ভালো।

মধুময় বলল, ছি:!

স্বপ্না বলল, আর তোমার পাশে দাঁড়াবার যোগ্যতা আমার নেই। এ পৃথিবীতে আমার আর স্থান নেই।

মধুময় দৃঢ় গলায় বলল, শোনো স্বপ্না, তোমায় যদি কেউ নরকে নিয়ে যেত, আমি সেখান থেকেও তোমায় খুঁজে আনতাম। আমি জানি, তোমার গায়ে ময়লা লাগলেও তোমার মনে কখনো ময়লা লাগতে পারে না। আমি কি কখনো তোমায় ছেড়ে...

রাস্তার লোক অবাক হয়ে মধুময়কে দেখে। সে পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছে। ঠিক যেন একটা পাগল।

এক সময় মধুময় চমকে উঠে সচেতন হয়ে যায়। লজ্জা পেয়ে সে দ্রুত হাঁটতে শুরু করে। সত্যিই তো স্বপ্নার কথা ভেবে ভেবে সে পাগল হয়ে গেল নাকি?

সাময়িকভাবে ভুলে থাকার জন্য, মাঝেমধ্যে সে সিনেমা-থিয়েটার দেখতে যায়। তবু কিছুতেই সেখানেও মন বসে না। খানিকটা বাদে সে টের পায় যে সিনেমার গল্পটা সে কিছুই বুঝতে পারছে না। কারণ সে পর্দার দিকে চেয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু তার মনের মধ্যে চলছে স্বপ্নার চলচ্চিত্র।

অনেক সময় দেখা যায়, ময়দানে কোনো অখ্যাত ক্লাবের ছেলেরা ক্রিকেট প্র্যাকটিস করছে, গায়ে চাদর দেওয়া লম্বা চেহারার মধুময় তাদের একমাত্র দর্শক। সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে সেখানে। ইচ্ছে করলে কি মধুময়ও ওদেরই মতন খেলাধুলো করে আনন্দে মেতে থাকতে পারত না? কিন্তু তার জীবনটা বদলে গেছে। সে আর অন্য কারুর মতন নয়।

একদিন সন্ধ্যেবেলা একটা বাড়ির সামনে মধুময় খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

এই বাড়িটা তার খুব চেনা। পুরোনো আমলের বাড়ি, সামনে লোহার গেট, ভেতরে একটু ছোট্টবাগান, তারপর হলুদ রঙের তিনতলা। দোতলার ডান দিকে যে ছোট্ট ঝোলানো বারান্দা, সেখানে মধুময় কতদিন দাঁড়িয়ে থেকেছে।

এবাড়িতে অমল থাকে, মধুময়ের স্কুলের বন্ধু। এক সময় মধুময় এবাড়িতে প্রায় প্রতিদিন আসত, অমলের মা-বাবা, ভাই-বোনেরা সবাই তাকে চেনে। অমলের মা, তাকে নিজের ছেলের মতন ভালোবাসতেন। অমলেরও একসময় শখ ছিল ছবি আঁকার, কতদিন মধুময় আর অমল ওই ঝুল বারান্দায় বসে ছবি এঁকেছে একের-পর-এক।

একদিনের ঘটনার পর মধুময় আর এবাড়িতে আসে না। তখন মধুময় আর অমল ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে, ওরা দু-জনে বসে ছবি আঁকছিল এক দুপুরে, এমন সময় হঠাৎ অমলের বাবা সেখানে এলেন। অমলের বাবাকে অত রেগে যেতে মধুময় আগে কখনো দেখেনি। তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন, পড়াশোনা নেই, কিছু না, দিনরাত শুধু ছবি আর ছবি! তোরা কালীঘাটের পোটো হবি ভেবেছিস। নিকুচি করেছে ছবি আঁকার!

তারপর অমলের বাবা অমলের আঁকা ছবিগুলো খামচে তুলে নিয়ে কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলেছিলেন।

খুব অপমানিত বোধ করেছিল মধুময়, সে নি:শব্দে উঠে বেরিয়ে গিয়েছিল। আর আসেনি কোনোদিন।

এমনকী মধুময় পাটনা থেকে ফেরার পর খবর পেয়েছিল যে, অমলের মায়ের খুব অসুখ, তবু সে দেখা করতে আসেনি একবারও। অমলের মা মারা গেছেন।

মধুময় গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকে এসে কলিংবেল টিপল।

দরজা খুলে দিল একজন পুরোনো ভৃত্য। এর নাম রাখু। এও মধুময়কে চেনে। সে একটু হেসে বলল, দাদাবাবু অনেক দিন পর এলেন।

অমল আছে?

হ্যাঁ আছেন।

দরজা খুলে রাখু সরে দাঁড়াল। আগেকার দিনে মধুময় সোজা দো-তলায় উঠে যেত অমলের ঘরে। রাখু ভেবেছে, মধুময় সেইরকমই যাবে।

মধুময়কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে বলল, যান-না, ওপরে যান, দাদাবাবু একটু আগেই ফিরেছেন।

মধুময় আড়ষ্ট বোধ করল। সে শুনেছে যে, এরমধ্যে অমলের বিয়ে হয়ে গেছে। অমল তার বাড়িতে নেমন্তন্ন করতেও গিয়েছিল, মধুময় তখন জেলে।

মধুময় বলল, না, আমি নীচের ঘরে বসছি, তুমি দাদাবাবুকে খবর দাও।

অমলদের পরিবার বেশ স্বচ্ছল। তা ছাড়া অমল পাশ-টাশ করে একটা চাকরিও পেয়েছে, তারপর বিয়ে করেছে, সে এখন সুখী মধ্যবিত্ত।

মধুময়ের যতদূর মনে আছে, এ পাড়ারই রীতা নামে একটি মেয়ের সঙ্গে অমলের ভাব ছিল। অমল কি তাকে বিয়ে করেছে? অমল স্বপ্নাকেও চেনে।

অমল এল, বেশ খানিকটা দেরি করে।

এই শীতের মধ্যেও সন্ধ্যে বেলা স্নান করেছে অমল। পাজামা-পাঞ্জাবির ওপর একটা সাদা শাল আলগা ভাবে জড়ানো। সারাগায়ে পাউডারের গন্ধ।

কী রে?

মধুময় কথা না বলে হাসল।

সোফার ওপর বসে পড়ে অমল পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে বলল, ‘খাবি? এতদিন পর হঠাৎ মনে পড়ল?’

অমল মধুময়েরও আগে থেকে সিগারেট ধরেছে। আগে অমলকে খুব লুকিয়ে-চুরিয়ে সিগারেট খেতে হত, এখন সে বিবাহিত সংসারী মানুষ বলে বসবার ঘরেই সিগারেট ধরাতে পারে। অমলের বাবা তো, যেকোনো মুহূর্তে আসতে পারেন এখানে।

মধুময় হাত বাড়িয়ে অমলের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট নিয়ে বলল, কেমন আছিস?

ভালোই। তোর খবর কী?

চলছে।

মাসিমা কেমন আছেন?

খুবই কাটা কাটা কথাবার্তা। মধুময়ের মনে হল, অমলের মুখে যেন অভিমানের ছাপ। মধুময় যে হঠাৎ এবাড়িতে আসা বন্ধ করেছিল সেইজন্য অমলের তো অভিমান হতেই পারে। বাবা-মায়েরা তো ওরকম একটু-আধটু বকাবকি করেন, তাবলে কি কেউ ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে ত্যাগ করে? অমলের বাবা অমলের ছবিই ছিঁড়েছিলেন। মধুময়ের তো ছেঁড়েননি। তা ছাড়া মধুময় নিজেই এখন ছবি আঁকা ছেড়ে দিয়েছে।

একটু পরেই মধুময়ের খেয়াল হল, সে নিজে থেকে দো-তলায় উঠে যায়নি, অমলও তাকে ওপরে যেতে বলল না। আগে তারা কখনোই বসবার ঘরে বসে গল্প করেনি।

অমল নিশ্চয়ই মধুময়ের কীর্তি কাহিনি সব জানে। মধুময়ের নামে যখন মামলা চলছিল তখন খবরের কাগজে সব ছাপা হয়েছিল। অমল নিশ্চয়ই খবরের কাগজ পড়ে। এমনিতেও এসব কথা লোকের মুখে মুখে ঠিক রটে যায়।

মধুময় জিজ্ঞেস করল, তুই কি রীতাকে বিয়ে করেছিস?

অমল চকিতে মাথা ঘুরিয়ে পেছনের দরজার দিকে তাকাল। তারপর একটু বিরক্তভাবে বলল, রীতাকে? কেন, রীতাকে বিয়ে করতে যাব কেন? রীতার তো আগেই বিয়ে হয়ে গেছে।

বেশি দিনের তো কথা নয়, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধান, তবু যেন, মনে হয় এক যুগ পার হয়ে গেছে, ঘটে গেছে কত কিছু, মধুময় তার অনেক কিছুরই খবর রাখে না।

তোর বউয়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিবি না?

দাঁড়া, ডাকছি।

সোফা থেকে উঠতে গিয়েও অমল আবার বসে পড়ে বলল, ও, ও তো বাড়ি নেই, আমার ছোটো বোনের সঙ্গে বেরিয়েছে। তুই আগে থেকে খবর দিয়ে আসিসনি, আর একদিন আয়।’

মধুময়ের কেন যেন মনে হল, অমল মিথ্যেকথা বলছে। অমলের স্ত্রী বাড়িতেই আছে, কিন্তু অমল তার সঙ্গে মধুময়ের আলাপ করিয়ে দিতে লজ্জা পাচ্ছে। অমলের স্ত্রী যদি বলে, এই তোমার সেই বন্ধু, যে ট্রেনে ডাকাতি করেছিল? যে ধরা পড়েছিল একটা বেশ্যার বাড়িতে?

অমল ওর স্ত্রীকে নীচে ডাকতে যাচ্ছিল। তার মানে, অমল আর ওকে দো-তলার ঘরে নিয়ে যেতে চায় না।

মধুময়ের খুব ইচ্ছে হল একবার দো-তলার সেই বারান্দাটায় গিয়ে দাঁড়াতে।

মধুময় যদি ওপরে যেতে চায় আর ওপরে গিয়ে দেখে যে, অমলের স্ত্রী বাড়িতেই আছে, তাহলে অমল লজ্জা পেয়ে যাবে।

চা খাবি?

খেতে পারি।

অমল এবার উঠে গিয়ে ভেতরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাঁক দিল, রাখু, রাখু—

রাখু এলে মধুময় কি জিজ্ঞেস করবে, বলো তো রাখু, তোমার দাদাবাবুর বউ বাড়িতে আছেন কি না?

মধুময়ের একটু হাসি পেল।

পরক্ষণেই তার মাথায় আর একটা উদ্ভট চিন্তা জাগল। অমলের কাছে কিছু টাকা ধার চাইলে কেমন হয়?

মধুময়ের টাকার দরকার নেই। দুটো মাস চালাবার মতন যথেষ্ট হাত-খরচ তার আছে। তবু সে অমলকে একটু পরীক্ষা করে দেখতে চায়। খুব বেশি নয়, শ-দুয়েক টাকা যদি চাওয়া যায়?

মধুময়ের মতন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে অমল নিশ্চয়ই দু-শো টাকা ধার দিতে পারে। কিন্তু মধুময় ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল বলে অমল কি এখন টাকাটা ধার দিতে চাইবে না? ওর বউয়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়ার মতন কথাটা ঘুরিয়ে দেবে?

এইসময় লোহার গেট ঠেলে দু-টি মেয়ে ভেতরে এল। একজন অমলের ছোটোবোন বনানী, অন্যজন বিবাহিতা। এই নিশ্চয়ই অমলের স্ত্রী। তাহলে তো অমল মিথ্যেকথা বলেনি।

অমল অবশ্য ওর স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল না, অন্যমনস্কভাবে সিগারেট টানতে লাগল।

মধুময় যখন বনানীকে দেখেছে, তখন ও ফ্রক পরত, এখন শাড়ি পরে রীতিমতো মহিলা হয়ে গেছে। সে অমলের স্ত্রীর সঙ্গে ভেতরে চলে যাচ্ছিল। মধুময় ডেকে বলল, এই বনানী, কেমন আছিস?

বনানী ঘুরে দাঁড়িয়ে বিস্মিতভাবে হেসে বলল, ও মা, মধুদা! চিনতেই পারিনি। আমি ভাবলাম কোনো অচেনা লোক। এত বড়ো বড়ো চুল রেখেছ!

কিন্তু মধুময় খুব ভালোভাবেই জানে, বনানী তাকে আগেই চিনেছিল, ওর চাহনি দেখেই বোঝা যায়। চিনতে পেরেও কথা না বলে চলে যাচ্ছিল।

বনানী বলল, এসো বউদি, তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। এ হচ্ছে মধুময়দা, দাদার খুব বন্ধু ছিল, একসময় খুব আসত আমাদের বাড়ি—

মধুময় উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে নমস্কার করে বলল, নমস্কার! আপনি আগে আমার কথা শোনেননি অমলের কাছে? আপনাদের বিয়ের সময় আমি আসতে পারিনি, তখন আমি জেলে ছিলাম।

অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল হঠাৎ। কেউ কোনো কথা বলল না একটাও।

মধুময় এবার একগাল হেসে বলল, আমি ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিলাম।

এবার অমল সঙ্গে সঙ্গে প্রবল প্রতিবাদ করে বলে উঠল, মোটেই না, কেন ইয়ার্কি করছিস, মধু? সবাই জানে তুই কিছু করিসনি, পুলিশ তোর নামে কোনো কেস দিতে পারেনি। জজ তোকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন।

বনানী বলল, আমরাও কাগজে তাই পড়েছি।

অমল বলল, ওকে মিথ্যে মামলায় জড়িয়েছিল। আজকাল পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এমনই অপদার্থ।

বনানী বলল, ইস, তোমাকে অনেক দিন জেলে আটকে রেখেছিল, তাই-না মধুদা? রোগা হয়ে গেছ সেইজন্য!

অমলের স্ত্রী বেচারি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। কী বলবে বা কী করবে বুঝতে পারছে না।

মধুময় ভাবল, ওর তো এমন অবস্থা হবেই। কেন-না নিশ্চয়ই মধুময়কে নিয়ে আগেও অনেক আলোচনা হয়েছে। মধুময় যে ট্রেনে ডাকাতি করেছিল তাতে ওদের কোনো সন্দেহ নেই। পুলিশ অনেকসময়ই এসব প্রমাণ করতে পারে না, সেইজন্যই তো বাঘা বাঘা উকিলরা রয়েছে। তা ছাড়া মধুময় কোথায় ধরা পড়েছিল, তাও তো কারুর আর অজানা নেই।

অমল যে জোর করে মধুময়কে নির্দোষ প্রমাণ করবার চেষ্টা করছে, তার মানে ওর স্ত্রীকে জানাতে চায় যে, একজন ডাকাত অমলের বন্ধু নয়। তাও আবার বিচ্ছিরি ধরনের ডাকাতি। অনন্ত সিংয়ের দলে ভিড়ে কোনো রাজনৈতিক ডাকাতি করলেও তবু কিছুটা মান রক্ষা করা যেত।

অমলের স্ত্রী বলল, আপনি বসুন। চা-টা কিছু দেয়নি, আমি দেখছি।

দ্রুতপায়ে সে ভেতরে ঢুকে গেল।

এরপর চায়ের সঙ্গে মিষ্টিও এল। অমল জোর করে ছাত্র-বয়েসের গল্প করতে লাগল। হেসে উঠল কয়েকবার। যেন মধুময়ের সঙ্গে তার আগের মতনই বন্ধুত্ব আছে।

কিন্তু মধুময় যেই বলল, ‘এবার উঠি’। অমল তার উত্তরে বলল, না আর একটু বোস। সে-ই, সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

বাইরের লোহার গেটটার কাছে এসে মধুময়ের মনের মধ্যে আবার বিড়বিড় করে উঠল। অমল তাকে একবারও দো-তলার ঘরে যেতে বলল না। অমলের বউ কিংবা বনানী আর ফিরে এল না তার সঙ্গে কথা বলবার জন্য।

গেটটা খোলার জন্য হাত দিয়েও থেমে গিয়ে মধুময় বলল, তোরা বললি আমি নির্দোষ, পুলিশ আমায় মিথ্যে মামলায় জড়িয়েছিল, কিন্তু স্বপ্না সে-কথা বিশ্বাস করে না।

অমল বলল, স্বপ্নার সঙ্গে অনেক দিন দেখা নেই। কেমন আছে স্বপ্না?

আমার সঙ্গে দেখা হয় না।

ও!

একটু থেমে মধুময় বলল, জানিস অমল, আমি কিন্তু সত্যি সত্যিই ট্রেনে ডাকাতি করেছিলাম।

একটুও না চমকে অমল তেতো গলায় বলল, কেন গিয়েছিলি! তোর কি এতই টাকার অভাব? মেসোমশাই তো এখনও চাকরি করছেন।

আমি কোনো চাকরি পেলাম না।

চাকরি না পেলেই কী, ভদ্রলোকের ছেলেরা ডাকাতি করে? এখন তোর একটা বাজে রেকর্ড হয়ে গেল, এখন কে তোকে চাকরি দেবে?

অমল তুই আমার একটা উপকার করবি? বিশেষ দরকার, তুই আমাকে দু-শো টাকা ধার দিবি?

যতটা চমকানো উচিত ছিল, ততটা চমকাল না অমল। সে যেন, এ-রকম কিছুরই প্রতীক্ষা করছিল। একটা-কোনো মতলব না থাকলে কি মধুময় হঠাৎ এমনি এসেছে এতদিন বাদে!

ভাবলেশহীন গলায় অমল বলল, কিন্তু আমার যে একদম হাত খালি ভাই। গত মাসে দার্জিলিং গিয়েছিলাম বাড়ির সবাইকে নিয়ে। তাতেই একেবারে ফতুর হয়ে গেছি।

কিছু দিতে পারিস-না? অন্তত শ-দেড়েক? বিশেষ দরকার বলেই বলছি।

খুব মুশকিলে ফেললি ... গোটা কুড়ি-তিরিশ টাকা দিতে পারি বড়োজোর।

আচ্ছা থাক।

গেট খুলে বেরিয়ে গেল মধুময়। হাসিমুখে বলল, চলি।

মধুময় কয়েক পা এগিয়ে যাওয়ার পর অমল বলল, গোটা পঞ্চাশেক হলে যদি চলে, কিংবা সামনের সপ্তাহে—

মধুময় বলল, ‘না থাক, তার আর দরকার হবে না।’

কিছু দূর যাওয়ার পর মধুময়ের মুখ থেকে হাসিটা আপনা-আপনি মুছে গেল। এ-রকমই তো হওয়ার কথা ছিল। মধুময় কি অন্যরকম কিছু আশা করেছিল? অমল তো এর থেকেও খারাপ ব্যবহার করতে পারত।

মন খারাপ—মন খারাপ—মন খারাপ—প্রতিপদক্ষেপে মধুময়ের মন খারাপ বাড়তে লাগল, তার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।

এই সবই বদলে দিতে পারে স্বপ্না। যদি স্বপ্না একবার এসে বলে, আমি তোমায় ভুল বুঝিনি—অমনি মধুময় অন্য মানুষ হয়ে যাবে। সে স্বপ্নার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়ে আগ্রহ্য করবে পৃথিবীর আর সব কিছু।

অথবা, এক্ষুনি হাতে একটা ছুরি নিয়ে মানুষের ভিড়ের মধ্যে লাফিয়ে পড়লেও মধুময়ের মন খারাপ কেটে যেতে পারে।

মধুময়দের বাড়ির দরজাটা দিয়ে ঢুকেই একটা ছোটোমতন গলি। সেখানে ওদের চিঠির বাক্স। সদর দরজা প্রায় সারাদিন খোলা থাকে বলে চিঠির বাক্সে তালা দেওয়া।

পোস্টম্যান যখন চিঠি দিতে এসেছে, ঠিক সেইসময় মধুময় বেরোচ্ছিল। পোস্টম্যানের কাছ থেকে সে চিঠিগুলো নিয়ে নিল। ভাগ্যিস নিয়েছিল! নইলে এ-চিঠিটাও পড়ত বাবার হাতে।

সাদা শক্ত কাগজে লম্বা খামটা মধুময় চট করে ভরে নিল নিজের পকেটে, বাকি চিঠিগুলো ফেলে দিল বাক্সে।

বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে এসে মধুময় পকেট থেকে চিঠিখানা বের করে খুলল। মুম্বাই থেকে তার মামা প্রায়ই মধুময়কে তাড়া দিয়ে চিঠি লিখছেন। মধুময় যেন অবিলম্বে সেখানে চলে আসে। এই চিঠিখানা খুবই জরুরি।

বড়োমামা লিখেছেন যে, মধুময়ের জন্য তিনি একটি চাকরি প্রায় পাকা করে ফেলেছেন। একটা নাম-করা ওষুধ কোম্পানিতে অফিসার্স ট্রেইনি, এখন পাবে আট-শো টাকা। ছ-মাসের ট্রেনিং কমপ্লিট করতে পারলে বারো-শো থেকে আঠারো-শো টাকা স্কেলে পোস্টিং হবে, সঙ্গে আরও নানারকম সুযোগসুবিধে আছে। মুম্বাইতে বাড়ি ভাড়া পাওয়া খুব শক্ত। এই কোম্পানি ফ্ল্যাটও দেবে।

মধুময়ের যা যোগ্যতা, তাতে এর চেয়ে ভালো কাজ সে নিজে কখনো জোগাড় করতে পারবে না। এই চাকরিটা তার এক্ষুনি লুফে নেওয়া উচিত। এরপর থেকে সে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে পারে।

বড়োমামা লিখেছেন, এ মাসের সাতাশ তারিখে শুধু একটা ইন্টারভিউ দিতে হবে। সব ঠিকঠাক হয়ে আছে যদিও, তবুও ওটা শুধু নিয়মরক্ষার জন্য। মধুময় যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুম্বাই চলে আসে।

মধুময় একবার ভাবল, চিঠিখানা কুটি কুটি করে ছিঁড়ে রাস্তায় উড়িয়ে দেবে। পরে বড়োমামা বাবাকে কিছু জানালে মধুময় অনায়াসেই বলতে পারবে, কই, আমি তো সেরকম কোনো চিঠি পাইনি!

আবার একটু ভেবে, চিঠিখানা না ছিঁড়ে পকেটেই রেখে দিল। এ মাসের সাতাশ তারিখ, তার মানে এখনও আট দিন দেরি আছে। পঁচিশ তারিখে শেষ হচ্ছে মধুময়ের দু-মাসের ব্রত। যদি সে যাওয়া ঠিক করে, তাহলে পঁচিশ তারিখ রাত্তিরেও সে প্লেনে করে মুম্বাই পৌঁছে যেতে পারে।

যদি সে যায়! সে যাবে কিনা নির্ভর করছে স্বপ্নার ওপরে। স্বপ্না যদি তাকে ক্ষমা করে, তাহলেই শুধু সে সুন্দর পরিচ্ছন্ন জীবনে ফিরে যাবে। মুম্বাইতে বড়ো কোম্পানির অফিসার, সাজানো-গোছানো ফ্ল্যাট, নির্ঝঞ্ঝাট জীবন।

স্বপ্না যদি না চায়, তাহলে এসব চাকরির কোনো মূল্যই নেই মধুময়ের কাছে। বারো- শো টাকা মাইনে? ফু:! ধনার প্ল্যান অনুযায়ী একটা গাড়ি মল্লিকবাজারে ডেলিভারি দিলেও দু-হাজার টাকা হাতে আসবে।

বড়োমামা যখন কলকাতায় ছিলেন, তখন তাঁর গাড়িতেই মধুময় ড্রাইভিং শিখেছিল। সে ঝড়ের মতন উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে গাড়ি। ধনার সঙ্গে এক মাসে সে তিরিশখানা গাড়ি হাওয়া করে দিয়ে রোজগার করতে পারে ক্যাশ ষাট হাজার টাকা। সে আর কোনোদিন ছবি আঁকবে না। সে ধনা আর রতনদের মতন মুখ-খিস্তি করবে সবসময়। সে অন্য জীবন বেছে নেবে, যে জীবন অনেক বেশি রোমাঞ্চকর।

তখন সবসময় কাছে একটা ছুরি রাখবে মধুময়। কিংবা রিভলবার। তখন কেউ তাকে ধরতে এলে আর বোকার মতন ধরা দেবে না সে।

স্বপ্না থাকলে একরকম জীবন, স্বপ্নাকে বাদ দিয়ে আর একরকম জীবন। স্বপ্নার কাছে তার আত্মার একটা টুকরো জমা রয়ে গেছে, যা আর কখনো ফেরত নেওয়া যায় না। স্বপ্না যদি একেবারে দূরে সরে যায়, তাহলে অর্ধেক আত্মা নিয়ে মধুময় দিন দিন অমানুষ হয়ে উঠবে।

সেদিন স্বপ্নাকে মধুময় আবিষ্কার করল দুপুর বেলা মেট্রো সিনেমার সামনে। স্বপ্না চঞ্চলভাবে ঘড়ি দেখছিল। মধুময় একটু দূরে দাঁড়াল। যাতে স্বপ্না তাকে দেখতে না পায়, কিন্তু সে ঠিক নজর রাখতে পারে। স্বপ্না খুবই ব্যস্তভাবে ছটফট করছে।

ঠিক তিনটে বেজে দশ মিনিটে একটি ফিয়াট গাড়ি এসে থামল তার সামনে। একটি অতিরিক্ত ভালো পোশাক পরা যুবক তার থেকে নেমে প্রচুর ক্ষমা চাইতে লাগল দেরি হওয়ার জন্য।

স্বপ্নার ভুরু কুঁচকে ছিল, আস্তে আস্তে তা সরল হল। তারপর সে হাসল। একটু পরেই ওরা দু-জনে চড়ে বসল গাড়িতে। গাড়িটা ভোঁ করে বেরিয়ে গেল। মধুময় দাঁড়িয়ে ছিল মাত্র পনেরো-কুড়ি গজ দূরে। ওদের দু-জনের কেউই তাকে লক্ষ করেনি।

ওই ছেলেটিকে চেনে মধুময়। কয়েকদিন ধরে স্বপ্নার সঙ্গে ওকে দেখছে। ছেলেটি একজন বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত গায়কের ছোটো ভাই। নিজেও গান-টান গেয়ে কিছু নাম করেছে। ওর নাম সুরজিৎ।

গাড়িতে ওঠবার সময় সুরজিৎ আর স্বপ্না এমন গাঢ়ভাবে তাকিয়ে ছিল পরস্পরের দিকে, যা শুধু প্রেমিক-প্রেমিকারাই তাকায়।

মধুময় একটু হাসল। বিবাহিতা পুরুষদের স্ত্রী মারা গেলে অন্তত দু-এক বছরের আগে তারা নতুন বিয়ে করে না। মেয়েদের বুঝি অত দেরি আর সয় না। স্বপ্নার কাছে এখন মধুময় মৃত কিনা কে জানে। তাহলে মাত্র এই ক-মাসের মধ্যেই সে আর একজনকে ভালোবেসে ফেলল।

চট করে একটা ট্যাক্সি নিয়ে মধুময় অনুসরণ করতে লাগল ফিয়াট গাড়িটাকে। আর কয়েক দিন বাদে, মধুময় যদি অন্যরকম জীবন কাটাবার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে কিছুদিনের মধ্যে সেও ও-রকম একটা ফিয়াট গাড়ি কিনে ফেলতে পারবে।

সামনের গাড়িটা চলল হাওড়ার দিকে। মধুময় ভেবেছিল ওরা ট্রেনে চেপে কোথাও যাবে। কিন্তু গাড়িটা হাওড়া স্টেশনে ঢুকল না, বাকল্যাণ্ড ব্রিজের ওপর উঠল।

মধুময় শুধু লক্ষ করছিল, ওরা কতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে। স্বপ্না কতটা বদলেছে? সে কি তার নতুন প্রেমিকের সঙ্গে শরীর ছোঁয়াছুঁয়ি করতে রাজি হয়েছে? একটু নির্জন রাস্তায় সে কি সুরজিৎকে টপ করে একটা চুমু খাবার অনুমতি দেবে?

সে-রকম কিছু ঘটল না। স্বপ্না খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখেই বসে রইল আগাগোড়া। তবে সুরজিৎ নামের ছেলেটি বড়ো বেশি সিগারেট খায়। গাড়ি চালাতে চালাতে সে সিগারেট ধরাচ্ছিল, একবার স্বপ্না বুঝি তাকে বকল, তারপর নিজেই লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে দিল ওর সিগারেট।

গাড়িটা থামল শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের সামনে।

মধুময় অনেকটা যেন নিশ্চিন্ত হল। এই বাগানেও ইচ্ছে করলে চুমু-টুমু খাওয়ার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। সেই সুযোগ কি ওরা নেবে? মধুময় শুধু দেখে নিতে চায়।

আর মাত্র সাত দিন। তারপরেই স্বপ্নার মুক্তি। মধুময়েরও মুক্তি। স্বপ্নার কাছে তার আত্মার যে টুকরোটা জমা আছে, আর সাত দিন পরে মধুময় সেটার দাবি একেবারেই ছেড়ে দেবে।

ওরা বাগানের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার বেশ খানিকক্ষণ পর মধুময় ঢুকল। সে ওদের ঠিক খুঁজে নিতে পারবে। এই কয়েক সপ্তাহে মধুময় অনুসরণ করার ব্যাপারে পুলিশের গোয়েন্দাদের চেয়েও দক্ষ হয়ে উঠেছে।

ছুটির দিন নয়, তাই বেশি ভিড় নেই। যারা এসেছে, তারা সবাই প্রায় প্রেমিক-প্রেমিকা। মধুময়ের সঙ্গেও স্বপ্না দু-বার এসেছে এখানে। স্বপ্নার সেসব কথা মনে পড়ছে না? কিংবা স্বপ্না মন থেকে মধুময়কে একেবারেই মুছে ফেলেছে?

স্বপ্না আর সুরজিৎ প্রথমে খানিকটা ঘুরতে লাগল এলোমেলো। সুরজিৎ এক একবার স্বপ্নার হাত ধরতে চাইছে আর স্বপ্না ছাড়িয়ে নিচ্ছে হাত। কিন্তু তার মুখে হাসি। খুব নীচু গলায় গান গাইছে স্বপ্না। সুরজিৎ তো রীতিমতো গায়ক, কিন্তু সে গান গাইছে না।

একবার ওরা ঢুকল একটা অর্কিড হাউসে! ওখানে মধুময় যেতে পারবে না। তাহলে নির্ঘাত ওদের চোখে পড়ে যাবে। বাইরে থেকে লোহার শিকের ফাঁক দিয়ে মধুময় চোখ রাখতে লাগল ওদের ওপর। সুরজিতের চুমু-টুমু খাওয়ার বেশ ইচ্ছেই আছে মনে হয়। সে মাঝে মাঝেই স্বপ্নার কাঁধে হাত রাখতে চাইছে, কিন্তু স্বপ্না ঠিক সুযোগ দিচ্ছে না।

মধুময় বেশ উপভোগই করছে ব্যাপারটা। সে কখনও রাস্তাঘাটে মেয়েদের পিছু নেয়নি। আর এই প্রায় দু-মাস সে প্রথম একটি মেয়ের পিছু পিছু ঘুরছে, যার সঙ্গে তার অন্তত দশ বছরের নিবিড় পরিচয়। যাকে সে মনে করত সবচেয়ে আপন। অথচ সে স্বপ্নার সঙ্গে একটাও কথা বলছে না।

স্বপ্না বেড়াতে ভালোবাসে। মধুময়ের সঙ্গেও সে প্রায়ই বেড়াতে যেত। কিন্তু তখন কি স্বপ্নাকে এত খুশি খুশি দেখাত? এখন যেন স্বপ্না বেশি উজ্জ্বল!

অর্কিড হাউস থেকে বেরিয়ে স্বপ্না আর সুরজিৎ গেল ঝিলটার ধারে। এখানে নৌকো ভাড়া পাওয়া যায়।

স্বপ্নাই বলল নৌকো চড়ার কথা। সুরজিতের খুব-একটা ইচ্ছে নেই মনে হচ্ছে। বোধ হয় সে সাঁতার জানে না। কিন্তু সে-কথাটা স্বপ্নার কাছে বলতেও লজ্জা পাচ্ছে।

শেষপর্যন্ত সুরজিৎ রাজি হল। দরাদরি হল নৌকোওয়ালার সঙ্গে। দু-জনে নৌকোয় উঠেও বসল। হঠাৎ সুরজিৎ পকেটে হাত দিয়ে বলল, সিগারেট দেশলাইটা গাড়িতে ফেলে এসেছি!

স্বপ্না বলল, থাক, সিগারেট খেতে হবে না।

অনেকক্ষণ খাইনি। দৌড়ে গাড়ি থেকে নিয়ে আসব।

স্বপ্না বলল, না।

সুরজিৎ নৌকোয় চড়ার নার্ভাসনেস কাটাবার জন্য সিগারেট ছাড়া থাকতে পারবে না। সে এবার বলল, মানি ব্যাগটাও রেখে এসেছি গাড়িতে। নৌকোর ভাড়া দিতে হবে না?

স্বপ্না বলল, আমার কাছে পয়সা আছে।

সুরজিৎ বলল, তাহলেও মানি ব্যাগটা গাড়িতে ফেলে রাখা মোটেই ঠিক হবে না প্লিজ, এক্ষুনি আসছি।

আচ্ছা, নিয়ে এসো।

নৌকো থেকে নেমে দৌড় শুরু করার আগে সুরজিৎ ঠাট্টা করে বলে গেল, দেখো, আবার একলা একলা ভেসে যেয়ো না যেন।

স্বপ্না কিন্তু নৌকোয় বসে রইল না। সুরজিৎ চলে যেতেই নৌকো থেকে নেমে দ্রুত পায়ে একটা ফুলগাছের ঝোপের এপাশে এসে মধুময়ের মুখোমুখি দাঁড়াল।

তুমি কী চাও?

মধুময় একটুও চমকে যায়নি। সে সদ্য একটা সিগারেট ধরিয়েছে। সে ভাবছিল, সিগারেটের প্যাকেটটা সে সুরজিৎকে উপহার দেবে কিনা। বেচারা অত দূরে গাড়ি পর্যন্ত দৌড়ে যাবে আসবে!

কিছু চাই না তো।

বেশি রাগ হলে স্বপ্না কেঁদে ফেলে। মধুময় জানে সে-কথা।

এখনও স্বপ্না কাঁদেনি অবশ্য। কিন্তু চোখ ছলছল করছে।

তুমি কেন সবসময় দিনের পর দিন, আমার পেছনে পেছনে ঘুরছ? তুমি কী ভাব, আমি তোমাকে দেখতে পাই না?

আমি যদি তোমায় দূর থেকে দেখতে চাই, সেটাও কি অপরাধ? তুমি তো আমায় বারণ করেছিলে তোমাদের বাড়িতে যেতে। সেখানে তো আর যাইনি আমি। এমনকী তোমাদের পাড়াতেও আমি যাই না—

কিন্তু আমি বলেছিলাম, আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে। তবু তুমি কেন আমাকে জ্বালাতন করছ?

জ্বালাতন! আমি বুঝতে পারিনি।

দিনের পর দিন সবসময় বোঝা যায় একজন কেউ নজর রাখছে তার ওপর, কেউ সহ্য করতে পারে?... এ রকম করলে আমি পাগল হয়ে যাব।

নজর রাখার জন্য নয়, আমি শুধু দূর থেকে তোমায় দেখতাম।

সেদিন ডায়মণ্ড হারবারে ওপারে লঞ্চ থেকে নামবার সময় একটা লোককে তুমি ঠেলে ফেলে দিয়েছিলে। আমি জানি। লোকটা যদি মরে যেত!

সেই ছেলেটা তোমাদের অপমান করেছিল, দরকার হলে আমি ওকে মেরেই ফেলতাম... কি ট্রেনে সেই মাতালটা—

তুমি বুঝি আজকাল খুন জখমও শিখেছ? সে তোমার যা খুশি করো... কিন্তু তোমায় কে অধিকার দিয়েছে আমার ওপর পাহারাদারি করবার? আমার কোনো দরকার নেই!

মধুময় দ্রুত ভেবে নিল, হ্যাঁ, সত্যিই এখন দরকার নেই। এখন তো স্বপ্নার সঙ্গে সুরজিৎ থাকেই। কিন্তু সুরজিৎও যদি স্বপ্নার অমতে স্বপ্নাকে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করত, তাহলে মধুময় নিশ্চয়ই সুরজিতের মাথাটা ভেঙে দিত।

স্বপ্না বলল, আমি যখন যেখানে যাই, সিনেমায়, বন্ধুর বাড়িতে, গানের ক্লাসে, সবসময় তুমি আমার পেছন পেছন ঘোরো। কেন।

মধুময় চুপ করে রইল।

আজও এখানে ঢোকার পরই আমি তোমায় দেখতে পেয়েছি। সবসময় পেছন পেছন কেউ আসছে, এটা জানতে পারলে মানুষের বেড়াতে ভালো লাগে? তোমার জন্য কি আমি বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ করে দেব?

উত্তর না দিয়ে মধুময় ভাবল, মেয়েদের মাথার পেছনেও চোখ থাকে, সেইজন্য তারা দেখতে পায়। স্বপ্না জানে যে মধুময় তাকে দেখছে, সেইজন্যই কি সে সুরজিতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসেনি গাড়িতে? সেইজন্যই কি সে সুরজিৎকে চুমু খেতে দেয়নি।

মধুময় উত্তর দিচ্ছে না দেখে স্বপ্না আরও রেগে গেল। সে বেশ উঁচু গলায় বলল, তুমি অর্কিড হাউসের গরাদের ফাঁক দিয়ে বিশ্রীভাবে তাকিয়ে ছিলে আমাদের দিকে। কেন? তুমি কেন এ-রকম ব্যবহার করছ আমার সঙ্গে?

স্বপ্না বোধ হয় এবার কেঁদেই ফেলবে। মধুময়ের একটা-কিছু বলা উচিত।

মধুময় খুব বিনীত গলায় বলল, আমার ভুল হয়েছিল। আজই শেষ, আর কোনোদিন তুমি আমায় দেখতে পাবে না।

স্বপ্না বাঁ-হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখ মুছল।

স্বপ্না, তুমি কেঁদো না। আমি আর তোমায় কষ্ট দেব না। আমি তোমার জীবন থেকে সরে যাচ্ছি। এবার আমার অন্য জীবন শুরু হবে।

দয়া করে তুমি আমায় মুক্তি দাও।

কথা দিলাম, তুমি আমায় আর কোনোদিন দেখতে পাবে না।

স্বপ্না চঞ্চল হয়ে দূরের দিকে তাকাল। মধুময় জানে, যত জোর দৌড়েই যাক সুরজিৎ এরমধ্যে ফিরতে পারবে না।

মধুময় বলল, আকাশ মেঘলা, হঠাৎ ঝড় উঠতে পারে, বেশিক্ষণ নৌকোয় থেকো না।

স্বপ্না ঝাঁঝের সঙ্গে বলল, তোমার তা ভাববার দরকার নেই। আমার জন্য তোমাকে আর কিছু ভাবতে হবে না।

আচ্ছা।

স্বপ্না ঘুরে যাচ্ছিল, মধুময় হাত তুলে বলল, দাঁড়াও, আর একটা কথা—

কী?

জেল থেকে আমি তোমায় তিনখানা চিঠি লিখেছিলাম, তুমি কি সত্যিই সেগুলো পাওনি?

না।

সেই চিঠিতে আমি ক্ষমা চেয়েছিলাম তোমার কাছে। আমি জীবনে একবার ভুল করেছি। তার জন্য কি আমাকে ক্ষমা করা যায় না?

ভুলের প্রশ্ন নয়। সে হলে অন্য কথা ছিল। তুমি আমাকে সাংঘাতিক অপমান করেছ।

অপমান?

নিশ্চয়ই! তুমি রেল-ডাকাতি করতে গিয়েছিলে। সেটাকেও না হয় আমি একটা অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে মেনে নিতাম। কিন্তু তুমি আমাকে না জানিয়ে গোপনে একটা খারাপ মেয়ের বাড়িতে রাত কাটাতে যেতে... তুমি আমাকে মুখে ভালোবাসার কথা বলে একটা বাজারের মেয়ের কাছে... ছি, ছি, ছি—

মধুময় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

বলো, তুমি সত্যি করে বলো, তুমি সেই মেয়েটার বাড়িতে রাত কাটাওনি? পুলিশ সেখান থেকে তোমায় ধরেনি? বলো, তুমি সেখানে যাওনি?

হ্যাঁ গিয়েছিলাম।

তোমার লজ্জা করে না! তারপরেও তুমি আমার সঙ্গে কথা বলতে আসো!

আর আসব না। তুমি মুক্তি চাইলে, মুক্তি দিলাম।

গেট বেশ অনেকটা দূর, তবু এর মধ্যে সেখান থেকে ফিরে এসেছে সুরজিৎ। দূর থেকেই সে দেখেছে স্বপ্নাকে একজনের সঙ্গে কথা বলতে। সে হাঁপাতে হাঁপাতে সেখানে এসে দাঁড়াল। ভুরু কুঁচকে গেছে তার।

স্বপ্না সুরজিতের হাত ধরে বলল, চলো।

কয়েক পা এগিয়ে একবার পেছন ফিরে মধুময়ের দিকে তাকিয়ে সুরজিৎ স্বপ্নাকে জিজ্ঞেস করল, কী বলছিল লোকটা? তোমার আগে থেকে চেনা?

স্বপ্না বলল, হ্যাঁ।

কে?

এমনিই চেনা, আমাদের আগেকার পাড়ায় থাকত।

মধুময় তারপরও একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। সুরজিৎ আর স্বপ্নার নৌকোয় ওঠা দেখল। স্বপ্নার মুখখানা লাল। এখনও সে ভেতরে ভেতরে রাগে গজরাচ্ছে নিশ্চয়ই।

মধুময় ভাবল, স্বপ্না ভালো সাঁতার জানে। নৌকোটা যদি উলটেও যায়, স্বপ্নাই বাঁচিয়ে দিতে পারবে সুরজিৎকে। মধুময়ের সাহায্যের দরকার হবে না।

নৌকোটা ছেড়ে যেতেই মধুময় ফিরল।

গেট পেরিয়ে এসে পকেট থেকে বের করল বড়োমামার চিঠিখানা। কোনো দ্বিধা না করে সেটাকে কুটি কুটি করে ছিঁড়ে উড়িয়ে দিল হাওয়ায়। অস্ফুট গলায় বলল, বিদায়! বিদায় মুম্বাই! ওই জীবন আমার চাই না!

বাসে চেপে খানিকটা গিয়ে আবার নেমে পড়ল মধুময়। একটা রিকশা নিয়ে অনেক ঘুরে ঘুরে তারপর এসে নামল গলির মধ্যে একটা দোতলা বাড়ির সামনে। সদর দরজা খোলা। মধুময় উঠে এল দোতলায়। একটা বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিল দু-বার।

মুক্তো বোধ হয় ঘুমোচ্ছিল তখন। ঘুম-চোখের বিস্ময় অনেক বেশি দেখায়।

কী গো, তুমি? তুমি আবার এসেছ! তোমার সাহস তো কম নয়!

মধুময় গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, তুমি আমায় চিনতে পেরেছ?

কেন চিনব না? তুমি তো সেই নাড়ুগোপাল! এসো ভেতরে এসো।

মধুময় বলল, না, ভেতরে যাব না। আমি তোমার কাছে দু-একটা কথা জানতে এলাম।

মুক্তো বলল, ভেতরে এসো না। দরজায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি কথা হয়?

মধুময় তবু সেখানে দাঁড়িয়েই জিজ্ঞেস করল, তুমি কোর্টে দাঁড়িয়ে কেন বললে, তুমি আমায় চেন না? তোমার বলা উচিত ছিল, আমি তোমার সঙ্গে বিছানায় রাত কাটিয়েছি। আমার সঙ্গে চোরাই মাল ছিল। তুমি একথা বললে আমার নির্ঘাত জেল হত। তুমি কেন সত্যি কথা বলনি?

কেন, খুব জেল খাটার শখ হয়েছে বুঝি?

আমার শাস্তি পাওনা ছিল।

মুক্তো মধুময়ের হাত ধরে টেনে জোর করে ঘরের মধ্যে এনে বলল, একটু বোসো না বাপু! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আবার কথা কী? চা খাবে?

না। আমি এক্ষুনি চলে যাব।

আহা রে, তোমার মুখখানা এত শুকনো কেন গো? কেউ বুঝি তোমার মনে দুঃখ দিয়েছে?

মধুময় জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘না না, কে আবার দুঃখ দেবে! আমি সহজে দুঃখ পাই না।’

মুক্তো তার শরীরটাকে গ্রাহ্যই করে না। শায়া ও ব্রেসিয়ারের ওপর একটা পাতলা শাড়ি জড়ানো। মাঝে মাঝে আঁচলটা খসে যাচ্ছে বুক থেকে, সে সম্পর্কে তার কোনো হুঁশ নেই। আবার প্রলোভন দেখাবারও যে কোনো চেষ্টা নেই, তাও বোঝা যায়।

মধুময় মুক্তোর চোখে চোখ রেখে বলল, তোমার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তুমি আমায় চেন না! তবু তুমি আমায় বাঁচাবার চেষ্টা করেছিলে কেন?

শোনো ছেলের কথা! কেন আবার কী? আমার ইচ্ছে হয়েছিল তাই!

পুলিশ তোমার ওপর অত্যাচার করেছিল?

দু-চার ঘা চড়-চাপড় দিয়েছিল। ওরকম মার খাওয়া আমাদের ঢের অভ্যাস আছে। দাঁড়াও, চা বানাই।

না থাক, আমি চা খাব না।

বিয়ার-টিয়ার খাবে? আনাব?

কিচ্ছু না।

ওরে বাবা, তুমি যে দেখছি একেবারে ঘোড়ায় জিন দিয়ে এসেছ! তা হঠাৎ এতদিন বাদে এসব কথা?

মধুময় বলল, তোমার কাছে আর একটা কথা জানতে চাই। আমি যদি আবার কখনো হঠাৎ অসময়ে এসে পড়ি, তুমি কি আমায় থাকতে দেবে?

মুক্তো মধুময়ের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বলল, তোমাকে আমি একটা কথা বলব? তুমি ও সব গুণ্ডামি বদমাইশির লাইনে যেয়ো না। ওসব তুমি পারবে না। তোমার মুখ দেখলেই বোঝা যায়, তুমি ভালো ছেলে।

মধুময় চোয়াল শক্ত করে মুখখানাকে নিষ্ঠুরের মতো করে জিজ্ঞেস করল, তুমি আমায় তখন থাকতে দেবে কি দেবে না?

মুক্তো হাসতে হাসতে দু-দিকে ঘাড় নেড়ে বলল, না!

মধুময় উঠে দাঁড়াল।

অমনি রাগ হল বুঝি? চলে যাচ্ছ যে?

মুক্তো মধুময়ের মাথায় চুলের মধ্যে হাত ডুবিয়ে বলল, তুমি যখন খুশি চলে এসো আমার কাছে... টাকা থাক-বা না থাক। সেসব চিন্তা করতে হবে না... তোমার মন খারাপ হলেই আমার কাছে চলে আসবে কেমন?

মধুময়ের হঠাৎ কান্না পেয়ে গেল। কান্না লুকোবার জন্যই সে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

বিকেল বেলা সাংঘাতিক ধুলোর ঝড় উঠেছিল, তারপর থেকেই একটানা বৃষ্টি পড়ে চলেছে। বছরের এই সময়টা লোকে ছাতা নিয়ে বেরোয় না, তাই রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। ধনা আর মধুময় এসে দাঁড়াল লাইটহাউস সিনেমার সামনে। সন্ধ্যে সাতটা বাজে।

অনেকগুলো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, ওরা ঘুরে ঘুরে পছন্দ করতে লাগল গাড়ি। ধনা আবার প্লেট দেখেও বুঝতে পারে কোন গাড়িটা কত নতুন। শুধু চকচকে চেহারা দেখলে বিশ্বাস নেই।

একটা কচি কলাপাতা রঙের অ্যাম্বাসাডার গাড়ি পছন্দ হল ওদের। ভেতরে ড্রাইভার নেই।

মধুময় পরে আছে একটা ক্রিম রঙের সুট, গলায় টাই। এই পোশাকে সে কয়েকবার চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিল। আজও একরকম ইন্টারভিউ দিতেই এসেছে। ধনা পরেছে পাজামা আর একটা ধার করা সিল্কের পাঞ্জাবি। কাঁধে শান্তিনিকেতনি ঝোলা।

কোটের পকেট থেকে একতাড়া চাবি বার করে মধুময় প্রথম চেষ্টাতেই খুলে ফেলল দরজাটা। গাড়িতে স্টার্ট দেওয়ার আগে সে দরজাটা খুলে কয়েক মুহূর্ত বসে রইল চুপ করে। দেখা দরকার, কেউ কোনো প্রতিবাদ করে কিনা। এখান থেকে পালাবারও সুবিধে আছে, দৌড়ে কোনোক্রমে নিউমার্কেটের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারলেই হল।

কেউ কিছু বলল না।

ধনা গাড়িতে ওঠেনি। সে খুব সপ্রতিভভাবে বলল, ব্যাক কর, ব্যাক কর। পেছনে অনেকটা জায়গা আছে।

মধুময় গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে ব্যাক-গিয়ার লাগাল। খুব সহজেই বেরিয়ে এল গাড়িটা। মধুময় ঘুরিয়ে নিল ডান দিকে। তারপর সামনের সিটের দরজাটা খুলে দিতে ধনা উঠে পড়ল চট করে।

মধুময় অ্যাকসেলারেটারে চাপ দিল। সাঁ করে এগিয়ে আবার ঘুরল ডানদিকে লিণ্ডসে স্ট্রিট দিয়ে এসে চৌরঙ্গি, তারপর পার্ক স্ট্রিটের উলটোদিকে ময়দানের রাস্তা। ধনার চোখেমুখে উল্লাস ফেটে পড়ছে একেবারে।

দেখলি তো, কত সোজা!

মধুময় সত্তর-আশি কিলোমিটার স্পিডে রেড রোড দিয়ে বেরিয়ে গেল। গাড়িটার পিক আপ ভালো। চালিয়ে আরাম আছে।

গঙ্গার ধার দিয়ে ওয়াটগঞ্জের দিকে ঘুরে মধুময় আবার ফিরে এল ময়দানে।

ধনা বলল, একটু অন্ধকার দেখে গাড়িটা একবার থামা।

কেন?

আমার ঝোলাতে দুটো ফলস নাম্বার প্লেট আছে, সেগুলো লাগিয়ে দেব, তাহলে আর কোনো শালা কিছু করতে পারবে না।

তার দরকার নেই।

হ্যাঁ, অবশ্য সিনেমা ভাঙতে ভাঙতে আমাদের ডেলিভারি হয়ে যাবে। তার আগে তো কেউ আর খোঁজ করবে না! এখন চল, মল্লিকবাজারের দিকে।

আমার একটু ঘুরতে ইচ্ছে করছে, অনেকদিন বাদে গাড়ি চালাচ্ছি তো!

তোর হাত দারুণ মাইরি!

আরও আধঘণ্টা গাড়িটা নিয়ে গঙ্গার ধারেই ঘুরপাক খেল মধুময়। পেট্রোলের কাঁটাটা নীচের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। আর বেশি ঘোরা যাবে না।

গাড়িটা এক জায়গায় থামিয়ে মধুময় আরাম করে একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, কাজটা সত্যিই খুব সোজা।

ধনা অতিরিক্ত উৎসাহের সঙ্গে বলল, তোকে বলেছিলাম না? কোনা রিস্ক নেই। কোনো শালা ধরতে পারবে না!

মধুময় বলল, এবার ফেরার পালা।

ধনা বলল, সার্কুলার রোড দিয়ে সোজা বেরিয়ে চল মল্লিকবাজার।

মধুময় বলল, আজ মল্লিকবাজার যাব না।

ধনা বলল, তার মানে? তাহলে কোথায় যাবি? তুই এখন বেশি দেরি করলেই বিপদ। আমি সব কথা বলে এসেছি। গাড়ি ডেলিভারি দিলেই—

আমি এখন গাড়িটা ফেরত রেখে আসব।

কী পাগলের মতো কথা বলছিস!

আজ ট্রায়াল দিলাম। দেখলাম, পারা যায় কি না। দেখা হয়ে গেল, এখনও শো ভাঙেনি ... এখন গাড়িটা ঠিক জায়গায় রেখে এলে গাড়ির মালিক কিছু টেরই পাবে না।

কিন্তু গাড়িটা ফেরত রেখে আসবি কেন? এক্ষুনি গাড়িটা ডেলিভারি দিয়ে এলেই তো ক্যাশ চার হাজার টাকা। তোতে-আমাতে সমান সমান।

তোকে আমি বলেছিলাম না আমার একটা ব্রত আছে ... এক মাস তেইশ দিন বাদে আমার যা ঠিক করার করব। তার এখনও তিন দিন বাকি। আমি এ লাইনেই যাব, কিন্তু সেই তিনদিন কেটে না গেলে কাজ শুরু করব না, আজ শুধু ট্রায়াল দিতে এলাম।

দেখ মধু, ইয়ার্কি করিস না, গাড়ি ঘোরা।

না ইয়ার্কি না। মাত্র আর তিনটে দিন ওয়েট করতে পারবি না? বললাম-না, আমার একটা ব্রত আছে।

ব্রত আবার কী? তুই মেয়েছেলে নাকি যে ব্রত করবি!

সত্যি অনেকটা যেন মেয়েছেলের মতো হয়ে গেছি রে। যাক, আর তো মোটে তিনটে দিন। আমি এককথার মানুষ রে ধনা! আমি যখন-তখন মত বদলাই না।

তা বলে, তুই গাড়ি ফেরত দিতে যাবি? পাগল ছাড়া কেউ একথা বলে? গাড়িটা এখানেই ফেলে রেখে যা।

তার দরকার নেই, এখনও অনেক সময় আছে।

ধনা চিৎকার করে উঠল, আমায় নামিয়ে দে। আমায় শিগগির নামিয়ে দে তাহলে।

ঘ্যাঁচ করে গাড়ি থামিয়ে মধুময় হেসে বলল, ভয় পাচ্ছিস? তাহলে নেমে যা!

ধনা নেমেই ছুটতে লাগল এবং তক্ষুনি মিলিয়ে গেল মাঠের অন্ধকারে।

মধুময় ঘড়ি দেখল। আটটা বাজতে পাঁচ, এখান থেকে লাইটহাউস পৌঁছোতে দু-তিন মিনিট লাগবে।

গ্র্যাণ্ড হোটেলের পাশ দিয়ে লাইটহাউসের গলিতে ঢুকতেই মধুময় দেখল সামনে প্রচুর ভিড়।

মধুময়ের বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। এত ভিড় কেন? সিনেমা কি ভেঙে গেছে? তা তো হতেই পারে না। ইংরেজি সিনেমা অনেকসময় তাড়াতাড়ি ভাঙে, কিন্তু ছবিটা অনেক বড়ো, শেষ হবে আটটা কুড়িতে। ধনা আগে থেকে খোঁজখবর নিয়ে গেছে।

মধুময় একটা দিক শুধু খেয়াল করেনি। ধনারও মনে পড়েনি একথা। হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে সিনেমা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে মিনিট পনেরো আগেই হল থেকে বেরিয়ে এসেছে লোক।

মধুময় মেল ট্রেনের চেয়েও দ্রুত চিন্তা করতে লাগল। এখন সে কী করবে? এখান থেকে গাড়ি ঘোরাবার উপায় নেই। মধুময় পেছন দিকে তাকাল। পেছনে গাড়ি এসে গেছে, সে ব্যাক করেও পালাতে পারবে না। এগিয়ে যেতে হবে সামনেই। কিন্তু এত ভিড়ের মধ্যে দিয়ে... সে ধরা পড়ে যাবে... সে ধরা পড়ে যাবে... মধুময় প্রচন্ড জোরে হর্ন বাজাল।

কিন্তু ভিড় সরে গেল না। মধুময়ের মনে হল, সমস্ত লোকজন যেন তার দিকেই এগিয়ে আসছে। যেন এক হিংস্র জনতা, আর প্রত্যেকেরই হাতে অস্ত্র। মধুময়ের সমস্ত শরীর কাঁপছে, শিরাগুলো যেন ফুলে উঠেছে, চোখ দুটো জ্বলছে। স্টিয়ারিংটা জোরে চেপে ধরল মধুময়। সে ঠিক করল, সে থামবে না, সে এইসমস্ত লোককে চাপা দিয়ে বেরিয়ে যাবে।

কিংবা গাড়িটা এরোপ্লেনের মতো লোকজনের মাথার ওপর দিয়ে উড়িয়ে নেওয়া যায় না? মধুময় থামবে না, কিছুতেই থামবে না...

মধুময় দরজা লক করে দিল, কিন্তু কাচটা তোলার সময় পেল না, তার আগেই জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ল অনেকগুলো হাত। একজন হিন্দিতে চেঁচিয়ে উঠল, এহি আদমি...

মধুময় কোনো কিছু কথা বলার সুযোগ পেল না। তার চুল ধরে টেনে হিঁচড়ে নামানো হল বাইরে। অন্যান্য গাড়ির ড্রাইভাররাই বেশি হিংস্রভাবে এগিয়ে এল তাকে মারবার জন্য। বিরাট একটা শোরগোল চেঁচামেচির মধ্যেও যেন খুব সরু গলায় দু-এক বার শোনা গেল, না—না—না—!

সকলেই তার মাথা লক্ষ করে মারতে চায়। মধুময় এক হাতে মুখ চাপা দিয়ে আর এক হাতে মার ঠেকাবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু একসঙ্গে অনেকে মিলে কিল ঘুসি চালানোয় মধুময় পা সোজা রাখতে পারল না। পড়ে গেল মাটিতে।

দু-এক জন ড্রাইভার লোহার হ্যাণ্ডেলও হাতে নিয়েছে।

শুয়ে থাকা অবস্থায় বেশিক্ষণ পড়ে থাকলে মার খেতে খেতে ওখানেই মরে যেত মধুময়। কলকাতার মানুষ মারতে ভালোবাসে।

এইরকম সময় অনেকের মধ্যেই এসে যায় খুন করার নেশা। কত লোকের কত ব্যাপারে রাগ জমে থাকে, সেইসব রাগ একসঙ্গে দপ করে জ্বলে ওঠে আগুনের মতো। সবাই মিলে এক জনকে খুন করলে কারুর মনেই খুনের অপরাধ লাগে না।

কিন্তু সে কিছুতেই জ্ঞান হারাবে না। ওই অবস্থাতেও সে যেন জপ করার মতন বলতে লাগল, আমি মরব না—আমি মধুময়—আমি বেঁচে থাকব।

ঠিক কোনো আরণ্যক প্রাণীর মতো মধুময় হঠাৎ লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর গাছপালা ভেদ করার মতো সে মানুষের ভিড়ের মধ্যে ঢুঁ দিয়ে ছুটল, দু-হাতে মুখ ঢাকা। কেউ আটকাতে পারল না তাকে। কয়েকজন তাড়া করে এল অনেকটা। কিন্তু তার আগেই সে নিউ মার্কেটের মধ্যে ঢুকে পড়েছে।

নিউ মার্কেটের মধ্যেও কত মানুষ। সবাই যেন মধুময়ের শত্রু। মধুময় মাথাখারাপ বেড়ালের মতো ঘুরতে লাগল এদিক-ওদিক। তারপর অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে আবার ছুটল।

দৌড়োতে দৌড়োতে ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, পার্ক স্ট্রিট, পার হয়ে একটা ছোটো পার্কে ঢুকে পড়ে জিরোতে লাগল মধুময়। একটুক্ষণ দম নেওয়ার পর সে মিলিয়ে দেখতে লাগল তার শরীরের সব ক-টা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠিক আছে কি না। দুটো চোখ, দুটো কান, একটা নাক, দুটো হাত, দুটো পা—সব ঠিকই আছে। তবে দাঁত নেই ক-টা, মুখ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে তখনও। দামি কোটটা ধুলো-রক্তে মাখামাখি। ঠোঁট ফুলে গেছে, মাথার পেছন দিকটায় দারুণ ব্যথা।

ধনা ঠিকই বলেছিল, গাড়িটা ফেরত দিতে যাওয়া ঠিক হয়নি। মাঠের মধ্যে ফেলে রাখলেই হত। মানুষের উপকার করতে নেই। সিনেমা দেখার পর লোকটার বাড়ি ফিরতে অসুবিধে হবে, সঙ্গে হয়তো কেউ-টেউ আছে—এই ভেবেই ...।

কিন্তু চোরাই গাড়ির ডেলিভারি ব্যবসায় নেমে এসব কথা ভাবতে নেই, বুঝলে মধুময় —মধুময় নিজেকে এই কথা বলল। আর কয়েকদিন পর আমি এসব আর একদম ভাবব না। প্রত্যেক দিন অন্তত দু-খানা করে গাড়ি হাওয়া করে দেব!

গাড়ি চুরি করা সহজ, ফেরত দেওয়া কঠিন। মধুময় আর কোনোদিন এইরকম পাগলামি করবে না। আজকের মার খাবার ঘটনাটা চেপে যেতে হবে, ধনা যেন জানতে না পারে।

কোটটা খুলে ছুড়ে ফেলে দিল মধুময়। গলা থেকে টাইটাও খুলে ফেলল। এসব আর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। পার্কের মধ্যের ছোটো পুকুরটায় নেমে বেশ ভালো করে মুখ হাত ধুয়ে নিল সে, একটা চিরুনি থাকলে ভালো হত, আঙুলগুলোই চিরুনির মতো করে চালিয়ে দিল চুলের মধ্যে।

ওপরে উঠে এসে কলকাতা শহরটাকে উদ্দেশ্য করে সে বলল, আর দু-দিন অপেক্ষা কর, তারপর মধুময় দত্ত দেখিয়ে দেবে সে কী! কেউ তার চুলের ডগাও ছুঁতে পারবে না। সে সারা শহরে আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে।

মধুময় বাড়ি ফিরল রাত প্রায় এগারোটায়। দেরি হলে, খাবার ঘরে ভাত ঢাকা থাকে। সে ভেবেছিল অন্য সবাই শুয়ে পড়লে সে চুপি চুপি ঢুকে পড়বে নিজের ঘরে। কিন্তু মা জেগে বসে আছেন খাওয়ার ঘরে। একা।

মধুময়কে দেখেই মা উঠে দাঁড়িয়ে ভীত গলায় বললেন, তুই এত দেরি করে ফিরলি! এদিকে আমি চিন্তায় চিন্তায় মরছি।

মধুময় মুখের কাছে হাত চাপা দিয়ে আছে। যাতে মা তার ফোলা ঠোঁটটা দেখতে না পান!

স্বপ্না সেই কখন থেকে বসে আছে তোর জন্যে—

মধুময় চমকে উঠল। স্বপ্না? এত রাত্তিরে স্বপ্না? সে তো অনেক দিন বাড়িতে আসেই না।— স্বপ্না?

হ্যাঁ! ওর কী হয়েছে?

তা আমি জানব কী করে?

আমায় কিছুই বলছে না। কাঁদছিল। তারপর বলল, তোর সঙ্গে দেখা না করে ও কিছুতেই বাড়ি ফিরবে না।

ভুরুর কাছেও চোট লেগেছে, তাই ভুরু কোঁচকাতে গিয়ে মধুময়ের ব্যথা লাগল। মধুময় ভেবে পেল না, স্বপ্না কেন এসেছে। স্বপ্না কি কোনো বিপদে পড়ে তার সাহায্য চায়? অথচ, স্বপ্নাই সেদিন বলেছিল, সে আর মধুময়ের মুখ দেখতে চায় না। সে পছন্দ করে না মধুময়ের পাহারাদারি।

মধুময় তো আজ সারারাত বাড়িতে নাও ফিরতে পারত। তা হলে কি স্বপ্না তার জন্য অপেক্ষা করত সারারাত?

মধুময় নিজের ঘরের দিকে এগোতেই মা সঙ্গে এলেন। মধুময় বলল, তুমি একটু এখানে বোসো। আমি আগে একটু আলাদা কথা বলে দেখি।

মা এতক্ষণ পর মধুময়কে লক্ষ করে বললেন, তোর মুখের এ কী চেহারা হয়েছে?

ও কিছু না!

ভেজানো দরজাটা ঠেলে ঘরে ঢুকল মধুময়। না, স্বপ্না এখন আর কান্নাকাটি করছে না। একটা বই খুলে বসে আছে চোখের সামনে।

মধুময়ের এখন আর বুক কাঁপছে না। স্বপ্নাকে সে মন থেকে মুছে ফেলেছে। তার জীবনে আর স্বপ্নার প্রয়োজন নেই।

কী খবর? তুমি এত রাত্তিরে?

স্বপ্না উঠে এসে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

এটাও কি মধুময়কে চমকে দেওয়ার জন্য? বাড়ির লোক নিশ্চয়ই কিছু ভাববে। এত রাত্রে স্বপ্না মধুময়কে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। সেই নীতি-বাতিকগ্রস্তা স্বপ্না!

স্বপ্না বলল, আমি সন্ধ্যের শো-তে লাইটহাউসে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম।

এবার মধুময়ের না চমকে উপায় নেই। স্বপ্না তাহলে নিজের কোনো প্রয়োজনে আসেনি? স্বপ্না খুবই অহংকারী, সে কোনো প্রয়োজনের জন্য মধুময়ের কাছে সাহায্য চাইতে আসবে না।

মধুময়ও স্বপ্নার কথায় গুরুত্ব না দেওয়ার জন্য বলল, সেখানে আমি অবশ্য তোমায় অনুসরণ করে যাইনি! আমি কথা দিলে কথা রাখি।

স্বপ্না বলল, ‘আমার নিয়তিই বোধ হয় আমাকে আজ সন্ধ্যে বেলা ওখানে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।’

মধুময় ঠাট্টার সুরে বলল, তাই নাকি? আমি নিয়তি মানি না।

তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব, উত্তর দেবে?

বলো।

তুমি সে-দিন বলেছিলে, এরপর থেকে তুমি অন্য জীবন শুরু করবে। সে কি এই জীবন?

একটুও দ্বিধা না করে মধুময় বলল, হ্যাঁ।

স্বপ্না হঠাৎ বসে পড়ল মধুময়ের পায়ের কাছে। মধুময়ের হাঁটু চেপে ধরে বলল, আর একটা কথা শুধু বলব... সুরজিৎ দু-বার আমাকে চুমু খেয়েছে। আমি বাধা দিইনি, সেজন্য তুমি কি আমাকে ক্ষমা করবে?

আজ অনেকগুলো চমকাবার অস্ত্র নিয়ে এসেছে স্বপ্না। মধুময় বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে একেবারে। এ তো অন্যরকম স্বপ্না! একে যেন মধুময় চেনেই না!

সুরজিৎ তোমায় ভালোবাসে, সে তো তোমায় চুমু খেতেই পারে। এতে দোষের কী আছে?

আমি ওকে ভালোবাসি না। আমি ভুল করেছি। একবার ভুল করলে কি ক্ষমা করা যায় না? তোমার কাছ থেকে এর উত্তর না জেনে আমি ফিরবই না।

মধুময় বলল, এসব গোলমেলে কথা তুলে আর লাভ কী? তুমি মুক্তি চেয়েছিলে, আমি মুক্তি দিয়েছি তোমায়। আর তো ক্ষমা-টমার প্রশ্নই ওঠে না।

স্বপ্না বলল, আমি মুক্তি কাকে বলে জানি না। আমাকে মুক্তি দেওয়া মানে কি ভুল জায়গায় ঠেলে দেওয়া?

সুরজিৎ খুব ভালো ছেলে।

হোক ভালো। কিন্তু ওর কাছে তো আমার আত্মার কোনো অংশ জমা নেই।

আমার কাছে আছে নাকি?

তুমি জানো না?

আমি যদি লাইটহাউস সিনেমায় না গিয়ে এলিট সিনেমায় যেতাম, তাহলে আর তুমি নিশ্চয়ই আজ আমার কাছে আসতে না। উঠে দাঁড়াও!

তুমি আগে বলো, আমায় ক্ষমা করবে কি না? বলো, বলো, বলো, বলো—

মধুময় ক্ষীণভাবে হাসল। তারপর নীচু হয়ে স্বপ্নার দু-হাত ধরে বলল, ওঠো। তুমি ঠিকই বলেছ, নিয়তিই বোধ হয় আজ সন্ধ্যে বেলা আমাদের দু-জনকে এক জায়গায় টেনে নিয়ে গিয়েছিল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%