১৩. সংযোজন : কেন লিখি? কার জন্য লিখি?

বিনয় ঘোষ

সংযোজন* : ক / জুন ১৯৮০

কেন লিখি? কার জন্য লিখি?

কেন লিখি? কেন ছবি আঁকি? কেন গান গাই? একই প্রশ্ন।

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে, যদি অবশ্য উত্তর ঠিকমতো দিতে হয়, অনেক কথা বলতে হয়। বেশি কথা একটি ছোটো নিবন্ধের মধ্যে বলা সম্ভব হবে না, তাই অল্প কথায় বিষয়টা নিজে লেখক হিসেবে বুঝতে এবং অন্যদের পাঠক হিসেবে বোঝাতে চেষ্টা করব। চেষ্টা সফল হবার সম্ভাবনা কম, কারণ অল্প কথায় গুরুবিষয় বলতে গেলে ভুল বোঝবার সম্ভাবনা বেশি।

গত প্রায় চল্লিশ বছরের লেখক—জীবনে খুব কম করেও অর্ধশতাধিক লেখক, চিত্রশিল্পী ও সুরশিল্পীদের সঙ্গে বিভিন্ন পরিবেশে এই বিষয়ে আলাপ—পরিচয় করে দেখেছি, একজনের উত্তরের সঙ্গে অন্যের উত্তরের বিশেষ মিল নেই। মিল না থাকলেও উত্তরগুলিকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। একদল লেখক—শিল্পী মনে করেন যে সাহিত্য—শিল্পের চর্চা করে অর্থাৎ লিখে বা ছবি এঁকে বাইরের কোলাহল, দায়দায়িত্ব, চিন্তাভাবনা ইত্যাদি থেকে বেশ পালিয়ে যাওয়া যায়। নিজের একটি নিভৃত নির্জন কোণ বেছে নিয়ে সেখানে বসে মনের মতো লেখা যায়; ছবি আঁকা যায়। আর—একদল বলেন, না তা যায় না, নিভৃত নির্জন কোণ তৈরি করা যায় না। বাইরের কোলাহল থেকে পালিয়ে যাওয়া যায় না। বাইরের দায়দায়িত্ব, চিন্তাভাবনা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। নির্জন কোণে তারা হামলা করে। জেগে ঘুমোবার চেষ্টা করলে কেবল দুঃস্বপ্ন দেখতে হয়, আর বারংবার ঘুম ভেঙে যায়। অতএব পালাবার চেষ্টা করে লাভ নেই। কোথায় পালাব? এই এক হতে পারে যদি মানুষের কাছ থেকে, সমাজের কাছ থেকে, বহু দূরে এমন কোনো গভীর জঙ্গলে চলে যাই, যেখানে মানুষের বসবাস নেই, মানুষের সমাজ নেই, তাহলে নির্জন কোণে বসে লেখা যায়, ছবি আঁকা যায়। কিন্তু তখন আবার সমস্যা দেখা দেবে, কী লিখব, কাকে নিয়ে লিখব? বনমানুষ? বুনো শুয়োর? বন্য ভল্লুক? বানর—হনুমান? তাই এঁরা বলেন যে সমাজ থেকে, মানুষের কাছ থেকে পালাবার উপায় নেই। সমাজ ও মানুষের সামনে মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে এবং তার ঘাতপ্রতিঘাতের সঙ্গে সংগ্রাম করতে হবে। সংগ্রামে ক্ষতবিক্ষত হলেও লক্ষ্য হবে জয়ী হওয়া।

এই দুই দলের বক্তব্যের উত্তরে প্রথমেই বলা যায়, পলায়ন যে কেবল গভীর জঙ্গলে অথবা হিমালয়ের পাদদেশে করা যায় তা নয়, পাগল হয়েও পালানো যায়, মৃত্যুবরণ করেও পালানো যায়। যাঁরা সংগ্রামে ক্ষতবিক্ষত হয়ে জয়ী হবার কথা বলেন তাঁরাও বিলক্ষণ জানেন যে অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া সংগ্রাম করা যায় না এবং কলমকে যতই আমরা তলোয়ারের চেয়ে শক্তিশালী বলি—না কেন, যখন কোনো সৈনিক তলোয়ার নিয়ে সেই শক্তিশালী লেখনীধারককে শিরশ্ছেদ করতে আসে তখন কলম দিয়ে তা প্রতিরোধ করা যায় না, তলোয়ার দিয়ে করতে হয়।

কিন্তু কেন লিখি তার উত্তর এর মধ্যে পাওয়া গেল না। পালিয়ে যাওয়া অথবা আত্মচিন্তায় বুঁদ হয়ে থেকে সেই ভাব প্রকাশ করা যদি লেখার উদ্দেশ্য হয় তাহলে LSD বা যেকোনো ট্র্যাঙ্কুলাইজার খেয়ে তা করা যেতে পারে। তার জন্য লিখতে হবে কেন? সংগ্রাম যদি করতে হয় তাহলে অস্ত্র নিয়ে তা করাই ভালো, লেখনীর প্রয়োজন কী? কাজেই আমরা লিখি অন্য কোনো কারণে। আমরা মানুষ, মানুষের মধ্যে বাস করি, মানুষ হিসেবে সামাজিক পরিপার্শ্ব থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করি, চোখে দেখি, কানে শুনি, বুদ্ধি দিয়ে বিচার—বিশ্লেষণ করি, হৃদয় দিয়ে অনুভব করি। যা—কিছু এইভাবেই আমরা মানুষ হিসেবে মানুষের মধ্যে থেকে গ্রহণ—বর্জন করি, তারই ক্রিয়া—প্রতিক্রিয়া আমরা লিখে প্রকাশ করতে চাই। মুখে প্রকাশ করলে কথক কবিয়াল বা আধুনিক বক্তা হতে হত। লিখে প্রকাশ করি বলেই আমরা লেখক। প্রকাশ করি এইজন্য যাতে পাঠকরা আমার মনের ভাবানুভাব, আমার অভিজ্ঞতা এবং সেই অভিজ্ঞতাকে বিচার করার রীতি ও ভঙ্গি ইত্যাদি জানতে পারে, অর্থাৎ Communicate করাই লেখকের উদ্দেশ্য। ‘The writer is, par excellence, a mediator and his commitment is to mediation’. (Sartre)

অনেক লেখক বলেন যে তিনি লেখেন তাঁর নিজের জন্যে, কে পড়ল—না পড়ল তাতে তাঁর কিছু আসে যায় না। এটা একেবারে মিথ্যে কথা। এমন যদি হয় যে কোনো দেশে বা কোনো দ্বীপে লেখক একলা বাস করেন, তাঁর পরিবেশ জনমানবশূন্য, লেখক ক্ষমতা তাঁর অসীম, মনের চিন্তাভাবনা অফুরন্ত এবং গভীর। তিনি কি সেখানে বসে হাজার হাজার পৃষ্ঠা লিখবেন? ধরে নিলাম লিখবেন, কিন্তু সেই লেখা কি তাঁর প্রকাশিত হবে? হবে না। কার জন্য হবে? তাঁর খেয়ালখুশিতে লেখা সেই হাজার হাজার পৃষ্ঠা কীটপতঙ্গের খাদ্য হবে, যে কীটপতঙ্গরা তাঁর মনের কথা একটিও বুঝতে পারবে না, অথচ তাঁর হাজার পৃষ্ঠার পাণ্ডুলিপি খেয়ে হজম করে ফেলবে। সুতরাং ‘আমার জন্য’ লিখি এই মিথ্যা কথা আবর্জনাস্তূপে নিক্ষেপ করা উচিত। আমরা লিখি পাঠকদের কথা মনে করে। আমরা যেমন মানুষ, পাঠকরাও তেমনি মানুষ। মানুষের সঙ্গে মানুষের ভাব আদানপ্রদানের জন্যই লেখা। লেখকের কাছে পাঠক ‘dialectical correlative’—এর মতো। লেখার সময় মানুষ হিসেবে পাঠকরাও লেখকের উপর প্রভাব বিস্তার করেন, যেমন লেখকরা মানুষ হিসেবে তাঁদের লেখার ভিতর দিয়ে পাঠকদের উপর প্রভাব বিস্তার করেন। লেখা বা যেকোনো শিল্পকলা সৃষ্টির মধ্যে এই যে ‘আমি’ শিল্পী এবং ‘তারা’ অনেকে যারা পাঠক—দর্শক—শ্রোতা, এই দুইয়ের মধ্যে যে ডায়লেকটিক্যাল সম্পর্ক থাকে তার গুরুত্ব উপলব্ধি করা প্রয়োজন। ‘There is no art except for and by other’. (Sartre)

লেখক কী লিখবেন? মানুষ সম্বন্ধে বললে কিছুই বলা হয় না। মানুষের কোন বিষয় নিয়ে লিখবেন? লেখক যদি রাজপুত্র হন, অথবা উচ্চশ্রেণিভুক্ত যে—কেউ হন, তাহলে তাঁর অভিজ্ঞতার পরিধি, তাঁর বিষয় সমস্যা ইত্যাদি যেরকম হবে, তা নিশ্চয় নিম্নশ্রেণিভুক্ত সাধারণ দরিদ্র কোনো লেখকের হবে না। দু—জনের জগৎ আলাদা, অথচ দু—জনের অভিজ্ঞতাই সামাজিক সত্য। কিন্তু সত্য হলেও দুই সত্যের মধ্যে পার্থক্য আছে। রাজপুত্র বা জমিদার বা উচ্চশ্রেণির লেখকের অভিজ্ঞতা খুব সীমাবদ্ধ। সমাজের একজনও যেহেতু তাঁদের শ্রেণিভুক্ত নন সেইজন্য সমাজের নিরানব্বইজনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাঁদের অভিজ্ঞতার যথেষ্ট গরমিল থাকার কথা। তাহলে সত্য কোনটাকে বলব? শতকরা নব্বইজনের মুখ দিয়ে যিনি কথা বলছেন এবং ১৮০টা হাতের প্রতিভূ একটি হাত দিয়ে যিনি লিখছেন, তাঁর কথাকি সামাজিক সত্য হিসেবে আরও অনেক বড়ো সত্য নয়? আমেরিকার নিগ্রো লেখকের মতো আমাদের দেশের কোনো হরিজন লেখক যদি ভারতীয় সমাজের নিদারুণ অবিচার—অনাচার—অত্যাচার সম্বন্ধে লেখেন এবং তাঁর লেখার মধ্যে যদি তিনি অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে তাঁর মনের ঘৃণা, ক্রোধ ও প্রতিহিংসার ভাব নির্মমভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন, তাহলে কি তাঁর লেখা মন্দ বা নিন্দনীয় বলে গণ্য হবে? কথাটা একটু ভাববার মতো। হয়তো হরিজন লেখকের শিক্ষাদীক্ষাচর্চা কোনো উচ্চশ্রেণির লেখকের মতো পরিশীলিত না হতে পারে, প্রকাশভঙ্গি ও ভাষার মধ্যে রূঢ়তা—গ্রাম্যতা থাকতে পারে, কিন্তু তার জন্য তাঁর লেখা কি ব্যর্থ হবে? শ্রীচৈতন্যপন্থী অথবা বিনবাপন্থী অথবা করুণাময়ী মাদার টেরেজাপন্থী কোনো উচ্চশ্রেণির সুশিক্ষিত লেখক সুন্দর মার্জিত ভাষায় যদি তাঁর ভাবনাচিন্তা খুব দক্ষ কলাকুশলীর মতো প্রকাশ করেন, তাহলে তাঁর লেখা কি হরিজন লেখকের চাইতে কেবল কলাকুশলতার জন্য উৎকৃষ্ট বলে স্বীকার করতে হবে? হরিজন লেখক ঘৃণা ও হিংসার ভাব প্রকাশ করেন এবং বিদগ্ধ উচ্চশ্রেণির লেখক অহিংসা—প্রেম প্রভৃতি উচ্চভাব প্রকাশ করেন। দু—জনের মধ্যে সত্য প্রকাশের কৃতিত্ব কার এবং সাহস কার? সোজা উত্তর হল, হরিজন লেখকের। কারণ হরিজন লেখক যে—সত্যকে সমাজের মানুষের কাছে প্রকাশ করতে চান, তার সত্যতা অন্য শ্রেণির লেখকের তুলনায় শতগুণ বেশি। শুধু তা—ই নয়, হরিজন লেখক তাঁর জীবনের সত্যকে প্রকাশ করার জন্য যে—স্বাধীনতার (freedom) আশ্রয় নিয়েছেন, তার মধ্যে তাঁর অসাধারণ সততা ও দুঃসাহস প্রকাশ পেয়েছে। রূঢ় ও অমার্জিত হলেও তাঁর লেখা থেকে বোঝা যায় যে তিনি জীবন পণ করে স্বাধীনভাবে লেখার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। লেখকের কাছে এই স্বাধীনতাই শ্রেষ্ঠ কাম্য, যে—স্বাধীনতার আশ্রয় নিয়ে তিনি জীবনের ও সমাজের শ্রেষ্ঠ সত্য নির্ভয়ে প্রকাশ করতে পারেন। ‘Thus whether he is an essayist, a pamphleteer, a satirist, or a novelist, whether he speaks only of individual passions or whether he attacks the social order, the writer, a freeman addressing free man, has only one subject—freedom.’ (Sartre)

লেখকের নিজের স্বাধীনতার সঙ্গে মানুষের স্বাধীনতার সম্পর্ক প্রত্যক্ষ বলা চলে এবং মানুষ মানে সমাজের অধিকাংশ মানুষ, মুষ্টিমেয় কয়েকজন দ্বিপদ ম্যামাল—মানুষ নয়। হরিজন—লেখক যখন নিপীড়িত শোষিত হরিজনদের প্রতি যুগ যুগব্যাপী অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখনী ধারণ করেন, তখন হরিজনদের ভিতর দিয়ে সমগ্র নিপীড়িত মানবজাতির পক্ষেই তিনি লেখেন, আমেরিকান নিগ্রো আর ভারতীয় হরিজনদের মধ্যে তখন কোনো পার্থক্য থাকে না। ভারতের হরিজনদের নিগ্রহের কথা আমেরিকার নিগ্রোদেরও মর্ম স্পর্শ করে এবং তখনই সেটি অনায়াসে বিশ্বসাহিত্যের পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়। তা যদি না হয় তাহলে হাজার দামামা বাজিয়েও কাউকে বিশ্বকবি বা বিশ্বশিল্পী বানানো যায় না। দামামার শব্দ একদিন স্তব্ধ হয়ে যায়, বিশ্বশিল্পীর বাইরের মুখোশও খসে পড়ে।

তাই স্বাধীন শিল্পী, স্বাধীন লেখক হওয়া সহজ নয়। উৎকেন্দ্রতা, স্বৈরাচারীর দাসত্ব করা স্বাধীনতা নয়। বৃহত্তম মানবগোষ্ঠীর সমস্ত ন্যায্য অধিকারের স্বাধীনতাই আসল স্বাধীনতা, আসল গণতন্ত্র। ফ্যাসিস্ট রাজত্বেও স্বাধীনতা থাকে, সামরিক একনায়কতন্ত্রেও স্বাধীনতা থাকে, ইমার্জেন্সির সময়ও স্বাধীনতা থাকে। কিন্তু কাদের জন্য সেই স্বাধীনতা? যারা ফ্যাসিস্টদের ও স্বৈরাচারীদের গোলামি করে, তাদের স্বাধীনতা। তারা কারা? সমাজের শতকরা দু—চারজন লোক। এই গোলামির স্বাধীনতা লেখকের জন্য নয়। লেখকের স্বাধীনতা যেহেতু সকল মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা, তাই তাঁকে সেই স্বাধীনতা ‘defend’ করতে হয়, কারণ সেই স্বাধীনতা বিপন্ন হলে লেখাও বিপন্ন হয়। এমন ঐতিহাসিক অবস্থারও উদ্ভব হতে পারে এবং যখন হয় তখন কেবল কলম দিয়ে তাকে রক্ষা করা যায় না। ‘A day comes when the pen is forced to stop, and the writer must then take up arms. Thus, however you might have come to it, whatever the opinions might have professed literature throws you into battle. Writing is a certain -way of wanting freedom; once you have begun, you are committed willy-nilly.’ (Sartre)*

এমন দিন যদি লেখকের জীবনে আসে যখন লেখনী ছেড়ে অস্ত্র ধরা ছাড়া উপায় নেই, তখন তা—ই তাঁকে করতে হবে, তাঁর নিজের স্বাধীনতা, তাঁর পাঠকদের ও বৃহত্তম মানুষের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য। লেখার জন্য লেখা, আমার জন্য লেখা, চিরন্তন সত্যের জন্য লেখা, এসব আগডুম—বাগডুম কথার কোনো মূল্য নেই, ইতিহাসে নেই, মানুষের জীবনে নেই, মানুষের সমাজে নেই। ‘চিরন্তন সত্য’ ইত্যাদি চিরন্তন অত্যাচারী অমানুষদের মুখের বুলি।

সংযোজন : খ

চার দশক আগে বর্তমান গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশের কালে নানা পত্রে যে—সমস্ত সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছিল তা থেকে সমসাময়িক প্রতিক্রিয়ার একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে। নীচে এরকম মাত্র তিনটি সমালোচনা নির্বাচন করা হয়েছে।

শিল্প, সংস্কৃতি ও সমাজ (প্রথম খণ্ড) : শ্রীবিনয় ঘোষ প্রণীত। প্রকাশক : শ্রীপ্রফুল্লকুমার রায়, অগ্রণী বুক ক্লাব, ৭বি যুগীপাড়া লেন, কলিকাতা। মূল্য ৩ টাকা।

সমসাময়িক আদর্শ সংঘাতে মানুষের মনে যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হইয়াছে তাহা তাহার মানসিকতার ক্ষেত্রেই কেবল অস্বস্তিকর হইয়া উঠে নাই। তাহার বিশ্বাসের মূল ভিত্তিটা পর্যন্ত নাড়িয়া দিয়াছে। কিন্তু এই অসুস্থ অনিশ্চয়তার মধ্যেও শ্রেণীস্বার্থের (সজ্ঞান না হইলেও) আকর্ষণ মানুষকে আদর্শ—বিশেষের প্রতি প্রবণ করিয়া তুলিতেছে। সে প্রবণতা আপাততঃ দ্বিধা—জটিল বলিয়া মনে হইলেও চরম সঙ্কট মুহূর্তে সকলেই নিজ নিজ শ্রেণীস্বার্থ—সংরক্ষণে সচেতন হইয়া উঠিতেছে এবং তজ্জন্য ঐক্যবদ্ধ হইতেছে। এই শ্রেণীস্বার্থেরই সজ্ঞান বা নির্জন প্রেরণার পৃথিবীর বহুসংখ্যক মানুষ সমাজতান্ত্রিক আদর্শের দিকে ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে এবং ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র প্রভৃতির ক্ষেত্রে মানবিক সম্বন্ধের নিরিখ নূতন করিয়া নির্ণয় করিতে সচেষ্ট হইয়াছে। জগৎব্যাপী এই স্বার্থ—সংঘাতের স্পর্শ হইতে কোন মানুষই বিমুক্ত নয়। এবং যে শিল্পীকে এতদিন মানসিকতার ক্ষেত্রে তুরীয় লোকবাসী বলিয়া প্রচার করা হইয়াছে, তিনিও যে শ্রেণীস্বার্থ সঞ্জাত আকর্ষণ বিকর্ষণের অতীত নহেন, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে তাহাও আজ আর অস্পষ্ট নহে। শিল্প ও শিল্পী সম্বন্ধে এই সচেতনতা পাশ্চাত্য শিল্প বিচারের ক্ষেত্রে যুগান্তর আনিয়াছে এবং এই নব আদর্শসম্ভূত অন্তর্দৃষ্টির অসঙ্কোচ প্রকাশ এক বিপুল সমালোচনা সাহিত্যের সৃষ্টি করিয়াছে। এই সাহিত্য কেবলমাত্র নূতন দৃষ্টিভঙ্গী হইতে শিল্প—সংস্কৃতির গতি ও প্রকৃতি নির্ণয় করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই—দেশে দেশে শিল্প সংস্কৃতির নবজাগৃতিকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করিবার জন্য যে উদগ্র বিরুদ্ধতা প্রকট হইয়া উঠিয়া শিল্পসঙ্কটের সৃষ্টি করিয়াছে তৎসম্বন্ধে শিল্পীকে পথনির্দেশ দিয়া অনিবার্য সংঘাত বিপর্যয়ে অবিচল থাকিবার প্রেরণা দিয়া এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়া শিল্পীর চক্ষুরুন্মীলনে সাহায্য করিতেছে।

আমাদের দেশের শিল্পীদের মধ্যে এ সম্বন্ধে সচেতনতা খুব বেশী নহে। বাঙ্গালার সমালোচনা সাহিত্যের অপ্রতুলতার মধ্যে এই নূতন দৃষ্টিভঙ্গী হইতে সাহিত্য বিচারের প্রয়াসও এতই অকিঞ্চিৎকর যে মাসিক পত্রিকায় ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত দুই চারিটা প্রবন্ধ ব্যতীত এ সম্বন্ধে কোন ধারাবাহিক প্রচেষ্টা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় নাই। আলোচ্য পুস্তকখানিই যে ওই সম্বন্ধে প্রথম ধারাবাহিক আলোচনা—একথা বলিলে বোধহয় অত্যুক্তি করা হয় না। কাজেই সেদিক দিয়া পুরোগামীর সম্মান বিনয়বাবুরই প্রাপ্য।

প্রথমে বলিয়া রাখি যে, গ্রন্থখানি আদ্যন্ত পাঠ করিয়া আমরা যথেষ্ট উপকৃত হইয়াছি। গ্রন্থের সর্বত্র গভীর চিন্তাশীলতা, দৃষ্টির সুষ্ঠুতা, ভাবনার বলিষ্ঠতা ও ভাষার নিপুণতা অসাবধানী পাঠকেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করিবে।

গ্রন্থখানির বিষয়বস্তুর গুরুত্বের দিক হইতেও বটে আর মার্ক্সীয় শিল্প সমালোচনার ক্ষেত্রে প্রথমাগত বলিয়াও বটে বিস্তৃত সমালোচনার দাবী রাখে। কিন্তু দৈনিক সংবাদপত্রের স্থানের অপ্রাচুর্য সে দাবী পরিপূরণের অনুকূল নহে। কাজেই আমরা গ্রন্থখানির বিষয়বস্তুর একটা অতি সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়াই ক্ষান্ত হইব।

মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে বিচার ও বিশ্লেষণের দার্শনিক ভিত্তি হইল দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism)। এই দর্শনে মূল কাঠামোটি গড়িয়াছিলেন দার্শনিক হেগেল। মার্ক্স তাঁহার সেই কাঠামোর ভাবপ্রধান আবরণটিকে বাদ দিয়া কেবলমাত্র পদ্ধতিটা গ্রহণ করেন এবং বৈজ্ঞানিক পন্থায় তাহাকে ঢালিয়া সাজেন। লেখক প্রথম অধ্যায়ে সংক্ষেপে অথচ সুষ্ঠুভাবে এই মার্ক্সীয় দর্শনের আলোচনা করিয়াছেন এবং হেগেলীয় দর্শনের সঙ্গে তার পার্থক্যটাও বিশ্লেষণ করিয়া দেখাইয়াছেন। প্রসঙ্গতঃ প্রুধোঁ ও ফয়েরবাখের সঙ্গে তাঁহার যে বিরোধ কোথায় তাহার ইঙ্গিতও লেখক করিয়াছেন।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি হেগেল, ক্রোচে ও কার্ল মার্ক্সের শিল্প—বিশ্লেষণধারার আলোচনা করিয়া মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গীর যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন এবং এই সিদ্ধান্তে আসিয়াছেন যে,—”শ্রেণিবিন্যস্ত সমাজে শ্রেণীতে শ্রেণীতে বিরোধ যেখানে বর্তমান সেখানে শ্রেণি—শিল্প (Class Art) ভিন্ন অন্য কিছু বিকশিত হোতে পারে না এবং শিল্পী যদি তাঁর যুগ—সমস্যার প্রতি যুগাদর্শের প্রতি নিষ্ঠাবান হন, সত্যকার শিল্পীকে হোতেই হবে,—তাহলে তিনি সেই যুগে প্রগতিপন্থী।”

ইহার পরবর্তী ‘সত্য ও বাস্তব’, ‘কাব্য’, ‘কাব্যের ক্রমবিকাশ’, ‘উপন্যাস’, ‘উপন্যাসের ঐতিহাসিক ধারা’—এই কয়টি অধ্যায়ে শিল্পের উপাদান, তাহার পরিপ্রকাশ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাহার অভিব্যক্তির ধারা, শিল্পের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ—সম্ভাবনা প্রভৃতি সম্বন্ধে এত নিপুণতার সঙ্গে আলোচনা করা হইয়াছে এবং প্রত্যেক অধ্যায়েই লেখকের বলিষ্ঠ মননশীলতা, বিস্তৃত অধ্যয়ন ও আদর্শ সম্বন্ধে সচেতনতা এত স্পষ্ট যে পাঠক মাত্রেই উহা হইতে চিন্তার প্রচুর খোরাক সংগ্রহ করিতে পারিবেন।

অষ্টম অধ্যায়ে ‘আধুনিক সোভিয়েট সাহিত্য’ সম্বন্ধে আলোচনা করা হইয়াছে। সামাজিক জীবনের বিভিন্ন স্তরে বিজ্ঞানের সম্বন্ধ নির্ণয় পরবর্তী অধ্যায়ের বিষয়বস্তু। এই দুইটি অধ্যায়ে লেখক শক্তির পরিচয় দিলেও উহা অপ্রচুর বলিয়া আমাদের মনে হইয়াছে। দুটি বিষয়ই বিস্তৃততর আলোচনার অপেক্ষা রাখে।

‘সংস্কৃতি—সঙ্কটের রূপ’, ‘মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও সমাজ’ ও ‘আমাদের কর্তব্য’—শেষের এই তিনটি অধ্যায়ের শিল্প ও সংস্কৃতি আজ যে সঙ্কটের সম্মুখীন হইয়াছে তাহার বিস্তৃত আলোচনা এবং তাহার নিদান নির্ণয়ের সক্ষম প্রচেষ্টা আছে। শিল্পে ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত শ্রেণির কি ভূমিকা সে সম্বন্ধে ইঙ্গিতও স্পষ্ট ও সুচিন্তিত। বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে শিল্পী, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক ও সাংবাদিকের কর্তব্য সম্বন্ধে স্পষ্ট ও নিঃসংশয় নির্দেশ দিয়া লেখক গ্রন্থ সমাপ্ত করিয়াছেন।

গ্রন্থশেষে যে প্রমাণ—পঞ্জী দেওয়া হইয়াছে, তাহা সুনির্বাচিত। গ্রন্থে আলোচিত বিষয় সম্বন্ধে বিস্তৃততর আলোচনেচ্ছু পাঠক উহা হইতে সহায়তা লাভ করিবেন। গ্রন্থমধ্যে যে সমস্ত গ্রন্থকারের মতামাত আলোচিত হইয়াছে, গ্রন্থশেষে তাঁহাদের নাম নির্ঘণ্ট গ্রন্থের উপযোগিতা বৃদ্ধি করিয়াছে।

লেখকের ভাষার স্বচ্ছতা ও প্রাঞ্জলতা সত্ত্বেও দুই তিনটি স্থানে আলোচনা আমাদের কাছে অস্পষ্ট বলিয়া মনে হইয়াছে। সক্ষমের এ ত্রুটি উপেক্ষণীয় নহে। কয়েকটি বাঙ্গালা পারিভাষিক শব্দ সম্বন্ধেও আমাদের আপত্তি আছে। স্থানে স্থানে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও বিরোধী মতাবলম্বীর প্রতি রূঢ় শব্দ প্রয়োগ মনকে পীড়া দেয়। আলোচ্য গ্রন্থে পাশ্চাত্য সাহিত্য হইতে প্রধানতঃ উপাদান সংগৃহীত হইয়াছে। গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে বাঙ্গালা সাহিত্যের ক্রমবিকাশ সম্বন্ধে আলোচনা করিবেন বলিয়া গ্রন্থকার আশ্বাস দিয়াছেন।

গ্রন্থের ছাপা ও কাগজ ভাল, বাঁধাই স্থায়ী ও রুচিসঙ্গত।*

—আনন্দবাজার পত্রিকা, রবিবার ২৩ জুন ১৯৪০, পৃষ্ঠা ১৭

শিল্প, সংস্কৃতি ও সমাজ, প্রথম খণ্ড, বিনয় ঘোষ। অগ্রণী বুক ক্লাব, কলিকাতা। মূল্য তিন টাকা।

বাংলা সাহিত্যের পরিধি যে এ যুগে বিস্তৃততর হইয়াছে, এই পুস্তকে তাহার প্রমাণ আছে, লেখক বিনয় ঘোষ চিন্তাশীল সমাজের দৃষ্টি ইতিমধ্যেই আকর্ষণ করিয়াছেন। বয়সে তরুণ হইলেও তাঁহার পাণ্ডিত্য অসাধারণ, অধিকন্তু তাঁহার বাচনভঙ্গী চমৎকার। এ সব কটি গুণ মিলিয়া আলোচ্য বইখানি উপাদেয় হইয়া উঠিয়াছে। এই বইখানি যাঁহারা মন দিয়া পড়িবেন, তাঁহারা লেখককে এক নূতন চিন্তাধারার প্রবর্তক বলিয়া স্বীকার করিবেন। বর্তমান যুগের বাংলা দেশের সমাজ ব্যবস্থার পটভূমি হইতে তিনি শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিচার করিয়াছেন। ইহাতে শিল্পের স্বরূপ বিশ্লেষণ, সত্য ও বাস্তব, কাব্য, উপন্যাস, মধ্যবিত্তশ্রেণী ও সমাজ প্রভৃতি আলোচনা আছে। প্রত্যেকটি আলোচনা বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যে সকল সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটিয়াছে, তাহাও নিপুণভাবে দেখানো হইয়াছে। আমরা সাগ্রহে এই পুস্তকের দ্বিতীয় খণ্ডের জন্য প্রতীক্ষা করিতেছি।

—শনিবারের চিঠি : কার্ত্তিক ১৩৪৭, ১৩শ বর্ষ, ১ম সংখ্যা, পৃষ্ঠা ১৫২

This is an ambitionus book in Bengali which aims at giving a summary of the relations of art, culture and society. The aim and courage of the author is praiseworthy. But anyone who knows English and read will find this not only super-fluous but inaccurate and confused. As for a reader who knows no English, the book is too pedantic.

—The Sunday Statesman, August 4, 1940

……………

* দ্বিতীয় সংস্করণের নূতন সংযোজন জুন, ১৯৮০

* উদ্ধৃতিগুলি Jean-Paul Sartre-এর What is Literature? (London 1950) বই থেকে গৃহীত।

* এই সমালোচনা সম্প্রতি—পরলোকগত সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ লিখেছিলেন—লেখক।

গ্রন্থপঞ্জি

Karl Marx : The Poverty of Philosophy

V.I. Lenin : Materialism and Empirio-criticism

F. Engels : Anti-duhring

J. Stalin : Foundations of Leninism

T.A. Jackson : Dialectics

Sidney Hook : From Hegel to Marx

*

T.S. Eliot : After Strange Gods

T.S. Eliot : Selected Essays

Ezra Pound : A. B. C. of Reading

Ezra Pound : Make it New

Oswald Spengler : Decline of the West

Oswald Spengler : The Hour of Decision

H. G. Wells : Experiment in Autobiography (2 vols)

H. G. Wells : The Fate of Homo Sapiens

H. G. Wells : The New World Order

Sigmund Freud : Beyond The Pleasure Principle

Sigmund Freud : Civilisation and its Discontents

Sigmund Freud : The Future of an Illusion

Dr. Ernest Jones : Psychoanalysis

G. D. H. Cole : What Marx Really Meant

*

Benedetto Croce : Æsthetic

Lascelles Abercrombie : Principles of Literary Criticism

Bertrand Russell : Education and the Modern World

Henry Levy : A Philosophy for a Modern Man

Leon Trotsky : Literature and Revolution

Max Eastman : Artists in Uniform

Wyndham Lewis : Men without Art

C. Day-Lewis : Mind in Chains

Philip Henderson : Literature

John Strachey : The Coming Struggle for Power

Samuel D. Schmalhausen : The New Road to Progress

Christopher Caudwell : Illusion and Reality

Christopher Caudwell : Studies in a Dying Culture

Ralph Fox : The Novel and the People

James T. Farrell : A Note on Literary Criticism

Stephen Spender : The Destructive Element

Alec Brown : The Fate of the Middle Classes

Romain Rolland : I Will Not Rest

Amedee Ozenfant : Journey through Life

I. A. Richards : Science and Poetry

*

Left Review

International Literature

New Writing

১৯৬০ ও ১৯৭০—এর দশকে প্রকাশিত কয়েকখানি উল্লেখ্য গ্রন্থ ও পত্রিকা :

S. Baxandall : Marxism and Aestheties : a selective annotated

bibliography : New York 1968

Baxandall and Marawski (ed) : Marx and Engels on Literature and

Art : St. Louis 1973

Raymond Williams : Marxism and Literature : London 1977

L. Goldmann : Towards a Sociology of the Novel : London 1975

A. Gramsci : Prison Notebooks : London 1970

G. Lukacs : The Historical Novel : London 1962

The Theory of the Novel : London 1971

H. Marcuse : The Philosophy of Aesthetics : N. Y. 1972

New Left Review

Socialist Register.

অধ্যায় ১৩ / ১৩
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%