হরিমতির বাগান – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পৌলোমী সেনগুপ্ত

হরিমতির বাগান – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

বিপিনবাবুর বউ হরিমতির খুব শখ ছিল একখানা বাগানওলা বাড়ি করবেন। কিন্তু কলকাতায় জমির যা দাম, তাতে বাগানওলা বাড়ি করার মাটি ছা-পোষা বিপিনবাবুর নেই। মফস্সলে গেলে হয়তো হয়, কিন্তু হরিমতি আবার শহরতলি পছন্দ করেন না, কলকাতার বাইরে যাওয়ার কথায় তিনি বেঁকে বসলেন, বললেন, “ও বাবা, কলকাতার বাইরে গেলে গড়িয়াহাটে বাজার করব কী করে?”

যাই হোক, শেষ অবধি একটা আপসরফা হল। নাকতলায় তিনতলার ওপর একখানা মাঝারি মাপের ফ্ল্যাট ধারকর্জ করে কিনে ফেললেন বিপিনবাবু।

হরিমতি ফ্ল্যাট দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এ তো বাক্স গো! গাছপালা না থাকলে আমার যে দম বন্ধ হয়ে আসে।”

বিপিনবাবু খুবই নিরীহ নির্বিরোধ মানুষ। বললেন, “আপাতত ফ্ল্যাটেই থাকো, কোনও দিন অবস্থার উন্নতি হলে বাগানওলা বাড়ি করা যাবে।”

হরিমতি বললেন, “আচ্ছা, আজকাল তো ঘরের মধ্যেই কিছু-কিছু গাছপালা করা যায় বলে শুনেছি, কী করে করা যায় তার বইও আছে, এনে দেবে একখানা?”

বিপিনবাবু খুঁজেপেতে ‘ঘরের মধ্যে চাষ’ বলে একখানা বই পেয়ে কিনে আনলেন।

কয়েক দিন কিছু বোঝা গেল না, দিনসাতেক পরে একদিন অফিস থেকে ফিরে বিপিনবাবু দেখলেন, তাঁর স্ত্রী হরিমতি আর দশ বছরের ছেলে রাহুল আর আট বছরের মেয়ে পুঁচকি বাইরের ঘরের এক ধারে মেঝের ওপর স্তূপাকার মাটি বিছিয়ে মাটির ওপর ঘাসের চাপড়া বসাচ্ছে।

বিপিনবাবু আঁতকে উঠে বললেন, “এ কী? বৈঠকখানা যে নোংরা হয়ে গেল?”

হরিমতি হেসে বললেন, “নোংরা হবে কেন? ঘাসের চাপড়া ঠিকমতো বসাই, তারপর দেখো, ঘরটাকে লন বলে মনে হবে।”

বিপিনবাবু নিরীহ মানুষ, অস্ফুট কণ্ঠে শুধু বললেন, “দুর্গা, দুর্গা, দুর্গতিনাশিনী!”

বাস্তবিকই দিন দুই পরে বৈঠকখানাটা একেবারে লন বলেই মনে হতে লাগল, সোফাসেট বিদেয় করে দিয়েছেন হরিমতি, অতিথিরা নাকি এসে ঘাসের ওপর বসবেন, সেটা অভিনব একটা ব্যাপারও হবে।

বিপিনবাবুর অস্বস্তি হচ্ছে, কিন্তু কিছু বলতে পারেন না, হরিমতি চটলে কুরুক্ষেত্র হবে।

কয়েক দিনের মধ্যেই দেখা গেল, লনের চার দিকে নানা বাহারি ফুলগাছের চারা বসে গেছে। দেওয়ালের একধারে একটা টবের ভেতর থেকে একটা লতানে গাছ দেওয়াল বেয়ে উঠবার চেষ্টা করছে।

বিপিনবাবু ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন বটে, কিন্তু কোনও মন্তব্য করলেন না।

হরিমতি খুব অহংকার করে বললেন, “জানো তো, আজকাল অনেকেই আমার ঘরের বাগান দেখতে আসছে!”

“তাই নাকি?” বলে বিপিনবাবু খুব আহ্লাদ প্রকাশের চেষ্টা করলেন বটে, কিন্তু হাসিটা যেন মুখ ভ্যাংচানোর মতো হয়ে গেল।

অফিসের কাজে দিনকয়েকের জন্য একটু কলকাতার বাইরে যেতে হল বিপিনবাবুকে, দিন-কুড়ি বাদে এক সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে বৈঠকখানাতে ঢুকতে যেতেই মাথায় একটা পেল্লায় গুঁতো খেয়ে “বাপ রে!” বলে আর্তনাদ করে উঠলেন।

হরিমতি গম্ভীর হয়ে বললেন, “ইস, আর একটু হলেই চালকুমড়োটা বোঁটা ছিঁড়ে পড়ে যেত।”

“চালকুমড়ো!” বলে ঊর্ধ্বমুখ হয়ে বিপিনবাবুর চোখ বাস্তবিকই ছানাবড়া হল, ঘরের মধ্যে অতি স্তিমিত আলোয় তিনি ঝুলন্ত চালকুমড়োটা দেখতে পেলেন এবং সেটা গাছ থেকেই ঝুলছে। তার পর আরও যা দেখলেন তাতে তাঁর বিস্ময়ে বসে পড়ার কথা! দেখলেন, নানা লতাপাতা দেওয়াল বেয়ে উঠে ঘরের লাইট ঢেকে ফেলেছে। ফ্যান থেকেও ঝুলছে লতাপাতা।

না, বিপিনবাবু প্রতিবাদ করলেন না, করে লাভ নেই।

শোওয়ার ঘরে ঢুকেও তাঁর ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। সেখানেও বড়-বড় টব এবং মেঝের ওপর মাটি ফেলে গাছপালার চর্চা শুরু হয়েছে। অনাবশ্যক আসবাবপত্র বিদেয় করে দেওয়া হয়েছে। তবে হ্যাঁ, এখনও খাট আর তার ওপর বিছানা আছে।

মাসখানেকের মধ্যেই ব্যালকনি থেকে লাউ-কুমড়ো, শসা আর ঝিঙের গাছ নীচে নামতে এবং ওপরে উঠতে শুরু করল। সন্ধের পর ঘরে রজনীগন্ধা এবং গোলাপের গন্ধ ম’ ম’ করতে লাগল, জানলাগুলো সম্পূর্ণ ঢেকে গেল নানা গাছপালায়।

সকাল থেকে পাড়া-প্রতিবেশীদের এবং তাদের সূত্রে আরও দর্শনার্থীদের ভিড় জমে যায় ফ্ল্যাটের সামনে। না, তা বলে তারা হুড়মুড় করে ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়তে পারে না। হরিমতি একজন বা দু’জন করে দর্শনার্থীকে ফ্ল্যাটে ঢুকতে দেন এবং নিজে সব ঘুরিয়ে দেখান। রীতিমতো গাইডেড টুর।

বিপিনবাবুর অস্বস্তি বাড়ছে।

এক রাতে পাশ ফিরে পাশবালিশ বলে যা আঁকড়ে ধরলেন, পরে দেখা গেল, সেটি একটি জাম্বো লাউ।

আজকাল ফ্ল্যাটবাড়ির কেউ-কেউ এসে নগদ দামে সবজি কিনে নিয়ে যায়। তাতে হরিমতির হাতে দুটো পয়সা আসতে শুরু করেছে।

কিন্তু ক্রমে-ক্রমে ফ্ল্যাটবাড়ির ভেতরে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যাওয়াটা বেশ দুর্গম হয়ে উঠল, ঝোপঝাড় ঠেলে উঠছে, কোথাও-কোথাও বেশ বুকসমান উঁচু গাছপালা, বাইরে থেকে পাখিটাখি ঢুকে দিব্যি বাসা বানিয়ে ফেলছে গাছপালার মধ্যে। পুঁচকি আর হাবুলের পড়াশোনার বারোটা বাজার জোগাড়, কারণ, তাদের পড়ার টেবিলের ওপর কাঁকরোল, করলা ইত্যাদি ফল আছে। বইয়ের র‍্যাকে পুঁইডগা বাইছে। দিনে রাতে ঘরের মধ্যে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। লাইট জ্বাললেও আলো হয় না, কারণ আলো গাছপালায় ঢাকা পড়ে গেছে।

বিপিনবাবু একদিন খুব সাহস সঞ্চয় করে হরিমতিকে বললেন, “কাজটা কি ঠিক হচ্ছে?”

হরিমতি অতি উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠলেন, “ওগো, সরকার থেকে আমাকে প্রাইজ দেবে। কাল সকালেই মন্ত্রী আসছেন আমার বাগান দেখতে।”

তা বাস্তবিকই মন্ত্রী এলেন, সঙ্গে বিশাল আমলা ও পুলিশবাহিনী। ঘরের ভেতরে ঢুকে চার দিকে টর্চ মেরে দেখে মন্ত্রী মুগ্ধ। তার পরই টিভির লোকজন এসে ছবি তুলল, হরিমতির ইন্টারভিউ নিল। সেদিনই বিকেলে রবীন্দ্রসদনে হরিমতিকে ‘কাননরানি’ উপাধিতে ভূষিত করে একটা রুপোর কাপ দিলেন মন্ত্রী।

বিপিনবাবু খুশি হবেন, না দুঃখিত হবেন বুঝতে না পেরে অবশেষে খুশি হবেন বলেই ঠিক করলেন। পরের ‘সেশনে’ ছেলে হাবুলকে একটা আশ্ৰমিক স্কুলের হস্টেলে আর মেয়েকে সারদেশ্বরী আশ্রমে দিয়ে দিলেন।

বিপিনবাবু আর হরিমতি ভালই আছেন। তাঁদের ফ্ল্যাটবাড়িটাকে লোকে ‘হরিমতির সবজি বাজার’ বলে অভিহিত করে। ফ্ল্যাটবাড়ির মধ্যে বিপিনবাবুর সঙ্গে হরিমতির মাঝে মাঝে দেখাও হয়ে যায়। কখনও ঝিঙে মাচানের তলায়, কখনও গোলাপঝাড়ের পাশে, কখনও লঙ্কাখেতে। বিপিনবাবুর কিছু একটা বলতে ইচ্ছে যায় হরিমতিকে, বলি-বলি করেও বলেন না, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাছপালার মধ্যে গা-ঢাকা দেন।

একদিন মাঝরাতে উঠে বাথরুমে যাওয়ার জন্য খাট থেকে নামতে গিয়ে একটা ফোঁস-ফোঁস আওয়াজ শুনে সাঁত করে পা টেনে নিলেন বিপিনবাবু। সাপ নয় তো! টর্চটা জ্বেলে একটা কালোমতো লেজের অংশ যেন দেখতেও পেলেন ঘাসজঙ্গলে।

তারপর একদিন হঠাৎ রাত বারোটায় পাশের ঘরে একটা হুক্কা হুয়া শব্দ পেয়ে উঠে বসলেন বিপিনবাবু। ব্যাপারটা কী? শেয়াল ডাকছে নাকি?

মাসদুয়েক বাদে নিশুতরাতে একটা গর্জনের শব্দে ঘুম ভেঙে উঠে বসলেন বিপিনবাবু। বুকটা ধকধক করছে। কীসের ডাক? জেগে উঠে আবার নির্ভুল ডাকটা শুনতে পেলেন, ঘরের জঙ্গলে বাঘ ডাকছে। বিপিনবাবু বিড়বিড় করে বললেন, “দুর্গা, দুর্গা, দুর্গতিনাশিনী!”

পরদিনই হরিমতিকে বললেন, “ওগো, চলো আমরা অন্য কোথাও চলে যাই।”

হরিমতি একগাল হেসে বললেন, “বলো কী! আমার বাগানের এখন কত নাম, আর শুধু কি বাগান! বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্যও আমাকে নাকি কেন্দ্রীয় সরকার প্রাইজ আর পদ্মশ্রী দেবে।”

বিপিনবাবু আর কিছু বলার সাহস পেলেন না, বলার আর কীই-বা থাকতে পারে?

২ জুলাই ১৯৯৭

সকল অধ্যায়
১.
ভারত যুদ্ধে পিঁপড়ে – প্রেমেন্দ্র মিত্র
২.
বিড়ালের চোখ – নীহাররঞ্জন গুপ্ত
৩.
শরচ্চন্দ্রের সন্ধিভেদ – শিবরাম চক্রবর্তী
৪.
ঝুনুমাসির বিড়াল – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
৫.
বিধু দারোগা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৬.
সাধু কালাচাঁদের পালাকীর্তন – শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
৭.
‘তেনা-রা’ – প্রেমেন্দ্র মিত্র
৮.
লালটেম – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৯.
অশরীরী – লীলা মজুমদার
১০.
রাজপুত্তুরের অসুখ – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
১১.
ভূতেরা বড় মিথ্যুক – প্রেমেন্দ্র মিত্র
১২.
রুকু আর সুকু – সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
১৩.
রাত তখন এগারোটা – বিমল মিত্র
১৪.
ম্যাজিশিয়ান – বিমল কর
১৫.
ঘণ্টাকর্ণের কান গেল – মনোজ বসু
১৬.
খুনি – সমরেশ মজুমদার
১৭.
বনকুঠির রহস্য – হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
১৮.
একদম রূপকথা – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
১৯.
তারিণীখুড়ো ও ডুমনিগড়ের মানুষখেকো – সত্যজিৎ রায়
২০.
অম্বর সেন অন্তর্ধান রহস্য – সত্যজিৎ রায়
২১.
দেবতার ভর – সুকুমার সেন
২২.
মজারুমামা – আশাপূর্ণা দেবী
২৩.
দুঃখহরা বড়ির শিশি – লীলা মজুমদার
২৪.
গঙ্গারামের কপাল – সত্যজিৎ রায়
২৫.
গোরক্ষনাথবাবুর নোটবুক – সমরেশ বসু
২৬.
ভুনিকাকার চৌরশতম্‌ – বিমল কর
২৭.
অনুকূল – সত্যজিৎ রায়
২৮.
ক্যাপ্টেন – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
২৯.
তুরুপের তাস চুরি – প্রেমেন্দ্র মিত্র
৩০.
নিখোঁজ নিরুদ্দেশ হতে গেলে – আশাপূর্ণা দেবী
৩১.
রুপোর গাছ – বাণী বসু
৩২.
বনঝাউয়ার রহস্য – ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য
৩৩.
জ্বরের ঘোরে শোনা – সমরেশ বসু
৩৪.
একটি লাল লঙ্কা – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
৩৫.
টিকটিকি অতীন্দ্রিয় শক্তি ও বেদান্ত বর্ধন -আশাপূর্ণা দেবী
৩৬.
নদুস্কোপ – রূপক সাহা
৩৭.
আতাপুরের দৈত্য – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৩৮.
নিখোঁজ চারু – অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়
৩৯.
গাবু – দুলেন্দ্র ভৌমিক
৪০.
কপালের নাম গোপাল – আশাপূর্ণা দেবী
৪১.
শিমুলতলার মাধবী লজ – ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
৪২.
কানকাটা বাঘ – শৈলেন ঘোষ
৪৩.
হিংসুটে – অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়
৪৪.
হরিণ-শিকারির বাড়ি – হর্ষ দত্ত
৪৫.
অর্জুন হতভম্ব – সমরেশ মজুমদার
৪৬.
কেউ কি এসেছিলেন – বিমল কর
৪৭.
হরিমতির বাগান – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৪৮.
মজাদার এক ফুটবল ম্যাচ আর দানাপুরি – বিমল কর
৪৯.
চারুহাসিনীর দেওয়াল-সিন্দুক – সুচিত্রা ভট্টাচার্য
৫০.
বন্ধু – তিলোত্তমা মজুমদার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%