সুচিত্রা ভট্টাচার্য
ফোনটা এল সাড়ে নটায়।
সকাল সকাল স্নান সেরে কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল শ্রীময়ী। স্নান মানে কাকস্নান। চুল শুকনো রেখে গায়ে সামান্য জল ছেটানো। বছরের এই সময়টায় শ্রীময়ী সহজে মাথা ভেজায় না। ওই হয়তো রবিবার কি ছুটির দিন, ভেবেচিন্তে, শরীর বুঝে। এবার অবশ্য দিল্লির শীত এখনও তেমন জাঁকিয়ে আসেনি, থার্মোমিটারের পারা একদিনই বুঝি দশের নীচে নেমেছিল, তবু এই ডিসেম্বরের শুরুটাই মারাত্মক। গত ডিসেম্বরেই শ্রীময়ীর যা গেছে! জ্বরে কাহিল, ঘঙ্ঘঙ কাশছে, ডাক্তার ডাকতে হল, কড়া কড়া অ্যান্টিবায়োটিক চলছে—একেবারে শয্যাশায়ী দশা। চিরকালই তার ব্রংকাইটিসের ধাত, ইদানীং শ্বাসকষ্টের চাপও অনুভব করছে মাঝে মাঝে। হয়তো দিল্লিতে পলিউশান বাড়ার জন্য, হয়তো বা ফুসফুসের জোর কমে এসেছে তাই। এত গাড়ি, এত কলকারখানা, এত ধোঁয়া, এখানে এখন সুস্থ থাকাটাই মুশকিল। শীতকালে আবার ধোঁয়া চাপ বেঁধে থাকে, কড়া সূর্যালোক না পেলে সরতে চায় না। সে যাই হোক, একা মানুষ সাবধানে থাকতেই হবে।
ইদানীং এই একা থাকা শব্দটা মাঝে মাঝেই মাথায় আসছে। ভালো নয়, একদম ভালো নয়। মনের কোণে কি চোরা শঙ্কা উঁকি দেয় কোনও? কোনও অমোঘ নিয়তির কথা মনে পড়ে? যার সঙ্গে দূরত্ব কমে আসছে ক্রমশ? একা থাকাকে আগে তো শ্রীময়ী কখনও ভয় পায়নি! এ কি তবে বয়সেরই লক্ষণ?
হ্যাঁ, বয়স তো হয়েছেই। বিকেল ফুরিয়ে গেছে, জীবনে এখন গাঢ় সন্ধে। রিটায়ারমেন্টের আর পাঁচ বছর বাকি, এরপর তো শুধু রাত আর রাত। তবু এই পঞ্চান্ন বছর বয়সটাকে নিয়ে এক পলও ভাবতে রাজি নয় শ্রীময়ী। ভাবতে ভালোও লাগছে না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শ্রীময়ী আলগা খোঁপা বেঁধে নিল একটা। চিত্তদৌর্বল্য শরীরকে আরও অসুস্থতার দিকে ঠেলে দেয়। চিন্তাটাকে জোর করে ঘুরিয়ে দিল কেজো ভাবনায়। আজ প্রথম ক্লাস সাড়ে এগারোটায়। অঙ্কের টিউটোরিয়াল, সেকেন্ড ইয়ার বিএসসির। তার এই মধুবিহার থেকে লাজপৎনগর কম দূর নয়, দশটার মধ্যে না বেরোলে ঠিক সময়ে পৌঁছনো অনিশ্চিত। আজকাল দিল্লিতে ট্রাফিক জ্যাম বেড়েছে খুব, কোথায় কোন মোড়ে স্থবির হয়ে যায় বাস তার ঠিক কী! কাল আইটিও ক্রসিং পার হতেই পাক্কা আধঘণ্টা লেগেছিল।
দরজায় পরদা নড়ে উঠল,—মা-জি, খানা লগা দুঁ?
পিঙ্কি। বছর তিরিশ বয়স। লম্বা ক্ষয়াটে মুখ, শীর্ণ চেহারা। বাংলাদেশি মুসলমান। কবে কী করে দিল্লি চলে এল জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে যায়। থাকে যমুনাপাড়ের ঝোপড়পট্টিতে, যার কায়দার নাম জে পি কলোনি। স্বামী রিকশা চালায়, এই মধুবিহারেই। ছোট ছোট বাচ্চাও আছে, মেয়ে। কাজে বেরিয়ে ভুলেও কখনও বাংলায় কথা বলে না পিঙ্কিরা। চলনে বলনে পোশাকে আশাকে একেবারে চোস্ত দিল্লিওয়ালি। আসে ঘড়ি মেপে সাড়ে সাতটায়, যায় দশটার মধ্যেই। এর মধ্যে রান্নাবান্না বাসনমাজা ঘর ঝাড়পোঁছ। ছুটির দিন একটু বেশিক্ষণ থাকে অবশ্য, কাচাকুচি করার জন্য। তার নি:শব্দ কাজ করার ভঙ্গি দেখলে তাকে রোবট বলে ভ্রম হয়।
মাঝের কটা বছর বাদ দিয়ে প্রায় গোটা জীবনটাই দিল্লিতে আছে শ্রীময়ী। সেও হিন্দিতে চোস্ত, কর্মক্ষেত্রে পথেঘাটে সর্বত্রই তার মুখে রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু এই মেয়েটির সঙ্গে ইচ্ছে করেই বাংলাতে কথা বলে। বলে মজা পায়। সে বাংলায় প্রশ্ন করবে, পিঙ্কি হিন্দিতে জবাব দেবে, এ এক আজব খেলা।
ওয়ার্ড্রোব থেকে একটা প্রিন্টেড সিল্কশাড়ি বার করতে করতে শ্রীময়ী জিজ্ঞেস করল, —কী রাঁধলি আজ?
—জি, গোবিকা সবজি।
—আর মাছ?
—উয়ো তো হ্যায় হি।
পটপড়গঞ্জের দিকে ভালো মাছ ওঠে সন্ধেবেলা। যমুনার এপারে বাঙালি বসতি বেড়ে গেছে খুব, তাদের রসনার তৃপ্তির জন্যই মৎস্যের আগমন। একদিন বেশি করে কিনে এনে ফ্রিজে রেখে দেয় শ্রীময়ী, সারা সপ্তাহ ধরে তারিয়ে তারিয়ে খায়। মাছের আঁশটে গন্ধটুকু ছাড়া তার মুখে ভাত রোচে না। রুটিও না।
শ্রীময়ী আবার জিজ্ঞেস করল,—কী করেছিস মাছের? পাতলা ঝোল, না কষকষে?
—জি, হলকা হলকা।
—ভালোই করেছিস।...ভাত বাড়, আমি আসছি।
খোলা জানলা দিয়ে হু হু করে বাতাস এল হঠাৎ। গা শিরশির করে উঠল শ্রীময়ীর, গুজরাটি চাদরখানা আরও ভালো করে সাপটে নিল গায়ে। ওয়ার্ড্রোব ঘাঁটছে। কোন শালটা নেওয়া যায় আজ? আট নটা শালের স্তূপ থেকে নীল সুতোর কাজ করা সাদাটাই মনে ধরল। হাতে তুলে শুঁকল শালটাকে, এখনও নতুনের গন্ধ লেগে আছে। পুজোর সময়ে মেয়েজামাই এসেছিল, তখনই দিল্লি হাট থেকে এই শালটা কিনে দিয়েছিল সুগত। জোর করে। জামাইটা তাঁর এক্কেবারে খ্যাপা আছে। একবার ক্যারা নড়ে উঠল তো দুমাদ্দুম জিনিস কিনতে শুরু করে দিল, টাকাপয়সার তোয়াক্কা না করেই। বাচ্চাকাচ্চা হয়েছে, কোথায় এখন একটু সঞ্চয়ী হবে, তা নয়...।
শ্রীময়ী আপনমনে হেসে ফেলল। জামাইটা এরকম বেহিসেবি বলেই বোধহয় তাকে একটু বেশি ভালোবাসে সে। ওরকম প্রাণবন্ত হাসিখুশি ছেলে আজকাল কটা পাওয়া যায়! কলেজে তরুণ অধ্যাপক-অধ্যাপিকাদের তো দেখছে, সব গোমড়ামুখো, নয় ধান্দাবাজ। সুগত এই জগতে ভারী মনোরম ব্যতিক্রম। ঠাট্টাতামাশা করছে, হই হই করছে, অনবরত লেগপুলিং করছে ... অথচ পড়ানোর সময়ে কী ভীষণ সিরিয়াস। অল অ্যালঙ ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট, আঠাশের মধ্যে পিএইচ ডি, মাত্র পঁয়ত্রিশে পৌঁছেই দায়িত্বশীল রিসার্চগাইড।... সুগত লাখো মে এক।
আবার হাসি পেল শ্রীময়ীর। তার এই জামাতাস্নেহ নিয়ে মিতুলের মনে চাপা ঈর্ষা আছে, শ্রীময়ী টের পায়। নিজের হাতে দুটো একটা নতুন পদ রান্না করে সুগতকে খাওয়ালেই মিতুল ঠোঁট ফোলাবে। কথাও শোনায় টুকটুক, মেয়ের চেয়ে জামাই দেখছি তোমার বেশি আদরের হয়ে গেল মা!
কেন যে দুম করে দিল্লি ছেড়ে কলকাতা চলে গেল সুগত? যাদবপুর ইউনিভার্সিটির রিডার হওয়া কী এমন মহার্ঘ চাকরি? এখানে থাকলেও কি দু-চার বছরের মধ্যে ইউনিভার্সিটিতে ঢুকে পড়তে পারত না? অভ্যস্ত পরিমণ্ডল, চেনা শহর, আত্মীয়স্বজন সব্বাইকে ছেড়ে ওই দূর কলকাতায় কি খুব ভালো আছে সুগতরা?
যাক গে, মরুক গে, যাদের জীবন, তাদের জীবন। শ্রীময়ী কেন মিছিমিছি ভেবে মরে! মানুষের পূর্ণ স্বাধীনতার বিশ্বাস করে সে, মেয়েজামাই যতই আপনার হোক নিজেদের ভবিষ্যত নিজেদের মতো করে ভাবার অধিকার তাদের আছে, শ্রীময়ীর জন্য তাদের মনোগত বাসনায় এতটুকু বাধার সৃষ্টি হোক, এ শ্রীময়ীর অভিপ্রেত নয়। তাই না এ নিয়ে কখনও মুখ দিয়ে টুঁ শব্দটি উচ্চারণ করেনি! শত মন খারাপ হওয়া সত্বেও না।
সাদা শালটা বিছানায় রেখে শ্রীময়ী একটা সিল্কের স্কার্ফ বার করল। ব্যাগে থাক, কলেজ থেকে ফেরার পথে গায়ে জড়াবে। গলাটা সামান্য খুশখুশ করছে। বিপদের পূর্বাভাস হতে পারে।
পায়ে পায়ে ডাইনিং স্পেসে এল শ্রীময়ী। ছোট্ট টু-রুম ফ্ল্যাট, একটু বসার জায়গা মতোও আছে। সঙ্গে কিচেন বাথরুম আর সরু একফালি ব্যালকনি। কার্পেট এরিয়া পাঁচশোর কাছাকাছি, সুপারবিল্ট ধরে ছশো তিরানব্বই স্কোয়ার ফিট। সাত বছর হল কিনেছে ফ্ল্যাটটা, এখনও লোন শোধ চলছে, বছর দুয়েকের মধ্যে ঋণ চুকে যাবে। অর্থাৎ শ্রীময়ীর রিটায়ারমেন্টের আগেই। বাবা যতদিন বেঁচেছিলেন, নিজস্ব ফ্ল্যাট বা মাথা গোঁজার ঠাঁই-এর কথা চিন্তাও করেনি শ্রীময়ী। মেয়ে নিয়ে বেশ ছিল চিত্তরঞ্জন পার্কে। দাদা বউদি ভাইপো ভাইঝি সকলের সঙ্গে। বছর তেরো আগে বাবা গত হলেন, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কেন যেন দাদা বউদির মনে হতে লাগল, ছেলেমেয়েরা বেশ বড় হয়ে গেছে, বড্ড বেশি ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকতে হচ্ছে সকলকে! মুখ ফুটে অবশ্য বলেনি কখনও, তবে হাবে ভাবে টের পাওয়া যেত। হয়তো শ্রীময়ীর কলেজের কোনও কোলিগ এসেছে সন্ধেবেলা, নটা-দশটা অবধি আড্ডা চলল, রাতে দেখা গেল বউদির মুখ ভার ... সামনে ছেলেটার পরীক্ষা, গোটা সন্ধেটা নষ্ট হল...! ...ওই খাটে তিন ভাই বোন কী আর একসঙ্গে শুতে পারে! ভাবছি এবার থেকে বাবলুর জন্য বারান্দায় ক্যাম্প খাট পেতে দেব! আর শীতকালে নয় তুতুলই বসার ঘরের ডিভানটায় ...!
তখনই সচেতন হয়েছিল শ্রীময়ী। কলেজের দু-একজন সহকর্মীকে আলগা ভাবে ভাড়াবাড়ির কথা বলে রেখেছিল, হিস্ট্রির সোহিনী শর্মা লক্ষ্মীনগরের দিকে একটা বাড়ির খোঁজ দিল। সোহিনীর বাড়ির পাশেই। ওয়ান-রুম ফ্ল্যাট, ভাড়া বারোশো। মায়ের ছলছল চোখ উপেক্ষা করে শ্রীময়ী চলে এল মিতুলকে নিয়ে। তখনও এদিকটা এত জমজমাট হয়নি। তারপর শহরের এই পুবপ্রান্ত তো দ্রুত বাড়তে শুরু করল। ইয়া ইয়া হাউজিং কমপ্লেক্স তৈরি হচ্ছে এদিকে ওদিকে। পটপড়গঞ্জে, মধুবিহারে, প্রেমবিহারে, ময়ূরবিহারে...। মরিয়া হয়ে তখনই একটা নিজস্ব ফ্ল্যাটের জন্য ঝাঁপ দিয়েছিল শ্রীময়ী, খানিকটা সাধ্যের বাইরে গিয়েই।
আজ, মধুবিহারের এই সাততলা দৈত্য সাইজ বাড়িটার পাঁচতলার ফ্ল্যাটে দাঁড়িয়ে শ্রীময়ীর মনে হয়, কাজটা সেদিন ভালোই করেছিল। এই শহরে, ভারতবর্ষের এই ঝলমলে রাজধানীতে, তার একটু তো নিজস্ব স্থান আছে। একেবারে নিজস্ব। অংশীদারবিহীন। মেয়ে নাতি এলে আজকাল একটু জায়গার অকুলান হয় বটে, তবুও...
অন্যমনস্ক মুখে শ্রীময়ী খাবার টেবিলে এল। সুগন্ধি ভাতের ঘ্রাণ আসছে। ভাতের ব্যাপারে শ্রীময়ী ভারী শৌখিন। সঙ্গে সবজি মাছ যাই থাকুক, চালটি ভালো হওয়া চাইই চাই।
খেতে খেতে শ্রীময়ী অল্প গলা ওঠাল,—হ্যাঁরে পিঙ্কি, আমায় কী টিফিন দিচ্ছিস আজ?
হিন্দিভাষী বাংলাদেশির বিলম্বিত জবাব,—জি, ব্রেড, বয়েল আণ্ডা, অউর কেলা।
—আজও আবার ডিমসেদ্ধ দিলি?
উত্তর নেই।
—ফ্রিজে মিষ্টি আছে না?...সন্দেশ?
পিঙ্কি বোধহয় রান্নাঘরে কড়াটড়া কিছু মাজছিল। হাত মুছতে মুছতে এসে উদাসীন মুখে ফ্রিজ খুলেছে,—নেই। মিঠাই নেহি হ্যায়।
শ্রীময়ীর ভুরুতে ভাঁজ পড়ল। পরশু সন্ধেবেলা সোহিনী এসেছিল, তখনই কি সন্দেশগুলো শেষ হয়ে গেছে? কাল সকালে কি ভাতের পাতে মিষ্টি খায়নি? কাল কলেজ থেকে ফেরার পথে পিৎজা কিনে এনেছিল, তখন কি ফ্রিজে মিষ্টি ছিল? এত খুঁটিনাটি মনে থাকে না আজকাল। কেন থাকে না? মস্তিষ্কে কি অক্সিজেন কম যাচ্ছে?
ব্যালকনি দিয়ে আলো এসে পড়েছে ডাইনিং স্পেসে। মলিন সূর্যরশ্মি, আকাশে মেঘ আছে প্রচুর। এ সময়ে একদিন বৃষ্টি হলেই চিত্তির, দুম করে ঠান্ডাটা বেড়ে যাবে। তখন রোজ ওই তিন চার, তিন চার। রুমহিটারগুলো সব ঠিকঠাক আছে তো? চালিয়ে দেখা হয়নি।
পাতে মাছের ঝোল ঢালতে গিয়ে শ্রীময়ীর মনে পড়ে গেল, ঘন ঘন ফোন আসছে বউদির। যেতে বলছে ও-বাড়ি। তুতুলের নাকি দু দুটো ভালো সম্বন্ধ এসেছে, দাদা বউদি তা নিয়ে আলোচনা করতে চায়। গেলে হয় আজ। আলোচনা তো হবে লবডঙ্কা, খানিক হইচই আড্ডা ...। দূরে থাকার একটা অন্তত সুফল আছে। সম্পর্কটা তেতো হওয়ার সুযোগ পায় না। চিত্তরঞ্জন পার্কে গেলে অবশ্য আর একটা কাজও হয় আজ। নতুন বাংলা ক্যাসেট কিনে আনা যাবে কয়েকটা। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা নামে একটি মেয়ে নাকি ভালো রবীন্দ্রসংগীত গাইছে আজকাল, তারপর ওই যে ছেলেটা গত বছর কলকাতা থেকে এল পুজোর সময়ে, চিত্তরঞ্জন পার্কে গান গেয়ে গেল...কী যেন নাম? কী যেন নাম?
শ্রীময়ী দু দিকে মাথা ঝাঁকাল। মস্তিষ্কে কি সত্যিই অক্সিজেন কম যাচ্ছে? মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সে স্মৃতিশক্তি এমন দুর্বল হয়ে যাওয়ার কোনও মানে হয়? তার মতো একজন ক্ষুরধার অঙ্কের অধ্যাপিকার?...
পিঙ্কি কী যেন কাজে আবার এসে ফ্রিজ খুলেছে। ডিপফ্রিজের চেম্বার খুলে কী একটা ঘাঁটাঘাঁটি করছে।
শ্রীময়ী জিজ্ঞেস করল,—কী খুঁজছিস?
—কুছ নেই। পিঙ্কি ফ্রিজের দরজা বন্ধ করল,—ঠিক সে বর্ফ নেই জম রহা হ্যায়।
—দেখেছি। ফ্রিজটা এবার বদলাতে হবে। সেই কবেকার কেনা...
—কিতনা সাল হুয়া ইসকা?
—এগারো। না না, বারো।
—নয়া খরিদেঙ্গে? স্বল্পভাষিণী পিঙ্কি হঠাৎ মুখর,—তো ইসকা কেয়া হোগা?
—বেচে দেব।
—কিসকো?
—দেখি কে নেয়! খদ্দের না পেলে দোকানকেই দেব, ওরা এক্সচেঞ্জের জন্য ডিসকাউন্ট দেবে।
পিঙ্কি কী যেন ভাবছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ বলল,—আপকো কেয়া ভাও মিলেগা ইসকা?
—হাজার আড়াই তিন তো পাবই।
—মা-জি, এক বাত কহুঁ?
—বল।
—অগর দো মে হো তো...। পিঙ্কি থেমে গেল।
শ্রীময়ী চোখ কুঁচকোল,—তোর চেনাজানা কেউ আছে নাকি কেনার?
—সোচতি হুঁ ম্যায় হি খরিদ লুঁ। পিঙ্কি অস্ফুটে বলল,—অগর আপকো কোই এতরাজ না হো তো...
শ্রীময়ী বেশ চমকে গেল। ভালোভাবে একবার নিরীক্ষণ করল পিঙ্কিকে। সালোয়ার কামিজ দুটোই বেশ মলিন পিঙ্কির, হাতে প্লাস্টিকের চুড়ি, মুখে চোখে যথেষ্ট অপুষ্টির ছাপ।
একটু অবিশ্বাসের সুরেই বলল,—তুই নিবি? দু হাজার দিতে পারবি?
—তনখাসে চুকতা কর দুংগি। হর মায়না শ দো'শো...য্যায়সে আপ চাহেঁ...
—ফ্রিজ দিয়ে তুই করবিটা কী? কোন কম্মে লাগবে?
পিঙ্কি উত্তর দিল না। আঙুলে ওড়না পাকাচ্ছে। নিরক্ত ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি।
শ্রীময়ীও হেসে ফেলল। সত্যি, এই মানুষগুলোর ঘরেও কীভাবে ঢুকে পড়েছে বিজ্ঞাপনী মোহ। পেটের ভাত, বাচ্চার লেখাপড়ার আগে ফ্রিজ টিভি কিনতে চায়! ভাবলে শিউরে উঠতে হয়, পণ্যসভ্যতার থাবা কীভাবে প্রকাণ্ড হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।
বিস্ময়মাখা ভাবনাটাকে ছিঁড়ে হঠাৎই টেলিফোন বেজে উঠল। ঠিক সাড়ে নটায়।
শ্রীময়ীর লিভিংস্পেসটি অনাড়ম্বর। প্রায় আভরণহীন। দুটি বেতের সোফা এল শেপে পাতা, একটি সেন্টার টেবিল, এক কোণে স্ট্যান্ডল্যাম্প, অন্য কোণে এরিকা পামের টব, ব্যস।
টবের সামনে রাখা টুলে টেলিফোন।
খাবার টেবিল থেকে উঠে রিসিভার তুলল শ্রীয়মী,—হ্যালো?
—মা...আমি....
শ্রীময়ী অবাক হল। এ সময়ে মিতুল? কলকাতার ফোন তো আসে সেই এগারোটার পর, যখন টেলিফোনের চার্জ কোয়ার্টার হয়ে যায়। এখন কী এমন জরুরি দরকার পড়ল...?
জিজ্ঞেস করল,—কী ব্যাপার রে? তুই হঠাৎ?
—একটা খারাপ খবর আছে মা। মিতুল মুহূর্তের জন্য চুপ। মুহূর্ত পরে স্বর ফুটল,—বাবার স্ট্রোক হয়েছে।
শেষ বাক্যটি মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে বেশ কয়েক সেকেন্ড সময় লেগে গেল। মগজের কোনও কোষে সংবাদটার জন্য পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না বলেই বোধ হয়।
ঈষৎ ধাতস্থ হয়ে শ্রীময়ী বলল,—কবে? কখন?
—আজ ভোরে। ম্যাসিভ অ্যাটাক। নার্সিংহোম ভর্তি করা হয়েছে।
শ্রীময়ী অস্ফুটে বলল,—ও।
—আমার খুব নার্ভাস লাগছে মা। মিতুলের গলা প্রায় বুজে এল,—এখন কী হবে মা?
কী বলবেন ঠিক ভেবে পেল না শ্রীময়ী। এ সংবাদে তার পুরোপুরি নিরাবেগ থাকার কথা, কিন্তু তা থাকতে পারছে কই! পঁচিশ বছর ধরে যে মানুষটার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই, যার কথা স্বপ্নেও আর মনে পড়ে না, তার অসুস্থতার খবরে শ্রীময়ী কেন বিচলিত হবে?
তবু সহসাই অচেনা এক উদ্বেগ নড়েচড়ে উঠল,—কী বলছেন ডাক্তার?
—কিছুই বলছে না।
—কেন?
—বাহাত্তর ঘণ্টার আগে নাকি কিছু বলা যাবে না। ইনটেনসিভ কেয়ারে আছে।... ইনজেকশান পড়ছে, কড়া সিডেটিভ দেওয়া হয়েছে...
—ও।
ও প্রান্তে মিতুল একটুক্ষণ নীরব। তারপর আচমকাই বলে উঠেছে,—তুমি একবার আসবে মা?
—আমি? শ্রীময়ী থমকে গেল। ঢোক গিলে বলল,—আমি গিয়ে কী করব?
—তুমি এ সময়ে পাশে থাকলে...
কথাটা ঠং করে কানে বাজল শ্রীময়ীর। মেয়ে কার পাশে থাকার কথা বলছে? মেয়ের? না মেয়ের বাবার?
মিতুল আবার বলল,—এসো না মা। প্লিজ। নার্সিংহোমে যাওয়ার পথে বাবা তোমার নাম করছিল।
আশ্চর্য, অন্য কোনও অনুভূতি নয়, কোত্থেকে ঈর্ষার এক কুটুস কামড়। নার্সিংহোমে যাওয়ার পথে ... মানে? সোমনাথ কি তবে মিতুলের কাছে ছিল? এসে থাকে মাঝে মাঝে? মিতুলরা তো কখনও কিছু জানায় না!
পরক্ষণে মেয়ের কথায় ভুল ভাঙল,—সক্কালবেলা ভবানীপুর থেকে মনুপিসির ফোন পেয়ে আমি আর সুগত তক্ষুনি ছুটে গেছিলাম। সুগতই অ্যাম্বুলেন্স ডাকল, তারপর আমরা দুজনে...। জানোই তো ওবাড়ির অবস্থা। দেখার কেউ নেই, যারা আছে তারাও সব নার্ভাস, ক্যালাস...
শ্রীময়ী কী বলবে ভেবে পেল না। চুপ করে আছে।
ফোনে আবার মিতুলের কাঁপা কাঁপা স্বর,—বাবা অনেকক্ষণ আনঅ্যাটেন্ডেড পড়ে ছিল মা। অবস্থা খুব ক্রিটিকাল। প্লিজ পারলে চলে এসো।
শ্রীময়ীর মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল,—দেখি।
—ছাড়ছি। রাতে আবার ফোন করব।
টেলিফোন রেখে খানিকক্ষণ নিষ্পন্দ দাঁড়িয়ে রইল শ্রীময়ী। তারপর ফিরে এসে বসেছে ডাইনিং টেবিলে। খেতে পারল না আর। বেসিনে হাত ধুয়ে ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কেন হঠাৎ 'দেখি' বলল মেয়েকে? সোমনাথ বেঁচে রইল, কী মরে গেল তাতে সত্যিই কী আর তার কিছু এসে যায়? হুঁহ, বাবা তোমার নাম করছিল ...! শ্রীময়ীর নাম থোড়ি মনে আছে সোমনাথের। এও তাকে দুর্বল করে দেওয়ার অপচেষ্টা। কারসাজি।
শ্রীময়ী লম্বা একটা শ্বাস ফেলল। মিতুলটা চিরকাল বাপমুখীই রয়ে গেল। তার এত ধৈর্য, এত পরিশ্রম, লড়াই দু যুগ ধরে দেখছে মেয়ে, এত কাছ থেকে, তবু মন বদলাল না। এ কি অতি নৈকট্যের পরিণাম? শুধু দূরে থাকার জন্যই কি জিতে গেল সোমনাথ?
ছি ছি, এসব কী ভাবনা! একটা মানুষ জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এখন, প্রাণটা শুধু মুহূর্তের সুতোয় ঝুলছে, এখন কি ওসব জেতা হারা নিয়ে ভাবার সময়? না হয় শ্রীময়ী না গেল, কিন্তু মনটাকে এত ছোট করছে কেন? এক সময়ে মানুষটার সঙ্গে একটা সম্পর্ক ছিল, সেই সুবাদেও তো তার শুভ কামনা করা যায়।
চোখ বুজে শ্রীময়ী বিড়বিড় করে উঠল,—আহা, বেঁচে থাক সোমনাথ। এ যাত্রা বেঁচে যাক।
—আপ লেট গয়ে মা-জি?
শ্রীময়ী চোখ খুলেছে। ঘরে পিঙ্কি, তার ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে একটু যেন জিজ্ঞাসা,—তবিয়ৎ ঠিক নেই লগ রহা হ্যায় কেয়া?
আড়ষ্ট হাসল শ্রীময়ী,—না রে, ঠিকই আছি।
—নিকলেঙ্গে নেহি?
—এই বেরোব।
—মেরে বারে মে আপ কুছ সোচা হ্যায় কেয়া?
—কি ব্যাপারে বল তো?
—ওহি ফ্রিজ কি বারে মে?
—নিস খন। আগে নতুনটা তো কিনি।
একটু বুঝি উজ্জ্বল হল পিঙ্কির মুখ। স্মিত মুখে বলল,—তো অভি ম্যায় চলুঁ?
—আয়। সদরটা ভালো করে টেনে দিয়ে যাস।
ইয়েল-লক বন্ধ হওয়ার শব্দ হতেই শ্রীময়ী উঠে পড়ল। শাড়ি বদলে গায়ে শাল জড়িয়ে নিয়েছে। ঝলক উঁকি দিয়ে নিল ব্যাগের অভ্যন্তরে, বই টই সব ঠিক আছে কিনা বুঝে নিল। তারপর আকাশটাকে দেখে ছাতাও নিয়ে নিয়েছে একটা। বৃষ্টি হোক না হোক, সাবধানের মার নেই।
বাড়ি থেকে বাসস্টপ হেঁটে গেলে মিনিট সাতেক। রাস্তায় বেরিয়ে শ্রীময়ী টের পেল শীত আজ একটু বেশিই আছে। সিমলার দিকে কি বরফ পড়ল? ঠান্ডা হাওয়া মাঝে মাঝেই ঝাপটা দিচ্ছে গায়ে, শাল ফুঁড়ে। পথ এখন জনবহুল, দু-পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাঁটছে পথচারীরা। উঁহু, হাঁটছে নয়, ছুটছে। এই শহরে সকাল দশটার সময়ে শুধু শুধু হাঁটে না কেউ।
আকাশে ছানা কাটা মেঘ। নিস্তেজ রোদ্দুর। গোমড়া আকাশের নীচে পৃথিবীটাকে ভারী মনমরা দেখায় এখন। প্রকৃতির বিষণ্ণতা শ্রীময়ীর মধ্যেও চারিয়ে যাচ্ছিল। হাজার মাইল দূরের এক শহর কল্পদৃশ্য হয়ে উঠছে চোখের সামনে। শ্রীময়ীর অজান্তেই। ওখানে কোন নার্সিংহোমে আছে সোমনাথ? অল্প অসুখেই সোমনাথ ভারী কাতর হয়ে পড়ত। শ্রীময়ী ঠাট্টা করে বলত, আজুলি! একমাত্র ছেলেকে আদর দিয়ে দিয়ে ননীর পুতুল করে গড়েছে বাপ-মা! থার্মোমিটারের পারা একশো ছুঁয়েছে কী ছোঁয়নি, ওমনি বাড়ি কাঁপিয়ে চিলচিৎকার! আমি আর বাঁচব না ময়ী! আমার দিন ফুরিয়ে গেছে, লোকজনকে ডাকো, শেষ দেখা দেখে যাক! শুনতে পাচ্ছ, পূর্বপুরুষেরা ডাকছে, সনু আয় সনু আয় ...! সঙ্গে দু-চারটে হাঁচি হলে তো আর কথাই নেই, দুম করে বাবু ফিরে এলেন কোর্ট থেকে! পোশাক-আশাকটি পর্যন্ত ছাড়বেন না, ধরাচূড়ো পরেই শয্যাগ্রহণ, আর অবিরাম প্রলাপ আর আবদারের ফুলঝুরি! ময়ী, আমার পিঠে মালিশ করো! ময়ী, আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও! এক্ষুনি ঠান্ডাগরম জল নিয়ে এসো, পা ডোবাবো! ডাক্তার এল না কেন এখনও, খবর দেয়নি! কী বলছে ডাক্তার, কখন আসবে! আমি অক্কা পাওয়ার পর! ও হো হো হো, কাজের লোকেরা সব গেল কোথায়! আমার জন্য খাট কিনে আনুক! আমার বোম্বাই খাট চাই, মজুমদার বাড়ির ছেলে কিন্তু চারপাই চড়ে শ্মশানে যাবে না!
সেই মানুষের কিনা হার্ট অ্যাটাক!
বাস এসে গেছে। ডিপো কাছেই, এখান থেকে উঠলে বাসে সিট পাওয়া যায়, জানলার ধারে জায়গাও পেয়ে গেল শ্রীময়ী। পাশে এক দশাসই চেহারার সর্দারনি। মোটামুটি লম্বা সিটেও অকুলান হচ্ছে দুজনের। কৃশতনু শ্রীময়ী আরও চেপে গেল জানলায়। ছুরি ছুরি বাতাস ঝাপটে পড়ছে নাকে মুখে, কাচটা নামিয়ে দিল আস্তে করে।
অস্বচ্ছ কাচের ওপারে শ্রীময়ীর চোখ। পটপড়গঞ্জের ফাঁকা রাস্তা অতিক্রম করে পাণ্ডবনগরে ঢুকছে বাস, রেলব্রিজে উঠল। দূরগামী ট্রেনলাইন আবার আনমনা করে দিচ্ছে শ্রীময়ীকে। শেষ পর্যন্ত স্ট্রোক হল সোমনাথের? স্ট্রোক হলে বুকে নাকি অসহ্য যন্ত্রণা হয়। বাবা বলত, বাঘে আঁচড়ানোর যন্ত্রণা। নিশ্চয়ই কাটা ছাগলের মতো ছটফট করেছে সোমনাথ! আশ্চর্য, ওই সময়ে নাকি শ্রীময়ীর কথা মনে পড়েছে! অসম্ভব, এ কথা কখনও সত্যি হতে পারে না। শ্রীময়ীর কথা কখনও কোনোদিনই ভাবেনি সোমনাথ, আজ অসুস্থ হয়ে ...। কিন্তু মিতুল বানিয়েই বা বলবে কেন? সোমনাথ সম্পর্কে শ্রীময়ীর মনে দুর্বলতা জাগিয়ে মিতুলের লাভ কী? গত পঁচিশ বছরে নিশ্চয়ই অজস্রবার রোগব্যাধি হয়েছে সোমনাথের। এক-দুবার তো মিতুল কাছেও ছিল। সেই যে সেবার কলেজে পড়ার সময়ে সামার ভেকেশনে কলকাতা গেল মিতুল, ফিরে এসে বলেনি সোমনাথের ম্যালেরিয়া হওয়ার গল্প? একশো ছয় অবধি নাকি জ্বর উঠে গিয়েছিল সোমনাথের, কখনও কুঁই কুঁই করছিল, কখনও নাকি ছোটবেলায় পড়া পাঠ্যবই-এর কবিতা চিৎকার করে আউড়ে যাচ্ছে...! বলতে বলতে হেসে লুটিয়ে পড়েছে মিতুল, কিন্তু কই অসুখে প্রলাপের ঘোরে শ্রীময়ীর নাম করেছে সোমনাথ এ কথা তো কখনও বলেনি!
আইটিও ব্রিজ ধরে ছুটছে বাস। নীচে একফালি যমুনার স্রোত, নর্দমার মতো। কুয়াশা এখনও পুরোপুরি মোছেনি, অদূরে পন্টুন ব্রিজ ঝাপসা ঝাপসা। ব্রিজ নয়, যেন একটা খেলনা সেতু।
কিংবা জীবন-মৃত্যুর মধ্যিখানে টলমল সাঁকো।
বন্ধ জানলা ভেদ করে হিমরেণু ছুঁয়ে গেল শ্রীময়ীকে। লোকটা কি তাহলে সত্যি সত্যি মরে যাবে?
শ্রীময়ীদের কলেজটা বিশাল। আয়তন, ছাত্রীসংখ্যা দুটোতেই। বেশ কয়েক একর জায়গা জুড়ে ঘেরা কম্পাউন্ড, তিনটে দারুণ ঝকঝকে অতিকায় বিল্ডিং, বিশাল বিশাল দুখানা মাঠ, মাঠ ঘিরে মনোরম ফুলবাগিচা ...। একটা মাঠে হকি খেলে মেয়েরা, অন্যটায় বাস্কেটবলের কোর্ট। বাগান এখন ছেয়ে আছে মরশুমি ফুলে। ডালিয়া জিনিয়া গাঁদা চন্দ্রমল্লিকা ...। গোলাপও ফুটেছে। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড। হরেক রংয়ের। লাজপৎনগরের এই মহিলা কলেজটির দেশজোড়া সুনাম। পড়াশোনার জন্যও বটে, খেলাধুলোর জন্যও বটে। হাজার দেড়েকের মতো ছাত্রী আছে কলেজে। সায়েন্স আর্টস কমার্স মিলিয়ে। এই শীত ছুঁই ছুঁই ঋতুতে উজ্জ্বল পোশাকে শোভিত উচ্ছল মেয়েরা এখন প্রস্ফুটিত কুসুম।
কলেজে ঢুকেই হিমেল ভাবনাগুলো মন থেকে মুছে গেছে শ্রীময়ীর। এখন সে ব্যস্ত অধ্যাপিকা, ক্লাস ছাড়া কিছু ভাবার সময় নেই। একটুও অন্যমনস্ক না হয়ে পর পর দুটো পিরিয়ড সারল। ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাসটায় ধকল গেল খুব। নতুন ব্যাচটা কেমন যেন, ডিটারমিন্যান্টের সহজ অধ্যায়টাও কী রকম শূন্য চোখে গিলছিল! এদের পিছনে খাটতে হবে অনেক। লাস্ট ইয়ারে এ কলেজে ম্যাথসের রেজাল্ট তত ভালো হয়নি, এ নিয়ে প্রিন্সিপালও দু-তিনবার কাঁই কাঁই করেছেন। শ্রীময়ীরই কি বোঝানোর ত্রুটি হচ্ছে কোনও?
দেড়টা নাগাদ স্টাফরুমে এসে শ্রীময়ী টিফিন কৌটো খুলল। অভ্যাস মতোই। পাঁউরুটি ছিঁড়ছে, মুখে তুলছে, চিবোচ্ছে, গিলছে। বিস্বাদ মুখে।
বুকের মধ্যে টিপটিপ ভাবটা ফিরে এসেছে আবার। মিতুলের ডাক কি উপেক্ষা করবেন শ্রীময়ী? করা কি উচিত?
স্টাফরুমের ওদিকের কোণে গজল্লা চলছে জোর। রেশমি মঞ্জরী কুসুম আর পারমিতা কী নিয়ে যেন তর্ক জুড়েছে। পারমিতা কলকাতার মেয়ে, বিয়ে হয়ে দিল্লি এসেছে, কোনো ব্যাপারেই সে অন্যদের সঙ্গে একমত হয় না, তাকেই বোধহয় খ্যাপাচ্ছে অন্যরা।
হ্যাঁ, ঠিক তাই। পারমিতা গলার শির ফুলিয়ে বলছে,—তুমহারা দিল্লিকা কোই আপনা ক্যারেকটার হ্যায় কেয়া? সবই তো তোমাদের ধার করা। এমনকী সিজনগুলোও।
—উয়ো ক্যায়সে? মধ্যবয়সি কুসুম সহায় চোখ বড় বড় করে তাকাল।
—বোঝ না? দ্যাখো না? টেরও পাও না? রাজস্থান গরম হলে তোমাদের এখানে সামার আসে। হিমাচল প্রদেশে স্নোফল হলে দিল্লির ঠকঠক করে কাঁপা শুরু হয়। এখানকার পলিটিকাল লিডারগুলোও তো ধার করা। দিল্লি, শুধু দিল্লির কোনও লিডার আছে? ওই নেহরু ফ্যামিলি ছাড়া? ইনফ্যাক্ট, তাদেরও তো অরিজিন...
—এত গজগজ করছিস কেন রে? তোদের কলকাতার লিডাররা দিল্লিতে পাত্তা পায় না বলে?
—আরে যাহ, আমাদের জ্যোতি বসু তো আর একটু হলেই প্রাইম মিনিস্টার হত।
—হুয়া কিঁউ নেহি? হমলোগ মনা কিয়া থা কেয়া?
—না হয়ে তো ভালোই হয়েছে। মঞ্জরী কার্লেকার ফোড়ন কাটল,—জ্যোতি বসু প্রাইম মিনিস্টার হলে দিল্লি ক্যালকাটা বনে যেত।
—বনধ বনধ, সব বনধ। রেশমি ফুট কাটল,—চাককা বনধ, অফিস বনধ, ফ্যাক্টরি বনধ, রাস্তা বনধ...
উত্তরে কী যেন বলল পারমিতা, ঠাট্টাচ্ছলে মন্তব্য ছুঁড়ল কৃষ্ণা। দোহারকি দিচ্ছে মঞ্জরী, পারমিতার মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। শ্রীময়ী মুখ ফিরিয়ে নিল। কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের নিন্দা প্রশংসা তাকে বড় একটা ছোঁয় না। মাঝে কটাই বা বছর ছিল কলকাতায়! এবং সেই বসবাসের স্মৃতিও এমন কিছু সুখস্মৃতি নয়। মঞ্জরী অবশ্য দিল্লির হয়ে লড়াই করছে শুধু পারমিতাকে উত্তেজিত করার জন্যে, শ্রীময়ী জানে। নইলে এমনিতে মঞ্জরীরাও দিল্লি নিয়ে এমন কিছু আপ্লুত নয়, হরবখতই দিল্লির সমালোচনা করে। কখনও পলিউশান, তো কখনও ভি আই পি উৎপাত, কখনও ওয়াটার লগিং, কখনও লোডশেডিং...।
আবার চিন্তাটা কড়া নাড়ছে বুকে। শ্রীময়ীকে কি কলকাতা যেতে হবে? যদি যায়ও সেখানে গিয়ে তার কাজটা কী হবে? সেবা করবে?
ছোট্ট একটা শ্বাস পড়ল শ্রীময়ীর। সোমনাথ মানুষ হিসেবে যত নিকৃষ্টই হোক, সেবার কাঙাল ছিল খুব। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে কেমন আদুরে বেড়ালের মতো কুঁকড়ে মুকড়ে শুয়ে থাকত।
সোহিনী টেবিলে রেজিস্টার রেখে খোঁপা ঠিক করছে। শ্রীময়ীর চোখে চোখ পড়তেই পাশে এসে বসল। হাসিমুখে বলল,—নাস্তা খতম?
শ্রীময়ী মৃদু মাথা নাড়ল,—হুম।
—এখন আর ক্লাস নেই?
—আছে। আড়াইটেয়।
—কটা অব্দি?
—কেন?
—তোকে নিয়ে সরোজিনীনগর মার্কেটে একবার যাব ভাবছিলাম। খুব বড় সেল দিচ্ছে ওখানে। বেডকভার পিলোকভার কিনতে হবে কয়েকটা, ছেলের জন্য একটা লেদার জ্যাকেট ...তুই জামাই-এর জন্য একটা ব্লেজার কিনবি বলেছিলি না?
—আজ থাক।
—কেন বাড়ি ফেরার তাড়া আছে?
—না, তেমন কিছু নয়। এমনিই।
সোহিনী আর কিছু বলল না। ব্যাগ খুলে টিফিন বার করেছে। চাউমিন। খেতে খেতে চোখের কোণ দিয়ে জরিপ করছে বান্ধবীকে।
লঘু সুরে বলল,—আজ ইতনা গুমসুম কিঁউ ভাই?
—তুৎ, গুমসুম হব কেন? শ্রীময়ী সপ্রতিভ হওয়ার চেষ্টা করল। ঝপ করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল,—সোহিনী, তোর একটা চেনা ট্রাভেল এজেন্ট আছে না?
—আছে। কেন?
—কলকাতার একটা টিকিট করে দিতে পারবি? এনি ট্রেন। রাজধানী হলেই ভালো।
—অচানক কলকাত্তা?
শ্রীময়ী বেজায় অস্বস্তিতে পড়ে গেল। বান্ধবীর চোখে চোখ রাখতে পারছে না। মনে হল সোহিনী বুঝি পড়ে ফেলছে তার মন। আমতা আমতা করল শ্রীময়ী। ঠোঁটে ফ্যাকাসে হাসি।
অনেকদিনের পুরনো সখী মিটিমিটি হাসছে,—নাতির জন্য মন কেমন করছে বুঝি?
শ্রীময়ীর হৃৎপিণ্ডটা তড়াং করে লাফিয়ে উঠল। আরে, এ কথাটা তো আগে মাথায় আসেনি! কেন আসেনি? এই বিশ্বসংসারে চার বছরের নাতিই এখন তাঁর প্রিয়তম জন, নাতির বিরহেই যা একটু প্রাণ কাঁদে এখন। সোমনাথ কেন, নাতিকে দেখতে তো যখন খুশি যেতে পারে কলকাতায়। যেতেই পারে। বুমবুম তো রোজই টেলিফোনে ডাকে, দিম্মা এসো, দিম্মা এসো...!
শ্রীময়ীর হাসি চওড়া হল,—বুঝিসই তো, ওই একটাই মায়া আমার এখন। একমাত্র পিছুটান।
—সমঝ গঁয়ে। তু ফঁস গয়ি।...কবে যাবি? ক্রিসমাসের সময় কিন্তু খুব রাশ থাকে।
—তখন নয়। আমি এখনই যেতে চাই।
—এখন?
—হ্যাঁ। কাল পরশু তরশু, যে-কোনও দিন। অ্যাজ আর্লি অ্যাজ পসিবল।
—পাগলি কাঁহিকি! কে তোকে কাল-পরশুর টিকিট দেবে?
—সেজন্যই তো তোকে ধরা। তুই একবার বলেছিলি না, তোর এজেন্ট যখন-তখন এমারজেন্সি কোটায় টিকিট করে দেয়?
—আমার এজেন্ট থোড়াই। আমার বরের এজেন্ট। ও হুটহাট বিজনেসের কাজে এদিক-ওদিক যায় তো...
—ওই হল। বল না ওকে।
—সত্যিই তুই ইমেডিয়েটলি যেতে চাস?
—নয়তো কি জোক করছি?
—এনি প্রবলেম ইন ক্যালকাটা? বাচ্চার শরীর খারাপ?
—না না, সেসব কিছু না। জাস্ট খুব ইচ্ছে করছে, তাই...
সোহিনী শর্মা দু-এক সেকেন্ড স্থির চোখে দেখল বান্ধবীকে। তারপর বলল,—ঠিক হ্যায়, কথা বলে দেখি। হলে কিন্তু চার-পাঁচশো টাকা এক্সট্রা পড়ে যাবে।
—দিতে হয়, দেব।
—বোস একটু, আমি আসছি।
শ্রীময়ীকে অদ্ভুত চোখে দেখতে দেখতে শূন্য টিফিন বক্স ব্যাগে পুরল সোহিনী। দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলে ঘর ছেড়ে।
কীরকম যেন অস্বস্তি লাগছিল শ্রীময়ীর। তার হর্ষ বিষাদ আবেগ উচ্ছ্বাস সবই এখন সুনিয়ন্ত্রিত। বিগত পঁচিশটা বছর তাকে অনেক যুক্তিবাদীও করে দিয়েছে। এমন ঝট মাগনি পট বিয়া গোছের কাজ তার ধাতে নেই। কখনও যে বান্ধবীদের সঙ্গে এদিক-সেদিক বেড়াতে যায় না শ্রীময়ী, তা নয়। তবে সে প্রচুর প্ল্যান প্রাোগ্রাম করে। হিসেব ছকে। যেন উল্টোপাল্টা খরচ-খরচা না হয়, সঙ্গীরা যেন মনোমত হয়, সব হোটেলে আগে থেকে বুকিং থাকা চাই...। অন্তত মাসখানেক ধরে বেরোন হচ্ছে বেরোন হচ্ছে এই উত্তেজনা পোহাবে, তবেই না ভ্রমণে সুখ।
হঠাৎ শ্রীময়ীর খাপছাড়া ইচ্ছেটাকে কি সন্দেহ করল সোহিনী? আন্দাজ করল কিছু? সখিত্ব থাকা সত্বেও সোমনাথকে নিয়ে সোহিনীর সঙ্গে কখনও তেমন খোলামেলা আলোচনা করেনি শ্রীময়ী। তবু সোহিনী আবছা আবছা জানে, বহুকাল আগে শুনেছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে সোহিনীর তা মনে পড়ার কথাই নয়। তাছাড়া সত্যিই তো নাতির কাছে যাচ্ছে শ্রীময়ী, সোমনাথ তো উপলক্ষ মাত্র!
হ্যাঁ, সোমনাথ উপলক্ষই। বুমবুমের আকর্ষণেই শ্রীময়ী কলকাতা ছুটছে।
চিন্তাটায় শ্রীময়ী ভারী তৃপ্তি বোধ করল। মাথা নাড়ছে আনমনে।
সোহিনী মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ফিরে এসেছে। ঘাড় দুলিয়ে বলল,—যা, হয়ে যাবে। তবে রাজধানী হবে না। কালকা। সাড়ে তিনশো এক্সট্রা পড়বে। এসি থ্রি টায়ার।
—কবেকার টিকিট?
—কালকের। কাল ভোরে।
—কালই?
—বারে, তুই তো তাড়াতাড়ি যেতে চাইলি! ব্যাগ থেকে কাগজ বার করে খসখস একটা নামঠিকানা লিখে দিল সোহিনী,—টাকা নিয়ে সন্ধে সাতটার মধ্যে এখানে পৌঁছে যাবি। একেবারে তোর নামে টিকিট দিয়ে দেবে।
ঠিকানাটা আলগা দেখল শ্রীময়ী। কালকাজি। সর্বনাশ, চারটে পঁয়তাল্লিশ অবধি ক্লাস, তার মধ্যেই বাড়ি ঘুরে সাতটায় পৌঁছোন যাবে? ব্যাগে আছে কত? মেরে কেটে পাঁচ- ছশো। কালকাজি থেকে দাদার বাড়ি দূর নয়, সোজা সেখানে গিয়ে টাকাটা নিয়ে চলে যাবে ট্রাভেল এজেন্টের কাছে? দাদার কাছে টাকা চাইতে দ্বিধা আছে শ্রীময়ীর। কেন যে দ্বিধা? কখনও চায়নি বলে? উঁহু, একবার চেয়েছিল। ফ্ল্যাট কেনার সময়ে। সে অবশ্য অনেক, হাজার পঞ্চাশ মতো। দাদার মুখটা পাংশু হয়ে গিয়েছিল। বলেছিল অফিসে গিয়ে কথা বলে দেখি, যদি লোন টোন পাওয়া যায়...।
সোহিনী বুঝি বান্ধবীর মনের কথা টের পেয়ে গেছে। আলগা ঠেলল শ্রীময়ীকে,—কী রে, কাছে টাকা নেই বুঝি?
—কম পড়ছে। শ্রীময়ী লাজুক হাসল,—মানে প্ল্যান তো ছিল না...
—কিৎনা চাহিয়ে? পাঁচশো? হাজার?
—হাজার মতো হলে...তোর অসুবিধে হবে না? মার্কেটিং যাবি বলছিলি?
—তোর দরকারটা আরজেন্ট। সোহিনী ব্যাগ খুলে নোটের বান্ডিল বার করল। দশটা একশো টাকার নোট গুণেও কী ভেবে আরও দুটো একশো বাড়িয়ে দিল শ্রীময়ীকে,—বারোশোই রাখ। মার্কেটিং আমি কাল-পরশু করব। ... বাই দা বাই, কাল ভোরে বেরোবি, ঘরে টাকা আছে তো?
—তা আছে।
—তাহলে আর কী! যা, কটা দিন নাতির সঙ্গে মস্তি করে আয়। ... ক্রিসমাসের আগে ফিরছিস, নাকি একদম ছুটি কাটিয়ে...?
—না না, ম্যাক্সিমাম সাত দিন।
ক্লাসের বেল পড়ল। সোহিনী ক্লাসে গেল। শ্রীময়ীর এ পিরিয়ডটাও অফ, কাগজে ছুটির দরখাস্ত লিখতে বসল শ্রীময়ী।
লিখতে লিখতে থামল একটু। সন্ধেবেলা চিত্তরঞ্জন পার্কেও ঘুরে আসবে কি? দাদাদের কিছুই না জানিয়ে চলে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? মাকেও তো একবার অন্তত...।
ভেতরে ভেতরে চোরা এক সংকোচ টের পাচ্ছিল শ্রীময়ী।
শ্রীময়ীর বাপের বাড়ি এখন আনন্দের ঝরনা। চিত্তরঞ্জন পার্ক কালীবাড়ির কাছেই এ বাড়িটায় হইহল্লা একটু বেশি হয়, চিরকালই। শ্রীময়ীর বাবা অবিনাশ মানুষটাও ছিলেন হুল্লোড়ে ধরনের, বংশধরদের মধ্যে সেই ধারাটা রয়ে গেছে। হয় বাবলু ঝ্যাং ঝ্যাং গিটার বাজাচ্ছে, নয়তো ফুল ভলিউমে টেপ, নতুবা তুতুলের ভারতনাট্যমের রেওয়াজ চলছে ঝমঝম। কোনও কিছুই না করলে শুরু হয় ভাইবোনের খুনসুটি। বাবলুই বিচ্ছু বেশি, সে এখন থার্ড ইয়ার বি কম, দিদিকে চটিয়ে দেওয়ায় সে অত্যন্ত দক্ষ। এমন চিমটি কাটা কাটা মন্তব্য করে তুতুলদের নাচের ট্রুপ নিয়ে! খানিকক্ষণ ভায়ের সঙ্গে সমানে সমানে পাল্লা দেয় তুতুল, তারপর আর পেরে ওঠে না। হয় হাউমাউ চেঁচায়, নয় পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসে। তুতুলের কান্নাও এ বাড়ির খুশির অঙ্গ।
আজও সবই চলছে। পুরো মাত্রায়। তুতুলের আসন্ন বিবাহসম্ভাবনায় বাড়ি একেবারে গুলজার। শ্রীময়ী এ বাড়িতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে তুতুল পিসির গা ঘেঁষে এসে বসেছিল, বকম বকম করছিল। পিসির সঙ্গে তুতুলের অনেক মনের প্রাণের কথা হয়। শ্রীময়ী নাকি তুতুলের নাচের প্রকৃত সমঝদার। সামনের মাসে তুতুলদের ট্রুপ একটা ডান্সড্রামা নামাচ্ছে, হ্যাবিট্যাট সেন্টারে ফার্স্ট শো, তাই নিয়ে তুতুল রীতিমতো উত্তেজিত। বাবলু মাঝে মাঝে এসে চোখা চোখা বিদ্র+প ছুঁড়ছিল, রেগেমেগে তুতুল উঠে চলে গেল।
একটু ফাঁক পেতেই মা-র ঘরে গেল শ্রীময়ী। অশীতিপর সুধাময়ীর এর মধ্যেই ঠান্ডায় বেশ জবুথুবু দশা, কুঁকড়ে মুকড়ে বসে আছেন বিছানায়।
তিরতির দুশ্চিন্তার মাঝেও শ্রীময়ী হেসে ফেলল। বিছানার কোণে বসে বলল, — হল কী তোমার? ডিসেম্বর পড়তে না পড়তেই এত কাহিল?
—হমু না? বাতাস যে বিঁধতাসে!
সুধাময়ী এখনও ওপার বাংলার বুলি ছাড়তে পারেননি। নাতি-নাতনিরা কত খ্যাপায়, তবুও না। অবিনাশ নিজের ভাষা দিব্যি বদলে নিয়েছিলেন, কিন্তু সুধাময়ী পারেননি। হয়তো বা এই সুতো ধরেই কোনও দূর অতীতে পৌঁছে যান তিনি।
এই ঝকঝকে রাজধানীতে মোটামুটি আরামে বাস করে বিষণ্ণ অতীতের স্মৃতি বয়ে বেড়ানো কি সুধাময়ীর মূর্খামি? শ্রীময়ীর অন্তত আজ তেমনটা মনে হল না।
মৃদু স্বরে বলল,— মা, আমি কাল কলকাতা যাচ্ছি।
ছানি পড়া চোখের মণি একটু উজ্জ্বল হল,—মিতুলের কাসে? বাহ, খুব ভালো। আওনের সময় আমার লেইগ্যা আমসত্ব আনিস তো।
—আনব।
—ওহানে এহন নতুন গুড় উঠসে না?
—উঠেছে নিশ্চয়ই।
—তাইলে কয়খান পাটালি আনবি।
শুধু নিজের খাওয়ার বাইরে আর কোনও কৌতূহলই নেই সুধাময়ীর। মিতুল, নাতজামাই, বুমবুম কারোর সম্পর্কে না। সোমনাথের অসুখের সংবাদ কি মা-র মগজে ঢুকবে? ঢুকলেও কী প্রতিক্রিয়া হবে কে জানে! হয়তো ডুকরে কেঁদে উঠবেন, কিংবা ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকবেন! সোমনাথকে কি আদৌ মনে আছে মা-র?
তাপসী এসেছে দরজায়। হাতে চায়ের কাপ, জলখাবারের প্লেট। শ্রীময়ীকে জিজ্ঞেস করল,—তোমাকে কি এখানেই দেব?
—না, টেবিলে রাখো। আসছি।
একটুক্ষণ দোনামোনা করে মা-র ঘর ছাড়ল শ্রীময়ী।
ডাইনিং টেবিলে এসে বসতেই তাপসী বলল,—জানো তো, একতলায় কী কাণ্ড হয়েছে! ওই গোয়েলটা কাল বেধড়ক বউ ঠেঙাচ্ছিল ...মদ খেয়ে চুর...কীসব মুখের ভাষা...! পাড়াটা একেবারে ঝোপড়পট্টির বেহদ্দ হয়ে গেল।
শ্রীময়ী ভুরু কুঁচকোল,—এখন একতলায় কোনও গোয়েল আছে বুঝি? সামন্তবাবুরা উঠে গেছেন?
—ওমা, সে তো কবে...। দেড় মাস হয়ে গেল।...ও, তুমি তো এর মধ্যে আসোনি।
এই দোতলা বাড়ির একতলাটা শ্রীময়ীর কাকার ভাগে। কাকা বাবার আগেই গত হয়েছেন, খুড়তুতো ভাই কমলেশ মা বউ বাচ্চা নিয়ে বহুকাল আগে চলে গেছে ব্যাংগালোর। একতলাটা কোম্পানিকে লিজ দিয়ে গেছে, ঘন ঘন ভাড়াটে বদলে যায়। আগে বাঙালি ভাড়াটেই আসত, ইদানীং অবাঙালিও আসছে মাঝে মাঝে। সামন্তবাবুর আগে ছিল এক সর্দার, তার আগে এক ইউ পি-অলা। বাঙালি কলোনি বলে খ্যাত এই অঞ্চলে আজকাল অবাঙালি বেড়েছে খুব, অনেকেই মোটা টাকা পেয়ে বাড়ি পর্যন্ত বেচে দিচ্ছে। কী আর করা, সর্বত্রই তো এখন বাঙালিদের পিছু হঠার সময়।
তাপসী আবার বলল,—তুমি ছেলেদুটোর ছবি দেখেছ?
—কোন ছেলে?
—যে সম্বন্ধগুলো এসেছে। একজন ইঞ্জিনিয়ার, রুড়কি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের। গুরগাঁওয়ে সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে আছে। বেশ ভালো পোস্টে। অন্যজনের বিজনেস। ওষুধের। কনট প্লেসে অফিস...
শ্রীময়ীর এসব প্রসঙ্গে মন বসছিল না। তবু জিজ্ঞেস করল,—ছেলেরা তুতুলকে দেখে গেছে?
—গেছে মানে? দুজনেরই তো তুতুলকে খুব পছন্দ। আমরাই এখন দোটানায় পড়েছি। ... দুটো ছেলেরই ফ্যামিলি এত ভালো! ...ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটি অবশ্য দিল্লির নয়, লখনউ-এর।
অরুণেশ অফিস থেকে ফিরেছে। ষাট ছুঁই ছুঁই অরুণেশের স্বাস্থ্য এখনও বেশ ভালো, নির্মেদ শরীরে বয়স এখনও দাঁত ফোটাতে পারেনি। চটপট জামাকাপড় বদলে, বাথরুম ঘুরে সেও এসে বসে পড়েছে ডাইনিং টেবিলে। স্ত্রী আর বোনের কথোপকথন শুনছে। বিনা মন্তব্যে।
শ্রীময়ী দাদাকে আলগা দেখে নিয়ে বলল,—তুতুলের কোন ছেলেকে পছন্দ?
—সে তো জিজ্ঞেস করলেই মুখ ভ্যাটকায়। তাপসী ঠোঁট উলটোল,—তার তো মনে হয় কাউকেই পছন্দ নয়।
—তাহলে এগোনোর দরকার কী! আরও ছেলে দ্যাখো।
—হাতে সময় তো অঢেল নেই ভাই। তোমার দাদার জুনে রিটায়ারমেন্ট, তার আগে দায়িত্বটা তো সেরে ফেলতে হবে।
বউদির বক্তব্যে যুক্তি আছে, শ্রীময়ী চুপ করে গেল। নিজের কথাটা কিছুতেই পাড়া যাচ্ছে না, কেবলই মনে হচ্ছে একটা ছন্দপতন ঘটে যাবে।
তাপসী ফের বলল,—তুমি একবার তুতুলকে বোঝাও না ভাই। ও তো তোমার কথা খুব মানে।
—আহা, আমি কী বলব! পছন্দ অপছন্দটা তো সম্পূর্ণ ওর ব্যাপার। তুতুল যথেষ্ট ম্যাচিওর মেয়ে, ওর ভালোমন্দ ও ঠিক বোঝে।
—অন্তত একটু কায়দা করে জানো সত্যিই অপছন্দ, নাকি...
শ্রীময়ী অস্বচ্ছন্দ বোধ করছিল এবার। নিজের মেয়ের ব্যাপারেই সে কোনোদিন মাথা গলায়নি। মিতুল যখন দুম করে একদিন সুগতকে বাড়িতে হাজির করেছিল, একটিও কূট প্রশ্ন তোলেনি শ্রীময়ী। না সুগতর ভবিষ্যৎ নিয়ে, না অতীত নিয়ে। সুগত খুব ভালো ছেলে, সুগতকে শ্রীময়ীর খুবই পছন্দ, তবে সুগত অপছন্দসই হলেও মেয়ের জীবনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকারে সে কক্ষনো হস্তক্ষেপ করত না। তার জীবনদর্শন, তার অভিজ্ঞতা তাঁকে এই শিক্ষাই দিয়েছে। যার নিজের নৌকোই ভাঙাচোরা, তার কি অন্যকে সমুদ্র সাঁতরানোর উপায় বাতলানো সাজে! সে হোক না মেয়ে, হোক না ভাইঝি।
তাপসী নীচু স্বরে বলল,—কী গো, তুতুলকে নিয়ে বসবে ওঘরে?
—থাক না বউদি, আজ ভাল্লাগছে না।
—আহ, ছাড়ো না। ওকে বোর করছ কেন? অরুণেশ স্ত্রীকে মৃদু ধমক দিল,—যাও তো ওঘর থেকে আমার সিগারেটের প্যাকেটটা এনে দাও তো।
অপ্রসন্ন মুখে সরে গেল তাপসী।
অরুণেশ স্থির চোখে বোনকে দেখছে বলল,—তোর কী হয়েছে রে আজ? মুখচোখ এত শুকনো লাগছে কেন?
দাদার স্বরে স্নেহের আভাস। বুকটা হঠাৎ চিনচিন করে উঠল শ্রীময়ীর। দাদা তেমন একটা বড় চাকরি করে না, এই রাক্ষুসে খরচের শহরে মেপে জুপে সংসার চালায়, হয়তো অনেক সময়ই দাদা তাকে প্রয়োজনীয় সাহায্য দেয়নি, তবু এখনও তো বোনের মন পড়তে পারে। আজকের দুনিয়ায় এটাই বা কম কী!
শ্রীময়ী প্রায় মুখ ফসকেই বলে ফেলল,—দাদা, তোকে একটা কথা বলার ছিল।
—কী রে?
—আজ সকালে মিতুলের ফোন এসেছিল। শ্রীময়ী গলার স্বর যথাসম্ভব সহজ রাখল,—মিতুলের বাবার স্ট্রোক হয়েছে। আজ ভোরে।
অরুণেশের সিগারেট হাতে ফিরছিল তাপসী, থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। বিস্মিত প্রশ্ন ঠিকরে এল গলা থেকে,—সে কী?
শ্রীময়ী নির্বিকার থাকার চেষ্টা করল। মাথা নাড়ছে ধীর লয়ে।
অরুণেশ কয়েক পল নীরব। তারপর জিজ্ঞেস করল,—সোমনাথের কি প্রেশার টেশার ছিল নাকি?
—বলতে পারব না।
—মিতুল কী বলল? কন্ডিশান কেমন?
—ক্রিটিকাল। আই সি ইউতে আছে। শ্রীময়ী বড় করে একটা শ্বাস ভরল ফুসফুসে। একটু থেমে থেকে বলল,—আমি কাল ভোরে একবার কলকাতা যাচ্ছি।
—তুই! অরুণেশ ভীষণ চমকেছে,—তুই যাবি?
—উপায় নেই রে দাদা। মিতুল খুব নার্ভাস হয়ে পড়েছে। বারবার করে এক্ষুনি চলে আসতে বলছে। শ্রীময়ী গড়গড় করে বলে ফেলল কথাগুলো। এক নিশ্বাসে।
ঘরের আবহাওয়া থমথমে হয়ে গেছে সহসা। অরুণেশ সিগারেট ধরাল একটা। হেলান দিয়ে বসেছে সোফায়, ভুরুতে ভাঁজ। তাপসী আড়ে আড়ে দেখছে স্বামী ননদকে।
শ্রীময়ী আন্দাজ করতে পারছিল দাদা কী ভাবছে। বিস্মিত হওয়াই তো স্বাভাবিক। সোমনাথের ওপর বোনের যে কী তীব্র ঘৃণা, কম দিন ধরে তো দেখেনি দাদা। শ্রীময়ীর স্মরণে এল অনেক অনেক কাল আগে, কলকাতা ছেড়ে দিল্লি চলে আসার পর পরই দাদা দু-একবার মিটমাটের কথা তুলেছিল, ঠারে ঠোরে। শ্রীময়ী বিরক্ত হয়েছিল খুব। বাবা পুরোপুরি মেয়ের পক্ষে ছিলেন বলে শ্রীময়ীকে তেমন কোনও মানসিক চাপে ভুগতে হয়নি। বউদি অবশ্য বরাবরই ননদের প্রসঙ্গে নীরব ছিল, আড়ালে আবডালেও দাদাকে এই নিয়ে খোঁচাখুঁচি করত বলে মনে হয় না। মোটামুটি ভালো মানুষ হওয়া সত্বেও দাদার মধ্যে এখনও কিছু পুরনো সংস্কার রয়ে গেছে! এখন নিশ্চয়ই মনে মনে ভাবছে যাক বুড়ো বয়সে তাও মিনির পতিপ্রেম উথলে উঠল!
নিজে নিজেই আত্মপক্ষ সমর্থনের ভঙ্গিতে শ্রীময়ী বলে উঠল,—তুই তো জানিসই দাদা, মেয়েটা আমার ওপর কীরকম ডিপেন্ড করে। ও এমন হেলপলেস ফিল করছে,... মা হয়ে কী করে ওকে রিফিউজ করি?
—হুঁ। এই সময়টায় তোর তো পাশে থাকাই উচিত। অরুণেশ অ্যাশট্রেতে ছাই ঝাড়ল, —মানে, মিতুলের পাশে। যা, ঘুরে আয়।
তাপসী মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,—মাকে কি তুমি এই কথাই বলতে গিয়েছিলে?
—হ্যাঁ, কিন্তু...
অরুণেশ মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বললেন,—ছাড় তো, মাকে কিছু বলতে হবে না। তেমন বুঝলে আমিই ...। আর এই বয়সে সোমনাথের ভালোমন্দ শুনে মা করবেই বা কী?
—আমিও তাই ভাবছিলাম। ভুরু কুঁচকে কয়েক সেকেন্ড কী যেন চিন্তা করল শ্রীময়ী। তারপরই গলা উঠিয়েছে,—বাবলু ...? বাবলু?
লম্বা লম্বা ঠ্যাঙে আবির্ভূত হল বাবলু। এই শীত শীত সন্ধেতেও তার পরনে সর্টস আর টিশার্ট, ঠান্ডা ফান্ডা লাগে না বোধহয়। চুল ছোট ছোট করে ছাঁটা, বাবা সায়গল প্যাটার্ন। এই মিলিটারি কাটিংটা ইদানীং দিল্লিতে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে।
বোধহয় পড়তে বসেছিল বাবলু, মুখে চোখে হালকা ঘোর লেগে আছে। প্রশ্ন করল,— কী বলছ গো পিসি?
—তুই আমার একটা উপকার করতে পারবি?
—অলওয়েজ অ্যাট ইওর সার্ভিস। শুধু মুখের কথাটি খসাও। ইলেকট্রিক বিল জমা দিতে হবে? নাকি টেলিফোন বিল?
বাবলুর কথাবার্তায় ভারী ঝকঝকে ভাব আছে, সহজেই অন্যের আড়ষ্টতা কেটে যায়। শ্রীময়ী অনেকটা স্বচ্ছন্দ বোধ করল। স্মিত মুখে বলল,—ওসব কাজ তোকে বলি কখনও? অশক্ত হয়ে না পড়া পর্যন্ত নিজের কাজ আমি নিজেই করে নেব।
—দেন হোয়াট?
—আমি কদিন থাকছি না। কলকাতায় তোর দিদির বাড়ি যাচ্ছি। পারলে মাঝে মাঝে গিয়ে আমার ফ্ল্যাটটা একটু দেখে আসিস। যা চারদিকে চুরিচামারি হচ্ছে...! ডুপ্লিকেট চাবিটা এখানে রেখে যাচ্ছি।
বাবলু ভুরু নাচাল,—কদ্দিনের প্রাোগ্রাম?
—দেখি, সুগত কবেকার টিকিট কাটে।
—যাচ্ছ যখন, ওদের সঙ্গে ক্রিসমাসটা কাটিয়েই এসো।
—হবে না রে। এখানে কাজ আছে।
—কাজ নয়, বলো তোমার ঘরের কোণটি ছেড়ে কিচ্ছু ভালো লাগে না। বাবলু হি হি হাসছে,—কোথায় দিদির বাড়ি গিয়ে এক দুমাস হইহল্লা করে আসবে, বুমবুমকে নিয়ে মস্তি করবে, তা নয়...। যাক যে যাক, যাও। তোমার ফ্ল্যাটের সিকিউরিটি এখন আমার চার্জে।
বিনা মন্তব্যে পিসি-ভাইপোর কথোপকথন শুনছিল অরুণেশ তাপসী। একটু যেন বেশি নীরব হয়ে গেছে দাদা-বউদি, মনে হল শ্রীময়ীর। বাবলু চলে যাওয়ার পর আর বসল না বেশিক্ষণ। অসহজ ভাবটা ফিরে আসছে।
অরুণেশ দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এল বোনকে। দায়িত্বশীল অভিভাবকের মতো বলল,—পৌঁছে কিন্তু ফোন করিস, আমি চিন্তায় থাকব।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় দশটা বেজে গেল। দাদার বাড়ির জলখাবারে পেটটা ভরে গেছে বেশ, আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। চটপট স্যুটকেসটা টেনে জামাকাপড় গুছিয়ে নিল শ্রীময়ী। গোটা পাঁচেক শাড়ি সায়া ব্লাউজ। কোল্ডক্রিম, ময়েশ্চারাইজার, আরও দু-একটা প্রসাধনের টুকিটাকি। এসব না নিলেও চলে, মেয়ের নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু অন্য কারোর জিনিস ব্যবহার করতে বাধো বাধো ঠেকে শ্রীময়ীর। হ্যাঁ, মেয়েও এখন পর।
অজান্তেই শ্রীময়ীর বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস গড়িয়ে এল। পর না হলে মেয়ে সোমনাথের জন্য এত উতলা হয়? বাবা! বাবার কোন কর্তব্যটা করেছে সোমনাথ? মেয়ের বিয়ের সময় পর্যন্ত এল না! শ্রীময়ীকে অপমান করার জন্য মেয়েকে এক সেট গয়না পাঠিয়ে দিল!
ফোন বাজছে। শ্রীময়ীর বুকটা ধক করে উঠল। দৌড়ে গিয়ে ধরেছে। যা ভেবেছে, তাই। মিতুলই।
—মা, কোথায় ছিলে? আমি তিন তিনবার তোমায় রিং করেছি।
শ্রীময়ী গলাটাকে শীতল করে ফেলল,—কী খবর?
—একটুও ভালো না মা। সুগত এইমাত্র নার্সিংহোমে চলে গেল, রাতে থাকবে। বাবার প্রেশার অসম্ভব ফ্লাকচুয়েট করছে। ডাক্তার অ্যাপ্রিহেন্ড করছে হয়তো আবার একটা...
শ্রীময়ী নিরস স্বরে বলল,—আমি কাল ভোরের কালকা মেলে যাচ্ছি।
—তুমি আসছ মা? মিতুলের গলা ঠিকরে উঠল।
কোচ নাম্বার জানিয়ে ফোন রেখে দিল শ্রীময়ী।
গোছগাছ শেষ। ঘড়িতে চারটেয় অ্যালার্ম দিয়ে শ্রীময়ী বিছানায় এল। ক্লান্ত লাগছে, ঘণ্টা কয়েকের ঘুম এখন ভীষণ জরুরি।
আলো নেবাতেই কেন যেন দাদার মুখটা ভেসে উঠল হঠাৎ। দাদা যেন কেমন অদ্ভুত চোখে তাকাচ্ছিল! মিতুলের আহ্বানের যুক্তিটা কি যথেষ্ট বিশ্বাস্য মনে হল না দাদার?
কেন অবিশ্বাস্য মনে হবে? শ্রীময়ী তো মিছে কথা বলেনি! মিতুল কি কান্নাভেজা স্বরে ডাকছে না মাকে? একবার নয়, দুবার নয়, বারবার।
শ্রীময়ী পাশ ফিরল। সংকুচিত ভাবটা ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। নাতিকে দেখতে যাচ্ছে সে, যাচ্ছে মেয়ের মিনতিতে সাড়া দিতে, সোমনাথ তো উপলক্ষ মাত্র। হ্যাঁ, সোমনাথ উপলক্ষই। তার বেশি কিচ্ছু না।
শূন্য ঘরে শ্রীময়ী এখন আর কারোর মুখোমুখি নেই। ঘরে কালচে আঁধার, নিজেকেও বুঝি আর দেখা যায় না। তবু নিজেরই যুক্তি নিজের কাছে এত ফাঁপা লাগে কেন?
তবে কি বালির নীচে স্রোত আছে এখনও...!
ট্রেন যমুনা ব্রিজ পার হতেই শ্রীময়ীর বুকটা থম মেরে গেল। সম্পূর্ণ বাতাসহীন। তারপরই মেঘগর্জনের গুড়গুড় ধ্বনি।
শ্রীময়ী জানলার দিকে চোখ ফেরাল। অন্ধকার কাচ, তার ওপারে পৃথিবীতে এখন নামেই ভোর, কিন্তু ততোধিক অন্ধকার। গতিময় ট্রেন আবছায়া মাখা এক স্টেশন পেরিয়ে গেল।
কেন চলেছে শ্রীময়ী? কীসের আশায়? কোন সোমনাথের জন্য?
কালো কাচে ভেসে উঠল টুকরো টুকরো ছবি। অসংখ্য। নাচছে ছবিরা, দুলছে, গড়াচ্ছে। যেন সময়ের অবিচ্ছিন্ন স্রোতে চলমান দৃশ্য এখন।
দৃশ্য এক
গভীর রাত। তিন বছরের মিতুল অঘোরে ঘুমোচ্ছে বিছানায়। বেডল্যাম্প জ্বেলে ল-এর জার্নাল পড়ছে সোমনাথ। উঁহু, পড়ছে কোথায়, হাই তুলছে ঘন ঘন। চোখ রগড়াচ্ছে।
পঁচিশ বছরের শ্রীময়ী এইমাত্র ঢুকল ঘরে। মুখেচোখে বিরক্তির ছাপ লেগে আছে, ঘামের মতো। এতক্ষণ শাশুড়ির বকর বকর গিলতে হচ্ছিল। স্নেহলতা যতক্ষণ না ঘরের খিল তুলছেন, ততক্ষণ শ্রীময়ীর বিছানায় আসার জো নেই।
ঢকঢক জল খেল শ্রীময়ী। বিছানার ধারে এসে বসেছে। আলতো ঠেলল সোমনাথকে, —এই?
সোমনাথ ধড়মড় করে তাকাল।
—একটা কথা বলব?
—সকালে শুনব। সোমনাথ লম্বা হাই তুলল,—ঘুম পাচ্ছে।
—আহা, শোন না। কাজের কথা।
—জ্বালালে। বলো।
শ্রীময়ী সোমনাথের গা ঘেঁষে এল। একটা হাত তুলে দিয়েছে সোমনাথের কাঁধে। নরম গলায় বলল,—আমার কেমন হাঁপ ধরে যাচ্ছে গো। দিনরাত শুয়ে বসে থাকা, কচর কচর পান চিবোন, পরনিন্দা পরচর্চা...
—বনেদি বাড়ির অন্দর মহলে ওরকমই হয়। শ্রীময়ীর হাত সরিয়ে দিয়ে সোমনাথ সটান শুয়ে পড়ল,—ছিলে তো মাস্টারের মেয়ে, বড়বাড়ির হালচাল তুমি কী বুঝবে!
কথাটা বিঁধল শ্রীময়ীকে, তবু প্রতিক্রিয়াহীন থাকার চেষ্টা করল শ্রীময়ী। বিয়ের পর এই সাড়ে চার বছরে গায়ের চামড়া একটু তো পুরু হয়েছেই।
মুখ হাসি হাসি রেখে আবদেরে সুরে বলল,—আমার ভালো লাগে না গো। একটুও ভালো লাগে না।
—তো আর কী করা যাবে? সোমনাথ নির্বিকার,—মিতুল তো রয়েছে, মেয়ে নিয়ে থাকো।
—মিতুল এখন অনেক সাব্যস্ত। সব নিজে নিজে করতে পারে। কদিন বাদে স্কুলে যাবে। ওর পেছন পেছন কী ঘুরব?
—হুম। একখানা জার্নাল বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে, সরিয়ে সাইড টেবিলে রাখল সোমনাথ,—তো?
—বা রে, বুঝছ না যেন! সোমনাথের শরীরের ওপর আর একটু ঝুঁকল শ্রীময়ী,—আগে তো বলেছি তোমায়!
—কী?
—করি না চাকরি। এখন তো আর আমি নতুন বউ নই।
—ফের ওই কথা? সোমনাথের স্বর ভারী হয়ে গেছে অকস্মাৎ,—ভবানীপুরের চৌধুরীবাড়ির বউ হয়ে ব্যাটাছেলের গায়ে গা ঘসার জন্য তুমি রাস্তায় বেরোবে? কেন? তোমার কি ভাতকাপড়ের অভাব হয়েছে?
শ্রীময়ী মৃদু প্রতিবাদ করল,—আহা, শুধু ভাতকাপড়ের জন্যই বুঝি লোকে চাকরি করে?
—তাহলে আর কীসের জন্যে করে?
—বা রে, অ্যাদ্দিন ধরে যে এত লেখাপড়া শিখলাম, সব বৃথা যাবে? কোনও কাজে লাগবে না? মনে আছে, বাবা কেন আমাকে এ বাড়ির বউ করে এনেছিলেন?
—না থাকার তো কারণ নেই। বংশে একটা বিদুষী বউ আনার শখ ছিল বাবার।
—হ্যাঁ, তোমাদের চৌধুরীবাড়িতে তো ওই জিনিসটাই ছিল না। শ্রীময়ীর স্বর সামান্য বেঁকে গেল। শ্লেষে। পরক্ষণেই স্বাভাবিক। আবার আদুরে ভাব ফিরিয়ে এনেছে গলায়,—অ্যাই, আমি কাগজ দেখে একটা দরখাস্ত ছেড়েছিলাম, ইন্টারভিউও দিয়ে এসেছি। চাকরিটা বোধহয় হয়ে যাবে।
সঙ্গে সঙ্গে সোমনাথ তড়াং করে বিছানায় উঠে বসেছে,—মা জানে?
—না।
—বাবা?
—না।...মানে বলা হয়নি এখনও।
—তোমার আস্পর্ধা তো কম নয়! বাড়ির কাউকে না জানিয়ে তুমি...
—বলব তো সবাইকেই। তোমাকেই আগে বলছি। খারাপ চাকরি তো নয়। মেয়েদের স্কুল। কাছেই, বেলতলায়।
—নো তর্ক। সোমনাথ দাঁত কিড়মিড় করল,—ওসব মতলব ছাড়ো। মন দিয়ে মেয়েটাকে মানুষ করো।
—মেয়ে মানুষ করার জন্য অঙ্কে মাস্টার ডিগ্রি লাগে না। শ্রীময়ীর স্বর তরতর চড়ে গেল,—ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট তো নয়ই।
—ফার্স্ট হয়েছিলে বলে তোমার খুব দেমাক, তাই না? সোমনাথের চোখ জ্বলছে, হিংস্র হয়ে উঠছে মুখ। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,—তোমার চাকরি করা হবে না। অন্তত এই বাড়িতে থেকে।
—কেন হবে না? তোমাদের অসুবিধে হলে আমি ছেড়ে দেব চাকরি।
—নো আর্গুমেন্ট। নো বেচালপনা। ইটস আ ক্যানন।
সোমনাথ বেডল্যাম্প নিবিয়ে দিল।
দৃশ্য দুই
কাগজের একটা খবর নিয়ে সোমনাথের সঙ্গে তর্ক হচ্ছে শ্রীময়ীর। খেলা বা রাজনীতি বা ওই ধরনের কিছু। সোমনাথ যুক্তির পরোয়া করে না। গাঁকগাঁক করে চেঁচাচ্ছে। ঠান্ডা মাথায় নিজের বক্তব্য বলে যাচ্ছে শ্রীময়ী। সোমনাথ আরও রেগে গেল।
—আমার চেয়ে তুমি বেশি বোঝ?
—না বোঝার কী আছে? এটা বুঝতে তো তেমন কিছু মগজ লাগে না।
দরজায় পরদা নড়ে উঠল। স্নেহলতার মুখ। টিটকিরি ছুঁড়ছেন,—আ লো, পণ্ডিত বাপের পণ্ডিত মেয়ের সঙ্গে একটু সমঝে বুঝে কথা বল রে বাপ...!
দৃশ্য তিন
বাড়ির পিছনের নিমগাছে কাক বাসা বাঁধছে। কোত্থেকে কাঠিকুটি জোগাড় করে আনছে কাকদম্পতি, কুটুর কুটুর জড়ো করছে ডালে। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে দেখছে শ্রীময়ী, চোখ উদাস। পাখির সংসারেও স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে ঘর গড়ে, মানুষের বেলায় পুরুষ নারীতে এত বিভেদ কেন? মানুষ অনেক উচ্চস্তরের প্রাণী বলে?
কানে স্নেহলতার অমৃতবাণী উড়ে এল,—ও লো ও বিদ্যের জাহাজ, হেঁশেলে অমন মূর্তিটি হয়ে দাঁড়িয়ে কেন বাছা? খাতা কলম এনে দেব? বসে বসে আঁক কষবে?
শ্রীময়ী বিদ্রুপটা ঝেড়ে ফেলতে চাইল গা থেকে। শক্ত চোয়াল নরম করে যথাসম্ভব মধুমাখা স্বরে বলল,—আপনি সব সময়ে আমার ওপর এত রেগে থাকেন কেন মা?
—শিক্ষাদীক্ষা নেই তো তাই। তোমার মতো বিদ্যেময়ী হলে নয় অন্যরকম হতুম।
—ভালো ব্যবহারের জন্য তো বইপড়া বিদ্যে লাগে না মা। আপনিও তো বড়বংশের মেয়ে, আপনার কথাবার্তা তো একটু অন্যরকম হওয়া উচিত।
—কী? বংশ তুলে কথা? আমার শাশুড়ি হলে তোর জিভ ছিঁড়ে নিত। রাগে চিড়বিড় করছেন স্নেহলতা,—যত বড় মুখ নয়, তত বড়...। আমার শাশুড়ি আমায় এর দশগুণ কথা শোনাত, কত ছেঁচা দিয়েছে, তবু একদিনও মুখে মুখে চোপা করিনি। যদি এ বাড়িতে থাকতে চাস...তুইও করবি না।
—নিজে অত্যাচার সয়েও বোঝেননি, পুত্রবধূর সঙ্গে কীরকম আচরণ করা উচিত? গালাগাল করলে ছেলের বউয়ের মনে কত কষ্ট হয়...
—তুই আমায় জ্ঞান দিচ্ছিস? চোপ।
গর্জনে রান্নাঘর থেকে বেড়ালটা পালিয়ে গেল। দুধের বাটি উলটে দিয়ে।
দৃশ্য চার
হাইকোর্ট থেকে ফিরলেন আদিনাথ চৌধুরী। সঙ্গে তাঁর জুনিয়র সোমনাথ। বাবার সঙ্গে দু-চারটে কথা বলে ঘরে চলে গেল ছেলে।
শ্রীময়ী এদিক-ওদিক দেখছে। সুড়ুৎ করে শ্বশুরমশায়ের ঘরে ঢুকে পড়ল। মাথায় ঘোমটা টেনে বলল,—বাবা...
আদিনাথ আরামকেদারায় গা ছড়িয়েছেন। একটু বুঝি নড়েচড়ে উঠলেন,—কী বউমা?
—একটা কথা ছিল বাবা?
—বলো।
—আমি চাকরি করতে চেয়ে কি খুব অপরাধ করেছি বাবা?
আদিনাথ নিরুত্তর।
—আপনার ছেলে আমায় পারমিশন দিচ্ছে না, মা রাগ করছেন...
আদিনাথের মুখে টুঁ শব্দ নেই। ভারী শরীর ভালো করে ছেড়ে দিলেন ইজিচেয়ারে। চোখ বুজলেন।
—আপনি তো শুধু আমার রূপ দ্যাখেননি বাবা, বিদ্যেটাও দেখেছিলেন। শ্রীময়ী নখ খুঁটছে,—আপনি জ্ঞানী মানুষ বাবা, আপনাকে আর কী বলব? জানেনই তো প্রয়োগ বিনা বিদ্যা নিষ্ফল।
আশ্চর্য, আদিনাথ চৌধুরী এবারও প্রতিক্রিয়াহীন। স্থূল চেহারাটা যেন কোনও মানুষের নয়, যেন একটা গ্র্যানাইট দেওয়াল। যেন সেখানে আছড়ে পড়ে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে কথাগুলো।
তবে আদিনাথ চৌধুরীর নৈ:শব্দ্য ভাঙল একসময়। ভাবলেশশূন্য মুখে বললেন,—তোমার শাশুড়িকে বলো তো আমার জলখাবার দিতে। নীচে ক্লায়েন্ট এসে গেছে, আমি এখন চেম্বারে বসব।
শ্রীময়ী মাথা নীচু করে বেরিয়ে আসছে ঘর ছেড়ে। বধির! বধির!
দৃশ্য পাঁচ
শ্রীময়ী ব্যাংকের পরীক্ষায় বসেছে। পিসির বাড়ি যাচ্ছি বলে লুকিয়ে বেরিয়েছে বলে বুক কাঁপছে টিপটিপ। কোয়েশ্চেন পেপার দিল, ঘোমটা টেনে আড়ষ্ট হাতে লেখা শুরু করেছে। প্রথম হাফ শেষ হল, বেল পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইরে যাচ্ছে পরীক্ষার্থীর দল। খিদেয় শ্রীময়ীর পেট চুঁই চুঁই, তবু চুপটি করে বসে আছে হলে। টিফিন খেতে বাইরে বেরোলে কেউ যদি দেখে ফেলে!
দৃশ্য ছয়
বাড়ি ফিরে পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকছে শ্রীময়ী। সামনে রক্তচক্ষু সোমনাথ। কোনও প্রশ্ন নয়, বাক্যবাণ নয়, চড় আছড়ে পড়ল গালে। বেড়ালছানার মতো ছিটকে পড়ল শ্রীময়ী, দরজায় দাঁড়ানো মিতুল হাউমাউ কেঁদে উঠল।
দৃশ্য সাত
অন্ধকার রাত। ছাদে একা হাঁটছে শ্রীময়ী। বিশাল ছাদের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। আকাশের দিকে তাকাচ্ছে, শক্ত হয়ে যাচ্ছে শরীর। চোখ জ্বলছে। চোয়াল কঠিন হয়ে গেল।
দৃশ্য আট
শ্রীময়ী শুয়ে আছে বিছানায়, দেওয়ালের দিকে মুখ। সোমনাথ টানছে, ফিরছে না শ্রীময়ী। জোর করে শ্রীময়ীকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল সোমনাথ। থাবা বসাচ্ছে শরীরে, শ্রীময়ীর অনাগ্রহ গ্রাহ্য করছে না। ডোলছে, পিষছে আপন মর্জিতে, যেন শ্রীময়ী স্ত্রী নয়, বাজারের বেশ্যা। খিদে মিটতেই সরে গেল সোমনাথ। পোড়া কাঠের মতো পড়ে আছে শ্রীময়ী। গা ঘিনঘিন করছে, বমি আসছে। যেন এক নির্লজ্জ কুকুর চেটে গেছে তাকে।
লাঞ্ছিত শ্রীময়ী শয্যা ছেড়ে উঠল, মাঝরাতে ঢুকেছে বাথরুমে, শাওয়ার চালিয়ে দিল। আহ, নেমে আসছে জলধারা, জুড়োচ্ছে শরীর। জুড়োচ্ছে, জুড়োচ্ছে ...
দৃশ্য নয়
মেয়েকে নিয়ে স্কুলে বেরিয়েছে শ্রীময়ী। অ্যাপ্লিকেশন ছাড়ল পোস্টবক্সে। চুপি চুপি ইন্টারভিউ।
রোজ ছুটছে পোস্ট অফিসে, যেন চিঠি কোনওভাবেই বাড়ি অবধি না পৌঁছয়। একদিন সত্যি সত্যি একটা লম্বা বাদামি খাম। ইউ আর অ্যাপয়েন্টড অ্যাজ এ অফিসার ট্রেনি...
নিজের ওপর যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস আছে শ্রীময়ীর, তবু নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সত্যি চাকরি হল! চিঠি পড়তে পড়তে অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে গেল।
দৃশ্য দশ
বেপরোয়া শ্রীময়ী শাশুড়ি ঠাকরুনের নাকের ডগা দিয়ে গটগট করে অফিস বেরিয়ে যাচ্ছে। ফিরল সন্ধেবেলা। কোর্ট থেকে জলদি জলদি ফিরে এসেছে সোমনাথ। ঘর অন্ধকার করে বসে আছে নির্বাক। চোখটা কেমন ঘোলাটে দেখাচ্ছে সোমনাথের।
দৃশ্য এগারো
পরের দিন একই ছবি।
দৃশ্য বারো
পরের দিনও একই ছবি।
দৃশ্য তেরো
এর পরেই ক্লাইম্যাক্স। সেই ঘটনাটা ঘটে গেল।
শ্রীময়ী অফিসে ঘাড় গুঁজে কাজ করছে। দু-ধারে টাইপরাইটারে আওয়াজ বাজছে খটখট, বিশাল হলঘর জুড়ে কেজো ব্যস্ততা।
হঠাৎ শ্রীময়ী ভূত দেখার মতো চমকেছে। সোমনাথ! শ্রীময়ীর দিকে তাকিয়েও তাকাল না, গটগট ঢুকে গেল বড়সাহেবের ঘরে।
শ্রীময়ীর নিশ্বাস আটকে এল। কেন এসেছে সোমনাথ? ওঘরে ঢুকে কী করছে?
সোমনাথের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শোনা গেল। ঘেরাটোপ ভেদ করে ঠিকরে আসছে সোমনাথের চিৎকার,—ভাবছেন কী, অ্যাঁ? জানেন আমি কোন বাড়ির ছেলে?
বড়সাহেব কী যেন বলছেন নীচু স্বরে, এপারে এল না শব্দগুলো।
আবার সোমনাথ,—হ্যাঁ হ্যাঁ, দিস ইজ সোমনাথ চৌধুরী। বি এ, এল এল বি। প্র্যাকটিসিং লইয়ার অফ ক্যালকাটা হাইকোর্ট।
বড়সাহেব তাঁর নিজস্ব মার্জিত গলায় বুঝি ঠান্ডা করার চেষ্টা করছেন সোমনাথকে।
হুঙ্কার ছাড়ল সোমনাথ,—চুপ। একটা কথা নয়। আমি জানতে চাই কেন আপনারা চাকরি দিয়েছেন আমার স্ত্রীকে? আই ও অ্যান এক্সপ্ল্যানেশন ফ্রম ইউ। আমার কনসেন্ট ছাড়া আমার ওয়াইফকে আপনি পয়সা দিয়ে পুষতে পারেন না।
অফিসসুদ্ধ লোক হতবাক। ড্যাবড্যাব চোখে একবার তাকাচ্ছে বড়সাহেবের চেম্বারের দিকে, একবার শ্রীময়ীকে দেখছে। বড়সাহেব বেল বাজালেন, পিওন বদ্রিনাথ ছুট্টে ঢুকল ঘরে।
কান ঝাঁ ঝাঁ করছে শ্রীময়ীর। পাথরের মতো বসে আছে চেয়ারে। হে ধরণী, দ্বিধা হও ... হে ধরণী, দ্বিধা হও ...
শ্রীময়ী অজ্ঞান হয়ে গেল।
দৃশ্য চোদ্দ
সাড়ে পাঁচ বছরের মেয়ের হাত ধরে মোটা মোটা থামওলা বাড়িটা থেকে বেরিয়ে আসছে শ্রীময়ী। পায়ে পায়ে। কাঁধে ব্যাগ, হাতে স্যুটকেস।
পথে নামার আগে একবার ঘুরে দাঁড়াল। আর একবার দেখছে বাড়িটাকে। গত শতাব্দীর বাড়ি এখনও গত শতাব্দীতেই পড়ে আছে। মাঝে পৃথিবীতে কত অজস্র ভাঙচুর, কত পরিবর্তন ঘটে গেল, কিছুই যেন ছাপ ফেলতে পারেনি এই অচলায়তনে। কত নারীর যে হাহাকার গুমরোচ্ছে ওই বাড়ির অন্দরে!
কোত্থেকে আচমকা ছুটে এল সোমনাথ। দরজায় দাঁড়িয়ে তর্জনী তুলে শাসাল,— আশা করি যা করছ, ভালো করে ভেবেচিন্তেই করছ। কনসিকোয়েন্স বুঝে করছ। মনে রেখো, এ বাড়ি থেকে তোমার বেরোনোটা স্বেচ্ছাধীন, ফেরাটা নয়।
এর পর রিল ফাঁকা। বেবাক সাদা।
শ্রীময়ী চোখ বুজলেন। সোমনাথের সঙ্গে সেই শেষ মোলাকাত। সেই দাপুটে সোমনাথ এখন খাবি খাছে নার্সিংহোমে, আর দুরু দুরু বুকে পথে নেমে আসা সেদিনের শ্রীময়ী হাজার মাইল উজান বেয়ে আজ তাকে দেখতে ছুটছে কলকাতায়!
এ যেন পাশার দান উলটে যাওয়া।
হঠাৎ শ্রীময়ীর বড় শীত করে উঠল। কামরার এসি কি বেশি বাড়ানো আছে? ট্রেনে উঠেই বেডরোল চেয়ে নিয়েছিল শ্রীময়ী, পায়ের কাছে জড়ো করা আছে, টেনে নিল কম্বলখানা। ওফ, এত কাঁপুনি ধরল কেন? জ্বর আসছে কি?
নাকি দ্বিধারা রক্তকণিকার গতি বাড়িয়ে দিল?
না গেলেই হত। না গেলেই হত।
—মা-জি, ব্রেকফাস্ট লাগবে?
প্যানট্রি কারের কর্মচারীর স্বর ক্ষীণ শুনতে পেল শ্রীময়ী। কম্বলের মধ্যে থেকে অস্পষ্টভাবে মাথা নাড়ল। চাই না। খিদে নেই।
তবু ওই স্বরটুকুই বুঝি তাঁকে স্থিত করল অনেকটা। ট্রেনের কম্বল এখন ওম ছড়াচ্ছে, আরাম হচ্ছে সামান্য।
মাথা থেকে কম্বল সরিয়ে শ্রীময়ী উঠে বসল। আলগা চোখ বোলাল কামরায়। বেশিরভাগ যাত্রীই অবাঙালি, বাচ্চাকাচ্চাও আছে, ক্যালর ব্যালর হচ্ছে খুব। কয়েকজনের পরনে রাতপোশাক, বোধহয় কালকা চণ্ডীগড় থেকে আসছে, হাতে টুথব্রাশ, কাঁধে তোয়ালে, ব্যস্ত সমস্ত মুখে বাথরুমের দিকে চলেছে। ওপরের বার্থে এখনও নাকডাকার শব্দ, শ্রীময়ীর উলটো সিটের মহিলাও ঘুমোচ্ছে এখনও। পাশের কুপে দুই তরুণী খিলখিল হেসে উঠল। বাঙালি, কী যেন বলছে বাংলায়।
ভ্রাম্যমাণ কফিঅলাকে দাঁড় করিয়ে শ্রীময়ী এক কাপ কফি নিল। ধোঁয়া ছড়ানো বাদামি তরলে চুমুক দিতেই মাথার ভার ভার ভাব অনেকটা উধাও। ট্রেনের লোকটাকে ভাগিয়ে দিল ঠিকই, তবু একটু একটু খিদের অনুভূতি আসে কেন? সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল, কাল রাতে কিছু খায়নি। কিছু কি নিয়েছে সঙ্গে? হ্যাঁ, থাকার তো কথা। হাতব্যাগ খুলে বিস্কুটের প্যাকেট বার করল শ্রীময়ী। ভোরে খালি পেটে কফি খাওয়া উচিত নয়, অম্বল হবে।
বাইরে আলো ফুটে গেছে। গাঢ়রঙ কাচের ওপারে নবীন প্রভাত কেমন যেন নীলচে লাগে। আদিগন্ত সর্ষেখেতের চোখধাঁধানো হলুদ বড় ম্রিয়মাণ। ঘন বসতি এল একটা, পেরিয়েও গেল। আবার নীল মাখা হলদেটে সবুজ খেত।
শ্রীময়ী হিসেব করল মনে মনে। কত দিন পর আজ ট্রেনে চাপল সে? গত বছর মার্চে বেরিয়েছিল, মেয়ে জামাই নাতির সঙ্গে। আগ্রা ফতেপুরসিক্রি সিকান্দ্রা। পাক্কা একুশ মাস আগে। তবে সে তো মাত্র ঘণ্টা চারেকের জার্নি ছিল, এবার পুরো দিন ট্রেনে!
আচম্বিতে একটা কথা চিড়িক করে খেলে গেল মাথায়। জীবনে এই প্রথম সে একা দূরে কোথাও যাচ্ছে। সম্পূর্ণ একা। আশ্চর্য, এ কথাটা তো একবারও মনে হয়নি এতক্ষণ? একটা গোটা জীবন প্রায় কেটে গেল, অথচ জীবনের প্রতিটি সফরে কেউ না কেউ তাঁর সঙ্গী ছিল। নিদেনপক্ষে মিতুল। তাঁর মত একজন প্রায় স্বাধীন মহিলার পক্ষে ব্যাপারটা একটু বিস্ময়কর নয় কি? কেন কখনও কোথাও একা যাওয়া হয়নি? কখনও ব্যাপারটা এভাবে তলিয়ে দেখেনি বলে? নাকি হৃদয়ে কোনও আড়ষ্টতা ছিল? কীসের আড়ষ্টতা? উঁহু, সময় সুযোগ হয়নি, প্রয়োজন হয়নি, নইলে নিশ্চয়ই যেত। আজ যেমন চলেছ। শুধু একা ট্রেনে ওঠার জন্যই কি মনে মনে অস্বচ্ছন্দ বোধ করছে শ্রীময়ী? মোটেই না। সত্যি জীবন কী বিচিত্র! মানুষের কত কিছুই না শুরু হয় পঞ্চান্ন বছর বয়সে!
চিন্তাটা শ্রীময়ীকে কিছুটা নির্ভার করে দিল। সপ্রতিভ পায়ে শ্রীময়ী বাথরুমে গেল, ফিরে এসে কিটব্যাগ খুলে ম্যাগাজিন বার করে সিটে হেলান দিয়েছে। মেয়েদের লঘু পত্রিকা, ইংরিজি। রিডিংগ্লাস পরে নিল শ্রীময়ী, পাখির চোখ বোলাচ্ছে পাতায়। এক জায়গায় এসে থমকাল। জনৈক মহিলা ভাস্করের ইন্টারভিউ বেরিয়েছে, একটুক্ষণ সে পাতায় তন্ময় শ্রীময়ী। মহিলার স্বামী পুত্র কন্যার কথা কিছু নেই কেন? মহিলা কি অবিবাহিত? তাহলে তো কোথাও না কোথাও স্পিনস্টার বলে উল্লেখ থাকত। লেখাটার আঁতিপাঁতি খুঁজল শ্রীময়ী। নাহ, কোথাও কিছু নেই। শিল্পী মহিলার ব্যক্তিগত জীবন এড়িয়ে গেছে পত্রিকা? তাই হবে। মনে হয় সেরকম বলার মতন নয়। একটু প্রতিষ্ঠিত হতে গেলে মেয়েদের যে কত ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে হয়, এ কথা শ্রীময়ীর চেয়ে বেশি আর কে জানে!
পত্রিকাটা আর টানছে না শ্রীময়ীকে, রেখে দিল পাশে। প্যান্ট্রি কারের আকাশিউর্দি কর্মচারী ঘুরঘুর করছে, তাকে ডেকে টোস্ট ওমলেট নিল। অজান্তেই ঘড়িতে চোখ পড়ল একবার। সাড়ে আটটা। ইশ, পিঙ্কি আজ বেল বাজিয়ে বাজিয়ে ফিরে যাবে। বুদ্ধি করে সামনের ফ্ল্যাটে জিজ্ঞেস করলে হয়। অবশ্য ওর কী দায়! হয়তো সে ফেরার পরেও এই অজুহাতে আরও কয়েকটা দিন ডুব মেরে দেবে। মেয়েটা কামাই করতে পারেও বটে। অছিলাও দেখায় না, হয় চুপ থাকে, নয় কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে অ্যাইসেহি! এভাবেই তো বেশ কামিয়ে যাচ্ছে, ফ্রিজ কেনার কথাও ভাবে...! ইশ, টিউটোরিয়ালের খাতাগুলো বাড়িতে পড়ে রইল, আজ দিনভর তো শুধু ট্রেনে বসে হাই তোলা, সঙ্গে থাকলে দেখে ফেলা যেত। এবারকার নতুন ব্যাচটা ভালো নয়, ক্রিসমাসের পর একটা স্পেশাল ক্লাশটেস্ট নিতে হবে। ... বাবলু তো খুব কায়দা মেরে বলে দিল, ও'ই পিসির ফ্ল্যাটের সিকিউরিটি, ... আসবে তো সত্যি সত্যি? নয় বন্ধুবান্ধব নিয়ে একটু হুল্লোড়ই করুক এসে ফ্ল্যাটে। তুতুল বলে বাবলুর নাকি প্রচুর বান্ধবী। তাদের নিয়ে নিরালা ফ্ল্যাটে...! ছি ছি, ভাইপোটাকে নিয়ে এসব কী ভাবনা! বাবলু এক-আধবার ঢুঁ মারলেই শ্রীময়ী বর্তে যাবে। সোহিনী বলছিল ওদের উলটোদিকের ফ্ল্যাটে নাকি এই সেদিন ভরদুপুরে ভয়ংকর ডাকাতি হয়ে গেছে। মহিলাকে ছুরি মেরে, গয়নাগাটি টাকাকড়ি হাতিয়ে ...। ওহ, দিল্লিটা কী হয়ে যাচ্ছে দিন দিন!
বেলা গড়াচ্ছিল। এলোমেলো চিন্তা দিয়েই অনেক অস্বস্তিকর ভাবনা দূরে সরাচ্ছিল শ্রীময়ী। দেখছে সহযাত্রীদের। সামনের মহিলা উঠে পড়েছে বহুক্ষণ, উপরের বার্থ থেকে নীচে নেমে এসেছে তার স্বামী। মধ্যবয়সি স্বামী-স্ত্রীর কথাবার্তা শুনে রাজস্থানি বলে মনে হয়। মহিলা বেশ পৃথুলা, বোঁচকা খুলে খাবার বার করছে। বাপস, খানা আছেও বটে। দিস্তে দিস্তে পরোটা, আলুর দম, লাড্ডু, আচার, নিমকি, ঝুরিভাজা ...! কাগজের প্লেট আছে সঙ্গে, সে প্লেট আর খালি হয় না। সামনে বসে কেউ এত এত খেলে শ্রীময়ীর কেমন বিবমিষা জাগে, জোর করে দৃষ্টি ফেরাল অন্যত্র। সে স্বভাবমিশুকে নয়, যেচে আলাপ পরিচয় করতে পারে না। তবু কান পাতল অন্য সহযাত্রীদের বাক্যালাপে। কখনও কখনও চোখ আটকাচ্ছে ছায়া নিসর্গে—কেটে যাচ্ছে সময়।
দুটো বাচ্চা ট্রেনের মধ্যেই বল খেলা শুরু করেছে। খটাং করে বল উড়ে এসে লাগল শ্রীময়ীর মুখে। অপ্রস্তুত মা হাঁ হাঁ করে ছুটে এল, ধমকাচ্ছে বাচ্চাদের। ভারী মিষ্টি দেখতে শিশু দুটোকে, বুমবুমের বয়সিই হবে।
বুমবুমের কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা তুলতুলে হয়ে গেল। আচ্ছা, কী করছে, এখন বুমবুম? দিম্মা আসবে শুনে লাফাচ্ছে? কী দুরন্তটাই না হয়েছে নাতি! এবার গরমের ছুটিতে দিল্লি এসে দিম্মার সাদা দেওয়ালে কত বিদ্যে ফলিয়ে গেছে। এ বি সি, সূর্য পাখি গাছ ...। মিতুল ছেলেটাকে চটাস চটাস মারে, কোনও মানে হয়! বললেই শোনাবে, আমাকে নিয়ে তো তোমায় কখনও ভুগতে হয়নি, ডানপিটে ছেলের জ্বালা তুমি কী বুঝবে! কথাটা অবশ্য বর্ণে বর্ণে সত্যি। মিতুল ছোটবেলায় ভারী শান্ত ছিল। পুতুল আর খেলনাবাটি দিয়ে বসিয়ে দাও, ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুপটি করে খেলে যাবে। জন্মসংসারী! বুমবুম পেয়েছে বাপের ধারা। বেয়ান বলে সুগত নাকি ছোটতে ভয়ংকর দুষ্টু ছিল। এটা ভাঙছে, ওটা ফেলছে, এর সঙ্গে মারপিট, নিজের মাথা ফাটা, সর্বাঙ্গে ব্যান্ডেজ প্লাস্টার...। অমন বিচ্ছু হওয়ার দরকার নেই, তবে বাচ্চা একটু চঞ্চল না হলে কেমন যেন গোবরগণেশ মনে হয়। বুমবুম হয়তো একটু বেশি ছটফটে, এই যা। ফতেপুরসিক্রিতে গিয়ে কী ছোটান ছুটছিল! সঙ্গে সঙ্গে দৌড়তে গিয়ে শ্রীময়ীর জিভ এক হাত বাইরে! টকাটক বেগমদের হাওয়া মহলের সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাচ্ছে, পাল্লা দিতে গিয়ে শ্রীময়ীর কোমর বেঁকে যাওয়ার জোগাড়! সিকান্দ্রায় ভারী মজা করেছিল বুমবুম। হুমহাম হনুমানের পাল দেখে বাচ্চা একেবারে সিঁটিয়ে যাচ্ছে শ্রীময়ীর গায়ে। যেই মুখপোড়াগুলো একটু হটছে, ওমনি দিম্মাকে টানাটানি, চলো না দিম্মা, হনুমান ধরব! যতটা ভয়, ততটাই কৌতূহল। দুটো প্রায় বিপরীতধর্মী অনুভূতি যে কী করে একসঙ্গে ক্রিয়া করে।
করে। করে। নাহলে শ্রীময়ী আবার আনমনা হচ্ছে কেন? অস্বচ্ছ কাচে আবার কেন অন্যরকম ছবি ভাসে?
রঙ জ্বলে গেছে ছবিগুলোর, হলদেটে হয়ে গেছে, তবু যেন আছে এখনও।
...বিয়ের পর প্রথম দিল্লি যাছে শ্রীময়ী। বাপের বাড়ি। জোড়ে। কী মাস ছিল যেন? হ্যাঁ হ্যাঁ, শ্রাবণ। চুনকালি মাখা আকাশ ছিল সেদিন। সকালে এটাওয়া স্টেশনে থেমেছে ট্রেন, দৌড়ে নেমে গেল সোমনাথ। স্টেশনময় ছোটাছুটি করছে। সদ্যপরিণীতা বধূর জন্য শালপাতার আধারে টাটকা রাবড়ি কিনল। কিনতে কিনতেই ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে দৌড়চ্ছে সোমনাথ। রড ধরে মস্ত লাফ দিয়ে কামরায় উঠল।
কাছে এসে চোয়াল-এঁটো-করা হাসি। ফিসফিস করে বলল,—এ শুধু রাবড়ি নয় কন্যে, এতে আমার লাইফরিস্কও পানচ করা আছে, চেখে দ্যাখো।
শালপাতার ঠোঙা হাতে নিয়ে শ্রীময়ী হেসে কুটিপাটি। কোথায় রাবড়ি? সবটুকুই চলকে পড়ে গেছে ...!
আরও হলদেটে ছবি এল। আরও।
... হানিমুন। কাশ্মীর। গর্জনময়ী লিদ্দার নদীর ধার ঘেঁসে কারা দুজন ওই সাদা ঘোড়ার পিঠে? পহেলগাঁও-এর আকাশে কী অপরূপ এক চাঁদ, ঠিক যেন রূপোর পিরিচ! নদী কল্লোল তুলছে, জ্যোৎস্নার মসলিন বিছিয়ে দিচ্ছে চাঁদ!
...ঘোড়ায় চড়ে সোনমার্গ যাচ্ছে শ্রীময়ী। বেয়াদপ ঘোড়া, চিলতে ঘাসের সন্ধানে কেবলই সরে যায় খাদের দিকে। পড়লেই নিশ্চিত মৃত্যু, আতঙ্কে ঠকঠক কাঁপছে শ্রীময়ী।
সামনের ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল সোমনাথ। ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে শ্রীময়ীর পাশে পাশে হাঁটছে, শ্রীময়ীকে ছুঁয়ে।
শ্রীময়ী সোমনাথের চোখে চোখ রাখল।
সোমনাথ হাসছে,—ভয় কীসের? আমি তো আছি।
—যদি পড়ে যাই? যদি মরে যাই?
—আমিও মরে যাব। তক্ষুনি ঝাঁপ দেব খাদে। ওপারে জলদি জলদি মিট করতে হবে না?
ওইসব ফিকে ছবি এখনও কি মায়া বহন করে কোনও? যে স্মৃতিকে শ্রীময়ী পিষে ফেলেছিল, তা কি মরেনি এখনও? তুষারের নীচে চাপা ঘাস আবার মাথা তুলতে চায়? সামান্য একটু উত্তাপেই?
শ্রীময়ী স্মৃতিগুলোকে আর প্রশ্রয় দিল না। নতুন করে চোখ ফেলল বাইরের পৃথিবীতে। মাঠের ফসল দুলছে হাওয়ায়, ছোট মতন একটা টিলা এল, আবার মলিন সবুজ প্রান্তর, ছোট্ট একটা খাল মতন পড়ল, স্নান করছে দেহাতি মেয়ে বউ, ছোট ছোট কুঁড়েঘর আসছে, মিলিয়ে যাচ্ছে, আবার মলিন প্রান্তর...। খণ্ড খণ্ড দৃশ্যগুলো প্রতিটি সুন্দর, কিন্তু খানিক পর যেন সবই একঘেয়ে লাগে। মনে হয় একই ছবির যেন পুনরাবৃত্তি ঘটছে, চোখ ক্লান্ত হয়ে আসে।
বড় স্টেশনে ঢুকল ট্রেন। কানপুর। খাবার এল। ট্রেনের। ঠান্ডা ভাত, স্বাদহীন মাছের ঝোল, নুন ছাড়া সবজি। এইই ভালো, স্টেশন থেকে উলটোপালটা খাবার কিনে বিপদ ডেকে আনার কোনও অর্থ হয় না। শ্রীময়ীর ভুললে চলবে না, জীবনে এই প্রথম তাঁর নি:সঙ্গ সফর।
খাদ্য কোনওক্রমে গলাধ:করণের পরেই শ্রীময়ীর বড় বড় হাই উঠতে শুরু করেছে। অ্যালার্ম বাজার আগেই চাপা টেনশানে ভুগতে শুরু করেছিল, সেই শেষরাত থেকে জাগা, শরীরে আর কত সয়!
কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল শ্রীময়ী। কয়েক মুহূর্ত পরেই চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। ঘুম নামছে...ঘুম...ঘুম....
... সার সার প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড থাম। থামের ওপার থেকে ক্ষীণ আর্তনাদ উড়ে এল। ওপারে ঘর দেখা যায় একখানা, ধোঁয়া ধোঁয়া, ঝাপসা ঝাপসা। ঘর জুড়ে এক বিশাল পালঙ্ক...। কে একজন শুয়ে আছে ওই পালঙ্কে, নাকে অক্সিজেনের নল, স্যালাইন চলছে! লোকটার পরনে কালো কোট! শায়িত মানুষটা সোমনাথ? কিন্তু ঘরটা কোন ঘর? ভবানীপুরের বাড়ির কক্ষগুলোর সঙ্গে মিল আছে ঘরটার, তবু ঠিক ঠিক যেন মেলে না। কেন এত চেনা লাগে ঘরটাকে? আরে, এ তো শ্রীময়ীর দিল্লির ফ্ল্যাটের বেডরুম! আয়তনে সে ঘর এত বড় হল কী করে? বিছানায় সোমনাথের পাশে শ্রীময়ীর রঙিন টিভি। টিভির ধূসর পরদায় কী যেন ফুটে উঠল। হৃৎপিণ্ড? কী ভীষণ ধকধক করছে সোমনাথের হৃৎপিণ্ডটা, ঠিক বায়োলজি প্র্যাকটিকাল ক্লাশে ডিসেক্ট করা ব্যাঙের হৃৎপিণ্ডের মতো! সোমনাথের খাটের পাশে কে ওই নারী এসে দাঁড়াল হঠাৎ? মিতুল? না না, ও তো শ্রীময়ীই।
এ কী করছে সোমনাথ? শ্রীময়ীকে দেখা মাত্র নলসুদ্ধু উঠে বসল যে! চৌত্রিশ বছরের সোমনাথ খপ করে শ্রীময়ীর হাত জড়িয়ে ধরল। হাউমাউ করে কাঁদছে, কী যেন বলছে...! ক্ষমা চাইছে নাকি? হাত ছাড়িয়ে শ্রীময়ী হাসিতে লুটিয়ে পড়ল।
হাসছে, হাসছে, পিশাচিনীর মতো...!
তন্দ্রা ছিঁড়ে গেল। শ্রীময়ী ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। ঠিক এই দণ্ডে সে কোথায় বুঝে উঠতে সময় লেগে গেল দু-চার সেকেন্ড। ট্রেনের কামরাটাকে কেমন অস্পষ্ট লাগছে, যেন কোনও অলীক অডিটোরিয়ামে বসে আছে শ্রীময়ী, স্বপ্নের হাসির রেশটা মিলোচ্ছে না কান থেকে।
আশপাশের কোনও কুপে উচ্চৈ:স্বরে হাসছে একটা মেয়ে, বোধহয় সেই দুই বাঙালি তরুণীর একজন। ওই হাসিই কি ঘুমের ভেতর...?
শ্রীময়ী কম্বল সরিয়ে দিল গা থেকে। এসি নির্ঘাৎ কমিয়ে দিয়েছে, বেশ গরম লাগছে। হাঁটু ছড়িয়ে বসল শ্রীময়ী, সিটে আলগা ঠেসান দিল। এসব কী দেখছিল এতক্ষণ? মনের অবচেতনে যা থাকে, তাই তো ঘুমে স্বপ্ন হয়ে আসে। তার কলকাতা যাওয়ার পিছনে ওইটাই কি তবে গূঢ় অভিপ্রায়? নিজেকে বিজয়িনী দেখার সাধ? এক ধর্ষকামী সুখ উপভোগ করতে চায় সে? স্বপ্নের শ্রীময়ীর পরনে সাদা থান...! কেন শ্রীময়ী থান পরেছেন? কেন? হ্যাঁ, সোমনাথের সঙ্গে তার আইনসংগত বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি, বাবার ইচ্ছে থাকা সত্বেও নিজে থেকে উদ্যোগ নিতে প্রবৃত্তি হয়নি শ্রীময়ীর। মনে মনে একটা শঙ্কাও ছিল, আইনি ঝঞ্ঝাটে গেলে যদি মিতুলকে নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু হয়! আদালত হয়তো ন্যাচারাল গার্জেন হিসেবে সোমনাথকেই...! সোমনাথ নিজে লইয়ার, কীভাবে কোন আইনের প্যাঁচ কষে তার ঠিক কী! তবে সে তো বহুকাল ধরেই সিঁদুর পরে না, শাঁখা লোহা কিছুই না। অর্থাৎ সধবা থাকার কোনও চিহ্নই ধারণ করে না সে। তবু কি মনের কোণে একটা সংস্কার রয়েই গেছে? সোমনাথ মরলে শ্রীময়ী বিধবা হবে...!
ওই সংস্কারই কি অমোঘ নিয়তির মতো শ্রীময়ীকে টেনে নিয়ে চলেছে কলকাতায়?
ট্রেনের দুলুনি কমছে। ঘটাংঘট শব্দে লাইন বদল করছে গাড়ি। গতি মন্থর হয়ে এল। মোগলসরাই আসছে।
শ্রীময়ী ছটফট করে উঠল। নেমে পড়বে এখানে? ফিরে যাবে দিল্লি? হঠাৎই তেমন ইচ্ছেই জাগছে এখন শ্রীময়ীর।
সশব্দে ট্যাক্সির দরজা বন্ধ করে সুগত বলল,—পথে আপনার কোনও অসুবিধে হয়নি তো মা?
শ্রীময়ী উত্তর দিল না। মৃদু হাসল শুধু। শরীর ছেড়ে দিয়েছে ট্যাক্সির সিটে। বেলা নটার কলকাতা বেশ উষ্ণ এখন, ঠান্ডার ছিটেফোঁটাও নেই, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কামরা থেকে নেমে গরমই লাগছে বেশ। গায়ে জড়ানো মহার্ঘ শাল সামান্য অবিন্যস্ত করে দিয়ে শ্রীময়ী পলকা একটা হাই তুলল।
সুগত ফের প্রশ্ন করল,—রাতে ঘুম হয়েছিল?
—হয়েছে মোটামুটি। ...ওই ট্রেনে যেমন হয়। গাড়ি চললে চোখ জড়িয়ে আসে, থামলে তন্দ্রা ভেঙে যায়।
—আমারও সেই দশা। সুগত মুচকি হাসল,—সারা রাত যা গেল!
আবার কি বাড়াবাড়ি হয়েছে সোমনাথের? কাল রাতও কি নার্সিংহোমে কাটিয়েছে সুগত? ছি ছি, তাহলে সুগতকে পাঠাল কেন, মিতুলই তো আসতে পারত।
সোমনাথের কন্ডিশান নিয়ে জামাইকে প্রশ্ন করতে পারল না শ্রীময়ী। শুধু ঘাড় ফিরিয়ে সুগতর দিকে তাকাল একবার।
সুগতর বুদ্ধিদীপ্ত মুখে হাসি জ্বলজ্বল,—আর কী, আপনার মেয়ের পাগলামি! অ্যালার্ম ঘড়িটা খারাপ হয়ে গেছে, নিজেই ঘণ্টায় ঘণ্টায় অ্যালার্ম হয়ে বেজে চলেছে! এই কটা বাজল দ্যাখো না! এই, ভোর ভোর কিন্তু উঠতে হবে! এই, হাওড়া এনকোয়্যারিতে একবার ফোন করো না!
শ্রীময়ী আশ্বস্ত হল। স্মিত মুখে বলল,—কেন, মিতুলের এত টেনশান কীসের? আমি কি কচি খুকি, হাওড়া স্টেশনে হারিয়ে যাব?
—বলুন, বলুন...। যত মিতুলকে বলি গাড়ি দু-আড়াই ঘণ্টা লেট, আটটা সাড়ে আটটার আগে ইন করবে না...কে শোনে কার কথা! সুগত মিতুলের বাকভঙ্গি নকল করল,—আমার মা একা আসছে, আমার মা একা আসছে...! মাকে আতান্তরে ফেলো না প্লিজ! মা কলকাতার রাস্তাঘাট কিছু চেনে না...! টেনশান নয়, আপনার মেয়ের যা আছে তাকে বলে হাইপারটেনশান।
—যা বলেছ। শ্রীময়ী শব্দ করে হেসে উঠেছে,—দ্যাখো না, আমাকেই কেমন ছুটিয়ে আনল!
বলেই ঝপ করে থেমে গেল শ্রীময়ী। সুগতর কি বিশ্বাস্য মনে হবে কথাটা? যথেষ্ট স্বচ্ছ মনের ছেলে সুগত, শ্রীময়ীর অতীত সম্পর্কে সে বিয়ের আগে থেকেই জানে, এবং কম দিন ধরে সে তার শাশুড়িকে দেখছে না, বিয়ের আগে পরে মিলিয়ে বছর দশেক তো হবেই, তবুও...। প্রৌঢ়া শাশুড়ির হৃদয়দৌর্বল্যের কথা ভেবে সুগত কি একটুও মনে মনে হাসছে না?
শ্রীময়ী তড়িঘড়ি বলে উঠল,—কোনও মানে হয়, তুমিই বলো? আমারও তো বয়স হচ্ছে, না কী? হুট বলতে এরকম ছুটে আসা সম্ভব? কেঁদেকেটে আমায় এমন নার্ভাস করে দিল!
—বটেই তো। ঠিকই তো। আপনার মেয়ে এমন অবুঝ...!
অনুযোগ? না অভিযোগ? না ঠাট্টা?
সুগতর সুরটা ঠিক ধরতে পারল না শ্রীময়ী। হালকা গলায় বলল,—তোমাকেও নিশ্চয়ই খুব ব্যতিব্যস্ত করে মারছে?
সুগত একটুক্ষণ থেমে থেকে বলল,—না, তা নয়। ওই পরশু রাতটাই যা...। ওদিকটা ও নিজেই সামলাচ্ছে। ...আমার অত সময় কোথায় বলুন? একে ইউনিভার্সিটির পিক টাইম, তার ওপর দুটো ছেলে আমার আন্ডারে একটা বড় প্রাোজেক্ট করছে, তাদের নিয়েও যথেষ্ট বিজি থাকতে হয়। ওই তারই ফাঁকে যতটুকু পারি...
শ্রীময়ীর কেন যেন মনে হল সোমনাথের অসুস্থতা নিয়ে সুগত তেমন যেন ভাবিত নয়। ভেতরে ভেতরে খুশিই হল একটু। সঙ্গে সঙ্গে কৌতূহলও উঁকি দিয়ে গেল বুকে। সোমনাথকে কি অপছন্দ করে সুগত? সম্ভব, খুবই সম্ভব। পছন্দ করার মতো কীই বা গুণ আছে সোমনাথের! বংশমর্যাদা? ফু:। বংশ নিয়ে বারফাট্টাই আজকালকার ছেলেরা মোটেই পছন্দ করে না। সুগতর মতো আধুনিক যুক্তিবাদী ধারালো সেলফমেড ছেলেরা তো নয়ই। অবশ্য সুগতর সোমনাথকে পছন্দ না করার অন্য কারণও থাকতে পারে। বিয়ের আগে মিতুল একদিন কথায় কথায় বলেছিল, সুগত তোমায় দারুণ রেসপেক্ট করে মা! তোমার মতো লড়িয়ে স্বাধীনচেতা উদার মহিলা নাকি ও জন্মে দ্যাখেনি! হয়তো তার মতো নারীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে বলেই সোমনাথ কোনোদিন সুগতর ভক্তিশ্রদ্ধার পাত্র হতে পারবে না।
চিন্তাটায় একধরনের সুখ আছে। আত্মতৃপ্তি আছে। এই মুহূর্তে সোমনাথের শারীরিক অবস্থা কেমন জানার ইচ্ছেটা সযত্নে দমন করল শ্রীময়ী। জানলায় চোখ, দেখছে অনেক দিন আগে ছেড়ে যাওয়া শহরটাকে। হাওড়া ব্রিজের অল্প জ্যামে শম্বুক গতিতে এগোচ্ছে ট্যাক্সি, অন্য গাড়িগুলোরও গতি বড় মন্থর। উফ, দিল্লিতে সব যেন ছুটছে সর্বসময়, তুলনায় এই শহরটাকে অনেক বেশি শ্লথ মনে হয়। ভারতের রাজধানীর স্লো মোশান! কাতারে কাতারে মানুষ হাঁটছে ব্রিজ ধরে, প্রবেশ করছে শহরে, হঠাৎ দেখলে মানুষের অন্তহীন মিছিল বলে ভ্রম জাগে। একজোড়া তরুণ-তরুণী ব্রিজের রেলিং ধরে ঝুলে নদীর পানে উদাস তাকিয়ে, এই কেজো দুনিয়ার সঙ্গে তাদের যেন কোনও সম্পর্কই নেই! শ্রীময়ীর ঠোঁটের কোণে চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সকাল নটা-দশটার দিল্লিতে এই দৃশ্য কি দেখা যাবে?
ব্রিজ পেরিয়ে একটা ফ্লাইওভারে উঠল গাড়ি। শ্রীময়ী স্মরণ করার চেষ্টা করল কলকাতা ছাড়ার সময়ে এই উড়ালপুল সে দেখেছিল কিনা। মনে পড়ল না। নাহ, মস্তিষ্কে সত্যিই অক্সিজেন কম যাচ্ছে।
সুগত চুলে আঙুল চালাচ্ছে। চশমা ঠিক করতে করতে বলল,—কেমন দেখছেন আমাদের শহরটাকে?
শ্রীময়ী চোখ পাকিয়ে তাকাল,—অ্যাই, আমাদের শহর কী? তুমি না দিল্লির ছেলে!
—তা বললে হবে! এখানে যখন বাস করতে এসেছি...
—কথার সুরে মনে হচ্ছে কলকাতা খুব ভালো লেগে গেছে? প্রথম দিকে তো খুব বলতে, অ্যাডজাস্ট করতে পারছ না, অ্যাডজাস্ট করতে পারছ না!
—এখনও পারি না। নিজের শহর ছেড়ে অন্য জায়গায় ভালো লাগে?
—তা হলে?
—কী করব, মানিয়ে নিচ্ছি। চাকরি বলে কথা।
সুগতর গলায় কি ক্ষোভ আছে কোনও? থাকা বিচিত্র নয়। শ্রীময়ীর মনে কূট সন্দেহ আছে, মেয়ে হয়তো কলকাতায় বাবার কাছাকাছি থাকবে বলে পীড়াপীড়ি করে সুগতকে যাদবপুরে চাকরিটা নিতে বাধ্য করেছে। সুগত অবশ্য মুখে কিছুই বলেনি কোনোদিন, তবে তার হাবভাবে যেন বোঝা যায় শ্রীময়ীর সংশয় অমূলক নাও হতে পারে।
লুকিয়ে একটা শ্বাস ফেলল শ্রীময়ী। মিতুলের যে চিরকালই বাবার ওপর একটা চোরা টান, নানা সময়ে, নানা ভাবে টের পেয়েছে সে। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিকে মেয়ে ফাঁকি দেবে কী করে! মেয়ের ডায়েরিতে বাবার উল্লেখ, মেয়ের ওয়ার্ড্রোবে বাবার ছবি, কলকাতা থেকে ক্বচিৎ কখনও বাবার টেলিফোন এলে মেয়ের মুখ কেমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে...! মেয়েকে শ্রীময়ী আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে রেখেছিল, স্নেহে, মমতায়। প্রয়োজন হলে শাসনেও। কিন্তু বাবার কাছে মেয়ের যাওয়া কোনোদিন আটকায়নি। কেন আটকাবে? মিতুল তো সোমনাথেরও মেয়ে, জোর করে মেয়ের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক ছিন্ন করতে গেলে সে যে মেয়ের কাছে ছোট হয়ে যাবে, এটুকু বোঝার মতো বুদ্ধি শ্রীময়ীর ছিল।
শ্রীময়ী কলকাতা ছাড়ার পর বহুবারই দিল্লি এসেছে সোমনাথ। মিতুলকে দেখতে। অথবা মিতুলের ওপর নিজের অধিকারটাকে বজায় রাখতে। অবশ্য কোনওবারই তাদের চিত্তরঞ্জন পার্কের বাড়ির ছায়া মাড়ায়নি সোমনাথ, সে উঠত তার কাকার কাছে, সেই রাজিন্দর নগরে। সেখানেই পৌঁছে দেওয়া হত মিতুলকে। এই আনা নেওয়ার কাজটা দাদাই করত। ক্বচিৎ কখনও সোমনাথের খুড়তুতো ভাই। মেয়ে নিয়ে দিল্লিতে থাকত না সোমনাথ, কখনও ছুটত আগ্রা জয়পুর, কখনও বা দেরাদুন মুসৌরি। আশ্চর্য, ফিরে এসে কখনও তেমন উচ্ছ্বসিতভাবে বাবার গল্প করেনি মিতুল! মেয়ের এই আপাত অনুচ্ছলতাই বুঝিয়ে দিত কোথায় যেন এক গোপন সাঁকো তৈরি হয়েছে বাপ মেয়ের মধ্যে। মায়ের কাছে বাবাকে আড়াল করে রাখতে চায় মেয়ে।
এমনটা চলছিল বেশ কয়েক বছর। মিতুলের গোটা স্কুললাইফটাই। তারপর তো কলেজে উঠে মিতুলের পা'ই লম্বা হয়ে গেল, ছুটিছাটায় একাই চলে যেত কলকাতায়। হয়তো গোটা সামারটাই কাটিয়ে এল, কিংবা বড়দিন।
সব মেনে নিয়েছে শ্রীময়ী, সব। নি:শব্দে। হাসি মুখে না হলেও নির্বিকার মুখে। যেন এটাই স্বাভাবিক, এমনই হওয়া সংগত। বাবা-মার বিচ্ছেদের আঁচ মেয়ে কেন পোহাবে? কোনওদিন ভুলেও নিজের পছন্দ অপছন্দের আঁচড়টুকু মেয়ের গায়ে লাগতে দেয়নি শ্রীময়ী। অথচ সোমনাথের নোংরামি আর ধারাবাহিক অত্যাচারের কাহিনী শুনিয়ে প্রতি পলেই কি মেয়ের মন বিষিয়ে দিতে পারত না?
নিয়তি কী রহস্যময়! নিজেরই মহত্ব এখন শেল হয়ে বেঁধে শ্রীময়ীর বুকে। হাহাকার জাগে। নিজের উদারতা দিয়ে সোমনাথের নীচতা প্রমাণ করতে চেয়েছিল শ্রীময়ী, মেয়ে তার কিছুই বুঝল না।
বাপ-মেয়ের সম্পর্ক বুঝি এমন ধারাই হয়। মা'র যন্ত্রণার বোঝা মেয়ে বইতে যাবে কেন?
জনবহুল অফিসপাড়া পেরিয়ে চওড়া ফাঁকা রাস্তায় এসে পড়েছে ট্যাক্সি। দু ধারে সবুজ ময়দান একটু বিবর্ণ যেন। শীত না এলেও শীতের প্রস্তুতি নিচ্ছে গাছেরা, একটু একটু করে রঙ হারাচ্ছে।
শ্রীময়ী মনটাকে বিশেষ তারে বেঁধে নিয়েছে। নিজস্ব দু:খবোধ সে তো গোপন রাখতেই ভালোবাসে।
সহজ গলায় সুগতর সঙ্গে গল্প শুরু করল,—তারপর বলো, তোমার ইউনিভার্সিটি কেমন চলছে?
—যেমন চলে। শামুকও নয়, ঘোড়াও নয়, চলছে একরকম।
—কলকাতায় তো শুনি খুব স্টুডেন্ট ইউনিয়নের উপদ্রব, তা নিয়ে প্রবলেম হচ্ছে না?
—যাদবপুরে অতটা নেই। স্টাফ ইউনিয়ন আছে... খুব জোরদার। তা ওই সব নিয়েই কেটে যাচ্ছে। সুগত একমুহূর্ত কী যেন ভাবল। হঠাৎ প্রশ্ন করল,—আপনি যে কলকাতা আসছেন, মা-বাবা জানে?
—তোমার মা-বাবা?...না মানে...
শ্রীময়ী ঈষৎ লজ্জায় পড়ে গেল। সেদিন যখন চিত্তরঞ্জন পার্কে গেল, একবার কি বেয়াই বেয়ানের বাড়ি ছুঁয়ে আসা উচিত ছিল? কী বলত গিয়ে? ফ্ল্যাটে ফিরে একবার বোধহয় ফোন করার কথা মনেও হয়েছিল। কীজন্য যেন হল না। মিতুলের ফোন এসে গেল বলে কি?
সুগত ঠিক বুঝে গেছে প্রসঙ্গটায় শাশুড়ির অস্বস্তি আছে। ঝটিতি অন্য দিকে কথা ঘুরিয়ে দিল। বুমবুম, কলকাতার বাজারদর, শব্দহীন দীপাবলি, সব নিয়েই গল্প করছে টুকটাক। সোমনাথের কথা একবারও তুলল না।
বাকি পথ শ্রীময়ী আর বিশেষ কথা বলল না। ওই শুধু হুঁ হ্যাঁ।
ট্যাক্সি বাড়ির দরজায় নামিয়ে দিয়ে চলে গেল।
ফ্ল্যাটের দরজায় পলক থমকে গেল শ্রীময়ী। মেয়েজামাই-এর কলকাতার ফ্ল্যাটে এই তার প্রথম পদার্পণ, একটু মিষ্টিমাষ্টা হাতে করে আনা উচিত ছিল।
এ হে হে, বুমবুমের জন্যও কিছু আনেনি।
মিতুলদের ফ্ল্যাটটা টালিগঞ্জে। একেবারে বাসরাস্তার ওপর। বেশ বড়সড়, ভেতরে অনেকটা জায়গা, কমপক্ষে হাজার স্কোয়্যার ফিট। দুটো বড় বড় শোওয়ার ঘর, ছোট একটা স্টাডিরুম, লিভিং স্পেসটাও অনেকখানি। চারজনের খাবার টেবিল পড়েছে, ফ্রিজ রয়েছে, ক্রকারি কেস রয়েছে, তার পরেও দিব্যি হাত-পা মেলা যায়। বসার জায়গাটাও ভারী সুন্দর করে সাজানো। বেতের সোফাসেট, কাচের সেন্টারটেবিল, এক দেওয়ালে ডিভান, অন্য দেওয়ালে বাহারি ক্যাবিনেট, সাইডটেবিল, স্ট্যান্ড ল্যাম্প, মেঝেয় কার্পেট, সবই মজুত।
মিতুল বুমবুম কেউই বাড়ি নেই। একজন নার্সিংহোম দৌড়েছে, অন্যজন কিন্ডারগার্টেন। সুগতই ফ্ল্যাট ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিল। শ্রীময়ী মাথা দোলাচ্ছিল তারিফ করার ভঙ্গিতে। বাহ, মিতুল দিব্যি গুছিয়ে সংসার করছে তো কলকাতায়।
ড্রয়িংস্পেসের সোফায় বসে শ্রীময়ী শরীরটাকে ছেড়ে দিল। রাতদিনের একটা কাজের মেয়ে আছে, সে রান্নাবান্না সারছে, তাকে চা করতে বলে সুগতও এসে বসল,—একটু ফ্রেশ হয়ে নেবেন না মা?
—হ্যাঁ, যাই। একটু দম নিয়ে নিই।... তোমাদের এই ফ্ল্যাটটা তো দিল্লির থেকেও ভালো।
—এমনি তো ভালো। কিন্তু ওই যে...একতলার ফ্ল্যাট, ধোঁয়া ধুলো আর গাড়িঘোড়ার আওয়াজে সারাদিন প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যায়। রাত বারোটা অব্দি প্যাঁপোর পোঁ প্যাঁপোর পোঁ।...বাড়িটা একটু বড় রাস্তা ছেড়ে হলে বেটার হত।
—তোমাদের এখানে ভাড়াও তো কম।
—অনেক কম। দিল্লিতে এই সাইজের ফ্ল্যাট চিত্তরঞ্জন পার্কে মিনিমাম দশ চাইবে। এখানে কত আন্দাজ করতে পারেন? মাত্র সাড়ে তিন হাজার।
—কিন্তু এখানে তো ভাড়া গুনতে হচ্ছে, দিল্লিতে তুমি ফ্রি থাকতে। শ্রীময়ী লঘু রসিকতা জুড়ল,—এখানে সেটলই যদি করো, আস্তে আস্তে কিছু কেনার কথা ভাবো।
—দেখি। সুগত যেন সামান্য অন্যমনস্ক,—ভাবি। তাড়া কীসের!
চা দিয়ে গেছে কাজের মেয়েটা। চটপট কাপ শেষ করে সুগত উঠে দাঁড়াল,—আমি তাহলে স্নানটা সেরে নিই মা? খেয়েদেয়ে আমায় একবার বেরোতে হবে।
—ক্লাস?
—হ্যাঁ। পর পর দু দিন যাইনি।...আপনি রেস্ট নিন মা। দরকার হলে আর একটা বাথরুম আছে...। মিতুল এক্ষুনি এসে পড়বে।
সুগত চলে যেতেই সেন্টারটেবিলে পড়ে থাকা খবরের কাগজটা টানল শ্রীময়ী। বাংলা ইংরিজি দুটো কাগজই নেয় সুগতরা। শ্রীময়ীর বাংলা কাগজ সচরাচর দেখা হয় না দিল্লিতে। নিজে তো ইংরিজিই নেয়, দাদা হয়তো কালেভদ্রে কোনও রবিবার...।
বাংলা কাগজটাই খুলল শ্রীময়ী, বড় বড় হেডিংগুলোতে চোখ বোলাচ্ছে। কীসব উড়ালপুল টুল নিয়ে বিবাদ চলছে, হকারদের কী যেন দাবিদাওয়া নিয়ে আশ্বাস দিয়েছেন রাজ্যের কোন মন্ত্রী...। দিল্লিরও খবর আছে প্রথম পাতায়। রাজনীতি সমাচার, রোজ যেমন থাকে। কোনও খবরেরই গভীরে ঢোকায় উৎসাহ পেল না শ্রীময়ী, কাগজ বন্ধ করে চোখ বুজল।
কাজের মেয়েটা শ্রীময়ীর ব্যাগ স্যুটকেস শ্রীময়ীর জন্য নির্দিষ্ট করা ঘরে ঢুকিয়ে এল। সামনে এসে দাঁড়িয়েছে,—মা, খাবেন কিছু এখন? টোস্ট ওমলেট দিই?
মেয়েটি পিঙ্কিরই সমবয়সি প্রায়, তবে মুখে চোখে বেশ লাবণ্য আছে। কথা বলার ধরনটিও মিষ্টি।
শ্রীময়ী হেসে বলল,—তোমার নাম কী?
—আজ্ঞে, টুকাই।
—টুকাই? শ্রীময়ী বড় বড় চোখে তাকাল,—সে তো ছেলেদের নাম! তোমার কোনও ভালো নাম নেই?
—নাহ, টুকাই বলেই তো ডাকে। টুকাই সলজ্জ হাসল,—আমাদের তিন বোনদেরই ছেলেদের নাম। টুকাই বুকাই পুকাই। মা-র খুব ছেলের শখ ছিল তো।
কতভাবেই যে মানুষ শখ পূর্ণ করে!
টুকাই আবার বলল,—তাহলে পাউরুটি সেঁকি, মা?
—দু পিস। আর ডিম ফিম লাগবে না।
শ্রীময়ী উঠে পড়ল। বাথরুমে গিয়ে আয়নায় নিজের মুখখানা দেখল একবার। রোগা লম্বা মুখমণ্ডলে শ্রান্তির ছাপ পড়েছে, কালো হয়ে আছে মুখ চোখ। ভালো করে জল ছেটাল মুখে। কলকাতার জল এখনও তেমন ঠান্ডা নয়, আরাম হচ্ছে। যত্ন করে তোয়ালে রাখা আছে রডে, চেপে চেপে হাতমুখ মুছল। একেবারে স্নান সেরে নিলে কি ভালো হত? থাক, নতুন জায়গা, একটু গরম জল না নিলে শরীর গড়বড় করতে পারে।
বাথরুম থেকে বেরোতেই মিতুল।
ছোট্টখাট্টো চেহারার মিতুল পাখির মতো উড়ে এসে জড়িয়ে ধরেছে,—তুমি এসে গেছ মা?
—তুই যেভাবে ডাকলি, না এসে পারি! ঝামর হয়ে থাকা মেয়ের চুলে হাত বোলাল শ্রীময়ী। তারপর প্রায় স্বাভাবিক স্বরে বলল,—এখন কেমন আছে তোর বাবা?
—ভালো। বেশ ভালো। মিতুল বড় করে শ্বাস নিল,—মানে অনেকটা স্টেডি হয়েছে আর কী।
—ডাক্তার কী বলছে? বিপদ কেটেছে?
—পুরোপুরি অ্যাশিওর করছে না। আজকের দিনটা না গেলে... পরশু রাত্তিরে তো ভীষণ ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। হঠাৎ আবার বুকে পেইন... ওফ, রাতটা যা চিন্তায় গেছে!
কথা বলতে বলতে শ্রীময়ীকে নিয়ে শ্রীময়ীর ঘরে এল মিতুল। এ ঘরে সিঙ্গলবেড খাট, অতিথি টতিথি এলে থাকে বোধহয়, পরে হয়তো বুমবুমের দখলে যাবে।
বিছানায় বসেছে শ্রীময়ী। পাশে মিতুল।
শ্রীময়ী জিজ্ঞেস করল,—তোর বাবার হঠাৎ অ্যাটকটা হল কেন? প্রেশার টেশার বেড়েছিল বুঝি?
—প্রেশার তো বরাবরই বেশি।
—ওষুধ খেত?
—খাওয়ার তো কথা। নিয়মিত খেত কি না কে জানে! ...কোনওকিছুই তো মানত না...! মিতুলের গলা ধরে এল,—মঙ্গলবার রাতে চিংড়িমাছের মালাইকারি খেয়েছিল বাবা। মনুপিসি বারবার বলেছিল চিংড়ি খেয়ো না ফুলদা, বাবা জোর করে তিন তিনটে...। রাতেই নাকি অস্বস্তি হচ্ছিল খুব, অ্যান্টাসিড খেয়ে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। ভোরবেলা বাথরুমে গিয়েছিল, সেখান থেকে বেরোনোর পর পরই...
মিতুল চোখ বুজে হাত উলটোল। নাক টানছে।
শ্রীময়ী মনে করার চেষ্টা করছিল মনুকে। রোগা ফ্যাকাসে মেয়েটা সোমনাথদের মেজ তরফে থাকত, আশ্রিত হিসেবে। লতায় পাতায় কীরকম যেন বোন হয় সোমনাথের, অল্প বয়সে বিধবা হয়েছিল...। শ্রীময়ীর সঙ্গে মনুর তেমন ঘনিষ্ঠতা ছিল না, তবে কথাবার্তা হত মাঝে মাঝে। মেয়েটা সারাক্ষণই খুব ভয়ে ভয়ে থাকত, জেঠিমাকে ভয়, কাকিমাকে ভয়, বউদিদের ভয়...। মনু একদিন শ্রীময়ীকে বলেছিল, তোমার খুব বুকের পাটা আছে ফুলবউদি...! সেই মনু সোমনাথের কেয়ারটেকার হল কবে থেকে?
মিতুল আবার কথা শুরু করেছে,—জানো মা, বাবা অনেকক্ষণ একা একা পড়ে ছিল। ভাগ্যিস মনুপিসির ঘুম পাতলা, গোঙানির শব্দ শুনে উঠে এসেছিল!
এখন এসব কথাবার্তা অর্থহীন, তবু শ্রীময়ীর মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল,—মনু যখন জানেই তোর বাবার খাওয়া রেস্ট্রিক্টেড, তখন ওসব মালাইকারি ফালাইকারি করতে গেল কেন?
মিতুল মাথা নামিয়ে নিল। চকিতে অপরাধীভাব ফুটেছে মুখে। নীচু গলায় বলল,—বাবার জন্য করেনি। আমাদের জন্য করেছিল।
—তোদের জন্য? শ্রীময়ী বিস্মিত।
—হ্যাঁ। বাবার সেদিন জন্মদিন ছিল তো। আমাদের নেমন্তন্ন করেছিল বাবা। জানোই তো, আমি কীরকম প্রন লাইক করি, তাই বাবা...। আমি কি জানি, বাবা ওসব রিচ রান্না খাবে? ...আমাদের সামনে বসে খাওয়াল, কিছুতেই নিজে তখন খেল না। বলল কোর্টে কী সব খেয়েছে, পেট ভার, পরে বসবে। ইস, আমি যদি ওদিন জোর করে আমাদের সঙ্গে খাইয়ে দিতাম!
মিতুল ফুঁপিয়ে উঠল। ওই চাপা কান্নার শব্দে বুকের ভেতরটা কেমন অসাড় হয়ে আসছিল শ্রীময়ীর। যেন যন্ত্রণা, ঈর্ষা, একাকীত্ব, সমস্ত রকম বোধের বাইরে চলে যাচ্ছে সে। যেন নিজের মেয়ে নয়, কোনও এক সোমনাথের মেয়ে বসে আছে পাশে। এই প্রথম সোমনাথের সেই মেয়ে বাবাকে নিয়ে কথা বলছে তার সঙ্গে। হ্যাঁ, প্রথম। জীবনে এই প্রথম।
শ্রীময়ী সোমনাথের মেয়েকে সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বলল,—মন খারাপ করছিস কেন? তোর বাবার ক্রাইসিস তো কেটে গেছে।
—ছাই কেটেছে। তুমি দ্যাখোনি, বাবার চোখ কেমন ঘোলাটে হয়ে গিয়েছিল! আমার জন্য... শুধু আমার জন্য...
এত দু:খের মুহূর্তেও শ্রীময়ীর হাসি পেয়ে গেল। ভালোবাসার মধ্যেই বোধহয় এমন তীব্র অহংবোধ থাকে, যার জন্য মানুষ প্রিয়জনের মৃত্যুর হেতু হিসেবে নিজেকে দাঁড় করিয়ে অনর্থক ব্যথা পায়। অথচ একটু সাদা চোখে দেখলে মিতুল বুঝতে পারত, সোমনাথের মতো সংযমহীন মানুষের আজ না হয় কাল স্ট্রোক হতই। ওই ঘটনার জন্য মিতুল নিমিত্তের ভাগী বই আর কিছু নয়।
সুগত স্নান সেরে বেরিয়েছে। খেতে বসল। মিতুল উঠে খাবার টেবিলে গেল, সঙ্গে সঙ্গে শ্রীময়ীও। টেবিলেই শ্রীময়ীর টোস্ট দিয়েছে টুকাই, সঙ্গে ওমলেট দেয়নি বটে, তবে প্লেটে প্রকাণ্ড সাইজের এক কলা।
শ্রীময়ী কলাটা তুলে নিয়ে টুকাইকে ডাকতে যাচ্ছিল, সুগত কঠোর দৃষ্টি হানল,—ও কী করছেন মা? খেয়ে নিন।
সুগতর শাসনে ভারী মজা পায় শ্রীময়ী। বুকের খাঁচায় যেন কোনো অজানা বালিকার অস্তিত্ব র্উকি দেয়।
নার্ভাস নার্ভাস মুখে বলল,—এগারোটা বাজে সুগত, একটু পরেই তো ভাত খাব।
—নয় ভাত একটু কম খাবেন। প্লেট থেকে কিছু ওঠানো চলবে না।
মিতুলও বলে উঠল,—খেয়ে নাও না মা। সকাল থেকে নিশ্চয়ই কিছু পেটে পড়েনি।
অগত্যা কলার খোসা ছাড়াচ্ছে শ্রীময়ী। টোস্টে কামড় দিল।
মিতুল সুগতর পাতে ডাল দিতে দিতে প্রশ্ন করল,—তুমি কি আজ বিকেলে নার্সিংহোমে যাবে মা?
শ্রীময়ীর খাওয়া থেমে গেল। অবধারিত প্রশ্ন, তবু শ্রীময়ী অস্বচ্ছন্দ বোধ করল। একটু ইতস্তত করে পালটা প্রশ্ন জুড়ল,—তুই কী বলিস? যাওয়া দরকার?
সুগত পুট করে বলে উঠল,—আজ গিয়ে লাভ কী? আই সি সি ইউ-এর ভেতরে তো ঢুকতে পারবেন না।
—তা অবশ্য ঠিক। বাহাত্তর ঘণ্টার আগে ভিজিটার অ্যালাও করছে না। গিয়ে সেই কাচের বাইরে থেকে দেখা...। মিতুলের ভুরুতে ভাঁজ,—তবে মা যেতে চাইলে...
—আমি একটা কথা বলব? ঠান্ডা মাথায় শুনবে?
—বলো।
—মা এতটা পথ জার্নি করে এসেছেন, আজকের দিনটা টোটাল রেস্ট নিন। সুগত রায় দিয়ে দিল,—তুমি তো নার্সিংহোমে যাচ্ছই, আমি ইউনিভার্সিটি থেকে সোজা ওখানে চলে যাব। মাকে যদি নিয়ে যেতেই চাও, কাল পরশু বরং...
—হুঁ, তাও হয়। মিতুল ঘাড় নাড়ল,—তাড়া নেই...
সুগতর প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করল শ্রীময়ী। ছেলেটা কী তার হৃদয়ের দোলাচল বুঝেছে। তার চকিত কলকাতা আসাটাকে সইয়ে নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।
সুগত বেরিয়ে যাওয়ার পর ডাস্টার দিয়ে ঘরদোর ঝাড়ল মিতুল। টুকিটাকি গোছগাছ করল। মা-র সঙ্গেও বকবক করল খানিক। দিল্লি নিয়ে, তুতুলের বিয়ে নিয়ে....। তুতুলের বিয়ের ব্যাপারে মিতুলের দারুণ কৌতুহল। দুই পাত্রের বর্ণনা শুনে সে একবাক্যে ইঞ্জিনিয়ারটির পক্ষে। ব্যবসাদারদের ওপর মিতুলের আস্থা নেই, এ ব্যাপারে সে নিখাদ বাঙালি, দিল্লিতে মানুষ হওয়া সত্বেও। ফেব্রুয়ারি মার্চে বিয়ে লাগতে পারে শুনে একটু বুঝি চিন্তায়ও পড়ে গেল। বোধহয় মনে মনে হিসেব করে নিল, কদিনের জন্য দিল্লি গেলে পড়তায় পোষাবে। বুমবুমের ওই সময়ে পরীক্ষা, অনন্তকাল তো দিল্লিতে বসে থাকতে পারবে না।
কাজের মেয়েটা বেরিয়েছে কোথাও। নিজেই মা'র জন্য গরম জল বসাল মিতুল, নিজেও স্নানে গেল।
ঘরে ফিরল শ্রীময়ী। স্যুটকেস খুলেছে। স্নান করে উঠে পরার শাড়ি বার করল, নিজের ব্রাশ চিরুনি তোয়ালে পেস্টও। স্যুটকেসের অন্দর নাড়াচাড়া করতে করতে হঠাৎই শ্রীময়ীর চক্ষু স্থির। এ কী ভরেছে স্যুটকেসে? কাফতানটা কেন? ঢোলাঢাল্লা ওই পোশাকটা পরে মাঝে মাঝে, রাত্রে। তা বলে ওই বগলখোলা ড্রেসে শোভিত হয়ে সুগতর সামনে ঘুরবে? ছি ছি।
শ্রীময়ী কাফতানটাকে একদম তলায় চালান করে দিল। রান্নাঘরে এসে দেখছে জল গরম হল কি না, তখনই দরজায় গুমগুম আওয়াজ।
হৃৎপিণ্ড তড়াং করে লাফিয়ে উঠল শ্রীময়ীর। চপল পায়ে ছুটেছে। দরজা পুরো খুলতে না খুলতেই টুকাই-এর হাত ছাড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বুমবুম,—দিম্মা দিম্মা দিম্মা...
টানা দেড় দিনের দ্বিধা সংকোচ জড়তা অস্বস্তি এক লহমায় উবে গেল। শ্রীময়ী দু হাত বাড়িয়ে বুমবুমকে বুকে জড়িয়ে ধরেছে,—আমার সোনা, আমার সোনা... কত দূর থেকে তোকে দেখার জন্য দৌড়ে এলাম।
শ্রীময়ীর গালে গাল ঘষছিল বুমবুম। দিদিমার হাত ছাড়িয়ে দু পা পিছিয়ে গেল অকস্মাৎ। তর্জনী তুলে বলল,—মিথ্যে কথা। লাই।
শ্রীময়ী হেসে উঠল,—ওমা, কী মিথ্যে কথা বললাম?
—তুমি মোটেই আমায় দেখতে আসোনি। তুমি তো এসেছ দাদুকে দেখতে। আমি জানি।
অমোঘ সত্য। নিখাদ সত্য। নির্লজ্জ সত্য।
শ্রীময়ী নির্বাক হয়ে গেল।
—দিম্মা... ও দিম্মা...?
বুমবুমের ধাক্কায় শ্রীময়ীর ঘুম ভেঙে গেল। মাথামুণ্ডহীন স্বপ্ন দেখছিল ঘুমের মাঝে, ঘোর ছিঁড়ে গেছে, তবু চোখ খুলতে পারছে না। ক্লান্তি? খেয়ে উঠে শোওয়ার সময়ও তো টের পায়নি এত ক্লান্তি জমে আছে শরীরে?
বুমবুম আবার ঠেলছে,—দিম্মা, ও দিম্মা? আর কত ঘুমোবে? ওঠো না, বিকেল হয়ে গেছে!
শ্রীময়ী চোখে রগড়াতে রগড়াতে উঠে বসল বিছানায়। জীবজন্তু জঙ্গল সমুদ্র দিল্লির কুতুবমিনার সব মিলিয়ে এক জগাখিচুড়ি ছবি অদৃশ্য পর্দায় নেচে বেড়াচ্ছিল এতক্ষণ, চেপে চেপে মুছছে, আস্তে আস্তে ফিরছে বাস্তবে। কলকাতায়। মেয়ের বাড়িতে।
তক্ষুনি তক্ষুনি একটা আজব তথ্য ঝিলিক দিয়ে গেল শ্রীময়ীর মাথায়। জীবনে এই প্রথম শ্রীময়ী মেয়ের বাড়ি বাস করছে! দিল্লিতে মেয়েজামাই থাকত শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সঙ্গে, সেখানে গিয়ে থেকে যাওয়ার তো কথাই ওঠে না, আর কলকাতায় মিতুলের বাড়িতে এই তো তার প্রথম আগমন।
আনমনে হেসে ফেলল শ্রীময়ী। সত্যিই জীবনের কতকিছুই যে পঞ্চান্ন বছর বয়সে প্রথম শুরু হয়!
বুমবুম গোল গোল চোখে শ্রীময়ীকে দেখছে,—ও দিম্মা, তুমি হাসছ কেন?
শ্রীময়ীর হাসি আরও চওড়া হল। হাসতে হাসতেই নাতিকে কাছে টেনে নিল,—এমনিই। ইচ্ছে করছে তাই।
—এমা, তুমি কি পাগল? পাগলরা তো মিছিমিছি হাসে।
ওফ, কথায় একেবারে ওস্তাদ! শ্রীময়ী আলগা গাল টিপল নাতির, স্মিত মুখে কৃত্রিম এক গাম্ভীর্য ফুটিয়ে বলল,—ঠিক আছে, আমি আর এমনি এমনি হাসব না। আবার তবে ঘুমিয়ে পড়ি?
—না না। বুমবুমের প্রবল আপত্তি,—আমরা এখন বেড়াতে যাব।
—ওমা, কোথায়?
—পার্কে।
—কী হবে পার্কে গিয়ে?
—আমি খেলব, তুমি দেখবে। আমার কত বন্ধু আসে পার্কে...। বুমবুম ঘোষণার ভঙ্গিতে বলল,—আমি রোজ বিকেলে পার্কে যাই।
—কিন্তু আমি যে কলকাতার কিছু চিনি না ভাই। আমার সঙ্গে গেলে তুই যদি হারিয়ে যাস?
—মোটেই হারাব না। আমি সব রাস্তা চিনি।
—তোর মা বুঝি তোকে নিয়ে খুব ঘোরে?
—ধ্যাৎ, মা যাবে কেন? টুকাইদিদি আমায় নিয়ে যায়। পার্কে বাজারে দোকানে....। আমি তো বিকেলে একা একা থাকি, টুকাইদিদি আমায় নিয়ে ঘোরে।
—কেন? একা থাকিস কেন? তোর মা যায় কোথায়?
—মা তো পড়তে যায়। লাইব্রেরিতে।
শ্রীময়ী আঁচ করল ব্যাপারটা। এমএ করার পর মিতুলের রিসার্চের ইচ্ছে ছিল, কাজকর্ম শুরুও করেছিল অল্প অল্প, বিয়ের পর ভাটা পড়েছিল উৎসাহে, ইদানীং আগ্রহটা তবে ফিরে আসছে! পুজোর সময় বলছিল নতুন করে কাজ শুরু করবে।
বুমবুম আবার টানছে,—ও দিম্মা, চলো।
—তোর টুকাইদিদি কোথায়?
—আমি আজ টুকাইদিদির সঙ্গে যাবই না। তোমার সঙ্গে যাব।
অগত্যা উঠতেই হয়। শ্রীময়ী নামল খাট থেকে। নাহ, শরীরটা ধীরে ধীরে বেশ চাঙ্গা লাগছে তো! তাঁর দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রার অভ্যেস নেই, কিন্তু ঘুমটা আজ বেশ কাজে দিয়েছে।
ত্বরিত পায়ে শ্রীময়ী বাথরুম ঘুরে এল। রান্নাঘরেও উঁকি দিল একবার। টুকাই আটা ঠেসছিল, তাকে দেখেই চায়ের কেটলি গ্যাসে চড়িয়ে দিয়েছে। শাড়িটা বদলে নিল শ্রীময়ী, দিল্লির মতো অত চামড়া টানছে না, তবু হালকা করে ক্রিম ঘষল গালে, চুলেও চিরুনি বুলিয়ে নিল একটু।
বাইরে এক অপরূপ হৈমন্তী বিকেল। যানবাহনের গর্জন আর লোকজনের কোলাহলে এখন কান পাতাই দায়, ধোঁয়া আর ধুলোর দূষণে জ্বালা জ্বালা করে মুখচোখ, তারই মধ্যে সোনালি মসলিন বিছিয়ে দিয়েছে সূর্য। ফিরোজারঙ আকাশে তুষারকুচির মতো ছড়িয়ে আছে মেঘ। সব মলিনতা সব ক্লিন্নতা ছাপিয়ে উঠে শহর এখন ভারী মায়াময়।
সন্তর্পণে পথ হাঁটছিল শ্রীময়ী। বুমবুমের হাত ধরে। টকর টকর কথা বলে চলেছে বুমবুম। স্কুল নিয়েই সে উত্তেজিত থাকে বেশি, স্কুলের কথা শুরু করলে আর থামতে চায় না। কোন আন্টি সংহিতাকে বকেছে, সম্রাট কী কী দুষ্টুমি করে, বুমবুম কেন দেবজিৎকে মাঠে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল...। মনোযোগ দিয়ে শুনছে শ্রীময়ী, ক্বচিৎ কখনও হুঁ হ্যাঁ করছে, ব্যাস তাতেই আরও উদ্যম বেড়ে যাচ্ছে বুমবুমের।
বড়রাস্তা ধরে সামান্য হাঁটতেই বাঁয়ে চওড়া গলি। গলি ধরে বিশ-পঞ্চাশ গজ এগোতেই মাঝারি সাইজের পার্ক। বেশ অনেককালের পুরনো পার্ক, ঘিঞ্জি এই অঞ্চলটায় ফুসফুসের মতো বিরাজ করছে যেন। শ্রীময়ীদের দিল্লির পার্কগুলোর মতো অত সুন্দর সাজানো গোছানো নয় বটে, তবে মোটামুটি আছে সবই। স্লাইড দোলনা সি-স...। একটুখানি সবুজও আছে, সেখানে চলছে কুচোকাচাদের অনন্ত হুড়োহুড়ি।
ছোট্ট ঘেরা জায়গাটায় মা মাসি আয়া দিদিদেরও কমতি নেই, তারাও ঘুরছে ফিরছে যত্রতত্র। ছড়ানো ছেটানো কাঠের বেঞ্চিতে ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই ভাব।
শ্রীময়ী একটা বেঞ্চিতে জায়গা খুঁজে বসতেই তির বেগে শিশুদের অরণ্যে ঢুকে গেল বুমবুম। শ্রীময়ী এদিক ওদিক দেখছিল। এলোমেলো চিন্তা আসছিল মনে। বুমবুমের কথা শুনে মনে হয় মিতুল আজকাল তেমন সময় দেয় না ছেলেকে... এটা কি ঠিক কাজ করছে মিতুল? বিকেলে একা থাকে বলার সময় বুমবুমের মুখে কেমন ছায়া পড়েছিল না? পড়াশুনো তো সেও করেছে, ডক্টরেট করার সময়ে মিতুল ছিল সাত-আট বছরের মেয়ে, প্রতিটি কাজের ফাঁকে কী হাঁচোড়-পাঁচোড় করেই না শ্রীময়ী মেয়ের কাছে থাকতে চেয়েছে সর্ব সময়ে। মিতুলের মামাবাড়িতে মানুষজন কম ছিল না, দাদু দিদা মামা মামি তুতুল বাবলু... তা সত্বেও মেয়েকে সঙ্গ দেওয়া অবশ্য কর্তব্য বলে মনে করত শ্রীময়ী। কী যে হয়েছে আজকালকার মেয়েরা! মিতুলকে সে তো একটু অন্যভাবে গড়তে চেয়েছিল, নিজের আদলে। হয়নি। বোধহয় হয়ও না। মিতুলের জিনের মধ্যে তো শ্রীময়ী একা নেই!
ছোট্ট একটা শ্বাস পড়ল শ্রীময়ীর, ভাবনাটা সেই সোমনাথের অভিমুখে ঘুরে গেল। কেমন আছে এখন সোমনাথ? শ্রীময়ীর আগমনবার্তা কি আজই বাবাকে শুনিয়ে আসবে মিতুল? শুনে কী প্রতিক্রিয়া হবে সোমনাথের? মিতুলকে জিজ্ঞেস করবে কি শ্রীময়ী? ছি:, সে এসেছে কর্তব্যের তাগিদে, মেয়ের আহ্বানে, নাতির টানে, এই ধরনের বালখিল্যসুলভ চিত্তচাঞ্চল্য তাকে মোটেই মানায় না।
বাচ্চাদের ঝাঁক থেকে ফিরে আসছে বুমবুম। দু পকেটে হাত, মুখ বেজার।
শ্রীময়ীর ভুরু কুঁচকে গেল,—কী রে, কী হল?
—আমার একটাও বন্ধু আসেনি।
—ও, এই ব্যাপার। শ্রীময়ী হেসে ফেলল,—তুই স্লাইডে ওঠ, দোলনায় চড়...
—আমার ওসব ভালো লাগে না। বুমবুমের ঠোঁট ফুলে গেছে,—কেন কেউ এলো না গো আজ?
—তা আমি কী করে জানব! শ্রীময়ী নাতিকে কাছে টানল,—আয়, তুই আর আমিই বসে বসে গপ্পো করি।
অনিচ্ছা সত্বেও পাশে বসল বুমবুম। দু চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খুঁজছে বন্ধুদের।
শ্রীময়ী একদৃষ্টে দেখছিল নাতির মুখখানা। পড়ন্ত সূর্যের আলো এসে পড়েছে বুমবুমের গালে, বিচ্ছুরিত হচ্ছে হেম বর্ণ। বেশ ফরসা হয়েছে বুমবুম। মিতুলের থেকে তো বটেই, এমনকী তার চেয়েও। মুখটায় কিন্তু মিতুলেরই ভাব। আরও ছোটতে সুগতর সঙ্গে মিল লাগত। মাত্র ক-বছরেই ছাঁদ কেমন বদলে গলে! ভালো, ভালোই তো, মাতৃমুখী ছেলেরা নাকি সুখী হয়। বড় হলে বুমবুমকে কেমন দেখতে লাগবে? এই নরম সরম ভাব আর থাকবে না, চোয়াল কঠিন হবে, মুখের পেশী অন্যরকম, তবু মিতুলের ভাবটুকু থাকবে নিশ্চয়ই।
মনে হতেই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল শ্রীময়ীর। মিতুলের মুখ তো সোমনাথের কার্বন কপি! অর্থাৎ বুমবুম সোমনাথ হয়ে ঘুরবে পথে ঘাটে!
চিন্তাটার চোরা বিতৃষ্ণা এড়াতেই বুঝি শ্রীময়ী আলটপকা প্রশ্ন করে বসল নাতিকে, —হ্যাঁ রে, আমি যে দাদুকে দেখতে এসেছি, তুই জানলি কী করে?
বুমবুম ঘাড় ফেরাল—বা রে, মা তো বলছিল বাবাকে। বাবা বলল, মাকে আবার কেন কষ্ট দিতে গেলে....! উনি এই বয়সে ছুটে ছুটে আসবেন!
একেবারে পাকাস্য পাকা। কীভাবে সুগতর প্রতিটি শব্দ মেমারিতে গেঁথে নিয়েছে বুমবুম!
নাতির চুলে আলতো হাত বোলাতে বোলাতে শ্রীময়ী বলল,—কেন দাদুকে দেখতে এসেছি, তা জানিস?
—দাদুর যে অসুখ করেছে। দাদু নার্সিংহোমে।
—তুই দাদুকে দেখতে গেছিলি?
—না। মা বলেছে সানডে ছাড়া বাচ্চাদের নার্সিংহোমে ঢুকতে দেয় না।
একটু বুঝি দুষ্টুমিতে পেল শ্রীময়ীকে। লঘু গলায় জিজ্ঞেস করল,—বুমবুম, দাদুকে তুই ভালোবাসিস?
বুমবুম ঘাড় হেলিয়ে দিল,—হ্যাঁ।
—কতটা বাসিস?
—অনেকটা। দু হাত ছড়িয়ে দিল বুমবুম,—এই এতটা।
—মানে আমায় যতটা ভালোবাসিস, তার চেয়েও বেশি?
এবার যেন একটু ধন্দে পড়েছে বুমবুম, নাক মুখ কুঁচকোচ্ছে। একটু সময় নিয়ে বলল, —না, তোমার চেয়ে বেশি নয়। সমান সমান।
সূক্ষ্ম কাঁটার মতো ফুটল কথাটা, একটু বুঝি রক্তক্ষরণও হল শ্রীময়ীর। ম্লান মুখে বলল,—একেবারে সমান সমান?
—হ্যাঁ। বুমবুম ঘাড় দোলাল—দাদু কত খেলে আমার সঙ্গে।
—খেলে? তোর সঙ্গে? শ্রীময়ী কৌতূহল চাপতে পারল না,—তোরা বুঝি প্রায়ই দাদুর বাড়ি যাস?
—আমরাও যাই, দাদুও আসে। দাদুই বেশি আসে।
রক্তক্ষরণটা বাড়ছে শ্রীময়ীর, তবু নীরব থাকতে পারল না। যেন এক গোপন রহস্যের চাবিকাঠি পেয়েছে, শেষ না জানা পর্যন্ত স্বস্তি নেই।
ফের প্রশ্ন করল—দাদু এসে কী করে? শুধু তোর সঙ্গে খেলে?
—মা'র সঙ্গেও গল্প করে। বাবা থাকলে বাবার সঙ্গেও।
আশ্চর্য, কী নিটোল এক ইউনিট গড়ে উঠেছে এখানে! সোমনাথ মিতুল বুমবুম। এবং সুগত। এবং এই ইউনিট তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ শ্রীময়ীর অগোচরে। তবে কি শ্রীময়ীর ধারণাটাই সত্যি? সোমনাথকে নিয়ে বৃত্ত রচনার জন্যই কলকাতায় চলে এসেছে মিতুলরা? সুগতর মতো ছেলেও তাহলে মন থেকে মেনে নিয়েছে সোমনাথকে? অবশ্য শ্রীময়ীকে শ্রদ্ধা করলে সোমনাথকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে হবে, এতটা বুঝি শ্রীময়ীর আশা করাও ঠিক নয়। কিন্তু তার কাছে কথাটা লুকিয়ে রাখার অর্থ কী? সে আহত হবে, এই আশঙ্কা? নাকি স্রেফ কপটতা? আশ্চর্য, পুজোর সময়েও যখন গেল, তখনও কেউ ভুলেও সোমনাথের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেনি! বুমবুম পর্যন্ত না! কেন সচেতনভাবে তাকে বৃত্তের বাইরে ঠেলে দিয়েছে সকলে?
বুকটা হু হু করছিল শ্রীময়ীর। ঈর্ষায় পুড়ছে? অভিমানে জ্বলছে? নাকি চোরা বিষাদ তুষের আগুন হয়ে শ্রীময়ীকে দাহ করছে ধিকিধিকি? নিজের ওপর অগাধ বিশ্বাস কি টলে যাচ্ছে শ্রীময়ীর?
বুমবুম ডাকছে,—ও দিম্মা, কী ভাবছ?
—কিছু না রে ভাই। শ্রীময়ী মাথা দোলাল,—ভাবছি আমার কপালের কথা।
—কী হয়েছে কপালে? ব্যথা করছে?
—সে তো আছেই রে। শ্রীময়ী অস্ফুটে বলল,—এ ব্যথা কী তুই বুঝবি?
বুমবুম কথাটা বুঝতে পারল না। ছোট্ট ছোট্ট দুই চোখে একদৃষ্টে নিরীক্ষণ করছে দিদিমাকে। নিজের মতো করেই কিছু ভেবে নিল বোধহয়। কলকল করে উঠেছে আবার,—আমি জানি, তোমার মন খারাপ লাগছে।
শ্রীময়ী হেসে ফেলল,—যাহ, মন খারাপ হবে কেন?
—হচ্ছে। আমি জানি। দাদুর অসুখ হয়েছে... দাদু মরে যাবে... তাই।
—অসুখ হলেই কেউ মরে যায় নাকি?
—উঁহু, দাদু মরে যাবে। মা সেদিন বলছিল, আর কাঁদছিল। আমি দেখেছি।
—ও এমনি এমনি বলেছে। দাদু অসুখে খুব কষ্ট পাচ্ছে তো, তাই তোমার মা মন খারাপ করে বলে ফেলেছে। নাতিকে একদম কোলের কাছে টানল শ্রীময়ী। উপদেশ দেওয়ার ঢঙে বলল,—তুমি ওভাবে মরার কথা বোলো না। আপনজনদের মরার কথা বলতে নেই।
—দাদু কি আমার আপনজন?
—নিশ্চয়ই। তোমার আপনজন, তোমার মা-র আপনজন, তোমার বাবার আপনজন...
আর এগোতে পারল না শ্রীময়ী, থেমে গেছে। সোমনাথকে কি কোনও হিসেবেই তার আপনজন বলা যায়? সুতো না ছেঁড়া একটা সম্পর্কের সূত্রে হয়তো যায়, কিন্তু তার কোনও নৈতিক সায় পাওয়া যায় কি? তবে তার অতি ঘনিষ্ঠ প্রিয়জনদের আপনজন তো বটেই সোমনাথ, সেই হিসেবে হয়তো আপন বলা গেলেও যেতে পারে। একসময়ে তার জীবনটাকে যত বিষিয়েই দিয়ে থাকুক, তবুও। এটাকে কি ম্যাথমেটিক্যাল ফ্যালাসি বলে? শূন্যের মান কখনও সসীম হচ্ছে, কখনও অসীম, কখনও বা শূন্য শূন্যই থাকছে...!
সন্ধে নামছে। পার্কের কোণে এক আদ্যিকালের ছাতিম গাছ, ডালে ডালে কিচিরমিচির ধ্বনি গাঢ় ক্রমশ। পাখিরা কুলায় ফিরছে। স্লাইড দোলনা ঘাসের মাঠ ফাঁকা হচ্ছে দ্রুত, অভিভাবকদের সঙ্গে ফিরে যাচ্ছে শিশুরা। একটা দুটো ফুল ফুটেছে আকাশে। তারার ফুল।
শ্রীময়ী বুমবুমকে ঠেলল,—চল, উঠি।
—উঁউঁউঁ, আর একটু থাকি না দিম্মা।
—কেন রে?
—বাড়ি গেলেই তো হোমটাস্ক করতে হবে।
—তোর পড়তে ভালো লাগে না?
উত্তর দিল না বুমবুম, চুপ করে আছে। শ্রীময়ীর হাতে হাত ঘসছে। কী নরম উষ্ণ হাত! বেশ লাগছিল শ্রীময়ীর। সঙ্গে সঙ্গে সচকিত হয়েছে। ঠান্ডা পড়ছে, এই সময়ে বাচ্চাদের অসুখ-বিসুখ করে খুব।
শ্রীময়ী ঝুঁকে আদর করল বুমবুমকে,—বাড়ি চলো সোনা, হিম পড়ছে যে।
ওমনি বুমবুম শ্রীময়ীর কোলে মাথা গুঁজে দিয়েছে, ছোট ছোট হাতে বেষ্টন করে আছে শ্রীময়ীকে। যেন শ্রীময়ীই ঢাল হয়ে হিমকে রুখে দেবে।
কে কাকে হিম থেকে বাঁচায়! ছোট্ট বুমবুমের পেলব উত্তাপে ভরে যাচ্ছিল শ্রীময়ী। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময়ে গরম লাগছিল বেশ, চাদর নেয়নি, এই শিশিরভেজা সন্ধ্যায় এতটুকু শীতের অস্তিত্বও আর টের পাচ্ছে না শ্রীময়ী। ক্ষণপূর্বের বিষণ্ণতাও উধাও, অপার্থিব এক সুখ জাগছে প্রাণে। প্রায় নির্জন পার্ক জ্বালিয়ে দিচ্ছে ঝাড়লন্ঠন, বুকের গভীরে, অনেক গভীরে।
এই কি বন্ধন! সুখ! নাকি এ মায়া!
রাত্রে খাবার টেবিলে কথা হচ্ছিল। তিন জনে। সোমনাথের শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে। মিতুল পুঙ্খানুপুঙ্খ সমাচার শোনাচ্ছে বাবার, কিছু বাদ পড়ে গেলে সুগত ধরিয়ে দিচ্ছে, মাঝে মাঝে টুকিটাকি প্রশ্ন করছে শ্রীময়ী। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে সারাক্ষণই সোমনাথের হৃদয়ের মনিটরিং চলছে, গত চব্বিশ ঘণ্টায় আর তেমন কোনও গোলমাল ধরা পড়েনি। স্ট্রোকটা মারাত্মকই ছিল, সোমনাথের হৃৎপিণ্ডের অ্যান্টেরিয়র ওয়ালের পেশী ছিঁড়ে গেছে। ডাক্তারের অভিমত ওই পেশী আপনাআপনি জুড়বে। জুড়ছেও, ওষুধে বেশ সাড়া দিচ্ছে সোমনাথের হৃদয়। রক্তচাপও এখন সুস্থিত হয়েছে, সুতরাং স্ট্রোকের সম্ভাবনাও কমে গেছে অনেকটা। রক্তে সোডিয়াম পটাশিয়ামের পরিমাণও পরীক্ষা করা হচ্ছে নিয়মিত, এখন তাদের মধ্যে মোটামুটি একটা ভারসাম্য ফিরে এসেছে।
সব মিলিয়ে সোমনাথের অবস্থা এখন ভালোর দিকে। যদি এক্ষুনি এক্ষুনি আবার নতুন করে হৃদয়ের ওপর কোনও আক্রমণ না হয়, তবে বেঁচেবর্তেই নার্সিংহোম থেকে ফিরে আসবে সোমনাথ।
দুশ্চিন্তা কিছুটা পরিমাণে লাঘব হওয়ার কারণেই মিতুল এখন বেশ হাসিখুশি। নার্সিংহোম থেকে ফিরে মা-র জন্য দু-একটা পদ রান্নাও করে ফেলেছে। রুইমাছের ভিন্ডালু, বেগুনভর্তা। দুটোই শ্রীময়ীর প্রিয় আইটেম।
মোটামুটি আগ্রহের সঙ্গেই শ্রীময়ী মেয়ের রান্না পরখ করছিল। কথায় কথায় জিজ্ঞেস করল,—হ্যাঁ রে, তোর বাবাকে কবে ছাড়বে সে ব্যাপারে কিছু বলল?
—এখন কী! আগে আই সি সি ইউ থেকে তো ছাড়া পাক, কেবিনে যাক, তারপরে তো...
—কাল পরশু বোধহয় কেবিনে শিফট করে দেবে। সুগত মন্তব্য করল,—ডাক্টর রাহা তো বলছিলেন আজ রাতটা স্মুথলি কেটে গেলে পেশেন্টকে আই সি সি ইউ থেকে সরিয়ে নেবেন।
—আমার ইচ্ছে বাবা নার্সিংহোমে দিন দশ পনেরো থাক।
—অ্যাদ্দিন?
—হ্যাঁ। বাড়ি ফিরলেই তো আবার শরীরের ওপর অত্যাচার করবে। ওখানে তো আর ট্যাঁ-ফোঁটি চলবে না।
—তা ঠিক। সুগত সায় দিল,—নিয়মে থাকাটাই এ অসুখের একটা বড় চিকিৎসা।
অনেকক্ষণ ধরে একটা চিন্তা পাক খাচ্ছিল শ্রীময়ীর মাথায়। একটু ইতস্তত করে বলেই ফেলল,—একটা কথা ভাবছিলাম... বুঝলি...
—কী মা?
—তোর বাবা তো এখন অনেকটাই রিকভার করে গেছে... তাই ভাবছিলাম... আমার দেখতে যাওয়াটা কী খুব জরুরি?
—তুমি যাবে না মা? মিতুলের গলা দিয়ে প্রায় আর্তনাদ ঠিকরে এল।
—কী হবে গিয়ে? মিছিমিছি ভিড় বাড়ানো।
—অদ্দূর থেকে এলে...?
—তখন ঝোঁকের মাথায়, প্লাস অমন একটা ক্রিটিকাল কন্ডিশান শুনে... তুইও কান্নাকটি করলি...
—আমি যে বাবাকে বলেছি মা, তুমি কাল আসবে! মিতুলের চোখে একই সঙ্গে বিস্ময় আর মিনতি,—প্লিজ মা, কাল একটা বার অন্তত...
একটুক্ষণ মনকে সংহত করে একটা সিদ্ধান্ত গড়েছিল শ্রীময়ী, সব কুটোর মতো ভেসে গেল। মেয়ের মুখ চেয়ে এতটা যখন এসেছে, এটুকুও নয় করল। সোমনাথ নামের মানুষটার ওপর এখনও যে তার তীব্র ঘৃণা জমে আছে, লোকটাকে দেখে আদৌ যে তার মায়া জন্মাবে না, উলটে ওই ঘৃণাটাই বেড়ে যাবে বহু গুণ, পুরনো নোংরা দিনগুলো ওই রোগশয্যায় শুয়ে থাকা লোকটার মুখে আয়না হয়ে ভেসে উঠবে, এই সহজ সত্যটা কেন বুঝতে পারে না তার পেটের মেয়ে? কী ভাবছে কী মিতুল? এক দীর্ঘ বিরহের নাটকের মিলনান্তক পরিণতি ঘটবে? ঠিক আছে, শ্রীময়ী নয় চোয়ালে চোয়াল কষেই যাবে কাল। সারাজীবন কর্তব্যই তো করে গেল শুধু, মেয়ে তার হৃদয়টাকে চিনল না।
শ্রীময়ীর মুখ বুঝি ভার হয়েছিল সামান্য, সুগত বুঝি আঁচ করেছে কিছু। সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠল,—ওসব ছাড়ো তো। সে মা নয় যাবেনখন কাল। বলেই শ্রীময়ীর দিকে ফিরেছে,—মা, তুতুলের বিয়ে তাহলে সব ঠিকঠাক?
শ্রীময়ী সমে ফিরল। স্মিত মুখে বলল,—মোটামুটি। দুজন ক্যান্ডিডেট শর্টলিস্টেড হয়েছে এখন। একজন ইঞ্জিনিয়ার, একজন বিজনেসম্যান। তুতুল যেদিকে ঘাড় হেলাবে, সেদিকেই...
—তুতুলের নিশ্চয়ই বিজনেসম্যানকে পছন্দ?
—কেন? মিতুল ফস করে বলে উঠল,—বিজনেসম্যানকে কেন পছন্দ করবে?
—টাকা বেশি বলে। তুতুলকে তো জানি একটু খরচে টাইপ। বরের হাতে কাঁচা টাকা থাকলে ও বেশি খুশি হবে।
—বাজে কথা। বিজনেসম্যানদের বাড়ির আবহাওয়া অনেক কনজারভেটিভ হয়, তুতুল সেখানে মোটেই স্যুট করবে না। বেচারাকে হয়তো নাচ ফাচ ছেড়ে পুরোপুরি বাড়িতে আটকা পড়তে হবে।
—আহা, সব ফ্যামিলি একরকম হবে কেন? আজকাল কত বিজনেসম্যান-বাড়ির বউ পারফরমিং আর্টের স্ফিয়ারে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
—হোক গে। ইঞ্জিনিয়ার পাত্রটাই ভালো। সিকিওরড লাইফের কোনও বিকল্প নেই।
—তোমার সঙ্গে তো আমার মত মিলবে না। তুমি তো কোনও কিছুই রিয়েলিটি দিয়ে দ্যাখো না...। হতে পারে তুতুল তোমার বোন, কিন্তু তার নেচারটা পর্যন্ত তুমি স্টাডি করোনি। ও কোনও কিছুই আঁকড়ে থাকার মেয়ে নয়, নাচ টাচ ও কন্টিনিউ করবে না। শী উইল বি আ পারফেক্ট হাউসওয়াইফ।
—মানে রাঁধাবাড়া আর বাচ্চা তৈরি করার যন্ত্র? তুতুলকে তুমি এই ভাবলে? ছি:!
—এটা আমার অ্যাসেসমেন্ট।
—তোমার অ্যাসেসমেন্ট তোমার কাছে রাখো। সব জায়গায় পণ্ডিতি ফলিয়ো না।
এ যে প্রায় ঝগড়া লেগে যাচ্ছে! এ কি খুনসুটি? নাকি এরকমই বাদবিসম্বাদ হয় আজকাল?
শ্রীময়ী হাত তুলে থামাল দুজনকে। হাসতে হাসতে বলল,—তুতুলের বিয়ের ভাবনাটা তুতলের ওপরই ছেড়ে দে না। তোরা মিছিমিছি জল্পনা-কল্পনা করে মরছিস কেন?
সুগত শান্ত হয়েছে। জিজ্ঞেস করল,—বিয়েটা হচ্ছে কবে নাগাদ? ফাল্গুন? বৈশাখ?
—উঁহু, বৈশাখ তো নয়ই, ফাল্গুন অব্দিও বোধহয় গড়াবে না। সব ঠিকঠাক হয়ে গেলে এই মাঘেই...। শ্রীময়ী খাওয়া শেষ করে জলে চুমুক দিল,—টানা দিন পনেরোর ছুটি নিয়ে চলে এসো, খুব হইহই হবে।
—মাঘ? আই মিন জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি? মনে মনে কী হিসেব করল সুগত,—আমি কি ও সময়ে যেতে পারব?
—না পারার কী আছে? মিতুল ঈষৎ বক্র সুরে বলল,—তোমাদের ইউনিভার্সিটি ছুটি দেয় না, এমন তো শুনিনি!
—তমাল মার্চে পেপার সাবমিট করবে, তার আগে এক থেকে দেড় মাস টানা আমার সঙ্গে বসে সমস্ত ডাটা স্টাডি করতে হবে। আমি চাই না শুধু আমার জন্য ছেলেটার কাজ হ্যাম্পার হোক।
—ফালতু এক্সকিউজ দেখিয়ো না।
—আমি এক্সকিউজ দেখালেই সেটা ফালতু? নিজেও তো কাজ শুরু করেছ, টের পাও না হুটহাট গাইড কেটে পড়লে কতটা প্রবলেম হয়? তোমরা যাও। তুমি, বুমবুম...। অবশ্য বুমবুমের তখন অ্যানুয়াল পরীক্ষা এসে যাবে, তুমিও বেশিদিন স্টে করতে পারবে না।
—থাক। বুমবুমের ভাবনা তোমার না ভাবলেও চলবে। কত ছেলেকে নিয়ে ভেবে উলটে যাচ্ছে! মিতুলের মুখ হাঁড়ি হয়ে গেছে,—তুমি তাহলে মাঘ মাস হলে যাবে না?
—দেখি।
—দেখি নয়। যেতে তোমায় হবেই। মনে রেখো, আমাদের বিয়ের পরে এটাই আমাদের পরিবারের প্রথম শুভ কাজ। তুমি সেখানে অ্যাবসেন্ট থাকলে কত কৈফিয়ত দিতে হবে জানো?
—আচ্ছা আচ্ছা, পরের কথা পরে।
—কোনও টালবাহানা করবে না, আমি বলে দিচ্ছি।
মিতুলের কথার ভঙ্গিটা শ্রীময়ীর ভালো লাগছিল না। বড্ড বেশি কর্তৃত্বের সুর যেন। উঠে বেসিনে হাত ধুতে ধুতে জামাইকে দেখল ঝলক। সুগত মাথা নিচু করে খাবার খুঁটছে। শাশুড়ির সামনে স্ত্রীর ওরকম আচরণে কি ক্ষুব্ধ হয়েছে সুগত? কোথায় যেন একটা মিলছে না দুজনের, ছন্দ কেটে কেটে যাচ্ছে!
শ্রীময়ী জোরে মাথা ঝাঁকাল। নিজে ঘরপোড়া গোরু বলেই কি স্বামী-স্ত্রীর তুচ্ছ কথা কাটাকাটিও আগুন বলে ভ্রম হয়? সুগত মিতুলের জীবনে অশান্তি আসবে কেন? ওরা তো পরস্পরকে চেনে জানে, দীর্ঘদিন মেলামেশার পর বিয়ে করেছে, ওদের জীবনে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ থাকতেই পারে না। আজকালকার ছেলেমেয়েরা, মানে এখনকার স্বামী-স্ত্রী হয়তো এভাবেই কথা বলে। হয়তো এদের মতের অমিল থাকলেও মনের অমিল ঘটে না।
বুমবুম বহুক্ষণ ঘুমিয়ে পড়েছে। মেয়েজামাই-এর শোওয়ার ঘরের দরজা থেকে বুমবুমকে একবার উঁকি দিয়ে দেখে নিয়ে শ্রীময়ী সোফায় এসে বসল। অন্যমনস্কভাবে টিভি চালিয়েছে। চ্যানেল বদলে বদলে বি বি সিতে এসে, খবর শুনছে। বি বি সির এই সংবাদপাঠিকার খবর পড়ার ধরনটা শ্রীময়ীকে টানে বেশ। পাশে এসে বসল সুগত মিতুল, তাদের চোখও রঙিন পর্দায়। একটুক্ষণ বসে থেকে মিতুল উঠে গেল শ্রীময়ীর ঘরে, মা-র বিছানা করে দিয়ে সোজা চলে গেছে নিজের শয্যায়। কাল রাতেও ভালো ঘুম হয়নি, সকাল থেকেও আজ বেশ ছুটোছুটি গেছে, এখন বেচারা সত্যিই ক্লান্ত।
শ্রীময়ীও আর বেশিক্ষণ বসল না। এসে শুয়ে পড়েছে বিছানায়। দরজা ভেজিয়ে। আলো নিবিয়ে। যত্ন করে মশারি টাঙিয়ে দিয়ে গেছে মিতুল। দিল্লিতে তাদের এলাকায় মশার তেমন একটা উপদ্রব নেই, ফলত মশারি খাটানোরও অভ্যেস নেই শ্রীময়ীর, এখানে এই নেটের খুপরিতে ঢুকে অস্বস্তি হচ্ছে। তবু শ্রীময়ী চোখ বুজল জোর করে, বেশি রাত অবধি জেগে থাকা তার অভ্যেস নেই।
নাহ, ঘুম আসছে না। দুপুরের শোওয়াটাই বুঝি কাল হল। নাকি এই অপরিচিত বিছানা? খানিকক্ষণ বিছানায় এপাশ ওপাশ করল শ্রীময়ী। মেয়ে পায়ের কাছে একটা পাতলা কম্বল ভাঁজ করে রেখে গেছে, গায়ে টানল, আবার সরিয়ে দিয়েছে। উফ, বাইরে এখনও কী গাড়িঘোড়ার শব্দ, চোখ বোজে কার বাপের সাধ্যি! বিছানায় উঠে বসল, খাটের পাশে টুলে জল রাখা আছে, মশারি থেকে বেরিয়ে কয়েক চুমুক জল খেল। গলাটা কেমন শুকনো শুকনো লাগছিল, একটু আরাম হল যেন। আবার মশারিতে ফিরতে যাবে, তখনই মনে পড়ে গেল। দাদাকে তো ফোন করা হল না? এখন করবে? কটা বাজে এখন?
শ্রীময়ী আলো জ্বালল। এগারোটা দশ। ফোন এখন একটা করাই যায়। চিত্তরঞ্জন পার্কের বাড়ি বারোটার আগে নিঝুম হয় না। দাদা হয়তো টেনশানে থাকবে...। তাছাড়া কথা যখন দিয়ে এসেছে, ফোন করাটা তার কর্তব্য।
ড্রয়িংস্পেসে এসে কেজো ফোনটা সেরে ফেলে নিশ্চিন্ত বোধ করল শ্রীময়ী। বাথরুমে গেল একবার, অভ্যাসমতো। ফেরার সময়ে চোখে পড়ল স্টাডিরুমের দরজা আধভেজানো, ভেতরে আলো জ্বলছে।
কী ভেবে শ্রীময়ী পায়ে পায়ে স্টাডিরুমের দরজায় এল। হুট করে কারোর ঘরে ঢুকে পড়ার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না সে, সামান্য ইতস্তত করে আলতো টোকা দিল দরজায়।
উঠে এল সুগত। শ্রীময়ীকে দেখে হঠাৎ চমকিত যেন,—আপনি ঘুমোননি এখনও?
শ্রীময়ী অপ্রতিভ মুখে হাসল।
সুগত ব্যস্তসমস্ত হয়ে পড়ল,—আসুন আসুন, ভেতরে আসুন।
ঘরটা ছোটই। বড় জোর দশ বাই আট। দুটো স্টিলের র্যাক দু দেওয়ালে, দুটোই বইএ ঠাসা। আসবাব সামান্যই। একটা টেবিল, একটা চেয়ার, আর একটা বেতের আরামকেদারা। টেবিলে স্তূপ হয়ে আছে বই। সুদৃশ্য টেবিলল্যাম্প আর টাইমপিসখানা কোনোক্রমে তাদের মাঝে স্থান করতে পেরেছে। সাদা কাগজে কিছু বোধহয় লেখালেখি করছিল সুগত, খোলা ডটপেন গড়াগড়ি খাচ্ছে পাতার ওপর।
শ্রীময়ী বেতের চেয়ারটায় বসল। ঠোঁট টিপে বলল,—তোমায় ডিসটার্ব করলাম তো?
—না না। জানেনই তো, আমি একটু নিশাচর টাইপ। সাড়ে বারোটা একটার আগে ঘুম আসে না। তাই একটু বইখাতা নিয়ে...। সুগত ডটপেন বন্ধ করে সরিয়ে রাখল,—তারপর বলুন, কেমন লাগল আমাদের পাড়া?
—আবার আমাদের?
—বাহ, বাস করছি, আমাদের বলব না? সুগত মিটিমিটি হাসছে,—দেখলেন ঘুরে ফিরে?
—ওই বুমবুম আমাকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে পার্ক অব্দি নিয়ে গেল আর এল... ওইটুকুই যা দেখা। যাই বলো বাপু, তোমাদের কলকাতা বড় কনজেস্টেড।
—হ্যাঁ, লোক বাড়ছে, জায়গা বাড়ছে না। আনপ্ল্যানড গ্রোথ। ...ওই দরিয়াগঞ্জ কারোলবাগের মতো আর কী।
শ্রীময়ী আলগা চোখ বোলাল ঘরে। বইপত্র একটু বেশি এলোমেলো। মিতুল যথেষ্ট পাকা গৃহিণী, সে কি এ ঘরটা একটু সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে পারে না? ঝাড়পোঁছও ভাল করে হয় না মনে হয়, ধুলোও আছে বেশ। কোনও মানে হয়!
আনমনেই শ্রীময়ী বলল,—তোমার একটা প্রাোজেক্ট চলছে বলছিলে না? কীসের প্রাোজেক্ট?
—রিগার্ডিং লিটারেসি। মানে ঠিক লিটারেসি নয়, সাক্ষরতার সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সম্পর্ক। মানে ঠিক তাও নয়, নারী সাক্ষরতা বৃদ্ধির সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটা সম্পর্ক...। ঠিক এটাও নয়। যেখানে পুরুষের সাক্ষরতার হার মোটামুটি কনস্ট্যান্ট, সেখানে নারী সাক্ষরতাবৃদ্ধি কীভাবে জনসংখ্যাকে অ্যাফেক্ট করছে, আবার যেখানে নারী সাক্ষরতার হার কম, সেখানে শুধুই পুরুষের সাক্ষরতা বাড়িয়ে সরকারের ফ্যামিলি প্ল্যানিং কর্মসূচি কতটা সাকসেসফুল হতে পারছে, এ দুটোর একটা তুলনামূলক স্টাডি...। বেশ গুছিয়ে বসেছে সুগত। দারুণ মনোযোগী ছাত্রীকে ক্লাসের পড়া বোঝাচ্ছে, এমনই তার মুখচোখ। হাত-পা নেড়ে বলেই চলেছে,—অর্থাৎ ধরুন কিনা একটা গ্রামে পুরুষের সাক্ষরতা তেত্রিশ পারসেন্ট, নারী লিটারেসি আঠারো পারসেন্ট, তার ঠিক পাঁচ মাইল দূরে আর একটা গ্রাম, সেখানে পুরুষসাক্ষর চৌত্রিশ পারসেন্ট, কিন্তু নারীসাক্ষর আঠাশ পারসেন্ট। এই দুটো গ্রামে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে ক্লিয়ারকাট ডিফারেন্স আছে। আবার বিপরীত দিক দিয়ে দেখতে গেলে...
বলতে বলতে শ্রীময়ীর মুখভাব দেখে কিছু বুঝি অনুমান করল সুগত, বোকা বোকা মুখে হাসছে। ঘাড় চুলকোতে চুলকোতে বলল,—খুব বোরিং, না?
শ্রীময়ী একটু পরিহাসের লোভ সামলাতে পারল না। হাসতে হাসতে বলল,—হ্যাঁ, রাত সাড়ে এগারোটা বারোটার সময় শাশুড়িকে বোঝানোর পক্ষে একটু তো বোরিং বটে।
—সরি সরি। আমি বড্ড বেশি বকে ফেলি।
—না না, ঠিক আছে। কোনও একটা কাজ সিরিয়াসলি করলে সেটা নিয়ে আলোচনা করার সময়ে একটু তো উৎসাহ আসবেই। সেটাই স্বাভাবিক। শ্রীময়ী চেয়ারে হেলান দিল,—যাই বলো বাপু, কাজটা কিন্তু তোমার বেশ জটিল। এতসব ডাটা পাচ্ছ কী করে?
—খুব খাটতে হচ্ছে। আমার রিসার্চ স্কলার নিজেও খুব পরিশ্রম করছে, তিনজন ইনভেস্টিগেটার রেখেছি তারাও গ্রামে গ্রামে ঘুরছে...। ইউনিসেফের প্রাোজেক্ট, বাই জুন শেষ করতেই হবে। সুগতর মুখে হঠাৎ একটা ছায়া পড়ল,—সেইজন্যই তো মিতুলকে বলছিলাম এই সময়টা আমার পক্ষে কলকাতা থেকে নড়া খুব কঠিন।
—ভালো করে বোঝাও মিতুলকে।
—ও বুঝতে চায় না। সুগতর ছোট্ট একটা শ্বাস পড়ল যেন,—কতকগুলো ব্যাপারে মিতুল এত রিজিড, এত আনরিজনেবল...
সুগত আরও কী বলতে গিয়েও থেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ঘরে নেমে এসেছে এক চরম নৈ:শব্দ্য। টেবিলের ওপর রাখা টাইমপিস টিকটিক শব্দ করে চলেছে শুধু। ধ্বনিটা প্রতি মুহূর্তে দ্বিগুণ হচ্ছে, চতুর্গুণ হচ্ছে, বাড়ছে ক্রমশ, শ্রীময়ীর কানে তালা ধরিয়ে দিচ্ছে। তবু নিস্তব্ধতা কাটছে না।
বিকট শব্দ তুলে একটা ট্রাক চলে গেল বাড়ির সামনে দিয়ে। রাতটাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে। ওই শব্দটুকুরই বোধহয় প্রয়োজন ছিল এখন।
শ্রীময়ী অনুচ্চ স্বরে বলে উঠল,—তোমার মনে কি কোনও ক্ষোভ জমেছে সুগত?
সুগত চুপ করে রইল।
শ্রীময়ী গলা আরও নামাল,—আমি শুধু মিতুলের মা নই সুগত, তোমারও মা। মিতুল কি তোমায় হার্ট করেছে? তুমি স্বচ্ছন্দে বলতে পারো।
সুগত দু দিকে মাথা নাড়ল,—না, তেমন কিছু নয়। এটা একটা পাসিং থট। আমরা ঠিক আছি।
শ্রীময়ী আর কথা বাড়াল না। দরজায় পৌঁছে থামল একটু। মৃদু শ্বাস পতনের শব্দ পাওয়া গেল কি? নাকি কানের ভুল?
বিছানার অন্ধকারে ডুবতেই এতাল বেতাল চিন্তা ঝাঁপিয়ে এল শ্রীময়ীর মাথায়। সুগত আর মিতুলের মধ্যে কি দূরত্ব তৈরি হয়েছে কোনও? নিশ্চয়ই হয়েছে। নিশ্চয়ই কোনও রন্ধ্রপথে ঢুকে পড়েছে ভুল বোঝাবুঝির বীজ। কী হতে পারে কারণ? সুগতকে বাবা মা ছেড়ে মিতুলের জন্যই চলে আসতে হয়েছে, তাই? এই নিয়ে সুগতর মনে মেঘ জমতেই পারে, যতই হোক সে'ও বাবা-মার একমাত্র ছেলে। বেয়াই বেয়ানও সুগতকে যথেষ্ট মিস করেন। নাকি সোমনাথকে নিয়ে একটু বেশি আহলাদিপনা করছে মিতুল যা সুগতর আদৌ পছন্দ নয়? যাক গে মরুক গে, মেয়েজামাই-এর সমস্যা নিয়ে বেশি মাথা না ঘামানোই ভালো। এমনিতেই মনটা খচখচ করছে। সুগতকে প্রশ্নটা না করলেই হত। সুগত হয়তো ভাবতে পারে কদিনের জন্য এসে শাশুড়ি একটু বেশিই কৌতূহল দেখাতে শুরু করেছে! সে নিজে একজন সংসারভাঙা নারী, তার পক্ষে এটা বোধহয় শোভনও নয়।
এতক্ষণে দু চোখের পাতা জড়িয়ে আসছে ঘুমে। একসময়ে ঘুমটা ভেঙেও গেল। এই বয়সে রাতে টানা ঘুম হতে চায় না, এক আধবার বাথরুম ছুটতে হয়। আলো জ্বালল না শ্রীময়ী, নিকষ অন্ধকার হাতড়ে বেরিয়েছে ঘর থেকে।
ঘুম মাখা চোখ গেঁথে গেল স্টাডিরুমের দরজায়। এখনও আলো জ্বলছে।
আবার একটা শ্বাস পতনের শব্দ শুনতে পেল শ্রীময়ী। নিজের।
দেশলাই খোলের মতো বাড়িটা চারতলা উঠে গেছে। নার্সিংহোম। বাড়িটার বহিরঙ্গ দিব্যি ঝকঝকে, দেখে মনে হয় চিকিৎসাপাতি এখানে ভালোই হয়। একতলায় দর্শনার্থীদের জন্য ছোট্ট লাউঞ্জ, তার এক পাশে রিসেপশান কাউন্টার, অন্য পাশে অফিস। রিসেপশান কাউন্টারে টেলিফোন আর ল্যাপটপ সহ দুই সুবেশা তরুণী। ঠোঁটে তাদের মাপা হাসি, মাপা আগ্রহ, মাপা ঔদাসিন্য, মাপা লিপস্টিক। মাথায় সাদা টুপিধারী সেবিকাদেরও চকিত দর্শন মিলছে। তাদেরও মুখমণ্ডলে অপার্থিব নির্লিপ্তি। লাউঞ্জে ভালোই ভিড়, ফাইবার গ্লাসের চেয়ার সব টইটুম্বুর।
খানিকক্ষণ লাউঞ্জে দাঁড়িয়ে থেকে শ্রীময়ী রাস্তায় বেরিয়ে এল। থোকা থোকা ভিড়ের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে থাকতে কেমন বিশ্রী লাগে, মনে হয় সকলে যেন হাঁ করে তাকেই দেখছে। বাইরে এসেও পুরোপুরি স্বস্তি নেই, এখানেও যথেষ্ট লোকজন দাঁড়িয়ে। তবে নার্সিংহোমটা একদম মেন রোডের ওপর নয়, সামনের রাস্তা ভালোই চওড়া, অ্যাম্বুলেন্স বা শববাহী শকট ঢোকার কোনও অসুবিধে নেই, এমন জায়গায় ভিড় থাকলেও নিভৃতি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর নয়। গেট থেকে বেশ খানিকটা সরে এল শ্রীময়ী। কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে পর পর, ফাঁকে ফোকরে টুকরো জটলা, উদ্বিগ্ন স্বরের চাপা গুঞ্জন। শ্রীময়ী এদিক-ওদিক দেখছিল, একটু বিস্ময় নিয়েই। চারদিকে এত লোক, এত ভিজিটার, এর মধ্যে সোমনাথের বাড়ির কেউ নেই? সোমনাথদের জ্ঞাতিগুষ্টি তো কম নয়, জেঠতুতো খুড়তুতো মামাতো পিসতুতো ভাইবোন দাদা ভাগনে ভাইপো ভাইঝি শহরময় ছড়ানো, তাদের একজনও আসেনি? সোমনাথ কি সবার সঙ্গেই সম্পর্ক খারাপ করে ফেলেছিল? নাকি এসেছে কেউ কেউ? শ্রীময়ী চিনতে পারছে না তাদের? খুবই সম্ভব। মাঝে গঙ্গা বেয়ে তো কম জল বয়ে গেল না! কিন্তু তারা এসে থাকলেও শ্রীময়ীকে কি চিনতে পারছে কেউ? কোনও আড়াল থেকে ড্যাবডেবিয়ে দেখছে না তো?
ভাবতেই আবার বিজবিজে অস্বস্তি। মিতুলটা সেই কখন ওপরে গেছে, এখনও ফেরে না কেন? সকালে মিতুল নার্সিংহোম ঘুরে গিয়ে বলল বাবার কন্ডিশান একই রকম, তবে আই সি সি ইউ থেকে আজই বের করছে না। ডাক্তার বিকেলে ভিজিটার অ্যালাও করবে বটে, কিন্তু একবারে একজনের বেশি কিছুতে নয়। ...বাবার সামনে গিয়ে কি বাহ্যজ্ঞানরহিত হয়ে গেল মিতুল? নাকি আবার কোনও গণ্ডগোল হল সোমনাথের? এসব রোগির কিছু বলা যায় না, এই ভালো, তো এই খারাপ। কেমিস্ট্রির সরোজিনী সহায়ের হাজব্যান্ড তো স্ট্রোকের পর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গিয়েছিল, গাড়ি ফাড়ি নিয়ে সরোজিনী যেদিন বরকে হাসপাতাল থেকে আনতে গেল সেদিনই দুপুরে আবার পর পর দুটো অ্যাটাক হয়ে...!
উঁহু, কু গাওয়া ঠিক নয়। শ্রীময়ী ধমকাল নিজেকে। সোমনাথ বাঁচুক, আরও অনেক দিন বাঁচুক। নিজের মতো করে বেঁচে থাক।
আলো মরে আসছে। সন্ধে ডানা মেলছে শহরে। ইট কাঠের জঙ্গলেও একটা দুটো পাখি উড়ছে এদিক সেদিক, নীড়ে ফিরছে। বাতাস বইছে অল্প অল্প। ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া, তবে তেমন কামড় নেই।
এদিক-ওদিক দৃষ্টি ফেরাল শ্রীময়ী। সাদা অ্যাম্বাসাডারের বনেটের সামনে এসে চোখের মণি থেমে গেল সহসা। অবনত মুখে দাঁড়িয়ে আছে এক মহিলা, নার্সিংহোমের ঠিকরে আসা আলো পড়েছে মহিলার মুখে, কোণাকুণি ভাবে। কেমন যেন চেনা চেনা লাগে না? হ্যাঁ, মনুই তো। আশ্চর্য, মাত্র সাত আট হাত তফাতে দাঁড়িয়ে, অথচ শ্রীময়ী এতক্ষণ লক্ষ্যই করেনি! আগে থেকেই ছিল? না, এই এসে দাঁড়াল? কী চেহারা হয়েছে মুনর! ঝিরকুটে! পাকানো! মাথাভরা সাদা চুল...! এত্ত বুড়িয়ে গেছে মনু? মনু তো মোটামুটি তারই সমবয়সি ছিল, বনেদি বাড়ির মানুষদের সেবা করতে করতে এত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল?
মনু কি দেখতে পেয়েছে শ্রীময়ীকে? মনে হয় না। কেমন অকম্পিত মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে মনু, কোনও দিকে তাকাচ্ছেই না। শ্রীময়ী কি যেচে গিয়ে কথা বলবে? পা সরতে চাইছে না। কোত্থেকে এক অচেনা সংকোচ এসে বাধা দিচ্ছে শ্রীময়ীকে। অর্থহীন। অর্থহীন। হাজার মাইল ঠেঙিয়ে কলকাতা আসতে পারল, মনুকে তার কীসের লজ্জা?
কুণ্ঠা কাটিয়ে গাড়িটার সামনে এল শ্রীময়ী। নিচু গলায় বলল,—কেমন আছ মনু?
মনু অর্থাৎ মনোরমা চমকে তাকিয়েছে। একটুক্ষণ মুখটা হাঁ হয়ে রইল। আস্তে আস্তে একটা পাতলা হাসি ফুটে উঠেছে মুখে,—ফুলবউদি!
—চমকালে যে? মিতুল বলেনি আমি এসেছি?
—বলেছিল। মনোরমা সামলে নিল নিজেকে,—কেমন আছ ফুলবউদি?
বার বার ফুলবউদি সম্বোধনটা কানে লাগছিল শ্রীময়ীর, তবু স্মিত মুখে বলল,—ভালো আছি।
মনোরমা আর কথা খুঁজে পেল না, প্রশ্নও না। বোধহয় এই মুহূর্তে আর কিছু জিজ্ঞাস্য থাকেও না।
বনেদি বাড়ির আশ্রিতাকে একটু ধাক্কা দিতে ইচ্ছে হল শ্রীময়ীর। বলল,—সোমনাথকে দেখে এসেছ?
মনোরমা কি বিস্মিত হল? শ্রীময়ী অবলীলায় স্বামীর নাম ধরে ডাকায়?
প্রতিক্রিয়াটা ঠিক বুঝতে পারল না শ্রীময়ী।
মনোরমা বলল,—যাব দেখতে। এই তো এলাম। ...আজ একটু দেরি হয়ে গেল।
শ্রীময়ী আর একটু প্রগলভ হল,—তুমি তো এখন সোমনাথের গার্জেন, তাই না?
—ঠাট্টা করছ? মনোরমার মুখটা শুকিয়ে গেল। ম্লান হেসে বলল,—ভাত কাপড়ের বিনিময়ে ফুলদার দেখভাল করি, সেবা-শুশ্রুষা করি। একে গার্জেনি বলে না।
বাহ, অনেক কথা ফুটেছে তো!
শ্রীময়ী জিজ্ঞেস করল,—তা এমনি আছ কেমন?
—আমার আর থাকা! ...যেমন দেখছ।
—চুলগুলো সব পাকিয়ে ফেললে কী করে? ফুলদার ঘরে খাটতে খাটতে?
মনোরমা নিরুত্তর।
—মেজ তরফ থেকে এদিকে চলে এসেছ যে? ঝামেলা ঝঞ্ঝাট হয়েছিল কিছু?
—কেন, মিতুল তোমায় কোনোদিন কিছু বলেনি?
হ্যাঁ বলবে, কী না বলবে, ভাবতে একটু সময় নিল শ্রীময়ী। যদি না বলে তাহলে কি তার সঙ্গে মিতুলের যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা নেই বলে মনে করবে মনু? আর হ্যাঁ বললে তো প্রশ্নটাই অর্থহীন হয়ে যায়।
মনোরমা অবশ্য উত্তরের অপেক্ষায় নেই। ভার ভার গলায় বলল,—সে অনেক ইতিহাস। কী দু:স্বপ্নের কাল যে গেছে! তুমি চৌধুরীবাড়ি ছেড়ে চলে গেলে, তার পরের বছর ... নাকি তারও পরের বছর হঠাৎ কোত্থেকে আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসে উপস্থিত। বড় ভাসুর, আর এক দেওর। কী? না আমাকে তারা সসম্মানে তাদের পরিবারে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। কোত্থেকে নাকি শুনেছে মামার বাড়িতে দাসীবাঁদির মতো আমার জীবন কাটছে, তাতে তাদের নাকি মানে লেগেছে... মরা ভায়ের বউকে এবার তারা মাথায় করে রাখবে। তখনই মেজমামা পই পই করে বারণ করেছিল, যাস না, যাস না...। ভালোবাসা থেকে বলেনি অবশ্য। বিনি মাইনের ঝি চলে যাচ্ছে...! সেজদা রাঙাদাও বলেছিল, যাচ্ছ যাও, তবে পরে পস্তালে আমাদের কাছে কাঁদতে এসো না...!
—তা সেখানে টিকতে পারলে না কেন?
—কপালের গুণে। মনোরমা একটা লম্বা শ্বাস ফেলল,—তারাও তো আর সত্যি সত্যি ভালোবেসে নিয়ে যায়নি ফুলবউদি, বিষয় স্বার্থের খাতিরে আমাকে তাদের প্রয়োজন হয়েছিল। কদিন খুব যত্নআত্তি করল, আমিও সুখে গলে যাচ্ছি... ওই সময়ে আমাকে দিয়ে কীসব কাগজপত্র সই করিয়ে নিল। পরে জানলাম, আমার স্বামীর ভাগটা আমাকে দিয়ে দানপত্র করিয়ে নিয়েছে।
—হুম। তারপর তারাও আবার দাসী বানিয়ে ফেলল, তাই তো?
—তা হলেও নয় সেখানে টিকে থাকতাম। ...তাও কপালে জুটল না। শুরু হল অন্যরকম অত্যেচার। বোঝো তো...তখন তো আমার যৌবন আছে...রোজ রাতে দরজায় ধাক্কা পড়ে! খুড়তুতো দেওর এসে হামলাচ্ছে, নিজের সেজ ভাসুর পর্যন্ত...সে আমি মুখে আনতে পারব না ফুলবউদি। এক রাতে মরিয়া হয়ে ট্রেন ধরে এক বস্ত্রে কলকাতায়। সারা রাত শেয়ালদা স্টেশনে বসে কেঁদেছি আর ভেবেছি কোথায় যাই, কী করি...। শেষে আলো ফুটতেই কপাল ঠুকে ফের ভবানীপুর। মেজমাইমা তো দেখে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিচ্ছিল, শেয়াল কুকুরের মতো, তখন বড়মাইমাই ডেকে...
—বড়মাইমা? শ্রীময়ী শিহরিত,—মানে সোমনাথের মা?
—হ্যাঁ, ফুলবউদি। তিনিই। আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখের কোণটা মুছল মনোরমা,—তুমি চলে যাওয়ার পর বড়মাইমা অনেক বদলে গেছিলেন। বোধহয় ভাবতে পারেননি তুমি সত্যি সত্যি গালে চড় মেরে চলে যেতে পারো। সে হাঁকডাকও আর ছিল না, কেমন যেন ধন্দ মেরে গেছিলেন। বড়মামা তোমার আর ফুলদার কাগজপত্রে ছাড়ান কাটানের জন্যে খুব উঠেপড়ে লেগেছিলেন এক সময়ে, মাইমার আপত্তির জন্যই...। মাইমা বলতেন, সে যদি নিজে থেকে না চায়, তোমরা জোর করে সম্পর্কটা ভাঙবে কেন? মেয়েমানুষের ফেরার একটা রাস্তা থাকা ভালো।
শ্রীময়ী নিথর হয়ে গেল। কোন মানুষ কখন যে কীরকম বুঝে ওঠা সত্যিই বড় কঠিন। যাকে একসময়ে অবিমিশ্র দানবী বলে মনে হত, তার মধ্যেও ন্যায় অন্যায় বোধ ছিল তাহলে!
মনোরমা আবার বলে উঠল,—তাহলে বলো, এত ঝড়ঝাপটার পরেও আমার শরীরে কোনও লয় ক্ষয় হবে না? আমার তো তোমার মতো পেটে বিদ্যেও ছিল না, মনের জোরও না, আমাদের তো অন্যের দয়ায় বেঁচে থাকাটাই নিয়তি।
শ্রীময়ী নি:শব্দে মাথা নাড়ল। বটেই তো।
—আমার কথা ছাড়ো ফুলবউদি, তোমার কথা বলো। মনোরমার চোখে সম্ভ্রম,—তুমি তো এখন অনেক উঁচুতে উঠে গেছ। কলেজে পড়াচ্ছ, ফ্ল্যাট কিনেছ, একার জোরে ঘটা করে মেয়ের বিয়ে দিলে...
—মেয়ের বিয়ে দেওয়াটা আমার কর্তব্য ছিল।
—না না, কর্তব্য বোলো না ফুলবউদি, কটা মা তোমার মতো পারে? তোমার কথা শুনলে আমার মাথাটাও উঁচু হয়ে যায়, চোখে জল আসে।
—কার কাছে শোনো?
—কেন? মিতুল। মেয়ের তো মা ছাড়া মুখে কোনও কথা নেই। আমার মা-র মতো মা হয় না, এত কষ্ট করেছে, এত পরিশ্রম করেছে...! মিতুলের মুখে তো শুধু ঘুরেফিরে তোমারই নাম।
সত্যি বলছে মনু? শ্রীময়ীর গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যেই বা বলবে কেন? তাকে খুশি করার তো কোনও দায় নেই মনুর! মেয়ে মুখে কিছু বুঝতে না দিলেও ঠিকই তবে উপলব্ধি করেছে মা-র আজীবনের সংগ্রাম! শ্রীময়ীর সব শ্রম সার্থক। বেঁচে থাকারও বুঝি একটা মানে খুঁজে পাওয়া গেল। যে বাড়ি থেকে মা একদিন অপমানিত হয়ে বেরিয়ে এসেছে, সেই বাড়িতে মাকে একটা উঁচু আসনে প্রতিষ্ঠিত করা—এর চেয়ে বড় প্রতিদান আর কী দিতে পারত মিতুল?
মনটা অনেক নির্ভার হয়ে গেছে শ্রীময়ীর। সহজ গলায় বলল,—তা এখন তো অনেকটা থিতু হয়েছ? আর তো ঘর হারানোর, আশ্রয় হারানোর ভয় নেই, এবার তো একটু শরীর টরিরের দিকে নজর দিতে পারো।
—নিজেকে দেখব, না ফুলদাকে সামলাব?
—বকাঝকা করো, শাসন করো।
—শোনে নাকি কিছু! মেয়েই এসে সামাল দিতে পারে না! মনোরমা ফ্যাকাসে হাসল, —কিছু মনে কোরো না ফুলবউদি, তুমি আর ফুলদা একই ধাতুতে গড়া। তোমাদের কারোরই জেদ কম নয়। টের তো পাই, তুমি চলে যাওয়ার পর থেকে ফুলদাও ভেতরে ভেতরে পুড়েছে খুব, মুখে তো মরে গেলেও প্রকাশ করবে না... শরীরটাও আস্তে আস্তে ঝাঁঝরা হয়েছে। ...ডাক্তারের বারণ মানে না, ঠিকমতো ওষুধ খায় না...। বুঝিয়ে বলতে গেলে হাসে। বলে, মনু বেঁচে যে আছি এটাই তো যথেষ্ট। মনোরমা এক সেকেন্ড থামল, ভাবল কী যেন। তারপর বলল,—পুরুষমানুষ হয়ে মেয়েমানুষের কাছে হারতে হয়েছে, এ ঘা কি ফুলদার ইহজীবন শুকোবে! তাও আবার যে সে পুরুষ নয়, ভবানীপুরের চৌধুরীবাড়ির পুরুষ!
এতকাল চৌধুরীবাড়ির অন্ন খেয়েও এখনও সে বাড়ির লোকের ওপর চোরা ঘৃণা রয়ে গেছে মনুর! কারণটা শ্রীময়ী ঠিক বুঝতে পারল না। বঞ্চিতা নারী বলে? নাকি এ মেয়েমানুষের স্বাভাবিক স্বজাত্যবোধ?
কথা বলতে বলতেই মনোরমা হঠাৎ নড়েচড়ে উঠেছে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে শ্রীময়ী দেখতে পেল মিতুলকে, ইতিউতি খুঁজছে তাদের।
মনোরমাকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে এল শ্রীময়ী। মিতুল বলে উঠল—কোথায় ছিলে? কখন থেকে খুঁজছি!
—এই তো, তোর মনুপিসির সঙ্গে গল্প করছিলাম।
—যাও, তাড়াতাড়ি ঘুরে এসো। তোমার পর মনুপিসি যাবে।
—সোমনাথকে বলেছিস আমি আজ এসেছি?
—হুঁ।
—শুনে কী বলল?
—আহ, তুমি যাও না। ভিজিটিং আওয়ার বেশিক্ষণ নেই। ...আই সি ইউ একেবারে টপ ফ্লোরে। হেঁটে উঠো না, লিফটে যাও।
ভেতরে ভেতরে হঠাৎ কেমন নার্ভাস বোধ করছিল শ্রীময়ী। বাইরে অবশ্য সেটা প্রকাশ হতে দিল না, কোলাপসিবল গেটে দাঁড়ানো দারোয়ানকে কার্ড দেখিয়ে ঢুকছে। অসতর্ক মুহূর্তে ঘাড় ঘুরে গেল। দেখল মিতুল কাউন্টারে, ঝুঁকে কথা বলছে রিসেপশনিস্টের সঙ্গে, ভ্যানিটিব্যাগ থেকে কাগজ বার করে কীসব টুকে নিচ্ছে। নার্সিংহোমের বিল মিতুলরাই মেটাচ্ছে নাকি? ছি ছি, সোমনাথের কি এতই হীন দশা এখন! বাপ মরার পর নিজে নিজে প্র্যাকটিস আর তেমন জমাতে পারেনি বোধহয়। বোধহয় কেন, তাইই। বাবুর তো যত বাক্যবাণ শুধু বাড়িতেই ছুটত, এজলাসে দাঁড়ালে তো তোতলাতো সোমনাথ। শ্বশুরমশাই এ নিয়ে কম গালাগাল করতেন ছেলেকে! পাঁঠার বেহদ্দ পাঁঠা, আমি মরে গেলে তো শুধু এফিডেভিট করে খেতে হবে! যত দূরবস্থাতেই আসুক না কেন, শ্রীময়ী কক্ষনো মেয়েজামাই-এর হাততোলা হয়ে থাকবে না। সাধে কি আত্মীয়স্বজনরা কেউ আসছে না! নির্ঘাৎ টাকা খসানোর ভয়ে। বেচারা মনু, শেকলে আটকা পড়ে গেছে তাই...। অবশ্য বাবা অসুস্থ বলে মিতুলের এটা সাময়িক সাহায্যও হতে পারে। সোমনাথ সেরে উঠে হয়তো সব মিটিয়ে দেবে। চৌধুরীপরিবারের আত্মসম্মানজ্ঞানের দেখনদারি তো কম নয়!
চিন্তা জুড়ে জুড়ে অন্যমনস্ক হয়ে থাকা শ্রীময়ী লিফটে উঠে চারতলায়। সহসা হাঁটুর জোর নি:শেষ। রাগ অভিমান দু:খ ঘৃণা প্রেম সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। একটু বুঝি শ্বাসকষ্টও অনুভব করল শ্রীময়ী। এ বাড়ির চারতলায় কি অক্সিজেন কম?
শ্রীময়ী কি এগোবে আর? না নেমে যাবে?
নার্সিংহোমের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটটা তেমন বড় নয়। মাত্র গোটা ছয়েক বেড, ঘন সবুজ পরদা দিয়ে দিয়ে পৃথক করা। প্রতিটি বিছানায় মাথার কাছে মনিটারিং মেশিন, হালকা সবুজ তরঙ্গ দুলে দুলে উঠছে পরদায়। অক্সিজেন স্যালাইন গ্লুকোজ কত কী চলছে রোগিদের। ব্যস্ত মুখে নার্সরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাদা অ্যাপ্রন জড়ানো জনাদুয়েক ডাক্তারও।
কাচের দরজা ঠেলে শ্রীময়ী পা রাখল ঘরটাতে। সঙ্গে সঙ্গে এক তীব্র ঠান্ডার অনুভূতি। এসি মেশিন ভয়ানক চড়ায় চলছে। ঘরময় চাপা উগ্র ঝাঁঝ। ওষুধের।
জোরে শ্বাস টেনে শ্রীময়ী বাতাস ভরার চেষ্টা করল ফুসফুসে, নিজেকে স্থিত করল। যৌবনের চাপল্য তাকে শোভা পায় না। সে এখন এক পরিণতবয়স্কা নারী। এমন নারী, যে জীবনের বেশিটা পথ একলাই হেঁটেছে। কয়েক পা এগিয়ে শ্রীময়ী শয্যাগুলোর দিকে তাকাল। সামনের এই ছ ছজন রোগির মধ্যে কোন জন সোমনাথ? সবাইকেই একরকম লাগছে যে! যেন পরোয়ানা পাওয়া ছয় আসামী শুয়ে আছে চরম মুহূর্তের প্রতীক্ষায়!
—শ্রীময়ী...!
ক্ষীণ ডাক শুনে শ্রীময়ী চমকে তাকাল। কোন বেড থেকে এল স্বরটা? দু নম্বর থেকে? আর একটু এগোল শ্রীময়ী। এইটেই কি সোমনাথ?
আবার ডাক উড়ে এল,—ময়ী...!
ঘুরল শ্রীময়ী। একটা দুর্বল হাত উঠছে বিছানা থেকে, ডাকছে। ওইটেই কি সোমনাথ?
শ্রীময়ী নিষ্পলক। এ কোন সোমনাথ? জীর্ণ চেহারা, কোটরগত চোখ, গালময় খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি, মাথার চুল প্রায় নেই বললেই চলে, টকটকে ফর্সা রঙে কালচে বাদামি প্রলেপ—এই লোকটাকে কি সে চিনত কোনোদিন?
নাহ, দু যুগ আগের সেই সোমনাথের সঙ্গে এই সোমনাথকে দূরকল্পনাতেও মেলানো যায় না। যাকে ছেড়ে শ্রীময়ী চলে গিয়েছিল, সে এই সোমনাথ নয়।
সোমনাথের হাত শ্রীময়ীর হাত চেপে ধরেছে,—তুমি এসেছ তবে? আমি ভাবতে পারিনি... আমি বিশ্বাস করতে পারছি না...
আশ্চর্য, সব অস্থিরতা, এ কদিন ধরে বুকের মধ্যে অহরহ চলতে থাকা অসহ্য টানাপোড়েন পলকে উবে গেছে শ্রীময়ীর! সে এখন পুরোপুরি স্থিত। হাতে ধরা হাতের চাপটা অনুভব করতে পারছে, কিন্তু কোনও অনুভূতিই জাগছে না। উল্টে অদ্ভুত এক নির্লিপ্তি ছেয়ে ফেলছে হৃদয়। নাহ, এই সোমনাথের সঙ্গে তার কোনও লড়াই ঝগড়া নেই।
কোনও ঘৃণা নেই। বিদ্বেষ নেই। ঈর্ষা নেই।
নাহ, এই সোমনাথের জন্য তার কোনও ভালোবাসাও নেই।
করুণা? মমতা? তাও নেই।
সোমনাথ দুর্বল স্বরে বলল,—দেখো, আমি এবার ঠিক ভালো হয়ে যাব।
—নিশ্চয়ই ভালো হবে। কী এমন হয়েছে?
একদম সহজ গলায় কথাটা বলল শ্রীময়ী। বোধহয় পাশের বেডের রোগির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেও এখন এই কথাই বলত। তাপহীন শীর্ণ হাতখানা অতি সন্তর্পণে নামিয়ে দিল রুগির বুকে।
শান্ত মুখে বলল,—বেশি কথা বোলো না। বিশ্রাম নাও।
—তোমাকে কাছে পাব বলেই বোধহয় এটা ঘটে গেল, ময়ী।
সম্বোধনটা ছুঁতেই পারল না শ্রীময়ীকে। চুপ করে রয়েছে।
সোমনাথ আবার বলল,—এখন থাকছ তো কলকাতায়?
—দেখি।
সোমনাথ আবার কী যেন বলতে যাচ্ছিল, শ্রীময়ী ঠোঁটে আঙুল রাখল,—চুপ। তোমার এখন কথা বলা বারণ।
—আজকের দিনেও চুপ থাকব?
শ্রীময়ীর নিরাসক্ত চোখ দেওয়ালে উঠে গেল। তারপর মনিটারে। ড্রিপের বোতলে। অক্সিজেন সিলিন্ডারে। সবুজ পরদায়। ঘুরতে ঘুরতে ফিরেছে সোমনাথে। আর কোনও কথা বলছে না সোমনাথ, শুধু ঘোলাটে মণি দুটো কেমন জ্বলছে যেন।
ওই দৃষ্টিও যেন এক অচেনা পুরুষের।
শ্রীময়ী গলা ঝেড়ে বলল,—আমি যাই। আমি গেলে মনু আসবে।
পিছন ঘুরেও শ্রীময়ী সোমনাথের স্বর শুনতে পেল,—সব ভুলে গেছ তো ময়ী? কোনও খেদ মনে রাখোনি তো?
এতক্ষণ পর একটা সত্যি বলার সুযোগ পেল শ্রীময়ী। দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,—ভুলে গেছি। সব ভুলে গেছি।
কাচের দরজার এপারে এসে হঠাৎ খুব কান্না পাচ্ছিল শ্রীময়ীর।
এতদিন ধরে পুষে রাখা বিদ্বেষটা মরে যাওয়ার জন্য।
ঘৃণা উবে যাওয়ার জন্য।
ভালোবাসা মুছে যাওয়ার জন্য।
কে এদের গ্রাস করল?
সময়?
ফেরার পথে মা মেয়েতে কথা হচ্ছিল। ট্যাক্সিতে বসে। মিতুল আজ একটু চিন্তান্বিত যেন। কথা বলছে, তবে সঙ্গে সঙ্গে কী যেন ভেবেও চলেছে। শ্রীময়ী অবশ্য পুরোপুরি নির্ভার, মেয়ের সঙ্গে লঘু রসিকতাও করছে এক আধটা।
হঠাৎই মিতুল বলল,—একটা কথা বলব মা?
—কী রে?
—বাবার কন্ডিশান তো দেখলে। গড ফরবিড, বাবা যদি এবার ভালোয় ভালোয় ফিরে আসে...। মিতুল অদৃশ্য দেবতার উদ্দেশে কপালে হাত ঠেকাল,—কটা দিন বাবাকে আমার কাছে এনে রাখলে কেমন হয়?
—সে তোর ইচ্ছে। রাখতেই পারিস।
—কিন্তু...
—কিন্তু কী?
—প্রবলেম আছে। ওই তোমার জামাই...
—সুগত আপত্তি করবে?
—মুখে কিছু বলবে না, কিন্তু সারাক্ষণ তোলো হাঁড়ি হয়ে থাকবে। একটা সাইলেন্ট প্রেশার তৈরি করবে আমার ওপর।
—কেন? সুগত তো তোর বাবার জন্য যথেষ্ট ছোটাছুটি করছে!
—ওর অনেক লোক দ্যাখানো ব্যাপার আছে। ও তুমি বুঝবে না। ও বাবাকে একটুও পছন্দ করে না, আমি জানি। নেহাত আমার মুখ চেয়ে...
সোমনাথের মেয়ের দিকে শ্রীময়ী তাকাল একঝলক, উত্তাপহীন স্বরে বলল,—হুম। তো কী করবি?
—ভাবছি। একটুক্ষণ জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল মিতুল। তারপর যেন শ্রীময়ীকে নয়, নিজেকেই বলল,—আমার বাবা যেমনই হোক, ভালো হোক, মন্দ হোক... তবু সে তো আমার বাবা। মেয়ে হয়ে আমি তাকে নেগলেক্ট করি কী করে? কেন যে সুগত আমাকে একটু ফিল করে না! ও যদি একটু রিজনেবল হত!
পলকের জন্য সুগতর স্টাডিরুমটা শ্রীময়ীর চোখের সামনে দুলে গেল। আলো জ্বলছে ঘরটায়, নিশুত রাতে। বসে আছে সুগত, একা।
শ্রীময়ীর মনে হল স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে আগুন আর বরফ ছাড়াও আরও কিছু থাকে বোধহয়। শুকনো চড়া। কিংবা অনতিক্রম্য খাদ।
আবার মিতুলের স্বর,—যাক গে, মরুক গে, আমার অত ভাবলে চলবে না। বাবাকে কাছে এনে রাখতেই হবে। বাবার একটু কড়া ওয়াচে থাকা দরকার। মনুপিসিকে দিয়ে হবে না। বাবা মনুপিসিকে উল্টো ট্যাঁকে গোজে। একটু ফিট হলেই বাবা ফের অনিয়ম শুরু করে দেবে। করবেই। এবার যদি বাবার কিছু হয়ে যায়, তখন আর হাত কামড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না।
—হুম।
মিতুল কয়েক পলক গোয়েন্দা চোখে জরিপ করল মাকে। তারপর বলল,—তোমার খারাপ লাগবে না তো মা?
—আমার! কী? কেন?
—না মানে...। মিতুল আবার একটু চুপ। দাঁতে নখ খুঁটছে। আচম্বিতে ধরা গলায় বলল, —বাবা খুব একা মা।
আবেগটা শ্রীময়ীকে একটুও ছুঁল না। একা কে নয়? মিতুলের চোখে মোহাঞ্জন, বোঝে না সেও একা। সুগতও। এমনকী বুমবুমও। মানুষ নিজেকে ঘিরে কিছু কিছু সম্পর্কের বৃত্ত রচনা করে, আত্মসুখের জন্য। ভাবে তাতেই সে পরিপূর্ণ। এই আমার মা, এই আমার বাবা, এই আমার স্বামী, আমার সন্তান...। কিছুই কিছু না। নিজের নির্মাণ করা এই বৃত্তে নিজেরই রিপুগুলো শুধু পাক খেয়ে মরে। কাম ক্রোধ লোভ মদ মোহ মাৎসর্য। অভিমান। ভালোবাসা।
হ্যাঁ, ভালোবাসাও।
কী শূন্যগর্ভ এই বিলাস—ভালোবাসা!
নাহলে সময় কি তাকে এমন নি:সাড়ে গিলে নিতে পারে?
শ্রীময়ীকে নিশ্চুপ দেখে মিতুল কাকুতির সুরে বলল,—তুমি জানো না মা, ভবানীপুরের বাড়িটা এখন প্রেতপুরী। বাবাদের অংশে মানুষ বলতে ওই মনুপিসি আর পুরনো বুড়ো চাকর অজুকাকা। কানে শুনতে পায় না, চোখে দেখতে পায় না, শুধু মরার জন্য এখানে পড়ে আছে।
অন্য কোথাও থাকলেও কি অনন্তকাল বাঁচবে সোমনাথ? কথাটা প্রায় শ্রীময়ীর মুখে এসে গিয়েছিল, গিলে ফেলল। কোমল গলায় বলল,—বেশ তো। রাখ না এনে।
—বিশ্বাস করো মা, বাবা এখন একদম বদলে গেছে। তুমি যে বাবাকে চিনতে, সে বাবা আর নেই।
এ সত্যও শ্রীময়ীর চেয়ে বেশি আর কে জানে! শ্রীময়ী বলল,—হুম।
—অতীতে তোমার সঙ্গে যে দুর্বব্যবহার করেছে, তার জন্য বাবা খুব অনুতপ্ত। কম বয়সে চৌধুরীবাড়ির বনেদিআনা বাবার দৃষ্টিকে ঘুলিয়ে দিয়েছিল। বাবা এখন অনেক স্বচ্ছভাবে সবকিছু দেখতে পারে, খোলা মনে ভাবতে পারে...
—বেশ তো। ভালো তো। আমাকে এত করে বলছিস কেন?
—তাহলে তোমার আপত্তি নেই তো মা?
—তুই তোর বাবাকে কাছে এনে রাখবি, সেবাযত্ন করবি, এতে আমার আপত্তির প্রশ্ন আসছে কোত্থেকে? মেয়ে হিসেবে এটা তো তোর ডিউটি। শ্রীময়ীর ঠোঁটের আলগা হাসি অনেকটাই ছড়িয়ে গেল। মেয়েকে কাছে টানল। নিরাসক্ত আঙুল বোলাল মেয়ের চুলে,—এবার আমি একটা কথা বলব? রাগ করবি না তো?
—কী মা?
—দুম করে চলে এলাম, কলেজে ছুটি নেওয়া হয়নি। অনেকগুলো কাজও আছে। কাল পরশু যদি একটা টিকিট পাওয়া যায়, তো চলে যাই।
—তুমি রাগ করলে? মিতুল এক ঝটকায় টানটান,—তুমি এখনও বাবাকে হিংসে করো? এত অসহায় দেখেও লোকটাকে তুমি ক্ষমা করতে পারছ না?
শ্রীময়ী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মিতুল কি বললেও বুঝবে, ক্ষমা বা হিংসে করার জন্যও যেটুকু আবেগ থাকা দরকার, সোমনাথের জন্য শ্রীময়ীর আর সেটুকুও অবশিষ্ট নেই!
ট্যাক্সি এগোচ্ছে। বাঁয়ে এক ভাঙা মসজিদ। বিশাল কাঠামো দাঁত বের করে আছে। এক সময়ে কত লোক এখানে জড়ো হত। আজ সুনসান। অন্ধকার।
সব বদলে যায়। কাল সব কিছুকেই বদলে দেয়।
রবিবারের পূর্বা এক্সপ্রেসে টিকিট পেয়ে গেল শ্রীময়ী। সুগতই জোগাড় করে দিল। প্রায় সোহিনীরই কায়দায়। তবে কলকাতা ভারতবর্ষের রাজধানী নয় তো, ঘুষের রেট এখানে কিঞ্চিৎ কম।
সক্কাল সক্কাল শ্রীময়ীকে ট্রেনে তুলে দিতে এসেছে মেয়ে জামাই নাতি। স্টেশনময় ছুটে বেড়াচ্ছে বুমবুম। তাকে সামলাতে সুগতও ছুটছে, গলদঘর্ম হয়ে। মিতুলের মুখ ভার, সে এখনও মা'র এই নিষ্ক্রমণ মন থেকে মেনে নিতে পারেনি।
শ্রীময়ী অবশ্য তা নিয়ে ভাবিত নয়। বরং বুমবুমের দস্যিপনা দেখে হাসছে মিটিমিটি। কফি খেল, ম্যাগাজিন কিনল, চকাস চকাস চুমু খেল বুমবুমকে।
ট্রেন প্রায় ঠিক সময়েই ছাড়ল। মাত্র পাঁচ মিনিট লেট।
শীতল কামরায় ফিরে নিজস্ব সিটে বসল শ্রীময়ী। কেজো ভাবনাগুলোকে ডেকে আনছে একে একে। কাল সকাল আটটা সাড়ে আটটার আগে দিল্লি পৌঁছবে। স্টেশন থেকে অটো ধরে মধুবিহার মিনিট কুড়ির বেশি লাগার কথা নয়। পিঙ্কিকে গিয়ে ধরা যাবে কি? ঘরের কী হাল হয়ে আছে কে জানে, একটু সাফসুতরো না করলে কি চলবে? খাওয়া অবশ্য কলেজ ক্যান্টিনেই সেরে নেওয়া যায়। টোস্ট ওমলেট ঘুগনি ফুগনি যা হোক কিছু। একটা তো মাত্র দিন...। কলেজের প্রথম ক্লাসটা কি ধরতে পারবে? কাদের ক্লাস আছে প্রথমে? ফার্স্ট ইয়ার না? ক্রিসমাসের পরই আবার ওদের ক্লাসটেস্ট নিতে হবে। কার্ডনস মেথডটা জলদি জলদি শুরু করা দরকার। বাড়িতে এক কাঁড়ি খাতা জমে আছে, কলেজে নিয়ে যাবে কি কাল? সোমবার পর পর দুটো পিরিয়ড অফ থাকে, কালই যদি খাতাগুলো শেষ করে ফেলা যায়...
এর মাঝেই একটা বাক্য বিদ্যুৎ ঝলকের মতো শ্রীময়ীর মনে উঁকি দিয়েই মিলিয়ে গেল।
শ্রীময়ীর এবার কলকাতা আসাটা বড়ই জরুরি ছিল।
তার নিজের জন্যই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন