অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

হাম্বিরের নাতি লখারানা—লড়াই করতে-করতে তিনি এখন বুড়ো হয়েছেন। আর তাঁর তলোয়ার, সে শত্রুর মাথা কাটতে-কাটতে এমন ভোঁতা হয়ে গেছে যে কেবল মুঠসার একগাছা আখ কাটবারও ধার তাতে নেই। তলোয়ারের ধার না থাকুক লখারানার কিন্তু কথার ধার খুবই ছিল; ঠাট্টায় তামাশায় তাঁর মুখের কাছে দাঁড়ায় কার সাধ্য। বয়সের সঙ্গে রানার মসকরা করবার বাতিক ক্রমেই বেড়ে চলেছিল।
সে একদিনের কথা—শাদা জামাজোড়া, শাদা দোপাট্টা পাকা চুলের উপরে ধবধবে পাগড়ি পরে লখারানা লক্কা পায়রাটি সেজে বসে আছেন। পাহাড়ের উপর শ্বেত পাথরের খোলা ছাদ—আধখানায় চাঁদের আলো পড়েছে, আর আধখানায় কেল্লার উঁচু পাঁচিলের কালো ছায়া বিছিয়ে গিয়েছে; রানার চারিদিকে সভাসদ পারিষদ, সকলের হাতে এক-এক খোরা সিদ্ধি। এখনি জলসা শুরু হবে—চাকরেরা বড়-বড় থালায় ফুলের মালা, পানের দোনা এনে রেখেছে, গোলাপ আর আতরের গন্ধ, ছাদের এক কোণে একদল নাচনী সোনার ঘুঙুর এ-ওর পায়ে জড়িয়ে দিচ্ছে। এমন সময় রাজকুমার চণ্ডের সঙ্গে মাড়োয়ারের রাজকুমারীর বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে রণমল্লের দূত এসে উপস্থিত—রুপোর পাতে মোড়া একটি নারকেল হাতে। মাড়োয়ারের দূত বেশ একটু মোটা; তার উপর এগারোগজি থানের প্রকাণ্ড একটা পাগড়ি বেঁধেছেন আর তাঁর আগে-আগে পেটটি এগিয়ে চলেছে। দূতকে দেখে লখারানা অনেক কষ্টে হাসি চাপলেন কিন্তু এই মানুষ-লাটিমকে নিয়ে একটু মসকরা করবার লোভ তিনি আর কিছুতেই সামলাতে পারলেন না।
রানা দূতের হাত থেকে রুপোয় মোড়া নারকেলটি নিজেই নিয়ে বলছেন, “বা, বেশ তো, এটা বুঝি তোমার রাজা এই বুড়ো বয়সে আমার খেলার জন্যে পাঠিয়েছেন?”
দূতের বলা উচিত ছিল—আজ্ঞে না, এটি রাজকুমার চণ্ডের জন্যে, কেননা তাঁরই সঙ্গে আমাদের রাজকুমারীর বিয়ের কথা নিয়ে এসেছি, আপনার মতো পাকা দাড়ির খেলার জিনিস এটি নয়—কিন্তু রানার ভাবগতিক দেখে দূতের মুখে আর কথা সরছে না। এদিকে সভাসুদ্ধ মুখ টিপে হাসছে, ওদিকে লজ্জায় রাজকুমার চণ্ডের মুখ রাঙা হয়ে উঠেছে। দূত তখন বিষম সমস্যায় পড়ে বলছেন, “মহারানা, বড় সুখের কথা যে আপনি নিজেই আমাদের রাজকুমারীকে চাইলেন, আমাদের দেশের রাজা গরীব, তাঁর এতদূর সাহস কেমন করে হবে যে বিয়ের সম্বন্ধ করে মহারানাকে নারকেল পাঠাবেন? তিনি চেয়েছিলেন রাজকুমারকে জামাই করতে, কিন্তু কি আশ্চর্য তিনি স্বপ্নেও যা আশা করেননি তাই ঘটল! মহারানার যদি হুকুম হয় তবে আমি আমার রাজাকে গিয়ে এই সুখের খবর এখন পাঠিয়ে দিই”—বলেই দূত উঠতে যান—রানা তখন কি জবাব দেন, তাড়াতাড়ি দূতের হাত ধরে বললেন, “বোসো, আমি তামাশা করছিলাম, ডাক কুমার বাহাদুরকে—” কুমার তখন সভা ছেড়ে উঠে গেছেন। রানার দূত চণ্ডের কাছে ছুটল কিন্তু চণ্ড বলে পাঠালেন—মহারানা তামাশা করেও যে রাজকুমারীকে বিয়ে করতে চেয়েছেন তিনি আজ থেকে আমার মায়ের তুল্য, আমি কিছুতেই তাঁকে বিয়ে করব না।
বুড়ো রানা বড়ই বিপদে পড়লেন! কি আশ্চর্য, ছেলেটা তামাশা বোঝে না! লোকের পর লোক রাজকুমারকে বোঝাতে ছুটুল কিন্তু চণ্ডের প্রতিজ্ঞা অটল। রানা নিজের কথার ফাঁদে নিজেই বাঁধা পড়লেন। এবারের তামাশা যে জাদুকরের আমগাছের মতো দেখতে-দেখতে এমন সত্যি হয়ে উঠবে এটা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি; বিয়ে করতে দুঃখ নেই কিন্তু তামাশাটা যে দূতকে ছেড়ে উল্টে তাঁকে নিয়েই শুরু হল এইটেতেই তাঁর আপত্তি।
অনেক বোঝানোর পরেও যখন চণ্ড বিয়ে করতে রাজী হলেন না, তখন রাগে বুড়ো রানা পাকা দাড়িতে মোচড় দিয়ে বললেন, “দেখ চণ্ড, তোমার প্রতিজ্ঞা তুমি রাখ; কিন্তু আমিও প্রতিজ্ঞা করলেম, এবার আমার যে ছেলে হবে তাকেই আমি সিংহাসন দেব, সে-ই হবে রানা, আর তোমাকে তার একজন সামন্ত হয়ে থাকতে হবে।” চণ্ড একলিঙ্গ মহাদেবের নামে শপথ করে বললেন, “তাই হবে!” সভাসুদ্ধ লোক চুপ হয়ে রইল। মাড়োয়ারের দূত রানার বিয়ের হুকুম নিয়ে বিদায় হল।
বুড়ো বয়সে বর সেজে যে তামাশা দেখাতে হল সেটা লখারানার বড়ই বাজল; তিনি চণ্ডকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারলেন না। বিয়ের দু বছর পরে দু মাসের ছেলে মকুলকে মেবারের সিংহাসনে বসিয়ে তিনি এক কম্বল এক লোটা নিয়ে তীর্থ করতে বেরিয়ে গেলেন—কবে কোনখানে জীবনের বিষম তামাশার থেকে তাঁর নিষ্কৃতি হল তা জানা গেল না।
মকুল তখন ভারি ছোট, নেহাত কচি—কাজেই রাজার যা কিছু কাজ সবই চণ্ডকে করতে হয়, রাজা না হয়েও তিনি রাজা। দেশের লোকের মুখে চণ্ডের সুখ্যাতি আর ধরে না। চণ্ডকে তারা যেমন ভয় করে তেমনি ভক্তিও করে, ভালোওবাসে, এটা কিন্তু মকুলের মায়ের আর যত মাড়োয়ারী মামার দলের প্রাণে সয় না। চণ্ড কাউকে কিছু বলেন না—কিন্তু বোঝেন তাঁর আর বেশি দিন এ রাজ্যে থাকা চলবে না। এই যে রাজবাড়ি, যেখানে চণ্ড মায়ের কোলে মানুষ হয়েছেন, বাপের আদরে বেড়ে উঠেছেন, এখানে তাঁর আপনার বলতে আজ কে আছে? পুরনো চাকর যারা ছিল মহারানী তাদের তাড়িয়ে নিজের দেশ থেকে যত মাড়োয়ারী এনে কাজে রেখেছেন। তাঁর নিজের যে মহল সেখানে রানীর ভাইরা এসে ঢুকছেন, তাঁর যে সোনা-রুপোর খাট-বিছানা আসবাবপত্র সবই এখন মকুলের, রাজবাড়িতে নিজের বলতে রয়েছে একমাত্র তাঁর তলোয়ার! কিন্তু মকুল—সেই অফুটন্ত ফুলের মতো কচি মকুল, তাঁর চেয়ে পঁচিশ বছরের ছোট মকুল, সেই হাসি মুখ ছোট ভাই মকুল—যে এখনো চলতে শেখেনি, বলতে শেখেনি, সে কি তাঁর আপনার নয়? সকালে সন্ধ্যায় রাজসভাতে নিয়ে যাবার সময় সে যখন তার ছোট দুটি হাত দিয়ে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে, তখন কি আর চণ্ডের কোনো দুঃখ মনে থাকে? চণ্ড কত বার মনে করেছেন চলে যাই, কিন্তু এই ছোট ভায়ের ছোট হাতের বাঁধন—তাঁর সব দুঃখের উপরে কচি দুখানি হাতের পরশ—একে ছেড়ে যাওয়া, একে কাটিয়ে বেরিয়ে পড়া চণ্ডের আর হয়ে ওঠে না! তিনি বছরের পর বছর সব দুঃখ সয়ে এই ছোট ভাই মকুলকে একদিন মেবারের রাজসিংহাসনে বসাবার মতো উপযুক্ত করে, মানুষ করে তুলতে লাগলেন। দারুণ গরমের দিনে সকাল-সকাল সভা ভঙ্গ করে মকুলকে নিয়ে চণ্ড খোলা ময়দানে গোলা খেলা করতে যান, চণ্ড চড়েন এক ঘোড়ায় আর এক টাট্টুতে মকুল—মাথার উপরে রোদ ঝাঁ-ঝাঁ করছে, কোথাও একটু ছায়া নেই, এরি মাঝে দুই ভায়ের ঘোড়া বিদ্যুতের মতো গোলার পিছনে-পিছনে ছুটে-ছুটে চলেছে—মুখে চোখে আগুনের মতো বাতাস লাগছে, দুই ভায়ের মুখ রক্তের মতো রাঙা হয়ে উঠেছে সূর্যের তাপে। আবার হয়তো কোনো দিন ঘোরতর মেঘ করে ঝুপ-ঝুপ বৃষ্টি নেমেছে—চণ্ড চলেছেন মকুলকে নিয়ে শিকারে—কাদা ভাঙতে ভাঙতে, জলে ভিজতে ভিজতে, থৈ-থৈ করছে নদীর জল, সাঁতার দিয়ে তা পেরিয়ে, বাড়ি থেকে অনেক দূরে গ্রাম ছাড়িয়ে অনেকখানি জঙ্গল আর জলার মাঝে। শীতের দিনে তাঁদের খেলা পাহাড়ে-পাহাড়ে, সেখানে বরফের মতো বাতাস ধারাল ছুরির মতো বুকে এসে লাগে। এমনি করে মকুল মানুষ হচ্ছেন, দিন-দিন শক্ত হচ্ছেন, তাঁর খাওয়া পরা খেলাধূলা রাজার ছেলে বলে কিছু যে আরামের ছিল তা নয়—চণ্ড মেবারের একজন সামান্য রাজপুতের ছেলের সঙ্গে যে একদিন মেবারের সর্বময় কর্তা হবে তার কোনো বিষয়ে কিছু তফাৎ রাখলেন না, এমনি করে লখারানা চণ্ডকে মানুষ করেছিলেন, আর ঠিক তেমনি করে চণ্ড তাঁর ছোট ভাইকে সিংহাসনের উপযুক্ত হবার, আপদে-বিপদে দুঃখে-কষ্টে বীরের মতো নির্ভয়ে থাকবার জন্যে ছোটবেলা থেকেই তৈরি করছেন। এটা কিন্তু মকুলের মায়ের ভালো লাগে না; তিনি চান গরমে মকুল পাখার বাতাসে, বাদলে ছাতার তলায়, শীতে লেপ-তোষকের মধ্যে থেকে মোমের পুতুলটির মতো গোলগাল মোটাসোটা হয়ে উঠুক! এর জন্য মকুলকে আর কখনো কখনো চণ্ডকেও মহারানীর কাছে গঞ্জনা সইতে হয়। মকুল সে ছেলে মানুষ, মায়ের ধমকে কখনো রাগ করে, কখনো খানিক কাঁদে আবার একটু পরেই সব ভুলে যায়—চণ্ডের প্রাণে কিন্তু রানীর বাক্যবাণ তীরের মতো গিয়ে বাজে।

এক-একদিন তিনি আপনার খুব প্রাণের যাঁরা বন্ধু বুড়ো-বুড়ো সর্দাদর তাঁদের কাছে বলেন—“আর না, এখানে আর থাকা চলে না। সবাই বলে আমি আমার ভাইকে বশ করে নিয়ে নিজে রাজাগিরি করছি; সে যখন আমার হুকুমে ওঠে-বসে, তখন আমিই হলেম সত্যি রাজা আর সে একটা সাক্ষিগোপাল—নামে মাত্র মেবারের রাজা। আপনারা আমায় ছুটি দিন, আমি অন্য রাজ্যে গিয়ে থাকি!” বুড়ো সর্দারেরা বলেন, “এখনো সময় হয়নি, যুবরাজ, আরো কিছু দিন থাক, মকুল আর একটু উপযুক্ত হয়ে উঠুক।”
চণ্ড চান কোনো সর্দারের হাতে মকুলকে মানুষ করবার ভার দিয়ে বেরিয়ে পড়েন কিন্তু কোনো সর্দার সে ভার নিতে চাইলে তবে তো! তাঁরা কেবলই বলেন—আমরা মকুলের জন্য সব করতে প্রস্তুত কিন্তু যুবরাজ, তবু আমরা পর মাত্র, আপনি তার ভাই। চণ্ড আর কোনো জবাব দিতে পারেন না। বাপ থাকলে কেউ তো চণ্ডকে মকুলের জন্য কষ্ট নিতে বলত না; কিন্তু এখন ভাই যদি তাকে না দেখে তবে মকুলকে রাজা হবার মতো শিক্ষা-দিক্ষা দিয়ে মানুষ করে তোলে কে?
এমনি করে দিন কাটছে, ইতিমধ্যে একদিন—কাল বৈশাখের রাত দুপুরে অন্ধকার দিয়ে বড়-বড় শাদা মেঘ একখানার পর একখানা আস্তে-আস্তে পুব থেকে পশ্চিমে চলেছে, মনে হচ্ছে যেন বড়-বড় পাল তুলে আকাশের এপার থেকে ওপারে, অন্ধকারে পাড়ি দিচ্ছে একটির পর একটি নৌকা! একটি তারা নেই, একটু শব্দ নেই। চণ্ড সারাদিনের কাজ সেরে সেই দিকে চেয়ে আছেন ঘরের আলো নিবিয়ে একলাটি, রাজবাড়ির সবাই ঘুমিয়ে, কেবল চণ্ড জেগে একা। আজ চণ্ডের বুকের ভিতরে একটা বেদনা থেকে-থেকে দুই পাঁজরের হাড়গুলো মোচড় দিয়ে-দিয়ে যেন ভাঙতে চেষ্টা করছে! ব্যথা যে কিসের, বেদনা যে কতটা, চণ্ড তা বুঝতে পারছেন না; তাঁর কেবলি মনে হচ্ছে মকুলকে একবার কাছে ডাকি কিন্তু উঠতেও পারছেন না, ডাকতেও পারছেন না। অন্ধকারের মধ্যে একলাটি চুপ করে পড়ে রয়েছেন। চণ্ডের দেহ-মন সমস্ত অসাড় হয়ে মরে গেছে, কেবল তাঁর চোখ যেন জীবনের সব আলোটুকু টেনে নিয়ে প্রহরের পর প্রহর বর্ষা রাতের অন্ধকারে কি যেন সন্ধান করে ফিরছে! একটা ঝড় অনেকখানি ঠাণ্ডা হাওয়ার ধাক্কায় গাছপালা ঘরবাড়ি জলস্থল আকাশ দুলিয়ে চলে গেল, অনেকখানি বৃষ্টির জল ঝরঝর করে চারিদিকে ঝরে পড়ল, বিদ্যুৎ বাজ খানিক চমক দিয়ে ধমক দিয়ে চলে গেল; তারপরে মেঘ আস্তে-আস্তে পাতলা হয়ে এল, রাত্রি শেষের সঙ্গে রুপোর মতো শাদা আলো ছেঁড়া-ছেঁড়া মেঘের ফাঁক দিয়ে এসে অন্ধকারকে ক্রমে ফিকে করে ভোরের একটি ছোট পাখির গানের সঙ্গে-সঙ্গে ক্রমেই ফুটে উঠতে লাগল; ঠিক সেই সময় বাদলা দিনের সকাল বেলায় ফুটন্ত কচি আলোর মাঝখানে একখানি জলে ভরা মেঘ! চণ্ড দেখছেন, সে কিবা চোখ জুড়োনো শান্ত রূপ—যেন তাঁর মা! চণ্ড সেই মেঘের দিক থেকে আর চোখ ফেরাতে পারছেন না, সারারাত্রি অন্ধকারের মধ্যে তাঁর দুই চোখ যে এরই সন্ধানে, তাঁর মরা মায়ের সন্ধানে ফিরছিল, এতক্ষণে দেখা পেলেন; তাঁর বুকের বেদনা, টানা-তার ছেড়ে দিলে যেমন, তেমনি কাঁপতে-কাঁপতে একেবারে শান্ত হয়ে গেল। সেই সারারাতে বাদল দিয়ে ধোয়া মেঘ, সেই মায়ের চোখের জলে জলভরা সেই সকালের মেঘ, তারই দিকে চেয়ে চণ্ড ঘুমিয়ে পড়লেন।
এদিকে বেলা হয়েছে। রাজসভায় যাবার ঘণ্টা পড়েছে—মহারানী মকুলকে সাজগোজ করিয়ে বসে রয়েছেন এমন সময় মকুলের দাই এসে বললে, “রানীমা, আজ সভা বসবে না; বড়কুমার চণ্ডের শরীর খারাপ হয়েছে।” সেখানে মহারানীর বাপ রণমল্ল বসেছিলেন; তিনি বলে উঠলেন, “কেন, বড়কুমার নইলে রাজসভা বন্ধ থাকবে, রানা মকুল কি কেউ নয়?” দাই সে অনেকদিনের, চণ্ডকেও সে মানুষ করেছে—রণমল্লের কথায় কি একটা জবাব দিতে যাচ্ছিল, রানী তাকে ধমকে বললেন, “যা, তোর তকরার করতে হবে না; বাবা এখুনি মকুলকে নিয়ে সভায় যাচ্ছেন; তুই সর্দারদের বসতে বলগে যা!”
মেবারের সিংহাসনে সেই দিন সূর্যবংশের কেউ না বসে, বসল কিনা পেটমোটা মাড়োয়ারী রণমল্ল নাতি মকুলকে কোলে নিয়ে! লজ্জায় সর্দারদের মুখ লাল হয়ে উঠল! সেই সময় চণ্ড হঠাৎ ঘুমের থেকে চমকে উঠে চেয়ে দেখলেন আকাশে গ্রহণ লেগেছে, সূর্য একখানা কলঙ্ক-ধরা তামার থালার মতো দেখা যাচ্ছে, আর সেই বুড়ি দাই তাঁর পায়ের তলায় বসে দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছে।
সেদিন সভাভঙ্গের পর বর্ষাকালের আকাশের মতো মুখ আঁধার করে রাজপুত সর্দারেরা যখন চণ্ডের কাছে এসে উপস্থিত, তখন চণ্ড তাঁদের হাত ধরে অনুরোধ করে বললেন, “দেখুন, মহারানীমা-র ইচ্ছা নয় যে আমি আর মেবারের কোনো রাজকার্য চালাই, কাল রাত্রে একথা মহারানীমা নিজের মুখে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, আজ সকালে তাঁরই হুকুমে মাড়োয়ারের রাজা রণমল্ল মকুলের দেখাশোনার ভার নিয়েছেন, এখন থেকে রাজ্যের কাজ তিনিই চালাবেন, আমার এখন ছুটি; মায়ের আদেশ আজ সকালে আমার কাছে পৌঁচেছে, মকুলকে আর এই বাপ্পার সিংহাসন আপনাদের জিম্মায় রেখে আমি এখনি বিদায় হব, আমার ঘোড়া প্রস্তুত।”
বুকের ভিতর কি বেদনা নিয়ে চণ্ড যে সারারাত কাটিয়েছেন তা আর কারো বুঝতে বাকি রইল না, তাঁরা কোনো কথা না কয়ে চণ্ডকে প্রণাম করে বিদায় হলেন।
চণ্ড তখন তাঁর দাই-মাকে কাছে ডেকে চুপি-চুপি বললেন, “মকুলের যাতে ভালো হয়, তার কোনো বিপদ না ঘটে দেখবে; আমার ছোট ভাই রঘুদেও কৈলোরে আছে, আমি তার সঙ্গে দেখা করে মাণ্ডুর রাজার কাছে চললেম। মহারানীকে বলবে যদি কোনো দিন কোনো বিপদ আসে, রাজ্যে যদি কোনো গোলমাল হয় তবে আমি কাছেই রইলেম, আমাকে ডেকে পাঠালেই আবার আসব, আমার তলোয়ার মকুলের শত্রুর জন্যে আর মেবারের জন্যে আমার প্রাণ। দাই-মা, এরা কি যাবার আগে মকুলকে একবার দেখতে দেবে না।”
দাই ঘাড় নেড়ে চোখে আঁচল দিয়ে কাঁদতে লাগল; চণ্ড বুঝলেন ছোট ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার কোনো উপায় নেই; তিনি একটি কথা না কয়ে যেমন সাজে ছিলেন তেমনি, কেবল তলোয়ারখানা কোমরে বেঁধে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে ঘোড়া ছুটিয়ে বেরিয়ে গেলেন—তখন মাথার উপরে দুপুরের রোদ ঝাঁ-ঝাঁ করছে। মকুল যখন শিকার খেলতে যাবার সময় তার দাদাকে খুঁজতে লাগল, তখন রানী বললেন, “তোর দাদাকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে, সে আর আসবে না।”
সারাদিন মকুলের চোখ ছল-ছল করতে লাগল, সে শূন্য রাজপুরীতে কোথাও তার দাদাকে খুঁজে পেল না। রাত্রে যখন সবাই শুয়েছে তখন মকুল তার দাই-মা’র গলা জড়িয়ে বললে, “যে বাঘ দাদাকে মেরেছে তাকে আমি বড় হয়ে নিশ্চয় মারব; তলোয়ারের এক চোটে তার মাথাটা কেটে এনে তোমায় দেব, কেমন?”
দাই বললে, “রানাসাহেব, আমি সেই বাঘটা ধরবার একটা দড়ির শক্ত ফাঁদ কালই বানিয়ে রাখছি—বাঘটাকে কিছুতেই পালাতে দেওয়া হবে না।”
মকুল খানিক চুপ করে বললে, “দাই-মা, বাঘটা দেখতে কেমন? আমি তো বাঘ দেখিনি, তাকে চিনতে পারব তো?”
“ঠিক চিনতে পারবে, নয়তো আমি চিনিয়ে দেব। তোমার ওই মাড়োয়ারী দাদামশায়ের মতো তার পেটটা মোটা আর ঠিক এমনি খোঁচা-খোঁচা দাড়ি-গোঁফও আছে।”
তার পরদিন সকালে যখন দাই মকুলকে সাজ পরিয়ে রাজসভায় তার বুড়ো দাদার কাছে দিতে গেল তখন রণমল্ল পাকা গোঁফে চাড়া দিয়ে চোখ পাকিয়ে তার দিকে চেয়ে বললেন, “দাই, বাঘ ধরবার ফাঁদ তৈরি করতে সময় লাগবে, সেজন্যে আজ থেকে তোমায় ছুটি দিলেম। আমার দেশের এক ভালো দাই সে-ই রানীর কাজ করবে, তুমি বসে-বসে ফাঁদ বাঁধো গিয়ে জঙ্গলে।” দাই “যো হুকুম” বলে খুব একটা বড় সেলাম রণমল্লকে দিয়ে মকুলকে বললে, “রানাসাহেব, বাঘটাকে চিনে রেখ—ঠিক তোমার বুড়ো দাদার মতো গোঁফ-দাড়ি, ওমনি মোটা পেট আর বড়ো-বড়ো দাঁত।” সভাসুদ্ধ লোক মুখ টিপে হাসতে লাগল। মকুল দুই চোখে একটা ভয় নিয়ে রণমল্লের দিকে চেয়ে এক দৌড়ে দাইয়ের কোলে গিয়ে উঠল।
দাই তার মুখে চুমু খেয়ে বললে, “বেটা ডরো মাৎ, সেরকো দেখ ভাগনা কভি নেহি, মার তলোয়ার কী চোট, কাট্ লে শির্।” সভাসুদ্ধ লোকের মুখে হাসি চাপা থাকে না দেখে রণমল্ল কথাটা চাপা দেবার জন্যে তাড়াতাড়ি একটা কাষ্ঠ হাসি হেসে দাইয়ের পিঠ চাপড়ে তার হাতে এক জোড়া সোনার বালা দিয়ে বললেন, “ভালো-ভালো, আমি খুব খুশি হলেম, এমনি করে মকুলকে সাহস দিয়ে এখন থেকে বাঘ শিকারে মজবুৎ করে তোল; আজ থেকে তোমার তলব আরো দশ-তন্খা বাড়িয়ে দেওয়া গেল, মকুলজী বড় হওয়া পর্যন্ত তুমিই তার তদারক করবে।” সভাসুদ্ধ লোক বুঝলে রণমল্লকে যদি কেউ জব্দ করতে পারে তবে সে দাই, আর রাজবাড়িতে তার মতো মকুলের বন্ধুও আর কেউ নেই। মেবারের সমস্ত রাজপুত সর্দার, যাঁরা রানীর খাতিরে রণমল্লকে ভয় করে একটি কথা কইতেন না, তাঁরা আজ এই দাইকে মনে-মনে তার সাহসের জন্যে তারিফ না করে থাকতে পারলেন না! রণমল্ল সেদিন মাথা হেঁট করে রাজসভা থেকে বিদায় হলেন।
চণ্ডের ছোট ভাই রঘুবীর, কিন্তু মেবারের সবাই তাঁকে নাম দিয়েছিল রঘুদেব—রূপে গুণে তিনি ছিলেন বাস্তবিকই দেবতার মতো। নগরের বাইরে রাজ্যের গোলমাল থেকে অনেক দূরে একখানি সুন্দর বাগানঘেরা ছোটখাটো পাথরের বাড়ি, তারই মধ্যে রঘুদেব একলা রাজার ছেলে হয়ে তপস্বীর মতো দীন দুঃখী কাঙাল নিয়ে থাকতেন। তাঁর মুখের কথা—সে যেন ছোট-বড় সবার মন গলিয়ে গানের মতো গিয়ে প্রাণে বাজতো। রাজ্যে তাঁর শত্রু ছিল না—এমন কি যে মহারানী চণ্ডকে বিষ-দৃষ্টিতে দেখতেন তিনিও রঘুদেবকে গুরুর মতো ভক্তি, ভায়ের মতো ভালোবাসা দিয়েছিলেন।
আর মকুল—সে ছোড়দাদার মুখের গল্প, তাঁর সেই বাগানের ফল পেড়ে বনভোজন, গাছের পাখিদের বাসার খুব কাছে গিয়ে তাদের ছোট-ছোট ছানাগুলিকে খাইয়ে আসা, গাছের ছায়ায় বসে বাঁশের বাঁশিতে রাখাল ছেলেদের কাছ থেকে গান শেখা, এই সব আনন্দের কথা কখনো ভুলবে না।
চণ্ড গিয়ে অবধি সে তার ছোড়দার কাছে যাবার জন্যে রোজ কাঁদছে, রানীর ইচ্ছে তাকে কিছুদিনের জন্যে সেখানে পাঠিয়ে দেন কিন্তু রণমল্ল কেবলই বাধা দিচ্ছেন। রানী একবার রঘুদেবকে রাজবাড়িতেই না হয় আনবার কথা বললেন কিন্তু তাতেও আপত্তি! শেষে একদিন রণমল্ল স্পষ্টই বলে দিলেন যে, তাঁর হুকুম ছাড়া রঘুদেবের সঙ্গে দেখা কিংবা তাঁকে এখানে আনানো হতে পারবে না—রানীর সেইদিন চোখ ফুটল; তিনি বুঝলেন, রাজ্যের কাজে তাঁর আর কোনো হাত নেই, এই পাথরের রাজবাড়ির চারখানা দেয়ালের মধ্যে তিনি আর মকুল দুজনকে বন্দীর মতো থাকতে হবে।
ইতিমধ্যে হঠাৎ একদিন খবর এলো রঘুদেব মকুলকে দেখতে নগরে আসছিলেন, হঠাৎ মারা পড়েছেন; দেশের লোক হাহাকার করে বলছে রণমল্ল তাঁকে বিষ দিয়ে খুন করেছে, সমস্ত মেবার তার মূর্তি ঘরে-ঘরে রেখে পুজো করছে আর মাড়োয়ারী শেয়ালরাজা আর তার দলবলকে খুনে, বদমাস, চোর বলে অভিসম্পাত দিচ্ছে। বুড়ি দাই রানীকে এসে বললে, “এখনও যদি ভালো চাও তো চণ্ডজীকে খবর পাঠাও, না হলে তোমার মকুলের দশা কোন দিন রঘুদেওজীর মতো হবে।”
কিন্তু খবর তাঁকে দেয় কে? যে চিঠি বইবে সে রণমল্লের লোক, আপনার লোক দিয়ে সে রাজ্যটা ভরিয়ে রেখেছে; তার চর রানীর অন্দরে ঘুরছে, তার অনুচর সর্দারদের বাসায়-বাসায়, গ্রামে-গ্রামে, প্রজাদের ঘরে-ঘরে, পাঠশালায়, মন্দিরে, মঠে! কে কোথায় কি করছে, কি বলছে, সব খবর পাচ্ছে সেই পেটমোটা মাড়োয়ারী রাজা রণমল্ল ডাকাতদের সর্দার, চোরের শিরোমণি। নগরের ফাটকে-ফাটকে কেল্লার বুরুজে-বুরুজে তার চেলারা সব থানা বসিয়ে পাহারা দিচ্ছে দিন-রাত। রাগে ভয়ে দুঃখে রানী অস্থির হয়ে পড়লেন, চারিদিক অন্ধকার দেখতে লাগলেন, চণ্ডকে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দিয়ে তিনি কি ভুলই করেছেন, আজ সেটা হাড়ে-হাড়ে বুঝতে তাঁর বাকি রইল না। রানী বুড়ি দাই-এর দুই পা জড়িয়ে কাঁদতে-কাঁদতে বললেন, “হায়, আমার কি হবে?” যে রানী একদিন তাকে দূর-দূর করে তাড়িয়েছিলেন আজ তাঁকে পা জড়িয়ে কাঁদতে দেখে বুড়ির চোখে জল এল। সে রানীকে শান্ত করে বললে, “আমি খবর পাঠাবার ব্যবস্থা করছি; কিন্তু রানীমা, তুমি খুব সাবধানে কাজ করবে যেন আমাদের মনের কথা কেউ না জানতে পারে। তোমার বাপ শুনতে পেলে বড় বিপদ হবে, তার মুঠোর ভিতর এখন সমস্ত রাজ্য, সে যদি গলা টিপে তোমার মকুলকে মেরে ফেলে, তবে ভয়ে কেউ একটি কথাও বলবে না।”
রানীর সঙ্গে কথা ঠিক করে দাই যেখানে বুড়ো রণমল্লটা সন্ধ্যেবেলা একটা ঘরে নিজের মতো মোটা একটা গের্দা ঠেস দিয়ে একরাশ মোহর গুনে-গুনে চটের থলিতে ভরে-ভরে রাখছেন ঠিক বড়বাজারের মাড়োয়ারী এক-একটা মহাজনের মতো, সেইখানে আস্তে-আস্তে এসে উপস্থিত হল। দাইকে হঠাৎ আসতে দেখে বুড়ো মোহরগুলো দুই থাবায় কোলের কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “তবে—তবে অসময়ে কি মনে করে?”
“আজ্ঞে, একটু সামান্য কাজ ছিল, যদি এখন ব্যস্ত থাকেন তো পরে আসব।”
রণমল্ল দাইকে ভয় করতেন, ঠিক দপ্তরখানার দপ্তরি যেমন তার মনিবকে ভয় করে। রাজ্যের সবাই রণমল্লের ভয়ে সারা কিন্তু রণমল্ল কাঁপেন দাইয়ের ভয়ে; তাই তিনি তাড়াতাড়ি দাইকে বললেন, “না, না, আগে তোমার কাজটাই সেরে নিই।”
দাই তখন বললে, “আজ্ঞে মকুলজীর একটু ফরমাস আছে, তাঁর কবুতর পালবার শখ হয়েছে, তাই হুজুরের কাছে দরবার করতে এসেছি!”
“মকুলজী পায়রা ওড়াবেন” বলেই বুড়ো হোঃ-হোঃ করে খানিক হেসে বললেন—“তা ভালো, এসব শখ ভালো—পায়রা ওড়ান, ছাগল পালুন এতে আমার আপত্তি নেই; ঘোড়া চড়া, তলোয়ার খেলা এগুলো ছাড়লেই বাঁচি, রাজার ছেলে ও-সব কেন? খান-দান ঘুড়ি ওড়ান, সুখে থাকুন আর”—দাই বলে উঠল—“আর রাজার ছেলের দাদামশায় বুড়ো মাড়োয়ারী সিংহাসনে বসে কেবল মোহরের তোড়া বাঁধুন?”
“ঠিক বলেছ দাই, আমি তোমার উপর খুশি আছি; মকুলকে তুমি এরকম পায়রা আর ঘুড়ি দিয়ে ভুলিয়ে রাখ আর দুটো বছর, তারপর দেখা যাবে সিংহাসন আমার কাছ থেকে কেমন করে এরা কেড়ে নেয়! এই নাও”—বলেই একটা মোহর বুড়ো অনেক কষ্টে থলি থেকে বের করে দাইয়ের হাতে দিতে গেলেন।
দাই হাত জোড় করে বললে, “আপনার মোহর আপনার কাছেই থাক, মকুলজীর কবুতর কেনবার পয়সার অভাব নেই।”
“হ্যাঁ, তা কি আর আমি জানিনে! তার মায়ের হাতে অনেক টাকা আছে, তা যাও তোমরাই তবে কবুতর জোড়ার দাম দিও। প্রজাদের খাজনা অনেক বাকি পড়েছে, এখন আমার হাতে একটি পয়সাও নেই”—বলেই বুড়ো আবার টাকা গুনতে লাগলেন। দাই একটা মস্ত সেলাম করে সেখান থেকে চলে গেল।
কেল্লার ছাদের এক কোণে পাথরের একটা টানা বারাণ্ডার কার্নিস খানিক ছায়া ফেলেছে, তারই তলায় একটি বাঁশের খাঁচায় দুটি পায়রা সকাল বেলার দিকে চেয়ে গলা ফুলিয়ে চুপটি করে বসে আছে, এখনি মকুল এসে খাঁচাটি খুলে আকাশের আলোর মাঝে তাদের ছেড়ে দেবে এই আনন্দে তাদের শাদা রঙের ডানা দুখানি থেকে-থেকে উল্সে উঠছে। এমন সময় মহারানীর সঙ্গে দাই এসে পায়রা দুটির ডানার নিচে দুখানি ছোট চিঠি বেঁধে দিয়ে আস্তে-আস্তে আবার খাঁচার দরজা বন্ধ করে চলে গেল।
তখনো সূর্যের আলো পৃথিবীতে এসে পড়েনি, রাজকুমার মকুল নরম বালিসের উপরে মাথাটি রেখে একটি হাত পুবের জানালার দিকে ছড়িয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে আছে মুঠোয় এক টুকরো কাগজ ধরে। রানী এসে তার ঘুম ভাঙিয়ে কোলে করে দাইয়ের কাছে দিয়ে বললেন, “তুই এখনো ঘুমচ্ছিস? বেলা হয়েছে, কখন আর তোর দাদার কাছে পায়রার গলায় বেঁধে চিঠি পাঠাবি?” মকুল কোনো কথা না বলে দাইকে টানতে-টানতে এক ছুটে ছাদে এসে উপস্থিত হল। দাই হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, “কই, মকুলজী তুমি যে বলেছিলে চিঠ্ঠি লিখে রাখবে, তা কই?” মকুল হাতের মুঠো খুলে দেখালে সেই হিজিবিজি লেখা কাগজখানি। দাই কাগজটি এপিঠ-ওপিঠ উল্টে-পাল্টে বললে, “বহুৎ আচ্ছা, চিঠ্ঠি পড় তো শুনি কুমার সাহেব, কি লিখেছ।” মকুল জানত কেমন করে চিঠি পড়তে হয়, তাই সে গম্ভীর হয়ে আরম্ভ করল:
দাদা, আমি তোমার ছোট ভাই, তোমার জন্য কাঁদছি, একবার এস, খুব খেলা হবে; কবুতর দুটো চিঠি নিয়ে যাচ্ছে জবাব দিও। এদের ছানা হলে তোমায় একটা দেব। আমি খুব ভালো আছি। ইতি—
মকুল
তোমার ছোট ভাই
পুঃ—মা আর দাই তোমার জন্য খালি কাঁদে।
“চিঠি যেমন হতে হয়”—বলে দাই কাগজখানা নিয়ে বেশ করে মুড়ে বললে, “তবে এখন কোন দাদাকে চিঠিখানা পাঠাতে চাও বল।” এইবার মকুল মুশকিলে পড়ল, বড়দাদা আর ছোটদাদা দুই দাদার মধ্যে বেছে নেওয়া তার পক্ষে শক্ত হল, দুইজনকেই সে সমান ভালোবাসে, দুইজনকেই সে চিঠি লিখে ডেকে পাঠাতে চায়; কিন্তু হায়, চিঠি তার একখানি বৈ নেই! ভাবনায় তার মুখ শুকিয়ে গেল, তখন রানী আস্তে আস্তে তাকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “এক কাজ কর, আধখানা চিঠি বড়দাদাকে, আর আধখানা ছোড়দাদাকে পাঠিয়ে দে।” তাই হল। প্রথম টুকরো ছোড়দাদার আর বাকিটুকু বড়দাদার জন্যে ছিঁড়ে মকুল দাইয়ের হাতে দিল।
শাদা ডানা দুই পায়রা সেই দু-টুকরো কাগজ গলায় বেঁধে আকাশে উড়ল, ডানার তলায় লুকানো রইল তাদের মহাবিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্যে চণ্ডের কাছে রানী আর দাইয়ের দুখানি চিঠি। সোনামাখানো মেঘের উপর দিয়ে উড়ে চলেছে দুটি পাখি ছোট-বড় দুজনের ডাক বয়ে, সূর্যের আভা আকাশ রাঙিয়ে তাদের দুজোড়া ডানার পালকে এসে ঠেকেছে শাদা পালে হাওয়ার মতো। চিতোরের কেল্লায় বন্দী অসহায় মকুল আর তার মায়ের ডাক সকালের সোনায় মাখা, দুপুরের রোদে পোড়া, সন্ধ্যার মেঘ আর আলোর চিত্র-বিচিত্র দিনের মধ্যে দিয়ে রাত্রির নীল-গোলা অন্ধকার আকাশ পার হয়ে যেদিন মাণ্ডুর কেল্লায় চণ্ডের কাছে এসে পৌঁছল, সেদিন চণ্ড সব দুঃখ সব অপমান ভুলে অনেক দিনের কোণে-রাখা তলোয়ার আর একবার কোমরে বেঁধে উঠে দাঁড়ালেন।
আজ তিনদিন ধরে একটা প্রকাণ্ড ঝড় রাজস্থানের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে—তারই মধ্যে থেকে এক-একবার সকাল সন্ধ্যায় সূর্যদেব দেখা দিচ্ছেন রক্তমূর্তি! চণ্ড যখন চিতোর ছেড়ে চলে আসেন তখন তিনশো ভীল তাঁর সঙ্গে তীর-ধনুক নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। আজ তারা চণ্ডের হুকুম নিয়ে চিতোরে আবার ফিরছে ঝড়-জল বিদ্যুতের মধ্যে দিয়ে।
চিতোর থেকে খানিকটা দূরে গো-সুন্দ নগর, পাহাড়ের উপর একটা মজবুত কেল্লা আর তাকেই ঘিরে ছোট-ছোট বাড়ি, পাহাড়ের নিচে অনেকখানি ঘন বন, তার মধ্যে দিয়ে ছোট-ছোট নদী বয়ে চলেছে, এই বনে চণ্ড তাঁর দলবল নিয়ে লুকিয়ে রইলেন! কথা ঠিক হল যে, মহারানী সুন্দেশ্বরীর পুজো দেবার ছল করে মকুলজীকে নিয়ে এইখানে এসে দেওয়ালীর দিন চণ্ডের সঙ্গে মিলবেন।
এদিকে চণ্ডের অনুচর যত ভীল মেবারের গ্রামে-গ্রামে ঘুরে রটিয়ে দিয়েছে—রণমল্ল মকুলজীকে মেরে ফেলেছে। লোকে সব গ্রামে-গ্রামে মাঠে-ঘাটে এই সব গুজব শুনে একেবারে ক্ষেপে উঠে লাঠি-তলোয়ার তীর-ধনুক নিয়ে চিতোরের দিকে দল বেঁধে চলেছে—যদি একথা সত্যি হয় তবে পেটমোটা মাড়োয়ারের রাজা রণমল্লকে আর আস্ত রাখবে না। রণমল্ল এই খবর পেয়ে ভয়ে কাঁপছেন, কি উপায় করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। সেই সময় একদিন দাই এসে তাঁকে বললে, “হুজুরের মেজাজ ভালো বোধ হচ্ছে না, একটা খবর শুনে আমারও ভয়ে গা কাঁপছে; শুনেছেন দেশের লোক তাদের রানা মকুলকে দেখবার জন্যে লাঠি-সোটা নিয়ে এই দিকে আসছে।” রণমল্ল খবরটা খুব ভালো করেই শুনেছিলেন তবু দাইকে ধমকে বললেন, “যাও-যাও, মাড়োয়ারের রাজা আর মেবারের এখনকার সর্বের্সবা দু-দশগাছা লাঠির ভয়ে কাঁপে না, আর কিছু খবর থাকে তো বল!”
দাই তখন চুপি-চুপি বললে, “এবারে যে-দল আসছে বড় শক্ত দল, মেবারের রাজপুতকে আপনি চেনেন না, এই বেলা যা হয় উপায় করুন!”
রণমল্ল মনে ভয় কিন্তু মুখে সাহস দেখিয়ে বলে উঠলেন, “কি উপায় করতে হবে শুনি?”
দাই বললে, “মকুলজীকে একবার গ্রামে-গ্রামে শিকার খেলার জন্যে পাঠিয়ে দিন। লোকে দেখুক তাদের রানা বেশ সুখে বেঁচে আছে আর খেলে বেড়াচ্ছে। তাহলেই তারা ঠাণ্ডা হবে আর আপনাকে বিরক্ত করতে আসবে না।”
রণমল্ল খানিক গম্ভীর হয়ে থেকে বললেন, “মন্দ পরামর্শ নয়, কিন্তু হাতিয়ার বেঁধে গ্রামে-গ্রামে শিকার খেলে বেড়ানো তো হতে পারে না, শিকার থেকে লড়াই বাধতে কতক্ষণ? অন্য কিছু উপায় থাকে তো বল।”
“তবে রানীমা আর মকুলজীকে পালকি চড়িয়ে গ্রামে-গ্রামে দেবতাদের পুজো দেবার জন্যে পাঠিয়ে দিন, কাজ একই হবে।” এ পরামর্শটা রণমল্লের মনোমতো হল, দাই রানীকে আর মকুলজীকে পালকিতে চড়িয়ে চিতোরের কেল্লা পার করে দিয়ে এল। যাবার সময় মকুল বললে, “দাই মা, তুমি যাবে না?”
“না জী, বাঘ ধরবার সেই ফাঁদটা শেষ করে তবে আমি তোমার কাছে যাব”—বলেই দাই চিতোরের কেল্লায় ফিরে এল।
গো-সুন্দ নগরে দেওয়ালীর আজ ভারি ধুম, মহারানী রানাজীকে নিয়ে কেল্লায় এসেছেন, খুব ঘটা করে আজ সুন্দেশ্বরীর পুজো দেওয়া হবে। ঘরে-ঘরে আজ প্রজারা পিদিম জ্বালিয়েছে, রাস্তায়-রাস্তায় দোকানীরা ঝাড়-লণ্ঠন ছবি আয়না দিয়ে দোকান সাজিয়ে বসে লোকের গায়ে কেবল গোলাপ জলের পিচকিরি দিচ্ছে। শহরের ছেলেগুলো রাস্তার মাঝে তুবড়ি পুড়িয়ে ছুঁচো-বাজি ছেড়ে মকুলজীর সঙ্গে যে-সব ঘোড়সওয়ার এসেছে তাদের ঘোড়াগুলোকে ক্ষেপিয়ে দিয়ে তামাশা দেখছে। ছেলে বুড়ো সবাই মিলে হাউই উড়িয়ে চরকি ঘুরিয়ে ফুলঝুরি, রংমশাল, বোমা, দোদমা, ভুঁইপটকা, চিনে-পটকা পুড়িয়ে খুব খানিকটা ধোঁয়া আর খুব খানিকটা আমোদ করে নিচ্ছে।
মকুলের আর আনন্দের সীমা নেই! এক সোনার সাজ-পরা কালো ঘোড়ায় চড়ে তিনি শহরময় ঘুরে-ঘুরে দেওয়ালীর আলো দেখে বেড়াচ্ছেন। আর রানীমা, কেল্লার ছাদে একলা তিনি চুপ করে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছেন, যত রাত বাড়ছে ততই তাঁর মনে হচ্ছে চণ্ড বুঝি এলেন না। আজ যে এই গো-সুন্দ নগরে দেওয়ালীর রাতে তাঁর দলবল নিয়ে আসবার কথা, কিন্তু কই? দেখতে-দেখতে শহরের আলো নিবে এল; মকুল তাঁর ঘোড়া ফিরিয়ে কেল্লায় এলেন, কিন্তু চণ্ডের আসবার কোনো লক্ষণ নেই, এই রাতের মধ্যে তাঁদের চিতোরে ফিরতে হবে, আর তো সময় নেই। রানী অন্ধকার আকাশের দিকে চেয়ে কাঁদতে লাগলেন, দুই চোখের জল তাঁর বুকের কাপড় ভিজিয়ে দিতে লাগল।
এদিকে সুন্দেশ্বরীর মন্দির থেকে ঢং-ঢং করে রাত দশটার ঘণ্টা পড়ছে, লোকজন প্রস্তুত হয়ে চিতোর যাবার জন্যে পালকি নিয়ে উপস্থিত হয়েছে, মকুল রানীকে ডাকছেন যাবার জন্যে কিন্তু রানীর পা আর উঠছে না, তাঁর বুকের ভিতরে যেন হাতুড়ির ঘা দিয়ে অন্ধকারে ঘণ্টা বাজছে এক, দুই, তিন, চার। রাত দশটার ঘণ্টা বেজে থেমেছে—অন্ধকার আকাশ বাতাস তারই শব্দের রেশায় এখনো রী-রী করে কাঁপছে, ঠিক সেই সময় পাহাড়ের নিচে বনের মাঝ দিয়ে দশটা হাউই আগুনের সাপের মতো ফোঁস করে ফণা ধরে আকাশে উঠে দপ করে আলোর ফুল হয়ে আকাশময় ছিটিয়ে পড়ল—আলোয় চারিদিক দিন হয়ে গেছে, শহরের লোক আশ্চর্য বাজি দেখতে হৈ-হৈ করে রাস্তায় ছাদে যে যেখানে পেরেছে বেরিয়ে এসেছে! রানী মকুলের হাত ধরে বললেন, “সময় হয়েছে, আর দেরী না, চল্।” মকুলের ইচ্ছা আরো খানিকটা ছাদে দাঁড়িয়ে বাজি দেখেন। কিন্তু রানী তাঁকে জোর করে ধরে পালকিতে ওঠালেন, আকাশের হাউই তাঁদের মাথার উপরে লাল আলোর পুষ্পবৃষ্টি করে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল! মকুল পালকি থেকে আবার কখন হাউই ওঠে দেখবার জন্য মুখ বাড়িয়ে বসে রইলেন কিন্তু আকাশ যে অন্ধকার সেই অন্ধকারই রইল।
মকুল রাত্রির মধ্যে অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে-থেকে ঘুমিয়ে পড়েছেন, রানীর পালকি নির্জন মাঠের পথে আস্তে-আস্তে চলেছে, মাটির উপরে আটটা পালকি-বেয়ারার খসখস পায়ের শব্দ ছাড়া আর কোনো দিক থেকে কোনো শব্দ রানীর কানে আসছে না। রানী অন্ধকারের মধ্যে মুখ বাড়িয়ে চেয়ে রয়েছেন। একবার মনে হল যেন একদল লোক খুব দূরে ঘোড়া ছুটিয়ে বেরিয়ে গেল, একবার দেখলেন রাস্তার ধারে একজন কে বল্লম হাতে চুপ করে দাঁড়িয়ে—পালকি কাছে আসতেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। গো-সুন্দ নগরে সেই দশটার তারাবাজি দেখে রানী চণ্ড এসে পৌঁচেছেন বুঝেছিলেন, তারপর থেকে কিন্তু চণ্ডকে স্পষ্ট করে দেখা এখনো তাঁর ঘটে ওঠেনি। চণ্ড যে তাঁর কাছাকাছি আছেন, সেটা কেবল এই ছায়া-ছায়া রকম দেখেছিলেন!
রাত গভীর—পালকি চিতোরের কাছাকাছি এসে পড়েছে, দূর থেকে কেল্লার দেয়াল আকাশের গায়ে কালো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পাহাড় বেয়ে রানীর পালকি কেল্লার ফটকের দিকে উঠে চলল কিন্তু তখনো চণ্ডের কোনো দেখা নেই। ঘোড়ার পায়ের শব্দ কি তলোয়ারের ঝনঝন কিছুই শোনা যাচ্ছে না; রানীর বুক কাঁপছে, তাঁর চোখের সামনে কেল্লার ফটকের বড় দরজা দুখানা আস্তে-আস্তে খুলে গেল যেন একটা রাক্ষস অন্ধকারে মুখটা হাঁ করলে। আস্তে-আস্তে রানীর পালকি কেল্লার মধ্যে ঢুকল, রানী একবার পালকি থেকে মুখ ঝুঁকিয়ে পিছনের দিকে দেখলেন ফটকের সামনে একদল ঘোড়সওয়ার খোলা তলোয়ার মাথায় ঠেকিয়ে তাঁর সঙ্গে কেল্লায় প্রবেশ করলে, তাদের সর্দার প্রকাণ্ড এক কালো ঘোড়ায়—মাথা থেকে পা পর্যন্ত তার কালো সাজ নিমেষের মধ্যে এই ছবিটা রানী দেখতে পেলেন; চণ্ডকে চিনতে তাঁর বাকি রইল না। তারপর “জয় মকুলজী কি জয়! জয় চণ্ডজী কি জয়!” শব্দে আকাশ কাঁপিয়ে উঠল, অমনি চিতোরের ছোট-বড়ো ছেলে-বুড়ো তলোয়ার খুলে রাজপথে রানীর পালকির চারিদিক ঘিরে নিয়ে রাজবাড়ির দিকে চলল। যত মাড়োয়ারী, যারা এতদিন বুক ফুলিয়ে রাজাগিরি ফলাচ্ছিল, সব আজ চণ্ডের নাম শুনেই ইঁদুরের মতো গর্তে গিয়ে লুকোলো, কারো এমন সাহস হল না যে রণমল্লকে গিয়ে খবরটা দেয়। আর খবর দিয়েই বা কি হবে? দেওয়ালীর রাতে খুব করে সিদ্ধি খেয়ে রণমল্ল খাটিয়ায় পড়ে নাক ডাকাচ্ছেন। দাই একগাছি মোটা দড়ি দিয়ে খাটিয়ার সঙ্গে তাঁকে আচ্ছা করে বেঁধে ছাদের উপর থেকে তামাশা দেখতে গেল। রণমলের ভোজপুরী আর মাড়োয়ারী দারোয়ানগুলো ঢাল তরোয়াল বেঁধে তালপাতার সেপায়ের মতো কেবল হাত-পা ছুঁড়তে লাগল, লড়াই দেবার আর সাধ্য হল না।

চণ্ড জোর করে তালা ভেঙে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করলেন। গোলমালে রণমল্ল জেগে উঠে দেখেন তাঁর চারিদিকে খোলা তলোয়ার, নিজের হাত-পা বাঁধা; তাঁর সাহসও ছিল জোরও ছিল; হাজার হোক তিনি মাড়োয়ারের রাজা, আর তলোয়ার দেখে তাঁর সিদ্ধির ঘোরও কেটে গেছে। তিনি পিঠে বাঁধা খাটিয়াখানাসুদ্ধ দাঁড়িয়ে উঠে চণ্ডকে বললেন, “আমার বাঁধন খুলে দাও, তারপর দেখা যাবে কে জেতে কে হারে! তুমি বীর, রাজার ছেলে—আমিও একটা দেশের রাজা, আমাকে জানোয়ারের মতো বেঁধে মারা তোমার উচিৎ হয় না।”
চণ্ড রণমল্লের বাঁধন খোলবার জন্যে ঘরে ঢুকবেন এমন সময় দাই ছুটে এসে বললে, “সাবধান, ওকে একা পুড়ে মরতে দাও, সরে যাও, না হলে সবাই মরবে।” দুম করে একটা ভয়ঙ্কর আওয়াজ হয়ে ঘরের কোণে একরাশ বারুদ জ্বলে উঠল, তারপর দাউ-দাউ করে ঘরখানায় আগুন লেগে গেল! ছুঁচো-বাজি দিয়ে ঘরখানা দাই যে কখন ভর্তি করে রেখেছিল কে জানে? ছুঁচোর মতো রণমল্ল পুড়ে মোলেন—“খুলে দে! খুলে দে!” বলে চীৎকার করতে-করতে। যাকে রাজবাড়ির দাসী বলে তিনি ঠাউরে ছিলেন, তারই হাতের বাঁধা দড়ির বাঁধ শেষ পর্যন্ত আগুনের নাগপাশের মতো তাঁকে জড়িয়ে রইল।
কোথায় মেবার মাড়োয়ার দুটো দেশ রণমল্ল দখল করে বসবেন, না এখন তার মাড়োয়ারের সিংহাসনটা পর্যন্ত মেবারের রানার হাতে এল। তাঁর ছেলে যোধরাও বাপের সিংহাসন হারিয়ে এখন সামান্য গুটিকতক সেপাই নিয়ে রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে চলল, অনেক দূরে লুনী নদীর ওপারে।
মহাবীর হরোয়া শংকল রাজর্ষি—লুনী নদীর ও-পারের সমস্ত পাহাড় নদী বন তাঁর রাজত্ব। তাঁর নামে সবাই মাথা নোয়ায় এমনি তাঁর বীরত্ব, এমনি তাঁর দয়া, তাঁর হুকুম অমান্য করে রাজস্থানে এমন লোক নেই। বিপদে যে পড়েছে তাকে উদ্ধার করা, দুঃখীর দুঃখ মোচন, অনাথকে আশ্রয় দেওয়াই তাঁর কাজ, তাঁর যত অনুচর সবাই সন্ন্যাসী বীর, গাঁজাখোর নয়, কাজের মানুষ। কেউ কারুর উপর অন্যায় অত্যাচার করলে তাদের হাতে নিস্তার নেই, বনের ভিতর পাহাড়ের গুহায় তাদের সব কেল্লা, সেখানে জালা-জালা টাকা পোঁতা আছে, লোকে চাইলে সেই টাকা দিয়ে তারা তাদের দুঃখ ঘোচায়। মাটির নিচে বড়-বড় ঘর, সেখানে তাদের অস্ত্র-শস্ত্র লুকোনো থাকে, কেউ বিপদে পড়ে তাদের কাছে এলে সেই অস্ত্র দিয়ে তারা সাহায্য করে, এমনি দলের রাজা তিনি হরোয়া শংকল। লুনী-নদী সাঁতার দিয়ে পার হয়ে যোধরাও রাত দুপুরে এসে তাঁরই আশ্রয় চাইলেন; যোধরাও জানতেন চণ্ডও ইচ্ছে করলে এখানে এসে গোলমাল করতে পারবেন না।
হরোয়া শংকল আদর করে যোধরাওকে বসালেন; তাঁর ছোট ঘর, রাজকুমারের সঙ্গে অনেক সেপাই, কাজেই সবাইকে গাছতলায় বসাতে হল, সন্ন্যাসী রাজা একটু ভাবিত হলেন এত রাত্রে এত লোকের খাবার কেমন করে যোগাবেন, লোকেরাও অনেক পথ চলে এসে খিদেয় কাতর হয়ে পড়েছে! রাজর্ষি তাঁর দলবলকে ডেকে সকলের আহারের সুবন্দোবস্ত করে দিতে বললেন, কিন্তু ঘরে তাঁর একটু খুদও নেই; সেদিনের যা-কিছু চাল ডাল সব তিনি অতিথিদের বিলিয়ে দিয়েছেন! বিপদে পড়ে চেলারা সব মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে দেখে রাজর্ষি বললেন, “অতিথিকে তো খেতে দিতে হবে, এস দেখি ঘরে কি আছে।” ঘরের এক কোণে সন্ন্যাসীদের কাপড় রাঙাবার জন্য এক রাশ মূঁজলতা বোঝা বাঁধা ছিল, রাজর্ষি সেইগুলি দেখিয়ে বললেন, “যাও, এইগুলো রেঁধে আনো।”
রাঁধুনী এক সন্ন্যাসী, সে হেসে বললেন, “প্রভু, এইবার অতিথি সেবার ঠিক বন্দোবস্ত করেছেন। যে মুখে ঠাকুরের ভোগ খাবে সেই মুখে কাল সকালে দেশে ফিরে কাউকে এবার আর ঠাকুরের অতিথি সেবার নিন্দে করতে হবে না, এইবার ঠিক হয়েছে!”
রাজর্ষি হেসে বললেন, “আজ আমি নিজের হাতে রাঁধব, তোমাদের সবাইকে নিয়ে এক সঙ্গে খাওয়া যাবে, নিমন্ত্রণ করছি, সব চেলাদের ডাক দাও।”
গাছের তলায় আগুন জ্বালিয়ে রান্না শুরু হল, রান্নার গন্ধে বন আমোদ করলে কিন্তু তরকারী দেখে অবধি চেলাদের আজ আর মোটেই খিদে নেই, যদিও সকালে এক-এক মুঠো ছোলা ছাড়া এ-পর্যন্ত কারো পেটে কিছু পড়েনি। কিন্তু, প্রভুর নিমন্ত্রণ কারো অগ্রাহ্য করার জো নেই। রান্না শেষ হলে সবাই অতিথিদের জন্যে পাতা পেড়ে অপেক্ষা করতে লাগল। আগে যোধরাও আর তাঁর লোকজনদের মোটা-আটার রুটি আর মূঁজলতার সেই তরকারি খাইয়ে রাজর্ষি সব চেলাদের নিয়ে খেতে বসলেন, কেবল সেই রাঁধুনি চেলাকে অনেক ডাকাডাকি করেও কেউ আনতে পারলে না, সে কম্বল মুড়ি দিয়ে জঙ্গলের কোনখানে যে লুকিয়ে রইল তার আর সাড়া-শব্দ পাওয়া গেল না। খাওয়া শেষ হলে সবাই রাজর্ষির রাঁধা তরকারির সুখ্যাতি করতে-করতে যে যার জায়গায় শুতে গেল। মূঁজশাকের এমন যে রান্না হয় তারা কেউ জানত না, এবার থেকে রোজ এই তরকারি দিয়ে তারা রুটি খাবে এই সব বলাবলি করছে এমন সময় সেই রাঁধুনী এসে উপস্থিত! সবার মুখে তরকারির তারিফ শুনে তার আর আপসোসের সীমা রইল না! সে ভেবেছিল ওই রঙ করবার পাতাগুলো খেয়ে সবাই মাথা ঘুরে মরবে কিন্তু দেখলে সবাই দিব্যি পেট ভরিয়ে আরামে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমতে লেগেছে, কেবল শীতের রাতে খিদের জ্বালায় সে-ই মরছে কেঁপে।
শীতের রাত সহজে কাটতে চায় না, রাঁধুনী ঠাকুরটিকে অনেক যন্ত্রণা দিয়ে তবে সে রাত পোহাল। সকালে উঠে সে একখানা কুড়ুল নিয়ে রান্নার কাঠ কাটতে চলেছে এমন সময় একজন বুড়ো মাড়োয়ারী সেপাইয়ের সঙ্গে দেখা; পাহাড়ের ঝরনার ধারে সে হাত-মুখ ধুচ্ছে, তার দাড়ি-গোঁফ সব লাল রঙের ছোপ-ধরা। কাল সন্ধ্যায় যার দাড়ি ছিল শাদা, আজ লাল হয়ে গেল। এ ব্যাপার দেখে রাঁধুনী ঠাকুরটি আর হাসি রাখতে পারলে না, হোঃ-হোঃ করে হাসতে-হাসতে সঙ্গীদের কাছে এই মজার খবরটা দিতে এসে দেখে, যত পাকা দাড়ি-গোঁফওয়ালা ছিল তারা নিজের-নিজের দাড়িতে হাত বোলাচ্ছে আর এ ওর মুখের দিকে চেয়ে দেখছে সবার দাড়ি-গোঁফে লাল রঙের ছোপ। ইতিমধ্যে রাজর্ষি বেরিয়ে এলেন, তাঁর কিন্তু শাদা দাড়ি ধবধব করছে। মূঁজপাতার যে রঙ লেগেছে এটা কারুর মনে এল না; দাড়িতে রক্ত কোথা থেকে লাগল এই ভেবে সবার যখন ভয়ে মুখ শুকিয়ে এসেছে তখন রাজর্ষি সবাইকে অভয় দিলেন, “নির্ভয়ে থাক, তোমাদের সুখের সূর্য উদয় হতে আর দেরি নেই; দেখ না এখনি তার রাঙা আলো তোমাদের মুখে এসে পড়েছে; এখন কিছুদিন এইখানে বিশ্রাম কর, তোমাদের রাজত্ব ফিরে পাবার বন্দোবস্ত করা যাবে।” সেইদিন কাঠ কেটে রাঁধুনী ঠাকুর রাজর্ষিকে আর এক বোঝা মূঁজপাতা এনে দিয়ে বললে, “ঠাকুর, আমাকে আজ একটু সেই তরকারি রেঁধে দিতে হবে।” রাজর্ষি হেসে বললেন, “তোমার কালো দাড়িতে লাল রঙের ছোপ তো খুলবে না, আগে দাড়ি পাকুক তবে একদিন মূঁজ শাকের চচ্চড়ির ছোপ ধরিয়ে দেওয়া যাবে, আজ ভালো করে অন্য তরকারি দিয়ে অতিথি খাওয়াবার বন্দোবস্ত কর।” রাঁধুনী ঠাকুরটি খেতে যেমন মজবুত রাঁধতেও তেমনি, আর রাজ্যের আজগুবি গল্প তার কাছে; যোধরাও আর তাঁর সঙ্গীদের বেশ আমোদ-আহ্লাদে দিন কাটতে লাগল, বনে আছেন মনেই হত না।
এদিকে হরোয়া শংকলের হুকুম চণ্ডের কাছে পৌঁছল—যোধরাওকে যেন মাড়োয়ারের সিংহাসন ফিরিয়ে দিয়ে ঝগড়াঝাঁটি সব মিটিয়ে নেওয়া হয়—এর উপর কোনো কথা নেই। চণ্ডের দুই ছেলে মুঞ্জজী আর কণ্ঠজী মাড়োয়ার শাসন করছিলেন; তাঁদের উপর হুকুম হল যে হরোয়া শংকল কিংবা তাঁর কোনো লোক যোধরাওকে সঙ্গে নিয়ে আসামাত্র মাড়োয়ারের সিংহাসন যেন তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। হরোয়া শংকল দূতের মুখে এই খবর পেয়ে নিজেই যোধরাওকে সঙ্গে নিয়ে মেবারে চললেন। সেখান থেকে চণ্ডকে নিয়ে মাড়োয়ার যাবার কথা। ঠিক সময়ে সবাই মেবার পৌঁছে চণ্ডকে সঙ্গে নিয়ে যোধরাওর রাজত্বে মুন্দরের কেল্লার দিকে চললেন; যোধরাও তখন ছেলেমানুষ—একরাত্রে সবাই মাঠের মধ্যে তাঁবু গেড়ে আছেন এমন সময় একটা বুড়ো মাড়োয়ারী যোধরাওর কানে-কানে বললে, “দেশে তো এসে পড়েছি, তবে এখন আর চুপ করে থাকা কেন? চলুন, আজ রাত্রেই গিয়ে কেল্লাটা দখল করে বসি, নিজের সিংহাসন পরের কাছ থেকে চেয়ে না নিয়ে জোরসে কেড়ে নেওয়াই ভালো, কি বলেন?” যোধরাও এ কথায় সায় দিলেন, আস্তে-আস্তে মাড়োয়ারী সৈন্য সব মুন্দরের দিকে বেরিয়ে গেল।
চণ্ড আর হরোয়া শংকল এ খবর কিছুই জানেন না, সকালবেলা শিবির থেকে বেরিয়েছেন এমন সময় দেখলেন দূর থেকে এক ঘোড়সওয়ার ছুটে আসছে—তার মাথার পাগড়ী খোলা, বুকের কাপড়ে রক্তের দাগ। সওয়ার যখন ছুটে এসে চণ্ডের কাছে দাঁড়াল তখন চণ্ড তাঁকে নিজের ছেলে কণ্ঠজী বলে চিনতে পারলেন। হরোয়া শংকল তাঁকে ঘোড়া থেকে নামিয়ে ঘাসের উপর শুইয়ে দিলেন, অমনি কণ্ঠজীর প্রাণ বেরিয়ে গেল। কে তাঁকে এমন করে মারল এই দেখবার জন্যে তাঁরা এদিক-ওদিক দেখছেন এমন সময় যোধরাও ঘোড়া ছুটিয়ে এসে বললেন, “প্রভু, আমার অপরাধ যদি হয়ে থাকে তো ক্ষমা করবেন। বাপের সিংহাসন আমি কারু কাছে ভিক্ষা বলে চেয়ে নিতে পারলুম না, নিজের জোরে ফৌজ পাঠিয়ে দখল করেছি, লড়াই শেষ হয়ে গেছে। চণ্ডজীর হাতে আমার বাপ পশুর মতো মারা পড়েছে, তারই ধার তাঁর দুই ছেলেকে যুদ্ধে বীরের মতো মেরে শোধ দিলেম, এতে যদি আমার দোষ হয়ে থাকে তো শাস্তি দিন।” চণ্ডের মুখে কোনো কথা সরল না। হরোয়া শংকল খানিক ঘাড় হেঁট করে রইলেন, তারপর আস্তে-আস্তে বললেন, “যোধরাও ভুল করেছ, চণ্ডের কোনো দোষ ছিল না, তুমি বালক বলে এবার তোমায় শাস্তি দিলেম না, কিন্তু প্রতিজ্ঞা কর, আর কখনো মেবারের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে না। আর এই মাটিতে যেখানে এই বীর কণ্ঠজী পড়ে রয়েছেন, এই পর্যন্ত মেবারের রাজ্যের সীমা ঠিক হল, এর পর থেকে তোমার রাজত্ব।”
চণ্ড চোখের জলের মধ্যে দিয়ে দেখলেন যেখানে তাঁর কণ্ঠজী প্রাণশূন্য দেহে পড়ে রয়েছে সেখানে সকালের আলোতে সমস্ত মাঠ জুড়ে সোনাব ফুলের মতো আঁওলার কচি ফুল ফুটে উঠেছে। তিনি হরোয়া শংকলের দিকে চেয়ে বললেন, “এই আঁওলার ফুলই যেন শান্তির ফুল হয়, যত দূর এই ফুল ফুটবে ততদূর যেন মেবারের রাজ্য এইটেই সবাই বলে। আমার কাজ শেষ হয়েছে, প্রভু আমাকে এখন আপনার সঙ্গী করে লুনী নদীর পারে তপোবনে আশ্রয় দিন।” রাজর্ষি বললেন, “তথাস্তু।”

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন