অনীশ দেব
শীত চলে যাচ্ছিল। তাই বসন্তও এসে হাজির হয়েছিল দরজায়। কিন্তু প্রকৃতির কী খেয়াল, শীত আবার ঘুরে দাঁড়াল। সেই সঙ্গে নিয়ে এল বর্ষা। ফলে বসন্ত দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
গতকাল সকাল থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফিকে হয়ে আসা শীত একটু-একটু করে বাড়তে শুরু করেছে। কাল রাতে শোওয়ার সময় আপনমনে গজগজ করতে-করতে চিকুর মা আলমারি খুলে আবার লেপ-কম্বল বের করে ফেলেছে।
‘এভাবে শীত চলে গিয়ে আবার ফিরে আসার কোনও মানে হয়!’ চিকুর বাবা একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে খবরের কাগজটা খুঁটিয়ে পড়ছিল, চিকুর মায়ের কথায় হেসে ফেলল : ‘হ্যাঁ, ব্যাপারটা খুব বিচ্ছিরি। এতে খুব অসুবিধে হয়। ওই যে সেদিন আমি অফিসে বেরিয়ে গেলাম—তারপর চশমাটা ভুলে ফেলে গেছি বলে ফিরে এলাম—তাতে চিকুর খুব অসুবিধে হয়ে গিয়েছিল...।’
চিকু ওয়াকম্যানের হেডফোন কানে লাগিয়ে সবে হিন্দি গান শোনার তোড়জোড় করছিল, বাবার কথায় অনুযোগ করে উঠল, ‘কী হচ্ছে, বাবা!’
ব্যাপারটা গত সপ্তাহের। বাবা সকাল দশটা নাগাদ অফিসে রওনা হতেই ও একটা রবারের বল নিয়ে ঘরের মধ্যে ফুটবল খেলতে শুরু করেছিল। আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বাবা আচমকা ফিরে আসায় কী কেলেঙ্কারি! কারণ, সামান্য জ্বর মতন হয়েছে বলে সেদিন ও স্কুলে যাবে না ঠিক করেছিল। বাবা ওর কথায় সায় দেওয়ায় মা শত জেদ করেও ওকে স্কুলে পাঠাতে পারেনি। এখন মায়ের চেঁচামেচি গ্ৰাহ্য না করে ও ফুটবল প্র্যাকটিস করছিল। সামনের রবিবার জামতলার তরুণ সঙ্ঘের সঙ্গে ম্যাচ। ম্যাচ তো নয়—একেবারে প্রেস্টিজ ফাইট। তাই...।
বাবা কোনও সময় চিকুকে বকাবকি করে না। চশমা নিতে এসে। ওকে খেলতে দেখে শুধু বলেছিল, ‘বল খেললেই দেখবি তোর জ্বর সেরে যাবে।’
তারপর হেসে চলে গিয়েছিল।
চিকু তাতে ভীষণ লজ্জা পেয়ে তিনদিন এমন পড়াশোনা করেছিল যেন ওর মাধ্যমিক পরীক্ষা একেবারে কাছে এসে গেছে। অথচ ও এখন সবে ক্লাস নাইনে পড়ে—টেন-এ উঠবে।
আজ সকালের খবরে চিকু শুনেছে উষ্ণতা এক ধাক্কায় চার ডিগ্রি কমে গেছে। সুতরাং ওর হাতকাটা সোয়েটার আর মাফলার আলমারির তাক থেকে আবার বেরিয়ে এসেছে।
সন্ধে ছ’টার সময় হরিহরবাবুর কোচিং-এ চিকু বাংলা পড়তে যায়। হরিহরবাবু চিকুদের জাঙ্গিকুল হাই-স্কুলের বাংলা স্যার ছিলেন। বছরদুয়েক হল রিটায়ার করেছেন। বাংলা দারুণ পড়ান—তাই ওঁর কোচিং-এ খুব ভিড়। তা ছাড়া ভীষণ পণ্ডিত মানুষ—নানান বিষয়ে অনেক জানেন।
চিকু যখন সাইকেল নিয়ে বেরোল তখন বৃষ্টি পড়ছে কি পড়ছে না। তবে আকাশের এখানে ওখানে বেশ মেঘ জমে রয়েছে।
মা চায়ের কাপে চুমুক দিতে-দিতে কেব্ল টিভিতে সিনেমা দেখছিল। চিকুকে বেরোতে দেখে বলল, ‘অ্যাই, ছাতা নিয়ে বেরোবি—।’
চিকু আবদারের গলায় বলল, ‘বৃষ্টি তো পড়ছে না!’
‘একটু পরেই পড়বে।’
বিরক্তভাবে মায়ের ফোল্ডিং ছাতাটা ব্যাগে ভরে নিল চিকু। তারপর সিঁড়ির নিচ থেকে সাইকেলটা বের করে রাস্তায় চলে এল।
হরিহরবাবুর কোচিং সাইকেলে বড়জোর পাঁচ-সাত মিনিট। ঘণ্টি বাজিয়ে জোরে প্যাডেল করতে শুরু করল চিকু। বৃষ্টি জোরে নামার আগেই ওকে কোচিং-এ পৌঁছতে হবে। ছাতা মাথায় দিয়ে সাইকেল চালানো এক ঝকমারি।
সরু পিচের রাস্তা ভাঙাচোরা কয়েকবছর ধরেই। এই দু-দিনের বৃষ্টি সেটাকে একেবারে বেহাল করে দিয়েছে। রাস্তায় লোকজন কম। যে-ক’জন চোখে পড়ল সকলেই সোয়েটার, মাফলার কিংবা চাদরমুড়ি।
নাটোর মোড়ের কাছে শ্যামাপদদার তেলেভাজার দোকান পেরিয়ে গেল চিকু। সেখানে বেশ ভিড়। সাইকেল-রিকশাগুলো প্যাকপ্যাক হর্ন বাজিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে।
ডানদিকে ঘুরে শিবতলার হর-পার্বতীর মন্দির পেরোতেই চিকু দেখল দেশপ্রিয় সুইটস-এর পাশে বেঞ্চি পেতে রোহনদারা বসে আছে।
এ-এলাকা রোহনদের কথায় চলে। কোথাও কোনও গোলমাল হলে রোহনরা সবার আগে সেখানে ছুটে যায়। রাতবিরেতে বিপদ-আপদ হলে রোহনরা একডাকে হাজির। গত পুজোর আগে সমীর মিত্রদের বাড়িতে ডাকাত পড়েছিল। ওদের কাজের লোক কোনওরকমে পালিয়ে এসে রোহনের বাড়িতে খবর দিয়েছিল। রোহন সঙ্গে সঙ্গে দলবল জুটিয়ে মিত্রদের বাড়িতে গিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিল। গুলি-বোমা নিয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর দুজন ডাকাত ধরা পড়েছিল, আর তিনজন পালিয়ে গিয়েছিল। কষে গণধোলাই দেওয়ার পর আধমরা ডাকাতদুটোকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।
চিকুকে দেখে রোহন হাত নাড়ল, চেঁচিয়ে বলল, ‘কোচিং যাচ্ছিস?’
সাইকেল না থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে চিকু জবাব দিল, ‘হ্যাঁ—বাংলা।’
রোহন হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় একবার ফেল করার পর আর লেখাপড়া করেনি। ওর বাবার সিমেন্ট-বালি-ইটের দোকান আছে—সেখানে মাঝে-মাঝে বসে। চিকুর সঙ্গে যখনই কথা হয় তখনই লেখাপড়া করতে পারেনি বলে দুঃখ করে। চিকুর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে, ‘তুই লেখাপড়ায় ফার্স্টক্লাস। ঠিকমতো চালিয়ে যা।’
জলাপুকুরের পাড় দিয়ে সাইকেল প্যাডেল করে যেতে-যেতে চিকুর এসব কথা মনে পড়ছিল। পুকুরের অন্ধকার জলে রাস্তার দু-চারটে টিমটিমে বালবের ছায়া পড়েছে। গ্যাঙর-গ্যাঙ ব্যাঙের দল ব্রিগেডের মিটিং শুরু করে দিয়েছে। কোথায় যেন ঘাপটি মেরে লুকিয়ে ছিল ওরা! বৃষ্টি হতে-না-হতেই লুকনো আস্তানা ছেড়ে বেরিয়ে এসে শোরগোল হইচই করে দুনিয়া মাথায় তুলেছে।
জলাপুকুরের নামটা কেন যে এরকম অদ্ভুত কেউ জানে না। মাপে প্রকাণ্ড হলে কী হবে, শ্যাওলা আর কচুরিপানায় প্রায় পুরোটাই ঢাকা। পুকুরের দু-কোণে ইট-পাথর পেতে সবাই ঘাটের মতো করে নিয়েছে। সেখানেই বাসনমাজা আর স্নানের কাজ চলে।
জায়গাটা বেশ নির্জন, আর শীতও যেন বেশি। চিকুর এখন হয়তো ভয়-ভয় করত, কিন্তু ব্যাঙের দল ওকে সাহস দিল। ও তাড়াতাড়ি প্যাডেল ঘোরাতে শুরু করল।
জলাপুকুর পেরিয়েই বিশাল এক আমবাগান। চিকু শুনেছে, এককালে এখানে শুধুই আমগাছ ছিল। কিন্তু এখন তারই মাঝে কাঁঠাল, শিমুল, তেঁতুল এসব গাছ গজিয়ে জায়গাটা ঝুপসি হয়ে গেছে। তবে জায়গাটার নাম এখনও সেই আমবাগান।
গাছগাছড়ার মধ্যে দিয়ে পায়ে চলা কাঁচা পথ। এখন বৃষ্টিতে কাদা-কাদা হয়ে গেছে। চিকু সাবধানে সাইকেল চালাতে লাগল। সাইকেলের হেডলাইট ওকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল।
আমবাগান পেরিয়ে রাজবাড়ি। তবে বাড়ির এখন যা অবস্থা তাতে পোড়োবাড়ি বলতেও কোনও অসুবিধে নেই। ভাঙাচোরা দোতলা বাড়িটা প্রকাণ্ড এক কালো কচ্ছপের মতো মাঠের ওপরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। এককালের রাজার দুই নাতি না পুতি তাদের পরিবার নিয়ে একতলার একপাশের দুটো ঘরে এখন বাস করে। তাই বাড়ির সেদিকটায় দু-চারটে জানলায় রাতে টিমটিম করে আলো জ্বলে।
বাড়িটার নানা জায়গা থেকে বট আর অশ্বত্থের চারা গজিয়ে রয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটাতো রীতিমতো গাছের চেহারা নিয়েছে। এখন অন্ধকারে সেটা ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছিল না। তবে মেঘ সরে গিয়ে আকাশে একটা ছোট্ট জানলা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আর সেই জানলা দিয়ে থালার মতো চাঁদটা উঁকি মারতেই চিকুর মনে পড়ে গেল আজ পূর্ণিমা। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় রাজবাড়ির ভাঙা ছাদটা অস্পষ্টভাবে চোখে পড়ছিল, আর সেইসঙ্গে গোটা তিন-চারেক বট কিংবা অশ্বত্থ গাছকে চেনা যাচ্ছিল।
রাজবাড়ির চৌহদ্দি পেরিয়েই বাঁদিকে একটা সরু গলি ঢুকে গেছে। সেই গলিতেই হরিহরবাবুর ছোট্ট দোতলা বাড়ি। একতলাটা থাকার মতো হলেও দোতলাটা এখনও ইট-কাঠ বের করা। বোধহয় টাকার অভাবে শেষ করা যায়নি। বাড়ির লাগোয়া জমিতে দুটো সুপুরি আর একটা চাঁপা গাছ। সুপুরিগাছ দুটো দেখলেই চিকুর হরিহরবাবুর পান খাওয়ার নেশার কথা মনে পড়ে যায়।
দরজার কাছে একটা বাল্ব জ্বলছিল। সেই আলোয় চিকু দেখল গ্রিলের গেটের ওপাশে পাঁচ-ছ’টা সাইকেল দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে নিজের সাইকেলটা রেখে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল চিকু।
কিন্তু পড়ার ঘরটায় ঢুকেই ও বেশ অবাক হয়ে গেল।
কৌশিক, প্রিয়াংকা, তিতুন, সুকান্ত আর প্রদীপ্ত গোল হয়ে বসে তেল-মুড়ি খাচ্ছে। সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজের টুকরো আর চানাচুর। ঘরে স্যার নেই। চিকুরা একসঙ্গে আটজন বাংলা পড়ে। তবে আজ বোধহয় বৃষ্টি আর শীতের জন্য শ্রাবণী আর উত্তম আসেনি।
চিকু ঘরে ঢুকতেই কৌশিক আর তিতুন সরে গিয়ে শতরঞ্চিতে ওকে বসার জায়গা করে দিল। সুকান্ত বলল, ‘নে, মুড়ি-চানাচুর খা। আজ স্যারের শরীর ভালো নেই—পড়াবেন না।’
প্রদীপ্ত চাপা গলায় বলল, ‘কাকিমা মুড়ি মেখে খেতে দিলেন।’
কাকিমা মানে হরিহরবাবুর স্ত্রী। ওদের সবাইকে খুব ভালোবাসেন। গোলগাল হাসিখুশি চেহারা। প্রায়ই ওদের নানান জিনিস খাওয়ান।
শতরঞ্চির মাঝখানটায় খবরের কাগজ পাতা—তার ওপরে মুড়ির পাহাড়। চিকু বসেই ঝুঁকে পড়ে হাত বাড়াল মুড়ির দিকে। পরপর দু-মুঠো মুড়ি মুখে গুঁজে দিয়ে জড়ানো গলায় বলল, ‘আমরা কি তা হলে আবার সামনের বুধবার আসব?’
প্রিয়াংকা কপাল থেকে চুল সরিয়ে বলল, ‘কাকিমা তো তাই বললেন।’
এমন সময় হরিহরবাবুর স্ত্রী ঘরে এসে ঢুকলেন।
চিকুকে দেখেই আপনজনের মতো একগাল হেসে বললেন, ‘চিকু শুনেছ তো, আজকে পড়া হবে না। তোমাদের স্যারের শরীরটা ভালো নেই—জ্বর-জ্বর মতন হয়েছে। আগে থেকে খবরটা দিতে পারলে ভালো হত। এই বিচ্ছিরি ওয়েদারের মধ্যে এসে শুধু শুধু তোমাদের ফিরে যেতে হল।’
‘তাতে কী হয়েছে, কাকিমা। আমরা পরের বুধবার আসব।’
‘নাও, মুড়ি-চানাচুর খাও। তোমরা কেউ চা খাবে?’
ওরা সবাই মাথা নাড়ল। না, খাবে না। হরিহরবাবু বলেন, ‘নেশার বশ হবি না কখ্খনও। পোষ যদি মানতে হয় তো সে শুধু ভগবান কি মহাজনের কাছে। দ্যাখ না, কত চেষ্টা করেও আমার পানের নেশাটা ছাড়তে পারছি না।’
সুতরাং, ওরা কেউ-কেউ চা খাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও মুখে ‘না’ বলল।
মুড়ি-চানাচুর শেষ করে ওরা কাকিমাকে বলে বেরিয়ে পড়ল। প্রিয়াংকা চিকুকে বলল, ‘তোমাকে “মোহাব্বতে”-র ক্যাসেটটা দেব বলেছিলাম, এখন আমার সঙ্গে গিয়ে নিয়ে আসতে পারো। আর আমাদের ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেমে একবার শুনেও নিতে পারো—কী দারুণ আওয়াজ... ফ্যানট্যাসটিক।’
‘চলো। তবে আমাদের টেপ রেকর্ডারটা অর্ডিনারি টু-ইন-ওয়ান। ওতে খুব একটা ভালো শোনাবে না মনে হয়...।’
এ-ওকে ‘টা টা’ করে ওরা সাইকেল নিয়ে যে-যার পথে ছড়িয়ে গেল। শুধু প্রিয়াংকা আর চিকুর সাইকেল দুটো একই পথ ধরে সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলল।
প্রিয়াংকাদের বাড়িটা চিকুদের বাড়ির উলটোপথে অনেকটা দূরে। ওদের বাড়ি থেকে রেল স্টেশনটা কাছে। সেখানে বেশ কয়েকটা সুন্দর-সুন্দর বাড়ি আছে। ঠিক যেন জলরঙে আঁকা ছবি। চিকু এর আগে দু-চারবার প্রিয়াংকাদের বাড়ি গেছে। ওদের বাড়িতে গেলে কোথা দিয়ে সময় কেটে যায় খেয়াল থাকে না। আজ অবশ্য দেরি হওয়ার কোনও ভয় নেই, মা-বাবা চিন্তাও করবে না। ওরা জানে চিকু বাংলা কোচিং-এ পড়ছে।
অন্ধকার পথ ধরে সাইকেল চালাতে চালাতে চিকু জিগ্যেস করল, ‘এই পথ দিয়ে একা-একা ফিরতে তোমার ভয় করে না?’
প্রিয়াংকা শব্দ করে হাসল : ‘অন্য দিন করে...আজ করছে না।’
ওদের সাইকেলের চাকা ঘুরতে লাগল।
বাড়ির দিকে ফেরার সময় রাজবাড়ির কাছাকাছি এসে চিকু প্রথম বিপদের গন্ধ পেল। পরিস্থিতি আর পরিবেশ কেমন যেন অন্যরকম মনে হল ওর। আর সেইজন্যই একটা আশঙ্কা তৈরি হল। সবকিছুই ঠিক আছে, অথচ যেন ঠিক নেই। কিন্তু গণ্ডগোলটা যে ঠিক কোথায় সেটাই ও ধরতে পারছিল না।
যতটা জোরে পারা যায় ততটা জোরেই সাইকেল চালাচ্ছিল চিকু। আর একইসঙ্গে ওর মনের ভেতরে উথালপাথাল চলছিল, একটাই প্রশ্নের উত্তর ও হাতড়ে হাতড়ে বেড়াচ্ছিল : গণ্ডগোলটা কোথায়?
চিকুর হাতে ঘড়ি নেই, তবে রাত বোধহয় সওয়া ন’টা কি সাড়ে ন’টা হবে। এতটা রাত না করলেই হত। বৃষ্টি এখন নেই। আকাশ বেশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। পূর্ণিমার চাঁদ উজ্জ্বল চোখে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছে। বাতাস বেশ ঠান্ডা।
চিকুর সোয়েটার ভেদ করে শীত ঢুকে পড়ছে ভেতরে। আজ রাতে মনে হয় লেপ গায়ে দিতে হবে।
রাজবাড়ি পেরিয়ে আমবাগানের কাছাকাছি এসে গণ্ডগোলটা খেয়াল করল চিকু।
এই পথে যাওয়ার সময় পথের আশপাশ থেকে দু-পাঁচটা ব্যাঙের ডাক ওর কানে এসেছিল। হয়তো রাস্তার পাশের নালায় বা জমে থাকা জলে কয়েকটা ব্যাঙ আস্তানা গেড়েছিল।
কিন্তু এখন ওরা আর কেউ ডাকছে না। কেউ যেন ভয় দেখিয়ে ওদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে।
ঠিক তখনই ও খেয়াল করল জলাপুকুরের দিক থেকেও ব্যাঙের কোরাস আর শোনা যাচ্ছে না। চারপাশটা কেমন যেন থমথম করছে। শুধু গাছের পাতার খসখস শব্দ।
জোরে প্যাডেল করে আমবাগানটা পেরিয়ে যেতে চাইল চিকু। ওর কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল।
আমবাগান শেষ হওয়ার মুখে একটা চাপা গর্জন ওর কানে এল। প্রচণ্ড রাগে কোনও পশু গরগর করছে। তার চাপা গোঙানির মধ্যেই হিংস্র ভাব টের পাওয়া যাচ্ছে।
একইসঙ্গে জান্তব একটা গন্ধও নাকে এল।
আতঙ্কে বেপরোয়া গতিতে সাইকেল ছোটাল চিকু। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা পাথর বা ইটের টুকরোয় হোঁচট খেয়ে ওর সাইকেল শূন্যে লাট খেয়ে পথের ওপরে ছিটকে পড়ল।
চিকু একদিকে, ওর ব্যাগ একদিকে, আর সাইকেল আর-একদিকে। সাইকেলের একটা চাকা তখনও ঘুরছে। হেডলাইটটা কাত হয়ে তেরছাভাবে আলোর বর্শা ছুড়ে দিয়েছে। আলোটা ক্রমেই মিটমিটে হয়ে নিভে আসছে।
চিকুর সারা শরীরে কাদা মাখামাখি। কনুইয়ে একটু চোটও লেগেছে। কিন্তু ভয় বড় আশ্চর্য জিনিস। পঙ্গুকে দিয়ে গিরি লঙ্ঘন করিয়ে নেয়। ফলে তখন ভয় আর ভগবানে কোনও তফাত থাকে না।
চিকু চটপট নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে পড়ল। দু-পা ফেলে এগিয়ে গেল ব্যাগের কাছে। ব্যাগটা এক ঝটকায় তুলে নিয়ে সাইকেলের দিকে এগোতেই জিনিসটা ওর চোখে পড়ল।
সাইকেলের আলো ততক্ষণে ক্ষয়ে এসেছে। কিন্তু পূর্ণিমার আলোয় ক্ষয় ধরেনি। তাই চিকুর দেখতে খুব একটা অসুবিধে হল না।
ও পায়ে পায়ে জিনিসটার কাছে এগিয়ে গেল। সেটা চিনতে পারামাত্রই একটা আতঙ্কের চিৎকার ওর গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে গেল। কিছুতেই গলা দিয়ে বেরোতে পারছিল না।
একটা মানুষের ছিন্নভিন্ন দেহ পড়ে রয়েছে বৃষ্টি-ভেজা মাটিতে। মাথাটা শরীর থেকে আলাদা হয়ে হাঁ করে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। হাত-পাগুলো এলোমেলোভাবে এদিক-ওদিক ছড়ানো। চাঁদের আলোয় রক্তের রং বোঝা যাচ্ছিল না। ফলে মনে হচ্ছিল, বৃষ্টির জমে থাকা কালো জলের ওপরে ছিন্নবিচ্ছিন্ন মানুষটা পড়ে আছে।
চিকুর মাথা কাজ করছিল না। তবে অন্ধ ভয় ওকে দিয়ে যান্ত্রিকভাবে কাজ করিয়ে নিচ্ছিল। ও ছুটে গিয়ে সাইকেলটা তুলল। আর সঙ্গে সঙ্গে কানে এল ভয়ঙ্কর এক গর্জন। এবার গর্জনটা এসেছে জলাপুকুরের দিক থেকে।
এটা কি বাঘের গর্জন? কোথাও থেকে একটা বাঘ কি এসে ঢুকে পড়েছে আমবাগানে?
সাইকেল পাশে নিয়ে কয়েক পা ছুটেই লাফিয়ে সাইকেলে উঠে পড়ল চিকু। তারপর প্রাণপণে সাইকেল চালাতে শুরু করল। আর ঠিক তখনই শুনতে পেল জলাপুকুরে কেউ যেন ঝপাং করে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
চিকুর সবকিছু কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল।
এই শীতের রাতে বাঘ হঠাৎ জলে ঝাঁপ দেবে কেন?
এবড়োখেবড়ো পথ ধরে যেতে-যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে জলাপুকুরের দিকে তাকাল ও। জলে কী একটা নড়ছে যেন! কেউ যেন প্রবল উল্লাসে জল ঘেঁটে দাপাদাপি করে স্নান করছে।
কৌতূহল বড় আশ্চর্য জিনিস। কখনও-কখনও ভয়কেও ছাপিয়ে যায়। চিকুর বেলায়ও তাই হল। জলাপুকুরের পাড়ে ব্রেক কষে সাইকেল দাঁড় করিয়ে দিল ও। তবে প্যাডেলে পা চেপে তৈরি থাকল। ওর হাত-পা থরথর করে কাঁপছিল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জলের শব্দ থামল। কিছু একটা উঠে আসতে লাগল জল থেকে।
প্রাণীটাকে জ্যোৎস্নার আলোয় দেখা গেল। তবে ওটার মাথায় কচুরিপানা আর শ্যাওলা বোঝাই হয়ে থাকায় মুখটা ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। লোমশ হাত দিয়ে সেগুলো সরাতে চেষ্টা করছিল। হাতটা মানুষের মতো হলেও আঙুলের ডগায় লম্বা-লম্বা সাদা বাঁকানো নখ। সামনে ঝুঁকে পড়ে কুঁজো হয়ে প্রাণীটা জল থেকে উঠে আসছিল। হাঁটু দুটো সামান্য ভাঁজ করে জলের মধ্যে পা ফেলছে। যেন কোনও চারপেয়ে জন্তু দু-পায়ে হাঁটার চেষ্টা করছে।
একটা হিংস্র গর্জন বেরিয়ে এল প্রাণীটার মুখ থেকে।
চিকুর শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। আর সঙ্গে-সঙ্গে এতক্ষণ দলা পাকিয়ে আটকে থাকা চিৎকারটা ওর গলা দিয়ে বেরিয়ে এল।
একটানা চিৎকার করতে-করতে পাগলের মতো সাইকেল ছুটিয়ে দিল চিকু।
ও যখন বাড়ি এসে পৌঁছল তখনও ওর চিৎকার থামেনি। মা-বাবা ছুটে বেরিয়ে এল দরজায়। দেখল চিকুর জামাকাপড় রক্ত আর কাদায় মাখামাখি।
মা ছুটে গিয়ে ওকে জাপটে ধরে আকুলভাবে জিগ্যেস করল, ‘কী হয়েছে রে, কী হয়েছে?’ চিৎকার করতে-করতেই চিকু আচমকা জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
পরদিন সকালে বেলা দশটার মধ্যেই পাশবিক খুনের এই ঘটনাটা জাঙ্গিকুলের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল। খুব ভোরে কেউ একজন পথের ওপরে পড়ে থাকা বীভৎস মৃতদেহটা আবিষ্কার করে। তারপর সেই ভয়ঙ্কর খবরটা ছোট এলাকায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
বেশ কয়েকবছর ধরে এই আধা-টাউনে খুনের মতো কোনও রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটেনি। তাই এই খুনটাকে কেন্দ্র করে গোটা অঞ্চল একেবারে তেতে উঠল। পুলিশও তাদের নিয়মমাফিক তদন্ত শুরু করে দিল।
যে-লোকটি খুন হয়েছে সে একজন ভবঘুরে ভিখারি। তাকে খুন করার কোনও উদ্দেশ্য খুঁজে বের করাটাই বেশ মুশকিলের। তা ছাড়া খুনটা কোনও মানুষের কাজ, না কি কোনও হিংস্র জন্তুর, সেটা নিয়েও চায়ের দোকানে, সেলুনে, বাজারে, বেশ তর্ক বেধে গেল। কেউ-কেউ খোঁজ করতে লাগলেন এ-এলাকার দু-চার মাইলের মধ্যে কোনও সার্কাস পার্টি এসে ঘাঁটি গেড়েছে কি না। আর তাদের দলে বাঘ কিংবা সিংহের মতো হিংস্র জন্তু-জানোয়ার আছে কি না।
তবে বেশিরভাগ মানুষেরই মত হল, মৃতদেহটার যে-ছিন্নভিন্ন বীভৎস অবস্থা দেখা গেছে তাতে এ-কাজ কোনও মানুষের হতে পারে না।
তা হলে এর পরের প্রশ্ন হল, যদি এটা হিংস্র কোনও পশুর কাজ হয় তো সেই পশুটা কী? বাঘ, সিংহ, নেকড়ে, হায়েনা—নাকি অন্য কিছু?
পরদিন চিকু বাড়ি থেকে আর বেরোয়নি। মা-বাবা দুজনেই ওকে স্কুলে যেতে দেয়নি।
কাল রাত থেকে চিকুর বাড়াবাড়িরকম অবস্থা চলেছে। বারবার ও কেঁপে উঠেছে ভয়ে। মা ওর পাশটিতে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও ওর ঘুম আসেনি। কখনও-কখনও তন্দ্রায় ওর চোখ বুজে এসেছে। আবার তারই মধ্যে গোঙানির শব্দ করে চমকে জেগে উঠেছে। তখন মা আধখানা ঘুমের ট্যাবলেট চিকুকে খাইয়ে দিয়েছে।
বাবা ডাক্তার ডাকার কথা বলেছিল, কিন্তু মা রাজি হয়নি। বলেছে, ওর তো জ্বর-টর কিছু হয়নি! মনে হয় ভীষণ ভয় পেয়েছে। আজ রাতটা বিশ্রাম নিক—কাল সকালে যা হয় করা যাবে।
চিকুর শেষ পর্যন্ত ঘুম এসেছিল অনেক রাতে। ফলে ওর ঘুম ভেঙেছে বেলা সাড়ে ন’টা নাগাদ। তারপর থেকে শুধুই বিশ্রাম, আর জানলা দিয়ে মেঘলা আকাশ, গাছপালা, আর রাস্তা দেখা। আজও বেশ শীত। তবে বৃষ্টি থেমে গেছে।
একা-একা বিছানার লাগোয়া জানলার পাশে বসে চিকু ভাবছিল, কাল রাতে ও যা দেখেছে তা সত্যি কি না। এখনও পর্যন্ত মা-বাবাকে ও কোনও কথা বলেনি। বললে ওরা বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না। আচ্ছা, ব্যাপারটা একটা বাজে দুঃস্বপ্ন নয় তো!
চিকুর শরীরটা ভালো নয় দেখে ওর বাবা আজ অফিসে বেরোয়নি। তাই হাতে সময় পেয়ে বাজার-দোকান সেরে নিচ্ছিল। বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ রাস্তা থেকে ফিরে বাবা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। মায়ের সঙ্গে চাপা গলায় কীসব কথা বলতে লাগল।
চিকু বুঝতে পারল, ওকে আড়াল করে বাবা-মা কোনও আলোচনা করছে। ওর হঠাৎ করেই মনে হল, আলোচনার বিষয়টা ওর বোধহয় জানা।
একটু পরে মা চিকুকে স্নানের গরম জল দিল। স্নান হয়ে যাওয়ার পর তোয়ালে নিয়ে যত্ন করে মাথা মুছিয়ে দিল। তারপর খেতে দিল।
মায়ের ভাবভঙ্গিগুলো এমন যেন চিকু এখনও সেই পাঁচ-ছ’বছরের ছোট খোকাটিই আছে।
খেয়েদেয়ে কম্বল গায়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়তেই ঘুম এসে ওর দু-চোখ জড়িয়ে ধরল। চিকু ঘুমের জগতে ডুবে গেল একেবারে।
ঘুম ভাঙল সেই চারটের পর। মেঘ ফিকে হয়ে আকাশটা এখন বেশ আলো-আলো লাগছে। তবে রাস্তা এখন ভিজে। দুপুরে বোধহয় আর-এক দফা ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়ে গেছে।
মা চা তৈরি করে বাবাকে দিল, নিজে নিল—তারপর চিকুকেও একটু সাধল : ‘দুটো বিস্কুট খেয়ে চায়ে চুমুক দে, শরীরটা বেশ তাজা লাগবে।’
বাবা আড়চোখে কেমন যেন খুঁটিয়ে-দেখা চোখে চিকুকে দেখছিল। চিকু চুপচাপ বসে চা-বিস্কুট খেতে লাগল।
চিকুর চা খাওয়া শেষ হতে না হতেই টেলিফোন বেজে উঠল। বাবা তাড়াতাড়ি এসে রিসিভার তুলল। তারপর ‘হ্যালো’ বলেই রিসিভারটা এগিয়ে ধরল চিকুর দিকে : ‘তোর ফোন। কথা বলতে পারবি?’
চিকু ঘাড় নেড়ে নেমে এল বিছানা থেকে। বাবার হাত থেকে রিসিভার নিয়ে ‘হ্যালো—’ বলল।
প্রিয়াংকা।
‘আজ স্কুলে যাওনি? আমরা স্কুলে যাওয়ার সময় জনতা কেবিনের সামনে তোমাদের দেখলাম না, তাই ভাবলাম হয়তো শরীর-টরির খারাপ হয়েছে—।
রোজ স্কুলে যাওয়ার সময় চিকু একটা বাঁকের মুখে ওর আরও দু-বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করে। সেখানে ‘জনতা কেবিন’ নামে একটা ভাতের হোটেল আছে। হোটেলের সামনে তিনজন জড়ো হওয়ার পর ওরা দল বেঁধে স্কুলে যায়। মোটামুটি সেই সময়টায় প্রিয়াংকাও কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে একজোট হয়ে স্কুলের পথে হেঁটে যায়। বেশিরভাগ দিনই ওদের দেখা হয়।
চিকু বলল, ‘না, আজ স্কুলে যাইনি...শরীরটা ভালো নেই...ভীষণ টায়ার্ড লাগছে।’
‘“মোহাব্বতে”-র ক্যাসেটটা শুনেছ?’
‘না, এখনও শোনা হয়নি। আজ সন্ধেবেলা শুনব।’
‘কাল তোমার ফেরার সময় কোনও প্রবলেম হয়নি তো?’
একটু ভেবে নিয়ে চিকু ছোট্ট করে বলল, ‘নাঃ...।’
‘আসলে কাল জলাপুকুরের কাছে একটা মার্ডার হয়েছে। ব্রুটাল মার্ডার। সবাই বলছে কোনও ডেঞ্জারাস অ্যানিম্যালের কাজ। সেইজন্যেই চিন্তা হচ্ছিল। ভাবছিলাম তুমি কাল ঠিকমতো বাড়ি ফিরেছ কি না। আমি স্কুল থেকে বাড়িতে এসেই তোমাকে ফোন করছি...।’
চিকু সারাদিনে বাবা কিংবা মায়ের মুখে খুনের কোনও খবর শোনেনি। যদিও ও জানে, এই ছোট্ট আধা-টাউন এলাকায় খবরটা এর মধ্যে সবাই জেনে গেছে। বাবা-মা হয়তো চিকুর ভালোর জন্যই খবরটা ওকে জানায়নি। ওরা তো আর জানে না, চিকুর খবর জানার কোনও প্রয়োজন নেই—কারণ, ‘খবর’টা ও কাল রাতে নিজের চোখে দেখেছে!
কাল রাতের দৃশ্যটা মনে পড়তেই চিকু একবার শিউরে উঠল। এখনও পর্যন্ত মা-বাবা কাউকে ও কিছু বলেনি। কাল মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে মা বহুবার জিগ্যেস করেছে, ‘কী রে, ভয় পেয়েছিস? কী হয়েছে বল—আমাকে বল—।’
কিন্তু চিকু কোনও কথা বলেনি। ওর মনটা কেমন অসাড় হয়ে গিয়েছিল।
অবশ্য এখন অনেক ভালো লাগছে। মন আর শরীরের দুর্বল ভাবটা মোটামুটি কেটে গেছে। কিন্তু কাল রাতে খুন হওয়া মানুষটা কে?
সে-কথাই ও প্রিয়াংকাকে জিগ্যেস করল, ‘কাল রাতে কে মার্ডার হয়েছে জানো?’
‘সবাই বলছে একজন ভ্যাগাবন্ড—ভিখারিগোছের লোক।’
‘ও–।’
‘নেক্সট উইকে বাংলা পড়তে যাচ্ছ তো?’
‘হ্যাঁ—যাব।’
প্রিয়াংকার সঙ্গে একমাত্র বাংলা কোচিংটাই ওর কমন। অন্যান্য সাবজেক্টের টিচাররা প্রিয়াংকাকে বাড়িতে এসে পড়ান। হরিহরবাবু কারও বাড়িতে গিয়ে পড়ান না—তাই প্রিয়াংকা ওঁর কোচিং-এ এসে পড়ে।
কথা শেষ করে চিকু রিসিভার নামিয়ে রাখল।
মুখ ফেরাতেই চিকু খেয়াল করল মা আর বাবা কেমন অদ্ভুত চোখে ওর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
বাবা অবাক হয়ে বলল, ‘তুই মার্ডারের ব্যাপারটা জানিস! খবর পেলি কী করে?’
চিকু আঙুলের নখ খুঁটল কিছুক্ষণ। তারপর মাথা নিচু করে বলল, ‘আমি সব জানি। সব আমি নিজের চোখে দেখেছি। সেইজন্যেই কাল রাতে অমন ভয় পেয়েছিলাম।’
ঘরে যেন বাজ পড়ল।
মা প্রায় ছুটে এল চিকুর কাছে : ‘কী দেখেছিস কাল রাতে!’
একটু সময় নিল চিকু। তারপর নিচু গলায় ধীরে-ধীরে সব ঘটনা বলে গেল।
মা আর বাবা ফ্যাকাসে মুখে চুপচাপ শুনতে লাগল। চিকুর কথা শেষ হলে মা-বাবা দুজনেই ওকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক প্রশ্ন করল। চিকুও সেগুলোর উত্তর দিতে চেষ্টা করল। তারপর ওরা দুজনে কেমন গুম হয়ে গেল। স্থির চোখে চিকুকে দেখতে লাগল।
ওরা মনে-মনে কী ভাবছে সেটা চিকু খানিকটা আঁচ করতে পারছিল। তবে বাবা এরপর একটা প্রশ্ন করতেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে গেল।
‘তুই...তুই ভুল দেখিসনি তো!’
চিকু একটু বিরক্ত গলায় বলল, ‘না, ভুল দেখিনি। বানিয়ে-বানিয়ে এরকম গল্প তৈরি করে আমার কী লাভ!’
একটু চিন্তা করে বাবা বলল, ‘যাকগে, এসব কথা আর কাউকে বলিস না। শেষকালে পাঁচকান হতে-হতে পুলিশের কানে গেলেই মুশকিল।’
মা চিন্তার গলায় বলল, ‘হ্যাঁ, তখন আবার টানাহ্যাঁচড়া শুরু হবে, হাজারটা প্রশ্ন করবে। না, না, এসব কথা তুই কাউকে বলিস না।’
‘ঠিক আছে, বলব না।’
চিকু কথাটা বলল বটে, তবে ওর সবাইকে বলতে ইচ্ছে করছিল। ইচ্ছে করছিল জলাপুকুরের কাছে গিয়ে দিনের আলোয় খুনের জায়গাটা একবারে দেখে আসতে। ওখানে গেলে কি প্রাণীটার পায়ের ছাপ পাওয়া যাবে? অথবা গায়ের লোম?
চিকুর মধ্যে একটা গোয়েন্দা জেগে উঠতে চাইছিল।
ও আর কোনও কথা না বলে পড়ার টেবিলে গিয়ে পড়তে বসল। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও পড়ায় মন বসাতে পারল না। বারবার কাল রাতের ঘটনাগুলো ওর মাথায় ঢুকে পড়ছিল।
হঠাৎই ওর চোখ গেল টেবিলের এক প্রান্তে পড়ে থাকা ‘মোহাব্বতে’-র ক্যাসেটটার দিকে। কী ভেবে চিকু চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। বিছানার কাছে গিয়ে বালিশের পাশ থেকে ওয়াকম্যানটা তুলে নিয়ে এল।
তারপর হেডফোন কানে লাগিয়ে ‘মোহাব্বতেঁ’-র ক্যাসেটটা শুনতে শুরু করল। জানলার বাইরে তখন অন্ধকার পা টিপে টিপে নেমে আসছে।
শেষ পর্যন্ত চিকুর ব্যাপারটা আর পুরোপুরি গোপন রইল না। এরকম একটা মারাত্মক ব্যাপার ও নিজের চোখে দেখেছে, এটা কাউকে না বলতে পারলে ও কিছুতেই যেন শান্তি পাচ্ছিল না। সবাই এ-কথা জানতে পারলে চিকুকে ঘিরে কত হইচই হত, ওর সাহসকে কত লোক প্রশংসা করত, একই গল্প ওকে কতবার না শোনাতে হত!
ভেতরের এই সাঙ্ঘাতিক টেনশান চিকু অতিকষ্টে তিনদিন সামলে রাখতে পারল। তারপর একদিন খবরটা ও ভাঙল প্রিয়াংকার কাছে। সেদিন ও ‘মোহাব্বতে’র ক্যাসেটটা ফেরত দিতে প্রিয়াংকাদের বাড়িতে গিয়েছিল। খবরটা শুনে প্রিয়াংকা তো একেবারে বোবা হয়ে গেল। ও অবাক হয়ে চিকুকে দেখতে লাগল।
‘মাই গুডনেস! কী ডেঞ্জারাস! এতবড় একটা ব্যাপার তুমি আমাকে বলোনি।’
‘কাউকে এসব কথা বোলো না। মা-বাবা কাউকে বলতে বারণ করেছে।’
প্রিয়াংকা খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে অনেক প্রশ্ন করল চিকুকে। সেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে চিকু মনে-মনে পূর্ণিমার সেই ভয়ঙ্কর রাতটায় ফিরে যাচ্ছিল।
সন্ধে সাতটা বাজতে না বাজতেই প্রিয়াংকা একরকম জোর করে চিকুকে বাড়ি রওনা করে দিল।
প্রিয়াংকার পর স্কুলের বন্ধু সোহনের কাছে গোপনে মুখ খুলল চিকু। স্কুল থেকে ফেরার পথে সোহনকে জলাপুকুরের গল্পটা শোনাল ও।
এরপর কানাকানি আর জানাজানির ব্যাপারটা নিউক্লিয় শৃঙ্খল বিক্রিয়ার মতো ক্রমে বাড়তে শুরু করল। এবং দশ-বারোদিনের মধ্যেই জাঙ্গিকুলের প্রায় সকলেই জেনে গেল পূর্ণিমার রাতে জলাপুকুরের কাছে চিকু কী দেখেছে।
একদিন সন্ধেবেলা দেশপ্রিয় সুইটস থেকে মিষ্টি কিনে ফিরছিল চিকু। হঠাৎই শুনতে পেল কে যেন ওকে নাম ধরে ডাকছে। সাইকেল থামিয়ে ঘাড় ঘোরাতেই চিকু রোহনদাকে দেখতে পেল। বিশুদার চায়ের দোকানে বসে আছে।
শিবতলার উলটোদিকেই বিশুদার চায়ের দোকান। রাস্তার একপাশে বাঁশের খুঁটি আর দরমা দিয়ে তৈরি। দোকানের মাথায় টালির ছাউনি। আর আলো বলতে হুক করে জ্বালানো একটা ষাট পাওয়ারের বাল্ব।
বিশুদা একা মানুষ। দোকানের পিছনদিকটায় থাকার মতো একটুখানি জায়গা করে নিয়েছে। আর দোকানের সামনে আধ-ফালা বাঁশ পেরেক দিয়ে ঠুকে খদ্দেরদের বসার জন্য একটা বেঞ্চি মতন তৈরি করে দিয়েছে।
বিশুদার দোকানটা নামে চায়ের দোকান হলেও ডিম-পাঁউরুটি, বিস্কুট, সিগারেট, হজমিগুলি, পান-পরাগের প্যাকেট আর বাচ্চাদের খেলার প্লাস্টিকের বলও পাওয়া যায়।
দোকানের সামনের বেঞ্চিতে রোহন আর ছোটকু বসে ছিল। ছোটকু রোহনের সব সময়ের সাথী। কালো, রোগাপটকা চেহারা, চোখগুলো বড়-বড়, মাথায় ঘন কোঁকড়ানো চুল।
সাইকেল থেকে নেমে পড়েছিল চিকু। সাইকেলটা পাশে-পাশে হাঁটিয়ে ও চলে এল রোহনের সামনে।
রোহন বলল, ‘বোস, কথা আছে। বিশুদা, তিনটে ছোট চা বানাও তো!’
চায়ে আপত্তি করল না চিকু। সাইকেলটা স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে রোহনের পাশে বসে পড়ল ও।
‘অ্যাই, তুই নাকি জলাপুকুরের মার্ডারটা হতে দেখেছিস? জাঙ্গিকুলে পুরো চাউর হয়ে গেছে—।’
চিকু আবার বলতে শুরু করল। এ-ক’দিনে গল্পটা বলে-বলে ও বেশ রপ্ত হয়ে উঠেছিল। ফলে ব্যাপারটা খুঁটিনাটিসমেত বলতে ওর কোনও অসুবিধে হল না, একবারের জন্যও হোঁচট খেল না।
গল্প শেষ হতেই ছোটকু চোখ বড়-বড় করে বলে উঠল, ‘আরিব্বাস! কী ডেঞ্জারাস কেস, বস!’
বিশুদা হাঁ করে চিকুর গল্প শুনছিল। গরম চা উথলে পাতা উনুনে পড়তেই ‘ছ্যাঁক’ শব্দ হল। বিশুদা চমকে উঠে উনুনের কাছে গেল। তিনটে কাপে চা ঢালতে লাগল।
রোহন চোখ ছোট করে ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবছিল।
অনেকক্ষণ চিন্তা করার পর ও জিগ্যেস করল, ‘মার্ডারারের গায়ে লোম ছিল? না কি ওভারকোট পরে ছিল?’
বিশুদা ওদের চা এগিয়ে দিল।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চিকু বলল, ‘না, কোট বলে মনে হয়নি। তা ছাড়া কোট পরে ওই রাতে কি কেউ জলে ঝাঁপ দেয়!’
চায়ে চুমুক দিয়ে ‘হুম’ করে ছোট্ট একটা শব্দ করল রোহন। তারপর : তুই কি লোকটার মুখ দেখতে পেয়েছিলি?’
‘না, শ্যাওলা আর কচুরিপানায় মুখটা ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। তবে হাতের আঙুলে লম্বা-লম্বা বাঁকানো নখ ছিল। আমি স্পষ্ট দেখেছি।’
‘পুরো ব্যাপারটা ছদ্মবেশ হতে পারে, বুঝলি। ফাঁড়ির বড়বাবুকে আমি গতকাল সেটাই বলেছি। কিন্তু প্রবলেমটা কোথায় জানিস? মার্ডারের মোটিভটাই কেউ বুঝতে পারছে না। একটা ভিখিরির কাছে আর কী-ই বা টাকাপয়সা থাকবে।’
‘সুড়ৎ’ শব্দ করে চা শেষ করল ছোটকু। তারপর হাত-পা নেড়ে রোহনকে বলল, ‘বস, এমন কেস নয়তো যে, লোকটা রাত্তিরবেলা খুন করা প্র্যাকটিস করছিল?’
রোহন বিরক্তভাবে হাতের ইশারায় ছোটকুকে থামতে বলল। তারপর অনেকটা যেন আপনমনেই বিড়বিড় করে বলল, ‘আমার এলাকায় মার্ডার করে সটকে পড়বে...এত বড় বুকের পাটা কার?’
চিকু রোহনকে দেখছিল।
লম্বা চওড়া ব্যায়াম করা চেহারা। গায়ের রং মাজা। মাথায় ছোট-ছোট করে ছাঁটা চুল। চোখজোড়া জ্বলজ্বল করছে। চোয়াল শক্ত। জামার নিচে বুকের মাসল স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
চায়ের কাপটা ‘ঠকাস’ করে নামিয়ে রেখে রোহন বলল, ‘তুই এ-ব্যাপারে আর কোনও খবর পেলে বা কিছু দেখলে আমাকে জানাবি।’
চিকু ঘাড় কাত করে ‘হ্যাঁ’ বলল। তারপর শেষ হয়ে-যাওয়া চায়ের কাপটা বিশুদার হাতে দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
সত্যিই তো! রোহনদা ঠিকই বলেছে। খুনের উদ্দেশ্যটাই তো কেউ বুঝতে পারছে না! তা হলে কি এ কোনও পাগল খুনির কাজ? অনেক সিনেমায় যেমন দেখায়!
এইসব কথা ভাবতে-ভাবতে বাড়ি ফিরে এল চিকু।
নাটোর মোড়ের কাছে মিস্টার ফক্স খেলা দেখাচ্ছিলেন। পরনে একটা শতচ্ছিন্ন কালো রঙের কোট। তার নানান জায়গায় রঙিন কাপড়ের তালি মারা। কোটের ওপরে তেলচিটে ময়লার আস্তরণ। ফলে ঝকঝকে রোদে কোটটা চকচক করছে।
মিস্টার ফক্সের বয়েস কত কেউ জানে না। চিকু ছোটবেলা থেকেই দেখছে, মিস্টার ফক্স পথে-পথে ঘুরে ভানুমতীর খেলা দেখান।
মিস্টার ফক্সের মাথায় কালো হ্যাট। বয়েসের ভাঁজ পড়া মুখে পাউডার মাখা। চোখে সুর্মার টান। আর ঠোঁটে লিপস্টিক।
মিস্টার ফক্স একটা ছোট মাপের পিয়ানো অ্যাকর্ডিয়ান বাজাচ্ছিলেন, আর সেই তালে তালে মাথা নাড়ছিলেন। তাঁর সামনে বিশাল ঢোলা হাফ প্যান্ট পরা একটি ছেলে ডিগবাজির কসরত দেখাচ্ছিল। ওর নাম মাস্টার পটল।
অ্যাকর্ডিয়ান বাজাতে-বাজাতে মিস্টার ফক্স হাঁক পেড়ে বলছিলেন, ‘ওয়েলকাম, লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন। দেখে যান মিস্টার ফক্সের শো। মিস্টার ফক্স—দ্য গ্রেট ম্যাজিশিয়ান। জাদুসম্রাট পি. সি. সরকারের ছাত্র মিস্টার ফক্স। এখন আপনাদের ডিগবাজির খেলা দেখাচ্ছে মাস্টার পটল। চলে আসুন...দেখে যান দ্য গ্রেট শো অফ মিস্টার ফক্স...।’
অনেকে বলে মিস্টার ফক্সের মাথায় ছিট আছে। আর মাস্টার পটল তো হাবাগোবা আধপাগল!
ব্যাপারটা সত্যি বলেই মনে হয় চিকুর। নইলে দোলের দিন সকালে কেউ ভানুমতীর খেলা দেখাতে বেরোয়!
আজ দোল। পথে-ঘাটে অলিতে-গলিতে শুধু রং খেলা চলছে।
চিকুও রং খেলতে বেরিয়েছে রাস্তায়। খেলতে খেলতে নাটোর মোড়ের কাছে এসে দ্যাখে দোলের মধ্যেই মিস্টার ফক্সের ‘শো’ চলছে। মাস্টার পটল প্রাণপণে ডিগবাজি খেয়ে চলেছে।
মাস্টার পটলের বয়েস আঠেরো কি উনিশ হবে। গোলগাল মুখে বোঁচা নাক। চোখজোড়া চিনেম্যানদের মতো। আর সবচেয়ে আশ্চর্য হল ওর মাথার চুলের ছাঁট। ন্যাড়া মাথার চার-পাঁচ জায়গায় উলের বলের মতো একথোকা করে চুল।
মিস্টার ফক্সের গায়ে অনেকে রং দিচ্ছে। মাস্টার পটলকে তাক করে কেউ-কেউ রং-ভরা বেলুন ছুড়ে মারছে। কিন্তু ওঁদের কোনওদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই।
‘আসুন, লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন! ইউনিক শো-ম্যান মিস্টার ফক্স, আর তাঁর ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট মাস্টার পটল—ওঁদের ইউনিক খেলা দেখে যান। হোলির স্পেশাল অ্যাট্রাকশন! আসুন, আসুন...।’
আশেপাশে লেডিজ খুব একটা কেউ ছিল না। আট থেকে বারো-চোদ্দো—এই বয়েসের কয়েকটি রোগাসোগা রং মাখা বালিকা কিংবা কিশোরী মাস্টার পটলের তুমুল ডিগবাজি দেখছিল। আর থেকে-থেকেই হেসে উঠছিল, এ-ওর গায়ে ঢলে পড়ছিল।
পটলের ডিগবাজি শেষ হলে তবেই মিস্টার ফক্স তাঁর বিচিত্র খেলা শুরু করেন।
তাসের হাতসাফাই, চার-পাঁচটা পিংপং বল লোফালুফি, কোটের পকেট থেকে অনন্ত রুমালের চেন বের করা, জ্যান্ত সাপ জল দিয়ে গিলে নিয়ে আবার উগরে দেওয়া, আরও কত কী!
পালা করে মিস্টার ফক্স আর মাস্টার পটলের খেলা চলতে থাকে। তারই ফাঁক-ফোঁকরে মিস্টার ফক্স ভিড় করে দাঁড়ানো মানুষজনের কাছে আবেদন রাখেন : ‘আমার খেলায় খুশি হয়ে যদি কিছু বখশিশ দিতে ইচ্ছে করে তা হলে দিন। পুয়োর ম্যান। প্লিজ হেল্প।’
বাড়ির জানলায়, বারান্দায় কিংবা ছাদে মেয়েদের ভিড়। সেদিকে হাত তুলে মিস্টার ফক্স বলে ওঠেন, ‘মা-জননীরা, একজন আর্টিস্টকে হেল্প করুন। আমি জাদুসম্রাট পি. সি. সরকারের ছাত্র মিস্টার ফক্স। আপনারা আমার মাদার এবং সিস্টার। প্লিজ হেল্প।’
মিস্টার ফক্সের সামনে টুং-টাং পয়সা পড়ছিল। মাস্টার পটল ‘থ্যাংক য়ু...থ্যাংক য়ু’ বলে সেগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছিল। আর মিস্টার ফক্স টুপি খুলে মাথা ঝুঁকিয়ে সাহেবি কায়দায় সাহায্যকারীকে অভিবাদন জানাচ্ছিলেন।
দোলের দিনে এই মজার খেলা অনেকেই উপভোগ করছিল। মিস্টার ফক্সের ভোজবাজির খেল এতই অদ্ভুত যে, আগে বহুবার দেখা হলেও আবার দেখতে ইচ্ছে করে। মাসদুয়েক আগেও মিস্টার ফক্সের সঙ্গে একটা বাদামী রঙের নেড়ি কুকুর থাকত—তার গলায় ফুলের মালা, কপালে লাল তিলক। নাম ছিল ভণ্ডুল। মিস্টার ফক্সের পিয়ানো অ্যাকর্ডিয়ানের তালে তালে দু-পায়ে খাড়া হয়ে নাচ দেখাত। ভণ্ডুল এখন নেই। লরি চাপা পড়ে মারা গেছে।
বেলা একটা বেজে গেলে মিস্টার ফক্স বাড়ি ফিরে যান। স্নান-খাওয়া-দাওয়া সেরে বিকেলে আবার বেরোন খেলা দেখাতে। তারপর সন্ধের আঁধার নামলেই খেলার পালা শেষ হয়। শুধুমাত্র বর্ষাকাল ছাড়া মিস্টার ফক্সের রোজই এক রুটিন। অসুখ-বিসুখ না হলে একটি দিনও কামাই নেই।
দোলের দিন বিকেলেও মিস্টার ফক্সের খেলা চলল। সঙ্গে মাস্টার পটলের ডিগবাজি। মাস্টার পটলের মাথায়-মুখে গোলাপী আবির। যখন সে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে হাসছে তখন কেমন অদ্ভুত লাগছে। মনে হচ্ছে ভিনগ্রহের কোনও প্রাণী। তাকে ঘিরে জমজমাট ভিড়। সকালে যারা রাস্তায় বেরোয়নি, তারাও এখন হাজির। মিস্টার ফক্সের ভানুমতীর খেলা সবাইকে মাতিয়ে রেখেছে।
খেলার পালা শেষ হতে হতে সন্ধে নামল। তারপর অন্ধকার।
তল্পিতল্পা গুটিয়ে মিস্টার ফক্স আর মাস্টার পটল আমবাগানের পথ ধরল।
মিস্টার ফক্সের একটু-আধটু নেশা করার অভ্যেস আছে। তাই আমবাগানের ভেতরে ঢুকে তিনি একটা বড়সড় গাছের গোড়ায় গুছিয়ে বসলেন। তারপর ম্যাজিকের সরঞ্জামের কালো ঝোলাটা মাস্টার পটলের হাতে দিলেন। বললেন, ‘তুই যা, রান্নাবান্নার ব্যবস্থা কর গিয়ে। আমি ঘণ্টাখানেক পরে যাচ্ছি। ও. কে.?’
অনুগতের মতো ঘাড় নাড়ল মাস্টার পটল। মাথায় দুবার হাত বুলিয়ে ম্যাজিকের ঝোলাটা কাঁধে তুলে নিল। তারপর রওনা হল আস্তানার দিকে। আস্তানা বলতে রেললাইনের ওপারে একটা ঝুপড়ি।
হঠাৎই পূর্ণিমার গোল চাঁদটাকে দেখা গেল। ছোট-ছোট বাড়ির মাথা ছাড়িয়ে, গাছপালার আড়াল সরিয়ে হাজির হয়ে গেছে আকাশে।
দূর থেকে হোলির উৎসবের ঢাক-ঢোল করতালের আওয়াজ ভেসে আসছিল। দোলের পূর্ণিমা তিথিতে কীর্তনের দল পথে-পথে বেরিয়ে পড়েছে।
মিস্টার ফক্স কোটের পকেট থেকে একটা ছোট মাপের বোতল বের করলেন। আমবাগানের চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলেন, কেউ কোথাও নেই। শুধু দুজন ম্যাজিশিয়ান হাজির : এখানে গাছতলায়—মিস্টার ফক্স, আর আকাশে চাঁদ। চাঁদকে মিস্টার ফক্স ম্যাজিশিয়ান বলে মানেন। ছোটবেলায় বাবার কাছে যখন হাতসাফাইয়ের ম্যাজিক শিখতেন তখন বাবা বলতেন, চাঁদ হচ্ছে এ-ক্লাস ম্যাজিশিয়ান। সারা মাস ধরে কেমন ছোট-বড় হওয়ার খেলা দেখায়! তারপর অমাবস্যায় একেবারে ভ্যানিশ হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, এ খেলা সে দেখিয়ে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে! ভাবা যায়! বোতলের ছিপি খুলতে খুলতে চাঁদের দিকে তাকালেন মিস্টার ফক্স।
কিন্তু দেখলেন, চাঁদটা আর নেই!
একটা কালো ছায়া চাঁদকে আড়াল করে দিয়েছে।
‘মিস্টার ফক্স, ভালো আছেন? কেমন যেন ভাঙা কর্কশ গলায় কালো ছায়াটা জিগ্যেস করল।
মিস্টার ফক্স একটু অবাক হয়ে গেলেন। বহুদিন ধরে এই এলাকায় তিনি ম্যাজিক দেখান। তাই এলাকার মানুষজনদের মধ্যে অনেককেই চেনেন। কিন্তু কারও সঙ্গেই খুব একটা আলাপ করেন না। বরং বলা যায় একটা দূরত্ব রেখে এড়িয়ে চলেন। এখন, এই জ্যোৎস্না রাতে, তাদেরই কেউ আচমকা এই নির্জন আমবাগানে এসে তাঁর কুশল জিগ্যেস করবে—এটা বেশ অস্বাভাবিক।
একটু সময় নিয়ে মিস্টার ফক্স বললেন, ‘হ্যাঁ—ভালো আছি। কিন্তু আপনি কে?’
উত্তরে চাঁদের দিক থেকে ছায়াটা একটু পাশে সরে গেল। তখনই ওটা ছায়া থেকে কায়া হয়ে গেল। জ্যোৎস্নার আলো মানুষটার চোখেমুখে এসে পড়ায় মিস্টার ফক্স তাকে চিনতে পারলেন। এই এলাকারই পরিচিত একজন মানুষ।
মিস্টার ফক্স অবাক হয়ে বললেন, ‘আপনি!’
মানুষটা কেমন ধরা গলায় বলল, ‘আপনাকে একটা ম্যাজিক দেখাতে এসেছি। এ-ম্যাজিকের কৌশল আপনিও জানেন না।’
মিস্টার ফক্স অবাক চোখে মানুষটাকে দেখতে লাগলেন। তাঁর কেমন যেন ঘোর লেগে গিয়েছিল। তিনি কোনও কথা বলতে পারছিলেন না। শুধু ভাবছিলেন, এই লোকটা কি সত্যি ম্যাজিশিয়ান? কই, কখনও তো এরকম শোনেননি! তা হলে নিশ্চয়ই মজা করছে।
‘এবার ভালো করে দেখুন...আমার ম্যাজিক শুরু হচ্ছে...।’ সত্যি-সত্যিই যেন ম্যাজিক শুরু হল।
মানুষটা চওড়ায় বাড়তে লাগল। ওর জামা-প্যান্টের সেলাইগুলো সেই চাপে ফড়ফড় করে ছিঁড়ে যেতে লাগল। বোতামগুলো খই ফোটার মতো ছিটকে গেল এদিক-ওদিক। তারই সঙ্গে মানুষটার মুখ দিয়ে একটা পাশবিক গর্জন বেরিয়ে এল।
ম্যাজিক তখনও চলছিল।
লোকটা মাথায় খানিকটা লম্বা হয়ে, কুঁজো হয়ে ঝুঁকে পড়ল—যেন ওর শিরদাঁড়াটা বেঁকে গেল। ওর চোয়ালটা কুকুরের মতো লম্বাটে হয়ে এগিয়ে এল সামনের দিকে। চোখ দুটো এতক্ষণ দেখা যায়নি—এবার দেখা গেল। হালকা সবুজ রঙের দুটো মার্বেল—অন্ধকার কোটরে ধকধক করে জ্বলছে।
মানুষটা চোখের সামনে একটা লোমশ জন্তুতে বদলে গেল। তার হাত-পায়ের আঙুলের ডগা থেকে বেরিয়ে এল হিংস্র বাঁকানো নখ। কান দুটো ছুঁচলো হয়ে মাথাচাড়া দিল। মুখ হাঁ করতেই দেখা গেল ঝকঝকে সাদা দাঁতের সারি। তার মধ্যে শ্বদন্ত দুটো মিস্টার ফক্সের হতভম্ব চোখের সামনেই মাপে বড় হতে লাগল!
ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় সত্যিই যেন এক অলৌকিক ম্যাজিক!
মানুষটা—অথবা, অমানুষটা—শূন্যে হিংস্র কামড় দিয়ে হাঁ বন্ধ করল। ‘খটাস’ শব্দ হল। নির্জন রাত সেই শব্দে কেঁপে উঠল। ভয়ঙ্কর নেকড়ে-মানুষটা যখন এক থাবার ঘায়ে মিস্টার ফক্সের চোয়ালের অর্ধেকটা উড়িয়ে দিল, তখনও তাঁর দু-চোখ অবাক বিস্ময়ে এই নতুন ম্যাজিকটা দেখে চলেছে।
একটু পরে মিস্টার ফক্সকে ছিন্নভিন্ন করে হোলি খেলার পর, তাঁর মৃতদেহ ফেলে রেখে অমানুষটা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। মিস্টার ফক্সের ঠেলে-বেরিয়ে-আসা চোখজোড়া তখন নিষ্প্রাণ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে পূর্ণিমার চাঁদের দিকে।
এক ম্যাজিশিয়ান আর-এক ম্যাজিশিয়ানকে অপলক চোখে প্রাণভরে দেখছে।
এবারের হইচইটা বেশ বড়সড় চেহারা নিল। গত পূর্ণিমায় খুন হওয়া মানুষটা কারও চেনা ছিল না। এমনকী হাজার চেষ্টা করেও পুলিশ তার আত্মীয়স্বজন কাউকেই খুঁজে পায়নি। কিন্তু মিস্টার ফক্সের ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা। তাঁকে সবাই চিনত। সাহেবি পোশাক পরা নিরীহ চেহারার এই মানুষটিকে সবাই পছন্দ করত। আর ছোট-বড় সকলের কাছেই ওঁর ম্যাজিকের আকর্ষণ ছিল চুম্বকের চেয়েও বেশি।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সবাই একমত হল যে, দু-দুটো খুনই একই লোকের কাজ—যদি অবশ্য খুনিকে আদৌ ‘লোক’ বলা যায়। জাঙ্গিকুল ফাঁড়ি থেকে বড়বাবু অবিনাশ মাইতি একজন সেপাইকে সঙ্গে নিয়ে একদিন চলে এলেন চিকুদের বাড়িতে।
প্রথম খুনের ফাইলটা তিনি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় খুনটা হওয়ার পর সেই বন্ধ হয়ে যাওয়া ফাইল আবার খুলতে হয়েছে। আর একইসঙ্গে তাঁর কানে এ-খবরও পৌঁছেছে যে, প্রথম খুনটা চিকু নামে এলাকার একটি ছেলে নিজের চোখে দেখেছে।
তার দু-চারদিন পরেই তিনি হাজির হয়েছেন চিকুদের বাড়িতে। কিন্তু চিকুকে নানান প্রশ্ন করেও তাঁর সমস্যার কোনও সমাধান হয়নি। শুধু চিকুর জবানবন্দি তাঁর ফাইলে গেঁথে দিয়েছেন।
খুনির পরিচয় নিয়ে নানান জল্পনা-কল্পনা আবার নতুন করে শুরু হল।
কেউ বলল, খুনি কোনও ক্ষুধার্ত হিংস্র পশু।
তখন প্রশ্ন উঠল, তা হলে সে মৃতদেহটা ফেলে রেখে চলে গেল কেন?
কেউ বলল, খুনি পশুর মতো নৃশংস কোনও মানুষ।
তখন প্রশ্ন উঠল, তা হলে খুনের উদ্দেশ্য কী?
কেউ-কেউ বলল, খুনি ভিনগ্রহের কোনও হিংস্র প্রাণী।
তাতে কে যেন জিগ্যেস করল, এর মহাকাশযানটা তা হলে কোথায় নেমেছিল? একটা মহাকাশযান কি সকলের চোখের আড়ালে নামা সম্ভব?
হরিহরবাবুর বাংলা কোচিং-এ গিয়ে চিকুরা জোর আলোচনায় মেতে ওঠে। আর সেই আলোচনায় চিকুই হল মধ্যমণি—কারণ, প্রথম খুনটা দেখার সুবাদে ও এখন বিখ্যাত হয়ে পড়েছে।
হরিহরবাবু ঘরে এসে ঢুকতেই ওদের চাপা গুঞ্জন পলকে থেমে গেল।
হরিহরবাবুর বয়েস প্রায় ষাটের কাছাকাছি। মাথার চুল ধবধবে সাদা, তবে গোঁফ কাঁচা-পাকা। লম্বা রোগা চেহারা। গাল সামান্য ভাঙা, টানা-টানা চোখ শান্ত। চোখে সরু মেটাল ফ্রেমের চশমা। ভাঁজ পড়া কপালে ছোট্ট চন্দনের টিপ। গলায় গোলমরিচের দানার মাপের রুদ্রাক্ষের মালা। পাঞ্জাবির গলার কাছে মালার খানিকটা উঁকি দিচ্ছে।
হরিহরবাবু ধার্মিক মানুষ। ধর্মগ্রন্থ চর্চা তাঁর নেশা। বাংলা পড়াতে-পড়াতে প্রায়ই সংস্কৃত সাহিত্যের উদাহরণে চলে যান। তবে চিকুদের কখনওই একঘেয়ে লাগে না। স্যারের পড়ানোটা এত সুন্দর যে, ভীষণ কাছে টানে।
হরিহরবাবু মেঝেতে গুছিয়ে বসলেন, তারপর কৌশিককে লক্ষ করে বললেন, ‘কৌশিক, পাখার রেগুলেটারটা এক পয়েন্ট কমিয়ে দে তো। আমার কেমন যেন শীত-শীত করছে।’
বারকয়েক কাশলেন হরিহরবাবু। ওঁর একটু কাশির ধাত আছে। কৌশিক রেগুলেটার ঘুরিয়ে জায়গামতো বসে পড়তেই হরিহরবাবু পড়াতে শুরু করলেন।
‘এবার তোদের গা-ঝাড়া দিয়ে বসতে হবে। সামনের বছরটা পেরোলেই বলতে গেলে মাধ্যমিক। রেজাল্ট যেন সবার ভালো হয়। নইলে আমার বদনাম হয়ে যাবে। নে, খাতা-পেন নিয়ে সব রেডি হয়ে নে। আজ আমরা পড়ব ভারতচন্দ্রের “অন্নপূর্ণা ও ঈশ্বরী পাটনি”। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ছিলেন ভারতচন্দ্র। সেই রাজার অনুরোধে লিখেছিলেন “অন্নদামঙ্গল” কাব্য। এ জন্যে রায়গুণাকর উপাধি পেয়েছিলেন। সেই “অন্নদামঙ্গল”-এর একটা অংশ হল “অন্নপূর্ণা ও ঈশ্বরী পাটনি”—বুঝলি?’
চিকুরা সবাই ঘাড় নাড়ল। এরপর হরিহরবাবু শ্রাবণীকে কবিতাটা জোরে-জোরে পড়তে বললেন।
কবিতা পড়া শেষ হলে তিনি আলোচনা শুরু করলেন।
‘এই জায়গাটা খেয়াল কর। দেবী অন্নপূর্ণা ঈশ্বরী পাটনিকে তাঁর স্বামীর পরিচয় দিচ্ছেন। যেহেতু সে-সময়ে স্ত্রীরা স্বামীর নাম মুখে উচ্চারণ করত না সেহেতু দেবী তাঁর স্বামী মহাদেবের পরিচয় দিতে গিয়ে কৌশল করে বলছেন—
“অতি বড় বৃদ্ধ পতি সিদ্ধিতে নিপুণ।
কোন গুণ নাহি তাঁর কপালে আগুন॥
কু-কথায় পঞ্চমুখ কণ্ঠ-ভরা বিষ।
কেবল আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব অহর্নিশ॥”
‘দেবী এখানে স্বামীর নিন্দার ছলে তাঁর গুণের কথা বলছেন। তাঁর স্বামী মহাদেব “বৃদ্ধ” মানে আসলে জ্ঞানবৃদ্ধ। দেবী বলছেন, তিনি “সিদ্ধিতে নিপুণ”। এর একটা অর্থ হল মহাদেব সিদ্ধির নেশা করেন। আর আসল অর্থ হল, তিনি যোগসিদ্ধ পুরুষ। এরপর “কপালে আগুন”। মহাদেবের কপালে একটি চোখ আছে। রেগে গেলে সেই চোখ দিয়ে আগুন ঝরে...।’
পড়ানো চলতে লাগল।
তারই মাঝে কাকিমা এসে স্যারকে চা-বিস্কুট দিয়ে গেলেন। আর ওদের জন্য একটা প্লেটে আটটা সিঙাড়া রেখে গেলেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, ‘তোমরা পড়ার ফাঁকে-ফাঁকে খেয়ে নিয়ো কিন্তু।’
পড়ানোর সময় যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে তখন হঠাৎ করেই তিতুন আর প্রদীপ্ত মিস্টার ফক্সের খুন হওয়ার কথাটা তুলল।
হরিহরবাবু নমস্কারের ভঙ্গিতে কপালে আঙুল ছোঁয়ালেন। তারপর মন দিয়ে ওদের কাছ থেকে দোলপূর্ণিমার খুনের ঘটনাটা শুনতে লাগলেন।
শোনা শেষ হলে তিনি একটু কেশে নিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, ব্যাপারটা আমি শুনেছি। তোরা ওসবে মাথা ঘামাস না। বোধহয় কুকুর-টুকুরের কাজ।’
চিকু আর চুপ করে থাকতে পারল না। প্রতিবাদের গলায় বলে উঠল, ‘না, স্যার, কুকুর নয়। ওই হিংস্র জানোয়ারটাকে আমি নিজের চোখে দেখেছি!’
হরিহরবাবু আগ্রহ নিয়ে চিকুর অভিজ্ঞতার কথা শুনতে চাইলেন। তারপর বললেন, ‘আগেই কিছু-কিছু কথা আমার কানে এসেছিল। এখন ব্যাপারটা স্পষ্ট হল। তবে জানোয়ারটা ঠিক কী ধরনের সেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।’
‘অনেকটা মানুষের মতো, স্যার।’ চিকু উত্তেজিত হয়ে বলল।
‘মানুষের মতো!’
‘হ্যাঁ, স্যার—তবে মাপে অনেক বড়। গায়েও নিশ্চয়ই অনেক জোর হবে। হাতের নখগুলো লম্বা-লম্বা, বাঁকানো...।’
হরিহরবাবু কেমন যেন বিব্রত হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ কী ভাবলেন—তারপর বললেন, ‘এ যেন শ্রীকৃষ্ণের নৃসিংহ অবতার! ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষা করতে নৃসিংহ অবতার সেজে ভগবান হিরণ্যকশিপুকে নিধন করেছিলেন। যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অভ্যুত্থানমধর্মস্য...।’
শ্লোকটা শেষ করে স্যার বললেন, ‘...বলা তো যায় না, যে- দুজন মানুষ খুন হয়েছে তারা হয়তো ভালো লোক ছিল না। সেইজন্যেই ভগবান পশুর রূপ ধরে তাদের বিনাশ করেছেন।’
কথা শেষ করতে-করতে কপালে আঙুল ছোঁয়ালেন হরিহরবাবু।
বোধহয় ভগবানকে প্রণাম জানালেন।
চিকুর মুখ দেখে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল স্যারের ব্যাখ্যা ওর পছন্দ হয়নি।
ওরা চাপা গলায় নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগল। তারপর বেরিয়ে এল বাইরে।
পরের পূর্ণিমায় আর-একটা খুন হতেই ত্রাসের ভয়ঙ্কর ছায়া নেমে এল জাঙ্গিকুলে। নানান গুঞ্জন, আলোচনা আর বিশ্লেষণ থেকে পূর্ণিমার সঙ্গে খুনের সম্পর্কের ছবিটা স্পষ্ট হয়ে গেল। সবাই বলল, পূর্ণিমার রাতেই খুনির মাথায় খুনের পাগলামি দেখা দেয়।
এবারে খুন হলেন একজন বিধবা ভদ্রমহিলা।
রাত সাড়ে ন’টার সময় তিনি সাইকেল-রিকশা করে ফিরছিলেন। জাঙ্গিকুলের একমাত্র নার্সিংহোম ‘আরোগ্য নিকেতন’-এর কাছাকাছি এসে রিকশাওয়ালা দেখতে পায় পথের ওপরে একটা মাঝারি মাপের গাছের গুঁড়ি আড়াআড়িভাবে পড়ে আছে। রিকশাওয়ালা বেশ অবাক হয়ে যায়। কারণ, কাঁচা রাস্তার ওপরে গাছের গুঁড়ি ফেলে কে আর ডাকাতির চেষ্টা করে! সাইকেল-রিকশা থামিয়ে ক’পয়সাই বা পাওয়া যাবে!
এইসব কথা আপনমনে বিড়বিড় করতে করতে সে রিকশা থেকে নেমে পড়ে। তারপর গাছের গুঁড়িটা সরাতে এগিয়ে যায়।
ঠিক তখনই পাশের একটা পোড়ো জমির অন্ধকার আগাছার জঙ্গল থেকে একটা পাশবিক গর্জন ভেসে আসে।
রিকশাওয়ালা আর দেরি করেনি। আগের দু-দুটো খুনের কথা তার বেশ মনে ছিল। সুতরাং একমাত্র আরোহীকে রিকশায় ফেলে রেখে সে প্রাণপণে ছুট লাগায়।
তখন গর্জনটা কাছে এগিয়ে আসতে থাকে।
আরোহী ভদ্রমহিলার আর কিছু করার ছিল না। পরদিন ভদ্রমহিলার ছিন্নভিন্ন দেহটা বীভৎস অবস্থায় পাওয়া গেল। সেইসঙ্গে পাওয়া গেল সাইকেল-রিকশাটার ধ্বংসাবশেষ।
পঞ্চাশতলা একটা বাড়ির ছাদ থেকে রিকশাটা আছড়ে পড়লে সেটার যে দশা হত, কেউ স্রেফ গায়ের জোরে রিকশাটার সেই হাল করেছে। যেন রাগে আক্রোশে অন্ধ হয়ে কোনও ক্ষিপ্ত জানোয়ার রিকশাটাকে চূর্ণবিচূর্ণ করার চেষ্টা করেছে।
এই খুনটার পর খুনির পরিচয় নিয়ে একটা নতুন সমস্যা দেখা দিল। খুনি কি কোনও পশু, না কি মানুষ?
এতদিন অনেকেরই ধারণা ছিল খুনি কোনও শক্তিশালী পশু। কিন্তু পশু কি বুদ্ধি খাটিয়ে পথের মাঝে গাছের গুঁড়ি ফেলে রাখতে পারে! তা হলে খুনি নিশ্চয়ই পশুর আড়ালে কোনও মানুষ।
সুতরাং পূর্ণিমার সঙ্গে সম্পর্কটা সকলে মেনে নিলেও খুনির পরিচয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতেই লাগল।
থানার বড়বাবু বেশ ফাঁপরে পড়লেন। মৃতদেহ নিয়ে নিয়মমাফিক দায়দায়িত্ব পালন করার পর আর কিছু করার আছে কি না সেটাই ভাবছিলেন। তিনি বেশ বুঝতে পারছিলেন, এই খুনের তদন্তের ফলাফল হবে ঠিক আগের খুন দুটোর মতোই—শূন্য।
রোহনরা কিন্তু প্রায় খেপে উঠল। কিছু একটা করার জন্য ওরা অস্থিরভাবে ছটফট করতে লাগল। এলাকার লোককে সতর্ক করার প্রথম ধাপ হিসেবে ওরা মাইক নিয়ে প্রচার শুরু করল। সাইকেল-রিকশায় ব্যাটারি আর মাইক লাগিয়ে রোহনের দলের দু-চারজন এলাকায় ঘুরতে লাগল।
রোহনদের ঘোষণা শুনতে-শুনতে চিকুর মনে হচ্ছিল, ভোট এসে গেছে। আর মাইকে ঘোষণা কে করছে কে জানে! ‘স’গুলো সব ইংরেজি ‘এস’-এর মতো করে উচ্চারণ করছে। তবে রোহনদের দলের বেশিরভাগই ‘স্যামবাজারের সসীবাবু’। মাইকে তখন শোনা যাচ্ছিল :
‘পূর্ণিমার রাতে সন্ধের পর সবাই সাবধানে থাকবেন। একা-একা রাস্তায় বেরোবেন না। বিপদ হতে পারে।...পল্লীবাসীগণ, আপনারা জানেন, গত তিন-তিনটে পূর্ণিমায় আমাদের এলাকায় তিন-তিনটে খুন হয়ে গেছে। তাই আপনাদের সাবধান করে বলছি, আগামী পূর্ণিমার রাতে রাস্তায় কেউ বেরোবেন না। সন্ধের পর সবাই সাবধানে থাকবেন...নইলে বিপদ হতে পারে।...পল্লীবাসীগণ, আপনারা জানেন...।’
শুধু যে মাইকে প্রচার তা-ই নয়, রোহনরা ঠিক করল পরের পূর্ণিমার রাতে ওরা আর্মস নিয়ে এলাকায় টহল দেবে। সে-কথা চিকু জানতে পারল ছোটকুর কাছে। ছোটকু তখন যথারীতি বিশুদার চায়ের দোকানে বসে আড্ডা মারছিল।
চিকুর সঙ্গে কথা বলতে-বলতে ছোটকু হঠাৎ বিশুদার দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করল, বিশুদা, তুমি রাতে দোকানে আর থেকো না। মানে, পূর্ণিমার রাতে কারও পাকা বাড়িতে গিয়ে শেলটার নিয়ো। এ-খুনিকে বিশ্বাস নেই।’
উত্তরে বিশুদা একগাল হেসে জবাব দিল, ‘আমার কী আছে যে আমাকে কেউ খুন করবে? আমাকে যমেও নেবে না।’
কিন্তু পূর্ণিমা যতই এগিয়ে আসতে লাগল ততই বিশুদার সাহস কমতে লাগল। শুধু বিশুদা কেন, জাঙ্গিকুলের প্রায় সকলেই ভাবতে লাগল, এবার কার পালা?
বুদ্ধপূর্ণিমার দিন বিকেলবেলা প্রবল ঝড় উঠল।
আকাশের একটা কোণ মেঘে মেঘে কালো হয়ে গেল। বৃষ্টিও পড়ল কিছুক্ষণ। গত ক’দিন ধরে গুমোট গরম যেভাবে চেপে বসেছিল তাতে জাঙ্গিকুলের সকলেই একটা কালবৈশাখীর জন্য অপেক্ষা করছিল। তার সঙ্গে বৃষ্টির আশাও ছিল।
বিকেল পাঁচটার পর ঝোড়ো হাওয়া আচমকা ধুলোর ঝড় তুলে সবাইকে অন্ধ করে দিল। কাপড়ে, রুমালে কিংবা হাতে মুখ-চোখ ঢেকে পথচারীরা যে যার মতো আশ্রয় খুঁজে নিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
বিশুদা ঝড় ওঠার সঙ্গে-সঙ্গেই দোকানের ঝাঁপ ফেলে দিয়েছিল। যে-দুজন খদ্দের চায়ের কাপ হাতে বেঞ্চিতে বসে ছিল তারা একছুটে চলে এল দোকানের ভেতরে।
আকাশে মেঘ ডেকে উঠল ‘গুড়ুম-গুড়ুম’।
তার একটু পরেই বৃষ্টি শুরু হল।
মরুভূমিতে তেষ্টায় গলা-বুক যখন শুকিয়ে কাঠ তখন কয়েকফোঁটা মিষ্টি জল পেলে তৃষ্ণার্ত পথিক ভগবানকে কৃতজ্ঞতা জানায়, তার চোখে জল এসে যায় আনন্দে। এখন রুক্ষ শুকনো মাটি ভগবানের দেওয়া এই আকাশ-জলকে প্রাণভরে শুষে নিচ্ছিল, আর মাটি থেকে সোঁদা গন্ধ উঠছিল।
বাঁখারির ঝাপ-ফেলা দোকানের ভেতর থেকে বিশুদা এই গন্ধ পাচ্ছিল। খদ্দেররা বিশুদার সঙ্গে বৃষ্টি, চাষবাস নিয়ে আলোচনা করছিল। বলছিল, বেশ কিছুক্ষণ ধরে বৃষ্টি হলে দারুণ হয়। কিন্তু একটু পরেই বৃষ্টি থেমে গেল।
বরুণদেবের হয়তো খেয়াল হয়েছে এখন বর্ষাকাল নয়—ভুল করে তিনি বৃষ্টি শুরু করে দিয়েছেন।
বৃষ্টি থামতেই খদ্দের দুজন চলে গেল।
তারপর রাস্তাঘাট বেশ ফাঁকা হয়ে এল।
রোহনদের ঘোষণা, পূর্ণিমার রাতে অজানা খুনির শিকার হওয়ার ভয়, আর শেষ পর্যন্ত এই ঝড়বৃষ্টি—সব মিলিয়ে জাঙ্গিকুল যেন কারফিউর আওতায় চলে গেল।
সিগারেট কিনতে এসে পাড়ারই একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক বলে গেলেন, রাজবাড়ির দিকে একটা বড় তেঁতুলগাছ ঝড়ে উলটে পড়েছে। তাতে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে স্টেশনের দিকটা লোডশেডিং হয়ে গেছে।
সুতরাং সাতটা বাজতে না বাজতেই বিশুদা পাতা উনুনে কড়াই বসিয়ে রাতের রান্না শুরু করে দিল। রসুন পেঁয়াজ দিয়ে আলু-বেগুনের তরকারিটা হয়ে গেলে তারপর পাঁচখানা আটার রুটি। ব্যস। এর সঙ্গে একটুকরো কাঁচা পেঁয়াজ আর একটা কাঁচালঙ্কা। সব মিলিয়ে দারুণ ভোজ।
বিশুদার ভীষণ একঘেয়ে লাগছিল, আর বারবার হাই উঠছিল। অন্যদিন খদ্দের থাকে রাত ন’টা-দশটা পর্যন্ত। কোথা দিয়ে সময় কেটে যায় টেরই পাওয়া যায় না। আর আজ থেকে-থেকেই চোখ টানছে।
রান্নার কাজ মিটে যেতেই বিশুদা পাতা উনুনে জল ছিটিয়ে আগুন নিভিয়ে দিয়েছে। কাল ভোরে উঠে উনুন পরিষ্কার করতে হবে। ছাই ঘেঁটে না-পোড়া কয়লাগুলো বের করে নিয়ে নতুন করে উনুন সাজাতে হবে। তারপর আবার একটা নতুন দিনের শুরু।
সাড়ে আটটার সময় বিশুদা খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ল। সুইচ টিপে বাল্বটা নিভিয়ে দিতেই সব অন্ধকার হয়ে গেল। একটু পরে, অন্ধকারটা চোখে সয়ে আসতেই, বাঁখারির ফাঁকফোকর দিয়ে জ্যোৎস্নার আলো দেখা গেল। সেই আলোর দিকে তাকিয়ে নানান কথা ভাবতে লাগল বিশুদা।
গতবারে যখন দেশের বাড়িতে যায় তখন ছোট ছেলেটার সর্দি-জ্বর দেখে এসেছিল। পরে চিঠিতে জেনেছে, ছেলে ভালো আছে। আর বড় মেয়েটার বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্রের খোঁজ চলছে। সাড়ে চার বিঘে ধানজমি নিয়ে শরিকি মোকদ্দমা চলছিল—সেটার কোনও হেস্তনেস্ত হয়নি। আরও ক’বছর এভাবে ঝুলে থাকবে কে জানে!
ভাবতে ভাবতে বিশুদা আনমনা হয়ে গিয়েছিল। দেশের বাড়ির মাঠেঘাটে মনে-মনে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎই একটা চাপা গুড়গুড় শব্দ বিশুদার স্বপ্ন ভেঙে দিল।
মেঘ ডাকল নাকি?
শব্দটা শোনা গেল আবার!
না—মেঘ তো নয়! তবে কী?
ঠিক তখনই—বিশুদার প্রশ্নের জবাবেই যেন একটা হিংস্র গর্জন শোনা গেল।
তেলচিটে বিছানায় চমকে উঠে বসল বিশুদা। তার বুকের ভেতরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে ধান ভানছিল কেউ। সারা শরীর কুলকুল করে ঘামতে লাগল।
বেড়ার গা ঘেঁষে একটা বিশাল কালো ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। ছায়াটার আড়ালে জ্যোৎস্না কোথায় হারিয়ে গেছে।
বিশুদা পলকে বুঝতে পারল পূর্ণিমার মৃত্যু তার দোকানের ঝাঁপ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ, গর্জন শোনা ছাড়াও নাকে একটা পাশবিক গন্ধ আসছিল—চিড়িয়াখানায় যেরকম গন্ধ পাওয়া যায়।
দোকান থেকে বেরোনোর পথ সামনের দিকে। পিছনদিকে বাঁশ, দরমা, টিন দিয়ে শক্তপোক্ত দেওয়াল। বছর সাতেক আগে একবার পিছনের দরমা ভেঙে বিশুদার দোকানে চুরি হয়েছিল। তারপর বিশুদাই ওটাকে মজবুত করেছে। এখন দরমা, টিন ভেঙেচুরে সেদিক দিয়ে পালানোর উপায় নেই। পালাতে পারলে বিশুদা হয়তো বেঁচে যেত। কারণ, পিছনে ঢালু নালা। তার পাড়ে বড়-বড় দু-চারটে গাছ। গাছ পেরিয়ে মজুমদারদের বাগানবাড়ির পাঁচিল। কোনওরকমে সেই পাঁচিল ডিঙোতে পারলে আর ভয় ছিল না।
বিশুদা বিছানায় বসে ঘামছিল। তার হাত-পা অবাধ্যভাবে কাপছিল। তবু তারই মধ্যে পশুটাকে দেখার একটা দুরন্ত কৌতূহল মনের মধ্যে উঁকিঝুঁকি মারছিল।
বেড়ার গায়ে আঁচড় কাটার খচর-খচর শব্দ হচ্ছিল। ছায়াটা অস্থিরভাবে এপাশ-ওপাশ চলে বেড়াচ্ছে। আর হিংস্রভাবে গজরাচ্ছে। বিশুদা কাঁপতে কাঁপতে সামনের বেড়ার কাছে গেল। বেড়ার ফোকরে চোখ রাখল। চিড়িয়াখানার গন্ধটা আরও জোরালোভাবে নাকে এল। অস্পষ্টভাবে একটা লোমশ শরীরকে দেখতে পেল বিশুদা। ঠিক দেখতে পেল নয়—বরং যেন অনুভব করল।
হাঁটুর কাছটা সামান্য ভাঁজ করা অবস্থায় দুটো লোমশ পা হেঁটে বেড়াচ্ছে—শিম্পাঞ্জি দু-পায়ে হেঁটে বেড়ালে যেমনটি দেখায়।
তবে কি এসব কোনও হিংস্র শিম্পাঞ্জির কাজ?
এ-কথা ভাবতে-না-ভাবতেই একটা জোরালো থাবা এসে পড়ল বেড়ার গায়ে। কাগজের দেওয়ালের মতো বেড়ার দেওয়াল ফুঁড়ে একটা লোমশ হাত ভেতরে ঢুকে এল। সেই হাতের লোমশ আঙুলে লম্বা-লম্বা বাঁকানো নখ।
বিশুদা একটা মারাত্মক চিৎকার করে উঠল।
চিৎকারটা বিশুদাকেই অবাক করে দিল। তার ভেতরে যে এত তীব্র, এত শক্তিশালী, এত ভয়ঙ্কর চিৎকারের ক্ষমতা লুকিয়ে আছে তা বিশুদা নিজেই কোনওদিন জানত না।
চিৎকার করেই বিশুদা দোকানের পিছনদিকে একটা কোণে চলে গেল। সেখানে দুটো টিনের মাঝে সামান্য একটু ফাঁক আছে। একটা খাটো বাঁশের টুকরো নিয়ে বিশুদা সেই দুর্বল জায়গায় পাগলের মতো গুঁতো মারতে লাগল।
ক’দিন আগেই না বিশুদা ছোটকুকে বলেছিল, ‘...আমাকে যমেও নেবে না!’ এখন দোরগোড়ায় যম এসে গেছে। হিংস্রভাবে দাপাদাপি করছে, গরগর করছে।
বাঁশের গুঁতোয় বেড়ার দেওয়ালে গর্ত হতে সময় লাগল না। সেই গর্তে বিশুদা শরীরটা জোর করে গলিয়ে দিতে চাইল। বেড়ার খোঁচায় গেঞ্জি ছিঁড়ে গেল, গায়ে ধারালো আঁচড় পড়ে রক্ত ঝরতে লাগল, লুঙ্গি ফেঁসে গেল কয়েক জায়গায়।
কিন্তু বিশুদার তাতে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। ওই বড়-বড় বাঁকানো নখে ফালা ফালা হওয়ার চেয়ে বাঁখারির আঁচড় অনেক ভালো! বিশুদা যখন ফোকর দিয়ে শরীরটাকে প্রায় অর্ধেকটা গলিয়ে দিয়েছে, ঠিক তখনই শুনতে পেল দোকানের সামনের ঝাঁপ ভেঙে পড়ার শব্দ। তারপরই গর্জনটা লাফিয়ে চলে এল বিশুদার বিছানার কাছে।
হাঁকপাঁক করে শরীরটাকে কোনওরকমে দোকানের বাইরে নিয়ে এল বিশুদা। তারপরই ঢালু জমিতে গড়িয়ে পড়ে গেল চওড়া নালার দিকে।
চাঁদের আলোয় নালার জল চিকচিক করছিল। বিশুদা টাল সামলাতে না পেরে তার মধ্যে গিয়ে পড়ল।
কয়েক সেকেন্ড বিশুদার মনে হল, সে চিৎ হয়ে একটা নরম বিছানায় শুয়ে আছে। আকাশের গোল চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। হাঁসফাঁস করা গরমে নালার ঠান্ডা জল যেন বাতানুকূল রাজশয্যা।
তারপরই দেখল তার দোকানের পিছনের দেওয়ালটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। আর একটা প্রকাণ্ড কালো শরীর দোকানের গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসছে বাইরে।
বিশুদা ভয়ার্ত খরগোশের মতো লাফিয়ে উঠে পড়ল নালা থেকে। নালার দুর্গন্ধ সারা গায়ে মাখামাখি হলেও বিশুদার নাক তেমনভাবে কাজ করছিল না। শুধু একটা জান্তব প্রবৃত্তি বিশুদাকে ভেতর থেকে চেঁচিয়ে বলছিল, ‘পালাও! পালাও!’
নালার ওপারে উঠে তাড়াহুড়ো করে ছুটতে গিয়ে একটা গাছের গুড়িতে বিশুদা ধাক্কা খেল। কোনওরকমে টাল সামলে নিয়ে ছুটল মজুমদারদের বাগানবাড়ির পাঁচিলের দিকে। একলাফে পাঁচিলে উঠে ওপারে ঝাপ দিয়ে পড়ল বিশুদা। একইসঙ্গে শুরু করল কানফাটানো আর্তচিৎকার।
জ্যোৎস্নার আলোয় প্রাণীটা থমকে দাঁড়াল। মাথা তুলে একবার পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকাল। তারপর চাপা গর্জন করে বড়-বড় পা ফেলে নেমে এল নালার দিকে।
অনায়াসে লাফিয়ে নালা পেরোল প্রাণীটা। তারপর ক্ষিপ্রভাবে ছুটে গেল বাগানবাড়ির পাঁচিলের দিকে। বাঁ হাতে পাঁচিলটা আঁকড়ে ধরে পোলভল্টের ভঙ্গিতে একলাফে শরীরটাকে নিয়ে ফেলল বাগানের ভেতরের স্যাঁতসেঁতে জমিতে।
আর ঠিক তখনই দুটো টর্চের জোরালো আলো প্রাণীটার মুখে এসে পড়ল। বিশুদার চিৎকারে ছুটে এসেছে মজুমদারদের দুই দারোয়ান। দূর থেকে ওরা খুনিকে লক্ষ্য করে টর্চের আলো ফেলেছে। হঠাৎ কী যে হল, প্রাণীটা একটা গর্জন করে পাঁচিল টপকে বেরিয়ে গেল বাইরে।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর দারোয়ান দুজন সাহস জোগাড় করে অতি সন্তর্পণে এগিয়ে এল পাঁচিলের কাছে। আঙুলের ওপরে দাঁড়িয়ে শরীরটা উঁচু করে ওরা পাঁচিলের বাইরেটা চোখ বুলিয়ে দেখল।
জ্যোৎস্নার সাদা আলোয় সবকিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ওরা দেখল, একটা বিশাল কালো ছায়া সামান্য কুঁজো হয়ে ত্রস্ত পায়ে হেঁটে চলেছে। একটু পরেই ওটা কয়েকটা গাছের আড়ালে চলে গেল।
ওরা দুজন ফিরে এসে দেখল বাগানবাড়ির চাতালে বিশুদা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।
পরদিনই বিশুদার কাহিনি জাঙ্গিকুলে ছড়িয়ে গেল। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ শোনার জন্য বহুলোক আসতে লাগল বিশুদার দোকনে। দোকানের বিক্রি একলাফে বেড়ে গেল।
রোহনরা সন্ধেবেলা চা খেতে বসে সব শুনল বিশুদার কাছে। রোহন বলল, ‘বিশুদা, পরের পূর্ণিমায় তুমি আমার বাড়িতে থাকবে। এর যেন কোনও নড়চড় না হয়।’
বিশুদা চোখ বড় করে বলল, ‘সে আর বলতে! ওই গোরিলার হাতে আমার মরার কোনও সাধ নেই। কাল ওই ডাকাবুকো দারোয়ান দুজন না থাকলে ওই গোরিলাটা আমাকে নির্ঘাত খতম করে যেত।’
ছোটকু বলল, ‘গোরিলা কেমন করে বুঝলে?’
‘যা সাইজ, আর যা গন্ধ!’
রোহন কী যেন চিন্তা করছিল। একটু পরে বলল, ‘বিশুদা, তুমি দোকানটা রিপেয়ার করে নিয়ো। যা লাগে আমি দিয়ে দেব।’
‘তুমি আর আমার জন্যে কত করবে!’
বিশুদা অভাব অনটনে পড়লে রোহনের থেকে টাকা ধার নেয়। কিন্তু রোহন কখনও সে-ধার শোধ নেয় না। বিশুদা কৃতজ্ঞতায় ওকে বিনাপয়সায় চা-বিস্কুট খাওয়াতে চায়, কিন্তু সেখানেও নিস্তার নেই। রোহন সবসময় জোর করে পয়সা দেয়। আর বলে, ‘এভাবে দানছত্র খুললে তোমার ব্যবসা লাটে উঠবে। তখন বড় মেয়েটার বিয়ে দেবে কী করে!’
ছোটকু রোহনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বস, অটো করে পাবলিসিটিটা তা হলে চালিয়ে যাই—কী বলো?’
‘না, না—ওটা থামাবি না। যেভাবে হোক মার্ডার ঠেকাতেই হবে।’
সুতরাং রোহনদের প্রচার আরও জোরদারভাবে শুরু হল। এবং পরের পূর্ণিমার দিন সন্ধে হতে না হতেই রাস্তাঘাটে লোকজন একেবারে কমে গেল।
সময়টা গ্রীষ্মকাল হলেও সাতটা সাড়ে সাতটা বাজতে না বাজতে দোকানপাটের ঝাঁপ পড়ে গেল ঝপাঝপ। ফলে রাত আটটার সময় মনে হল যেন রাত বারোটা বেজে গেছে। শুধু শিবতলার হর-পার্বতীর মন্দিরটাই ছিল ব্যতিক্রম।
আজ স্নানযাত্রা পূর্ণিমা। আকাশের চাঁদ অন্যান্য পূর্ণিমার মতোই শান্ত, ধ্যানে মগ্ন। তবু মনে হয় যেন সে ভয়ঙ্কর কোনও কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে।
হর-পার্বতীর মন্দিরে ঘণ্টা বাজছিল। চারপাশে বহুদূর পর্যন্ত আর কোনও শব্দ না থাকায় সেই ঘণ্টার শব্দের রেশ অনেকক্ষণ পর্যন্ত কানে লেগে রইল।
মন্দিরের ভেতরে পুরুতমশাই পুজো করছিলেন। অথচ পুজো দেখার জন্য আজ আর কেউ বসে নেই। ভয় এমনই জিনিস! দেবতার চেয়েও ভয়কে বেশি সমীহ করে মানুষ। আজ তা হলে কে-ইবা প্রসাদ নেবে, আর কে-ইবা নেবে শান্তির জল!
পুরুতমশাই ঠিক খেয়াল করেননি। তিনি দেবতার আরতিতে ব্যস্ত ছিলেন। একজন ভক্ত মন্দিরের দরজায় মসৃণ শ্বেতপাথরের ওপরে বসে ছিল। দু-চোখে তার মুগ্ধ দৃষ্টি। ভক্তির আবেগে চোখের কোল বেয়ে নেমেছে জলের ধারা। দেবতার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলছিল সে।
পুজো শেষ করে পুরুতমশাই পিছনে ফিরতেই তাকে দেখতে পেলেন। অবাক হয়ে গেলেন তিনি। আজ মন্দিরের বারান্দা, শান-বাঁধানো চাতাল, সব খাঁ-খাঁ করছে। অথচ অন্যান্য দিন কত ভক্ত সেখানে ভিড় করে থাকে।
পঞ্চপ্রদীপ নিয়ে এই সাহসী ভক্তের কাছে এলেন পুরুতমশাই। লোকটি উঠে দাঁড়িয়ে প্রদীপশিখার তাপ নিয়ে মাথায় বোলাল। পুরুতমশাই অবাক হয়ে বললেন, ‘এ কী, আপনি! আজ কেউ আসেনি—অথচ আপনি এসেছেন!’ হাসলেন পুরুতমশাই : ‘আপনার কি ভয়ডর নেই?’
উত্তরে ভক্ত স্মিত হেসে বলল, ‘আমার কাছে ভয়ের চেয়ে ভগবানের টান বেশি। মুক্তির আশায় আশায় আমি খ্যাপা কুকুরের মতো এক মন্দির থেকে আর এক মন্দিরে ঘুরে বেড়াই...।’
‘মুক্তি কি অত সহজে পাওয়া যায়! আমরা সবাই তো মুক্তির আশাতেই বসে আছি।’
পুরুতমশাইকে পাশ কাটিয়ে ভক্ত দেবতার মূর্তির দিকে দু-পা এগিয়ে গেল। মেঝেতে হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল। তারপর গড় হয়ে প্রণাম করে আবেগ-ভরা গলায় বলে উঠল, ‘আমায় মুক্তি দাও, ভগবান—এই অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি দাও...।’
পুরুতমশাই খানিকটা করুণার চোখে এই কষ্ট পাওয়া ভক্তকে দেখছিলেন। ভাবছিলেন, এর জীবন অভিশপ্ত কেন? আর প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই তাঁর প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলেন।
ভক্ত মানুষটি তখনও গড় হয়ে প্রণামের ভঙ্গিতে মাথা ঝুঁকিয়ে ঠাকুরকে ডাকছিল। সেই অবস্থাতেই তার শরীরটা ফুলতে শুরু করল। জামা ছেঁড়ার শব্দ পাওয়া গেল। আর লোকটার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল পশুর গোঙানি।
কয়েক সেকেন্ড পর সেই মানুষটা, কিংবা অমানুষটা, সোজা হয়ে দাঁড়াল—ঘুরে তাকাল পুরুতমশাইয়ের দিকে। পঞ্চপ্রদীপ হাতে নিয়ে হতভম্ব পুরুতমশাই তাঁর বদলে যাওয়া ভক্তকে দেখছিলেন।
কী ভয়ঙ্কর বীভৎস চেহারা! ঘন কালো লোমে ঢাকা কোনও আদিম মানুষ যেন! হিংস্র চোয়াল পশুর মতো লম্বাটে। দু-পাটি ধারালো দাঁত আলো পড়ে ঝকঝক করছে। দাঁত থেকে সুতোর মতো সরু হয়ে লালা ঝরে পড়ছে।
অমানুষটা সামান্য কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাঁটু দুটো কিছুটা ভাঁজ হয়ে থাকায় পা দুটো টানটান সোজা হতে পারছে না। দুটো লোমশ হাত দু’পাশে ঝুলছে। হাতের আঙুল বাঁকানো, নখও একইরকম।
একটা চাপা গর্জন করে প্রাণীটা তার ছেঁড়া আলুথালু পোশাকে এক টান মারল। তারপর পায়ের এক ঝটকায় সেটা দূরে ছিটকে ফেলে দিল। এবং পুরুতমশাইয়ের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। দুটো হলদে সবুজ চোখ। নিশাচর পশুর মতো জ্বলজ্বল করছে। অথচ সেই চোখে মানুষের মতো দৃষ্টি।
পুরুতমশাই বেশ বুঝতে পারছিলেন, মৃত্যু সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অপেক্ষা করছে।
তাই তিনি আর অপেক্ষা করতে চাইলেন না।
অমানুষটাকে অবাক করে দিয়ে তার শরীরের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন দুঃসাহসী পুরুতমশাই। জ্বলন্ত পঞ্চপ্রদীপটা চেপে ধরলেন তার মুখে : ‘শয়তান!’
বীভৎস রক্ত-হিম-করা গর্জন শোনা গেল। নাকে এল লোম এবং চামড়া পুড়ে যাওয়ার গন্ধ।
পুরুতমশাই তখন পাগলের মতো ধস্তাধস্তি করছিলেন আর চিৎকার করছিলেন, ‘তুই পাপী! তুই ছদ্মবেশী পাপী! ভগবান তোকে বিনাশ করবে!’
অমানুষটা বোধহয় কথা বলতে চাইল। কিন্তু তার মুখ দিয়ে শুধুই পাশবিক গর্জন বেরিয়ে এল। এক ঝটকায় সে পুরুতমশাইয়ের দেহটা সজোরে ছিটকে দিল শ্বেতপাথরের দেওয়ালে। পিতলের পঞ্চপ্রদীপ দেওয়ালে ঠোক্কর খেয়ে আছড়ে পড়ল মেঝেতে। ঠং-ঠং করে ধাতব শব্দ হল। আর তার ঠিক পাশাপাশি শোনা গেল একটা ভোঁতা শব্দ। পুরুতমশাইয়ের ভারি দেহটা ঠিকরে পড়েছে মেঝেতে।
যন্ত্রণায় গজরাতে গজরাতে পুরুতমশাইয়ের কাছে এগিয়ে এল প্রাণীটা। সামান্য ঝুঁকে পড়ে নিথর দেহটা অবলীলায় তুলে নিল। তারপর পশুর মতো ক্ষিপ্রতায় একলাফে শ্বেতপাথরের বারান্দা পেরিয়ে মন্দিরের শানবাঁধানো চত্বরে নেমে এল।
প্রাণীটা এবার রাতের আকাশের দিকে মুখ তুলল। তাকাল পূর্ণিমার চাঁদের দিকে। তারপর এক আকুল দীর্ঘ গর্জনে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দিল।
জাঙ্গিকুলের অনেকেই শুনতে পেল সেই গর্জন। রোহনরাও শুনতে পেল। ওরা তখন রাজবাড়ির কাছাকাছি ছিল। গর্জনটা শুনতে পেয়েই ওরা শব্দের নিশানা ধরে ছুটতে শুরু করল। ছুটতে ছুটতেই রোহন কোমর থেকে রিভলবার বের করে নিল।
জলাপুকুর, দেশপ্রিয় সুইটস, বিশুদার চায়ের দোকান পেরিয়ে ওরা মিনিটখানেকের মধ্যেই পৌঁছে গেল শিবতলার হর-পার্বতীর মন্দিরের কাছাকাছি।
এদিক থেকেই তো গর্জনটা এসেছে বলে মনে হল! অথচ চারদিক শুনশান, চুপচাপ।
শুধু আশপাশের দু-একটা বাড়ির বারান্দায় কৌতূহলী কয়েকটা মুখ দেখা গেল। সবক’টা মুখই ভয়ে ফ্যাকাসে। মন্দিরের দিকে চোখ পড়ল রোহনের।
শানবাঁধানো চত্বরে ঢোকার গ্রিলের দরজাটা হুড়কো দিয়ে আটকানো। তবে মূল মন্দিরটা খানিকটা উঁচুতে হওয়ায় রাস্তা থেকেই ভেতরটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। দরজা হাট করে খোলা। ঝকঝকে আলোয় দেবতার মূর্তি প্রাণবন্ত উজ্জ্বল। অথচ পুরুতমশাইকে দেখা যাচ্ছে না।
গোটা মন্দিরটা কেমন যেন নিঝুম। ঠিক কোথা থেকে ভেসে এল গর্জনটা?
কিছুক্ষণ এলোমেলো খোঁজাখুঁজির পর রোহনের কেমন যেন সন্দেহ হল। পুরুতমশাইকে দেখা যাচ্ছে না কেন? অথচ ঘণ্টাখানেক আগে এ-পথ দিয়ে টহল দেওয়ার সময় রোহনরা তাঁকে দেখেছে! তাঁকে জিগ্যেস করলে হয়তো গর্জনটার কোনও হদিস পাওয়া যেতে পারে।
রোহন রিভলবার উঁচিয়ে ধরল। ওর সঙ্গে যে আরও চারজন শাগরেদ ছিল তারাও নিরস্ত্র নয়। কারও হাতে রড, কারও হাতে ভোজালি। ওরা সবাই তৈরি। খুনিকে হাতের কাছে পেলে ওরা কিছুতেই ছেড়ে দেবে না।
ওরা মন্দিরের গ্রিলের দরজার কাছে এগিয়ে গেল। গ্রিলের গেট খুলে রোহনরা মন্দিরের শানবাঁধানো চত্বরে ঢুকে পড়ল। এবং পুরুতমশাইকে ওরা খুঁজে পেল।
মন্দিরের চত্বরে বেশ কয়েকটা কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া আর শিমুল গাছ রয়েছে। তাদের গোড়াগুলো সিমেন্ট দিয়ে বাঁধিয়ে বেদির মতো করা। বেশিরভাগ সময় ভক্তরা এখানে বসে থাকে, নামকীর্তন শোনে। সেইরকমই একটা বেদির ওপরে পুরুতমশাইয়ের ছিন্নভিন্ন দেহটা শোয়ানো। মাথাটা বেদি ছাড়িয়ে নিচের দিকে ঝুলে পড়েছে। হাঁ করা মুখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ছে।
গোটা বেদিটা রক্তে মাখামাখি। রক্তের দাগ গড়িয়ে এসেছে নিচে। শানবাঁধানো চত্বরে রক্তের ধারা তৈরি হয়ে গেছে। রক্তের ছাপ চত্বরের নানান জায়গায়, মন্দিরের সিঁড়িতে, এমনকী মন্দিরের ভেতরেও।
রোহনের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। এরকম দুঃসাহসী খুনি! দেবতার সামনে খুন করতেও সে ভয় পায় না! খুনি আশপাশে কোথাও লুকিয়ে নেই তো!
রোহনরা মন্দিরের প্রতিটি জায়গা তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখল। ওদের বুকের ভেতরে টিপটিপ শব্দ হচ্ছিল। একইসঙ্গে রোহনের ভীষণ রাগ হচ্ছিল। এত চেষ্টা করেও খুনটাকে ওরা ঠেকাতে পারল না!
মন্দিরের ভেতরে অবহেলায় পড়ে থাকা পঞ্চপ্রদীপটা রোহনের চোখে পড়েছিল। সেটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখল ও। প্রদীপের তেলের গায়ে কয়েক গোছা লোম লেপটে রয়েছে।
খুঁটিয়ে নজর করতেই ও দেখল, বেশ কয়েকটা লোম আধপোড়া। তা হলে কি পঞ্চপ্রদীপের আগুনে খুনির গায়ের লোম পুড়ে গেছে? পুরুতমশাইয়ের সঙ্গে খুনির কি ধস্তাধস্তি হয়েছে?
ঠিক তখনই রোহনের এক শাগরেদ নান্টু মেঝেতে ঝুঁকে পড়ে কী যেন তুলে নিল। তারপর রোহনকে ডেকে বলল, ‘এগুলো কী দ্যাখো তো, রোহনদা—।’
রোহন কাছে এসে ভালো করে দেখল।
মটরদানার মতো গোল-গোল তিনটে বিচি। সেগুলোয় ফুটো করা—বোধহয় মালা গাঁথা ছিল। খুলে পড়ে গেছে।
রোহন বিচিগুলো নিয়ে পকেটে রাখল। ওর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।
মন্দিরের ভেতরেও অল্পবিস্তর রক্তের ছাপ ছিল। কিন্তু কোনও ছাপই হাতের কিংবা পায়ের বলে স্পষ্ট চেনা যায় না।
অনেক খোঁজাখুঁজি করেও রোহনরা খুনির কোনও চিহ্ন পেল না। কেউ কোথাও নেই। মন্দিরের পিছনদিকে একটা পোড়ো জমি আছে—গাছপালা আর কাঁটাঝোপে ভরা। খুনি হয়তো সেদিক দিয়ে সরে পড়েছে।
হতাশ হয়ে রোহনরা বেরিয়ে এল রাস্তায়। দেখল, কয়েকজন কৌতূহলী মানুষ সাহস করে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। তাদেরই একজন রোহনের কাছে এগিয়ে এসে জানতে চাইল, ‘কী হয়েছে, রোহন? গর্জনটা কীসের কিছু বুঝতে পারলে?’
রোহন ক্লান্তভাবে মাথা নেড়ে ‘না’ বলল। তারপর : ‘পুরুতমশাই খুন হয়েছেন। আমরা ফাঁড়িতে খবর দিতে যাচ্ছি—।’ রোহনের বাড়ি থেকে সাইকেল নিয়ে রোহন আর ছোটকু রওনা হল থানার দিকে।
যেতে-যেতে ছোটকু বলল, ‘বস, আজ হেভি প্রেস্টিজে লাগল মাইরি। আমাদের এরিয়ায় নাকের ডগায় মার্ডার করে মার্ডারার হাওয়া হয়ে গেল!’
রোহন ধীরে-ধীরে মাথা নাড়ল। ওর ভেতরে অপমানটা টগবগ করে ফুটছিল।
স্কুলের লাগোয়া এক অপরূপ বাগানে হরিহরবাবু দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাগানে ঝকঝকে সবুজ সব ফুলের গাছ। তাতে ফুটে রয়েছে নানান রঙিন ফুল। সেই ফুলের মেলার মাঝে আরও এক ঝাঁক রঙিন ফুল ছুটোছুটি করছিল। একদল ছেলে-মেয়ে।
ওরা এলোমেলোভাবে ছুটোছুটি করছে। নিজেদের মধ্যে হইচই কলরোল তুলে বাগানটাকে একেবারে মাতিয়ে দিয়েছে ফুলের মতো স্কুলপড়ুয়ার দল।
বাগানের একটা বেদিতে বসে মুগ্ধ চোখে ওদের দেখছিলেন হরিহরবাবু। তাঁর কোনও ছেলেমেয়ে নেই। তবে তার জন্য কোনও দুঃখও নেই। ছাত্র-ছাত্রীরাই তাঁর সন্তান।
বিকেলের রোদ মরে এসেছিল। কিন্তু সন্ধের ছায়া তখনও নামেনি। হরিহরবাবু দেখলেন, দূরে, পুবের দিগন্তে, তালগাছের সারির ফাঁক দিয়ে চাঁদ উঁকি দিয়েছে। পূর্ণিমার চাঁদ।
ছুটোছুটি করা ছেলেমেয়ের দলও চাঁদ দেখতে পেল।
কী যে হল, হঠাৎই ওরা খেলাধুলো ছেড়ে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সবাই একইসঙ্গে হাঁ করে তাকাল পূর্ণিমার চাঁদের দিকে। হরিহরবাবু বেদি ছেড়ে উঠে পড়লেন। ওরা সবাই কেন অবাক হয়ে চাঁদ দেখছে সেটা বুঝতে চেষ্টা করলেন।
ওদের নিষ্পাপ মুখগুলো দেখছিলেন হরিহরবাবু। না, ওরা ফুল নয়—বরং ফুলের চেয়ে কিছু বেশি। ‘ছোটবেলা’র মতো দারুণ জিনিস আর হয় না! মনে-মনে ভাবলেন তিনি। আর ঠিক তখনই একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটতে শুরু করল।
ছেলে-মেয়েগুলোর মুখ বদলে যেতে লাগল। নিষ্পাপ মুখগুলো বিকৃত হয়ে জন্তুর চেহারা নিল। চোয়াল লম্বাটে হয়ে গেল। সারি সারি ধারালো দাঁত তৈরি হয়ে গেল সেখানে। হাতে পায়ে ঘাড়ে লোম গজিয়ে উঠল। কানের ওপর দিকটা ছুঁচলো হয়ে গেল।
তারপর ওরা সমস্বরে এক দীর্ঘ গর্জন তুলে আকাশ-বাতাস মাতিয়ে দিল।
হরিহরবাবু ভয়ে কাঁপছিলেন আর কুলকুল করে ঘামছিলেন। চিৎকার শেষ করে ছেলে-মেয়েগুলো হরিহরবাবুর দিকে ঘুরে দাঁড়াল। এক বিচিত্র পাশবিক স্বরে ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে...’ সুর করে গাইতে শুরু করল। যেন স্কুলের প্রার্থনা সঙ্গীত গাইছে।
এবং ওরা হরিহরবাবুর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। হরিহরবাবু বাঁশপাতার মতো থরথর করে কাঁপতে শুরু করলেন।
একইসঙ্গে মৃত্যুর প্রহর গুনতে লাগলেন। ঠিক তখনই তাঁর ঘুমটা ভেঙে গেল।
উঃ, কী বিশ্রী স্বপ্ন!
সারা শরীর ঘামে ভেজা। বিছানার চাদরটাও ভিজে গেছে। অবসন্ন চোখে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালেন হরিহরবাবু। সন্ধে প্রায় ছ’টা। আর ঠিক তখনই স্ত্রীকে দেখতে পেলেন। তাঁর মাথার কাছটিতে দাঁড়িয়ে। মুখে কৌতুকের হাসি।
‘সেই তখন থেকে ডাকছি। ওরা সব পড়তে এসে গেছে।’
ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলেন হরিহরবাবু। দেওয়ালে টাঙানো মা-কালীর ফটোর দিকে তাকিয়ে কপালে হাত ঠেকালেন। মা—মা-গো!
‘ঘুমের মধ্যে অমন গোঙাচ্ছিলে কেন? তোমাকে কি বোবায় ধরেছিল?’
‘কে জানে!’ বিছানা থেকে নেমে পড়লেন হরিহরবাবু : আসলে একটা বাজে স্বপ্ন দেখছিলাম। ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন...।’
‘তোমার তো আবার অল্পেতেই ভয়!’ হরিহরবাবুর স্ত্রী হাসলেন : ‘শরীর ভালো না লাগলে আজ আর পড়াতে হবে না—।’
হরিহরবাবু প্রস্তাবটাকে আমলই দিলেন না। কোচিং ক্লাস কামাই করা তিনি একেবারে পছন্দ করেন না।
পোশাক পালটে নিয়ে বাইরের ঘরে এলেন তিনি। চিকু, প্রিয়াংকা, কৌশিকের দল হাজির। ওদের দিকে একপলক তাকিয়েই দুঃস্বপ্নটার কথা মনে পড়ে গেল। সংকোচের হাসি হেসে বললেন, ‘দুপুরের ঘুমটা একটু লম্বা হয়ে গেছে...।’
চিকু হাঁ করে হরিহরবাবুকে দেখছিল। ওর শরীরের ভেতরে শিরায় শিরায় বরফকুচির স্রোত বইতে শুরু করল। ওর মাথা ঝিমঝিম করছিল। চোখের দৃষ্টি কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছিল।
চিকু টলে পড়ে যাচ্ছিল। কোনওরকমে পাশে বসা প্রিয়াংকাকে ধরে নিজেকে সামলে নিল।
প্রিয়াংকা টের পেল চিকুর হাত বরফের মতো ঠান্ডা। ও অবাক হয়ে চিকুর চোখে তাকাল। চাপা গলায় জিগ্যেস করল, কী হয়েছে?’
চিকুও নিচু গলায় জবাব দিল, ‘আমি সব বুঝতে পেরে গেছি।’
‘কী বুঝতে পেরেছ?’
চিকু কোনও উত্তর দিল না। চোখের ইশারায় হরিহরবাবুকে দেখাল। তারপর ডানহাতের দুটো আঙুল ভাঁজ করে আর দুটো আঙুল টানটান করে রিভলবারের আদল তৈরি করল। সেই রিভলবারটা স্যারের দিকে তাক করে মুখে চাপা শব্দ করে স্যারকে মিছিমিছি ‘গুলি’ করল চিকু।
প্রিয়াংকা কিছু বুঝতে না পেরে ঠোঁট উলটে প্রশ্নের ভঙ্গি করল।
চিকু হেসে বলল, ‘এখন না—আগে পড়া শেষ হোক—তারপর। তুমি আমার সঙ্গে থেকো—তা হলে সব বুঝতে পারবে।’
চিকুর উসখুস ভাবটা হরিহরবাবু লক্ষ করেছিলেন। তিনি জিগ্যেস করলেন, ‘চিকু, কিছু বলবি?’
চিকু মাথা নাড়ল : ‘না, স্যার।’
‘প্রিয়াংকার সঙ্গে কী কথা বলছিস?’
হরিহরবাবুর কৌতূহলটা চিকুর কানে বড্ড বাড়াবাড়িরকম ঠেকল। তাই ও অম্লানবদনে বলে বসল, ‘পুরুতমশাইয়ের মার্ডারটা নিয়ে আলোচনা করছিলাম, স্যার।’
গত পূর্ণিমার পর মাত্র তিনটে দিন পার হয়েছে। পুরুতমশাইয়ের হত্যাকাণ্ড জাঙ্গিকুলের ছোট-বড় সবাইকে একেবারে ভিত পর্যন্ত নড়িয়ে দিয়েছে। লোকজনের কথাবার্তা আলোচনায় এখন থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আগামী পূর্ণিমায় সন্ধে হলেই যে যার ঘরে ঢুকে পড়বে। দরজায় খিল এঁটে নিরাপদ আশ্রয়ে বসে থাকবে। অপঘাতে কেউ আর মরতে চাইবে না।
চিকুর কথায় কোচিং সরগরম হয়ে উঠল। সুযোগ পেয়ে সকলেই পূর্ণিমার খুনগুলো নিয়ে নানান মন্তব্য করতে লাগল।
হরিহরবাবু হাত তুলে সবাইকে চুপ করতে ইশারা করলেন। একটু কেশে নিয়ে বললেন, ‘শোন, এই খুনগুলো নিয়ে আমিও অনেক ভেবেছি। তোদের তো আগে একদিন বলেছি, এ যেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নৃসিংহ অবতার। তা ছাড়া, যারা খুন হয়েছে তাদের সবারই নিয়তি ছিল মৃত্যু। তবে জানবি, তাদের আত্মার মৃত্যু হয়নি। গীতায় আছে, আত্মা অবিনাশী, নিত্য, অজ, অব্যয়। আত্মার জন্মও নেই, মৃত্যুও নেই। আত্মার আসল রূপ হল...।’
চিকু স্যারের কথা শুনছিল। কিন্তু প্রতিমুহূর্তেই ওর হাসি পাচ্ছিল। কারণ রোহনদার কথাগুলো ওর মনে পড়ছিল।
গত পূর্ণিমার পরের দিন বিকেলে রোহনের সঙ্গে চিকু দেখা করেছিল। দেখা করার জন্য রোহনই ওকে খবর পাঠিয়েছিল।
বিশুদার চায়ের দোকানে বসে মন্দিরের খুন নিয়ে চিকুর সঙ্গে আলোচনা করেছিল রোহন। তারপর মন্দির থেকে পাওয়া মটরদানার মতো তিনটে বিচি চিকুকে দেখিয়েছিল।
‘এগুলো কী বল তো! সকাল থেকে অনেককে দেখিয়েছি। ওরা বলছে...।’
বিচিগুলো দেখামাত্রই চিনতে পারল চিকু। রুদ্রাক্ষ। রোহন কথা বলে যাচ্ছিল : ‘...মনে হয় খুনির সঙ্গে ধস্তাধস্তির সময় পুরুতমশাইয়ের গলার মালাটা ছিঁড়ে পড়ে গেছে।’
চমকে উঠল চিকু। কখনও না! কারণ, মন্দিরে ও প্রায়ই যায়। পরীক্ষার আগে তো বেশ ঘন-ঘন যায়। পুরুতমশাইকে ও বেশ খুঁটিয়ে লক্ষ করেছে। ওঁর গলায় রুদ্রাক্ষের মালা ছিল না। বরং লকেটওয়ালা একটা সোনার চেন ছিল। মৃত্যুর পরেও সেটা ওঁর গলায় ছিল।
তা হলে?
বিধবা ভদ্রমহিলা খুন হওয়ার পর থেকেই সকলের ধারণা হয়েছিল যে, খুনি আসলে কোনও মানুষ। আবার তার বাইরের চেহারাটা অনেকটা পশুর মতো হওয়ায় কারও কারও ধারণা হয়েছিল, সে মানুষ এবং পশুর মাঝামাঝি কোনও প্রাণী। তার সঙ্গে পূর্ণিমার সম্পর্কটা জুড়ে দিয়ে কে যেন প্রথম ওয়্যারউল্ফ বা নেকড়ে মানুষের কথা বলেছিল।
বিশুদা বুদ্ধপূর্ণিমার রাতে শুধু শব্দ শুনেছিল—কাউকে তেমন স্পষ্টভাবে দেখতে পায়নি। তবে পশু বলেই মনে হয়েছিল।
কিন্তু পুরুতমশাইয়ের খুনের পর নেকড়ে-মানুষের ধারণাটা জোরালো চেহারা পেয়ে গেছে। নেকড়ে মানুষ। যে-মানুষ প্রতি পূর্ণিমার রাতে ভয়ঙ্কর হিংস্র অমানুষে বদলে যায়, হয়ে যায় অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক পশু। তারপর, পূর্ণিমা কেটে গেলেই, সে আবার সুস্থ-স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
চিকু মনে-মনে এরকম একজন অসুস্থ মানুষকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল।
রুদ্রাক্ষের মালা...রুদ্রাক্ষের মালা...রুদ্রাক্ষর মালা...। একটা সন্দেহের ছায়া মনের কোণে উঁকি দিতে শুরু করল। এরপর রোহন পঞ্চপ্রদীপের কথা বলল। বলল, প্রদীপের গায়ে লোম পাওয়া গেছে। তাতে আধপোড়া লোমও আছে। হয়তো পঞ্চপ্রদীপের শিখায় খুনির শরীর পুড়ে গেছে।
বেশ উত্তেজিতভাবে রোহন আর চিকু প্রায় ঘণ্টাখানেক আলোচনা চালিয়ে গিয়েছিল। শেষে রোহন বলল, ‘ফাঁড়ির মাইতিবাবু বলছিলেন এবার কলকাতা থেকে গোয়েন্দার দল আসবে। সঙ্গে ফোরেনসিক এক্সপার্টরাও থাকবে। সে ওরা যা পারে করুক। তবে ওদের আগে মার্ডারারকে ধরতে পারলে আমার মনটা ঠান্ডা হত।’
‘রোহনদা, তুমি আমাকে দু-চারদিন সময় দাও।’ চিকু বলল।
‘কেন রে?’
‘আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে...।’ রোহন অবাক হয়ে চিকুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এখন স্যারের দিকে তাকিয়ে রোহনের মুখটা মনে পড়ল চিকুর।
স্যারের আত্মার কচকচি তখনও চলছিল। আর চিকু অবাক হয়ে স্যারকে দেখছিল।
স্যারের গলায় রুদ্রাক্ষের মালাটা নেই। স্যারের বাঁ গালে চোখের নিচে নাকের পাশে তুলো আর স্টিকিং প্লাস্টার লাগানো।
হরিহরবাবু পড়াতে আসামাত্রই ওঁর মুখের ব্যান্ডেজ সকলের চোখে পড়েছে। তিতুন, সুকান্ত, প্রদীপ্তরা জিগ্যেসও করেছে, ‘স্যার, মুখে কী হয়েছে?’
উত্তরে স্যার হেসে বলেছেন, ‘ও কিছু নয়—সামান্য একটু পুড়ে গেছে।’
চিকু কোনও কথা বলতে পারেনি। ওর শরীরের ভেতরে বরফকুচির স্রোত বইতে শুরু করেছিল।
হরিহরবাবুই কি তা হলে পূর্ণিমার নরপিশাচ?
‘...গত পূর্ণিমার রাতগুলোয় যারা মারা গেছে ভগবান তাদের ভবিতব্য আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন। মারে কৃষ্ণ রাখে কে! কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে হাজির হয়ে অর্জুন যখন বিষাদে কাতর হয়ে বলেছিলেন, আত্মীয়স্বজনকে আমি হত্যা করতে পারব না, তখন শ্রীকৃষ্ণ হেসে বলেছিলেন, হে পার্থ, তুমি ওদের হত্যা করবে কী, আমি তো ওদের আগেই মেরে রেখেছি! জাঙ্গিকুলের ঘটনাটাও ঠিক একইরকম, বুঝলি? এখানে ওই খুনি স্রেফ নিমিত্ত মাত্র। ভগবান ওই চারজনকে আগেই মেরে রেখেছিলেন...। আর, একজন বেঁচে গেছে কারণ...রাখে কৃষ্ণ মারে কে! বেঁচে যাওয়া তার কপালে ছিল।’
জ্ঞানগর্ভ ব্যাখ্যা শেষ করে হরিহরবাবু আবার লেখাপড়ায় ফিরে এলেন। বই আর খাতা খুলে ওরা সবাই পড়ায় মন দিল।
কিন্তু চিকুর বুকের ভেতরটা টিপটিপ করছিল। কিছুতেই ওর পড়ায় মন বসছিল না।
পড়ানোর মাঝে কাকিমা একবার ঘরে এলেন। হরিহরবাবুকে চা-বিস্কুট দিলেন। আর চিকুদের দিলেন একটা করে কেক।
কাকিমা বোধহয় বিকেলে স্নান করেছেন। ফরসা টলটলে মুখ, কপালে বড় মাপের সিঁদুরের টিপ, গালে লাল আভা। কাকিমাকে দেখলেই কেমন কাছের মানুষ বলে মনে হয়। আর হরিহরবাবু? ওঁকে কাকিমার স্বামী বলে ভাবতে চিকুর বেশ কষ্ট হচ্ছিল।
পড়ানো শেষ হয়ে যাওয়ার পর সবাই যখন বই-খাতা-ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়াল, চিকু তখনও বসে রইল। ওর ভেতরে কেমন একটা রাগ আর জেদ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। স্যারকে ও কয়েকটা কথা জিগ্যেস করতে চায়। বুঝতে চায় ওর সন্দেহটা সত্যি কি না।
‘কী রে, চিকু—তুই যে বসে রইলি—বাড়ি যাবি না? স্নেহের সুরে হরিহরবাবু জিগ্যেস করলেন।
‘আপনার সঙ্গে....ক কয়েকটা ক-কথা আছে, স্যার।’ আমতা-আমতা করে চিকু বলল।
বন্ধুরা সব ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। শুধু প্রিয়াংকা জুতো পায়ে দিয়ে দরজার চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। কাকিমা ভেতরের ঘরে হয়তো সংসারের কাজে ব্যস্ত।
‘কী কথা?’
অন্দরে কোথাও টেলিফোন বেজে উঠল। কাকিমা ফোন ধরে কথা বলতে লাগলেন। বাইরের ঘর থেকে চিকু আবছাভাবে কাকিমার গলা পাচ্ছিল।
‘আপনার গলার রুদ্রাক্ষের মালাটা কোথায় গেল, স্যার?’ পলকে চারপাশটা কেমন স্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু সিলিং পাখার ভনভন শব্দ কানে বাজছিল। হরিহরবাবুর বাঁ চোখটা একবার কেঁপে উঠেই আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল।
‘কোথাও বোধহয় খুলে পড়ে গেছে। আ-আমি ঠিক খ্-খেয়াল করিনি....।’
‘আপনার মুখ পুড়ে গেল কী করে?’
‘বললাম তো, সামান্য একটু পুড়ে গেছে!’ হরিহরবাবু হঠাৎই রেগে উঠলেন।
‘না, স্যার—ঠিক কীভাবে পুড়ল আপনাকে বলতে হবে।’ জেদি গলায় বলল চিকু।
‘এতবড় তোর স্পর্ধা। আমার কাছে জবাবদিহি চাস।’ হরিহরবাবু উত্তেজিত হয়ে পড়ছিলেন। ওঁর গলার স্বর থরথর করে কাঁপছিল। দরজার কাছ থেকে প্রিয়াংকা চিকুকে ডাকল, ‘চিকু কী হচ্ছে! চলে এসো!’
ওর দিকে না তাকিয়েই হাতের একটা ইশারা করল চিকু। বই-খাতা-ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর ফস করে বলে বসল, ‘আপনার বাঁ গালে পঞ্চপ্রদীপের ছাপ পড়ে গেছে।’
চিকুকে অবাক করে দিয়ে হরিহরবাবুর বাঁ হাতটা সঙ্গে-সঙ্গে গালে পৌঁছে গেল। ওঁর হাতের আঙুল আন্দাজে ভর করে পঞ্চপ্রদীপের ছাপটাকে খুঁজতে চাইল।
একইসঙ্গে চিকুর প্রমাণ খোঁজার পালা শেষ হল। অসুস্থ নরপশুটাকে ও খুঁজে পেয়ে গেছে।
কিন্তু ও এতটুকুও ভয় পেল না, কারণ, এতদিনে ও বুঝে গেছে, পূর্ণিমার রাত ছাড়া এই মানুষটাকে ভয় করার কোনও কারণ নেই। ও টান-টান গলায় বলল, ‘আপনার রুদ্রাক্ষের মালাটা গত পূর্ণিমার রাতে শিবতলার মন্দিরে ছিঁড়ে পড়ে গেছে, স্যার। আর সে-রাতে পুরুতমশাই বোধহয় আপনার সঙ্গে একটু ধস্তাধস্তি করেছিলেন...।’
‘চিকু! চিকু, তুমি কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ! এসব আজেবাজে কথা বলার সাহস তুমি কোথা থেকে পেলে! অসভ্য, ইতর...।’ স্যার রেগে গিয়ে কথাগুলো বলছিলেন বটে, তবে সেগুলো কেমন যেন ফাঁকা আওয়াজের মতো শোনাচ্ছিল। আর স্যারের মুখ-চোখও কেমন অপরাধীর মতো ফ্যাকাসে লাগছিল।
ঠিক এই সময়ে অন্দরমহল থেকে কাকিমা বেরিয়ে এলেন। কাকিমাকে দেখে চিকুর বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। নিপাট ভালোমানুষ কাকিমা বোধহয় হরিহরবাবুর আসল চেহারাটা জানেন না। জানলে তিনি হয়তো শোকে-দুঃখে আত্মহত্যাই করবেন।
কাকিমার সামনে আর কোনও কথা বলতে পারল না চিকু। হরিহরবাবু চিকুর দিকে দু-পা এগিয়ে এলেন, মুখের ভাব মোলায়েম করে বললেন, ‘তোর বয়েস অল্প। তোর না জানার জগৎটা বড় বেশি। জানবি পাপ করলে তার শাস্তি পেতেই হবে। শ্রীকৃষ্ণের নৃসিংহ অবতার হিরণ্যকশিপুকে ধ্বংস করেছিল...’
চিকু চোয়াল শক্ত করে বলল, ‘আমি কোনও পাপ করিনি...।’
কাকিমা স্বামীকে জিগ্যেস করলেন, ‘কী হয়েছে? ভেতর থেকে চেঁচামেচি শুনতে পাচ্ছিলাম...এত শোরগোল কীসের?’
স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে হরিহরবাবু হাসলেন : ‘ও কিছু নয়। চিকুকে একটু শাসন করছিলাম। তবে ছোট ছেলে...আমি ওকে ক্ষমা করে দিয়েছি—।’ চিকু ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল।
প্রিয়াংকা এতক্ষণ ওর হাত ধরে টানছিল। বাইরে এসেই প্রিয়াংকা চিকুকে জিগ্যেস করল, ‘কী ব্যাপার বলো তো! তোমাদের কথাবার্তার আমি কোনও মিনিং খুঁজে পাচ্ছি না। স্যারের সঙ্গে পঞ্চপ্রদীপ আর পুরুতমশাইয়ের রিলেশান কী?’
‘চলো—যেতে-যেতে সব বলছি। তবে তুমি এখন কাউকে কোনও কথা বলতে পারবে না। প্রমিস?’
চিকুর হাত ছুঁয়ে প্রিয়াংকা বলল, ‘প্রমিস।’
ওরা সাইকেল চালাতে শুরু করল।
বাতাসে অনেকক্ষণ ধরেই একটা ঝড়ের গন্ধ টের পাওয়া যাচ্ছিল। গুমোটের মধ্যে ঠান্ডা বাতাস মাঝে-মধ্যেই খেলে বেড়াচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, শিগগিরই একটা কালবৈশাখী হবে। তবে তার সঙ্গে একটু বৃষ্টি হলে ভালো হয়, চিকু ভাবল।
চিকুর কাছে সব শোনার পর প্রিয়াংকা ভয়ে কাঠ হয়ে গেল। ও বলল, ‘আমি আর বাংলা কোচিং-এ পড়তে যাব না।’
চিকু বলল, ‘আমি যতটুকু বুঝেছি, পূর্ণিমার রাত ছাড়া স্যারকে ভয়ের কোনও কারণ নেই। কিন্তু আমার সঙ্গে আজ যেরকম কথাকাটাকাটি হয়ে গেল তাতে আমার আর বাংলা কোচিং-এ যাওয়া হবে না। বাড়িতে মা-বাবাকে কী বলব তাই ভাবছি...।’
‘তোমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। সবাই প্রুফ চাইবে। বলবে, এ হতে পারে না—ইমপসিবল।’
প্রিয়াংকার কথাগুলো চিকু কিছুক্ষণ চিন্তা করল। ওর মনে হল, প্রিয়াংকা ঠিকই বলেছে। হরিহরবাবুর মতো ধার্মিক সাত্ত্বিক মানুষকে কেউ রক্তপিশাচ বলে ভাবতে পারবে না। তা ছাড়া সবাই হয়তো জানতে চাইবে, হঠাৎ করে মানুষটা এরকম হয়ে গেল কেমন করে। উনি জাঙ্গিকুলে বহুবছর ধরে আছেন—এতদিন তো পূর্ণিমার রাতে কোনও খুন হয়নি! তা হলে চার-পাঁচমাস আগে হঠাৎ এমন কী হল যে, মানুষটা অমানুষ হয়ে গেল!
চিকু এসব প্রশ্নের কোনও উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না। প্রমাণের কথা ভাবতে-ভাবতে ওর মাথার ভেতরটা কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। সত্যিই তো, ওর মুখের কথা কেউ একবর্ণও বিশ্বাস করতে চাইবে না! তা ছাড়া চিকু নিজেও হরিহরবাবুকে নৃশংস ভয়ঙ্কর একটা অমানুষ বলে ভাবতে পারছিল না।
সুতরাং, অকাট্য একটা প্রমাণ চাই। আর তার জন্য বোধহয় আগামী পূর্ণিমা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এ ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।
কিন্তু পূর্ণিমা আসতে তো এখনও অনেক দিন বাকি! এতগুলো দিন কি স্রেফ হাত গুটিয়ে বসে থাকা যায়? ঠিক তখনই চিকুর মাথায় বুদ্ধিটা এল।
ও প্রিয়াংকাকে বলল, ‘তুমি ঠিকই বলেছ সবাই প্রমাণ চাইবে। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমার মনে আর কোনও সন্দেহ নেই। অবশ্য আমার মুখের কথা সবাই মানবে কেন। ধরো, স্যার নিজে যদি সব স্বীকার করেন?’
‘স্যার হঠাৎ কনফেস করতে যাবেন কেন?
‘কারণ আমি আর তুমি স্যারকে ফোন করে করে পাগল করে মারব।’
‘ওরে বাবা!’ প্রিয়াংকা ভয়ে আঁতকে উঠল।
চিকু ওকে আশ্বাস দিয়ে বলল, ‘কোনও ভয় নেই। আমি তোমাকে সব শিখিয়ে দিচ্ছি। তুমি রোজ একবার ফোন করবে—আর আমি একবার। তাতেই আশা করি অ্যাকশন হবে।’
আরও মিনিট পনেরো আলোচনার পর চিকু বাড়িতে ফিরে এল। রাতে শোওয়ার আগে ও মাকে বলল, বাংলা কোচিং-এ ঠিকমতো পড়া হচ্ছে না। ও অন্য বাংলা স্যারের কোচিং-এ ভরতি হবে।
মা খানিকটা অবাক হলেও রাতে আর কথা বাড়াল না। পরদিন সকালে বাবা অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পর চিকু হরিহরবাবুর বাড়িতে ফোন করল।
কাকিমা ফোন ধরে ‘হ্যালো’ বলতেই ও খুব মোলায়েম গলায় বলল, ‘স্যার আছেন?’
‘ধরো, দিচ্ছি—।’
কাকিমা চিকুর গলা চিনতে পারেননি। অবশ্য পারার কথাও নয়। কারণ, চিকু এর আগে স্যারের বাড়িতে মাত্র একদিন ফোন করেছে।
‘হ্যালো’ হরিহরবাবুর গলা শুনতে পেল চিকু।
ও রিসিভারের খুব কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, ‘তোমার পাপের বোঝা তোমাকে শেষ করে দেবে...।’
‘কে? কে?’
‘আমি সব জানি।’ ধীরে-ধীরে ফিসফিস করে চিকু বলল, ‘গত চারটে পূর্ণিমায় তুমি চারজন মানুষকে নৃশংসভাবে খুন করেছ। আর একজনকে খুন করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত পারোনি।’
‘কে, চিকু?’ চাপা গলায় জানতে চাইলেন হরিহরবাবু।
প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চিকু বলে চলল, ‘আমি সব দেখেছি। সব জানি। সামনের পূর্ণিমায় কাউকে আমি খুন হতে দেব না।’
‘চিকু, তুই আমাকে মিছিমিছি সন্দেহ করছিস। আমি কোনও পাপ করিনি। তুই খুব ভালো ছেলে। মিছিমিছি আমাকে ভুল বুঝিস না...।’
‘অন্য কাউকে খুন করার চেয়ে নিজেকে খুন করা অনেক সহজ। তোমার সুইসাইড করা উচিত। তোমার মতো পাপীরা আত্মহত্যা করলে সেটা মহাপাপ হয় না। সামনের পূর্ণিমায় তুমি নিজেকে খুন করো—সেটা সবার পক্ষে ভালো হবে।’
ও-পাশ থেকে আবেগে থরথর গলা শোনা গেল, ‘তুই ভুল করছিস। আমি পাপী নই। আমি কোনও পাপ করিনি।’
‘পূর্ণিমার রাতে তুমি কী করো জাঙ্গিকুলের সবাইকে আমি জানিয়ে দেব। রাস্তা-ঘাটে লোকে তোমাকে দেখলে “ছি-ছি” করবে, তোমার গায়ে থুতু দেবে। সুইসাইড করা ছাড়া তোমার আর কোনও পথ নেই...।’
রিসিভার নামিয়ে রাখল চিকু। ওর বুকের ভেতর টিপটিপ করে শব্দ হচ্ছিল। বড়-বড় নিঃশ্বাস পড়ছিল। আবার কাল সকালে ও স্যারকে ফোন করবে।
কিন্তু এভাবে ফোন করলে কি কাজ হবে? স্যার কি পুলিশের কাছে নিজের দোষ স্বীকার করবেন? তা ছাড়া এ রকম ভয়ঙ্কর অলৌকিক ঘটনা পুলিশ কি বিশ্বাস করবে?
এইসব নানান কথা ভাবতে-ভাবতে স্কুলের জন্য তৈরি হতে লাগল চিকু। আজ জনতা কেবিনের সামনে প্রিয়াংকার সঙ্গে ও দেখা করবে। বলবে, টেলিফোনে স্যারের সঙ্গে ওর কী ধরনের কথাবার্তা হয়েছে। তা হলে প্রিয়াংকার ফোন করার কাজে খানিকটা সুবিধে হতে পারে।
সাইকেল নিয়ে স্কুলে যাওয়ার পথে দেশপ্রিয় সুইটস-এর কাছে রোহনকে দেখতে পেল চিকু—সঙ্গে দু-চারজন বন্ধুবান্ধব দাঁড়িয়ে আছে। চিকু রোহনের কাছে গিয়ে সাইকেল থামাল।
‘রোহনদা, তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে—’ উত্তরে রোহন পকেট থেকে রুদ্রাক্ষের একটা দানা বের করল: ‘এই বিষয়ে?’
মাথা নাড়ল চিকু : ‘হ্যাঁ।’
‘এখন বলবি?’
‘না, স্কুলের দেরি হয়ে যাবে। সন্ধেবেলা তোমার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলব।’
সাইকেল চালিয়ে বেরিয়ে গেল চিকু।
সন্ধেবেলা ওর কাছে সব কথা শুনে রোহন একেবারে তাজ্জব হয়ে গেল। ও আপনমনেই বলল, ‘এ-কথা তো কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না!’
‘হ্যাঁ—প্রিয়াংকাও তাই বলছিল। বলছিল, প্রমাণ চাই।’ দেশপ্রিয় সুইটস-এর কাছে একটা শিরীষ গাছের পাশে দাঁড়িয়ে রোহন আর চিকু কথা বলছিল। বিকেলের দিকে একটা কালবৈশাখী হয়ে দু-পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। তাই রাস্তায় কাদা আর জল। স্কুটার বা গাড়ি গেলে কাদা-জল ছিটকে আসছে। তাই পথচারীরা এবড়োখেবড়ো রাস্তার পাশ ঘেঁষে হাঁটছে।
রাস্তার দিকে চোখ রেখে চিন্তা করতে-করতে রোহন বলল, ‘হু প্রমাণ চাই। রুদ্রাক্ষের মালা আর মুখের পোড়া দাগ তো ঠিক প্রমাণ নয়...।’
‘সেইজন্যেই তো আমি আর প্রিয়াংকা উড়ো ফোন করে স্যারকে কনফেস করতে বলছি!’
‘তাতে কী লাভ! ধর ফোনে হরিহরবাবু সব স্বীকার করলেন—তাতে তো আর ওঁকে অ্যারেস্ট করা যাচ্ছে না! যুক্তি-বুদ্ধির বাইরে এরকম আজগুবি ব্যাপার কে বিশ্বাস করবে!’
‘কেন, লাস্ট পূর্ণিমার রাতে সেই অমানুষটার ফেরোশাস গর্জন অনেকেই তো শুনেছিল!’
‘শোনা এক জিনিস, আর চোখে দেখা এক জিনিস...’ রোহন আনমনাভাবে বলল।
রোহনের কথাটা চিকুর মনে বারবার প্রতিধ্বনি তুলতে লাগল। শোনা এক জিনিস, আর চোখে দেখা এক জিনিস...শোনা এক জিনিস, আর...।
কিছুক্ষণ পর চিকু বলল, ‘টেলিফোনে কাজটা ক’দিন চালিয়ে যাই...দেখি, মাথায় আর কোনও আইডিয়া আসে কি না। তুমিও ব্যাপারটা নিয়ে একটু ভেবে দ্যাখো...তবে এখনই কাউকে কিছু বলার দরকার নেই, কী বলো?’
‘মাথা খারাপ! তুই তোর অপারেশান চালিয়ে যা। কোনও আইডিয়া এলে আমাকে বলিস।’
রোহনের কথায় ঘাড় নেড়ে বাড়ির দিকে ফিরে চলল চিকু। প্রমাণ চাই—প্রমাণ।
রাতে বিছানায় শুয়ে চিকু ছটফট করতে লাগল। কিছুতেই ওর ঘুম আসছিল না। ওর ভয় হচ্ছিল যে, ঘুমিয়ে পড়লেই ও হয়তো হরিহরবাবুকে স্বপ্নে দেখবে। দেখবে সৌম্যকান্তি মানুষটা ধীরে-ধীরে কীভাবে বদলে যাচ্ছে অমানুষে। তারপর এগিয়ে আসছে চিকুর দিকে। সামনে দুটো হাত বাড়ানো। সেই হাতের দশ আঙুলে লম্বা-লম্বা বাঁকানো নখ।
চিকু টের পাচ্ছিল, প্রিয়াংকা ওকে হাত ধরে প্রাণপণে টানছে আর চিৎকার করছে, ‘পালাও, চিকু, পালাও!’
চিকুর ঘুম ভেঙে গেল। নানান কথা ভাবতে ভাবতে কখন ওর তন্দ্রা মতন এসে গিয়েছিল কে জানে! প্রিয়াংকার কথা মনে পড়ল ওর। রাত আটটা নাগাদ প্রিয়াংকাকে ও ফোন করেছিল। তখনই প্রিয়াংকা ওর উড়ো ফোনের কথাবার্তা চিকুকে জানিয়েছে। কথাগুলো চিকুর মনে ভেসে উঠল আবার।
ও-প্রান্তে ফোন বেজে উঠতেই হরিহরবাবুর স্ত্রী ফোন ধরেছেন। ‘হ্যালো।’
‘স্যার আছেন?’ প্রিয়াংকা স্বাভাবিক গলায় জিগ্যেস করেছে। ‘ধরো—দেখছি...।’
একটু পরেই ফোন ধরে স্যার ‘হ্যালো’ বলতেই প্রিয়াংকা চিকুর পরামর্শ মতো বলে উঠেছে, ‘ “অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে / তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।” ’
‘কে? কে কথা বলছ?’ হতচকিত হয়ে হরিহরবাবু জিগ্যেস করলেন।
ফিসফিস করে প্রিয়াংকা বলল, ‘সামনের পূর্ণিমায় তুমি বাড়ি ছেড়ে বেরোবে না। বেরোলেই তোমাকে খতম করে দেওয়া হবে।’
‘আমি...আমি...আমার কোনও দোষ নেই। এটা...এটা...আমার অসুখ। অসুখের ওপর আমার কোনও হাত নেই...।’
‘তুমি শিক্ষকদের কলঙ্ক। জাঙ্গিকুলের কলঙ্ক...।’
‘না-না, না, আমি কোনও অন্যায় করিনি...কোনও পাপ করিনি। আমার আত্মা পবিত্র।’
‘তোমার আত্মা বলে কিছু নেই। তুমি প্রেতাত্মা।’
হরিহরবাবু ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বললেন, ‘বিশ্বাস করো, আমার কোনও দোষ নেই! একটা শয়তান ছল করে আমাকে দিয়ে কীসব করিয়ে নেয়। আমার তখন জ্ঞান থাকে না।’
‘আর কাউকে খুন করার চেয়ে নিজেকে খুন করা অনেক সহজ। তোমার সুইসাইড করা উচিত...তোমার সুইসাইড করা উচিত...।’
‘তুমি কে?’ আচমকা প্রশ্ন করলেন হরিহরবাবু। তাঁর গলার স্বর দিব্যি স্পষ্ট। কান্নার কোনও ছোঁওয়া সেখানে নেই।
তা হলে কি স্যার এতক্ষণ অভিনয় করছিলেন? প্রিয়াংকা মনে মনে ভাবল।
‘তুমি কে? চিকুর বন্ধু?’ কিছুক্ষণ ও-প্রান্ত চুপচাপ। তারপর : ‘তুমি কি প্রিয়াংকা?’ সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়াংকা ভয় পেয়ে রিসিভার নামিয়ে রেখেছে। ওর হাত থরথর করে কাঁপছিল।
সত্যিই কি এটা স্যারের অসুখ? চিকু নিজেকে যেন প্রশ্ন করল।
এই অসুখের ওপরে কি স্যারের কোনও হাত নেই? সত্যিই কি একটা শয়তান ছল করে স্যারকে দিয়ে প্রতি পূর্ণিমায় জঘন্য কাজ করিয়ে নেয়?
এইসব ভাবতে-ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল চিকু।
কিন্তু পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই চিন্তাগুলো আবার চিকুর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
একইসঙ্গে ওর মনে পড়ে গেল, স্যারকে আবার ফোন করতে হবে।
হরিহরবাবুর কাছ থেকে নেমন্তন্নটা এল একেবারে আচমকা। এরকম ভয়ঙ্কর নেমন্তন্ন চিকু জীবনে কখনও পায়নি। পূর্ণিমার রাতে স্যার ওকে বাড়িতে আসতে বললেন। সঙ্গে প্রিয়াংকাকেও নিয়ে আসতে বললেন।
উড়ো টেলিফোনের ব্যাপারটা তিন-চারদিন চলার পরই নেমন্তন্নটা পেল চিকু।
রোজকার মতো সেদিন সকালে স্যারের বাড়িতে ফোন করেছিল চিকু। রিং বেজে ওঠামাত্র স্যার নিজেই ফোন ধরলেন।
‘হ্যালো, চিকু?’
চিকুর মনে হল, স্যার বোধহয় ওর টেলিফোনের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। চিকু ফিসফিসে গলায় বলল, ‘সামনের পূর্ণিমায় কোনও মানুষ যেন খুন না হয়।’
‘না, না, আর কেউ খুন হবে না, আর কেউ খুন হবে না।’
স্যারকে বাধা দিয়ে চিকু বলল, ‘কিন্তু একটা সুইসাইড যেন হয়।’
‘সুইসাইড!’
‘হ্যাঁ। একটা নরপিশাচ যেন আত্মহত্যা করে। এ-আত্মহত্যায় কোনও পাপ নেই।’
টেলিফোনের ও-প্রান্তে হরিহরবাবু ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তারপর কান্না-ভাঙা গলায় বললেন, ‘নিজেকে খুন করতে আমি পারব না। তা হলে তোদের কাকিমাকে কে দেখবে! ওকেও হয়তো আমার সঙ্গে সহমরণে যেতে হবে। আর সেটা তো সম্ভব নয়! এটা যে কী কষ্ট তা তুই বুঝবি না। এ-অসুখের জ্বালা আমাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মারছে...।’
চিকু স্যারের কান্নায় নরম হল না। কোথা থেকে যেন এক দুর্জয় সাহস ওর ভেতরে তৈরি হয়ে যাচ্ছিল। ও বলল, ‘যাদের তুমি খুন করেছ তাদের আত্মীয়স্বজন তোমার চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট পাচ্ছে। তোমাকে আত্মহত্যা করতেই হবে!’
‘চিকু, চিকু—শোন—শোন—।’
‘কী?’
‘সামনের গুরুপূর্ণিমায় তুই আমার বাড়িতে আয়। তোকে সব খুলে বলব। তখন তুই আমার অসুখের ব্যাপারটা বুঝতে পারবি...।’
আগামী পূর্ণিমায় স্যার ওঁর বাড়িতে যেতে বলছেন! চিকু বেশ অবাক হল। তা হলে কি সামনের পূর্ণিমায় কেউ খুন হওয়ার ভয় নেই?
‘...সন্ধের পর তুই আসিস...’ স্যার তখনও কথা বলে যাচ্ছিলেন, ‘...আর প্রিয়াংকাকেও সঙ্গে নিয়ে আসিস...।’
কেন, প্রিয়াংকা কেন!
প্রিয়াংকার নাম শুনে চিকু যেন ইলেকট্রিক শক খেল। স্যার কি তা হলে ওদের দুজনের গলাই ধরে ফেলেছেন।
সুতরাং আর লুকোচুরি করে কোনও লাভ নেই। তাই চিকু এবার স্বাভাবিক গলায় কথা বলল, ‘প্রিয়াংকাকে সঙ্গে নিয়ে আসব কেন?’
উত্তরে স্যার হাসলেন : ‘তুই সেদিন সন্ধেবেলায় আমার সঙ্গে যখন তুমুল তর্ক জুড়ে দিয়েছিলি, প্রিয়াংকা তখন তোর সঙ্গে ছিল। ওর মনে হয়তো নানারকম কৌতূহল হচ্ছে। হয়তো তোরই মতো ও আমাকে শয়তান, পিশাচ, কিংবা অমানুষ বলে ভাবছে। আর তুই তো জানিস, তোরা দুজন আমার সবচেয়ে প্রিয় স্টুডেন্ট। তোদের মনে কোনও ব্যথা দিতে আমি চাই না।’
চিকু কেমন যেন দোটানায় পড়ে গেল। ওর চিন্তাগুলো মনের ভেতরে তালগোল পাকিয়ে যেতে লাগল।
হরিহরবাবু একটানা কথা বলে যাচ্ছিলেন। ওঁর কথায় সাপ-খেলানো বাঁশির মতো সুর। সেই সুর চেতনাকে অবশ করে দিতে চাইছে। চিকুর মাথা ঝিমঝিম করছিল।
‘...চোখের সামনে যদি সব দেখিস, তবে তোরা ব্যাপারটা তলিয়ে বুঝতে পারবি। বুঝতে পারবি, আমার আসলে কোনও দোষ নেই। সবই নিয়তি...।’
শেষ পর্যন্ত চিকু রাজি হল। কারণ, জলজ্যান্ত প্রমাণ চাইলে এ ছাড়া আর কোনও পথ নেই। তবে রোহনদাকে ও সঙ্গে নিয়ে যাবে। যদি সত্যি-সত্যি কোনও বিপদ হয় তা হলে রোহনদা বাঁচাবে। সুতরাং, রোহনকে নেমন্তন্নের খবরটা জানাল চিকু।
‘কী করি বলো তো, রোহনদা? যাব?’
‘নিশ্চয়ই যাবি! তা না হলে কেসটা প্রমাণ হবে কী করে!’
‘যদি স্যারের বাড়িতে সাঙ্ঘাতিক কিছু হয়?’
খদ্দরের পাঞ্জাবির তলায় হাত ঢোকাল রোহন। তারপর একটা দোনলা-শাটগান বের করে চিকুকে দেখাল : ‘এই দ্যাখ, নলকাটা দোনলা মেশিন। দেশি, তবে কাজে বিদেশিকে টেক্কা দেবে। কিছুদিন ধরে শুনছিস না, পাশের নলডাঙ্গায় খুব ডাকাতি হচ্ছে! তাই গত মাসে এটা কিনেছি। এটা কাছ থেকে ফায়ার করলে বডি ফুটো করে একজোড়া গুলি বেরিয়ে যাবে।’ চিকুর কাঁধে হাত রাখল রোহন। মন-কেমন-করা গলায় বলল, ‘তুই, প্রিয়াংকা, তোরা পড়াশোনায় এ ক্লাস। আমাদের দেশের ফিউচার। আর আমার কাজ কী জানিস? যে শয়তানের বাচ্চারা তোদের মতো ব্রাইট ছেলেমেয়েদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে, তাদের খতম করা। হয় জানে, নয় মানে, খতম করে দেব।’ শটগানটা উঁচিয়ে ধরল রোহন, আকাশের চাঁদের দিকে তাকাল : ‘তোর কোনও ভয় নেই। চাঁদটা পুরোপুরি গোল হতে দে, তারপর দেখবি...জাঙ্গিকুলের সব গোলমাল ভসকে দেব।’
চিকু অবাক হয়ে রোহনকে দেখছিল। বিশুদার দোকানের বালবের আলোয় রোহনের চোখ চকচক করছিল। মন্দকে খতম করার জন্যই ও মন্দ হয়েছে।
পূর্ণিমার দিন কীভাবে ওরা যাবে, কখন যাবে, সেসব চাপা গলায় আলোচনা করে নিল রোহন আর চিকু। চিকু বলল, প্রিয়াংকার সঙ্গে ও এ-ব্যাপারে কথা বলে নেবে। তারপর ওরা পূর্ণিমার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
পূর্ণিমার তখনও ষোলো দিন বাকি ছিল। চিকুরা ষোলো, পনেরো, চোদ্দো করে দিন গুনতে লাগল।
পূর্ণিমা এসে পড়ার দু-চারদিন আগেই বর্ষা জাঙ্গিকুলে উকিঝুঁকি মারতে শুরু করল। জলাপুকুরের জল বেড়ে উঠল। আগাছার ঝোপঝাড়গুলো প্রকৃতির আশকারা পেয়ে আবার মাথাচাড়া দিতে লাগল। পথঘাটে খানাখন্দে ঘোলা জল জমতে লাগল।
বর্ষার সময় সবুজ গাছপালা থেকে এক অদ্ভুত গন্ধ পায় চিকু। সেই গন্ধে আকাশ-বাতাস ছেয়ে গেল। বাঁশপাতি, কাঠঠোকরা, বুলবুলি, মাছরাঙা পাখিগুলো ঝকঝকে রং নিয়ে এখানে-সেখানে উড়ে বেড়াতে লাগল।
গুরুপূর্ণিমার দিন সন্ধে সাতটা নাগাদ চিকু আর প্রিয়াংকা যখন সাইকেল চালিয়ে হরিহরবাবুর বাড়িতে এসে পৌঁছল, তখন বেশ বৃষ্টি পড়ছে। আশপাশ থেকে ব্যাঙের গ্যাঙোর-গ্যাঙ ডাক কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে।
গ্রিলের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল চিকু আর প্রিয়াংকা। সাইকেল দুটো একপাশে দাঁড় করিয়ে রেখে ওরা ছাতা মাথায় দিয়ে বাড়ির দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর পিছন ফিরে রাস্তার দিকে তাকাল।
একে বৃষ্টি, তার ওপরে রাস্তার আলো টিমটিম করে জ্বলছে। তা সত্ত্বেও ওরা রোহন আর ছোটকুকে দেখতে পেল। একটা আমগাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে ওদের দিকে হাত নাড়ল। তারপর তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে হরিহরবাবুর বাড়ির কাছে চলে এল। ভেতরে ঢুকে পড়ল। রোহন একটা বর্ষাতি পরে এসেছে। আর ছোটকুর মাথায় নীল রঙের পলিথিন শিটের ঘোমটা। তার ওপরে বৃষ্টি পড়ে চড়বড় চড়বড় শব্দ হচ্ছে।
রোহনের ইশারায় ছোটকু সুপুরিগাছের নিচে গিয়ে দাঁড়াল। চিকু আর প্রিয়াংকার খুব কাছে এসে রোহন চাপা গলায় বলল, ‘তোরা ভেতরে যা। আমি আর ছোটকু দরজার কাছেই আছি। কান পেতে সব শোনার চেষ্টা করছি। কেস ডেঞ্জারাস হয়ে উঠলেই আমাকে ডাকবি—।’
কথাগুলো বলে রোহন আর ছোটকু আড়ালে সরে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে চিকু কলিংবেল বাজাল।
কাকিমা এসে দরজা খুলে দিলেন। স্নেহের গলায় বললেন, ‘ইস! অনেকটা ভিজে গেছ দেখছি! ভেতরে চলো, তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে নেবে।’
কাকিমার পিছন পিছন ওরা দুজনে পড়ার ঘরে গিয়ে ঢুকল। আর ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই ভয়ে পাথর হয়ে গেল।
হরিহরবাবু মেঝেতে বেশ আয়েস করে বসে আছেন। খুব ধীরে-ধীরে পান চিবোচ্ছেন। চোখে শান্ত নিশ্চিন্ত দৃষ্টি। যেন শিকার খুব কাছাকাছি, একেবারে আওতার মধ্যে চলে এসেছে।
স্যারকে দেখামাত্রই চিকু আর প্রিয়াংকার সব সাহস উবে গেল। সাঙ্ঘাতিকভাবে মনে পড়ে গেল, আজ পূর্ণিমা—যদিও আকাশে মেঘ থাকায় চাঁদ চোখে পড়েনি। তাতে হরিহরবাবুর কি কোনও অসুবিধে হবে? বোধহয় না। আকাশে গোল চাঁদ কোথাও একটা থাকলেই হল। তা হলেই অমানুষিক অসুখটা মাথাচাড়া দিতে পারবে।
ওর দুজনে কুলকুল করে ঘামছিল আর ফ্যালফেলে চোখে হরিহরবাবুর দিকে তাকিয়ে ছিল।
‘আয়, আয়—বোস।’ একগাল হেসে সাদর আমন্ত্রণ জানালেন হরিহরবাবু, ‘বসে একটু জিরিয়ে নে। তারপর সব বলছি। তোরা যা-যা জানতে চাস, জিগ্যেস করবি, আমি তোদের সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেব।’
শতরঞ্চি পাতাই ছিল। ওরা স্যারের কাছ থেকে একটু দূরত্ব রেখে জড়োসড়ো হয়ে বসল। কাকিমা একটা তোয়ালে নিয়ে ঘরে এসে ঢুকলেন : ‘এই নাও, এটা দিয়ে গা-মাথা একটু মুছে না—ও’ তোয়ালেটা প্রিয়াংকার হাতে দিলেন কাকিমা, আড়চোখে একবার স্বামীর দিকে দেখলেন : ‘আজ আর কেউ পড়তে আসবে না?’
‘না। আজ ওদের দুজনকে স্পেশাল ক্লাস করাব বলে ডেকেছি।’
কাকিমা বললেন, ‘তোমরা পড়ো। আমি পেঁয়াজি আর বেগুনি ভাজছি—খেয়ে যাবে।’
কাকিমা আড়ালে চলে যেতেই হরিহরবাবু নড়েচড়ে বসলেন। বললেন, ‘তোদের আজ খোলাখুলি সব বলব। আমার একটা মারাত্মক অসুখ হয়েছে। এমন অসুখ যে, সবাইকে এটার কথা খোলাখুলি বলা যায় না। তা সত্ত্বেও আমি অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি। তাঁদেরকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে অসুখটার আভাস দিয়েছি। তাঁরা ওষুধ দিয়েছেন...কিন্তু সেসব ওষুধে কোনও কাজ হয়নি...।’
চিকু আর প্রিয়াংকা দম বন্ধ করে শুনছিল। ওদের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
বাইরে থেকে বৃষ্টির শব্দ ভেসে আসছিল। সেই সঙ্গে ব্যাঙের ডাকও। সিলিং ফ্যানের হাওয়ায় চিকুর কেমন শীত-শীত করছিল।
আনমনা চোখে একটা বন্ধ জানলার দিকে তাকিয়ে হরিহরবাবু বলে চললেন, ‘অসুখটা আমার আগে ছিল না। গতবছর পুজোর সময় আমি আর তোদের কাকিমা—আমরা দুজনে মিলে হিমাচল প্রদেশে বেড়াতে গিয়েছিলাম। কুলু-মানালি ওইসব আর কী! সেখানে একদিন এক পাহাড়ি পথে একজন ট্রাইবালের সঙ্গে—মানে, উপজাতির লোকের সঙ্গে—আমাদের আলাপ হয়। লোকটা পথের ধারে একটা ছোট্ট ঝুপড়িতে বসে উলকি কাটার কাজ করছিল। আমি আর তোদের কাকিমা সেখানে দাঁড়িয়ে লোকটির কাজ দেখছিলাম। লোকটা ভাঙা-ভাঙা হিন্দিতে আমাকে বলল, “বাবুজি, আপনারা উলকি কেটে গায়ে ছবি এঁকে নিন। আমার কাছে নানান ধরনের ছবি আছে। এমন ছবিও আছে যার মধ্যে অনেক ক্ষমতা আছে—মানুষকে তেজি করে দেয়। সব মুশকিল আসান করে দেয়। এইসব উলকি মন্ত্র-তন্ত্র করে আঁকতে হয়। মাত্র একশো টাকা দিলেই এঁকে দেব।”
‘কী যে হল আমাদের! লোকটার কথায় রাজি হয়ে গেলাম।’ কথা বলতে-বলতে পাঞ্জাবির বোতামগুলো খুলে ফেললেন হরিহরবাবু। ওটার গলার কাছটা ধরে বাঁদিকে টেনে নামলেন।
‘এই দ্যাখ—।’
ঘরের আলোয় স্পষ্ট দেখা গেল, স্যারের বাঁ বাহুতে একটা লোমশ পশুর ছবি আঁকা। পশুটা কেমন যেন কুঁজো হয়ে রয়েছে—যেন এক্ষুনি শিকার লক্ষ্য করে লাফ দেবে।
পাঞ্জাবিটা আবার ঠিকঠাক করে নিলেন স্যার।
‘...তারপর থেকেই আমার ক্লান্তি ক্রমশ কমতে লাগল। সবসময় শরীরের ভেতরে একটা চনমনে ভাব টের পেতে লাগলাম। বিশেষ করে পূর্ণিমার রাতে কিছু একটা করার নেশায় একেবারে খেপে উঠতে লাগলাম। সেইসঙ্গে কেমন জ্বর-জ্বর লাগত।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ নিচু করলেন হরিহরবাবু : ‘বেশ মনে আছে, গত ডিসেম্বরের পূর্ণিমায় আমি প্রথম খুন করেছি। না, না, মানুষ নয়—একটা ছাগলকে মেরেছিলাম। তারপর...ধীরে-ধীরে অসুখের তেজটা বাড়তে লাগল। আর...আর...গত ফেব্রুয়ারিতে প্রথম একজন ভবঘুরে ভিখিরিকে খুন করলাম।
‘তোরা হয়তো বলবি আমি মহাপাতক, পাপী। কিন্তু আমি বলব, আমি নির্দোষ। আমার একটা অসুখ হয়েছে—যে-অসুখটা ডাক্তাররা সারাতে পারছে না। তোরা আমাকে ভুল বুঝিস না। মাঝে-মাঝে মনে হয় আমি অপরাধী। মনে হয়, আত্মহত্যা করে এই নোংরা জীবনটাকে শেষ করে দিই। কিন্তু তারপরই আবার মনে হয়, আমার তো কোনও দোষ নেই।’ মুখ তুললেন হরিহরবাবু। ওঁর চোখে জল। কান্না-ধরা গলায় তিনি বললেন, ‘আসলে এই অসুখটা আমার নিয়তি...।’
কথা বলতে-বলতে হরিহরবাবুর গলাটা কর্কশ হয়ে যাচ্ছিল।
‘...আমার ভবিতব্য...আমার নিয়তি...তোদেরও বোধহয় নিয়তি...।’ তারপরই সব অর্থহীন কর্কশ জড়ানো শব্দ বেরিয়ে আসতে লাগল ওঁর মুখ দিয়ে। এবং ভয়ঙ্কর পরিবর্তনটা শুরু হয়ে গেল।
চিকু আর প্রিয়াংকা এত ভয় পেয়ে গেল যে, ভয় বোধটাই ওদের মন থেকে উবে গেল। ওরা হাঁ করে স্যারের পালটে যাওয়া দেখতে লাগল। যেন মুগ্ধ হয়ে কোনও হরার সিনেমা দেখছে।
স্যারের দেহটা ফুলতে লাগল। চোয়াল লম্বা হয়ে গেল। ঠোঁট ফাঁক হয়ে পান-চিবোনো ছিবড়ে বেরিয়ে এল। দাঁতগুলো হয়ে গেল ধারালো আর লম্বা।
ফুলে ওঠা শরীরের চাপে পাঞ্জাবি ফেটে গিয়ে কাপড়ের টুকরোগুলো এখান ওখান থেকে ঝুলে রয়েছে। সিলিং ফ্যানের হাওয়ায় সেগুলো পতাকার মতো উড়ছে।
বর্ষায় আগাছা গজিয়ে ওঠার মতো স্যারের সারা শরীরে বড়-বড় লোম গজিয়ে উঠল। হাত-পায়ের নখগুলো মাপে লম্বা হয়ে বাঁকানো ছুরির ফলা হয়ে গেল।
চোখের সামনে হরিহরবাবু মানুষ থেকে অমানুষ হয়ে গেলেন। প্রিয়াংকা ভয়ে থরথর করে কাপতে কাপতে উঠে দাঁড়াল। চিকুর হাত ধরে প্রচণ্ড এক টান মারল।
চিকু অনেকক্ষণ ধরে একটা চিৎকার খুঁজে বেড়াচ্ছিল। স্বপ্নের মধ্যে যেমন দৌড়তে চাইলেও দৌড়নো যায় না, এই মুহূর্তে চিৎকারটাও চিকুকে নিয়ে সেইরকম খেলা খেলছিল।
ভয়ঙ্কর অমানুষটা উঠে দাঁড়িয়ে সজোরে মাথা ঝাকাল। লালা ছিটকে পড়ল ওটার মুখ থেকে। তারপর চাপা গর্জন করে চিকুদের দিকে এক পা এগিয়ে এল। কোমরের কাছে ধুতিটা এলোমেলোভাবে জড়িয়ে থাকায় প্রাণীটাকে ভারি অদ্ভুত দেখাচ্ছিল।
হঠাৎই চিকুকে অবাক করে দিয়ে প্রিয়াংকা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। যে-প্রমাণ ওরা এতদিন ধরে খুঁজছিল, সেই প্রমাণ এখন ওদের চোখের সামনে। কী ভয়ঙ্কর প্রমাণ!
‘...চোখের সামনে যদি সব দেখিস তবে তোরা ব্যাপারটা তলিয়ে বুঝতে পারবি। বুঝতে পারবি আমার আসলে কোনও দোষ নেই। সবই নিয়তি...।’ টেলিফোনে শোনা স্যারের কথাগুলো মনে পড়ে গেল চিকুর।
এই অমানুষটাকেই ও জলাপুকুর থেকে শ্যাওলা আর কচুরিপানা মাথায় নিয়ে উঠে আসতে দেখেছিল।
অমানুষটা এক হিংস্র গর্জন করে উঠল।
আর সঙ্গে-সঙ্গে বাইরে কড় কড় কড়াৎ করে বাজ পড়ার শব্দ হল।
তারপরই চিকুরা শুনতে পেল দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কার আওয়াজ। কাকিমা ভেতর থেকে পড়িমরি করে ছুটে এলেন পড়ার ঘরে।
অমানুষটার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকালেন। সঙ্গে-সঙ্গে বাইরের দরজার ছিটকিনি ভাঙার আওয়াজ শোনা গেল।
হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল রোহন আর ছোটকু। ওদের সারা শরীর জলে ভেজা। বড় বড় শ্বাস ফেলে হাঁফাচ্ছে। ওদের গায়ে বর্ষাতি বা পলিথিন শিট নেই। বোধহয় বাইরে কোথাও খুলে এসেছে।
ওদের দেখেই কাকিমার মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
কোনওরকমে তিনি বললেন, ‘কে—কে তোমরা?’
উত্তরে রোহন শটগানটা বের করে উঁচিয়ে ধরল।
চিকু আর প্রিয়াংকা তখন ঘরের এক কোণে দেওয়ালে মিশে যেতে চাইছে। এ ওকে আঁকড়ে ধরে থরথর করে কাঁপছে।
বিশাল চেহারার অমানুষটার ছায়া ঘরটাকে অন্ধকার করে দিয়েছে। ওটার হলদেটে সবুজ চোখ রেডিয়াম দেওয়া ঘড়ির মতো ধকধক করে জ্বলছে। ওটা কী বুঝল কে জানে। চিকুদের দিক থেকে ঘুরে তাকাল রোহনদের দিকে।
ছোটকুর চোখ যেন ছিটকে বাইরে বেরিয়ে আসবে। ওর মুখ হাঁ করা। সারা শরীর ঠকঠক করে কাঁপছে। কিন্তু রোহনের চোখে ঠান্ডা দৃষ্টি। ও যেন আগে থেকেই জানত এইরকম কিছু একটা হবে। রোহন আর দেরি করল না। প্রাণীটার মুখের দিকে শটগান তাক করে ঠান্ডা বলায় বলল, ‘তোমার আত্মাকে মুক্তি দিলাম।’
তারপর ফায়ার করল।
শব্দটা বদ্ধ ঘরে তেমন জোরালো শোনাল না। তবে দুটো গুলিই প্রাণীটার মুখে গিয়ে লাগল : একটা বাঁ চোখে, একটা কপালে।
এক বুক কাঁপানো গর্জন করে বিশাল অমানুষটা ভূমিকম্পে ধসে পড়া বহুতল বাড়ির মতো মেঝেতে পড়ে গেল। ওটার হাত কিছু একটা আঁকড়ে ধরতে চাইছিল। কাকিমার শাড়ির ভাঁজে ওটার বাঁকানো নখ আটকে গেল। ফলে সেই টানে কাকিমাও পড়ে গেলেন মেঝেতে। ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন।
শটগানে নতুন গুলি ভরে নিল রোহন। তারপর সতর্ক পায়ে প্রাণীটার কাছে এগিয়ে এল।
চিকু আর প্রিয়াংকাও নিজেদের সামলে নিয়ে প্রাণীটার দিকে কৌতূহলের নজরে দেখতে লাগল।
আর কাকিমা সেই ভয়ঙ্কর লোমশ শরীরটাকে আঁকড়ে ধরে বিলাপ শুরু করলেন। সদ্যবিধবার সেই বুকফাটা কান্না পাথরকেও গলিয়ে দিতে পারে।
প্রাণীটার মুখের খানিকটা অংশ শটগানের গুলির দাপটে ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে গেছে। মুখ আর কপাল রক্তে মাখামাখি। সারা শরীর নিথর।
বোঝাই যাচ্ছিল, পূর্ণিমার রাতে জাঙ্গিকুলে আর কখনও কেউ খুন হবে না।
হঠাৎই একটা অবাক কাণ্ড ওদের চোখে পড়ল। প্রাণীটার দেহের লোমগুলো শরীরের মধ্যে ধীরে-ধীরে ঢুকে পড়ছে। বাঁকানো লম্বা নখ আবার ঢুকে যাচ্ছে আঙুলের ভিতরে। দাঁতগুলো ক্রমশ ছোট হয়ে যাওয়ায় ঠোঁটজোড়া টান-টান অবস্থা থেকে ক্রমশ ঢিলে হচ্ছে, আবার ঢেকে দিতে পারছে দাঁতের পাটিকে।
ধীরে ধীরে মৃতদেহটা বদলে গেল। অমানুষ থেকে আবার মানুষ হয়ে গেল।
ওদের চোখের সামনে এখন পড়ে রয়েছে হরিহরবাবুর মৃতদেহ। সেই মৃতদেহ আঁকড়ে ধরে তাঁর বিধবা স্ত্রী হাউহাউ করে কাঁদছেন। চিকু আর প্রিয়াংকা কাছে এগিয়ে গেল। অস্বস্তি হলেও কাকিমাকে ওরা সান্ত্বনা দিতে চাইল।
‘কাকিমা, কাঁদবেন না। স্যারের শরীরে পিশাচ ভর করেছিল। স্যারের আত্মা এবার শান্তি পাবে।’ চিকু নরম গলায় বলল।
উত্তরে কাকিমা স্বামীর মৃতদেহ থেকে মুখ তুললেন। ঘুরে তাকালেন চিকু আর প্রিয়াংকার দিকে।
‘কিন্তু আমাকে শান্তি দেবে কে? আমিও তো হাতে উলকি কেটে ছবি এঁকেছি!’
চিকু অবাক হয়ে দেখল কাকিমার দু-চোখের মণিতে দু-টুকরো লাল আগুন জ্বলছে। আর ঠোঁটের বাইরে বেরিয়ে এসেছে দুটো লম্বা শ্বদন্ত। খলখল করে হেসে কাকিমা উঠে দাঁড়ালেন।
প্রিয়াংকা চিৎকার করে উঠল।
‘আমরা দুজনে বেশ ছিলাম। পিশাচ বর, আর পিশাচ বউ। ও শিকার করে রক্ত খেয়ে আসত। আর আমি ওর শরীর থেকে রক্ত খেতাম। এমনই ছিল আমাদের রক্তের সম্পর্ক। এখন কী হবে! একা-একা আমি বাঁচব কী করে!’
রোহন হতবাক হয়ে গিয়েছিল। চিকু, প্রিয়াংকা, ছোটকুরও একই দশা। এরকম একটা আশ্চর্য ঘটনার জন্য ওরা কেউই তৈরি ছিল না।
কাকিমা আচমকা বনবেড়ালের মতো লাফ দিলেন। ওঁর লক্ষ্য ছিল রোহন। কিন্তু ছোটকু পলকে ছিটকে এসে রোহনকে আগলে দাঁড়াল।
ফলে রাগে শোকে অন্ধ পিশাচী খ্যাঁক করে কামড়ে ধরল ছোটকুর গলা। ওর ধারালো দাঁতে ছোটকুর গলার নলি ছিঁড়ে গেল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল। সেইসঙ্গে চাপা ঘড়ঘড় শব্দ শোনা গেল।
সম্মোহনের ঘোর কাটিয়ে রোহন শটগান তুলে ধরল। ছোটকুর ওপরে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকা কাকিমার ঘাড়ে শটগানের নল ঠেকিয়ে ফায়ার করল।
ছোটকু আর কাকিমা দুজনেই জড়াজড়ি করে খসে পড়ল মেঝেতে। কিন্তু পরমুহূর্তেই ছোটকুর রক্তমাখা দেহ ছেড়ে আহত কেউটের মতো রোহনকে ছোবল মারতে চাইলেন কাকিমা। শরীরটাকে দু-পাক গড়িয়ে ধারালো দাঁতে রোহনের পা কামড়ে ধরলেন।
রোহন যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। সেই চিৎকারে সকলের কানে তালা লেগে গেল।
বাইরে বিকট শব্দে বাজ পড়ল।
আর রোহন অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে করতে শটগানের বাঁট হাতুড়ির মতো বসিয়ে দিল কাকিমার মাথায়।
ও পাগলের মতো চিৎকার করছিল আর রাগে অন্ধ হয়ে শটগানের বাঁট দিয়ে উন্মাদ পিশাচীর মাথাটা থেঁতো করছিল।
একসময় কাকিমার দেহটা অসাড় হয়ে গেল। থেঁতলানো মাথাটা চুলে রক্তে মাখামাখি। আর হরিহরবাবুর মতোই কাকিমার শ্বদন্ত মাপে ছোট হয়ে আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। চোখের মণির লাল বিন্দু দুটোও মিলিয়ে গেল।
রক্তে ভেসে যাওয়া ঘরে তিনটে মৃতদেহ পড়ে রইল।
রোহন ছোটকুর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাঁদছিল। ওর পা থেকে রক্ত বেরোচ্ছিল।
প্রিয়াংকা রোহনের পিঠে হাত রেখে ওকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করছিল। তারপর খেয়াল হতেই একটা রুমাল নিয়ে রোহনের পায়ের কাটা জায়গাটা বাঁধতে লাগল।
চিকু কোনওরকমে টলতে টলতে ভেতরের ঘরের দিকে এগোল। ফোন করে সবাইকে খবর দিতে হবে। ফাঁড়িতেও একটা খবর দেওয়া দরকার।
বাইরে বৃষ্টির তেজ হঠাৎই আরও বেড়ে গেল।
কান-ফাটানো শব্দে বাজ পড়ল আবার।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন