৪.২ শিক্ষা ও ভাষা সমস্যা

অম্লান দত্ত

আমি মাতৃভাষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার পক্ষপাতী; আমি চাই যে, বিভিন্ন বিষয়ে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠনে মাতৃভাষার স্থান হোক।

কিন্তু এই কথাটুকু বলেই যাঁরা বক্তব্য শেষ করেন, তাঁদের সঙ্গে আমার মতের ঘোরতর অমিল। মাতৃভাষায়, অথবা আঞ্চলিক ভাষায়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকার্য বিশ বৎসর চালাবার পর এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের ভিতর ভাববিনিময় চলবে কী করে?

এটা চিন্তিত হবার মতো প্রশ্ন। স্বাধীনতা লাভের সময় আমরা এমন নেতৃবৃন্দ পেয়েছিলাম যাঁরা ছিলেন চিন্তায় ও আদর্শে সর্বভারতীয়। আজ ধীরে ধীরে রাজনীতির ক্ষেত্রে যাঁরা সামনে এগিয়ে আসছেন, তাঁরা আগের নেতাদের তুলনায় অনেকটা বেশী আঞ্চলিক। এ-অবস্থায় দেশের ভাববিনিময়ের সেতুটা, বিশেষত শিক্ষিত সম্প্রদায়ের ভিতর, যত্নের সঙ্গে রক্ষা করা আবশ্যক। একটা কথা এই সঙ্গে স্পষ্ট করে বলা দরকার। ইংলন্ডের মতো শিল্পোন্নত দেশেও অধিকাংশ লোক নিজ নিজ অঞ্চলে জীবনের

অধিকভাগ কাটিয়ে দেন। এদেশেও অল্পসংখ্যক লোকই দেশময় আলোচনায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করবেন। কিন্তু দৈশের ঐক্যের জন্য দেশময় আলোচনার এই স্রোতটাকে অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। আমরা অনেকেই ঐক্যে এতোটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, আমাদের ধারণা যোগাযোগের ভাষা ছিন্ন করে দিলেও ঐক্যটা টিকে থাকবে। এমন একটা প্রমাণহীন ধারণাকে অবলম্বন করে শিক্ষানীতি নির্ধারণ করা দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রমাণ। দেশের ঐক্য ভাঙা সহজ; আবার গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন।

এ প্রসঙ্গে অনেকে একটা ভুল তুলনা দিয়ে থাকেন। তাঁরা বলেন, ইয়োরোপের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষা, তবুও তো ওদের ভিতর আলোচনা চলেছে। তর্জমার বেড়া ডিঙিয়ে আলোচনা অবশ্য ভারতবর্ষ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবার পরও চলবে। আমি বিভক্ত ইয়োরোপের তুল্য বিভক্ত ভারতের কথা ভাবছি না, বরং রাজনৈতিক ঐক্যে বিধৃত ভারতের সংস্কৃতির কথাই বলছি। এই পরিপ্রেক্ষিতে ভাষাসমস্যা আলোচনা করতে হবে।

অনেকে আবার বলেন যে, ইংরেজীকে তো আমরা উঠিয়ে দিচ্ছি না, অতএব ভয়ের কারণ কী? কিন্তু এখানেই আমাদের দ্বিতীয় বিরাট ভুল। আমরা বলি যে, ইংরেজীকে। আমরা রাখবে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের ভাষা হিসাবে। আজকের রুশ পণ্ডিতও প্রায়ই ইংরেজী জানেন বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্যই; কিন্তু তিনি ইংরেজীতে কথা বলতে পারেন না। আমরা ভুলে যাই যে, একটা ভাষায় বিদেশের বই পড়ে বুঝতে পারা এক জিনিষ; সে ভাষায় নিজের চিন্তা গুছিয়ে প্রকাশ করতে পারা অন্য জিনিস।

সোভিয়েত দেশের সঙ্গে এদেশের তুলনায় একটি কথা বিশেষভাবে বলা প্রয়োজন। সোভিয়েত দেশও বহুভাষার দেশ। কিন্তু তবুও একটা পার্থক্য আছে। ওদেশে রুশ ভাষার সঙ্গে তুলনীয় সমৃদ্ধ ভাষা আর নেই। রুশ ভাষায় শুধু সংখ্যায় বেশী লোকই কথা বলেন না, পুশকিন-ডষ্টয়েভস্কিটলষ্টয়ের ভাষা সাহিত্যিক সম্পদে সোভিয়েত দেশের সকল ভাষার ভিতর অতুলনীয় শ্রেষ্ঠত্বের দাবী করতে পারে। এদেশের অবস্থা ভিন্ন। আমাদের কোনো ভাষাই অন্যান্য সব ভাষার তুলনায় ঐরকম প্রশ্নাতীত শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করতে পারে না; বাঙ্গালী, উর্দুভাষী অথবা অমিল স্বীকার করবেন না যে হিন্দী ভারতের শ্রেষ্ঠ ভাষা। ফলে সোভিয়েত দেশের সমস্ত শিক্ষিত সম্প্রদায়ের কাছে রুশভাষা ঐক্যের বন্ধন হিসাবে যেমন সহজে গ্রহণযোগ্য, এদেশে হিন্দী তেমন নয়। নগরে নগরে সাধারণ মানুষের ভিতর খানিকটা হিন্দী অবশ্য ছড়িয়েছে; সে জন্য সরকারী ফতোয়া বা আইন প্রণয়ন প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু আইনের জোরে এ দেশের উপর হিন্দী চাপাতে গেলে তার পরিণাম কি হতে পারে দক্ষিণ ভারত থেকে তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত আমরা ইতিমধ্যেই পেয়েছি।

উচ্চশিক্ষার সুযোগ যাঁরা পেয়েছেন তাঁদের সঙ্গে জনসাধারণের যোগাযোগের প্রশ্ন কেউ কেউ তুলেছেন। এই যোগাযোগটা হবে নিশ্চয়ই মাতৃভাষার মাধ্যমে। শিক্ষিত সম্প্রদায়ের ভিতর যাঁরা নিজ অঞ্চল ছেড়ে ভারতের ভিন্ন কোনো অংশে স্থায়ীভাবে অথবা দীর্ঘ দিনের জন্য বসবাস করতে চাইবেন তাঁরা ওই অঞ্চলের ভাষা শিখে নেবেন। জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দেশময় সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে হিন্দী শেখাবার প্রয়োজন নেই। কোনো শিক্ষিত বাঙ্গালী অথবা হিন্দীভাষী যদি তামিল চাষীর ভিতর কাজ করতে চান তো তাঁকে সেই চাষীর ভাষাটাই শিখে নিতে হবে; সমস্ত তামিল চাষীকে সেজন্য হিন্দী শেখাবার অর্থ হয় না। স্বাভাবিক গতিতে হিন্দী যতটা ছড়ায় ততটাই ভালো। কিন্তু আমাদের মূল প্রশ্নটা তবু থেকেই যায় উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সারা ভারতে যোগাযোগের ভাষা কি হবে?

একথাটা আজ আমাদের পরিষ্কারভাবে ভেবে দেখবার সময় এসেছে যে, আজ থেকে বিশ বছর পর ইংরেজীকে আমরা এদেশের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের বিভিন্ন অংশের ভিতর জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা সমস্যা আলোচনার মাধ্যম হিসাবে রাখতে চাই কি না? যদি চাই তো কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের ইংরেজী এতোখানি শিখতে হবে যে,তাঁরা শুধু ইংরেজী বই পড়েই বুঝতে পারবেন না, ইংরেজীতে নিজের চিন্তাও পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করতে পারবেন। কথাটা অন্যভাবেও রাখা যায়। হিন্দী যদি অবশ্যপাঠ্য হয়ও তবু প্রশ্ন থেকে যায় যে, ইংরেজী ও হিন্দী দুটোই সামান্য শিখবার পর অহিন্দীভাষী ভারতীয় উচ্চশিক্ষার জন্য কোন্ ভাষাটি ভালো করে শিখবেন? তিনটি ভাষায় উচ্চচিন্তা সুচারুভাবে প্রকাশ। করতে শেখা কঠিন কাজ। কিন্তু দুটি ভাষায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা দুরূহ নয় এবং আমাদের দেশে এটা প্রয়োজন। মাতৃভাষা আমাদের চাই; কিন্তু সেই সঙ্গে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আন্তঃ ভারতীয় যোগাযোগের একটি ভাষাও চাই। সেই ভাষা হবে কোনটি? কোন। দুটি ভাষার যোগাযোগে আমাদের জ্ঞান আহরণের ক্ষমতা যথাসম্ভব বৃদ্ধি পাবে? এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, দুটি ভারতীয় ভাষা উচ্চ পর্যায়ে শেখার চেয়ে একটি ভারতীয় ভাষা। (মাতৃভাষা) ও ইংরেজী ভালো করে শিখলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আমাদের দেশ লাভবান হবে বেশী।

অর্থাৎ, আমাদের উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা এমন হওয়া প্রয়োজন যে, এ দেশের ছাত্রেরা ইংরেজী ও আঞ্চলিক ভাষা উভয়ের মাধ্যমেই শুধু পুস্তক পাঠেই সক্ষম হবেন না, বিদ্বজ্জন সমাজে নিজেকে প্রকাশ করতেও পারবেন। রামমোহন থেকে জগদীশচন্দ্র পর্যন্ত অনেকেই এটা পারতেন; কিন্তু আজ শিক্ষার সুপরিকল্পনা ছাড়া বিশ বছর পর এ আর সম্ভব হবে না। অথচ দেশের ঐক্য ও প্রগতির জন্য এটা আমাদের না হলেই নয়।

গণযুগ ও গণতন্ত্র (১৯)

সকল অধ্যায়
১.
১.০১ গণতন্ত্রের আধ্যাত্মিক ভিত্তি
২.
১.০২ সত্যাসত্য
৩.
১.০৩ গণযুগ ও গণতন্ত্র
৪.
১.০৪ শ্রমিক ও গণতন্ত্র
৫.
১.০৫ সাধারণ নির্বাচন ও গণতন্ত্র
৬.
১.০৬ আটষট্টির সন্ধিক্ষণে
৭.
১.০৭ গণতন্ত্র ও সমাজবিবর্তন
৮.
১.০৮ ব্যক্তি ও গণসমাজ
৯.
১.০৯ সাম্যবাদ ও প্রগতির পথ
১০.
১.১০ জাতীয় সংহতি
১১.
১.১১ জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে
১২.
১.১২ মাতৃভাষা, ইংরেজী ও হিন্দী
১৩.
১.১৩ এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে
১৪.
১.১৪ সীমান্ত চিন্তা
১৫.
১.১৫ বাংলাদেশ দেখে এলাম
১৬.
১.১৬ গণতন্ত্র ও সাম্যবাদের সংকট
১৭.
১.১৭ চীনের ছাত্র আন্দোলন
১৮.
১.১৮ পূর্ব ইউরোপ মার্ক্সবাদ সাম্যবাদ
১৯.
১.১৯ ঐক্য ও শান্তি
২০.
১.২০ ঐক্য নিয়ে আরো কিছু চিন্তাভাবনা
২১.
২.১ খাদ্য ও কৃষি সমস্যা
২২.
২.২ আমরা দেশ গড়বো কবে?
২৩.
২.৩ শ্লোগান বনাম সত্য
২৪.
২.৪ আর্থিক উন্নতির শর্ত
২৫.
২.৫ কর্মসংস্থান ও আর্থিক পুনর্গঠন
২৬.
২.৬ উন্নয়নের তত্ত্ব ও ভবিষ্যৎ
২৭.
৩.০১ বিজ্ঞান ও প্রগতির পথ
২৮.
৩.০২ স্বজন ও সজ্জন
২৯.
৩.০৩ পঞ্চপ্রীতি
৩০.
৩.০৪ ধর্ম, যুক্তিবাদ ও স্বাধীন সমাজ
৩১.
৩.০৫ সনাতন ও আধুনিক
৩২.
৩.০৬ সাংস্কৃতিক বিপ্লব প্রসঙ্গে
৩৩.
৩.০৭ পল্লী ও নগর
৩৪.
৩.০৮ প্রেম ও নিয়ম
৩৫.
৩.০৯ তিন দিগন্ত
৩৬.
৩.১০ যুক্তি ও প্রতিষ্ঠান
৩৭.
৩.১১ আচার বিচার আনন্দ
৩৮.
৩.১২ দ্বন্দ্ব বিদ্বেষ মঙ্গলবোধ
৩৯.
৩.১৩ সমাজ সংগঠনের পথের সন্ধানে
৪০.
৩.১৪ বাংলার সংকট ও কলকাতা
৪১.
৩.১৫ বাংলার নবজাগরণ ও আজকের সংকট
৪২.
৩.১৬ উনিশশতকী বাংলা নবজাগরণের গৌরব ও অপূর্ণতা
৪৩.
৩.১৭ নারী মুক্তি
৪৪.
৩.১৮ দ্বন্দ্ব
৪৫.
৩.১৯ দ্বন্দ্বের রূপভেদ
৪৬.
৩.২০ মধ্যবিত্তের ভবিষ্যৎ
৪৭.
৩.২১ ইতিহাস চিন্তা
৪৮.
৩.২২ ইতিহাস ও দর্শন
৪৯.
৩.২৩ দুর্নীতি
৫০.
৪.১ বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার সমস্যা
৫১.
৪.২ শিক্ষা ও ভাষা সমস্যা
৫২.
৪.৩ রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শ
৫৩.
৪.৪ শিক্ষার সমস্যা – ১
৫৪.
৪.৫ শিক্ষার সমস্যা – ২
৫৫.
৪.৬ শান্তিনিকেতন ও শিক্ষার দ্বন্দ্ব
৫৬.
৫.০১ মার্ক্সের মূল্যায়ন
৫৭.
৫.০২ গান্ধীবাদ কি অচল?
৫৮.
৫.০৩ গান্ধী ও মাও
৫৯.
৫.০৪ গান্ধী ও সংসদীয় গণতন্ত্র
৬০.
৫.০৫ গান্ধী ও ঈশ্বর
৬১.
৫.০৬ গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ
৬২.
৫.০৭ রবীন্দ্রনাথ ও যুক্তিবাদ
৬৩.
৫.০৮ আনন্দের সন্ধানে রাসেল
৬৪.
৫.০৯ রামমোহন রায়
৬৫.
৫.১০ মানবেন্দ্রনাথের চিন্তাধারা প্রসঙ্গে
৬৬.
৫.১১ মানবেন্দ্রনাথ রায় জাতীয়তাবাদ থেকে মার্ক্সবাদ
৬৭.
৫.১২ মানবেন্দ্রনাথ ও নবমানবতাবাদ
৬৮.
৫.১৩ বিনয় কুমার সরকার : দ্বন্দ্ব ও “শক্তিযোগ”
৬৯.
৫.১৪ ভীমরাও রামজী আম্বেডকর
৭০.
৬.১ কানুদা
৭১.
৬.২ অরুণকুমার সরকার
৭২.
৬.৩ এযুগের বুদ্ধদেব
৭৩.
৭.১ মানুষ! মানুষ!!
৭৪.
৭.২ ধর্ম
৭৫.
৭.৩ ধর্ম ও যুক্তি
৭৬.
৭.৪ শিল্পচিন্তা
৭৭.
৭.৫ উত্তরণের শর্ত
৭৮.
৭.৬ প্রেম ও পূজা
৭৯.
৭.৭ হে মহাজীবন! হে মহামরণ!
৮০.
৮.০১ তৃতীয় চরণ (কমলা বক্তৃতা)
৮১.
৮.০২ বর্তমান সংকটে কর্তব্য
৮২.
৮.০৩ বাংলার সংকট ও সমাধানের পথ
৮৩.
৮.০৪ শান্তিনিকেতন : উপাসনা ও ভাষণ
৮৪.
৮.০৫ মূল বইগুলির ভূমিকা ও পরিশিষ্ট
৮৫.
৮.০৬ ভারতে ও চীনে খাদ্যোৎপাদন
৮৬.
৮.০৭ “সাম্যবাদ ও প্রগতির পথ”
৮৭.
৮.০৮ “মার্ক্সের মূল্যায়ন”
৮৮.
৮.০৯ “গান্ধীবাদ কি অচল?”
৮৯.
৮.১০ “মানুষ! মানুষ!!”

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%