অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

অনেক, অনেকটা সময় কেটে গেছে। কবে যে শেষ খেয়েছে, তাই খেয়াল নেই ছেলেটার। আরও তো অনেকে ছিল ওর দলে, কোথায় গেল তারা! শুধু মনে পড়ে দলের বুড়ো লোকটা ওকে ঘুম থেকে ঠেলে উঠিয়ে বলেছিল,—দানব জেগে উঠেছে, পালাতে হবে—যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালাতে হবে।
বলে দূরের পাহাড়টার দিকে দেখিয়েছিল। রেগে গেলে ওর মুখ থেকে আগুন বেরোয়।
সত্যিই তাই। ওই মুখ থেকে বেরোনো আগুনের লেলিহান শিখায় সারা আকাশ তখন লাল। বুড়ো মাথা নেড়ে বলেছিল,—আমরা কেউ বাঁচব না। দানব খেপে উঠেছে।
দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করেছিল ছেলেটা। উপায়ও ছিল না। ওর দিকে তেড়ে আসছিল টকটকে লাল জ্বলন্ত তরল। নীচের মাটি পাথর গলিয়ে ওই লাল তরলের নদী তার শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দ্রুত ছুটে আসছিল। ওর লাল জিভ লোভে লকলক করছিল শিকার ধরার জন্য।
শরীর কেটে গেলে যেরকম হয়, সেরকমই চারদিকের পাহাড়-পর্বত-টিলার ফাঁক দিয়ে বইছিল লাল নদী। প্রচণ্ড গরম। কাছে এলেই—ব্যস! সব শেষ হয়ে যাবে।
যত দূরে থাকা যায়—তাই পাগলের মতো ছুটছিল ছেলেটা। কিন্তু শুধু তো পায়ের দিকে তাকিয়ে ছুটলেই হবে না, ওপর থেকেও ছিটকে আসছিল বড়-বড় পাথর। যেরকম পাথর দিয়ে ওরা শিকার করে, তার থেকে অনেক বড়। আর দানবটার সে কী গর্জন! যেন হাজারটা বাজ একসঙ্গে পড়ছে। আকাশটাও যেন গলে গলে পড়ছিল। কারণ ওটা তো আর নীল রঙের আকাশ নেই। মাথা তুলে তাকালে শুধুই কালো অন্ধকার আর ধোঁয়া। পোড়া কাঠের মতো রং। পুড়ে যাওয়া আকাশটা ছাই হয়ে নেমে আসছিল ছেলেটার চোখেমুখে। দমবদ্ধ হয়ে আসছিল ধোঁয়ায় আর ওই ছাইতে। দু-চোখ জ্বালা করছিল। পাঁচহাত দূরেরও কিছু দেখা যাচ্ছিল না।
তবু ছেলেটা দৌড়োনো থামায়নি। ও তো কোনওদিন হারতে শেখেনি। ওর মতো পাথর ছুড়ে ওই বড় বড় জানোয়ারগুলোকে কেউ মারতে পারত না। সাঁতরে পাহাড়ি নদী পেরোতেও ওর জুড়ি ছিল না কেউ। গাছের ডাল থেকে ডালে লাফ দিয়ে বাঁদর ধরে আনত। কিন্তু জানোয়ারগুলো আজ গেল কোথায়? পায়ের পাতা পুড়ে গেছে, সারা গায়ে ছ্যাঁকা লেগে ফোস্কা পড়ে গেছে, তবুও থেমে যায়নি। থামা মানেই মৃত্যু।
এই ক'দিন মাঝেমধ্যে গুহার মধ্যে লুকিয়েছে। আবার যখন গুহার বাতাসে দমবন্ধ লেগেছে, আগুনের ওই নদীর কাছে চলে এসেছে, ছুটতে শুরু করেছে।
আকাশের দিকে ফের তাকাল ছেলেটা। বড়-বড় পাথর এখনও ছিটকে-ছিটকে আসছে। চারদিক অন্ধকার। আর কি কখনও আলো আসবে না? ওই যে আগে রোজ নীল আকাশে লাল আগুনের থালাটা দেখা যেত, তাকেও কি অন্য সবকিছুর সঙ্গে চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে দানবটা? তাই হবে হয়তো। নয়তো এতটা সময়েও অন্ধকার কাটল না কেন? দূরে দানবটার মুখ থেকে যে আগুনের হলকা বেরোচ্ছিল, তা এখন একটু কমে এসেছে। এরকম আগুন ছেলেটা আগে কখনও দেখেনি। গাছগুলো সব পুড়ে গেছে। সাদা ছাইতে ঢেকে গেছে।
এরকমই একটা পুড়ে যাওয়া গাছের নীচের দিকের ডালে কয়েকটা সবুজ কাঁচা পাতা খুঁজে পেল ছেলেটা। চিবিয়ে খেয়ে নিল। একটু যেন তেষ্টা মিটল। পায়ের তলার মাটি আবার তেতে উঠছে। আবার কি ওই লাল নদী তেড়ে আসছে? হবে হয়তো। ছুটতে যাবে, হঠাৎ চমকে ওঠে—আরে এটা কী! ওরই মতো আরেকজন। খানিকটা দূরে পড়ে আছে চিৎ হয়ে। একটা মেয়ে। ওর থেকে ছোটই হবে। কাছে গিয়ে বুকের ওপর কান পাতল ছেলেটা। একটা ধুকপুক আওয়াজ হচ্ছে। বেঁচে আছে তাহলে। পা দুটো পুরো পুড়ে গেছে। মুখটাও বেশ খানিকটা। যাক, একটু খাবার জুটল অবশেষে। জ্ঞান ফেরার আগেই মেরে খেয়ে নেবে।
জ্ঞান থাকলে, ছটফট করলে মারতে কেমন যেন লাগে। পাশ থেকে বড় একটা পাথর কুড়িয়ে আনল। থেঁতলে দেবে মাথাটা। তারপর ধুকপুকুনি থামলে আরামসে খাওয়া যাবে। রেখেও দেওয়া যাবে খানিকটা। আবার কবে এরকম খাবার পাওয়া যাবে কে জানে?
পাথরটা তুলে মারতে গিয়ে হঠাৎ ও থেমে গেল। পাথরটা পাশে নামিয়ে রাখল। ভারি মিষ্টি মুখটা। আর হাতের ওপর দিকে একটা সুন্দর পাতা আঁকা। একটু চুপ করে বসে রইল ছেলেটা। কেউ নেই—এ দানবটা তো সবাইকে খেয়ে ফেলেছে। এই হোক না ওর বন্ধু।
গাছের কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে এসে মেয়েটার চোখের পাতায় বোলাতে লাগল ও। খানিকবাদে চোখের পাতাটা নড়ে উঠল। জ্ঞান ফিরছে। বড়-বড় চোখ মেলে মেয়েটা তাকাল ওর দিকে। উঠে বসারও ক্ষমতা নেই।
কিন্তু এখানে থামলে তো চলবে না। মেয়েটাকে পিঠে তুলে নিয়ে ছুটতে শুরু করল ছেলেটা, লাল গরম নদী আর ছুটে আসা পাথর এড়িয়ে। দূরে একটা অন্যরকম গর্জন শুরু হয়েছে। এ আওয়াজটা ওর চেনা। এটা ওই দানবটার থেকেও সাংঘাতিক। সমুদ্রের। যখন তেড়ে আসে তখন পালানোর কোনও উপায় থাকে না। শেষে সমুদ্রকেও কি ওর দলে নিয়ে নিয়েছে দানবটা? কী সাংঘাতিক!
ত্রিবান্দ্রম, 15 সেপ্টেম্বর
অনিলিখা সমুদ্রের ধার দিয়ে হাঁটছিল। খোলা চুল উড়ছিল হাওয়ায়। পায়ের নীচে সরে সরে যাচ্ছিল কোভালাম বিচের মসৃণ বালি। বিচের ওপরেই একটা পাঁচতারা হোটেলে ও এসে উঠেছে অফিসের কাজে। সারাদিন মিটিং চলেছে। দিনের শেষে সমুদ্রতটে সূর্যাস্ত দেখতে বেরিয়ে পড়েছে একাই। কিন্তু সূর্যাস্তের দেখা মেলেনি। মেঘের ফাঁকে চোখ এড়িয়ে কখন যে সূর্য শেষ ডুবটা মেরেছে তা ঠিক বোঝা যায়নি। উধাও হওয়ার আগে একটা সোনালি আলোর রেশ দিগন্তরেখার ওপর ছড়িয়ে দিয়ে বেপাত্তা হয়ে গেছে।
মুগ্ধ হয়ে ওই দিকে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়েছিল অনিলিখা। তারপর ঝিনুক কুড়োতে কুড়োতে বালির ওপর হাঁটছিল। আর শুনছিল ঢেউয়ের সঙ্গে ঢেউয়ের কথা বলা। বিচে এখন বেশি লোক নেই। এখানে বেশিরভাগই প্রাইভেট বিচ—হোটেলগুলোর নিজস্ব। কয়েকটা কুকুর এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাঝেমধ্যে কয়েকজন বিদেশিকে দেখা যাচ্ছে। এরা বিদেশ থেকে এসে এই হোটেলগুলোতে লম্বা ছুটি কাটিয়ে যায়। তাই কোনও তাড়া থাকে না। আজ সমুদ্রে কেউ সাঁতারে নামেনি। কেউ কেউ শুধু মাঝে মাঝে শান্ত সমুদ্রে পা ভিজিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
আনমনে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে হাঁটছিল অনিলিখা। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল, দূরে উলটোদিক থেকে একজন এগিয়ে আসছে। খুব পরিচিত হাঁটাটা। চেহারাটা স্পষ্ট হতে শুরু করল। রাজা কি?
ঠিক তাই—আরেকটু কাছে আসতেই অনিলিখা দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। বেশ কয়েকবছর আগে রাজার সঙ্গে একই সঙ্গে হার্ভাডে পড়েছে অনিলিখা। সাবজেক্ট যদিও আলাদা ছিল। রাজার সাবজেক্ট ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞান। তবু ভালো বন্ধুত্ব ছিল। ইন্দোনেশিয়ার ছেলে। পুরো নাম ছিল অর্ধরাজা। ওরা সবাই রাজা বলেই ডাকত। এমনিতেও ইন্দোনেশিয়াতে কেউ পুরো নাম ধরে নাকি ডাকে না। তা ও এখানে কী করছে?
—রাজা! বলে চেঁচিয়ে উঠল অনিলিখা।—তুমি এখানে? ভারতে?
রাজা একটু চমকে উঠে হাসিমুখে এগিয়ে এল।
—এখানে কী করছ? ভারতে এসেছ আর আমাকে জানাওনি?
—হ্যাঁ, হঠাৎই প্ল্যান করেছি। তা তুমি তো এখানে থাকো না?
—না, অফিসের কাজে এসেছি। তা তুমি আছ কোথায়?
—এখানেই। কাছেই একটা হোটেলে। অনেকদিন কোথাও বেড়ানো হয়নি। তাই হঠাৎই ছুটিতে আসার প্ল্যান করলাম। তোমার কথা খেয়াল হয়নি।
—কতদিন আছ? কলকাতা আসছ কি?
—নাহ, কলকাতায় আর যাব না। কালই ফিরে যাচ্ছি। বলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রাজা বলে উঠল,—এখন আমার একটু তাড়া আছে। তোমার নাম্বারটা দাও। আমেরিকায় ফিরে পরে কথা বলব।
অনিলিখার নাম্বারটা নিয়ে যেদিক থেকে আসছিল, সেদিকেই দ্রুত আবার ফিরে চলল রাজা। অনিলিখা একটু অবাকই হল। এতদিন বাদে দেখা—সামান্য কয়েকটা কথা বলারও সময় নেই। অবশ্য এটাও ঠিক যে মাঝে অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। প্রথমদিকে ফোনে, ই-মেলে যোগাযোগ ছিল। পরে সেই যোগাযোগটা রাখা দুজনের পক্ষেই আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবুও...।
সত্যি জিনিয়াস বলতে যা বোঝায়, তাই ছিল রাজা। তা না হলে ইন্দোনেশিয়ার একটা ছোট গ্রাম থেকে এভাবে হার্ভাডে পড়ার সুযোগ করে নেওয়া সহজ ছিল না। শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞান নয়। সব বিষয়ে দারুণ কৌতূহল ছিল রাজার। সব সময় বই নিয়ে বসে থাকত। যাকে বলে বইয়ের পোকা। তবে শুধু পড়ার বই নয়, সবরকমের বই। তবে মজার বিষয়—আমেরিকায় পড়তে গেলেও আমেরিকা সম্বন্ধে ধারণা ছিল খুব খারাপ। বলত—সারা পৃথিবীর মধ্যে খাঁটি মানুষ যদি খুঁজে পেতে হয় তাহলে সুমাত্রায় যেতে হবে। তা খাঁটি মানুষের সংজ্ঞাটা কী? ওর মতে আমাদের জিনে এত ভেজাল ঢুকেছে যে সত্যিকারের মানুষ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। যত বড় সভ্যতা তত বেশি ভেজাল। সত্যিকারের মানুষ বলতে যাদের বোঝায়, তারা নাকি আছে সুমাত্রার জঙ্গলে। তাদের জীবনে গত হাজার বছরে কোনও পরিবর্তন হয়নি। এ ব্যাপারটা সবার কাছেই খুব হাস্যকর ছিল। কিন্তু এ নিয়ে রাজাকে খেপালেও ও খেপত না। পরের দিকে প্রসঙ্গটা তুলতই না।
রাজার ফোন নাম্বারটা নিয়ে রাখা উচিত ছিল। আর কোন হোটেলে উঠেছে, সেটাও তো ঠিক জানা হল না। বিচ এখন প্রায় ফাঁকা। সূর্য ডুবে গেছে। দূরের হোটেলগুলোতে আলো জ্বলে উঠেছে। ফেরার রাস্তা ধরল অনিলিখা।
(বর্তমান ইতালি) মার্কোপোলো ও পিসা
রাস্তিশিয়ান দে পিসা ও মার্কোপোলো দুজনে একই সঙ্গে জেনুয়ার জেলে বন্দি। ভেনিস যুদ্ধে হেরে গেছে জেনুয়ার কাছে। ভেনিসের অন্যতম সেনাধ্যক্ষ মার্কোপোলো তাই জেনুয়ার জেলে। তার সঙ্গে একই সেলে পিসা। পিসা ভালো গল্প লেখে। মার্কোপোলোকে সঙ্গী পেয়ে সে ভারি খুশি। চিন-সুমাত্রা-ভারতে বহুবছর কাটিয়েছে মার্কোপোলো। তাই ওর কথা শুনে পিসা লিখে চলেছে ভ্রমণের বিবরণ।
—তারপর মার্কো, তুমি ল্যাম্ব্রির (বর্তমান সুমাত্রা) কথা বলছিলে কাল—তারপর কী হল?
—হ্যাঁ, যা বলছিলাম। থাইল্যান্ড থেকে ম্যালে পেনিনসুলা ধরে ল্যাম্ব্রিতে পৌঁছোলাম। কিন্তু তখন হাওয়া ঠিক দিকে বইছিল না। বাধ্য হয়ে ওখানে থামতে হল। ওখানকার লোকেদের সম্বন্ধে কিছু কথা বলি। ওখানে সবাই মূর্তিপূজা করে। আগে বেশিরভাগ হিন্দু ছিল। পরে আরব দেশের সওদাগরদের প্রভাবে, অনেকেই মুসলমান হয়ে গেছে।
ওদের সম্বন্ধে একটা কথা শুনলে তুমি বিশ্বাস করবে না, আর যদি বা করো, যারা তোমার লেখা পড়বে তারা তো করবেই না। ওখানে কিন্তু লোকেদের বিশাল বিশাল লেজ। বেশ মোটা লেজ।
ইয়া তাগড়াই চেহারা। ওদের অনেকে পাহাড়ে থাকে। ওখানে পৃথিবীর সেরা কর্পূর পাওয়া যায়। তার দাম সোনার থেকেও বেশি। কর্পূর আর মশলাপাতি কিনতে প্রচুর সওদাগর ওখানে যায়। ওখানকার লোকেরা রুটি খায় না। খায় শুধু ভাত। সঙ্গে দুধ আর মাংস। ওখানে কিছু বিশাল বিশাল গাছ আছে। আকাশছোঁয়া। এমন ঘন তাদের পাতা যে মাথা তুললে আকাশ দেখা যায় না। কিন্তু ওই গাছের ছাল খুব পাতলা। ছালের নীচে একধরনের ময়দার মতো জিনিস থাকে। ওখানকার লোকেরা ওই ময়দা দিয়ে নানারকম জিনিস তৈরি করে খায়। ওখানকার পাহাড়ে অনেক সোনা পাওয়া যায়। তোমাদের পিসায় যেমন পাথর, ওখানে তেমন সোনা অফুরন্ত। ওখানকার নামই তাই স্বর্ণদ্বীপ।
—তাই নাকি? তা তুমি সেখান থেকে সোনা নিয়ে আসনি?
—আমাকে কুবলাই খান এত দামিদামি রত্ন দিয়েছিল যে তা সাবধানে নিয়ে আসতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিলাম। তা ছাড়া আমার সঙ্গে ওদের পরিবারের রাজকন্যা ছিল—তাকে ছেড়েই বা জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরি কী করে! পারস্যের রাজপুত্রের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার জন্য শুধু আমার ভরসাতেই রাজকন্যাকে পাঠিয়েছিল কুবলাই খান। সাবধানে তাকে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। তাই ওকে ফেলে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমি তো আর ল্যাম্ব্রির সোনাদানা আর মশলাপাতি জোগাড় করতে যাইনি। নেহাতই চিন থেকে ভেনিস যাওয়ার পথে ওখানে আটকে পড়েছিলাম, তাই। অনুকূল হাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে আমি ল্যাম্ব্রিতে পাঁচ মাস বসেছিলাম। আমার সঙ্গীরা মহাফূর্তিতে ছিল, আর আমি রোজ ভাবতাম কবে ভারত রওনা হতে পারব।
—তা যা বলছিলে। ওখানকার লোকগুলো কেমন?
—ওখানে বেশিরভাগ লোক ব্যবসা করতে আসে। তারা ভদ্র। তারা ভারত, চিন এসব জায়গা থেকে আসে। কিন্তু, একটু ভেতরে যাও, ওখানকার জঙ্গলে পাহাড়ে অসভ্য লোকের বাস। তারা জ্যান্ত মানুষ ধরে খায়। তারা সব আধাপশু। তবে তাদের থেকেও খারাপ আরেকদল লোক আছে। পাহাড়ের গুহাতে অনেক গভীর জঙ্গলে থাকে ওরা।...থাক সে কথা।
—কেন, থাকবে কেন? বলো!—আমাকে তো সবই বলছ।
—আচ্ছা, বলছি। কিন্তু ওদের কথা খবরদার লিখো না। তাহলে আমি-তুমি কেউ রেহাই পাব না। আমি সংক্ষেপে বলছি।
ফের বলে ওঠে মার্কো,—বুঝতেই পারছ অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেলে আমি যাব না তা কি হয়! তার জন্যই তো চব্বিশ বছর ধরে দেশে দেশে ঘুরে বেড়িয়েছি। শুধু সোনার লোভে নয়। আমাকে ওখানকার একজন ওদের কথা বলেছিল। ওদের কাছে গেলে মানুষ নাকি বাঁচে না। ওদের গায়ে নাকি সাংঘাতিক জোর। আর তেমনি হিংস্র। তারপর কৌতূহলবশত আমি শ-পাঁচেক লোক নিয়ে ওরা পাহাড়ে যেখানে থাকে সেদিকে গিয়েছিলাম।
তখন শীতের সময়। আমরা প্রায় পাঁচদিন জঙ্গল পেরিয়ে ওই জায়গার কাছে গিয়েছিলাম। জঙ্গলে ঘেরা বড় পাহাড়। ভারি সুন্দর সে জায়গা। তারই ওপরের দিকে ওদের বাস। ওদের কথা অন্যদের বললে নাকি অভিশাপ লাগে। এটাই নাকি নিয়ম। ওদের আমি দেখিনি। কিন্তু আমার দলে পাঁচশো জন ছিল। তিনশো জনের একটা দল প্রথম দিন গিয়েছিল, একজনও ফেরেনি। তারপর আরও পঞ্চাশ জন যায়, তারাও ফেরেনি। পরে এক স্থানীয় লোক আমাকে বলে যে ওখানে গেলে কেউ নাকি ফেরে না। লোকটা খুব বিশ্বাসযোগ্য ভাবেই বলেছিল।
এরপর আমরা ওখান থেকে ফিরে আসি। একমাস বাদে পালে হাওয়া লাগলে ওখান থেকে শ্রীলঙ্কার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। আর যাই লেখো না কেন—ওই পাহাড়ের লোকগুলোর কথা লিখো না। ওরাই নাকি আদি, আসল মানুষ।
—ঠিক আছে, কথা দিলাম। কিন্তু একটা কথা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারলাম না। তোমার দলের অত লোক বিপদে পড়ল, মারা গেল—আর তুমি একবারও গিয়ে দেখলে না। অসম্ভব! তোমার কথা আমি অনেক শুনেছি। ভেনিস-জেনুয়ার যুদ্ধে তোমার বীরত্বের কথা সবার মুখে মুখে ঘোরে। কীভাবে তুমি তরবারি নিয়ে নিজে যুদ্ধে নেমেছ, সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছ—সেই কথা। তোমার জাহাজ সবার পরে জেনুয়ার অধীনে আসে। তোমাদের পুরো সৈন্যদল যখন আত্মসমর্পণ করেছে, তুমি তখনও হাল ছাড়োনি। তুমি বলতে চাও যেখানে তোমার দলের অত লোক মারা পড়ল, তুমি সেখান থেকে কাপুরুষের মতো পালিয়ে এলে! এ কথা আমি বিশ্বাস করব! ঠিক করে বলো কী হয়েছিল।
সেলের অন্ধকারে প্রায় মুখ লুকিয়ে মার্কোপোলো আস্তে-আস্তে বলে উঠল,—পিসা, আমাদের চারপাশে যা হয় সব কি আমাদের জানা? সব কি আমরা বুঝি? ওই আকাশের দিকে দ্যাখো। তারাগুলো ঘুরে ঘুরে এক জায়গায় ফিরে আসে। সূর্যটা রোজ আমাদের পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। অতটুকু একটা জিনিস—কিন্তু কী তেজ! আমরা কি এসব বুঝি? ঠিকই ধরেছ। আমিও ছিলাম ওদের সঙ্গে। দুটো অভিযানেই। কোনওক্রমে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম। এতটুকুই তোমার জানার জন্য যথেষ্ট। নাও, এবার তোমার গল্প শোনাও।
—ঠিক আছে, ল্যাম্ব্রির কথা তো অনেক হল। তোমাকে আজ আমার লেখা একটা গল্প বলি, আশাকরি ভালোই লাগবে।
পিসা ওর গল্প বলতে শুরু করে জেলের আধা অন্ধকার খুপরিতে।
প্রফেসার জ্যাসন ইগার ফোনটা অন করলেন। 38টা মিসড কল। 12টা মেসেজ। মিসড কলগুলোতে চোখ বুলিয়ে নিজের উদ্দেশ্যে ধিক্কার সূচক একটা আওয়াজ করে মাথা নাড়লেন। নাহ। এতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন হওয়াটা উচিত হয়নি।
বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন—আলু না পেঁয়াজ কিনতে! নাকি দুধ? পথে হঠাৎ করে আকাশের দিকে চোখ পড়ল। আর এটাই কাল হল। আলোর রেখা হঠাৎ হঠাৎ করে জ্বলে উঠে উধাও হয়ে যাচ্ছে। অভিজ্ঞ চোখে ব্যাপারটা বুঝতে দেরি হয়নি। কমেট শাওয়ার। দুর্লভ ঘটনা। অবাক হয়ে দেখছিলেন প্রকৃতির এই খেলা। সঙ্গে টেলিস্কোপও ছিল। তাতে চোখ লাগিয়ে কাটিয়েছেন বেশ কয়েক ঘণ্টা। তারপরে ওনার অভ্যাসমতো লিখে রাখতে চেয়েছিলেন। তা লিখতে লিখতে কখন যে গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়েছেন কে জানে!
কেউ যাতে জাগতিক কোনও ব্যাপারে বিরক্ত না করে তাই ফোনটা শুরু থেকেই বন্ধ করে রেখেছিলেন। আর চালু করা হয়নি। আরেকবার ফোনে চোখ রাখলেন। শেষ মেসেজটা লোকাল পুলিশের। তার মানে পুলিশেও খবর দিয়েছে! কী অবস্থা! জ্যাসন কি বাচ্চা নাকি, যে হারিয়ে যাবে! হ্যাঁ, এটা ঠিক যে কয়েকমাস আগে একটা কমেটের কক্ষপথের জটিল অঙ্ক মিলছিল না বলে, বাড়িতে না জানিয়ে তিনদিন একটা হোটেলে ছিলেন। তা, সেটা তো আর রোজকার ব্যাপার নয়!
বাড়িতে ফোন করতে যাবেন, হঠাৎ গাড়ির কাচের জানলায় ধাক্কার আওয়াজ পেয়ে মুখ ঘোরালেন। দুজন লোক। অচেনা। নির্ঘাৎ পুলিশের লোকই হবে। ওনার খোঁজে এসেছে। দরজার লক খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। বলতে যাবেন—তার আগেই মুখের ওপর কে যেন রুমাল চেপে ধরল। কিছু বলার সুযোগ দিল না। জ্ঞান হারানোর আগে জ্যাসন শুধু এটুকুই বুঝলেন যে তারা পুলিশের লোক নয়। ওনার সাবজেক্টেরও লোক নয়। কমেট শাওয়ার নিয়ে ওদের বিন্দুমাত্রও আগ্রহ নেই। ওনাকে কিডন্যাপ করা হচ্ছে।
মার্কের মনটা আজ খুব খারাপ। এরকম মন খারাপ হলে উনি সাধারণত টেলিস্কোপে চোখ রাখেন। দূরের তারাগুলোর দিকে তাকালে নিজের সমস্যাগুলোকে অনেক ছোট ছোট লাগে। হারিয়েই যায়। কিন্তু দিনের বেলা সে উপায় নেই। খবরের কাগজে চোখ বোলালেন। নাহ, খবরগুলো পড়তে ইচ্ছে করছে না। টিভি চালালেন। বাস্কেটবল ম্যচ দেখাচ্ছে। কিন্তু তাতেও দু-মিনিটের বেশি বসে থাকতে পারলেন না। মনটা বড় অস্থির লাগছে। পাশের ঘরে রবিন শুয়ে। একবার গিয়ে আবার ফিরে এলেন। রবিনের অবস্থা আর চোখে দেখা যাচ্ছে না। অসহায় দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। শরীরের সব মাসল জবাব দিয়ে দিয়েছে। শুধু অনুভূতি আর বাঁচার ইচ্ছেটা রয়ে গিয়েছে। আর ক'টা দিন। তারপর সব শেষ। পনেরো বছরের ছেলেটাকে আর কোনওদিন দেখতে পাবেন না মার্ক।
অনেক ডাক্তার দেখিয়েছেন। অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোনও চিকিৎসা নেই এ অসুখের। গত ছ'মাস ধরে রবিন শয্যাশায়ী। হাত-পা কিছুই নাড়তে পারছে না। কথাও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। তবু তো প্রাণ আছে। একটা উপলব্ধি আছে। চলে গেলে এ-ঘরে আর এক মুহূর্তও কাটাতে পারবেন না মার্ক।
ফের রবিনের ঘরে ঢুকলেন মার্ক। পাশে গিয়ে বসলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। ওর মা অনেক বছর আগে মারা গেছেন। মার্কের কাছেই মানুষ রবিন। অন্য বাবাদের তাদের ছেলেদের সঙ্গে যতটা যোগাযোগ থাকে, মার্কের সঙ্গে রবিনের যোগাযোগ তার থেকে অনেক বেশি। কাজের বাইরে বেশিরভাগ সময় কাটে ছেলেকে নিয়ে। যখন ও হাঁটতে পারত, তখন ওকে নিয়ে মার্ক নানান জায়গায় ঘুরতে যেতেন। কিন্তু শেষ কয়েকমাস ওকে নিয়ে কোথাও-ই যাওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ, রবিনকে নিয়ে হুইলচেয়ারে ঘুরতে হবে। গাড়ির সিটে কোলে করে নিয়ে বসাতে হবে। নানান ঝামেলা।
কথাটা খেয়াল হতেই মার্কের মনে হল—আজকেই, হ্যাঁ, আজকেই তো রবিনকে নিয়ে বেরোনো যায়। কাছেই একটা জায়গায় লায়ন সাফারি আছে। সেখানে নিয়ে গেলে রবিনের খুব ভালো লাগবে। যেই ভাবা—সেই কাজ। আধঘণ্টার মধ্যে রবিনকে নিয়ে মার্ক বেরিয়ে এলেন।
লায়ন সাফারি বাড়ি থেকে দেড়ঘণ্টার রাস্তা। গাড়ি জোহানেসবার্গ থেকে বেরিয়ে হাইওয়ে দিয়ে ঘণ্টাখানেক ছুটে চলল প্রিটোরিয়ার দিকে। তারপর ডানদিকে অপেক্ষাকৃত একটা ফাঁকা রাস্তায় গিয়ে উঠল। এ রাস্তাটা বিশেষ নিরাপদ নয়। কয়েকটা জায়গায় রাস্তার ধারে লেখাও আছে যে এখানে কিডন্যাপিং ও মার্ডার বেশি হয়। সাউথ অফ্রিকায় অবশ্য এরকম ওয়ার্নিং প্রায়শই দেখা যায়।
মার্ক একবার রবিনের মুখটা দেখে নিলেন। কথা না বললেও রবিনের মুখে একটা আনন্দের ছাপ। ওর মুখে এই হাসির ছোঁয়া দেখতে চাঁদে যেতেও রাজি মার্ক। স্টিরিয়োর গানটা চালিয়ে গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে ব্রেক করে গাড়িটাকে কোনওভাবে থামাতে পারলেন মার্ক। রাস্তা জুড়ে একটা বড় ট্রাক দাঁড়িয়ে! কী ব্যাপার! দেখতে গাড়ি থেকে নামলেন। ট্রাকের দিকে এগোতেই হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন ওকে জাপটে ধরে মুখের ওপর একটা রুমাল চেপে ধরল। 'রবিন' বলে চেঁচানোরও সময় পেলেন না মার্ক। অবশ্য চেঁচালেও রবিন তো আর ছুটে এগিয়ে আসত না। অচৈতন্য মার্ককে টেনে নিয়ে তোলা হল ট্রাকের পিছনে।
পেড্রো ওর দশ বাই দশফুট সেলে চুপচাপ বসেছিল। সময়টা যেন এই সেলের অন্ধকারের মতোই থমকে দাঁড়িয়ে আছে। ও ভাবছিল নিজের কৃতকর্মের কথা। ওর ক্ষেত্রে কি এ শাস্তিটা লঘুদোষে গুরুদণ্ড নয়? সরকারের কিছু খারাপ কাজের কথা ফাঁস করেছিল ও। কীভাবে সরকার সবার ফোন ট্যাপ করে, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট থেকে তথ্য জোগাড় করে, অন্য দেশের গোপনীয় খবর সংগ্রহ করে—এসব নিয়ে বিদেশের একটা পত্রিকায় লিখেছিল ও। তারপরই ওর ওপর একটা সাজানো খুনের চার্জ আনা হল। ফলত দশ বছর জেল। হাইসিকিউরিটি জেল। কিন্তু সে জেলেরও ক্ষমতা ছিল না 170 IQ-র পেড্রোকে রোখার। দু-বছরের মধ্যে জেল থেকে পালাল পেড্রো।
কথাটা মনে পড়তেই হেসে উঠল পেড্রো। জেলে কাঠের কাজ করতে হত ওদের। রোজ একঘণ্টার জন্য জেলের ওয়ার্কশপে কাঠের নানান জিনিস বানাতে দেওয়া হত। জেলরক্ষীদের সতর্ক প্রহরার মধ্যেই সবার চোখ এড়িয়ে একটার পর-একটা দরজার চাবি বানিয়ে ফেলল পেড্রো। প্রত্যেকটা দরজার তালা আলাদা, চাবি আলাদা। প্রথম দিকের কয়েকটা দরজার চাবির ছাঁচ তৈরি করা অতটা শক্ত ছিল না, কারণ এই পথ দিয়েই ওদের রোজ ওয়ার্কশপে কাজে নিয়ে যাওয়া হত। একবার তালার দিকে তাকিয়ে চাবি আন্দাজ করে সবার চোখ এড়িয়ে ওয়ার্কশপে চাবি তৈরি করা।
জেলের কয়েকজন সঙ্গী অবশ্য একথা জানতে পেরেছিল। তবে তারা পেড্রোর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তারা জানত যে যদি জেল থেকে পালাতে হয়, তাহলে এই অসামান্য প্রতিভাবান বন্দির সাহায্যেই পালাতে হবে। প্রথম চারটে গেটের চাবি তৈরি করতে সময় লেগেছিল দু-মাস। কারণ শুধু দু-সেকেন্ড সময় পাওয়া যেত ওই চাবি টেস্ট করার। সঙ্গের রক্ষীদের চোখ এড়িয়ে একবার কি-হোলে কোনওক্রমে মোচড় দিয়ে ছাপ তুলে নিত।
ওগুলো তো তা-ও সহজ ছিল। মুশকিল হল পরের ছ'টা গেট—যেখান দিয়ে পেড্রো কখনই যাওয়ার সুযোগ পেত না। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। তা সে যত শক্ত কাজই হোক না কেন। তিনদিন জেলারের চোখ এড়িয়ে অসম্ভব রিস্ক নিয়ে বাকি কয়েকটা গেটের তালা একনজর দেখতে পারল পেড্রো। শুধু তার ওপর আন্দাজ করেই চাবি বানিয়ে ফেলল। ফলত ছ-মাসের অবিরাম চেষ্টার পর দুজন সঙ্গীকে নিয়ে দেশের সব থেকে হাই সিকিউরিটি জেল থেকে পালানোর সুযোগ পেল।
দেশ ছেড়ে পালানোর অনেক চেষ্টা করেছিল পেড্রো। সম্ভব হয়নি। ছ'মাস পরে আবার ফিরতে হল শ্রীঘরে। তারপরে আরও একবছর কেটে গেছে। এবারেও একই জেলে। কিন্তু এবার আরও অনেক বেশি সতর্কতা। জেলের মধ্যে 322 নং সেলে যে একজন অসাধারণ প্রতিভাবান অপরাধী আছে তা জেলের জমাদাররাও জানে। তাই সবদিক দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থা। কোনও ফাঁক নেই। আগের বারের মতো পেড্রোকে কাঠের কাজ করতে দেওয়া হয় না, পোশাক তৈরি করতে দেওয়া হয় না। তিন-চার জন সিকিউরিটি গার্ড আসে খাওয়ার সময়। খুব সাবধানে খাবার দিয়ে চলে যায়। কোনও কথাও বলে না।
কিন্তু তা সত্বেও একটা উপায় পেড্রো বার করেছে। সময় একটু বেশি লাগবে। বছরখানেক লেগে যেতে পারে। তবু একটা জিনিস পেড্রো বুঝতে পেরেছে গত দু-বছরে। জীবন কত দামি। তাকে দশ বাই দশ ফুটের একটা ঘরে শেষ করে দেওয়া যায় না। আর এই আশার নামই জীবন। জীবনে কখনও এই আশা ছাড়তে রাজি হয়নি পেড্রো।
একটু ঝিমোচ্ছিল পেড্রো। হঠাৎ সেলের দরজা খুলে গেল। পরিচিত যারা আসে তাদের সঙ্গে আরও একজন আজকে। কী ব্যাপার? ওর প্ল্যানের কথা টের পেয়ে গেল নাকি?
ওকে নিয়ে এগিয়ে চলল লোকগুলো। অন্যদিনের মতো সতর্ক দৃষ্টি নেই ওর ওপর। সোজা জেলারের কাছে। পরের আধঘণ্টা স্বপ্নের মতো কাটল পেড্রোর। ও মুক্ত। সম্পূর্ণ মুক্ত। ওর বিরুদ্ধে সব অভিযোগ তুলে নেওয়া হচ্ছে। পরিবর্তে একটা কাজ করতে হবে। কী কাজ? খুব খারাপ কোনও কাজ? নাকি ওকে মেরে ফেলারই কোনও চক্রান্ত করেছে এরা? সাবধানি হয়ে লোকটার সঙ্গে এগোতে লাগল পেড্রো।
অবশেষে খোলা আকাশের নীচে আসতেই সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব কেটে গেল। মৃত্যু হোক, তবু তা আসুক খোলা আকাশের নীচে। জেলের ঠিক বাইরেই একটা দামি মার্সিডিজ অপেক্ষা করছিল ওর আর সঙ্গের লোকটার জন্যে। গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল লোকটা। পেড্রোও পিছু-পিছু গাড়িতে গিয়ে উঠল।
অটিজম রিসার্চ সেন্টার। অবশ্য নামেই তা। রিসার্চের কাজের সঙ্গে এই নামের কোনও যোগাযোগ নেই। অনেক বাচ্চা আছে। তাদের মধ্যে অটিস্টিক বাচ্চা যেমন আছে, স্বাভাবিক বাচ্চাও আছে। কোত্থেকে এসব বাচ্চা ওরা জোগাড় করে তা রহস্য। এদের খোঁজও কেউ নিতে আসে না। কিন্তু এসব নিয়ে কোনও প্রশ্ন করা যায় না।
আজও একটা জিনিস অবাক লাগে ক্রিসের। এই রিসার্চ সেন্টার চলে কার টাকায়? শুনেছে বড় একটা গ্রুপ এর পিছনে আছে। কিন্তু তাদের ম্যানেজমেন্টের কাউকে কখনও দেখতে পাওয়া যায় না।
অবশ্য এ নিয়ে ক্রিসের বিশেষ মাথাব্যথা নেই। ও যথেষ্ট টাকা পায়। সরকারি রিসার্চ সেন্টারগুলোতে, এমনকী সেরা প্রাইভেট রিসার্চ সেন্টারগুলোতে এর অর্ধেক স্যালারিও পেত না। আর শুধু ও নয়, ওর সতীর্থ বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। তাই বিশেষ আগ্রহ না দেখানোই ভালো।
আজকের দিনটা বিশেষ একটা দিন। প্রায় তিনমাস ধরে একটা নতুন জিনথেরাপির ওপর গবেষণার পর প্রথম টেস্ট হবে একদল বাচ্চার ওপরে। এদের প্রত্যেকের ওপরেই একটা বিশেষ ধরনের জিনথেরাপি করা হয়েছে। বিশেষ একরকম রেট্রো-ভাইরাস এদের জিনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে কয়েকদিন আগে। তা নিয়মমাফিক কাজ করছে কিনা তা আজ দেখা হবে।
ঘরের লাগোয়া বারান্দায় এসে দাঁড়াল ক্রিস। মরুভূমির মধ্যে খানিকটা বেখাপ্পা ভাবে দাঁড়িয়ে আছে এই বাড়িটা। যতদূর দেখা যায়—সোনোরান ডেজার্ট, ক্যাকটাস আর কাঁটাঝোপ। লোকজনের চোখের আড়ালে বিশাল এলাকা জুড়ে উঁচু পাঁচিল, বাইরে কড়া নিরাপত্তা। তার মধ্যে এই বাড়ি, বাইরে এখন তাপমাত্রা 50 ডিগ্রির মতো। প্রচণ্ড চড়া রোদ। দু-মিনিটের বেশি দাঁড়াতে কষ্ট হয়। বাইরের এই রুক্ষতা যেন ক্রিসের চরিত্রের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। তাই বাচ্চাদের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেও কোনও দ্বিধা হয় না ক্রিসের। যারা আসে তারা সব গিনিপিগ। কেউ মারা গেলেও কারুর কিছু আসে যায় না।
ঘরের ভেতরে ঢুকে এল ক্রিস। তারপর ঘরের অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে লবি দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। খানিকটা এগিয়ে ডানদিকের রিসার্চ ল্যাবে ঢুকে পড়ল। পল, রবিন ও অন্যান্য অ্যাসিট্যান্টরা ইতিমধ্যেই এসে গেছে। পাশের ঘর আর এ-ঘরের মধ্যে একটা কাচের দেওয়াল আছে। তা দিয়ে পাশের ঘরে কী হচ্ছে তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
কফি মেশিন থেকে কফি নিয়ে চেয়ারে এসে বসল ক্রিস।
—আমরা রেডি?
—হ্যাঁ, আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। এবার শুরু করব। রবিন বলে উঠল।
পাশের ঘরের আলোটা নিভিয়ে দেওয়া হল। দেখার জন্য প্রত্যেকে নাইট-ভিশন চশমা পরে নিল।
এবার সুইচ টিপে পাশের ঘরের দরজা খুলে দিল রবিন। দরজা দিয়ে আটটা বছর তিন-চারেকের বাচ্চা ঘরে ঢুকল। ঘরে নানান খেলার জিনিস ছড়িয়ে রাখা আছে। কয়েকটা পাজলের ব্লক, চেসবোর্ড, বেশ কয়েকটা গাড়ি, পুতুল। ওরা ঢুকে খেলনাগুলো নিয়ে খেলায় মেতে উঠল! ঘরের অন্ধকারের জন্য কারও কোনও অসুবিধে হচ্ছে বলে মনে হল না। একটা বাচ্চা দু-মিনিটের মধ্যেই দুরূহ রুবিক কিউব পাজল সলভ করে ফেলল।
পল বলে উঠল,—আশ্চর্য! দেখলেন ক্রিস!—কী অসামান্য ইনটেলিজেন্স। এবার আমি আস্তে-আস্তে ঘরের উষ্ণতা কমাব আর সঙ্গে সঙ্গে সালফার ডাই-অক্সাইড গ্যাস বাড়াব।—রবিন বলে উঠল।
ঘরটা আস্তে-আস্তে ধোঁয়ায় ভরে গেল। বাইরে থেকে কিছুই প্রায় দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু বাচ্চাদের কোনও অসুবিধে হচ্ছে বলে মনে হল না।
উত্তেজনায় রবিন ক্রিসের হাত ঝাঁকিয়ে বলে উঠল,—কাজ করছে! 15 ppm আমরা কোনওভাবে সহ্য করতে পারতাম না। অথচ এখনও ওদের কোনও অসুবিধে হয়নি। আমরা যা সহ্য করতে পারি ওরা তার থেকে অনেক বেশি সহ্য করতে পারছে। আর একটুক্ষণ দেখা যাক।
মিনিট পাঁচেক কেটে গেল। মনিটরগুলোতে বাচ্চাগুলোর হার্টবিট, পালসরেট, অন্যান্য শারীরিক অবস্থা দেখা হচ্ছে।
হঠাৎ পল হাত তুলল,—শিগগিরি ওদের বার করো—দুটো বাচ্চা সহ্য করতে পারছে না। ওই দ্যাখো।
খেয়াল করলে বোঝা যাচ্ছে দুজন ঠিক স্বাভাবিক নেই। খেলনা ছেড়ে মাটিতে শুয়ে পড়েছে।
সঙ্গে সঙ্গে রেসকিউ অপারেশন শুরু। সঙ্গে সঙ্গে চারজন লোক ওই ঘরে ঢুকে বাচ্চাগুলোকে বার করে নিল। মেডিক্যাল এমার্জেন্সি টিম রেডি ছিল। তাড়াতাড়ি ওদের দেখতে শুরু করল। কোনও বিপদ হয়নি। বাচ্চাদুটো মোটামুটি ঠিকই আছে।
তবে এক্সপেরিমেন্ট সেদিনের মতো শেষ। ক্রিস পলকে বলে উঠল,—আমরা ঠিক দিকেই এগোচ্ছি। তবে একেক জনের ওপর প্রভাবটা একেকরকম হচ্ছে। আমাদের আরও এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে। আরও টেস্ট সাবজেক্ট লাগবে। বেশ কিছু বাচ্চা আরও দরকার।
এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে গানের সিডি কেনার জন্য কেরালা গভর্নমেন্টের একটা দোকানে ঢুকল অনিলিখা। বেশ বড় দোকান। শুধু স্থানীয় রাগাশ্রয়ী গান, বাঁশির সিডি নয়, নানান ধরনের চাদর, বিশেষ ধরনের শাড়ি, কথাকলি নাচের মুখোশ, চন্দন কাঠের ওপর কাজ করা মূর্তি, বিভিন্ন স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র—সবই আছে।
চন্দন কাঠের ছোট একটা বুদ্ধমূর্তি আর-একটা শাড়ি কিনে গাড়িতে উঠতে যাবে, হঠাৎ অনিলিখার চোখ পড়ল পাশের গাড়িতে। মাঝের সিটে একটা গুন্ডামতন চেহারার মাথা কামানো কালো মুশকো লোক বসে আছে। আর তার পাশে ঠিক সেরকমই এক নিতান্ত ভদ্রোচিত চেহারার লোক। ফরসা রং, চোখা চোখা নাক মুখ, সাদা দাড়ি। চোখে রিমলেস চশমা। লোকটা সিটে ঘাড় এলিয়ে ঘুমোচ্ছে। সায়েন্টিস্ট স্বরাজ পল না?
অনিলিখার গাড়ির ড্রাইভার গাড়িতে নেই। আশেপাশে কোথাও গেছে। তাকে ফোন করে বাইরে অপেক্ষা করতে থাকল অনিলিখা। পাশের গাড়িটা লক্ষ করতে লাগল। পাশের গাড়ির ড্রাইভার একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট নিয়ে খানিকবাদে ফিরে এল। তারপর তাড়াহুড়ো করে গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে গেল। আধমিনিটের মধ্যে অনিলিখার গাড়ির ড্রাইভার কিষেণও এসে উপস্থিত। চট করে গাড়িতে উঠে অনিলিখা এয়ারপোর্টের উলটোদিকে গাড়ি চালাতে বলল।
—কিষেণ, ওই যে দূরে সাদা টয়োটা গাড়িটা দেখছ ওটাকে ফলো করো। খুব দরকার।
—এয়ারপোর্টে যাবেন না? আপনার তো ফ্লাইট আছে!
—-এয়ারপোর্ট পরে। আগে ওই গাড়িটাকে ফলো করো। খুব আর্জেন্ট।
একটু রহস্যের গন্ধ পেয়ে কিষেণ আর কোনও কথা না বলে ফুলস্পিডে গাড়ি চালিয়ে দিল। আর দূর থেকে আগের গাড়িটাকে ফলো করে এগোতে থাকল।
স্বরাজ পলকে অনিলিখা ব্যক্তিগতভাবে চেনে না। ইসরোর সঙ্গে যুক্ত নামকরা মহাকাশ বিজ্ঞানী। নামটা শোনা। পরশুদিন খবরের কাগজে ওনার একটা ছবি আর খবর ছিল। চাঁদিপুরের বাড়িতে ছুটি কাটাচ্ছিলেন। ওখানকার বাড়ি থেকে ব্যক্তিগত কাজে বেরিয়েছিলেন। আর বাড়িতে ফেরেননি। কারুর সঙ্গে যোগাযোগও করেননি। ব্যাপারটা নিয়ে বেশ রাজনৈতিক চাপান-উতোর চলছে। তা উনি হঠাৎ করে এখানে!
ত্রিবান্দ্রম থেকে দক্ষিণের দিকে ছুটে চলেছে গাড়ি। কন্যাকুমারিকার দিকে। ত্রিবান্দ্রমের মূল শহর ছাড়িয়ে গাড়ি এগিয়ে চলল গ্রামের পথ দিয়ে। দু-পাশে ধানখেত, নারকোল আর পাম গাছের সারি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে দু-একটা বাড়ি। প্রত্যন্ত এলাকায় চলে এসেছে ওরা।
প্রায় দেড়ঘণ্টা বাদে বড় রাস্তা থেকে বাঁ-দিকে ঘুরল সামনের ইনোভা গাড়িটা। সরু পিচের রাস্তা। মিনিট দশেক বাদে একটা বড় পাঁচিল ঘেরা বাড়ির গেটে ঢুকে গেল!
কিষেণকে গাড়ি নিয়ে খানিকটা দূরে দাঁড়াতে বলে অনিলিখা হেঁটে গেটের দিকে এগিয়ে গেল। একটু দূরে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করল। গেটে কাউকে না দেখে গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল অনিলিখা। ইনোভা গাড়িটা বাঁ-দিকে পার্ক করা আছে। চারপাশে পরপর বেশ কয়েকটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট কটেজ। খানিকটা এগোলে পিছনের দিকে বড় তিনতলা একটা বাড়ি। বাড়িটার দিকে সন্তর্পণে এগোচ্ছিল অনিলিখা। হঠাৎ চেনা গলার ডাকে ঘাড় ঘুরিয়ে চমকে উঠল অনিলিখা। রাজা। ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি-মুচকি হাসছে।
—চলো অনি, এতটা যখন এসেই পড়েছ, ভেতরে এসো, এমনিতেও তোমার মতো একজনের আমাদের দরকার ছিল। আর্যভট্টর দেশের লোকেদের মাথা খুব পরিষ্কার।
অনিলিখাকে নিয়ে রাজা বাড়িটার মধ্যে ঢুকল।
অনিলিখাকে নিয়ে রাজা একটা প্যাসেজ ধরে খানিকটা এগিয়ে গেল। ডানদিকে সার দেওয়া ঘর। বাড়িটা বোধহয় স্কুলবিল্ডিং বা বড় সরকারি বিল্ডিং ছিল। সব ঘরের দরজায় তালা। খানিক আগে গিয়ে প্যাসেজটা ডানদিকে বেঁকে গেছে। তারপর আর একটু এগিয়ে একটা বড় কাঠের দরজায় গিয়ে শেষ হয়েছে।
রাজা এগিয়ে গিয়ে কাঠের দরজার হাতলের সামনে হাত রাখল। দরজাটা অদ্ভুতভাবে পাশাপাশি সরে গেল। সামনে ছোট একটা কাচে ঘেরা জায়গা। তারপরে একটা বিশাল বড় ঘর। ঘরের ভেতরের দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ অনিলিখার মুখে কোনও কথা এল না। অবাক হয়ে অনিলিখা বলে উঠল—এখানে এসব কী? স্যাটেলাইট মিশন কন্ট্রোল সেন্টার?
বিশাল ঘরটার সিলিং-এর হাইট অন্তত চল্লিশ ফুট। আর তার মধ্যে দশটা ব্যাডমিন্টন কোর্ট অনায়াসে ঢুকে যায়। সারি দিয়ে পরপর কন্ট্রোল ডেস্ক। তার ওপর অত্যাধুনিক ইনস্ট্রুমেন্টেশন প্যানেল। প্রত্যেকটাতে ডিসপ্লে, সিমুলেটর, অজানা কিছু যন্ত্র। ঘরের মধ্যে অন্তত কুড়িজন লোক যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করছে। সামনের পুরো দেওয়াল জুড়ে রাখা বিশাল এল.ই.ডি. প্যানেলে বিশাল পৃথিবীর ম্যাপ। তার মধ্যে বিশেষ কতগুলো জায়গায় লাল-হলুদ আলো দপদপ করছে।
—কী ব্যাপার রাজা? এসব কী?
—চলো ক্যাফেতে যাওয়া যাক! পাঁচ মিনিটে তোমাকে সব বলে দিই। আমার হাতেও একদম সময় নেই।
খানিকবাদে ওই বাড়িরই আরেকটা বড় ঘরে ওরা এসে ঢোকে। সার দিয়ে চা-কফির মেশিন ও অন্যান্য সরঞ্জাম রাখা। চট করে মেশিন থেকে দুটো কফি নিয়ে সোফায় মুখোমুখি বসে রাজা বলে উঠল,—
—আমাদের খুব বিপদ অনিলিখা। উই আর অন দ্য ভার্জ অফ এক্সটিংকশন। সারা পৃথিবী ধ্বংসের মুখে। প্রায় দেড় কিলোমিটার লম্বা অ্যাসটেরয়েড ঠিক চব্বিশ দিন বাদে আমাদের এই পৃথিবীতে আছড়ে পড়বে। ভাবতে পারছ?
—সে কী! পৃথিবীতে ধাক্কা মারতে পারে এমন প্রায় সব স্যাটেলাইটকেই তো আমরা চিহ্নিত করে ফেলেছিলাম। হঠাৎ করে এই অ্যাসটেরয়েডটা এল কোত্থেকে?
—ওই, ওই যে 'প্রায়' কথাটা বললে। এক কিলোমিটারের থেকে বড় নব্বই শতাংশ পাথরকে আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছিলাম। কিন্তু বাকি দশ? দু-মাস আগে নিউ মেক্সিকোর এক মিটার লম্বা একটা টেলিস্কোপে যতক্ষণ না এই অ্যাসটেরয়েডটা ধরা পড়েছিল, ততক্ষণ আমরাও তোমার মতো নিশ্চিন্ত ছিলাম। ভেবেছিলাম আমরা বোধহয় সব অ্যাসটেরয়েডের কথাই জানি। তারপরে হঠাৎ এই শনির উদয়। হ্যাঁ, এই অ্যাসটেরয়েডটার নাম দেওয়া হয়েছে শনি।
—তা এ ধাক্কা মারলে কী হবে?
—প্রাণের কোনও চিহ্নই থাকবে না বলতে পারো। কারণ এক কিলোমিটারের বেশি কোনও অ্যাসটেরয়েড ধাক্কা মারলে তার প্রভাব কোনও একটা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। হিরোশিমার মতো দশ হাজারটা পরমাণু বোমা একসঙ্গে ফাটলে যা ফল হয় তাই আর কি! ঠিক যেমন পঁয়ষট্টি লক্ষ বছর আগে ডাইনোসরদের যুগ শেষ হয়েছিল এরকমই একটা অ্যাসটেরয়েডের আঘাতে—তেমনই হতে চলেছে। এবার আমাদের পালা। ওই যে আমরা ভাবতাম আমরা খুব বুদ্ধিমান—আমরাই দু-মিলিয়ান বছর ধরে রাজত্ব করব—সব ভুল।
রাজা খানিকক্ষণ থেমে ফের উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল,—তবে সব কিছু এখনও শেষ হয়নি অনিলিখা। এখনও উপায় আছে। আর তাই আমরা সমবেত হয়েছি। এখানে যাদের দেখছ তারা সবাই মহাকাশ বিজ্ঞানে পৃথিবীর সেরা বিজ্ঞানী। এদের মধ্যে কেউ মিশন স্পেশালিস্ট হিসেবে মহাকাশে গেছেন, তো কেউ স্পেস ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার। মহাকাশ যাত্রার অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। অনেকের আবার এ বিষয়ে প্রচুর রিসার্চ আছে। এঁরা সবাই বাড়িঘর-পরিবার ছেড়ে এখানে চলে এসেছেন।
—অনেককে না জানিয়ে জোর করে ধরে নিয়ে এসেছ, তাই না? স্বরাজ পলের মতো?
—করতে হয়েছে অনিলিখা। মনে রেখো এ বিষয়ে পৃথিবীর সেরা মেধাকে একসঙ্গে না করতে পারলে কোনও সমাধান বেরোবে না। আর তখন এ পৃথিবীই থাকবে না। আমরা কেউ থাকব না। না থাকবে আমাদের পরিবার—না থাকবে আমাদের বন্ধু, আত্মীয়স্বজন কেউ না! ঘটা করে ডেকে আনলে গোপনীয়তা রক্ষা করা যেত না।
—কিন্তু এই ক'দিনের মধ্যে কি সম্ভব?
—সেটাই তো চ্যালেঞ্জ অনিলিখা। আমরা কুড়ি বছরের কাজ দু-মাসে করার চেষ্টা করছি। প্রত্যেকদিন, প্রত্যেক ঘণ্টা, প্রত্যেক মুহূর্ত আমাদের কাছে মূল্যবান। এই যে তোমার সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলছি, তারও একটা উদ্দেশ্য আছে অনিলিখা। তুমি ঠিক এ বিষয়ের না হলেও তোমার অসম্ভব ট্যালেন্ট সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল। তুমি আমাদের সঙ্গে কাজ করো। আমরা সবাই এ বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত। তোমার চিন্তাভাবনার খোলা হাওয়া আমাদের দরকার। তবে বাড়ির কাউকে এ ব্যাপারে জানাতে পারবে না।
—কিন্তু ওরা তো চিন্তা করবে। হয়তো পুলিশে খবর দেবে। তখন?
—ওসব চিন্তা আমার ওপরে ছেড়ে দাও। আমার লজিস্টিক্স টিম সব সামলে নেবে। হয়তো অন্য কোনও কারণ জানানো হবে।
—ঠিক আছে রাজা। বাড়িতে অন্তত একটা ফোন করে দিই।
—একটাও না,—অস্বাভাবিকরকম জোরে শাসনের সুরে বলে উঠল রাজা। তারপর গলার স্বর একটু নামিয়ে বলল,—এমনিতেও পুরো এলাকার সবরকম নেটওয়ার্ক ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। এখানে যারা আছে তারা কেউ চাইলেও এ-প্রাোজেক্টের সঙ্গে যুক্ত নয় এরকম কারুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে না। এটাই এখানকার নিয়ম। ভাবতে পারছ কী হবে যদি এই অ্যাসটেরয়েডের ধাক্কার কথা বাইরে কোনওভাবে জানাজানি হয়ে যায়। সারা পৃথিবী জুড়ে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে যাবে। আইনকানুন ভেঙে পড়বে। প্যানিক ছড়িয়ে পড়বে। আমরা আমাদের ধ্বংস আরও তাড়াতাড়ি ডেকে আনব।
অনিলিখাকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে রাজা ফের বলে উঠল,—আর তোমাকে নিশ্চয়ই বলতে হবে না যে আমরাই ইচ্ছে করে তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি। তা না হলে কারও পক্ষে এখানে ঢোকাও সম্ভব নয়—বেরোনোও সম্ভব নয়। সে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেও।
—তা হঠাৎ করে এখানে? এখানে তো কোনও সুযোগ সুবিধেই নেই। অনিলিখা এতক্ষণে কফিতে চুমুক দিয়ে বলে উঠল।
—আমরাই চাইনি মূল মহাকাশ কেন্দ্রগুলোতে এ নিয়ে কাজ করতে। তাতে খবর ছড়িয়ে যেত তাড়াতাড়ি। এরকম টপ সিক্রেট প্রাোজেক্টে অনেক অসুবিধে। আমরা তাই অন্য উপায় বেছে নিয়েছি। আমরা চারটে টিমে কাজ করছি। চারটে টিম চার ধরনের পদ্ধতিতে অ্যাসটেরয়েডের ধাক্কা আটকানোর চেষ্টা করছে। আমেরিকার টিমটা ফ্লোরিডায়। কেনেডি স্পেস সেন্টারের কাছাকাছি একটা জায়গা থেকে কাজ করছে। দ্বিতীয় টিমটা জার্মানির মিউনিখে। জার্মানির কলম্বাস কন্ট্রোল সেন্টারের কাছাকাছি একটা জায়গায় আছে। তৃতীয় টিমটা জাপানের সুকুবা স্পেস সেন্টারের কাছে অপারেট করছে। আর চতুর্থ টিম—আমরা। এখানে। বিক্রম সারাভাই স্পেস স্টেশনের কাছে।
আমরা এসব কেন্দ্র থেকে সবরকম প্রযুক্তিগত সাহায্য পাচ্ছি, আবার একইসঙ্গে গোপনীয়তাও রক্ষা হচ্ছে। কারণ আমরা কাজ করছি এসব মহাকাশ কেন্দ্রের বিশেষ কিছু লোকের সঙ্গে। আমাদের কাজটা তো রকেট তৈরি করা নয় বা লঞ্চ সেন্টার তৈরি করাও নয়। আমরা শুধু সারা বিশ্বের সবক'টা মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র, লঞ্চ সেন্টার আর মিশন কন্ট্রোল সেন্টারগুলোকে ব্যবহার করে এই প্রাোজেক্টটাকে পরিচালনা করছি।
—তা, টিমগুলো কাজ করছে কী ভাবে?
—আমেরিকার টিমটা কাজ করছে পারমাণবিক রকেটের ওপর। রকেটের সাহায্য পরমাণু বোমা ছোঁড়া হবে। প্রচণ্ড গতিতে গিয়ে ধাক্কা মারবে অ্যাসটেরয়েডকে। পৃথিবীতে ঢোকার আগেই অ্যাসটেরয়েড চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। তবে এতে সমস্যা আছে। ভাঙা বড় টুকরো পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসতে পারে, তবে এটাই প্রধান সমস্যা নয়। সমস্যা হল এ ধরনের রকেট ছোঁড়ার অনুমতি পাওয়া। সামান্য এদিক ওদিক হলেই অন্য কোথাও গিয়ে পড়বে। আর তাতে পারমাণবিক বিস্ফোরণ হলে যে কী হবে! সারা পৃথিবী একজোট হয়ে সম্মতি দিলে তবেই এরকম রকেট ছোঁড়া যাবে। তবে পরমাণুবোমা অন্য কোনওভাবে অ্যাসটেরয়েডের গায়ে বসানো যায় কিনা সেটাও দেখা হচ্ছে।
—জার্মানির টিমটা?
—বুঝতেই পারছ জার্মানির টিমটা ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সি আর রাশিয়ার ফেডারেল স্পেস এজেন্সির সঙ্গে মূলত কাজ করছে। ওরা সৌরশক্তি চালিত মেশিন অ্যাসটেরয়েডের গায়ে বসিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছে। ওপরে ওখানে তো আর সূর্যের আলোর অভাব নেই। ওই মেশিন সৌরশক্তিতে চলবে আর আস্তে আস্তে অ্যাসটেরয়েডের মুখ ঘুরিয়ে দেবে। মুশকিল হল, সময় খুব কম। এতটুকু সময়ের মধ্যে এত শক্তিশালী একটা মেশিন তৈরি করা, তাকে ঠিকভাবে অ্যাসটেরয়েডের গায়ে বসানোও চাট্টিখানি কথা নয়। পাঁচ-ছ'বছর সময় পাওয়া গেলে এভাবে কিছু করা সম্ভব হত। কিন্তু এখন তো মাঝে কয়েকটা দিন।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল রাজা। পাশের কাচের জানলার দিকে এগিয়ে গেল। বাইরের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,—এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে এরকম হতে পারে। আমার দু-মাস সবে বিয়ে হয়েছে। ওকেও কিছু জানাইনি। হয়তো আর দেখাও হবে না।
একটু থেমে রাজা ফের বলে উঠল,—তৃতীয় টিম জাপানের। ওই টিমের কাজটা খুব অভিনব। ওরা ভাবছে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে একটা বড় লেন্স পাঠানোর কথা—যার সাহায্যে সৌরশক্তিকে অ্যাসটেরয়েডের ওপর ফোকাস করা হবে। এতে অ্যাসটেরয়েডের কিছু অংশ পুড়ে যাবে আর ভর কমে যাওয়ার জন্য অ্যাসটেরয়েডের গতিপথ আস্তে আস্তে পালটে যাবে। এখানে কিছুটা কাজ এগিয়েছে। তবে প্রশ্ন হল গতিপথ যতটা পালটানো যাবে তা যথেষ্ট কি না।
—আর এখানকার টিমটা?
—আমরা ভাবছি একটা মহাকাশযান পাঠাব যা ওই অ্যাসটেরয়েডের সঙ্গে সঙ্গে যাবে। সরাসরি অ্যাসটেরয়েডের গায়ে না বসে পাশাপাশি যাবে আর অভিকর্ষ বলের সাহায্যে অ্যাসটেরয়েডকে কাছে টেনে পথ থেকে সরিয়ে দেবে।
—তা তার জন্য তো বিশাল মহাকাশযান পাঠাতে হবে।
—হ্যাঁ, সেটাই তো সমস্যা। কতটা কন্ট্রোল দরকার ভাবতে পারছ? মাত্র এ-ক'দিনে কতটা সরানো যাবে সেটাই প্রশ্ন। আমরা চেষ্টা করছি যতটা সম্ভব বেশি পে-লোড পাঠাবার, যাতে অভিকর্ষবল জোরদার হয়। আর যতটা সম্ভব গতিপথ পালটানো যায়। মুশকিল হল, এ পর্যন্ত মহাকাশে যত পে-লোড আমরা পাঠিয়েছি, এক্ষেত্রে দরকার হবে তার হাজারগুণ বেশি পে-লোডের। তবে সেটাও যদি কাজ না করে—
রাজা কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল।
—চলো এবার কাজে নেমে পড়া যাক। তোমার দায়িত্ব কী হবে তা বুঝিয়ে বলি। মাঝে মাত্র চব্বিশ দিন। বলে রাজা অনিলিখাকে নিয়ে দ্রুতপায়ে কন্ট্রোল রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
প্রাোজেক্ট মিশন কন্ট্রোল সেন্টার, ত্রিবান্দ্রম, 24 সেপ্টেম্বর—কুড়ি দিন বাকি
কয়েকটা দিন ঝড়ের মতো কেটে গেল। দিনরাত কাজ চলছে। এ তো আর শুধু পরিকল্পনা আর গবেষণা নয়, সেই পরিকল্পনাকে সাকার করার জন্য সঙ্গে সঙ্গে অনেক ব্যবস্থাও নিতে হচ্ছে।
এতগুলো স্পেস এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ রাখাও একটা ব্যাপার। তার মধ্যে ইজরায়েলের স্পেস এজেন্সিও যেমন আছে, তার শত্রুদেশ ইরানের স্পেস এজেন্সিও আছে। চিনের স্পেস অর্গানাইজেশনও আছে। জাপানের এরোস্পেস এক্সপ্লারেশন এজেন্সি আছে। একই সঙ্গে সবরকম গোপনীয়তাও অবলম্বন করতে হচ্ছে। দেখা হচ্ছে কোথায় কোন লঞ্চ সেন্টার আছে, সেখান থেকে অতীতে কী ধরনের রকেট ছোঁড়া হয়েছে, তাদের প্রযুক্তিগত ক্ষমতা কীরকম। সবচেয়ে বড় কী রকেট আছে—তাদের কোন উচ্চতা পর্যন্ত পাঠানোর ক্ষমতা আছে। তারপরে প্রয়োজনমতো তাদের প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে সাহায্য করা হচ্ছে।
অনিলিখা রাজাকে মূলত সাহায্য করছে পুরো প্রাোজেক্টের ম্যানেজমেন্টে, নতুন চিন্তাভাবনা জোগাতে, সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে।
রাজা সত্যিই দক্ষ প্রশাসক। এতজন নামকরা বিজ্ঞানীকে হঠাৎ এক জায়গায় নিয়ে এসে তাদেরকে দিয়ে একসঙ্গে কাজ করানো সোজা কথা নয়। প্রত্যেকের নিজস্ব মতামত আছে, ইগো আছে। অনেকে এরকম টিমে কাজ করতে অভ্যস্তই নয়। তা ছাড়া নানান দেশের নানান ভাষার সমস্যা—নানানরকমের ব্যবহার—এসব সমস্যা তো আছেই; অনিলিখার সামনেই সেদিন নাসার সায়েন্টিস্ট ডক্টর স্টিভেন আর রাশিয়ান কসমোনট কোটভ ওলেগের মধ্যে কাজের পদ্ধতি নিয়ে এমন তর্কবিতর্ক শুরু হয়ে গেল যে, রাজা এসে মধ্যস্থতা না করলে কী হত বলা মুশকিল।
এদের মধ্যে অনেকেরই মহাকাশযাত্রার অভিজ্ঞতা আছে। কেউ কেউ আবার মিশন স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করেছে। যেমন জাপানের ডক্টর ওয়াকাটা। ইনি ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে আগে কাজ করেছেন। রোবোটিক্স অপারেশনের সব দায়িত্ব পালন করেছেন। কীভাবে মহাকাশে রোবোটিক্স আর্ম ব্যবহার করা যায় সে ব্যাপারে উনি এক্সপার্ট। আবার কারো কারো রিকের মতো বহুমুখী অভিজ্ঞতা। রিকের কথাই বলা যাক। প্রথমে স্পেস ফ্লাইটের জন্য সফটওয়্যারের ওপর কাজ করেছেন। পরে ককপিটের ডিজাইনের ওপর কাজ করেছেন। তারপর অ্যাসট্রনটের ট্রেনিং নিয়ে তিনটে মহাকাশ যাত্রায় মিশন স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। মহাকাশে চল্লিশ দিন কাটিয়েছেন। মহাকাশে হেঁটেওছেন। এঁদের মধ্যে অনেকে আবার মনে মনে খুব ক্ষুব্ধ। না জানিয়ে জোর করে নিয়ে আসা হয়েছে বলে।
যেমন মার্ক। মূলত গণিতজ্ঞ। অ্যাসটেরয়েডের কক্ষপথ গণনায় ওনার মতো এক্সপার্ট খুব কম আছে। থাকেন জোহানেসবার্গে। অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন। ওনাকে জোর করে নিয়ে আসা হয়েছে। ছেলের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি। উনি মাঝেমধ্যেই রাজার ওপর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছেন। তবে কাজ বন্ধ করেননি।
এসবের মধ্যেই রাজা ঠান্ডা মাথায় কড়া হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে। নিয়মের কোনও নড়চড় নেই। প্রত্যেকদিন তিন ঘণ্টা অন্তর অন্তর কুড়ি মিনিটের জন্য টিমের মধ্যে কাজের সমন্বয়ের জন্য টিম মিটিং হচ্ছে। দিনে একবার প্রত্যেকটা টিম এক ঘণ্টার জন্য অন্য টিমগুলোর সঙ্গে কথা বলছে। কোন টিম তাদের কাজে কতটা এগিয়েছে, তা অন্য টিমকে জানানো হচ্ছে। তাদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া রাজার প্রাোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট টিমের সঙ্গে নানান মহাকাশ সংস্থার কথাবার্তা চালু আছে।
রাজা অনিলিখাকে একবার বলেছিল,—প্রথমবার সারা বিশ্ব একজোটে কাজ করছে। আমি নিজেও সবার কাছ থেকে এতটা সাপোর্ট পাব তা ভাবতে পারিনি। আমরা দেশভাগ ভুলে একসঙ্গে কাজ করলে কী না পারি? তবে যাকে বলে মরণকালে হরিনাম।
অনিলিখা বলে উঠল,—কেন, ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের কাজে পৃথিবীর নানান দেশ একসঙ্গে কাজ করে। প্রায় গত পনেরো বছর ইন্টারন্যাশনাল স্পেস সেন্টারের কাজ তো এভাবে চলছে।
—সে আর ক'টা দেশ! তা-ও অনেক লিখিত অলিখিত নিয়ম আছে। বাধা নিষেধ আছে। এখানে পৃথিবীর যে-ক'টা দেশে মহাকাশ প্রযুক্তি খানিকটা এগিয়েছে, তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে আমরা কাজ করছি। প্রথমবার সারা পৃথিবী এক আকাশের তলায়। উপায় একটা বেরোবেই।
একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলল রাজা।—মুশকিল একটাই। আর মোটে কুড়িদিন বাকি।
ত্রিবান্দ্রম, 26 সেপ্টেম্বর—আঠেরো দিন বাকি
—ডক্টর ন্যাশ, এ মেলটা কি আপনারই লেখা? রাজা বলে উঠল।
ডক্টর ন্যাশ ওনার ডেস্কে সিম্যুলেটর নিয়ে কী সব করছিলেন। হঠাৎ চমকে উঠলেন। কাগজটা একঝলক দেখামাত্র ওনার কানদুটো লাল হয়ে উঠল। ডক্টর ন্যাশ ইংল্যান্ডের লোক। 'অ্যাসটেরয়েডরা যখন সূর্যের কাছ দিয়ে যায়, তখন তাপ গ্রহণ করে। পরে সে তাপ যখন বেরিয়ে যায়, তখন তার গতিপথে সামান্য পরিবর্তন হয়।' ডক্টর ন্যাশ এই তত্বের মূল প্রবক্তা। অত্যন্ত সজ্জন, পণ্ডিত ব্যক্তি। উনিও ভারতের টিমে আছেন।

রাজা বলতে থাকে,—আপনি লিখেছেন যে আপনি অন্তত এটা দেখবেন যে অ্যাসটেরয়েডের আঘাতে ইংল্যান্ডের বড় কোনও বিপদ না হয়। এ-ও লিখেছেন যে গতিপথে সামান্য পরিবর্তন করা সম্ভব হলে ইংল্যান্ড বা আয়ার্ল্যান্ডের তেমন কোনও ক্ষতি হবে না। অ্যাসটেরয়েড আফ্রিকার ভূখণ্ডে এসে পড়বে। রকেট ছোঁড়া সম্ভব হলে এটা আপনি নিশ্চিত করবেন। এখানে আসার আগে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সাংকেতিক মেসেজে পাঠালেও আমার উদ্ধার করতে অসুবিধে হয়নি। এই মেলটা কাকে করেছেন তা-ও আমরা জেনে গেছি। আমাদের লক্ষ্য পুরো পৃথিবীকে বাঁচানো, কোনও একটা দেশকে নয়। তাই না?
ডক্টর ন্যাশ মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
রাজা ফের বলল,—আমি এ-ও জানি যে G8-এর অন্তর্ভুক্ত তিনটে দেশের শীর্ষনেতাকে দুদিন আগে আয়ার্ল্যান্ডের ডাবলিনে এক পাবে মাঝরাতে আলোচনা করতে দেখা গেছে—যার মূল বিষয় ছিল কীভাবে সেই তিনটে দেশকে এই অ্যাসটেরয়েডের আঘাত থেকে রক্ষা করা যায়। আমি নিশ্চিত যে আমাদের মধ্যে আরও কেউ আছে যার হয়তো এরকম কোনও সংকীর্ণ স্বার্থ আছে।
নাইজেরিয়ার বিজ্ঞানী ড: আজিজ উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করলেন,—এ জন্যই আমরা আমেরিকা আর ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস করি না। বাকি পৃথিবীতে আর কোনও লোক বেঁচে না থাকলেও ওদের কিছু আসে যায় না।
ব্যস, পুরো ঘরে শোরগোল শুরু হয়ে গেল। প্রায় মাছের বাজারের মতো চিৎকার-চেঁচামেচি। কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষীর অনেক চেষ্টার পরে পরিস্থিতি আয়ত্তে এল।
অনিলিখা শান্তভাবে বলতে শুরু করল,—আপনারা সবাই অত্যন্ত বুদ্ধিমান, পণ্ডিত লোক। আমিই বরঞ্চ এ বিষয়ের নই। আপনারা প্রত্যেকেই জানেন যে এ সংঘাত হলে কোনও দেশই রক্ষা পাবে না। কিছু দেশ হয়তো সঙ্গে সঙ্গে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, কিন্তু যারা পড়ে থাকবে তাদের অবস্থা হবে আরও খারাপ। পুরো আকাশ ঢেকে যাবে ধুলোয়। মাসের পর-মাস, বছরের পর-বছর সে ধুলোর বাষ্পে ঢেকে যাবে সূর্যের আলো। থাকবে না কোনও গাছপালা, থাকবে না কোনও খাদ্য। আমরা কেউ থাকব না। আসুন, আমরা এখানে রাজনীতি থেকে দূরে থাকি। দেশের সীমারেখা ভুলে যাই। আমাদের একটাই দেশ। তা হল পৃথিবী। আমরা তাকে বাঁচাবই। এখনও আঠেরো দিন বাকি।
ভিডিয়ো কনফারেন্সিং-এ চারটে টিমেরই প্রাোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট অফিস উপস্থিত। এরাই প্রাোজেক্টের পুরো প্ল্যান নিয়ন্ত্রণ করে। জার্মান টিমের প্রধান অ্যাক্সেল ওয়াইজ ঘুম জড়ানো গলায় বলতে শুরু করলেন,—নাহ, কোনওভাবেই সম্ভব নয়। দশ বছরের কাজ কি আর দু-মাসে করা যায়! তবু আমরা হাল ছাড়িনি।
একটু থেমে ফের শুরু করলেন,—কাজাখস্তানের বৈকনুর কসমোড্রোম, ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সি, মস্কোর মিশন কন্ট্রোল সেন্টার গত দেড়মাস ধরে চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করে গেছে আমাদের সঙ্গে। গুড নিউজ হল তার জন্য এখন আমরা একটা প্রাোটন রকেট বৈকনুর কসমোড্রোম থেকে লঞ্চ করতে প্রস্তুত। তাতে আমরা রোবোটিক্স ল্যাবরেটরিও বসিয়ে দিয়েছি। সৌরশক্তি চালিত যন্ত্র রোবো দু-ঘণ্টা আগে রেডি হয়ে গেছে, যদিও তার শক্তি খুবই সীমিত। আমাদের স্পেস ট্রাভেল এক্সপার্ট থিওডরও প্রস্তুত। থিওডরের মতো স্পেস ট্রাভেলে অভিজ্ঞ কসমোনট সারা পৃথিবীতে খুব কম আছে। কিন্তু এতসব করার পরেও রকেট পাঠিয়ে কোনও লাভ হবে না।
—কেন? অ্যাসটেরয়েডে রোবো বসাতে কোনও মুশকিল হচ্ছে? জন এদিক থেকে বলে উঠল।
—বুঝতেই পারছ সে কাজটা সোজা নয়। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা হল অ্যাসটেরয়েড এখন পৃথিবীর এত কাছে চলে এসেছে যে এই চোদ্দো দিনে গতিপথে যা পরিবর্তন করা যাবে, গণনা করে দেখা যাচ্ছে তা যথেষ্ট নয়। দেখো—ট্র্যাজেক্টরির কতটুকু পরিবর্তন হবে—বলে অ্যাক্সেল ওখানকার কনফারেন্স রুমের ডিসপ্লেতে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।
—আগের গতিপথ আর নতুন পরিবর্তিত গতিপথের মধ্যে প্রায় কোনওই তফাত নেই। এমনকী পৃথিবীর যে জায়গায় অ্যাসটেরয়েড ধাক্কা মারত, তার সঙ্গে পরিবর্তিত জায়গার দূরত্ব হবে বড়জোর চারশো কিলোমিটার।
অ্যাক্সেল একটু কেশে নিয়ে ফের বলে উঠলেন,—অ্যাসটেরয়েড এখন এত কাছে এসে গেছে যে আমার মনে হয় না ইনডাইরেক্ট মেথডগুলো দিয়ে আর কোনও কাজ হবে। ওই সাইজের অ্যাসটেরয়েডকে এত কম সময়ের মধ্যে সরাতে যা শক্তির প্রয়োজন, তার দশ হাজার ভাগের এক ভাগ শক্তিসম্পন্ন মেশিন পাঠানোর ক্ষমতাও আমাদের নেই। এখন উপায় সরাসরি ধাক্কা।
কায়টো টাকাহাসি জাপানের টিমের প্রধান। উনিও অ্যাক্সেলের সপক্ষে বলে উঠলেন,—আমরা জাপানে কোনও কিছু সহজে ছেড়ে দিই না। শেষ পর্যন্ত আশা রাখি। কিন্তু আমাদের টিমেরও এই ধারণা। আমাদের লেন্স তৈরির কাজ প্রায় আশি শতাংশ হয়ে গেছে। আমরা এখন থেকে ঠিক চারদিন তিন ঘণ্টার মধ্যে ওই লেন্স ইন্টারন্যাশনাল স্পেস সেন্টারে পাঠিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করেছি। কিন্তু ওখানে ঠিকভাবে লাগাতে, অ্যাসেম্বল করতে, লেন্সের সাহায্যে সৌরশক্তি কেন্দ্রীভূত করে অ্যাসটেরয়েডে ফেলার জন্য প্রস্তুত হতে আরও অন্তত বারো ঘণ্টা লাগবে। অর্থাৎ, পড়ে থাকবে ন'দিন-ন'ঘণ্টা। তাতে অ্যাসটেরয়েড যতটাই ভস্মীভূত হোক না কেন—তা যথেষ্ট নয়। ওইটুকু ভর কমলে গতিপথ কিছুই পালটাবে না। আমাদের সফল হওয়ার প্রাোবাবিলিটি হাজার ভাগের একভাগ।
তা ছাড়া এটাও খেয়াল রাখতে হবে যে এই প্রযুক্তি পরীক্ষিত নয়। এত দ্রুত ধাবমান অ্যাসটেরয়েডের গতির সঙ্গে লেন্সের দিক পরিবর্তনের তাল মেলাতে হবে। আমারও মনে হয় আমরা আলাদা আলাদা করে চেষ্টা না করে এখন একটাই উপায় ঠিক করি। তাতে অন্তত কিছু যদি করা সম্ভব হয়।
আরও বেশ খানিকক্ষণ আলোচনা চলল। একটা কথাই বোঝা গেল যে প্রত্যেকেই অসহায়। প্রত্যেকেই ভাবছে যে অন্য কেউ যদি কিছু মির্যাকল করে দেখায়। 'অসম্ভব' কথাটা প্রথমবার সত্যি মনে হল অনিলিখার। যত সময় যাচ্ছে একটা অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছে প্রত্যেকের মধ্যে—চোখে-মুখে, হাঁটাচলায়। অনিলিখা নিজেও তার বাইরে নয়। সত্যিই কি আর চোদ্দো দিনে সব শেষ হয়ে যাবে!
ঘরে ফিরে এসে ফোনে সেভ করে রাখা আগের ছবিগুলো দেখল অনিলিখা। মা-বাবা-বন্ধুদের ছবি। আর কি কখনও দেখা হবে? ইস, কত কিছুই তো করার ছিল।
প্রাোজেক্ট মিশন কন্ট্রোল সেন্টার, ত্রিবান্দ্রম, 4অক্টোবর—ঠিক দশ দিন বাকি
—স্ক্রিনে বারচার্টে ফুটে উঠছে—উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের প্রস্তুতি 50 শতাংশ, রকেটের প্রস্তুতি 40 শতাংশ—কন্ট্রোল সিস্টেমের প্রস্তুতি 20 শতাংশ, মহাকাশযানের মাধ্যমে অ্যাসটেরয়েডকে গতিপথ থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি 20 শতাংশ।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকে গেল রাজার। আর মোটে দশ দিন বাকি। বিশেষ মিটিং ডাকা হয়েছে। সবাইকে উদ্দেশ্য করে রাজা বলতে শুরু করল,—আমরা যতটা সম্ভব চেষ্টা করেছি। কিন্তু আর এই চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার সত্যিই কোনও অর্থ নেই। আমরা ব্যর্থ।
একটু থেমে রাজা ফের বলে উঠল,—আমাদের যে পে-লোড দরকার অ্যাসটেরয়েডকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তা আমরা কোনওভাবেই পাঠাতে পারব না। আমরা আমেরিকার দুটো, রাশিয়ার তিনটে, ভারত ও জাপানের একটা করে রকেট উৎক্ষেপণের জন্য রেডি করেছি। কিন্তু মুশকিল দুটো। এক, তাতেও যথেষ্ট পে-লোড পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। দুই, প্রত্যেক মহাকাশযানকে নির্ভুলভাবে অ্যাসটেরয়েডের পাশে পাশে যেতে হলে যে প্রস্তুতি দরকার তা আমাদের কোনওভাবেই নেই।
কথাটা বলে রাজা চুপ করে গেল। কনফারেন্স রুমে সম্পূর্ণ নীরবতা। আসলে কারও কিছু বলার নেই। ড: ক্রিশ্চিয়ানো বলে উঠলেন,—এখন একমাত্র ভরসা অ্যাসটেরয়েডে সরাসরি আঘাত। আমি আগেই বলেছিলাম এ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কোনও অর্থ নেই, শুধু শুধু এতগুলো দিন নষ্ট হল!
—নষ্ট নয় ক্রিশ্চিয়ানো। আমরা যা করেছি তা সম্পূর্ণভাবে ওদের কাজে লাগবে। আমরা আমেরিকার টিমের সঙ্গে সমানে তাল মিলিয়ে কাজ করেছি। আমরা কী করছি, ওরা তা সবই জানে। ওরা অনেকটাই এগিয়েছে। আমাদের কাজ হবে আগামী কয়েকদিন ওদেরকে সবরকমভাবে সাহায্য করা। ওরাই এখন একমাত্র ভরসা। সরাসরিভাবে যদি অ্যাসটেরয়েডকে ধাক্কা মেরে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু খুব কাছে চলে এলে সেটাও করা যাবে না।
ফ্লোরিডা মিশন কন্ট্রোল সেন্টার, 10 অক্টোবর—চার দিন বাকি—
ডক্টর লেনো সবাইকে শুভ সম্ভাষণ করে বলতে শুরু করলেন,—আমাদের যা কিছু করার তা পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই করতে হবে। গত দু-তিনদিন এই প্রাোজেক্টের সঙ্গে যুক্ত সব বিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা হয়েছে। বাকি তিনটে টিম আমাদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করেছে। কিন্তু তা-ও এটা ঠিক যে আমাদের প্রস্তুতি যে অবস্থায় তাতে সরাসরি ধাক্কা মারার সম্ভাবনা এখন 1 শতাংশেরও কম।
এই দেড় কিলোমিটার ব্যাসের অ্যাসটেরয়েড আমাদের দিকে যে গতিবেগে ধেয়ে আসছে তাকে মিশাইল দিয়ে মারতে গেলে, মিশাইল এতটাই নিখুঁতভাবে ছুড়তে হবে যা এক কথায় অকল্পনীয়। সাহারা মরুভূমিতে একটা ছুটন্ত উটের পিঠের বস্তায় রাখা একটা ছুঁচকে এখান থেকে ছোঁড়া একটা আধইঞ্চির মার্বেল দিয়ে তাক করার থেকেও এ কাজ হাজারগুণ শক্ত। তাই আমরা দুটো প্ল্যান করেছি।
প্রথম প্ল্যান, আই সি বি এম মিসাইল প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা গত দেড়মাসে বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের সাহায্যে এর ডিজাইনে অনেক পরিবর্তন এনেছি। এর রেঞ্জ অনেক বাড়িয়েছি। এর শক্তি, নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানার ক্ষমতাও অনেক বাড়িয়েছি। এর জন্য আমরা যে রকেট দুটো তৈরি করেছি সেগুলো পাঁচটা স্টেজের। শেষ স্টেজটাকেও অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। শেষ স্টেজটাতে পাঁচটা ওয়ারহেড আছে, তা পাঁচটা পারমাণবিক বোমা অ্যাসটেরয়েডের ওপর নিক্ষেপ করবে। যদি একটাও লাগে তো আমরা নিশ্চিন্ত। অন্তত পুরো পাথরটা পৃথিবীতে আঘাত হানবে না। আমাদের কন্ট্রোল সিস্টেম নিশ্চিত করবে যে পাথরটাকে লক্ষ সীমার মধ্যে ঠিকভাবে খুঁজে না পেলে ওই পারমাণবিক ওয়ারহেডগুলো কার্যকরী হবে না। বিস্ফোরণ হবে না।
—তা আমরা কি টুকরো হয়ে যাওয়া পাথরগুলোর কথা ভেবেছি? প্রফেসার জ্যাসন ইগার ত্রিবান্দ্রম মিশন কন্ট্রোল সেন্টার থেকে বলে উঠলেন।
—না প্রফেসার। ওগুলোর কথা এখন ভাবার সময় নয়। জানি ওই পাথরের গুঁড়ো অন্য ধরনের সমস্যা তৈরি করবে। আমাদের স্যাটেলাইটগুলোকে বিপদে ফেলবে। কিন্তু আপাতত আমরা শুধু কিছুটা সময় পাওয়ার চেষ্টা করছি।
—কিন্তু এরকম এতগুলো নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড যুক্ত দুটো রকেট ছোড়ার অনুমতি পাওয়া তো এককথায় অসম্ভব। আমি যতদূর জানি বিভিন্ন দেশের মধ্যে চব্বিশটারও বেশি এগ্রিমেন্ট আছে এরকম পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রযুক্ত রকেট ছোড়ার বিরুদ্ধে। পাওয়া যাবে এ পারমিশন! ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার স্টিভেন প্রশ্নটা করে।
একটু হাসলেন ডক্টর লেনো। বলে উঠলেন,—বললাম না চব্বিশ ঘণ্টা আরও সময় আছে। তার মধ্যে পরের কুড়িঘণ্টা অন্তত লাগবে উৎক্ষেপণের যাবতীয় প্রযুক্তিগত বিষয়ের প্রস্তুতি দেখতে। ওই কুড়িঘণ্টায় প্রায় চল্লিশ ঘণ্টার কাজ সারতে হবে। সাড়ে তিন ঘণ্টা আগে আমাদের রকেট লঞ্চ সিকুয়েন্স চালু করতে হবে। তাহলে, পড়ে রইল আধঘণ্টা। ওই আধঘণ্টায় আমরা সব দেশের সম্মতি জোগাড় করব।
বলে একটু থেমে ফের বলে উঠলেন—কিছু জিনিস কোনওরকম অনুমতি ছাড়াই করতে হয়। স্পেশালি যখন তাতে সারা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ জুড়ে থাকে।
—আর দ্বিতীয় প্ল্যান?
—একটা ম্যানড স্পেসক্রাফট গিয়ে ধাক্কা মারবে পাথরটাকে।
—কে চালাবে সেই মহাকাশযান? অনিলিখা জিজ্ঞাসা করল।
—দুজন মহাকাশচারীকে আমরা নির্বাচন করেছি এর জন্য। বিখ্যাত রাশিয়ান কসমোন্যাট ওলেগ। ওলেগের মতো মহাকাশযান চালানোর অভিজ্ঞতা খুব কম লোকের আছে। তার সঙ্গে যে যাবে তাকে অনেকেই চেনে না। নাম পেড্রো। পেড্রোকে আমরা গত দেড়মাস ধরে তৈরি করেছি মহাকাশ যাত্রার জন্য। পেড্রো তার নিজের ক্ষমতায় পৃথিবীর হায়েস্ট সিকিউরিটি জেল থেকে বেরিয়ে এসেছিল। ওর তাৎক্ষণিক বুদ্ধির অনেক পরিচয় আমরা পেয়েছি। তা ছাড়া আগে যুদ্ধবিমান চালানোর অভিজ্ঞতাও ওর আছে। তাই এ ট্রেনিং নিতে ওর কোনও অসুবিধে হয়নি।
—তা এ প্ল্যানটা কি প্রথম প্ল্যানটা ফেল করলেই নেওয়া হবে?
—হ্যাঁ, আমরা তাই ঠিক করেছি, তবে সময় এত কম যে যদি প্রথম প্ল্যান ঠিকমতো কাজ না করে তার ঠিক দু-ঘণ্টার মধ্যে এই ম্যানড স্পেসক্রাফট পাঠাতে হবে, যা সরাসরি আছড়ে পড়বে অ্যাসটেরয়েডের বুকে। আমরা পরের চব্বিশ ঘণ্টায় প্রতি ঘণ্টার প্রগ্রেস জানাব। পুরো পৃথিবীর ভাগ্য ঠিক হবে আমাদের হাতে আগামী কয়েক ঘণ্টায়। আপনাদের সবার সম্পূর্ণ সাহায্য যেন আমি পাই।
বলে লেনো ভিডিয়ো কনফারেন্সিং শেষ করলেন। প্রত্যেকে যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
লাইভ ফ্রম বৈকনুর কসমোড্রোম, কাজাখস্তান
খানিক আগেই আমাদের কাছে খবর এসেছে পৃথিবীর দুটো রকেট লঞ্চ সেন্টার থেকে অভূতপূর্বভাবে একইসঙ্গে দুটো রকেট পাঠানো হচ্ছে। কী কারণে তা বোঝা যাচ্ছে না। আমাদের করেসপন্ডেন্ট পেট্রোভা বৈকনুর থেকে সরাসরি আমাদের সঙ্গে। ওভার টু ইউ পেট্রোভা।
—আমাদের সঙ্গে আছে এ প্রাোজেক্টের সঙ্গে যুক্ত রাশিয়ার মস্কো মিশন কন্ট্রোল সেন্টারের ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার—ওলেগ।... ওলেগ, হঠাৎ করে এভাবে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় রকেট ছোড়া, —আপনি কী বলবেন এ ব্যাপারে?
—না, এটা যুদ্ধকালীন তৎপরতা নয়। আমরা জানি যে বড় কোনও অ্যাসটেরয়েড কোনও না-কোনও সময়ে পৃথিবীতে আঘাত হানবে। তাই আমরা দেখতে চাই যে বাইরে থেকে কোনও অ্যাসটেরয়েড পৃথিবীর দিকে ছুটে এলে আমরা একসঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে আঘাত করার ক্ষমতা রাখি কিনা। এজন্যই আমরা দুটো জায়গা থেকে দুটো রকেট পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছি।
—তা এরকম কোনও পাথরের পৃথিবীতে আঘাত করার সম্ভাবনা কি আপনারা দেখছেন?
—না, একেবারেই নয়, অন্তত আগামী একশো বছরে তো নয়ই। তবে আমরা যদি এখন থেকে মোকাবিলার প্রস্তুতি না নিই যখন দরকার হবে, তখন আমরা কিছুই করতে পারব না।
—তা, প্রশ্ন উঠছে যে এত গোপনীয়তার সঙ্গে এ প্রাোজেক্ট করা হল কেন? এমনকী মস্কো মিশন কন্ট্রোল সেন্টারেরও বেশিরভাগই নাকি এ প্রাোজেক্ট সম্বন্ধে জানত না।
—দেখুন, এই প্রথমবার আমরা অনেকগুলো দেশ মিলে এ ধরনের রিসার্চ প্রাোজেক্টে কাজ করছি। এতগুলো স্পেস এজেন্সির মধ্যে সমন্বয় একটা খুব দরকারি জিনিস। একই সঙ্গে আমাদের লক্ষ রাখতে হয়েছে যে আমরা যেন অহেতুক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ না করি। অন্য প্রাোজেক্টগুলোর কাজেও যেন কোনও ব্যাঘাত না তৈরি করি, তাই।
একটু হেসে পেট্রোভা বলে উঠল,—তা আপনি যদি আমাদের দর্শকদের একটু বুঝিয়ে বলেন যে আপনারা ঠিক কী করতে চলেছেন।
ওলেগ বলতে শুরু করলেন,—খুব সংক্ষেপে বলছি। আমরা মাল্টিস্টেজ রকেটের সাহায্যে তৈরি মিসাইলের মাধ্যমে দেখতে চাইছি, বিভিন্ন রকেট থেকে একই লক্ষ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার দরকার হলে আমরা তা করতে পারি কি না। তা এক্ষেত্রে তো সত্যি কোনও পাথর নেই, তাই আমরা নজর রাখব ওদের গাইড্যান্স সিস্টেম কতটা নিখুঁতভাবে কাজ করে তার ওপর। একটা কল্পিত টার্গেটের কত কাছে আমরা কোনও মিসাইল ছুঁড়তে পারি—এ তারই পরীক্ষা।
—তা এটা কি ট্যাক্সপেয়ারদের টাকা নষ্ট করা নয়? শুধু শুধু কবে একটা পাথর আসতে পারে তা ভেবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা।
ওলেগ হেসে বললেন—তা সে তো মানুষের চাঁদে যাওয়াও পয়সা নষ্ট ছিল। তাই না?...ওলেগ বলতে থাকেন।
মিশন কন্ট্রোল সেন্টার, ত্রিবান্দ্রম, 11 অক্টোবর সন্ধে ছ'টা, তিন দিন বাকি
অবশেষে যুদ্ধ শুরু। কনফারেন্স রুমে সবার নজর সামনের মনিটরে। নয়তো দেওয়ালের ডিসপ্লেতে, মাঝেমধ্যে নোটস নেওয়ার জন্য পাতা ওলটানোর শব্দ। আর রকেট লঞ্চের অ্যানাউন্সমেন্ট। সামনের বিশাল ডিসপ্লেতে দুটো রকেটের লঞ্চ সিকুয়েন্স দেখানো হচ্ছে। অন্যদিকে স্ক্রিনের কোণে দেখানো হচ্ছে টেলিস্কোপ থেকে পাঠানো ধাবমান অ্যাসটেরয়েডের ছবি।
একই সঙ্গে দুটো রকেট ছোড়া হচ্ছে। একটা আমেরিকার ফ্লোরিডার কেপ কার্নিভাল থেকে। অন্যটা কাজাখস্তানের বৈকনুর কসমোড্রোম থেকে। লক্ষ্য এক—ওই অ্যাসটেরয়েড। দুটো থেকেই শেষ স্টেজে বেরিয়ে আসবে পরমাণু ওয়ারহেড, যা গিয়ে ধাক্কা মারবে অ্যাসটেরয়েডকে।
কেপ কার্নিভাল থেকে ছাড়া হবে বিশেষভাবে প্রস্তুত ডেল্টা রকেট —যার পরমাণু ক্ষেপনাস্ত্র ছোড়ার ক্ষমতা আছে। অন্যদিকে বৈকনুর থেকে ছোড়া হচ্ছে বিশেষভাবে তৈরি একটা প্রাোটন রকেট।
দুটো রকেট উৎক্ষেপণের টেকনিকাল ক্লিয়ারেন্স পাওয়া গেছে আট ঘণ্টা আগে। তবে কোনও সরকারি অনুমোদন নেওয়া হয়নি। সেটা নেওয়ার চেষ্টাও করা হয়নি। তিনঘণ্টা আগে লঞ্চ সিকুয়েন্স চালু করা হয়েছে।
অনিলিখা আর এখানকার বাকি বিজ্ঞানীদের তেমন কোনও ভূমিকা নেই। পুরো উৎক্ষেপণটাই এখন দুটো জায়গার মিশন কন্ট্রোল সেন্টারের হাতে। এখানে সবাই শুধু দেখছে রকেট উৎক্ষেপণের প্রত্যেকটা পদক্ষেপ ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা। মূলত দর্শকের ভূমিকায় হলেও দরকার মতো এখান থেকেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রত্যেকের মধ্যেই অস্থিরতা, প্রত্যেকের মধ্যেই টেনশন। পাশেই টেবিলে কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, তবু হুঁশ নেই। এতটাই মন দিয়ে সবাই লঞ্চ সিকুয়েন্স দেখছেন।
অনিলিখা দেখল যে একমাত্র মার্ক খুব উদাসীনভাবে পাতায় কীসব হিজিবিজি লিখে যাচ্ছেন। কাল মার্ক আর রাজার মধ্যে ক্যাফেতে খুব কথা কাটাকাটি হচ্ছিল। মার্ক যে-কোনওভাবে বাড়ি যেতে চান, অসুস্থ ছেলেকে দেখার জন্য। পরশুদিন নাকি কমপ্লেক্স থেকে বেরোনোর ও চেষ্টা করেছিলেন। পারেননি। সিকিউরিটি ধরে ফেলে। মার্ক আঙুল তুলে উত্তেজিতভাবে কীসব বলছিলেন রাজাকে। কাছে গিয়ে না শুনলেও তা যে ওই প্রসঙ্গেই কিছু, তা নিয়ে সন্দেহ নেই অনিলিখার।
অনিলিখা আগে একবার রাজাকে বলেছিল মার্ককে বাড়িতে যেতে দেওয়ার জন্য। রাজা কথাটা উড়িয়ে দিয়ে বলেছিল,—ও নিয়ে তুমি মাথা ঘামিও না অনি। এমনিতেও যা শুনেছি ছেলেটা দু-একদিনে মারা যাবে। গিয়ে কী লাভ! অ্যাসটেরয়েডের কথা বাইরে গিয়ে মিডিয়াকে জানালে কী হবে ভেবেছ? আর সেটা উনি জানাবেনই।
মার্কের চিন্তা ছেড়ে সামনের স্ক্রিনে চোখ রাখল অনিলিখা। উৎক্ষেপণ ঠিক দু-মিনিট বাকি।
অ্যানাউন্সমেন্ট হচ্ছে—
T-2 মিনিট—রিপোর্ট রেঞ্জ স্ট্যাটাস।
অন্য একটা গলায় শোনা গেল—রেঞ্জ গ্রিন, হাইড্রলিক প্রেশার 4000।
T-90 সেকেন্ড—লিক্যুইড অক্সিজেন ট্যাঙ্ক টু ফ্লাইট প্রেশার।
T-80সেকেন্ড—ফার্স্ট স্টেজ লিক্যুইড অক্সিজেন 100 পার্সেন্ট।
T-60 সেকেন্ড—লঞ্চ এনেবেলড সুইচ 'অন' পজিশন।
একটা অজানা উত্তেজনায় অনিলিখার সারা শরীর যেন শিহরিত হয়ে উঠল। মানবসভ্যতার সব আশা ভরসা এই রকেটের ওপরে। এ-দুটো রকেট পাঠাবার পিছনে অনিলিখারও অনেক অবদান আছে। ঠিক বা ভুল—দুটোতেই ওর দায়িত্ব আছে।
T-30 সেকেন্ড—ড্রেন ভালব ক্লোজড।
T-20 সেকেন্ড—ফ্লাইট লক ইন।
T-10 সেকেন্ড—আর্থ লঞ্চ ভেহিকল ইগনিশান সিস্টেম—প্রাোসিড ইগনিশান।
T-7 সেকেন্ড—মেন ইঞ্জিন স্টার্ট।
6, 5, 4, 3, 2, 1, 0—প্রচণ্ড গর্জনের মধ্যে ডেল্টা রকেট মাটি ছেড়ে মহাকাশের দিকে ছুটতে শুরু করল। পুরো লঞ্চ সাইট ঢাকা পড়ে গেছে ব্লাস্টের আগুনে। ডেল্টা আমেরিকার মাটি ছাড়ার ঠিক 8 সেকেন্ড বাদে কাজাখস্তানের মাটি ছাড়ল প্রাোটন রকেট—মানুষ বিপদে পড়লে যে দেশভাগ ভুলতে পারে, তারই প্রমাণ রেখে।
মনিটরে এক অক্ষে সময়, অন্য অক্ষে রকেটের গতিবেগ, উচ্চতা আর উৎক্ষেপণস্থল থেকে দূরত্ব দেখানো হচ্ছে। বড় স্ক্রিনে একই সঙ্গে দুটো রকেটকে দেখানো হচ্ছে। ডেল্টা আর প্রাোটন মিশন কন্ট্রোল সেন্টার থেকে দুটো উৎক্ষেপণের ধারাবিবরণী দেওয়া হচ্ছে। টেকনিকাল ভাষায়।
1 মিনিট 20 সেকেন্ড—8 নটিক্যাল মাইল উচ্চতা, বেগ 5000 মাইল প্রতি ঘণ্টা, চেম্বার প্রেশার ঠিক আছে।
1 মিনিট 40 সেকেন্ড—12 নটিকাল মাইল উচ্চতা, বেগ 7600 মাইল প্রতি ঘণ্টা। ইঞ্জিনের নিয়ন্ত্রণ খুব ভালো দেখাচ্ছে।
3 মিনিট 30 সেকেন্ড—ইগনিশন অন সেকেন্ড স্টেজ। গুড স্টেবল বার্ন। ফার্স্ট স্টেজ সেপারেশন।
4 মিনিট 30 সেকেন্ড—53 নটিকাল মাইল উচ্চতা, গুড ইঞ্জিন কন্ট্রোল ইন সেকেন্ড স্টেজ। চেম্বার প্রেশার লুকস গুড।
রকেট যত এগোচ্ছে সে তার আগের স্টেজকে ফেলে পরবর্তী স্টেজগুলো নিয়ে আর আরও কম জ্বালানি নিয়ে গতিপথ অনুযায়ী ছুটে চলেছে। প্রত্যেকটা স্টেজেরই আলাদা আলাদা মোটর, আলাদা গাইড্যান্স সিস্টেম।
অনিলিখা টেকনিকাল অ্যানাউন্সমেন্ট থেকে বুঝছে যে নিখুঁতভাবে ঠিক পরিকল্পিত গতিপথেই দুটো রকেট এগিয়ে চলেছে।
পনেরো মিনিটের মাথায় অভীষ্ট অ্যানাউন্সমেন্টটা হল।
—নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড লঞ্চড সাকসেসফুলি।
হাততালির ধ্বনিতে ঘর প্লাবিত হল। পরমাণুবোমা যে কখনও এত আনন্দ দিতে পারে তা কনফারেন্স রুমের অবস্থা না দেখলে ভাবা যেত না। সব বিজ্ঞানীরা উঠে দাঁড়িয়ে একে অপরকে কনগ্রেচুলেট করছে। মিশন কন্ট্রোল সেন্টার গুলোতেও একই অবস্থা। আনন্দের সব বাঁধন খুলে গেছে। এ মিশনের সঙ্গে যুক্ত সবাই জানে যে এ মিশনের গুরুত্ব অন্যরকম। এ এক নতুন ভোরের সন্ধান।
রাজা এবার সত্যি কথাটা মনে করাল সবাইকে।
—আমরা কিন্তু এখনও জানি না ওই মিসাইলগুলো অ্যাসটেরয়েডকে ধাক্কা মারবে কিনা। সেটা আমরা জানতে পারব আরও এক ঘণ্টা বাদে। তবে হ্যাঁ, আমাদের দুটো রকেটকেই নির্ভুল লক্ষ্যে ছোঁড়া হয়েছে। যতটা সতর্কতা নেওয়া সম্ভব, আমরা নিয়েছি। বাকিটা ভাগ্য।
কনফারেন্স রুমে পিন ড্রপ সাইলেন্স। এ নিস্তব্ধতা অন্য ধরনের। যখন কেউ জানে মৃত্যু অবধারিত—তাকে কোনওভাবে এড়ানোর উপায় নেই, তখন বোধহয় এরকম স্তব্ধতাই নেমে আসে। সবার মুখে-চোখে হতাশা। আর কোনও আশা নেই। খানিক আগেই খবর এসেছে যে ডক্টর লেনো আত্মহত্যা করেছেন। ডেল্টা, প্রাোটন দুটো মিশনই ব্যর্থ হয়েছে। পরমাণু বোমা অ্যাসটেরয়েডের ধারেকাছে দিয়েও যায়নি। এখনও টেলিস্কোপে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে অ্যাসটেরয়েডের দাপুটে চেহারা! সে কাছে, আরও কাছে এগিয়ে আসছে। আর মোটে তিনদিন বাকি। তারপর সব শেষ।
ব্যাক আপ প্ল্যানও কাজ করেনি। ওলেগ আর পেড্রোর মহাকাশযান দু-ঘণ্টা বাদে পাঠানো হয়েছিল। সেটাও অ্যাসটেরয়েডকে ছুঁতে পারেনি। ওই মহাকাশযানের সঙ্গে যোগাযোগও শেষ মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ওদের আত্মত্যাগ বৃথা। অবশ্য শুধু ওরা নয়, সবারই একই অবস্থা হবে। শুধু কয়েকঘণ্টা কমবেশি আর কি। বিজ্ঞানীদের হাতে যে-ক'টা উপায় ছিল, সবক'টাই ব্যর্থ।
এর মধ্যে এখনও বোধহয় ড: জ্যাসন ইগার আশা ছাড়েননি কিংবা বরাবরের মতো উনি এখনও ওনার অঙ্ক ঠিক মিলেছে কিনা তা দেখে যাচ্ছেন। গতিপথটা মনিটরে দেখে খাতায় কীসব অঙ্ক কষে যাচ্ছেন। আর মাঝেমধ্যে মাথা নাড়ছেন।
স্টিভেন বলে উঠলেন,—আর তো কোনও আশা নেই। এবার আমার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হোক।
ওয়াকাটাও তার সপক্ষে বলে উঠলেন,—হ্যাঁ, আমিও চাই শেষ মুহূর্ত আমার পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে কাটাতে। আমাকে যেভাবে হঠাৎ করে নিয়ে আসা হয়েছিল, তাতে ওরা নিশ্চয়ই খুব চিন্তায় আছে। আমি এক্ষুনি ওসাকায় ফিরতে চাই।
সবারই একই মত। সবাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরতে চায়। রাজা সবাইকে আশ্বস্ত করে বলে উঠল,—আপনারা নিশ্চিন্ত হন। আমি কালকে সকালেই সবার ফেরার ব্যবস্থা করব। নিশ্চিত করব যাতে শেষ মুহূর্তে আপনারা আপনজনের সঙ্গে থাকতে পারেন। আপনাদেরও যেমন তাড়া আছে, তেমন আমারও তাড়া আছে। তবে তার আগে একটা খুব দরকারি কথা বলতে চাই। আমি আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করব খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতে। অ্যাসটেরয়েড যে ধাক্কা মারবে—এটাই এখন নিয়তি। আমরা হয়তো থাকব না। কিন্তু মানবজাতি যাতে চিরতরে মুছে না যায় তার একটা উপায় আছে।
—সে আবার কী করে সম্ভব? স্বরাজবাবু প্রশ্ন করলেন।
—হ্যাঁ, সেটাই আমি বলছি। কথাটা খুবই গোপনীয়। এ কথা আমি আমার বাবার কাছ থেকে ওনার মৃত্যুর কিছুদিন আগে শুনি। আমি আজীবন এ কথা গোপন রাখব—এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আমি আজ নিতান্ত বাধ্য হয়ে এ কথা বলছি।
আজ থেকে পঁচাত্তর হাজার বছর আগে সুমাত্রার টোবা এলাকায় একটা ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হয়। গত কুড়ি লক্ষ বছরের মধ্যে এটাই ছিল সবথেকে বড়। পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পুরু ছাই-এর আস্তরণে ঢাকা পড়ে যায়। সব গাছপালা নষ্ট হয়ে যায়। বিষাক্ত সালফার ডাই-অক্সাইডে বাতাস ভরে যায়।
ড: আজিজ একটু অসহিষ্ণু ভাবে বলে ওঠেন,—তা এখন এসব শুনে কী লাভ?
—আমাকে পুরোটা বলতে দিন, বুঝতে পারবেন। আজ থেকে ঠিক আশি হাজার বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষ হোমো স্যাপিয়েন্সরা প্রথম আফ্রিকার বাইরে পা রাখে। আফ্রিকা আর আরব দেশের মাঝখানে রেড সি। মোটে এগারো কিলোমিটার সমুদ্র দূরত্ব পেরোলেই আরব। কিন্তু এর আগে কখনও মানুষ এইটুকু দূরত্বও পেরোয়নি।
'গেট অফ গ্রিফ' বলে পরিচিত ওই পথ পেরিয়ে কুড়ি-বাইশজনের দু:সাহসী একটা দল আরব দুনিয়ায় প্রথমবার প্রবেশ করে। তারপরে খাবারের সন্ধানে ও আরও ভালো জীবনের খোঁজে আজকের ইয়েমেন, ওমান, পাকিস্তানের সমুদ্রতীর বরাবর হেঁটে ভারতে প্রবেশ করে। ভারত থেকে বার্মা, থাইল্যান্ড, ম্যালেশিয়া, সুমাত্রা, জাভা, বালি, টিমোর ও আরও ছোট ছোট দ্বীপপুঞ্জ পেরিয়ে এরা অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছোয়। আর এই পথটা যেতে কয়েক হাজার বছর আর বেশ কয়েকটা প্রজন্ম লেগেছিল।
পঁচাত্তর হাজার বছর আগে সুমাত্রায় যখন অগ্ন্যুৎপাত হয়, তখন এদের ছোট একটা অংশ সুমাত্রা পেরিয়ে গেলেও ওদের বড় অংশটা সুমাত্রা আর ভারতে ছিল। আগ্নেয়গিরি জেগে ওঠায় তাদের প্রায় সবাই সঙ্গে সঙ্গে মারা গেল। হাতে গোনা সামান্য যে-ক'জন বেঁচে রইল তারা আশ্রয় নিল পাহাড়ের গুহায়—সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড আর অ্যাসিড বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য।
কিন্তু গুহাতে লুকোলেই তো আর বাঁচা যায় না। খাবার চাই। খাবার আসবে কোথা থেকে? চারদিকে যেদিকেই যাও, হাজার হাজার মাইল তখন ছাই-এ ঢাকা, একইসঙ্গে সারা পৃথিবী জুড়ে উষ্ণতা কমে গেছে বেশ কয়েক ডিগ্রি। ফসল, উদ্ভিদ সব নষ্ট হয়ে গেছে।
অনিলিখা যোগ করল,—প্রথমে তাই সব তৃণভোজী প্রাণীরা মারা গেল। তারপর মারা গেল তাদের খেয়ে বেঁচে থাকে যারা, সেই সব মাংসাশী প্রাণীরাও। পুরো ফুড চেনই ইমপ্যাক্টেড। পড়েছি যে কয়েক বছরের মধ্যে সুমাত্রা, ওই এলাকার সব দ্বীপপুঞ্জ, ভারত, প্রায় পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে প্রাণের কোনও চিহ্ন ছিল না। মানবজাতি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যেতে বসেছিল। পুরো এশিয়াতে মানবজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও বেঁচে রইল আরশোলা, ব্যাঙের মতো কিছু প্রাণী।
—আর কয়েকজন মানুষ যারা অত সহজে হার মানতে শেখেনি। কথার খেই ধরে রাজা বলে উঠল।
অনিলিখা বলে উঠল,—তাই? কী করে জানলে?
—আজও ওদের বংশধরেরা সুমাত্রায় বেঁচে আছে। ভাবতে পারো তাদের জিনে কী অসম্ভব লড়াকু ক্ষমতা! শুধু যে তারা পায়ে হেঁটে, কাঠের ভেলায় সমুদ্র পেরিয়ে, শ্বাপদ জন্তুর সঙ্গে লড়াই করে সুমাত্রায় পৌঁছেছিল তাই নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে সব থেকে বড় ভলকানিক ইরাপশনের মধ্যেও লড়াই করে বেঁচেছিল।
—তুমি সুমাত্রার কোন আদিবাসীদের কথা বলছ? শুনেছি ওখানে 'বাটাক' বলে এক সম্প্রদায় আছে যারা একশো বছর আগেও মানুষ খেকো ছিল। ডক্টর ন্যাশ বলে ওঠেন।
—না, আমি যাদের কথা বলছি, তাদের কথা পুরো পৃথিবীর কাছেই অজানা। গেউরেদঙ পাহাড়ের গভীর গুহায় তাদের বাস। চারদিকে সুমাত্রার গভীর রেনফরেস্ট—পৃথিবীর সব থেকে ঘন জঙ্গলের মধ্যে এটা একটা। আধুনিক মানুষের যাতায়াত এ অঞ্চলে নেই বললেই চলে। শুধু যায় চোরা কাঠের ব্যবসায়ীরা। তা, তারাও কখনও এদেরকে দেখেনি। হয়তো এদের অদ্ভুত জীবনযাত্রার জন্য।
—এরা কি নিশাচর? অনিলিখা জিজ্ঞাসা করে।
—ঠিক ধরেছ অনি। গুহার অন্ধকারে এরা হাজার হাজার বছর কাটিয়েছে। ধুলোয় ঢাকা পৃথিবীতে তখন আলোর প্রবেশও নিষিদ্ধ। আগুনের ব্যবহারও এরা শেখেনি। অভিযোজনের জন্য এখন এরা পুরোপুরি নিশাচর। রাতের বেলা স্পষ্ট দেখতে পায়। দিনের আলো সহ্য করতে পারে না। খাবার অভ্যাসও অদ্ভুত। পোকামাকড়, আরশোলা, ব্যাং, সাপ—এই হল এদের প্রধান খাদ্য। হবেই তো। হাজার হাজার বছর ধরে এরা ছাইয়ে ঢাকা পৃথিবীতে স্বাভাবিক খাদ্য খুঁজে পায়নি। আর এরা মেয়েদের পুজো করে। কেন জানি না।
—তা রাজা, তুমি এদের কথা বলছ কেন? তুমি কি এদের মাধ্যমে মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার কথা ভাবছ? ডক্টর জ্যাসন ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে প্রশ্ন করলেন।
—আপনি ঠিকই ধরেছেন। সুমাত্রায় আগ্নেয়গিরির পরবর্তী অবস্থা আর অ্যাসটেরয়েড সংঘর্ষের পরে পৃথিবীর যে অবস্থা হবে—তার মধ্যে অনেক মিল। ধুলোর মেঘে আটকে যাবে সূর্যের আলো। সারা পৃথিবী জুড়ে তীব্র শীতের আবির্ভাব হবে। সূর্যের আলোর অভাবে হারিয়ে যাবে যাবতীয় উদ্ভিজ্জ। মারা যাবে সব শাকাহারী জীব। শুরু হবে অ্যাসিড বৃষ্টি। মিলিয়ে দেখুন সুমাত্রার আগ্নেয়গিরি আর অ্যাসটেরয়েডের সংঘাতের পরের ছবি। একই ছবি দেখতে পাবেন। তাই এ ধরনের পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারবে শুধু ওরাই। আর এরা যেরকম খায়, তাতে খাবারেরও কোনও অসুবিধে হবে না। মানবজাতিকে যদি বাঁচিয়ে রাখতে হয়, তো সে স্বপ্নকে সাকার করতে পারে একমাত্র এরাই।
—তুমি কী বলছ রাজা! আমাদের প্রতিনিধি হবে একটা অসভ্য, অনুন্নত উপজাতি—যারা গত আশি হাজার বছরে কোনও সভ্যতার আলো দেখেনি! যাদের মধ্যে না আছে শিক্ষা-দীক্ষা, না আছে মানুষের কোনও হাবভাব—। ডক্টর ন্যাশ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন।
রাজা উত্তেজিত না হয়ে ঠান্ডা মাথায় বলে উঠল,—উপায়? আর তা ছাড়া আপনি ভুলে যাচ্ছেন যে আমরা সবাই এদেরই বংশধর। পরবর্তী সময়ে এরাই আবার আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। আর অনুন্নত কাদের বলছেন? জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার লড়াইয়ে এরা আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে। এরা আশি হাজার বছর ধরে পরিবেশকে হার মানিয়েছে। জেনেটিক বিচারে এদের রক্ত আমাদের থেকে অনেক বেশি শুদ্ধ। এদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাও আমাদের থেকে অনেক বেশি।
একটু থেমে রাজা ফের বলে উঠল,—আরেকটা কথাও বলি। গত দশ বছর ধরে পৃথিবীর কিছু ল্যাবরেটরিতে আমরা এদের জিন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলাম। খুবই গোপনীয় ভাবে। দেখছিলাম কীভাবে এদের জিন থেকে ভালো কিছু গুণ নিয়ে জিনথেরাপির মাধ্যমে আমাদের ক্ষমতা আরও বাড়ানো যায়। ভাগ্যক্রমে ঠিক এক মাস আগে আমরা এতে সফল হই। ছোট ছোট বাচ্চাদের ওপর আমরা এ পরীক্ষা করছিলাম। বড়দের নিয়ে এ কাজ করা অনেক শক্ত। তাই শুধু এরা নয়, এদের সঙ্গে এই পরিবেশে বাঁচার ক্ষমতা পেয়েছে বেশ কিছু ছোট বাচ্চা—যারা হবে ভবিষ্যতে মানবসভ্যতার প্রতিনিধি। আমাদের মানবসভ্যতা সৌরজগতের একমাত্র সভ্যতা, হয়তো পুরো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির মধ্যেই। তাকে এত সহজে নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।
—অসাধারণ আইডিয়া রাজা। কিন্তু তুমি খবরটা এত গোপন করে রেখেছ কেন? এ তো আমরা সারা বিশ্বকে জানাতে পারি। বিজ্ঞানী ওয়াকাটা উত্তেজিত হয়ে রাজার হাত ঝাঁকিয়ে বলে উঠলেন।
—অবশ্যই জানানো হবে। তবে এখনও সে সময় আসেনি। এরা যতবারই গুহা ছেড়ে বেরিয়েছে, আমরা অকারণে এদের পশুর মতো শিকার করেছি। আমি চাই না এ খবর নিয়ে কোনও ধরনের আলোড়ন হোক, জানাজানি হোক আর আমরা এদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলি।
রাজা এবার খানিকটা হালকা মুডে সবার সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করল। অনিলিখাকে দেখিয়ে বলে উঠল,—দেখুন, আপনারা সব মনমরা হয়ে বসে আছেন, আর অনিকে দেখুন! এরমধ্যেও একটা ভারি সুন্দর শাড়ি পরে সেজেগুজে এসেছে। এটাই হল স্পিরিট। কখনও ওকে দেখেছেন মনমরা হয়ে বসে থাকতে! ও হারতে জানে না। ওকে দেখলেই মনে হয় এখনও আশা আছে।
অনিলিখা মুচকি হেসে বলে উঠল,—হ্যাঁ, নতুন শাড়িটা তো আর পরার সুযোগ নাও হতে পারে, তাই পরে চলে এলাম। তবে তোমার কথা শুনে সত্যিই স্বস্তি পেলাম। তা ওই বাচ্চাগুলো এখন কোথায় আছে?
রাজা অনিলিখাকে বোঝাতে এগিয়ে গেল।
মিশন কন্ট্রোল সেন্টার ত্রিবান্দ্রম, 12 অক্টোবর
ভোর চারটে। অনিলিখার ঘরের ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। প্রথমবার ধরতে-না-ধরতেই কেটে গেল। আবার রিং। এবার ধরতেই উলটোদিকে রাজার গলা। জরুরি মিটিং। এখনই সবাইকে কনফারেন্স রুমে চলে আসতে হবে।
অনিলিখার শুতে কাল অনেক রাত হয়েছিল। এই দু-দিনের মধ্যে অনেক কিছু করার আছে। সেটারই প্ল্যান করছিল অনিলিখা। দু:স্থ ছাত্রদের একটা সংস্থার সঙ্গে অনিলিখা বহুদিন যুক্ত। এই দুদিনের মধ্যে ওদের সঙ্গে বেশ খানিকক্ষণ সময় কাটানোর ইচ্ছে আছে। কলকাতায় শ্যামবাজারের কাছে একটা অনাথ আশ্রমে অনিলিখা প্রায়ই যায়। ওদের গান, কবিতা আবৃত্তি শেখায়। ওদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথের একটা নাটক করাবে বলে শেষবার কথা দিয়ে এসেছিল। কথা দিয়ে কথার খেলাপ অনিলিখা কখনও করে না। তা সময় হবে কি ওদেরকে দিয়ে নাটকটা করানোর? আরও অনেক অনেক কিছু করার ছিল। বহুদিন ধরে ওর ইচ্ছে ছিল প্লেন চালাতে শেখার। এসব এলোপাথাড়ি চিন্তা সামলে ঘুমোতে ঘুমোতে রাত তিনটে বেজে গিয়েছিল। তারপরে ঘুমের অকাল বিয়োগ ঘটিয়ে এই ফোন।
কোনওরকমে প্রস্তুত হয়ে কনফারেন্স রুমে আসতে অনিলিখার মিনিট পাঁচেক লাগল। আরও দু-তিন মিনিটের মধ্যে সবাই এসে গেল। রাজা বলতে শুরু করল—
—একটা খুবই আনন্দের খবর আছে। অ্যাসটেরয়েডের সংঘাত হচ্ছে না। আমরা এ যাত্রায় বেঁচে গেছি।
—কী করে!
—সেটা বলছি। তবে ধাক্কা যে লাগছে না, তা নিশ্চিত।
—হচ্ছে না! প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে উঠে সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠল। হঠাৎ স্কুলছুটি হলে বাচ্চাদের যেরকম হয়! এ ওকে আনন্দে জড়িয়ে ধরছে। ডক্টর আজিজ আবার নাচতে শুরু করে দিলেন। স্বরাজবাবুও তাতে যোগ দিলেন। শুধু ডক্টর জ্যাসন বোধহয় আগেই জানতেন। উনি সেরকম অবাক হয়েছেন বলে অনিলিখার মনে হল না।
রাজা বলল,—ডক্টর জ্যাসন, আপনিই এ ব্যাপারটা সবাইকে বিস্তারিত বলুন। আপনার জন্যই এ কথা জানতে পেরেছি, একটু দেরিতে যদিও।
ডক্টর জ্যাসন বলতে শুরু করলেন,—আমার প্রথম সন্দেহ হয় তখনই, যখন দেখি আমাদের পাঠানো তিন-তিনটে রকেটই ব্যর্থ হয়েছে। আমার চোখে পড়ে অ্যাসটেরয়েডের কক্ষপথ যেন পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। আমি ও মার্ক গতকাল অনেকক্ষণ ধরে এটা নিয়ে পর্যালোচনা করি। খুব জটিল গণনা। কাল রাত বারোটা নাগাদ নিশ্চিত হই। দেখি, আমাদের ধারণা ঠিক। উর্ট বলয়ের একটা কমেটই এই বিচ্যুতির কারণ। কালকে ওই কমেটের নিউক্লিয়াস আর ওই অ্যাসটেরয়েড পরস্পরের কাছ দিয়ে যায়। আর তারই জন্য অ্যাসটেরয়েডের গতিপথের হঠাৎ এই পরিবর্তন। ওই কমেটকে ধন্যবাদ—এই মহাবিশ্বের নিয়ন্তাকে ধন্যবাদ—অনেক অনেক ধন্যবাদ, উনি আমাদের সবাইকে দেখিয়ে দিলেন যে আমরা কতটা অসহায়। নাউ এনজয়! শ্যাম্পেনের বোতলটা ওপরের দিকে তুলে ধরে ডক্টর জ্যাসন শেষ করলেন।
ডক্টর জ্যাসনের কথা শোনার ধৈর্যও এখন আমাদের নেই। এ-ক'টা দিন যা টেনশনে কেটেছে! কে কবে দেশে ফিরবে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। এরমধ্যে রাজা সবাইকে চুপ করার অনুরোধ করে বলতে শুরু করল।
—আপনাদের মধ্যে অনেকেই আমাকে সুজাক উপজাতি দেখাতে অনুরোধ করেছেন। 'সুজাক' নামটা আমারই দেওয়া। এখান থেকে সুমাত্রা দূর নয়। আমি চার্টার্ড প্লেনের ব্যবস্থা করেছি। এখান থেকে সুমাত্রার মেডান পর্যন্ত চার্টার্ড প্লেনে যাব। তারপরে সেখান থেকে গাড়িতে। ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনওরকম চিন্তা করবেন না। দুদিনের মধ্যে ফিরে এসে আমরা যে যার দেশে ফিরে যেতে পারি। অবশ্য আমি এ ব্যাপারে জোরাজোরি করব না। যাঁরা ইচ্ছুক, তাঁরাই যাবেন। তবে এটুকুই বলব যে যাঁরা যাবেন না, তাঁরা পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাসের প্রথম মানুষ দেখার এক অসাধারণ সুযোগ হারাবেন। এ সুযোগ বারবার আসবে না।
সবাই একবাক্যে রাজি। এরকম সুযোগ কে হাতছাড়া করে! সারা পৃথিবী এখন এদের কথা জানে না। তা ছাড়া সুমাত্রার আকর্ষণ! যার আগের নাম ছিল স্বর্ণদ্বীপ। সুমাত্রার বন-জঙ্গল-পাহাড়—তার আকর্ষণই বা কম কীসের?
রাজা আবার বলতে শুরু করল,—তবে একটা শর্ত আছে। ফেরার আগে অবধি কেউ সুজাক উপজাতির কথা কাউকে জানাতে পারবে না। নো ফোন-ক্যামেরা-ল্যাপটপ-আইপ্যাড। এসব কোনও কিছু নিতে দেওয়া হবে না। আর আমরা ফিরে এসেই একেবারে বাড়ির লোকজনের সঙ্গে দেখা করব। ঠিক?
কিছু বিরোধিতা ছিল, তবে শেষে সবাই এ শর্ত মেনে নিল। ঠিক হল দুপুর বারোটায় সুমাত্রার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া হবে। রাজা এইটুকু সময়ের মধ্যেই সবকিছু ব্যবস্থা করে নিতে পারবে।
এতক্ষণে অনিলিখা লক্ষ করল যে কনফারেন্স রুমে সবাই আছে, শুধু মার্ক নেই, রাজার কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল—মার্ককে দেখছি না, মার্ক কোথায়?
রাজার মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠল।
—কাল রাতে ওর ছেলে মারা গেছে, ওকে আমি তাই আজ সকালে যেতে দিয়েছি। এই খানিক আগেই চলে গেলেন।
—খুব অন্যায় করেছ রাজা। ওনাকে এভাবে আটকে রাখা একদম উচিত হয়নি। অন্তত মৃত্যুকালে তো উনি ছেলের সঙ্গে থাকতে পারতেন।
রাজা কোনও কথা বলল না, চুপ করে রইল।
কনফারেন্স রুম থেকে নিজের ঘরে ফেরার সময় অনিলিখা মার্কের রুমে একবার উঁকি মারল। ঘর ফাঁকা, লাগেজ, জামাকাপড় কিছু নেই। মার্কের সঙ্গে সামান্য আলাপ হয়েছিল অনিলিখার। খুব ভালো লোক বলে মনে হয়েছিল মার্ককে। ছেলের জন্য খুব চিন্তায় ছিলেন। ঘর যেরকম পরিষ্কার, তাতে মনে হল না যে মার্ক খুব তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেছেন। বাজে কাগজ ফেলার ঝুড়ির মধ্যে শুধু একটা কাগজ পড়ে আছে।
অনিলিখা কাগজটা তুলে নিল, কারণ কাগজটায় যে ভাষায় লেখা তা খুব ইন্টারেস্টিং। অনিলিখার চেনা। প্রাচীন মিশরীয় হরফে লেখা। জিন ফ্র্যাঙ্কোয়িসের লেখা পড়ে প্রথম এ ভাষার ওপর কৌতূহল হয় অনিলিখার। শিখেও ফেলে। প্রাচীন মিশরে তিন ধরনের হরফে লেখা হত। প্রথম ধরন হল হাইরোগ্লোফিক। এ হরফে মূলত ছবির ব্যবহার হত। এই হরফে লেখা হত প্রাচীন মিশরের স্তম্ভে, মন্দিরে বা কবরে।
দ্বিতীয় ধরনের হরফ হল হাইর্যাটিক। লেখা হত ডানদিক থেকে বাঁ-দিকে, ব্যবসার কাজে প্রধানত এই হরফ ব্যবহার করা হত।
তৃতীয় ধরনের হরফ হল ডেমোটিক। অন্য দুই হরফের থেকে সৃষ্টি এই হরফের। প্রাচীন মিশরে দৈনন্দিন কাজকর্মে, ব্যবসার কাজে প্রধানত এর ব্যবহার ছিল। গল্পও লেখা হত। এ হরফে লেখা সোজা। কিন্তু পড়া খুব শক্ত।
এই কাগজের টুকরোতে লেখা হয়েছে ডেমোটিক হরফে। একটু কষ্ট করেই পড়তে হল অনিলিখাকে।
তাতে লেখা—'আমি যে-কোনও ভাবে তোমাকে বাঁচাব। বাঁচাবই।'
লেখাতে শপথ নেওয়া হয়েছে মিশরের সূর্যদেবতা 'রাহ'-এর নামে।
চোখে জল এসে গেল অনিলিখার। সত্যিই ছেলেকে খুব ভালোবাসত মার্ক। তাকে জোর করে এভাবে অসুস্থ ছেলের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে আসাটা একেবারেই উচিত হয়নি। মার্ক হয়তো এই দুর্ভাবনার মধ্যে মনোবল পাওয়ার জন্য সূর্যদেবতাকে উদ্দেশ্য করে লিখে রেখেছিলেন। আজকে ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে ফেলে দিয়েছেন। তবে...অনিলিখার কপালে একটু ভাঁজ পড়ল। কাগজটাতে ফাউন্টেন পেনে লেখা। মার্ক তো ফাউন্টেন পেন ব্যবহার করতেন না।
অনিলিখা মার্কের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলল। বেশি সময় নেই। একটু বিশ্রাম নিতে হবে। দু-দিনে ফিরে আসতে হলে পুরো ট্রিপটাতেই যে খুব ধকল সহ্য করতে হবে তা বলাই বাহুল্য। আর বিশেষ করে যখন সে পথে সুমাত্রার বন-জঙ্গল-পাহাড়-সুজাক উপজাতি, এসব আছে।
মেডান। উত্তর সুমাত্রার একটা বড় শহর। শক্তিশালী 'অ্যাসে' সুলতানরা 1873 সাল পর্যন্ত এসব জায়গায় রাজত্ব করত। দীর্ঘ তিরিশ বছরের যুদ্ধের পরে তা ডাচদের অধীনে আসে। তাই শহরময় ডাচ স্থাপত্যের নিদর্শন ছড়ানো। মেডান অবধি চার্টার্ড প্লেনে এসে মেডান থেকে দুটো গাড়ি নেওয়া হয়েছে। গাড়ির অবস্থা যথেষ্ট ভালো হলেও রাস্তার অবস্থা নিতান্তই শোচনীয়। সমুদ্রতীর ধরে গাড়ি উত্তরের দিকে চলেছে।

সুমাত্রার সরকারি টুরিস্ট বোর্ড হল ন্যাট্টাবু। তা, ন্যাট্টাবু থেকে গাড়ি নেওয়ার সময় রাজা লেক তাওয়ার দেখার কথা বলেছে। লেক তাওয়ার দেখার যে বিশেষ লোক হয় না, তা সংস্থার লোকেদের হাবভাব দেখেই বোঝা গেছে। ওরাই বলে দিল যে এ পথে গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক। তারপর ওখান থেকেই 'অ্যান্ডি' বলে একজনকে গাইড হিসেবে দেওয়া হয়েছে। ছোটখাটো চেহারা, চওড়া মিলিটারি গোঁফ। জিনসের প্যান্ট ও শার্ট পরা। তবে একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে প্যান্টে নানান ধরনের মেরামতি সেলাই। নেহাত অবস্থার বিপাকে পড়েই অ্যান্ডি গাইড হয়েছে।
বারবার সুনামিতে, ভূমিকম্পে উত্তর সুমাত্রার অনেক ক্ষতি হয়েছে। অনেক লোক মারা গেছে। আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে ক্ষত অনেকটা মুছেও গেছে। পথের দুধারে অনেক রাবার আর নারকোল গাছ। মাঝেমধ্যে বিস্তৃত ধানজমি। কোথাও কোথাও কফির চাষ হচ্ছে। সুমাত্রা কফির জন্য বিশ্ববিখ্যাত। এখানকার চাষিদের মাথায় বিশেষ ধরনের শোলার টুপি। এক সময় এসব জায়গায় প্রচুর তামাকের চাষ হত। এখানকার তামাকের নাম ছিল বিশ্বময়।
প্যাসোলায় পৌঁছোতে-পৌঁছোতে রাত আটটা বেজে গেল। ঠিক হল ওখানেই রাত্রিবাস। এখানে বড় হোটেল নেই। সাধারণ লোকেরাই বাড়ি ভাড়া দেয়। অনিলিখারা যে-বাড়িতে ভাড়া নিল, সে বাড়ির এক বৃদ্ধা দুদিন আগে মারা গেছে। বৃদ্ধার মৃতদেহ চেয়ারে বসিয়ে রাখা আছে। গায়ে ইকাট নামের এক শুকনো রঙিন কাপড় জড়ানো।
এখানে এরা সব মেরাপু ধর্মাবলম্বী। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অনেক খরচ বলে কয়েকজনের কবর এরা একসঙ্গে দেয়। এজন্য অনেক সময় মৃতদেহ বছরের পর বছর বাড়িতেই ফেলে রাখা হয়। অনিলিখা ওদেরকে এরজন্য বেশ কিছু অর্থসাহায্য করল যাতে বৃদ্ধার কবর পরের দিনই হয়ে যায়।
দলের সবাই ক্লান্ত। যে যার মতো শুতে চলে গেল। অনিলিখার তেমন একটা ক্লান্ত লাগছিল না। বাড়ির সবার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে আলাপ করল। বাচ্চাদের সঙ্গে গল্প শুরু করল, নানান দেশের। ওদের এলাকার প্রধানের সঙ্গে আলাপ হল। প্রধানও অনিলিখাকে নানান স্থানীয় গল্প বলল, যেমন—ওরাং পেনডেকের কথা। এরা হল একধরনের বনমানুষ। দেখতে শিম্পাঞ্জি আর মানুষের মাঝামাঝি। এদের গায়ে নাকি অসম্ভব জোর। টেনে ছোট গাছ তুলে নিতে পারে। তবে এদের দেখা পাওয়া নাকি সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। এদের নিয়ে অনেক গল্প-গাথা আছে, কিন্তু কেউই দেখেনি।
এসব নানান গল্প চলল অনেক রাত অব্দি। ওরা অনিলিখার মতো একজনকে পেয়ে ভারি খুশি। আরও খানিক পরে অনিলিখা যখন শুতে গেল, তখন ও ওদেরই একজন হয়ে গেছে।
পরের দিন সকাল সাতটা নাগাদ অনিলিখারা প্যাসোলা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। অনেকটা পথ—বিকেল হওয়ার আগে যদি পৌঁছোনো যায়। রাস্তার ধারের পাইন গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে মাঝেমধ্যেই উঁকি মারছিল সমুদ্র আর সাদা বালুচর। ডিঙি নৌকোগুলোতে কালো পাল। কালো রং এখানে সৌভাগ্যের প্রতীক। তাই চারদিকে কালো রং।
অনিলিখা ইতিমধ্যেই অ্যান্ডির সঙ্গে ভালো আলাপ জমিয়ে ফেলেছে। অ্যান্ডির কাছ থেকেই জানল যে এখানকার লোকেদের আচার-ব্যবহার খুব অদ্ভুত। এরা শরীরের কিছু অংশে কখনই জল লাগায় না। মুরগির শুধু মাথা আর পা খায়। সমুদ্রের দানবের পুজো করে। তাকে খুশি করতে বাড়ির বাইরে খাবার রেখে দেয়। এসব জায়গায় বেশিরভাগই বাটাক সম্প্রদায়ের। তবে ভাগ্য ভালো এখন আর এরা মানুষ খায় না।
অনিলিখারা বিরুইন পৌঁছোল দুপুর বারোটা নাগাদ। ওখান থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে যাত্রার শুরু। দুপুরের খাবার সারা হল একটা ছোট গ্রামে। খাবার চয়েস বেশি নেই। দড়িতে সার দিয়ে বাঁধা বাদুড়। তার স্টু। অনিলিখা আপেল-কলা খেয়ে কোনওরকমে পেট ভরাল। গ্রামের বাড়িগুলোর সামনে কফি শুকোতে দেওয়া হয়েছে। বাচ্চারা রাস্তায় গুলি-ডান্ডা খেলছে। ঠিক যেন ভারতেরই ছোট্ট গ্রাম। গ্রামটা পেরোনোর ঘণ্টাদেড়েক বাদ থেকে পাহাড়ি রাস্তা শুরু হল। আঁকাবাঁকা রাস্তা। ধারে খাদ। পুরো সুমাত্রার পশ্চিম বরাবর ব্যারিসন পাহাড়শ্রেণি। অনেকগুলো সক্রিয় আগ্নেয়গিরি আছে এই পর্বতশ্রেণিতে। এদের মধ্যে অনিলিখাদের গন্তব্য গেউরেদঙ পর্বত। ওখানেও দুটো আগ্নেয়গিরি আছে।
পথের চেহারা খানিকক্ষণের মধ্যেই বদলে গেল। সরু পাহাড়ি পথের একদিকে খাদ। অন্যদিকে ঘন জঙ্গল। কখনও বা আকাশ অবরুদ্ধ হয়ে গেছে সুউচ্চ গাছের আড়ালে। দু-ধারের গাছের মধ্যেও শৃঙ্খলার অভাব। নানান আকারের নানান ধরনের গাছ। এ যেন বাচ্চা ছেলের তুলির আঁচর। বাতাসে একটু ঠান্ডা স্যাঁতস্যাতে ভাব। রাস্তার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। মাঝেমধ্যে রাস্তাই হারিয়ে গেছে নদীর হালকা জলস্রোতে। এ জঙ্গলে আজও বাঘ, হাতি, পাইথন, ভালুক, ওরাং ওটাং সবই আছে। চোরাকাঠের কারবারীদের পাল্লায় পড়ে সুমাত্রার অনেক জায়গায় বনভূমি ধ্বংস হয়ে গেলেও, এদিকের জঙ্গলে তেমন দাগ পড়েনি। তাই এদিকে এরকম গা-ছমছমে জঙ্গল।
রাজা পুরো পথটাই খুব চুপচাপ। অনিলিখার পাশে বসলেও পুরো পথটা হুঁ-হাঁর বেশি কিছু কথা বলেনি। তবে ও যে অনেকবার এদিকে এসেছে তা নিশ্চিত। তাই ড্রাইভার প্রায় ওরই কথা অনুযায়ী এগিয়ে চলেছে।
বিকেল পাঁচটায় ওরা একটা জায়গায় পৌঁছোল, যেখানে এসে গাড়ি যাওয়ার পথ শেষ হয়ে গেছে। এরপরে হাঁটা পথ গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। হেঁটে এখনও প্রায় তিন মাইলের মতো যেতে হবে। দূরে আগ্নেয়গিরির মুখ দেখা যাচ্ছে। একটা না, দুটো। আর তার দিকে তাকালে—মাঝখানে শুধুই সুমাত্রার আদিম, অকৃত্রিম জঙ্গল।
ডক্টর ন্যাশের এই সময়ে ওখানে যাওয়ার ব্যাপারে একটু আপত্তি ছিল। শুধু উনি নন, সবারই একটু হলেও দ্বিধা ছিল। সুমাত্রার এসমস্ত জঙ্গলে বাঘ থাকাটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। সুমাত্রার অন্যসব জঙ্গলে বাঘ, হাতি এসব আর দেখা না গেলেও এদিকে এদের থাকার সম্ভাবনা যথেষ্টই প্রবল। রাজাই এ এলাকা সবথেকে ভালো করে চেনে। গাইড অ্যান্ডি আর ড্রাইভাররাও এদিকে কখনও আসেনি। অ্যান্ডি বলল,—ওরাং পেনডেকের দেখা এদিকেই পাওয়া গেছে। যদিও বছরে এক-আধবার।
সুজাক উপজাতি আর ওরাং পেনডেক যে একই জীব, এরকম একটা ধারণা অনিলিখার মনে তৈরি হয়েছে।
রাজা বলে উঠল,—আমরা যদি সুজাক উপজাতির দেখা পেতে চাই, তা হলে এখনই যাওয়া উচিত। হেঁটে যেতে ঘণ্টাদেড়েক লাগবে। কাছাকাছি কোনও গ্রামও নেই। সব থেকে ভালো হবে গাড়িতে বা ক্যাম্পে রাত না কাটিয়ে, আজ রাতেই গুহা দেখে ফিরে যাওয়া। আমি তো আগেও এসেছি, কোনও ভয় নেই।
কারুর কাছেই এ প্রস্তাবের কোনও বিকল্প নেই। নিশাচর এক উপজাতি দেখতে হলে তো এ সময়েই যেতে হবে। অগত্যা ড্রাইভার দুজন আর অ্যান্ডি গাড়িতেই রইল। অ্যান্ডির শরীর খারাপ লাগছে, ও তাই সঙ্গে যেতে চাইল না।
অনিলিখারা সরু চড়াই পথ ধরে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। পায়ের নীচে ঝরা পাতার মচমচ আওয়াজ। রাজা সবার সামনে যাচ্ছে। ওর হাতে একটা বন্দুক। বাকি সবার হাতে টর্চ, জলের বোতল, গাছকাটার ছুরি। গাছপালা সরিয়ে সরিয়ে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। সবরকম উচ্চতার গাছ আছে। মাটির কাছেও গাছ-আগাছার ভিড়। নরম কাদায় হাতির পায়ের ছাপ। এসব জঙ্গলে হঠাৎ করে সুমাত্রার গন্ডারের মুখোমুখি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। যেতে যেতে ওরা একদল ওরাংওটাং-ও দেখল। বেশ আয়েস করে গাছ থেকে ঝুলতে ঝুলতে কৌতূহলী দৃষ্টিতে ওদেরকে দেখছিল। তা এভাবে হাঁটতে হাঁটতে প্রায় দু-ঘণ্টা কেটে গেল। একফালি চাঁদ গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে চারদিক আরও মায়াময় করে তুলেছে।
ডক্টর স্টিভেন একবার বললেন,—কী রাজা! এতক্ষণ লাগছে—ভুল পথে চলে আসিনি তো?
রাজা সংক্ষেপে জানাল,—না, না, ঠিক পথেই চলছি। আর আধঘণ্টা বড়জোর।
ওপরের দিকে তাকালে গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে তারাখচিত আকাশ। মাঝেমধ্যে হঠাৎ করে শুরু হচ্ছে ঝিঁঝি পোকার তান। দূরে কোনও ছোট ঝরনার ঝিরঝিরানি শব্দ। রাতের স্তব্ধতার সুযোগ নিয়ে ওই ঝরনার স্রোতের আওয়াজ আরও বেড়ে গেছে। বাঘ একদম কাছে চলে এলেও পায়ের শব্দ শোনার কোনও উপায় নেই। মাঝে মাঝে পাখির ডানার ঝটপটানির আওয়াজ। হঠাৎ এরমধ্যে রাজা বলে উঠল,—এই তো এসে গেছি। দূরে গুহা দেখা যাচ্ছে।
চাঁদের আলোয় বেশ কয়েকটা গুহার মুখ দেখা যাচ্ছে। ওপরের দিকে আরও প্রায় আধমাইল রাস্তা—পাহাড়ের গায়ে সন্ধ্যাতারার পাশে। রাজা সবাইকে টর্চের আলো জ্বালাতে বারণ করল। আলো ওরা সহ্য করতে পারে না। এমনিতেও এতটা পথ হাঁটার পর চোখ অভ্যস্ত হয়ে গেছে চাঁদের আলোয় পথ চলতে। গুহার সামনের দিকটা খানিকটা পরিষ্কার। দেখেই বোঝা যায় গাছ-আগাছা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বাইরে থেকে গুহার ভেতরের কিছুই বোঝার উপায় নেই। ভেতরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। চাঁদের আলো রাজার জিনসের শার্টের পকেটে গোঁজা পেনের ওপর পড়ে চকচক করে উঠে হারিয়ে গেল। রাজা সবার আগে ঢুকল। তার পেছন পেছন সবাই। অনিলিখা কী যেন ভাবতে ভাবতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে বাইরেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর গুহার দিকে এগোতে যাবে, হঠাৎ সামনে দুটো চোখ জ্বলে উঠল। চাঁদের আলোয় একপলক তাকিয়েই অনিলিখা বুঝল যে সামনে—ওর আর গুহার মাঝে একটা হায়েনা। কীরকম একটা জঙ্গুলে হিংস্রতার সঙ্গে অনিলিখার দিকে তাকিয়ে আছে। এরা মানুষকে আক্রমণ করে না। তবু অনিলিখা চুপ করে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎ গুহার মধ্যে থেকে আর্তনাদ শোনা গেল। ডক্টর ন্যাশের, ডক্টর আজিজের, ডক্টর অ্যালান ডকের, ডক্টর ওয়াকাটার, স্বরাজবাবুর। মুহুর্মুহু আর্তনাদে চারদিকের রাতঘুম ভেঙে গেছে। প্রতিমুহূর্তে একটার পর একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর চেঁচিয়ে উঠে ফের স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এক নিমেষে অনিলিখার কাছে পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল। সুজাক উপজাতির লোকেরা তাহলে কি নরখাদক? সুমাত্রার নরখাদক বাটাক উপজাতির কথা ও আগেই শুনেছে। আর সবাইকে নিরস্ত্র করে এদের হাতে তুলে দেওয়াটা কি রাজারই প্ল্যান? যাতে ফিরে গিয়ে কেউ এদের কথা কখনও না বলতে পারে। কাউকে না জানাতে পারে।
ভাগ্যিস রাজার বুক পকেটের দিকে নজর পড়েছিল অনিলিখার। আর তাই ও অন্যমনস্ক হয়ে উঠেছিল। কারণ মার্কের ঘরে খুঁজে পাওয়া ফাউন্টেন পেনে কাগজের ওই লেখা মার্কের নয়, রাজার। যাতে লেখা ছিল 'আমি যে-কোনওভাবে তোমাকে বাঁচাব, বাঁচাবই।' ওটা 'তোমাকে' নয়। 'তোমাদের'-কে হবে, কারণ ডেমোটিক ভাষায় এই দুটো শব্দের মধ্যে কোনও তফাত নেই। অর্থাৎ রাজা বলেছিল যে করে হোক সুজাকদের বাঁচাবে। আর তাই—
তাহলে কি মার্ককেও রাজাই হত্যা করেছে? আর তখনই ওই কাগজটা ওর পকেট থেকে মার্কের ঘরে পড়ে গিয়েছিল।
মুহূর্তের মধ্যে অনিলিখা বুঝল যে সুমাত্রার জঙ্গলের বাঘ ও গন্ডারের থেকেও অনেক বেশি বিপদ ওর খুব কাছেই। গুহার ভেতরে কারুর সাহায্যের জন্য এগোবে কি?...কিন্তু খালি হাতে? না, তার কোনও মানে হয় না। উলটোদিকের জঙ্গলের মধ্যে ছুটতে শুরু করল অনিলিখা। হঠাৎ, বন্দুকের গুলির আওয়াজ। পা ঘেঁষে চলে গেল গুলিটা। মাটিতে পড়ে গেল অনিলিখা। কোনওরকমে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখে সামনে রাজা এসে দাঁড়িয়েছে। হাতে বন্দুক।
—স্যরি অনি। তোমাকেও এদের স্বার্থে মরতে হবে। আমি বিশ্বাস করি না যে এ ঘটনার কথা, এদের কথা তুমি গোপন রাখবে। আর আমার কাছে এদের প্রাণের থেকে দামি কিছু নেই।
বন্দুকটা আবার গর্জে উঠল। কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। তার কারণ ঠিক সেই মুহূর্তেই একটা বাঁদর ঝাঁপিয়ে পড়েছে রাজার ওপর। রাজার বন্দুকটা ছিটকে পড়েছে। ও শুয়ে পড়েছে, আর বাঁদরটা ওর বুকের ওপরে। রাজা বাঁদরটাকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু পেরে উঠছে না। বাঁদরটা ওর বুক আর পেটের মাংস কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে।
এ দৃশ্য সহ্য করা অনিলিখার পক্ষে সম্ভব নয়। কোনওরকমে উঠে দাঁড়িয়ে শরীরের সব শক্তি একসঙ্গে করে ও ছুটতে শুরু করল। হঠাৎ পাশের গাছে ঝড় তুলে কী একটা ওর সামনে এসে দাঁড়াল। ওইরকমই আরেকটা বাঁদর। নাহ, ঠিক বাঁদর নয়। উচ্চতা সাড়ে চার ফুট। অসম্ভব চওড়া কাঁধ। বিশাল চওড়া বুক, শক্তিশালী হাত। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে। পা অপেক্ষাকৃত সরু ও ছোট, সাধারণ মানুষের মতো। কোটরে বসা চোখদুটোতে হিংস্রতার ছাপ। মুখে রক্ত লেগে আছে। গরিলা আর শিম্পাঞ্জির সঙ্গে অনেক মিল থাকলেও আজকের মানুষের সঙ্গেই সবথেকে বেশি মিল। এরাই তাহলে প্রথম মানুষ! যাদেরকে রাজা বলে সুজাক, এখানকার লোকেরা বলে ওরাং-পেনডেক।
অনিলিখা বুঝতে পারল ওর শেষমুহূর্ত ঘনিয়ে এসেছে। ওর অবস্থাও রাজার মতো হতে চলেছে। এক্ষুনি ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর বুকে-পেটে কামড়াতে শুরু করবে মানুষটা। চোখ বন্ধ করে ফেলল অনিলিখা। এক মিনিট কেটে গেল। দু-মিনিট। কই কিছুই হল না তো! অনিলিখা চোখ খুলল সাহস করে। লোকটা উধাও।
তবে কি এরা মেয়েদের খায় না? রাজা বলেছিল যে ওরা মেয়েদের পুজো করে। কিন্তু এটা এসব পর্যালোচনার সময় নয়। আহত পা নিয়েই অনিলিখা বনের মধ্যে দিয়ে ছুটতে আরম্ভ করল। শুধু চাঁদের আলোর ভরসায়। ওর মনে হচ্ছিল সামনে যেন কেউ ওর জন্য পথ করে দিচ্ছে। বনজঙ্গল ঝোপঝাড় সরিয়ে সরিয়ে কী যেন ওর আগে আগে চলে যাচ্ছিল। তা না হলে এই রাতে ওর একার পক্ষে পথ চেনা অসম্ভব হত।
নীচে দুটো গাড়িই দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ড্রাইভার নেই। গাড়িতে চাপ চাপ রক্ত। অর্থাৎ, ওদেরকেও রেহাই দেয়নি এই নরখাদকের দল। গাড়ি স্টার্ট করল অনিলিখা। ফেরার পথ ধরল। ফেরার পথে ট্যাবেগাও-তে ও পুলিশ রিপোর্ট লেখাল। ওরাও নরখাদক মানুষের কথা আগে শুনেছে। আর ঠিক এই কারণে চোরাকাঠ শিকারিরা, পামওয়েলের সন্ধানী ব্যবসায়ীরা এখানে ঢোকে না। হঠাৎ করে ওরা কেন ওখানে এসেছিল, তা নিয়ে অনিলিখাকে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করা হল। ও ইচ্ছে করেই সুজাক উপজাতির কথা কিছু বলল না। ওরা অনাবিষ্কৃত হয়েই থাক—বেঁচে থাক ওদের মতো করে।
অবশেষে চোখ মেলল ছেলেটা। গত কয়েকদিন জ্বরে বেহুঁশ হয়ে পড়েছিল। ওঠার চেষ্টা করল, পারল না। অনেকদিন খাওয়া হয়নি। হাড়গুলো বেরিয়ে গেছে। সারা গায়ে ক্ষতের চিহ্ন। কোনওরকমে মাথা তুলে চারদিকটা দেখে নিল একবার। এ গুহার মধ্যেও জল ঢুকে গেছে। শুধু সামান্য জায়গা বাকি। গুহার ছাদ আর নীচের জলের স্রোতের মধ্যে বড়জোর দু-হাত ফাঁকা।
ভাগ্যিস উঁচু পাথরটা পাওয়া গিয়েছিল! পাথরটা কোনওরকমে জলস্রোতের ওপরে মাথা তুলে আছে। তবে, তাও কতক্ষণ? বাইরে আর ভেতরে একইরকম অন্ধকার। শুধু জলোচ্ছ্বাসের আওয়াজ। এই বুঝি তেড়ে এল! মেয়েটা-মেয়েটা কোথায়?
এই এক মাসে ও ওরই মতো আরও দুজনকে খুঁজে পেয়েছিল। তারা তাদের মতো ব্যবস্থা করে নিয়েছে। ওকে অসুস্থ দেখে ফেলে চলে গেছে। শুধু মেয়েটা ছেড়ে যায়নি। এই এক মাস যা খাবার পেয়েছে দুজনে ভাগ করে খেয়েছে। যেদিন খায়নি, দুজনেই খায়নি। এই যে ওর শরীর এত খারাপ, ওকে তো ফেলে মেয়েটা চলে যেতে পারত, কিন্তু যায়নি। পাশে বসে থেকেছে। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখন কোথায় গেল? নাহ, মেয়েটারই বা কী দোষ! ওর সঙ্গে এই গুহায় আটকে থেকে সেধে মৃত্যু ডেকে আনার তো কোনও কারণই নেই। খানিকবাদে এ গুহাতেও হয়তো জল ঢুকবে। ওর যা শরীরের অবস্থা ও কোনওভাবেই নড়তে পারবে না। জলে দমবন্ধ হয়ে মরতে হবে। নাহ, যদি চলে গিয়ে থাকে তো ঠিকই করেছে মেয়েটা।
হঠাৎ একটা পাথরের শব্দ এল কাছ থেকে। চমকে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল ছেলেটা। ওই-ওই তো মেয়েটা! পাথর দিয়ে কিছু একটা থেঁতলে মেরেছে। এক হাতে কিছু একটা নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। কাছে এসে কিছু একটা ওর মুখে গুঁজে দিল।
আহ, কী সুন্দর! এক টুকরো মাংস। কতদিন বাদে যে এটুকু খাবার জুটল! মেয়েটা হাসছে। ভারি সুন্দর চোখের পাতা মেলে। ওর চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জলের ফোঁটাটা আঙুল দিয়ে মুছে মেয়েটা ওর হাতের মুঠোটা চেপে ধরল। এখনও সব শেষ হয়নি। আমরা বাঁচবই।
—বিশ্বজিৎদা, খবরটা দেখেছ? রুজু বাংলা খবরের কাগজটার তৃতীয় পাতার কোণের দিকটা এগিয়ে দিল। ছোট খবর।
বিশ্বজিৎদা খুব আনমনে দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে হাতে ধরা একটা বই কাছে দূরে করে নিজের নতুন চশমাটা টেস্ট করছিল, আর গুনগুন করে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর ভাঁজছিল।
—কী হল বিশ্বজিৎদা! খবরটা দ্যাখো।
তবু বিশ্বজিৎদার কোনও সাড়াশব্দ নেই। মিলন পাশ থেকে হাত বাড়িয়ে খবরের কাগজটা রুজুর হাত থেকে টেনে নিয়ে একঝলক দেখে বলে উঠল,—অ্যাঁ, অ্যাসটরয়েডের ধাক্কার সম্ভাবনা! বলিস কীরে!
—কী? কীসের খবর? অ্যাসটেরয়েডে আমাদের সবারই খুব আগ্রহ।
রুজু এবার খবরটা পড়তে শুরু করল—'ঠিক যেমন—হঠাৎ করে দেখা দিয়েছিল অ্যাসটেরয়েড 2015 SX তেমনই আবার হঠাৎ করে হারিয়েও গেল। নাসার বিজ্ঞানীরা রীতিমতো চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন, যখন দশ দিন আগে এক সাধারণ পর্যবেক্ষকের টেলিস্কোপে এই অ্যাসটেরয়েড ধরা পড়ে। বিজ্ঞানীদের চেনাজানা অ্যাসটেরয়েডের মধ্যে এটা ছিল না। পৃথিবী থেকে চাঁদের যতটা দূরত্ব তার এক চতুর্থাংশ দূরত্ব দিয়ে 14 অক্টোবর এই বিশাল পাথরের টুকরোটার যাওয়ার কথা ছিল।
এত কাছ দিয়ে এত বড় পাথর এখনও পর্যন্ত যায়নি। পৃথিবীর সঙ্গে ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। কিন্তু মজার কথা হল 14 অক্টোবরের দুদিন আগেই সেটা ভ্যানিশ। ম্যাজিকের মতো উধাও অ্যাসটেরয়েড। কী করে কেউ জানে না। জ্যোতির্বিজ্ঞানী রন ওয়াইল্ড বলেছেন যে এ ঘটনা এটাই প্রমাণ করে যে আমরা এখনও মহাবিশ্বের কিছুই বুঝি না।
—দেখেছিস? বলেছিলাম না সেদিন! ডাইনোসরদের মতো আমরাও একদিন অ্যাসটরয়েডের ধাক্কায় শেষ হয়ে যেতে পারি—বলেছিলাম না? প্রতীক সবজান্তার মতো বলে উঠল।
—গাঁজাখুরি গল্প। এতক্ষণে রবীন্দ্রনাথের সুর ছেড়ে বিশ্বজিৎদা বলে উঠল,—এসব খবর কোথা থেকে আসে জানিস! স্রেফ সাংবাদিকদের মস্তিষ্কের ডানদিকের অংশ থেকে। হয়তো জায়গাটা রাখা ছিল কোনও একটা কেচ্ছা কাহিনির জন্য। ঘটেনি সেরকম কিছু। ব্যস, এই খবর! ওই পাথরটা কবে আসবে তাও জানা ছিল না। তাই ভ্যানিশ হলেও কেউ প্রশ্ন করবে না। শুধু তোদের মতো কয়েকটা গজমূর্খ টেবিলে রাখা সিঙাড়া ঠান্ডা করে এসব আলোচনা করে যাবে।
বলে বিশ্বজিৎদা নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসে হাত বাড়িয়ে সামনের টেবিলে প্লেটে রাখা একটা সিঙাড়া তুলে নিল।
তোমরা যারা আমাদের শনিবারের আসর সম্পর্কে বিশেষ পরিচিত নও, তাদের বলি—প্রত্যেক শনিবারে উত্তর কলকাতার পুরোনো পাড়ায় রামতনু বোস লেনের একটা বাড়িতে আমরা জনাকুড়ি জমায়েত হই। বেশিরভাগের বয়স কুড়ির নীচে হলেও, বিশ্বজিৎদা, শ্যামলদা, দেবুদা—এরাও আমাদের আড্ডায় যোগ দেয়। আর কালেভদ্রে আসে অনিলিখাদি। অনিলিখাদির এমন এমন অদ্ভুত অভিজ্ঞতা আছে যার তুলনা পাওয়া মুশকিল। অনিলিখাদি উচ্চশিক্ষিতা, স্বাধীনচেতা, সবার বিপদে সবসময়ে এগিয়ে যায়। সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়। আর কলকাতায় থাকলে হঠাৎ হঠাৎ এ আসরে উদয় হয় বিদেশের নানান ধরনের চকোলেট নিয়ে। তবে তার থেকে অনেক বেশি আকর্ষণ অনিলিখাদির গল্পে। তাই আমরা সবসময় অনিলিখাদির অপেক্ষায় থাকি।
আজকে বিশ্বজিৎদার কথা শেষ হতে-না-হতেই বাইরে চটি খোলার আওয়াজ। অনিলিখাদি ঘরে ঢুকল। একমুহূর্তে আমাদের আড্ডার ঝিমিয়ে পড়া ভাবটা ভ্যানিশ। একটু যেন খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হেঁটে চেয়ারে এসে বসল অনিলিখাদি। হাতে দুটো বই, তারমধ্যে একটা অ্যাসটেরয়েডের ওপরে লেখা। আমাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে উঠল,—অ্যাসটেরয়েডের ওপর খুব সুন্দর বই—তোরা পড়িস।
—কী আশ্চর্য! তুমি কী করে জানলে? আমরা এইমাত্র অ্যাসটেরয়েডের পৃথিবীতে ধাক্কা মারা নিয়ে কথা বলছিলাম। মনীশ বলে উঠল।
—এই দ্যাখো। অ্যাসটেরয়েড নিয়ে একটা খবর বেরিয়েছে। সত্যিই কি ধাক্কা মারার সম্ভাবনা ছিল? রুজু কাগজটা এগিয়ে দিল।
বিশ্বজিৎদা ঠাট্টা করে বলে উঠল,—দাঁড়া, অনিলিখাকে একটু বসতে দে। এতদিন বাদে এল। এসব হল ওর কাছে পুরোনো খবর। অ্যাসটেরয়েডের পাস্ট, প্রেজেন্ট, ফিউচার—সব অনিলিখার জানা।
বলে একটু সিরিয়াসভাবে অনিলিখাদিকে ফের প্রশ্ন করল,—তা তোমার এ খবরটার ব্যাপারে কী মনে হয়? পুরো বানানো গল্প, তাই না?
অনিলিখাদি মুচকি হেসে একটু যেন সময় নিয়েই বলে উঠল,—এই একটা ব্যাপারে তোমার সঙ্গে একমত। পুরোপুরি বানানো।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন