ইমানুল হক
সোভিয়েত রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের প্রথম কবর যিনি খুঁড়েছিলেন সেই ক্রুশ্চেভ স্তালিনের জীবদ্দশায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনও কথা বলেননি। মৃত্যুর পর তাঁর বিরুদ্ধে স্বৈরতান্ত্রিক পথে চলার অভিযোগ আনেন।
নিজেকে জাহির করার চেষ্টায় নস্যাৎ করার প্রবল প্রচেষ্টা শুরু হয় স্তালিনের কৃতিত্বকে নস্যাৎ করার।
জ্যোতি বসু স্তালিন নন। কিন্তু তাঁকেও সহ্য করতে হয়েছে অপমান। জীবদ্দশাতেই তিনি বিরোধী এমনকী দলীয় সহকর্মীদের কাছে শুনেছেন ‘কিছুই হয়নি’, ‘পিছিয়ে পড়েছে রাজ্য’। কিন্তু সত্যিই কি তাই হয়েছিল?
ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ গ্রন্থে বলেছিলেন যে, বিপ্লবীদের জীবদ্দশায় বহু অপমান, অবমাননা সইতে হয়, কিন্তু মৃত্যুর পর তাদেরই মহান বানায় বুর্জোয়ারা।
জ্যোতি বসু কমিউনিস্ট পার্টির ‘হোলটাইমার’ বা সর্বক্ষণের কর্মী। কমিউনিস্ট পার্টির ‘হোল টাইমার’ বা সর্বক্ষণের কর্মীদের সাধারণভাবে ‘পেশাদার বিপ্লবী’ বলা হয়, এই অর্থে বিপ্লবী, যদিও তাঁর অস্ত্রধারণের কোনো ইতিহাস সেভাবে জানা নেই।
কিন্তু জ্যোতি বসু সমাজবিপ্লবী এবিষয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।
বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনে জ্যোতি বসুর অবদান বিপুল। অথচ তাঁর সঠিক মূল্যায়ন আজও হয়নি।
বরং লেনিনের কথার উল্টো ঘটেছে। মৃত্যুর পরও তাঁকে সইতে হয়েছে বিপুল অসম্মানের চেষ্টা ও ব্যক্তিগত আক্রমণ।
লেনিনের জীবনেও তাই ঘটেছে। ঘটেছে স্তালিনের জীবনেও। এখনও তাঁদের আক্রান্ত হতে হয় প্রচার মাধ্যমে।
জ্যোতি বসুর প্রধান অবদান এই নয় যে, তিনি ২৩ বছর একটানা মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর প্রধান অবদান বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রে বদল ঘটানো। বদল এসেছিল অর্থনৈতিক মানচিত্রেও।
তফশিলি জাতি, উপজাতি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যেভাবে সম্মান পেয়েছেন তা বিরল। ব্রাহ্মণ তথাকথিত উচ্চবর্গের সঙ্গে বসে খাওয়া, শোয়া, ও বসা-বাংলায় আগে সাধারণভাবে বিরল ছিল। জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্তের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি এক্ষেত্রে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
এই সংস্কৃতি কমিউনিস্ট সংস্কৃতি। চৈতন্য চেষ্টা করেছিলেন সামাজিক সমন্বয়ের, কিন্তু যবন হরিদাসের সঙ্গে একপাতে খেতে তিনিও পারেননি। রামমোহনের প্রেমিকা ছিলেন মুসলিম সম্প্রদায় জাত। সে নিয়ে বহু কটাক্ষ শুনেছেন তিনি। কিন্তু কোনো মুসলিম ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষা নেননি, রামমোহন এভাবে ভাবেননি বা ভাবতে পারেননি। যদিও মূর্তিপূজার তীব্র বিরোধিতা করে মাত্র ১৪ বছর বয়সে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষিত হন। আর আজ মূর্তিপূজার বিরোধিতা করে কোনও জন? কারও সে সাহস আছে? মূর্তিপূজাকে কুসংস্কার বলার? মূর্তি পূজা এখন সবচেয়ে বড় উৎসব।
বিদ্যাসাগর শেষজীবন কাটিয়েছেন আদিবাসী সাঁওতালদের মধ্যে। ‘সভ্য’ আর্যদের চেয়ে ‘অসভ্য’ সাঁওতালদের ভালো মনে হয়েছে তাঁর।
বিবেকানন্দ ছোটোবেলায় ‘মুসলমান’দের জন্য নির্দিষ্ট হুঁকায় মুখ দিয়েছেন, কিন্তু এটাকে সামাজিক প্রথায় রূপান্তরে ব্যর্থ। কায়স্থ সম্প্রদায়জাত মানুষ বিবেকানন্দকে কখনো কখনো অন্য ব্রাহ্মণ সন্ন্যাসীর কাছে শুনতে হয়েছে ‘শূদ্র’ অভিধা। বিবেকানন্দ মূর্তি পূজার বিরোধিতা করতে ‘বেদ’ উদ্ধৃত করেছিলেন, কিন্তু খুব সাহস করেননি, একে ঠেকাতে; এখন তিনি নিজেই তো বিগ্রহ প্রায়।
রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে চেয়েছেন সাম্প্রদায়িক, বিশ্বজনীন শিক্ষার আদর্শ স্থাপন করতে, কিন্তু তাঁকেও ব্রাহ্মণ ছাত্র অব্রাহ্মণ শিক্ষককে প্রণাম করবে না, বা, এক পংক্তিতে সবাই খাবে না—বলতে বাধ্য হতে হয়েছিল।
পরে শান্তিনিকেতন তাঁর মনের মতো হয়। শান্তিনিকেতনে মূর্তি পূজা নিষিদ্ধ হয়। এখন অবশ্য তিনি নিজেই অন্য এক মূর্তি। রবীন্দ্র আদর্শহীন রবীন্দ্রপূজা চলছে চারদিকে। তাঁকে পূজার ছলে তাঁকেই ভুলে থাকছে সবাই।
শরৎচন্দ্রও এক অর্থে শুধু সাহিত্যিক নন, সমাজ সংস্কারক। নিজে ব্যক্তিগত জীবনে তথাকথিত অন্ত্যজদের সঙ্গে মিশে ব্রাহ্মণ সমাজে ব্রাত্য হয়েছেন। পানিত্রাসে নিজের বাসভবনের চারপাশে প্রাচীর দিয়েছিলেন যাতে ব্রাহ্মণরা তাঁর সীমানায় ঢুকতে না পারে। ঘোষালদের চরিত্র তিনি আঁকেন ‘পল্লীসমাজ’ উপন্যাসে।
কিন্তু এঁরা কেউ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে একত্র ভোজন, শয়ন, গমনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেননি।
কমিউনিস্ট পার্টি এক পংক্তিতে ভোজন শয়ন, গমনের অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। কাকাবাবু মুজফ্ফর আহমেদ, আব্দুল হালিম, আবদুল্লাহ রসুল, সরোজ মুখার্জি, কনক মুখার্জি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন—সার্পেন্টাইন লেনে কমিউন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
জ্যোতি বসুও বাস করেছেন কমিউনে। শুধু তাই নয়, বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার ঘর ঝাঁট দিয়েছেন, রান্না করেছেন একজন ট্রাম শ্রমিকের জন্য—নাম তাঁর মহম্মদ ইসমাইল। ‘মুসলিম’ ছদ্মনাম নিয়েছেন জ্যোতি বসু। ঘরে আমৃত্যু লুঙ্গি পরতেন। নিজের জামা-কাপড় শেষ বয়স পর্যন্ত নিজে কাচতেন। আবার পুজোআচ্চা নামাজে বিশ্বাস স্থাপন করেননি।
একটা সময় পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা সেভাবে ধর্মেকর্মে আস্থা রাখতেন না। পরে পূজার সময় মণ্ডপের কাছে বইয়ের স্টল দিতেন, এখন দুর্গা পূজা হয়ে গেছে ‘জাতীয় উৎসব’। মহরমে, ইদে বাজছে মাইক। ১৯৮১-৯১—এই ১০ বছরে রাজ্যে বিদ্যালয় বেড়েছে ১০ হাজার। আর ধর্মস্থান ১৬৯০০০০।
আপাতদৃষ্টিতে ‘ধান ভাঙতে শিবের গীত’ মনে হলেও একটা কথা মনে রাখা খুব জরুরি—একটা জাতির অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে হলে ধ্বংস করতে হয় তাঁর সংস্কৃতিকে; সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে হলে ধ্বংস করতে হয় তাঁর শিক্ষাকে; শিক্ষাকে ধ্বংস করতে হলে ধ্বংস করতে হয় তাঁর ভাষাকে; শিক্ষাকে ধ্বংস করতে হলে ধ্বংস করতে হয় তাঁর আত্মমর্যাদাবোধকে।
জ্যোতি বসু-রা বাঙালির অর্থনীতির (হ্যাঁ অর্থনীতি), সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ভাষা ও সর্বোপরি বাঙালির আত্মমর্যাদার উন্নয়নে সচেষ্ট হয়েছিলেন।
সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম এসব আলোচনার সময় বিবদমান দু’পক্ষের লোকেরাই বেমালুম একটা কথা বলতে ভুলে যান—বাংলায় টাটা সালিমদের আসার প্রধান কারণ বাংলার অর্থনীতি ধসে পড়া নয়, বরং উন্নত বুঝিয়েছে। কুড়ি হাজার কোটি টাকার বাজার তৈরি হয়েছে। সারা দেশে আবাসন শিল্পে যে বিপর্যয় নেমেছে, তা এখনও রাজ্যে নামেনি। না খেতে পাওয়া মানুষের সংখ্যা অন্য রাজ্যের তুলনায় কম। ভিখারির সংখ্যা জ্যোতি বসুদের আমলে কমেছিল। বন্যা হলেই দলে দলে লোক সাপের ছবি নিয়ে শহরে বা অন্য এলাকায় চলে আসত না। শিক্ষার হারে বিপুল পরিবর্তন। এই যে ছাত্র ভর্তির সমস্যা—এ সমস্যা তো আসলে জ্যোতি বসুদের সাফল্য। তফশিলি জাতি, উপজাতি ঘরের ছেলেমেয়েরা পড়তে আসছে দলে দলে। সংখ্যালঘু ঘরের মেয়েরা ছেলেদের থেকে বেশি সংখ্যায় পড়ছে। এর থেকে বড় সাফল্য আর কি হতে পারে?
১৯৭৭ থেকে ১০ গুণ বেশি মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী বেড়েছে। কলেজে বেড়েছে। বেড়েছে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, অঙ্গনওয়াড়ি, প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়। কারিগরি মহাবিদ্যালয় বেড়েছে। মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেলে ভালো হত। ভালো হত সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার মান আরও উন্নত হলে।
কিন্তু শিক্ষায়, অর্থনীতিতে রাজ্য জ্যোতিবাবুর আমলে পিছিয়ে পড়েছে… এ তথ্য মিথ্যা। এত সরকারি বা সরকারপোষিত চাকরির সম্ভাবনা আছে কোথাও? শিক্ষার হার এমনি বাড়েনি। বাড়াতে হয়েছে। প্রাথমিকে ইংরিজি তুলে দেওয়া এর একটা বড় কারণ। আর অন্য কারণ সীমিত হলেও ভূমি সংস্কার, খাস জমি বিলি, খেত মজুরের মজুরি বৃদ্ধি। সম্মান বেড়েছে। তাই এসেছে সমান হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, সেই আকাঙ্ক্ষায় ইন্ধন জুগিয়েছে বছর বছর ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষের সরকার বা সরকারপোষিত চাকরি পাওয়ার সুযোগ। দাদা দিদি ধরে চাকরি হয়নি এমন নয়, তবে পি এস সি, এস এস সি মারফৎ চাকরির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এনেছিল জ্যোতি বসুর সরকার। বিশ্ববিদ্যালয় ব্যতিক্রম, প্রাথমিক বিদ্যালয়েও যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি হয়েছে শেষ দিকে।
সে কারণেই মানুষ পড়তে চেয়েছে, কষ্ট করেও সন্তানকে পড়তে পাঠিয়েছে। যদিও একটি ক্ষেত্রে খানিকটা ব্যর্থ হয়েছে। আদর্শগত লড়াই শেষ পর্যন্ত চালাতে পারেনি দল। তাই ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় বেড়েছে। টিউশনি বেড়েছে। আদর্শের চেয়ে বড় হয়েছে অর্থ।
ফয়েরবাখ থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন হেগেল। কিন্তু তাঁর অনেক কিছু মানেননি, কিন্তু একটা কথা হুবহু মেনেছিলেন; জীবনধারার ছাপ চেতনাকে গড়ে।
মার্কস হেগেল থেকে শিক্ষা নিয়ে হেগেলের বহু তত্ত্ব নস্যাৎ করেন। কিন্তু তিনিও হুবহু মানেন; জীবনধারার ছাপ চেতনাকে গড়ে। জীবনধারা অনেকের বদলে গেল। তাই বদলে গেল আদর্শ। ক্ষমতা হয়ে উঠল নিয়ন্ত্রক। ফলে সর্বনাশ হল। এর জন্য জ্যোতিবাবুকে কেউ কেউ দায়ী করেন। কারণ তাঁর পুত্রকে তিনি রাজনীতিতে আনেননি, আনেননি, ভালোই করেছেন। পুত্রের প্রবণতা বুঝেই বোধহয় আনেননি।
সম্মান পেয়েছেন মানুষ। কোনও গরিব পাড়াকে আর ‘ছোটলোকদের পাড়া’ বলার হিম্মৎ কারো নেই। রিকশাওলা, খেতমজুর, সবজিওলাকে দুম করে ‘তুই’ কঠিন। আপনি না হোক অন্তত ‘তুমি’ বলার চল এসেছে।
উচ্চবর্ণের কারো বাড়ি গেলে একজন তথাকথিত পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষকে গোবর জল বা গঙ্গাজল দিয়ে শুদ্ধ করার অপমানজনক দৃশ্য আর চোখের সামনে দেখতে হয় না। স্কুলে শুনতে হয় না ‘তোদের পড়ে কি হবে, বাঁকা কলম মানে লাঙল ঠেলগে যা’।
মেয়েদের শুনতে হয় না—চুপ করে থাক, মেয়েছেলের দল। বা দুদিন পর তো সেই হাঁড়ি ঠেলতেই হবে, পড়ে আর কী করবি? আজ মেয়েরা বিদ্যালয়ে দপ্তরে বিপুল সংখ্যায়।
সন্ধ্যার পর মেয়েরা দূরে থাক, পুরুষেরা বেরোতে সাহস করতেন না—আইন শৃঙ্খলার এই অবনতিকে কঠোরভাবে দমন করেছিলেন জ্যোতি বসু।
দু-একটা বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটেনি, তা বলা যাবে না, কিন্তু সামগ্রিক চেহারা ছিল না।
জ্যোতি বসু নাকি ‘কালচার টালচার’ বুঝতেন না, নিজেও দু’একবার বলেছেন। কিন্তু সত্যিই কি তাই? বাসব দাশগুপ্ত-র লেখায় আছে, গাড়িতে করে বক্তৃতা করতে যাওয়ার পথে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস ‘চতুরঙ্গ’ নিয়ে দীর্ঘ ধরে তর্ক চলেছিল জ্যোতি বসু আর প্রবল পাণ্ডিত্যের অধিকারী হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের মধ্যে।
নিয়মিত পড়তেন বই। সংবাদপত্র পড়তেন খুঁটিয়ে। দুটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উল্লেখ এ প্রসঙ্গে করা ভুল হবে না।
১৯৯৬-এ জ্যোতি বসু নন, দেবেগৌড়া প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তার কিছুদিন পর দেবেগৌড়ার সরকার দাম বাড়িয়েছে তেলের। সে নিয়ে দেশ তোলপাড়। এ সময়ে প্রণব মুখোপাধ্যায় এসেছেন কলকাতায়। কংগ্রেসের নেতা তিনি। ‘আজকাল’ পত্রিকার সাংবাদিক দীপঙ্কর নন্দী আর ‘প্রতিদিন’ কাগজের সুধীরদার সঙ্গে গেছি প্রণববাবুর বাড়ি। প্রতিক্রিয়া জানার উদ্দেশ্যে। আমার প্রশ্ন ছিল, আপনি অর্থমন্ত্রী থাকলে কি করতেন?
প্রণববাবুর স্ত্রী ছিলেন কাছেই, তিনি উত্তর দিলেন, উনি থাকলে দাম বাড়াতেন না।
প্রণববাবু স্ত্রীকে থামিয়ে উত্তর দিলেন, না দাম না বাড়িয়ে কোনো উপায় নেই।
কেন নেই?
প্রণববাবু শিক্ষকের মতো দেশের অর্থনীতি, মুদ্রাভাণ্ডার, তেল খাতে খরচ ইত্যাদি বিষয়ে একটা ছোটোখাটো ক্লাস নিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দিলেন, কেন দাম বাড়ানো ছাড়া দেবেগৌড়াদের উপায় নেই। খবরটা মাত্র দুটো কাগজে বের হয়।
‘আজকাল’ আর ‘প্রতিদিন’-এ। তাও ভেতরের পাতায়। ছোট আকারে। পরদিন মহাকরণ গেছি সকাল সকাল। মাত্র দুজন হাজির। টেলিগ্রাফের ইন্দ্রনীল আর আমি। ইন্দ্রনীল পরে এন ডি টি ভি-তে যোগ দেন।
ইন্দ্রনীল প্রশ্নটা করলেন, তেলের দাম বাড়ল, আপনার প্রতিক্রিয়া?
জ্যোতি বসু উত্তর দিলেন, আজকের কাগজে বেরিয়েছে প্রণববাবুও তো বলেছেন, তেলের দাম না বাড়িয়ে উপায় নেই।
১৯৯৬-এ এত চ্যানেল নেই। আর খবর দুটি কাগজ ছাড়া বের হয়নি। সকাল ১১টায় মহাকরণে তিনি ঢুকছেন, সুতরাং অফিসারদের ব্রিফিংও সম্ভব নয়। নিজেই পড়েছেন। ভেতরের পাতার ছোটো খবরও নজর এড়ায়নি।
আর একটি বছর দুয়েক পরের। কল্যাণীতে এস এফ আইয়ের রাজ্য সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশে ভাষণ দেবেন জ্যোতিবাবু। দিল্লি থেকে আসবেন। সেদিন আবহাওয়া প্রতিকূল। বিমান ফিরে যায় দিল্লি। আবার আসে। এই করতে করতে দেরি। সরাসরি নেমেই কল্যাণী। সেদিন সুতীর্থ একটা খবর করে ‘প্রতিদিন’-এ। এস এফ আইয়ের কর্মকর্তা নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্বের খবর। জ্যোতিবাবু নিজের দেরিতে আসার কারণ ব্যাখ্যা করে উল্লেখ করলেন—খবরটা। করে বললেন, এসবে পাত্তা দেবেন না।
জ্যোতিবাবু সংবাদপত্র পড়তেন খুঁটিয়ে কিন্তু সংবাদ মাধ্যমকে বুঝতেন তিনি। নিয়মিত চারটি প্রধান দৈনিক তাঁর বিরুদ্ধে লিখত। তিনিও বিরুদ্ধে বলতেন। কোনো মোহ ছিল না।
তাঁর দেখানো বিচক্ষণতা ও ধৈর্যের একটি ঘটনার কথা বলা যাক। ১৯৯৬। পঞ্চম বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়েছে। জ্যোতি বসু আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নেই। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। কলকাতা পুলিশ এ্যাসোসিয়নের সভা। তখনকার দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা মহেন্দ্র মণ্ডল বক্তৃতা করছেন। সরকারের কাজের সমালোচনা। এই নেই, সেই নেই। রেশন খারাপ। আবাসনের মান ভালো নয়। একটা করে প্রসঙ্গ তুলছেন আর হল ফেটে যাচ্ছে হাততালিতে। বুদ্ধদেব গম্ভীর। তাঁর বক্তৃতা শেষ করলেন। সমালোচনা তাঁর নয়। কারণ সদ্য এসেছেন। তবু মুখ লাল। জ্যোতি বসু কী বলেন সেটাই দেখার। কারণ সমালোচনা তাঁর আমল ঘিরেই। জ্যোতি বসু প্রথমেই বললেন, আপনাদের অভিনন্দন। অভিনন্দন কেন না মন খুলে সমালোচনা করেছেন। আমরা ৭৭-এ ক্ষমতায় আসার সময় বলেছিলাম আমরা কোনও মৌলিক সমস্যার সমাধান করতে পারব না। কিন্তু মানুষ পাবেন মৌলিক অধিকার। মন খুলে কথা বলার অধিকার। সমালোচনার অধিকার। সেই অধিকার আপনারা সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছেন—এজন্য অভিনন্দন।
হল ফেটে গেল আর একরকম হাততালিতে। সমালোচনাকে ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে যে বিচক্ষণতা সংযম ধৈর্য—জ্যোতি বসু দেখিয়েছিলেন, তা যে কারো কাছে শেখার বিষয়।
এরপর তিনি একেক করে দেখালেন রেশনে দুর্নীতি ও অন্য বিষয়ে আইন প্রয়োগ করাটা সরকারের হয়ে পুলিশের কাজ। সে কাজ পুলিশ করুক। আর তখন কলকাতায় খুব ডাকাতি শুরু হয়েছিল। এমনকী দিনের বেলাতেও ফ্ল্যাটে ডাকাতি হচ্ছিল। তিনি বললেন, পুলিশের দক্ষতা আছে। তাকে কাজে লাগাতে হবে। পুলিশ জানে কারা এসব করছে। পুলিশ চাইলে একদিনে এসব বন্ধ হতে পারে।
ঠিক দুদিনের মধ্যে কলকাতায় ডাকাতি কমে গেল। আর কোনও খবর কাগজে এল না।
জ্যোতি বসু নাকি হাসতেন না! বাজে কথা। ১৯৯৩-এর ৭ নভেম্বর বর্ধমানে বিজ্ঞান কেন্দ্রের উদ্বোধন। একজন বৃদ্ধা দূর থেকে দাঁড়িয়ে জ্যোতিবাবুকে দেখার চেষ্টা করছেন। দেখে জ্যোতিবাবু তাকে ডাকলেন, মঞ্চ থেকে হাত বাড়িয়ে। স্থানীয় শিক্ষক কালী ব্যানার্জির মা। সাংবাদিকতা করি তখন। সঙ্গে করে নিয়ে গেলাম। মাসিমার ইচ্ছা হল জ্যোতিবাবুর সঙ্গে হাত মেলাবেন। মঞ্চের নীচে থেকেই সে চেষ্টা। জ্যোতিবাবু হাত বাড়িয়ে, মাসিমাকে হেসে বললেন, ভালো থাকবেন।
আর তাঁর বক্তৃতায় সবাই ভালো থাকার প্রসঙ্গটি তিনি প্রতিবার উল্লেখ করতেন। এমনভাবে বক্তৃতা করতেন, যেন সামনে বসে কথা বলছেন। নাটকীয়তা ছিল তাঁর ভারি অপছন্দ।
অলিভার ক্রমওয়েলকে যখন জিগ্যেস করা হয়, ‘ঈশ্বরের নির্বাচিত ব্যক্তিরূপে আপনাকে গর্বের সঙ্গে প্রবেশ দেখার জন্য যে এতগুলো মানুষ ভিড় করেছে তার জন্য কি আপনি গর্বিতবোধ করছেন না? তাতে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, এর চেয়ে তিনগুণ বেশি লোক আমাকে ফাঁসিকাঠে ঝুলতে দেখার জন্য ভিড় করবে।’
ফ্রয়েডকে তাঁর আকস্মিক জনপ্রিয়তা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি শুনিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের গণতান্ত্রিক রাজা অলিভার ক্রমওয়েল-এর এই বয়ান।
আমাদের রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ‘আজকাল’ সম্পাদক অশোক দাশগুপ্তের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ইতিহাসের ফুটনোটেও জায়গা হবে না। সেটা সত্যি কিনা ইতিহাস বলবে। কিন্তু নিজেদের সম্পর্কে এমন নির্মম মূল্যায়ন অন্তত ইতিহাসে থাকবে।
শেষ কথা ১৯৯৬-এ যদি জ্যোতি বসু যদি প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন, তবে বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী হতেন না। মোদিদেরও এত বাড়বাড়ন্ত হত না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন