২৩. আমি সিনেমা নির্মাণ করি গল্প বলার জন্য-সত্যজিৎ রায়

‘আমি সিনেমা নির্মাণ করি গল্প বলার জন্যে’
—সত্যজিত রায়

এ ধরনেরই একটা বক্তব্য পড়েছিলাম বলে মনে পড়ছে আমার। অতি বড় একজন ব্যক্তিত্বের কথা এটি, যার নাম সত্যজিৎ রায়। তাঁর পথের পাঁচালী দেখে হতবাক হয়েছিলাম। সিনেমা এরকম হতে পারে! সেই কাশবন দিয়ে দৌড় দিয়ে ট্রেন দেখা— কোন মানুষ ভুলতে পেরেছে? আমি তো পারিনি। মিষ্টিওয়ালার পিছন পিছন অপুদের হাঁটা, সঙ্গে একটি পথের কুকুর, পুকুরের পানিতে তার ছায়া। আহা!

আর অপুর সংসার? তখন বুয়েটের ছাত্র আমি। শর্মিলা ঠাকুরের তো প্রেমেই পড়ে গেলাম। সিনেমার তখন বুঝি কী? কিছুই না। শুধু দেখতে ভাল লাগে। ছোট্ট বেলা থেকে আবা আম্মার হাত ধরে দেখতাম সূচিত্রা উত্তম সাবিত্রী বিকাশ রায়, ছবি বিশ্বাস পাহাড়ী সান্যালদের অভিনয় সমৃদ্ধ অসাধারণ সব ছায়াছবি। কলেজ জীবনে এসে দিলীপ কুমার, মধুবালা, দেবানন্দ, ওয়াহিদা রেহমান, রাজ কাপুর নার্গিস-? আর কত বলবো, তারপর এলো আমাদের দেশীয় সিনেমার যুগ-খান আতা, সুমিতা দেবী, সুজাতা, আজিম, রাজ্জাক কবরী প্রমুখ— কত নাম করবো-

এর মধ্যে হঠাৎ করে একটা ছবি আলোড়ন তুলল-অপুর সংসার। আমরা হলের কিছু ছাত্র দল বেঁধে দেখেছিলাম-যেমন দেখতাম করাচি লাহোর বা ঢাকার ছবি। কিন্তু এই ছবিটা মনের ভিতরে এমন একটা সুন্দরের অনুভব সৃষ্টি করে দিয়ে গেল আমার,-আজো ভুলতে পারি না। সে সময় দেখলাম মেঘে ঢাকা তারা। আর এক চমক ছিল এটা আমাদের জন্য। আমার মনটাও আপ্লুত হয়েছিল ঋত্বিক কুমার ঘটকের মত পরিচালকের কাজের মুন্সিয়ানায়। তখন কি একবারও ভেবেছিলাম এই মানুষটার হাত দিয়েই আমি পা দেব বড় পর্দায়?

মোটেই নয়। সিনেমার অভিনয়টাই তো ছিল কল্পনার অতীত। অভিনয় তো ছোট্টবেলা থেকেই করি— মঞ্চই বুঝতাম আমার কাজের যায়গা— তাই বলে সিনেমা-কল্পনাও করিনি। আমার মান্নাফ চাচার কথা বলেছি-যাঁর হাত ধরে সেই জীবনের প্রথম সিনেমা দেখেছিলাম, আর ভাঙ্গা কাঁচে চুন দিয়ে ছবি এঁকে তার পেছনে আলো ফেলে দেয়ালে সিনেমার মত ছবি দেখানো শিখেছিলাম— তাই বলে নিজেকে ওই রকম ছবি হয়ে পর্দায় দেখা যাবে-কষ্মিনকালেও মাথায় আসেনি আমার।

আমাদের দেশের একজন কিংবদন্তী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমামের সাথে পরিচয় হয়েছিল ১৯৬৮র শেষের দিকে। সংস্কৃতি সংসদের মাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো সংস্কৃতি সংসদের মাধ্যমে। সেই আয়ুব ইয়াহিয়ার আমলে যখন বাংলা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সরকার যড়যন্ত্র করছিল তখন আরো অনেকের সাথে এই সংস্কৃতি সংসদও পথে নেমেছিল তার প্রতিবাদে। এরই অন্যতম প্রধান কাজটি ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী নাটকটির মঞ্চায়ন। পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সৈয়দ হাসান ইমাম। নানান কারণে নাটকটির মহড়া চলেছিল প্রায় বছর খানেক। এরপর আরও বেশ কিছু বিপ্লবী নাটক সংস্কৃতি সংসদের ব্যানারে হাসান ভাই-এর নির্দেশনায় করেছিলাম আমি-আর তাতে বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। এরপর তো মুক্তিযুদ্ধ এল। আমি অসুস্থতার জন্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম— সাংস্কৃতিক সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে। দেশ মুক্ত হওয়ার পর আবার জড়ো হতে শুরু করলাম একে একে।

তখনই একদিন রাতে হাসান ভাই বাসায় এসে হাজির, মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায়।

সিনেমা করবে?

শুনেই লাফিয়ে উঠেছিলাম। কারণ মনের গভীরে হয়তো কোথাও একটা আকাঙ্ক্ষা জমে ছিল আমার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের।

ঋত্বিক ঘটক এসেছেন বাংলাদেশে। তার সিনেমায় অভিনয় করার জন্য অভিনেতা চাই। তোমার কথা বলেছি, করবে?

ব্যাস, একবাক্যে রাজী। পরদিন হাসান ভাই-ই নিয়ে গেলেন তাঁর কাছে— পুরোন ঢাকার কোনো এক বাসায়। তিনি এক নজর দেখে বললেন পরের দিন এফডিসিতে যেতে। সেখানে screen test হবে। দুরু দুরু বক্ষে পরদিন যথাসময়ে হাজির হলাম এফডিসির এক নম্বর ফ্লোরের মেকআপ রুমে।

মেকআপ টেকআপ করে মাথায় একটা পর চুলা লাগিয়ে দেখেই বললেন-পাশ যাও। ব্যাস্ শুরু হলো আমার চলচ্চিত্র জীবন। প্রথম শুরু হলো আরিচায়। নদীর ঘাটের গ্রামে। কোআর্টিস্ট তখনকার জনপ্রিয় শিল্পী রোজী। সে অনেক কথা আছে প্রথম শুটিং নিয়ে-সহজে বলি, তিন দিন গিয়ে ঘুরে এসে চতুর্থদিন আমার প্রথম শট হলো। দাঁড়ালাম বেবী ইসলামের ক্যামেরার সামনে। তিতাস একটি নদীর নাম, সিনেমার এক ছোট্ট শিল্পী হয়ে আমি নতুন জগতে প্রবেশ করলাম।

এই ছবির শুটিং শেষ হতে না হতেই— ডাক এল আর এক দিকপাল চলচিত্র নির্মাতা রাজেন তরফদারের কাছ থেকে। ছবির নাম পালঙ্ক। নায়ক নায়িকা-আনোয়ার হোসেন, সন্ধ্যা রায় আর কেন্দ্রীয় চরিত্রে আর এক বাঘা শিল্পী উৎপল দত্ত। দুটি ছবিই কালজয়ী হয়ে রয়েছে বাংলা চলচ্চিত্র খাতে। যতই ছোট চরিত্র হোক না কেন, আমি যে এমন দুটি কাজের সাথে জড়িত হতে পেরেছি, সেটাই আমার আনন্দ।

দিন যেতে লাগলো, আমার বাড়তে থাকলো ব্যস্ততা। একদিকে চাকরি, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক জগৎ।

থিয়েটার চলছে পুরোদমে, চলছে টেলিভিশন, রেডিও। সে এক মহাযজ্ঞের যোদ্ধা আমি। বেশ কটা সিনেমা করে ফেললাম এর মধ্যে। প্রখ্যাত চলচিত্রনির্মাতা সুভাষ দত্ত ডাকলেন তার সিনেমা ‘অরুনোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ এবং বলাকা মন সিনেমার জন্যে। তারপর মালিক মজিদ সাহেবের (পুরো নাম মনে করতে পারছি না) ‘রক্তশপথ,’ ক্যামেরাম্যান বেবী ইসলামের চরিত্রহীন-আরও যেন কী কি মনে নেই। তবে একটি কথা ভুলতে পারিনি কাজী জহিরের ‘বধূ বিদায়’।

একদিন কাজী ভাইয়ের ফোন পেলাম-একটু দেখা করবেন। আমার একটা সিনেমায় আপনাকে নিতে চাই।

মনে মনে একটু রাগ হয়েছিল, এমন ব্যবহারে-তারপরও কাজী জহিরের ছবি— না গিয়ে পারি? মাস্টারের চরিত্রে অভিনয় করলাম সেই ছবিতে। সুপারহিট ছবি।

পরের ছবিতেও চুক্তি হয়ে গেল, কিন্তু তার আগেই আমি ফুরুৎ। চলে গেলাম লিবিয়া। ফিরলাম তিন বছর পর ১৯৮১ ডিসেম্বরে। এরপর ৮৭ পর্যন্ত বিরতি নানান কারণে। পরবর্তীতে করলাম আয়াত আলী পাটোয়ারীর ছবি। আবার বিরতি। টেলিভিশনের প্রযোজনায় এক ছবিতে অভিনয় করলাম, হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস, মুস্তাফিজুর রহমানের নির্দেশনায় শঙ্খনীল কারাগার। তারপর হুমায়ুন আহমেদেরই নির্দেশনায় ‘আগুনের পরশমনি’।

উনিশ শ’ বিরানব্বইয়ে ঘোষণা দিয়ে চলচ্চিত্রকে পেশা হিসেবে নিলাম। এরপরই অনেক ছবিতে কাজ করেছি— শুরুটা হয়েছিল সোহানুর রহমান সোহানের নির্দেশনায় নির্মিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ পর্যন্ত দিয়ে। তারপর একের পর এক সিনেমা করি। এর মাঝে আবার এল TV প্যাকেজ শিল্প। এটা আমার পছন্দের জগৎ বিধায় নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করলাম প্যাকেজ নাটকে অভিনয়, নির্মাণ ও নাট্য রচনায়। এখনো সেই কাজটিই করে চলছি— তবে সিনেমাকে একেবারে ত্যাগ করিনি কখনো। সর্বশেষ গত বছরেই (২০২৩) তিনটি ছবি করেছি— ‘দায়মুক্তি’, ‘অসম্ভব’ আর তৌকিরের ‘স্ফুলিঙ্গ’। তৌকির চলচ্চিত্র নির্মাণে আসবার পর একটি বাদে সব ক’টিতেই আমার অভিনয় করা হয়েছে। ‘জয়যাত্রা’, ‘রূপকথার গল্প’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’, ফাগুন হাওয়া, ‘অজ্ঞাতনামা’ ইত্যাদি। মাঝের হিসাবগুলো বলতে পারবো না। তবে আমার মনে হয় অদ্যাবধি শতাধিক তো হবেই।

চলচ্চিত্র নির্মাণের চিন্তা যে কখনো করিনি তা নয়। পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত ছিল। কিন্তু প্রথমত প্যাকেজ নাটকের অতি ব্যস্ততার কারণে ওটা হয়ে ওঠেনি-আর এখন সাহস পাইনা— মনে একই ভয় হয়, হয়তো সিনেমা বানাতে গিয়ে, নাটক বানিয়ে ফেলবো, যা আমাদের অনেকেই করেছিল।

তবে সিনেমা তো আমি বানাই-ই, আমার নির্মিত নাটক দেখে চলচ্চিত্র জগতের অনেকেই বলেছেন— ভাই আপনি এত কষ্ট করে (অতি অল্প বাজেটে) নাটকের নামে তো সিনেমা বানান-তার চেয়ে চলে আসেন না বড় পর্দায়। বানিয়ে আনন্দ তো পাবেন-নানান পরীক্ষা নিরীক্ষার ও সুযোগ আসবে হাতে।

এখনো ভাবি কে কে সব সিনেমা বানাচ্ছে, আমি কেন নই? পরেই মনে হয়-আমার সাহসের অভাবই আমাকে বারবার পিছিয়ে দিচ্ছে-

হাতে সময় সংক্ষেপিত হচ্ছে-জানি না এরপর আর আদৌ সম্ভব হবে কিনা। কারণ এখন নাটক আর সিনেমায় যে হরর আর থ্রিলারের ধুন্দুমার দর্শকপ্রিয়তা চলছে, সেখানে আমাদের মত মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের মানুষ হয়তো ধোপে টিকবে না আদৌ।

সকল অধ্যায়
১.
১. দিনগুলি মোর সোনার খাচায় রইল না
২.
২. তেলের শিশি ভাঙলো বলে খুকুর পরে রাগ করো
৩.
৩. জীবন যখন শুকায়ে যায়
৪.
৪. মোরা ভোরের বেলা ফুল তুলেছি
৫.
৫. আসা-যাওয়ার পথ চলেছে
৬.
৬. শৈশব হারিয়ে গেছে সময়ের স্রোতে
৭.
৭. নদী বহে যায় নূতন নূতন বাঁকে
৮.
৮. আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো
৯.
৯. রেলগাড়ি ঝমাঝম, পা পিছলে আলুর দম
১০.
১০. পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে হারে
১১.
১১. দিগবলয়ে নব শশী লেখা
১২.
১২. ছেলে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার
১৩.
১৩. নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়
১৪.
১৪. দূর কোন পরবাসে তুমি চলে যাইবারে
১৫.
১৫. এলেম নতুন দেশে
১৬.
১৬. নীড়ে ফেরা পাখি
১৭.
১৭. মিলিটারি ॥ আপকা নাম কিয়া?
১৮.
১৮. চল চল চল ভাই আজি শুভদিনে পিতার ভবনে
১৯.
১৯. মাগো মা ওগো মা আমারে বানাইলা তুমি দিওয়ানা
২০.
২০. আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহ দহন লাগে
২১.
২১. একজন অভিনেতা হবে ভাল এবং সৎ মানুষ
২২.
২২. মার্কনীর বেতার তরঙ্গে আমি
২৩.
২৩. আমি সিনেমা নির্মাণ করি গল্প বলার জন্য-সত্যজিৎ রায়
২৪.
২৪. বোকার বাক্স
২৫.
২৫. বিজ্ঞাপন একটি সৃজনশীল শিল্পকলা
২৬.
২৬. আমি কি লেখক?
২৭.
২৭. পুরস্কার
২৮.
২৮. মাঠে প্রান্তরে
২৯.
২৯. আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ
৩০.
৩০. ছানাপোনার কাহিনি
৩১.
৩১. সারমেয় সমাচার
৩২.
৩২. পায়ের তলায় সর্ষে
৩৩.
৩৩. কোন আলো লাগলো চোখে
৩৪.
৩৪. সুন্দরের কোন মন্ত্রে মেঘে মায়া ঢালে
৩৫.
৩৫. তামাম শোধ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%