একাত্তর অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

৭১

বরিশালের জেলে সতীন্দ্রনাথ সেনের অনশন নিয়ে চারদিকে একটা তুমুল উত্তেজনা বয়ে যাচ্ছিল। একশ দিন পার করেও সতীন সেন খাদ্য, পানীয়, ওষুধ কিছুই গ্রহণ করছেন না। গায়ের তাপ ধীরে ধীরে নেমে আসছে। নাড়ির গতি ক্ষীণ হয়ে আসছে। খবরের কাগজে যে বিবরণ থাকে তা সাঙ্ঘাতিক। সতীন সেনের নিদারুণ শয্যাক্ষত হয়েছে, পেটে একটা মাংসের দলা পাকিয়ে উঠেছে, অসহ্য যন্ত্রণায় মরণোন্মুখ বিপ্লবী ছটফট করছেন। তবু কিছুতেই অনশন ভাঙছেন না। সতীন সেনের এই অনশনের ঘটনা এবং তাঁর বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে এত হৈ-চৈ হচ্ছিল যে শশিভূষণের ঘটনাটা চাপা পড়ে গেল।

খবরের কাগজ এলেই প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে কৃষ্ণকান্ত।সতীন সেনের খবরের পর সে সাগ্রহে পড়ে নেয় মীরাট ষড়যন্ত্রের মামলার খবর, সুভাষ বসু বা মহাত্মা গান্ধীর বক্তৃতা। তার ভিতরটা গমগম করতে থাকে এক অদ্ভুত উত্তেজনায়। এক বৃহৎ দেশের অগণিত দুঃখী মানুষের সঙ্গে সে নিজের এক গভীর আত্মীয়তা অনুভব করতে থাকে। একদিন সে গিয়ে জনসভায় আলম সাহেবের বক্তৃতাও শুনে এল।

রঙ্গময়ী সংস্কৃত পড়াতে বসে একদিন বলল, তোর কী হয়েছে বল তো! সব সময় কী যেন ভাবিস!

কিছু হয়নি পিসি। বলে কৃষ্ণকান্ত একটু চুপ করে থেকে বলে, সতীন সেন কি মারা যাবেন?

কৃষ্ণকান্ত কেন অন্যমনস্ক তা এই কথা শুনে রঙ্গময়ী বুঝতে পেরে যায়। সতীন সেন কে তা রঙ্গময়ী ভালই জানে। তবু না জানার ভান করে বলে, সতীন সেন কে রে?

তুমি খবরের কাগজ পড়ো না পিসি? সেই যে বরিশালের জেলে যিনি অনশন করছেন!

কয়েকদিন আগে সুখেন্দু দত্ত নামে কংগ্রেসের এক ভলাণ্টিয়ারকে চট্টগ্রামে খুন করা হয়েছিল। সুখেন্দুর বয়স ছিল মাত্র ষোলো বছর। কংগ্রেসের ভিতরকার দলাদলি আর গণ্ডগোলে পণ্ড হয়ে যাওয়া একটা মিটিং থেকে যখন সে ফিরছিল তখন তাকে ছুরি মারা হয়। দেশের বড় বড় নেতারা এই খুনের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সেই থেকে রঙ্গময়ীর মনটা খারাপ। সে বলল, শোন বোকা, স্বদেশী করতে চাইলেই হয় না। ওসব গণ্ডগোলে এখনই যাওয়ার দরকার নেই। বড্ড খুনোখুনি বাবা।

খুনোখুনি জিনিসটা কৃষ্ণকান্তর খুব অপছন্দ নয়। খুনোখুনি না থাকলে স্বদেশী করার ব্যাপারটা কি আলুনি হয়ে যায় না। দেশের জন্য খুন করে ফাঁসি যাওয়ার ব্যাপারটা মোটামুটি সে নিজের ভবিষ্যৎ হিসেবে স্থির করে নিয়েছে। ক্ষুদিরামের মতো।

কিন্তু মুশকিল হল স্বদেশীওলাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ঘটছে না। স্কুলে সে বহুজনকে বলে রেখেছে। কিন্তু স্বদেশীদের ঠিকানা কেউ তাকে দিতে পারেনি। কিংবা দিতে চায়নি। একদিন একটা ছেলে বলে ফেলল, তোর বাবা তো বিপ্লবী শশিভূষণকে ধরিয়ে দিয়েছিল। ওরা তোর বাবাকেও খুন করবে।

একথায় খুব চমকে যায় কৃষ্ণকান্ত। এরকম একটা ধারণা অনেকের আছে বলে সে শুনেছে। কিন্তু ঘটনাটা সত্য নয়। তবে কৃষ্ণকান্ত তাই নিয়ে ছেলেটার সঙ্গে তর্ক বা ঝগড়া করল না। গুম হয়ে রইল।

বাড়ি ফিরে সে সোজা হেমকান্তর কাছে গিয়ে বলল, বাবা, শশীদাকে ধরিয়ে দিয়েছিল কে জানেন?

হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, কেউ ধরায়নি। পুলিশই ধরেছে।

কিন্তু কেউ না কেউ অবশ্যই পুলিশকে খবর দিয়েছিল। নইলে শশীদা যে আমাদের বাড়িতে লুকিয়ে আছে তা পুলিশ জানল কি করে?

হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, শশী খুব একটা লুকিয়ে ছিল এমন কথা বলা যায় না। আমরা তো তাকে ঠিক লুকিয়ে রাখিনি। বাড়িতে এতগুলো কর্মচারী, দাসদাসী, তারা নিশ্চয়ই এ নিয়ে আলোচনা করেছে। পুলিশের স্পাইরাও সজাগ। কে খবর দিয়েছে তা বলা অসম্ভব।

আপনি কোনো স্পাইয়ের কথা জানেন?

হেমকান্ত অবাক হলেও প্রিয় পুত্রের মুখের দিকে চেয়ে হেসে বললেন, স্পাই যে কে আর কে নয়, তা ভাবনার বিষয়। স্বদেশীরা বোধকরি আমাকেও পুলিশের স্পাই বলে মনে করে।

কৃষ্ণকান্ত রেগে গিয়ে বলে, মনে করবে কেন? ওরা কি বোকা?

তা নয় বাবা। আমার দোষ হল, আমার বাড়িতেই শশী ধরা পড়ে। ফলটা হল ভারী অদ্ভুত। স্বদেশীওলারা ভেবে নিল আমি ধরিয়ে দিয়েছি, আর পুলিশ ধরে নিল আমি জেনেশুনে ওকে লুকিয়ে রেখেছি। উভয়সংকট কথাটার মানে আজ টের পাচ্ছি। কিন্তু তুমি এ নিয়ে ভাবছো কেন?

আপনার সম্পর্কে কেউ খারাপ কিছু বললে আমার খুব রাগ হয়।

হেমকান্ত অবাক হয়ে বললেন, কেউ কি কিছু বলেছে?

স্কুলে সেই ছেলেটির সঙ্গে ঝগড়া করেনি বটে কৃষ্ণকান্ত, কিন্তু রাগ ও অভিমান তার বুকের মধ্যে জমা ছিল। হেমকান্তর শান্ত কণ্ঠ ও নির্বিরোধী নিরীহ স্বভাব এবং অসহায় মুখ দেখে হঠাৎ তার ভিতরটা উথাল-পাথাল করে উঠল। চোখের জল রাখতে পারল না, কান্নাও চাপা রইল না।

হেমকান্ত একটু হতভম্ব হয়ে ছেলেকে দুহাতে জাপটে ধরে ব্যস্ত হয়ে বললেন, আরে! তুমি কাঁদছো কেন? কখনো তো তোমাকে কাঁদতে দেখিনি? কী হয়েছে?

কী হয়েছে তা বলবে কী করে কৃষ্ণকান্ত? শুধু বাবার বিশাল বক্ষপটে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল সে। কান্নাটাকে জোর করে গলা টিপে মারল। স্বদেশীরা যদি তার নিরীহ বাবাকে খুন করেই তাহলে কৃষ্ণকান্তর হাতে একদিন কয়েকজন স্বদেশী মরবেই। বাবাকে ছুঁয়ে থেকে সে নিঃশব্দে এই প্রতিজ্ঞা করল।

পরদিন সকালে ইরফান মিঞার সঙ্গে লাঠি খেলার সময় কৃষ্ণকান্ত যে বিপুল বিক্রম, বাড়তি তেজ ও তৎপরতা দেখাল তা প্রায় গুরুমারা বিদ্যে। ইরফান অবাক হয়ে বলে, ছোটোকর্তা যে ওস্তাদের মতো লড়ছেন আজ! উরে বাবাঃ, লাঠি যে কথা কয় আপনের হাতে!

এই ঘটনার পর থেকে বাড়তি বিক্রম প্রায় সব ব্যাপারেই প্রকাশ পেতে লাগল তার। মুগুর ভাঁজা, ডন-বৈঠক, ধ্যান ও লেখাপড়া সবকিছুতেই। পরীক্ষায় সে ডবল প্রমোশন পেল। বন্দুকের নিশানা হতে লাগল অব্যর্থ। শরীরটা লকলক করে বেড়ে উঠে উপছে পড়তে লাগল প্রাণশক্তি ও উদ্যমে। গরীব প্রজাদের যেসব ছেলেকে জড়ো করে সে দল পাকাত তারা আরো বশংবদ হয়ে উঠতে লাগল তার। গম্ভীর, ধীর, সাহসী ও বিচক্ষণতা মিশিয়ে বেশ একটা ব্যক্তিত্ব তৈরি হতে লাগল তার।

লাহোর কংগ্রেসে যে বড় রকমের একটা পরিবর্তন ঘটে গেল সেটা বেশ ধাক্কা দিল তাকে। উনিশশো ত্রিশের এপ্রিল মাসে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। লোকের মুখে মুখে মাস্টারদার নাম।

এইসব ঘটনা কৃষ্ণকান্তর ভিতরে উপর্যুপরি বিস্ফোরণ ঘটাতে লাগল। অন্তর্গত এক উত্তেজনায় সে সর্বদা অস্থির চঞ্চল। গৃহবাস প্রায় অসহনীয় হয়ে উঠতে লাগল। প্রতিমুহূর্তেই তার ইচ্ছে করে সব ছেড়েছুঁড়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে।

ঠিক এই সময়ে একদিন হেমকান্ত কোকাবাবুদের বাড়িতে একটা অন্নপ্রাশনের নিমন্ত্রণ থেকে ফিরছিলেন। নিমন্ত্রণ ছিল দুপুরে। কিছু কথাবার্তা বলতে বলতে এবং সান্ধ্য জলসায় এক বড় গায়কের ঠুংরী শুনতে গিয়ে একটু দেরী হয়ে গিয়েছিল।

যখন ফিরছেন তখন বেশ ঘোরালো অন্ধকার। সন্ধ্যাবেলা কিছু জলঝড় হয়ে গেছে। বৃষ্টি এখনো পড়ছে ঝিরঝির করে। রাস্তায় লোক চলাচল নেই বললেই হয়। ঘোড়ার গাড়িটার শব্দ ফাঁকা রাস্তায় বেশ জোরালো হয়ে কানে আসছে।

পাশের জানালাটা খুলে হেমকান্ত ব্রহ্মপুত্রের দিকে চেয়ে ছিলেন। এই নদীর প্রতি তাঁর আবাল্য আকর্ষণ। প্রবহমানতার মধ্যে তিনি আদি-অন্তহীন এই জীবনের ছায়া দেখতে পান।

মৃত্যু-চেতনা বাস্তবিক তাঁকে আজও ছেয়ে আছে। সাংসারিক কোলাহলে মাঝে মাঝে একটু পলিমাটির আস্তরণ পড়ে তার ওপর। কিন্তু শয়নে স্বপনে জাগরণে ভিতরে ভিতরে ঘুণপোকার মতো মৃত্যুকীট তাঁকে ক্ষয় করে চলেছে, তিনি অনুভব করেন। আজ এই অন্ধকারে বৃষ্টিধৌত আবহের ভিতর দিয়ে আবছায়া নদীটির দিকে চেয়ে তাঁর ভিতরে এক করুণ সুর বাজতে লাগল। একথা ঠিক,মানুষের মৃত্যু হলেও সে সর্বাংশে মরে না। তার কিছু থেকে যায়। কিন্তু জাগতিক পরিচয়ে নয়। সে এক ভিন্ন অস্তিত্ব, এক ভিন্ন জগৎ।

মৃত্যুর পরবর্তী সেই ভিন্ন জগৎ আর ভিন্ন অস্তিত্বের কথাই বিবশ হয়ে ভাবছিলেন হেমকান্ত। আজকের আবহাওয়া এইসব চিন্তাভাবনার অনুকূল। এক মৃদু-কোমল বৃষ্টির অসংখ্য প্রেতহাত চরাচরকে এক রহস্যময় অস্পষ্টতা দিয়েছে। নদীর বিস্তারটি আবহাওয়ায় আধেকলীন। পার্থিবতায় লেগেছে পরলোকের আলো-আঁধারি। ঘোড়ারগাড়ির চলমানতাও যেন পৃথিবী ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছে অলৌকিকতায়।

হেমকান্তর চোখে পলক পড়ছিল না। বৃষ্টির ছাঁটে অল্প অল্প ভিজে যাচ্ছেন। কিন্তু গ্রাহ্য করছেন না।

কালীবাড়ি ছাড়িয়ে গাড়িটা এগোতেই আচমকা লাগামে টান পড়ল। গাড়োয়ান চেঁচিয়ে উঠল, “হোঁশিয়ার!”

হেমকান্ত সামান্য টাল খেয়ে সোজা হয়ে বসতে না বসতেই পাদানীতে কে যেন লাফিয়ে উঠল। দরজার হ্যাণ্ডেল ঘুরিয়ে এক ঝটকায় খুলে ফেলল পাল্লাটা। হেমকান্তর মাথায় তখনো পরলোকের ঘোর। বাস্তবতায় নেমে আসতে পারেননি। একটু বিরক্ত হয়েছেন চিন্তাসূত্রে এরকম বাধা পড়ায়।

একজন লোক পাদানী থেকে ঝুঁকে পড়ল ভিতর দিকে। তার মুখে কালো কাপড় জড়ানো। হাতটা প্রসারিত করে দিল ভিতর দিকে।

ঘটনাটা স্পষ্ট দেখলেন হেমকান্ত। কিন্তু তাঁর মস্তিষ্কে অসঙ্গতিটা তখনো ধরা পড়ছিল না। তবে আগন্তুকের হাতটা যখন বিদ্যুৎবেগে তাঁর বুকের দিকে নেমে এল তখন তিনি ঘোড়ার গাড়ির ভিতরকার অন্ধকারেও ইস্পাতের শানানো ঝিলিক লক্ষ করলেন। একটা অস্ফুট ভয়ার্ত চিৎকার তাঁর কণ্ঠ থেকে আপনিই নির্গত হল। তিনি নন, তাঁর শরীরই বোধহয় আত্মরক্ষার তাগিদে একটা হাত তুলেছিল। শরীরটা যতদূর সম্ভব সরে যেতে চেয়েছিল আঘাত থেকে।

ছোরাটা বিঁধল তাই সঠিক বুকে নয়, একটু ওপর দিকে কাঁধের কাছ বরাবর। যেখানটায় বিঁধল সেখানটা যেন আচমকা অবশ হয়ে ঝিনঝিন করতে লাগল। ছপাৎ করে ছিটকে বেরোলো গরম রক্ত।

ঘটনাটা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না হেমকান্ত। কী হচ্ছে এসব? কেন হচ্ছে? এরকম কিছু প্রশ্ন তাঁর ঠোঁটে খেলা করল, কিন্তু উচ্চারণ করার মতো অবকাশ হল না। আততায়ী তার ব্যর্থতা বুঝতে পেরে ছোরাটা টেনে নিল এবং আবার একবার হাতটা আঘাতে উদ্যত হল।

হেমকান্ত এবার নিজের সর্বনাশ বুঝতে পারলেন। তিনি ভীতু, নিরীহ, নির্বিরোধী বটে, কিন্তু অচল অথর্ব নন। এখনো তাঁর শরীরে মত্ত হাতির বল। এখনো তিনি যথেষ্ট গতিবেগসম্পন্ন। ডান হাতটা বাড়িয়ে তিনি ছোরাসুদ্ধ হাতটা চেপে ধরলেন। ঠিক এই সময়ে ঘোড়ার গাড়ির মাথা থেকে তাঁর গাড়োয়ান গাজী মিঞা সপাটে চাবুকটা চালাল আততায়ীর পিঠে।

হেমকান্ত অবশ্য হাতটা ধরে রাখতে পারলেন না। বরং অত্যন্ত ধারাল সেই দোধার ছোরায় তাঁর হাতের তেলো চড়াৎ করে ফেড়ে গেল। ফোয়ারার মতো রক্ত ঝরতে লাগল হাত দিয়ে।

কিন্তু আততায়ী আর দ্বিতীয় চেষ্টা করল না। গাড়িতে একটা দুলুনী তুলে বেড়ালের মতো লাফিয়ে পড়ে এক দৌড়ে মিলিয়ে গেল পরকালের আবছায়ায়।

গাজী নেমে এল নীচে, হেমকান্তর অবস্থা দেখে ডুকরে উঠল, কর্তা! কী হল কর্তা?

হেমকান্ত অস্ফুট স্বরে বললেন, তাড়াতাড়ি কর! খুব তাড়াতাড়ি। আমাকে মনুর কাছে পৌছে দে।

গাজী এক মুহুর্ত দেরী করল না। নিজের আসনে উঠে ঘোড়াদুটোকে প্রায় নিংড়ে যতদূর সম্ভব দ্রুত গতিতে এবড়োখেবড়ো রাস্তায় গাড়ি ছুটিয়ে দিল।

যখন বাড়ির দেউড়িতে গাড়ি পৌছোলা তখনো হেমকান্ত জ্ঞান হারাননি বটে, কিন্তু অত্যধিক রক্তপাতে অবসন্ন হয়ে পড়েছেন। চোখ আধবোজা, ঠোঁট সাদা, রক্তে ভেসে যাচ্ছেন। বিড় বিড় কবে শুধু বলছেন, মনু! কৃষ্ণকে দেখো! আমার কৃষ্ণকে দেখো।

খবরটা ছড়িয়ে পড়তে দেরী হল না। বাড়ি ভিড়ে ভিড়াকার হয়ে গেল দেখতে না দেখতে। তিনজন ডাক্তার হেমকান্তের পরিচর্যা করতে লাগলেন। দারোগা রামকান্ত রায় অন্তত দশবারোজন কনস্টেবলকে নিয়ে এসে হাজির হলেন।

হেমকান্ত মারা গেছেন এরকম একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ায় পাড়াপ্রতিবেশীদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে গেল। প্রজারা বিলাপ করে কাঁদতে লাগল বারবাড়ির উঠোনে জড়ো হয়ে। দাঙ্গাবাজ কিছু লোক লাঠি, বল্লম আর মশাল নিয়ে বিভিন্ন দিকে ধাওয়া করে গেল।

রামকান্ত রায় গাড়োয়ানের জবানবন্দী নিতে নিতে চারদিককার উত্তেজনা ও শোক লক্ষ করে মৃদু একটু হাসলেন। হেমকান্তর ওপর এই আক্রমণে তিনি অখুশি হয়েছেন বলে মনে হল না।

গাজী তার জবানবন্দীতে বলল, কালীবাড়ি ছেড়ে এসে পড়তেই নির্জন রাস্তায় আচমকা একটা লোক লাফিয়ে পড়ে ঘোড়ার বলগা টেনে ধরে। কাজটা খুবই বিপজ্জনক। কারণ জমিদারবাবুর গাড়ির দুটো ঘোড়াই ওয়েলার এবং শক্তিশালী। তবে গাজী লোকটাকে পাগল ভেবে নিজেই লাগাম টেনে গাড়ি থামায়। কিন্তু গাড়ি থামবার আগেই আর একজন পাদানীতে উঠে দরজা খুলে কর্তাবাবুকে ছোরা মারে। লোকদুটোর মুখে কালো কাপড় বাঁধা ছিল, রাতটাও ছিল অন্ধকার, ফলে তাদের চেনা যায়নি। তবে দুজনেরই বয়স কম। ছোকরা বলেই মনে হয়।

জবানবন্দী নিয়ে রামকান্ত রায় তাঁর ঘোড়ায় চেপে রওনা হয়ে গেলেন। কিছু লোক তাঁর দিকে বিষাক্ত চোখে চেয়ে রইল।

প্রচুর রক্তপাতের ফলে হেমকান্ত সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলেন। আঘাত খুবই গুরুতর। তবে মৃত্যু যে নিশ্চিত এমন কথা বলা যায় না। চারজন ডাক্তার রোগীকে ভালভাবে পরীক্ষা করার পর নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করতে লাগলেন।

রঙ্গময়ী হেমকান্তের শিয়রের কাছে বসে শূন্য চোখে চেয়ে ছিল সামনের দিকে। বিশাখা রক্ত দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। তাকে তার ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অত্যন্ত অস্থির পায়ে রক্তাভ মুখে বারান্দায় উদ্‌ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিল কৃষ্ণকান্ত। খালি গা, পরনে ফেরতা দিয়ে পর একটা ধুতি। চোখ দুটো লাল টকটকে। তার নিরীহ, নির্বিরোধ বাবার এই অবস্থা কে করল? স্বদেশীরা? হায় ভগবান, সে যে নিজে মনে মনে ঘোর স্বদেশী!

রাতটা উদ্বেগের মধ্যে কাটতে লাগল।

শেষ রাত্রের দিকে হেমকান্তকে নিয়ে যাওয়া হল হাসপাতালে।

রঙ্গময়ী আর কৃষ্ণকান্ত দুজনেই সঙ্গে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু ডাক্তাররা নিষেধ করায় যাওয়া হয়নি।

হেমকান্তকে হাসপাতালে নেওয়ার পর বিশাখার ঘরে বসেছিল তিনজনে। কৃষ্ণকান্ত, রঙ্গময়ী আর বিশাখা। উপবাস ও উদ্বেগে তিনজনের চেহারাতেই গভীর ক্লান্তির ছাপ। বিশাখার চোখ মুখ কেঁদে কেঁদে ফুলে উঠেছে। রঙ্গময়ীর চোখ দুটিও লাল, তবে সে দাঁতে দাঁত চেপে কান্না রুখেছে। কৃষ্ণকান্তের চোখে এক গভীর শূন্যতার চাউনি।

বিশাখা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, কী হবে পিসি? বাবা কি বাঁচবে?

রঙ্গময়ী একটা শ্বাস ছেড়ে বলে, বাঁচবে। সাহেব ডাক্তার দেখছে হাসপাতালে। ভাবিস না তো।

তুমিও তো ভাবছো। আমাকে ভোলাচ্ছো, না?

তোকে ভোলাবো কি রে? আমাকে ভোলায় কে? সারাটা জীবন একজনের মুখ চেয়ে বেঁচে আছি না? তোর তো সে বাবা, আমার কী জানিস? আমার কাছে সে-ই ভগবান। তুই বুঝবি না।

বিশাখা রঙ্গময়ীর এই অস্পষ্ট স্বীকারোক্তি শুনে এই শোকের সময়েও অবাক হয়ে চেয়ে রইল।

উঠোনে এখনো বিস্তর লোকের জমায়েত। সারা রাত কেউ ঘুমোয়নি। এক-আধজন পাজি লোক রটাতে চেয়েছিল, কাণ্ডটা কোনো মুসলমানের। সেই শুনে একটা উত্তেজনার সঞ্চার হয়েছিল বটে, কিন্তু কিছু প্রবীণ মানুষ গুজবটিকে চাপা দিয়েছেন। এটা যে স্বদেশীদের কাজ সে বিষয়ে এখন মোটামুটি সকলেই নিশ্চিন্ত। লাঠি আর বল্লম নিয়ে যারা আততায়ীদের খুঁজতে বেরিয়েছিল তারা ফিরে এসেছে। এখন কী কর্তব্য তাই নিয়ে কথাবার্তা আলোচনা চলছে চাপা গলায়।

শচীন হাসপাতাল থেকে খবর নিয়ে ফিরল। হেমকান্তর অবস্থা খারাপ। তবে এযাত্রা বেঁচে যেতে পারেন। শুনে উঠোনে জমায়েত লোকজন একটু স্বস্তির শ্বাস ফেলে।

শচীন ধীর পায়ে দোতলায় উঠে আসে। সিঁড়ির মুখেই উদ্বেগাকুল মুখে কৃষ্ণ, বিশাখা আর রঙ্গময়ী।

শচীন একটু হাসল। বলল, ভয় নেই। একটু ভাল আছেন।

বিশাখা বলল, সত্যি কথা বলছেন তো?

সত্যি। জ্ঞান ফিরেছিল।

কিছু বলেছেন তখন?

একটাই কথা বারবার বলছেন। মনু কৃষ্ণকে দেখো।

রঙ্গময়ী কৃষ্ণকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে একটু ধরা গলায় বলে, বড্ড ভাবে ছেলের কথা।

কৃষ্ণ কোনো কথা বলল না। পাথরের মতো রঙ্গময়ীর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল।

শচীন বলল, আপনারা একটু ঘুমিয়ে নিন বরং। আমি আবার হাসপাতালে যাচ্ছি। সব সময়ে খবর নেবো। চিন্তা নেই।

রঙ্গময়ী বলে, ঘুম কি আসবে? অমন নিপাট ভাল লোককে যারা মারে তারা কেমন লোক শচীন?

শচীন একটু হেসে বলে, তারা খারাপ কি ভাল তা জানি না। তবে তাদের সিদ্ধান্ত যে ভুল এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। আমার মনে হয়, ওঁর পক্ষে এ জায়গা আর নিরাপদ নয়। একটু সুস্থ হলেই ওঁকে কলকাতা বা অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া উচিত।

এ কথা শুনে তিনজনেই চুপ করে রইল।

সেই নীরবতায় দু’ জোড়া চোখ আর দু’ জোড়া চোখের ওপর নির্নিমেষ হয়ে ছিল। শচীন আর বিশাখা।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়
৪৭.
সপ্তচল্লিশ অধ্যায়
৪৮.
অষ্টচল্লিশ অধ্যায়
৪৯.
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়
৫০.
পঞ্চাশ অধ্যায়
৫১.
একান্ন অধ্যায়
৫২.
বায়ান্ন অধ্যায়
৫৩.
তিপ্পান্ন অধ্যায়
৫৪.
চুয়ান্ন অধ্যায়
৫৫.
পঞ্চান্ন অধ্যায়
৫৬.
ছাপ্পান্ন অধ্যায়
৫৭.
সাতান্ন অধ্যায়
৫৮.
আটান্ন অধ্যায়
৫৯.
ঊনষাট অধ্যায়
৬০.
ষাট অধ্যায়
৬১.
একষট্টি অধ্যায়
৬২.
বাষট্টি অধ্যায়
৬৩.
তেষট্টি অধ্যায়
৬৪.
চৌষট্টি অধ্যায়
৬৫.
পঁয়সট্টি অধ্যায়
৬৬.
ছেষট্টি অধ্যায়
৬৭.
সাতষট্টি অধ্যায়
৬৮.
আটষট্টি অধ্যায়
৬৯.
ঊনসত্তর অধ্যায়
৭০.
সত্তর অধ্যায়
৭১.
একাত্তর অধ্যায়
৭২.
বাহাত্তর অধ্যায়
৭৩.
তিয়াত্তর অধ্যায়
৭৪.
চুয়াত্তর অধ্যায়
৭৫.
পঁচাত্তর অধ্যায়
৭৬.
ছিয়াত্তর অধ্যায়
৭৭.
সাতাত্তর অধ্যায়
৭৮.
আটাত্তর অধ্যায়
৭৯.
ঊনআশি অধ্যায়
৮০.
আশি অধ্যায়
৮১.
একাশি অধ্যায়
৮২.
বিরাশি অধ্যায়
৮৩.
তিরাশি অধ্যায়
৮৪.
চুরাশি অধ্যায়
৮৫.
পঁচাশি অধ্যায়
৮৬.
ছিয়াশি অধ্যায়
৮৭.
সাতাশি অধ্যায়
৮৮.
আটাশি অধ্যায়
৮৯.
ঊননব্বই অধ্যায়
৯০.
নব্বই অধ্যায়
৯১.
একানব্বই অধ্যায়
৯২.
বিরানব্বই অধ্যায়
৯৩.
তিরানব্বই অধ্যায়
৯৪.
চুরানব্বই অধ্যায়
৯৫.
পঁচানব্বই অধ্যায়
৯৬.
ছিয়ানব্বই অধ্যায়
৯৭.
সাতানব্বই অধ্যায়
৯৮.
আটানব্বই অধ্যায়
৯৯.
নিরানব্বই অধ্যায়
১০০.
একশ অধ্যায়
১০১.
১০১তম অধ্যায়
১০২.
১০২তম অধ্যায়
১০৩.
১০৩তম অধ্যায়
১০৪.
১০৪তম অধ্যায়
১০৫.
১০৫তম অধ্যায়
১০৬.
১০৬তম অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%