নির্বাসিতের আত্মকথা – চতুদর্শ পরিচ্ছেদ

রাজনৈতিক মতামত লইয়া মাঝে মাঝে সুপারিনটেনডেন্টের সহিত আমাদের তর্ক-বিতর্ক হইত। বলা বাহুল্য, ইংরেজ গবর্ণমেন্টের মহিমা প্রচার করাই তাঁহার উদ্দেশ্য। স্ত্রীলোক ও রাজপুরুষের সহিত তর্ক উপস্থিত হইলে হারিয়া যাওয়াই ভদ্রতাসঙ্গত; কিন্তু সে কথা জানিয়াও আমরা মাঝে মাঝে ছুই চারিটা অপ্রিয় সত্য বলিয়া ফেলিতাম। সেখানে জিহ্বা সঞ্চালন ভিন্ন আর কি করা যায়?

রুসিয়ায় তখন বিপ্লব আরম্ভ হইয়া গিয়াছে, একদিন জেলার আমায় ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—

“সুপারিনটেনডেন্ট যে তোমাদের সঙ্গে অতক্ষণ ধরিয়া তর্ক-বিতর্ক করেন, তা’র কি কারণ বলিয়া মনে হয়?”

আমি বলিলাম—“কি জানি সাহেব? স্বজাতির গুণগান করা ছাড়া আর যদি কোন গূঢ় উদ্দেশ্য থাকে ত বলিতে পারি না।”

জেলার বলিলেন—“এ কথা বোধ হয় জান যে ছয় মাস অস্ত্রর ইণ্ডিয়া গবর্ণমেণ্টের কাছে তোমাদের প্রত্যেকের সম্বন্ধে এক একখানি করিয়। রিপোর্ট যায়। তোমরা সুপারিনটেনডেন্টের কাছে যে মতামত প্রকাশ কর তিনি সেগুলি নোট করিয়া রাখেন, আর তাহার উপর নির্ভর করিয়াই রিপোর্ট প্রস্তুত হয়। চারিদিকে যেরূপ হুলস্থুল কাণ্ড বাধিয়া গিয়াছে, তাহাতে ইংরেজ যদি হারে, তা ল্যাঠা চুকিয়াই গেল; আর যদি জয়ী হয় ত জানন্দের প্রথম ধাক্কায় তোমাদের ছাড়িয়াও দিতে পারে। ইংরেজ রাজত্বটা যে কি, তাহা আমি আইরিশ, সুতরাং ভাল করিয়া বুঝি। জেলখানার ভিতর সব সময়ে পেটের কথা মুখে আনিয়া লাভ নাই।”

ভাবিয়া দেখিলাম, কথাগুলো ত ঠিক। জেলখানাটা ঠিক বক্তৃতা দিবার জায়গা নয়। শত্রুর মুখ হইতেও উপদেশ শাস্ত্রমত গ্রাহ্য; সুতরাং জিহ্বাটা সেই সময় হইতে অনেক কষ্টে সংযত করিয়া ফেলিলাম।

সুপারিনটেনডেন্ট মাঝে মাঝে যুদ্ধের বিষয় লইয়া আলোচনা করিতেন। জার্মানী যে কি ভীষণ রকম পাজি তাহাই তাঁহার প্রতিপান্ত। আমরাও এক বাক্যে জার্মানীর পাঞ্জিত্ব স্বীকার করিয়া লইয়া তাঁহাকে জানাইয়া দিলাম যে মরিবার পর জার্মানী নিশ্চয় নরকে যাইবে। দেবলোকে ইংরাজের পার্শ্বে স্থান থাইবার তাহার কোনই সম্ভাবনা নাই।

ইংরেজ চরিত্রে একটা কেমন সঙ্কীর্ণতা আছে—সে কোন জিনিসের নিজের দিক ছাড়া পরের দিক সহজে দেখিতে পায় না। তেত্রিশ কোটী ভারতবাসী যে চিরদিন ইংরেজের আশ্রয়েই থাকিতে চায়, এ কথা বিশ্বাস করিবার জন্য ইংরেজের প্রাণ একেবারেই লালায়িত! ভারতে ইংরেজ রাজত্ব যে আদর্শ শাসনযন্ত্রের খুব কাছাকাছি এ বিষয়ে তাঁহাদের বড় একটা সন্দেহ নাই।

কিন্তু এ বিশ্বাস সুপারিনটেনডেন্ট সাহেবের শেষ পর্যন্ত ছিল বলিয়া মনে হয় না। যুদ্ধের সময় ত বেচারা প্রাণপণ করিয়া পরিশ্রম করিলেন, কয়েদীর খরচ কমাইয়া সরকারী তহবিলে অনেক টাকা জমা দিলেন; কিন্তু যুদ্ধ শেষ হইবার পর নিজের একমাত্র শিশু কন্যাকে বিলাতে রাখিয়া আসিবার জন্য যখন ছয় মাসের ছুটী চাহিলেন তখন ছুটী আর মিলিল না! আবেদনের পর আবেদনের যখন কোনও উত্তর পাওয়া গেল না তখন তিনি বলিতে আরম্ভ করিলেন-“ All governments are bad. I am an anarchist” শেষে চটিয়া গিয়া তিনি চাকরী ছাড়িয়া দিবার প্রস্তাব করিয়া বলিলেন— “The gods of Simla are incorrigible.” কিছুদিন পূর্বে মন্টেগু সাহেবের রিফর্ম বিলের খসড়ায় যখন ইণ্ডিয়া গভর্ণমেন্টকে একেবারে সর্বময় প্রভু করিয়া খাড়া করা হইয়াছিল, তখন ঐ সুপারিনটেনডেন্টই একদিন কথাপ্রসঙ্গে বলিয়াছিলেন-“তাহাতে কোন দোষ হইবে না। The government of India are sensible people.” নিজের লেজে পা না পড়িলে কেহ পরের দুঃখ বুঝিতে পারে না।

যাক্—এ দিকে যুদ্ধ শেষ হইয়া গেল! যুদ্ধের পূর্বে যখন ছাড়া পাইবার আশা ভরসা একেবারে ছাড়িয়া দিয়া মরণের প্রতীক্ষায় বসিয়াছিলাম অমন দুঃখের মাঝখানে দিন একরূপ কাটিয়া যাইতেছিল; কিন্তু যুদ্ধের পর আবার কয়েদী ছাড়িবার কথা উঠিল। তখন আশায় ও আশঙ্কায় দিন কাটান ভার হইয়া উঠিল। একদিন সংবাদ আসিল যে, যে সমস্ত যাবজ্জীবন দণ্ডে দণ্ডিত রাজনৈতিক কয়েদী পিনাল কোডের ৩০২ ধারা অনুসারে অপরাধী নয় তাহারা জেলখানায় যদি সাত বৎসর কাটাইয়া থাকে ত তাহাদিগকে মুক্তি দেওয়া হইবে। আমাদের সাত বৎসর ছাড়িয়া দশ বৎসর হইয়া গিয়াছে, সুতরাং প্রাণে একটু আশার সঞ্চার হইল। কিছুদিন পরে শুনিলাম যে, যে সমস্ত কয়েদীর মুক্তির জন্য ইণ্ডিয়া গবর্ণমেন্টের কাছে নাম পাঠান হইয়াছে তাহাদের সঙ্গে আমাদের নামও গিয়াছে; এখন গবর্ণমেণ্ট তাহা মঞ্জুর করিলেই নাকি আমরা নাচিতে নাচিতে দেশে ফিরিয়া যাইতে পারি।

এ পর্যন্ত কোনও যাবজ্জীবন দণ্ডে দণ্ডিত রাজনৈতিক কয়েদী পোর্টব্লেয়ার হইতে বাঁচিয়া ফিরে নাই। ১৮৫৭ সালে যাহারা সিপাহী বিপ্লবের পর পোর্টব্লেয়ারে গিয়াছিল তাহাদের সকলকেই সেখানে একে একে দেহরক্ষা করিতে হইয়াছে। খিবর সহিত যুদ্ধের পর যে সমস্ত ব্রহ্মদেশীয় কয়েদী আসিয়াছিল তাহারাও কেহ ছাড়া পায় নাই। আজ আমাদের জন্য যে ইণ্ডিয়া গবর্ণমেণ্টের ইতিহাসে নূতন অধ্যায় আরম্ভ হইবে একথা সহসা বিশ্বাস করিতে সাহস হইল না। কিন্তু না বিশ্বাস করিয়াই বা করি কি? প্রাণ যে ফুলিয়া ফুলিয়া হাঁপাইয়া উঠিতেছে!

ক্রমে জার্মানীর সহিত সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হইল। ইংলণ্ডে বিজয় উৎসব ফুরাইয়া গেল। কিন্তু কই, কয়েদী ত ছাড়িল না। যুদ্ধ বন্ধ হইবার পর হইতেই দিন গণনা আরম্ভ করা গিয়াছে; দিন গণিতে গণিতে সপ্তাহ, সপ্তাহ গণিতে গণিতে মাস, ক্রমে মাস গণিতে গণিতে বৎসব ফুবাইয়া গেল; কিন্তু বিড়ালের ভাগ্যে শিকা ছিঁড়িল না। খবরের কাগজে কিন্তু পড়িয়াছিলাম যে অক্টোবর মাসে ভারতবর্ষের বিজয় উৎসব হইবে সুতরাং মনের কোণে একটু আশা রহিয়া গেল।

ভারতে যখন বিজয় উৎসব ফুরাইয়া গেল তখন মনটা ছট ফট, করিতে আরম্ভ করিল— খবর বুঝি এই আসে, এই আসে! শেষে ইণ্ডিয়া গবর্ণমেণ্টের নিকট হইতে খবরও একদিন আসিল। সুপারিনটেনডেন্ট আমাদের অফিসে ডাকাইয়া শুনাইয়া দিলেন যে সরকার বাহাছব কৃপাপরবশ হইয়া আমাদিগকে বৎসরে একমাস করিয়া মাফ দিয়াছেন।—ব্যোম ভোলানাথ! এত দিনের আশা এক ফুৎকারে উড়িয়া গেল!

তখন দেখিলাম যে পোর্টব্লেয়ারে জীবনের বাকী কয়টা দিন কাটান ছাড়া আর উপায়ান্তর নাই। তাই যদি করিতে হয় ত ভূতের বেগার আর খাটিয়া মরি কেন? চীফ কমিশনারের নিকট আবেদন করিলাম যে সমস্ত মাফ লইয়া যখন আমাদের চৌদ্দ বৎসর পূর্ণ হইয়াছে তখন সরকারী প্রতিশ্রুতি অনুসারে আমাদের জেলের কাজকর্ম হইতে অব্যাহতি দেওয়া হোক। কিন্তু সে আবেদন পত্র যে চীফ কমিশনারের দপ্তরে গিয়া কোথায় ধামা চাপা পড়িয়া গেল তাহার আর কোন উদ্ভব পাওয়া গেল না।

এই সময় জেল কমিটির পোর্টব্লেয়ারে আসিবার কথা ছিল। আমি স্থির করিলাম যে আমাদের যা কিছু বক্তব্য সমস্ত জেল কমিটির নিকট গায়ের ঝাল ঝাড়িয়া বলিয়া দিয়া তাহার পর কাজকর্ম ছাড়িয়া দিয়া বসিয়া পড়িব। কিন্তু রাখে কৃষ্ণ মারে কে? জেল কমিটি চলিয়া যাইবার অল্পদিন পরেই একদিন প্রাতঃকালে সুপারিনটেনডেন্ট আসিয়া আমাদের সংবাদ শুনাইয়া দিলেন যে বেঙ্গল গবর্ণমেণ্ট আমাদের আলীপুর জেলে পাঠাইয়া দিবার আদেশ দিয়াছেন; সেখান হইতে আমাদের মুক্তি দেওয়া যাইবে।

অল্প দিনের মধ্যে গবর্ণমেন্টের মতিগতি কি করিয়া পরিবর্তিত হইল সে রহস্য উদঘাটন করিবার কৌতূহল মনের মধ্যেই চাপা পড়িয়া রহিল। লম্বা হইয়া মেজের উপর পড়িয়া স্ফুর্তিতে কেহ চীৎকার করিতে লাগিল, কেহ হাত পা ছুঁড়িতে লাগিল, কেহ গান জুড়িয়া দিল। একজন বিজ্ঞ বন্ধু সকলকে শান্ত করিবার জন্য বলিলেন—“একটু স্থির হও, দাদারা; এ বাড়ীতে ফলার করতে এলে না আঁচানো পর্যন্ত বিশ্বাস নেই। শেষে মাঝ দরিয়ায় না জাহাজ ডুবিয়ে দেয়!”

জাহাজে চড়িবার আর দুই দিন বাকী। রাত্রে চোখে নিজা নাই। আহারে প্রবৃত্তি নাই। কল্পনার শত চিত্র চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিতেছে। বহুদিন বিশ্বত সুপরিচিত মুখগুলি আবার মনের মধ্যে ফুটিতেছে। যাহাদের সহিত ইহকালের সব বন্ধন কাটিয়া গিয়াছিল তাহারা আবার স্নেহের শতডোরে বাঁধিতে আরম্ভ করিয়াছে।

দুই দিন কাটিয়া গেল। দল বাঁধিয়া ছাব্বিশ জন জেল হইতে বাহির হইলাম। তখনও কাহারও কাহারও পায়ে বেড়ী বাজিতেছে। জেলের বাহির হইয়াই শিখেরা আকাশ পাতাল কাপাইয়া চীৎকার করিয়া উঠিল— “ওয়া গুরুজী কি ফতে।” তাহার পর গান আরম্ভ হইল!–

“ধন্য ধন্য পিতা দশমেস গুরু
যিনি চিড়িয়াঁসে বাজ তোড়ায়ে—”

( হে পিতঃ, হে দশম গুরু! চটক দিয়া তুমি বাজ শিকার করাইয়াছিলে; তুমি ধন্য! )

আজ আবার চটক দিয়া বাজ শিকার করিবার দিন আসিয়াছে তাই ঐ সঙ্গীতের তালে তালে আমাদের প্রাণও নাচিয়া উঠিল! মনে মনে বলিলাম—“হে ভারতের ভাবী গুরু, হে ভগবানের মূর্ত প্রকাশ, সমুদ্র পার হইতে তোমার দীন ভক্তের প্রণাম গ্রহণ কর।”

তাহার পর জাহাজে চড়িয়া একবার পোর্টব্লেয়ারের দিকে শেষ দেখা দেখিয়া লইলাম। Wordsworthএর কবিতা মনে পড়িল-“What man has made of man.”

জাহাজ তিন দিন ধরিয়া ছুটিয়াছে; মনটা তাহার আগে ছুটিয়াছে। ঐ সাগর দ্বীপে বাতি জ্বলিতেছে, ঐ রূপনারায়ণের মোহানা! আজই খিদিরপুরের ঘাটে জাহাজ গিয়া পৌঁছিবে!

নাঃ—জাহাজ ত কৈ ডুবিল না। এ যে সত্য সত্যই ঘাটে আসিয়া লাগিল। পুলিস প্রহরী আমাদের সঙ্গে লইয়া আলীপুরের জেলের দিকে চলিল।

আবার আলীপুরের জেল—কিন্তু সে চেহারা আর নাই। আমাদের শুভাগমন বার্তা সুপারিনটেনডেন্ট সাহেবের কাছে গেল। আমাদের কাছে যা কিছু জিনিস-পত্র ছিল প্রহরীরা আসিয়া তাহা বুঝিয়া লইল। বড় বিশেষ কিছু ছিলও না। পোর্টব্লেয়ার হইতে আসিবার সময় বইটই সমস্ত নূতন নূতন ছেলেদের মধ্যে বিলাইয়া দিয়া আসিযাছিলাম। স্থির করিয়া ছিলাম দেশে ফিরিয়া আর মা সরস্বতীর সহিত কোন সম্বন্ধ রাখা হইবে না। চুপ করিয়া শুধু দুটি ভাত খাইব আর পড়িয়া থাকিব।

ঘণ্টা খানেক জেলে থাকিবার পর সুপারিনটেনডেন্ট আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সেদিন শনিবার। আমরা ভাবিয়াছিলাম সেদিন ও তাহার পরদিন বুঝি আমাদের জেলেই থাকিতে হইবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সুপারিনটেনডেন্ট ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—“তোমরা বোধ হয় আজই বাহিরে যাইতে চাও? কলিকাতায় তোমাদে থাকিবার জায়গা আছে?” বাহিরে যাইবার নাম শুনিয়া আমর। লাফাইয়া উঠিলাম। মুখে বলিলাম—“জায়গা যথেষ্ট আছে,” আর মনে মনে বলিলাম— “জায়গা না পাই রাস্তায় শুয়ে থাকবো; একবার ছেড়ে ত দাও।”

সে রাত্রে হেমচন্দ্র, বারীন্দ্র ও আমি ছাড়া পাইলাম। কিন্তু যাই কোথায়? শ্রীযুক্ত সি, আর দাসের বাড়ী গিয়া দেখিলাম তিনি বাড়ীতে নাই; তখন সেখান হইতে ফিরিয়া হেমচন্দ্রের বন্ধু হাইকোর্টের উকিল শ্রীযুক্ত সাতকড়িপতি রায়ের বাড়ীতে গিয়া আতিথ্য গ্রহণ করিলাম। হেমচন্দ্র সে রাত্রে সেইখানেই রহিয়া গেল। আর আমি চন্দননগরের বাড়ী যাওয়াই স্থির করিলাম। ভাবিলাম রাত ১০ টার সময় হাওড়া ষ্টেশনে গিয়া ট্রেণ ধরিব।

কিন্তু বাড়ীর বাহির হইয়া দেখিলাম যে কলিকাতার রাস্তাঘাট সব ভুলিয়া গিয়াছি। ঘুরিতে ঘুরিতে যখন হাওড়া ষ্টেশনে আসিয়া হাজির হইলাম, তখন ট্রেণ ছাড়িয়া গিয়াছে। ভবানীপুরে ফিরিয়া যাইবার আর প্রবৃত্তি হইল না। শ্যামবাজারে শ্বশুরবাড়ী—ভাবিলাম সেইখানে গিয়া রাতটা কাটাইয়া দিব। শ্যামবাজারে যখন পৌঁছিলাম, তখন রাত বারোটা বাজিয়া গিয়াছে। বাড়ীর দরজা বন্ধ। দুই চারিবার কড়া নাড়িয়া যখন কোন সাড়া পাইলাম না, তখন ভাবিলাম “কুচ পরোয়া নেহি। আজ রাতটা কলিকাতার রাস্তায় না হয় ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইব।” প্রাণে একটা নূতন রকম আনন্দ দেখা দিল। আজ বারো বৎসর পরে খোলা রাস্তায় ছাড়া পাইয়াছি। সঙ্গে জেলার নাই, পেটি অফিসার নাই, একটা ওয়ার্ডার পর্যন্ত নাই! অতীতের বন্ধন কাটিয়া গিয়াছে, নূতন বন্ধন এখনও দেখা দেয় নাই। আজ সংসারে বাস্তবিকই আমি একা। কিন্তু এই একাকিত্ববোধের সঙ্গে কোন বিষাদের কালিমা জড়িত নাই, বরং একটা শান্ত আনন্দ উহার তালে তালে ফুটিয়া উঠিতেছে।

শ্যামবাজার হইতে সার্কুলার রোড ধরিয়া শিয়ালদহ ষ্টেশনের দিকে রওনা হইলাম। বারো বৎসর জুতা পরা অভ্যাস নাই, সুতরাং আজ নূতন জুতায় পা একেবারে ক্ষত বিক্ষত হইয়া গেল। জুতা খুলিয়া বগলে পুরিয়া চলিতে লাগিলাম। বগলে পুঁটলি দেখিয়া রাস্তায় এক পাহারাওয়ালা ধরিয়া বসিল-কোথা হইতে আসিতেছি, কোথায় যাইব ইত্যাদি ইত্যাদি। একবার মনে হইল সত্য কথা বলিয়াই দিই যে আমি কালাপানির ফেরত আসামী; তাহা হইলে আর কিছু না হোক, থানায় একটু মাথা গুঁজিবার জায়গা পাওয়া যাইবে। তাহার পর ভাবিলাম আর সত্যনিষ্ঠার বাড়াবাড়ি করিয়া কাজ নাই। একবার সত্য কথা বলিতে গিয়া ত বারো বৎসর কালাপানি ঘুরিয়া আসিলাম। শেষে বলিলাম-“আমি কালীঘাট হইতে আসিতেছি, শিয়ালদহ ষ্টেশনে যাইব।” কনষ্টেবল সাহেব আমার বগলের পুঁটুলি পরীক্ষা করিয়া অনেকক্ষণ আমার মুখের ‘দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—“তুই কি উড়ে?” বহু কষ্টে হাস্য সম্বরণ করিয়া বলিলাম—“হাঁ”। তখন তাঁহার নিকট হইতে যাইবার অনুমতি পাইয়া তাঁহাকে একটা দীর্ঘ সেলাম দিয়া আবার রওনা হইলাম। সেই রাত্রে রাত একটার সময় গাড়ী চড়িয়া যখন শ্যামনগরের ষ্টেশনে আসিয়া পৌঁছিলাম, তখন রাত দুইটা বাজিয়া গিয়াছে। নৌকায় গঙ্গাপার হইয়া যখন নিজেদের পাড়ার ঘাটে আসিয়া নামিলাম, তখন রাত প্রায় তিনটা; রাস্তা-ঘাট একেবারে জনশূন্য; টিম টিম করিয়া রাস্তার মোড়ে মোড়ে এক একটা কেরোসিনের বাতি জ্বলিতেছে। বাড়ীর সম্মুখে গিয়া দেখিলাম, বাড়ীর চেহারা সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছে। জানালায় ধাক্কা মারিয়া ভায়াদের নাম ধরিয়া ডাকিতে ডাকিতে একটা জানালা খুলিয়া গেল আর ভিতর হইতে হর্ষোদ্বেগ-চঞ্চল একটা সুপরিচিত বামা-কণ্ঠে প্রশ্ন হইল— “তুমি কে?” সঙ্গে সঙ্গে আর একটা জানালা খুলিয়া মা ঐ একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন। যাহার আশা সকলেই ছাড়িয়া দিয়াছে, সে যে আবার ফিরিয়া আসিয়াছে এ কথা বিশ্বাস করিতে যেন কাহারও সাহসে কুলাইতেছে না।

বাড়ীর ভিতর চারিদিকে ছুটাছুটি পড়িয়া গেল। এক পাল ছেলে আসিয়া চোখ মুছিতে মুছিতে আমার চারিদিকে ঘিরিয়া দাঁড়াইল। কারা এরা? ইহাদের কাহাকেও যে চিনি না। একটি ছোট ছেলে একটু দূরে দাঁড়াইয়া হাঁ করিয়া আমার মুখের দিকে চাহিয়া ছিল। আমার ভ্রাতুষ্পুত্র তাহার সহিত আমার পরিচয় করাইয়া দিয়া বলিল –”এই আপনার ছেলে।” যাহাকে দেড় বৎসরের রাখিয়া গিয়াছিলাম, সে আজ তেরো বৎসরের হইয়াছে!

আবার নূতন করিয়া সংসারের খেলা-ঘর পাতিয়া বসিলাম।

ওগো খেয়াপারের কর্ণধার! এবার কোন্ কুলে পাড়ি দিবে?

সমাপ্ত

অধ্যায় ১৪ / ১৪
সকল অধ্যায়
১.
নির্বাসিতের আত্মকথা – প্রথম পরিচ্ছেদ
২.
নির্বাসিতের আত্মকথা – দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
৩.
নির্বাসিতের আত্মকথা – তৃতীয় পরিচ্ছেদ
৪.
নির্বাসিতের আত্মকথা – চতুর্থ পরিচ্ছেদ
৫.
নির্বাসিতের আত্মকথা – পঞ্চম পরিচ্ছেদ
৬.
নির্বাসিতের আত্মকথা – ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
৭.
নির্বাসিতের আত্মকথা – সপ্তম পরিচ্ছেদ
৮.
নির্বাসিতের আত্মকথা – অষ্টম পরিচ্ছেদ
৯.
নির্বাসিতের আত্মকথা – নবম পরিচ্ছেদ
১০.
নির্বাসিতের আত্মকথা – দশম পরিচ্ছেদ
১১.
নির্বাসিতের আত্মকথা – একাদশ পরিচ্ছেদ
১২.
নির্বাসিতের আত্মকথা – দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
১৩.
নির্বাসিতের আত্মকথা – ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ
১৪.
নির্বাসিতের আত্মকথা – চতুদর্শ পরিচ্ছেদ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%