০১. উপরে কি কেউ আছেন?

কাজী মাহবুব হাসান

অধ্যায় ১. উপরে কি কেউ আছেন?

ধর্ম কী? আর কোথা থেকে এটি এসেছে? ধর্ম এসেছে মানব প্রাণীদের মন থেকে, সুতরাং আমাদের কাছ থেকেই এটি এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে প্রতীয়মান যে, পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণীরই ধর্মের প্রয়োজন নেই। আর আমরা যতদূর বলতে পারি তারা কোনো ধর্মও সৃষ্টি করেনি। তার কারণ, আমাদের চেয়ে তারা তাদের জীবনের সাথে অনেক বেশি একাত্ম। সহজাত প্রবৃত্তি অনুযায়ী তারা আচরণ করে। তারা তাদের অস্তিত্বের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতার সাথেই জীবন কাটায় সারাক্ষণ সেই বিষয়ে না-ভেবে। মানব প্রাণী সেই কাজটি করার ক্ষমতা হারিয়েছে। আমাদের মস্তিষ্ক এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে, এটি আমাদের আত্মসচেতন করে তোলে। নিজেদের ব্যাপারে আমরা বেশ কৌতূহলী। কোনোকিছু নিয়ে না-ভেবে আমরা থাকতে পারি না। আমরা চিন্তা না করে থাকতে পারি না।

আর সবচেয়ে বড় যে-বিষয়টি নিয়ে আমরা চিন্তা করি, সেটি এই মহাবিশ্ব নিয়ে, এবং কোথা থেকে এটি এসেছে সেই বিষয়ে। কেউ কি কোথাও আছেন যিনি এটি সৃষ্টি করেছেন? আর সম্ভাব্য সেই কেউ বা কোনোকিছুকে বোঝাতে আমরা যে-শব্দটি ব্যবহার করি সেটি হচ্ছে ‘গড’ বা ‘ঈশ্বর’, গ্রিক ভাষায় ‘থিওস’, আর এমন কেউ যিনি মনে করেন একজনের ঈশ্বর আছেন তাকে বলা হয়। ‘থেইস্ট বা আস্তিক’। আর যিনি ভাবেন কোথাও এমন কেউ বা কিছু নেই আর এই মহাবিশ্বে আমরা একা, তাদের বলা হয় ‘এথেইস্ট বা নাস্তিক’। আর ঈশ্বরকে নিয়ে অধ্যয়ন আর আমাদের কাছে তিনি কী চাইছেন সেই বিষয়ে জ্ঞানার্জনকে বলা হয় ধর্মতত্ত্ব বা ‘থিওলজি’। আরেকটি বড় প্রশ্ন যা আমরা নিজেদেরকে না করে থাকতে পারি না, সেটি হচ্ছে, মৃত্যুর পরে আমাদের সাথে কী ঘটবে? যখন আমরা মারা যাব, সেটাই কি শেষ নাকি এর পরে আরো কিছু ঘটবে? আর যদি কিছু থেকে থাকে, কেমন হবে সেটি?

যা আমরা ধর্ম বলে চিহ্নিত করি, সেটি হচ্ছে এইসব প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্যে আমাদের প্রথম প্রচেষ্টা। প্রথম প্রশ্নটির জন্যে এর উত্তর খুব সহজ। মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছে একটি শক্তিশালী সত্তা, যাকে আমরা কেউ কেউ ‘গড’ বা ‘ঈশ্বর’ বলি, এবং যা-কিছু তিনি সৃষ্টি করেছিলেন, সেগুলো নিয়ে তার কৌতূহল আর সেখানে হস্তক্ষেপ করা অব্যাহত রেখেছেন। ঈশ্বর নামের শক্তিশালী সত্তাটি কেমন, এবং আমাদের কাছে এটি কী প্রত্যাশা করে, প্রতিটি ধর্ম সেই বিষয়ে পৃথক পৃথক সংস্করণ প্রস্তাবনা করেছে, কিন্তু সেগুলোর প্রত্যেকটি কোনো-না-কোনো একটি রূপে এর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। সেগুলো আমাদের বলে, এই মহাবিশ্বে আমরা একা নই। আমাদের বোধের সীমানার বাইরেও অন্য বহু বাস্তবতা আছে, অন্য জগৎ। আমরা তাদের ‘অতিপ্রাকৃত’ বলি, কারণ সেগুলো এই প্রাকৃতিক জগতের বাইরে অবস্থিত, যে প্রাকৃতিক জগৎটি আমাদের ইন্দ্রিয়ের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে অভিগম্য।

যদি ধর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাসটি হয়, এই জগতের বাইরে আরো একটি বাস্তবতার অস্তিত্বের ওপর বিশ্বাস, যাকে আমরা ঈশ্বর বলছি, তাহলে কী এই বিশ্বাসটিকে প্ররোচিত বা অনুপ্রাণিত করেছিল, আর কখন এটি শুরু হয়েছিল? এটি শুরু হয়েছিল বহু যুগ আগে। বাস্তবিকভাবে, আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, এমন কোনো সময় আসলেই কখনো ছিল না, যখন মানুষ এই পৃথিবীর বাইরে একটি অতিপ্রাকৃত জগতের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেনি। এবং মানুষ মারা যাবার পর সেই মানুষগুলোর সাথে কী ঘটে সেই বিষয়টি নিয়ে কল্পনা আর ভাবনা হয়তো এইসব কিছুর সূচনা করেছিল। সব প্রাণীই মারা যায়, কিন্তু অন্যদের ব্যতিক্রম, মানুষ তাদের স্বজনদের মৃতদেহ যেখানে তারা মারা যাচ্ছে সেখানে পড়ে পচার জন্যে ফেলে রেখে যায় না। যতদূর আমরা সেই মানুষগুলোর ইতিহাস অনুসরণ করতে পারি, মানুষ স্পষ্টতই মৃতদের জন্যে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করত। আর তারা সেই অনুষ্ঠানটি যেভাবে পরিকল্পনা করতেন, সেটি তাদের সবচেয়ে প্রাচীনতম বিশ্বাসগুলো সম্বন্ধে আমাদের কিছুটা ধারণা দেয়।

অবশ্যই, এর মানে এমন কিছু বলা হচ্ছে না যে, অন্য প্রাণীরা তাদের মৃত সঙ্গীদের জন্যে শোক প্রকাশ করে না। বহু প্রমাণ আছে যে, অনেক প্রাণী সেটি করে। এডিনবরায় ছোট একটি কুকুরের বিখ্যাত মূর্তি আছে, যার নাম ছিল ‘গ্রেফ্রায়ার্স ববি’, সেটি সাক্ষ্য দিচ্ছে কোনো প্রাণী কীভাবে দুঃখ অনুভব করে যখন তারা তাদের সাথে সম্পর্কযুক্ত এমন কাউকে হারায়। ববি মারা গিয়েছিল ১৮৭২ সালে, তার জীবনের শেষ চৌদ্দটি বছর সে তার মৃত মনিব, জন গ্রে’র কবরের উপর শুয়ে কাটিয়েছিল। কোনো সন্দেহ নেই ববি তার বন্ধুর অনুপস্থিতি গভীরভাবে অনুভব করেছিল, কিন্তু জন গ্রে’র মানব-পরিবারই তার জন্য প্রকৃত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, এবং গ্রেফ্রায়ার্স কার্কইয়ার্ডে তাকে সমাহিত করেছিল। এবং তাকে সমাহিত করার মাধ্যমে তারা খুব বৈশিষ্ট্যসূচক মানব-আচরণগুলোর একটি আচরণ সম্পন্ন করেছিলেন। তাহলে কোন বিষয়টি মৃতদের সমাহিত করা শুরু করতে মানুষকে প্ররোচিত করেছিল?

মৃতদের ব্যাপারে যে সুস্পষ্ট ব্যাপারটি আমাদের নজরে পড়ে সেটি হচ্ছে তাদের ভিতরে যা-কিছু ঘটছিল সেটি ঘটা বন্ধ হয়ে গেছে। তারা আর শ্বাস নিচ্ছে না। আর নিশ্বাস নেবার কাজটির সাথে সেই ধারণাটিকে সংশ্লিষ্ট করা ছিল খুব ক্ষুদ্র একটি পদক্ষেপ : আমাদের ভিতরে কিছু বাস করছে, কিন্তু সেটি আমাদের ভৌত শরীর থেকে পৃথক এবং যা এটিকে জীবন দিচ্ছে। এর জন্য গ্রিক শব্দটি ছিল ‘সাইকি’, ল্যাটিন ‘স্পিরিটাস’, এই দুটোই এসেছে সেই ক্রিয়াপদগুলো থেকে, যার অর্থ শ্বাস নেওয়া অথবা ফুঁ দেওয়া। একটি ‘স্পিরিট’ অথবা ‘সোল’ বা ‘আত্মা’ হচ্ছে এমন কিছু, যা কোনো-একটি শরীরকে জীবন্ত করে ও এটিকে নিশ্বাস নেওয়ায়। খানিকটা সময়ের জন্যে একটি শরীরের মধ্যে এটি বাস করে। যখন শরীর মারা যায়, এটি শরীরটিকে ত্যাগ করে চলে যায়। কিন্তু এটি কোথায় যায়? একটি ব্যাখ্যা ছিল, এটি এই জগতের ওপারে অন্য সেই জগতে চলে যায়, ‘আত্মার জগৎ, আমরা পৃথিবীতে যে-জগতে বাস করছি, এটি সেই জগতেরই অপর পিঠ।’

প্রাচীন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া-সংশ্লিষ্ট আচরণগুলো যা আমরা আবিষ্কার করেছি সেগুলো সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করছে, যদিও আমাদের দূরের পূর্বসূরিরা, তারা কী চিন্তা করছিলেন তার নীরব কিছু চিহ্ন আমাদের জন্যে রেখে গেছেন। তখনও লেখার পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি, সুতরাং তাদের চিন্তাগুলো কিংবা তাদের বিশ্বাসের বিবরণ তারা আমাদের জন্যে লিখে রেখে যেতে পারেননি, যেন আজ আমরা সেগুলো পড়তে পারি। কিন্তু তারা যা চিন্তা করেছিলেন সেই বিষয়ে আমাদের জন্যে কিছু ইঙ্গিত রেখে গেছেন। সেগুলো খুঁজে পেতে আমাদের বর্তমান ‘কমন’ সময়ের (যিশুর জন্ম) বেশ কয়েক হাজার বছর আগে ফিরে যেতে হবে। তবে আলোচনায় আরো অগ্রসর হবার আগে ‘বিসিই’, (‘বিফোর কমন এরা’ –কমন সময়ের আগে) শব্দটির একটি ব্যাখ্যা দরকার।

যখন অতীতে কোনো ঘটনা ঘটে, সেগুলো ঘটার দিন-তারিখ চিহ্নিত করার জন্যে কোনো বৈশ্বিক ক্যালেন্ডার বা উপায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ। যা আমরা এখন ব্যবহার করি সেটি ষষ্ঠ শতাব্দীতে (কমন এরা) পরিকল্পনা করেছিল খ্রিস্টীয় জগৎ, যা প্রদর্শন করছে, আমাদের ইতিহাসে ধর্ম ঠিক কতটা প্রভাবশালী হতে পারে। হাজার বছর ধরে ক্যাথলিক চার্চ পৃথিবীর অন্যতম ক্ষমতাশালী একটি প্রতিষ্ঠান ছিল, এতই ক্ষমতাবান যে তারা সেই ক্যালেন্ডার নির্ধারণ করেছিল, যা আমরা এখনো ব্যবহার করছি। ক্যাথলিক চার্চের প্রতিষ্ঠাতা, যিশুখ্রিস্টের জন্ম ছিল এর কেন্দ্রীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাঁর জন্মসাল হচ্ছে ‘ইয়ার ওয়ান’ বা প্রথম খ্রিস্টাব্দ। যা-কিছু এর আগে ঘটেছে সেগুলো ‘বিফোর ক্রাইস্ট’ বা বি.সি. বা খ্রিস্টপূর্বাব্দ। এরপরে যে বছরগুলো এসেছিল সেটি হচ্ছে এ.ডি. বা আনো ডমিনি, দ্য ইয়ার অব দ্য লর্ড (আমাদের প্রভুর বছর)।

আমাদের এই সময়ে বি.সি. আর এ.ডি, প্রতিস্থাপিত হয়েছে বি.সি.ই. বা বিফোর কমন এরা অথবা সি.ই. বা উইদইন কমন এরা শব্দগুলো দিয়ে, যে শব্দগুলো কোনো ধর্মীয় ইঙ্গিত ছাড়াই অনুবাদ করা যেতে পারে : হয় খ্রিস্টীয় যুগের পূর্বে বা বি.সি.ই. এবং খ্রিস্টীয় যুগের মধ্যে বা সি.ই. অথবা কমন এরার পূর্বে বা বি.সি.ই. অথবা কমন এরার মধ্যে বা সি.ই.। কীভাবে এই শব্দগুলো বুঝবেন সেটি আপনি নিজেই বাছাই করতে পারেন। এই বইয়ে আমি বি.সি.ই. ব্যবহার করব সেই ঘটনাগুলোকে চিহ্নিত করতে, যেগুলো ঘটেছিল খ্রিস্টের জন্মের আগে অথবা কমন এরার আগে। কিন্তু লেখার মধ্যে বিশৃঙ্খলা যেন সৃষ্টি না হয়, সেজন্য আমি সি.ই. শব্দটির পরিমিত ব্যবহার করব এবং শুধুমাত্র যেখানে প্রয়োজনীয় সেখানেই সেটি শুধু ব্যবহার করব। সুতরাং যদি এমন কোনো তারিখ আপনার চোখে পড়ে যার পরে বি.সি.ই কিংবা সি.ই, শব্দটি নেই, আপনি জানবেন যে এটি উইথইন দ্য ক্রিশ্চিয়ান অথবা কমন এরা হবে (অর্থাৎ খ্রিস্টাব্দ)।

যাই হোক, ১৩০,০০০ বি.সি.ই. (খ্রিস্টপূর্ব) থেকেই আমাদের পূর্বসূরিরা যেভাবে তাদের মৃতদের সমাহিত করতেন সেখান থেকে তাদের একধরনের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রমাণ আমরা পাই। কবরের মধ্যে মৃতদেহের পাশে খাদ্য, ব্যবহার করার মতো হাতিয়ার বা যন্ত্র আর অলংকার সাজিয়ে রাখা হয়েছে, এমন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে, যা মৃতরা একধরনের মৃত্যুপরবর্তী জীবনের পথে যাত্রা করে এবং সেই যাত্রার জন্যে তাদের প্রস্তুত করে প্রেরণ করা প্রয়োজন, এমন একধরনের বিশ্বাসের উপস্থিতি প্রস্তাব করে। আরেকটি আচরণ ছিল, মৃতদের শরীর লাল গিরিমাটি দিয়ে চিত্রিত করা; হয়তো চলমান জীবনের প্রতীকী প্রকাশ ছিল সেটি। এটি আবিষ্কৃত হয়েছিল আপাতত খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীনতম সমাধিক্ষেত্রে, একটি মা ও শিশুর সমাধি ছিল এটি, ইজরায়েলের কাফজে হতে, এটির সময়কাল প্রায় ১০০,০০০ বি.সি.ই. (খ্রিস্টপূর্ব)। ঠিক সেই একই আচরণ আবার খুঁজে পাওয়া যায় অর্ধেক পৃথিবী দূরত্বে অস্ট্রেলিয়ার লেক মুংগো এলাকা, ৪২,০০০ বি.সি.ই. সময়কালের, যেখানে সমাহিত ব্যক্তির শরীর চিত্রিত ছিল লাল গিরিমাটি দিয়ে। মৃতদেহের শরীর-চিত্রায়ন মানবতার সবচেয়ে বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ ধারণাগুলোর উন্মেষকাল হিসাবে চিহ্নিত করা হয়, সেটি হচ্ছে প্রতীকী চিন্তা। ধর্মে এমন চিন্তা খুব ব্যাপকভাবেই উপস্থিত, সুতরাং বিষয়টি বোঝা খুব জরুরি।

অন্য অনেক উপযোগী শব্দের মতো ‘সিম্বল’ শব্দটি এসেছে গ্রিকভাষা থেকে। এর মানে সেই জিনিসগুলো একসাথে জড়ো করা যা আলাদা হয়ে গেছে, যেভাবে কোনো ভাঙা প্লেটের টুকরোগুলো আঠা দিয়ে লাগিয়ে একসাথে করতে পারেন আপনি। তারপর একটি প্রতীক একটি বস্তুতে পরিণত হয় যদি সেটি কোনোকিছুর পক্ষে অথবা কিছুর প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু তারপরও এর সেই ধারণাটি থাকে যা নানা জিনিসকে যুক্ত করার বিষয়টি ইঙ্গিত করে, কিন্তু শুধুমাত্র ভাঙা প্লেটের টুকরো আঠা দিয়ে জোড়া লাগানোর চেয়েও এটি আরো বেশি জটিল রূপ ধারণ করে। প্রতাঁকের একটি চমৎকার উদাহরণ হচ্ছে জাতীয় পতাকা; যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্টার আর স্ট্রাইপস’। যখন আমরা এই নক্ষত্র আর লাল সাদা দাগগুলো দেখি, সেটি আমাদের মনে যুক্তরাষ্ট্র নামের একটি দেশের প্রতি তথ্যনির্দেশ করে। এটি এর প্রতীকী রূপ, এর পরিবর্তে যা প্রকাশ করা যেতে পারে।

প্রতীক মানুষের কাছে পবিত্র হয়ে ওঠে, কারণ ভাষায় যতটুকু প্রকাশ করা। সম্ভব, সেগুলো তারচেয়েও আরো গভীর আনুগত্যের প্রতিনিধিত্ব করে। আর সেকারণে সবাই তাদের প্রিয় প্রতীকগুলোর অবমাননা দেখতে ঘৃণাবোধ করেন। পুরোনো একটি কাপড় আগুন দিয়ে পুড়ানোর মধ্যে দোষের কিছু নেই, কিন্তু যদি ‘সেটি’ ঘটনাক্রমে আপনার নিজের জাতিকে প্রতিনিধিত্ব করে, এটি আপনাকে ক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে। যখন প্রতীকগুলো ধর্মীয়, কোনো একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে পবিত্র, সেগুলো আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আর সেগুলোর অপমান উন্মত্ত ক্রোধের সূচনা করতে পারে। আপনার মনের মধ্যে প্রতাঁকের ধারণাটি কিছুক্ষণ ধরে রাখুন, কারণ এই বইয়ে এই ধারণাটির পুনরাবৃত্তি হবে। একটি জিনিস, যেমন, লাল গিরিমাটি, অন্যকিছুর প্রতিনিধিত্ব করছে, সেই চিন্তাটি, যেমন, সেই বিশ্বাসটি, মৃতরা তাদের মৃত্যুর পরে অন্য একটি জগতে তাদের নতুন জীবন শুরু করে।

প্রতীকী চিন্তার আরো একটি উদাহরণ হচ্ছে যেখানে মৃতদের সমাহিত করা হয়েছে, সেটি চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, বিশেষ করে যদি তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ কোনো ব্যক্তি হন। কখনো তাদের শুইয়ে রাখা হতো দানবীয় পাথরের টুকরোর নিচে, কখনো খুব সতর্কভাবে নির্মিত পাথরের কক্ষে যাদের ‘ডলমেন’ বলা হয়, যা মূলত দুটি খাড়া করে দাঁড় করানো পাথর, যা আরো একটি বড় পাথরকে এর ছাদ হিসাবে ধরে রাখে। মৃতদের জন্যে নির্মিত সবচেয়ে নাটকীয় স্মারকস্তম্ভ হচ্ছে মিশরের গির্জায় পিরামিডগুলো। কবর ছাড়াও, পিরামিডগুলোকে ভাবা হয় একধরনের উৎক্ষেপণ এলাকা হিসাবে, যেখান থেকে সেই পিরামিডগুলোর রাজকীয় বাসিন্দারা অমরত্ব অভিমুখে যাত্রা করতেন।

সময়ের সাথে সমাহিত করার আচার শুধুমাত্র আরো বিস্তারিতভাবে জটিলই হয়নি, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেগুলো রূপান্তরিত হয়েছিল ভয়ংকর নিষ্ঠুর একটি আচরণেও, যেখানে মৃতব্যক্তিদের এই জীবন-পরবর্তী অন্য জীবনে সবধরনের স্বাচ্ছন্দ্য আর মর্যাদা টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে জোরপূর্বক বিসর্জন দেওয়ার মাধ্যমে। স্ত্রী ও ভৃত্যদেরও তার সাথে সেখানে পাঠানো হতো। এখানে লক্ষ করা দরকার, শুরু থেকেই ধর্মের একটি নিষ্ঠুর দিক ছিল, কোনো একক ব্যক্তির জীবনকে যা খুব সামান্যই মূল্য দিয়েছে।

এইসব ইঙ্গিতগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করলে বোঝা যায়, মৃত্যুকে আমাদের পূর্বসূরিরা অস্তিত্বের আরেকটি স্তরে প্রবেশ হিসাবে দেখেছিলেন, যা এই জীবনের একটি অন্য সংস্করণ হিসাবে কল্পিত হয়েছে। এই পৃথিবী ছাড়িয়ে আরেক পৃথিবীর ওপর তাদের বিশ্বাসটিকে আমরা একনজর দেখতে পাই, যে-জীবনের সাথে এই জীবন সংযুক্ত, শুধুমাত্র দরজা হিসাবে মৃত্যু যে জীবনদুটির মাঝে দাঁড়িয়ে আছে।

এ পর্যন্ত ধর্মীয় বিশ্বাস দেখতে এমনই ছিল, যেন সেটি অনুপ্রাণিত অনুমান নির্ভর কোনো ধারণার ওপর ভর করে অর্জিত হয়েছে। আমাদের পূর্বসূরিরা। নিজেদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কোথা থেকে এই পৃথিবী এসেছে এবং তারা ধারণা করেছিলেন, এটি অবশ্যই সৃষ্টি করেছে কোনো উচ্চতর শক্তিমান সত্তা, যিনি এই পৃথিবীর বাইরে কোথাও আছেন। তারা নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া মৃতদের লক্ষ। করেছিলেন এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, তাদের আত্মা অবশ্যই তাদের শরীর ত্যাগ করেছে, যা একসময় সেই শরীরে বাস করত এবং এখন সেটি অন্য কোথাও চলে গেছে।

কিন্তু ধর্মের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠীর সদস্যরা কিন্তু শরীরত্যাগী আত্মার গন্তব্য হিসাবে এই জগতের সীমানা পেরিয়ে অন্য কোনো জগতের অস্তিত্ব শুধুমাত্র ‘কল্পনা’ বা ‘অনুমান’ করেনি। তারা আমাদের বলেছেন যে, তারা সেই জগতে গিয়েছেন, এবং সেই জগৎটি তাদের কাছে এসেছে। আমাদের কাছে সেটি কী প্রত্যাশা করেছে সেটি তারা শুনেছেন। তাদের ওপর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেন তারা সেই নির্দেশগুলোর কথা অন্যদের বলেন, তারা কী দেখেছেন আর শুনেছেন। সুতরাং তারা দাবি করেছেন সেই বার্তাগুলো, যা তাদের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে এবং তারা গ্রহণ করেছেন। তারা বহু অনুসারীদের আকৃষ্ট করে। থাকেন, যারা তার কথার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং তাদের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন কাটাতে শুরু করেন। আমরা তাদের বলি নবী, প্রফেট কিংবা প্রাজ্ঞ সাধু। এবং এদের মাধ্যমেই নতুন ধর্মগুলোর জন্ম হয়েছিল।

তারপর অন্যকিছু ঘটেছিল। তারা যে-গল্পগুলো বলেছিলেন সেটি তাদের অনুসারীরা মুখস্থ করেছিলেন। প্রথমে এটি মুখে-মুখে হস্তান্তরিত হয়েছে। কিন্তু একটি সময় সেগুলো কাগজের উপর লেখা হয়েছিল। তারপর এটি সেই বিশেষ বইয়ে রূপান্তরিত হয়েছিল, যেগুলোকে আমরা বলি, হলি স্ত্রিপচার বা পবিত্র গ্রন্থ। বা ধর্মগ্রন্থ, শাস্ত্র ইত্যাদি। দ্য বাইবেল! দ্য বুক! এবং এটাই ধর্মের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতাঁকে রূপান্তরিত হয়েছিল। আসলেই এটি একটি বই অবশ্যই, মানুষই এটি লিখেছে। আমরা এর ইতিহাস অনুসরণ করতে পারি। কিন্তু এর শব্দগুলোর মাধ্যমে অন্য জগতের বার্তা আমাদের জগতে নিয়ে আসা হয়েছে। এই বইটি সীমাবদ্ধ সময় আর অনন্তকালের মধ্যে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করেছে। মানুষকে এটি স্বর্গীয় সত্তার সাথে যুক্ত করেছে। আর সে-কারণে এটিকে বিস্ময়কর শ্রদ্ধার সাথে দেখা হয় আর গভীরভাবে অধ্যয়ন করা হয়। আর সে-কারণে যখন এটিকে ধ্বংস কিংবা অবজ্ঞা করা হয়, তখন বিশ্বাসীরা খুবই অপছন্দ করেন।

ধর্মের ইতিহাস হচ্ছে এইসব নবী আর সাধুদের গল্প এবং যে-আন্দোলনগুলো তারা শুরু করেছিলেন এবং যে-ধর্মগ্রন্থগুলো লেখা হয়েছে তাদেরকে নিয়ে। কিন্তু এটি বেশ বিতর্কিত আর মতানৈক্যেরও একটি বিষয়। এইসব নবীদের, এমনকি কারো কারো আদৌ অস্তিত্ব ছিল কিনা সেটি নিয়ে সন্দেহবাদীরা প্রশ্ন তুলেছেন। এইসব স্বর্গীয় বা ঈশ্বর বা তার প্রেরিত কোনো প্রতিনিধির দৃশ্য বা কণ্ঠস্বর নিয়ে করা নবীদের দাবিগুলো নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। অবশ্যই যুক্তিসংগত, কিন্তু মূল বিষয়টি বুঝতে ব্যর্থ হওয়ার একটি সম্ভাবনা আছে। যা সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে সেটি হচ্ছে, তাদের নিয়ে বলা সব গল্পে তাদের অস্তিত্ব আছে, যে-গল্পগুলো বহু। হাজার কোটি মানুষের জন্যে এখনো অর্থবহ।

এই বইটিতে আমরা সেই গল্পগুলো পড়ব, ধর্মগুলো আমাদেরকে যে গল্পগুলো এর নিজের সম্বন্ধে বলেছে, আসলেই এভাবে অতীতে ঘটনাগুলো ঘটেছিল কিনা সারাক্ষণ এমন কিছু জিজ্ঞাসা না করে। কিন্তু যেহেতু সেই প্রশ্নটিকে পুরোপুরি অবজ্ঞা করাও ভুল হবে, আমরা পরে অধ্যায়টি চিন্তা করে কাটাব, আসলেই কী ঘটে যখন ঐসব নবী আর সাধুরা কোনো ঐশী দৃশ্যের দ্রষ্টা হন বা কণ্ঠস্বর শোনেন। এইসব নবীদের মধ্যে একজনের নাম ছিল ‘মোজেস’।

সকল অধ্যায়
১.
০. ভূমিকার পরিবর্তে
২.
০১. উপরে কি কেউ আছেন?
৩.
০২. দরজাগুলো
৪.
০৩. চাকা
৫.
০৪. এক থেকে অনেক
৬.
০৫. রাজকুমার থেকে বুদ্ধ
৭.
০৬. কোনো ক্ষতি কোরো না
৮.
০৭. যাযাবর
৯.
০৮. নলখাগড়ার বনে
১০.
০৯. দশ নির্দেশ
১১.
১০. নবীরা
১২.
১১. সমাপ্তি
১৩.
১২. ভিন্নমতাবলম্বী
১৪.
১৩. শেষ যুদ্ধ
১৫.
১৪. পার্থিব ধর্ম
১৬.
১৫. সবচেয়ে ভালো উপায়
১৭.
১৬. কাদা মন্থন
১৮.
১৭. ধর্ম যখন ব্যক্তিগত হয়ে উঠেছিল
১৯.
১৮. ধর্মান্তরিত
২০.
১৯. মেসাইয়া
২১.
২০. যিশু এলেন রোমে
২২.
২১. চার্চ যখন দায়িত্ব নিয়েছিল
২৩.
২২. শেষ নবী
২৪.
২৩. সমর্পণ
২৫.
২৪. সংগ্রাম
২৬.
২৫. নরক
২৭.
২৬. খ্রিস্টের প্রতিনিধি
২৮.
২৭. প্রতিবাদ
২৯.
২৮. মহাবিভাজন
৩০.
২৯. নানকের সংস্কার
৩১.
৩০. মধ্যম পথ
৩২.
৩১. পশুর শিরশ্চেদ
৩৩.
৩২. বন্ধুরা
৩৪.
৩৩. আমেরিকায় তৈরি
৩৫.
৩৪. আমেরিকায় জন্ম
৩৬.
৩৫. মহা-হতাশা
৩৭.
৩৬. অতীন্দ্রিয়বাদী এবং চলচ্চিত্র তারকা
৩৮.
৩৭. দরজা উন্মুক্ত করা
৩৯.
৩৮. ক্রুদ্ধ ধর্ম
৪০.
৩৯. পবিত্র যুদ্ধগুলো
৪১.
৪০. ধর্মের সমাপ্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%