৫.০৭ সপ্তম পরিচ্ছেদ – মেঘ-ঘনীভূত

পাঁচকড়ি দে

গুপ্ত-ড্রয়ারের ভিতর হইতে সেই কণ্ঠহার বাহির হইতে দেখিয়া জোহেরার মুখে কথা নাই-হরিপ্রসন্ন বাবুর মুখেও কথা নাই-দেবেন্দ্রবিজয়ও বিস্ময়-স্তম্ভিত| সর্ব্বপ্রথমে দেবেন্দ্রবিজয় নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিলেন| জোহেরাকে বলিলেন, “দেখুন দেখি, সেই সেই কণ্ঠহার কি না; আপনি যেরূপ বর্ণনা করিয়াছিলেন, তাহাতে ইহা যে সেই সৃজান বিবির কণ্ঠহার, দেখিয়া বেশ বুঝা যাইতেছে; এই যে মাঝখানে হীরার একখানা বড় ধুক্ধুকিও রহিয়াছে|”
জোহেরা কম্পিতকণ্ঠে কহিল, “হাঁ, এই সেই কণ্ঠহার; কিন্তু-কিন্তু-এ তীরের ফলা-ইহা ত কখনও আমি দেখি নাই|” বলিয়া জোহেরা তাহা ড্রয়ারের মধ্য হইতে তুলিয়া লইল|
জোহেরার হাত হইতে সেই তীরের ফলা লইয়া উকীল হরিপ্রসন্ন বাবু উল্টাইয়া দেখিতে লাগিলেন, “তাই ত এ তীরের ফলা কোথা হইতে আসিল? খুব ধারাল দেখিতেছি|”
দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “খুব সাবধান, হরিপ্রসন্ন বাবু! ধার পরীক্ষা করিতে চেষ্টা করিবেন না| এখনই বিপদ্ ঘটিয়া যাইবে – বড় সাংঘতিক – দেখিতেছেন না, ইহা বিষাক্ত?”
“বিষাক্ত!’ বলিয়া সভয়ে হরিপ্রসন্ন বাবু সেই তীরের ফলাটা ড্রয়ারের মধ্যে ফেলিয়া দিলেন| বলিলেন, “কিরূপে আপনি বুঝিতে পারিলেন, ইহা বিষাক্ত?”
দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “নিশ্চয়ই বিষাক্ত! পূর্ব্বে আমাদের ভুল হইয়াছিল; সেই ছুরিতে সৃজান বিবি খুন হয় নাই| আমি এখন ঠিক বুঝিতে পারিতেছি, এই তীরের ফলা দিয়া সৃজান বিবিকে খুন করা হইয়াছে|”
জোহেরা হতাশভাবে বলিল, “মহাশয়, তবে কি আপনি এখন মুন্সী সাহেবকেই দোষী স্থির করিতেছেন?”
দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “হাঁ, নিজের পত্নীর অসচ্চরিত্রতার কথা তাঁহার অনবগত ছিল না| সৃজান বিবি মনিরুদ্দীনের সঙ্গে গৃহত্যাগ করিবার যে বন্দোবস্ত করিয়াছিল, তাহাও তিনি সেদিন কোন রকমে জানিতে পারিয়া থাকিবেন| সেই খুনের রাত্রিতে তিনি যে গোপনে স্ত্রীর অনুসরণ করিয়া মেহেদী-বাগানের দিকে গিয়াছিলেন. তাহা মনিরুদ্দীন দেখিয়াছিলেন| আর একজন – মজিদ খাঁ, তিনিও মুন্সী সাহেবকে পথের ধারে একটা আলোক-স্তম্ভের নীচে দাঁড়াইয়া সৃজান বিবির সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা করিতে করিতে তাহার গলদেশ হইতে একছড়া কণ্ঠহার ছিনাইয়া লইতে দেখিয়াছেন| তখনই সৃজান বিবি মেহেদী-বাগানের দিকে ছুটিয়া পালাইয়া যায়-মুন্সী সাহেবও তাহার অনুসরণ করেন| তাহার পর যখন সেই মেহেদী-বাগানে সৃজান বিবির লাস পাওয়া যাইতেছে, তখন মুন্সী সাহেবই দোষী| বিশেষতঃ মুন্সী সাহেব ভিন্ন আর কেহই এ গুপ্ত ড্রয়ারের বিষয় জানে না, আর সৃজান বিবি যদিও জানিত, সে এখন জীবিত নাই; অথচ যখন এই ড্রয়ারের মধ্যে সৃজান বিবির খুনের প্রধান নিদর্শন স্বরূপ এই কণ্ঠহার আর তীরের ফলা পাওয়া যাইতেছে, তখন মুন্সী সাহেবই ইহা এইখানে লুকাইয়া রাখিয়াছেন| নিশ্চয়ই তিনি স্ত্রীহন্তা!”
হরিপ্রসন্ন বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, “এখন আপনি কি করিবেন?”
দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, “এখন এই কণ্ঠহার আর তীরের ফলা গুপ্ত-ড্রয়ারের ভিতরেই রাখিয়া দিয়া মুন্সী সাহেবের অপেক্ষায় বসিয়া থাকিব| তিনি আসিলে প্রথমতঃ তাঁহাকে খুন সম্বন্ধে যাহা জিজ্ঞাসা করিবার, তাহা করিব| অবশ্যই তিনি অস্বীকার করিবেন; তখন এইগুলি সহসা তাঁহার চোখের সাম্নে ধরিয়া দিলে তিনি মহা গোলমালে পড়িয়া আত্মদোষক্ষালনের কোন উপায়ই পাইবেন না|”
জোহেরা একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া মুখ নত করিল| জোহেরা বুঝিল, তাহার আর এক নূতন বিপদ্ উপস্থিত! এক্ষণে ঘটনা যেরূপ দাঁড়াইতেছে, তাহাতে মজিদ খাঁ মুক্তি পাইবেন বটে; কিন্তু তাহার অভিভাবক মুন্সী সাহেবের বিপদ্ বড়ই গুরুতর হইয়া উঠিতেছে| জোহেরা মনে অত্যন্ত ব্যথা লাগিল| বলিল, “যদি সৃজান বিবির স্বভাব ভাল হইত, তাহা হইলে আমাদের আজ এমন সর্ব্বনাশ হইত না!”
দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “সকলের স্বভাব যদি ভাল হইত, তাহা হইলে আমাদের কাজ চলে কৈ? হাত-পা গুটাইয়া বেকার বসিয়া থাকিতে হয়|”
অনন্তর দেবেন্দ্রবিজয় এই গুপ্ত-ড্রয়ারটা কিরূপে খোলা ও বন্ধ করা যায়, পরীক্ষা করিয়া দেখিয়া তন্মধ্যে হীরার কণ্ঠহার ও বিষাক্ত তীরের ফলাটা রাখিয়া বন্ধ করিয়া দিলেন|
এমন সময়ে বাহিরের সোপানে কাহার পদশব্দ হইল| পরে কণ্ঠস্বরও শুনা গেল| স্বর শুনিয়া জোহেরা বুঝিতে পারিল, মোবারক| বলিল, “মোবারক বিবাহের প্রস্তাব লইয়া মুন্সী সাহেবের সহিত দেখা করিতে আসিতেছেন; বোধ হয়, এই ঘরেই আসিবেন| আমি তাঁহার সহিত দেখা করিতে চহি না – আপনারা বসুন – আমি বাড়ীর ভিতরে যাই|” বলিয়া জোহেরা গমনোদ্যতভাবে ফিরিয়া দাঁড়াইল|
দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “তাই ত, এমন সময়ে আবার মোবারক আসিয়া উপস্থিত| আমি মুন্সী সাহেবের সঙ্গে একাকী দেখা করিব মনে করিয়াছিলাম| আমারও এখন একবার অন্য একটা ঘরে গিয়া বসিলে সুবিধা হয়|”
জোহেরা বলিল, “এই পাশের ঘরে আপনারা উভয়ে বসিতে পারেন| মোবারক চলিয়া গেলে আপনারা মুন্সী সাহেবের সঙ্গে দেখা করিবেন|” এই বলিয়া জোহেরা পার্শ্ববর্ত্তী কক্ষের-দ্বার সম্মুখস্থ পর্দ্দাখানা সরাইয়া দিল| সকলে পার্শ্ববর্ত্তী প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করিলে জোহেরা ভিতরে গিয়া পর্দ্দা টানিয়া দিল|

সকল অধ্যায়
১.
১.০১. প্রথম পরিচ্ছেদ – আলোকে
২.
১.০২. দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ – অন্ধকারে
৩.
১.০৩. তৃতীয় পরিচ্ছেদ – নারীহত্যা
৪.
১.০৪. চতুর্থ পরিচ্ছেদ – সংবাদ-পত্রের মন্তব্য
৫.
১.০৫. পঞ্চম পরিচ্ছেদ – দেবেন্দ্রবিজয়
৬.
১.০৬. ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ – মা ও মেয়ে
৭.
১.০৭. সপ্তম পরিচ্ছেদ – লতিমন
৮.
১.০৮. অষ্টম পরিচ্ছেদ – নুতন রহস্য
৯.
১.০৯. নবম পরিচ্ছেদ – বেনামী পত্র
১০.
১.১০. দশম পরিচ্ছেদ – অনুসন্ধান
১১.
১.১১. একাদশ পরিচ্ছেদ – দারুণ সন্দেহ
১২.
১.১২. দ্বাদশ পরিচ্ছেদ – ছুরি – বিষাক্ত
১৩.
২.০১. প্রথম পরিচ্ছেদ – পরিচয়
১৪.
২.০২. দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ – আর এক রহস্য
১৫.
২.০৩. তৃতীয় পরিচ্ছেদ – আত্মসংযম
১৬.
২.০৪. চতুর্থ পরিচ্ছেদ – সন্দেহ প্রবল হইল
১৭.
২.০৫. পঞ্চম পরিছেদ – বালক শ্রীশচন্দ্র
১৮.
২.০৬. ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ – দ্বিতীয় পত্র
১৯.
২.০৭. সপ্তম পরিচ্ছেদ – জোহেরা
২০.
২.০৮. অষ্টম পরিছেদ – উদ্যানে
২১.
২.০৯. নবম পরিচ্ছেদ – বিশ্রম্ভালাপে
২২.
২.১০. দশম পরিচ্ছেদ – ঘটনা-সূত্র
২৩.
২.১১. একাদশ পরিচ্ছেদ – বিপদে
২৪.
২.১২. দ্বাদশ পরিচ্ছেদ – সংজ্ঞালাভে
২৫.
৩.০১ – প্রথম পরিচ্ছেদ – আর এক উদ্যম
২৬.
৩.০২ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ – উদ্যমের ফল
২৭.
৩.০৩ তৃতীয় পরিচ্ছেদ – কে ধরা পড়িল?
২৮.
৩.০৪ চতুর্থ পরিচ্ছেদ – মনে মনে নানা ভাবের প্রাবল্য
২৯.
৩.০৫ পঞ্চম পরিছেদ – সাখিয়া
৩০.
৩.০৬ ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ – রহস্য ক্রমেই গভীর হইতেছে
৩১.
৩.০৭ সপ্তম পরিচ্ছেদ – তিতুরাম
৩২.
৩.০৮ অষ্টম পরিচ্ছেদ – পারিবারিক
৩৩.
৩.০৯ নবম পরিচ্ছেদ – পূর্ব্বকথা
৩৪.
৩.১০ দশম পরিচ্ছেদ – উকীল-হরিপ্রসন্ন
৩৫.
৩.১১ একাদশ পরিচ্ছেদ – মুখ বন্ধ
৩৬.
৩.১২ দ্বাদশ পরিচ্ছেদ – মুখবন্ধের কারণ কি?
৩৭.
৩.১৩ ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ – কারণ – দুর্জ্ঞেয়
৩৮.
৩.১৪ – চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ – স্বপক্ষে
৩৯.
৩.১৫ পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ – সন্দেহ-বৈষম্য
৪০.
৪.০১ প্রথম পরিচ্ছেদ – স্বপক্ষে না বিপক্ষে?
৪১.
৪.০২ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ – পট-পরিবর্ত্তন
৪২.
৪.০৩ তৃতীয় পরিচ্ছেদ – ভ্রম-নিরাস
৪৩.
৪.০৪ চতুর্থ পরিচ্ছেদ – দিলজানের কথা
৪৪.
৪.০৫ পঞ্চম পরিছেদ – ঘটনা-বৈষম্য
৪৫.
৪.০৬ ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ – প্রত্যাগমন
৪৬.
৪.০৭ – সপ্তম পরিচ্ছেদ – দোষক্ষালনের জন্য কি?
৪৭.
৪.০৮ অষ্টম পরিচ্ছেদ – তাহার পর কি হইল?
৪৮.
৪.০৯ নবম পরিচ্ছেদ – ইহা কি সম্ভব?
৪৯.
৪.১০ দশম পরিচ্ছেদ – রোগশয্যায় অরিন্দম
৫০.
৪.১১ একাদশ পরিচ্ছেদ – উপদেশ
৫১.
৪.১২ দ্বাদশ পরিচ্ছেদ – গুরু ও শিষ্য
৫২.
৪.১৩ ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ – কাজের কথা
৫৩.
৪.১৪ চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ – ভ্রম-সংশোধন
৫৪.
৫.০১ প্রথম পরিচ্ছেদ – কারাকক্ষে
৫৫.
৫.০২ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ – রহস্য-দুর্ভেদ্য
৫৬.
৫.০৩ তৃতীয় পরিচ্ছেদ – রহস্য-বৈষম্য
৫৭.
৫.০৪ চতুর্থ পরিচ্ছেদ – ঝটিকা ভিন্নদিকে বহিল
৫৮.
৫.০৫ পঞ্চম পরিচ্ছেদ – তদন্তে
৫৯.
৫.০৬ ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ – কণ্ঠহার
৬০.
৫.০৭ সপ্তম পরিচ্ছেদ – মেঘ-ঘনীভূত
৬১.
৫.০৮ অষ্টম পরিচ্ছেদ – মহা বিপদ্
৬২.
৫.০৯ নবম পরিচ্ছেদ – ধরা পড়িল
৬৩.
৫.১০ দশম পরিচ্ছেদ – নিজের বিষে
৬৪.
৫.১১ একাদশ পরিচ্ছেদ – নিজে মরিল
৬৫.
৫.১২ দ্বাদশ পরিচ্ছেদ – শেষ
৬৬.
৫.১৩ উপসংহার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%