বোম্বেটেদের দল

স্যার আর্থার কোনান ডয়েল

পরিচ্ছেদ ১ঃ সেই লোকটা

১৮৭৫। ৪ ফেব্রুয়ারি। প্রচণ্ড ঠান্ডা, গিলমারটন পর্বতের গিরিসঙ্কটগুলো বরফের আচ্ছাদনে আবৃত৷ রেললাইন অবশ্য বরফের আক্রমণ থেকে মুক্ত। সন্ধ্যার ট্রেন ধীরে ধীরে কয়লার ধোঁয়ার স্তূপের রেখা আকাশের বুকে আলপনা এঁকে ছুটছে চড়াইয়ে স্টাগভিলে উপত্যকার দিকে। সেখান থেকে উতরাইয়ে নামবে ভারমিস্সা সমতল ভূমির ধূসর প্রান্তরে, যেখানে ভারমিস্সার উপত্যকার শহরাঞ্চল। এই শহরাঞ্চল থেকে রেললাইন নেমে গেছে বারটনস্ অঞ্চলে, সেখান থেকে হেল্মডেল, তারপর ট্রেন পৌঁছবে পুরোপুরি চাষনির্ভর জেলা মেরটনে। এই রেলপথে সিঙ্গল লাইন; তার পাশে সাইডিং-এ দীর্ঘ ট্রাকের সারি, প্রতি ট্রাক কয়লা এবং খনিজ-লোহাতে বোঝাই। আর কয়লা ও খনিজ লোহাই এইসব অঞ্চলের সোনা, যার টানে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে বিশাল জনবসতি, যাদের মধ্যে কয়লা আর লোহা নিয়ে নিরন্তর হাঙ্গামা, মারামারি, কাটাকাটি। জায়গাটা যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র, আমেরিকা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, সেইহেতু সভ্যসমাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। ট্রেন খুবই ছোট। দু-পাশে গভীর অরণ্য, বিপদ-সংকুল গিরিসঙ্কট আর প্রায় আকাশের মাথা ছুঁয়ে-ফেলা সুউচ্চ পর্বতমালার অজানা রহস্য ভেদ করে যেন হামাগুড়ি দিয়ে চলেছে। ট্রেনে কয়েকটা মাত্র বগি৷ একেবারে সামনের বগিতে তেল-ল্যাম্প জ্বালানো হয়েছে, কিছু যাত্রী আছে। সব মিলিয়ে কুড়ি বা তিরিশ জন। এতজন যাত্রীদের মধ্যে বেশিরভাগই হল কুলি-কামিন, উপত্যকার নীচের দিকে খনিতে হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর যে যার আবাসে ফিরছে তারা। তাদের মুখে ধুলো-ময়লা, হাতে সেফটি-লণ্ঠন, যা দেখে বোঝাই যায় তারা খনি-শ্রমিক। বগির একধারে, কাঠের লম্বা বেঞ্চে গোল হয়ে বসেছে তারা, ধূমপান করছে আর নিজেদের মধ্যে নীচু-স্বরে গুলতানি করছে। মাঝে মাঝে বাঁকা চোখে তাকাচ্ছে তারা, বিপরীত দিকের বেঞ্চে বসে থাকা দুজন যাত্রীর দিকে, যাদের পরনের ইউনিফর্ম এবং কাঁধের চকচকে ব্যাজ বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে তারা আইনরক্ষক অর্থাৎ পুলিশের লোক।

যাত্রীদের মধ্যে আর যারা ছিল, কয়েকজন মহিলা-শ্রমিক, স্থানীয় দোকানদার ইত্যাদি। আর এইসব ভিড়, ফিসফাস, গুলতানি থেকে দূরত্ব রেখে বগির এক কোণে যাচ্ছিল অন্যরকম চেহারার একজন যুবক। এই যুবকের দিকেই আমাদের প্রকৃত আগ্রহ। তার দিকে ভালোভাবে তাকান পাঠক। এই যুবকই, প্রকৃতপ্রস্তাবে, আমাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

যুবকের গায়ের রং তাজা আপেলের মতো রক্তিম ফর্সা। উচ্চতা মাঝারি, বয়স অনুমান করা যায় তিরিশের কাছাকাছি। তার চোখদুটি বড়, বুদ্ধিদীপ্ত; ঈষৎ কৌতুকের ছায়া সেই চোখে, যা ঘুরছে, যেন কিছু খুঁজছে এদিক-ওদিক। দৃষ্টি ফেলছে অন্য যাত্রীদের দিকে তার চশমার কাচের ভেতর দিয়ে। কিছুক্ষণ তাকালেই বোঝা যায়, যে যুবকটি একলসেঁড়ে নয়। সামাজিক মননের, সহজভাবে মেলামেশা করতে চায় চারপাশের মানুষের সঙ্গে। সবথেকে বড় কথা হল, তার চেহারা দেখলেই বোঝা যায় সে যথেষ্ঠ শক্তি ধরে শরীরে। কাঁধ চওড়া, বাহুদুটি পেশল, ঘাড় লম্বা এবং চোয়ালে দৃঢ়তা।

ভারমিস্সা জেলার লোহার এবং কয়লা খনিগুলির পরিবেশ অলস এবং সাংস্কৃতিক জীবনযাপনের জন্যে আদৌ নয়। যেসব বসতি সেখানে ক্রমে ক্রমে গড়ে উঠেছিল, বেঁচে থাকার পরিবেশ একেবারেই অনিন্দ্যসুন্দর নয়, বরং সর্বত্রই নিষ্ঠুর এবং নীরস জীবন-যুদ্ধের কদাকার ছাপ। বেঁচে থাকার জন্যে সেখানে নিত্যদিন দাঁতে দাঁত চেপে পশুর মতো কাজ করে যেতে হয়; আর যারা সবথেকে নির্মম এবং পেশি শক্তিতে বলীয়ান, তারাই একমাত্র এখানে টিকে থাকতে পারে।

সেই যুবক-আগন্তুক যেন অনুভব করছিল সে ক্রমশ প্রবেশ করছে এক অ-সুন্দর অঞ্চলে, আর সেই কারণেই তার মুখে ফুটে উঠেছিল অনাগ্রহ এবং আগ্রহের মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তার চোখের দৃষ্টিতে যে কৌতূহল ফুটে উঠেছিল তা থেকে বোঝা যাচ্ছিল যে, সে এই অঞ্চলে একেবারেই নবাগত। মাঝে মাঝে সে পকেট থেকে বের করছিল এক-তাড়া কাগজে লেখা কোনো চিঠি, যার সঙ্গে যেন সে মিলিয়ে নিতে চাইছিল নতুন জায়গার পরিবেশ এবং সেই চিঠির পৃষ্ঠাগুলোর মার্জিনে সে লিখে রাখছিল হয়তো তার মানসিক প্রতিক্রিয়ার কথা। একবার দেখা গেল, সে ডান হাত ঘুরিয়ে কোমরের আড়াল থেকে একটা জিনিস বের করে আনলে যেটা, আশা করা কঠিন যে, ভদ্র-চেহারার ওই লোকটার কাছে থাকতে পারে৷ জিনিসটি হল, বেশ বড় আকারের একটা রিভলভার৷ মনে হয় রিভলভারটি পুরোপুরি কার্তুজে ভর্তি। লোকটা তাড়াতাড়ি ট্রাউজারের কোনো গোপন পকেটে অস্ত্রটি লুকিয়ে ফেলল। কিন্তু তার পাশেই বসে থাকা শ্রমিকটির চোখ সে এড়াতে পারেনি।

‘হুললো দোস্ত!’ সেই শ্রমিকটি বলল, ‘ঝাড়পিট করার জন্যে তৈরি মনে হচ্ছে?’

যুবক কিঞ্চিৎ অস্বস্তির সঙ্গে হেসে ফেলল।

‘হুঁ’, সে বলল, ‘যে জায়গা থেকে আমি আসছি সেখানে এরকম যন্তর নিজের কাছে রাখতে হয়।’

‘সে জায়গাটা কোতায় দোস্ত?’

‘আসছি শিকাগো থেকে।’

‘এই অনচলে লতুন বটে?’

‘হুঁ।’

‘দেকিবেন এসব জায়গায় অস্তরটা দরকার বটে।’

‘হুমম্! তাই নাকি?’ যুবককে বেশ আগ্রহী মনে হল।

‘কিচু শোনেননি দোস্ত এডা ক্যামন জায়গা?’

‘কিছুই না…।’

‘এখানকার বদনাম তো লোকের মুকে মুকে। তোমার কানেও আসবে দোস্ত। কী কর্তে আসা হচ্চে এ চুলোয়?’

‘শুনেছি, যে কাজ করতে চায় তার নাকি এ-অঞ্চলে কাজের অভাব হয় না।’

‘ইউনিয়নের মেম্বার আছ বটে?’

‘অবশ্যই।’

‘তালে, মনে হয়, কাম মিলবেক। কোনো দোস্ত আচে এখেনে?’

‘এখনও মেলেনি; কিন্তু দোস্তি পাতাবার উপায় আমার জানা আছে।’

‘কী রকম? কী রকম বটে?’

‘যে শহরে যাচ্ছি সেখানে থাকার জায়গা মানে, লজ-টজ আছে নিশ্চয়ই? আর যদি সেখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই জোটে, তাহলে দোস্তও জুটে যাবে ঠিক।’

যুবকের এই মন্তব্যে পাশের যাত্রী বেশ আগ্রহী হল। এই বগিতে অন্য যাত্রীদের দিকে সে সন্দেহের চোখে তাকাল। খনি-শ্রমিকরা নিজেদের মধ্যে ফিসফাস কথা বলেই চলেছে। পুলিশ দুজন ঢুলছে। যুবকের পাশের লোকটা তার দিকে সরে এল, ঘন হয়ে বসল, একটা হাত বাড়িয়ে দিল।

‘নিজের হাত আমার হাতে রাকো, দোস্ত।’ বলল লোকটা। দুজনে দুজনের হাতে হাত রেখে ঝাঁকুনি দিল।

‘দেকচি তুমি সচ্ বাত বলতেচ।’ লোকটা বলল, ‘তবুও আরো একটু লিশ্চিন্তি হতে দাও।’ লোকটা তার ডান হাত ছোঁয়াল তার নিজের ডান ভ্রূতে। আমাদের যুবক তার বাঁ-হাতে দ্রুত ছুঁল তার বাম ভ্রূ।

‘আঁধার রাতগুলা অশান্তির।’ শ্রমিক বলল।

‘ঠিক, যারা নতুন এসেছে তাদের জন্যে।’ যুবক ফিরতি বলল।

‘আচ্চা হ্যায়, আচ্চা...আমি ব্রাদার স্ক্যানলান, লজ ৩৪১, ভারমিস্সা ভ্যালি। তোমাকে দেকে খুশি।’

‘ধন্যবাদ। আমি ব্রাদার জন মিকমুরডো, লজ ২৯, শিকাগো। বডিমাস্টার জে. এইচ. স্কট। কপাল ভালো যে এখানে আসতে না আসতেই একজন ব্রাদারের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।

‘হুঁ, হুঁ, এখানে আমরা দলে বেশ ভারী। এই ভারমিস্সা ভ্যালিতে আমরা সবাই খুব বিন্দাস, স্টেটসের আর কোথাও এমন পাবে না। তোমার মতো ছেলে-ছোকরাদের আমাদের দলে দরকার৷ কিন্তু আমি বুইঝতে পারলাম না আমাদের ইউনিয়নের লোক হয়ে তুমি শিকাগোতে কাম-কাজ পেলে না বটে?’

‘সেখানে প্রচুর কাজ ছিল আমার।’ বলল মিকমুরডো।

‘তালে সে দেশ ছাইড়ে চইল্যা এলে কেন বটে?’

মিকমুরডো পুলিশ দুজনের দিকে ঘাড় নেড়ে ইশারা করল। তারপর হেসে বলল : ‘কারণটা মনে হয় আইনের ওই দুজন রক্ষক শুনলে আনন্দ পাবে।’

স্ক্যানলান গলা নামিয়ে জিগ্যেস করল, ‘কিচু গোলমাল?’

‘ভীষণ!’

‘ঝামেলায় পড়েচিলে?’

‘ঝামেলা বলে ঝামেলা…।’

‘খুন-টুন?’

‘একদিনের আলাপেই সব বলতে হবে?’ কিঞ্চিৎ বিরক্তির সঙ্গে বলল মিকমুরডো। ‘শিকাগো ছেড়ে এখানে চলে আসার কারণটা আপনার এখুনি না জানলেও চলবে। আপনি কে হে যে আমাকে এত কথা জিগ্যেস করছেন?’ চশমার আড়ালে তার চোখদুটো রাগে ঝলসে উঠল।

‘ঠিক আচে, দোস্ত, ঠিক আচে। তুমি কোতায় কী করে এসেচ, ওসব নিয়ে এখানকার ছোঁড়ারা মাথা ঘামাবে না৷ কোতায় চলেছেন স্যার?’

‘ভারমিস্সা।’

‘আর দুইটা ইস্টিশান বাদে বটে৷ থাকা হবে কোতায়?

মিকমুরডো একটা লম্বা খাম বের করল, তেলের ল্যাম্পের ধোঁয়ায় অস্পষ্ট আলোতে, খাম থেকে একটা কাগজ বের করে বলল, ‘এই তো ঠিকানা, জ্যাকব শ্যাফটার, শেরিডান স্ট্রিট। এটা একটা বোর্ডিং হাউস। শিকাগোর একজন পরিচিত লোক এই ঠিকানাটাই দিয়েছে।’

‘আচ্ছা, ঠিকানাটা আমি চিনি না। ভারমিস্সায় আমি থাকিও না। আমি থাকি হবসন পল্লিতে, টেরেন এখন সেখানেই থামবেক৷ নেমে যাবার আগে, দোস্ত, তোমাকে একটা পরামর্শ দিয়ে যাই; ভারমিস্সায় যদি কোনো ঝামেলায় পড়ো, সোজা চলে যাইবে ইউনিয়ন অফিসে৷ সেখেনে দেখা কইরবে বস্ মিকগিনটির সঙ্গে। তাকে সবাই ডাকে ভারমিস্সার বডিমাস্টার, আর তার কথাতেই সবাই এখেনে ওটে-বসে। চললুম দোস্ত! ওই পাড়াতেই একদিন দেকা হয়ে যাবে আমাদের। কিন্তু কতাগুলো মনে রেখ : ঝামেলায় পড়লেই সোজা কালা জ্যাক মিকগিনটির পায়ে গিয়ে পড়বেক বটে।’

স্ক্যানলান নেমে গেল। মিকমুরডো আবার নিজের ভাবনায় ডুবে গেল। অন্ধকার এখন নেমেছে, আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফার্নেসগুলোর আগুন যেন ফোঁস ফোঁস করছে আর তেড়ে যাচ্ছে অন্ধকারের দিকে।

‘মনে হতেচে যেন নরক-দর্শন করচি।’ কানের কাছে একজনের গলা। মিকমুরডো ঘাড় ঘোরালো, দেখল সেই সিপাই দুজনের একজন এদিকে একটু সরে বসেছে। ফার্নেসের আগুন-সাপেদের দিকে তাকিয়ে আছে।

‘ঠিকই বলেচো,’ অন্য সিপাইটি বলল, ‘নরক দেকতে মনে হয় ওরকমই। নরক যেমন আচে এখেনে, নরকের কীটেরাও আচে, তাদের দু-একজনকে পাকড়াতে পারলে ভালোই হতো। মনে হচ্চে, এই অঞ্চলে নতুন আসা হচ্চে, ইয়ং ম্যান?’

‘তাতে হয়েছেটা কী?’ রুক্ষ স্বরে উত্তর দিল মিকমুরডো।

‘শুদু একটা পরামর্শ মনে রাকবেন মিস্টার, বন্ধুবান্ধব করবেন বুঝেশুনে৷ প্রথম এসেই মাইক স্ক্যানলানের সঙ্গে এত গুজুর-গুজুর ফুসুর-ফুসুর...।’

‘কার সঙ্গে আমি দোস্তি করব তাতে আপনার মাথা ঘামাবার কী আছে?’ মিকমুরডো এত জোরে চেঁচিয়ে উঠল যে কামরার সব মাথাগুলো এদিকে ঘুরে গেল কিচাইনের মজা দেখতে। ‘আপনার পরামর্শ আমি চেয়েছি? নাকি আমাকে ভেবেছেন দুধ খাওয়া শিশু যে কারোর হাত না ধরলে হাঁটতে গিয়ে পড়ে যাব? কথা বলবেন তখনই, যখন আপনার সঙ্গে কথা বলা হবে। কপাল ভালো যে আজ এর বেশি কিছু বললাম না!’ সে তাদের দিকে মুখটা বাড়িয়ে এমন বাঁকা হাসি হাসল যে মনে হল খ্যাপা কুকুর দাঁত খিঁচোচ্ছে।

সিপাই দুজন নিতান্তই ভালোমানুষ, যুবকের তর্জন-গর্জন শুনে তো তাদের হৃৎকম্প হবার জোগাড়।

‘রাগ করচেন কেন, ভাই,’ বলল একজন। ‘আপনার ভালোর জন্যেই আপনাকে সাবধান করেচি, কারণ, আপনাকে দেকেই বুঝেচি এই অঞ্চলে আপনি নতুন।’

‘এই অঞ্চলে আমি নতুন ঠিকই কিন্তু আপনাদের মতো পুলিশরা আমার কাছে নতুন নয়।’ আবার ঠান্ডা গলায় গজরানি মিকমুরডোর, ‘আমি জানি সব জায়গাতেই আপনারা একই রকম, যার পরামর্শের দরকার নেই, তার কানেও গুঁজে দেবেন পরামর্শ।’

‘হুমম্, মনে হচ্চে তাড়াতাড়ি দেখা হবে, দুজন সিপাইয়ের একজন দাঁত বের করে বলল।’ লোক চিনতে তো বাকি নেই আমাদের, লাইনের লোক বলেই মনে হচ্চে।’

‘আমারও তাই মনে হয় বটে,’ আর একজন বলল, ‘মনে হচ্চে আমাদের দেকা হতে বেশি দেরি হবে না।’

‘ভুলেও ভাববেন না যে, আমি আপনাদের খুব ভয় পাচ্ছি!’ চেঁচিয়েই বলল মিকমুরডো, ‘আমার নামটা কান খুলে শুনে রাখুন, জ্যাক মিকমুরডো। মনে থাকবে? যদি আমাকে দরকার লাগে, আমাকে পাবেন ভারমিস্সার শেরিডান স্ট্রিটে, জ্যাকব শ্যাফটারের লজে। আমি ইঁদুরের গর্তে লুকিয়ে থাকব না, ঠিক আছে? দিন কিংবা রাত যখনই হোক, আপনাদের মুখোমুখি হতে একটুও ভয় পাবে না আমার। ভুলে যাবেন না যেন এই কথাটা!’ অচেনা আগন্তুকের সাহসের ঝলক দেখে যাত্রীরা খুবই অবাক; ফিসফিসিয়ে প্রশংসার আলোচনা চলতে থাকল তাকেই নিয়ে৷ আর সিপাই দুজন তাদের কাঁধ ঝাঁকিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। স্পষ্টতই তারা যুবককে আর ঘাঁটাতে চায় না।

কয়েক মিনিট পরেই ট্রেন ঢুকল ভারমিস্সা স্টেশনে, আলোর থেকে প্ল্যাটফর্মে অন্ধকারই বেশি; দূরে দূরে টিমটিমে তেলের ল্যাম্প। মিকমুরডো তার চামড়ার হাত-ব্যাগটা তুলে নিয়ে, ট্রেন থেকে নেমে অন্ধকারে হাঁটা শুরু করবে, একজন খনি-শ্রমিক তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘মাইরি বলচি, দোস্ত! ওই শালা পুলিশদের কীভাবে চমকাতে হয় ভালোই জানো বটে তুমি। তোমার ব্যাগটা আমার হাতে দাও, রাস্তাটাও আমি দেখিয়ে দিচ্চি। আমার ঝুপড়িতে যাবার রাস্তায় শ্যাফটার পড়ে।’

অন্য খনি-শ্রমিকরাও, যারা এই ট্রেনে যাত্রী ছিল, যে যার বাড়ির রাস্তায় এগোনোর আগে, সবাই একসঙ্গে সাহসী যুবককে ‘গুড নাইট’ জানাল৷ ভারমিস্সায় পা দেবার সঙ্গে সঙ্গেই মিকমুরডো কতবড় মাস্তান তা অনেকেই জেনে গেল।

ভারমিস্সা জায়গাটার চেহারা তো অবিকল নরক; শহরে ঢুকে বোঝা গেল, যেদিকে চোখ যায় ঝুপড়ির সারি আর সরু রাস্তায় জঞ্জাল, দুর্গন্ধ। বরফ আর কাদা মিশে রাস্তার যা অবস্থা কহব্য নয়। তার ওপর বিরক্তিকর যানজট। ফুটপাতগুলো সরু এবং এবড়ো-খেবড়ো।

সাবধানে হাঁটতে হাঁটতে শহরের মাঝামাঝি জায়গায় পৌঁছে বোঝা গেল যে, আলো-ঝলমলে দোকানের সারি আছে; এমনকী চুল-ছাঁটার সেলুন আর জুয়োর ডেরাও আছে, এই জুয়োর ডেরাগুলোই হল খনি-শ্রমিকদের রক্ত-জল করা উপার্জন উড়িয়ে দেবার উপযুক্ত জায়গা।

‘ওটা হল ইউনিয়ন-অফিস,’ যে লোকটা রাস্তা দেখিয়ে আনছিল, সে আঙুল দেখাল একটা আলোকিত বড়-বাড়ির দিকে, যাকে ছোটখাটো হোটেলও বলা যায়। জ্যাক মিকগিনটি হলেন গিয়ে এখেনকার বস্ বটে।’

‘বারবার শুনছি লোকটার নাম। কীরকম সে?’ জিগ্যেস করল মিকমুরডো।

‘কী! বস্ কীরকম তুমি শোননি?’

‘আমি তো সবে আজই এলাম এখানে, কী করে শুনব তার সম্বন্ধে?’

‘আমরা তো জানি তার নাম সারা দেশে ছড়িয়ে গেছে। মাঝে মাঝে খবরের কাগজেও তো তার ছবি ছাপা হয়, ঘরও ছাপা হয় বটে।’

‘কেন?’

‘আরে!’ লোকটা গলা নামিয়ে বলল, ‘প্রায়ই তো গণ্ডগোল লেগে যায় এখেনে।’

‘কীসের গণ্ডগোল?’

‘হায় ঈশ্বর, মিস্টার! তুমি তো দেকতেচি অদ্ভুত জীব, মাথা গরম কোরো না দোস্ত! এখেনে আলোচনার বিষয় কী জানো? এখানকার বোম্বেটেদের কিচাইন।’

‘এই বোম্বেটেদের বিষয়ে শিকাগোর পেপারে পড়েছি। তারা তো খুনির দল, তাই না?’

‘চুপ, বাঁচতে চাও তো চুপ!’ খনি-শ্রমিক ফিসফিসিয়ে বলল। ভয়ে সে দাঁড়িয়ে পড়েছে, অবাক চোখে দেখছে যুবককে। ‘শোনো ভাই, শুনিয়ে রাকি তোমাকে, বেশিদিন এখানে বাঁচবে না, যদি রাস্তায় দাঁইড়ে এরকম কথা জোরে জোরে বল৷ এর থেকে কম অপরাধ করে কত হতভাগা এমন পিটুনি খেয়েচে যে অক্কাই পেয়েচে একেবারে।’

‘আসলে আমি ওদের বিষয়ে তো তেমন কিছু জানি না। শুধু পেপারে একটু-আধটু খবর দেখেছি।’

‘আমি তো বলচি না তুমি যা পড়েচো সত্যি নয়।’ কথা বলতে বলতে লোকটা ভয়ে ভয়ে এদিক-ওদিক দেখছিল, যেন একটু দূরে ছায়ার অন্ধকারে কোন দুশমন দাঁড়িয়ে আছে। ‘খুনোখুনির কথা যে বলচিলে সেসব এখেনে নিত্যদিন। কিন্তু এসব বেপারে জ্যাক মিকগিনটির নাম জড়িয়ে যেন কোন কতা বলুনি। ফিসফিস করে কতা বললেও তা ওর কানে ঠিক পৌঁছে যাবে বটে। আর তার কানে একবার ঢুকলে যে বলেচে তার আর রক্ষে থাকবেক না। যাক্, যে বাড়ি তুমি খুঁজতেচ, তা হল রাস্তার একটু ভেতরে ওই বাড়িটা। বুড়া জ্যাকব শ্যাফটার যে মালিক এই লজের, সে অবশ্য এই বদমাশদের শহরে সেরা মানুষ।’

‘ধন্যবাদ আপনাকে,’ বলল মিকমুরডো। হাত মেলাল লোকটার সঙ্গে। চামড়ার ব্যাগ তার হাত থেকে নিয়ে, একটু জোরেই পা চালাল বাড়িটার দিকে। বন্ধ দরজাতে জোরেই নক করল।

সঙ্গে সঙ্গে খুলে গেল দরজা, আর যে দরজা খুলেছে তাকে এই জায়গায় আশাই করেনি যুবক। অসাধারণ সুন্দরী এক যুবতী। দেখে মনে হল জার্মান। এক মাথা সোনালি চুল, সুন্দর, গভীর দুই চোখে সে আগন্তুকের আপাদমস্তক দেখছিল যথেষ্ট বিস্ময় এবং অস্বস্তির সঙ্গে। তার পাঙাশ মুখ রাঙা হয়ে উঠছিল। খোলা দরজার ওপারে, উজ্জ্বল আলোর বিভায় যুবতীকে অপ্রত্যাশিতভাবে দেখে, মিকমুরডোর মনে হল, দরজার ফ্রেমে সে খ্যাতিমান শিল্পীর আঁকা অনবদ্য এক ছবি দেখছে। চারপাশের বিধ্বস্ত, নোংরা পরিবেশের তুলনায় সেই ছবি যেন আরো অপরূপ লাগছে মিকমুরডোর৷ মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে ছিল সে, মুখে কথাই সরছিল না, ফলে নৈঃশব্দ ভাঙতে হল সেই যুবতীকেই।

‘মনে হচ্ছে বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?’ সুমিষ্ট স্বরে জার্মান উচ্চারণের টান। ‘কিন্তু তিনি তো শহরে গেছেন। আশা করছি এখনই তিনি বাড়ি ফিরবেন।’

মিকমুরডোর চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠেছিল অগাধ বিস্ময় আর মুগ্ধতা। তাকিয়েই ছিল সে বাক্যহীন, ফলে ভীষণ অস্বস্তির সঙ্গে যুবতী চোখ নামিয়ে নিল।

‘না, মিস্,’ কোনোরকমে বলল সে, ‘তিনি আসুন না ফিরে, আমার তাড়াহুড়ো নেই। কিন্তু এই বাড়িতেই থাকার জায়গা হবে আমার, এরকম বলা হয়েছে। আশা ছিল জায়গাটা মন্দ হবে না। এখন দেখছি থাকার পক্ষে এই বাড়ি খুবই ভালো।’

‘আপনি দেখছি তাড়াতাড়ি মনস্থির করতে পারেন,’ মৃদু হেসে বলল যুবতী।

‘অন্ধ না হলে যে কেউ সেটা পারবে।’

প্রচ্ছন্ন প্রশংসায় সাড়া দিল যুবতী। খিলখিল হেসে উঠল, ‘ভেতরে আসুন স্যার। ওয়েলকাম। আমি মিস এট্টি শ্যাফটার, মি. শ্যাফটারের মেয়ে। আমার মা নেই, ঘরদোর দেখাশোনা আমিই করি৷ সামনের ঘরে গরম স্টোভের পাশে আপনি বসুন, যতক্ষণ না বাবা আসেন। ওহ, এই তো এসে গেছেন! এখন তাহলে দরকারি কথাবার্তা বাবার সঙ্গে সেরে নিন।’

মোটাসোটা, লম্বা, বয়স্ক এক মানুষ, বাইরের সিঁড়ি দিয়ে ধীর-পায়ে উঠে বাড়িতে ঢুকলেন। সামান্য কথা বলেই মিকমুরডো বোঝাতে পারল তার উদ্দেশ্য৷ শিকাগোতে মারফি নামে এক ব্যক্তি তাকে এই বাড়ির ঠিকানা দিয়েছে৷ বুড়ো শ্যাফটার সঙ্গে সঙ্গে সব বুঝে গেলেন। থাকার ভাড়া, রাহা-খরচ, যা উল্লেখ করলেন বৃদ্ধ, সবকিছুর সঙ্গেই একমত হল আগন্তুক। বোঝা গেল, পয়সাকড়ি তার সঙ্গে ভালোই আছে৷ থাকার ও খাওয়ার খরচের জন্যে সে এক সপ্তাহের আগাম পেমেন্ট করল সাত ডলার।

তাহলে এই হল মিকমুরডো, নিজেই খানিক আগে চলন্ত ট্রেনে দুজন আইন-রক্ষক এবং এই অঞ্চলের বেশ কিছু কুলি-কামিনদের বুক ফুলিয়ে জানিয়েছে যে, আইন-কানুনের খুব একটা তোয়াক্কা সে করে না। আশ্রয় পেল সে শ্যাফটারের বাড়িতে, আর এটা হল গা-ছমছমে ঘটনার ঘনঘটার প্রথম পদক্ষেপ, যার শেষ দেখব আমরা অনেক অনেক দূরের এক দেশে।

পরিচ্ছেদ ২ঃ বডিমাস্টার

মিকমুরডোর পরিচিতি ছড়িয়ে যেতে লাগল দ্রুত। যেখানেই সে যাক, লোকজন তাকিয়ে থাকত তার দিকে, ফিসফাস করত তাকে নিয়ে। এক সপ্তাহের মধ্যে শ্যাফটারের কাছাকাছি অঞ্চলে সে একজন ডাকাবুকো হিসেবে পরিচিত হয়ে গেল। শ্যাফটার লজে দশজন কী বারোজন বোর্ডার ছিল, তাদের কেউ রেল-কোম্পানিতে সাদামাটা চাকরি করে বা কোনো দোকানে কেরানির কাজ করে, সেই যুবকেরা আইরিশের মতো সবসময় বুক ফুলিয়ে মাস্তানের মতো হাঁটাচলা করে না; তারা নেহাতই মাছিমারা কেরানি শ্রেণীর। সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে যখন মিকমুরডোকে মধ্যমণি করে গুলতানিতে জড়ো হতো, তখন নানা রকম মজার কথা বলে মিকমুরডো মাতিয়ে রাখত তাদের। চোখা-চোখা কথাবার্তায় অবাক করে দিত তাদের আর সুন্দর গান গাইত গলা খুলে। যে-কোনো আড্ডাকে জমিয়ে তুলতে সে ওস্তাদ। তার উপস্থিতিরই একটা চৌম্বক-ক্ষমতা আছে, তার সঙ্গ পেলে মিইয়ে থাকা মানুষগুলো চাঙা হয়ে উঠত।

কিন্তু প্রাণবন্ত এই যুবক মজা যেমন করতে পারত, আবার কোনো বেফাঁস কথা কানে এলেই রেগে উঠত ভীষণ, যেমন রেগে উঠেছিল প্রথম দিন, সেই পুলিশ দুজনের ওপর রেলের কামরায়। আর তার বেয়াড়া রাগ আর আগুনে মেজাজ আশপাশের নিরীহ লোকগুলোর থেকে আদায় করে নিত সম্ভ্রম আর কখনও কখনও ভয়।

প্রথম থেকেই সে বুড়ো শ্যাফটারের অনিন্দ্যসুন্দর মেয়ের প্রশংসা করত প্রকাশ্যেই, বলে বেড়াত যে ওই সুন্দরীর কাছে সে তার হৃদয়কে বন্ধক রেখেছে প্রথম দিনের সেই স্মরণীয় মুহূর্ত থেকে যখন প্রথম দেখেছিল তার অপরূপ সৌন্দর্য এবং মাধুর্য। সে একেবারেই মুখচোরা প্রেমিক নয়। দ্বিতীয় দিনেই সে মেয়েটিকে জানিয়ে দিল যে সে তাকে ভালোবেসে ফেলেছে। আর তারপর থেকে সে সকলকে প্রকাশ্যে বলে বেড়াত সেই কথা, এই ব্যাপারটাকে পাত্তা না দিয়েই যে মেয়েটি তাকে ভালোবাসে কিনা!

আর একটা কথা মিকমুরডো বেশ চেঁচিয়ে সগর্বে বলত যে, আইন এবং আইনরক্ষকদের তার খুব চেনা আছে। আসল অপরাধীকে ধরার সাহস নেই, কিন্তু বাঁ হাত বাড়িয়ে ঘুষটি খুব খেতে জানে। পুলিশদের কে আর পছন্দ করে? তার এই কথাগুলো বোর্ডারদের বেশ আনন্দ দিত, কেউ কেউ আবার ভয়ও পেত, কারণ পুলিশ পারে না এমন কাজ আছে নাকি!

এদিকে তার চমৎকার কথা বলার ক্ষমতা, কত বিচিত্র দেশ দেখেছে সে, পর্বত দেখেছে, উপত্যকা দেখেছে, সমুদ্র দেখেছে, এত সব মনোরম অভিজ্ঞতার গল্প সে ফেনিয়ে বলত বুড়ো শ্যাফটারের মেয়েকে। এরকম একজন মানুষকে নরম-হৃদয় এট্টি না ভালোবেসে পারে! মনে মনে মিকমুরডোর প্রতিও তার অনুরাগ জন্মাল।

ইতিমধ্যে মিকমুরডো ছোটখাটো একটা চাকরিও জুটিয়ে ফেলেছে। শিক্ষাদীক্ষা আছে তার। চাকরিটা হল বুককিপারের৷ একদিন সন্ধের পর স্ক্যানলান এসে হাজির। তার সঙ্গেই প্রথম দিন ট্রেনে আলাপ হয়েছিল।

‘তারপর মিকমুরডো, কেমন আছ দোস্ত?’

‘চলছে আর কী? এলাকার খবর কী?’

‘সব ঠিক আছে৷ কিন্তু তুমি তো আসল কাজটা এখনও করনি দোস্ত৷ এতদিন হয়ে গেল, তুমি এখনও রিপোর্ট করনি বডিমাস্টারের কাছে। এখানকার শের মিকগিনটির সঙ্গে এখনও দেকা করতে যাওনি?’

‘আমি একটা চাকরি পেয়েছি। খুব ব্যস্ত।’

‘যেভাবে হোক, তোমাকে সময় বের করতে হবে। তোমাকে কী বলেছিলুম দোস্ত? এখেনে পৌঁছনোর পরদিন সকালেই ইউনিয়ন অফিসে গিয়ে তোমার নাম রেজিস্টার করা উচিত ছিল বটে৷ সে কিন্তু তোমার কতা সব শুনেচে। কিন্তু তুমি দেকা করনি বলে...,’ স্ক্যানলান তাকিয়ে ছিল তার দিকে কীরকম বাঁকা দৃষ্টিতে।

‘দোস্ত তুমি পুলিশ শালাদের গালাগাল দাও এটা বসের কানে গেচে।’

‘তাহলে সে খুব খুশি বলো আমার ওপর?’

‘খুশি হয়তো আচে। কিন্তু রেগেই আচে খুব বললুম তোমাকে...।’

‘তাহলে...।’

‘এখনই বসের সঙ্গে করো৷ তার গোঁসা আর বাড়িয়ো না...।’

ঘটনাচক্রে সেই একই সন্ধ্যায় মিকমুরডোর সঙ্গে আর একজনের কথাবার্তা হল, যা থেকেও তার মনে হল এবার এখানকার বসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা উচিত। এরকম হতে পারে যে, এট্টির প্রতি তার বিশেষ মনোযোগ চোখে পড়ছিল অনেকের। কিংবা নিজের মেয়ের প্রতি যুবকের এরকম ছুকছুক ভাব লজের জার্মান মালিকের চোখে পড়ে গিয়েছিল বিশেষভাবে; কারণ যাই হোক, বুড়ো একদিন চোখের ইশারায় ছোকরাকে ডাকল নিজের ঘরে আর ধানাই-পানাই না করে সোজা চলে গেল আলোচনার বিষয়ে।

‘আমার মনে হচ্চে মিস্টার,’ বুড়ো বলল, ‘এট্টির প্রতি আপনি বেশ দুর্বল হয়ে পড়েচেন। ঠিক বলচি না ভুল বলচি?’

‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন,’ যুবক উত্তর দিল।

‘বেশ, আমি আপনাকে এখনই জানিয়ে দিতে যাই যে এতে কোনো লাভ হবে না। আপনার আগে অন্য একজন এট্টির পেছনে লেগে আচে।’

‘এট্টি সেটা জানিয়েছে আমাকে।’

‘বেশ, এট্টি সত্যি কথাই বলেচে। অবশ্য মিথ্যে আমার মেয়ে বলে না। কিন্তু সে কি এটা বলেচে সেই বাহাদুর কে?’

‘না, আমি তাকে জিগ্যেস করেছিলাম; কিন্তু সে বলতে চায়নি।’

‘বলতে চায়নি না, মেয়েটা ঝামেলা চায়নি, তাই সেই বাহাদুরের নামটা বলতে চায়নি৷ তার নাম শুনে আপনি চমকাতে পারেন, এটা সে চায়নি।’

‘চমকাব আমি? মুহূর্তে মিকমুরডোর মুখ লাল।’

‘হ, হ, চমকাইবেই বটে। দোস্ত! তাকে ভয় পেলে তোমার লজ্জা হবার কোনো কারণ নেই৷ সে ছোকরার নাম হল টেড বলডউইন।’

‘মালটা কে বলুন তো?’

‘এখানকার বোম্বেটের মধ্যে একজন কেউকেটা বটে।’

‘বোম্বেটে! শুনেছি বটে তাদের গপ্প। এখানে বোম্বেটে, সেখানে বোম্বেটে, ফিসফিসানি কানে এসেছে আমার। তাতে আপনারা এত চমকান কেন? আর এই বোম্বেটেদের গপ্পটাই বা কীরকম?’

বোর্ডিং-মালিক নিজে থেকেই চট্ করে তার স্বর নামিয়ে নিল, এখানকার সকলেই যেরকম করে থাকে সেই বেপরোয়া দলের কথা বলতে। ‘এরা হল, মানে এই বোম্বেটেরা, স্বাধীন দস্যুর দল! কেউ এখানে তাদের ঘাঁটাতে সাহস করে না!’

যুবক অবিচলভাবে বলল, ‘তাহলে বলতে হয়, আমিও সেই দলের একজন।’

‘আপনি! আগে এটা জানলে আপনাকে আমার বাড়িতে থাকতেই দিতুম না। সে মশাই আপনি যদি আমাকে এক হপ্তার জন্যে একশো ডলার দিতেন তাও...।’

‘কেন, এদের প্রতি আপনাদের এত ভয় কেন? এরকম দলের মেম্বার যারা, তারা তো মানুষের ভালোর জন্যে কাজ করে। বিপদে অসহায় মানুষকে বাঁচায়। সোসাইটির নিয়মে তো সেরকমই বলা আছে...।’

‘অন্য কোথাও সেই নিয়ম হয়তো চালু আচে। কিন্তু এখেনে বদমাশরা ওসব নিয়মের পরোয়া করে না।’

‘এখানে এদের হালচালটা কীরকম শুনি?’

‘এখেনকার সোসাইটিকে বলা হয় খুনেদের সোসাইটি। ব্যাপারটা অক্ষরে অক্ষরে সেরকম।’

মিকমুরডো অবিশ্বাসীর হাসি হাসল। ‘আপনার কথার প্রমাণ আছে?’

‘প্রমাণ? পঞ্চাশটা মার্ডারের কথা বলতে পারি যেগুলো এদের হাতে হয়েচে! মিলম্যান, ভ্যান সরসট্, নিকলসন ফ্যামিলি, বেচারি বুড়ো মি. হায়াম, ছোকরা বিল্লি জেমস, এরকম কত? কতজনের নাম করব যাদের গলা কেটেছে ওরা! প্রমাণ? এই অঞ্চলে এমন কেউ আচে যে এসব কতা জানে না?’

‘দেখুন মশাই!’ গম্ভীর স্বরে বলল মিকমুরডো, ‘হয় আপনি এদের সম্বন্ধে এতক্ষণ যা যা বললেন, ফিরিয়ে নিন, আর নয়তো সোসাইটির ভালো কাজকর্মের কথা বলুন৷ যে-কোনো একটা আপনাকে করতেই হবে; তা না হলে আমি এখান থেকে পাততাড়ি গুটোব৷ আপনি নিজেকে আমার জায়গায় ভাবুন তো? এখানে কিছুদিন হল আমি এসেছি, শহরে একেবারে নতুন। একটা সোসাইটির একজন সদস্য আমি, যে সোসাইটির কাজই হল মানুষের মঙ্গল করা। তাই যখন আমি ভাবছি, এখানকার সোসাইটির একজন মেম্বার হব, তখন আপনি আমাকে বলছেন, এরা সবাই বোম্বেটে, খুনির দল। এরকম মন্তব্য করার জন্যে হয় আপনি ক্ষমা চান, আর নয়তো আরও বিবরণ দিন ওরা আর কী কী খারাপ কাজ করে এখানে৷ বোঝাতে পেরেছি, মি. শ্যাফটার?’

‘শুনুন মিস্টার, আমি আপনাকে সেগুলোই জানাতে পারি যা সারা শহরের সবাই জানে। এখানে কেউ কাউকে মানে না, প্রত্যেকে প্রত্যেককে চোখ রাঙিয়ে কতা বলে বটে৷ আপনি যদি একজনকে রাগিয়ে দেন, তাহলে অন্য একজন তার হয়ে আপনার পিঠে ছুরি বসাবে৷ আমরা এরকম কত দেকেচি।’

‘আপনি যা বলছেন, ওসব আপনাদের গালগল্প। আমি প্রমাণ চাই, প্রমাণ!’ বলল মিকমুরডো।

‘যদি এখেনে আর কিচুদিন থাকেন, প্রমাণ পেয়ে যাবেন। কিন্তু আমি জানতুম না যে, আপনি নিজেই হতেচেন ওদের একজন। হুম্, তাহলে ভাবতেচি ওদের মতন আপনিও লোক সুবিধের নন। এখেনে মাথা গোঁজার জায়গা আরো মিলে যাবে মিস্টার৷ আমার এই শান্তিপূর্ণ ডেরায় আপনার থাকা চলবে না৷ এমনিতেই, শালা আমার মুগুরের ঘায়ে কুকুর পাগল হবার অবস্থা! ওদের একজন বদমাশ রোজ আসবে আমার বাড়িতে, আর অসভ্যতা করার চেষ্টা করবে আমার মা-মরা মেয়েটার সঙ্গে। তাকে আমি আঙুল তুলে একটা কতাও বলতে পারব না! তার ওপর আপনি হলেন গিয়া এক ওদেরই শাগরেদ? না, মশাই, আমি পারব না আপনাকে আমার এখেনে রাকতে! আজকের রাতটা থাকুন, আগামীকাল সকালেই কেটে পড়বেন। বুইঝলেন?’

মিকমুরডোর তো স-সে-মি-রা অবস্থা। আমও যেতে চায়, ছালাও যেতে চায়। বুড়ো তাকে জবাব দিয়ে দিয়েছে; তার মানে, এত দেবীর মতন মেয়েটা যার সঙ্গে ভালোই আসনাই চলছিল তার, সে-ও হবে চোখের আড়াল। বুড়ো বাইরে কোথায় কেটে পড়ল। সন্ধেবেলায় এট্টিকে দেখল একা বসে থাকতে বৈঠকখানায়। তাকে দেখামাত্র সে গড়গড় করে তার সমস্যার কথা উগরে দিল।

‘তোমার বাবা তো আজ আমাকে নোটিশ দিয়েই দিলেন।’ মিকমুরডো করুণ গলায় বলল। ‘শুধু যদি থাকার জন্যে একটা ঘরের ব্যাপার হতো, তাহলে আমার ভাবনার কিছুই ছিল না; কিন্তু এট্টি, তোমাকে মনের কথাটা খুলে বলি। যদিও এক সপ্তাহ হয়েছে মাত্র তোমার সঙ্গে আমার আলাপের, এখন তুমি আমার জীবনের সব, তোমাকে ছেড়ে আমি থাকতেই পারব না!’

‘চুপ! চুপ! মি. মিকমুরডো, ওরকম কথা বলবেন না!’ মেয়েটি বলল, ‘আমি তো আপনাকে জানিয়েছি, জানাইনি?... আপনি আমার জীবনে দেরি করে এসেছেন? আর একজন আছে, বহুদিন থেকে আমাকে পটাবার চেষ্টা করছে, যদিও আমি তাকে বিয়ে করব এরকম পাকা কথা দিইনি, তবুও তাকে আমি ছেঁটেও ফেলতে পারব না।’

‘ধরো, আমি যদি তোমার জীবনে প্রথম আসতাম এট্টি, তাহলে কি তুমি আমার হতে?’

তরুণী তার দুই হাতের মুঠোয় মুখ লুকাল। ‘ঈশ্বরকে আমি রোজ বলি আর চোখের জল ফেলি যে, আপনি আমার জীবনে আগে এলেন না কেন!’ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে।

তরুণীর সামনে মিকমুরডো চকিতে হাঁটু গেড়ে বসল। ‘ঈশ্বরের দোহাই এট্টি, আমাকে ভালোবাসো!’ করুণ গলায় সে বলল, ‘কাকে চাপের মুখে কথা দিয়েছ তার কী মূল্য আছে? তার জন্যে কী আমাদের দুজনের জীবন নষ্ট হোক, তাই তুমি চাও? কাউকে ভয় না করে, তোমার মন, তোমার হৃদয় যা চাইবে তুমি তাই করবে, মাই ডিয়ার! আবার বলছি, কাকে কী কথা দিয়ে রেখেছ, ভুলে যাও, তোমার হৃদয়ের বাসনাকেই অনুসরণ করে চলো।’

নিজের দুই তামাটে হাতে সে এট্টির অপরূপ সাদা হাত ধরল।

‘বলো তুমি আমারই হবে, যা ঘটবে আমরা দুজনে একসঙ্গে তার মোকাবিলা করব!’

‘এখানে থাকলে সেটা করা যাবে না।’

‘কেন, এখানেই, অবশ্যই এখানেই।’

‘না, না, জ্যাক!’ কাঁদো কাঁদো গলায় সে বলল, ‘এখানে তোমাকে আর আমাকে ওরা শান্তিতে থাকতে দেবে না। আমাকে নিয়ে তুমি পালিয়ে যেতে পারবে না?’

এক মুহূর্ত মিকমুরডোর মুখে দারুণ উদ্বেগের ছায়া, পরমুহূর্তেই তার মুখ গ্রানাইট পাথর। ‘না, এখানেই থাকব আমরা। পালিয়ে যেতে শিখিনি আমি।’ বেশ জোর দিয়ে বলল সে, ‘পৃথিবীর যত বাধা আসে আসুক, আমি তোমাকে বুক দিয়ে আগলে রাখব এট্টি। এখানেই থাকব, এখানেই!’

‘এই বিশ্রী জায়গা ছেড়ে আমরা চলে যেতে পারি না কেন?’

‘না এট্টি, এ জায়গা ছেড়ে আমি এখন যেতে পারব না।’

‘কিন্তু কেন?’

‘ভয়ে এই জায়গা ছেড়ে পালিয়েছি এটা ভেবেই সারাজীবন আমাকে মাথা হেঁট করে চলতে হবে৷ তাছাড়া, এত ভয়ের কী আছে? স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা চলাফেরা করতে পারব না কেন? যদি আমরা দুজনে দুজনকে সত্যি ভালোবাসি, আমাদের বিচ্ছিন্ন করার সাহস কার আছে?’

‘তোমার কোনো ধারণাই নেই, জ্যাক। মাত্র সাতদিন হল তুমি এখানে এসেছ। এই বলডউইন লোকটা যে কী মারাত্মক তুমি জানো না। মিকগিনটি আর তার খুনির দল যে কী ভয়ঙ্কর হতে পারে তোমার কোনো ধারণাই নেই।’

‘না, আমি জানি না তাদের, ভয়ও করি না তাদের, আর তারা যে আমার ক্ষতি করতে পারবে এটাও আমি বিশ্বাস করি না।’কঠিন স্বরে বলল মিকমুরডো, ‘বজ্জাত এবং বদমাশদের সঙ্গে আমি অনেক মিশেছি, মাই ডারলিং। বরাবরই আমি তাদের ভয় করিনি, শেষমেশ দেখা গেছে তারাই আমাকে রীতিমতো সমঝে চলছে। যা বলছি, সব, সত্যি বলছি এট্টি। তোমার বাবার মুখে যা শুনলাম। যদি এখানকার এই বদমাশগুলো, এই অঞ্চলে, অপরাধের পর অপরাধ করে যায়, খুনের পর খুন করে যায়, আর তাদের যদি এখানকার সবাই চেনে, তাহলে পুলিশের কাছে তাদের বিরুদ্ধে নালিশ করা হয় না কেন? বলো আইনের সাহায্য নেওয়া হয় না কেন? বলো, উত্তর দাও এট্টি!’

‘কারণ তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে কেউ এগিয়ে আসবে না। তাদের বিরুদ্ধে কেউ যদি সাক্ষ্য দেয় তাহলে পরদিনই তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না৷ এছাড়া এই ছন্নছাড়ার দল নিজেরাই ভালো মানুষ সেজে আদালতে গিয়ে সাক্ষী দিয়ে থাকে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা সর্বৈব মিথ্যা, কারণ অভিযুক্ত অপরাধের সময় সে জায়গাতেই ছিল না। আমার ধারণা জ্যাক, তুমি নিশ্চয়ই এসব সংবাদপত্রে পড়েছ। এই যুক্তরাষ্ট্রের সব দেশে, সব অঞ্চলে এদের ভয়ঙ্কর কীর্তিকলাপের কথা সংবাদপত্র মারফত সবাই জানে৷ সংবাদপত্রে এদের নিয়ে লেখালেখি তো প্রায়ই হয়?’

‘ঠিকই, আমি নিজেও সংবাদপত্র পড়ে এদের বিষয়ে অনেককিছু জেনেছি৷ কিন্তু সেসব পড়ে আমার মনে হয়েছে সংবাদপত্রের বানানো গল্প৷ এরকমও তো হতে পারে যে, এখানকার লোকগুলো যে মারদাঙ্গা করে, তার কোনো কারণ আছে৷ হয়তো তাদের ওপরও নানাভাবে আগে অত্যাচার করা হয়েছে। এখন সুযোগ পেলেই তারা সেই অন্যায়-অবিচারের শোধ তোলে।’

‘ওহ, জ্যাক, তোমার মুখেও এই কথা! এসব তো ও বলে, সেই বদমাশটা যে আমাকে বিরক্ত করতে আসে।’

‘বলডউইন, সে এরকম কথা বলে নাকি?’

‘জানো, প্রধানত সেই কারণেই আমি তাকে ঘৃণা করি৷ জ্যাক, ভুল বুঝো না আমাকে, আমি যা বলছি সব সত্যি। ওই অসভ্য লোকটার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র মোহ নেই। ঘৃণা, ঘৃণা, আমি তাকে শুধু ঘৃণা করি! কিন্তু তাকে ভয়ও করি। নিজের জন্যে ততটা নয়, বাবার জন্যে। যদি সে কোনোদিন জানতে পারে যে আমি তাকে ভালোবাসা তো দূরের কথা শুধুই ঘৃণা করি, তাহলে হয়তো সেদিনই হবে আমার বুড়ো বাবার শেষদিন৷ সেই কারণেই একটু-আধটু ছলাকলা তার সঙ্গে আমাকে করতেই হয়। বলতে হয় যে, সময় হলেই আমি তার স্ত্রী হব। এভাবেই বেঁচে আছি আমরা, অন্তত বাবাকে বাঁচিয়ে রেখেছি। কিন্তু যদি তুমি আমাকে নিয়ে অনেক দূরে কোথাও পালিয়ে যেতে পারো জ্যাক, সঙ্গে বাবাকেও নেব অবশ্যই; তাহলে এই নরকের কুলাঙ্গারদের থেকে পালিয়ে আমরা শান্তিতে থাকব।’

মিকমুরডো চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। কিছু ভেবে নিল সে। আবার তার মুখে দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ছাপ। ‘তোমার কিংবা তোমার বাবার কোনো ক্ষতি হবে না। আমার এই কথায় তুমি বিশ্বাস রাখতে পারো। গুণ্ডাগুলোর কথা ভেবে ভয় পাচ্ছ তো? খুব তাড়াতাড়ি তুমি দেখবে ওদের মধ্যে যে সবথেকে নিষ্ঠুর গুণ্ডা, তার থেকেও আমি কত নিষ্ঠুর হতে পারি; এটা নিছক আস্ফালন নয়। সময় আসুক দেখবে আমি কী ধাতুতে তৈরি।’

‘না, না, জ্যাক! আমি তোমার ওপর বিশ্বাস রাখছি।’

চোখ কুঁচকে হাসল মিকমুরডো৷ ‘ভেবে হাসি পাচ্ছে, এখনও তুমি আমাকে কত কম জানো। তুমি ঘরোয়া মেয়ে, বিশুদ্ধ আত্মা তোমার, মাই ডারলিং! রূঢ় বাস্তবতার তুমি কতটুকুই বা জানো, কতটুকুই বা দেখেছ! কিন্তু, কোনো অতিথি এল মনে হচ্ছে?’

দরজাতে বেশ জোরে জোরে করাঘাত। ‘ওই সে এসেছে!’ এট্টি চাপা স্বরে বলল, তারপর দ্রুত খুলে দিল দরজা।

এক যুবকের আবির্ভাব। হাঁটাচলার এমনই ভঙ্গী তার, যেন কাউকে পরোয়াই করে না৷ দেখতে সুন্দর, তরতাজা, ভীষণ সপ্রতিভ। মিকমুরডোরই বয়সি এবং তার মতোই পেশীবহুল চেহারা৷ মাথায় কালো ফেল্ট হ্যাট, সেটা ভদ্রতাবশত মাথা থেকে খোলার দরকার মনে করল না যুবক৷ ঈগলের মতো তীক্ষ্ণ নাক। তীব্র-জ্বলজ্বলে চোখে সে দুজনের দিকে তাকিয়েছিল।

এট্টি তার পায়ে পড়ে গেল। হাউমাউ করে বলল, ‘খুব ভালো হয়েছে, আপনি এসেছেন মি. বলডউইন! আজ একটু আগে এসেছেন আপনি। আসুন, বসুন এই ভালো চেয়ারটাতে।’

বলডউইন ট্রাউজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়েই ছিল, তীব্র চোখে দেখছিল মিকমুরডোকে। ‘মালটা কে?’ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে সে জিগ্যেস করল।

‘ইনি আমাদের নতুন বোর্ডার, মি. বলডউইন। বাবার পরিচিত। কয়েকদিন থাকতে এসেছেন...।’

মুখ বেঁকিয়ে দুজন যুবক, দুজনের দিকে ঘাড় নাড়ল।

‘মিস এট্টি নিশ্চয়ই তোমাকে বলেচে আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক?’

‘সম্পর্ক? কীসের সম্পর্ক?’

‘এখনও জানো না? তাহলে মনোযোগ দিয়ে শুনে নাও, এই মেয়েটি আমার। এখন কাটো তো, বাইরে ঘুরে এসো।’

মিকমুরডো আড়মোড়া ভেঙে বলল, ‘শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে। আজ আর বাইরে যাব না।’

‘যাবে না?’ যুবকের শয়তান চোখ জ্বলে উঠল রাগে। তাহলে মি. বোর্ডার, একটু ঝাড়পিট হয়ে যাবে নাকি?’

‘হতে পারে!’ বসে ছিল, তড়াক করে দাঁড়িয়ে বলল মিকমুরডো। ‘মাঝে মাঝে ঝাড়পিট মন্দ লাগে না।’

‘দোহাই তোমার জ্যাক, ওরকম বোলো না ওকে!’ আর্তস্বরে বলছিল এট্টি। ‘জ্যাক, তুমি জানো না ওর গায়ের ক্ষমতা!’

‘তাই নাকি? একেবারে জ্যাক?’ গাল দিল বলডউইন, ‘একেবারে জ্যাক বলে ডাকাডাকি শুরু হয়েচে?’

‘তোমার পায়ে পড়ি টেড। ওরকম রেগে যেও না। যদি তুমি আমাকে সত্যিই ভালোবাসো টেড, তাহলে ওকে ক্ষমা করে দাও!’

‘আমার মনে হয় এট্টি, আমাদের দুজনের মধ্যে ব্যাপারটা বুঝে নিতে দাও।’ অকম্পিত স্বরে বলল মিকমুরডো৷ ‘কিংবা এটাও হতে পারে মি. বলডউইন, বাড়ির মধ্যে ঝামেলা না করে আমরা রাস্তায় যেতে পারি। সন্ধের আবহাওয়া দারুণ! আর ঘুঁষোঘুঁষি করার ভালো জায়গা আছে, একটা মাঠ, এই বাড়ির ঠিক পাশেই৷’

‘এখন ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করতে চাই না আমি,’ শত্রু বলল চিবিয়ে চিবিয়ে।’তোর সঙ্গে বোঝাপড়া যতক্ষণ না হচ্ছে, পা রাখবি না তুই এই বাড়িতে।’

‘আয় না, নিজেরা পরীক্ষা করে দেখে নিই, কে কেমন...!’

‘কোন্ সময়টা ঠিক হবে, সেটা আমাকেই ভাবতে দে বোর্ডার! এটা দেখে রাখ...’ বলে সে হাতের আস্তিন গুটোল। মিকমুরডো দেখল, একটা অদ্ভুত চিহ্ন, হাতে যেন ছ্যাঁকা দিয়ে দেগে দেওয়া হয়েছে! চিহ্নটা হল, একটা বৃত্তের ভিতর একটা ত্রিভুজ। জানা আছে, এই চিহ্নটার মানে কী?

‘জানি না, জানার দরকারও নেই।’

‘তাড়াতাড়ি জানবি, এই বলে গেলুম। বেশিদিন তোকে আর বাঁচতে হবে না! মিস এট্টি তোকে নিশ্চয়ই বুঝিয়ে দেবে সব। আর তোমাকে, বলে যাচ্ছি এট্টি, আমার কাছে তোমাকে আসতে হবে। হাঁটু ঘষে ঘষে। শুনে রাখো, হাঁটু ঘষে ঘষে। তারপর ভেবে দেখব, কী শাস্তি হয় তোমার।’

মিকমুরডোর দিকে তাকিয়ে দাঁত ভেংচে সে বলল, ‘নিজের কবর তুই নিজেই খুঁড়লি! দেঝে নেব তোকে!’ কথাগুলো বলে ঝপাং শব্দে দরজা খুলে টেড বেরিয়ে গেল।

কয়েক মুহূর্তের স্তব্ধতা। তারপরই যুবতি ঝাঁপিয়ে পড়ল মিকমুরডোর চওড়া বুকে।

‘ওহ জ্যাক, কী সাহস তোমার! কিন্তু ওদের সঙ্গে পারবে না জ্যাক, তোমাকে পালাতে হবে! আজ রাতেই, জ্যাক, আজ রাতেই! বাঁচতে গেলে পালাতে তোমাকে হবেই৷ ও তোমাকে ছাড়বে না! ওর ভয়ঙ্কর চোখ দেখেই আমি বুঝেছি। এই অপমানের শোধ ও তুলবেই! বস মিকগিনটিকে নিয়ে ওরা সবাই আসবে৷ অতজনের সঙ্গে তুমি কীভাবে লড়বে?’

মিকমুরডো যুবতির আলিঙ্গন থেকে ধীরে ছাড়িয়ে নিল নিজেকে, চুম্বন করল তাকে, তারপর তাকে বসাল একটা চেয়ারে।

‘শান্ত হও! শান্ত হও এট্টি! আমাকে নিয়ে চিন্তা কোরো না, ভয়ও পেয়ো না। খুন-খারাবিতে ওদের থেকে আমি কম যাই না৷ সেটা জেনে তুমি হয়তো ঘেন্নাই করবে আমাকে।’

‘ঘেন্না করব, তোমাকে? যতদিন বেঁচে থাকব, তোমাকে আমি ভুলব না! কিন্তু শিকাগোতে তুমি যদি ওদের দলেরই লোক ছিলে, তাহলে তুমি নিজেই যাও মিকগিনটির কাছে। নিজের পরিচয় দাও, সব কথা খুলে বলো তাকে। ওরা দলবেঁধে এখানে এসে পড়ার আগেই তুমি ওদের নেতার সঙ্গে দেখা করো।’

‘আমিও তাই ভাবছি,’ বলল মিকমুরডো, ‘এখনই আমি যাব তার কাছে, গোলমাল মিটিয়ে নেব। তোমার বাবাকে বলে রেখো যে আজ রাতটা আমি এখানেই ঘুমোব। সকালে অন্য ডেরা খুঁজে নেব।’

বিলাসবহুল, বড় কক্ষ মিকগিনটির। একপাশে বার,মাতালদের আড্ডা, সমস্ত কক্ষ ভিড়ে ভর্তি৷ এই শহরের যত চোর-ছ্যাঁচড়-রঙবাজ-গুণ্ডা-বদমাইশদের আড্ডা দেবার, হুল্লোড় করার জায়গা এটাই। এখানকার প্রধান লোকটি যে বেশ জনপ্রিয় তা তো বোঝাই যাচ্ছে৷ সিংহাসনের মতো একটা চেয়ারে বসে আছে পালের গোদা। মুখে কর্কশভাব, কিন্তু একটা পোশাকি হাসি ঝুলছে৷ মিকমুরডো ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে ভাবছিল, এই লোকটাকেই যমের মতো ভয় করে এই শহরের সবাই; এমনকী শুধু এই শহর কেন, চল্লিশ-পঞ্চাশ মাইল জুড়ে ভারমিস্সার উপত্যকার অ-ঘোষিত নৃপতি সে। পুলিশ তার গায়ে হাত দিতে সাহস করে না। তারই নির্দেশে টেডের মতো ছারপোকারা নিরীহ মানুষকে খুন করে, অসহায় মেয়েদের ধর্ষণ করে, গরিবদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে দানবের মতো হাসে। মিকগিনটি এখানে শয়তানের প্রতিভূ; এ ছাড়াও তার একটা গালভরা, আনুষ্ঠানিক পরিচয় আছে। সে হল এই শহরের মিউনিসিপাল কাউন্সিলর, ভোট দিয়ে তাকে উঁচু পদে জেতায় তারই দুর্বৃত্ত-চ্যালারা। বিনিময়ে সেই দুর্বৃত্তরাও তার প্রসাদ পায়, রাস্তা তৈরির বড় বড় কাজের বরাত। বছরের পর বছর রাস্তা একরকমই থাকে; ভাঙাচোরা, খানা-খন্দে ভর্তি, আর রাস্তা সারাবার টাকা অসাধু লোকগুলোর পকেটে যায়। বছরের পর জনসাধারণের করের টাকা এভাবেই অপচয় হয়। মানুষকে ট্যাক্স দিতে হয় অনেক, উন্নয়নের কাজ কিছুই হয় না বললেই চলে৷ মিউনিসিপাল অফিসের বার্ষিক হিসাবনিকাশের বহর যেসব অডিটর পরীক্ষা করতে আসে, তাদেরও প্রচুর ঘুষ দিয়ে কিনে নেওয়া হয়। শহরের ভদ্র নাগরিকরা সব বোঝে, সব দেখে; কিন্তু নিরুপায়ভাবে মুখ বুজে থাকে; কারণ মুখ খুললেই প্রকাশ্য দিবালোকে সেই সৎ প্রতিবাদীদের নাঙ্গা করে শহরের প্রধান রাস্তায় নির্যাতন করা হয় কিংবা বুলেটের বিনিময়ে তাদের মুখ চিরতরে বন্ধ করা হয়।

বছরের পর বছর চলে যায়, মিকগিনটির নিজস্ব তহবিলে অর্থের পাহাড় জমে। তার বাসস্থান প্রাসাদোপম হয় আর তার অফিস বড় হতে হতে রাস্তার ছোটখাটো বাজার, দোকান সব গিলে নেয়। সবাই তার আওতার মধ্যে, তার নিষ্ঠুর শাসনের রাজত্বে ভয়ে ভয়ে দিন কাটায়।

কাউন্সিলরের বিশাল কক্ষের দোল-খাওয়া দরজা ঠেলে মিকমুরডো ভিতরে ঢুকল। মানুষের ভিড় ধীরে ধীরে ঠেলে সে এগিয়ে যাচ্ছিল; ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে আছে কড়া তামাক আর ঝাঁঝালো শরাবের গন্ধে। আলোয় উজ্জ্বল ঘর, দেয়ালে সার বেঁধে গিল্টি করা আয়না। মদ নেবার জায়গায় প্রচুর ভিড়। কর্মচারীরা খদ্দেরদের চাহিদামতো পান-পাত্রে মদ ঢালছে আর এগিয়ে দিচ্ছে। ঘরের একেবারে শেষ প্রান্তে দীর্ঘকায়, পেশীবহুল শরীরে ঝলমলে পোশাক একজন দণ্ডায়মান; তার ঠোঁটের একধারে বিচিত্র কায়দায় আটকে রাখা লম্বা সিগার ধূম উদগিরণ করছে, একবার দেখলেই বোঝা যায় নায়কোচিত ভাবভঙ্গির এই লোকটাই রীতিমতো বিখ্যাত মিকগিনটি। মাথার ঘন-কালো, লম্বা চুল ঘাড় ছাপিয়ে নেমে এসেছে, জামার কলার ছুঁয়েছে৷ তার গায়ের রং তামাটে, চোখের রং গভীর কালো, এক চোখ অল্প ট্যারা, সব মিলিয়ে তার দর্শনই বেশ ভীতিপ্রদ।

মিকমুরডো যা দেখার দেখে নিয়েছে; তার নিজস্ব ঔদ্ধত্যের ভঙ্গীতে কনুই দিয়ে ভিড় ঠেলে ঠেলে সে হাজির হল এক ঝাঁক চাটুকারদের মধ্যে, যারা বসের সামান্য রসিকতাতেও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হাসছিল। মিকগিনটির সতর্ক, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ভিড়ের মধ্যে ঠিকই দেখে নিয়েছে সপ্রতিভ মিকমুরডোকে, চশমার ভেতরে তার অতি-উজ্জ্বল চোখদুটিকে।

‘এই যে ছোকরা, আগে এখেনে দেকিচি বলে তো মনে হয় না।’

‘আপনার এখানে আমি নতুন, মি. মিকগিনটি।’

‘এতই লতুন যে, একজন ভদ্রলোককে তার উপাধি উল্লেখ করে কতা বলতে হয়, তা জানা নেই?’

‘ওঁকে ডাকুন কাউন্সিলর মিকগিনটি,’ ভিড়ের মধ্যে একজন বলল।

‘আমি দুঃখিত, কাউন্সিলর, এখানকার আদব-কায়দা কিছুই জানি না। কিন্তু আমাকে বলা হয়েছে আপনার সঙ্গে দেখা করতে।’

‘বেশ, দেকলে তো আমাকে। এর থেকে বেশি দেকার কী আছে। কী মনে হচ্চে আমাকে দেকে?’

‘এত তাড়াতাড়ি তেমন কিছু বলা কঠিন৷ যদি আপনার হৃদয় ও মন আপনার শরীরের মতন বিশাল হয় এবং আপনার আত্মা আপনার মুখের মতনই সুন্দর হয়, তার থেকে বেশি আর কী চাওয়ার থাকতে পারে,’ উত্তর দিল মিকমুরডো।

‘আরে বে! কথা শুনে মনে হচ্চে আইরিশ...’ বলল বস। এক মিনিট নতুন আগন্তুকের আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলল, ‘তাহলে আমার চেহারা বলচ খারাপ নয়?’

‘এত তেজি পুরুষ আমি দেখিনি।’

‘আমার সঙ্গে দেখা করতে বলা হয়েচে তোমাকে?’

‘ইয়েস কাউন্সিলর।’

‘তার নাম কী?’

‘ব্রাদার স্ক্যানলান, লজ ৩৪১, ভারমিস্সা,’ ইতিমধ্যে এক পাত্র মদ এগিয়ে এল মিকমুরডোর দিকে। সপ্রতিভভাবে সে পাত্রটা নিয়ে উঁচু করে বলল, ‘মাননীয় কাউন্সিলরের স্বাস্থ্য আরও উন্নত হোক, আমাদের বন্ধুত্ব আরও দৃঢ় হোক।’ এই বলে নাটকীয়ভাবে মিকমুরডো পানীয়তে চুমুক দিল।

‘হুমম্, তাহলে আরও একটু ভালোভাবে তোমাকে পরখ করা উচিত, মি.–’

‘মিকমুরডো।’

‘একটু কাচে আসতে হবে, মি. মিকমুরডো; এখানে আমরা চট করে লোকজনকে বিশ্বাস করি না, তারা যা যা বলে তাও বিশ্বাস করি না৷ আসুন, ছোট ঘরের ভিতরে আসুন। এই বার-এর পেছনে।’

সত্যিই ছোট একটা ঘর। সারি সারি পিপে দাঁড় করানো। মিকগিনটি ঘরের দরজা ভালোভাবে এঁটে দিল, বসল একটা পিপের ওপর। ঠোঁটের সিগার চিবুচ্ছিল সে, আগন্তুকের আপাদমস্তক তখনও দেখছিল সন্দেহের চোখে। মিনিট দুই কোনো কথা নেই৷ নৈঃশব্দ৷ মিকমুরডো হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। একটা হাত কোট-পকেটের ভিতর, আর একটা হাতে সে তার গোঁফ চুমড়াচ্ছিল। হঠাৎ মিকগিনটি সামনের দিকে ঝুঁকল, এখন তার হাতে উদ্যত রিভলভার।

‘শোনো হে জোকার,’ কর্কশ স্বরে সে বলল, ‘যদি মনে হয় যে তুমি কোনো মতলব নিয়ে এয়েচ, সেদিনই ধরাধামে তোমার শেষ দিন।’

‘অভ্যর্থনাটা বড় অদ্ভুত বস,’ গম্ভীরভাবে বলল মিকমুরডো। ‘নবাগত ভাইকে এভাবে ওয়েলকাম জানানো কি বডিমাস্টারের পক্ষে শোভনীয়?’

‘বুঝলুম, কিন্তু তুমি যে আমাদেরই আখড়ার লোক সেটা তোমাকে প্রমাণ করতে হবে, আর যদি তা না পারো তাহলে! তোমার আগেকার আখড়া নাম কী?’

‘লজ ২৯, শিকাগো।’

‘সময়?’

‘জুন ২৪, ১৮৭২।’

‘জেমস এইচ. স্কট।’

‘জেলার নেতার নাম?

‘বার্থোলোমিউ উইলসন।’

‘হুমম্! ঠিক ঠিক লোকের সঙ্গেই কাজ করেচ তো? এখানে কী করতেচ?’

‘কাজ না করলে খাব কী? কিন্তু সামান্য কাজ...।’

‘মুখে মুখে বেশ উত্তর দিতে পারো তো?’

‘সেটা ঠিক বস৷ আমার জিভে কথারা উঁচিয়ে থাকে।’

‘হাতের কাজও কি তাড়াতাড়ি চলে?’

‘যারা আমাকে ভালো চেনে, তাদের কাছে ও ব্যাপারে আমার সুনাম আছে।’

‘বেশ, খুব তাড়াতাড়ি তার পরীক্ষা দিতে হবেক, এখানকার আখড়া সম্বন্ধে কিচু শুনেচ?’

‘শুনেছি, নবাগতকে ভাই হিসেবে দেখা হয়।’

‘বেশ, মিকগিনটি খুশ হ্যায়। শিকাগো ছাড়তে হল কেন?’

‘আমার বিপদ হতে পারে, যদি সব বলি!’

মিকগিনটি চোখ বুজিয়ে শুনছিল, চোখ খুলল। এরকম উত্তর শুনতে সে অভ্যস্ত নয়। মজা পেল মনে মনে।

‘আমাকে বলবে না কেন?’

‘কারণ আপনি জানেন, আমাদের আখড়ার কোনো ভাই আর এক ভাইকে মিথ্যে বলে না।’

‘তাহলে সত্যিটা এতই খারাপ যে বলা যাবে না?’

‘সেভাবে বলতে পারেন, যদি আপনি চান।’

‘দেখো মিস্টার, বডিমাস্টার হিসেবে আমি তোমাকে আমাদের আখড়াতে জায়গা দেব না, যদি তোমার অতীত জীবনের সব না জানাও।’

কিঞ্চিৎ হতভম্ব লাগল মিকমুরডোকে। তারপর সে তার কোটের ভেতরের পকেট থেকে খবরের কাগজের একটা মুড়ে যাওয়া, পুরোনো টুকরো বের করল।

‘আমার সঙ্গে বেইমানি হবে না তো?’

‘এই ধরনের কতা যদি আবার শুনি একটা ঘুষিতে মুখ ভেঙে দেব! রাগে চেঁচিয়ে উঠল মিকগিনটি।’

‘ঠিক বলেছেন কাউন্সিলর,’ হাতজোড় করে বলল মিকমুরডো, ‘ক্ষমা চাইছি আমি। কিছু না ভেবেই কথাটা বলে ফেলেছি৷ সত্যি বলছি, আপনার কাছে আমি নিরাপদ। এই ক্লিপিংটা দেখুন।’

মিকগিনটি চোখ বুলিয়ে পড়ে নিল, ১৮৭৪ সালে নিউ ইয়ার উইক সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছোট্ট খবর, ‘শিকাগো, মার্কেট স্ট্রিট, লেক স্যালুন অঞ্চলে জোনাস পিনটো নামে এক ব্যক্তিকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেবার সংক্ষিপ্ত সংবাদ।’

‘তোমার হাতের কেরামতি?’ কাগজের কাটিং ফিরিয়ে দিয়ে কাউন্সিলরের প্রশ্ন। মিকমুরডো ঘাড় নাড়ল।

‘লোকটাকে সাবাড় করেছিলে কেন?’

‘আঙ্কল স্যামকে ডলার জাল করার কাজে সাহায্য করতাম। এই লোকটা পিনটো আমাকে সাহায্য করত...।’

‘সাহায্য করত? কীভাবে?’

‘আসলে জাল ডলার বাজারে ছড়িয়ে দেবার ব্যাপারে ও সাহায্য করত। একদিন হঠাৎ লোকটা বেঁকে বসল। বলল, দলে থাকবে না।। আসলে পুলিশের খেচর হয়ে গিয়েছিল। আমি তাকে কোনো সুযোগ দিইনি। তাকে খেলতে দিলে জাল চক্রটাই ধরা পড়ে যেত। তাকে মেরে দিলাম৷ যে অঞ্চলে কয়লা খনি আছে, সেদিকে পালিয়ে এলাম।’

‘কয়লা খনি অঞ্চলে কেন?’

‘কারণ খবরের কাগজে পড়েছিলাম যে এইসব কয়লা খনি অঞ্চলে পুলিশের ধরপাকড় কম।’

এবার মিকগিনটির মুখে হাসি, ‘প্রথমে ডলার জাল করলে, তারপর খুন করলে, শালা ওস্তাদ আচো বে..., তারপর পালিয়ে এলে এখেনে, কারণ তুমি ভাবলে যে এখানে সবাই তোমাকে ফুলের মালা গলায় দিয়ে পুজো করবে।’

‘এই হল আমার গপ্প।’ শেষমেশ মিকমুরডো বলল।

‘বেশ, কপালে অনেক উন্নতি আচে তোমার। আচ্ছা, জাল ডলার কি এখনও বানাতে পারো?’

তার পকেট থেকে মিকমুরডো ছটা ডলার বের করল। বলল, ‘ফিলাডেলফিয়া টাঁকশাল থেকে এই ডলার তৈরি হয়নি।’

‘কী বলচ তুমি!’ তার বিশাল পাঞ্জায় মিকগিনটি ডলারগুলো আলোতে নিয়ে দেখছিল। আর মিকমুরডো দেখছিল লোকটার গরিলার মতো লোমশ হাত!

‘কোনো তফাতই দেকচি না আমি৷ বাহবা বেটা! তুমি তো যথেষ্ট কাজের লাগবে আমার, দেকতে পাচ্চি! তোমার মতো ওস্তাদ শয়তানকে তো আমি মাতায় করে রাখব!’

‘আপনার অন্য ওস্তাদদের কাজে লাগাতে আমি আছি বস।’

‘তোমার সাহস আচে। যখন রিভলভার বের করলুম আমি, তুমি একটুও চমকালে না।’

‘আপনার রিভলভারের বিরুদ্ধে বিপদে ছিলেন আমি না, আপনি।’

‘কেন?’

মিকমুরডো তার জ্যাকেটের ফুটোতে দেখাল তার রিভলভারের নল। ‘যখন কথা বলছিলাম আমরা, তখন আপনার দিকে তাক্ করা ছিল আমার অস্ত্র। আপনি যদি সত্যিই ফায়ার করতে যেতেন, তার আগেই আমি ফায়ার করতাম।’

‘তোবা! তোবা!’ মিকগিনটি রাগতে গিয়েও রাগল না, হাসিতে ফেটে পড়ল।‘শোনো স্যাঙাত, অনেকদিন হল তোমার মতো সাহসী ঢ্যামনা দেখিনি! আমাদের আখড়া তোমাকে পেলে বর্তে যাবে...আরে কী চাই রে তোর? কোনো ভদ্রলোকের সঙ্গে কি পাঁচ মিনিটও কতা বলতে পারব না? শুয়োরের বাচ্চা, দরজাতে না টোকা দিয়েই ঢুকে পড়বি?’

বারের কর্মচারী থতমত খেয়ে গেল, ‘সরি, কাউন্সিলর, টেড বলডউইন আমাকে পাটালো স্যার। উনি বলতেচেন, আপনার সঙ্গে এখুনি দেকা করতে চান।’ কর্মচারীটি সবেমাত্র কথা শেষ করেছে, টেড ধৈর্য রাখতে না পেরে, তাকে ঠেলে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

‘ও,’ কটমট করে তাকিয়ে সে মিকমুরডোকে বলল, ‘আগেই এখানে হাজির হয়ে গেছ? এ্যাঁ? কাউন্সিলর, এই লোকটা একেবারেই সুবিধের নয়, এর বিষয়ে দু-একটা কতা বলতে চাই আপনাকে।’

‘যদি কিছু বলতে হয়, আমার সামনেই বলা হোক।’ বলল মিকমুরডো।

‘যখন সময় হবে বলব, আমার মতো করে বলব।’

‘চুপ! একেবারে চুপ!’ পিপে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মিকগিনটি বলল, ‘ঝগড়া চলবে না এখানে। আমরা একজন নতুন সদস্য পেয়েচি বলডউইন, তাকে এরকম বিশ্রীভাবে অভিনন্দন জানালে চলবে না। দুজনে হাতে হাত মিলিয়ে ঝামেলা মিটিয়ে নাও!’

‘কখনোই না!’ রাগে চেঁচিয়ে উঠল বলডউইন।

‘আমি ওকে মারামারির প্রস্তাব দিয়েছি। যদি আমি ওর প্রতি কোনো ভুল করে থাকি,’ জানাল মিকমুরডো, ‘প্রথমে হাতাহাতি হোক, তাতেও যদি ওর রাগ না কমে, ও যেভাবে চায় সেভাবেই দুজনের মধ্যে ফয়শালা হবে। সব ব্যাপারটা আমি আপনার ওপর ছেড়ে দিলাম, কাউন্সিলর। বডিমাস্টার হিসেবে বিচার আপনি করবে।’

‘ঝগড়ার কারণটা কী শুনি?’

‘এক ভদ্র যুবতী৷ তাঁর পছন্দ করার অধিকার তো তাঁরই।’

‘তাই নাকি?’বলডউইন আবার চেঁচাল।

‘ঠিকই তো বলেচে ও। মেয়েটার পছন্দই তো বড় কথা।’

‘ও, আপনার তাহলে এই বিচার, এই?’

‘হ্যাঁ, ঠিক তাই, টেড বলডউইন।’ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল কাউন্সিলর, ‘এসব ব্যাপারে তুমি বিচার করবে নাকি?’

‘আমি পাঁচ বছর আচি আপনার সঙ্গে, সেটা আপনি ভুলে গেলেন? আর তোল্লাই দিচ্ছেন এমন একজনকে যাকে এই প্রথম দেখচেন। জ্যাক মিকগিনটি শুনে রাখুন, আপনি সারাজীবন বডিমাস্টার থাকবেন না, পরের বার ভোটের সময়...।’

কথা শেষ হল না বলডউইনের, বাঘের ক্ষিপ্রতায় তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কাউন্সিলর। বিশাল দুই পাঞ্জায় গলা টিপে ধরল টেডের, তারপর বস্তার মতো ছুঁড়ে দিল সারি সারি পিপের মাঝখানে। ভয়ঙ্কর রাগে কাউন্সিলর গলা টিপে টেডকে মেরেই ফেলত, যদি মিকমুরডো এগিয়ে গিয়ে ছাড়িয়ে না দিত তাদের।

‘ছেড়ে দিন, কাউন্সিলর! আপনার দোহাই, ছেড়ে দিন।’ বলতে বলতে সে টেনে আনল কাউন্সিলরকে।

মিকগিনটি ছেড়ে দিল বলডউইনকে; তার অবস্থা সত্যিই খারাপ; হাঁফাচ্ছিল সে কুকুরের মতো, কাঁপছিল থরথর। মিকগিনটিকে বাধা না দিলে সে হয়তো আজ যমালয়েই পাঠিয়ে দিত টেডকে।

‘কিছুদিন থেকে শুনচি বটে তোর মুখে এরকম কথা। আজ আমার সামনে মনের কতাটা বলে ফেললি!’ মিকগিনটি গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছিল। তার চওড়া, বলিষ্ঠ বুক হাঁফ নেবার তালে তালে উঠছে আর নামছে। ‘আমি জানি তোর মনের বাসনা৷ পাঁচ বছর বাদে ভোটে আমাকে হারাবি, আর নিজে বডিমাস্টার হয়ে বসবি! ভবিষ্যতের কতা ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু যতদিন আমি চেয়ারে আচি, কেউ আমার বিরুদ্ধে বা আমার বিচারের বিরুদ্ধে গলা তুলে কতা বলবে না।’

‘আপনার বিরুদ্ধে আমি সেরকম ভাবিনি,’ ককিয়ে বলল বলডউইন। তখনও সে লাল হয়ে যাওয়া গলায় হাত বুলোচ্ছিল।

‘বেশ, ঠিক আচে,’ বলল মিকগিনটি। এখন তার আবার খুশির মেজাজ ফিরে এসেছে, ‘আমরা সকলেই বন্ধু আর তোদের ঝগড়া এখানেই মিটে গেল।’

একটা শ্যাম্পেনের বোতল হাতে তুলে নিল সে সেলফ্ থেকে, ঘুরিয়ে ছিপিটা খুলল, তিনটি গ্লাসে ঢালল মদ। বলল, ‘ঝগড়া ভুলে গিয়ে এসো, পান করি। আর নিজেদের মধ্যে কোনো রাগারাগি নয়, মাথা গরম করা নয়! এবার বলডউইন তোকে জিগ্যেস করি, আমাদের এই নতুন আগন্তুকের সঙ্গে কীসের ঝগড়া তোর?’

‘আকাশে মেঘ করেছিল।’ বলল বলডউইন।

‘এখনি সূর্য উঠবে। টেনশান নয়...।’

‘ঠিক আচে বস।’

‘আর তোমাকেও বলি মিকমুরডো! আখড়ায় থাকতে হলে মিলেমিশে থাকতে হবে। আখড়ার শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। যদি আমার কতা কেউ অমান্য করে তার কপালে কিন্তু দুঃখ আচে...।’

‘কথা দিচ্ছি বস, আপনার নির্দেশের নড়চড় হবে না। টেডের সঙ্গে আমার আর কোনো ঝগড়া নেই।’ বলে মিকমুরডো টেডের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও, কাউন্সিলরের জ্বলজ্বলে চোখের দিকে তাকিয়ে, সে মিকমুরডোর সঙ্গে হাত মেলাল। কিন্তু তার মুখের তিতকুটে ভাব গেল না। টেড বলডউইন অত সরল মনের লোক নয়৷ তার খাবারের দিকে হাত বাড়িয়েছে উড়ে এসে জুড়ে বসা এই লোকটা। এত সহজে সে জায়গা ছাড়বে না তাকে।

‘আর এই মাগিগুলোই হল যত নষ্টের গোড়া। ছোট পেটিকোট পরে পেট দেকিয়ে, বুকের খাঁজ দেকিয়ে এরা আমার আখড়ার ছেলেদের মাথা খারাপ করবে আর তারা নিজেদের মধ্যে মারপিট করবে৷

সারা পৃথিবীতে শালা এই মাগিরাই হচ্চে সব বিবাদের মূলে। জন্ম নিয়েই এরা শিখে যায় পুরুষদের মাতা কীভাবে ঘোরাতে হয়। এখানেও দেকচি তাই।...আমি একটা ব্যাপার বলে দিচ্চি তোমাদের দুজনকেই, মাগিটার ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে মিউচুয়াল করে নাও, ওর ফাঁদে পা দিও না৷ মাগিদের স্বভাবই হল, দুদিকে খেলা। টেড যখন সামনে যাবে তখন এমন ভান করবে যে, টেডই হল তার হৃদয়ের মাঝখানে; আর মিকমুরডো, তুমি নিজেকে যতই চালাক, স্মার্ট আর বুদ্ধিমান মনে করো, ওই মাগি তোমাকে কাত করে দেবে৷ এমন অভিনয় করতে থাকবে যে, তোমার মনে হবে সেই তোমার হেলেন, তোমার ক্লিওপেট্রা! যাই হোক মাগি নিয়ে এসব রেষারেষি, ঝগড়াঝাঁটি যেন আমাদের আখড়ার কাজে কোনো বাধা সৃষ্টি না করে। ওসব তোমরা বাইরে মিটিয়ে নেবে৷ ব্রাদার মিকমুরডো তোমাকে আমরা লজ ৩৪১-এর মেম্বার করে নিলুম। আমাদের লজের, মানে আখড়ার নিজস্ব নিয়মকানুন আচে, শিকাগোর থেকে সেসব অন্যরকম৷ আগামী শনিবার রাতে আমাদের মিটিং আচে। সেই মিটিং-এ তুমি হাজির থাকবে।

পরিচ্ছেদ ৩ঃ লজ ৩৪১, ভারমিস্সা

পরের দিনই মিকমুরডো, বৃদ্ধ জ্যাকব শ্যাফটারের ডেরা ছেড়ে দিয়ে উঠে গেল অন্য এক লজে৷ শহরের একেবারে শেষ সীমায় সেই লজ। এক বিধবা, আন্টি ম্যাকনামারা মালিক সেই সুবিধাজনক এবং মোটামুটি পরিচ্ছন্ন, মাথা-গোঁজার ডেরার। এমনকী স্ক্যানলান, চলন্ত ট্রেনের সেই প্রথম বন্ধু, সে-ও ব্যক্তিগত কারণে ভারমিস্সায় এসে জুটল; এবং মিকমুরডোর সঙ্গে একই লজে থাকতে শুরু করল। ওরা দুজন ছাড়া আর কোনো বোর্ডার লজে ছিল না; আর মালকিন বৃদ্ধ, সহজ-সরল আন্টি ম্যাকনামারা নিজের কাজ নিয়েই থাকতেন। দুজন বোর্ডারের কাজকর্মে, কথাবার্তায় কোনোদিন নাকও গলাতেন না।

বুড়ো শ্যাফটার অবশ্য তার লজ ছেড়ে চলে আসবার সময় মিকমুরডোকে বলেছিল, যখনই দরকার মনে হবে, মিকমুরডো যেন গরিবের লজে আসে. আসলে বুড়ো চেয়েছিল মেয়ে এট্টির সঙ্গে মিকমুরডোর মেলামেশা যেন বন্ধ না হয়ে যায়। যদিও বুড়োর চোখের আড়ালে, মিকমুরডো এবং এট্টির অন্তরঙ্গতা ক্রমে গভীর হয়ে উঠছিল।

নতুন ডেরায় নির্জনতা এবং গোপনীয়তা অনেক বেশি। তাই কাউন্সিলর মিকগিনটির নির্দেশেই হয়তো দলে দলে আখড়ার ছেলেরা আসতে লাগল মিকমুরডোর ডেরায়। জাল ডলারকে কীভাবে আসল ডলারে পালটে ফেলা যায়, তার প্রমাণ নিজেরাই পাবে বলে। প্রত্যেকেই আসত বেশ কিছু নকল বা অচল ডলার তার পকেটে নিয়ে। প্রত্যেকেই অবাক হয়ে যেত, যখন মিকমুরডো সেই অচল পয়সাগুলো নিয়ে পাশের ঘরে চলে যেত এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে সেগুলোকে আসল পয়সাতে পালটে ফেলে আবার ফেরত দিত আখড়ার ব্রাদারকে। ব্যাপার দেখে তাদের সকলেরই চক্ষু হয়ে যেত চড়কগাছ! শুধু একটা ব্যাপার তাদের মাথায় কিছুতেই ঢুকত না যে, এরকম অবিশ্বাস্য ক্ষমতার অধিকারী হয়েও মিকমুরডো কেন সামান্য একটা চাকরি করতে যেত। আর মিকমুরডো তাদের এই সহজ সত্যটা বুঝিয়ে দিত যে, পয়সা উপার্জনের কোনো উপায় ছাড়াই, অর্থাৎ সামান্য ওই চাকরিটা ছাড়াই পাঁড় বেকার অবস্থায় সে মস্তিতে ঘুরে বেড়ায় আর কথায় কথায় মুঠো মুঠো কাঁচা ডলার বের করে সে প্রকাশ্যে খরচ করতে শুরু করে। তাহলে তার কার্যকলাপের ব্যাপারে কিংবা বেকার একজনের এত বড়লোকী চালের ব্যাপারে পুলিশের কাছে নালিশ যাবেই আর তখন পুলিশও তার পেছনে লেগে যাবে।

একদিন সত্যিই প্রমাণ পাওয়া গেল যে, তার ওপর পুলিশের নজর পড়েছে। শনিবারের সেই মিটিং-এ কাউন্সিলর মিকগিনটি নতুন সদস্যের সঙ্গে আখড়ার অন্যান্য সদস্যদের আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিন সন্ধের পর, অফিস-ফেরত মিকমুরডো ঢুঁ মারত কাউন্সিলরের বিশাল অফিসে। সেখানে হুল্লোড় চলত, মদ্যপান চলত, জুয়ো চলত। মিকমুরডো সবেতেই ওস্তাদের শিরোমণি। সে হুল্লোড়বাজ, প্রচুর মদ্যপান করেও মাতাল হয় না এবং বডিমাস্টার মিকগিনটি ও অন্যান্য সদস্যদের সামনে হাস্যকর অঙ্গভঙ্গি করে এমন সব মজার গল্প ফাঁদে যে, বস্ তো বটেই, অন্যান্যরা হেসে গড়িয়ে পড়ে। অল্পদিনের মধ্যেই মিকমুরডোকে সকলে পছন্দ করে ফেলল আর বস্ মিকগিনটি তো তাকে একদিন না দেখলে যেন চোখে হারায়৷ একদিন যখন হুল্লোড়বাজি তুঙ্গে, সন্ধের পর আড্ডা তুমুল জমে উঠেছে, একটা ঘটনা ঘটল এবং সেই ঘটনার যেভাবে মোকাবিলা করল মিকমুরডো, তার ওপর সকলের আস্থা এবং বিশ্বাস আরো দৃঢ় হল।

কাউন্সিলরের বিশাল আয়নাতে সাজানো ঘরে ভিড়, পা ফেলার উপায় নেই৷ সবাই যে যার মতন মজা লুটছে। হঠাৎ প্রবেশ-দরজা ঠেলে একজন মাঝবয়সি লোকের আবির্ভাব হল৷ তার পরনে নীল ইউনিফর্ম এবং ছুঁচলো ধরনের টুপি; খনি-অঞ্চলের পুলিশ-অফিসারদের বিশেষ পোশাক। এরা সাধারণ পুলিশের থেকে অনেক বেশি প্রশিক্ষিত এবং বাজপাখির মতো চতুর ও ক্ষিপ্র। রেল কোম্পানির কর্তা ও খনির মালিকদের অনুরোধে ও অর্থ-সহায়তায় স্থানীয় মুখ্য প্রশাসন এই বাহিনিকে গড়ে তুলেছে, এখানকার ডাকাত, বদমাইশ ও বোম্বেটেদের শায়েস্তা করার দুরূহ কাজে স্থানীয় থানার পুলিশদের অতিরিক্ত সাহায্য করার জন্যে। অফিসার আড্ডার ডেরায় ঢুকতেই, একমুহূর্তে হুল্লোড় থেমে গিয়ে এক অস্বস্তিকর নৈঃশব্দ নেমে এল এবং প্রায় সবাই কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকাচ্ছিল৷ কিন্তু ভারমিস্সার মতো খনি-অঞ্চলে পুলিশের সঙ্গে অপরাধীদের সম্পর্কটা একটু বিশেষ ধরনের; অন্যেরা সেই অফিসারের অপ্রত্যাশিত উপস্থিতিতে ঘাবড়ে গেলেও, মিকগিনটিকে দেখে মনে হল না সে বিশেষ ভয়-টয় পেয়েছে; মদ বিক্রি করার কাউন্টারের সামনে এসে অফিসার যখন বলল, ‘বড় পেগের একটা হুইস্কি, জব্বর শীত পড়েচে।’ এবং মিকগিনটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি তো কাউন্সিলর?’

‘হ্যাঁ।’ মিকগিনটির উত্তর।

‘এই প্রথম আপনাকে দেখচি...।’

‘আপনি কি নতুন এয়েচেন, অফিসার?’

‘ঠিকই ধরেছেন। আমি আপনার সঙ্গেই কথা বলতে এসেছিলাম। এই অঞ্চলের বিশেষ বিশেষ মান্যগণ্য নাগরিকদের সঙ্গেও কথা বলেছি। প্রত্যেককেই অনুরোধ করেছি যে, এই খনি-শহরের আইন-শৃঙ্খলার উন্নতি করতে আমাদের সু-পরামর্শ দিতে। আপনার কাছেও সেই পরামর্শ চাইতে এসেছি। আমার নাম, ক্যাপটেন মারভিন।’

‘আপনাদের স্পেশ্যাল বাহিনীর সাহায্য ছাড়াই তো এখানে আইন-শৃঙ্খলা যথেষ্ঠ ভালো।’ মিকগিনটি ঠান্ডা স্বরে বলল।‘কারণ আমাদের এই শহরে একটা পুলিশ-স্টেশন আছে, তারা যথেষ্ঠ ভালো কাজ করছে। আপনাদের মতো ভাড়া করা বাহিনির দরকার নেই এখানে। আপনারা তো ক্যাপিটালিস্টদের ভাড়া করা গুণ্ডাবাহিনী, তাদের পয়সাতে এখানে ফুটানি মারতে এয়েচেন। বিশেষ কাজ আর আপনারা কী করবেন? শুধু নিরীহ, গরিব শ্রমিকদের পান থেকে চুন খসলে ধরে ধরে ঠ্যাঙানো কিংবা গুলি করে তাদের একেবারে চুপ করিয়ে দেওয়া ছাড়া?’

‘ভালো, ভালো, এখন আমি তর্কে যেতে চাইছি না।’ পুলিশ-অফিসারটি বলল একটু হেসেই, ‘আমি আশা করব সচেতন এবং ভদ্র নাগরিক হিসেবে আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করব। কিন্তু সবসময় তা হচ্ছে না। এই শহরের আইনশৃঙ্খলার প্রায়ই বেশ অবনতি লক্ষ করছি আমরা।’ বড় পেগের মদ কয়েক চুমুকে শেষ করে অফিসার চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ তার চোখ পড়ল, মিকগিনটির পাশেই, কপালে ভ্রূকুটি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জ্যাক মিকমুরডোর দিকে এবং সঙ্গে সঙ্গে বাঁকা হাসি হেসে অফিসার বলল, ‘হুললো! হুললো!’ মিকমুরডোর পা থেকে মাথা পর্যন্ত এক নিমেষে নজর করে সে বলল, ‘এই তো পুরোনো পরিচিতি বেরিয়ে গেছে!’ মিকমুরডো থমকে গেল। বলল, ‘মনে হচ্ছে, এ জন্মে আমি আপনার বন্ধু-টন্ধু ছিলাম না।’

‘আরে! পুরোনো পরিচিতি মানেই কি বন্ধু?’ পুলিশ-অফিসারের মুখে তখনও বাঁকা-হাসি। ‘আপনি হলেন গিয়ে শিকাগোর জ্যাক মিকমুরডো, ঠিক বলেছি? আপনি এখানে এসে জুটলেন কবে?’

মিকমুরডো কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘নামটা আমার ঠিকই বলেছেন অফিসার। তো আমার প্রতি এত কৌতূহল কেন?’

‘আছে, আছে, কারণ আছে বইকি।’

‘কী বলতে চাইছেন আপনি?’ মিকমুরডো গর্জন করে উঠল।

‘উঁহু, উঁহু, জ্যাক, ওরকম চোখ তুলে আমার সঙ্গে কথা বলে লাভ হবে না। আমি শিকাগোতে পোস্টেড ছিলাম, এই জঘন্য খনি-অঞ্চলে আসার আগে। আর শিকাগোর কোনো বদমাশ আমার চোখ এড়াতে পারবে না।’

মিকমুরডোর মুখ শুকিয়ে গেল৷ ‘আপনি কি শিকাগো সেন্ট্রাল পুলিশের কমিশনার মি. মারভিন?’

‘চিনেছেন তাহলে? টেড্ডি মারভিন৷ জোনাস পিনটোকে গুলি করে হত্যার ঘটনা এখনও সেখানকার পুলিশ রেকর্ডে জ্বলজ্বল করছে৷ কেসটার তদন্ত এখনও চলছে।’

‘আমি কারোকে গুলি করিনি।’

‘আপনি করেননি না? আপনার সাক্ষ্য তো নিরপেক্ষ হবেই৷ তাই না? যাক্ সে অতীতের ব্যাপার। আমি চলে এসেছি। কিন্তু কেস ওপেন আছে। তদন্ত চলছে। তবে শিকাগো থেকে পালিয়ে আসার তো কোনো কারণ দেখি না৷ সেখানে আপনি আবার যেতে পারেন।’

‘এখানেই আমি বেশ ভালো আছি।’

‘বেশ কেসটা সম্বন্ধে সবই জানালাম। আর আপনি তো বেয়াদপ! তাই ধন্যবাদটুকুও পেলাম না।’

‘ধন্যবাদ।’ বলতে হয় তাই যেন বলল মিকমুরডো।

‘একটা কথা শুনে রাখুন পুরোনো পাপী! এখানে যদি ভদ্রভাবে থাকেন, বজ্জাতি না করেন, তাহলে আমিও চুপচাপ থাকব। কিন্তু যদি কিছু বেচাল দেখি, তাহলে আমার রূপ পালটে যাবে! আপাতত গুড নাইট আপনাকে, আর আপনাকেও কাউন্সিলর সাহেব।’

অফিসার মারভিন গট্ গট্ জুতোর শব্দ তুলে চলে গেল। ইতিমধ্যে ঘরে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে৷ তারা শুনেছিল বটে যে মিকমুরডো শিকাগোতে কী একটা অপরাধ করে এসেছে। কিন্তু আজ তো হাতেনাতে প্রমাণ হল যে লোকটা দুর্ধর্ষ। মিকগিনটিও বেশ খুশি। তার শিষ্য উচিত জবাব দিয়েছে শুয়োরের বাচ্চা আইনের রক্ষককে। সবাই ঘিরে ধরল তাকে। সেই রাতেই রীতিমতো হিরো বনে গেল মিকমুরডো। সবাই তাকে ড্রিংকস অফার করছে, আর পেগের পর পেগ উড়িয়ে দিচ্ছে সে। সেদিন স্ক্যানলান সঙ্গে না থাকলে মিকমুরডো বোধহয় বারেই রাত কাটিয়ে দিত। বেশ টলছিল সে। স্ক্যানলান তাকে ধরে নিজেদের ডেরায় নিয়ে এল।

শনিবার রাতে আখড়ার মিটিং-এ মিকমুরডো হাজির হল। আনুষ্ঠানিকভাবে এই সভার যথেষ্ঠ গুরুত্ব আছে। ইউনিয়ন অফিসের বিশাল হলে আখড়ার সদস্যরা সবাই জড়ো হয়েছে। প্রায় ষাট জন সদস্য তাদের আসন গ্রহণ করেছে। প্রথমে প্রতি সদস্যের সঙ্গে মিকমুরডো পরিচিত হল। কয়েকজন চুপিচুপি শোনাল তাকে যে আজ নাকি তার কপালে দুঃখ আছে। কিন্তু কেউই খুলে বলছে না কী করা হবে তাকে। এবার দুজন সদস্য গম্ভীর মুখে এগিয়ে এল। তাকে নিয়ে গেল বাইরের একটা ঘরে। হলঘর থেকে ভেসে আসছিল গুঞ্জন। সে বুঝল, তাকে নিয়ে সবাই আলোচনা করছে। কী করা হবে তাকে নিয়ে? নিজের কোটের পকেটে হাত দিল মিকমুরডো। লোডেড্ রিভলভারটা সঙ্গেই আছে। প্রয়োজন হলে...।

ছোট, ফাঁকা ঘরে মিকমুরডো কিঞ্চিৎ বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়েছিল৷ বিশাল চেহারার একজন লম্বা লোক ঢুকল। তার বুকের ওপর সোনার হার, সবুজ লকেট।

‘বডিমাস্টারের আদেশ তোমাকে লোহার বেল্ট পরতে হবে, চোখে বেঁধে দেওয়া হবে, তারপর সভার ঘরে নিয়ে যাওয়া হবে।’ লোকটা রুক্ষ স্বরে জানাল।

আর দুজন লোক ঢুকল ছোট ঘরে। তিনজনে মিলে মিকমুরডোর কোট খুলে নিল, ডান হাতের জামার হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে দিল। ডান হাতের কনুইতে মোটা, কাছি দড়ির বাঁধন দিল। হাত নাড়াতেই পারছে না মিকমুরডো। তারপর তারা তার মাথায় পরিয়ে দিল মোটা কাপড়ের কালো টুপি; এমনভাবে নামিয়ে দেওয়া হল টুপিটা চোখের ওপর দিয়ে যে, মিকমুরডোর দুই চোখ ঢাকা পড়ে গেল, কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না সে। তারপর তাকে তিনজনে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গেল সভাকক্ষে। চোখের সামনে অন্ধকার৷ যেন সত্যিই অন্ধ হয়ে গেছে সে৷ শুধু শুনতে পাচ্ছে আশেপাশে সদস্যদের ফিসফাস কথা, তারপর তার কানে এল মিকগিনটির গম্ভীর গলার আওয়াজ; টুপিটা দিয়ে কানদুটোও এমনভাবে ঢেকে দেওয়া হয়েছে যে, মনে হচ্ছে অনেক দূর থেকে কথা বলছে বডিমাস্টার।

‘জ্যাক মিকমুরডো,’ মিকগিনটির গলা, ‘তুমি কি ফ্রিম্যান আখড়ার পুরোনো সদস্য?’

‘হ্যাঁ’ সূচক ঘাড় নাড়ল মিকমুরডো।

‘শিকাগোর লজ নাম্বার-২৯?’

আবার ঘাড় নাড়ল সে।

‘অন্ধকার রাতগুলো স্বস্তির নয়,’ বডিমাস্টারের গলায় সংকেতবাণী।

‘হ্যাঁ, অজানা লোকদের ভ্রমণ করার পক্ষে অসুবিধেজনক।’ এই কথাটাও সংকেত।

‘আকাশে কালো মেঘ।’ আবার সংকেত।

‘হ্যাঁ, একটা ঝড় এসে গেছে।’ উত্তরটাও সংকেত।

‘সব সদস্য-ভাইরা সন্তুষ্ট?’ বডিমাস্টারের প্রশ্ন।

সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ...’

‘আমার সংকেতগুলোর যে উত্তর তুমি সংকেতেই দিলে, তা থেকে বুঝেছি, যে তুমি আমাদের আখড়ারই পুরোনো সদস্য।’ বলল মিকগিনটি৷ আবার জানাল, ‘এখন আমাদের আখড়ার নিয়ম অনুযায়ী তোমাকে একটা কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে৷ তুমি প্রস্তুত?’

‘হ্যাঁ।’

‘বুকে সাহস আছে?’

‘হ্যাঁ।

‘প্রমাণ দাও, সামনের দিকে হেঁটে যাও।’

কথাগুলো যেইমাত্র উচ্চারিত হল, মিকমুরডো অনুভব করিল তার দু-চোখের সামনে যেন দুটো গজাল রাখা আছ। বিন্দুমাত্র এগোলেই তার দু-চোখেই বিঁধে যাবে। নিজের মনকে পাথরের মতো শক্ত করে রেখেছে সে, কোনো বাধাতেই ভয় পাওয়া যাবে না। দু-চোখ যদি অন্ধ হয়ে যায় তো যাক, এখন আর পেছনে ফেরার উপায় নেই। দৃঢ় পদক্ষেপে সে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। মুহূর্তে বুঝল চোখে কোনো আঘাত আসেনি, গজালদুটো দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।‘ বাহাদুর, বাহাদুর!’ চাপা গুঞ্জন কানে এল তার।

‘বুকের পাটা আচে তোমার।’ মিকগিনটির গলা, ‘যন্ত্রণা সহ্য করতে পারো?’

‘সকলে যেমন পারে, আমিও।’

‘এবার তারই পরীক্ষা।’

ভয়ঙ্কর তপ্ত এক আগুনের গুলি তার ডান-হাতের, কনুইয়ের নীচে, সামনের অংশের মাংস ফুঁড়ে যেন চলে গেল! অসহ্য যন্ত্রণার বোধ! কিন্তু তবুও তার মুখ থেকে একটা শব্দ বের হল না। দাঁতে দাঁত টিপে সেই নারকীয় যন্ত্রণা সহ্য করছে সে। মনে হল এখুনি অজ্ঞান হয়ে যাবে। কিন্তু নিজের ঠোঁট প্রাণপণে কামড় ধরল সে, এবং হাত দুটো মুঠো করে, শরীরের সব শক্তি দিয়ে আটকে রাখল প্রতিক্রিয়ার আর্তনাদ!

‘এর থেকেও বেশি যন্ত্রণা সহ্য করতে পারি।’ তার গমগমে গলা সভাকক্ষের বিস্মিত নৈঃশব্দকে যেন ছিঁড়ে দিল। এবার আর সম্মিলিত গুঞ্জন নয়; হাততালির জোর শব্দ। তার পিঠ চাপড়ে দিল কিছু হাত, আর চোখ-বন্ধ-করা সেই লম্বা টুপি তার মাথা থেকে তুলে নেওয়া হল। চোখ পিটপিট করছিল সে, অন্ধকার থেকে আলোর দিকে তাকালে যেমন হয়। সবাই আসন থেকে উঠে এসে গোল হয়ে ঘিরে ধরেছে তাকে, বাহবা দিচ্ছে; আর মিকমুরডো স্মিতমুখে সটান দাঁড়িয়ে আছে।

‘শেষ একটা কথা ব্রাদার মিকমুরডো,’ বলল মিকগিনটি। ‘ইতিমধ্যেই তুমি শপথ নিয়েছ গোপনীয়তার এবং বিশ্বস্ততার এবং তুমি জেনেছ যে, বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি হল মুহূর্তে অনিবার্য মৃত্যু।’

‘হ্যাঁ জেনেছি।’ বলল মিকমুরডো।

‘এবং যে-কোনো পরিস্থিতিতে বডিমাস্টারের আইন এবং নির্দেশ তোমাকে মেনে চলতে হবে, এতে রাজি তো?’

‘অবশ্যই।’

‘তাহলে, আজ থেকে, এই ভারমিস্সার লজ ৩৪১-এর সব ধরনের সুবিধা এবং আলোচনায় তোমাকে স্বাগত জানানো হচ্ছে৷ ব্রাদার স্ক্যানলান, মদের বোতল টেবিলে নিয়ে এসো, আমাদের বিশিষ্ট ব্রাদারের সম্মানে আমরা সবাই পান করব।’

মিকমুরডোর কোট তাকে একজন দিয়ে গেল, সেটা গায়ে চড়াবার আগে সে তার ডান হাতটা দেখে নিল। গরম লোহা দিয়ে দাগানো হাতের জায়গটা ভীষণ জ্বলছে! যেন সাপের দংশন! মাঝে মাঝে মিকমুরডোর মনে হচ্ছিল, যন্ত্রণায় সে অজ্ঞান হয়ে যাবে। প্রবল শারীরিক ও মানসিক শক্তির জোরে সে সকলের সামনে এমন ভাব করছিল যেন কিছুই হয়নি। হাতের ওই জায়গাটা মাংস দগদগে হয়ে ফুলে উঠেছে, আর সেখানে একটা চিহ্ন লাল হয়ে ফুটে উঠেছে। একটা বৃত্তের ভেতর একটা ত্রিভুজ, অঙ্গারে গরম-করা লোহা তার হাতের মাংসে এঁকে দিয়েছে৷ তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন ব্রাদার তাদের ডান-হাতের জামার হাতা গুটিয়ে দেখাল তাদের হাতেও মাংস-দাগানো একই চিহ্ন।

‘আমাদের হাতেও আছে একই চিহ্ন।’ বলল একজন; ‘ওরকম গরম লোহা দিয়ে দেগে দেওয়া হয়েছিল হাতের মাংস। যন্ত্রণায় খুব চেঁচিয়ে উঠেছিলুম আমি, তোমার মতো মুখ বুজে সহ্য করতে পারিনি।’

‘দুর! এটা কিছুই নয়।’ মিকমুরডো বলল, ‘যদিও তার ডান হাত যন্ত্রণায় যেন টুকরো হয়ে ছিঁড়ে পড়বে মনে হচ্ছিল।

মদ পান করতে করতে হুল্লোড়বাজি শেষ হল একসময়৷ তারপর সবাই চুপ করে বসল যে যার আসনে। থমথমে গাম্ভীর্যের মধ্যে শুরু হল সভার কার্যক্রম।

‘আজকের প্রথম এজেন্ডা হল, সভাপতির উঁচু চেয়ার থেকে বলল মিকগিনটি, ‘একটা চিঠি যেটা আমাদের ঠিকানায় পাঠিয়েছে মেট্রন কাউন্টি লজ ২৪৮ থেকে ডিভিশন মাস্টার উইনডল্। চিঠিটাতে সে কী লিখেচে আমি পড়চি :

‘ডিয়ার স্যার,

আমাদের অঞ্চলের খনি-মালিকদের জন্য আপনাদের পক্ষ থেকে একটা কাজ করার আছে। আপনার স্মরণে আছে নিশ্চয়ই যে, আমাদের লজ থেকে দুজন ব্রাদারের সাহায্য আপনারা নিয়েছিলেন গত মাসে। তারা আপনাদের প্রহরীর কাজ করেছিল। তার বিনিময়ে আপনাকে অনুরোধ করা হচ্ছে যে, দুজন দক্ষ ব্রাদারকে আপনারা আমাদের লজে পাঠাবেন। তারা রিপোর্ট করবে আমাদের ট্রেজারার মি. হিগিনসের কাছে। তিনি দেখিয়ে দেবেন কীভাবে কাজ করতে হবে।

আপনার বিশ্বস্ত,

জে. ডব্লিউ. উইনডল্, ডি. এম. এ. ও. এফ’

দুজন ব্রাদারকে এই কাজের জন্যে নিয়োজিত করা হল। একজন টাইগার করম্যাক, আর একজন বব উইলসন। মিকমুরডো উঠে দাঁড়িয়ে বলল, সে-ও এই ধরনের কাজ করতে রাজি আছে৷ তার তৎপরতার প্রশংসা করতে লাগল অনেকেই। কিন্তু মিকগিনটি যে দক্ষ প্রশাসক তা বোঝা গেল যখন সে সামান্য হেসে বলল, ‘ব্রাদার মিকমুরডো, তোমার সময়ও আসবে। আমরা লক্ষ্য করেছি যে আমাদের আখড়ার একজন ব্রাদার হিসেবে তুমি অত্যন্ত দক্ষ, শক্তিমান এবং বুদ্ধিমান৷ আমাদের লজ তোমার মতো একজন সদস্যকে পেয়ে গর্বিত এবং পুলকিত। আজ রাতেই একটা ছোট কাজ আছে যেটার দায়িত্ব তুমি নিলে আমরা আনন্দিত হব।’

‘নিশ্চয়ই, সেই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হোক আমাকে, আনন্দের সঙ্গে তা করব।’

‘আজ রাতে তুমি আমার অফিসে এসো। তখনই বলা হবে কাজটা কী।...ইতিমধ্যে আমাকে সভা শেষ করতে দেওয়া হোক, আরও দু-একটা আলোচনার বিষয় নিয়ে সকলের মত নেবার পর।’

‘আপনি যেমন নির্দেশ দেবেন, চেয়্যারম্যান।’ বলল মিকমুরডো।

মিকগিনটি এবার টেবিলের একটা ফাইল থেকে একটা চিঠি বের করল৷ গলা উঁচিয়ে সে বলল, ‘ভাইসব, এই শহরের একটা লোক আমাদের পেছনে লেগেচে৷ তাকে একটু সমঝে দিতে হবে৷ ‘হেরাল্ড’ সংবাদপত্রের রিপোর্টার জেমস স্ট্যানজারের কথা বলচি। একটা রিপোর্ট লিখেচে সে ওই সংবাদপত্রে, যাতে আমাদের বিরুদ্ধে অতি জঘন্য সব কতা লেখা হয়েচে। এবং খুবই সহজে অনুমান করা যায় যে, এই রিপোর্টটা স্ক্রাউন্ডেল সাংবাদিক জেমস স্ট্যানজার এত ডিটেলসে লিকেচে সাধারণ মানুষের কাচে আমাদের ছোট করার জন্যে। পুলিশের নজর যাতে আমাদের দিকে আরও বেশি করে পড়ে তার জন্যে৷ চিঠিটা আমি পড়চি। সব শুনে আপনারাই বিচার করুন...।’

‘চিঠিটা এখনই পড়া হোক, মাননীয় চেয়ারম্যান!’ সভায় হুল্লোড় উঠল। মিকমুরডো তার পাশের লোকটিকে বলল, ‘এই রিপোর্টারকে আমিই দেখে নেব!’

মিকগিনটি পড়া শুরু করল :

‘কয়লা-খনি এবং লোহা-খনি অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব’

‘কয়েকটি নৃশংস খুনের চাঞ্চল্যকর সংবাদ এই পত্রেই ছাপা হয়েছিল, যা থেকে আইনের রক্ষকেরা এবং সাধারণ নাগরিকগণ সম্যক উপলব্ধি করেছিলেন যে, আমাদের এই বিস্তৃত খনি-অঞ্চলে, বস্তুত আমাদের চর্মচক্ষুর সামনেই দুর্দান্ত সব অপরাধীদের এক বড় সংগঠন নির্ভয়ে কাজ করে চলেছে। তারপর থেকে কেটে গেল বারোটি বছর। অপরাধীদের সংগঠনের দাপট তো কমেইনি, উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। এখন তো এই নৃশংস গুণ্ডা-বদমাশদের দাপট এতই বেড়েছে যে, আমাদের এই খনি-অঞ্চল সভ্য সমাজের কাছে এক কলঙ্ক হিসেবে পরিগণিত হতে চলেছে। তাদের লুঠ-তরাজ, খুন, নিরীহ মানুষের প্রতি ক্ষমাহীন অত্যাচার ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। পুলিশের চোখের ওপর সাধারণ মানুষকে চুপ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে পেশিশক্তি এবং বুলেটের সাহায্যে। অপরাধীরা প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তাঘাটে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস কারোর নেই। পুলিশ-প্রশাসন সব দেখে সব শুনেও মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে! সাধারণ নাগরিকের মনে প্রশ্ন এসেছে যে, আর কতদিন তাদের এরকম জঙ্গলের রাজত্বে বাস করতে হবে।...চিরকাল কি আমরা---

‘অনেক পড়েচি আমি, আর পড়ার দরকার নেই।’ চেয়ারম্যান বলল থমথমে গলায়, কাগজটা সে ঠেলে সরিয়ে দিল টেবিলের একধারে। ‘এতসব কথা রিপোর্টার লিকেচে আমাদের সম্বন্ধে। প্রশ্ন হল, আমি আপনাদের মতামত চাইছি, আমরা সেই মানবদরদী রিপোর্টারকে কী বলব?’

‘গুলি করে শেষ করে দেওয়া হোক, ছুরি দিয়ে চোখ উপড়ে নেওয়া হোক!’ উত্তেজিত গলায় অনেকে বলছিল।

‘আমি প্রতিবাদ জানাচ্ছি এই সিদ্ধান্তের,’ কথাটা যে বলল তার নাম ব্রাদার মরিস। ভদ্র চেহারা, কামানো দাড়িতে চকচকে গাল।

‘আমি বলচি আপনাদের, ভাইসব, এই উপত্যকায় সত্যিই আমাদের তেমন সুনাম নেই। একটা সময় আসবে, যখন নিজেদের সম্মান, নিজেদের ঘরবাড়ি, নিজেদের জীবন বাঁচাতে মানুষ একজোট হয়ে আমাদের পিটিয়ে মারবে৷ জেমস স্ট্যানজার একজন বৃদ্ধ। এই শহরে এবং সারা জেলায় মানুষ তাঁকে সম্মান করে। তিনি যে সংবাদপত্রের সঙ্গে কাজ করেন, সেটি এই উপত্যকার উন্নয়নের জন্যে কতরকম লেখা ছাপে। এই বিশেষ মানুষটির গায়ে যদি হাত পড়ে, সারা রাজ্যে আগুন জ্বলবে আর সেটাই হবে আমাদের সকলের শেষদিন।’

‘কেমন করে আমরা শেষ হব, মি. স্ট্যান্ডব্যাক?’ চেঁচিয়ে উঠল মিকগিনটি। ‘পুলিশকে লেলিয়ে দেবে আমাদের পেছনে? নিশ্চয়ই জানা আছে আপনার, অর্ধেক পুলিশ আমাদের মাসোহারার তালিকায়, আর অর্ধেক আমাদের নাম শুনলে কাঁপে। নাকি মহামান্য আদালত আমাদের বিরুদ্ধে বিচারসভা বসাবে? আমাদের অনেকেরই বিচার কি আগে হয়নি? কজন দোষী সাব্যস্ত হয়েছে?’

‘একজন অত্যন্ত আইনজ্ঞ, সৎ বিচারক আছেন, বিচারক লিঞ্চ, তিনি যদি আমাদের অপরাধের বিচার করেন...’

সভাকক্ষে চিল-চিৎকার শুরু হল। সবাই বক্তার বিরুদ্ধে রাগে ফেটে পড়েছিল।

‘একবার আঙুল তুলব আমি,’ ভীষণ রাগে মিকগিনিটি চিৎকার করে উঠল, ‘দুশো মানুষ খোলা রাস্তায় আমাদের সাহায্য করতে বেরিয়ে আসবে, সাক্ষ্য দেবে আমাদের পক্ষে।’ তারপর মিকগিনিটির গলা থেকে বেরিয়ে এল গর্জন। তার মোটা, কালো ভ্রূ বেঁকে গেল ভয়ঙ্কর ভ্রূকুটিতে। ‘শোনো, ব্রাদার মরসি, কিছুদিন থেকে তোমার ওপর নজর রেখেছি। আমাদের লজের কাজকর্মে তোমার মন নেই, অন্যদেরও তুমি নানা কতা বলে নিরুৎসাহ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্চো। সেই দিনটা হবে তোমার পক্ষে সাংঘাতিক ব্রাদার মরিস, যেদিন তোমার কার্যকলাপ আমাদের আলোচনার এজেন্ডা হবে৷ হতে পারে পরের মিটিংয়েই হয়তো তোমাকে আমাদের জবাবদিহির সামনে পড়তে হবে।’

এক মুহূর্তে মরিসের মুখ শুকিয়ে গেল, ঠকঠক কাঁপতে লাগল হাঁটু, ধপাস করে বসে পড়ল চেয়ারে। আবার উঠে দাঁড়িয়ে, হাতজোড় করে বলতে লাগল, ‘মাননীয় বডিমাস্টার, আমি হাতজোড় করে ক্ষমা চাইচি আপনার কাচে এবং এখানে উপস্থিত সকল সদস্যের কাচে! আমার যা বলা উচিত নয়, আমি তা বলে ফেলেছি। জানবেন স্যার, আমি একজন বিশ্বস্ত সদস্য, সবাই তা জানেন। আমি আখড়ার মঙ্গলের জন্যেই দু-একটা কথা বলে ফেলেচি যা, আবার বলচি, আমার উচিত হয়নি উচ্চারণ করা। কিন্তু, মাননীয় বডিমাস্টার, আপনার মতামতকে আমি সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি এবং এটাও জানি বিপদে পড়লে আপনিই বাঁচাবেন আমাদের। প্রতিজ্ঞা করচি আর কোনোদিন এমন কতা বলব না, যাতে আপনি ক্ষুব্ধ হন।’

এভাবে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার কারণেই বডিমাস্টারের ভ্রূর ভ্রূকুটি অন্তর্হিত। সে বলল, ‘ঠিক আছে, ব্রাদার মরিস। ভবিষ্যতে এইধরনের বাজে কথা যেন না শুনি।’

তারপর বডিমাস্টার এক মুহূর্ত যেন কী ভেবে নিল। তারপর আবার রুক্ষ স্বরে বলল, ‘কিন্তু এই রিপোর্টার স্ট্যানজারকে আমাদের একটু কড়কে দিতে হবে। বারবার লোকটা যদি আমাদের বিরুদ্ধে লিখে যায় তার প্রভাব পড়বে সমাজে এবং সেটা আমাদের আখড়ার পক্ষে ভালো নয়। ব্রাদার বলডউইন, বুড়ো রিপোর্টারকে আজ রাতেই একটি উত্তম-মধ্যম দিতে পারবে, যাতে ও ভয় পেয়ে যায়...?’

‘অবশ্যই!’ বলডউইন যেন মারামারি করার জন্যে চনমন করছে।

‘কতজন লোক দরকার তোমার?’

‘ছ’জন। আর দুজনকে দরকার তার বাড়ির দরজাতে পাহারায় থাকার জন্যে।’

‘কাদের সঙ্গে নেবে–নাম বলো?’

‘গাওয়ার, ম্যানসেল, কনরাড আর উইলবি-ভাই দুজন।’

‘আমাদের নতুন সদস্য মিকমুরডোও থাকুক তোমার দলে।’

প্রস্তাবটা টেড বলডউইনের পছন্দ হল না৷ তবুও বডিমাস্টারের কথা সে অগ্রাহ্য করতে পারে না৷ তাই বিরস মুখে বলল, ‘যদি ও চায়, আসতে পারে।’

সভা ভাঙল। সবাই নিজের নিজের রাস্তা ধরল।

নির্দিষ্ট ব্রাদাররা দল বেঁধে ছুটল বুড়ো রিপোর্টারের বাড়িতে। বাড়িটা বেশ বড়। বন্ধ দরজাতে সোনার জলে লেখা : ‘ভারমিস্সা হেরাল্ড।’ বলডউইন মিকমুরডোকে বলল, ‘তুমি নীচে থাকো। দরজা আগলাবে। তোমার সঙ্গে থাকবে আরথার উইলবি। কাউকে বাড়ির কাছে আসতে দেবে না।’

সময়টা মাঝরাত। রাস্তা শূন্য। দু-একজন মাতাল আর হাঁটতে না পেরে রাস্তার ধারে বস্তার মতো পড়ে আছে। বলডউইনের নেতৃত্বে চারজন গুণ্ডা বাড়ির দোতলায় উঠল। ডোর-বেল বাজাল তারা। খানিক বাদে একতলা থেকে মিকমুরডোর কানে এল দরজা খোলার শব্দ। তারপরই হুড়মুড় আওয়াজ, একটা চেয়ার পড়ে যাওয়ার চোরা আওয়াজ, একজন মহিলার আর্তচিৎকার আর একজন বয়স্ক মানুষের অসহায় আবেদন, ‘হেল্প! হেল্প!’ তারপরই দেখা গেল বলডউইন আর অন্যেরা, একজন পাকা চুল, বয়স্ক মানুষকে টানতে টানতে সিঁড়ি দিয়ে নিয়ে আসছে। একতলায় নামিয়ে আনা হল বৃদ্ধকে, বলডউইন তার মুখে সজোরে একটা ঘুষি হাঁকাল। যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল প্রহৃত, তার চোখ থেকে চশমাটা ছিটকে পড়ে গেল! বৃদ্ধ মাটিতে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে পড়ে আছে আর বলডউইন ও অন্যান্যরা তার ওপর যথেচ্ছ চালাচ্ছে কিল, লাথি, ঘুষি। বৃদ্ধের নাক দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছিল, কপাল ফেটে রক্ত, মাটিতে শুয়ে বৃদ্ধ তবুও দুহাত ওপরে তুলে যতটা পারে নিজেকে বাঁচাতে চাইছিল আর বলছিল ‘ওহ মাই লর্ড, মাই লর্ড!’ বলডউইন ইতিমধ্যে একটা ভোজালি বের করেছে জামার ভেতর থেকে। বিদ্যুতগতিতে মিকমুরডো বজ্রমুষ্টিতে বলডউইনের হাত চেপে ধরল।

‘অসহায় লোকটাকে খুন করবে নাকি?’

জ্বলন্ত চোখে বলডউইন মিকমুরডোর দিকে তাকাল, ‘হাত ছাড়ো!’

‘ভোজালি যতক্ষণ না হাত থেকে ফেলবে হাত ছাড়ব না।’

‘তুমি কে হে স্ক্রাউন্ড্রেল আমার কাজে বাধা দিচ্ছো? আমি সর্দারের নির্দেশমতো কাজ করচি!’

‘সর্দার বলেননি লোকটাকে মেরে ফেলতে, বলেছেন একটু কড়কে দিতে।’ বলডউইন শরীরের সব শক্তি প্রয়োগ করে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইছে। কিন্তু মিকমুরডোর শক্তির কাছে তার ক্ষমতা কিছুই নয়। মিকমুরডো চকিতে বাঁ হাত দিয়ে হিপ-পকেট থেকে বের করল রিভলভার। বলডউইনের কপালে ঠেকিয়ে বলল, ‘বুড়ো ভদ্রলোককে যদি মারতে চাও, তাহলে আমি তোমাকে কুকুরের মতো গুলি করে মারব। জবাবদিহি যা করার আমি করব সর্দার মিকগিনটির কাছে।’ দলের একজন বলল, ‘চারপাশের বাড়িগুলোর আলো জ্বলে উঠেচে৷ কিছু লোক বোধহয় গোলমাল শুনে রাস্তায় বেরিয়ে এসেচে৷ তাদের হাতে লাঠি আছে, কোদাল আছে, অন্য অস্ত্রও থাকতে পারে। আমাদের ঘিরলে আমরা ধরা পড়ে যেতে পারি।’

বলডউইন ততক্ষণে ভোজালি লুকিয়ে ফেলেছে। মিকমুরডোর দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে বলল, ‘তুই কিন্তু বাড়াবাড়ি করচিস এটা মনে রাকবি! আমি তোকে একদিন এমন...।’ রাগে দাঁত কিড়মিড় করল বলডউইন। মিকমুরডো হেসে বলল, ‘আমার সঙ্গে লাগতে এলে মারা পড়বি। তোর মতো ছুটকো মাস্তান আমি অনেক দেখেছি।’ লোকজন এগিয়ে আসার আগেই সবাই কেটে পড়ল। মিকমুরডো একবার মাটিতে পড়ে থাকা বৃদ্ধের দিকে দেখল। কাতরাচ্ছে বৃদ্ধ, মাথার পাকা চুলে রক্ত।

পরিচ্ছেদ ৪ঃ ভয়ের উপত্যকা

পরদিন মিকমুরডো বেলা করে ঘুম থেকে উঠল। প্রাতরাশ সারল। তারপর সেদিনকার ‘দৈনিক হেরাল্ড’-এ চোখ বুলোতে লাগল। সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠাতেই বিশেষ কলামে ছাপা হয়েছে এই খবর :

হেরাল্ড অফিসে হামলা

সম্পাদক প্রহৃত

গতরাতে সংবাদপত্রের অফিসে যা ঘটেছে, তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা৷ সেই খবরে যা লেখা হয়েছে তার থেকে বেশি জানে মিকমুরডো। সুতরাং খবরটা মন দিয়ে পড়ার দরকার নেই। কিন্তু সংবাদপত্রের শেষ অংশটি যথেষ্ঠ মনোযোগের দাবি রাখে। মিকমুরডো মন দিয়ে পড়ল :

ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। কিন্তু বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেল যে, আসল অপরাধীরা কোনো রহস্যময় কারণে অধরাই থেকে যাবে। ওই নিন্দনীয় হামলায় যারা জড়িত ছিল, তাদের কয়েকজনকে প্রতিবেশীরা চিনতে পেরেছে; সম্ভবত তাদের নাম পুলিশকে জানানোও হয়েছে৷ কিন্তু এই ধরনের নাশকতামূলক ঘটনা অতীতেও সংঘটিত হয়েছিল, পুলিশ যথারীতি তদন্তও শুরু করেছিল, কিন্তু অপরাধীরা কেউই ধরা পড়েনি। হেরাল্ড কর্তৃপক্ষের বিশ্বাস, এবারও পুলিশের সেই ব্যর্থতারই পুনরাবৃত্তি হবে। ভারমিস্সার লৌহ ও কয়লা খনি অঞ্চলসমূহ বহুদিন থেকেই বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত এক খুনি সংগঠনের অবাধ বিচরণক্ষেত্র। আইনের শাসন এদের ক্ষেত্রে একেবারেই ফলপ্রসূ নহে। বোম্বেটের অত্যাচারে সাধারণ মানুষের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন ভয়ানকভাবে বিপর্যস্ত। সেই অন্ধকারের মাঝেই আশার আলো, নির্ভীক সাংবাদিক মি: স্ট্যানজার, যিনি এই দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া সত্ত্বেও, চিকিৎসায় সাড়া দিয়েছেন এবং অবিলম্বে সুস্থ হয়ে উঠবেন আশা করা যায়।

খবরের একেবারে শেষে উল্লিখিত আছে যে, হেরাল্ড পত্রিকার স্থানীয় অফিস বর্তমানে পুলিশ-প্রহরায় নিশ্ছিদ্র।

খবরটা পড়ে কাগজ সরিয়ে রাখল মিকমুরডো, পাইপ ধরিয়ে গত রাতের কথাই ভাবছিল৷ হেরাল্ডের সাংবাদিক জানে না যে, বদমাশ বলডউইনকে সে বাধা না দিলে বৃদ্ধ সাংবাদিক ঘটনাস্থলেই খুন হয়ে যেতেন। হঠাৎ দরজাতে নক্। সে ‘কাম ইন’ বলায় স্বয়ং মালকিন হাজির। শুভ সকাল জানিয়ে একটা চিঠি তিনি মিকমুরডোর হাতে দিলেন। চিঠিটা একটু অবাক হয়েই খুলল মিকমুরডো। মালকিন চলে গেছেন। তবুও সাবধানের মার নেই। কখন কে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়বে তাই দরজাতে ছিটকিনি তুলে দিল সে। তারপর ছোট চিঠিটা পড়তে লাগল। চিঠির নীচে কোনো সই নেই। অর্থাৎ কে লিখেছে সেটা বোঝা গেল না। চিঠির বক্তব্য এরকম :

আপনার সহিত আমি নিভৃতে কথা বলিতে চাই। কোনো প্রকাশ্য স্থানে আমাদের না সাক্ষাৎ হওয়াই উচিত। আপনি যে সরাইখানায় উঠিয়াছেন, সেস্থান হইতে দক্ষিণ দিকে কিছুটা যাইলেই একটি ছোট টিলা পড়বে। ওই টিলা স্থানীয়ভাবে মিলার হিল হিসেবে পরিচিত। জায়গাটি নির্জন৷ টিলার উঠিবার মুখে জর্জ ওয়াশিংটনের একটি আবক্ষ প্রস্তর-মূর্তি আছে। আমি ওই প্রস্তরমূর্তির সামনে দাঁড়াইয়া আছি। কিছু জরুরি ও গোপন খবর আপনাকে জানাইতে চাই।

মিকমুরডো প্রথমেই ভেবে নিল এটা কোনো ফাঁদ কিনা। আখড়াতে টেড বলডউইন তার প্রধান শত্রু৷ সে নির্জনে তাকে ডেকে...। দুশ্চিন্তাটা মিকমুরডো হেসে উড়িয়ে দিল৷ বলডউইনের মুরোদ তার বোঝা হয়ে গেছে। হাতে যদি একটা গুলিভর্তি রিভলভার থাকে, তাহলে দশজন বলডউইনের মোকাবিলা সে একাই করতে পারে৷ যে চিঠি লিখেছে সে কে হতে পারে, কী খবর সে সরবরাহ করতে পারে! মিকমুরডো ভীতু নয়। সে রিভলভার শরীরের যথাস্থানে রেখে বেড়িয়ে পড়ল। মিলার হিলে পৌঁছোতে মিনিট দশ লাগল। আবক্ষ প্রস্তর-মূর্তির পাশেই একজন ব্যক্তি পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে৷ চারপাশে সত্যিই জনপ্রাণী নেই৷ নিরাপদ দূরত্ব থেকে মিকমুরডো গলা তুলে বলল, ‘কে আপনি? নিজের মুখটা দেখান।’

লোকটা সামনের দিকে ফিরল। আরে! এ তো ব্রাদার মরিস! বয়স্ক মানুষ। গতকাল আখড়ার সভায় তার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর শুনেছিল সবাই। যদিও পরমুহূর্তেই ক্ষমা চেয়ে সে সর্দার মিকগিনটির ক্রোধ কিছুটা প্রশমিত করতে পেরেছে।

বয়স্ক লোকটি এগিয়ে এল৷ অল্প হেসে বলল, ‘আমি জানতুম আপনি আসবেন, মি. মিকমুরডো। আপনার সঙ্গে আমার কিছু জরুরি আলোচনা আছে।’

‘চিঠিতে আপনি নিজের নাম লেখেননি কেন?’

‘সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েচে আমাকে। আমরা দুজনে এভাবে গোপনে দেখা করচি, যদি আখড়ার কেউ জানতে পারে দুজনেরই বিপদ৷ এখন যা শোচনীয় অবস্থা, কাকে বিশ্বাস করা উচিত, কাকে উচিত নয়, তা বলা কঠিন।’

‘আখড়ার সদস্যরা নিজেরা নিজেদের বিশ্বাস করতে পারবে না?’

‘অবশ্যই পারবে না।’ বেশ জোর দিয়েই বলল মরিস।’এটা জানবেন বন্ধু, নিজেদের মধ্যে আমরা যা কিছু বলি, এমনকী মনে মনে চিন্তাও করি, সব পৌঁছে যাবে সর্দার মিকগিনটির কানে। বলা হয়, দেয়ালরাও নাকি তার গুপ্তচর।’

‘দেখুন মশাই!’ রুক্ষভাবে বলল মিকমুরডো। ‘আপনি ভালোই জানেন, গতকাল রাতেই প্রকাশ্য সভায় আমি বডিমাস্টার বা সর্দারের কাছে বিশ্বস্ততার শপথ গ্রহণ করেছি। সেই শপথ-বিরোধী কোনো কাজ আমি করতে পারব না।’

‘আপনি যদি এই দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে কথা বলেন,’ বয়স্ক মরিসের মুখটা পাংশু হয়ে গেল, ‘তাহলে আমি এটাই বলব, আমি খুবই দুঃখিত হব এই কারণে, যে আপনি কষ্ট করে এতদূর এলেন৷ সত্যিই আমরা এমন এক দুঃস্বপ্নের রাজত্বে বাস করচি যে, দুজন স্বাধীন নাগরিক মন খুলে কথাও বলতে পারব না।’

‘দেখুন, মি. মরিস, আমি এই অঞ্চলে এবং এই আখড়াতে একেবারেই নতুন। কাকে বিশ্বাস করা যায় আর কাকে যায় না, তা আমি সত্যি বলছি, এখনও বুঝে উঠতে পারিনি৷ সুতরাং আমি নিজে কিছুই বলব না, বলার মতো তেমন কিছু অভিজ্ঞতাও এখানে আমার হয়নি৷ কিন্তু আপনি যদি আমাকে কিছু জানাতে চান, আমি তা শুনতে পারি।’

‘তারপর আমার কথাগুলো বস্ মিকগিনটির কানে তুলে দেবেন?’

‘এটা জেনে রাখুন মি. মরিস, আমার সন্দেহবাতিক থাকতে পারে, কিন্তু আমি বিশ্বাসঘাতক নই। আপনার যদি সত্যিই কিছু বলার থাকে, আপনি নির্ভয়ে আমাকে বলতে পারেন। তা গোপনই থাকবে।’

‘নিজের ভালোমন্দের কতা আমি এখন আর ভাবি না,’ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল মরিস। ‘হয়তো আপনাকে যা বলব তার জন্যে আমার মরণও হতে পারে। গতকাল আমি আপনার কার্যকলাপ সব লক্ষ্য করেছি, আপনিও আখড়ার ওই দয়ামায়া-হীন বদমাশগুলোর থেকে কম কিছু নয়; ওদের কারোর কারোর থেকে খারাপও আপনি হতে পারেন। কিন্তু আপনি এখানকার আখড়াতে নতুন, তাই মনে হয়েচে, বিবেক বস্তুটাকে আপনি সম্পূর্ণ বিসর্জন এখনও দিতে পারেননি৷ তাই কিচু কতা বলতে চেয়েছিলুম।’

‘ঠিক আছে, আপনি বলে যান, আমি শুনছি।’

‘যদি আমার কথাগুলো আপনি দুর্বৃত্ত সর্দারের কানে তুলে দেন, তাহলে আপনার মাতায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে!’

‘আপনি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছেন...’

‘তাহলে জিগ্যেস করি আপনাকে, যখন আপনি শিকাগোতে ফ্রিম্যান সোসাইটিতে সদস্য হয়েছিলেন এবং শপথ নিয়েছিলেন, বিশ্বস্ততার আর মানুষের কল্যাণের জন্যে কাজ করার, তখন কি বুঝেছিলেন সোসাইটি আপনাকে রক্ত, দলাদলি, হত্যা আর অপরাধের রাস্তায় ঠেলে দেবে?’

‘অপরাধের মাত্রা কি খুব বেশি?’ মিকমুরডো জিগ্যেস করল।

‘অপরাধের মাত্রা!’ মরিস উত্তেজিত হয়ে পড়ল, আবেগে কাঁপছিল তার গলা। ‘এখানে নূতন এসেচেন, এই তো সবে শুরু! গতরাতে আপনার বাপের বয়সি এক বৃদ্ধকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হল। সেটা কি অপরাধ নয়? নাকি অন্য কিছু?’

‘কেউ কেউ আবার ব্যাপারটার অন্য ব্যাখ্যা দিচ্ছে। বলছে এটা এক ধরনের লড়াই, ক্যাপিটালিস্টদের বিরুদ্ধে প্রোলেতারিয়েতদের।’

‘দেখুন আমি ভদ্র নাগরিক, ঈশ্বরকে মানি এবং আমার বিবেকও খুব জাগ্রত৷ কিন্তু এরা, এই বিবেকহীন সর্দার ও তার চেলারা আমাকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিয়েচে...।’

‘কীরকম?’

‘আমাকে একটা কাজ দেওয়া হয়েছিল। জঘন্য কাজ৷ আমি সেই কাজ করতে মানসিকভাবে একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না৷ কিন্তু সর্দারের কতা অমান্য করলে আমার কপালে কী আচে তাও জানতুন৷ তাই কাজটা করতে বাধ্য হয়েছিলুম আমি৷ ওহ্, কী ভয়ঙ্কর! এখনও সেই দৃশ্য আমি ভুলতে পারি না। এখান থেকে কুড়ি মাইল দূরে একটা বাড়িতে আমাদের কয়েকজনকে যেতে বলা হয়েচিল। আমাকে বলা হয়েচিল, দরজার কাচে পাহারায় থাকতে। যেমন আপনাকে বলা হয়েচিল গতরাতে৷ আমাকে আসল কাজের ব্যাপারে ওরা বিশ্বাস করেনি। অন্যেরা বাড়ির ভেতরে গেল৷ যখন তারা বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এল, সকলের হাতের কব্জি পর্যন্ত রক্তে মাখামাখি। যখন চলে আসচিলুম আমরা, একটা বাচ্চা ভয়ে চিৎকার করতে করতে আমাদের পেছনে ছুটে আসচিল। সে পাঁচ বছরের একটা ছেলে। তার চোখের সামনে তার বাবাকে খুন করা হয়েছিল৷ আমার চোকে জল এসে গিয়েছিল৷ কিন্তু কিছু বলতে পারিনি৷ বাচ্চাটাকে কোলে তুলে একটু আদর করতে পারিনি। তাই যদি করতুম, তাহলে সেই নিষ্ঠুরেরা সর্দারকে জানাত, আমার আর বাচ্চাটারও একই পরিণাম হতো। সেই রাতে এরকম নৃশংস হত্যার কোনো প্রতিবাদ আমি করতে পারিনি৷ শুধু মনের মধ্যে গুমরে মরেচি৷ আমি মনে-প্রাণে ক্যাথলিক। কিন্তু স্থানীয় চার্চের যাজক আমার সঙ্গে কোনো কথা বলেন না, যেদিন থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, আমিও বোম্বেটের দলের একজন। এখন আমি দেখচি আপনিও সেই একই রাস্তায় হাঁটচেন। ঠান্ডা মাতায় খুন, রক্তপাত, হাড়গোড় ভেঙে দেওয়ার মতো পিটুনি। আমরা এসব অন্যায় মুখ বুজে মেনে নেব? এসব থামাবার চেষ্টা করব না?’

‘কী করতে চান আপনি? কীভাবে প্রতিবাদ জানাবেন?’

‘সেটা ঠিক। ওদের বে-আইনি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গেলেই তো গুলি খেয়ে মরতে হবে।’

‘ঠিক। আমি দেখছি আপনি মানসিকভাবে বেশ দুর্বল। তিলকে তাল করছেন।’

‘তিলকে তাল...? আপনি তো এখানে নতুন৷ যত দিন যাবে দেকবেন কত ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হবে।’

‘জানি সেটা...। তবে আপনি খুব ভালো মানুষ। আপনি এদের সঙ্গে চলতে পারবেন না। বরং পরিবার নিয়ে পালিয়ে যান কোনো নিরাপদ জায়গায়। অবশ্য আমি জানি না, আপনি ইনফর্মার কিনা!’

‘না, না, বিশ্বাস করুন...’

‘ঠিক আছে। সাবধানে থাকবেন।’

‘চলে যাবার আগে একটা কতা বলি৷ আখড়ার চর চারদিকে ছড়ানো আচে। আমাদের দুজনকে এখানে কতা বলতে ওরা নিশ্চয়ই দেকেচে। যদি পরে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় কী কতা বলছিলুম আমরা?’

‘সেটা অবশ্য ঠিকই বলেচেন।’

‘আমার একটা ছোট মুদির দোকান আচে। আমি ওদের বলব, আপনাকে সেখানে হেল্পারের কাজ করার জন্যে বলচিলুম।’

‘সেই সঙ্গে এটা বলবেন যে আমি কাজটা নিতে রাজি হইনি। ঠিক আচে, ব্রাদার মরিস, সাবধানে থাকবেন।’

সেদিনই বিকেলে, মিকমুরডো নিজের বাড়িতে বসে পাইপ টানছিল আর ভাবছিল নানা কথা। দরজাতে করাঘাত৷ দরজা খুলে সে মনে মনে একটু চমক খেল। বিশাল বপু নিয়ে স্বয়ং মিকগিনটির আবির্ভাব। মিকমুরডো তাকে ওয়েলকাম জানাল। বসতে অনুরোধ করল।

একটা চেয়ারে বসে মিকগিনটি শুরু করল, ‘আমি কোথাও চট করে আসি না। এত ভিজিটর আমার কাচে আসে, তাদের ছেড়ে উটতেই পারি না। শুধু একটা কতা বলতে তোমার বাড়ি এলুম।’

‘কাউন্সিলর আপনি নিজে আমার বাড়ি এসেছেন। আমি গর্বিত।’

ধানাই-পানাই না করে মিকগিনটি আসল কথায় এল।

‘ব্রাদার মিকমুরডো, আজ সকালে, মিলার হিলের ব্রাদার মরিসের সঙ্গে কী কথা হচ্চিল?

এ ধরনের প্রশ্নই যে আসবে মিকমুরডো জানত। সে হাসিতে ফেটে পড়ল।

‘লোকটা একেবারে সাধাসিধা। ও জানে না যে, আমি এখানেই একটা ছোটখাটো কাজ জুটিয়ে নিয়েছি। ওর ধারণা আমি এখানে বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। ওর কী একটা দোকান আছে, সেখানে আমাকে কাজ নিতে বলছিল।

‘ওহ, শুধু এই?’

‘শুধু এই।’

‘তুমি কাজটা নাওনি তো?’

‘প্রশ্নই আসে না কাজটা নেওয়ার।’

‘ঠিক। তবে ওই মেনিমুখোর সঙ্গে বেশি কতাবার্তা উচিত নয়।’

‘কেন কাউন্সিলর?’

‘মরিসকে আমি বিশ্বাস করি না৷ ও কি আমাদের লজের বিরুদ্ধে কিচু বলেচে?’

‘না।’

‘আমার বিরুদ্ধে?’

‘না।’

‘বলেনি৷ কারণ ও তোমাকেও বিশ্বাস করে না। ও আমাদের দলে আচে বটে, কিন্তু ওকে বিশ্বাস করা যায় না। আমরা নজর রাকচি, ঠিক সময়ে ওকে উচিত শিক্ষা দেব৷ ও দলের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতাও করতে পারে। আর ওরকম বিশ্বাসঘাতকের সঙ্গে যদি তুমি মেলামেশা করো, তাহলে আমরাও তোমাকে বিশ্বাসঘাতক ভাবতে শুরু করব।’

‘ওর সঙ্গে বেশি মেলামেশা করার প্রশ্নই ওঠে না। লোকটাকে আমি একেবারে পছন্দ করি না। আর আমাকে আপনি ছাড়া অন্য কেউ যদি বিশ্বাসঘাতক বলত, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ ভেঙে দিতাম।’

‘ঠিক আচে, ঠিক আচে। মাতা ঠান্ডা রাখো ব্রাদার...’

মিকগিনটি দরজার কাছে যাবার আগেই দরজা শব্দ করে খুলে গেল। পুলিশ-টুপি মাথায় কয়েকটা তীক্ষ্ণ চোখ! মিকমুরডো লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল, কিন্তু দেখল তার দিকে দুটো উইনচেসটার রাইফেল উদ্যত। ঝকঝকে ইউনিফর্মে একজন এগিয়ে এল। তার হাতে রিভলভার। ইনি আর কেউ নন, স্বয়ং ক্যাপ্টেন মারভিন। বাঁকা হাসি হাসছে ক্যাপ্টেন, মিকমুরডোর দিকে তাকিয়ে।

‘চলো, শ্রীঘরে যেতে হবে।’

‘এর পরিণাম ভালো হবে না, ক্যাপ্টেন মারভিন।’ বলল মিকগিনটি। ‘আমি জানতে চাই, আপনি কে? শান্তিপ্রিয় নাগরিকের ঘরে এভাবে ঢুকে পড়ে তাকে ভয় দেকাচ্চেন?’

‘আপনাকে কিন্তু আমরা কিছু বলিনি, কাউন্সিলর মিকগিনটি,’ বলল পুলিশ-ক্যাপ্টেন।’আমরা তো আপনাকে কিছু বলছি না, এই লোকটাকে আমরা তুলতে এসেছি। কাউন্সিলর হিসেবে আপনার উচিত পুলিশকে সাহায্য করা, তাদের বাধা দেওয়া নয়।’

‘মি. মিকমুরডো আমার একজন বন্ধু। তার আচরণ সম্বন্ধে জবাবদিহি আমি করব।’

‘যদি কোনোদিন প্রয়োজন হয়, কাউন্সিলর, আপনার কোনো আচরণের জন্যে আপনার কাছেও জবাবদিহি চাইতে পারি। কিন্তু আজ আমাদের ডিউটি হল, এই বদমাশটাকে তুলে নিয়ে যাওয়া। অ্যাই, তোমরা ওকে রাইফেল দিয়ে ঘিরে থাকো, লোকটা পাক্কা বদমাশ! আগে ওর অস্ত্রটা কেড়ে নিই।’

‘এই নিন আমার অস্ত্র।’ মিকমুরডো ঠান্ডা স্বরে বলল। ‘ক্যাপ্টেন আজ সেপাইদের নিয়ে এসেছেন তাই; আপনি একা থাকলে আমাকে বাগে পাওয়া এত সহজ হতো না।’

‘ওয়ারান্ট আচে? জিগ্যেস করল মিকগিনটি।’এটা কী ধরনের আইন ক্যাপ্টেন অফিসার! পৃথিবীর সর্বত্রই পুলিশের চরিত্র এরকম! আপনারা সাধারণ মানুষদের জন্যে ভাবেন না! আপনারা হলেন ক্যাপিটালিস্টদের পা-চাটা!’

‘আপনি আপনার কর্তব্য যেভাবে ভালো বোঝেন, করুন কাউন্সিলর। আমাদের কর্তব্যটা আমরা বুঝে নেব।’

‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগটা কী?’ প্রশ্ন মিকমুরডোর।

‘হেরাল্ড অফিসের বৃদ্ধ সম্পাদক স্ট্যানজারের বাড়িতে হামলা করা ও তাকে বিশ্রীভাবে মারধর করার জন্যে যারা দায়ী তাদের মধ্যে তুমি একজন।’

‘এই অভিযোগ?’ মিকগিনটি বাঁকা হাসি হাসল, ‘তাহলে তো সেই অভিযোগ মিথ্যে৷ কারণ, যেদিন ওই গোলমালটা হয়েছিল, সেদিন এই লোকটা, মিকমুরডো আমার অফিসে আমার সঙ্গে মাঝরাত পর্যন্ত পোকার খেলেচে। আমি এক ডজন লোককে দাঁড় করিয়ে দেব, যারা এর সাক্ষী।’

‘সেটা আপনার ব্যাপার, যা কিছু প্রমাণ করার আপনাকে তা করতে হবে আগামীকাল, আদালতে। বেরিয়ে এসো মিকমুরডো, পেঁদিয়ে তোমাকে তক্তা করার আগে বেরিয়ে এসো। আপনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকুন মিকগিনটি। সাবধান করে দিচ্ছি আমি আপনাকে, যখন আমি ডিউটিতে আছি, তখন আমাকে বাধা দেবার ফল ভালো হবে না।’

ক্যাপ্টেনের মেজাজ দেখে দুজনের কেউই আর কোনো কথা বলতে সাহস পেল না। মিকগিনটি ফিসফিস করে কয়েকটা কথা বলল আসামির সঙ্গে।

‘সেগুলোর কী হবে?’ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সে জাল ডলার বোঝাল।

‘সব ঠিক জায়গায় আছে,’ ফিসফিসিয়ে বলল মিকমুরডো।

‘ঠিক আচে ব্রাদার।’ বলল কাউন্সিলর, ‘আদালতে তোমার হয়ে ভালো উকিল দাঁড়াবে। ওরা তোমাকে আটকে রাখতে পারবে না।’

‘দুজন কনস্টেবল, ভালোভাবে এই লোকটাকে আটকে রাখো, চোখে চোখে রাখো একে। ওর বাড়ি আমি সার্চ করব!’

হাজতে এসে মিকমুরডো কিছুটা অবাক৷ সেখানে গুলতানি করছে, বলডউইন এবং আরও তিনজন অপরাধী৷ সকলকেই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে সেদিন বিকেলে৷ এদের সবাইকে আদালতে তোলা হবে আগামীকাল সকালেই।

আদালতে কারোরই অভিযোগ প্রমাণিত হল না। সরকারপক্ষের উকিলকে খুব আত্মবিশ্বাসী মনে হল না। তিনি কয়েকজন সাংবাদিককে সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন। তারা প্রত্যেকেই প্রায় একই বিবৃত দিল...যে, গভীর রাতে আকাশ মেঘলা থাকায় আর রাস্তায় আলো কম থাকায়, তারা স্পষ্টভাবে দেখতে পারেনি অপরাধীদের চেহারা। তবে দলে পাঁচজন লোক ছিল হামলাকারী, এটা তারা দেখেছে। আর মিকিগিনিটি যে অ্যাটর্নিকে দাঁড় করিয়েছিল, তিনি সত্যিই ওস্তাদ। সরকারপক্ষের সাক্ষীদের এমনভাবে চোখাচোখা প্রশ্ন করতে লাগলেন যে, তারা ঘাবড়ে গিয়ে উল্টোপাল্টা উত্তর দিতে লাগল। আর মি. স্ট্যানজার বললেন, সবাই মিলে তাঁকে আক্রমণ করায় তাঁর চশমা চোখ থেকে খুলে পড়ে গিয়েছিল। আর চশমা ছাড়া তিনি চোখে কিছুই দেখতে পান না। সবাই মিলে তাঁকে এমনভাবে প্রহার করতে করতে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল যে, কোনো আসামির মুখই তিনি দেখতে পাননি।

বলাই বাহুল্য যে বিচারকের কিছু করার ছিল না। আসামিরা সবাই বেকসুর খালাস পেল। পুলিশের বিরুদ্ধে বিচারক তির্যক মন্তব্য করলেন। উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া এভাবে ভুলভাল লোকদের আসামি বানিয়ে, তাদের গ্রেপ্তার করে, আদালতে হাজির করানোর মতন অ-পেশাদার কাজ করা পুলিশের উচিত হয়নি। আদালতের একধারে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যাপ্টেন মারভিনের মুখ কালো হয়ে গেল। আখড়ার ‘ব্রাদার’-রা প্রায় সবাই হাজির ছিল আদালতে। তারা মিকমুরডো ও অন্যান্যদের কাঁধে তুলে নাচতে লাগল৷ তাদের মধ্যে একজনকে দেখা গেল মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে আছে। সে পুলিশের কেউ নয়৷ লজ্ বা আখড়ারই সদস্য। মাথায় খাটো, মুখে চাপদাড়ি, গাঁট্টাগোট্টা দেখতে লোকটা নিজের মনেই ফিসফিসিয়ে বলছিল, ‘অসভ্য গুণ্ডার দল! তোরা অপরাধ করে বারবার পার পাবি না! তোদের খারাপ দিন আসচে!’

পরিচ্ছেদ ৫ঃ নিকষ-কালো অন্ধকার

মাত্র কিছুদিন যেতে না যেতেই জ্যাক মিকমুরডো আখড়ার অন্যান্য সদস্যদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠল। এটার কারণ হল তার একধরনের ডোন্ট-কেয়ার ভাব, সর্দার মিকগিনটির মুখের ওপরেও সে উচিত কথা বলতে ছাড়ে না। কিন্তু তার দ্রুত জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হল, তার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া পরদিনই বিনা শর্তে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে বেকসুর খালাস পাওয়া। এমনকী যথেষ্ঠ চালাক ও অভিজ্ঞ পুলিশ-অফিসার ক্যাপ্টেন মারভিনেরও চোখে চোখ রেখে কথা বলতে সে সাহস করে। আখড়ার সবাই নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে, ‘এতদিন পরে একটা আসল মাস্তান দেকচি বটে। লোকটা কঠিন জিনিস। ওকে দিয়ে আমাদের অনেক কাজ হবে।’

মিকগিনটিও প্রকাশ্যেই এই নবাগত জোয়ানকে বেশ সমীহ করে৷ সেও তার কাজকর্ম, চলাফেরায়, কথাবার্তায় যথেষ্ঠ মুগ্ধ এটা বোঝাই যায়। একমাত্র আখড়ার একজন সদস্য, টেড বলডউইন মিকমুরডোর এই জনপ্রিয়তাকে ভীষণ ঈর্ষা করে৷ কিন্তু ওকে ঘাঁটাতে সাহস করে না, কারণ মিকমুরডোকে বাঁকা কথা কিছু বললে সে মারামারির প্রস্তাব দিয়ে বসবে।

এদিকে এট্টি শ্যাফটারের সঙ্গে মিকমুরডোর দেখাসাক্ষাৎ আজকাল অনেক কমে গেছে। প্রথমত, বুড়ো শ্যাফটার চায় না যে, মাস্তান-গোছের লোকটা তার বাড়িতে খুব যাওয়া-আসা করুক; দ্বিতীয়ত, আখড়ার নানা ধরনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় মিকমুরডোও এট্টির কথা মনে হয় ভুলতে বসেছে। কিন্তু এট্টি ইতিমধ্যেই মিকমুরডোর প্রেমে যাকে বলে, হাবুডুবু খাচ্ছে। আবার এদিকে দুশ্চিন্তা, মিকমুরডো ইতিমধ্যেই একজন ক্রিমিন্যাল বলে পরিচিত হয়ে উঠেছে, সে জেল-ফেরত আসামি; তাকে সে বিয়ে করবে কীভাবে?

একদিন দুশ্চিন্তায় সারারাত ঘুম হল না এট্টির। পরদিন সকালে বাবার চোখ এড়িয়ে সে ছুটল প্রেমিকের বাড়িতে। তাকে চেষ্টা করতে হবে, প্রাণপণ চেষ্টা করতে হবে, মিকমুরডোকে অসৎ সঙ্গ থেকে সরিয়ে আনার, তাকে জীবনের ঠিক পথে চালিত করার।

মিকমুরডোর ঘরের দরজায় ছিটকিনি লাগানো ছিল না। বাইরের জানালার দিকে মুখ করে সে টেবিলের সামনে বসে ছিল। তার সামনে টেবিলে একটা খোলা চিঠি। এট্টির বয়স মাত্র উনিশ। তার তো কিশোরীসুলভ দুষ্টুমি করতে ইচ্ছে হতেই পারে। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে সে পা টিপে, পা টিপে সামনে এগিয়ে গেল৷ আলতো করে মিকমুরডোর কাঁধে হাত রাখল।

সে চেয়েছিল, মিকমুরডোকে চমকে দিতে; পরিবর্তে নিজে চমক খেল অনেক বেশি৷ যেন বাঘের ক্ষিপ্রতায় মিকমুরডো চেয়ার থেকে উঠে ঘুরে দাঁড়াল আর ডান হাতে গলা টিপে ধরল এট্টির৷ সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের চিঠিটাও বাঁ হাতে দ্রুত মুড়ে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে দিল! এক মুহূর্ত তার চোখ দিয়ে যেন আগুন বের হচ্ছিল৷ পরমুহূর্তেই এট্টিকে দেখে তার মুখের হিংস্রভাব মুহূর্তে উধাও, হা হা হেসে উঠল, বলল, ‘তুমি! আমার হৃদয়ে সবসময় চাঁদের আলো! এসো, ডার্লিং বসো। তোমাকে তো আশাই করিনি তাই---’

‘কিন্তু তোমার কী হয়েছে জ্যাক?’ এট্টির চোখে ভয়, ‘আমাকে দেখে কি তুমি ভয় পেলে? জ্যাক, তুমি নিশ্চয়ই কোনো অপরাধবোধে ভুগছ, খুব উদ্বেগে আছো তুমি, তা না হলে এরকম অস্বাভাবিক ব্যবহার করলে কেন?’

‘আসলে একটা ব্যাপারে আমি গভীর চিন্তা করছিলাম। ভাবতেই পারিনি একটা পরি এসে আমার---’

‘না জ্যাক, তোমার চোখে আমি দেখেছি ভয়, অপরাধবোধ!’ তারপরেই সে বলল, ‘দেখি একবার কী চিঠি লিখছিলে?’

‘এট্টি, আমাকে এই অনুরোধ কোরো না।’

‘অন্য কোনো মেয়েকে তুমি নিশ্চয়ই চিঠি লিখছিলে! তুমি কি তোমার স্ত্রীকে চিঠি লিখছিলে? কীভাবেই বা জানব আমি তুমি বিবাহিত নয়? তোমার সম্বন্ধে আমরা কেউ কিছু জানি না!’

‘আমি বিবাহিত নই এট্টি। আমাকে ভুল বুঝো না তুমি৷ খ্রিস্টের নামে শপথ নিয়ে বলছি আমি একমাত্র তোমাকেই ভালোবেসেছি।’ তার দুই চোখে যে সজল আবেগ ফুটে উঠল, এট্টি তাকে না বিশ্বাস করে পারল না।

‘ঠিক আছে। তাহলে যে চিঠি লিখছিলে সেটা দেখাও?’

‘তুমি বোঝো। একটু বুঝতে চেষ্টা করো আমাকে! এই চিঠিটা হল আমাদের এই লজ বা আখড়ার ব্যাপারে। এটা গোপন ব্যাপার। তোমাকেও দেখানো যাবে না। আসলে কী জানো তো? পুলিশের গোয়েন্দারা আমার পেছনে লেগে আছে। সে কারণেই কাঁধে তোমার হাতের ছোঁওয়া পেয়ে আমি অত চমকে উঠেছিলাম!’ বলতে বলতেই মিকমুরডো তার প্রেমিকাকে বুকে জড়িয়ে ধরল এবং চুমোতে চুমোতে তাকে অস্থির করে দিল। তারপর হেসে বলল, ‘এখন মন থেকে দুশ্চিন্তা গেছে?’

‘মন থেকে দুশ্চিন্তা কীভাবে যাবে জ্যাক? আমাকে সবসময় কী শুনতে হয়? যে তুমি একটা গুণ্ডা, একটা ক্রিমিন্যাল। তোমাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিল, তুমি হাজতবাস করেছিলে, আমার কানে আসে–‘‘বোম্বেটেদের বোম্বেটে বদমাশ মিকমুরডো!” এসব নিন্দে আমার বুকে যেন ছুরির মতো বিঁধে যায়!’--এট্টি এবার তার কান্নাভেজা মুখ গুঁজে দিল মিকমুরডোর চওড়া বুকে; বলতে লাগল, ‘এখানকার গুণ্ডা-বদমাইশের দল তুমি ছেড়ে দাও জ্যাক! আমি তোমাকে ভালোবাসি৷ আমার একটা কথা শোনো। খারাপ লোকেদের সঙ্গ তুমি ছেড়ে দাও৷ আজ আমি তোমার বাড়ি চলে এসেছি শুধু এই অনুরোধ করতে৷ তোমার পায়ে পড়ি জ্যাক, কুসঙ্গে মিশে নিজের ক্ষতি কোরো না৷ সরিয়ে নাও নিজেকে।’ এট্টির মুখ নিজের চওড়া বুকে চেপে ধরে তার কপালে শুধু চুমু খাচ্ছিল মিকমুরডো।

‘ডার্লিং, তোমার উৎকণ্ঠা, ভয়, আমার জন্যে। শুধুই আমার জন্যে। আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আমার অন্য এক বিপদের কথা তুমি ভাবছ না। আমি আখড়ার গিয়ে শপথ গ্রহণ করেছি। এতদিন ধরে ওদের সঙ্গে মিশে দলের অনেক গোপন কথা জেনেছি। আমি যদি এখন এই খুনির দল থেকে সরে আসতে চাই, তাহলে ওরা কি আমাকে সহজে ছেড়ে দেবে ভেবেছ? ওরা আমাকে কুকুরের মতো গুলি করে মারবে! দলের সর্দার-কাউন্সিলর মিকগিনটির প্রাণে দয়ামায়া নেই। সে আমাকে বিশ্বাসঘাতক ভেবে আমাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবে।’

‘সে বিপদের কথাও আমি ভেবেছি জ্যাক৷ একটা প্ল্যানও করেছি৷ বাবা বেশ কিছু টাকাপয়সা সঞ্চয় করেছেন। তিনি নিজেও এই গুণ্ডা-বদমাশদের জায়গায় থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি নিরাপদ কোনো নতুন জায়গায় গিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে চান। চলো, আমরা সবাই মিলে পাড়ি দিই ফিলাডেলফিয়া কিংবা ন্যুইয়র্কে; যেখানে ওরা আমাদের নাগাল পাবে না।

মিকমুরডো ম্লান হাসল। ‘এই লজ কিংবা আখড়া যাই বলো, এদের হাত কিন্তু খুব লম্বা। ফিলাডেলফিয়া বা ন্যুইয়র্কে গিয়ে আমার খোঁজ করা এদের কাছে কঠিন কিছু নয়।’

‘ঠিক আছে, তাহলে পশ্চিমের দিকে চলে যাব, কিংবা ইংল্যান্ডে অথবা জার্মানিতে, যে-কোনো জায়গায় শুধু চিরকালের জন্যে ত্যাগ করতে এই ভয়ের উপত্যকা!’

মিকমুরডোর মনে পড়ে গেল, বয়স্ক ব্রাদার মরিসের কথা। সে-ও এই কথাটা বলেছিল, ‘ভয়ের উপত্যকা!’ সত্যিই এই উপত্যকাকে তোমরা সবাই খুব ভয় করো?’

‘এখানে আমাদের প্রতি মুহূর্ত আতঙ্ক আর অশান্তিতে কাটে! তুমি কি মনে করো টেড বলডউইন সেদিন তোমার কাছে ধ্যাতানি খেয়ে সব ভুলে গেছে? তোমার ভয়েই ও আমাদের কিছু বলতে সাহস করে না। আমি যখন রাস্তায় বের হই, যদি ও আমাকে দেখতে পায়, এমন অসভ্যের মতো, খিদের চোখে আমার শরীরের দিকে তাকায় যে আমার গা ঘিনঘিন করে ওঠে!’

‘অসভ্য এবং বিপজ্জনক লোক একটা! যদি কোনোদিন ওরকম মুহূর্তে ওকে আমি ধরতে পারি এমন উচিত শিক্ষা দেব! কিন্তু আমার বাচ্চা, অবুঝ, মিষ্টি মেয়ে, এটা বোঝো তুমি, এখন এই উপত্যকা ছেড়ে আমি যেতে পারব না৷ আমার পক্ষে সম্ভব হবে না আপাতত। কিন্তু তুমি যদি আমার ওপর, আমার ভালোবাসার প্রতি বিশ্বাস রাখো, তাহলে নিশ্চিন্ত থাকো, আমি শেষমেশ এমন একটা উপায় বের করব যাতে আমরা তিনজন সম্মানের সঙ্গে এই জায়গা ছেড়ে মাথা উঁচু করে ভালো কোনো জায়গায় গিয়ে সুখে থাকব।’

‘এখানে আর থাকাটা সম্মানের নয়।’

‘শোনো আমার অবুঝ মেয়ে, এখন তোমার এরকম মনে হচ্ছে৷ কিন্তু আমি তোমার থেকে ছটি মাস চেয়ে নিচ্ছি৷ এই ছ’মাসের মধ্যে এমন সব ব্যাপার ঘটবে যা তোমার মনে হবে না অসম্মানের।’

উনিশ বছরের সুন্দরীর মুখ উদ্ভাসিত এখন হাসিতে। ‘ছ’মাস!’ সে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল ‘প্রতিজ্ঞা করছ?’

‘ঠিক আছে আর একটু বেশি সময়৷ সাত মাস কী আট মাস? জেনে রেখো এক বছরের মধ্যে আমরা এই ভয়ের উপত্যকা ছেড়ে চলে যাব।

অনেক সাধ্য-সাধনা করে, অন্তত এই প্রতিশ্রুতিটা এট্টি আদায় করতে পারল। তবুও তো অন্তত এক বছর সময়! অনেক দূরের হলেও, আশার আলো বইকি! বুড়ো বাবার কাছে নিষ্পাপ মেয়েটি কিছুটা আনন্দ নিয়ে ফিরে গেল। সে ভুল করেনি। সৎ, একরোখা, সবল, একজন ভালো মানুষকেই ভালোবেসেছে। এই নরক থেকে তাকে মুক্তি দিতে মিকমুরডো পারবে, ঠিক পারবে।

ভেবেছিল মিকমুরডো যে আখড়ার প্রথম সারির একজন সদস্য হিসেবে আখড়ার সমস্ত কার্যকলাপ সে জানবে কিংবা তাকে জানানো হবে। কিন্তু এটা আবিষ্কার করতে বেশি দেরি হল না তার যে, সংগঠন এখানকার অতি সাধারণ লজের থেকেও অনেক বেশি বিস্তৃত, অনেক বেশি জটিল। এমনকী এমন অনেক ঘটনা পরে এই আখড়ার সকলের নজরে এল, যা বস্ মিকগিনটিরও জানা ছিল না৷ একজন বড় মাপের সদস্যের নাম কানে এল মিকমুরডোর, কাউন্টি ডেলিগেট; বোঝাই যায় এটা তার আসল নাম নয়, উপাধিমাত্র। হবসনের ঠেক তার এলাকার নাম, মিকগিনটির আখড়া থেকে বেশ দূরে, যার নিয়ন্ত্রণে আরো অনেক আখড়া বা লজ, আর সেই আখড়াগুলোকে এই মহা-সদস্য পরিচালনা করে তার নিজস্ব কায়দায়। শুধুমাত্র এক মাথা পাকা চুল, ইঁদুরের মতো কুতকুতে চোখ, একটু খুঁড়িয়ে হাঁটার ধরন, আর কারোর দিকে তাকানোর ভঙ্গি সোজাসুজি নয়, আড়চোখে, আর দৃষ্টিতে যেন শানিয়ে ওঠে বিদ্বেষ। তার প্রকৃত নাম হল, ইভানস্ পোট্; ভারমিস্সার দোর্দণ্ডপ্রতাপ সর্দার-কাউন্সিলরও বেশ সমীহর সঙ্গে কথা বলে। যদিও পেছনে তাকে গালি দেয় এবং ভেংচি কাটে।

একদিন স্ক্যানলান, যে মিকমুরডোর পাশের ঘরেই থাকে, একটা ছোট চিঠি পেল মিকগিনটির কাছ থেকে; তার চিঠির সঙ্গে সে পাঠিয়েছে ইভানস্ পোটের একটা চিঠি, যা পড়ে জানা গেল যে, সে (ইভানস্) দুজন উপযুক্ত লোককে পাঠাচ্ছে, ল-লার আর অ্যানড্রিউস, যাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাওয়ার জন্য মিকগিনটির এরিয়ায়। এই দুজনের কাজটা যে কী সে সম্বন্ধে অবশ্য মিকগিনটি কিছুই জানে না৷ সর্দার মিকগিনটির শুধু দায়িত্ব ওই দুজনের আরামে থাকার ব্যবস্থা করা, যতদিন না তারা কাজটা সাঙ্গ করবে। তার চিঠিতে মিকগিনটি আরও লিখেছে যে, ইউনিয়ন হাউসে অচেনা লোকদের রাখলে তাদের নিয়ে অন্যান্য সদস্যেরা কৌতূহলী হয়ে পড়বে; গোপন বলে কিছু থাকবে না। সেই কারণেই মিকমুরডো ও স্ক্যানলানকে তার অনুরোধ তাদের বোর্ডিং-হাউসে দুজনকে আশ্রয় দেওয়ার৷

সেদিন সন্ধেবেলা, দুজন লোক পৌঁছে গেল, দুজনের হাতেই দুটো ব্যাগ৷ ল-লার বয়স্ক, দেখেই বোঝা যায় বেশ ধূর্ত, চুপচাপ এবং খুব একটা কথা-টথা বলে না। পরনে পুরোনো কালো কোট, মাথায় ফেল্ট টুপি আর এক মুখ অযত্নে বেড়ে-ওঠা ধূসর দাড়ি। তার সঙ্গী, অ্যানড্রিউস একেবারেই কম বয়সের যুবক, হাসিখুশি; কথা বলে টুকটাক, মজার৷ তার ভাবভঙ্গী দেখে মনে হয় বেশ ফূর্তিতে আছে সে, যেন ছুটি কাটাতে এসেছে এরকম ভাবভঙ্গী। দুজনের কেউই মদ ছোঁয় না, বলতেই হবে আখড়ার সদস্য হিসেবে তারা বেশ মার্জিত ও ভদ্র। অতীতে তারা আখড়ার স্বার্থে কী কী কাজ করেছে, বেশ গলা তুলে, কিঞ্চিৎ অহঙ্কারের সঙ্গে শোনাচ্ছিল; কিন্তু এখানে কী কাজ করতে এসেছে, সে ব্যাপারে একটা কথাও বলল না।

কিন্তু মিকমুরডো এবং স্ক্যানলান সহজে হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। দুজনে ঠিক করল কী কীর্তি তারা করতে এসেছে এখানে, সে ব্যাপারে অবশ্যই নজর রাখবে। সেই কারণেই, পরদিন খুব ভোরে, মিকমুরডো যখন শুনল যে দুজনে পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে, সে তাড়াতাড়ি স্ক্যানলানকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল এবং দুজনে দ্রুত তৈরি হয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে দুজনেই দেখল বোর্ডিংয়ের দরজা খোলা। ভোরের অস্পষ্ট আলোতে তারা দেখতে পেল দুজন আগন্তুক রাস্তায় নেমে হাঁটছে। মিকমুরডো ও স্ক্যানলান বেশ দূরত্ব রেখে তাদের অনুসরণ করছিল, রাস্তার পুরু বরফের ওপর দিয়ে এত সতর্কভাবে হাঁটছিল যাতে কোনো শব্দ না হয়।

একটা তেমাথার কাছে একটু দাঁড়াল ওরা দুজন, সেখানে তিনজন অচেনা লোক অপেক্ষা করছিল; দেখা হতেই পাঁচজন কিছু বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল। তারপর পাঁচজনই একসঙ্গে হাঁটতে লাগল। অনুসরণকারী দুজন বুঝতে পারছিল এমন কোনো কাজে তারা এসেছে, যাতে লোকবল লাগে। একটা জায়গা থেকে বেশ কিছু সরু রাস্তা বেরিয়ে গেছে, এক একটা রাস্তা গেছে এক-একটা খনির দিকে। পাঁচজনের দল সেই রাস্তাটা ধরল যেটা চলে গেছে ক্রো-হিল্ খনির দিকে। এই নীরস অঞ্চলে এই খনিটা দারুণ চলছে। এই খনির প্রশাসন বেশ জবরদস্ত লোকদের হাতে, এবং ইংল্যান্ড থেকে সম্প্রতি এই উপত্যকায় আসা নতুন ম্যানেজার, জোসিহা এইচ. দুন্, অত্যন্ত কড়া ধাতের মানুষ। এই উপত্যকার যতই অখ্যাতি থাক, সেসব গ্রাহ্যের মধ্যেই আনেন না মি. দুন্। খনি-শ্রমিকদের কাজে ফাঁকি-দেওয়া, শৈথিল্য, যখন তখন সামান্য কারণে আন্দোলন করে খনির কাজ বন্ধ করে দেওয়া, ‘এসব তিনি একেবারে বরদাস্ত করেন না, অরাজকতা দেখলেই কড়া হাতে তার মোকাবিলা করেন।

সূর্যের উদয় হয়েছে। শুরু হতে চলেছে একটা কাজের দিন, শ্রমিকেরা লাইন দিয়ে খনির দিকে এগোচ্ছে।

মিকমুরডো এবং স্ক্যানলান শ্রমিকদের ভিড়ের মধ্যে চট্ করে ঢুকে পড়ল, নজরে রাখল সেই পাঁচজন লোককে৷ কোথায় চলেছে ওরা? কী উদ্দেশ্যে? একটা গোলমাল বাধাবে মনে হচ্ছে! পুরু কুয়াশা ভেসে এল, তা ভেদ করে ভেসে এল সাইরেনের তীব্র-তীক্ষ্ণ আওয়াজ। দশ মিনিট বাজল সাইরেন, তারপরই খাঁচায় খনির গভীরে নেমে যাবে শ্রমিকেরা। প্রায় একশো শ্রমিকের একটা দঙ্গল অপেক্ষায়, একবার করে খাঁচা পাতাল থেকে উঠে আসবে আর তার হাঁ-এর ভেতর শ্রমিকদের নিয়ে পাতালেই নেমে যাবে। পাঁচজন অচেনা ব্যক্তির সেই দল ইঞ্জিন-হাউসের আড়ালে বেশ ভালোই আত্মগোপন করেছে। শ্রমিকদের ভিড়ে টুপিতে যতটা পারা যায় মুখ ঢেকে, মিকমুরডো এবং স্ক্যানলান লক্ষ্য রাখছে তাদের দিকে। খনি ইঞ্জিনিয়ারকে হেঁটে আসতে দেখা গেল। বুক পর্যন্ত ঝোলা দাড়ি, স্কটল্যান্ডের অধিবাসী, নাম মেনজিস, সে হুইসল বাজাল যাতে খাঁচার আসা-যাওয়া এবং শ্রমিকদের পাতালে নেমে যাওয়ার মধ্যে একটা শৃঙ্খলা থাকে। হুইসল বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে একজন হৃষ্টপুষ্ট ম্যানেজার এনজিন-হাউস থেকে নেমে এল। সে এবার শ্রমিকদের লাইনে শৃঙ্খলা বজায় রেখে দাঁড়িয়ে থাকার আদেশ দেবে এবং প্রত্যেকবার খাঁচায় কজন করে শ্রমিক পাতালে নামছে তার হিসেব রাখবে।

সেই মুহূর্তে, ছিপছিপে চেহারার এক যুবক, চকচকে মুখ, গম্ভীর মুখে এগিয়ে গেল খনিতে নামবার মুখে। সেখানে অপেক্ষারত শ্রমিকেরা, তাদের মুখে কোনো কথা নেই, পায়ে গতি নেই, কাঠের পুতুলের মতো অপেক্ষায় কখন খাঁচা আসবে, তারা নেমে যাবে খনিগহ্বরে৷ যুবককে দেখে আগুয়ান ম্যানেজার চমকে উঠল। সে কি বুঝতে পেরেছিল মৃত্যুর হাঁ এগিয়ে আসছে তার দিকে। তারপরই অবশ্য ম্যানেজার তার মনের জড়তা ঝেড়ে ফেলে যুবকের দিকে এগিয়ে এল; চোখ লাল করে জানতে চাইল, ‘কে তুমি? এখানে ঘুরে মরচ কেন?’

উত্তর এল না। সেই কিশোর অ্যানড্রিউজ এক পা এগিয়ে গেল, ফায়ার করল, গুলিটা লাগল ম্যানেজারের পেটে। অতজন শ্রমিক যেমন নিস্পন্দ, নির্বাক দাঁড়িয়েছিল, সেরকমই রইল। ম্যানেজারের চোখদুটো যেন বিস্ময়ে ঠেলে বেরিয়ে আসছিল; পেট থেকে ফিনকিতে রক্ত বের হচ্ছে। দুই-হাতে পেট চেপে সে রক্ত বন্ধ করতে চাইল। পড়ে যাবার আগে টলছিল। সেই মুহূর্তে পাঁচজনের আর একজন এগিয়ে এসে গুলি করল। এবার ম্যানেজার মাটিতে পড়ে গেল, দেহটা কয়েক মুহূর্ত কেঁপে উঠল, তারপর স্থির হয়ে গেল। স্কচম্যান, মেনজিস এই দৃশ্য দেখে গর্জন করে উঠল ক্রোধে, একটা লোহার কোদাল উঁচু করে এগিয়ে এল হত্যাকারীদের দিকে। তাকেও মুহূর্তে গুলি করা হল মুখে, তারও মুখ দিয়ে কোনো আর্তনাদ বের হল না। বিশাল চেহারার সেই ব্যক্তি ধুপ করে পড়ে গেল দুষ্কৃতিদের পায়ের কাছে।

এবার অবশ্য শ্রমিকদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিল। দল বেঁধে, চিৎকার করে তারা ছুটে আসছিল পাঁচজন দুষ্কৃতির দিকে। এবারে তারা এলমেলো গুলি ছুঁড়তে লাগল আকাশের দিকে৷ ভয় পেয়ে পেছিয়ে গেল শ্রমিকের দল। এবং সেই চেঁচামেচি, ঠেলাঠেলির সময়ে, সকালের ঘন কুয়াশায় পাঁচ গুণ্ডা কোনদিকে যে পালাল তা বোঝা গেল না। ইতিমধ্যে খনিতে বিপদের সাইরেন বেজে উঠেছে, অফিস থেকে দলে দলে নিরাপত্তারক্ষীরা ছুটে আসছিল; কিন্তু সব তৎপরতাই বৃথা গেল। পাঁচজনকে ধারে কাছে পাওয়াই গেল না। মুহূর্তে তারা অদৃশ্য!

সুযোগ বুঝে স্ক্যানলান আর মিকমুরডো নিজেদের আস্তানার রাস্তা ধরল। স্ক্যানলানের মুখটা গম্ভীর, কাঁদো-কাঁদো। সে বেচারি কোনোদিন চোখের সামনে কাউকে খুন হতে দেখেনি। মিকমুরডো চিন্তিত, একটাও কথা বলছে না৷

বোর্ডিং-হাউসের কাছাকাছি এসে সে বলল, ‘অন্য অঞ্চলের গুণ্ডারা এসে আমাদের অঞ্চলে খনির দুজন অফিসারকে দিনের বেলায় এভাবে খুন করে গেল৷ আমাদের কাছে এসব ব্যাপারে কোনো খবরই ছিল না! সর্দার মিকগিনটি নিজেও জানতেন না, কেন লোকদুজনকে আশ্রয় দেবার কথা বলা হয়েছিল।’

সেদিন রাতে ইউনিয়ন-হাউসে খুব চেঁচামেচি হল। সবাই ক্ষুব্ধ। বাইরে থেকে এসে একটা গ্যাং ক্রো-হিল্-মাইনের দুজনকে খুন করে গেল, অথচ এই আখড়ার দলপতি এবং অন্যান্য সদস্যরা এ-বিষয়ে কিছুই জানে না। এর ফল, ভারমিস্সা আখড়ার পক্ষে মারাত্মক। কারণ পুলিশের সব সন্দেহ এসে পড়বে তাদের ওপর।

কিন্তু কাউন্টি ডেলিগেট ইভ্যানস্ দেখা গেল অন্য ধাতুর মানুষ। সে পাঠিয়েছিল পাঁচ জন সদস্যকে ওই খনিতে খুনখাবারি চালাতে। এবার সে মিকগিনটিকে অনুরোধ পাঠাল যে, ভারমিস্সা আখড়ার তিনজন দক্ষ সদস্যকে পাঠানো যেতে পারে তার অঞ্চলের খনি ‘স্টেক রয়্যালের’ জনপ্রিয় মালিক উইলিয়ম হেলস্কে খুন করার জন্যে। উইলিয়মের জনপ্রিয়তা এই কারণে যে তিনি প্রায় অজাতশত্রু। শুধু শ্রমিকদের মুখে রক্ত তুলে খাটিয়েই মারেন না; তাদের এবং তাদের পরিবারের মঙ্গলের জন্যে চিন্তাভাবনাও করেন। কিন্তু কোনো শ্রমিককে যদি তিনি দেখেন, খনির কাজে ফাঁকি দিতে, কাজের সময় মদ খেয়ে বেলেল্লাপনা করতে, তাহলে তিনি তাদের একেবারেই প্রশ্রয় দেন না, প্রয়োজন হলে ছাঁটাই করে দেন সেইসব অবাধ্য, ফাঁকিবাজ শ্রমিকদের। এরকমই কয়েকজন অলস এবং মাতাল শ্রমিকদের তিনি মজুরি বন্ধ করে দিয়েছেন, সাসপেনড্ করেছেন তাদের। ফলে সেই শ্রমিকেরা যে আখড়ার সদস্য (ইভানসের আখড়া) সেই আখড়া থেকে তাঁর অফিসের দরজাতে মৃত্যু-সমন জারি করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, তিনি যদি অবিলম্বে ওই সাসপেনডেড শ্রমিকদের খনির কাজে বহাল না করেন, তাহলে তাঁকে হত্যা করা হবে। অসমসাহসী উইলিয়ম সেই মৃত্যু-পরোয়ানায় একেবারেই ভয় পাননি, গ্রাহ্য করেননি সেই ভীতি-প্রদর্শন।

উইলিয়ম হেলসকে খুন করার দায়িত্ব পড়ল মিকগিনটির আখড়ার ওপর। তিনজন সদস্যকে নির্বাচন করা হল এই হত্যাকাণ্ডের জন্য। টেড বলডউইন, যে ইদানিং বডিমাস্টারের পাশের চেয়ারটাতেই মুরুব্বীর ভঙ্গিতে বসে থাকে, তাকে দেওয়া হল সেই হত্যাকাণ্ডের মূল দায়িত্ব৷ ইদানিং সে মদ্যপান চূড়ান্ত মাত্রায় বাড়িয়েছে, রাতে বোধহয় নিদ্রাহীনতায় ভোগে; তাই তার মুখ বিশ্রীভাবে ফুলে থাকে, চোখদুটো হয়ে থাকে রক্তজবা-লাল৷ দুজন সদস্যকে নিয়ে তারা রওনা দিল, পাহাড়ের দিকে।

খুব খারাপ আবহাওয়া সত্ত্বেও একেবারে সামনাসামনি পরপর গুলি করল সেই জনপ্রিয় খনি-মালিককে৷ ঘটনাস্থলে মৃত্যু হল সেই হতভাগ্য মালিকের। তিনজন ফিরে এল ভারমিস্সা উপত্যকায় বুক ফুলিয়ে, বডিমাস্টার নিজে এবং অন্য সদস্যরা তাদের নিয়ে খুব নাচানাচি করতে লাগল। সবাই শুনতে চাইল, সেই কঠিন কাজটা কীভাবে করল তারা। টেড বলডউইন যা কিছু ঘটেছে তা অতিরঞ্জিত করে রীতিমতো নাটকের ভঙ্গীতে বলতে লাগল। আর সেই বানানো গল্প শুনে অন্য সদস্যদের কী হাসি আর উল্লাস।...ওরা চারজন লুকিয়ে ছিল টিলার আড়ালে। সন্ধের পর খনি-মালিক ঘোড়ায় টানা গাড়িতে সেই রাস্তা দিয়েই বাড়ি ফিরবে। টিলার সামনের রাস্তাটা এতই খারাপ, এতই এবড়ো-খেবড়ো যে, ঘোড়াদের পা স্লিপ করতে পারে। মালিককে প্রতিদিনই সামান্য একটু হেঁটে খারাপ রাস্তাটা পেরোতে হয়। কোচোয়ান ঘোড়াদের সাবধানে রাস্তাটা পার করে গাড়িসহ। এরকম খবর ছিল বলেই বলডউইন তার দলবল নিয়ে ঠিক ওই জায়গাতেই টিলার আড়ালে ওত পেতে ছিল। খারাপ রাস্তাটা আসতেই মালিক গাড়ি থেকে নেমে হাঁটছে। প্রচণ্ড শীত। তাই ফারের ওভার কোট ছিল মালিকের গায়ে। ওরা তিনজন মালিককে ঘিরে ধরে। মালিক ফার-কোটের পকেট থেকে রিভলভার বের করেছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে টেড অব্যর্থ লক্ষ্যে তার হাতে গুলি করে। তারপর অসহায় মালিককে তিনজন আততায়ী ঘিরে ধরে। প্রচণ্ড মারধর করা হয় তাকে৷ মালিক নাকি টেডের পা জড়িয়ে ধরে। প্রাণ-ভিক্ষা চায়। সেদিকে কান না দিয়ে তিনজন পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক গুলি করে মালিককে। তারপর তাদের আখড়ার নেতা মিকগিনটির শ্লোগান দিতে দিতে তারা অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। নিঃসন্দেহে এই গল্পটা টেডের অতিরঞ্জন। আসলে যেটা হয়েছিল, মালিক গাড়ি থেকে নেমে যখন হাঁটছিল, ওরা তিনজন পেছন থেকে একযোগে গুলি করে এবং তাড়াতাড়ি পালিয়ে আসে।

কেউ কেউ হাসতে হাসতে টেডকে বলল, ‘দেখি ওই জায়গাটা ড্রামা করে দেখাও মালিক কীভাবে তোমার পা জড়িয়ে ক্ষমা চাইছিল। টেড সেই মিথ্যেটা অভিনয় করে দেখায়। সতীর্থরা হেসে গড়িয়ে পড়ে।

মিকমুরডো মিথ্যে কথাগুলো একপাশে দাঁড়িয়ে শুনছিল, বার-এর একজন কর্মচারি এসে খবর দিল, বস মিকগিনটি ডাকছে। সে কাউনসিলরের ঘরে ঢুকতে মিকগিনটি তাকে পাশের চেয়ারে বসাল। ঘরে আর কেউ ছিল না। মিকমুরডোর কাঁধে হাত দিয়ে বস্ বলল, ‘শোনো ব্রাদার, আমি একটা কাজের কতা ভেবেচি, যেটা তুমি ছাড়া আর কেউ করতে পারবে না।’

‘শুনে গর্ব বোধ করছি, বস্...’

‘কাজটা বলি?’

‘হ্যাঁ, কাউন্সিলর...’

‘দুজন লোককে, মানে আমাদের আখড়ার ব্রাদারদের তোমার সঙ্গে দেব৷ একজনে নাম ‘ম্যানডারস আর একজন রিলি। কীভাবে তোমাকে সাহায্য করতে হবে সে ব্যাপারে আমি ওদের ট্রেনিং দিয়ে দিয়েছি। কিন্তু অপারেশানটা লিড্ করবে তুমি...’

‘অপারেশান?’

‘হ্যাঁ...এই জেলাতে চেস্টার উইলক্স তার রাজত্ব নিয়ে বেশ গেঁড়ে বসেছে৷ আমাদের লজের সব সদস্য তোমাকে টুপি খুলে ধন্যবাদ জানাবে যদি এই লোকটাকে তুমি পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে পারো।’

‘এই কাজে আমি আমার সবটা দেব বস্। এখন বলতে হবে লোকটা কে এবং তাকে কোথায় পাওয়া যাবে?’

মিকগিনটি ঠোঁটের কোণে সিগারে লম্বা টান দিয়ে এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে সিগার ছাইদানিতে রাখল, তারপর টেবিলে রাখা প্যাড থেকে একটা সাদা পাতা তুলে একটু এলমেলো ডায়াগ্রাম আঁকতে লাগল৷

‘লোকটা হল আয়রন ডিক কোম্পানির চিফ ফোরম্যান। লোকটা ইদানিং বেশ তালেবর হয়ে উঠেছে। যুদ্ধফেরত লোক। সেজন্যে নিজেকে বেশ কেউকেটা মনে করে। আমাদের আখড়ার যেসব ব্রাদার ওই কোম্পানিতে শ্রমিকের কাজ করে, তাদের ওপর লোকটা খুব ছড়ি ঘোরায়৷ কাউকে ডিউটি দেবে, কাউকে দেবে না, বসিয়ে রাখবে৷ কেউ হয়তো একদিন অ্যাবসেন্ট হল, তার সেদিনের পে-কাট করে দেবে৷ অনেকদিন ধরে আমাদের লোকদের এরকম একপেশে অত্যাচার করে চলেচে। আমরা দুবার তাকে মারার চেষ্টা করেচি৷ কিন্তু নো লাক৷ বরং দ্বিতীয় অপারেশানের সময় আমাদের সদস্য জিম কারনাওয়ে লোকটার গুলিতে কবরে চলে গেল। এবার তোমার ওপর ভার দিলুম। এই হচ্ছে তার বাড়ি, সামনের রাস্তাটা যেমন এঁকেচি সেরকম সোজা চলে গেচে। রাস্তার নাম ‘আয়রন ডাইক ক্রসরোড৷ লোকটাকে বেকায়দায় ফেলতে গেলে দিনের বেলা সুবিধে হবে না৷ ডেনজারাস লোক। এক্স-আরমি-ম্যান। তাই কোমরে দুটো পিস্তল নিয়ে ঘোরাফেরা করে৷ হাতের টিপ সাংঘাতিক। বিপদের আঁচ পেলেই কোনো কথাবার্তায় যাবে না, পিস্তলের ঘোড়া টিপে দেবে। কিন্তু রাতে লোকটা ভদ্র নাগরিক-জীবনযাপন করে৷ সঙ্গে বউ, তিন বাচ্চা আর একজন হাউসকিপার৷ এরকম হতে পারে যে, ওকে মারতে গিয়ে তোমাকে ওর ফ্যামিলিকেও মারতে হবে, কিছু করার নেই৷ মারতে হবে! যদি ওর বাড়ির বন্ধ দরজার সামনে এক বস্তা বারুদ রেখে দেশলাই জ্বালিয়ে দাও, তাহলে সবাই মিলে পুড়ে মরবে।’

‘লোকটা আমাদের কী ক্ষতি করেছে?’

‘একটু আগে বললুম না আমাদের জিমকে গুলি করে মেরেচে?’

‘গুলি করল কেন?’

‘জিমকে পাঠিয়েছিলাম রাতে ওর বাড়িতে ওকে সাবাড় করে দেবার জন্যে। কিন্তু জিমের উপস্থিতির আঁচ পেয়ে লোকটা গুলি চালায়। সাংঘাতিক টিপ৷ গুলিটা জিমের বুকে এসে লাগে। আপাতত এটুকুই তোমাকে জানালুম। বদমাশটাকে চিরতরে কবরে ঘুম পাড়িয়ে দেবার দায়িত্ব তোমার।’

‘একজন স্ত্রীলোক আর দুজন বাচ্চা আছে। তাদেরকেও হিসেবের মধ্যে রাখতে হবে।’

‘রাখতে তো হবেই। লোকটা তার পরিবারকে বাঘের মতো আগলে রাখে।’

‘বিনা কারণে নিষ্পাপ মহিলা ও বাচ্চাদের খুন করা একটু কঠিন। বুকে বড় লাগে!’

‘বোকার মতো কথা বলচ? কাজটা করবে না?’

‘টেক ইট ইজি...কাউন্সিলর! আপনার নির্দেশ আমি মানব না?’

‘কাজটার দায়িত্ব নিচ্ছ?’

‘অবশ্যই।’

‘কখন?’

‘আমাকে দুটো রাত দিন আপনি। বাড়িটা গোপনে দেখে আসি, তারপর মতলব কষব।’

‘দারুণ! দারুণ!’ মিকগিনটি তার সঙ্গে করমর্দন করল। ‘এ ব্যাপারে সব দায়িত্ব আমি তোমার ওপর ছেড়ে দিচ্চি। যেদিন ভালো খবরটা নিয়ে আসবে, সেদিনই আমরা সেলিব্রেট করব। এই ফোরম্যান লোকটাকে সরাতে পারলেই ওই কোম্পানির সবাই আমাদের সামনে হাঁটু মুড়ে বসবে।’

মিকমুরডো কদিন ধরে কাজটা নিয়ে ভাবল। তার কাঁধে বেশ গুরুদায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হল। চেস্টার উইলকক্সের-এর বাড়িটা শহর থেকে একটু দূরে। অন্তত পাঁচ মাইল দূরে সংলগ্ন এক উপত্যকার ভিতর। সেদিন রাতেই সে একাই চলে গেল বাড়িটার অবস্থান দেখতে, কাজটা কেমন ভাবে করতে হবে তার মোটামুটি চাক্ষুষ পরিকল্পনা করতে। ভোরের খানিক আগে, প্রাথমিক নিরীক্ষা শেষ করে সে ফিরে এলো নিজের ডেরায়। পরের দিন, আখড়ার যে দুজন সদস্য তার সঙ্গে কাজটা করতে যাবে, তাদের নিয়ে বসল একটা ঠেকে। কথাবার্তা বলে ছোকরা দুজনের মনোভাব বুঝতে চাইল। ম্যানডারস আর রিলি, দামাল দুই ছোকরা। তারা তো খুন-টুন করতে যাবে। এসব শুনে আহ্লাদে আটখানা। যেন ব্যাপারটা হরিণ শিকারের মতন।

দু-দিন বাদে, তিন দিনের রাতে তারা তিনজন জড়ো হল শহরের বাইরে এক জায়গায়। তিনজনেই সশস্ত্র। একজনের হাতে বাড়তি একটা বস্তা, ভর্তি বারুদে, খনির কাজে ব্যবহার করা হয় যে বারুদ। রাত দুটো নাগাদ তারা বাড়িটার কাছে এল। ঝোড়ো হাওয়ার রাত, আকাশে কাস্তে-চাঁদ, মাঝে মাঝে উড়ন্ত মেঘে তার মুখ ঢেকে ফেলছে। ওই বাড়িতে পাহাড়ায় থাকে দুটো বিশাল ব্লাড হাইন্ড কুকুর, এ-খবর আছে তাদের কাছে; সুতরাং সতর্কভাবে তারা বাড়িটার দিকে এগোতে লাগল, পিস্তলের ট্রিগারে আঙুল রেখে। কিন্তু বাড়িটা একেবারে চুপচাপ, জনপ্রাণীর সাড়া-শব্দ নেই; শুধু ঝোড়ো বাতাসের সোঁ-সোঁ আওয়াজ, আর বাড়ির চারপাশে গাছগুলো দুলছে সেই বাতাসের এলমেলো ছন্দে।

মিকমুরডো কান পাতল বাড়ির দরজায়; কিন্তু মনে হল বাড়ির ভেতরে সব চুপচাপ৷ এবার যেটা করা হল, মারাত্মক কাজ। বারুদের বস্তা ঠেকিয়ে রাখা হল দরজাতে, ছুরি দিয়ে মিকমুরডো খ্যাঁ-চ-চ্ করে বস্তার মুখ খুলে ফেলল। আর জ্বলন্ত দেশলাইকাঠি ফেলে দেওয়া হল বস্তার বারুদের ভেতর৷ তারপর তিনজন ছুট লাগাল দূরে, একটা বড় গর্তে লাফিয়ে পড়ে অপেক্ষা করতে লাগল বিস্ফোরণের জন্যে। কয়েক মুহূর্ত বাদেই অবশ্য শোনা গেল, বিস্ফোরণের বিকট শব্দ! আগুন ধরে গেল অতবড় বাড়িটাতে। কাঠের বাড়ি তাই আগুনের শিখা লকলকিয়ে ছড়িয়ে পড়ল সারা বাড়িতে৷ তিনজনের চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল বাড়ি। নিখুঁত কাজ৷ আখড়ার রক্তাক্ত ইতিহাসে, এত কুশলী কাজের নমুনা খুব কমই আছে।

কিন্তু এটা তো ঠিক, যে অত পরিকল্পিত, সাহসের সঙ্গে পরিচালিত কাজ সবটাই বৃথা গেল! কোনোভাবে সাহেবের কাছে খবর চলে গিয়েছিল যে তাকে পরিবারশুদ্ধ নিধনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এখানকার নিষ্ঠুর বোম্বেটেদের জানতে বাকি ছিল না সাহেবের৷ তিনি জানেন উপত্যকার দূর-দূরান্তে কয়লা-খনির কত সাহসী এবং একগুঁয়ে মালিকদের ওদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। তাই একদিন আগেই পরিবার আর লটবহর নিয়ে তিনি গা-ঢাকা দিয়েছেন নিরাপদ কোনো জায়গায়, সেখানে পুলিশের পাহারায় নাকি দিব্যি আছেন। মিকমুরডো ও আরও দুজন ফাঁকা বাড়িকেই ধ্বংস করে চলে এসেছে।

‘ধূর্ত লোকটার ভার আমার ওপর ছেড়ে দিন কাউন্সিলর; ও ছাড়া পাবে না আমার হাত থেকে। বছর খানেকের মধ্যেই ওর ভবলীলা সাঙ্গ করব আমি।’ মিকমুরডো জানিয়েছিল মিকগিনটিকে। ‘তোমরা যা করেছ ব্রাদার, যথেষ্ঠ, যথেষ্ঠ।’ হেসে মিকগিনটি বলেছিল। সেদিন রাতে সবাই মদ খেয়ে খুব নাচাগানা করেছিল। সেটা নাকি মিকমুরডো ও তার কমরেডদের সম্মানে। কয়েক সপ্তাহ বাদে অবশ্য সংবাদপত্র থেকে জানা গেল, উইলক্সকে গুলি করে মারা হয়েছে। এটা যে মিকমুরডোরই কাজ সেটা বুঝতে বাকি রইল না সর্দারের।

এরপর ভারমিস্সা আখড়ার বোম্বেটেদের একের পর এক ভয়ঙ্কর কীর্তিকাহিনি সেই অঞ্চলের ইতিহাসেই লেখা রইল৷ পুলিশ-অফিসার হান্ট ও ইভ্যানস্ খুব ধর-পাকড় চালাচ্ছিল মিকগিনটির শাকরেদদের। একদিন তাদের দুজনকে কুকুরের মতো গুলি করে মারা হল। মি. লারবে, একজন খনি-মালিক এবং তার স্ত্রীকে গুলি করে মারা হল, বুড়ো জেনকিনসকে গলা কেটে হত্যা করা হল, জেমস মারডকের ধড়-মুণ্ড আলাদা করে কুচিকুচি কাটা হল, স্ট্যাপহাউস পরিবারকে বাড়ির মধ্যে আটকে রেখে বাড়িশুদ্ধ পুড়িয়ে মারা হল, তারপর শোনা গেল আরেকজন খনি-মালিক স্তাঁদালকে নৃশংসভাবে খুনের ঘটনা।

ভয়ের উপত্যকায় মরণের কুয়াশা থেকেই গেল৷ বসন্ত এল। প্রকৃতি সাজল রং-বেরং ফুলে। কিন্তু ভারমিস্সা উপত্যকায় শান্তি নেই। নিরীহ মানুষেরা সেখানে দিন কাটায় আতঙ্কে। ১৮৭৫ সালে, ভারমিস্সা উপত্যকা রূপ নিল কদর্য নরকের।

পরিচ্ছেদ ৬ঃ বিপদ! বিপদ!

আতঙ্কের আর ত্রাসের রাজত্ব তখন রমরমিয়ে চলছে। আখড়ার প্রশাসনিক স্তরে মিকমুরডো এখন বেশ উচ্চতায়। মিকগিনটির পরেই তার কর্তৃত্বভার। ঘটনাপ্রবাহ তার পক্ষেই এগিয়ে যাচ্ছে। এরকমও হতে পারে, অদূর ভবিষ্যতে সে হয়তো মিকগিনটির জায়গায় বডিমাস্টারের পদ পেতে পারে। এখন সে রাস্তায় বের হলে, আখড়ার অন্যান্য সদস্যরা তাকে সসম্মানে সেলাম জানায়৷ এদিকে ভারমিস্সা উপত্যকার সাধারণ নাগরিকেরা বোম্বেটেদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হতে শুরু করেছে। লজ অফিসে জোর গুজব যে, ‘হেরাল্ড’ পত্রিকার অফিসে সাংবাদিকরা ও সাধারণ নাগরিকেরা প্রায়ই গোপনে জড়ো হয়; পুলিশও নাকি তাদের সাহায্য করছে বড়-ছোট নানা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে। হয়তো কোনোদিন বোম্বেটেদের বিরুদ্ধে নাগরিকেরা সশস্ত্র সংগ্রাম ঘোষণা করবে। কিন্তু সর্দার মিকগিনটি এবং তার চ্যালারা এসব গুজবে কানই দেয় না। তাদের অস্ত্রের ভাণ্ডার অফুরন্ত। লোকবলও তাদের অনেক বেশি। নাগরিকেরা তো আর কোনোদিন মারামারি করেনি, বন্দুক-রিভলভারও চালায় না কথায় কথায়। আখড়ার পেশাদার গুণ্ডারা নাগরিকদের বিদ্রোহ নিয়ে অতটা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ নয়।

মে মাসের এক শনিবারের সন্ধ্যা। শনিবার মানেই আখড়ার অফিসে চলবে অবাধ হল্লা, অবাধ মদ্যপান, নাচা-গানা। গভীর রাত পর্যন্ত আশনাই চলবে। মিকমুরডো সন্ধের একটু আগে বের হচ্ছিল আখড়ার উদ্দেশে। হঠাৎ মরিস এসে হাজির৷ মরিসকে আখড়ার অন্য সদস্যেরা তত পাত্তা দেয় না৷ তাকে কোনো কাজও দেওয়া হয় না৷ বডিমাস্টার তাকে এখনও সন্দেহের চোখেই দেখে থাকে। মরিসকে দেখে বেশ বিভ্রান্ত লাগছিল।

‘কয়েকটা কথা বলতে পারি, মিস্টার?’

‘নিশ্চয়ই।’

‘আমি এখনও ভুলিনি যে, একদিন আমার মনের কথা তোমার কাছে উজাড় করে দিয়েছিলুম৷ তুমিও তোমার কথা রেখেচ৷ সেসব কথা ফাঁস করনি কারোর কাচে। বসকেও ম্যানেজ করে নিয়েছিলে।’

‘আমি কখনও কারোর সঙ্গে বেইমানি করিনি।

‘সেটা আমি বুঝেচি। সেই কারণেই তোমার সঙ্গে কথা বলতে এসেচি। গোপন কথা আচে একটা এখানে,’ সে নিজের বুকের দিকে আঙুল দেখাল। ‘সেই গোপন কথাটি কাউকে বলতে পারিনি বলেই আমার বুকটা জ্বলে যাচ্চে! তোমাকে বলে হালকা হতে চাই। এই গোপন কথা তুমি ছাড়া আর যদি কেউ জানতে পারে, তাহলে ওরা কুকুরের মতন গুলি করে মারবে আমাকে। আর যদি না বলি, তাহলে আমাদের রাজত্বের শেষ হবে। ভীষণ বিভ্রান্তির মধ্যে আছি আমি!’

মরিসের দিকে ভালোভাবে তাকাল মিকমুরডো। লোকটা ভয়ে জবুথবু, কাঁপছে! একটা গ্লাসে ব্র্যান্ডি ঢেলে সে দিল মরিসকে। ‘এটা ঢেলে দাও পেটে। তাজা বোধ করবে। এখন বলো তো শুনি তোমার গোপন কথা?’

এক চুমুকে মরিস ব্র্যান্ডি সাবাড় করে দিল। তার মুখের পাণ্ডুর ভাব কিছুটা কমল। ‘ছোট্ট একটা কথাই বলব তোমাকে।’ বলল মরিস, ‘একজন ডিটেকটিভ আমাদের দলের পেছনে লেগেচে।’

মিকমুরডোর চোখে বিস্ময়, কিছুটা কৌতুকও। সে বলল, ‘এই তোমার গোপন কথা?’ হাসল সে। ‘পুলিশ আর ডিটেকটিভ তো আমাদের পেছনে বরাবরই লেগে আছে। আজ পর্যন্ত কোনো ক্ষতি তারা করতে পেরেছে আমাদের?’

‘না, না, না; লোকাল কোনো লোক নয়। লোকাল পুলিশ আমাদের টিকিও ছুঁতে পারবে না। আমি জানি সেটা। তুমি কি পিনকারটনের কতা শুনেচ?’

‘খবরের কাগজে এদের বিষয়ে পড়েছি।’

‘তোমাকে আমি দিব্যি গেলে বলতে পারি, যখন একজন পিনকারটন্ তোমার পেছনে লাগবে, তুমি জানবে তোমার শেষ। এই দল সরকারি কর্মচারিদের দিয়ে তৈরি নয়। পিনকারটন্ হল একটা গোপন এজেন্সি, সিক্রেট এজেন্সি। আমেরিকান উঁচু স্তরের প্রশাসন এই এজেন্সিকে ভারমিস্সা আখড়ার পেছনে লেলিয়ে দিয়েচে। এরা নেকড়ের চেয়েও হিংস্র, শিয়ালের চেয়েও ধূর্ত। যার বা যাদের পেছনে লাগে, তাদের একেবারে শেষ করে দেয়। কোনো পিনকারটন্ গোয়েন্দা যদি সত্যিই আমাদের ধরতে এসেচে, তাহলে আমাদের শিরে সংক্রান্তি, সমূলে বিনাশ হব আমরা।’

‘সেই গোয়েন্দার পেট, ছুরি আর রিভলভারে ফাঁসিয়ে দিতে হবে।’

‘প্রথমেই তোমার খুন-খারাবির কথা মনে এল? তার মানে সর্দারকে আর আখড়ার সবাইকে তুমি গোপন কথা ফাঁস করে দেবে! তোমাকে আমি বললুম না যে খুনোখুনি শুরু হলে আমরাই মরব!’

‘খুনোখুনি মিকগিনটির আখড়ার কাছে কোনো ব্যাপার? এ অঞ্চলে খুনোখুনি, রক্তারক্তি তো লেগেই আছে?’

‘সেটা ঠিকই। তবু আমি বুঝে গেচি আমাদের সকলেরই মাথা এখন হাঁড়িকাটে৷ আমাদের দিন শেষ। যা ভাবচি কিংবা যা খবর পেয়েচি, এ লোক যদি সে লোক হয়, তাহলে সত্যিই বিপদ। হা ঈশ্বর, এখন কী করব আমি?’ মরিসকে খুবই অসহায় এবং ভীত লাগছিল।

মিকমুরডো আর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। মরিসের দুই কাঁধ ধরে সে ঝাঁকানি দিল। বলল, ‘শোনো হে মরিস-ভাই’, রাগে দাঁত কিড়মিড় করে সে বলল, ‘মেয়েদের মতো ঘরের কোণে লুকিয়ে বসে থাকলেই কি তুমি নিজেকে বাঁচাতে পারবে? সব জানাও তো আমাকে! লোকটা কে? থাকে কোথায়? তুমি তার সম্বন্ধে জানলে কীভাবে? আর জেনে আমার কাছেই বা এসেছ কেন?’

‘তোমার কাচে এসেচি দোস্ত, একটাই কারণে; তুমি হলে একমাত্র লোক যে আমাকে ঠিক পরামর্শ দেবে। আমি তোমাকে বলেছিলুম যে আগে আমি ফিলাডেলফিয়ায় থাকতুম। সেখানে কয়েকজন বন্ধু ছিল আমার। এখনও তাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। তাদের মধ্যে একজন টেলিগ্রাফ দপ্তরে কাজ করে। গতকাল সে আমাকে একটা চিঠি পাটিয়েচে। এই সেই চিটি। তুমিও পড়ে দেকতে পারো৷’ মিকমুরডো পড়তে লাগল’

তোমাদের অঞ্চলে দাঙ্গাবাজ, বোম্বেটেদের খবর কী? সংবাদপত্রে তো তাদের কীর্তিকলাপের কথা প্রায়ই পড়ি। তোমাকে একটা কথা জানাচ্ছি। এটা পাঁচ কান করে বেড়াবে না৷ পাঁচটি বড় কর্পোরেট অফিস আর দুটি রেলকোম্পানি এই দস্যুদের, খুনেদের নিকেশ করতে উঠে পড়ে লেগেছ৷ তারা পণ করেছে যে, হামলাবাজদের ভিটে-মাটি উচ্ছেদ করবে। পিনকারটন্ এজেন্সিতে তারা অনেক টাকা ঢেলেছে। পিনকারটন্ তাদের সবথেকে ধুরন্ধর, চতুর ও ওস্তাদ গোয়েন্দা, বার্ডি এডওয়ার্ডসকে তোমাদের অঞ্চলে পাঠিয়েছে। এরকমই শুনেছি। তাকে খুঁজে বের করো। নিকেশ করো তাকে। তা না হলে তোমাদের ভীষণ বিপদ।

‘আবার পরে টেলিগ্রাফের খানিকটা এসেচে। এই দেকো।’

যদিও, যা জানালুম তোমাকে তার কতটা সত্যি আমি জানি না৷ সবটাই কানাঘুষোতে শোনা। তবে যা রটে তার কিছুটা সত্যিও হয় বটে।

মিকমুরডো টেলিগ্রাফ হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। সবটাই কুয়াশাচ্ছন্ন তার মনে হল। সামনে ভয়ঙ্কর খাদ৷

‘আর কেউ এটা জানে?’ সে জিগ্যেস করল।

‘আর কাউকে বলিনি দোস্ত।’

‘তোমার এই বন্ধু, আর কাউকে এরকম লিখতে পারে?’

‘আরো দু-একজনকে সে অবশ্য চেনে।’

‘আমাদের আখড়ার?’

‘হতেও পারে।’

‘আমি কেন জিগ্যেস করছি জানো?’

‘কেন?’

‘এই গোয়েন্দা বার্ডি এডওয়ার্ডসকে কেমন দেখতে তার কিছুটা বর্ণনা হয়তো তোমার বন্ধু টেলিগ্রাফে অন্য কাউকে জানিয়েছে। সেই টেলিগ্রাফ দেখলে আমরা হয়তো কিছুটা বুঝতে পারতুম লোকটা কে। তাকে খোঁজ করতে পারতাম।’

‘সেটা সম্ভব বটে৷ কিন্তু আমার মনে হয় না, বন্ধু গোয়েন্দার চেহারা কেমন সেটা জানে। সে শুধু এদিক-ওদিক আলোচনায় যা শুনেচে আমাকে বলেচে। পিনকারটনের সেই লোককে সে চিনবে কীভাবে?’

মিকমুরডো উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠল।

‘শালাকে চিনতে পেরেছি আমি! কী বোকা আমি? এ্যাঁ, কী বোকা? ভাগ্যিস তুমি আমাকে টেলিগ্রাফের কথা জানালে! সে শালা কিছু করতে পারার আগেই তাকে পাকড়ে নেব আমি। মরিস তুমি একটা কাজ করবে?’

‘কী বস্?’

‘এই টেলিগ্রাফের কাগজ আমাকে দেবে?’

‘এখুনি নাও ভাই, এসব বিপজ্জনক জিনিস আমার কাচে রাখব না।’

‘তোমার নাম আমি কারোর কাছে করব না। তুমি এরকম ভয় পেয়ো না। আমি যাদের জানাব, তাদের এমনভাবে বলব যেন টেলিগ্রাফটা আমিই পেয়েছি। তাহলে তুমি খুশি?’

‘আমি ছা-পোষা লোক। বাধ্য হয়ে এদের দলে নাম লিকিয়েচি৷ আমার নাম যেন না জড়ায় বস্!’

‘তাহলে চুপচাপ থাকো। আর কারোর সঙ্গে এসব নিয়ে আলোচনা কোরো না। আমি কাউন্সিলরের অফিসে যাচ্ছি। সব জানাচ্ছি তাকে৷ পিনকারটন্ গোয়েন্দার পেট ফাঁসিয়ে দেব আমরা।’

‘লোকটাকে খুন করবে না তো?’

‘এসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না, ব্রাদার মরিস। কারোর সঙ্গে আলোচনা করবে না। বারবার সাবধান করে দিলাম। তুমি জড়িয়ে পড়বে তাহলে...’

‘আমি কোনো ঝুট-ঝামেলায় থাকতে চাই না।’

‘ঠিক আছে। তবে এই এজেন্সির খোচরকে আমরা ছাড়ব না৷ একে যদি বেশি খেলতে দিই, তাহলে ও আমাদের সর্বনাশ করে ছাড়বে৷ ব্রাদার মরিস, তুমি আজ আখড়ার সদস্যদের জন্যে কত ভালো কাজ করলে তুমি জানো না। পরের নির্বাচনে তোমার বডিমাস্টার হওয়া উচিত। তুমি আমাদের এভাবে বাঁচালে।’

মরিস চলে যাওয়ার পর, মিকমুরডো সত্যিই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে বসল। পিনকারটন্ এজেন্সি যে গোয়েন্দাকে ভারমিস্সা অঞ্চলের দাঙ্গাবাজদের ঠান্ডা করতে ফিল্ডে নামিয়েছে, এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে যথেষ্ঠ দুশ্চিন্তার কারণ আছে৷ যাই হোক, সে বাড়ির দরজাতে তালা লাগিয়ে বেরিয়ে পড়ল। একবার মনে হল, বুড়ো স্যাফটার-এর বাড়ি ঘুরে যাবে৷ বেশ কিছুদিন হল, এট্টির সঙ্গে কথা হয়নি। সামনের জানালায় টোকা মারতেই এট্টির অপরূপ মুখ। সে বাড়ির দরজা খুলে দিল। বুড়ো যথারীতি বাড়িতে নেই। সন্ধের দিকে সে বাইরে যায়। পরিচিতজনের সঙ্গে আড্ডা দিতে।

কিন্তু মিকমুরডোর মুখের দিকে তাকিয়েই এট্টি বলল, ‘কী হয়েছে জ্যাক? তোমার মুখ শুকনো!’

‘তেমন কিছু নয়, মিষ্টি মেয়ে। তবে এবার বোধহয় আমাদের পাততাড়ি গোটানোর সময় হয়েছে...’

‘পাততাড়ি...?’

‘মানে, যাবার সময় হয়েছে।’

‘কোথায় যাবার?’

‘সব ভুলে গেলে ডার্লিং? আমি তোমার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, একদিন তোমাদের দুজনকে নিয়ে এই জায়গা ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় চলে যাব। ভাবছি, এখন বোধহয় সেই সময় এসে গেছে। কিছুক্ষণ আগে একটা খারাপ খবর পেলাম...খুবই খারাপ। বিপদ এগিয়ে আসছে।’

‘পুলিশ?’

‘না পিনকারটন্...’

‘পিনকারটন্?’

‘তুমি এখন সবটা বুঝবে না ডার্লিং। কিন্তু তুমি বলেছিলে আমি যখন এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যাব, তুমি তোমার বাবাকে নিয়ে আমার সঙ্গে আসবে...।’

‘ওহ জ্যাক! তোমার সঙ্গে নিরাপদ জায়গায় চলে যাওয়া, এটাই তো আমার এতদিনকার স্বপ্ন!’

‘এট্টি, প্রিয়া আমার, আমি তোমাকে বারবার যে কথাটা বলতে চেয়েছি যে, আমি মনে-প্রাণে একজন সৎ মানুষ। আমি তোমাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছি। কোনো মালিন্য নেই আমার মনে, অন্তত তোমার ব্যাপারে। কেউ যদি তোমার হাতে একটা আঁচড়ের কারণ হয়, আমি তাকে ছারপোকার মতো টিপে মেরে ফেলব। নিজের মনের আয়নায় যে সোনার সিংহাসনে আমি তোমাকে বসিয়েছি, চিরকাল সেখানে তুমি অধিষ্ঠিত থাকবে। কোনোদিন অবিশ্বাস করবে না আমাকে, কোনোদিন না। বিশ্বাস রাখবে তো আমার ওপর?’

সুন্দরী তার হাত রাখল প্রেমিকের হাতে। এই মুহূর্তে হৃদয়ই আবেগে উতলা হয়। কথা ফুরিয়ে যায়। কিছুক্ষণ তারা এভাবেই বসে থাকে। মিকমুরডো এট্টির কপালে আলতো একটা চুমু এঁকে বলে, ‘বেশ, এখন তাহলে যা বলছি মন দিয়ে শোনো। আমি যা বলব ঠিক তাই করতে হবে তোমাকে। একমাত্র প্রশ্নহীনভাবে আমার কথা-অনুযায়ী কাজ করবে তুমি এবং তোমরা। এখন এটাই বাঁচার একমাত্র উপায়৷ এই উপত্যকায় সাংঘাতিক কিছু ঘটতে যাচ্ছে। হাড়ে হাড়ে আমি তা বুঝছি। যে-কোনো সময় এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যাব, তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাব। কিন্তু সেটা দিনেও হতে পারে, রাতেও হতে পারে। তোমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। আমি যখনই ডাক দেব–’

‘তুমি যেমন বলবে, সেভাবেই চলব জ্যাক।’

‘ঘুণাক্ষরেও কোনো কথা যেন কেউ জানতে না পারে।’

‘এ ব্যাপারে তুমি নিঃসংশয় থাকো জ্যাক। উদ্যত বন্দুক বা রিভলভারের সামনেও আমার আর বাবার মুখ দিয়ে একটা কথা বের হবে না। শুধু এই সত্য জেনে রাখো, আমি তোমাতেই সঁপেছি আমার প্রাণ-মন সব।’

কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে মিকমুরডো গিয়ে হাজির হল লজ বা আখড়ার অফিসে। খুব ভিড় আজ অফিসে। তামাকের ধোঁয়ায় চোখ জ্বলে যাবার জোগাড়। আর কানে আসছিল মদের পাত্রের টুং-টাং শব্দ। সবাই বেশ মেজাজে আছে মনে হল। একটা দারুণ চকচকে জামা পরনে, টোঁটে পাইপ বডিমাস্টার মিকগিনটি প্রকৃত নেতার মতো বসে আছে। চারপাশে স্তাবকদের ভিড়। নিষ্ঠুর মুখের, ক্রূর দৃষ্টির বলডউইন, শকুনের মতো উদাসীন শয়তান--হারাওয়ে, সচিব ও আরো প্রায় বারোজন সর্দারকে ঘিরে আমোদ-আহ্লাদ করছে। মিকমুরডো মনে মনে স্বস্তি পেল। নাটকীয়ভাবে খবরটা দেওয়ার জন্যে রঙ্গমঞ্চ প্রস্তুত।

‘এই তো আমাদের সবথেকে বুদ্ধিমান ব্রাদার এসে গেচে!’ হাসতে হাসতে বলল মিকগিনটি, ‘এখানে একটা তর্কাতর্কি চলচে, কেউ বিচারের বাণী উচ্চারণ করতে পারছে না। একজন সলোমনকে দরকার। সেটা তুমি ছাড়া আর কে হতে পারে?’

‘ব্যাপারটা খুলে বলি সর্দার? তা না হলে ওস্তাদ বিচার কীভাবে করবে?’ একজন স্তাবক বলল।

‘হ্যাঁ, বলো, বলো...,’ মিকগিনটি এক পেগ সোনালি রং মদ পুরোটাই ঢেলে দিল গলায়।

‘আসলে হয়েচে কী জানো জ্যাক মিকমুরডো? ল্যানডার আর ইগ্যান, আমাদের দুই সদস্য খুন করতে গেসল বুড়ো এবং বদমাশ খনি-মালিক মি. ক্র্যাকবিকে। দুজনেই বলচে প্রথম গুলি করে পেট ফাঁসিয়েচে বুড়োর। যে প্রথম গুলি করেচে তাকে সর্দার ইনাম দেবে। এখন বিচার করে দেকতে হবে কে আগে গুলি করেচে?’

মিকমুরডো চেয়ারে বসে ছিল। উঠে দাঁড়াল। তার মুখে একরাশ কালো মেঘের স্তূপ। তার মুখে সর্বদা লেগে থাকে যে উজ্জ্বল হাসি, কোথায় গেল আজ? তার গুরু গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে মিকগিনটিও বেশ অবাক হল।

‘কী ব্যাপার ব্রাদার? সিরিয়াস কিচু হয়েচে?’

‘মাননীয় বডিমাস্টার,’ আনুষ্ঠানিক ভঙ্গিতে, গম্ভীর স্বরে সে বলল, ‘খুব জরুরি একটা খবর আছে। কোনো রকম বাচালতাকে এখন প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।’

‘এ্যাই, কেউ কোনো আজেবাজে কতা এখন বলবে না!’ বজ্রকণ্ঠে মিকগিনটি বলল, ‘ব্রাদার, শোনাও কী খবর?’

মিকমুরডো টেলিগ্রাফের ছেঁড়া অংশ পকেট থেকে বের করল।

‘মাননীয় বডিমাস্টার এবং উপস্থিত ভাইসব,’ সে শুরু করল, ‘আজ আমি আপনাদের জন্যে বয়ে এনেছি খুবই খারাপ একটা খবর। কিন্তু আমি মনে করি, এটা সৌভাগ্য আমাদের যে, খবরটা আগেই আমি পেয়েছি এবং সঙ্গে সঙ্গে আপনাদের জানাতে পারছি; তা না হলে, আমাদের চূড়ান্ত বিপদে ফেলে দিত।

খবর আছে আমার কাছে যে, সবথেকে ক্ষমতাশালী এবং ধনী কর্পোরেট হাউসগুলো, রেল-কোম্পানির সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে আমাদের আখড়াকে উড়িয়ে দেবার মতলব করেছে। তারা পিনকারটন্ এজেন্সির সবথেকে চতুর, ধূর্ত এবং নিপুণ গোয়েন্দা, কে একজন বার্ডি এডওয়ার্ডসকে এই উপত্যকায় বহাল করেছে। তার কাজ হল, ছদ্মবেশে উপত্যকার মানুষের মধ্যে মিশে থেকে নানারকম সাক্ষ্য জোগাড় করা আমাদের বিরুদ্ধে। সেসব সাক্ষ্য পুলিশের হাতে পড়লে আদালতে খুব সহজেই আমাদের অনেকের বিরুদ্ধে সমাজবিরোধীতার অপরাধ প্রমাণ করা যাবে; এবং বিচারে আমাদের অনেককে পরতে হবে ফাঁসির দড়ি আর অনেককেই ভোগ করতে হবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এই দুঃসংবাদ দেবার জন্যেই আমি সবাইকে ইঙ্গিত করেছিলাম, চুপ করে আমার কথা শুনতে।’

সমস্ত অফিস নিঃশব্দ। পিন-পতনের আওয়াজও কানে আসবে। সেই নৈঃশব্দ ভাঙল মিকগিনটির গম্ভীর স্বরে।

‘ব্রাদার মিকমুরডো, তুমি যা শোনালে, তার স্বপক্ষে প্রমাণ কী আছে?’

‘যে চিঠি আমার হাতে এসেছে, সেটা পড়লেই সব সন্দেহের অবসান হবে।’ বলল আত্মবিশ্বাসী মিকমুরডো। সে চিঠিতে যা লেখা ছিল তা চেঁচিয়ে পড়ল। উদ্বেগে থমথমে মিকগিনটির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মাননীয় বডিমাস্টার, এই একটা প্রমাণই আমার কাছে আছে, যেটা আমি মনে করি একমাত্র মোক্ষম প্রমাণ। যা আমি নিজের চেষ্টায় জেনেছি, তার সবটাই আপনার ও সতীর্থদের কাছে হুবহু পেশ করলাম।’

‘মি. চেয়ারম্যান, একটা কথা বলার অনুমতি দেন,’ বয়স্ক একজন সদস্য বলল, ‘এই বার্ডি এডওয়ার্ডস সম্বন্ধে আমিও শুনেচি, এটা একেবারে ঠিক, পিনকারটন্ এজেন্সির সেই হল সবথেকে ধুরন্ধর গোয়েন্দা।’

‘লোকটাকে কেমন দেখতে কেউ জানে?’ জিগ্যেস করল মিকগিনটি।

‘হ্যাঁ,’ বলল মিকমুরডো। ‘আমি জানি।’

সভাকক্ষে বিস্ময়ের গুঞ্জন।

‘আমার বিশ্বাস সে আমাদের হাতের মুঠোর মধ্যেই আছে,’ বাঁকা হেসে বলল মিকমুরডো।’যদি আমরা বুদ্ধি খাটিয়ে, তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা নিতে পারি, তাহলে ওই বার্ডির কেরামতি আমরা খুব সহজেই থামিয়ে দিতে পারব। যদি চেয়ারম্যান, আপনি আত্মবিশ্বাসী থাকেন এবং আমাকে সাহায্য করেন, তাহলে ভয় করার কিছু নেই।’

‘ভয় করব আমরা কী কারণে? আমাদের সম্বন্ধে লোকটা কতটা জানে?’

‘আপনার মতো সাহসী এবং শক্তিশালী যদি আমরা সবাই হতাম, কাউন্সিলর সাহেব, তাহলে ভয় করার কিছু ছিল না। কিন্তু এই লোকটার জন্যে ক্যাপিটালিস্টরা লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করছে। টাকা দিয়ে বশ করা যায় অনেককেই। আমাদের আখড়া সদস্যদের মধ্যে যদি কাউকে কিনে নিতে পারে তাহলে তো কেল্লা ফতে! আমাদের সমস্ত গোপনকথা সে জেনে যাবে; এরকমও হতে পারে ইতিমধ্যেই জেনে গেছে। সুতরাং...’

‘সুতরাং?’

‘একটাই রাস্তা খোলা আছে...’

‘এই উপত্যকা ছেড়ে সে যেন পালাতে না পারে,’ বলল আর কেউ নয়, ব্রাদার বলডউইন।

মিকমুরডো হেসে ঘাড় নাড়ল। বলল, ‘তোবা, তোবা, ব্রাদার বলডউইন, তোমার সঙ্গে আমার অনেক কিছুতেই মেলে না। কিন্তু এইমাত্র তুমি যে কথাটি বললে তার থেকে ঠিকঠাক, যথাযথ কথা আর কিছু হতে পারে না।’

‘কিন্তু লোকটা এখন কোথায়? কোথায় পাব তাকে আমরা?’ মিকগিনটিকে যথেষ্ঠ অধৈর্য মনে হল।

‘মাননীয় বডিমাস্টার,’ এবার গম্ভীরভাবে বলল মিকমুরডো, ‘আপনাকে আমি জানাতে চাই যে, কী করতে হবে আমাদের। সেটা সকলের সামনে আলোচনা করা যাবে না। এখানে যারা উপস্থিত আছে, (এ কথাটা মিকমুরডো বলল গলা নামিয়ে) তারা সকলে যথেষ্ঠ বিশ্বাসযোগ্য নয়। আমরা এই লোকটাকে হাতের নাগালে পেতে যে ব্যবস্থা নেব, তা এখনই সকলের জানা উচিত নয়। আমাদের মধ্যে কেউ যদি তাকে আমাদের পরিকল্পনা জানিয়ে দেয়, তাহলে আমাদের বাঁচার আশা সব শেষ। সেক্ষেত্রে আমি প্রস্তাব করব একটা ছোট কমিটি করা হোক৷ মি. চেয়ারম্যান হবেন প্রধান পরামর্শদাতা। আপনার সঙ্গে থাকবে ব্রাদার বলডউইন ও আরও পাঁচজন। সেই পাঁচজন কারা হবেন সে ব্যাপারে চেয়ারম্যানই সিদ্ধান্ত নেবেন।’

মিকমুরডোর প্রস্তাব সঙ্গে সঙ্গে মেনে নেওয়া হল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে গেল কমিটি। চেয়ারম্যান, মিকমুরডী, সাহসী বলডউইন, শকুন-চেহারার সেক্রেটারি, হার্রাওয়ে, টাইগার করম্যাক। এই কজনকে নিয়ে তৈরি হল কমিটি। কমিটির প্রতি সদস্যই মরতে ভয় পায় না। চেয়ারম্যানের উচ্চস্বরে আদেশে, এই কয়েকজন ছাড়া বাকি সব সদস্যকে সভাকক্ষের বাইরে যেতে হল।

‘এবার ব্রাদার মিকমুরডো,’ গম্ভীরস্বরে বলল মিকগিনটি, ‘সেই স্মার্ট গোয়েন্দাকে শেষ করতে কী মতলব ভেঁজেছেন আমাদের জানান।’

‘কিছুক্ষণ আগে আমি আপনাদের বলেছি যে, বার্ডি এডওয়ার্ডসকে আমি চিনি৷ এটা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না যে, লোকটা তার আসল নামে গা-ঢাকা দিয়ে আছে। লোকটা সাহসী। আবার সেই সঙ্গে প্রচণ্ড ধূর্ত। এখানে সে একটা নতুন নাম নিয়েছে, স্টিভ উইলসন, আর এই নামেই সে আস্তানা গেড়েছে হবসনের ঠেকে।’

‘কীভাবে এটা জানা গেল?’ চেয়ারম্যানের প্রশ্ন।

‘কারণ তাকে আমি না চিনেই তার সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তখন তাকে চিনতে পারিনি এবং কোনো সন্দেহ আমার হয়নি। আমার সঙ্গে কীভাবে দেখা হল, সেটা বলি। হবসনের ঠেকে গাড়ি থেকে লোকটাকে আমি নামতে দেখি। একেবারে নতুন মুখ। তাই আমি তাকে তার পরিচয় জিগ্যেস করি। সে আমাকে বলেছিল যে, সে একজন রিপোর্টার। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, কোন্ সংবাদপত্রের জন্যে রিপোর্টারের কাজ করছে। সে আমাকে জানায় কাগজের নাম নিউ ইয়র্ক পেপার। তখন সে আমাকে বলে আমার সঙ্গে তার কিছু গোপন কথা আছে। আমি সাধারণ, নির্ঝঞ্ঝাট নাগরিকের ভান করে জানতে চাই গোপন কথা। তখন সে আমাকে বলে এই ভারমিস্সা উপত্যকায় বহু দাঙ্গাবাজ আছে যারা হাসতে হাসতে মানুষ খুন করে, বাড়িঘর লুঠ করে, চুরি-ডাকাতি করে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি করেছে। বিগ্ কর্পোরেট হাউসের মালিকেরা এবং রেল-কর্তৃপক্ষ সেই বোম্বেটের বদমাইশি থামাতে চাইছে, ঢিট্ করতে চাইছে তাদের। এই কথা বলতে বলতে সে পকেট থেকে একটা কুড়ি ডলারের নোট বের করে আর আমাকে চোখ টিপে বলে যে, যখনই তাকে আমি বোম্বেটেদের সম্বন্ধে গোপন খবরাখবর দেব, সে আমাকে প্রতিবারই কুড়ি ডলার পে করবে। বুঝলাম, এভাবে খবর সংগ্রহ করে সে নিউ ইয়র্ক সংবাদপত্রে রিপোর্টের আকারে পাঠাচ্ছে। সেসব পড়ে প্রশাসনের উঁচু স্তরে আলোচনা চলছে, কীভাবে আমাদের অর্থাৎ ভারমিস্সা উপত্যকার দাঙ্গাবাজদের সমূলে শেষ করা যায়। আমি খপ্ করে তার হাত থেকে কুড়ি ডলারের নোটটা নিয়ে পকেটে পুরে তাকে জিগ্যেস করি, এই অঞ্চলের দাঙ্গাবাজদের সম্বন্ধে সে কী জানতে চায়। সে আমাকে বলল, আমি যা জানি সেসবই যেন বলি।

‘কী বললে তুমি?’ মিকগিনটি জিগ্যেস করল।

‘বানিয়ে বানিয়ে মনে যা আসে তাই বললাম। সব মিথ্যে কথা, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।’

‘তারপর কী হল, ব্রাদার?’ জিগ্যেস করল বলডউইন।

‘আপনারা সবাই জানেন, হবসনের ঠেকের কাছাকাছি ভারমিস্সা টেলিগ্রাফ ব্যুরো। আমি তাকে বানিয়ে বানিয়ে কিছু কথা বলার পর দূরে চলে গেলাম। লক্ষ রাখছিলাম সে কোথায় যায়। দেখলাম সে টেলিগ্রাফ অফিসে গেল এবং মিনিট কুড়ি বাদে বেরিয়ে এল। তারপর গাড়িতে উঠে চলে গেল।

‘সে চলে যাবার পরই আমি টেলিগ্রাফ অফিসে ঢুকলাম৷ অপারেটরকে জিগ্যেস করলাম, “এই লোকটা কে? কী রিপোর্ট দিল? কোথায় পাঠাল সেই রিপোর্ট?” অপারেটর বেশ বিরক্ত হয়ে জিগ্যেস করল যে আমি কে। আমি এত কথা জিগ্যেস করছি কেন? তখন আমি সার্ট তুলে কোমরের রিভলভারটা দেখিয়ে বললাম, ‘আমি আখড়ার লোক। বুঝতেই পারছেন? তখন অপারেটর জানাল যে, লোকটা একজন রিপোর্টার। প্রতিদিন সেই অফিস থেকে নানা ধরনের রিপোর্ট পাঠায় নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত সংবাদপত্রগুলোতে। আমি সেই অপারেটরকে বললাম কিছু রিপোর্ট দেখাতে। আমার পরিচয় পেয়ে সে আর আপত্তি করল না। রিপোর্টের কপি দেখাল আমাকে। প্রতিটি রিপোর্টেই আমাদের আখড়া সম্বন্ধে অনেক গোপন খবর লেখা। তারপর আমার হাতে টেলিগ্রাফের সেই ছেঁড়া অংশটা এসে গেল। যাতে লেখা আছে পিনকারটন বার্ডি এডওয়ার্ডসকে এখানে পাঠিয়েছে আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্যে।’

‘এখন একে ধরার জন্যে আমাদের কী করা উচিত ব্রাদার?’ জানতে চাইল মিকগিনটি।

একজন বলল, ‘আমরা তো এখনই হবসনের ঠেকে যেতে পারি৷ কুকুরের মতোও গুলি করে মারতে পারি তাকে।’

‘হ্যাঁ, এই আড়কাঠিকে শেষ করা যায় যত তাড়াতাড়ি, ততই ভালো।’ আর একজন বলল।

‘ঠিকই বলেছ তোমরা’ মিকমুরডো বলল, ‘যদি আমি জানতাম হবসন অঞ্চলে সে কোথায় থাকে, তাহলে এখনই তোমাদের আমি সেখানে নিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু মুশকিল হল, ওই অঞ্চলে সে কোথায় আস্তানা গেড়েছে আমি তা জানি না।’

‘তাহলে কী করা যাবে?’ মিকগিনটি জানতে চাইল।

‘আমি একটা মতলব ভেঁজেছি সর্দার; সেটা কি বলব?’

‘বলো, বলো ব্রাদার! ইট’স সো আরজেন্ট।’

‘আগামীকাল সকালে আমি “হবসন ঠেক”-এ যাব। অপারেটরের মাধ্যমে আমি বার্ডি এডওয়ার্ডসকে খুঁজে বের করব। অপারেটর নিশ্চয়ই জানে সেই ওস্তাদ কোথায় থাকে। তারপর আমি তাকে বলব যে, আমি দাঙ্গাবাজদের দলের একজন। আমি বার্ডিকে বলব যে, টাকার বিনিময়ে আমি তাকে আখড়ার সমস্ত গোপন কথা বলব৷ আমি বাজি রেখে বলতে পারি এই টোপটা লোকটা গিলবে।’

‘বেশ। বেশ। তারপর?’ সর্দারের মুখে এতক্ষণ বাদে হাসির আভাস।

‘বার্ডিকে আমি বলব যে, আখড়ার সমস্ত গোপন কাগজপত্র আমার আস্তানায় আছে। প্রতিটা কাগজই মূল্যবান। সেউ কাগজগুলো যদি তার হাতে পড়ে, তাহলে দাঙ্গাবাজদের বিষয়ে আরো বিশদ রিপোর্ট সে পাঠাতে পারবে নিউ ইয়র্কে। সংবাদপত্রে সেসব রিপোর্ট প্রকাশ পেলে, পুলিশও ভারমিস্সা অঞ্চলের দাঙ্গাবাজদের সবাইকে গ্রেপ্তার করার ব্যাপারে তাদের ব্লু প্রিন্ট তৈরি করতে পারবে। লোকটা তো বোকা নয়। বরং বেশ ধুরন্ধর। আমার এসব বানানো কথায় সে, আমার বিশ্বাস, চেয়ারম্যান, আহ্লাদে একেবারে ডগোমগো হয়ে উঠবে আর আগামীকাল আমার বাড়িতে আসতে রাজি হবে৷ সময়টা তাকে বলব রাত দশটা৷ আর সে এলে উলটো-পালটা, বানানো কিছু কাগজ তাকে দেখতে দেব। সে যখন সেসব দেখতে ব্যস্ত থাকবে, তখনই সর্দারের নেতৃত্বে আমরা তার যা ব্যবস্থা করার করব।’

‘তাকে কি খুন করব স্পটেই?...না বন্দি করে নিয়ে আসব?’

‘সেটা আপনাকেই ঠিক করতে হবে কাউন্সিলর সাহেব৷ বুড়ি ম্যাকনামারার যে ডেরাতে আমরা থাকি, আমি আর স্ক্যানলান, একেবারে ফাঁকা, আর কেউ থাকে না সেই বাড়িতে।...আগামীকাল তার সঙ্গে আমার যা কথা হবে, সব আপনাকে জানাব৷ আপনারা সাতজন রাত নটার সময় আমার বাড়িতে অপেক্ষা করবেন। আমি নিশ্চিত যে আগামীকাল বার্ডি এডওয়ার্ডসের শেষ দিন।’

‘ঠিকই বলেচ ব্রাদার,’ হিসহিসিয়ে বলল মিকগিনটি। একটু থেমে আবার বলল, ‘আমারও বিশ্বাস, পিনকারটন এজেন্সিতে একটা পদ শূন্য হবে; আর সেটা বার্ডি এডওয়ার্ডসের। ওকে হাতের নাগালে পেলে কী করব, সেটা আমার ওপর ছেড়ে দাও ব্রাদার! আগামীকাল রাত ন’টার সময় তোমার বাড়িতে দেখা হবে৷ গুড নাইট।’

পরিচ্ছেদ ৭ঃ ফাঁদ

ঠিকই বলেছিল মিকমুরডো, যে বাড়িটাতে সে থাকে, তার অবস্থান শহর থেকে বেশ দূরে নির্জন জায়গায়। লোকের বেশি আনাগোনাও নেই চারপাশে। যে ফাঁদের পরিকল্পনা তারা করেছে, তার পক্ষে একেবারে আদর্শ৷ অন্যান্য ক্ষেত্রে দাঙ্গাবাজরা যেটা করে আসছে এতদিন, যে লোকটাকে তারা সন্দেহ করেছে কিংবা নিশ্চিত হয়েছে যে, আখড়ার কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সে কাজ করছে, তাকে কোনো নির্জন, সুবিধাজনক, পরিত্যক্ত জায়গায় ডেকে পাঠানো এবং বেশি কথায় না গিয়ে, সবাই মিলে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া তার শরীর। কিন্তু এক্ষেত্রে, লোকটাকে দেখামাত্র সাবাড় করে দিলে চলবে না। খুবই দরকারি হল, চাপের মুখে তাকে রেখে তার থেকে জেনে নেওয়া আখড়ার কার্যকলাপ বিষয়ে কতটা সে জেনেছে এবং কতটাই বা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষের কাছে, যারা তাকে বহাল করেছে এখানে গোয়েন্দাগিরিতে।

এই ব্যাপারটা নিয়ে মিকগিনটি চিন্তা করেছে। এটা হতেই পারে যে, বার্ডি এডওয়ার্ডস সম্বন্ধে তারা খবর পেয়েছে অনেক দেরিতে। ফলে ইতিমধ্যেই হয়তো বদমাইশটা তার কর্তৃপক্ষকে গোপন কথা যা যা জানাবার সবই আগেই ফাঁস করে দিয়েছে৷ যদি তাই হয়, তাহলে এখন গোয়েন্দাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা বা গলাটা তরোয়ালের এক কোপে কেটে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। কিন্তু মিকগিনটির ক্ষীণ আশা আছে যে, সেই গোয়েন্দাপ্রবর হয়তো এখনও এখানকার দাঙ্গাবাজদের বিষয়ে সব গোপন খবর জোগাড় করে উঠতে পারেনি; তা না হলে সে মিকমুরডোকেই টাকা দিয়ে কিনে নিতে চাইবে কেন? আরো আখড়ার ভেতরের খবর সংগ্রহ করার জন্যে। যাই হোক, লোকটাকে ফাঁদে ফেলে তার নিজের মুখ থেকে, সে কতটা জেনেছে, সেটাই জানতে হবে। তাকে কথা বলতে হবে। আর শত্রুকে কীভাবে কথা বলাতে হয়, তার পেট থেকে গোপন খবর কী উপায়ে বের করে নিতে হয়, সে পদ্ধতি কাউন্সিলরের ভালোই জানা আছে। এরকম আগেও হয়েছে, বেইমানকে ধরতে পারার পর তারা নিজেদের পৈশাচিক কায়দায় তার মুখ থেকে সব গোপন কথা জেনেছে।

হবসনের ঠেক এলাকায় মিকমুরডো পরদিন সকালে গেল, যেমন কথা হয়েছিল সর্দারের সঙ্গে। সেদিন সকালে আবার পুলিশের টনক নড়ল মিকমুরডোর হাল-হকিকত জানতে। ক্যাপ্টেন মারভিন, যে মিকগিনটিকে সকলের সামনে জানিয়ে দিয়েছিল যে, শিকাগো থেকে তাকে (মিকমুরডোকে) সে চেনে এবং জানে। স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল পুরোনো পরিচিতকে, আর তার নাম ধরে ডাকল। মিকমুরডো মারভিনকে দেখে সাড়া না দিয়ে, পা চালিয়ে দূরে চলে গেল যে কাজে হবসন গিয়েছিল সে, সেটা সেরে সোজা গেল ইউনিয়ন হাউসে, দেখল বসে আছে সর্দার মিকগিনটি।

‘আসবে...।’ সে জানাল।

‘দারুণ খবর।’ বলল সর্দার। দৈত্যের মতো চেহারা নিয়ে সে বসে আছে, হাফ-হাতা জামা পরে, তার ওয়েস্টকোটে তারার মতো ঝিকমিক করছে সোনার চেন, মেডেল; আর দু-কানে চিকচিক করছে দুটো হিরের দুল৷ আখড়ার সর্দার এবং কাউন্সিলর হয়ে সর্দারের পয়সা হয়েছে প্রচুর আর এই অঞ্চলে তার কথাই শেষ কথা৷ তবুও, মিকগিনটির মন বেশ উচাটন হয়ে আছে। গতরাতে সে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছে। হাজতের অন্ধকারে সে একা বসে আছে এবং পরমুহূর্তেই কয়েকজন পুলিশ তাকে শেকল পরিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ফাঁসির মঞ্চের দিকে।

‘তোমার কী মনে হয় ব্রাদার? ওই শালা গোয়েন্দা কি আমাদের অনেক খবর জেনে ফেলেচে?’

মিকমুরডো গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ল, বলল, ‘লোকটা এখানে অপারেট করছে বেশ কিছুদিন, অন্তত ছ’সপ্তাহ তো বটেই আমার অনুমান। সে আমাদের এই অঞ্চলে খুব একটা বেশি আসেনি, তবে আমাদের আখড়াতে সদস্য অনেক, সবাই তো সমান নয়, কাকে সে কীভাবে টাকা খাইয়ে কী খবর জোগাড় করেছে, সেটা বলা মুশকিল। তবে যা যা খবর পেয়েছে, এক মুহূর্তও দেরি করেনি সেসব পাচার করে দিতে ফিলাডেলফিয়ায় বা নিউ-ইয়র্কে।’

‘আমাদের আখড়াতে বেইমানি করার মতো ব্রাদার খুবই কম। প্রত্যেককে এমনিভাবে তৈরি করা হয়েচে যে, মেরে ফেললেও মুখ খুলবে না। শুধু একমাত্র ভয় ওই ভেড়ার বাচ্চা বুড়ো মরিসকে নিয়ে। যদি আমাদের মধ্যে কেউ বেইমানি করে তো ওই শুয়ারটাই করবে৷ আমি ভেবেচি আমাদের আখড়ার দুজন মাস্তান-ছোকরাকে পাঠাব হতভাগার বাড়িতে; ওকে পিটবে তারা৷ চেষ্টা করবে লোকটার মুখ থেকে বের করতে যে, সে আদৌ সেই গোয়েন্দাকে কোনো খবর পাচার করেচে কিনা।’

‘হুমম্, সেটা করা উচিত। যদিও মরিস লোকটার ব্যাপারে আমার একটা দুর্বলতা আছে, তবুও ওকে একেবারে সন্দেহের আওতার বাইরে রাখি না। এ ব্যাপারে আপনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আমাদের এখন শিরে সংক্রান্তি, সব কিছুই বাজিয়ে দেখতে হবে আমাদের।’

‘বুড়ো এক নম্বরের বিচ্চু, এক নম্বরের শয়তান!’ বলল সর্দার হিসহিসিয়ে। ‘অনেকদিন থেকে ওঁর ওপর আমার নজর আচে। আমাদের আখড়ার প্রতি ওর কোনো বিশ্বস্ততা নেই!’

‘একমাত্র আপনিই সেটা ভালো জানবেন,’ বলল মিকমুরডো, ‘কিন্তু আজ সন্ধে বেলা মরিসের বাড়িতে লোক পাঠানো ভুল হবে৷ আগামীকাল পাঠানোই ভালো। আজ রাতে পিনকারটন---ঝামেলাটা মিটে না গেলে, মরিসকে মারধর করাটা ঝুঁকির হয়ে যাবে। পুলিশের কাছে গোলমালের খবরটা যাবে আর গেলেই তারা এই অঞ্চলে ঝাঁকে ঝাঁকে পুলিশ পাঠাবে। তখন পুলিশের নাকে যদি বার্ডিকে ধরার জন্যে আমরা যে ফাঁদ পেতেছি, তার গন্ধ যায়, তাহলে আমার বাড়িতে রাতে কেন আপনি নিজে ও আরো কয়েকজন জড়ো হয়েছি, এই ব্যাপারে পুলিশের সন্দেহ বাড়বে আর আমাদের পরিকল্পনাও বানচাল হয়ে যাবে।’

‘ঠিকই বলেছ ব্রাদার,’ চিন্তিতভাবে বলল মিকগিনটি। ‘একেবারে বার্ডি এডওয়ার্ডসের কাছ থেকেই জানব কোথা থেকে সে জেনেচে আমাদের সম্বন্ধে আর কতটা জেনেচে। তারপর তার বুকে ছুরি দিয়ে ফালাফালা করব আমরা। তোমার কী মনে হয়? আমাদের ফাঁদ সম্বন্ধে সে কি কিছু আঁচ করেচে?’

তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল মিকমুরডো। ‘লোকটা নিজেকে খুব চালাক ভাবতে পারে। আমি তাকে বোকা বানিয়েছি, আবার তার থেকে ডলারও কামিয়েছি। কিছু কাগজপত্রও তাকে দিয়েছি আমি।’

‘কাগজপত্র? কীসের কাগজপত্র?’

‘আমি তাকে দিয়েছি আমাদের আখড়ার সংবিধান, সদস্য হবার নিয়মাবলী, আইনের বইপত্র...সবই আমার নিজের বানানো, আমারই লেখা। হাবিজাবি মিথ্যেয় ভরা৷ সবকিছুর আদি থেকে অন্ত জানতে চায় তো গাড়লটা। তাই তাকে দিয়েছি ওসব ভুলভাল পেপারস। এখন কত জানবে জানুক!’

‘তাই নাকি?’ মিকগিনটিও হাসতে লাগল, এরপর বলল, ‘আরো কী চেয়েচে সে তোমার থেকে?’

‘আর কী চাইবে? সে নিজেও জানে আমার ওপর পুলিশের নজর আছে৷ এই তো আজ সকালেই! আমি যাচ্ছিলাম হবসনের দিকে৷ ক্যাপ্টেন মারভিন আমাকে দেখে ডাকল। আমি ফিরেও তাকাইনি তার দিকে৷ জোরে হেঁটে তার নাগালের বাইরে চলে গেছি৷ ওই এক হায়না! সবসময় পিছে লেগে আছে!’

‘হ্যাঁ, আমি শুনেচি সে কথা।’ বলল মিকগিনটি, ‘লোকটাকে ফাঁদে পেয়ে ওকে কুচি কুচি কাটার পর সমস্ত সন্দেহটা পড়বে হয়তো তোমারই ওপর। তাকে মারার পর তার বডি লুকিয়ে ফেলা, এসবও খুব কঠিন কাজ। পুলিশের খানাতল্লাশি জোর শুরু হবে।

মিকমুরডো কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘ঠিকঠাক, প্ল্যানমাফিক কাজগুলো সারতে পারলে, তাকে যে হত্যা করা হয়েছে এটা প্রমাণ করাই কঠিন হবে। অন্ধকারে কেউই দেখতে পাবে না সে আমার বাড়িতে আসছে। কেউ যাতে তাকে দেখতে না পায় তার ব্যবস্থা আমি করব। আমার পরিকল্পনার কথা আপনাকে তো সবটা বলেছি সর্দার। শুধু এটুকু নিশ্চিত করবেন যে, অন্য ব্রাদারসরাও যেন ঠিক ঠিক কাজ করে। আপনারা সবাই সময়মতো আসবেন আমার বাড়িতে। বার্ডি আসবে ঠিক দশটার সময়। সে আমার দরজাতে তিনবার নক্ করবে। আমি তাকে দরজা খুলে দেব৷ তারপর সে ঘরে ঢুকলেই দরজা বন্ধ করে দেব। ব্যস্! তখন সে ইঁদুর-কলে পড়া ইঁদুর!’

‘সত্যি! ব্রাদার! তোমার প্ল্যান জলের মতো সোজা।’

‘কিন্তু পরের ঘটনাগুলোও মাথায় রাখতে হবে...’

‘কীরকম?’

‘লোকটা কিন্তু শেয়ালের মতো ধূর্ত৷ তার কাছে গুলিভর্তি দুটো রিভলভার তো থাকতেই পারে। আমি তাকে বোকা বানিয়েছি ঠিকই। কিন্তু সে আমার সব কথাই যে বিশ্বাস করেছে এমন নয়। নিজেকে সাবধানে সে রাখবেই। ধরুন, আমি তাকে বলেছি আমার বাড়িতে আমি একাই থাকব৷ কিন্তু ঘরর ঢুকে সে কী দেখবে, না, বসে আছে সাতজন। সঙ্গে সঙ্গে সে ধরে ফেলবে সে ফাঁদে পড়েছে। গোলাগুলি শুরু হয়ে যেতে পারে, কেউ না কেউ তো আহত হবেই।’

‘ঠিকই বলচ...।’

‘আর নিস্তব্ধ রাতে গোলাগুলির আওয়াজ শুনলেই চারপাশ থেকে কৌতূহলীর দল আমার বাড়ির চারপাশে জমা হতে শুরু করবে।’

‘একেবারে ঠিক বলচ।’

‘সুতরাং আমাদের কাজ হাসিল করার উপায় এরকম হতে পারে। আপনারা সবাই অপেক্ষা করবেন আমার বাড়ির ভেতরের ঘরে, মানে আমার বড় সাইজের বেডরুমে। সে আসতেই আমি তাকে দরজা খুলে দেব। সামনের ঘরে বসে অপেক্ষা করতে বলব৷ আর নিজে আসব ভেতরের ঘরে কাগজপত্র নিতে৷ যে কাগজপত্র আমি তাকে দেব বলেছি, সবই জালি পেপারস৷ বানিয়ে বানিয়ে হাবিজাবি লেখা আছে তাতে। সে অপেক্ষা করবে আর ততক্ষণে আমি বড় ঘরে এসে তোমাদের জানাব যে সে এসে গেছে। সবটাই ইশারায়। তারপর জালি কাগজপত্তরের বান্ডিল নিয়ে আমি আসব তার কাছে। যখন সে মন দিয়ে কাগজপত্র দেখতে থাকবে, আমি লাফিয়ে পড়ব তার ওপর আর তার পিস্তলটা আগে ছিনিয়ে নেব। চেঁচিয়ে আমি ডাকব আপনাদের, ছুটে আসবেন আপনারা। যত তাড়াতাড়ি আসবেন, তত ভালো। কারণ তার গায়েও প্রচণ্ড শক্তি, আমি একা তাকে সামলাতে নাও পারি৷ কিন্তু আপনারা না আসা পর্যন্ত আমি তাকে ঠিক জাপটে ধরে থাকব।’

‘দারুণ প্ল্যান, দারুণ! আমার লজ, আমার আখড়া তোমার কাছে ঋণী থাকবে। আমি ভাবচি, ঝামেলা মিটে গেলে আমি নিজে সকলকে জানিয়ে দেব আমার উত্তরাধিকারী কে হবে। সেটা যে তুমিই, তা নিশ্চয়ই বলতে হবে না।’

‘এসব বলে আমাকে আর লজ্জা দেবেন না, কাউন্সিলর। আমি এখন ভবিষ্যতের কথা ভাবছি না, আমি চিন্তিত আজকের রাতটা নিয়ে। পরিকল্পনা মাফিক সব যদি এগোয়...’

‘সব ঠিক হবে। বার্ডি গোয়েন্দাকে আজ জ্যান্ত গোর দেব।’

মিকগিনটির থেকে বিদায় নিয়ে মিকমুরডো, নিজের বাড়ি ফিরে এল। জিনিসপত্তর গুছিয়ে নিচ্ছিল৷ সামনে একটা অনিশ্চিত এবং ভয়ঙ্কর রাত অপেক্ষা করছে তার জন্যে।

প্রথমেই মিকমুরডো তার স্মিথ অ্যান্ড ওয়েস্সন রিভলভার ড্রয়ার থেকে বের করল। অস্ত্রটা পরিষ্কার করল ভালোভাবে, তেল লাগাল ব্যারেলে, তারপর পুরো কার্তিজ লোড করে নিল। চুমু খেল একবার অস্ত্রটাকে। বাঁচালে এটাই বাঁচাবে আজ। তারপর সে বাইরের ঘরটা তন্ন তন্ন করে দেখে নিল, এই ঘরটাই তো ইঁদুর-কল মানে ফাঁদ, যেটা পাতা রয়েছে ডিটেকটিভের জন্যে৷ ঘরটা কম বড় নয়। মাঝখানে সেগুন-কাঠের লম্বা টেবিল, একপাশে বসানো আছে বড় স্টোভ। চা এবং খাবার-দাবার তৈরির জন্য এই স্টোভটাই ব্যবহৃত হয়। ঘরের দুদিকে তিনটে করে জানালা। কোনো জানালার শার্টার নেই; শুধু হালকা পর্দা, যা এখন সরানো আছে।

মিকমুরডো সবকিছুই মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। দেখতে দেখতে তার মনে হল, এই অ্যাপার্টমেন্ট কোনো গোপন সভার জন্যে আদৌ উপযুক্ত নয়। তবে মূল রাস্তা থেকে অ্যাপার্টমেন্টের দূরত্ব বেশ। তবুও সবকিছু নিজে পর্যবেক্ষণ করার পর সে, তার দোসর-বোর্ডার স্ক্যানলানের সঙ্গে সমস্ত ব্যাপারটা আলোচনা করল। স্ক্যানলান, বোম্বেটে-আখড়ারই একজন সদস্য হলেও, খুব যে দাঙ্গাবাজিতে নিজেকে জড়ায় তা নয়, ঝামেলা এড়িয়েই চলে। তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো মানসিক শক্তি তার নেই; খুন-খারাবি-রক্ত দেখলেই তার মাথা ঘুরে যায়। যদিও কখনো কখনো তাকেও দলে পড়ে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে হয়েছে। একজন খচ্চর টিকটিকিকে ধরার জন্যে যে একটা ফাঁদ পাতা হয়েছে, সেটা অবশ্য মিকমুরডো সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিল স্ক্যানলানকে। তাকে এটাও বলল, ‘যদি তোমার জায়গায় আমি থাকতাম, মাইক স্ক্যানলান, কিংবা আমি যদি তুমি-ই হতাম, আজকের রাতে আমি এখানে থাকতাম না। ঝামেলায় নিজেকে জড়াতাম না। কারণ আজ গভীর রাতে গুলি-গোলা এখানে চলবেই, লাশ পড়তেও পারে, রক্তের হোলি খেলা হবে।’

‘বললে যখন, ভালোই হল ব্রাদার,’ একটু ভেবে নিয়ে স্ক্যানলান বলল, ‘রক্ত দেখলেই আমি ভাই নার্ভাস হয়ে যাই। তোমার মতো বা সর্দার মিকগিনটির মতো আমি মারদাঙ্গা করতে পারি না। যদি আখড়ার বস্ মনে করেন আমার উপস্থিতির দরকার নেই, তাহলে তুমি যেমন পরামর্শ দেবে আমাকে...আমি বরং সন্ধে থেকেই কেটে পড়ব। থাকব না আমার এই ডেরাতে আজ রাতে।’

‘এখানে রাতে সর্দারের সঙ্গে কয়েকজন বাছাই লোক থাকবে। তোমার নাম কেউ বলেনি অবশ্য। বস্ তো নয়ই।’

‘তাহলে আমি সন্ধেবেলা অন্য জায়গায় কাটাব।’

রাত নামল। মিকগিনটি তার অনুচরদের নিয়ে যথাসময়েই মিকমুরডোর ডেরায় হাজির। বাইরে থেকে দেখে, আখড়ার কোনো সদস্যকেই বোঝা যাবে না যে, তারা কত হিংস্র দাঙ্গাবাজ; বরং মনে হবে বেশ সম্মানীয় নাগরিক। পরনে দামি পোশাক, প্রত্যেকেরই গা থেকে ভুরভুর সুগন্ধ ছড়িয়ে যাচ্ছে বাতাসে। কিন্তু যে মানুষ, অন্য মানুষের মুখ মনোযোগ দিয়ে নিরীক্ষণ করার পর সঠিক বুঝতে পারেন তার মুখে যে ইস্পাত-কাঠিন্য এবং চোখে নিষ্ঠুরতার ছায়া, সেসবই তার চরিত্রলক্ষণ, তাঁর উপলব্ধিই ঠিক বলতে হবে; এবং এরকম প্রজ্ঞাবান মানুষকেই আমরা বলতে পারি, মানুষের মুখের ও মনের প্রকৃত বিচারক।

মিকগিনটির সঙ্গে অতি ভদ্রবেশে যারা হাজির হল মিকমুরডোর ডেরায়, তাদের প্রত্যেকের হাত অন্ততপক্ষে বারোবার অসহায় মানুষের তাজা রক্তে রক্তাক্ত হয়েছে। এরা প্রত্যেকেই মানুষ খুন করতে পারে, কসাইয়ের মতো উদাসীন পেশাদারিত্বের সঙ্গে।

দোর্দণ্ডপ্রতাপ কাউন্সিলর এবং আখড়ার সর্দার মিকগিনটির পরিচয় নতুনভাবে আর দেওয়ার কী আছে! তার দীর্ঘকায়, মেদহীন, বিশাল শরীর, চাপা ও কঠিন চোয়াল এবং চকচকে খুদি-খুদি চোখের দিকে তাকালেই সকলে এক মুহূর্তে বুঝে যায় যে, এই লোককে ঘাঁটানো একেবারেই উচিত নয়। তার পোশাকও অত্যন্ত বিলাসবহুল। হাতে সোনার ঘড়ি, চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা। কানে (আগেই বলা হয়েছে) ঝকঝকে হিরের দুল। এবার তার সহচরদের দিকেও একবার তাকানো যাক। হার্রাওয়ে, সেক্রেটারি, একটু রোগা-পাতলা চেহারার মানুষ, যার মুখে হাসি প্রায় দেখাই যায় না। জিরাফের মতো-প্রায় লম্বা, রোগা ঘাড়, আখড়ার যাবতীয় বে-আইনি কাজের প্রতি সে অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং বিবেক বস্তুটার সে পরোয়া করেনি কোনোদিন। আখড়ার ট্রেজারার কার্টার মাঝবয়সি, সাধারণ চেহারার একজন বদমাশ, যে হিসেবপত্তরকে গুলিয়ে দিতে ওস্তাদ। উইল্যাবিস পদবির দুই ভাই; দুজনেই লম্বা, ছিপছিপে এবং কম কথার মানুষ। দুজনেই ছুরি ও আগ্নেয়াস্ত্র চালাতে ওস্তাদ। এদের সঙ্গে আছে টাইগার কোরম্যাক, লম্বা এবং ভারী চেহারার যুবক। মেজাজে অত্যন্ত হিংস্র টাইগারকে আখড়ার অন্য ভাইরা বেশ সমঝে চলে। রেগে গেলে এই লোকটার থেকে বেপরোয়া আর কেউই বোধহয় হতে পারবে না।

এইসব গণ্যমান্য ব্যক্তির সমাবেশ হয়েছে আজ নিশীথে মিকমুরডোর ডেরায় পিনকারটন ডিটেকটিভকে হাতেনাতে ধরা এবং জবাই করার জন্যে।

আতিথ্যের কোনো ত্রুটি রাখেনি মিকমুরডো। টেবিলে পরিবেশিত হয়েছে দামি এবং পছন্দের হুইস্কি। আর কিছুক্ষণ পরেই যে ভয়ঙ্কর কাজটা করতে চলেছে তার জন্যেই অতিথিরা সেই হুইস্কি সেবন করে নিজেদের চাঙ্গা করে নিচ্ছে। বলডউইন আর টাইগার কোরম্যাক পেগের পর পেগ গলায় ঢেলেছে এবং ইতিমধ্যেই বেশ মাতাল হয়ে খিস্তি-খাস্তা দিতে শুরু করেছে।

‘বাহ্, এই স্টোভে তো লকলকিয়ে আগুন জ্বলচে!’ কোরম্যাক বলল।

‘শালা টিকটিকিকে এই স্টোভের আগুনে মুখ গুঁজড়ে ধরব, তারপর বলব, ‘বল্ শালা, কী জেনেচিস, আমাদের বিষয়ে বল্।’

‘সত্যি কথাগুলো ওর গলা থেকে বমির মতো হড়হড়িয়ে বেরিয়ে আসবে!’ বলল মিকমুরডো। অতিথিরা সবাই এই লোকটার দিকেই প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। এই লোকটা, মিকমুরডো, ‘আজকের যজ্ঞের প্রধান পুরোহিত, ম্যাজিক-শোয়ের প্রধান বাজিগর, গুরুদায়িত্ব তার মাথার ওপর, তবুও লোকটার হাঁটাচলায় নার্ভাসনেসের কোনো লক্ষণই নেই; তাকে শান্ত, দৃঢ় এবং অবিচলিত লাগছে।

‘সেই শেয়ালের মতো টিকটিকিকে সামলানোর দায়িত্ব তোমারই...।’ বেশ দরাজ গলায় মিকগিনটি বলল।

‘লোকটা যেন আগে থেকে বুঝতে না পারে যে তার জন্যেই ফাঁদ পাতা হয়েছে।’ আরও বলল মিকগিনটি। তারপর জানালার দিকে তাকিয়ে বলল সর্দার, ‘তোমার এই ঘরের জানালাগুলোর শাটার থাকলে ভালো হতো।’ মিকমুরডো প্রতিটা জানালার সামনে গিয়ে পর্দাগুলো ভালোভাবে টেনে দিল। বলল, ‘বাইরে থেকে কোনো বাপের সাধ্য নেই এই ঘরে কী চলছে তা বোঝার।’ তারপর একটু গলা নামিয়ে বলল, ‘লোকটার আসার কিন্তু সময় হয়ে গেছে!’

‘হতেও তো পারে, বাছাধন আসবে না। হয়তো বিপদের গন্ধ আগেই পেয়ে গেচে’, বলল সেক্রেটারি।

‘সে আসবেই, কোনো সন্দেহ নেই,’ মিকমুরডো বলল। ‘তোমরা যেমন দেখতে চাইছ, সে-ও তেমনই উৎসুক। ওই শোনো!’

সবাই শিরদাঁড়া সোজা করে বসল, যেন স্থির মোমের পুতুল। কেউ কেউ পেগের পানীয় শেষ না করেই পেগ নামিয়ে রাখল টেবিলে।

‘চুপ! কোনো শব্দ নয়!’ মিকমুরডো হাত তুলে ফিসফিসিয়ে বলল। বাইরের দরজাতে তিনবার ঠক্! ঠক্! ঠক্!

অতগুলো কৌতূহলী চোখ উৎসুক তাকিয়ে দরজার দিকে, আর প্রত্যেকের হাত আপনা থেকেই চলে গেল কোমরের লুকোনো অস্ত্রে।

‘কোনো শব্দ নয়, উত্তেজনা নয়!’ আবার ফিসফিস করল মিকমুরডো। সে নিজে সন্তর্পণে ঘরের বন্ধ দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল, সাবধানে, শব্দ না করে, ভেজিয়ে দিল দরজা।

কয়েকজন মারাত্মক দাঙ্গাবাজ কান খাড়া করে অপেক্ষায়। তাদের বন্ধু, তাদের ভাই সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে, তার পায়ের শব্দ নৈঃশব্দ ভেঙে আসছে তাদের কানে। একতলার দরজাটাও সে খুলল, আওয়াজ কানে এল মিকগিনটি ও অন্যদের। দুজন লোকের মধ্যে হল সম্ভাষণ বিনিময়; এটাও যে সেই টিকটিকির সঙ্গে মিকমুরডোর অভিনয়, এটা বুঝেছে দোতলায় অপেক্ষারত আখড়ার প্রতিনিধিরা। তারপর তারা শুনল, দোতলার ঘরে অন্যধরনের পদশব্দ, এটা মিকমুরডোর পদশব্দ নয়। আর একটা অচেনা গলার কাশিও যেন কানে এল তাদের। পরমুহূর্তেই কানে এল, দরজা ভেজানোর এবং দরজার লকে চাবি দেওয়ার শব্দ৷ একটা চাপা গুঞ্জন আখড়ার প্রতিনিধিদের মধ্যে! এইবার তাদের শিকার জালে পড়েছে! টাইগার কোরম্যাক হা হা হা হেসে উঠল; এবার হরিণের ঘাড়ে বসাবে সে বাঘের থাবা! কিন্তু টাইগারের মুখ চেপে ধরল মিকগিনটি, ‘চুপ! শালো চুপ!’ সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, ‘আমাদের ফাঁসিয়ে দিবি তুই!’

বাইরের ঘরে দুজনের কথা কানে আসছে। মনে হল, বেশ কিছুক্ষণ চলছে তাদের কথা। হঠাৎই খুলে গেল এই ঘরের দরজা৷ আবির্ভাব হল মিকমুরডোর, ঠোঁটে তার তর্জানি। টেবিলের ও-প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সে, তাকাল একবার সকলের দিকে। যেন অন্যরকম মনে হচ্ছে তার ব্যবহার! মনে হচ্ছে সে যেন সাংঘাতিক কোনো নাটকের জন্যে প্রস্তুত। তার মুখের সেই চেনা চাপল্য উধাও। সেখানে ইস্পাতের কাঠিন্য। চশমার আড়ালে তার দু-চোখ চকচক করছে উত্তেজনায়। সম্পূর্ণ অন্যরকম, এই মুহূর্তে, তার শরীরের ভাষা। যেন হঠাৎই অনেক লম্বা হয়ে গেছে সে, অনেক লম্বা, আখড়ার সর্দার এবং পদমর্যাদায় কাউন্সিলর মিকগিনটির থেকেও লম্বা। এরা সবাই তার দিকে বেশ অবাক হয়েই তাকিয়ে আছে; কিন্তু মিকমুরডোও তাদের দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে আছে। তার মুখে কোনো কথা নেই। আবার সে দৃঢ়, কঠিন মুখে তাকাচ্ছে মিকগিনটির দিকে, টেড্ বলডউইনের দিকে, টাইগার কোরম্যাকের দিকে, সেক্রেটারির দিকে...!

‘কী ব্যাপার?’ এবার মিকগিনটি আর চুপ থাকতে পারল না, ‘এসেচে?’ বস্ মিকগিনটি জিগ্যেস করল। ‘বার্ডি এডওয়ার্ডস এসেচে?’

‘হ্যাঁ,’ গম্ভীর স্বরে কেটে কেটে বলল মিকমুরডো৷ ‘তোমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বার্ডি এডওয়ার্ডস। আমিই বার্ডি এডওয়ার্ডস্!’

দশ সেকেন্ড কেটে গেল। মনে হল ঘরে কেউ নেই। এতই গভীর নৈঃশব্দ! স্টোভের ওপর বসানো কেটলিতে জল ফুটছে, শোঁ-শোঁ শব্দ যেন ধারালো হয়ে কেটে বসছে সকলের কানে৷ সাতটা মুখ, নিস্পন্দ, ভয়ে এবং বিস্ময়ে পাণ্ডুর, তাকিয়ে আছে যেন সামনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকে। তারপর জানালার পর জানালায় কাচ ভাঙার শব্দ, উদ্যত রাইফেলের চকচকে নল ভাঙা কাচের ফাঁক দিয়ে এগিয়ে এল খাঁচায় বন্দি সাতজন জানোয়ারের দিকে, ঝোলানো পর্দাগুলো টেনে, ছিঁড়ে দিল বাইরের রাইফেলধারীরাই।

সেদিকে তাকিয়ে বস্ মিকগিনটি হুঙ্কার দিয়ে উঠল, যেন আহত ভালুক, আধখোলা দরজার দিকে বিশাল এক লাফ দিল৷ উদ্যত এক রিভলভার তার কপালে ঠেকল। দেখা গেল রিভলভারের মালিক ক্যাপ্টেন মারভিন ঠান্ডা, নিষ্ঠুর নীল চোখে তাকিয়ে আছে। সর্দার নিদারুণ অসহায়তায় সংযত করল নিজেকে, ধপ্ করে বসে পড়ল তার চেয়ারে।

‘চুপচাপ চেয়ারে বসে থাকো কাউন্সিলর, এতদিন অনেক ক্ষমতা, অনেক খেল্ দেখিয়েছ! বাড়াবাড়ি করলেই মাথার খুলি রিভলভারের একটা গুলিতে ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে!’ বলল সেই লোকটা, যাকে তারা জানত মিকমুরডো নামে। ‘আর তুই, ফুকো মাস্তান বলডউইন, কোমরের পিস্তল থেকে হাতটা সরা, ফাঁসির চকচকে দড়ি তোর জন্যে দুলছে আমি দেখতে পাচ্ছি।...এই তো লক্ষ্মী ছেলে! শুনে রাখো সবাই, এই বাড়ি ঘিরে আছে চল্লিশজন রাইফেলধারী, সুতরাং বুঝতেই পারছ, আজ দিনটা তোমাদের কারোরই নয়। মারভিন, বাইরে থেকে সশস্ত্র পুলিশদের ডাকো! তাড়াতাড়ি এদের পিস্তলগুলো ছিনিয়ে নিতে হবে!’

অন্তত দু-ডজন উদ্যত রাইফেলের সামনে প্রতিরোধের বা হঠকারিতার প্রশ্নই ওঠে না। আখড়ার সাতজন দাঙ্গাবাজের প্রত্যেকের আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নেওয়া হল। গোমড়া-মুখে এক-একটা ভিতু ভেড়ার মতো লাগছিল তাদের। অবশ্য চোখে বিস্ময়ও ছিল। মিকগিনটি বোধহয় নিজের হাতে চিমটি কেটে দেখছিল, সব কিছু সত্যি? না স্বপ্ন! টেবিল ঘিরে বসে আছে কয়েকটা ভেড়া। তাদের দিকেই সোজাসুজি, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে মিকমুরডো বলছিল, ‘তোমরা সবাই গারদের অন্ধকারে আর আমরা নিরাপদ আরামের জায়গায় চলে যাবার আগে কিছু কথা বলে যাই। আমার অনুমান, আবার তোমাদের সঙ্গে আমার দেখা হবে আদালতের কক্ষে, যেখানে বিচার চলবে তোমাদের। এখন কিছু কথা বলছি, যা গারদের অন্ধকারে তোমাদের একাকী জীবনে চিন্তার খোরাক হবে। এখন তোমরা জেনেছ আমার আসল পরিচয় এবং আমার কেরামতি। এখন তুরুপের তাসগুলো টেবিলে রাখতে আমার কোনো অসুবিধা নেই৷ আবার বলি, আমি বার্ডি এডওয়ার্ডস, স্বনামধন্য গোয়েন্দা, পিনকারটন এজেন্সির। ওই এজেন্সি এবং অন্যান্য চিন্তাবিদরা আমাকেই পছন্দ করেছিলেন, তোমাদের কুখ্যাত দলটাকে শেষ করে দেবার জন্য। স্বীকার করতেই হবে, খেলাটা আমার পক্ষে খুবই কঠিন এবং বিপজ্জনক ছিল। কয়েকজন ছাড়া কেউ না, হ্যাঁ কেউ না, এমনকী আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনরাও জানত না যে আমি কী সাংঘাতিক মরণ-খেলায় নেমেছি৷ শুধু ক্যাপ্টেন মারভিন এবং আমার নিয়োগকর্তারা জানতেন এটা। আজ রাতে সেই বিপজ্জনক খেলা শেষ হল। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আজ আমি জয়ী!’

সাতটি পাণ্ডুর, রাগী, নৃশংস মুখ তাকিয়ে ছিল বক্তার দিকে। প্রত্যেকের চোখে গোয়েন্দার প্রতি জ্বলছে ঘৃণার আগুন। বার্ডি অনুভব করছিল, সে যেন পুড়ে যাচ্ছে সমবেত ঘৃণার আগুনে!

‘হতে পারে তোমরা ভাবছ যে খেলাটা পুরো হয়নি, এখনও অনেক খেলা বাকি আছে। আমিও সেই শেষ খেলার জন্যে তৈরি থাকব। আপাতত, বাঘা বাঘা সাতজনকে তো পুলিশের হাতকড়া পরতেই হবে; তোমরা ছাড়াও এখানকার আখড়ার দলে আরো ষাটজন দুর্বৃত্ত আছে, যাদের আজ রাতেই পুলিশ তুলে নেবে। হয়তো এখন সেই কাজ শুরুও হয়ে গেছে৷

একটা কথা বলতে চাই, এখানে সেই গুরুদায়িত্ব নিয়ে আসার আগে, আমি বিশ্বাস করতেই চাইনি যে, দাঙ্গাবাজদের সত্যিই এরকম একটা বিশাল ও দুর্ভেদ্য সোসাইটি আছে। আমার ধারণা ছিল, তোমাদের বিষয়ে যা কিছু রোমাঞ্চকর খবর প্রকাশিত হতো নানা সংবাদপত্রে, সবই হল সাংবাদিকদের অতিরঞ্জন, বানানো এবং আমি নিয়োগকারীদের কাছে সেটা প্রমাণ করে দেব অচিরেই। তাঁরা বলেছিলেন যে, সংবাদপত্র গল্প লিখছে না, সত্যিই বাস্তবে ওরকম ভয়ঙ্কর সোসাইটি আছে, তার প্রমাণ পেতে গেলে তোমাকে ছদ্মবেশে ওদের সঙ্গে মিশে যেতে হবে এবং তাদের কাজের ধারা, নানা গোপন ক্রিয়াপদ্ধতি তোমাকে কড়ায় গণ্ডায় জানতে হবে৷ তারা আরো জানালেন যে, শিকাগোতে তোমাদের মতোই একটা ছোট সোসাইটি আছে। সেই সোসাইটিতে একজন সদস্য হয়ে তোমাকে প্রথমে প্রশিক্ষিত হতে হবে৷ শিকাগোর সোসাইটিতে মিশে গিয়ে আমার মনে হল, তারা লুঠতরাজ, খুন-খারাবিতে লিপ্ত নয়; তারা অনাথ শিশু, নিরন্ন মানুষদের জন্যে কাজ করে। সেখানে কিছুদিন থেকেই আমার মনে হল, আমি যা ভেবেছিলাম তাই, এই সোসাইটিগুলোর খারাপ দিক সম্বন্ধে সাংবাদিকরাই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে লেখে। ওসব গল্পকাহিনির কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।

‘তবুও আমার ওপর যখন ভারমিস্সা উপত্যকার সোসাইটির সম্বন্ধে খোঁজখবর করতে বলা হল, তখন কয়লাখনির এই বিশাল সাম্রাজ্যে বুক ঠুকে আসতেই হল। এখানে পা দিয়ে, কয়েকদিনের মধ্যে আমার ভুল ধারণা ভাঙল। বুঝলাম, সাংবাদিকরা কল্পনার সাহায্যে রোমাঞ্চকর উপন্যাস লেখেননি। যা রটেছে, তার অনেকটাই সত্যি। থেকে গেলাম এখানে৷ সতর্ক অভিনয় শুরু হল আমার। অনেক বানানো মিথ্যে বলতে হল আমাকে৷ অনেক কেরামতি, হাত সাফাইয়ের খেলা দেখাতে হল।

শিকাগোতে মানুষ তো দূরের কথা, একটা ছাগশিশুকেও খুন করিনি আমি৷ সারাজীবনে কোনোদিন জাল ডলার ছাপাইনি, ছাপাতে জানিও না৷ যেসব ডলার আমি তোমাদের দিয়েছিলাম, বলেছিলাম, এগুলো জাল ডলার, আমার হাতে তৈরি, হুবহু আসল ডলারের মতো দেখতে, সেগুলো ছিল আসল ডলারই। নিজের ট্যাঁক থেকে খরচ করেছিলাম তোমাদের বোকা বানাবার জন্যে; আর জীবনে কোনোদিন তোমাদের রাজত্বে এত ডলার খরচ করার মতো আনন্দ পাইনি। তোমাদের কীভাবে বোকা বানাতে হবে, বিশ্বাস করাতে হবে আমার কথা, তা আমি ভালোই বুঝেছিলাম। সুতরাং একদিন কাউন্সিলরের অফিসে ক্যাপ্টেন মারভিনকে আসতে হয়েছিল, সকলের সামনে আমাকে বলতে হয়েছিল আমি খুনি, শিকাগোতে আমার খুনের রেকর্ড আছে এবং সেই কারণেই অতি-ধূর্ত মারভিন সকলের সামনে আমাকে বলেছিল যে, সে আমার ওপর নজর রাখবে।

‘তারপর তোমাদের নরক-আখড়ার একজন বিশ্বাসযোগ্য, স্থায়ী সদস্য হয়ে গেলাম আমি। ভয়ঙ্কর সব সত্যি ঘটনা আমার চোখ খুলে দিল। যেদিন আমি আখড়ার সদস্য হলাম, সেদিনই রাতে, সৎ, সাহসী, বৃদ্ধ সাংবাদিক স্ট্যানজারকে তোমরা ধোলাইয়ের ব্যবস্থা করলে৷ আমার হাতে সময় ছিল না, বেচারা সাংবাদিকের কাছে আগাম খবর পাঠানো এবং তাকে সতর্ক করার। কিন্তু বলডউইনের হাত আমি মুচড়ে ধরেছিলাম, যখন সে অসহায় বৃদ্ধকে গুলি করতে যাচ্ছিল। তোমাদের বিশ্বাস আরো বেশি অর্জন করার জন্য, আমি যেসব কাজ করতে কাউন্সিলরকে পরামর্শ দিতাম, সেসব আমি নির্বাচন করতাম এমনই ভাবনাচিন্তা করে, যাতে শেষমেশ কারোর কোনো অনিষ্ট তোমরা না করতে পারো। দুজন খনি-মালিক ডুনন্ ও মেনজিসকে আমি বাঁচাতে পারিনি; খুন করতে পেরেছিলে তোমরা তাদের এই কারণে যে, তাদের আমি চিনতাম না এবং তাদের হত্যা করার পরিকল্পনা আখড়া থেকে নেওয়া হয়েছে, এটাও আমি জানতাম না। কিন্তু এখন তাদের খুনিদের যাতে ফাঁসি হয় সে ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা আমি নেবই৷

চেস্টার উইলকক্স, আর একজন একরোখা, সাহসী খনি-মালিক, তাকে স-পরিবার পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, বারুদে আগুন লাগিয়ে তার বাড়ি উড়িয়ে দেবার ছক কষা হয়েছিল। উইলকক্সে-এর সৌভাগ্য বলতে হবে যে, এই কঠিন কাজটার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আমাকেই ও আরও দুজন সাগরেদের ওপর। আমি চেস্টার উইলকক্সকে আগাম সতর্ক করে দিয়েছিলাম। যখন তার বন্ধ বাড়ি বারুদে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তার অনেক আগেই উইলকক্স তাঁর পরিবারের সকলকে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় পালাতে পেরেছিলেন৷ তোমাদের অনেক অপরাধই আমি আটকাতে পারিনি; আবার অনেক মারাত্মক অপরাধের পরিকল্পনায় আমি জল ঢেলে দিতে পেরেছিলাম।’

‘শুয়োরের বাচ্চা তুই, বিশ্বাসঘাতক!’ বিষাক্ত সাপের মতো হিসহিস করে উঠল মিকগিনটি।

‘এ্যাই জন মিকগিনটি, গালাগাল দিবি না! খুব গায়ের জ্বালা হচ্ছে! এখন তুই আমার হাতের মুঠোয়। যদি বেগড়বাঁই করিস তাহলে, আমার রিভলভারের ছটা কার্তুজই তোর মুন্ডুতে ভরে দেব! এই অঞ্চলে তুই এতকাল ছিলিস নরক থেকে উঠে আসা শয়তান হিসেবে। এখানকার সমস্ত শান্তিপ্রিয় নাগরিকের ওপর তুই এতকাল কী অত্যাচারই না করেছিস! স্থানীয় পুলিশকে তুই কিনে নিয়েছিলিস৷ তোর সব বে-আইনি কার্যকলাপ দেখেও পুলিশ মুখ বুজিয়ে থাকত। তোর মতো জঘন্য শয়তানকে ফাঁদে ফেলতে আমাকে এত মাস ধরে এত কষ্ট করতে হয়েছে৷ তোর আর তোর পা-চাটা সাগরেদদের সামনে আমাকে আর ক্যাপটেন মারভিনকে দিনের পর দিন কৌশলী অভিনয় করে যেতে হয়েছে৷ তুই আমাকে বলতে পারিস বিশ্বাসঘাতক। কিন্তু আমার অনুমান এই উপত্যকার হাজার হাজার মানুষ, কয়লাখনির মালিক ও নিরীহ শ্রমিকেরা আমাকে তাদের কৃতজ্ঞতা জানাবে, এই জন্যে যে, আমি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই নরকে একা এসেছিলাম শুধু তাদের, তোর মতো বিষাক্ত কীটের হাত থেকে বাঁচাব আর মুক্তি দেব বলে।

তিনমাস সময় নিয়েছি আমি। তিনমাস তোদের মতো নোংরা লোকেদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে হয়েছে আমাকে; যাতে তোদের হাতে হাতকড়া পরানো যায়। এই তিনমাস যে কী মানসিক যন্ত্রণায় কাটিয়েছি তা আমিই জানি৷ তিনমাস যদি ওয়াশিংটনের সরকার আমাকে পুরস্কৃত করার জন্যে তাদের টাঁকশালে বিশাল উঁচু পদে অধিষ্ঠিত করে তাহলেও আমি রাজি হব না। আমার জীবন থেকে এই তিনমাস ভুলে যেতে চাই আমি। আমার কষ্ট, ধরা পড়ে যাবার ভয়, আমার সাংঘাতিক মানসিক যন্ত্রণাকে ভুলে যেতে চাই। তিনমাস আমাকে দিনরাত পরিশ্রম করতে হয়েছে তোদের প্রত্যেককে চিনতে, আখড়ার সব গোপন রহস্য ক্রমে ক্রমে জানতে। সব তথ্য আমার হাতে চেয়েছিলাম, না হলে তোদের মতো ধূর্ত শেয়ালদের জালে ফেলা অত সহজ হতো না। হয়তো আমি আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে পারতাম, যদি না জেনে ফেলতাম যে আমার ধরা পড়ে যাবার মতো পরিস্থিতি হয়েছে। একটা টেলিগ্রাফ ভাগ্যিস আমার হাতে এসে পড়েছিল, যাতে লেখা ছিল বার্ডি এডওয়ার্ডস কাজ করছে গোপনে এই অঞ্চলে। এই টেলিগ্রাফ যদি প্রথমে তোদের হাতে পড়ত, তাহলে বিপদ হতে পারত আমার৷ তাই আমাকে এত তাড়াতাড়ি সব কাজ সেরে ফেলতে হল।

‘আমার আর বেশি কিছু বলার নেই, শুধু এটাই আমার সান্ত্বনা যে, শান্তিতে মরতে পারব আমি এই ভেবে যে, এই উপত্যকার সাধারণ মানুষদের মঙ্গলের জন্যে আমি অন্তত একটা বড় কাজ করতে পেরেছি। মি. মারভিন আপনাকে আর অপেক্ষা করাব না৷ এদের সবাইকে নিয়ে যান। যা ব্যবস্থা করার করুন।’

গল্প, থুড়ি, সত্যি ঘটনার কাহিনি তো প্রায় শেষ হয়েই এল। বার্ডি স্ক্যানলানকে একটা সিল-করা খাম দিয়েছিল। সেটা স্ক্যানলান ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হেসে পৌঁছে দিয়েছিল মিস্ এট্টি শ্যাফটারের হাতে।

পরদিন ভোরবেলা, বার্ডি এডওয়ার্ডস, সুন্দরী এক যুবতী এবং মোটা মাফলার ও টুপিতে গলা, কান, মাথা, সব ঢাকা এক বৃদ্ধ, ‘এই তিনজন উঠে পড়ল এক স্পেশ্যাল ট্রেনে, যা পাঠিয়েছিল রেল-কোম্পানি এই তিনজনেরই জন্যে৷ যদিও ফার্স্ট ক্লাস কামরাতে উঠে তারা দেখল, সশস্ত্র পুলিশ অফিসার ও কিছু সেপাই তাদের অভিবাদন জানাবার জন্যে অপেক্ষারত। অফিসার বার্ডি এডওয়ার্ডসকে স্যালুট ঠুকল। ট্রেন মাঝরাস্তায় আর কোথাও থামল না। একেবারে সোজা শিকাগো পৌঁছল। ভয়ের উপত্যকা থেকে চিরকালের জন্যে বিদায় নিল বার্ডি, মিস শ্যাফটার ও তার বাবা। দশদিন বাদে, শিকাগোতেই দুজনের শুভ-বিবাহ সম্পন্ন হল। সেই বিবাহের একমাত্র সাক্ষী থাকলেন, বৃদ্ধ জ্যাকব শ্যাফটার।

প্রায় দেড়শো দাঙ্গাবাজদের বিচারের ব্যবস্থা হল, ভারমিস্সা উপত্যকা থেকে অনেক দূরে, যাতে মিকগিনটির মো-সাহেবরা বিচারব্যবস্থার মাননীয় অভিভাবকদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালাতে না পারে। মো-সাহেবরা অবশ্য চেষ্টার ত্রুটি রাখল না। অন্তত সর্দার-কাউন্সিলর মিকগিনটিকে যাতে বে-কসুর খালাস পাওয়ানো যায়। কিন্তু সব অপচেষ্টা ব্যর্থ হল। সাধারণ নাগরিকদের ঠকিয়ে, ভয় দেখিয়ে তাদের শোষণ করত মিকগিনটির বোম্বেটেরা। লাখ লাখ কালো টাকা জমেছিল আখড়ার তহবিলে। সেই সব টাকা জলের মতো খরচ করেও মো-সাহেবরা আইনের বজ্রমুষ্টি থেকে বাঁচাতে পারল না প্রায় কাউকেই। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বার্ডি এডওয়ার্ডসের আবেগহীন সত্যোচ্চারণ, তার বিশদ ও পরিপূর্ণ জ্ঞান সেই অপরাধীদের লাইফ-স্টাইল, তাদের সংগঠনের একের পর এক অসামাজিক কার্যকলাপ, তাদের অগুন্তি রক্তক্ষয়ী অপরাধ এবং সব কথা বিচারকদের সামনে নির্ভয়ে, দীপ্ত কণ্ঠে কবুল করা, সুবিধালোভী মো-সাহেবদের সবরকম অসৎ চেষ্টাকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিল। বিচারকগণ, আদালতে হাজির গণ্যমান্য ব্যক্তিরা, ভারমিস্সা উপত্যকায় স্বেচ্ছাচারীদের কী ভয়ঙ্কর অত্যাচার চলত, তা জেনে, যারপরনাই বিস্মিত ও আতঙ্কিত হলেন। অনেক বছর পর ওই উপত্যকায় জঘন্য অপরাধীদের রাজত্ব শেষ হল। উপত্যকার আকাশ থেকে কালো মেঘ সরে গিয়ে প্রকাশ্য হল নীল, ঝাঁ-চকচকে আকাশ। উপত্যকার নাগরিকরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল, উপভোগ করতে লাগল নিরুপদ্রব জীবনযাপনের আনন্দ। দক্ষ ও কুশলী গোয়েন্দা,’বাডি এডওয়ার্ডস যে কত মানুষের আশীর্বাদ কুড়োলেন তার ইয়ত্তা নেই।

ফাঁসির মঞ্চে উঠতে হল মিকগিনটিকে, আহত শুয়োরের মতো আর্তনাদ করে, খঞ্জ কুকুরের মতো অসহায় চিৎকার করে তাকে ফেলতে হল শেষ নিঃশ্বাস৷ তার ঘনিষ্ঠ শাগরেদদের মধ্যে আটজনকেও গলায় পরতে হল চর্বি-মাখানো ফাঁসির রজ্জু। পঞ্চাশ জনেরও বেশি অপরাধীদের কপালে জুটল সশ্রম কারাদণ্ড। বার্ডি এডওয়ার্ডস তাঁর পরিশ্রমের ফল পেলেন।

তবুও, যেমনটা তিনি অনুমান করেছিলেন খেলা শেষ হয়েও, হল না শেষ। ভাগ্যের লম্বা হাত সবটাই যে জিতিয়ে দিল গোয়েন্দাকে, তা হল না। টেড্ বলডউইন, কীভাবে যেন ফাঁসির দড়ি থেকে অব্যাহতি পেয়ে গেল। আরও কয়েকজনেরও মৃত্যুদণ্ড হল না, কয়েক বছরের কারাবাসই হল তাদের শাস্তি৷ দশ বছর এই অপরাধীরা প্রত্যেকে কারাগারের অন্ধকারে কাটাল৷ তারপর মুক্তি পেল তারা৷ সেই খবর পেয়ে বার্ডিও বুঝলেন, তাঁর নিরবচ্ছিন্ন শান্তির দিন শেষ। টেড্ বলডউইন ও অন্যান্যরা নিশ্চিন্তে থাকতে দেবে না তাঁকে। তারা লেগেই থাকবে তাঁর পিছনে।

শিকাগো থেকেই তাঁর পেছনে লেগে গেল বলডউইন ও অন্যান্যরা। দুবার তারা গোয়েন্দাকে বাগে পেয়েই গিয়েছিল, কোনোক্রমে প্রাণে বাঁচলেন বার্ডি৷ তৃতীয়বার কি জেলঘুঘুদের রোষ থেকে তিনি নিজেকে বাঁচাতে পারবেন? শিকাগো থেকে নিজের নাম বদল করে তাঁকে পালাতে হল ক্যালিফোর্নিয়া। এখানে তাঁর জীবনের আলো যেন ক্ষীণ হয়ে এল, কারণ তাঁকে ছেড়ে পরপারে গেল এট্টি এডওয়ার্ডস৷ আরো একবার তাঁকে নিধন করার চেষ্টা হল, নিজের প্রখর বুদ্ধি ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের সুবাদে সেবারও বেঁচে গেলেন তিনি৷ এবার নাম নিলেন ডগলাস। বার্কার নামে এক ইংরেজের সঙ্গে পার্টনারশিপে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার এক গিরিখাতে কয়লাখনির ব্যবসা শুরু করলেন ও প্রচুর অর্থ উপার্জন করলেন। একদিন অকস্মাৎ খবর পেলেন যে, ব্লাড-হাউন্ডরা আবার তাঁর খোঁজ পেয়েছে; সেই রাতেই কোনো ঝুঁকি না নিয়ে, জন ডগলাস পালিয়ে এলেন সুদূর ইংল্যান্ডে। সেখানেই দ্বিতীয়বার প্রেমে পড়লেন তিনি এক সুন্দরী ব্রিটিশ মহিলার৷ একসময় পরিণয়-সূত্রে আবদ্ধ হলেন সেই গুণী মহিলার সঙ্গে। তারপর পাঁচবছর তিনি সুখী দাম্পত্য-জীবন কাটালেন সাসেকসে, বার্লস্টোন ম্যানরের মতো এক বিশাল গথিক-স্থাপত্যের ভবনে। সেখানে কাছাকাছি নিজের বাড়িতে সিসিল থাকছিলেন৷ ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ইংল্যান্ডে তিনি রাতারাতি পালিয়ে এসেছিলেন একা নয়; ব্যবসার সূত্রে বন্ধু সিসিল বার্কারও তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

কিন্তু অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও বার্ডি এডওয়ার্ডস ওরফে জন ডগলাস, ভারমিস্সা উপত্যকার কিছু শয়তানের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারেননি। রহস্যজনকভাবে তাঁর মৃত্যু হয়, যা পরে আমাদের কানে আসে।

উপসংহার

পুলিশকে আইন-অনুযায়ী কাজ করতেই হবে। সুতরাং ডগলাসের বার্লস্টোন ম্যানর হাউসে টেড বলডউইনের নিহত হবার ঘটনা ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ডকে রিপোর্ট করতেই হল পুলিশ-কোর্টে৷ তথ্য প্রমাণ, জন ডগলাসের বিবৃতি শুনে পুলিশ-আদালত কোনো রায় না দিয়ে মামলাটি প্রেরণ করল উচ্চ আদালাতে৷ উচ্চ আদালত মামলাটির সরাসরি বিচার না করে, সেটি প্রেরণ করল এক ধাপ নীচে অর্থাৎ সেশনস্ আদালতে৷ সেখানে জুরিগণ এবং বিচারক রায় দিলেন যে, জন ডগলাস নিজের আত্মরক্ষার তাগিদেই বলডউইন নামক এক দুষ্কৃতির সঙ্গে শটগান সমেত ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই ধ্বস্তাধ্বস্তির মুহূর্তেই শটগান থেকে কার্তুজ ছিটকে বলডউইনের মুখে মারাত্মক আঘাত করে এবং সেই আঘাতের ফলেই ওই দুষ্কৃতির মৃত্যু হয়৷ পেনাল কোড অনুযায়ী, আত্মরক্ষার নিমিত্ত কোনো ব্যক্তি যদি কাউকে হত্যা করতে বাধ্য হন; সেটি হত্যার অপরাধ হিসেবে আদালতে গ্রাহ্য হয় না। সুতরাং জন ডগলাস বে-কসুর ছাড় পেলেন এই মামলায়।

‘ইংল্যান্ড থেকে স্বামীকে যে-কোনো উপায়ে নিয়ে যান অন্য কোনো নিরাপদ স্থানে,’ হোমস চিঠি লিখল ডগলাসের স্ত্রীকে৷ কারণ হিসেবে হোমস জানাল যে, ‘এখানে (ইংল্যান্ডে) আরো অনেক বিপজ্জনক গুণ্ডা-বদমাইশরা আপনার স্বামীর পিছনে লেগে আছে। যারা টেড বলডউইনের থেকেও মারাত্মক। জানবেন, ইংল্যান্ডে আপনার স্বামীর নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়।’

দু-মাস কোথা দিয়ে যে কেটে গেল, কিছুটা হলেও, জন ডগলাসের বিপদ, নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়গুলো আমাদের মাথা থেকে বেরিয়ে গেল। তারপর একদিন সকালে আমাদের বাসস্থানের লেটার-বাক্স পাওয়া গেল রহস্যজনক একটা টুকরো কাগজ। ‘প্রিয় মি. হোমস, প্রিয়...আমি!’ শুধু এই কটি কথাই লেখা ছিল সেই অত্যাশ্চর্য কাগজের টুকরোতে। এক লাইন সেই লেখার তলায় কারোর সই ছিল না, কোনো স্ট্যাম্প কিংবা তারিখও ছিল না। আমি তো ব্যাপারটাকে হেসে উড়িয়ে দিলাম। কিন্তু শার্লক হোমসের মুখ গম্ভীর, থমথমে হয়ে রইল। তাকে দেখে মনে হল, সে যেন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সেই এক লাইন, ধাঁধাঁর মতো লেখাটিকে।

‘শয়তানি, ওয়াটসন! মারাত্মক শয়তানি!’ বিড়বিড় করছিল সে। ইজিচেয়ারে দীর্ঘ শরীর এলিয়ে দিয়ে কী যেন চিন্তা করতে লাগল। তার কপালে আমি দেখলুম দুশ্চিন্তার মেঘ। সেদিনই রাতের দিকে, মিসেস হাডসন, আমাদের পরিচারিকা, সংবাদ আনলেন যে, এক ভদ্রলোক হোমসের সঙ্গে দেখা করতে চান, খুব জরুরি প্রয়োজন তাঁর, খুব জরুরি৷ সত্যিই জরুরি মনে হল, কারণ ভদ্রলোকের আর তর সয়নি; মিসেস হাডসনের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনি হোমসের সামনে এসে দাড়ালেন। ভদ্রলোককে দেখেই চিনলুম। তিনি হলেন, পরিখা বেষ্টিত সেই জমিদারবাড়ির সিসিল বার্কার, আমাদের পুরোনো বন্ধু। তাঁর মুখে দুশ্চিন্তা ও উদভ্রান্তির ছাপ।

‘খারাপ খবর আছে, ভয়ঙ্কর খবর, মি. হোমস,’ বললেন তিনি।

‘এই খবরের ভয়ই আমি পাচ্ছিলাম।’ উত্তরে বলল হোমস।

‘কোনো টেলিগ্রাফ এসেছে আপনার কাছে?...কোনো টেলিগ্রাফ?’

‘টেলিগ্রাফ পাইনি।’

‘তবে কী পেয়েছেন?’

‘আমার লেটার-বাক্স এক টুকরো কাগজ পেয়েছি। এক লাইন লেখা ছিল তাতে। মাথামুন্ডু বুঝিনি সেই লেখার৷ কে পাঠাচ্ছে তার সই কিংবা নামও ছিল না।’

‘এই নোট এসেছিল হতোভাগ্য ডগলাসের কাছ থেকেই। ইংল্যান্ড থেকে যেখানে পালিয়ে যাচ্ছিল সে, সেখানকার নাম নিয়েছিল এডওয়ার্ডস; কিন্তু যে নামই সে নিক, আমার কাছে সে বরাবরই জ্যাক ডগলাস। বেনিটো গিরিখাতের জ্যাক ডগলাস, আমি জানিয়েছিলাম আপনাকে যে, সে আর মিসেস ডগলাস, তিন সপ্তাহ আগে, পালমিরা (Palmyra) জাহাজে দক্ষিণ আফ্রিকা রওনা হয়েছিল।

‘এগজ্যাক্টলি!’

‘গত রাতে জাহাজ তাদের নিয়ে পৌঁছেছিল কেপ টাউন। আর আজ সকালে, মিসেস ডগলাসের কাছ থেকে আমি পেয়েছি এই তারবার্তা।’

আমাদের জাহাজ সেন্ট হেলেনা বন্দর ছেড়ে রওনা দেবার পরই প্রচণ্ড ঝড় ওঠে৷ আমার বারণ সত্ত্বেও জ্যাক ঝড়ের মধ্যেই পরিস্থিতি বুঝতে জাহাজের ডেকে বেরিয়েছিল। তারপর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। যদি তার কোনো দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, কীভাবে তা ঘটল, কেউ বুঝতেও পারছে না, কিছু বলতেও পারছে না।

আইভি ডগলাস

‘হায়! হায়! এভাবেই শেষ হল সেই মূল্যবান জীবন? এইভাবে?’ হোমস ভীষণ চিন্তিতমুখে বলল। ‘বুঝতে পেরেছি আমি...’

‘কী বুঝেছেন মি. হোমস?’ ব্যগ্রভাবে বললেন বার্কার।

‘আর কী? কোনো সন্দেহই নেই আমার যে, শয়তানেরা আচমকা ঝড় এবং মি. ডগলাসের সামান্য অসতর্কতার সুযোগ খুবই নিপুণভাবে ব্যবহার করেছে।’

‘কী বলতে চাইছেন আপনি? আপনি কি ভাবছেন যে কোনো দুর্ঘটনাই ঘটেনি?’

‘কোনো দুর্ঘটনাই ঘটেনি। কোনো দুর্ঘটনাই হয়নি...।’

‘আমার বন্ধুকে কি খুন করা হয়েছে?’

‘অবশ্যই। কোনো সন্দেহই নেই। সেই দুর্ভাগাকে ওরা খুনই করেছে!’

‘হায়! হায়!’কপাল চাপড়ে বললেন বার্কার।’ আমিও সেটাই ভেবেছি। সেই নরকের কীট, বোম্বেটেরা, অভিশপ্ত, হিংস্র দাঙ্গাবাজদের দল!’

‘না, না, ওরা না, মাননীয় মহাশয়,’ বলল হোমস, ‘বিশাল শক্তিধর, এক অপরাধীর অদৃশ্য হাত আসল খেলাটা খেলেছে। করাতে কাটা দিশি শট্-গান জবরজং রিভলভারের সাধ্য ছিল না, বার্ডি এডওয়ার্ডসের মতন দক্ষ গোয়েন্দাকে চিরকালের জন্য ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া৷ এক চরম-কুশলী বুড়ো ওস্তাদের ভেলকির খেল্ এটা। তার ম্যাজিক-তুলির তুখোড় এক টান। সেই মৃত্যুবান থেকে নিজেকে বাঁচানোর উপায় গোয়েন্দা বার্ডিও জানতেন না। তাই যা হবার তা হল...। এ কাজ কার বুঝতে পেরেছ ওয়াটসন?’

‘কিছুই বুঝতে পারিনি হোমস।’

‘এই মৃত্যু নিয়ে ভেলকির খেলা হল পণ্ডিত বৃদ্ধের। যাঁর বাস খোদ লন্ডনে। যিনি লন্ডনে বসেই ইংল্যান্ড ও আমেরিকার বাঘা-বাঘা ঠক, বজ্জাত, তোলাবাজ এবং খুনিদের পরিচালনা করেন। বার্ডি এডওয়ার্ডসের মৃত্যুর নিপুণ ছক কষা হয়েছিল লন্ডনে, আমেরিকাতে নয়। বলো তাঁর নাম?

‘প্রফেসর মরিআর্টি?’

‘শাবাশ ওয়াটসন, শাবাশ!

‘কিন্তু সেই খুনে অধ্যাপকের বার্ডি এডওয়ার্ডসকে খুন করার মোটিভটা কী?’

‘মোটিভটা সরলভাবে বোঝা যাবে না ওয়াটসন। একটু ঘুরপথে বুঝতে হবে৷ মিকগিনটি আর তার লজের নাড়ি বাঁধা ছিল ওই সর্বশক্তিমান অধ্যাপক মরিআর্টির হাতে৷ যেমন ইংল্যান্ড ও আমেরিকার ছোট-বড় সমস্ত সমাজবিরোধী, সমস্ত চোর-ছ্যাঁচড়, গুণ্ডাবাহিনির, নাড়া বাঁধা আছে তাঁরই হাতে। এই লন্ডন শহরে বসেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। তিনি ব্যর্থতা কাকে বলে জানেন না। তিনি আজীবন চিনেছেন সফলতা, কুবেরের বিষয়-আশয়। বার্ডি এডওয়ার্ডসের মতো একজন লোকের মগজ-প্রতিভা যখন ভারমিস্সা উপত্যকায় তাঁর অত প্রিয়, সাজানো-গোছানো সংগঠন ভেঙে তছনছ করে দিল, তখন সেই প্রতিভাধর অধ্যাপক বোধহয় প্রথম পরাজয়ের স্বাদ পেলেন। সেই পরাজয়ের তিক্ততা মেনে নিতে পারলেন না তিনি৷ সুতরাং, বার্ডি এডওয়ার্ডসের মাথা তাঁর চাই। তাঁর মগজকে ভেঙে চূর্ণ করে ফেলতে হবে তাঁকে। সমস্ত শক্তি, তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকা অপরাধীদের ও নিজের বিরল মগজের তিনি ব্যয় করলেন চরম প্রতিশোধস্পৃহায়। এবং অবশেষে সেই বাদামকে হাতের মুঠোয় পেয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেললেন।

‘এই লোকটির কাছে কেমন করে পৌঁছল সব সংবাদ? বার্ডির অসমসাহসী কৃতিত্ব ও মিকগিনটির শোচনীয় পতন?’

‘অধ্যাপক মরিআর্টি সব খবরই পেতেন সংবাদপত্রের ও তাঁর চরেদের মাধ্যমে। ইংল্যান্ডের কুখ্যাত অপরাধীরা ও আমেরিকার খনি এলাকার যত অপরাধীদের একটা চুক্তি হল অধ্যাপকের নেতৃত্বে। তখনই আমি বুঝে গিয়েছিলাম, বার্ডি এডওয়ার্ডস ওরফে জন ডগলাসের পক্ষে নিজেকে বাঁচানো অসম্ভব। যখন টেড বলডউইনের মতো দুর্বৃত্তও ডগলাসকে যমালয়ে পাঠাতে পারল না, তখন প্রফেসর নিজের হাতে নিলেন সেই চ্যালেঞ্জ। তোমার মনে আছে ওয়াটসন আমি ম্যানর হাউসে মি. ডগলাসকে বলেছিলাম যে, সামনে আপনার যে বিপদ আসছে তা অতীতের সব বিপদের থেকেও মারাত্মক প্রাণঘাতী। ঠিক বলেছিলাম তো? শার্লক হোমসের ভবিষ্যদ্বাণী ফলে যাবেই...।’

বার্কার অনুর্বর ক্রোধে তাঁর কপালে ঘুষি মারতে লাগলেন, ‘আমরা কি এই নরকের শয়তানের সব বিধ্বংসী ক্রিয়াকলাপ এভাবে মেনে নেব? শুধু মার খেতেই থাকব আমরা? শয়তানদের এই রাজাকে কেউই কি শাস্তি দিতে পারবে না?’

‘না। আমি সে-কথা বলছি না, ‘বলল হোমস, তার দুই ঈগল-চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন দূর ভবিষ্যতের দিকেই ন্যস্ত৷’ আমি কখনোই বলছি না শয়তানদের এই ক্রূর রাজাকে কোনোদিনই ফাঁসির দড়িতে ঝোলান যাবে না। কিন্তু আমাকে সময় দিতে হবে। আপনাদের আমাকে সময় দিতে হবে!’

নির্বাক আমরা কিছুক্ষণ বসে রইলাম আর হোমসের নিয়তি-নির্দিষ্ট প্রখর দুই চোখের দৃষ্টি জীবনের রহস্যজনক পর্দাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করতে চাইছিল যেন।

অধ্যায় ২ / ২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%