হেমেন্দ্রকুমার রায়
প্রথম পরিচ্ছেদ
অবলাবিবি নয়, অবলাবাবু
আজকের বিকালবেলাটা বিমলের কাছে কেমন ফাঁকা ফাঁকা মনে হচ্ছিল। কারণ তার অষ্টপ্রহরের সঙ্গী কুমার বেড়াতে গিয়েছিল মামার বাড়িতে, শান্তিপুরে।
ইজিচেয়ারে শুয়ে শুয়ে সে একখানা মাসিক পত্রিকার পাতা ওলটাচ্ছিল আনমনে।
এমন সময়ে নীচে থেকে মেয়ে—গলায় ডাক এল, 'বিমলবাবু বাড়িতে আছেন?'
বিমল বিস্মিত হল। কারণ আজ পর্যন্ত কোনও মহিলা আগন্তুকই রাস্তা থেকে এভাবে গলাবাজি করে তার নাম ধরে ডাকেননি।
চেঁচিয়ে বললে, 'রামহরি, কে ডাকছেন দ্যাখো! ওঁকে বৈঠকখানায় নিয়ে গিয়ে বসাও। আমি এখনই যাচ্ছি।'
রামহরি নিজের মনেই বকবক করতে করতে এগিয়ে গেল—'কালে কালে আরও কতই দেখতে হবে, জানিনে বাপু! রাস্তায় বেরিয়ে মেয়েরাও বাবুদের মতো নাম ধরে চেঁচিয়ে ডাকে! হল কি!'
গেঞ্জির উপরে পাঞ্জাবিটা চড়িয়ে বিমলও নীচে নেমে গেল।
বৈঠকখানায় ঢুকে সবিস্ময়ে দেখলে, একখানা কৌচ জুড়ে বসে আছে অতিকায় এক পুরুষমূর্তি—মানুষের এত মস্ত চেহারা প্রায় অসম্ভব বললেও চলে! উঠে দাঁড়ালে তার মাথা নিশ্চয়ই সাত ফুটের উপরে যাবে, এবং তার বুকের ঘের সহজ অবস্থাতেই বোধহয় পঁয়তাল্লিশ—ছেচল্লিশ ইঞ্চির কম হবে না। তার রং শ্যাম, মুখের আধখানা প্রকাণ্ড চাপদাড়িতে সমাচ্ছন্ন এবং সর্বাঙ্গ দিয়ে যেন একটা উদ্দাম পশুশক্তির উচ্ছ্বাস বয়ে যাচ্ছে। বয়েস তার চল্লিশের ভিতরেই।
বিমল ঘরের এদিক—ওদিক তাকিয়ে বললে, 'যে মহিলাটি আমায় ডেকেছিলেন, তিনি কোথায় গেলেন?'
মেয়ে—গলায় খিলখিল করে হেসে উঠে আগন্তুক বললে, 'না বিমলবাবু, ডাকছিলুম আমিই। আমায় কি আপনি মেয়েমানুষ বলে মনে করেন?'
বিমল চমৎকৃত হয়ে হেসে বললে, 'সর্বনাশ, আপনার মতো প্রচণ্ড পুরুষকে মহিলা বলে শেষটা কি বিপদে পড়ব?'
আগন্তুক বললে, 'আপনার দোষ নেই, আমার গলা শুনে সকলেই ধোঁধায় পড়ে যান, তারপর আমার চেহারা দেখে চমকে ওঠেন! ভগবানের ভুল মশাই, ভগবানের ভুল! তারপরে বাবাও ভুল করে আমার নাম রেখেছেন অবলাকান্ত!'
বিমল একখানা সোফার উপরে বসে পড়ে বললে, 'তাই বুঝি আপনি কুস্তি—টুস্তি লড়ে ভগবানের আর পিতার ভ্রম—সংশোধনের চেষ্টা করেন?'
অবলাকান্ত আবার নারীকণ্ঠে হাসতে শুরু করে দিলে।
ওই চেহারার ভিতর থেকে মেয়ে—হাসি শুনে বিমল কেমন অস্বস্তি বোধ করতে লাগল,—এ যেন জয়ঢাক ফুঁড়ে বেরুচ্ছে সেতারের প্রিং—প্রাং!
সে বললে, 'আমার কাছে কি মশাইয়ের কোনও দরকার আছে!' এবং বলেই লক্ষ করলে, অবলাকান্ত কানা। তার একটা চোখ পাথরের।
অবলাকান্ত বললে, 'হ্যাঁ বিমলবাবু, আপনাকে আমার অত্যন্ত দরকার! আমি এখানে এসেছি একটা গোপনীয় পরামর্শ করতে!'
—'আমার মতো অচেনা লোকের সঙ্গে আপনি গোপনীয় পরামর্শ করতে এসেছেন? আশ্চর্য কথা বটে!'
—'বিলক্ষণ! কে বললে আপনি আমার অচেনা! আপনাদের দুঃসাহসিকতার কাহিনি বাংলাদেশের কে না জানে? খালি কি বাংলাদেশ? মঙ্গল গ্রহ পর্যন্ত আপনাদের চিনে ফেলেছে! তাই তো এসেছি আপনার কাছে!'
বিমল কৌতূহলী স্বরে বললে, 'কিন্তু ব্যাপারটা কী খুলে বলুন তো?'
—'হ্যাঁ, তাই বলব বলেই তো এসেছি। কিন্তু তার আগে অঙ্গীকার করুন, আমার গুপ্তকথা আর কারুর কাছে প্রকাশ করবেন না?'
—'বেশ অঙ্গীকার করছি।'
অবলাকান্ত অল্পক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বললে, 'আপনারা একবার অসমে যকের ধন আনতে গিয়েছিলেন তো?'
—'হুঁ।'
—'আমি কিন্তু এই কলকাতাতেই এক অদ্ভুত রহস্যের সন্ধান পেয়েছি।'
বিমল তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে বসে বললে, 'কী রকম?'
—'শুনুন বলি—আমি টালিগঞ্জের পাঁচ নম্বর মণিলাল বসু স্ট্রিটে একখানা বাড়ি ভাড়া নিয়ে আছি। বাড়িখানা খুব বড়ো আর পুরোনো। শুনেছি কোন সেকালে এখানে নাকি এক রাজা বাস করতেন—এখন তাঁর বংশের কেউ নেই। এই বাড়ির সিঁড়ির তলায় চোর—কুঠুরির মতন একখানা ঘর আছে, সে ঘর আমরা ব্যবহার করি না। এই ঘরেরই এক দেয়ালে হঠাৎ আমি একটা গুপ্তদ্বার আবিষ্কার করেছি।'
বিমল বললে, 'সেকালকার অনেক ধনীর বাড়িতেই এমন গুপ্তদ্বার পাওয়া যায়। এ আর এমন আশ্চর্য কী? আপনি কি সেই গুপ্তদ্বার খুলেছেন?'
—'হ্যাঁ।'
—'খুলে কী দেখলেন?'
—'খালি অন্ধকার।'
—'তাহলে আমার কাছে এসেছেন কেন? অমন অনেক গুপ্তদ্বারই আমি দেখেছি। তাদের পিছনে অন্ধকার থাকতে পারে, কিন্তু কোনও রহস্য থাকে না।'
—'আগে আমার কথা শুনুন। গুপ্তদ্বার খুলে প্রথমে দেখলুম অন্ধকার। তারপর আলো জ্বেলে দেখলুম, একটা সরু পথ। সেই পথ ধরে খানিকটা এগিয়েই কি হল জানেন?'
—'কী হল?'
বিমল দেখলে, অবলাকান্তের পাথরের চোখে কোনও ভাবান্তর হল না বটে, কিন্তু তার অন্য চোখটি দারুণ আতঙ্কে বিস্ফারিত হয়ে উঠল। ভীত অভিভূত কণ্ঠে সে বললে, 'পথটা কতখানি লম্বা জানি না, কারণ, আমার লণ্ঠনের আলো সামনের অন্ধকার ঠেলে বেশিদূর যেতে পারেনি। আমিও হাত পাঁচ—ছয়ের বেশি যেতে না যেতেই শুনতে পেলুম, নিরেট অন্ধকারের ভিতর থেকে বিকট, অমানুষিক স্বরে কে গর্জন করে উঠল। তারপরেই শুনলুম যেন কাদের দ্রুত পদশব্দ—যেন কারা দৌড়ে আমার দিকে তেড়ে আসছে! ভয়ে পাগলের মতো হয়ে আবার বাইরে পালিয়ে এলুম। সে দরজা আবার বন্ধ করে দিয়েছি।'
বিষম কৌতূহলে বিমলের দুই চক্ষু জ্বলে উঠল—এতক্ষণ পরে জাগল তার সত্যিকারের আগ্রহ!
অবলাকান্ত বললে, 'আমার বিশ্বাস সেই গুপ্তদ্বারের পিছনে যকেরা পাহারা দেয়, আর তার ভিতরে আছে গুপ্তধন! কিন্তু গুপ্তধনের লোভে তো আর প্রাণ দিতে পারি না মশাই!'
বিমল বললে, 'ওখানে গুপ্তধন আছে কি না জানি না, কিন্তু যক—টক যে নেই এটা একেবারে নিশ্চিত। ওসব আমি মানি না।'
অবলাকান্ত বললে, 'আমার চেহারাটাই কেবল প্রকাণ্ড, আপনার মতন দুর্জয় সাহস আমার নেই! আর এ—রকম ব্যাপারে আপনার মাথা খুব খেলে জেনেই তো পরামর্শ করতে এসেছি! এখন আমার কী করা কর্তব্য?'
—'সেই গুপ্তদ্বারটা আগে আমাকে একবার দেখাতে পারেন?'
—'কেন পারব না? মনে রাখবেন, গুপ্তধন উদ্ধার করতে পারলে আপনিও তার অংশ থেকে বঞ্চিত হবেন না!'
বিমল শুষ্কস্বরে বললে, 'গুপ্তধনের কথা এখন থাক। সুড়ঙ্গের রহস্যটা কী আমি কেবল তাই জানতে চাই! আপনি কি এখনই আমাকে নিয়ে যেতে পারবেন?'
—'অনায়াসে। ট্যাক্সিতে চড়ে সেখানে যেতে আধঘণ্টার বেশি লাগবে না।'
—'তাহলে উঠে পড়ুন। আজ আমি দরজাটা খালি চোখে দেখে আসব। কর্তব্য স্থির করব পরে।'
টালিগঞ্জের যে—জায়গায় গিয়ে ট্যাক্সি থামল সেখানটাকে কলকাতা শহরের এক প্রান্ত না বলে প্রায় নির্জন জঙ্গলের প্রান্ত বলা উচিত। লোকজনের আনাগোনা খুব কম—দূর থেকে মাঝে মাঝে কেবল দু—একজন মানুষের উচ্চ কণ্ঠস্বর বা কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। আসন্ন সন্ধ্যার বিষণ্ণ ছায়ায় চারিদিক ঝাপসা হয়ে আসছে ধীরে ধীরে।
বড়ো রাস্তা ছেড়ে অবলাকান্তের সঙ্গে বিমল আরও সরু এমন একটি পথে প্রবেশ করল, যেখান দিয়ে গাড়ি চলবার উপায় নেই।
বেশ খানিকটা এগিয়ে পাওয়া গেল একখানা জরাজীর্ণ, কিন্তু প্রকাণ্ড অট্টালিকা। এই নাকি অবলাকান্তের রাজবাড়ি। কত যুগ আগে সে যে রাজার উপযোগী ছিল, তাকে দেখে আজ তা অনুমান করা সহজ নয়। তার চারিদিকের জঙ্গলাকীর্ণ জমি আচ্ছন্ন করেই কেবল মান্ধাতার আমলের বুড়ো বুড়ো গাছ বিরাজ করছে না, নিজের গায়ে অর্থাৎ দেওয়ালের ওপরেও সে আশ্রয় দিয়েছে রীতিমতো হোমরা—চোমরা অশ্বত্থ—বটকে। অনেক জায়গাতেই জানলা—দরজা পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়েছে, তাদের বদলে রয়েছে কতকগুলো হাঁ—হাঁ করা গর্ত।
বিমল বিস্মিত স্বরে বললে, 'অবলাকান্তবাবু, এ বাড়িতে থাকেন কী করে?'
অবলাকান্ত বললে, 'বাড়ির বর্তমান মালিকের এমন পয়সা নেই যে এর আগাগোড়া মেরামত করেন। কিন্তু তিনি একটা মহল ভালো করেই সংস্কার করে দিয়েছেন, কাজেই আমার অসুবিধা হয় না। এই যে, এইদিকে আসুন।'
হ্যাঁ, বাড়ির এ অংশটা বাসের উপযোগী বটে। উপরের কোনও কোনও ঘরে আলো জ্বলছে, নীচের সদর—দরজার সামনে বসে এক দারোয়ান।
অবলাকান্ত দারোয়ানের কাছ থেকে একটা লণ্ঠন চেয়ে নিয়ে বললে, 'আসুন আমার সঙ্গে। আপনাকে আগেই সেই চোর—কুঠরিটা দেখিয়ে আনি।'
দু—দিকের কয়েকটা ঘর পার হয়েই তারা একটা উঠানে গিয়ে পড়ল। উঠানের এককোণে সেকেলে সিঁড়ির সার এবং তার তলায় একটা মাঝারি আকারের দরজা, কিন্তু অত্যন্ত মজবুত—গায়ে তার লোহার খিল মারা।
অবলাকন্তে দরজার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে আড়ষ্ট স্বরে বললে, 'ওই দরজাটা খুললেই ওর ভেতরে পাবেন সেই ভয়াবহ গুপ্তদ্বার! সত্যি বলছি বিমলবাবু, আমার কিন্তু এখানে আর দাঁড়াতে সাহস হচ্ছে না!'
বিমল বাইরের দরজা খুলে ফেলে বললে, 'আপনার ভয় দেখে আমার হাসি পাচ্ছে! কই গুপ্তদ্বার কোথায়? আলোটা ভালো করে তুলে ধরুন দেখি!' সে একেবারে চোর—কুঠরির ভিতরে গিয়ে দাঁড়াল—এবং সঙ্গে সঙ্গে দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল চোর—কুঠরির দরজা! ঘোর অন্ধকার!
ভিতর থেকে বিস্মিত কণ্ঠে বিমল বললে, 'একি অবলাকান্তবাবু, দরজা বন্ধ করলেন কেন?'
বাহির থেকে শব্দ শুনে বোঝা গেল, চোর—কুঠরির দরজায় শিকল তুলে দেওয়ার ও তালা—চাবি—লাগানোর শব্দ!
দরজায় ধাক্কা মারতে মারতে বিমল ক্রুদ্ধস্বরে বললে, 'দরজা খুলে দিন অবলাকান্তবাবু! আমি এ—রকম ঠাট্টা পছন্দ করি না!'
বাহির থেকে নারীকণ্ঠে খিলখিল করে হেসে উঠে অবলাকান্ত বললে, 'ঠাট্টা নয় হে বিমল, ঠাট্টা নয়! আজ তুমি আমার বন্দি!'
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
রামহরি যা শোনে, ভোলে না
মামার বাড়ি থেকে ফিরে এসে কুমার প্রথমেই ছুটল বিমলের বাড়িতে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে এল বাঘা। তখন সকাল।
এ রাস্তায় বিমলদের দু—খানা বাড়ি ছিল। একখানা খুব বড়ো এবং একখানা খুব ছোটো। বড়ো বাড়িখানায় বাস করতেন বিমলের বহু আত্মীয়—স্বজন—যাঁদের সঙ্গে আমাদের গল্পের কোনও যোগ নেই।
ছোটো বাড়িখানায় বাস করত বিমল নিজে। সে বহু লোকের গোলমাল সহ্য করতে পারত না, তাই ফাই—ফরমাশ খাটবার পক্ষে রামহরিই ছিল যথেষ্ট। বড়ো বাড়িতে যেত কেবল দু—বেলা দুটি আহার করবার জন্যে। বাকি সময়টা তার কেটে যেত ছোটো বাড়ির ছোট্ট বৈঠকখানায় বা লাইব্রেরিতে বসে কখনও পড়াশুনা করে এবং কখনও কুমারের সঙ্গে বিচিত্র ও অসম্ভব সব স্বপ্ন দেখে। শান্তিপূর্ণ নির্জনতায় বাড়িখানিকে মনে হত যেন আশ্রমের মতো।
এ—বাড়ির আর একটি বিশেষত্ব হচ্ছে, পিছনকার বাগান। বিমল ও কুমারের যত্নে এই মাঝারি বাগানখানি সৌন্দর্যে ও ঐশ্বর্যে এমন অপূর্ব হয়ে উঠেছিল যে, অধিকাংশ বিখ্যাত ও বৃহৎ উদ্যানকেও লজ্জা দিতে পারত অনায়াসেই। তারা যখনই পৃথিবীর যে—কোনও দেশে গিয়েছে, তখনই সেখান থেকে নিয়ে এসেছে নানা—জাতের গাছ—গাছড়া। ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার নানা দেশের গাছ ও চারার সঙ্গে মিলে—মিশে বাস করে এখানে বাংলার নিজস্ব বনভূমির রং, গন্ধ, শ্যামলতা।
আঁকাবাঁকা করে কাঁটা একটি খাল নদীর অভাব মেটাবার চেষ্টা করে। টলমলে জলে দোলে পদ্মফুল, আশেপাশে বাহারি ঝোপঝাপ, ছোট্ট নকল পাহাড়, কোথাও সুদৃশ্য সেতু চলে গিয়েছে এ—পার থেকে ও—পারে। এক জায়গায় পাহাড়ের উপর আছে কৃত্রিম ঝরনা। ফুলন্ত লতাপাতায় সমাচ্ছন্ন এতটুকু একখানি কুঁড়েঘরেরও অভাব নেই। বড়ো বড়ো গাছের ঘন পাতার আড়ালে লুকোনো সব খোঁচায় বসে নানান পাখি মিষ্টি সুরের আলাপে চারিদিক করে তুলেছে সঙ্গীতময়। বাগানে এসে দাঁড়ালেই বিস্ময় জাগে, এত অল্প জায়গার ভিতরে এত বৈচিত্র্যের সমাবেশ সম্ভবপর হল কেমন করে?
কুমার বাড়ির সদর—দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল। বৈঠকখানায় কেউ নেই, লাইব্রেরিও শূন্য। উপরে উঠেও কারুর দেখা পেলে না। একটু আশ্চর্য হয়ে ডাকলে, 'বিমল, বিমল!...রামহরি!'
কারুর সাড়া নেই।
বাঘা ব্যস্তভাবে এ—ঘরে ও—ঘরে ঢুকে ঘেউ—ঘেউ ভাষায় বোধ করি বিমল ও রামহরিকেই ডাকতে লাগল।
কুমার ভাবলে, বিমল তাহলে বাগানের দিকে গেছে। সিঁড়ি দিয়ে আবার নীচে নামবার উপক্রম করছে, এমন সময় সবিস্ময়ে দেখলে, রেলিং ধরে কাতরভাবে উপরে উঠছে রামহরি—তার মাথার চুল, মুখ ও দেহ রক্তমাখা!
মুহূর্তকাল হতভম্বের মতো থেকে কুমার বললে, 'রামহরি, এ—কী ব্যাপার?'
রামহরি ধপাস করে সিঁড়ির ধাপের উপরে বসে পড়ে বললে, 'গুন্ডার হাতে পড়েছিলুম বাবু!'
—'গুন্ডার হাতে!'
রামহরি হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, 'কাল বৈকালে একটা দুশমন চেহারার লোক এসে খোকাবাবুকে ডেকে নিয়ে যায়! অনেক রাত পর্যন্ত খোকাবাবু ফিরল না বলে আমি যখন ভারী ব্যস্ত হয়ে উঠেছি, তখন হঠাৎ সদর—দরজায় কড়া—নাড়া শুনে গিয়ে দেখি, একটা অচেনা লোক দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই সে জিজ্ঞাসা করলে, 'তোমার নাম কি রামহরি?' আমি বললুম, 'হ্যাঁ।' সে বললে, 'বিমলবাবু তোমাকে ডাকছেন। শিগগির চলো।' সামনেই একখানা মোটরগাড়ি দাঁড়িয়েছিল, আমি আর দ্বিরুক্তি না—করে গাড়িতে গিয়ে উঠলুম। তারপর আমরা যখন গড়ের মাঠের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, তখন পাশ থেকে সেই লোকটা হঠাৎ লাঠি তুলে এমন জোরে আমার মাথার ওপর মারলে যে, আমি একেবারে অজ্ঞান হয়ে গেলুম। জ্ঞান হবার পর দেখলুম, সকাল হয়ে গেছে, আমি একটা গাছতলায় শুয়ে আছি, আর গুন্ডারা গাড়ি নিয়ে পালিয়েছে!'
কুমার চমৎকৃত স্বরে বললে, 'রামহরি, তুমি যা বললে তার কোনও মানে হয় না। তোমাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে এমন ভাবে আক্রমণ করবার উদ্দেশ্য কী?'
—'আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, বাবু! তারা কি পাগল, না আমার শত্রু?'
—'তারা যদি তোমার শত্রু হবে, তবে বিমল কোথায় গেল? সে এখনও ফেরেনি কেন?'
রামহরি হাউমাউ করে চেঁচিয়ে উঠে বললে, অ্যাঁঃ, খোকাবাবু এখনও ফেরেনি? বলো কি গো! তবে কি তারা চোর—ডাকাত? ফন্দি খাটিয়ে খোকাবাবু আর আমাকে পথ থেকে সরিয়ে তারা কি এ—বাড়ির সর্বস্ব লুটে নিয়ে গেছে?'
কুমার মাথা নেড়ে বললে, 'না, রামহরি, না! এ—বাড়িতে লুট করার মতো কোনও সম্পত্তি থাকে না! এ—বাড়ির সবচেয়ে মূল্যবান নিধি হচ্ছে, বিমল নিজেই।—তাকেই আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! নিশ্চয়ই এর মধ্যে অন্য কোনও গূঢ় রহস্য আছে।'
হঠাৎ নীচে সদর—দরজার কাছ থেকে উচ্চ কণ্ঠস্বর শোনা গেল—'আরে, আরে! এ বাড়ি যে আমি চিনি! কী আশ্চর্য, এ যে বিমলবাবুর বাড়ি! হুম!'
কুমার তখনই বুঝতে পারলে, এ হচ্ছে পুলিশ ইনস্পেকটার সুন্দরবাবুর গলা! গত বৎসরে তাঁর সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়েছে। সে তাড়াতাড়ি নীচে নামতেই দেখলে সুন্দরবাবু দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করলেন।
—'একি, সুন্দরবাবু যে, নমস্কার! আপনি ঠিক সময়েই এসেছেন!'
—'ঠিক সময় এসেছি মানে?'
—'কাল এখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে সুন্দরবাবু!'
—'হুম, সেইজন্যেই তো আমি তদারক করতে এসেছি!'
—'তাহলে বিমলের খোঁজ আপনারা পেয়েছেন?'
—'হুম! আমি বিমলবাবুর খোঁজ করবার জন্যে এখানে আসিনি! আমি এসেছি আপনাদের বাগানে চোরের পায়ের ছাপ খুঁজতে!'
—'আমাদের বাগানে? চোরের পায়ের ছাপ? কী বলছেন!'
—'কিচ্ছু ভুল বলিনি। জানেন, কাল রাতে জেরিনার কণ্ঠহার চুরি গিয়েছে? আগে তার দাম ছিল পঞ্চাশ লক্ষ টাকা, কিন্তু এখন তাকে অমূল্য বলাও চলে!'
—'জেরিনার কণ্ঠহার? সে আবার কী?'
—'শুনুন তবে—রুশিয়ার সম্রাট আর সম্রাজ্ঞীকে জার আর জেরিনা বলে ডাকা হত, জানেন তো? রুশিয়ার সম্রাজ্ঞীর গলায় ছিল একছড়া মহামূল্য হিরার হার। কিন্তু রুশিয়ার বিপ্লবের সময় জার আর জেরিনাকে যখন হত্যা করা হয়, তখন এই আশ্চর্য কণ্ঠহার কেমন করে রুশদেশের বাইরে গিয়ে পড়ে। বিজয়পুরের মহারাজা গেল বছরে ফ্রান্সে বেড়াতে গিয়ে প্রকাশ্য নিলামে আধকোটি টাকা দিয়ে সেই হার কিনে আনেন।'
—'কিন্তু কোনও নির্বোধ ধনী যদি আধকোটি টাকা খরচ করে কতকগুলো দুর্লভ, অকেজো কাচ কিনে বসেন, তার জন্যে আমাদের মাথা—ব্যথার দরকার কি?'
—'আ—হা—হা শুনুন না! দরকার আছে বইকী! জেরিনার সেই কণ্ঠহার কাল রাতে চুরি গিয়েছে!'
—'আপদ গিয়েছে! এখন তা নিয়ে দুঃখ করবার সময় আমার নেই!'
—'আপনি বয়সে নবীন কিনা, তাই আসল কথা শোনবার আগেই অধীর হয়ে উঠছেন! কুমারবাবু আপনি কি জানেন না, বিজাপুরের মহারাজা কলকাতায় এসে আপনাদেরই বাগানের পিছনকার মস্ত বাড়িখানা ভাড়া নিয়ে বাস করছেন?'
—'তা আবার জানি না? রাজকীয় ধুমধামের চোটে এ—পাড়ার প্রাণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে যে!'
—'বিজয়পুরের মহারাজা কাল মহারানিকে নিয়ে মোটরে করে কলকাতার বাইরে কোথায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে রাত্রিবেলায় ফেরবার সময়ে পথে হঠাৎ মোটরের কল বিগড়ে যায়। ফলে মোটরকে আবার কার্যক্ষম করে নিয়ে বাড়িতে আসতে তাঁদের অনেক রাত হয়। ইতিমধ্যে কখন যে মহারাজের শোবার ঘর থেকে জেরিনার কণ্ঠহার চুরি গিয়েছে, সে—কথা কেউ জানে না। আজ সকালে সেই চুরির কথা প্রকাশ পেয়েছে, আর সঙ্গে সঙ্গে মামলার কিনারা করবার জন্যে ডাক পড়েছে ছাই ফেলতে ভাঙা—কুলো এই সুন্দর চৌধুরির! আমি এসে দেখলুম—'
—'আপনি এসে কী দেখলেন, তা জানবার আগ্রহ আমার একটুও নেই! আমি এখন—'
কুমারকে থামিয়ে দিয়ে সুন্দরবাবু খাপ্পা হয়ে বললেন, 'আপনি কথায় কথায় বড্ড বেশি বাধা দিচ্ছেন কুমারবাবু! আগে আমি কী বলি শুনুন, নইলে পথ ছেড়ে দিন, আমি এই বাড়ির ভিতরটা আর বাগানের চারিদিকটা একবার ভালো করে দেখে আসি!'
কুমার বিস্মিত স্বরে বললে, 'কেন?'
—'কারণ আমার মতন ঝানু ইনস্পেকটারের চোখে ধুলো দেওয়া সহজ নয়! আমি আবিষ্কার করেছি যে, চোরেরা এই বাড়ির পিছনকার বাগানের পাঁচিল টপকে মহারাজার বাড়িতে ঢুকে জেরিনার কণ্ঠহার চুরি করে আবার এই দিক দিয়েই ফিরে এসেছে! রাজবাড়ি থেকে আজ যখন আপনাদের বাগানটাকে দেখলুম, তখন বুঝতে পারিনি যে, এটা বিমলবাবুর বাড়ি—কারণ এ—বাড়িতে এসে আমি অনেক চা, টোস্ট, ওমলেট উড়িয়েছি বটে, কিন্তু কোনওদিন ওই বাগানটার দিকে যাইনি। কিন্তু বাড়ির সামনের দিকে এসেই বিমলবাবুর বাড়ি চিনতে পেরেছি। এখন আমি এই বাড়ির সর্বত্র খানাতল্লাশ করতে চাই,—হুম! কী করব বলুন, 'ডিউটি ইজ ডিউটি'!'
প্রথমটা কুমারের মন রাগে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল! আরক্ত মুখে সে কড়া কথা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ একটা সত্য আবিষ্কার করে ফেলে নিজেকে সামলে নিলে এবং তারপরেই উত্তেজিত স্বরে বলে উঠল, 'বুঝেছি—বুঝেছি, এতক্ষণ পরে বুঝেছি! এই জন্যেই বিমল হয়েছে অদৃশ্য আর রামহরি হয়েছে আহত!'
সুন্দরবাবু থতমত খেয়ে বললেন, 'কুমারবাবু, আপনার এসব কথার অর্থ কী? কে অদৃশ্য, আর কে আহত হয়েছে?'
কুমার বললে, 'সুন্দরবাবু এতক্ষণ আমরা দুজনেই অন্ধকারে বাস করছিলুম, তাই কারুর কথা কেউ বুঝতে পারছিলুম না! এইবার আমি এসেছি অন্ধকার থেকে আলোকে!'
—'হুম, তার মানে?'
—'আগে রামহরির গল্প শুনুন,—রামহরি, রামহরি!'
রামহরি ওপর থেকে নীচে নেমে এল। তাকে দেখেই সুন্দরবাবু চমকে বলে উঠলেন, কী রামহরি, তোমার এমন মূর্তি কেন?'
রামহরি আবার তার গল্প বললে। সুন্দরবাবু সব শুনে মহাবিস্ময়ে বললেন, 'অ্যাঁঃ বলো কী? বিমলবাবু অদৃশ্য!'
কুমার বললে, 'কিন্তু বিমলের অদৃশ্য হওয়ার কারণ অনুমান করতে পারছেন?'
—'হুম, এখনও আমি কারণ—টারণ অনুমান করবার চেষ্টা করিনি। কিন্তু আপনি কি অনুমান করেছেন?'
—'ভেবে দেখুন সুন্দরবাবু! একদল চোর যদি এই বাড়ির ভিতর দিয়ে বিজয়পুরের মহারাজার বাড়িতে ঢুকে চুরি করতে চায়, তাহলে তারা কি চুরির আগে বিমল আর রামহরিকে যে কোনও কৌশলে পথ থেকে সরাবার চেষ্টা করবে না?'
সুন্দরবাবু বেজায় উৎসাহে লাফ মেরে বললেন, 'ঠিক ধরেছেন কুমারবাবু!...রামহরি, রামহরি! কাল বিকেলে যে—লোকটা বিমলবাবুকে ভুলিয়ে নিয়ে যায়, তার চেহারা কী রকম বলতে পারো?'
—'তা কেন পারব না? তার মতন ঢ্যাঙা আর লম্বা—চওড়া চেহারা আমি আর কখনও দেখিনি, বাবু! মুখে মস্ত গাঁফ—দাড়ি, কিন্তু তার গলার আওয়াজ ঠিক মেয়েমানুষের মতো! তার চেহারা দেখলে ভয় হয়, কিন্তু গলা শুনলে হাসি পায়।'
—'হুম। রাত্রে যে তোমার কাছে এসেছিল, তাকে আবার দেখলে তুমি চিনতে পারবে?'
—'তা আবার পারব না, তাকে আর একবার দেখবার জন্যে আমার মন যে ব্যাকুল হয়ে আছে!'
—'আমরাও কম ব্যাকুল নই হে! আচ্ছা রামহরি, বিমলবাবু কোথায় যাচ্ছেন বেরুবার সময়ে সেকথা তোমাকে বলে যাননি?'
—'না...তবে হ্যাঁ, একটা কথা এখন আমার মনে পড়ছে! আমি একবার ঘরের দরজার কাছ দিয়ে যেতে যেতে শুনেছি বটে, খোকাবাবুর সঙ্গে কথা কইতে কইতে সেই গুণ্ডার মতন লোকটা বলছে—'আমি টালিগঞ্জের পাঁচ নম্বর মণিলাল বসু স্ট্রিটে বাড়ি ভাড়া নিয়ে আছি।'
সুন্দরবাবু উত্তেজিত স্বরে বললেন, 'পাঁচ নম্বর মণিলাল বসু স্ট্রিট! পাঁচ নম্বর মণিলাল বসু স্ট্রিট! ঠিক শুনেছ রামহরি?'
—'হ্যাঁ গো বাবু, হ্যাঁ। আমি একবার যা শুনি তা আর কখনও ভুলি না।'
—'হুম, তোমার এ অভ্যাসটি ভালো বলতে হবে। কুমারবাবু, এখন আমাদের কী কর্তব্য বলুন দেখি?'
—'পাঁচ নম্বর মণিলাল বসু স্ট্রিটের দিকে সবেগে অগ্রসর হওয়া।'
—'ঠিক বলেছেন। এই আমি মহাবেগে অগ্রসর হলুম, হুম।'
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
অবলার ছবি
কুমার বললে, 'সুন্দরবাবু, এই যে মণিলাল বসু স্ট্রিট।'
সুন্দরবাবু বললেন, 'বাব্বাঃ। কোন রসিক এই গলিটার নাম রেখেছে স্ট্রিট! এটা শহরের রাস্তা, না জঙ্গলের পথ? এই সেপাইরা, হুঁশিয়ার! গলির ভেতর থেকে কারুকে বেরুতে দিয়ো না, খবরদার!'
পানায়—সবুজ পচা জলে ভরা পুকুরের পাশ দিয়ে, দু—ধার থেকে ঝুঁকে—পড়া বাঁশঝাড়ের তলা দিয়ে, নড়বড়ে কুঁড়েঘর আর ভাঙা ভাঙা ছোটো ছোটো বাড়ি আর ঝোপঝাপ জঙ্গল, আদ্যিকালের অশ্বত্থ—বট—আম—কাঁঠাল গাছের ভিতর দিয়ে আঁকাবাঁকা পথের সঙ্গে মোড়ের পর মোড় ফিরতে ফিরতে সদলবলে কুমার খানিকটা এগিয়েই দেখতে পেলে সেই মান্ধাতার আমলের প্রকাণ্ড অট্টালিকাখানা। সকালবেলার সমুজ্জ্বল সূর্যকিরণে তার দীনতা ও জীর্ণতা যেন আরও ভালো করে ফুটে উঠেছে।
কুমার বললে, 'ওইখানেই পাঁচ নম্বর বাড়ি বলে বোধ হচ্ছে।'
এগুতে এগুতে সুন্দরবাবু বললেন, 'ও বাড়ির আবার নম্বর আছে নাকি? ও তো মস্ত বড়ো ভাঙা ঢিপি!' কুমার বললে, 'না, না, এদিকে এসে দেখুন। এদিকটাতে দেওয়ালের গায়ে অশথ—বটরা রাজত্ব বিস্তার করতে পারেনি, চুন—বালির প্রলেপ ঠেলে বাড়ির কঙ্কালও বেরিয়ে পড়েনি। ওই দেখুন, সদর—দরজায় একজন দারোয়ানও অবাক হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।'
কিন্তু দারোয়ানের সেই বিস্মিত ভাব স্থায়ী হল না। হঠাৎ সে উঠে দাঁড়াল এবং তাড়াতাড়ি ভিতরে ঢুকেই দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিলে।
সুন্দরবাবু বললেন, 'বটে, বটে, হুম। পুলিশ দেখেই লোকটা যখন ভড়কে গেল, তখন বাড়ির ভেতরে নিশ্চয়ই কোনও রহস্য আছে।'
কুমার দৌড়ে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মুখ তুলে দেখে বললে, 'এই তো পাঁচ নম্বরের বাড়ি!'
সুন্দরবাবু বেজায় জোরে দরজার কড়া নাড়তে নাড়তে ডাকলেন, 'দরোয়ান। দরোয়ান। এই বেটা পাজির পা—ঝাড়া।'
কেউ সাড়া দিলে না।
কুমার বললে, 'এত বড়ো বাড়ি ঘিরে ফেলবার মতো লোক আমাদের সঙ্গে নেই। ওদিকে দরওয়ানটা বাড়ির ভেতরে গিয়ে এতক্ষণে খবর দিয়েছে, সময় পেলেই বদমাইশরা কোন দিক দিয়ে পালাবে, কে জানে? সুন্দরবাবু, আসবার সময়ে আপনি তো সার্চ—ওয়ারেন্ট বার করে এনেছেন, দরজাটা ভেঙে ফেলুন না।'
সুন্দরবাবু বললেন, 'হুম, তা ছাড়া আর উপায় নেই দেখছি।...জমাদার, তোমরা সবাই মিলে দরজাটা লাথি মেরে ভেঙে ফ্যালো তো।'
পাহারাওয়ালাদের দমাদ্দম লাথির আঘাত সেই পুরাতন দরজা বেশিক্ষণ সইতে পারলে না, তার ভিতরকার খিল গেল ভেঙে।
ভিতরে প্রবেশ করল সর্বাগ্রে কুমার, তারপর সুন্দরবাবু, তারপর জমাদার ও জনকয় পাহারাওয়ালা। সকলে উঠানের উপরে গিয়ে দাঁড়াল।
সুন্দরবাবু তাড়াতাড়ি চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, 'ওই তো দেখছি ওপরে ওঠবার সিঁড়ি। কিন্তু রোসো, আগে নীচের ঘরগুলোই খুঁজে দেখি। আরে আরে, ও কী ও?'
দুম, দুম, দুম করে একটা শব্দ শোনা যেতে লাগল।
কুমার এক—ছুটে সিঁড়ির তলাকার সেই লোহার খিল মারা দরজাটার সুমুখে গিয়ে উত্তেজিত স্বরে বললে, 'সুন্দরবাবু, ভেতর থেকে কে ওই দরজায় ধাক্কা মারছে!'
দ্বারের ওপাশ থেকে জাগল বিমলের সুপরিচিত কণ্ঠস্বর—'কুমার, কুমার! আমি অন্ধকূপে বন্দি, আমাকে উদ্ধার করো বন্ধু!'
আনন্দে পাগলের মতো হয়ে কুমার সেই বদ্ধ—দ্বারের উপর মারতে লাগল প্রচণ্ড লাথির পর লাথি!
সুন্দরবাবু বললেন, 'ঠান্ডা হোন কুমারবাবু, ঠান্ডা হোন! হাতি লাথি মারলেও এ দরজা ভাঙবে কি না সন্দেহ। কিন্তু দরজা ভাঙবার দরকার কী? দেখছেন না, ওপরে খালি শেকল লাগানো রয়েছে, তালা পর্যন্ত নেই?'—বলেই তিনি শিকল খুলে দিলেন।
দরজা খুলে বিমল বাইরে আসতেই তাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে কুমার বলে উঠল, 'বিমল! এত সহজে তোমাকে যে ফিরে পাব স্বপ্নেও তা ভাবতে পারিনি!'
বিমল শ্রান্ত স্বরে বললে, 'এতক্ষণ অন্ধকূপে বন্ধ থেকে হঠাৎ বাইরের আলোতে এসে কিছুই আমি দেখতে পাচ্ছি না! একটু সবুর করো ভাই, নিজেকে আগে সামলে নি!'
সুন্দরবাবু বললেন, 'আচ্ছা, আপনারা এইখানেই থাকুন, ততক্ষণে আমি বাড়ির ভেতরটা খানাতল্লাশ করে আসি। জমাদার, সেপাইদের নিয়ে আমার সঙ্গে এসো।'
পুলিশের দলবল সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল। বিমল মিনিট—দুই চুপ করে থেকে বললে, 'এইবারে তোমার কথা বলো, কুমার! কেমন করে তোমরা জানতে পারলে আমি এখানে বন্দি হয়ে আছি?'
কুমার সংক্ষেপে সমস্ত বর্ণনা করে বললে, 'এখন বলো, তোমার মতন অসাধারণ লোককে এরা বন্দি করেছিল কোন কৌশলে?'
বিমল তিক্তস্বরে বললে, 'ভাই, আমি অসাধারণ লোক নই, কারণ বন্দি হয়েছি তুচ্ছ একটা সাধারণ প্যাঁচে। এ ভাবে তুমি বন্দি হলে তোমাকে আমিও বোকা ছাড়া আর কিছু বলতে পারতুম না। রামহরি যে ঢ্যাঙা লম্বা—চওড়া দুশমন চেহারার লোকটার কথা বলছে, সে কেবল মহাশক্তিশালী নয়, মহাচতুরও বটে; সে জানে আমার দুর্বলতা কোথায় আর সেই হিসাবেই আমাকে ধরবার ফাঁদ পেতেছিল। কিন্তু এতক্ষণ আকাশ—পাতাল ভেবেও আমি ঠাওরাতে পারিনি, আমাকে এভাবে বন্দি করে তার কোন উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে! এখন তোমার মুখে সমস্ত শুনে আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারছি। তার নাম অবলাকান্ত, যদিও তার চেহারাটা হচ্ছে নামের মূর্তিমান প্রতিবাদ। আবার অবলার গলার আওয়াজেও পাবে তার চেহারার প্রতিবাদ। সে—' বলতে বলতে বিমলের দুই চোখ উঠল চমকে। সে স্পষ্ট দেখলে, উঠানের পশ্চিম দিকের রৌদ্রোজ্জ্বল দেওয়ালের উপরে পড়েছে একটা আবক্ষ নরমূর্তির কালো ছায়া।
অত্যন্ত আচম্বিতে বিমল উপর—পানে মুখ তুলে তাকালে এবং সঙ্গে সঙ্গে দেখলে,প্রকাণ্ড একখানা মুখ ছাদের কার্নিসের ধার থেকে সাঁৎ করে সরে গেল।
বিমল উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল, 'কুমার, কুমার। ওই সেই অবলাকান্ত। ছাদের ধার থেকে উঁকি মেরে আমাদের দেখছিল, কিন্তু বুঝতে পারেনি যে সূর্যদেব তাকে ধরিয়ে দেবেন। চলো, চলো, ওপরে চলো।'
দ্রুতপদে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে তারা দুজনে দেখলে তেতলার সিঁড়ির মুখে পাহারাওয়ালাদের নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সুন্দরবাবু।
হতাশভাবে তিনি বললেন, 'কোথাও টুঁ—শব্দটি নেই, সব ব্যাটাই বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।'
বিমল বললে, 'আপনি তেতলায় এখনও ওঠেননি?'
—'হুম, নিশ্চয় উঠেছি। তেতলায় তো মোটে দুখানা ঘর। কোনও ঘরেই কেউ নেই, সব ভোঁ—ভোঁ।'
—'না, সুন্দরবাবু, আমি এইমাত্র স্বচক্ষে দেখেছি, সেই পালের গোদা অবলাকান্ত তেতলার ছাদের ওপর থেকে উঁকিঝুঁকি মারছে।'
—'অবলাকান্ত আবার কে?'
—'যে আমাকে বন্দি করেছিল। আসুন আবার তেতলায়।'—বলেই বিমল তেতলার সিঁড়ি দিয়ে বেগে উপরে উঠতে লাগল।
তেতলার উত্তর দিকে দুখানা বড়ো ঘর, অন্য তিনদিকে খোলা ছাদ। কিন্তু ছাদে কেউ নেই।
বিমল বললে, 'সুন্দরবাবু, লোকজন নিয়ে আপনি ওই ঘর—দুখানার দিকে যান। এসো কুমার, আগে আমরা ছাদটা দেখে আসি।'
কুমার বললে, 'ছাদ চোখের সামনেই পড়ে আছে, কোথাও একটা চড়াই পাখি পর্যন্ত নেই।'
—'কিন্তু ছাদের তলায় কী আছে সেটা দেখা দরকার—যদি ছাদ থেকে অদৃশ্য হবার কোনও উপায় থাকে।'
ছাদের তলায় পূর্বদিকে রয়েছে প্রায়—দুর্ভেদ্য সবুজ জঙ্গল। আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, জামরুল, নোনা, ডুমুর, নারিকেল, সুপুরি ও খেজুর প্রভৃতি ফলগাছের বাহুল্য দেখে বোঝা যায় আগে সেখানটা ছিল বাগান। এখনও সেখানে বেঁচে রয়েছে অশোক, রঙ্গন, কৃষ্ণচূড়া, চাঁপা ও বকুল প্রভৃতি পুষ্পতরু। তাদের ভিতর থেকে সাড়া দিচ্ছে কোকিল, বউ—কথা—কও ও শ্যামা প্রভৃতি গীতকারী পাখির দল। ফলের ফসল আর নেই বললেও চলে, ফুলের বাসর ভেঙেছে, কিন্তু পাখিদের গানের আসর আজও বসে আগেকার মতোই।
দক্ষিণদিকে খানিকটা ঝোপঝাপ—ভরা খোলা জমির পর মস্ত বড়ো একটা দিঘি। তার পানায় আচ্ছন্ন বুকের দিকে হঠাৎ দৃষ্টিপাত করলে সন্দেহ হয়, সেটা যেন একটা তৃণশ্যামল মাঠ। তারপরেই দেখা যায় মাঝে মাঝে পানা ছিঁড়ে গেছে, রোদে জল চকচক করছে। মাঝে মাঝে দেখা যায়, দলবদ্ধ শালুকফুলেরও বাহার।
পশ্চিমদিকে মণিলাল বসু লেন।
বিমল সব ভালো করে দেখে—শুনে বললে, 'না, ছাদের কোনওদিক দিয়ে পালাবার কোনও উপায় নেই। অবলাকান্তকে যদি পাওয়া যায়, উত্তরের ওই দুটো ঘরের ভেতরেই পাওয়া যাবে। চলো কুমার।'
তারা সুন্দরবাবুর কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, 'বিমলবাবু, আপনি ভুল দেখেছেন। এ দুটো ঘরেই কেউ নেই।'
—'তবু আমি একবার ঘর দুটো দেখব' বলে বিমল প্রথম যে ঘরখানায় ঢুকল সেখানা একেবারেই খালি—এমনকী আসবাবের মধ্যে রয়েছে মাত্র দুখানা শীতলপাটি বিছানো চৌকি।
কিন্তু অন্য ঘরখানা খুব সাজানো! একদিকে একখানা দামি খাট, তার উপরে ধবধবে চাদরে ঢাকা নরম বিছানা। আর একদিকে সোফা—কোচ টেবিল। আর একদিকে একটি আলমারি ও ড্রেসিংটেবিল এবং আর—একদিকের দেওয়ালে রয়েছে খুব পুরু ফ্রেমে আঁটা একখানা 'অয়েল—কালারে' আঁকা প্রকাণ্ড ছবি, সেখানা প্রায় মেঝের উপরে এসে পড়েছে।
বিমল বললে, 'সুন্দরবাবু, যে মহাপ্রভুকে আমরা খুঁজছি তার ছবির চেহারা দেখুন!'
সুন্দরবাবু ছবির দিকে খানিকক্ষণ বিস্মিত নেত্রে তাকিয়ে থেকে বললেন, 'হুম, অবলা দেখছি মহা বলবান ব্যক্তি! কিন্তু ছবিতে কি এর চেহারা বেশি বড়ো করে আঁকা হয়েছে?'
—'না, এখানা হচ্ছে অবলার 'লাইফ—সাইজে'র ছবি।'
—'ওরে বাবা, বলেন কি? অবলা কি মাথায় সাত ফুটের চেয়েও লম্বা?'
—'বোধহয় তাই।'
—'কিন্তু অবলাকে যখন পেলুম না, তখন তার ছবি নিয়ে আমাদের আর কী লাভ হবে? চলুন, যাই।'
—'আমি স্বচক্ষে তাকে ছাদের ওপর থেকে উঁকি মারতে দেখেছি। কিন্তু এখন সে ছাদেও নেই, এ—ঘরে ও—ঘরেও নেই। এটা যে অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে। অবলা কি ডানা মেলে উড়ে গেল?' বলতে বলতে বিমল ছবির কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্নদৃষ্টিতে অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে কী পরীক্ষা করতে লাগল।
সুন্দরবাবু বললেন, 'ও কী বিমলবাবু, আপনি কি অবলাকে না পেয়ে তার ছবিখানাকেই গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে চান?'
বিমল খানিকক্ষণ জবাব দিলে না। তারপর কুমারের দিকে ফিরে বললে, 'দ্যাখো তো কুমার, ছবির ওপরে ডানদিকের ওইখানটায় তাকিয়ে!...কী দেখছ?' কুমার ভালো করে দেখে বললে, 'মাকড়সার একটা বড়ো ছেঁড়া জাল।'
—'জালটার খানিকটা রয়েছে দেওয়ালের ওপরে, আর খানিকটা রয়েছে ছবির ফ্রেমের ওপরে। জালটা নিশ্চয়ই সবে ছিঁড়েছে, কারণ মাকড়সাটা এখনও ব্যস্তভাবে তার জাল মেরামত করবার চেষ্টায় আছে। কিন্তু জালটা ছিঁড়ল কেন?'
সুন্দরবাবু বিরক্ত স্বরে বললেন, 'কী বিপদ, হুম! আসামি কোথায় চম্পট দিলে, আর আপনারা মাকড়সার জাল নিয়েই মেতে রইলেন যে! আপনাদেরও স্বভাব দেখছি, আমাদের শখের গোয়েন্দা জয়ন্ত ভায়ার মতো!'
বিমল মুখ টিপে হেসে বললে, 'সুন্দরবাবু, আমি গোয়েন্দা নই। কিন্তু আপনি পুলিশের পাকা লোক হয়েও কি বুঝতে পারছেন না, অমন অস্থানে ছবির ফ্রেম থেকে দেওয়াল পর্যন্ত ছিল যে মাকড়সার জাল, সে—জাল সদ্য সদ্য ছিঁড়ে যাওয়া অত্যন্ত সন্দেহজনক?'
—'কেন, সন্দেহজনক কেন? আপনার কথার অর্থ কী?'
—'আমার কথার অর্থ হচ্ছে এই যে, বড়ো ছবিখানাকে এইমাত্র কেউ দেওয়ালের গা থেকে সরিয়েছিল।'
—'সরিয়েছিল তো সরিয়েছিল, তাতে আমাদের এত মাথাব্যথা কেন?'
—'আমাদের মাথাব্যথার কারণ হয়তো কিছুই নেই, তবে আমিও ছবিখানাকে আর একবার দেওয়ালের গা থেকে সরিয়ে ফেলতে চাই।'—বলেই মলিল ছবিখানাকে দুই হাতে তুলে ধরে দেওয়ালের উপর থেকে সরিয়ে ফেললে।
ঘরসুদ্ধ সবাই চমৎকৃত হয়ে দেখলে, ছবির পিছনেই দেওয়ালের গায়ে রয়েছে একটা বন্ধ দরজা।
সুন্দরবাবু অভিভূত কণ্ঠে বললেন, 'হুম। বাহাদুর বিমলবাবু।'
বিমল বললে, 'এর মধ্যে আমার বাহাদুরি একটুও নেই। অবলাকান্ত ভারী চালাক বটে, কিন্তু একটু আগে তাকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন সূর্যদেব, আর একটু পরে এখন তার পথ নির্দেশ করলে তুচ্ছ এক মাকড়সা। সুন্দরবাবু, এই বন্ধ দরজার পিছনে কী আছে জানি না, কিন্তু অবলাকান্ত অদৃশ্য হয়েছে এই পথেই।'
সুন্দরবাবু প্রায় গর্জন করেই বললেন, 'জমাদার। ডাকো সিপাইদের। ভাঙো এই দরজা।'
বিমল বললে, 'কিন্তু সবাই সাবধান। অবলাকান্ত খুব শান্ত নিরীহ বালক নয়!'
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি
বিমল ও কুমার বার করলে রিভলভার। কনস্টেবলরা এগিয়ে গিয়ে জোরে লাথি মারতে লাগল দরজার উপর। দরজার পাল্লা—দুখানা দড়াম করে খুলে যেতে দেরি লাগল না।
হুড়মুড় করে সবাই খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল।
কিন্তু ঘরের মধ্যে কেউ নেই। ছোট্ট এক ফালি ঘর—চওড়ায় চার হাত আর লম্বায় ছয় হাতের বেশি হবে না। একেবারে আসবাব—শূন্য।
এদিক—ওদিক দৃষ্টিপাত করে সুন্দরবাবু বললেন, 'কই মশাই, কোথায় আপনার অবলা? ফুস—মন্ত্রে উড়ে গেল নাকি?'
উত্তরদিকের দেওয়ালে রয়েছে গরাদহীন একটা ছোটো জানলা। বিমল সেই দিকে ছুটে গিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখলে, জানলার বাইরে মস্ত একটা হুক থেকে ঝুলছে, মোটা একগাছা দড়ি। তারপর বুক পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়ে নীচের দিকে চেয়ে দেখলে, দড়ির অন্য প্রান্ত প্রায় মাটি পর্যন্ত নেমে গেছে এবং তখনও লটপট করে খুব দুলছে।
দড়িগাছা খানিকটা টেনে তুলে সকলকে দেখিয়ে বিমল বললে, 'সুন্দরবাবু, অবলাকে আবার ভূতলে অবতীর্ণ করেছে এই দড়ি। এটা এখনও যখন দুলছে তখন বুঝতে হবে যে, মাটিতে পা দিয়ে অবলা এইমাত্র একে ত্যাগ করেছে।'
সুন্দরবাবু মুখভঙ্গি করে বললেন, 'হুম, এ যে একেবারে ডিটেকটিভ উপন্যাসের কাণ্ড! আমরা হচ্ছি সত্যিকারের পুলিশ, এর মধ্যে পড়ে আমাদের মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে রে বাবা! এখন উপায়?'
কিন্তু বিমল তখন সুন্দরবাবুর কথা শুনছিল না। মুখ বাড়িয়ে তীক্ষ্নদৃষ্টিতে নীচের দিকটা পর্যবেক্ষণ করছিল।
এদিক থেকেই এই পাঁচ নম্বরের বাড়ির বিশাল ধ্বংসস্তূপের আরম্ভ। নীচে সামনেই রয়েছে একটা মহলের উঠান, এক সময়ে তার দুই ধারে ছিল সারি সারি ঘর ও টানা বারান্দা, এখন কিন্তু বেশির ভাগই হয়েছে ভূমিসাৎ। উঠানের উপরে রাশি রাশি ইটের ঢিপি, মাঝে মাঝে বুনো চারাগাছ এবং মাঝে মাঝে গর্ত। দু—দিন আগে বৃষ্টি হয়েছিল, এখনও তারই জল জমে রয়েছে গর্তগুলোর ভিতরে।
বিমল হঠাৎ জানলার ফাঁকে নিজের দেহটা গলিয়ে দিতে দিতে বললে, 'কুমার, তুমিও আমার সঙ্গে এসো এই পথে।'
সুন্দরবাবু হাঁ—হাঁ করে বলে উঠলেন, 'আরে মশাই, করেন কী, করেন কী! পড়লে বাঁচবেন না যে।'
—'পড়লে যে মানুষ বাঁচে না, আমিও সেকথা জানি সুন্দরবাবু। কিন্তু না—পড়বার জন্যে আমি কিছুমাত্র চেষ্টার ত্রুটি করব না। এখন আমার জন্যে মাথা না ঘামিয়ে আপনি সিঁড়ি দিয়েই নীচে নেমে যান। তারপর অন্য পথে বাড়ির ওই ভাঙা অংশটায় ঢুকে পড়তে পারেন কি না দেখুন।' বলেই বিমল বাইরে গিয়ে দড়ি ধরে ঝুলে পড়ল।
সুন্দরবাবু দৌড়ে জানালায় গিয়ে বিস্মিত চোখে দেখলেন, বিমল অত্যন্ত অনায়াসে তড়বড় করে দড়ি ধরে নীচে নেমে যাচ্ছে। তিনি চোখ পাকিয়ে বললেন, 'বাপ রে বাপ। সিঁড়ির চওড়া ধাপ দিয়েও আমরা এর চেয়ে তাড়াতাড়ি নীচে নামতে পারতুম না! কুমারবাবু, আপনার বন্ধুর উচিত সার্কাসে যোগ দেওয়া।'
রজ্জুর শেষ—প্রান্তে পৌঁছে বিমল মাথা নামিয়ে দেখলে, তার পা মাটি রয়েছে হাত—তিনেক তফাতে। রজ্জু ত্যাগ করতেই সে পড়ল গিয়ে ইঞ্চি—দুয়েক জল—ভরা জমির উপরে।
সেইখানেই দাঁড়িয়ে সে ঊর্ধ্বমুখে অপেক্ষা করতে লাগল, কারণ কুমারও করেছে তখন রজ্জুকে অবলম্বন।
অল্পক্ষণ পরেই কুমার হল ভূমিষ্ঠ।
উপর থেকে জাগল সুন্দরবাবুরর চিৎকার—'ওইখানেই দাঁড়ান, আপনারা, আমি এক্ষুনি নেমে ছুটে যাচ্ছি।'
বিমল বললে, 'সুন্দরবাবু ভুঁড়ি কতক্ষণে এখানে এসে পড়তে পারবে, কেউ তা জানে না। তবু তাঁর দলবলের জন্যে বাধ্য হয়ে আমাদের খানিকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবেই—কারণ এটা হচ্ছে শত্রুপুরী, সঙ্গে যতবেশি লোক থাকে ততই ভালো। কিন্তু আপাতত পদযুগল চালনা করতে না পারলেও আমরা মস্তিষ্ক চালনা করতে পারব। অতএব এসো কুমার, আমরা এইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই 'ব্লাড—হাউন্ডে'র কাজ আরম্ভ করে দি।'
কুমার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বললে, 'সব দিকেই তো দেখছি ভেঙে—পড়া দেওয়াল, বড়ো বড়ো রাবিশের স্তূপ, ঝোপঝাপ আর এলোমেলো অলিগলি। খুব সহজেই এখানে লুকোনো বা এখান থেকে পালানো যায়। এখন কোনদিকে আমরা অগ্রসর হব, বিমল?'
বিমল বললে, 'কুমার, তুমিও সাধারণ পুলিশ—অর্থাৎ সুন্দরবাবুর মতন হয়ো না। ভগবান তোমাকে অনুভূতি দিয়েছেন, অনুভব করো। দৃষ্টিশক্তি দিয়েছেন, ব্যবহার করো।'
কুমার বললে, 'দৃষ্টিশক্তি ব্যবহার করেই তো দেখছি, চারিদিকে ভগ্নস্তূপ। আর অনুভূতি? হুঁ, অনুভব করছি বটে, আমার পায়ের তলায় রয়েছে জল আর কাদা।'
—'কিন্তু ভাই কুমার, তুমি অনুভব করছ অন্ধের মতো। আর ব্যবহার করছ কেবল স্থূলদৃষ্টি। বড়ো বড়ো স্পষ্ট জিনিস দেখে অপরাধী আর সাধারণ পুলিশ সহজে অনেক কিছুই অনুমান করতে পারে। পাছে বড়ো বড়ো সূত্র পিছনে ফেলে যায়, সেই ভয়ে অপরাধীও স্পষ্ট প্রমাণগুলোকে নষ্ট করতে ব্যস্ত হয়। আর সাধারণ পুলিশও খোঁজে কেবল অমনি সব বড়ো ও স্পষ্ট সূত্রকে। ফলে সূক্ষ্ম বা ছোটো প্রমাণগুলো ফাঁকি দেয় দুই পক্ষেরই চোখকে। তুচ্ছ মাকড়সার জাল, অবলা তাই তাকে আমলে আনেনি। সুন্দরবাবুর চোখেও তা যথাসময়ে পড়েনি, পড়লে হয়তো অবলা পালাতে পারত না। আর বর্তমান ক্ষেত্রে জলকাদার উপরে দাঁড়িয়ে থেকেও তুমি চোখ ব্যবহার করে দেখছ না যে, এর জের কোথায় গিয়ে পৌঁছোতে পারে!...কুমার, কুমার! কে যেন চাপা হাসি হাসলে বলে মনে হল না?'
—'চাপা হাসি? কই, আমি শুনিনি তো। বোধহয় তোমার ভ্রম?'
'ভ্রম? হতেও পারে। কিন্তু আমি যেন কার চাপা হাসির আওয়াজ পেলুম।'
—'ও কিছু নয়! তুমি যা বলছিলে বলো। এই জল—কাদার জের কোনখানে গিয়ে পৌঁছোবে?'
—'ওইখানে কুমার, ওইখানে!' বলেই বিমল হাত—ছয়েক তফাতে মাটির উপরে অঙ্গুলিনির্দেশ করলে।
কুমার দেখলে, উঠানের যেখানে জল নেই সেখান থেকে উত্তরদিকে চলে গিয়েছে অনেকগুলো ভিজে পায়ের ছাপ। নিশ্চয় এইমাত্র কেউ এই রজ্জু—অবলম্বন ত্যাগ করে সরে পড়েছে ওইদিকেই, সুতরাং তার অনুসরণ করাও কঠিন হবে না।
কুমার বললে, 'ওঃ, তাই বলো? এতক্ষণে বুঝলুম।'
বিমল বললে, 'কিন্তু ওইটুকু তোমার বোঝা উচিত ছিল আগেই। দড়ি ছেড়ে যখন আমি অবতীর্ণ হলুম ভূতলে, যখনই আমার পায়ের তলায় অনুভব করলুম জল—কাদাকে, সেই মুহূর্তেই আমার মন বললে,—'অবলা কোনদিকে গিয়েছে তা জানা আর কঠিন হবে না। কারণ তাকেও যখন নামতে হয়েছে এই জল—কাদায়, তখন ধরিত্রীর গায়ে পায়ের ছবি না এঁকে কোনওদিকেই সে আর পালাতে পারবে না।' মনে—মনে মনের কথা শুনেই ফিরে দেখলুম, সত্যই তাই। ফিরে না দেখলেও চলত, কারণ পৃথিবীতে এমন অনেক কিছুই আছে, চোখে দেখবার আগেই যাদের বলা যায় অবশ্যম্ভাবী!'
কুমার হেসে ফেলে বললে, 'আমি হার মানছি। তুমি তো জানোই ভাই বিমল, যতক্ষণ তোমার সঙ্গে থাকি ততক্ষণ আমি নিজের মস্তিষ্ককে ঘুম পাড়িয়ে আর নিজের বুদ্ধিকে মনের কৌটোয় বন্দি করে রাখি। আমার নিজের অস্তিত্ব কেবল প্রকাশ পায় তোমার অসাক্ষাতেই—যেমন পেয়েছিল আজ সকালে, তোমাকে দেখতে না পেয়ে।'
বিমল হেসে সস্নেহে কুমোরের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললে, 'জানি বন্ধু, জানি,—তোমাকে জানতে আমার বাকি নেই। তখন তোমার নিজের অস্তিত্ব জেগেছিল বলেই এত শীঘ্র আমি মুক্তি পেয়েছি।...কিন্তু চোর পালাবার পর আমাদের বুদ্ধি নিয়ে কী করব? সুন্দরবাবু হচ্ছেন জড়ভরত দি সেকেন্ড, এখনও তাঁর আবির্ভাব হল না, আমাদের আর অপেক্ষা করা চলে না। চলো কুমার, অগ্রসর হই। তোমার রিভলভারটা বার করে হাতে নাও।'
কর্দমাক্ত পদচিহ্ন উঠান পার হয়ে উত্তরদিকের একটা ছাদ—ভাঙা দালানের উপরে গিয়ে উঠেছে। তারপর একটু ডানদিকে এগিয়েই বাঁ—দিকে ফিরে একটা ঘরের ভিতরে ঢুকেছে।
পদচিহ্নের অনুসরণ করে বিমল ও কুমার সে—ঘরের ভিতর দিয়ে ঢুকল আর এক ঘরে। তারপর পদচিহ্ন এমন ক্ষীণ হয়ে গেল যে আর দেখা যায় না।
বিমল চারিদিকে তাকিয়ে বলল 'কুমার, পদচিহ্নের আয়ু তো ফুরিয়ে গেল। কিন্তু সে যতটুকু পথ নির্দেশ করেছে আমাদের পক্ষে তাই—ই যথেষ্ট। কারণ আমরা বেশ বুঝতে পারছি, প্রথমত, একটু আগে অবলা এইখানে এসে দাঁড়িয়েছিল, দ্বিতীয়ত, এ—ঘর থেকে ভিতর দিকে যাবার জন্যে রয়েছে একটিমাত্র দরজা। অবলা এখান থেকে যে—পথে এসেছে সেই পথেই আবার বেরিয়ে যায়নি নিশ্চয়। সুতরাং আমাদের যাত্রা করতে হবে ভিতর দিকেই।'
তারা এবার যে ঘরে ঢুকল তার ছাদ, দেওয়াল ও দরজা, জানলা সব অটুট বটে, কিন্তু ভিতরে বাসা বেঁধেছে ঘুটঘুটে অন্ধকার। বিমল ও কুমার সেখান থেকে বেরুবার পথ খুঁজছে, এমন সময় হঠাৎ তাদের পিছনে হল দুম করে দরজা বন্ধ করার শব্দ।—সঙ্গে সঙ্গে ঘরের হিংস্র অন্ধকার যেন সেখানকার ম্লান আলোটুকুকে গপ করে একেবারে গিলে ফেললে।
বিমল তাড়াতাড়ি ফিরে একলাফে ঘরের বন্ধ—দরজার উপরে গিয়ে পড়ল।
দরজার ওপাশ থেকে জাগল আবার সেই পরিচিত নারী কণ্ঠস্বর—'হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ! বিমল, আবার তুমি আমার বন্দি!'
দারুণ ক্রোধে ও নিষ্ফল আক্রোশে নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বিমল প্রায় অবরুদ্ধ—স্বরে বললে, 'কুমার, কুমার। ধিক আমার নির্বুদ্ধিতা! বিপদের রাজ্যে এসেও বিপদের দিকে নজর রাখিনি!'
বাহির থেকে অবলা আবার খুব খানিকটা হেসে নিলে। তারপর তীক্ষ্ন খনখনে স্বরে বললে, 'ওহে বিমল। এই তোমার বুদ্ধি? এই বুদ্ধি ভাঙিয়ে তুমি দেশ—বিদেশে এত বিখ্যাত হয়ে পড়েছ? একটা নেংটি ইঁদুর পর্যন্ত এক ফাঁদে দুবার ধরা পড়ে না—তুমি যে দেখছি নেংটি ইঁদুরেরও চেয়ে অধম। একটু আগে তুমিই আবার মস্ত মুরুব্বির মতন অনুভূতি আর দৃষ্টিশক্তি নিয়ে কুমারকে যে মস্ত লেকচার দিচ্ছিলে, তাও আমি আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনেছি। শুনে আমি হাসি চাপতে পারিনি আর সে হাসির আওয়াজ পেয়েও তুমি সাবধান হওনি। ওহে নাবালক, সূক্ষ্ম দৃষ্টিশক্তি কেবল তোমারই একচেটে না? জানো মূর্খ, মাটির ওপরে যে আমার কাদা—মাখা পায়ের ছাপ পড়ছিল, আমারও তা অজানা ছিল না! ইচ্ছা করলেই আমি পায়ের ছাপগুলো মুছে তোমাকে ধোঁধায় ফেলে পালাতে পারতুম। কিন্তু তা আমি করিনি। কেন জানো? তোমার বুদ্ধি নেংটি ইঁদুরেরও চেয়ে মোটা বলে। আমি বেশ জানতুম, পায়ের দাগগুলো দেখেই তুমি আহ্লাদে আটখানা হয়ে ধেই—ধেই করে নেচে উঠবে! তাই আমি মাটির গায়ে পায়ের ছবি আঁকতে আঁকতে এমন জায়গায় এসে অদৃশ্য হয়েছি যেখানে আমার পক্ষে তোমাকে ফাঁদে ফেলা হবে খুবই সহজ! বুঝলে বোকাচন্দ্র? ঘুমোও এখন অন্ধকারে, নাকে সর্ষের তেল দিয়ে!'
অতিরিক্ত রাগে ফুলতে ফুলতে বিমল আর কোনও কথাই বলতে পারলে না। কিন্তু কুমার চেঁচিয়ে বললে, 'ওরে হতভাগা চোর! আমাদের তুই বন্দি করবি? এতক্ষণে বাড়ির ভেতরে পুলিশ এসে পড়েছে, তা জানিস?'
অবলা আবার হেসে উঠে বললে, 'পুলিশ, না ফুলিশ? ওই ভুঁদো হাঁদা—গঙ্গারাম সুন্দরবাবুকে আমি চিনি না নাকি? সে আমার কী করতে পারে? জানো কি বাপু, এই সাতমহলা সেকেলে বাড়িখানা ভাঙাচোরা বটে, কিন্তু মস্ত এক গোলকধোঁধার মতো? ঠিক এই জায়গাটিতে আসতে আসল পুলিশের এখন একটা দিন লাগতেও পারে! ভেবো না, আমাদের আনাগোনার সাক্ষী হয়ে পায়ের ছাপগুলো এখনও চারিদিকে ছড়িয়ে আছে! আমার লোকজনেরা সেগুলোকে এখন কেবল নিশ্চিহ্নই করে দিচ্ছে না, পুলিশকে ভুল পথে নিয়ে যাবার জন্যে উলটোদিকে নতুন নতুন পদচিহ্নও রেখে এসেছে! অতএব হে বিমল, হে নেংটি—ইঁদুরাধম! আপাতত আমি বিদায় গ্রহণ করছি! হ্যাঁ, আর একটা কথা শুনে রাখো। ষাঁড়ের মতন চেঁচিয়ে মিছে গলা ভেঙো না, কারণ তোমাদের চিৎকার বাইরে গিয়ে পৌঁছোবে না!'
বিমল তখন হাত বুলিয়ে বুলিয়ে দেখে নিয়েছে যে, এ—ঘরের দরজাটা রীতিমতো পুরাতন। কাল সে যেখানে বন্দি হয়েছিল সেখানকার মতন এ—দরজাটাও মজবুত ও লোহার খিল মারা নয়। অবশ্য সাধারণ লোকের পক্ষে এ—দরজাও যথেষ্ট দুর্ভেদ্য, কিন্তু অবলা বোধহয় তার প্রায়—অমানুষিক শক্তির সঙ্গে পরিচিত নয়! আর সেই শক্তি এখন প্রচণ্ড ক্রোধে হয়ে উঠেছে ভয়ানক মারাত্মক! বিমল জীবনে আর কখনও এত অপমান বোধ করেনি!
অবলার কথা যখন শেষ হয়নি, বিমল পিছনে হটে গিয়ে নিজের দেহের মাংসপেশিগুলোকে দ্বিগুণ ফুলিয়ে তুললে! তারপর বেগে ছুটে গিয়ে নিজের সমস্ত শক্তি একত্র করে প্রাণপণে দরজার উপরে মারলে এক বিষম ধাক্কা! মড়—মড় শব্দে দরজার পাল্লা ভেঙে পড়ল।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
অপূর্ব লুকোচুরি খেলা
ভাঙা দরজার ভিতর থেকে বিমল বাইরে লাফিয়ে পড়ল ক্রুদ্ধ ব্যাঘ্রের মতো!
বেরিয়েই দেখতে পেলে একচক্ষু অবলার দাড়ি—গাঁফে সমাচ্ছন্ন মস্ত বড়ো মুখখানা—ক্ষণিকের জন্যে। এবং সেই এক পলকের মধ্যেই বিমল এও লক্ষ করলে, অবলার মুখে ফুটে উঠেছে বিপুল বিস্ময়ের চিহ্ন—নিশ্চয়ই দরজা ভেঙে তার এমন অতর্কিত আবির্ভাব সে একেবারেই আশা করেনি!
কিন্তু পরমুহূর্তেই অবলার প্রকাণ্ড মূর্তিখানা সে—ঘরের ভিতর থেকে সাঁত করে সরে গেল।
মহা ক্রোধে জ্ঞানশূন্যের মতন বিমল বেগে অগ্রসর হতে গিয়ে হঠাৎ সে—ঘরের দরজার চৌকাঠে ঠোক্কর খেয়ে দড়াম করে মাটির উপরে পড়ে গেল! তার দেহ আর পাঁচজনের মতন ছোটো ও হালকা ছিল না, আঘাতটা হল রীতিমতো গুরুতরই।
কুমার তাড়াতাড়ি ছুটে এসে তাকে তুলে ধরে বললে, 'বিমল, বিমল! কোথায় লাগল?'
নিজেকে তখনই সামলে নিয়ে একলাফে দাঁড়িয়ে উঠে বিমল বললে, 'না, না, আমার কিছু লাগেনি! চলো, চলো—অবলা বুঝি আবার পালাল!'
ছুটে দুজনেই আর একটা শূন্যঘর পেরিয়ে আবার সেই ছাদভাঙা দালানের উপরে এসে পড়ল। উঠানের উপরে কেউ নেই। কিন্তু ভাঙা দালান দিয়ে খানিক ছুটেই পাওয়া গেল একটা সরু লম্বা পথ—দু—ধারেই তার সারি সারি কয়েকখানা ঘর।
বিমল বললে, 'কুমার, তুমি ও—ধারের ঘরগুলো খোঁজো, আমি খুঁজি এ—ধারের ঘরগুলো!'
প্রথম ঘরটায় উঁকি মেরে বিমল দেখলে, কেউ নেই। আসবাবহীন ঘুপসি ঘর— দেখলেই বোঝা যায়, বহুকাল তার মধ্যে কেউ বাস করেনি—এককোণে পড়ে রয়েছে কেবল একটা বড়ো কুপো।
দু—ধারে পাঁচখানা করে ঘর ছিল—সব ঘরই দুর্দশাগ্রস্ত, বাসের অযোগ্য। কোনও ঘরেই অবলাকে পাওয়া গেল না।
শেষঘর ও গলির পরেই তারা দুজনে যেখানে এসে দাঁড়াল সেখানেও আর একটা ছোট্ট উঠানের মতো আছে বটে, কিন্তু তার সমস্তটাই ধ্বংসস্তূপে পরিপূর্ণ। সেই পুঞ্জীভূত ইষ্টকের রাশি ও রাবিশের ফাঁকে ফাঁকে গজিয়ে উঠেছে নানান রকম আগাছার চারা। সেখান দিয়ে কারুর পক্ষে পালানো অসম্ভব এবং সেখানে সাপ টিকটিকি ছাড়া কোনও বড়ো জীবেরই লুকোবার উপায় নেই।
বিমল হতাশভাবে বললে, 'ফিরে চলো কুমার, আজ আমাদের কপাল খারাপ!'
কুমার বললে, 'উঃ, রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছে! হতভাগাকে যদি একবার ধরতে পারতুম!'
—'ধরতে তাকে নিশ্চয়ই পারতুম, হঠাৎ ঠোক্কর খেয়ে পড়ে গিয়েই তো সব মাটি করলুম। কিন্তু সে গেল কোনদিকে?...কুমার, কাছেই দুম করে কি একটা শব্দ হল না?'
—'হ্যাঁ, বিমল, আমিও শব্দটা শুনেছি! কী যেন একটা পড়ে গেল!'
—'শব্দটা এসেছে এই গলির দিক থেকেই', বলেই বিমল দৌড়ে আবার সেইদিকে গেল।
কিন্তু গলির ভিতরে কেউ নেই। তারা দুজনে আবার তাড়াতাড়ি দু—দিকের ঘরে উঁকি মারতে মারতে এগিয়ে চলল।
গলির প্রান্তে এসে শেষঘরে উঁকি মেরে বিমল চকিত স্বরে বললে, 'এ কী!'
—'কী বিমল?'
—'কুপোটা দেখে গিয়েছিলুম ঘরের কোণে দাঁড় করানো রয়েছে, কিন্তু এখন দেখছি সেটা মেঝের উপরে গড়াগড়ি খাচ্ছে!...কুমার, অবলা ঠিক কথাই বলেছে—আমি হচ্ছি একটি আস্ত গাধা। শতধিক আমাকে, হাতে পেয়েও তাকে ছেড়ে দিলুম!'
কুমার ঘরের ভিতরে ঢুকে বললে, 'তাহলে সে কি ওই কুপোর ভিতরে ঢুকে বসেছিল?'
—'কুপোর ভিতরে কী তার আড়ালে গা—ঢাকা দিয়েছিল তা আমি জানি না, কিন্তু একটু আগে সে নিশ্চয়ই ছিল এই ঘরে! হঠাৎ নিজে নিজেই জ্যান্ত হয়ে ঘরময় গড়াগড়ি দিতে পারে, এমন আশ্চর্য কুপোর কাহিনি পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি! কুপোটাকে কেউ ফেলে দিয়েছে, আর অবলা ছাড়া সে অন্য কেউ নয়।'
—'কিন্তু সে—'
কুমারের মুখের কথা মুখেই রইল, খানিক দূর থেকে হঠাৎ চারিদিক কাঁপিয়ে বিষম আর্তনাদ উঠল—'বাবা রে, মরে গেছি রে, সেপাই! সেপাই!'
—শিগগির এসো কুমার, শিগগির! এ যে সুন্দরবাবুর গলা!'
তারা দ্রুতপদে আবার আগেকার উঠানে এসে পড়ল।
কুমার বললে, 'উঠোনে তো কেউ নেই! সুন্দরবাবু কোথা থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন?'
—'সেপাই, সেপাই! জলদি আও—হামকো মার ডালা!'
বিমল একদিকে ছুটতে ছুটতে বললে, 'সুন্দরবাবু চ্যাঁচাচ্ছেন, বাগান থেকে। এই যে, ওদিকে যাবার পথ!'
ধ্বংসস্তূপের মাঝখান দিয়ে বুনো গাছের জঙ্গল মাড়িয়ে বিমল ও কুমার উঠান থেকে বেরিয়েই দেখলে, একটা বটগাছের তলায় মাটির উপরে ভুঁড়ি ফুলিয়ে চিত হয়ে পড়ে সুন্দরবাবু ধনুষ্টঙ্কারের রোগীর মতো ক্রমাগত হাত—পা ছুড়ছেন এবং বাগানের নানা দিক থেকে ছুটে আসছে সাত—আটজন পাহারাওয়ালা!
বিমল এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, 'কী হয়েছে সুন্দরবাবু? অত চ্যাঁচালেন কেন? এত হাত—পা ছুড়ছেন কেন?'
কুমার তাঁকে দু—তিনবার চেষ্টার পর টেনে তুলে বসালে।
সুন্দরবাবু হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, 'চ্যাঁচাব না? হাত—পা ছুড়ব না? বলেন কী মশাই? হুম, আমি পেটে খেয়েছি ভয়ানক এক ঘুষি, গালে খেয়েছি বিষম এক চড়। আমার দম বেরিয়ে গেছে, আমি চক্ষে সর্ষেফুল দেখছি!'
—'কে আপনাকে ঘুষি—চড় মারলে? ভালো করে খুলে বলুন।'
—'দাঁড়ান মশাই, দাড়ান! ভালো করে খুলে বলবার আগে ভালো করে হাঁপ ছেড়ে নি।...হ্যাঁ, শুনুন এইবার! আপনারা তো দিব্যি দড়ি বেয়ে 'শর্ট—কাট করে ফেললেন, কিন্তু আপনাদের খোঁজে আমাকে এখানে আসতে হয়েছে দস্তুরমতো সাত—ঘাটের জল খেয়ে! বাবা রে বাবা, এটা কি বাড়ি না গোলকধোঁধা? আমি—'
বিমল বিরক্ত স্বরে বাধা দিয়ে বললে, 'অত ব্যাখ্যা শোনবার সময় নেই! কে আপনাকে মেরেছে তাই বলুন! সে কোথায় গেল?'
—'আরে মশাই, রাগ করেন কেন? কে আমাকে মেরেছে আমি কি ছাই তাকে চিনি? সে কোথায় গেল তা দেখবার সময় কি আমি পেয়েছি? আমি দেখেছি খালি সর্ষেফুল। আসামিকে খোঁজবার জন্যে সেপাইদের এদিক—ওদিক পাঠিয়ে আমি নিজে এলুম এইদিকে। হঠাৎ কোথা থেকে একটা দৈত্যের মতো লোক ছুটে এসে আমার পেটে মারলে গুম করে ঘুষি আর গালে মারলে ঠাস করে চড়—সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘুরে আমি ধড়াম করে পড়ে গেলুম!'
—'দৈত্যের মতো লোক? তাহলে নিশ্চয় সে অবলাকান্ত!'
—'হুম, অবলাকান্ত? কক্ষনও তার নাম অবলাকান্ত নয়—তাহলে প্রবলাকান্ত বলব কাকে?...আরে, আরে—ওই দেখুন মশাই, ওই দেখুন! ও বাবা, বেটা এতক্ষণ ওই ঝোপের ভেতরে লুকিয়ে ছিল নাকি? এই সেপাই, সেপাই! পাকড়ো, আসামি ভাগতা হ্যায়।'
হ্যাঁ, অবলাই বটে! ঝোপের আড়ালে থেকে বেরিয়েই সে আবার বাগান ছেড়ে ছুটল ভাঙাবাড়ির ভিতর দিকে এবং তার অনুসরণ করতে বিমল ও কুমার একটুও দেরি করলে না—যদিও তারা ছিল অনেকটা পিছিয়ে!
আবার সেই পোড়ো উঠান! বিমল ভিতরে ঢুকেই দেখলে, খানিক আগে সে যে দড়ি ধরে উঠানে নেমেছে সেই দড়ি অবলম্বন করেই অবলা আবার অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে উপর দিকে উঠে যাচ্ছে! অত বড়ো দেহে ক্ষিপ্রতা সত্যসত্যই বিস্ময়জনক!
বিমল বেগে ছুটে গিয়ে নীচে থেকে দড়ি ধরে হ্যাঁচকা টান মারতে মারতে চিৎকার করে বললে, 'একটা রিভলভার! একটা রিভলভার! কার কাছে একটা রিভলভার আছে? সুন্দরবাবু, সুন্দরবাবু!'
পাহারাওয়ালারা সবাই এসে পড়ল, কিন্তু তাদের কারুর কাছেই রিভলভার ছিল না! কুমার আর কিছু না পেয়ে ইট কুড়িয়ে নিয়ে ছুড়তে লাগল। সুন্দরবাবু যখন হাঁসফাঁস করতে করতে আবির্ভূত হয়ে রিভলভার বার করলেন, অবলা তখন তেতলার জানলার আড়ালে হয়েছে অন্তর্হিত!
বিমল তিক্তস্বরে বললে, 'নাঃ, আর পারা যায় না, এই একঘেয়ে লুকোচুরি খেলা আজকেই শেষ করতে হবে! অবলা আবার তার গর্তে ঢুকল! সুন্দরবাবু, পাঁচ নম্বর মণিলাল বসু স্ট্রিটের সদর দরজায় পাহারাওয়ালা আছে তো?'
—'আছে বইকী, দুজন।'
—'আচ্ছা, আপনি বাকি পাহারাওয়ালাদের নিয়ে আবার পাঁচ নম্বরকে আক্রমণ করুনগে যান!'
—'হুম, আচ্ছা ধড়িবাজ আসামির পাল্লায় পড়েছি রে বাবা, প্রাণ যে ওষ্ঠাগত হয়ে উঠল!'
—'যান, যান—দেরি করবেন না!'
—'আপনারা?'
—'আমরা আক্রমণ করব এইদিক দিয়ে, নইলে অবলা আবার পালাতে পারে'—বলেই বিমল দড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করলে!
সুন্দরবাবু পাহারাওয়ালাদের নিয়ে অদৃশ্য হলেন। কুমার নীচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
বিমল রজ্জুপথে যখন দোতলা পার হয়েছে তখন হঠাৎ জাগল সেই খনখনে গলায় মেয়েলি হাসি! সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল—'ওরে হাঁদারাম বিমল, আর তোর রক্ষে নেই—মর, মর, মর!—'
কুমার সভয়ে দেখলে, তেতলার জানলার ভিতর থেকে সড়াৎ করে একখানা হাত বেরিয়ে ধারালো ভোজালি দিয়ে বিমলের অবলম্বন রজ্জুর উপর আঘাত করলে একবার, দুইবার, তিনবার!
—এবং দড়িটা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার সঙ্গেই যেন দপ করে নিবে গেল কুমারের চোখের আলো!
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
কচুরির দুর্ভাগ্য
চোখের সামনে গাঢ় অন্ধকার নিয়ে কুমার যখন দাঁড়িয়ে রয়েছে আচ্ছন্নের মতো, তখন হঠাৎ ওপর থেকে শোনা গেল আবার সেই চিরপরিচিত, নির্ভীক, আনন্দময় কণ্ঠের উচ্চ হাস্যধ্বনি!
বিমল হাসছে!
কুমার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলে না, কারণ সেই মুহূর্তেই তার দুই কান প্রস্তুত হয়েছিল একটা গুরুভার দেহের বিষম পতনধ্বনি শোনবার জন্যে!
অন্ধকারের আবরণের ভিতর থেকে নিজের চোখ দুটোকে প্রাণপণে মুক্ত করে নিয়ে কুমার প্রথমে মাটির দিকে তাকিয়ে দেখলে।—সেখানে ভোজালি দিয়ে কাটা দড়িগাছা পড়ে আছে বটে, কিন্তু কোনও যন্ত্রণাকর দৃশ্যের বা মানুষের রক্তাক্ত দেহের অস্তিত্ব নেই, আকস্মিক পুলকে উচ্ছ্বসিত হয়ে পরমুহূর্তেই উপর—পানে চোখ তুলে সে দেখলে, একটা বৃষ্টির জল বেরুবার লোহার মোটা নল ধরে তার বন্ধু বিমল নীচের দিকে নেমে আসছে! তাহলে তার কান ভুল শোনেনি—দুরাত্মা শত্রু এবং সাক্ষাৎ মৃত্যুকে উপহাস করে এইমাত্র হেসে উঠেছিল তার বন্ধুই?
বিপুল আনন্দে চিৎকার করে কুমার ডেকে উঠল, 'বিমল, ভাই বিমল!'
বিমল নামতে নামতে বললে, 'ভয় নেই কুমার, আমার আয়ু এখনও ফুরোয়নি।'
কুমার আরও উপর দিকে তাকিয়ে দেখলে। তেতলার জানলা থেকে অবলা এবং তার ভোজালি অদৃশ্য হয়েছে, ঝুলছে খালি কাটা দড়ির খানিকটা। তেতলার ছাদ থেকে জল বেরুবার পাইপটা জানলার পাশ দিয়ে দেয়াল বেয়ে নেমে এসেছে প্রায় ভূমিতল পর্যন্ত। এটা কুমার বরাবরই দেখে এসেছে, যত বড়ো বিপদ যত অকস্মাৎই দেখা দিক, বিমল উপস্থিত বুদ্ধি হারায় না কখনও। অবলার অস্ত্রাঘাতে দড়ি ছেঁড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বা ঠিক তার পূর্ব—মুহূর্তেই বিমল খপ করে হাত বাড়িয়ে তার পাশের পাইপটা চেপে ধরে খুব সহজেই আত্মরক্ষা করেছে।
নল ত্যাগ করে ভূতলে অবতীর্ণ হয়ে বিমল হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে বললে, 'ভাই কুমার, মৃত্যু আমাকে গ্রহণ করলে না। বোধহয় এত সহজে মরবার জন্যে ভগবান আমাকে সৃষ্টি করেননি।'
কুমার বললে, 'কিন্তু পাইপটা ওখানে না থাকলে কী যে হত, তাই ভেবেই আমার গা এখনও শিউরে উঠছে। বিমল, তুমি আজ বেঁচে গেছ দৈবগতিকে।'
বিমল বললে, 'বন্ধু' পাইপটা না পেলেও আমি বোধহয় মরতুম না। দড়ি ছেঁড়বার আগেই দড়ি ছেড়ে দোতলার কার্নিশ ধরে ঝুলতে পারতুম। আর দৈবের কথা বলছ? দৈবের সুযোগ তারাই নিতে পারে, বুদ্ধি যাদের অন্ধ নয় আর সাহস যাদের সর্বদাই সজাগ। দ্যাখো, অবলা যে দুরাত্মা সে বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। কিন্তু কেবলমাত্র সাহসী আর বুদ্ধিমান বলেই বারবার বেঁচে যাচ্ছে সে দৈবের মহিমায়।...যাক, এখন আর এসব আলোচনার সময় নেই। তুমি এখন এক কাজ করো কুমার। দৌড়ে এই বাড়ির সদর দিয়ে ভিতরে ঢুকে দ্যাখোগে যাও, সুন্দরবাবুরা অবলাকে ধরতে পারলেন কি না। যে—জানলা দিয়ে অবলা তেতলার ঘরে ঢুকেছে ওই জানলা থেকেই তুমি আমাকে সব খবর দিয়ো।'
কুমার বললে, 'খবর দেব মানে? তুমি কি এইখানেই থাকবে?'
—'নিশ্চয়। নইলে অবলা যদি আবার ওই জানলা দিয়ে বেরিয়ে চম্পট দেয়?'
—'কিন্তু তার পালাবার উপায় তো আর নেই। দড়ি তো সে নিজের হাতেই কেটে দিয়েছে।'
বিমল একটু বিরক্ত হয়ে বললে, 'আঃ, কুমার! যা বলি, শোনো। ওটা হচ্ছে অবলার নিজের বাসা। আর একগাছা নতুন দড়ি সংগ্রহ করতে তার বেশিক্ষণ লাগবে না। যাও, আর দেরি কোরো না, আমি এখানে পাহারায় রইলুম।'
কুমারের মনটা খুঁতখুঁত করতে লাগল, তবু আর কিছু না—বলে সে অগ্রসর হল।
উঠান থেকে বেরিয়ে জঙ্গলময় বাগানের ভিতরে গিয়ে দেখলে, বড়ো বড়ো গাছের ছায়া হেলে পড়েছে পূর্বদিকে। আন্দাজে বুঝলে, বেলা হয়েছে প্রায় দুটোর কাছাকাছি। কোন সকালে সে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, পেটে এখনও অন্ন—জল পড়েনি। বিশেষ, তার এত তৃষ্ণা পেয়েছিল যে বাগানের সেই পানায় সবুজ পুকুরের দিকেই সে কয়েক পা এগিয়ে না গিয়ে পারলে না। কিন্তু তারপরেই তার মনে হল বিমলের কথা। কাল থেকে সে অন্ন—জলের স্পর্শ পায়নি, তবু এখনও সমস্ত কষ্ট সহ্য করে আছে অম্লান মুখে! নিজের দুর্বলতায় লজ্জিত হয়ে কুমার আবার ফিরে এসে পাঁচ নম্বরের বাড়ির খিড়কির দরজা খুঁজতে লাগল।
সুন্দরবাবু ঠিক বলেছেন। এটা কি বাড়ি না গোলকধোঁধা! রাবিশের পাহাড়, ঝোপঝাপ, জঙ্গল ও কাঁটাবনের ভিতর থেকে আসল পথটি বার করে নিতে তার বেশ কিছুক্ষণ লাগত, কিন্তু একজন পাহারাওয়ালা তাকে দেখতে পেয়ে বাড়ির মধ্যে ঢোকবার পথ বাতলে দিলে।
ভিতরে ঢুকে সিঁড়ি দিয়ে উঠেই সে দেখলে, দোতলার বারান্দায় সুন্দরবাবু একখানা চেয়ারের উপরে শুকনো মুখে চুপ করে বসে আছেন এবং তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে আছে কাঠের পুতুলের মতন জন—চারেক পাহারাওয়ালা।
কুমার শুধোলে, 'কী খবর সুন্দরবাবু? এখানে বসে কেন?'
সুন্দরবাবু হাসবার জন্যে বিফল চেষ্টা করে বললেন, 'আপনাদের পথ চেয়ে বসে আছি আর কি!'
—'তার মানে?'
—'আমি জানি সার্কাসের খেলোয়াড়দের মতো দড়ি বেয়ে তেতলায় উঠে আপনারা আবার নীচে নেমে আসবেন। তারপর আপনাদের নামতে দেরি হচ্ছে দেখে চারজন সেপাইকে ওপরে পাঠিয়ে আমি এইখানেই বসে অপেক্ষা করছি। কিন্তু আপনি একলা এদিক দিয়ে এলেন কেন?'
—'সে কথা পরে বলছি। কিন্তু তার আগে জানতে চাই, আপনি কি এখনও অবলার খোঁজ করেননি?'
সুন্দরবাবু শ্রান্ত স্বরে বললেন, 'হুম, করেছি বইকী কুমারবাবু, করেছি বইকী! দোতলা একতলা সব তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখেছি—কোথাও অবলা হতভাগা নেই! সদর—দরজার সেপাইদের মুখে শুনলুম, এ—বাড়ি থেকে জনপ্রাণী বাইরে বেরোয়নি। কিন্তু বিমলবাবু কোথায়? তিনি তো এতক্ষণে তেতলায় উঠেছেন?'
কুমার খুব সংক্ষেপে বিমলের খবর জানালে।
সুন্দরবাবু সবিস্ময়ে বললেন, 'হুম। ত্যাঁদোড় আসামির কথা তো আমি জীবনে কখনও শুনিনি। এই একখানা বাড়ির ভিতরেই বসে এতগুলো মানুষকে নিয়ে সে যা—ইচ্ছে—তাই করছে? কী দুর্দান্ত লোক রে বাবা! যান কুমারবাবু, শিগগির তেতলায় যান, ওপরে চারজন সেপাই আছে—আপনার কোনও ভয় নেই। আমি এইখানেই ঘোঁটি আগলে বসে রইলুম!'
—'আপনিও আমার সঙ্গে এলে ভালো হত না?'
সুন্দরবাবু করুণ স্বরে বললেন, 'কিন্তু আমাকে কিছুক্ষণের জন্যে মাপ করুন ভায়া, একে খিদের জ্বালায় ছটফট করে মরছি, তার ওপরে তেষ্টার চোটে প্রাণ করছে টা—টা! এখন উঠে দাঁড়ালে আমি হয়তো মাথা ঘুরেই পড়ে যাব। এক ঠোঙা খাবার আনতে পাঠিয়েছি, কিঞ্চিৎ জলযোগ না করলে আমি তো আর নড়তে পারছি না!'
এমন কাঁচুমাচু মুখে সুন্দরবাবু কথাগুলো বললেন যে, কুমার কোনও প্রতিবাদ করতে পারলে না। কেবল বললে, 'আমি যাচ্ছি, কিন্তু আপনার রিভলভারটা একবার আমাকে দেবেন কি?'
সুন্দরবাবু বিনাবাক্যব্যয়ে 'বেল্ট' থেকে রিভলভারটা খুলে নিয়ে কুমারের হাতে সমর্পণ করলেন।
কুমার তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে তেতলায় উঠে গিয়ে দেখে, ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে চারজন পাহারাওয়ালা।
জিজ্ঞাসা করলে, 'তোমরা কি ওই ঘরগুলো খুঁজে দেখেছ?'
তারা জানালে, খুঁজে দেখেছে বটে, কিন্তু কেউ কোথাও নেই।
কুমার বললে, 'অসম্ভব। আসামি তেতলাতেই লুকিয়ে আছে।'
সে ছুটে গিয়ে আগেই চোর—কুঠরির ভিতরে ঢুকল। ঘরে কেউ নেই।
তারপর এগিয়ে গিয়ে গরাদহীন জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়েই সচমকে দেখলে, বাইরের হুকে ঝুলছে দুইগাছা দড়ি—তার একগাছা ছেঁড়া এবং আর একগাছা নেমে গিয়েছে প্রায় নীচেকার উঠান পর্যন্ত।
তাহলে বিমলের সন্দেহই সত্যে পরিণত হল? নতুন দড়ি ঝুলিয়ে অবলা আবার সরে পড়েছে?
কিন্তু সে পালাবে কেমন করে? উঠানের উপরে পাহারা দিচ্ছে যে বিমল নিজে!
কুমার বুক পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়ে উঠানের চারিদিকে দৃষ্টিপাত করলে। সেখানে বিমল বা অবলার কারুর কোনও চিহ্নই নেই!
কুমার আশ্চর্য হয়ে ভাবতে লাগল, বিমলের সাবধানি চোখকে ফাঁকি দিয়ে অবলা নিশ্চয়ই নামতে পারেনি; আর এ—বিষয়েও একতিল সন্দেহ নেই যে, প্রাণ থাকতে বিমল কখনওই তাকে পালাতে দেবে না! তবে?...তবে কি এরই মধ্যে বিমলের সঙ্গে তার হাতাহাতি হয়ে গেছে? আর জয়ী হয়েছে অবলাই? না, এটাও সম্ভব নয়। বিমলের মতো বলবান লোক বাংলাদেশে বেশি নেই, এত শীঘ্র সে কাবু হবার ছেলে নয়! কিন্তু অবলার সঙ্গে সেও অদৃশ্য কেন? তবে কি বিমল আবার শত্রুর পিছনে পিছনে ছুটেছে?
কুমার চিৎকার করে অনেকবার বিমলের নাম ধরে ডাকলে, কিন্তু কোনও সাড়া পেলে না!
ভীত, চিন্তিত মুখে সে দ্রুতপদে আবার দোতলায় নেমে এসে উত্তেজিত স্বরে বললে, 'সুন্দরবাবু, সুন্দরবাবু। অবলা নতুন দড়ি বেয়ে ফের নীচে নেমে অদৃশ্য হয়েছে, বিমলেরও দেখা নেই।'
খাবারের ঠোঙা থেকে একখানা কচুরি নিয়ে সুন্দরবাবু তখন সবে প্রথম কামড় বসাবার জন্যে মুখব্যাদান করেছেন; কিন্তু খবর শুনেই তাঁর পিলে চমকে গেল রীতিমতো! মহা বিস্ময়ে বলে উঠলেন, 'এ কী রকম জাঁহাবাজ আসামি রে বাবা! এ যে পারার ফাঁটার মতো হাতের মুঠোর ভেতর থেকেও ধরা দেয় না! হুম, আমাকে হাল ছাড়তে হল দেখছি।'
কুমার ক্রুদ্ধস্বরে বললে, 'তাহলে হাল ছেড়ে খাবারের ঠোঙা নিয়ে আপনি এইখানেই বসে থাকুন, আমি একলাই চললুম আমার বন্ধুর সন্ধানে।'
সুন্দরবাবু বললেন, 'আ হা হা, চটেন কেন মশাই? সব সময় কি মুখের কথাই সত্যি কথা হয়? আমার কি কর্তব্যজ্ঞান নেই? এই রইল আমার খাবারের ঠোঙা—আর রইল আমার মুখের কচুরি, কোথায় যেতে হবে চলুন—হুম!'
সপ্তম পরিচ্ছেদ
জয়ন্ত ও মানিকের প্রবেশ
আবার সেই পোড়োবাড়ির জঙ্গলভরা উঠান!
সুন্দরবাবু বললেন, 'ওই অলক্ষুণে পাঁচ নম্বরের বাড়ি আর এই হতচ্ছাড়া উঠান! আমাদের কি আজ এরই মধ্যে লাট্টুর মতো বাঁ বাঁ করে ঘুরে মরতে হবে?'
কুমার কোনও কথা না বলে একেবারে উঠানের সেইখানে গিয়ে হাজির হল, খানিক আগে সে যেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল বিমলকে।
সেখানে ভিজে মাটির উপরে রয়েছে অনেকগুলো পায়ের দাগ এবং আরও নানারকম চিহ্ন। কুমার সেগুলোর দিকে তাকিয়ে নতুন কোনও সূত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করছে, এমন সময়ে উঠানের ভিতরে প্রবেশ করলে আর দুজন নতুন লোক।
কিন্তু নতুন লোক হলেও তারা আমাদের অচেনা নয়। কারণ তাদের একজন হচ্ছে বিখ্যাত শখের ডিটেকটিভ জয়ন্ত এবং আর একজন তার বন্ধু মানিক।
সুন্দরবাবু আনন্দে নেচে উঠে বললেন, 'আরে আরে—হুম। কোথায় ছিলে হে তোমরা? কেমন করে আমাদের খোঁজ পেলে? ভারী আশ্চর্য তো!'
জয়ন্ত বললে, 'কিছুই আশ্চর্য নয়। আমরা গিয়েছিলুম বিমলবাবুর সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে রামহরির মুখে সব শুনে সিধে এখানে চলে এসেছি। ব্যাপার কী বলুন দেখি? আসামি কি ধরা পড়েছে? বিমলবাবুকে দেখছি না?'
সুন্দরবাবু বললেন, 'আসামিরও খোঁজ নেই, বিমলবাবুও অদৃশ্য। ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছি না।'
জয়ন্ত বললে, 'কুমারবাবু, সংক্ষেপে আমাকে ব্যাপারটা বলতে পারবেন?'
কুমার খুব অল্প কথায় প্রধান প্রধান ঘটনাগুলো বর্ণনা করলে।
সমস্ত শুনে জয়ন্ত উদ্বিগ্ন স্বরে বললে, 'বলেন কী কুমারবাবু? কিন্তু আপনি চুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী করছেন?'
—'মাটির ওপরের ওই দাগগুলো পরীক্ষা করছি।'
মানিক নীচের দিকে তাকিয়ে বললে, 'তাই তো, এখানে যে অনেক রকম দাগ রয়েছে! জয়ন্ত, তোমাকে সবাই তো পদচিহ্ন—বিশারদ বলে জানে, এখানকার মাটি দেখে কিছু আবিষ্কার করতে পারো কি না দ্যাখো না!'
জয়ন্ত তখনই মাটির উপরে বসে পড়ল। তারপর মিনিট—পাঁচেক ধরে নীরবে সমস্ত পরীক্ষা করে বললে, 'হুঁ, কিছু কিছু বোঝা যাচ্ছে বটে। কুমারবাবু, এই একজোড়া পদচিহ্ন দেখুন। খুব স্পষ্ট, নিখুঁত চিহ্ন, আর বেশ গভীর। কেউ এখানে খানিকক্ষণ ধরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল, আর সেই জন্যেই ছাপ এমন স্পষ্ট উঠেছে। আমার বিশ্বাস, এ পায়ের দাগ হচ্ছে আমাদের বন্ধু বিমলবাবুর।'
কুমার বললে, 'হ্যাঁ, বিমল ওইখানেই ছিল বটে।'
—'তারপরেই দেখছি অনেকখানি ঠাঁই জুড়ে একটা লম্বা—চওড়া দাগ। আর ওই ভাঙাবাড়ির দিক থেকে দু—জোড়া পায়ের দাগ এই লম্বা—চওড়া দাগের কাছে এসে থেমেছে। ব্যাপারটা বুঝছেন? লম্বা—চওড়া দাগটা দেখে অনুমান করছি, একটা মানুষের দেহ এখানে আছাড় খেয়েছে! আর ওই দু—জোড়া দাগের আকার দেখে বেশ বোঝা যায়, ওগুলো হচ্ছে ছুটন্ত লোকের পায়ের ছাপ। হুঁ, দুজন লোক ভাঙাবাড়ির দিক থেকে ছুটে এসেছে একজন ভূপতিত লোকের কাছে! কেবল তাই নয়, দেখুন কুমারবাবু, দেখুন! ওই ঝুলন্ত দড়ির তলা থেকেও আর একজোড়া পায়ের দাগও এইখানে এসে থেমেছে। আন্দাজ বলতে পারি, এ হচ্ছে অবলার পদচিহ্ন। তাহলে হিসাবে কী পাই? একজন ভূতলশায়ী লোক আর তিনজন দণ্ডায়মান লোক! না, তারা কেবল দাঁড়িয়েই ছিল না, এখানে হাঁটু গেড়ে বসেও পড়েছিল। এই দেখুন, ভিজে মাটির উপরে তিনজোড়া হাঁটুর চিহ্ন! আমার সন্দেহ হচ্ছে, বিমলবাবু পড়ে গিয়েছিলেন, আর তিনজন লোক এসে তাঁকে মাটির ওপরে চেপে ধরেছিল!'
কুমার রুদ্ধশ্বাসে কাতরভাবে বললে, 'জয়ন্তবাবু, আর কিছু বুঝতে পারছেন?'
জয়ন্ত ভূতলে দৃষ্টি সংলগ্ন রেখেই উঠে দাঁড়িয়ে বললে, 'পারছি বইকী! এই দেখুন, তিনজোড়া পায়ের দাগ চলেছে আবার ওই ভাঙাবাড়ির দিকে, আর তাদের সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে মাটির ওপর দিয়ে একটা ভারী দেহ টেনে নিয়ে যাওয়ার চিহ্ন।...সবই তো বেশ বোঝা যাচ্ছে। কুমারবাবু, আপনার বন্ধু বিপদে পড়েছেন! এই দাগ ধরে আমি অগ্রসর হই, আপনারা সবাই আসুন আমার পিছনে পিছনে!'
জয়ন্ত এগুলো। কিন্তু গেল—বারে বিমলের সঙ্গে কুমার ভাঙাবাড়ির ডানদিকে গিয়েছিল, এবারে জয়ন্ত সে দিকে গেল না। বাঁদিকে এগিয়ে ছাদ—ভাঙা দালানে উঠল। পাশাপাশি খানকয় ঘর—একটা ঘর ছাড়া সব ঘরই দরজা খোলা।
বন্ধ—দ্বারের উপরে করাঘাত করে জয়ন্ত বললে, 'এ ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ কেন?' বলেই সে জীর্ণ দরজার উপরে পদাঘাত করলে সজোরে এবং পরমুহূর্তে অর্গল ভেঙে খুলে গেল দ্বার সশব্দে।
জয়ন্ত, কুমার, মানিক ও সুন্দরবাবুর সঙ্গে পাহারাওয়ালারা বেগে ভিতরে প্রবেশ করলে। ঘর কিন্তু শূন্য।
সে—ঘরের ভিতর দিয়ে আর একটা ঘরে যাবার দরজা এবং সে—দরজাও বন্ধ।
এবারের দরজাটা তেমন জীর্ণ ছিল না বটে, কিন্তু মহা—বলবান জয়ন্তের ঘন ঘন পদাঘাত সহ্য করবার শক্তি তার বেশিক্ষণ হল না। আবার গেল তারও হুড়কো ভেঙে।
ঘরের ভিতর ঢুকে দেখা গেল এক ভয়াবহ দৃশ্য!
প্রায়—অন্ধকার ঘর, প্রথমটা ভালো করে নজরই চলে না। কেবল এইটুকুই আবছা আবছা বোঝা গেল, একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে এক স্থিরমূর্তি।
জয়ন্ত তাড়াতাড়ি রিভলভার বার করে বললে, 'কে তুমি ওখানে দাঁড়িয়ে?'
সাড়া নেই।
—'জবাব দাও, নইলে মরবে!'
তবু সাড়া নেই।
পাহারাওয়ালারা দুটো জানালা খুলে দিল।
একটা পুরানো তেপায়ার উপরে দাঁড়িয়ে আছে বিমল। তার মুখ কাপড় দিয়ে বাঁধা।
কুমার দৌড়ে তার কাছে গেল।
জয়ন্ত ভীতকণ্ঠে বললে, 'এ কী ভয়ানক! দ্যাখো মানিক, কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে দ্যাখো!'
কড়িকাঠের একটা কড়ায় বাঁধা একগাছা রজ্জু এবং সেই রজ্জুর অপর প্রান্ত সংলগ্ন রয়েছে বিমলের কণ্ঠদেশে! বিমলের হাত দুখানা পিছমোড়া করে বাঁধা এবং তার দুই পায়েও দড়ির বাঁধন!
কুমার বিভ্রান্তের মতন বলে উঠল, 'বিমল! বন্ধু! তোমার গলায়—'
জয়ন্ত দুই হাতে বিমলের দেহ ধরে নামিয়ে বললে, 'কার পকেটে ছুরি আছে? শিগগির বিমলবাবুর গলার আর হাত—পায়ের দড়ি কেটে দাও।'
সুন্দরবাবুর কথামতো কাজ করলেন। মানিক দিলে মুখের বাঁধন খুলে।
জয়ন্ত দুই চক্ষু বিস্ফারিত করে বললে, 'সর্বনাশ! বিমলবাবু, গলায় ফাঁস পরে আপনি যে শূন্যে দোলও খেয়েছেন দেখছি! দেখুন সুন্দরবাবু, গলার চারিদিকে রাঙা টকটকে দড়ির দাগ!'
সুন্দরবাবু শিউরে উঠে বললেন, 'হুম!'
বিমল মুখ টিপে একটু হাসলে বটে, কিন্তু তার দুই চোখ তখন অশ্রুসজল।
কুমার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল, কারণ বিমলকে সে কাঁদতে দেখেনি কখনও!
বিমল বললে, 'তুমি অবাক হয়ে গেছ কুমার? ভাবছ আমার চোখে কান্নার জল? না বন্ধু, না! এ কান্নার অশ্রু নয়, এ হচ্ছে রুদ্ধ ক্রোধ আর নিষ্ফল আক্রোশের অশ্রু। অবলা ঠিক কলের পুতুলের মতন আমাদের নাচিয়ে নাচিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। তাকে ধরব কি, তার হাতে বারবার ধরা পড়ছি আমি নিজেই! আর এবারে খালি ধরাই পড়িনি—চক্ষের সামনে দেখেছি নিশ্চিত মৃত্যুর ঘোর অন্ধকার!'
কুমার বললে, 'কিন্তু কী করে তুমি বন্দি হলে? অবলা তো ছিল তেতলায়!'
বিমল বললে, 'হ্যাঁ। অবলা ছিল তেতলায়। আমি দাঁড়িয়েছিলুম উঠোনের ওপরে। আমার দৃষ্টি তেতলার জানলা ছেড়ে আর কোনও দিকে তাকায়নি, কারণ এখানে অবলা ছাড়া দ্বিতীয় কোনও শত্রু থাকতে পারে, এমন সম্ভাবনা আমার মনে জাগেনি!...দাঁড়িয়ে আছি, আচমকা পিছন থেকে 'ল্যাসো'র মতন দড়ির একটা ফাঁসকল এসে পড়ল আমার গলার ওপর। কিছু বলবার আগেই অদৃশ্য হাতের বিষম এক হ্যাঁচকা টানে পরমুহূর্তেই দড়াম করে মাটির ওপরে পড়ে গেলুম। আঘাত পেয়ে দু—এক মিনিট অজ্ঞানের মতো হয়ে রইলুম।...সাড় হতে দেখি, আমি এই ঘরের ভিতরে রয়েছি—আমার মুখ, হাত, পা, সব বাঁধা আর আমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে অবলার সঙ্গে আরও দুজন লোক। আমি—'
হঠাৎ বাধা দিয়ে সুন্দরবাবু বলে উঠলেন, 'বিমলবাবু! এতক্ষণ লক্ষ করে দেখিনি, কিন্তু আপনার গলায় ওটা কী ঝুলছে?'
—'জেরিনার কণ্ঠহার।'
—'জেরিনার কণ্ঠহার?'
—'হ্যাঁ, অবলার উপহার!'
—'বলেন কি মশাই, বলেন কি? যে মহামূল্যবান হিরের হারের জন্যে এত কাণ্ড, অবলা সেইটেই আপনাকে উপহার দিয়েছে?'
—'আমাকে নয়, আপনাদের। কারণ অবলা জানে, কড়িকাঠের দড়িতে এখন আমার মৃতদেহ আড়ষ্ট হয়ে ঝুলছে!'
কুমার অধীর কণ্ঠে বললে, 'বিমল, ও কথা রেখে এখন আসল কথা বলো।'
—'তাই বলি! অবলা খিলখিল করে খুব খানিকটা হেসে নিয়ে বললে, 'এই যে, বাছাধনের যে জ্ঞান হয়েছে দেখছি! বামন হয়ে চাঁদ ধরবার লোভ করেছিলে, এখন লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু হবে বইকী! বড্ড বেশি লেগেছে বুঝি? কি করব খোকাবাবু, আমার যে মোটেই সময় নেই, নইলে আদর করে দু—দণ্ড তোমার গায়ে হাত বুলিয়ে দিতুম! যাক, আর বেশিক্ষণ তোমাকে কষ্ট দেব না, এবারে একেবারে সব জ্বালা তোমার জুড়িয়ে দিচ্ছি!...ওরে ভোঁদা, কড়িকাঠের কড়ায় দড়িটা বাঁধা হল?...হয়েছে? আচ্ছা।' এই বলে সে নিজের পকেট থেকে একছড়া হিরের হার বার করলে। তারপর হারছড়া আমার গলায় পরিয়ে দিয়ে বললে, 'এই নাও ছোকরা জেরিনার কণ্ঠহার পরো। শুনে অবাক হচ্ছ? অবাক হয়ো না। কারণ এটি হচ্ছে নকল জেরিনার কণ্ঠহার। বিজয়পুরের মহারাজা ভারী চালাক, আমাদের জন্যে লোহার সিন্দুকে এই নকল হারছড়া রেখে, আসল জিনিস সরিয়ে রেখেছেন অন্য কোথাও! আর এই কাচের নকল হার বোকার মতো চুরি করে এনে আমরা বিপদ—সাগরে নাকানি—চোবানি খেয়ে মরছি! ও হার তোমার গলায় রইল, এখন পুলিশ এসে ওটাকে উদ্ধার করবে অখন! আমাকে এখন যেতে হবে, কিন্তু তার আগে তোমার একটা ব্যবস্থা করে যেতে চাই!...ওরে ভোঁদা, ওরে উপে! চেয়ারখানা এদিকে টেনে নিয়ে আয় তো! হ্যাঁ, এইবার ছোকরাকে ওর ওপরে তুলে দাঁড় করিয়ে দে।' তারা হুকুম তামিল করলে। তারপর আমার গলায় পরিয়ে দিলে দড়ির ফাঁস। অবলা বললে, 'বিমলভায়া, চোখে ধোঁয়া দেখবার আগে মনে মনে ভগবানকে ডেকে নাও। যদিও তুমি আমাকে যথেষ্ট জ্বালিয়েছ, তবু তোমার মতো ক্ষুদ্র জীবকে বধ করবার ইচ্ছা আমার ছিল না। কিন্তু জানো তো, মাঝে মাঝে পিঁপড়ের মতন তুচ্ছ প্রাণীকেও না মারলে চলে না? আমি আবার বিজয়পুরের মহারাজার অনাহুত অতিথি হতে চাই, এবারে আসল জেরিনার কণ্ঠহার না নিয়ে ফিরব না! কিন্তু তুমি বেঁচে থাকলে আবার আমাকে বাধা দেবার চেষ্টা করবে! তাই—' ঠিক এই সময়ে বাহির থেকে আর—একজন লোক ছুটে এসে বললে, 'বাবু, পুলিশের লোক আবার উঠোনের ওপর এসেছে!' অবলা ব্যস্ত হয়ে বললে, 'ভোঁদা, যা—যা, শিগগির ছুটে গিয়ে মোটরখানা বার করে 'স্টার্ট' দে, আর এ—বাড়িতে নয়!' তারপর আমার দিকে ফিরে বললে, 'বিমল, আরও মিনিট তিন—চার তোমার সঙ্গে গল্প করব ভেবেছিলুম, কিন্তু তা আর হল না। শুনেছি তুমি নাকি 'অ্যাডভেঞ্চার' ভালোবাসো—এইবার তোমার চরম অ্যাডভেঞ্চারের পালা! যাও, এখন 'দুর্গা' বলে পরলোকের পথে যাত্রা করো।' সে একটানে চেয়ারখানা আমার পায়ের তলা থেকে সরিয়ে নিয়ে বেগে দৌড়ে চলে গেল! ঝপাং করে আমার দেহ ঝুলে পড়ল—গলায় লাগল বিষম হ্যাঁচকা টান। সেই মুহূর্তেই হয়তো আমার দফারফা হয়ে যেত, কিন্তু আমি আগে থাকতেই এর জন্য প্রস্তুত ছিলুম, গলার সমস্ত মাংসপেশি ফুলিয়ে শক্ত আর আড়ষ্ট করে প্রথম ধাক্কাটা সামলে নিলুম—যদিও ভয়ানক যন্ত্রণায় প্রাণ হল বেরিয়ে যাবার মতো! তুমি জানো কুমার, আমার মতো যারা নিয়মিতভাবে খুব বেশি ব্যায়াম অভ্যাস করে, তারা শরীরের যে কোনও স্থানের মাংসপেশি ইচ্ছা করলেই লোহার মতন কঠিন করে তুলতে পারে, তখন মুগুরের আঘাতও অটলভাবে সহ্য করা অসম্ভব হয় না! কাজেই গলায় দড়ির চাপ কোনওরকমে সামলে নিলুম—যদিও এ উপায়ে বেশিক্ষণ আত্মরক্ষা করতে পারতুম না। বেশিক্ষণ এভাবে থাকবারও দরকার হল না, কারণ আগেই দেখে নিয়েছিলুম ওই তেপায়াটা! পুলিশের ভয়ে অত্যন্ত তাড়াতাড়ি পালাতে হল বলে অবলা ওর দিকে ফিরে চাইবার সময় পায়নি, নইলে নিশ্চয়ই ওটাকে সরিয়ে ফেলত। বার—দুয়েক ঝাঁকি মেরে দোল খেয়ে আমি কোনওরকমে ওর ওপরে গিয়ে দাঁড়ালুম। তারপর খানিকক্ষণ যে কী ভাবে কেটেছে, তা জানেন খালি আমার ভগবান! পুরনো, নড়বড়ে তেপায়া, আমার ভারী দেহের ভারে টলমল ও মচমচ শব্দ করতে লাগল। প্রতি মুহূর্তেই ভয় হয়—এই বুঝি পটল তুলি! এক এক সেকেন্ডকে মনে হয় এক এক ঘণ্টা! সে যেন মরণাধিক যন্ত্রণা! তারপর—তারপর আর কী, ঘটনাস্থলে তোমাদের আবির্ভাব, যমালয়ের দ্বার থেকে আমার প্রত্যাবর্তন!'
সুন্দরবাবু সহানুভূতি—মাখা স্বরে বললেন, 'হুম, বিমলবাবু, হুম! না—জানি আপনার কতই লেগেছে! কিন্তু বিজয়পুরের মহারাজাটা তো ভারী বদ লোক দেখছি! চোরে যে নকল হিরের হার চুরি করেছে এ—কথাটা আমাদেরও কাছে প্রকাশ করেনি!'
কুমার বললে, 'ও—সব কথা পরে হবে, এখন আমাদের কী করা উচিত? বিমলের কথায় বোঝা গেল, অবলা তার দলবল নিয়ে মোটরে চড়ে এখান থেকে সরে পড়েছে!'
বিমল বললে, 'এর পর তার দেখা পাব আমরা বিজয়পুরের মহারাজার ওখানেই। জেরিনার কণ্ঠহার ছেড়ে সে অন্য কোথাও নড়বে না। সেইখানেই আর একবার তার সঙ্গে শক্তি—পরীক্ষা করব!..হ্যাঁ, ভালো কথা! জয়ন্তবাবু, মানিকবাবু! আপনারাও এখানে যে?'
জয়ন্ত বললে, 'এখন বাড়ির দিকে চলুন! চুম্বক কেন যে লোহাকে টেনেছে, পথে যেতে যেতে সে কথা বলব অখন!'
অষ্টম পরিচ্ছেদ
নৈশ অভিনয়
বিজয়পুরের মহারাজাবাহাদুর যে বাড়িখানা ভাড়া নিয়েছেন, ঠিক তার সামনেই একখানা ছোটো তেতলা বাড়ি।
বড়ির উপর—তলার রাস্তার ধারে এক ঘরে জানলার কাছে বসেছিল একজন বিপুলবপু পুরুষ। তার দেহখানা এত বড়ো যে দেখলেই মনে হয়, ওই চেয়ারখানা ভার সইতে না পেরে এখনই মড়মড় করে ভেঙে পড়বে।
এইমাত্র ক্ষৌরকার্য সমাপ্ত করে সে 'স্ট্রপে'র উপরে ক্ষুর ঘষতে ঘষতে ডাকলে, 'উপে!'
দরজা ঠেলে একজন লোক ঘরের ভিতরে ঢুকেই চমকে উঠল।
ক্ষুরখানা খাপের ভিতরে ঢুকিয়ে মেয়ে—গলায় খিলখিল করে হেসে উঠে প্রথম লোকটি বললে, 'কী রে, আমাকে দেখেই চমকে উঠলি বড়ো যে?'
উপে বললে, 'আজ্ঞে, দাড়ি—গাঁফ কামিয়েছেন বলে আপনাকে এখন সহজে আর চেনা যাচ্ছে না!'
—'হুঁ, তাই তো আমি চাই! আমাকে দেখে চিনতে পারলে পুলিশ অবলা বলে ছেড়ে দেবে না। কিন্তু মুশকিলে পড়েছি আমার এই প্রকাণ্ড দেহখানা নিয়ে। গাঁফ—দাড়ি কামিয়ে ফেলা যায়, কিন্তু বড়ো চেহারা তো ছেঁটেছুটে ছোটো করা যায় না! আমার বেয়াড়া দেহটা দেখলেই যে লোকে ফিরে—ফিরে তাকায়, আর আমার হতচ্ছাড়া মেয়েলি গলার আওয়াজ! এ গলা যে একবার শোনে সে আর ভোলে না। উপে রে, একটু চালাক লোক হলেই আমার ছদ্মবেশ ধরে ফেলতে পারবে!'
উপে বললে, 'কর্তা, আপনি রাজবাড়ির এত কাছে এসে ভালো করেননি। পুলিশ এখন ভারী সাবধান, চারিদিকে আপনাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে!'
অবলা বললে, 'হ্যাঁ, খুঁজে বেড়াচ্ছে বটে, তবে রাজবাড়ির এত কাছে নয়। ওই ভুঁদো সুন্দর—দারোগাকে আমি খুব চিনি, তার নজর থাকবে এখন টালিগঞ্জের দিকেই। আমরা যে ভরসা করে রাজবাড়ির এত কাছে আসব, এ সন্দেহ কেউ ভুলেও করতে পারবে না। এখানেই আমরা বেশি নিরাপদ। কিন্তু সে কথা এখন থাক। শ্যামা এসে রাজবাড়ির কোনও খবর দিয়ে গেছে?'
——'হ্যাঁ কর্তা! শ্যামা এইমাত্র এসে বলে গেল, আসল কণ্ঠহার আছে রাজার শোবার ঘরে, ড্রেসিং টেবিলের ডানদিকের টানায়।'
—'হুঁ, বিজয়পুরের রাজা দেখছি মহা বুদ্ধিমান ব্যক্তি! তিনি নকল হার রাখেন সিন্দুকে লুকিয়ে, আর আসল জিনিস রাখেন প্রায় প্রকাশ্য জায়গায়! তিনি বেশ জানেন যে, সাধারণ লোকের চোখ আগেই খোঁজে লোহার সিন্দুক। চমৎকার ফন্দি।'
—'শ্যামা আরও বললে, রাজার শোবার ঘরের ঠিক সামনে দিনরাত একজন বন্দুকধারী সেপাই মোতায়েন থাকে।'
অবলা বললে, 'ও সেপাই—টেপাইকে আমি থোড়াই কেয়ার করি। তাদের চোখে ধুলো দিতে বেশি দেরি লাগবে না।'
—কিন্তু কর্তা, শ্যামা যে আজই রাজবাড়ির কাজ ছেড়ে দিতে চায়। তাকে নাকি সকলে সন্দেহ করছে।'
—'তা এখন কাজ ছাড়লে আমার কোনও ক্ষতি নেই। যে—কারণে তাকে রাজবাড়িতে কাজ নিতে বলেছিলুম আমার সে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে। তবে আজকের দিনটা সবুর করতে বলিস।'
ঠিক এই সময়ে দড়াম শব্দে ঘরের দরজা খুলে একটা লোক ভিতরে ঢুকেই উৎফুল্ল স্বরে বলে উঠল, 'কেল্লা ফতে বাবু, কেল্লা ফতে।'
অবলা বললে, 'কী রে ভোঁদা, ব্যাপার কী?'
—'বিমল বেটা পটল তুলেছে!'
—'ঠিক বলছিস তো?'
—'বাবু, বেঠিক কথা বলবার ছেলে আমি নই। একেবারে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে আমি খবর নিয়ে এসেছি। বিমলকে অজ্ঞান অবস্থায় কাল দুপুরে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু কিছুতেই তার জ্ঞান হয়নি। আজ ভোরবেলায় সে মারা পড়েছে।'
অবলা তার মস্ত বড়ো মুখে এক—গাল হেসে বললে, 'তাহলে আমার মুখ থেকে বিমল যেটুকু শুনেছিল, নিশ্চয়ই তার কিছুই প্রকাশ করতে পারেনি। বহুৎ আচ্ছা, এতক্ষণে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম। ভোঁদা তোড়জোড় সব ঠিক কর। বিমল যখন পরলোকে হাওয়া খেতে গেছে, তখন আজ রাত্রে আবার আমরা তারই বাগান দিয়ে রাজবাড়ি আক্রমণ করব।'
—'কিন্তু বাবু, ও—বাড়িতে সেই রামহরি বুড়ো তো এখনও আছে?'
—'সে বেটা আজ বিমলের শোকে আচ্ছন্ন হয়ে থাকবে, পাঁচিল টপকে কখন আমরা বাগানের ভেতরে গিয়ে ঢুকব, এটা জানতেও পারবে না।...এখন কী করতে হবে শোন ভোঁদা।'
—'বলুন কর্তা।'
—'জন—ছয়েক লোক নিয়ে আমরা রাজবাড়িতে ঢুকব। রাজবাড়ির পশ্চিমদিকের রাস্তায় রাত্রে লোকজন বড়ো চলে না, সেইখানে আমাদের একখানা মোটরগাড়ি থাকবে। শ্যামার মুখে খবর পেয়েছি, পূর্বদিকে রাজার শোবার ঘরে আসল কণ্ঠহার আছে। ও—বাড়ির অন্ধি—সন্ধি সব আমার জানা। রাজবাড়িতে ঢুকে তোকে নিয়ে এক জায়গায় লুকিয়ে থাকব। বাকি লোকদের নিয়ে উপে বারান্দা দিয়ে যাবে পশ্চিমদিকে। আগে গাছকয় দড়ি বারান্দা থেকে ঝুলিয়ে দেবে। তারপর এমন আওয়াজ করে কোনও দরজা—টরজা ভাঙবার চেষ্টা করবে, যাতে—করে বাড়ির লোকের ঘুম ভেঙে যায়। তারপর চোর এসেছে বলে সবাই যখন ব্যস্ত হয়ে পশ্চিমদিকে ছুটে যাবে, আমার লোকেরা দড়ি বেয়ে নীচে নেমে মোটরে চড়ে লম্বা দেবে—বুঝেছিস?'
ভোঁদা আহ্লাদে নাচতে নাচতে বললে, 'বুঝেছি কর্তা, বুঝেছি! বাড়ির সবাই যখন চোর ধরতে ছুটবে, তখন আমরা দুজনে ঢুকব রাজার শোবার ঘরে।'
উপে তারিফ করে বললে, 'উঃ, আমার কর্তার কী বুদ্ধির জোর! বলিহারি!'
অবলা বললে, 'ও বিমলছোকরা কিছু করতে না পারুক, আমাদের বড়োই জ্বালিয়ে মারছিল। পথের কাঁটা এখন সাফ। প্রথমটা আমি তাকে মারতে চাইনি। কিন্তু যে নিজে মরতে চায়, ভগবানও তাকে বাঁচাতে পারে না, আমি কী করব?'
সে—রাত্রির সঙ্গে চাঁদের সম্পর্ক ছিল না—অবশ্য কলকাতা শহরও আজকাল আর চাঁদের মুখাপেক্ষী নয়। গ্যাস ও ইলেকট্রিকের সঙ্গে মিতালি করে কলকাতা আজ চাঁদের গর্ব চূর্ণ করেছে। তবু এখানে চাঁদের আলো জাগে বটে, কিন্তু সে যেন বাহুল্য মাত্র।
রাত তখন দুটো বাজে—বাজে। পথে পথে লোকজন আর চলছে না। পাহারাওয়ালারা রোয়াকে ঘুমিয়ে পড়ে কণ্ঠকে নীরব, কিন্তু নাসিকাকে জাগিয়ে সরব করে তুলেছে। তাদের নাসাগর্জনে ভয় পেয়ে ঝিঁঝিপোকারা একেবারে চুপ মেরে গেছে।
হঠাৎ বিজাপুরের মহারাজার অট্টালিকার পাশের এক রাস্তার কয়েকটা গ্যাসের আলো যেন অকারণেই নিবে গেল। তারপরই জাগল একখানা মোটরগাড়ির আওয়াজ। গাড়িখানা অন্ধকার রাস্তার ভিতরে ঢুকে খানিক এগিয়েই থেমে পড়ল।
কিছুক্ষণ সমস্ত চুপচাপ।...মিনিট পনেরো কাটল।
তারপরেই আচম্বিতে চারিদিকের স্তব্ধতাকে যেন টুকরো টুকরো করে দিয়ে চিৎকার উঠল—'চোর, চোর! ডাকাত! এই সেপাই! এই দরোয়ান!' মুহূর্তের মধ্যে বহু কণ্ঠের কোলাহলে ও বহু লোকের পদশব্দে বেধে গেল এক মহা হুলুস্থুল।
বলা বাহুল্য, এই গোলমালের জন্ম বিজয়পুরের মহারাজের বাড়িতেই। পাড়াসুদ্ধ সকলের ঘুম ভেঙে গেল, এবং ছুটে গেল রোয়াকের পাহারাওয়ালার কত সাধের সুখস্বপ্ন! দেখতে দেখতে রাজপথের উপরে বৃহৎ এক জনতার সৃষ্টি হল!
কোথায় চোর, কারা চিৎকার করছে, সেসব কিছু বোঝবার আগেই সকলে শুনতে পেলে দ্রুতগামী এক মোটরের শব্দ।...
রাজবাড়ির দোতলার একটা ঘুপসি জায়গা থেকে বেরিয়ে পড়ে অবলা চুপিচুপি বললে, 'ভোঁদা, এইবার আমাদের পালা।'
দুজনে দ্রুতপদে, কিন্তু নিঃশব্দে পূর্বদিকে এগিয়ে গেল।
অবলা বললে, 'এই ঘর। যা ভেবেছি তাই। সেপাই গেছে চোর ধরতে। ঘরের দরজা খোলা, ভেতরে আলো জ্বলছে। ভোঁদা, একবার উঁকি মেরে ভেতরটা দেখ তো।'
ভোঁদা উঁকি মেরে দেখে নিয়ে বললে, 'ঘরের ভেতরে কেউ নেই।'
—'হুঁ, তাহলে রাজাবাহাদুরও চোর—ধরা দেখতে গেছেন। বহুৎ আচ্ছা। চল।'
দুজনে সিধে ঘরের ভিতরে গিয়ে দাঁড়াল। মাঝারি ঘর। একদিকে একখানা বড়ো খাট। আর একদিকে দুটো আলমারি এবং আর একদিকে একটা আয়নাওয়ালা ড্রেসিং— টেবিল।
অবলা তাড়াতাড়ি টেবিলের কাছে গিয়ে ডানদিকের একটা টানা জোর করে টেনে খুলে ফেললে। ভিতর থেকে একটা ছোটো বাক্স বার করে তার ডালা খুলেই আনন্দে অস্ফুট চিৎকার করে উঠল।
ইতিমধ্যে একটা আলমারির আড়াল থেকে বেরিয়ে এল অভাবিত দুই মূর্তি।
তাদের একজনের হাতে রিভলভার। সে বললে, 'কী দেখছ অবলাকান্ত? জেরিনার কণ্ঠহার?'
অবলা চমকে দুই পা পিছিয়ে গেল। তার মুখের ভাব বর্ণনাতীত।
—'কী অবলা, অমন করে তাকিয়ে আছ কেন হে? আমাদের চেনো না বুঝি? তাহলে শুনে রাখো, আমার নাম জয়ন্ত আর এর নাম মানিক। আমরা হচ্ছি শখের গোয়েন্দা—অর্থাৎ ঘরের খেয়ে তোমাদের মতন বনের মোষ তাড়াই। আমরা জানতুম, আজ হোক কাল হোক, তোমরা এখানে আসবেই। তাই তোমাদের অভ্যর্থনা করবার জন্যেই আমরা এখানে অপেক্ষা করছিলুম।...ওকি, ওকি, তুমি বন্ধুর পিছনে সরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছ কেন? আমার রিভলভার দেখে ভয় হচ্ছে বুঝি?'—বলতে বলতে জয়ন্ত পায়ে পায়ে এগুতে লাগল।
অবলা হঠাৎ পিছন থেকে ভোঁদাকে মারলে প্রচণ্ড এক ধাক্কা। ভোঁদা ঠিকরে একেবারে হুড়মুড় করে জয়ন্তের দেহের উপরে এসে পড়ল। জয়ন্ত এর জন্যে প্রস্তুত ছিল না, টাল সামলাতে না পেরে সেও ভোঁদাকে নিয়ে পড়ে গেল মাটির উপরে।
মানিক তাড়াতাড়ি হেঁট হয়ে জয়ন্তকে তুলতে গেল। জয়ন্ত নিজেকে ভোঁদার আলিঙ্গন থেকে মুক্ত করতে করতে বললে, 'আমাকে নয়—আমাকে নয় মানিক, তুমি ধরো অবলাকান্তকে।'
কিন্তু অবলা তখন ঘরের বাইরে। সে চোখের নিমেষে দোতলার বারান্দার রেলিং ধরে বাইরের দিকে ঝুলে পড়ল। তারপর রেলিং ছেড়ে অবতীর্ণ হল পাশের বাগানের পাঁচিলের উপরে। এবং সেখান থেকে একলাফে বাগানের ভিতরে। সে হচ্ছে বিমলের বাগান।
বাগানের চারিদিকে ফুটফুটে চাঁদের আলো। অবলা লাফ মেরে বসে পড়েই উঠে দাঁড়িয়ে সভয়ে দেখলে, একটা ঝাঁকড়া গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছে আবার দুই মূর্তি।
মূর্তি দুটো এগিয়ে এল। তারে দুজনেরই হাতে কী চকচক করছে? রিভলভার!
একটা মূর্তি হেসে উঠে বললে, 'আমাদের চিনতে পারছ অবলা? আমরা হচ্ছি বিমল আর কুমার। হ্যাঁ। তোমার মায়া কাটাতে পারলুম না, তাই যমালয় থেকেই ফিরে এলুম।'
—'হুম। বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এবার বধিব ঘুঘু তোমার পরান। হুম। হুম।' বলতে বলতে আর একদিক থেকে আবির্ভুত হলেন সুন্দরবাবু!
তারপরেই নানা দিক থেকে দেখা দিতে লাগল পাহারাওয়ালার পর পাহারাওয়ালা।
নবম পরিচ্ছেদ
সুন্দরবাবুর পুনরাগমন
মিথ্যা আর পলায়নের চেষ্টা! এটা বুঝে অবলা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, পাথরের মূর্তির মতো।
কুমার বললে, 'সুন্দরবাবু, অবলার মতো ধড়িবাজকে কিছু বিশ্বাস নেই। শিগগির ওর হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিন।'
—'ঠিক বলেছেন। এই অবলা, হুম। বার করো হাত, পরো লোহার বালা। আমি তোমাকে গ্রেপ্তার করলুম।'
ইতিমধ্যে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘটনাস্থলে জয়ন্ত ও মানিকের আবির্ভাব হল। অবলাকে বন্দি অবস্থায় দেখে জয়ন্ত আশ্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললে, 'যাক, পালের গোদাটা তাহলে পালাতে পারেনি। উঃ, সত্যি বিমলবাবু, এ হচ্ছে ভয়ানক ধড়িবাজ, আর একটু হলে আমারও চোখে ধুলো দিয়েছিল।'
মানিক বললে, 'কিন্তু জয়ন্ত, অবলার সঙ্গের লোকটা কোন ফাঁকে লম্বা দিয়েছে।'
জয়ন্ত বলল, 'উপায় কী, আমরা যে অবলাকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে ছিলুম।'
হঠাৎ মেয়ে—গলায় খনখন করে হেসে উঠে অবলা বললে, 'আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হবার দিন এখনও তোমাদের ফুরোয়নি।'
সুন্দরবাবু বললেন, 'হুম, তার মানে?'
—'মানে? মানে—টানে আমি জানি না। বললুম একটা কথার কথা।'
—'চুপ করে থাকো রাসকেল। তোমার ছোটো মুখে অত কথার কথা আমি শুনতে চাই না।'
—'ওহে সুন্দর—দারোগা, কী বলব, আমার হাত বাঁধা, নইলে আমাকে রাসকেল বলার ফল এখনই পেতে! তোমার মতো ক্ষুদ্র জীবের হাতে ধরা পড়লে এতক্ষণে আমি হয়তো লজ্জাতেই মারা পড়তুম! কিন্তু আমি ধরা পড়েছি বিমলের হাতে, এতে আমার অগৌরব নেই। তার ওপরে দেখছি আমার অজান্তে বিমল আর কুমারের সঙ্গে যোগ দিয়েছে ডিটেকটিভ জয়ন্তও। এতগুলো মাথাকে কেমন করে সামলাই বলো! কিন্তু আমি ধরা পড়েছি একটিমাত্র ভুলেই। আগে যদি জানতুম বিমল এখনও বেঁচে আছে, তাহলে তোমরা কেউই আজ আমাকে ফাঁদে ফেলতে পারতে না।'
বিমল হাসতে হাসতে বলল, 'হ্যাঁ অবলা, তোমার কথা মিথ্যে নয়। কিন্তু আমাকে কিছুক্ষণের জন্যে মরতে হয়েছিল যে তোমাকে ফাঁদে ফেলবার জন্যেই! তুমি আমাকে যথেষ্ট জ্বালিয়েছ। সত্যি কথা বলতে কি, এত অল্প সময়ের মধ্যে আর কেউই আমাকে এত বেশি জ্বালাতন করতে পারেনি। তোমার বুদ্ধির তারিফ করি। কিন্তু এও জেনে রাখো অবলা, শেষপর্যন্ত অসাধুতার জয় কখনও হয় না।'
অবলা বললে, 'বৎস বিমল, তোমার হিতোপদেশ বন্ধ করো, ওসব বুলি আমারও অজানা নেই। এখন আমাকে নিয়ে যা করবার হয়, করো।'
জয়ন্ত বললে, 'আমাদের প্রথম কর্তব্য হচ্ছে, তোমার কাছ থেকে জেরিনার কণ্ঠহার আদায় করা।'
সুন্দরবাবু চমকে উঠে বললেন, 'অ্যাঁঃ! অবলা—নচ্ছার কণ্ঠহারটা এরই—মধ্যে চুরি করতে পেরেছে নাকি।'
জয়ন্ত বললে, 'হ্যাঁ, কণ্ঠহার চুরি করবার পরেই আমরা দেখা দিয়েছি।'
অবলা হাসিমুখে বললে, 'না, কণ্ঠহার আমার কাছে নেই।'
—'নেই?'
—'না। তোমাদের দেখে আমি যখন ভোঁদার পিছনে সরে দাঁড়াই, কণ্ঠহারটা তখনই লুকিয়ে তার পকেটে ফেলে দিয়েছি।'
—'তুমি বলতে চাও, ভোঁদা কণ্ঠহার নিয়ে পালিয়ে গিয়েছে?'
—'হ্যাঁ। তোমরা আমাকে ধরলেও কণ্ঠহার পাবে না। আমার আসল উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে।'
সুন্দরবাবু ও জয়ন্ত এগিয়ে গিয়ে অবলার জামাকাপড় তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখলেন। কিন্তু কণ্ঠহার পাওয়া গেল না।
অবলা বললে, 'দেখছ তো, হেরেও আমি জিতে গেলুম?'
সুন্দরবাবু রাগে গসগস করতে করতে বললেন, 'হতভাগার বাদুড়ে মুখখানা থাবড়া মেরে ভেঙে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে!'
অবলা বললে, 'ওহে খুদে দারোগা, আর এখানে দাঁড়িয়ে বীরত্ব দেখিয়ে কোনওই লাভ নেই। কণ্ঠহারের আশা ছেড়ে এখন আমায় থানায় নিয়ে চলো দেখি। আমার ঘুম পেয়েছে।'
সুন্দরবাবু ধাক্কা মেরে অবলাকে পাহারাওয়ালাদের দিকে ঠেলে দিতে গেলেন, কিন্তু তাকে এক ইঞ্চিও নড়াতে পারলেন না।
অবলা খিলখিল করে হেসে বললে, 'ওহে পুঁচকে বীরপুরুষ! তোমার নিজের শক্তি দেখছ তো? এখন যদি আমার হাত খোলা থাকত, তোমার কী অবস্থা হত বলো দেখি?'
সুন্দরবাবু রাগে অজ্ঞানের মতো হয়ে চেঁচিয়ে বললেন, 'হুম, হুম! এই সেপাই ছুঁচোটাকে ধাক্কা মারতে মারতে ওখান থেকে নিয়ে চলো দেখি! হুম!'
জয়ন্ত বললে, 'সুন্দরবাবু, লোকটা সুবিধের নয়, আমরাও আপনার সঙ্গে থানা পর্যন্ত যাব নাকি?'
সুন্দরবাবু তাচ্ছিল্যভরে বললেন, 'সঙ্গে সেপাই রয়েছে, অবলারও হাত বাঁধা, তোমাদের সাহায্যের দরকার নেই। মোটরে উঠে থানায় পৌঁছোতে ছ—সাত মিনিটের বেশি লাগবে না।'
সুন্দরবাবু অবলাকে নিয়ে চলে গেলেন।
জয়ন্ত ফিরে দেখলে, সামনের দিকে তাকিয়ে বিমল চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সেও সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলে। তারপর হাসিমুখে বললে, 'বিমলবাবু, আপনি কী ভাবছেন হয়তো আমি তা বলতে পারি।'
—'বলুন দেখি।'
—'আপনি ভাবছেন, অবলা এইমাত্র কণ্ঠহারের যে কাহিনি বললে, হয়তো সেটা সত্য নয়।'
—'ঠিক। তারপর?'
—'আপনি আরও ভাবছেন, অবলা এতক্ষণ যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে অনেক ফুলগাছ আর হাস্নুহানার বড়ো ঝোপ রয়েছে। ওখানটা একবার ভালো করে খুঁজে দেখা দরকার।'
—'বাহাদুর জয়ন্তবাবু, আপনি আমার মনের কথা ঠিক ধরতে পেরেছেন। অতএব কুমার, বাড়ির ভেতর থেকে তুমি একটা পেট্রলের লণ্ঠন জ্বেলে নিয়ে এসো।'
কুমার তাড়াতাড়ি ছুটল এবং পেট্রলের লণ্ঠন নিয়ে ফিরে এল।
বিমলের সন্দেহ মিথ্যে নয়। অল্পক্ষণ খোঁজবার পরেই হাস্নুহানার ঝোপের ভিতরেই পাওয়া গেল জেরিনার কণ্ঠহার!
কুমার সানন্দে বললে, 'অবলা গ্রেপ্তার—কণ্ঠহার উদ্ধার! ব্যাস আমরাও নিশ্চিন্ত!'
ঠিক সেই সময়ে মহাবেগে সুন্দরবাবুর দ্বিতীয় আবির্ভাব বিষম! চিৎকার করতে করতে তিনি বলছেন, 'সর্বনাশ হয়েছে! অবলা আবার পালিয়েছে।'
দশম পরিচ্ছেদ
শেষ রাতে
বিমল অত্যন্ত আশ্চর্য স্বরে বললে, 'অবলা আবার পালিয়েছে! বলেন কি সুন্দরবাবু?'
সুন্দরবাবু প্রায় কাঁদো—কাঁদো গলায় বললেন, 'আর কিছু বলবার মুখ আমার নেই ভায়া। তোমরা অনায়াসেই আমার এক গালে চুন আর এক গালে কালি মাখিয়ে দিতে পারো। আমি একটুও আপত্তি করব না।'
জয়ন্ত বললে, 'অবলার হাত বাঁধা, আপনার সঙ্গে ছিল সার্জেন্ট আর পাহারাওয়ালা, তবু সে পালাল কেমন করে?'
সুন্দরবাবু বললেন, 'হুম, কেমন করে? সে এক অদ্ভুত কাণ্ড ভাই, অদ্ভুত কাণ্ড! পুলিশের ওপর ডাকাতি—অশ্রুতপূর্ব ব্যাপার!'
—'কী বলছেন আপনি!'
—'তাহলে শোনো। অবলাকে নিয়ে আমরা তো মোটরে উঠে থানার দিকে চললুম—গাড়িতে আমার সঙ্গে ছিল একজন সাব—ইনস্পেকটার, একজন সার্জেন্ট, আর দুজন পাহারাওয়ালা। খানিক দূর এগিয়েই দেখলুম, পথ জুড়ে আড়াআড়ি ভাবে একখানা মোটর দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর একটা লোক তার মেশিনের ঢাকনা খুলে কী যেন পরীক্ষা করছে। পথ জোড়া দেখে আমার ড্রাইভারও বাধ্য হয়ে গাড়ি থামিয়ে ফেললে, আর তার পরমুহূর্তেই তোমাদের বলব কী ভাই, চোখে—কানে কিছু দেখবার শুনবার আগেই, কোত্থেকে কারা এসে বিপুল বিক্রমে আমাদের এমন আক্রমণ করলে যে, আমরা কেউ একখানা হাত তোলবারও অবকাশ পেলুম না! চারিদিকে দেখলুম সর্ষেফুলে ভরা ঘোর অন্ধকার, সর্বাঙ্গে খেলুম কিল—চড় আর ডান্ডার গুঁতো, তার পরের সেকেন্ডেই অনুভব করলুম আমি চিতপাত হয়ে শুয়ে আছি রাস্তার ধুলোয়!...একখানা গাড়ি ছুটে চলে যাওয়ার শব্দ শুনে ধড়মড় করে উঠে বসে দেখি, অচেনা মোটরখানা অদৃশ্য, আমাদের মোটরখানা দাঁড়িয়ে আছে, আর আমার সঙ্গীরা রাস্তায় গড়াগড়ি দিতে দিতে আর্তনাদ করছে!'
—'হুঁ, অবলার দলের সবাই দেখছি খুব কাজের লোক, কেউ কম যায় না। এরই মধ্যে তারা রাজবাড়ি থেকে পালিয়ে আবার তাদের দলপতিকে উদ্ধার করবার জন্য চমৎকার এক 'প্ল্যান' ঠিক করে ফেলেছে! বাহাদুর!'
—'হুম, ওদের তো বাহাদুরি দিচ্ছ জয়ন্ত, কিন্তু আমার অবস্থাটা কী হবে বলো দেখি? কালকেই তো খবরের কাগজের রিপোর্টাররা আমাকে নিয়ে যা তা ঠাট্টা শুরু করে দেবে!'
—'আপনিও মোটরে উঠে তাদের পিছনে ছুটলেন না কেন?'
—'সে—চেষ্টাও কি করিনি ভাই? কিন্তু মোটর চালাতে গিয়ে দেখা গেল, তার চাকার 'টায়ার'গুলো হতভাগারা ছ্যাঁদা করে দিয়ে গেছে!'
—'এই ভয়েই তো আপনার সঙ্গে আমরাও যেতে চেয়েছিলুম সুন্দরবাবু!'
—'বেঁচে গিয়েছ ভায়া, বেঁচে গিয়েছ—আমার সঙ্গে থাকলে তোমাদেরও চোরের মার খেয়ে মরতে হত!'
মানিক বললে, 'আজ্ঞে না মশাই! আমরা গাড়িতে থাকলে আপনার মতো ঘুমিয়ে পড়তুম না!'
সুন্দরবাবু মহা চটে বললেন, 'হুম, এ হচ্ছে অত্যন্ত আপত্তিকর কথা। মানিক, তুমি কি আমার চাকরিটি খাবার চেষ্টায় আছ? ঘুমিয়ে পড়েছিলুম মানে?'
—'মানে হচ্ছে এই যে, অত রাত্রে রাস্তা জুড়ে একখানা সন্দেহজনক গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও আপনি সাবধান হতে পারেননি। তা যে পারবেন না, এ তো জানা কথাই। কারণ যখন কারুর নাক ডাকে তখন কেউ কি সাবধান হতে পারে?'
সুন্দরবাবু অভিযোগ করে বললেন, 'জয়ন্ত, জয়ন্ত! মানিকের আজকের ঠাট্টা আমি কিন্তু সহ্য করতে পারব না! এ বড়ো 'সিরিয়াস' ঠাট্টা!'
মানিক বললে, 'দাঁড়ান না, আমার ঠাট্টাই আপনার গায়ে লাগছে, কিন্তু কাল কাগজওয়ালারা যখন 'ঘুমন্ত পুলিশের কাণ্ড' শিরোনাম দিয়ে বড়ো বড়ো প্রবন্ধ রচনা করে ফেলবে, তখন বুঝতে পারবেন কত ধানে কত চাল!'
সুন্দরবাবু করুণভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে ক্ষীণস্বরে বললেন, 'তা যা বলেছ ভাই! তুমি তো ঘরের লোক—ঠাট্টাও করো, ভালোও বাসো। কিন্তু ওই কাগজওয়ালার দল ওদের আমি ঘৃণা করি!'
বিমল সান্ত্বনা দিয়ে বললে, 'সুন্দরবাবু, আপনার এত বেশি মুষড়ে পড়ার কারণ নেই। যার জন্যে এত গণ্ডগোল সেই আসল জেরিনার কণ্ঠহার আমরা আবার উদ্ধার করতে পেরেছি।'
সুন্দরবাবু ভয়ানক বিস্মিত হয়ে বললেন, 'হুম, বলো কী!'
বিমল সব কথা সংক্ষেপে প্রকাশ করে বললে, 'কণ্ঠহারটা কি আপনি এখনই নিয়ে যেতে চান?'
সুন্দরবাবু শিউরে উঠে বললেন, 'বাপ রে, খেপেছ? এই রাত্রে ওই সর্বনেশে কণ্ঠহার নিয়ে পথে বেরুলে কি রক্ষে আছে? যে আশ্চর্য ক্রিমিনালের পাল্লায় পড়েছি, সে সব করতে পারে।'
বিমল যেন কী ভাবতে ভাবতে বললে, 'হ্যাঁ, অবলা যে অসাধারণ ব্যক্তি, সে—বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। হয়তো এই মুহূর্তেই সে আমার বাড়ির আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে!'
সুন্দরবাবু একবার চমকে উঠেই চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, 'নাঃ এতটা সাহস তার হবে না। কারণ সে বিলক্ষণই জানে, এবারে ধরা পড়লে আমি তার একখানা হাড়ও আস্ত রাখব না। যে কিল—চড়—ডান্ডা খেয়েছি, তার শোধ নিতে হবে তো! হুম, পুলিশকে ধরে ঠ্যাঙানো, এত বড়ো আস্পর্ধা!'
বিমল বললে, 'যাক, যা হবার হয়ে গেছে, এইবার রাত থাকতে থাকতে আপনারা যে যার বাসায় ফিরে একটু ঘুমোবার চেষ্টা করুন গে, যান।' বলে সে বাগানের ঘাস—জমির উপরে হাত—পা ছড়িয়ে বসে পড়ল।
জয়ন্ত বললে, 'ওকি, আপনি ওখানে জমি নিলেন কেন? বাড়ির ভেতরে যাবেন না?'
—'না, আমি আর কুমার, এইখানেই খোলা হাওয়ায় খানিক বিশ্রাম করতে চাই। কী বলো কুমার, রাজি আছ?'
—'আলবত।' বলেই কুমার বিমলের পাশে গিয়ে স্থান গ্রহণ করলে।
জয়ন্ত হেসে কী বলতে গিয়ে আর বললে না, ফিরে হনহন করে বাগানের ফটকের দিকে এগিয়ে চলল এবং তার পিছু নিলেন মানিকের সঙ্গে সুন্দরবাবুও।
পথে বিমলের বাড়ি ছাড়িয়ে মিনিট খানেক অগ্রসর হবার পরেই পাওয়া গেল একটি সরকারি পার্ক।
জয়ন্ত বললে, 'সুন্দরবাবু, আপনার সঙ্গে তো পাহারাওয়ালা রয়েছে, থানায় একলা যেতে হবে না। অতএব আমি আর মানিক এইখান থেকেই বিদায় নিচ্ছি।'
—'এখান থেকে বিদায় নেবে কেন? তোমাদের বাসা তো থানা ছাড়িয়ে!'
—'বিমলবাবুদের মতো আমরাও পার্কের এই খোলা হাওয়ায় খানিক বিশ্রাম করব।'
সুন্দরবাবু হতভম্বের মতন ভঙ্গি করে বললেন, 'আমি প্রায় দেখি, তোমাদের আর বিমলবাবুদের মাথায় কেমন একরকম ছিট আছে। বাড়িতে অপেক্ষা করছে বিছানার আরাম, তবু হাটে বাটে যেখানে—সেখানে বিশ্রাম! না, তোমরা যতটা ভাবো আমি ততটা হাঁদা নই! হুম, নিশ্চয়ই এর কোনও মানে আছে!'
—'মানেটা যে কী, বাসায় ফিরে সেইটে আবিষ্কার করে ফেলুন গে'—হাসিমুখে এই কথা বলতে বলতে মানিকের হাত ধরে জয়ন্ত পার্কের ভিতর প্রবেশ করল।
একটা গাছের গুঁড়ির পিছনে আশ্রয় নিয়ে জয়ন্ত বলল, 'মানিক পথ থেকে আমাদের কেউ দেখতে পাবে না, কিন্তু এখান থেকে আমরা পথের সবাইকেই দেখতে পাব।'
মানিক কৌতূহলী হয়ে বললে, 'এই শেষ—রাতে পথে তুমি কাকে দেখবার আশা করো?'
—'অবলাকে।'
—'কী বলছ হে?'
—'হ্যাঁ। বিমলবাবুও জানেন, অবলা আজ রাত্রেই আবার ঘটনাস্থলে আসতে বাধ্য। সেইজন্যেই তিনি আজ বাগান ছেড়ে নড়তে রাজি নন।'
—'ও, বুঝেছি! তোমরা বলতে চাও, সেই হাস্নুহানার ঝোপের ভেতর থেকে কণ্ঠহারছড়া উদ্ধার করবার জন্যে আবার হবে অবলার আবির্ভাব?'
—'হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। এখানে তার পুনরাবির্ভাব যদি হয়, আজ রাত্রেই হবে। কারণ অবলার যুক্তি হবে এই : কণ্ঠহার ওই ঝোপেই আছে, বিমল বা অন্য কেউ এখনও তার সন্ধান পায়নি। কিন্তু আজকের রাতটা পুইয়ে গেলে কাল সকালের আলোয় কণ্ঠহারটা নিশ্চয়ই অন্য কারুর চোখে পড়ে যাবে। অতএব হারছড়াটাকে যদি উদ্ধার করতে হয়, আজ রাত্রেই করতে হবে। ও হারের ওপরে অবলার যে বিষম লোভ, এমন সুযোগ সে ছাড়বে বলে মনে হয় না। তার বিশ্বাস, আমরা সবাই এখন যে যার বিছানায় শুয়ে স্বপ্ন দেখছি, বাগান একেবারে নিষ্কণ্টক!'
গ্যাসের আলোয় দেখা যাচ্ছে, বিজন রাজপথ—অত্যন্ত স্তব্ধ। পনেরো মিনিটের মধ্যে একজনও পথিকের সাড়া পাওয়া গেল না।
মানিক বললে, 'আর একটু পরেই গ্যাসের আলো নিববে, ধীরে ধীরে শহর জেগে উঠবে।'
জয়ন্ত চিন্তিত মুখে বললে, 'তবে কি অবলা প্রাণের ভয়ে কণ্ঠহারের আশা ত্যাগ করলে! উঁহু, সে তো কাপুরুষ নয়!'
মানিক আগ্রহ—ভরে বললে, 'দ্যাখো, দ্যাখো। ওই একটা লোক আসছে! লোকটা চোরের মতো ভয়ে ভয়ে চারিদিকে তাকাতে তাকাতে অগ্রসর হচ্ছে।'
—'কিন্তু মানিক, লোকটাকে চেনবার উপায় নেই। ওর মাথা থেকে নাক পর্যন্ত চাদরে ঢাকা! তবে লোকটা খুব জোয়ান আর ঢ্যাঙা বটে!'
—'ও যে বিমলবাবুদের বাড়ির দিকেই এগিয়ে গেল!'
—'এইবারে আমাদেরও পার্কের আশ্রয় ত্যাগ করতে হবে। চলো, কিন্তু সাবধান!'
পার্ক থেকে বেরিয়ে দুজনে উঁকি মেরে দেখলে, লোকটা পথের উপর থেকে অদৃশ্য হয়েছে!
জয়ন্ত নস্যদানি বার করে এক টিপ নস্য নিয়ে খুশি—গলায় বললে, 'এত তাড়াতাড়ি যখন অদৃশ্য হয়েছে, লোকটা তখন নিশ্চয়ই বিমলবাবুদের বাগানের ভেতরেই ঢুকেছে!'
—'আমরাও এগুব নাকি?'
—'নিশ্চয়।'
কিন্তু কয়েক পা এগুতে না এগুতেই শেষ—রাত্রের স্তব্ধতা ভেঙে গেল উপর—উপরি তিনবার রিভলভারের গর্জনে। জয়ন্ত ও মানিক বেগে ছুটতে আরম্ভ করলে।
বিমলদের বাড়ির কাছে পৌঁছেই তারা দেখলে, বাগানের পাঁচিল টপকে ঠিক সামনেই লাফিয়ে পড়ল একটা লোক।
জয়ন্তও তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাঘের মতো, লোকটা কোনও বাধা দেবার আগেই প্রচণ্ড দুই ঘুষি খেয়ে মাটির উপরে ঘুরে পড়ে গেল।
মানিক হেঁট হয়ে দেখে বললে, 'একেবারে অজ্ঞান হয়ে গেছে।'
পরমুহূর্তে পাঁচিলের উপর থেকেই পথে অবতীর্ণ হল বিমল ও কুমার।
জয়ন্ত বললে, 'ওই দেখুন বিমলবাবু, আপনার আসামিকে।'
বিমল সচকিত কণ্ঠে বললে, 'আপনারা! তাহলে আপনারাও জানতেন, অবলা আজ আবার আসবে?'
—'নইলে ঘর থাকতে বাবুই ভিজবে কেন? এই রাতে পথ আশ্রয় করব কেন? কিন্তু বিমলবাবু, যাকে ধরেছি সে অবলা নয়, ভোঁদা।'
—'ভোঁদা?' বিমলের মুখে হতাশার ভাব ফুটে উঠল।
—'হ্যাঁ বিমলবাবু। অবলা এত সহজে ধরা পড়বার ছেলে নয়। চালাকের মতন ভোঁদাকে সে প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছে।'
—'যাক, উপায় কী? ভোঁদাও বড়ো কম পাত্র নয়, অবলার ডান হাত।'
—'এখন একে নিয়ে কী করা যাবে?'
—'সে কথা সকালে ভাবব। আজ তো ওকে আমার বাড়িতে বন্দি করে রেখে দি। কি বলেন?'
—'বেশ।'
একাদশ পরিচ্ছেদ
অনাহুত অতিথি
কাল শেষ—রাত পর্যন্ত ঘুমের সঙ্গে ছিল বিচ্ছেদ, আজ সকালে তাই বেলা নটার আগে বিমলের ঘুম ভাঙল না।
সে বিছানা ছেড়ে উঠেই শুনলে, কুমারের নাসিকা—বাঁশরি এখনও তান—ছাড়া বন্ধ করেনি।
চেঁচিয়ে ডাকলে, 'বলি কুমার! ওহে কুমার! এখন নিদ্রাভঙ্গের আয়োজন করো। প্রভাতের পরমায়ু ফুরোতে আর দেরি নেই!'
কুমার এপাশ থেকে ওপাশে ফিরল। তারপর দুই চোখ মুদেই বললে, 'নিদ্রাভঙ্গের আয়োজন তো করব, কিন্তু উপকরণ কই?'
—'অর্থাৎ এক পেয়ালা গরম চা?'
—'নিশ্চয়। আগে চা আসুক, তবে আমি চোখ খুলব।'
বিমল ডাকলে, 'রামহরি! ওগো রামহরি! বলি তুমিও ঘুমচ্ছো নাকি? স্টোভের ওপরে গরম জল ভরা কেটলির সঙ্গীত শুনতে পাচ্ছি না কেন?'
রামহরি বিশেষ চিন্তিত মুখে ঘরের ভিতরে ঢুকে বললে, 'থামো খোকাবাবু, অত আর চ্যাঁচাতে হবে না। ওদিকে কী কাণ্ডটা হয়েছে শুনলে তোমাদের চক্ষুস্থির হয়ে যাবে।'
কুমার চোখ মেলে বললে, 'চক্ষুস্থির হোক আর না হোক, তোমার কথা শুনে এই আমি চক্ষু উন্মীলিত করলুম। কী কাণ্ড হয়েছে রামহরি?'
—'তোমাদের সেই ভোঁদা বেটা লম্বা দিয়েছে।'
বিমল কিছুমাত্র ব্যস্ত না হয়ে বললে, 'তাই নাকি?'
কুমার খালি বললে, 'ও।'
—'তোমাদের কি মনে নেই, একতলার যে—ঘরে ভোঁদাকে বন্ধ করে রেখেছিলে, তার একটা জানলার একটা গরাদ ভাঙা? ভোঁদা সেইখান দিয়েই পালিয়েছে।'
বিমল বললে, 'তাই নাকি?'
কুমার বললে, 'ও!'
রামহরি বিস্মিত স্বরে বললে, 'তোমরা দুজনে কাল কি সিদ্ধিটিদ্ধি কিছু খেয়েছ?'
—'কেন?'
—'নইলে অত কষ্ট করে যাকে ধরলে, সে পালিয়েছে শুনেও তোমাদের টনক নড়ছে না কেন?'
বিমল খিলখিল করে হেসে উঠল।
কুমার বললে, 'আমাদের টনক সহজে নড়ে না। যাও রামহরি চা নিয়ে এসো!'
রামহরি হতভম্বের মতন তাদের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বিমল ও কুমার সমস্বরে গর্জন করে উঠল, 'চা! চা! চা!'
রামহরি নড়ল না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ কী ভাবলে। তারপর হঠাৎ সমুজ্জ্বল মুখে বললে, 'ওঃ—হো, বুঝেছি।'
—'ঘোড়ার ডিম বুঝেছ!'
—'ঘোড়ার ডিম নয় গো খোকাবাবু, ঠিক বুঝেছি! এতকাল একসঙ্গে ঘর করলুম, তোমাদের মতন মানিক—জোড়কে চিনতে আর পারব না?'
—'বটে?'
—'হ্যাঁ গো, হ্যাঁ! ভোঁদাকে তোমরা ইচ্ছে করেই পালাতে দিয়েছ!'
—'কী করে বুঝলে?'
—'ও ঘরে জানলার গরাদ ভাঙা, সেটা তো তোমরা জানতেই! আর জেনে—শুনেই তোমরা যখন ভোঁদাকে ওই ঘরেই বন্ধ করেছিলে, তখন তোমাদের নিশ্চয় মনের বাসনা ছিল, সে যেন এখান থেকে সরে পড়ে!'
বিমল বললে, 'তাই নাকি?'
কুমার বললে, 'ও!'
রামহরি বললে, 'আর ন্যাকামি করতে হবে না, যাও! সত্যি করে বলো দেখি, আমি ঠিক বুঝেছি কি না?'
বিমল বললে, 'আমি স্বীকার করছি রামহরি, তুমি ঠিকই আন্দাজ করেছ। এখন দয়া করে চটপট চা এনে দাও দেখি!'
রামহরি গাঁ ধরে মাথা নেড়ে বললে, 'উঁহু, তা হবে না। আগে বলো, কেন ভোঁদাকে ধরেও ছেড়ে দিলে?'
—'আহা, তুমি জ্বালালে দেখছি! এতটা যখন বুঝেছ তখন এটুকু আর বুঝতে পারছ না যে, ভোঁদাকে ছেড়ে দিয়েছি পালের গোদাকে ধরব বলে!'
—'কেমন করে?'
—'জয়ন্তবাবু আর মানিকবাবু তার পিছনে আছেন। আমরা অবলার এখনকার ঠিকানা জানি না। ভোঁদা পালিয়ে নিজেদের আড্ডা ছেড়ে আর কোথাও যাবে না। সেই আড্ডার সর্দার হচ্ছে অবলা।'
—'খোকাবাবু, বুদ্ধি খেলিয়েছ ভালো! কিন্তু ভোঁদা তো জয়ন্তবাবুদের চেনে, তাঁরা পিছু নিলে সে সন্দেহ করবে না?'
—'রামহরি, তুমি আমাকে খোকাবাবু বলে ডাকো বটে, কিন্তু সত্যিই তো আমি আর খোকা নই! ও—কথা কি আমরাও ভাবিনি! জয়ন্তবাবুরা ভোঁদার পিছনে যাবেন না, যাবে তাঁদের চর।'
—'চর?'
—'হ্যাঁ। তুমি তো জানো না, কাজের সুবিধে হবে বলে জয়ন্তবাবু আজকাল একদল চর পুষছেন। তারা হচ্ছে পথের ছেলে—অনেকেই আগে ছিল ভিখারি। বয়সে তারা ছোকরা বটে, কিন্তু জয়ন্তবাবুর হাতে পড়ে সবাই খুব চালাক হয়ে উঠেছে। তাদের দিয়ে জয়ন্তবাবু এখন অনেক কাজ পান—তারা প্রত্যেকেই নাকি এক—একটি ছোট্টখাট্ট গোয়েন্দা! ভোঁদার পিছু নেবে তাদেরই কেউ। আমরা এখন জয়ন্তবাবুর জন্যেই অপেক্ষা করছি।'
ঠিক সেই সময়ে সিঁড়ির উপরে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল।
কুমার বললে, 'নিশ্চয় জয়ন্তবাবু আর মানিকবাবু আসছেন। রামহরি, আর দাঁড়িয়ে থেকো না, চায়ের ব্যবস্থা করো—গে যাও।'
—'চা? তা দু—এক কাপ চা পেলে মন্দ হয় না।' বলতে বলতে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলে একমুখ হাসি নিয়ে স্বয়ং অবলা এবং তার পিছনে পিছনে ভোঁদা। তাদের দুজনেরই হাতে রিভলভার।
বিমল, কুমার ও রামহরির মুখের ভাব দেখলে মনে হয়, তাদের চোখের সামনে যেন প্রেতমূর্তির আবির্ভাব হয়েছে।
খিলখিল করে মেয়ে—হাসি হেসে অবলা বললে, 'হে গর্দভরাজ বিমল, আমাদের দেখে তুমি কি বড়োই আশ্চর্য হয়েছ? কেন বলো দেখি? তোমরা তো আমাকেই খুঁজছিলে। সেইজন্যেই তো তোমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলুম।'
হতভম্ব বিমলের মুখ দিয়ে একটাও কথা বেরুল না, অবলার দুর্জয় সাহস দেখে বিস্ময়ে প্রায় হতজ্ঞান হয়ে গেল।
অবলা রিভলভারটা বাগিয়ে ধরে একখানা চেয়ারের উপরে বসে পড়ে বললে, 'ভোঁদা, তুই ওপাশে গিয়ে দাঁড়া। এরা কেউ একটা আঙুল নাড়লেই গুলি করবি।...বিমল, এখনও তোমার বিশ্বাস বোধহয় যে, সূক্ষ্মবুদ্ধি আর বিচারশক্তিতে তুমি হচ্ছ একটি অদ্বিতীয় জীব? আর আমি হচ্ছি একটি আস্ত হাঁদারাম? যে—ঘরের জানলা ভাঙা সে—ঘরে ভোঁদাকে বন্ধ করার মানেই যে তাকে ছেড়ে দেওয়া, এ—কথাটাও আমি বুঝতে পারব না? তোমরা ভেবেছিলে ভোঁদার পিছু নিলেই আমার ঠিকানা জানতে পারবে? বেশ, এই তো আমি নিজেই এসেছি, আমাকে নিয়ে কী করতে চাও, বলো।'
কুমার ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললে, 'তুমি চোর, তুমি ডাকাত, তুমি খুনে। তোমাকে আমরা গ্রেপ্তার করতে চাই।'
—'ওরে বাপ রে, কী উচ্চাকাঙ্ক্ষা! এই তো আমি হাজির, গ্রেপ্তার করবার হুকুম হোক।'
বিমল স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। কুমার অত্যন্ত অসহায়ের মতো অবলার ও ভোঁদার রিভলভারের দিকে তাকিয়ে দেখলে। রামহরি আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আপন মনে বিড়বিড় করে কী বকতে লাগল।
অবলা বললে, 'আমাকে গ্রেতার করবি? আস্পর্ধার কথা শোনো একবার! তোদের মতো চুনোপুঁটির হাতে ধরা পড়বার জন্যে আমার জন্ম হয়নি, বুঝেছিস? পদে পদে আমার কাছে নাকাল হচ্ছিস, তবু তোদের চৈতন্য হল না?'
ভোঁদা বললে, 'কর্তা, মিছে কথা বলে কাজ নেই, যা করতে এসেছেন চটপট সেরে ফেলুন।'
অবলা বললে, 'কেন রে ভোঁদা, তাড়াতাড়ির দরকার কী? জয়ন্ত আর মানিক তাদের চ্যালা—চামুণ্ডা দিয়ে আমাদের খালি—বাসার ওপরে যত খুশি পাহারা দিক না, আমরা তো সেখানে নেই—সেখানে আর ফিরেও যাব না, তবে তোর ভয় কিসের বল দেখি?'
ভোঁদা বললে, 'ওরা যদি পুলিশে খবর দেয়?'
—'যদি নয় রে ভোঁদা, নিশ্চয় এতক্ষণে পুলিশ খবর পেয়েছে। কিন্তু খবর পেয়েই তো মোটকা গোয়েন্দা সুন্দরলাল আমাকে ধরবার জন্যে ছুটে আসতে পারবে না। ইংরেজদের যতই দোষ থাক, তাদের আইন ভারী চমৎকার রে। সুন্দরকে আগে তার কর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে, তারপর আমাদের এই নতুন বাসা 'সার্চ' করবার জন্য আলাদা হুকুম নিতে হবে। কাজে—কাজেই আমি এখন খানিকক্ষণের জন্য নিশ্চিন্ত হয়ে বিমলের সঙ্গে গল্প করতে পারি—কি বলো বিমলভায়া, তাই নয় কি? তুমি বোধ করি ভাবছ যে, জয়ন্তের ঈগল—চক্ষুর পাহারাকে ফাঁকি দিয়ে কেমন করে আমি এখানে এলুম? গুপ্তদ্বার ভায়া, গুপ্তদ্বার! জয়ন্ত জানে না, আমার নতুন বাসার পিছন দিয়ে পালাবার জন্যে একটা লুকানো পথ আছে!'
বিমল এতক্ষণ পরে বললে, 'অবলা, তোমার সাহস দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি।'
চেয়ারে বসে পা নাচাতে নাচাতে অবলা বললে, 'হুঁ, তোমার বিস্মিত হওয়াই উচিত! সাহস তো আমার আছেই, তার উপরে আছে মৌলিকতা! আমি কাজ করি নতুন পদ্ধতিতে—অন্য লোক যেখানে দেখে অসম্ভব সব বাধা, আমি সেখানে অনায়াসেই সহজ পথ আবিষ্কার করতে পারি। দ্যাখো না, নইলে সোজা লম্বা না দিয়ে আজ কি আমি তোমার সঙ্গে আলাপ করতে আসতে পারতুম? কী বিমল, মাঝে মাঝে আড়চোখে ওই টেবিলটার দিকে তাকিয়ে কী দেখছ বলো দেখি? ওর কোনও টানায় রিভলভার—টিভলভার কিছু আছে বুঝি? ভাবছ, একটু ফাঁক পেলেই ওইদিকে হাত বাড়াবে? কিন্তু ও—বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকো, ফাঁক তুমি পাবে না—নড়েছ কি গুলি করেছি!...হুঁ, ভালো কথা! ওই টেবিলের টানায় সেই কণ্ঠহারটা তুমি লুকিয়ে রাখোনি তো?'
বিমল বললে, 'কণ্ঠহার আমি সুন্দরবাবুর হাতে দিয়েছি।'
—'কখন? কাল রাত্রে? আমার হাত থেকে ঠ্যাঙানি খাবার পরও সুন্দর এখানে এসে কণ্ঠহার নিয়ে গেছে?'
—'হুঁ।'
—'আমি একথা বিশ্বাস করি না। সে—অবস্থায় কণ্ঠহার নিয়ে যাবার সাহস নিশ্চয় তার হয়নি। আর অত রাত্রে হার—ছড়া হাতছাড়া করবে, তুমিও এমন বোকা নও।...ভোঁদা, এদের ওপরে আমি নজর রাখছি, তুই টেবিলের টানাগুলো খুলে দেখ তো!'
ভোঁদা হুকুমমতো কাজ করলে। কোনও টানাই চাবি—বন্ধ ছিল না। সেগুলো হাতড়ে একটা রিভলভার বের করে নিয়ে সে বললে, 'এখানে কণ্ঠহার নেই, কিন্তু এটা ছিল।'
—'রিভলভার? আমি আগেই জানতুম, বিমলের হাত ওটা নেবার জন্যে নিশপিশ করছে! কিন্তু বাপু, তুমি কার পাল্লায় পড়েছ, জানো তো? এখন যা চাই, বার করো দেখি। কোথায় সেই কণ্ঠহার?'
—'সুন্দরবাবুর কাছে।'
—'আবার ধাপ্পা? সাবধান বিমল, আগুন নিয়ে খেলা কোরো না। ওই কণ্ঠহারের জন্যে আমি প্রাণ পর্যন্ত পণ করেছি, এখানে আমি এত বিপদ মাথায় নিয়ে ছেলেখেলা করতে আসিনি! যদি দরকার হয়, এখনই তোমাদের তিনজনকে খুন করেও আমি কণ্ঠহার নিয়ে যাব।'
বিমল অবহেলা—ভরে বললে, 'খুন করতে তোমার যে হাত কাঁপে না, তা আমি জানি। এখনও আমার গলায় দড়ির দাগ মিলোয়নি।'
সকৌতুকে অবলা হাসতে লাগল এবং সে হাসির সঙ্গে নীরবে যোগ দিলে যেন তার একটিমাত্র চক্ষুও। তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললে, 'সেবারে দৈবগতিকে গলার দড়িকে ফাঁকি দিয়েছ বলে মনে কোরো না যেন, এবারেও আমার হাতের রিভলভারকে ফাঁকি দিতে পারবে! আমি এখানে এসেছি কণ্ঠহার নিয়ে যাবার জন্যে।'
বিমল বললে, 'কিন্তু আমার কথা তো শুনলে। কণ্ঠহার আমার কাছে নেই।'
অবলা উঠে দাঁড়িয়ে বললে, 'ভোঁদা, তোর রিভলভারটাও আমাকে দে। এই আমি দু—হাতে দুটো রিভলভার নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম, তুই আগে বিমল আর কুমারের জামাকাপড়গুলো ভালো করে খুঁজে দেখ।'
হঠাৎ বাইরের রাস্তা থেকে কে খুব জোরে তিনবার শিস দিলে।
অবলা ও ভোঁদা দুজনেই চমকে উঠল।
ভোঁদা সভয়ে বললে, 'মোনা শিস দিলে! পুলিশ আসছে!'
—'অ্যাঁঃ, আমার হিসেব গুলিয়ে গেল? পুলিশ কী করে এত শীঘ্র খবর পেলে?'—বলতে বলতে অবলা একলাফে ঘরের বাইরে গিয়ে পড়ল—সঙ্গে সঙ্গে ভোঁদাও। পরমুহূর্তে তারা অদৃশ্য এবং সিঁড়ির উপরে দ্রুত পদশব্দ!
বিমলও একলাফে উঠে দাঁড়িয়ে বললে, 'শীঘ্র এসো কুমার। অবলাকে যদি ধরতে হয় তবে আজকেই ধরতে হবে!'
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
বন্যা
সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে নামতেই বিমল ও কুমার শুনতে পেলে, একখানা মোটরগাড়ি ছোটার আওয়াজ।
কুমার বললে, 'অবলা আবার ভাগল!'
বিমল ছুটে সদর দরজা থেকে বেরিয়েই ডানদিকে তাকিয়ে দেখলে, একখানা লাল রঙের মোটর যেন ঝড়ো হাওয়ার আগে উড়ে চলেছে!
বাঁ—দিকেও গাড়ির শব্দ শুনে তারা ফিরে তাকাল। আর একখানা মোটর ঠিক সেইখানেই এসে থামল এবং গাড়ির হুইল ছেড়ে নীচে লাফিয়ে পড়ল জয়ন্ত।
তাকে কোনও কথা বলবার সময় না দিয়ে বিমল বললে, 'ওই লাল গাড়িতে অবলা পালাচ্ছে!'
আর কিছু বলতে হল না। জয়ন্ত আবার একলাফে ড্রাইভারের আসনে গিয়ে বসল—সঙ্গে সঙ্গে বিমল ও কুমারও গাড়ির ভিতরে উঠে পড়ল। মানিকও সেখানে ছিল। গাড়ি ছুটল তিরবেগে।
বিমল বললে, 'জয়ন্তবাবু, আপনি কেমন করে অবলার খবর পেলেন?'
গাড়ি চালাতে চালাতে সামনের দিকে তীক্ষ্নদৃষ্টি রেখে জয়ন্ত বললে, 'ভাগ্যিস আমার এক ছোকরাকে এইখানে পাহারায় রেখে গিয়েছিলুম! সেই—ই আমাকে ছুটে গিয়ে খবর দিয়েছে!'
মানিক বললে, 'উঃ, কী জোরে অবলাদের গাড়ি ছুটছে! অ্যাক্সিডেন্ট হল বলে!'
কিন্তু তাদের, না অবলাদের গাড়ি—কাদের গাড়ি ছুটছে বেশি বেগে? দুখানা গাড়িই যেন পাগলা হয়ে জনাকীর্ণ রাজপথে বিষল বিশৃঙ্খলা ও উত্তেজনার সৃষ্টি করলে। প্রথম গাড়িখানা এড়াতে না এড়াতেই দ্বিতীয় গাড়িখানা পথিকদের উপরে এসে পড়ে হুড়মুড় করে! কেউ পথের উপরে আছাড় খেয়ে আর্তনাদ করে ওঠে, কেউ ভয়ে চিৎকার করে, কেউ রেগে গালাগালি দেয়, বিস্মিত কুকুররা ঘেউ—ঘেউ রবে প্রতিবাদ করতে থাকে, অন্যান্য গাড়িগুলো কোনওরকমে পাশ কাটিয়ে নিজেদের সামলে নেয়। এক জায়গায় একটা পাহারাওয়ালা লাল গাড়িখানাকে বাধা দেবার চেষ্টা করবামাত্র মোটরের ভিতর থেকে হল রিভলভারের গুলিবৃষ্টি! পাহারাওয়ালা 'বাপ রে বাপ' বলে চেঁচিয়ে উঠে লম্বা দৌড় মেরে পৈতৃক প্রাণ রক্ষা করলে।
দুখানা গাড়ির মধ্যে ব্যবধান ছিল যথেষ্ট। জয়ন্ত অনেক চেষ্টা করেও সে ব্যবধান কমাতে পারলে না। সে তিক্তস্বরে বললে, 'ও গাড়িখানাকে যদি আরও একটু কাছে পাই, তাহলে গুলি করে ওর 'টায়ার' ছ্যাঁদা করে দিতে পারি।'
লাল গাড়ি একটা তেমাথায় গিয়ে হঠাৎ মোড় ফিরে অদৃশ্য হল।
কয়েক মুহূর্ত পরে জয়ন্তও মোড় ফিরে বিস্মিত কণ্ঠে বললে, 'দেখুন বিমলবাবু! মোড় ফিরেই আমরা অবলাদের কত কাছে এসে পড়লুম!'
সকলে দেখলে সত্যি—সত্যিই দুখানা গাড়ির মধ্যে ব্যবধান অনেকটা কমে গিয়েছে।
বিমল উত্তেজিত ভাবে বললে, 'তার মানে হচ্ছে, মোড় ফিরে আমাদের চোখের আড়ালে এসেই অবলাদের গাড়ি নিশ্চয় একবার থেমে দাঁড়িয়েছিল!'
কুমার বললে, 'আর সঙ্গে সঙ্গে অবলাও গাড়ি ছেড়ে নেমে পড়েছে। খাসা ফন্দি! আমরা ছুটব লাল গাড়ির পিছনে, আর অবলা দেবে সোজা লম্বা!'
বিমল বললে, 'আর বাসায় ফিরে গর্দভরাজ বিমলের কথা ভেবে হেসে লুটিয়ে পড়বে।'
জয়ন্ত বললে, 'অবলা যে পালিয়েছে তাতে আর সন্দেহ নেই। কিন্তু সে গেল কোন দিকে? ডাইনে তো একটা সরু গলি দেখছি!' বলেই সে নিজের গাড়ি থামিয়ে ফেললে।
বিমল গলির মোড়ের একটা দোকানের দিকে তাকিয়ে হাঁকলে, 'ওহে দোকানি, এখুনি একখানা লাল গাড়ি এখানে দাঁড়িয়েছিল?'
—'হ্যাঁ বাবু! সর্বনেশে গাড়ি! যেন তুফান মেল! আপনারাও তো কম যান না দেখছি! আজ কি শহরের রাস্তায় মোটরের রেস চলেছে?'
বিমল অধীর স্বরে বললে, 'লাল গাড়ি থেকে কেউ এখানে নেমেছে?'
—'হ্যাঁ! মস্ত লম্বা একটা জোয়ান লোক গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ে ওই গলির ভেতরে ছুটে চলে গেল!'
ততক্ষণে জয়ন্তের গাড়ি থেকেও সবাই নীচে নেমে পড়েছে।
কুমার বললে, 'দোকানি, এ গলিটা দিয়ে বেরুনো যায়?'
—'না বাবু!'
জয়ন্ত গলির দিকে ছুটল।
বিমল বললে, 'সাবধান জয়ন্তবাবু! রিভলভারটা বার করে গলির ভেতরে ঢুকুন! অবলা সশস্ত্র!'
মানিক বললে, 'আমিও রিভলভার এনেছি। আপনারা?'
—'আমরা নিরস্ত্র।'
—'তাহলে আপনারা এইখানেই অপেক্ষা করুন।'
—'বলেন কী! শত্রুর রিভলভারের ভয়ে পশ্চাৎপদ হবার মতন বুদ্ধিমান আমরা নই! চলুন—আর দেরি নয়!'
সকলে অতি সতর্কভাবে আশেপাশে আনাচে—কানাচে তাকাতে তাকাতে এগুতে লাগল। সেই সাপের মতন পাকখাওয়া গলিটা প্রায় দেড়—শো ফুট লম্বা। দু—তিনজন লোককে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, একজন ঢ্যাঙা লোক ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গলির ভিতর দিকে চলে গিয়েছে।
কিন্তু সারা গলি খুঁজেও অবলার কোনও পাত্তাই মিলল না।
মানিক সন্দেহ প্রকাশ করলে, 'এ গলির ভেতরেও হয়তো অবলার কোনও আড্ডা আছে।'
কুমার বললে, 'অসম্ভব নয়। কিংবা সে কোনও অচেনা বাড়ির ভেতরে ঢুকে লুকিয়ে আছে!'
কুমারের কথা শেষ হতে—না—হতেই একখানা বাড়ির মধ্যে উঠল মেয়ে—পুরুষ নানা কণ্ঠে বিষম গণ্ডগোল :—'ওমা কী হবে গো!' 'পুলিশ, পুলিশ!'—'ডাকাত, গুন্ডা!'
জয়ন্ত বললে, 'গোলমালটা আসছে ওই বাড়ির ভেতর থেকে! নিশ্চয় ওখানে অবলার আবির্ভাব হয়েছে!'
সকলে দৌড়ে একখানা তেতলা বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করল।
উঠানের পাশে একতলার দালানে তিন—চারজন মেয়ে ও দুজন পুরুষ দাঁড়িয়ে ভীত, উত্তেজিত স্বরে ক্রমাগত চিৎকার করছে!
বিমল বললে, 'ব্যাপার কী, ব্যাপার কী?'
একজন উত্তর দিলে, 'গুন্ডা মশাই, ডাকাত। দু—হাতে তার দুটো পিস্তল!'
—'কোথায় সে?'
—'তেতলার' সিঁড়ি দিয়ে ছাদের ওপরে উঠেছে।'
তেতলার সিঁড়ির সার দেখা যাচ্ছিল। সর্বাগ্রে বিমল, তার পিছনে আর সবাই সিঁড়ি বয়ে উপরে উঠতে লাগল।
একেবারে তেতলার ছাদে। কিন্তু সেখানে কেউ নেই।
জয়ন্ত গলির দিকে ছাদের শেষে ছুটে গিয়ে মুখ বাড়ালে। এবং সেই মুহূর্তেই দেখলে, ছাদ থেকে বৃষ্টির জল বেরুবার যে লোহার পাইপটা নীচে পর্যন্ত চলে গিয়েছে, তার শেষপ্রান্ত ত্যাগ করে অবলা আবার নেমে পড়ল গলির মধ্যেই!
গলি ভরে গিয়েছে তখন কৌতূহলী জনতায়। জন—কয় লোক অবলার দিকে এগিয়ে আসতেই সে ফস করে বার করলে রিভলভার! একে তার প্রকাণ্ড মূর্তি দারুণ ক্রোধে ফুলে আরও বড়ো হয়ে উঠেছে, তার উপরে আবার মারাত্মক রিভলভার আবির্ভাবে জনতার সাহস একেবারে উপে গেল—যে যেদিকে পারল ছুটে পালাতে লাগল। দুই—তিন সেকেন্ডেই পথ সাফ! অবলা আবার বড়ো রাস্তার দিকে দৌড় দিলে।
ততক্ষণে বিমল, জয়ন্ত, কুমার ও মানিক আবার গলিতে নেমে এসেছে।
গলির মুখেই ছিল জয়ন্তের মোটরখানা। অবলা লাফ মেরে তার ভিতরে গিয়ে বসল।
জয়ন্ত চিৎকার করলে, 'পাকড়ো, পাকড়ো!'
আর পাকড়ো! গাড়ি অদৃশ্য!
তারাও বড়ো রাস্তায় গিয়ে পড়ল।
জয়ন্ত প্রাণপণে চ্যাঁচাতে লাগল, 'ট্যাক্সি! ট্যাক্সি!'
ট্যাক্সি নেই! কিন্তু একখানা বড়ো ফোর্ড গাড়ির দেখা পাওয়া গেল।
বিমল রাস্তার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে দু—দিকে দুই হাত ছড়িয়ে চেঁচিয়ে বললে, 'ড্রাইভার, গাড়ি থামাও!'
গাড়ি দাঁড়াল! ভিতর থেকে মুখ বাড়িয়ে একজন হোমরা—চোমরা বাবু বিরক্ত স্বরে বললেন, 'কে আপনারা? আমার গাড়ি থামালেন কেন?'
তিনি কোনও জবাব পেলেন না। বিমল, কুমার ও মানিক বিনাবাক্যব্যয়ে গাড়ির দরজা ঠেলে ভিতরে গিয়ে বসে আসল মালিককে একেবারে কোণ—ঠাসা করে ফেললে।
জয়ন্ত ড্রাইভারের পাশে গিয়ে আসন গ্রহণ করে বললে, 'চালাও গাড়ি! খুব জোরসে!'
ড্রাইভার অসহায় ভাবে ফিরে তার মনিবের মুখের পানে তাকালে!
জয়ন্ত পকেট থেকে রিভলভার বার করে বললে, 'আমার হাতে কী, দেখছ?'
ড্রাইভার দেখেই চমকে উঠল। আর মনিবের হুকুমের দরকার হল না। সে প্রাণপণে গাড়ি চালিয়ে দিলে।
তখন সামনের দিকে অবলার স্বহস্তে চালিত জয়ন্তের গাড়িখানাকে আর দেখাও যাচ্ছিল না।
কুমার বললে, 'বিমল, আর অবলার আশা ছেড়ে দাও। সে খালি দুর্দান্ত সুকৌশলী সুচতুর নয়, ভাগ্যদেবীও তার প্রতি সদয়।'
মানিক বললে, 'এই তো আমরা স্ট্র্যান্ড রোডে এসে পড়লুম। এর পরেই গঙ্গার ধার। অবলা কোন দিকে গিয়েছে জানতে হলে আমাদের নামতে হবে।'
জয়ন্ত বললে, 'কিন্তু মোড়ের মাথায় অত ভিড় কেন? একখানা লরির পাশে পড়ে রয়েছে একখানা ভাঙা মোটর! অ্যাক্সিডেন্ট নাকি? আরে, আরে, এ যে আমারই গাড়ি দেখছি! কিন্তু—'
এক এক লাফে সবাই আবার রাস্তায় নেমে পড়ল।
হ্যাঁ, এখানা জয়ন্তেরই গাড়ি বটে! তার এক অংশ লরির সঙ্গে ধাক্কা লেগে ভেঙে একেবারে চুরমার হয়ে গিয়েছে।
একজন প্রতক্ষদর্শী বললে, 'লরির ড্রাইভারের কোনও দোষ নেই মশায়! মোটরখানা যে চালাচ্ছিল নিশ্চয় সে পাগল! কিন্তু খুব তার পরমায়ুর জোর, আশ্চর্য—রকম বেঁচে গিয়েছে! তার মাথা ফেটে গিয়েছে বটে—'
বাধা দিয়ে বিমল বললে, 'কিন্তু সে গেল কোথায়?'
—'গঙ্গার দিকে তিরের মতো ছুটে পালাল।'
সেখান থেকেই গঙ্গা দেখা যাচ্ছিল। তারা আর কিছু শোনবার জন্যে দাঁড়াল না—প্রচণ্ড বেগে দৌড় দিলে গঙ্গার দিকে।
এই তো গঙ্গার ধার! কিন্তু কোথায় অবলা? ঘাটে স্নানার্থীদের ভিড়, কিন্তু তাদের মধ্যে অবলা নেই।
তারা সকলকে প্রশ্ন করতে লাগল। একজন বললে, 'হ্যাঁ মশাই, একটা রক্তমাখা লোককে দেখেছি বটে! সে তাড়াতাড়ি ঘাটের সিঁড়ি বয়ে জলে গিয়ে পড়ল...ওই দেখুন, ওই যে সাঁতার কাটছে!'
সকলে আগ্রহ—ভরে দেখলে, তীর থেকে খানিক দূরে একটা লোক সাঁতার কেটে বেগে এগিয়ে চলেছে!
বিমল চিৎকার করে বললে, 'শিগগির একখানা নৌকা ভাড়া করো।'
দুর্ভাগ্যক্রমে ভাড়া যাবার মতো কোনও নৌকাই পাওয়া গেল না।
জয়ন্ত মালকাঁচা মেরে বললে, 'তাহলে আমাদেরই সাঁতার কাটতে হবে!'
একজন লোক শুনতে পেয়ে বললে, 'এখন সাঁতার কাটবেন কী মশাই? দেখছেন না, জল থেকে সবাই তাড়াতাড়ি ওপরে উঠে আসছে?'
—'কেন?'
—'এখনই বান ডাকবে। আজ খুব জোর বান আসবার কথা। আসবে কী—ওই বান এসেছে।'
চারিদিকে চিৎকার উঠল—'বান, বান!' 'সাবধান!' সবাই ওপরে উঠে এসো—সবাই ওপরে উঠে এসো!'
তারপরেই শোনা গেল চতুর্দিক পরিপূর্ণ করে সমুদ্রগর্জনের মতন সুগম্ভীর এক জল—কোলাহল! দেখা গেল, সাগর—তরঙ্গের মতোই উত্তাল এক সুদীর্ঘ তরঙ্গ—রেখা প্রায় সারা গঙ্গা জুড়ে পাকের পর পাক খেতে খেতে ছুটে আসছে—এবং তারই মধ্যে অসংখ্য ক্রুদ্ধ অজগরের মতো ঢেউ—এর দল শূন্যে ছোবল আর ছোবল মারছে! ফেনায়িত গঙ্গা যেন টগবগ করে ফুটতে লাগল।
বানের কবলে পড়ে অবলা সকলের চোখের আড়ালে চলে গেল।
বিমল, কুমার, জয়ন্ত ও মানিক একদৃষ্টিতে বন্যা—তরঙ্গের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বান যখন বহু দূরে চলে গেল, বিমল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে, 'কুমার, এত করেও অবলাকে ধরতে পারলুম না—শেষটা বান হল আমাদের প্রতিবাদী! আমার বিশ্বাস, অবলা মরবে না!'
জয়ন্ত বললে, 'হ্যাঁ বিমলবাবু, আমারও সেই বিশ্বাস! এই হল আমার প্রথম পরাজয়!'
বিমল ক্ষুব্ধ স্বরে বললে, 'এত অল্প সময়ের মধ্যে বারংবার এত বিপদেও কখনও পড়িনি, আর শেষ পর্যন্ত এমন ভাবে আমাকে বোকা বানিয়ে ফাঁকি দিয়ে পালাতেও কেউ পারেনি! অদ্ভুত লোক ওই অবলা!'
কুমার বললে, 'অবলা অদ্ভুত লোক হতে পারে, কিন্তু জিতেছি আমরাই। বিমল, ভুলে যেয়ো না, জেরিনার কণ্ঠহার আমরা উদ্ধার করতে পেরেছি!'
বিমল বললে, 'হুঁ, ওইটুকুই যা সান্ত্বনা!'
অবশিষ্ট
এক—রাত্রের বিভীষিকা
জায়গাটির নাম নাই—বা শুনলে! আমার সঙ্গীটির আসল নামও বলব না, কারণ তাঁর আপত্তি আছে। কারণ বোধ হয়, এই নৈশ নাটকে আমাদের কেউই বীরের ভূমিকায় অভিনয় করেনি। তবে এইটুকু শুনে রাখো, আমার সঙ্গীটি হচ্ছেন কলকাতার একজন বিখ্যাত ডাক্তার। আমি তাঁকে সুবোধ বলে ডাকব।
এত লুকোচুরি কেন জানো? গল্পটি অমূলক নয়।
অনেকদিন আগেকার কথা। সুবোধ তখন সবে ডাক্তারি পাশ করেছে, কিন্তু কোমর বেঁধে রোগী—বধকার্যে নিযুক্ত হয়নি।
ছেলেবেলা থেকেই ভাঙা—চোরা সেকেলে মন্দির প্রভৃতি দেখবার শখ ছিল আমার অত্যন্ত। ভারতবাসীর অধিকাংশ নিজস্বতা খুঁজতে গেলে এই সব ধ্বংসাবশেষের মধ্যে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।
সেদিনও আমরা দুজনে একটি পুরানো মন্দির দেখতে গিয়েছিলুম। তার গর্ভ থেকে দেবতার চিহ্ন পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়েছে বটে, কিন্তু তার গা থেকে কারুকার্যের সৌন্দর্য এখনও কেউ মুছে দিতে পারেনি। সেই সব কারিকুরি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল আমার নয়ন—মন।
কিন্তু সুবোধ হল নিরাশ। বিরক্তস্বরে বললে, 'বনজঙ্গল মাঠের ভেতর দিয়ে পথে—বিপথে সাত মাইল পেরিয়ে এই দেখাতে আমাকে এখানে নিয়ে এলে? এ যে পর্বতের মূষিক—প্রসব!'
আমি বললুম, 'মেডিকেল কলেজে মড়ার সঙ্গে বাস করে করে তোমার মনও মরে আড়ষ্ট হয়ে গেছে সুবোধ! নইলে এমন শিল্পচাতুরী দেখবার পরেও মুখ—ভার করতে পারতে না!'
সুবোধ বললে, 'আরে রেখে দাও তোমার শিল্পচাতুরী! রোদ পড়ে আসছে, সামনে আছে সাত মাইল দুর্গম পথ। এ—সময়ে শিল্পচাতুরী নিয়ে তর্ক না করে বাসার দিকে পা চালাবার চেষ্টা করো। পথে আসতে আসতে শুনেছ তো, এখানকার বনে—জঙ্গলে বাঘ—ভাল্লুকের অভাব নেই? তারা শিল্পরসিকের মর্যাদা রাখে না।'
আকাশের দিকে চেয়ে দেখলুম। সূর্যের ছুটি নেবার সময় হয়ে এসেছে। আর ঘণ্টাখানেক পরেই অন্ধকারের কালো রাজত্ব শুরু হবে। শুনেছি এ—অঞ্চলে মাঝে মাঝে ডাকাতের ভয়ও হয়।
সুবোধ আগেই অগ্রসর হল। আমিও তাকে অনুসরণ করলুম।
কিন্তু বরাত ভালো ছিল না।
একটা জঙ্গলের ভিতর দিয়ে খোলা মাঠের উপরে পড়েই দেখলুম, আকাশের একপ্রান্ত আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছে কালির মতন কালো মেঘে মেঘে।
সেইদিকে আঙুল তুলে সুবোধ বললে, 'দেখেছ?'
—'হুঁ, দেখেছি। মিশকালো মেঘ, ঝড় ওঠবার সম্ভাবনা।'
সুবোধ বললে, 'মাঠের ওপর দিয়ে আমাদের প্রায় দু—মাইল হাঁটতে হবে। আসবার সময় দেখেছি, মাঠের ও—পাশে তিন—চারখানা কুঁড়েঘর আছে। কিন্তু সেখানে যাবার অনেক আগেই ঝড় আমাদের নাগাল ধরে ফেলবে। এখন উপায়?'
—'উপায় খুব তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে দেওয়া!' বলেই আমি প্রায় ছুটতে শুরু করলুম।
কিন্তু মাইল—খানেক এগুতে—না—এগুতেই মেঘের দল এগিয়ে এল একেবারে আমাদের মাথার উপরে এবং সঙ্গে সঙ্গে সে কী ঝড়ের তোড়! সুবোধের মাথায় ছিল টুপি, ঝড়ের ছোঁয়া পেয়েই সে পক্ষীধর্ম অবলম্বন করে ফুড়ুক করে আকাশে উড়ে গেল। চারিধারে হু—হু গাঁ—গাঁ গর্জন, পিছন থেকে ঝোড়ো হাওয়ার ধাক্কা এবং রাশি রাশি কাঁকর ছুটে এসে আমাদের গায়ে বিঁধতে লাগল, ছররা গুলির মতো। সন্ধ্যার অন্ধকারের সঙ্গে মেঘের কালিমা মিলে আমাদের দৃষ্টি করে দিলে প্রায় অন্ধের মতো। ভাগ্যে ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল, নইলে নিশ্চয়ই আমরা পথ হারিয়ে ফেলতুম।
কোনওরকমে মাঠ পার হলুম বটে, কিন্তু গায়ে পড়ল বড়ো বড়ো কয় ফাঁটা জল।
সুবোধ বললে, 'ওহে, এইবার বৃষ্টির পালা আরম্ভ হবে। সামনে একটা ঘরের মতন কী দেখা যাচ্ছে, ওইদিকে চলো—ওইদিকে চলো!'
হ্যাঁ, পাশাপাশি দু—তিনখানা কুঁড়েঘরই বটে। একটা দাওয়ার উপরে উঠে দাঁড়াতে—না—দাঁড়াতেই ঝমঝম করে নামল মুষলধারে বৃষ্টি।
খানিকক্ষণ ধরে হাঁপ ছাড়বার পর সুবোধ তেঁতো হাসি হেসে বললে, 'বন্ধুবর, শিল্পচাতুরী এখন কেমন লাগছে?'
—'মন্দ কী?
ঝর—ঝর বরষা,
নাহি কোনও ভরসা।
এও একটা নূতনত্ব ভেবে অনায়াসেই উপভোগ করা যেতে পারে।'
—'ভবিষ্যতে তোমার ভাবুকতার ফাঁদে আর কখনও পড়ব না। এখান থেকে আমাদের বাসা এখনও চার মাইলের কম হবে না। এই বৃষ্টি আর অন্ধকারে সেখানে যাওয়াও অসম্ভব, এখানে থাকাও অসম্ভব।'
—'থাকা অসম্ভব কেন?'
—'সারা রাত উপোস করব? হিন্দু বিধবার মতো উপোস করবার শক্তি আমার নেই। আমার এত খিদে পেয়েছে যে, আমি যদি বাঘ হতুম, তোমাকে ধরেই গপ করে খেয়ে ফেলতুম, বন্ধু বলে মানতুম না।'
ফিরে দেখলুম, আমাদের পিছনে একটা দরজার ফাঁক দিয়ে আলোর লাইন দেখা যাচ্ছে। আমি সেই দরজায় ধাক্কা মারলুম। দরজাটা খুলে গেল। হ্যারিকেন লণ্ঠন হাতে করে একজন স্ত্রীলোক আমাদের দেখেই বিস্মিতভাবে দু—পা পিছিয়ে গেল।
কিন্তু তার চেয়েও বেশি বিস্মিত হলুম আমরা।
বাবা, এত বৃহৎ স্ত্রীলোক আমি কখনও দেখিনি! যেমন লম্বায়, তেমনি চওড়ায়! দেখলেই তাকে পালোয়ানের মতন জোয়ান বলে মনে হয়। এবং কী কালো আর কী কুৎসিত! বলতে কী, সে স্ত্রীলোক হলেও তাকে দেখে আমার বুকের কাছটা ছোঁৎ—ছোঁৎ করতে লাগল।
স্ত্রীলোকটা ভাঙা—ভাঙা বাংলায় বললে, 'তোমরা কে গো বাবুজি?'
—'আমরা এদিকে বেড়াতে এসেছিলুম গো। ফেরবার পথে এই ঝড়—বৃষ্টি! আমাদের বাসা এখান থেকে অনেক দূরে। আজ রাতটা এখানে থাকবার ঠাঁই হবে?'
সে বললে, 'বাবুজি, আমরা ভারী গরিব। এই নোংরা ঘরে তোমরা থাকতে পারবে কি?'
—'খুব পারব গো, খুব পারব। অবিশ্যি কাল সকালে তোমাকে ভালো করে বকশিশ না দিয়ে যাব না।'
স্ত্রীলোকটা খানিকক্ষণ কী ভাবলে। তারপর বললে, 'আচ্ছা, এসো!' আমরা ঘরের ভিতরে গিয়ে দাঁড়ালুম।
সে লণ্ঠনটা তুলে নিয়ে বললে, 'আমার সঙ্গে চলো।'
চললুম। সে—ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে স্ত্রীলোকটা বললে, 'বাবুজি, এই ঘরে তোমাদের থাকতে হবে।'
চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলুম। মাঝারি আকারের ঘর। মেঝেময় ছাগলের বিষ্ঠা, মেটে দেওয়াল, উপরে খড়ের ছাউনি। একদিকে দেওয়াল ঘেঁষে একটা সস্তা দামের আলমারি দাঁড় করানো রয়েছে, কিন্তু তার পাল্লায় কাচ নেই এবং ভিতরেও তাক নেই। আর একদিকে একখানা দড়ির খাটিয়া। সারাঘরে এমন বাঁটকা দুর্গন্ধ যে নাকে কাপড় চাপা দেবার ইচ্ছা হল।
স্ত্রীলোকটা বললে, 'বাবুজি, রাতে তোমরা খাবে কী?'
সুবোধ বললে, 'আমিও তোমাকে ঠিক ওই কথাই জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলুম! রাতে খাব কী? তোমাদের বাড়িতে খাবারটাবার কিছু নেই?'
—'দুটি চাল আছে, আর কিছু নেই। বাবুজি, আমরা বড়ো গরিব।'
সুবোধ ম্রিয়মাণ ক্ষীণস্বরে বললে, 'বেশ, আজ ওই চালেই আমাদের চলবে।'
স্ত্রীলোকটা বললে, 'বাবুজি, তোমরা মোরগ খাও?'
—'মোরগ? অর্থাৎ ফাউল? নিশ্চয়ই খাই।'
—'আমার মোরগ আছে, বাবুজি!'
সুবোধ অত্যন্ত উৎসাহিত হয়ে বললে, 'অ্যাঃ, তোমার মোরগ আছে? তবে কে বলে তুমি গরিব? মোরগ তো রাজভোগ! আচ্ছা, এখন এই একটা টাকা নাও, কাল সকালে তোমাকে আরও তিন টাকা বকশিশ দিয়ে যাব।' বলেই সে ফস করে পকেট থেকে মনিব্যাগটা বার করলে।
স্ত্রীলোকটার দুই চোখ হঠাৎ জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠল। তার সেই লোলুপ দৃষ্টির অনুসরণ করে দেখলুম, সুবোধ তার ব্যাগ খুলেছে এবং ব্যাগের ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়েছে কয়েকখানা নোট।
ঠিক সেই সময়ে দরজার কাছ থেকে কর্কশ হেঁড়ে গলায় কে বললে, 'মণিয়া, এরা কারা?'
চমকে ফিরে দেখি, দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে আর একখানা বীভৎস মুখ! কালো পাথরের থালার মতন গোল মুখে দুটো ভোঁটার মতো চোখ, থ্যাবড়া নাক, ঝাঁটার মতো খোঁচা খোঁচা গাঁফ এবং হিংস্র জন্তুর মতো বড়ো বড়ো দাঁত! যেন মা—দুর্গার অসুর!
মণিয়া—অর্থাৎ সেই স্ত্রীলোকটা তাড়াতাড়ি বললে, 'বাবুজিরা আজ এখানে থাকবে। চল, তোকে সব বলছি।'
সেই দুই অদ্ভুত ও ভয়াবহ মূর্তি অদৃশ্য হবার পর আমি বিরক্ত স্বরে বললুম, 'সুবোধ, এই স্ত্রীলোকটার সামনে কে তোমাকে ব্যাগ খুলতে বললে?'
—'কেন ভাই, কিছু অন্যায় হয়েছে নাকি?'
—'অন্যায় হয়েছে কি না আজ রাতেই হয়তো বুঝতে পারব! একে তো এই অজানা জঙ্গুলে জায়গা, ঝড়—বাদলের রাত, আর আমাদের এই অসহায় অবস্থা, তার উপরে কৃতজ্ঞতার খাতির রেখেও বলতে হচ্ছে, আমাদের আশ্রয় দিয়েছে যারা তাদের চেহারা হচ্ছে দানব—দানবীর মতো! রক্ষক শেষটা ভক্ষক হয়ে না দাঁড়ায়!'
সুবোধ ভীতভাবে ফ্যালফ্যাল করে আমার মুখের পানে তাকিয়ে রইল।
খানিক পরেই দেখি পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এল সেই দুশমনের মতন পুরুষটা। দরজার কাছেই ছিল হ্যারিকেন লণ্ঠনটা। তার ম্লান আলোতেও স্পষ্ট দেখলুম, লোকটার হাতে চকচক করছে একখানা প্রায় একহাত লম্বা ছুরি—না, ছুরি না বলে তাকে ছোটো তরবারি বললেই ঠিক হয়! লোকটা একবার আমার দিকে তাকিয়ে বিশ্রী হাসি হাসলে, তারপর দাওয়া থেকে উঠানে নেমে অন্ধকারের ভিতরে মিলিয়ে গেল।
সুবোধও দেখেছিল। চোখ কপালে তুলে সে বললে, 'সর্বনাশ! এই রাতে অতবড়ো ছুরি নিয়ে ও কী করবে? ও আমাদের পানে তাকিয়ে অমন করে হাসলে কেন?'
পাশের ঘর থেকে স্ত্রী—পুরুষের গলার আওয়াজ এল।
আমি বললুম, 'আমরা এখানে এসে প্রথমে দেখেছিলুম মণিয়াকে। তারপর দেখলুম আর একটা লোককে। এখন দেখছি এ বাড়িতে আরও পুরুষও আছে! তাদের চেহারাও বোধহয় কার্তিকের মতন নয়!'
সুবোধ ধপাস করে খাটিয়ার উপরে শুয়ে পড়ে বললে, 'এক মণিয়া—রাক্ষসী আক্রমণ করলেই আমরা দুজনেই হয়তো কাবু হয়ে পড়ব, তার উপরে আবার পুরুষ—সঙ্গীর দল! নাঃ, আমাদের আর কোনওই আশা নেই!'
ঘণ্টা দুয়েক পরে মোটা লাল চালের ভাতের সঙ্গে এল গরম ফাউলের ঝোল। কিন্তু ফাউল খাবার জন্যে সুবোধ আর কোনও আগ্রহই দেখালে না। তার মুখের ভাব দেখলে মনে পড়ে বলির পাঁঠার কথা। আমার নিজের মুখের ভাব কী রকম হয়েছিল, জানি না।
রাতে শোবার আগে ঘরের দরজা ভিতর থেকে খুব সাবধানে বন্ধ করে দিলুম। হ্যারিকেনের লণ্ঠনটা সেই কাচ ও তাক—হীন আলমারির মাথায় এমনভাবে রেখে দিলুম, যাতে ঘরের সবটা দেখতে পাওয়া যায়।
সুবোধ বললে, 'এরা কী জাত, বোঝা গেল না! এরা মুরগি পোষে, মুরগি রাঁধে, কিন্তু এদের মুসলমান বলে মনে হচ্ছে না।'
খাটিয়ার উপরে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে বললুম, 'আমার বিশ্বাস, এরা সাঁওতাল কি ওই রকম কোনও বুনো জাত!'
সুবোধ ত্রস্তস্বরে বললে, 'কী হে, ঘুমোবে নাকি? আমি কিন্তু সারারাতই জেগে বসে থাকব। এখানে ঘুম মানে মৃত্যু বা আত্মহত্যা।'
—'তুমি যদি পাহারা দিতে রাজি হও, তা হলে আমি আর জেগে মরি কেন?' বলেই চোখ মুদে ফেললুম।
বাইরে তখনও ঝমঝম করে বৃষ্টি হচ্ছে। থেকে থেকে গাছে গাছে ঝোড়ো হাওয়ার কান্নাও শোনা যাচ্ছে। সেইসঙ্গে শুনলুম একটা ছাগলও চিৎকার করছে প্রাণপণে।
কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, কতক্ষণ যে ঘুমিয়েছি জানি না, কিন্তু হঠাৎ সুবোধের প্রচণ্ড ঠেলাঠেলির চোটে ভেঙে গেল আমার ঘুম।
ধড়মড় করে উঠে বসলুম, 'কী, কী, ব্যাপার কী?'
সুবোধ প্রায় কান্নার স্বরে বললে, 'বাইরে থেকে দরজায় ধাক্কা মারছে! তারা আসছে—তারা আসছে!'
—'কী বলছ? কারা আসছে?'
—'যারা আমাদের গলা কাটতে চায়! আর রক্ষে নেই।'
সভয়ে দরজার দিকে তাকালুম।
সুবোধ থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বললে, 'ও—দরজায় নয়, অন্য কোনও দরজায়! ওই শোনো।'
সত্য, ঘটাঘট করে একটা দরজার শব্দ হল। শব্দটা জাগছে এই ঘরের ভিতরেই, অথচ এখানে একটা ছাড়া দরজা নেই!
সুবোধ কান পেতে শুনে বললে, 'শব্দটা আসছে যেন ওই ভাঙা আলমারির পেছন থেকেই।'
তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে আলমারিটা একটু টেনে সরিয়ে তার ফাঁকে উঁকি মেরে দেখলুম, সত্য—সত্যই আলমারির পিছনে রয়েছে আর একটা দরজা!
সুবোধ বললে, 'ভাই, আমরা পাকা ডাকাতের পাল্লায় পড়েছি। ওই দরজাটা লুকোবার জন্যেই ওখানে ওরা আলমারি রেখেছে!'
হাত বাড়িয়ে দেখলুম, সে—দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করবার কোনও উপায় নেই।
বুঝলুম, একটু জোরে ধাক্কা মারলেই এই ভাঙা আলমারিটা এখনই উলটে হুড়মুড় করে পড়ে যাবে মেঝের উপরে। কিন্তু শত্রুরা জোরে ধাক্কা মারছে না কেন? আমাদের ঘুম ভেঙে যাবার ভয়ে? খুব সম্ভব তাই।
আলমারিটাকে আবার যথাস্থানে সরিয়ে রেখে তার গায়ে খাটিয়াখানা ঠেলে দিলুম। তারপর খাটিয়ায় বসে পড়ে ঘড়ি বার করে দেখলুম, রাত সাড়ে তিনটে।
কিন্তু আমাদের প্রাণ এবং সুবোধের নোটগুলো এ—যাত্রা বেঁচে গেল, কারণ রাত্রে সন্দেহজনক আর কিছু ঘটল না।
সকালে ঘরের দরজা খুলেই দেখি, মণিয়া দাওয়ায় দাঁড়িয়ে আছে।
সে হেসে জিজ্ঞাসা করলে, 'বাবুজি, রাতে ঘুম হয়েছিল তো?'
আমি ক্রুদ্ধস্বরে বললুম, 'সারারাত তোমরা যদি দরজা ঠেলাঠেলি করো, তাহলে ঘুম হয় কেমন করে?'
মণিয়া আবার হেসে বললে, 'ও, বুনি বুঝি ওদিকের ভাঙা দরজাটা ঠেলেছিল? হ্যাঁ বাবুজি, বুনির ওই স্বভাব। ও দরজার খিল নেই, বুনি তা জানে। তার জ্বালাতেই তো দরজার সামনে আলমারিটা দাঁড় করিয়ে রেখেছি।'
—'বুনি কে শুনি?'
—'আমাদের বকরি, বাবুজি!'
ছাগলি! একটা ছাগলির ভয়ে কাল রাতে আমরা—
হঠাৎ সুবোধ একদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলে।
উঠানের মাঝখানে রয়েছে একরাশ মুরগির পালক প্রভৃতি এবং তার পাশেই দেখা যাচ্ছে মস্ত একখানা একহাত লম্বা ছুরি।
তাহলে কাল রাতে সেই লোকটা এই ছুরিখানা নিয়ে বেরিয়েছিল মুরগি কাটবার জন্যেই?
বিদেশ—বিভুঁই, ঝড়—বাদল, নিশুতি রাত, অচেনা মানুষের বিকট চেহারা, বৃহৎ ছুরি, লুকানো দরজা, ছাগলি বুনির গৃহপ্রবেশ—চেষ্টা প্রভৃতি একসঙ্গে মিলে আমাদের মনের ভিতরে যে ঘোরতর বিভীষিকার জগৎ সৃষ্টি করেছিল, সকালের সূর্যালোকে তা উড়ে গেল কুয়াশার মতো।
নিজেদের মনে—মনে লজ্জাও যে হচ্ছিল না এমন কথা বলতে পারি না।
এবং অনুতাপও হচ্ছিল যথেষ্ট। হতে পারে মণিয়া আর তার সঙ্গীদের চেহারা অপ্সর—অপ্সরীদের মতন নয়। কিন্তু এই দুর্যোগের রাতে গহন বনে আমাদের মতন অনাহুত অতিথিদের আশ্রয় ও আহার্য দিয়ে তারা যে যত্নাদরটা করেছে, তার মর্যাদা না দিয়ে আমরা যে তাদের উপরেই অকৃতজ্ঞের মতন হীন সন্দেহ করেছি, এই অপ্রিয় সত্যটাই আমাদের মনকে আঘাত দিতে লাগল বারংবার।
বলা বাহুল্য, সুবোধের অঙ্গীকৃত তিন টাকা বকশিশ পরিণত হল পঞ্চ মুদ্রায়। এই অভাবিত সৌভাগ্যে মণিয়ার কালো মুখের উপর দিয়ে বয়ে গেল মিষ্ট হাসির তরঙ্গ।
প্রকাশিত—১৯৪০
___
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন