বিচার, সূক্ষ্ম বিচার

পলাশ বরন পাল

দু-টুকরো কাগজ

রাজা অত্যাচারী, এ ব্যাপারটা খুব একটা অভূতপূর্ব নয়৷ রাজাকে অনেকেই অপছন্দ করেন, এবং তাঁদের মধ্যে অনেকে সে কথা গোপনও রাখেন না৷ এঁদের নেতা যিনি, তাঁর আসল নামটা যাই হোক, এই গল্পে তাঁকে 'অ' বলে উল্লেখ করতে চাই৷

রাজবাড়ির ঠিক সামনেই একদিন সন্ধে বেলায় রাহাজানি হল, চলতি পথিককে থামিয়ে তার কাছে যা ছিল সব লুট করে নিল অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকটি লোক৷ রাজ্যের যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে, এ রকম কাজ 'অ' নিজে তো করতে পারেনই না, তাঁর চেলাচামুণ্ডারাও করতে পারেন না৷ তবু রাজা 'অ'-কেই ধরলেন, এবং বিচার করলেন৷ বিচার মানে অবশ্য প্রহসন, তাতে স্থির হল 'অ'-এর মৃত্যুদণ্ড৷ তবে হ্যাঁ, সত্যি কথা বলতে কি, কথাটা অন্যায় হতে পারে কিন্তু অভিনব কিছু নয়, এরকম অনেক রাজাই করে থাকেন৷

রাজ্যের লোকে খেপে গেল৷ দারুণ আন্দোলন শুরু হয়ে গেল চারদিকে৷ অবস্থা ঘোরালো দেখে শেষ পর্যন্ত রাজাই বললেন, 'ঠিক আছে, আবার বিচার হবে৷ তবে এ বার বিচার আমি করব না, করবেন ভগবান৷'

নির্দিষ্ট সময়ে রাজধানী উজাড় করে লোকজন উপস্থিত৷ ভগবান কী করে বিচার করবেন? রাজা বুঝিয়ে দিলেন, 'দেখো, এই দু-টুকরো কাগজ নিচ্ছি আমি৷ এর মধ্যে একটায় লিখেছি, 'অ' দোষী, অন্যটায় লিখেছি, 'অ' নির্দোষ৷ কাগজ দুটো গোল্লা পাকিয়ে এখানে রাখছি৷ 'অ' এর মধ্যে যে কোনো একটা তুলে নেবে৷ সেটায় যদি লেখা থাকে দোষী, তাহলে বোঝা যাবে, ওইটাই ভগবানের বিধান৷ তাহলে শাস্তি হবে তার৷ আর যদি লেখা থাকে যে, সে নির্দোষ, তাহলে বেকসুর খালাস৷ কেউ কিন্তু কোনো কথা বলতে পারবে না এখন৷'

সবার মনেই একটা সন্দেহ গুড়গুড় করছে, কিন্তু কথা বলা যাবে না এখন৷ রাজা যেরকম, দুটো কাগজেই যদি দোষী লিখে রেখে থাকেন, তাহলে? নির্ঘাত তা-ই করেছেন রাজা৷ হায় হায়, কী হবে, যে কাগজই তুলুন না কেন, 'অ'-এর মৃত্যু তো অনিবার্য!

গম্ভীরভাবে একটি কাগজ তুলে নিলেন 'অ'৷ রাজা বললেন, 'দেখি এইবার নিয়ে আসুন আপনার কাগজটা৷' মনের মধ্যে চাপা আনন্দ, কেননা কী লেখা আছে তা তো জানা৷

সমবেত দীর্ঘশ্বাস পড়ল একটা সভায়৷ কিন্তু তারপরেই অবাক হয়ে সবাই দেখল, একটা অভাবনীয় ব্যাপার৷ নিজের হাতের কাগজটা মুখে পুরে কচমচিয়ে গিলে ফেলেছেন 'অ'৷ রাজা ব্যস্তসমস্ত হয়ে বললেন, 'এ কী করলেন? কী লেখা আছে তা তো দেখার কথা ছিল এখন৷'

শান্ত, সংযত গলায় 'অ' বললেন, 'তার অসুবিধে হবে না কোনো৷ অন্য যে কাগজটা আছে সেটা খুলে দেখুন৷'

খোলা হল৷ তাতে লেখা, 'অ দোষী৷'

এবার 'অ' বললেন, 'আপনি তো আগেই বলেছেন, দুটো কাগজের একটায় লিখেছেন আমি দোষী, আর

অন্যটায় লিখেছেন যে আমি নির্দোষ৷ এটায় দেখা যাচ্ছে লেখা আছে যে আমি দোষী৷ তাহলে যে কাগজটা আমি তুলেছিলাম, তাতে নিশ্চয়ই লেখা ছিল যে আমি নির্দোষ৷ এই হল আপনার ভগবানের বিচার, তাহলে এবার আমি আসি?'

এবার চাপা আনন্দের একটা শব্দ শোনা গেল সমবেত জনতার মধ্যে থেকে৷ শোনা গেল দু-একটা জোরালো গলা, 'অ জিন্দাবাদ৷'

মুক্তি পেয়ে গেলেন 'অ'৷

চা কেন মিষ্টি

দুই পণ্ডিতে আলোচনা হচ্ছিল৷ সঙ্গে চা৷ কথায় কথায় কথা উঠল, চা খেতে মিষ্টি লাগে কেন? এক জন পণ্ডিত বললেন, 'এ তো সোজা কথা৷ চায়ে চিনি দেওয়া হয় বলে মিষ্টি লাগে৷'

দ্বিতীয় পণ্ডিত বললেন, 'চট করে লোকে তাই ভাবে বটে৷ কিন্তু একটা কথা ভেবে দেখেছেন কি? চিনির থেকেই যদি মিষ্টিটা হয়, তাহলে চামচের দরকার কী?'

প্রথম পণ্ডিত চিন্তায় পড়ে গেলেন৷ খানিকটা সরব চিন্তার মতোই বলে উঠলেন, 'চিনি দেওয়া হল, চামচটা দিয়ে নাড়া হল, তবে মিষ্টি হল চা৷'

তাতে দ্বিতীয় পণ্ডিত বললেন, 'তবেই দেখুন, মিষ্টিটা চিনির জন্য হয় না, হয় চামচের জন্য৷'

প্রথম পণ্ডিত সায় দিয়ে বললেন, 'যথার্থ বলেছেন৷ সত্যি কথা বলতে কি, চিনিতেই যদি মিষ্টিটা হত, তাহলে তো চায়ে চিনি ঢেলে দিলেই হত৷ তা তো হয় না৷ চামচ দিয়ে নাড়লে তবেই তো মিষ্টি হয়, তার আগে তো হয় না!'

দ্বিতীয় পণ্ডিত সগৌরবে বললেন, 'তাহলে বুঝছেন, মিষ্টিটা চামচ থেকেই হয়৷'

প্রথম পণ্ডিতের মনে একটা প্রশ্ন জাগল৷ তিনি বললেন, 'আপনার কথাটা সত্যি, তাতে কোনো সন্দেহই নেই৷ শুধু একটা খটকা লাগছে৷ চামচেই যদি মিষ্টি হয়, তাহলে চিনির দরকারটা কী?'

দ্বিতীয় পণ্ডিত একটু চিন্তা করে দেখলেন৷ তারপর বিজয়গর্বে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল তাঁর মুখে৷ বললেন, 'চামচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে চিনিটা সম্পূর্ণ গুলে যায়, লক্ষ করেছেন তো! তখন আমরা আর নাড়ি না৷ তার মানে, ওইটাই হচ্ছে চিনির কাজ৷ চিনিটা গুলে গেলে বোঝা যায়, চামচ নাড়া এবার থামাতে হবে৷ চিনি না থাকলে কী করে বুঝতেন বলুন, কখন চামচ নাড়া বন্ধ করতে হবে?'

ওস্তাদে ওস্তাদে

গথাম থেকে লোকটি সকাল বেলা বেরিয়ে যাচ্ছিল নটিংহ্যামের হাটে৷ পথের মাঝে ছোটো যে নড়বড়ে সাঁকোটা আছে খালের ওপর দিয়ে, তার ওপরে উঠতেই দেখা হয়ে গেল এক পড়শির সঙ্গে৷ আসছিল উলটো দিক থেকে৷

'নমস্কার!' বলল পড়শি৷

'নমস্কার৷'

'তা চললেন কোথায় সাত সকালে?'

'যাচ্ছি একটু নটিংহ্যামের হাটে৷'

'কেনাকাটা আছে বুঝি?'

'তা আছে বটে একটু৷ এক পাল ভেড়া কেনার ইচ্ছে৷'

'বেশ বেশ৷ তা অত ভেড়া নিয়ে ফিরবেন কী করে?'

'কেন, হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে! আমি আসব পেছন পেছন, তাড়াতে তাড়াতে৷'

'না না, সে কথা হচ্ছে না৷ কোন রাস্তা দিয়ে আসবেন?'

'কেন, এই রাস্তা দিয়ে!'

'বলেন কী, এই সাঁকোটার ওপর দিয়ে নিয়ে যাবেন ভেড়া?'

'নিশ্চয়ই!'

'সেটা উচিত হবে না বোধ হয়৷ সাঁকোটার হাল দেখছেন তো! অত ভেড়ার ওজন সইবে না৷'

'আলবাত সইবে৷'

'সইবে কি সইবে না সেটা আপনার জানার কথা নয়! মাঝের থেকে ওস্তাদি করতে গিয়ে সাঁকোটার বারোটা বাজিয়ে দেবেন আর কি!'

'আবোল-তাবোল যা খুশি তাই বলবেন না৷ কটা মাত্র ভেড়া, তাদের ওজনে সাঁকো ভেঙে পড়বে?'

'বাজে কথা বাড়াবেন না৷ সাঁকোটা ভাঙলে দুর্দশা একলা আপনার হবে না, হবে গাঁয়ের সকলের৷ তাই পরিষ্কার বলে দিচ্ছি শুনুন, ভেড়া নিয়ে যাবেন না এখান দিয়ে৷'

'কেন যাব না মশাই? আপনার কথায়?'

'হ্যাঁ, আমার কথায়৷'

'মুখ সামলে!'

ব্যাস, হাতাহাতির উপক্রম হয়ে গেল৷ আস্তিন-টাস্তিন গুটিয়ে দুজনেই প্রায় তৈরি, মারামারি শুরু হল বলে! ঠিক এমনি সময়ে একটা ঠেলাগাড়িতে একটা বিশাল বস্তা চাপিয়ে সেখানে এসে হাজির হল আর একজন লোক৷

'আরে করছেন কী আপনারা!' -নতুন লোকটির প্রশ্ন৷

'এই দেখুন না, ইনি বলছেন এই সাঁকোর ওপর দিয়ে ওনার ভেড়ার পাল নিয়ে যাবেন৷'

'যাবই তো! কে ঠেকায় দেখি!'

এই বলতে বলতে আবার দু-জনে প্রায় মারামারি শুরু করে দেয় আর কি! তৃতীয় জন একটু হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন করে, 'ও মশাই! আরে কী নিয়ে এত গণ্ডগোল আপনাদের সেটা একটু বুঝিয়ে বলুন তো কেউ! আমি তো কোনো ভেড়াই দেখছি না, আর আপনারা সেই ভেড়া পার করা নিয়ে ঝগড়া লাগিয়ে দিয়েছেন! ভেড়া কোথায়?'

প্রথম জন উত্তর দিল, 'আরে ভেড়া কিনতেই তো যাচ্ছি আমি হাটে৷'

এবার অট্টহাস্যে ফেটে পড়ল নতুন লোকটি৷ 'বলেন কী, ভেড়া কেনাই হয়নি এখনও, সেই ভেড়া নিয়ে এত বচসা! আপনাদের মতো অদ্ভুত লোক জন্মে দেখিনি মশাই!'

যে দু-জন ঝগড়া করছিল, তারা এবার একটু থতোমতো৷

'কেন কেন?' বলল প্রথম জন৷

'হ্যাঁ, কেনার সঙ্গে ঝগড়ার সম্পর্কটা কী?' বলল দ্বিতীয়জন৷

তৃতীয় লোকটি হাসল এক গাল৷ বলল, 'দাঁড়ান, বুঝিয়ে দিই৷ আসুন, আমার সঙ্গে হাত লাগান দেখি একটু, এই বস্তাটায় গম নিয়ে যাচ্ছিলাম ভাঙাবার জন্য, এটা ধরে আমার পিঠে চাপিয়ে দিন তো দেখি৷' -বলতে বলতে ঠেলার পাশে এসে দাঁড়াল লোকটি৷ অন্য দু-জনে ধরাধরি করে বস্তাটা চাপিয়ে দিল তৃতীয় জনের পিঠে৷

এবার তৃতীয় জন বস্তাটা নিয়ে এসে ব্যালেন্স করে রাখল সাঁকোর রেলিঙের ওপরে৷ তারপরে বলল, 'বেশ, এবার বস্তার মুখটা খুলে দিন দেখি!'

অন্য দু-জন খুলে দিল মুখ৷ বুঝতে পারছে না, কী করতে চায় লোকটি৷ তৃতীয় জন এবারে বস্তাটাকে হেলিয়ে ধরল৷ গমের দানা গড়িয়ে পড়তে লাগল খালের জলে৷ বস্তার তলাটা তুলে ধরল লোকটি, নিমেষে বস্তা ফাঁকা হয়ে গেল৷ বস্তাটাকে ভালো করে ঝেড়েঝুড়ে নিল লোকটি, দেখল এক দানা গমও পড়ে আছে কি না৷ নেই৷ তখন অন্য দু-জনের দিকে তাকিয়ে বলল, 'এই যে, এবার দেখুন দেখি৷ বস্তায় কত গম আছে এখন বলুন৷'

দু-জনে তাকাল বস্তার ভেতর৷ বলল, 'এক দানাও নেই৷ বিলকুল ফাঁকা৷'

এইবার আবার অট্টহাস্যের পালা তৃতীয় লোকটির-'হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন৷ এইবার মনে করুন, এই গম খাওয়া নিয়ে যদি আপনারা দু-জনে ঝগড়া করতেন, সেটা কীরকম হাস্যকর হত বলুন দেখি! সত্যি কথা বলতে কী, কিছু মনে করবেন না, আপনাদের দু-জনের মাথায় কতটা ঘিলু আছে তার উত্তরও ওই একই- এখন বস্তায় যত গমের দানা আছে, ঠিক ততটা৷ তা না হলে, যে ভেড়া এখনও কেনা হয়নি, সে ভেড়া কোথা দিয়ে হাঁটবে তাই নিয়ে কেউ ঝগড়া করে! হাঃ হাঃ হাঃ৷'

ভৌগোলিক জ্ঞান

দু-জন শখের অভিযাত্রী একবার বেলুনে চড়ে উড়বেন ঠিক করলেন৷ ওড়ার জন্য বেলুন যেমন হয়, তেমনি বিশাল সাইজের বেলুন বানানো হল৷ দু-জনে তাতে চড়ে শুভক্ষণে যাত্রা শুরু করলেন৷

উড়বার একটু পরেই অবশ্য হাওয়া বইতে শুরু করল৷ বেলুন যে দিকে যাওয়ার কথা ছিল সে দিকে তো গেলই না, হাওয়ার দাপটে কোন দিকে যে চলতে থাকল তা অভিযাত্রীদের কেউই বুঝতে পারলেন না৷ আর এমন দুর্যোগ যে, কোনো দিকে খুব একটা কিছু দেখাও যায় না!

ঘণ্টা দুয়েক তাণ্ডব চলার পর যখন হাওয়া একটু শান্ত হল, অভিযাত্রীরা দেখলেন বেলুনও খানিকটা নীচে নেমে এসেছে৷ রাস্তাঘাট পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে দিব্যি খালি চোখে, রাস্তায় একজন মানুষ হেঁটে যাচ্ছেন সেটা পর্যন্ত চোখে পড়ছে৷ এতই যখন কাছে, তখন আর একটু কপাল ঠুকে দেখা যাক না! দুই অভিযাত্রী যারপরনাই জোরে চিৎকার করে রাস্তার লোকটিকে ডাকলেন, 'ও দাদা! শুনছেন?'

নীচের ভদ্রলোক থামলেন, ওপরে তাকিয়ে হাত নাড়লেন৷ যাক, বাঁচা গেল৷ এইবার অভিযাত্রীরা জিজ্ঞেস করলেন আসল প্রশ্নটি, 'আমরা কোথায় আছি বুঝছি না৷ আপনি বলতে পারেন?'

রাস্তার ভদ্রলোক প্রশ্নটা শুনে বেশ চিন্তায় ডুবে গেলেন মনে হল৷ একটুক্ষণ পর মুখ তুলে চেঁচিয়ে বললেন, 'আপনারা একটা বেলুনের মধ্যে আছেন৷'

অভিযাত্রীদের এক জন অপর জনকে বললেন, 'এই লোকটা অঙ্কের পণ্ডিত৷'

দ্বিতীয় জন বললেন, 'কী করে জানলি?'

প্রথম জন বললেন, 'লক্ষণ সব মিলে যাচ্ছে৷ প্রথমত, উত্তর দিতে খানিকটা সময় নিল, দেখলি তো? তার মানে লোকটা চিন্তা করে৷ দ্বিতীয়ত, লোকটা যা বলেছে তা নিভুÍল৷ নিঃসন্দেহে৷ তৃতীয়ত, লোকটা যা বলল তা কারুর কোনো কাজে লাগবে না৷'

ব্রিজ

কাহিনিটা অনেকের জানা৷ যে শহরের কথা, তার নামও জানা৷ শহরের পাশ দিয়ে একটা নদী আছে, নামটা ভুলে যাচ্ছি নদীটার৷ যাই হোক, সেই নদীর ওপর একটা ব্রিজ বানাবার কথা উঠল একবার৷

পাছে কেউ ভুল বুঝে বসে, তাই আগেই বলে রাখছি, ব্রিজটা কিন্তু বানানো হয়নি এখনও৷ কেন হয়নি? কিছু লোকের কি অমত ছিল ব্রিজ বানানোর ব্যাপারে? না, তাও নয়৷ তাহলে?

আসলে কথাটা প্রথমে পেড়েছিল শহরের একদল ব্যবসায়ী৷ নদীর উলটোদিকে তখন সদ্য সদ্য কিছু শহর গড়ে উঠছে৷ খেয়া ছিল একটা, সেই খেয়ায় করে ওপারের লোকজন আসত এপারে, বাজার-হাট করতে৷ ব্যবসায়ীরা বলল, একটা ছোটোখাটো ব্রিজ যদি করে দেওয়া যায়, ওপারের লোক সহজে আসতে পারে, ব্যাবসারও সুবিধে হয়৷

শহর কমিটির মিটিঙে প্রস্তাবটা আনল তারা৷ শুনে একদল লোক বলল, 'ব্রিজ বানাতে হয় তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই৷ কিন্তু ব্যাবসার সুবিধে হবে বলে ব্রিজ বানাবে? এটা একটা কারণের মতো কারণ হল? ব্যবসায়ীগুলো এমনিতেই যথেচ্ছ লাভ করছে, তার ওপর ওদের কথায় আবার ব্রিজও তৈরি হবে! না, এ আমরা হতে দেব না৷ তবে হ্যাঁ, আমাদের কত ভালো ইঞ্জিনিয়ার আছে, তাদের একটা কৃতিত্ব দেখাবার জন্য যদি একট ব্রিজ বানানো হয়, সে অতি উত্তম কথা৷'

আর এক দল বলল, 'এ তো হরেদরে একই কথা হল-ব্যবসায়ীদের কেরামতি না দেখিয়ে ইঞ্জিনিয়ারদের কেরামতি দেখানো৷ আমাদের কথা হল, ব্রিজ বানাতে হবে সৌন্দর্যের জন্য, অন্য কোনো কারণে নয়৷ জায়গাটা সত্যি দেখতে সুন্দর হবে একটা ব্রিজ হলে৷ আমাদের কোনোই আপত্তি নেই তাতে৷ তবে হ্যাঁ, কারুর কেরামতি দেখবার জন্য ব্রিজ বানানো চলবে না৷'

আর এক দল লোক বলল, 'শুধু দেখতে ভালো হবে বলে একগাদা পয়সা খরচ করে ব্রিজ বানাতে হবে, এমন বেআক্কেলে কথা কখনো শুনিনি৷ আসল কথা হচ্ছে, ওপারে নতুন লোক এসেছে, তাদের মধ্যে আমাদের আত্মীয়স্বজনও আছে, তাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করার জন্য একটা ব্রিজ চাই৷ অন্য যে সব কারণ দেখাচ্ছে সবাই সে সব ভুয়ো কারণ৷'

এই নিয়ে ঝগড়া লাগল৷ সবাই একমত, ব্রিজ হওয়া দরকার৷ কিন্তু কেন দরকার, তাই নিয়েই বিবাদ৷ সে ঝগড়া মিটেছে এমন খবর পাওয়া যায়নি৷ আর ব্রিজটা যে এখনও বানানো হয়নি তা তো ওই শহরে যারা গেছে তারা সবাই জানে৷

বেড়ালের পা

চার জন যুবক এক সাথে মিলে ঠিক করল, ব্যাবসা করবে৷ বিশাল খেতজমি কিনল, তাতে শুরু করল আখ চাষ৷ ফসল হল ভালোই, লাভ হল না সেই অনুপাতে৷ কারণ খুব সরল-ইঁদুরের উৎপাত৷ অর্ধেক ফসল কেটে নষ্ট করে দিল ইঁদুরে৷

পরের বার চাষ করার আগে তাই চার জনে পরামর্শ করে একটা বেড়াল কিনল৷ কাজ দিল খুব৷ বিশাল লাভের টাকা ঘরে এল, হু হু করে জমতে লাগল পয়সা৷

পয়সা হলেই আসে দুশ্চিন্তা৷ চার জনের প্রত্যেকেরই আশঙ্কা, অন্যেরা পয়সা মেরে দেবে৷ অতএব ঠিক হল, সম্পত্তি ভাগ করে নেবে, যে যার নিজের ভাগ দেখাশোনা করবে৷

জমি ভাগ হয়ে গেল৷ কিন্তু বেড়ালটা? সেটার ভাগ হবে কী করে? অনেক যুক্তির পর উপায় বার হল একটা৷ বেড়ালের চারটে পা, ব্যাবসার ভাগীদারও চার জন৷ সহজ হিসেব-এক-এক জনের ভাগে এক-এক পা৷ মনে রাখার সুবিধের জন্য চার জনে চারটে ফিতে বেঁধে দিল বেড়ালের পায়ে-লাল ফিতে যে পায়ে সে পা প্রথম জনের ভাগে, নীল ফিতের পা দ্বিতীয় জনের, তৃতীয় জনের হলুদ ফিতে বাঁধা পা, আর চতুর্থ জনের সবুজ৷

দিন চলছিল মন্দ না, কিন্তু হঠাৎ বিপর্যয় ঘটে গেল একটা৷ বেড়ালটা এক দিন একটা ইঁদুরকে তাড়া করতে করতে দৌড়ে এল একজনের রান্নাঘরে৷ উনুন জ্বলছিল, একটা জ্বলন্ত কাঠ লেগে গেল বেড়ালের পায়ের সবুজ ফিতেটায়৷ আগুন ধরে গেল৷ আতঙ্কে ছুটে পালাল বেড়ালটা-গেল খেতের দিকে৷ তখন পায়ের আগুন লাগল খেতের ফসলে, দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল ফসল৷ চার ভাগীদার ছুটে এল, গায়ে জল ঢেলে বেড়ালটাকে বাঁচাল, কিন্তু খেতের আগুন নেবানো গেল না৷ সব ফসল পুড়ে ছাই হয়ে গেল৷

প্রথম তিন ভাগীদার তখন চতুর্থ জনকে বলল, 'আগুন লাগিয়েছে তোমার ভাগের পা৷ অতএব ক্ষতিপূরণ দিতে হবে তোমাকেই৷'

চতুর্থ জন বলল, 'পয়সা তো আমার নেই৷ খেত গেছে, পয়সাও গেছে৷ আছে শুধু আমার শরীরটুকু৷ গতরে খেটে তোমাদের ঋণ শুধতে পারি৷'

তাই ঠিক হল৷ চতুর্থ জন হয়ে গেল অন্য তিন জনের খেতের মুনিশ৷ তার ভাগের খেতটাও ভাগাভাগি করে দখল করে নিল অন্য তিন জন৷

এমনি করে বহু বছর কাটল৷ হতভাগ্য চতুর্থ যুবকের দিন কাটতে লাগল তিন জনের খেতে দিবারাত্রি খেটে৷ কোনোমতে সামান্য পয়সায় টেনেটুনে দিন চলে৷ তবু এর মধ্যেও বিয়ে করল, একটি ফুটফুটে মেয়ে হল তার৷ মেয়েটি বড়ো হল-যেমনি সৌন্দর্য তার, তেমনি বুদ্ধি৷

এই মেয়ে হঠাৎ একদিন প্রশ্ন করল বাপকে 'আচ্ছা বাবা, অন্যের খেতে যারা কাজ করে, তারা সবাই তো কোনো এক জনের খেতে খাটে৷ শুধু তোমারই দেখি তিন জন মনিব৷ কেন?'

বাবা এড়িয়ে যেতে চাইল কথাটা, কিন্তু মেয়ে নাছোড়বান্দা৷ শেষ পর্যন্ত শোনাতেই হল সব বৃত্তান্ত৷

শুনে মেয়ে অবাক৷ বলল, 'বাবা, এর জন্য তুমি প্রাণপাত করছ ওদের খেতে আজ আঠেরো বছর ধরে! কাল থেকে যেয়ো না কাজে৷'

বাপ বলল, 'তা কী করে হয়? ওরা কি ওমনি ছেড়ে দেবে নাকি?'

মেয়ে বলল, 'দেখোই না কী হয়! আমি সব ঠিক করে দেব৷ তুমি শুনে দেখো আমার কথা!'

রাজি হল বাপ, কাজে গেল না পরদিন৷ একটু বেলা না হতেই তিন মনিব এল ছুটে, গালমন্দ করে বাড়ি মাথায় তুলল৷ মেয়েটা বেরিয়ে এসে তখন বলল, 'আজ থেকে বাবা আপনাদের কাজ করবে না৷'

'ইস, বললেই হল! এ কি মগের মুল্লুক নাকি?'

'মগের মুল্লুক কেন হবে, আইনের শাসন তো আছে! যান, নালিশ করুন গে আপনারা৷ দেখা যাবে৷'

বিচারকের দরবারে বৃত্তান্ত পেশ করল তিন মনিব৷ তাদের চতুর্থ বন্ধু, বা এখন যে তাদের চাকর, তাকে ডাকা হল, সাথে এল তার মেয়ে৷ বিচারককে মেয়ে বলল, 'ধর্মাবতার, এই তিন জন অন্যায়ভাবে আমার বাবাকে চাকরের মতো খাটিয়েছে গত আঠারো বছর৷ এ জন্য এদের উচিত আমার বাবাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া৷'

'অন্যায় ভাবে খাটিয়েছি কীরকম?' -হুংকার দিল তিন মনিব-'ওর ভাগের পা থেকে খেতে আগুন লাগেনি বলতে চাও?'

মেয়েটি বলল, 'আমার বাবার ভাগের পায়ে আগুন লেগেছিল সত্যি৷ কিন্তু সে তো রান্নাঘরে৷ সেখান থেকে আগুন খেতে গেল কী করে? বাবার ভাগের যে পা, তার একার পক্ষে তো যাওয়া সম্ভব ছিল না খেতের দিকে, যাওয়ার ইচ্ছেও ছিল না৷ তাকে নিয়ে গেছে অন্য তিন জনের ভাগের পা৷ অর্থাৎ ওখানে ক্ষতি যা হয়েছে, তার জন্য আপনাদের ভাগের তিনটে পা-ও সমান দায়ী৷ তাহলে এর জন্য আমার বাবাকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে কেন?'

বিচারক রায় দিলেন, তিন জনে যেন উপযুক্ত পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেয় মেয়েটির বাপকে৷

মোরগ কেন ডাকে

দুই পণ্ডিত থাকতেন পাশাপাশি দুই বাড়িতে৷ এক জন গরিব আর ঝগড়াটে, অন্য জন পয়সাওয়ালা কিন্তু কঞ্জুস৷ শাস্ত্রপাঠ এবং শাস্ত্রব্যাখ্যা করা দু-জনের কাজ৷

গরিব পণ্ডিত একবার একটা মোরগ কিনলেন৷ উদ্দেশ্য-ভোরে মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙবে, তাড়াতাড়ি পড়াশোনা করতে বসা যাবে৷ মোরগ ডাকল ভোরে, কিন্তু তাতে শুধু গরিব পণ্ডিতেরই ঘুম ভাঙল না, ভাঙল পাশের বাড়ির কঞ্জুস পণ্ডিতেরও৷ সে পণ্ডিত ভাবলেন, 'বাঃ, ভালোই তো হল, সকাল সকাল পড়তে বসে যাই আমিও৷'

এই করে কয়েক সপ্তাহ কাটল৷ গরিব পণ্ডিত লক্ষ করলেন ব্যাপারটা৷ তারপরে একদিন অন্য পণ্ডিতকে ডেকে বললেন, 'দেখুন মশাই, মোরগের ডাকে আপনিও উঠছেন যখন, তখন মোরগটাকে খাওয়ানো-পরানোর খরচটাও আপনার অর্ধেক দেওয়া উচিত৷'

কঞ্জুস পণ্ডিত বললেন, 'এ আবার কী অন্যায় আবদার! আমি কেন টাকা দিতে যাব? আপনি কি আমার কথায় মোরগ কিনেছেন?'

'না, তা কিনিনি৷ কিন্তু লাভটা তো হচ্ছে আপনারও৷'

'মোরগটার ডাকে আমি ঘুম থেকে উঠি বলে কি আপনার ওকে খাওয়াতে বেশি খরচ হচ্ছে?'

'বেশ, বোঝাই যাচ্ছে সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না৷ চলুন তাহলে কাজির কাছে৷'

'চলুন৷'

দু-জনে উপস্থিত হলেন কাজির দরবারে৷ বৃদ্ধ কাজি সব শুনলেন, অনেক চিন্তা করলেন৷ সোজা মামলা নয়৷ তারপর বললেন, 'দেখো বাবারা, প্রশ্নটা অত্যন্ত জটিল৷ এর মীমাংসার জন্য অনেক চিন্তা করতে হবে আমায়৷ শুধু শুধু অত চিন্তা পোষাবে না৷ তাই তোমরা দু-জনেই আমাকে এক মোহর করে দাও দেখি!'

দু-জনেই দিলেন একটি করে মোহর৷ একটু অবাকও হলেন, কেননা সাধারণত কাজি তো পয়সা নেন না এ সব ছোটোখাটো ঝগড়ার ফয়সালা করে দেওয়ার জন্য৷

এবারে রায় দেওয়ার জন্য প্রস্তুত কাজি৷ বললেন, 'দেখো, ঝগড়াটা কী নিয়ে সেটা ভালো করে বুঝিয়ে দিই৷' বলে, গরিব পণ্ডিতের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, 'তুমি হলে মোরগের মালিক, তাই তোমার ধারণা মোরগ যখন ডাকে তখন শুধু তুমি শুনবে বলেই ডাকে৷' তারপর অন্য পণ্ডিতের দিকে আঙুল তুলে বললেন, 'আর তুমি বলছ, মোরগ যখন ডাকে, তখন তুমিও সে ডাক শুনতে পাও৷ তাহলে মোরগ ডাকে তোমার জন্যও৷ অর্থাৎ আসল প্রশ্নটা হচ্ছে, মোরগ কেন ডাকে? এই প্রশ্নটাই মনে মনে চিন্তা করলাম আমি এতক্ষণ ধরে, এখন উত্তর পেয়েছি৷ শুনবে মোরগ আসলে কেন ডাকে? যাতে তোমাদের মতো আহাম্মকের কাছ থেকে আমি মোহর নিয়ে আমার পকেটে পুরতে পারি, সেই জন্য৷ সে উদ্দেশ্য সফল হয়েছে, সুতরাং এবার তোমরা বাড়ি যেতে পার৷'

পাখা

চীনের হাংজাও প্রদেশের শাসনকর্তা হয়ে এসেছেন সু দং পো৷ একদিন সকালে গাঁ থেকে দুটি লোক এল তাঁর দরবারে৷ একজনের নাম লি, অন্যজন হং৷

লি এসেছে নালিশ নিয়ে, সে জানাল সে কথা৷ খেটেখুটে গোটা দশেক রুপোর টাকা জমিয়েছিল সে৷ মাস দুই আগে হং এসে ধার চায় সে টাকা৷ বলে, একটা ব্যাবসা করতে চায়, কিছু মূলধন দরকার৷ সুদ দিতেও সে রাজি৷ লি বলে, 'নাও হে ভাই, বন্ধুতে বন্ধুতে আবার সুদের কথা কেন! নেবে নাও৷ তবে কিনা, আমার যখন দরকার হবে তখন ফেরত দিয়ো কিন্তু৷'

এদিকে এখন লি-এর বিয়ে ঠিক হয়েছে৷ বিয়ের খরচখরচার জন্য টাকা দরকার৷ হং-এর কাছে গিয়ে ফেরত চেয়েছে সে টাকা৷ হং বলেছে, 'টাকা কোথায় পাব?' চাপাচাপি করেছে লি৷ তাতে তাকে এক ঘা বসিয়ে দিয়েছে হং৷

'সে কী! ওর কাছ থেকে টাকা ধার করে আবার ওর গায়েই হাত তুলেছ?'-সু দং পো বেশ রুষ্ট মুখে তাকালেন হং-এর দিকে৷

'হুজুর! দোষ আমার নয়৷ ওর থেকে টাকা নিয়ে ভেবেছিলাম হাতপাখার ব্যাবসা শুরু করব৷ তালপাতা হল, সরঞ্জাম কেনা হল৷ বানালামও পাখা৷ কিন্তু হুজুর, এবার যে গরম মোটে পড়বে না, তা বুঝব কী করে বলুন? লোকে এখনও চাদর গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ পাখা কে কিনবে? ট্যাঁকে ফুটো পয়সাটিও নেই, এদিকে লি এসে ঘ্যানরঘ্যানর শুরু করল৷ মেজাজটা চড়ে গেল, হাত উঠল৷ তার জন্য শাস্তি দিতে হয় দিন, কিন্তু টাকা না দেওয়ার জন্য দোষ ধরবেন না৷'

ভুরু কুঁচকে তাকালেন সু দং পো৷ বললেন, 'কিন্তু লি-র বিয়েটা তো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার৷ টাকা তোমাকে দিতেই হবে৷'

হং বলল, 'পারলে আমি এই মুহূর্তে দিয়ে দিতাম টাকা৷ ওর বিয়ে, আনন্দটা কি আমারও নয়?'

সু দং পো বললেন, 'তাহলে লি, তুমি বরং অন্য কোনো ভাবে টাকার জোগাড় করো৷ কী আর করা যাবে!'

লি বলল, 'বাঃ! একেই বলে বিচার! দশটা রুপোর মোহর কি চাট্টিখানি কথা! তা ছাড়া পাখা বানানোর কথা-টথা ও যে সব বানিয়ে বলছে না তারই বা প্রমাণ কই?'

সু দং পো বললেন, 'তাই তো! ওহে হং তুমি যে সব পাখা বানিয়েছ, সেগুলো কোথায়?'

'শহরে বেচতে এসেছিলাম, এখানেই এক বন্ধুর বাড়িতে রেখে গেছি৷'

'যাও, তুমি সেই বন্ধুর বাড়ি থেকে খান বিশেক পাখা নিয়ে এসো দেখি এক্ষুনি, ফয়সালা হয়ে যাক ব্যাপারটার৷'

হং তো প্রায় উড়ে গেল আর এল৷ কুড়িখানা পাখা হাতে নিয়ে সু দং পো বললেন, 'এবারে বোসো

তোমরা দু-জনে চুপচাপ৷' বলে, তুলি আর রং বার করে বসলেন তিনি নিজে৷ সূক্ষ্ম টানে পাখার ওপরে ফুটে উঠতে লাগল পাহাড়, বন, নদী, আকাশ৷ বেশিক্ষণ লাগল না৷ কুড়িখানাতেই ছবি আঁকা শেষ হল৷

দশখানা পাখা দিলেন তিনি লি-কে৷ বললেন, 'যাও, বাইরে গিয়ে দু-একবার হেঁকে বল-সু দং পোর আঁকা, কে কিনতে চান আসুন৷ এক একটার জন্য দাম ধরবে এক টাকা৷ দশ টাকা পাবে, তোমার বিয়ের খরচ৷'

হংকে দিলেন বাকি দশটা পাখা৷ বললেন, 'তুমিও ওই একই কাজ করো৷ দশটা টাকা পাবে৷ তা দিয়ে নতুন একটা ব্যাবসা শুরু কোরো৷'

এ সব বহুকাল আগের কথা৷ তখন সত্যিই দশ টাকা দিয়ে বিয়ের উৎসব হত, একটা ছোটোখাটো ব্যাবসাও শুরু করা যেত৷ এক টাকা তখন বিরাট ব্যাপার৷ তাই এক টাকা দিয়ে ছবি কে কিনবে, এইসব ভাবতে ভাবতে হতভম্ব দু-জনে বেরিয়ে এল৷

শহরের রাস্তা৷ জনারণ্য৷ একবার মাত্র হাঁক পাড়ল লি৷ কুড়িটা পাখা এক লহমায় বিক্রি হয়ে গেল৷

বাড়ি ফিরতে ফিরতে দু-জনে ভাবছে-এ কি ভোজবাজি নাকি! না, ভোজবাজি নয়৷ তারা জানত না, তাদের এই বিচারকই চীনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও চিত্রকর সু দং পো৷

মাছের ফুর্তি

চীনের বিখ্যাত দার্শনিক চুয়াং চে বিকেলে হাওয়া খেতে বেরিয়েছেন বন্ধু হুই চের সঙ্গে৷ হাঁটতে হাঁটতে পড়ল একটা খাল৷ খালের ওপর সাঁকো৷ সাঁকোর ওপর দিয়ে যেতে যেতে জলের দিকে তাকালেন চুয়াং চে৷ দেখলেন, মাছ৷ বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'দেখো দেখো, কী সুন্দর খেলা করছে মাছগুলো! বড়ো আনন্দে আছে ওরা৷'

হুই চে কট্টর যুক্তিবাদী৷ বললেন, 'তুমি তো মাছ নও, তুমি কী করে বুঝলে মাছেরা আনন্দে আছে?'

চুয়াং চে জবাব দিলেন, 'তুমি তো চুয়াং চে নও, তুমি কী করে বুঝবে আমি কী করে বুঝলাম?'

হুই চে বললেন, 'তবেই দেখো! আমি চুয়াং চে নই বলে যদি চুয়াং চের মনের কথা না ধরতে পারি, তবে তুমি মাছ না হয়ে মাছের মনের কথাও ধরতে পারবে না৷ সহজ যুক্তি৷'

চুয়াং চে বললেন, 'দাঁড়াও দাঁড়াও! তোমার আসল প্রশ্নটারই জবাব দেওয়া হয়নি৷ তুমি প্রথমে জিজ্ঞেস করেছিলে, আমি কেমন করে বুঝলাম মাছেরা আনন্দে আছে৷ তার মানে তুমি তো ধরেই নিয়েছিলে যে আমি মাছেদের আনন্দটা বুঝেছি৷ কী উপায়ে বুঝেছি, সেটা জানতে চেয়েছিলে কেবল, তাই তো? তার উত্তর হল-ও আমি মাছেদের সাঁতার কাটার কায়দা দেখেই ধরে ফেলেছি৷'

দক্ষিণা

ছোটো গ্রাম, বলতে গেলে একজনই ডাক্তার৷ সমস্যা তাঁর দক্ষিণা নিয়ে৷ ডাক্তারে চিকিৎসা করলে দক্ষিণা নেবে তাতে বলার কিছু নেই৷ কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এই ডাক্তারের প্রায় পুরো নজরটাই দক্ষিণার দিকে, রোগী সারাবার দিকে নয়৷

গ্রামের দর্জির বউয়ের অসুখ করল খুব, বউকে দিয়ে দর্জি গেলেন ডাক্তারের কাছে৷ ডাক্তার প্রাথমিক যা দেখার দেখে-টেখে বললেন, 'এ সারাতে সময় লাগবে অনেক, খাটনিও হবে প্রচুর৷ সে সবের জন্য পয়সা দেবার সামর্থ্য তোমার আছে বলে মনে হচ্ছে না৷ কাজেই ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই, বাড়ি নিয়ে যাও বউকে৷'

দর্জি কাকুতি-মিনতি করলেন অনেক করে৷ শেষ পর্যন্ত ডাক্তার বললেন, 'শক্ত ব্যারাম৷ বাঁচাতে যদি না পারি, তাহলে কী হবে? তাহলেও দক্ষিণা দেবে তো ঠিকমতো?'

'নিশ্চয়ই ডাক্তারবাবু৷ বাঁচান বা মারেন, টাকা আপনি ঠিক পাবেন৷'

চিকিৎসা শুরু হল৷ কিন্তু রোগী বাঁচল না, হপ্তাখানেকের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল সব৷ সেই শোকের জ্বালার মধ্যেই ডাক্তার এক বিল পাঠালেন দর্জির কাছে, দু-হাজার টাকার৷

দর্জি আকাশ থেকে পড়লেন৷ দু-হাজার টাকা! মাত্র ক-দিনের জন্য! এ পরিমাণ টাকা দেওয়া অসম্ভব৷ জানিয়ে দিতে গেলেন সেই কথা ডাক্তারকে৷

ডাক্তার খাপ্পা৷ দর্জির ঘাড় ধরে বললেন, 'চলো কাজির কাছে, ঠগ জোচ্চোর কাঁহাকা৷'

সব শুনলেন কাজি৷ বুঝলেন মনে হল৷ দর্জিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'টাকা দিচ্ছ না কেন? বলেছিলে তো দেবে৷'

দর্জি বললেন, 'আজ্ঞে এরকম একটা উদ্ভট পরিমাণ টাকা যে উনি দাবি করবেন তা তো ভাবিনি!'

এবার কাজি ডাক্তারকে বললেন, 'তোমার সঙ্গে ওর কী কথা হয়েছিল আর একবার বলো দেখি৷'

ডাক্তার বললেন, 'কথা হয়েছিল, রোগী বাঁচাই বা মারি, পুরো টাকা আমার প্রাপ্য৷'

কাজি তাকালেন দর্জির দিকে-'তুমি ডাক্তারকে এই কথা বলেছিলে-উনি বাঁচান বা মারেন ওনার সব টাকা তুমি দেবে?'

দর্জি ঘাড় নেড়ে বললেন, 'আজ্ঞে হ্যাঁ, সে রকমই বলেছিলাম বটে৷ কিন্তু...'

'দাঁড়াও, থামো তুমি৷ তা ডাক্তার, তুমি কি বাঁচিয়েছ রোগীকে?

'না পারলাম কই?'

'তাহলে তুমি কি মেরেছ রোগীকে?'

'সে কী কথা, আমি মারব কেন?'

'ও বলেছিল বাঁচালে বা মারলে টাকা দেবে তোমাকে৷ তুমি যদি বাঁচিয়ে না থাকো, মেরেও না থাকো,

পাপ ও শাস্তি

রাজার প্রিয় ঘোড়ার বয়স হয়েছে, রাজা তাই একজন নতুন লোক রাখলেন তার পরিচর্যার জন্য৷ হবি তো হ, বুড়ো ঘোড়াটা অক্কা পেল তার কয়েকদিনের মধ্যেই৷ ভয়ানক চটে গেলেন রাজা৷ নির্ঘাত সহিসটারই গাফিলতি! হুকুম দিলেন-মৃত্যুদণ্ড৷

ব্যাপারটাকে 'লঘু পাপে গুরু দণ্ড' বললেও ভুল হয়, এ তার চেয়েও মারাত্মক৷ সহিসটার আদৌ দোষ আছে কি না তারই ঠিক নেই, এ দিকে চূড়ান্ত শাস্তি ধার্য হয়ে গেল তার৷ এ কী বাড়াবাড়ি! কিন্তু রাজার খেয়াল, কে বোঝাবে তাঁকে?

রাজার সভাসদ ছিলেন ইয়েন ৎসু৷ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'মহারাজ, কেবল যদি মেরেই ফেলেন তবে তো লোকটা নিজের দোষটা ভালোমতো বুঝতেই পারবে না৷ অনুমতি দেন তো ওকে বুঝিয়ে বলি, ওর দোষটা কী৷ অন্যরাও শুনুক, জানুক, বুঝুক, সাবধান হোক৷ মারতে হয় তার পরে মারবেন৷'

'ভালো কথা,' বললেন রাজা৷

ইয়েন ৎসু বলতে শুরু করলেন৷ 'দেখো হে বাপু, দোষ তোমার এক-আধটা নয়, তিন-তিনটে৷ তোমার ওপরে ঘোড়াটা দেখাশোনার ভার ছিল, সে কর্তব্যে তুমি অবহেলা করেছ৷ আমি নিজে অবশ্য ঘোড়ার ব্যাপারে কিছুই বুঝি না, কিন্তু নিশ্চয়ই অবহেলা করেছ তুমি, নইলে ঘোড়াটা মরলই বা কেন, আর রাজামশাই তোমাকে ফাঁসির হুকুম দিলেনই বা কেন? এটা তোমার পয়লা নম্বর দোষ, তা মানতেই হবে৷ তারপর দেখো, আমাদের রাজার মনে তুমি দুঃখ দিয়েছ৷ রাজা আমাদের সবার প্রিয়, সবার প্রভু৷ রাজাকে দুঃখ দেওয়া মানে আমাদের সবাইকেই দুঃখ দেওয়া৷ রাজ্যসুদ্ধ সবাইকে এমন একটা দুঃখের মধ্যে ফেলে দিলে-এ হল তোমার দু-নম্বর দোষ৷ শুধু এ জন্যই তোমার গর্দান নেওয়া উচিত৷ কিন্তু এসব কথা যদি বাদও দিই, তুমি তিন নম্বর এমন একটা দোষ করেছ, যার কোনো ক্ষমা নেই৷ দেখো, তুমি এমন একটা কাণ্ড বাধালে যে, সামান্য একটা ঘোড়ার মৃত্যুর জন্য রাজাকে একজন জলজ্যান্ত মানুষের প্রাণদণ্ড ঘোষণা করতে হল৷ রাজ্যের লোকে যখন এ কথা জানবে, তারা রাজার ওপর অসন্তুষ্ট হবে৷ আশপাশের রাজ্যের লোক যখন জানবে, তারা আমাদের রাজ্যের নিন্দে করবে, আমাদের রাজাকে ঘেন্না করবে৷ কাজেই দেখো, তুমি একটা ঘোড়ার মৃত্যুর জন্য বিশ্বসুদ্ধ সবার কাছে আমাদের মাথা হেঁট করে দিলে, আমাদের রাজার মুখে চুনকালি মাখিয়ে দিল৷ ছি ছি৷'

রাজা বললেন, 'ওকে ছেড়ে দাও৷'

উচিত জবাব

বড়ো খিদে৷ মেটাবার একটা অবশ্য উপায় আছে৷ গাঁয়ের জমিদারবাড়িতে রোজই কয়েকজন বাইরের লোককে খাওয়ানো হয়৷ মুশকিল হচ্ছে, খাবারের সঙ্গে জমিদারমশায়ের কথাবার্তাও হজম করতে হয়, এবং সে কথাগুলো তেমন উপাদেয় নয়৷ এমন ভাবে জমিদার কথা বলেন যেন অন্য সবাই নরকের কীট, খাবার দিয়ে তাদের ধন্য করে দিচ্ছেন উনি৷

খানিকক্ষণ এধার-ওধার করে অন্য উপায় ভাববার চেষ্টা করল লোকটি৷ কিন্তু নাঃ, এত খিদে পেয়েছে যে ঠিকমতো ভাবাও যাচ্ছে না৷ অগত্যা জমিদারবাড়ির দিকেই পা বাড়াল৷

বাইরের ঘরে বসেছিলেন জমিদার৷ খাবার সময় হয়েছে, তাই উঠবেন-উঠবেন করছিলেন৷ এমন সময়ে লোকটি এসে দাঁড়াল, খেতে চাইল৷ জমিদার নিজের দানধর্ম দেখাবার জন্য উন্মুখ, সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে খবর পাঠালেন, 'ওরে, এর জন্য বেশ করে ডাল ভাত তরকারি নিয়ে আয় তো!'

এসে গেল খাবারদাবার, পরিতৃপ্তি করে খেল লোকটি৷ জমিদার বললেন, 'আর ডাল-তরকারি দিতে বলব?'

'আজ্ঞে না, এ যা খেয়েছি, পেট একেবারে টইটুম্বুর ভরে গেছে, আর খেতে পারব না৷'

জমিদার ভেতরের দিকে তাকিয়ে হাঁক পাড়লেন, 'তাহলে এবার মাছের ঝোল নিয়ে আয়৷'

এসে গেল এক বাটি-ভরা মাছের ঝোল, ঢেলে দেওয়া হল লোকটির পাতে৷ জমিদার বললেন, 'খা৷'

চেটেপুটে শেষ করল লোকটি৷ জমিদার বললেন, 'আর এক টুকরো মাছ?'

'আজ্ঞে না, পেট আইঢাই করছে, আর খেতে পারব না৷'

জমিদার নাছোড়বান্দা৷ এবারে লোকটির পাতে পড়ল এক বাটি মিষ্টি৷ ধীরেসুস্থে সেটিও শেষ করল লোকটি৷

জমিদার বললেন, 'তবে! যতবারই জিজ্ঞেস করি কেবলই বলিস পেট ভরে গেছে৷ অথচ খেয়ে তো যাচ্ছিস যা দিচ্ছি৷ গাধা কোথাকার, পেট ভরেছে কি না তাও বুঝিস না!'

ঠিক এই ভয়টাই প্রথম থেকেই করছিল লোকটি৷ এই রকমের কথাবার্তা এক্কেবারে পছন্দ হয় না তার৷ বিরস মুখে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল সে৷

কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিলেন জমিদার-'কী রে হাঁদা গঙ্গারাম, উত্তর দিচ্ছিস না যে৷'

অন্যদিকে তাকিয়ে আছে লোকটি, দেখছে সেদিকে মিস্তিরিরা কাজ করছে, নতুন দালান উঠছে জমিদার-বাড়িতে৷ উপকরণ সব ডাঁই করে রাখা আছে একদিকে-মাটির ওপর ঢিপি করে বালি, একটা বাক্সের মধ্যে পাথরকুচি৷ সেদিকে তাকিয়ে লোকটি জমিদারকে বলল, 'একটু দেখে যান এখানে৷'

জমিদার বাইরে এলেন লোকটির সঙ্গে৷ পাথরকুচি-ভরা বাক্সটা দেখিয়ে লোকটি প্রশ্ন করল, 'আচ্ছা আপনার কী মনে হচ্ছে, এই বাক্সটা ভরতি তো?'

'নিশ্চয়ই ভরতি, দেখাই তো যাচ্ছে৷'

পাশের বালির গাদা থেকে এক ঝুড়ি বালি তুলে নিয়ে লোকটি এবার ছড়িয়ে দিল পাথরকুচির ওপরে৷ পাথরকুচির ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে গেল বালি৷ লোকটি জিজ্ঞেস করল, 'এবার, ভরতি?'

'হ্যাঁ ভরতি৷'

এবার এক বালতি জল এনে ওপরে ঢেলে দিল লোকটি৷ প্রশ্ন করল, 'এবার?'

'ভরতি৷'

'তবে! খুব যে আমাকে কথা শোনাচ্ছিলেন! সামান্য একটা বাক্স, আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি বললেন সেটা নাকি ভরতি৷ তার পরেও দিব্যি এক ঝুড়ি বালি ঢুকে গেল তার মধ্যে, তারও পরে ঢুকল এক বালতি জল৷ তাহলে প্রথমেই আপনি বাক্সটাকে ভরতি বলেছিলেন কোন আক্কেলে? আমাকে তো গাধা বললেন, আমি নাকি কখন পেট ভরতি হচ্ছে বুঝতে পারি না৷ পেট তো দেখা যায় না, বাক্স তো দেখা যায়৷ আপনাকে এখন কী বলা যায় তাহলে আপনিই বলুন৷'

জোরদার মামলা চলছে আদালতে৷ খুনের মামলা৷ একজন নতুন সাক্ষীকে দাঁড় করানো হয়েছে, তাঁকে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন সরকারি উকিল৷ প্রথম প্রশ্ন-

'আসামিকে আপনি চেনেন?'

'কেন, আমি আসামিকে চিনি, এ কথা আপনার মনে হল কেন?'

'যেদিন ঘটনাটি ঘটে, সেদিন সন্ধে সাতটা নাগাদ আপনি কী করছিলেন?'

'কবে কখন কী করছিলাম, সে সব কথা কি কেউ মনে করে রাখে?'

'আপনি কি আসামিকে দেখেছেন সেদিন?'

'কেন, আমি দেখেছি কি না তাতে কী যায় আসে?'

এইবার বিচারকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল৷ উকিলকে থামিয়ে তিনি সাক্ষীর দিকে তাকিয়ে বজ্রগম্ভীর স্বরে বললেন, 'আপনাকে যে প্রশ্নই করা হচ্ছে, আপনি তার উত্তর না দিয়ে আর একটা প্রশ্ন করছেন কেন বলুন দেখি?"

ঠান্ডা গলায় সাক্ষী এবার বললেন, 'কেন, তাতে কি আপনার খুব অসুবিধে হচ্ছে?'

কাজির আলোয়ান

কাজিসাহেবের অনেক বদনাম ছিল, তার মধ্যে প্রধান হল-মদ্যপানটা তিনি একটু বেশি করতেন৷ না, বলা ভুল হল, একটু বেশি নয়, ভালো রকমেরই বেশি৷ কোথা থেকে যেন বেশ করে নেশা চড়িয়ে ফিরছিলেন, রাস্তার মাঝখানে আর পারলেন না, গাছতলায় বসে একটু জিরিয়ে নেবেন ভাবলেন৷ বসতে না বসতেই গা-টা এলিয়ে দিয়ে শয়ন, এবং অবিলম্বে নিদ্রা৷

পাশ দিয়ে একটি লোক যাচ্ছিল৷ দেখল, কাজিসাহেব অঘোরে ঘুমোচ্ছেন নেশার ঘোরে, গায়ের ওপর পড়ে রয়েছে তাঁর আলোয়ানটা৷ এমন সুযোগ তো আর ছাড়া যায় না৷ আস্তে করে আলোয়ানটি গায়ের ওপর থেকে তুলে নিয়ে চম্পট দিল লোকটি৷

কাজিসাহেব ঘুম থেকে উঠে দেখেন, আলোয়ান উধাও৷ রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে সভায় এসেই পেয়াদাদের হুকুম দিলেন, আলোয়ানটা যার গায়েই দেখা যাবে তাকে যেন ধরে আনা হয়৷ যেমন-তেমন আলোয়ান নাকি!

কিছুক্ষণের মধ্যেই পেয়াদারা ধরে আনল লোকটাকে৷ লোকটা নাকি প্রকাশ্য বাজারের মধ্যে চুরি-করা আলোয়ানটা গায়ে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল! এটা কি দুঃসাহস, নাকি স্রেফ আহাম্মুকি, তাও বুঝে উঠতে পারল না পেয়াদারা৷

কাজি বললেন, 'কী হে! আমার আলোয়ান চুরি করেছ, আস্পর্ধা তো কম নয় তোমার!'

লোকটা হাত জোড় করে বলল, 'হুজুর মাপ করবেন, কিন্তু আপনি বোধ হয় ভুল করছেন৷ চুরি আমি করিনি হুজুর৷ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, দেখি গাছতলায় একটা লোক বেহদ্দ মাতাল হয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে, কোনো দিকে হুঁশ নেই ব্যাটার৷ মনে হল লোকটাকে ঠিক করে বোঝানো দরকার, কী বাজে কাজটা করছে সে৷ ওই জন্য লোকটার আলোয়ানটা গায়ে দিয়ে বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, যাতে লোকটা সহজেই আমাকে দেখতে পায়, আলোয়ানটা ফেরত চায়৷ চাইতে এলেই লোকটাকে এমন আচ্ছা করে বুঝিয়ে দেব, লোকটা দেখবেন জীবনে আর ওরকম মাতলামি করবে না৷ এতে অপরাধটা কী হল হুজুর? তবে হ্যাঁ, আপনি যদি বলেন যে আলোয়ানটা আপনারই, তাহলে আর আমার কী বলার থাকতে পারে বলুন! নিন তবে আপনার আলোয়ান৷'

কাজি ব্যস্তসমস্ত হয়ে বললেন, 'না না, আমার আলোয়ান মোটেই নয় এটা, যাও তুমি যাও৷'

ট্র্যাজেডি

প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছে হল, শিক্ষাব্যবস্থা কীরকম চলছে তা নিজের চোখে দেখবেন৷ তাই একদিন গেলেন একটা ইশকুল পরিদর্শন করতে৷

ইশকুলের শিক্ষকেরা খুব সমাদর করে তাঁকে নিয়ে গেলেন একটা ক্লাসঘরে৷ ক্লাস চলছে৷ প্রধানমন্ত্রী আসতেই উঠে দাঁড়াল সবাই৷ প্রধানমন্ত্রী একটা চেয়ার টেনে বসলেন, অন্যদেরকেও বসতে বললেন৷ শিক্ষকেরা বললেন, 'আপনি কিছু প্রশ্ন করুন ওদের৷'

প্রধানমন্ত্রী ছাত্রছাত্রীদের ভাষাজ্ঞান পরীক্ষা করার জন্য প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, 'আচ্ছা, বলো তো দেখি, ট্র্যাজেডি কথাটার অর্থ কী?'

সবাই চুপ করে রইল৷ প্রধানমন্ত্রী আবার বললেন, 'এক কথায় অর্থ না হলেও চলবে৷ উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও কেউ৷'

চট করে হাত তুলল একটি মেয়ে৷ প্রধানমন্ত্রী উৎসাহিত হয়ে বললেন, 'বলো৷'

মেয়েটি বলল, 'ধরুন আমার সবচেয়ে প্রিয় যে বন্ধু, যার সঙ্গে প্রতিদিন আমি গল্প করি খেলা করি, হঠাৎ একদিন রাস্তা পার হতে গিয়ে গাড়ির ধাক্কা লেগে সে মারা গেল৷ সেটা নিশ্চয়ই ট্র্যাজেডি!'

নাকটা কুঁচকে প্রধানমন্ত্রী বললেন, 'ঠিক তা নয়৷ হলে সেটা খুব দুঃখের ব্যাপার হবে তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু এটাকে ঠিক ট্র্যাজেডি বলা যায় না৷ এটা হল দুর্ঘটনা৷ ...বেশ, আর কে বলবে?'

একটি ছেলে হাত তুলল৷ দাঁড়িয়ে উঠে বলল৷ 'ধরুন এক ক্লাসের পঞ্চাশ জন ছাত্রছাত্রী ইশকুল থেকে বাসে চড়ে পিকনিক করতে যাচ্ছে, হঠাৎ পথের মধ্যে বাস উলটে সবাই মারা গেল৷ তাহলে কি ট্র্যাজেডি হবে?'

প্রধানমন্ত্রী বললেন, 'না, খুব দুঃখের কথা হবে এটাও, অপূরণীয় ক্ষতি হবে, কিন্তু এটাও ঠিক ট্র্যাজেডি নয়৷'

এবার অন্য একটি মেয়ে বলল, 'যদি এমন হয়... একদল সন্ত্রাসবাদী বোমা মারল আপনার গাড়িতে, আপনি মারা গেলেন৷'

প্রধানমন্ত্রীর মুখচোখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল৷ বললেন, 'ঠিক বলেছ৷ এই হচ্ছে ট্র্যাজেডি৷ কী করে বুঝলে?'

মেয়েটি বলল, 'আসলে আমি ভেবে দেখলাম, সেরকম যদি হয়, তাহলে সেটাকে নিশ্চয়ই দুর্ঘটনা বলা যাবে না, কেননা দুর্ঘটনা তো কেউ ভেবেচিন্তে ঘটায় না! অথচ ব্যাপারটা খুব দুঃখেরও হবে না, এতে অপূরণীয় ক্ষতিও হবে না৷ তাই...'

টাকার থলে

বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎই চোখে পড়ে গেল জিনিসটা৷ রাস্তার পাশেই পড়ে আছে খানিকটা ধুলো-ময়লার মধ্যে৷ একটু এগিয়ে গেল জোসেফ, হ্যাঁ, যা ভেবেছে তা-ই৷ টাকার একটা থলে৷ আশেপাশে লোকজন আসছে কি? নাঃ, কী আশ্চর্য, কেউই নেই কাছাকাছি৷ চাদরের নীচে থলেটা নিয়ে সোজা বাড়ি চলে এল জোসেফ৷

বাড়ি মানে অবশ্য বস্তির মধ্যে নয়-নয় করে একটু মাথা গোঁজবার জায়গা৷ তাও চালে ফুটো, দেওয়ালের মাটি খসে পড়ছে, মেঝেতে মাটি নিকোনো হয়নি বহু যুগ৷ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে, সবেধন নীলমণি জানালাটি বন্ধ করে, টাকার থলেটা খুলে ফেলল জোসেফ৷ জয় ভগবান! একটা-দুটো নয়, এক্কেবারে হাজার টাকা! আহা-হা, আজ কার মুখ দেখে উঠেছিল ঘুম থেকে!

আনন্দে প্রায় নাচতে ইচ্ছে করল জোসেফের৷ এ তো ভগবানেরই দান! চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করল সবাইকে৷ জানালাটাও খুলল, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, না না, পড়শিদের জানানোটা বেশ বোকামির কাজ হয়ে যাবে৷ জানালাটা বন্ধ থাকাই ভালো, পাছে কেউ দেখে ফেলে!

জানালা বন্ধ করার আগেই দেখতে পেল, রাস্তা দিয়ে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে যাচ্ছে এক জন লোক, বলছে, 'রেব অস্কার আজ পথে একটি টাকার থলে হারিয়ে ফেলেছেন৷ এই থলে যদি কেউ খুঁজে পেয়ে থাকে, রেব অস্কারকে ফিরিয়ে দিলে তিনি যথাযোগ্য পুরস্কার দেবেন৷'

রেব অস্কার মানে শহরের সবচেয়ে ধনী লোক৷ তার কাছে হাজার টাকা কী আর, হাতের ময়লা! তাহলে থলেটা ফেরত দেওয়ার দরকার কী? -এইসব সাতপাঁচ ভাবল জোসেফ৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাবল, না যাকগে, জেনেশুনেও যদি টাকাটা ফেরত না দিই, তাহলে তো সেটা চুরি করারই সামিল হল৷ নাঃ, দিয়ে আসাই ভালো৷

রেব অস্কার টাকার থলেটা নিয়ে পুরস্কারের কোনো উচ্চবাচ্য তো করলই না, দুটো ভালো কথা পর্যন্ত বলল না৷ প্রায় খেঁকিয়ে বলল কেবল, 'হাতাবার মতলবে ছিলি তো! ঢ্যাঁড়ার ভয়ে টিকতে পারলি না?'

সে কথা তেমন গায়ে না মেখে জোসেফ শুধু বলল, 'আজ্ঞে আমার পুরস্কারের টাকাটা?'

রেব অস্কার বলল, 'আরে যা যা৷ আবার বকশিশ চাইতে এসেছেন! ছিল তো আমার থলেতে দু-হাজার টাকা, তার থেকে অর্ধেক তো সরিয়ে রেখেছিস আগেই৷ আবার বকশিশ চাইতে লজ্জা করে না?'

'মোটেও দু-হাজার ছিল না৷'

'আলবাত ছিল৷ চোরের আবার বড়ো গলা!'

এত বড়ো অপমান! 'ঠিক আছে, কথায় যখন ফয়সালা হবে না, চলুন তবে রাবির কাছে৷'

বৃদ্ধ রাবি সব শুনলেন৷ বুঝলেন৷ তারপর অস্কারের দিকে চেয়ে বললেন, 'কত টাকা ছিল বাপু তোমার হারানো থলেতে?'

'দু-হাজার৷'

এবার জোসেফের দিকে চেয়ে বললেন, 'আর তুমি যে থলেটা পেয়েছ সেটায় কত ছিল বাবা?'

'এক হাজার৷'

'ও৷ তবে তো পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, যে থলেটা জোসেফ কুড়িয়ে পেয়েছে সেটা অস্কারের থলে নয়৷ দেখি, ওটা আমার হাতে দাও৷'

হতভম্ভ অস্কার রাবির আদেশ পালন করল৷ হাজার হোক, রাবির আদেশ অমান্য করা মানে ইহুদিদের পক্ষে অনন্ত নরকবাস৷ থলেটা হাতে নিয়ে জোসেফের দিকে বাড়িয়ে দিলেন রাবি-'এই নাও বাবা জোসেফ, এই থলেটার আসল মালিককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না৷ তুমি যখন রাস্তায় পেয়েছ এটা, তখন ভগবানের ইচ্ছে এটা তোমার কাছেই থাক৷ নাও৷ আর বাবা অস্কার, তোমার থলেটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না যখন, তখন ধরে নিতেই হবে যে, ভগবানের ইচ্ছে ওটা তোমার চোখের আড়ালেই থাক আপাতত৷ ব্যাস, তোমরা দু-জনে এসো এবার৷'

অস্বাস্থ্যকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে যে সব দেশ খুব উন্নত, তাদের মধ্যে ইংল্যান্ড এবং মার্কিন দেশের লোকেদের হৃদপিণ্ড খুব দুর্বল, হার্টের নানারকম অসুখ লেগেই আছে৷ দুই দেশের স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্তারা লক্ষ করলেন ব্যাপারটা, এবং বিচলিত হলেন৷ তাঁদের মনে হল, হয়তো অত্যধিক মদ খাওয়ার ফলেই এই দুরবস্থা৷ একটি কমিটি তৈরি করা হল, এ ব্যাপারটা ভালো করে বোঝার জন্য৷

কমিটির সদস্যরা বিস্তর আলোচনা করলেন, গবেষণা করলেন৷ তাঁরা দেখলেন, জাপানিরাও মদ খায়, যদিও তাদের হৃদপিণ্ড তেমন দুর্বল নয়৷ ইংরেজ বা মার্কিনিদের তুলনায় ফরাসিরা লাল মদ অনেক বেশি খায়, অথচ তাদের হার্টের অসুখ হয় গড়ে অনেক কম৷ ইতালীয়দের সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেল, ইতালীয়রাও এ নিয়ে অনেক কম ভোগে, যদিও তারা সাদা মদ খায় ইংরেজ বা মার্কিনিদের থেকে অনেক বেশি৷ জার্মানির লোকেরা বিয়ার খায় প্রচণ্ড পরিমাণে, ইংল্যান্ড বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লোক তার ধারেকাছেও আসতে পারে না৷ কিন্তু জার্মানিতেও হার্টের অসুখ অপেক্ষাকৃত কম৷ স্পেনের লোকেরা লিকর নামক ভারী মাদক খায় একরকম, প্রচুর পরিমাণে৷ তাদের হার্টের অসুখের হিসেবও তো তেমন মারাত্মক কিছু নয়৷

অবশেষে তাঁরা সিদ্ধান্তে পৌঁছোলেন৷ রিপোর্টে লিখলেন, 'হৃদপিণ্ডের ব্যামো কেন বেশি হয়, তা নির্ণয় করাই ছিল এই কমিটির কাজ৷ মাদক পানীয় বেশি খেলে ক্ষতি হয়, এরকম কোনো নিদর্শন আমরা পাইনি৷ তবে আমরা যা তথ্য সংগ্রহ করেছি, তার ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে যে বেশি ইংরিজি বললে হার্টের অসুখ হয়৷'

নামকরণ

ইহুদি সমাজে যে কোনো সমস্যাতেই রাবি হচ্ছেন প্রথম আদালত৷ সেই আদালতে একদিন এসে হাজির স্বামী-স্ত্রী-মতের মিল হচ্ছে না তাদের৷ কেবলই ঝগড়া লাগছে৷

'কী নিয়ে?' -প্রশ্ন করলেন রাবি৷

দু-জনে মিলে যা বলল তার সারমর্ম হচ্ছে এই৷ একটি ছেলে হয়েছে ওদের সদ্য৷ তার কী নাম দেওয়া হবে, তাই নিয়েই দু-জনের মতবিরোধ৷ স্বামীর ইচ্ছে, নিজের বাবার নামে ছেলের নাম দেয়৷ স্ত্রী ওদিকে তার বাবার নামে ছেলের নাম দেবে বলে ঠিক করেছে৷

কঠিন সমস্যা৷ কী করে এগোবেন রাবি? আর কিছু না ভেবে পেয়ে স্বামীকে জিজ্ঞেস করলেন, 'নাম কী তোমার বাবার?'

'নাহুম৷'

'আর তোমার বাবার?' -এ বারের প্রশ্নটা স্ত্রীর উদ্দেশে৷

'নাহুম৷'

শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন রাবি৷ দাদু ঠাকুর্দা দু-জনেরই একই নাম- ঝগড়াটা তাহলে কী নিয়ে? বললেন সে কথা উপস্থিত স্বামী-স্ত্রীকে৷

স্ত্রী বলল, 'দেখুন, আমার বাবা খুব ধার্মিক পণ্ডিত মানুষ৷ আর আমার শ্বশুরমশাই একবার ঘোড়া চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন৷ ওরকম ঘোড়া-চোরের নামে আমার ছেলের নাম দেওয়া হবে, এ আমি বরদাস্ত করতে পারব না৷'

স্বামীটি পাশে দাঁড়িয়ে রইল গোঁজ হয়ে৷

অনেক চিন্তা করলেন রাবি৷ দুরূহ প্রশ্ন৷ শেষকালে বললেন, 'সবই বুঝলাম৷ আমার মত, আপাতত তোমরা ছেলের নাম রাখো নাহুম, কিন্তু সেটা ঠাকুর্দার নাম না দাদুর নাম তা এখনই ঠিক কোরো না৷ সময়কালে সবই বোঝা যাবে৷ যদি দেখো বড়ো হয়ে ছেলেটার পড়াশোনা ধর্মকর্মের দিকে মতি হচ্ছে তাহলে বুঝবে দাদুর নামেই ওর নাম হয়েছিল৷ আর যদি বড়ো হয়ে ঘোড়া চুরির দিকে যায়, তাহলে বুঝবে ঠাকুর্দার নামেই ওর নাম৷'

বোকাদের তফশিল

মধ্যযুগে ইতালিতে আর্লোত্তো মাইনার্দি নামে একজন বিখ্যাত ধার্মিক পণ্ডিত ছিলেন৷ ইতালীয় ভাষায় পাদরি কথাটার প্রতিশব্দ হল 'পিয়োভানো', তাই অনেকে এনার নাম উল্লেখ করতে হলে বলেন 'পিয়োভানো আর্লোত্তো'৷ ১৪৪৮ খ্রিস্টাব্দে এই পাদরি একটা জাহাজে চেপে ফ্লোরেন্স থেকে সিসিলি যাচ্ছিলেন৷ মাঝপথে ঝড়ে জাহাজ খানিকটা ভেঙেচুরে যায়, মেরামতের জন্য তীরে ভিড়তে হয়৷ জাহাজের ক্যাপ্টেন জানান, অন্তত হপ্তাখানেক থাকতে হবে সেখানে৷

জায়গাটা ছিল ইতালির দক্ষিণের মহানগর নেপলস৷ আর্লোত্তো সেখানে এসেছেন, এ খবর ছড়িয়ে পড়ল হাওয়ার বেগে৷ দিন তিনেকের মধ্যে খবর পৌঁছে গেল রাজার কাছে৷ রাজা এই বিখ্যাত জ্ঞানী পণ্ডিতকে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন, আমন্ত্রণ করে রাজসভায় আনালেন তাঁকে৷

শুভেচ্ছা বিনিময় হল প্রথমে, তারপর খাদ্য ও পানীয় সহযোগে নানা কথা আলোচনা হতে লাগল৷ শেষমেশ একসময়ে রাজা বললেন, 'আমি শুনেছি, আপনি নাকি একটি কালো রঙের খাতা নিয়ে ঘোরেন৷ সেই খাতার পাতায় পাতায় লিখে রাখা আছে সারা পৃথিবীর সেরা মূর্খদের নাম?'

আর্লোত্তো উত্তর দিলেন, 'মোটামুটি ঠিকই শুনেছেন মহারাজ৷ তবে সারা পৃথিবীর লোকের নাম আমি কোথায় পাব? শুধু আমি যেখানে যেখানে ভ্রমণ করেছি, সেসব জায়গায় যত বিশিষ্ট মূর্খের কথা শুনেছি বা যাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, তাদের নাম এবং কীর্তির কথাই লিখে রেখেছি৷'

রাজা বললেন, 'একটা কথা জানার আমার বড়োই কৌতূহল৷ আপনি তো আমার রাজধানীতে গত তিন দিন যাবত আছেন৷ এই ক-দিনের মধ্যে কারুর নাম কি যোগ হয়েছে আপনার তালিকায়?'

'সামান্যই সময় পেয়েছি মহারাজ৷ এখানকার মাত্র একজনের নামই লিখেছি এ পর্যন্ত৷'

'কার নাম, বলতে আপত্তি আছে কি?'

'না মহারাজ, আপত্তি নেই৷ নামটা আপনার৷'

রাজা প্রচণ্ড রেগে গেলেন, কিন্তু কোনো রকমে মনের ভাব চাপা দিয়ে বললেন, 'আমার নাম? আমি কী এমন বোকামি করলাম?'

পিয়োভানো আর্লোত্তো আলখাল্লার ভেতর থেকে বার করলেন তাঁর কালো খাতাটি, পাতা উলটে খুঁজে বার করলেন রাজার নাম ও কীর্তির কথা৷ রাজাকে বললেন, 'এই যে মহারাজ, পেয়েছি৷ এখানে আসার পরে লোকমুখে শুনলাম যে, আপনার এক খাস ভৃত্য ছিল তেওদোরিগো নামে, ঠিক কি না?'

রাজা বললেন, 'ছিল কেন বলছেন, এখনও সে দিব্যি আছে৷ অবশ্য এখানে নেই এই মুহূর্তে৷ গেছে...'

রাজাকে থামিয়ে পণ্ডিত বললেন, 'জানি৷ গেছে তার বাড়ি, জার্মানিতে৷ কিংবা বলা ভালো, আপনিই পাঠিয়েছেন তাকে৷ তার দেশে নাকি অতি উত্তম দুধেল গোরু পাওয়া যায়, তাই আপনি তাকে পাঁচশোটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে পাঠিয়েছেন, সেই গোরু কিনে নিয়ে আসার জন্য৷ ঠিক কি না?'

রাজা বললেন, 'হ্যাঁ৷'

আর্লোত্তো বললেন, 'এই কারণেই আপনার নাম উঠে গেছে এই বোকাদের তফশিলে৷'

রাজা একটু ক্ষুণ্ণ স্বরে বললেন, 'এটা কিন্তু আপনার অবিচার হয়েছে৷ তেওদোরিগো অত্যন্ত বিশ্বস্ত লোক, ছোটোবেলা থেকে এখানে আছে৷ আপনি কি ভাবছেন, সে এই টাকা নিয়ে পালিয়ে যাবে?'

'অপরাধ নেবেন না মহারাজ৷ লোকটি ছোটোবেলা থেকে এই প্রাসাদে রয়েছে, আপনি নিজেই বললেন৷ অর্থাৎ নিজে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার সুযোগই সে পায়নি কখনো৷ তাকে আপনি যে পরিমাণ অর্থ দিয়েছেন তাতে তার বাকি জীবনটা হেসেখেলে চলে যাবে৷ পাঠিয়েছেন যেখানে, সেটা তার নিজের দেশ, আপনার রাজ্যের বাইরে৷ অর্থাৎ আপনি তাকে ধরে আনতে পারবেন না, তাই তাকে পালিয়ে বেড়াতে হবে না৷ তাহলে সেখানে সে ঘর বাঁধবে না কেন, বলতে পারেন?'

থমথমে মুখে রাজা একটু চুপ করে ভাবলেন৷ তারপর বললেন, 'বুঝলাম৷ হয়তো আপনার কথাই ঠিক৷' তারপরে একটু উদ্ভাসিত মুখে যোগ করলেন, 'তবু বলব, আপনি অবিচার করেছেন৷ আপনার অনুমান ঠিক কি না, এখন পর্যন্ত তার কোনো প্রমাণ নেই৷ তেওদোরিগো গেছে অল্পদিন মাত্র হল৷ এমনিতেই তার ফেরার সময় হয়নি৷ ধরুন সে গোরু কিনে ফিরে এল, টাকাপয়সা যা বাঁচল তা ফেরত দিল আমায়৷ তখন কী হবে? আপনি কি আপনার খাতা সংশোধন করবেন তখন?'

পিয়োভানো আর্লোত্তো উত্তর দিলেন, 'অবশ্যই করব মহারাজ৷ এ কথা শোনামাত্র আমি খাতা থেকে আপনার নাম কেটে দিয়ে সেখানে তেওদোরিগোর নাম লিখে রাখব৷'

যার যেমন তার তেমন

ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রহ্মদেশের রাজা ছিলেন মিন্দন-তাঁকে নিয়ে এই গল্প৷ রাজার সভায় ছিলেন এক বৌদ্ধ ভিক্ষু, রাজার উপদেষ্টা হিসেবে৷ নাম তাঁর থিঙ্গাজার৷ তাঁর জ্ঞান এবং বুদ্ধির খ্যাতি ছিল সর্বজনবিদিত৷

বুদ্ধপূর্ণিমার সময়ে দেশ উজাড় করে লোক আসে-তারা পুজো দেয় তথাগত বুদ্ধের নামে, অন্নজল দান করে ভিক্ষুদের৷ এদের দেখে প্রশ্ন জাগল রাজা মিন্দনের মনে৷ থিঙ্গাজারকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে ভিক্ষু, দেখছি কেউ কেউ পুজো আনে সকালে, আবার কেউ আনে সন্ধেয়৷ আমার ধারণা, সন্ধেয় পুজো দেওয়া শাস্ত্রের রীতিবিরোধী৷ ভাবছি একটা আইন করে শহরে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে দিই-সন্ধে বেলায় কেউ যেন পুজো না দেয়৷ আপনি কী বলেন?'

থিঙ্গাজার বললেন, 'মহারাজ, লোকে যখন ভিক্ষুদেরকে অন্নজল দেয়, তখন সেটা সকালে দেওয়াই সঙ্গত৷ কেননা ভিক্ষুরা দুপুরে আহার করে, রাত্রে তাদের উপবাস৷ কিন্তু ভগবান বুদ্ধের উদ্দেশ্যে যখন লোকে পুজো দিচ্ছে মহারাজ, তার আর সময়-অসময় কী? ভগবান তো সব সময়েই শুনবেন মানুষের কথা! তা ছাড়া দেখুন, সবারই সুবিধে-অসুবিধে আছে৷ কেউ হয়তো এমন কোনো কাজ করে যার জন্য সারা সকালটাই তার আটকা-সে কী করে সকালে আসবে বলুন! আসল কথা হল ভক্তি, সেটা থাকলেই হল৷'

রাজা বললেন, 'নিয়ম থাকবে না তাই বলে?'

থিঙ্গাজার জবাব দিলেন, 'নিশ্চয়ই থাকবে৷ নিজের সুবিধে-অসুবিধে বিচার করে প্রত্যেকে তৈরি করে নেবে তার নিজের নিয়ম৷ সেই হাতি আর ইঁদুরের উপাখ্যানটা জানেন তো?'

রাজা বললেন, 'কী উপাখ্যান?'

তখন থিঙ্গাজার রাজাকে এই গল্পটা বললেন৷

বনের মধ্যে একদিন হাতি আর ইঁদুরের দেখা৷ হাতি বলল, 'আজ আমার বড়ো একটা ফাঁড়া গেছে৷ আসছিলাম বনের পথ ধরে কিছুক্ষণ আগে, এমন সময়ে পাশ থেকে আর একটা বিশাল হাতি ছুটে এল৷ হাতিটা দাঁতাল শুধু নয়, মনে হল পাগলও৷ আমাকে গুঁতাবার জন্য তিরবেগে ছুটে আসছে৷ পাগলের সঙ্গে যুদ্ধ করার কোনো ইচ্ছে ছিল না আমার, তাই ওকে এড়াবার জন্য ছুটে পালাচ্ছি, তখন একটা গাছের নীচু ডালে লেগে আমার পিঠটায় ছড়ে গেছে গভীর হয়ে৷ দেখো, তাকালেই দেখতে পাবে পিঠে প্রায় দু-হাত লম্বা একটা দাগ৷'

ইঁদুর বলল, 'ভাই, তোমার ব্যথায় তোমার কষ্ট হচ্ছে সন্দেহ নেই৷ কিন্তু আমার যা হয়েছে তার কাছে তোমারটা কিছুই নয়৷ তোমার তো প্রাণের ভয় ছিল না দৌড়োবার সময়ে! আর আমাকে ধাওয়া করেছিল একটা ইয়া বড়ো হুলোবেড়াল, প্রাণের ভয়ে ছুটছিলাম ঊর্ধ্বশ্বাসে, তখন বেড়ালটা একবার থাবা বাড়িয়ে

এক ঝটকায় আমার পিঠের থেকে মাংস খুবলে নিয়েছে৷ তাকিয়ে দেখো, প্রায় দু-হাত লম্বা একটা দাগ আমার পিঠে৷'

হাতি তাকাল ইঁদুরের দিকে, বলল, 'বন্ধু, তোমার লেগেছে খুবই তা মানছি, তোমার মনে ব্যথাও দিতে চাই না, তবু বলি, দু-হাত লম্বা দাগ তোমার পিঠে হবে কেমন করে, তোমার সারা শরীরটাই তো এক হাতও লম্বা নয়৷'

ইঁদুর বলল, 'কার হাতের এক হাত? তোমার পিঠের দাগ মাপবার জন্য মাপতে হবে তোমার হাতের মতো করে, আর আমার দাগ মাপতে হবে আমার হাতের মাপে৷ যার যেমন তার তেমন৷ তাই না?'

দুই পণ্ডিতে তর্ক লেগেছে৷ গভীর তর্ক৷

প্রথম জন বললেন, 'এতই যদি আপনার যুক্তির দৌড়, তাহলে এই ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে দিন দেখি! লক্ষ করেছেন নিশ্চয়ই, পাঁউরুটিতে মাখন লাগাবার পরে দৈবাৎ যদি হাত থেকে পড়ে যায় রুটিটা, তাহলে মাখনের দিকটাই পড়ে মাটিতে! এর কী ব্যাখ্যা দেবেন বলুন৷'

দ্বিতীয় জন আবার অত কথার ধার ধারেন না৷ হাতেনাতে পরীক্ষা করার দিকে ঝোঁক তাঁর৷ একটা রুটি নিয়ে তাতে মাখন লাগালেন তিনি, তারপর ফেলে দিলেন হাত থেকে৷ মাখনের দিকটা মাটিতে পড়ল না, পড়ল ওপর দিকে মুখ করে৷ বিজয়ীর হাসি দেখা দিল দ্বিতীয় জনের মুখে৷

'দেখুন দেখুন! আপনার কথাটা আগাগোড়া ভুল৷'

প্রথম জন ভূপতিত রুটিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন একটু, তারপর অট্টহাস্যে ফেটে পড়লেন৷ বললেন, 'হেঁঃ! ভাবলেন চালাকিটা আমি ধরতে পারিনি! আপনি তো ভুল দিকে মাখন লাগিয়েছেন মশাই!'

তিনটি বর

এ গল্পটা ইউরোপের ভয়ভোদিনা অঞ্চলের৷ দানিয়ুব নদীর তীরে বিস্তীর্ণ সমভূমি এখানে, চাষবাস হয় বিস্তর, নদীতে অঢেল মাছ, মানুষজন শান্তশিষ্ট সন্তুষ্ট প্রকৃতির৷ এই জায়গার একটি লোক নদীতে মাছ ধরছিল৷ ছিপে ধরা পড়ল অদ্ভুত এক মাছ৷ মাছটাকে ছিপ থেকে ছাড়িয়ে চুবড়িতে ঢোকাতে যাচ্ছে, এমন সময়ে মাছটা একেবারে পরিষ্কার মানুষের গলায় বলে উঠল, 'দোহাই তোমার! আমাকে ছেড়ে দাও৷ তার বদলে তিন-তিনটি বর দেব তোমায়৷'

ভালোমানুষটি বলল, 'পুঁচকি মাছ, তুই আবার কী দিবি? যা, এমনিতেই তোকে ছেড়ে দিচ্ছি৷'

মাছ বলল, 'না না, তা কেন, বলেছি যখন তখন তিন বর তোমার পাওনা৷ বলো কী নেবে৷'

অনেক ভাবল লোকটি৷ কী-ই বা চাইবে? ঘরে খাবারদাবার আছে আজকের মতো, তাই খাবার চাওয়ার কোনো মানে হয় না৷ তাহলে চাইবেটা কী?

মাছ বলল, 'বলো, চুপ করে রইলে কেন? যা খুশি চাইতে পারো৷'

লোকটি বলল, 'না, তেমন কিছু চাওয়ার নেই৷'

মাছ বলল, 'তা কি হয় নাকি কখনো? দেখো ভেবেচিন্তে৷'

খানিকটা ভেবে-টেবে লোকটি বলে উঠল, 'হ্যাঁ হ্যাঁ, এইবার পেয়েছি একটা৷ এই একটা জিনিসই আমার চাইবার আছে৷ ওহে মাছবাবাজি, তুমি বরং এই বর দাও যেন আমার বউ-ছেলে-মেয়ে আমাকে সারাজীবন খুব ভালোবাসে৷'

মাছ বলল, 'এটা আবার চাইবার কী হল? তুমি তো জানোই, তোমার পরিবারের সকলেই তোমাকে ভালোবাসে খুব৷ তাহলে এটা চেয়ে মিছিমিছি তুমি বর নষ্ট করবে কেন? তার চেয়ে বেশ দামি জিনিস-টিনিস কিছু চাও৷'

লোকটা বলল, 'দামি জিনিসই তো চাইছি! ভালোবাসার চেয়ে দামি জিনিস কি আর হয় নাকি? বর না দিতে হয় দিয়ো না, আমি তো চাইনি৷ কিন্তু দিতে যদি চাও, তবে এটাই আমার প্রার্থনা৷'

মাছ বলল, 'বেশ, মঞ্জুর৷ কিন্তু আরও বর পাওনা আছে তোমার৷ এইবার বেশ করে ভেবে জব্বর দেখে কিছু চাও৷'

আবার চিন্তায় পড়ে গেল লোকটি৷ কুঁড়েঘর-ছাদ দিয়ে জল পড়ছে না৷ চাষের জমি-ফসল তো হচ্ছে৷ ঘরে খাবারদাবার-না খেয়ে থাকতে হয় না৷ তাহলে আর কী চাইবার থাকতে পারে?

মাছ কিন্তু নাছোড়বান্দা, তিনটি বর সে দেবেই দেবে৷ কী করা যায়?

ভাবতে ভাবতে লোকটির মাথায় এসে গেল আর একটা কথা৷ মাছকে বলল, 'হ্যাঁ, এইবার হয়েছে৷ আর একটা প্রার্থনা আছে বটে আমার৷'

মাছ বলল, 'বলো৷'

লোকটি বলল, 'ধরো, আমার বউ-ছেলে-মেয়ে যদি আমাকে এত ভালো নাও বাসে কোনোদিন, আমি যেন তা বুঝতে না পারি৷'

মাছ বলল, 'কী আশ্চর্য! এই তো তোমাকে বর দিলাম যে, ওরা সারাজীবন তোমাকে ভালোবাসবে৷ তাহলে এ প্রশ্ন এল কোথা থেকে? এটা তুমি ভুলে যাও, অন্য কিছু চাও৷'

লোকটি খুব অনুনয় করে বলল, 'না না, কিছু মনে করো না, এইটাই আমার দ্বিতীয় বর৷ আমি এটাই চাই৷'

মাছ বলল, 'বেশ, এটাও মঞ্জুর৷ কিন্তু এইবার ভালো করে ভেবে তৃতীয় বরটা চাইবে৷ এইটাই শেষ বর, মনে রেখো৷'

আবার অনেকক্ষণ চিন্তায় ডুবে গেল লোকটি৷ চাইবার কী আছে আর? অবশেষে উদ্ভাসিত মুখে তাকাল মাছের দিকে৷ বলল, 'আর একটা জিনিস চাইবার আছে বটে আমার৷ আমার বউ বা ছেলে-মেয়ে যদি এত ভালো নাও বাসে আমায়, এবং ধরো যদি তা কোনোক্রমে বুঝতেও পেরে যাই, তাহলেও যেন ওদের ওপর আমার কোনো বিরূপ মনোভাব না জাগে, আমি যেন ওদেরকে আগেকার মতোই ভালোবাসতে পারি৷'

মাছ বলল, 'বেশ, তাই হবে৷' বলে, চলে গেল জলের তলায়৷

দারুণ ফুর্তিতে বাড়ির পথ ধরল লোকটি৷

ভেড়ার রং

তিন জন অধ্যাপক যাচ্ছিলেন একটা কনফারেন্সে৷ তিন জনের মধ্যে এক জনের পাণ্ডিত্য জ্যোতির্বিদ্যায়, দ্বিতীয় জনের পদার্থবিদ্যায়৷ আর শেষ জন হলেন অঙ্কের পণ্ডিত৷ কনফারেন্স স্কটল্যান্ডে৷ লন্ডন অবধি প্লেনে করে এসে এই তিন অধ্যাপক ট্রেন ধরেছেন, যাচ্ছেন একসঙ্গে৷

ট্রেন চলেছে স্কটল্যান্ডের ওপর দিয়ে৷ জানলা দিয়ে বাইরে দেখা যাচ্ছে ধুধু মাঠ৷ অধ্যাপকেরা মুগ্ধ হয়ে দেখছেন৷ আগে কখনো স্কটল্যান্ডে আসেননি তাঁরা৷

জ্যোতির্বিদ তাকিয়ে ছিলেন একদিকের জানলা দিয়ে৷ হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল একটি ভেড়া চরে বেড়াচ্ছে মাঠে৷ ভেড়াটার রংটা দেখে একটু আশ্চর্য লাগল জ্যোতির্বিদের৷ সম্পূর্ণ কালো৷ অন্য দু-জনকে ডেকে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেনে, 'স্কটল্যান্ডের ভেড়াগুলো কালো হয় তা তো জানতাম না!'

পদার্থবিদ একটু ক্ষুণ্ণ হলেন এই কথায়৷ ভেড়াটির দিকে তাকিয়ে তিনি জ্যোতির্বিদ বন্ধুর উদ্দেশ্যে বললেন, 'এ কথাটা তোমার বলা উচিত হয়নি৷ তুমি দেখেছ একটামাত্র ভেড়া৷ সেটা কালো৷ তা থেকে 'স্কটল্যান্ডের ভেড়াগুলো কালো হয়' বলাটা একটু বাড়াবাড়ি হচ্ছে নাকি? বড়োজোর তুমি বলতে পার, স্কটল্যান্ডে কালো ভেড়া আছে৷ তাই না?' -বলে, অঙ্কের পণ্ডিতের দিকে তিনি সমর্থনের আশায় তাকালেন৷

অঙ্কের পণ্ডিত খুবই তাজ্জব বোধ করলেন৷ হতাশভাবে অন্য দু-জনের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, 'আমি ভাই তোমাদের কথা কিছুই বুঝতে পারছি না৷ এখন পর্যন্ত যুক্তি দিয়ে আমি যেটুকু বুঝতে পেরেছি, তার ভিত্তিতে আমি বলতে পারি যে, স্কটল্যান্ডে অন্তত একটি ভেড়া আছে, যার শরীরের অন্তত একটি দিকের লোম কালো রঙের৷ এইটুকু জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে কী করে সেই ভেড়াটাকে কালো ভেড়া বলা যায় তাই আমি বুঝছি না, অন্য ভেড়ার কথা তো দূরস্থান!'

হেলমের বিচার

গোটা হেলম শহরের সমস্ত লোক মুহ্যমান৷ মারাত্মক ব্যাপার ঘটে গেছে সেখানে৷ মুচির কাছে জুতো সারাতে গিয়েছিল একজন লোক৷ কথায় কথায় কী বচসা বাধে তার মুচির সঙ্গে৷ তা থেকে হাতাহাতি৷ শেষ পর্যন্ত রাগের মাথায় মুচি তার চামড়া-কাটার ছুরিটা তুলে বসিয়ে দিয়েছে লোকটার বুকে-লোকটা মারা গেছে সাথে সাথে৷

মুচির বিচার দেখতে ভেঙে পড়ল সারা শহরের লোক৷ সবার মনে প্রশ্ন-কী হয়, কী হয়! সব শুনে বিচারক রায় দিলেন-মৃত্যুদণ্ড৷

আরও মুহ্যমান হয়ে গেল হেলমের লোকেরা৷ বিচারককে সমবেতভাবে বলল তারা, 'ধর্মাবতার, একটু বিবেচনা করে দেখতে আজ্ঞা হোক৷ বেচারা একটা দোষ করে ফেলেছে তা ঠিক৷ তা বলে ওকে মরতে হবে? তা ছাড়া দেখুন, আমাদের এই ছোট্ট শহরে একজনই মাত্র মুচি৷ তাকে যদি ফাঁসি দেন, তবে আমাদের জুতোটা চটিটা বানাবে কে, সারাবেই বা কে?'

চিন্তায় পড়লেন বিচারক মশাই৷ বললেন, 'ভেবে দেখি৷' -বলে ঢুকে গেলেন তাঁর খাস কামরায়৷ রুদ্ধশ্বাসে বিচারসভায় অপেক্ষা করতে লাগল সবাই৷

খানিক বাদে বেরোলেন বিচারক ঘর ছেড়ে৷ ঘোষণা করলেন-'খুনের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, এর নড়চড় হবার কোনো উপায় নেই৷ কিন্তু আপনারা পাঁচ জনে যা বললেন, সেটাও ভাববার কথা৷ শহরে মুচি সত্যিই এক জন, তাকে দরকার আমাদের সবারই৷ কী হবে তাহলে? উপায় একটাই, আমি ভেবে দেখলাম৷ মুচি এক জন, কিন্তু ঘরামি তো দু-জন! অতএব মুচিকে ছেড়ে দিয়ে একজন ঘরামিকে ফাঁসি দেওয়া হোক-এই আমার শেষ কথা৷'

অধ্যায় ২ / ২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%