হাদীসে কুদসী

হাদীসের আর এক প্রকার রহিয়াছে, যাহাকে ‘হাদীসে কুদসী’حديث قدسى বলা হয়। ‘কুদসী’قدسى‘কুদস’قدسহইতে গঠিত ইহার অর্থ الظهر পরিত্রতা, মাহনত্ব। আল্লাহর আর এক নাম ‘কুদ্দুস’قدوس : মহান; পবিত্র।

[*******]

এই ধরনের হাদীসকে ‘হাদীসে কুদসী’ বল হয় এইজন্য যে, উহার মূল কথা সরাসরিভাবে আল্লাহর নিকট হইতে প্রাপ্ত। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁহার নবীকে ‘ইলহাম’ কিংবা স্বপ্নযোগে যাহা জানাইয়া দিয়াছেন, নবী নিজ ভাষায় সে কথাটি বর্ণনা করিয়াছেন। উহা কুরআন হইতে পৃথক জিনিস। কেননা কুরআনের কথা ও ভাষা উভয়ই আল্লাহর নিকট হইতে ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ। প্রখ্যাত হাদীস ব্যাখ্যাতা আল্লাম মুল্লা আলী আল-কারী ‘হাদীসে কুদসী’র সংজ্ঞা দান প্রসঙ্গে বলিয়াছেনঃ

******************************************************

******************************************************

হাদীসে কুদসী সেসব হাদীস, যাহা শ্রেষ্ঠ বর্ণনাকারী পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল পরম নির্ভরযোগ্য হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) আল্লাহর নিকট হইতে বর্ণনা করেন, কখনো জিব্রাঈল (আ) এর মাধ্যমে জানিয়া, কখনো সরাসরি ওহী কিংবা ইলহাম বা স্বপ্নযোগে লাভ করিয়া। যে, কোন প্রকারের ভাষার সাহায্যে ইহা প্রকাশ করার দায়িত্ব রাসূলের উপর অর্পিত হইয়া থাকে।

[৩৮************]

আল্লামা আবুল বাকা তাঁহার ‘কুল্লিয়াত’ গ্রন্হে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

******************************************************

কুরআনের শব্দ, ভাষা, অর্থ, ভাব ও কথা সবই আল্লাহর নিকট হইতে সুস্পষ্ট ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ; আর ‘হাদীসে কুদসী’র শব্দ ও ভাষা রাসূলের; কিন্তু উহার অর্থ, ভাব ও কথা আল্লাহর নিকট হইতে ইলহাম কিংবা স্বপ্নযোগে প্রাপ্ত।

[৩৯**********]

আল্লামা তাইয়্যেবী-ও এই কথা সমর্থন করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

******************************************************

কুরআনের শব্দ ও ভাষা লইয়া জিব্রাঈল (আ) রাসূলে করীমের নিকট নাযিল হইয়াছেন। আর ‘হাদীসে কুদসী’র মূল কথা ইলহাম বা স্বপ্নযোগে আল্লাহ তাহা জানাইয়া দিয়াছেন। (এইজন্য হাদীসে কুদসী আল্লাহর কথারূপে পরিচিত হইয়াছে) কিন্তু এতদ্ব্যতীত অন্যান্য হাদীসকে আল্লাহর কথা বলিয়া প্রচার করেন নাই এবং তাঁহার নামেও সে সবের বর্ণনা করেন নাই।

[৪০********]

কুরআন ও হাদীসে কুদসীর মধ্যে যে পার্থক্য রহিয়াছে, তাহা নিম্নরূপঃ

ক) কুরআন মজীদ জিব্রাঈলের মাধ্যম ছাড়া নাযিল হয় নাই, উহার শব্দ ও ভাষা নিশ্চিতরূপে ‘লওহে মাহফুয; হইতে অবতীর্ণ। উহার বর্ণনা পরস্পরা মুতাওয়াতির, -অবিচ্ছিন্ন, নিশ্চিত ও নিঃসন্দেহ; প্রত্যেক পর্যায়ে ও প্রত্যেক যুগে।

খ) নামাযে কেবল কুরআন মজীদই পাঠ করা হয়, কুরআন ছাড়া নামায সহীহ্ হয় না, আর কুরআনের পরিবর্তে হাদীসে কুদসী পড়িলেও নামায হয় না।

গ) ‘হাদীসে কুদসী’ অপবিত্র ব্যক্তি হায়েয নিফাস সম্পন্ন নারীও স্পর্শ করিতে পারে, কিন্তু কুরআন স্পর্শ করা ইহাদের জন্য হারাম।

ঘ) হাদীসে কুদসী কুরআনের ন্যায় ‘মুজিযা’ নহে।

ঙ) হাদীসে কুদসী অমান্য করিলে লোক কাফির হইয়া যায় না- যেমন কাফির হইয়া যায় কুরআন অমান্য করিলে।

[৪১***********]

শায়খ মুহাম্মদ আলী ফারুকী হাদীসকে দুই ভাগে ভাগ করিয়াছেন। এক, হাদীসে নববী- রাসূলে করীমের হাদীস; এবং দুই হাদীসে ইলাহী- আল্লাহর হাদীস। আর ইহাকেই বলা হয়, ‘হাদীসে কুদসী’। তিনি লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

‘হাদীসে কুদসী’ তাহা, যাহা নবী করীম (ﷺ) তাঁহার আল্লাহ তা’য়ালার তরফ হইতে বর্ণনা করেন, আর যাহা সেরূপ করেন না, তাহা হাদীসে নববী।

[৪২************]

‘হাদীসে কুদসী’ কুরআন নয়; কিন্তু তাহা সত্ত্বেও ইহাতে আল্লাহর কুদসী জগতের মনোমুগ্ধকর ঘ্রাণ মিশ্রিত রহিয়াছে। উহাও গায়েবী জগত হইতে আসা এক ‘নূর’। মাহন প্রতাপসম্পন্ন আল্লাহর দাপটপূর্ণ ভাবধারা উহাতেও পাওয়া যায়। ইহাই ‘হাদীসে কুদসী’। ইহাকে ‘ইলাহী’ বা ‘রব্বানী’ ও বলা হয়।

[৪৩************]

প্রাচীনকালের হাদীস গ্রন্হাবলীতৈ হাদীসে কুদসীর বর্ণনা হয় এই ভাষায়ঃ

******************************************************

নবী করীম (ﷺ) আল্লাহর তরফ হইতে বর্ণনা করিতে গিয়া বলিয়াছেন………..

আর পরবর্তীকালের মুহাদ্দিগণ ইহা উদ্ধৃত করিয়াছেন এই্ ভাষায়ঃ

******************************************************

আল্লাহ বলিয়াছেন- যাহা নবী করীম (ﷺ) তাঁহার নিকট হইতে বর্ণনা করিয়াছেন……..।

বলা বাহুল্য, এই উভয় ধরনের কথার মূল বর্ণনাকারী একই এবং তিনি হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)।

[৪৪***********]

সকল অধ্যায়
১.
হাদীসের সংজ্ঞা ও পরিচয়
২.
হাদীস শব্দের অর্থ
৩.
হাদীস ও সুন্নাত
৪.
হাদীসের বিষয়বস্তু
৫.
বিষয়বস্তুর দৃষ্টিতে হাদীসের প্রকারভেদ
৬.
হাদীসে কুদসী
৭.
সনদ ও মতন
৮.
জ্ঞান-বিজ্ঞানের মূল সূত্র
৯.
ওহী
১০.
হাদীসের উৎস
১১.
কুরআন ও হাদীসের পার্থক্য
১২.
ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় হাদীসের গুরুত্ব
১৩.
হাদীসের অপরিহার্যতা
১৪.
হাদীস ও রাসূলের ইজতিহাদ
১৫.
হাদীসের উৎপত্তি
১৬.
হাদীস সংরক্ষণ
১৭.
হাদীস সংরক্ষণ ও প্রচারের জন্য রাসূলের নির্দেশ
১৮.
পারস্পরিক হাদীস পর্যালোচনা ও শিক্ষাদান
১৯.
হাদীসেন বাস্তব অনুসরণ
২০.
ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব পালন
২১.
সাহাবীদের হাদীস প্রচার ও শিক্ষাদান
২২.
হাদীস বর্ণনায় সতর্কতা
২৩.
হাদীস লিখন
২৪.
নবী (ﷺ) কর্তৃক লিখিত সম্পদ
২৫.
সাহাবীদের লিখিত হাদীস সম্পদ
২৬.
হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের শ্রেণীবিভাগ
২৭.
হাদীস বর্ণনায় সংখ্যা পার্থক্যের কারণ
২৮.
তাবেয়ীদের হাদীস সাধনা
২৯.
কয়েকজন প্রখ্যাত তাবেয়ী মুহাদ্দিস
৩০.
হাদীস লিখনে উৎসাহ দান
৩১.
হাদীস সংগ্রহের অভিযান
৩২.
হাদীস গ্রন্থ সংকলন
৩৩.
খুলাফায়ে রাশেদুন ও হাদীস গ্রন্থ সংকলন
৩৪.
হিজরী দ্বিতীয় শতকে হাদীস সংকলন
৩৫.
হিজরী তৃতীয় শতকে হাদীস চর্চা
৩৬.
তৃতীয় শতকের হাদীস সমৃদ্ধ শহর
৩৭.
তৃতীয় হিজরী শতকের কয়েকজন বিশিষ্ট মুহাদ্দিস
৩৮.
মুসনাদ প্রণয়ন
৩৯.
হাদীস সংকলনের চূড়ান্ত পর্যায়
৪০.
ইলমে হাদীসের ছয়জন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি
৪১.
ছয়খানি বিশিষ্ট হাদীসগ্রন্হ
৪২.
চতুর্থ শতকে ইলমে হাদীস
৪৩.
চতুর্থ শতকের পরে হাদীস-গ্রন্থ প্রণয়ন
৪৪.
সপ্তম ও অষ্টম শতকে হাদীস চর্চা
৪৫.
বিভিন্ন দেশে হাদীস চর্চা
৪৬.
হাদীস গ্রন্হসমূহের পর্যায় বিভাগ
৪৭.
হাদীস বর্ণনায় রাসূল (ﷺ)-এর নৈকট্য
৪৮.
হাদীস জালকরণ ও উহার কারণ
৪৯.
হাদীস সমালোচনার পদ্ধতি
৫০.
হাদীস বর্ণনাকারীদের শ্রেণী বিভাগ (গুণগত)
৫১.
হাদীস সমালোচনার সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি
৫২.
উপমহাদেশে ইলমে হাদীস
৫৩.
আরব উপনিবেশসমূহে হাদীস প্রচার
৫৪.
উপমহাদেশে ইলমে হাদীসের রেনেসাঁ যুগ
৫৫.
বঙ্গদেশে ইলমে হাদীস
৫৬.
ইলমে হাদীস বনাম অমুসলিম মনীষীবৃন্দ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%