৮. রুকাইয়া বিনত মুহাম্মদ

পরিচিতি

নবী করীম (ﷺ) ও খাদীজা (রা)-এর দ্বিতীয় কন্যা রুকাইয়া (রা)। পিতা নবী করীম (ﷺ)-এর নবুওয়্যাত লাভের সাত বছর পূর্বে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। যুবাইর ও তার চাচা মুসআব যিনি একজন কুষ্টিবিদ্যা বিশারদ, তারা ধারণা করেছেন, রুকাইয়া (রা) নবী করীম (ﷺ)-এর ছোট কন্যা। জুরজানী এ মত সমর্থন করেছেন। তবে অধিকাংশের মতে যয়নব (রা) হলেন বড়, আর রুকাইয়া দ্বিতীয়। ইবন হিশামের মতে, রুকাইয়্যা কন্যাদের মধ্যে বড়। মুহাম্মদ ইবন ইসহাক সংকলিত একটি বর্ণনামতে, নবী করীম (ﷺ)-এর বয়স যখন ত্রিশ তখন যয়নব (রা)-এর জন্ম হয় এবং তেত্রিশ বছর বয়সে জন্ম হয় রুকাইয়ার (রা)। যা হোক, সীরাত বিশেষজ্ঞরা রুকাইয়াকে নবী করীম (ﷺ)-এর দ্বিতীয় কন্যা বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

প্রথম বিবাহ

নবী করীম (ﷺ)-এর নবুওয়াত লাভের পূর্বে মক্কার আবু লাহাবের পুত্র উতবার সাথে রুকাইয়া (রা)-এর প্রথম বিয়ে হয়। নবী করীম (ﷺ) নবুওয়্যাত লাভ করলেন। কুরাইশদের সাথে তার বিরোধ যখন চরম আকার ধারণ করে তখন তারা নবী করীম (ﷺ)-কে কষ্ট দেয়ার সকল পথ ও পন্থা বেছে নেয়। তারা সকল নীতি-নৈতিকতার মাথা খেয়ে সিদ্ধান্ত নেয় যে মুহাম্মদের বিবাহিত কন্যাদের স্বামীর ওপর চাপ প্রয়োগ অথবা প্রলোভন দেখিয়ে প্রত্যেকের স্ত্রীকে তালাক দেবে এবং পরে তাদের পিতৃগৃহে পাঠিয়ে দেবে। তাতে অদ্ভুত মুহাম্মাদের মনোকষ্ট ও দুশ্চিন্তা বাড়বে এবং নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। যেমন চিন্তা তেমন কাজ। তারা প্রথমে গেল নবী করীম (ﷺ)-এর বড় কন্যার স্বামী আবুল আস ইবন রাবী’র নিকট। আবদার জানালো তার স্ত্রী যয়নব বিনত মুহাম্মদকে তালাক দিয়ে পিতৃগৃহে পাঠিয়ে দেওয়ার। কিন্তু তিনি তাদের মুখের ওপর সাফ ‘না’ বলে দিলেন। নির্লজ্জ কুরাইশ নেতৃবৃন্দ এমন জবাব শ্রবণ করেও থামলো না। তারা গেল রুকাইয়ার (রা) স্বামী উতবা ইবন আবী লাহাবের নিকট এবং তার স্ত্রীকে তালাক দানের জন্যে চাপ প্রয়োগ করলো। পাশাপাশি এ প্রলোভনও দিল যে, সে কুরাইশ গোত্রের যে সুন্দরীকেই চাইবে তাকে তার স্ত্রী বানিয়ে দেয়া হবে। বিবেকহীন উতবা তাদের প্রস্তাব মেনে নিল। সে রুকাইয়ার বিনিময়ে সা’ঈদ ইবনুল আস মতান্তরে আবাল ইবন সা’ঈদ ইবনুল আসের একটি কন্যাকে পাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। কুরাইশ নেতারা সানন্দে তার এ দাবী মেনে নিল। তাদের না মানার কোন কারণও ছিল না। তাদের তো প্রধান উদ্দেশ্য ছিল যে কোনভাবে এবং যতটুকু পরিমাণেই হোক নবী করীম (ﷺ)-কে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা। নবী করীম (ﷺ)-এর একটু কষ্টতেই তাদের মানসিক প্রশান্তি। নরাধম উতবা তার স্ত্রী রুকাইয়াকে (রা) তালাক দিল। তবে এ বিষয়ে আরেকটি বর্ণনা এই যে, যখন উতবা পিতা-মাতার নিন্দায় সূরা ‘লাহাব’ অবতীর্ণ হয় তখন আবু লাহাব ও তার স্ত্রী উন্মু জামীল- “ হালাল হাতাব” তারা পুত্ৰ উতবাকে বলল যদি তাকে বিদায় না কর তাহলে তোমার সাথে আমাদের আর কোন সম্পর্ক নেই। মাতা পিতার অনুগত সন্তান মা-বাবাকে খুশী করার জন্যে স্ত্রী রুকাইয়াকে তালাক দেয়। উল্লেখ্য যে, উতবার সাথে রুকাইয়ার কেবল আব্দ হয়েছিল। স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাসের আগেই তালাকের এ ঘটনা ঘটে।

রুকাইয়া (রা)-এর দ্বিতীয় বিয়ে

উসমান (রা) তার ইসলাম গ্রহণ ও বিয়ের ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, আমি পবিত্র কা’বার আঙ্গিনায় কতিপয় বন্ধুর সাথে বসে ছিলাম। এমন সময় কোন এক ব্যক্তি এসে আমাকে জানালো যে, নবী করীম (ﷺ) তার কন্যা রুকাইয়াকে উতবা ইবন আবী লাহাবের সাথে বিয়ে দিয়েছেন। যেহেতু রুকাইয়্যা রুপ-লাবণ্য এবং ঈর্ষণীয় গুণ- বৈশিষ্ট্যের জন্যে স্বাতন্ত্রের অধিকারিণী ছিলেন, এ কারণে তার প্রতি আমার খানিকটা মানসিক দুর্বলতা ছিল। আমি তার বিয়ের সংবাদ শ্রবণ করে কিছুটা অস্থির হয়ে পড়লাম। তাই উঠে সোজা বাড়ী চলে গেলাম। তখন আমাদের বাড়ীতে থাকতেন আমার খালা সাদা। তিনি ছিলেন একজন কাহিনা” (ভবিষ্যদ্বক্তা)। আমাকে দেখেই তিনি হঠাৎ নিম্নের কথাগুলো বলতে শুরু করলেন

آبشر وحبيت ثلاثا وثرا، ثم ثلاثا ثلاثا أخرى، ثم بأخرى گی تنم عشرا، لقبت برا وقت شرائگت والله انا زهرا ، وانت بگو وقت بگا۔

(হে উসমান) তোমার জন্য সুসংবাদ। তোমার প্রতি তিনবার সালাম। আবার তিনবার সালাম। তারপর আবার তিন বার। শেষে একবার সালাম। তাহলে মোট দশটি সালাম পূর্ণ হয়ে যায়। আল্লাহর ইচ্ছায় তুমি শুভ ও কল্যাণের সাথে মিলিত হবে এবং অকল্যাণ থেকে দূরে থাকবে। আল্লাহর কসম, তুমি একজন ফুলের কুঁড়ির মত সতী-সাধ্বী সুন্দরী কন্যাকে বিয়ে করেছে। তুমি একজন কুমার, এক কুমারী পাত্রীই লাভ করেছে। তার এমন কথাতে আমি ভীষণ আশ্চর্য বনে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, খালা। আপনি এসব কী বলছেন? তিনি বললেন

ثمان، باثمان، باثمان لك الجمال ولك الشأن هذا نبئ مع البرهان ارسله بقه الدئا وجاء التمثيل والفنان نائبثه لأ نك الأوثان.

উসমান, উসমান, হে উসমান। তুমি সুন্দরের অধিকারী, তোমার জন্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইনি নবী, তাঁর সাথে আছে দলিল-প্রমাণ। তিনি সত্য-সঠিক রাসূল। তার ওপর আমি এবারও কিছু বুঝলাম না। আমি তাকে একটু বিশ্লেষণ করে বলার জন্যে অনুরোধ করলাম। এবার তিনি বললেন

ان محمد بن عبد الله رسول الله من دون الله جاء بتزيل الله بدعوه إلى الله، يتباه مصباخ ودینه تلاش، مايثق الصباح ولو وقع الرماح وسلت الناح ومدت الرماح

মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহ যিনি আল্লাহর রাসূল, কুরআন নিয়ে এসেছেন। আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাচ্ছেন। তার প্রদীপই প্রকৃত প্রদীপ, তার দ্বীনই সফলতার মাধ্যম। মারামারি কাটাকাটি হৈচৈ কোন মঙ্গল বয়ে আনবে না। তাঁর এ কথা আমাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করলো। আমি ভবিষ্যতের করণীয় বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করলাম। আমি প্রায়ই আবু বকরের নিকট গিয়ে বসতাম। দুদিন পর আমি যখন তার নিকট গেলাম তখন সেখানে কেউ ছিলনা। আমাকে চিন্তিত অবস্থায় বসে থাকতে দেখে তিনি প্রশ্ন করলেন, আজ তোমাকে এত চিন্তিত মনে হচ্ছে কেন? তিনি আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন, তাই আমি আমার খালার বক্তব্যের সারকথা তাকে বললাম। আমার কথা শ্রবণ করে তিনি বললেন : উসমান, তুমি একজন বুদ্ধিমান মানুষ। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য যদি তুমি করতে না পার তাহলে সেটা হবে একটা আশ্চর্যের বিষয়। তোমার স্ব-জাতির লোকেরা যে মূর্তিগুলির উপাসনা করে, সেগুলো কি পাথরের তৈরী নয়- যারা কোন কিছু শুনে না, দেখে না এবং কোন উপকারও অপকারও করার ক্ষমতা তারা রাখেনা? উসমান বললেন, আপনি যা বলেছেন, তা সম্পূর্ণ সত্য। আবূ বকর বললেন, তোমার খালা যে কথা বলেছেন তা সত্য। মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহ আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ তার বাণী মানুষের নিকট পৌছানোর জন্যে তাকে প্রেরণ করেছেন। যদি তুমি তার নিকট যাও এবং মনোযোগ সহকারে তার কথা শ্রবণ কর, তাতে ক্ষতির কী আছে? তার এ কথার পর আমি নবী করীম (ﷺ) নিকট গেলাম। আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, তাদের এ আলোচনার কথা শুনে নবী করীম (ﷺ) নিজেই উসমান (রা)-এর নিকট যান। নবী করীম (ﷺ) বলেন, শোন উসমান, আল্লাহ তোমাকে জান্নাতের দিকে ডাকছেন, তুমি সে আহ্বানে সাড়া দাও। আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তোমাদের তথা সমগ্র সৃষ্টি জগতের প্রতি আমাকে পাঠানো হয়েছে। আল্লাহই জানেন তার এ কথার মধ্যে কী এমন শক্তি ছিল। আমি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম। অবলীলাক্রমে আমার মুখ থেকে উচ্চারিত হলো কালেমায়ে শাহাদাত

أشهد أن لا اله الا الله وأشهد أن محمدا رسول الله.

এ ঘটনার পর মক্কাতেই উসমানের (রা) সাথে রুকাইয়ার (রা) বিয়ে আকদ সম্পন্ন হয়।

রুকাইয়্যার ইসলাম গ্রহণ, বাইআত ও হিজর

রুকাইয়া (রা) তার মা উম্মুল মু’মিনীন খাদীজা (রা) ও বড় বোন যয়নব (রা)-এর সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। অন্য নারীরা যখন নবী করীম (ﷺ)-এর বাই’আত করেন তখন তিনিও বাই’আত করেন। নবুওয়্যাতের পঞ্চম বছরে তিনি স্বামী উসমান (রা)-এর সাথে হাবশায় হিজরত করেন। আসমা বিন্ত আবু বকর (রা) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল ও আবু বকর হেরা গুহায় অবস্থান করতেন আর আমি তাদের দুজনের খাবার নিয়ে যেতাম। একদিন উসমান (রা) নবী করীম (ﷺ)-এর নিকট হিজরতের অনুমতি চাইলে তাকে হাবশায় যাওয়ার অনুমতি দান করেন। অতঃপর তারা স্বামী-স্ত্রী মক্কা ছেড়ে হাবশার দিকে রওয়ানা হন। তারপর আমি আবার যখন তাদের খাবার নিয়ে গেলাম তখন নবী করীম (ﷺ) জানতে চান : উসমান ও রুকাইয়া কি চলে গেছে। বললাম : জী হ্যা, তারা চলে গেছেন। তখন তিনি আমার পিতা আবু বকরকে (রা) শুনিয়ে বললেন

انها الأول من هاجر بعد ابراهيم ولوط .

‘নিশ্চয় তারা দুজন ইবরাহীম ও পূত- এর পর প্রথম হিজরতকারী। (আনসাবুল আশরাফ-১/১৯৯; হায়াতুস সাহাবা-১৩৪৬)

কিছুদিন হাবশায় অবস্থানের পর তারা আবার মক্কায় ফিরে আসেন। মক্কার কাফিদের অপতৎপরতার মাত্রা তথন আরো বৃদ্ধি পেয়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। তাই সেখানে অবস্থান করা সমীচীন মনে করলেন না। আবার হাবশায় ফিরে গেলেন। আনাস বিন মালেক (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। উসমান ইবন আফফান (রা) তার স্ত্রী রুকাইয়াকে (রা) নিয়ে হাবশার দিকে বেরিয়ে গেলেন। তাঁদের সংবাদ নবী করীম (ﷺ) -এর নিকট আসতে দেরী হলো। এর মধ্যে এক মহিলা হাবশা থেকে মক্কায় এলো। সে বললো : মুহাম্মদ, আমি আপনার জামাতাকে তার স্ত্রীসহ যেতে দেখেছি। রাসূল (ﷺ) জানতে চাইলেন : তুমি তাদের কি অবস্থায় দেখেছো? সে বললো : দেখলাম সে তার স্ত্রীকে একটি দুর্বল গাধার উপর বসিয়ে হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। নবী করীম (ﷺ) তখন মন্তব্য করলেন : ‘আল্লাহ তাদের সাথী হোন। পূত আলাইহিস সালামের পরে উসমান প্রথম ব্যক্তি যে সস্ত্রীক হিজরত করেছে। তারা দ্বিতীয়বার বেশ কিছুদিন হাবশায় অবস্থান করার পর মক্কায় ফিরে আসেন এবং কিছুদিন মক্কায় অবস্থান করে পরিবার-পরিজনসহ আবার চিরদিনের জন্য মদীনায় হিজরত করেন।

রুকাইয়্যা (রা) মা হন

দ্বিতীয়বার হাবশায় অবস্থানকালে রুকাইয়ার (রা) পুত্র ও আবদুল্লাহর জন্ম হয়। এ আব্দুল্লাহর নামেই উসমান (রা)-এর উপনাম হয় আবু আবদিল্লাহ। এর পূর্বে হাবশায় প্রথম হিজরতের সময় তার গর্তের একটি সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। কাতাদা বলেন, উসমান (রা)-এর ঔরসে রুকাইয়া (রা)-এর কোন সন্তান হয়নি। ইবন হাজার বলেন, এটা কাতাদার একটি ধারণা মাত্র। এমন কথা তিনি ব্যতীত আর কেউ বলেননি। তবে আবদুল্লাহর পরে রুকাইয়ার (রা) আর কোন সন্তান হয়নি। আবদুল্লাহর বয়স যখন মাত্র ছয় বছর তখন হঠাৎ একদিন একটি মোরগ তার একটি চোখে ঠোকর দেয় এবং তাতে তার চেহারা ফুলে সমস্ত দেহে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এ দুর্ঘটনায় হিজরী চতুর্থ সনের জামাদিউল আউয়াল মাসে সে ইন্তিকাল করে। নবী করীম (ﷺ) দাদা তার জানাযার সালাত পড়ান এবং উসমান (রা) কবরে নেমে তার দাফন কাজ সম্পন্ন করেন।

রুকাইয়্যার ইন্তেকাল

মদীনায় পৌঁছার পর রুকাইয়া (রা) হিজরী দ্বিতীয় সনে রোগাক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হন। তখন ছিল বদর যুদ্ধের সময়কাল। নবী করীম (ﷺ) আর যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি উসমানকে (রা) তার রুগ্ন স্ত্রীর সেবা-শুশ্রুষার জন্যে মদীনায় রেখে নিজে বদরে গমন করেন। হিজরতের এক বছর সাত মাস পরে পবিত্র রমজান মাসে রুকাইয়া ইন্তেকাল করেন। উসামা ইবন যায়েদ (রা) বলেন, আমরা যখন নবী করীম (ﷺ) ইবন হারিছা বদরে বিজয়ের সুসংবাদ নিয়ে হাজির হন। রাসূল আমাকে উসমানের সাথে মদীনায় রেখে গিয়েছিলেন।

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, তারা যখন রুকাইয়ার (রা) দাফন কাজে ঠিক সে সময় উসমান (রা) দূর থেকে আসা একটি তাকবীর ধ্বনি শ্রবণ করে উসামার (রা) নিকট জানতে চান এটা কী? তাঁরা তাকিয়ে দেখতে পেলেন যায়েদ ইবন হারিছা (রা) নবী করীম (ﷺ)-এর উটনীর উপর সওয়ার হয়ে আছেন এবং বদরে মক্কার কুরাইশ নেতাদের হত্যার সংবাদ ঘোষণা করছেন। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস বলেন, রুকাইয়ার (রা) ইন্তেকালের পর রাসূল বলেন

الحقي بسلفنا الصالح عثمان بن مظعون .

তুমি আমাদের পূর্বসূরী উসমান ইবন মাজউনের সাথে মিলিত হও। (আল ইসাবা-৪/৩০৪)

নারীরা কাঁদতে থাকে। এ সময় ওমর (রা) এসে তার হাতের চাবুক উঁচিয়ে পেটাতে উদ্যত হন। নবী করীম (ﷺ) হাত দিয়ে তার চাবুকটি ধরে বলেন, ছেড়ে দাও। তারা তো কান্নাকাটি করছে। অন্তর ও চোখ থেকে যা বের হয়, তা হয় আল্লাহ ও তাঁর অনুগ্রহ থেকে। আর হাত ও মুখ থেকে যে ক্রিয়া প্রকাশ পায় তা হয় শয়তান থেকে। ফাতিমা (রা) নবী করীম (ﷺ)-এর পাশে কবরের ধারে বসেছিলেন। নবী করীম (ﷺ) নিজের পোশাকের কোনা দিয়ে তার চোখের পানি মুছে দিচ্ছিলেন। ইবন সা’দ উপরিউক্ত বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, সকল বর্ণনাকারীর নিকট এটাই সর্বাধিক সঠিক বলে বিবেচিত যে, রুকাইয়ার (রা) মৃত্যু ও দাফনের সময় রাসূল (ﷺ) বদরে ছিলেন। সম্ভবত এটা নবী করীম (ﷺ) অন্য কন্যার মৃত্যুর সময়ের ঘটনা। আর যদি রুকাইয়ার মৃত্যু সময়ের হয় তাহলে সম্ভবত রাসূল বদর থেকে ফিরে আসার পরে কবরের পাশে গিয়েছিলেন, আর নারীরাও তখন ভীড় করেছিলেন।

মুসনাদে ইমাম আহমাদের একটি বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূল (ﷺ)-এর অনিচ্ছার কারণে উসমান (রা)-এর বদলে আবু তালহা (রা) কবরে নেমে রুকাইয়াকে (রা) শায়িত করেন। এ ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন উঠেছে যে, তা কেমন করে সম্ভব? রাসূল তো তখন বদরে। তাই মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, এটা উম্মু কুলসুমের (রা) দাফনের সময়ের ঘটনা। তাছাড়া অপর একটি বর্ণনায় উম্মু কুলসুমের (রা) নাম রয়েছে। উল্লেখ্য যে, উম্মু কুলসুম (রা) নবী করীম (ﷺ)-এর তৃতীয় কন্যা রুকাইয়ার (রা) মৃত্যুর পর উসমান (রা) তাঁকে বিয়ে করেন। কিছুদিন পর তিনি ইন্তেকাল করেন। রুকাইয়া (রা) খুবই রূপ-লাবণ্যের অধিকারিণী ছিলেন। দুররুল মানছুর” গ্রন্থে এসেছে : তিনি ছিলেন দারুণ রূপবতী। হাবশায় অবস্থানকালে সেখানকার একদল বখাটে লোক তার রূপ-লাবণ্য দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। এ দলটি তাকে ভীষণ বিরক্ত করে। তিনি তাদের জন্য বদ-দু’আ করেন এবং তারা ধ্বংস হয়ে যায়। প্রিয়তমা স্ত্রী ও সুখ-দুঃখের সাথীর অকাল মৃত্যুতে উসমান (রা) দারুন কষ্ট পান। সর্বোত্তম দম্পতি রুকাইয়্যা ও ওসমান তাদের দুজনের মধ্যে দারুণ মিল-মুহাব্বত ছিল। জনগণ বলাবলি করতো এবং কথাটি যেন উপমায় পরিণত হয়েছিল যে

أحسن الزوجيني رآها الإنسان قبنة وزوجها عثمان .

মানুষের দেখা দম্পতিদের মধ্যে রুকাইয়া ও তার স্বামী উসমান হলো সর্বোত্তম। (আল-ইসাবা-৪/৩০৫)

বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়, রুকাইয়া ছিলেন একজন স্বামী- সোহাগিনী এবং পতি-পরায়ণা স্ত্রী। তাঁদের সাময়িক সময়ের দাম্পত্য জীবনে তারা কখনো বিচ্ছিন্ন হননি। সকল বিপদ-আপদ ও প্রতিকূল অবস্থা তাঁরা একসাথে মুকাবিলা করেছেন। তিনি নিজে যেমন স্বামীর সেবা করে সকল যন্ত্রণা লাঘব করার চেষ্টা করতেন, তেমনি স্বামী উসমানও স্ত্রীর জীবনকে সহজ করার চেষ্টা সব সময়। করতেন। একদিন নবী করীম (ﷺ) উসমান (রা)-এর গৃহে গমন করে দেখেন রুকাইয়া স্বামীর মাথা ধৌত করে দিচ্ছেন। তিনি কন্যাকে বললেন

بابن أحسني إلى أبي عبد الله نائه أشبه اضابی لی

‘আমার কন্যা! তুমি আবু আবদিল্লাহর (উসমান) সাথে উত্তম আচরণ করবে। কারণ আমার সাহাবীদের মধ্যে স্বভাব-চরিত্রে আমার সাথে তার বেশী মিল। (প্রাগুক্ত)

আবু হুরাইরা (রা) বলেন, আমি একদিন নবী করীম (ﷺ)-এর কন্যা ও উসমানের স্ত্রী রুকাইয়ার ঘরে গিয়ে দেখি তার হাতে চিরুনী। তিনি বললেন : নবী করীম (ﷺ) এ মাত্র আমার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তিনি দেখে গেলেন, আমি উসমানের মাথায় চিরুনী করছি।

সকল অধ্যায়
১.
১. উম্মুল মু’মিনীন খাদীজা (রা)
২.
২. উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রা)
৩.
৩. উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রা)
৪.
৪. মারইয়াম (আ)
৫.
৫. আছিয়া (আ)
৬.
৬. উম্মু সুলাইম (রা)
৭.
৭. যয়নব বিনত রাসূলুল্লাহ
৮.
৮. রুকাইয়া বিনত মুহাম্মদ
৯.
৯. উম্মু কুলছুম বিনত নবী করীম (ﷺ)
১০.
১০. ফাতিমা বিনত রাসূলিল্লাহ
১১.
১১. সুমাইয়া (রা)
১২.
১২. উম্মুল মুমিনীন সাদা বিনতে যামআ (রা)
১৩.
১৩. উম্মুল মুমিনীন যয়নব বিনতে খুযাইমা (রা)
১৪.
১৪. উম্মুল মু’মিনীন উম্মু সালামা (রা)
১৫.
১৫. উম্মুল মুমিনীন যয়নব বিনতে জাহাশ (রা)
১৬.
১৬. উম্মুল মু’মিনীন জুয়াইরিয়া (রা)
১৭.
১৭. উম্মুল মুমিনীন উম্মু হাবীবা (রা)
১৮.
১৮. উম্মুল মু’মিনীন সফিয়্যা (রা)
১৯.
১৯. উম্মুল মুমিনীন মায়মূনা (রা)
২০.
২০. উম্মুল মুমিনীন রায়হানা (রা)
২১.
২১. উম্মুল মু’মিনীন মারিয়া কিবতিয়া (রা)
২২.
২২. হালীমা (রা)
২৩.
নবী করীম (ﷺ)-এর বহু বিবাহের সমালোচনার প্রতিবাদ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%