এঁটোকুড়ি

কল্যাণ সরকার

দত্তপুকুর স্টেশনে নামা মাত্রই আমার নজরে পড়ল, প্ল্যাটফর্মের শেডের নীচে আমার জন্য অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছে সুজয়দা। আমাকে এগিয়ে আসতে দেখেই একগাল হেসে সুজয়দা বলে উঠল...

—'ওহো, তুমি এসে গেছো? আরে চলো.. চলো.. বাইরে বাইক রাখা আছে। কোনো অসুবিধা হবে না।'

সুজয়দার কথাটা শুনে মনে মনে বেশ শান্তি পেলাম আমি... যাক বাবা, এটা একটা ভালো কাজ করেছে সুজয়দা। বাইকটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। নাহলে আবার অটো টোটোর জন্য অপেক্ষা করতে হত। আমি বললাম...

—'তা যেতে কতক্ষণ লাগবে?'

সুজয়দা হাঁটতে হাঁটতেই জবাব দিল...

—'আরে বেশিক্ষণ না। মিনিট পনেরো কুড়ির মধ্যেই পৌঁছে যাব।'

স্টেশন থেকে বেরিয়ে এসে দেখলাম একটা লাল রঙের হণ্ডা ইউনিকর্ন বাইক দাঁড় করানো রয়েছে। সেটার দিকে তাকিয়ে সুজয়দা হাসি মুখে বলল...

—'ছোটো ছেলের গাড়ি... চাবিটা আজ চেয়ে নিয়ে এসেছি। নাও নাও... আর দেরি কোরোনা, তাড়াতাড়ি উঠে বসো।'

গাড়িতে উঠে বসার পরই সুজয়দা সেল্ফ স্টার্টিং সুইচে একটা চাপ দিল, আর তারপরেই সেটা একটা ভটভট শব্দ তুলে এগিয়ে চলল আমাদের গন্তব্যের দিকে।

এইক্ষেত্রে জানিয়ে রাখি, সুজয়দা আর আমি বর্তমানে একই অফিসে চাকরি করি। বয়সে ও আমার থেকে বেশ খানিকটা বড়ো হলেও, কলিগ হওয়ার সুবাদে এখন আমাদের সম্পর্কটা অনেকটা প্রায় বন্ধুদের মতোই হয়ে গেছে। দুজনের মধ্যেই দেদার আড্ডা, গল্প, ঠাট্টা, তামাশা, নেশার বস্তু সেবন... এই সবই চলে একসাথে। এর আগেও অবশ্য আমি বার দুয়েক এসেছি এই দত্তপুকুরে। সুজয়দার আমন্ত্রণে ওরই বাড়িতে। তবে এইবার আমার এখানে আসার উদ্দেশ্যটা একটু আলাদা। এইবার আমি আর সুজয়দার বাড়ি যাওয়ার জন্য এখানে আসিনি। বরং এসেছি অন্য এক কারণে।

আসলে বেশ কিছুদিন ধরেই আমার মাথায় একটা পরিকল্পনা চলছিল, যেটা বাস্তবায়িত করা হচ্ছিল না সময়ের অভাবে। তাই আজ রবিবার... অর্থাৎ ছুটির দিন দেখে সকাল সকালই বেরিয়ে পড়েছিলাম দত্তপুকুরের উদ্দেশ্যে। আসতেও খুব বেশি সময় লাগেনি। আমি যখন এখানে এসে পৌঁছেছি, তখন ঘড়িতে সকাল দশটা বেজে কুড়ি মিনিট।

গাড়ির পিছন থেকেই সুজয়দার উদ্দেশ্যে একটু জোর গলায় বললাম...

—'আচ্ছা... জায়গাটার নাম কী?'

—'পাঁচুড়ে...' গাড়ি চালাতে চালাতেই জবাব দিল সুজয়দা। আমি বললাম...

—'তা, এখন গেলে ওনাকে বাড়িতে পাওয়া যাবে তো?'

—'আশা তো করছি পেয়ে যাব। এমনিতে তো বাড়ি থেকে বেরোন না খুব একটা। তবে কেউ যদি কোনো দরকারে ডেকে নিয়ে যায়, তাহলে কপাল খারাপ...'

সুজয়দার কথাটা শুনে এইবার আমি যেন একটু মুষড়েই পড়লাম। মনে মনে ভাবলাম... এতদূর থেকে আসার পর যদি দেখাই না পাই, তাহলে তো পুরো খাটনিটাই ব্যর্থ যাবে। আমি চিন্তিত গলায় আবার বললাম...

—'আচ্ছা, ওনার কোনো ফোন নাম্বার নেই তোমার কাছে? মানে, ফোন করে যদি একবার জেনে নেওয়া যেত...'

—'এইসব মানুষের আবার ফোন!' হেসে উঠল সুজয়দা। তারপর হাসি থামিয়ে বলল...

—'আরে এতটা পথ তো এসেই গেছ.. আর মাত্র মিনিট পনেরোর রাস্তা... এখন আর এইসব ভেবে লাভ কী?'

ভাবলাম, কথাটা তো ঠিকই বলেছে সুজয়দা। এখন আর এইসব ভেবে লাভ কি? মনেমনে দুবার ঠাকুরকে ডেকে নিলাম...

ঠাকুর, দেখো... আসাটা যেন ব্যর্থ না হয়।

* * *

দত্তপুকুর স্টেশন চত্বর ছেড়ে গাড়িটা যতই গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলল, আশেপাশের দৃশ্যাবলিও ততই যেন পরিবর্তন হতে থাকল। এখন আমরা যেখান দিয়ে চলেছি, তার রাস্তা যতই পাকা থাক না কেন, এবং মাঝে মাঝে যতই দু-একটা দোতলা তিনতলা বাড়ি চোখে পড়ুক না কেন... এখানকার পরিবেশটা যে গ্রাম্য, সেটা আর আলাদা করে বলে দিতে হয়না।

সুজয়দা পিছন দিকে একবার মাথা ঘুরিয়ে বলল...

—'এই জায়গাটার নামই হল পাঁচুড়ে।' আমি বললাম...

—'ওহ! তা আর কতদূর?'

—'এই তো এসেই গেছি। আর মিনিট খানেকের মধ্যেই পৌঁছে যাব।'

দেখলাম সুজয়দার সময় জ্ঞ্যানটা সত্যিই অসাধারণ। ঠিক মিনিট খানেকের মাথাতেই আমাদের বাইকটা এসে দাঁড়াল একটা একতলা পাকা বাড়ির সামনে।

যদিও নামে এটা একটা পাকা বাড়ি, তবে তার ভগ্নদশা দেখে বোঝাই যায় যে এই বাড়ির মেরামতি বহুকাল যাবৎ হয়না।

বাড়িটার বেশিরভাগ জায়গাতেই ফাটল ধরেছে। রংচটা দেওয়ালের বিভিন্ন স্থান থেকে খসে পড়েছে সিমেন্টের পলেস্তারা। জানালার মরচে ধরা লোহার রডগুলো দেখে মনে হয় একটা জোরে ধাক্কা দিলেই সেগুলো হয়তো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে সময় নেবে না।

সুজয়দা রাস্তার ধারে বাইকটা স্ট্যান্ড করিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকল। পিছনে আমি। বার তিনেক কড়া নাড়তেই একজন বছর তিরিশের ভদ্রমহিলা এসে দরজাটা খুলে, কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন...

—'কাকে চাই?'

—'ফকির বাবা বাড়িতে আছেন?' জিজ্ঞেস করলো সুজয়দা।

মহিলাটি একটু ইতস্তত করে একবার ভিতরের দিকে দেখে নিয়ে বললেন...

—'আছেন... তবে ওনার তবিয়তটা একটু খারাপ আছে।'

ঠিক তখনই ভিতর একটা পুরুষ কণ্ঠের কাশির শব্দ ভেসে এল। আর তারপরেই শোনা গেল এক জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বর...

—'কে এসেছে রে বিটিয়া?'

—'বাবা... দুজন লোক আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে।'

—'আসতে বল ভিতরে..'

মহিলাটি অনিচ্ছা সত্ত্বেও দরজা ছেড়ে ভিতরে ঢুকে গেল। আর সেই সাথেই সুজয়দার পিছু পিছু আমিও প্রবেশ করলাম ঘরের ভিতর।

ছোট্ট একটা চৌকোণা আকৃতির ঘর। তারমধ্যে একটা তক্তপোশ, দুটো বেতের চেয়ার, একটা পুরোনো আমলের কাঠের টেবিল, আর থরেথরে সাজানো বেশ কয়েকটা টিনের সুটকেস ছাড়া বড় বিশেষ কিছু চোখে পড়ল না। বাড়ির বাইরের সাথে ঘরের ভিতরের চেহারার সেরকম কোনো বৈসাদৃশ্য নেই। এখানেও চারপাশে রংচটা দেওয়াল আর বিভিন্ন জায়গা থেকে খসে পড়েছে সিমেন্টের আস্তরণ।

তক্তপোশের উপর একজন বয়স্ক মানুষ দেওয়ালের সাথে বালিশ ঠেস দিয়ে বসে আছে। বয়স পঁচাত্তরের কম হবে না। রোগা-পাতলা চেহারা, চুলগুলো উসকোখুসকো, দাড়িগোঁফ বিহীন তোবড়ানো গাল। পরনে সাদা ফতুয়া আর পাজামা। দেখে বুঝলাম ইনিই সেই ফকির বাবা।

সুজয়দা ওনার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল...

—'বাবার বুঝি শরীর খারাপ?' কথাটা বলেই সুজয়দা একটা বেতের চেয়ারে বসতে গেল। ওকে দেখে আমিও তার পাশের চেয়ারটায় যেই বসতে যাবো, অমনি ফকির বাবা সুজয়দার দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে চিৎকার করে বলে উঠল...

—'তোর বিপদ হয়েছিল... ঘোর বিপদ... ভয়ংকর কিছু ঘটে যেতে পারত... কিন্তু উপরওয়ালার আশীর্বাদে এখন সেই বিপদ কেটে গেছে!'

ফকির বাবার এইরকম জোরালো গলার আওয়াজ শুনে আমার বুকের ভিতরটা যেন হঠাৎ করে কেঁপে উঠল। এহেন একজন অস্থিসার সর্বস্ব মানুষের যে এত ভারী গলার আওয়াজ হতে পারে, তা আমি নিজে চোখে না দেখলে কখনোই বিশ্বাস করতে পারতাম না।

সুজয়দা দেখলাম অবিচলিত ভাবেই চেয়ারে বসে বলল...

—'হ্যাঁ বাবা... হয়েছিল তো বিপদ! মারাত্মক এক বিপদ! আপনিই তো গেছিলেন আমার গঙ্গারামপুরের বাড়িতে। ভুলে গেলেন?'

ফকির বাবা এবার কিছুক্ষণ নিজের কপালে হাত দিয়ে কী যেন চিন্তাভাবনা করলেন। তারপর হঠাৎ বলে উঠলেন...

—'ও হ্যাঁ হ্যাঁ... মনে পড়েছে। সেই তোদের বাড়িতেই তো কুকুরের গলার চেনে মরা মেয়েটার মাথার চুল আটকে ছিল! তাই না?'

—'হ্যাঁ বাবা... একদম ঠিক বলেছেন।'

ফকির বাবা একটা গভীর নিশ্বাস ছেড়ে গম্ভীর গলায় বললেন....

—'হুমমম...' তারপর অপেক্ষাকৃত নিচু স্বরে বললেন...

—'আসলে বয়েস বাড়ছে তো, তাই আজকাল আর আগের মতো সবকিছু মনে থাকছে না। তা বেটা আমার সাথে কী দরকার? আবার বুঝি কোনো অসুবিধা হচ্ছে?'

—'না বাবা... আমার আর কোনো অসুবিধা নেই। তবে আমার এই বন্ধুটা আপনার কাছে একটা অনুরোধ নিয়ে এসেছে।'

—'অনুরোধ! কিসের অনুরোধ?' কৌতূহলী চোখে আমার দিকে ঘুরে তাকালেন ফকির বাবা।

আমি সামান্য ইতস্তত করে বললাম...

—'বাবা... আমি একজন শখের লেখক... মাঝেসাঝে টুকটাক লেখালেখি করি... বইও বেরিয়েছে দু-একটা....'

—'বাঃ... এ তো খুবই ভালো কথা। তা আমার কাছে কেন?'

—'আসলে আমি যা লিখি, তার বেশিরভাগই হল ভৌতিক কাহিনি... অর্থাৎ ভূতের গল্প। আর সুজয়দার মুখে আমি আপনার কাজের ব্যাপারে অনেক কথাই শুনেছি। তাই আপনি যদি আপনার জীবনের কয়েকটা বাস্তব অভিজ্ঞতা আমায় শোনান... তাহলে আমি সেগুলো গল্পের আকারে কোনো বইতে লিখতে পারি। অবশ্য তাতে আপনার নামটাও উল্লেখ করা থাকবে।'

আমার কথা শুনে দেখলাম ফকির বাবা কেমন যেন চুপ হয়ে গেল। মনে হল হয়তো চিন্তা করছে... কী করা উচিত? তারপর সামান্য একটু খকখক করে কেশে নিয়ে, বোতল থেকে কিছুটা জল খেয়ে, বোতলটা আবার যথাস্থানে রেখে দিল। এরপর গলাটা ঝেড়ে নিয়ে বলল...

—'নাম!!! তা এই বুড়ো বয়সে আমার নাম দিয়ে আমি কী করব বল তো?

নাঃ... ওইসব নাম-টাম আমার আর লাগবে না। তবে তুই যখন শুনতে চাইছিস, তখন তোকে একটা ঘটনা আমি বলব। এই হপ্তাখানেক আগেই ঘটেছে। আর তারপর থেকেই শরীরটা আমার খারাপ যাচ্ছে।'

এতদূর বলার পরেই ফকির বাবা একটু উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে বললেন...

—'আয়েশা বেটি... বাবুদের জন্য দুকাপ চা দিয়ে যা তো।'

আমি ফকির বাবাকে বাধা দিয়ে বলতেই যাচ্ছিলাম... আমরা এখন চা খাব না। কিন্তু সুজয়দা চোখের ইশারায় আমায় চুপ থাকতে বলল, তাই আর কিছু বললাম না।

এই ঘরে ঢোকার পর থেকেই একটা ব্যাপার আমার কাছে বেশ অদ্ভুত লাগছিল। এবার সেটা না জিজ্ঞেস করে থাকতে পারলাম না।

—'আচ্ছা বাবা... আমি যতদূর জানি আপনি একজন মুসলিম। কিন্তু আপনার ঘরে তো দেখছি মক্কা মদীনার ক্যালেন্ডারের সাথে, মা কালী, বজরং বলী, জিসাস ক্রাইস্টদেরও ছবি আছে। ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না।'

আমার কথা শুনে এবার হেসে ফেললেন ফকির বাবা। তারপর বললেন...

—'এতে এত অবাক হওয়ার কি আছে বেটা? আমি তো একজন মানুষ, আর ওনারা হলেন আমার উপরওয়ালা। আমি সব উপরওয়ালাদেরই ভক্তি করি... ভালোবাসি। এটা তো কোনো দোষের না।'

ওনার উত্তরটা শুনেও আমার মনের দ্বিধাটা যেন কাটতে চাইল না। তাই আবার বললাম...

—'সে না হয় বুঝলাম... কিন্তু বাবা, যতই হোক আপনি তো একজন মুসল.....'

আমার বলা সম্পুর্ণ হওয়ার আগেই ফকির বাবা আমার মুখের কথাটা কেড়ে নিয়ে বললেন...

—'ধুর বোকা... ফকিরের আবার ধর্ম কি রে? সেই কোন ছোটোবেলায় নিজের বাপ-মা'কে হারিয়েছি। ওরা যে কোন জাতের ছিল, তাও মনে নেই। রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে বেড়াতাম। থাকার জায়গা ছিলনা তাই কখনো মন্দির, মসজিদ আবার কখনো গির্জায় ঠাঁই নিতাম। বিশ্বাস কর, ওরা কেউ কোনোদিন আমায় ফিরিয়ে দেয়নি। কেউ কখনও জিজ্ঞেস করেনি আমি হিন্দুর ছেলে, নাকি মুসলমানের, আর নাকি খ্রিস্টানের?

এই যে তোরা বলিস আল্লাহ, গড, ভগবান... এগুলো তো সব তোদের দেওয়া নাম। আমার কাছে তো এরা সবাই আমার ''উপরওয়ালা''।

একটু থামলেন ফকির বাবা। বুঝতে পারছিলাম এক নাগাড়ে কথা বলতে ওনার বেশ কষ্ট হচ্ছে। মিনিট খানেক চুপ করে থেকে উনি আবার বলতে শুরু করলেন...

—'তখন আমি সবে কিশোর বয়েসে পা রেখেছি। এক মাজারের পির বাবা আমায় নিয়ে গেলেন ওনার সাথে। বছর চারেক ওনার কাছেই ছিলাম। ওই সময়ের মধ্যে উনি আমায় অনেক কিছুই শিখিয়েও ছিলেন। বলতে পারিস, আমার এইসব বিদ্যার প্রথম হাতে খড়ি ওনার কাছেই হয়েছিল।

তবে সবটুকু উনি আমায় শিখিয়ে যেতে পারেননি। কারণ, আমার শিক্ষা সম্পুর্ণ হওয়ার আগেই উনি একদিন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন।

পির বাবা চলে যাওয়ার পর আমিও আর বেশিদিন থাকিনি ওই মাজারে। দিন কয়েক পরেই ওখান থেকে আবার বেরিয়ে পড়েছিলাম পথে পথে।

অনেকদিন নানা জায়গায় ঘোরাঘুরির পর এইবার আমি সান্নিধ্য পেলাম তারাপীঠ মহাশ্মশানের এক তেজস্বী তান্ত্রিক, শ্রী ভৈরবানন্দ স্বামীর। কেন জানি না ওনার আমাকে দেখেই খুব পছন্দ হয়ে গেল।

বললেন.. তান্ত্রিক বিদ্যা শিখতে চাস? শিষ্য হবি আমার?

কথাটা শোনামাত্রই আমার যেন হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো অবস্থা। সাথে সাথেই ঘাড় নাড়িয়ে জবাব দিলাম... হ্যাঁ, চাই। তা শুনে উনি আরও একবার আমায় ভালো করে দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন... ভীষণ কঠিন কাজ কিন্তু। পারবি তো নিজের জাগতিক সব চাহিদা ত্যাগ করে এই সাধনা করতে? আমি দৃঢ় কণ্ঠে বললাম... হ্যাঁ বাবা, পারব।

এরপর উনি আমায় দীক্ষা দিলেন। তন্ত্র সাধনার বীজমন্ত্র শেখালেন। ওনার কাছ থেকেই আমি প্রেতসিদ্ধি, শবসাধনা, চিতাসাধনা, পিশাচ বশীকরণ, ভৈরবীসাধনা... এইরকম আরও অনেক বিদ্যাই শিখেছিলাম।

প্রায় বছর তিনেক আমি ভৈরবানন্দ স্বামীর সাথেই ছিলাম। আর সেই সময়ের মধ্যেই উনি আমায় তন্ত্র ক্রিয়া সম্পর্কিত গুহ্যবিদ্যা, মহাবিদ্যা, যজ্ঞবিদ্যা.... এমনকী মারণবিদ্যাও... অর্থাৎ যা কিছুই ওনার জানা ছিল, সেই সকল জ্ঞ্যানই আমায় প্রদান করেছিলেন।'

ফকির বাবা নিজের জোর হাতটা দুবার কপালে ঠেকিয়ে একটু থামলেন। সুজয়দা বেশ কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল...

—'তারপর?'

ফকির বাবা মৃদু হেসে বললেন...

—'তারপরের কি আর কোনো শেষ আছে রে বেটা? সারা জীবন ধরে অগুনতি মানুষের সাথে মিশেছি। তাদের সাথে থেকেছি। সে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, ইশাই, বৌদ্ধ... যেই ধর্মেরই হোক না কেন। তাদের থেকে অফুরন্ত শিক্ষা অর্জন করার চেষ্টা করেছি। তারপর আবার সেই শিক্ষা দিয়েই মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। এটাই তো একজন ফকিরের জীবনের আসল উদ্দেশ্য।'

অনেকক্ষণ ধরেই একটা প্রশ্ন আমার মাথার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। এইবার সেটা করেই ফেললাম...

—'আচ্ছা বাবা, আপনার বিবাহিত জীবন সম্পর্কে তো কিছু বললেন না। মানে কবে বিয়ে করলেন, বা কীভাবে করলেন... এইসব কিছু!'

আমার প্রশ্ন শুনে ফকির বাবা কেমন যেন থমথমে গম্ভীর মুখে আমার দিকে চেয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ! তারপর হঠাৎ উচ্চস্বরে হো হো করে হেসে উঠে বললেন...

—'ওরে পাগল, ফকির মানুষ আবার বিয়ে করে কবে? ওইসব বিয়ে-সাদি কি আর আমাদের জন্য রে?'

আমি আরও কিছু বলতেই যাচ্ছিলাম, ঠিক এমন সময় দরজার সামনে মানুষের পায়ের আওয়াজ পেয়ে থেমে গেলাম। দেখলাম, আয়েশা একটা স্টিলের ট্রেতে করে তিন কাপ চা নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল।

ফকির বাবা ওর দিকে তাকিয়ে আমায় বলল...

—'ওহ, বুঝেছি... এই আয়েশাকে আমি বেটি বলে ডাকছি, তাই ভাবলি তো? আরে তোদেরও তো আমি বেটা বলেই ডাকছি। আমার কি আর একটা দুটো ছেলেমেয়ে আছে রে? আমার এরকম অনেক অনেক বেটা বেটি আছে। তারা আমায় ভালোবাসে, তাদের সাথে রাখতে চায়, আদর যত্ন করতে চায়... তা কী করব বল? তাছাড়া আমারও তো বয়স হয়েছে... পথে পথে বেশি ঘুরতে পারিনা। তাই থেকে যাই ওদের কাছে।'

নিজের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছিলাম আমি। তাই আর অতিরিক্ত কোনো কৌতূহল না দেখিয়ে এবার সরাসরি কাজের কথায় এলাম...

—'বাবা, যেই কাজের জন্য আমি এখানে এসেছি। সেটা যদি এবার বলেন...'

—'ওহ... তুই তো আবার আমার জীবনের ভয়ংকর কোনো সত্যি ঘটনা জানতে এসেছিস। বেশ... সেটাই না হয় তোকে বলি।'

ফকির বাবা ট্রে থেকে একটা চায়ের কাপ তুলে নিলেন। তারপর সশব্দে তাতে লম্বা-লম্বা দুটো চুমুক দিয়ে বলতে শুরু করলেন...

—'ঘটনাটা আজ থেকে আট দিন আগের। অর্থাৎ এই শনিবারের আগের শনিবার। তোদের মনে আছে নিশ্চয়ই সেদিন আবার সকাল থেকেই একটানা বৃষ্টি পড়ে যাচ্ছিল। দুপুরের দিকে সেটা একটু কম হলেও, বিকেলের পর আবার শুরু হল মুষলধারে। এমনিতেও সেদিন কোথাও বেরোনোর মতো ছিলনা, তাই বাড়িতে বসেই জানালা দিয়ে চুপচাপ বৃষ্টির দাপট দেখছিলাম।

ঠিক যখন সন্ধেটা নামল, এমন সময় ওই প্রবল দুর্যোগের মধ্যেও একজন এল আমার সাথে দেখা করতে। লোকটার বয়স পঁয়ত্রিশের সামান্য বেশিই হবে। লম্বা চওড়া চেহারা। ন্যাড়া মাথা। চোখেমুখে একটা দুশ্চিন্তার ভাঁজ। আমায় দেখেই উনি কেমন যেন একটা অসহায় গলায় জিজ্ঞেস করলেন...

—'আপনিই কি ফকির বাবা?'

আমি মাথা নাড়িয়ে 'হ্যাঁ' বলা মাত্রই লোকটা চিৎকার করে বলে উঠল...

—'বাবা, আমায় বাঁচান আপনি। অনেক আশা নিয়ে আপনার কাছে এসেছি। দয়া করে আমার বউটাকে রক্ষা করুন বাবা।'

অত বড়ো লোকটা আমার সামনে বাচ্চাদের মতো হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করল। এমনিতেই লোকটা বাড়িতে ঢোকার পর থেকে আমি কেমন যেন একটা নেতিবাচক শক্তি অনুভব করতে পারছিলাম সারা ঘরে। এখন লোকটার অবস্থা দেখে বুঝলাম, ও বেশ ভয়ংকর বিপদের সম্মুখীন হয়েই এই বৃষ্টিবাদলা মাথায় নিয়ে আমার কাছে এসেছে। আমি ওকে সান্ত্বনা জানিয়ে জিজ্ঞেস করলাম... কী ঘটেছে ওর সাথে? কেন ও এত ভয় পেয়ে আছে?

তার উত্তরে লোকটা আমায় যা বলল, তা শুনে আমার মতো ভয়ভীতিহীন একজন ফকিরের বুকটাও ঢিপঢিপ করে উঠল।'

ফকির বাবা এরপর ওই লোকটার বলা সম্পুর্ণ ঘটনাটাই আমাদের শুনিয়ে ছিলেন। আমি আপনাদের কাছে সেটা গল্পের আকারে সাজিয়ে নিয়ে উপস্থাপন করলাম। এতে হয়তো আপনাদের ঘটনাটা উপলব্ধি করতে খানিক সুবিধাই হবে।

ফকির বাবার কাছ থেকে সাহায্যের আশ্বাস পেয়ে লোকটা একটু ধাতস্থ হল। তারপর একটা চেয়ারে বসে নিজেকে কিছুক্ষণ সামলে নিয়ে ও বলতে শুরু করল...

—'আমার নাম সন্তোষ তালুকদার। বাড়ি মছলন্দপুর। পেশায় আমি একজন মাছের ব্যবসায়ী। মছলন্দপুর স্টেশন রোডের ধারে যে বাজার আছে, সেখানেই আমি বসি।পরিবার বলতে এইমুহূর্তে বাবা, আমি, আমার বউ শ্রাবন্তী, আমাদের সাত বছরের মেয়ে তিন্নি আর চার বছরের ছেলে তাতাই... এই পাঁচজন। আগে মা ছিলেন। দিন তিনেক হল উনি মারা গেছেন।

তা যাই হোক, যেই কারণে আমার এখানে আসা, সেটা আপনাকে বলি। আমার বাড়িটা মছলন্দপুরে হলেও, জায়গাটা মছলন্দপুর আর গোবরডাঙ্গার প্রায় মাঝামাঝি এলাকা। নাম চড়াইখোলা। জানিনা আপনি কোনোদিন শুনেছেন কিনা এই নাম। তবে যদি শুনে থাকেন তাহলে নিশ্চয়ই জানবেন জায়গাটা মছলন্দপুর রেললাইনের একদম পাশেই।

আমি যেই ঘটনার কথা বলছি, সেটা আজ থেকে প্রায় মাস দেড়েক আগের কথা। সেসময় আমার ঠাকুমা বেঁচে ছিলেন। ওনার বয়স তখন পঁচাশি কি ছিয়াশি হয়েছিল। তবে বয়েস যাই হোক, বুঝতেই পারছেন আগেকার দিনের মানুষ... তাই ওই সময়েও বেশ শক্তসমর্থই ছিলেন উনি। নিজের কাজগুলো সবসময় নিজে করতেই বেশি পছন্দ করতেন। এই যেমন... শোওয়ার ঘর পরিষ্কার করা, নিজের জামাকাপড় কাচা, প্রতিদিন পুজো দেওয়া, সন্ধ্যা দেওয়া... এইসব আর কি। তা ওইসময় আমাদের পাড়ায় একটা পাগলি বউ থাকত। বয়স এই পঁয়ত্রিশ কি ছত্রিশ হবে। ও যে কবে আর কোথা থেকে এসেছিল এখানে, তা কেউ জানতো না। তবে সারাক্ষণ ও আমাদের পাড়ার অলিগলি গুলোতে ঘুরে বেড়াত, আর রাতের বেলায় রেললাইনের ধারে জগাইদের বন্ধ দোকানটার শেডের নীচে শুয়ে থাকত। পাড়া থেকে আমরা কেউ না কেউ প্রতিদিনই ওকে খাবার দাবার দিতাম, তা সে দিনের বেলাই হোক কিংবা রাতের বেলা। তবে ওর একটা বদ অভ্যেস ছিল। ওকে যে যাই খাবারই দিক না কেন, ও আগে সেটাকে উপুড় করে মাটির মধ্যে ঢালত... আর তারপর সেখান থেকে কুড়িয়ে কুড়িয়ে ওগুলো খেত। ওর এই অভ্যাসের জন্যই, আমরা সবাই ওকে ''এঁটোকুড়ি'' বলে ডাকতাম। তবে কে যে এই নামটা ওকে প্রথম দিয়েছিল... তা আমি জানিনা। তবে আমাদের কাছে ও ''এঁটোকুড়ি'' বলেই পরিচিত ছিল।

তা এই এঁটোকুড়িকে আমার ঠাকুমা আবার খুব ভালোবাসতেন। প্রতিদিনই নিজের খাবার থেকে কিছু না কিছু বাঁচিয়ে নিয়ে, ওকে খেতে দিতেন। আর ওদিকে এঁটোকুড়িও হয়তো এই ব্যাপারটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারত। তাই রোজ ঠাকুমার খাওয়ার সময় হলেই, ও আমাদের বাড়ির সামনে এসে ঘুরঘুর করত।

যাক, এইভাবেই চলছিল সবকিছু। বেশ কিছুদিন কেটেও গেছিল নির্বিঘ্নে। কিন্তু এরপরেই হঠাৎ করে একদিন এমন একটা বিপর্যয় ঘটল, যার জন্য আমাদের পরিবারের সমস্ত সুখশান্তি, সব আনন্দ ধীরে ধীরে বিষন্নতার আড়ালে ঢেকে যেতে লাগল। পড়ে থাকল শুধু একরাশ ভয়, আতঙ্ক, আর আমাদের করুণ অসহায়তা।

ব্যাপারটা না হয়, আরেকটু খোলসা করেই বলি আমি। তাহলে হয়তো আপনার বুঝতে একটু সুবিধা হবে।

আসলে, আমার ঠাকুমার নিত্যদিনের অভ্যাসগুলোর মধ্যে একটা অভ্যাস ছিল, রাত থাকতে উঠে গিয়ে ঠাকুরের জন্য ফুল তুলে আনা... আর তারপর সেই ফুল দিয়েই ঠাকুর পুজো দেওয়া। এ কাজ উনি প্রতিনিয়তই করতেন। তা সে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, যাই হোকনা কেন, কোনোদিনই ঠাকুমা এর অন্যথা করেননি।

মাস দেড়েক আগে সেদিনও উনি ভোর হওয়ার আগে এইজন্যই বেরিয়ে ছিলেন। সময়টা ছিল শ্রাবণ মাস। সারারাত ধরে একনাগাড়ে বৃষ্টি হওয়ার পর, ভোররাতের দিকে বৃষ্টিটা একটু থেমেছিল। আর সেই সুযোগেই ঠাকুমা বেরিয়ে ছিলেন ফুল তুলতে। আমাদের বাড়ি থেকে হাঁটাপথে মিনিট খানেকের দূরত্বেই ছিল রেললাইনটা। আর ওই রেললাইনের ধারেই ছিল একটা টগরফুল গাছ। ঠাকুমা রোজ সেখান থেকেই ফুল নিতেন। সেদিনও উনি তাই-ই করছিলেন।

চারিদিকে তখনও রাতের অন্ধকার ছেয়ে আছে। ভোরের আলো ফুটতে আরও বেশ কিছু সময় বাকি। স্যাঁতসেঁতে, নিঝুম, নিস্তব্ধ পরিবেশে ঠাকুমা একা দাঁড়িয়ে, লাইটপোস্টের হলদে আলোয় গাছের থেকে একের পর এক ফুল তুলে চলছিলেন। ওনার সমস্ত মনোযোগটাই তখন ছিল ফুল তোলার দিকে। কিন্তু, হঠাৎই ওনার মনে হল, জালের মতো কিছু একটা জিনিসে যেন ওনার পা'টা পেঁচিয়ে গেছে।

কী সেটা? দেখার জন্য নিচের দিকে তাকালেন ঠাকুমা। আর সাথে সাথেই যেই দৃশ্য ওনার চোখে পড়ল, তাতে ঠাকুমার সর্বাঙ্গ যেন মুহূর্তের মধ্যে থরথর করে কেঁপে উঠল! হাতে ধরে থাকা ফুলের সাজিটা নিজের থেকেই খসে পড়ে গেল মাটিতে। উনি দেখলেন ওনার ঠিক পায়ের কাছেই হাঁ করে পড়ে আছে এঁটোকুড়ির ধড়বিহীন কাটা মাথাটা!!! স্থির হয়ে থাকা খোলা চোখদুটো তখনও একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে রাতের আকাশের দিকে। আর সেই মাথারই নোংরা জট পাকানো চুলের ফাঁকে আটকে গেছে ঠাকুমার পা!!!

ভয়ে, আতঙ্কে আর মারাত্মক বিভীষিকায় ঠাকুমার সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে এল। উনি কোনোমতে ওখান থেকে ছুটে পালানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন না। চুলের ফাঁকে পেঁচিয়ে যাওয়া পা এগোনো মাত্রই, এঁটোকুড়ির কাটা মাথাটাও ওনার পায়ের সাথে মাটি ঘষে এগিয়ে চলল। রাতের অন্ধকারে এইরকম একটা নির্জন ফাঁকা জায়গায় এহেন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে, উনি যে ঠিক কী করবেন... বুঝে উঠতে পারলেন না। হঠাৎ ওনার চোখ পড়ল রেললাইনের মাঝখানের পাটাতনগুলোর উপর। উনি দেখলেন সেখানে তখনও দুমড়ে মুচড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে এঁটোকুড়ির মস্তকহীন দেহখানা। ওর হাত-পা বেঁকে দলা পাকিয়ে গিয়ে, এক তাল মাংসের রূপ ধারণ করেছে সমস্ত শরীরটা।

রক্ত জল করা এই বীভৎস দৃশ্য দেখে ঠাকুমা আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। চিৎকার করে সেখানেই জ্ঞান হারালেন।

ভাগ্যিস সেই রাতে আমাদের পাড়ার একজন পরিচিত লোক ফার্স্ট ট্রেন ধরার জন্য ওই পথ দিয়েই যাচ্ছিলেন। তাই বড় কোনো অঘটন ঘটে যাওয়ার আগেই ঠাকুমাকে আমরা সেদিন ঘরে ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলাম।'

এতদূর শোনার পর ফকির বাবা জিজ্ঞেস করলেন...

—'তারপর এঁটোকুড়ির কী হল?'

—'এঁটোকুড়ির আর কী হবে? পুলিশ এসে সামান্য জিজ্ঞাসাবাদ করল আমাদের। তারপর ওর ডেডবডি নিয়ে চলে গেল। পুলিশের ধারণা রাতের অন্ধকারে লাইন পারাপার করতে গিয়েই হয়তো ট্রেনের তলায় কাটা পড়েছে এঁটোকুড়ি।'

ফকির বাবা গম্ভীর গলায় বললেন...

—'হিন্দুর ঘরের সধবা বউ ছিল ও... অপঘাতে মারা গেছিল। কোনো শ্রাদ্ধশান্তি করা হয়নি?'

সন্তোষবাবু মৃদু হেসে বললেন...

- 'একজন পাগলির জন্য কে নিজের গ্যাটের টাকাকড়ি খসিয়ে শ্রাদ্ধশান্তি করতে যাবে বাবা? পুলিশরা তো আর এইসব কাজ করবেনা। তাই ওগুলো কিছু করা হয়নি।'

কথাটা শুনে ফকির বাবার মুখটা একদম কালো হয়ে গেল। কিছুক্ষন চুপচাপ থাকার পর, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উনি বললেন...

- 'হুমমম... বুঝলাম... তারপর?'

সন্তোষ তালুকদার আবার বলতে শুরু করলেন....

—'এই ঘটনার দিন দুয়েকের মধ্যেই ঠাকুমা পুরোপুরি শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠলেও, ওনার মধ্যে কেমন যেন একটা অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করলাম আমরা। যেমন- ফাঁকা ঘরে একা একা বিড়বিড় করা, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া, কিংবা ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে অনবরত নখ দিয়ে দেওয়ালে আঁচড় কাটা... এইসব আর কী!

প্রথমটা ভাবতাম, বয়স্ক মানুষ... হয়তো ওইরকম একটা বীভৎস দৃশ্য নিজের চোখের সামনে দেখায়, মাথার কোনো গোলমাল দেখা দিয়েছে। কিন্তু তারপর একদিন রাতে হঠাৎ যা দেখলাম...'

সন্তোষবাবুর চোখেমুখে একটা ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। ফকির বাবা থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করলেন...

—'কী দেখলি?'

সন্তোষবাবু গলার স্বর একদম নিচু করে বললেন...

—'প্রতি রাতের মতো সেই রাতেও শ্রাবন্তী খাবার দিতে গেছিল ঠাকুমার ঘরে। থালাটা মেঝেতে নামিয়ে রেখে তাকাতেই, ও দেখতে পেল ঠাকুমা ওর দিকে পিঠ করে বিছানার উপর বসে আছে। জানালা দিয়ে কী যেন একটা দেখছে খুব মনোযোগ সহকারে। বাইরে ঝমঝমিয়ে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। ও ঠাকুমাকে ডাক দিয়ে বলল...

—'ঠাম্মা, তোমার ভাত এনেছি। খেতে এসো।'

কিন্তু ঠাকুমা ওর কথার কোনো উত্তর দিলেন না। সেই একইভাবে বসে রইলেন পাথরের মূর্তির মতো। শ্রাবন্তী আরও বেশ কয়েকবার ডাকাডাকির পরেও ঠাকুমা যখন কোনো সাড়াশব্দ দিলেন না, তখন ওর মনে কেমন যেন একটা সন্দেহ হল! ও ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল ঠাকুমার দিকে। আর তারপর ওনার পিঠের উপর একটা হাত রাখল। শ্রাবন্তীর হাত ঠাকুমার শরীর স্পর্শ করা মাত্রই বিদ্যুৎ গতিতে ওর দিকে ঘুরে তাকালেন ঠাকুমা।

কিন্তু একি!!!! এটা কী রূপ ঠাকুমার???

পঁচাশি ছিয়াশি বছরের একজন বিধবা বৃদ্ধার মাথায় জ্বলজ্বল করছে পুরু করে দেওয়া সিঁদুরের রেখা, কপালে লেগে আছে ঘেটে যাওয়া লাল টিপ, আর দুই হাতে শোভা পাচ্ছে সধবা মহিলাদের বিবাহের প্রতীক... শাঁখা-পলা। ঠাকুমা পান খাওয়া লাল ঠোঁটে তখন হাসি হাসি মুখে চেয়ে আছে শ্রাবন্তীর দিকে।

চমকে উঠল শ্রাবন্তী! ঠাকুমার কি তবে মাথা খারাপ হয়ে গেছে? একজন বিধবা হওয়া সত্ত্বেও এইসব কী ধরনের বেশভূষা ওনার?

শ্রাবন্তী ছুটে এল আমাদের সকলকে ডাকতে। ওর মুখ থেকে সব কথা শোনার পর আমরা যখন ঠাকুমার ঘরে গেলাম, তখন যেই দৃশ্য আমাদের চোখে পড়ল, তাতে আমাদের সকলেরই হাত-পা কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে গেল! আমরা কেউই বুঝে উঠতে পারলাম না, চোখের সামনে এটা আমরা কাকে দেখছি....

ঠাকুমা... নাকি এঁটোকুড়ি!!!!

বিস্মিত চোখে আমি দেখলাম, আমার ঠাকুমা মাটিতে ভাত, ডাল, তরিতরকারি সমস্ত কিছু ঢেলে নিয়ে এঁটোকুড়ির মতোই কুড়িয়ে কুড়িয়ে খাচ্ছে। চোখে সেই একই চাহনি... ঠোঁটের ফাঁকে সেই একই ধরনের হাসি।

বাবা চিৎকার করে ছুটে গেল ঠাকুমার কাছে। কিন্তু কিছুতেই ওনাকে মাটি থেকে কুড়িয়ে খাওয়া থেকে বিরত করা গেল না। একজন ছিয়াশি বছরের বৃদ্ধার শরীরে কী পরিমাণ যে শক্তি হতে পারে, সেটা সেই রাতে আমি প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম। এরপর সেদিন আমি আর বাবা কোনোরকমে ঠাকুমাকে বিছানায় শোওয়াতে সমর্থ হয়েছিলাম। আর তার কিছুক্ষন বাদে সৌভাগ্যবশত ঠাকুমা ঘুমিয়েও পড়েছিলেন।'

একটা নিশ্বাস ছাড়লেন সন্তোষবাবু। ফকির বাবার কপালে তখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ। গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন...

—'এরপর কী হল?'

সন্তোষবাবু আবার বলতে লাগলেন...

—'এরপর যত দিন গড়াতে লাগল, ঠাকুমার পাগলামিগুলোও যেন বেড়ে যেতে থাকল। সারাক্ষণ ঘরে বসে একা একাই বিড়বিড় করতেন। কেউ কোনো কথা বলতে গেলে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতেন। আর সবচেয়ে বড়ো কথা হল, ওনার এইসব নোংরা ব্যবহারগুলোর সাথে সাথে সমান তালে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলছিল... ওনার খিদে।

সর্বগ্রাসী এক রাক্ষুসে খিদের আগুন সবসময় যেন জ্বলতো ওনার পেটের ভিতর। দিনভর খালি চিৎকার করে যেতেন, খেতে দে... খেতে দে, করে। আর খাবার না পেলেই প্রচণ্ড রাগে ক্রোধে হিংস্র হয়ে উঠতেন। আপনাকে বললে হয়তো বিশ্বাস করবেন না বাবা। সেসময় ঠাকুমা একাই প্রায় চার-পাঁচজন মানুষের খাবার খেয়ে ফেলতেন।'

—'আচ্ছা, তখনও কি উনি সেই শাঁখা-সিঁদুরগুলো পরতেন?' সন্তোষবাবুর দিকে তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলেন ফকির বাবা।

—'হ্যাঁ... পরতেন তো! ওগুলো ওনার শরীর থেকে সরায়... কার সাধ্যি ছিল? একবার আমি আর বাবা মিলে জোর করে চেষ্টা করেছিলাম বটে, কিন্তু তাতে উনি যা দাপাদাপি করেছিলেন... আমরা ভয় পেয়ে ছেড়ে দিয়েছিলাম।'

—'আর সেই মাটি থেকে কুড়িয়ে খাওয়ার অভ্যেসটা?'

—'হ্যাঁ... সেটাও ছিল। যখনই যাই খেতে দিতাম, সেটা থালা সমেত মাটিতে উপুড় করে তবেই খেতেন।'

ফকির বাবার কুঁচকে থাকা ভ্রু জোড়া আরও একটু কুঁচকে গেল। গম্ভীর গলায় উনি বললেন...

—'হুমমম... বুঝলাম! এরপর কী হল?'

সন্তোষবাবু সামনে রাখা জলের গ্লাসটা থেকে বেশ খানিকটা জল খেয়ে, গ্লাসটা আবার যথাস্থানে রেখে দিলেন। তারপর নিজের ডানহাত দিয়ে মুখটা মুছে নিয়ে বলতে শুরু করলেন...

—'দিন দুয়েক এইভাবেই কেটে গেল। এরপর একদিন গভীর রাতে হঠাৎ করে আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। মনে হল আমার ঘরের বাইরে থেকে অনবরত একটা ঘষঘষ শব্দ হয়ে চলেছে। কিন্তু সেটা কিসের শব্দ, ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। প্রথমটা ভাবলাম, হয়তো বাড়ির বিড়াল গুলোই এইসব কীর্তি করছে। আসলে আমাদের বাড়িতে চারটে বিড়াল ছিল তখন। আমার মা বিড়াল খুব ভালোবাসতো। সারাক্ষণ ওগুলোই গোটা বাড়িময় ছুটোছুটি করে বেড়াত।

কিন্তু তারপরেই মনে হল... বিড়ালগুলো তো রাতে দোতলায় বাবা মায়ের ঘরে থাকে। আর সেই ঘর ভিতর থেকে বন্ধ থাকে।

তাহলে এটা কিসের আওয়াজ?

কৌতূহল বশত ঘুমের চোখেই উঠে পড়লাম আমি। বাইরে এসে দেখলাম বারান্দাটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে।

কেন জানি না জীবনে এই প্রথমবার নিজের পরিচিত বারান্দাটায় পা রাখা মাত্রই আমার বুকের ভিতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। মনে হল শরীরটা যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। আমি বারান্দার হলদে আলোটা জ্বালিয়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে চললাম বারান্দা দিয়ে। আমাদের ঘরের ঠিক পাশের ঘরটাই ঠাকুমার। আমি যখন সেখানে গিয়ে দাঁড়ালাম, আওয়াজটা যেন আরও তীব্রভাবে আমার কানে এসে লাগল। বয়স বাড়ার পর থেকে ঠাকুমা কোনোদিনই ঘরের দরজা দিয়ে শুতেন না। সেদিনও উনি তাই করেছিলেন। দরজাটা ভিতর থেকে ভেজানো ছিল। মনের মধ্যে কেমন যেন একটা খটকা লাগায় আমি ধীরে ধীরে সেই দরজায় একটা ঠেলা দিলাম। সেটা খুলে গেল। দেখলাম ঠাকুমার ঘরে লাল রঙের নাইট ল্যাম্পটা জ্বলছে। আমি সামান্য ইতস্তত করে ধীরে ধীরে ঘরের ভিতর প্রবেশ করলাম। আর সবার আগে আমার চোখ গেল ঠাকুমার খাটের দিকে।

আমি দেখলাম ঠাকুমা খাটের মধ্যে উপুড় হয়ে শুয়ে রয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ওনার মাথাটা এবং কাঁধের থেকে সম্পূর্ণ ডানহাতটা ঝুলে রয়েছে খাটের বাইরে। আর সেই ডান হাতেই ধরে রাখা একটা পানের ডিবে উনি অনবরত ঘষে চলেছেন ঘরের মেঝের মধ্যে। ওনার পেকে যাওয়া সমস্ত সাদা চুলগুলো তখন এলিয়ে পড়েছিল মাটিতে।

আমি বেশ আশ্চর্য হয়েই ঠাকুমার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

—'ঠাম্মা.. ও ঠাম্মা.. কি হয়েছে তোমার? ঘুম আসছে না বুঝি?'

কিন্তু উনি কোনো উত্তর দিলেন না। আমি আবার ডাক দিলাম...

—'আরে, এইভাবে ঝুলে শুয়েছো কেন? ঠিকভাবে উপরে উঠে শোও।'

আমার এই কথাতেও ঠাকুমা কোনো সাড়াশব্দ করলেন না। শুধু একইভাবে মেঝের মধ্যে পানের ডিবেটা ঘষেই চললেন।

বাধ্য হয়ে আমি নিজেই ঠাকুমার ঝুলে থাকা মাথাটা বিছানার উপর তুলে দিতে গেলাম।

কিন্তু একি!!!! ঠাকুমার চোখগুলো এমন উলটে গিয়ে ঘোলা হয়ে গেছে কেন? আর নাকের ছিদ্র দিয়েই বা এত রক্ত কেন বেরিয়েছে?

বুকের ভিতরটা হঠাৎ কেন জানি ধড়াস করে উঠল। একটা চাপা আশঙ্কা, একটা দম বন্ধ করা উত্তেজনায় সমস্ত শরীরটা কেমন যেন কুঁকড়ে গেল আমার। আমি কাঁপতে থাকা হাতটা বাড়িয়ে দিলাম ঠাকুমার কপাল লক্ষ্য করে।

গায়ে হাত ছোঁয়ানো মাত্রই অনুভব করলাম ওনার শরীরটা যেন বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে। তার সাথে ঘাড়টাও বেঁকে গিয়ে লোহার মতো শক্ত হয়ে গেছে। একে তো মরণ সংকোচন বলে!!!!

তার মানে.... ঠাকুমা এখন আর বেঁচে নেই!!!! অনেকক্ষণ আগেই মারা গেছেন।

হে ভগবান... তাহলে ওনার ডান হাতটা মেঝের মধ্যে পানের ডিবেটা ঘষে চলেছে কী করে???

ঘষঘষ.. ঘষঘষ.. ঘষঘষ..

গভীর রাতের অন্ধকারে, একলা ফাঁকা ঘরে, লাল লাইটের মৃদু আলোয় এহেন ভয়াবহ দৃশ্য দেখে আমার সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে উঠল। অনুভব করলাম হাত-পাগুলো যেন থরথর করে কাঁপতে শুরু করছে।

আমি ভয়ে আতঙ্কে চিৎকার করে ছুটে বেরিয়ে এলাম ওই ঘর থেকে। আমার চিৎকার শুনে সারা বাড়ির লোক তখনই জেগে গেল। এরপর ডাক্তার ডাকা হল। ডাক্তার এসে বলল... ঠাকুমার মৃত্যু নাকি ৪/৫ ঘণ্টা আগেই হয়েছে। আর মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলল... সার্টেন ব্রেইন স্ট্রোক।

কিন্তু একটা ব্যাপার আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলাম না... দ্বিতীয়বার আমি যখন বাড়ির লোকদের সাথে ওই ঘরে ঢুকলাম, তখন খাটের উপর ঠাকুমার শুধু প্রাণহীন নিথর দেহটাই পড়ে ছিল। সেসময় ওনার ডান হাতে আর কোনো জীবনের স্পন্দন ছিল না।

কিন্তু এটা কী করে সম্ভব??? দুমিনিট আগেও যেই হাতটাকে আমি নড়াচড়া করতে দেখলাম, এইটুকু সময়ের মধ্যেই সেটা পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে এইরকম লোহার মতো শক্ত হয়ে গেল?

তবে কি আমি কিছু ভুল দেখেছিলাম? নাকি ঠাকুমার দেহে তখনও কোনো প্রাণের অস্তিত্ব ছিল? যেটা আমি বেরিয়ে যাওয়ার পরই সমাপ্ত হয়েছে। কিন্তু তাই বা হয় কী করে? ডাক্তার যে বলল... রাইগর মর্টিস দেখা দিয়েছে। তারমানে মৃত্যু তো হয়েছে চার-পাঁচ ঘণ্টা আগে। তাহলে ঠাকুমার হাতটা কী করে নড়তে পারে?

অদ্ভুত এক ভয়ে, আশঙ্কায়, বিছানায় শুইয়ে রাখা মরদেহটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। কেন জানি মনে হল, একটু আগে আমি যা দেখেছি... তা আমার চোখের ভুল বা কল্পনা নয়। সেটা সত্যি সত্যিই ঘটেছে আমার সামনে। তবে এই কথা বাড়ির কাউকে আর আমি জানাতে পারলাম না। কারণ আমি চাইছিলাম না আমার কথা শুনে বাড়ির মধ্যে একটা আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হোক। তাই চুপ থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হল আমার।'

ঘরের ভিতর থমথমে নীরবতা। ফকির বাবা চিন্তিত মুখে চেয়ে আছেন টেবিলের দিকে। সেখান রাখা চায়ের কাপ দুটোর থেকে অনবরত গরম ধোঁয়া উঠে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে। একটু আগেই আয়েশা এসে চা রেখে গেছে ওদের জন্য। সেইদিকে বেশ কিছুক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর ফকির বাবা গম্ভীর গলায় বললেন...

—'আচ্ছা... এরপর নিশ্চই আরও কিছু ঘটনা ঘটেছে ওই বাড়িতে, যেগুলো তোর ঠিক স্বাভাবিক বলে মনে হয়নি... তাই না?'

—'সে আর বলতে বাবা! এটা তো সবে সূত্রপাত ছিল। যার সমাপ্তি এখনও হয়নি।

জানেন বাবা... ঠাকুমার মৃত্যু যেদিন হল, সেদিনও আমি জানতাম না যে এরপর আমাদের পরিবারে আর কী কী বিপর্যয় নেমে আসতে চলেছে। কিন্তু আজ যখন ওইসব ঘটনাগুলোর কথা মনে পড়ছে, তখন সেটা বলতে গিয়েও আমার ভয়ে বুক কেঁপে উঠছে!'

ফকির বাবা টেবিলের উপর থেকে একটা চায়ের কাপ তুলে নিলেন। তারপর তাতে একটা সশব্দে চুমুক দিয়ে বললেন...

—'যা ঘটেছে, তার সম্পুর্ণটাই আমায় খুলে বল। সবটা না জানলে যে আমার পক্ষেও তোর জন্য কিছু করা সম্ভব হবে না।'

বাইরে বৃষ্টির গতিবেগ সামান্য একটু বাড়ল বলেই মনে হল। সন্তোষ বাবু প্লেটসহ চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে এক মনে কী যেন চিন্তা করলেন। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন...

—'সেদিন রাতের ওই অদ্ভুত ঘটনাটা খুব বেশি মনে ছাপ ফেলতে পারেনি আমার। কারণ ঠাকুমার দাহকার্য, আর তার পরের নিয়মগুলো পালন করতে গিয়ে ওই ব্যাপারটার কথা একেবারে ভুলেই গেছিলাম আমি।

এরপর বেশ কিছুদিন খুব ব্যস্ততার মধ্যেই কাটলো আমাদের। তারমধ্যে দু-একটা ছোটোখাটো ব্যাপার ছাড়া, অস্বাভাবিক সেরকম কিছু চোখেও পড়ল না আমার। এই যেমন... কোনো কারণবশতঃ ঠাকুমার ঘরে ঢুকলে শরীরটা হঠাৎ ভারী হয়ে যাওয়া, কিংবা সন্ধ্যার পরে ওই ঘরে লাইট জ্বালিয়ে রাখলে সেটা নিজের থেকে নিভে যাওয়া, বেশি রাতে ঠাকুমার ঘর থেকে থালাবাসনের আওয়াজ আসা, শ্রাবন্তীর কানে কেউ এসে ফিসফিস করে বলে যাওয়া- ''খিদে পেয়েছে....খেতে দে''। এইসব টুকটাক কয়েকটা ব্যাপার ছাড়া, খুব বেশি আশ্চর্য হওয়ার মতো ঘটনা ওই কদিনে সেরকম কিছুই ঘটেনি।

তারপরের যেই ঘটনাটা আবার আমার মনে দুশ্চিন্তার সৃষ্টি করল, সেটা হল ঠাকুমা মরার ঠিক এগারো দিনের মাথায়। অর্থাৎ ঠাকুমার শ্রাদ্ধের দিন।

সেদিন সকাল থেকেই শ্রাদ্ধের কাজ, নিমন্ত্রিত অতিথিদের দেখাশোনা করা, বিভিন্ন দরকারে বারবার দোকান বাজার যাওয়া... এইসব করতে করতেই সারাটাদিন কেটে গেল। ঠিক সন্ধ্যা নাগাদ শ্রাবন্তী ঠাকুমার জন্য ওনার প্রিয় পদগুলো নিজের হাতে রান্না করে মাটির থালা-বাটিতে সাজিয়ে দিল। যেটাকে আমরা বলি ভাতসড়া।

এরপর আমি, বাবা, বাবার এক পিসতুতো বোন, আর আমার মামা মিলে সেই ভাতসড়ার থালাটা রাখতে গেলাম আমাদেরই বাড়ির পিছন দিকে এক পুকুর পাড়ে।

জায়গাটা বেশ নির্জন আর ঝোপঝাড়ে ভরা। একটা ঘন ঘাসের জমি আর তার শেষপ্রান্তে ওই পুকুরটা। কয়েকটা খেজুর নারকেল, আর কুল গাছ মিলে ঘিরে রেখেছে সম্পূর্ণ পুকুর পাড়টাকে। বহুকাল হয়ে গেল ওই পুকুর এখন আর কেউ ব্যবহার করেনা। তাই শ্যাওলা, কচুরিপানা, আর নোংরা আবর্জনা জমা হয়ে পুকুরের জলটাও প্রায় ঢাকা পড়ে গেছে।

কেন জানি দিনের বেলাতেও এদিকটায় কেউ আসতে চায়না। কোনো কারণবশতঃ এলেও এই থমথমে পরিবেশে বুকের ভিতরটা কেমন যেন ঢিপঢিপ করে।

আমরা যখন ওই স্থানে পৌঁছালাম, তখন চারিদিক কালো করে সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমশ গাঢ় হয়ে উঠছে। বাবা ভাতসড়ার থালাটা পুকুর ঘাটে নামিয়ে রেখে, একটা মাটির প্রদীপ আর ধূপকাঠি জ্বালিয়ে দিল। এরপর কিছুক্ষণ সেই জ্বলন্ত প্রদীপের দিকে তাকিয়ে মনে মনে কী যেন বিড়বিড় করল। হয়তো ঠাকুমার উদ্দেশ্যেই শেষবারের মতো কিছু বলল। তারপর আমরা ফিরে চললাম বাড়ির দিকে। নিয়ম ছিল ফেরার সময় যেন আমরা পিছন দিকে ঘুরে না তাকাই। এতে নাকি ক্ষতি হতে পারে।

আমরা তখন সবেমাত্র কয়েকপা এগিয়েছি, ঠিক এমন সময় হঠাৎ পিছন দিক থেকে আমার কানে এল কোনো মেয়ে মানুষদের চুড়ির আওয়াজ। তবে সেটা ঠিক কাচের চুড়ি নয়। হাতে শাঁখা, পলা, সোনার বালা এইসব একসাথে থাকলে যেইরকম আওয়াজ হয়... অনেকটা ঠিক সেইরকম।

জানিনা আমি ছাড়া ওটা কেউ শুনেছিল কিনা। তবে আওয়াজটা শোনামাত্রই আমার বুকের ভিতরটা কেমন যেন ছ্যাঁত করে উঠল।

এরকম ঝোপঝাড়, আবর্জনায় ঢাকা অন্ধকার পুকুর ঘাটে এই সময় কে এসেছে??? তবে কি ওটা ঠাকুমা! যদিও এইসব ব্যাপারে আমার বিশ্বাস খুব একটা নেই, তবু তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নিই ঠাকুমাই এসেছেন, তাহলে চুড়ির আওয়াজ কেন হবে? ঠাকুমা তো বিধবা ছিলেন। হ্যাঁ, মরার আগে উনি কয়েকদিন এইসব পরে পাগলামি করেছিলেন ঠিকই, তাই বলে মরার পরেও কি উনি সেই একইরকম থাকবেন?

না না... এটা কী করে সম্ভব? এটা হতেই পারেনা! এইসব কী ভুলভাল ভাবছি আমি?

তবে আওয়াজটা যে পেলাম, সেটা তো নিশ্চিত। এখানে কেউ তো এসেছে অবশ্যই। সে তাহলে কে?

আমার খুব ইচ্ছা হল, একবার পিছনে ঘুরে তাকানোর। কিন্তু ঠাকুরমশাইয়ের বারণ অমান্য করে সেটা আর করলাম না।

মিনিট দুয়েক পর আমরা যখন বাড়িতে এসে পৌঁছালাম, তখন একটা অদ্ভুত কথা শুনলাম। মা'কে নাকি কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একটু আগেই বাড়িতে ছিল। হঠাৎ করে কাউকে কিছু না জানিয়েই কোথায় যেন চলে গেছে। কথাটা শোনামাত্রই আমার মনের মধ্যে কেমন যেন একটা সন্দেহের উদয় হল। তাহলে কি আমি যা ভাবছি সেটাই ঠিক???

কাউকে কিছু না বলেই বেরিয়ে পড়লাম বাড়ির বাইরে। পিছন দিকের খালি জমিটায় তখন চাপ চাপ অন্ধকার জমে আছে। আমি ঝোপঝাড় আগাছা পেরিয়ে, কোনোমতে এগিয়ে চললাম পুকুর ঘাটের দিকে। কেন জানি মনে হচ্ছিল, ওখানে গেলেই আমার সব প্রশ্নের উত্তর আমি পাব।

কিছুটা এগোতেই হঠাৎ আমার পা দুটো যেন নিজের থেকেই থমকে গেল! পুকুর ঘাটের প্রদীপটা তখনও জ্বলছিল টিমটিম করে। সেই প্রদীপের মৃদু আলোয় আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম... পুকুর ঘাটের ঠিক পাশেই, অন্ধকারের মধ্যে কে যেন হাঁটু মুড়ে বসে আছে। ভালো করে মুখটা দেখা না গেলেও বুঝতে অসুবিধা হল না, তিনি একজন মহিলা! পরনে শাড়ি। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, এত দূর থেকেও সেই শাড়িটাকে আমার বড্ড চেনা বলে মনে হল!

বুকের ভিতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।

কে ওটা? অন্ধকারের মধ্যে ওখানে কেন বসে আছে?? আর ওই শাড়িটা! ওটা তো আমি আজ সকাল থেকেই একজনকে পরে থাকতে দেখেছি....

হৃৎস্পন্দনের গতিবেগ ক্রমশ যেন বেড়েই চলল আমার। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে আরও কিছুটা এগিয়ে গেলাম আমি। এইবার যেই দৃশ্যটা আমার চোখে পড়ল, তাতে আমার সারা শরীর কেমন যেন অবশ হয়ে এল। আমি দেখলাম, পুকুর পাড়ে হাঁটু গেড়ে বসে ঠাকুমাকে দেওয়া ভাতসড়ার খাবারগুলো গোগ্রাসে খাচ্ছে আমার মা!!!

আর ঠিক খাচ্ছে বলাও ভুল। মা যেন হাভাতের মতো গিলছে খাবারগুলোকে। দেখে মনে হচ্ছে বহুদিন যাবৎ যেন কিছুই খেতে পায়নি। সেইসঙ্গে আরও একটা ব্যাপার দেখে, রীতিমতো চমকে উঠলাম আমি... খাবারগুলো মা ভাতসড়ার থালায় না খেয়ে, পুরোটাই মাটির মধ্যে ঢেলে, সেখান থেকে কুড়িয়ে কুড়িয়ে খাচ্ছে!

মনে পড়ে গেল, মৃত্যুর কয়েকদিন আগে ঠাকুমার করা পাগলামিগুলোর কথা। ঠাকুমাও তো এই একইভাবে এঁটোকুড়ির মতো মাটি থেকে খাওয়ার কুড়িয়েই খেতেন। তবে কি মায়ের মাথাতেও ঠাকুমার মতো সেই একই গোলমাল দেখা দিল? কিন্তু এটা কী করে সম্ভব? আজ সকালেও তো মানুষটা একদম ঠিকঠাকই ছিল। তাহলে এখন হঠাৎ কী হল?

দ্রুত গতিতে এগিয়ে চললাম পুকুর পাড়ের দিকে। মনে হল খুব বেশি বাড়াবাড়ি হওয়ার আগেই ব্যাপারটা আমাকে জানতে হবে।

কিন্তু কেন জানিনা, ওখানে পৌঁছানোর ঠিক আগেই, মা হঠাৎ নিজের খাওয়াটা বন্ধ করে দিল।

তবে কি আমার উপস্থিতি টের পেয়ে গেল? একমুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম আমি।

চারিদিকে সব কিছুই কেমন যেন অস্বস্তিকর নীরব আর নিস্তব্ধ। একটা পাতা নড়ার শব্দও শোনা যাচ্ছে না কোথাও। আমি দম বন্ধ করে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম মায়ের দিকে। কিন্তু এইবার যা ঘটল.... তারজন্য একদমই প্রস্তুত ছিলাম না আমি। ধীরে ধীরে আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল মা। আর তারপরেই আমায় দেখতে পেয়ে পাগলের মতো ছুটতে শুরু করল সেখান থেকে।

অন্ধকারের মধ্যে আমিও মায়ের পিছন পিছন ছুটতে শুরু করলাম।

—''মা... মা... কোথায় যাচ্ছো... যেওনা বলছি... দাঁড়াও''

কিন্তু মা দাঁড়াল না। ঝোপঝাড় আর আগাছায় ভরা এবড়োখেবড়ো ঘাসের জমির উপর দিয়ে কী করে যে এত দ্রুত ছুটে চলল, তা আমি কিছুতেই বুঝতে পারলাম না। কিছুক্ষণ বাদেই আমার দৃষ্টির আড়ালে, অন্ধকারের মধ্যে কোথায় যেন মিশে গেল মা... আমি আর দেখতে পেলাম না। বাধ্য হয়েই থমকে দাঁড়াতে হল আমায়।

আশ্চর্য! মা কোথায় গেল? এখানে তো কেউই নেই। তাহলে কি আমি এতক্ষণ ভুল দেখলাম?

মাথার ভিতর সবকিছু কেমন যেন গোলমাল পাকিয়ে গেল আমার। দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনায় ডুবে থেকে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলাম বাড়ির দিকে। বাড়িতে ঢুকেই শুনতে পেলাম... মা নাকি একটু আগে ফিরে এসেছে। শ্রাবন্তী এসে বলল... মায়ের নাকি বাড়ির ভিতর দম বন্ধ লাগছিল। তাই একটু হাঁটতে বেরিয়েছিল খোলা হাওয়ায়।

কথাটা শুনে কেন জানি বেশ অবাকই হলাম আমি। আসলে এতগুলো বছর ধরে মাকে দেখে আসছি। আগে তো এরকম কখনো শুনিনি, তাই হঠাৎ করে এই ধরনের কথা কানে আসায় একটু আশ্চর্যই লাগল আমার।

সেদিন সন্ধ্যার পর মায়ের সাথে আর এই বিষয় কোনো কথা বলিনি আমি। তবে মায়ের হাবভাব চালচলন দেখে কেমন যেন একটু অদ্ভুত লাগছিল আমার।'

—'তা কিরকম অদ্ভুত লাগছিল শুনি? মা কি কোনো অস্বাভাবিক আচরণ করছিল?' প্রশ্নটা করলেন ফকির বাবা।

—'না... ঠিক অস্বাভাবিক না। তবে মা যেন আমায় একটু এড়িয়েই চলছিল সেদিন। আমি কোনো কথা বলতে গেলে দূরে দূরে থাকছিল। কিছু জিজ্ঞেস করলে ঠিকমতো জবাব দিচ্ছিল না। এমনকী নিজের ঘরের বাইরেও বেশি বেরোতে চাইছিল না। এছাড়া একটা ব্যাপার হল... মায়ের শাড়িতে সেদিন আমি কাদা মাটির দাগ দেখেছি... যার থেকে পচা পাঁকের গন্ধ বেরোচ্ছিল। এই গন্ধটা আমাদের ওই পুকুর পাড়ে গেলেই পাওয়া যায়।'

ফকির বাবা নিজের চোখ বুজে, কী যেন একটা চিন্তা করতে করতে বললেন...

—'এরপর কী হল?'

সন্তোষবাবু একবার ফকির বাবার মুখটার দিকে ভালো করে দেখে নিলেন। তারপর বলতে লাগলেন...

—'সেই রাতে আমি আর সেরকম কিছু টের পাইনি। আসলে সারাটা দিন এত খাটুনি পড়েছিল, যে বিছানায় শোওয়া মাত্রই ঘুম এসে গেছিল। পরেরদিন ঘুম থেকে ওঠার পর শ্রাবন্তী আমায় বলল... গতকাল ও নাকি সারারাত আমাদের বারান্দায় কারও হাঁটাচলার আওয়াজ পেয়েছে। এমনকী তার ফিসফিস করে কথা বলার শব্দও ও শুনেছে। যদিও ওর এইসব কথায় আমি ঠিক বিশ্বাস করিনি, কারণ বারান্দার লোহার গেট আটকানো থাকলে ওখানে কারও পক্ষে ঢোকা অসম্ভব। তাই মনে হয়েছিল ও হয়তো রাস্তা দিয়ে লোকের চলাফেরার আওয়াজ পেয়েছে, আর রাতে ঘুমের ঘোরে সেটাকেই বারান্দা ভেবে ভুল করেছে।

কিন্তু চা খেতে খেতে বাবার মুখ থেকে এমন একটা কথা আমি শুনতে পেলাম, যেটা শোনার পর মনে হল শ্রাবন্তী তাহলে খুব একটা ভুল কথা বলেনি।'

—'কি বলল বাবা?' সেই একইরকম চোখ বোজা অবস্থায় প্রশ্নটা করল ফকির বাবা।

—'বাবা বলল, আগের রাতে মা নাকি দোতলার ঘরে বাবার সাথে শোয়নি। নীচে একা একা ঠাকুমার ঘরে শুয়েছে! কথাটা শুনে চমকে উঠেছিলাম আমি! কারন সত্যি কথা বলতে, ঠাকুমা মরার পর দিনের বেলাতেও ওই ঘরে ঢুকলে গা-টা কেমন যেন ছমছম করে। আর সেই ঘরে সারারাত মা একা শুয়েছে, শুনেই আশ্চর্য হয়ে গেলাম আমি। তাছাড়া হঠাৎ এইরকম করার কারণটাই বা কি, সেটাও বুঝে উঠতে পারলাম না আমি।'

—'তুই বলেছিলি না তোদের দোতলার ঘরে মায়ের পোষা বিড়াল থাকে। তা সেই বিড়ালগুলো সেই রাতে কোথায় ছিল?'

—'বিড়ালগুলো বাবার সাথে দোতলার ঘরেই ছিল। নীচের ঘরে মা একাই শুয়েছিল।'

এইবার ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালেন ফকির বাবা। তারপর মৃদু হেসে বললেন...

—'জানতাম... কারণ বিড়ালের সাথে এক ঘরে রাত কাটানো তোর মায়ের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই তো নীচের ঘরে শুতে হয়েছিল।'

বিস্ময়ে সন্তোষবাবুর চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠল।

—'মানে! কী বলতে চাইছেন বাবা?'

—'মানেটা না হয় তোকে পরে বুঝিয়ে বলব। তুই তার আগে বল, এরপর কী হল?'

—'কি আর বলব বাবা! এরপর আমাদের বাড়িতে যেন অস্বাভাবিক ঘটনার ফোয়ারা বইতে শুরু করল। একের পর এক এমন সব ঘটনা ঘটতে লাগল... যা সাধারণ মানুষের চিন্তাধারার বাইরে। যাই হোক, যতদূর বলেছি তার পর থেকেই না হয় শুরু করি বলা...

শ্রাদ্ধের কাজ মিটে যাওয়ার দিন দুয়েক পরের কথা এটা। সেদিন একটা কাজের সূত্রে আমাকে বনগাঁ যেতে হয়েছিল। ফিরতে ফিরতে বেশ সন্ধ্যা হয়ে গেছিল। বাড়ির সামনে যখন এসে পৌঁছালাম, তখন চারিদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। রাস্তার ধারে লাইট পোস্টের আলোগুলো জ্বলে উঠেছে। এতক্ষন যখন আমি রাস্তায় ছিলাম তখন অবধি সবকিছু একদম ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু বললে বিশ্বাস করবেন না, যেই আমি বাড়ির লোহার গেটটা খুলে ভিতরে পা রাখলাম অমনি গা-টা কেমন যেন ছমছম করে উঠল। মনে হল শরীরটা যেন আচমকা খুব ভারী হয়ে গেল। এমনিতে অন্যদিন আমাদের গেটের বাইরের লাইটটা জ্বালানই থাকে, কিন্তু সেদিন কেন জানি সেটাও অফ হয়ে ছিল। আমি অন্ধকারের মধ্যেই বার দুয়েক কলিং বেলটা বাজাতে, শ্রাবন্তী এসে দরজাটা খুলে দিল। ওর চোখ মুখ দেখে মনে হল, বেশ দুশ্চিন্তায় আছে ও।

আমি হাত-পা ধুয়ে ঘরে আসতেই, শ্রাবন্তী আমার হাতে একগ্লাস জল দিয়ে বলল...

—''জানো, আমাদের যদুটা আজ মারা গেছে!''

শুনেই বুকের ভিতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। যদু আমাদের চারটে বিড়ালের মধ্যে একটার নাম। খুব আদর করে রাম, শ্যাম, যদু, মধু... এই চারটে নাম মা রেখেছিল। আমি হতাশার সুরে বললাম...

—''নিশ্চই গেটের বাইরে বেরিয়েছিল। হয় গাড়ি চাপা পড়েছে, নয় কুকুরে কামড়েছে... তাই না?''

শ্রাবন্তী ঘাড় নেড়ে বলল...

—''না... ও বাড়িতেই ছিল। কিন্তু....''

শ্রাবন্তী কেমন যেন একটু ইতস্তত করতে লাগল। জলের গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম...

—''কিন্তু কী???''

শ্রাবন্তী এবার একটু ভয় জড়ানো চোখে চারিদিকে একবার তাকিয়ে নিল। তারপর খুব চাপা গলায় বলল...

—''যদুকে তোমার মা মেরেছে, নিজের হাতে।''

কথাটা শোনামাত্রই আমার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল! এসব কী বলছে ও? যেই মা কিনা বিড়াল অন্ত প্রান ছিল, সে নিজের হাতে বিড়াল মেরেছে? এটা কী করে সম্ভব?

শ্রাবন্তী বলে চলল...

—''যদু আজ দুপুর বেলায় খাওয়াদাওয়ার পর গেটের সামনেটাতেই শুয়ে ছিল। আমিও তখন তাতাইকে নিয়ে ঘরে ঘুমোচ্ছিলাম। বাইরেটা মোটামুটি ফাঁকাই ছিল। সেই সুযোগে তোমার মা চুপিচুপি ফুলগাছ সমেত একটা ভারী টব তুলে নিয়ে গিয়ে যদুর মাথায় আছাড় বসিয়ে দেয়... আর সাথে সাথেই ওর মাথা সেখানেই থেঁতো হয়ে যায়। বেচারা একটা আওয়াজ করারও সময় পায়নি। আর এই পুরো ব্যাপারটাই বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজের চোখে দেখেছে তিন্নি।''

কথাটা শুনে শরীরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল আমার!

ইস... এতোটা নৃশংস হয়ে গেছে মা? তাহলে কি সত্যিই মায়ের মাথা খারাপ হয়ে গেছে? কিন্তু কেন হচ্ছে এরকম? দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনায় মনটা হঠাৎ ছটফট করে উঠল।

এমনিতেও কয়েকদিন ধরে মা কেমন যেন একটা অদ্ভুত আচরণ করছিল। সারাক্ষণ ঠাকুমার ঘরে একা একা দরজা বন্ধ করে থাকত, কারও সাথে কোনো কথাও বল! না। এমনকী কেউ কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলেও বলছিল... আমার শরীর খারাপ। জ্বালাতন কোরো না। আমায় একটু একা থাকতে দাও।

দিনে চারবার খাবার নিতে আসা ছাড়া মা ঘরের বাইরে পাও রাখছিল না। আর খাবারটাও যে নিচ্ছিল... তাও প্রায় দু-তিনজন মানুষের সমান। এত খেতে এর আগে আমি মাকে কোনোদিন দেখিনি।

চিন্তিত গলায় আমি বললাম...

—''তিন্নি কোথায়? ডাকো তো ওকে একবার।''

এর উত্তরে শ্রাবন্তী আমায় বলল...

—''বিকালে ভাই এসেছিল। যদু মারা যাওয়ায় তিন্নি এমনিতেই খুব কান্নাকাটি করছিল। তারমধ্যে ভাইকে দেখে ও আরও বায়না জুড়ে দিল মামাবাড়ি যাবে বলে। তাই ওকে পাঠিয়েছি। দিন দুয়েক বাদেই ভাই দিয়ে যাবে বলেছে।''

সব শুনে একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেড়িয়ে এল আমার গলা দিয়ে।

সেদিন রাতে খাওয়া দাওয়ার পর একটা সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছি। ঘড়িতে প্রায় এগারোটা বাজে তখন। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পথঘাট নির্জন, থমথমে। মনে মনে ভাবলাম এই বৃষ্টিবাদলার মধ্যে এত রাতে কেই বা আর বাইরে থাকবে?

অন্ধকার ফাঁকা রাস্তাটা তখন লাইটপোস্টের হালকা আলোয় ঈষৎ হলদে হয়ে আছে। বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে সেই দিকেই তাকিয়ে আপন মনে সিগারেট টেনে চলেছি। হঠাৎ আমার চোখ পড়ল বাড়ির গেটের ঠিক পাশেই। সেখানে কেউ একজন যেন দাঁড়িয়ে আছে! মুখটা ভালো করে বোঝা না গেলেও সে যে একজন মহিলা... এটা পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম।

কে ওটা? ভালো করে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। পরনে ময়লা শাড়ি, কাঁধে ছেঁড়াখোঁড়া একটা পুটুলি, মাথায় এলোমেলো জট পাকানো চুল... আর কপালে লেপ্টে যাওয়া সিঁদুরের টিপ।

আরেঃ, এটা তো..... এঁটোকুড়ি!!!!

প্রচণ্ড জোরে ধড়াস করে উঠল আমার বুকের ভিতরটা! এক মুহূর্তে যেন শরীরের সমস্ত নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল।

এ..এ..এটা কী করে সম্ভব? এঁটোকুড়ি এখানে কী করে এল? ও তো মাস দুয়েক আগেই ট্রেনের তলায় কাটা পড়ে মারা গেছে... তাহলে?

তবে কি আমি ভুল দেখছি?

না.. না সেটাই বা কি করে হয়? আমি যে পরিষ্কার দেখতে পারছি আমার থেকে কয়েক হাত দূরে, আমাদেরই বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এঁটোকুড়ি।

ও.. ও.. ওই তো... ওর মুখে এখনও লেগে আছে সেই বিচ্ছিরি নোংরা হাসিটা। গায়ের বোটকা গন্ধটাও তো আমি এখান থেকে অনুভব করতে পারছি।

দেহের প্রত্যেকটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ক্রমশ শিথিল হয়ে আসতে লাগল আমার। আমি আর বেশিক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। ধীরে ধীরে ফিরে এলাম নিজের ঘরে।

সেই রাতে আমি কখন ঘুমিয়েছি... তা আমার নিজেরও মনে নেই। তবে এইটুকু জানি ঘুমানোর আগে অবধি আমার ঘরের দরজার বাইরে কারো পায়ের আওয়াজ আমি পেয়েছি। আর তার সাথে পেয়েছি... একটা পচা আঁশটে গন্ধ!!!'

* * *

এতদূর শোনার পর ফকির বাবা বিছানা থেকে নেমে, ধীরে ধীরে ঘরের জানালাটার দিকে এগিয়ে গেলেন। বাইরে তখন মধ্যম গতিতে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। সেই দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে উনি বললেন...

—'তোর সেই পচা আঁশটে গন্ধটা আমি এখনও পাচ্ছি। তুই আজ এখানে আসার পর থেকেই সারা ঘরে ওই গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে।'

বিস্ফারিত চোখে ফকির বাবার দিকে ঘুরে তাকালেন সন্তোষবাবু! ওনার কথা বলার শক্তিটুকুও যেন লোপ পেয়েছিল। ফকির বাবা আবারও বললেন...

—'যতটুকু বুঝতে পারছি তোদের ঘরের সর্বত্র এখন এক ভয়ংকর আত্মার উপস্থিতি রয়েছে। ওকে আটকাতে হলে, সবার আগে আমায় জানতে হবে... ও কী করে এখানে এল? আর কেনই বা এল? যদিও একটা খটকা লেগেছে বটে। তবে সম্পুর্ণ নিশ্চিন্ত হওয়ার আগে আমায় বাকি ঘটনাটুকুও জানতে হবে।'

—'আপনার কি খটকা লেগেছে বাবা? আমায় যদি একটু বলেন....'

—'বলবো বেটা... সব বলব... তার আগে তুই তোর কথা শেষ কর।'

একটু হতাশ হয়েই সন্তোষবাবু পুনরায় বলতে শুরু করলেন...

—'আগের রাতের ওই ভয়টা পরেরদিন সকাল হতেই মাথা থেকে একদম বেরিয়ে গেছিল। মনে হল গতরাতে যাই ঘটেছিল, আমি যাই দেখেছিলাম... সেসব আমার মনের ভুল ছাড়া আর কিছু নয়। আসলে রাতের অন্ধকারে, বৃষ্টি ভেজা ওইরকম ঘোলাটে পরিবেশে মানুষের দৃষ্টিভ্রম হতেই পারে। এটা খুব একটা বড়ো ব্যাপার নয়।

মাথা থেকে সমস্ত চিন্তাভাবনা ঝেড়ে ফেলে, সেদিন একটু সকাল সকালই কাজে বেড়িয়ে গেছিলাম আমি। এমনিতেই আমার মাছের গাড়ি আসার কথা ছিল... তার উপর আবার দু-তিনটে বড়ো বড়ো অর্ডারও ছিল ওইদিন। তাই সারাটাদিন বেশ ব্যস্ততার মধ্যেই কাটল আমার। মাঝে অবশ্য শ্রাবন্তী বার দুয়েক ফোন করেছিল। তবে আমি ঠিক ভাবে কথা বল উঠতে পারিনি ওর সাথে। ও কি সব ঠাকুরের মূর্তি, পুজো, ক্যালেন্ডার... এই নিয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিল আমায়। কিন্তু আমি ব্যস্ত আছি, পরে কল করছি... বলে, ফোনটা রেখে দিয়েছিলাম। এরপর আর কাজের চাপে করা হয়ে ওঠেনি, তাই জানাও হয়নি... কী বলতে চাইছিল ও।

ওই দিন সন্ধ্যায় রেললাইনের ওপারে একটা পার্টির কাছ থেকে পেমেন্ট কালেকশন করতে গেছিলাম। যখন ফিরছি ওখান থেকে, তখন ঘড়িতে প্রায় পৌনে আটটা বাজে। এমনিতে ওই পার্টির বাড়ির থেকে আমার বাড়ির দূরত্ব খুব একটা বেশি না। হাঁটাপথে বড়োজোর কুড়ি মিনিটের রাস্তা। কিন্তু সেই রাস্তার আবার মিনিট দশেক মতো আসতে হয় নির্জন রেললাইনের ধার দিয়ে। একেই রাত নেমে এসেছিল, তার উপর সেদিন আবার কালেকশনের বেশ কিছু টাকাও ছিল পকেটে... তাই হাঁটতে হাঁটতেই ভাবলাম, এই অন্ধকারে শুধু শুধু লাইনের ধার দিয়ে না গিয়ে একটু ঘুরে গেলেই হয়তো ভালো হয়। কিন্তু তারপরেই আবার মনে হল... ধুর! সামান্য দুটো লাইন পার করলেই তো বাড়ি... তার জন্য আবার এতোটা হাঁটার কোনো মানে হয় না। তারচেয়ে বরং এখান দিয়েই চলে যাই। কী আর হবে? এখনও তো আটটাও বাজেনি। নিশ্চই লোকজন পেয়েই যাব পথে।

যেই ভাবা সেই কাজ। ওখান দিয়েই হাঁটতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর যখন লাইনের ধারে এসে পৌঁছালাম, তখন দেখলাম গোটা রাস্তাটাই একদম জনশূন্য আর গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা। আমি ছাড়া আর কোনো মানুষেরই অস্তিত্ব নেই সেখানে।

কী করব... যাব কি যাব না... এইসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে হল, এখন যদি অন্য রাস্তা দিয়ে যেতে যাই... তাহলে বাড়ি পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তার থেকে এখান দিয়েই না হয় একটু জোরে পা চালিয়ে চলে যাই।

যা থাকে কপালে, এই ভেবে আমি ওখান দিয়েই হাঁটতে শুরু করলাম। লাইনের ধারের এই রাস্তাটা লোকজন চলাচলের পক্ষে খুবই সংকীর্ণ। এক ধারে বড়ো ঝিল, আরেক ধারে রেললাইন... মাঝখানে ছোটো ছোটো ঝোপঝাড় আর আগাছার উপর দিয়ে মানুষের পায়ে হেঁটে চলার পথ।

মিনিট পাঁচেকের রাস্তা বেশ নিশ্চিন্তেই অতিক্রম করলাম। কিন্তু এরপরেই হঠাৎ মনে হল কেউ যেন আমার ঠিক পিছনেই হেঁটে হেঁটে আসছে। তবে কি আমারই মতো আরও কেউ এই পথ দিয়ে বাড়ি ফিরছে? কৌতূহলবশত ঘুরে তাকালাম পিছন দিকে।

কিন্তু এ কি!!! পিছনে তো কেউই নেই! রাস্তা তো পুরো খালি। তাহলে আমি যে পায়ের আওয়াজটা পাচ্ছি, যেন কেউ এগিয়ে আসছে আমার দিকে... সেটা কিসের?

শরীরের সমস্ত রোমকূপগুলো একটা একটা করে খাড়া হয়ে উঠল আমার। মনে হল যেন, শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল নীচের দিকে।

এইরকম অবস্থায় কী করব, ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। একে তো ঝোপঝাড়ে ভরা শুনশান এই পথ, তার উপর আবার রাতের অন্ধকার। এখানে রাস্তার ধারে আলাদা করে কোনো আলোর ব্যবস্থাও নেই। আকাশে একফালি চাঁদ টিমটিম করে জ্বলছে। আমি সেই সামান্য আলোতেই পথের দিকে চোখ রেখে দ্রুত গতিতে পা চালাতে লাগলাম। মনে মনে ভাবলাম... কোনোমতে এইটুকু রাস্তা পেড়িয়ে যেতে পারলেই হয়, তাহলে আর কোনো চিন্তা থাকবে না।

কিন্তু, খুব বেশি দূর এগোতে পারলাম না আমি। বড়োজোর দশ পনেরো পা হেঁটেছি, ঠিক এমন সময় ঘাড়ের কাছে একটা ঠান্ডা নিশ্বাস অনুভব করলাম। আর তারপরেই শুনলাম, কেউ খুব ফিসফিস করে আমার কানের কাছে বলছে...

—''কিসু খেতে দ্যাবে গো... বড় খিদা পেয়েসে''

চমকে উঠলাম আমি! এ..এ..এই আওয়াজ তো আমার চেনা। মাঝে মাঝে যখন জগাইদের বন্ধ দোকানটার পাশ দিয়ে বাড়ি ফিরতাম, তখন বেশ কয়েকবার এই আওয়াজ আমি শুনেছি। এঁটোকুড়ি তো এটা বলেই খেতে চাইতো আমার কাছে। তাহলে কি আমার পিছনে এখন এঁটোকুড়িই দাঁড়িয়ে আছে? কিন্তু ও তো মাস দেড়েক আগেই...

ভয়ে গলাটা শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে গেল। মারাত্মক আতঙ্কে আমি ওই ঝোপঝাড়ের উপর দিয়েই পাগলের মতো ছুটতে শুরু করলাম। আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল, তবু আমি থামলাম না। কারন আমি জানতাম এখানে থামলে, নির্ঘাত হার্টফেল করে মারা যাব।

এইভাবে বেশ কিছুটা ছুটে আসার পর আমার চোখে পড়ল, লাইনের ওপারের সেই টগরফুল গাছটা... যেখান থেকে ঠাকুমা রোজ ফুল নিতেন। তারমানে আর কোনো ভয় নেই। এবার রেললাইনটা ক্রশ করলেই আমি বাড়ির রাস্তা পেয়ে যাবো। দাঁড়িয়ে পড়ে এবার একটু দম নিলাম আমি। এতটা পথ ছুটে এসে সত্যিই খুব হাঁফিয়ে গেছিলাম।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর মনটা যখন একটু শান্ত হল, তখন ধীরেধীরে রেললাইনের উপর উঠে, সেটা পেরোতে শুরু করলাম আমি। কিন্তু বেশি নিশ্চিন্ত হতে গিয়ে একটা কথা ভুলে গেছিলাম যে, এই লাইনেরই কোনো এক জায়গায়... কাটা পড়েছিল এঁটোকুড়ি! যদি মনে থাকতো, তাহলে হয়তো এই ভুলটা আমি কখনোই করতাম না।

যাই হোক, প্রথম লাইনটা পেরোতে কোনো অসুবিধা হল না আমার। কিন্তু তারপর যেই দ্বিতীয় লাইনটা পার করার জন্য ওটায় পা রাখলাম, অমনি কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি এসে চেপে ধরলো আমায়। মনে হল আমার শরীরটা যেন হঠাৎ করেই খুব ভারী হয়ে গেল। তার সাথে প্রচণ্ড ঠান্ডাও লাগতে লাগল আমার। গায়ে শীতের কাঁটা উঠে গেল। আশ্চর্য হয়ে গেলাম আমি! দুটো লাইনের মধ্যে তাপমাত্রার এত তারতম্য কী করে হতে পারে? একটু আগেও তো আমার শরীর দিয়ে গরমে রীতিমতো ঘাম ঝরছিল। তাহলে এই জায়গাটা এত শীতল হল কী করে?

আমি তাড়াতাড়ি লাইনটা পেরোনোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু কেন জানি কিছুতেই আর সামনে এগোতে পারলাম না। মনে হল কেউ যেন আমার পা দুটোকে রেললাইনের কংক্রিটের পাটাতনের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। যেগুলোকে নড়ানোর ক্ষমতা আমার নেই।

বুঝে উঠতে পারলাম না এসব কি হচ্ছে আমার সাথে? আর কেনই বা হচ্ছে? ভয়ে আতঙ্কে চারিদিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখতে লাগলাম আমি... যদি আশেপাশে কাউকে সাহায্যের জন্য পাওয়া যায়। কিন্তু নাঃ... কাউকেই আমার চোখে পড়ল না। অন্ধকার রাতে নির্জন এই রেললাইনের উপর শুধুমাত্র আমি একাই দাঁড়িয়ে আছি।

হঠাৎ আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগল...

—''আচ্ছা, এই লাইন দিয়ে যদি এখন একটা ট্রেন যায়। তাহলে কী হবে?''

কথাটা ভাবতেই আমার সারা শরীরটা আতঙ্কে শিউরে উঠল।

আমি আরও একবার মনে জোর এনে পা'টা এগোনোর চেষ্টা করে দেখতে গেলাম, আর ঠিক তখনই একটা চেনা দুর্গন্ধ আমার নাকে এল। বিচ্ছিরি, বোঁটকা, আঁশটে একটা গন্ধ। এটা এর আগেও আমি বহুবার পেয়েছি। যখনই এঁটোকুড়িকে কোনো খাওয়ার দিতে গেছি, এই গন্ধটা আমার নাকে এসেছে। একদম সহ্য করতে পারতাম না এই গন্ধটা আমি। খুব গা গুলিয়ে আসতো। কিন্তু আজ কেন জানি খারাপ লাগছে না আমার। মনে হল অদ্ভুত একটা নেশা নেমে আসছে আমার দেহে। মাথাটা ভার হয়ে ঝিমঝিম করে উঠল। চোখদুটো বুজে এল। আমি যেন তলিয়ে যেতে থাকলাম সেই গন্ধে। গভীরে.. আরও গভীরে... আরও আরও গভীরে...

কতক্ষণ এইভাবে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানিনা। হঠাৎ একটা তীব্র আলো, আর তার সাথে একটা জোরালো যান্ত্রিক আওয়াজে সম্বিৎ ফিরে পেলাম আমি। দেখলাম, আমি যেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছি... তার পাশের লাইন দিয়েই দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে একটা ট্রেন।

শরীরের সমস্ত রক্ত হিম হয়ে গেল আমার! ট্রেনটা যদি ওই লাইন দিয়ে না এসে এই লাইন দিয়ে আসত, তাহলে....???

সেই রাতে এরপর আমি যে কি করে বাড়ি ফিরেছিলাম, তা আমি নিজেও জানি না। তবে এইটুকু জানি, অনেক বড়ো ক্ষতি হয়ে যেতে পারত সেই রাতে। কেবলমাত্র আমার ভাগ্যের জোরেই সেদিন রক্ষা পেয়েছিলাম আমি।

—'শুধুই কি তোর ভাগ্যের জোরে ওইরাতে বেঁচে ফিরেছিলিস তুই?' একটা গভীর নিশ্বাস নিলেন ফকির বাবা। 'আমার তো মনে হয়....'

—'কী মনে হয় বাবা?' ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন সন্তোষবাবু।

ফকির বাবা একনজর সন্তোষবাবুর মুখের দিকে তাকিয়েই, চোখটা আবার ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন...

—'একজন পঁচাশি ছিয়াশি বছরের বয়স্ক মহিলার শরীরটাকে কব্জা করে, যে তাকে এইভাবে পাগল বানিয়ে মেরে ফেলতে পারে... সেই হিংস্র আত্মার হাত থেকে তুই যে কেবলমাত্র ভাগ্যের জোরে রক্ষা পেয়ে গেছিস, এটা আমি ঠিক মেনে নিতে পারলাম না।'

—'এ আপনি কী বলছেন বাবা? ঠাকুমাকে এঁটোকুড়ি মেরেছিল? ওনার তাহলে ব্রেন স্ট্রোক হয়নি? চমকে উঠলেন সন্তোষবাবু!

ফকির বাবা নির্লিপ্ত স্বরে বললেন...

—'মৃত্যু তো ওনার ব্রেন স্ট্রোক করেই হয়েছিল। কিন্তু সেই স্ট্রোকটা কেন হয়েছিল... সেটা বুঝলি না বেটা?'

—'কেন বাবা?'

—'একজন বয়স্ক মানুষ তার শরীরের ভিতর কতদিনই বা একজন মরা মানুষের আত্মাকে ধারণ করতে পারে? একটা সময়ের পর সেই শরীর হার মেনেই নেয়। তাছাড়া ওই ভয়ংকর, হিংস্র, পাগলিটার আত্মা তোর ঠাকুমার উপর যেই পরিমাণ অত্যাচার করেছে... তা এই বয়সের কোনো মানুষের পক্ষেই বেশি দিন সহ্য করা সম্ভব নয়। সেই জন্যই এই ব্রেন স্ট্রোক।'

সন্তোষবাবু এবার বুঝতে পারলেন... কেন সেদিন ঠাকুমা মারা যাওয়া পরেও ওনার হাতটা পানের ডিবেটাকে অনবরত মেঝের মধ্যে ঘষে যাচ্ছিল। কারণ ঠাকুমার মৃত শরীরে তখনও এঁটোকুড়ির আত্মাই ছিল। আর সেই করছিল এই কাজটা। কথাটা ভাবতেই গা'টা কেমন যেন ছমছম করে উঠল সন্তোষ বাবুর। উনি একটু অন্যমনস্কভাবে নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠলেন...

—'তবে কি মায়ের সাথেও এরপর সেই একই দুর্ঘটনা ঘটেছিল?' দুশ্চিন্তার একটা ভাঁজ দেখা দিল সন্তোষ বাবুর কপালে।

উনি আবার ফকির বাবার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন...

—'সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে শ্রাবন্তীর মুখ থেকে আরও একটা অদ্ভুত ঘটনা শুনতে পেলাম আমি। প্রতিদিনকার মতো সেইদিনও নাকি ও বেলা বারোটা নাগাদ স্নানে গেছিল। তাতাই তখন ঘরে একাই ঘুমাচ্ছিল। মা ঠাকুমার ঘরে দরজা বন্ধ করে শুয়েছিল, আর বাবা কাজে বেরিয়েছিল। ওরা তিনজন ছাড়া বাড়িতে ওইসময় আর কেউই ছিল না। এমনকী কাজের দিদিটাও না। তাছাড়া বারান্দার গ্রিলটাতেও তালা লাগানো ছিল... তাই বাইরের লোক যে ঘরে এসে ঢুকবে, সেই সম্ভাবনাও ছিল না।

যাই হোক, স্নান করতে বড়োজোর মিনিট পনেরো কুড়ি সময় লেগেছিল শ্রাবন্তীর। এরপর ও যখন ফিরে এল তখন দেখল, আমাদের ঘরের মা কালীর ক্যালেন্ডারটা কে যেন ছিঁড়ে অর্ধেক করে দিয়েছে! একটু অবাক হল ও! তার সাথে কেমন যেন একটা সন্দেহও জাগলো ওর মনে। কৌতূহলবশত ও হল রুমের দেওয়ালে টাঙানো রাধাকৃষ্ণের ফটো ফ্রেমটা দেখতে গেল।

কিন্তু অবাক ব্যাপার! সেটার মধ্যেও কে যেন কাজল লেপে কালো করে দিয়ে গেছিল। এরপর শ্রাবন্তী একে একে পুজোরঘর আর অন্যান্য ঘরে গিয়েও দেখেছিল, কিন্তু কোথাও একটাও ঠাকুরের মূর্তি ও অক্ষত অবস্থায় পায়নি। সবকটাকেই কেউ ইচ্ছাকৃত ছিঁড়ে, ভেঙে, কিংবা কালো করে নষ্ট করে দিয়েছিল।

সবটা শোনার পর বেশ আশ্চর্য হয়েই শ্রাবন্তীকে জিজ্ঞেস করলাম...

—''তোমার কি মনে হয়? কে করতে পারে এই কাজ?''

ও কেমন যেন একটা ভয় জড়ানো থমথমে গলায় আমায় বলল...

—''তাতাই সেসময় ঘুমাচ্ছিল। আর তাছাড়া একটা সাড়ে চারবছরের বাচ্চার দ্বারা তো এত কিছু করা সম্ভবও নয়। তাহলে করার মতো বাড়িতে ছিলাম শুধু দুজন... আমি আর মা। এরমধ্যে আমি আবার বাথরুমে ছিলাম। তারমানে বাকি রইল......''

শ্রাবন্তীর কথাটা হঠাৎ করে মাঝপথেই থেমে গেল। ওর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ও কেন জানি খুব ভীত সন্ত্রস্ত চোখে আমাদের দরজার দিকে দেখছে। ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকাতেই আমার চোখে পড়ল... আমাদের দরজাটার ঠিক সামনেই চৌকাঠের উপর দাঁড়িয়ে আছে মা। ক্রোধে ফেটে পড়া একটা বিকৃত রাগী চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে শ্রাবন্তীর দিকে। আমি একটু হাসিমুখে একদম নরম গলায় বললাম...

—''কী হয়েছে মা? কিছু বলবে?''

মা একটা অস্বাভাবিক কর্কশ স্বরে জবাব দিল...

—''খিদে পেয়েছে... খেতে দে...'' এরপর ধীরে ধীরে ফিরে চলল নিজের ঘরের দিকে।

লক্ষ্য করলাম মায়ের হাবভাব, চালচলন, কথাবার্তা সব কিছুতেই কেমন যেন একটা অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে এই কদিনে। একজন মানুষ অসুস্থ হলে যে তার ব্যবহার এতটা পালটে যেতে পারে... এই ধারণা আমার কস্মিনকালেও ছিল না।

ওইরাতে খাওয়াদাওয়া সেরে একটু আগেই শুয়ে পড়েছিলাম আমি। সারাদিনের ধকল আর সন্ধ্যার ওই ব্যাপারটার পর এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে ঘুম আসতে খুব বেশি সময় লাগল না।

কতক্ষণ যে এইভাবে ঘুমিয়ে ছিলাম তা নিজেও জানিনা। তবে হঠাৎ একটা মহিলা কণ্ঠের আর্তনাদ শুনে ঘুমটা আচমকা ভেঙে গেল আমার। নাইট ল্যাম্পের নীলচে আলোয় আধবোজা চোখে পাশে তাকিয়ে দেখলাম, তাতাই বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু শ্রাবন্তীর বালিশ খালি পড়ে আছে। ও ঘরে নেই!

আশ্চর্য! কোথায় গেল ও এত রাতে?

প্রথমটায় ভাবলাম হয়তো বাথরুমে গেছে। তাই নিশ্চিন্ত হয়ে চোখটা আবার বুজতে গেলাম। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, তাহলে একটু আগে চিৎকারটা কে করল?

দুরুদুরু বুকে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি। মোবাইলে সময় দেখলাম রাত দুটো বেজে সাঁইত্রিশ মিনিট। দরজা খুলে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলাম ঘরের বাইরে। সেখানে তখন চারিদিকে চাপচাপ অন্ধকার জমে আছে। সেই অন্ধকারে পা রাখতেই গায়ে কেমন যেন একটা শিরশিরানি দিয়ে উঠলো। মনে হল কোথা থেকে একগাদা ভয় এসে চেপে ধরলো আমায়। তাড়াতাড়ি গিয়ে হলরুমের আলোটা জ্বালালাম আমি। ঝলমলে আলো চোখে পড়ায় এবার যেন আমার মনের ভয়টা একটু স্থিত হল।

''শ্রাবন্তী... শ্রাবন্তী... কোথায় তুমি?'' জোর গলায় ডাক দিলাম আমি। কিন্তু উলটোদিক থেকে কোনো সাড়া পেলাম না।

''কী হল... শুনতে পারছো না? আমি জিজ্ঞেস করছি কোথায় আছো তুমি? শ্রাবন্তী... শ্রাবন্তী...''

এবারও সেই আগের মতোই নিঃশব্দতা ফিরে এল আমার কাছে। বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। গেল কোথায় মেয়েটা? কোনো বিপদ হল না তো? বাড়ির ভিতর চারিদিকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করলাম। রান্নাঘর, ঠাকুরঘর, হলরুম, সিঁড়ি, বাথরুম... কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলাম না শ্রাবন্তীকে। কি করব ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

এদিক সেদিক তাকাতে তাকাতে হঠাৎ করেই আমার চোখ গেল ঠাকুমার ঘরের দিকে। সেখানে মা শুয়ে রয়েছে, তাই দরজাটা ভিতর দিয়ে বন্ধ। বাইরে থেকে কোনো আলোর রেখাও দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য না দেখা যাওয়ারই কথা। এত রাতে কেউ তো আর আলো জ্বালিয়ে জেগে বসে থাকবে না। একবার মনে হল মাকে ডেকে বলি কথাটা। কিন্তু তারপরেই আবার মনে হল, এত রাতে মাকে ডাকাটা কি ঠিক হবে? এমনিতেই ঠাকুমা মারা যাওয়ার পর থেকে মা একটু কেমন যেন হয়ে রয়েছে। কারও সাথে মেশে না, কথাবার্তা বলে না, হাসে না, এমনকী দরকার ছাড়া কারও সামনে পর্যন্ত আসেনা। সারাক্ষণ অসুস্থতার কথা শুনিয়ে একা একা দরজা বন্ধ করে ঘরের ভিতর বসে থাকে। ডাক্তার দেখানোর কথা বললে... তাতেও রাজি হয়না। বলে, নিজের থেকেই নাকি ঠিক হয়ে যাবে। জোরাজুরি করতে গেলে চিৎকার করে... অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ দেয়। সেই মাকে যদি এখন ঘুম থেকে উঠিয়ে শ্রাবন্তীর কথা জিজ্ঞেস করতে যাই... তাহলে ঝামেলা বাড়বে বই কমবে না। এর চেয়ে যা করার সেটা নিজে করা ভালো।

আমি আবারও শ্রাবন্তীকে খুঁজতে শুরু করলাম।

—''শ্রাবন্তী... শ্রাবন্তী...''

এদিকের বারান্দাটাও তো খালি পড়ে আছে। এখানেও তো নেই। উফফ.. এত রাতে গেল কোথায় ও? হঠাৎ, আমার মাথায় যেন একটা বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ খেলে গেল... আচ্ছা, ছাদে যায়নি তো? সেখানে তো আমার খুঁজে দেখা হয়নি! সিঁড়ির আলো জ্বালিয়ে তাড়াতাড়ি ছুটে গেলাম ছাদের দিকে। কিছুদূর ওঠার পরই বুঝলাম... আমি যা ভেবেছিলাম, ঠিক তাই। ছাদের দরজাটা খোলা পড়ে আছে। তারমানে শ্রাবন্তী ওখানেই আছে।

কিন্তু এত রাতে অন্ধকারের মধ্যে ও কী করছে ওখানে? তাছাড়া ছাদের লাইটটাও তো বহুদিন হল খারাপ হয়ে পড়ে আছে। সত্যি, এই মেয়েটার কোনোদিন আর বুদ্ধিশুদ্ধি হবেনা। একটু বিরক্তি ভরেই দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলাম আমি।

অন্ধকার ছাদ। হালকা চাঁদের আলোয় সবকিছুই যেন ছায়ার মতো আবছা লাগছে। কিন্তু শ্রাবন্তী গেল কোথায়? ওকে তো এখানে দেখতে পাচ্ছি না। ভালো করে চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম আমি।

নাঃ... ও এখানেও নেই। হতাশ হয়ে ছাদ থেকে আমি নামতেই যাব, এমন সময় চোখ পড়ল ছাদের রেলিং এর ঠিক পাশেই... সেখানে কে যেন অন্ধকারের মধ্যে মাটিতে পড়ে রয়েছে!

কে ওটা! শ্রাবন্তী নয় তো? চমকে উঠলাম আমি। এক ছুটে সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বুঝতে পারলাম... আমার ধারনা নির্ভুল। এটা শ্রাবন্তীই পড়ে আছে। আমি চিৎকার করে উঠলাম...

—''শ্রাবন্তী... শ্রাবন্তী... কী হয়েছে তোমার? কিন্তু ও কোনো সাড়া দিলনা। আমার বুঝতে অসুবিধা হল না, কোনো কারণে জ্ঞ্যান হারিয়েছে ও। আমি কোনোমতে শ্রাবন্তীকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলাম। তারপর নীচে নামিয়ে আনার জন্য যেই সিঁড়ির দিকে এগোতে যাবো, এমন সময় হঠাৎ পায়ের কাছ থেকে একটা মিহি সুরেলা গলার ডাক শুনতে পেলাম...

''মিঁয়াওও...''

অন্ধকারের মধ্যে আচমকা এই ডাক শুনে চমকে উঠলাম আমি! তারপর ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম শ্যাম, মানে আমাদেরই পোষা বিড়ালটা পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। ও যে কখন আমার পিছু পিছু ছাদে চলে এসেছিল, সেটা একদমই খেয়াল করিনি আমি।

শ্রাবন্তীকে নীচের ঘরে শুইয়ে ওর চোখেমুখে জলের ছিটা দিতেই, ওর জ্ঞ্যান ফিরে এল। তবে সেই রাতে ও আর কিছু বলার অবস্থায় ছিলনা। চোখমুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল মারাত্মক আতঙ্কে রয়েছে। আমিও ওকে আর কিছু জিজ্ঞেস করে বিব্রত করতে চাইলাম না তখন। ভাবলাম এখন ঘুমাক, যা জানার কাল সকালেই না হয় জানা যাবেখন।

সেই রাতে আমার আর ভালো করে ঘুম হল না।-দুচোখের পাতা এক করতে যেতেই হাজার রকমের দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনা ভিড় করে আসতে লাগল মাথার মধ্যে। প্রথমে আমার সাথে ঘটা রেললাইনের ওই অদ্ভুত ঘটনাটা, তারপরে বাড়ির সব ঠাকুরের ছবি নষ্ট হয়ে যাওয়া, আর এখন আবার ছাদের মধ্যে শ্রাবন্তীর এইভাবে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকা... আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না, কী হচ্ছে আমাদের সাথে? তবে এইটুকু বুঝলাম, যাই হচ্ছে... সেটা ঠিক স্বাভাবিক নয়।'

ঠকঠকঠকঠক...

দরজায় কারও কড়া নাড়ার আওয়াজ পেয়ে নিজের কথা থামালেন সন্তোষবাবু। তার সাথে শোনা গেল একজন পুরুষের কণ্ঠস্বর...

—'ফকির বাবা, বাড়ি আছেন নাকি?'

—'দরজাটা একটু খুলে দিবি বেটা?' সন্তোষবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে কথাটা বললেন ফকির বাবা।

সন্তোষবাবু দরজাটা খোলা মাত্রই একজন পঞ্চাশোর্ধ পুরুষ এবং একজন মধ্য চল্লিশের মহিলা প্রবেশ করলেন ঘরের ভিতর। সাদামাটা পোশাক... দেখলেই বোঝা যায়, খুব একটা অবস্থাপন্ন ঘরের নয়। দুজনেই বেশ খানিকটা ভিজে গেছেন বৃষ্টিতে, আর চোখে মুখে ফুটে রয়েছে উৎকণ্ঠার ছাপ। ফকির বাবা সেই দিকে একবার তাকিয়ে অবাক হয়ে বললেন...

—'আরে বিশু যে... সাথে তো দেখছি বউমাও আছে... তা এত রাতে কী ব্যাপার? সব ঠিক আছে তো?'

—'না বাবা.. কিচ্ছু ঠিক নেই.. আমার মেয়েটার উপর বোধহয় কেউ কিছু করেছে।' কেঁদে ফেললেন ভদ্রমহিলা। ফকির বাবা একটু ব্যস্ত হয়ে বললেন...

—'আরে আরে কাঁদো কেন? বলো কী হয়েছে..'

—'কী আর বলব বাবা... এক বান্ধবীর দাদার বিয়েতে, দিন তিনেকের জন্য মেয়েটা আমার গোপালনগর গেছিল। সেখান থেকে ফিরেই দেখি কেমন অসুস্থ হয়ে পড়ল। সারাক্ষণ গাটা আগুনের মতো গরম থাকে, শরীরেও কি সব লাল রঙের চাকা চাকা দাগ বেড়িয়েছে। না কিছু খেতে চায়, না ঘুমাতে চায়... এমনকী কারও সাথে কথাও বলতে চায়না। সব সময় বিছানায় শুয়ে শুধু দাপাদাপি করে। আমার মেয়েটাকে কেউ বোধ হয় তুকতাক করেছে... আপনি ওকে বাঁচান বাবা।'

কথাটা বলেই মহিলা আবার কাঁদতে শুরু করে দিলেন।

ফকির বাবা গম্ভীর গলায় বললেন...

—'তা মেয়েকে ডাক্তার দেখিয়েছ তোমরা?'

—'হ্যাঁ বাবা... পাড়ার ওই শম্ভু ডাক্তারকে দেখিয়েছি। তিনদিনের ওষুধ দিয়েছিল... বলেছিল কমে যাবে। কিন্তু কমার বদলে উল্টে আরও বেড়ে গেছে।'

চোখের জল মুছতে মুছতে জবাব দিল বিশু।

ফকির বাবা এবার বেশ বিরক্ত হয়ে বললেন...

—'আরে বাবা, সব রোগই কি পাড়ার ওই শম্ভু ডাক্তার দিয়ে হয়? আমার তো মনে হয় তোমাদের মেয়ের কোনো সংক্রমিত রোগ হয়েছে। কালই হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে বড়ো ডাক্তার দেখাও। ওনারা সবরকম পরীক্ষা করে ওষুধ দেবেন... দেখবে মেয়ে ঠিক ভালো হয়ে যাবে।'

—'আপনি যখন বলছেন... তাই না হয় করব। কিন্তু তারপরেও যদি ঠিক না হয়, তাহলে কি আপনি একবার মেয়েকে দেখতে আমাদের বাড়িতে আসবেন বাবা?'

বিশুর গলায় অনুরোধের সুর।

ফকির বাবা ওর দিকে মৃদু হাসিমুখে তাকিয়ে বললেন...

—'কেন যাবনা? আলবৎ যাব। তবে তার আগে যেটা বললাম... সেটা কাল অতি অবশ্যই কোরো। আমার বিশ্বাস তোমাদের মেয়ে খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে।'

ওরা দুজন ফকির বাবাকে প্রনাম জানিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর, ফকির বাবারই আদেশে সন্তোষবাবু দরজাটা পুনরায় বন্ধ করে দিয়ে এলেন। বাইরে তখনও বিরামহীন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়েই চলেছে। ঘড়িতে সময় রাত আটটা বেজে পাঁচ মিনিট। ফকির বাবা বিছানার উপর পা দুটো টানটান করে বসে, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন...

—'জানিস বেটা, উপরওয়ালা আমাদের সব বিপদ থেকেই রক্ষা পাওয়ার জন্য কোনো না কোনো রাস্তা বানিয়ে রেখেছে। শুধু আমাদের চোখ সবসময় সেটা দেখতে পায় না। এই যেমন বিশুরা দেখতে পাচ্ছিল না... আমি ওদের দেখিয়ে দিলাম। আসলে আমি জানি ওদের মেয়েকে কেউ কোনো যাদুটোনা করেনি... যদি করত, তাহলে ওরা এখানে আসার পর আমি সেই গন্ধটা পেতাম। যেমনটা তুই আসার পর পেয়েছি। খুব বিচ্ছিরি আর আঁশটে একটা গন্ধ। যাক, সেসব কথা বাদ দে... তারপর কী হল বল?'

সন্তোষবাবু একটু নড়েচড়ে বসে, ঘটনাটা আবার বলতে শুরু করলেন...

—'পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে আমার একটু দেরিই হল। আসলে সারারাত জেগে থাকার পর ভোরের দিকে কখন যে একটু চোখ লেগে গেছিল, নিজেও জানিনা। ঘুম ভেঙে দেখলাম, পাশে শ্রাবন্তী নেই। চটপট বিছানা ছেড়ে নেমে বাইরে আসতেই দেখতে পেলাম... ও ব্যাগপত্র গুছিয়ে রেডি করছে। আমি ওর সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম...

—'কী ব্যাপার... সকাল সকাল ব্যাগ গোছাচ্ছ যে... কোথায় যাচ্ছ?'

ও ভীত সন্ত্রস্ত মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল...

—''আমি যাচ্ছি মায়ের কাছে। এখানে আর একমুহূর্তও আমি আমার ছেলেকে নিয়ে থাকব না।''

আমি বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করলাম...

—'কেন? কি হল আবার?'

ও বেশ কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে রইল, তারপর খুব রুক্ষ গলায় বলে উঠল...

—'ওহঃ... জানো না বুঝি কী হয়েছে? কালকের ওই ঘটনার পর এখনও কিছু বাকি রয়েছে জানার?'

তারপর একটু থেমে আবার বলল...

—'শোনো... একটা কথা তুমিও জানো আর আমিও জানি... এই কদিন ধরে এখানে যা শুরু হয়েছে, তা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। কোনো অভিশাপ লেগেছে আমাদের বাড়িতে... ভয়ংকর কোনো অভিশাপ। তা না হলে এক-দেড়মাস আগে মারা যাওয়া একটা মানুষকে কেন আমি বাড়ির ছাদে দেখতে পাব?'

—'মানে!!!' চমকে উঠলাম আমি। 'কাকে দেখতে পেয়েছ বাড়ির ছাদে?'

এরপর শ্রাবন্তী গতকাল রাতের সম্পূর্ণ ঘটনাটা আমার সামনে তুলে ধরল, যা শুনে ওই সকাল বেলাতেও আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।

আগেরদিন রাত তখন কটা বাজে শ্রাবন্তীর ঠিক মনে নেই, তবে আমরা তখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ একটা আওয়াজে ওর ঘুমটা ভেঙে গেল। মনে হল কেউ যেন ওর নাম ধরে ডাকছে। ও আরও একবার কান পেতে শোনার চেষ্টা করল আওয়াজটাকে। এইবার ও পরিষ্কার শুনতে পেল কেউ খুব চেনা গলায় বলছে...

—'শ্রাবন্তী... খিদে পেয়েছে.. কিছু খেতে দে'

এত রাতে মা খাবার চাইছে? এই একটু আগেই তো খেয়েদেয়ে শুলো। এত তাড়াতাড়ি খিদে পেয়ে গেল? আশ্চর্য হয়ে গেল শ্রাবন্তী। ও তৎক্ষণাৎ বিছানা ছেড়ে উঠে বাইরে বেরিয়ে এল। ঘরের বাইরে হলরুমে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। শ্রাবন্তী সেখানকার আলো জ্বালিয়ে চারিদিকে একবার দেখল। কিন্তু কোথায় মা? এখানে তো কেউ নেই! তাহলে ওর নাম ধরে কে ডাকল? ও আরও একবার ভালো করে চোখ বোলালো চারিদিকে। নাঃ... কেউই তো নেই এখানে। তাহলে হয়তো ঘুমের ঘোরে ভুল শুনেছে। ও ফিরে আসার জন্য ঘরের দিকে পা বাড়াল, আর ঠিক সেই সময়েই আবার শোনা গেল ওই ডাকটা। তবে এবার ছাদে যাওয়ার সিঁড়ির দিক থেকে..

—'কিরে শ্রাবন্তী.. কিছু দে নারে খেতে.. বড্ড খিদে পেয়েছে'

চমকে উঠল ও! মা কি তবে সিঁড়িতে বসে আছে? শ্রাবন্তীও ধীরেধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করল। ও যখন সিঁড়িটার মাঝামাঝি এসে পৌঁছাল, তখন আবারও সেই একই ডাক ওর কানে এল...

—'খিদে পেয়েছে... খুউউব খিদে... খেতে দে...'

আরে আওয়াজটা তো সিঁড়ি থেকে নয়, আসছে ছাদ থেকে। এত রাতে মা ওখানে কী করছে? এবার যেন অবাক হওয়ার সাথে সাথে একটু ভয়ও পেয়ে গেল শ্রাবন্তী। ও তাড়াতাড়ি ছাদে উঠে এসে মাকে খুঁজতে লাগল চারিদিকে। কিন্তু কোথায় মা?

গভীর রাতের অন্ধকারে ঢেকে থাকা থমথমে নিস্তব্ধ ছাদ। আধফালি চাঁদের আলোয় ভালো করে দেখাও যাচ্ছে না সব কিছু। দিনের বেলায় যেই জায়গাটাকে এত পরিচিত বলে মনে হয়, রাতের অন্ধকারে সেই জায়গাটাকেই এখন বড় অপরিচিত বলে মনে হল শ্রাবন্তীর। বাড়ির পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা নারকেল গাছের পাতাগুলো হালকা হাওয়ায় দুলছে... সেদিকে চোখ পড়তেই বুকের ভিতরটা কেমন যেন ঢিপঢিপ করে উঠল ওর। মনে হল কোনো অশরীরী কালো ছায়ামূর্তি যেন হাত নাড়িয়ে নিজের কাছে ডাকছে ওকে। ভীত চোখে শ্রাবন্তী আরও একবার এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করল মাকে। হঠাৎ ওর নজর গেল ছাদের একদম বাঁদিকে, রেলিংটার ঠিক সামনেই। সেখানে কেউ একজন গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে মিশে, ওর দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে আছে!

কে ওটা? নিশ্চই মা! উফফ... কটা দিন ধরে যা শুরু করেছে, আর পারা যাচ্ছেনা। শ্রাবন্তী দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল বাঁদিকের রেলিংটার দিকে। তারপর একদম সামনে গিয়ে বিরক্ত জড়ানো গলায় বলল...

—''এত রাতে কী করছ এখানে? চলো নীচে চলো''

মানুষটা সামান্য নড়ে উঠল। তারপর ধীরেধীরে মুখটা ঘুরিয়ে তাকালো শ্রাবন্তীর দিকে।

একি!!! এটা তো এঁটোকুড়ি!!! প্রচণ্ড জোরে ধড়াস করে উঠল শ্রাবন্তীর বুকের ভিতরটা।

এটা কী করে সম্ভব? যেই মানুষটা কয়েকদিন আগেই রেলে কাটা পড়ে মারা গেছে, সেই মানুষটা এত রাতে ওর থেকে মাত্র হাত খানেকের দূরত্বে কী করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে? সারা শরীরটা থরথর করে কাঁপতে লাগল শ্রাবন্তীর। রাতের এই অন্ধকারেও ও পরিষ্কার দেখতে পেল... একঝাঁক উসকোখুসকো জট পাকানো চুল, আর কপালে লেপটে থাকা সিঁদুরের টিপ নিয়ে এঁটোকুড়ি ওর দিকে একটা বিকৃত হাসি মুখে তাকিয়ে আছে। এরপর শ্রাবন্তী কিছু বুঝে ওঠার আগেই এঁটোকুড়ি হঠাৎ বলে উঠল...

—''শ্রাবন্তী.. খুউউউব খিদে পেয়েছে... খেতে দে নারে কিছু...''

এঁটোকুড়ির গলা দিয়ে মায়ের আওয়াজ! বিস্ময়ে চোখ দুটো যেন ফেটে বেড়িয়ে এল শ্রাবন্তীর! নিজের কানকে ও বিশ্বাস করতে পারল না, এটা ও কী শুনছে! ভয়ে, আতঙ্কে, আর মারাত্মক বিভীষিকায় পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে গেল শ্রাবন্তী। ওর সারা শরীরের ওজন এতো বেশি বেড়ে গেল, যে ও নিজের চলনশক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলল। ও দেখতে পেল, এঁটোকুড়ি নিজের সেই বিচ্ছিরি চেহারাটা নিয়ে একপা-একপা করে এগিয়ে আসত লাগল ওর দিকে। এরপর শ্রাবন্তী শুধু আর একটাই আওয়াজ শুনতে পেল...

—''মিঁইইইয়াওওও...'' তারপরেই ওর চোখের সামনে সবকিছু কেমন যেন ঘোলা হয়ে অন্ধকার নেমে এল। এরপর ওর আর কিছুই মনে নেই।'

একটা থমথমে গম্ভীর গলায় ফকির বাবা বলে উঠলেন...

—'বিড়াল... হ্যাঁ, বিড়ালই বাঁচিয়েছে ওই রাতে তোর বউকে... নইলে ওর হাত থেকে তোর বউয়ের সেদিন কিছুতেই নিস্তার ছিল না।'

—'কী বলছেন বাবা? শ্রাবন্তীকে ওইদিন আমাদের বাড়ির বিড়ালটা বাঁচিয়েছে?

—'হ্যাঁ... ঠিকই শুনেছিস। সেদিন যদি ওই মুহূর্তে বিড়ালটা না চলে আসত, তাহলে ও আর তোর বউকে জীবিত ছাড়ত না। পারেনি শুধুমাত্র বিড়াল এসে যাওয়ায়।'

কথাটা শুনে হতবাক হয়ে গেলেন সন্তোষবাবু। উনি যেন ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারলেন না এটা। ফকির বাবা ওনার মনের ভাবটা আন্দাজ করতে পেরে বললেন...

—'মনে আছে বেটা, তোকে একটু আগেই জিজ্ঞেস করেছিলাম... তোর মায়ের ঘরে বিড়ালগুলো আর থাকত কিনা? তুই ''না'' বলেছিলিস।'

—'হ্যাঁ বাবা.. মনে আছে।' ঘাড় নাড়িয়ে জবাব দিলেন সন্তোষবাবু।

—'আসলে কি বলত, আমি বুঝতেই পেরেছিলাম তোর মায়ের পক্ষে বিড়ালের সাথে আর একঘরে থাকা সম্ভব নয়। এর কারনটা অবশ্য অনেকেরই অজানা যে বিড়াল হচ্ছে এমন একটা প্রাণী...যাদের সংস্পর্শে আসা মৃত আত্মারা একদমই পছন্দ করে না। আর সেসময় তোর মায়ের শরীরের দখল নিয়েছিল এঁটোকুড়ির আত্মা। তাই তোর মা যে বিড়ালদের থেকে দূরে থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক।'

—'কিন্তু বাবা, বিড়ালদের মধ্যে এমন কী আছে যার জন্য মৃত আত্মারা ওদের থেকে দূরে থাকে?' কৌতূহলী গলায় প্রশ্নটা করলেন সন্তোষবাবু।

ফকির বাবা মৃদু হেসে ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন...

—'বিড়ালের মধ্যে যে প্রচুর পরিমাণে ভালো শক্তির আধার থাকে বেটা। ওই যে যাকে তোরা বলিস পজিটিভ এনার্জি... সেটাই আর কি। তাই কোনো নেগেটিভ শক্তি ওদের সামনে এসে ঠিকঠাক কাজ করতে পারেনা। যে কারণে সেই রাতে তোর বউও নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছিল। আর এইজন্য খেয়াল করে দেখবি যেইসব বাড়িতে বিড়াল থাকে বা পোষা হয়, সেখানে কিন্তু এইসব উপদ্রব হয়না।'

—'তাহলে বাবা আমাদের বাড়িতে এমন কেন হল? আমরাও তো বিড়াল পুষতাম।'

—'সেই কথাই তো তখন থেকে চিন্তা করছিরে বেটা। এমনটা তো হওয়ার কথা নয়।'

ফকির বাবার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ দেখা দিল। তারপর নিজের মনেই কী যেন একটা বিড়বিড় করে, জানালার দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্কভাবে বললেন...

—'আচ্ছা... এরপর তোর বাড়িতে আর কী কী ঘটল একটু বল তো।'

সন্তোষবাবু গলাটা দুবার ঝেড়ে নিয়ে, আবার বলতে শুরু করলেন...

—'শ্রাবন্তীর মুখ থেকে কথাগুলো শোনার পর, এবার আমি সত্যিই একটু যেন ঘাবড়ে গেলাম। মনে হল, কদিন ধরে এখানে যা কিছু ঘটছে... তা যে কেবল আমি একাই অনুভব করতে পারছি, সেটা নয়। আমার মতো বাড়ির আর সকলেও সেই একই জিনিস অনুভব করতে পারছে। তারমানে এটাই দাঁড়ায় যে এগুলো আমার কোনো মনগড়া চিন্তাভাবনা নয়। বাস্তবিকই আমাদের পরিবারের সাথে কিছু একটা হয়ে চলেছে... যার কারণটা আমাদের প্রত্যেকেরই অজানা।

আমি মনে মনে স্থির করলাম এইরকম ভয়ের আবহ সৃষ্টি করা এক পরিবেশে তাতাইকে নিয়ে শ্রাবন্তীর এই বাড়িতে একা একা থাকা সত্যিই ঠিক হবেনা। কারণ আমি আর বাবা সারাটাদিন মোটামুটি বাড়ির বাইরেই কাটাই। বাড়িতে মানুষ বলতে থাকে মা, শ্রাবন্তী, তাতাই, আর তিন্নি। এরমধ্যে তিন্নি এখন ওর মামাবাড়িতে, আর মা অসুস্থ হওয়ায় কদিন ধরে নিজেকে প্রায় ঘরবন্দি অবস্থাতেই রাখছে। তার মানে গোটা বাড়িতে পড়ে থাকছে শুধু তাতাই আর শ্রাবন্তী। এইরকম অবস্থায় ওদের যদি কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, তাহলে আমার আফসোসের সীমা থাকবে না। তাই শ্রাবন্তীকে ওর মায়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়াই সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে হল আমার।

সেদিন সকালে আমি নিজে গিয়ে ওদের রেখে এলাম মধ্যমগ্রামে, শ্বশুর বাড়িতে। তারপর ওখানেই দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে, যখন রওনা দিলাম, তখন পড়ন্ত বিকেলের লালচে আলো ফিকে হয়ে এসেছে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। বাড়িতে ঢুকেই গেটের সামনে বাইকটা রেখে যখন দরজার দিকে পা বাড়ালাম, তখনই অনুভব করলাম এখানকার তাপমাত্রাটা যেন রাস্তার তুলনায় অনেকটাই কম। গেটের বাইরের গরম ভাবটা এখানে একদমই নেই। বরং এখানকার পরিবেশটা কোনো এক অদ্ভুত কারণে বড্ড বেশি স্যাঁতসেঁতে আর শীতল হয়ে রয়েছে। আশ্চর্য হয়ে গেলাম আমি! এরকম হওয়ার কারণ কী? এতোক্ষন তো বেশ গরমই লাগছিল বাইরে। তাহলে এখানে হঠাৎ এত ঠান্ডা কেন?

চিন্তিত মনে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বার তিনেক কলিং বেলটা টিপতেই, বাবা এসে দরজাটা খুলে দিল। বাবার মুখটা দেখে মনে হল কেমন যেন একটু মুষড়ে আছে। ভাবলাম দুপুরের খাওয়াদাওয়াটা হয়তো ঠিকঠাক হয়নি। তাই জিজ্ঞেস করলাম...

—'দুপুরে খেয়েছ কিছু?'

গম্ভীর গলায় উত্তর এল... 'হ্যাঁ, খেয়েছি। আমিই রান্না করেছিলাম।'

বুঝতে পারলাম মা আজও নিজের ঘর থেকে বেরোয়নি, তাই বাবাকেই রান্নাটা করতে হয়েছে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম...

—'মা খেয়েছে?' বাবা সেই একইরকম গম্ভীর অথচ নির্লিপ্তভাবে জবাব দিল... 'হয়তো খেয়েছে। দুপুরে একবার বেরিয়েছিল। খাবার নিয়েই ঘরে ঢুকে গেছে।'

এইবার যেন মনে মনে একটু বিরক্তই হলাম আমি। বাবার হঠাৎ কী হল? আমার সাথে এইভাবে কথা বলছে কেন? ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করতেই, বাবা একটু চুপ করে থেকে তারপর ধীরেধীরে বলল...

—'আজ দুপুরে কেউ বা কারা এসে শ্যামকে মেরে দিয়ে গেছে!''

চমকে উঠলাম আমি! শ্যাম মানে তো আমাদের বাড়ির পোষা বিড়ালটা! ওকে আবার কে মারতে পারে? আর কেনই বা মারবে?

এর উত্তরে বাবা আমায় যা বলল, তা হল... আজ দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর বাবা দোতলার ঘরে শুয়ে ছিল। মা'ও একতলায় নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে ভিতরেই ছিল। শুয়ে থাকতে থাকতে কখন যে বাবার চোখটা লেগে এসেছিল, বাবা তা টের পায়নি। হঠাৎ শ্যামের চিৎকার করে কান্নার আওয়াজে ঘুমটা ভেঙে গেল। প্রথমটায় বাবা ভেবেছিল হয়তো এমনিই কাঁদছে। বিড়ালরা মাঝেমধ্যে এরকম করেই থাকে। কিন্তু একটু পরেই বাবা বুঝতে পারল, অন্যদিনের কান্নার সাথে আজকের কান্নার আওয়াজটার যেন অনেকটাই পার্থক্য রয়েছে। ব্যাপারটা কী হয়েছে দেখার জন্য বাবা বিছানা ছেড়ে নীচে নেমে এল। তারপর ওর ডাক লক্ষ্য করে বাড়ির পিছন দিকটায় যেতেই দেখতে পেল, সেখানে শ্যাম প্রায় মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। ওর সারা শরীরের চামড়া, মাংস, লোম... সব ঝলসে গিয়ে গুটিয়ে গেছে। গায়ের থেকে তখনও হালকা হালকা ধোঁয়া উঠছে, আর ওই জায়গাটাও সম্পূর্ণ জলে ভিজে রয়েছে। বাবার বুঝতে অসুবিধা হল না, শ্যামের গায়ে কেউ এসে ফুটন্ত জল ঢেলে দিয়ে গেছে। তাই ওর এই অবস্থা।

কিন্তু একটা ব্যাপার বাবা বুঝতে পারল না, এই দিনেদুপুরে কে করতে পারে এরকম কাজ? আর একটা সাধারণ বিড়ালের সাথে তার কিসের শত্রুতাই বা থাকতে পারে?'

—'ওই সাধারণ বিড়ালটার জন্যই তো আগের রাতে তোর বউকে মারতে পারেনি ও। তাই শত্রুতা তো থাকবেই।' গম্ভীর গলায় কথাটা বললেন ফকির বাবা। তারপর আবার বললেন...

—'যাক যেটা বলছিলি সেটা বল। রাত হয়ে যাচ্ছে অনেক। এরপর তোকে আবার বাড়ি ফিরতে হবে।'

সন্তোষবাবু ফকির বাবার শান্ত অথচ কঠিন মুখটার দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর পুনরায় বলতে শুরু করলেন...

—'সেই রাতে বলার মতো সেরকম আর কোনো বড়ো দুর্ঘটনা ঘটল না। তবে হ্যাঁ.. একটা ছোটো অথচ এমন ঘটনা ঘটল, যা আমার মনেও আতঙ্কের একটা দাগ ফেলে গেল। এবং তারপর থেকে আমার বিশ্বাসটাও আরও জোরদার হল যে সত্যিই আমাদের বাড়িতে কিছু একটা আছে, যার জেরে এই অস্বাভাবিক, অলৌকিক ঘটনাগুলো ঘটছে।

সেদিন রাত তখন কটা হবে? বড়োজোর একটা-দেড়টা। আমরা তিনজন, অর্থাৎ আমি, মা, আর বাবা যে যার নিজের ঘরে ঘুমিয়ে ছিলাম তখন। হঠাৎ অভ্যাসবশত বাথরুম পেয়ে যাওয়ায়, ঘুমটা ভেঙে গেল আমার। আমি বিছানা ছেড়ে উঠে হাই তুলতে তুলতে বাথরুমে গিয়ে দাঁড়ালাম। তখন অবধি সব ঠিকঠাকই ছিল। এরপর কাজ সেরে নিয়ে যখন জলটা দিতে যাব, ঠিক এমন সময় আমার মনে হল, বাথরুমের পিছন দিকটায় ওর বাইরের দেওয়ালের গা ঘেষে কোনো মহিলা যেন দাঁড়িয়ে আছে। আর শুধু দাঁড়িয়েই নেই, সাথে করে কিছু চিবিয়ে চিবিয়েও খাচ্ছে ও। আমি বাথরুমের ভিতর থেকেও ধুসর রঙের ওর ছায়াটা স্পষ্ট দেখতে পেলাম দেওয়ালের গায়ে। প্রথমে ব্যাপারটাকে আমি অত গুরুত্ব দিলাম না। কারণ আমাদের বাথরুমের পিছন দিকটায় কোনো বাউন্ডারি পাঁচিল নেই, তাই চাইলেই যে কেউ এসে যখন তখন দেওয়ালের গা ঘেষে দাঁড়াতে পারে। এতে আশ্চর্য হওয়ার মতো কিছু নেই।

ঘুম জড়ানো চোখে আমি ভাবলাম.. হয়তো কোনো পাগলি টাগলি হবে, ওখানে দাঁড়িয়েছে কিছু খাওয়ার জন্য। নিশ্চিন্ত মনেই বাথরুমের লাইটটা নেভাতে গেলাম। তবে, তার আগে আরও একবার তাকালাম দেওয়ালটার দিকে। ছায়াটা তখন আমার মুখোমুখি একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই মনে হল, ও যেন আমায় বাথরুমের বাইরে থেকেও পরিষ্কার দেখতে পারছে। কেমন যেন একটু ভয় ভয় লাগল আমার! তাড়াতাড়ি বাথরুমের আলো নিভিয়ে ঘরে যাওয়ার জন্য যেই পা বাড়াতে গেলাম, অমনি একটা কথা মাথায় আসায়... থমকে দাঁড়ালাম আমি!

আরে, এটা কী করে সম্ভব??? কেউ যদি বাথরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে তো তার ছায়াটা সবসময় বাইরের দেওয়ালের গায়েই পড়বে!!! বাথরুমের ভিতরের দেওয়ালে আসবে কী করে? এটা তো কোনো পর্দা না, যে ওপাশের ছায়া এপাশ দিয়ে দেখা যাবে। তাহলে আমি কী করে দেখলাম?

হৃৎপিণ্ডের গতিবেগ উত্তরোত্তর বাড়তে থাকল আমার! একটা প্রশ্নই বারংবার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল। তবে কি আমার সাথে বাথরুমের ভিতর আরও কেউ ছিল... খালি চোখে যাকে দেখা যায়না?

কোথা থেকে একটা ঠান্ডা হাওয়া এসে আমার শিরদাঁড়াটা যেন কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। ভয়ে আমার সারা গায়ে কাটা দিয়ে উঠল। আমি তাড়াতাড়ি ছুটে গেলাম ঘরের দিকে। তারপর ঘরে ঢুকেই দরজাটা সবার আগে বন্ধ করে দিলাম।

সেই রাতে বিছানায় শুয়েও আমার বুকের ধড়ফড়ানিটা যেন কিছুতেই কম হতে চাইছিলো না। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল একটা ধুসর ছায়ামূর্তিটা... যার চুলগুলো ছিল উসকোখুসকো আর জটপাকানো..'

* * *

—'বাবা, আসবো?'

ভিতরের দরজার পর্দার আড়াল থেকে শোনা গেল আয়েষার নরম গলার স্বর।

ফকির বাবাও বেশ কোমল স্বরে জবাব দিলেন...

—'আয় বেটি'

এরপর পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকে এল আয়েষা। ওর হাতের ট্রে-তে দু-কাপ গরম চা। সেগুলোকে টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে, আগের বারের এঁটো কাপ প্লেটগুলো তুলে নিয়ে ও পুনরায় ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ফকির বাবা সেইদিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললেন...

—'মেয়েটা বড্ড ভালো রে। খুব ছোটোবেলাতেই নিজের বাবাকে হারিয়েছে। ওর বাবা জালালও নাকি এককালে খুব ভালো মানুষ ছিল। লোকের বিপদে আপদে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তা একদিন অনেক রাত করে কাজ থেকে বাড়ি ফিরছিল জালাল। পথে যে সেদিন কী হয়েছিল, কেউ জানে না। কিন্তু পরেরদিন সকালে ওর লাশ পাওয়া গেল মাঠের পাশে একটা ডোবার মধ্যে! কেউ বলল জালালকে খুন করা হয়েছে, আবার কেউ বলল ও জলে ডুবে মরেছে। কিন্তু ওর শরীরে না তো কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল, আর না ছিল পেটে কোনো জল। শুধু মরণকালে চোখদুটো অসম্ভব রকমের বিস্ফারিত হয়ে খোলা ছিল। লোকে বলে জালালকে নাকি সেদিন কোনো ভূতে মেরেছিল। কিন্তু তারই বা প্রমাণ কোথায় আছে বল? এখন যদি হত, তাও না হয় আমি খোঁজ খবর নিয়ে দেখার চেষ্টা করতাম। কিন্তু এসব তো বহুকাল আগেকার কথা।

জানিস, মেয়েটা আমায় বলে, আমিই নাকি ওর মরা বাবা। তাই কিছুতেই ছাড়তে চায় না আমায়। অবশ্য, আমারও যে ওর উপর বড়ো মায়া পড়ে গেছে রে। কোথাও গিয়ে ওকে ছাড়া বেশিদিন থাকতেও পারিনা। তাই তো বারবার ছুটে আসি ওর কাছে। সবাই বলে... ''ফকিরের নাকি কোনো ঠিকানা হয় না'। কিন্তু, আমি বলি... আমরা সবাই ভালোবাসার কাঙাল। ভালোবেসে বাঁধতে জানলে, শুধু রাজা-বাদশা কেন, পাগলা ফকিরকেও বেঁধে ফেলা যায়। তারও কোথাও একটা নিজের ঠিকানা হয়।''

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ফকির বাবা। চোখেমুখে প্রশান্তির ছাপ। এরপর টেবিলের উপর থেকে একটা ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে তুলে নিয়ে, তাতে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে বললেন...

—'যাক, আমার কথা না হয় পরে হবেখন, তার আগে তোর কথা বল। এরপর কী হল?'

সন্তোষবাবুও টেবিলের উপর থেকে প্লেটসমেত চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিলেন, তারপর সেটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন...

—'পরেরদিন সকালে একটা আশ্চর্য ব্যাপার দিয়ে আমার দিনটা শুরু হল। আমি তখন রান্নাঘরে রুটি করছি। খেয়েদেয়ে বাজারে যেতে হবে তাই। সেদিন আবার একটা শ্রাদ্ধ বাড়িতে মাছের অর্ডার ছিল আমার। হঠাৎ দেখলাম... মা কখন থেকে যেন রান্নাঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমটায় বেশ অবাকই হলাম। যেই মা ঠাকুমার শ্রাদ্ধের পর থেকে রান্নাঘরে আসা তো দূরের কথা, খাবার নেওয়া ছাড়া নিজের ঘরের বাইরে পর্যন্ত বেরোয় নি... সে হঠাৎ আজ এখানে দাঁড়িয়ে আছে! নিশ্চয়ই খিদে পেয়ে গেছে, তাই খাবার চাইতে এসেছে। আমি রুটি সেঁকতে সেঁকতেই বললাম...

—'খিদে পেয়েছে, তাইনা মা? দাঁড়াও এক্ষুনি দিচ্ছি।'

মা আমার এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলনা। তার বদলে যেই কথাটা বলল, সেটা আমার কাছে একদমই অপ্রত্যাশিত ছিল।

—'সন্তু, আজ একটু কাউকে দিয়ে ইলিশ মাছ পাঠিয়ে দিবি বাড়িতে? খুব রান্না করতে ইচ্ছা করছে।''

অবাক হয়ে বেশ কিছুক্ষণ মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি! তারপর ভাবলাম, মায়ের শরীরটা হয়তো একটু ঠিক হয়েছে। তাই নিজের থেকেই রান্না করতে চাইছে।

সেদিন খুব নিশ্চিন্ত মনেই বাজার গেলাম আমি। সময় মতো বাড়িতে মাছও পাঠিয়ে দিলাম। তবে কাজের চাপ থাকার জন্য দুপুরে বাড়ি ফিরতে পারলাম না। ফিরতে ফিরতে সেদিনও প্রায় সন্ধ্যাই হয়ে গেল আমার। বাড়িতে ঢুকে সবেমাত্র জলের বোতল থেকে দু-ঢোক জল গলায় ঢেলেছি, এমন সময় বাবা এসে বলল...

—'আজ মধু মারা গেছে''

জল খাওয়াটা বন্ধ হয়ে গেল আমার। চারটে বিড়ালের মধ্যে যদু আর শ্যাম মারা যাওয়ায়, রাম আর মধুই ছিল বাড়িতে। আজ আবার তারমধ্যে মধুও মারা গেল? বিস্মিত গলায় জিজ্ঞেস করলাম... ''কী করে???''

—'তা তো জানি না। দুপুরে যখন দেখেছিলাম, তখন মাছ ভাত খাচ্ছিল বারান্দায়। তারপর আমি একটু বেরিয়েছিলাম বাইরে। বিকালে ফিরে দেখলাম মুখ থেকে গেঁজা বেরিয়ে মরে পড়ে রয়েছে।'

তার মানে তো বিষ! হতবাক হয়ে গেলাম আমি! এসব হচ্ছেটা কী আমাদের বাড়িতে? একের পর এক বিড়ালগুলো এইভাবে মারা যাচ্ছে কিসের জন্য? কে করছে এমন?

সারাদিনের খাটাখাটনির পর এইরকম একটা খবর পেয়ে, মাথায় হঠাৎ করে রক্ত উঠে গেল আমার। বুঝতে পারলাম এই বাড়িতে থাকলে, রামও আর বেশিদিন বাঁচবে না। তাই সাথে সাথেই ফোন করলাম আমার এক বন্ধুকে, আর রামকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গেলাম বাড়ির থেকে। এরপর ওই বন্ধুটার কাছে রামকে রেখে, একটু নিশ্চিন্ত মনে যখন আমি বাড়ির পথ ধরলাম, ঘড়িতে তখন প্রায় রাত আটটা বাজে।

গলির কাছাকাছি আসতেই দূর থেকে নজরে পড়ল আমাদের অন্ধকারে মোড়া দোতলা বাড়িটা। সেটার দিকে তাকাতেই, গাটা কেন জানি ছমছম করে উঠল। এমনিতেই কয়েকদিন ধরে সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরতে কেমন যেন একটা অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল আমার। তার উপর আজ যেন সেই অস্বস্তির মাত্রা আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। মনে হল, দুদিন আগে অবধিও এই বাড়িটাতে কত কেউ ছিল একসাথে... তিন্নি, তাতাই, শ্রাবন্তী, চারটে বিড়াল। ওদের হাসি-কান্না, কথাবার্তা, খেলাধুলায় সারাক্ষণ মেতে থাকত বাড়িটা। আর আজ সবকিছুই কেমন যেন খালি খালি। তিন্নি, তাতাই, আর শ্রাবন্তী চলে গেল ওর মায়ের কাছে। বিড়ালগুলোও একে-একে সব মরে গেল। শুধু গোটা বাড়িটা জুড়ে পড়ে রইলাম আমি, মা, বাবা, আর এই থমথমে অদ্ভুত পরিবেশ।

উফফ.. কেন যে হল আমাদের সাথে এমন?

একটা হতাশা দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়ে দলা পাকিয়ে বেড়িয়ে এল আমার গলা থেকে।

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে খাওয়ার টেবিলে বসে বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম...

—'আচ্ছা, আজ দুপুরে মধুকে কে খাবার দিয়েছিল?'

বাবা খেতে খেতেই শান্ত গলায় জবাব দিল... 'আমিই দিয়েছিলাম।'

এরপর আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম...

—'ভালো করে দেখে দিয়েছিলে তো? মানে ওর খাবারে কিছু পড়েছিল কিনা?''

এইবার বাবা ভাতের থালা থেকে মুখ তুলে আমার দিকে চাইল। তারপর ধীরেধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে আড়চোখে একবার দেখে নিল মায়ের ঘরের দিকে। সেই ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। মা আজও যথারীতি সবার আগে খাবার নিয়ে ভিতরে ঢুকে গেছে। এইবার বাবা নিজের গলার স্বরটা একদম নীচু করে নিয়ে বলল...

—'আজ সকালে ইলিশ মাছটা তোর মা'ই রান্না করেছিল। দুপুরে সেটা দিয়ে খেয়ে উঠে আমি একটু আড্ডা দিতে বাইরে বেরোচ্ছিলাম। এমন সময় তোর মা পিছন থেকে আমায় ডাক দিয়ে বলল... রাম, আর মধুকে খাবারটা একটু দিয়ে যেতে। দেখলাম হাতে দুটো বাটি। তাতে ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত মাখা। আমি একটু অবাকই হলাম। তোর মা তো বরাবর নিজের হাতেই ওদের খেতে দেয়। তা আজ হঠাৎ কী হল? এর উত্তরে তোর মা আমায় বলল... ওর শরীর খারাপ, তাই বিড়ালের কাছে যাবে না। অগত্যা আমিই ওদের খেতে দিয়ে গেলাম। তারপর তো বিকালে ফিরে দেখি এই অবস্থা।''

বাবা একটু থামল। তারপর আবার এদিক ওদিক তাকিয়ে নিয়ে সেই একইরকম চাপা গলায় বলল...

—'জানিস সন্তু, বাগানের পোকা মারার জন্য যেই কীটনাশকের বোতলটা এনেছিলাম, সেটা আজ রান্নাঘরে খালি অবস্থায় পেয়েছি। ওর একটা উগ্র গন্ধ আছে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে সেই গন্ধ ঢাকতেই আজ ইলিশ মাছ আনা হয়েছে।'

—'কী বলছ বাবা? মা মেরেছে বিড়াল গুলোকে!!!

চমকে উঠলাম আমি। নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারলাম না। মনে পড়ে গেল তিন্নির ঘটনাটা, সেদিন ও দেখে ফেলেছিল মাকে বিড়াল মারতে। প্রথমে যদিও ওর কথায় বিশ্বাস করেছিলাম আমি, কিন্তু পরে ব্যাপারটা একদমই মাথা থেকে বের করে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম বাচ্চা মেয়ে, কী দেখতে কী দেখে ফেলেছে... তবে এখন তো মনে হচ্ছে ও ঠিকই দেখেছিল সেদিন।

বাবা গম্ভীর গলায় বলল...

—'হ্যাঁ, একদম ঠিক শুনেছিস। আমার তো মনে হয়, তোর মা'ই মারছে বিড়ালগুলোকে। আমি বাটি দুটো শুঁকে দেখেছিলাম পরে। ওর থেকে কীটনাশকের গন্ধ আসছিল। রাম হয়তো খেতে গিয়ে গন্ধটা পেয়ে গেছিল, তাই আজ দুপুরের খাবারে ও মুখ দেয়নি। কিন্তু মধু.....'

হঠাৎ করে মাঝপথেই থেমে গেল বাবার কথাটা। লক্ষ্য করে দেখলাম, বাবার চোখদুটো স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মায়ের ঘরের দিকে। সেই দিকে ঘুরে তাকাতেই দেখতে পেলাম... মায়ের দরজাটা ঈষৎ ফাঁকা হয়ে রয়েছে, আর সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে ঘরের ভিতরের নাইট ল্যাম্পের লালচে আলো। সেই হালকা আলোতেও আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম দরজার আড়ালে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে, যে কান পেতে শোনার চেষ্টা করছে আমাদের কথাগুলো। এরপরেই মায়ের দরজাটা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেল। ছিটকিনি আটকানোর মৃদু আওয়াজ কানে এল আমাদের।

আমি আর বাবা হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইলাম একে অপরের মুখের দিকে। সেই রাতে খাবার টেবিলে আমাদের আর কোনো কথা হল না। শুধু খাওয়া শেষ করে ঘরে ঢোকার সময় আমি বাবাকে বললাম...

—'আজ আর এত রাতে এই ব্যাপার নিয়ে মাকে আর ডাকাডাকি করলাম না। তবে কাল এই বিষয়ে একবার খোলাখুলি আলোচনা করতেই হবে মায়ের সাথে।'

কথাটা বলেই আমি নিজের ঘরে ঢুকে দরজা দিয়ে দিলাম। বাবাও দোতলার ঘরে শুতে চলে গেলেন।

সেদিন রাতে বিছানায় শোওয়া মাত্রই খুব তাড়াতাড়ি চোখ লেগে গেল আমার। আমি ভাবলাম মোবাইলে একটা সিনেমা দেখব। কিন্তু চেষ্টা করেও কিছুতেই জেগে থাকতে পারলাম না। কখন যে একটা গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম, নিজেও জানিনা।

ঘুম ভাঙল দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ শুনে। কে যেন অনবরত আমার দরজায় ধাক্কিয়েই চলেছে। মোবাইলে সময় দেখলাম, তিনটে বেজে ছাপ্পান্ন মিনিট। বেশ আশ্চর্য হলাম আমি! এই সময় আবার কে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে? এবার দরজার আওয়াজের সাথে সাথে একটা ডাকও শুনতে পেলাম...

—'সন্তু... সন্তু... জেগে আছিস? দরজাটা একটা খুলবি?'

এটা বাবার গলার আওয়াজ না! কী ব্যাপার, এত রাতে বাবা হঠাৎ আমায় ডাকছে কেন? কোনো বিপদ হয়নি তো?

তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে দরজাটা খুললাম আমি। দেখলাম আমার ঘরের দোরগোড়াতেই বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাবা। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। আমায় দেখতে পেয়েই বলল...

—'গলাটা খুব ব্যথা করছে রে। একটু দেখবি কী হয়েছে?'

আমি তাড়াতাড়ি বাবাকে ঘরে নিয়ে এসে বিছানার উপর বসালাম। তারপর টিউব লাইটের ধবধবে আলোয় বাবার গলার দিকে তাকাতেই, মারাত্মক চমকে উঠলাম আমি!

—'এ কী!!! তোমার সারা গলায় এইরকম নীল নীল দাগ কেন? কী হয়েছে তোমার?'

বাবা আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ মাথা নীচু করে বসে রইল মাটির দিকে তাকিয়ে। বাবার কপালে তখনও বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটা। বুঝতে পারলাম, বাবার হয়তো কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। টেবিলের উপর থেকে জলের বোতলটা এগিয়ে দিতেই, সেটা থেকে বেশ খানিকটা জল খেল বাবা। তারপর আরও কিছুক্ষণ ওইভাবেই চুপ করে বসে থাকার পর খুব ক্ষীণ কণ্ঠে বলল...

—'স্বপ্ন যে এতো ভয়াবহ হতে পারে, আর বাস্তবে যে তার ছাপ ফেলে যেতে পারে... সেটা প্রথম জানলাম আজ।''

আমি কৌতূহলী চোখে বাবার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। বাবা আবারও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল...

—'আজ খেয়েদেয়ে উপরে উঠেই শুয়ে পড়েছিলাম আমি। অন্যদিনের মতো টিভি চালিয়ে বসিনি। তাই ঘুমটাও হয়তো তাড়াতাড়িই এসে গেছিল আজ। কতক্ষণ যে ঘুমিয়ে ছিলাম জানি না। হঠাৎ একটা পচা আঁশটে দুর্গন্ধে নিশ্বাসটা কেমন বন্ধ হয়ে এল। প্রথমে ঘুমের ঘোরে ভাবলাম বিড়ালগুলোর গা থেকেই হয়তো এই গন্ধটা আসছে। তাই বালিশের মধ্যে নাক চাপা দিয়ে শুলাম। কিন্তু তারপরেই আচমকা মনে পড়ল, বিড়াল আসবে কোথা থেকে? আজ তো ঘর খালি! ততক্ষণে দুর্গন্ধটা যেন আরও প্রবল হয়ে উঠেছে। এতটাই প্রবল... যে দম নিতেও কষ্ট হল আমার। বাধ্য হয়ে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালাম আমি... আর তারপরেই ঘরের হালকা আলোয় যা দেখলাম, তাতে আমার সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল!'

আমি বিস্মিত গলায় জিজ্ঞেস করলাম...

—'কী দেখলে!!!'

বাবা ভয় জড়ানো চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল...

—'দেখলাম, একদম আমার মাথার গোড়ায় তোর মা দাঁড়িয়ে আছে! কী হিংস্র ওর চোখের দৃষ্টি। কী অদ্ভুত ওর বেশভূষা। মাথার চুল এলোমেলো হয়ে জট পেকে রয়েছে, কপালে লেপ্টে গেছে সিঁদুরের টিপ, আর পরনের শাড়িটাও যেন বহু পুরোনো আর ছেঁড়াখোঁড়া। যার থেকে নোংরা একটা বোটকা গন্ধ আসছে। আমি প্রচণ্ড ঘাবড়ে গিয়ে তোর মাকে জিজ্ঞেস করতেই যাচ্ছিলাম যে এত রাতে এখানে কী করছ? কিন্তু তার আগেই তোর মা আমায় বলল... খেতে দে, খিদে পেয়েছে। বিশ্বাস কর সন্তু, তোর মায়ের গলা দিয়ে যেই আওয়াজ তখন বেরিয়েছিল, সেটা ওর না। অন্য কারোর আওয়াজ। গলাটা শুনেই আঁতকে উঠলাম আমি! এটা কে কথা বলছে ওর ভিতর থেকে? ওর আওয়াজ তো এরকম না!

ততক্ষণে তোর মা আবার আমায় বলল... খেতে দিবিনা? বল, দিবিনা খেতে আমায়? আমি তখন ওর ওই বীভৎস রূপ দেখে এতটাই ভয় পেয়ে গেছিলাম যে আমার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোচ্ছিল না। তোর মা আরও একবার সেই একইরকম হিংস্র গলায় বলল... দিবিনা তো খেতে? তারপরেই আমার গলাটা সজোরে চেপে ধরে চিৎকার করতে লাগল... খেতে দে.. দে আমায় খেতে... খেতে দে বলছি... দে দে দে।

আমি নিশ্বাস নেওয়ার জন্য ছটফট করে উঠলাম। কিন্তু নিশ্বাস নিতে পারলাম না। প্রাণপণে চেষ্টা করতে লাগলাম তোর মায়ের হাত থেকে আমার গলাটা ছাড়ানোর জন্য। কিন্তু সেটাও পারলাম না। ওর আসুরিক শক্তির কাছে আমার শক্তি হার মেনে গেল। ক্রমশ দমটা বন্ধ হয়ে আসতে লাগল আমার। সারা শরীর শিথিল হয়ে এল। আর তারপর চোখটা নিজের থেকেই বুজে গেল।

বুঝতে পারলাম আমি জ্ঞান হারাতে চলেছি। কিন্তু না, এত তাড়াতাড়ি হার মানলে চলবে না, আমাকে চেষ্টা করতেই হবে... এই ভেবে আমি আরও একবার জোর করে চোখ মেলে তাকালাম।

কিন্তু একি! এটা আমি কী দেখছি? নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারলাম না আমি। দেখলাম, ঘরের ভিতর কেউই নেই। আমি নিজেই নিজের গলা টিপে ধরে রেখেছি! তারমানে আমি নিজেই নিজেকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছিলাম? মাথার ভিতর সবকিছুই কেমন যেন গোলমাল পাকিয়ে গেল আমার।''

এতদূর বলার পর বাবা একটু চুপ করলো। তারপর অন্যমনস্কভাবে ঘরের দরজাটার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল...

—'ওটা আমার স্বপ্ন ছিল নাকি বাস্তব, তা আমি জানি না। তবে এইটুকু জানি, আজ মরণকে খুব সামনে থেকে দেখে এসেছি আমি। ওর দুর্বিষহ যন্ত্রণা ভোগ করে এসেছি। তাই বুঝতে পারছি নিজেকে নিজে মারার সময় একজন মানুষ কতটা কষ্ট পায়।' একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বাবার গলা থেকে।

সমস্ত ঘটনাটা শোনার পর, আমিও ঠিক কী বলব বুঝে উঠতে পারলাম না। স্বপ্নে কখনো মানুষ এরকমও যে করতে পারে, তা সত্যিই আমার ধারণার বাইরে ছিল। তবে একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ছিলাম, বাবার সাথে যাই কিছু হয়েছে, তার সাথে জড়িত আছে আমাদের বাড়ির অস্বাভাবিক ঘটনাগুলো, যা এই কদিন ধরে ক্রমাগত ঘটে চলেছে। হঠাৎ আমার মনে হল... আচ্ছা, মা ঠিক আছে তো? মায়ের সাথে আবার এরকম কিছু হয়নি তো?

তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটে গেলাম মায়ের ঘরের সামনে। তারপর দরজার কড়া নাড়িয়ে ডাকতে থাকলাম...

—'মা... ও মা... তুমি ঠিক আছো তো?'

বেশ কয়েকবার ডাকাডাকির পর ভিতর থেকে একটা কর্কশ গলায় জবাব এল...

—'আঃ... কী চাই তোর... আমি এখন কথা বলতে পারছি না... তুই যা এখান থেকে!''

কেমন যেন অদ্ভুত শোনাল মায়ের গলাটা! মনে হল যেন ভিতর থেকে অন্য কেউ কথাটা বলল। তারপর আবার ভাবলাম, হয়তো ঘুমের ঘোরে রয়েছে, তাই গলাটা শুনতে এরকম লাগল। আমি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ চলে এলাম নিজের ঘরে। বাবা ততক্ষণে আমার বিছানায় আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। আমিও গিয়ে শুয়ে পড়লাম বাবার পাশেই। ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে চারটে বেজে পঁচিশ মিনিট। মানে দিনের আলো ফুটতে এখনও বেশ কিছুটা সময় বাকি আছে। চোখটা বুজতেই কখন যে ঘুম ধরে গেল, নিজেও টের পেলাম না।

তবে সেদিন শান্তিতে ঘুমানোটা হয়তো আমার কপালে লেখা ছিল না। তাই ভোর হতে না হতেই এমন একটা খবর পেলাম, যা শুনে আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল!

কতক্ষণই বা ঘুমিয়ে ছিলাম সেদিন? বড়োজোর আধঘণ্টা বা চল্লিশ মিনিট। তারপরেই বাড়ির বাইরে থেকে একটা চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ শুনে চোখটা খুলে গেল আমার। গেটের সামনে এসে দেখলাম, আমাদেরই পাড়ার সহদেবদা আর বিনয় দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখামাত্রই ওরা বিস্মিত গলায় বলে উঠল...

—'কাকিমা... মানে তোর মা'কে দেখলাম পুকুরের জলে ভাসছে!''

মানে!!!! কানের ভিতর যেন বাজ পড়ল আমার। হাত-পা গুলো থরথর করে কাঁপতে লাগল। এ..এ..এসব কি বলছে ওরা? মা'তো ঘরের ভিতরই শুয়ে আছে। তাহলে?

পাগলের মতো ছুটে গেলাম মায়ের ঘরের দিকে। তারপর এক ধাক্কায় দরজাটা খুলে দেখলাম, ভিতরটা একদম খালি! মা নেই সেখানে! চোখের সামনে সবকিছুই যেন ঘোলাটে হয়ে গেল আমার। মাথাটা কাজ করা পুরোপুরি বন্ধ করে দিল। আমি অসহায়ের মতো ধপ করে বসে পড়লাম মায়ের বিছানার উপর।

বাবাকে নিয়ে যখন বাড়ির পিছনের ওই পরিত্যক্ত পানা পুকুরটার কাছে গেলাম, তখন সেখানে বেশ কিছু লোক জড়ো হয়ে গেছে। ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে, জলের দিকে তাকাতেই আমার গলা ফেটে চিৎকার বেরিয়ে এল...

—'মা..আ..আ..আ..আ..আ..''

পুকুরের শ্যাওলা ঢাকা জলের ঠিক মাঝখানটায় তখন ভেসে রয়েছে আমার মা। জল খেয়ে ফুলে ফেঁপে মায়ের সারা শরীরটা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে রয়েছে। মুখের আকৃতিটাও যেন পালটে গিয়ে দ্বিগুণ আকার ধারণ করেছে। সেইদিকে তাকাতেই আমার বুকের ভিতরে একটা অসহ্য যন্ত্রণা মোচড় দিয়ে উঠল। চোখের থেকে ঝরঝর করে নেমে আসতে লাগল নোনা জলের ধারা।

শুনতে পেলাম পাশে দাঁড়ানো কেউ একজন কাউকে বলছে... 'মনে হয় সাত আট ঘণ্টা আগে মারা গেছে। নাহলে বডি এইভাবে ফুলত না।''

কথাটা কানে আসতেই, আমার মাথায় যেন বিদ্যুৎ প্রবাহ বয়ে গেল! এটা কী করে সম্ভব? মা যদি সাত আট ঘণ্টা আগেই মারা গিয়ে থাকে, তাহলে একটু আগেই মায়ের ঘর থেকে আমায় জবাব দিল কে???

মা হারানোর দুঃখের মাঝেও বুকের ভিতরটা কেন জানি ঢিপঢিপ করে উঠল আমার! ভোরের আলোয়, এতো লোকের মাঝেও একটা ঠাণ্ডা শিহরণ খেলে গেল আমার মেরুদণ্ড বেয়ে!!!'

বিছানা থেকে হঠাৎ কেন জানি নেমে পড়লেন ফকির বাবা। তারপর ঘরের চারিদিকে ব্যস্ত পায়ে একটু হাঁটাহাঁটি করে আবার এসে বসে পড়লেন সামনের কাঠের চেয়ারটায়। উদ্বিগ্ন মুখে বললেন...

—'ঠিক লাগছে না রে বেটা... কিচ্ছু ঠিক লাগছে না!'

সন্তোষবাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন...

—'কী ঠিক লাগছে না বাবা?'

ফকির বাবা এই প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে, নিজের মনেই বিড়বিড় করে বললেন...

—'প্রতিহিংসা বড়োই খারাপ বস্তু... মৃত্যুর পর কেবলমাত্র ওটাই সঙ্গে যায়... আর বাকি সব কিছু তো এখানেই ত্যাগ করে যেতে হয়।'

বড্ড বেশি চিন্তিত দেখাল ফকির বাবাকে। সেটা লক্ষ্য করে সন্তোষবাবু বললেন...

—'আপনার কি কোনো অসুবিধা হচ্ছে বাবা?'

—'হুম.. কী বললি? অসুবিধা? না না, আমি ঠিক আছি। তুই বল তারপর..'

একটু আনমনাভাবেই কথাটা বললেন ফকির বাবা। সন্তোষবাবু এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীরেধীরে আবার বলতে শুরু করলেন...

—'মায়ের এরকম একটা অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর বাড়ির সর্বত্রই একটা শোকের ছায়া ছিল। কিন্তু সেই শোকের মাঝেও কোথাও যেন লুকিয়ে ছিল একটা ভয়, একটা আতঙ্কের করাল গ্রাস। সেদিন খবরটা পাওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই শ্রাবন্তী চলে এসেছিল ওর মায়ের বাড়ি থেকে। তিন্নি আর তাতাইও এসেছিল, ওদের ঠাম্মিকে শেষবারের মতো দেখতে। শ্রাবন্তীর কথা ছিল, ও এখানে থাকলেও তিন্নি আর তাতাই মা'কে একবার দেখেই ফিরে যাবে ওদের মামাবাড়িতে। কারণ এইরকম একটা ভয়াবহ পরিবেশে ও কিছুতেই ওর বাচ্চাদের এখানে রাখবে না। অবশ্য আমিও আর এই নিয়ে কোনো দ্বিমত করিনি। আমারও মনে হয়েছিল বাড়ির যা অবস্থা, তাতে ওদের এখানে না থাকাই ভালো।

মায়ের যেহেতু অপঘাতে মৃত্যু, তাই শ্রাদ্ধ শান্তির কাজটা ছিল তিন দিনে। সেই বিষয়ে কথা বলার জন্য সন্ধ্যায় ঠাকুরমশাইকে ডাকা হয়েছিল। আমি মনে মনে ভেবেই রেখেছিলাম ঠাকুরমশাই আসলে আমাদের বাড়ির অসুবিধাগুলো নিয়ে একটু আলোচনা করবো। যদি কোনো পূজার্চনা বা হোম-যজ্ঞ করে এই বিপদগুলো থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়, তাহলে ভালো হয়।

আসলে আপনি তো জানেনই বাবা, এগুলো এমন একটা বিষয় যা কাউকে কখনো বুঝিয়ে বলা যায় না। আর যদিও বা বলা হয়, তাহলে কেউই তা বিশ্বাস করতে চায় না। শুধু যাদের সাথে ঘটে, তারাই কেবল জানে এর যন্ত্রণা।'

ফকির বাবা গম্ভীরভাবে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলেন সন্তোষবাবুর কথায়। সন্তোষ বাবুও বলে চললেন...

—'ওইদিন সন্ধ্যায় যথাসময়েই ঠাকুরমশাই এলেন আমাদের বাড়িতে। উনি পাশের পাড়াতেই থাকেন। ভালো পুরোহিত হিসেবে ওনার বেশ নামডাকও আছে। শোনা যায় পূজার্চনা করে নাকি অনেকের অনেক বাধাবিঘ্নও কাটিয়ে দিয়েছেন উনি। আগেরবার ঠাকুমার কাজের সময় ওনাকে পাওয়া যায়নি। কোথায় যেন গেছিলেন। তবে এইবার পেয়ে যাওয়ায় ওনাকেই ডাকা হয়েছিল।

যাই হোক, সেদিন ঠাকুরমশাইয়ের কাছ থেকে শ্রাদ্ধের সমস্ত বিধিনিয়ম আর প্রয়োজনীয় উপকরণ সামগ্রীর ব্যাপারে জেনে নেওয়ার পর, উনি যখন ঘর থেকে বেরোচ্ছিলেন, তখন আমিও ওনার পিছু পিছু গেট অবধি গেলাম। উদ্দেশ্য একটাই... ওনাকে আমাদের বাড়ির এই ভয়ংকর পরিস্থিতি সম্পর্কে বলা। কিন্তু আমি কিছু বলতে যাবো, তার আগেই উনি আমাকে বললেন...

—'বাবা সন্তোষ, তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।'

আমি আগ্রহী গলায় বললাম... 'হ্যাঁ, বলুন না ঠাকুরমশাই কী বলবেন?'

উনি রাস্তায় বেরোনোর আগে, বাড়ির একদম গেটের মুখটায় এসে থমকে দাঁড়ালেন। তারপর চিন্তিত মুখে আমার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন...

—'তোমাদের বাড়ির বাতাসটা বড্ড ভারী হয়ে আছে। আজ এখানে আসার পরই আমি সেটা অনুভব করেছিলাম। তবে কারও সামনে বলিনি কথাটা। এমনিতে মরা বাড়ির বাতাস একটু আধটু ভারী হয়েই থাকে, সেটা অতটা চিন্তার বিষয় না। তারমধ্যে অপঘাতে মৃত্যু হলে তো এটা হবেই হবে। কিন্তু তোমাদের বাড়ির ব্যাপারটা বড্ড আলাদা ঠেকল।'

একটু থামলেন ঠাকুরমশাই। তারপর একমুহূর্ত কী যেন চিন্তা করে বললেন...

—'কিছু একটা আছে এখানে। আর সেটা যাই হোক না কেন, শুভ কিছু নয়। শ্রাদ্ধ শান্তি মিটে গেলে তুমি তাড়াতাড়ি এর প্রতিকারের ব্যবস্থা করো... নইলে ঘোর বিপদ!''

ঠাকুরমশাইয়ের কথা শুনে গলাটা শুকিয়ে গেল আমার। মনে হল, এইটুকু সময়ের জন্য এসেই উনি সব টের পেয়ে গেলেন? আর আমি কিনা এতদিন ধরে সব জেনে বুঝেও অবুঝের মতো চুপ করে বসেছিলাম? যদি আগে চেষ্টা করতাম, তাহলে হয়তো মায়ের এরকম মর্মান্তিক পরিণতি হত না। একটা চাপা যন্ত্রণায় বুকের বাঁদিকটা চিনচিন করে উঠল আমার।

এরপর ঠাকুরমশাইকে একে একে এই কদিনের সমস্ত ঘটনাই খুলে বললাম আমি। সব শোনার পর উনি বিস্ফারিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন...

- ''সর্বনাশ!!! করেছ কি? এত ভয়াবহ বিপদের মধ্যে জড়িয়ে ফেলেছে নিজেদের! এর থেকে উদ্ধার পাওয়ার রাস্তা তো আমারও জানা নেই।'

আমি করুণ মুখে ঠাকুরমশাইকে অনুরোধ করে বললাম...

—'দেখুন না যদি কোনো রাস্তা থাকে। জানেনই তো বাড়িতে দুটো বাচ্চা নিয়ে থাকি। তারমধ্যে বাবারও বয়স হয়েছে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে ঘরবাড়ি ছেড়ে কোথায় যাবো এখন?'

এরপর ঠাকুরমশাই বেশ কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে তারপর আপনার নামটা আমায় বললেন। সাথে এও বললেন... একমাত্র আপনিই পারবেন এইসব কিছু ঠিক করতে। আমি যেন অতি অবশ্যই শ্রাদ্ধের পরের দিনই আপনার সাথে এসে দেখা করি।

গতকাল মায়ের শ্রাদ্ধ ছিল বাড়িতে। তাই আমি আজই এসে গেছি আপনার কাছে। আমাদের দয়া করে আপনি বাঁচান বাবা। সত্যি বলছি এই যন্ত্রণা আর নিতে পারছি না। মাঝে মাঝে মনে হয় এতো আতঙ্কের মধ্যে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াটাই হয়তো ভালো।'

ছলছল করে উঠল সন্তোষ বাবুর চোখ। দু-ফোঁটা জলও নেমে এল গাল বেয়ে। সেটা লক্ষ্য করে ফকির বাবা ব্যস্ত হয়ে বললেন...

—'আরে আরে কী করছিস বেটা? কাঁদছিস কেন? জানিস না... যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণই আশ। আর মানুষের শ্বাস কতক্ষণ চলবে, সেটা কারও হাতে নেই। তার মালিক কেবল উপরওয়ালা।

যাই হোক, আমি কতটা কী করতে পারব তা জানি না। কিন্তু চেষ্টা তো অবশ্যই করব। তবে তার আগে আমায় জানতে হবে মা মরার দিন থেকে কাল শ্রাদ্ধের দিন অবধি... আর কী কী ঘটেছে তোর বাড়িতে?'

সন্তোষবাবু এবার নিজের জামার হাতাটা দিয়ে চোখের জলটা মুছলেন। তারপর টেবিলে রাখা জলের বোতলটা থেকে সামান্য একটু জল খেয়ে, সেটাকে আবার যথাস্থানে রেখে দিয়ে বলতে শুরু করলেন...

—'মা মারা যাওয়ার দিন রাতে সেরকম কিছু না ঘটলেও, একটা এমন ব্যাপার ঘটেছিল... যেটাকে আমি তখন অত পাত্তা দিইনি। কিন্তু পরে বুঝতে পেরেছিলাম, ওই ব্যাপারটাই ছিল পরবর্তী ঘটনার সূত্রপাত। যাই হোক, আমি আপনাকে না হয় সবটাই খুলে বলি।

ওইদিন ঠাকুরমশাই চলে যাওয়ার পর, রাত প্রায় দশটা অবধি লোকজন আসাযাওয়া করেছিল আমাদের বাড়িতে। এরপর যখন বাড়ি ফাঁকা হল, তখন আমি আর বাবা শ্রাদ্ধের ব্যাপারটা নিয়ে একটু আলোচনা করতে বসলাম। কী করব, কাকে কাকে বলব... এইসব আর কী। তারপর পৌনে এগারোটা নাগাদ সাবু মাখা খেলাম আর এগারোটার মধ্যে শুতে চলে গেলাম। ওইদিন ভোর থেকে অনেক দৌড়ঝাঁপ হয়েছিল সারাদিন, তাই বেশ ক্লান্ত ছিল শরীরটা। বিছানায় শোওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম এসে গেল আমার।

কতক্ষণ ওইভাবে শুয়েছিলাম জানি না। তবে ঘুমটা ভাঙল, মৃদু একটা কম্পনে। মনে হল, আমার পাশে কিছু যেন অনবরত নড়ে চলেছে। ঘুমের ঘোরেই পাশের বালিশটায় একবার হাত রেখে দেখলাম। সেটা খালি পড়ে আছে! কেউ নেই সেখানে। কিন্তু, এখানে তো শ্রাবন্তী থাকার কথা ছিল। গেল কোথায় ও? আবার ছাদে চলে যায় নি?

একটা অজানা আশঙ্কায় চোখটা নিজের থেকেই খুলে গেল আমার। আর সাথে সাথেই নাইট ল্যাম্পের মৃদু আলোয় আমি দেখতে পেলাম, শ্রাবন্তী উঠে বসে আছে খাটের উপর। আর শুধু বসেই নেই... ক্রমাগত জোরে জোরে দুলে চলেছে ও। ওর মুখ দিয়েও কেমন যেন একটা অদ্ভুত আওয়াজ বেরোচ্ছে...

হুহ... হুহ... হুহ... হুহ...

আমি ঘুম জড়ানো গলায় ওকে জিজ্ঞেস করলাম...

—'কি হল বসে আছো কেন? ঘুম আসছে না বুঝি?'

শ্রাবন্তী আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে, সেই একইভাবে দুলে যেতে থাকল। একটু বিরক্ত হয়েই, আবারও ওকে বললাম...

—'আরে বলবে তো কিছু... কী হয়েছে তোমার?'

এবার ও থামল। তারপর অদ্ভুত একটা দাঁত বের করা হাসি মুখে আমার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল...

—'খিদে পেয়েছে... খুউব খিদে... কিছু খেতে দেবে আমায়... বলোনা, দেবে কিছু খেতে?'

—'ওহ, এই ব্যাপার?' আমি উলটোদিকে ঘুরে শুয়ে বললাম...

—'আমি আবার কী খেতে দেব? যাও নিজে দেখো গিয়ে... আমায় ঘুমাতে দাও।''

এরপর একটা লম্বা হাই তুলে চোখ বুজলাম আমি। তারপর গভীর ঘুম। সেই রাতে শ্রাবন্তী আর কী করেছে না করেছে, তা আমি কিছুই জানিনা। চোখ যখন খুলেছি, তখন সকাল হয়ে গেছে।'

এতদূর শোনার পর ফকির বাবা গম্ভীর গলায় বললেন...

—'পরেরদিন তো তোদের ক্ষৌরকর্ম মানে ঘাটকাজ ছিল... তাই না? তা সেদিন কোনো অসুবিধা হয়নি?'

সন্তোষবাবু মাথা নাড়িয়ে বললেন...

—'হ্যাঁ বাবা... হয়েছে তো। তবে সেটা রাতের দিকে। দিনের বেলাটা শ্রাবন্তী একদম ঠিকঠাকই ছিল। অবশ্য এখন মনে পড়ল, একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছিলাম। নাপিত যখন ওর নখ কাটার জন্য হাতটা বাড়াতে বলল... ও তখন কেমন যেন ভয় পেয়ে গেল। নখ কাটতে রাজি হল না। আমি জিজ্ঞেস করায় বলল... পরে বাড়িতে কেটে নেবে।'

—'আচ্ছা.. তোর বউ শ্রাদ্ধের বিধিনিয়মের কাজগুলো করছিল?' ফকির বাবার চোখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি ফুটে উঠল।

সন্তোষবাবু এবার একটু ইতস্তত করে বললেন...

—'না মানে ইয়ে... বলছিলাম কী বাবা, সেদিন দুপুরের পর ওর পিরিয়ড হয়ে গেছিল। তাই ও কোনো কাজে যোগদান করতে পারেনি।'

—'ওহ... বুঝলাম। তারপর বল, সেদিন রাতে কী যেন হয়েছিল বলছিলিস?'

সন্তোষবাবু আবার বলতে শুরু করলেন...

—'ওইদিন সন্ধ্যার পর থেকেই শ্রাবন্তীর হাবভাব ব্যবহারে কেমন যেন একটা অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করছিলাম আমি। তবে সেটা সারাক্ষণ নয়। মাঝেমধ্যে ও এমন কিছু করে ফেলছিল... যেটা কোনো সুস্থ মানুষ কখনোই করতে পারে না। এই যেমন... হঠাৎ করে একা ঘরে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠা, কিংবা আচমকা চিৎকার করে কাঁদা, একা একা নিজের মনে বকবক করা... এইসব আর কী! কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলছিল, মায়ের পুরোনো কথাগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে। তাই আমিও ওকে আর বেশি প্রশ্ন করছিলাম না। বুঝতেই পারছিলাম, মায়ের এইরকম মৃত্যুতে ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আছে।'

একটু থামলেন সন্তোষবাবু। তারপর অন্যমনস্কভাবে কিছু একটা চিন্তা করে নিয়ে বললেন...

—'সেইদিন শ্রাবন্তীর আরও একটা ব্যাপার কিন্তু আমাকে বেশ অবাক করেছিল। যদিও ব্যস্ততার মধ্যে থাকায়, বিষয়টাকে সেদিন আমি অতো গুরুত্ব দিইনি। তবে এখন কথাটা চিন্তা করতে গিয়ে সত্যিই আশ্চর্য হলাম আমি! যেই মেয়ের কিনা খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে এত প্রবল অনীহা ছিল, যাকে বকা দিয়ে না খাওয়ালে খেতে পর্যন্ত বসতে চাইতো না... সেই মেয়ে কিনা ওইদিন সারাদিনে দশ-বারো বার খাওয়ার খেতে বসেছিল!!! নিজের থেকেই একটু বাদে বারবার বলছিল...

—'খিদে পেয়েছে... খুউউউব খিদে...'

ফকির বাবা মৃদু হেসে বললেন...

—'ও কি তখন আর তোর বউ ছিল রে বেটা? ওর শরীরে তো তখন এক সর্বগ্রাসী অতৃপ্ত আত্মার বাস। দহনক্ষুধা তো ওর থাকবেই। যাক, ছাড় এইসব কথা। যা বলছিলি সেটা বল।'

সন্তোষবাবু দেওয়ালে টাঙানো ঘড়িটার দিকে একবার চোখ রাখলেন। রাত আটটা বেজে চল্লিশ মিনিট। এইবার ঘটনাগুলো তাড়াতাড়ি শেষ করে, এখান থেকে বেরোতে হবে। অনেকটাই রাত হয়ে গেল। ফিরতেও আবার বেশ কিছুটা সময়ও লাগবে এখান থেকে। উনি আবার বলতে শুরু করলেন...

—'পরেরদিন বাড়িতে শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠান। সকাল সকাল উঠতে হবে ঘুম থেকে। তাই সেদিন আমরা সবাই একটু তাড়াতাড়িই চলে গেছিলাম নিজেদের ঘরে। শ্রাবন্তী লাইট নিভিয়ে বিছানায় এসে বলল...

—'নাও, এবার তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো। কাল আবার ভোর হতে না হতেই কাজ শুরু হয়ে যাবে।' এই কথা বলেই ও পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল।

কিন্তু আমার চোখে কেন জানি ঘুম ধরছিল না সেদিন। বারবার একটাই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছিল মাথার মধ্যে। আগেরবার ঠাকুমার শ্রাদ্ধের দিন থেকেই তো শুরু হয়েছিল মায়ের মধ্যে অস্বাভাবিকতাটা, যেটা শেষ হল মায়ের মৃত্যুতে গিয়ে। কালও তো বাড়িতে আবার একটা শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠান। তাহলে কি কালও আবার নতুন কিছু শুরু হতে চলেছে? ঠাকুমা গেল, মা গেল... এবার তাহলে কে? আমি, বাবা, না শ্রাবন্তী? উত্তরটা যে এতো তাড়াতাড়ি পেয়ে যাব... সেই আশা আমি করিনি।

সেদিন রাতে এইসব আজেবাজে চিন্তা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। ঘুমটা ভাঙল মাঝরাতে। বাথরুমে যাব বলে উঠতে গিয়েই দেখলাম, বিছানায় শ্রাবন্তী নেই। দরজার দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম সেটা খোলা পড়ে আছে।

এত রাতে গেল কোথায় ও? আবার কিছু হল না তো? সেদিন রাতে ছাদের ঘটনাটা হওয়ার পর থেকেই, আমার মনে শ্রাবন্তীকে নিয়ে কেমন যেন একটা আতঙ্ক ঢুকে গেছিল। ওকে দেখতে না পেলেই মনে হয় আবার হয়তো ওর সাথে খারাপ কিছু ঘটেছে। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে এলাম ঘরের বাইরে। হলরুমে পা রাখতেই দেখলাম, সেটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে।

কিন্তু এটা কী করে সম্ভব? আমার পরিষ্কার মনে আছে আজ শোওয়ার আগে আমি নিজে হলরুমের লাইটটা জ্বালিয়ে শুয়েছিলাম। তাহলে সেটা নিভলো কীভাবে?

আচ্ছা... কেউ কি ইচ্ছা করে বন্ধ করে দিয়েছে? কিন্তু কেন? আর কেই বা করতে পারে এমন?

হঠাৎ ঠাকুরমশাইয়ের বলা কথাটা মনে পড়ল আমার... এই বাড়িতে এমন কিছু আছে, যেটা শুভ নয়। সাথে সাথেই গাটা কেমন যেন নিজের থেকেই শিরশির করে উঠল আমার। কোথা থেকে একটা অজানা হিমশীতল ভয় এসে সারা শরীরের রোমকূপগুলো একটা একটা করে খাড়া করে দিল। আমি তাড়াতাড়ি হলরুমের লাইটের সুইচে চাপ দিলাম। আলো জ্বলার পর মনের ভয়টা একটু কম হলেও, একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখে মুহূর্তের মধ্যে হতবাক হয়ে গেলাম আমি!

মায়ের শ্রাদ্ধের কাজের জন্য, আজই যাবতীয় উপকরণ কিনে এনে রেখেছিলাম সন্ধ্যাবেলায়। সেগুলো রাখা ছিল এই হলরুমেই। এখন দেখলাম সেগুলোকে কে যেন ছিঁড়েভিড়ে, ভেঙেচুরে তছনছ করেছে। সমস্ত জিনিসগুলোই ছড়িয়ে ছিটিয়ে নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে গোটা হলরুমে। মনে হল একটু আগেই যেন এখান দিয়ে কোনো ঝড় বয়ে গেছে। দেখেই মাথায় হাত পড়ল আমার। কাল সকালে ঠাকুরমশাই আসলেই এগুলোর দরকার পড়বে। তখন কী করব আমি???

মাথার ভিতর সবকিছুই কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গেল। চিন্তা করার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেললাম আমি। হঠাৎ আমার মনে পড়ল, আমি কিসের জন্য বাইরে এসেছিলাম.... শ্রাবন্তীকে খুঁজতে। তাই তো, গেল কোথায় মেয়েটা?

আমি এদিক সেদিক তাকিয়ে ওকে খোঁজার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোথাও দেখতে পেলাম না ওকে। আচমকা রান্নাঘরের থেকে একটা খচর মচর জাতীয় শব্দ আমার কানে এল। মনে হল, কেউ যেন কিছু চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে ওখানে! আমি তাড়াতাড়ি ছুটে গেলাম রান্না ঘরের দিকে। কিন্তু ওখানে পৌঁছেই যা দেখলাম, সেই ভয়াবহ দৃশ্য মুখে বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

আমি দেখলাম রান্নাঘরের মেঝের উপর দুই পা ছড়িয়ে বসে আছে শ্রাবন্তী। ওর পরনের পোশাক আলুথালু, মাথায় এলোমেলো জট পাকানো চুল, আর কপালে লেপ্টে রয়েছে লাল সিঁদুরের টিপ। ওর ঠিক সামনেই রাখা আছে চাল, কলা, তিল, মধু, ঘি, আরও বাকি সব উপকরণ দিয়ে বানানো বেশ কয়েকটা বড়ো বড়ো পিণ্ড। যেরকমটা শ্রাদ্ধের পিণ্ডদানের সময় বানানো হয়, অনেকটা ঠিক ওইরকম। আর শ্রাবন্তী তার থেকে একটা পিণ্ড মুখে ভরে আপনমনে চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে। ওর চোখেমুখে ছড়িয়ে আছে একটা পরিতৃপ্তির ছাপ।

হঠাৎ আমি এসে পড়ায়, আমাকে দেখে খিকখিক করে হেসে উঠে ও বলল...

—'খিদে পেয়েছে... খুউউউব খিদে...'

ওর এই অবস্থা দেখে ভয়ে, আতঙ্কে, আর মারাত্মক বিভীষিকায় আমার সর্বশরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। মনে হল সাক্ষাৎ এঁটোকুড়ি বসে আছে আমার চোখের সামনে, আর মাটি থেকে কুড়িয়ে কুড়িয়ে খাচ্ছে নিজের খাবার। আমি নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। চিৎকার বেরিয়ে এল আমার গলা থেকে...

—'শ্রাবন্তীইইইইইই...'

আমার চিৎকার শুনে হঠাৎ চমক ভাঙল ওর! দেখে মনে হল এতক্ষণে যেন নিজের হুঁশ ফিরে পেল শ্রাবন্তী। সেই সাথে আমিও লক্ষ্য করলাম একটা ধুসর ছায়ামূর্তি রান্নাঘরের দেওয়াল ঘেষে ধীরেধীরে বাইরে বেরিয়ে গেল। তার চুলটাও যে এলোমেলো আর জট পাকানো, সেটা ছায়া দেখেও স্পষ্ট বুঝতে পারলাম আমি।

মনে পড়ে গেল দুদিন আগে আমার সাথে ঘটা সেই ঘটনাটার কথা। এই ছায়ামূর্তিটাকেই তো সেদিন রাতে আমি আমার বাথরুমের দেওয়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম! আজ আবারও সেটাকে দেখলাম আমাদের রান্নাঘরে। তারমানে, যেই অশুভ জিনিসটার কথা গতকাল ঠাকুরমশাই আমায় বলছিলেন... সেটা আর কিছু না, এই ছায়ামূর্তিটাই! যে কিনা আমাদের বাড়ির সর্বত্র এখন বিচরণ করে বেড়াচ্ছে। আর সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার হল... আমি জানি এই ছায়ামূর্তিটা আসলে কে?

সে হল, এঁটোকুড়ি!!!!

সম্বিৎ ফিরে পেয়ে, ঘরের অবস্থা দেখে হতবাক হয়ে গেল শ্রাবন্তী। নিজের চোখকে নিজেই যেন বিশ্বাস করে উঠতে পারলো না।বিস্ময় জড়ানো গলায় আমায় জিজ্ঞেস করল...

—'আমি এখানে এলাম কী করে? আর এগুলোই বা কী?'

আমি ওর প্রশ্নের কী জবাব দেব, ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। যদি ওকে সত্যি কথা জানিয়ে দিই, তাহলে ও হয়তো ভয় পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়বে। যেটা আমি কোনোমতেই চাইছিলাম না। কিন্তু মিথ্যা কথাই বা কী বলব?

অনেক ভেবেচিন্তে শ্রাবন্তীকে জানালাম, ওর স্লিপ ওয়াকিং হয়েছিল আজ। অর্থাৎ কিনা ঘুমের ঘোরে হেঁটে এসেছে ও। তার সাথে এও জানালাম... চিন্তা করার কিছু নেই। এরকম অনেকের সাথেই হয়। ডক্টর কনসাল্ট করলেই ঠিক হয়ে যাবে সব।

জানি না সেই রাতে শ্রাবন্তী আমার কথা কতটা বিশ্বাস করেছিল? কিংবা, আদৌ করেছিল কিনা? তবে ওর চোখমুখ দেখে বেশ বুঝতে পারছিলাম, ভালোই ঘাবড়ে গেছে ও।'

দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা আয়েষা কতক্ষণ ধরে যে ওদের কথা শুনছিল, তা ফকির বাবা বা সন্তোষবাবু কেউই জানতেন না। এবার পর্দা সরিয়ে ভিতরে ঢুকে এসে ও বলল...

—'লোকে বলে আমার আব্বাকেও নাকি কোনো খারাপ আত্মা বেহুঁশ করে টেনে নিয়ে গেছিল ডোবার জলে। তখন খুব ছোটো ছিলাম আমি। এইসব কথা শুনে ভয় পেতাম। কিন্তু এখন আর ভয় পাইনা। কারণ আমার সাথে ফকির বাবা আছেন।'

এইবার আয়েষা ফকির বাবার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল...

—'নিজের আব্বাকে বাঁচাতে পারিনি। কিন্তু শ্রাবন্তী দিদির যেন কোনো ক্ষতি না হয় বাবা। এটা তোমার বেটির অনুরোধ তোমার কাছে।'

এক মুহূর্তের জন্য চোয়ালটা হঠাৎ শক্ত হয়ে উঠল ফকির বাবার। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত পায়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে লাগলেন উনি। কপালে চিন্তার ভাঁজ, দুই চোখের স্থির দৃষ্টিতে ক্ষুরধার চাহনি।

—'আচ্ছা, গতকাল শ্রাদ্ধের দিন তোদের কোনো অসুবিধা হয়নি? যেমন, ভাতসড়া দেওয়ার সময় কিম্বা রাতে... কিছু অঘটন ঘটে নি?' গম্ভীর গলায় প্রশ্নটা করলেন ফকির বাবা।

সন্তোষবাবু ফকির বাবার বজ্রকঠিন মুখটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বললেন...

—'না বাবা, কিছুই ঘটেনি। আসলে আপনার মতো আমিও ভেবেছিলাম কাল হয়তো কিছু হতে পারে শ্রাবন্তীর সাথে। তাই আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম শ্রাদ্ধ শান্তির কাজ মিটে গেলেই ওকে ওর মায়ের সাথে পাঠিয়ে দেব। কিন্তু কেন জানি অনেক বলার পরেও শ্রাবন্তী কাল যেতে রাজি হল না। তাই বাধ্য হয়েই ওর মা আর ভাইকে থেকে যেতে হল এখানে। গতরাতে শ্রাবন্তী ছেলেমেয়েগুলোকে নিয়ে ওর মায়ের সাথেই শুয়েছিল আমাদের ঘরে। আমি আর ওর ভাই ছিলাম হলরুমের সোফায়। সারারাত আমরা একরকম জেগেই কাটিয়ছিলাম প্রায়। তাই হয়তো কাল সেভাবে কিছু ঘটতে পারেনি।'

ফকির বাবা সেই একইভাবে পায়চারি করতে করতে গম্ভীর গলায় বললেন...

—'শুধুই কী তাই? আরও একবার ভালো করে ভেবে দ্যাখ তো বেটা... এছাড়া আর কোনো কারণ আছে কিনা?'

সন্তোষবাবু এবার বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন একমনে। তারপর হঠাৎ বললেন...

—'ও হ্যাঁ... মনে পড়েছে বাবা। কাল শ্রাদ্ধের কাজ মিটে যাওয়ার পর ঠাকুরমশাই একটা শান্তির জল দিয়েছিলেন আমায়। বলেছিলেন, সারা বাড়িতে আর সবার গায়ে ছিটিয়ে দিতে। এতে নাকি অশুভ শক্তিকে একটা দিনের জন্য বেঁধে ফেলা যায়। যদিও শ্রাবন্তীর পিরিয়ড চলছে বলে ও এটা নিতে চাইছিল না। কিন্তু তবুও ওকে আমি জোর করেই দিয়েছিলাম।'

ফকির বাবা এবার নিজের হাঁটা থামিয়ে পুনরায় ফিরে এসে বসলেন কাঠের চেয়ারটায়। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন...

—'দ্যাখ বেটা, জীবিত অবস্থায় এই এঁটোকুড়িকে একজন সাধারণ পাগলি মনে হলেও, মরার পর ও কিন্তু এখন ভয়ানক হিংস্র আর ধূর্ত আত্মায় পরিণত হয়েছে। তুই যদি প্রথম থেকে ওর কাজগুলো চিন্তা করে দেখিস, তাহলেই বুঝতে পারবি আমি কিছু ভুল বলছি না।

জীবদ্দশায় এঁটোকুড়ির মাত্র একটাই চাহিদা ছিল... তা হল খাদ্য। আর মৃত্যুর পর ওর সেই খিদের জ্বালা যেন আরও হাজারগুণ বৃদ্ধি পেল। তাই নিজের দহনক্ষুধা মেটানোর জন্য ওর আত্মা প্রথমে দখল নিল তোর ঠাকুমার শরীরের। কিন্তু একজন বয়স্ক মানুষের পক্ষে ওর সেই ভয়ংকর খিদে মেটানো বেশিদিন সম্ভব হল না। তাই উনি মারা গেলেন স্ট্রোক করে।

এরপর এঁটোকুড়ির আত্মা অধিকার করল তোর মায়ের শরীর। কিন্তু সেখানেও একটা বড়ো অসুবিধা দেখা দিল। তোর মা শুতো তোর বাবার সাথে, দোতলায়। আর সেই ঘরে থাকত বিড়াল। আগেই বলেছিলাম একটা আত্মার পক্ষে বিড়ালের সাথে একঘরে থাকা কখনোই সম্ভব নয়। তাই ও তোর মাকে টেনে নিয়ে এল একতলায়... তোর ঠাকুমার ঘরে। তোর মা যে সারাক্ষণ নিজেকে ঘরের ভিতর বন্দি করে রাখত, তারও কারণ ছিল তোদের সারা বাড়িতে বিড়ালের দৌরাত্ম।

সেইজন্য এঁটোকুড়ির আত্মা এরপর তোর মাকে দিয়ে বিড়াল মারতে শুরু করল। কিন্তু সেটা এমন ভাবে, যাতে বিড়ালের গায়ে স্পর্শ না করেও ওকে মারা যায়। মনে করে দেখ বেটা, তোদের তিনটে বিড়ালের কোনোটাকেই কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে কেউ মারেনি। সবই মারা হয়েছে দূর থেকে। কারণ সামনে দাঁড়িয়ে বিড়াল মারতে ও পারত না।'

এক মুহূর্তের জন্য চুপ করলেন ফকির বাবা। তারপর তীক্ষ্ন চোখে একবার আয়েষা আর একবার সন্তোষবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললেন...

—'শুধুই কি বিড়াল? ওই হিংস্র, কুটিল আত্মা ঘরের সব শুভ শক্তিকে শেষ করার জন্য তোদের বাড়ির সমস্ত ঠাকুরগুলোকেও তো নষ্ট করেছিল। ও চেয়েছিল ওর পথের সব বাঁধাকেই চিরতরে শেষ করে দিতে। মনে আছে, তুই যেদিন তোর মাকে ভাতসড়ার খাবার খেতে দেখেছিলি, ঠিক তার পরেরদিনই কিন্তু তোর সাথে রেললাইনের ওই ঘটনাটা ঘটেছিল। আবার একইভাবে যেদিনই তোর বউ আর তোর বাবা, তোর মায়ের আচরণের উপর সন্দেহ প্রকাশ করেছিল... তার পরপরই কিন্তু ওদের উপরেও দুর্যোগ নেমে এসেছিল। মনে করে দেখ।'

সন্তোষবাবু এবার যেন একটু একটু হিসাবটা মেলাতে পারছিলেন। ফকির বাবা বলে চললেন...

—'সবই তো বুঝতে পারছি। কিন্তু কয়েকটা ব্যাপারে খটকা এখনও থেকেই যাচ্ছে!'

—'কি কী বাবা?' কৌতুহলী গলায় জিজ্ঞেস করলেন সন্তোষবাবু।

—'এই যেমন ধর, পাড়ায় এতো বাড়ি থাকতে এঁটোকুড়ি কেন তোদের বাড়িটাকেই বেছে নিল?'

—'আমি তো আপনাকে আগেই বলেছি বাবা, ঠাকুমা এঁটোকুড়িকে খুব ভালোবাসতেন। আর শুধু ঠাকুমা নয়, মা, শ্রাবন্তী এরাও এঁটোকুড়িকে সবসময় ভালোবেসে খাবার খাওয়াতো। সেইজন্যেই হয়তো...'

সন্তোষবাবুর কথা শেষ হওয়ার আগেই ফকির বাবা গম্ভীর গলায় বললেন...

—'তাই যদি হয়, তাহলে এঁটোকুড়ির আত্মা তোর মা'কে জলে ডুবিয়ে মারতে গেল কেন? ওর খাবার তো ও পেয়েই যাচ্ছিল। অসুবিধা তো কোনো ছিল না।

আর যদি ধরে নিই, ওর পাগলামির কারণে ও এটা করেছে। তাহলে তোদের কেন ছেড়ে দিল? তোকে ট্রেনের তলায় ফেলে, আর তোর বাবাকে ঘরে গলা টিপে তো ও মারতেই পারত। সেই সুযোগও তো ওর এসেছিল। তোর বউয়ের বেলায় না হয় বিড়াল এসে যাওয়ায় পারেনি। কিন্তু তোদের বেলায় তো কোনো বাঁধা ছিলনা। তবে কেন মারল না?'

ফকির বাবার কপালে চিন্তার ভাঁজটা আবার স্পষ্ট হয়ে উঠল।

বাইরের আকাশটা এখনও লাল হয়ে থাকলেও, বৃষ্টিটা বন্ধ হয়েছে তাও বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেল। হঠাৎ একটা হালকা আলোর ঝলকানি দেখা গেল কাঠের জানালার ফাঁক দিয়ে, তার কিছুক্ষণ পরেই শোনা গেল মৃদু গুড়গুড় শব্দ। ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে রাত নটা বেজে দশ মিনিট।

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন ফকির বাবা। তারপর সন্তোষবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন...

—'তুই এবার বাড়ি যা বেটা। অনেক রাত হয়ে গেল। এরপর বৃষ্টিও নেমে যাবে। আমি কাল ভোরেই তোদের বাড়ি পৌঁছে যাব। আর হ্যাঁ... তোদের ওই ঠাকুরমশাইকেও ডেকে রাখিস। আরও একটা শ্রাদ্ধের কাজ করতে হবে।'

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েই আবার থমকে গেলেন সন্তোষবাবু।

—'শ্রাদ্ধ! আমাদের বাড়িতে আবার কার শ্রাদ্ধের কাজ করবেন বাবা?'

—'এঁটোকুড়ির। তবে তোদের বাড়িতে নয় রে বেটা। ও যেখানে রাতে ঘুমাতো, সেখানে।' মৃদু হাসলেন ফকির বাবা। তারপর আবার গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললেন...

—'তবে মনে রাখিস, আজ রাতটা কিন্তু খুব সাবধানে থাকতে হবে। তুই যে আমার কাছে এসেছিস, সেটা কিন্তু ও টের পেয়ে গেছে। তাই আজ রাতেই ও তোর সবথেকে বড়ো ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। আর সেটাকে যে করেই হোক তোকে আটকাতে হবে।'

ফকির বাবার কথা শুনে সন্তোষবাবুর মুখটা অন্ধকারের মতো কালো হয়ে এল। উনি যে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেছেন, তা ওনার চেহারা দেখেই বোঝা গেল। সেটা লক্ষ্য করে ফকির বাবা আয়েষার দিকে তাকিয়ে বললেন...

—'যা তো বেটি... ওগুলো নিয়ে আয় তো।'

আয়েষা পর্দা সরিয়ে ভিতরের ঘরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ও যখন ফিরে এল, তখন ওর হাতে খান দশেক তাবিজ। ফকির বাবা তার থেকে একটা সন্তোষবাবুর হাতে বেঁধে দিলেন। আর বাকিগুলো ওনার হাতে দিয়ে বললেন...

—'একটা কথা জেনে রাখ, কোনো মানুষের শরীরকে সম্পূর্ণ দখলে নিতে গেলে আত্মাদেরও কয়েকটা দিন সময় লেগে যায়। আর এই সময়ের মধ্যে ওকে যদি আটকানো যায়, তাহলে বিপদের সম্ভাবনাটা অনেক কম থাকে। কিন্তু তা যদি না হয়, আর আত্মা যদি কারও শরীরের সম্পূর্ণ দখল নিয়ে ফেলে... তাহলে মানুষটার থেকে সেই মৃত আত্মাকে পৃথক করা খুবই মুশকিল কাজ। সেক্ষেত্রে জীবন মৃত্যুর সমস্যা পর্যন্ত দেখা দিতে পারে।

তোর কথা শুনে আমার মনে হয়েছে, এঁটোকুড়ির আত্মা এখনও তোর বউকে সম্পুর্ণ নিজের দখলে করে উঠতে পারেনি। তাই বাড়ি ফিরে সবার আগে ওর হাতে এই তাবিজ বাঁধবি। আর যদি এটা করতে পেরেছিস, তাহলে ভাববি আজ রাতে তোদের আর কোনো বিপদের সম্ভাবনা থাকবে না।

নে... আর দেরি করিস না। এইবার তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়।'

ফকির বাবাকে প্রণাম জানিয়ে সন্তোষবাবু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। তারপর গাড়িতে উঠে সেটা স্টার্ট দিতেই যাবেন, এমন সময় ফকির বাবা ওনার হাতে একটা ছোট্ট চিরকুট দিয়ে বললেন।

—'এটা রেখে দে বেটা। আমার তো ফোন নেই, এতে আয়েষার নাম্বার লেখা আছে। আজ রাতে যাই হোক, আর যত রাতেই হোক, তুই আমাকে জানাস।'

সন্তোষবাবু দ্রুত গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে দিলেন বাড়ির দিকে। সেই দিকে তাকিয়ে ফকির বাবা মনে মনে বললেন....

—'হে উপরওয়ালা, ওদের এই বিপদ থেকে রক্ষা কোরো।'

গভীর রাত। গাঢ় ঘুমে তলিয়ে আছে সবাই। হঠাৎ একটা সুমধুর শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল আয়েষার। বালিশের পাশে রাখা মোবাইলটা বাজছে।

এত রাতে এখন আবার কার ফোন এল? একটু বিরক্ত হয়ে মোবাইলটা হাতে নিতেই আয়েষা দেখল স্ক্রিনের উপর একটা অচেনা নাম্বার। কলটা রিসিভ করতেই ফোনের ওপার থেকে শোনা গেল একটা উত্তেজিত চেনা কণ্ঠস্বর...

—'হ্যালো, আমি সন্তোষ বলছি... দয়া করে ফকির বাবাকে একবার ফোনটা দেবেন? খুউউব দরকার...'

আয়েষা আর একমুহূর্তও কাল বিলম্ব না করে ছুটে গেল ফকির বাবার কাছে।

—'হ্যাঁ বল বেটা... কী হয়েছে?'

ফকির বাবার গলাটা শোনামাত্রই চিৎকার করে কেঁদে ফেললেন সন্তোষবাবু।

—'বাবা, দয়া করে আমার বউটাকে বাঁচান আপনি... ওর কিছু হয়ে গেলে আমি যে আর থাকতে পারব না বাবা।'

আবার সেই কান্নার আওয়াজ ভেসে এল ফোনের ওপার থেকে। অতি কষ্টে বুঝিয়ে সুঝিয়ে সন্তোষবাবুকে কোনোমতে শান্ত করলেন ফকির বাবা। তারপর বললেন...

—'বল কী হয়েছে?'

সন্তোষবাবু এরপর পুরো ব্যাপারটা বলতে শুরু করলেন...

—'আপনার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যখন প্রায় অর্ধেক রাস্তা এসে গেছি, তখন হঠাৎ গাড়ির টায়ারটা লিক করে গেল। সেটাকে দোকান থেকে সারিয়ে, গাড়িতে আবার স্টার্ট দিতে দিতে সময় হয়ে গেল রাত প্রায় সোওয়া দশটা। ততোক্ষণে বাইরে তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। আমি সেই বৃষ্টি উপেক্ষা করেই গাড়ি চালাতে লাগলাম, যাতে তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছাতে পারি। আমার থেকে বাড়ির দূরত্ব যখন আর মিনিট দুয়েকের রাস্তা, ঠিক এমন সময় শাশুড়ি মা ফোন করল আমায়। বলল... শ্রাবন্তীকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা কোথাও।

বিশ্বাস করবেন না বাবা, কথাটা শোনামাত্রই মাথার ভিতরটা কেমন যেন শূন্য হয়ে গেল আমার। কয়েক মুহূর্তের জন্য চিন্তাভাবনা করার সমস্ত শক্তিই হারিয়ে ফেললাম আমি। তারপরেই হঠাৎ মনে পড়ল আপনার কথাটা। আপনি বলেছিলেন, আজ রাতে ও আমার সবচেয়ে বড়ো ক্ষতি করার চেষ্টা করবে, আর সেটা আমায় আটকাতেই হবে। আমি তাড়াতাড়ি গাড়ি চালিয়ে ফিরে এলাম বাড়িতে। এখানে এসে শুনলাম, শ্রাবন্তীর নাকি হঠাৎ খুব খিদে পেয়ে গেছিল। তাই ও, ওর ভাই, আর আমার বাবা তিনজনে একসাথে খেতে বসে পড়েছিল। খাওয়া শেষে শ্রাবন্তী অন্যদিনের মতোই বাথরুমে ঢুকেছিল হাত ধুতে। সেখানে মিনিট পাঁচেক সময় লেগেছিল ওর। এরপর ও যখন বাইরে এল তখন আমার শাশুড়ি মা রান্নাঘরে কিছু একটা কাজ করছিল। শ্রাবন্তী ওর মায়ের পিছনে দাঁড়িয়ে বলল...

—'খিদে পেয়েছে... খুউউউব খিদে... খেতে দে...'

কথাটা শুনেই অবাক হয়ে গেল ওর মা! যেই মেয়ে পাঁচ মিনিট আগেই পেট ভরে খাবার খেয়েছে, তার এত তাড়াতাড়ি খিদে পায় কী করে? তাছাড়া এটা কোন ধরনেরই বা ভাষা? নিজের মাকে তুইতোকারি করে কে কথা বলে? এরকম তো আগে কখনও করেনি ও। তাহলে আজ হঠাৎ কী হল?

সন্দেহবশত মেয়ের মুখের দিকে ঘুরে তাকাল ওর মা। আর তারপরেই চোখ দুটো যেন স্তম্ভিত হয়ে গেল।

একি!!! এটা কী অদ্ভুত চেহারা বানিয়েছে ও নিজের? দেখেই তো বুক কেঁপে উঠছে।

মাথার চুলগুলো সব উসকোখুসকো আর জট পাকানো। যেন বহুদিন তেল চিরুনি পড়েনি ওই চুলে। সিঁদুরের টিপটাও লেপ্টে রয়েছে সারা কপালে। তার উপর চোখের ওই স্থির দৃষ্টিটা... সেটাও তো যেন মরা মাছের মতো অস্বাভাবিক রকমের ফ্যাকাসে। উফফ... কী হিংস্র তার চাহনি! শুকনো ঠোঁটের কোণে লেগে রয়েছে পৈশাচিক এক হাসি।

নিজের মেয়ের এহেন বিকৃত রূপ দেখে ওর মায়ের বাকশক্তি যেন রুদ্ধ হয়ে গেল। কী বলবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। শুধু ভয়ার্ত চোখে চেয়ে রইল মেয়ের মুখের দিকে। শ্রাবন্তী আবারও চিৎকার করে বলল...

—'খেতে দিবি না? খেতে দে! বলছি না, খুব খিদে পেয়েছে... দে খেতে!''

ওর মা বুঝতে পারল, মেয়ের মধ্যে অস্বাভাবিকতা দেখা দিয়েছে। যেই অঘটনটা গতকাল ঘটবে বলে ভাবছিলাম আমরা, তা আজ ঘটতে শুরু করেছে। আমার শাশুড়ি মা কোনোমতে আমতাআমতা করে মেয়েকে জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করল... ও কেন এরকম করছে? কিন্তু তার উত্তরে শ্রাবন্তীর মুখে শুধু একটাই কথা...

—'খেতে দিবিনা তাহলে?? দিবিনা খেতে আমায়???''

আর পরক্ষনেই ও ঝাঁপিয়ে পড়ল নিজের মায়ের উপর। প্রবল আক্রোশে চেপে ধরলো মায়ের গলার টুটি। সেসময় হলরুমে বসেছিল শুভ, অর্থাৎ শ্রাবন্তীর ভাই। মায়ের চিৎকার শুনে রান্নাঘরে ছুটে এসে, এইরকম ভয়ংকর দৃশ্য দেখে ও হতবাক হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি দিদির হাত থেকে মাকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল ও। কিন্তু শ্রাবন্তীর শরীরে তখন যেন অন্য কোনো শক্তিই ভর করেছিল। শুভ একটা শক্তসমর্থ ছেলে হয়েও কিছুতেই যেন পেরে উঠছিল না নিজের দিদির শক্তির সাথে। ধস্তাধস্তি, ধাক্কাধাক্কি, টানাহ্যাঁচড়া চলতেই থাকল অনবরত। একটা সময় পর শ্রাবন্তী হঠাৎ নিজের মাকে ছেড়ে দিয়ে চেপে ধরল শুভকে। আর মারাত্মক ক্ষোভে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরল ওর বাঁহাতের কবজিতে। যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠল শুভ। আর সেই সুযোগেই শুভকে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে ঘর থেকে একছুটে বেরিয়ে গেল শ্রাবন্তী।

এতদূর শোনার পর মাথায় হাত দিয়ে ধপকরে বসে পড়লাম আমি। একে তো অন্ধকার রাত, তার উপর এই মুষলধারে বৃষ্টি। কোথায় খুঁজে পাবো শ্রাবন্তীকে? ওই হিংস্র এঁটোকুড়ি, এতক্ষণে ওকে কোথায় নিয়ে চলে গেছে কে জানে? শাশুড়ি মা জানালো, শুভ পাড়ার কিছু লোক নিয়ে খুঁজতে বেরিয়েছে শ্রাবন্তীকে। ওরা এলাকার সমস্ত অলিগলি, বড়ো রাস্তা, পুকুর পাড়, এমনকী পুকুরের জলেও টর্চ ফেলে খুঁজে দেখেছে। কিন্তু এখনও কোথাও এখনও খুঁজে পায়নি শ্রাবন্তীকে।

জানেন বাবা, নিজেকে তখন বড্ড অসহায় বলে মনে হচ্ছিল আমার। কী করব, কোথায় যাব, কাকে বলব শ্রাবন্তীকে খুঁজে এনে দিতে? কিচ্ছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বারবার মনে হচ্ছিল... আমি হেরে গেলাম, আর ওই শয়তান এঁটোকুড়ি জিতে গেল। পারলাম না নিজের বউটাকে আটকে রাখতে। ও সেই নিয়েই গেল ওকে। কেমন যেন একটা বিতৃষ্ণা, একটা ধিক্কার জেগে উঠছিল নিজের প্রতি নিজেরই।

আমি যখন এইভাবে মানসিক বিপর্যস্ত হয়ে সম্পুর্ণ ভেঙে পড়েছিলাম, ঠিক তখনই আপনার একটা কথা আমার মনে পড়ল। আর সাথে সাথেই একহাতে একটা টর্চ, আরেক হাতে আপনার দেওয়া তাবিজটা নিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই ভিজে ভিজে বেরিয়ে পড়লাম আমি।

বাইরে তখন অঝোর ধারার বৃষ্টিতে চারিদিক একেবারে জলে জলাকার। লাইটপোস্টের হলদেটে আলোয় কোনটা যে ড্রেন আর কোনটা যে খানাখন্দ... কিছু বোঝা যাচ্ছিল না। আমি সেই সবকিছুই উপেক্ষা করে এগিয়ে চললাম নিজের গন্তব্যের দিকে। বাড়ির থেকে জায়গাটার দূরত্ব, মিনিট দুয়েকের হাঁটাপথ মাত্র। তবে এই জলবৃষ্টির কারনে আমার সময় আরেকটু বেশি লাগল। আমি যখন সেখানে পৌঁছালাম, তখন জায়গাটার অবস্থা দেখেই গাটা কেমন ঘিনঘিন করে উঠল আমার। একটা নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে হাজারো আবর্জনা। ছেঁড়াফাটা পুরোনো শাড়ি, ময়লা কম্বল, পচা ন্যাকড়া, শুকিয়ে যাওয়া শাল পাতার থালা, খবরের কাগজের টুকরো, প্লাস্টিকের প্যাকেট, ঠোঙা... আরও কত কী! আর সেইসবের মধ্যেই একটা নোংরা পুঁটুলি মাথায় দিয়ে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে রয়েছে একজন মহিলা!

আপনি বলেছিলেন, শ্রাদ্ধের কাজটা সেখানেই করবেন, যেখানে এঁটোকুড়ি রাতে ঘুমাতো। আমিও জগাইদের সেই বহুকাল আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া দোকানটার টিনের শেডের নীচেই খুঁজে পেলাম শ্রাবন্তীকে। ওর মুখে টর্চের আলো ফেলতেই বুঝতে পারলাম ও ঘুমোচ্ছে। কিন্তু মাথার পুঁটুলিটা দেখেই বুকের ভিতরটা ধড়াস করে উঠল আমার! এটা তো এঁটোকুড়ির। ও আগে এটাই সঙ্গে করে ঘুরে বেড়াত সারাক্ষণ।

কেন জানি বেশ ভয় ভয় করতে লাগল আমার। মনে হল শরীরটা যেন আচমকা ভারী হয়ে গিয়ে, হৃৎস্পন্দনের গতিবেগ অনেক বেড়ে গেল। তার সাথে হালকা শীত শীতও অনুভব হতে লাগল। এক মুহূর্তের জন্য বুঝে উঠতে পারলাম না, ওর দিকে এগোনো ঠিক হবে কি হবেনা? তার পরক্ষনেই আবার মনে হল, ভয় তো লাগবেই। কিন্তু শ্রাবন্তীকে বাঁচাতে গেলে সেই ভয়কে উপেক্ষা করতেই হবে। আমি ধীরেধীরে ওর সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলাম। ও তখনও সেই একইভাবে চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে। আমি এবার টর্চটাকে মাটিতে রেখে, ওর হাতে আপনার দেওয়া তাবিজটা বাঁধতে গেলাম। আর এটা করার জন্য যেই ওর ডানহাতটা আমি নিজের হাত দিয়ে স্পর্শ করেছি, অমনি হঠাৎ চোখ খুলে ফেলল শ্রাবন্তী। ওর ঠোঁটের ফাঁকে খেলে গেল একটা ভয়ংকর বিকৃত হাসি। আর এর থেকে বেশি কিছু দেখতে পাওয়ার আগেই, মুহূর্তের মধ্যে আমার মাথায় সজোরে টর্চ দিয়ে আঘাত করলো ও। চোখের সামনেটা যেন অন্ধকার হয়ে গেল আমার। আমি বেসামাল হয়ে পড়ে গেলাম মাটিতে। আর সেই সুযোগে খিলখিল করে হেসে উঠে ওখান থেকে ছুটে পালাল শ্রাবন্তী।

মিনিট খানেক ওইভাবেই পড়ে ছিলাম মাটির মধ্যে। যন্ত্রণায় টনটন করছিল মাথাটা। বুঝতে পারছিলাম, রক্ত বেরোচ্ছে। কিন্তু এসব নিয়ে ভাবার সময় এখন আমার নেই। আমাকে যে করেই হোক শ্রাবন্তীর হাতে তাবিজটা বাঁধতেই হবে। মনকে শক্ত করে পুনরায় উঠে দাঁড়ালাম আমি।

কিন্তু শ্রাবন্তী কই? আবার কোথায় চলে গেল ও?

দুশ্চিন্তায় মাথাটা কেমন যেন পাগল পাগল লাগল আমার। কী করব কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না। একে তো অন্ধকার রাত, তার উপর এই প্রচণ্ড বৃষ্টি। তারমধ্যে আজকে আবার এখানকার লাইট পোস্টের আলোটাও জ্বলছে না। এরমধ্যে এখন আমি কোথায় খুঁজবো ওকে? কোন দিকে গেল তাও তো দেখিনি।

আমি চারিদিকে তাকাতে তাকাতে ওর নাম ধরে চিৎকার করে ডাকতে লাগলাম...

—'শ্রাবন্তী... শ্রাবন্তী...'

কোনো উত্তর এল না। আমি আরও একবার ভালো করে সব জায়গাগুলো খুঁজে দেখতে লাগলাম। জগাইদের দোকানের পিছন দিকটা, টগরফুল গাছের তলাটা, অন্ধকার লাইট পোস্টের আড়ালটায়, এমনকী ছোটো ছোটো ঝোপঝাড় গুলোর মধ্যেও উঁকি দিয়ে দেখলাম আমি। কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলাম না ওকে। উত্তেজিত গলায় আমি আবার চিৎকার করে বললাম...

—'শ্রাবন্তী... কোথায় তুমি?'

কিন্তু এবারও আমার প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না কেউ। শুধু একটানা বৃষ্টির ঝমঝম শব্দটা হয়েই চলল। আমার থেকে সামান্য দূরেই দেখা যাচ্ছে ফাঁকা রেললাইনটা। সেদিকটাতেও বেশ কয়েকবার ভালো করে তাকিয়ে নিলাম আমি। কিন্তু না... বিশেষ কোনো লাভ হলোনা। ওখানে যে কেউ নেই, সেটা এই অন্ধকারের মধ্যেও আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম।

এইটুকু সময়ের মধ্যে গেল কোথায় মেয়েটা? মাথায় যেন দুশ্চিন্তার আকাশ ভেঙে পড়ল আমার। নিজেকে খুব একা, খুব অসহায় বোধ হতে লাগল। ঠিক এমন সময় বৃষ্টির আওয়াজ ছাপিয়ে, খুব দূর থেকে একটা মৃদু শব্দ কানে এল আমার। ট্রেন আসছে। এটা তার বাঁশির শব্দ। আর পরক্ষণেই একটা হলদে আলোর রশ্মি দেখা গেল রেললাইনটার উপর। সেইদিকে চোখ পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে আমার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন জল হয়ে গেল!

অন্ধকারের মধ্যে তখন ভালো করে দেখে উঠতে পারিনি, কিন্তু এখন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি... দুটো রেললাইনের মাঝে থাকা কংক্রিটের পাটাতনগুলোর উপর টানটান হয়ে শুয়ে আছে শ্রাবন্তী! ওর চোখ বন্ধ, শরীর নিস্তেজ। সামান্য নড়াচড়াটুকুও করছে না ও।

আমার বুঝতে অসুবিধা হল না, ওই শয়তান এঁটোকুড়ির আত্মা শ্রাবন্তীকে দিয়ে কী করাতে চাইছে। আসলে, নিজের জীবনের অন্তিম পরিণতিটাই ও লিখে দিতে চাইছে শ্রাবন্তীর জীবনেও।

কিছুক্ষণের জন্য আমার হৃৎস্পন্দন যেন বন্ধ হয়ে এল। মনে হল, আমার দেহ কোনো অসাড় জড় পদার্থে পরিণত হয়েছে। তার পরেই আবার মনে হল... এইসব ভেবে সময় নষ্ট করার মতো সময় এখন আমার হাতে নেই। আমাকে যে করেই হোক শ্রাবন্তীকে বাঁচাতেই হবে। আমি উদভ্রান্তের মতো ছুটে গেলাম ওর দিকে। তারপর দুই লাইনের মাঝে দাঁড়িয়ে, ঝুঁকে পড়ে ওকে তোলার চেষ্টা করলাম ওখান থেকে। কিন্তু ঠিক তখনই এমন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল, যা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল।

আমি যখন শ্রাবন্তীকে দুইহাতে পাঁজাকোলা করে তোলার চেষ্টা করছি ওখান থেকে, ঠিক ওইসময়তেই শ্রাবন্তী হঠাৎ আমার একটা পা শক্ত করে চেপে ধরল নিজের হাত দিয়ে। আর অপর হাত দিয়ে চেপে ধরল রেললাইনের লোহার পাতটাকে। তার ফলে না তো আমি ওকে তুলতে পারলাম, না নিজে নড়াচড়া করতে পারলাম সেখান থেকে। দুজনেই আটকা পড়ে রইলাম লাইনের উপর। মুহুর্মুহু কাছে এগিয়ে আসতে লাগল ট্রেনের বাঁশির শব্দ। তারসাথে বাড়তে থাকল হলদে আলোর তীব্রতা। তবে সেইদিকে তাকানোর ক্ষমতা আমার ছিল না। কারন জানতাম, সেইদিকে তাকালে আমি আর নিজের কাজে অবিচল থাকতে পারব না। লোহার পাতের কম্পন ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকলো। বুঝতে পারলাম ট্রেন আরও সামনে এগিয়ে এসেছে। ততোক্ষণে শ্রাবন্তীর চোখেও ফুটে উঠেছে এক হিংস্র দৃষ্টি... ঠোঁটের ফাঁকে লেগে আছে সেই বিকৃত হাসি।

এরপর হঠাৎ যে আমার কি হল, আমি নিজেও জানিনা। আপনার দেওয়া তাবিজটা, যেটা আমার হাতেই ছিল তখন, আচমকা পেঁচিয়ে ধরলাম ওর ডানহাতের বাহুতে... আর সাথে সাথেই অনুভব করলাম ওর শরীর যেন শিথিল হয়ে এল। কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ল ও।'

একটু থামলেন সন্তোষবাবু। তারপর ধীরে ধীরে শান্ত গলায় আবার বলতে শুরু করলেন...

—'আজ রাতে ওখান থেকে কি করে যে এরপর শ্রাবন্তীকে ফিরিয়ে এনেছি, তা আমায় এখন জিজ্ঞেস করলে আমিও বলতে পারবো না। শুধু এইটুকু জানি, এঁটোকুড়ির আত্মা নিজের পছন্দের মানুষগুলোকে একে একে নিজের কাছে টেনে নিয়ে যাওয়ার যেই চেষ্টাটা করছিল... শ্রাবন্তীকে বাঁচিয়ে নেওয়ার ফলে, তা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।'

এরপরেই সন্তোষবাবু গলার স্বরে আবার উদ্বেগ প্রকাশ পেল...

—'আমি জানি বাবা, ও আবার চেষ্টা করবে। শ্রাবন্তীকে না নিয়ে যাওয়া অবধি ওর শান্তি নেই। আপনি আমার বউটাকে বাঁচান। নইলে যে আমার ছোটো ছোটো বাচ্চাগুলো এই বয়সেই মাতৃহারা হবে। কিছু করুন বাবা... দয়া করে কিছু করুন।'

—'হুমমম..' একটা গভীর নিশ্বাস বেরিয়ে এল ফকির বাবার গলা থেকে। তারপর গম্ভীর গলায় উনি বললেন...

—'শান্ত হ বেটা... তোর বউয়ের কিছুই হবে না। তাবিজ যখন তুই ওর হাতে পরিয়ে দিয়েছিস, তখন এই ফকির তোকে কথা দিচ্ছে, আজ রাতে ওর আর কোনো ভয় নেই। তোরা সবাই এখন নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাতে পারিস। আর হ্যাঁ... কাল সকালে আমি আসছি তোদের বাড়িতে। একটা প্রশ্নের উত্তর জানা এখনও বাকি রয়ে গেছে আমার! সেটা না জানতে পারলে যে আমার মনেও শান্তি নেই বেটা।'

পুবের আকাশ ফরসা হয়ে কিছুক্ষণ আগেই দিনের আলো ফুটেছে। গতকাল সারারাত একটানা বৃষ্টি হওয়ার পর এখন সেটাও আর নেই। তার বদলে মেঘ কেটে গিয়ে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে একচিলতে রোদ্দুর। ঘড়িতে সময়, সকাল সাতটা বেজে কুড়ি মিনিট। ভটভট শব্দ করতে করতে একটা মোটর বাইক এসে থামলো সন্তোষবাবুদের গেটের সামনে। গাড়ির চালক অচেনা একজন ব্যক্তি। বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। লম্বা, চওড়া, দোহারা শরীর। গাড়িটা থামতেই পিছনের সিট থেকে ধীরেধীরে নেমে এলেন ফকির বাবা।

সন্তোষবাবু ওনাকে দেখতে পেয়েই তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে বললেন...

—'আসুন বাবা আসুন... রাস্তায় কোনো অসুবিধা হয়নি তো?'

ফকির বাবা এই প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়েই সন্তোষবাবুদের গোটা বাড়িটা ভালো করে চোখ ঘুরিয়ে দেখতে থাকলেন। তারপর বললেন...

—'তোর বউ এখন কেমন আছে? রাতে আর কোনো অসুবিধা হয়নি তো?'

—'না বাবা... আর কোনো অসুবিধা হয়নি। ও এখনও ঘুমাচ্ছে।'

—'বেশ বেশ... চল ভিতরে যাওয়া যাক।' বলেই গটগট করে বাড়ির ভিতর দিকে এগিয়ে গেলেন ফকির বাবা। পিছু পিছু চললেন সন্তোষ বাবু... এবং সব শেষে অচেনা লোকটি। ভিতরে ঢুকেই ফকির বাবা ঘরের চারিদিকে নাক টেনে টেনে কিসের যেন একটা গন্ধ শুঁকতে লাগলেন। তারপর গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন...

—'গন্ধ... গন্ধ... গন্ধ... ঘরের সর্বত্র পাচ্ছি ওই গন্ধটা! নিশ্চয়ই কিছু একটা তো আছে এই বাড়িতে, নইলে এতো গন্ধ হতে পারে না।'

—'কী থাকার কথা বলছেন বাবা?' কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করলেন সন্তোষবাবু।

ফকির বাবা ওনার মুখের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন...

—'সে না হয় পরে বলছিখন, তার আগে বল... তোদের ঠাকুরমশাই কখন আসবে?'

—'এই তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে যাবেন উনি। ফোন করেছিলাম একটু আগেই।'

—'বেশ... তাহলে একবার আয়। তোর বউয়ের সাথে কথা বলতে হবে একটু।'

এরপর এগোতে গিয়েই হঠাৎ করে থমকে দাঁড়ালেন ফকির বাবা। তারপর সেই অচেনা লোকটিকে দেখিয়ে বললেন...

—'আরে বেটা এ হল জাহির। আয়েষার স্বামী। বড় ভালো ছেলে। দেখনা, কাল সারারাত নাইট ডিউটি করেও আজ সকালে আবার আমাকে নিয়ে এসেছে এখানে। কতো বারণ করলাম, শুনলোই না।'

সন্তোষবাবু জাহিরের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। জাহিরও সামান্য লজ্জা পেয়ে হাসি মুখে বলল...

—'বাবা সবসময় এরকমই বলতে থাকেন। আসলে বাবা জানেনই না যে ওনার কোনো কাজে আসতে পারলে আমরা কত খুশি হই।'

সন্তোষবাবুর সাথে ফকির বাবা যখন শ্রাবন্তীর ঘরে ঢুকলেন, ও তখন ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে আছে। পাশে বসে আছেন ওর মা শর্মিলা দেবী। শুভ তখন বাড়িতে ছিল না। পাড়ার একজনকে সঙ্গে করে শ্রাদ্ধের জিনিসপত্র জোগাড় করতে বেরিয়েছিল ও।

ফকির বাবা কোনোরকম ভণিতা না করে সরাসরি শ্রাবন্তীকে একটা প্রশ্ন করলেন...

—'দেখ বেটি... আমি জানি তোদের বাড়িতে যা হচ্ছে, সেটা খুব খারাপ হচ্ছে। কিন্তু একে আটকাতে গেলে আমারও যে একটা প্রশ্নের সঠিক উত্তর চাই। কারন সত্যিটা না জানতে পারলে আমার পক্ষেও যে ওকে আটকানো সম্ভব হবে না।'

শ্রাবন্তী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ফকির বাবার দিকে। ফকির বাবাও একদম স্থির দৃষ্টিতে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন...

—'পাড়ায় এতগুলো বাড়ি, এতগুলো মানুষ থাকতে, ও শুধু তোদের সাথেই কেন এমন করল বেটি? আমি জানি এর উত্তর তোর কাছে আছে।'

সন্তোষবাবু হঠাৎ বলার চেষ্টা করলেন...

—'আমি তো আপনাকে আগেই বলেছি বাবা। পাড়ার অন্যসব বাড়ির থেকে, আমাদের বাড়ির এই তিনটে মানুষই এঁটোকুড়িকে সবচেয়ে বেশি.......'

ফকির বাবার হাতের ইশারায় সন্তোষবাবুকে তার কথা মাঝপথেই থামাতে হল। এরপর ফকির বাবা আবার শ্রাবন্তীর দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন...

—'চুপ থাকিস না বেটি... আমি জানি ও এগুলো তোদের প্রতি কোনো ভালোবাসার আকর্ষণে করছে না। বরং ওর মারাত্মক প্রতিহিংসা ওকে দিয়ে এইসব করাচ্ছে। এখনও সময় আছে... বলে দে বেটি। নইলে এরপর যে আমারও আর করার কিছু থাকবে না।'

শ্রাবন্তী কোনো কথা না বলে চুপ করে মাথা নিচু করে বসে রইল। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটা। চোখেমুখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে একটা উদ্বেগের চিহ্ন। পাশে বসে থাকা শর্মিলা দেবী ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন...

—'বলে দে মা। যদি কিছু জানিস, বলে দে। নইলে তো বিপদ এরপর আরও বাড়বে। নিজের কথা না ভাবিস... বাচ্চাদুটোর কথা তো ভাববি একবার।'

শ্রাবন্তী এবার মনে মনে কি যেন একটু চিন্তা করল। তারপর মাথা নিচু করেই ধীরেধীরে বলতে শুরু করল...

—'এটা একদম সত্যি কথা যে পাড়ার অন্যসব বাড়িগুলোর তুলনায়, আমরাই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতাম এঁটোকুড়িকে। তা ওর সারাদিনের খাবার-দাবারই হোক, কিম্বা শীতকালে গায়ে দেওয়ার চাদর কম্বল, তার বেশিরভাগটাই দেওয়া হত আমাদের বাড়ি থেকে। আর এটা হয়তো এঁটোকুড়িও খুব ভালো করে বুঝতে পারত, যে আমাদের বাড়ির লোকজনেরা ওর খেয়ালটা বেশি রাখে। তাই ওর খিদে পেলেই বা অন্য কোনো দরকারে, ও সারাক্ষণ আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েই ঘুরঘুর করতে থাকত। এতে অবশ্য আমরা কেউই কোনোদিন ওর উপর বিরক্ত হইনি। বরং ও যদি সময়মতো বাড়ির সামনে না আসতো, তাহলেই বেশ চিন্তায় পড়ে যেতাম আমরা। ঠাম্মী তো রীতিমতো ঘ্যানঘ্যান শুরু করে দিত।

কি জানি কি হল? আসছে না কেন মেয়েটা? শরীর-টরির খারাপ করেনি তো আবার? কেউ দেখারও নেই। এইসব একা একাই বকবক করতে থাকত। মা আর আমি এরকম না করলেও, চিন্তাটা আমাদের মাথাতেও থাকত। যতক্ষণ না ও আমাদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে, কিংবা বলছে... 'খেতে দে... খুউউব খিদে পেয়েছে।'

যাই হোক, এইভাবেই সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল। কোথাও কোনো অসুবিধা ছিল না আমাদের। কিন্তু অসুবিধাটা শুরু হল মাস দুয়েক আগে, একটা দিন দুপুরবেলায়। সেদিন কেন জানি এঁটোকুড়ির খাওয়ার সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও, ও আসছিল না খেতে। ঠাম্মী প্রতিদিনকার অভ্যাস মতো নিজের খাওয়ার পর, ওর জন্য খাবার বেড়ে অপেক্ষা করছিল। যখন অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল, তাও ও এল না, তখন ঠাম্মীর মনে কেমন যেন একটা সন্দেহ হল। ঠাম্মী কাউকে কিছু না বলেই, এঁটোকুড়ির খাবারটা সঙ্গে নিয়ে একাএকাই বেরিয়ে গেল বাড়ির থেকে। এরপর পৌঁছে গেল জগাইদের বন্ধ দোকানটার সামনে। সেখানে তখন এঁটোকুড়ি চুপচাপ শুয়েছিল। দেখেই মনে হচ্ছিল শরীরটা ঠিক নেই ওর। ঠাম্মী ওর সামনে খাবারের প্লাস্টিকটা এগিয়ে ধরতেই, তাড়াতাড়ি উঠে বসল ও। তারপর সব খাবারগুলোকে মাটিতে ঢেলে, গোগ্রাসে খেতে শুরু করল।

এরপর ঠাম্মী ফিরে আসছিল নিজের বাড়ির দিকে, কিন্তু হঠাৎ একটা মিষ্টি আদুরে ডাক শুনে পা দুটো থমকে গেল ওর।

'মিঁয়াওওওওও'

ঠাম্মী ঘুরে তাকিয়ে দেখল, দুধ সাদা রঙের খুব সুন্দর ছোট্ট একটা বিড়ালের বাচ্চা গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে এঁটোকুড়ির খাবারের দিকে। হয়তো নিজের মায়ের থেকে হারিয়ে গেছিল ওটা। আর খিদের জ্বালায় মাছের গন্ধ পেয়ে খেতে এসেছিল ওখানে। সে যাই হোক, বিড়ালের বাচ্চাটাকে দেখে ঠাম্মীর খুব পছন্দ হয়ে গেল। মনে মনে ভাবল ওটাকে বাড়িতে এনে পুষবে। ততক্ষণে বিড়ালের বাচ্চাটাও গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে চলে এসেছে এঁটোকুড়ির খাবারের একদম সামনে। ওটা যেই মুহূর্তে এঁটোকুড়ির মাটিতে পড়ে থাকা মাছটার মধ্যে মুখ দিতে যাবে, ঠিক সেইসময় একটা হাত এসে খপাৎ করে চেপে ধরল ওকে। ঠাম্মী চমকে উঠে দেখল... এঁটোকুড়ি এক হাতে মাটির সাথে চেপে ধরেছে বিড়ালের বাচ্চাটাকে, আর অন্য হাতে তুলে নিয়েছে একটা থান ইট। ওর চোখেমুখে ফুটে উঠেছে ভয়ংকর রকমের হিংস্রতা। বুকটা কেঁপে উঠল ঠাম্মীর! কি করতে চলেছে ও? ঠাম্মী চিৎকার করে বলল...

- ''এঁটোকুড়ি, কিছু করিস না বিড়ালটাকে... ছাড় বলছি ওকে।'

এইবার এক মুহুর্তের জন্য থামল এঁটোকুড়ি। তারপর ধীরেধীরে ঘুরে তাকালো ঠাম্মীর মুখের দিকে। ওর চোখে তখনও সেই একইরকমের হিংস্রতা লেগে আছে। কিছুক্ষণ ওইভাবেই তাকিয়ে রইল ও। আর তারপরেই ওর ঠোঁটের ফাঁকে খেলে গেল একটা পৈশাচিক হাসি। সাথে সাথে থান ইটটাও সজোরে নেমে এল মাটির দিকে। ঠাম্মী দেখল ওর চোখের সামনেই একটা দুধ সাদা বিড়ালের বাচ্চা, মুহূর্তের মধ্যেই রক্ত মাংসের ড্যালায় পরিণত হয়ে গেল।'

শ্রাবন্তী নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য এবার একটু থামল। দেখেই মনে হল, একটানা কথা বলতে ওর যেন কষ্ট হচ্ছে। ফকির বাবা গম্ভীর গলায় বললেন...

—'তারপর কি হল?'

শ্রাবন্তী নিজের ক্লান্ত চোখ দিয়ে ফকির বাবার মুখটার দিকে একবার তাকাল। তারপর ধীরেধীরে আবার বলতে শুরু করল...

—'এই ঘটনাটা জানার পর, আমরা কেউই আর এঁটোকুড়িকে সহ্য করতে পারতাম না। ওকে দেখলেই আমাদের মাথা যেন গরম হয়ে যেত। বিশেষ করে মা আর ঠাম্মী তো ওর নাম পর্যন্ত শুনলে রেগে যেত। এরপর আমাদের বাড়ি থেকে ওকে খাবার দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। যদিও বাবা বা সন্তোষ এই ব্যাপারে কিছুই জানত না। তবে এঁটোকুড়ি রোজই আসত আমাদের বাড়ির সামনে। খাবার চাইত। কিন্তু আমরা দিতাম না। উলটে ওকে বকা দিয়ে, ভয় দেখিয়ে, কিংবা গায়ে ঠান্ডা জল ছিঁটিয়ে... তাড়ানোর চেষ্টা করতাম। প্রথম প্রথম ও চলেও যেত। কিন্তু পরের দিকে ওরও যেন জেদ বাড়তে শুরু হল। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকত গেটের সামনে। আর চিৎকার করে বলে যেত...

—'খেতে দে... খুব খিদে পেয়েছে।'

একদিন তো ঠাম্মী অসহ্য হয়ে ওকে লাঠি দিয়ে বেশ কয়েক ঘা দিয়েও দিয়েছিল। আর তাতে ফলও হয়েছিল ভালো। দিন দুয়েক এঁটোকুড়ি আর আমাদের বাড়ির সামনে আসেনি। কিন্তু তৃতীয় দিন আবার যেই কে সেই অবস্থা। সেইদিনও অবশ্য ঠাম্মী লাঠি নিয়ে বেরিয়েছিল ওকে মারার জন্য। কিন্তু ওর চোখমুখের হিংস্রতা দেখে, আর সামনে যাওয়ার সাহস করেনি। ও গেটের সামনে দাঁড়িয়ে, অনবরত খাবার চেয়েই যাচ্ছিল। দেওয়া হচ্ছিল না দেখে চিৎকারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। এরপর একটা সময় বাধ্য হয়ে মা বেরিয়ে এসেছিল ঘর থেকে। তারপর বেশ কয়েকটা ঢিল ছুঁড়ে ওকে সেদিন তাড়িয়েছিল মা। আসলে আমাদের বাড়িতে মা যেহেতু বিড়াল ভালোবাসতো, তাই মায়ের রাগটাই সব থেকে বেশি ছিল এঁটোকুড়ির উপর।

যাই হোক, এরপর এই ব্যাপারটা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমাদের কাছে। এঁটোকুড়িকে দেখতে পেলেই কখনও মা, কখনও ঠাম্মী, আবার কখনও বা আমি... ওকে ঢিল ছুঁড়ে তাড়াতে শুরু করলাম। এইভাবেই কেটে গেল সপ্তাহ দুয়েক সময়। এরমধ্যে এঁটোকুড়িও আমাদের বাড়ির সামনে আসা, অনেকটাই কমিয়ে দিল।

এরপর একদিন দুপুরের ঘটনা। আমি সেদিন আবার আমার বাপের বাড়িতে গেছিলাম। মা-ও যেন কোথায় একটু বেড়িয়েছিল। বাড়িতে সেসময় মানুষ বলতে শুধু ঠাম্মী একাই ছিল। হঠাৎ গেটের সামনে থেকে আওয়াজ এল... 'খেতে দে... খুউউব খিদে পেয়েছে।'

ঠাম্মী বুঝতে পারল এঁটোকুড়ি এসেছে। তাই কোনো জবাব না দিয়ে, চুপচাপ বসে রইল নিজের ঘরে। ধীরেধীরে সেই আওয়াজ বাড়তে থাকল। আর ক্রমশ সেটা চিৎকারে পরিণত হল। একটা সময় বিরক্ত হয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল ঠাম্মী। আর একটা ঢিল তুলে ছুঁড়ে মারল ওকে। কিন্তু সেদিন ওর কি হয়েছিল কে জানে? ঠাম্মীর এই ব্যবহারে ওর পাগলামি যেন আরও বেড়ে গেল। ও বাইরের গেট ধরে জোরে জোরে ঝাঁকাতে থাকল, আর তারসাথে চিৎকার করে চলল।

এইবার ঠাম্মীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। এঁটোকুড়িকে শাস্তি দেওয়ার জন্য একটা মোক্ষম পরিকল্পনা করল ঠাম্মী। সেইমতো ঘর থেকে একবাটি ফুটন্ত জল নিয়ে এগিয়ে গেল গেটের দিকে। এঁটোকুড়ি ভাবলো, ঠাম্মী হয়তো ওর জন্য বাটিতে করে খাবার নিয়ে আসছে। তাই শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ওর কাছে যাওয়ামাত্রই, বাটি ভর্তি গরম জলটা ওর দিকে ছুঁড়ে দিল ঠাম্মী। আর পরক্ষনেই ব্যথায় যন্ত্রণায় দাপাতে দাপাতে সেখান থেকে ছুটে পালিয়ে গেল এঁটোকুড়ি।

এরপর ও আর কোনোদিন আসেনি আমাদের বাড়িতে। হয়তো সেই সময়টাও আর পায়নি ও। কারণ এই ঘটনার দুদিন বাদেই ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছিল এঁটোকুড়ি।'

ঘরে থমথমে নীরবতা। কারও মুখেই কোনো কথা নেই। শ্রাবন্তীর কাছ থেকে ঘটনাটা শোনার পর কী প্রতিক্রিয়া দেওয়া উচিত, কেউ যেন কিছু বুঝে উঠতে পারছে না।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ফকির বাবা। তারপর ঘরের নৈঃশব্দ্যতা ভেঙে বললেন...

—'এরপরের ঘটনাটা আমি যেন একটু আন্দাজ করতে পারছি। মানে, এঁটোকুড়ি কি ভাবে মারা গেল... আমি সেই ব্যাপারটার কথা বলছি।'

ওখানে উপস্থিত সকলেই বিস্মিত চোখে ঘুরে তাকাল ফকির বাবার দিকে! সন্তোষ বাবুর বাবা বললেন...

—'আপনি জানেন কী করে মারা গেছিল এঁটোকুড়ি?'

—'সঠিক জানি কিনা জানিনা... তবে ধারণা করতে পারি।' ফকির বাবার ঠোঁটে মৃদু হাসির ঝলক।

—'কী করে শুনি...'

ফকির বাবা এবার সন্তোষ বাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন...

—'মনে আছে বেটা তুই বলেছিলি... এঁটোকুড়ি যেদিন মারা যায়, তার আগের রাতে খুব বৃষ্টি হয়েছিল।' সন্তোষবাবু ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানান।

—'আমার মনে হয় ঘটনাটা অনেকটা এরকম হয়েছিল...' ফকির বাবা বলতে শুরু করলেন...

—'সেদিন সারারাত বৃষ্টির কারণে এঁটোকুড়ি হয়তো জেগেই বসে ছিল। এরপর ভোররাতের দিকে যখন বৃষ্টি কমল, তখন তোর ঠাকুমা ওখানে ফুল তুলতে গেল। হাতে ফুলের সাজি। যতো দূর সম্ভব এঁটোকুড়ি দূর থেকেই দেখতে পেয়েছিল তোর ঠাকুমাকে। সাথে সাথেই ওর মনে পড়ে গেল গরম জলের কথাটা। অন্ধকারের মধ্যে ফুলের সাজিটাকে ও গরম জলের বাটি ভেবে ভুল করে বসল। ভাবল, তোর ঠাকুমা হয়তো আবার ওর গায়ে গরম জল ঢালতে আসছে। তাই প্রচণ্ড ভয় পেয়ে ও ছুটতে শুরু করল রেললাইনের দিকে। আর সেটাই হল ওর জীবনের সবচেয়ে বড়ো কাল।

অন্ধকারের মধ্যে লাইনের উপর দিয়ে দৌড়াতে গিয়ে, সেখানকার পাথরে ঠোকর খেল ও। আর মুখ থুবড়ে পড়ল ওখানেই। ঠিক তখনই ওই লাইন দিয়ে আসছিল সকালের ফার্স্ট ট্রেন। এঁটোকুড়ি আর উঠে দাঁড়ানোর সময়টুকু পেলোনা। ট্রেন চলে গেল ওর উপর দিয়েই। তারপরের ঘটনা তো মোটামুটি তোদের সবারই জানা।'

একটু থামলেন ফকির বাবা। ঘরের সকলে ততোক্ষণে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ওনার মুখের দিকে চেয়ে আছে। উনি আবার বলতে লাগলেন...

—'অপঘাতে মৃত্যুর পরেও এঁটোকুড়ির জন্য কোনো শ্রাদ্ধ শান্তি করা হল না। তাই ওর আত্মাও আর মুক্তি পেল না। ও থেকে গেল এখানেই। মরার আগে তোদের বাড়ির তিনজন মহিলার থেকে যেই খারাপ ব্যবহারটা ও পেয়েছিল, মৃত্যুর পর তারই প্রতিহিংসার আগুন জ্বলতে থাকল ওর মধ্যে। তাই তো বদলা নেওয়ার জন্য ও একে একে শেষ করে দিচ্ছিল এই বাড়ির মহিলাদের। তবে ভেবে দেখ, পুরুষদের বেলায় সুযোগ পেয়েও খুব বড়ো ক্ষতি কিন্তু ও করেনি। কারণ এই বাড়ির পুরুষদের উপর ওর সেরকম কোনো রাগ ছিল না। শুধু যেইটুকু করেছিল, তা কেবল তোদের সাবধান করার জন্য।'

—'আমাদের সাবধান করার জন্য!!! মানে? কিসের সাবধান?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন সন্তোষবাবু।

মৃদু হাসলেন ফকির বাবা। তারপর আবার গলার স্বর গম্ভীর করে নিয়ে বললেন...

—'আসলে ও তোদের এটাই বোঝাতে চেয়েছিল যে, তোরা যাতে ওর ব্যাপারে বেশি নাক না গলাস। সেটা করলে তোদের ক্ষতি হতে পারে।

মনে করে দেখ, তুই যেদিন কৌতূহলবশত পুকুর পাড়ে গিয়ে তোর মাকে ভাতসড়ার খাবার খেতে দেখেছিলি... তারপরেই কিন্তু তোর সাথে রেললাইনের ওই ঘটনাটা ঘটেছিল। যেটায় তুই মরতে মরতে বেঁচেছিলিস। তুই ভেবেছিলি ওটা তোর কপালের জোরে হয়েছিল। কিন্তু তা নয়। আসলে এঁটোকুড়ি সেদিন তোকে প্রাণে মারতে চায়নি। চেয়েছিল সাবধান করতে।

আবার আরেকটা ঘটনা ভেবে দেখ। যেদিন তোর বাবা তোকে জানিয়েছিল যে বিড়ালের খাবারে তোর মা'ই বিষ মিশিয়েছে, সেদিন রাতেই কিন্তু ওনার গলা টিপে ধরেছিল এঁটোকুড়ি। কিন্তু সেইবারও ওনাকে ছেড়ে দিয়েছিল ও। কারণ তোদের মারা ওর লক্ষ্য নয়। ওর লক্ষ্য আলাদা ছিল।'

সন্তোষবাবুর মাথাটা এবার ঝিমঝিম করে উঠল। এই কদিনে এত কিছু চলছিল এই বাড়িতে... উনি যেন বিশ্বাস করে উঠতে পারলেন না। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফকির বাবা বললেন...

—'একটা ব্যাপার কী বল তো? মৃত্যুর আগে এঁটোকুড়ি একজন সাধারণ পাগলি থাকলেও, মৃত্যুর পর ও কিন্তু এখন ভয়ংকর ধূর্ত একটা আত্মায় পরিণত হয়েছে। যার বুদ্ধি প্রচণ্ড ধুরন্ধর।

তোর বউ যখন ভয় পেয়ে এই বাড়ি ছেড়ে নিজের মায়ের কাছে চলে গেল, তখনই এঁটোকুড়ির মনে হল ওকে এই বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে হবে। তা না হলে ওর প্রতিহিংসা সম্পুর্ণ হবে না। আর ও জানতো, তোর মায়ের মৃত্যু হলে, তোর বউকে এই বাড়িতে ফিরে আসতেই হবে। সেইজন্যেই তো তোর মাকে জলে ডুবিয়ে মেরেছিল ও।'

—'উফফ... কী নৃশংস!' সন্তোষ বাবুর বাবা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন সামনের চেয়ারটায়। এতক্ষণ জাহির দূরে দাঁড়িয়ে খুব মনযোগ দিয়ে শুনছিল ফকির বাবার কথা। এবার ও হঠাৎ জিজ্ঞেস করল...

—'আচ্ছা বাবা... এঁটোকুড়ি তো চাইলে সবাইকে অনেক আগেই মেরে ফেলতে পারতো। তাহলে ও এতো সময় কেন নিত?'

—'এঁটোকুড়ি মরার আগে, এই বাড়ির লোকগুলো ওকে যেইভাবে কষ্ট দিয়েছিল... ও ঠিক সেইভাবেই যন্ত্রণা দিয়ে ধীরেধীরে মারতে চাইছিল এদের। তাইজন্যই তো এত সময় নিচ্ছিল।'

ফকির বাবা এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। ওনার কপালে চিন্তার একটা হালকা ভাঁজ দেখা গেল। দুই হাত পিছনে রেখে ঘরের ভিতর মৃদু পায়ে পায়চারী করতে করতে উনি বললেন...

—'সবই তো বুঝলাম। কিন্তু একটা খটকা সেই থেকেই গেল।'

সন্তোষ বাবু উদগ্রীব গলায় জিজ্ঞেস করলেন... 'কি বাবা?'

ফকির বাবা সেই একইভাবে হাঁটাচলা করতে করতে বললেন...

—'এঁটোকুড়ির আত্মা এই বাড়িতে ঢুকল কী করে? সচরাচর যেখানে বিড়াল থাকে, আত্মারা সেখানে প্রবেশ করতে চায় না। তাহলে এইক্ষেত্রে সেই হিসাবটা মিলল না কেন?'

একটু থেমে উনি আবার বললেন...

—'কিছু তো একটা অবশ্যই আছে এখানে, যার সাথে এঁটোকুড়ির সরাসরি যোগাযোগ আছে। আর ওই জিনিসটার কারণেই ও ঢুকতে পেরেছে এখানে। কিন্তু কী সেটা?'

ফকির বাবা এবার সন্তোষবাবুর একদম সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর ওনাকে বললেন...

—'একটু চিন্তা করে দেখ তো বেটা, এঁটোকুড়ি মরার পর ওর কি কোনো জিনিস এই বাড়িতে ঢুকেছে? যেমন ওর কোনো শাড়ির টুকরো, পায়ের চটি, কিংবা মাথার সিঁদুর... এইধরনের কিছু... যার সাথে ও সরাসরি সম্পর্কযুক্ত ছিল।'

সন্তোষবাবুর বুকের ভিতরটা হঠাৎ ছ্যাঁত করে উঠল! এঁটোকুড়ির জিনিস এই বাড়িতে!!! কথাটা চিন্তা করতেই শরীরটা কেমন যেন শিউরে উঠল ওনার। আমতাআমতা করে উনি বললেন...

—'না তো বাবা। সেরকম তো কিছু নেই। আর কেই বা আনবে ওর জিনিস? বেঁচে থাকতেই তো ওকে বাড়ির ভিতর ঢুকতে দেওয়া হত না।'

ফকির বাবা আবার চিন্তায় পড়ে গেলেন। কী করে হতে পারে এটা? কোনো কিছুর সাহায্য ছাড়া তো ওর এই বাড়িতে ঢোকা অসম্ভব। আর সেই জিনিসটা যদি এখান থেকে বের না করা হয়, তাহলে তো ওকেও বের করা যাবেনা। এখন উপায়...

ফকির বাবা যখন এই বিষয়টা নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তায় মগ্ন, ঠিক তখনই জাহির বলে উঠল...

—'আচ্ছা বাবা... মরার পর তো এঁটোকুড়ির সাথে এই বাড়ির শুধুমাত্র ঠাম্মীর দেখা হয়েছিল। হতেও তো পারে ঠাম্মীই ওর কোনো জিনিস সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল।'

কথাটা শুনেই চকচক করে উঠল ফকির বাবার চোখ। উৎফুল্ল গলায় উনি বলে উঠলেন...

—'সাব্বাশ জাহির বেটা' তারপরেই আদেশের ভঙ্গিতে বললেন...

—'সেদিন রাতে তোর ঠাকুমার সাথে কি কি জিনিস এসেছে এই বাড়িতে, মনে করে দেখ। আর তাড়াতাড়ি সেগুলো বের করে নিয়ে আয়।'

কথাটা শুনেই সন্তোষ বাবুর আগে ওনার বাবা বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। তারপর মিনিট খানেকের মধ্যে একজোড়া হাওয়াই চপ্পল এনে ফকির বাবার সামনে রেখে বললেন...

—'মা সেদিন জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়ায় ওনার জামাকাপড় সব নোংরা হয়ে গেছিল। সেগুলো ফেলে দেওয়া হয়েছে। ফুলের সাজিটাও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে, মায়ের স্মৃতি হিসেবে এই চপ্পলজোড়া আমি রেখে দিয়েছিলাম নিজের কাছে।'

ফকির বাবা তাড়াতাড়ি ওগুলো নিজের হাতে তুলে নিলেন। তারপর ভালো করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে, উলটো করলেন নীচের দিক দেখটা। আর সাথে সাথেই ওখানে উপস্থিত সকলে স্তম্ভিত হয়ে দেখল... দুটো চটির একটার মধ্যে লেগে আছে এক গোছা জট পাকানো চুল, আর কিছু শুকনো রক্তের দাগ!!!

ফকির বাবা খুব গম্ভীর হয়ে বললেন...

—'তোর ঠাকুমার এই পায়ের সাথেই পেঁচিয়ে গেছিল এঁটোকুড়ির কাটা মাথাটা! এটা ওরই মাথার চুল আর রক্ত লেগে আছে।'

তারপর একটা গভীর শ্বাস নিয়ে, অন্যমনস্কভাবে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বললেন...

—'এইবার বুঝলাম ওর এখানে আসার রহস্যটা কি! যোগাযোগ... সরাসরি যোগাযোগ।'

১০

শ্রাদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো সব ঠিকঠাক ভাবেই জোগাড় করে এনেছিল শুভ। ঠাকুরমশাইও এসে গেছিলেন যথা সময়ে। উনি আবার সঙ্গে করে একজনকে নিয়েও এসেছিলেন গীতা পাঠের জন্য। ফকির বাবার নির্দেশে জগাইদের দোকানের সামনেটা পরিষ্কার করে সেখানেই শ্রাদ্ধের সব আয়োজন শুরু করা হল।

সকাল সাড়ে দশটা। রৌদ্রজ্জ্বল ঝলমলে একটা দিন। আকাশে মেঘের নামগন্ধ পর্যন্ত নেই। দেখে মনেই হয়না গতকাল সারারাত ধরে এখানে এত বৃষ্টি হয়েছিল। ঠাকুরমশাই জগাইদের দোকানের সামনে নিজের পছন্দমতো একটি জায়গা বেছে নিয়ে, সেখান আসন পাতলেন। তারপর এঁটোকুড়ির পারলৌকিক ক্রিয়া আরম্ভ করার জন্য প্রস্তুত হলেন। এমন সময় ফকির বাবা ওনার কাছে এসে খুব চাপা গলায় বললেন...

—'একটা কথা আপনাকে জানিয়ে রাখি ঠাকুরমশাই। আজ আপনি যার শ্রাদ্ধ শান্তির কাজ করতে চলেছেন, সে কিন্তু ইতিমধ্যেই প্রেতযোনি লাভ করেছে। তাই হতেও পারে শ্রাদ্ধের নিয়ম আচার পালন করার সময় বাধাবিঘ্ন আসতে পারে। তবে আপনি ঘাবড়াবেন না। শুধু মনযোগ দিয়ে নিজের কাজটুকু সম্পুর্ণ করবেন।'

ঠাকুরমশাই সামান্য হেসে বললেন...

—'যেখানে আপনার মতো মানুষ উপস্থিত আছেন, সেখানে আমি কেন শুধুশুধু ঘাবড়াতে যাবো বলুন তো? আপনি একদম নিশ্চিন্ত থাকুন। যাই হয়ে যাক, আমি আমার কাজ সম্পুর্ণ না করা অবধি, এই আসন ছেড়ে উঠব না।'

ঠাকুরমশাইয়ের জবাব শুনে ফকির বাবা মুখে কিছু না বললেও, মনে মনে বেশ খুশিই হলেন উনি। যাক, একটা দিকে তাহলে অন্তত নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। সন্তোষ যে লোকটার সম্পর্কে খুব একটা ভুল কিছু বলেনি... সেটা ওর কথা শুনেই ফকির বাবা। মানুষটা সত্যিই অন্যসব পুরোহিতদের থেকে একটু আলাদা।

ফকির বাবা আবার ফিরে চললেন সন্তোষবাবুদের বাড়ির দিকে। এখানে আর ওনার কোনো কোনো নেই। এখন যা কাজ, সবই বাড়ির ভিতর। তাছাড়া ঠাকুরমশাইয়ের টুকিটাকি দরকারের জন্য শুভ আর পাড়ার দু-তিনজন তো রইল ওখানে। ওরাই সব সামলে নিতে পারবে।

বাড়ি ফিরেই ফকির বাবা সবার আগে সন্তোষবাবুর ঠাকুমার চপ্পল দুটো, একটি পিজবোর্ডের বাক্সে ভরে গেটের বাইরে রাখলেন। তারপর শ্রাবন্তীর ঘরে এসে ওকে বললেন...

—'তোকে আজ আবার ভাতসড়ার জন্য খাবার রান্না করতে হবে। তবে হ্যাঁ... কারও সাহায্য নেওয়া কিন্তু চলবে না। সম্পূর্ণটাই করতে হবে তোকে নিজের হাতে। মনে রাখিস, একমাত্র এই রান্নাটাই হবে এঁটোকুড়ির মৃত আত্মার কাছে তোর ক্ষমা প্রার্থনা।'

শ্রাবন্তী আনত নয়নে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল ফকির বাবাকে। এরপর ফকির বাবা ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে, নিজের ঝোলা থেকে একটি জল ভর্তি বোতল বের করলেন। তারপর সেই জল একটি তামার ঘটিতে ঢেলে, মুখে বিড়বিড় করে মন্ত্র বলতে বলতে ছিঁটিয়ে দিতে লাগলেন সারা বাড়ির প্রতিটা অংশে। সেই সাথে ওনার সঙ্গে থাকা জাহিরও একটা সাদা আঁশের ঝালর নিয়ে, সেটা বুলিয়ে দিতে থাকল গোটা বাড়ির সমস্ত দেওয়াল, আসবাব এবং জিনিসপত্রে। ব্যাপারটা শুনতে যতটা সহজ বলেই মনে হোক না কেন, আসলে কাজটা ছিল ঠিক ততটাই কঠিন আর সময়সাপেক্ষ। এইক্ষেত্রে বাড়ির কোনো একটা স্থানও যদি ওদের নজর এড়িয়ে বাকি থেকে যায়, তবে সম্পূর্ণ প্রচেষ্টাটাই বৃথা হয়ে যায়। তবে জাহির বা ফকির বাবা কেউই নিজের ধৈর্য হারালেন না। অত্যন্ত সংযম আর একাগ্রতার সাথে পালন করে চললেন নিজেদের দায়িত্বটা।

দেখতে দেখতে কখন যেন সকাল গড়িয়ে দুপুর নেমে এল। কিন্তু ওদের কাজ তখনও শেষ হল না। এইভাবে আরও বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর, যখন একটা মুহূর্তে এসে ফকির বাবার মনে হল বাড়ির আর কোনো অংশই বাকি নেই শুদ্ধিকরণ হতে, তখন ওনারা ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লেন দুজনে। চোখেমুখে প্রশান্তির ছাপ। সুষ্ঠুভাবে কার্যসিদ্ধি হয়েছে। এখন আর এঁটোকুড়ির আত্মা এই বাড়ির কোথাও লুকিয়ে নেই। সন্তুষ্টি জড়ানো গলায় ফকির বাবা বললেন...

—'নে বেটা... আর কোনো ভয় নেই। সব অশুভ প্রভাব কেটে গেছে। আজকের পর থেকে তোদের বাড়িতে আর কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটবে না।'

খবরটা শুনেই সন্তোষ বাবুর দু-চোখ আনন্দে ছলছল করে উঠল। আজ বহুদিন বাদে উনি যেন একটু প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিলেন এই বাড়িতে। অনুভব করতে পারলেন এখানকার বাতাসটা এখন আগের মতো ভারী নেই আর। তারসাথে সেই অদ্ভুত অস্বস্তিটা, কিংবা গা ভার ভার হয়ে যাওয়া ব্যাপারটাও একদমই চলে গেছে।

শুভ এসে জানাল, শ্রাদ্ধের কাজ নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন হয়েছে। অসুবিধা খুব একটা হয়নি। শুধু মাঝে মধ্যে যেই ঝোড়ো হাওয়াটা বইছিল, তাতে প্রদীপগুলো নিভে যাচ্ছিল বারংবার। বেশ কয়েকবার নাকি শ্রাদ্ধের জিনিসপত্র গুলোও উলটে পড়েছিল ওই হাওয়ার গতিতে। তবে ওরা সেসব সামলে নিয়েছে। ঠাকুরমশাইকে এই নিয়ে কোনো বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি।

শুভর কথা শুনে ঘরে উপস্থিত সকলেই বিস্মিত হয়ে গেল।

ঝোড়ো হাওয়া!!! আজ আবার অত জোরে হাওয়া দিল কখন? সকাল থেকেই তো কড়া রোদ আর গুমোট গরম। গাছের পাতা তো সারাদিন নড়েনি বললেই চলে। তাহলে কোন হাওয়ার কথা বলছে শুভ?

ব্যাপারটা কারও বোধগম্য না হলেও, সবার অলক্ষ্যে একজনের ঠোঁটে খেল গেল মৃদু হাসির ঝলক। তিনি হলেন ফকির বাবা। উনি জানেন, শুভ যেই ঝোড়ো হাওয়ার কথা বলছে... তা কেবল শ্রাদ্ধের স্থানেই বয়েছিল, আর কোথাও নয়। আর ওই হাওয়ার একটাই মাত্র উদ্দেশ্য ছিল... শ্রাদ্ধের কাজে বিঘ্ন ঘটিয়ে, সেটাকে পণ্ড করা। কিন্তু ঠাকুরমশাইয়ের আত্মবিশ্বাসের কাছে ওর প্রচেষ্টা আজ সফল হয়ে উঠতে পারেনি। মনে মনে ওই মানুষটার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত করলেন ফকির বাবা।

দিনের শেষ আলোটুকু পশ্চিমে বিদায় নিয়েছে, বেশ কিছুক্ষণ আগেই। সন্ধ্যার অন্ধকার ধীরেধীরে এখন রাতের রূপ ধারণ করছে। শ্রাবন্তী এসে ফকির বাবার সম্মুখে রেখে দিল ভাতসড়া দেওয়ার মাটির থালা, বাটি, গ্লাস। তাতে হরেক রকমের খাবার আর জল। এরপর দুইহাত জোর করে প্রণাম জানিয়ে ও মনে মনে বলল...

—'তোমায় মৃত্যুর আগে যেই কষ্ট দিয়েছি, জানি তা পূরণ করার সাধ্য আমার নেই। তবু পারলে ক্ষমা কোরো।'

সন্তোষ বাবু শেষবারের মতো অনুরোধ করলেন ফকির বাবাকে...

—'বাবা, আপনি এইভাবে অন্ধকারের মধ্যে একা একা যাচ্ছেন। এটা আমার ঠিক ভালো লাগছে না। কাউকে তো সাথে নিয়ে যেতে পারতেন।'

ফকির নিজের ডানহাত তুলে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন...

—'না বেটা, কাউকে লাগবে না। আমার কোনো অসুবিধা হবে না। তাছাড়া কে বলল আমি একা যাচ্ছি? জাহির আছে তো আমার সাথে। ও থাকবে দূরে দাঁড়িয়ে।'

এরপর ভাতসড়ার সমস্ত উপকরণ আর গেটের বাইরে রাখা সেই হাওয়াই চপ্পলের বাক্সটা সঙ্গে নিয়ে, জাহির আর ফকির বাবা বেরিয়ে গেলেন সন্তোষবাবুদের বাড়ি থেকে।

আজ সকাল থেকে সারাদিন রোদ থাকলেও, বিকেলের পর আকাশটা আবার মেঘলা হয়ে ছিল। এখন আবার তার সাথে শুরু হল ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। ফকির বাবা সেইদিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। তারপর অন্ধকার পথ পেরিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে চললেন রেললাইনের দিকে। কিছু দূর আসার পর উনি বললেন...

—'জাহির বেটা, তুই এখানেই দাঁড়া। আমি কাজ সেরে আসি। আর হ্যাঁ... ভুলেও কিন্তু রেললাইনের দিকে তাকাবি না। তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।'

জাহির ফকির বাবাকে বহুদিন ধরে চেনে। ও জানে এই বয়স্ক মানুষটা একবার মুখ থেকে যা বলে দেয়, তার অন্যথা সে করে না। তাই আর কোনো কথা না বলে, ও চুপচাপ দাঁড়িয়ে গেল সেখানেই। ফকির বাবা এরপর একাই এগিয়ে গেলেন।

ফাঁকা রেললাইনের সামনে এসে দাঁড়ানো মাত্রই ফকির বাবা অনুভব করলেন, এখানকার পরিবেশ যেন আশেপাশের তুলনায় অনেক বেশি শীতল হয়ে রয়েছে। তারসাথে কেমন যেন একটা বিচ্ছিরি দুর্গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে এখানকার সমস্ত বাতাসে। উনি বুঝলেন, ইতিমধ্যেই এখানে এসে গেছে ও। ওকে আর কষ্ট করে ডাকতে হবে না। এবার শুধু বাকি কাজটুকু শেষ করার পালা।

ফকির বাবা অন্ধকার রেললাইনের একপাশে সাবধানে নামিয়ে রাখলেন ভাতসড়ার থালাটা। তারপর পিজবোর্ডের বাক্সটাকেও রাখলেন সেটারই পাশে। এরপর ঝোলা থেকে একটা কেরোসিন তেলের শিশি বের করে, তার কিছুটা তেল ঢেলে দিলেন সেই বাক্সের উপর। এবার একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে, বাক্সটার গায়ে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করলেন উনি। কিন্তু সেটা জ্বলল না। আবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু এইবারও সেই একই ফল হল। এরপর একের পর এক দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়েও বারংবার ব্যার্থ হলেন ফকির বাবা। হালকা বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া বাক্সটার গায়ে কিছুতেই আগুন লাগতে চাইল না।

এবার হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন ফকির বাবা। ওনার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। চোখের দৃষ্টি দিয়ে ঝরে পড়ছে অদ্ভুত এক তেজ। বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে চিৎকার করে বললেন উনি...

—'তুই এই ফকিরকে আটকাবি? যে কিনা প্রবল বর্ষণের মাঝে দাঁড়িয়েও চিতাতে আগুন জ্বালিয়েছে। তাকে বাঁধা দিবি তুই?'

এই বলেই শিশির সমস্ত তেল উনি ঢেলে দিলেন বাক্সটার উপর। তারপর বিড়বিড় করে মন্ত্র বলতে বলতে একটা জ্বলন্ত কাঠি ছুঁইয়ে দিলেন তার গায়ে। সাথে সাথেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠল ভেজা পিজবোর্ডের বাক্সটা।

কিছুটা পিছিয়ে এলেন ফকির বাবা। তারপর শান্ত গলায় বললেন...

—'খিদে নিয়ে মরেছিলিস তুই। নে... আজ শেষবারের মতো জন্মের খাওয়া খেয়ে নে। নিভিয়ে নে তোর পেটের আগুন। তারপর মুক্তি পেয়ে ফিরে যা যথাস্থানে। উপরওয়ালা তোর মঙ্গল করুন'

রেললাইন থেকে নেমে এসে, ধীরে ধীরে ফিরে চললেন ফকির বাবা। এবার আর পিছনে ঘুরে তাকানো যাবে না। এটাই নিয়ম। কিন্তু কয়েকপা এগোতেই, উনি শুনতে পেলেন একটা খচরমচর শব্দ। মনে হল, কেউ যেন খুব আয়েশ করে চিবিয়ে চিবিয়ে কিছু খাচ্ছে। উনি বুঝলেন, এঁটোকুড়ি এসে গেছে নিজের অন্তিম খাবার খেতে। ওর দিকে এইমুহূর্তে আর ঘুরে তাকানো যাবেনা। যে তাকাবে তার বিপদ হওয়াটা অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু তবুও কেন জানি, ফকির বাবার খুব ইচ্ছা হল মেয়েটাকে একবার নিজের চোখে দেখতে। একটা পাগলি মেয়ে, যে কিনা এই পৃথিবীর কাছে কখনো কিছু চায়নি শুধু একটু খাবার ছাড়া, তার শেষবেলার খাওয়াটা আপন চোখে দেখার আগ্রহ উনি কিছুতেই সম্বরণ করতে পারছিলেন না। ফকির বাবা জানতেন এটা করলে উপরওয়ালার বিরুদ্ধচারণ করা হবে, এবং এর জন্য ওনাকে কঠিন শাস্তি পেতেই হবে। কিন্তু তবুও নিজের ইচ্ছাটাকে অবদমন করতে পারলেন না উনি। একটা অদম্য কৌতুহল চোখে নিয়ে ধীরেধীরে পিছন দিকে ঘুরে তাকালেন ফকির বাবা।

রাতের অন্ধকারে ঢেকে থাকা, ফাঁকা রেললাইনটার পাশে তখনও দাউদাউ করে জ্বলছে সেই পিজবোর্ডের বাক্সটা। তার কাঁপতে থাকা হলদে আলোয় ফকির বাবা এবার স্পষ্ট দেখতে পেলেন... লাইনের উপর উবু হয়ে বসে আছে একটা মেয়ের অবয়ব। যার মাথার চুলগুলো উসকোখুসকো এবং জট পাকানো, কপালে লেপ্টে আছে লাল সিঁদুরের টিপ, আর শরীরে জড়ানো রয়েছে আধছেঁড়া পুরোনো একটা ময়লা কাপড়। মেয়েটার চোখেমুখে তখন এক পরম উল্লাস। মহা তৃপ্তিতে দুই হাত ভরে মাটি থেকে চেটেপুটে খাচ্ছে ওর জন্য রাখা খাবারগুলো। পাশেই উলটে পড়ে আছে ভাতসড়ার খালি থালা বাটিগুলো। ওকে দেখেই একটা হতাশার দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ফকির বাবার গলা থেকে। নিজের মনেই উনি বিড়বিড় করে বললেন...

—'সত্যিই তুই এঁটোকুড়ি...'

এরপর কেটে গেল বেশ কয়েক মুহূর্ত। ফকির বাবা তখনও নিষ্পলক চোখে চেয়ে রয়েছেন ওর খাওয়ার দিকে তাকিয়ে। উনি চেষ্টা করেও যেন নিজের দৃষ্টি সরাতে পারছেন না ওর ওপর থেকে। এঁটোকুড়িকে দেখার তীব্র নেশা, একটা মায়াবী আকর্ষণে ক্রমশ বিভোর হয়ে গেলেন ফকির বাবা। কতোক্ষন যে এইভাবে অন্ধকার আর বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে রইলেন, তা উনি নিজেও জানেননা।

হয়তো আরও অনেক সময় ধরে এই একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতেন উনি। কিন্তু তার আগেই হঠাৎ একটা হিমশীতল দমকা বাতাস এসে সমস্ত শরীরে কাঁপুনি ধরিয়ে ওনার। ফকির বাবা লক্ষ্য করলেন, এঁটোকুড়ির অবয়বটা ধীরেধীরে ঘুরে তাকাল ওনার দিকে। আর তারপরেই ওর তীক্ষ্ন চোখের চাহনি দিয়ে চেয়ে রইল ফকির বাবার চোখের দিকে।

উফফ কী অস্বাভাবিক সেই দৃষ্টি!!! বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে সারা শরীরে যেন ঝিম ধরে যায়। হাত-পা অবশ হয়ে আসে। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফকির বাবা অনুভব করলেন ওনার বুকের ভিতর মারাত্মক একটা যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। আর সেটা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। উনি বুঝলেন, উপরওয়ালার শাস্তি নেমে আসছে ওনার উপর। কারণ উনি পাপ করেছেন... মহা পাপ! অন্তিমলগ্নে এসে এঁটোকুড়িকে ভাতসড়া খেতে দেখাটা ওনার একদমই উচিত হয়নি। এ যে নিয়ম বিরুদ্ধ কাজ। আর, এর শাস্তি তো ওনাকে পেতে হবেই।

ঘটনাটা আমাদের এতোদূর বলার পর ফকির বাবা এবার থামলেন। আমি ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম...

—'এরপর কী হল বাবা?'

উনি মৃদু হেসে বললেন...

—'এরপর আবার কী হবে? বুকের যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে আমি ওখানেই লুটিয়ে পড়লাম। ভাগ্যিস, জাহির সময় মতো এসে আমায় তুলে নিয়ে গেছিল। তা নাহলে যে এই বুড়ো ফকিরটার সাথে আজ তোদের আর কথা বলা হত না।' আবার হেসে ফেললেন ফকির বাবা।

সুজয়দা এবার কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করল..

—'আচ্ছা বাবা.. এঁটোকুড়ির এরপর কী হল?'

ফকির বাবা এবার একটা লম্বা নিশ্বাস নিয়ে, ঘরের খোলা জানালাটার দিকে তাকালেন। ওখান দিয়ে একফালি রোদ ঘরের ভিতর ঢুকছে। সেটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে বললেন...

—'ও এখন নিজের সঠিক স্থানেই রয়েছে।'

ফকির বাবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর, গাড়িতে বসে সুজয়দা আমায় বলল...

—'কি অদ্ভুত... তাই না? এইসব ঘটনা নিয়ে কিন্তু সিনেমা করা উচিত।'

আমি মুখে কিছু না বললেও মনে মনে ভাবলাম... নাঃ, একদমই না। কিছু জিনিস সিনেমার পর্দায় না আসাই ভালো। আসলে হয়তো সেটার কোনো ঐতিহ্য থাকবে না। আর আমি কখনোই চাইবোনা, ফকির বাবার এই ঘটনাটার প্রতি কোনোরকম অবিচার করা হোক। তাই এটা না হয় গল্প হয়েই বন্দি থাকুক আমার বইয়ের পাতায়। আমার পাঠকরাই না হয় এর আসল স্বাদ আস্বাদন করুক।

দুপুরে সুজয়দার ওখানে খাওয়াদাওয়া সেরে, জমিয়ে আড্ডা দিয়ে, বাড়ি ফেরার জন্য যখন ট্রেন ধরলাম... তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে। শ্যামনগর পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত প্রায় আটটা বেজে গেল আমার। স্টেশনের বাইরে এসেই মনে হল পিছনের সরু গলিটা দিয়ে শর্টকাটে চলে যাই। তাহলে একটু তাড়াতাড়িই বাড়ি ফেরা যাবে। এমনিতে এই গলিটা অন্ধকার থাকে ঠিকই, তাছাড়া লোকজনও বেশি থাকেনা, তবে বহুবার যাতায়াত করার কারণে আমার খুব একটা অসুবিধা হয়না কোনোদিনই।

কিন্তু আজ কী হল, ঠিক বুঝলাম না। নির্জন অন্ধকার গলিটায় পা রাখা মাত্রই, গাটা কেমন যেন ছমছম করে উঠল। মনে হল কেউ যেন পিছনে পিছনে হাঁটছে আমার। অবাক হয়ে একবার ঘুরে তাকিয়েও দেখলাম।

কিন্তু কই? কেউই তো নেই। ফাঁকা রাস্তাটায় শুধু আমি একাই রয়েছি।

তাহলে কেন এমন অদ্ভুত লাগছে আজ? যেন মনে হচ্ছে কেউ রয়েছে আমার সাথে।

সাহস করে আরও কয়েক পা এগোতেই, এবার হঠাৎ একটা শব্দ কানে এল আমার। মনে হল কেউ যেন অন্ধকারের মধ্যে থেকে একদম আমার কানের সামনে এসে ফিসফিস করে বলল...

—'খেতে দে... খুউউব খিদে পেয়েছে...'

সমাপ্ত

অধ্যায় ২ / ২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%