পরিশিষ্ট (বঙ্গ ভাষার ইতিহাস)

যাঁহাদিগকে লইয়া বঙ্গভাষা, যাঁহারা বঙ্গভাষাকে ভাষামধ্যে গণ্য করিয়াছেন ও করিতেছেন, উপসংহারে তাঁহাদিগের বিষয় সমালোচনা করা নিতান্ত আবশ্যক ও কৃতজ্ঞতার উপদেশ। কিন্তু এই ক্ষুদ্র পুস্তকে তাহা সাধ্যাতীত। তথাচ একবারে পরিত্যাগ করাও অবিধেয় বিবেচনায় যথা সাধ্য নিম্নে সংক্ষিপ্ত বিবরণ গ্রহণ করিলাম।

এই বিষয় পৰ্যালোচনা করিবার প্রথমেই পণ্ডিতবর শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় আমাদিগের বরণীয় হইতেছেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নামোউচ্চারণ মাত্রেই আমাদিগের অন্তঃকরণ এক অপূর্ব ভাবে আপ্লুত হয়। বস্তুতঃ তাঁহার করপল্লবনিঃসৃত বেতাল পঞ্চবিংশতি, বিধবাবিবাহ, সীতার বনবাস, শকুন্তলা, ভ্রান্তিবিলাস, জীবনচরিত, চরিতাবলী, বোধোদয় প্রভৃতি এবং সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব, যিনি একবার পাঠ করিয়াছেন, তিনি কখনই তাঁহাকে বিস্মৃত হইতে পারিবেন ন।। উৎকৃষ্ট রচনা, উৎকৃষ্ট বিদ্যানুরাগ, সমাজসংস্করণ ও দানশীলতাদি বহুবিধ সদ্গুন ইঁহার শোভাময় অলঙ্কার। এই জন্যই তাঁহার যশঃপ্রভা দেশ বিদেশে বিস্তৃত হইয়াছে।

দ্বিতীয় শ্রীযুক্ত বাবু অক্ষয়কুমার দত্ত মহাশয়। সুমধুর ও কোমল গদ্য রচনায় ইনি বিদ্যাসাগর অপেক্ষা কোন অংশে ন্যূন নহেন। ইহার বর্ণিত বিষয় সকল অধিক শিক্ষাপ্রদ ও প্রীতিকর। ইনি কবিতাও রচনা করিতে পারেন। “অনঙ্গমোহন কাব্য” ইহার রচনা। পরিতাপের বিষয়! এই পুস্তকখানি অতিশয় অপ্রাপ্য হইয়াছে। অক্ষয়বাবুর অধিকাংশ প্রবন্ধ ইংরাজী হইতে অনুবাদিত, কিন্তু তাঁহার রচনার এমনি অপূৰ্ব্ব কৌশল যে, কিছুকাল পরে তাহাকেই মূল বলিয়া লোকের ভ্রম হইবে। ইনি “তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা” প্রথম হইতে ১৭৭৭ শক পর্যন্ত সম্পাদন করিয়াছেন। এই পত্রিকা ও সংবাদ প্রভাকরে যে সকল প্রবন্ধ লিখিত হইয়াছিল, তাহাই সঙ্কলন করিয়া তিনভাগ চারুপাঠ, বাহ্য বস্তুর সহিত মানবপ্রকৃতির সম্বন্ধবিচার দুইভাগ, পদার্থ বিদ্যা, ধর্ম্মনীতি এবং ভারতবর্ষীয় উপাসকসম্প্রদায় নামক ৮খানি পুস্তক প্রকাশ করিয়াছেন। অনেকে ইঁহাকে বঙ্গভাষায় সুবিখ্যাত এডিসনের সহিত তুলনা করিয়া থাকেন। বাস্তবিক অক্ষয়বাবু এই তুলনার অযোগ্য পাত্র নন।

সদগুনাধার বাবু রাজেন্দ্রলাল মিত্র বহুকাল হইতে বঙ্গভাষার রমণীয় উদ্যানে বিহার করিতেছেন।

স্বদেশহিতকর এমন অল্প বিষয়ই আছে, যাতে রাজেন্দ্রবাবু আহলাদের সহিত যোগ না দেন। বর্ণাকিউলার লিটারেচর সোসাইটীর ইনি একজন প্রধান অধ্যক্ষ। এই সভার “বিবিধার্থ-সংগ্রহ” তৎকর্তৃক সম্পাদিত হইত। তাহার পরিবর্তে “রহস্য-সন্দর্ভ” পত্র লিখিত হইতেছে। উক্ত পত্রদ্বয়ের উৎকর্ষের বিষয় পূর্ব্বেই কহা হইয়াছে। ঐ দুই পত্রের বর্ণিত বিষয় কেবল বিজ্ঞবর রাজেন্দ্রবাবুর বহুদর্শিতা ও বিদ্যানুরাগিতার পরিচয় দিয়া থাকে। এতদ্ভিন্ন পত্র-লিখিবার ধারা প্রভৃতি কতকগুলি অত্যাবশ্যক পুস্তক, সুদৃশ্য মানচিত্র ও অস্মদ্দেশীয় প্রাচীন কীর্তিকলাপের ফটোগ্রাফ্ সমূহ তাঁহার দ্বারা প্রচারিত হইয়াছে। ইঁহার ন্যায় প্রাচীন ইতিহাস অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তি বাঙ্গালী সমাজে দ্বিতীয় নাই বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। ইনি এই উদ্দেশে মধ্যে মধ্যে অনেক স্থান ভ্রমণ করিয়া থাকেন। কেবল এই মাত্র গুণ নয়, এসিয়াটিক সোসাইটীর অধিবেশনে ইনি সচরাচর যে সকল দুর্লভ পদার্থের আবিষ্কারবিষয়িণী ঘোষণা পাঠ করেন, তাহা সাধারণের বিশেষ চিত্তাকর্ষক ও বিশেষ উপকারক। বিজ্ঞানশাস্ত্রের চর্চ্চায়ও ইহার আন্তরিক উৎসাহ ও অনুরাগ আছে। ৭/৮টী ভাষায় ইহার যথোচিত ব্যুৎপত্তি থাকাতে মনোগত সকল ইচ্ছাই প্রায় তিনি কাৰ্যে পরিণত করিতে সক্ষম হইতেছেন।

মৃত বাবু কালীপ্রসন্ন সিংহ মহোদয় মাতৃভাষার বিশেষ উপকার সাধন করিয়া গিয়াছেন। তাঁহার মেধাশক্তি এত প্রখরা ছিল যে, তিনি সপ্তদশ বর্ষ বয়ঃক্রম কালে সংস্কৃত বিক্রমোর্বশীয় নাটকের অনুবাদ করেন। মৃত কাশীরাম দেব যেমন মহাভারত পদ্যে লিখিয়া সংস্কৃতানভিজ্ঞ বাঙ্গালীগণের সুবিধা করিয়াছেন, তেমনি সিংহ মহোদয় দ্বারা মূল মহাভারত অবিকল উৎকৃষ্ট গৌড়ীয় সাধুভাষায় অনুবাদিত হওয়াতে সর্ব্বসাধারণের অধিকতর উপকার হইয়াছে। কালীপ্রসন্ন বাবুর এই কার্য্য তাঁহার জীবনের দৃঢ়তর কীৰ্ত্তিস্তম্ভ। যে মহাভারত বর্দ্ধমানাধিপতি বাহাদুর শত শত পণ্ডিত নিযুক্ত করিয়াও অদ্যাপি শেষ করিতে পারিলেন না, কালীবাবু ৮ বৎসরের মধ্যে সেই সুবিস্তৃত মহাভারত সম্পূর্ণ করিয়া সাধারণকে বিনা মূল্যে বিতরণ করিয়াছেন। সুবিখ্যাত সিংহ মহোদয় ভারত অনুবাদ করিয়াই যে নিশ্চিন্ত ছিলেন এমন নহে, “হুতোম প্যাঁচার নকশা” রচনা করিয়া বঙ্গ ভাষায় একপ্রকার নূতন রচনা প্রণালী উদ্ভাবন করিয়া গিয়াছেন। ইহা ব্যতীত তাঁহার স্বরচিত আরও কয়েকখানি গ্রন্থ আছে।

সুবিখ্যাত বাবু টেক্‌চাঁদ ঠাকুর মহোদয়ের আলালের ঘরের দুলাল, রামারঞ্জিকা, যৎকিঞ্চিৎ, মদ খাওয়া বড় দায় ইত্যাদি পুস্তকও বঙ্গ ভাষার গৌরব স্বরূপ।

কবিবর শ্রীযুক্ত বাবু রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাইকেল মধুসূদন দত্ত বহুদিন হইল কবিযশো-মুকুট শিরে ধারণ করিয়াছেন। ইহারা উভয়েই নিরর্থক শব্দালঙ্কার দ্বারা আপনাদিগের কাব্য পরিপূর্ণ করেন নাই। ভাবশক্তিতে মেঘনাদ ও পদ্মিনীর উপাখ্যান শ্রেষ্ঠ। শ্রীযুক্ত বাবু রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় পদ্মিনীর উপাখ্যান, কর্ম্মদেবী ও শূরসুন্দরীর রচয়িতা। প্রথমোক্ত গ্রন্থদ্বয়ের নিমিত্ত তিনি বিশেষ বিখ্যাত হইয়াছেন। মান্যবর মাইকেল মধুসূদন দত্ত মহোদয় বঙ্গভাষার অমিত্রাক্ষর ছন্দের “আদি পিতা” বলিয়া বিখ্যাত। ইনি ক্রমান্বয়ে শর্মিষ্ঠা, পদ্মাবতী, তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য, একেই কি বলে সভ্যতা, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁয়া, মেঘনাদ বধ কাব্য, ব্ব্রজঙ্গনা কাৰ্য, কৃষ্ণকুমারী নাটক, বীরাঙ্গনা কাব্য, চতুৰ্দ্দশ পদী কবিতাবলী নামক ১০ খানি পুস্তক লিখিয়াছেন। শেষোক্ত গ্রন্থখানি ফ্রান্সরাজ্যের অন্তঃপাতী ভার্সেলিস নগর হইতে কলিকাতায় মুদ্রাঙ্কনার্থ প্রেরিত হয়। কবিবর ইটালিক্ ভাষা হইতে আদর্শ লইয়া বঙ্গভাষায় চতুর্দ্দশপদী কবিতার সৃষ্টি করিয়াছেন। এতদ্ভিন্ন আরও কয়েক প্রকার নূতন ছন্দঃ তৎকর্তৃক প্রচারিত হইয়াছে।

শ্রীযুক্ত বাবু বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একপ্রকার নূতন রচনা প্রণালী প্রকাশ করিয়া বঙ্গভাষার একটী অভাব মোচন করিয়াছেন। সর ওয়াল্টার স্কট প্রভৃতি লেখকগণ যেমন ইংরাজীতে নবেল লিখিয়াছেন, বঙ্কিমবাবুর দ্বারা তদ্রূপ দূর্গেশনন্দিনী, কপালকুণ্ডলা, ও মৃণালিনী নাম্নী তিনখানি অত্যুৎকৃষ্ট গ্রন্থ রচিত হইয়াছে। এই সকল পুস্তকের বিশেষ গুণ এই যে, যত পাঠ করা যায়, ততই পঠনেচ্ছা বলবতী হইতে থাকে। ইঁহার প্রণীত একখানি পদ্য গ্রন্থ ও আছে।

অশেষগুনালঙ্কৃত পণ্ডিতবর দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের লেখনী কেবল সংবাদপত্র লিখিয়াই নিরস্ত নহে। অবকাশমতে অস্মদ্দেশীয় বালকবৃন্দের নিমিত্ত গ্রীসের ইতিহাস, রোমের ইতিহাস, নীতিসার প্রভৃতি কয়েকখানি পাঠ্য পুস্তকও রচনা করিয়াছেন। কিন্তু “সোমপ্রকাশ” তাঁহার যশঃকীর্তির স্তম্ভ-মূল দৃঢ়ীভূত করিয়াছে।

বিবিধ গুণরাশি বাবু ভূদেব মুখোপাধ্যায় মহাশয় ও বঙ্গভাষার একটী মহৎ অভাব পূরণ করিয়াছেন। ইঁহার দ্বারাই প্রথম সুপ্রণালীবদ্ধ বৈজ্ঞানিক পুস্তক বঙ্গভাষায় প্রচারিত হইয়াছে। ইঁহার প্রণীত প্রাকৃত বিজ্ঞান, ক্ষেত্রতত্ত্ব, ইংলণ্ডের ইতিহাস, ঐতিহাসিক উপন্যাস বঙ্গবিদ্যালয়সমূহের পাঠ্য পুস্তক। এডুকেশন গেজেটের বর্তমান সমৃদ্ধাবস্থা ভূদেববাবুর দ্বারা সাধিত হইতেছে।

বাবু হরিশচন্দ্র মিত্র, হরিমোহন গুপ্ত, দ্বারকানাথ রায়, বিহারিলাল চক্রবর্ত্তী প্রভৃতি বঙ্গভাষার গণনীয় কবি। হরিশ বাবু বহুকাল হইতে সাহিত্য-সংসারে গুঞ্জন করিতেছেন। ইহার দ্বারা অনেকগুলি প্রাচীন বাঙ্গালা কাব্য আবিষ্কৃত হইয়াছে। গদ্য পদ্য উভয়বিধ রচনায় ইহার বিশেষ ক্ষমতা দেখা যায়। ইনি বিধবা বঙ্গাঙ্গনা, কীচকবধ কাব্য, রামায়ণ—আদিকাণ্ড, বীরবাক্যাবলী, সীতা-নিৰ্ব্বাসন কাব্য, কবিরহস্য, জানকী নাটক, জয়দ্রথ নাটক, কবিকলাপ ইত্যাদি পুস্তক সমূহ রচনা করিয়াছেন। পত্রিকা সম্পাদন বিষয়ে ইনি বঙ্গদেশের পূর্বাঞ্চলে একজন প্রসিদ্ধ লোক। হিন্দুহিতৈষিণী, ঢাকাদর্পণ, হিন্দুরঞ্জিকা প্রভৃতি সংবাদপত্র ইহার দ্বারা সম্পাদিত হইত। এক্ষণে “মিত্র-প্রকাশ” নামক সাহিত্য-সমালোচক-পত্র সম্পাদন করিতেছেন। মান্যবর হরিমোহন গুপ্ত মহাশয় রামায়ণ, সন্ন্যাসীর উপাখ্যানাদি পুস্তক লিখিয়। কবি-যশঃ লাভ করিয়াছেন। বাবু দ্বারকানাথ রায় প্রকৃতসুখ, কবিতাপাঠ, প্রকৃতিপ্রেম, রাসামৃত, সুশীল মন্ত্রী, মহমুদগার ও স্ত্রীশিক্ষণ বিধানের প্রণেতা। তিনি “সুলভ-পত্রিকা” নাম্নী এক খানি নীতিগর্ভ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। দ্বারকানাথ রায়ের গদ্য পদ্য উভয়বিধ রচনাই সরল। বিহারিলাল বাবু “অবোধবন্ধু” পত্রের সম্পাদক। সঙ্গীতশতক, বঙ্গসুন্দরী, নিসর্গ সন্দর্শন, প্রেমপ্রবাহিনী, এবং বন্ধুবিয়োগ ইহার উৎকৃষ্ট রচনাশক্তির পরিচয় দিতেছে।

কলিকাতা নৰ্ম্মাল বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রীযুক্ত বাবু গোপালচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় বিংশতি বৎসর কাল শিক্ষা বিভাগে অতিবাহিত করিয়া, বঙ্গভাষায় “শিক্ষাপ্রণালী” প্রস্তুত করিয়াছেন। ইহার প্রণীত “গোলকের উপযোগিতা” দ্বারা আর একটী অভাব পূরণ হইয়াছে। এতদ্ভিন্ন বালকদিগের পাঠোপযোগী নিম্ন লিখিত পুস্তকগুলি রচন’ করিয়াছেন। যথা, — হিতশিক্ষা চারিভাগ। বর্ণশিক্ষা দুইভাগ। মানসাঙ্ক ছয়ভাগ। এবং মাদক সেবনের অবৈধতা।

সংস্কৃত কালেজের অধ্যক্ষ বাবু প্রসন্নকুমার সর্বাধিকারী প্রথম “পাটীগণিত” ও “বীজগণিত” সঙ্কলন পূর্ব্বক বাঙ্গালায় অঙ্কশিক্ষার্থিগণের বিশেষ উপকার করিয়াছেন।

সজ্জনপ্রধান বাবু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের দ্বারা বঙ্গভাষার বিস্তর উন্নতি সাধিত হইয়াছে।

বাবু দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর চারিখণ্ড “তত্ত্ববিদ্যা” রচনা করিয়া,বঙ্গসমাজে বিশেষ প্রশংসনীয় হইয়াছেন।

শ্রীযুক্ত বাবু তারিণীচরণ চট্টোপাধ্যায় প্রণীত “ভারতবর্ষের ইতিহাস” অতিশয় প্রসংশনীয়। চট্টোপাধ্যায় মহাশয় দ্বারা বঙ্গ ভাষায় প্রথম উৎকৃষ্ট ভূগোল রচিত হয়।

সংস্কৃত কালেজের কৃতবিদ্য ছাত্র বাবু লাল মোহন ভট্টাচার্য্যের দ্বারা বঙ্গ ভাষার অতি উৎকৃষ্ট “অলঙ্কার কাব্য নির্ণয়” প্রকাশিত হইয়াছে।

অনুবাদক সমাজের সাহায্যে বাবু মধুসুদন মুখোপাধ্যায় দ্বারা সুশীলার উপাখ্যান তিন খণ্ড, নুরজিহানের জীবনচরিত, ও অহল্যা হড্‌ডিকার জীবনচরিত ইত্যাদি অনেকগুলি পুস্তক রচিত হইয়াছে। এই সকল পুস্তকের রচনা অতিশয় সরল।

মৃত বাবু নীলমণি বসাক ও রাধামোহন সেন এবং পণ্ডিতবর মুক্তারাম বিদ্যাবাগীশর্তৃক অনেকগুলি পুস্তক লিখিত হইয়াছিল। প্রথমোক্ত মহোদয়ের নবনারী, ভারতবর্ষের ইতিহাস, পারস্য উপন্যাস, অতীব প্রশংসনীয়। পণ্ডিতবর মুক্তারাম বিদ্যাবাগীশ মহাশয় অনেকগুলি ভিন্ন ভাষাস্থ পুস্তক বঙ্গভাষায় অনুবাদ করিয়াছেন। “সর্ব্বার্থ পূর্ণচন্দ্রে” প্রকাশিত পুরাণাদির অনুবাদ, এবং আরব উপন্যাস প্রভৃতি পুস্তক তাঁহার নাম চিরস্মরণীয় করিয়াছে।

পণ্ডিতবর রামনারায়ণ তর্করত্ন, বাবু দীনবন্ধু মিত্র, ও উমেশচন্দ্র মিত্র নাটক রচনা করিয়া বিশেষ খ্যাতি লাভ করিয়াছেন।

অস্মদ্দেশীয় মহিলাকুলের গরিমা স্বরূপা, পাবনানিবাসিনী শ্রীমতী ৰামাসুন্দরী দেবী এবং কলিকাতাস্থ শ্রীমতী কৈলাসবাসিনী দেবী বঙ্গভাষায় লেখনী ধারণ করত, বিশেষ আদরণীয়া হইয়াছেন।

ধর্ম্মপ্রচারক বাবু কেশবচন্দ্র সেন মহোদয় দ্বারাও বঙ্গভাষার বিস্তর উপকার হইয়াছে। ইঁহার সদুপ-দেশপূৰ্ণ বক্তৃতা সমূহ পাঠ করিয়া সকলেই পরিতৃপ্ত হন। সম্প্রতি কয়েক মাস হইল, ইংলণ্ড হইতে প্রত্যাগত হইয়া “সুলভসমাচার” নামক একখানি এক পয়সা মূল্যের পত্র প্রচার করিয়াছেন। এক্ষণে বাঙ্গালা ভাষার শুভকাল উপস্থিত। পূর্ব্বোক্ত সুলভের আদর্শ গ্রহণ করিয়া অনেকগুলি পত্র প্রচারিত হইয়াছে, তন্মধ্যে “সাহিত্যমুকুর” বর্ণনার যোগ্য।

এতদ্ব্যতিরিক্ত “আমার গুপ্ত কথা” নামক একখানি রহস্যমূল ও উপদেশপূর্ণ নবেল সংখ্যানুসারে প্রকাশিত হইতেছে। সম্প্রতি দ্বাবিংশতি ফর্ম্মায় প্রথম পৰ্ব্ব সমাপ্ত হইয়াছে। আমরা অনুসন্ধান দ্বারা অবগত হইলাম, শোভাবাজারের রাজবংশীয় বিদ্যানুরাগী শ্রীযুক্ত কুমার উপেন্দ্রকৃষ্ণ বাহাদুরের যত্নে ও উপদেশে প্রভাকরের সহকারী সম্পাদক ভুবন বাবু ইহার রচনা করিতেছেন। ইহা পাঠ করিয়া অনেকেই কৌতুক ও উপদেশ লাভ করিতে পারিবেন সন্দেহ নাই। গ্রন্থকার বঙ্গদেশের দুর্নীতি সংশোধনার্থ যত্নশীল হইয়াছেন। আমরা ভরসা করি, দেশহিতৈষী মহোদয়গণ রচয়িতাকে উৎসাহিত করিয়া প্রকৃতগুণের আদর করিবেন।

পণ্ডিতবর আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশ, ভরতচন্দ্র শিরোমণি, জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চানন, জগন্মোহন তর্কালঙ্কার, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য, কৃষ্ণধন বিদ্যারত্ন, মথুরানাথ তর্করত্ন, লোহারাম শিরোরত্ন, মধুসূদন বাচস্পতি, রামগতি ন্যায়রত্ন, বাবু দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিদ্যালয় সমূহের ডিপুটি ইনস্পেক্টর বাবু রাধিকা প্রসন্ন মুখোপাধ্যায় ও বাবু নীলমণি মুখোপাধ্যায়, হাইকোর্টের ইন্টারপ্রিটর বাবু শ্যামাচরণ সরকার, বাবু প্রতাপচন্দ্ৰ ঘোষ, গ্রামবার্ত্তা সম্পাদক বাবু হরিনাথ মজুমদার এবং পাদরি লং ও রবিনসন সাহেব প্রভৃতি মহোদয়গণ বহু দিন অবধি বঙ্গভাষার উন্নতিকল্পে ব্রতী হইয়াছেন।

বহরমপুরস্থ বিদ্যানুরাগী জমিদার বাবু রামদাস সেন, দীনপালিনী বিদ্যানুরাগিণী রাণী স্বর্ণময়ী, মুক্তাগাছাস্থ জমিদার বাবু সূর্য্যকান্ত আচার্য্যচৌধুরী এবং রাজা যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর প্রভৃতি মহোদয়গণ বিদ্যোৎসাহিতাগুণে চিরস্মরণীয় যশোলাভ করিয়াছেন। যে কোন নূতন পুস্তক বা পত্রিকা প্রচারিত হয়, ইঁহারা অতি আগ্রহের সহিত তাহা গ্রহণ করিয়া থাকেন। এতদ্ভিন্ন কোন পত্রিকার সম্পাদক বা গ্রন্থ রচয়িতা উঁহাদিগের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করিলে প্রশস্ত হৃদয়ে অর্থ দান করিতে কুণ্ঠিত হন না। রামদাস বাবুর রচনাশক্তিও সাধারণের হৃদয়গ্রাহিণী। ইঁহার রচিত তিনখানি কাব্য পুস্তক অতি সুললিত হইয়াছে।

পূর্ব্বোক্ত বিষয় সকল সমালোচনা করিয়া, বঙ্গভাষার তিনটি অবস্থা নির্ণীত হইল। প্রথম, নানা ভাষার বিমিশ্র অবস্থা। দ্বিতীয়, বাঙ্গালা বা প্রাকৃত। এবং তৃতীয় সংস্কৃত বা বিশুদ্ধ।

প্রায় নিত্য নিত্যই এখন নূতন নূতন অনেক পুস্তক আমাদিগের দৃষ্টিগোচর হয়, কিন্তু তাহার অধিকাংশই অসার। কলিকাতা বটতলার অনেক পুস্তক বঙ্গভাষার অপমান স্বরূপ।

***

অধ্যায় ৫ / ৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%