য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ০৬

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

৩০ আগস্ট। আমাদের এ-জাহাজে ডেকের উপরে আর-একটি দোতলা ডেকের মতো আছে। সেটি ছোটো এবং অপেক্ষাকৃত নির্জন। সেইখানেই আমরা আশ্রয় গ্রহণ করলুম।

আমার বন্ধুটি নীরব এবং অন্যমনস্ক। আমিও তদ্রূপ। দূর সমুদ্রতীরের পাহাড়গুলো রৌদ্রে ক্লান্ত এবং ঝাপসা দেখাচ্ছে। একটা মধ্যাহ্নতন্দ্রার ছায়া পড়ে যেন অস্পষ্ট হয়ে এসেছে।

খানিকটা ভাবছি, খানিকটা লিখছি, খানিকটা ছেলেদের খেলা দেখছি। এ-জাহাজে অনেকগুলি ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে আছে; আজকের দিনে যেটুকু চাঞ্চল্য সে কেবল তাদেরই মধ্যে। জুতোমোজা খুলে ফেলে তারা আমাদের ডেকের উপর কমললেবু গড়িয়ে খেলা করছে– তাদের তিনটি দাসী বেঞ্চির উপরে বসে নতমুখে নিস্তব্ধভাবে সেলাই করে যাচ্ছে এবং মাঝে মাঝে কটাক্ষপাতে যাত্রীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে।

বহুদূরে এক-আধটা জাহাজ দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে সমুদ্রে এক-একটা পাহাড় জেগে উঠেছে, অনুর্বর কঠিন কালো দগ্ধ তপ্ত জনশূন্য। অন্যমনস্ক প্রহরীর মতো সমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারা উদাসীনভাবে তাকিয়ে আছে, সামনে দিয়ে কে আসছে কে যাচ্ছে তার প্রতি কিছুমাত্র খেয়াল নেই।

এইরকম করে ক্রমে সূর্যস্তের সময় হল। “কাস্‌ল্‌ অফ ইণ্ডোলেন্স” অর্থাৎ কুঁড়েমির কেল্লা যদি কাকেও বলা যায় সে হচ্ছে জাহাজ। বিশেষত গরম দিনে প্রশন্ত লোহিতসাগরের উপরে। যাত্রীরা সমস্ত বেলা ডেকের উপর আরাম-কেদারায় পড়ে ভ্রূর উপরে টুপি টেনে দিয়ে দিবাস্বপ্নে তলিয়ে রয়েছে। চলবার মধ্যে কেবল জাহাজ চলছে এবং তার দুই পাশের আহত নীল জল নাড়া পেয়ে অলস আপত্তির ক্ষীণ কলস্বরে পাশ কাটিয়ে কোনোমতে একটুখানিমাত্র সরে যাচ্ছে।

সূর্য অস্ত গেল। আকাশ এবং জলের উপর চমৎকার রং দেখা দিয়েছে। সমুদ্রের জলে একটি রেখামাত্র নেই। দিগন্তবিস্তৃত অটুট জলরাশি যৌবনপরিপূর্ণ পরিস্ফুট দেহের মতো একেবারে নিটোল এবং সুডোল। এই অপার অখণ্ড পরিপূর্ণতা আকাশের এক প্রান্ত থেকে আর-এক প্রান্ত পর্যন্ত থমথম করছে। বৃহৎ সমুদ্র হঠাৎ যেন একটা জায়গায় এসে থেমেছে যার ঊর্ধ্বে আর গতি নেই, পরিবর্তন নেই; যা অনন্তকাল অবিশ্রাম চাঞ্চল্যের পরম পরিণতি, চরম নির্বাণ। সূর্যাস্তের সময় চিল আকাশের নীলিমার যে একটি সর্বোচ্চ সীমার কাছে গিয়ে সমস্ত বৃহৎ পাখা সমতলরেখায় বিস্তৃত করে দিয়ে হঠাৎ গতি বন্ধ করে দেয়, চিরচঞ্চল সমুদ্র ঠিক যেন সহসা সেইরকম একটা পরম প্রশান্তির শেষ সীমায় এসে ক্ষণেকের জন্যে পশ্চিম অস্তাচলের দিকে মুখ তুলে একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে আছে। জলের যে বর্ণবিকাশ হয়েছে সে আকাশের ছায়া, কি সমুদ্রের আলো ঠিক বলা যায় না। যেন একটা মাহেন্দ্রক্ষণে আকাশের নীরব নির্নিমেষ নীল নেত্রের দৃষ্টিপাতে হঠাৎ সমুদ্রের অতলস্পর্শ গভীরতার মধ্যে থেকে একটা আকস্মিক প্রতিভার দীপ্তি স্ফূর্তি পেয়ে তাকে অপূর্ব মহিমান্বিত করে তুলেছে।

সন্ধ্যা হয়ে এল। ঢং ঢং ঢং ঢং ঘণ্টা বাজল। সকলে বেশভূষা পরিবর্তন করে সান্ধ্যভোজনের জন্যে সুসজ্জিত হতে গেল। আধঘণ্টা পরে আবার ঘণ্টা। নরনারীগণ দলে দলে ভোজনশালায় প্রবেশ করলে। আমরা তিন বাঙালি একটি স্বতন্ত্র ছোটো টেবিল অধিকার করে বসলুম। আমাদের সামনে আর-একটি টেবিলে দুটি মেয়ে একটি উপাসক-সম্প্রদায়ের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে খেতে বসেছেন।

চেয়ে দেখলুম তাঁদের মধ্যে একটি যুবতী আপনার যৌবনশ্রী বহুলপরিমাণে উদ্‌ঘাটিত করে দিয়ে সহাস্যমুখে আহার এবং আলাপে নিযুক্ত। তাঁর শুভ্র সুগোল সুচিক্কণ গ্রীবাবক্ষবাহুর উপর সমস্ত বিদ্যুৎ-প্রদীপের অনিমেষ আলো এবং পুরুষমণ্ডলীর বিস্মিত সকৌতুক দৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছিল। একটা অনাবৃত আলোকশিখা দেখে দৃষ্টিগুলো যেন কালো কালো পতঙ্গের মতো চারিদিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে লম্ফ দিয়ে পড়ছে। এমন কি, অনেকে মুখ ফিরিয়ে ফিরিয়ে তাকে নিরীক্ষণ করছে এবং তাই নিয়ে ঘরের সর্বত্র একটা চাপা হাসির চাঞ্চল্য উঠেছে। অনেকেই সেই যুবতীর পরিচ্ছদটিকে “ইন্ডেকোরাস” বলে উল্লেখ করছে। কিন্তু আমাদের মতো বিদেশী লোকের পক্ষে তার বেআব্রু বেআদবিটা বোঝা একটু শক্ত। কারণ, নৃত্যশালায় এ-রকম কিংবা এর চেয়ে অনাবৃত বেশে গেলে কারো বিস্ময় উদ্রেক করে না।

কিন্তু বিদেশের সমাজনীতি সম্বন্ধে বেশি উৎসাহের সঙ্গে কিছু বলা ভালো নয়। আমাদের দেশে বাসরঘরে এবং কোনো কোনো বিশেষ উপলক্ষ্যে মেয়েরা যেমন অবাধে লজ্জাহী্‌তা প্রকাশ করে, অন্য কোনো সভায় তেমন করলে সাধারণের কাছে দূষ্য হত সন্দেহ নেই। সমাজে যেমন নিয়মের বাঁধাবাঁধি, তেমনি মাঝে মাঝে দুটো-একটা ছুটিও থাকে।

সকল অধ্যায়
১.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ০১
২.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ০২
৩.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ০৩
৪.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ০৪
৫.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ০৫
৬.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ০৬
৭.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ০৭
৮.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ০৮
৯.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ০৯
১০.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ১০
১১.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ১১
১২.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ১২
১৩.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ১৩
১৪.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ১৪
১৫.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ১৫
১৬.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ১৬
১৭.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ১৭
১৮.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ১৮
১৯.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ১৯
২০.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ২০
২১.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ২১
২২.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ২২
২৩.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ২৩
২৪.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ২৪
২৫.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ২৫
২৬.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ২৬
২৭.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ২৭
২৮.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ২৮
২৯.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ২৯
৩০.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৩০
৩১.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৩১
৩২.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৩২
৩৩.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৩৩
৩৪.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৩৪
৩৫.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৩৫
৩৬.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৩৬
৩৭.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৩৭
৩৮.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৩৮
৩৯.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৩৯
৪০.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৪০
৪১.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৪১
৪২.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৪২
৪৩.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৪৩
৪৪.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৪৪
৪৫.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৪৫
৪৬.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৪৬
৪৭.
য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি – ৪৭

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%