ভূতুড়ে টেলিফোন

অভিরূপ সরকার

প্রথম পরিচ্ছেদ

রাস্তায় নেমে আদিত্য দেখল পুবদিকের আকাশে আবার মেঘ জমছে। একটু আগে, দুপুরবেলায়, বেশ কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বউবাজার স্ট্রিটের খানাখন্দগুলো এখনও বৃষ্টির জলে টইটুম্বুর। ফুটপাথ কাদায় কাদা। আদিত্য ঘড়ির দিকে তাকাল। বিকেল সাড়ে চারটে। আপিসের ভিড় এখনও শুরু হয়নি। বিবাদী বাগের মিনিবাস গুমটি প্রায় ফাঁকা। কিছু একটা খেতে হবে। সেই সকালে চা-বিস্কুট খেয়ে বেরিয়েছিল তারপর সারাদিন আর কিছু পেটে পড়েনি। আদিত্য রাস্তা পার হয়ে বিবাদী বাগের দিকে যেতে যাবে এমন সময় কে যেন তার নাম ধরে ডাকল।

বউবাজারের এই অঞ্চলটা আপিস পাড়ার ঠিক গায়ে। একটু এগোলেই রাধাবাজারের ঘড়িপট্টি। এজরা স্ট্রিট। সারি সারি ইলেকট্রিকাল গুডস-এর দোকান। রাস্তায় অবিশ্রাম লোক চলছে। রাত নটা-সাড়ে নটা অব্দি এরকমই চলবে। ভিড়ের মধ্যে আদিত্য পেছন ফিরল। তাদের আপিস বিল্ডিং-এর সিকিউরিটির নতুন ছেলেটা তাকে ডাকছে। কী যেন নাম ওর? বোধহয় শ্যামল।

'আরে আদিত্যবাবু কতক্ষণ থেকে চ্যাঁচাচ্ছি শুনতে পাচ্ছেন না?' শ্যামল ভিড় ঠেলে এগোতে এগোতে বলল।

'কী ব্যাপার, তাড়াতাড়ি বল। সারাদিন খাওয়া হয়নি। ভীষণ খিদে পেয়েছে।'

আদিত্যর ভয় হল বিল্ডিং-এর মালিক গোকুলচাঁদ বুঝি শ্যামলকে দিয়ে আবার ভাড়ার টাকা চেয়ে পাঠিয়েছে। গত তিনমাস আদিত্য আপিস ঘরের ভাড়া দিতে পারেনি। মুখে একরাশ নকল বিরক্তি নিয়ে সে শ্যামলের সামনে দাঁড়াল।

'আপনাকে একজন বাবু খোঁজাখুঁজি করছেন। ভাবসাব দেখে মনে হল মক্কেল। তাই ভাবলাম দেখি, আপনাকে কাছে-পিঠে খুঁজে পাই কিনা।'

শ্যামলও এই ক'দিনে জেনে গেছে মক্কেল বস্তুটা আদিত্যর জীবনে কী ভীষণ দুর্লভ। আশায়-আশঙ্কায় আদিত্যর বুকটা ধক করে উঠল। ধুর, মক্কেল হয়তো নয়। হয়ত তাদের মেসের চুনীবাবু। চুনীবাবুর কাছ থেকে সে গতমাসে কিছু টাকা ধার করেছিল। এখনও শোধ দেওয়া হয়নি। কিন্তু চুনীবাবু টাকার তাগাদা করতে এখানে আসবেন কেন?

মুখে নির্বিকার ভাব এনে আদিত্য বলল, 'কোথায় বাবু?'

'তাকে আপিসের মেন গেটে দাঁড় করিয়ে এসেছি।'

আরও কয়েক পা হেঁটে আপিসের মেন গেটের কাছে এসে আদিত্য দেখল কড়া ইস্ত্রি করা সাদা-বুশশার্ট-সাদা-প্যান্ট পরনে কালো মতো ফিটফাট এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আর অস্থিরভাবে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায় ভদ্রলোকচুলে কলপ করেছেন। মুখের চামড়া আর চুলের রঙের মধ্যে সামঞ্জস্য নেই। আদিত্য অনুমান করল, চুলের রঙ কুচকুচে কালো হলেও ভদ্রলোকের বয়েস পঞ্চাশে-র এদিকে হবে না। আরও খানিকটা এগিয়ে ভদ্রলোকের সামনে পৌঁছে সে বলল,

'আমাকে খুঁজছিলেন? আমার নাম আদিত্য মজুমদার।'

ভদ্রলোক চমকে উঠে আদিত্যর দিকে তাকালেন। মুখে হুলো বেড়ালের সতর্কতা।

'ও আপনিই আদিত্য মজুমদার? তা, মানে, একটু দরকার ছিল আপনার সঙ্গে।'

'আসুন আমার সঙ্গে। দোতলায় আমার আপিস। আসুন।'

মেন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই সারি সারি লেটার বক্স। ওপরে বহুদিনের জমা ঝুল। একপাশ দিয়ে পুরোনো আমলের সিঁড়ি উঠে গেছে। বাড়িটা পাঁচতলা হলেও কোনও লিফট-এর ব্যবস্থা নেই। আদিত্যর ভাগ্য ভাল সে দোতলায় একটা ঘর পেয়েছে। যাও বা এখন কালেভদ্রে দু'একটা মক্কেল আসে, এই পাহাড়ের মত সিঁড়ি ভেঙে পাঁচতলায় উঠতে হলে তাও আসত না। আদিত্য ভদ্রলোককে সঙ্গে নিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে শুরু করল। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে। জায়গায় জায়গায় পানের পিকের লাল লাল ছোপ। দেখলে গা ঘিন ঘিন করে। দোতলায় উঠে ডানদিকে বেঁকল আদিত্য। লম্বা করিডোর। প্রথমে একটা জাল সিডির গুদোম। আদিত্য এখানে আসার পর দু'বার পুলিশ রেড হয়ে গেছে। তারপর একটা ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির আপিস। সর্বদা লরি ড্রাইভারদের ভিড় লেগে থাকে। হট্টগোলে কান পাতা যায় না। সেসব পেরিয়ে করিডোরের একেবারে শেষপ্রান্তে আদিত্যর দরজা। দরজার গায়ে কাঠের নতুন নেমপ্লেট। তাতে ইংরেজিতে লেখা—আদিত্যবর্ণ মজুমদার, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর।

পকেট থেকে চাবি বার করে দরজা খুলে আদিত্য ভদ্রলোককে বলল, 'আসুন।'

ঘরটা ছোট, কিন্তু বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। একটা বড় টেবিল, তার একদিকে একটা রিভলভিং চেয়ার, উল্টোদিকে দু'টো গদি-আঁটা আরাম কেদারা। ঘরের একদিকে একটা আলমারি, অন্যদিকে একটা সোফাও আছে। আসবাবগুলো বেশ পুরোনো, কিন্তু একটু দেখলেই বোঝা যায়, রীতিমত দামি। এগুলো আদিত্যর পারিবারিক সম্পত্তি। উত্তরাধিকারসূত্রে, বলতে গেলে, সে ওইটুকুই পেয়েছে। ঘরের একদিকের দেয়ালে একটা জানলা। জানলা দিয়ে বউবাজার স্ট্রিটের চলমান জনস্রোত দেখা যায়। এখানে আসার পরে আদিত্য জানলায় নতুন কাচ লাগিয়ে নিয়েছে। দরজা-জানলা বন্ধ করে দিলে ঘরটা বেশ নিরিবিলি হয়ে যায়।

আদিত্য ভদ্রলোককে বসতে বলে নিজেও বসল।

'বলুন, কী ব্যাপার।'

'একটা গোপনীয় ব্যাপারে আপনার সাহায্য চাইতে এসেছি। মানে, ব্যাপারটা খুবই গোপনীয়।' ভদ্রলোক পকেট থেকে রুমাল বার করে কপালের ঘাম মুছলেন।

'বুঝলাম। তা আমার কথা জানলেন কী করে? খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখেছেন?'

'না, না। উকিলবাবু, মানে আপনার বন্ধু সুনন্দ মিত্র, আপনার কাছে আসতে বললেন। আমি আমার সমস্যা নিয়ে ওঁর কাছে গিয়েছিলাম। উনি বললেন, উনি কিছু করতে পারবেন না, আপনার ঠিকানা দিয়ে বললেন, আমার বন্ধুর কাছে যান, ও আপনাকে সাহায্য করতে পারবে। আপনার, মানে ফিসটা কত যদি একটু বলেন।'

'টাকা-পয়সার কথা পরে হবে। আপনি আগে আপনার সমস্যাটা বলুন।'

'বলছি। তার আগে একটা কথা। শুনলেই বুঝতে পারবেন, আমার সমস্যাটা গোপনীয়। এটা গোপনীয় রাখাটা খুব দরকার। আমার কথাগুলো পাঁচকান হলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।'

'আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, কেউ কিচ্ছু জানতে পারবে না। মক্কেলদের গোপনীয়তা রক্ষা না করতে পারলে আমার ব্যবসা দু'দিনে লাটে উঠে যাবে। আপনার সমস্যাটা এবার বলুন। আচ্ছা দাঁড়ান, আগে একটু চা বলে আসি।'

ভদ্রলোককে বসিয়ে রেখে আদিত্য নীচে এসে দেখল শ্যামল দরজার কাছে টুলের ওপর বসে বসে ঝিমোচ্ছে।

'শ্যামল, একটু চা আনতে হবে ভাই। একটু তাড়াতাড়ি, মক্কেল বসে আছে। আর দেখো, কাপটা যেন পরিষ্কার হয়। চারটে বিস্কুটও এনো। এই নাও। ফেরতটা তুমি রেখে দিও।'

আদিত্য একটা কুড়ি টাকার নোট এগিয়ে দিল।

'আমার ভালো নাম জিতেন্দ্রনাথ দত্ত। তবে মন্টু দত্ত বলেই লোকে আমাকে বেশি চেনে। মেডিকেল কলেজের উল্টোদিকে আরপুলি লেনে আমার একটা ছোটখাট প্রেস আছে। ওখানে গিয়ে মন্টুবাবুর প্রেস বললে যে কেউ দেখিয়ে দেবে। আমার প্রথম স্ত্রী চিররুগ্না ছিলেন। দশ বছরেরও বেশি হয়ে গেল মারা গিয়েছেন। আমার মেয়ে তখনও ইশকুলে পড়ে। ওই মেয়ে ছাড়া আমার আর কোনও সন্তান নেই। আমি সাবধানী মানুষ মশাই, মেয়ে মাধ্যমিক পাশ করতে না করতে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। ২০০৯-এর নভেম্বর, হ্যাঁ, তাও প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর হতে চলল। জামাই ভিলাইতে কাজ করে। বয়েসে আমার মেয়ের থেকে প্রায় পনেরো বছরের বড়, কিন্তু স্বভাবচরিত্র ভাল। তবে কলকাতায় আসার সুযোগও নেই, ইচ্ছেও নেই। বলতে কি, বিয়ের পরে মেয়ে একেবারে পর হয়ে গেছে। দূরে থাকে, খুব একটা খোঁজ-খবরও নেয় না। নাতিটাকেও দু'একবারের বেশি চোখে দেখিনি। বুঝতেই পারছেন, মেয়ের বিয়ের পর খুবই একা হয়ে পড়েছিলুম। কিছুই ভাল লাগে না, কাজে-কম্মেও মন বসে না। শেষে বছর তিনেক আগে আবার একটা বিয়ে করেছি। আমার দ্বিতীয় স্ত্রী বকুল আমাদের পাড়ারই মেয়ে। বাপ-মা নেই। ভাইদের গলগ্রহ হয়ে ছিল। কিছুতেই বিয়ে হচ্ছিল না, নইলে দোজবরকে কে বিয়ে করবে বলুন? যাইহোক, আমার সঙ্গে বিয়ে হয়ে বকুলও বাঁচল, মানে তার ভবিষ্যতের একটা উপায় হল, আর আমিও একটা সঙ্গী পেলুম। মোট কথা, বিয়ের পর বছর দুয়েক বেশ ভালোই কাটল। আর তারপরেই শুরু হল ঝামেলা।'

'একটু দাঁড়ান। আপনার এখন বয়েস কত চলছে?'

মন্টুবাবু একটু থতমত খেলেন। 'তিপ্পান্ন চলছে, সামনের নভেম্বর মাসে তিপ্পান্ন কমপ্লিট করে চুয়ান্নতে পড়ব।'

'আর আপনার দ্বিতীয় স্ত্রীর বয়েস?' আদিত্য একটা ডায়রিতে নোট নিচ্ছিল।

'মেয়েদের বয়েস তো মশাই বোঝা মুস্কিল। জিজ্ঞেস করলেও সত্যি কথা বলে না। তবে আমার মনে হয় বকুলের বয়েস সাঁইত্রিশ-আটত্রিশের কম হবে না। অনেকদিন বিয়ের জন্য বসে ছিল।'

'আপনাদের বিয়ে কবে হয়েছে?'

'২০১১ সালে, নভেম্বর মাসে।'

'হুঁ, তারপর কী হল বলে যান।'

শ্যামল দরজায় টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকল। হাতে চায়ের কেটলি, দুটো খালি কাপ, খবর কাগজে মোড়া চারটে থিন-এরারুট বিস্কুট। চা কাপে ঢেলে কেটলি নিয়ে শ্যামল চলে গেল।

'আসুন, চা খান।'

'শুধু চা। বিস্কুট খাব না।'

মন্টুবাবু শব্দ করে চায়ের কাপে চুমুক লাগালেন। আদিত্য চায়ে চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরাল। মন্টুবাবুর দিকে সিগারেটের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিতে তিনি মাথা নাড়লেন, তাঁর সিগারেট চলে না। তিন-চার চুমুকে চা শেষ করে মন্টুবাবু আবার বলতে লাগলেন—

'আমার নিজের সমস্যাটার কথা বলার আগে আমাদের পাড়াটার কথা একটু বলে নিই। আমার বাড়ি শহরের পুবদিকে, গোবরা কবরস্থান অঞ্চলে। চিত্তরঞ্জন হাসপাতালের পেছন দিয়ে একটা রাস্তা এঁকেবেঁকে আমাদের ওইদিকটায় গিয়ে পড়েছে। রাস্তাটা ধরে চলতে থাকলে দুবার রেল লাইন পেরোতে হয়। প্রথমটা পার্ক সার্কাস-শেয়ালদার মেন রেললাইন। ওটার ওপর দিয়ে ঘন ঘন ট্রেন যায়। লেবেল ক্রসিং-এ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এর পরে আর একটা রেল লাইন আছে যেটা শেয়ালদা স্টেশনের পেছন দিক দিয়ে অর্থাৎ স্টেশনটাকে পশ্চিমে রেখে পার্ক সার্কাস স্টেশন থেকে সোজা স্যার গুরুদাস হল্ট বলে একটা ছোট্ট স্টেশন ছুঁয়ে একেবারে বিধাননগর স্টেশনে গিয়ে ঠেকেছে। আমাদের পাড়াটা এই দ্বিতীয় রেললাইনটার গা ঘেঁষে। এই লাইনটার ওপর দিয়ে খুব বেশি ট্রেন চলে না। কিছু মালগাড়ি যায় আর সারাদিনে মেরে কেটে দু-তিনটে লোকাল ট্রেন। আপনি ওদিকটায় কখনও গেছেন কিনা জানি না, তবে হয়তো শুনে থাকবেন ওই অঞ্চলটা খুব একটা ভাল নয়। নেহাত বাবা ওখানে বাড়ি করেছিলেন বলে ছেড়ে যেতে পারি না। পাড়াটা রেল লাইনের ধারে বলে ওয়াগন ব্রেকার, সমাজবিরোধীদের ঝামেলা লেগেই আছে। প্রতি মাসেই একটা-দুটো লাস পড়ে। প্রায় রোজই রাত্তিরের দিকে বোমা, গুলিগোলার শব্দ শোনা যায়। মাঝে মাঝে পাড়ায় পুলিশ আসে, হম্বিতম্বি করে, দু-একজনকে ধরেও নিয়ে যায়, তারপর আবার যে কে সেই। আমার বাড়ি এবং শ্বশুরবাড়ি, মানে বকুলের বাপের বাড়ি, দুটোই রেললাইনের একেবারে গা ঘেঁষে। বকুলের বাবা-মা বহুদিন গত হয়েছেন, নিকটজন বলতে দুই দাদা। বড়দা রজনী বসাক অতিশয় সজ্জন, পিএনটি-তে চাকরি করত, বদখেয়াল কিছু নেই, পান-বিড়ি পর্যন্ত খায় না, নেশা বলতে শুধু দেশ-বিদেশ বেড়ানো। আপিস থেকে প্রিম্যাচিওর রিটায়ারমেন্ট নিয়ে একটা ট্র্যাভেল এজেন্সি খুলেছে। বয়েসে রজনী আমার থেকে কয়েক বছরের ছোট। তার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের পরিচয়। তার কাছ থেকেই বকুলকে বিয়ে করার ব্যাপারে প্রস্তাবটা এসেছিল। তো সে যাই হোক, রজনীর ছোট ভাই দেবীটা কিন্তু এক নম্বরের বদমাশ। ক্লাস ফোর ফাইভের পর আর ইশকুলমুখো হল না। কুসঙ্গে পড়ে মদ-গাঁজা ধরল, তারপর একটু বয়েস বাড়তে স্মাগলারদের দলে ভিড়ল। মানে সেইরকমই শুনতে পাই আর কি। তাকে পুলিশ দু'চারবার ধরে নিয়ে গেছে, তারপর দলের লোকেরা টাকা-পয়সা দিয়ে ছাড়িয়ে এনেছে। শেষবার সে কী কুকর্ম করেছিল জানি না, দলের লোকেরা তাকে আর ছাড়াতে পারল না। প্রায় দু-বছরের জেল হয়ে গেল। তার সঙ্গে তার স্যাঙাত এবং সব অপকর্মের গুরুমশাই সুশান্ত হালদারেরও জেল হল। এই সুশান্তটাই দেবীকে খারাপ পথে নিয়ে এসেছিল। তাছাড়া আমার স্ত্রী বকুলের ওপরেও সুশান্তর কুনজর ছিল।'

বলতে বলতে মন্টুবাবু মাথা নিচু করলেন। আদিত্য বুঝতে পারল অচেনা মানুষের কাছে পারিবারিক কলঙ্কের কথা বলতে ভদ্রলোকের মোটেই ভাল লাগছে না। আস্তে আস্তে এই মন্টুবাবু লোকটাকে আদিত্যর ভাল লেগে যাচ্ছিল। এমনিতে কলপ করা লোক সে মোটেই পছন্দ করে না। কিন্তু মন্টুবাবুর বাইরেটা কলপ করা হলেও ভেতরটা মনে হয় খাঁটি। সে মন্টুবাবুকে কিছুটা তৈরি হবার সময় দিল। তারপর নিচু গলায় বলল,

'শুনুন, আমার কাছে কিছু লুকোবেন না। আমার কাছে কথা লুকোলে আপনারই কাজ পেতে অসুবিধে হবে।'

'না, না। আপনার কাছে কিছু লুকোব না। আপনাকে তো সব কথাই বলতে এসেছি। এক গেলাস জল হবে?'

আদিত্য ডায়েরি বন্ধ করে জানলার কাছে কুঁজো থেকে এক গ্লাস জল এনে ভদ্রলোকের সামনে রাখতে না রাখতেই ভদ্রলোক ঢকঢক করে জলটা খেয়ে ফেললেন। বোঝা গেল, যেকোনও পানীয়ই ভদ্রলোক চট করে গিলে ফেলায় বিশ্বাসী, তা সে চা-ই হোক, কি জল। জল খেয়ে, পকেট থেকে রমাল বার করে মুখ মুছে, ভদ্রলোক আবার শুরু করলেন,

'দেবী আর সুশান্ত জেলে যেতে আমাদের পাড়াটাও যেন কিছুদিনের জন্য হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। এরই কিছুদিন পরে রজনীর কাছ থেকে বকুলকে বিয়ে করার প্রস্তাবটা আসে। দেবী আর সুশান্ত জেলের বাইরে থাকলে কিছুতেই এই বিয়ে হতে দিত না। বছরখানেক আগে জেলের মেয়াদ শেষ করে দেবী আর সুশান্ত বাইরে বেরোল। আগে সুশান্ত, তার মাস তিনেক পরে দেবী। পাড়ায় এসে তারা শুনল বকুলের বিয়ে হয়ে গেছে।'

এদিকে রজনী তার ছোট ভাইকে সাফ সাফ জানিয়ে দিল তার বাড়িতে জেল-ফেরত কয়েদির কোনও জায়গা হবে না। সে ভদ্র সমাজে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাস করে, সরকারি চাকরি করত, এখন সৎ ভাবে ব্যবসা করছে। এই বয়সে সে মান-সম্মান খুইয়ে পরিবার সুদ্ধু পথে বসতে রাজি নয়। বাড়িটা রজনীর নিজের টাকায় করা। তাই সেখানে কে থাকবে আর কে থাকবে না সেটা ঠিক করার পুরো অধিকার তার আছে। দাদার কথা শুনে দেবী খুব একচোট হম্বিতম্বি করল। তারপর বলল, দুএকদিনের মধ্যেই সে ফিরে এসে বদলা নেবে। সে চলে যেতেই রজনী পাড়ার পাঁচজনকে ডেকে তার সমস্যার কথা বলল। সকলেই তার পক্ষে। আমাদের ওদিকটা কলকাতার একটু বাইরে বলে এখনও একটা গ্রাম-গ্রাম ভাব আছে। বিপদে-আপদে পাড়ার লোক বুক দিয়ে করে। সবাই মিলে পরামর্শ করে সেইদিনই আমাদের এম এল এ সাহেবের কাছে যাওয়া হল। আমাদের এম এল এ মানুষটি অতি ভদ্রলোক। তিনি অভয় দিলেন। তাঁর কথায় পার্টির ছেলেরা পরদিন দেবী আর সুশান্তকে রেল লাইনের ধারে দেখতে পেয়ে প্রচণ্ড ধমকাল। তাদের বলা হল, ফের যদি তারা পাড়ায় ঢোকে তাহলে তাদের ছাল ছাড়িয়ে নেওয়া হবে। দেবী আর সুশান্ত একটু ভড়কাল। তারা পাড়ায় আর ঢুকল না বটে কিন্তু পুরোপুরি পাড়া ছেড়ে চলেও গেল না। পাড়ার ঠিক বাইরে একটা সাইবার কাফে খুলে বসল। দোকান ঘরের পেছনের ঢাকা জায়গাটাতে তারা রাত্তিরে থাকে। কোনও রকম ঝামেলায় আর তারা যায় না। ধীরে ধীরে পাড়ার লোক ওদের অতীতের কথা ভুলতে শুরু করল। কেউ কেউ এটাও বলতে লাগল যে, জেলের ঘানি টেনে ছেলে দুটো একেবারে শুধরে গেছে। এখনও সেইভাবেই চলছে। ওদের দোকানে আজকাল বেশ ভিড় হয়। আমাদের পাড়ায় আর কোনও কম্পিউটারের দোকান নেই তো। আমার কিন্তু স্থির বিশ্বাস ছেলেদু'টো ঠিক আগের মতোই বদমায়েশ আছে। শুধু জেলের ভাত খেয়ে আরও সেয়ানা হয়েছে।'

মন্টুবাবু দম নেবার জন্য খানিকটা থামলেন। আদিত্য আবার সিগারেট ধরাল। টেরিয়ে দেখল তার হাতঘড়িতে সোয়া পাঁচটা বেজে গেছে। বাইরে আবার বৃষ্টি নেমেছে। খুব জোরে নয়, আবার খুব আস্তেও নয়। ভিজিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। আপিসগুলো ছুটি হচ্ছে। রাস্তায় শুধু ছাতা আর ছাতা। একটা ট্র্যাম বেলাইন হয়ে ভয়ানক যানজট সৃষ্টি করেছে। বাস, মিনিবাস, ট্যাক্সি সকলে একসঙ্গে হর্ন বাজাচ্ছে। সেই ভয়ঙ্কর গোলমাল জানলার মোটা কাচ ভেদ করে কিছুটা ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ছে।

'জানলাটা একটু খুলে দেওয়া যাবে?' মন্টুবাবু কিন্তু কিন্তু গলায় বললেন।

আদিত্য বুঝল সিগারেটের ধোঁয়ায় ভদ্রলোকের কষ্ট হচ্ছে। সে উঠে গিয়ে জানলাটা খুলে দিতেই এক ঝলক ভিজে হাওয়া ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। সেই সঙ্গে রাস্তার হট্টগোল আর উল্টোদিকে নয়নতারা কেবিন থেকে ভেসে আসা মোগলাই পরোটা, কোবরেজি ভাজার হালকা গন্ধ। আদিত্য-র হঠাৎ মনে পড়ে গেল আজ সারাদিন তার কিছুই খাওয়া হয়নি। তার ভীষণ খিদে পেয়ে গেল। খিদেটাকে চাপা দেবার জন্য সে হাতের সিগারেটটাতে একটা লম্বা টান দিয়ে অবশিষ্টাংশ অ্যাশট্রেতে গুঁজে আবার নিজের জায়গায় এসে বসল।

'তারপর?'

'হ্যাঁ, তারপর আসল কথায় আসি। আগেই বলেছি, জেলে যাবার আগে থেকেই বকুলের দিকে সুশান্তর কুনজর ছিল। রজনীও অনেকবার আমাকে বলেছে ওই সুশান্ত ছোকরা মাঝে মাঝেই তার বোনকে বিরক্ত করে। জেল থেকে বেরিয়ে সুশান্ত আবার বকুলের দিকে দৃষ্টি দিল। তবে আগেকার মতো খোলাখুলি নয়, লুকিয়ে চুরিয়ে।'

'কেন আপনার এরকম মনে হল?'

'বকুল নিজেই আমাকে দু-একবার বলেছে রাস্তাঘাটে দেখা হলে সুশান্ত তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে।'

'শুধু কথা বলার চেষ্টা করে?'

'না, শুধু কথা বলার চেষ্টা করলে সমস্যা ছিল না। দেবী আর সুশান্ত জেল থেকে ছাড়া পাবার কয়েক মাসের মধ্যে আমাদের বাড়িতে ভূতুড়ে টেলিফোন আসতে শুরু করল। প্রত্যেকদিন অন্তত দশ-পনেরোবার টেলিফোন আসে। ফোন তুলে হ্যালো বললে সঙ্গে সঙ্গে কেটে দেয়। কোনও কথা বলে না। এতদিন আমাদের বাড়ির টেলিফোনটা মোটামুটি বোবা হয়েই বসে থাকত। কে আর ফোন করবে? আমার তো তিনকুলে কেউ নেই, মেয়েও খোঁজখবর নেয় না। আর বকুলেরবাপের বাড়ি দু'পা দূরে। তার দাদা, বৌদি, ভাইঝি দু'বেলা আসা-যাওয়া করছে। তাছাড়া বকুল আর আমার দুজনেরই একটা করে মোবাইল আছে। কথা বলার থাকলে তাতেই কথা হয়। বলতে পারেন টেলিফোনটা এতদিন অকেজো হয়েই পড়ে থাকত। নেহাত বাবার আমলের টেলিফোন তাই মায়া করে কানেকশনটা কাটিয়ে দিতে পারিনি। দু'মাস অন্তর ভাড়া গুনে গেছি। কিন্তু দেবী-সুশান্ত ফিরে আসার পর থেকে ঘনঘন টেলিফোন বাজতে শুরু করল। আমি রিসিভার তুলে হ্যালো বললেই কুট করে কেটে দেয়।'

'শুধু আপনি কথা বললেই কেটে দেয়, নাকি ...'

'না, বকুল হ্যালো বললেও একই রকম হয়। অন্তত বকুল তাই বলছে।'

'টেলিফোনটা কোথা থেকে আসছে কখনও ট্রেস করার চেষ্টা করেছেন?'

'করেছি। টেলিফোন ভবনে আমার চেনাশোনা একজন কাজ করে। সে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জানতে পেরেছে যে টেলিফোনটা একই নম্বর থেকে আসে। নম্বরটা চিত্তরঞ্জন হাসপাতালের উল্টোদিকের একটা টেলিফোন বুথের। বুথটা দিনের অনেকটা সময় খোলা থাকে আর সারাক্ষণ সেখানে ভিড় লেগেই আছে। রুগিদের বাড়ির লোকের ভিড় আর কি। তাও আমি সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলুম। তারা বলল রোজ তাদের দোকান থেকে এত লোক ফোন করে যে একটা বিশেষ নম্বরে কে বারবার ফোন করছে তাদের পক্ষে খেয়াল রাখা সম্ভব নয়।

'দেখুন মন্টুবাবু, আপনি যদি ভূতুড়ে টেলিফোন সমস্যার সমাধান করতে আমার কাছে এসে থাকেন, তাহলে কিন্তু ভুল করেছেন। এর জন্য টেলিফোন আপিস আছে, পুলিশ আছে। দরকার হলে আপনার টেলিফোন নম্বরটা পাল্টেও নিতে পারেন। টেলিফোন আপিসে তার জন্য শুধু একটা দরখাস্ত করতে হবে।'

'না, না আমি সেজন্য আসিনি। দেখুন তেমন বুঝলে আমি তো টেলিফোন লাইনটাই কাটিয়ে দিতে পারি। বাড়িতে টেলিফোন রাখার কোনও প্রয়োজনই আমার নেই। আমি এসেছি অন্য একটা কারণে। এবার সেই কথাটা বলি।'

মন্টুবাবু একটু নড়েচড়ে বসে আবার শুরু করলেন।

'সুশান্তর যে বকুলের প্রতি দুর্বলতা ছিল সে তো আগেই বলেছি। কিন্তু বকুলের দিক থেকে কোনও প্রশ্রয় ছিল কিনা, কে বলতে পারে? দেখুন, নিজের স্ত্রীর সম্বন্ধে এসব নোংরা কথা ভাবতে আমার নিজেরই ঘেন্না করছে। কিন্তু মাথা ঠান্ডা করে ভেবে দেখলে সম্ভাবনাটা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে একটা কথা মনে হয়। বিয়ের আগে যদি সুশান্তর প্রতি বকুলের কোনও দুর্বলতা থেকেও থাকে, বিয়ের পরে সেসব কিছু আর অবশিষ্ট নেই। তবে মেয়েদের চরিত্র, বুঝলেন কিনা।'

'এটাই কি সমস্যা?'

'না, না। আসল সমস্যাটা অন্য জায়গায়। আমার ধারণা, বিয়ের আগে বকুলের সঙ্গে সুশান্তর বেশ খানিকটা মাখামাখি হয়েছিল। ফলে বকুলের জীবনের কোনও গোপন কথা সুশান্ত জানে আর এখন সেই কথাটা ফাঁস করে দেবার ভয় দেখিয়ে সে বকুলকে ব্ল্যাকমেল করছে। কথা হচ্ছে, সেই গোপন কথাটা যত ভয়ঙ্করই হোক, আমি কিন্তু আমার স্ত্রীকে ছাড়ছি না। মুস্কিল হল, কথাটা বকুলের কাছে পাড়তেই পারছি না। এসব কথা বলতে গেলেই সে এমন গম্ভীর হয়ে যায় যে বেশি দূর আর এগুনো যায় না।'

'সুশান্ত বকুলকে ব্ল্যাকমেল করছে এমন ধারণা আপনার হল কেন?

কারণ প্রথমত ওই ভূতুড়ে টেলিফোন। আমার মনে হয় ভূতুড়ে টেলিফোন করে সে বকুলের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। হয়তো আমার অনুপস্থিতিতে বকুলকে ফোন করে সে ভয়ও দেখায়। আমি লক্ষ করে দেখেছি আজকাল টেলিফোন এলেই বকুল কেমন যেন ভয় পেয়ে যায়। তাছাড়া একদিনের ঘটনা বলি। সাধারণত সারা দিনটা আমি প্রেসেই কাটাই। বাড়ি ফিরতে সাড়ে আটটা নটা বেজে যায়। সেদিন শরীরটা ভালো লাগছিল না বলে দুপুরবেলায় বাড়ি ফিরে আসছিলুম। তাড়াতাড়ি ফিরব বলে বাড়ির পেছন দিকের রাস্তাটা দিয়ে শটকাট করছি এমন সময় দেখি আমাদের বাড়ির পেছন দিকের গলিতে বকুল দাঁড়িয়ে আছে আর তার কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আছে সুশান্ত। সুশান্তর হাতে একগোছা পাঁচশো টাকার নোট। আমাকে দেখে বকুলের মুখটা ভয়ে সাদা হয়ে গেল আর সুশান্ত চট করে পাশের গলিটায় গা ঢাকা দিল। ওই ভরদুপুরে ওখানে কী করছিল জিজ্ঞেস করতে বকুল আমতা আমতা করতে লাগল। মনে হল আরও চেপে ধরলে কেঁদেই ফেলবে। আমি আর তাকে খুব একটা ঘাঁটাতে সাহস পেলুম না।'

'আচ্ছা, আপনার স্ত্রী তো চাকরি করেন না। ব্ল্যাকমেলের টাকা তিনি পাবেন কোথায়?'

'দেখুন, টাকা-পয়সার ব্যাপারে আমি আমার স্ত্রীকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি। সংসার খরচের পুরো টাকাটাই তো তার হাতে। তার থেকে দশ-বিশ হাজার এদিক ওদিক হয়ে গেলেও টের পাব না। আপনাকে বললুম বটে আমার প্রেসটা ছোটখাট, কিন্তু আসলে প্রেসটা খুব একটা ছোট নয়। পাকা এবং ঠিকে মিলিয়ে ষাট-সত্তরজন কাজ করে আমার প্রেসে। মাসে তিন-চার লাখ টাকার কম আয় হয় না। যা আয় করি, স্ত্রীর হাতে তুলে দিই। ব্যাঙ্কট্যাঙ্ক-এর কাজগুলো বকুলই দেখে। প্রেসের কাজ সামলে আমি আর টাকাপয়সার ব্যাপারটা দেখে উঠতে পারি না। তাছাড়া টাকাপয়সা বাদ দিয়েও বকুলকে সুশান্ত অন্য কোনও ব্যাপারে বাধ্য করতে পারে।'

'ভয় দেখিয়ে কোনও নোংরা শারীরিক দাবি সুশান্ত করতে পারে এটাই বলছেন কি?'

মন্টুবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর চোয়াল শক্ত করে রুদ্ধস্বরে বললেন,

'সেটাই বলছি। ব্যাপারটা আমি অনেক ভেবে দেখেছি। আমার মনে হয়েছে সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে আমি নিশ্চিত যে, সেরকম কিছু ঘটে থাকলে বকুলের অনিচ্ছাতে তার অসহায়তার সুযোগ নিয়ে সুশান্ত ঘটিয়েছে।'

'আপনি আমাকে ঠিক কী করতে বলছেন?'

আপনার কাছে আমার দুটো অনুরোধ। একনম্বর, আপনাকে জানতে হবে বকুলকে সত্যি-সত্যি কেউ ব্ল্যাকমেল করছে কিনা। আর দু'নম্বর, করে থাকলে কীসের জোরে করছে? বলাই বাহুল্য, দু'টোরই প্রমাণ আপনাকে জোগাড় করতে হবে।'

জানলার দিকে তাকিয়ে আদিত্য খানিকক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল,

'আপনার কেসটা আমি নিলাম। আপনার ঠিকানাটা আমাকে দিয়ে যান।'

'এই যে আমার কার্ড। এতে আমার আপিস এবং বাড়ির ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, টেলিফোন নম্বর সবই আছে। বাড়ির যে টেলিফোন নম্বরটা কার্ডে দেওয়া আছে ওই নম্বরেই ফোনগুলো আসে। আপনার ফী-এর ব্যাপারটা তো বললেন না?'

'এখন হাজার দশেক অ্যাডভান্স দিয়ে যান। পরে আরও হাজার চল্লিশ লাগবে। তবে আপনার কাজ যদি না করে দিতে পারি, তাহলে গাড়িভাড়া এবং একটা সামান্য পারিশ্রমিক কেটে নিয়ে বাকিটা ফেরত দেব। চলবে তো?'

'খুব চলবে মশাই, খুব চলবে। টাকার ব্যাপারটা খোলাখুলি বলে নিলাম বলে কিছু মনে করবেন না। ব্যবসাদার মানুষ তো, টাকাকে ঠিক খোলামকুচি মনে করতে পারি না।'

মন্টুবাবু পকেট থেকে একটা পাঁচশো টাকার নোটের বান্ডিল বার করে গুনে গুনে দশ হাজার টাকা টেবিলের ওপর রাখলেন। আদিত্য টাকাটা ড্রয়ারে রেখে একটা রসিদ কেটে দিল।

'আচ্ছা, আজ আসি তাহলে?'

'আসুন। ও হ্যাঁ, আমার মোবাইল নম্বরটা নিয়ে যান। কিছু জানাবার থাকলে ফোন করবেন।'

'আপনার মোবাইল নম্বর আছে আমার কাছে। সুনন্দবাবুর কাছ থেকে পেয়েছি। ভেবেছিলুম ফোন করে আসব। কিছুতেই ফোনে পেলুম না। বলছে, আউট অফ সার্ভিস।'

'এবার পাবেন। নমস্কার।'

'নমস্কার।'

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

আপিস বন্ধ করে রাস্তায় এসে আদিত্য দেখল বৃষ্টি থেমে গেছে। বাড়ি ফেরার পথে যেসব আপিসযাত্রী বৃষ্টির জন্য আটকা পড়েছিল, তারা একটু একটু করে রাস্তায় নামছে। ফুটপাথে মানুষের ট্র্যাফিক জ্যাম। আদিত্য একবার ভাবল কোনও রেস্তোরাঁতে ঢুকে কিছু খেয়ে নেবে। পকেটে আজ টাকা আছে। কিন্তু সারাদিন কিছু না খেয়ে খিদেটা যেন মরে গেছে। তাছাড়া আপিস থেকে বেরোবার আগে শ্যামলের আনা চারটে বিস্কুট সে খেয়ে বেরিয়েছে। আদিত্য বউবাজার স্ট্রিটের ভিড় ঠেলে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে বিবাদী বাগে মিনিবাসের লাইনে দাঁড়াল। একডালিয়া রোডের মিনিবাস। সর্পিল লাইন এঁকেবেঁকে বহুদূর অব্দি চলে গেছে। একঘন্টার আগে বাস পাবার আশা নেই। আদিত্যর মেস হ্যারিসন রোড আমহার্স্ট স্ট্রিট মোড় থেকে মিনিট দুয়েক। এখন সে উল্টোদিকে যাবে। কাজ সেরে ফিরতে ফিরতে দশটা তো বাজবেই। তার মানে রাত্তিরের মিল বন্ধ হয়ে যাবে। অতএব মেসে ঢোকার আগে বাইরে কিছু খেয়ে নিতে হবে। সারাদিন না খেয়ে থাকলে শরীর টিকবে না। অবশ্য যেখানে যাচ্ছে সেখানেও খাবার জুটে যেতে পারে।

আজ মনটা খুব হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে কাজটা ইন্টারেস্টিং হবে। প্রথমে যখন এই লাইনে এল তখন পেটের তাগিদে যা করতে হত সেগুলো ছিল নেহাতই ছোটখাট কাজ। করতে ভালোও লাগত না। তারপর তার একটু নাম হল। কয়েকটা বড় কাজ জুটল। তবে এবারে অনেক দিন বসে থাকতে হয়েছিল তাকে। সেদিক থেকে দেখলে এখন কিছুদিনের জন্য নিশ্চিন্ত। আদিত্য ভাবল, বাবা বেঁচে থাকলে কী বলত। নিশ্চয় তার এই কাজকে খুব একটা ভালো চোখে দেখত না। গোয়েন্দাগিরি দূরে থাক তার সাতপুরুষে কেউ পুলিশেও চাকরি করেনি। শুধু পুলিশে কেন, কোনও চাকরিই তার সাতপুরুষ করেনি। হয়তো সেই জন্যই তার আজ এই অবস্থা। পুরোনো জমিদারির জমা টাকায় কতদিন চলবে?

মাকে আদিত্যর মনেই পড়ে না। কিন্তু মায়ের অভাব বাবা তাকে কোনোদিন বুঝতে দেয়নি। ছোটবেলায় তার জীবনের সবটুকু জুড়ে ছিল তার বাবা। আর তার বাবার জীবনেও সে ছাড়া আর কেউ ছিল না। ছোটবেলায় আদিত্য জানত তারা খুব বড়লোক। বাড়িতে ঠাকুর-চাকর-দরোয়ান গিজ গিজ করত। বাড়ির গ্যারেজে দু'দু'টো বিদেশি গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকত। ইস্কুলের ছুটি পড়লে ফার্স্টক্লাশ কামরা রিজার্ভ করে বেড়াতে যাওয়া হত। প্রত্যেকবার একই জায়গায়। মধুপুরে। মধুপুরে তখন তাদের একটা মস্ত বড় বাড়ি ছিল। বাইরের ঠাটবাট বজায় থাকলেও ভেতরটা যে ক্রমশ ঝাঁঝরা হয়ে আসছে সেটা সেই বয়সে তার বোঝার কথা নয়।

বাবা তাকে কলকাতার দামি সাহেবি ইস্কুলে পড়িয়েছিল। তবে ইস্কুলের থেকেও ইস্কুলের বাইরে অনেক বেশি শিখেছিল সে। গানবাজনা, সাঁতার, শরীরচর্চা, সাহিত্যপাঠ কিছুই বাদ যায়নি। দেশ স্বাধীন হবার আগে আলোকপ্রাপ্ত জমিদার-পুত্ররা যেভাবে বড় হত ঠিক সেভাবেই সে বড় হচ্ছিল। পড়াশোনায় সে কোনোদিনই খারাপ ছিল না। ইস্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে অঙ্ক অনার্স পড়তে ঢুকেছিল। অঙ্ক নিয়ে কলেজে ভর্তি হবার পেছনেও বাবা। অঙ্কের বাজার খারাপ, অঙ্ক নিয়ে পাশ করলে চাকরি পাওয়া যায় না, এসব কথা তার বন্ধুরা বলাবলি করত। কিন্তু বাবা বলত, যেটা ভালো লাগে সেটাই পড়। আসলে বিদ্যে বেচে পেট চালানোর কথা তাদের পরিবারে কেউ কখনো ভাবেনি। আর ছোটবেলা থেকেই অঙ্ক জিনিসটা আদিত্যর বেশ ভালো লাগত। কলেজে পড়ার সময় সে স্বপ্ন দেখত বড় হয়ে গাউস বা অয়লারের মত মস্ত ম্যাথামেটিশিয়ান হবে।

বি এসসি পাশ করার পর যখন তার কেম্ব্রিজে পড়াশোনা করতে যাওয়া প্রায় পাকা তখন হঠাৎ বাবা মারা গেল। বাবার মৃত্যুর মাস খানেকের মধ্যেই আদিত্য তাদের আসল অবস্থাটা বুঝতে পারল। ধার, ধার, চারদিকে শুধু ধার। কলকাতার বাড়ি তিনটে, মধুপুরের বাড়িটা সবই দেনার দায়ে বাঁধা পড়েছে। বাড়িগুলো গেল, গাড়িদুটোও, স্থাবর অস্থাবর যা কিছু ছিল প্রায় সবই গেল। ছ'মাসের মধ্যে আদিত্য পথে বসল। ঈশ্বর জানেন, এ নিয়ে তার মনে বিন্দুমাত্র ক্ষোভ নেই। হয়ত ছোটবেলা থেকে প্রাচুর্যের মধ্যে বড় হয়েছিল বলে বিত্তের ব্যাপারে তার একটা নিরাসক্তি এসে গিয়েছিল। শুধু বিলেত যাওয়াটা হল না বলে তার মনের কোণে এখনও কিছুটা দুঃখ রয়ে গেছে।

দারিদ্রের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তার যে প্রথম প্রথম একটু অসুবিধে হয়নি তা নয়। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর বছর দুয়েক বাবার অভাবটা এমন তীব্রভাবে তার মন জুড়ে থাকত যে শারীরিক কোনও অস্বাছন্দ সে তেমন টের পেত না। যখন বাবার মৃত্যুর আঘাতটা একটু একটু করে সয়ে এল ততদিনে দারিদ্রটাও মোটামুটি অভ্যেস হয়ে গেছে। তবে মেসবাড়ির বাথরুমটা অনেকদিন পর্যন্ত তার ভীষণ নোংরা লাগত। বহুদিন পর্যন্ত বন্ধুবান্ধবের বাড়ি গিয়ে বাথরুম সেরেছে সে। এখন অবশ্য সেটাও অভ্যেস হয়ে গেছে।

আদিত্য যে কী করে এই অদ্ভুত গোয়েন্দাগিরির লাইনে এল সেটা তার নিজেরও ভালো করে মনে পড়ে না। বাবার মৃত্যুর পর তার জীবনটা একেবারে ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছিল। গত দশ-পনেরো বছর সে নানা ঘাটের জল খেয়েছে। পয়সার অভাবে এম এসসি-টা পড়া হয়নি। পেট চালানোর জন্য বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ছাত্র পড়িয়েছে, একটা ইস্কুলেও বদলি হিসেবে কাজ করেছে। কিছুদিন, তা প্রায় বছর দেড়েক হবে, এক জাদুকরের সাকরেদি করেছে, এক বছর ঝাড়গ্রামের কাছে এক জঙ্গলে ফরেস্ট গার্ডের কাজ করেছে। কয়েক বছর একটা বেসরকারি আপিসে কেরানিগিরিও করেছে। কোনও কাজই তার ভালো লাগেনি। আসলে দশটা-পাঁচটা চাকরির ব্যাপারটা তার রক্তে নেই। চাকরি-বাকরি ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় বসে আছে, এমন সময় একদিন তার সঙ্গে সুনন্দ সরকারের দেখা। সুনন্দ সরকার আদিত্যর সঙ্গে ইস্কুলে পড়ত। ওরা তিন পুরুষের ক্রিমিনাল লইয়ার। সুনন্দই তাকে একটু একটু করে এই লাইনে নিয়ে এসেছে। প্রথমে ছোটখাট কাজ। বেশির ভাগই ডিভোর্স কেস সংক্রান্ত। স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীর জন্য, স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামীর জন্য প্রমাণ সংগ্রহ করার কাজ। করতে যে খুব একটা ভালো লাগত তা নয়। কিন্তু টুকটাক রোজগার হত। পেট চলে যেত। ইদানীং কয়েকটা জটিল সমস্যার সমাধানে পুলিশকে সাহায্য করার পর তার কিছুটা সুনাম হয়েছে। তবে টাকাপয়সার সমস্যাটা রয়েই গেছে। সুনন্দর পরামর্শমতো বছরখানেক হল এই আপিসটা ভাড়া নিয়েছে আদিত্য। সুনন্দরই এক ক্লায়েন্ট পুরোনো ভাড়ায় ঘরটা সাবলেট করেছে আদিত্যকে। মোটে দু'হাজার টাকা ভাড়া। তাও সে মাঝে মাঝে সময়মতো দিয়ে উঠতে পারে না।

একডালিয়া রোডের মিনিবাসটা যখন আদিত্যকে বালিগঞ্জ ফাঁড়ির মোড়ে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল তখন সোয়া আটটা বেজে গেছে। কোয়ালিটির পাশের গলিটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে আদিত্য বালিগঞ্জ প্লেসে এসে পড়ল। বৃষ্টির জন্য রাস্তাঘাট ফাঁকা। শুধু একটা ক্যারি আউট চিনে খাবারের দোকানের সামনে দু-একজন অপেক্ষা করছে। আর একটু এগিয়ে একটা মনিহারি দোকান। আদিত্য সেখান থেকে একটা বড় চকোলেট বার কিনল। তারপর রাস্তা পেরিয়ে ঢুকে পড়ল উল্টোদিকে একটা সাততলা বাড়ির ভেতর। লিফটে উঠে ছ'নম্বর বোতামটা টিপতে যাবে তার আগেই ভীষণ মোটা একজন মহিলা অসম্ভব ছোট একটা কুকুর কোলে নিয়ে হাঁসফাঁস করতে করতে লিফটে এসে উঠলেন। তিনজন কিশোরীও কলকল করে কথা বলতে বলতে লিফটে উঠল। লিফটে এত কম জায়গা যে কুকুরের মুখটা আদিত্যের গায়ে ঠেকছে। কুকুর নিয়ে আদিখ্যেতা আদিত্য একদম পছন্দ করে না। পাঁচতলায় কুকুরসহ ভদ্রমহিলা নেমে যাওয়া অব্দি আদিত্য ভয়ে সিটিয়ে রইল। কুকুরটা যদি চেটে দেয়। ছ'তলায় আদিত্যর সঙ্গে সঙ্গে মেয়েগুলোও নামল। নেমে বাঁদিকে বেঁকে গেল। আদিত্য ডানদিকে বেঁকে করিডোর ধরে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ৬০২ নম্বর ফ্ল্যাটে বেল বাজাল।

যে দশ বছরের শ্যামলা ছেলেটা কিছুক্ষণ বাদে দরজা খুলে দিল তার হাতে একটা খোলা ডটপেন। বোঝা যায় লেখাপড়া করছিল। আদিত্যকে দেখে তার মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। সে হইহই করে উঠল,

'আদিত্যকাকু এসেছে। বাবা আদিত্যকাকু এসেছে।'

আদিত্য চকোলেট বারটা ছেলেটার হাতে তুলে দিয়ে বলল,

'টুপলুবাবু এটা তোমার। ইস্কুল-টিস্কুল সব ঠিকঠাক চলছে তো?'

চকোলেট পেয়ে টুপলুবাবুর মুখে একরাশ দাঁত বেরিয়ে পড়ল। ওপরের সারির দাঁতের দু'কোণে দু'টো গজদাঁত।

'থ্যাংকিউ আদিত্যকাকু, তুমি এখন অনেকক্ষণ থাকবে তো?'

'অনেকক্ষণ থাকব।'

বাড়ির ভেতর থেকে পুরুষকন্ঠ শোনা গেল,

'আদিত্য বোস। আমি আসছি। টুপলু তুমি তোমার ঘরে গিয়ে কালকের হোম-ওয়ার্কটা করে নাও। হয়ে গেলে আদিত্যকাকুর সঙ্গে গল্প করবে।'

আদিত্য যে ঘরটায় দাঁড়িয়েছিল সেটা এই ফ্ল্যাটবাড়ির বসার ঘর। একদিকে কয়েকটা বেতের চেয়ার, টেবিল, উল্টোদিকে নিচু একটা ডিভান, তিনদিকের দেয়াল জুড়ে বইয়ের র‍্যাক ছাত পর্যন্ত উঠে গেছে। অসংখ্য বই, কিছু বইয়ের র‍্যাকে জায়গা হয়নি, তারা ডিভানের ওপরে স্থান পেয়েছে। মেঝেতে দাঁড় করানো দু'টো বাঁকুড়ার ঘোড়া, একপাশে একটা জাপানি সাউন্ড সিস্টেম, ক্যাবিনেটের ভেতর প্রচুর রেকর্ড, টেপ, সিডি। আদিত্য পায়ের কাবলি জুতোটা খুলে ডিভানের ওপর জায়গা করে নিয়ে পা তুলে আরাম করে বসল।

'কী ব্যাপার, দশ-পনের দিন তোর খবর নেই, মোবাইল অফ করে রেখেছিলি কেন?' এবার রান্নাঘরের অন্তরাল থেকে নারীকন্ঠ শোনা গেল।'

'মোবাইলে পয়সা ফুরিয়ে গিয়েছিল। পকেটেও। আজ পয়সা ভরলাম।'

'মক্কেল পেয়েছিস নাকি?' বলতে বলতে যে মহিলা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তাঁকে সুন্দরী বলবার জন্য কষ্ট করতে হয় না। কিন্তু রূপ ছাড়াও তাঁর চেহারায় একটা সহজ ব্যাক্তিত্ব আছে। অচেনা আধচেনা লোক চট করে তার কাছে ঘেঁসতে সাহস পাবে না।

'আজ তুই রান্নাঘরে কেন? বিশেষ কেউ খাবে নাকি? আমি কিন্তু তাহলে কাটব।' আদিত্য শঙ্কিত গলায় বলল।

'কেউ খাবে না। তুই বোস। আমাদের কলেজের শিপ্রাদির বাড়িতে চিকেন বাগদাদি খেয়েছিলাম। রেসিপি নিয়ে আজ রাঁধছি। তুই এসে খুব ভালো হল। রাত্তিরে খেয়ে যাবি।'

'নিশ্চয় খাব। তবে এখন একটা ডিম-টিম কিছু ভেজে দে। ভয়ঙ্কর খিদে পেয়েছে। সারাদিন ভারচুয়ালি কিছু খাওয়াই হয়নি।'

'রত্না বলছিল তুই নাকি সন্ন্যাসী হয়ে হিমালয়ে চলে গেছিস।' বলতে বলতে এবার বাড়ির কর্তা ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। 'শুনে টুপলুর কী কান্না।'

কর্তা-গিন্নী দুজনেই আদিত্যর সহপাঠী। রত্না, পোশাকি নাম রত্নাবলী মিত্র, প্রেসিডেন্সিতে ইতিহাস পড়ত। গত এগারো বছর কলকাতার একটা নামজাদা মেয়েদের কলেজে মাস্টারি করছে। তার স্বামী অমিতাভ মিত্র, কলেজ থেকে আদিত্যর বুসুম বাডি, অধুনা দেশের প্রথিতযশা ঐতিহাসিকদের অন্যতম। বাংলা করে বলতে গেলে, অল্প বয়সেই বেজায় নাম করেছে। রত্না-অমিতাভ-টুপলুই আদিত্যর একমাত্র পরিবার, যদিও ভবঘুরে স্বভাবের জন্য সে সব সময় এবাড়িতে এসে উঠতে পারে না। রত্না উঠে পড়ল। আদিত্যর জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করতে গেল।

'শোন একটা দরকার আছে। ভুলে যাবার আগে বলে রাখি। তোদের হাউসিং সোসাইটিতে কাজ করত, সেই যে ছেলেটা, নাম বোধহয় বিমল না কি যেন, একবার আমাকে খুব হেল্প করেছিল। সে কি এখনও আছে?'

'কে? বিমল গায়েন? না সে আর নেই। নতুন কমিটি তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তবে আমার কাছে মাঝে মাঝে আসে। পঞ্চাশ-একশো টাকা নিয়ে যায়। কষ্টে আছে।'

'একটা মোবাইল নম্বর দিয়েছিল না?' রান্নাঘর থেকে রত্নার গলা শোনা গেল।'

'হ্যাঁ, দিয়েছিল বটে। কখনও ফোন করিনি। তুই করে দেখতে পারিস।' অমিতাভ বলল।

'ঠিক আছে।'

'নতুন কাজ পেলি?'

'একটা পেয়েছি। আজই পেলাম। বেশ ইন্টারেস্টিং। বিমলকে লাগবে। ভাবছি ক'টা দিন গা ঢাকা দেব।'

'ছদ্মবেশি গোয়েন্দা? দু'হাতে দু'টি উদ্যত পিস্তল, অপর হাতে টর্চ?'

'বলতে পারিস। তবে পিস্তল-টিস্তল নেই। একটা টর্চ খোঁজাখুঁজি করলে বেরোতেও পারে। নতুন গান-টান শুনলি?'

'এবার বম্বে গিয়ে সায়নি মুধোলকর বলে একটা বাচ্চা মেয়ের গান শুনলাম। আমাদের এক বন্ধুর বাড়িতে গাইল। গোয়ালিয়র, জয়পুর দুটো ঘরেই শিখেছে। বড় করে শুদ্ধ সারং গাইল, তারপর ছোট করে গৌড় সারং, বৃন্দাবনী সারং। বেশ গায়। তুই কিছু শুনলি?'

'আমি আর নতুন কী শুনব? সেই পুরোনো আমীর খাঁ, আলি আকবর, নিখিল। নতুন কিছু শোনার ইচ্ছে থাকলেও হয়ে ওঠে না। তুই বিমলের নম্বরটা দে।'

অমিতাভ নম্বর খুঁজতে ভেতরে গেল। রত্না প্লেটে একটা ডিমের পোচ, দুটো টোস্ট আর কিছু পটেটো চিপস নিয়ে এসেছে।

'এটা খেয়ে নে। চা হচ্ছে। বেশি দিলাম না, তাহলে রাত্তিরে খেতে পারবি না। তুই খা, আমি রান্নাটা দেখে আসি।'

আদিত্য খেতে খেতে বাঁ হাতে পকেট থেকে একটা সস্তার মোবাইল বার করল। তারপর পকেট হাতড়ে মন্টুবাবুর কার্ডটা। মন্টুবাবুর নম্বরটা লাগানোর কিছুক্ষণ পরে ওপাশ থেকে শব্দ শোনা গেল, 'হ্যালুউউউ'?

'আমি আদিত্য মজুমদার বলছি। কথা বলা যাবে? আশেপাশে কেউ আছে?'

'কেউ নেই। আমি আপিসে একা। বলুন।'

'ভেবে দেখলাম আপনার টেলিফোন রহস্য ভেদ করতে গেলে কিছুদিন আপনার বাড়িতে থাকতে হবে। বলাই বাহুল্য, ছদ্ম-পরিচয়ে। আপনার দূর সম্পর্কের ভাই-টাই কেউ আছে? যাকে আপনার স্ত্রী কখনও দেখেননি?'

ওপারে বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধতা। লাইনটা কেটে গেল নাকি? আদিত্য গলা তুলে বলল,

'হ্যালো?'

'হ্যাঁ, একটু ভাবছিলাম। আমার দিকে তেমন কেউ নেই। তবে আমার মেয়ের এক দেওর আছে। ভিলাইতেই থাকে। আমরা কখনও দেখিনি। একবার বলেছিল কী একটা ট্রেনিং নিতে কলকাতায় আসবে। দিনকতক আমাদের বাড়িতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত আর আসেনি।'

'আপনার মেয়ের দেওর সাজতে গেলে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি সম্বন্ধে একটু জানতে হবে। কোনও ছবির এলবাম থাকলে পাঠিয়ে দেবেন। লোকগুলোকে চিনে নিতে হবে। শুধু আপনার মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকদের নয়। আপনার পাড়াপড়শিদের ছবিও দু'চারটে পাওয়া গেলে ভালো হয়।'

'এলবামগুলো বকুলের জিম্মায় থাকে। বার করে আনা মুস্কিল। দেখি কী করা যায়। কবে থেকে থাকতে চান?'

'সপ্তাহখানেক পর থেকে। হাতে দু'একটা কাজ আছে, সেরে আসতে হবে। আপনাকে দু'তিনদিন আগে জানাব। আপনি এখন থেকেই বাড়িতে একটু আভাস দিয়ে রাখুন।'

'ঠিক আছে। আমি দেখছি ছবির কী করতে পারি।'

'নমস্কার।'

'নমস্কার।'

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলেও গরমটা কাটছে না। আকাশ এখনও মেঘলা। যেকোনও সময় আবার বৃষ্টি আসতে পারে। আদিত্য চিত্তরঞ্জন হাসপাতালের সামনে বাস থেকে নেমে হাসপাতালের পাশের রাস্তায় ঢুকে পড়ল। সারি সারি ওষুধের দোকান, রুগিদের বাড়ির লোকজনের জটলা। একটু এগিয়ে একটা টেলিফোন বুথ। এই সাতসকালেই একজন ফোন করছে। আজকাল সকলেরই তো মোবাইল আছে, টেলিফোন বুথ থেকে ফোন করে কারা? বুথের উল্টোদিকের ফুটপাথে কচুরির দোকান। মস্ত কড়ায় কচুরি ভাজছে। পাশে রসের কড়ায় জিলিপি। দোকানে প্রচণ্ড ভিড়। শালপাতায় কচুরি-তরকারি নিয়ে আদিত্য রাস্তার একধারে দাঁড়াল। চমৎকার বানিয়েছে। তবে অম্বলের সম্ভাবনাও প্রবল। কচুরির পর জিলিপি। তারপর চা। পাশেই চায়ের দোকান। চায়ে চুমুক লাগাতে লাগাতে আদিত্য গুনে দেখল সে এখানে দাঁড়ানোর পর থেকে আরও চারজন লোক টেলিফোন বুথ ব্যবহার করেছে। তবে কেউই খুব বেশি সময়ের জন্য নয়। চা শেষ করে আদিত্য পুবদিকে হাঁটতে লাগল। ঘিঞ্জি রাস্তা সাপের মতো এঁকেবেঁকে রেল লাইন পর্যন্ত পৌঁছেছে। চারদিকে দিন শুরুর ব্যস্ততা। আদিত্যর মনে পড়ল জীবনানন্দের সেই পংক্তি, 'মানুষের ঘন বসতির ভিড় নিরুত্তেজ রোদের ভিতরে/ ছড়ায়ে রয়েছে প্রাচী, অবাচীর, উদীচীর দিকে'। এখন অবশ্য নিরুত্তেজ বা তেজি কোনও রোদই নেই। বরং যেকোনও মুহূর্তে আবার বৃষ্টি নামার সম্ভাবনা।

আর একটু এগোতে সত্যি সত্যিই বৃষ্টি নামল। বেশ বড় বড় ফোঁটা। আদিত্যর সঙ্গে ছাতা নেই। সে দ্রুত পায়ে হেঁটে, খানিকটা দৌড়ে, একটা আধা তৈরি হওয়া বাড়ির ভেতর আশ্রয় নিল। বাড়ির বাইরের কাঠামোটা শুধু উঠেছে, ভেতরটা প্রায় ফাঁকা। মনে হয় বেশ কিছুদিন কাজকর্ম বন্ধ আছে। এখানে ওখানে রাবিশ, জঞ্জাল। একতলার এককোণে একটা ইঁট বার করা ঘর। বোধহয় একসময় ওভারশিয়ারবাবু এই ঘরে বসে কুলিদের মাইনেপত্র দিতেন, কাজের হিসেব রাখতেন। এখন ঘরটা ফাঁকা। বাইরে বৃষ্টিটা আরও জাঁকিয়ে এল। আদিত্য পায়ে পায়ে বাড়ির ভেতরে আর একটু এগিয়ে গিয়ে দেখল, দু'টো অল্পবয়সি ছেলে স্তূপীকৃত জঞ্জালের ওপর জবুথবু হয়ে বসে আছে। আদিত্যকে এগিয়ে আসতে দেখে তাদের একজন ঘোলাটে চোখ তুলে তাকাল। দৃষ্টিতে প্রাণ নেই। অন্যজনের মাথা এখনও নোয়ানো।

হঠাৎ তাদের পেছন থেকে আবির্ভূত হলেন এক বলিষ্ঠ চেহারার মহিলা যাকে মহিলা না বলে মেয়েমানুষ বলাটাই সমীচীন। নিকষ কালো রঙ, বেশ লম্বা-চওড়া, পরনে ক্যাটক্যাটে হলুদ রঙের স্লিভলেস চুড়িদার। বাহুতে শৈশবের টিকে ওঠা দাগের ওপর সোনার মাদুলি। পানের রস ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে গলে থুতনিতে নেমেছে।

'ক্যা কাম হ্যায়? কী চাই?' খ্যানখ্যানে গলায় মেয়েমানুষটি বলল।

'কাম কুছ নেহি হ্যায়। বৃষ্টির জন্য আটকে গেছি।' আদিত্য মিনমিনে গলায় বলল।

'অন্দর কিঁউ ঘুসা? আপনা বাপকা মকান সমঝা ক্যা?'

অপমানে আদিত্যর কানদু'টো ঝাঁঝাঁ করে উঠল। কিন্তু উত্তর দেবার আগেই মেয়েমানুষটা চেঁচিয়ে উঠল, 'আব্দুল, এ আব্দুল। এক সালা জাসুসকা বচ্চা অন্দর ঘুস আয়া। তু আকে দেখ।'

ডাক শুনে বাড়ির পেছন দিক থেকে মাঝারি উচ্চতার এক ব্যক্তি বেরিয়ে এল। সঙ্গে আর একজন। আদিত্য মনে মনে ঠিক করে নিল প্রথমজনই আব্দুল। আব্দুল আদিত্যকে অনেকক্ষণ জরিপ করল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল, 'এখানে কী দরকার?'

'বৃষ্টিতে আটকে পড়েছি ভাই।' আদিত্য নিরীহ গলায় বলল।

'আপনাকে আগে তো পাড়ায় দেখিনি। কোথায় যাবেন?'

'হিঙ্গন জমাদার লেন। লাইনের ওপারে।'

'কত নম্বরে যাবেন? কার বাড়ি?'

'সাতাশ নম্বরে, মন্টুবাবুর বাড়ি। আমি ওর মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোক। ভিলাইতে থাকি।'

আব্দুল কিছুক্ষণ ভাবল। আরও একবার আদিত্যকে জরিপ করে নিল। তারপর বলল, 'সোজা চলে যান। এ পাড়াটা ভালো নয়। যেখানে সেখানে ঢুকবেন না। একটা রেল লাইন পেরিয়ে আর একটা রেল লাইনের গায়েই হিঙ্গন জমাদার লেন।' আব্দুলের গলাটা প্রায় ভদ্র শোনাল।

বৃষ্টি এখনও সমানভাবে ঝরে যাচ্ছে। এখন বেরোলে একেবারে ভিজে যেতে হবে। তবু এই ঝুট-ঝামেলার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে বেরিয়ে পড়াই ভালো। রাস্তার দিকে এগোতে এগোতে আদিত্য আড়চোখে দেখল, পাথরের মতো বসে থাকা ছেলে দু'টোর একজন মেঝেতে শুয়ে পড়েছে। তার মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে। মরে-টরে যাবে না তো? আদিত্য একবার ভাবল দাঁড়িয়ে গিয়ে ছেলেটাকে সাহায্য করে। পরমুহূর্তেই তার মনে হল এখানে দাঁড়িয়ে গেলে বিপদ আছে। এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে ছেলে দু'টো ড্রাগ নিয়েছে। আর যে অর্ধনির্মিত বাড়িটাতে সে ঘটনাচক্রে ঢুকে পড়েছে সেটা ড্রাগ ব্যবসায়ীদের একটা গোপন আস্তানা। খুব গোপন অবশ্য নয়। প্রায় রাস্তার ওপরেই খোলাখুলি ড্রাগের ব্যাবসা চলছে। আশ্চর্য। আদিত্য বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে পড়ল। খানিকটা এগিয়ে পিছন দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল আব্দুল ও তার সাথী সেই বাড়িটার ভেতর থেকে স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

একটু আগে মন্টুবাবুর লোক এসে একটা খাম দিয়ে গেছে। খামের ভেতর দু'টো পুরোনো ছবি আর একটা চিঠি। একটা ছবিতে শিশু কোলে একটি পৃথুলা যুবতী। অন্য ছবিতে জনা কয়েক পুরুষ ও মহিলা একটা নদীর ধারে সার বেঁধে খেতে বসেছে। চিঠিতে মন্টুবাবু লিখেছেন,

মাননীয় আদিত্যবাবু,

আপনার কথামতো দু'টি ছবি পাঠালাম। একটি ছবি চড়ুইভাতির। বিয়ের আগে বকুল পরিবারের সকলের সঙ্গে কোলাঘাটে পিকনিক করতে গেছিল, এটা সেই সময় তোলা। পিকনিকে পাড়ার কয়েকজনও ছিল। এটা একটা পুরোনো ব্যাগের মধ্যে অন্যান্য কাগজপত্রের সঙ্গে পেলাম। ছবিতে বাঁদিক থেকে তিন নম্বর ব্যক্তি আমার ছোট শ্যালক দেবীরঞ্জন, তার ডান পাশে সুশান্ত এবং সুশান্তর ডানপাশে বকুল। লাইনের একেবারে শেষে বকুলের বড়দা রজনীরঞ্জন। দ্বিতীয় ছবিটা আমার কন্যা সুলতার। কোলে আমার নাতি। ছবিটা নাতির অন্নপ্রাশনের সময় তোলা। আমি গিয়ে উঠতে পারিনি, তাই ছবি তুলে পাঠিয়ে দিয়েছিল। বকুলকে বলেছি আমার মেয়ের দেওর ভিলাই থেকে আসছে। ক'টা দিন থাকবে। বকুল সহজভাবেই নিয়েছে। কুশল জানবেন। কবে আসছেন কয়েকদিন আগে জানালে ভালো হয়।

ইতি

জিতেন্দ্রনাথ দত্ত (মন্টুবাবু)

'আমাকে ডেকেছিলেন স্যার?' অফিসের দরজাটা ঈষৎ ফাঁক করে বিমল উঁকি মারল।

'হ্যাঁ, তোমার বন্ধুর মোবাইলে ফোন করেছিলাম। বোসো।'

'বন্ধু নয় স্যার, আমার ইস্ত্রির দাদা। ওকে ফোন করে দিলে আমি খবর পেয়ে যাই।' বিমল বসতে বসতে বলল।

'ইস্ত্রির দাদা? তোমার বিয়ে হয়ে গেছে নাকি?'

'সে কি আজকে স্যার? গোঁফ ওঠার আগেই বাবা বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন।'

'ছেলেপুলে? তাও আছে?'

'তা স্যার বিয়ে হলে তো ছেলেপুলে হওয়াটাই দস্তুর। আমারও হয়েছে পছন্দসই দু'পিস। একটা ছেলে, একটা মেয়ে।'

'তাহলে তো তোমার সুখের সংসার।'

'তা আপনাদের আশীর্বাদে সংসারে সুখের অভাব নেই। তবে কিনা মাঝে মধ্যে ডাল-ভাতের অভাব হয়। এখন যেমন অভাব চলছে। মাস ছ'য়েক হয়ে গেল চাকরিটা চলে গেছে স্যার।'

'চলছে কী করে?'

'এই টুকটাক কাজ করে চালাচ্ছি স্যার। গিন্নিকেও একটু আধটু সেলাই-ফোঁড়াই-এর কাজ করতে হয়।'

'শোনো, তোমার জন্য একটা কাজ আছে। টিকটিকির কাজ। আগে যেমন দু'একবার করে দিয়েছ। পারবে?'

'নিশ্চয় পারব স্যার। ব্যাপারটা বলুন।'

আদিত্য পিকনিকের ছবিটা বিমলের হাতে দিল।

'ছবির বাঁ দিক থেকে তিন এবং চার নম্বরের ওপর নজর রাখতে হবে। তিন নম্বরের নাম দেবীরঞ্জন বসাক, চার নম্বর সুশান্ত হালদার। তারা কোথায় যায়, কী করে সব জানাবে। তবে খুব সাবধানে কাজ করতে হবে। দুজনেই জেল-ফেরত দাগি আসামি। সঙ্গে অস্ত্র-টস্ত্র থাকাও বিচিত্র নয়।'

'আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন স্যার। শুধু বলুন ওরা থাকে কোথায়।'

'চিত্তরঞ্জন হাসপাতালের গা দিয়ে যে রাস্তাটা এঁকেবেঁকে রেল লাইন অব্দি চলে গেছে সেটা পেরিয়ে আর একটা রেল লাইন। এই দ্বিতীয় রেল লাইনটার ধারে এদের সাইবার কাফে। চেনা খুব সোজা। আমি একবার গিয়ে দেখে এসেছি। ও-চত্বরে আর কোনও সাইবার কাফে নেই। এই কাগজটা রাখ। এতে নাম ঠিকানা সব লেখা আছে।'

'রাখছি স্যার, তবে ও আমার লাগবে না। একবার শুনলেই সব মনে থাকে।'

'ছবিটার একটা কপি করবে। আজকাল ডিজিটাল ফটোর দোকান হয়েছে। বউবাজারেই দু'চারটে আছে। ওখানে গেলেই কপি করে দেবে। কপিটা নিজের কাছে রেখে আসলটা আমাকে ফেরত দিয়ে যাবে। আর একটা কথা। মেডিকেল কলেজের উল্টোদিকে আরপুলি লেনে মন্টুবাবুর প্রেস। মন্টুবাবু এবং তার প্রেস সম্বন্ধে যাবতীয় খবর জোগাড় করবে।'

'ঠিক আছে স্যার। আজ উঠি?'

'দাঁড়াও। এই টাকাটা নাও। দু'হাজার আছে। তোমার অ্যাডভান্স। আর এই নাও আরও একশো টাকা। ছবি কপি করার খরচ।'

'থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। খুব উপকার হল স্যার।'

বিমলের চোখ দু'টো কৃতজ্ঞতায় চিকচিক করে উঠল।

আজকাল লালবাজারে ঢোকার নানান হ্যাপা। ঢোকার মুখে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আগে মোবাইল জমা রাখতে হবে। তারপর কম্পিউটারে নাম এন্ট্রি। বলতে হবে কোন ডিপার্টমেন্টে যেতে চাই। কেন যেতে চাই। যার কাছে যেতে চাই তার অনুমতি আছে কিনা। আগে কয়েকবার এইভাবেই আদিত্যকে ঢুকতে হয়েছে, তাই আদিত্য জানে। ইদানীং অবশ্য অত সব কিছু করতে হয় না। আদিত্যর কলেজের সহপাঠী গৌতম দাশগুপ্ত, জাঁদরেল আইপিএস অফিসার, কয়েক বছর হল জেলা থেকে বদলি হয়ে লালবাজারে এসেছে। আদিত্য মাঝে মাঝেই গৌতমের কাছে সাহায্যের জন্য আসে। গৌতম গেটে বলে রেখেছিল। আদিত্য নাম বলতেই গেটের পুলিশ মহা খাতির করে তাকে ভেতরে ঢুকিয়ে নিল। একজন সাদা পোশাকের পুলিশকে বলল, 'স্যারকে দোতলায় পৌঁছে দিয়ে এস।'

দোতলায় ওয়েটিং রুম, এয়ার কন্ডিশন চলছে। কয়েকজন বসে রয়েছে, আদিত্য একপাশে গিয়ে বসল। সেন্টার টেবিলে কয়েকটা ম্যাগাজিন, খবর কাগজ। লালবাজারের ভেতরে এমন একটা ঘর আছে সে-ই কি আগে জানত? বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। মিনিট দু'তিন পরেই একজন লম্বা-চওড়া অবাঙালি লোক, সে-ও নিশ্চয় পুলিশ, দরজার গোড়ায় এসে বলল, আদিত্য মজুমদার কে আছেন, স্যার ডাকছেন।

দরজার বাইরে পেতলের ফলকে লেখা গৌতম দাশগুপ্ত, আইপিএস, জয়েন্ট কমিশনার, ক্রাইম। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে না ঢুকতেই গৌতমের গমগমে গলা শোনা গেল, 'আয়, আয়, কোথায় ডুব মেরেছিলি?'

কলেজে পড়ার সময় গৌতম চোখ বুজে খুব ভাব-টাব দিয়ে জর্জ বিশ্বাসের স্টাইলে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইত। তখন কে ভেবেছিল সে পুলিশ হবে?

মস্ত বড় ঘর। তার সঙ্গে মানানসই টেবিল। টেবিলে গোটা চারেক টেলিফোন। ডানদিকের দেয়ালে সাহেবি আমলের পুলিশ কর্তাদের ছবি। বাঁ দিকের দেয়ালে দিশি কর্তাদের। আদিত্য লক্ষ করেছে, ডানদিকে সাহেবদের ছবিগুলোর মধ্যে একজন দিশি লোকের ছবিও আছে।

'তুই আমাকে না দেখলেও তোকে আমি মাঝেমাঝেই টিভিতে দেখি।' আদিত্য বসতে বসতে বলল। 'তোর চেহারাটা কিন্তু দিন দিন ভারিক্কি হচ্ছে।'

'তুই আগের মতোই রয়ে গেলি। রোগা, টাফ। শরীরচর্চা করিস এখনও?'

'খানিকটা করি। বাকিটা বাসে-ট্রামে যাতায়াত করলেই হয়ে যায়।'

'তোর সমস্যাটা বল। টেলিফোনে বললি বলতে সময় লাগবে। তোর জন্য একঘণ্টা রেখেছি। সাড়ে চারটেয় মিটিং আছে। চা খাবি তো?'

গৌতম বেল বাজিয়ে বেয়ারাকে ডাকল। যখন টি ব্যাগ সহ দু'কাপ গরম জল এসে পৌঁছল, ততক্ষণে আদিত্য তার সমস্যার কথা বলতে শুরু করেছে।

গৌতম আদিত্যর কথাগুলো ভীষণ মন দিয়ে শুনছে। এত মন দিয়ে আগে কখনও শুনেছে কিনা আদিত্যর মনে পড়ছে না। চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে ঘড়িতে সোয়া চারটে বেজে গেল।

আদিত্য বলছিল, 'তুই দেবী বসাক আর সুশান্ত হালদারের পুলিশ রেকর্ডটা একটু বার করে দে। কবে জেলে গিয়েছিল, কী দুষ্কর্ম করেছিল সব জানতে হবে। আর ওই আধা তৈরি হওয়া বাড়িটার ওপর নজর রাখতে পারিস। আমি শিওর ওখানে ড্রাগের একটা ঠেক আছে। তবে এখখুনি কাউকে অ্যারেস্ট করলে আমি একটু ঝামেলায় পড়ব। আমাকে ওই পাড়ায় কিছুদিন কাটাতে হবে। আমার মুখ ওরা নিশ্চয় চিনে রেখেছে।'

এতক্ষণ পরে গৌতম মুখ খুলল, 'তোর এই কেসটাতে আমাদের বিশেষ ইন্টারেস্ট আছে। সত্যি বলতে কি, তোর গল্পের অনেকটাই আমাদের আগে থেকে জানা। তবে অন্যদিক থেকে শোনারও একটা দাম আছে। দাঁড়া, আর একবার চা বলি। তারপর আমাদের দিকটা তোকে বলছি।'

গৌতম একটা লাল রঙের ফোন তুলে বলল, 'উপাধ্যায় সাহেব, মিটিংটা আধঘণ্টা পেছাতে হবে। খুব জরুরি কাজে আটকে গেছি। বাইরের কেউ তো আসছে না। আপনি ইন্টারনাল সকলকে জানিয়ে দিন।' বেয়ারা আবার চা দিয়ে গেল। এবার আর টি-ব্যাগ নয়। টিপটে চা, চিনি দুধ আলাদা। চায়ে একটা লম্বা চুমুক লাগিয়ে গৌতম বলতে শুরু করল :

'গোবরার ওই অঞ্চলটার ওপর অনেকদিন পুলিশের নজর আছে। ওখানে যে ড্রাগ পাচারের একটা হাব আছে অনেকদিন ধরেই আমরা সেটা টের পাচ্ছিলাম। কিন্তু ওখানকার লোকাল থানার যিনি কর্তা ছিলেন, তিনি বিশেষ সুবিধের লোক ছিলেন না। আমাদের কাছে পরিষ্কার খবর ছিল ড্রাগ মাফিয়ারা তার জন্য একটা মোটা মাসোহারার ব্যবস্থা করে দিয়েছে, ফলে ড্রাগ ট্র্যাফিকিং আটকানোর ব্যাপারে দারোগা সাহেবের খুব একটা উৎসাহ নেই। আমাদের দু'-দু'জন ইনফরমার খুন হল। ওই অঞ্চলে যে ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্কটা তৈরি হয়েছিল সেটাও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার উপক্রম হল। এটা বছর ছয়েক আগেকার কথা বলছি। আমি তখনও এই চেয়ারে আসিনি। দারোগা সাহেবের খুঁটির জোর ছিল তাই তাকে অন্য থানায় বদলি করাটা সহজ কাজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত আমার পূর্বসূরি অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একেবারে ওপরমহলে ধরাধরি করে সেই অতি কঠিন কাজটা সম্পন্ন করলেন।'

'তারপর?'

'থানার বড়বাবু হয়ে নতুন যিনি এলেন, সেই বাসুদেব কানুনগো, চমৎকার অফিসার। অ্যাওয়ার্ড পাওয়া। আসার বছরখানেকের মধ্যেই তিনি আবার একটা ইনফর্মেশন নেটওয়ার্ক গড়ে তুললেন, কয়েকটা চুনোপুঁটিকে জেলেও ভরা হল, তারপর রাঘব বোয়ালটিকে ধরার জন্য জাল পাতা হল। তখন আমি এখানে এসে গেছি। আমাদের সব থেকে বড় অসুবিধে ছিল এই যে, দলের পাণ্ডা কে বা কারা সে ব্যাপারে আমাদের কোনও ধারণাই ছিল না। অনেকটাই অন্ধকারে ঢিল ছোড়া। তবে আমরা জানতাম মেঘের আড়ালে মেঘনাদ যিনিই হোন, তিনি কাছেপিঠেই কোথাও থাকেন।'

'ভেরি ইন্টারেস্টিং। তারপর কী হল?'

'আমাদের পাতা জালে দেবী বসাক আর সুশান্ত ধরা পড়ল। আমরা ভাবলাম পেয়ে গেছি আমাদের আসল লোকদের। কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের ভুল ভাঙল। যাদের ধরেছি তারা নেহাতই চুনোপুঁটি। আসল লোক বাইরে রয়ে গেছে। ফলে ড্রাগ পাচার আগের মতই চলছে। লাভের মধ্যে, আবার আমাদের একজন ইনফর্মার খুন হল। তাছাড়া বোঝার ওপর শাকের আঁটি, দেবী এবং সুশান্তর বিরুদ্ধে তেমন জোরাল প্রমাণ জোগাড় করা গেল না। নানান অছিলায় ওদের দু'বছর লক-আপে আটকে রাখলাম, কিন্তু তারপর তারা আদালতে বেল পেয়ে গেল। এখনও বেলেই আছে, কেস উঠলে কী হবে জানি না। আমাদের জুডিশিয়াল সিস্টেমের হাল জানিস তো।'

একটুক্ষণ চুপ করে রইল গৌতম। তারপর বলল, 'দেবী আর সুশান্ত যখন জেলে অথচ ড্রাগের ব্যবসা পুরোদমেই চলছে, সেই সময় আব্দুল আজিজ বলে এক ব্যক্তির কথা আমরা জানতে পারলাম। খবর পেলাম, দেবী-সুশান্তর অনুপস্থিতিতে তার ওপরেই সাম্রাজ্য চালানোর ভার পড়েছে। তবে নানা ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট হল যে সে নিজে পালের গোদা নয়। অন্তরীক্ষ থেকে কেউ তাকে চালাচ্ছে। আব্দুলকে তুই দেখেছিস। যে বাড়িটায় তুই ঘটনাচক্রে ঢুকে পড়েছিলি আব্দুল সেটার কেয়ারটেকার। বাড়িটার ওপর পুলিশের নজর আছে। কিন্তু বার কয়েক রেড করেও তেমন ইনক্রিমিনেটিং কিছু পাওয়া যায়নি। শুধু দু'চারটে ড্রাগ অ্যাডিক্ট ছোকরা ধরা পড়েছে। বাড়ির ভেতরে নেশা করে বসেছিল, ঠিক তুই যেমন দেখেছিলি। বাড়ির মালিক মহম্মদ আসলাম দুবাইতে থাকে, আপাতত আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে তার সম্বন্ধে অনেক কথাই আমরা জানি। এক সময় সে ওই অঞ্চলের ড্রাগ ডিলারদের মাথা ছিল। তারপর চারদিকের হাওয়া খুব গরম হয়ে গেলে সে দুবাই পালিয়ে যায়। আর ফিরে আসেনি। অবশ্য কেন সে বাড়িটা আধখানা তৈরি করে ফেলে রেখেছে সেটা আমাদের জানা নেই। সে যাই হোক, এবার আসল কথায় আসি।'

গৌতম পকেট থেকে একটা কৌটো বার করে একটা লবঙ্গ মুখে ফেলল। আদিত্যকেও একটা দিল। আদিত্যর মনে পড়ল গৌতম সিগারেট ছাড়ার চেষ্টা করছে।

'হ্যাঁ, যা বলছিলাম। দেবী-সুশান্ত লক-আপ থেকে বেরোনোর পর আমাদের স্ট্র্যাটেজি ছিল তাদের ওপর কড়া নজর রাখা। আশা, তাদের মধ্যে দিয়ে আসল লোকের কাছে পৌঁছে যেতে পারব। নজর রাখার কাজটা ইন্সপেক্টর কানুনগো ভালোই করছিলেন। মাঝে মাঝে তাদের এবং আব্দুলকে আলাদা আলাদা করে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হচ্ছিল। এই সময় একদিন ইন্সপেক্টর কানুনগো আমাকে ফোন করলেন। খুব উত্তেজিত। বললেন, 'একটা খুব দরকারি লিড পেয়েছি স্যার। মনে হচ্ছে কিছুদিনের মধ্যেই পালের গোদাটাকে ধরে ফেলতে পারব। এখনই কিছু বলছি না, কারণ আমার ধারণাটা এখনও খানিকটা অনুমান-নির্ভর'।'

গৌতম খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর থেমে থেমে বলল,

'এর কয়েকদিন পরে ট্রেন লাইনের ধারে ইন্সপেক্টর কানুনগোর গলা কাটা লাসটা পাওয়া যায়।'

ঘরে নিস্তব্ধতা। লালবাজারের এই ভেতর মহলে বহির্বিশ্বের কোলাহল খুব একটা পৌঁছয় না। শুধু একটা দেয়াল ঘড়ি টিকটিক করছে। কিছুটা জিরিয়ে নিয়ে গৌতম আবার বলতে শুরু করল,

'কানুনগো ঠিক কী লিড পেয়েছিল, কতটা এগিয়েছিল, কিছুই আমাদের জানা নেই। তার বাড়ি থেকে একটা পকেট ডায়েরি পাওয়া গেছে। কিন্তু তাতে কাজের কিছু আছে বলে মনে হয় না। শুধু লাল দাগ দেওয়া একটা টেলিফোন নম্বর আছে। আর পুরোনো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট একটা ছবি ডায়েরির মধ্যে ছিল। আমার মনে হচ্ছিল নম্বরটা থেকে হয়ত কোনও লিড পাওয়া গেলেও যেতে পারে।'

গৌতম ড্রয়ারের ভেতর থেকে একটা খাম নিয়ে তার থেকে একটা ছোট ছবি বার করে আদিত্যর হাতে দিল। বছর পঁচিশেকের এক অচেনা যুবতীর ছবি। একটু মোটার দিকে গড়ন। বারান্দার রেলিং-এ ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আদিত্য অনেকক্ষণ ধরে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। নিঃসন্দেহে একে আদিত্য কোনোদিন দেখেনি। তবু কোথাও একটা অস্বস্তি থেকে যাচ্ছে। ছবিটা কিছু একটা বার্তা দিচ্ছে যেটা সে ধরতে পারছে না।

'কীরে, ছবি দেখে প্রেমে পড়ে গেলি নাকি?' গৌতম খাম থেকে একটা চিরকুট বার করেছে। চিরকুটটা আদিত্যর হাতে দিয়ে গৌতম বলল, 'এই নম্বরটাই কানুনগোর ডায়েরি থেকে পাওয়া গেছে। নম্বরটা লিখে রাখ। পরে কাজে লাগতে পারে।'

কাগজটার দিকে তাকিয়ে এবার আদিত্যর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। নম্বরটা মন্টুবাবুর বাড়ির। যে নম্বরে ভূতুড়ে টেলিফোন আসে।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

আমহার্স্ট স্ট্রীট, যার এখন নাম হয়েছে রামমোহন সরণি, যেখানে হ্যারিসন রোড অর্থাৎ অধুনা মহাত্মা গান্ধী রোড-এর সঙ্গে এসে মিশেছে তার খুব কাছে, একটা ছোট গলির মধ্যে শঙ্কর হোটেল। নামে হোটেল হলেও আসলে এটা আধা হোটেল, আধা মেসবাড়ি। তিনতলা বাড়িটার একতলায় বিচিত্র সব বিপণীর সমাহার—জামাকাপড়ের শোরুম, জুতোর আড়ত, ইলেকট্রিকাল গুডস-এর দোকান, সাবেকি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, এমনকি একটা জ্যোতিষীর আপিসও আছে। দোতলায় হোটেল। মূলত শেয়ালদা স্টেশন দিয়ে মফস্বল থেকে কলকাতায় কাজে আসা মানুষ, যাদের তেমন ট্যাঁকের জোর নেই, দু'চারদিনের জন্য এখানে থেকে যায়। হোটেলটা চলে ভালো, বিশেষ করে এই কারণে যে, হোটেলের পাচক ভানু ঠাকুরের রান্নার খ্যাতি আছে। অল্প তেল-মশলায় চমৎকার ডাল-তরকারি-মাছের ঝোল নাকি ভানু ঠাকুরের মতো কম লোকই রাঁধতে পারে।

তিনতলায় মেসবড়ি। থ্রি-সিটার, টু-সিটার এবং সিঙ্গল রুম তিন রকম ব্যবস্থাই আছে। আদিত্য তিনতলার এক কোনায় একা একটা ঘর নিয়ে থাকে, বাথরুমটাও তার নিজস্ব। এর জন্য তাকে মাসে মাসে কিছু বেশি টাকা গুনতে হয়, এবং সেই টাকা দিতে মাঝেমধ্যে অসুবিধেও হয়, কিন্তু তার খানদানি রক্ত এর নীচে নামতে নারাজ। বারান্দার একদিকে একটা এজমালি খাবার ঘর আছে, সকাল ও রাত্তিরের ভাত সেখানেই পরিবেশিত হয়। খাবার আসে দোতলায় ভানু ঠাকুরের হেঁসেল থেকে। সপ্তাহে একবার খাদ্যতালিকায় মুরগি দেখা যায়, মাসের শেষ রবিবার পাঁঠার মাংস। জলখাবারের ব্যবস্থা যে যার নিজের দায়িত্ব, তবে মেসের চাকর বলরামকে একটা সামান্য মাসোহারা দিলে সে রাস্তার উল্টোদিকের দোকান থেকে ভোরবেলার চা-বিস্কুট ঘরে পৌঁছে দেয় আর রোববারে টোস্ট-মামলেট কিংবা সিঙ্গাড়া-জিলিপি।

সকাল সাড়ে-নটায় বিমলের ফোন এল, 'আপনি কি বাড়িতে আছেন স্যার? কিছু খবর দেবার ছিল। ফোনে অত কথা বলা যাবে না।' আধঘণ্টার মধ্যে বিমল সশরীরে হাজির।

'ব্যাপার কি? এত কাহিল দেখাচ্ছে কেন?'

'সেই ভোরবেলা বেরিয়েছি স্যার। একটু চা খাওয়াবেন?'

আদিত্য ঘর থেকে বেরিয়ে বলরামকে চা-জলখাবারের কথা বলে এল। বাইরে চড়া রোদ্দুর উঠেছে। আদিত্যর ঘরটা তিনতলায় বলে ছাদের গরমে তাড়াতাড়ি তেতে ওঠে। তবু জানলা দু'টো বন্ধ করে দিলে খানিকটা ঠাণ্ডা। আদিত্য জানলা বন্ধ করতে গিয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল। আকাশে গোটা কয়েক ঘুড়ি উড়ছে। আজকাল শহরের দক্ষিণ বা পুবদিকে ঘুড়ি তো দেখাই যায় না। তবু এই উত্তর-মধ্য কলকাতায় দু'চারজন এখনও ঘুড়ি ওড়ায়। আদিত্য ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে অনেক ঘুড়ি উড়িয়েছে, বাড়িতে মাঞ্জাও দিয়েছে। বিশ্বকর্মা পুজো কতদিন দেরি?

'মন্টুবাবুর প্রেসে গিয়েছিলাম স্যার।' চেয়ারে পা ছড়িয়ে বসে বিমল একটু ধাতস্থ হয়েছে। ঘরে একটাই চেয়ার। আদিত্য দেয়ালে ঠেশ দিয়ে খাটের ওপর আরাম করে বসল।

'মন্টুবাবুর প্রেসে গিয়ে বললাম, একটা স্যুভেনির ছাপাতে চাই। ভাগিয়ে দিচ্ছিল স্যার। বলল, এখানে ওসব ছোটখাট কাজ হয় না। দেখলাম সত্যিই মোটা মোটা টেস্ট পেপার, নোটবই, গল্প-উপন্যাস এইসব ছাপা হচ্ছে। ভাবছি কী করব এমন সময়, কী বলব স্যার, আশ্চর্য কপাল, আমাদের পাড়ার গোপীনাথবাবুর শালার সঙ্গে দেখা। উনি ওই প্রেসেই অ্যাকাউন্টস-এ কাজ করেন। গোপীনাথবাবুর ছেলের বিয়ের সময় আমার সঙ্গে খুব আলাপ জমেছিল। আমাকে দেখে খুব খুশি। বললেন, দু'পা এগিয়ে মোড়ের কাছে একটা ছোট প্রেস আছে, ওরা স্যুভেনির-টুভেনির ছাপে। তারপর বললেন, চলুন চা খেয়ে আসি।'

'শালাবাবু বেজায় গপ্পে লোক। চা খেতে খেতে অনেক কথা বলে গেলেন। সবটা আপনার কাজে লাগবে না। শুধু মন্টুবাবুর সম্বন্ধে যেটুকু বললেন সেটুকু বলছি। শালাবাবু আগেও দু'একটা প্রেসে কাজ করেছেন। কিন্তু তাদের তুলনায় মন্টুবাবুর প্রেসটা অনেক বড়। তাছাড়া, শালাবাবুর মতে মন্টুবাবুর মতো মালিক হয় না। এত বছর চাকরি হল, কখনও মাইনে পেতে দেরি হয়নি। প্রেসের লাইনে কটা প্রেস মন্টুবাবুর মতো নিয়মিত মাইনে দিতে পারে? আসলে, প্রেসের ব্যবসায় বড় বড় পেমেন্ট অনেক সময়েই আটকে যায়। আর পেমেন্ট আটকে গেলে কর্মচারীদের মাইনেও আটকে যায়। কখনও একমাস, কখনও বা তিনমাস। মালিক কি আর ঘরের টাকা থেকে ওয়ার্কারদের মাইনে দেবে? মন্টুবাবুরও যে মাঝেমধ্যে পাওনা টাকা আটকে যায় না তা নয়। অ্যাকাউন্টস-এর লোক হিসেবে শালাবাবু এটা ভালোই জানেন। কিন্তু মন্টুবাবু কখনও এর জন্য কর্মচারীদের মাইনের টাকা ফেলে রাখেন না। এই কারণে কেউ চট করে মন্টুবাবুর কাজ ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায় না। শালাবাবুর মাঝে মাঝে মনে হয়, টাকাপয়সা ম্যানেজ করার ব্যাপারে মন্টুবাবু যেন যাদুকর। ব্যবসায় সাময়িকভাবে টাকার টানাটানি হলে পাকা যাদুকরের মতো কোনও যাদুর থলি থেকে টাকা বার করে সব সামলে দেন।

মন্টুবাবুর প্রেসে নিয়মিত নতুন যন্ত্রপাতি আসে। একেবারে আধুনিক যন্ত্রপাতি। ছাপার লাইনে আজকাল সর্বত্রই কম্পিউটার ঢুকেছে। কিন্তু মন্টুবাবু ছাপার কাজে কম্পিউটার এনেছেন অন্তত পনেরো বছর আগে। কারোর চাকরি যায়নি। যত্ন করে সকলকে কম্পিউটার ট্রেনিং করিয়েছেন। দু'একজন যারা নেহাতই শিখতে পারেনি তাদের প্রেসের মধ্যেই অন্য কাজ দিয়েছেন।

এককথায়, মন্টুবাবুকে তাঁর কর্মচারীরা দেবতার মতো ভক্তি করে, আবার ভালোও বাসে। মন্টুবাবুর প্রথম স্ত্রীকেও কর্মচারীরা খুব ভক্তি করত। তিনি অবশ্য মাত্রই কয়েকবার প্রেসে এসেছেন। তাঁর শরীর ভাল থাকত না। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি অপঘাত মৃত্যুতে তিনি চলে যাবেন কর্মচারীরা কেউ ভাবেনি।'

'কী বললে? মন্টুবাবুর প্রথম স্ত্রীর অপঘাত মৃত্যু হয়েছিল?' আদিত্য এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। মাঝে মাঝে নোটও নিচ্ছিল। প্রশ্নটা অজান্তেই তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল।

'শালাবাবু তাই তো বললেন। মন্টুবাবু স্ত্রী-কন্যা নিয়ে দার্জিলিং বেড়াতে গিয়েছিলেন। সঙ্গে পাড়ারও কেউ কেউ ছিলেন। মন্টুবাবুর স্ত্রী পাহাড় থেকে পা পিছলে খাদে পড়ে যান এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। হাসপাতালেও নিয়ে যাওয়া যায়নি। এর কিছুদিন পরেই মন্টুবাবু আবার বিয়ে করেন।'

'হুঁ, ইন্টারেস্টিং। তা মালিকের দ্বিতীয় পক্ষ নিয়ে কী শুনলে?'

'দ্বিতীয় পক্ষকে কর্মচারীরা খুব বেশি চেনে না। একবার মাত্র দেখেছে। মনে হয়, দ্বিতীয় বিয়েটা মন্টুবাবু কিছুটা চুপিসাড়েই করেছিলেন। ফলে খবরটা প্রেসে পৌঁছতে খানিকটা সময় লেগেছিল। খবরটা পেয়ে সকলেই একটু অবাক হয়েছিল। একটু দুঃখও পেয়েছিল। মন্টুবাবুর প্রথম স্ত্রীকে সকলেই ভালবাসত। বুড়োবয়সে আবার বিয়ে করাটা সাহেবদের দেশে চললেও, আমাদের সমাজে এখনও তেমন চালু হয়নি। অন্য কারও সঙ্গে যাক বা না যাক, শালাবাবুর মতে, দ্বিতীয় বার বিয়ে করার ব্যাপারটা মন্টুবাবুর সঙ্গে ঠিক যায় না।'

'বিয়ের পর মন্টুবাবুর কোনও পরিবর্তন দেখা গেছিল?'

'আমি ঠিক এই প্রশ্নটাই শালাবাবুকে করেছিলাম। শালাবাবু বললেন, দ্বিতীয় বার বিয়ে করার পর মন্টুবাবু পোশাক-আসাকে ফিটফাট হয়েছেন, চুলে কলপ পড়েছে। তবে প্রেসের কাজ বা কর্মচারীদের প্রতি ব্যবহারে কোনও তফাত দেখা যায়নি। প্রেস আগের মতোই রমরম করে চলছে।'

বলরাম চা-জলখাবার দিয়ে গেল। বিমলের জন্য চা-জলখাবার, আদিত্যর জন্য শুধু চা। চায়ের কাপে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে আদিত্য বলল, 'সুশান্ত হালদার, দেবী বসাকের সঙ্গে দেখা হয়েছে? তারা কী করছে?'

'এখনও দেখা হয়নি স্যার। গত কয়েকদিন সাইবার কাফে বন্ধ ছিল। আজ আর একবার দেখব। নইলে অন্য রাস্তা ভাবতে হবে। তবে একটা আশ্চর্য জিনিস লক্ষ্য করলাম। সাইবার কাফেটা মন্টুবাবুর বাড়ির ঠিক পেছন দিকে। মাঝখানে একটা দেয়াল আছে আর একটা সরু গলি। তাই সোজাসুজি যাওয়া যায় না। পুরোনো দেয়াল। পাড়ার লোকে বলল আগে ওখানে একটা ওষুধের কারখানা ছিল। তারা তুলেছিল। আমি সাইবার কাফের ধারে ঘোরাঘুরি করছিলাম, শুনতে পেলাম মন্টুবাবুর বাড়ি থেকে কথাবার্তা ভেসে আসছে, টেলিফোন বাজছে।'

'শুনতে পেলে টেলিফোন বাজছে?'

'হ্যাঁ স্যার, স্পষ্ট শুনতে পেলাম।'

'শোনো, আজ বিকেল থেকে কয়েকদিন আমি মন্টুবাবুর বাড়িতে থাকব। অবশ্য অন্য নামে। ওই পাড়ায় আমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে না চেনার ভান কোরো। ফোন খোলা থাকবে। খুব দরকার পড়লে ফোন করবে, নাহলে নয়।'

'ঠিক আছে স্যার।'

অমিতাভ-রত্না দুপুরে খাওয়ার নেমন্তন্ন করেছিল। বলেছিল সকাল থেকে চলে আসিস। অনেকদিন ভাল আড্ডা হয় না। এখানে ব্রেকফাস্ট খাবি। বিমল এসে পড়ায় দেরি হয়ে গেল। আদিত্য অবশ্য ফোন করে ওর দেরি হবে জানিয়ে দিয়েছে।

দুপুর বারোটা নাগাদ একটা ছোট ব্যাগে কিছু জামাকাপড়, টুথপেস্ট-টুথব্রাস এবং আরও কিছু টুকিটাকি ভরে আদিত্য বেরিয়ে পড়ল। অমিতাভদের ওখান থেকে একেবারে মন্টুবাবুদের বাড়ি চলে যাবে। মন্টুবাবুকে বলা আছে। মেস থেকে বেরিয়ে মহাত্মা গান্ধী রোড অব্দি হেঁটে এসে মেট্রো ধরবে। যতীন দাস রোডে নেমে বালিগঞ্জ ফাঁড়ি অব্দি অটো, তারপর আবার মিনিট পাঁচেক হাঁটা। বেশ কিছু নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। এলোমেলো অনেক তথ্য। তার মধ্যে কিছু প্রয়োজনীয়, কিছু ততটা নয়, আবার কিছু মারাত্মক রকমের দরকারি। মুস্কিল হচ্ছে, কোনটা দরকারি, কোনটা অদরকারি আগে থেকে বোঝা যায় না। তিনজনের কাছ থেকে তিন সেট ইনফরমেশন পাওয়া গেছে। এক, মন্টুবাবুর কাছ থেকে, দুই, পুলিশকর্তা গৌতম দাশগুপ্তর কাছ থেকে, এবং তিন, বিমলের মাধ্যমে জনৈক গোপীনাথবাবুর শ্যালকের কাছ থেকে যিনি মন্টুবাবুর প্রেসে বেশ কিছুদিন কাজ করছেন। এই তথ্যগুলোকে একে অপরের সঙ্গে ক্রস চেক করতে হবে।

আদিত্য যখন অমিতাভ-রত্নাদের বাড়ি পৌঁছল তখন ঘড়িতে প্রায় দেড়টা। বেল বাজাতে অমিতাভ নিজেই দরজা খুলে দিল।

'আয়, আয়। এত দেরি করলি কেন?'

'আরে আমি তো অনেক আগেই আসতে চেয়েছিলুম। সকালে বিমল এল। কথা বলতে বলতে দেরি হয়ে গেল। তারপর মেট্রোর জন্য আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে। একে রবিবারে ট্রেন কম, তার ওপর আবার যান্ত্রিক গোলযোগ।'

'রত্না তোর জন্য জম্পেশ ব্রেকফাস্ট বানিয়েছিল। তোর তো সকালে উঠে মুখ ধুয়েই চলে আসার কথা।'

'আমার কপালটা জানিস তো কোনদিনই ভাল নয়। যাই হোক মধ্যাহ্নভোজনে উসুল করে নেব। মাটন হয়েছে মনে হয়। সারা বাড়িতে দারুণ গন্ধ ছড়াচ্ছে। টুপলু কোথায় রে?'

'টুপলু ওপরের তলায় বন্ধুর বাড়িতে ভূগোলের নোট মেলাতে গেছে। একখুনি চলে আসবে। ভেবেছিলাম তুই এলে আজ একসঙ্গে শুধু ভীমপলাশি শুনব। সেই মত অনেকগুলো ভীমপলাশি বেছে রেখেছিলাম। সব শোনা হবে না। তবে এইটা শোন। সিক্সটিসে আলি আকবর খাঁ সাহেব কারো বাড়িতে বাজিয়েছিলেন। অনেক কষ্টে জোগাড় করেছি।'

'এতক্ষণে আসার সময় হল?' রত্না ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল। কোমরে আঁচল গোঁজা, কপালে ঘাম।

'উপায় ছিল না রে। লোক এসে গেছিল। তার ওপর মেট্রোতে দেরি। তুই খুব লেবার দিয়ে রান্না করেছিস দেখতে পাচ্ছি। যা গন্ধ ছাড়ছে না, মনে হচ্ছে একখুনি খেতে বসে যাই।'

'শুধু আমি লেবার দেবো কেন? একটা মাছ তো অমিতাভ রেঁধেছে। স্যালাডটাও ও-ই বানিয়েছে।' রত্না এবার স্বামীকে ধমক লাগাল,

'অ্যাই, এখন ওসব গান-টান রাখো। আগে আমরা খেয়ে নিই। তারপর যত খুশি গান হবে। আদিত্যর নিশ্চয় নাড়িভুঁড়ি হজম হয়ে যাচ্ছে। তুমি ওপরের ফ্ল্যাটে ফোন করে টুপলুকে চলে আসতে বল। বল, আদিত্যকাকু এসে গেছে।'

'আমি এখনও তো চানই করিনি।'

'করবে কী করে? সকাল থেকেই যে কালোয়াতি গান চলছে। একখুনি চান করতে যাও।'

'ঠিক আছে, তুমি টুপলুকে ডাক, আমি চানটা সেরে আসি। আদিত্য, তুই একা বসে বসে কী করবি? আলি আকবর খাঁ সাহেবের ভীমপলাশিটা শোন।'

রত্না টেবিল সাজাচ্ছে। আদিত্যর সত্যিই খিদে পেয়েছে। খাবার ঘর থেকে নানা সুগন্ধ ভেসে আসছে। আলি আকবর কোমল গান্ধার লাগালেন, একটু মোচড় দিয়ে কোমল নিষাদ হয়ে, ধৈবত হয়ে, খাদের পঞ্চমে থিতু হলেন। ছ'তলার এই ঘরটা থেকে পুবদিকে অনেক দূর অব্দি দেখা যায়। এদিকের আকাশটা নির্মেঘ হলেও পুবদিকের আকাশ কালো হয়ে এসেছে। ওদিকেই তো মন্টুবাবুর বাড়ি, তাকে একটু পরেই যেতে হবে। খাঁ সাহেব গান্ধার-মধ্যম-পঞ্চম নিয়ে খেলা করছেন। কালো মেঘের পোশাকে একটা অজানা অশুভ যেন পুবদিকটা জুড়ে রয়েছে। অমিতাভ-রত্নার এই শান্তির আলয়ের অনেক বাইরে। দু'টো নতুন খবর সে জানতে পেরেছে। এক, মন্টুবাবুর ভূতুড়ে টেলিফোন নম্বরটি পুলিশের খাতায় রয়েছে। পুলিশ মনে করছে নম্বরটার পেছনে কোনও রহস্য আছে। দুই, মন্টুবাবুর প্রথম স্ত্রীর অপঘাত মৃত্যু হয়েছিল। খবরটা মন্টুবাবু চেপে গেলেন কেন? কিন্তু এই দু'টো ছাড়াও আরও কিছু দরকারি খবর কেউ কেউ দিয়েছে। সেগুলো আদিত্যর সামনেই আছে। তার মন বলছে আছে। তবু সে ঠিক ধরতে পারছে না। বিশেষ করে কানুনগোর ডায়েরিতে সযত্নে রেখে দেওয়া ছবিটা তাকে খুব ভাবাচ্ছে। খাঁ সাহেব খাদের নিষাদ থেকে উঠতে উঠতে পঞ্চমে পৌঁছনোর বদলে মধ্যমে দাঁড়িয়ে গেলেন। আর অমনি সারা পৃথিবী জুড়ে একটা মস্ত হাহাকার তৈরি হল। এত দুঃখ কোথায় জমে ছিল এতদিন? আদিত্যর একেবারে ভেতর থেকে একটা 'ও হো হো হো' ধ্বনি বেরিয়ে এল।

'খাবার তৈরি, চলে আয়।' রত্না খেতে ডাকছে।

শহরের এই অঞ্চলে এখনও সাইকেল রিক্সা চলে। একে রবিবারের বিকেল, তার ওপর আকাশ কালো করে এসেছে। রাস্তায় খুব বেশি লোকজন নেই। বৃষ্টির আশঙ্কায় আদিত্য একটা রিক্সাতে উঠে পড়ল। হাসপাতালের চৌহদ্দি পেরিয়ে কিছুটা ভেতরে ঢুকলেই মফস্বল। একতলা-দোতলা বাড়িগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, মাঝে-মধ্যে মাঠ, পুকুর, খাপরার ছাউনি দেওয়া চা-বিস্কুটের দোকান। তবু তার মধ্যেই দু'একটা অর্বাচীন ছ'সাততলা বাড়ি এলোপাথাড়িভাবে হঠাৎ গজিয়ে উঠেছে। মনে করিয়ে দিচ্ছে, কিছুদিনের মধ্যেই মহানগর এসে এই নিরভিমান মফস্বলকে গিলে খাবে। কিছুক্ষণ চলার পর লেভেল ক্রসিং, ভাগ্য ভাল খোলা রয়েছে। লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে কিছুক্ষণ চলার পর রিক্সা জরাজীর্ণ পাঁচিল-ঘেরা একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ধারে এসে পড়ল। জায়গায় জায়গায় ভেঙেও পড়েছে পাঁচিল। অনেকটা জমি ফাঁকা পড়ে রয়েছে। রিক্সাওলার কাছ থেকে জানা গেল এখানে আগে একটা ওষুধের কারখানা ছিল। ঘোড়ার রক্ত থেকে ধনুষ্টঙ্কারের ওষুধ তৈরি হত। ভেতরে ছিল ঘোড়ার আস্তাবল। অনেক ঘোড়া ছিল। ঘোড়াগুলো মরে গেছে। কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে বহুদিন। পরিত্যক্ত কারখানার পেছন দিয়ে চলে গেছে আরেকটা ট্রেনের লাইন।

রিক্সাওলা রাস্তা চেনে। দ্বিতীয় ট্রেন লাইনটা পেরোনোর আগেই আদিত্যকে নিয়ে সে একটা গলিতে ঢুকে পড়ল। দু'-তিনটে বাড়ির পরেই সাতাশ নম্বর। পুরোনো দোতলা বাড়ি, কিন্তু এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায়, যত্নে আছে। একতলায় লাল সিমেন্টের বারান্দা। গাছ-গাছালি ঢাকা লাল সুরকির পথ দিয়ে বারান্দায় উঠে আদিত্য কলিংবেল বাজাল। কিছু পরে অন্তরীক্ষে পায়ের শব্দ, দরজা খুলে গেল। একজোড়া দীঘল জিজ্ঞাসু চোখ আদিত্যকে মাপছে।

'নমস্কার। আমার নাম সূর্য, সূর্যশঙ্কর সাহা। আমি ভিলাই থেকে আসছি। এটা কি জিতেন্দ্রনাথ দত্তর বাড়ি?'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ, আসুন, আসুন। আমার স্বামী আপনার কথা বলেছেন। আপনি সুলতার দেওর তো? উনি একটু বাইরে গেছেন, আধঘণ্টার মধ্যেই ফিরে আসবেন।'

'আমি আপনাদের খুব অসুবিধে করে দিচ্ছি।' আদিত্য কুণ্ঠিতভাবে বলল।

'অসুবিধে কীসের? আমাদের এখানে কেউ আসে না। ফাঁকা বাড়িটা পড়ে আছে। কেউ এসে থাকলে আমাদের খুব ভাল লাগবে। আপনার থাকার ঘরটা দেখিয়ে দিচ্ছি। আগে একটু চা খান। ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি, আমার নাম বকুল।'

বাইরের বারান্দার মতো ভেতরের দালানটাও লাল সিমেন্টের, ধারে কালো বর্ডার। দালানের একপাশে বসার ঘর। বকুল আদিত্যকে নিয়ে বসার ঘরে ঢুকল। একটা পুরোনো সোফাসেট, গোল টেবিলে কয়েকটা সিনেমা পত্রিকা, মেয়েদের ম্যাগাজিন। ঘরের একদিকে একটা কাচের আলমারির ওপরের তাকে একসেট শরৎ গ্রন্থাবলী সমেত কিছু বাংলা উপন্যাস, একটা গীতবিতান। নীচের তলায় দু'একটা কেষ্টনগরের পুতুল, কিছু কাপ-প্লেট, যেগুলো দেখলেই বোঝা যায় তারা কালেভদ্রে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে একটা ডিভান, তার ওপর শাড়ি জড়ানো একটা বাদ্যযন্ত্র শোয়ানো আছে। দেখে মনে হয় তানপুরা। আদিত্য সোফার এককোণে গুটিসুটি মেরে বসল। তাকে খুব একটা অভিনয় করতে হচ্ছে না। সে স্বভাবে ভীষণ মুখচোরা।

'আসলে, আমার ট্রেনিংটা গতকাল শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু কিছুতেই আগামী শুক্রবারের আগে ট্রেনের টিকিট পেলাম না। গত তিন সপ্তাহ ব্যাঙ্কের গেস্ট হাউসেই ছিলাম। ট্রেনিং শেষ হয়ে গেলে তো আর থাকতে দেবে না। তাই ভাবছিলাম কোথায় যাই। তখন আপনাদের কথা মনে পড়ল। খুব সঙ্কোচ হচ্ছিল। খুব একটা সম্পর্ক তো আর রাখা হয় না।'

'আপনি এত কিন্তু কিন্তু করছেন যে আমারই খারাপ লাগছে। আরাম করে ক'টা দিন থাকুন। কলকাতা দেখুন। মালতী, চা বসাও।' শেষের কথাগুলো, বলাই বাহুল্য, নেপথ্যে থাকা কোনও পরিচারিকার উদ্দেশে।

'আপনাদের পাড়াটা কিন্তু বেশ নিরিবিলি। আগেও কয়েকবার কলকাতায় এসেছি কিন্তু এদিকটা কখনও আসা হয়নি। আমরা ছোট শহরের লোক, একটু নিরিবিলি ভাল লাগে।'

'আপনি ভিলাইতে কতদিন আছেন?'

'তা প্রায় কুড়ি বছর। তার আগে রায়পুরে থাকতাম। মধ্যপ্রদেশেই আমাদের জন্ম-কম্ম। বাবা চাকরি করতে গিয়ে আর ফেরেননি। এখন অবশ্য ছত্তিসগড়।'

'সে তুলনায় আপনার বাংলাটা কিন্তু একটুও টোল খায়নি।'

আদিত্য ভেতরে ভেতরে একটু থতমত খেল। পশ্চিমা বাঙালির বাংলা সে শুনেছে। কিন্তু সেটা নকল করা তার পক্ষে অসম্ভব।

'আসলে কি জানেন আমরা দু'ভাই ঠাকুমার কাছে মানুষ। ঠাকুমার বাড়ি ছিল দর্জিপাড়া। সেই ভাষাটাই মুখে বসে গেছে। তাছাড়া বাড়িতেও খানিকটা বাংলার চর্চা ছিল। সব বাড়িতে তো থাকে না।'

মালতী টিপটে চা নিয়ে এসেছে। সঙ্গে ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুট।

'আপনি চায়ে চিনি দুধ খান তো?'

'না না চিনি দুধ নয়, শুধু লিকার। আগেই আমার বলা উচিত ছিল।'

'কোনও অসুবিধে নেই তো। মালতী আলাদা করে লিকারই এনেছে। চিনি দুধ না মেশালেই হল। আমি আবার দুধ চিনি ছাড়া চা খেতে পারি না। নিন।'

বকুল চায়ের কাপ এগিয়ে দিল। আদিত্য বকুলকে যত দেখছে, তত অবাক হচ্ছে। আধুনিক, সপ্রতিভ, বুদ্ধিমতী। গায়ের রঙ কিছুটা চাপা, সুন্দরীও হয়তো ঠিক বলা যাবে না, কিন্তু চেহারার একটা আশ্চর্য আকর্ষণ আছে। ইংরেজি করে বললে, সেক্স অ্যাপিল। এরকম মেয়ের কপালে মন্টুবাবুর মতো দোজবর জুটল কেন?

'ছত্তিসগড় শুনেছি খুব সুন্দর জায়গা। কখনও যাইনি। দেশের মধ্যে খুব বেশি ঘোরা হয়নি। একবার শুধু দার্জিলিং গিয়েছিলাম। সেখানেই তো সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাটা ঘটল। নিশ্চয় সুলতা বলেছে। ও তখন ইস্কুলে পড়ে।'

আদিত্য খানিকটা আন্দাজ করতে পারছে কোন ঘটনার কথা বকুল বলছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে চুপ করে থাকাই ভাল। ভাগ্যবশত, বকুল কথা বলার মেজাজে আছে।

'পাহাড় খুব সুন্দর লেগেছিল। কী বিশাল। হিমালয় বলে কথা। আচ্ছা, আপনাদের ভিলাইতে পাহাড় আছে?'

আদিত্য প্যাঁচে পড়েছে। প্রশ্নটার উত্তর সে সত্যিই জানে না। ভিলাইয়ের যে দু'একটা ছবি সে দেখে এসেছে তার একটাতেও পাহাড় নেই। কিন্তু বলা যায় না, শহরের বাইরে ছোটখাট টিলা থাকতেই পারে। বিন্ধ্যপাহাড়ের রেঞ্জটা তো ওইসব জায়গা দিয়েই গেছে। এত কম জেনারেল নলেজ নিয়ে গোয়েন্দাগিরিতে আসা উচিত নয়। আপিসে একটা ইন্টারনেট সহ কম্পিউটার থাকলে দেখে আসা যেত।

'ঠিক পাহাড় নেই, আশেপাশে কিছু টিলা আছে।' আদিত্য আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ল।

আর ঠিক তখনই, যেন তাকে অস্বস্তির হাত থেকে রেহাই দেবার জন্য, ঘরের একটা অদৃশ্য কোণ থেকে তারস্বরে বেজে উঠল টেলিফোন। টেলিফোনটা যে ঘরের ভেতরেই ছিল আদিত্য এতক্ষণ খেয়ালই করেনি।

'এই পাড়ায় আমাদের প্রায় পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল। একটা ওষুধের কারখানা ছিল এখানে। টিটেনাসের ওষুধ বানাত। কারখানাটা চলল না। হয়তো আরও আধুনিক ওষুধ বাজারে বেরিয়ে গিয়েছিল। সে যাই হোক, কারখানার কিছু জমি যখন বিক্রি হচ্ছিল আমার বাবা খানিকটা কিনে নেন। বাবারও একটা প্রেস ছিল, তবে আমার বর্তমান প্রেসটা নয়। বউবাজার অঞ্চলে আরও ছোট একটা প্রেস। এই অঞ্চলটা তখন প্রায় গ্রামই ছিল। বাবা জমিটা সস্তাতে পেয়েছিল। তারপর বাড়ি তৈরিটা নেশার মতো পেয়ে বসেছিল বাবাকে। সত্যি বলতে কি, এত বড় বাড়ি বানানোর সামর্থ্য বা প্রয়োজন কোনটাই বাবার ছিল না। শুধু এই বাড়িটা বানিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি। পাশের বাড়িটাও বাবার বানানো। অনেকদিন ফাঁকা পড়েছিল। বছর পাঁচেক হল ভাড়াটে বসিয়েছি।

একটা ব্যাপার, কারখানার বাকি জমিগুলো এই পঞ্চাশ বছরেও বিক্রি হল না। দেখবেন, এখনও ওইভাবেই পড়ে আছে। কীসব মামলা মকদ্দমা এখনও নাকি চলছে শরিকদের মধ্যে। একদিক থেকে আমাদের ভালই হয়েছে, জায়গাটা ঘিঞ্জি হয়ে যায়নি। আবার উলটোদিকে ওই পোড়ো কারখানার ভেতর নানা ক্রিমিনাল অ্যাক্টিভিটি বাসা বেঁধেছে। লোকে বলে ড্রাগ পেডলারদের আখড়া। দিনের বেলাতেও পাড়ার ভদ্রলোক ওর ভেতরে ঢোকে না। মাঝে মাঝে দেখি পুলিশ আসে। তবে সকলেই জানে পুলিশের সঙ্গে ড্রাগ চালানকারীদের বিশেষ ভালবাসা আছে।'

মন্টুবাবু দম নেবার জন্য থামলেন। আদিত্য সিগারেট ধরাল। রাত্তিরে খাওয়া-দাওয়ার পর দুজনে হাঁটতে বেরিয়েছে। এপাড়ায় রাস্তার আলোগুলো কিছু জ্বলে, বেশিভাগই জ্বলে না। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে আলো-আঁধারি। তার ওপর পরিত্যক্ত কারখানাটা যেন একটা কবরখানার মতো নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তায় গাড়ি খুব কম, শুধু মাঝেমধ্যে কলকাতার দিক থেকে দুএকটা গাড়ি হেডলাইট জ্বালিয়ে বাড়ি ফিরছে।

'বকুলকে কেমন দেখলেন? স্বাভাবিক অবস্থায় আছে মনে হল?'

'বকুলকে অসম্ভব বুদ্ধিমতী মনে হল। যদি অস্বাভাবিকত্ব কিছু থাকেও বাইরে থেকে বোঝা যাবে না।'

'টেলিফোন বাজতে শুনলেন?'

'বকুলের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনবার টেলিফোন বেজেছে। বকুল উঠে ধরার আগেই প্রত্যেকবার কেটে গেল। টেলিফোন ধরার ব্যাপারে বকুলের খুব একটা তাড়াও দেখলাম না। আমি জিজ্ঞেস করতে বলল টেলিফোনে রোজই আট-দশটা রং নাম্বার আসে। বাড়ির সকলের গা সওয়া হয়ে গেছে।'

'টেলিফোন বাজার সময় বকুল কি একটু ভয় পেয়েছে মনে হল?'

'একটু সন্ত্রস্ত মনে হল। হয়তো বা একটু বিরক্তিও ছিল। বকুলকে কেউ ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে কিনা বার করতে আরও ক'টা দিন লাগবে। আগামী শুক্রবার অব্দি তো আছি। তার মধ্যে আশা করছি একটা কিছু জানতে পারব।'

'আপনার আর কোনও সাহায্য লাগবে?'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ বকুলের ব্যাকগ্রাউন্ডটা জানতে চাই। কতদূর লেখাপড়া করেছে, কোনও ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে কিনা, সারাদিন সময় কাটায় কীভাবে?'

'বকুল পাড়ার ইস্কুলে পড়েছে। লেখাপড়ায় নেহাত মন্দ ছিল না। ইস্কুলের পর কাছেই একটা মেয়েদের কলেজে ভর্তি হয়েছিল। ইস্ট মেট্রোপোলিটান গার্লস কলেজ। বছর দু'য়েক পড়ে ছেড়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত বিএ-টা পাশ করেনি। কেন, আমি জানি না। কখনও জিজ্ঞেস করা হয়নি। এক সময় বকুলের অনেক বন্ধুবান্ধব ছিল। বিয়ের পর মনে হয় তাদের সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ নেই। তবে শ্রীলেখা বলে একটা মেয়ে এখনও মাঝে মাঝে বকুলের মোবাইলে ফোন করে। বকুল তার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলে, দেখেছি। এই মেয়েটা রজনীর ট্র্যাভেল এজেন্সিতে কাজ করে। বোধহয় বকুলই কখনও যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল। এক কথায়, আর পাঁচটা বাঙালি বউ যেভাবে সময় কাটায় বকুলও সেইভাবেই সময় কাটায়। সংসারটা নজরে রাখে, ব্যাঙ্ক-ট্যাঙ্কের কাজগুলো সামলায়, দুপুরবেলা ঘুমোয়, হয়তো সিরিয়ালও দেখে। ছাতে একটা বাগান করেছে।'

'বকুলের মোবাইল নম্বরটা আমার দরকার।'

'আমার তো নম্বর মনে থাকে না। নম্বরটা আমার মোবাইলে সেভ করা আছে। মোবাইলটা আবার বাড়িতে ফেলে এসেছি। বাড়ি ফিরে আপনাকে নম্বরটা দিয়ে দেব।'

'আর একটা কথা। আপনার প্রথম স্ত্রীর অপঘাতে মৃত্যু হয়েছিল বলেননি কেন?'

প্রশ্নটা করে আদিত্য সরাসরি মন্টুবাবুর দিকে তাকাল। মন্টুবাবু দাঁড়িয়ে পড়লেন। রাস্তার আলোগুলো ঠিকমত জ্বলছে না। সেই আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে আদিত্যর মনে হল, নিমেষের মধ্যে একাধিক অভিব্যক্তি খেলে যাচ্ছে মন্টুবাবুর মুখের ওপর দিয়ে। ভয়, সংকোচ, লজ্জা, একটা বেপরোয়া ভাব। বেশ কিছুক্ষণ পরে মন্টুবাবু শান্ত গলায় বললেন,

'আমার প্রথম স্ত্রী দার্জিলিং বেড়াতে গিয়ে পা স্লিপ করে পাহাড় থেকে পড়ে যান। একটা খাদে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায়। পাহাড় থেকে পড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা একটু অস্বাভাবিক। সচরাচর এরকম ঘটে না। এটা নিয়ে পুলিশও তদন্ত করেছিল। কিছু পাওয়া যায়নি। আপনাকে ঘটনাটা বলিনি কারণ মনে হয়েছিল টেলিফোন কাণ্ডের সঙ্গে এর কোনও যোগ নেই। তাছাড়া এটা একটা পারিবারিক লজ্জার ব্যাপারও বটে। তাই, স্বীকার করছি, নিজের থেকে বলতে সঙ্কোচ হয়েছিল।'

'কারা কারা গিয়েছিলেন দার্জিলিং-এ?'

'আমার পরিবার, মানে স্ত্রী কল্পনা, মেয়ে সুলতা এবং আমি, আমার বন্ধু রজনীর পুরো পরিবার, অর্থাৎ রজনী, রজনীর মেয়ে-বউ, রজনীর বোন বকুল, রজনীর ভাই দেবী আর তার বন্ধু সুশান্ত।'

'তার মানে ঘটনার সময় দেবী বসাক এবং সুশান্ত হালদার আপনাদের সঙ্গেই ছিল।'

'তা তো ছিলই। আসলে এটা ছিল রজনীদের পরিবারের হাওয়াবদল। আমরা ওদের সঙ্গে জুটে গিয়েছিলাম আর কি। যা কিছু ব্যবস্থা রজনীরাই করেছিল। তবে, অস্বীকার করব না, ওই বিপদের সময় দেবী-সুশান্ত খুব করেছিল। খাদে নেমে ওরাই প্রথম আবিষ্কার করে কল্পনা নীচে পড়ে গেছে। অ্যাম্বুলেন্স ওরাই নিয়ে আসে। পরে পুলিশকে ওরাই সামলেছিল।'

'দুর্ঘটনাটা কেমন করে ঘটল?'

'আমরা টাইগার হিলের কাছে একটা পিকনিক স্পটে চড়ুইভাতি করতে গিয়েছিলাম। দুপুরে খাওয়ার আগে গান-বাজনা হচ্ছিল। কেউ-কেউ তাস খেলছিল। কেউ একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছিল। পিকনিকে যেমন হয়। খাওয়ার সময় দেখা গেল সবাই রয়েছে, কল্পনা নেই। কেউ কেউ কল্পনাকে একা-একা ঘুরতে দেখেছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর দেবী-সুশান্ত একটা খাদের নীচে কল্পনার বডিটা দেখতে পায়। ওদের সঙ্গে একটা বাইনোকুলার ছিল, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখবে বলে নিয়ে এসেছিল, তাই দিয়ে দেখতে পায়।'

কথা বলতে বলতে ওরা আবার মন্টুবাবুদের বাড়ির সামনে ফিরে এসেছে। বাড়ির মধ্যে সিগারেট খাওয়া যাবে না ধরে নিয়ে আদিত্য তাড়াতাড়ি আর একটা সিগারেট ধরাল।

'আমি কাল সকালে সুশান্ত-দেবীরঞ্জনের দোকানে একবার ঢুঁ মারব। দেখি কিছু পাই কিনা।'

'দেখুন। তবে একটু সাবধানে। ছেলে দু'টো একটু রাফ ধরনের। কথাবার্তাও ভাল নয়।'

ওদের গলার আওয়াজ পেয়ে বকুল বেরিয়ে এসেছে।

'আপনার শোবার ঘর তৈরি। সকালে ক'টায় চা দেব?'

'আমি খুব ভোরে উঠে পড়ি। ভোরে উঠে একটু হাঁটার অভ্যেস আছে।'

'মালতী ছ'টায় আপনার ঘরে চা পৌঁছে দেবে। দুপুরে খাবেন তো?'

'সকালে একটু বেরোব, ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে যাবে। কাল দুপুরে বাইরেই খেয়ে নেব।'

আদিত্য বাড়িতে ঢোকার আগে মরিয়া হয়ে সিগারেটে শেষ কয়েকটা টান দিয়ে নিচ্ছে, এমন সময় পাশের বাড়ি থেকে বিশাল লম্বা-চওড়া এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। আদিত্যকে দেখে অত্যন্ত মিহি গলায় বললেন,

'বাড়িতে নতুন অতিথি এল নাকি মন্টুবাবু? এঁকে তো আগে পাড়ায় দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।'

আদিত্য চমকে উঠে তাকাল। ভাবা যায় না, এমন বিশাল চেহারা থেকে এত মিহি আওয়াজ বেরোতে পারে। মন্টুবাবু বললেন,

'আমার মেয়ের দেওর। ভিলাই থেকে কলকাতায় কাজে এসেছে। ক'টা দিন এখানে থাকবে।'

'তবু ভাল। আমি ভাবলাম, টেলিফোন রহস্য ভেদ করার জন্য বুঝি গোয়েন্দা এনেছেন। হাঃ, হাঃ হাঃ।'

ভদ্রলোক নিজের রসিকতায় নিজেই এত জোরে হেসে উঠলেন যে সামনের গাছটা থেকে কয়েকটা কাক উড়ে গেল। বকুলের মুখে পরিষ্কার বিরক্তি। মন্টুবাবু অপ্রতিভ। অস্বস্তি কাটাতে মন্টুবাবুই মুখ খুললেন,

'আলাপ করিয়ে দিই, আমার মেয়ের দেওর সূর্যশঙ্কর সাহা, আর ইনি আমাদের পড়শি ও ভাড়াটে রামানুজ চট্টোপাধ্যায়।'

রাত্তিরে আদিত্য দু'বার বকুলকে স্বপ্নে দেখল। একবার দেখল দার্জিলিং-এ মস্ত পাহাড়ের তলায় বসে সে আর বকুল চা খাচ্ছে। অনেকটা চা-কোম্পানির বিজ্ঞাপনের মতো। সে চায়ের প্রশংসা করাতে বকুল বলছে, চা ভাল তো হবেই, খোদ ভিলাই-এর চা বলে কথা। আর একবার দেখল সে বকুলকে নিয়ে অমিতাভ-রত্নাদের বাড়ি গিয়েছে, গল্প-টল্প হচ্ছে। তবে সেই গল্পে বিমল, রামানুজ চট্টোপাধ্যায় সকলেই শামিল হয়েছে। দু'বারই তার ঘুম ভেঙে গেল টেলিফোনের শব্দে। ভূতুড়ে টেলিফোন তাহলে রাত্তিরেও বিশ্রাম নেয় না।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

সাইবার কাফেটা ছোট, সব মিলিয়ে তিনটে ডেস্কটপ, একটা প্রিন্টার-স্ক্যানার। তাছাড়া নিশ্চয় ওয়াই-ফাইও আছে। একদিকে সোফার ওপর বসে একটা ছেলে কানে হেডফোন লাগিয়ে মোবাইলে গান শুনছে। অন্যদিকে পার্টিশন দিয়ে মালিকের আপিসঘর। এখন তিনটে কম্পিউটারই ফাঁকা। মন্টুবাবু বলেছিলেন, দোকানটা চলে ভাল। এখন অন্তত তার কোনও প্রমাণ দেখা যাচ্ছে না। হয়তো বিকেলের দিকে ছাত্র-টাত্ররা গেম খেলতে আসে। আদিত্য ভেতরে ঢুকে দেখল আপিসঘরে বছর চল্লিশের একটি লোক বসে আছে। চেহারাটা আদিত্যর চেনা। ছবিতে দেখেছে। সুশান্ত হালদার।

'আপনাদের এখানে ইন্টারনেট করতে গেলে রেট কত?' আদিত্য জিজ্ঞেস করল।

'ঘণ্টায় পঁচিশ টাকা। বাঁ দিকেরটা খারাপ আছে। অন্য যে কোনোটাতে বসতে পারেন।' সুশান্ত হালদারের গলাটা বেশ ভদ্র শোনাল।

'পাসওয়ার্ড আছে?'

'না না সোজাসুজি লগ ইন করুন।'

আদিত্য ডানদিকের যন্ত্রটাতে গিয়ে বসল। প্রথমে ই-মেল খুলে দেখল, কিছু পুরোনো মেল এসে জমে আছে। উত্তর দেওয়া হয়নি। খুব দরকারি কিছু নয়। তবু সময় নিয়ে আদিত্য মেলগুলোর উত্তর দিল। কিছুটা ইনিয়ে বিনিয়ে। বন্ধুদের মেল। কেউ আমেরিকায় থাকে, কেউ বিলেতে। এখনও মেলে যোগাযোগ রাখে। শীতকালে কলকাতায় এলে দেখা হয়। আদিত্যর এখানে এখন ঘণ্টাখানেক বসে থাকা দরকার। ইমেল সেরে সে ফেসবুকে ঢুকল। দুটো ছেলে দোকানে ঢুকেছে। আদিত্যর পাশের যন্ত্রটায় বসল। নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছে। মনে হল, কোথাও অনলাইনে অ্যাপ্লাই করবে। দূরে টেলিফোন বাজছে। আদিত্য শব্দটা চেনে। এটা মন্টুবাবুর টেলিফোন। বাজলে এখান থেকে হালকা শোনা যায়। যে ছেলেটা মোবাইলে গান শুনছিল সে বেরিয়ে যাচ্ছে। আর একজন ঢুকল। দুটো কম্পিউটারই আটকা দেখে সেও বেরিয়ে যাচ্ছিল, তাকে আপিস থেকে সুশান্ত হালদার বলল,

'দুটোর পরে এস। ফাঁকা থাকবে।'

নিশ্চয় চেনা খদ্দের। আদিত্যর মনে হল জায়গাটা অনেকটা পাড়ার চুল কাটার সেলুনের মতো। ভিড় থাকলে খদ্দের আবার ঘুরে আসে। ফেসবুকে নানা লোক নানা কথা লিখছে। কথা বলতে পয়সা লাগে না। কারও কারও কাজ এত কম, সারাদিন ফেসবুক নিয়ে বসে থাকে। আদিত্যর এক বন্ধু, আমেরিকাবাসী, সপরিবারে মিশর বেড়াতে গিয়েছিল। অনেক ছবি পোস্ট করেছে। আবার ফোন বাজল? না না সেই ফোন নয়। কারও মোবাইল বাজছে। আদিত্য কতক্ষণ একমনে ফেসবুক দেখছিল সে নিজেই জানে না। সে খেয়ালও করেনি তার পাশের ছেলেদুটো কখন বেরিয়ে গেছে, সাইবার কাফেতে সে একা।

'আদিত্যবাবু, একবার শুনবেন?'

আদিত্য চমকে উঠে পেছনে তাকাল। সুশান্ত হালদার কখন নিঃশব্দে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। কী সর্বনাশ! সুশান্ত তার নাম জেনে গেছে! নাম যখন জেনেছে তখন এটাও নিশ্চয় জেনেছে যে আদিত্য এখানে আত্মীয়-বাড়ি বেড়াতে আসেনি।

'আদিত্য মজুমদার, আপনার সঙ্গে আমার খুব দরকারি কথা আছে। আমি দোকানের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে আসি। কথা বলার সময় কেউ এলে অসুবিধে হবে। এমনিতেই একটা থেকে দুটো দোকান বন্ধ থাকে। দু'চার মিনিট আগে বন্ধ হলে এমন কিছু ক্ষতি হবে না।'

সুশান্তর গলায় এমন একটা ঠাণ্ডা অমোঘ আত্মবিশ্বাস ছিল যে আদিত্যর মনে হল সুশান্তর কাছে পরিচয় নিয়ে মিথ্যে বলে কোনও লাভ নেই। সে চুপ করে রইল।

'ভয় পাবেন না। দরজা বন্ধ করে আমি আপনার কোনও শারীরিক ক্ষতি করব না।'

ভয় অবশ্য আদিত্য পায়নি। বরং সুশান্ত কী বলে তা জানার জন্য আদিত্যর খুব কৌতূহল হচ্ছিল। সুশান্ত দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে একটা চেয়ার নিয়ে আদিত্যর সামনে এসে বসল।

'আমি জানি আপনার নাম আদিত্য মজুমদার। আমি এও জানি, পেশায় আপনি একজন বেসরকারি গোয়েন্দা। আপনার অফিস, আপনার মেস সবই আমি চিনি। অতএব পরিচয় গোপন করলে মিছিমিছি সময় নষ্ট হবে।'

পকেট থেকে সুশান্ত একটা সিগারেটের প্যাকেট বার করে আদিত্যকে অফার করল। দামি বিদেশি সিগারেট। আদিত্য এবং তার নিজের সিগারেট ধরিয়ে সুশান্ত বলল,

'আপনি নিশ্চয় ভাবছেন কী করে আপনার পরিচয় জানতে পারলাম। আপনার পাঠানো ছেলেটি আমার দোকানের সামনে দু'দিন আগে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করছিল। দেখে মনে হল ব্যাপারটা বোঝা দরকার। আমার একটা ছেলেকে ওর পেছনে লাগিয়ে দিলাম। সে খবর আনল গতকাল সকালে আপনার ছেলেটি আপনার বাড়ি গিয়েছিল। আপনাদের মেসের দরোয়ানের কাছ থেকে আপনার অফিসের ঠিকানা পাওয়া গেল। তারপর আপনাদের অফিস বিলডিং-এর সিকিউরিটির কাছ থেকে জানা গেল আপনার পরিচয়। এত কিছু জানার জন্য অবশ্য সামান্য টাকা-পয়সা খরচ করতে হয়েছে। কিন্তু সেটা নিয়ে আমার কোনও অভিযোগ নেই।'

আদিত্য একেবারে বোকা বনে গিয়েছে। এই অবস্থায় শুধু শুনে যাওয়া ছাড়া তার আর কিছু করণীয় নেই। সুশান্ত বলে চলেছে, 'আমার ছেলেটি আপনাদের আপিসের সিকিউরিটির কাছ থেকে এটাও জানতে পেরেছে যে আপনার খুব একটা মক্কেল-টক্কেল হয় না। তবে কয়েকদিন আগে এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। সম্ভবত মক্কেল। অনেকক্ষণ ছিল। মক্কেল মশায়ের চেহারার যা বর্ণনা শুনলাম তাতে আমি মোটামুটি নিশ্চিত হলাম যে তিনি আমাদের মন্টু দত্ত ছাড়া আর কেউ নন। কাল বিকেলে আমার ছেলেটি এসে খবর দিল আপনি সুলতার দেওর সেজে মন্টুবাবুর বাড়িতে থাকতে এসেছেন। শুনে যেটুকু বা সংশয় ছিল, সেটাও চলে গেল। আমি একশভাগ নিশ্চিন্ত হলাম মন্টুবাবুই আপনার মক্কেল। প্রশ্ন উঠবে, মন্টুবাবু কেন আপনার কাছে গিয়েছিলেন? কেন তাঁর মতো নিরীহ, নির্বিরোধ একজন লোকের গোয়েন্দার সাহায্য নেবার দরকার পড়ল?'

'উত্তরটা অবশ্য আমার জানাই ছিল। মন্টুবাবুর বাড়িতে যে বেশ কিছুদিন ধরে ভূতুড়ে টেলিফোন আসছে সেটা তো আমার থেকে ভালো আর কেউ জানে না। এটা নিয়ে মন্টুবাবু যে বকুলকে সন্দেহ করছেন সেটাও আমার অজানা ছিল না। দুয়ে দুয়ে চার করে বুঝলাম ভূতুড়ে টেলিফোনের রহস্যভেদ করার জন্য মন্টুবাবু আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছেন।'

'কী করে জানলেন মন্টুবাবু বকুলকে সন্দেহ করছে?' এতক্ষণ পরে মুখ খুলল আদিত্য।

'সেটা জানার জন্য আর একটু আগে থেকে শুরু করতে হবে। বকুলকে আমি অনেকদিন ধরে চিনি। বকুলের ছোড়দা দেবী ইশকুলে আমার দু' ক্লাস নীচে পড়ত। এক পাড়ার ছেলে। বলতে পারেন আমার চ্যালা ছিল। সেই সূত্রে ওদের বাড়িতে যাতায়াত। দেবী ইস্কুলের গণ্ডি পেরোতে পারেনি। আমি ইস্কুল পেরিয়ে কলেজে ঢুকলাম। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্বটা রয়েই গেল। আমি লেখাপড়ায় খারাপ ছিলাম না। তাছাড়া খেলাধুলো করতাম, লোকের বিপদে-আপদে গিয়ে দাঁড়াতাম। তাই সেই বয়সে আমি ছিলাম পাড়ার হিরো। ওই সময় বকুল বড় হচ্ছিল। বকুল যখন ইস্কুলের গণ্ডি পেরোবে পেরোবে, আমি কলেজে ঢুকেছি, আমাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়।'

'কার সঙ্গে কথা বলছ ওস্তাদ?' আপিসঘরের পিছনের একটা দরজা ঠেলে হোঁতকা চেহারার এক ব্যক্তি সাইবার কাফের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। আপিসঘরের পেছনে যে বাইরে যাবার একটা দরজা আছে আদিত্য এতক্ষণ খেয়ালই করেনি।

তার কথার সরাসরি উত্তর না দিয়ে সুশান্ত আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বলল,

'ইনি হলেন দেবীরঞ্জন বসাক, বকুলের ছোড়দা।' তারপর হোঁতকা লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, 'ইনি সেই আদিত্য মজুমদার, মন্টুবাবুর ভাড়া করা টিকটিকি, আপাতত মন্টুবাবুর বাড়িতেই নাম ভাঁড়িয়ে রয়েছেন।'

'কেলাতে হবে?' দেবী আদিত্যর দিকে দু'পা এগিয়ে এল।

'এখন দরকার নেই। তুই বাইরে থাক। দরকার পড়লে ডাকব।'

দেবী খানিকটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও পিছনের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।

'তারপর যা বলছিলাম' সুশান্ত আবার শুরু করল, 'বকুলের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা যতদূর গড়ানো সম্ভব, ততদূরই গড়িয়েছিল। ইতিমধ্যে আমার জীবনে আরও কিছু পরিবর্তন আসে। আমি কিছুটা অভাবের চাপে কিছুটা স্বভাবের দোষে বিপথে চলে গেলাম। প্রথম প্রথম বেশ লাগত। হাতে প্রচুর কাঁচা টাকা, বকুলকে নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছি, দামি হোটেলে খাওয়াচ্ছি। কিছুদিন পরে বুঝলাম পথটা পিচ্ছিল, এতটাই পিচ্ছিল যে একবার নামতে শুরু করলে আর সহজে ওঠা যায় না। পাড়ায় বদনাম হল। বকুল প্রথমে বকাবকি, পরে কান্নাকাটি শুরু করল। শেষে পুলিশের ফাঁদে পা দিয়ে দু'বছরের জন্য জেলে গেলাম।

'জেলে বসে ঠিক করলাম, আর নয়। জেল থেকে বেরিয়ে ভাল হয়ে যাব। বকুলকে বিয়ে করব। সৎপথে থেকে ব্যবসা করব। চাকরি তো আর দাগি আসামীকে কেউ দেবে না। বকুলই ছিল আমার ভাল হবার ইচ্ছের পেছনে মূল শক্তি।'

'অথচ জেল থেকে বেরিয়ে কী দেখলাম? দেখলাম বকুল মন্টুবাবুকে বিয়ে করেছে। বড়লোকের গৃহিণী হয়ে মহা আরামে আছে। মাথায় আগুন জ্বলে গেল। একদিন রাস্তায় ওকে ধরলাম। ও বলল, বাড়ির চাপে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে। ওকে যেন আমি ক্ষমা করে দিই। অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করল। আমি ভাবলাম যা বলছে সেটা সত্যি হতেও পারে। জেলে যাওয়া প্রেমিকের জন্য হিন্দি সিনেমায় ছাড়া আর কে কবে অপেক্ষা করেছে? কিছুদিন আর ওর সঙ্গে কথা হয়নি। ইতিমধ্যে দেবী আর আমি এই সাইবার কাফেটা শুরু করেছি। ব্যবসা একটু একটু করে জমেও উঠছে। ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। তবু দূর থেকে বকুলকে লক্ষ করার অভ্যেসটা ছাড়তে পারিনি।

'একসময় খেয়াল করলাম বকুল আসলে গোড়া থেকেই শুধু টাকাপয়সা চেয়েছিল। টাকাপয়সা ছাড়া আর কিছুই ভালবাসেনি। ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা জমে ওঠার পেছনেও ওই টাকাপয়সাই ছিল। এখন বুঝতে পারি, আমার হাতে অত কাঁচা টাকা না থাকলে বকুল আমার দিকে ঘেঁষতই না। ভেবে দেখলাম, আমার কুপথে যাবার পেছনে বকুলের এই টাকাপয়সার প্রতি টানটা বিরাটভাবে কাজ করেছিল। বকুলকে পটাতে হবে তাই টাকা দরকার, তা সেই টাকা যেভাবেই আসুক, এটাই ছিল আমার বিপথে যাবার মন্ত্র। আমি নিশ্চিত হলাম যে বকুল মন্টুবাবুকে যতটা না বাড়ির চাপে বিয়ে করেছে, তার থেকে অনেক বেশি টাকার লোভে করেছে। দূর থেকে বকুলকে দেখতাম, আধবুড়ো স্বামীকে হাতের মুঠোয় রেখে সে দেদার টাকাপয়সা খরচ করছে। দামি গাড়ি, দামি শাড়ি-গয়না, ভালগারিটির চূড়ান্ত। আমার মাথায় আবার আগুন জ্বলতে শুরু করল। আমার জীবনটা ছারখার করে দিয়ে বকুল তো দিব্যি আছে। ঠিক করলাম এইভাবে তাকে থাকতে দেব না।

'আমার কাছে বকুলের কিছু পুরোনো চিঠি এবং ছবি আছে যা তার বর্তমান বিয়েটা নষ্ট করে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। একদিন ওকে রাস্তায় পাকড়াও করলাম। চিঠি এবং ছবিগুলোর কথা বললাম। বললাম আমাকে প্রতি সপ্তাহে পনেরো হাজার টাকা দিতে হবে। না দিলে চিঠি এবং ছবিগুলো মন্টুবাবুর কাছে পৌঁছে যাবে। সরাসরি ব্ল্যাকমেল। বকুল আবার কান্নাকাটি করল। আমি অটল রইলাম। সেই থেকে প্রতি সপ্তাহে পনেরো হাজার করে টাকা পেয়ে যাচ্ছি। টাকার কথা মনে করিয়ে দেবার জন্য প্রতি সপ্তাহে বকুলের বাড়ির টেলিফোনে মিসড কল দিই।

'টাকা তো নিয়মিত পেয়ে যাচ্ছেন, তাহলে দিনে এতবার মিসড কল কেন? সপ্তাহে একবার মিসড কল দিলেই তো যথেষ্ট হত।' আদিত্য জিজ্ঞেস করল।

'আপনাকে বুঝতে হবে, বকুল আমার জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছে, আমি তাকে সহজে ছাড়ব না।' সুশান্তর গলাটা প্রায় হিস্টিরিক শোনাল। 'আমি তাকে বলেছি এখন সপ্তাহে সপ্তাহে টাকা দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছ, কিন্তু কতদিন পাবে জানি না। আমি যেকোনও দিন মত বদলে চিঠি-ছবি মন্টুবাবুর হাতে তুলে দিতে পারি। সেই সম্ভাবনাটা মনে করিয়ে দেবার জন্য আমি দিনে বারবার মিসড কল করি। নিজে সব সময় করতে পারি না। আমার ছেলেরা করে। বকুলকে আমি এক মুহূর্তের জন্য শান্তিতে থাকতে দিতে চাইনি। এটা ইর‍্যাকশানাল বলবেন? তা কিন্তু নয়। এটা বকুলকে প্রবল মানসিক চাপে রাখা। তার অতীত পাপ সম্বন্ধে বারবার তাকে মনে করিয়ে দেওয়া। আমি জানি এই ভূতুড়ে টেলিফোন বকুলকে প্রতি মুহূর্তে কুরেকুরে খাচ্ছে। বকুল নিজেই আমাকে কাকুতি-মিনতি করে ভূতুড়ে টেলিফোন থামিয়ে দিতে বলেছে। বলেছে, ওই আওয়াজটা সে আর সহ্য করতে পারছে না। টাকা সে দিয়ে যেতে রাজি, কিন্তু টেলিফোন যেন আর না আসে।'

সুশান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। আদিত্যও কথা বলছে না। শেষে আদিত্য বলল,

'আপনি বকুলের মোবাইলে ফোন না করে বাড়ির ফোনে করেন কেন?'

'কেন করি জানেন? এটা করে আমি একটা মানসিক পরিতৃপ্তি পাই। বকুলের বাড়িতে ফোন বাজলে আমার এখান থেকে শোনা যায়। শুনে ভাল লাগে। মনে হয়, আরও সাতপাড়া জানুক বকুল আমার সঙ্গে কী অন্যায়টা করেছে।'

আরও কিছুক্ষণ স্তব্ধতা। সুশান্ত আদিত্যকে সিগারেট দিয়ে নিজেও একটা ধরাল। আদিত্য জানলা দিয়ে দেখল নির্মেঘ আকাশ। চড়া রোদ্দুরে গাছগুলো ঝলমল করছে। সে বলল, 'এত কথা আপনি আমাকে কেন বলছেন?'

'ঠিক প্রশ্নটাই করেছেন। কেন আপনাকে এত কথা বলছি। আপনাকে এত কথা বলার অবশ্যই একটা কারণ আছে। সম্প্রতি আমি আমার এই ব্যবসাটা বাড়ানোর একটা সুযোগ পেয়েছি। ব্যবসা বাড়াতে কিছু টাকা লাগবে। লাখ দশেক পেলেই আপাতত শুরু করা যাবে। অত টাকা আমার নেই। অত টাকা বকুলের পক্ষেও একসঙ্গে দেওয়া সম্ভব নয়। টাকাটা একমাত্র মন্টুবাবুই দিতে পারেন।'

'কিন্তু মন্টুবাবু আপনাকে অত টাকা দেবেন কেন?'

'আপনাকে আমি যে কথাগুলো বললাম, আপনি মন্টুবাবুকে ঠিক সেই কথাগুলোই বলবেন। এই কথাগুলো জানবার জন্যই তো মন্টুবাবু আপনাকে পয়সা দিচ্ছেন। আমার দশ লাখ টাকার প্রস্তাবের কথাটাও বলবেন। বলবেন, টাকাটা পেলে আমি চিঠি এবং ছবি তাঁর হাতে তুলে দিয়ে চিরতরে তাদের মুক্তি দেব। আর টাকাটা না পেলে চিঠি ও ছবির কথা পাড়ার লোকে সকলে জানতে পারবে। হয়তো তাঁর প্রেসেও জানাজানি হবে। চিঠি ও ছবিগুলো বেশ রগরগে। পাবলিক এনজয় করবে। এখানে একাধিক সম্ভাবনা আছে। একটা হতে পারে, মন্টুবাবু নিজের সম্মান বাঁচানোর জন্য আমাকে টাকাটা দিয়ে দিলেন, কিন্তু বকুলকে তিনি ক্ষমা করলেন না। তাঁদের সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে গেল। এতে আমার ডবল লাভ। টাকাও পেলাম, বকুলের ওপর প্রতিশোধটাও নেওয়া গেল। আরেকটা সম্ভাবনা, পরিবারের সম্মান বাঁচানোর জন্য টাকাটা মন্টুবাবু দিয়ে দিলেন, কিন্তু তিনি বকুলে এতটাই মজে গেছেন যে বকুলকেও ছাড়তে পারলেন না। বকুলকে যদি মন্টুবাবু ক্ষমা করে দেন, আমার কিছু করার নেই। কিন্তু সেক্ষেত্রে অন্তত টাকাটা আমি পেয়ে যাচ্ছি। তৃতীয় সম্ভাবনা, মন্টুবাবু টাকাটা দিলেন না। তাহলে মন্টুবাবু বকুলকে ক্ষমা করুন বা না করুন, চিঠি এবং ছবি পাড়ার লোককে জানিয়ে বকুলকে যেটুকু হেনস্থা করা যাবে সেটুকুই আমার লাভ। ..... আমি ভেবেছিলাম কথাগুলো নিজেই মন্টুবাবুকে বলব। আপনাকে পেয়ে কাজটা সহজ হয়ে গেল। মন্টুবাবুকে বলবেন চটপট একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে সরাসরি আমার সঙ্গে কথা বলতে। দরকার পড়লে আমি নিজেও তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারি। তবে, আমি একটু তাড়ায় আছি। আর হ্যাঁ, পুলিশের কাছে গিয়ে খুব লাভ নেই। আমাকে পুলিশে ধরলে চিঠি-ছবির কথা সঙ্গে সঙ্গে পাড়ার লোক জেনে যাবে। আমি সে ব্যবস্থা করে রেখেছি। আপনাকে আর কিছু বলার নেই। আশা করি আমার সব কথা বুঝতে পেরেছেন। দেবী, ভেতরে আয়। দোকানের গেট খুলে দে। দু'টো বেজে গেছে।'

মন্টুবাবুর ফোনটা অনেকক্ষণ বেজে যাচ্ছে। হয়তো রাস্তায় আছেন তাই শুনতে পাচ্ছেন না। আদিত্য একটা মেসেজ করল, 'আমি সন্ধে সাতটা অব্দি আমার আপিসে আছি। একবার আসুন। খুব জরুরি দরকার।' তারপর মোবাইলে অমিতাভর নম্বরটা লাগাল। এই ফোনটা আবার সুইচড অফ। ক্লাসে আছে নাকি? আদিত্য ঘড়ি দেখল। বিকেল সাড়ে পাঁচটা। এতক্ষণ তো ক্লাস হবার কথা নয়। ফোনটা বেজে বেজে থেমে যাবার পর আদিত্য রত্নার নম্বরটা লাগাতেই ওপার থেকে কলকাকলি শোনা গেল, 'একি টেলিপ্যাথি নাকি রে? এইমাত্র তোকে ফোন করতে যাচ্ছিলাম।'

'আমাকে? কেন?'

'বৃহস্পতিবার রাত্তিরে গৌতম আর ওর বউ মালিনীকে ডিনারে ডেকেছি। অমিতাভকে বললাম তোকে খবর দিতে। তুই না থাকলে ডিনার জমবেই না। তো আমার কর্তার সময়ই হচ্ছে না তোকে জানানোর। আজ সারাদিন ফোন বন্ধ করে গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনে মল্লার ফেস্টিভাল শুনছে।'

'ও হ্যাঁ, কাল অমিতাভ বলছিল বটে গান শুনতে যাবে। তা তোদের সঙ্গে গতকাল দেখা হল তখন তো ডিনারের কথা কিছু বললি না?'

'কী করে বলব? আজ সকালে শুনলাম মালিনী কলকাতায় এসেছে। দু'তিন দিন থাকবে। শুনে ওদের খেতে বললাম। অমিতাভ বলল, তোকে জানিয়ে দেবে। হয়ত রাত্তিরে ফোন করত। আমি তার আগেই জানিয়ে দিলাম। তুই আসতে পারবি তো?

'অবশ্যই পারব। গৌতমের সঙ্গে আমার খুব দরকার। তোদের বাড়িতে গিয়ে রথ দেখা কলা বেচা দু'টোই সেরে নেব। তবে মালিনী থাকলে চোয়াল ব্যথা করে ইংরিজি বলতে হবে। একটু ভাল খাবার-দাবার রাখিস। নইলে পোষাবে না।'

'খাবার ভালোই থাকবে। তবে আজকাল মালিনী বেশ বাংলা বুঝতে পারে। বলতেও পারে একটু একটু। তোর চোয়াল ব্যথা হবে না।'

'দেখা যাক।'

ফোনটা পকেটে পুরে আদিত্য শ্যামলের খোঁজে আপিস ঘরের বাইরে এল। কোথায় শ্যামল? সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে দেখল গেটের সামনে টুলের ওপর শ্যামল বসে আছে।

'তোমার সঙ্গে কথা ছিল, একবার ওপরে আসবে? আর হ্যাঁ, আসার সময় একটু চা এনো।' আদিত্য শ্যামলকে একটা দশ টাকার নোট এগিয়ে দিল।

শ্যামল চা ঢালছিল। আদিত্য সিগারেট ধরিয়ে বলল,

'গতকাল তোমার কাছে কি কেউ আমার খোঁজ করছিল?'

'হ্যাঁ একজন ছোকরা মতো বাবু আপনার কথা জিজ্ঞেস করছিল। বলল, আদিত্যবাবুকে খুব দরকার। আমি ভাবলাম কোনও মক্কেল হবেন। আপনার আপিস ঘরটা দেখতে চাইলেন। আমি বললাম আজ রবিবার সব বন্ধ, তবু শুনল না। দোতলায় উঠে আপনার নেমপ্লেট দেখে জিজ্ঞেস করলেন আপনার মক্কেল-টক্কেল কেমন হয়।আগের দিন যে একজন বাবু এসেছিল আমি তেনার কথা বললাম। সেই মক্কেলের কথা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করল। তারপর চলে গেল।'

'তোমায় কিছু বকশিস দিয়ে গেল নিশ্চয়।'

'তা, হ্যাঁ, মানে ভালোই বকশিস দিল। সেদিন যে কার মুখ দেখে উঠেছিলুম।'

'ঠিক আছে, তুমি এখন যেতে পার।'

আদিত্য ভাবছে। সকাল থেকে অনেক ঘটনা ঘটল। মনে হচ্ছে ভূতুড়ে টেলিফোন রহস্যের কিনারা হয়ে গেছে। আর কিছু বোঝবার নেই। সত্যিই কি আর কিছু বোঝবার নেই? হয়তো নেই, তবু কোথায় যেন একটা খটকা থেকে যাচ্ছে। অথচ খটকাটা যে কোথায় আদিত্য কিছুতেই ধরতে পারছে না। আদিত্যর মুস্কিল হল সে খুব তাড়াতাড়ি কিছু ভাবতে পারে না। তবে একটা ভাবনা নিয়ে অনেকদিন লেগে থাকতে পারে। তার বন্ধু অমিতাভ বলে এটা খাঁটি গবেষকের গুণ। ভাগ্যের দোষে আদিত্য গবেষণার বদলে গোয়েন্দাগিরিতে নেমেছে।

ফোনটা বেজেই থেমে গেল। বিমল মিসড কল দিয়েছে। মানে ফোন করতে বলছে। আদিত্য বিমলের নম্বরটা ডায়াল করল।

'দু'টো জিনিস জানানোর ছিল স্যার। দরকারি কিনা বুঝতে পারছি না, তবু ভাবলাম জানিয়ে রাখি।' বিমলের গলায় একটু কিন্তু কিন্তু ভাব।

'বল।'

'মন্টুবাবুর পাশের বাড়িতে এক ভদ্রলোক থাকেন। রামানুজ না কি যেন একটা নাম। ভদ্রলোক একটু অদ্ভুত আছেন। রাতবিরেতে পাড়া বেড়াতে বের হন। পোড়ো কারখানাটাতেও রাত্তির বেলা ঢুকতে দেখেছি। অত রাত্তিরে ওইসব জায়গায় কী করেন বলা মুস্কিল।'

'আর কি জানলে?'

'আজ আবার সেই শালাবাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বোনের কাছে এসেছিলেন। রাস্তায় হঠাৎ দেখা। চা খাওয়ালাম। কথায় কথায় বললেন, মন্টুবাবুর আর একটা বাড়ি আছে। বাড়িটা ঠিক কোথায় শালাবাবু জানেন না। সম্ভবত পাইকপাড়ার দিকে কোথাও। মন্টুবাবুর এক বিধবা শালী একসময় সেখানে থাকতেন। শালাবাবু বলছিলেন, বড়লোকদের কত সুবিধে ভাবুন। একটা বাড়ি ফাঁকাই পড়ে আছে। ইচ্ছে হল, কিছুদিন শালীকে সেখানে থাকতে দিলেন। আবার ইচ্ছে হল কিছুদিন ফাঁকা ফেলে রাখলেন।'

'সুশান্ত আর দেবীর গতিবিধি কেমন?'

'ওরা তো দোকান থেকে বেরোয়ই না স্যার। আমি দোকানের উল্টোদিকে একটা গাছের আড়ালে টানা আট-নয় ঘণ্টা কাটালাম। ওদের তো একবারের জন্যেও বেরোতে দেখলাম না।'

'শোনো, তোমার পেছনে টিকটিকি লেগেছিল। তুমি ধরা পড়ে গেছ। তোমার পেছন পেছন এসে সুশান্তর লোক আমারও বাড়ি, আপিস সব চিনে নিয়েছে। আর তোমার ওই পাড়ায় যাবার দরকার নেই।'

ওপারে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর বিমলের গলাটা প্রায় হাহাকারের মতো শোনাল, 'আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না স্যার। আমার পেছনে কী করে টিকটিকি লাগবে? আমি এই ধরনের কাজ আগেও তো করেছি। কখনও এরকম হয়নি। আমি আগাগোড়া ভীষণ সাবধান ছিলাম স্যার। আপনি তো সাবধান হতেই বলে দিয়েছিলেন। আমি আপনাকে খুব বিপদে ফেললাম। কী বলব বুঝতে পারছি না।'

'কিছু বলতে হবে না। তেমন ক্ষতি কিছু হয়নি। এই কাজটা, ধরে নাও, শেষ হয়ে গেল। তোমার আরও কিছু টাকা পাওনা আছে। ক'দিন পরে যোগাযোগ কোরো।'

'আমি আর টাকা নিতে পারব না স্যার। আমি তো আপনার কাজটা ঠিকমত করতেই পারলাম না।'

'বললাম তো আমার কাজের কোনও ক্ষতি হয়নি। তুমি ক'দিন বাদে ফোন করে আমার বাড়ি বা অফিসে এস। আজ রাখলাম।'

আদিত্য প্রায় জোর করেই ফোনটা কেটে দিল। নাহলে বিমলের আত্মবিলাপ কখন থামত কে জানে।

সন্ধে সাড়ে ছটায় মন্টুবাবু এলেন। তাঁকে কিছুটা উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল। সুশান্তর পুরো গল্পটা তাঁর কাছে বলতে প্রায় আধঘণ্টা লেগে গেল। সুশান্ত যা যা বলেছে সবটাই মন্টুবাবুকে জানিয়ে দিল আদিত্য। যখন মন্টুবাবুর টাকা নিয়েছে তখন সব কথা জানানোটাই তার কর্তব্য। সে মন্টুবাবুর কাছ থেকে খানিকটা চরম প্রতিক্রিয়া আশা করছিল। কার্যত কিন্তু তেমন কিছু ঘটল না। সব শুনে মন্টুবাবু অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধরা-ধরা গলায় বললেন,

'আমি এইরকমই একটা কিছু আশঙ্কা করছিলাম। আপনি খুব ভাল কাজ করেছেন আদিত্যবাবু। টেলিফোন রহস্য সমাধান করে দিয়েছেন। আর আপনাকে দরকার পড়বে না। সুশান্ত যখন বলেছে, সে নিশ্চয় আমার সঙ্গে বোঝাপড়া করে নেবে। আমি কী করব সেটা আমাকেই ভাবতে হবে। বকুলের সঙ্গেও খোলাখুলি আলোচনা করতে হবে। তবে একটা অনুরোধ। অন্তত আজকের রাত্তিরটা আপনি সুলতার দেওর হয়ে আমাদের বাড়িতে ফিরে চলুন। বকুল আজ রাত্তিরে ওর দাদা-বৌদি-ভাইজিকে খেতে বলেছে। তারা আপনার সঙ্গে আলাপ করতে আসছে। পাশের বাড়ির রামানুজবাবুও থাকবেন। আলাপ হলে দেখবেন আসলে লোকটা মোটেই খারাপ নয়। সুলতা ছোটবেলায় রজনীদের খুব নেওটা ছিল। ওরা সুলতার গল্প শুনতে চাইবে। ওদের সামনে একটা ধোঁকার টাটি খাড়া করে রাখা দরকার। অনেক কেচ্ছা হয়েছে, পাড়ায় আর নতুন করে কেচ্ছা চাই না।'

শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে মন্টুবাবুর গলাটা কান্নায় জড়িয়ে এল।

বকুল বেশ সেজেছে। নীল পাড় দেওয়া কালো শাড়ি, চুল খোলা, ভুরুর ওপরে বড় টিপ। আদিত্যর মনে হল, মাজা রঙে কালো শাড়িটা বেশ মানায়। খানিক আগে সস্ত্রীক, সকন্যা রজনী বসাক এসে পৌঁছেচেন। আদিত্য অবশ্য আরও আগে পৌঁছে গিয়েছিল। বসার ঘরে গল্প-সল্প হচ্ছে। মালতী নানারকম ভাজাভুজি এনে টেবিলে রাখল। মন্টুবাবু ভাবনায় ডুবে আছেন, কথা প্রায় বলছেনই না। কথা বলার ব্যাপারে রজনী বসাক অবশ্য একাই একশো। তিনি আদিত্যর মতো অনুগত শ্রোতা মনে হয় বহুদিন পাননি। বাঙালি যে আজকাল আর আগের মতো ঘরকুনো নেই এই তাঁর প্রতিপাদ্য। তিনি বলছিলেন, 'বুঝলেন ভাই, মধ্যবিত্ত বাঙালি যে আজকাল কোথায় কোথায় বেড়াতে যায় সে আপনি ভাবতেই পারবেন না। ইয়োরোপ-আমেরিকা তো আছেই, তাছাড়া মিশর, আফ্রিকান সাফারি, এমনকি মস্কো থেকে রিগা অব্দি সেই বিখ্যাত ট্রেন যাত্রা, কোনটাতেই আর বাঙালি পিছপা নয়। অনেক পরিশ্রম করে একটা ভ্রমণ-সংস্থা দাঁড় করিয়েছি, জানেন। বাঙালিকে সারা পৃথিবী দেখাব, এটাই ছিল স্বপ্ন। সেই স্বপ্নে এখনও মশগুল হয়ে আছি।'

বকুল তার বৌদির সঙ্গে গল্প করছে। সাদামাটা সাংসারিক কথোপকথন। বকুলের কিশোরী ভাইজি মোবাইলে নিজের মনে কী যেন দেখছে। বোধহয় ফেসবুক।

'সুলতা খুব গিন্নিবান্নি হয়ে গেছে নিশ্চয়। ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করে ওকে।' বকুলের বৌদি আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বললেন। 'আমাদের কথা বলে সুলতা? মার কথা বলে? মাসির কথা বলে? মা মরে যাবার পর তো মাসির কাছেই মানুষ। মাসি চলে গেল, সেই থেকে বিয়ে হওয়া অব্দি আমার কাছেই সব আবদার।'

'বৌদির মাসি ছিল জানতাম না তো।' আদিত্য অবাক হবার ভান করল।

'ছিল বৈকি।'

তাঁর কথা শেষ হবার আগেই বেল বাজল। পাশের বাড়ির রামানুজবাবু ঘরে ঢুকলেন। এদিক-ওদিক তাকিয়ে সোজা রজনীবাবুর পাশে গিয়ে বসলেন। তাঁর বিশাল শরীর থেকে অতি মিহি কণ্ঠস্বর শোনা গেল, 'এই যে ভূপর্যটক সাহেব আবার কবে অজানার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন? আমাকেও এবার সঙ্গে নিয়ে চলুন না।'

'আমি আপনাকে নিয়ে যাবার কে? পয়সা খরচা করলেই যেতে পারবেন।' রজনীবাবুর গলাটা একটু বিরক্ত শোনাল।

'একটু কমসম করে দিন। পাসপোর্টটা কবে থেকে করে রেখেছি। পড়েই আছে। তা, এবার যাচ্ছেন কোথায়?'

'স্ক্যান্ডিনেভিয়া যাচ্ছি। নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড। যেতে হলে দু'এক দিনের মধ্যেই জানিয়ে দিতে হবে।'

'দক্ষিণা কত?'

'আমার ঠিক মনে নেই। কাল আমাদের আপিসে এসে জেনে যাবেন।' রজনীবাবু নির্লিপ্ত গলায় বললেন।

'আমাদের রজনীবাবুর একটা ট্র্যাভেল এজেন্সি আছে। রজনীবাবু তার নাম দিয়েছেন 'পান্থজনের সখা'। কী পোয়েটিক নাম বলুন তো।' রামানুজ চাটুজ্জে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বললেন। 'কিন্তু নাম পোয়েটিক হলে কী হবে, আকাল-চচ্চড়ে দাম। আমাদের মতো হ্যাভনটসদের জন্য নয়। বলি, পাড়ার লোকদের একটু ডিস্কাউন্ট দিতে হয় তো।'

'আপনার সত্যি সত্যি যে কোথাও যাবার ইচ্ছে আছে এমন প্রমাণ তো কখনো পাইনি।'

রজনীবাবু টেবিল থেকে একটা মাসিকপত্র তুলে নিয়ে মুখ ঢাকলেন। রামানুজ চাটুজ্জে আসার পর থেকে তাঁর কথার খেই হারিয়ে গেছে। আদিত্যর সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছিল। সে মন্টুবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল,

'একটু বাইরে থেকে আসছি।'

সে ঘর থেকে বেরিয়ে সদর দরজার দিকে এগোচ্ছে, খেয়াল করেনি কখন বকুল তার সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।

'ছাতে গিয়ে সিগারেট খেতে পারেন। চলুন ছাতটা দেখিয়ে দিই। আমাদের ছাতটা কিন্তু খুব সুন্দর।'

দোতলা পেরিয়ে তিনতলায় ছাত। অন্ধকার। বকুল আদিত্যর দিকে মুখ করে পাঁচিলে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। সত্যিই চমৎকার ছাত। একটু দূরে ট্রেন লাইন দেখা যায়। লাইনটা খানিকটা গিয়ে বাঁক নিয়েছে। সুশান্ত আর দেবীর সাইবার কাফেটাও এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। বকুলের শরীর থেকে মৃদু পারফিউমের গন্ধ আসছে। খুব দামি বিদেশি পারফিউম। আদিত্যর একটু নার্ভাস লাগছিল। স্বাভাবিক হবার জন্য সে সিগারেট ধরাল।

'আমারও সুলতাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে জানেন। আরও ইচ্ছে করে ওর ছেলেকে দেখতে। এতদিনে অনেক বড় হয়ে গেছে নিশ্চয়। ওরা এদিকে একদম আসে না।' বকুলকে কিছুটা বিষণ্ণ দেখাল।

'বাবা বুড়োবয়সে বিয়ে করেছে বলে সুলতার প্রচণ্ড অভিমান। বাবার ওপর অভিমান করে কলকাতাকেই ভুলে গেছে। আমাদের সঙ্গেও আর যোগাযোগ নেই। সুলতা ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে খুব আসত। বলতে গেলে আমার বৌদিই ওকে মানুষ করেছে। বিশেষ করে ওর মাসি হারিয়ে যাবার পর থেকে।'

'সুলতা বৌদি আপনার বৌদির কথা খুব বলে। বলে, ওর মাকে ও কখনই সুস্থ দেখেনি। আপনার বৌদিই ওর মায়ের মতো। কিন্তু মাসির কথা কখনো বলেনি তো।'

'ওই দেখুন, আমি আবার আপনাকে এসব পুরোনো কথা বলতে শুরু করলাম। সুলতার মাসির কথা এই বাড়িতে কেউ বলে না। সুলতাকেও ছোট থেকে শেখানো হয়েছিল মাসির কথা না বলতে। অথচ সুলতার মাসিকে আমার খুব মনে আছে। মা মারা যাবার পর সুলতা মাসির কাছেই অনেকটা সময় মানুষ হয়েছে। মাসি অল্পবয়সে বিধবা হয়েছিলেন। প্রায়ই এবাড়িতে আসতেন। মাঝে মাঝে থেকেও যেতেন। সুলতা তার কাছেই বড় হচ্ছিল। তারপর হঠাৎ একদিন মাসি কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন। আর কোনোদিন ফিরে এলেন না। পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছিল। তারাও কিছু করতে পারল না। পরে শুনেছিলাম মাসি নাকি কোনও বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে পালিয়ে গেছেন। পারিবারিক কলঙ্ক। সেই কলঙ্ক চাপা দেবার জন্য মাসির কথা এবাড়িতে আর কেউ মুখে আনত না। আমার খুব কষ্ট হত। সুলতা তখন এতটাই ছোট নয় যে এসব কিছু বুঝবে না। হয়তো ইচ্ছে করেই সুলতা তার মাসির কথা ভুলে গেছে। হয়ত মাসির ওপরেও একটা অভিমান জমে আছে।'

বকুল একটু চুপ করে রইল, তারপর খানিকটা ক্ষমা চাওয়ার মতো করে বলল, যাগ গে, অনেক অদরকারি কথা বলে ফেললাম, সুলতাকে যেন বলবেন না।'

আদিত্য অনেকক্ষণ চুপ করে আছে। বকুলও আর কথা বলছে না। নীচে টেলিফোনটা বেজে উঠেছে। একটু কি শিউরে উঠল বকুল? একটা ট্রেন আসছে। মালগাড়ি। শম্বুক গতিতে চলতে চলতে একসময় বাঁকের মুখে হারিয়ে গেল ট্রেন। সুশান্তর দোকানের পেছনের দরজা দিয়ে কে যেন বেরোল। গলিতে এসে দাঁড়াল। দূরে লেভেল ক্রসিং-এর দরজা ওপরে উঠে যাচ্ছে। সাইকেল, সাইকেল রিক্সা, ম্যাটাডোর ধীরে ধীরে লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে যাচ্ছে। এখান থেকে সব দেখা যায়।

'আমার কর্তা বললেন আপনি কাল চলে যাচ্ছেন। ট্রেনের টিকিট পেয়ে গেছেন শুনলাম।' বকুল নিস্তব্ধতা ভাঙল।

'কাল রাত্তিরে ট্রেন, বিকেল-বিকেল বেরিয়ে পড়তে হবে।'

'দুটো দিন থাকলেন, আমাদের খুব ভাল লাগল।'

'আমারও খুব ভাল লাগল। আজ শহরটা একটু ঘুরে দেখারও সুযোগ পেলাম। ভাগ্যিস বৃষ্টি ছিল না।'

আদিত্যর কথা শেষ হতে না হতে দু'একটা বৃষ্টির ফেঁটা ওদের গায়ে এসে পড়ল।

'দেখেছেন, বৃষ্টির কথা বলতে না বলতেই বৃষ্টি এসে গেল। মানুষ হলে বলতাম অনেকদিন বাঁচবে। জোরে বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে।'

'সত্যি বলতে কি বৃষ্টি আমার বেশ ভালোই লাগে। ছোটবেলায় সুযোগ পেলেই বৃষ্টিতে ভিজতাম। আর ভিজলেই জ্বর।' আদিত্য হাসল। বকুলের দিকে তাকাল। বকুল চোখ নামিয়ে নিয়েছে। একটু পরে বলল, 'চলুন নীচে যাওয়া যাক।' অন্ধকারে বকুলের শেষ কথাগুলো খানিকটা দীর্ঘশ্বাসের মতো শোনাল।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

সকালটা ইচ্ছে করেই আদিত্য হাতে রেখেছিল। বকুলকে সে বলেছে রাত্তিরের ট্রেন, অতএব বিকেলে বেরোতেই হবে। তার আগে কয়েকটা কাজ সেরে নেওয়া দরকার। মন্টুবাবু আটটা বাজতে না বাজতেই বেরিয়ে গেছেন। আদিত্য যখন বেরোল তখন সাড়ে নটা। বকুলকে বলল, টুকিটাকি কিছু কেনাকাটা আছে। বকুল বলল, 'তাড়াতাড়ি ফিরবেন, দুপুরে একসঙ্গে খাব।'

কিছুটা হেঁটে, কিছুটা অটোতে চড়ে আদিত্য থানায় পৌঁছল দশটা নাগাদ। দেখল, একজন দোহারা চেহারার অফিসার ডেস্কে বসে আছেন।

'বড়বাবু, মানে বলাইবাবুর সঙ্গে দেখা করতে পারি?' আদিত্য জিজ্ঞেস করল।

'বড়বাবু সাড়ে এগারোটা বারোটার আগে আসেন না, দরকার থাকলে আমাকে বলতে পারেন।'

আদিত্য ইতস্তত করল। তারপর বলল, 'বড়বাবুর ফোন নম্বরটা আমার সঙ্গে আছে। আমি ওঁকে একটা ফোন করে নিই?'

'যাকে ইচ্ছে ফোন করুন। তবে এই জায়গাটা ছেড়ে ওই বেঞ্চিটাতে বসে ফোন করুন।'

আদিত্য বেঞ্চিতে বসে বড়বাবুর নম্বরটা লাগাল। একটা গম্ভীর পুলিশি গলায় 'হ্যালো' শুনতে পেয়ে বলল, 'আমি আদিত্য মজুমদার বলছি। আমার কথা জয়েন্ট কমিশনার গৌতম দাশগুপ্ত মনে হয় আপনাকে বলেছে।'

কিছুক্ষণ স্তব্ধতা। আদিত্যর মনে হল ওপারে যিনি ফোন ধরে আছেন তিনি স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন। আধ মিনিট পরে ভেসে এল,

'নিশ্চয়, নিশ্চয়। আপনার কথা জয়েন্ট কমিশনার সাহেব অবশ্যই বলেছেন। সাহেব বলেছেন আপনাকে সব রকমের সাহায্য করতে। আপনি বলুন আমি আপনার জন্য কী করতে পারি?' বড়বাবুর গলায় এখন মধু ঝরে পড়ছে।

'আমি আপনার জন্য থানায় অপেক্ষা করছি। আপনি কখন আসবেন?'

'এই মিনিট পনেরোর মধ্যে চলে আসছি স্যার।'

'আসুন। এলে কথা হবে।'

ফোন রাখার কিছুক্ষণ পরেই আদিত্য লক্ষ করল ডেস্কের অফিসার বাবুটির কাছে একটা ফোন এসেছে। এবং তার খানিকটা পরে যখন থানার বাবুদের জন্য কেটলি করে চা এল, ডেস্কের বাবুটি আদিত্যর সামনে এক ভাঁড় চা নিয়ে এসে একগাল হেসে বললেন,

'খেয়ে নিন স্যার। বড়বাবু এসে পড়লেন বলে।'

নিশ্চয় বড়বাবু ফোন করে আদিত্যকে আদর-আপ্যায়ন করার কথা বলে দিলেন। আদিত্যর মনটাও চা-চা করছিল। চা শেষ করে সে একটা সিগারেট খেতে সবে বাইরে বেরিয়েছে, দ্যাখে বড়বাবুর জিপ থানার সামনে এসে দাঁড়াল।

বড়বাবু মানুষটি নাতিদীর্ঘ, স্থূলকায়, কৃষ্ণবর্ণ ও বিরলকেশ। ভারসাম্য রাখার জন্যই বোধহয় নাকের নীচে প্রকাণ্ড গোঁফ রেখেছেন। মানুষটি প্রয়োজন বিশেষে বিনত বা উদ্ধত হতে পারেন। এককথায়, আদিত্যর মনে হল, বড়বাবু লোকটি অতিশয় ঘোড়েল। আবার চা এল, সঙ্গে সিঙ্গাড়া-মিষ্টি। আদিত্য একে সকালে কম খায় তার ওপর একটু আগে ভারি ব্রেকফাস্ট খেয়ে বেরিয়েছে, আর কিছু খাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে সে কাজের কথায় এল,

'গৌতম নিশ্চয় আপনাকে বলেছে কেন আমি এখানে এসেছি। তবু আর একবার বলছি, আপনার অঞ্চলে ড্রাগ পেডলারদের যে গ্যাংটা বেশ কিছুদিন ধরে দৌরাত্ম করে বেড়াচ্ছে তাদের ধরার জন্য গৌতমকে আমি সাহায্য করছি। এ-ব্যাপারে আপনারও আন্তরিক সাহায্য চাই।'

'আমি তো স্যার একশ ভাগ সাহায্য করতে রাজি। দাশগুপ্ত সাহেব বললে আমি করতে পারি না এমন কাজ নেই। অমন সৎ দক্ষ অফিসার আর হয় না। তবে কিনা, যেটা আমি দাশগুপ্ত সাহেবকেও বারবার বলছি, এ তল্লাটে ড্রাগ পেডলারদের কোন গ্যাং আর নেই স্যার।'

'গ্যাং-ই নেই?'

'না স্যার। গ্যাং-ই নেই। আগে ছিল। সেই গ্যাংটা সুশান্ত হালদার বলে একজন চালাত। দেবীরঞ্জন বসাক ছিল তার ডানহাত। কিছুদিন আগে তাদের জেল হয়। জেলের ভাত খেয়ে ছেলে দুটো একেবারে বদলে গেছে। দেখবেন, দুজনে মিলে একটা সাইবার কাফে চালাচ্ছে। ভালোই চলছে। আমাদের তো স্যার এইসব দাগী আসামীদের ভালো হতে সাহায্য করা উচিত। তাই না স্যার?'

'আপনাদের এখানে যদি ড্রাগ পেডলাররা না থাকে তাহলে দুমাস অন্তর রেললাইনের ধারে লাস পড়ে কেন? আব্দুলের ঠেকে পাতাখোররা ভিড় করে কেন?'

'স্যার, আব্দুল কোথা থেকে তার মাল নিয়ে আসে আমরা এখনো ধরতে পারিনি। তবে আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি এই অঞ্চলে এখন আর কোনও গ্যাং নেই স্যার। আর লাস পড়ার কথা যদি বলেন, এদিকটায় এখনও অনেক ওয়াগন ব্রেকার আছে। জায়গাটা রেল লাইনের ধারে তো। তাদের মধ্যে বখরা নিয়ে মারামারি লেগেই থাকে। এসব কথা কর্তারা লালবাজারে বসে ঠিক বুঝতে পারেন না স্যার। সমস্ত ঝামেলা, গণ্ডগোল ড্রাগওলাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়।'

বড়বাবু চুপ করলেন। আদিত্য আর কী জিজ্ঞেস করবে ভেবে পেল না। লোকটা, সন্দেহ নেই, ড্রাগওয়ালাদের টাকায় আকণ্ঠ ডুবে আছে। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আদিত্য বলল,

'আমাকে সাহায্য করার জন্য অনেক ধন্যবাদ।'

'আপনাকে সব রকম সাহায্য করা তো আমার কর্তব্য স্যার। বিশেষ করে জয়েন্ট কমিশনার সাহেব যখন আপনার কথা এত করে বলেছেন।'

বড়বাবুর কণ্ঠে একটা প্রচ্ছন্ন শ্লেষ আছে। একটা চ্যালেঞ্জ। আদিত্য আর কথা না বাড়িয়ে থানা থেকে বেরিয়ে পড়ল।

ফেরার পথে মন্টুবাবুর পড়শি রামানুজ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা। ভদ্রলোকের হাতে বাজারের থলে। পুঁইশাক, কুমড়োর ফালি উঁকি মারছে।

'আসুন না আমার বাড়িতে, এক কাপ চা খেয়ে যাবেন।' ভদ্রলোক বললেন, 'একাই থাকি, আসুন না কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলা যাবে।'

আদিত্য ঘড়ি দেখল, সাড়ে এগারোটা। বকুল একসঙ্গে খাবে বলেছিল। নিশ্চয় সেটা সাড়ে বারোটার আগে নয়। হাতে সময় আছে। কিছুক্ষণ রামানুজবাবুর সঙ্গে কাটালে মন্দ কী?

রামানুজবাবুর বাড়িটা ছোট, কিন্তু সাজানো। একদিকে রান্নাঘর। রামানুজবাবু বাজার নামিয়ে রেখে চায়ের জল চাপালেন।

'আপনার মতো আমিও পশ্চিমের লোক। আমার ঠাকুরদাদা লাহোরে ওকালতি করতেন।' রামানুজবাবু টি পটে দু চামচ চা পাতা দিতে দিতে বললেন, 'দেশভাগের পর আমার বাবা আর পশ্চিমবঙ্গে ফেরেনি। তবে দুই কাকা এই কলকাতাতেই সেটল করেছিলেন। তাঁদের একজন এখনও বেঁচে আছেন। এই দুই কাকার পরিবারই এখন আমার আপনার জন।'

আদিত্য লক্ষ করল রামানুজবাবুর সেই কমিকাল ভঙ্গীটা আর নেই। গলার আওয়াজ যদিও সেইরকমই মিহি, কিন্তু তার মধ্যেই একটা সিরিয়াস ভাব রয়েছে।

'আমি জয়পুরে বড় হয়েছি। বাবা-মায়ের এক সন্তান। কলেজ থেকে বেরিয়ে রাজস্থান পুলিশে চাকরি পেলাম। বছর দশেক সেখানেই চাকরি করলাম। তারপর একটা বেসরকারি কোম্পানির সিকিউরিটি অফিসার হয়ে আরও পঁচিশ বছর। সংসার করা হয়ে ওঠেনি। ভাবলাম শেষ জীবনটা শিকড়ে ফিরে যাব। কলকাতায় ফিরে এলাম। তাও ছয় বছর হল। এখানকার আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মিলে-মিশে ভালই আছি। এই দেখেছেন, নিজের কথাই বলে যাচ্ছি। আপনার কথা বলুন। আপনার কথা শুনব।'

'আমার তো বলার মতো তেমন কিছু নেই। মধ্যপ্রদেশে জন্ম-কম্ম। এখন সেখানেই একটা ব্যাঙ্কে চাকরি করি। আমার জীবনে উল্লেখযোগ্য কিছুই নেই যা বলা যায়।' আদিত্য সাবধান হয়ে বলল।

'সবার জীবনেই কিছু না কিছু থাকে। আপনারও নিশ্চয় আছে। তবে বলতে না চাইলে অন্য কথা।' রামানুজবাবু একটু থামলেন, তারপর আস্তে আস্তে বললেন,

'আপনি যদি আপনার কথাটা বলতেন তাহলে আমিও আমার কিছু কথা আপনাকে বলতে পারতাম।'

আদিত্য একটু ঘামছিল। খুব তাড়াতাড়ি একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রামানুজবাবুকে কি বিশ্বাস করা যায়? আদিত্য ভাবছে কী করবে। মনে পড়ল, কলেজে তার প্রিয় মাস্টারমশাই প্রফেসর শান্তনু মিত্র বলতেন, একজন চিন্তাশীল মানুষের সব থেকে বড় অস্ত্র তার ইন্টুইশন, এমন একটা অনুভূতি যেটা সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। কথাটা যে কতটা দামী গোয়েন্দাগিরি করতে এসে আদিত্য পদে পদে টের পায়। এখানেও তার ইন্টুইশনকেই কাজে লাগাতে হবে। তার মন বলছে, রামানুজ চাটুজ্জেকে বিশ্বাস করা যায়। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর সে বলল,

'আমিও আপনার সঙ্গে কিছু কিছু জিনিস আলোচনা করতে চাই। সময় নষ্ট করে লাভ নেই। আপনার সন্দেহটাই ঠিক। আমি একজন বেসরকারি গোয়েন্দা। মন্টুবাবু আমাকে ভূতুড়ে টেলিফোন রহস্য সমাধান করার জন্য নিয়োগ করেছেন। তবে আমার এখানে আসার আর একটা উদ্দেশ্য আছে। এই অঞ্চলে একটা ড্রাগ ডিলারদের গ্যাং বেশ কিছুদিন ধরে দৌরাত্ম্য করছে। পুলিশ হাজার চেষ্টা করেও তাদের মাথাটাকে ধরতে পারছে না। এই গ্যাংটাকে ধরার ব্যাপারে পুলিশকে আমি সাহায্য করছি। কিন্তু স্থানীয় থানা থেকে কোনও সহযোগিতা পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না। একটু আগে ওসির সঙ্গে কথা বলে মনে হল তিনি ড্রাগ পেডলারদের থেকে নিয়মিত টাকা পেয়ে থাকেন। তিনি বলার চেষ্টা করলেন, এই অঞ্চলে ওই ধরনের গ্যাং-ট্যাং কিছু নেই। আপনি তো এখানে বেশ কিছুদিন আছেন আপনার কিছু চোখে পড়েছে? মানে অন্য কারো চোখে না পড়লেও আপনার ট্রেনড চোখে অনেক কিছু নজরে আসতে পারে।'

'আপনি আমার সঙ্গে খোলাখুলি কথা বললেন, এতে আমার খুব ভাল লাগছে। আপনার মতো কারও সঙ্গে কথা বলার জন্য আমি দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে আছি। আমি পুলিশকে সাহায্য করতে চাই। কিন্তু চেষ্টা করে দেখেছি সেটা সম্ভব নয়। আপনি একেবারে ঠিক কথাটা বলেছেন। এই অঞ্চলের পুলিশরা সব বিক্রি হয়ে গেছে। আমার কথা তারা শুনবে কেন?' রামানুজবাবুকে বেশ উত্তেজিত মনে হল।

'আপনি পুলিশকে কী বলতে গিয়েছিলেন?' আদিত্য জিজ্ঞেস করল।

'তিনটে জিনিস আমার বলার ছিল। আমার ধারণা মন্টুবাবুর বাড়ির পেছনের গলিটাতে কোনও রহস্য আছে। ঠিক কী বলতে পারব না, গলিটা আমার বাড়ি থেকে দেখাও যায় না, পুরোনো কারখানাটার ভাঙা একটা পাঁচিলে আড়াল পড়ে যায়। কিন্তু কয়েকবার ওখান দিয়ে আসার সময় দেখেছি কারা যেন রয়েছে। আমাকে দেখে যেন সরে গেল। সব মিলিয়ে আমার মনে হয়েছে গলিটার ওপরে পুলিশের নজর রাখা উচিত।'

'এটা তো একটা জিনিস হল। আর কিছু?'

'হ্যাঁ, দ্বিতীয়ত আমার মনে হয়েছে আমাকে এই বাড়ি থেকে কেউ তাড়াবার চেষ্টা করছে। রাত্তিরে নানারকম শব্দ শোনা যায়। দিন দুপুরেও ছোটখাট উৎপাত লেগে থাকে। জানলায় ঢিল পড়ে, কাচ ভাঙে, ছাতে কারা যেন পায়চারি করে। আমি এই বাড়িতে থাকলে যেন কাদের খুব অসুবিধে হচ্ছে। আমার বাড়িওলা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই অবশ্য আমাকে বারবার অভয় দিয়েছেন। বলতে গেলে ওদের ভরসাতেই এখানে রয়ে গেছি। তাছাড়া একটা জেদও চেপে গেছে।'

'আর কিছু?'

'হ্যাঁ, তৃতীয় যেটা বলতে চাই সেটা বলার জন্য খানিকটা পিছিয়ে যেতে হবে। জয়পুরে থাকার সময় আমরা একটা বাঙালি পরিবারকে চিনতাম। খুব বেশিদিনের জন্য নয়। মাস আটেক ওরা আমাদের সামনের বাড়িতে ভাড়া ছিল। সেই পরিবারে একটি মেয়ে ছিল তার নাম ছিল আলপনা, আলপনা দত্ত। আমি যখন ওদের চিনতাম তখন আলপনা খুবই ছোট, ফ্রক পরে ইশকুলে যায়। ওই আটমাসের পর তাকে আর কোনোদিন দেখিনি। মন্টুবাবুর বাড়িতে আসার পরে শুনলাম সুলতার এক মাসি, তার নামও আলপনা, বিয়ের আগে আলপনা দত্তই নাম ছিল, এখানে আসত, কখনো কখনো থেকেও যেত, সুলতার দেখাশোনা করত, হঠাৎ সে উধাও হয়ে গেছে। আমার মনে হল এই আলপনা সেই জয়পুরের আলপনা নয়ত? তারপর যখন শুনলাম সুলতার মাসিও জয়পুর থেকে এসেছিল, তখন আমার কৌতূহল আরও বাড়ল। কিন্তু আমার কৌতূহল নিরসনের কোনও উপায় ছিল না। তারপর বছর দুয়েক আগে আমার এক খুড়তুতো ভাইয়ের পুরোনো অ্যালবাম থেকে একটা ছবি বেরিয়ে পড়ল। খুড়তুতো ভাইরা যখন জয়পুরে আমাদের কাছে বেড়াতে গিয়েছিল সেই সময়ের তোলা ছবি। দেখলাম সেই ছবিতে অনেকের সঙ্গে আলপনাও আছে। আমার কী মনে হল, ছবিটা আমি চেয়ে নিলাম। পুরোনো ছবি, কোনও নেগেটিভ নেই, ভেবেছিলাম ছবিটার একটা কপি করে নিয়ে আমার খুড়তুতো ভাইকে ফেরত দিয়ে দেব। করছি করব করে কপিটা আর করানো হয়নি। ছবিটা একদিন মন্টুবাবুদের দেখালাম। একটা রবিবারের দুপুরে ওদের বাড়িতে নেমন্তন্ন হয়েছিল, সেখানে তখন রজনীবাবুরাও ছিলেন। মন্টুবাবুর দ্বিতীয় স্ত্রী তো অবশ্যই ছিলেন। পুরোনো কথা হচ্ছিল। কথায় কথায় সুলতার মাসির প্রসঙ্গ উঠল। আমার তখন ছবিটার কথা মনে পড়ে গেল। ভাবলাম ছবিটা এনে দেখাই, যদি কেউ চিনতে পারে। বলাই বাহুল্য ছবিটা আমার সঙ্গে ছিল না। আমি বাড়ি থেকে ছবিটা নিয়ে এসে সকলকে দেখালাম। কেউই ছবিটাকে চিনতে পারল না। আমি নিশ্চিত হলাম, আমার দেখা আলপনা দত্ত আর সুলতার মাসি আলপনা দত্ত সম্পূর্ণ আলাদা লোক। তারপর, সত্যি বলতে কি, ব্যাপারটা ভুলেই গিয়েছিলাম। কিছুদিন আগে আবার ছবিটার কথা মনে পড়ল। মনে হল, একটা কপি করে নিয়ে ছবিটা ফেরত দেওয়া দরকার। একটা অ্যালবামের মধ্যে আলগাভাবে ছবিটা রাখা ছিল। কিন্তু অ্যালবামটা খুলে দেখি ছবিটা সেখানে আর নেই। তন্নতন্ন করে খুঁজলাম, ছবিটা কোথাও নেই। আমি কিন্তু ঠিক জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলার লোক নই। গোছানো লোক বলে আমার একটু গর্বই আছে। তাই সমস্ত ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত।'

'ছবিটা হারিয়ে যাবার কথা কাউকে বলেছিলেন?'

'বোধহয় মন্টুবাবুকে বলেছিলাম। ঠিক মনে পড়ছে না।'

'আপনার তিনটে জিনিসই বেশ ইন্টারেস্টিং। আমি মাথায় রাখব।'

আদিত্য ঘড়ি দেখল। সোয়া বারোটা। বকুলের সঙ্গে দুপুরে ভাত খেতে হলে এখনই উঠতে হবে।

রাস্তায় নেমেই রজনী বসাকের সঙ্গে দেখা।

'আপনার সঙ্গে তো ভাল করে আলাপই জমল না সেদিন।' আদিত্যই এগিয়ে গিয়ে কথা বলল।

'কে? ও সূর্যবাবু? কেমন আছেন? আমি এই একটু বকুলের সঙ্গে দেখা করে গেলাম। রোজই অফিস যাবার পথে একবার দেখা করে যাই। আসবেন নাকি একদিন আমাদের অফিসে? দেখাতাম, কত বিচিত্র জায়গায় আমরা বাঙালিকে বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছি।'

'আমি তো আজ রাত্তিরের ট্রেনেই ভিলাই ফিরে যাচ্ছি। যেতে হলে এখনই যেতে হয়। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে আপনারা কোথায় কোথায় নিয়ে যান। ভিলাইতেও অনেকে ইন্টারেস্টেড হতে পারে। আপনাদের ব্রোশিয়র বা ফ্লায়ার গোছের কিছু পেলে নিয়ে যেতাম।'

'এখনই চলুন না আমার সঙ্গে।'

আদিত্য একটু ভাবল। বকুল একসঙ্গে লাঞ্চ খাবে বলেছিল। এখন রজনীবাবুর সঙ্গে গেলে সেটা হবে না। সে ঠিক করল রজনীবাবুর সঙ্গেই যাবে। কিন্তু বকুলকে কথাটা জানানো দরকার। আদিত্য রজনীবাবুকে একটু দাঁড়াতে বলে মন্টুবাবুর বাড়িতে ঢুকল।

মালতী বলল, 'বৌদি এইমাত্র চান করতে ঢুকেছে। আধঘণ্টার আগে বেরোবে না।'

'বেরোলে বৌদিকে বলে দিও আমি বৌদির দাদার সঙ্গে ওঁদের আপিসে যাচ্ছি। দুপুরের খাওয়া বাইরে খেয়ে নেব। আমার জন্য অপেক্ষা না করে যেন খেয়ে নেন।'

'পান্থজনের সখা'র আপিসটা ক্যামাক স্ট্রীটে। একটা দশতলা বাড়ির সাততলায়। রজনীবাবুর গাড়ি যখন বাড়িটার পার্কিং লটে দাঁড়াল তখন সোয়া একটা বেজে গেছে। ছিমছাম আপিস। কয়েকজন সুবেশ, সুদর্শন তরুণ-তরুণী ডেস্কে কাজ করছে। ভেতর আপিসে আরও অনেক কর্মচারী। ডেস্কের এপারে ভ্রমণপিপাসুদের ভিড় চোখে পড়ার মতো।

রজনীবাবুর নিজস্ব চেম্বারটি চমৎকার। একদিকে দেয়াল জুড়ে জানলা, ক্যামাক স্ট্রীট লোয়ার সার্কুলার রোডের মোড় পর্যন্ত দেখা যায়। অন্য দিকের দেয়ালে বরফের ওপর সটান দাঁড়ানো একটা মস্ত গ্রিজলি বেয়ারের ছবি, নীচে লেখা ইয়ালোস্টোন ন্যাশানাল পার্ক। রজনীবাবু নিজের চেয়ারে বসে বেল বাজালেন। বেয়ারাকে বললেন,

'অশোককে আসতে বল, আর দু'কাপ কফি দাও। কফি খাবেন তো?' শেষ প্রশ্নটা আদিত্যকে।

কফি এল। অশোককে 'পান্থজনের সখা'র আগামী ট্যুরগুলির খবর-সম্বলিত প্রচারপত্র আনতে বলা হল। আদিত্য জানতে পারল, আগামী ছ'মাসে 'পান্থজনের সখা' ইয়োরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে এগারোটি সফরের আয়োজন করেছে। মাথাপিছু খরচ দেড় থেকে দুলাখের মধ্যে। দামটা আদিত্যর বেশ কমই মনে হল।

'এত কম খরচে নিয়ে যান কী করে?' আদিত্য রজনীবাবুকে জিজ্ঞেস করল।

'ইচ্ছে থাকলে, বুঝলেন, সবই হয়। এটা আমার ব্যবসা নয়, প্যাশান।'

'আপনাদের সব ট্রিপগুলোই দেখছি দুবাই বা লন্ডন দিয়ে যাচ্ছে। ওখানে কি আপনাদের আপিস আছে?'

'ঠিক ধরেছেন। দুটো জায়গাতেই আমাদের ব্রাঞ্চ আছে। তাই হয় দুবাই, না হয় লন্ডন দিয়ে রুটটা হলে আমাদের সুবিধে হয়। তাছাড়া এমিরেটস এবং ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ দুটো কোম্পানির সঙ্গেই আমাদের চুক্তি আছে। ওরা টিকিটের দামে আমাদের ভাল ছাড় দেয়।'

আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর আদিত্য উঠে দাঁড়াল।

'আজ চলি। ভিলাই থেকে কয়েকজনকে জুটিয়ে নিয়ে আপনাদের সঙ্গে ঝুলে পড়ব। অনেক জায়গায় যেতে ইচ্ছে করে। তবে সবার আগে আফ্রিকা।'

সপ্তম পরিচ্ছেদ

চুল কাটার সেলুনে পৌঁছে আদিত্য দেখল তাদের মেসের নিতাইবাবু কলপ করাচ্ছেন। সেলুনটা ছোট। কুল্লে দু'জন একসঙ্গে চুল কাটতে পারে। কিন্তু দুজন নাপিতের একজন এখনও আসেনি। অতএব একটা চেয়ার ফাঁকাই রয়েছে। অন্যজন ইশারায় আদিত্যকে বসতে বলল।

কাল সন্ধেবেলা আদিত্য মন্টুবাবুর বাড়ি থেকে ফিরে এসেছে। আজ তার হাতে অনেক কাজ।

'কতক্ষণ লাগবে?' আদিত্য জিজ্ঞেস করল।

'বেশিক্ষণ লাগবে না। মিনিট দশের মধ্যে হয়ে যাবে। আপনি ঘুরে আসতে পারেন। তবে আজকে আমি একা। রঘুয়া দেশে গেছে।'

যে চুল কাটছে তার নাম রমেশ, রঘুয়া তার পার্টনার। এরা ঝাড়খণ্ডের লোক। তবে অনেকদিন কলকাতায় আছে বলে পরিষ্কার বাংলা বলতে পারে। আজ বছর পাঁচেক হল দু'জনে মিলে পাড়ায় এই সেলুনটা খুলেছে। এখান থেকে আদিত্যর মেস খুব দূরে নয়। আদিত্য একবার ভাবল বাড়ি থেকে ঘুরে আসে। কিন্তু তারপর মনে হল, লাভ কী? হঠাৎ বৃষ্টি আসতে পারে। তখন আবার এখানে ফেরা মুস্কিল হবে। তাছাড়া ইতিমধ্যে নিতাইবাবুর কলপ করা শেষ হয়ে গেলে অন্য কোনও খদ্দের এসে চেয়ারটা দখল করে ফেলতে পারে। তার চেয়ে এখানেই অপেক্ষা করা ভাল।

চুল কাটার চেয়ার দু'টোর পেছনে একটা কাঠের বেঞ্চি পাতা। আদিত্য সেখানে গিয়ে বসল। নিতাইবাবুর ওপর তার খুব রাগ হচ্ছে। কলপ-করা লোক এমনিতেই তার অপছন্দ, তার ওপর এই নিতাইবাবু লোকটা রোজ সন্ধেবেলা ঘাড়ে পাউডার লাগিয়ে কোথায় যেন যায়। অনেক রাত্তিরে বাড়ি ফেরে। আদিত্য মাঝেমাঝে দেখেছে, নিতাইবাবু পাড়ার রেস্টোরেন্টে একা-একা বসে বিপুল পরিমাণ মাংস-পরোটা সাবাড় করছে। ভাবতে ভাবতে আদিত্যর হঠাৎ হাসি পেয়ে গেল। নিতাইবাবু যদি রোজ সন্ধেবেলা সেজেগুজে কোনও কুস্থানেও যায়, নিতাইবাবু যদি রোজ-রোজ রেস্টোরেন্টে বসে কাঁড়ি কাঁড়ি মাংস-পরোটা খায়, তাতে আদিত্যর কী বলার থাকতে পারে? আদিত্যর পয়সায় তো কিছু করছে না। আসলে চুল কাটার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে আদিত্য বেজায় চটে গেছে। চুলটা এত বড় হয়েছে যে আজ না কাটালেই নয়, অথচ এই সকালের মধ্যেই কয়েকটা কাজ সারতে হবে।

নিতাইবাবুর কলপ-পর্ব শেষ। এখন শ্যাম্পু চলছে। এরপর দাড়ি কামানো আছে, মাথা ও ঘাড়ের দলাই-মলাই আছে। তার মানে আরও ঝাড়া পনেরো-কুড়ি মিনিট। আদিত্য অসহিষ্ণুভাবে ঘড়ি দেখল। সাড়ে নটা বেজে গেছে। আদিত্যর পাশে বেঞ্চির ওপর কিছু পুরোনো পত্র-পত্রিকা রাখা আছে। প্রায় সবই হিন্দি ভাষায় সিনেমা পত্রিকা। তারই মধ্যে অনেক খুঁজে-পেতে একটা বাংলা সিনেমা পত্রিকা পাওয়া গেল। সংখ্যাটা প্রায় এক বছরের পুরোনো। আদিত্য সময় কাটানোর জন্য সেটাই হাতে তুলে নিল।

সিনেমায় আদিত্যর খুব একটা উৎসাহ নেই। বিশেষ করে বাজার চলতি বাংলা সিনেমায়। পুরোনো কিছু হলিউড অবশ্য এখনও বেশ লাগে। আদিত্য ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাতে ওলটাতে নানা তথ্য জানতে পারল। জানতে পারল, কোন নায়কের সঙ্গে কোন নায়িকার এখন লটঘট চলছে। কার সঙ্গে কার আড়ি হয়ে গেছে। জানতে পারল, কোন কোন ছবি মুক্তির প্রতীক্ষায় দিন গুনছে। আদিত্য ভাবল, এতদিনে এদের অনেকেরই নিশ্চয় মুক্তি ঘটে গেছে। পাতা ওলটাতে ওলটাতে একটা জায়গায় আদিত্যর চোখ আটকে গেল। বাংলা সিনেমার ফাইন্যান্সিং-এর ওপর একটা লেখা। প্রতিবেদক লিখছেন, বলিউডের মতো টলিউডেও এখন একটু একটু করে অপরাধ জগতের টাকা ঢুকছে। এর মূল অসুবিধে হল, মাঝেমাঝে নানারকম আইনের ঝামেলায় এইসব টাকার স্রোত শুকিয়ে যায়, কখনও বা যিনি টাকা যোগাচ্ছিলেন তাঁকেই শ্রীঘরে ঢুকতে হয়, ফলে বহু সিনেমা শুরু হয়েও মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

মাঝপথে আটকে যাওয়া এই রকম কয়েকটা সিনেমার কথা প্রতিবেদক লিখেছেন। তার মধ্যে একটি সিনেমা, নাম 'লাভ ইন অকল্যান্ড', যার নামটা ইংরেজিতে হলেও বাকি সব কিছু বাংলায়, অনেকদিন বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি আবার শুরু হয়েছে। সিনেমাটি নতুন করে প্রযোজনা করছে 'পান্থজনের সখা' নামে একটি ভ্রমণ-সংস্থা। এই সংস্থাটি ভ্রমণ-পিপাসুদের একটি অভিনব প্যাকেজ দিচ্ছে। যেসব ভ্রমণকারী 'পান্থজনের সখা'র মাধ্যমে নিউজিল্যান্ড বেড়াতে যাবেন তাঁদের অকল্যান্ড, হ্যামিলটন, ওয়েলিংটন, ক্রাইস্টচার্চ ইত্যাদি শহর ঘোরানো ছাড়াও অতি শীঘ্র নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য 'লাভ ইন অকল্যান্ড' ছবির শুটিংও দেখানো হবে।

'খালি আছে নাকি?' নতুন কোনও খদ্দের সেলুনে ঢুকেছে।

'একটু সময় লাগবে' রমেশ নিতাইবাবুর মাথা দলাই-মলাই করতে করতে বলল, 'এটা হয়ে গেলে যে বাবু বসে আছেন তিনি চুল কাটবেন।'

আদিত্য বুঁদ হয়ে লেখাটা পড়ছে। 'লাভ ইন অকল্যান্ড' ছবির নায়ক-নায়িকার মুখ দুটো আদিত্যর পরিচিত। তাঁদের অনেকগুলো ছবি ছাপা হয়েছে। নায়িকা জানিয়েছেন, নিউজিল্যান্ডে শুটিং করতে যাবার ব্যাপারে তিনি খুবই উৎসাহী, যেহেতু তিনি আগে কখনও নিউজিল্যান্ড যাননি। নায়ক অবশ্য বলেছেন, গত বছরেই ছুটি কাটাতে তিনি নিউজিল্যান্ড গিয়েছিলেন। 'পান্থজনের সখা'র তরফ থেকে শুটিং ও ভ্রমণের ব্যাপারটা দেখাশোনা করছেন কোম্পানির লন্ডন অফিসের কর্ত্রী শ্রীলেখা ভট্টাচার্য। প্রতিবেদনের সঙ্গে তাঁর ছবিসহ একটা সংক্ষিপ্ত বক্তব্যও ছাপা হয়েছে। তিনি বলেছেন, তাঁদের মত প্যাকেজ সারা বাংলায় কেন সারা পৃথিবীতে এই প্রথম। ছবিটা খানিকটা অস্পষ্ট। ভালভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে ছবিতে জনৈকা বয়কাট চুল কালো ফ্রেমের চশমা পরা ভদ্রমহিলা দর্শকের দিকে তাকিয়ে আছেন। ভদ্রমহিলা শুভ্রকেশ, কিন্তু তাঁর মুখচ্ছবিটি এখনও বেশ খুকি-খুকি রয়েছে। আদিত্য নিতাইবাবুর প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করছে। তিনি অতক্ষণ চেয়ার দখল করে বসে না থাকলে, এই সিনেমা পত্রিকাটা দেখাই হত না। আদিত্য জাদুকরী ক্ষিপ্রতায় পত্রিকাটা তার গেঞ্জির ভেতরে চালান করে দিল। জাদুকরের সাগরেদি করাটা তার এই সময়ে খুব কাজে লাগল।

নিতাইবাবু উঠে পড়েছেন। 'চলে আসুন বাবু, হয়ে গেছে', রমেশ আদিত্যকে চুল কাটতে ডাকছে।

'ভাস্কর, আমি আদিত্য বলছি, আদিত্য মজুমদার।'

'আদিত্য? আরে কেমন আছিস? কতদিন তোর সঙ্গে দেখা হয় না, কথা হয় না।'

'তুই তো মাঝেমাঝে ফোন করতিস। অনেকদিন করিসনি কেন ?'

'আর বলিস না। আমার পুরোনো মোবাইলটা হারিয়ে গেছে। নতুন একটা কিনেছি, কিন্তু সব ফোন নম্বর পুরোনো মোবাইলে সেভ করা ছিল। এখন একটু একটু করে ফোন নম্বরগুলো উদ্ধার করার চেষ্টা করছি। তুই ফোন করে ভাল করলি। তোর নম্বরটা সেভ করে রাখব।'

'শোন, একটা জরুরি দরকারে তোকে ফোন করেছিলাম। আমার যতদূর মনে পড়ছে, তুই এম এসসি-র পর কিছুদিন ট্যাংরার দিকে একটা মেয়েদের কলেজে পার্টটাইম পড়িয়েছিলি না?'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ। ইস্ট মেট্রোপলিটান গার্লস কলেজে। আট মাস মতো পড়িয়েছিলাম। তারপর তো বিদেশ চলে গেলাম।'

'সেই কলেজের কিছু পুরোনো খবর দরকার। এমন কেউ তোর চেনা আছে যে কলেজের পুরোনো খবর দিতে পারে?'

'তোর গোয়েন্দাগিরির জন্য লাগবে?'

'তাছাড়া আর কি?'

'চেনা আছে। আমি যখন ওই কলেজে পড়াতাম, ওখানকার প্রিন্সিপাল ছিলেন মহিতোষবাবু, মহিতোষ ভাদুড়ি। তোদের সাবজেক্টের, মানে অঙ্কের লোক। পুরোনো প্রেসিডেন্সি। তবে আমাদের থেকে অন্তত পঁচিশ বছরের সিনিয়র। এখন রিটায়ার করেছেন। লেক মার্কেটের পেছন দিকে রাজা বসন্ত রায় রোডে থাকেন। ঠিকানাটা মনে আছে। পি ১৩২। একসময় খুব যেতাম তো। কিন্তু ফোন নম্বরটা পুরোনো মোবাইলে ছিল, হারিয়ে গেছে। নাহলে আমি একটা ফোন করে দিতাম।'

'ফোন করার দরকার নেই। আমি ম্যানেজ করে নেব।'

'আমারও তাই মনে হয়। এমনিতেই অমায়িক মানুষ। তার ওপর যদি গিয়ে বলিস তুইও প্রেসিডেন্সিতে পড়েছিস, খুব খুশি হবেন।'

'শোন আজ রাখছি। খুব শিগগির একদিন আড্ডা দিতে হবে। পুরোনো বন্ধুরা সব স্মৃতির গম্বুজ হয়ে যাচ্ছে।'

'যা বলেছিস।' ভাস্কর রেফারেন্সটা ধরতে পারল না।

'রাখছি তাহলে।'

'ও-কে। পরে ফোন করব।'

মহীতোষবাবুর বাড়িটা পুরোনো, মনে হয় বাপ-ঠাকুরদাদার আমলের। একতলা বাড়ি, সামনে এক সময় বাগান ছিল, এখন আগাছার জঙ্গল। ভাবতে আশ্চর্য লাগে, এমন জায়গায় একটা পুরোনো বাড়ি পড়ে আছে অথচ এখনও প্রোমোটিং হয়নি। লোহার গেট আলগা করে লাগানো, আদিত্য গেট খুলে সদর দরজা অব্দি পৌঁছে বেল বাজাল। একটা পুরোনো ফিয়াট গাড়ি বাগানের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটা চলে তো? একটু পরে দরজার পেছনে চটির আওয়াজ। দরজা ফাঁক হয়ে এক সৌম্যদর্শন বৃদ্ধের জিজ্ঞাসু মুখ উঁকি মারল, 'কাকে চাইছেন?'

'মহীতোষ ভাদুড়ির সঙ্গে দেখা করতে পারি?'

'আমিই মহীতোষ ভাদুড়ি। বলুন কী দরকার?'

'আমি ভাস্কর ঘোষের বন্ধু। যে ভাস্কর কিছুদিন আপনাদের কলেজে কেমিস্ট্রি পড়িয়েছিল, এখন যাদবপুরে আছে। আমি আদিত্য মজুমদার। ভাস্করের সঙ্গে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তাম। যদি পাঁচ মিনিট আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারতাম।'

'ভেতরে আসুন।' ভাস্কর ঠিক বলেছিল। প্রেসিডেন্সি শুনে বুড়োর মন গলেছে। 'আপনারও কি কেমিস্ট্রি?' মহীতোষবাবু বাড়ির ভেতর ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞেস করলেন।

'না, না, কলেজে আমার বিষয় ছিল অঙ্ক।'

'অঙ্ক? স্ফেনডিড। আজকালকার ছেলেমেয়েরা তো ম্যাথেম্যাটিক্স পড়তেই চায় না। অথচ অঙ্ক ছাড়া সায়েন্স এক পা এগোতে পারে? এখন তো শুনি সোশাল সায়েন্স-এও বেশ অঙ্ক লাগছে।'

আদিত্য মহীতোষবাবুর পেছন পেছন একটা হল পেরিয়ে বৈঠকখানায় ঢুকেছে। একটা বেতের সোফা সেট, এক দিকে লেখার টেবিল, চেয়ার, দেয়াল আলমারি, সেখানে আদিত্য তার ছাত্রজীবনের কিছু পরিচিত বই দেখতে পেল।

'এবার বলুন কী দরকার।' মহীতোষবাবু সোফায় বসে বললেন।

উত্তরে কিছু বলবার আগে আদিত্য তার একটা ভিজিটিং কার্ড বার করে মহীতোষবাবুর হাতে দিল।

'প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর? বেসরকারি গোয়েন্দা?' মহীতোষবাবুর কপালে তিন থাক প্রশ্নের ভাঁজ। 'হঠাৎ আমাকে আপনার দরকার পড়ল কেন?'

'বলছি। আপনার কলেজের দুটি পুরোনো ছাত্রী সম্বন্ধে একটু জানতে চাই। বছর কুড়ি আগে তারা ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান কলেজে পড়ত। আপনি তখন প্রিন্সিপাল ছিলেন। একজনের নাম ছিল বকুল বসাক, অন্যজন শ্রীলেখা ভট্টাচার্য। দ্বিতীয়জনের পদবীটা ভুলও বলতে পারি।'

'দু'টো নামই ঠিক বলেছেন। দু'জনকেই আমার মনে আছে। তবে আলাদা আলাদা কারণে। বকুল বসাক একটা স্ক্যান্ডেলে জড়িয়ে পড়েছিল। তাকে কলেজ থেকে রাস্টিকেট করা হয়েছিল। পাশের কলেজের একটি ছোকরার সঙ্গে তাকে অত্যন্ত কম্প্রোমাইজিং অবস্থায় কলেজের ছাতে দেখতে পাওয়া যায়। সেই ছোকরা তো আমার কলেজের নয়। তাই তাকে কিছুই করতে পারিনি। কিন্তু বকুল বসাককে কলেজ থেকে বহিষ্কার করেছিলাম। আমার সময় আমি কলেজে স্ট্রিক্ট ডিসিপ্লিন রাখার চেষ্টা করতাম। মেয়েদের কলেজে এটার খুব দরকার।'

'যে ছেলেটির সঙ্গে বকুল বসাককে অশালীনভাবে দেখা গিয়েছিল, তার নাম কি সুশান্ত হালদার?'

'আমি নামটা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলাম। আপনি বলতে মনে পড়ে গেল। নামটা ওটাই বটে।'

'আর শ্রীলেখা ভট্টাচার্য?'

'শ্রীলেখা ছিল আমাদের কলেজের গর্ব। ভীষণ ভাল অভিনয় করত। বার দুয়েক ইন্টার কলেজ ড্রামা কম্পিটিশনে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার এনেছিল। শ্রীলেখার সঙ্গে কিছুদিন আগেও একটা বিয়ে বাড়িতে আমার দেখা হয়েছে। বলল, অভিনয় একেবারেই ছেড়ে দিয়েছে। লন্ডনে একটা ট্র্যাভেল এজেন্সি চালায়। বিয়ে করেনি। মাথার চুল সব সাদা হয়ে গেছে। আমি প্রথমটা দেখে চিনতেই পারিনি।' মহীতোষবাবু একটু থেমে বললেন, 'আচ্ছা, আপনি আমাকে এতসব কথা কেন জিজ্ঞেস করছেন বলুন তো?'

'বকুলের বর্তমান স্বামীর ধারণা বকুলকে সুশান্ত হালদার ব্ল্যাকমেল করছে। তাই বকুলের অতীত সম্বন্ধে একটু খোঁজ নিচ্ছিলাম। শুনলাম, শ্রীলেখা বকুলের খুব বন্ধু ছিল। তাই তার সম্বন্ধেও একটু জানতে ইচ্ছে করছিল। বকুলের স্বামী আমাকে হায়ার করেছেন।'

মহীতোষবাবু খানিকক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন, 'বকুলের সঙ্গে শ্রীলেখার একটা আশ্চর্য বন্ধুত্ব ছিল। দুজন দুজনকে ছেড়ে প্রায় থাকতেই পারত না। বকুল রাস্টিকেট হতে শ্রীলেখা খুব ভেঙে পড়েছিল। তার জন্যে আমার খারাপ লাগত। কিন্তু বকুল বসাকের জন্য আমার কোনও সিমপ্যাথি নেই। ওইসব মেয়ের কপালে ব্ল্যাকমেলই লেখা থাকে।'

আধমরা রোদ। মেঘের ফাঁক দিয়ে মাঝেমাঝে সূর্য উঁকি মারছে। তবে মেঘ সরে গেলেই রোদ্দুর আবার নিজমূর্তি ধারণ করবে। আদিত্যকে ছোটবেলায় কে যেন শিখিয়েছিল, ভাদ্রমাসের অর্ধেক দিন মুচির, অর্ধেক দিন চাষার। কথাটা মিথ্যে নয়। আদিত্য বেলগাছিয়া মেট্রো স্টেশনে নেমে খানিকটা হেঁটে মিল্ক কলোনির মোড় থেকে একটা বাস ধরে নর্দার্ন এভিনিউ-এর মোড়ে গিয়ে নামল। তারপর নর্দার্ন এভিনিউ ধরে খানিকটা হেঁটে একটা দোতলা বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এটা মন্টুবাবুর বাড়ি। এই বাড়ির দোতলায় সুলতার হারিয়ে যাওয়া মাসি থাকতেন। একতলাটা অবশ্য চিরকালই বন্ধ থাকে। তখনও থাকত। দোতলায় মন্টুবাবু কিছুদিন হল নতুন ভাড়াটে বসিয়েছেন। বাড়ির উল্টোদিকে ব্যাঙ্ক। এখানেই আদিত্যর দরকার।

এই অবেলায় ব্যাঙ্কে বিশেষ ভিড় নেই। আদিত্য ম্যানেজারের ঘরে গিয়ে নিজের পরিচয় দিতে ম্যানেজার খাতির করে বসালেন। থানা থেকে অনুরোধ এসেছে যেন আদিত্য মজুমদারকে সাহায্য করা হয়। ম্যানেজার আদিত্যকে বললেন, 'আপনার জন্য আলপনা সামন্তর একাউন্টের একটা প্রিন্ট আউট নিয়ে রেখেছি। বড়বাবু সেই রকমই বলেছেন।'

ম্যানেজার বেল বাজিয়ে কী একটা নির্দেশ দিলেন। একটু পরে একজন মোটা একতাড়া কম্পিউটার প্রিন্ট আউট দিয়ে গেল।

'সাধারণত ডরম্যান্ট অ্যাকাউন্টগুলো ট্রেস করতে একটু সময় লাগে। এই একাউন্টটাতে তো ছ'বছর আগে শেষ ট্রানজাকশন হয়েছে। যাইহোক বড়বাবু আগে থেকে বলে দিয়েছিলেন বলে প্রিন্ট আউটটা বার করতে কোনও অসুবিধে হয়নি। আপনি বরং এখানে বসে অ্যাকাউন্টটা স্টাডি করুন, আমি হাতের কাজগুলো সেরে নিই।' ম্যানেজার নিজের কম্পিউটার স্ক্রিনে মন দিলেন।

অ্যাকাউন্ট-এর প্রত্যেকটা এন্ট্রি খুঁটিয়ে দেখা বেশ খাটনির কাজ। আদিত্য আর দেরি না করে কাজে লেগে পড়ল। ২০০৪-এর অগস্ট মাস থেকে ২০০৯-এর এপ্রিল মাস এই চার বছর আট মাস অ্যাকাউন্টটা চালু ছিল। উধাও হয়ে যাবার আগের দিন আলপনা সামন্ত প্রায় সমস্ত টাকা তুলে নিয়েছিল। এখন অ্যাকাউন্টে মাত্র চার হাজার টাকা পড়ে আছে।

আদিত্য লক্ষ্য করল, ২০০৪-এর পর থেকে প্রত্যেক সপ্তাহে নিয়ম করে চার হাজার টাকা তোলা হয়েছে। কখনও এর কোনও অন্যথা ঘটেনি। এটা নিশ্চয় আলপনা সামন্তের মাসিক সংসার খরচ। ব্যাপারটা আদিত্যর একটু অস্বাভাবিক মনে হল। তার অভিজ্ঞতা বলে, সাধারণভাবে মাসের গোড়ায় একটা বড় খরচ হয়ে যায়, মুদি, কাজের লোকের মাইনে, কেবল টিভির ভাড়া সবই মাসের গোড়ার খরচ। তারপর সারা মাস একটু একটু করে আরও খরচ হয়। কিন্তু তার পরিমাণটা অনেক কম। আলপনা সামন্তর টাকা তোলার ধরন দেখে মনে হয় সে সারা মাস ধরে সমানভাবে খরচা করত। কেন এমন হবে? আরেকটা জিনিসও অস্বাভাবিক। সাধারণত, যে-কোনোও পরিবারে মাসিক খরচের একটা কম-বেশি থাকে। কোনও মাসে কম খরচ হয়, কোনও মাসে কিছু বেশি। আলপনা সামন্তর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে সব মাসে একই রকম খরচ।

প্রত্যেক মাসের শেষ দিন নিয়ম করে একটা টাকা অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছে। এটা কী আলপনা সামন্তর বিধবা ভাতার টাকা? কিন্তু টাকাটা আসছে কোথা থেকে? আদিত্য খেয়াল করল, ভাতার টাকাটা কখনও বাড়েনি। চার বছর আট মাস ধরে প্রত্যেক মাসে ঠিক কুড়ি হাজার টাকা করে আলপনা সামন্তর একাউন্টে জমা পড়েছে। এটাও অস্বাভাবিক। প্রথমত, কোনও পেনশন হলে তার পরিমাণ একেবারে কাঁটায় কাঁটায় কুড়ি হাজার হতো না। একটু কম-বেশি হতোই। দ্বিতীয়ত, সেটা বছর বছর বাড়ত। তাহলে টাকাটা কী হিসেবে আসছে? আলপনা সামন্ত প্রত্যেক মাসে চার হাজার টাকা করে জমিয়েছে। এখানেও একটা আশ্চর্য ধারাবাহিকতা আছে। চার বছর আট মাসে তার জমেছিল দুই লাখ চব্বিশ হাজার টাকা। তার থেকে সে দু'লাখ কুড়ি হাজার তুলে নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।

'দুটো প্রশ্ন ছিল।' আদিত্য ম্যানেজারের দিকে মুখ তুলে বলল।

'বলুন।'

'প্রথম প্রশ্ন, আলপনা সামন্তর কি কোনও ফিক্সড ডিপোজিট ছিল? দ্বিতীয় প্রশ্ন, আলপনা সামন্তর মাসিক চেকটা কোথা থেকে আসত?'

'আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তর না, অন্তত আমাদের ব্যাঙ্কে আলপনা সামন্তর কোনও ফিক্সড ডিপোজিট ছিল না। দ্বিতীয় প্রশ্নটা উঠতে পারে ভেবে আমি আগে থেকেই খোঁজ নিয়ে রেখেছি। টাকাটা আসত লন্ডনের একটি ব্যাঙ্ক থেকে। কোনও একটি কোম্পানির অ্যাকাউন্ট থেকে টাকাটা ক্রেডিট করা হত। এর বেশি আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়।'

'না, না, এতেই হবে। আর একটা কথা। আলপনা সামন্ত কি মাঝেমাঝেই ব্যাঙ্কে আসতেন? নাকি কালে ভদ্রে?'

'মাঝেমাঝেই আসতেন। টাকা তুলতেন, পাশ বই আপডেট করাতেন, ফিক্সড ডিপোজিটে সুদের হার জানতে চাইতেন, যদিও ফিক্সড ডিপোজিট তিনি কখনও করেননি। বলা যায় কারণে-অকারণে তিনি ব্যাঙ্কে চলে আসতেন।

আদিত্য উঠে দাঁড়াল। তার যা জানার জানা হয়ে গেছে।

'আমার কাজ হয়ে গেছে। আমি আসছি। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। প্রিন্ট আউটটা আমার আর লাগবে না। আমি আমার দরকারি পয়েন্টগুলো নোট করে নিয়েছি।'

'একটু চা খেয়ে যান। চা বলে দিয়েছি। এখনই আসছে।'

চায়ের কথা শুনে আদিত্য আবার বসে পড়ল।

অষ্টম পরিচ্ছেদ

মেসবাড়িতে বলরামই আদিত্যর লোকাল গার্জেন। ঘরে ঢুকে বলল,

'খেয়ে নিন, ঢের বেলা হয়েছে। এবার সকালের মিল বন্ধ হয়ে যাবে।'

আদিত্য ঘড়ি দেখল, একটা বাজে। আপিসের দিনে আর বেশিক্ষণ খাবার ঘর খোলা থাকবে না। অথচ তার খিদে নেই। সকাল থেকে অনেকবার চা খেয়েছে। অসংখ্য সিগারেট। খিদেটা মরে গেছে।

'আজ আর খাব না রে। চান করাও হয়নি। একটু পরে চান করে বেরোব। বাইরে কিছু একটা খেয়ে নেব। রাত্তিরে নেমন্তন্ন আছে।'

'একটু কিছু খেয়ে নিন। চান-টান পরে করবেন।' আদিত্য জানে খেতে না উঠলে বলরাম নড়বে না। অগত্যা সে বাথরুমে হাত ধুয়ে খেতে চলল। সঙ্গে সঙ্গে বলরাম। সে যতক্ষণ খাবে, বলরাম ঠায় পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে।

'দেশে যাবি কবে?' আদিত্য খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল।

'সামনের মাসে ছুটি চেয়েছি। মালিক এখনও হ্যাঁ-না কিছু বলেনি।'

'তোর মা-এর জন্য শাড়ি আর বাবার জন্য জামা নিয়ে যাস। আমি টাকা দিয়ে দেব। তোকেই কিনে নিতে হবে।'

মন্টুবাবুদের বাড়ি থেকে চলে আসার সময় মন্টুবাবু নগদ পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা হাতে দিয়ে দিয়েছেন। চল্লিশ হাজার পারিশ্রমিক, আরও পাঁচ হাজার ইন্সিডেন্টাল এক্সপেন্স। আদিত্য পাঁচ হাজারটা ফেরত দিতে যাচ্ছিল। খরচ বলতে গেলে কিছুই তো হয়নি। পরে মনে পড়ল বিমলকে টাকা দিতে হবে। তাই পুরো টাকাটাই সে নিয়ে নিয়েছে। এখন কিছুদিনের জন্য সে বড়লোক। অবশ্য পুরোনো কিছু ধারদেনা মেটাতে হবে। যেকোনও কারণেই হোক বকুলের কথা সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না। আসার সময় বকুল ট্রেনের জন্য কিছু রান্না করা খাবার দিয়ে দিয়েছিল। আর কিছু শুকনো কেক-বিস্কুট।

'আর একটু ভাত দেবে?'

'না না খাওয়া হয়ে গেছে। তুই আমার জন্য এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে আয় তো। একটু দাঁড়া, হাত ধুয়ে পয়সা দিচ্ছি।'

আদিত্য ঘরে ফিরে বলরামকে একটা পাঁচশ টাকার নোট দিয়ে বলল,

'এটা ভাঙিয়ে দু' প্যাকেট নিয়ে আসিস। তাড়াতাড়ি আসবি। তুই আবার নীচে গেলে কোথায় যেন হারিয়ে যাস।'

বলরাম সিগারেট নিয়ে ফিরে এসে দেখল আদিত্য ঘরের মধ্যে পাইচারি করছে। মনে হয় গভীরভাবে কিছু চিন্তা করছে। বলরামকে দেখে ইশারায় সিগারেট ও ফেরত পয়সা টেবিলে রাখতে বলল। বলরাম ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যাবে এমন সময় আদিত্য বলল,

'তোর খাওয়া হয়েছে?'

'এখন খাব কি? অনেক কাজ বাকি। খেতে খেতে তিনটে বেজে যায়।'

'এই কেকগুলো রাখ। আমি কয়েকটা খেয়েছি।' আদিত্য বকুলের দেওয়া অর্ধসমাপ্ত কেকের প্যাকেটটা বলরামের হাতে তুলে দিল।

'কটায় ঘুম থেকে উঠিস?'

'সাড়ে চারটেয় উঠে পড়ি। নাহলে দেরি হয়ে যায়।'

'তোর তো ঘড়ি নেই। বুঝিস কী করে কটা বেজেছে?'

'তিন নম্বরের কাশীনাথবাবু সাড়ে চারটেয় উঠে হাঁটতে যান। বৃষ্টি পড়লে বারান্দায় পাইচারি করেন। সাধারণত নিয়মের হেরফের হয় না। ওঁর ঘরে এলার্ম ঘড়ি বাজে। আমি খাবার ঘর থেকে শুনতে পাই। আমার ঘুম ভেঙে যায়।'

'বাহ ভাল মজা তো, তোর আর ঘড়ির কী দরকার?' বলতে বলতে আদিত্য হঠাৎ খুব অন্যমনস্ক হয়ে গেল।

চিন্তা করতে করতে আদিত্যর একটু ঘুম এসে গিয়েছিল, ঘুম ভাঙল মোবাইলের আওয়াজে। গৌতম ফোন করছে।

'কী ব্যাপার, তুই কোথায় উধাও হয়ে গেছিলি? আমি তোকে ফোন করতে গিয়েও করতে পারিনি। কে জানে কোথায় কীভাবে রয়েছিস।'

'আমি তোকে দু'একবার ফোনে চেষ্টা করেছিলাম। বেজে গেল। বোধহয় মিটিং-এ ছিলি।'

'হতে পারে। কোনও খবর আছে?'

'অনেক খবর আছে, আলোচনা করার আছে। ভেবেছিলাম কাল রাত্তিরে অমিতাভদের বাড়িতে তোর সঙ্গে দেখা হলে কথা বলে নেব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ওখানে হবে না। আর অত দেরিও করা যাবে না।'

'তুই চারটে নাগাদ লালবাজারে আসতে পারবি?'

'নিশ্চয় পারব।'

'তাহলে চলে আয়।'

'তাহলে এই হল ইন্সপেক্টার কানুনগোর সেই রহস্যময় টেলিফোনের গল্প। এখন মনে হচ্ছে টেলিফোন নম্বরটা কানুনগো কোনোভাবে সুশান্ত হালদারের কাছ থেকেই পেয়েছিল। কিম্বা হয়ত লক্ষ করেছিল সুশান্তর চেলারা এই নম্বরে ফোন করে বকুলকে ভয় দেখায়। কিন্তু এটা জেনে আমাদের তো কোনও উপকার হল না।' গৌতমের গলাটা খুব হতাশ শোনাল।

'আপাতত ব্যাপারটা সেই রকমই দাঁড়াচ্ছে। তবু কিছু খটকা কিন্তু থেকে যাচ্ছে এখনও। তুই আমাকে কয়েকটা ব্যাপারে একটু সাহায্য করতে পারবি?' আদিত্যর গলায় একটা চাপা উত্তেজনা রয়েছে।

'বল।'

'এক, মন্টুবাবুর প্রথম স্ত্রী, নামটা বোধহয় কল্পনা দত্ত, কীভাবে দার্জিলিং-এ মারা গিয়েছিলেন সেটা জানতে হবে। এ ব্যাপারে নিশ্চয় পুলিশ রেকর্ড রয়েছে। যদি একবার ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের সঙ্গে কথা বলতে পারি তাহলে সব থেকে ভাল হয়। দুই, মন্টুবাবুর শালীর একটা খোঁজ লাগাতে হবে। একটা সোর্স বলছে তিনি মন্টুবাবুর পাইকপাড়ার বাড়িতে থাকতেন। সম্ভবত সেখান থেকেই উধাও হয়ে যান। তিনি কোথায় গেলেন? শুনেছি পুলিশে একটা ডায়েরি করা হয়েছিল। সেখান থেকে হয়ত কিছু হদিশ পাওয়া যেতে পারে। তিন, যে ছবিটা কানুনগোর ডায়েরির মধ্যে ছিল, তার একটা কপি আমার চাই। চার, পুলিশ ফাইল থেকে যদি পাওয়া যায়, সুলতার হারিয়ে যাওয়া মাসির একটা ছবি পেলে খুব সুবিধে হত। আর পাঁচ, একটা খবর নিতে পারবি, মন্টুবাবুর বাড়ির টেলিফোন, যেটাতে ভূতুড়ে কল আসে, গত দুই-আড়াই বছরে কখনও খারাপ হয়েছিল কিনা? এবং তার আগে কীরকম ফ্রিকোয়েন্সিতে খারাপ হত?'

'আমি দেখছি কী করতে পারি।'

'আর একটা কথা। তুই কি তোর টিমের লোকদের সঙ্গে আমার সম্বন্ধে কিছু আলোচনা করেছিলি?'

'একটা খুব ছোট গ্রুপের মধ্যে করেছিলাম। কেন বলত?'

'কী আলোচনা করেছিলি?'

'তোর কাছে মন্টুবাবুর আসার কথা, মন্টুবাবুর বাড়িতে তার মেয়ের দেওর সেজে তোর যাবার কথা, সব কিছু নিয়েই কথা হয়েছিল।'

'আমার মনে হয় তোদের দলের মধ্যে কেউ একজন আছেন যিনি শত্রুপক্ষের কাছে তোদের ভেতরের কথা ফাঁস করে দিচ্ছেন। ইংরেজি স্পাই থ্রিলারে যাকে বলে মোল।'

গৌতম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নীচু গলায় বলল,

'কেন তোর এরকম মনে হচ্ছে?'

'দ্যাখ, সুশান্ত যদিও বলছে ওর লোক আমার ছেলেটাকে ফলো করে আমার বিষয়ে সব জানতে পেরেছে, কথাটা আমার বিশ্বাস হয় না। আসলে ওর গল্পের মধ্যে একটা ফাঁক আছে। ওর লোক আমার বিষয়ে সব কিছু জেনে ফেলতেই পারে কিন্তু সে তো আমাকে কখনও দেখেনি। সুশান্তও আমাকে আগে কখনও দেখেনি। তাহলে সাইবার কাফেতে দেখামাত্র সে আমাকে চিনে ফেলল কী করে? ডিটেকটিভ লাইসেন্স পাবার জন্য আমাকে দু'টো ছবি সহ এই লালবাজারেই দরখাস্ত করতে হয়েছিল। একটা ছবি আমার লাইসেন্স-এ লাগানো আছে। অন্যটা নিশ্চয় এখানেই কোথাও আমার ফাইলে রাখা আছে। একজন ভেতরের লোকের পক্ষে সেটার নাগাল পাওয়া শক্ত নয়। আমার ছবি সুশান্তর হাতে আগেই পৌঁছে গেছিল।'

'তোকে মন্টুবাবুর সঙ্গে ও পাড়ার কেউ দেখেনি?'

'একবার রাত্তিরে মন্টুবাবুর সঙ্গে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। কিন্তু রাস্তার আলোগুলো সব কটা জ্বলছিল না। এত কম আলোয় কাউকে দেখে চিনে নেওয়া সহজ কাজ নয়।'

গৌতম অনেকক্ষণ ধরে ভাবল। তারপর বলল,

'তুই যেটা বলছিস সেটা অসম্ভব নয়। অন্য নানা ব্যাপারেও এই ধরনের একটা সন্দেহ আমার মনে দানা বাঁধছিল। আমি সাবধান হব। তবে দু'একজনের ওপর তো নির্ভর করতেই হবে। মন্টুবাবুর প্রথম স্ত্রী ঠিক কতদিন আগে মারা গিয়েছিলেন বলতে পারবি?'

'একেবারে সঠিক বলতে পারব না, তবে মন্টুবাবু বলেছিলেন তাঁর স্ত্রী গত হয়েছেন দশ বছরেরও বেশি হয়ে গেল।'

'ওতেই হবে। আর সুলতার মাসির ব্যাপারটা আমি টালার পুলিশ স্টেশনে খোঁজ লাগাচ্ছি। পাইকপাড়ার ঘটনা হলে ওরাই বলতে পারবে। আর কিছু?'

'আর একটা ছোট্ট ব্যাপার। হয়তো আদৌ গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবু একটু জেনে রাখা ভাল। 'পান্থজনের সখা' বলে কোনও ট্র্যাভেল এজেন্সির নাম শুনেছিস? বিদেশের নানারকম এক্সটিক জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যায়।'

'পান্থজনের সখা? নামটা চেনা চেনা লাগছে। বোধহয় টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দেখেছি। খোঁজ নিতে অসুবিধে হবে না। কিন্তু তুই ঠিক কী জানতে চাস?'

'যতটা জানা সম্ভব। কোম্পানি কেমন চলে, মালিক কেমন লোক, বিশেষ করে বিদেশে কোনও আপিস আছে কিনা।'

'জানিয়ে দেব। আমাকে এখন একটা মিটিং-এ যেতে হবে রে। তোর সঙ্গে কাল সন্ধেবেলা তো দেখা হচ্ছেই।'

রাত্তিরের দিকে গৌতম আবার ফোন করল।

'ভীষণ ইন্টারেস্টিং একটা খবর। এইমাত্র পেলাম। তোকে না জানিয়ে পারছি না। দার্জিলিং-এ কল্পনা দত্তর অপঘাত মৃত্যুর ইনভেস্টিগেটিং অফিসার ছিলেন সেই ইন্সপেক্টার কানুনগো যিনি পরে বদলি হয়ে গোবরায় আসেন এবং সুশান্ত হালদারদের জেলে পাঠান। কাল দুপুরের মধ্যে আরো কিছু তথ্য মেসেঞ্জার দিয়ে তোর আপিসে পাঠিয়ে দেব।'

পরদিন বেলা তিনটে নাগাদ একজন সাদা পোশাকের পুলিশ আদিত্যর আপিসে একটা প্যাকেট পৌঁছে দিল। মোটা প্যাকেট। পুলিশ চাইলে কী না পারে। ঘণ্টা দু'য়েক সেই কাগজপত্র নিয়ে বুঁদ হয়ে রইল আদিত্য। একটা ছবি একটু একটু করে চোখের সামনে ফুটে উঠছে। সেটাকে ধরে রাখার জন্য ভেবেচিন্তে আদিত্য একটা কালপঞ্জী বানাল, তার কিছুটা আবশ্য কাল্পনিক। সে ডায়েরিতে লিখল

জুন, ২০০৪—কল্পনা দত্তর অপঘাত মৃত্যু, সুলতার বয়স তখন ১১ বছর, দেবী-সুশান্তর ৩১/৩২ বছর, বকুলের ২৯/৩০ বছর, রজনীবাবুর ৩৭/৩৮ বছর, মন্টুবাবুর ৪২ বছর

মাস দু'য়েক পরে সুলতার মাসির প্রবেশ

ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ - ইন্সপেক্টার কানুনগোর ট্যাংরা থানায় পোস্টিং

এপ্রিল, ২০০৯ - মাসির অন্তর্ধান

জুলাই, ২০০৯ - রামানুজবাবুর আবির্ভাব

নভেম্বর, ২০০৯ - সুলতার বিয়ে

অগস্ট, ২০১১ - দেবী-সুশান্তর জেল

নভেম্বর, ২০১১ - মন্টুবাবুর সঙ্গে বকুলের বিয়ে

মার্চ-মে, ২০১৩ - দেবী-সুশান্ত জেল থেকে ছাড়া পেল, মার্চে সুশান্ত, জুন মাসে দেবী

কয়েক মাস পর থেকে ভূতুড়ে টেলিফোনের শুরু

মে, ২০১৪ - ইন্সপেক্টার কানুনগো খুন হলেন

জুলাই, ২০১৫ - মন্টুবাবু সাহায্য চাইতে এলেন

'পান্থজনের সখা' সম্বন্ধেও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। মালিকের নাম, কবে শুরু হয়েছে এসব ছাড়াও জানা গেল লন্ডন এবং দুবাইতে তাদের আপিস আছে। সংস্থাটির শুরু ২০০০ সালে। প্রথমে খুব ভালো চলত না। ২০০৪-০৫ থেকে একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এখন সংস্থাটির বেজায় সুনাম। ভোক্তা মূলত মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত বাঙালি। 'পান্থজনের সখা' ওয়েবসাইটে অনেক ভোক্তাই মুক্তকণ্ঠে তাঁদের তৃপ্তির কথা জানিয়েছেন। বিশেষ করে এটা অনেকেই বলেছেন যে এত অল্প খরচে এত আরামে যে বিদেশ ভ্রমণ করা যায় 'পান্থজনের সখা'র মাধ্যমে না বেড়ালে তাঁরা জানতেই পারতেন না। রিপোর্টটা পড়তে পড়তে আদিত্যর মনে হচ্ছিল এবার ইন্টারনেট কানেকশন সহ একটা কম্পিউটার না কিনলেই নয়। এইসব তথ্য সে নিজেই তো ইন্টারনেট ঘেঁটে বার করতে পারত। এখনই অবশ্য কম্পিউটার কেনার পয়সা নেই।

গৌতমের পাঠানো কাগজপত্রের মধ্যে দুটো ছবিও আছে। একটা সুলতার হারিয়ে যাওয়া মাসির ছবি। কালার ছবি, ছবির ওপর নীল ফেল্টপেন দিয়ে লেখা আলপনা সামন্ত। আদিত্য অনেকক্ষণ ধরে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। বয়েস আন্দাজ তিরিশ-একত্রিশ, একটু গ্রাম্য চেহারা। তেল চুকচুকে পাতাকাটা চুল, সামনের দুটো দাঁত ঈষৎ উঁচু। আদিত্য ছবিটার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসল। তার যে সন্দেহটা হচ্ছে সেটা যাচাই করে নেওয়া কঠিন হবে না। অন্য ছবিটা সাদা-কালো, কানুনগোর ডায়েরির মধ্যে যেটা ছিল। এই ছবিটা সে আগেই দেখেছে। এটাও যাচাই করে নিতে হবে।

আদিত্য ঘড়ি দেখল। ছ'টা বেজে গেছে। একটু পরেই অমিতাভদের বাড়িতে যেতে হবে। তার আগে কয়েকটা ফোন সেরে নেওয়া দরকার। প্রথম ফোন তার বন্ধু ক্রিমিনাল লয়ার সুনন্দ মিত্রকে যে মন্টুবাবুর কাছে তার খবর পৌঁছে দিয়েছিল।

'আদিত্য, বল।' ওপার থেকে সুনন্দর গমগমে গলা শোনা গেল।

'দু'মিনিট কথা বলা যাবে?'

'অবশ্যই। কোর্ট শেষ, চেম্বারে সাতটার আগে যাই না। তুই বল।'

'প্রথমেই তোকে ধন্যবাদ জানাই, আমার কাছে ক্লায়েন্ট পাঠানোর জন্য। তুই কি মন্টুবাবুকে আগে থেকে চিনতিস?'

'মন্টুবাবু? কে বলত? ঠিক বুঝতে পারছি না।'

'মন্টুবাবু, পোশাকি নাম জিতেন্দ্রনাথ দত্ত, আমার কাছে একটা ব্যাপারে সাহায্য চাইতে এসেছিলেন। বললেন, তুই পাঠিয়েছিস।'

ওপারে কিছুক্ষণ নীরবতা। লাইনটা কেটে গেল নাকি? আদিত্য দু'বার 'হ্যালো, হ্যালো' বলল। লাইন কাটেনি। সুনন্দ ভাবছিল। এবার তার মনে পড়েছে,

'ও হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। ভদ্রলোক কী একটা টেলিফোনে গোস্ট কলের সমস্যা নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন। আমি বললাম এটা আইনের সমস্যা নয়। আমি কিছু করতে পারব না। তোর কাছে যেতে বললাম।'

'তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে ভদ্রলোক তোর রেগুলার ক্লায়েন্ট নন। তোর কাছে সোজাসুজি অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে নতুন লোকেদের তো তিন-চার মাস লেগে যায়। ভদ্রলোক কি কারও রেফারেন্স-এ এসেছিলেন?'

'এক পুলিসকর্তার রেফারেন্সে অ্যাপয়েন্টমেন্ট হয়েছিল। বুঝতেই পারছিস আমাদের লাইনে করে কম্মে খেতে গেলে পুলিসের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রাখতেই হয়।'

'আমাকে পুলিসকর্তাটির নামটা বলতে পারবি? অবশ্যই কনফিডেন্সিয়ালি।'

'ও কে। বলছি। তবে জানিস তো এসব কথা পাঁচকান না হওয়াই ভাল।'

'নিশ্চিন্ত থাক। আর কেউ জানতে পারবে না।'

আদিত্য নামটা লিখে নিল। পরের ফোন মন্টুবাবুকে।

'হ্যালুউউউ?'

'মণ্টুবাবু, আমি আদিত্য মজুমদার বলছি। কেমন আছেন?'

'ভাল আছি আদিত্যবাবু, মানে এই অবস্থায় যতটা ভাল থাকা যায় আর কি। আপনার কি খবর?'

'আমার নতুন কোনও খবর নেই। তবে আপনার ভূতুড়ে টেলিফোনের কেস এখনও আমাকে ভাবাচ্ছে। যদি আপনার আপত্তি না থাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি?'

'বলুন। তবে বলে রাখি, সুশান্তর সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা হয়ে ওঠেনি। ফলে ভূতুড়ে টেলিফোন আগের মতোই বেজে যাচ্ছে। বকুলকেও এখনও কিছু বলিনি। আদৌ বলব কিনা ভাবছি। একটা কিছু ঠিক করে আপনাকে জানাব।'

'আমার মনে হয়, আর একটা সপ্তাহ যেতে দিন। তারপর না হয় কিছু একটা করবেন। দরকার পড়লে আমি তো আছিই।'

'সে আমি জানি। আপনি কী জিজ্ঞেস করবেন বলছিলেন?'

'হ্যাঁ, আমার প্রথম প্রশ্ন, আমার বন্ধু সুনন্দ মিত্রের কাছে আপনাকে কে পাঠাল?'

'আমি তো উকিল-ব্যারিস্টারের তেমন খোঁজ রাখি না, আমার বন্ধু রজনী বলল সুনন্দবাবুর কাছে যেতে। ওর পুলিশে কে চেনাশোনা আছে, তাকে ধরে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্টও করিয়ে দিল। সুনন্দবাবু বললেন এ ব্যাপারে ওঁর করনীয় কিছু নেই। উনি আপনার কাছে যেতে বললেন। আপনার ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর সব দিয়ে দিলেন।'

'বুঝলাম। আর একটা জিনিস জানার ছিল। আপনার মেয়ে সুলতার এক মাসি আপনার প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর কয়েক বছর সুলতার দেখাশোনা করতেন। তার সঙ্গে আগে, মানে আপনার স্ত্রী মারা যাবার আগে, আপনাদের যোগাযোগ ছিল?'

'খুব একটা ছিল না। কল্পনার নিজের কোনও ভাইবোন ছিল না। ইনি কল্পনার খুড়তুতো বোন। কল্পনার কাকা দিল্লী না জয়পুর কোথায় যেন চাকরি করতেন। কল্পনার বোন আলপনা ওসব দেশেই বড় হয়েছে। আমাদের বিয়ের সময় ওরা নিশ্চয় এসেছিলেন। তবে আমার ঠিক মনে নেই। কল্পনার এই বোনের বিয়েও হয়েছিল ওসব জায়গায় কোথাও। মাঝখানে ওদের সঙ্গে দীর্ঘদিন কোনও যোগাযোগ ছিল না। আলপনার বিয়ের খবর পেয়েছিলাম, তবে দূরে বলে যাওয়া হয়নি। কল্পনা মারা যাবার কিছুদিন পরে আলপনা হঠাৎ একদিন আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। এসে নিজের পরিচয় দিল, নাহলে তো আমি চিনতেই পারতাম না। ইতিমধ্যে সে বিধবা হয়েছে। ছেলেপুলেও নেই। শ্মশুরবাড়ির কোনও দূর সম্পর্কের আত্মীয়বাড়িতে অপমানে আছে। তারপর থেকে সে মাঝে মাঝেই আসত। সুলতা ওর খুব নেওটা হয়ে পড়ল। পাইকপাড়ায় আমার একটা বাড়ি খালি পড়ে ছিল। আমি ওখানে ওকে থাকতে দিলাম। মাঝে মাঝে সুলতার আবদারে আমাদের বাড়িতেও থেকে যেত। আমি ওর কাছে খুব কৃতজ্ঞ ছিলাম। সুলতাকে ও মায়ের যত্নে মানুষ করত।'

'তারপর কি হল?'

'আপনি নিশ্চয় জানতে পেরেছেন, আলপনা হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যায়। এটা আমাদের পরিবারের আরেকটা কলঙ্ক। শুনতে পেলাম ওর স্বামীর টাকাকড়ি ম্যানেজ করার জন্য ও যে মাঝে মাঝে ব্যাঙ্কে যেত সেখানেই এক বিবাহিত ভদ্রলোকের সঙ্গে ওর আলাপ হয়। পরে শুনলাম ভদ্রলোক নাকি মাঝে মাঝে পাইকপাড়ার বাড়িতেও আসতেন। তারপর একদিন দুজনে মিলে পালিয়ে যায়। আমরা পুলিশে ডায়েরি করেছিলাম। পুলিস কত দূর চেষ্টা করেছিল জানি না, তবে আলপনার সন্ধান কিছুই দিতে পারেনি। সুলতা খুব কষ্ট পেয়েছিল। ও তখন বড় হচ্ছে, বুঝতে শিখছে। মাসির কথা আর বলত না। মাসির ওপর ওর নিশ্চয় খুব অভিমান হয়েছিল।'

মন্টুবাবু থামলেন। আদিত্য বলল,

'আজ রাখছি। আমি কয়েকদিন পরে ফোন করে খবর নেব। ভাল থাকবেন।'

'আপনিও ভাল থাকবেন।'

তৃতীয় ফোনটা করার আগে আদিত্য অনেকক্ষণ ভাবল। একটা দ্বিধা, একটা দোটানা তাকে ফোন করতে বাধা দিচ্ছে। একবার কয়েকটা সংখ্যা ডায়াল করে মাঝপথে কেটে দিল। শেষে অনেক দোলাচলের পর পুরো নম্বরটা ডায়াল করল সে। ওপাশ থেকে বকুলের গলা শোনা গেল,

'হ্যালো।'

'আমি সূর্য বলছি। সুলতার দেওর। কেমন আছেন?'

'ও সূর্যবাবু? আপনি কোথা থেকে বলছেন? ভিলাই থেকে?' বকুলের গলাটা উষ্ণই শোনাল।

'আমি কলকাতা থেকেই বলছি। সেদিন আমার যাওয়া হয়নি। আর এসি টিকিটটা কনফার্মড হল না। ভাবলাম অত দূর বসে বসে যেতে পারব না। শুক্রবারই যাব ঠিক করলাম। কাল রাত্তিরে আমার ট্রেন।

'এই কদিন কোথায় রয়েছেন?'

'এক পুরোনো কলিগের বাড়িতে। আমি জানতাম না ও এখন এখানে পোস্টেড। সেদিন আপনাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্টেশন যাবার পথে ওর ফোন এল। ওদের বাড়িতে থাকিনি বলে খুব বকাবকি করল। হাওড়া থেকে ওদের বাড়িতে চলে গেলাম। মন্টুবাবু অবশ্য এসব কিছু জানেন না।'

'ভালোই হল। আমাকে মনে করে তবু ফোন করলেন। ভিলাই পৌঁছে গেলে কি আর মনে থাকত?'

'ভাবছিলাম, কাল রাত্তিরে তো চলে যাচ্ছি। আর কোনও দিন দেখা হবে কিনা কে জানে। আসার সময় ভাল করে গুডবাইটাও বলে আসতে পারলাম না। তাই ভাবছিলাম, কাল সকালে আপনার সঙ্গে কোথাও দেখা করা যেতে পারে কি? আমি ঢাকুরিয়ায় আছি। গড়িয়াহাটের কোথাও যদি এক সঙ্গে লাঞ্চ করা যায় খুব ভাল হয়। মন্টুবাবুকেও বলব ভাবছিলাম। কিন্তু উনি ব্যস্ত মানুষ, কাজের দিনে হয়ত আসতে পারবেন না। তাই ওঁকে আর বিব্রত করছি না। আসলে, ক'টা দিন আপনাদের ওখানে খুব অত্যাচার করলাম তো। একবার অন্তত আপনাকে কোথাও ট্রিট করতে পারলে খুব ভাল লাগবে।'

বকুল উত্তর দিচ্ছে না। আদিত্য ফোনটা ধরেই আছে। প্রায় একযুগ পরে চাপা গলায় বকুল বলল,

'সাড়ে বারোটায় গড়িয়াহাটে ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলির সামনে অপেক্ষা করব।'

রত্নাবলী বলল তাদের কলেজের কয়েকজন অধ্যাপিকা সম্প্রতি 'পান্থজনের সখা' নামক ট্র্যাভেল এজেন্টদের মাধ্যমে ইটালি ঘুরে এসে খুব পরিতৃপ্ত। রত্নাবলী বলছিল,

'এদের ট্রিপগুলো সাধারণত একটা দেশ বা একটা বড় দেশের একটা অংশতে কনফাইনড থাকে। অন্য এজেন্সিগুলো যেমন পাঁচদিনে সাতটা দেশ দেখিয়ে দেয়, যার ফলে ফিরে আসার পর হোটেলের ঘরগুলো ছাড়া আর কিছুই মনে থাকে না, শুধু পাড়ার লোককে বলা যায় সুইটজারল্যান্ড দেখেছি, ফ্রান্স দেখেছে, জার্মানি দেখেছি, হল্যান্ড দেখেছি, এই দেখেছি ওই দেখেছি, 'পান্থজনের সখা' সেরকম নয়।'

'একটা পুরোনো হলিউডের ছবি ছিল, ইফ ইটস টিউসডে, দিস মাস্ট বি বেলজিয়াম। এইসব ঝটিকা সফর নিয়ে। বেশ মজার ছবি। অনেকদিন আগে দেখেছিলাম।' অমিতাভ বলল।

'আমিও দেখেছি।' আদিত্যর মনে পড়ে গেল। 'দাঁড়া, দাঁড়া, আমরা একসঙ্গেই তো দেখেছিলাম। ইউ এস আই এস-এ দেখিয়েছিল।'

'হোয়্যার ডিড ইয়োর কলিগস ট্র্যাভেল ইন ইটালি?' মালিনী জিজ্ঞেস করল।

'বেশি জায়গা নয়। ভেনিস, ফ্লরেন্স, রোম আর নাপোলি মানে নেপলস। নেপলস থেকে পম্পেইতেও নিয়ে গিয়েছিল। লাস্ট সাপারটা দেখানোর জন্য মিলান-এও নিয়ে যাবার কথা ছিল, কিন্তু ওদেশে পৌঁছে শোনা গেল লাস্ট সাপার-এর রেনোভেশন চলছে। ওপরটা পুরো ঢাকা, দেখতে হলে শুধু পাগুলো দেখতে হবে। তাই ওরা আর যায়নি। কিন্তু যেখানে নিয়ে গেছে খুব ভাল করে ঘুরিয়ে দেখিয়েছে। তাছাড়া কী একটা গণ্ডগোলের ফলে ফেরার প্লেন ধরতে দুদিন দেরি হয়েছিল। 'পান্থজনের সখা' ওদের ভাল হোটেলে রেখেছিল অ্যাট নো এক্সট্রা কস্ট। আর ওদের খরচটাও আশ্চর্য রকমের কম। মালিনী ইউ ফলো মি, রাইট?' শেষের প্রশ্নটা রত্না একটু কন্ট্রিতভাবে মালিনীকে করল।

'জাস্ট ডোন্ট ওয়ারি, আই ফলো ইউ পারফেক্টলি। বিসাইডস আই অ্যাম গেটিং ট্রান্সফার্ড টু বেঙ্গল ভেরি সুন। আই হ্যাভ টু পিক আপ বাংলা।'

'আমি ওকে দু'দিনে বাংলা শিখিয়ে দেব।' গৌতম ভারিক্কি চালে বলল।

'বুঝতেই পারছি রত্না, 'পান্থজনের সখা' তোকে এজেন্ট হিসেবে রেখেছে। তা রাখুক, আমার আপত্তি নেই। তুই শুধু বল, ওদের সঙ্গে কি কোনও ট্যুর গাইড থাকে? ইটালির মত জায়গায় একটা গাইড না থাকলে খুব অসুবিধে।' আদিত্য রত্নার দিকে তাকিয়ে বলল।

'থাকে তো। ওদের সঙ্গে একটি বাঙালি ছেলে সারাক্ষণ ছিল। তাছাড়া ওদের কোনও অসুবিধে হচ্ছে কিনা দেখার জন্য এক বাঙালি ভদ্রমহিলা, যিনি ওদের লন্ডন অফিসটা দেখাশোনা করেন, সেখান থেকে এসে কিছুদিন ওদের সঙ্গে কাটিয়ে গেছিলেন।'

'যাঁরা ইটালি গেছিলেন তাঁদের মধ্যে কারোর সঙ্গে একটু কথা বলা যাবে?'

'কেন? তুই ইটালি যাবি নাকি?' রত্না একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

'আমি না, আমার এক মক্কেল। ব্যাপারটা জরুরি। একটু তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করা যাবে?'

'কাল সাড়ে দশটা নাগাদ কলেজে চলে আয়। সুনন্দাদির সঙ্গে কথা বলিয়ে দেব।'

'একবার বারান্দায় আসবি, কথা আছে।' আদিত্য উঠে দাঁড়িয়ে গৌতমকে বলল।

আদিত্য আর গৌতম উঠে বারান্দায় যাচ্ছে, শুনতে পেল রত্না পেছন থেকে বলছে,

'কথা না কচু। দু'টোতে বিড়ি ফুঁকতে যাচ্ছে।'

বারান্দায় সিগারেট খেতে খেতে আদিত্য গৌতমের সঙ্গে তার ধারণাগুলো নিয়ে অনেকক্ষণ আলোচনা করল। ভবিষ্যতের করণীয় নিয়েও কথাবার্তা হল। জাল গুটিয়ে আসছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ভূতুড়ে টেলিফোন রহস্যের সত্যিকারের সমাধান হয়ে যাবে মনে হচ্ছে।

নবম পরিচ্ছেদ

আদিত্যর ছোটবেলায় কলকাতা সহরের ভাল রেস্তোরাঁগুলো সবই ছিল পার্ক স্ট্রীটে। তার মধ্যে সাহেবি পার্ক স্ট্রীটের একেবারে শেষ প্রান্তের একটি রেস্তোরাঁ ছিল আদিত্যর বাবার সব থেকে পছন্দসই। পার্ক স্ট্রীটে খেতে যাওয়া হলে সেখানেই যাওয়া হত। অনেকদিন হল রেস্তোরাঁটি উঠে গেছে। তবে আদিত্যর বাবার আমলে সচরাচর বাইরে খেতে যাওয়া হত না। আদিত্যর বাবা কলকাতার অভিজাত ক্লাবগুলির সবকটিরই মেম্বার ছিলেন। রাত্তিরে মাঝে মাঝেই ক্লাব থেকে খাবার আসত। সেসব খাবারের স্বাদ এখনও আদিত্যর মুখে লেগে আছে। বিশেষ করে সনাতন রোস্ট, স্টেক, সুফ্লে বা পুডিং জাতীয় সাহেবি খাবার বানানোয় ক্লাবগুলোর জুড়ি ছিল না। বহু বছর হয়ে গেল আদিত্য কোনও ক্লাবে যায়নি।

আজকাল অবশ্য দক্ষিণ কলকাতায় বেশ ভাল ভাল রেস্তোরাঁ হয়েছে। অমিতাভ-রত্না-টুপলুর সঙ্গে অনেকবার আদিত্য সেসব রেস্তোরাঁতে খেয়েছে। তাদের কয়েকটাকে মন্দ লাগেনি। তবে আদিত্য অবাক হয়ে খেয়াল করেছে, যেসব রেস্তোরাঁর খাবার তার ভাল লেগেছিল তার কোনটাই খুব বেশি দিন চলেনি। নিশ্চয় তার যেটা পছন্দ সেটা আমজনতার পছন্দ নয়। আদিত্যর চিন্তাসূত্র ছিঁড়ে গেল, একটা লাল গাড়ির পেছনের সীট থেকে বকুল তাকে ডাকছে।

'তাড়াতাড়ি উঠে পড়ুন, এখানে একেবারে দাঁড়াতে দেয় না, পার্কিংও নেই। তাড়াতাড়ি উঠুন।'

পেছনের দরজা খুলে আদিত্য বকুলের পাশে বসল। বলল,

'কোথায় যাওয়া হবে আপনিই ঠিক করুন। আমি এসব পাড়ার কিছুই জানি না।'

'লেকের কাছে একটা নতুন জাপানি রেস্টোরান্ট হয়েছে। খুব দূরে নয়। ওখানেই যাই। আপনার মাথায় ভাল মতন কাঁঠাল ভাঙা যাবে।'

'আমার তাতে কোনই আপত্তি নেই।'

বকুল একটা হালকা ছাই রঙের কুর্তা-চুড়িদার পরেছে। চোখে মস্ত গোল গোল রোদ-চশমা। গাড়িতে উঠে আদিত্য আবার সেই হালকা পারফিউমটার গন্ধ পেল। বকুলই ড্রাইভারকে বলল কোথায় যেতে হবে। মিনিট দশেকের মধ্যে আদিত্য দেখতে পেল তারা টেম্পুরা গার্ডেন বলে ছিমছাম একটা রেস্তোরাঁর সামনে পৌঁছে গেছে। পাড়াটা নির্জন, বিশেষ করে এই কাজের দিনের দুপুরে রাস্তায় একটাও লোক নেই। আদিত্যর বেশ নার্ভাস লাগছে। কোনও মহিলাকে নিয়ে সে কখনো কোনও রেস্তোরাঁতে আসেনি। তার ওপর এই মহিলা বিবাহিত এবং তার মক্কেলের স্ত্রী।

'সুসি দিয়ে শুরু করা যাক, না কি? তারপর না হয় এদের একটা প্রন টেম্পুরা মিল আছে সেটা নেওয়া যাবে। আপনার কাঁচা মাছ চলবে তো?'

'কাঁচা মাছ? আপনার চললে আমারও চলবে। আপনিই মেনুটা ঠিক করুন। আমি জাপানি খাবারের কিছুই জানি না। আপনার হাতে নিজেকে সঁপে দিচ্ছি।'

আদিত্যর মনে পড়ল, কলকাতার যে অভিজাত ক্লাবটি থেকে তাদের বাড়িতে প্রায়শই খাবার আসত সেখানে বছরে অন্তত দুবার জাপানি ফেস্টিভাল পালন করা হত। সেই উপলক্ষে সুসি বা টেম্পুরা সে বহুবার খেয়েছে। কিন্তু এখানে সেসব কথা বলার উপায় নেই।

'গতকাল আমার এক পরিচিত আপনার দাদার ট্র্যাভেল এজেন্সি 'পান্থজনের সখা'র খুব প্রশংসা করছিল। 'পান্থজনের সখা'র মাধ্যমে তারা সম্প্রতি ইটালি ঘুরে এসেছে। খুব স্যাটিসফায়েড। আপনি কখনও ওদের সঙ্গে বেড়াতে যাননি?'

'গেছি তো। বলতে গেলে প্রত্যেক বছরেই যাই। কোনও কোনও বছরে একাধিকবারও গেছি। আমার কর্তামশাই অবশ্য কখনো যাননি। ভ্রমণে তাঁর কোনও উৎসাহ নেই, বিদেশ ভ্রমণে তো একেবারেই নেই। তবে আমার যাবার ব্যাপারে তিনি কখনও বাধা দেননি, বরং উৎসাহ দিয়েছেন। একবার ভেবেছিলাম দাদার এজেন্সিতে একটা চাকরি নেব। একা একা বাড়িতে ভাল লাগে না। দাদাকে বললেই রাজি হয়ে যেত। কিন্তু এই একটা ব্যাপারে আমার কর্তাটি ভীষণ কনজারভেটিভ। তাঁর ধারণা বাড়ির বউ-এর কখনও বাইরে চাকরি করতে যাওয়া উচিত নয়। সে যাক। আপনার কথা বলুন। আপনার সম্বন্ধে তো জিজ্ঞেসই করা হয়নি। আপনার বাড়িতে কে কে আছেন?'

'বাড়িতে কেউ নেই। একা থাকি। মাঝে মাঝে সুলতা-বৌদিদের বাড়িতে যাই। তবে সেও ন-মাসে ছ-মাসে।'

আদিত্য নিজেই অবাক হয়ে গেল কী অনায়াসে সে মিথ্যে কাল্পনিক একটা জীবন বানিয়ে নিচ্ছে।

'বিয়ে করেননি?'

প্রশ্নটা করতে গিয়ে বকুলের গলাটা একটু কেঁপে গেল কি? আদিত্যর মনের ভুল হতে পারে। সে বলল,

'হয়ে উঠল কই?' তারপর নিরীহভাবে বলল,

'আমার কখনো বিদেশ যাওয়া হয়নি, জানেন। তবে যেতে খুব ইচ্ছে করে। ব্যাঙ্ক থেকে চার বছরে একবার বেড়াতে যাবার টাকা দেয়। তাতে বিদেশ যাওয়া যায় না, তবে দেশের মধ্যে দিন কতক বেশ ঘুরে আসা যায়।একবার গোয়া গেছি। একবার কেরালা। একাই।'

'দেশের মধ্যে আমার কোথথাও যাওয়া হয়নি। মেয়েরা তো আর একা বেড়াতে যায় না। আমার কর্তা কিছুতেই কলকাতা ছেড়ে নড়বেন না। দাদার এজেন্সি ছাড়া আমার কোথাও যাবার উপায় নেই। ওরা দেশের মধ্যে ঘোরায় না।'

খাবার এসে গেছে। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। বকুল জিজ্ঞেস করল,

'কাঁচা মাছ কেমন লাগছে?'

'বুঝতেই তো পারলাম না কাঁচা মাছ। তবে চিংড়িটা সত্যিই ভাল। এটাই বুঝি টেম্পুরা?'

'এটাই টেম্পুরা। আর ওই ভাত দিয়ে মোড়া মাছের টুকরোগুলো সুসি।'

'আপনি খুব রান্না করেন, না?'

'রোজের রান্না মালতীই করে। আমি কখনও-সখনও সখ করে রান্না ঘরে ঢুকি। তবে আমার কর্তার পছন্দগুলো একেবারে সাবেকি। ডাল, ঝোল, তরকারি। এর অন্যথা হলে মুখ ভার। কার জন্য আর নতুন নতুন পদ রাঁধব?'

'একটা চাদর ঢাকা তানপুরা দেখলাম আপনাদের বৈঠকখানায়। আপনার কি গান-বাজনার চর্চা আছে?'

'তানপুরা আমার নয়, সুলতার। সুলতা খুব সুন্দর গান গাইত। ওর বিয়ে হয়ে যাবার পর থেকে তানপুরাটা ওইভাবেই পড়ে আছে। ভিলাইতে সুলতা গান করে না?'

'কখনো শুনিনি। মনে হয় সংসারের চাপে বৌদি গান-টান একেবারে ছেড়ে দিয়েছে। ফিরে গিয়ে একবার জিজ্ঞেস করব।'

বকুলের রোদ চশমাটা কপালের ওপর তোলা। চশমার আয়নায় মেঘের ছায়া পড়েছে।

'সময় কাটান কেমন করে? বই পড়েন? টিভি?'

'সময় কাটতেই চায় না। বই পড়ার অভ্যেস নেই। টিভিও বেশিক্ষণ ভাল লাগে না। ছাদে একটা বাগান করেছি। সেদিন অন্ধকারে দেখানো হয়নি। বাগানের পেছনে খানিকটা সময় কাটে। মাটির টবে একটা জুঁই গাছ হয়েছে। খুব কুঁড়ি ধরেছে। এবার ফুল ফুটবে।'

আদিত্য জানলা দিয়ে দেখল একটা গাড়ি অনেকক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। দুটো লোক সামনের সীটে বসে অপেক্ষা করছে। একজন ড্রাইভারের সীটে, একজন তার পাশে। কার জন্য অপেক্ষা করছে? একটা বড় মেঘ এসে আস্তে আস্তে সূর্যটাকে ঢেকে দিচ্ছে। রাস্তাটা আঁধার হয়ে গেল। বকুলের মুখের ওপরেও কি অন্ধকারের ছায়া পড়ল? ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে বকুলকে। আদিত্য অনেকক্ষণ বকুলের দিকে তাকিয়ে ছিল। বকুলের ভেতরে কী ঘটছে বোঝার চেষ্টা করছিল। ওয়েটার কফি দিয়ে গেছে।

সন্ধের দিকে গৌতমের ফোন এল। আদিত্য তখন আপিসে। গৌতম বলল,

'কালকের আয়োজন মোটামুটি কমপ্লিট। কাল ভোর-রাত্তিরে সুশান্তর দোকান, আব্দুলের আড্ডা, মন্টুবাবুদের পাড়ার পরিত্যক্ত কারখানা সব এক সঙ্গে রেড হচ্ছে। আমি আমার টিমকে জানিয়ে দিয়েছি। যে নামটা তুই বললি তাকে বলেছি যেন পুরোটা কোঅরডিনেট করে। আমরা আর একটু পরে অপরেশনে যাব। এটা অবশ্য কেউ এখনও জানে না। আমরা যখন অপরেশনে যাব তখন সাইমাল্টেনিয়াসলি 'পান্থজনের সখা'র অফিস রেড করা হবে। এটাও তুই আমি ছাড়া আর কেউ আগে থেকে জানছে না। তোর কী খবর?'

'খবর ঠিকই আছে। সকালে রত্নাদের কলেজে গিয়েছিলাম। প্রথম ছবিটা কেউ চিনতে পারল না। কিন্তু দ্বিতীয় ছবিটা, যেটা তোদের আর্টিস্ট একটু মডিফাই করে দিয়েছেন, দেখানো মাত্রই আইডেন্টিফাইড হয়ে গেল। অর্থাৎ যা সন্দেহ করেছিলাম ঠিক তাই। নতুন কিছু ঘটলে তোকে সঙ্গে সঙ্গে জানাব।'

'ও কে। কাল তাহলে তোকে সকাল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ তুলে নিচ্ছি।'

'ও কে।'

আদিত্য মোবাইল বন্ধ করে টেবিলে রাখল। আরও দুএকটা ফোন সেরে নিতে হবে। প্রথমে বিমল।

'গুড ইভিনিং স্যার। প্ল্যান সব ঠিক আছে তো?'

'সব ঠিক আছে। তুমি এখন কোথায়?'

'ক্যামাক স্ট্রীটে, একটা রাস্তার চায়ের দোকানে বসে আছি স্যার। যে বিল্ডিং-এ পান্থজনের আপিস, তার ঠিক উলটো দিকে। রজনীবাবু এখনও বেরোননি। বেরোলে আপনাকে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে জানিয়ে দেব।'

'ঠিক আছে, বসে থাক।'

আদিত্য ফোন ডিসকানেক্ট করে আরেকটা নম্বর লাগাল।

'আদিত্যবাবু, বলুন।' ওপার থেকে মিহি কণ্ঠ ভেসে এল।

'চারদিকে নজর রাখছেন তো?'

'আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমার দৃষ্টি এড়িয়ে একটা মাছিও গলতে পারবে না।'

'সন্দেহজনক কিছু দেখলেই জানাবেন।'

'সঙ্গে সঙ্গে জানাব। আপনার কোনও চিন্তা নেই।'

'ঠিক আছে। হয়ত কালই দেখা হয়ে যেতে পারে।'

'ঠিক আছে।'

এখন অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই। আদিত্য আপিস বন্ধ করে রাস্তায় নামল। বউবাজার স্ট্রীটে জনস্রোত চলছে। সে ভাবল, এখনো সে এই রাস্তাটাকে বউবাজার স্ট্রীটই বলে। এর আধুনিকতর নাম যে বিপিনবিহারি গাঙ্গুলি স্ট্রীট সেকথাটা মনেই থাকে না। কেন যে কর্পোরেশনের কর্তারা পুরোনো নামগুলো পালটে দেন। ইতিহাসের প্রতি কিছুমাত্র শ্রদ্ধা থাকলে এটা ঘটত না। অন্নদাশঙ্করের লাইন মনে পড়ল ''দ্বিধা হও দ্বিধা হও ওগো মা ধরণী/ চিতুরের নাম হল রবীন্দ্র সরণী''।

আদিত্য এখন কলেজ স্ট্রীট ধরে হাঁটছে। পুরোনো বইয়ের দোকানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বই দেখল। তারপর কফি হাউসে গিয়ে বসল। তার ভেতরে ভেতরে একটা দারুণ উত্তেজনা রয়েছে। এক কাপ কালো কফি নিয়ে আদিত্য অনেকক্ষণ বসে রইল। তারপর আরও এক কাপ। যখন বেয়ারারা ফাঁকা চেয়ারগুলোকে টেবিলের ওপর তুলে দিয়ে কফি হাউস বন্ধ করার ইঙ্গিত দিচ্ছে, আদিত্য উঠে পড়ে ঘরমুখো হল। সে মেসবাড়ির সিঁড়ি দিয়ে তিনতলায় উঠছে, তখন প্রথম ফোনটা এল। দ্বিতীয় ফোনটা এল তার অনেক পরে, প্রায় রাত একটায়। আজ রাত্তিরে আদিত্যর ঘুম হবে না।

ঠিক সাড়ে পাঁচটাতেই গৌতমের ফোন এল, 'নীচে নেমে আয়, আমরা এসে গেছি।'

পৌনে ছটার মধ্যে তারা চিত্তরঞ্জন হাসপাতালের সামনে। স্করপিও গাড়ির মাঝের সীটে গৌতম আর আদিত্য, পেছনের সীটে তিনজন আর্মড পুলিশ, সামনে ড্রাইভারের পাশে গৌতমের খাস বডিগার্ড। পিছনে আর একটা গাড়ি ভরতি পুলিশ। চিত্তরঞ্জন হাসপাতাল অব্দি যেতে হবে ড্রাইভার এইটুকুই জানত। জিজ্ঞেস করল, 'এবার কোনদিকে স্যার?'

'আদিত্য, রাস্তা বলে দে।' গৌতম আদিত্যকে বলল।

কলকাতা সহর এখনও ঘুমের মোড়ক থেকে বেরোয়নি। শুধু রুগির বাড়ির দু'চারজন যারা কাল সারারাত হাসপাতালে রাত জেগেছিল, চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। আদিত্য লক্ষ করল সেই টেলিফোনের বুথটা খোলা রয়েছে, যদিও এই মুহূর্তে কেউ সেখান থেকে টেলিফোন করছে না। উলটো দিকের কচুরির দোকানটা এখনও খোলেনি। পুলিশের গাড়ি দুটো যখন মন্টুবাবুর বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল তখন ঘড়িতে ছটা বেজে কয়েক মিনিট। আদিত্যরা গাড়ি থেকে নামতেই ভোজবাজির মতো হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটা লোক আবির্ভূত হল।

'কাল সাড়ে আটটা নাগাদ ম্যাডাম ফিরেছেন। ম্যাডামের স্বামী ফিরেছেন আরও আধঘণ্টা পরে। তারপর বাড়িতে আর কেউ আসেনি, বাড়ি থেকেও কেউ বেরোয়নি। আমি সারারাত্তির নজর রেখেছি স্যার।'

'এটা কে?' আদিত্য গৌতমের দিকে তাকাল।

'এ আমাদের লোক। খুব হুশিয়ার ছেলে। সারা রাত্তির মন্টুবাবুর বাড়ির ওপর নজর রেখেছে।।'

'ও, তাই বুঝি।'

গৌতম লোকটিকে বলল, 'তুমি এখন বাইরেই থাক। ভেতরে যাবার দরকার নেই। আদিত্য, তুই অবশ্য উইটনেস হিসেবে আমার সঙ্গে যাচ্ছিস।'

বার তিনেক বেল বাজানোর পর চোখ মুছতে মুছতে মালতী এসে দরজা খুলে দিল। পুলিশ দেখে স্পষ্টতই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে তার মুখে। তারপর আদিত্যকে চিনতে পেরে ব্যাকুল হয়ে বলল,

'এসব কী হচ্ছে দাদাবাবু? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। পুলিশ কেন?'

'তোমাকে বুঝতে হবে না। তুমি দাদা-বৌদিকে খবর দাও।'

খবর অবশ্য দিতে হল না। তার আগেই লুঙ্গি-গেঞ্জি পরে মন্টুবাবুকে দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখা গেল, তাঁর পেছন পেছন রাত্রিবাসের ওপর একটা চাদর জড়িয়ে বকুল। মন্টুবাবুই প্রথম কথা বললেন,

'কী ব্যাপার? আপনারা এত ভোরবেলা?' তাঁর গলাটা কাঁপছে।

গৌতম এগিয়ে গেল, পুলিশি কায়দায় বলল,

'আপনার নাম জিতেন্দ্রনাথ দত্ত?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ।'

'আমরা লালবাজার থেকে আসছি। আমি জয়েন্ট কমিশনার ক্রাইম, গৌতম দাশগুপ্ত। আর ইনি আদিত্য মজুমদার, সাক্ষী হিসেবে আমার সঙ্গে এসেছেন। আপনার বাড়ি সার্চ করা হবে। ওয়ারেন্ট আছে।'

'সার্চ করা হবে? কেন? আদিত্যবাবু, আমি কী করেছি?' মন্টু দত্তর গলার আওয়াজটা প্রায় আর্তনাদের মত শোনাল।

'সেটা একটু পরেই বুঝতে পারবেন।' গৌতমের বাহিনী ইতিমধ্যে বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়েছে। এত কাণ্ডের মধ্যে বকুল কিন্তু প্রায় অবিচলিতই আছে।

খুব বেশি খুঁজতে হল না। মন্টু দত্তর আলমারির পেছন থেকে গোটা দশেক প্যাকেট বেরোল। একজন উর্দিপরা পুলিশ একটা প্যাকেট থেকে এক চিমটে গুঁড়ো জিভের ডগায় লাগাল, তারপর বলল, 'খাঁটি কোকেন স্যার। সব মিলিয়ে পাঁচ কোটি টাকার কম হবে না।'

'কোকেন!' মনে হল মন্টু দত্ত এবার অজ্ঞান হয়ে যাবেন।

গৌতম এক পা এগিয়ে এল। গম্ভীর গলায় বলল,

'মিসেস বকুল দত্ত, কোকেন ট্র্যাফিকিং-এর চার্জে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হল। তাছাড়া ইন্সপেক্টার কানুনগোকে খুন করার চার্জও আপনার ওপর আছে। এই কাজে আপনার মূল সহযোগী সুশান্ত হালদারকে কিছুক্ষণ আগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আপনাকে সাবধান করে দিই, এখন থেকে আপনি যা কিছু বলবেন তা আপনার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে।'

ভোজবাজির মতো একজন উর্দিপরা মহিলা পুলিশ আবির্ভূত হয়েছে। আদিত্য লক্ষ করেনি, নিশ্চয় দ্বিতীয় পুলিশের গাড়িটাতে ছিল। মহিলা বকুলের কাঁধে হাত রাখল। বকুল এখনও নির্বিকার। শুধু খুব ঠাণ্ডা চোখে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

দশম পরিচ্ছেদ

'একেবারে গোড়া থেকে বল। আমরা তো কিছুই জানি না।' রত্নাবলী বলল। তাদের বাড়িতে সন্ধেবেলা একটা বড় জমায়েত হয়েছে। সেখানে অমিতাভ-রত্না ছাড়াও রয়েছে গৌতম, গৌতমের কথায় কটা দিনের জন্য দিল্লী ফিরে যাওয়া পিছিয়ে দিয়ে রয়েছে গৌতমের স্ত্রী মালিনী, মন্টুবাবুর পড়শি রামানুজ চট্টোপাধ্যায় এবং অবশ্যই আদিত্য। আদিত্যর পেড়াপেড়িতে বিমলও এসেছে। খুব সংকোচের সঙ্গে ঘরের এক কোণে বসে আছে সে। কিন্তু মন্টুবাবু কিছুতেই এলেন না। বকুল গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে একটা আশ্চর্য নীরবতা গ্রাস করেছে তাঁকে। প্রেসেও যাচ্ছেন না, সারাদিন বাড়িতেই থাকছেন। আদিত্য মূল বক্তা। সে বলতে শুরু করল,

'গোড়া থেকেই বলছি। মাঝে মাঝে একটু অনুমানের মিশেল থাকবে, কিন্তু সেই অনুমানের বাস্তব ভিত্তি আছে। এই সহরের পুবদিকে, পার্ক সার্কাস ও শেয়ালদা স্টেশনের মধ্যবর্তী অঞ্চলে, রেল লাইন ঘেঁসে, বেশ কয়েক বছর ধরে ড্রাগ ডিলারদের একটা বড় চক্র গড়ে উঠেছিল। ঠিক কতদিন ধরে, সেটা পুলিশ একটু চেষ্টা করলেই বার করতে পারবে। কিন্তু আমাদের গল্পের জন্য সেটা খুব একটা প্রাসঙ্গিক নয়। সে যাই হোক, এই ড্রাগ ডিলারদের মাথা ছিল মহম্মদ আসলাম নামে এক ব্যক্তি। তার ব্যবসা ভালোই চলছিল। বিশেষ করে এই শতাব্দীর গোড়ার দিকে সে স্থানীয় একটা কলেজ থেকে কিছু একেবারে অল্পবয়স্ক ছাত্রকে কাজে লাগিয়েছিল যারা তার ব্যবসার প্রসারে দু'ভাবে সাহায্য করত। এক, এই অল্পবয়সী মধ্যবিত্ত বাঙালি ছেলেমেয়েগুলোকে পুলিশ চট করে সন্দেহ করতে পারেনি। দুই, ড্রাগের ব্যবসায় এলেও এরা কেউই নিজেরা ড্রাগ অ্যাডিক্ট ছিল না। ফলে অনেক বেশি ঠাণ্ডা মাথায় এরা কাজ করতে পারত। এই ছেলেমেয়েদের লিডার ছিল সুশান্ত হালদার, তার মাসলম্যান ছিল দেবীরঞ্জন। দেবীর বোন বকুলের সঙ্গে সুশান্ত হালদারের প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং বকুলও কিছুদিন পরে এই ব্যবসায় যোগ দেয়। এখানে বলে রাখি, এই ছেলেমেয়েদের মধ্যে সব থেকে মেধাবী ছিল বকুল। না, না, পড়াশোনায় নয়, নিছক বুদ্ধিতে, কল্পনাশক্তিতে, দূরদৃষ্টিতে। আর মাথা ঠাণ্ডা রাখার ব্যাপারে। পড়াশোনা করলে হয়ত বকুল অনেকদূর পৌঁছতে পারত, কিন্তু সেটা হবার নয়, তার মধ্যে যে প্রবল একটা ক্রিমিনাল সত্ত্বা ছিল সেই সত্ত্বাটাই তাকে বক্রপথে চালিত করেছে। ফলে যা অবধারিত তাই ঘটল। ধীরে ধীরে এই পথভ্রষ্ট ছেলেমেয়েগুলোর চালিকাশক্তি হয়ে উঠল বকুল। সুশান্ত হালদার নামেই দলের মাথা, আসলে দলটাকে চালায় বকুল।

'ইতিমধ্যে মাফিয়া ডন মহম্মদ আসলাম নানা রকমের অসুবিধেয় পড়ল। একদিকে পুলিশের উৎপাত, অন্যদিকে আর একটা রাইভাল গ্যাং-এর সঙ্গে এলাকা দখল নিয়ে লাগাতার ঝামেলা। মাঝে মাঝেই তার দলের লোকেদের লাস ট্রেন লাইনের ধারে পড়ে থাকতে দেখা যায়, তার দলের লোকেরাও যে দুচারটে লাস ফেলে আসে না, এমন নয়। কিন্তু এই অশান্তির আবহাওয়ায় ব্যবসা করা যায় না।

'আসলামের ব্যবসার দু'টো দিক ছিল। সে নেপাল থেকে মাল এনে তার একটা অংশ রিটেলে কলকাতায় পাতাখোরদের কাছে বিক্রি করত। এর জন্য তার একটা নেটওয়ার্ক ছিল যেখানে সে এই ছেলেমেয়েগুলোকে কাজে লাগিয়েছিল। সে এদের ধরে রাখার জন্য খুব ভাল টাকা দিত। সাধারণত ড্রাগ অ্যাডিক্টরাই নেশার লোভে ড্রাগ পেডলারের কাজ করে। অর্থাৎ ড্রাগের নেশা ধরিয়ে দিয়েই ড্রাগ পেডলারদের ধরে রাখা হয়। এক্ষেত্রে কিন্তু টাকার নেশা ধরিয়ে ছেলেমেয়েগুলোকে বশে রাখা হত। দেখা যাচ্ছে, ড্রাগের নেশার থেকে টাকার নেশা কোনওভাবেই কম মারাত্মক নয়।

'আসলামের দ্বিতীয় কাজ ছিল নেপাল থেকে মাল এনে মধ্যপ্রাচ্য দিয়ে ইয়োরোপে পাচার করা। এই কাজে দুবাইতে তার এক সহযোগী ছিল। দেশে থাকাটা ধীরে ধীরে অসম্ভব হয়ে পড়ায় আসলাম ঠিক করল সে পাকাপাকিভাবে দুবাই চলে যাবে। কিন্তু সে দুবাই চলে গেলে তার দেশের ব্যবসাটা কে দেখাশোনা করবে? কলকাতায় আসলামের ডানহাত ছিল আব্দুল। প্রভুভক্তিতে আব্দুলের জুড়ি ছিল না, সে আসলামের জন্য হাসতে হাসতে জীবন দিয়ে দিতে পারত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত একটা অর্গানাইজেশন চালানোর মতো মাথা আব্দুলের ছিল না। এই সময় সুশান্ত হালদার পুরো অর্গানাইজেশনের মাথায় উঠে বসে। এর জন্য যে শঠ বুদ্ধির প্রয়োজন ছিল সেটা বলাই বাহুল্য যুগিয়েছিল বকুল। এককথায় বলতে গেলে বকুলই কার্যত দলের মাথা হয়ে দাঁড়াল।

'দলের কর্তৃত্ব পাবার পর বকুল দু'টো কাজ করল, একটা স্বেচ্ছায়, আরেকটা বাধ্য হয়ে। যেহেতু আসলাম তখন দুবাইতে, দুবাই হয়ে ইয়োরোপে কোকেন পাচার করার সম্ভাবনা তখন অনেক বেড়ে গেছে। সমস্যা হল, সেই সময় দুবাইতে মাল নিয়ে যাবার কোনও স্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল না। এখানে আমাদের বকুলের বড়দা রজনীরঞ্জনের দিকে চোখ ফেরাতে হবে। রজনীবাবু মানুষটা গোড়ায় অসৎ ছিলেন না, কিন্তু বিদেশ ভ্রমণ এবং ট্র্যাভেল এজেন্সি চালানোর পাগলামিটা তখন তার মাথায় ভাল মতন চেপে বসেছে। চাকরি থেকে তাড়াতাড়ি অবসর নিয়ে একটা ট্র্যাভেল এজেন্সি খুলে বসেছেন, স্বপ্ন দেখছেন, বাঙালিকে কম খরচে বিশ্বদর্শন করাবেন। কিন্তু কোম্পানি একেবারেই চলছে না। রিটায়ারমেন্টের পুরো টাকাটাও কোম্পানির গর্ভে চলে গেছে। রজনীবাবুর যখন প্রায় পথে বসার অবস্থা সেই সময় দলের কর্তৃত্ব সুশান্তর বকলমে বকুলের হাতে চলে আসে।

'সুশান্তর মাধ্যমে বকুল তার দাদাকে একটা প্রস্তাব পাঠাল। রজনীবাবুর কোম্পানিকে সুশান্ত অনেক টাকা দিয়ে সাহায্য করতে প্রস্তুত, কিন্তু সুশান্তর কিছু কিছু কাজ কোম্পানিকে করে দিতে হবে। মূল কাজ কিছু জিনিস নিয়মিত দুবাইতে পৌঁছে দেওয়া। ঠিক কী জিনিস পৌঁছতে হবে সে ব্যাপারে সুশান্ত নিরুত্তর রইল, তবে এই মাল পৌঁছে দেবার কাজটা যে খুব একটা আইনসম্মত নয়, সেটা রজনীবাবুর পক্ষে আন্দাজ করা কঠিন ছিল না। রজনীবাবু লোভে পড়ে গেলেন। শুধু স্বপ্নপূরণের লোভ নয়, মোটা টাকার হাতছানিও বটে। সব মিলিয়ে তাঁর পদস্খলন হল। ক্রমে তিনি সুশান্তর টাকায় দুবাই ও লন্ডনে আপিস খুললেন। তাঁর ব্যবসার প্রভূত উন্নতি ঘটল। আর তাঁর কোম্পানির মাধ্যমে সুশান্ত-বকুলের মধ্যপ্রাচ্য এবং ইয়োরোপের ব্যবসা দিনে দিনে বাড়তে লাগল। রজনীবাবু অবশ্য ঘুণাক্ষরেও জানতে পারলেন না এই সব কিছুর পেছনে তাঁর সহোদরাও আছেন। রজনীবাবুর ট্র্যাভেল এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করাটা বকুলের প্রথম কাজ।

'এই সময় এমন একটা ঘটনা ঘটল যার জন্য ড্যামেজ কন্ট্রোল করাটা একেবারে অতি আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মন্টুবাবুর বাড়ির পেছনে যে গলিটা আছে, যার পাশ দিয়ে চলে গেছে রেল লাইন, সেখানেই মূলত কোকেন বা কোকেনজাত অন্যান্য নেশার জিনিসের কেনাবেচা চলত। যোগান আসত রেলগাড়ি করে, লেভেল ক্রসিং-এ রাত্তিরে মালগাড়ি থামিয়ে নিষিদ্ধ বস্তুগুলো নামানো হত। ওই লাইনটা শেয়ালদা স্টেশনে না ছুঁয়ে স্টেশনের পেছন দিয়ে চলে গেছে, তাই এর ওপর দিয়ে খুব বেশি ট্রেন যায় না। ড্রাগ পাচার করার জন্য এটাই আদর্শ রেলরাস্তা। এসব আমরা এখন সুশান্তর কাছ থেকে একটু একটু করে জানতে পারছি।

'আমার বিশ্বাস মন্টুবাবুর প্রথম স্ত্রী কল্পনা দত্ত তাঁর বাড়ির পেছনের গলিতে কিছু একটা ঘটতে দেখেছিলেন। তিনি চিররুগ্না, সারাদিন বাড়িতে থাকেন, তাঁর পক্ষে কিছু একটা দেখে ফেলাটা মোটেই আশ্চর্যের নয়। অচেনা কাউকে যদি তিনি ড্রাগ কেনাবেচা করতে দেখতেন তাহলে কিছু এসে যেত না। তিনি নিশ্চয় চেনা কাউকে কোন গুরুতর অপকর্ম করতে দেখেছিলেন।

'কল্পনা দত্ত একটু পুরোনো ধ্যান-ধারণার মানুষ ছিলেন, ফলে স্বামীর সঙ্গে তাঁর একটা স্বাভাবিক দূরত্ব ছিল। চিররুগ্ন হওয়ার ফলে সেই দূরত্ব আরও বেড়েছিল। তাই তিনি যেটা দেখেছেন সেটা সরাসরি স্বামীকে বলতে তাঁর সংকোচ হল। তাছাড়া নিজের ওপর তাঁর আস্থাও তেমন ছিল না। এটাও দীর্ঘদিন রোগ ভোগের ফল। ফলে তিনি যেটা দেখেছেন সেটা ঠিক দেখেছেন কিনা তা নিয়েও তাঁর সংশয় ছিল। বকুল মাঝেমাঝেই তাঁকে দেখতে আসত। অবশ্য ঠিক তাঁকে দেখতে নয়। মন্টুবাবুর বাড়ির পেছনের গলিতে যে ব্যবসা চলছে তার রক্ষণাবেক্ষণ করতে আসত বকুল। যাইহোক এই আসা-যাওয়ার ফলে বকুলের সঙ্গে কল্পনা দত্তর একটা সহজ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। ফলে কল্পনা দত্ত যা দেখেছেন সেটা বকুলকেই প্রথমে বললেন। বকুল, বলাই বাহুল্য, কথাটা হেসে উড়িয়ে দিল। বলল, শরীর রুগ্ন হলে মানুষ এইরকম হ্যালুসিনেশন দেখে। কিন্তু একই সঙ্গে সে মনে মনে ঠিক করল কল্পনা দত্তকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে। বলা তো যায় না, উনি কার কাছে আবার এই সব কথা গল্প করে বসবেন।

'রজনীকে দার্জিলিং ভ্রমণের আয়োজন করতে বলা হল। রজনীবাবুর পরিবার, ভাই বোন ছাড়াও পারিবারিক বন্ধু হিসেবে সুশান্ত বেড়াতে যাবে। রজনীবাবুকে বলা হল দার্জিলিং ভ্রমণে মন্টুবাবুদেরও রাজি করাতে হবে। মন্টুবাবু ঘরকুনো লোক, তাঁর স্ত্রী অসুস্থ। দার্জিলিং ভ্রমণে তাঁদের রাজি করানো সহজ কাজ নয়। এই কাজটা রজনীবাবুই একমাত্র করতে পারেন। রজনীবাবু বন্ধুকে বললেন আমাদের সঙ্গে চলো, বৌদিরও একটা হাওয়া বদল হবে। মন্টুবাবু গাঁইগুঁই করে শেষ পর্যন্ত রাজিও হয়ে গেলেন। আমার বিশ্বাস, রজনীবাবু জানতেন না কল্পনা দত্তকে দার্জিলিং-এ নিয়ে গিয়ে খুন করার চক্রান্ত হচ্ছে।

'পিকনিক করতে গিয়ে কল্পনা দত্ত একা ঘুরতে ঘুরতে আলাদা হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর অসুস্থ শরীর, তবু কলকাতার বাইরে গিয়ে, বিশেষ করে হিমালয়-টিমালয় দেখে, তাঁর মনে একটা জোর এসে গিয়েছিল। সেই মনের জোরে তিনি একা একা খানিকটা হাঁটতে সাহস পাচ্ছিলেন। তিনি কোথায় যাচ্ছেন তার খেয়াল রাখছিল দেবী। হয়তো দেবীই তাকে সঙ্গ দিয়ে আরও দূরে নিয়ে যায়। তারপর কল্পনাকে নির্জনে পেয়ে তাঁকে শ্বাসরোধ করে খুন করে। খুন করার পর দেবী মৃতদেহটা ফেলে দেয় একটা খাদে। পুলিশ পরে ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে এই সত্যটাই আবিষ্কার করেছিল। ইনভেস্টিগেটিং অফিসার ছিলেন বাসুদেব কানুনগো। পুলিশ ফোর্সে এত সৎ এবং দক্ষ অফিসার সচরাচর দেখা যায় না। ইন্সপেক্টার কানুনগো আরও কী কী সত্য আবিষ্কার করেছিলেন আমাদের পক্ষে জানা এখন আর সম্ভব নয়। কিন্তু পুলিশের ওপর মহলে সুশান্তদের লোক ছিল। সেই লোক, যার নামটাও আমরা সম্প্রতি জানতে পেরেছি, সুকৌশলে কানুনগোকে বদলি করে দিলেন। একই সঙ্গে কল্পনা দত্ত হত্যা মামলার কিছু অতি দরকারি নথিও লোপাট করে দেওয়া হল। কল্পনা দত্তকে যে হত্যা করা হয়েছে সেই সত্যটাই প্রকাশ্যে এল না। ফলে কল্পনা দত্তর মামলা সম্পূর্ণ চাপা পড়ে গেল। এর জন্য অবশ্য উক্ত পুলিশকর্তাটিকে একটা অবিশ্বাস্য রকম ঘুষ দিতে হয়েছিল, কিন্তু সুশান্তদের আর যাই হোক টাকার অভাব কোনও দিনই ছিল না। কল্পনা দত্তকে খুন করানোটা বকুলের দ্বিতীয় কাজ। এই কাজটা তাকে খানিকটা বাধ্য হয়েই করতে হয়েছিল।

'মন্টুবাবুর বাড়ির পেছনের গলিটাতে অবশ্য আগের মতোই কেনাবেচা চলছিল। সুশান্ত-বকুলের মনে হল, ওই গলিটার ওপর একটা ভাল মতো নজরদারি দরকার। নজরদারিটা সব থেকে ভাল করে করা যায় মন্টুবাবুর বাড়ি থেকে। সুশান্ত-বকুলদের দলে শ্রীলেখা বলে একটি মেয়ে ছিল। কলেজ থেকেই শ্রীলেখা বকুলের অভিন্নহৃদয় বন্ধু। বকুল জানত জয়পুরে কল্পনা দত্তর এক খুড়তুতো বোন থাকে। সম্ভবত কল্পনাই বকুলকে গল্প করেছিল। বকুল এটাও বুঝেছিল যে কল্পনার বোনকে মন্টু দত্তর মনে থাকার কথা নয়। ব্যাপারটা সে কথায় কথায় মন্টু দত্তর কাছ থেকে যাচাইও করে নিয়েছিল। কল্পনা দত্তর বোনকে চিনত একমাত্র কল্পনা দত্ত নিজে, কিন্তু সে-ই তো আর নেই। তাই সুশান্ত এবং বকুল শ্রীলেখাকে আলপনা সামন্ত অর্থাৎ কল্পনা দত্তর খুড়তুতো বোন সাজিয়ে মন্টু দত্তর সামনে হাজির করল।

'শ্রীলেখা কলেজে ভাল অভিনয় করত। সে খানিকটা মেক আপ নিয়ে চেহারায় একটা গ্রাম্যতা আনল। সামনে দুটো নকল দাঁত লাগাল। তারপর সুলতার মাসি সেজে মন্টু দত্তর বাড়িতে পাকাপাকি জায়গা করে নিল। সে ওপর ওপর সুলতার দেখাশোনা করত আর তলায় তলায় মন্টুবাবুর বাড়ির পেছনের গলিতে মাদক কিনতে আসা খদ্দেরদের তদারকি করত। মন্টুবাবু তাকে পাইকপাড়ার বাড়িতে থাকতে দিলেন। শ্রীলেখার টাকা-পয়সার কোনও প্রয়োজন ছিল না। বেআইনি রাস্তায় তার প্রচুর রোজগার ছিল। তবু লোককে দেখানোর জন্য সে নিয়মিত ব্যাঙ্কে গিয়ে টাকা তুলত। যে টাকাটা সে প্রত্যেক সপ্তাহে তুলত তাই দিয়ে তার একদিনের খরচটাও চলত কিনা সন্দেহ। ফলে তার টাকা তোলার সঙ্গে তার মাসিক বা সাপ্তাহিক খরচের কোনও সম্পর্কই ছিল না। আসলে, ব্যাঙ্কে যাবার পিছনে তার অন্য একটা উদ্দেশ্য ছিল। সে তার পড়শিদের দেখাতে চাইত সে স্বাভাবিক একজন মহিলা। তার জীবনে কোনও রহস্য নেই, লুকোছাপা নেই। সে চাইত সবাই তাকে বারবার দেখুক। একদিন যে তাকে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যেতে হবে সেটা তার মাথায় ছিল না। আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, মাসে মাসে 'পান্থজনের সখা'র লন্ডন আপিস থেকে কুড়ি হাজার টাকা তার ব্যাঙ্কে জমা পড়ত।

'সুলতার নকল মাসির ছবি রত্নাদের কলেজে কেউ চিনতে পারেনি। কিন্তু ওই ছবিটাতে পুলিশের আর্টিস্ট খানিকটা রদবদল ঘটিয়ে যেটা দাঁড় করিয়েছিল, সেটা 'পান্থজনের সখা'র শ্রীলেখা ভট্টাচার্য বলে সঙ্গে সঙ্গে আইডেন্টিফায়েড হয়ে গেল।

'বছর পাঁচেক সুশান্তদের নিরুপদ্রবে কাটল। তারপর, তাদের দুর্ভাগ্য, ইন্সপেক্টার কানুনগো গোবরায় বদলি হয়ে এলেন। এমন হতেই পারে যে এটা নিছক কাকতালীয়। কিন্তু আমার স্থির বিশ্বাস ব্যাপারটা এরকম নয়। ইন্সপেক্টার কানুনগো নিজেই খানিকটা চেষ্টা করে ওই অঞ্চলে বদলি নিয়ে এসেছিলেন, এমনটা হবার সম্ভাবনাই ষোলোআনা। হয়তো, কল্পনা দত্ত হত্যা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে তিনি সুশান্ত-দেবীদের কার্যকলাপের কোনও সূত্র পেয়েছিলেন, হয়ত তিনি টের পেয়েছিলেন গোবরা অঞ্চলের একটি ড্রাগ ডিলারদের গ্যাং এই হত্যার পেছনে আছে। ওপরওলার অঙ্গুলিহেলনে যে কল্পনা দত্ত হত্যা মামলাটা পুরোপুরি চাপা পড়ে গেল, বলাই বাহুল্য, এটা তাঁর মত সৎ এবং কর্তব্যনিষ্ঠ অফিসারের ভাল লাগেনি। তাই অনুসন্ধানটা আবার নতুন করে শুরু করার একটা সুযোগ তিনি খুঁজছিলেন। এবং সেই কারণেই তাঁর গোবরায় আসতে চাওয়া। তবে এসবই আমার অনুমান।

আদিত্য একটু থামল। একঢোঁক জল খেল। চা এসেছে। চায়ের কাপে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে আদিত্য আবার শুরু করল।

'বদলি হয়ে আসার পরেই ইন্সপেক্টার কানুনগো কাজে লেগে গেলেন। তাঁর মনে হল, মন্টুবাবুর বাড়ির পেছনের গলিটার মধ্যে কোনও একটা রহস্য আছে। দেবীরঞ্জন বসাক, সুশান্ত হালদার, আব্দুল আজিজ এদের সকলের সম্বন্ধেই তিনি একটু একটু করে জানতে পারলেন। তিনি কল্পনা দত্তর সূত্র ধরে একদিন মন্টু দত্তর বাড়িতে হাজির হলেন। দেখলেন সেখানে কল্পনা দত্তর এক বোন রয়েছেন। সেই বোনের সঙ্গে কথা বলে কিন্তু তাঁর বেজায় খটকা লাগল। অনুসন্ধান করতে গিয়ে কল্পনা দত্তর অতীত সম্বন্ধে তিনি যতটা জেনেছিলেন, তাঁর মনে হল, এই মহিলা তার কিছুই জানে না। এই মহিলা তাহলে কে? প্রশ্নটা তাঁর মনে ঘুরতে লাগল।'

'শ্রীলেখা বকুলকে ঘটনাটা জানাল। বলল, কানুনগো তাকে সন্দেহ করছে। বকুল শ্রীলেখাকে উধাও হয়ে যেতে বলল। ফলে ইন্সপেক্টার কানুনগো ওই অঞ্চলে বদলি হয়ে আসার দু'মাসের মধ্যেই সুলতার মাসি চিরতরে উধাও হয়ে গেলেন। আমরা অবশ্য তার খোঁজ পেয়েছি। আমরা জানতে পেরেছি তিনি গত কয়েক বছর যাবত 'পান্থজনের সখা'র লন্ডন অফিসটা দেখাশোনা করেন। প্রসঙ্গত জানাই, ইন্সপেক্টার কানুনগো, আসল আলপনা সামন্তের একটা ছবি জোগাড় করেছিলেন, যে ছবিটা আমরা তাঁর ডায়েরির ভেতরে পেয়েছিলাম। রামানুজবাবু কনফার্ম করেছেন এটা তাঁর বহুদিন আগে চেনা আলপনা দত্তরই ছবি। ছবিটা দেখে আমারও একটা খটকা লেগেছিল, কিন্তু কেন খটকা লাগছে সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারিনি। পরে বুঝতে পারলাম, ছবির মেয়েটির সঙ্গে মন্টুবাবুর মেয়ে সুলতার একটা অতি সূক্ষ্ম মিল আছে। মাসি-বোনঝির চেহারার মধ্যে ওইটুকু মিল তো থাকতেই পারে। আর আসল আলপনা দত্তর অন্য যে ছবিটা, যেটা রামানুজবাবুর কাছে ছিল, সেটা যে বকুলই কোনও এক ফাঁকে সরিয়ে ছিল এবিষয়ে আমি নিশ্চিত।

'ওই বছরেই সুলতার বিয়ে হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি সুলতার বিয়ে দিয়ে দেবার পরামর্শটা আমার অনুমান রজনীবাবুই দিয়েছিলেন। মন্টুবাবু এখানে থাকলে কনফার্ম করতে পারতেন। সবকিছুর আড়ালে অবশ্যই বকুল। মন্টুবাবুর বাড়িটা ফাঁকা হয়ে গেলে তাদের কাজ করতে সুবিধে হবে।' আদিত্য থামল। রত্নাবলীর দিকে তাকিয়ে বলল, 'দাঁড়া, বারান্দা থেকে একটা সিগারেট খেয়ে আসি।'

'এখানেই খা। পারমিশন দিলাম। তবে একটা। আর নয়।' রত্না বলল, 'জমাটি গল্পের মাঝখানে উঠতে পারবি না।'

আদিত্য সিগারেট ধরাল, গৌতমের ইশারায় সাড়া দিয়ে তাকেও একটা ধরিয়ে দিল। মালিনী কটমট করে দুজনের দিকে তাকাল। রত্না উঠে গিয়ে বারান্দার দরজাটা খুলে দিতে আদিত্য আবার বলতে লাগল,

'সুলতার বিয়ে হয়ে যাবার পর মন্টুবাবুর বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল। মন্টুবাবু সারাদিন বাড়ি থাকেন না, অনেক রাত্তিরে ফেরেন। বাড়িতে তো কেউ নেই, কার কাছেই বা ফিরবেন? ফলে সুশান্তদের খুব সুবিধে হয়ে গেল। পেছনের গলিটা তারা অবাধে তাদের কুকাজের জন্য ব্যবহার করতে লাগল। কিন্তু ইতিমধ্যে কানুনগোও একটু একটু করে এগোচ্ছেন। গৌতম তাকে পুরো সাপোর্ট দিচ্ছে। বছর দু'য়েকের মধ্যে এমন অবস্থা হল যে ইন্সপেক্টার কানুনগো গ্যাংটাকে প্রায় ধরে ফেলেন আর কি। এই সময় সুশান্ত আর বকুল মিলে একটা প্ল্যান করল।

'বলছি বটে সুশান্ত আর বকুল মিলে, কিন্তু আমার বিশ্বাস প্ল্যানটা বকুলের মস্তিষ্কপ্রসূত একটা মাস্টারস্ট্রোক। অন্য কেউ হলে তদন্তটাকে ভুল পথে চালিত করার জন্য দলের চুনোপুঁটি দু'একটাকে ধরিয়ে দিয়ে ভান করত এরাই যেন রাঘব বোয়াল। বকুল ঠিক উল্টোটা প্ল্যান করল। দলের একেবারে মাথা সুশান্ত হালদার তার সাগরেদ দেবীকে নিয়ে পুলিশের কাছে ধরা দেবে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে যে প্রমাণগুলো পুলিশের হাতে কৌশলে তুলে দেওয়া হবে তা দিয়ে তাদের বেশিদিন ধরে রাখা যাবে না। সব মিলিয়ে পুলিশের ধারণা হবে তারা যাদের ধরেছে সেই সুশান্ত এবং দেবী নেহাতই চুনোপঁটি। ফলে পুলিস একজন কাল্পনিক রহস্যের মেঘনাদের খোঁজে ছুটে বেড়াবে। আর পাকাপাকিভাবে পুলিশের নজর সুশান্তর ওপর থেকে সরে যাবে। এই টোপটা কানুনগোর মতো অভিজ্ঞ পুলিস অফিসারও সাময়িকভাবে গিলে ফেললেন।

'সুশান্ত-দেবী জেলে যাবার পর বাইরে থেকে আব্দুল ব্যবসা চালাতে লাগল আর অন্তরালে রইল বকুল। বকুল আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিল মন্টুবাবুর বাড়িটার ওপর পাকাপাকিভাবে কব্জা না করতে পারলে বেশিদিন ওই গলিটায় ব্যবসা চালানো যাবে না। সে সুশান্তর সঙ্গে আলোচনা করে রেখেছিল, সুশান্তরা জেলে যাবার পরেই সে মন্টুবাবুকে বিয়ে করে পাকাপাকিভাবে ওই বাড়িতে বাস করতে শুরু করবে। নিজের শরীর ব্যবহার করা নিয়ে বকুলের কোনও বাতিক ছিল না। সুশান্তর একটু আপত্তি ছিল বটে, কিন্তু বকুলের ঠাণ্ডা যুক্তির কাছে তাকে হার মানতে হল। প্রসঙ্গত, বকুল-সুশান্তর শারীরিক সম্পর্ক বহুদিনের, একথা সুশান্তই আমাদের বলেছে। তাছাড়া কলেজের ছাদে সুশান্তর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে গিয়ে জানাজানি হয়ে যায়। এবং এই কারণে কলেজ থেকে বকুলকে রাস্টিকেট করা হয়।

'বকুল নিশ্চিত ছিল একাকী মন্টুবাবু এক কথায় তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যাবেন। পুরুষের চোরা-চাহনির অর্থ তার থেকে ভাল কে বুঝবে? অতএব রজনীকে দিয়ে বিবাহের প্রস্তাব পাঠানো হল। বকুল এটাও জানত যে একবার বিয়ে হয়ে গেলে সে মন্টুবাবুকে পুরোপুরি বশে রাখতে পারবে। সেটা যে কতটা সত্য সেটা মন্টুবাবুর কথা শুনে প্রথম দিনেই বুঝতে পেরেছিলাম। বকুল মন্টুবাবুকে বিয়ে করার বছর দেড়েক পরে সুশান্ত এবং দেবী জেল থেকে বেরোল।

'আগে থেকেই ঠিক ছিল জেল থেকে বেরোনোর পরে রজনীবাবুর সঙ্গে দেবী-সুশান্ত প্রকাশ্যে সমস্ত সম্পর্ক ছেদ করে দেবে। নাটকের ব্লুপ্রিন্ট আগেই তৈরি ছিল, নাটক মঞ্চস্থ হল, দেবীরঞ্জন সুশান্ত সমভিব্যহারে সর্বসমক্ষে দাদার বাড়ি থেকে বিতাড়িত হলেন। তারপর তারা দুজন মিলে সাইবার কাফে শুরু করল, পাড়ার সবাই ভাবল ছেলে দুটো ভাল হয়ে গেছে। এর কিছুদিন পর থেকে ভূতুড়ে টেলিফোনের উপদ্রব শুরু হয়।

'মণ্টুবাবু যেদিন ভূতুড়ে টেলিফোনের সমস্যা নিয়ে প্রথম আমার কাছে এলেন, আমার মনে হয়েছিল তিনি যে সমস্যাটা নিয়ে এসেছেন আসল সমস্যা সেটা নয়। যেন নকল একটা সমস্যা নিয়ে কেউ তাকে আমার কাছে পাঠিয়েছে। কেন আমার এরকম মনে হল এককথায় বলতে পারব না, হয়ত একটা ইন্টুইশন কাজ করছিল। হয়তো মনে হয়েছিল এত সামান্য কারণে কেউ এতগুলো টাকা খরচ করে না। তাই প্রথম প্রথম আমার মন্টুবাবুকেই সন্দেহ হচ্ছিল। তারপর একদিন আমি আমাদের মেসের চাকর বলরামের একটা কথায় হঠাৎ ভূতুড়ে টেলিফোনের আসল অর্থ বুঝতে পারলাম। বলরাম বলছিল, রোজ সকালে একজন বোর্ডারের ঘর থেকে ভেসে আসা অ্যালার্ম ঘড়ির শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। সামান্যই কথা। কিন্তু আমার মনে হল এমনও তো হতে পারে, টেলিফোনটা বাজে অন্য কাউকে শোনানোর জন্য। মন্টুবাবুর বাড়ির কেউ ফোনটা ধরল কি ধরল না সেটা অপ্রাসঙ্গিক।

'আমি মনে মনে একটা থিয়োরি খাড়া করলাম। মন্টুবাবুর বাড়ির পেছনে একটা নির্জন গলি আছে। গলিটাতে এমনিতে লোক যাতায়াত নেই। কানা গলি, একদিক বন্ধ। গলিতে ঢোকার মুখে এক গাদা আবর্জনা পড়ে থাকে। তাই গলিটাকে কেউ ব্যবহার করে না। বস্তুত, ড্রাগ-ডিলাররাই নিয়মিত গলির মুখে আবর্জনা ফেলে যায়, যাতে গলিটাতে কেউ না ঢোকে। এবার ধরা যাক কোনও নেশাড়ুর নেশার বস্তু কেনা দরকার। তার কাছে একটা টেলিফোন নম্বর আছে। সে জানে একটা বিশেষ টেলিফোন বুথ থেকে তাকে এই নম্বরে ফোন করতে হবে। ওপারে কেউ হ্যালো হ্যালো বললেও উত্তর দেওয়া চলবে না। তারপর তাকে দশ মিনিটের মধ্যে মন্টুবাবুর বাড়ির পেছনের গলিতে পৌঁছে যেতে হবে। একটু পা চালিয়ে হাঁটলে সেটা অসম্ভব নয়। সেখানে পৌঁছলে নগদ টাকার বিনিময়ে সে হাতে হাতে নেশার বস্তু পেয়ে যাবে। কেমন করে এটা সম্ভব হচ্ছে?

'খেয়াল করতে হবে, মন্টুবাবুর টেলিফোনটা যখন বাজছে তখন সুশান্তর সাইবার কাফে থেকে সেটা পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। সাইবার কাফের কোথাও নেশার বস্তু মজুত করা আছে। টেলিফোনের আওয়াজ শুনে সুশান্ত একজন সাগরেদকে মাল সুদ্ধু পাঠিয়ে দিচ্ছে। সে সাইবার কাফের পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গলির মধ্যে খদ্দেরের জন্য অপেক্ষা করছে। একদিন মন্টুবাবুর ছাদে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে খেতে যখন বকুলের সঙ্গে কথা বলছিলাম তখন এই ব্যাপারটাই ঘটেছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তে ঠিক খেয়াল করতে পারিনি। পরে ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিলাম। অর্থাৎ ভূতুড়ে টেলিফোনের একটা উদ্দেশ্য আছে। তার উদ্দেশ্য খদ্দের যে আসছে এই বার্তা বিক্রেতার কাছে পৌঁছে দেওয়া। আইডিয়াটা বকুলের মাথা থেকেই বেরিয়েছিল।'

'আমার থিয়োরিটা যাচাই করার জন্য গৌতমের কাছে খোঁজ নিয়ে জানাতে বললাম, মন্টুবাবুর টেলিফোনটা গত দু'বছরে কতবার খারাপ হয়েছে। গৌতম খোঁজ নিয়ে জানাল, একবারও হয়নি। এটা অস্বাভাবিক। আগে কিন্তু টেলিফোনটা মাঝে মাঝে খারাপ হত। যেমন সব টেলিফোন হয়। বুঝলাম, কেউ টেলিফোন কোম্পানির লোকেদের টাকা-পয়সা খাইয়ে টেলিফোনটা যাতে ঠিক থাকে সেই ব্যবস্থা করে রেখেছে। বলাই বাহুল্য, কোটি টাকার ব্যবসা যে টেলিফোনের ওপর নির্ভর করছে তাকে কখনই খারাপ হতে দেওয়া যায় না। নিশ্চিন্ত হলাম, আমার ভাবনাটা ঠিক পথেই চলছে।

'সুশান্তর সাইবার কাফে অবশ্য মাঝে মাঝে পুলিশ রেড করত। কিন্তু রেড হবার আগাম খবর উক্ত পুলিশকর্তা মারফত আগেই সুশান্তদের কাছে পৌঁছে যেত। তারা তখন তাদের স্টক সবসুদ্ধু মন্টুবাবুর বাড়িতে বকুলের জিম্মায় চালান করে দিত। রেড শেষ হয়ে গেলে আবার মালপত্র ফিরে আসত সাইবার কাফেতে। আমরা শেষ যেদিন সাইবার কাফে রেড করলাম, সেদিনও আগে থেকে খবরটা পৌঁছে গিয়েছিল, ফলে সাইবার কাফের পুরো স্টকটাই মন্টুবাবুর বাড়িতে পাচার করা হয়েছিল। আমরা অবশ্য এরকমই আশা করছিলাম। এতে আমাদের এটাই সুবিধে হল যে পুরো স্টকটাই আমরা এক সঙ্গে একটা জায়গায় পেয়ে গেলাম। 'পান্থজনের সখা'র আপিসও যে রেড করা হবে সেটা অবশ্য গৌতম আর আমি ছাড়া আর কেউ জানত না। সেখান থেকেও আমরা কিছু মাল উদ্ধার করেছি।

'যাই হোক, ভূতুড়ে টেলিফোনের মাধ্যমে ড্রাগ বিক্রির কাজে বাধা পড়ল যখন ইন্সপেক্টার কানুনগো এই রহস্যটা ধরতে পারলেন। পুরো রহস্যটা তিনি ধরতে পেরেছিলেন কিনা জানি না, তবে এই ভূতুড়ে টেলিফোন নম্বরটি তিনি জোগাড় করতে পেরেছিলেন। আমরা এই নম্বরটা তাঁর ডায়েরির মধ্যে পেয়েছিলাম। বলাই বাহুল্য, টেলিফোন নম্বরটি খুব নিয়মিত খদ্দের ছাড়া কাউকে দেওয়া হত না। দুর্ভাগ্যবশত সুশান্তরাও তাদের বেতনভুক পুলিশকর্তাটির কাছ থেকে জানতে পারল কানুনগো টেলিফোন নম্বরটি পেয়ে গেছেন। ফলে কানুনগোকেও মরতে হল।

'মন্টুবাবু আমার কাছে টেলিফোন রহস্য সমাধানের জন্য এলেন কেন? কেউ কি তাঁকে পাঠিয়েছিল? নাকি তিনি নিজে নিজেই আমার কাছে এসেছিলেন? প্রথম প্রশ্নের উত্তরটা আগে দিই। আগেই বলেছি, সুশান্তরা জানত পুলিশের কাছে ভূতুড়ে টেলিফোন নম্বরটা পৌঁছে গেছে। যে পুলিশকর্তাটি সুশান্তদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা পেতেন তিনিই এই খবরটা সুশান্তদের জানিয়ে দিয়েছিলেন। এটা জানার পর দুটো পথ খোলা ছিল। এক, ভূতুড়ে টেলিফোন নম্বরটা পুরোপুরি বাতিল করে দিয়ে মাল বিক্রির সম্পূর্ণ নতুন কোনও উপায় বার করা। দুই, কোনোভাবে পুলিশকে বোঝানো যে ভূতুড়ে টেলিফোনের পেছনে খুব সাধারণ কোনও গল্প আছে। অতএব নম্বরটা নিয়ে আর তদন্তের দরকার নেই। ভূতুড়ে টেলিফোনের সাহায্যে ব্যবসাটা এতটাই ভাল চলছিল এবং এতগুলো নিয়মিত খদ্দের এইভাবে মাল কেনার ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল যে সুশান্ত-বকুলরা ভাবল ভূতুড়ে টেলিফোন একেবারে বাতিল করে দেবার আগে দ্বিতীয় রাস্তাটা চেষ্টা করা যাক। যদি সেটা কাজ না করে তখন না হয় ভূতুড়ে টেলিফোনের মধ্য দিয়ে মাল বিক্রি পুরো বন্ধ করে দেওয়া যাবে। কিন্তু পুলিশকে কি করে বোঝানো যায় যে আসলে ভূতুড়ে টেলিফোনের পেছনে খুব সাদামাটা কোনও কাহিনি আছে?

'সুশান্তরা তাদের বেতনভুক পুলিশকর্তাটির মাধ্যমে জানতে পেরেছিল যে আদিত্য মজুমদার বলে একটি বেসরকারি গোয়েন্দা আছে যার সঙ্গে জয়েন্ট কমিশনার ক্রাইম গৌতম দাশগুপ্তর গলায় গলায় ভাব। আদিত্য মজুমদারকে যদি ভূতুড়ে টেলিফোনের কোনও আষাঢ়ে গল্প বিশ্বাস করানো যায় তাহলে সেটা গৌতম দাশগুপ্ত পর্যন্ত পৌঁছে যাবার ষোলোআনা সম্ভাবনা। এই বিশ্বাস করানোর কাজটা সম্পন্ন করার জন্যই আমার কাছে মন্টুবাবুর আগমন। অর্থাৎ যাকে ইংরেজিতে বলে 'ফিডিং মিস-ইনফরমেশন' সেই উদ্দেশ্য নিয়েই মন্টুবাবু আমার কাছে এসেছিলেন।

'এবার দ্বিতীয় প্রশ্ন, মন্টুবাবু কি স্বেচ্ছায় এই কাজে এসেছিলেন নাকি তাঁর অজান্তেই কেউ তাঁকে ব্যবহার করেছিল? আমার প্রথমে মনে হয়েছিল যে আমার কাছে আসার পেছনে মন্টুবাবুর অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে। মন্টুবাবু সাবধানী ব্যবসাদার, তিনি তেমন কারণ ছাড়া পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ করবেন কেন? পরে তাঁর আসার কারণটা বুঝতে পারলাম। দ্বিতীয়বার বিয়ে করার পর থেকে মন্টুবাবু এক মুহূর্তের জন্য সুখ পাননি। বকুল তাঁকে মন কোনোদিনই দেয়নি, কিছুদিন পর থেকে, বিশেষ করে সুশান্ত হালদার জেল থেকে বেরোনোর পর থেকে, নানা অছিলায় শরীর দেওয়াও বন্ধ করে দিয়েছিল। আমার বিশ্বাস, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে কল্পনা দত্তর মতো মন্টু দত্তকেও সরিয়ে দেওয়া হত।

'বকুলের ওপর জোর খাটানো মন্টুবাবুর পক্ষে সম্ভব ছিল না। অথচ বকুলের শরীর ও ব্যক্তিত্ব তাঁকে দিনরাত্রি আকর্ষণ করত, আগুন যেমন পতঙ্গকে টানে। তাঁর মনে হচ্ছিল সুশান্তর সঙ্গে বকুলের একটা গভীর সম্পর্ক আছে, কিন্তু তাঁর কাছে কোনও প্রমাণ ছিল না। প্রমাণ পেলেই বা তিনি কী করতেন তা অবশ্য আমার জানা নেই। যাই হোক, রজনীবাবু যখন তাঁকে আমার বন্ধু সুনন্দর কাছে যেতে পরামর্শ দিলেন এবং সুশান্তদের বেতনভুক পুলিশকর্তাটির সাহায্যে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্টও করিয়ে দিলেন, তখন মন্টুবাবু রাজি হয়ে গেলেন। ভাবলেন, হয়তো সুশান্ত-বকুলের সম্পর্কে কিছু দরকারি কথা জানা যাবে। সুনন্দ মন্টুবাবুকে আমার কাছে পাঠাল। সুশান্তরা ঠিক এটাই আশা করেছিল।

'সুশান্তর গল্প মন্টুবাবুকে যখন বললাম, তিনি ভেতরে ভেতরে ছেলেমানুষের মত খুশি হয়ে উঠলেন। যদিও ওপর ওপর চিন্তিত হওয়ার ভান বজায় রাখলেন। তিনি ভাবলেন, বকুল এবার পুরোপুরি তাঁর হয়ে যাবে। তিনি যে খুশি হয়েছেন সেটা বুঝলাম যখন তিনি চলে আসার সময় আমার হাতে নগদ চল্লিশ হাজার টাকা গুঁজে দিলেন। কোনও ঝানু ব্যবসাদার এত সহজে টাকা খরচ করে না।

আদিত্য থামল। রামানুজ চট্টোপাধ্যায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

'রামানুজবাবুও সেদিন অনেক সাহায্য করেছেন। তিনি পেছন দিক থেকে মন্টুবাবুর বাড়ির ওপর নজর রাখছিলেন। আমরা যখন লালবাজারের ভেতরে রটিয়ে দিলাম যে সুশান্তদের সাইবার কাফে, আব্দুলের আড্ডা এবং পরিত্যক্ত কারখানা রেড করা হবে, আমরা জানতাম এই খবর অচিরেই সুশান্তদের কাছে পৌঁছে যাবে, ঠিক যেমন আগেও কয়েকবার গিয়েছিল। ফলে, অনুমান করেছিলাম, সুশান্তরা সাময়িকভাবে সমস্ত মাল মন্টুবাবুর বাড়িতে বকুলের জিম্মায় সরিয়ে দেবে। রামানুজবাবু গভীর রাত্তিরে ফোন করে জানালেন, মন্টুবাবুর বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে মাল ভেতরে ঢুকেছে। আমরা নিশ্চিন্ত হলাম।'

'আমার একটা প্রশ্ন আছে' রামানুজবাবু মিহি গলায় বললেন। 'ধরুন আপনি বকুল-সুশান্তদের আসল প্ল্যানটা ধরতে পারলেন না। আর আপনার কথা শুনে মিস্টার দাশগুপ্তও ওই ভূতুড়ে নম্বরটা নিয়ে ইনভেস্টিগেশন বন্ধ করে দিলেন। তাহলে মন্টুবাবুকে নিয়ে বকুল-সুশান্ত কী করত? সুশান্ত কি মন্টুবাবুর কাছে ব্ল্যাকমেলের টাকা চাইত? তাহলে তাকে কিছু ইনক্রিমিনেটিং ডকুমেন্টও তো তৈরি করতে হত।'

'এই প্রশ্নটা নিয়ে আমিও ভেবেছি। হয়তো কিছু চিঠি এবং ছবি তৈরি করে মন্টুবাবুর কাছ থেকে ওরা কিছু টাকা আদায় করে নিত। কিংবা হয়তো কিছুই না করে কিছুদিন ওরা মন্টুবাবুকে লেজে খেলাত। ঠিক কোনটা করত সেটা অনুমানসাপেক্ষ। হয়ত প্রথমটাই করত যাতে আমি মন্টুবাবুর কাছ থেকে খবর পেয়ে গৌতমকে জানিয়ে দিই এবং ভূতুড়ে টেলিফোনের আসল গল্পটা ব্ল্যাকমেলের গল্পের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। কিন্তু একবারে ব্ল্যাকমেলের পুরো টাকাটা ওরা নিত না। ভূতুড়ে টেলিফোন কল জিইয়ে রাখার একটা উপায় ওরা ঠিকই বের করত। তবে একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। ভূতুড়ে টেলিফোন নম্বর নিয়ে পুলিশ ইনভেস্টিগেশন বন্ধ করে দিলে মন্টুবাবুর জীবনের দাম এক কানা কড়িও থাকত না। তাঁর প্রথম স্ত্রীর মতো তাঁকেও সরিয়ে দেওয়া হতো। ভূতুড়ে টেলিফোন নম্বর নিয়ে পুলিশ ইনভেস্টিগেশন বন্ধ হয়েছে কিনা সেই খবর সুশান্ত-বকুলরা তাদের বেতনভুক পুলিশকর্তাটির কাছ থেকেই পেয়ে যেত।'

'বকুল দত্তকে আপনি কীভাবে সন্দেহ করলেন?' আবার রামানুজবাবুর প্রশ্ন।

'বকুল-সুশান্তর বেতনভোগী পুলিশ কর্তাটিকে আমরা আইডেনটিফাই করতে পেরেছি। যদিও প্রমাণের অভাবে আমরা তাঁর কিছুই করতে পারতাম না, আমরা ব্লাফ দিলাম। বললাম, তাঁর বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ আমাদের হাতে আছে। তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। আমরা তাঁকে ছেড়ে দেব এই শর্তে তিনি বকুল-সুশান্তদের অর্গানাইজেশনটা সম্বন্ধে বেশ কিছু তথ্য আমাদের জানালেন। বলাই বাহুল্য, তাঁকে আমরা ছাড়ছি না। বকুলের পুরো স্টেটমেন্টটা পেলে হয়ত ওই পুলিশ কর্তাটিকে ইনক্রিমিনেট করতে পারব।'

'আমার একটা কথা শোন। তুই যে সেদিন বকুলের সঙ্গে লাঞ্চ খেতে বেরিয়েছিলি সেটা আমরা জানতে পেরেছে। গৌতম আমাদের বলেছে। আমার কথা হল, তুই বকুলের সঙ্গে লাঞ্চ খেতে গিয়েছিলি কেন?' রত্না আদিত্যকে চেপে ধরেছে।

'বলতে পারিস ওটা একটা শো ডাউন। পরস্পর পরস্পরকে যাচাই করে নেওয়ার একটা ঠাণ্ডা যুদ্ধ। আমার একটা সুবিধে ছিল। বকুল জানত আমি কে এবং আমি জানতাম যে বকুল আমার আসল পরিচয় জানে। কিন্তু বকুল জানত না যে আমিও বকুলের আসল পরিচয় জানি। বোধহয় ভেবেছিল আমি ওর প্রেমে পড়ে গেছি। খেতে খেতে লক্ষ করলাম বকুলের দু'জন বডিগার্ড বাইরে গাড়িতে অপেক্ষা করছে। আশ্বস্ত হলাম, বকুলই দলের মাথা।'

'শো ডাউন না ছাই। গৌতম বলছিল, আদিত্য মেয়েটার বেধড়ক প্রেমে পড়ে গেছে। নাহলে ওর বুদ্ধির এত প্রশংসা করে। বলছিল, এবার আদিত্যটার একটা বিয়ে দিতে হবে। নয়ত কোন ক্রিমিনালের সঙ্গে কবে ভিড়ে যাবে কে জানে।' রত্না আদিত্যকে ছাড়বে না।

আদিত্য একটা উত্তর দিতে গিয়েও চুপ করে গেল। তার মনে পড়ে গেল গতকাল রাত্তিরেও সে বকুলকে স্বপ্নে দেখেছে।

বলরাম ঘরে ঢুকে দেখল আদিত্য একমনে কাজ করছে। বলরামকে দেখে বলল,

'এটা কী জানিস? এটাকে বলে ল্যাপটপ।'

'কী নাম বললেন? এটা তো কম্পিউটার। বসিরহাট থেকে এক বাবু হোটেলে আসেন, তাঁর কাছে দেখেছি।'

'ঠিকই বলেছিস। এটা একটা ছোট কম্পিউটার। সঙ্গে নিয়ে ঘোরা যায়।'

'কিনলেন, নাকি কারো কাছ থেকে নিয়ে এলেন? এসব জিনিসের তো দাম খুব।'

আদিত্যর সামর্থের ওপর বলরামের খুব একটা ভরসা নেই।

'কিনলাম রে। নগদ পঞ্চান্ন হাজার দিয়ে কিনলাম।'

'প-ঞ্চা-ন্ন হা-জা-র?' বলরামের গলায় স্পষ্ট অবিশ্বাস।

'পুরো পঞ্চান্ন হাজার। পুলিশের কাছ থেকে একটা পাঁচ লাখ টাকার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি জানিস। মানে পাঁচ লাখ টাকার পুরস্কার। আমি এখন বড়লোক।'

বলরাম কিছু বলতে পারল না। তার চোখদুটো ছানাবড়া হয়ে গেছে। আদিত্য বলল,

'তোকেও একটা পুরস্কার দিতে হবে। তুই অ্যালার্ম ঘড়ির কথাটা না বললে ভূতুড়ে টেলিফোনের আসল রহস্যটা আমার মাথাতেই আসত না। ভাবছি তোকে একটা ভাল অ্যালার্ম ঘড়ি কিনে দেব।' আদিত্য জুত করে একটা সিগারেট ধরাল।

অধ্যায় ২ / ২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%