সায়ন্তনী পূততুন্ড
জলের সাথে আমার ছায়া বলছে আমার কথা
জল বোঝে না কোনটা কথা, কোনটা প্রগলভতা!
ছপছপিয়ে আতুর বিরাম আসল এখন কাছে,
ছলছলিয়ে ভাসিয়ে নিল খাতার শেষের পাতা৷
জল জানে না কোনটা কথা, কোনটা প্রগলভতা!
বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে৷ বন্ধ কাচের জানলার ও প্রান্তে ঝাপসা প্রেক্ষাপট৷ বর্ষাস্নাত প্রকৃতি আস্তে আস্তে যুবতি হচ্ছে৷ জলের স্বচ্ছ ফোঁটা পাতায় পাতায় দ্যুতি ছড়িয়ে হাসছিল৷ প্রচণ্ড গরমের ক্লান্তিকর ঘামের দাগ নিশ্চিহ্ন করতেই এই ধারাস্নানের উদ্যোগ! যেন সারাদিনের কাজকর্ম সেরে গৃহিণী সান্ধ্যস্নান করছেন৷ তাঁর অনিন্দ্যসুন্দর মুখ চুঁইয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ছে ঝরে জলবিন্দু৷
গহন ক্লান্ত দৃষ্টিতে বন্ধ জানলার দিকে তাকিয়েছিলেন৷ বৃষ্টি নয়৷ দ্রষ্টব্য বিষয় নিজের মুখের প্রতিচ্ছবি৷ কাচের জানলায় তাঁর নিজের মুখেরই প্রতিবিম্ব পড়ছিল৷ সেই প্রতিবিম্বের ওপর দিয়ে বৃষ্টির জল সরলরেখা টেনে টেনে চলে যাচ্ছে৷ তিনি আপনমনেই গুনছিলেন, কটা সরলরেখা দাগ ফেলে গেল তাঁর মুখে!
তার মধ্যেই কানের কাছে কে যেন উচ্ছ্বাসিত হয়ে কবিতার কয়েকটা লাইন আউড়ে গেল৷ সে বেচারারও দোষ নেই৷ ছোকরা উঠতি কবি৷ বেশ কয়েকটা লিটল ম্যাগাজিনে তার লেখা বেরিয়েছে৷ একেই অত্যুৎসাহী তরুণ কবি, তার ওপরে এমন সুন্দর বর্ষণমুখর পরিবেশ৷ সবমিলিয়ে রোমান্টিসিজমের চূড়ান্ত৷ ধাক্কাটা সামলাতে পারেনি৷ উচ্ছ্বাসিত হয়ে বলে গেল কবিতার কয়েকটা লাইন—‘জলের সঙ্গে আমার ছায়া বলছে আমার কথা৷ জল বোঝে না কোনটা কথা কোনটা প্রগলভতা...!’
পনেরো...ষোলো...সতেরো...আঠারো...৷ গহন তখনও একমনে জলের সরলরেখার সংখ্যা গুনে যাচ্ছিলেন৷ হঠাৎই অঙ্কের মধ্যে দ্রাম করে আছড়ে পড়ল কাব্য! কবিতার গুঁতোয় খেই হারিয়ে ফেলেন তিনি৷ গভীর চোখদুটো জানালার দিক থেকে ফিরল আবৃত্তিকারের দিকে৷ অবিমিশ্র বিরক্তি ভেসে উঠছে চোখদুটোয়৷
আবৃত্তিকার সেই চাউনি দেখেই থতোমতো খেয়ে চুপ করে গেল৷ গহন মুখে কিছু বলেননি৷ কিন্তু তাঁর চোখদুটো আদ্যন্ত ভাষাময়! সেই চোখই যেন বিরক্তিমিশ্রিত কণ্ঠস্বরে বলে উঠল—‘চুপ করো৷’
উঠতি কবি কাব্যে ক্ষান্ত দিল৷ তার পিছনে একটা ছোটোখাটো ভিড়ও বসেছিল৷ সদ্য গোঁফ-দাড়ি গজানো কবি, কিংবা পোড় খাওয়া, জুতোর শুকতলা খইয়ে ফেলা কবি, অথবা লিটল ম্যাগাজিনে দুর্বোধ্য প্রেমের দুর্বোধ্যতর কবিতা লেখা কবি—সব নমুনাই পাওয়া যাবে সেই ভিড়ে৷ সপ্তাহান্তে ছুটির দিনে ওরা এসে আড্ডা জমায় গহনের বাড়িতে৷ গহন ওদের আসতে বলেন না৷ তবু ওরা আসে৷ ওদের সবাইকে চেনেনও না৷ কিন্তু ওরা সবাই তাঁকে চেনে৷ নিজেদের চেনাতেও চায়৷ এককথায় ওরা ‘ভক্তবৃন্দ’৷
অথচ গহনের কাছে ওরা ‘ভিড়’৷ যখন দল বেঁধে আসে তখন মনে হয় ‘কী জ্বালাতন!’ যখন কলকণ্ঠে তাঁর কবিতার প্রশংসা করে আর ক্ষণজন্মা কলমটা এখন থেমে গেছে বলে আক্ষেপে মাথা নাড়ায়, কেন লিখছেন না সে বিষয়ে বারবার প্রশ্ন করে, তখন ভাবেন—কতক্ষণে ‘যাবে!’ আর যখন বেশ কিছুটা সময় নষ্ট করে সদলবলে তাঁকে প্রণাম করে বিদায় নেয় তখনই তাঁর আত্মা কানে কানে বলে ওঠে ‘বাঁচা গেল৷’
তবে এই সবকটা বাক্যই থাকে মনের ভেতরে৷ মনের গণ্ডি পেরিয়ে কখনও মুখে আসে না৷ ভক্তবৃন্দরা ভিড় জমিয়ে প্রশংসাবাক্যে ভরিয়ে দিতে শুরু করলেও তাঁর মুখ নির্লিপ্তই থাকে৷ যেন ওরা গহনের কথা নয়, কোনো থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বারের কথা বলছে! আস্তে আস্তে সেই প্রশংসা যখন ‘অতিশয়োক্তির’ রাস্তা ধরে ‘স্তুতি’ হয়ে ‘চাটুকারিতায়’ পৌঁছায় তখনও গহন মুখে কিছু বলেন না৷ বরং নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে মাথার ওপরে ঘুরন্ত পাখাটার দিকে তাকিয়ে বসে থাকেন৷ যেন এ যাবৎ যত নারীদের নিয়ে তুমুল প্রেমের কবিতা লিখেছেন—সেই নিশিগন্ধা, শ্রেয়সী, প্রিয়ম্বদাদের কেউ মাথার চুল ধরে ফ্যানের ব্লেডের সঙ্গে বেঁধে দিয়েছে! অনুরাগীরাও অগত্যা সেই ফ্যানের দিকেই তাকিয়ে থাকে৷ তাদের অনুমান যখন এই ‘প্রাজ্ঞ’, ‘আদ্যোপান্ত ইনটেলেকচুয়াল’ বিখ্যাত কবিটি মাথার ওপরের তিন ব্লেডওয়ালা পাখাটার প্রতি এত মনোযোগ দিয়েছেন, তখন নিশ্চয়ই ওটার মধ্যেও কোনো বিশেষ কাব্যিক অনুপ্রেরণা আছে৷ বলা যায় না—কোনোদিন হয়তো আবার তাঁর থেমে যাওয়া কলম থেকে বেরিয়ে আসবে যুগান্তকারী কোনো কবিতা, যার নাম ‘প্রাত্যহিক পাখার গুজরান!’
মোদ্দা কথা হল, কাব্যিক রূপকের বাইরের বাস্তব ঘটনা—যাকে ফ্যাক্ট বলে, সেটাই কেউ বুঝে উঠতে পারে না৷ কবি গহন দত্তগুপ্ত যে ওদের তাড়াতে পারলে বাঁচেন এই সত্যিটা কাব্যময় কল্পনায় ধরা পড়ে না৷ অগত্যা প্রায় মিনিট পঁয়তাল্লিশ কবি ও তাঁর ভক্ত—উভয়পক্ষই ফ্যানের দিকে তাকিয়ে নীরব হয়ে থাকে৷ অবশেষে একসময় তারা নিজেরাই অস্বস্তি বোধ করে৷ কবির ভাবতন্ময়তাকে ভেঙে দেওয়া উচিত নয়—একথা বিবেচনা করে সদলবলে গাত্রোত্থান করে৷ গহন শান্তভাবে ওদের বিদায়পর্ব দেখেন, এবং বলাই বাহুল্য হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন৷
এই গোটা ঘটনায় কিন্তু কবির নিজস্ব সংলাপ বিশেষ থাকে না৷ এমনিতেই তিনি অন্তর্মুখীন মানুষ! ‘হ্যাঁ’, ‘হুঁ’, ‘না’, ‘উহুঁ’র বেশি কিছু বলতে চান না৷ যা বলার তা তাঁর অনুরাগীরাই বলেন৷
কিন্তু আজ নিয়মের ব্যতিক্রম হল৷ তাঁর প্রতিচ্ছবির ওপরে জলের সরলরেখার সংখ্যা গোনায় ব্যাঘাত ঘটায়, আক্ষরিক অর্থেই রেগে গেলেন গহন৷ তাঁর চোখে বিরক্তির পাশাপাশি এবার রাগও ফুটে উঠেছে৷ যে বেচারা উচ্ছ্বাসিত হয়ে কবিতাটা আবৃত্তি করছিল, সমস্ত ক্ষোভ গিয়ে পড়ল তার ওপরেই৷
শান্ত অথচ বিরক্ত কণ্ঠে বললেন—‘কে লিখেছে এ কবিতাটা? তুমি?’
আবৃত্তিকার ঢোঁক গেলে৷ আশপাশের ভিড়টাও স্তম্ভিত হয়ে পরস্পরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করছে৷ কী বলবে যেন ভেবে পাচ্ছে না৷
গহন অবশ্য বলার অপেক্ষাও করেননি৷ সংযত অথচ উষ্মামিশ্রিত গলায় বলেন—‘অর্থহীন যত প্রলাপ৷ কেন যে এসব লেখো!’
কথাগুলো ঠিক কাব্যিক শোনাল না! ভিড়টা সচকিত হয়ে ওঠে৷ এতক্ষণের ভাবজগৎ থেকে একধাক্কায় তাদের বাস্তবে ফিরিয়ে এনেছেন কবি স্বয়ং৷ এবার বুঝতে অসুবিধা হল না যে গহন বিরক্ত হয়েছেন৷
—‘কবিতা ছাড়া তোমাদের কি আর কোনো বক্তব্য নেই?’ অশান্ত কণ্ঠস্বরে চাপা রাগ ঝরে পড়ল৷ বোধহয় সেই রূঢ়তার আঁচ তিনি স্বয়ংই উপলব্ধি করেন৷ আস্তে আস্তে পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণে আনেন৷ মানুষের কাছে কবি গহন দত্তগুপ্ত ‘জেন্টলম্যান’৷ বহুদিনের ইমেজটাকে একদিনেই ভেঙে ফেলার ইচ্ছে নেই৷
তিনি এবার অপেক্ষাকৃত শান্ত গলায় বললেন—‘আমি দুঃখিত, কিছু মনে কোরো না৷ আজ আমায় একটু বেরোতে হবে৷ ইফ ইউ প্লিজ অ্যালাউ মি...৷’
—‘নিশ্চয়ই...দাদা...নিশ্চয়ই...৷’
মুহূর্তের মধ্যে ঘর ফাঁকা হয়ে গেল৷ তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন৷ কাচের জানালার দিকে দৃকপাতও না করে উঠে গেলেন বেডরুমের দিকে৷ এই মুহূর্তেই বিরক্তিটা ঝেড়ে ফেলা দরকার৷ নয়তো সারাদিন আপনমনেই খুঁতখুঁত করে বেড়াবেন৷ যাকে-তাকে খিঁচিয়ে উঠবেন৷ সেটা কাম্য নয়৷
বেডরুমে তখন গহনের সহধর্মিণী স্মৃতিকণা বালিশে ভর দিয়ে শুয়ে বাইরের বৃষ্টি দেখছিলেন৷ এই মহিলা অতীতে রীতিমতো সুন্দরী ছিলেন৷ এখন সেই সৌন্দর্যের সিংহভাগই কেড়ে নিয়েছে দুরারোগ্য ক্যানসার! গত দু-বছর ধরেই রোগটার সঙ্গে লড়তে লড়তে একে একে বিসর্জন দিয়েছেন যাবতীয় সৌন্দর্য৷ শুধু কাঠামোটাই বাকি আছে৷
নারীর সবচেয়ে বড়ো সৌন্দর্য তার মাথার ঘন চুল৷ কেমোথেরাপির সৌজন্যে এখন তা-ও নেই৷ তবু কণার মুখখানা ভারী মায়াবী! যৌবন, সৌন্দর্য, সুস্থতা—সব গেছে৷ কিন্তু অন্তরের মায়া, মমতা, স্নেহ কেড়ে নিতে পারেনি দুর্দান্ত রোগটা৷ সেই মায়াবী চোখদুটোই বৃষ্টির দৃশ্যপট থেকে সরে গিয়ে ন্যস্ত হল স্বামীর ওপর৷ তাঁর প্রেমিক পুরুষ! চিরকালই বড়ো মুখচোরা, লাজুক প্রকৃতির৷ এখনও এমন লাজুক লাজুক ভঙ্গিতে বেডরুমে ঢুকছেন, যেন সদ্যপরিণীতা স্ত্রীর কাছে সবাইকে লুকিয়ে-চুরিয়ে আসছেন৷ কেউ দেখে ফেললেই কেলেঙ্কারির একশেষ!
কণা গহনের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হেসে বলতে শুরু করলেন, ‘জলের সাথে আমার ছায়া, বলছে আমার কথা/জল বোঝে না কোনটা কথা, কোনটা প্রগলভতা...৷’
গহন এগিয়ে এসে বিছানার ওপর বসতে যাচ্ছিলেন৷ কিন্তু তার আগেই থমকে গেছেন৷ স্ত্রী আরও কিছু বলার আগেই অ্যাবাউট টার্ন মেরে বাইরের দিকে পা বাড়ালেন৷
কণা এমন পরিস্থিতির জন্য আগেভাগেই প্রস্তুত ছিলেন৷ শীর্ণ হাতটা বাড়িয়ে খপ করে চেপে ধরেন স্বামীর হাত—‘পালাচ্ছ কোথায়?’
রাগতস্বরে উত্তর এল—‘যেখানে প্যানপ্যানে বৃষ্টি আর এই অপদার্থ কবির অপদার্থতর কবিতাটা নেই৷’
কণা মনে মনে হাসছেন৷ যদিও মুখে নিপাট গাম্ভীর্য—‘কবি অপদার্থ— এইটুকু তথ্যেই খুশি? বাকি তথ্যগুলো জেনে যাবে না?’
গহন ঘুরে দাঁড়িয়ে ভাসা ভাসা চোখজোড়া স্ত্রীর চোখের ওপরে রেখেছেন৷ তাঁর দৃষ্টি সপ্রশ্ন৷
—‘কবিতার নাম ‘জলসই’৷ কাব্যগ্রন্থের নাম ‘শিশিরের শব্দ’৷ প্রকাশিত হয়েছে ২ জুন ২০০৬-এ৷ প্রায় হট কেকের মতোই বিক্রি হয়েছে৷ এখনও মাঝেমধ্যে বেস্ট সেলারের লিস্টে দেখতে পাই৷ লিখেছিলেন এক সুদর্শন রোমান্টিক কবি৷ ঘটনাচক্রে তাঁর নামও গহন দত্তগুপ্ত৷ এবং আরও কাকতালীয় ব্যাপার যে তিনিও আমারই স্বামী৷’ কণা ফিক করে হেসে ফেলেছেন— ‘আবৃত্তিকার বেচারা খামোকাই ধমক খেল৷’
গহন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷ তারপর অনুতপ্তভঙ্গিতে স্ত্রীর হাতদুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে নিলেন৷
—‘আই অ্যাডমিট কণা৷’ বিছানায় বসে পড়ে বললেন তিনি—‘অন্যায় হয়েছে৷ আগেই বোঝা উচিত ছিল, এই জাতীয় অর্থহীন, অপদার্থ, কবিতা একমাত্র আমি ছাড়া আর কেউই লিখতে পারে না৷’
কণা বড়ো সস্নেহে সগর্বে তাকান স্বামীর দিকে৷ গহন সদ্য সদ্যই সাতচল্লিশ পেরিয়েছেন৷ কিন্তু এখনও মানুষটাকে চল্লিশ বলে অনায়াসেই চালিয়ে দেওয়া যায়৷ গায়ের রং এতটাই কালো যে বাবা-মা আদর করে নাম রেখেছিলেন ‘গহন’৷ কালো হলেও মুখখানা ভারী লাবণ্যময়৷ সবচেয়ে সুন্দর তাঁর চোখদুটো৷
দৃষ্টির গভীরতাতেও ‘গহন’ সার্থকনামা৷
তাঁদের কোনো সন্তান-সন্ততি নেই৷ গোড়ার দিকে তা নিয়ে আপসোস থাকলেও এখন আর দুঃখ করেন না কণা৷ স্বামী আর সন্তান এই দুই সত্তাই একসঙ্গে গহনের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন৷ তাই যখন স্বামীর দিকে তাকান তখন সেই চাউনিতে স্ত্রীর প্রেম আর মায়ের বাৎসল্য—দুই-ই মিশে যায়৷
বেডরুমের খোলা জানালা দিয়ে উত্তাল হাওয়ার ঝাপটায় বৃষ্টির ছাঁট এসে পড়ছিল কণার চোখে৷ বিন্দু বিন্দু জল মহা আহ্লাদে গড়াগড়ি দিচ্ছে তাঁর কপালে, গলায়, গালে৷ তিনি বৃষ্টির খামখেয়ালিপনাকে প্রশ্রয় দিচ্ছিলেন৷ তাঁর ভালোই লাগছিল৷ কিন্তু গহনের ভালো লাগল না৷ তিনি সপাটে জানলা বন্ধ করে দিয়েছেন৷
কণা ব্যথিত হলেন—‘এ কী! জানলা বন্ধ করলে যে!’ সশব্দে জানালা বন্ধ করতে করতে বললেন গহন—‘আই হেট রেন...আই জাস্ট হেট ইট...৷’
‘সে কী! কবির বৃষ্টি পছন্দ নয়!’ তিনি বিস্মিত—‘বরং কবিরাই তো বৃষ্টি বেশি পছন্দ করেন৷ কবিগুরুও করতেন...৷’
—‘কবিগুরু পছন্দ করতেন বলে আমাকেও করতে হবে?’ গহনের কণ্ঠস্বর এখনও মোলায়েম৷ এটাই তাঁর টোন৷ এর বেশি রূঢ় বা উঁচুস্বরে তিনি কথা বলেন না৷ কিন্তু তার মধ্যেই ফুটে উঠেছে প্রবল বিরক্তি—‘কবিগুরু তো একহাত লম্বা দাড়িও রাখতেন, জোববাও পরতেন৷ তাই বলে কি আমিও ওইরকম দাড়ি রেখে জোববাধারী হয়ে বসে থাকব? তা ছাড়া গুরুপত্নীর সর্দি-কাশি-জ্বর হলে তিনি দাদুরি, ময়ূর, ঝিল্লিকে ছেড়ে—প্যারাসিটামল, থার্মোমিটার, আর ভিক্স ভেপোরাব নিয়ে চর্চা করতেন কিনা জানা নেই৷ কিন্তু আমাকে করতে হয়৷’
—‘হুঁ’, কণা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন—‘ভুলেই গিয়েছিলাম যে আধখানা ফুসফুস নিয়ে বেঁচে আছি৷’
গহন তাঁর দিকে তাকিয়েছেন৷ এবার তাঁর দৃষ্টিতেও অপরিসীম বেদনা— ‘আমি কি তাই বলেছি?’
—‘না তুমি বলোনি!’ তিনি ম্লান হাসলেন—‘আ ফ্যাক্ট, কান্ট বি ডিনায়েড৷ আমার থিম সং হওয়া উচিত ‘সমুখে শান্তি পারাবার, ভাসাও তরণী’...৷’
—‘চোপ!’ কবির চোখে-মুখে রাগ ফুটে উঠেছে—তুমি ক্যানসার পেশেন্ট নও৷ ক্যানসার কিয়োরড৷ এ নিয়ে আর-একটাও বাজে কথা বলবে না৷ যতসব ডেইলি সোপের নায়িকা মার্কা ডায়লগ৷’
‘হুম৷’ কণা গহনকে আরও রাগিয়ে দিতে চাইছিলেন৷ রেগে গেলে কবিবরকে ভারী চমৎকার লাগে৷ তিনিও মজা পান৷
—‘দিস ইজ নট দ্য হোল ট্রুথ৷’ গোবেচারার মতো স্বরে বললেন—‘আমার রোগের ঠ্যালায়—তোমার নিশিগন্ধা, শ্রেয়সীরা সবাই পালিয়ে গেছে৷ দিনরাত বউয়ের সেবা করছ৷ তাই সরস্বতী অবহেলিত৷’
—‘ডোন্ট বি সিলি৷’ তিনি সত্যিই রেগে গেছেন—‘কে বলেছে তোমার জন্য আমি লেখা ছেড়েছি? আমার লাস্ট বই—২০০৬-এ প্রকাশিত৷ তারপর থেকে আর-একটি কবিতাও লিখিনি৷ তোমার রোগ ধরা পড়েছে ২০০৯-এ৷ আমার লেখা ছেড়ে দেওয়ার তিন বছর পর! একটা বাচ্চা ছেলেও বুঝতে পারবে যে, তোমার অসুস্থতার সঙ্গে আমার লেখা ছাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই৷’
—‘তাহলে কীসের সঙ্গে সম্পর্ক আছে? কোনো উদ্ভিন্নযৌবনার সঙ্গে পরকীয়ায় ব্যর্থ হয়েছ?’
রাগতে গিয়েও এবার ফিক করে হেসে ফেলেছেন গহন৷ হাসতে হাসতেই বললেন—‘ইউ আর সিম্পলি ইম্পসিবল কণা৷ গান শুনবে? বলো কী চালাব?’
—‘শীলা কি জওয়ানি! আছে?’
প্রখ্যাত কবি তির্যক দৃষ্টিতে সহধর্মিণীর দিকে তাকিয়েছেন৷
কণা নির্লিপ্ত মুখে জানালেন—‘তোমার কথামতো আমি ক্যানসার কিয়োরড৷ তাই এখন ডেইলি সোপের নায়িকার মতো ডায়লগ দেওয়া অ্যালাউড নয়৷ অন্তত আইটেম নাম্বারের সঙ্গে নাচতে তো পারিই৷’
—‘না৷ তাও পারো না৷’ তিনি হাসছেন—‘তাতে হাড় ভাঙার প্রবল সম্ভাবনা৷ বরং আমার পছন্দের গান শোনো৷’
—‘বেশ৷’
ডি. ভি. ডি প্লেয়ারে বেজে উঠল রবীন্দ্রসংগীত৷ কণা চোখ বুজলেন৷ তাঁর প্রিয় গানটা চালিয়েছেন গহন৷ বর্ষার প্রগলভ মুখরতাকে ছাপিয়ে গমগম করে উঠল কবিগুরুর গান৷
তিনি স্বামীর বুকে মাথা রেখেছেন৷ যে প্রশ্নটা দিনরাত আজকাল তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়, যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নিজেকেই বারবার কাঠগড়ায় তুলেছেন, সেটাই ক্রমাগত মনের মধ্যে ফিরে আসছিল৷ গহনের বুকে মুখ গুঁজে প্রশ্নটা স্তিমিত কণ্ঠে করে ফেলেন কণা—
—‘একটা কথা বলবে? উঁ?’
গহন অন্যমনস্কভাবে বলেন—‘কী?’
—‘তুমি আর কবিতা লেখো না কেন?’ অদ্ভুত স্বচ্ছ চোখজোড়া তুলে অতিপ্রিয় মানুষটার দিকে তাকিয়েছেন তিনি৷ কণ্ঠস্বরে ব্যাকুল বেদনা—‘গহন, তোমার তো ক্যানসার হয়নি! তবে?’
গহন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন৷ আলগোছে স্ত্রীর মাথাটা বুকে চেপে ধরেছেন৷ এ কথার কোনো জবাব হয় না৷ ক্যানসারের চেয়েও যে গভীর অসুখে আক্রান্ত তিনি, সে কথা কণাকে কী করে বোঝাবেন!
তাঁর বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বৈপরীত্য সৃষ্টি করে, মিউজিক সিস্টেমে তখনও বাজছে উচ্ছ্বাসিত সুর—
—‘প্রাণ ভরিয়ে, তৃষা হরিয়ে, মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ...৷’
‘আবার জীবন পেলে দেখাতাম কাশ ভাঙা ঢেউ
বেরং দেয়ালে চাপা পড়ে গেছে জীবনের সোঁতা
আবার কখনও যদি হয়ে আসি আমি আর কেউ
তোমায় দেখাব ফের পরিশেষে বড় হয়ে ওঠা৷’
চশমার শোরুমের মালিক তন্ময় হয়ে কবিতার লাইন আওড়াচ্ছিল৷ তার সামনের ক্রেতাটির তখন করুণ দশা৷ চোখের ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের আধখানা তার হাতের মুঠোয়, বাকি আধখানা লোকটার উপুড় করা তালুতে আটকে আছে৷ একান্ত ইচ্ছে গোটা প্রেসক্রিপশনটাই হাতিয়ে নিয়ে এখান থেকে চম্পট দেওয়ার৷ কিন্তু কাগজটা ছিঁড়ে যাওয়ার ভয়ে বেশি টানাটানিও করা যাচ্ছে না৷ অগত্যা ক্রেতাটি বাধ্য হয়েই মিউমিউ করে বলে—‘দাদা...আপনি বুঝতে পারছেন না৷ আমার চশমাটা ভীষণ দরকার৷ আ-র্জে-ন্ট৷’
‘আর্জেন্ট’ শব্দটার দীর্ঘায়িত উচ্চারণও শোরুমের মালিকের ভাবান্তর ঘটায় না৷ বরং উলটে সে ক্রেতাটিকে এক ধমক দিয়ে বলে—‘ধুর মশাই, চশমা পরে হবে, আগে কবিতা শুনুন৷ গহন দত্তগুপ্তের কবিতা পড়েছেন কখনও?’
—‘কিন্তু আমার চশমা.....৷’
—‘চশমার নিকুচি করেছে৷’ লোকটি ভয়াবহ রেগে গিয়েছে—‘কবিতা পড়েন না, শোনাতে চাইলে শোনেন না৷ জানেন, এই কবিতাটা কোন ছন্দে লেখা? মিশ্রকলাবৃত্ত৷ সবচেয়ে সুরেলা আর মিষ্টি ছন্দ৷ জীবনানন্দ এই ছন্দে গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা লিখে গেছেন৷ জানেন এসব? জানেন না৷ জানার ইচ্ছেও নেই৷ খালি তখন থেকে ‘চশমা...চশমা’ করে লাফাচ্ছেন৷ কী হবে মশাই চশমা দিয়ে, যদি কবিতাই না পড়লেন!’
কবিতার সঙ্গে চশমার যে কী সম্পর্ক, বলাই বাহুল্য ক্রেতাটির মাথায় ঢুকল না৷ সে অসহায় দৃষ্টিতে শোরুমের অন্যান্য কর্মচারীদের দিকে তাকায়৷ হয়তো করুণ সাহায্য প্রার্থনাও ছিল সে দৃষ্টিতে৷ কিন্তু আবেদন রাখবে কোথায়? কর্মচারীরাও তস্য অসহায়ভাবে তারই দিকে তাকিয়ে আছে৷
ক্রেতাটির জানার কথা নয় যে, এই নাটক এখানে প্রথমবার অভিনীত হচ্ছে না৷ শোরুমের মালিক এখানে নিজে উপস্থিত না থাকলে সবকিছুই শান্তিপূর্ণভাবে হয়ে যেতে পারত৷ এমনকি তার চশমাটাও সঠিক পাওয়ারের লেন্সে সেজেগুজে দৃষ্টিশক্তিকে আরও সবল করে তুলত নিঃসন্দেহে৷ কিন্তু মালিক উপস্থিত থাকলেই বিপদ৷ কবি হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত যে লোকটা সাধারণ চশমার দোকানি হয়েই থেকে গেল, তার বেদনা বোঝার জন্য ব্যস্ত মহানগরীতে বিশেষ কেউ নেই৷ আর সেটাই হয়েছে যত নষ্টের গোড়া৷ সুযোগ পেলেই সে চশমার বদলে কবিতা বিতরণ করতে বসে৷ ক্রেতারা আজকাল তাকে দেখলেই পালিয়ে যায়৷ কারণ এ চত্বরের সবাই জেনে ফেলেছে যে এ শোরুমে চশমার অর্ডার দিতে গেলেই প্রথমে শুনতে হবে সাগ্রহ প্রশ্ন—‘চশমার কথা পরে বলছি, আগে বলুন কবিতা-টবিতা পড়া হয়? কার কার কবিতা পড়েছেন?’
সদ্য আগত ক্রেতাটি এতসব জানত না৷ বাধ্য হয়েই সে প্রায় কাঁদো কাঁদো মুখে বলে—‘স্যার, চশমা লাগবে না৷ প্লিজ আমায় ছেড়ে দিন৷’
—‘বেশ, চশমা থাক৷’ বিক্রেতা তাকে প্রেসক্রিপশনটা ফেরত না দিয়েই বলে—‘কিন্তু কবিতা না শুনিয়ে আপনাকে ছাড়ছি না৷’
অগত্যা বেচারাকে নিমের পাঁচন গেলার মতো মুখ করে কবিতা শুনতে হল৷ শুধু কবিতাই নয়, তার পিছন পিছন এল মিশ্রবৃত্ত, কলাবৃত্ত, দলবৃত্তের থিসিস৷ নানারকম বৃত্তের ঠ্যালায় যখন সে প্রায় চারকোনা হতে চলছে, ঠিক তখনই ঈশ্বর দয়াপরবশ হয়ে দেবদূত পাঠিয়ে দিলেন৷ শোরুমের কাচের দরজা ঠেলে এক দারুণ সুদর্শন পুরুষ ঢুকলেন৷ তাকে দেখেই কাব্যবিশারদ হইহই করে উঠেছে—‘কী কাণ্ড! একশো বছর বাঁচবি দেখছি৷ এই মাত্রই তোর কথা হচ্ছিল৷’
ক্রেতাটি একঝলক তার রক্ষাকর্তার দিকে দেখল৷ পরক্ষণেই তার নজর গেল প্রেসক্রিপশনটার দিকে৷ এতক্ষণ ওটা বিক্রেতার হাতের তলায় চাপা পড়েছিল৷ এখন অসতর্কভাবেই লোকটা হাত তুলে নিয়েছে৷ এই সুযোগ৷ এবং সে সম্পূর্ণ সদব্যবহার করল৷ ক্ষিপ্রগতিতে প্রেসক্রিপশনটা তুলে নিয়ে এমন দৌড় মারল যে-অলিম্পিকের দৌড়বীরও লজ্জা পাবে৷
গহন সকৌতুকে লোকটির ড্রামাটিক টেম্পোয় প্রস্থানপর্ব দেখলেন৷ তারপর মুচকি হেসে বললেন—‘এ মাসে এই নিয়ে কটাকে ভাগালি?’
—‘যাঃ, পালিয়ে গেল!’ কাব্যবিশারদ আমসির মতো মুখ করেছে—‘এই নিয়ে সাড়ে পাঁচ’৷
—‘সাড়ে পাঁচ!’
—‘এদের মধ্যে একটা হাফও ছিল তো! আই মিন বাচ্চা৷’
গহন সবিস্ময়ে বন্ধুর দিকে তাকিয়েছেন—‘শুঁটকি, তুই আজকাল—বাচ্চাদেরও ছাড়ছিস না!’
—‘বাচ্চা আবার কী!’ শুঁটকির চেহারাটা সত্যিই শুঁটকি মাছের মতো৷ শুকিয়ে প্রায় নারকেলের দড়ি হয়ে গেছে৷ শিরা বের করা শীর্ণ হাত নাড়িয়ে সে বলে—‘ওটা বাচ্চা নয়, চৌবাচ্চা৷ চোখের পাওয়ার কত জানিস? মাইনাস ফাইভ! দুনিয়ার সবকিছু জানে৷ ইংরেজি কবিতা গড়গড় করে বলে৷ রা-ওয়ানের হিরোইনের নাম থেকে শুরু করে ফেসবুক, টুইটার অবধি হেন জিনিস নেই যা জানে না৷
—‘তাতে কী!’ তিনি আস্তে আস্তে বলেন—‘আজকালকার বাচ্চারা অনেক অ্যাডভান্স৷ ওরা অনেক কিছুই জানে৷ তাতে অন্যায়টা কী হয়েছে?’
—‘অন্যায় কিছু হয়নি’, শুঁটকি এবার ভেটকি মাছের মতো ভাবলেশহীন মুখ করেছে—‘সব জানে বলেই জানতে চেয়েছিলাম ‘প্রশ্ন’ কবিতাটা কার লেখা? আমার ধারণা ছিল সেটাও জানবে৷’
গহনের ঠোঁটে একটা স্মিত হাসি ভেসে উঠল—‘উত্তর কি পেলি?’
সে কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে গহনের দিকে তাকিয়ে থাকে৷ তারপর শুকনো মুখে উত্তর দেয়—‘চেতন ভগৎ৷’
তিনি হো হো করে হেসে উঠেছেন৷ দোকানের কর্মচারীরাও মুচকি মুচকি হাসছে৷
—‘তুই হাসছিস!’ শুঁটকি উত্তেজিত—‘বাঙালির বাচ্চা হয়ে রবি ঠাকুরের নাম জানে না৷ এটা তোর খুব মজার জিনিস মনে হচ্ছে?’
তিনি হাসতে হাসতেই বলেন—‘না, মজার কেন হবে? তারপর নিশ্চয়ই তুই রবি ঠাকুরের নাম জানাতে বসলি৷’
—‘হ্যাঁ বসলাম৷’ তার মুখে বিরক্তির ছাপ—‘জানিয়েও দিতে পারতাম, যদি না ওর মা এসে ওকে টেনে নিয়ে চলে যেত৷’
গহন আর-একবার উচ্চস্বরে হেসে উঠতে যাচ্ছিলেন৷ কিন্তু শুঁটকির করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে চেপে গেলেন৷
—‘এরা জীবনে কখনও শঙ্খ, শক্তি, সুনীল পড়বে? কখনও জানবে যে জীবনানন্দ বলে একটা লোক নিঃসঙ্গতার তাড়নায় কী সব কবিতা লিখে গেছে!’ তার কণ্ঠস্বরে হতাশার প্রাবল্য—‘শুধু একটা জিনিসই জানতে পারে৷ যখন কলকাতায় ট্রাম আর থাকবে না, জাদুঘরে ট্রামের মডেল দেখিয়ে ইতিহাস বলা হবে, তখন এক লাইনে জীবনানন্দের সম্পর্কে একটাই তথ্য জানবে এরা৷ ওই নামে একটা বিশ্বট্যালা কবি ছিল৷ লোকটা চাপা পড়ার জন্য ট্রেন, বাস, ট্যাক্সি, মেট্রো—কিছুই খুঁজে পায়নি৷ অগত্যা ওই ঢিকঢিকে ট্রামের তলাতেই তাকে চাপা পড়তে হল! বাঙালির পরবর্তী প্রজন্মের এই অবস্থাই হবে গহন, আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি৷’
শুঁটকির দু-চোখে অপরিসীম বিষণ্ণতা৷ গহন দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে থাকেন৷ শুঁটকি বোধহয় খুব একটা ভুল বলেনি৷ বিশ্বায়নের দাপট আর ইংরেজি মিডিয়ামের দৌলতে হয়তো এমনই একটা ভয়াবহ ভবিষ্যৎ আসতে চলেছে৷ এখনই তরুণ প্রজন্ম বাংলা সাহিত্য এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে৷ সাহিত্য বলতে রাউলিং, চেতন ভগৎ, বা ঝুম্পা লাহিড়ি অবধিই বোঝে৷ তারপর আর কিছু নেই৷
—‘ছাড় ওসব কথা৷’ শুঁটকি বলল—‘যত ভাবব ততই ভয় করবে৷ তোর খবর বল৷ এবার কিছু লেখার কথা ভাবছিস?’
—‘নাঃ৷’
—‘কেন?’
এ প্রশ্নের উত্তরে কী বলবেন গহন ভেবে পেলেন না৷ এই প্রশ্নটা শুনতে শুনতে তিনি ক্লান্ত৷ কেন লিখছেন না, কবে আবার লিখবেন, আদৌ আর লিখবেন কিনা—এসব প্রশ্ন রোজই চতুর্দিক থেকে ফণা তোলে৷ কোনোমতে ভুজুং ভাজুং দিয়ে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান৷
কিন্তু শুঁটকির সামনে সেসব যুক্তি ধোপে টিঁকবে না৷ সে তাঁর অনেকদিনের বন্ধু৷ দুজনে একসঙ্গে স্কুলে, কলেজে পড়েছেন৷ একসঙ্গে গাঁজা খেয়েছেন৷ এবং মধ্যরাত্রের কলকাতাকে নেশাজড়িত উচ্চকণ্ঠে কবিতা শোনাতে শোনাতে বাড়ি ফিরেছেন৷ শুঁটকি তাঁকে হয়তো তাঁর নিজের থেকেও ভালো চেনে৷ ওর কাছে মিথ্যে বলার উপায় নেই৷ তবু একটু ইতস্তত করে বললেন—‘আসলে বয়েস হচ্ছে তো৷ এখন আর শিং ভেঙে বাছুর হয়ে গদগদ প্রেমের কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে না৷’
শুঁটকি তাঁর দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকায়—‘তুই শালা চিরকেলে এসকেপিস্ট৷ সমস্যার সামনে পড়লে পিঠ দেখিয়ে পালাস৷ আমায় ওসব গপ্প দিস না৷ এমন কিছু বয়েস হয়নি তোর৷ এই তো সুবিমল বিশ্বাসকে দেখ৷ প্রায় আশি বছর হতে চলল বুড়োর৷ এখনও প্রেমিকার কাঁচুলিতে জমা ঘাম নিয়ে চর্চা করছে৷ বয়স দেখাস না আমায়৷ তা ছাড়া প্রেমের কবিতাই লিখতে হবে—এমন মাথার দিব্যি কে দিয়েছে? অন্য কিছু নিয়ে লেখ৷’
গহন চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে আছেন৷ শুঁটকিও তাঁর চোখের দিকে নিষ্পলকে দেখছে৷ একমিনিট সে চুপ করে গহনকে জরিপ করল৷ তারপর বলল—‘অ, তুই তো আবার রোম্যান্টিক কবিতা ছাড়া লিখবি না, টিপিক্যাল এসকেপিস্ট! চল৷’
—‘কোথায়?’
—‘পেটে দু-পাত্তর না পড়লে তোর মুখ খোলাতে পারব না৷ আর আমিও সহজে ছাড়ছি না৷’
—‘শুঁটকি....’ গহন নিরুপায় ভাবেই বলেন—‘আজ থাক.......৷’
—‘কিচ্ছু থাকবে না৷’ শুঁটকি প্রায় গর্জন করে উঠেছে,—‘ভালোয় ভালোয় যাবি? না সবার সামনে নর্মদা থেকে নর্দমা হব৷’
এই কথাটার অর্থ খুব ভালোই বোঝেন গহন৷ অর্থাৎ শুঁটকি এবার ভালো ভালো শব্দ ছেড়ে শ-কার, ব-কার, ম-কারের প্যাঁটরা খুলবে৷ ও একবার মুখ খুললে ম্যানহোলও লজ্জা পায়৷ তিনি ঝুঁকি নিলেন না৷ লক্ষ্মী ছেলের মতো শুঁটকির পিছন পিছন পা বাড়ালেন৷
—‘আয়৷’ শোরুমের বাইরে একটু দূরত্বেই শুঁটকির স্টিল কালারের জেন দাঁড়িয়ে আছে৷ গহনের চোখে পড়ল একটি বছর বারো-তেরোর বাচ্চা ছেলে গাড়িটার পাশেই অপেক্ষারত৷ ছেলেটাকে দেখলে ভিখিরি বলেই মনে হয়৷ পরনে একটা শতচ্ছিন্ন নোংরা শার্ট, এবং তার চেয়েও নোংরা একটা হাফপ্যান্ট৷ মাথার চুল রাস্তার ধুলোয় প্রায় সাদা, চোখে একগাদা পিঁচুটি নিয়ে পরম আগ্রহে তাকিয়ে আছে শুঁটকির দিকেই৷
গহন বুঝতে পারলেন না যে বাচ্চাটা এত আগ্রহভরে এদিকেই দেখছে কেন৷ শুঁটকি বুড়ো বা অথর্ব লোক ছাড়া আর কাউকে ভিক্ষে দেয় না৷ বাচ্চাদের তো একেবারেই নয়৷ অথচ ছেলেটার দৃষ্টি স্পষ্ট জানান দিচ্ছে যে শুঁটকিকে সে চেনে৷ এবং তার আগ্রহ নিতান্তই অযৌক্তিক নয়৷
ব্যাপারটা অবশ্য একটু পরেই স্পষ্ট হল৷ শুঁটকি ড্রাইভিং সিটে বসতেই সে জানলার কাছে ঘনিয়ে এসেছে৷ গহন কৌতূহলী হয়ে ব্যাপারটা দেখছিলেন৷ ছেলেটা জানলার কাছে এসে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে—‘বাবু, হয়ে গেছে৷’
শুঁটকি তার দিকে তাকিয়েছে—‘পুরোটা?’
—‘হ্যাঁ৷’
—‘বল দেখি৷’
ছেলেটা একটু যেন থমকাল৷ তারপরই যেন মঞ্চে উঠে আবৃত্তি করছে, এমন ভঙ্গিতে হাতজোড় করে বলল—‘নমস্কার, কবিগুরু রবীন্দোনাথ ঠাকুরের ‘জুতা আবিষ্কার’—কহিলা হবু, শুনগো গবুরায়,/কালিকে আমি ভেবেছি সারারাত্র/মলিন ধুলা লাগিবে কেন পায়/ধরণী মাঝে চরণ ফেলা মাত্র৷’
গহন সবিস্ময়ে দেখছিলেন তাকে৷ যাকে ভিখিরি ভেবেছিলেন সে রীতিমতো গড়গড়িয়ে ‘জুতা আবিষ্কার’ মুখস্থ বলে যাচ্ছে৷ কিছু অমার্জিত উচ্চারণ ছাড়া বাদবাকিটা একদম ঠিকঠাক৷ কোথাও কোনো ভুলচুক নেই৷ এমনকি যেখানে যেখানে যতির ব্যবহার প্রয়োজন, সেখানে সেখানেই থামছে৷ এ কী কাণ্ড!
‘সেদিন হতে চলিল জুতাপরা/বাঁচিল গবু রক্ষা পেল ধরা......৷’ ছেলেটা একনিশ্বাসে কবিতাটা শেষ করে ফেলল৷ শেষ লাইনটা বলে সে সাগ্রহে শুঁটকির দিকে তাকায়৷
—‘ভেরি গুড!’ শুঁটকি তার মাথায় হাত রেখে আদর করে—‘খুব ভালো হয়েছে৷ শুধু উচ্চারণটা আর-একটু ঠিক করতে হবে৷ রবীন্দোনাথ ঠাকুর নয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷ বল র-বী-ন্দ্র-না-থ....৷
বেশ কিছুক্ষণ উচ্চারণের তালিম চলল৷ গহন অবাক হয়ে ব্যাপারটা দেখছিলেন৷ একটা ভিখিরি ছেলে রবীন্দ্রনাথ আওড়াচ্ছে! গোটা ব্যাপারটাই তাঁর অবিশ্বাস্য ঠেকছিল! মনে হচ্ছিল স্বপ্ন দেখছেন৷
—‘ঠিক আছে’, তালিম শেষ করে শুঁটকি পকেট থেকে নোট বের করে এগিয়ে দেয় ছেলেটার দিকে৷ গহন আড়চোখে দেখলেন—সেটা পঞ্চাশ টাকার নোট!
—‘নে’, সে স্মিত হেসে বলে—‘এটা দিয়ে মাংস-ভাত খাবি৷ খবরদার, ফেভিকল, ডেনড্রাইটের চক্করে পড়বি না৷ যদি বুঝতে পারি যে ওসব কিনে খাচ্ছিস....৷’
—‘না বাবু৷’ ছেলেটি একশো আশি ডিগ্রি মাথা নাড়ল—‘ওসব খাইনে কো৷’
—‘ভালো৷ এখন যা৷’ শুঁটকি গাড়িতে স্টার্ট দিয়েছে—‘আবার কাল-পরশু নাগাদ আসিস৷ নতুন কবিতা দেব৷’ ছেলেটা মাথা নেড়ে চলে গেল৷ গহন স্তম্ভিত হয়ে ব্যাপারটা দেখছিলেন৷ এবার মৃদু অথচ বিস্মিত স্বরে বলেন—‘শুঁটকি! এসব কী হচ্ছে!’
শুঁটকি অ্যাক্সিলেটরে চাপ দিয়েছে—‘আমার নবতম আবিষ্কার৷ ছেলেটার নাম গোপাল৷ বাপ-মা আদর করে ওই নামই দিয়েছিল৷ আমার শোরুমের উলটোদিকের ফুটপাথে থাকে৷ আয়লা ঝড়ে গাছ ভেঙে পড়ে বাপ-মা দুটোই ফৌত হয়ে গেছে৷ এখন ছেলেটা ফুটপাথে ভিক্ষা করে৷’
—‘সে তো বুঝলাম৷ কিন্তু ‘জুতা আবিষ্কার’.......!’
—‘ওটা আমিই ওকে শিখিয়েছি৷’ সে নির্লিপ্ত গলায় বলে—‘ছেলেটার মেমোরিটা খুব শার্প৷ যাকে বলে শ্রুতিধর৷ বুঝলি, একবার আমার শোরুমে ভিক্ষে চাইতে ঢুকেছিল৷ তখন আমি এক ব্যাটাকে ‘রূপসী বাংলা’ আবৃত্তি করে শোনাচ্ছিলাম৷ লোকটা দু-মিনিট পরেই অবশ্য পালিয়ে বাঁচল৷ আর এ ছোঁড়া আমাকে একবারে চেপে ধরল৷ তিন দিন ধরে নাকি খায়নি৷ টাকা দিতেই হবে৷ জানিসই তো, বাচ্চাদের আমি ভিক্ষে দিই না৷’ শুঁটকির মুখে মুচকি হাসি—‘কিন্তু হতভাগা একবারে নাছোড়বান্দা৷ তাই ভাগানোর জন্য বলেছিলাম, একটু আগেই বলা কবিতার একটা লাইনও যদি ঠিকঠাক বলতে পারে, তবে দশটাকা দেব৷’
‘তারপর?’ রুদ্ধশ্বাসে শুনছিলেন গহন৷
—‘তারপর আর কী?’ সে হাসতে হাসতে বলে—‘সবাইকে অবাক করে দিয়ে ব্যাটা একেবারে চারটে লাইন ঠিকঠাক বলে দিল৷ একবার শুনেই মোটামুটি মাথায় তুলে নিয়েছে৷ খুশি হয়ে চল্লিশ টাকা দিয়ে দিলাম৷ তারপর থেকেই চলেছে এই ট্রেনিং৷ রোজ সকালে এসে একটা করে কবিতা শোনে৷ পরদিন মনে করে আমাকে শোনায়৷ কবিতা ছোটো হলে একবার শুনেই মনে রাখতে পারে৷ বড়ো হলে তিন-চারবার শোনাতে হয়৷’
গহন গোটা বৃত্তান্ত শুনে কী বলবেন ভেবে পেলেন না৷ শুধু অবাক হয়ে বড়ো বড়ো চোখে শুঁটকিকে দেখছিলেন৷ লোকটাকে তাঁর মাঝে মাঝে দুর্বোধ্য ঠেকে৷ একি তার খামখেয়ালিপনা, না অদ্ভুত শখ!
—‘এ ছেলে ভালো ঘরে জন্মালে জজ-ম্যাজিস্ট্রেট হত’৷ শুঁটকি বিমর্ষ মুখে মাথা নাড়ে—‘ভাগ্যের দোষ! যাক গে৷ তুই তোর কথা বল৷ কবিতা লেখাটা ছাড়লি কেন?’
আবার সেই এক প্রসঙ্গ৷ ভবি ভোলবার নয়৷ গহন বিব্রত বোধ করেন৷ এই প্রশ্নটা সামনে এলেই কেমন যেন অসহায় মনে হয়৷ ভেতরে ভেতরে একটা অস্থিরতা টের পান৷ একটা ক্ষোভের মেঘ জমাট বাঁধে বুকে৷
—‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি৷’ সে স্টিয়ারিঙে আলতো করে একটা চাপ মারে—‘তুই সেই কেউ কেউ-এর একজন৷ অথচ এমন কেঁউ কেঁউ করছিস কেন বুঝতে পারছি না৷’
—‘কী হবে কবিতা লিখে?’
—‘কবিতা লিখে কিছু হয় নাকি?’ শুঁটকি জোরে হেসে উঠেছে—‘হয় শুধু হয়ের অণ্ড, আই মিন—ঘোড়ার ডিম! কিছু হওয়ার জন্য তুই কবিতা লিখিস বুঝি! বাজে কথা ছেড়ে সত্যি কথাটা বল৷ আজ আর পালাস না প্লিজ৷’
—‘ঠিক তা নয়৷’ গহন আস্তে আস্তে বলেন—‘আসলে ঠিক বুঝতে পারি না....৷’
—‘কী?’
তিনি ব্যথিত ক্লান্ত দৃষ্টিতে বন্ধুর দিকে তাকিয়েছেন—‘আমি কি আদৌ কবিতা লিখি শুঁটকি?’
—‘হো-য়া-ট!’
শুঁটকি বিস্ময়ের ধাক্কাটা সামলাতে না পেরে সজোরে ব্রেক কষল৷ ড্যাশবোর্ডের ওপর থেকে সিগারেটের প্যাকেট ছিটকে পড়েছে গহনের কোলে৷ ঝাঁকুনির চোটে লকারটাও খুলে গেছে৷ তার ভেতরে পানীয়ের বোতলও চোখে পড়ে৷ শুঁটকি সবসময়ই এ জিনিসটা স্টকে রাখে৷ মদ খাওয়ার জন্য বারে যাওয়া সে পছন্দ করে না৷ তা ছাড়া বিকেলের পর থেকে তার যতটা মদ লাগে, তা সাপ্লাই দিতে কলকাতার যে-কোনো বার ফেল পড়বে৷ মিছরির পানা খাওয়ার মতো সে মদ খায়৷ এই নিয়ে অনেক অশান্তি হয়েছে দুই বন্ধুর মধ্যে৷ শুঁটকির লিভারে আজকাল ব্যথা হয়৷ তবু সে ডাক্তার দেখাবে না৷ মদ খাওয়াও ছাড়বে না৷ গহন কিছু বললেই বলে—‘ডাক্তার আর সুরা দুটোকে একসঙ্গে রাখা যায় না৷ তাই ডাক্তারকেই স্যাক্রিফাইস করতে হল৷’
আজ অবশ্য বিকেল অবধি অপেক্ষা করতে হল না৷ গাড়ি থামিয়েই উত্তেজিত ভঙ্গিতে পানীয়ের বোতল খুলে গলায় ঢেলে দিয়েছে৷ উগ্র ঝাঁঝালো একটা গন্ধ গহনের নাকে ঝাপটা মারল৷ বেশ খানিকটা তরল গলায় ঢেলে যেন একটু শান্ত হল সে৷
—‘তুই কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছিস! প্রায় ত্রিশ বছর ধরে কবিতা লিখে, প্রতিষ্ঠা—খ্যাতির এভারেস্টে উঠে, হাফ-ডজন পুরস্কার পেয়ে—আজ জিজ্ঞাসা করছিস যে তুই আদৌ কবিতা লিখিস কি না! এটা কি নতুন ধরনের কোনো রসিকতা! লেটেস্ট আমদানি করেছিস?’
গহন ক্লান্তভাবে গাড়ির সিটে শরীর এলিয়ে দিয়েছেন৷ এই জন্যই অন্তরের গোপনতম কথাটা কাউকে বলতে চান না৷ কারণ গোটা ঘটনাটাই সবার কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকবে৷ কী করে বলবেন যে সত্যিই এই আত্ম-জিজ্ঞাসা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে৷ অদ্ভুত লাগলেও এ কথাটা আদ্যোপান্ত সত্যি৷ তিন দশক ধরে কবিতা লেখার পর আজ গহন দত্তগুপ্ত ভাবছেন—তিনি কি আদৌ কবিতা লিখেছেন? সত্যিই কি তাঁর কবিতারা, কবিতা হয়ে উঠেছে!
—‘তুই বিশ্বাস না করলে আমার কিছু করার নেই৷’ গহন আস্তে আস্তে বলেন—‘কিন্তু এটাই ফ্যাক্ট৷ সত্যিই বুঝতে পারছি না যে, আদৌ আমি কবিতা লিখি কি না!’
—‘বাঃ!’ শুঁটকি বোতলে আরও কয়েকটা চুমুক দেয়—‘আশ্চর্য আবিষ্কার! এই আবিষ্কারের জন্য তোকে একজোড়া নোবেল দেওয়া উচিত৷ এনকোর... এনকোর!’
—‘ইয়ার্কি নয়৷ আমি সিরিয়াসলি বলছি৷ তুই যদি শুনতে না চাস, তাহলে বলতে ইন্টারেস্টেড নই৷’
সে তখনই কথাটার কোনো প্রত্যুত্তর না দিয়ে অনিমেষে তাকিয়ে আছে গহনের দিকে৷ মুখ গম্ভীর৷ শান্ত ভঙ্গিতে দু-এক মিনিট দেখল গহনকে৷ যেন বুঝতে চাইছে যে, তিনি কতটা সিরিয়াস৷ তারপর আস্তে আস্তে বলল— ‘বল, শুনছি৷’
গহনের বোধহয় সত্যিই কোনো মনোযোগী শ্রোতার প্রয়োজন ছিল৷ তিনি মনে মনেই অনুভব করেছিলেন ক্রমাগতই মনের খোলা জানালাগুলো বন্ধ হয়ে আসছে৷ বুকের ভেতরে এই অসহ্য চাপ যে একা একা বেশিদিন বওয়া যাবে না তাও বুঝতে পেরেছিলেন৷ বহুদিনের বন্ধুত্ব আজ তাঁকে হালকা হওয়ার সুযোগ এনে দিল৷
তাঁর চোখ দুটো বিষণ্ণতায় ছেয়ে আছে৷ আস্তে আস্তে বললেন—‘জানি না, প্রবলেমটা তুই কতদূর বুঝবি৷ কিন্তু আমি ক্রমাগত বিভ্রান্ত হচ্ছি৷’
—‘কেন?’
তিনি অন্যমনস্ক—‘তুই তো জানিস, একসময় রীতিমতো লড়াই করেই আমাকে আজকের জায়গায় পৌঁছোতে হয়েছে৷ প্রতিভাবান কবি সে সময়ে কম ছিল না৷ তার ওপর সমালোচনার লাল চোখ! অনেক প্রতিকূলতা ঠেলে আজ এখানে এসে দাঁড়িয়েছি৷ কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এ সবের মানে কী!’
—‘যাচ্চলে! মানে?’
—‘মানে, আজ আমি যেখানে এসেছি সেখানে কোনো লড়াই নেই৷ কোনো সমালোচনা নেই৷ সর্বোপরি কোনো চ্যালেঞ্জ নেই৷’ গহন বলতে বলতেই উত্তেজিত হয়ে ওঠেন—‘অষ্টপ্রহর কানের কাছে একদল ভক্ত আমার গুণকীর্তন করছে৷ যা-ই লিখি সেটাই নাকি মাস্টারপিস! একই লাইন পাঁচবার লিখে, শেষে ‘এখানেই শেষ হোক’ লিখে তিনটে ডট মেরে দিলাম৷ সেটাই নাকি শতাব্দীর সেরা কবিতা! ওই তিনটে ফুটকির ব্যঞ্জনা নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠল৷ অথচ কেউ বুঝলই না যে ওই ডটগুলো আর কিছুই নয়৷ কবি আর কী লিখবেন ভেবে পাননি, তাই ডট বসিয়ে দিয়েছেন৷ রাবিশ!’
এতদিনের পুষে রাখা রাগটা এবার বিস্ফোরণ হয়ে বেরিয়ে এল৷ শুঁটকির মুখে একটা স্মিত অথচ হাসি ফুটে ওঠে৷ সেদিকে না তাকিয়েই গহন বলতে থাকেন—‘‘বড়ো’ ‘বড়ো’ পত্রিকারা লেখা পাওয়ার জন্য হা-পিত্যেশ করে বসে থাকে৷ আমার ওঁচা লেখাগুলো পর্যন্ত ধরে ধরে ছাপে৷ মিডিয়া, স্তাবক, সমালোচক—সকলে মিলে আমার কবিতাগুলোকে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম কবিতা আর আমাকে প্রায় ভগবান বানিয়ে ছেড়েছে৷ যখন আমার কবিতাই শ্রেষ্ঠ, আমি ঈশ্বরত্ব পেয়েই গিয়েছি তখন লিখব কেন? নতুন করে কিছু তো প্রমাণ করার নেই! কোথাও যাওয়ার নেই! নিজের লেখাকেই অতিক্রম করার চ্যালেঞ্জ নেই৷ কারণ সবই তো মাস্টারপিস, তাকে কি টপকানো যায়?’
শুঁটকি মন দিয়ে গহনের কথা শুনছিল৷ তিনি নেহাত মিথ্যে বলছেন না৷ বাংলা সাহিত্যের বাজারটাই আজকাল এরকম হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ বড়ো বড়ো পত্রিকা, মিডিয়ার প্রচার, ভক্তবৃন্দ কবি-লেখকদের গায়ে গ্রেডেশনের ট্যাগ লাগিয়ে দিয়েছে৷ উনি ‘এ’ গ্রেডের লেখক বা কবি৷ তাই ওঁর সব লেখা চমৎকার হতেই হবে! ইনি ‘বি’ গ্রেডের৷ এঁর ফিফটি পার্সেন্ট লেখা ভালো, ফিফটি পার্সেন্ট মোটামুটি৷ ভক্তবৃন্দ তৈরি হয়েই থাকে ‘বাঃ...বাঃ’ বলার জন্য৷ এই বাহবার পিছনে কতটা যে আন্তরিক প্রশংসা, আর কতটা চাটুকারিতা তা বোঝা মুশকিল৷ পুরস্কারের তালিকায়, মিডিয়ার ফ্ল্যাশের ঝলকানিতে, প্রচারে, বিজ্ঞাপনে, বড়ো বড়ো পত্রিকার পৃষ্ঠপোষকতার চটকদারিতে স্রষ্টা যত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন, তাঁর সৃষ্টি ততই গুরুত্ব হারায়৷ এ যেন হলমার্কের স্ট্যাম্প! যে সোনার গায়ে লাগানো আছে সেটাই খাঁটি! স্ট্যাম্পটাই শেষ কথা—সোনা নয়!
—‘লিখতে হলে খিদে চাই৷ প্রেরণা চাই৷’ গহন হতাশভাবে মাথা নাড়লেন— ‘আমি দুটোই হারিয়ে ফেলেছি৷ আমার পক্ষে আর লেখা সম্ভব নয়৷’
শুঁটকি অর্ধনিমীলিত দৃষ্টিতে কী যেন ভাবছে৷ তার চোখে কী যেন একটা ভাবনার ছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছিল৷ অস্থির আঙুলগুলো স্টিয়ারিঙে তবলা বাজাচ্ছে৷
—‘তোর বাড়িতে নেট আছে গহন?’
গহন নির্জীবের মতো চোখ বুজে ছিলেন৷ এই অপ্রাসঙ্গিক কথার আকস্মিকতায় ঘাবড়ে গেলেন—‘নেট!’
—‘হ্যাঁ৷ ইনটারনেট৷ আছে?’
—‘ইনটারনেট!’ তিনি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন শুঁটকির দিকে৷ যেন প্রশ্নটার অর্থ বুঝতে পারছেন না—‘হ্যাঁ...আছে৷ মানে... আমার তেমন দরকার পড়ে না৷ কিন্তু কণা বাড়িতে বসে বসে বোর হচ্ছিল বলে......৷’
তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সে বলে—‘ইনটারনেট এনেছিস৷ বেশ করেছিস৷ কণা ইউজ করছে, এবার তুইও করবি৷’
গহন তার কথার মাথা-মুন্ডু কিছুই বুঝে উঠতে পারেন না৷ এমনিতেই তিনি কম্পিউটার, ইনটারনেট—এসব এড়িয়েই চলেন৷ উন্নততর প্রযুক্তির প্রতি বিতৃষ্ণায় নয়৷ আসলে ওই জিনিসটার সঙ্গে ঠিক সড়গড় হয়ে উঠতে পারেননি৷
শুঁটকি তাঁর হতভম্ব ভাব লক্ষই করেনি৷ সে তখন সিগারেটের প্যাকেটের ভেতর থেকে রাংতা বের করে এনে কী যেন খসখস করে লিখছে৷
—‘ব্যাপারটা একটু খোলসা করে বলবি?’ বাধ্য হয়ে তিনি প্রশ্নটা করেই ফেলেন৷
লিখতে লিখতেই সে উত্তর দেয়—‘খোলসা করার কিছু নেই৷ তুই নিজেই একটু আগে বললি যে, মাথায় কিছু আসছে না বলে যেখানে-সেখানে একগুচ্ছ ডট বসাচ্ছিস৷ তোর ডট বেশি হয়েছে৷ তাই ডট কম করার চেষ্টা করছি৷’
—‘মানে?’
—‘মানে এই৷’ কাগজটা এগিয়ে দিয়েছে সে৷ তিনি দেখলেন রাংতার পিছনের দিকে লেখা আছে—‘ডব্ল্যু ডব্লু ডব্লুডট কবিতা ডট কম৷’
—‘কবিতা ডট কম!’ তাঁর চোখ প্রায় ব্রহ্মতালুতে উঠেছে—‘আজকাল কবিতারও ডট কম বেরিয়েছে!’
শুঁটকি এবার মৌজসে সিগারেট ধরায়—‘তুই এখনও সত্যযুগে পড়ে আছিস! পুথিতে কাব্যি করার দিন আর নেই বাচ্চা! এখন লোকে ইন্টারনেটে কাব্যচর্চা করছে৷ ওয়েবজিন, ব্লগ, কম্যুনিটি, গ্রুপ—এমনকি সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোতে গেলে দেখবি লোকে নিজের অ্যালবামে কবিতা সেঁটে রেখেছে৷’
গহন চোখ গোল গোল করে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করেন, যদিও পুরো ব্যাপারটাই তাঁর মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে৷ তবু কোনোমতে বললেন—
—‘এটাও কি সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট?’
—‘নাঃ’, সে সিগারেটের ছাই ঝেড়ে বলে—‘এটা শুধু কবিতার একটা ওয়েবসাইট৷ ভারত-বাংলাদেশের অনেক কবি—অকবি, অ্যামেচার কবি এখানে কবিতা পোস্ট করে৷ কোনো সেন্সর-টেন্সর নেই৷ বাছাবাছির বালাই নেই৷ যে কেউ এখানে কবিতা দিতে পারে৷ এর অনেকগুলো সুবিধাও আছে৷’
—‘যেমন?’
—‘যেহেতু এটা অনলাইন কবিতার সাইট সেহেতু রেসপন্স অনেক তাড়াতাড়ি পাবি৷’ সে একমুখ ধোঁয়া ছাড়ল—‘প্রিন্টেড ম্যাগাজিনে তুই একটা কবিতা লিখবি, দু-মাস পরে সেটা পাবলিশড হবে৷ তারও একমাস পরে পাঠকের চিঠি আসবে—তবে তুই জানতে পারবি কবিতাটা কেমন লেগেছে৷ এখানে সে-সব ঝামেলা নেই৷ যে মুহূর্তে কবিতাটা পোস্ট করছিস, ঠিক সেই মুহূর্তেই হয়তো দশ-পনেরোটা লোক—অনলাইন হয়ে বসে আছে৷ কম্পিউটারের পর্দায় এক মিনিটের মধ্যেই কবিতাটা পড়ে ফেলবে৷ দু-মিনিটের মধ্যেই রি-অ্যাকশন পেয়ে যাবি৷ একদম ইনস্ট্যান্ট রি-অ্যাকশন৷’
গহন এক মুহূর্ত ভাবলেন—‘হুঁ৷’
—‘দ্বিতীয়ত এখানে তোর পরিচয় কেউ জানতে চাইবে না৷ যে-কোনো ছদ্মনামে তুই কবিতা পোস্ট করতে পারিস৷ মানেটা বুঝতে পারছিস?’ শুঁটকি রহস্যমাখা হাসি হাসে—‘এখানে তোর কবিতার পাশে গহন দত্তগুপ্ত—এ ওয়ান কবির নেমপ্লেটটা থাকবে না৷ বড়ো বড়ো পত্রিকার রেফারেন্সও থাকবে না৷ তোর আইডেন্টিটি ক্যারি করবে শুধু তোর কবিতা৷ কবিতাটা কেমন হল সে সম্পর্কে একদম খাঁটি আর আনবায়াসড রেসপন্স পাবি৷’
তিনি শুঁটকির কথা শুনে সংশয়ান্বিত হয়ে পড়েছিলেন৷ এরকম আবার হয় নাকি! এমন কথা আগে কখনও শোনেননি৷
—‘অত ভুরু কোঁচকানোর কিছু হয়নি৷ তোকে ঠিকানা দিয়ে দিলাম৷ অ্যাপ্লাই করে দ্যাখ৷ কয়েক মিনিটেই জবাব পেয়ে যাবি—যে সত্যিই তোর কবিতা, কবিতা হচ্ছে কিনা৷’
গহন তখনও সংশয় কাটিয়ে উঠতে পারেননি৷ তাঁর মনে একটা অদ্ভুত সন্দেহও ঘনিয়ে আসছিল৷
—‘শুঁটকি, তুই এই সাইটটার খোঁজ পেলি কী করে?’
সে হাসল৷ মাঝেমধ্যেই সে এরকম অদ্ভুত একটা হাসি হাসে৷ হাসিটাকে গহনের, হাসি কম, কান্না বেশি বলে মনে হয়৷
—‘সে প্রসঙ্গ থাক৷’ শুঁটকি হাসতে হাসতে বলে—‘অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি৷ আমি শেষমেশ চশমার দোকানি হয়েছি৷ কিন্তু স্বপ্নটা মরেনি, জানিস৷ বেশিদিন বাঁচব না জানি৷ কিন্তু মরার আগে একবার কবি হতে চাই আমি...শুধু একবারের জন্য কবি হতে...৷’ গহনের বুক ভেঙে দীর্ঘশ্বাস পড়ল৷
তোমার খোঁপা এলো হলেই বাদলা নামে
মেললে দু-চোখ লজ্জাহত সূর্য পালায়,
মনের কথা লিখছি রোজই মেঘের খামে
বদ্ধ আখর গুমরে মরে বন্দিশালায়৷
বুকের ভিতর আঁকছি নদী কল্পজালে,
তোমার মতোই অলীক বুঝি আমার চাওয়া
যতই ভাবি পৌঁছে যাব পা বাড়ালে
অনেক চলার শেষেও তোমায় যায় না পাওয়া!
উশ্রী অবিকল বনলতা সেনের মতো চোখ তুলে তাকিয়ে বলল—‘এটা আমাকে নিয়ে লিখেছ?’
—‘হ্যাঁ...তোমাকে নিয়ে৷ শুধু তোমাকেই নিয়ে উশ্রী৷’
উশ্রীর চুল আজ খোলা৷ রেশমের মতো একঢাল ঘন চুল ফুরফুরে হাওয়ায় উড়ছে৷ মন্দারের খুব ইচ্ছে করছিল ওই ঝাঁপিয়ে পড়া মেঘের প্রপাতের নীচে শুয়ে থাকতে৷ নরম, মসৃণ, সুগন্ধি কালো ছায়ায় মুখ ডুবিয়ে ঘ্রাণ নিতে৷ এমন চুল নিয়ে খেলা করতে না জানি কেমন লাগবে!
কালো কুচকুচে ধনুকের মতো ভুরু বাঁকিয়ে বলল উশ্রী—‘কেন? আমাকে নিয়ে কেন?’
মন্দার উশ্রীর মুখোমুখি ঘন হয়ে দাঁড়াল৷ দু-হাতে তার মোম রঙের সুডৌল মুখ স্পর্শ করে৷ গাঢ় স্বরে বলে—‘আমি তোমায় খুব ভালো...’
‘ভালোবাসি’ শব্দটাই বোধহয় বলতে চেয়েছিল সে৷ হয়তো বলতেও পারত৷ কিন্তু তার আগেই গালে সপাটে একটা বিরাশি সিক্কার চড়! পেল্লায় হাতের এক মোক্ষম চড়ে তার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল৷ চোখের সামনে সরষেফুলের দিগন্তবিস্তৃত খেত! সে তখনও ভেবে পায়নি যে উশ্রী তাকে এমন প্রলয়ংকর থাপ্পড় মারল কী করে! অমন নরম-সরম পুতুলের মতো মেয়ের এমন বাঘের থাবার মতো হাত! উশ্রী কি রোজ ডাম্বেল ভাঁজে!
সে কোনোমতে মাথা ঝাঁকিয়ে ধাতস্থ হওয়ায় চেষ্টা করে৷ কানের ভেতর ঢুকে যেন এক ডজন চড়ুই পাখি ঝগড়া লাগিয়ে দিয়েছে৷ চোখ ঝাপসা! তার মধ্যেই কোনোমতে উশ্রীর দিকে সবিস্ময়ে তাকায় মন্দার৷ কিন্তু উশ্রী কোথায়! তার জায়গায় লম্বা-চওড়া কালো একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে! কয়লা লোকটার চেয়ে কালো, না লোকটা কয়লার চেয়ে কালো—তা নিয়ে ডিবেট হতে পারে৷ ভুরু দুটো ঠিক যেন একজোড়া শুঁয়োপোকা৷ সবচেয়ে ভয়ংকর চোখদুটো! মহাভারতের কংসের বোধহয় এমন চোখ ছিল৷ সাজপোশাকও পৌরাণিক সিরিয়ালের ভিলেনের মতো! মাথায় মুকুট, কানে দুল, কবচ, গলায় নীল পাথরের হার!—যেন এইমাত্র রামানন্দ সাগরের সিরিয়াল থেকে নেমে এল!
—‘হা-রা-ম-জা-দা!’ লোকটা দাঁত খিঁচিয়ে বলে—‘বামুনের ছেলে হয়ে উলটো-পালটা মন্ত্র পড়ে! সংস্কৃতের ‘স’-ও জানে না৷ ভুল-ভাল উচ্চারণ করে জীবন অতিষ্ঠ করে ছেড়েছে! আর প্রেম করার সময়ে একেবারে মদন! মাথায় একশো কুড়ি ডাঙস না মেরেছি.....!’
বলতে-না-বলতেই আর এক পেল্লায় থাপ্পড়! মন্দারের মাথা তিনশো ষাট ডিগ্রিতে ঘুরে গেল৷
সে চেঁচিয়ে ওঠে—‘বাঁচাও...বাঁচাও...’
‘কী হল! অমন ষাঁড়ের মতন চ্যাঁচাচ্ছিস কেন?’
কানের কাছে প্রায় কয়েকশো ডেসিবেলের একটা বাজখাঁই গলার আওয়াজ শুনে ধড়মড় করে উঠে বসল মন্দার৷ সদ্য ঘুমভাঙা চোখে কণ্ঠস্বরের মালিককে দেখে আঁতকে উঠেছে! এ কী! এ তো সেই লোকটা! কুচকুচে কালো! ভাঁটার মতো চোখ৷ শুঁয়োপোকা ভুরু! শুধু ‘জয় হনুমান’ মার্কা পোশাকটা ছেড়ে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে এসেছে৷
সে অস্ফুটে বিড়বিড় করে বলে—‘সর্বনাশ! শনিদেব!’
—‘কী বিড়বিড় করে বকছিস!’ লোকটা রেগে গিয়ে বলে—‘ন’টা বাজে৷ স্নানে যাবি না!’
মন্দার এতক্ষণে ধাতস্থ হয়৷ নাঃ, লোকটা স্বপ্ন থেকে নেমে আসেনি৷ বরং ভীষণ রকম বাস্তব৷ ভদ্রলোক অন্য কেউ নন—স্বয়ং তার বাবা! দশটা নয়, পাঁচটা নয়, একমাত্র পিতৃদেব!
ব্যাজার মুখে বিছানা ছাড়ল সে৷ মনমেজাজ খারাপ হয়ে গেছে৷ কেমন সুন্দর একটা রোমান্টিক স্বপ্ন দেখছিল৷ কিন্তু তার মধ্যেও টপকে পড়তে হল পালোয়ানটাকে! লোকটা কিছুতেই তার পিছন ছাড়বে না৷ স্বপ্নে মাধুরী দীক্ষিতের সঙ্গে প্রেম করুক কি উশ্রীর সঙ্গে—ঠিক কোনো-না-কোনো ভাবে এসে বাগড়া দেবেই! আগে তবু দাঁত খিঁচিয়েই ক্ষান্ত হত৷ এখন দুমদাম হাত চালাচ্ছে৷
টয়লেটের দিকে যেতে যেতেই রান্নাঘরের ফ্যাঁচফোঁচ শব্দ পেল সে৷ হাতা-খুন্তিগুলো আজ একটু বেশিই শব্দ করছে৷ বাটি-গ্লাসগুলোও ক্রমাগত ঝনঝন আওয়াজ দিচ্ছে৷ মন্দার বুঝতে পারে, পরিস্থিতি আজ গরম! রান্নাঘরে এত শব্দকল্পদ্রুমের অর্থ একটাই! মা বলতে চাইছেন—‘আমি রেগে আছি’৷
উশ্রী কিন্তু কখনও রাগ করে না৷ সে ভারী মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে৷ ডাইরেক্টর তাকে বকাবকি করলেও শান্ত হয়ে সব কথা শোনে৷ সবসময়ই প্রোডাকশনের লোকদের সঙ্গে খুনসুটি করছে৷ একটা মিষ্টি রহস্যময় হাসি তার ঠোঁটে সবসময়ই লেগে থাকে৷
ভাবতেই মন্দারের মুখেও মুচকি হাসি ভেসে উঠল৷ উশ্রী এ বাড়ির বউ হয়ে এলে রান্নাঘরের হুড়ুম-দুড়ুম কমবে৷
—‘কী ব্যাপার রে?’
তার ছোটো বোন টিকলি ডাইনিং টেবিলে বসে কর্নফ্লেক্স খাচ্ছিল৷ দাদাকে দেখে টিপ্পনী কাটল—‘কাল রাত্রে ইসবগুল খেয়েছিস নাকি!’
মন্দার তার দিকে চোখ গোলগোল করে তাকিয়েছে—‘ইসবগুল! মিন্স!’
—‘না! দিব্যি ‘মোনালিসা’-স্মাইল দিতে দিতে টয়লেটে যাচ্ছিস কিনা!’ টিকলি ফিচ ফিচ করে হাসল—‘রোজ সকালে তোর মুখে ‘উঃ কী চাপ!’ গোছের এক্সপ্রেশন থাকে৷ আজ ‘আঃ কী আরাম’ মার্কা হাসি দিচ্ছিস৷ তাই জিজ্ঞেস করছি—লুবরির বন্দোবস্ত করেছিস কি না৷’
সে কিছুক্ষণ বোনের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে৷ টিকলি হায়ার সেকেন্ডারিতে লজিক নেওয়ার পর থেকেই হঠাৎই যুক্তিপূর্ণ কথা বলতে শুরু করেছে! এমনকি দাদার ওপর ‘দিদিগিরি’ করতেও ছাড়ছে না৷
—‘শ্রীরামকৃষ্ণের সামনের দাঁতের পাটিতে ফাঁক ছিল, মায়েরও আছে৷ তাহলে মা, রামকৃষ্ণ নয় কেন?’ মন্দার হাসল—‘থিঙ্ক ইট......’
টিকলি ঠোঁট ফুলিয়েছে, কর্নফ্লেক্সের বাটি সরিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই ছুটে গেল রান্নাঘরের দিকে৷ বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতেই মন্দার শুনতে পেল সে মায়ের কাছে নাকি সুরে নালিশ জানাচ্ছে—‘দ্যাঁখো মাঁ, দাঁদাভাই কিঁ বলেছেঁ৷ বলেঁ কিনাঁ তোঁমার দাঁতেও ফাঁক আঁছে...রাঁমকৃষ্ণের দাঁতেও.....৷’
দড়াম করে টয়লেটের দরজাটা বন্ধ করে দিল মন্দার৷ টিকলির নালিশের প্রত্যুত্তর শুনতে চায় না৷ কমোডের ওপর চেপে বসে সে আজকের স্বপ্নটার কথাই ভাবছিল৷ উশ্রীকে আজ কী অপূর্ব লাগছিল! ওকে খুব চুমু খেতে ইচ্ছে করছিল তার৷ হয়তো একটা-দুটো চুমু খেয়েও ফেলতে পারত৷ কিন্তু ওই লোকটা সব ভেস্তে দিল!
ভাবতেই তার রাগ হয়ে গেল৷ কী কুক্ষণে গ্যাস খেয়ে পইতে নিতে গিয়েছিল! বামুনের ছেলে হওয়ার এই শাস্তি! সবার ধাক্কা-টাক্কা খেয়ে এই দামড়া বয়েসে যদিও-বা পইতে নিল, তাতেও শান্তি নেই৷ পইতে নিলে নাকি একটা পুজো করতেই হয়৷ অন্তত একবার পুরুতের আসনে বসে ‘অং বং চং’ করাটা মাস্ট! এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল৷ কোনোমতে ‘চাঁদ সদাগর’ হয়ে পুজোটাও নির্বিঘ্নে করে ফেলতে পারত সে৷ কিন্তু তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর মধ্যে আর কাউকে খুঁজে পাওয়া গেল না! শেষ পর্যন্ত শনিদেব! কেন? হাতের সামনেই তো দিব্যি ভোলেভালা মহাদেব ছিলেন! ঠাকুমার কাছে শুনেছে তিনি নাকি গাঁজা-ভাং খেয়ে ভোম হয়ে বসে থাকেন৷ একটা-দুটো ভুলভাল মন্ত্র পড়লেও বিশেষ পাত্তা-টাত্তা দিতেন না৷ আর যিনি আগেই বিষ খেয়ে নীলকণ্ঠ হয়ে বসে আছেন, সেখানে ‘মহেশ্বর’ ভুলক্রমে ‘মহাষাঁড়’ হয়ে গেলেও এমনকি ক্ষতি হত৷
কিন্তু না, মন্দারকে বিশেষ করে বাঁশ দেওয়ার জন্যই সবাই মিলে শনিদেবকেই খুঁজে পেল! পুজো দেওয়ার সময় কি আর জানত যে এই দেবতা কানখাড়া করে সব শুনছেন! আর তাকে কুম্ভীপাক দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন! যেদিন থেকে শনিপুজো করেছে, সেদিন থেকেই নিজের কপালে শনি নিয়ে ঘুরছে সে! যা-ই করতে যায় তাতেই ‘আছোলা বাঁশ!’ মনের আনন্দে একটা মেগা সিরিয়ালে স্ক্রিপ্ট লিখছিল৷ মেইন স্ক্রিপ্ট-রাইটার দেবুদা বেশ ভালো মানুষ ছিলেন৷ সামান্য ভুল-ত্রুটি হলেও মাথা ঘামাতেন না৷ কিন্তু কপালে সে সুখ সইল না! দুম করে স্ক্রিপ্ট-রাইটার চেঞ্জ হয়ে গেল! ভালোমানুষ দেবুদার জায়গায় এলেন অজয় পান্ডা ওরফে পান্ডাদা! সে আর একরকম মূর্তিমান শনি! যেন কালো ষাঁড়ের মতো চেহারা, তেমনি তার হাঁকডাক৷ পায়ে আর্থ্রাইটিস—তাই হাঁটার সময় ডানদিকে-বাঁদিকে সমান অ্যাঙ্গেলে বেঁকে হাঁটে৷ ডাইনে-বাঁয়ে ক্রমাগত হেলে হাঁটার জন্য অনেকেই তাকে পেছনে ‘পান্ডা’র বদলে ‘পেন্ডুলাম’ বলে৷ কিন্তু কী মেজাজ? পান থেকে চুন খসলেই রদ্দা বাগিয়ে তেড়ে আসে!
অ্যাসিস্ট্যান্ট স্ক্রিপ্ট-রাইটারের কাজ করলেও মন্দার আসলে মনেপ্রাণে কবি৷ নেহাত বাবার ঠ্যালা খেয়ে কাজটা নিয়েছে৷ আর ওই কবি কবি ভাবই হয়েছে যত নষ্টের গোড়া! মেগা সিরিয়ালের সংলাপও মাঝে মধ্যে কাব্যিক হয়ে পড়ে৷ পেন্ডুলাম খেপে গিয়ে খিস্তি দেয়—‘এসব কী ন্যাকা ন্যাকা সংলাপ! কবি হবি নাকি! কাব্যি করতে চাইলে—দাড়ি রেখে আগে আঁতেল হ৷ তারপর ঝোলা কাঁধে নিয়ে নন্দনে বসে থাক৷ সিরিয়াল মারাচ্ছিস কেন বে?’
মাথায় রক্ত চড়ে গেলেও কোনোমতে মেজাজ ধরে রাখে মন্দার৷ পান্ডা, তথা পেন্ডুলামের কথার যে কোনো মা-বাপ নেই তা ইন্ডাস্ট্রির সবাই জানে৷
—‘হুঁ, কবি হবে!’ পেন্ডুলাম একখানা বাংলা দৈনিকের পাতা টেনে এনেছিল৷ তার ওপর ভাল্লুকের মতো একখানা থাবা রেখে বলে—‘কবিতা লেখা কী এমন শক্ত! খবরের কাগজের একটা পেজ খোল৷ তারপর হাতের পাতা দিয়ে চাপা দে৷ আঙুলের ফাঁক দিয়ে যে সব অক্ষর উঁকিঝুঁকি মারবে, সেগুলোকে লিখে দিলেই হয়ে গেল কবিতা! যত দুর্বোধ্য তত অনবদ্য৷’ বলেই সে ভুঁড়ি কাঁপিয়ে অশ্লীলভাবে হেসে উঠল৷ মন্দার প্রথমে রেগে গেলেও পরে তাকে মনে মনে ক্ষমা করে দেয়! অশিক্ষিত লোকজন! কবিতার মাহাত্ম্য কে বুঝবে! কী করে বুঝবে যে মন্দার পাতি কবি নয়৷ তার কবিতা ‘সৌরভ’, ‘বিশ্ববঙ্গ’, ‘জলচ্ছবি’র মতো লিটল ম্যাগাজিনে ছাপা হয়৷ কবিতা ডট কমের লোকজনও তার কবিতা পড়ে উচ্ছ্বাসিত প্রশংসা করে!
কবিতা ডট কমের কথা মনে পড়তেই তার কপালে ভাঁজ পড়ল৷ সেখানেও আজকাল শনির দৃষ্টি পড়েছে৷ ‘কুবলাশ্ব’ ছদ্মনামের একটা লোক তাকে জ্বালিয়ে খাচ্ছে৷ যাই লেখে, লোকটা তার মধ্যে খুঁত ধরবেই৷ তার পোস্ট করা একটি কবিতার লাইন ছিল—‘প্লিহার বেদনাতেও তোমার প্রেমের ব্যথা কমে না৷’ কুবলাশ্ব সেটা পড়ে মতামত দিল—‘সবই তো বুঝলাম! কিন্তু প্লিহার ব্যথা উঠলে তো লোকে মা-বাপের নামই ভুলে যায়৷ অথচ আপনার দেখছি প্রেমিকার নামও মনে থাকে! আশ্চর্য!’
বিলো দ্য বেল্ট পাঞ্চ খেয়ে সে মনে মনে দাঁত কিড়মিড় করেছিল৷ কিন্তু বিজ্ঞ বিজ্ঞ ভাব বজায় রেখেই টাইপ কবে—‘এসব রোমান্টিসিজিমের ব্যাপার৷ যে-কোনো ব্যথাই আদতে রোমান্টিক৷’
কুবলাশ্ব সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দেয়—‘প্লিহা, মানে পিলের ব্যথায় আবার রোমান্টিসিজম আছে নাকি! আমার এক পিসেমশাই তো প্রায়ই পিলের ব্যথায় ভোগেন৷ কই, তাঁকে তো বিন্দুমাত্রও রোমান্টিক বলে মনে হয় না৷ বরং সবসময়ই খিটমিট করেন৷ আপনার কাছে সব ব্যথাই রোমান্টিক বুঝি! দাঁতের ব্যথায় ভুগেছেন কখনও?’
সে আর বলতে! আক্কেল দাঁত ওঠার সময়ই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে ‘আক্কেল গুড়ুম’ হওয়া কাকে বলে৷
অগত্যা, কুবলাশ্বকে আর মুখের মতো জবাব দেওয়া যায়নি৷ নিষ্ফল আক্রোশে দাঁত কিড়মিড় করেছে মন্দার, আর মনে মনে ভেবেছে ‘এইসা দিন নেহি রহেঙ্গা’৷ তারও দিন আসবে৷
কমোডের ওপর চেপে বসে এই সবই ভাবছিল সে৷ হঠাৎ বাইরে থেকে বাবার উত্তেজিত চিৎকার—
—‘ওঃ ভগবান, তুই এখনও টয়লেটে!’
—‘বাবা......!’ সে বাবার উত্তেজনাকে বিশেষ পাত্তা দেয় না—‘ভগবান টয়লেটে নেই৷ আমি আছি৷’
—‘কতক্ষণ লাগবে তোর?’ বাবা আরও জোরে চেঁচিয়ে ওঠেন—‘একেই নিম্নচাপ, আর্জেন্ট কেস৷ তার ওপর গ্র্যাভিটেশনের দুরন্ত ডাক! পারছি না৷
—‘অন্য টয়লেটটায় যাও না৷’
—‘ওটাতে টিকলি ঢুকেছে৷’ বাবার গলা ফুল ভলিউমে—‘তাড়াতাড়ি কর৷’
বাধ্য হয়েই পরের কাজগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেরে ফেলল মন্দার৷ পাঁচ মিনিট পরে যখন সে তৈরি হয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এল, ততক্ষণে বাবা মেঝের ওপর চেপে বসে পড়েছেন৷ সম্ভবত মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে প্রবল লড়াই চলছে৷
—‘যাও৷’
বাবা তার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন সে ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’র অমিতাভ বচ্চন! এবং তিনি পাঁচ কোটি টাকা পেয়ে গেছেন৷
রান্নাঘরের ঢং ঢং-ঠং ঠং এখন অনেকটাই কম৷ তার মানে এখন মায়ের রাগ কমের দিকে৷ সম্ভবত সকালেই কর্তা-গিন্নির মধ্যে একচোট রোঁয়া ফোলানো হয়ে গেছে৷ ফলস্বরূপ এবেলা দুজনের বাক্যালাপ বন্ধ৷ বাবাকে দূরদর্শী লোক বলতে হবে৷ তিনি আগেভাগেই কিচেনের দেয়ালে নীরব একটা ব্ল্যাকবোর্ড সেঁটে রেখেছেন৷ রান্নাঘরে ঢুকতে ঢুকতেই মন্দার দেখল ব্ল্যাকবোর্ডের ওপরও খড়ির দাগে বাবা-মায়ের ঝগড়া চলেই যাচ্ছে৷
প্রশ্ন—কোন শার্টটা পরে যাব?
উত্তর—যেটা খুশি৷
প্রশ্ন—ব্লু রঙের টাইট খুঁজে পাচ্ছি না৷
উত্তর—বেডরুমের নীচের কাবার্ডে সাইডে ভাঁজ করে রাখা আছে৷
প্রশ্ন—আমার শর্টস কোথায়?
উত্তর—আমি পরে বসে আছি৷
শেষ উত্তরটা পড়ে কোনোমতে হাসি চাপল সে৷ মা তখনও একমনে হাতাখুন্তি নাড়িয়ে চলেছেন৷ মুখে-গলায় ফোঁটা ফোঁটা ঘাম৷ ব্লাউজের পিছনটা ঘামে ভিজে জবজবে৷ পিছনে না ফিরেই বললেন—‘পাঁচ মিনিট, ডিমের ঝোলটা নামিয়েই খেতে দিচ্ছি৷’
—‘ঠিক আছে৷’
আর কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরে চলে এল মন্দার৷ তাড়াতাড়ি ল্যাপটপটা অন করল৷ মা যতক্ষণে খেতে ডাকবেন, ততক্ষণে ‘কবিতা ডট কমের’ একটা চক্কর মেরে নেবে৷ রোজ সকালে, বিকেলে, সময় পেলেই অনলাইন হয়ে ‘কবিতা ডট কমের’ কবিতাগুলো পড়ে ফেলা তার নেশা৷ নতুন কে কী লিখল, তার নিজের কবিতায় কটা কমেন্ট পড়ল—সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে৷
ল্যাপটপটা অন হতেই স্ক্রিনে উশ্রীর ছবি ভেসে উঠেছে৷ দেখেই মন ভালো হয়ে গেল৷ একমাথা ঘন চুল এলিয়ে কেমন ছেলেমানুষের মতো হাসছে৷ উশ্রীর স্থির হাসির প্রত্যুত্তরে মন্দারও হাসল৷ তারপর অভ্যস্ত হাতে ব্রাউজার খুলে ‘কবিতা ডট কমে’ চলে গেল৷
কবিতা ডট কমে আজ সকাল থেকে কবিতার ভিড়৷ প্রথম পাতায় একের-পর-এক কবিতা৷ তার নিজের কবিতাটা সম্ভবত দ্বিতীয় বা তৃতীয় পাতায় চলে গেছে৷ ‘অগ্রদূত’, ‘যাযাবর’, ‘আকাশনীল’, ‘জোনাকি’ প্রত্যেকেই লিখেছে৷ একটাই শুধু নতুন নাম,—‘একা মেঘ’৷
কবিতাপাড়ায় নতুন কবির আমদানি হয়েছে! সে নিতান্তই কৌতূহলবশত কবিতার নামের ওপর ক্লিক করল৷ এটাই এখনও পর্যন্ত লাস্ট পোস্ট৷ কোনো কমেন্ট পড়েনি৷ মাত্র এক মিনিট আগেই কবিতাটা জমা পড়েছে৷
মন্দার পেজটা খুলে কবিতার থ্রেডে চোখ রাখল৷ ক্লিক সংখ্যা এক৷ অর্থাৎ সেই-এ কবিতার প্রথম পাঠক৷ কবিতার নাম—‘নোনা রোদ’৷
বালির রেতে দফন প্রাচীন শামুক
অন্ধকার ও সমুদ্র ডাক নিয়ে৷
ঢেউ চলে যায় একলা দ্বীপান্তরে—
পুরোনো স্মৃতির টিলায় মাখা রোদ
নোনা ধরা জলে আরশিটা মেলে ধরে
আর পিছু টানে জংলি হাঁসের ডাক৷
উড়ে যাক
উড়ে যাক
উড়ে যাক.....৷
কবিতাটা পড়ে তার ফের মাথা ঝিমঝিম করে উঠল৷ শনিদেবের থাপ্পড় খেয়েও এমন অনুভূতি হয়নি৷ সে প্রথমে লাইন-বাই-লাইন পড়ল৷ তারপর গোটা কবিতাটা! একেবারে অর্থহীন নয়৷ কিন্তু সব মিলিয়ে কি! ‘বালির রেত’ আবার কীরকম শব্দ! বালি মানেই তো রেত! না অন্য কিছু? শব্দের চাতুরী মানেই কি কবিতা! অত সহজ!
মন্দার নিজের ছদ্মনামে মন্তব্য পোস্ট করল—‘কবিতা না অ্যাটম বোমা ঠিক বুঝলাম না! ‘উড়ে যাক...উড়ে যাক... বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত মাথার ওপর দিয়ে উড়েই গেল৷ উড়িয়েও দিল৷ এসব কী বিটকেল ফ্যান্টাসি৷ ঝুলস্য ঝুল!’
তার একটু রাগই হয়৷ এরা কী ভাবে! কতগুলো সুন্দর সুন্দর শব্দ পরপর বসিয়ে দিলেই কবিতা হয়ে গেল! এদের জন্যই পেন্ডুলামের মতো পাব্লিকগুলো কবিতার নামে হাসে৷ একবার এই কবিতা ডট কমেই ‘কালকেতু’ নামের এক কবি লিখেছিল—‘শূকরের মাথা যেন এক ঝুড়ি লুচি!’ কুবলাশ্ব তাকে এমন ঝেড়ে কাপড় পরিয়েছিল যে পালাবার পথ পায়নি৷ তারপর থেকে তাকে আর এ পাড়ার ত্রিসীমানায়ও দেখা যায় না৷
মন্দার নিজেই কুবলাশ্ব-র ওপর চটে থাকলেও মনে মনে স্বীকার করল যে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তার মতো পাঠকেরও প্রয়োজন আছে! এরা খোঁচা না মারলে এইসব শূন্যকুম্ভরা নড়েচড়ে বসবে না৷ কবিতা লিখতে গেলে যে, কিছু পড়তেও হয় তা বোঝানোর জন্যই কুবলাশ্ব-র মতো তেএঁটে লোক দরকার৷ আস্ত থিসিস না থাকলেও কিছু কিছু কবির কবিতা তো পড়তেই হবে৷
মন্দারের ফেভারিট কবি অবশ্যই একমেবাদ্বিতীয়ম গহন দত্তগুপ্ত! কীসব অমানুষিক কবিতা লিখেছে লোকটা! পড়লেই গায়ে কাঁটা দেয়৷ বুকের ভেতরটা কেমন করে৷
ভাবতেই আবার মন খারাপ হয়ে গেল৷ গহন দত্তগুপ্তের কবিতাকে এত ভালোবাসে বলেই না স্বয়ং কবির বৈঠকে সটান হাজির হয়েছিল৷ এমনিতে ভদ্রলোক ভারী শান্তশিষ্ট৷ কথা বলার চেয়ে ফ্যানের দিকেই তাকিয়ে থাকেন বেশি৷ নীচুস্বরে ছাড়া কথা বলেন না, বকা তো দূর! অথচ সেই মানুষটিও মন্দারকে এক মোক্ষম দাবড়ানি দিয়ে বসলেন৷ দোষের মধ্যে সে বৃষ্টিস্নাত দিনে কবির লেখা ‘জলসই’ কবিতাটা উচ্ছ্বাসিত হয়ে আবৃত্তি করে ফেলেছিল৷ তাতেই ভদ্রলোক এমন খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠলেন, যেন মন্দার তাঁর লেখা কবিতা নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছে!
নাঃ, গহন দত্তগুপ্ত-র দোষ নয়৷ দোষ তার নিজের কপালের৷ কী কুক্ষণেই যে শনিপুজোটা করতে গিয়েছিল!
ঝুলস্য ঝুল!
গহন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না৷ তাঁর কবিতাকে ‘ঝুলস্য ঝুল’ বলেছে কেউ! গহন দত্তগুপ্ত-র কবিতাকে....৷
হঠাৎ করে রক্তচাপ বেড়ে গেল৷ মাথাটা দপ করে গরম হয়ে গেছে৷ এ যাবৎ জীবন অনেক কঠিন সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন৷ অনেক কঠোর বাক্যবাণ সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে৷ কিন্তু তাঁর কাব্যপ্রতিভাকে কেউ এভাবে নস্যাৎ করে দেয়নি৷ অথচ কোথাকার কে এই ‘রামহনু’ ছদ্মনামধারী ব্যক্তি, একেবারে সপাটে বলে দিল—‘কবিতা না অ্যাটম বোমা ঠিক বুঝলাম না৷ উড়ে যাক...উড়ে যাক...বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত মাথার ওপর দিয়ে উড়েই গেল৷ উড়িয়েও দিল৷ এসব কী বিটকেল ফ্যান্টাসি৷ ঝুলস্য ঝুল৷’
অক্ষরগুলো যেন তাঁর চোখে লংকার গুঁড়ো ছিটিয়ে দিয়েছে৷ সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না এমন দুর্নাম তাঁর অতিবড়ো শত্রুও দেবে না৷ কিন্তু এই ভাষায় সমালোচনা রীতিমতো অপমানজনক! একজন প্রবীণ, প্রতিষ্ঠিত কবির পক্ষে হজম করা কঠিন৷ এর চেয়েও অপমানজনক পরের কমেন্টটা৷ জনৈক ‘কুবলাশ্ব’ লিখেছে—‘দাদা, এমন কবিতা লেখার চেয়ে তেলেভাজা খেয়ে অ্যাসিড বাঁধিয়ে বসে থাকুন না! তাতে অন্তত আমরা রক্ষা পাই৷’
গহন উইন্ডোটা ক্লোজ করে রীতিমতো সশব্দেই মাউসটাকে সরিয়ে রেখেছেন৷ বজ্রাহতের মতো চেয়ারেই বসে থাকলেন কিছুক্ষণ৷ কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না৷ ইচ্ছে করছিল শোকেসে সাজানো স্মারকগুলোকে ডাস্টবিনে ফেলে দিতে৷ যত বই আজ পর্যন্ত লিখেছেন সব আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে পারলেই হয়তো স্বস্তি পান তিনি৷
আরও কতক্ষণ ওভাবেই বসে থাকতেন কে জানে৷ কিন্তু পিছন থেকে সুললিত কণ্ঠে ডাক এল—‘কবিবর’.....৷
গহনের রাগ তখনও পড়েনি৷ বিষবাক্যের জ্বালায় তখনও চিড়বিড় করে জ্বলছিলেন৷ জ্বলন্ত দৃষ্টিতে কণার দিকে তাকালেন৷
—‘এ কী!’ কণার মায়াবী চোখদুটোয় চাপা কৌতুক—‘এখনও বসন্তকাল আসেনি৷ আমিও তপোভঙ্গ করতে আসেনি৷ তাহলে এই তেজোদীপ্ত অগ্নিদৃষ্টির কারণ?’
মৃদু অথচ রাগতস্বরে বললেন তিনি—‘ওই নামে আমায় ডাকবে না৷’
—‘কেন?’ কণার শীর্ণমুখ হাসিতে ঝলমল করে ওঠে—‘তুমি কবিও বটে৷ এবং আমার বরও নিঃসন্দেহে৷ তাহলে ‘কবিবর’ শব্দটা কি দোষ করেছে?’
একটু থেমে আবার দুষ্টু দুষ্টু হেসে যোগ করলেন—‘নাকি একা আমারই বর কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে!’
—‘সে বিষয়ে সন্দেহ নেই৷’ গহনের মেজাজও খানিকটা ঠান্ডা হয়ে আসে৷ অপেক্ষাকৃত শান্তস্বরে বলেন—‘তবে কবি কিনা তাতে সন্দেহ আছে৷’
—‘যাক, তবে তোমার ওপর আমার অনন্ত মৌরসি৷’ তিনি কণ্ঠস্বরে ছদ্ম অভিমান মাখিয়েছেন—‘তাহলে এই অসময়ে বিছানা ছেড়ে তোমায় কষ্ট করে ডাকতে এলাম কেন, সে কথা জানতে চাইছ না যে!’
এতক্ষণে খেয়াল হল তাঁর৷ এখন কণার বিশ্রামের সময়৷ খাওয়াদাওয়ার পাট চুকিয়ে ঘণ্টাখানেকের জন্য একটু গড়িয়ে নেন তিনি৷ খুব প্রয়োজন না পড়লে বিছানা ছেড়ে এ সময়ে সচরাচর ওঠেন না৷ অথচ আজ নিয়মভঙ্গ হয়েছে৷
গহনের চোখে সপ্রশ্ন কৌতূহল৷ কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই কণা জবাব দিয়ে দিলেন—‘ঘুঁটু এসেছে৷ তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়৷ অসিতদা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন৷’
শেষ বাক্যটা বলার সময় তাঁর মুখে আন্তরিক উদবেগের ছাপ পড়ল৷ গহন তাঁর দিকে অপলকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন৷ তারপর চিন্তিত, মন্থর স্বরে বললেন—‘তুমি যাও, আমি দু-মিনিটের মধ্যেই আসছি৷’
কণা আর কথা না বাড়িয়ে চলে গেলেন৷ গহন চেয়ারে বসে কী যেন চিন্তা করছেন৷ অসিতদার কথা মনে পড়তেই চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে৷ বুকে স্মৃতির উঁকিঝুঁকি৷ অসিতদা, তথা অসিতবরণ চৌধুরী একসময়ে তাঁদের হিরো ছিলেন৷ চেহারাটা এখনও স্পষ্ট মনে আছে৷ তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ বলতে যা বোঝায় তাঁর গায়ের রংটা ঠিক তাই৷ লম্বা একহারা চেহারা৷ সাদা ধবধবে পাটভাঙা ধুতি-পাঞ্জাবি, ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো চুল, ক্লিন শেভ করা নীলচে গাল, সবসময়ই পান খেয়ে ঠোঁট দুটো লাল করে বসে থাকতেন৷ শিরায় জমিদারি রক্ত ছিল৷ তার ওপর কট্টর কমিউনিস্ট৷ অসম্ভব আদর্শবাদী তাই হয়তো চিরকালই অদ্ভুত, খামখেয়ালি সাহিত্যের ওপর প্রতিষ্ঠানের প্রভাব মানতেই চাইতেন না৷ রীতিমতো ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা করে বসেছিলেন, যে বড়ো বড়ো নামকরা পত্রিকায় কিছুতেই লিখবেন না৷ এ প্রসঙ্গে অনুযোগ করলেই বলতেন—‘কেন, ওরা ছাড়া দেশে কোনো পত্রিকা নেই নাকি? আমি বুর্জোয়াদের জন্য কবিতা লিখি না৷ সাহিত্য করলেই কয়েকটা মুষ্টিমেয় প্রতিষ্ঠানের বশ্যতা স্বীকার করতে হবে? অসম্ভব! পারব না....৷’
গহন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন৷ তেজ আর জেদ—দুটোই ছিল অসিতদার৷ নিজের সর্বস্ব দিয়ে জন্ম দিলেন এক নতুন পত্রিকার৷ জন্ম নিল ‘নকশীকথা’৷ সমস্ত তরুণ উদীয়মান কবি সেখানে লিখতে শুরু করল৷ তাদের মধ্যে গহন ছিলেন অন্যতম৷ অসিতদা তাঁকে একটু বেশিই ভালোবাসতেন৷ বলতেন, ‘আমার অর্জুন’৷ বেশি ভালোবাসতেন বলেই বোধহয় বেশি ঘৃণাও করতে পেরেছিলেন৷ পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড়ো সাহিত্য পত্রিকা—‘স্বদেশে’-র শারদীয়া সংখ্যায় যখন গহনের দীর্ঘ কবিতা ছাপা হল তখন অসিতদার ফরসা মুখ রাগে লাল হয়ে গিয়েছিল৷ প্রচণ্ড রাগে চিৎকার করতে করতে বলেছিলেন—‘শেষ পর্যন্ত তুইও প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছিস! তোর মধ্যে লোভ আছে! লোভী! বিশ্বাসঘাতক! বেরিয়ে যা...এই মুহূর্তে বেরিয়ে যা৷ তোর মুখ আর কোনোদিন দেখতে চাই না৷ বেরিয়ে যা...৷’ তাঁর তর্জনী নিষ্ঠুরভাবে দেখিয়ে দিয়েছিল দরজাটা৷ মাথা নীচু করে সেই দরজা দিয়েই বেরিয়ে এসেছিলেন গহন৷
‘নকশীকথা’র দরজা তাঁর জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ অসিতদার ওপর নিবিড় অভিমানে তাঁকে আর কোনোদিন মুখ দেখাননি তিনি৷ অথচ এই অসিতদাই গহনের বিয়ের সময় বাবার জায়গা নিয়েছিলেন৷ কণাকে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন—‘কবির বউ হয়েছ মা, স্বামীর ভালোবাসা ছাড়া আর সবকিছুই ঘরে বাড়ন্ত থাকবে৷ শাঁখা, সিঁদুর আর জলজ্যান্ত পতিদেব ছাড়া অন্য কোনো অলংকার পাওয়ার সম্ভাবনাও কম৷ কষ্ট করতে পারবে তো?’
ভাবতেই বুক খাঁ খাঁ করে উঠল৷ সেই মানুষই কী নির্মমভাবে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁকে৷ ‘নকশীকথায়’ আর ফিরে যাননি গহন৷ কিন্তু খবর রেখেছিলেন৷ প্রায় দশ বছর ধরে উদয়াস্ত খেটে, ম্যাগাজিনটাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন অসিতদা৷ তারপর আচমকাই ‘নকশীকথা’ থেকে সরে দাঁড়ালেন৷ প্রথম প্রথম ছোটোখাটো কয়েকটা লিটল ম্যাগাজিনে তাঁর কবিতা নিয়মিত ভাবেই ছাপা হত৷ তারপর আস্তে আস্তে কবে যে বিস্মৃতির আড়ালে চাপা পড়ে গেলেন তার খবর আর কেউ রাখে না৷
চোখে বাষ্প জমে এসেছিল৷ আলগোছে চোখ মুছে নিলেন৷ তারপর উঠে গেলেন বসার ঘরের দিকে৷ ঘুঁটু ওরফে অধীর তরফদার তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসেছিল৷ নকশীকথার আমল থেকেই দুজনের আলাপ৷ দুজনেই প্রথমে অসিতদার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে চলতে শুরু করেছিল৷ ঘুঁটু ডাকনামটা অসিতদারই দেওয়া৷ গহনকে তাড়িয়েছিলেন অসিতদা৷ আর ঘুঁটু নিজেই সরে গিয়েছিল৷
বর্তমানে সে একটা বিরাট সাহিত্য প্রতিষ্ঠানের সম্পাদকীয় বিভাগে চাকরি করে৷ কবিতা বিভাগটা দেখে৷ মোটা টাকা মাইনে পায়৷ সেই গ্রামের গোবেচারা ঘুঁটুকে এখন আর চেনাই যায় না! এখন সে দস্তুরমতো সম্মানীয় শ্রীযুক্ত অধীর তরফদার৷
ঘুঁটু এই ক-বছরে বহরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে৷ অতিরিক্ত মেদবাহুল্য আর উত্তেজনার যুগপৎ আক্রমণে সে ঘামছিল৷ গহনকে দেখে রুমালে মুখ মুছতে মুছতে হাঁসফাঁস করে বলল—‘শুনেছিস?’
গহন শান্তভাবেই তার মুখোমুখি চেয়ারটাতে বসে পড়েন—‘কী হয়েছে?’
—‘সেরিব্রাল’, ঘুঁটুর ডাবল চিন নড়ে ওঠে—‘গত বৃহস্পতিবার রাত্রে বাথরুমে যেতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলেন৷ সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে আই.সি.ইউ-তে অ্যাডমিট করতে হয়েছিল৷ শরীরের ডানদিকটা একদম পড়ে গেছে বুঝলি! তবে ডাক্তাররা বলেছে প্যারালিসিস হওয়া একদিক দিয়ে ভালোই৷ প্রাণের আশঙ্কা নেই৷ এখন অবশ্য জেনারেল বেডে দিয়েছে...৷’
ঘুঁটু আরও কত কি বকবক করে বলে গেল কে জানে৷ গহন কিছুই শুনেছিলেন না৷ তিনি ভাবছিলেন অসিতদার ডানহাতটা অসাড় হয়ে গেছে৷ আর কবিতা লেখা হবে না তাঁর৷
—‘দাজি কাল তোর কথা খুব বলছিলেন৷’ সে একটু কুণ্ঠিত স্বরে বলে—‘একবার দেখতে যাবি?’
তার কথা শুনে ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে গেলেন গহন৷ এতদিন বাদে অসিতদার মুখোমুখি হতে পারবেন কি! যে পথ দিয়ে তিনি হেঁটে গিয়েছিলেন, গহন সে পথে কোথায়? আজ তিনি অসিতদার চেয়ে অনেক উঁচুতে উঠে গেছেন৷ সে উচ্চতা থেকে মানুষটাকে দেখাও যায় না৷
অথচ সেই মানুষটার মুখোমুখি দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছেন আজকের প্রতিষ্ঠিত কবি! এ কি ভয়, না লজ্জা! আদর্শচ্যুত হওয়ার লজ্জা কি প্রতিষ্ঠার চেয়েও বড়ো!
—‘দ্যাখ’, ঘুঁটু তাঁর কাঁধে হাত রেখেছে—‘আমিও জানি দাজি তোর সঙ্গে অন্যায় করেছেন৷ একটা সামান্য ব্যাপারে তোকে অপমান করেছিলেন৷ কিন্তু এখন ওসব মনে রাখার সময় নয়...৷’
সত্যিই কি অসিতদা অন্যায় করেছিলেন! ন্যায়-অন্যায়, মান-অপমান মনে পুষে রাখার লোক নন গহন৷ তবু কোথায় যেন একটা কুণ্ঠা, একটা আত্মগ্লানি তাঁকে চেপে ধরে৷
তাঁর আত্মনিমগ্ন চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে যেন হতাশ হয়ে পড়ল ঘুঁটু৷ কাতরস্বরে বলে—‘একবার যাবি না গহন?’
বুকের ভেতরে কুচ করে কী যেন একটা বিঁধল৷ একটা সূক্ষ্ম অথচ তীক্ষ্ণ ব্যথা টের পেলেন৷ ঘুঁটুর দিকে তাকাতে গিয়েই চোখ পড়ল আয়নায়৷ দামি কাচে কণার প্রতিচ্ছবি৷ দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনছেন তিনি৷ দু-চোখে জলভরা মেঘ নিয়ে তাকিয়ে আছেন স্বামীর দিকেই৷ যেন জানতে চাইছেন, ‘আর কত পালাবে?’
গহন একমুহূর্তের জন্য চোখ বুজলেন৷ জোরালো একটা শ্বাস টেনে বললেন—‘চল৷’
‘এখন চারদিকটা কেমন যেন কালো কালো ঠেকে!
যেদিকেই হাতড়াই, খালি অশরীরী ছায়া টেনে ধরে নির্বাক,
একটা কালো নদী খোলস পালটেছে—
কালোকে মাঝেমধ্যে লাল দেখি৷
নদীটা হাত ফসকে মিলিয়ে গিয়েছিল
ডালিম গাছের পাতার ফাঁকে—পাখির ঠোঁটে টুপ করে
ঝরে পড়ে দুটো—একটা দানা চুনি চুনি৷
এখন চতুর্দিকে শুধু ভাঙাভাঙির শব্দ,
কাচ ভাঙছে৷ তার পিছনে ঝাপসা ঝাপসা মুখ
বেঁকেচুরে ভেঙে যাচ্ছে৷ প্লেট টেকটনিক
তত্ত্বই আসলে সত্যি৷ আমাদের পায়ের তলায়,
মাটি ভেঙে টুকরো টুকরো প্লেট হয়ে যায়৷
তারপর ধাক্কাধাক্কি ভাঙাভাঙি৷
ভেঙে যায়...ভেঙে যায়
ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে৷
তারপরও আমাদের বুড়ো বটগাছটা
কালো ভূতের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে৷
শিমশিম করে দুলে ওঠে প্রাচীন শিরা৷
ব্রহ্মদত্যির ভয় দেখাতে চাওয়া
লাল-লাল চোখ নিরস্ত হয়ে মিশে যায়
মাটিতে৷ গভীর শিকড়ে গুঁড়ো গুঁড়ো ঘামের মতো মাটি আঁকড়ে,
গ্রাম আঁকড়ে, দেশ আঁকড়ে, বিশ্ব আঁকড়ে
দাঁড়িয়ে থাকা চারকোল ছবি দেখতে চাই৷
অন্ধকার কি নেমেছে বসুন্ধরা?’
হাসপাতালের বেডে একটা কঙ্কাল শুয়েছিল৷
অসিতদা নয়, অসিতদার কঙ্কাল৷ অত লম্বা মানুষটা যেন কুঁকড়ে ছোটো হয়ে গেছেন৷ এখন দেখলে আর কেউ বলবে না, যে-কোনোদিন তাঁর নায়কের মতো চেহারাও ছিল৷ কোথায় সেই পুরুষালি সৌন্দর্য! তার বদলে যেন কেউ একটা প্রাচীন ঐতিহাসিক ফসিলকে শুইয়ে রেখেছে৷ ডান হাতটা নিঃসাড় হয়ে আছে বুক ঘেঁষে৷ মুখের একদিক বেঁকে গেছে৷ বাঁ হাতটা বেডের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা! অক্সিজেনের নল, স্যালাইনের বোতল, ক্যাথিটার,—আরও কত উপসর্গ ছুঁচ ফুটিয়ে রয়েছে গোটা শরীরে!
গহন স্তম্ভিতের মতো একদৃষ্টে তাকিয়েছিলেন অসিতদার মুখের দিকে৷ সদাব্যস্ত নার্স এদিক-ওদিক ঘুরে তদারকি করছিল৷ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন— ‘ওঁর হাত বেঁধে রেখেছেন কেন?’
নার্স বিরক্ত হয়ে উত্তর দেয়—‘কী করব? সুযোগ পেলেই অক্সিজেন, স্যালাইন, চ্যানেলগুলো ধরে টেনে খুলে ফেলার চেষ্টা করছেন৷ তাই বাধ্য হয়েই হাত বেঁধে রেখেছি৷’
অসিতদার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল৷ শব্দগুলো স্পষ্ট নয়—ক্রমাগতই জড়িয়ে যাচ্ছে—তার মধ্যেই কোনোমতে বললেন—‘গহন, আমি শিউলির গন্ধ নিতে চাই৷ এখানে শুধু মেডিসিনের উৎকট গন্ধ!’
শিউলি! এই গরমের মরশুমে শিউলি কোথায়! গহনের স্পষ্ট মনে পড়ে, অসিতদার বাড়ির সামনে একটা শিউলি গাছ ছিল৷ শরৎকাল এলেই বাড়ির সামনের পথ, উঠোন অবধি সাদা হয়ে থাকত৷ রোজ ভোরে অসিতদা ফুল কুড়িয়ে নিয়ে একটা বাটির মধ্যে জলে ভিজিয়ে রাখতেন৷ সেই মিষ্টি গন্ধটা আজও যেন টের পান তিনি৷ গলার কাছে অদ্ভুত ব্যথাবোধ জমাট বেঁধেছিল৷ অসিতদার দিকে চোখ তুলে তাকাতেও পারছিলেন না৷ অপরাধবোধ তাঁকে একটু একটু করে গ্রাস করছিল৷
—‘আমি আপনাকে শিউলি ফুল এনে দেব দাজি৷’
শীর্ণ মুখটায় শিথিল হাসি ফুটল৷ একটু চুপ করে থেকে যেন দম নিয়ে নিলেন৷ তারপর ফের অস্পষ্ট জড়ানো কণ্ঠস্বরে বলেন—‘তোর কাছে কাগজ- কলম আছে?’
গহনের কাছে সবসময়ই একটা রাইটিং প্যাড থাকে, তিনি ব্যাগ থেকে সেটাকে বের করে এনেছেন৷ নার্সটি তীক্ষ্ণচোখে গোটা ব্যাপারটাই দেখছিল৷ এবার খনখনে গলায় বলে—‘বেশি কথা বলবেন না৷ ডাক্তারবাবুর বারণ আছে৷’
অসিতদা হাসলেন৷ মুখটা বেঁকে যাওয়ায় হাসিটাও বাঁকা ঠেকল৷ গহন কাগজ-কলম নিয়ে তৈরি৷ অসিতদা চোখ বুজে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবেন৷ তারপর আস্তে আস্তে স্খলিত উচ্চারণে একের-পর-এক লাইন বলে গেলেন৷ গহন যেন বাধ্য ছাত্রের মতো ক্লাস নোট নিচ্ছেন৷ মাথা নীচু করে লিখে গেলেন, পঙক্তির পর পঙক্তি৷
—‘অন্ধকার কি নেমেছে বসুন্ধরা!’ শেষ লাইনটা অতিকষ্টে বলে চুপ করে গেলেন তিনি৷ পাঁজর-সর্বস্ব বুকটা হাপরের মতো উঠছে নামছে৷ মানুষটাকে ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল৷ শরীরটা হাসপাতালের ময়লা চাদরের সঙ্গে একবারে মিশে গেছে৷
গহন চুপ করে তাকিয়েছিলেন তাঁর দিকে৷ অসিতদা একসময়ে লিটল ম্যাগাজিনে দাপিয়ে বেড়াতেন৷ কবিতা-অন্ত-প্রাণ এই প্রচারবিমুখ কবি অনেক প্রতিষ্ঠিত নামী কবির চেয়েও ভালো লিখতেন৷ আত্মাভিমানী মানুষটার আজ আর কবিতা লেখার উপায় নেই! লিখতে চাইলেও অন্য কারুর শরণাপন্ন হতে হবে৷
—‘কবিতাটা তুই বড়ো ভালো লিখতিস গহন৷’ শ্বাস টানতে টানতে বললেন তিনি—‘তবে আমি তোর থেকেও ভালো লিখতাম৷’
সেই অহংকার! এ অহমিকা গহনের পরিচিত৷ তিনি অসিতদার চোখে এই প্রথম চোখ রেখেছেন৷ গর্তে ঢুকে যাওয়া চোখদুটোয় এক অমানুষিক দীপ্তি!
—‘কিন্তু তুই ঠিক রাস্তাটা ধরেছিলি৷ আই ওয়াজ রং!’
তিনি বিস্মিত হলেন! এ কী কথা বলছেন অসিতদা! এমন কথা কখনও তাঁর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হবে তা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি৷ নির্বাক, বিহ্বল দৃষ্টিতে দেখছেন তাঁকে৷
—‘অনেকক্ষণ কথা বলছেন দাজি৷ এবার একটু রেস্ট...৷’
—‘ভাবছিস বুড়োকে ভীমরতিতে ধরেছে!’ খুব কষ্ট করে বাঁকা হাসিটা হাসলেন অসিতদা৷ একটু দম নিয়ে ফের বলেন—‘সারাজীবন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলে জেহাদ করে এলাম৷ প্রতিষ্ঠানের পোষা কবি বলে তোকে তাড়ালাম, নকশীকথার পিছনে সবকিছু ব্যয় করেছি আমি৷ অথচ...৷’
—‘দাজি, এখন ওসব কথা থাক...৷’
—‘নাঃ, বলতে দে৷’ হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন তিনি—‘কনফেশনের দরকার আছে৷ হয়তো সময় পাব না...৷’
কী বলবেন গহন! অসহায় দৃষ্টিতে শীর্ণকায় মানুষটির দিকে তাকিয়ে আছেন৷ সেরিব্রাল অ্যাটাকে আক্রান্ত রোগীর এত কথা বলা উচিত নয়৷ কিন্তু অসিতদাকে সে কথা কে বোঝাবে!
—‘নকশীকথা আমার সন্তানের মতো ছিল৷ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাতিয়ার৷ ভেবেছিলাম খুব প্রতিবাদ করছি৷ বুর্জোয়াগুলোকে দেখিয়ে দেব সাহিত্যের ক্ষেত্রে গোষ্ঠীই শেষ কথা নয়৷ কিন্তু...৷’ রুগণ মানুষটার চোখদুটো জলে ভরে এসেছে—‘কয়েকবছর পরে বুঝলাম আসলে আমিও আর-একটা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন তৈরি করেছি! প্রতিষ্ঠান, গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যেতে গিয়ে নিজের অজান্তেই কখন যেন আর-একটা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে ফেলেছি৷ আমারই হাতে তৈরি হয়েছে আরও একটা বুর্জোয়া গোষ্ঠী—সেই লবি-অ্যান্টিলবির ঘৃণিত গল্প! যা আন্তরিক ভাবে চিরকাল ঘৃণা করে এসেছি—আমিও সেই গোষ্ঠীবাদেরই জনক৷’
গহন নির্বাক শ্রোতা৷ এত যন্ত্রণা অসিতদার মধ্যে ছিল! যে লোকটা কোনোদিন কোনো পরিস্থিতিতেই হার মানেনি, আজ সে কী বলছে! তার একান্ত পরাজয়ের গ্লানিময় ইতিহাস এতদিন নৈঃশব্দ্যের পিছনেই লুকিয়ে ছিল৷ আজ বুকফাটা হাহাকার হয়ে বেরিয়ে এসেছে৷
—‘আজ তুই কোথায়, আর আমি...৷’ অসিতদা যেন ভেতরে ভেতরে কাঁদছেন—‘আমাকে কেউ চিনল না গহন...কেউ জানল না আমার কথা...আমি হারিয়ে গেলাম...হারিয়েই গেলাম...৷’
অসিতদার দিকে তাকিয়ে হঠাৎই পিতামহ ভীষ্মের কথা মনে পড়ে গেল গহনের৷ নিজেরই প্রতিজ্ঞার ফাঁদে জড়িয়ে পড়া পৌরাণিক বীরটিও কি গোপনে গোপনে এমনই কেঁদেছিলেন? অন্তিম মুহূর্তে তাঁর মনেও কি আপসোস কামড় বসায়নি?
বাদবাকি সময়টা নীরবেই কাটল৷ অসিতদা অবসন্নের মতো বিছানায় পড়ে রইলেন৷ এরপর আর একটা কথাও বলেননি৷ গহনও ভারাক্রান্ত মনে, সজল চোখে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন৷ অপরাধবোধটা দ্বিগুণ বেড়েছে৷ সবচেয়ে বিড়ম্বনা, এ বেদনার কোনো নিদান নেই৷ সান্ত্বনা, ভরসা, স্তোকবাক্য—কোনোটাতেই এ যন্ত্রণা কমানো সম্ভব নয়৷
ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ হতেই তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন করিডোরে৷ একরকম পালিয়েই এলেন৷ তাঁর দেহও যেন অবসন্ন হয়ে আসছে৷ কোনোমতে সামনের একটা কাঠের চেয়ারে ধপ করে বসে পড়েন৷ মনে কোনো অনুভূতিই আর দাগ কাটছে না৷ দুঃখ, কষ্ট, রাগ, অভিমান—কিছুই না! শুধু খাঁ খাঁ শূন্যতা৷
ঘুঁটু এতক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলছিল৷ এবার গহনকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসে৷ তার কণ্ঠস্বরে নিশ্চিন্ততার প্রলেপ৷
—‘দাজি এখন আউট অফ ডেঞ্জার৷ ডাক্তাররা বলছে—আপাতত কয়েকটা দিন খুব সাবধানে...৷’ বলতে বলতেই থেমে গেল সে৷ গহনের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে আশঙ্কিত গলায় বলল—‘গহন! কী হয়েছে!’
গহন তখন ভাবছিলেন, অসিতদাও ইচ্ছামৃত্যুর বর পেলেন না কেন!
‘আমরা কেউ মাস্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল৷
অমলকান্তি সে-সব কিছু হতে চায়নি৷
সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল!
ক্ষান্ত বর্ষণ কাক-ডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর,
জাম আর জামরুলের পাতায়৷
যা নাকি অল্প-একটু হাসির মতন লেগে থাকে৷’
—‘অমলদা...৷’
শুঁটকি আপনমনেই এককোণে বসে মদের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিল৷ এমনিতে সে বারে আসতে চায় না৷ কিন্তু আজ দায়ে পড়ে আসতে হয়েছে৷ জিনিসটা স্টকে রাখতে ভুলে গিয়েছিল সে৷ আজকাল প্রায়ই গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা মনে থাকছে না৷ কে জানে অ্যালঝাইমার হল কিনা!
অ্যালঝাইমারকে ভয় পায় না শুঁটকি৷ বরং যে মানুষ সবকিছু ভুলে যেতে পারে তার চেয়ে সুখী আর কেউ নেই৷ স্মৃতি মানেই শুধু মৃত্যু, বেদনা, আঘাত! আজ পর্যন্ত স্মৃতির অন্য মানে জানতে পারল না সে!
শুধু একটাই দুঃখ৷ অ্যালঝাইমার হলে রুমার জন্য কবি হওয়ার স্বপ্নটাও ভুলে যাবে৷ সারাজীবন ধরে ওই একটা স্বপ্নই তো দেখছে৷ একদিন সে-ও কবি হবে৷ অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি৷ কিন্তু শুঁটকি কবি হয়েই ছাড়বে৷
—‘ও অমলদা৷’
পিছনের ডাকটা এবার জোরালো হয়েছে৷ শুঁটকির হঠাৎ মনে পড়ে গেল যে তার পিতৃপ্রদত্ত নামটাও অমলকান্তি৷ শীর্ণ, কাঁকলাসের মতো চেহারার জন্য শুঁটকি নামটা এমনই বহুল প্রচলিত, যে নিজের খানদানি নামটাই ভুলে গিয়েছিল৷ আজ মনে পড়তেই বেদম হাসি পেয়ে গেল তার৷ জীবনে ব্যর্থ হওয়ার জন্য বেছে বেছে এই নামটাই রাখতে হয়েছিল বাবা-মাকে!
—‘কোন শালা রে?’
ঘাড় ঘুড়িয়ে পিছনের লোকটাকে দেখার চেষ্টা করে শুঁটকি৷ লোকটা এবার তার মুখোমুখি চেয়ারটাতে এসে বসেছে৷
—‘খামোখা মুখ খারাপ করছ কেন? আমি স্বর্ণাভ৷’
বিরক্তিতে নিজের অজান্তেই মুখ বিকৃত হয়ে আসে তার—‘তুই এখানে কি করছিস? এখনও নোবেল দেওয়ার জন্য তোকে ডাকেনি?’
স্বর্ণাভ গুপ্ত এখনকার উঠতি তরুণ কবিদের অন্যতম৷ কী যে মাথামুন্ডু কবিতা লেখে তা শুধু ও-ই জানে৷ অথচ হাম্বাগ দি গ্রেট৷ কথায় কথায় বোদলেয়ঁ, চমস্কি, এলিয়ট ভ্যালেরি আওড়ায়৷ বাংলা কবিতার নাম শুনলেই নাক সিঁটকানো এদের স্বভাব৷ শুঁটকির ভীষণ বিরক্ত লাগে৷ যদি এত বড়ো সাহেবই হয়েছিস তো চানা-মটর চিবিয়ে ফরাসি বা ইংরেজিতে কবিতা লিখিস না কেন? কলম ধরলেই তো সেই ‘দীনা হীনা পিঁচুটি নয়না’ বঙ্গভাষার কথাই মনে পড়ে! যতসব হারামজাদার দল!
শুঁটকির বক্রোক্তিকে পাত্তা না দিয়েই স্বর্ণাভ বলে—‘তুমি এখানে যে! এ পাড়ায় তো তোমাকে দেখাই যায় না৷ ভুল করে চলে এসেছ বুঝি?’
—‘ঠিকই বলেছিস৷’ সে উঠে দাঁড়ায়—‘সত্যিই খুব ভুল হয়ে গেছে৷ চলি৷’
—‘আরে...৷’ স্বর্ণাভ তার হাত টেনে ধরেছে—‘এখনই কোথায় যাচ্ছ? সবে তো কলির সন্ধে৷ বোসো, আরও পাঁচ-ছ পেগ মেরে যাও৷ আমার ট্রিট৷’
—‘পাঁচ-ছ পেগ!’ শুঁটকি হেসে ফেলল—‘ধুস, ওতে কি হবে? পাঁচ-ছ পেগে আমার ব্রেকফাস্টও কমপ্লিট হয় না!’
—‘ঠিক আছে, যত খেতে চাও, খাও৷’ সে হাসছে—‘বিল আমি দেব৷’
শুঁটকি ভুরু কুঁচকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকে দেখে—‘কেসটা কী বল তো! কখনও তো একটা বরফের গোলাও খাওয়াসনি! আজ একেবারে মাল! সত্যি সত্যিই নোবেল পেয়েছিস নাকি!’
স্বর্ণাভ কোলগেট হাসি হাসল—‘নোবেল পাইনি বটে, তবে বেলতলায় যাচ্ছি, আই মিন, ছাঁদনাতলায় দাঁড়াচ্ছি’৷
সে সরুচোখ করে ছেলেটাকে দেখছে৷ জগতে এমন মেয়েও আছে যে এই ফ্রেঞ্চলিশ গাধাটাকে বিয়ে করবে! এমনিতেই তো আঁতেলের শিরোমণি৷ তার ওপর চেহারারও কী বাহার! মেয়েদের মতো পনিটেল রেখেছে৷ মুখ ভরতি উলুবনে চোখ-নাক সবই ঢেকে গেছে৷ তার ওপর যা দশাসই একখানা পেটমোটা বপু! মেয়ের বাপ জগতে আর মানুষ খুঁজে পায়নি! শেষ পর্যন্ত এই গোরিলাটাকেই পেল!
—‘কী ভাবছ?’
—‘এই মুহূর্তে একটা কবিতা মাথায় সুড়সুড় করছে৷’ শুঁটকি খলখল করে হেসে উঠেছে—‘হি প্রিয়তম,/যদি হাতে দিলে তোমার ছবি/হূদয়ে দিলে প্রেম/তোমার ওই হতকুচ্ছিত দাড়ি কেন/ছাড়িয়ে গেল ফ্রেম!’
—‘এটা কার কবিতা?’
—‘তোর বউয়ের!’ হাসতে হাসতে তার চোখে জল এসে পড়ে—‘এখনও লেখেনি৷ তবে তোকে বিয়ে করার পর শিয়োর লিখবে৷’
—‘ধুস৷’ স্বর্ণাভ বলে—‘তোমাকে বলাটাই ভুল হয়েছে৷ ফ্রাস্টু লোকদের সুখবর শোনাতেই নেই৷’
—‘ঠিক বলেছিস৷ ফ্রাস্টু লোকদের ফরাসি আর ইংরেজি কবিতা শোনাতে হয়৷’ শুঁটকি চোখ টিপল—‘আছে নাকি স্টকে?’
ব্যস! স্বর্ণাভকে আর পায় কে! সে প্রথমে ফরাসি সাহিত্য নিয়ে একচোট বক্তৃতা দিতে শুরু করল৷ শুঁটকি খুব বাধ্য ছাত্রের মতো তাকিয়ে আছে ঠিকই৷ কিন্তু আদৌ লেকচার শুনছে না৷ তার লক্ষ্য বিনা পয়সায় আরও কয়েক পেগ মদ খাওয়া৷ এমন সুযোগ পেলে কেউ ছাড়ে?
ও প্রান্তে শিক্ষক তখন ফরাসি ছেড়ে বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে ইংরেজি সাহিত্যের তুলনামূলক আলোচনা চালাচ্ছেন৷ যথারীতি ঝুম্পা লাহিড়ি, ভি. এস. নৈপল, অরুন্ধতী রায়, অরবিন্দ আদিগা—সমস্ত ঝলমলে নামগুলো উঠে আসতে শুরু করেছে৷ সে চিরকালই প্রমাণ করতে চায় যে তার মতো পণ্ডিত ব্যক্তি খুব কমই আছে৷ দুনিয়ার সব লেখক ও তাঁদের সমস্ত সৃষ্টি তার ঠোঁটস্থ৷
—‘আচ্ছা, তুই ভর্না শ-এর লেখা পড়েছিস?’ আচমকা প্রশ্ন করল শুঁটকি—‘শুনেছি ভদ্রমহিলা দারুণ লেখেন৷ একটুর জন্য বেচারির বুকারটা ফসকে গেল৷’
—‘ঠিকই শুনেছ৷ অসাধারণ লেখিকা৷ আমি ওঁর অনেকগুলো লেখা পড়েছি’, স্বর্ণাভ আবার বক্তৃতা দিতে শুরু করেছে৷ সব পুরস্কারই যে যোগ্যতম ব্যক্তিকে দেওয়া হয় না, বরং এর পিছনে অন্য কোনো কেমিস্ট্রি কাজ করে, তার রীতিমতো ইতিহাস, স্ট্যাটিসটিক্স, রাজনীতি সহ যুক্তিনিষ্ঠ প্রমাণ দিয়েও ফেলল৷
শুঁটকি ভাবলেশহীনভাবে গ্লাস শেষ করল৷ এটাই তার শেষ পেগ৷ আর এই কচকচি ভালো লাগছে না৷ কী কুক্ষণে যে বারে এসেছিল! এই লোকটার পাল্লায় পড়তে হবে জানলে বোধ হয় কষ্ট করেও নির্জলা থাকতে পারত!
গ্লাসটা ঠক করে টেবিলের ওপর রেখে দাঁড়াল সে৷ স্বর্ণাভর কাঁধে হাত রেখে নেশাজড়িত আন্তরিক গলায় বলে—‘থ্যাঙ্কস ভাই৷ তোর কাছ থেকে অনেক তথ্য পেলাম৷ বলতে পারিস ঋদ্ধ হলাম৷ অনেস্টলি, স্পিকিং, ভর্না শ নামে কোনো মহিলা লেখালেখি করেন তা দশ মিনিট আগেও জানতাম না, বুকারের গপ্পো তো দূর! এটা জাস্ট আমার বানানো একটা নাম৷ স্বর্ণাভ-র উলটো সংস্করণ৷ স্বর্ণাভ থেকে ভর্না শ৷ ভেবেছিলাম বোধহয় ওখানেই থামবি৷ কিন্তু তুই তো দেখছি মহিলার অনেকগুলো লেখাও পড়ে ফেলেছিস! কি আর বলব৷ ইউ আর রিয়েলি জিনিয়াস! এ ছেলে বাঁচলে হয়৷’
কথাগুলো বলেই স্তম্ভিত স্বর্ণাভকে পিছনে ফেলে হনহন করে করে এগিয়ে গেল শুঁটকি৷ দরজার দিকে এগোতে এগোতেই শুনতে পেল স্বর্ণাভ বিড়বিড় করে বলছে—‘শালা ঢ্যামনা৷’
ফিচ করে হেসে ফেলল সে৷ লোকে রেগে গেলে তাকে ‘ঢ্যামনা’ই কেন বলে কে জানে৷ নেশা নেশাও হয়েছিল তার৷ সেইজন্যই বোধহয় হাসিটা থামতেই চাইছে না৷ আপনমনেই ফিচফিচ করে হাসতে হাসতে শুঁটকি বারের বাইরে এসে দাঁড়ায়৷
—‘স্যার৷’ দারোয়ান তাকে স্যালুট ঠুকতে সে পকেট থেকে একটা নোট বের করে তাকে দেয়৷ তার সন্ধানী চোখ তখন নিজের গাড়িটা খুঁজছে৷ সারি সারি গাড়ির মধ্যে স্টিল কালারের জেনটা কোথায়! এখানেই পার্ক করেছিল? না অন্য কোথাও? নাকি বেশি নেশা হয়ে গেছে, তাই নিজের গাড়িটাকেই খুঁজে পাচ্ছে না!
তার রকমসকম দেখে দারোয়ানের সন্দেহ হয়৷ সে একটু কুণ্ঠিত স্বরে বলে—‘স্যার, স্টিল কালারের জেনটা কি আপনার ছিল?’
—‘হ্যাঁ আমারই৷’ কথাটা অন্যমনস্কভাবে বলেই চমকে ওঠে শুঁটকি—‘ছিল মানে!’
—‘আপনাকেই একটু আগে আমি খুঁজছিলাম স্যার৷ কিন্তু খুঁজে পাইনি৷’ দারোয়ান মাথা হেঁট করেছে—‘আপনি নো পার্কিং জোনে গাড়ি পার্ক করেছিলেন৷ তাই পুলিশের গাড়ি ওটাকে তুলে নিয়ে গেছে!’
কেউ যেন ধড়াম করে একটা মস্ত গদা তার মাথায় বসিয়ে দিল৷ কথাটা বুঝতে কিছুক্ষণ সময় লাগল৷ কোনোমতে হতবিহ্বলভাবে বলে সে—‘তুলে নিয়ে গেছে!’
—‘হ্যাঁ...স্যার৷’
—‘হা-রা-ম-জা-দা!’ শুঁটকি অদ্ভুত আক্রোশে ছুটে গেল বাইরের দিকে৷ মেইন রোডের ওপর দাঁড়িয়ে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে পুলিশের উদ্দেশে অশ্রাব্য গালিগালাজ দিতে শুরু করল৷
—‘শালা, বাঞ্চোত...বোকাচোদা...তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য তোরা আমার গাড়িটাই পেয়েছিলি!...যতসব ভুঁড়িওয়ালা ঘুষখোরের দল...’
আরও কিছুক্ষণ শ-কার, ব-কার, ম-কারের বন্যা বইয়ে শেষ পর্যন্ত শান্ত হল শুঁটকি৷ গালাগালি দেওয়ার চোটে তার মুখে ফেনা জমে গেছে৷ আস্তে আস্তে উত্তেজনা প্রশমিত হয়৷ রাস্তায় দাঁড়িয়ে লম্ফঝম্প করে যে বিশেষ লাভ নেই, দেরিতে হলেও একথা মাথায় ঢুকেছে৷ এখন সমস্যা একটাই৷ বাড়ি ফিরবে কী করে!
বাড়ির কথা মনে পড়তেই শুঁটকি নিজেকেই নিজে ভেংচি কাটে৷ বাড়ি কাকে বলে? ইট কাঠ পাথরের একটা নির্বোধ আশ্রয়৷ মাথার ওপর একটা ছাত আর চারদিকে মজবুত দেয়াল থাকলেই বাড়ি হল! আহা! বাড়ির কী ছিরি! অমন বাড়িতে ফেরার কী দরকার!
সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, আজ আর বাড়ি ফিরবে না৷ এখন রাত প্রায় পৌনে বারোটা৷ যানবাহন পাওয়া যাবে না৷ ট্যাক্সিগুলোও বসে থাকে রিফিউজ করার জন্যই৷
অতএব আজ আর ঘরে ফেরা নয়৷ কলকাতার রাস্তাতেই ঘুরে বেড়ানো যাক৷
ভাবতেই মনে বেশ রোমাঞ্চ হল তার৷ রহস্যে ডুবে থাকা কলকাতার পথঘাট৷ কল্লোলিনীর একদিকে হয়তো এত রাতেও আলোর উৎসব৷ এ শহর কখনও ঘুমোয় না৷ বরং শুঁটকির মনে হয় মটকা মেরে পড়ে থাকে৷ যখন মধ্যবিত্তের ঘরের আলো নেভে, তখনই অন্য কোথাও রহস্যময় আলো জ্বলে ওঠে৷ অপ্সরা-কিন্নরীর জমায়েত হয়,—স্বাভাবিক ভাবেই ‘দেবতা ঘুমালে তাহাদের দিন, দেবতা জাগিলে তাহাদের রাতি’৷
ইচ্ছে করলে গভীর রাতে রহস্যময় দিনটার খোঁজে যেতে পারত৷ কিন্তু ‘অমলকান্তি’দের সবই উলটো৷ তাই পথের দিকেই পা বাড়াল সে৷
মেইন রোড প্রায় শুনশান হয়ে এসেছে৷ দু-পাশের সারসার ল্যাম্পপোস্টের আলোর ঔজ্জ্বল্যও যেন খানিকটা ম্লান৷ পিচের রাস্তার ওপর পিছলে পড়ে ক্ষীণ আভা তৈরি করছে৷ একটা-দুটো ল্যাম্পপোস্ট আবার অন্ধ! আলোর সারির মধ্যে ফোকলা দাঁতের মতো তাদের ব্যঙ্গাত্মক উপস্থিতি৷
ফুটপাথের ওপর চাদর বিছিয়ে ভিখিরিরা গভীর ঘুমে কাদা৷ হলুদ আলোর পিঙ্গল আভায় শায়িত যেন তামাটে মূর্তি৷ কেউ একা, কেউ বা সপরিবারে৷ একপাশে দুটো ছোটো ছোটো বাচ্চাকে নিয়ে বাচ্চাদের বাপ ঘুমন্ত৷ তুলনামূলক বড়োটা পাশে৷ একেবারে চুন্নুমুন্নুটা বুকে৷ পাশের শিশুটিকে বড়ো সযত্নে, সতর্কতার সঙ্গে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায় শুইয়েছে তার বাবা৷ যদি কোনো মদ্যপের বেসামাল গাড়ি কোনোভাবে ফুটপাথে উঠে পড়ে, তখন তার গাড়ির চাকা বাবার বুকেই আটকে যাবে৷
শুঁটকি কখন যেন অজান্তেই থমকে দাঁড়িয়ে গেছে৷ নিদ্রিত পরিবারটির দিকে তাকিয়ে কেমন যেন কান্না পেয়ে গেল৷ মাথার উপরে ছাত নেই৷ নেই নরম বিছানার ওম৷ তবু ঘুম আছে! ছাতওয়ালা, দেওয়াল যুক্ত চৌকানো বাক্সটা নেই৷ তবু বাড়ি আছে৷
সে আরও অনেক কিছুই ভাবতে যাচ্ছিল৷ তার আগেই বুকপকেটের মোবাইল বেজে উঠেছে৷ শুঁটকি তাড়াতাড়ি খানিকটা এগিয়ে গেল৷ মোবাইলের শব্দে বাচ্চাদের ঘুম ভেঙে যেতে পারে৷ প্রযুক্তির চিৎকারে সহূদয় ঘুমের সর্বনাশ হোক, তা চায় না৷
সেলফোনের ডিসপ্লেতে গহনের নাম!
—‘বল৷’
কলটা রিসিভ করতেই ও প্রান্তে বিষণ্ণ স্বর—‘বিরক্ত করলাম না তো!’
—‘ফ্যাট শালা!’ শুঁটকি ঝাঁপিয়ে ওঠে—‘প্রেমিকাকে ফোন করছিস নাকি! ওসব কার্টসি মেয়েদের দেখাস৷’
গহন হেসে ফেলেন—‘আর পালটালি না বাচ্চা’!
—‘আমি পলিটিশিয়ান না গিরগিটি!’ শুঁটকির পায়ের কাছে একটা কোল্ডড্রিংকের খালি বোতল পড়েছিল৷ সেটাতে একটা শট মেরে বলল সে—‘তা ছাড়া তুই বা পালটেছিস কই? শালা যথারীতি এসকেপিস্ট৷ কঠিন বাস্তবের সামনে পড়লেই ন্যাজ তুলে চোঁ চা দৌড়! একদিকে লম্বা লম্বা দার্শনিক ডায়লগ ঝাড়ছিস ‘সমালোচনা নাই, হ্যানো চাই, ত্যানো চাই, নইলে লিখতে পারছি না...৷’ অথচ উদমা ঝাড় খেলেই কুঁইকুঁই করতে করতে ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন৷
টেলিফোনের ও প্রান্তে গহন কতটা চমকে উঠলেন তা বোঝা গেল না৷ কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বরে নিখাদ বিস্ময়—‘তুই জানলি কী করে?’
—‘মধ্যরাত্রে এমন ‘বা-জে করুণ সুরে’ মার্কা ভলিউম শুনলে জানার বাকি কি থাকে?’ সে ভারী মজার খেলা পেয়েছে৷ গহনের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই বোতলটা নিয়ে ফুটবল খেলছে৷ ফাঁকা বোতল কিক খেয়ে গড়গড় করে এগিয়ে গেল৷ পিছন পিছন এলোমেলো পায়ে শুঁটকি৷
—‘কুঁই কুঁই করছি না৷’ একটু চুপ করে থেকে বললেন গহন—‘কিন্তু এটা তো ঠিক, যে আমি কবিতা লিখতে পারছি না৷’
—‘কে বলল?’ সে একটা লম্বা কিক মেরে বোতলটাকে সাইড করে— ‘কেউ তো বলেনি যে ওটা কবিতা হয়নি৷ যদি বলতও তাহলেই বা কী হত? কোনটা কোনটা কবিতা নয়—তা ডিসাইড করার ধক সুপ্রিম কোর্টেরও নেই৷’
—‘তবু...৷’
—‘দ্যাখ গহন৷ তবু, যদির এখানে কোনো সিন নেই৷’ শুঁটকি বলল... ‘কবিতা তুই লিখিস কি লিখিস না—সেটা এখানে বড়ো কোনো ইস্যু নয়৷ আসলে তোর কবিতাটা কাউকে স্পর্শ করতে পারেনি৷ ইনফ্যাক্ট কারুর ভালো লাগেনি৷ সেটাই তারা অনেস্টলি বলেছে৷ তোর যদি খারাপ লাগে, তবে ওটার পাশে ‘গহন দত্তগুপ্ত’ ট্যাগ লাগিয়ে মাঠে নামিয়ে দে৷ ঝুড়ি ঝুড়ি ভূরি ভূরি প্রশংসা পাবি৷’ সে হাসে—‘তবে সেটা কবির নামের মাহাত্ম্য৷ কবিতার নয়৷’
—‘যারা আমার কবিতার সমালোচনা করছে তাদের কি আদৌ সে যোগ্যতা আছে শুঁটকি?’ গহন উত্তেজিত—‘এককথায় যে একটা কবিতাকে ‘ঝুলস্য ঝুল’ বলে দেয়—সে কতটা পড়াশোনা করেছে, আদৌ করেছে কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে৷ সে কি কবিতার সমালোচনা করার যোগ্য?’
—‘হয়তো যোগ্য, হয়তো নয়৷ তাতে কি এল গেল?’ বলতে বলতেই সে খিলখিল করে হেসে উঠেছে৷
—‘হাসছিস কেন?’
—‘তোর ইগো দেখে৷’ হাসতে হাসতেই বলল শুঁটকি—‘এত ইগো থাকলে ইগো ধুয়ে খা৷ ‘সমালোচনা চাই—সমালোচনা চাই’ বলে দেয়ালা করছিস কেন?’
—‘শুঁটকি!’
—‘শুনতে যতই খারাপ লাগুক, কথাটা সত্যি৷’ বোতলটাকে ট্যাকল করতে করতে সে বলে—‘যাঁরা বিজ্ঞ, বিশেষজ্ঞ এবং যোগ্যতম মানুষ—তাঁরা আদৌ কবিতার বই কিনে পড়েন না৷ এইসব অযোগ্য, নির্বোধ লোকগুলোই কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে ভিড় করে তোর কবিতার বই কেনে৷ এই লোকগুলোর জন্যই তোর ঘরে মোটা রয়্যালটি আসে৷ বই বেস্ট সেলার্সের লিস্টে জায়গা পায়৷ যাদের তুই সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় ভাবিস, সেই লোকগুলোই আসলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়৷ কবিতার টেকনিক্যাল চুলচেরা বিশ্লেষণ করে হাড়, মাংস, কঙ্কাল ঘেঁটে ঘেঁটে আঁতলেমি করার ক্ষমতা হয়তো তাদের নেই৷ কিন্তু অনুভব তারাই বেশি করে৷ টেকনিক্যাল নয়, কবিতার নিটোল সার্বিক আবেদনটাই তাদের কাছে বড়ো কথা৷’
ও প্রান্তে গহন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন৷ তাঁর নীরবতার কারণ বুঝতে পারল শুঁটকি৷ মুচকি হেসে বলে—‘তোর ধারণা ঠিক৷ আমিও আছি ওই আকাট মুখ্যু লোকগুলোর দলে৷ তোর কবিতাটাও পড়েছি৷ মাইরি বলছি, ‘ঝুলস্য ঝুল’ একদম পারফেক্ট বিশ্লেষণ৷’
কবির কণ্ঠস্বর সন্দিগ্ধ—‘কী নামে আছিস?’
—‘সেটা ক্রমশ প্রকাশ্য৷’
তিনি বিরক্তিতিক্ত কণ্ঠস্বরে বলেন—‘আর এখানে কবিতা দিতে ইচ্ছে করছে না৷ কে—কোথাকার একটা ‘রামহনু’ ফের এসে লিখে দিয়ে যাবে ‘ঝুলস্য ঝুল কবিতা’৷
—‘কেন লিখবে? ’রামহনু’র তোর সঙ্গে কোনো পার্সোনাল ক্ষার নেই৷ তাহলে সে খামোখা কথায় কথায় বাজে মন্তব্য করবে কেন? ভালো লিখলে ভালো কমেন্টই দেবে৷ অবশ্য সত্যিই যদি তুই ‘ঝুলস্য ঝুল’ লিখিস তাহলে আর কী করা!’
বোতলটাকে একটু দূরপাল্লার শট মারতেই সেটা ড্রেনে গিয়ে পড়ল৷ হতাশ হল শুঁটকি৷ যাঃ...এমন মজাদার খেলাটা ভেস্তে গেল!
—‘তুই কচি খোকাটি নোস৷ সমালোচনা, চ্যালেঞ্জ চেয়েছিলি, পেয়েছিস৷ যদি চ্যালেঞ্জটা নেওয়ার সাহস না থাকে তাহলে বৃথা কান্নাকাটি কেন?’
—‘কীসের চ্যালেঞ্জ?’
—‘‘নো ওয়ান’ থেকে ‘বেস্ট ওয়ান’ হওয়ার চ্যালেঞ্জ৷ ‘ঝুলস্য ঝুল’ থেকে ‘কুলস্য কুল’ হওয়ার চ্যালেঞ্জ৷ যেটা বৃহত্তর ক্ষেত্রে করেছিস, সেই লড়াইটাই একটা ছোটো জায়গায় করতে হবে৷’ সে হাসল—‘মাস্টার্সে ফার্স্ট-ক্লাস-ফার্স্ট পাওয়ার পর যদি মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে ভয় করে, তবে তুই কোথাকার ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট? আর কেনই-বা তুই গহন দত্তগুপ্ত? গঙ্গু তেলি আর তোর মধ্যে পার্থক্য কোথায়?’
বলতে বলতে এবার হঠাৎই বিরক্ত হয়ে বলল সে—‘শোন, আমি এখন রাস্তায় হাঁটছি৷ জব্বর হিসি পেয়েছে৷ আর চাপতে পারছি না৷ ছাড়ছি৷’
লাইনটা কেটে গেল৷ শুঁটকি একটু এদিক-ওদিক দেখে নেয়৷ আশপাশে কেউ নেই৷ রাস্তার পাশে একটা গাছের তলায় হালকা হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে পড়ল সে৷ লোকে দেখলে খিস্তি দেবে৷ পুলিশ দেখলে রুল উঁচিয়ে তাড়া করবে৷ কিন্তু অন্যায় কি করছে? গাছের গোড়ায় সামান্য ইউরিয়াই তো ঢালছে৷ তেমন হলে কালকে না হয় এখানে আরও একটা গাছের চারা লাগিয়ে যাবে৷
—‘অ্যাই শালা!’
পিছনে একটা বাইকের শব্দ৷ আর পরক্ষণেই একটা চাপা অথচ রূঢ় স্বর শুনে ঘাবড়ে গেল শুঁটকি৷ পুলিশে ধরল নাকি! এত রাত্রেও ব্যাটারা চরে বেড়াচ্ছে!
সে পিছনে তাকায়৷ পুলিশ নয়, দুটো ছেলে৷ মুখ কালোকাপড়ে বাঁধা৷ একটার হাতে উদ্যত ভোজালি৷ বিদ্যুতের মতো সামনে এসে তার গলায় ঠেকিয়ে বলল—‘একদম চিল্লামিল্লি নয়৷ লোচা করলেই এই চিকনি তোর গলা কাটবে! দামি জিনিস সঙ্গে যা যা আছে সব দে৷’
ও! পুলিশ নয়! বরং উলটোটাই৷ যাক তাহলে ভয়ের কিছু নেই৷ শুঁটকি বিনাবাক্যব্যয়ে ওয়ালেটটা এগিয়ে দিল৷ দ্বিতীয় ছেলেটা এবার এগিয়ে এসে সেটা কেড়ে নিয়েছে৷ আস্তে আস্তে হাতের ঘড়ি, সোনার আংটি, সোনার চেন, দামি মোবাইল সবই শান্তভাবে দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দিল সে৷ ছেলেদুটো বোধহয় এরকম ঝামেলাহীন শান্তিময় সহযোগিতা অপর পক্ষের কাছ থেকে আশা করেনি৷ যে ভোজালি ধরেছিল সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে অস্ত্রটা নামিয়ে নিয়েছে৷ দ্বিতীয় ছেলেটাও অবাক!
সমস্ত দামি দামি জিনিস হস্তান্তরিত করে এবার হঠাৎই শার্ট খুলতে শুরু করেছে সে৷
—‘আবে-শালা...কী করছিস...?’
ছেলেদুটো হতভম্ব! শুঁটকি শান্তভাবেই বলে—‘কেন? তোমরাই তো বললে দামি জিনিস সঙ্গে যা যা আছে সব দিতে৷’
বলতে বলতেই প্যান্টও খুলে ফেলেছে—‘সব দামি জিনিস তো দিতে পারব না৷ যেটুকু দিতে পারি দিলাম৷ নাও৷’
ছেলেদুটো তখনও স্তম্ভিত৷ তাদের অবস্থা দেখে করুণা হল তার৷ সে আকাশের দিকে তাকিয়েছে—‘যে স্বপ্নটা আমি একদিন রেখে যাব ভাবছি সেটাই সবচেয়ে দামি...সেটা তো দিতে পারব না ভাই৷ তার চেয়ে বরং আমার জুতোদুটো, গেঞ্জি আর আন্ডারওয়্যারটাও...৷’
—‘সানকি মাল!...পুরো সানকি!’
বলতে বলতেই প্রায় ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় মেরেছে ছেলেদুটো৷ বাইকে স্টার্ট দিতে দিতেই দেখল, পাগল লোকটা ইতিমধ্যেই জুতো আর গেঞ্জিও খুলে ফেলেছে!
—‘...শালা ফুলটু স্ক্রু ঢিলা...৷’
বাইকটা হুশ করে বেরিয়ে গেল৷ এমন করে তাড়াতাড়ি পালিয়ে গেল যেন একটা ভয়াবহ ডাইনোসর তাদের তাড়া করেছে৷
ফুটপাথবাসী দুটি বাচ্চার বাপ সেদিন মধ্যরাত্রে আচমকা ঠ্যালা খেয়ে ঘুম ভেঙে উঠে বসল৷ বিস্ময়মাখা দৃষ্টিতে দেখল একটা কালো সিড়িঙ্গে চেহারার লোক শুধু একটা আন্ডারওয়্যার পরে সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷ গায়ে বিলিতি মদের গন্ধ৷ সদ্য ঘুমভাঙা অবস্থায় এটা স্বপ্ন না বাস্তব বোঝার আগেই সে শুনতে পেল একটা কুণ্ঠিত স্বর৷ লোকটা সংকুচিতভাবে বলছে—
—‘তোমাদের পাশে একটু শোওয়ার জায়গা হবে ভাই?’
‘কবিতা ডট কম’ আজ সকাল থেকেই সরগরম! এককথায় বলতে গেলে রীতিমতো বাওয়াল শুরু হয়েছে এখানে! ঘটনাটা আর কিছুই নয়৷ মগনলাল নামের এক কবি ভয়াবহ একটা কবিতা পোস্ট করেছেন৷ আর সেটা—নিয়েই শুরু হয়েছে টানাহ্যাঁচড়া৷
কবিতাটা অনেকটা এইরকম—
পাহাড়ের মাথা থেকে
জংলি বাইসনের নিতম্ব বারান্দায়—মস্তিষ্কে বরফ প্রলেপ!
জরায়ু যখন হেঁটে বেড়ায়, তখন
নগ্নতার একশো কুড়ি ডেসিবেলকে ঘৃণা করি৷
যে যৌনরমণী ঘুমন্ত পুরুষের দণ্ডটি নেড়েচেড়ে
দেখেছিল, শান্তিনিকেতনে তার ভিতরের উষ্ণতারস পাইনি৷
এখন শুধুই আঙুলে টিপে মারি অসহ্য উকুন!
আর দিনগত পাপক্ষয়৷
এখানেই বিতর্ক ও চাপানউতোরের শুরু৷
থ্রেডের প্রথম কমেন্টটাই ‘ফ্রাস্টু কবি’র৷ সে লিখেছে—‘দাদা, আপনি মগনলাল না নগনলাল? কবিতাটা যে বুঝেছি তা বলতে পারছি না৷ কিন্তু কবিতা কাকে বলে তাও বেমালুম ভুলে গেছি৷’
ঠিক তারপরেই ‘আকাশনীলের’ ফোড়ন—‘হায় কবিতা কাহারে কয়?/সে কি শুধুই যৌনতাময়?’
‘মুমতাজ’ বেশ সরল সাদাসিধে মিষ্টি পাঠিকা৷ সে বেচারি বলেই ফেলেছিল—‘কবিতাটা ঠিক বুঝতে পারিনি৷ কেউ বুঝিয়ে দেবেন?’
তার উত্তরেই ‘কুবলাশ্ব’র বিস্ফোরক ভাবসম্প্রসারণ৷ সে বিশেষ অন্যায় কিছু করেনি৷ শুধু ‘মুমতাজ’কে কবিতাটা বুঝিয়ে বলেছে৷
অনেক ভেবেচিন্তে নিজের মতো করে যা মানে বের করেছে তা অনেকটা এইরকম—
কবি পাহাড়ের মাথায় থাকা একটি সমকামী বাইসনকে নিজের প্রেমিকারূপে কল্পনা করেছেন৷ সেই সমকামী বাইসনের নিতম্বকে বারান্দা ভেবে তিনি বোধহয় পায়চারি করতে গিয়েছিলেন৷ সেইজন্য বাইসনটা খেপে গেছে৷ তাই পাহাড়ি লোকেরা তার মাথায় বরফের প্রলেপ দিয়ে রেখেছে, যাতে মাথা ঠান্ডা থাকে এবং কাউকে গুঁতিয়েও না দিতে পারে৷
যেহেতু বাইসনটা সমকামী, সেহেতু তার জরায়ু থাকা-না-থাকা দুই-ই সমান৷ অগত্যা বিরক্ত হয়ে জরায়ুটা একা-একাই ইভনিং ওয়াকে বেরিয়েছে৷ বাইসনটা নগ্ন ছিল৷ স্বাভাবিক! তাকে জামাকাপড় বা মোজা কে পরাবে? সে নগ্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে একশো কুড়ি ডেসিবেলে গাঁ গাঁ করে জরায়ুকে ডাকছে৷ সেই ডাক কবির অসহ্য ঠেকছে৷
সেই চিৎকার শুনতে শুনতেই তিনি বাইসনটিকে প্রেমিকার মতো করে কল্পনা করেছেন৷ যে মেয়েটি কবি ঘুমিয়ে পড়লে তার দাদুর লাঠিটা নেড়েচেড়ে দেখত এবং ভাবত, সেটা দিয়ে বাড়ি মারলে কবির মাথার ভিতরের জিনিসপত্তর বাইরে আসবে কিনা! আর এইরকম গাঁক গাঁক করে চেঁচিয়ে বলত—‘আমি পেপসি খাব...পেপসি খাব৷’ একেই কোল্ডড্রিংক তার ওপর বরফের প্রলেপ! তাই তার ভেতরে উষ্ণতারস পাননি কবি৷ অগত্যা তিনি মাথার উকুন বেছে বেছে মারছেন৷ অর্থাৎ টাইম পাস করছেন, যার এক্সপ্রেশন শেষ লাইনটা—‘আর দিনগত পাপক্ষয়’৷
কবিতাটা ভয়ংকর নিঃসন্দেহে৷ কিন্তু তার ভাবসম্প্রসারণটা আরও ভয়াবহ৷ মন্দার অনুভব করল ‘কুবলাশ্ব’-কে সে মনে মনে পছন্দ করতে শুরু করেছে৷ লোকটার এলেম আছে৷ এই কবিতাটার এমন ভয়ংকর ব্যাখ্যা বোধহয় একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব!
বলাই বাহুল্য মগনলালের সেটা বিশেষ পছন্দ হয়নি৷ সে এতক্ষণ অন্যান্য পাঠক ও কবিদের মন্তব্য কোনোরকমে দাঁতে দাঁত চেপে হজম করছিল৷ কিন্তু এবার আর সহ্য হল না৷ সে চটে গিয়ে দশটা বেজে তিন মিনিটে মন্তব্য করল—‘আপনি আমাকে অপমান করছেন৷’
কুবলাশ্ব’র উত্তর দশটা বেজে চার মিনিটেই কম্পিউটার স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে—‘আপনি কবিতার অপমান করেছেন৷’
—‘মানে?’
—‘এরকম আপাদমস্তক হিজিবিজিকে আপনি কবিতা বলেন?’
—‘আমি যা-ই বলি৷ আমার কবিতার এরকম বিকৃত অর্থ করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? এ তো কবির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ! কবির অপমান!’
কুবলাশ্ব একটা বত্রিশপাটি বার করা স্মাইলি দিল৷
—‘আমি যদি বিকৃত অর্থ করে থাকি তবে আন্তরিক ক্ষমাপ্রার্থী৷ মুমতাজ কবিতার অর্থ জানতে চেয়েছেন৷ আপনি যদি স্বয়ং কবিতাটির অর্থ জানিয়ে দেন তবে বাধিত হই৷’
‘মগনলাল একটু থতোমতো খেয়ে গিয়ে উত্তর দেয়—‘কবিতার কোনো মানে হয় না৷ কবিতা বোঝার জিনিস নয়, বাজার জিনিস৷’
—‘সে আবার কী! কবিতা কি হারমোনিয়াম না—পাখোয়াজ, যে বাজবে! তা ছাড়া যখন লিখেছিলেন তখন নিশ্চয়ই কিছু ভেবে লিখেছেন৷ কী ভেবে লিখেছেন সেটাই অন্তত শুনি৷ ছাত্রবন্ধু লিখতে বলছি না৷ শুধু একটু ক্লু হলেই চলবে৷’
দিব্যি ‘ওয়ান-টু-ওয়ান’ তর্ক চলছিল৷ কিন্তু এর মধ্যে আবার স্বর্ণাভ গুপ্ত এসে টপকে পড়লেন৷ ইনি স্বনামেই লেখেন৷
বুকনির চোটে টেকাই যায় না৷ সামনা-সামনি কখনও না-দেখলেও স্বভাব- চরিত্র বুঝতে বাকি নেই মন্দারের৷ কথায় কথায় বাতেলা দেওয়াই তার স্বভাব৷ কিছু মানুষ আছে যারা ‘দেখ আমি কত জানি’ গোছের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে বেড়ায়৷ স্বর্ণাভ গুপ্ত তাদের মধ্যে অন্যতম৷
তিনি বোধহয় এতক্ষণ গোটা ব্যাপারটাই দেখছিলেন৷ এবার উড়ে এসে জুড়ে বসে গ্রাম্ভারি মন্তব্য করলেন—‘তার আগে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া যাক৷ কবিতা আসলে কার? কবির না পাঠকের?’
এরকম আলটপকা দার্শনিক মন্তব্যে ব্যোমকে গেল মন্দার৷ সে এতক্ষণ এই বিতর্কে কোনোভাবেই যোগদান করেনি৷ শুধু চুপ করে তামাশা দেখছিল৷ কোথাকার জল কোথায় গড়ায় সেটাই দ্রষ্টব্য৷
কুবলাশ্বও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়৷ তার সপাট উত্তর—‘কবিতা ততক্ষণ কবির, যতক্ষণ না সেটা পাঠকের দরবারে আসছে৷ মগনলাল যদি তাঁর কবিতাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে চালাতে চান, তবে খাতায় ভরে রাখলেই পারেন৷ অনলাইনে পোস্ট করার দরকার কী? যে মুহূর্তে ওটা পোস্ট হয়েছে, সেই মুহূর্তেই পাঠকও কবিতাটার সঙ্গে ইনভলভড হয়ে গেছে৷ এখন তাদের বক্তব্যও কবিকে শুনতে হবে বই-কি!’
—‘কাদের বক্তব্য? কোন পাঠকের? কবিতা অনুভবী ও শিক্ষিত পাঠকের জন্য৷ যারা কবিতার মানে জানতে চায় এমন লে-ম্যানদের জন্য নয়৷’
পুরোপুরি ‘বিলো দ্য বেল্ট’ আক্রমণ৷ এতক্ষণ কবিতাটা নিয়েই কথা চলছিল৷ এবার স্বর্ণাভ গুপ্ত তর্কটাকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে গেছেন৷ এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই৷ উনি প্রায়শই এরকম করে থাকেন৷ আসলে ভদ্রলোক কবিতার চেয়ে লবিবাজিটাই বেশি পছন্দ করেন৷
নিজের অজান্তে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে৷ কবিতার অন-লাইন সাইট হলেও এমন ভাবার কোনো কারণ নেই যে এখানে লবিবাজি নামক বস্তুটি অনুপস্থিত! বরং প্রিন্টেড মিডিয়ার থেকে এখানে খামচাখামচি আরও বেশি৷ প্রকাশ্য জগতে মানুষগুলোকে চোখে দেখা যায়৷ তাই চক্ষুলজ্জাও থাকে৷ এখানে সেসব বালাই নেই৷ ছদ্মনামের আড়ালে তাই চামচাগিরি, লবিবাজি, লেঙ্গি মারামারির প্রবল সুযোগ৷ যাঁরা প্রিন্টেড মিডিয়ায় বিশেষ কলকে-টলকে পান না, তাঁরাই এখানে বাঘ সেজে বসে থাকেন৷ আর সেইসব মহান দাদাদের গুণধর ভাই-বোনেরা পদলেহন শিল্পে কামসূত্রকেও টেক্কা দেয়৷
আর লবিরও কী রকমফের! প্রবীণ কবি—নবিশ কবি, মহিলা কবি—পুরুষ কবি, শিক্ষিত কবি—অশিক্ষিত কবি৷ দাড়িওয়ালা কবি—দাড়ি ছাড়া কবি, প্রেমিক কবি—ব্যর্থপ্রেমিক কবি...উফফ! কবির থেকেও বোধহয় লবির সংখ্যা বেশি!
সেক্ষেত্রে মগনলালের হয়ে স্বর্ণাভ গুপ্ত মাঠে নামবেন—এতে আর আশ্চর্যের কী আছে৷ মগনলাল স্বর্ণাভ-র খাস চামচা৷ পরস্পরের পিঠ চুলকানো আর সাবাশি দেওয়াই ওদের কাজ৷ মন্দার জানে এবার খেলা জমে যাবে৷ স্বর্ণাভ-র অ্যান্টিলবি আকাশনীলও ঢাল-তরোয়াল নিয়ে মাঠে নামল বলে৷ থ্রেডে পোস্টের সংখ্যা কয়েকশো ছাড়িয়ে যাবে৷ দিন গড়িয়ে রাত হয়ে যাবে৷ তবু মারপিট থামবে না৷ ‘আমি তোর থেকে বড়ো কবি ঢিসুম’ ‘আমি তোর থেকে বেশি শিক্ষিত কবি গুদুম’...এই চলবে৷
মন্দার এতকিছু ভাবতে ভাবতেই দেখল কুবলাশ্ব উত্তর দিয়ে দিয়েছে৷ পেজটা রিফ্রেশ করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল তার জোরালো জবাব—‘তাই নাকি? কিন্তু দাদা, কয়েকদিন আগেও তো আপনি এইসব লে-ম্যানদের জন্যই লিখেছেন৷ প্রশংসাও পেয়েছেন৷ ইনফ্যাক্ট, শঙ্খ ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতাও আমরা অল্পবিস্তর বুঝতে পারি৷ তাহলে উক্ত কবিরাও লে-ম্যানদের জন্যই কবিতা লিখেছেন! সেক্ষেত্রে কী প্রমাণিত হয়? হয় মগনলাল তাঁদের থেকেও বড়ো কবি! নয় আস্ত একটি গাম্বাট অপদার্থ!’
পুরো বাউন্সার! কুবলাশ্ব মেয়ে হলে বোধহয় তার প্রেমে পড়ত মন্দার৷ এই মুহূর্তে তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে ইচ্ছে করছিল৷ একদম উপযুক্ত জবাব দিয়েছে ব্যাটা৷ কিন্তু একা কতক্ষণ যুদ্ধ করবে? কয়েক মিনিটের মধ্যে স্বর্ণাভ-র লবির লোকেরা হুড়মুড় করে এসে পড়ল বলে৷ কতজনের সঙ্গে তর্ক করবে কুবলাশ্ব!
সে ভাবছিল কুবলাশ্বকে ব্যাক-আপ দেওয়ার জন্য ‘রামহনু’ হয়ে মাঠে নেমে পড়বে কিনা৷ কিন্তু তার আগেই বাধা পড়ল৷
আর্ট ডাইরেক্টর শাশ্বত মুখখানা পুরো ট্রাকের তলায় চাপা পড়া প্লাস্টিকের ঠোঙার মতো করে এসে বলল—‘তুই এখানে বসে খুটখুট করে ল্যাপটপে কবিতা মারাচ্ছিস! ওদিকে হারামি পেন্ডুলাম ষাঁড়ের মতো চেল্লাচ্ছে৷’
মন্দারের চোখের সামনে সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত একটা দৃশ্য ভেসে উঠল৷ একটা কালো বাইসন একশো কুড়ি ডেসিবেলে গাঁক গাঁক করে ডাকছে!
সে ল্যাপটপ অফ করে ব্যাগের মধ্যে ভরে রাখল৷ ওয়্যারলেস কানেকশনের মোডেমটাও যথাস্থানে চলে গেছে৷ ধীরেসুস্থে ব্যাগ গুছিয়ে বলে—‘চ্যাঁচাচ্ছে কেন? পুরো সিন তো কমপ্লিট করে দিয়েছি৷’
—‘গাঁড় মারা গেছে সিনের!’ শাশ্বত বিরক্ত—‘গোটা সিন ফের পালটাতে হবে৷ এক্ষুনি চল৷ শুয়োরের বাচ্চা কানের মাথা খেয়ে ফেলেছে৷ ওই তো বালের গপ্পো লেখে! তার কী রোয়াব!’
মন্দার লক্ষ করে দেখেছে, এখানে কেউ খিস্তি না দিয়ে কথা বলতে পারে না৷ এত খিস্তি দেওয়ার কি আছে! শালীন ভঙ্গিতে কথা বললে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়! গালাগালি খেয়ে এখানকার লোকেদেরও এমন অভ্যাস হয়েছে যে ভালো কথা ওদের পোষায় না৷ একবার এক স্পটবয়কে বলেছিল—‘ভাই, একটু চা হবে?’
তার পরিপ্রেক্ষিতেই স্পটবয়টির উত্তর—‘শান্তিনিকেতনি মাল নাকি!’
—‘আমাদের কি লাইফ বল৷’ শাশ্বত আপশোশের সঙ্গে বলে—‘শালা সব ঝাড়খন্ডি মাল৷ দিনরাত ঝাড় খেয়ে খণ্ড খণ্ড হয়ে মরছি৷ বাপের বড়ো মিষ্টির দোকান আছে শ্যামবাজারে৷ মাঝেমধ্যে ভাবি সব ছেড়েছুড়ে মিষ্টির দোকানেই বসি৷ এই ঢ্যামনাগুলোর খিস্তি খাওয়ার চেয়ে বরং বাপের ঝাড় হজম করা সহজ৷’
মন্দার তার কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে৷ তার বাবা আবার ব্যাংকের ম্যানেজার৷ মিষ্টি দোকানও নেই যে সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে দোকানে বসবে! অগত্যা ঝাড় খাওয়াই তার কপালে আছে৷
সেটের ভেতরে পেন্ডুলাম সত্যিই একটা খ্যাপা বাইসনের মতো ভোঁস ভোঁস করে যথারীতি ডাইনে-বাঁয়ে বেঁকতে বেঁকতে পায়চারি করছিল৷ দেখে মনে হল ওর নিতম্বে ও মস্তিষ্কে বরফ ঘষা দরকার৷ তাকে দেখেই এমন লাফিয়ে উঠল যেন পাছায় পিন ফুটেছে৷
—‘এই যে ক্যালানে কার্তিক!’ স্ক্রিপ্ট-এর গোছাটা তার দিকে প্রায় ছুড়ে দিয়েছে পান্ডাদা—এটা কী লিখেছিস শুয়োরের বাচ্চা? মাত্র একটা চুমু খেয়েই সেকেন্ড ভিলেন মরে যাবে৷ এটা স্ক্রিপ্ট না আমার শ্রাদ্ধ?’
পেন্ডুলামের পাশেই বসেছিলেন সিরিয়ালের ডিরেক্টর আশুদা৷ তিনি অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা মাথার মানুষ৷ সামান্য মাথা নেড়ে বললেন—‘মরার আগে অন্তত দু-মিনিটের ফুটেজ লাগবে৷ একটা চুমুতে দশ সেকেন্ডও কাটবে না৷ স্ক্রিপ্টে আরও একটা-দুটো সেক্সি সিকোয়েন্স নামিয়ে দে৷ অন্তত অল্পস্বল্প আদর-টাদর, অল্প ফস্টিনস্টি৷’
মন্দার আড়চোখে দেখল, সেটে সুইমিং কস্টিউম পরে ভিজে গায়ে টাওয়েল জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার স্বপ্নসুন্দরী উশ্রী৷ সেকেন্ড ভিলেন শুভাশিস সুইমিং পুলের পাশে পায়চারি করছে৷ সিকোয়েন্সটা বেশ উত্তেজক৷ সেকেন্ড ভিলেন নায়িকাকে এক্সপ্লয়েট করার প্ল্যান করে তাকে নিজের বাগানবাড়িতে এনেছে৷ কিন্তু নায়িকা আগেই সে প্ল্যানের কথা জেনে যায়৷ তাই সুইমিংপুলে নামার আগে কায়দা করে ভিলেনের মদের গ্লাসে বিষ মিশিয়ে দিয়েছে৷ তারপর নায়িকাকে জড়িয়ে ধরে একটা চুমু খেয়ে সে মরে যাবে৷
এই তো সিন! একেবারে জলের মতো সহজ৷ কিন্তু সেখানেও ঝামেলা৷ মরার আগে দু-মিনিটের ফুটেজ চাই!
সে পেন্ডুলামের দিকে তাকায়—‘কিন্তু পান্ডাদা দু-মিনিট কোথা দিয়ে আসবে?’
পেন্ডুলাম খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠল—‘সেটাও আমি বলব পাগলা...৷’ ফের একটা গালাগালি৷ মন্দারের কান-মাথা ধ্বক করে গরম হয়ে ওঠে৷ তবু সে শান্ত গলায় বলে—‘আরে, কি বিষ দিয়েছ সেটা তো আগে দেখবে! পটাশিয়াম সায়ানাইডের একটা আস্ত অ্যাম্পুল! আমি তো তবু চুমু খাইয়েছি! লোকে তো পটাশিয়াম সায়ানাইড জিভে ঠেকিয়ে খাবি খাওয়ারও সময় পায় না! সেখানে দু-তিনটে চুমু! ইম্পসিবল!’
—‘হোয়াট ইম্পসিবল!’ পেন্ডুলাম আরও জোরে চ্যাঁচাচ্ছে—‘তোকে কি ফরেনসিক সায়েন্সের ক্লাস নিতে বলা হয়েছে গান্ডু? আরও দু-মিনিটের ফুটেজ না হলে চলবে না, ব্যস!’
কী আশ্চর্য! পটাশিয়াম সায়ানাইডের একটা গোটা অ্যাম্পুল খাওয়ার পরও দু-মিনিট বাঁচতে হবে লোকটাকে! সেকেন্ড ভিলেন তো অগস্ত্য মুনি নয়, যে ইল্বল-বাতাপি-পটাশিয়াম সায়ানাইড, সব হজম করে মেরে দেবে!
কিন্তু সে কথা পেন্ডুলামকে কে বোঝাবে? সে প্রায় হিড়িম্বা নৃত্য করতে লেগেছে—‘বাস্তব-অবাস্তব বুঝি না! মেগা সিরিয়ালে বাস্তব বলে কিছু নেই৷ যদি বাস্তব কিছু থাকে তা হল ওই দু-মিনিটের ফুটেজ আর তিনটে চুমু৷ যদি পারিস তো করে দে৷ না পারিস তো কবি হয়ে পেছন মারা!’
শেষ কথাটা শুনে সেটের সকলেই কেমন তাচ্ছিল্যভরা হাসি হেসে উঠল৷ উশ্রীও কেমন গায়ে জ্বালা ধারানো হাসি হাসছে! রাগে-ক্ষোভে মন্দারের চোখে এই প্রথম জল এসে পড়ল৷ উশ্রী অমন ব্যঙ্গাত্মক হাসি হাসছে কেন? সে কি কবিতা পড়ে না? একজন কবি যে একজন স্ক্রিপ্ট-রাইটারের চেয়ে বেশি মর্যাদার পাত্র তা কি সে বোঝে না!
—‘আর শোন’, পান্ডা খরখরে গলায় যোগ করে—‘নায়িকার মাকে কিছুদিনের জন্য কাশী, গয়া বা হরিদ্বারে পাঠিয়ে দে৷ নেক্সট সিনে উশ্রীর মুখে ডায়লগ থাকবে—‘মা কয়েকদিনের জন্য হরিদ্বারে গেছে’—বুঝেছিস?’
মন্দার মাথা নীচু করে চোখের জল আড়াল করেছে৷ কোনোমতে মাথা নাড়ল৷
অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর জাভেদ একবার ক্ষীণ স্বরে প্রতিবাদ করে—‘তা কী করে হয় দাদা! তাহলে তো শুরুর এপিসোডগুলোর সঙ্গে কন্টিনিউইটি থাকছে না! শুরু থেকেই দেখানো হচ্ছে যে নায়িকার মা, আই মিন বৈজয়ন্তীদি দস্তুর মতো জাঁদরেল ও আধুনিকা৷ তিনি স্লিভলেস পিঠকাটা ব্লাউজ, শিফনের শাড়ি পরেন৷ বব কাট চুল৷ মদ, সিগারেট খান, পার্টিতে নাইট ক্লাবে যান৷ যিনি এমন আধুনিকা, তিনি কাশী, গয়া বা হরিদ্বারে মরতে যাবেন কেন?’
—‘কেন? মানুষের মনের কি পরিবর্তন হয় না?’ পেন্ডুলাম জাভেদকে এক রামধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছে—‘আর যদি পরিবর্তন না হয় তবে নায়িকার মায়ের রোলটা কি তুই করবি? বৈজয়ন্তীদির চিকুনগুনিয়া হয়েছে জানিস না? শুটিংয়ে আসবেন কী করে?’
পাশ থেকে কে একজন ফোড়ন কাটল—‘তবে অনির্দিষ্টকালের জন্য আন্দামানে পাঠিয়ে দাও না দাদা৷ এক্কেবারে দ্বীপান্তর৷’
সকলে আর-একবার গা জ্বালানো হাসি হেসে ওঠে৷ মন্দার মাথা নীচু করে ভাবছিল, কী নির্বোধ এরা! নির্বুদ্ধিতার কি শেষ নেই?
সে আস্তে আস্তে সেখান থেকে সরে এল৷ তার ভীষণ কান্না পাচ্ছে৷ উশ্রী এমন বোকার মতো হাসছে কেন? ওদের সঙ্গে থাকতে থাকতে কি সে-ও অনুভূতিহীন নির্বোধে পরিণত হয়েছে!
আর থাকতে পারল না মন্দার৷ স্টুডিয়োর টয়লেটে ঢুকে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল৷ এখানে কী করছে সে? কতগুলো নিম্নমেধার লোকের ভিড়ে তার অবস্থান কোথায়? তার কাজ কি শুধু এই গালিগালাজগুলো খেয়ে, পাতার-পর-পাতা অর্থহীন মেলোড্রামা লিখে যাওয়া! এই জন্যই জন্মেছিল মন্দার! এই করেই মরবে!
হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল বাবার বলা কঠিন শব্দগুলো—‘সাহিত্য পড়ে কোন রাজকার্যটা করবি? কবিতা লিখে কি পেট ভরবে! বাপের হোটেল চিরকাল খোলা থাকবে না চাঁদু! এটাই বাস্তব!’
সত্যিই কবি হয়ে পেট ভরানো যায় না৷ বিয়ে করা যায় না উশ্রীর মতন মেয়েকেও৷ সেইজন্যই তো এত কষ্ট সহ্য করেও এখানে টিকে আছে৷ আস্তে আস্তে পয়সা জমিয়ে দামি দামি গিফট দিয়েছে উশ্রীকে৷ কখনও জুয়েলারি, কখনও ফ্রেঞ্চ পারফিউম, কখনও বা দামি লেডিস হ্যান্ডব্যাগ৷ উশ্রী লাজুক মুখে সেগুলো নিয়ে ছুড়ে দিয়েছে মোহিনী হাসি৷ ওই হাসিটা দেখার জন্য বহুবার মরতে পারে সে!
আস্তে আস্তে মন্দার চোখের জল মুছে ফেলল৷ তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে৷ নাঃ, টিকে থাকতেই হবে৷ এগারোশো স্কোয়্যার ফিটের একটা ঝকঝকে ফ্ল্যাট, একটা গাড়ি, কিছু ব্যাংক ব্যালেন্স—আর উশ্রী৷ সবকটা পেতে হলে লেগে থাকতেই হবে৷
সে চোখমুখে জল দিয়ে এসে বসল চেয়ারে৷ এখন মনটা অনেকটা শান্ত৷ স্ক্রিপ্টের গোছাটা নিয়ে দু-তিনটে চুমুর সিকোয়েন্স আর গোটা কয়েক ডায়লগ বসাতে যাবে, এমন সময় একটা মেয়েলি গোলগাল হাত সামনে এসে পড়ল৷ হাতে ধরা একটা রুমাল৷
—‘ছেলেদের কাঁদলে ভালো লাগে না৷’ একটা মিষ্টি রিনরিনে স্বর বলে ওঠে—‘আপনার চোখে এখনও জল লেগে আছে৷ মুছে নিন৷’
মন্দার অবাক হয়ে পিছনে তাকায়৷ উশ্রীর বোন ঊর্মি ঠিক তার পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে৷ এই মেয়েটিকে রোজই দেখে৷ দিদির সঙ্গে শুটিংয়ে আসে৷ বোধহয় দিদিকে পাহারা দেয়৷ শুটিং চলাকালীন সবসময়ই গম্ভীর মুখে ল্যাপটপে খুটুর খুটুর করে কী যেন করে৷
কোনোদিন মেয়েটাকে ভালো করে দেখেনি৷ আজ দেখে মনে হল, ঊর্মি উশ্রীর বোন হতেই পারে না৷ দুই বোনের চেহারায় আকাশপাতাল তফাত৷ উশ্রী তন্বী, সুন্দরী৷ চোখে সবসময়ই দুষ্টুমি চিকমিক করছে৷ কালো কুচকুচে ঘন ভুরুর নানা বিভঙ্গে, লম্বা চুল ঝাপটে, ছেলেমানুষি হাবেভাবে পুরুষের বুকে ঝড় তোলে৷ নিজেকে কী করে মোহিনী সাজিয়ে তুলতে হয় তা সে জানে৷ সেইরকমই আউটফিট পরে৷
তুলনায় ঊর্মি বেশ খানিকটা মোটাসোটা৷ এমন ঢিলেঢালা একটা সালোয়ার সুট পরে আছে যে হাঁটলেই মনে হয় থলির ভেতরে বিড়াল লাফাচ্ছে৷ সম্পূর্ণ প্রসাধনহীন মুখ৷ শান্ত চোখ৷ একখানা দিদিমণি মার্কা চশমা নাকের ওপর৷ মোটা ফ্রেমের দৌলতে ভুরু দেখাই যায় না৷ আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার, সে সবসময়ই মাথায় একটা ওড়না পরে থাকে৷
—‘আমি কাঁদছি না৷’ মন্দার প্রতিবাদ করে—‘চোখে জলের ঝাপটা দিয়েছি৷’
উর্মি মুচকি হাসল৷ তারপর রুমালটা তার দিকে এগিয়ে দেয়৷ সে বুঝতে পারে এ মেয়ে একটু আলাদা৷ এর চোখে ধুলো দেওয়া মুশকিল৷
—‘কবিতা-টবিতা লেখা হয়?’
রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে থমকে গেল মন্দার৷
—‘আপনাকে কে বলল?’
—‘আমি একটু আগেই সেটের ভেতরে ছিলাম৷’
ওই একটা বাক্যেই সবকথা বলা হয়ে গেল৷ মন্দার মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়৷
—‘এখানে এসে একজন কবির দেখা পাব ভাবিনি৷’ ঊর্মির কণ্ঠস্বরে সম্ভ্রম ও সহানুভূতি৷
—‘কোথায় লেখেন?’
—‘বেশ কয়েকটা লিটল ম্যাগাজিনে৷’ ঊর্মির সঙ্গে কথা বলতে তার ভালো লাগছিল৷ এই মেয়েটা হয়তো কবিতার মর্ম বোঝে৷ অন্যদের মতো অনুভূতিহীন নয়৷ বরং বেশ সহূদয়৷ সে মৃদু স্বরে বলল—‘একটা ওয়েবসাইটেও লিখি৷’
—‘ওয়েবসাইট! ইন্টাররেস্টিং৷’ ঊর্মির চোখে কৌতূহল—‘কোন ওয়েবসাইট?’
—‘কবিতা ডট কম৷’ সে রুমালটা ফেরত দিয়ে বলল—‘ওখানে অবশ্য ছদ্মনামে কবিতা দিই৷’
—‘ছদ্মনাম৷ কীরকম?’
মন্দার এবার সামান্য হাসে—‘নামটা মোটেও শোনার মতো নয়৷’
—‘তবু শুনি৷’
সে ফিক করে হেসে ফেলেছে—‘রামহনু৷’
ঊর্মি কিছুক্ষণ তার দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে৷ বোধহয় ছদ্মনামটা শুনে হাঁ হয়ে গেছে৷ তারপর বিস্ময়ের ধাক্কাটা সামলে নিয়ে সে-ও হাসল৷ মুচকি হেসে বলল—‘মন্দ কি! বেশ তো৷’
—‘বুঝলেন কিনা, অ্যাঁ? মানুষের এমন শুষ্ক চোখ...৷’
গহন বোতল থেকে জল খাচ্ছিলেন৷ ‘শুষ্ক চোখ’ শব্দটা শুনেই একটা মোক্ষম বিষম খেয়েছেন৷
কণারও প্রচণ্ড হাসি পাচ্ছিল৷ স্বামীর করুণ অবস্থা দেখে মুচকি হেসে ‘শুষ্ক চোখে’-র সঠিক সংস্করণটি উচ্চারণ করলেন—‘সূক্ষ্ম চোখ’৷
—‘হ্যাঁ...ওই তো শুষ্ক চোখ! সবকিছুই খুঁচি খুঁচি করে দ্যাখে৷’
পতিদেব এবারও হাঁ করে তাকিয়ে আছেন দেখে কৃপা হল তাঁর৷ পরিমলবাবু বাংলাটা এরকমই বলেন৷ তাঁর উরুশ্চারণের একটু দোষ আছে৷ কোনোমতে ফিসফিস করে স্বামীর কানে কানে বললেন—‘খুঁচি খুঁচি মানে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে৷’
গহন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন৷ কণা দো-ভাষীর কাজটা চমৎকার করছেন৷ তিনি না থাকলে যে কী অবস্থা হত তাঁর! বোধহয় হাড়ি চণ্ডালের দশা হত! কৃতজ্ঞতাপূর্ণ চোখে কণার দিকে তাকালেন তিনি৷ কণাও কৌতুকমিশ্রিত সপ্রেম দৃষ্টিতে স্বামীর সাধুবাদ গ্রহণ করলেন৷
—‘বুঝলেন কিনা, অ্যাঁ? মেয়ের জন্য কয়েক সেট জরায়ু কিনেছি৷ বড়ো- ঘরে যাচ্ছে তো! যেমনি-তেমনি ভাবে মেয়ে তো পাঠাতে পারি না৷’ পরিমলবাবু হাসলেন—‘তার সঙ্গে পাত্রপক্ষের দাবি, দশ ভরি সোনা দিতে হবে...৷’
কবিবর ফের স্তম্ভিত! দশ ভরি সোনার ব্যাপারটা তবু বোঝা গেল, কিন্তু কয়েক সেট জরায়ু!
কণাই ফের উদ্ধারকর্তা হয়ে এগিয়ে এলেন—‘দশ ভরি সোনাই তো যথেষ্ট ছিল৷ তার সাথে আবার জড়োয়ার সেট কিনলেন কেন? এত খরচ করছেন পরিমলবাবু! ছোটো মেয়ের বিয়েও দিতে হবে৷’
ওঃ! জরায়ু মানে জড়োয়া! হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন গহন৷ ভাগ্যিস এই ভদ্রলোকের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হয় না! দেখা হলে বোধহয় মাতৃভাষাটুকু ভুলে যেতেন!
পরিমলবাবুর মুখে বিষণ্ণতার ছাপ পড়ে—‘কী করি বলুন দিদি! ভগবান আমাদের ঘরে পয়সা দেয় না৷ কিন্তু উৎপাত হাজারো! বউ-এর অম্ল, আমাদের ডাইবেটিস! আরও কত কী! অসুখের পিছনেই অর্ধেক ব্যাতন যায়৷’
—‘তবে?’
ভদ্রলোকের চোখ ছলছল করে ওঠে—‘মেয়েটা আমার বড় লক্ষ্মী দিদি৷ দেখতে শুনতে ভালো না ঠিকই৷ তবু বড়ো লক্ষ্মীমন্তর৷ কালো মেয়ের বাপ হওয়ার বড়ো যন্তনা৷ কিন্তুক এবারে সম্মন্ধটা খুব ভালো৷ ছেলে এঞ্জিনিয়ার— বাপের এট্টু দাবি-দাওয়া আছে, তবে ছেলে হিরের টুকরো৷ এমন সম্মন্ধ আমাদের ঘরে ভগবান দেয় না৷ তবে ললিতা মায়ের গান শুনেই ছেলে কাত৷ তাই ভাবি৷ ভগবান যুদি না—ও যদি লেখে—তবু ললিতার কপালে এ ছেলের নাম আমিই লিখব৷ তার জন্য ভিটেমাটি তো দূর, নিজের রক্ত, কিডনি বিক্কিরি করতে হয় তাই সই৷ কিন্তুক মেয়ের বিয়ে এই ছেলের সঙ্গেই দেব নিচ্চই৷’
বলতে বলতেই তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে—‘আর ছোটো মেয়েটা ফরসা-টরসা সোন্দর৷ আমি বেঁচে থাকলে ওরও গতি হবে৷’
গহন অবাক হয়ে পরিমলবাবুর দিকে তাকিয়ে ছিলেন৷ একজন মধ্যবিত্ত মানুষের কী অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস! ভাগ্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস একজন ছাপোষা কেরানিও রাখে!
—‘ললিতা ভারী সুন্দর গান গায়৷’ কণা হাসলেন—‘ওর গলাটাই একটা অ্যাসেট! যে গুণের কদর বোঝে তার কাছে রূপ তুচ্ছ জিনিস মাত্র৷’
—‘হ্যাঁ৷’ পরিমলবাবুর মুখ গর্বে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে—‘মা আমার রবীন্দসংগীত বড়ো ভালো গায়৷ আর উশ্চারণও খুব ভালো৷ রবীন্দসংগীতে উশ্চারণটাই আসল বেপার৷ বুঝলেন কিনা, অ্যাঁ?’
আরও কিছুক্ষণ পাড়ার সমস্ত খবরাখবর দিয়ে উঠলেন তিনি৷ কার মেয়ে কার সঙ্গে ‘পেম’ করছে, বাজারের ‘দর’ ভয়াবহ৷ কিছুই কেনার উপায় নেই! পাশের বাড়ির ‘নন্দীবাবুর’ চরিত্তির খারাপ—এইসব আর কী!
কণা গালে হাত দিয়ে অত্যন্ত মনোযোগী শ্রোতার মতো শুনছিলেন৷ গহনের বিরক্ত লাগছিল৷ এ তো মানুষ নয়—আস্ত ডেইলি গেজেট! পাড়ার কোথায় কি হচ্ছে—সব ঠোঁটস্থ! তিনি পরনিন্দা-পরচর্চা য় বিশেষ অভ্যস্ত নন৷ তাই ভাবছিলেন, কী অজুহাতে এখান থেকে পালানো যায়!
কিন্তু অত কষ্ট করতে হল না৷ একটু বাদেই গাত্রোত্থান করলেন পরিমলবাবু৷ বিয়ের কার্ড গহনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন—‘আসবেন দাদা৷ আপনারা এলে খুব খুশি হব৷ ললিতাও খুশি হবে৷ আপনারা হলেন মন্যিমান লোক! আপনাদের আশীববাদের দামই আলাদা—বুঝলেন কিনা, অ্যাঁ?’
বলতে বলতেই বিদায় নিলেন ভদ্রলোক৷ গহন স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন৷ যাক অবশেষে ‘ডেইলি গেজেট’ বন্ধ হল! কণা তাঁর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন—‘কী ভাবছ? বিয়েবাড়িতে যাবে না?’
—‘পাগল!’
—‘কেন? পাগলের কী আছে?’ তিনি বলেন—‘বাড়ি বয়ে এসে নেমন্তন্ন করে গেলেন ভদ্রলোক৷ না গেলে অভদ্রতা হবে৷ আমি তো যাবই৷ আমার সঙ্গে তুমিও যাবে কিনা সেটাই জানার বিষয়৷’
গহন বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকালেন—‘তুমি যাবে?’
—‘অফকোর্স৷ কতদিন বিয়ের নেমন্তন্ন খাওয়া হয়নি৷’ তাঁর মুখের হাসিটা তখনও মিলিয়ে যায়নি—‘তার ওপর শুনলাম স্টার্টারে তন্দুরি চিকেন থাকছে৷... সঙ্গে মাটন বিরিয়ানি৷ এরকম সুযোগ কেউ ছাড়ে!’
—‘ভদ্রলোক কি তোমাকে মেনুটাও বলে গেছেন?’
—‘সে কী!’ কণা চোখ কপালে তুলেছেন—‘একটু আগেই তো বললেন, শোনোনি? অবশ্য শুনবে কী করে? তুমি তখন ফ্যানের দিকে তাকিয়ে তোমার নতুন প্রেমিকার কথা ভাবছিলে৷’
কবি রাগত চোখে সহধর্মিণীর দিকে তাকিয়েছেন—‘আমার কোনো প্রেমিকা নেই৷’
—‘তাই বুঝি?’ কৌতুকে ভুরু নেচে উঠল কণার—‘তাহলে আজকাল অত কম্পিউটারে নাক গুঁজে কীসব করা হচ্ছে শুনি? সবসময়ই দেখছি মহাউৎসাহে কম্পিউটার অন করে খুটখাট টাইপ করা হচ্ছে৷ কী উৎসাহ কবিমশাইয়ের! দিন নেই, রাত নেই—সবসময় কম্পিউটারের সামনে আসীন৷ বুড়ো বয়সে অরকুট বা ফেসবুকে কোনো অষ্টাদশী প্রেমিকা জুটিয়েছ৷ তার সঙ্গেই চ্যাটপর্ব চলছে৷’ তাঁর মুখে দুষ্টু হাসি—‘হুঁ হুঁ বাবা...যতই লুকাও, ঠিক ধরে ফেলেছি!’
—‘কি ধরেছি দেখবে?’ গহন কণাকে হাত ধরে টেনে বিছানা থেকে নামিয়ে এনেছেন৷—‘চলো দেখাচ্ছি তোমায়৷ আমার প্রেমিকা কে, আর তার সঙ্গে কি চ্যাট করছি—সব দেখাব৷’
—‘অবশ্যই আমার দেখা উচিত৷’ কণা বিনা প্রতিবাদে পিছু পিছু চললেন— ‘আমার স্বামীর গার্লফ্রেন্ড বলে কথা৷ আমারও তো পছন্দ-অপছন্দ আছে৷ যার-তার হাতে তো তোমায় তুলে দিতে পারি না৷’
গহন ভ্রূকুটি করেছেন৷ কণা হাসতে হাসতেই ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বললেন—‘শশশশ...৷’
কম্পিউটারটা খোলাই ছিল৷ কবিতা ডট কমের থ্রেডটাও স্ক্রিনে ভাসছে৷ ‘একা মেঘ’ বলে জনৈক কবি লিখেছেন—‘ভাঙা চাঁদ৷’
কার্নিশে চড়ুইয়ের লাফালাফি
বিস্রস্তবসনার ঘামের বিন্দু ফোঁটায় ফোঁটায়...৷
নির্জনে নির্বাসিত একা লাইট হাউস৷
মেঘেরা মিজোরামে আজও কাঁদে৷
শূন্য কলশিতে ধরা বালিয়াড়ি
পুঁইমাচাটা অবিন্যস্ত৷
তার মধ্যেই ভেঙে গিয়েছিল আস্ত একাট চাঁদ...৷
খুঁজে পেয়েছি তার দু-এক টুকরো কোনখানে...৷
—‘একা মেঘটা কে? তোমার প্রেমিকা?’ কণা উৎসুক৷
গহন বিষণ্ণ মুখে বলেন—‘নাঃ৷ আমিই৷’
—‘তুমি!’ তিনি হাঁ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন স্বামীর দিকে—‘তুমি আবার কবিতা লিখছ! তাও ছদ্মনামে!’
তাঁর কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট উচ্ছ্বাস! সে উচ্ছ্বাসিত সুরের রেশ কেটে গেল গহনের বেসুরো জবাবে—‘লিখছি৷ কিন্তু আর লিখব বলে মনে হয় না৷’
—‘কেন?’
—‘কমেন্টগুলো পড়ে দেখো৷’
সর্বমোট পঁচিশটা কমেন্ট পড়েছে৷ কেউ লিখেছে—‘ধুত্তোর! ফের মাথার ওপর দিয়ে গেল!’ কেউ বলেছে—‘ঝুলস্য ঝুল৷’ কেউ বা আবার মন্তব্য করেছে—‘একই দিনে দুটো ঘেঁটে ঘ করার মতো কবিতা৷ কী চাপ!’
কণার সবচেয়ে মজাদার লাগল বিশেষ দুটো কমেন্ট৷ প্রথমটা রামহনুর৷ সে লিখেছে—‘ঠিক ব্যাপারটা বুঝলাম না৷ আমার মনে হল কবি কি কি সাবজেক্ট নিয়ে কবিতা লিখবেন তার লিস্টটাই আগে পোস্ট করেছেন৷ কবিতাগুলো বোধহয় পরে আসবে৷ কবিতার অপেক্ষায় রইলাম৷’ তার পাশেই দাঁত বের করে হাসার স্মাইলি৷
আর একটা জব্বর মন্তব্য দিয়েছে কুবলাশ্ব৷ তার বক্তব্য—‘একটু আগেই মগনলালের কবিতার থ্রেডে কুরুক্ষেত্র হয়ে গেছে৷ তাই বিশেষ কথা বাড়াতে চাই না৷ সম্ভবত এলিয়ট বলেছিলেন, যে কবিতার অর্ধেক বোঝা যায়, অর্ধেক যায় না—সেটাই আসল কবিতা৷ যেটা পুরোটাই বোঝা যায় না, সেটা বোধহয় কবিতার চেয়েও উচ্চমার্গের জিনিস৷ তুরীয় দশায় উত্তীর্ণ হওয়া ছাড়া বোঝার উপায় নেই দেখছি৷’
মুমতাজ নাম্নী একটি মেয়ে মৃদু প্রতিবাদ করেছে—‘অমন বোলো না৷ কবিতার শেষ দুটো লাইন আমার বেশ ভালো লেগেছে৷’
উত্তরে কুবলাশ্ব বলেছে—‘ভাই মুমতাজ, তোমার যদি শেষ দুটো লাইন ছাড়া বাকিটাও কবিতা মনে হয় তাহলে কিছু বলার নেই৷’
‘কেবিসিতে অমিতাভের নাচানাচি
ক্যাটরিনার আমসূত্রর ফোঁটায় ফোঁটায়
ফিলম থেকে নির্বাসিত একা রানি মুখার্জি
নিরূপা রায়েরা সিনেমায় আজও কাঁদে৷
শূন্য বাংলা ফিলমের ভাঁড়ে ধরা তামিলের মিক্সচার
ইমরান হাসমির দাড়ি অবিন্যস্ত...
আগেরটা যদি কবিতা হয়, তবে এটাও কবিতা৷’
কণা আর থাকতে পারলেন না, খিলখিল করে হেসে উঠলেন৷ গহন সবিস্ময়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে ব্যথিত কণ্ঠে বলেন, ‘তুমি হাসছ!’
‘হাসব না!’ তিনি হাসি থামাতেই পারছেন না—‘কুবলাশ্বর সেন্স অব হিউমারটা কী মারাত্মক দ্যাখো কী সুন্দর তোমার কবিতার প্যারোডি বানিয়েছে! হিঃ...হিঃ...হিঃ...!’
গহন কিছুক্ষণ বাচ্চা ছেলের মতো গোঁজ হয়ে থাকলেন৷ তারপর দ্রুত পায়ে সেখান থেকে চলে গেলেন৷
কণা বুঝলেন কবিবরের আঁতে ঘা লেগেছে! অমন মুখের ওপর হেসে ওঠাটা ঠিক হয়নি৷ ভুলটা বুঝতে পেরে সামান্য অনুতপ্তও হলেন৷ পরক্ষণেই অভদ্র হাসিটা ফের ‘অধিকার’ করে নিয়েছে তাঁকে৷ বেশ কিছুক্ষণ ফিক ফিক করে হাসার পর ক্রমশ শান্ত হলেন৷ এবার রঙ্গ-রসিকতাকে দূরে সরিয়ে রেখে কর্তব্যপালনের পালা! কবির অর্ধাঙ্গিনী হওয়া সহজ কথা নয়৷
আজও স্নিগ্ধ বৃষ্টি হচ্ছে৷ খুব জোরে নয়, বরং মাখনের মতো ঝিরঝিরে মোলায়েম বৃষ্টি৷ তার সঙ্গে মিঠে সোনালি রোদ্দুর কখনও লাজুক বউয়ের মতো মুখ দেখায়৷ আবার পরক্ষণেই পাতলা মেঘের ঘোমটা টেনে দেয়৷ যখনই রোদ্দুরের আভা বৃষ্টির ফোঁটার ওপর পড়ছে, তখনই বিন্দুগুলো সোনালি হয়ে উঠছে৷ ঠিক যেন গলন্ত সোনা৷
কণা ধীর পায়ে বেডরুমের দিকে গেলেন৷ মেজাজ খারাপ হলে গহন সচরাচর বিছানায় চুপ করে শুয়ে থাকেন৷ অথবা মিউজিক সিস্টেমে গান শোনেন৷
এখন অবশ্য তিনি গান শুনছিলেন না৷ বরং জানলাগুলো বন্ধ করে, অন্ধকার ঘরে শুয়েছিলেন৷ বৃষ্টি তার পছন্দ হচ্ছে না৷ ইদানীং বর্ষাকালের ওপরেও খাপ্পা হয়ে আছেন৷
কণা মনে মনে স্বীকার করলেন যে কবিদের মেজাজ-মর্জি বোঝা ভগবানেরও অসাধ্য৷
তিনি আস্তে অস্তে স্বামীর পাশে শুয়ে পড়েন৷ ঘন হয়ে আদুরে ভঙ্গিতে তাঁর বুকে মুখ গুঁজেছেন৷ অন্যান্য দিন গহন আলগোছে তাঁর মাথাটা জড়িয়ে ধরে, কপালে আলতো একটা চুমু এঁকে দেন৷ আজ একদম স্থির! নড়াচড়া নেই৷
—‘কী হল? রাগ নাকি?’ দু-হাতে তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলেন কণা—‘কার ওপর এত গোঁসা কবিবর!’
রাগ নয়, হতাশা চুঁইয়ে পড়ল গহনের কণ্ঠস্বরে—‘আমি আর কবি নই৷ আমি আর কবিতা লিখতে পারছি না কণা৷’
—‘কে বলল লিখতে পারছ না?’ তিনি সস্নেহে তাঁর মাথার চুলে বিলি কাটছেন—‘কবিতা যে লিখছ তা তো নিজের চোখেই দেখে এলাম৷’
—‘ধুস!’ অধৈর্য হয়ে মাথা ঝাঁকালেন গহন—‘কমেন্টগুলো তো নিজের চোখেই দেখলে৷ ত্রিশ বছর ধরে কবিতা লিখছি৷ কিন্তু শুঁটকির ভাষায় এমন ‘ঝাড়’ আগে কখনও খাইনি৷’
—‘হ্যাঁ৷ নিজের চোখে দেখেছি৷ তাতে কী?’ তাঁর শান্ত উত্তর৷
—‘তাতেই সব৷’
—‘সব নয় গহন৷ তুমি শুধু ঝাড়টাই দেখছ৷ কিন্তু ওরা যা বলেছে তা অবান্তর কিছু নয়৷’
—‘তার মানে?’ গহন উত্তেজিত—‘তার মানে তুমিও বলতে চাইছ আমি যা লিখেছি তার সবটাই ‘ঝুলস্য ঝুল’!’ কণা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন তাঁর দিকে৷
—‘কি দেখছ?’
—‘একটা সত্যি কথা বলবে?’
—‘কী?’
—‘কবিতাটা লেখার আগে ঠিক কি ভেবেছিলে? মানে কি ভেবে লিখেছিলে?’
কণার কথায় থতোমতো খেয়ে গেলেন তিনি৷ এতক্ষণ কথাটা ভেবে দেখেননি৷ কবিতার সমালোচনার ঝালেই গা জ্বলছিল৷ কিন্তু কবিতার উৎপত্তি নিয়ে বিন্দুমাত্রও ভাবেননি৷
—‘কিছুই ভাবোনি৷ তাই না?’ কণা নিজেই উত্তর দিয়ে দিয়েছেন—‘যা মাথায় এসেছে, সুন্দর সুন্দর শব্দ দিয়ে সাজিয়ে তাই বসিয়ে দিয়েছ৷’
গহন আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন—‘আই মাস্ট কনফেস৷ ঠিক তাই৷’
‘—এটাই তোমার প্রবলেম৷ না ভেবে, শুধু শব্দের জোরে, যা খুশি তাই লিখে পার পাওয়ার ক্ষমতা গহন দত্তগুপ্তর আছে৷ কিন্তু ‘একা মেঘের’ নেই৷ পাঠক অত বোকা নয়৷ তারা একটা বিরাট নামের সামনে বোকা সাজে বটে৷ কিন্তু আদতে অত নির্বোধও নয়৷ পঙক্তিগুলো সুন্দর হচ্ছে অথচ স্পর্শ করছে না৷ সেইজন্যই এই রি-অ্যাকশন৷’
—‘শুধু রি-অ্যাকশন নয়, রুড রি-অ্যাকশন!’
—‘স্বাভাবিক৷’ কণার হাতদুটো গহনের মুখ তাঁর বুকে চেপে ধরেছে৷ যেন মা সন্তানকে বুকে নিয়ে ভোলাচ্ছে৷
—‘তোমার মনে আছে গহন? একদিন তুমি পার্কস্ট্রিট থেকে আমার মোবাইলে ফোন করেছিলে৷ আমি স্নানে গিয়েছিলাম৷ কলারটিউনে ‘সখী ভাবনা কাহারে বলে, সখী যাতনা কাহারে বলে’ গানটা বাজছিল৷ টয়লেট থেকে বেরিয়ে যখন ফোনটা রিসিভ করলাম, তখন তোমার রি-অ্যাকশন কি ছিল মনে আছে?’ কণা ফিক করে হেসে ফেললেন৷ তারপর গহনের বাচনভঙ্গি নকল করে বলেন—‘তুমি বলেছিলে কি সব গান লাগিয়েছ! আমি এদিকে চাঁদিফাটা রোদে দাঁড়িয়ে গলগল করে ঘামছি—আর তোমার ফোনে বাজছে ‘সখী ভাবনা কাহারে বলে, সখী যাতনা কাহারে বলে, সখী ভালোবাসা কারে কয়?’ এই পরিস্থিতিতে এইসব দার্শনিক প্রশ্ন শুনতে ভালো লাগে?’
ঘটনাটা গহনেরও মনে পড়ে গেল৷ অবিকল এই কথাগুলোই বলেছিলেন তিনি৷ ভাবতেই হাসি পেয়ে গেছে তাঁর৷
—‘তোমার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হচ্ছে৷ চতুর্দিকে মানুষের এত সমস্যা, এত যন্ত্রণা, এত কষ্ট—অথচ কবিতায় তার কোনো ছাপই নেই! তোমার কবিতা নরম, আতুর, সুন্দর৷ কখনও ভাবের গভীরে ডুবে যাচ্ছে, কখনও দার্শনিকতার আকাশে উড়ছে৷ কিন্তু মাটিতে নেমে আসছে না৷’ কণা স্নিগ্ধস্বরে বলেন—‘যে লোকটা সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে, বসের খিঁচুনি খেয়ে, ট্রামে-বাসে ঝুলতে ঝুলতে বাড়ি ফিরছে, কিংবা যে ছেলেটি বা মেয়েটি বেকারত্বের জ্বালায় মরছে—তাদের কাছে ভাব, দার্শনিকতা বা সুন্দর শব্দ কোনোটাই আবেদন রাখে না৷ কারণ তুমি তো তাদের কথা কখনও বলোনি, তাদের যন্ত্রণাকে স্পর্শ করোনি৷’
গহন কণার বুকে মুখ ডুবিয়ে খুব মন দিয়ে কথাগুলো শুনছিলেন৷ তিনি জানেন কণা একদম ঠিক কথা বলছেন৷ এর চেয়ে চরম সত্য আর কিছু হতেই পারে না৷ তবু মনের কোথাও একটা যন্ত্রণা কাঁটার মতো বিঁধছিল৷
—‘কিন্তু কণা, আমি যে কঠিন শব্দ, কষ্টের কথা, যন্ত্রণার কথা বলতে পারি না৷’
—‘সে আবার কী কথা!’ কণা যেন শাসনের সুরে বলেন—‘কেন পারো না! তোমার কলম আছে, শব্দ আছে, অনুভূতি আছে, ক্ষমতাও আছে৷ তবে পারবে না কেন?
—‘হুঁ’৷
—‘হুঁ নয় হ্যাঁ৷’ তিনি বললেন—‘আজকে যে মানুষটি আমাদের নেমন্তন্ন করে গেলেন, সেই মানুষটি তোমাকে জ্ঞানীগুণী মানুষ বলে জানেন৷ কিন্তু তোমার কোনো কবিতা কখনও পড়েছেন কি? পড়েননি৷ তার কারণ এই নয় যে তুমি ইন্টেলেকচুয়ালদের জন্য লেখো৷ না পড়ার একমাত্র কারণ, কখনও তাঁর কথা লেখোনি তুমি৷ কবিতা মানেই তো দুর্বোধ্য জিনিস নয়৷ যা মানুষকে ভাবায়, অনুভূতিকে ধাক্কা মারে—তাই কবিতা৷ যার অনুভূতি আছে, আবেগ আছে সে-ই কবিতা পড়বার যোগ্য৷ সেই অনুভব থেকে ওকে বঞ্চিত করবে কেন? ওনার অপরাধ কী? উনি আঁতেল নন, সাংঘাতিক ডিগ্রি নেই এটাই কি অপরাধ?’
গহন চুপ করে থাকলেন৷ এ প্রশ্নের জবাব দেওয়া যায় না৷ সত্যি বলতে কি এর উত্তর তাঁর কাছে নেই৷ সবসময়ই ভেবে এসেছেন কবিতা শুধু শিক্ষিত পাঠকদের জন্য৷ যাদের কাব্যচর্চা করার অভ্যাস আছে তারাই একমাত্র পাঠক হওয়ার উপযুক্ত৷ কিন্তু আজ মগনলালের থ্রেডে, স্বর্ণাভ গুপ্তর এই একই কথার উত্তরে কুবলাশ্বর একটি পোস্ট তাঁকে ভাবাচ্ছে৷ কুবলাশ্ব লিখেছিল—‘কবিতা চর্চা করার অভ্যাস পুরো ভাঁটের কথা৷ মায়ের পেট থেকে পড়ে কেউই কাব্যচর্চা করতে শুরু করে না৷ আমাদের সকলের কবিতা চর্চা শুরু হয় ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ থেকে৷ তারপর একটু একটু করে বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সাথেই পরিচয় হয় মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, মোহিতলাল মজুমদারের সঙ্গে৷ তারপর জীবনানন্দ, সুকান্ত ভট্টাচার্যরাও এসে পড়েন৷ এই অবধি সব মানুষই অল্পবিস্তর পড়ে থাকেন৷ কারণ এরা আমাদের সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত৷ তার মধ্যে যারা একেবারে মাথামোটা, তাদের কথা বাদই দিলাম—কিন্তু যাদের অল্পবিস্তর সূক্ষ্ম অনুভূতি আছে, তারা এর রস্বাস্বাদনও করতে পারে৷ সুতরাং যাকে বেস বলে তা তাদের তৈরি হয়ে যায়৷ অতএব অল্পবিস্তর সব মানুষেরই কবিতা পড়ার অভ্যাস থাকে৷ তারা হয়তো কবিতার ল্যাজা মুড়ো, ছন্দ অলংকার নিয়ে মাথা ঘামায় না৷ কিন্তু অনুভব করার ক্ষমতা রাখে৷’
এর উত্তরে স্বর্ণাভ গুপ্তর তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গোক্তি—‘সেই অনুভব করার ক্ষমতা কি ইন্টেলেকচুয়াল কবিদের কবিতা বোঝার পক্ষে যথেষ্ট?’
কুবলাশ্বর ফের ঝাঁঝালো উত্তর—‘ইন্টেলেকচুয়াল কবি বলতে আপনি যদি নিজেকে ও মগনলালকে বোঝান—তবে অনুভব তো দূর, কোনোকিছুই যথেষ্ট নয়৷ কিন্তু যখন শঙ্খ ঘোষ বলেন, ‘আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক’ কিংবা শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলে ওঠেন—‘ভালোবাসা পেলে সব লন্ডভন্ড করে চলে যাবো’ অথবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হাহাকার করে বলেন—‘কেউ কথা রাখেনি’—তখন আমরা অনুভব করতে পারি৷ কবিতা তখন আমাদের বুকে ধাক্কা দেয়৷ কাঁদায় হাসায়! যখন উচ্চারিত হয় ‘কাল ছিল ডাল খালি/আজ ফুলে যায় ভরে/বল দেখি তুই মালি/হয় সে কেমন করে’ তখন বিস্মিত হই৷ আপনি কি বলেন? এগুলো কি কবিতা নয়? না কবিরা আপনার মতে যথেষ্ট ইন্টেলেকচুয়াল নন৷’
স্বর্ণাভ গুপ্ত এখানেই ক্ষান্ত দিয়েছিলেন৷ মডারেটর ব্যাসদেবও বিপদ বুঝে থ্রেডটাই ক্লোজ করে দিয়েছেন৷ কিন্তু গহনের মাথায় কথাগুলো তখন থেকেই ঘুরছিল৷ আর এই মুহূর্তেই কণা ঠিক ওই ভাষাতে না হলেও, মোটামুটি কাছাকাছি বক্তব্যই পেশ করেছেন৷
—‘কী ভাবছ?’
গহন কণার দিকে তাকিয়ে হাসলেন—‘ভাবছি এত কথা শিখলে কোথায়!’
—‘বা-রে!’ তিনি ঠোঁট ফুলিয়েছেন—‘আফটারঅল আমি কবিপত্নী৷ গহন দত্তগুপ্ত’র বউ বলে কথা! বুঝলেন কিনা, অ্যাঁ?’
গহন হেসে ওঠেন৷ আদর করে স্ত্রীয়ের স্ফুরিত অধরে চুমু এঁকে দিলেন—‘এটা তার পুরস্কার৷’
—‘পুরস্কার তো বুঝলাম! কিন্তু মাথায় কিছু ঢোকাতে পেরেছি কি?’
—‘মাথায় কি ঢুকিয়েছ তা একমাত্র গহন দত্তগুপ্তর বউয়ের স্বামী ছাড়া কেউ বুঝবে না৷’ তিনি কণার কোমর ধরে টেনে তুলে এনেছেন বুকের ওপর৷
—‘এসো৷ দেখি, আমার নদীটা কেমন আছে৷’
কণা গহনের বুকে আলতো করে কিল মারলেন৷ লাজুক হেসে বললেন, ‘অসভ্য!’
—‘থ্যাঙ্কস ফর দ্য কমপ্লিমেন্ট৷’
—‘আচ্ছা, একটা কথা বলবে?’
কণার চুল আদরে এলোমেলো করে দিতে দিতে বললেন গহন—‘বলো৷’
—‘তুমি রোমান্টিক কবিতা ছাড়া অন্য কিছু লেখো না কেন? বাস্তবকে এত ভয় কীসের?’
তিনি কণাকে ঘনভাবে জড়িয়ে ধরেছেন৷ তাঁর মনে অদ্ভুত একটা ক্ষোভ গুমরে মরছিল৷ তবু একটা মৃদু হাসি দিয়ে ক্ষোভ ঢাকলেন৷ বললেন—‘এসো৷ একটু ভালোবাসি৷’
কণা বুঝলেন যে প্রসঙ্গটা গহন এড়িয়ে গেলেন৷ গহনও বুঝলেন যে কণা বুঝেছেন৷ তবু যে কথাটা স্পষ্ট করে বলতে পারলেন না সেটাই যেন উচ্চারিত হল তাঁর দীর্ঘশ্বাসে৷
—‘বাস্তবকে ভয় পাই না কণা৷ বাস্তব যে আঘাত ছাড়া আর কিছু দেয় না, তা তোমায় কী করে বোঝাই৷’
ঘড়িতে বারোটার ঘণ্টা পড়ল!
সারাদিন ধরে নম্র হওয়ার দরুন এখন পরিবেশ ঠান্ডা৷ এই মুহূর্তে বৃষ্টি নেই৷ তবে একটা জোলো হাওয়া থেকে থেকেই হুহু করে এসে আছড়ে পড়ছে৷ আকাশে একটা-দুটো পাতলা মেঘের স্তর খামখেয়ালিভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল৷ তার মধ্যে দিয়েই শলমাজরির মতো নক্ষত্ররা কৌতুকে চোখ টিপছে৷
রাতের অন্ধকার মেখে ছাতে পায়চারি করে বেড়াচ্ছিলেন গহন৷ ছায়া ছায়া জ্যোৎস্না মাখা প্রেক্ষাপটে তাঁকে অতৃপ্ত আত্মার মতো মনে হয়৷ গন্ধরাজের মিষ্টি গন্ধ মাঝেমধ্যেই নাকে আসছে৷ কণা ছাতের টবে গন্ধরাজ লাগিয়েছেন৷ তার পাশে লংকা গাছের সহাবস্থান৷ গন্ধরাজের সঙ্গে লংকা গাছের বুনো গন্ধও পাচ্ছেন গহন৷
তিনি অন্যমনস্ক ভাবে হাত বাড়িয়ে দেন গাছটার দিকে৷ ঠান্ডা ভিজে, ঈষৎ স্যাঁতস্যাঁতে পাতাগুলো তাঁর স্পর্শে খসখস করে উঠল৷ যেন সামান্য উষ্ণতা পেয়ে উল্লসিত হয়ে উঠেছে৷
গহন পরম স্নেহে হাত বাড়িয়ে দেন গাছগুলোর গায়ে৷ নিজেদের কোনো সন্তান তো আর হল না৷ এরাই কণার সন্তান৷ কণা এদের স্নেহে, যত্নে বড়ো করে তুলেছেন৷ যখন প্রথম এ বাড়িতে এসেছিল তখন ছোট্ট ছোট্ট চারা ছিল৷ এখন বড়ো হয়েছে৷
গাছগুলোও যেন বুঝতে পারে তাদের ভীষণ আপন কেউ এসেছে৷ স্পর্শে ঝুঁকে পড়ে অভিবাদন জানায়৷ লংকা গাছটা লংকার ভারে বিধ্বস্ত৷ তবু গহনের হাত স্পর্শ করে যেন বলছে—‘দ্যাখো...আমি তোমাদের উপহার দেওয়ার জন্য প্রস্তুত৷ এই নাও আমার ফুল...এই নাও ফল...৷ স্পর্শ করো...অনুভব করো...৷’
স্পর্শে যে কী আনন্দ তা আজ টের পেলেন গহন৷ অন্ধকারে ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না৷ তবু গাছটার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সব বুঝতে পারছেন! কোনটা পাতা! কোনটা ফুল! কোনটা ফল—সব অনুভব করছেন৷
তাঁর আনন্দ যেন প্রকৃতির গায়েও ছড়িয়ে পড়ল৷ টুপ টুপ করে নিঃশব্দেই কয়েক ফোঁটা জল পড়ল তাঁর গায়ে৷ স্বাতী নক্ষত্রের জল নাকি! হাওয়া হুহু করে বয়ে গেল তাঁকে ছুঁয়ে৷ বাড়ির সামনের বড়ো আমগাছটার ডালপালা এসে পড়েছে ছাতে৷ হাওয়ার দমকে তার পাতায় পাতায় মর্মরধ্বনি৷ বাড়ির পিছনে অন্ধ গলিতে জোনাকির ভিড়৷ স্পষ্ট ও জোরালো আলোয় গ্রিন সিগন্যাল দিচ্ছে৷ রাস্তায় ভিখিরি আর কুকুরের দ্বন্দ্বযুদ্ধের আওয়াজ! তার মাঝখানেই রাতজাগা প্রহরীর লাঠির ঠুকঠুক, হুইসেল এবং চিৎকার—‘জাগতে রহো— ও-ও-ও-ও!’
সব মিলিয়ে আজ যেন পৃথিবী জীবন্ত হয়ে উঠে বলছে, ‘দ্যাখো...চোখ মেলে দ্যাখ্যো...কান্না দ্যাখ্যো...বেদনা-যন্ত্রণা-লজ্জা সব দ্যাখো৷ স্পর্শ করো... অন্ধের মতো নয়, দার্শনিকের মতো নয়, মরমি মানুষের মতো স্পর্শ করো...৷’
গহন দু-চোখ ভরে দেখলেন রাতের পৃথিবীকে৷ ছাত থেকে গোটা পাড়ার দৃশ্যই স্পষ্ট দেখা যায়৷ এতদিন আকাশের সৌন্দর্য দেখেছেন৷ এবার মাটির দিকে তাকালেন৷
গহনের পাশের বাড়িতে তখনও আলো জ্বলছে৷ জানলা খোলা৷ কণার কাছে শুনেছেন, এ বাড়ির ছেলেটা রোজ রাতে মদ খেয়ে বাড়ি ফেরে৷ কাউকে হাতের কাছে না পেয়ে অসহায় বউটাকেই বেদম পেটায়৷ মাঝেমধ্যেই প্রবল চিৎকারও কানে আসে৷ নিতান্তই পি.এন.পি.সি. ভেবে পাত্তা দেননি৷ তা ছাড়া বিষয়টা তাঁর কাছে বিরক্তিকর ঠেকেছে৷
কিন্তু আজ স্বচক্ষেই দেখতে হল দৃশ্যটা৷ তিনি শিউরে উঠেছেন৷ এ কী মানুষ! না না জানোয়ার! বেদম মারতে মারতেই ছেলেটা ঝাঁপিয়ে পড়েছে মেয়েটির ওপর৷ জোর করে ছিঁড়ে ফেলেছে তার ব্লাউজটা! শাড়ি অবিন্যস্ত৷ খাটটা যেন ভয় পেয়ে প্রবল নড়ে উঠল! পৈশাচিক দৃ,শ্য দেখে সে-ও নিজে কেঁপে কেঁপে উঠছে৷ মানবিক নয়, জান্তব রিরংসা৷ পাশবিক মৈথুন!
গহন চোখ সরিয়ে নিলেন সেদিক থেকে৷ বুকের ভেতরে অসহ্য একটা অন্ধ রাগ, ক্ষোভ দানা বাঁধছিল৷ দাঁতে দাঁত চেপে বললেন—‘স্কাউনড্রেল৷’
ছাতের উলটোদিকে বস্তির দৃশ্য! এখান থেকে খানিকটা দূরেই বস্তি অঞ্চল৷ দু-একটা ঘরে তখনও আলোর আভা৷ বেশ খানিকটা কালো ধোঁয়া উড়ে উড়ে ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে৷ এত রাতে কারুর বাড়িতে হাঁড়ি চড়েছে৷ যখন সমস্ত মানুষ পেট ঠেসে খেয়ে স্বপ্নের দেশে পাড়ি দিচ্ছে, তখন হয়তো দুটো ভাতের জন্য লালায়িত হয়ে বসে আছে কেউ!
বস্তির কালো ধোঁয়া যেন উজ্জ্বল চাঁদকে ম্লান করে দেয়৷ গহন আকাশের দিকে তাকালেন না৷ আর ভালো লাগল না৷ বুকের ভেতরে একটা অব্যক্ত কষ্ট৷ ভীষণ অসহায় লাগছে নিজেকে৷ তিনি ফের চোখ ফিরিয়েছেন পাশের বাড়ির জানলায়৷ আলো নিভে গেছে৷ কিন্তু ল্যাম্পপোস্টের আলো নিষ্প্রভ বেদনার মতো পিছলে পড়েছে জানালার ওপরে৷ সেই ক্ষীণ আলোয় দেখতে পেলেন মেয়েটি জানলার গরাদে মুখ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ তার দু-চোখে নিষ্প্রাণ শূন্য দৃষ্টি! পাথরের মূর্তির মতো নিষ্প্রাণ৷ ভঙ্গি দেখে মনে হয়, বোধ হয় সে বেঁচে নেই!
অত ক্ষীণ আলোতেও বুঝতে অসুবিধে হল না, তার কপালে, গালে কালশিটে! চুলের ফাঁকে, ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ রক্তরেখা, গলায় সিগারেটের ছ্যাঁকার দাগ!
গহন দেখলেন মেয়েটির স্থির চোখ বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ছে৷ ল্যাম্পপোস্টের আলো পড়ে ঝিকিয়ে উঠল অশ্রুবিন্দুরা! মনে হল যেন বলছে—‘দ্যাখো আমায়...স্পর্শ করো...চোখের জল স্পর্শ করো...অনুভব করো কালশিটের ব্যথা...স্পর্শ করো...৷’
গহনের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে৷ কিন্তু মেয়েটির দিকে তাকাতে অস্বস্তি বোধ করছেন৷ তার চোখে চোখ রাখার সাহস পাচ্ছেন না৷ দৃ,শ্যটা সহ্য হচ্ছে না৷ তাই আস্তে আস্তে তার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে, ছাত থেকে চুপিসারে নেমে গেলেন গহন৷ একরকম পালিয়েই গেলেন৷ সাধে কি শুঁটকি তাঁকে বলে—এসকেপিস্ট!
‘চালচুলো নেই তার, নেই তার চেনা বা অচেনা
আদমসুমারি হলে তার মাথা কেউ গুনবে না৷
তার ভোট চাইবে না গণতান্ত্রিক কোনো প্রার্থী৷
সরকারের দরকার নেই, তাই নিজের সুড়ঙ্গে—
পাগল,...পাগল, সাপলুডো খেলছে বিধাতার সঙ্গে৷’
ফ্ল্যাটের ঘরটা অন্ধকার! অদ্ভুত আলোহীন বিবরের মতো৷ হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় এ ঘরে বোধ হয় আলো ঢোকে না৷ ঢোকেনি কখনও! প্রাচীন সুড়ঙ্গের অন্দরে যেমন নির্নিমেষ রাত্রি ছড়িয়ে থাকে, ঠিক তেমনই অন্ধকার তার স্থায়িত্ব কায়েম রেখেছে এখানে৷
ঘরে প্রধান শব্দ বলতে শুধু কবীর সুমনের গান৷ এ ছাড়াও খুঁটিনাটি দু-একটা ক্ষীণ শব্দ মাঝমধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে৷ কখনও-বা সেটা ঘড়ির কাঁটার টিকটিক৷ কখনও বাথরুমের কলে জলের টুপটাপ৷ আবার কখনও বা দেশলাই জ্বালানোর আওয়াজ৷ ঘন অন্ধকারের মধ্যেও সিগারেটের আগুনে মুখটা তীব্র ধকধকে আলো নিয়ে জ্বলছিল;
—‘জগতে যা কিছু আছে, কিছু নেই তার অনুষঙ্গে
পাগল...পাগল...সাপলুডো খেলছে বিধাতার সঙ্গে...৷’
গানটা শেষ হয়ে যেতেই আরেকটা নতুন শব্দ যোগ হল৷ তরলে বরফ পড়ার ছলাৎ আওয়াজ৷ তার পেছন পেছন একটা কণ্ঠস্বর—
কোনো উত্তর নেই৷
—‘কথা বলবে না? রাগ করেছ?’
এবারও কোনো উত্তর এল না৷ শুধু রকিং চেয়ারটা যেন একটু দুলে উঠল৷
রকিং চেয়ারটার ঠিক সামনের ডিভানটাতে বসেছিল শুঁটকি৷ বিকেল থেকেই প্রচুর মদ খেয়েছে সে৷ কথা বেশ অস্পষ্ট৷ জড়িয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে৷
—‘আজ একটু বেশি খেয়ে ফেলেছি৷ মাফ করে দাও৷’
চেয়ারটা আর একটু নড়ল৷ শুঁটকির মনে হল চেয়ারে বসা নারীমূর্তির মুখ বিষণ্ণ৷
—‘সরি রুমা৷’ সে অপরাধীর মতো মাথা নীচু করেছে—‘জানি আমি ভীষণ খারাপ৷ মদ খাওয়ার অভ্যেসটা ছাড়তেই পারি৷ কিন্তু ছেড়ে দিলে তুমি তো আর বারণ করতে আসবে না৷’
এবারও অন্যপক্ষ নিশ্চুপ! তার এই মৌনতার পিছনে রাগ লুকিয়ে না দুঃখ—তা বোঝা মুশকিল৷
‘বুবাই কেমন আছে? বড়ো হয়েছে?’ শুঁটকি উৎসাহভরে জানতে চায়—‘এখন কি বাবা বলে ডাকতে পারি? ওকে তুমি আমার কথা বলেছ?’
টুপ টুপ করে শুধু কোথায় যেন জল পড়ে যায়৷ আর কোনো শব্দ নেই৷
‘বলোনি তাই না?’ সে যেন একটু হতাশ হল—‘আচ্ছা, পরে বলে দিয়ো৷ বোলো ওর বাবা খুব দুষ্টু৷ মাকে খুব ব্যথা দিয়েছিল৷ তাই মা তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে৷ কিন্তু বাবার ওকে দেখতে ইচ্ছে করে৷ খুব আদর করতে ইচ্ছে করে৷ ওর জন্য বাবা একটা ঘর সাজিয়ে রেখেছে৷’ তার কণ্ঠস্বর ফের উৎসাহিত হয়ে ওঠে—‘গোলাপি রঙের দেয়াল, জানলায় মিকি মাউসের ছবিওয়ালা পর্দা৷ নরম গদির ছোট্ট একটা ধবধবে বিছানা৷...হ্যাঁ তার দু-দিকে রেলিংও লাগিয়ে দিয়েছি রুমা৷ বুবাই পড়ে যাবে না৷ একটা দোলনাও আছে৷ আর আছে অ-নে-ক পুতুল৷ টেডি বিয়ার, বাঘ, সিংহ, বেন-টেন না কি যেন—অনেক খেলনা৷’
বলতে বলতেই চুপ করে গেল শুঁটকি৷ কুণ্ঠাভরা কাতর গলায় বলে—‘ও কি একবার বাবার কাছে আসবে? আমি শুধু একবার ওকে দেখব৷ কথা দিচ্ছি, সেদিন একটুও মদ খাব না৷ বাজে খিস্তি দেব না৷ তুমি বলতে যে বাচ্চাদের সামনে খিস্তি দিতে নেই! বুবাই এলে শুধু ভালো ভালো কথাই বলব৷ অনেক বেলুন কিনে আনব ওর জন্য৷ আমরা দুজনে শুধু খেলব৷ তোমার কোনো ব্যাপারে আর কোনোদিন জোর করব না৷ একটুও জ্বালাব না রুমা...৷’ তার কথায় তীব্র আকুতি—‘ওকে শুধু একবার নিয়ে এসো...আনবে না?’
এমন প্রার্থনায় বোধহয় ঈশ্বরের মনও দ্রবীভূত হয়৷ কিন্তু ওপ্রান্তের মানুষটা এবারও কোনো কথা বলল না৷ শান্ত নীরবতায় ভরে আছে গোটা ঘর৷ হাস্নুহানার মিষ্টি গন্ধ আচ্ছন্ন করে রেখেছে আবেশে৷ রুমা এলেই এই গন্ধটা পায় শুঁটকি৷ সে জানে রুমার গা থেকেই গন্ধটা আসে৷
বেশ খানিকক্ষণ নীরবতা৷ সে চুপ করে উত্তরের প্রতীক্ষা করছে৷ ওপ্রান্তের মানুষটি এখনও নীরব৷ বুকের ভেতরে দীর্ঘশ্বাসটা কোনোমতে চাপল শুঁটকি৷ তার মধ্যে হতাশা ক্রমাগতই গুমরে মরছিল৷ এখনও কি ক্ষমা পাওয়া যাবে না? আজও কি ক্ষমা করবে না রুমা? সে তো কোনোদিন রুমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি! কোনোদিন গায়ে হাত তোলেনি! তুলবেই বা কেন! সে যে রুমাকে ভীষণ ভালোবাসত৷ আজও বাসে৷ শুধু একটা দিনের ভুল...মুহূর্তের ভুল৷ ক্ষণিকের মতিভ্রম...৷
হঠাৎই মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল৷ রিংটোনে একটা বাচ্চা খিলখিলিয়ে হাসছে৷ শুঁটকি একটু বিরক্ত হয়েই ফোনটা তুলে নেয়৷ গহনের ফোন! এই রাত দুটোর সময় তার আবার কী হল!
—‘সরি রুমা৷’ সে অনুতপ্ত স্বরে ক্ষমা প্রার্থনা করে—‘গহন ফোন করেছে৷ গহনকে তো চেনো তুমি৷ ফোন না তুললে হারামজাদা অভিমান করে বসে থাকবে৷ তুমি একটু বোসো,...আমি ওর সঙ্গে কথা বলেই আসছি৷’
ফোনটা হাতে নিয়ে বারান্দায় চলে এল শুঁটকি৷ কলটা রিসিভ করেই বলল—‘রামছাগল কোথাকার...এত রাত্রে ফের নাকে কান্না জুড়েছিস! ঝাড় সহ্য না হলে লেখা বন্ধ করে দে৷ মগজমারি খতম৷ আমায় জ্বালাচ্ছিস কেন?’
গহনের কণ্ঠস্বরটা আজ অন্যরকম শোনাল—‘না শুঁটকি, আমি লিখব৷’
শুঁটকি হাসে—‘ঝাড় সহ্য করেও লিখবি! বাঃ৷ এবার আর পালাবি না! বাঘ! বাঘ! গহন দত্তগুপ্ত আর পালাবে না! গ্রেট!’
—‘না!’ গহন দত্তগুপ্ত নয়, গহন শান্তভাবে বলেন—‘গহন দত্তগুপ্ত-ই হচ্ছে সব নষ্টের গোড়া৷ আমি বুঝতে পারছিলাম যে সমালোচনা প্রয়োজন, অথচ সমালোচনা সহ্য করতে পারছিলাম না৷ এই দ্বিচারিতার কারণ ওই গহন দত্তগুপ্ত নামটাই৷ ওই নামটা তার ইগোর পাহাড় নিয়ে বারবার বাধা দিচ্ছিল৷ এখন আমি আর গহন দত্তগুপ্ত-ই নই৷ কল মি একা মেঘ৷’
‘বাঃ৷’ সে হেসে উঠল—‘তবে আজ তোর নবজন্ম হল৷’
—‘বলতে পারিস৷ অথবা নিউ জার্নিও বলা যায়৷’
—‘যাই হোক৷’ শুঁটকি আন্তরিক স্বরে বলে—‘শেষ পর্যন্ত তুই জিতবিই৷’
—‘তোর মুখে ফুল-চন্দন পড়ুক৷’
—‘ইয়ে...তার সঙ্গে একটু তুলসীপাতা, একটু এসেন্স, একটা খাটিয়া, আর এক-প্যাকেট ধূপও৷ বুঝতেই পারছিস, খরচ বেঁচে যায়৷’
গহন বিরক্ত হলেন—‘এই রাত দুটোর সময় ফের আজেবাজে কথা শুরু করেছিস!’
—‘কেন? রাত দুটোর সময় তুই জন্মাতে পারিস, আর আমি মরার কথা ভাবতে পারি না?’ সে বলে—‘এমনিতেও আমাদের মরাটা কোনো ইস্যু নয়৷ চোখ বুজলে চশমার দোকানের কাস্টমারগুলো হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে৷ বড়োজোর মদের দোকানের মালিকগুলো একফোঁটা-দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলতে পারে৷ একটা ভালো খদ্দের কমে গেল কিনা৷’
—‘আমাকে বাদ দিয়ে গেলি!’
—‘তুই!’ শুঁটকি হা হা করে হেসে ওঠে—‘শালা, তোকে আমি চিনি না! তুই মহা হারামি মাল! আমি মলে একটুও কাঁদবি না৷ বরং খাতাপেন নিয়ে কবিতা লিখতে বসবি৷’
গহন ব্যথিত কণ্ঠে বললেন—‘এতদিনে তুই আমায় এই চিনলি!’
—‘খামোখা সেন্টু দিস না খুড়ো৷ তোকে আমি ঠিক চিনেছি৷ এখন আর জ্বালাস না৷ রুমার সঙ্গে কথা বলছি৷ তোর জন্য প্রেমটা চটকে গেল শালা!’
গহন চুপ করে গেলেন৷ কিছুক্ষণ নীরব থেকে আস্তে আস্তে বললেন—‘ঠিক আছে৷ তোরা কথা বল৷ আমি রাখছি৷’
লাইনটা কেটে দিয়ে ফোনটাকে সুইচ অফ করে দেয় শুঁটকি৷ রুমার সঙ্গে কথা বলার সময় কেউ তাকে জ্বালাতন করুক তা চায় না৷ এই সময়টুকু তার একান্ত নিজস্ব৷ শুধু তার আর রুমার! মাঝখানে আর কাউকে সে বরদাস্ত করবে না৷
শুঁটকি ফোনটাকে পকেটে পুরে রুমার কাছে ফিরে এল৷ গাঢ় স্বরে বলল—‘গহন আবার কবিতা লিখতে শুরু করেছে জানো? মালটার একটু ঝাড় খাওয়ার দরকার ছিল৷ এতদিন স্রেফ ফাঁকি দিয়ে ‘আম গাছ-জাম গাছ’ লিখে পাতা ভরিয়েছে৷ উদমা খিস্তি খাওয়ার পর এবার সত্যিকারের কবিতা আবার ওর হাত থেকে বেরোবে৷’ তার মুখে একটা স্মিত হাসি ভেসে ওঠে—‘আমিও অবশ্য লুকিয়ে-চুরিয়ে একটু-আধটু কবিতা লিখছি৷ সব কবিতাই তোমাকে নিয়ে৷ পাবলিশারের সঙ্গে কথাও বলেছি৷ চার ফর্মা, মানে চৌষট্টি পৃষ্ঠার বই না হলে সেটা বই বলে ধরাই হয় না৷ এখনও পর্যন্ত চল্লিশটা কবিতা লিখেছি৷ পাবলিশার বলেছে ছাপান্ন থেকে আটান্নটা কবিতা চাই৷ আর ষোলোটা৷ আমারও বই বেরোবে রুমা৷ আমিও কবি হয়ে যাব৷ শুঁটকি কবি হবে!’ কথাটা বলেই হা হা করে হেসে ফেলল সে৷ যেন খুব বড়ো একটা রসিকতা করেছে! হাসতে হাসতেই চোখে জল এসে গেছে৷ দু-হাতে চোখের জল মুছে বলল—‘আজও একটা লিখেছি৷ শুনবে?’
ওপারের জমাট নিস্তব্ধতা থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া এল না৷ তবু শুঁটকি মহা উৎসাহে আবৃত্তি করতে শুরু করল—
পুড়ব বলেই কাব্য লিখি সহজ মন,
তরাই ঘুরে, আদর করে আসল জল৷
তিস্তানদীর বুকের ভাষায় মাদল শোন
যে কথাটা বলবি ভাবিস, আজকে বল৷
ভিড় পড়েছে জংশনে আর চৌমাথায়
কে জানে কোথায় যাচ্ছি ভেসে কে জানে!
হিজবিজিয়ে ছন্দ ওঠে আজ মাথায়,
দেয়াললিখন কালের কাছে হার মানে৷
কলকাতাতে ট্রাফিক—আলোর রূপকথা৷
ফুটপাথে ঐ স্বপ্নপোড়ার জ্বলছে ঘুম!
গাত্রদাহ আজ শহরের চুপকথা
তাই বেপাড়ার নষ্ট মেয়ের সাজের ধুম
দিব্যি দিলেও তিস্তাপারে ডুবব না,
ভেসে বাঁচার, বেঁচে ভাসার মন্ত্র চাই৷
গীতার বাণী আর কিছুতেই শুনবো না৷
প্রেম বলে তাই কাম শরীরে আজ জাগাই!
তবুও কেন তিস্তাপারে রঙিন ফুল
ফুটছে মনে, স্বপ্নকোণে আজ বদল!
যে কথাটা বন্দি, ঠোঁটে তোর আঙুল,
চুপ করে সেই গোপন কথাই আজকে বল৷
শুঁটকির আবৃত্তি শেষ হল৷ আবার পিন পতনের স্তব্ধতা ফিরে ফিরে এসেছে৷ বেসামাল হাওয়ায় ঘরের সাদা পর্দাটা হু হু করে উড়ছিল৷ একটা টিকটিকি কোথা থেকে যেন মৃদু আওয়াজ দিয়ে ওঠে—‘ঠিক...ঠিক...ঠিক...৷’
—‘তোমার দিঘার রাতটার কথা মনে আছে রুমা?’ সে আপনমনেই বলে—‘তখন পূর্ণিমা ছিল৷ চাঁদের আলোয় সমুদ্রের সাদা ফণা চিকচিক করছিল৷ ভরা কোটালের জল ফুলে ফুলে উঠছিল৷ বড়ো বড়ো ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছিল তোমার পায়ের কাছে৷ চোখে-মুখে নোনতা জলের ছিটে...’ তার চোখ স্বপ্নিল৷ যেন সেই মুহূর্তটা আবার এসে দাঁড়িয়েছে চোখের সামনে৷ সমুদ্রের নোনা গন্ধ, উত্তাল হাওয়া সবই যেন তার অনুভবে ধরা দেয়—চ ‘তোমার কোলে ছ-মাসের বুবাই৷ চাঁদের আলোয় দুধসাদা শাড়ি হিমজুঁইয়ের মতো ঝলমল করছিল৷ হাওয়ায় এলোমেলোভাবে তোমার চুল উড়ছিল৷ শাড়ির আঁচল উড়ছিল৷ তুমি জানো না, সমুদ্রের সামনে দাঁড়ালে তোমাকে ভেনাসের মতো দেখায়৷ আমি বলেছিলাম—‘চলো সমুদ্রে নামি৷’ তুমি ভয় পেয়েছিলে৷ ভেনাসের সমুদ্রকে ভয় কী! জোর করে হাত ধরে টেনে জলে নামালাম৷ তোমার শাড়ি ভিজে গেল৷ ভয়ও খানিকটা কাটল৷ খুব মজা পেয়েছিলে৷ বুবাইকে শক্ত করে ধরে এক পা এক পা করে কোমর জলে নামলে৷ সমুদ্র কোমর ছুঁয়ে, শাড়ি ছুঁয়ে কলকল—ছলছল করে বয়ে যাচ্ছিল৷ আর আমি গান ধরেছিলাম৷ কোন গানটা বলো তো?’
শুঁটকি উদাত্ত গলায় গান গেয়ে ওঠে৷ ফ্ল্যাটের ঘরটায় অনুরণিত হতে লাগল তার কণ্ঠস্বর৷ চোখ বুজে, গলার শিরা ফুলিয়ে একমনে গেয়ে যাচ্ছে সে—‘সাগরসঙ্গমে সাঁতার কেটেছি কত, কখনও তো হই নাই ক্লান্ত/তথাপি মনে মোর প্রশান্ত সাগরে ঊর্মিমালা অশান্ত...৷’
একই লাইন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে গাইছিল শুঁটকি৷ তার গলায় বিশেষ সুর নেই৷ কথাও জড়িয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে৷ তা সত্ত্বেও কী অদ্ভুত জেদে, জোর করে গেয়ে যাচ্ছিল৷ কথাগুলো আস্তে আস্তে বিকৃত হয়ে আসে৷ গলাও কী যেন অজ্ঞাত কারণে ধরে এসেছে৷ ভেঙে যাচ্ছে বারবার, তবু বারবার ফিরে ফিরে গাইছিল— ‘তথাপি মনে মোর প্রশান্ত সাগরে ঊর্মিমালা অশান্ত/সাগরসঙ্গমে...৷’
আস্তে আস্তে গান সুরহীন হয়ে এল৷ একসময় হারিয়ে গেল কথাগুলোও৷ হা হা করে কেঁদে উঠল শুঁটকি৷ প্রবল আবেগে চেয়ারের পায়ের কাছে বসে পড়েছে সে৷ ক্ষমাপ্রার্থনার ভঙ্গিতে হাহাকার করে বলল—‘আমায় ক্ষমা করো রুমা...আমি জানতাম না, হঠাৎ একটা বিরাট ঢেউ বেসামাল হয়ে আচমকা এসে আছড়ে পড়বে...জানতাম না, যে বোল্ডারগুলো অত শক্ত! তোমার, বুবাইয়ের যে অত ব্যথা লাগবে আমি জানতাম না...জানতাম না...৷’
হাস্নুহানার গন্ধ মাখা একঝলক হাওয়া হুহু করে তাকে ছুঁয়ে যায়৷ রকিং চেয়ারটা দুলে উঠল কয়েক মুহূর্তের জন্য৷
কবিতা ডট কমের পেজগুলো খুলে খুলে সবার কবিতা পড়ছিলেন গহন৷ এমনকি কমেন্টগুলোও বাদ দিচ্ছিলেন না৷
এতদিন যেন বুকের ওপর একটা পাথর চেপে ছিল৷ গহন দত্তগুপ্ত নামটার অহংবোধ তাঁকে অন্যদের কবিতা পড়া থেকে সবসময়ই বিরত রেখেছে৷ ভাবটা এমন ছিল, যেন এই সাইবার জগতের একটা গুরুত্বহীন সাইটে কবিতা পোস্ট করে সবাইকে ধন্য করেছেন৷ কিন্তু যে মুহূর্তেই সাইটটার গুরুত্ব বুঝতে পারলেন সেই মুহূর্তেই নতুন লড়াই শুরু হল৷ গহন দত্তগুপ্ত-র নয়৷ ‘একা মেঘের’৷ যাকে কেউ চেনে না, জানে না৷ নাম শোনেনি কখনও৷ নিতান্তই ভাগ্যান্বেষী এক কবি৷ তার ইগো নেই৷ সে যেখানে খুশি যেতে পারে, যা খুশি বলতে পারে, সবার কথা শুনতেও পারে৷ তার কোনো অহংবোধ নেই৷
কবিদের মধ্যে ‘জোনাকি’, ‘আকাশনীল’-এর কবিতা বেশ ভালো লাগল তাঁর৷ কিন্তু আশ্চর্য কিছু লাগল না৷ লিখেছে ভালোই৷ অথচ মনে তেমন দাগ কাটছে না৷ অন্যদিকে মনে মনে অবাকও হচ্ছিলেন৷ কবিতাগুলো কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে৷ মনে হচ্ছে এ ধরনের কবিতা আগেও পড়েছেন৷
এমন মনে হওয়ার কারণটা খুঁজছিলেন গহন৷ উত্তর পেতেও অবশ্য দেরি হল না৷ কমেন্টগুলো পড়তে পড়তেই রামহনুর বক্তব্যে পেয়ে গেলেন ইপ্সিত উত্তর৷ রামহনু স্পষ্ট লিখেছে—‘কবিতা ভালো লাগল৷ তবে নতুনত্ব কিছু পেলাম না৷ বরং শব্দ চয়ন, স্টাইল, রোমান্টিসিজমে প্রখ্যাত কবি গহন দত্তগুপ্ত-র ক্ষুদ্র সংস্করণ বলা যেতে পারে৷ কিন্তু মৌলিকতা নেই৷’
কমেন্টটা পড়ে চমকে উঠলেন তিনি৷ বিস্মিতভাবে কবিতাগুলো আবার পড়ে দেখলেন৷ রামহনুর কথা সম্পূর্ণ সঠিক! কবিতাগুলোর নীচে অনায়াসেই গহনের নাম লিখে চালিয়ে দেওয়া যায়! কেউ কোনো পার্থক্য বুঝতেও পারবে না৷ শুধু উক্ত দুজনেরই নয়, আর অনেকের কবিতাই পড়ে দেখলেন৷ প্রত্যেকের রচনাশৈলীই প্রায় একরকম৷ একইরকম বিরহ, একইরকম প্রেম, একইরকম সুন্দর সুন্দর শব্দচয়ন৷ শুধু কুবলাশ্ব-র কবিতাটা এর থেকে কিছুটা আলাদা৷ সে কিছু আঞ্চলিক আটপৌরে শব্দ ব্যবহার করেছে বলেই বোধহয় বেশি ভালো লাগল কবিতাটা৷
তু হমার মরদ বটিস-লয়?
...মেয়েটা ভাবে৷
‘আপন করম ভায়েক ধরম’ গানে
তাল মিলিয়েই গোটা পরব যাবে৷
‘কেনি রে তু চাস না হামার পানে?’
সোহাগ রঙের অভিমানী মেয়ে,
আকুল ব্যথায় ঈষৎ এলোমেলো
চাঁদকে ভেবে সওদাগরের আলো
বলছে কেঁদে—‘দেখলি না তু চেয়ে!’
নীলচে আভা নীল পাহাড়ের গায়ে,
চাঁদ চলে যায় তেপান্তরের পারে৷
আকুল ব্যথা ফিরল দখিন বায়ে
‘টুকুনখানিও দেখলি না তু হা রে!’
শালের বনে জ্যোৎস্না ঝরে পড়ে
মহুল মাতাল—ধূপ জ্বলেছে বুঝি!
চাঁদ জানে না, করছে খোঁজাখুঁজি
এক মেয়ে, তার প্রেমিক সদাগরে৷
জ্যোৎস্না বুকে পাথর হল মেয়ে
টুকুনখানিও দেখল না চাঁদ চেয়ে৷
তিনি ‘একা মেঘ’ কবিতার নীচে মন্তব্য লিখে দিলেন—‘কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ সত্যিই প্রশংসনীয়৷ শব্দের চালাকি নেই৷ সোজাসাপটা সরল ভাষায় একটি রূপকথার মতো কবিতা৷ আদ্যন্ত সুন্দর৷’
তাঁর মন্তব্যের একমিনিট পরেই রামহনু মন্তব্য করল—‘ঠিক বলেছেন৷ আপনাকে দ্বিত্ব দিলাম৷’
গহন অবাক হয়ে পালটা মন্তব্য করেন—‘দ্বিত্ব! মানে?’
রামহনু একটা স্মাইলি দিয়েছে—‘এ পাড়ায় নতুন তো! তাই সব কথার মানে বুঝতে একটু সময় লাগবে৷ আপাতত এইটুকু বলতে পারি—দ্বিত্ব মানে, সেকেন্ড করা৷’
—‘ও৷’
—‘বাই দ্য ওয়ে, আপনাকে কী বলে ডাকব? ‘একাদা’ বা ‘একাদি’ বলে ডাকা যাবে? না মেঘ না মেঘদি বলব?’
গহন হেসে ফেলেন৷ এই রামহনুর বিরূপ মন্তব্যেই রাগ হয়েছিলেন তিনি৷ কিন্তু এখন আর রাগ নেই৷
—‘মেঘদাটাই বেটার৷ আমি কোনোভাবেই দিদি নই৷’
—‘বেশ, ‘মেঘদা’ই বলব তবে৷’ রামহনু লিখল—‘রাতে কতক্ষণ অনলাইন থাকবেন? একটু আড্ডা মারা যাবে?’
—‘নিশ্চয়ই৷’
—‘তাহলে আড্ডার থ্রেডে আসুন৷’ সে আবার স্মাইলি দিয়েছে—‘নয়তো কুবলাশ্ব কাল সকালে কুরুক্ষেত্র করবে৷ কবিতার থ্রেডে পাব্লিক গপ্পো করলে ওর একদম পছন্দ হয় না৷ ব্যাটাকে আমি বড্ড ভয় পাই৷ বড়ো কড়া লোক৷
গহনের বেশ মজা লাগছিল৷ তিনি উত্তরে টাইপ করলেন—‘সে কী! কুবলাশ্ব ব্যাটা নাকি? আমি তো ভেবেছিলাম বেটি!’
—‘বেটি! বলেন কী! কুবলাশ্ব বেটি হতে যাবে কোন দুঃখে!’
—‘কবিতা পড়ে তো বেটিই মনে হল৷ তা ছাড়া ছদ্মনাম তো মুখোশের মতো৷ তার পিছনের আসল লোকটাকে দেখা যায় না৷ অবশ্য আমার ধারণা ভুলও হতে পারে৷’
রামহনু উত্তরে আরও কিছু টাইপ করার আগেই এই সাইটের মডারেটর ‘ব্যাসদেব’ স্ক্রিনে আবির্ভূত হলেন—‘মেঘবাবু ও হনু, কুবলাশ্বর জেন্ডার নির্ণয় ও ওই বিষয়ক আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা থাকলে আড্ডাঘরে গিয়ে বলুন৷ আমি অদরকারি পোস্টগুলো ডিলিট করব৷’
—‘আহা দাদা, এমন জব্বর পোস্টগুলো ডিলিয়ে দেবে৷ কুবলাশ্ব-র দেখা উচিত যে ওকে কেউ মেয়ে বলেছে৷ তারপর ঘোড়াটা কি কুকথা বলে সেটাই দেখার!’
রামহনুর কথার উত্তরে ব্যাসদেব বললেন—‘হনু, কবি ছেলে কি মেয়ে সেটা বড়ো কথা নয়৷ শেষ পর্যন্ত সে কবিই৷ আমি পোস্টগুলো ডিলিয়ে দিচ্ছি৷ আড্ডাঘরে এসো৷’
গহন চমৎকৃত হচ্ছিলেন৷ দু-তিনটে লোক কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে চোখ রেখে বসে আছে৷ তারা ছেলে না মেয়ে, সুন্দর কী অসুন্দর, লম্বা না বেঁটে, বুড়ো না জোয়ান—তা কেউ জানে না৷ কেউ কাউকে চেনে না৷ অথচ কেমন সুন্দর আন্তরিকভাবে আড্ডা মারছে৷ সাইবার ওয়ার্ল্ডের কী অসীম ক্ষমতা!
কয়েক মিনিটের মধ্যে তিনজনের আড্ডা জমে গেল৷ ব্যাসদেব দুঃখ করে বলছিলেন—‘আজকাল কবিতার আর সেই দিন নেই৷ এই কবিতা ডট কমেই একসময় কীসব অসাধারণ কবিতা পোস্ট হত! এখন সব কপিক্যাট আর চোরদের জায়গা হয়েছে৷’
গহন বিস্মিত—‘কপিক্যাট আর চোর মানে?’
রামহনু ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেয়—‘বেশির ভাগ কবিতাগুলোই কোনো না কোনো বিখ্যাত কবির স্টাইলে লেখা৷ নিজস্ব স্টাইল এখানকার খুব কম লোকেরই আছে৷ যেমন আজকাল ট্রেন্ড চলছে গহন দত্তগুপ্ত-র৷ ভদ্রলোক বহুদিন কবিতা লিখছেন না৷ কিন্তু তাঁর অভাব আমরা টেরই পাচ্ছি না৷ কারণ ‘জোনাকি’, ‘আকাশনীল’ বা আরও কিছু কবি হুবহু গহন দত্তগুপ্ত’র স্টাইলেই লেখে৷ ওদের কবিতা পড়লেই মনে হয় বকলমে গহন দত্তগুপ্তই লিখে দিয়ে গেছেন কবিতাগুলো৷ সেই সাবজেক্ট! একই ভঙ্গি৷ নতুনত্ব কিছু নেই৷ বুঝলাম, যে ওরা কবির অন্ধভক্ত৷ তাই বলে তাঁকেই সবসময় কপি পেস্ট মারতে হবে!’
রামহনুর কথার রেশ টেনেই ব্যাসদেব জানালেন—‘সত্যিই তাই, মৌলিকতা কিছু নেই৷ ইনফ্যাক্ট ওদের কবিতাগুলো যদি পরপর কবির নাম ছাড়া পোস্ট করে দেওয়া হয়—তাহলে কোনটা কার কবিতা আলাদা করে আইডেন্টিফাই করা যাবে না৷ সবই একরকম৷ কবির সিগনেচারের অভাব যাকে বলে আর কী!’
গহন আস্তে আস্তে টাইপ করেন—‘ও৷’
—‘কিছু পাব্লিক তো তার চেয়েও আরও উচ্চস্তরের ঝাড়ু৷’
—‘ঝাড়ু! মানে ঝাঁটা?’
—‘না...না...৷’ রামহনু একটা চোখ টেপার স্মাইলি দেয়—‘ঝাড়ু মানে ঝাড়া বিদ্যায় এক্সপার্ট৷’
ব্যাসদেব একটা কাঁদো কাঁদো মুখের ইমোটিকন দিয়েছেন—‘সেই চিরাচরিত সমস্যা৷ প্লেগিয়ারিজম৷ আজকাল তো ব্লগে ব্লগে শখের কবিরা কবিতা পোস্টাচ্ছে৷ কথা নেই বার্তা নেই—একজন তার মধ্যেই একটা কবিতা বেমালুম ঝেঁপে দিয়ে এখানে নিজের নামে পোস্ট করে দিল৷ ব্যস, সেই নিয়ে চলল মারপিট৷ দুই কবিই একটা কবিতাকে নিজের বলে দাবি করছে! সে প্রায় প্রাণান্তকর পরিস্থিতি!’
যত জানতে পারছিলেন গহন, ততই তাঁর চোখ ব্রহ্মতালুতে গিয়ে ঠেকছিল৷ এরকমও হয়!
—‘তোমরা কেউ জানো না৷’ রামহনুর মন্তব্যে এবার ভুরু কোঁচকানো রাগি মুখের স্মাইলি—‘ভানুসিংহের পদাবলির গোটাটা আমি আগের জন্মে লিখেছিনু৷ দাদু ঝেঁপে দিয়েছে! উঃ, কী দুঃখু৷’
তার মন্তব্যের ভঙ্গিতে তিনি হেসে ফেলেছেন৷ তাঁর মাথায় তখন অন্য একটা চিন্তাও ঘুরঘুর করছিল—
—‘আচ্ছা, এদের কেউ কিছু বলে না?’
ব্যাসদেব উত্তর দিলেন—‘প্লেগিয়ারিজম হলে চোরের আই. পি. অ্যাড্রেসটাকে ব্যান করে দেওয়া হয়৷ তার অ্যাকাউন্টও ব্লক করা হয়৷ কিন্তু কপিক্যাটদের নিয়ে কী করবেন? এরা প্রত্যেক বইমেলাতেই কবিতার বই বের করে৷ কোন প্রকাশনী যে বের করে, আর কারা যে পড়ে তা ভগবানই জানেন! কিন্তু অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না৷ কার কটা বই হয়েছে তা নিয়েও কম্পিটিশন! এদের কারুর পঁয়ত্রিশটা বই, কারুর-বা আবার চল্লিশটা৷ সব স্বঘোষিত ‘মহান কবি’৷ কালেভদ্রে যদি একটা বা দুটো কবিতা কপালগুণে ‘স্বদেশ’-এ ছাপা হয়ে যায় তবে তো কথাই নেই! বাবফট্টাইয়ের চোটে টেকাই যায় না৷ আর যদি না হয় তাহলে আঙুরফল টক৷ বলে বেড়াবে—‘আমি প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে৷’
গহন নিজের মনেই সজোরে হেসে উঠলেন৷ এমন প্রজাতির বিশেষ অভাব নেই৷ সকলেই অসিতবরণ চৌধুরীর মতো নিঃস্বার্থ নয়৷ এমনকি সেই স্বেচ্ছা-নির্বাসিত কবিও হাসপাতালের বেডে শুয়ে আক্ষেপ করেছেন, আর এরা তো নিতান্তই ভেকধারী! আর বইয়ের সংখ্যাও প্রচুর! তিনি আপনমনেই গুনতে শুরু করেন—আদৌ তাঁর নিজের অতগুলো বই আছে কি?
রামহনু যোগ করে—‘এদের প্রচুর পোষা ভাই-বোনও আছে৷ দাদাদের অন্ধ ভক্ত৷ দু-লাইন লিখলেই একেবারে ‘বাঃ বাঃ’ করে পিঠ চুলকোতে শুরু করে৷ আর কি বলব৷ এসে যখন পড়েছেন তখন সবই স্বচক্ষে দেখতে পাবেন৷ চিন্তা নেই৷’
আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে গহন লগ আউট করেন৷ কম্পিউটার শাট ডাউনও করেছেন৷ কিন্তু তখনই শুতে গেলেন না৷ বরং অশান্ত মনে পায়চারি করছেন৷
তাঁর মাথায় একটা চিন্তাই ঘুরেফিরে আসছিল৷ বারবার ভাবছিলেন এই জোনাকি, আকাশনীলদের সঙ্গে তাঁর তফাতটা কোথায়? ওদের বইয়ের সংখ্যা তাঁর থেকেও বেশি৷ ওদেরও ‘বাঃ, বাঃ’ করার জন্য ভক্তবৃন্দ আছে! এমনকি তিনি ঠিক যেমন কবিতা লেখেন, এরাও অবিকল তেমনই লেখে৷ পার্থক্য কোথায়? তবে আকাশনীল কেন ‘আকাশনীল’? আর তিনিই বা কেন তিনি?
রাতের ছায়ায় নিভৃত আসনে বসে বারবার নিজেকে প্রশ্ন করতে থাকেন কবি—‘আমি কে? আমি কোথায় আলাদা?...আমি কেন আমি?...’
হঠাৎ মনে পড়ে গেল পরিমলবাবুর কথা৷ কণা বলেছিলেন—‘ওঁর কথা কখনও লেখোনি তুমি...’
তাঁর কপালে ভাঁজ পড়ল৷ কী ভেবে যেন খাতা-কলম নিয়ে বসে গেলেন৷ কয়েকটা মিনিট স্তব্ধতা৷ তারপরেই সাদা পাতার ওপর কলম খসখস করে চলতে শুরু করল৷
—‘ওঃ ঈশ্বর! তুই এখনও টয়লেটে!’
প্রায় রোজই বাবার এই ডায়লগটা শুনে শুনে বোর হয়ে গেছে মন্দার৷ ভদ্রলোক তো মানুষ নন, ‘মার্ফিজ ল’-এর (Murphys law) চলতা ফিরতা উদাহরণ৷ যেদিন তিনি ছাতা নিয়ে বেরোবেন না, সেদিনই বৃষ্টি নামবে! যেদিন গুরুত্বপূর্ণ মিটিং থাকবে, সেদিনই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র খুঁজে না পেয়ে ‘লেট হচ্ছে...লেট হচ্ছে...’ বলে নাচতে শুরু করবেন৷ এবং অবধারিত ভাবেই সেদিন তাঁর গাড়ির টায়ার পাংচার হবে ও স্টেপনি থাকবে না!
সেইসব অমোঘ নিয়মগুলোর অন্যতম হল, যেদিন মন্দারকে তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে, এবং সে বাথরুমে ঢুকে বসে থাকবে, ঠিক তখনই বাবার নিম্নচাপ ও গ্র্যাভিটেশনের চূড়ান্ত হবে৷
মন্দারের এমনিতেই আজ মেজাজ খিঁচড়ে ছিল৷ ভোররাতে আবার একটা দুঃস্বপ্ন-র গুঁতো খেয়েছে৷ আজ অবশ্য লোকটা তাকে মারেনি৷ শুধু যখন উশ্রীকে ‘ভালোবাসি’ বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই টপকে পড়ে উশ্রীর মাথার একঢাল চুল ধরে টান মেরে বলল—‘এইবার!’
মন্দার হতভম্ব হয়ে দেখে যে কালো মুষকো লোকটার হাতে উশ্রীর পুরো চুলটাই উঠে এসেছে! তার মাথায় টাক! উশ্রীকে এমন কুশ্রী আগে কখনও লাগেনি! চুল ছাড়া একটা মেয়েকে যে এত খারাপ লাগতে পারে তা তার ধারণাতেই ছিল না৷ সে বোধহয় হার্টফেলই করত! ভাগ্যক্রমে ঘুমটা তার আগেই ভেঙে গেল৷
এই শনিপুজোই তার কাল হয়েছে৷ ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে খুচুর-খুচুর করে দাঁত মাজতে মাজতে দুঃস্বপ্নগুলোর কথাই ভাবছিল সে৷ কালো পালোয়ানটা তাকে কিছুতেই ‘ভালোবাসি’ শব্দটা বলতে দেয় না কেন? বাস্তবে প্রপোজ করার মতো সাহস এখনও জুটিয়ে উঠতে পারেনি৷ কিন্তু স্বপ্নে তো ‘ভালোবাসি’ বলে ফেলতেই পারে! অথচ প্রত্যেকবার বলার আগেই ওই কেলে মোষটা এসে কিছু-না-কিছু কাণ্ড ঘটবেই৷
আসলে দোষ লোকটারও নয়৷ সব দোষ ওই কুবলাশ্বের৷ কাল একটা চমৎকার কবিতা লিখেছিল সে৷ যথারীতি সে কবিতার নায়িকা উশ্রী৷ তার রেশমি চুলের বর্ণনাও দিয়েছিল চমৎকার৷ কিন্তু সব মাটি করল ওই হতভাগা৷ কবিতাটা পড়েই দ্রাম করে মন্তব্য করল—
—‘আপনারা কবিরা এত প্রেমিকার চুল ধরে টানাটানি করেন কেন বলুন তো! মেয়েদের মাথায় চুল থাকলে সুন্দর দেখায় নিঃসন্দেহে৷ কিন্তু তা নিয়ে এত আদিখ্যেতা করার কি আছে?’
সে বিশেষজ্ঞের মতো বলে—‘কবির প্রেমিকার মাথায় ঘন চুল থাকাটা মাস্ট৷’ জীবনানন্দও তো বলেছেন—‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা৷’
—‘সে জীবনানন্দ বলেছেন...বলেছেন৷ উনি তো এ-ও বলেছেন...‘মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য’৷ ‘শ্রাবস্তীর কারুকার্য’ মুখে তখনই থাকতে পারে যখন প্রেমিকার মুখময় ব্রণ থাকে৷ তাই বলে কি সব কবির প্রেমিকার মুখই ‘শ্রাবস্তীর কারুকার্য’ হতে হবে! এবার বলুন, ওটাও মাস্ট৷’
মন্দার বুঝতে পারছিল না, সে সামান্য একটা বিষয়কে নিয়ে এত টানাহ্যাঁচড়া করছে কেন? কোনোমতে জানায়—
—‘না...আসলে প্রেমিকার ঘন লম্বা চুল কাব্যিক!’
—‘এ আবার কী কথা! কোনো কবির প্রেমিকা কি ববকাট কাটতে পারে না? মাশরুম ছাঁট বা ভেজ ছাঁট যে মেয়েরা মারে, তারা কি সুন্দরী নয়? অথবা যে মেয়ের মাথায় টাক আছে সে কি কবির প্রেমের যোগ্য নয়?’
টাকলু মেয়ে! তার প্রায় বিষম খাওয়ার দশা৷ এসব কী উদ্ভট উদ্ভট কথা বলছে লোকটা!
সে কথা বলতেই ‘কুবলাশ্ব’র কড়া জবাব—‘উদ্ভট নয়, আসলে আপনারা চিরকালই বাহ্যিক সৌন্দর্যের পূজারি৷ আপনাদের কাছে প্রেমের যোগ্য মেয়ে মাত্রেই সুন্দরী হতে হবে৷ আর তার সৌন্দর্যের একমাত্র মাপকাঠি ঘন, কালো, লম্বা চুল৷ ডাবর আমলা কেশ তেলের মডেল৷’
মন্দারের মনে সন্দেহ ঘনীভূত হয়৷ ‘একা মেঘ’ বোধ হয় ঠিক কথাই বলেছিল৷ কুবলাশ্ব নামের পিছনে নির্ঘাৎ কোনো ববছাঁট চুলের মেয়ে আছে৷ সেইজন্যই এমন সদ্য তেলে ফেলা বেগুনের টুকরোর মতো ছ্যাঁক ছ্যাঁক করছে৷
সে আর কথা বাড়ায়নি৷ চেপে গিয়েছিল৷ আর তারপরই এই দুঃস্বপ্নটা৷ উশ্রীর মাথায় টাক!
—‘কী হল? আর কতক্ষণ?’ বাইরে থেকে বাবার প্রাণান্তকর হাঁক—‘ওরে, এটা কি অর্ডিনারি না ফেভিকল?’
এরপর আর বেশিক্ষণ বাথরুম আটকে রাখা যায় না৷ অগত্যা মন্দার বেরিয়ে এল৷ মানে বেরোতেই হল তাকে৷
বাবা তখন যথারীতি মেঝের ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছিলেন৷ তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল সে—‘এমন জব্বর টাইমিং ফিক্স করো কি করে একটু বলবে? যখনই আমি টয়লেটে ঢুকি ঠিক তখনই তোমার ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়৷ পাঁচ মিনিট আগে বা পরে এই ঘটনাটা ঘটে না কেন?’
বাবা কুঁই কুঁই করে উত্তর দেন—‘টাইমিং ফিক্স করার আমি কে! আমার কোলনকে জিজ্ঞেস কর৷’
—‘মানতেই হবে যে তোমার কোলনের টাইমিং শচীন তেন্ডুলকরের চেয়েও ভালো৷ যাও’৷
বাবা দৌড়োলেন৷ সে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে রান্নাঘরের দিকে চলল৷ আজ নাকি টিকলি একটা এক্সপেরিমেন্টাল ডিশ তৈরি করবে৷ এই এক্সপেরিমেন্ট-এর গিনিপিগ অবধারিতভাবেই সে আর বাবা! এর আগের সপ্তাহে টিকলি ‘মাশরুম চিচিঙ্গা’ নামের একটা ডিশ তৈরি করেছিল৷ সেটা খেতে কেমন হয়েছিল তা টের পাওয়া গিয়েছিল পরদিন সকালে৷ মন্দার আর বাবা দুজনেই সেই ডিশের ধাক্কায় টয়লেটে প্রায় ইট পেতে রেখেছিল৷
রবিঠাকুর বোধহয় টিকলির ডিশের কথা ভেবেই লিখেছিলেন—‘শুধু যাওয়া-আসা...শুধু স্রোতে ভাসা...৷’
আজও ডিশের নামে আর-একখানা মূর্তিমান জোলাপ তৈরি হচ্ছে! সে ভয়ে ভয়ে রান্নাঘরে ঢুকে দেখল টিকলি মুখখানা হাঁড়ি-পানা করে ভাজা মাছের দিকে তাকিয়ে আছে৷ সে মুখে সদ্য সদ্যই দই মেখে সাদা ভূত সেজেছে৷ আজকাল বেশ রূপচর্চা র দিকে ঝোঁক গেছে বেটির! মুলতানি মাটি, বেসন, চন্দন—কিছুই বাদ যাচ্ছে না!
কিন্তু আজ কী হল! এমন ‘কলহান্তরিতা’ নায়িকার মতো মাছের দিকে তাকিয়ে আছে কেন? মন্দারের সন্দেহ হয়৷ তবে কি দইটা মাছের গায়ে পড়ার কথা ছিল? ভুল করে নিজের মুখে মেখে ফেলেছে!
—‘কী হয়েছে?’ থাকতে না পেরে প্রশ্নটা করেই ফেলে সে—‘মুখে অমন হসন্ত দিয়ে রেখেছিস কেন?’
টিকলি কোনো কথা না বলে ভাজা মাছের দিকে আঙুল তুলে দেখায়৷
মন্দার সবিস্ময়ে দেখে, মাছগুলোকে কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে৷ কোন বাজারে এ ধরনের মাছ পাওয়া যায়! এ কী জিনিস বাজার থেকে এনেছে বাবা! কুচকুচে কালো! মাছ না অন্যকিছু!
—‘সব পুড়ে গেছে!’ টিকলি প্রায় কেঁদে ফেলেছে—‘আমি কড়ায় বসিয়ে মুখে দই মাখতে গিয়েছিলাম...সেই ফাঁকে!’
এতক্ষণে গোটা ব্যাপারটা মাথায় ঢুকল৷ এগুলো মাছই৷ অন্তত কড়ায় বসানোর আগে তাই-ই ছিল৷ কিন্তু এখন পুড়ে ঝামা!
টিকলি ঠিকমতো কাঁদতেও পারছে না৷ চোখ থেকে জল পড়লেই মুখের দই ধুয়ে যাবে৷ কোনোমতে বলল—‘কি করব দাদাভাই? ভিনিগার ঢেলে দিলে পোড়া পোড়া ভাবটা কি যাবে?’
পোড়া মাছ উইথ ভিনিগার! ভাবতেই হূৎকম্প হতে শুরু করল৷ সে আমতা-আমতা করে বলে—‘ইয়ে...মানে...টিকলি, আজ আমার এক বন্ধুর বাড়িতে নেমন্তন্ন আছে৷ সকালে...মানে এখন তার বাড়িতেই খাওয়ার কথা৷ তুই বরং বাবাকে নতুন ডিশটা টেস্ট করা...৷’
টিকলি আর কিছু বলার আগেই সে রাজধানী এক্সপ্রেসের স্পিডে সেখান থেকে কেটে পড়ল৷ এখন কোনোমতে বাড়ি থেকে বেরোতে পারলে সে বাঁচে৷
কিন্তু পেটকে তো বেশিক্ষণ পোড়া মাছ আর ভিনিগারের ভয় দেখিয়ে রাখা যায় না! তার ওপর এখন আবার বাইরে খেয়ে পয়সা নষ্ট করছে না মন্দার৷ উশ্রীর জন্মদিনে তাকে চমকে দেবে সে৷ সেই লক্ষ্যেই একটু-একটু করে টাকা জমাচ্ছিল৷ বাইরে খাচ্ছে না, যাতায়াতের জন্য ট্যাক্সি ভাড়া করছে না, এমনকি নিজের জন্য একটা সুতোও কেনেনি৷ নামকরা জুয়েলারির দোকানে একটা দারুণ হিরের আংটি দেখেছে৷ ওই আংটিটাই উশ্রীকে দেবে এবারের জন্মদিনে৷ এই লক্ষ্যেই গোটা বছর সে তার মাইনের টাকা বাঁচিয়ে এসেছে৷
আজ সেইদিন! আজ উশ্রীর জন্মদিন! দোকানে গিয়ে তার যথাসর্বস্বের বিনিময়ে আংটিটা কিনে নিল মন্দার৷ পেটে তখন ছুঁচো ডন মারতে শুরু করেছে৷ কিন্তু বুকভরা আনন্দের কাছে খালি পেটের চিনাচিনানি আর কতটুকু!
হিরের আংটিটা ব্যাগে পুরে সে হাওয়ায় উড়তে উড়তে স্টুডিয়োতে পৌঁছোল৷ আজ এই আংটিটা উশ্রীকে দেবে৷ আজই তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে নিজের হূদয়ের কথা জানাবে সে৷ উশ্রী কি হাসবে? চোখের ঘন পল্লব ঝুঁকিয়ে লাজুক মুখে সম্মতি দেবে কি? ওর আপেলের মতো গালে আরও-একটু রক্তিমাভা কল্পনা করে মন্দার নিজেই বিহ্বল হয়ে পড়ে৷ ভয় হয় দৃশ্যটা দেখার আগেই না তার হূদপিণ্ড থেমে যায়৷
স্টুডিয়োতে এসে কিন্তু উশ্রীকে দেখতে পেল না সে৷ হয়তো সে কোনো শটে ব্যস্ত৷ তবে বাইরে ঊর্মির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল৷ সে তখন যথারীতি ল্যাপটপে ওয়্যারলেস কানেকশন গুঁজে নিবিষ্ট মনে কি যেন করছে৷ মন্দারের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই হাসল—‘গুড মর্নিং৷’
—‘গুডমর্নিং ঊর্মি৷’ মন্দার তার পাশের চেয়ারটাতে বসে পড়ে—‘কেমন আছ?’
তাদের মুখোমুখি পরিচয়ের পর আপনি থেকে তুমি-তে নামতে বেশি সময় লাগেনি৷ ঊর্মি খুব মজার মেয়ে৷ গভীরমনস্কও বটে৷ তার সঙ্গে বন্ধুত্ব জমে উঠেছে কয়েকদিনেই৷ মন্দারের তার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে৷ ঊর্মির সঙ্গে কথা বলে, তার কথা শুনে সে আরাম পায়৷ তার শ্যালিকা ভাগ্য ভালো বলতে হবে!
মন্দারের চোখের দিকে তাকিয়েই সে যেন তার অনুচ্চারিত প্রশ্নটা ধরে ফেলে—‘আমি দিব্যি আছি৷ উশ্রীও ভালো আছে৷ শট দিচ্ছে, একটু পরেই আসবে৷’
—‘ও৷’ মন্দার আরও কিছু বলার আগেই তার পেট রীতিমতো সশব্দ বিপ্লব করে ওঠে—গরররর ঘুঁ উ উ...৷
আর গররররঘুঁ! জ্বলন্ত ইজ্জতের মুখে ফুঁ! প্রেস্টিজে গ্যমাক্সিন! ঊর্মি পর্যন্ত আওয়াজটা শুনতে পেয়েছে৷ তার মুখে স্মিত হাসি৷
—‘মধ্যপ্রদেশে এমন কোলাহল কেন? ব্রেকফাস্ট হয়নি?’
—‘না...না...!’ মন্দার অপ্রস্তুত৷ মাথা চুলকে বলে—‘হয়েছে...মানে...৷’
পেটটা বোধহয় ঠিক করেছে যে করেই হোক তার মুখে চুন-কালি মাখিয়ে ছাড়বে৷ সে এবার আরও তীব্র প্রতিবাদ জানাল—‘ঘুর র র র...ঘুট...ঘুট... ঘুট...৷’ অর্থাৎ ‘মিথ্যেবাদী! ব্রেকফাস্টে কী খেয়েছিস? হরিমটর!’
মন্দার পারলে এক্ষুনি অভদ্র পেটটাকে কেটে বাদ দেয়! ঊর্মি আড়চোখে তার পেটের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে৷ মাথায় জড়ানো ওড়নাটা বারবার মুখের ওপর এসে পড়ছিল৷ একহাতে সেটাকে সরিয়ে বলল—‘কেমন হয়েছে তা ঘুঁ ঘুঁ...ঘুঁট ঘুঁট শুনেই বুঝতে পারছি৷’
মন্দার লক্ষ করেছে যে ঊর্মির সঙ্গে সবসময়ই একটা ঢাউস ব্যাগ থাকে৷ উশ্রীর মেকআপ বক্স, এক্সটা আউটফিট, পারফিউম, জলের বোতল ইত্যাদি ক্যারি করার জন্যই ব্যাগটা ব্যবহূত হয়৷
সেই ব্যাগ থেকে একটা টিফিন বক্স বের করে এগিয়ে দিল ঊর্মি৷
—‘এই নাও৷’
—‘কী এটা?’ মন্দার বিস্মিত!
—‘খাবার৷’ সে মৃদু হেসেই উত্তর দেয়—‘আমার স্পাইসি ফুড খাওয়ার একদম অভ্যেস নেই৷ এখানে লাঞ্চে রীতিমতো লংকার গুঁড়ো দেওয়া খাবার দেয়৷ তাই নিজের লাঞ্চ আমি সবসময়ই ক্যারি করি৷’
মন্দারের দ্বিধা তবু কাটে না—‘এটা তো তোমার খাবার!’
—‘হ্যাঁ, আমার কথা ভেবেই বানিয়েছিলাম৷’ সে আবার হাসল—‘কিন্তু আজ না হয় তুমিই টেস্ট করে দ্যাখো৷’
—‘কিন্তু তুমি...?’
—‘আমি আজ তোমার লাঞ্চে ভাগ বসাব৷’ ওড়নাটা ফের তার চোখের ওপর এসে পড়েছে৷ সেটাকে বাঁ হাতে সরিয়ে হাসে ঊর্মি, ‘আশা করি অসুবিধে হবে না৷’
একটু কিন্তু কিন্তু করতে করতেই টিফিন বাক্সটা খুলল মন্দার৷ ভেতরে জ্বলজ্বল করছে সাদা ফকফকে পাতলা রুটি, বেগুনভাজা আর আলুর তরকারি৷ রুটির এককোনা ছিঁড়ে আলুর তরকারি সুদ্ধু মুখে দিতেই মনে হল—অমৃত! সাধারণ একটা খাবারও যে এত সুস্বাদু হতে পারে তা জীবনে এই প্রথম জানল সে!
—‘তরকারিটা তুমি করেছ!’ মন্দার বিস্ময় আর প্রশংসা মাখা দৃষ্টি ঊর্মির দিকে ছুড়ে দিয়েছে—‘ডেলিশিয়াস!’
ঊর্মি দু-চোখে স্নেহ মাখিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে৷ অদ্ভুত একটা বাৎসল্য তার হাসির মধ্যে ফুটে ওঠে৷ মন্দারের মনে হল—এমনভাবে বোধহয় একমাত্র মেয়েরাই হাসতে পারে! অভুক্ত সন্তানের সামনে নিজের খাবারটুকু তুলে দিয়ে এমন তৃপ্তিমাখা হাসি হাসার ক্ষমতা শুধু গর্ভধারিণীরই আছে৷
সে মুগ্ধ হয়ে ঊর্মির মুখের দিকেই তাকিয়ে ছিল৷ এমন হাসি উশ্রীর মুখে কখনও দেখেনি৷ তার হাসিতে আকর্ষণী শক্তি আছে, মদিরতা আছে, কুহক আছে—কিন্তু স্নেহ, মমতা নেই!
কেন কে জানে, এই প্রথম তার বুকে অব্যক্ত একটা কষ্ট হচ্ছিল৷ মনে হচ্ছিল, এমন হাসি কেন উশ্রী হাসে না!
—‘কী হল? খাও!’
ঊর্মির কণ্ঠস্বরে সংবিৎ ফিরল মন্দারের৷ খিদেও পেয়েছিল খুব৷ প্রায় চেটেপুটেই রুটি, বেগুনভাজা, আলুর তরকারি শেষ করে ফেলেছে৷ খাওয়া শেষ করে খালি টিফিন-বক্সটা এগিয়ে দিয়ে বলল—
—‘থ্যাঙ্কস ঊর্মি৷’
—‘ওয়েলকাম৷’
—‘দাঁড়াও...তোমাকে একটা জিনিস দেখাই৷’ মন্দার হাত-মুখ ধুয়ে এসে ব্যাগ খুলতে খুলতে বলল—‘দ্যাখো তো জিনিসটা কেমন? উশ্রীর পছন্দ হবে? আমি আবার মেয়েদের পছন্দ-অপছন্দ ঠিক বুঝি না৷’
সে বাক্স খুলে হিরের আংটিটা দেখায়৷ এবার অবাক হওয়ার পালা ঊর্মির৷ হিরেটা আগুনের ছোট্ট কণার মতো দ্যুতি ছড়িয়ে জ্বলছিল৷ সেদিকে তাকিয়েই বিস্মিত গলায় বলল—‘কী সর্বনাশ! এ তো খাঁটি ডায়মন্ড! কার জন্য কিনেছ? এত দামি জিনিস...!’
মন্দার সমস্ত কথা ঊর্মিকে খুলে বলে৷ কার জন্য কিনেছে, কেন কিনেছে, কীভাবে কিনেছে—সব৷ ঊর্মি তার সব কথা শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে৷ সব কথা যেন ঠিক মাথায় ঢুকছে না৷
মন্দারের কথা শোনার পর সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে৷ অদ্ভুত বিষণ্ণতা তাকে ছেয়ে আছে৷
—‘কী হল? উশ্রীর কি পছন্দ হবে না গিফটটা?’
মন্দারের শঙ্কিত কণ্ঠস্বর শুনে একটু যেন বিষণ্ণ হাসি হাসে ঊর্মি—‘অপছন্দ হওয়ার মতো জিনিস তো নয়৷ কিন্তু মন্দার, তুমি কী কখনও উশ্রীকে তোমার ফিলিংসের কথা বলেছ?’
—‘না৷’ মন্দার একটু চিন্তা করে জবাব দেয়—‘সেভাবে কখনও বলিনি৷ কিন্তু ভ্যালেন্টাইনস ডে, রোজ ডে বা নিউ ইয়ারে সবসময় দামি দামি গিফট দিয়েছি৷ ও রিফিউজ করেনি কখনও৷’
ঊর্মি চুপ করে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল৷ তারপর আস্তে আস্তে বলল—‘অন্য দামি গিফটের কথা বলছি না৷ তবে হিরের আংটির ব্যাপার আলাদা৷ হিরেটার নিশ্চয়ই অনেক দাম৷ কিন্তু তার দামের চেয়েও বেশি দামি তোমার ফিলিংস৷ এটার পিছনে তোমার রক্ত, ঘাম, কৃচ্ছ্রসাধন জড়িয়ে আছে৷ এটা হিরের আংটি নয়, আসলে তোমার সমস্ত জীবন, সমস্ত অনুভব৷ কার হাতে যাবে সেটা বড়ো কথা নয়৷ বড় কথা, সেই হাতের এই আংটি পরার যোগ্যতা আছে কি না৷’
মন্দার ঊর্মির কথা শুনছিল৷ তার বিরক্ত লাগছে৷ হঠাৎ করে ঊর্মি এমন ভাষণ দিতে শুরু করেছে কেন? বিরক্তিটা সম্ভবত তার মুখেও ছাপ ফেলেছিল৷ ঊর্মি সেটা লক্ষ করেই ফের বিষণ্ণ হাসিটা হাসে—‘আমি তোমায় জ্ঞান দিতে চাই না মন্দার৷ শুধু এইটুকু বলতে চাই তোমার ফিলিংস যেন কারুর কাছে ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ হয়ে না দাঁড়ায়৷ দ্যাটস অল৷’
বলতে-বলতেই তার কণ্ঠস্বরের গাম্ভীর্যটা সরে গেছে৷ তার বদলে এখন একটা ছেলেমানুষি ভাব—‘আর শুধু উশ্রীর জন্য গিফট আনলেই হবে? আমার জন্য কী এনেছ?’
সে আশ্চর্য হয়ে বলে—‘তোমার জন্য?’
—‘হ্যাঁ, আমার জন্য৷’ ঊর্মি মিটিমিটি হাসে—‘জানো না? উশ্রী আর আমি টুইনস৷ আমাদের জন্ম একই দিনে৷ উশ্রী আমার থেকে দু-মিনিটের বড়ো৷ অর্থাৎ আজ আমারও জন্মদিন৷’
মন্দার অপ্রস্তুত৷ এমন সম্ভাবনার কথা তার মাথায় আসেনি৷ উশ্রী আর ঊর্মি পরস্পরকে নাম ধরে ডাকে, ‘তুইতোকারি’ করে৷ কিন্তু উশ্রী সর্বত্র ঊর্মিকে ‘বোন’ হিসেবে পরিচয় দেয়৷ সে পরিচয়টাই জানত মন্দার! ওদের দুজনের চেহারা, স্বভাব, ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ আলাদা! তাই কখনও মনে হয়নি ওরা যমজ বোনও হতে পারে৷
—‘ওঃ...আই অ্যাম সরি...৷’ সে আমতা আমতা করে বলে—‘আমি জানতাম না...আই মিন...বুঝতে পারিনি৷ তোমাদের দেখতে তো...৷’
—‘একদম একরকম৷’ ঊর্মি মুখ টিপে হাসল...‘শুধু বাইরের লোক সেটা দেখতে পায় না৷’ সে একটু থেমে ফের বলে—‘কই, আমার গিফট তো দিলে না?’
ঊর্মির কথায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিল মন্দার৷ দুজন একরকম দেখতে! বলে কী! ওদের দুজনের চেহারায় আকাশ-পাতাল তফাত!
বিস্ময়টা কোনোমতে গিলে ফেলে সে বলল—‘তোমার জন্য তো কিছু আনিনি৷ সরি ঊর্মি৷’
—‘সরি বললে তো শুনছি না৷’ ঊর্মি ঢাউস ব্যাগটা খুলে একটা বিরাট ডায়ারি বের করে এনেছে৷ ডায়ারির একটা পাতা খুলে এগিয়ে দেয়—‘দাও৷’
মন্দার বিহ্বল—‘কী?’
—‘গিফট৷ উদীয়মান কবির সই সহ একটি তাৎক্ষণিক কবিতা৷’ সে বলল—‘বলা যায় না, কোনোদিন হয়তো তুমি বিশাল নামী কবি হবে৷ আমাদের চিনতেই পারবে না৷ তখন এই গিফটটাই সবাইকে সগর্বে দেখিয়ে বলব—‘মন্দার ভট্টাচার্য একসময় আমাকে চিনতেন৷’
—‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল!’ মন্দার ফিক করে হেসে ফেলেছে৷ হাসতে হাসতেই তার ডায়ারিতে জন্মদিন উপলক্ষ্যে কয়েক লাইনের একটা ছড়া লিখে দিল—
এই মরেছে, এই মরেছে, এই হয়েছে কেলো!
হেড্ডিমণির জন্মদিনে কেকটা কোথায় গেল?
ফেট্টিবাঁধা দুষ্টুবুড়ি
মিষ্টি কথায় মিছরি ছুরি
রূপের ঠ্যালায় কোথায় লাগে অ্যাঞ্জেলিনা, জেলো!
কেক আনিনি, গিফট আনিনি, তাই তো বাজাই বাজা,
ট্যাঁকের কৃপায় আমি সদাই বোম্বাগড়ের রাজা৷
এমন সাধের জন্মদিনে
নাই বা দিলুম কিছুই কিনে
দিদিমণি, তুমিই সত্য, বাদবাকি সব গাঁজা!
—‘ও-মা! লিমেরিক!’ ঊর্মির মুখ খুশির হাসিতে ঝলমল করে উঠেছে—‘কী সুন্দর হয়েছে!’
—‘পছন্দ হয়েছে তোমার?’
—‘ভীষণ...ভীষণ...ভীষণ’, সে ছেলেমানুষের মতো উচ্ছ্বাসিত—‘তুমি আজকের পার্টিতে আসবে তো? আমার সব বন্ধুদের আমি কবিতাটা পড়ে শোনাব...৷’
—‘পার্টি!’
—‘হ্যাঁ, পার্টি৷’ ঊর্মি একটু যেন অবাক হয়—‘কেন? উশ্রী তোমায় ইনভাইট করেনি?’
মন্দার কিছু বলার আগেই উশ্রী এসে পড়ল৷ তার মুখে তখনও মেক-আপ৷ শট দিয়ে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে৷ মন্দারের দিকে তাকিয়ে অল্প হেসে বলল—‘হাই মন্দার৷’
—‘হাই উশ্রী৷’ সে হিরের আংটির বাক্সটা তার দিকে এগিয়ে দিয়েছে—‘হ্যাপি বার্থ ডে৷ ভেরি ভেরি রিটার্নস অফ দ্য...’
—‘কী এটা?’ উশ্রী নিরুৎসুকভাবে বাক্সটা খুলল৷ বাক্সের ভেতর হিরেটা ঝলমলিয়ে উঠেছে৷
অথচ সেই ঝলমলানির কণামাত্রও উশ্রীর মুখে দেখতে পেল না মন্দার৷ ভেবেছিল আংটিটা তাকে পরিয়ে দেবে৷ কিন্তু সে নিজেই আংটিটা পরে ফেলেছে৷ বেশ কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে দেখে তার ভুরু কুঁচকে গেল৷ ঊর্মির দিকে তাকিয়ে বলল—‘কী মনে হয়? এটা এক ক্যারাট হবে?’
ঊর্মির হাসি ঝলমলে মুখ যেন ফ্যাকাশে হয়ে যায়৷ মন্দারের মনে হল শনিদেব নয়, এবার চড়টা তাকে উশ্রীই মেরেছে৷
—‘না৷’ তার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছিল না৷ তবু কোনোমতে বলল—‘ফরটি ফাইভ সেন্ট৷’
অদ্ভুত তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে উশ্রী বলে—‘এক ক্যারাটের নীচে হিরে হিরেই নয়৷’
—‘উশ্রী,...৷’ ঊর্মির মুখ রাগে থমথম করছে—‘এটা কী জাতীয় ভদ্রতা? তুই জানিস কত কষ্ট করে এই আংটিটা ও কিনেছে?’
—‘দ্যাটস নট মাই প্রবলেম৷’ উশ্রীর মুখে সেই কুহকমাখা হাসি৷ মন্দারের হঠাৎ মনে হল এমন কুৎসিত নির্বোধ হাসি আগে কখনও দেখেনি৷
—‘একটা মিডলক্লাস ঘরের সাধারণ স্ক্রিপ্টরাইটারকে আমি হিরে গিফট দিতে বলিনি৷’ সে তার ঘন চুলে হাত বোলায়—‘এনিওয়ে আই অ্যাম টায়ার্ড৷’
মন্দারের মুখ কালো হয়ে গিয়েছিল৷ এমন অপমানিত সে কখনও হয়নি৷ সকাল থেকে কত কিছুই না কল্পনা করেছে৷ কেউ যেন সেই কল্পনাকে এক হাতুড়ির বাড়ি মেরে খানখান করে দিল৷
তার চোখ বাষ্পাচ্ছন্ন৷ নাক-কান দিয়ে আগুনের হলকা বেরোচ্ছে৷ তবু দাঁতে-দাঁত চেপে বলল—‘আমি জানতাম না উশ্রী, তুমি আমার সম্পর্কে এরকম ভাবো!’
—‘কাম অন...গ্রো আপ মন্দার!’ উশ্রী খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে—‘এরকম, ওরকম তো দূর৷ আমি তোমার সম্পর্কে কিছুই ভাবি না! তোমাকে নিয়ে ভাবার সময় আমার নেই৷’
বলতে-বলতে সে উঠে দাঁড়িয়েছে—‘আমার কাজ আছে৷ অ্যান্ড মন্দার, থ্যাঙ্কস ফর দ্য গিফট৷’
মন্দার দেখল ঊর্মি তার দিকে ব্যথিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে৷ হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল একটু আগেই তার বলা কথাগুলো৷
—‘এটা হিরের আংটি নয়, আসলে তোমার সমস্ত জীবন, সমস্ত অনুভব! কার হাতে যাবে সেটা বড়ো কথা নয়৷ বড়ো কথা, সেই হাতের এই আংটি পরার যোগ্যতা আছে কিনা৷...’
তখন ভীষণ ভেবে বিরক্ত হয়েছিল সে৷ কিন্তু...৷
—‘দাঁড়াও উশ্রী৷’ কোথা থেকে তার মধ্যে এত জোর এল, মন্দার জানে না৷ কিন্তু সে বিদ্যুৎগতিতে উঠে গিয়ে উশ্রীর সামনে দাঁড়িয়েছে৷ তার চোখে চোখ রেখে বলল—‘আংটিটা ফেরত দাও৷’
ঊশ্রী যেন তার কথাটা বুঝতে পারেনি৷ থতোমতো খেয়ে বলে—‘সরি...!’
—‘আই অ্যাম সরি উশ্রী৷’ তার কণ্ঠস্বরে জেদ, রাগ, ক্ষোভের মিলিত প্রকাশ—‘এই আংটিটা তোমার জন্য নয়৷ ফেরত দাও৷’
উশ্রীর ফরসা মুখ লাল হয়ে ওঠে৷ সে বিনাবাক্যব্যয়ে সঙ্গে সঙ্গেই হাত থেকে খুলে আংটিটা ছুড়ে দিয়েছে তার মুখের ওপর৷ খপ করে সেটাকে লুফে নিল মন্দার৷ শান্ত স্বরে বলল—‘থ্যাঙ্ক ইউ৷’
আমার অ্যান্টাসিডের শিশি,
দাঁতে সকালবেলার মিশি,
বউয়ের বাসি মুখের কিসি
নিয়ে মধ্যবিত্ত আমি৷
হাতের বাবরি আমল ছাতায়,
প্রভুর চিত্রগুপ্ত খাতায়
ভুঁড়ি ইন্দ্রলুপ্ত মাথায়
নিয়ে নিটোল গৃহস্বামী৷
আবেগ নেয় না কোনো ঝুঁকি,
তোমায় ডিস্কো প্রণাম ঠুকি,
তবু দেয় না কপাল উঁকি
প্রভু আধকপালী ছেড়ে,—
মেশে রক্তে চিনি স্নেহ৷
তবু পাঁঠামৃতই দেহো!
যতই বাড়ুক মধুমেহ,
ডোবা কবজি তোলে কে রে!
বহর ছোট্ট লম্বোদরো৷
কাব্যে সখী আমায় ধরো!
ফিলিম মোগ্যাম্বো গব্বরও
আমার ডেইলি হাতিমতাই৷
ঘরে বৌ-মায়ে কারগিল
আমি বিষণ্ণ চার্চিল
ইস্যু তাল হয়ে যায় তিল
‘প্রভু নষ্ট হয়ে যাই৷’
আমি বাসে ট্রামে চড়ি
কনুই হিলের গুঁতোয় মরি
আজও স্বপ্নে দেখি পরি
পাঁচীর সঙ্গে খাটে শুয়ে...!
তোমার বৈকুণ্ঠে বাতি
আমার লোডশেডিংই সাথী৷
যতই হই না আমি পাতি
ঝড়ে পড়ছি না তো নুয়ে!
তোমার একটেরে চোখ খোলা
আশিস তাদের জন্য তোলা
যাদের ব্যাংকে টাকার গোলা
দেশের শুম্ভ-নিশুম্ভ৷
আমি সবার জন্য আছি
একা যুদ্ধ করেই বাঁচি৷
যতই দাও না পাছায় কাঁচি
জমি ছাড়ছে না কুম্ভ৷
যারা লক্ষহিরা ছড়ায়
তোমায় বুর্জোয়া-পাঠ পড়ায়
সোনা রুপোর মুকুট গড়ায়
তাদের বাড়ুক তসিল খান!
ধনে থাকি বা নাই থাকি
মনে ডাকছে অচিন পাখি
নিজের জীবন নিজেই আঁকি
আমিই মধ্য ভগবান!
—‘পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?’
শুঁটকি অর্ধনিমীলিত দৃষ্টিতে গহনের দিকে তাকিয়েছে—‘কবিতাটা লিখেছিস ভালো৷ এটাও ঘটনা যে তোর পরিচিত রাইটিং স্টাইল ভেঙে বেরিয়েছিস৷ কিন্তু প্রশ্নটা সেই একই জায়গায়—‘পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ?’
গহন অসহিষ্ণু হয়ে বলেন—‘তুইও কপালকুণ্ডলা নোস, আমিও নবকুমার নই৷ তাহলে হঠাৎ করে বঙ্কিমবাবু এসে পড়লেন কেন?’
—‘বঙ্কিমবাবু আসেননি৷ প্রশ্নটা এসেছে৷’ শুঁটকি বলল—‘তুই ভাবছিস যে পরিচিত ছক ভেঙে বেরিয়েছিস৷ তা বেরিয়েছিস ঠিকই৷ কিন্তু নিজের পরিচিত ছক ভাঙতে গিয়ে অন্য একটা ছকে ঢুকে পড়েছিস৷ যেটা আমাদের কাছেও সমান পরিচিত৷’
—‘মানে?’
—‘কমেন্টগুলো দ্যাখ৷’
কবিতার নীচে বড়ো বড়ো ব্লকে ত্রিশটা কমেন্ট পড়েছে৷ ‘আকাশনীল’ লিখেছে—‘আরে, এ তো পুরো ঝিঙ্কু চিকু৷ মিঠুনের ফিলমে রম্ভার নৃত্য! একেবারে স্বপ্নিলীয় স্টাইল৷’
ব্যাসদেব বলেছেন—‘এতদিনে একটা অন্যরকম কবিতা পড়লাম৷ শব্দচয়ন দুর্ধর্ষ৷ ছন্দ জমে ক্ষীর! আপনি কি স্বপ্নিল আচার্যের ফ্যান?’
নিধিরাম সর্দারের মন্তব্য—‘পুরো চম্পা মাল মামা৷ স্বপ্নিল, স্বপ্নিল গন্ধ! পাগলা, ক্ষীর খা কুলস্য কুল৷’
গহন সবকটা কমেন্টেই চোখ বোলালেন৷ তারপর বিভ্রান্তভাবে বলেন—‘এতে দেখার কী আছে? এতদিন ‘ঝুলস্য ঝুল’ ছিলাম৷ এখন ‘কুলস্য কুল’ হয়েছি৷’
—‘এই!’ শুঁটকি চেয়ারের হাতলে আলতো চাপড় মারে—‘এই হচ্ছে তোর পলায়নপর মনোবৃত্তি৷ ভালো ভালো জিনিসগুলো দেখলি—অথচ আসল জিনিসটাই দেখলি না!’
—‘কি দেখিনি?’
—‘প্রত্যেকেরই কবিতাটা ভালো লেগেছে৷ কিন্তু...!’ সে পায়ের ওপর পা তুলে বসেছে—‘প্রত্যেকেই বলেছে যে কবিতাটায় ‘স্বপ্নিল’,...‘স্বপ্নিল’ গন্ধ আছে৷ নতুন প্রজন্মের ফেমাস কবি স্বপ্নিল আচার্য ঠিক এইরকম ভাষাতে, এইরকম স্টাইলেই কবিতা লেখেন৷ কবিতাটা ভালো হয়েছে নো ডাউট৷ তোর অন্যান্য লেখার থেকে আলাদা হয়েছে তা-ও ঠিক৷ কিন্তু স্বপ্নিলের কবিতার মতো হয়েছে৷ তুই নিজেকে ভাঙতে গিয়ে অন্য একজনের মতো করে গড়ে ফেলেছিস৷’
গহন কপালে হাত রেখে শুঁটকির কথা শুনছিলেন৷ সে বিন্দুমাত্রও বাড়িয়ে বলছে না৷ কবি স্বপ্নিল আচার্যের অনেক কবিতা পড়েছেন তিনি৷ লেখার সময়ে মনে হয়নি যে, সেই আদলেই কবিতাটা গড়ে উঠছে৷ কিন্তু এখন বুঝতে পারছেন সত্যিই ওটা স্বপ্নিলীয় স্টাইল হয়ে গেছে!
—‘নিজেকে ভাঙছিস ভাঙ৷’ শুঁটকি বলে—কিন্তু নিজের মতো করে ভাঙ৷ নিজের মতো করে শব্দ বেছে নে৷ অন্যের মতো নয়৷ একটা জিনিস দেখাই তোকে৷’
সে চেয়ার ছেড়ে উঠে গেল৷ গহন দেখলেন শুঁটকি তার লাইব্রেরির দিকে যাচ্ছে৷ নির্ঘাত এখনই কোনো বই এনে বলবে—‘তোর এটা পড়া উচিত৷’ কিংবা কোনো বইয়ের রেফারেন্স এনে সুদীর্ঘ ভাষণ দেবে৷ বলবে, কবিতা কাকে বলে, কবিতা কী জন্য কবিতা—এইসব!
ভেবেই মনে মনে আতঙ্কিত হয়ে উঠছিলেন গহন৷ শুঁটকির লেকচার হজম করা রীতিমতো কঠিন কাজ৷ সে শুরু করতে জানে, থামতে জানে না৷
বাস্তবে অবশ্য সেসব কিছুই ঘটল না৷ শুঁটকি দলামোচা পাকানো, হলদে হয়ে যাওয়া কাগজ নিয়ে এসেছে৷ গহনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল—‘পড় এটা৷’ গহন সবিস্ময়ে দেখলেন হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজে নীল অক্ষরে গোটা গোটা হরফে একটা কবিতা লেখা আছে—
—‘এ কী!’ তিনি বিস্মিত চোখজোড়া তুলে তাকালেন বন্ধুর দিকে— ‘এ তো...৷’
—‘হ্যাঁ, তোরই কবিতা৷’ শুঁটকি বলে—‘আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে, তুই নিজেই লিখে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলি৷ কুড়িয়ে রেখেছিলাম৷ এটা অন্যদিক দিয়ে ইউনিক গহন৷ কারণ এমন কবিতা তুই আর কখনও লিখিসনি৷ যদিও তোরই লেখা উচিত ছিল৷’
গহন চোখ বুজলেন৷ তিনি জানেন এবার সে কী বলবে—
—‘তোকে আমি এসকেপিস্ট কেন বলি জানিস?’ শুঁটকি বলে—‘কারণ তুই চিরকাল জীবনের সেই দিকটার দিকে পিঠ ফিরিয়ে রেখেছিস, যে দিকটা তোর চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না৷’
সে চুপ করে গেল৷ গহনও স্তব্ধ৷ তিনি আন্দাজ করতে পারেন শুঁটকি কোন দিকের কথা বলছে৷ যে সময়ের কথা ভুলে যেতে চান, ঠিক সময়ের কথাই বলছে সে৷
মুখ নীচু করে গোঁজ হয়ে বসেছিলেন গহন৷ শুঁটকির দিকে না তাকিয়েও বেশ বুঝতে পারছেন যে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এদিকেই নিবদ্ধ৷ ভেতরে ভেতরে একটা তীব্র প্রতিবাদ জন্ম নিচ্ছিল৷ যে প্রতিবাদে একদিন সেই সময়টার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, ডুবে গিয়েছিলেন রোমান্টিসিজমে৷ মনে হয়েছিল—‘কেন লিখব? যে ক্ষত বুকে আছে তা থাক৷ ভিখিরির মতো দেখিয়ে বেড়াব কেন? যে অসুখের কথা ভুলে যেতে চাই, তাকে ফিরিয়ে আনব কোন যুক্তিতে?’
—‘তুই শুধু রোমান্টিক কবিতাই লিখিস কেন?’ সে তীব্র দৃষ্টিতে গহনকে দেখছে—‘খুব অল্প বয়সে একটা অশান্ত সময় দেখেছিস৷ যদিও সে সময়কে বোঝার মতো বয়েস তখন তোর বা আমার—কারুর ছিল না৷ কিন্তু সেই সময়টা তোকে একটা জোরদার ধাক্কা দিয়ে গেছে৷ ছাপ ফেলে গেছে৷ আজও তেমন একটা সময় আসছে গহন৷ আবার একটা অস্থির সময়৷ তার মধ্যে দাঁড়িয়েও চাঁদ-তারা-ফুল-পাখির সৌন্দর্যে নিজেকে জোর করে ডুবিয়ে রাখবি! কেন তাকাবি না সেই অস্থিরতার দিকে?’
—‘আমি কবিতা লিখতে চাই৷’ গহন যেন একটু উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলেন—‘স্লোগান লিখতে চাই না৷’
তিনি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন৷ তার আগেই বাধা পড়ল৷ একটি বারো-তেরো বছরের ছেলে ঘরে এসে ঢুকেছে৷ গহন দেখেই চিনতে পারলেন৷ এই সেই ছেলেটা৷ যে সেদিন ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতাটা আদ্যোপান্ত মুখস্থ বলেছিল৷ তিনি অবাক! ছেলেটা এখানে কী করছে? শুঁটকির সংসারে নতুন অতিথি!
—‘কহো গোপাল...৷’ শুঁটকির সস্নেহ চোখ ছেলেটার দিকে ফিরল—‘কী সমাচার?’
গোপালকে এখন আর চেনাই যায় না৷ পরনে ঝকঝকে তকতকে জামা৷ মাথায় শ্যাম্পু আর গায়ে সাবান পড়েছে৷ তবে মাথার উকুনগুলোর রাজত্ব বোধহয় এখনও কায়েম৷ সে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে—‘ভাত কি বসিয়ে দেব?’
শুঁটকির ভুরু কুঁচকে গেছে৷ ভ্রূকুটি করে বলল—‘তোকে কি আমি ভাত রাঁধতে বলেছি? যা করতে বলেছি সেটা কতদূর?’
মুখ কাঁচুমাচু করে বলল গোপাল—‘দীঘ্যইটা লিখতে পাচ্ছিনে কো৷’
‘দীর্ঘই’টা লিখতে পারছ না, তাই ভাত রাঁধার এত তাড়া৷’ সে ধমক দেয়—‘যা৷ লেখার চেষ্টা করগে৷ না পারলে দেব এক কানের গোড়ায়...৷’
ছেলেটা বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে চলে গেল৷ গহন গোটা ঘটনাটা সবিস্ময়ে দেখছিলেন৷ এবার মুখ খুললেন—
—‘তুই কি সাক্ষরতা অভিযানে নেমেছিস শুঁটকি!’
—‘আরে, নাঃ৷’ শুঁটকি মৃদু হাসে—‘ঠিক তা নয়৷ ব্যাটাকে পুষ্যি নিয়ে নিলাম, বুঝলি?’
—‘কিন্তু হঠাৎ...৷’
—‘হঠাৎ নয়৷ হিস্ট্রি আছে৷ গত বুধবার রাতে দোকান বন্ধ করে ফিরছি, চোখে পড়ল ব্যাটা রাস্তার ওপরে বস্তা পেতে ঘুমোচ্ছে৷’ সে আড়চোখে দেখে নেয় যে গোপাল ধারে-কাছে আছে কিনা৷ তারপর দরজা বন্ধ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল—‘হ্যাঁ, যা বলছিলাম৷ গোপাল রাস্তার ওপরে ঘুমোচ্ছিল৷ আর ওর ঠিক পাশেই কি যেন একটা চিকচিক করছে৷ রাস্তার আলোয় দেখি চকচকে জিনিসটা অল্প অল্প নড়ছেও৷’
—‘তারপর?’
—‘তারপরই তো কেলো! সন্দেহ হল! কাছে গিয়ে টর্চের আলো ফেলে যা দেখলাম, তুই জাস্ট ভাবতে পারবি না৷’ শুঁটকি চোখ বড়ো বড়ো করেছে—‘একটা আস্ত গোখরো সাপ! কলকাতার রাস্তার কোথা থেকে এল কে জানে৷ কিন্তু দিব্যি ফণা গুটিয়ে গুঁড়িসুড়ি মেরে গোল হয়ে শুয়ে আছে! একবার ভেবে দেখ, বাচ্চা ছেলেটা ঘুমিয়ে আছে৷ তার পাশে একটা গোখরো সাপ! একটু নড়াচড়া করলেই কামড়ে দিত৷’
কলকাতার যীশুদের হেঁতালের লাঠির দরকার পড়ে না!
ভাবতেই গা শিরশির করে ওঠে গহনের৷ দৃশ্যটা তিনি কল্পনাও করতে চান না!
—‘তাড়াতাড়ি গিয়ে সাবধানে গোপালকে ডেকে তুললাম৷ প্রথমে তো উঠতেই চায় না৷ তারপর ঘুম ভেঙে পাশের প্রাণীটিকে দেখেই ‘আই বাবা’ বলে চেঁচিয়ে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরল৷’ শুঁটকি বিষণ্ণ হাসল—‘‘বাবা’ শব্দটা এই প্রথম শুনলাম জানিস৷ বুবাই কখনও বলেনি৷ বড়ো ছোট্ট শব্দ৷ কিন্তু মায়াবী৷ মায়ায় জড়িয়ে গেলাম৷ ভাবলাম আমিও একা, ওরও জগতে কেউ নেই৷ দুই কপালপোড়া মিলেই না হয় একসঙ্গে থাকি৷ ভাতেভাত, ডাল-ভাত আমার যা জোটে, ওরও দুটো যা হোক করে জুটে যাবে৷ ব্যস, তারপর থেকেই গোপাল বাবাজির এখানে অধিষ্ঠান৷ সব ভালো, শুধু পড়তে বললেই হাই ওঠে—এই যা দোষ৷’
গহন আপন মনে কী যেন ভাবছিলেন৷ ঠিক গোপালের অর্ধেক বয়সেই গোখরো সাপের চেয়েও বিষাক্ত কিছুর ছোবল খেয়েছিলেন তিনি৷ শুঁটকির দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখে রুধির জমছিল৷ যেন সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে জানতে চাইছেন—‘আমাকেও তো সাপে কামড়েছিল! তখন তুই কোথায় ছিলি শুঁটকি!’
‘যে পিতা সন্তানের লাশ শনাক্ত করতে ভয় পায়
আমি তাকে ঘৃণা করি
যে ভাই এখনও নির্লজ্জ স্বাভাবিক হয়ে আছে
আমি তাকে ঘৃণা করি
যে শিক্ষক বুদ্ধিজীবী কবি ও কেরানি
প্রকাশ্য পথে হত্যার প্রতিশোধ চান না
আমি তাকে ঘৃণা করি’...
সকাল থেকেই দিনটা থমথমে৷ বাবা সাত দিন হল বাড়ি ফেরেননি৷ বাড়িতে একা মা, যুবতী মেয়ে আছে আর ছ-বছরের ছেলে৷ বাচ্চাটা জানে না বাইরে ঠিক কী হচ্ছে! বাবা কেন বাড়ি ফেরেন না তা-ও তার জানার কথা নয়! মাঝেমধ্যেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে মা আর দিদি কেন চমকে ওঠে, সে সম্পর্কেও তার কোনো ধারণা নেই৷ সে শুধু জানে, কিছুদিন যাবৎ একটা বন্দিজীবন তাকে ঘিরে ধরেছে৷ স্কুলে যাওয়া বন্ধ৷ বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে খেলতে যাওয়া বারণ৷ শুধু স্যাঁতস্যাঁতে দেয়ালের চৌহদ্দির মধ্যেই তার দিন কাটছে৷
এ বাড়ির ভেতরে রোদ ভুলেও উঁকি মারে না৷ সবসময়ই একটা স্থির শীতলতা৷ কেন যেন তার মনে হয়—শীত শীত ভাবটা এ ক’দিনে আরও বেড়েছে৷ আগে এই চত্বরটা সরগরম থাকত৷ ফুচকাওয়ালার দোকানের ভিড়ে, পানের দোকানে, চায়ের ঠেকের জমজমাট আড্ডায় গমগম করত চতুর্দিক৷
কিন্তু বেশ কিছুদিন হল দৃশ্যপটের পরিবর্তন হয়েছে৷ কার অদৃশ্য ইশারায় যেন সন্ধে সাতটার পরই চুড়িসারে পড়ে যায় দোকানের ঝাঁপ৷ শুনশান হয়ে যায় রাস্তা৷ দু-একটা বেওয়ারিশ কুকুরের ‘ভৌ ভৌ’ নিস্তব্ধতাকে আরও বেশি প্রকট করে তোলে৷
কখনো-কখনো অবশ্য গভীর রাতে কিছু বিজাতীয় শব্দ শুনতে পায় ছেলেটা৷ হঠাৎ করেই রাতের থমথমে নৈঃশব্দ্যকে চিরে বেজে ওঠে তীক্ষ্ণ বাঁশি৷ দুমদাম করে কান ফাটানো আওয়াজ! বারুদের উৎকট গন্ধ! দুপদাপ করে কয়েক জোড়া ভারী বুট শব্দ তুলে ছুটে যায়৷ তারপরই ‘দুড়ুম’ করে আরও একটা শব্দ!
ছেলেটা চমকে ওঠে৷ জানলা দিয়ে উঁকি মারতে চায়৷ কিন্তু মা তাকে বাধা দেন৷
—‘ওটা কীসের শব্দ মা?’
ছেলের উৎসুক প্রশ্নের উত্তরে মা তার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলেন—
—‘কিছু না বাবা৷ ছেলেরা বাজি ফাটাচ্ছে৷’
—‘বাজি ফাটাচ্ছে! আজ কি পুজো?’
—‘হ্যাঁ৷’
—‘আমি পুজো দেখব মা...৷’
মা অদ্ভুত আতঙ্কে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেছেন—‘না খোকা৷ এ পুজো দেখতে নেই!’
পুজো কেন দেখতে নেই এ প্রশ্নটা খোকার মাথায় বারবার ধাক্কা মারতে থাকে৷ মা তাকে বুঝিয়ে বললেন যে, এটা বড়োদের পুজো৷ ছোটোদের দেখতে নেই৷ ছোটোরা দেখলে ঠাকুর পাপ দেয়৷ ছেলেটা মায়ের বুকে মাথা রেখে মশারির দিকে তাকিয়ে কতকিছুই না ভাবে৷...বড়ো হয়ে সে বাবার সঙ্গে বড়োদের পুজো দেখতে যাবে৷ বাবা ফিরে এলে বলবে রাত্রে মাঝে মাঝে যে বাঁশি বাজে, সেইরকম বাঁশি কিনে দিতে...দিদিকে মেলা থেকে লাল কাচের চুড়ি কিনে দেবে৷ লাল রং পরলে দিদিকে খুব সুন্দর লাগে...৷
ঘুমে দু-চোখ বুজে আসার আগে ক্ষীণভাবে কানে আসে জানলার বাইরে কাদের যেন ফিসফাস৷ কিছু একটা ঘষটে টেনে নিয়ে যাওয়ার শব্দ! তার ঘুমে অসাড় হয়ে আসা মস্তিষ্ক তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না৷
এমন করেই কেটে যাচ্ছিল দিন৷ ছেলেটার জীবনে তেমন কিছু পরিবর্তন হয়নি৷ তবে তার কৈশোরের স্বভাবজাত কৌতূহলে মনে কিছু প্রশ্ন এসে ভিড় জমাচ্ছিল৷ বাবা কোথায়? কবে বাড়ি ফিরবে? মধ্যরাত্রে কারা যেন এ বাড়ির চতুর্দিকে লঘু পায়ে হেঁটে বেড়ায়৷ ফিসফিস করে কথা বলে৷ ওরা কারা? মা আর দিদি হাসে না কেন? বাইরে বেরোনো বারণ কেন?
অনেক জিজ্ঞাসা করেও প্রশ্নের জবাব কখনও পায়নি সে৷ তার পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না যে, এ আসন্ন প্রলয়ের ইঙ্গিত! কখনও অনুভব করতে পারেনি আজকাল হাওয়াও বড়ো সাবধানে বয়৷ গাছের পাতাও খুব সন্তর্পণে নিঃশব্দে ঝরে পড়ে৷ চতুর্দিক গুমোট হয়ে এসেছে৷ অবধারিতভাবে ঝড়ও আসবেই৷
আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনবহিত ছেলেটা তখন সূর্যোদয়ের ছবি আঁকছিল! কমলা রঙের সূর্য পাহাড়ের মাথায় উঁকি মারছে৷ সাদা বরফে ঢাকা পাহাড় সোনালি হয়ে উঠেছে৷ তার পায়ের কাছে একটা রুপোলি নীল রঙের নদী৷ নদীর জলে সোনা রঙের আভা!
সে রাতেও সে বড়ো যত্ন নিয়ে ছবিটা আঁকছিল৷ কমলা, গোলাপি আকাশে হালকা কালো রং দিয়ে একঝাঁক পাখির উড়ে যাওয়া চিহ্নিত করছিল ছেলেটা৷
হঠাৎ নিঝুম রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিয়ে প্রচণ্ড বোমার শব্দ! বন্ধ দরজার বাইরে কয়েকজোড়া ভারী বুটের কর্কশ আওয়াজ! পরক্ষণেই কড়া নাড়ার পুরুষ শব্দ!
মা আর দিদি চমকে উঠে পরস্পরের দিয়ে ভয়ার্ত দৃষ্টিপাত করছে৷ ছেলেটা ভাবে, ওরা এত ভয় পাচ্ছে কেন? বাবা হয়তো ফিরে এসেছে৷ সে উল্লসিত হয়ে ওঠে৷ বাবা এলে তাকে এই নতুন ছবিটা দেখাবে৷ জানতে চাইবে—কেমন হয়েছে?
দরজায় ফের প্রবল কড়া নাড়ার শব্দ৷ মা কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, ‘কে’?
—‘পুলিশ৷ দরজা খুলুন৷’
মা উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই বাড়িতে যেন ঝড় বয়ে গেল! একদল উর্দিপরা লোক ভেতরে ঢুকে পড়ে গোটা বাড়ি তছনছ করতে লাগল৷ জলের কলশি ভেঙে, বাবার বইয়ের টেবিল উলটে ফেলে, তক্তপোশের চাদর ছিঁড়ে, বালিশ ছুড়ে ফেলে দিয়ে অসম্ভব প্রতিশোধস্পৃহায় কী যেন খুঁজছে৷
মুহূর্তের মধ্যে বাড়িটাকে লন্ডভন্ড করে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত করল তারা৷ কিন্তু যা খুঁজছিল তা হয়তো পেল না৷ ভীষণ আক্রোশে মুখ লাল করে এসে মাকে বলল—‘মাস্টার কোথায়?’
ছেলেটা দেখল মায়ের মুখ শক্ত৷ কঠিন দৃষ্টি অন্যদিকে নিবদ্ধ৷ জোরালো গলায় বললেন—‘জানি না৷’
প্রচণ্ড একটা শব্দ! সে বিস্ফারিত চোখে দেখে যে, উর্দিপরা একটা লম্বা-চওড়া লোক মাকে চড় মারল৷ দাঁতে দাঁত পিষে বলল—‘হারামজাদি! ছেনালিপনা হচ্ছে! মাস্টার কোথায়? কোথায় লুকিয়ে আছে?’
মায়ের গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ৷ ঠোঁট কেটে রক্ত পড়ছে৷ ব্যথায় চোখে জল এসে গেছে৷ তবু সেই জলেই যেন আগুন জ্বলল৷ রুদ্রাণীর মতো অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়েছেন তিনি৷
—‘জানি না৷ জানলেও বলব না৷’
—‘খানকি মাগী!’
আবার একটা জোরালো থাপ্পড়! লোকটা মায়ের চুলের মুঠি চেপে ধরেছে৷ হিড় হিড় করে টানতে বলল—‘চল থানায় চল৷ বেশি চর্বি হয়েছে না? সব চর্বি নামিয়ে দেব শা-লি!’
মা কঁকিয়ে উঠলেন৷ অসহায়ভাবে চুলের গোছা ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছেন৷ কিন্তু পাষণ্ড লোকটার হাত থেকে নিষ্কৃতি নেই৷
আর-একটা লোক চেপে ধরল দিদিকে৷ সে ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল৷ তাকেও মেঝেতে ঘষটাতে ঘষটাতে টেনে নিয়ে চলল ওরা৷ অমানুষিক প্রতিশোধস্পৃহায় অশ্লীল সব গালিগালাজ দিচ্ছিল লোকগুলো৷
—‘ডবকা রান্ডি বাড়িতে পুষেছে শালা! গতরে এত গরম! তোর সব গরম আজ ঠান্ডা করব মাগী৷ নাঙ কোথায় জানো না! মুখ না খুললে চামড়া খুলে নেব! থানায় চল৷ মাস্টার পুলিশ খুন করে লুকিয়ে বেড়ায়৷ আর মাগীরা ছেনালিপনা দেখাচ্ছে!’
ছেলেটা এতক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে দেখছিল৷ ঠিক যেন একটা দুঃস্বপ্ন দেখছে! এমন বাস্তবে হয় না! হতে পারে না! সে তো আজ সকালেও দেখেছে পায়রারা ঝাঁক বেঁধে আকাশে মনের সুখে উড়ে বেড়াচ্ছে৷ আজও কৃষ্ণচূড়া গাছটা ফুলে ফুলে লাল হয়ে আগুন ছড়াচ্ছিল! বিকেলেও তুলসীতলায় প্রদীপ স্নিগ্ধ নীল শিখায় জ্বলে উঠেছে, শাঁখ বেজেছে, ধূপের শান্ত সৌরভে চতুর্দিক ‘ম’ ‘ম’ করেছে৷ তার মধ্যে এই লোকগুলোর আসুরিক অস্তিত্ব কোথায়!
সে ছুটে গিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে৷ যে লোকটা মাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে৷ মায়ের হাত টেনে ধরে কাতর গলায় বলে—‘তোমরা আমার মাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ! ছেড়ে দাও...ছেড়ে দাও৷’
কিন্তু ব্যর্থ প্রচেষ্টা! উদভ্রান্তের মতো সে একবার দৌড়ে যাচ্ছে মায়ের দিকে, আর-একবার দিদির দিকে৷ লোকগুলোর হাত ধরে টেনেও ছাড়াতে পারল না কাউকে৷ নিস্তব্ধ রাত্রির বুক চিরে কতগুলো পাশবিক লোকের উন্মত্ত গালিগালাজ, দুই অসহায় নারীর আর্তচিৎকার আর একটি বাচ্চা ছেলের কান্না ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হল চতুর্দিকে৷
ছেলেটা তখন একজনের পা চেপে ধরেছে৷ হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল—‘আমার মাকে, দিদিকে নিয়ে যেয়ো না...ওদের ছেড়ে দাও...ছেড়ে দাও...৷’
লোকটা এক লাথি মেরে সরিয়ে দিয়েছে তাকে৷ শক্ত বুটের লাথিটা তলপেটে পড়েছে৷ একটা কাতর শব্দ করে ছিটকে পড়ল সে৷ ভীষণ ব্যথা লেগেছিল৷ মনে হচ্ছিল, এক্ষুনি মরে যাবে৷ তবু সামনের পৈশাচিক দৃশ্য অমন শান্ত ছেলেটাকেও হিংসা শিখিয়ে দিল৷ সে উন্মত্ত বনবিড়ালের মতো লোকগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আঁচড়ে-কামড়ে দিচ্ছে৷ যেন পারলে নখ-দাঁত দিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে তাদের!
—‘ছেড়ে দাও...ছেড়ে দাও...আমার মাকে...দিদিকে...ছেড়ে দাও৷’
—‘শুয়োরের বাচ্চা!’
কানের তলায় একটা মোক্ষম ঘুসি৷ চোখে আচমকা অন্ধকার দেখল ছেলেটা! কান বেয়ে তরল, উষ্ণ কী যেন একটা চুঁইয়ে পড়ছে!
সম্পূর্ণ অচেতন হওয়ার আগে টের পেল কতগুলো শক্ত ভারী বুট তাকে নেড়ে-চেড়ে দেখছে৷ কেউ যেন ফিসফিস করে বলে—
—‘মরে গেল নাকি স্যার!’
‘থুঃ’ করে তার মুখে একদলা থুতু ছিটিয়ে দিয়ে বলল আর-একজন— ‘হারামের পিল্লা! বেঁচে থাকলে তো বাপের মতো হারামি হত! মরাই ভালো৷’
তারপর আর কিছু মনে নেই ছেলেটার! কতক্ষণ অজ্ঞান হয়েছিল জানে না৷
শুধু মনে আছে, ভোর রাতে একটা জিপ বাড়ির সামনে ছুড়ে দিয়ে গিয়েছিল দুটো ছিন্নভিন্ন দেহকে! দেহ দুটো তখনও জ্যান্ত ছিল৷ কিন্তু প্রাণহীন৷
মা তারপর থেকে আর কোনো কথা বলেননি৷ চোখের সামনে যে বীভৎস দৃশ্য দেখতে হয়েছিল তা বর্ণনা করার জ্বালা সহ্য করতে হয়নি তাঁকে৷ সে রাতের পর থেকে তিনি মূক, স্থবির পাথরে পরিণত হয়েছিলেন৷
ছেলেটা ঝাপসা চোখে দেখেছিল, দিদি দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে আছে৷ তার শাড়ি ছিন্নভিন্ন, কপালে কালশিটে৷ গলায় জমাট রক্ত৷ কামড়ের দাগ! ঠোঁটের কোণ বেয়ে জমাট রক্তের ধারা শুকিয়ে আছে৷ চুল অবিন্যস্ত৷ ব্লাউজটা ছেঁড়া! শাড়ির নিম্নদেশ রক্তে ভিজে গেছে৷
—‘দিদি!’
কান্নাজড়ানো আর্তসুরে ডেকেছিল সে৷ তার সর্বাঙ্গে ব্যথা৷ তবু কোনোমতে দেহটাকে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে টেনে নিয়ে গেল দিদির কাছে৷ দু-হাতে দিদির ক্ষতবিক্ষত মুখ ধরে ব্যাকুল স্বরে ডেকেছিল—‘দিদি...দিদি...দিদি...৷’
দিদি কোনো উত্তর দেয়নি৷ কেমন যেন শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল অন্যদিকে৷ ভাই তাকে ছেড়ে দিতেই কাত হয়ে পড়ে গেল!
ঠিক তার পাশেই সেই সূর্যোদয়ের ছবিটা পড়ে আছে! সে অসহায় জলভরা চোখে দেখল, কমলা রঙের সূর্য, সাদা সোনালি পাহাড়, রুপোলি নীল রঙের নদী, গোলাপি আকাশ—সব লাল হয়ে গেছে! সব লাল!...
দিদিকে লাল রঙে ভারি সুন্দর লাগত! সেই দিদিই দেহের লাল তরল অংশকে ভীষণ ঘেন্নায় ত্যাগ করেছিল৷ যে দিদিকে লাল চেলি পরলে ঊর্বশী মনে হত, সেদিন সে সাদা হয়ে গিয়েছিল!
‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না
এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না
এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না
এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না৷
বাবা, দরজাটা খুলে দাও—
চাবুকগুলো অনেকদিন বাইরে দাঁড়িয়ে আছে—
আমি এখনও অন্ধকার ঘরে অরণ্যদেব...অরণ্যদেব খেলি
সাদা ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পায়াভাঙা চেয়ারটাকে
সাদা ঘোড়া ভাবি৷
দরজাটা খুলে দাও, ওরা ভিতরে আসুক
কশাঘাতে কশাঘাতে ফিরিয়ে দিক রক্তাক্ত সন্ধ্যা!
বাবা, আমাদের দেশ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে চলে৷
‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে ভারত ভাগ্যবিধাতা’—
যারা তোমার লাশ হয়ে যাওয়া মাংসের পিণ্ডটাকে
জুতোর তলায় চেপটে দিয়েছিল
তারা কি জানত ‘জনগণমন’ কাকে বলে?
যে মাছিগুলো ভনভন করে মুখের রক্ত চেটে খাচ্ছিল,
শুকিয়ে যাওয়া মৃত্যুকালীন রক্তবমি, আর তিন দিনের
পচা-বাসি লাশের দুর্গন্ধে
স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিল তারা!
বাবা, তুমি জানো না, স্বাধীনতা মানে রোজ সকালে বমি করে
অম্ল-পিত্ত উগরে দেওয়া!
স্বাধীনতা মানে—রোজকার হাগু—মুতু,
এক নারীকে মন্থন অথবা ধর্ষণ করে বীর্যপতনের অধিকার৷
অথবা নীলছবি দেখে উত্থিত শিশ্নসবল শীৎকারে হস্তমৈথুন!
ভডকা থেকে রাম, চুমু থেকে সিগারেট,—সব স্বাধীনতা!
শুধু যে বাঞ্চোত বলে ‘আমি আমার মতন দেশে বাঁচতে চাই’
গুলি করে মারো তাকে৷
যে লোকটা শেখায় স্বাধীনতার মানে সবার সমানাধিকার
ঠুঁসে দাও তার পোঁদে পয়েন্ট আটত্রিশ বা বাইশ!
যে হতভাগা তার সন্তানকে একটা
সুস্থ দেশে জন্ম দেওয়ার স্বপ্ন দেখে, তার
লিঙ্গ কেটে দাও—সন্তানের স্বপ্ন যেন সে না দেখতে পারে!
বেচুবাবুদের বলো, ঘর, আসবাবপত্র, এমনকি
নিজেদের মা-বোনকেও বিক্রি করতে;
তবু ভুলেও যেন স্বপ্ন বিক্রি না করে!
ধর্মশিক্ষা, যৌনশিক্ষা সব চলবে৷
সবাই জানুক কীভাবে, ঈশ্বর বানাতে হয়
কীভাবে আর-একটা মূঢ় মানুষের বাচ্চা বানাতে হয়,
সাবান থেকে ন্যাপথলিন—সব বানাতে শেখাও৷
কিন্তু যে হারামজাদা দেশ বানাতে শেখায়
তার গিলোটিনে চড়া নিশ্চিত!
বাবা, দরজাটা খুলে দাও—
তোমার দলামোচা শরীরটা ওরা আজও টেনে আনছে!
ওই পচা-গলা দুর্গন্ধময় লাশ
মাসের পর মাস, বছরের পর বছর...
গাধার মতো টেনেই চলে!
গলে গলে খসে পড়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো
কেটে দেখে বারবার৷
পচা হূদয়, গলিত বৃক্ক, পাকস্থলীর পুতি দুর্গন্ধে গা গুলোয়,
তবু নষ্ট দেহটাকে হাতড়ে হাতড়ে তন্নতন্ন করে খোঁজে
—‘আদর্শটা কোথায়! ফরেনসিক রিপোর্টে তার
কথা তো কেউ লেখেনি!’
বাবা, ওই দরজাটা খুলে দ্যাখো—
এক কিশোর ধানের খেতের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখছে৷
কিংবা ওর চোখ দিয়ে তুমি দেখছ—
দু’চোখে তাচ্ছিল্য, গ্রীবায় ঔদ্ধত্য৷
বুকের ভিতরে তাজা হাওয়া নিয়ে
অঙ্কুরে অঙ্কুরে ছড়িয়ে দিচ্ছে সাম্যবাদের ঘ্রাণ
একদিন তোমাদের মতো করেই সূর্যকে মুঠোয় ধরবে সে
ছুড়ে দেবে জ্বলন্ত প্রতিবাদ
স্টেনগানের তিলক মাথায় নেওয়ার জন্য জন্ম হয়েছে তার৷
প্রতিটা বুলেট বুকে নিয়ে মৃত্যুর পরও প্রশ্ন রেখে যাবে—‘আদর্শ কোথায়?’
শকুনগুলো ওর নিথর দেহ ঠুকরে ঠুকরে খুঁজবে আদর্শ!
আর মাটি ছুঁয়ে জেগে উঠবে আরও একটা স্বপ্নের চারাগাছ৷
বাবা, দরজাটা খুলে দাও৷
চারাগাছটা আমার জন্য বাইরে অপেক্ষা করছে৷’
ছ-বছরের ছেলেটার ব্যথিত চোখ আস্তে আস্তে পূর্ণবয়স্ক হয়ে ওঠে৷ গহন তখনও যেন একচল্লিশ বছর আগেকার দিনটাতে পড়ে আছেন৷ যে দিনগুলোর কথা বারবার ভুলে যেতে চেয়েছেন, যে কষ্টকর গ্লানিময় অভিজ্ঞতার কথা অস্বীকার করার চেষ্টা করেছেন—এক টুকরো কাগজ তাঁকে আবার সেই দিনগুলোতেই ফিরিয়ে নিয়ে গেল৷
তিনি হলুদ কাগজটার দিকে তাকালেন৷ কবিতাটা লিখে নিজেই ফেলে দিয়েছিলেন৷ শুঁটকি কুড়িয়ে নিয়েছে৷ পঁচিশ বছর ধরে নিজের কাছেই আগলে রেখেছিল৷ আজ ফেরত দিল৷
—‘দেখ গহন৷’ শুঁটকি বলেছিল—‘যতই ক্যামোফ্লেজ করিস না কেন, এই হচ্ছিস আসল তুই৷ আমি এতদিন ধরে এটাকে সামলে রেখেছি একটাই কারণে৷ জানতাম, মুখোশ পরে থাকতে থাকতে একসময়ে নিজেই বিরক্ত হয়ে যাবি৷ তখন তোকে এটা দেখাব৷’ তার মুখে একচিলতে হাসি মিঠে রোদ্দুরের মতো ভেসে ওঠে—‘আজ তোকে তোর সঙ্গেই দেখা করিয়ে দিলাম৷ এবার ঠিক কর—কী লিখবি৷ স্লোগান না কবিতা!’
গহন চোখ বুজলেন৷ দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে লুকিয়ে রাখা বড়ো ক্লান্তিকর৷ যতই পালাতে চাও, কোনো-না-কোনোসময় অতীত সামনে এসে দাঁড়াবেই৷ এতদিন তিনি চোখ বুজে সূর্যটাকে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছিলেন৷ এবার সে তার গনগনে উত্তাপ নিয়ে একেবারে মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে৷
হাতের কাগজটাকে টেবিলের ওপর রেখে তিনি উঠে দাঁড়ালেন৷ আস্তে আস্তে বাথরুমে গিয়ে চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিচ্ছেন৷ জলের বিন্দু তাঁর মুখ চুঁইয়ে ঝরে পড়ে৷ সেই জলের ফোঁটাগুলোর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বিন্দু বিন্দু রক্তের ঘ্রাণ পেলেন! এমন ফোঁটা ফোঁটা রক্ত দিদির ঠোঁট বেয়ে পড়ছিল!
বুকের ভেতরে একটা অশান্ত উচ্ছ্বাস! ছ-বছরের ছেলেটার অনুভূতিগুলো আবার ফিরে এল গহনের মধ্যে৷ অনুভব করলেন, হাত-পা কাঁপছে৷ একটা তীব্র অসহায়তা, রাগ, কান্না গলার কাছে জমে উঠেছে৷ চোখটা কড়কড় করছিল৷ গহন চোখে জলের ঝাপটা দিলেন৷ তবু জ্বলুনি কমল না৷ ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জলের বোতল বের করে মাথায়, মুখে ঢেলে দিয়েছেন৷ তা সত্ত্বেও অনির্বাণ জ্বালা ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাক করে দিতে চায়—প্রশমিত হয় না৷ অশান্তভাবে হলঘরে পায়চারি করে বেড়াচ্ছিলেন তিনি৷ কণা যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন৷ তাই যথাসম্ভব নিঃশব্দেই হেঁটে বেড়াচ্ছেন৷
বুকের ভেতরে ভূমিকম্প হচ্ছিল৷ একাত্তর সালের সেই অভিশপ্ত দিনটা পুরোনো ক্ষতকে খুঁড়ে বের করেছে৷ বারবার মনে পড়েছে শুঁটকির কথাগুলো—
—‘আজও তেমন একটা সময় আসছে গহন৷ আবার একটা অস্থির সময়! তার মধ্যে দাঁড়িয়েও চাঁদ-তারা-ফুল-পাখির সৌন্দর্যে নিজেকে জোর করে ডুবিয়ে রাখবি!...’
পাশের বাড়ির নিত্যনৈমিত্তিক চিলচিৎকারে চিন্তাসূত্র ছিঁড়ে গেল গহনের৷ ফের শুরু হয়েছে মারধর! এরপর কী হবে তা জানেন৷ কয়েকদিন আগে স্বচক্ষেই দেখেছেন৷ প্রথমে মার খাবে মেয়েটি, তারপর ধর্ষিত হবে একটা মদ্যপ পশুর হাতে!
দৃশ্যটা কোনোদিন দেখতে চাইতেন না গহন৷ চিরদিন এইসব কুৎসিত ছবিগুলো থেকে চোখ সরিয়ে নিয়েছেন৷ আজও তাই হওয়াই স্বাভাবিক ছিল৷ কিন্তু হল না!
গহন দ্রুত পায়ে চলে গেলেন ছাতে৷ সেখানে দাঁড়িয়েই গোটা দৃশ্যটা দেখলেন৷ অসম্ভব কষ্ট হচ্ছিল৷ অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করছিলেন৷ তবু আগের দিনের মতো চোখ সরিয়ে নেননি৷ স্তম্ভিত, নির্বাক, যন্ত্রণাকাতর দৃষ্টিতে সোজা তাকিয়ে রয়েছেন জানলার দিকে৷
অনেক রাতে, ঘরের আলো নিভে যাওয়ার পর মেয়েটি ফের এসে দাঁড়াল জানলার সামনে৷ ল্যাম্পপোস্টের আলো তার ফুলে ওঠা কপালের কালশিটে, রক্তাক্ত ঠোঁট ছুঁয়ে গেল৷ প্রাণহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে৷
গহন এই প্রথম তার চোখে চোখ রাখেন৷ মনে মনে যেন স্পর্শ করতে চাইছেন তার ক্ষতবিক্ষত মুখকে৷ যেমনভাবে কচি কচি হাত দুটো ছুঁয়েছিল তার দিদির মুখ! মেয়েটির চোখে অবিকল দিদির দৃষ্টি! জাগতিক সবকিছু ছাড়িয়ে কোন অসীমের দিকে যেন অজ্ঞান বেদনায় তাকিয়ে আছে৷
ও-প্রান্তে এক নির্বাক বিস্রস্তবসনা! এ-প্রান্তের মানুষটি কখন যেন পৌঁছে গেলেন একচল্লিশ বছর আগের দিনটায়৷ জলে ভরল তাঁর চোখ! সমস্ত প্রতিরোধ ছাপিয়ে বেরিয়ে এল অসহায় কান্না! দু-চোখে জল নিয়ে, চোয়াল শক্ত করে, দৃঢ় হাতের মুঠোয় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছ’বছরের ছেলে! নিজের দেহে অনুভব করছে দিদির ক্ষতগুলোর যন্ত্রণা! মনে মনে বারবার স্পর্শ করছে সেই নারীকে! আর ডাকছে—‘দিদি...দিদি...দিদি...৷’
‘আ-বে শালা!’
সর্বশক্তি দিয়ে গাড়িতে ব্রেক কষল শুঁটকি৷ বরাতজোরে অল্পের জন্য গাড়ির তলায় চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে গেছে ছেলেটা৷ আর-একটু হলেই ওর আজকে ‘রাম নাম সত্য’ হত!
রোজকার মতোই চশমার দোকান থেকে রাতে ফিরছিল সে৷ গোপালের জন্য একবাক্স আইসক্রিম, চকোলেট, আপেল, আর চিপস কিনেছে৷ মহা ত্যাঁদড় ছেলে৷ কিছু খেতে ইচ্ছে করলেই চালের ড্রাম খুলে একমুঠো কাঁচা চাল মুখে চালান করে দেয়৷ অথবা ভাতের ফ্যান গিলে নেয়৷ যেন মহাসুস্বাদু জিনিস! শত বকেঝকেও তার এই অভ্যাস ছাড়াতে পারছে না৷ তাই এখন কূটনৈতিক রাস্তা ধরেছে শুঁটকি৷ বিকেলে প্রায়ই তাকে পিৎজা, এগরোল, চাউমিন ঘুষ দিচ্ছে৷ ভালো ভালো খাবার খেয়ে যদি তার এই বদভ্যাসটা পালটায়!
আগে শুঁটকির ফ্রিজে মদের বোতল, চানাচুর ছাড়া আর কিছুই থাকত না৷ এখন সেখানে শোভা পাচ্ছে কোল্ডড্রিংকস, ফ্রুট জুস, দুধের বোতল, কেক এবং অন্য রকমারি খাওয়ার জিনিস৷ গোপালের সৌজন্যে মদের বোতল বাড়িতে ঢুকছে না৷ বাচ্চাটা তাকে মদ খেতে দেখলে বাজে শিক্ষা পাবে, এই কথা ভেবেই একদিন সকালবেলায় উঠে সিদ্ধান্ত নিল—‘ধুত্তোর, আর মদ খাবই না৷’ সেদিন থেকে আর মদ স্পর্শও করেনি সে৷ এমনকি সিগারেট খেলেও বাথরুমে লুকিয়ে বা দরজা বন্ধ করে খায়৷ গোপালকে বিশ্বাস নেই৷ বাপ-মা মরা ছেলে৷ এতদিন মাথার ওপরে কেউ ছিল না৷ রাস্তার ছেলেদের সঙ্গেই মিশত৷ কে বলতে পারে, শুঁটকিকে দেখে হয়তো তারও শখ হল সিগারেটে টান মারার! অতএব ‘সাধু সাবধান’৷ ছেলের বাপ হওয়ার ঝক্কি নেহাত কম নয়!
আজও নিয়মমতো মার্কেটিং করে ফিরছিল সে৷ গোপালের দেখাশোনা করার জন্য এক মধ্যবয়স্কা গভর্নেসকেও রেখেছে৷ শুঁটকির দোকানে থাকার সময়টুকু সেই ওকে স্নান করায়, খাওয়ায় দাওয়ায়, পড়ায়৷ শুঁটকি ফিরলে তার ছুটি৷
আজ বেরোতে বেরোতে একটু দেরিই হয়ে গিয়েছিল৷ তার ওপর রাস্তায় জ্যাম৷ কোনোমতে জ্যামটা কাটিয়েই গাড়ি ফুলস্পিডে চালাচ্ছিল৷ ন-টার মধ্যে তাকে বাড়িতে পৌঁছোতেই হবে৷ নয়তো গোপাল না খেয়ে বসে থাকবে৷ বাচ্চা হলে কি হবে, জেদ আছে ছেলের৷
হয়তো সময়মতো বাড়ি পৌঁছোতে বিশেষ অসুবিধেও হত না৷ কিন্তু সব বিগড়ে দিল এই উটকো ছেলেটা৷ কোথা থেকে যেন হুড়মুড় করে এসে টপকে পড়ল গাড়ির ঠিক সামনে!
গাড়িটা কোনোমতে সাইড করেই সে একেবারে তেড়েফুঁড়ে ছুটে গেল ছেলেটার দিকে৷
—‘হারামজাদা! মরার জন্য আমার গাড়িটাই পেয়েছিলি তুই!’ শুঁটকি তাকে এই মারে তো সেই মারে! ছেলেটা চোখ কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে আছে৷ অল্প অল্প টলছেও!
—‘অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গেলে কী হত? তুই তো যমরাজের কোলে বসে হাওয়া খেতিস—আর আমি জেলখানায়!’
ছেলেটার বয়েস বেশি না৷ তাকে বেশ অপ্রকৃতিস্থও লাগছে৷ কোনোমতে বলল—‘আই অ্যাম সররররি! দেখতে পাইনি৷’
তার মুখ থেকে একটা পরিচিত গন্ধ পেল শুঁটকি৷ সে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে ছেলেটাকে মাপছে৷ ব্যাটার শরীর কাঁপছিল৷ ‘দেখতে পাইনি’ বলেই রাস্তার ওপর হড়হড় করে বমিও করে ফেলে৷
শুঁটকি আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে৷ ঠিকই ধরেছে৷ মাতাল! কিন্তু একেবারে নবিশ! সদ্য সদ্যই মদ ধরেছে৷ পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের যুবক৷ ছেলেটার মুখটা মিষ্টি৷ ভারি কচি কচি নিষ্পাপ৷ এ ছেলের মদ খাওয়ার কথা নয়!
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ মাতালরা জাতে রক্তবীজের বংশধর৷ একটা মরলে, আর-একটা জন্মাবে! শুঁটকি নিজে মদ ছেড়ে দিয়ে ভেবেছিল—হয়তো দুনিয়ায় একটা মাতালের সংখ্যা কমাতে পেরেছে! কিন্তু কোথায় কী? সে ছেড়েছে, আর এই ব্যাটা ধরেছে৷
—‘নাম কী?’ শুঁটকি এবার খানিকটা নরম সুরে জানতে চায়৷
—‘উশ্রী!’
সে ছেলেটার নামই জানতে চেয়েছিল৷ কিন্তু উদ্ভট উত্তর পেয়ে হিস্ট্রিটা বুঝতে অসুবিধে হল না তার৷ ছেলেটার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—‘টাইটেল?’
—‘জানি না’৷
—‘থাকে কোথায়?’
—‘জানি না৷’
—‘দিনে ক-বার খায়, কী দিয়ে ভাত মাখে, ক-বার পটি করে, কী সাবান ইউজ করে, ক-বার পার্লারে যায়, কি পেস্ট দিয়ে দাঁত মাজে, চোখে পিচুটি হয় কি না, মাথায় কতটা খুশকি আছে, সর্দির ধাত, পাইরিয়া বা আমাশা আছে কিনা জানিস?’
ছেলেটা কেমন বিস্মিত দৃষ্টিতে তার দিকে দেখছে! যেন শুঁটকি এইমাত্র মঙ্গলগ্রহ থেকে খসে পড়ল! শুঁটকি কিছুক্ষণ চুপ করে তাকে দেখল৷ মনে মনে কিছু স্থির করছে! পরক্ষণেই সপাটে এক থাপ্পড়!
—‘ফা-জ-লা-মি হচ্ছে! যার সম্বন্ধে আর কিছু তো দূর, টাইটেলটাও ঠিকমতো জানিস না তার জন্য মাল খেয়ে বাওয়ালি করছিস৷ গর্দভ৷ ইডিয়ট!’
চড়টা খেয়ে হকচকিয়ে গেল ছেলেটা৷ বিড়বিড় করে বলল—‘ফের শনিদেব!’
—‘কী!’
সে সামলে নেয়! চড় খেয়ে নেশাটা চটে গেছে৷ জেদি উত্তেজিত গলায় বলল—‘আমি শুধু এইটুকু জানি যে আমি ওকে সত্যিই ভালোবাসতাম৷’
—‘বাল ভালোবাসতি!’ শুঁটকি প্রায় তাকে তেড়ে মারতেই যায়—‘সত্যিই ভালোবাসলে ‘ভালোবাসতাম’ বলতি না! বলতি ‘ভালোবাসি’৷ ভালোবাসার কোনো অতীত-ভবিষ্যৎ হয় না৷ এ কি জুতো পেয়েছিস যে পুরোনো হলেই ‘এককালে সত্যিই পরতাম’ বলে অতীত করে দিবি!’
সে একটু থামল৷ কয়েক মুহূর্ত পর ফের নীচু স্বরে বলে—‘বাবা জানে?’
—‘কী?’
—‘তুই মদ খাস৷’
ছেলেটা প্রতিবাদ করে—‘আমি মদ খাই না৷ খাইনি কখনও৷’
—‘তাহলে তোর মুখ থেকে কীসের গন্ধ আসছে? দুধের? আমায় ছাগল পেয়েছিস?’
—‘না৷’ কচি কচি মুখটা দৃঢ় হল—‘আজ খেয়েছি৷’
—‘কেন খেয়েছিস?’
—‘আমি উশ্রীকে ভুলতে চাই...ওকে মন থেকে মুছে ফেলতে চাই...৷’
—‘গা-ড়ো-ল কোথাকার!’ শুঁটকি ধমকে ওঠে—‘কোথাকার অশিক্ষিত রে! মদ খেলে লোকে ভোলে? ছাতা ভোলে! মদ খেলে আরও বেশি মনে পড়ে! যত নেশা করবি, স্মৃতিগুলো বাস্তবকে ছাপিয়ে আরও কাছে আসবে৷ যা ভুলতে চাস, সেগুলোই যখন চোখের সামনে নাচবে—তখন ভালো থাকবি তুই? আর যখন তোর বাপ-মা দেখবে, ছেলে মাতাল হয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে, তখন তারা খুব খুশি হবে—তাই না?’
ছেলেটা তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে৷ তারপরই কথা নেই বার্তা নেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে৷ কান্নার চোটে তার নাকের জল, চোখের জল, মুখের লালা সব মিলেমিশে শার্টে পড়ছে৷
—‘যা বাব্বা! এ তো টোটাল ইমোশনাল!’ শুঁটকি রাগ ভুলে গিয়ে ছেলেটাকে বুকে টেনে নেয়৷ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে—‘কাঁদছিস কেন বাবা! এইটুকুতেই ভেঙে পড়লে চলবে! অ্যাঁ?’
তার আলিঙ্গনের আন্তরিকতায় ছেলেটার বোধহয় আরও কান্না পেয়ে গেল৷ বুকে যখন ব্যথার পাহাড় জমে তখনই একটু উষ্ণ স্পর্শের প্রয়োজন হয়! তার কান্না আরও উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠেছে৷ শুঁটকি তাকে কাঁদতে দিল৷ কাঁদুক৷ কান্না দুঃখকে অনেকটাই তরল করে দেয়৷ প্রাণ ভরে কেঁদে নিক৷
বেশ কিছুক্ষণ কান্নার পর আস্তে আস্তে শান্ত হল সে৷
—‘হয়েছে? এবার মুখ মুছে নে৷ চোখ-মুখের কী অবস্থা করেছিস! জল খাবি একটু?’ মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় ছেলেটা৷
গাড়ি থেকে জলের বোতল বের করে এনে তার চোখে-মুখে জল ছিটিয়ে দিল শুঁটকি৷ কয়েক ঢোঁক জল খেয়ে সে একটু ধাতস্থ হয়৷
—‘নাম কী তোর?’
ক্ষীণস্বরে উত্তর এল—‘মন্দার৷’
—‘মন্দার৷ বেশ নাম৷ বোস৷ তোর সঙ্গে একটু কথা বলি৷’
বলতে বলতেই শুঁটকি রাস্তার ওপরে বসে পড়েছে৷ মন্দারও একদম বাধ্য ছেলের মতো তার পাশে বসল৷ পিচের মসৃণ রাস্তার একদিক আটকে রেখেছে দুটো লোক৷ পিছন থেকে একরাশ গাড়ির অধৈর্য ভোঁ ভোঁ-পোঁ পোঁ-পিঁপ পিঁপ ভেসে এল৷ হেডলাইটের তীব্র আলো চোখে এসে পড়ায় শুঁটকি বিরক্ত হয়—‘ধুর মশাই, ভেঁপু বাজাচ্ছেন কেন? অতখানি রাস্তা ফাঁকা আছে দেখতে পাচ্ছেন না! ওদিক দিয়ে যান!’
একটি অল্পবয়সি মেয়ে ত্রস্তব্যস্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে আসে৷ আতঙ্কিত স্বরে বলে—‘দাদা, এ রাস্তা দিয়ে কি যাওয়া যাবে না? কিছু হয়েছে নাকি?’
—‘না মামণি কিছু হয়নি৷ এটা রাস্তা রোকো নয়৷ ছোট্ট একটা মিটিং...আইমিন গজল্লা৷’ সে কান এঁটো করা হাসি হাসে—‘আসলে এখানে তো আর কোথাও বসার জায়গা নেই৷ সাইডে গাড়ি থামিয়ে গপ্পো মারলে পুলিশ প্রথমে টর্চ মেরে ভেতরের সিন দেখার চেষ্টা করবে৷ দুজন পুরুষ মিলে আর কী সিন করব! জড়াজড়ি-চুম্মাচাটি কিছুই দেখতে পাবে না৷ অতএব ব্যর্থ হয়ে খেপে গিয়ে ফাইন করবে৷ তাই রাস্তাতেই বসে পড়েছি৷’
মেয়েটির মুখে একটা কিম্ভূতকিমাকার এক্সপ্রেশন ফুটে ওঠে৷ যেন শুঁটকি নয়, এক্সহর্স্টিসের ভূত তার সঙ্গে কথা বলছে৷
দুজন মানুষকে সাইডে রেখে হুশহুশ করে বিনাপ্রতিবাদে গাড়িগুলো চলে গেল৷ সবারই এখন বাড়ি ফেরার তাড়া৷ তাই ঝামেলা করতে চায়নি৷ শুঁটকি মন্দারের দিকে তাকিয়ে চোখ টেপে—‘মেয়েটা রাপচিক ছিল—তাই না? বয়েসটা অল্প হলে ওর সঙ্গে একটু ফস্টিনস্টি করতাম৷’
মন্দার বিষণ্ণ—‘জানি না৷ দেখিনি৷’
—‘সে কী! তুই কী রে!’ সে চোখ কপালে তুলে ফেলেছে—‘রাস্তায় চলন্ত গাড়ি দেখতে পাস না! সামনে সুন্দরী মেয়ে দেখতে পাস না৷ পাগল না কবি!’
—‘কবিদের সম্পর্কে এরকম মন্তব্য করবেন না৷’ মন্দার ফোঁস করে ওঠে—‘আমার ভালো লাগে না৷’
শুঁটকি কুলকুল করে হেসে ফেলল—‘শালা, জাতে মাতাল তালে ঠিক! বুঝেছি, তুই কবি৷ এবার বল ঘোঁটালাটা কী?’
মন্দার লোকটাকে চেনে না৷ জীবনে কখনও দেখেনি৷ আর কখনও দেখবে কিনা ঠিক নেই! তবু মনে হল ওর কাছে সব কথা বলা যায়৷ যা এখনও পর্যন্ত কাউকে মুখ ফুটে বলেনি, সেই আন্তরিক ব্যথার কথাও বলে ফেলা যায় এই মানুষটির কাছে৷ এই রাতের বেলায়, মেইন রোডের ওপর বাবু হয়ে বসে কী করছে সে জানে না! কেন বলছে, কীজন্য বলছে তাও জানা নেই৷ শুধু এইটুকুই জানে, এই লোকটির সঙ্গ তার এই মুহূর্তে খুব প্রয়োজন৷
সব ঘটনাই ধৈর্য ধরে শুনল শুঁটকি৷ তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—‘বোঝো! যাকে জানলি না, চিনলি না, ভালোবাসলি না—তার জন্য মাল খেয়ে শহরের রাস্তার ল্যাদ খাচ্ছিস৷’
—‘ভালোবাসিনি৷ কে বলল আপনাকে?’
—‘ভালোবাসার মানে জানিস তুই?’ সে বলল—‘ইন্টারনেটে একজন হরিদাস পাল নামের কবি দু-লাইনের একটা কবিতা পোস্ট করেছিলেন— ‘ভালোবাসা স্বপ্নের মতো, জেগে গেলে মাপা যায় না/ভালোবাসা পটির মতো, বেগে এলে চাপা যায় না৷’ প্রেমের নিয়মই হচ্ছে নিজেকে প্রকাশ করা৷ সে সবসময়ই চিৎকার করে বলতে চায়—‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’৷ সেখানে তুই মেয়েটার কাছেই বেমালুম চেপে গিয়েছিস৷ তাহলে ভালোবাসলি কবে?’
মন্দারের মনে পড়ল স্বপ্নেও কখনও ‘ভালোবাসি’ শব্দটা বলতে পারেনি সে৷ যখনই বলতে চেয়েছে, তখনই কালো, মুষকো লোকটা থাপ্পড় মেরে ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে৷ তবু নাছোড়বান্দা হয়ে বলে—‘কিন্তু আমি তো সবসময়ই ওকে ভালো ভালো গিফট দিয়েছি, ওকে নিয়ে কবিতা লিখেছি...’
—‘কবিতা যে বোঝে না, তাকে নিয়ে কবিতা লেখা, আর শুয়োরকে বিরিয়ানি খেতে দেওয়া—দুইই সমান৷’ শুঁটকি হাসল—‘তা ছাড়া যতদূর শুনলাম, তাতে মনে হল মেয়েটার মাথায় গিফটের দামটা যত ভালোভাবে ঢুকেছে, কারণটা ততটাই মাথার ওপর দিয়ে গেছে৷ তুই তো কবি৷ যে এত সহজ ব্যাপারটাই বোঝে না,—এমন মাথামোটা মেয়েকে বিয়ে করতে যাবি কোন দুঃখে৷’
মন্দার থমকে যায়৷ ব্যাপারটা এভাবে সে ভেবে দেখেনি৷
—‘কবি আর তার বউ হবে টেনিস প্লেয়ারের মতো৷’ সে হাসতে হাসতে বলে—‘কবি এদিক থেকে ‘ঠুক’ করলে সে-ও ওদিক থেকে সমান তালে ‘ঠাক’ করবে৷ বিজনেসম্যান, কর্পোরেট কর্তারা ‘শো-পিস’ নিয়ে ঘর করতে পারে৷ কিন্তু তোর তো বাবা রক্তমাংসের মেয়ে দরকার৷ কাচের সুন্দর মূর্তি নিয়ে কাব্যি করতে পারিস, ঘর করবি কীভাবে?’
বলতে বলতেই সে সিগারেট ধরায়—‘নিজের ওজনটা আগে বোঝ বাচ্চা৷ যে-কোনো শিক্ষিত বা অশিক্ষিত পয়সাওয়ালা লোকের পায়ে তেল মাখাতে অনেকেই চায়৷ পা টিপে দিতে পারে, এমনকি পা চাটতেও পারে৷ তবে সবের পিছনেই কিছু-না-কিছু স্বার্থ থাকে৷ কিন্তু কবি, সাহিত্যিক প্রজাতিটা একটু আলাদা! লোকে তাদের পায়ের কাছে মাথা ঝোঁকায়৷ প্রণাম করে৷ এবং বিনা স্বার্থেই করে৷ এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য বুঝিস?’
মন্দার চুপ করে শুনছিল৷ এতদিন কেউ তাকে এসব বলেনি৷ বাড়িতে বা শুটিংয়ের সেটে ঝাড় খেতে খেতে কখনও মনে হয়নি যে সে আলাদা! কেউ কখনও বলে দেয়নি—‘মন্দার, তুমি স্পেশাল!’
সে কথা বলতেই শুঁটকি মুখ টিপে হাসে—‘এখানেই কবি কেঁদেছেন! একজন বলেছে৷ কিন্তু তুই এমনই বুদ্ধু যে বুঝতেই পারিসনি৷ অথবা গুরুত্ব দিসনি৷’
কার কথা বলছে লোকটা! মন্দারের মাথায় সব তালগোল পাকিয়ে যায়৷
—‘ভালোবাসা নয়, তুই একটা ধাক্কা খেয়েছিস৷ কচি বয়েসে একটা ব্যথা পেয়েছিস৷ সেই ব্যথাকে ব্যবহার কর৷ কবিতা লেখ৷’ সে হেসে ওঠে—‘যন্ত্রণা ছাড়া কি সৃষ্টি হয়? মদ নয়, কবিতা ধর৷ মদ তোকে কষ্ট দেবে! আর কবিতা শক্তি৷ যাকগে, অনেক কথা বলেছি—এবার বল—! তোর বাড়ি কোথায়?’
—‘কেন?’
—‘সারারাত এখানে বসে আড্ডা তো মারতে পারি না৷ নিজে বাড়ি যেতে পারবি? না ড্রপ করে দেব?’
মন্দারের নেশা প্রায় কেটেই গিয়েছিল৷ সে মাথা নাড়ে—‘না, আমি যেতে পারব৷’
—‘গুড৷ বিন্দাস বাড়ি যা! ভালো করে একটা ঘুম দে৷ তারপর কাল সকালে উঠে কথাগুলো মন দিয়ে ভেবে দেখবি৷’
—‘আচ্ছা৷’
সে উঠে দাঁড়ায়৷ শুঁটকিও দাঁড়িয়ে পড়ে জামা-প্যান্ট ঝাড়ছে৷
—‘থ্যাঙ্কস দাদা৷’ মন্দার তার দিকে কৃতজ্ঞতাপূর্ণ দৃষ্টিপাত করে চলে যাচ্ছিল৷ পিছন থেকে ডাক এল—‘এই শোন৷’
সে সচকিত হয়ে ওঠে—‘কিছু বলবেন?’
—‘মেয়েটার বোনটার নাম কি যেন?’
—‘ঊর্মি৷’ মন্দার বিস্মিত—‘কেন?’
শুঁটকি রহস্যময় হাসি হাসল—‘ওর টাইটেল আর ঠিকানা জেনে নিস৷ পারলে বাকি ডিটেলসগুলোও৷ কাজে লাগবে৷ চল বাই৷’
স্তম্ভিত মন্দারকে সেখানেই রেখে হনহন করে চলে গেল সে৷
তার গাড়িটা এক সাইডেই দাঁড় করানো ছিল৷ ড্রাইভিং সিটে বসতেই আচমকা একটা মৃদু মিষ্টি গন্ধ তাকে ছুঁয়ে গেল৷ হাস্নুহানার গন্ধ!
—‘রুমা!’ যুগপৎ বিস্ময় ও আনন্দ মেশানো কণ্ঠে ডেকে উঠেছে শুঁটকি! পাশের সিটে এক নারীর ছায়া ছায়া অবয়ব!
—‘কখন এসেছ?’ সে একটু অনুতপ্ত হয়ে বলে—‘অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছ তাই না? সরি, আসলে ওই ছেলেটা...কি নাম যেন, তাকে জ্ঞান দিতে গিয়েই দেরি হয়ে গেল৷ আজকের ছেলেপুলেগুলোও পারে! শুধু অ্যাট্রাকশনকেই প্রেম ভেবে বসে থাকে৷ তারপর ল্যাং খেয়ে কুপোকাত! আসল প্রেম যে কী জিনিস, তা বোঝার আগেই লাইফ বরবাদ করে ফেলে৷’
বলতে বলতেই হাসল শুঁটকি—‘আসলে কি জানো? আমার কাছে বুবাই, গোপাল—এইসব ছেলেগুলো, সবাই একরকম৷ যদি বুবাই কখনও এরকম কাণ্ড ঘটাত—তোমার, আমার ভালো লাগত? ওই ছেলেটার মা-বাবাও তো আমাদেরই মতো৷ তাই একটু বোঝাচ্ছিলাম৷’
বলতে বলতেই তার চোখে স্বপ্নিল আচ্ছন্নতা ভেসে উঠেছে৷ দু-চোখে ঝলমলে আকাশ নিয়ে সে বলল—‘দেখো রুমা, যেদিন ও সত্যিই প্রেমে পড়বে, সেদিন চতুর্দিক হাস্নুহানার গন্ধে ভেসে যাবে৷ সেদিন ওর রক্তে রক্তে মল্লার বাজবে৷ সেই মুহূর্তটা জীবনে ও কখনও ভুলতে পারবে না...কোনদিনও ভুলতে পারবে না...আমার মতো...যেমন আমি পারিনি...৷’
শুঁটকির মনে হল নারীমূর্তিটা হেসে উঠেছে৷ তার ঠোঁটে ঝলমল করছে খুশির হাসি৷ একটা ছায়া ছায়া হাত শুঁটকির হাত জড়িয়ে ধরেছে৷ যেন বলতে চাইছে—‘আমি আছি৷’
—‘এসো, তোমায় সিটবেল্ট পরিয়ে দিই৷’ সে ছায়ামূর্তিকে বেল্ট পরাতে পরাতে বলে—‘তারপর চলো, বাড়ি যাই৷ আমাদের বাড়ি৷ যেখানে তুমি আছ, আমি আছি, বুবাই আছে আর গোপাল আছে৷’
ছায়ামূর্তি আবার হাসল৷ হাস্নুহানার গন্ধে ভরে উঠল মুহূর্তটা!
দেখতে দেখতে একমাস কেটে গেল৷ আবহাওয়া বদলাল৷ বদলাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি৷ বাজারদর আরও কয়েক ধাপ চড়ল৷ প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে সম্পর্কের দিশা বদলাল৷ জীবন নানা মোড় নিল৷
বদলাল না শুধু কবিতা ডট কম৷ আর তার নিত্যনৈমিত্তিক কাদা ছোড়াছুড়ি৷
—‘কবিতায় অশ্লীল শব্দ ব্যবহারের আমি বিরোধী নই৷ কলোকিয়াল শব্দ, খিস্তি ব্যবহার করেও দারুণ সব কবিতা লেখা যায়৷ কিন্তু এ আবার কী! কবি যেভাবে চ-কার শব্দটি অকারণে ব্যবহার করেছেন তাতে একটা ট্যাক্সিওয়ালারও উত্তেজনা হবে না!’
—‘চ-কার শব্দটিকে কুবলাশ্ব অশ্লীল কেন বলতে চাইলেন বুঝতে পারলাম না৷ এটি যথেষ্ট ভালো শব্দ৷ বাংলা অভিধানে এর অর্থ, শারীরিক মিলন বা সঙ্গম৷’
—‘স্বর্ণাভদা, তাহলে ‘মিলিত হত’ লিখলেই তো ল্যাঠা চুকত৷ ওই শব্দটি ব্যবহার করার দরকার পড়ল কেন? সমস্ত কবিতাটির ভাষা প্রায় রাবীন্দ্রিক৷ হঠাৎ করে তার মধ্যে ফা;নী রায়, মলয় রায়চৌধুরীদের ঢুকে পড়ার কারণ কী! তা-ও আবার একটি শব্দের জন্য! একবারের জন্য ভেবেছিলাম, হয়তো ভুল করে শব্দটি লিখে ফেলেছেন৷ কিন্তু ষষ্ঠ লাইনটি পড়ে চক্ষু চড়কগাছ৷ ওই একই শব্দ ডেলিবারেটলি ফের ষষ্ঠ লাইনে লিখেছেন তিনি৷ এমনকি পরের লাইনেও! নগ্ন নারীর ছবি আঁকা দোষের নয়৷ শুধু পায়ে মোজা পরানোটা মেনে নিতে পারলাম না৷’
কবিতা ডট কমে-এ আজ আবার খামচাখামচি শুরু হয়েছে৷ কবি ‘অন্য কেউ’ একটা কবিতা পোস্ট করেছেন৷ সে কবিতাটা আপাতদৃষ্টিতে বেশ নিরীহ৷ বেশ সুন্দর রাবীন্দ্রিক ছিমছাম রোমান্টিসিজম নিয়ে শুরু হয়েছিল৷ কিন্তু পঞ্চম লাইনে এসেই পিলে চমকে গেল৷
রবীন্দ্রনাথ যদি হঠাৎ জোববা-টোববা ছেড়ে, মাইকেল জ্যাকসনের পোশাকে মুন ওয়াক করতে শুরু করেন তাহলে যা হয় আর কী! রোমান্টিসিজম ও আতুর শব্দাবলি ছেড়ে কবি একেবারে সোজাসুজি চ-কার ব্যবহার করেছেন! আর সেটা নিয়েই স্বর্ণাভ গুপ্ত অ্যান্ড কোং-এর সঙ্গে কুবলাশ্বর অবধারিত ঠোকাঠুকি৷
মন্দার নিজেও কবিতাটা পড়ে আঁতকে উঠেছিল৷ খিস্তি দেওয়া, গালিগালাজ দেওয়া বুদ্ধিদীপ্ত কবিতা সে অনেক পড়েছে৷ দেখেছে সে কীভাবে কলোকিয়াল, তথাকথিত ‘অশ্লীল’ শব্দকেও শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়৷ কিন্তু এমন গোদা পদ্ধতিতে সুড়সুড়ি দেওয়ার প্রচেষ্টা দেখে, সে হাসবে না কাঁদবে ভেবে পাচ্ছিল না৷
—‘কুবলাশ্ব কি আগে কখনও কবিতায় অশ্লীল শব্দের প্রয়োগ দেখেননি? তাঁকে হাংরি জেনারেশনের কবি মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা পড়ে দেখার অনুরোধ করছি৷ কবি ব্রাত্য রাইসুর একটি কবিতার লাইন যদি—‘ঘরের ভিতর ভাউয়া ব্যাঙে করছে চোদাচুদি’ হতে পারে, তবে ‘অন্য কেউ’ কি দোষ করেছেন?’
—‘স্বর্ণাভদা, কবি মলয় রায়চৌধুরীর যে বিশেষ কাব্যগ্রন্থের দিকে ইঙ্গিত করছেন, সেই ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’, আমিও পড়েছি৷ সমস্যাটা মলয় রায়চৌধুরী বা ব্রাত্য রাইসুর কবিতা নিয়ে নয়৷ যে কবি লেখেন—‘কেন আমি পিতার আত্মমৈথুনের পরে তার পেচ্ছাপে বয়ে যাইনি/কেন আমি রজস্রাবে মিশে যাইনি শ্লেষ্মায়’ সেই কবি কখনোই দাবি করেননি যে তিনি মাইকেল মধুসূদনের বংশধর৷ কবি ব্রাত্য রাইসুর যে কবিতাটির কথা আপনি বলেছেন, সেই কবিতার কাব্যগ্রন্থটির নাম থেকেই কবি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তিনি স্বভাব ফিচেল৷ যাঁর কাব্যগ্রন্থের নাম ‘আকাশে কালিদাসের লগে ম্যাঘ দেখতাসি’, তিনি এমন কবিতা লিখবেন তাতে আর আশ্চর্য কী! যাঁর কবিতার লাইন এরকম—‘কাউয়া বলে কা-কা/কলা বলে কলা খা’ কিংবা ‘চেয়ার বহনকারী দুইজন নারী/চেয়ারের চেয়ে তারা ভারী...’ তিনি যতই কালিদাসের সঙ্গে মেঘ দেখুন, নিজেকে কালিদাসের রি-ইনকারনেশন বলেননি৷ তাই তাঁর ফিচেল মুড বা রাইটিং স্টাইলে ‘ভাউয়া ব্যাঙের চোদাচুদি’ চলে যায়৷ কিন্তু কবি ‘অন্য কেউ’ যেভাবে পাইরেটেড রবীন্দ্রনাথ হওয়ার ভণ্ডামি দেখান সেখানে হঠাৎ চ-কারের অনুপ্রবেশ সহ্য হয় না!’
মন্দার হাঁ! ‘কুবলাশ্ব’-কে ভালো লাগত বটে৷ কিন্তু সে যে স্বর্ণাভ গুপ্ত’র মতো আঁতেলকেও শুইয়ে দেওয়র ক্ষমতা রাখে তা জানা ছিল না৷ এতদিন লোকটার প্রতি তার একটা অদ্ভুত ভালো লাগার অনুভূতি ছিল৷ এবার যুক্ত হল শ্রদ্ধা! লোকটা রীতিমতো শিক্ষিত৷ হয়তো মন্দারের চেয়েও বেশি পড়াশোনা করা মানুষ!
এবার উলটে পড়া গুরুদেবকে টেনেটুনে তোলার জন্য মগনলাল এসে হাজির হয়েছে—‘কুবলাশ্ব আসলে কী বলতে চান? তাঁর কোনটায় আপত্তি? কবিতাটায় না শব্দটায়?’
কুবলাশ্ব নিশ্চয়ই উত্তর দিত৷ কিন্তু তার আগেই তাকে কভার করল ‘একা মেঘ’৷
—‘মগনলাল, আপনি কি এতক্ষণ ঘুমোচ্ছিলেন? না কুবলাশ্ব হিব্রুভাষায় কথা বলছেন? যে-কোনো রচনার একটা নিজস্ব ভাষা থাকে৷ এখানে প্রথম কয়েকলাইন এতটাই মসৃণ যে আচমকা বিশেষ পাঠক হোঁচট খাচ্ছে৷’
মন্দারও আর থাকতে পারল না৷ সে ‘রামহনু’ হয়ে নেমে পড়ল যুদ্ধক্ষেত্রে—‘মেঘদা আপনি শুধু হোঁচট খেলেন! আমি যে চেয়ার থেকে পড়েই গেনু!’
প্রতিপক্ষ ক্রমশই শক্তিশালী হয়ে উঠছে দেখে স্বর্ণাভ-র দলবলও তেড়ে আসে৷ স্বর্ণাভ-র অতিপ্রিয় ই-ভগিনী ‘তুর্কি’ এমনিতে মহা নাকউঁচু মহিলা! নিজের কবিতা দিয়ে আপামর জনগণকে ধন্য করাই তার স্বভাব৷ আর বেছে বেছে নিজেদের দাদাদের কবিতাতেই মন্তব্য করে৷ তথা পিঠ চুলকায়৷ অন্য কারুর কবিতা পড়েও দেখে না!
এই সাইবার কবিতা জগতে মেয়েদের বড়োই সুবিধা৷ মেয়ে কবির সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম বলে মেয়েরা কবিতা লিখলেই ছেলেরা প্রশংসা করার জন্য লাফিয়ে পড়ে৷ যতই ‘ঝুলস্য ঝুল’ লিখুক না কেন, সবাই মিলে ‘বাঃ বাঃ’ বলে হাওয়া দিতে থাকে৷
তুর্কি তেমনই গরম হাওয়ায় ভরা ফানুস! মাঝেমধ্যে ওর ওই ফোলানো পশ্চাদ্দেশে পিন ফুটিয়ে দেওয়ার লোভ হয় তার৷ আজকে আচমকা সে সুযোগ জুটেও গেল৷
—‘কবির কি শব্দচয়নের স্বাধীনতা নেই! তিনি হয়তো মোলায়েম শব্দগুচ্ছ ছেড়ে এক্সপেরিমেন্টাল কিছু করতে চেয়েছেন৷ আমার মনে হয় এই প্রচেষ্টা যথেষ্টই গঠনমূলক৷’
তুর্কি যে স্বর্ণাভদেরই সাপোর্ট করবে তা জানাই ছিল৷ মন্দার ‘রামহনু’ হয়ে লিখল—‘তুর্কিদেবী, এক্সপেরিমেন্ট করতে হলে শুরু থেকেই সেটা করা উচিত৷ কবিতার মাঝখানের শুধু একটি শব্দের ওপরই তাকে এক্সপেরিমেন্ট করতে হল? এ কেমন এক্সপেরিমেন্ট! বঙ্কিমচন্দ্র যদি এমন এক্সপেরিমেন্ট করে কখনও লিখতেন—প্রাতঃকালে মুখপ্রক্ষালনাদি সমাপন করিয়া, ভোজন পর্ব সমাধা করিয়া, অশ্বারোহণ পূর্বক অবন্তীনগরে প্রত্যাবর্তন মাত্রই ক্লান্তদেহে বৃক্ষতলে ধপ্পৎ কইরা হুইয়া পড়লাম,—তাহলে সেটা কি জাতীয় ইতিবাচক এক্সপেরিমেন্ট হত?’
তার কথাকে সমর্থন করেই কুবলাশ্ব দাঁত বের করা একটা স্মাইলি দিয়েছে৷ মন্দার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হাসল৷ মনে মনে বলে—‘চলো গুরু একসঙ্গে লড়ি৷’
এই নিয়েই বেশ কিছুক্ষণ আকচাআকচি চলল৷ কুবলাশ্ব চিরকালই ভালো লড়িয়ে৷ কিন্তু একা মেঘ আর রামহনুও যেন আজ রুদ্রমূর্তি ধরেছে৷ স্বর্ণাভ’র দল তখন পালানোর পথ পাচ্ছে না!
অবশেষে কবি ‘অন্য কেউ’ স্বয়ং আবির্ভূত হলেন৷ বললেন—‘আসলে আমি বাংলা ভাষায় ঠিক সড়গড় নই৷ ইনফ্যাক্ট দীর্ঘ তিন বছর ধরে একটা বাংলা কবিতাও লিখিনি৷ ইংলিশ ইজ মোর কমফর্টেবল৷ ইংরেজির শব্দভাণ্ডার অনেক সমৃদ্ধ৷ আমি কবিতাটায় রাফ রাস্টিক টাচ আনতে চেয়েছিলাম৷ কিন্তু বাংলা ভাষায় তেমন শব্দ খুঁজে পেলাম না’৷
ন্যাকামি দেখে মন্দারের মাথা গরম হয়ে গেছে৷ সে খটখট করে টাইপ করে—‘এটা কি জাতীয় ঢ্যামনামি? বাংলায় রাফ অ্যান্ড রাস্টিক শব্দ নেই! স্বর্ণাভদা একটু আগেই মলয় রায়চৌধুরীর রেফারেন্স দিচ্ছিলেন কুবলাশ্বকে৷ আপনাকে দেননি? আর বাংলা ভাষার প্রতি যদি এতই অনীহা তবে বাংলা কবিতা লিখতে আসেন কেন?’
এবার বোধহয় ‘অন্য কেউ’ কেঁদেই ফেলেছেন৷ লিখলেন—‘ও খুড়ো, কেন আমায় বারবার লিখতে বলো! দেখছই তো আর কবিতা লিখতে পারি না৷ এ গালাগালি আর সহ্য হয় না!’
তুর্কি একেবারে বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী—‘ঢ্যামনামি! একজন কবিকে এ কি জাতীয় বিশেষণ দেওয়া হচ্ছে! আমি অ্যাবিউস রিপোর্ট করছি৷’
স্বর্ণাভ লিখল—‘আমিও অ্যাবিউস রিপোর্ট করছি৷’
যা! নালিশ কর৷ নালিশ করে বালিশ পাবি! মন্দার কম্পিউটারকে টার্ন-অফ করে দেয়৷ সে জানে এরপর কী হবে৷ ‘অন্য কেউ’ নাকে কেঁদে বেড়াবেন, আর মডারেটর ব্যাসদেব তাঁর পিছনে পিছনে টিস্যুর দলা নিয়ে ঘুরবেন৷
বাইরে তখন ফটফটে রোদ আমগাছের পাতায় পাতায় লুকোচুরি খেলছিল৷ তার মধ্যে একটা লম্বা নারকেল গাছের শান্ত ছায়া ঝিরঝির করে এসে পড়েছে৷ সেদিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে গেল মন্দার৷ প্রায় একমাস হয়ে গেল সে স্ক্রিপ্ট-রাইটারের কাজ ছেড়ে দিয়েছে৷ সেদিন যে লোকটা মাঝপথে প্রায় দেবদূতের মতো এসে হাজির হয়েছিল, তার প্রতিটি কথা পরদিন মন দিয়ে ভেবে দেখেছে৷ ভাবতে ভাবতেই সে অদ্ভুতভাবে আবিষ্কার করেছিল নিজেকে৷ আবিষ্কার করেছিল এগারোশো স্কোয়্যার ফিটের ফ্ল্যাট, ব্যাংক ব্যালেন্স, গাড়ি—কোনোটাই তার নিজের স্বপ্ন ছিল না! এর কোনোটাই সে আসলে চায়নি৷ উশ্রীকেও ভালোবাসেনি৷ ভালোবাসার জন্য যতখানি চেনার প্রয়োজন, ততটা পরিচয় কখনোই উশ্রীর সঙ্গে তার হয়নি৷ সে শুধু একটা মোহ ছিল৷ যেমন ওয়ার্ল্ডকাপ জেতার উন্মাদনা৷ একটা সোনালি-রুপোলি কিংবা প্ল্যাটিনামের সুদৃশ্য কাপ! জেতার আগে মনে হয় কী দুর্মূল্য জিনিস! অথচ জেতার পর সেটার মূল্য শুধু শো-কেসই বোঝে৷
উশ্রী মন্দারের কাছেও তেমনই৷ একটা সুদৃশ্য অধরা কাপ! যাকে জয় করার জন্য এগারোশো স্কোয়্যার ফিট, গাড়ির স্বপ্ন দেখতে বাধ্য হয়েছিল সে৷
ওই সিড়িঙ্গে লোকটা তার জীবনে এসে পড়ে বুঝিয়ে দিয়ে গেল, প্রেম আর উন্মাদনা দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস! জানিয়ে গেল যে কবির সবচেয়ে বড়ো মাহাত্ম্য এগারোশো স্কোয়্যার ফিটে নয়! তার ছোট্ট আসনে সে নিজেই মহান৷
যেদিন মন্দার চাকরি ছাড়ল, ছেড়ে দিল উশ্রীকে—সেদিন মনে হয়েছিল বুক থেকে একটা বিরাট পাথর নেমে গেল! টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপোয় দাঁড়িয়ে বুক ভরে উন্মুক্ত জীবনের শ্বাস নিয়েছিল সে৷ আর পৌঁছানোর তাড়া নেই, পান্ডা তথা পেন্ডুলামের দাঁত খিঁচুনি নেই, বোকা বোকা ডায়লগ লিখে আর আত্মধিক্কারে ভুগতে হবে না৷ ‘কবি’ বলে কেউ তাকে অপমান করবে না৷ কাউকে পাওয়ার জন্য টাকার পিছনে র্যাটরেসে নামার আর দরকার নেই৷
তবে চাকরি ছেড়ে সে একেবারে হদ্দ বেকার হয়ে বসে নেই৷ চাকরিটা ছেড়ে দেওয়ার তিনদিন পরেই একটা অজানা নম্বর থেকে ফোন এল মন্দারের মোবাইলে৷
—‘হ্যালো৷’
ও প্রান্তে রহস্যময়ী নারীকণ্ঠ—‘বলো তো কে?’
মন্দার নিজেই আশ্চর্য হয়ে গেল৷ এ গলা তার চেনার কথাই নয়! কারণ গলার মালিক কোনোদিন তাকে ফোন করেনি৷ কিন্তু এই দুষ্টু দুষ্টু হাসিমাখা গলাটাকে চিনতে তার কোনো অসুবিধেই হল না!
—‘ঊর্মি! তুমি!’
—‘ইয়েস স্যার৷’ ঊর্মি ওপ্রান্তে সজোরে হেসে উঠেছিল—‘আমার টিফিনবক্সটা তোমায় খুব মিস করছে৷ তাই ভাবলাম, খবর নিই৷ কেমন আছ?’
—‘চাকরি ছেড়ে একটা দামড়া ছেলে বাপের হোটেলে যেমন থাকে—তেমনই আছি৷’
ঊর্মি ফের হাসল—‘তার মানে তুমি খই ভাজছ!’
—‘হ্যাঁ, ভাজছি৷ খাবে তো চলে এসো৷’
সে যেন এই প্রস্তাবটার জন্য তৈরিই হয়েছিল৷ প্রায় তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বলল—‘ঠিকানাটা বলো৷ এক্ষুনি আসছি৷’
মন্দারকে স্তম্ভিত করে সত্যি সত্যিই সেদিন তার বাড়ি চলে এসেছিল ঊর্মি৷ তাকে দেখে প্রথমেই ‘থ’ হয়ে গিয়েছিল সে৷ চিনতেই পারেনি! বরং প্রথমে উশ্রী ভেবেই ভুল করতে যাচ্ছিল৷ অবিকল একইরকম দেখতে৷ শুধু চুলের স্টাইলটা অন্যরকম, আর চেহারাটা একটু বাল্কি! এ ছাড়া দুজনের চেহারায় কোনো বাহ্যিক তফাত নেই! এ মেয়েটা এমন সুন্দরী! তবে ওরকম বিটকেল জামাকাপড় পরে থাকত কেন?
মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়েছিল মন্দার৷ তাকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে হেসে ফেলে ঊর্মি৷ মন্দার তখনই বুঝল—উশ্রীর পক্ষে এমন হাসি হাসাই সম্ভব নয়৷ চোখে সপ্রতিভ অথচ শান্ত গভীরতা, হাসিতে স্নেহ-মমতা ঝরে পড়ছে—ঊর্মিকে উশ্রীর চেয়ে অনেক বেশি সুন্দরী মনে হল তার!
অথচ এই মেয়েটা দিনের-পর-দিন মাথায় ওড়না বেঁধে, ভুরু ঢাকা মোটা ফ্রেমের চশমা পরে, ঢলঢলে আউটফিট পরে বসে থাকত! নিজের সৌন্দর্যকে একটা আবরণের পিছনে লুকিয়ে, সুন্দরী দিদির পাশে নিজেকে অসুন্দর প্রমাণ করার চেষ্টা করত৷
—‘তুমি তো একদম...৷’
—‘উশ্রীর মতো দেখতে৷ তাই না?’ খিলখিল করে হেসে ওঠে ঊর্মি— ‘আগেই তো বলেছিলাম, আমাদের দু-জনকেই একরকম দেখতে৷ শুধু বাইরের লোক বুঝতে পারে না৷’
—‘কী করে বুঝবে?’ সে বলল—‘মাথায় ফেট্টি বেঁধে, নাকে পাঁউরুটি ফ্রেমের চশমা চাপিয়ে, ভুরু ঢেকে, তাঁবুর মতো সালোয়ার কামিজ পরে বসে থাকলে বোঝাও সম্ভব নয়৷’
উত্তরে ঊর্মি মুখ টিপে হাসে—‘তাহলে দেখো, সৌন্দর্য ব্যাপারটা কতটা আপেক্ষিক৷ আউটফিটের সঙ্গে সঙ্গে রং বদলায়৷’
কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে দিব্যি মা, বাবা আর টিকলির সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলল৷ আধঘণ্টা পর মায়ের তৈরি ব্রেড রোলে কামড় দিতে দিতে মন্দারের বিছানায় দিব্যি ঠ্যাং তুলে ঠাকুরানির মতো বসে বলল—‘তারপর চাকরি-বাকরি ছেড়ে কী করবে ভেবেছ?’
—‘আপাতত ঘাস সাপ্লাই করা ছাড়া আর তো কোনো অপশন দেখছি না৷’
—‘হুমমম...ব্রেড রোলটা দারুণ৷’ মন্দারের চোখের সামনেই গোটা প্লেটটাই একা সাবাড় করে দিয়ে বলে ঊর্মি—‘ঘাস সাপ্লাইটা মেইন বিজনেস হিসাবে রাখতে পারো৷ তবে তার সঙ্গে একটা পার্ট-টাইম জব করলেও মন্দ হয় না৷ তোমারও খারাপ লাগবে না৷ আর-একজনেরও উপকার হয়৷’
—‘কীরকম?’
ঊর্মি তখনই তাকে অফারটা দিয়েছিল৷ তার এক কাকা নামকরা একটি পাক্ষিক পত্রিকার এডিটর৷ ওই পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে বাংলা সাহিত্যে পারদর্শী ছেলে-মেয়ে লাগবে৷ সপ্তাহে পাঁচদিন অফিস৷ সময়ের তেমন কড়াকড়ি নেই৷ শনি-রবিবার ছুটি৷
—‘কিন্তু হঠাৎ আমাকে নিয়ে পড়লে কেন...? তুমিও তো চাকরিটা করতে পারতে৷’ মন্দার বলে—‘নাকি সারাজীবনই উশ্রীর সেক্রেটারির চাকরি করে যাবে!’
—‘একদম না৷’ ঊর্মি হাসল—‘আমি কারুর সেক্রেটারি নই, বরং হোম মিনিস্টার হওয়ার তালে আছি৷ তা ছাড়া ওসব চাকরিবাকরি আমার পোষাবে না৷’
—‘তাহলে কী পোষাবে?’
—‘আপাতত আর-একটা ব্রেড রোল৷’ ঊর্মি ধনুকের মতো ভুরু নাচায়—‘হবে?’
ঊর্মির ধাক্কা খেয়েই কপাল ঠুকে কাজটার জন্য অ্যাপ্লাই করে দিয়েছিল মন্দার৷ ছোটোবেলা থেকে বাংলা-ইংরেজি দুটো ভাষাই তার সমান দখলে৷ চাকরিটা পেতেও বিশেষ অসুবিধে হয়নি৷ দারুণ ইনটারভিউ দিয়েছিল৷
আপাতত সেই কাজটাই করছে সে৷ স্যালারি খুব বেশি নয়৷ তবে ভদ্রস্থভাবে চলে যাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট৷ কিন্তু কাজটা করতে খুব ভালো লাগছে৷ বিশেষ করে কবিতার বইয়ের রিভিউ-এর দায়িত্বটা নিয়ে সে খুব খুশি৷ কত নামকরা কবি, সাহিত্যিকের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হচ্ছে৷ তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হচ্ছে!
একমাস আগে যখন উশ্রীর প্রত্যাখ্যানে ব্যথিত হয়ে মদ খেয়ে মাতলামি করছিল, তখন কি জানত জীবন এভাবে সুন্দর একটা বাঁক নেবে! ওই লোকটা আচমকা এসে থাপ্পড় না মারলে সে হয়তো আজও মাতাল হয়ে কোনো নর্দমার পাশে পড়ে থাকত৷ জীবন এমন সুন্দর—তা জানা হত না৷ বন্ধুত্ব এত সুন্দর তাও অজানা থাকত৷ ঊর্মির বন্ধুত্ব, নিজের মনের মতো কাজ করার আনন্দ—কোনোটাই পেত না সে৷
আজকাল স্বপ্নে শনিদেব এসেও আর হামলা করছেন না৷ সব মিলিয়ে বড়ো শান্তিতে আছে মন্দার৷ সবকিছুই ভালো লাগছে৷ এমনকি টিকলির ভয়ংকর এক্সপেরিমেন্টাল ডিশগুলোও খুব সুস্বাদু মনে হয়৷ অফিস থেকে ছুটি হওয়ার পর ঊর্মির সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফুচকা বা কুলফি খেতে ভালো লাগে৷ ভালো লাগে তার সঙ্গে পার্কে বসে চিনেবাদাম চিবোতে৷ সে বীরপুঙ্গবের মতো জানায় আজকে কোন কোন কবিকে রিভিউতে একহাত নিয়েছে৷ ঊর্মি মুখে সস্নেহ হাসি নিয়ে সব শোনে৷ আবার মন্দারের কথা শুনে সে ‘কবিতা ডট কমের কবিতাও’ পড়তে শুরু করেছে৷ সে বিষয়ে আলোচনা হয়৷
সব মিলিয়ে সময়টা বড়ো সুন্দর৷ যে কন্ডাক্টারটা রোজ রেজগি নিয়ে ঝামেলা করে, কখনো কখনো তাকেও চুমু খেতে ইচ্ছে করে মন্দারের! নেহাত সেটা সম্ভব নয় বলে চেপে গেছে৷
নারকেল গাছের তিরতিরে ছায়াটার দিকে তাকিয়ে আপনমনেই নিজের কথা ভাবছিল সে৷ এত সুখ, এত আনন্দ হঠাৎ কোথা দিয়ে এল! একমাস আগেও যে জীবনটাকে ফ্যাকাশে মনে হচ্ছিল, সে কোথা থেকে এত রং নিয়ে এসে হাজির হল! জীবন কি এমনই! কোথায়, কোন বাঁকে কি লুকিয়ে রাখে—তা কেউ জানে না!
আরও কি কি ভাবত কে জানে, কিন্তু তার আগেই মোবাইল সশব্দে বেজে উঠেছে৷ মন্দার ডিসপ্লেতে চোখ রাখল৷ ঊর্মির ফোন৷
—‘হ্যাঁ, বলো৷’
ওপ্রান্ত থেকে ঊর্মির উচ্ছ্বাসিত স্বর ভেসে আসে—‘শিগগির হোটেল ব্লু স্টারে চলে এসো৷ দারুণ খবর আছে৷’
—‘কী খবর? তুমি বিয়ে করছ?’
—‘ধ্যাৎ!’ ঊর্মি ঝাঁঝিয়ে উঠেছে—‘তুমি একটা গাগোল৷ তাড়াতাড়ি এসো বলছি৷’
—‘গাগোল!’ মন্দার বিস্মত—‘সেটা কী!’
—‘গাড়োল আর ছাগলের মিক্সচার৷ তুমি আসছ কিনা! আমি আর আধঘণ্টা অপেক্ষা করব৷ তারপর স্ট্রেট তোমার বাড়ি চলে যাব৷’
—‘কী এমন সুখবর যে আর তর সইছে না!’ মন্দার ফিচেল হাসি হাসে— ‘কোনো হতভাগা তোমার প্রেমে পড়েছে নাকি!’
—‘ডোন্ট টক রাবিশ৷ আমি রাখছি৷ তোমার হাতে আর আধঘণ্টা সময় আছে৷ হারি আপ৷’
‘হারি আপ’ শুনে মন্দার প্রায় হ্যারি পটারের ঝাঁটার মতোই দ্রুতবেগে ‘ব্লু স্টারে’ পৌঁছোল৷ ঊর্মির সব ভালো৷ কিন্তু বড্ড জেদি! সময়মতো না পৌঁছালে হয়তো সত্যি সত্যিই বাড়ি এসে হামলা করবে৷ আজ দুপুরে মা কষিয়ে চিকেন রান্না করেছে৷ সে আবার ভয়ানক খেতে ভালোবাসে৷ মাকে ‘কাকিমা...কাকিমা’ করে পটিয়ে-পাটিয়ে ঠিক মুরগির ঠ্যাংটা বাগাবে! মন্দার তার জাঙিয়াও লোকের সঙ্গে শেয়ার করতে পারে—কিন্তু মুরগির ঠ্যাং নয়৷
অগত্যা ‘ব্লু স্টারে’ গেল সে৷ মানে যেতেই হল তাকে৷ হোটেলের বাইরে পিংক কালারের কুর্তি আর ব্ল্যাক জিনস পরে দাঁড়িয়ে আছে ঊর্মি৷ আজকে সে বেশ সেজেছে৷ চোখে লাইনার৷ গালে গোলাপি আভা৷ ঠোঁটে মেরুন রঙের লিপস্টিক৷
—‘কী ব্যাপার! এমন মাঞ্জা মেরেছো যে!’
—‘বলছি...বলছি...’ ঊর্মি আঙুল নেড়ে বলল—‘তার আগে কাকিমাকে ফোন করে বলে দাও যে, তুমি আজ বাড়িতে লাঞ্চ করবে না৷’
যাত্তারা! মন্দার মনশ্চক্ষে দেখতে পেল রান্না করা মুরগিটা তার আস্ত ঠ্যাং নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে!
—‘কেন?’
—‘কারণ তুমি আর আমি আজ ব্লু স্টারে লাঞ্চ করব...৷’
—‘বাট...!’
—‘নো বাট...নো ইফ...জাস্ট সেলিব্রেশন...৷’
সেলিব্রেশন! কীসের সেলিব্রেশন! গোটাটাই মাথার ওপর দিয়ে গেল! মেয়েটা কি পাগল হয়ে গেছে!
—‘আর ইউ ও কে ঊর্মি?’ সে ভয়ে ভয়ে জানতে চায়৷
—‘নো৷ আই অ্যাম নট ওনলি ও কে৷’ ঊর্মি দু-চোখ বুজে বলল—‘আই অ্যাম ভেরি ভেরি মাচ ও কে৷’
‘ও কে’-র আগে এতগুলো ‘ভেরি...ভেরি...ভেরি’-র ভেরী বাজছে কেন কে জানে! মন্দার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারে না! মেয়েটা বোধহয় সত্যিই পাগল হয়ে গেছে!
—‘ব্যাপারটা কী একটু খোলসা করে বলবে?’
—‘ব্যাপার এই...৷’ নাটকীয় ভঙ্গিতে একটা চকচকে ম্যাগাজিন মন্দারের দিকে এগিয়ে দিয়েছে ঊর্মি৷ মন্দার দেখল সেটা ‘স্বদেশ’-এর তাজা সংখ্যা৷
—‘হ্যাঁ৷ স্বদেশের এবারের সংখ্যাটা এখনও আমি পাইনি৷’ সে অবাক হয়ে বলে—‘কিন্তু এটা দেওয়ার জন্য এমন তাড়া মেরে আমাকে টেনে আনলে৷ আমি তো কাল-পরশুই এটা পেয়ে যেতাম...৷’
বলতে বলতেই মন্দার বিরক্তিমাখা মুখে ‘স্বদেশের’ প্রথম পাতাটা খোলে৷ ঊর্মির এ কী জাতীয় রসিকতা! শুধু এই পত্রিকাটা দেওয়ার জন্য এমন হুড়ো মারল৷...পাগল না...
ভাবতে ভাবতেই সে থমকে গেছে! একি! পত্রিকাটার মাথায় লেখা ‘কমপ্লিমেন্টারি কপি!’ ভেতরে একটা খাম গোঁজা৷
—‘এটা কী?’
—‘খুলে দ্যাখো৷’
মন্দার তখনও বুঝতে পারেনি ঘটনাটা ঠিক কী ঘটছে৷ কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো খামটা খুলে দেখল তার ভেতর পাঁচশো টাকার একটা চেক! পাঠিয়েছে ‘স্বদেশ’ কর্তৃপক্ষ৷ প্রাপকের নাম মন্দার ভট্টাচার্য!
সে স্তম্ভিত! তার আঙুল কাঁপছে৷ ‘স্বদেশ’ তাকে চেক পাঠিয়েছে! কেন? কীজন্য?
দ্রুত হাতে কবিতার পাতা খুলে ফেলেছে ঊর্মি৷ কবিতার পাতার প্রথম কবিতাটার ওপর আঙুল রেখে বলল—‘দ্যাখো৷’
মন্দারের শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যায়! সে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না৷ পাতার প্রথমেই জ্বলজ্বল করছে কবিতার নাম—‘ছেঁড়া রামধনু’! তার নীচেই কবির নাম—‘মন্দার ভট্টাচার্য!’
যখন হিরের মতো জ্বলেছিল দ্যুতি
তোমার ও মুখে পানপাতা ধোয়া জল
কোথাও শিশির কেঁদেছিল সারারাতে
তাকেই দু-চোখে ধরেছি যে নিষ্ফল৷
এ পাকদণ্ডি ধোঁয়া দিয়ে আজও ঢাকা
পাকে পাকে শুধু তুমি গিয়েছিলে উঠে
সারে গা ডোরেমি ডুবে মরেছিল ঝিলে
যখন সে গান গেয়েছিলে অস্ফুটে৷
আজও ছেঁড়া তারে বাজাব কি রামধনু?
আজও কি বর্ষা নেমে আসে এলোচুলে?
তুমি কি এখনও মেঘ রঙে ডুবে থাকো,
অস্তরাগের অলকার উপকূলে?
তুমি কি জেনেছ কেউ রোজ মরে যায়—
ফের বেঁচে ওঠে স্মৃতির পদক্ষেপে!
লাল তিল আজ অন্য সোহাগমালা...
থির বিদ্যুতে তেমনই কি ওঠে কেঁপে?
যদিও অতীত ছাপিয়েছে সেই দ্যুতি
আমার এ বুকে বাঁধভাঙা নোনাজল
তবুও মেঘের ঠিকানাটা রাখি চোখে
বৃষ্টিহীনের এটুকুই সম্বল৷
—‘ঊর্মি!...ঊর্মি...এটা কে পাঠাল! এটা...!’ মন্দারের ভীষণ কান্না পেয়ে যায়৷ এই সেই কবিতা যেটা সেই কষ্টের রাতে লিখেছিল! লোকটা বলেছিল মদ শুধু কষ্ট দেয়, আর কবিতা শক্তি৷ তাই বুকের যন্ত্রণাকে মুক্তি দিয়েছিল শব্দে শব্দে৷
—‘সরি, তোমায় জানাতে পারিনি৷’ ঊর্মি হাসতে হাসতেই বলল—‘কবিতা ডট কম-এ কবিতাটা দেখে আর লোভ সামলাতে পারলাম না৷ কপি করে প্রিন্ট আউট নিয়ে স্ট্রেট পাঠিয়ে দিয়েছিলাম ‘স্বদেশ’-এর ঠিকানায়৷ তখন তোমার ঠিকানা জানতাম না৷ তাই নিজের বাড়ির ঠিকানাই দিতে হল৷ আর আজই এটা এসে পৌঁছেছে৷ কেমন সারপ্রাইজ বলো?’
মন্দার ভেতরে ভেতরে কাঁদছিল৷ এ তার স্বপ্ন! এ তার বহুদিনের প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষা! আজ সফল হল৷
—‘তুমি অনেক বড়ো কবি হবে মন্দার৷’ ঊর্মির দু-চোখে যেন মন্দারের স্বপ্ন ডানা মেলে দিয়েছে—‘একদিন সব বড়ো জায়গায় তোমার কবিতা ছাপা হবে৷ কিন্তু এই দিনটার কথাই সবাইকে গর্ব করে বলে বেড়াব৷ বলব যে মন্দার ভট্টাচার্যকে গড়ে উঠতে আমি দেখেছি৷’
মন্দার এবার কান্নামাখা হাসি হাসল৷ ভীষণ সুখে তার চোখে জল এসে গেছে৷ চোখ নীচু করে চোখের জল লুকোতে লুকোতে বলল—‘হোটেলে লাঞ্চ করবে ঊর্মি? কিন্তু হোটেলের কুক যে তোমার পছন্দ-অপছন্দ জানে না৷ তবে আমি জানি, আজকে আমাদের বাড়িতে চিকেন কষার একটা জব্বর লেগপিস আছে৷ আর তার সঙ্গে তুমি লুচি খেতে ভালোবাসো—তাই না?’
ভোরবেলায় হঠাৎ লোকজনের সন্ত্রস্ত কোলাহলে ঘুম ভেঙে গেল গহনের! তার সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সের হুটারের আর্তস্বর!
আজকাল সকালে ঘুম ভাঙতে চায় না তাঁর৷ রোজ রাতে জেগে থাকাটাই রুটিন হয়ে গেছে৷ যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, ল্যাম্পপোস্টের বাতিগুলোও জ্বলে জ্বলে ক্লান্ত পিঙ্গল আভা ছড়াতে শুরু করে, তখন তিনি চুপিসারে ছাতে উঠে যান৷ নির্বাক তাকিয়ে থাকেন উলটোদিকের বাড়ির দিকে৷ ও বাড়ির জানালায় এক নারীমূর্তি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে৷ তার মুখোমুখি দাঁড়ান এক কবি৷ আর প্রতিরাতে নিজেকে চাবুক মারেন৷ অসহায়ভাবে ক্ষমা চেয়ে যান সারারাত ধরে৷ উলটোদিকে বস্তি থেকে কালো ধোঁয়া ক্রমাগতই আচ্ছন্ন করে দেয় চাঁদের ঔজ্জ্বল্য৷ ঘুরতে ঘুরতে ছড়িয়ে পড়ে আকাশে৷
মেয়েটির নাম জানেন না গহন৷ কণার কাছে জানতে চাইতে পারতেন৷ কিন্তু প্রয়োজন বোধ করেননি৷ ওর নাম, বয়েস, যোগ্যতা কোনোটাই জানার দরকার নেই—শুধু আসল কথাটা প্রতি রাতেই অমোঘভাবে জানতে পারেন তিনি৷ যখন সে ক্ষতবিক্ষত শরীরটাকে টেনে এনে জানলার সামনে দাঁড়ায়, কী এক ব্যাকুল প্রার্থনায় চেয়ে থাকে অনির্দিষ্টের উদ্দেশে—তখন তার ইতিহাস সম্পূর্ণ জানা হয়ে যায়৷
মেয়েটি কখনও গহনকে লক্ষ করেনি৷ সে জানেও না যে এক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি রোজ তাকে দেখার জন্য ছাতে এসে দাঁড়ান৷ তবু গহন অপেক্ষা করেন, যদি সে একবারও তার দিকে তাকায়! যেমন একটা ছ-বছরের ছেলে আকুলভাবে তাকিয়েছিল তাঁর দিদির নিথর দেহের দিকে৷ মনে ক্ষীণ আশা নিয়ে অপেক্ষা করছিল, যদি দিদির দৃষ্টি একবার তার দিকে ফেরে...!
সে আশা অধরাই থেকে গিয়েছিল৷ দিদি আর কখনও তাকায়নি তার দিকে৷ এই মেয়েটিও তাকায় না৷ গহন মরিয়া হয়ে শুধু কাতর প্রার্থনা করে গেছেন৷ কিন্তু সে প্রার্থনা সফল হয়নি৷
গতকালও দেখা হয়েছিল দুজনের৷ কাল মেয়েটির হাবভাব অন্যরকম ছিল৷ অন্যদিনের মতো উদাস, ব্যথিত দৃষ্টিতে শূন্যে তাকিয়ে থাকেনি৷ বরং তার চোখে আগুন জ্বলছিল৷ কাল সে কাঁদেনি৷ বরং ল্যাম্পপোস্টের আলো তার চোখে পড়ে ধিকি ধিকি স্ফুলিঙ্গ জাগিয়ে তুলেছিল৷ একটা হাত তলপেটে রেখে কী যেন অনুভব করার চেষ্টা করে সে৷ তার মুখ অদ্ভুত এক সংকল্পে দৃঢ় হয়ে উঠেছে৷
গহন ভয় পেয়েছিলেন৷ ও কাঁদছে না কেন? তবে কি চোখের জলও বুকের আগুনে বাষ্প হয়ে গেছে! তলপেটে হাত দিয়ে কী অনুভব করতে চায়! তবে কী...!
প্রায় তিনটে অবধি ওভাবেই দাঁড়িয়েছিল সে৷ তারপর জানলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ জানলার পাল্লা বন্ধ হওয়ার আগে একঝলক তার মুখ দেখতে পেয়েছিলেন৷ বিস্মিত হয়ে দেখেছিলেন, কান্না নয় এই প্রথম সে হাসছে! অদ্ভুত একটা বঙ্কিম হাসি! হাসিটা যেন তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ নিয়ে এসে বিঁধল! এমন হাসি লোকে চরম প্রতিশোধ নেওয়ার আগে হাসে৷
গহনের বুক দুরু দুরু করে উঠেছিল৷ সেই হাসিটা কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না৷ বিছানায় শুয়ে ক্রমাগতই এপাশ-ওপাশ করতে করতে ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন৷ তবু অবচেতনে একটা আশঙ্কা ছিলই৷
সেই নিরাকার আশঙ্কাই আজ সকালে রূপ নিল লোকজনের কোলাহলে আর অ্যাম্বুলেন্সের হুটারে!
ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলেন তিনি৷ হুটার বাইরে নয়, যেন তাঁর বুকের ভেতরে বাজছে৷ সাইরেনের বিপদসংকেত!
দ্রুত পায়ে বিধ্বস্ত অবস্থায়, উশকোখুশকো চুলে উদভ্রান্তের মতো ছুটে গেলেন বারান্দার দিকে৷ কণা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েছিলেন৷ উদবিগ্ন কণ্ঠে তাঁকেই প্রশ্নটা করলেন—‘কণা, কী হয়েছে?’
কণা স্বামীর দিকে তাকিয়েছিলেন৷ তাঁর চোখে উদবেগের ছাপ পড়ল—
—‘তুমি এত সকালে উঠে পড়েছ যে! চা দেব?’
—‘কথা ঘুরিও না৷ কী হয়েছে?’
কণা চোখ নামিয়ে নিয়েছেন—‘তেমন কিছু নয়৷ বোধহয় কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েছে৷ যাই, তোমার চা...!’
তাঁর পথ আটকে দাঁড়ালেন গহন৷ দৃঢ় স্বরে বললেন—‘কী হয়েছে?’
কণা মুখ নীচু করেছিলেন৷ যখন মুখ তুললেন তখন তাঁর ঠোঁট কাঁপছে৷ চোখে রক্তিমাভা৷ কোনোমতে বললেন—‘ওই মেয়েটা আজ ভোর রাতে সুইসাইড করেছে...গলায় দড়ি দিয়ে...মেয়েটা প্রেগন্যান্ট ছিল...!’
শেষ কথাটা যেন তিরের মতো বিঁধল বুকে৷ কণার দু-চোখ বেয়ে জল পড়ছে৷ উদগ্র কান্নাকে দমন করার চেষ্টা করছেন৷
গহন কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখলেন৷ অ্যাম্বুলেন্সে মৃতদেহ তোলা হচ্ছে৷ ক্ষিপ্ত জনতা মারমুখী হয়ে উঠেছে! মেয়েটির স্বামীকে পেড়ে ফেলে এলোপাথাড়ি মারছে৷ লোকটা মার খেয়েই মরে যেত৷ কিন্তু তার আগেই পুলিশ এসে তাকে কোনোমতে বাঁচাল৷
সমস্ত ঘটনাই চুপচাপ দেখলেন গহন৷ তারপর নিত্যনৈমিত্তিক অভ্যাসমতো প্রাতরাশও সারলেন৷ কিন্তু সবটাই নিশ্চুপে৷ আজ শব্দেরা হারিয়ে গেছে৷ বলার কিছু নেই৷ শব্দ তিনি বড়ো ভালোবাসতেন৷ নরম লিরিক্যাল শব্দে কতবার সাজিয়ে দিয়েছেন পঙক্তির-পর-পঙক্তি৷
কিন্তু আজ মনে হল, সেসব শব্দের মানে কি! কতগুলো মূঢ় ফ্যান্টাসি! যে লাশটা ঘাড় মুচড়ে সাদা চাদরের তলায় পড়েছিল—তার কাছে শব্দের কোনো অর্থই নেই৷ যে ছোট্ট প্রাণটাকে আর জীবনের দায়ভার বইতে হল না, মাতৃগর্ভের নৈঃশব্দ্যকে সম্বল করেই ফিরে গেল অনন্ত অন্ধকারে—সে শব্দের কী বোঝে! তাঁর মধ্যেও কোথাও যেন একটা অন্ধ রাগ জন্ম নিচ্ছিল৷ কেন রাগ, কীসের রাগ তা নিজেও জানেন না৷ একটা অন্ধকার সমুদ্র পাঁজরের ওপর প্রচণ্ড রোষে ঝাঁপিয়ে পড়ছে! ভেতরে ভেতরে পাড় ভাঙার শব্দ পাচ্ছিলেন গহন৷
—‘কোথায় যাচ্ছ?’
প্রাতরাশ শেষ করে বেরোনোর জন্য তৈরি হচ্ছিলেন তিনি৷ কণা সভয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেন—‘কোনো জরুরি কাজ...?’
—‘শুঁটকির কাছে যাচ্ছি৷ ফিরতে রাত হবে৷ দুপুরে ওর বাড়িতেই খেয়ে নেব৷ চিন্তা কোরো না৷’
তিনি স্বামীর দিকে তখনও একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন৷ যেন আরও কিছু বলার আছে৷ কিন্তু ইতস্তত করছেন৷
—‘কিছু বলবে?’
—‘না...৷’ কণা ইতস্তত করতে করতেই জবাব দেন—‘মানে...‘স্বদেশ’-এর সম্পাদক ফোন করেছেন৷ তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন৷ ওঁদের এবার একটা স্পেশাল সংখ্যা বেরোবে৷ তোমার লেখা চাইছিলেন...৷’ কথাটা বলে ফেলেই আস্তে আস্তে বাকি শব্দগুলো উচ্চারণ করলেন তিনি—
—‘তুমি কি কথা বলবে?’
—‘না৷’
এত রূঢ় ও স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করলেন তিনি, যে কণাও চমকে ওঠেন৷ গহন একবারে সপাটে ‘না’ বলার লোক নন৷ গত পাঁচ বছর ধরে তিনি কোনো ম্যাগাজিনেই লিখছেন না৷ আক্ষরিক অর্থেই লেখা ছেড়ে দিয়েছেন৷ অথচ সবসময়ই সম্পাদকদের সঙ্গে কথা বলেছেন৷ সবিনয়ে নিজের অক্ষমতার কথা জানিয়ে নিরস্ত করেছেন তাঁদের৷ কিন্তু ‘না’ শব্দটা এত তীক্ষ্ণভাবে কোনোদিন বলেননি৷
কণা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাঁকে একবার দেখে নিলেন৷ তারপর আরও নম্র সুরে বললেন—‘তাহলে কি ওঁকে বারণ করে দেব? বলব যে, তুমি লিখতে পারছ না...৷’
—‘না৷’ দ্বিতীয়বার আবার সেই শব্দটাই উচ্চারণ করলেন তিনি৷ শার্টের বোতাম আটকাতে আটকাতে বললেন—‘জেনে নাও কবে দিতে হবে৷ কবিতা দেব আমি৷’
কণাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি৷ এক্ষুনি শুঁটকির কাছে পৌঁছোতে হবে৷ তাকে এই মুহূর্তে ভীষণ দরকার৷
শুঁটকি তখন বাড়িতেই ছিল৷ আজ সে দোকানে যাবে না৷ তার কবিতার কোটা প্রায় পূর্ণ হয়ে এসেছে৷ আর একটা লিখলেই ছাপ্পান্নটা হয়ে যাবে৷ তাহলেই একটা চার ফর্মার বইয়ের মালিক হবে সে৷ কবি হবে৷ শুঁটকি তার পাণ্ডুলিপির পাতাগুলো সযত্নে গুছিয়ে নিচ্ছিল৷ আর তার পায়ের কাছে বসে গোপাল গড়গড় করে ‘বীরপুরুষ’ কবিতাটা আবৃত্তি করছে৷
কিন্তু আবৃত্তিতে বাধা পড়ল৷ গহন দ্রুত পায়ে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকেছেন৷ শুঁটকি বিস্মিত দৃষ্টিতে তাঁকে দেখে নেয়৷ তিনি একটা কথাও না বলে সোজা সোফার ওপরে বসে পড়েন৷ কোনোদিকে খেয়াল নেই৷ চোখে-মুখে কাঠিন্য৷ নিশ্বাস দ্রুত৷ চোয়াল শক্ত করে কী যেন ভাবছেন৷
শুঁটকি একবার শুঁটকির মুখের দিকে তাকাল৷ একবার গহনের দিকে৷ বুঝতে পেরেছে এই মুহূর্তে তার এখানে থাকা উচিত নয়৷ সে আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল৷
গোপাল একবার কিছুক্ষণ বন্ধুর দিকে তাকিয়ে থাকে৷ তারপর ফের কাগজ-পত্র গুছোতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে৷ পঞ্চান্নটা কবিতা একের-পর-এক ক্রমানুযায়ী সাজাচ্ছে৷ একটা আস্ত লোক যে সামনে ‘থ’ হয়ে বসে আছে— সেদিকে কোনো খেয়াল নেই!
নিজের বন্ধুকে সে খুব ভালোভাবেই চেনে৷ গহন এইমুহূর্তে কিছুক্ষণ একা থাকতে চান৷ কিছু একটার সঙ্গে মনে মনে মোকাবিলা করছেন৷ যখন তাঁর ইচ্ছে হবে তখন নিজেই কথা বলবেন৷
প্রায় আধঘণ্টা এভাবেই কাটার পর অবশেষে গহনই মুখ খুললেন৷ এখন তিনি অনেকটা শান্ত৷
—‘কী করছিস?’
শুঁটকি হেসে আবৃত্তি করার ভঙ্গিতে বলল—‘শূন্যের ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে ফিরছিলাম আমি/আমার কৈশোর ছিল অর্থহীন/আমার যৌবন ছিল বেমানান—ফাঁকা৷/কীভাবে এত যে বিষ আমি চেয়েছিলাম জীবনে/আছে কি জীবন বলে আজও কিছু?—/ছাই৷ শুধু ছাই৷’
গহন বিস্ময়বিস্ফারিত দৃষ্টিতে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে থাকেন৷ শুঁটকি কি ম্যাজিক জানে? অথবা সে অন্তর্যামী!
—‘জল খাবি?’
তিনি প্রশ্নটার উত্তর না দিয়ে আত্মমগ্নভাবে বললেন—‘ভাস্কর চক্রবর্তী৷ তাই না?’
—‘হ্যাঁ, জিরাফের ভাষা৷ ‘ছয় নম্বর কবিতা’৷’
গহন ফের অন্যমনস্ক! একটা ঝড় এতক্ষণ বুকের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল৷ এখন যেন অঝোরে বৃষ্টি নামল৷ শুঁটকি বেছে বেছে এই কবিতাটাই আবৃত্তি করল কেন?
—‘জল খাবি কিনা বললি না তো!’
প্রসঙ্গ পালটে ফেললেন গহন—‘অতগুলো কাগজপত্র নিয়ে কী করছিস?’
সে রহস্যময় হাসি হাসছে—‘কবিতার বই ছাপাব৷ তারই প্রস্তুতি নিচ্ছি৷’
—‘তুই! কবিতার বই ছাপাবি!’ বিস্ময়ে প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন তিনি— ‘আগে বলিসনি তো!’
—‘বলে কী হবে?’ শুঁটকি হাতের কাগজপত্র সরিয়ে রেখেছে—‘তোকে তো বইয়ের কপি দিতে পারব না৷ কবিতা পড়াতেও পারব না৷ জানতে পারলে খিস্তি দিবি৷ তাই বেমালুম চেপে গিয়েছিলাম৷’
—‘কপি দিতে পারবি না মানে! বই ছাপাবি মানে মিনিমাম দুশো-তিনশো কপি বেরোবে৷ তার মধ্যে একটা কপি আমাকে দিবি না! ফাজলামি হচ্ছে!’
—‘ওই দেখ৷ তুই কিছু না জেনেই ফের সেন্টু খেতে লেগেছিস!’ সে বলে—! ‘আসল ব্যাপারটা একটু আলাদা৷ এ বইয়ের দুশো, তিনশো কপি আদৌ হবে না! হবে মাত্র এক কপি৷’
—‘এক কপি!’ পুরো ব্যাপারটাই মাথার ওপর দিয়ে গেল গহনের— ‘এতগুলো টাকা খরচ করে তুই শুধু এক কপি বই ছাপাবি! তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে!’
—‘মাথা আর কবে ঠিক ছিল? আমি হচ্ছি লগনচাঁদা ছেলে৷’ সে হো হো করে হেসে উঠেছে—‘এক কপিই আমার পক্ষে যথেষ্ট৷’
গহনের মনে হল গোটা ব্যাপারটাই তাঁর মাথায় তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে৷ শুঁটকির কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছেন না৷
শুঁটকিও বোধহয় বুঝতে পারে যে গহন কিছুই বোঝেননি৷ তাঁর পক্ষে বোঝা সম্ভবও নয়৷ একজন প্রখ্যাত কবি কি করে বুঝবেন যে সে কেন পয়সা খরচ করে মাত্র এক কপি বই ছাপাবে? এই বইটা সবার জন্য নয়৷ শুধু রুমার কাছেই শুঁটকি কবি হতে চায়৷ রুমাকে না-বলা কথাগুলো সে কবিতায় সাজিয়েছে৷ তা বারোয়ারি হবে কেন? এ শুধু তার আর রুমার নিভৃত সংলাপ! অন্য লোকের পড়ার অধিকার নেই৷ এমনকি গহনেরও নেই!
শুঁটকি মনে মনে চিন্তা করে, বইটাকে সে বাঁধিয়ে রাখবে৷ সামনে লাল ভেলভেটের মলাটের ওপর সোনার জলে নাম লেখা থাকবে তার৷ প্রতিটি পাতা ল্যামিনেট্রেড হবে৷ যেদিন জানালা দিয়ে জ্যোৎস্নার ফটফটে রুপোলি আলো এসে পড়বে বিছানার ওপর, হুহু করে দখিনা বাতাস আছড়ে পড়ে তৈরি করবে অদ্ভুত মূর্ছনা, হাস্নুহানার মদির গন্ধ ছড়িয়ে রুমা চুপি চুপি এসে বসবে রকিং চেয়ারে, সেদিন তার খোঁপায় জুঁইফুলের মালা পরিয়ে দেবে শুঁটকি৷ জুঁইফুল বড়ো ভালোবাসে রুমা৷ আর সারারাত ধরে একের-পর-এক কবিতা শুনিয়ে যাবে৷ এ কবিতাগুলো শুধু তার আর রুমার৷ আর কারুর নয়৷
—‘আমার কথা ছাড়৷ নিজের কথা বল৷ নতুন কোনো কবিতা লিখলি?’
গহন মাথা নাড়ালেন৷ তাঁর চোখ যেন জ্বলে ওঠে—‘এখনও লিখিনি৷ তবে এবার লিখব৷’
—‘এই তো চাই! সা-বা-শ!’ শুঁটকি খুশি হয়ে চেয়ারের হাতলে চাপড় মারে—‘এবার তবে অন্ধকারে যা গহন৷ অন্ধকারে যা৷ অন্ধকার তোকে ঠিক পথ চিনিয়ে দেবে৷ সঠিক পথ!’
পূর্ণদৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন গহন—‘সেইজন্যই তোর কাছে এসেছি৷ একটু অন্ধকার দিতে পারিস আমায়? নিস্তরঙ্গ অন্ধকার?’
সে তাঁর দিকে তাকিয়ে সম্মতিসূচক হাসি হাসে৷
—‘একটু বোস৷’
‘মিথ্যে দিয়ে ঘেরা এই পৃথিবীর শেষ সত্য দেখতে চাই আমি
যে হিংস্রতা আমাকে পোড়ায় প্রতিদিন
যে নিষ্ঠুরতার কাছে প্রতিদিন হেরে যাই আমি—
স্নায়ুহীন আলোর সমাজে
একটি ওঙ্কার ধ্বনি টের পেতে চাই আমি৷
এই শুধু, শুধু মাত্র এই৷’
সামনে নিঃসীম অন্ধকার৷ ঘরের সব জানলা বন্ধ৷ কোনোদিক দিয়ে সামান্য আলোর ক্ষীণ রশ্মিও আসছে না৷ চতুর্দিকে স্থির নিস্তব্ধতা৷ মাতৃজঠরের মতো শব্দহীন, আলোহীন শান্তি৷
কবি অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না৷ অবশ্য দেখতেও চাইছিলেন না৷ অস্থিরভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন অন্ধকারে৷ হোঁচট খাচ্ছেন৷ ঠোক্কর খাচ্ছেন৷ মাঝেমধ্যেই অপ্রয়োজনীয় কিছু কঠিন বস্তু ধাক্কাও মেরে যাচ্ছে৷ তবু সামলে নিচ্ছিলেন৷
কবির ঠিক সামনে একটি কাচের আয়না ছিল৷ আর কিছু টের না পেলেও আয়নাটার মসৃণ অস্তিত্ব টের পেয়েছেন৷ দেখতে না পেলেও আন্দাজ করতে পারেন, সেই আয়নাটায় এখন এক নগ্ন অন্ধকারের প্রতিবিম্ব পড়েছে৷
হাত দিয়ে সেই অন্ধকারের প্রতিবিম্বকে স্পর্শ করতে চাইলেন গহন৷ অন্ধকার মানুষ চেনে৷ চেহারা নয়, কণ্ঠস্বর নয়, তাঁর অন্দরের উলঙ্গ সত্তাকে চিনে নিতে অসুবিধে হয় না৷ গহনের মনে হল তার আঙুলগুলো সেই স্থির আঁধারে আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে৷ আঙুলগুলো স্পর্শ করছে এক অনাবিল বাস্তবকে৷ স্পর্শ করছে সেই শব্দগুলোকে যা আজ সকালেই শুনেছেন৷
মেয়েটা প্রেগন্যান্ট ছিল!
এক ফিনিক্স পাখি জন্ম নিতে চেয়েছিল৷
প্যান্ডোরার বাক্সে বন্দি অনুভূতির রাজ্যে
দু-ফোঁটা চোখের জল ফেলতে চেয়েছিল সে৷
রোজ চেতনার সতীচ্ছদ ছিন্নভিন্ন করে নপুংসকের দল—
বিষাক্ত ঔরস রক্তাক্ত যোনিবর্ত্মে অনুপ্রবেশ করে
জন্ম দিতে চায় আর একদল মেফিস্টোর!
তবু জন্মাতে চেয়েছিল ফিনিক্স পাখিটা
তখন কালীঘাটের বস্তিতে তাড়ি সহযোগে বিষ পান করেছে
ক্লান্ত অর্ফিয়ুস৷
পার্কস্ট্রিটের আলোঝলমলে চোখে কখন যেন আচমকা
ভেসে উঠেছিল একলা হ্যামলিন!
তার জন্মক্ষণে কেউ বাঁশি বাজায়নি৷
জলভরা থলিতে শুয়ে সে শুনেছিল মাতালের চিৎকার৷
আর কতদিন রাংতা মোড়া আলেয়ায়
নিষ্ফল পদচারণা করে যাব!
আর কতদিন নেঁচে, কুঁদে মৈথুনিয়ে—ব্যর্থ শুক্রকীটের
মতো ভেসে বেড়াব নীল গহ্বরে!
স্বপ্নের সমাধিতে প্রস্রাব করে বলব—‘আমি
পৃথিবীর শেষদিন পর্যন্ত বাঁচতে চাই!’
রমানাথ মিস্তিরি, ছেদীলাল পিয়োনের ধর্ষকামী রিরংসার জ্বালায়
সিতিমার অশ্রু দেখে লাফিয়ে উঠব নিজের আবিষ্কারে—‘আহা চাঁদে জল আছে!’
ফিনিক্স পাখিটা জন্ম নিতে পারত৷
ঝলমলে ডানায় রোদের টুকরো নিয়ে
সাজিয়ে দিতে পারত পাতায় পাতায়৷
অথচ জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে গেল নির্নিমেষে!
স্বপ্ন পুড়ে যাওয়ার আগে
নিজেকেই ভস্মীভূত করে গেল নীরব প্রতিবাদে৷
এই দ্যাখো, সেই ভস্মে হাত রেখেছি আমি—
ভস্মাচ্ছাদিত হয়ে দাঁড়িয়েছি প্রশ্নের মুখোমুখি!
যে আঁধার অকুতোভয়ে সহ্য করেছে বীভৎস পাশবিকতা
আজ সেই অনঙ্গ অন্ধকার প্রশ্ন হয়ে ছাত থেকে ঝুলছিল
একা!
আমি দেখেছি তার গর্ভে ফিনিক্সের পচাগলা শব৷
আমি মেখেছি তার ছাইভস্ম৷
প্রশ্নটা মৃত মাছের দৃষ্টিতে দেখছিল আমায়
দেখো না—ভয় পাই!
গহন থামলেন৷ তাঁর হাত কাঁপছিল৷ একটা কান্না গলা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠছিল বারবার৷ আর থাকতে পারলেন না৷ একটা ভাষাহীন কাঁপুনি তাঁকে ভেঙে দিচ্ছিল৷ টুকরো টুকরো করে দিচ্ছিল৷...
পুরো ছাপ্পান্নটা!
শুঁটকির আজ বড়ো আনন্দের দিন৷ গতকাল রাতেই শেষ কবিতাটা লিখে ফেলেছে৷ আজই পাবলিশারের কাছে যাবে৷ তার মনের ভেতরে অস্থিরতা! যতদিন লেখা সম্পূর্ণ হয়নি ততদিন ধৈর্য ছিল৷ কিন্তু এখন ধৈর্য জবাব দিয়ে দিয়েছে৷ সে মনে মনে ভাবছিল, কতদিনে বইটা হাতে পাবে৷ কেমন দেখতে হবে! বুবাইয়ের ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিনে ঠিক যেমন একটা ভয়—উৎকণ্ঠা মেশানো আনন্দ তিরতির করে কাঁপছিল, তেমনই একটা উত্তেজনা খেলে বেড়াচ্ছিল তার রক্তে৷
—‘গোপাল, বল তো আজ কোন দিন?’
গোপাল মাথা চুলকে জবাব দেয়—‘বিষ্যুদবার৷’
—‘ধুর পাগল, আজ যে বৃহস্পতিবার তা আমিও জানি৷’ সে হেসে বলে—‘আর কি বল তো?’
গোপাল বিমূঢ় হয়ে মাথা নাড়ে৷ আজ স্বাধীনতা দিবস নয়৷ হলে পাড়ার ছেলেরা মোড়ের মাথায় তিনরঙা পতাকা টাঙাত৷ আজ ভ্যালেন্টাইন ডেও নয়৷ তাহলে হোর্ডিঙে—ছেলেমেয়েরা মাথা, মুখ ঠোকাঠুকি করত৷ তবে আজ কী দিন?
সে আমতা আমতা করে বলে—‘তালে?’
—‘আজ আমার জন্মদিন৷’ শুঁটকি হাসল—‘বল বিকেলে কী খাবি?’
গোপালের সপাট উত্তর—‘মাছ-ভাত৷’
—‘বোঝো!’ তার হাসি পেয়ে যায়—‘মাছ-ভাত তো রোজই খাস৷ আজ কী খাবি? যা বলবি তাই খাওয়াব৷’
গোপাল অনেক ভেবেচিন্তে উত্তর দিল—‘মাছ-ভাত৷’
শুঁটকি হাল ছেড়ে দেয়৷ গোপালের দোষ নেই৷ জীবন ওর গ্রামাফোনের পিন-টা মাছভাতের ওপরই আটকে রেখেছে৷ যতই জিজ্ঞাসা করা হোক রেকর্ডে ‘মাছ-ভাত’-ই বাজবে৷
সে মনে মনে ঠিক করে বিকেলে দোকান থেকে ফেরার পথে বিরিয়ানি কিনে আনবে৷ গোপাল কখনও বিরিয়ানির স্বাদ পায়নি৷ আজ একবার চোখই দেখুক৷
—‘ঠিক আছে৷ বিকেলে ভেবে দেখব’খন৷’
কোনোমতে স্নান করার নামে কয়েক মগ জল গায়ে ঢেলে, নাকে-মুখে দুটো গুঁজে সে তৈরি হয়ে নিল৷ প্রথমে কিছুক্ষণের জন্য চশমার দোকানে হাজিরা দেবে৷ তারপর সিধে কলেজ স্ট্রিট৷
আজ রাস্তাতে ট্র্যাফিকের করুণ দশা! অন্যান্য দিনও যে খুব ভালো পরিস্থিতি থাকে তা নয়৷ কিন্তু আজকের চাপটা একটু অস্বাভাবিক৷ স্কুল-অফিসের তাড়া, সবই ঠিকঠাক আছে৷ তবু সবকিছুর মধ্যে অদ্ভুত একটা সন্ত্রস্ত ভাব!
কোনোমতে দোকানে পৌঁছোতেই থমথমে পরিবেশের কারণটা বোঝা গেল৷ তার এক কর্মচারী বিশু জানাল—‘দাদা, আইজ আমি তাড়াতাড়ি ঘর ফিরুম৷ দুইটার আগে আমারে ছুটি দেন৷’
শুঁটকি তখনও ভালোভাবে নিজের চেয়ারটাতে বসতে পারেনি৷ তার আগেই এ-হেন আবদার শুনে তার ভুরু কুঁচকে গেছে৷ আজ কি সকলেরই বিশেষ দিন নাকি!
—‘কেন?’
—‘টি.ভি.-তে দ্যাখেন নাই?’ বিশু অম্লানবদনে জানায়—‘সরকারি পাট্টির লোকেরা বিরোধীর তিনটারে মারসে৷ দুফর দুইটায় প্রতিবাদ মিছিল বাইরইবে৷ ম্যালা ঝকমারি৷ তায় আবার পায়ে বাত৷ যাইতে সময় লাগবেনে৷ আমি চান্স নিমু না৷ দুইটার আগেই শ্যালদা পারাইয়া যামু৷’
সে ভুরু কুঁচকে কি যেন ভাবছিল৷ তিনটের সময় তার কলেজ স্ট্রিট পৌঁছোনোর কথা৷ পাণ্ডুলিপি জমা দিতে হবে৷ ‘শিয়ালদা’ নামটা শুনে তার মাথায় তিনজন মানুষের খুন হওয়ার কথা মনে পড়ল না৷ মনে পড়ল না প্রতিবাদ মিছিল ও তার আনুষঙ্গিক সমস্যার কথা৷ শুধু মনে হল কতক্ষণে পৌঁছোতে পারবে! রাস্তায় যদি ট্রাফিকের চাপ থাকে তবে সময়মতো অ্যাপয়েন্টমেন্ট রাখতে পারবে তো!
শুঁটকির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে৷ অন্যমনস্কভাবে বিশুকে বলল—‘ঠিক আছে, তুই আগেই বেরিয়ে যাস৷’
—‘আইচ্ছা৷’ সে খুশি হয়ে মাথা নেড়ে কাউন্টারে ফিরে যায়৷ সহকর্মীদের সঙ্গে দেশের হাল নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করে৷
বেলা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দোকানে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছিল৷ সেদিকে মন নেই শুঁটকির৷ আজ কাউকে ধরে কবিতা শেখানোর ইচ্ছেও দেখা গেল না তার৷ অস্থির হাতটা মাঝেমধ্যেই ব্যাগের ভিতরের কাগজের তাড়াটাকে স্পর্শ করছে৷ ওদিকে ঘড়িটাও আজকে বড়ো আস্তে চলছে৷ সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টার কাঁটা যেন আর নড়তেই চায় না৷
—‘হ্যাঁ রে৷’ অনেকক্ষণ উশখুশ করে শেষ পর্যন্ত আর থাকতে না পেরে, পাশে দাঁড়িয়ে আরেক কর্মচারীকেই জিজ্ঞাসা করে বসল সে—‘ক-টা বাজে? আমার ঘড়িটা বোধহয় স্লো যাচ্ছে৷’
কর্মচারীটি বিস্মিত দৃষ্টিতে তার হাতের ঘড়িটার দিকে তাকায়৷ তারপর আস্তে আস্তে বলে—‘বারোটা কুড়ি দাদা৷’
—‘এখনও সাড়ে বারোটা বাজেনি!’
এলাহাবাদ থেকে শুরু করে অক্ষরেখা-দ্রাঘিমারেখা সবার ওপরই বিরক্ত হল শুঁটকি৷ এ কী জাতীয় চক্রান্ত! আজ কি সময়টা একটু তাড়াতাড়ি এগোতে পারে না! না তারও পায়ে বাত ধরেছে!
সে অন্যমনস্কভাবে বলে—‘তোরা দোকানটা দেখ, আমি একটু বেরোচ্ছি৷’
প্রত্যুত্তরের অপেক্ষায় না থেকে দোকান থেকে বেরিয়েই পড়ল শুঁটকি৷ বাইরে তখন কাঠফাটা রোদ্দুর৷ শোরুম থেকে বেরিয়ে আসতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল তার৷ তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ রোদ নির্বিচারে উষ্ণতা ঢেলে যাচ্ছে শহরের ওপর৷ পিচের গরম রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়ে ভুঁড়িওয়ালা ট্রাফিক পুলিশ নিরন্তর মূকাভিনয়ে ব্যস্ত৷ তার মধ্য দিয়েই কখনও রুপোলি, কখনও সোনালি, কখনো-বা চেরি রঙের ঝিলিক মেরে বিদ্যুৎগতিতে বেরিয়ে যাচ্ছে গাড়ি৷
—‘বাবা, শ্যালদা যাবে?’
সে তখন ফুটপাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ভাবছিল কোথায় যাবে! শোরুমের এ.সি.র নিষ্প্রাণ শীতলতা ভালো লাগছিল না৷ চশমার কেনা-বেচা ফ্রেমের ডিজাইন, লেন্সের পাওয়ার, ক্যাশবাক্স, পাঁচশো, হাজার টাকার নোট—কোনোটাই এই মুহূর্তে অভিপ্রেত নয়৷ জাগতিক বস্তুর মোহ থেকে সে যে আজ বহুদূরে দাঁড়িয়ে, সে কথা কে বুঝবে!
তাই ভাবছিল যে এখন থেকে তিনটে অবধি কোথায় যাবে, কী করবে৷ কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে আসার আগেই ভাবনায় ছেদ পড়ল৷
এক বুড়ি পরনে জন্মের নোংরা কাপড়চোপড়! হাতে দগদগে একটা ভীষণদর্শন ঘা৷ হাতের পুঁটুলিটা তার জামাকাপড়ের চেয়েও নোংরা৷ চামড়া ওঠা বলিরেখাময় মুখে অসহায়তার ছাপ৷ কুঁকড়ে যাওয়া মুখটাকে কুণ্ঠায় আরও কুঁকড়ে বলল—‘দশটা ট্যাকা নয় বেশি দেব! শ্যালদা যাবে বাবা?’
শুঁটকি প্রথমে অবাক হল৷ কথাটা বলেই পিচুটিমাখা পিটপিটে চোখে তার দিকে দেখছে বুড়ি৷ সর্বনাশ! ট্যাক্সি ড্রাইভার ভেবেছে নাকি! হঠাৎ মনে পড়ল যে, আজ সে অ্যাশ কালারের সাফারিস্যুট পড়েছে৷ আর চেহারাটাও ট্যাক্সি ড্রাইভারেরই অনুকূলে!
সে হেসে ফেলে৷ বুড়ির ভুলটা ভাঙিয়ে দিতেই যাচ্ছিল! তার আগেই সে খুনখুন করে বলল—‘না হয় পনেরো ট্যাকাই বেশি নিয়ো৷ কিন্তু পৌঁচে দাও৷ আল্লা তোমার ভালো করবেন৷ আমি দোয়া করব৷’
শেষ দুটো কথা শুঁটকির বড়ো ভালো লাগল৷ সে ঈশ্বরবিশ্বাসী নয়৷ কিন্তু পনেরো টাকা বেশি দেওয়ার মধ্যে যে দুনিয়াদারির ছোঁয়া ছিল, শেষ দুটো বাক্যের আন্তরিকতা তাকে আদ্যন্ত মুছে দিল৷ আপাতদৃষ্টিতে দোয়ার চেয়ে টাকাটা অনেক বেশি লোভনীয়৷ কিন্তু পরের জিনিসটার জন্য বড়ো লোভ হল শুঁটকির৷ প্রার্থনা কার কাছে করা হচ্ছে সেটা বড়ো নয়৷ কিন্তু তার জীবনেও প্রার্থনা করার কেউ আছে, তার জন্যও ‘দোয়া’ করতে একজোড়া হাত অসীমের দিকে উঠবে—এটা ভেবেই খুশি হল৷
—‘বেশ৷’ সে এক মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে৷ নিজের গাড়ির পিছনের দরজা খুলে দিয়েছে—‘এসো বুড়োমা৷’
বুড়োমা গাড়ি দেখে হকচকিয়ে গেছে৷ সে একটা কালো-হলুদ রঙের ট্যাক্সি আশা করেছিল৷ তার জায়গায় একটা স্টিল কালারের জেন!
শুঁটকি তার মনোভাব বুঝল৷ শান্তস্বরে বলে—‘আমার ট্যাক্সিটা গ্যারাজে গেছে৷ এটা মালিকের গাড়ি৷ তুমি উঠে এসো৷’
বুড়ি ভয়ে ভয়ে পিছনের সিটে বসেছে৷ তার ছোট্ট শরীরটা আরও গুটিয়ে আছে৷ যেন সে অচ্ছুৎ! গাড়ির গায়ে তার হাত লাগলেই পুরো গাড়িটা অপবিত্র হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা৷
—‘আরাম করে বসো৷ অত ভয় পাচ্ছ কেন?’
শুঁটকি তাকে আশ্বস্ত করে৷ একটু একটু করে বুড়োমার জড়তা কাটে৷ তারপর আস্তে আস্তে জানায় তার ইতিহাস৷
সে ট্রাফিক সিগন্যালের সামনে বসে ভিক্ষে করে৷ আগে তার এত দুরবস্থা ছিল না৷ তার বুড়ো শিয়ালদায় রিকশা টানত৷ একবার সেই যে মুখ থুবড়ে পড়ল, আর উঠল না৷ তারপর থেকেই এই দুর্দশা! আজ ঠা ঠা রোদে শরীর খুব খারাপ লাগছে৷ সকাল থেকে যে টাকা জমেছে তা সম্বল করেই ট্যাক্সি ধরার দুঃসাহস দেখাতে হয়েছে৷ কিন্তু কোনো ড্রাইভারই ঘেন্নায় তাকে গাড়িতে তুলতে চায় না৷ আল্লার অনেক মেহেরবানি যে শুঁটকির মতো মানুষও পৃথিবীতে আছে!
শুঁটকি তার ইপ্সিত জায়গায় তাকে নামিয়ে দিল৷ বুড়ি পুঁটুলি থেকে কয়েকটা নোট বের করে এনেছে৷
—‘বুড়োমা, টাকা তোমার কাছেই থাক৷’ সে হেসে বলল—‘আমার দোয়াই যথেষ্ট৷’
বুড়ির শুকনো চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে৷ কী বলবে যেন ভেবে পায় না৷ কোনোমতে ধরা গলায় বলে—‘তোমার সব খোয়াব সাচ্চা হোক বাবা৷ তোমার মধ্যে খোদা আছে৷ তোমায় খোদা ভালোবাসেন৷ তার প্যায়ার সবসময় সঙ্গে থাকুক৷’
শুঁটকি তার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতেই ফের টের পেল পরিচিত মিষ্টি গন্ধটা৷ সামনের আয়নায় দেখল বুড়োমা যেখানে বসেছিল, ঠিক সেখানেই বসে হাসছে রুমা৷ এখন আর সে ছায়া হয়ে নেই৷ বরং ঝাপসা ঝাপসা অবয়ব নিয়ে বসে৷ যেন ঘষা কাচের ওপ্রান্তে বসে আছে৷
সে-ও তার দিকে তাকিয়ে হাসল৷ দিনটা আজ বড়ো সুন্দর৷ আজ রুমাকে সবচেয়ে বড়ো উপহার দেবে৷ রুমা আর রাগ করে থাকতে পারবে না৷ ফিরে আসতেই হবে তাকে৷ ফিরে আসতেই হবে...৷
‘ফুরায় না তার যাওয়া, এবং ফুরোয় না তার আসা,
ফুরোয় না সেই একগুঁয়েটার দুরন্ত পিপাসা৷
সারাটা দিন আপনমনে ঘাসের গন্ধ মাখে
সারাটা রাত তারায় তারায় স্বপ্ন এঁকে রাখে৷
ফুরোয় না তার, কিছুই ফুরোয় না,
নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়োয় না৷
ভালোবেসে মেঘলা আকাশ দেবে,
কিংবা চোখে অনন্ত মৌসুমী?
ভালোবাসা কান্না ভালোবাসে
এ কথা কি জানতে আগে তুমি?’
কবিতা ডট কমের ‘আকাশনীল’ কবিতাটা আজ সকালেই পোস্ট করেছে৷ মন্দার একঝলক দেখেই চোখ সরিয়ে নেয়৷ তার আজ কিছুই ভালো লাগছে না৷ কবিতাও নয়৷
সামনে বেশ কয়েকটা বই পড়ে আছে৷ ওগুলো পড়ে রিভিউ লিখতে হবে৷ ল্যাপটপে জ্বলজ্বল করছিল ‘কবিতা ডট কম’৷ তবু কিছুতেই শান্তি নেই৷ আগে কখনও এমন হয়নি মন্দারের৷ শুধুমাত্র একটি মানুষের অনুপস্থিতি যে সমস্ত কিছুকেই ব্যর্থ করে দিতে পারে, এ ধারণা তার ছিল না৷ এমনকি—উশ্রী যখন তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল তখন একটা চিড়বিড়ে জ্বালা তাকে জ্বালিয়ে মারছিল৷ কিন্তু এখন কোনো জ্বালা নয়, কোনো যন্ত্রণা নয়, ব্যর্থতা আর হতাশা এসে জমেছে বুকে৷ অদ্ভুত একটা ব্যথা যার বর্ণনা করা সম্ভব নয়—তেমনই একটা ব্যথা বারবার চিনচিন করে উঠছে৷
এই নিয়ে সাতদিন হল ঊর্মি ফোন করেনি৷ তার ফোন তোলেনি৷ কথা বলেনি, দেখা করেনি৷ মেসেজের উত্তরও দেয়নি৷ এমনকি শুটিং-এও হানা দিয়েছিল সে৷ কিন্তু ঊর্মি সেখানেও নেই! মন্দারের মনে হচ্ছিল সারা দুনিয়ায় এখন আগুন লাগুক, সুনামিতে ভেসে যাক সমস্ত ভারতবর্ষ৷ ঊর্মির সাড়া না পেলে, সঙ্গ না পেলে সব অর্থহীন! ঊর্মি না থাকলে—সব ফাঁকা৷
কী অন্যায় মন্দার? ঊর্মির সঙ্গে মিশতে মিশতে হঠাৎই তার মনে হয়েছিল জীবন বড়ো সুন্দর! একদিন আবিষ্কার করল, ঊর্মিকে তার প্রয়োজন৷ ভীষণভাবে প্রয়োজন! শুধু একঘণ্টা-দু’ঘণ্টায় তার মাধুর্যটুকু যথেষ্টভাবে উপভোগ করা হচ্ছে না৷ সারাজীবন ধরে সে তাকে পাশে চায়৷ ওই নরম হাত তার হাত দুটো জড়িয়ে ধরুক৷ সারাজীবন পাশে পাশে হাঁটুক৷ ফুচকা, চিনেবাদাম খেয়ে টাইম পাস করুক—কিন্তু লাইফ টাইমের জন্য৷
এক সুন্দর বিকেলে সাহস করে মনের কথাটা বলে ফেলেছিল সে৷ ঊর্মির স্পর্শ যে তার দেহে বিদ্যুৎ সঞ্চার করে, সে হাসলে মনে হয় সব জ্বালা ভুলে গিয়ে ঊর্মির নরম কোলে মুখ গুঁজে দেয়—সব বলেছিল৷ ভীষণ আবেগে তার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে বলেছিল—‘তুমি আমার জীবনে এসো ঊর্মি৷ আমি তোমাকে চাই৷’
ঊর্মি তড়িদাহতের মতো চমকে ওঠে৷ হাত দুটো সজোরে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে—‘কী বলছ? পাগল হয়ে গেলে নাকি?’
—‘এখনও হইনি৷’ মন্দার তার হাত দুটো ফের জড়িয়ে ধরেছে—‘কিন্তু একবার হ্যাঁ বলে দ্যাখো৷ আনন্দে সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে যাব৷ পার্কস্ট্রিটে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলব—‘আমি ঊর্মিকে ভালোবাসি৷’ দরকার পড়লে পেন্ডুলামকেও চুমু খেয়ে থ্যাঙ্কস জানাব৷ ঊর্মি, তুমি আমার জীবনে এলে আমি পাগল হতেও রাজি৷’
ঊর্মির চোখে জল জমেছিল৷ সে দৃঢ় গলায় বলে—‘তা হয় না৷’
—‘কেন?’
—‘তুমি আমার সম্বন্ধে কতটুকু জানো?’
এ প্রশ্নটার জন্য তৈরি ছিল মন্দার৷ সেই লোকটা আগেই তাকে বলে রেখেছিল৷
—‘তোমার সারনেম চ্যাটার্জি, সাউথ সিটিতে মা, বাবা, দিদির সঙ্গে থাকো, ঝাল সহ্য করতে পারো না, কিন্তু খাদ্যরসিক৷ হলুদ আর কমলা রং পছন্দ, তোমার রাশি কন্যা, কবিতা পড়তে ভালোবাসো—এসব তো আমি জানি৷’
—‘না সবটা জানো না৷’ রাগে ঊর্মির নাকের পাটা ফুলে ওঠে—‘আসল জিনিসটাই জানো না৷ তুমি জানো আমার অতীত কী?’
—‘দরকার নেই ঊর্মি৷ আমি শুধু জানি তোমাকে ছাড়া আমি এক পাও এগোতে পারব না৷’
ঊর্মি শুধু দৃঢ়স্বরে বলে—‘না৷’
মন্দার ব্যথা পেল৷ ব্যথিত স্বরে বলল—‘না কেন? তুমি আমায় পছন্দ করো না? ভালোবাসো না?’
—‘না, সে অধিকার আমার নেই৷’
—‘অধিকারের প্রশ্ন উঠছে কোথা থেকে?’
তার দিকে তর্জনী তুলে বলল ঊর্মি—‘তুমিই তুলেছিলে প্রশ্নটা৷’
—‘আমি!’
মন্দার কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি৷ ঊর্মি কি বলছে! ভালোবাসার অধিকার! প্রশ্ন!
—‘জানতে চাও তুমি কাকে ভালোবাসো?’ সে উত্তেজিত গলায় বলে— ‘দেখে নাও তবে...৷’
বলতে বলতেই নিজের মাথার চুল ধরে টানল! মন্দার স্তম্ভিত! গোটা চুলের গোছাটাই ঊর্মির হাতে! আসলে ওটা উইগ! ঊর্মির মাথায় একটা চুলও নেই! সম্পূর্ণ খাঁ খাঁ করছে৷
সে চমকে উঠেছিল৷ কিন্তু আরও চমক বাকি ছিল৷ নিজের হাতেই তার ধনুকের মতো ভুরু দুটোও খুলে ফেলল ঊর্মি৷ সে দুটোও নকল৷ তার ভুরুও নেই! মন্দারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক বিরলকেশ, ভুরুহীন নারী৷
মন্দারের মুখে কোনো কথা জোগায় না৷ সে বাকশক্তিরহিত৷ ভাষা হারিয়ে ফেলেছে৷
—‘ষোলো বছর বয়সে একটা রোগ হয়েছিল৷ ‘অ্যালোপেশিয়া ইউনিভার্সালি’ বলে রোগটাকে৷’ গলা কাঁপছে ঊর্মির—’খুব বড়ো ক্ষতি কিছু হয়নি৷ শুধু মাথার চুল, ভুরু, গায়ের লোম—সব ঝরে গিয়েছিল৷ আর কখনও গজায়নি৷’
বলতে বলতেই সে কান্নায় ভেঙে পড়ে—‘রোগটা না হলে লোকে আমায় উশ্রীর মতোই সুন্দরী বলত৷ কিন্তু আমি একটা কুৎসিত বাস্তব! এক অসম্পূর্ণ নারী৷ ঘর-সংসার, সন্তানের স্বপ্ন দেখার অধিকার নেই আমার৷ কাউকে ভালোবাসতে পারি না, কবির কল্পনা হওয়ার যোগ্যতাও নেই৷ কখনও মাথায় ফেট্টি বেঁধে, ভুরুঢাকা চশমা পরে, কখনও বা বিদেশি উইগ, নকল ভুরু পরে একটা নকল জীবনযাপন করি৷ এবার বলো, কবির প্রেমিকা হওয়ার যোগ্যতা আছে আমার?’
ঊর্মি একটু থামল, মন্দার তখনও তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে৷ সে তখন অন্যকথা ভাবছিল৷ স্বপ্নে একবার ঊশ্রীকে এমনই বিরলকেশ অবস্থায় দেখেছিল৷ চুল ছাড়া তাকে জঘন্য দেখাচ্ছিল৷
কিন্তু ঊর্মিকে তো অত খারাপ লাগছে না! বরং অভিমানাহত ভিজে চোখের দৃষ্টিতে, স্ফুরিত অধরে তাকে আরও সুন্দরী মনে হচ্ছিল! মন্দারকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফুঁসে উঠেছিল ঊর্মি৷—‘এবার কথা বেরোচ্ছে না কেন মুখ থেকে? তুমিই তো আমার প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলে যে ‘কবির প্রেমিকার মাথায় ঘন চুল থাকাটা মাস্ট’, প্রেমিকার মাথার ঘন চুলটাই কাব্যিক৷ মনে পড়ে?’ তার চোখ কান্নায় লাল হয়ে গেছে৷ কোনোমতে বলল— ‘আর কখনও আমার সঙ্গে যোগাযোগ কোরো না মন্দার৷ আমি কবির প্রেমিকা হওয়ার যোগ্য নই৷’
বলতে বলতেই সে ছুটে চলে গিয়েছিল৷ মন্দার নির্বাক হয়ে তার চলে যাওয়া দেখে৷ কী বলল ঊর্মি! এসব কথা মন্দার তাকে কবে বলেছে? সে তো এগুলো কবিতা ডট কমে কুবলাশ্বকে বলেছিল! তবে ঊর্মি...৷ তার মাথায় বিদ্যুৎ খেলে যায়৷ বিস্মিত স্বরে আপনমনেই বলে—‘ঊর্মি কুবলাশ্ব!’
ঊর্মিই যে আসলে কুবলাশ্ব হতে পারে তা সে কখনও কল্পনা করতে পারেনি৷ যখন জানল তখন প্রথমে স্তম্ভিত হয়েছিল৷ পরে ঊর্মির ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকা, কবিতা সম্পর্কে গভীরতা, বিস্তারিত আলোচনা—সব একের-পর-এক মিলিয়ে দেখছিল৷ ঊর্মিকে সে ভালোবাসে, আর কুবলাশ্বকে শ্রদ্ধা এবং সমীহ—দুটোই করে৷ ঊর্মি কুবলাশ্ব না হলে তাতে ব্যথা পেত মন্দার৷ কিন্তু এখন হারানোর কথা ভাবতেই পারছে না!
সে আবার ডায়াল করল ঊর্মির নম্বর৷ ক্রমাগতই বেজে যাচ্ছে! তুলছে না কেউ৷ কেটে দিয়ে আবার ফোন করল৷ এবারও ফোন নিরুত্তর! মন্দারের মুখ শক্ত হয়ে ওঠে৷ আজই ব্যাপারটার এস্পার কি ওস্পার করে ছাড়বে সে৷ ঊর্মিকে তার সঙ্গে আজ কথা বলতেই হবে৷ সব সিদ্ধান্ত সে একা নিতে পারে না৷ মন্দারের কথাও তাকে শুনতেই হবে৷ শুনিয়েই ছাড়বে তাকে৷
সে ঘড়ির দিকে তাকায়৷ প্রায় তিনটে বাজতে যায়৷ স্টুডিয়োতে এখন উশ্রীর সঙ্গে যায় না ঊর্মি৷ অতএব তাকে বাড়িতেই পাওয়া যাবে৷
অসময়েই অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল মন্দার৷ তার মনে তখন অটুট সংকল্প! আজ ঊর্মিকে ছাড়বে না সে৷ মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে৷ তার সব প্রশ্নের জবাব আজ সে পাবে৷ আজ মন্দার তাকে কোনো মূল্যেই ছাড়ছে না!
—‘তুমি!’
দরজা খুলেই প্রায় ভূত দেখার মতো চমকে উঠল ঊর্মি৷ সে সপাটে মুখের উপর দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছিল৷ তার আগেই দরজার ফাঁকে পা গলিয়ে দিয়েছে মন্দার৷
—‘দাঁড়াও৷’
ঊর্মির চোখে সেই পাঁউরুটি ফ্রেমের চশমা, মাথায় ফেট্টি৷ তার মুখ লাল হয়ে উঠেছে—‘কেন এসেছ? তোমার এত বড়ো সাহস!’
—‘সাহসের এখনও কিছুই দ্যাখোনি তুমি৷’ মন্দার অদ্ভুত রকমের বেপরোয়া! সে এক ঝটকায় দরজা খুলে ফেলে জোর করেই ভেতরে ঢুকল—‘কিন্তু আজ দেখবে৷’
উশ্রী এখন শুটিংয়ে৷ ঊর্মির মা-বাবা এই সময়ে অফিসে থাকেন৷ ঊর্মিকে বাড়িতে একা পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ছিল৷ মন্দার দেখল, তার আন্দাজ সম্পূর্ণ সঠিক৷ বাড়ি একদম ফাঁকা৷ সে পিছন ফিরে দরজায় ছিটকিনি তুলে দেয়৷ ঊর্মি ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকে লক্ষ করছে৷ কোনোমতে বলে—‘কী করছ?’
—‘যা অনেক আগেই করা উচিত ছিল৷’
—‘মন্দার, পাগলামি করো না৷’
—‘আমি বিন্দুমাত্রও ‘পাগলামি’ করছি না৷’ সে ঊর্মির দিকে এগোতে থাকে—‘আমার চোখের দিকে তাকিয়ে দ্যাখো৷ সেখানে পাগলামি নেই৷’
মন্দারের চোখে অদ্ভুত জেদ! ঊর্মি ভয় পেয়ে পিছোতে থাকে৷
—‘আমি চ্যাঁচাব মন্দার...এগিয়ো না...৷’
—‘আজ স্বয়ং ঈশ্বর এলেও আমাকে ঠেকাতে পারবে না৷’ সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—‘চ্যাঁচাও...কত চ্যাঁচাতে পারো৷’
বলতে বলতেই মন্দার জাপটে ধরেছে ঊর্মিকে৷ তার বাহুবন্ধনের মধ্যে বনবিড়ালের মতো খণ্ডযুদ্ধ করছে মেয়েটা৷ হাতের নখে ছড়ে গেল মন্দারের গাল৷ তবু সে তাকে বুকের ওপর আরও শক্ত করে চেপে ধরেছে৷
—‘ছেড়ে দাও...৷’ ছটফট করতে করতে বলল ঊর্মি...—‘আমার লাগছে৷’
—‘চোপ!’
প্রেম মানুষকে হয়তো বন্য করে তোলে৷ করে তোলে শক্তিশালী৷ যে মন্দার আগে উশ্রীর সামনেই দাঁড়াতে ভয় পেত, সে যে কখন ছেলে থেকে পুরুষ হয়ে গেল তা কেউ জানে না! প্রেম শেখায় যে তার নিজের, তাকে যে-কোনো মূল্যে পেতে হবে৷ তার জন্য অল্প বলপ্রয়োগও দোষের নয়!
শান্তশিষ্ট হিসাবে পরিচিত মন্দারের উগ্র ধমক খেয়ে ঊর্মি হতভম্ব! মন্দার তখন মাথার ফেট্টি টান মেরে খুলে ফেলেছে৷ চশমাটাও একটানে চোখ থেকে সরিয়ে নিয়েছে৷
—‘আর কতদিন নিজেকে লুকিয়ে রাখবে?’ সে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে—‘নিজের আসল সৌন্দর্য কোথায় সেটা নিজেই জানো না! স্টুপিড কোথাকার! তুমি অসম্পূর্ণ? তোমার ভালোবাসার অধিকার নেই? তোমাকে আমি শিক্ষিত, ইনটেলেকচুয়াল, অসাধারণ ভাবতাম৷ কিন্তু তুমি তো একটা অশিক্ষিত, মধ্যযুগীয় মেয়ে ছাড়া কিছুই নও!’
সে ঊর্মিকে ছেড়ে দিল৷ উত্তেজনায় তার নিশ্বাস জোরে জোরে পড়ছে৷ ঊর্মি দু-হাতে মুখ ঢেকে ফেলে৷ ভুরুহীন কেশবিরল কুৎসিত মুখ কাউকে দেখাতে চায় না৷
—‘মুখ ঢেকেছ কেন?’ মন্দার তার হাত দুটো জোর করে সরিয়ে দিয়েছে৷ নিজের দুই হাতে তার মুখ চেপে ধরে—‘ভুরু থাক বা না থাক, চুল থাক বা না থাক এ মুখ এখন আমার৷ দেখতে দাও আমায়৷’
দু-মিনিট সব চুপচাপ৷ মন্দারের চোখে অদ্ভুত মুগ্ধতা! ঊর্মির মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেও যেন তার সাধ মেটে না৷ এমন গভীর নদীর মতো চোখ, স্নেহক্ষরা দৃষ্টিতে অদ্ভুত বিস্ময়, প্রেম আর কান্না! চোখের জলেও এত সুখের রং থাকে তা সে আগে কখনও দেখেনি৷ ঊর্মির ঠোঁটজোড়া প্রজাপতির মতো থিরথির করে কাঁপছে৷ এ নারী কুৎসিত নয়! এ নারী অন্য প্রজাতির! সম্পূর্ণ আলাদা৷
—‘কবির প্রেমিকারা কেউ নারী নয় ঊর্মি৷ আমি বুঝতে পেরেছি, আসলে তারা শুধু একটা আইডিয়া৷ তারা কারুর নয়৷ তারা আসলে কেউ নেই৷ কিন্তু তুমি আছ৷ তুমি আমার রক্তমাংসের নারী৷’ মন্দার চিবুক ধরে তার মুখ সামান্য তুলে দেয়—‘মন্দার ভট্টাচার্যকে গড়ে উঠতে দেখেই খুশি! গড়ে ওঠার পথে সঙ্গ দেবে না?’
ঊর্মি কেঁদে ফেলছিল৷ জীবনে এত সুখ কখনও সে পায়নি৷ আজ পর্যন্ত জেনে এসেছে কোনো পুরুষের ভালোবাসা পাওয়া তার ভাগ্যে নেই৷ সংসার, সন্তান, নিজের পুরুষ কোনোটাই তার জন্য নয়৷ কিন্তু আজ মন্দারের প্রেমসিক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হল—ও আমার!...ও শুধুই আমার! ওকে ঈশ্বর আমার জন্যই পাঠিয়েছেন৷
মন্দারের মুখ তার মুখের কাছে ঘন হয়ে এসেছে৷ ঠোঁটের ওপর ঠোঁট৷ বাধা দিল না৷ পরম সুখে তার চোখ বুজে এসেছে৷ ঠোঁট ঠোঁট ডুবিয়ে পাগলের মতো চুমু খাচ্ছে মন্দার৷ তার হাত দুটো বড়ো সযত্নে খুলে ফেলেছে নাইটি৷ আঙুলগুলো এমনভাবে স্পর্শ করছে যেন সে বড়ো দামি জিনিস৷ ঊর্মি বড়ো আনন্দে দুজনেই অধীর৷ দুটো হূদপিণ্ড বড়ো কাছাকাছি, একসঙ্গে স্পন্দিত হচ্ছে৷ যেন বলছে—
‘আমার কাছে আসতে বোলো
আমায় ভালোবাসতে বোলো
বাহিরে নয়, বাহিরে নয়
ভিতর জলে ভাসতে বোলো
আমায় ভালোবাসতে বোলো
ভীষণ ভালোবাসতে বোলো
বিছানায় মন্দারের বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়েছিল ঊর্মি৷ আজ প্রমাণিত হয়েছে সে নারী৷ সেও ভালোবাসতে পারে৷ অন্য মেয়েদের মতো রতিক্রিয়াতেও পারদর্শী৷ জীবনের এই নতুন আবিষ্কারে বারবার রোমাঞ্চিত হচ্ছিল সে৷
—‘হাতটা দাও তো৷’
মন্দারের কথা শুনে মুখ তুলে তাকায় ঊর্মি—‘কেন?’
—‘যোগ্য হাত যখন পেয়েছি, তখন এটাও পরিয়ে দিই৷’
তার হাতে এককণা নীলাভ আগুন দ্যুতি ছড়িয়ে জ্বলে উঠল৷ এই সেই হিরের আংটি৷ তার অনামিকায় অতি যত্নে আংটিটা পরিয়ে চুমু খেল মন্দার—
—‘আমার সমস্ত জীবন, সমস্ত অনুভব তোমায় দিলাম৷ নিজের করে নেবে ঊর্মি৷’
ঊর্মি লাজুক হেসে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল৷
—‘ম্যায় করু তো শালা, ক্যারেক্টার ঢিলা হ্যায়৷’
কফি হাউসে বসে শুঁটকি কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে কবি অনুপম মিত্রের দিকে মন্তব্যটা ছুড়ে দিল৷ কথাটা বলেই সজোরে হেসে উঠেছে৷ অনুপম অপ্রস্তুত—‘কী বলতে চাইছ?’
—‘কী আর বলব?’ সে চিকেন স্যান্ডউইচে আলতো কামড় বসায়—‘তুই তো বাবা, দিব্যি দোকান খুলে বসেছিস৷ এখনও আঁতেলগুলো ছাড়া কবি হিসাবে আর কেউ তোর নাম জানে না! শিয়ালদা স্টেশনে গিয়ে দশটা লোককে ‘অনুপম মিত্র’র নাম বললে ভাববে—তল্লাটে নতুন কোনো টিকিট চেকার এসেছে৷’
অনুপমের মুখ রক্তাভ হয়ে ওঠে৷ কিন্তু রেগে গিয়েও কিছু বলার উপায় নেই৷ ইনফ্যাক্ট বলার ক্ষমতাই নেই৷ শুঁটকিকে সমস্ত কবিই অল্পবিস্তর চেনে৷ কথার ঝাঁঝের জন্যও কুখ্যাত৷ বেশি কথা বললে এমন ডোজ দেবে যে পালাবার পথ পাওয়া যাবে না৷
তাই সে মুখ বুজেই থাকল৷
—‘অথচ এখনই বগলে মামণিদের নিয়ে ঘুরছিস৷ পরশু রাখি৷ তরশু মল্লিকা৷ কাল মুন্নি, আজ...?’
শুঁটকি কিছু বলার আগেই অনুপমের পাশের মেয়েটি নিজের নাম বলে দিল—‘শীলা৷ শীলা ভাদুড়ি৷’
—‘বাঃ৷ শীলাও চলে এসেছে!’ কৌতুকে তার চোখ নেচে ওঠে—‘উইদ হার জওয়ানি!’ শুঁটকির দৃষ্টি মেয়েটির দিকে ফিরল—‘তা মামণি, এত লোক থাকতে এই ভামটার সঙ্গে ঘুরছ কেন? দেখে তো বাচ্চা মেয়ে বলেই মনে হচ্ছে৷ নিশ্চয়ই কবিতা লেখো৷ আর এই মাকড়াটা বলেছে যে ওর সাথে ঘুরলে বড়ো বড়ো পত্রিকায় লেখার স্কোপ দেবে৷ তাই না?’
মেয়েটি অবাক হয়ে একবার শুঁটকির দিকে, আর একবার অনুপমের দিকে তাকায়৷ সে কী করে জানবে যে মার্কেটে সকলেই অনুপমকে হাড়ে হাড়ে চেনে! বয়েস চল্লিশ ছাড়িয়েছে৷ ঘরে স্ত্রী-ছেলে সবই আছে৷ তবু তার চুলকানি কমেনি৷ মহিলা কবি দেখলেই তাকে প্রোমোট করার প্রতিশ্রুতি দেয়৷ বলে— ‘আমার সঙ্গে লেগে থাকো৷ তোমার ব্যবস্থা করে দেব৷’ সে লেগে থাকার প্রসেস যে কেমন, আর শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থা কী হয় তা কারুর অজানা নেই৷
শুঁটকি মেয়েটির দিকে তাকায়৷ রীতিমতো সুন্দরী৷ সুন্দরীরা আবার কবি হলে নাক উঁচু হয়৷ এই মেয়েটির হাবভাবও তেমন৷ একটা অদ্ভুত ‘সবজান্তা...সবজান্তা’ ভাব!
তার মেয়েটিকে নিয়ে একটু মজা করার ইচ্ছে হল৷ সে আস্তে আস্তে বলে—‘তা মামণি, কতদূর পড়াশোনা করা হয়েছে?’
—‘ইংলিশে এম. এ. করেছি৷’ সপ্রতিভ উত্তর৷
—‘তারপর? ফিউচারে কী করার ইচ্ছে আছে?’
—‘লেখালেখিই করব৷ কবিতা আমার প্যাশন৷’
—‘কীরকম প্যাশন?’ শুঁটকি মুচকি হাসে৷
মেয়েটি কফি হাউসের ছাতের দিকে তাকিয়ে বলে—‘আই ইট পোয়েট্রি, ড্রিংক পোয়েট্রি, ড্রিম পোয়েট্রি,...৷’
—‘ওরে বাবা! তুমি তো দেখছি কবিতা গুলে খেয়ে ফেলেছ৷ বেশ, বেশ৷ তা বাংলা কবিতা লিখবে না ইংলিশ?’
—‘দুটোই৷’ মেয়েটা শুঁটকির সামনেই ফস করে একটা সিগারেট ধরাল৷ ‘আই ওয়ান্না বি আ বাইলিঙ্গুয়াল পোয়েট৷’
‘বাইলিঙ্গুয়াল! আ-হা৷’ সে কী যেন ভাবছে—‘তুমি নিশ্চয়ই প্রচুর পড়াশোনা করেছ৷ বাইলিঙ্গুয়াল পোয়েট হওয়া সহজ কথা নয়৷ তা বলো তো মা—এই লাইনগুলো কার?’
শুঁটকি আবৃত্তি করল—'I saw her as a sailor after the storm/rudderless in the sea, spies of a sudden/the grass green heart of the leacy island/where were you so long? she asked...'
মেয়েটি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে অনুপমের দিকে তাকায়৷ অনুপমেরও ‘সসেমিরা’ অবস্থা৷ কবিতাটা সে-ও চিনে উঠতে পারেনি৷ গুরু ও শিষ্যার দ্বৈত কনফিউশন দেখে শুঁটকির হাসি পাচ্ছিল৷ তবু সে হাসি চেপে গম্ভীর সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে৷
—‘টেনিসন?’
টেনিসন! শুঁটকি এবার হেসে ফেলেছে৷ হাসতে হাসতেই বলল—‘নাঃ৷’
—‘তবে? শেলী? বা ওয়ার্ডসওয়ার্থ?’
পাশ থেকে অনুপমও জানতে চায়—‘কীটস?’
—‘বেচারা বায়রন বাদ গেল কেন?’ সে অনুপমের দিকে তাকিয়ে চোখ টেপে—‘আফটার অল লোকটা ‘ডন জুয়ান’ লিখেছিল৷ যাকে এককথায় তোর বায়োগ্রাফি বলা যায়!’
অনুপম অপমানিত বোধ করে৷ বিরক্ত গলায় বলে—‘রহস্য ছেড়ে বলবে এটা কার লেখা? আমি কস্মিনকালেও পড়িনি...৷’
—‘শিয়োর যে কস্মিনকালেও পড়িসনি?’ তার মুখে একটা রহস্যময় হাসি, চোখে কৌতুক—‘দাঁড়া, এটার বাংলা ভার্সানটা বলি৷ এবার দ্যাখ পড়েছিস কিনা!’
বলেই সে গড় গড় করে বলে গেল—....‘হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা/সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি দ্বীপের ভিতর/তেমনই দেখেছি তারে অন্ধকারে, বলেছে সে, এতদিন কোথায় ছিলেন?...’
অনুপম প্রায় লাফিয়ে ওঠে—‘পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন! জীবনানন্দ!’
—‘তাহলে দেখ কস্মিনকালেও পড়িসনি কথাটা ঠিক নয়!’ শুঁটকি বলল— ‘প্রথমটা চিদানন্দ দাশগুপ্তের অনুবাদ ছিল৷ ইংরেজি শব্দগুলোর মানে ভালো করে বুঝলেই বনলতা সেন’কে ধরতে তোর দু-মিনিটও লাগত না৷ কিন্তু তোরা তো কবিতা পড়িস না—মুখস্থ করিস৷ মুখস্থ বিদ্যা গাল ভরে আওড়াতে খুব ভালো লাগে৷ কিন্তু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেই ফুসসস৷’
বলতে বলতেই তার সহাস্য দৃষ্টি মেয়েটির দিকে ফেরে—‘বুঝেছ মামণি? কবি হতে গেলে সিগ্রেট, মদ, দাদা, মামা, কিস্যু ধরার দরকার নেই৷ স্রেফ কবিতাকে ধরো৷ তাকে জলে গুলে খাওয়ারও দরকার নেই৷ শুধু বোঝো, অনুভব করো৷ কবিতাই পারে তোমাকে কবি বানাতে, দাদারা নয়৷ বিনে পয়সায় জ্ঞান দিলুম৷ নিলে নাও, নয়তো ‘শীলা কি জওয়ানি’র চর্চা ই করো৷ আটকাচ্ছে কে?’
দুই বিমূঢ় নরনারীকে রেখে সে হাসতে হাসতে কফি হাউস থেকে বেরিয়ে গেল৷ এখন ঘড়ির কাঁটা পৌনে তিনটের ঘর ছুঁইছুঁই৷ আর পনেরো মিনিট এদিক-ওদিক ঘুরে কাটিয়ে দেবে৷ কফি হাউসে বসলেও হত৷ কিন্তু অনুপম আর ওই কচি মেয়েটার ঢলাঢলি দেখার ইচ্ছে তার বিন্দুমাত্রও নেই৷
কফি হাউসের সিঁড়ির ঠিক নীচে একটা সিগারেট-চুইংগাম-চকোলেটের ছোট্ট দোকান আছে৷ সেখান থেকেই এক প্যাকেট সিগারেট কিনল শুঁটকি৷ কী ভেবে যেন গোপালের জন্য একটা চকোলেট বারও নিয়ে নিয়েছে৷ ব্যাটাকে আজ রাতে বিরিয়ানি খাইয়েই ছাড়বে৷
আপাতত হাতে যখন সময় আছে তখন বিরিয়ানিটাও এই বেলাই কিনে নেওয়াই যাক৷ পরে মাইক্রোওয়েভে গরম করে নিলেই চলবে৷
ভাবতে ভাবতেই বেরিয়ে পড়েছে সে৷ কিন্তু এগোতে গিয়েই বাধা পেল৷ ভেড়ার পাল লাইন করে চলেছে আমহার্স্ট স্ট্রিটের দিকে৷ যেন ঠিক শেভিংক্রিমের ফেনা মেখে, গম্ভীর মুখে গুটগুটিয়ে যাচ্ছে৷ তার মধ্যে একটা শুঁটকির প্রায় গায়ের ওপরই উঠে পড়ছিল৷ কোনোমতে লাফ মেরে সরে গিয়ে এড়িয়েছে৷ তার বিরক্ত লাগে! এ কী রে বাবা! যাচ্ছে তো যাচ্ছেই৷ আর-একটু তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারে না!
বিরক্ত হয়ে সে আরও কিছু ভাবতে যাচ্ছিল—তার আগেই একটা কানফাটানো আওয়াজ; প্রচণ্ড কোলাহল৷ তীব্র তীক্ষ্ণ সমবেত ভয়ার্ত চিৎকার! যেন হঠাৎ সচকিত হয়ে উঠল গোটা এলাকা৷ গাছে গাছে বসে থাকা কাকগুলো কর্কশস্বরে মহা শোরগোল ফেলে দিল৷ এবার ভেড়াগুলো দুড়দাড়িয়ে ছুটতে শুরু করেছে! তার পিছনেই মানুষের দল৷ ভেড়ার পালের মতোই দৌড়ে আসছে এদিকে৷ চোখে-মুখে আতঙ্ক৷ হল কী!
—‘কী হয়েছে দাদা?’
সে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসা একটি লোককে জিজ্ঞাসা করে৷ কিন্তু লোকটা উত্তর দেবে কি? সে শুঁটকিকে এক ধাক্কা মেরে বেরিয়ে গেছে সামনের দিকে৷ অসহায়ভাবে খুঁজছে একটা নিরাপদ আশ্রয়!
শুঁটকি দেখল ঝপঝপ করে সব দোকানের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে! একদল যুবক-যুবতি তার পাশে দিয়ে দৌড়ে গেল৷ তাদেরই একজনের ভীত কণ্ঠস্বর শুনল শুঁটকি—‘পুলিশ এসেছে...ফায়ারিং চলছে!’
ওর মনে পড়ে আজ সকালেই বিশু বলেছিল একটা প্রতিবাদ মিছিলের কথা৷ সম্ভবত সেই মিছিল এখানে এসে পৌঁছেছে৷ কফি হাউসে থাকাকালীন কোনো শব্দ পায়নি সে৷ কিন্তু বেরিয়ে একটা হালকা স্লোগানের শব্দ পেয়েছিল৷ কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা প্ল্যাকার্ড ফেস্টুন হাতে নিয়ে একটু আগেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেছে৷ সে তো কত কারণেই যায়৷ কলেজ স্ট্রিট এলাকায় প্রায়ই স্লোগান, ভাষণ, জমায়েত লেগে থাকে৷ নিতান্তই পরিচিত দৃশ্য৷ তাই বিশেষ পাত্তা দেয়নি শুঁটকি!
এখনও যে গোটা ব্যাপারটা পরিষ্কার বুঝল, তাও নয়৷ তবু আন্দাজ করতে পারল, হয়তো প্রতিবাদ মিছিল কোনো কারণে জনবিক্ষোভে পরিণত হয়েছিল৷ অথবা হত্যার বদলে হত্যার রাজনীতি৷ বোধ হয় দুই রাজনৈতিক দল হিংসাত্মক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে৷ ফলস্বরূপ পুলিশের এই পেশি প্রদর্শন!
পিলপিল করে লোক দৌড়োচ্ছে৷ শুঁটকি ধাক্কার পর ধাক্কা খেতে খেতে জনস্রোতের উলটো দিকে চলল৷ তারও পালানোই সমীচীন ছিল৷ কিন্তু অদ্ভুত কী এক কৌতূহলে সে অকুস্থলের দিকেই এগোল৷ একের-পর-এক ফায়ারিঙের শব্দ কানে আসছে! প্রবল চিৎকার-চ্যাঁচামেচি! তার মধ্যেই স্লোগানের আওয়াজ৷
একটু এগোতেই গোটা দৃশ্যটা চোখে পড়ে তার৷ কে কোন দলের তা এই মুহূর্তে বোঝা সম্ভব নয়! রাস্তায় লুটিয়ে পড়ছে ফেস্টুন! ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে৷ আতঙ্কিত মানুষের পায়ের তলায় পিষে যাচ্ছে প্ল্যাকার্ড৷ খাকি উর্দি পরা একদল মানুষ এলোপাথাড়ি লাঠি চালিয়ে যাচ্ছে৷ বাইশ-তেইশ বছরের এক যুবক রক্তাক্ত দেহে এলিয়ে পড়েছে রাস্তার ওপরে৷ তবু স্লোগান দিয়ে যাচ্ছে! তার হাতের দৃঢ় মুঠি তখনও আকাশের দিকে অভ্রান্ত লক্ষ্যে স্থির৷ পুলিশের নিষ্ঠুর লাঠিও তাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে পারেনি৷
শুঁটকি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিল, এ কোথায় এসে পড়েছে! লাঠির বাড়ি খেয়ে কতগুলো তাজা মুখ রক্তাক্ত হয়ে যাচ্ছে, ঢলে পড়ছে মাটিতে! কেউ নির্বিবাদে মার খাচ্ছে, কেউ পালাচ্ছে! মিছিল ছত্রভঙ্গ৷ তবু পিছন থেকে কয়েকজন এসে পুলিশকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল৷ দু-একটা ইট-পাটকেল উড়ে এল উর্দিধারীদের লক্ষ্য করে৷ লাগল হেলমেটে৷ প্রতিশোধস্পৃহায় যেন উন্মত্ত হয়ে উঠেছে লোকগুলো৷
মেয়েদের ওড়না, সালোয়ার কামিজ ছিঁড়ে গেছে৷ জমে আছে চাপ চাপ রক্ত৷ সেই অবস্থাতেই তাদের চুলের মুঠি ধরে রাস্তার ওপর দিয়েই ঘষটাতে ঘষটাতে নিয়ে চলল পুলিশ ভ্যানের দিকে৷ উদভ্রান্ত, আতঙ্কিত জনতা দিগবিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়োচ্ছে৷ চতুর্দিকে শুধু আর্তনাদ, রক্ত, মৃত্যুর বিভীষিকা!
হঠাৎ মনে হল সে কিছু শুনতে পাচ্ছে না! কিছু দেখতে পাচ্ছে না! মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে দাঁড়াল৷
শুঁটকি বিস্ফারিত চোখে দেখল ওই আতঙ্কিত মানুষের ভিড়, ক্ষতবিক্ষত দেহগুলোর মধ্যেই রাস্তায় বসে আছে এক দু-তিন বছরের পথশিশু!! যে-কোনো মুহূর্তে তাকে পদপিষ্ট করে চলে যাবে বিভ্রান্ত মানুষের দল! সে কিছুই বুঝছে না! ভয়ার্ত দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজছে৷ আর চিৎকার করে অসহায়ের মতো কাঁদছে!
সে কান্নার ভাষা কী ছিল তা জানে না শুঁটকি৷ কিন্তু তার মনে হল ওই অসহায়, বিপন্ন বাচ্চাটা—‘বাবা...বাবা...’ বলে কাঁদছে৷ একদিকে জনতার রাশ৷ অন্যদিকে মারমুখী পুলিশের লাঠি! যে-কোনো মুহূর্তে ওর নরম খুলি দু-টুকরো হয়ে যাবে যেমন দিঘার বোল্ডারে বুবাইয়ের মাথাটা!
সে দেখল—বুবাই রাস্তায় বসে দু-হাত বাড়িয়ে তাকে ডাকছে৷ ও আর কেউ নয়! তার বুবাই! বুবাই কাঁদছে ‘বাবা...বাবা...’ করে, অসহায় ভাবে ডেকে চলেছে৷ তাকেই খুঁজছে৷
একমুহূর্তেই মাটিতে লুটোল এতদিনের পরিশ্রম! এতদিনের স্বপ্ন-কবিতার পাণ্ডুলিপি রাস্তাতেই গড়াগড়ি খাচ্ছে! শুঁটকি ছুড়ে ফেলে দিল সবকিছু৷ উন্মাদের মতো সবলে জনস্রোতের বুক চিরে ছুটতে লাগল বাচ্চাটার দিকে! বুবাইয়ের মাথা লক্ষ্য করে উদ্যত হয়েছে শক্ত লাঠি! আবার চলে যাবে ও! বাবাকে ছেড়ে চলে যাবে!
যেতে দেব না তোকে...আর যেতে দেব না বাবা!
সে চিৎকার করে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাচ্চাটাকে আড়াল করে৷ পুলিশ ক্ষিপ্ত হয়ে এলোপাথাড়ি লাঠি চালাচ্ছিল৷ এক বাড়িতেই ওইটুকু শিশুর মাথা চুরমার হয়ে যেত৷ হয়ে গেলেই বা কী হত! কত ভিখিরি মায়ের শিশু এভাবেই বছরের-পর-বছর মারা যায়৷ মৃতের সংখ্যা একটা বাড়ত বই তো কিছু নয়৷
অথচ তার আগেই কোথা থেকে এক খ্যাপা এসে লাফিয়ে পড়ল তার ওপরে৷ বুকে জড়িয়ে ধরেছে বাচ্চাটাকে৷ লাঠির মোক্ষম বাড়ি থেকে বাঁচল শিশু৷ কিন্তু লোকটা নিজেকে বাঁচাতে পারল না৷ জোরালো আঘাত পড়ল একেবারে মাথার পিছন দিকে৷ মস্তিষ্কের সবচেয়ে অরক্ষিত অংশে!
বাচ্চাটা দেখল তাকে যে মানুষটা বুকে জড়িয়ে ধরেছিল, তার মাথা দিয়ে গল গল করে রক্ত পড়ছে৷ নাক দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ল শিশুটির মুখের ওপর৷ তা সত্ত্বেও লোকটা তার দিকে তাকিয়ে কেমন অদ্ভুতভাবে হাসছে৷ দু-হাত শক্ত করে ধরে তাকে বুকের নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে, সে নিজে অবশভাবে কাত হয়ে পড়ল৷ ভয়ার্ত মানুষেরা তাকে মাড়িয়ে চলে যাচ্ছে৷ কিন্তু তার কোনো সাড়া নেই! সে স্থির দৃষ্টিতে কী যেন দেখছে!
শুঁটকি কেমন যেন অসাড় হয়ে যাচ্ছিল! তার মাথা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে৷ কত রক্ত...কত রক্ত! অথচ রক্তের গন্ধ নেই তো! বরং হাস্নুহানার গন্ধে ভরে যাচ্ছে চতুর্দিক!
শুঁটকি মুগ্ধ হল৷ তার রক্তে এত হাস্নুহানার গন্ধ মিশে ছিল! শিরায় শিরায় এতদিন ধরে বয়ে চলেছিল রুমার সৌরভ! আজ সেই সুগন্ধ শুঁটকির দেহ থেকে ছড়িয়ে পড়ল হাওয়ায় হাওয়ায়; সমস্ত কলেজ স্ট্রিট জুড়ে আজ রুমার গন্ধ!
সে জানে মৃত্যু আসছে৷ সবাই বলে মৃত্যু বড়ো কষ্টকর৷ কিন্তু মৃত্যু কি রুমার মতো? নয়তো সামনে এসে ও কে দাঁড়িয়েছে! সাদা শাড়ি হাওয়ায় উড়ছে৷ উড়ছে খোলা চুল৷ সমুদ্রের সামনে দাঁড়ালে এ নারীকে ভেনাসের মতো দেখায়৷ এই মুহূর্তে ছায়া ছায়া নয়৷ নয় ঘষা কাচের পিছনের আবছায়া—একেবারে স্পষ্ট রুমা৷ হাত বাড়িয়ে তাকে ডাকছে!
শুঁটকি হাসতে চাইল৷ বলতে চাইল—‘এসেছ?’
তার মুখটা হঠাৎ একটা হেঁচকি তুলেই শক্ত হয়ে গেছে৷ কিন্তু চোখ দুটো তখনও হাসছে, ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি৷ বুকের ভেতর শিশুটাও টের পেলে না মানুষটার বুকের ওঠাপড়া থেমে গেছে!
শুঁটকি দেখতে পেল না তার বড়ো সাধের কবিতার পাণ্ডুলিপিকে পিষে দিয়ে চলে গেল পুলিশের জিপ! সেই ভিখারিনি জানতে পারল না যে তার প্রার্থনা ঈশ্বর এত তাড়াতাড়ি কবুল করে নিয়েছেন৷ মন্দার জানল না, যে মানুষটি তাকে বাঁচতে শিখিয়েছিল, সে আজকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে৷ আর কবিতা ডট কমের সদস্যরা কোনোদিনই হয়তো জানবে না যে, সাইটের মডারেটর ব্যাসদেবের প্রোফাইলটা থেকেই গেল, কিন্তু লোকটা নেই!
—‘তুই নাকি আবার কবিতা লিখছিস?’
ঘুঁটু চায়ের কাপে আলতো চুমুক দেয়৷ তার বহরের জন্য সে সবসময়ই ঘামে৷ তার কপালে ঘাম জমছিল৷ গহন সেটা লক্ষ করেই এ. সি. চালিয়ে দেন৷
—‘কবিতা লিখছি কিনা জানি না—কিন্তু কিছু একটা লিখছি৷’
—আমাকে ‘স্বদেশ’-এর সম্পাদক বললেন তুই ওঁদের স্পেশ্যল ইস্যুতে কবিতা দিবি বলেছিস৷’
—‘ঠিকই শুনেছিস৷’ গহন শান্ত স্বরে বললেন—‘তবে কবিতা লিখব বলিনি৷ বলেছি কিছু একটা লিখব৷’
—‘তুই কবিতা ছাড়া আর কী লিখবি!’ ঘুঁটু অবাক৷
তিনি স্মিত হাসলেন—‘এর আগেও কি আদৌ কবিতা লিখছিলাম! যাইহোক, এবার অন্তত কিছু লেখার চেষ্টা করব৷’
—‘তাহলে আমাদের ম্যাগাজিনে একটা কবিতা দে গহন৷ অনেকদিন তোর লেখা পড়িনি৷’
ঘুঁটুর চোখ আমেজে বুজে আসে—‘আহা, কী জলতরঙ্গের মতো শব্দ, কী রোম্যান্টিসিজম, কী অদ্ভুত ছন্দ!...ভীষণ মিস করি তোর লেখা৷’
গহন তার দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন৷
—‘ঘুঁটু, তুই কি সত্যিই আমার লেখা চাস? না ফরমায়েশি লেখা চাইছিস?’
—‘ফরমায়েশি লেখা কখন চাইলাম!’ ঘুঁটু আকাশ থেকে পড়ে৷
—‘এই যে বললি জলতরঙ্গের মতো শব্দ, রোম্যান্টিসিজম, ছন্দ—এটসেট্রা, এগুলো যদি বাদ দিয়ে দিই—তবেও কি আমার কবিতা চাইবি?’
সে অবাক হয়ে গহনের দিকে তাকিয়ে আছে৷ গহন আপনমনেই দীর্ঘশ্বাস ফেলেন৷ এরা তাঁকে রোম্যান্টিক কবির ট্যাগ লাগিয়ে দিয়েছে৷ এ ট্যাগ ভেঙে বেরোতেই হবে তাঁকে৷ তিনি প্রসঙ্গ পালটালেন—‘অসিতদা কেমন আছেন?’ ঘুঁটুর মুখে হতাশার ছাপ পড়ল—‘আছেন একরকম৷ কথাবার্তা বলেন না৷ ঠিকমতো চিনতেও পারেন না৷ হাতটা হয়তো ফিজিয়োথেরাপিতে খানিকটা ঠিক হবে৷ কিন্তু মানসিক অবস্থা খুব খারাপ৷ ডাক্তার বলছে— ডিপ্রেশন৷’
গহনের মনে পড়ল অসিতদার বলা কথাগুলো৷ কথা নয়, যেন হাহাকার! তবে কি তাঁর মনের অবচেতনে কোথাও অন্য কোনো সুপ্ত বাসনা ছিল? আদর্শের জন্য তাকে অবহেলা করেছেন? আর তাই হয়তো এই শেষ বেলায় অবহেলিত ইচ্ছেগুলো তাঁকে টেনে নিয়ে গেছে অবচেতনে৷ ঘিরে ফেলেছে নিরন্তর হতাশায়৷
—‘এখন আর কবিতা লেখেন না?’
—‘ওটাই শুধু আছে৷’ ঘুঁটু বলে—‘হাতের কাছে কাউকে পেলেই তাকে ইশারায় খাতা-পেন আনতে বলেন৷ তারপর লাইন-বাই-লাইন বলে যান৷ কবিতা শেষ হয়ে গেলে ফের কী চিন্তায় যেন ডুবে যান৷ আর কিছু বলেন না৷ এই তো কালই এই কবিতাটা আমি কপি করেছি৷’
সে ব্যাগ থেকে একটা নোটবুক বের করে আনে৷ গহন কবিতাটা পড়লেন—
আমাকে দিয়েছ তুমি বুদ্ধি, মন, ইন্দ্রিয়নিচয়;
শ্রেষ্ঠত্বের যত পরিচয়—
বিবেকের কশাঘাত, বুদ্ধির আলো
মনুষ্যত্ব বিকাশের সুবর্ণসুযোগ—
শব্দে শব্দে সন্ধির যোগ!
মনুষ্যত্ব বিকশিত হয়নি আমার
জীবনের গুরুভার বইতে পারিনি আর
আশ্চর্য ভাতের গন্ধে ভরেছিল আকাশ
তখন বসন্ত মাস৷
অহো! কী অবর্ণনীয় শোভা!
ভাতের চেয়েও কি সে বেশি মনোলোভা!
যে বালক উঠোনে বাঘবন্দি খেলত
বসন্ত তার জীবনে এসেছে কখনও....
কবিতা-আজ তুমি শোনো—
মনুষ্যত্ব ছিল আমার,
সুযোগ ছিল, ইন্দ্রিয় ছিল,
ছিল বিবেক, বুদ্ধিও ছিল
শুধু বিষ...বিষে ভরেছি অণু-পরমাণু
আমি অমানুষ
তিনি কবিতা পড়া শেষ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷ নোটবইটা ঘুঁটুকে ফেরত দিয়ে বলেন—‘তুই আমার কবিতা চাইছিলি না? তার জায়গায় এই কবিতাটা ছেপে দে৷’
—‘খেপেছিস!’ ঘুঁটু প্রায় লাফিয়ে ওঠে—‘অসিতদা চিরকাল প্রতিষ্ঠানবিরোধী! আমি যদি পত্রিকায় এই কবিতা ছাপাই তাহলে উনি আত্মহত্যা করবেন!’ এমনিতেই মানুষটা আধমরা হয়ে আছে৷ তুই কি ওঁকে পুরোপুরি মারতে চাস গহন?’
গহন স্মিত হাসলেন৷ ঘুঁটুর কাঁধে হাত রেখে বলেন—‘আমি আমার কথা বললাম৷ তুই ভেবে দেখ৷ তবে আমার মনে হয় না অসিতদা আত্মহত্যা করবেন!
ঘুঁটু আরও কিছুক্ষণ থেকে, কিছু চানাচুর আর কুকি ধ্বংস করে অবশেষে উঠে পড়ল৷ তাকে ফের অফিসে ফিরে যেতে হবে৷
ঘুঁটুকে বিদায় দিয়ে নিজের ঘরে ফিরে এলেন গহন৷ টেবিলের ওপরে বইপত্র অগোছালো ভাবে পড়েছিল৷ শুঁটকির কাছ থেকে বেশ কিছু বই নিয়ে এসেছিলেন৷ সেগুলোকে সকাল থেকে পড়ছেন৷ কিন্তু নিরুপদ্রবে পড়তে পারছেন না৷ কী করে যেন চতুর্দিকে রাষ্ট্র হয়ে গেছে যে, কবি গহন দত্তগুপ্ত ফের লেখালেখি শুরু করেছেন৷
ব্যস, তারপর থেকেই একের-পর-এক ফোন৷ একের-পর-এক আবদার৷ কারুর পাঁচটি প্রেমের কবিতা চাই, কারুর নিশিগন্ধা সিরিজের নতুন কবিতা লাগবে, কারুর-বা আবার বক্তব্য—‘দাদা, প্লিজ একটা কবিতা দিন৷ আপনার নামে বিজ্ঞাপন পর্যন্ত দিয়েছি৷ এখন কবিতা না পেলে নাক কাটা যাবে!’
কতজনের নাক রক্ষা করবেন গহন? মনে মনে বিরক্ত হয়ে উঠছিলেন৷ আশ্চর্য আক্কেল এদের! বিজ্ঞাপন দেওয়ার আগে একবার জিজ্ঞাসা করে নেয় না কেন? অনুমতি ছাড়াই তাঁর নামে বিজ্ঞাপন দিয়ে বসে আছে! যেন ওদের নিজের ওপর নিঃশর্ত জোতদারি দিয়ে দিয়েছেন তিনি!
আলগোছে বইগুলো টেবিলের ওপর থেকে শোকেসে তুলে রাখছিলেন গহন৷ শুঁটকির বই বলে কথা! একটা আঁচড় লাগলেও সে গহনের মুন্ডু চিবোবে৷
কণা তখন বেডরুমে বসে টি.ভি দেখছিলেন৷ রোজ বিকেলে খবরটা দেখা তাঁর প্রাত্যহিক অভ্যাস৷ কোথায় কী হচ্ছে তা না দেখলে রাতের খাবার হজম হবে না তাঁর৷
আজও চ্যানেল বদলে বদলে প্রাত্যহিক খবর দেখছিলেন তিনি৷ ফিলমের গসিপ, নায়ক-নায়িকার ইন্টুপিন্টু রসিয়ে রসিয়ে পরিবেশন করছে উপস্থাপিকা৷ তিনি চ্যানেল বদলালেন৷ এসব চটুল খবর শুনতে ভালো লাগে না৷
পরের চ্যানেলে যেতেই টিভিতে ভেসে উঠল চতুষ্কোণ পর্দায় মারপিটের দৃশ্য৷ প্রতিবাদ মিছিলের ওপর অন্যায়ভাবে পুলিশের লাঠিচার্জ! পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে যে, প্রতিবাদ মিছিল সহিংস হয়ে উঠেছিল৷ তারা গাড়ি ভেঙেছে, বাস জ্বালিয়েছে, বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসাবে পরিচিত মানুষদের মেরেছে৷ অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি ঠেকানোর জন্যই পুলিশের এই পদক্ষেপ৷
পুলিশের দাবি, তারা ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করেছে৷ সরাসরি গুলি চালায়নি৷ অথচ সাংবাদিকের ক্যামেরায় বুলেটের আঘাতে নিহত যুবকের দেহ! কণা দেখলেন রাস্তার ওপরে রক্তাক্ত দেহের ভিড়! অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হচ্ছে তাদের৷
দেখতে দেখতেই তাঁর চোখ বিস্ফারিত! এ কী দেখছেন! হঠাৎ যেন শ্বাসকষ্ট হতে শুরু করল৷ সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে ওঠেন—‘গহন...’
তাঁর আর্ত চিৎকার শুনেই গহনের হাত থেকে বইগুলো পড়ে গেছে৷ তিনি প্রায় দৌড়ে এসেছেন৷ কণার মুখ উত্তেজনায় লাল! দমকে দমকে উঠে আসছে কাশি৷ কিছু বলার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন৷ কিন্তু পারছেন না৷
—‘কণা...৷’ গহন ব্যাকুলভাবে তাঁকে জড়িয়ে ধরে মাথায়, গায়ে হাত বুলিয়ে শান্ত...করার চেষ্টা করছেন৷ কণা অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে পড়লে এরকম শ্বাসকষ্ট আর কাশি হতে থাকে৷ তিনি তাঁকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন—‘কণা...কণা কী হয়েছে? জল খাবে?’
কণা জোরে জোরে শ্বাস টানছেন৷ কোনোমতে আঙুল তুলে নির্দেশ করলেন টি.ভি-র দিকে৷
‘—জল খাও৷’
বিছানার পাশেই জলের গ্লাস ছিল৷ সেটা কণার হাতে ধরিয়ে টি.ভি.-র দিকে তাকালেন তিনি৷ কী দেখে কণা এত উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন সেটাই দ্রষ্টব্য বিষয়৷
কিন্তু যা দেখলেন তাতে তাঁরও চেতনা যেন কয়েকমুহূর্তের জন্য বিলুপ্ত হল! কলেজ স্ট্রিটের রাস্তায় অনেকের মধ্যেই পড়ে আছে একটা পরিচিত মানুষের নিথর দেহ৷ তখনও বুকের মধ্যে বাচ্চাটা সুরক্ষিত! চোখ দুটো স্থির!
তিনি ধপ করে বসে পড়লেন বিছানার ওপর৷ চোখে জল এল না৷ মনে হল চতুর্দিকের আলো নিভে গেছে৷ পায়ের তলায় মাটি কাঁপছে৷ অনাবিল অন্ধকার...! এখন শুধু অন্ধকার...! কোনো শব্দ নেই....শব্দ নেই...!
বৃষ্টির ফোঁটা হতে চেয়েছিল, ভাসানে বৃষ্টি নয়
দু-এক পশলা ইলশেগুঁড়িতে একমুঠো পরিচয়৷
যেমন বর্ষা ফিরে ফিরে আসে, শ্রাবণ আকাশ জানে
মন কেমনের মেঘ জমে ওঠে বাউলের গানে গানে
তেমনই মেঘে সে বুকে ধরেছিল—অলীক রূপান্তর!
বৃষ্টি হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে আমার বারিশকর৷
লোকে বলে ‘খ্যাপা’ বৃষ্টি কি আসে নাগরিক চিন্তনে?
পাগলটা তবু জল ছুঁয়ে যায় বর্ষার ইন্ধনে৷
ছাতের উপরে মই লাগিয়েছে, মেঘ থেকে জল পাড়ে৷
কখনো-সখনো গান গেয়ে ওঠে আবিষ্ট মল্লারে৷
চালচুলো নেই, নেই কোনো দাবি; হতভাগা এমনে
কখন শিরায় মেঘ নেমে আসে, শুধু সে প্রহর গোনে৷
ছেড়ে যায় সুখ, কুয়াশায় ঢাকা নিভৃত বন্দর;
দুঃখের সাথে কানামাছি খেলে আমার বারিশকর৷
আমরা দালাল—হিরের মূল্যে বৃষ্টির কণা বেচি,
কত হাঁকেডাকে শূন্য কুম্ভ, কত ভাঁটে চেঁচ্যামেচি!
ঝরিয়ে, ডুবিয়ে, ভাসিয়ে দেওয়ার নানাবিধ কারিকুরি
আসলে সবাই বৃষ্টির নামে জলের আত্মা খুঁড়ি৷
আমরা দেশের কৃতীসন্তান, অনোখা যুগন্ধর!
ভিড় থেকে দূরে একা একা হাসে আমার বারিশকর৷
যে লোকটা মারে তার রং লাল—যে লোকটা মরে নীল৷
এ শালার দেশ শুধু রং চায়, রঙিন মুখ মিছিল!
লাল, নীল, কালো কমলা হলুদ—পরিচয় রঙে বাঁধা!
বারিশকরের কোনো রং নেই—আসলে সে এক ধাঁধা৷
নয় সে মানুষ, নয় সে ক্যাডার৷ দেবতা কদাপি নয়—
নেই তার গুলি মারার সাহস, নেই মৃত্যুর ভয়৷
কী জাতীয় লোক? মুখোশের ভিড়ে মুখ হয়ে কেন আসে?
এত কিছু ছেড়ে মানুষটা কেন বৃষ্টিকে ভালোবাসে!
সত্যি পাগল? অথবা কি কোনো হারামি ধুরন্ধর?
পরিচয় শুধু একটাই তার, আমার বারিশকর!
অস্ত্রকে যারা বাগিয়ে ধরেছে ঢ্যামনা সাপের রাগে
নিজের পাছায় চালালে হত না, ধান্দাবাজির আগে?
আপনাদের লাঠি চেনে না মানুষ, শোনে না কান্না হাসি—
দমনকারীর হাতে ফণা তোলে বিমূঢ় খুনপিয়াসী—
বারিশকরের গ্রহে লাঠি নেই, আছে নির্জরা ফুল
লাঠির প্রহারে হেসে উঠেছিল, আঘাতের এ কী ভুল!
ফেটে গেল তার বুকের ধমনি ফেটে গেল হূদশিরা!
বুক ভাঙা শ্বাস ছড়িয়ে দিয়েছে জলের বিষম ব্রীড়া!
লোহিত গন্ধী প্রতিঘাতে তার বৃষ্টির ছল ছল
রক্ত কোথায়! মানুষ কোথায়! এ যেন গভীর জল!
হাওয়ায় হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে বড়োই স্বার্থপর
বর্ষায় আজ দু-চোখে নেমেছে আমার বারিশকর!
রামহনু মন্তব্য করল—‘এ কী লিখেছেন দাদা! কম্পিউটার স্ক্রিন ঝাপসা দেখছি! হ্যাটস অফ! টুপি বিয়োজন!’
কুবলাশ্ব লিখেছে—‘অসম্ভব মর্মস্পর্শী৷ ভীষণ মানবিক৷ অপূর্ব কবিতা৷ স্ট্যান্ডিং ওভেশন দিলাম৷’
মুমতাজ জানাল—‘এটা বোধহয় এই সাইটে আমার পড়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা৷ কুডোস৷’
মন্তব্যগুলো পড়তে পড়তে চোখ সজল হয়ে উঠছিল গহনের৷ বুকের মধ্যে অদ্ভুত অপরাধবোধের ওঠাপড়া৷ ঘন অন্ধকার ঢেকে রেখেছে তাঁর অবয়ব৷ গভীর রাতের নৈঃশব্দ্যে নিজের হূদস্পন্দনের আওয়াজও পাচ্ছিলেন তিনি৷
একটু দূরেই সোফার ওপরে ঘুমিয়ে আছে গোপাল৷ গত তিন দিন ধরে সে একটা কথাও বলেনি৷ শুঁটকির মুখাগ্নি ওই বাচ্চা ছেলেটাই করেছে৷ ইলেকট্রিক চুল্লি যখন ওর দেহটা গিলে নিল, তখনও গহন একদৃষ্টে তাকিয়েছিলেন সেইদিকে৷ ভাবছিলেন, তাঁর জীবনসঙ্গী আজ তাঁকে ছেড়ে চলে গেল৷
শুঁটকির চশমার শোরুম আপাতত বন্ধ৷ ফ্ল্যাটে তালা লাগিয়ে এসেছেন গহন নিজেই৷ তার জিনিসপত্র কিছুই নাড়াচাড়া করেননি৷ শুধু গোপালকে সঙ্গে এনেছেন৷ ছেলেটা শুঁটকির মৃত্যুটা মেনে নিতে পারেনি৷ কেমন যেন হতভম্বের মতো ‘থ’ হয়ে বসেছিল৷ মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে একফোঁটা চোখের জলও ফেলেনি সে৷ সকালে যে মানুষটা হাসতে হাসতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল, রাত্রে সে এমন নিথর হয়ে ফিরল কেন—এই জিজ্ঞাসা তার মনের মধ্যে নিরন্তর ঘুরে বেড়াচ্ছিল৷
এই প্রশ্নের উত্তর বোঝার বয়েস ওর এখনও হয়নি৷ গহন তাকে কিছু বোঝানোর চেষ্টাও করেননি৷ শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার পর চুপচাপ তার হাত ধরে এনে তুলেছিল নিজের বাড়িতে৷ কণা তাকে এ ক-দিন বুক দিয়ে আগলিয়েছেন৷ গোপাল নীরবে নতুন পরিবেশে, নতুন মানুষদের সঙ্গে মানিয়েও নিয়েছে৷ কিন্তু একটা কথাও বলেনি৷ যেন সে বোবা হয়ে গেছে!
কণা তার এই নীরবতায় শঙ্কিত—‘ও কাঁদছে না কেন গহন? কথা বলছে না কেন?’
গহন নিজেও আশঙ্কিত হচ্ছিলেন৷ ওইটুকু ছেলের মনের ভেতরে কী হচ্ছে কে জানে! শোকের এ প্রকাশ বড়োই গভীর৷ আশঙ্কাজনকও বটে৷
তিনি কম্পিউটার শাট ডাউন করে গোপালের পাশে গিয়ে বসলেন৷ ছেলেটা শরীরটাকে কুঁকড়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে৷ কী মনে করে তার মাথায় হাত রেখেছেন৷ স্নিগ্ধস্বরে ডাকলেন—‘গোপাল৷’
গোপাল আধো তন্দ্রায় একবার নড়ে ওঠে৷ কিন্তু চোখ মেলে তাকাল না৷
—‘গোপাল৷’
এবার সে মিটমিট করে তাকায়৷ গহন তাকে হাত ধরে টেনে তোলেন৷
—‘আয়৷ তোকে একটা জিনিস দেখাই৷’
নীরবে তাঁর হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল বাচ্চা ছেলেটা৷ গহন কোনো কথা না বলে ওকে ছাতে নিয়ে এলেন৷ চতুর্দিক এখন নিস্তব্ধ৷ একটা জোলো হাওয়া শিরশির করে বয়ে যাচ্ছিল দুজনকে ছুঁয়ে৷ আকাশে আজ মেঘ নেই৷ তারাগুলো ঘুম ঘুম চোখে সবিস্ময়ে তাকিয়ে আছে৷
—‘ওই দেখ৷’ গহন আঙুল দিয়ে একটি বিশেষ নক্ষত্রকে নির্দেশ করলেন৷ নক্ষত্রটা কৃশ৷ তার চোখ ধাঁধানো জ্বলজ্বলে দ্যুতি নেই৷ কিন্তু অদ্ভুত এক নীলাভ আভায় উজ্জ্বল করে রেখেছে চতুর্দিক৷ সেই তারাটাকে দেখিয়ে বললেন—‘ওই দেখ, তোর বাবা৷’
গোপাল অবাক হয়ে গহনের দিকে তাকায়৷ তারপর নক্ষত্রটার দিকে৷ নক্ষত্রটা তখনও মায়াময় প্রভা ছড়িয়ে স্নিগ্ধ হাসছে৷ ঠিক যেন গোপালের দিকেই তাকিয়ে সকৌতুকে চোখ পিটপিট করছে৷ অবিকল শুঁটকির মতন!
এই প্রথম তার অধর স্ফুরিত হল৷ তারাটার দিকে তাকিয়ে অভিমানে গাঢ় হয়ে এল দৃষ্টি! একটা অস্ফুট ফোঁপানির শব্দ পেলেন গহন৷ কয়েক মুহূর্ত পরেই বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ল গোপাল৷ গহনকে জড়িয়ে ধরে সে কাঁদছে৷ অন্তর থেকে একটা ভীষণ আন্দোলন নিয়ে উঠে আসছে যন্ত্রণাকাতর গোঙানি!
গহন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন৷ তাঁর চোখ বেয়েও অশ্রু টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছে৷ মনে হল, কে যেন কানে ফিসফিস করে বলল—‘দেখলি শালা! আমায় নিয়ে সেই কবিতা লিখতেই বসলি৷’
তিনি নক্ষত্রটার দিকে তাকিয়েছেন৷ মনে মনে বললেন—‘আমায় ক্ষমা করে দিস, শুঁটকি৷ আমি কবিতা না লিখে পারলাম না!’
‘একা মেঘ ও বারিশকর!’
বইটার নাম দেখেই চমকে উঠল মন্দার৷ কবির নাম গহন দত্তগুপ্ত! লোকমুখে আগেই শুনেছিল যে তিনি আবার লিখতে শুরু করেছেন৷ কিন্তু দু-মাসের মধ্যেই যে তাঁর নতুন বই রিলিজ করবে তা জানা ছিল না৷
চমকটা সেখানে নয়! ‘একা মেঘ’ এবং ‘বারিশকর’ দুটো শব্দই তার ভীষণ পরিচিত৷ ঠিক দু-মাস আগেই কবিতা ডট কম-এ ‘একা মেঘ’ ‘বারিশকর’ নামের একটা কবিতা পোস্ট করেছিল!
সে বইটা আগাপাশতলা পড়ে ফেলল৷ পড়তে পড়তে তার বিস্ময় ক্রমাগতই বাড়তে থাকে৷ এই বইটার অন্তত চারটে কবিতা ডট কম-এ ‘একা মেঘ’ পোস্ট করেছিল! ‘মধ্য ভগবান’ ‘চারাগাছ’ ‘ফিনিক্সের জন্ম’ এবং ‘বারিশকর!’
মন্দার স্তম্ভিত হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে৷ তার মাথায় সব তালগোল পাকাতে শুরু করেছে৷ ‘একা মেঘ’ তবে....!
সে মোবাইল ফোনের ফোনবুক থেকে গহন দত্তগুপ্ত-র ল্যান্ডলাইন নম্বর বের করে ডায়াল করল৷ কিছুক্ষণ একঘেয়ে রিংটোন৷ তারপরই একটা মোলায়েম শান্ত পুরুষ কণ্ঠস্বর—‘হ্যালো৷’
মন্দারের বুক ঢিপঢিপ করে৷ এ কণ্ঠস্বর তার পরিচিত৷ গহন দত্তগুপ্ত’র বাড়ির জমায়েতে আগে শুনেছে৷ তবু সংকোচে জানতে চায়—
—‘কবি গহন দত্তগুপ্ত...?’
—‘বলছি৷’
তার গলাটা একটু কেঁপে যায়—‘আপনার নতুন বইটা পড়লাম৷ একটা প্রশ্ন করতে পারি?’
—‘বলুন৷’
—‘আপনি কি কখনও ‘কবিতা ডট কম-এ’ কবিতা লিখতেন? মানে আপনিই কি...‘একা মেঘ?’
ও-প্রান্তে হাসির শব্দ৷ গহন দত্তগুপ্ত হাসছেন৷ হাসতে হাসতেই বললেন— ‘হ্যাঁ, আমিই৷ আপনি?’
—‘আমি...মানে!’ মন্দারের তখনও বিশ্বাস হয় না৷ সে তখন নিজেকে রীতিমতো চিমটি কাটছে—‘আমি রামহনু!’
গহন ফের হেসে ফেললেন—‘হ্যাঁ, রামহনু৷ বলুন৷’
—‘আমায় আবার বলুন কেন দাদা? তুমি করেই তো ডাকতেন৷’
—‘বেশ৷ বলো৷’
—‘ইয়ে...মানে৷’ সে জিভ কেটে বলল—‘আপনার সঙ্গে বড্ড অন্যায় করেছি৷ অনেক উলটো-পালটা কথা বলেছি...৷’
—‘উপকার করেছ ভাই৷’ মোলায়েম স্বরে উত্তর এল— এর আগে আমার ‘ঝুলস্য ঝুল’ কবিতাগুলোকে কেউ এভাবে মুখের ওপর ‘ঝুলস্য ঝুল’ বলতে পারেনি৷ তুমি পেরেছ৷ থ্যাঙ্কস টু ইউ৷’
মনে মনে আর-একবার জিভ কাটে মন্দার—‘আমি কি একবার আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি? জাস্ট একবার ‘সরি’ বলার জন্য৷’
—‘সরি বলার জন্য এসো না৷ বরং এক কাপ চা খেতে আসতেই পারো৷’
—‘তাহলে কবে আসব? আজ কি আপনার সময় হবে...?’
—‘নিশ্চয়ই৷’ এককথায় রাজি হয়ে গেলেন গহন—‘এখনই চলে এসো৷ আমিও দেখি ‘রামহনু’ কীদৃশ জীব!’
মন্দারও এবার হাসল৷’—‘ইয়ে...আর একটা রিকোয়েস্ট ছিল৷’
—‘বলো৷’
—‘আপনার ডিডাকশনটা একদম ঠিক৷ ‘কুবলাশ্ব’ কোনো ব্যাটা নয়, বেটিই৷ আর...মানে...৷’ সে একটু লজ্জিত ভাবে বলে...‘আমরা দিন পনেরো আগেই বিয়ে করে ফেলেছি৷ তাই যদি অনুমতি দেন তবে ওকেও...৷’
—‘কুবলাশ্ব আর রামহনু!’ এবার অট্টহাসির শব্দ—‘চমৎকার জুটি৷ সস্ত্রীক চলে এসো৷ চায়ের নেমন্তন্ন রইল৷’
ফোনটা কেটেই ঊর্মির নম্বর ডায়াল করে মন্দার৷ ঊর্মি তখন খুব মন দিয়ে কপালে সিঁদুরের টিপ পরছিল৷ মোবাইল ফোনটা বেজে উঠতেই চমকে উঠেছে৷ ফলস্বরূপ টিপটা ধেবড়ে গেল৷
হাতের শাঁখা-পলা, সোনার চুড়ি ঝনঝনিয়ে ফোনটা ধরল সে—‘বলো৷’
—‘তুমি এখনই তৈরি হয়ে নাও৷’ ও-প্রান্তে মন্দার উত্তেজিত—‘আমি দশ মিনিটের মধ্যেই বাড়ি আসছি৷ তারপর তোমায় নিয়ে একজনের বাড়ি যাব৷’
—‘কার বাড়ি?’
—‘এখন অত এক্সপ্লেইন করার সময় নেই৷ তাড়াতাড়ি রেডি হও৷ যেতে যেতে সব বলব৷ এখন সব কথা বলার সময় নেই সোনা৷’ মন্দার ফোন রাখার আগে ফোনেই একটা চুমু ছুড়ে দেয়—‘ভালোবাসি৷’
ঊর্মি লাজুক হয়ে বলে—‘আমিও৷’
‘গহন দত্তগুপ্তের নতুন বই ‘একা মেঘ’ ও ‘বারিশকর’ সম্পর্কে বিশেষ কিছু বলার নেই৷ কবির স্বেচ্ছা-অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল৷ অন্তত সেক্ষেত্রে তাঁকে কবি হিসাবে লোকে মনে রাখত!’
—দৈনিক খবর
‘একা মেঘ’ ও ‘বারিশকর’ বইটি পড়ে অবাক হলাম৷ কবি গহন দত্তগুপ্ত প্রায় পাঁচ বছরের স্বেচ্ছা-অবসর ভেঙে এই জাতীয় কবিতা লিখতে কেন ফিরে এলেন বুঝলাম না! তাঁর কবিতায় চিরকালই অদ্ভুত এক বিমূর্ত রোমান্টিসিজম থাকত৷ কিন্তু ‘একা মেঘ’ ও ‘বারিশকরের’ প্রত্যেকটি কবিতাই যেন ঝান্ডা তুলে চলেছে! কবি কি সম্প্রতি কোনো রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ হয়েছেন?
—ভোরের কাগজ
‘‘একা মেঘ’ ও ‘বারিশকরের’ প্রতিটি কবিতাই প্রায় আখ্যানধর্মী৷ গহন দত্তগুপ্ত-র কলমে যেমন আতুর, নরম শব্দ গুচ্ছ পাওয়া যায়, এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি সম্পূর্ণ তার বিপরীত৷ কবিতাগুলিকে কবিতার চেয়ে স্লোগান বলেই বেশি মনে হয়৷’
—তাজা সংবাদ
‘‘একা মেঘ’ ‘বারিশকর’ কাব্যগ্রন্থের কোনো কবিতাতেই গহন দত্তগুপ্ত তাঁর নামের প্রতি সুবিচার করেননি৷ বরং কবিতার রহস্যময়তার সর্বনাশ করেছেন৷
—পাক্ষিক কুরুক্ষেত্র
আজও বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল৷ এই কয়েক মাসে বৃষ্টির চেহারায় বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি৷ শুধু প্রথমদিকে বেশ ছিপছিপে তরুণীর মতো সুললিত পায়ে আসত৷ টুপুর-টাপুর শব্দে সলজ্জ ভঙ্গিতে ঝরে পড়ত৷ আর এখন যেন ঘুসি পাকিয়ে পালোয়ানের মতো হুড়মুড়-দুড়দাড় করতে করতে আসে৷
কণার বিছানার পাশের জানলা আজও খোলা ছিল৷ কিন্তু তিনি আজ বৃষ্টি দেখছেন না৷ বরং মেজাজটা বেশ বিগড়ে আছে৷ মুখ থমথমে৷ একপাশে খবরের কাগজ ও পত্রিকাগুলো অযত্নে পড়ে৷ এইমাত্রই ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন৷
—‘কী হল?’ গহন নম্রপায়ে এসে বসলেন বিছানার ওপরে৷ কণার মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে বললেন—‘গোটা আকাশটাকেই নিজের মুখে টেনে এনেছ যে!’
কণা উত্তর দিলেন না৷ রাগের আঁচ তাঁর মুখে৷ নাকের পাটা ফুলছে৷ গহন কাগজপত্রগুলো সযত্নে গুছোতে শুরু করেছেন দেখে রাগত স্বরে বললেন—‘ওগুলোকে ডাস্টবিনে ফেলে দাও!’ তাঁর গলায় বিরক্তি ফুটে ওঠে— ‘এই সমালোচকগুলো নিজেদের কি ভগবান ভাবে! যা খুশি তাই বলবে! কবিতার কী বোঝে ওরা?’
গহনের মুখে স্মিত হাসি—‘অন্যায় কী বলেছে?’
—‘তোমার কবিতাকে স্লোগান বলে গাল দিয়েছে!’ কণা অবাক—‘আর তুমি হাসছ?’
—‘শুধু স্লোগানই তো বলেছে৷’ তিনি হাসতে হাসতেই বললেন—‘‘ঝুলস্য ঝুল’ বলেনি৷ কবিতার ভয়ংকর প্যারোডিও বানায়নি৷’
কণা রাগতে গিয়েও পারলেন না৷ বরং উলটে তাঁর মুখেও হাসির রেখা ভেসে ওঠে৷
—‘ওই দুটো বদমাশ আজ আমাদের বাড়ি আসছে৷’ গহন বলেন—‘কুবলাশ্ব আর রামহনু৷ ওদের জন্য তোমার স্পেশাল পকোড়া বানিয়ে দেবে প্লিজ?’
—‘কথা ঘুরিয়ো না৷’ কণা তীব্রদৃষ্টিতে মাপছেন কবিবরকে—‘এতদিন ধরে কবিতা লিখে এলে৷ এতদিন ধরে জেনে এলাম তুমি কবিতা লেখো৷ আর ওই লোকগুলো তোমার লেখাকে স্লোগান বলছে...৷’
—‘বেশ করেছে৷’ কবি শান্ত দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকালেন—‘হয়তো সত্যিই আমি স্লোগান লিখেছি৷ অথবা লিখিনি৷ এতদিন ধরে কবিতা লিখে এলাম৷ এবার না হয় স্লোগানই লিখি৷’ তাঁর চোখজুড়ে স্বপ্ন পাখা মেলে দিয়েছে, নতুন কোনো স্বপ্ন—‘স্লোগান লিখতে লিখতে একদিন স্লোগানকেই গান করে দেব, কবিতা করে দেব৷ দেখো কণা, আমি আরও লিখব৷ স্লোগানই একদিন কবিতা হবে৷ শুধু লিখেই যাব...যতদিন না এই লোকগুলোই ‘সাধু সাধু’ করে উঠবে৷ দেখো...আমি পারব...আমি লিখব...আরও লিখব...৷’
বলতে বলতেই হো হো করে হেসে উঠেছেন তিনি৷ কণার দিকে তাকিয়ে বললেন—‘এ তোমার কবিবরের নতুন লড়াই!’
কণা গর্বমাখা দৃষ্টি ছুড়ে দিলেন স্বামীর দিকে৷ গহন তখন বেডরুম থেকে বেরিয়ে হলঘরে যাচ্ছিলেন৷ চোখে পড়ল গোপাল হলঘরের জানলায় দাঁড়িয়ে দু-হাতে বৃষ্টির জল ধরছে৷ তার চোখেমুখে উপচে পড়ছে কৈশোরের আনন্দ৷
গহন তার পাশে এসে হাঁটুগেড়ে বসলেন৷ স্নেহসিক্ত কণ্ঠে বললেন— ‘ভিজবি গোপাল?’
কণার ঘরের জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল৷ তিনি স্তম্ভিত হয়ে দেখলেন বাচ্চা ছেলেটার সঙ্গে হাত ধরাধরি করে বৃষ্টিতে ভিজছেন গহন! যে মানুষটা কিছুদিন আগেও বৃষ্টিকে ঘৃণা করত সেই মানুষটাই আজ জলে ভিজছে! কবি ভিজে ঘাস পায়ে মাড়িয়ে ছেলেমানুষের মতো ছুটোছুটি করছেন গোপালের পিছন পিছন৷ দু-হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ধরছেন৷ তাঁর মুখ, মাথা, চিবুক চুঁইয়ে হাজার হাজার জলবিন্দু ঝাঁপিয়ে পড়ছে পরম আনন্দে৷
‘আরো বেদনা আরো বেদনা,
প্রভু, দাও মোরে আরো চেতনা৷
দ্বার ছুটায়ে বাধা টুটায়ে
মোরে করো ত্রাণ মোরে করো ত্রাণ৷
আরো প্রেমে আরো প্রেমে
মোর আমি ডুবে যাক নেমে
সুধাধারে আপনারে
তুমি আরো আরো আরো করো দান৷৷
প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে...৷’
ঠিক তখনই বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকছিল মন্দার আর ঊর্মি৷ তারাও দেখল কবি ভিজছেন....! কবি ভিজছেন!...কবি ভিজছেন...’!
—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন