পল্লব সরকার

এয়ারপোর্ট থেকে যখন থিরুপুর প্যালেসে পৌঁছোলাম সূর্যদেব তখন মালাবার সমুদ্রের বুকে ঢলে পড়েছেন৷ আসার পথে নারকেল গাছের সারি ঘেরা এই দারু হর্ম্যটিকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন কেউ হলুদ সেলোফেন দিয়ে মুড়ে দিয়েছে৷
দেশ থেকে রাজন্য ব্যবস্থার অবলুপ্তির আগে পর্যন্ত থিরুপুর রাজ্যটির শাসনকার্য এই প্রাসাদটি থেকেই পরিচালিত হত৷ শেষ রাজা মার্কণ্ডেয়দেব এখনও বেঁচে আছেন৷ যাকে বলে স্টিল লাইভ অ্যান্ড কিকিং৷ তাঁর অনুরোধেই দিল্লি থেকে আমার এখানে ছুটে আসা৷
আমার এখানে আসার ঘোষিত উদ্দেশ্য রাজার একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া৷ জাতীয়স্তরের বিখ্যাত ইংরাজি পাক্ষিক ইন্ডিয়া ফোর্টনাইটলি-র আমি একজন সহকারী সম্পাদক৷ তদন্তমূলক সাংবাদিকতায় সম্প্রতি আমার কিছু নামযশ হয়েছে৷ রাজামশাই মনে হয় সেই সূত্রেই আমার নামটি জেনেছেন৷
প্রাসাদের পোর্টিকোয় আমাকে সহাস্য আননে স্বাগত জানাল রাজার সেক্রেটারি বিষ্ণু শ্রীনিবাসন৷ রোগাসোগা চটপটে মানুষ৷ বয়স আন্দাজ পঞ্চাশ৷ পরনে সাফারি স্যুট৷ সব মিলিয়ে একটা শার্প চেহারা৷ দিল্লির দপ্তরে ফোন করে বিষ্ণুই আমাকে রাজার নিমন্ত্রণের কথা জানায়৷ এ কথাও বলে যে রাজার নাকি আমার সঙ্গে বিশেষ দরকার এবং সেটি আমাকে সম্পূর্ণ গোপন রাখতে হবে৷
সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে সম্প্রতি থিরুপুরের জগদ্বিখ্যাত পদ্মনাভ বিষ্ণু মন্দিরের তলায় লুকোনো ভল্টগুলির ধনসম্পদের মূল্যায়ন শুরু হয়েছে৷ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভক্তদের দান সঞ্চিত হতে হতে ভল্টগুলো এক অবিশ্বাস্য অঙ্কে পৌঁছেছে৷ এতদিন তা লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিল৷ শুধুমাত্র একটা ভল্ট থেকে যে সম্পদ পাওয়া গেছে তাতেই পদ্মনাভ বিষ্ণু বিশ্বের সবচেয়ে ধনাঢ্য দেবতা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে গেছেন৷ বাদবাকি ভল্টগুলি এখনও খোলা বাকি৷
এই ডামাডোলের বাজারে রাজার নিমন্ত্রণ পেয়ে একটু অবাকই হয়েছিলাম৷ আমার সঙ্গে তাঁর কী এমন দরকার থাকতে পারে৷ তাও আবার গোপন! অবশ্য এও ভাবলাম যে ভালোই হল, মন্দিরের সম্পদ নিয়ে দেশজোড়া হুলস্থুলের মধ্যে রাজার একটা ইন্টারভিউ নিতে পারলে বেশ হয়৷ অফিশিয়ালি আমার থিরুপুরে আসার কারণটাও নয় ওটাই দেখানো যাবে৷ আমি মেল করে আগেভাগেই ইন্টারভিউয়ের প্রশ্নগুলো বিষ্ণুকে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম৷ আগামীকাল সকাল দশটায় রাজার সঙ্গে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট৷
পরদিন সকাল দশটা বাজার কিছুক্ষণ আগে বিষ্ণু এসে আমাকে প্রাসাদের লাইব্রেরির একটা কক্ষে নিয়ে গেল৷ রাজা এখানেই আমার সঙ্গে দেখা করবেন৷
দশটা বাজার মিনিট দুয়েকের মধ্যেই ঘরে প্রবেশ করলেন হিজ হাইনেস মার্কণ্ডেয়দেব পেরুমল৷ বেঁটেখাটো দোহারা চেহারা৷ গায়ের রং বেশ কালো৷ মাথার চুল সব সাদা৷ পরনে হাফ হাতা শার্ট আর দক্ষিণি স্টাইলে পরা সাদা ধুতি৷ গলায় এবং দু-হাতের আঙুলে মহার্ঘ অলঙ্কার৷ নেট-জ্ঞানী হিসাবে জানি রাজার বয়স বিরানব্বই চলছে৷
আমি সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে নমস্কার করলাম৷ তিনিও প্রতিনমস্কার জানিয়ে আমাকে বসতে বললেন৷ তারপর বললেন, আমি তোমার প্রশ্নগুলোর উত্তর টাইপ করিয়ে রেখেছি৷ বিষ্ণুর কাছ থেকে নিয়ে নিও৷ তোমাকে যে কারণে এখানে আসার জন্য আমন্ত্রণ করেছি এখন সে প্রসঙ্গে আসা যাক৷ ব্যাপারটা গোপন তো বটেই, তার চেয়ে বড়ো কথা হল সেটা এমনই একটা রহস্যময়তার আবরণে ঢাকা যে এই রাজবংশের কেউই বিগত পাঁচ শতাব্দীতে সে রহস্যের সমাধান করতে পারেনি৷
আমি বললাম, ও কে৷ কিন্তু আপনি আমার কী ধরনের হেল্প চান?
তার আগে বলি, তোমার মনে নিশ্চই প্রশ্ন জাগছে যে একটা রহস্যের ব্যাপারে আমি একজন সাংবাদিককে কেন হঠাৎ ইনভলভ করতে চাইছি?
ইয়েস৷ ইটস বিট অ্যাবসার্ড৷ জেনরলি এসব ব্যাপারে মানুষ সাংবাদিকদের অ্যাভয়েডই করে৷
একজ্যাকটলি৷ কিন্তু আমি তোমাকে যে কাজের দায়িত্ব দিতে চাই, অবশ্য তোমার সে ব্যাপারে যদি আপত্তি না থাকে, সেটা হল ওই রহস্যের সমাধান করা৷ আমি জানি, পুলিশ বা কোনো প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির কম্ম এটা নয়৷ সিম্পলি স্পিকিং, সরকারী তদন্ত আনপ্রফেশনাল আর প্রাইভেট এজেন্সিগুলো প্রিম্যাট্রিমোনিয়াল ইনফরমেশন জোগাড় করা ছাড়া আর কিছু পারে কিনা তা আমার জানা নেই৷
রহস্য, তা সে যাই হোক, সেটা যে আমি সলভ করতে পারব এ বিশ্বাস আপনার হল কী করে?
জানি না তুমি সলভ করতে পারবে কি না৷ বাট, আই নিড এ কমপিটেন্ট পারসন ইভন টু ডিসকাস সাচ হাইলি কনফিডেন্সিয়াল ম্যাটার৷ আই রেড ইওর রিপোর্টস ইন ইওর ম্যাগাজিন...স্প্লেনডিড৷ অ্যান্ড দ্যাটস দ্য রিজন ফর ইনভাইটিং ইউ ইন মাই প্যালেস৷
রাজার ব্যারিটোন বেশ জবরদস্ত৷ ওই আওয়াজে নিজের প্রশংসা শুনতে বেশ ভালোই লাগল৷ বললাম, থ্যাঙ্কস৷ লেটস কাম টু দ্য পয়েন্ট৷
রাজা বিষ্ণুর দিকে ঈঙ্গিত করতে বিষ্ণু একটা ফাইল থেকে একটা কাগজ বার করে রাজার হাতে দিল৷ কাগজটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে রাজা বললেন, আমাদের ফ্যামিলি ট্রি৷ খুঁটিয়ে দ্যাখো৷ যারা সিংহাসনে বসেছিলেন তাঁদের নামের পাশে অ্যাসটরিক্স দেওয়া আছে৷ আমাদের মাতৃতান্ত্রিক পরিবার৷ তাই মেয়েদের সিংহাসনে বসার ইতিহাসও আছে৷
কাগজে দীর্ঘ বংশতালিকা৷ রাজবংশের প্রতিষ্ঠা ইংরাজি ১৪৯৫ সালে৷ প্রথম রাজা কুহক শর্মা ষোল বছর রাজত্ব করেন৷ তারপর রাজা হন ধবলদেব৷
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কি ব্রাহ্মণ বংশ?
ইয়েস৷ আমরা জাতিতে ব্রাহ্মণ হলেও পেশায় ছিলাম যোদ্ধা৷ যাকে বলে ব্রহ্ম-ক্ষত্রিয়৷ সাউথ থেকে তোমাদের বেঙ্গলে যে সেন বংশ গিয়েছিল তারাও ছিল ব্রহ্ম-ক্ষত্রিয়৷
প্রথম রাজার নামটাও অফবিট৷ দক্ষিণি নাম কি এমন হয়? মানে আমার জানা নেই যে পাঁচশ বছর আগে কী হত৷
ওটা একটা ছদ্মনাম৷ আসলে যে মিস্ট্রির কথা তোমাকে বলতে যাচ্ছি তার শুরুই হচ্ছে ওখান থেকে৷ নামটা অফবিট বটে কিন্তু মালয়লমে সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার সেই সময়েও বেশ প্রচলিত ছিল৷ প্রথম রাজা কুহক শর্মা ছিলেন পূর্বতন রাজবংশের রাজবৈদ্য৷ একজন সাধারণ সৈনিক হিসাবে জীবন শুরু করলেও তিনি অধ্যাবসায়ের গুণে চিকিৎসাবিদ্যায় পণ্ডিত হয়ে ওঠেন এবং কালক্রমে রাজবংশের প্রধান বৈদ্য পদে উন্নিত হন৷ তবে শুধুমাত্র আয়ুর্বেদেই তাঁর জ্ঞান চর্চা সীমিত ছিল না৷ তিনি ছিলেন একাধারে উদ্ভিদবিদ্যা বিশারদ, ধাতুবিদ এবং ঐন্দ্রজালিক৷
ঐন্দ্রজালিক...ম্যাজিশিয়ান৷
ইয়েস, ম্যাজিশিয়ান! এই কারণেই হয়তো তিনি কুহক শর্মা ছদ্মনাম নিয়েছিলেন৷
ইন্টারেস্টিং!
আজকের দিনে কোনো স্পিশিসের সায়েন্টিফিক নেম লেখার জন্য যে বাইনোমিয়াল নোমেনক্লেচার সিস্টেম ব্যবহার করা হয় সেটা ইউরোপ কেরল থেকেই শিখেছিল৷ এই ব্যাপারে কুহক শর্মার যথেষ্ট অবদান আছে৷ বুঝতেই পারছ, কুহক শর্মা কী ক্যালিবারের লোক ছিলেন৷ মিথ আছে যে চিকিৎসাশাস্ত্রে তাঁর জ্ঞান প্রয়োগ করে তিনি আগের রাজবংশের শেষ রাজাকে মৃত্যুশয্যায় প্রায় অবিশ্বাস্যভাবে বহুদিন বাঁচিয়ে রেখেছিলেন এবং সেই সুযোগে রানিদের ব্ল্যাকমেল করে রাজ্যের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে বসেন৷ এইভাবে রাজ্যের উপর তাঁর কর্তৃত্ব যখন অবিসংবাদিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তিনি সমস্ত চিকিৎসাব্যবস্থা উইথড্র করে রাজার মৃত্যুঘটান এবং নিজে সিংহাসন অধিকার করেন৷ বুঝতেই পারছ, কুহক শর্মা ছিলেন অত্যন্ত ধূর্ত মানুষ৷ অবশ্য সে যুগে নিজের অস্তিত্ব জাহির করতে গেলে এছাড়া উপায়ও ছিল না৷ নৃশংসতাই ছিল পুরুষকারের প্রকাশ৷
পদ্মনাভ মন্দিরও কি কুহক শর্মা প্রতিষ্ঠা করেন?
কুহক শর্মার হাজার বছর আগের তামিল আলোয়ার কবিদের লেখাতে মন্দিরটির উল্লেখ আছে৷ শ্রীবিষ্ণুর ১০৮ টি দিব্য দেশমের মধ্যে পদ্মনাভ মন্দির একটি৷ কুহক শর্মা সিংহাসনে বসার পর মন্দিরটি নতুন করে গড়ে তোলেন৷ মন্দিরে বর্তমানে পূজিত অনন্তশয়নে বিষ্ণু মূর্তিটিও তাঁর আমলে নির্মাণ করিয়েছিলেন৷
কিন্তু রহস্যটা কী?
রহস্যটা তৈরি হয়েছে একটা মিথকে ঘিরে৷ মিথটা হল, কুহক শর্মা নাকি মৃত্যুর অর্ধসহস্রাব্দ পরে পুনর্জীবিত হবেন৷ ওনার মৃত্যু১৫১২ তে৷ হিসাব করলে এই বছরই পাঁচশ বছর পূর্ণ হচ্ছে৷ কাকতালীয়ভাবে মন্দিরের সম্পদ নিয়ে টানাপোড়েনও শুরু হয়েছে এই বছরই৷ অবশ্য ও নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই৷ আইন অনুযায়ী যা হওয়ার হবে৷ আমার প্রশ্ন হল এই মিথটার কি আদৌ কোনো বাস্তব ভিত্তি আছে? যদি থাকে তাহলে পুনর্জীবিত হওয়ার জন্য কুহক শর্মার দেহটির অস্তিত্ব থাকতে হয়৷ সেটি তাহলে কোথায়? আমাদের বংশে একটা গল্প প্রচলিত আছে যে মৃত্যুর পর কুহক শর্মার দেহ নাকি পদ্মনাভের বিগ্রহে লীন হয়ে যায়৷ অর্ধসহস্রাব্দ অতিক্রান্ত হলে তিনি নাকি ওই বিগ্রহ থেকেই পুনরাবির্ভুত হবেন৷ ধরে নিচ্ছি এটা নিছকই গল্প৷ কিন্তু মন্দিরের গর্ভগৃহের নীচে, বেসমেন্টে যে ভল্টগুলো রয়েছে, যেগুলো আবার কুহক শর্মার আমলেই নির্মিত, তাতে কোনো মৃতদেহ সংরক্ষিত থাকার তথ্য আমার জানা নেই৷
মোট ক-টা ভল্ট আছে?
আটটা৷
তার মধ্যে ক-টা এখনও পর্যন্ত খোলা হয়েছে?
একটা৷ গভর্নমেন্ট ভ্যালুয়াররা এখনও পর্যন্ত একটা মাত্র ভল্টই দেখে উঠতে পেরেছে৷
কিন্তু একটা মিথ নিয়ে এরকম ব্যতিব্যস্ত হওয়ার সত্যিই কি কোনো কারণ আছে?
হতাম না৷ এতদিন এসব নিয়ে মাথাও ঘামাইনি৷ কিন্তু গত এক সপ্তাহের ডেভলপমেন্ট এ নিয়ে আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছে৷
কী ডেভলপমেন্ট?
মন্দিরের প্রধান পুরোহিত অনন্ত আচার্য রামস্বামী আয়েঙ্গার গত এক সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ৷ আয়েঙ্গার পরিবার গত পাঁচশবছর ধরে মন্দিরের সেবক৷ কুহক শর্মাই এই পরিবারটির কোনো এক পূর্বপুরুষকে মন্দিরের সেবায়েত নিয়োগ করেন৷ এই পরিবারটিও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে কুহক শর্মা জীবিত অবস্থায় আবার ফিরে আসবেন৷ নিখোঁজ হওয়ার দিন দুয়েক আগে অনন্ত আচার্য একান্তে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন৷ সেদিন তাঁকে খুবই উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল৷ উদ্বেগের কারণ জিজ্ঞেস করায় বললেন, বিগ্রহের দিব্যস্নানমের ধারা নালা দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় তাতে চক্রাবর্তন সৃষ্টি হচ্ছে৷ তাঁর মতে এই ঘটনা নিশ্চই কোনো অভূতপূর্ব ঘটনার ইঙ্গিত৷ কারণ কুহক শর্মার মত্যুর পর এটিই পাঁচশতম বছর৷
বললাম, যদি একটু ডিটেলে বলেন...
প্রতিদিন বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত আয়ুর্বেদিক দ্রবণ দিয়ে পদ্মনাভ বিগ্রহকে স্নান করানো হয়৷ এর দুটো ধাপ৷ প্রথম হল আলিম্পন৷ বিগ্রহের সর্বাঙ্গে নানা উপাদানে তৈরি একটা মিশ্রণের প্রলেপ লাগানো হয়৷ মিশ্রণটিকে নবরত্ন মিশ্রণ বলে৷ তারপর দিব্যস্নানম৷ নানা ভেষজ মিশ্রিত জলীয় দ্রবণ দিয়ে বিগ্রহকে স্নান করানো হয়৷ এই দ্রবণ নালা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বেরিয়ে যায়৷ অনন্ত আচার্য প্রবাহমান এই ধারার মধ্যেই চক্রাবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন৷ চক্রাবর্তন মানে, ওই ইংরাজিতে যাকে বলে হোয়ার্লপুল!
ঘূর্ণি! আই সি৷ কিন্তু এর মধ্যে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে?
ইয়ংম্যান, এই দ্রবণ অত্যন্ত ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিত হয়৷ এই সামান্য তরল বয়ে যাওয়ার সময় কি তাতে চক্রাবর্তন তৈরি হতে পারে? অনন্ত আচার্যের কথা শুনে পরেরদিন দিব্যস্নানমের সময় আমিও উপস্থিত ছিলাম৷ সত্যিই, প্রবাহিত ধারা নালার একটি নির্দিষ্ট স্থানে চক্রাকারে আবর্তিত হচ্ছে! সেদিন অনন্ত আচার্য আমাকে জানালেন যে গত রাত্রে তিনি স্বপ্নে পদ্মনাভের দর্শন পেয়েছেন৷ তিনি দেখেছেন, ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র আবর্তিত হতে হতে দিব্যস্নানমের ধারায় চক্রাবর্তন সৃষ্টি করছে এবং সেই আবর্তন থেকে উঠে আসছেন স্বয়ং কুহক শর্মা!
আমি হেসে বললাম, স্বপ্ন তো স্বপ্নই৷ গভীর বিশ্বাস এবং ভক্তি থেকে মানুষ এরকম দেখতেই পারে৷
স্মিত হাসিতে রাজা বললেন, অনন্ত আচার্যের স্বপ্নদর্শন আর পাঁচটা লোকের মতো নয়৷ এতদিন পর্যন্ত তাঁর কোনো স্বপ্নদর্শনই ব্যর্থ হয়নি৷ তিনি যা দেখেন বাস্তবে সেটাই ঘটে৷ জ্ঞান ও ভক্তিমার্গের যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে তিনি উন্নিত হয়েছেন তা আমরা কল্পনাই করতে পারব না৷
বুঝলাম অনন্ত আচার্যের দৈবী ক্ষমতায় রাজার বিশ্বাস অটল৷ বললাম, আপনিও কি বিশ্বাস করেন যে কুহক শর্মা জীবিত অবস্থায় ফিরে আসবেন?
রাজার মুখে একটা দ্বিধার ভাব ফুটে উঠল৷ তিনি বললেন, দ্যাখ এতদিন পর্যন্ত এসব ব্যাপারকে প্রচলিত গল্প বলেই ভাবতাম৷ সত্যি বলতে কী এগুলো নিয়ে এত মাথা ঘামাবার প্রয়োজনও মনে করিনি৷ কিন্তু অনন্ত আচার্যের স্বপ্নদর্শন এবং স্নানধারায় চক্রাবর্তন মনে হয় কোনো অভাবনীয় ঘটনারই সংকেত৷
মনে মনে ভাবলাম, তর্কে গিয়ে লাভ নেই৷ বিশ্বাস ব্যাপারটা এমনই যে জন্মদাগের মতো তা মুছে ফেলা সম্ভব নয়৷ প্রসঙ্গ পালটে বললাম, আমাকে কী করতে বলছেন?
দুটো কাজ৷ প্রথম হল অনন্ত আচার্যকে খুঁজে বার করা এবং দ্বিতীয়, কুহক শর্মার সম্বন্ধে প্রচলিত মিথটার সত্যাসত্য অনুসন্ধান করা৷ তুমি কি রাজি?
একটু ভেবে বললাম, প্রথমটা তো চেষ্টা করাই যেতে পারে৷ তবে দ্বিতীয়টির সম্বন্ধে কতটা কী করতে পারব সেটা এখনই বলতে পারছি না৷
ও কে৷
কাজ শুরু করার আগে আমি কিছু ইনফরমেশন চাই৷
যেমন?
মন্দিরের কোনো লে-আউট আছে কি? মানে মন্দিরের স্ট্রাকচারের ডিটেইলটা আমার জানা দরকার৷
আমার কথা শুনে বিষ্ণু উঠে গিয়ে আলমারি থেকে একটা ফাইল নিয়ে এল৷ ফাইল থেকে বেরল জাম্বো সাইজের একটা ব্লু-প্রিন্ট৷ রাজামশাই ব্লু-প্রিন্টটা বিষ্ণুর হাত থেকে নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন৷
মন্দিরের গর্ভগৃহটি আয়তনে চল্লিশ ফুট বাই চল্লিশ ফুট৷ ঠিক মাঝখানে কুড়ি ফুট লম্বা, দশ ফুট চওড়া এবং দু-ফুট উঁচু বেদীর উপর বিগ্রহ স্থাপিত৷ বেসমেন্টে বেদীর ভিত্তিকে ঘিরে ভল্টগুলো রয়েছে৷ সেগুলো রোমান হরফে নাম্বারিং করা৷ মোট আটটা ভল্ট৷ এক নম্বর ভল্ট থেকে একটা সুড়ঙ্গ এই প্রাসাদ পর্যন্ত চলে এসেছে৷ সুড়ঙ্গটা আন্দাজ আড়াইশো ফুট হবে৷
রাজা বললেন, রাজপ্রাসাদ থেকে যাতে সরাসরি ভল্টে পৌঁছোনো যায় তাই এই ব্যবস্থা৷ এছাড়াও গর্ভগৃহের ফলস মেঝে সরিয়ে সরাসরি ছ-নাম্বার ভল্টে নামা যায়৷ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ওই পথটিই ব্যবহার করেন৷

পদ্মনাভ মন্দিরের বেসমেন্টের ম্যাপ
ব্লু-প্রিন্টে দেখা যাচ্ছে প্রতিটা ভল্ট থেকে তার পার্শ্ববর্তী দুটি ভল্টে যাওয়ার জন্য দরজা রয়েছে৷
তদন্তের স্বার্থে আমাকে একবার ভল্টগুলো দেখতে হবে৷ বললাম আমি৷
রাজা বললেন, ও কে৷ কবে দেখতে চাও?
আজই৷
তাহলে রাত ন-টার পর৷ আমি আর বিষ্ণুও থাকব৷ আমরা সুড়ঙ্গপথে রাজপ্রাসাদের দিক থেকে ঢুকব৷ সন্ধ্যারতির পর তখন গর্ভগৃহের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে৷
আপনি কি এই বয়সে এত ধকল নিতে পারবেন?
ইয়ংম্যান, এজ ইজ ওনলি আ নাম্বার!
নিজের শারীরিক ক্ষমতার উপর রাজার অটুট আস্থা দেখে আমিও আর কথা না বাড়িয়ে বললাম, ও কে, অ্যাজ ইউ উইস৷
দুপুরে দক্ষিণি খানার স্বাদ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলাম৷ রাজপ্রাসাদের গেস্ট হাউসের বিছানায় শুয়ে এই রাজবংশের ইতিহাসের উপর একটা বই পড়তে পড়তে বিকেল হয়ে গেল৷
ঠিক রাত আটটার সময় বিষ্ণু এল৷
সুড়ঙ্গপথে কি আলোর ব্যবস্থা আছে? জিজ্ঞেস করলাম আমি৷
না৷ এমনকী ভল্টগুলোতেও কোনো আলোর ব্যবস্থা নেই৷ সে কারণে আলো লাগানো হেলমেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে৷
বাঃ! দারুণ ব্যবস্থা৷ চলুন রওনা হওয়া যাক৷
হাতঘড়িতে দেখলাম ন-টা দশ৷ থিরুপুর প্যালেসে রাজা মার্কণ্ডেয়দেব পেরুমলের শয়নকক্ষের ঠিক বাইরে একটি দারু নির্মিত পদ্মনাভ মূর্তির সামনে আমরা দাঁড়িয়ে৷ এটি মূল বিগ্রহের রেপ্লিকা৷ আয়তনে এক ফুট লম্বা, ছ-ইঞ্চি চওড়া৷ একটা কাঠের বেদীর উপর রাখা৷ বিষ্ণু হাত দিয়ে মূর্তিটাকে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘোরাতেই বেদীর উপরের পাটাতন ফাঁক হয়ে গেল৷ দেখলাম ধাপ ধাপ সিঁড়ি নেমে গেছে অন্ধকার গহ্বরে৷
হেলমেটের আলো জ্বালিয়ে প্রথমে নামলাম আমি৷ পিছনে মার্কণ্ডেয়দেব৷ শেষে বিষ্ণু৷
সুড়ঙ্গের মধ্যে গড়পড়তা মানুষ খাড়া হয়ে দাঁড়াতে পারে৷ ছাদ, দেওয়াল, মেঝে সবই গ্র্যানাইটে মোড়া৷ তবে তাতেও স্যাঁতস্যাঁতে ভাবটা আটকায়নি৷ জলের দেশ তো৷ সব মিলিয়ে বেশ একটা গা ছমছমে ব্যাপার৷
সুড়ঙ্গ দিয়ে এগোতে এগোতে একজায়গায় দেখলাম একটা শাখাপথ বেরিয়ে গেছে৷ তবে সেটার মুখ পাথর দিয়ে বোজানো৷ ব্লু-প্রিন্টে এটার উল্লেখ দেখিনি৷ কারণ জিজ্ঞেস করায় বিষ্ণু জানাল যে ওটা সমুদ্র পর্যন্ত চলে গেছে৷ শত্রুর আক্রমণের সময় প্রাসাদের বাসিন্দাদের সুরক্ষার জন্য পথটি বানানো হয়েছিল৷ এখন এটার আর কোনো প্রয়োজন নেই বলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে৷
মূল সুড়ঙ্গটি এক নম্বর ভল্টে গিয়ে শেষ হয়েছে৷ হেলমেটের আলোয় দেখলাম ভল্টটি ফাঁকা৷ কেবল পাথুরে দেওয়ালে যক্ষ এবং যক্ষিণী মূর্তি খোদাই করে উৎকীর্ণ৷ ভল্টটিতে দুটি দরজা৷ প্ল্যান অনুযায়ী একটি দু-নম্বর এবং অপরটি আট-নম্বর ভল্টের পথ৷
আমি বললাম, দু-নম্বর থেকেই শুরু করা যাক৷
বিষ্ণুর হাতে চাবির গোছা৷ সে দু-নম্বর ভল্টের দরজা খুলল৷ আমরা ভিতরে ঢুকলাম৷ ভল্টের দেওয়ালে ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত পরপর তাক৷ কাঠ এবং ধাতুর তৈরি বড়ো বড়ো বাক্স তাকগুলোর উপর রাখা৷ রাজা এগিয়ে গিয়ে একটা বাক্সের সামনে দাঁড়ালেন৷ বিষ্ণু বাক্সের ডালা খুলে দিল৷ ডালা যে বেশ ভারী তা বিষ্ণুর কসরত দেখেই বোঝা গেল৷ হেলমেটের আলো বাক্সের মধ্যে পড়তেই ঝকমক করে উঠল পৃথিবীর সবচেয়ে আদরণীয় বস্তু— সোনা৷ রাশি রাশি শুধুই সোনা৷ অপার অগাধ সেই স্বর্ণসমুদ্রের যে কী মোহন রূপ তা যে দেখেনি সে কল্পনাও করতে পারবে না৷ নিজেকে যতদূর জানি, মোটামুটি নির্লোভই বলা চলে৷ কিন্তু এমন অনন্ত ঐশ্বর্যের যে একটা অদ্ভুত সম্মোহন আছে তা সে ক্ষণেই উপলব্ধি করলাম৷ একটু দুঃখও হল৷ এই অকল্পনীয় সম্পদ কত যুগ ধরে এমন স্থবির অবস্থায় পড়ে আছে! এই সম্পদ কি মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা যায় না?
বিষ্ণু বাক্সটা বন্ধ করে দিল৷ রাজা ঠোঁটের কোণে একটা অর্থপূর্ণ হাসি ঝুলিয়ে বললেন, ইয়ংম্যান, ইন্ডিয়া ইজ আ রিচ কান্ট্রি৷
দু-নম্বর ভল্ট থেকে গেলাম তিন নম্বরে৷ এখানেও শুধু থরে থরে বাক্স রাখা৷ রাজা বললেন, সমস্ত বাক্সের মধ্যেই সোনা, হীরে, পান্নার সঞ্চয়৷ অনুমান করো তো এই সম্পদের মূল্য দেশের জি ডি পি-র কত শতাংশ?
এই অনন্ত সম্পদ বদ্ধ হয়ে রয়েছে একটা মন্দিরের নীচে কয়েকশো স্কোয়ার ফিট জায়গার মধ্যে৷ এ পাপ ছাড়া আর কী? সত্যি বলছি, মনে এই কথাগুলোরই উদয় হল৷
তিন নম্বর থেকে এলাম চার নম্বর ভল্টে৷ সেখান থেকে পাঁচে৷ দুটি ভল্টই ওই একইরকম ধনসম্পদপূর্ণ বাক্সে ঠাসা৷
ছ-নম্বর ভল্টটা ফাঁকা৷ গর্ভগৃহের ফলস মেঝে সরিয়ে সরাসরি এই ভল্টটায় নামা যায়৷ তার জন্য পাথরের সিঁড়িও রয়েছে৷
সাত নম্বর ভল্টটিতেও সোনা-দানা ঠাসা বাক্স ভর্তি৷ সেটি পেরিয়ে আমরা আট নম্বর অর্থাৎ, শেষ ভল্টে ঢুকলাম৷ শূন্য৷ কিছুই নেই৷ অনন্ত আচার্যেরও কোনো চিহ্ন নেই কোথাও! নিজের মনকেই বললাম, তুমি কি ভেবেছিলে অনন্ত আচার্য ভল্টের মধ্যে লুকিয়ে আছেন? কী বোকা বোকা ভাবনা৷ তাঁর এখানে লুকিয়ে থাকার দরকারটাই বা কী?
আট নম্বর থেকে বেরলেই আমরা এক নম্বর ভল্টে পৌঁছে যাব৷ অর্থাৎ, আর দেখার কিছু নেই৷
হঠাৎ একটা অদ্ভুত অনুভূতি আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কে নাড়া দিল৷ মনে হল, কোথাও যেন সিমেট্রির একটা অভাব রয়েছে! পিছন ফিরলাম আমি৷ রাজা এবং বিষ্ণুও দাঁড়িয়ে পড়েছে৷
রাজা বললেন, হোয়াট হ্যাপেন্ড?
জাস্ট এ মিনিট৷ এই ভল্টটা একটু অন্যরকম মনে হচ্ছে না?
অন্য রকম! রাজা মার্কণ্ডেয়দেবের দেহভঙ্গিমায় বিস্ময়৷
এই ভল্টটায় কোনো তাক বা বাক্স নেই কেন?
সে তো এক আর ছ-নম্বরেও নেই৷ বললেন রাজা৷
কিন্তু লক্ষ্য করুন ওই দুটো ভল্ট দিয়েই বেসমেন্টে ঢুকতে হয়৷ অর্থাৎ, প্রবেশ পথ৷
সো হোয়াট?
সেই কারণেই ওই দুটো ভল্টে কোনো ধনসম্পদ রাখার ব্যবস্থা নেই৷ মোস্ট প্রোব্যাবলি সিকিওরিটি রিজনে এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷ বাট, আট নম্বর ভল্ট দিয়ে কোনো প্রবেশ পথ নেই৷ তাহলে এই ভল্টটা ফাঁকা রাখার কারণ কী?
রাজা একটু ভেবে বললেন, সেটা একটা প্রশ্ন বটে৷ কিন্তু উত্তর আমাদের কারোরই জানা নেই৷
আমি ঘরটাকে ভালোভাবে আরেকবার দেখব বলে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি৷ হঠাৎ একদিকের দেওয়ালের একটা ছোট্ট অংশে হেলমেটের আলো প্রতিফলিত হল৷ এক নম্বর ভল্টের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে সেটা ঘরের ডানদিকের দেওয়াল৷ আমি এগিয়ে গিয়ে দেওয়ালটা ছুঁতেই একটা ধাতব অনুভূতি হল৷
দ্যাট ইজ নট রক৷ বললেন রাজা৷ একমাত্র ওই দেওয়ালটাই পাথরের তৈরি নয়, ধাতুর৷ তবে কারণ বলতে পারব না৷
আমি দেওয়ালটাকে ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে লাগলাম৷ কুড়ি ফুট লম্বা এবং প্রায় সাত ফুট উঁচু ধাতুর দেওয়াল৷ তবে ধাতুটা যে কী তা আমার বোধগম্য হল না৷ বহুযুগের মলিনিমা জমে ধাতু তার স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য হারিয়েছে৷ দেওয়ালের একটা জায়গায় কোনো কারণে ঘষা লেগে মলিনিমা উঠে যাওয়ায় চকচকে ভাব ফিরে এসেছে৷ আমার হেলমেটের আলো দেওয়ালের ওই অংশে পড়েই প্রতিফলিত হয়েছিল৷ কিন্তু দেওয়ালে কীসের ঘষা লাগল?
হঠাৎই হেলমেটের আলোয় দেখলাম আমার আঙুলে কালো গুঁড়ো গুঁড়ো কী যেন সব লেগে রয়েছে৷ নাকের কাছে আনতেই কেরোসিনের গন্ধ পেলাম৷ এ তো ভুষো কালি! কেরোসিনের বাতি থেকে যেমন ওঠে৷ কিন্তু এই দেওয়ালে তা এল কী করে? হেলমেটের আলোটা ঠিকভাবে ফেলতেই নজরে এল মেঝে থেকে ফুট তিনেক উঁচুতে দেওয়ালের গায়ে এক জায়গায় ভুষো কালি জমে রয়েছে৷ তার মধ্যে আমার চার আঙুলের দাগ৷
ততক্ষণে রাজা এবং বিষ্ণু দু-জনেই আমার দিকে এগিয়ে এসেছেন৷ তাঁদেরও ভুষো কালির স্পটটা চোখে পড়েছে৷
রাজা অবাক স্বরে বললেন, এসব কী বিষ্ণু?
বিষ্ণু জানাল যে সে এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে৷ জীবনে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার সে ভল্টে নামল৷
আমি বললাম, আচ্ছা বিষ্ণু, এখানে কেউ এলে লাইট সোর্স হিসাবে কী নিয়ে আসে?
অফ কোর্স টর্চ বা অন্য কিছু৷ যেমন আমরা এনেছি৷
যদি সেই ব্যক্তির কাছে সেটা কোনো কারণে অ্যাভেলবল না হয় তা হলে?
তা হলে...
কোনো নেকেড ফ্লেম যেমন, মোমবাতি, মশাল বা ওই জাতীয় কিছু৷ তাই তো?
মে বি৷
আমার সেটাই চাই৷ কুইক!
রাজা বললেন, কিন্তু আমাদের কাছে তো আলো আছে৷ তাহলে ও দিয়ে কী হবে?
আমি উত্তরে বললাম, একটা ঘটনা রিকনস্ট্রাক্ট করতে চাইছি৷ দেওয়ালে কার্বনের এই আস্তরণ খুব একটা পুরোনো তো নয়ই এমনকী এ থেকে এখনও কেরোসিনের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে৷ তার মানে খুব রিসেন্টলি কেউ এই ভল্টে ঢুকেছিল৷ এবং তার হাতে ছিল কেরোসিনের মশাল৷ সে ব্যক্তি কে হতে পারে? আপনাদের সে সম্বন্ধে কোনো ধারণা আছে?
রাজা এবং বিষ্ণুর মুখের ভাব দেখে মনে হল কারোরই এ বিষয়ে কোনো ধারণা নেই৷ আমি বললাম, অনেক সময় ঘটনাটা রিকনস্ট্রাক্ট করলে ঘটনাপরম্পরায় নতুন দিক উন্মোচিত হতে পারে৷ যেটা প্যাসিভ অবজারভেশনে কখনোই সম্ভব নয়৷
বিষ্ণু বলল, ও কে৷ আমি জোগাড় করে আনছি৷ বাট ইট উইল টেক সাম টাইম৷
বিষ্ণু বেরিয়ে গেল৷ আমি এবং রাজামশাই অপেক্ষা করতে লাগলাম৷ দু-জনের মধ্যে টুকটাক নানা কথা হচ্ছিল৷ সময় যেন আর কাটতেই চায় না৷
প্রায় পঁচিশমিনিট পর বিষ্ণু ফিরে এল৷ হাতে একটা লাঠির ডগায় পেঁচানো কাপড় কেরোসিনে ভেজানো৷
বিষ্ণু বলল, জ্বালাই?
রাজা বললেন, ইট উইল বি সাফোকেটিং৷
আমি বললাম, একটু হতে পারে৷ যত তাড়াতাড়ি হয় আমাদের কাজ সারতে হবে৷
বিষ্ণু দেশলাই জ্বালিয়ে আগুন দিতেই দাউদাউ করে হলুদ শিখায় মশাল জ্বলে উঠল৷ আমি দু-জনকে হেলমেটের আলোগুলো নিভিয়ে দিতে বললাম৷ আমার আলোটাও নিভিয়ে দিলাম৷ মশালের কম্পমান আলোয় উদ্ভাসিত পাষাণকক্ষটিকে মনে হচ্ছে যেন কোনো ঐতিহাসিক নাটকের দৃশ্যপট৷ আমরা তার কুশীলব৷ ইতিহাস কি কোনো পুনরাবৃত্তি করবে? আদৌ আছে কি পুনরাবৃত্তির মতোকোনো ঘটনা?
বিষ্ণুকে বললাম, মশালটা ধাতুর দেওয়ালের গায়ে এমনভাবে রাখ যেন ওটার শিখা ওই কার্বন স্পটের উপর পড়ে৷
বিষ্ণু মশালটা ঠিক আমার কথা মতো রাখল৷ তখন আমি দু-জনকে উদ্দেশ্য করে বললাম, এবার আমাদের কাজ হবে এই ভল্টের দেওয়াল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা৷ কোথাও কোনো লেখা বা ছবি বা মানচিত্র ফুটে উঠছে কিনা সেটা লক্ষ্য করতে হবে৷
আমি গেলাম মশালের দিকে অর্থাৎ, ধাতব দেওয়ালের দিকে৷ রাজা ও বিষ্ণু অন্য দেওয়ালগুলো দেখতে লাগলেন৷
প্রায় দশমিনিট খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেও অর্থপূর্ণ কিছু পাওয়া গেল না৷ ধাতব দেওয়ালের মাঝখান দিয়ে কেবলমাত্র একটা জোড়ের দাগ ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত নেমে গেছে৷ দেওয়ালের গায়ে আর যেসব আঁকিবুঁকি তা কালের পদচিহ্ন ছাড়া আর কিছু নয় বলেই অনুমান৷
ভল্টের বাতাস ইতিমধ্যে মশালের ধোঁয়ায় ভারী৷ মশালও নেভার পথে৷ এবার বেরতে হবে৷
ঝনাং! হঠাৎ একটা ভারী ধাতব শব্দ!
আমরা তিনজনেই রীতিমতো চমকে উঠেছি৷
বিস্ফারিত চোখে দেখলাম ধাতব দেওয়াল মাঝখান দিয়ে দু-ভাগ হয়ে গেছে! সেই ফাঁক দিয়ে একজন মানুষ গলে যেতে পারে৷
আমার মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে গেল, অ্যামেজিং!
রাজা এবং বিষ্ণুর চোখে বিস্ময় এবং শুধুমাত্র বিস্ময়!
সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত এবং অভূতপূর্ব এই ঘটনায় অবাক না হয়ে পারা যায় না৷ আমি মনে মনে বলে উঠলাম, ধন্য তুমি কুহক শর্মা৷ ধন্য তোমার বিজ্ঞান সাধনা৷ ধন্য তোমার প্রতিভা!
রাজা এবং বিষ্ণু দু-জনেই হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন৷ ওঁদের মনের অন্ধকার দূর করতে বললাম, কুহক শর্মা যে একজন অতি উচ্চ মানের ধাতুবিদ ছিলেন এই দেওয়ালই তার প্রমাণ৷
রাজা বললেন, প্লিজ ইলাবোরেট৷
ধাতুর তৈরি এই দেওয়ালটা আসলে একটা দরজা এবং দরজার পাল্লাগুলি হল থার্মোস্ট্যাট৷ মানে, দুটি ভিন্ন ধাতুর পাত জুড়ে পাল্লাগুলো বানানো হয়েছে৷ এক্ষেত্রে বাইরের দিকের ধাতুটি তাপে ভিতরের দিকের ধাতুর তুলনায় কম বাড়ে৷ ফলে তাপ দিলে বাইরের দিকে বেঁকে যায় এবং দরজা খুলে যায়৷ ধাতু ঠাণ্ডা হয়ে গেলে আবার আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে৷ তাই ভিতরে ঢুকতে হলে দরজার ফাঁক যাতে বন্ধ না হয়ে যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে৷
আমি আর বিষ্ণু মিলে সাত নম্বর ভল্ট থেকে একটা বাক্স এনে দরজার দুই পাল্লার মাঝখানে রাখলাম৷
এই ভল্টটার অস্তিত্ব এতদিন জানাই ছিল না! এমনকী ব্লু-প্রিন্টেও বিগ্রহের বেদীর ঠিক নীচের এই অংশটাকে ভরাটই দেখানো হয়েছে৷
অতঃপর হেলমেটের আলো জ্বালিয়ে তিনজনে ঢুকে পড়লাম নবআবিষ্কৃত ‘ন’-নম্বর ভল্টে৷ আমাদের পায়ের শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল সমস্ত কক্ষ জুড়ে৷
ভল্টে ঢুকতেই পচা একটা দুর্গন্ধ নাকে এসে লাগল৷ না জানি কত শত বছরের বদ্ধ বায়ু৷ হেলমেটের আলোয় দেখলাম ভল্টটি কুড়ি বাই দশ ফুটের একটা আয়তক্ষেত্র৷
ও কী! চিৎকার করে উঠল বিষ্ণু৷
বিষ্ণুর তর্জনী-নির্দেশ লক্ষ্য করে দেখলাম ভল্টের বাঁ-দিকের কোণায় একজন মানুষ পড়ে আছে! দ্রুত পায়ে পৌঁছে গেলাম মানুষটার কাছে৷ জীবন্ত মানুষ নয়! মৃতদেহ! গলে পচে ফুলে উঠেছে৷ এতক্ষণ এই গন্ধটাই পাওয়া যাচ্ছিল৷
তিনটি হেলমেটের জোড়ালো আলো পড়তেই রাজা আতঙ্কের স্বরে বলে উঠলেন, এ কী! এ তো মনে হচ্ছে অনন্ত আচার্য! উনি এখানে এলেন কী করে?
মৃতদেহটি বদ্ধ জায়গায় আছে বলে ম্যাগট জন্মায়নি৷ কিন্তু পচন ধরে গেছে৷ মৃতদেহের পাশে পড়ে আছে একটা নিভে যাওয়া মশাল৷
এই দুর্গন্ধের মধ্যে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না৷ দ্রুত চোখ বুলিয়ে দেখলাম ভল্টের একটি দেওয়ালে পেরেক-জাতীয় কিছু থেকে কয়েকটা আংটা ঝুলছে৷ আর আংটাগুলো থেকে ঝুলছে চৌকো চৌকো পাত৷ অনেকটা চাবির গোছার মত৷
আমি দেওয়াল থেকে একটা আংটা নামালাম৷ বেশ ভারী৷ প্রতিটা আংটায় গোটাদশেক পাত৷ পাতগুলোর একটা কোণ ফুটো করে তার মধ্যে দিয়ে আংটা গলানো৷ সম্ভবত পাতগুলো তামার৷ জায়গায় জায়গায় কালচে সবুজ ছোপ ধরে গেছে৷
এগুলো কী কোনো আইডিয়া আছে? জিজ্ঞেস করলাম আমি৷
রাজা বললেন, যতদূর অনুমান এগুলো তাম্রশাসন৷ রাজেন্দ্র চোলের আমলের এরকমই কিছু কপার প্লেট ইনসক্রিপশন চেন্নাইয়ের মিউজিয়ামে রাখা আছে৷
কিন্তু তাম্রশাসন হলে এগুলো এরকম গোপন জায়গায় এত সতর্কতার সঙ্গে রাখা হবে কেন? দেখুন তো পড়তে পারেন কি না৷ একখানা পাত আমি রাজার সামনে তুলে ধরলাম৷
রাজা এবং বিষ্ণু দু-জনেই ঝুঁকে পড়ে পাতটা দেখতে লাগলেন৷
নাঃ৷ অনেকটা আধুনিক মালায়লমের মতো হলেও পড়া যাচ্ছে না৷ মুখ তুললেন রাজা৷
স্বাভাবিক৷ এটা কোনো প্রাচীন লিপি৷ এখন সম্ভবত এর আর প্রচলন নেই৷ কিন্তু শুধুমাত্র কিছু তামার ফলক রাখার জন্য এমন চরম গোপনীয়তা স্বাভাবিক নয়৷ অর্থাৎ, এগুলো আরও বেশি কিছু৷ কিন্তু কী?
আমি দু-জনের উদ্দেশে বললাম, এই ভল্টটা একবার ভালো করে চেক করে নেওয়া যাক৷ তবে এই দুর্গন্ধের মধ্যে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না৷ কুইক৷
আমরা তিনজন তিনদিকে ছড়িয়ে গেলাম৷
কিন্তু ভল্টে আর কিছুই নেই৷ পাষাণ ঘেরা শুধুই শূন্যতা৷
হঠাৎ রাজার ডাক শুনলাম, প্লিজ কাম হেয়ার৷
বিষ্ণুও রাজার ডাক শুনেছিল৷ আমরা রাজার দিকে এগিয়ে যেতেই রাজা প্রশ্ন করলেন, বিষ্ণু তুমি কি কোনো পরিচিত সুগন্ধ পাচ্ছ?
বিষ্ণু সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল৷
আমিও ততক্ষণে গন্ধটা পেয়েছিলাম৷ বললাম এটা কীসের গন্ধ?
বিষ্ণু উত্তর দিল, মন্দিরের বিগ্রহের দিব্যস্নানমের জন্য যে আয়ুর্বেদিক দ্রবণ ব্যবহার করা হয় এটা তার গন্ধ৷
কিন্তু সেই দ্রবণ এখানে এল কী করে?
তা বলতে পারছি না৷ তবে দিব্যস্নানমের ধারা যে নালাটি দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মন্দির থেকে বেরিয়ে যায় সেটা ঠিক আমাদের মাথার উপর দিয়েই হবে৷
মেঝের দিকে তাকাতেই হেলমেটের আলোয় দেখলাম মেঝের বেশ কিছুটা অংশ ভিজে৷ আমি নীচু হয়ে বসে ডান হাতের তর্জনী মেঝের ভিজে অংশে ঠেকিয়ে নাকের কাছে আনলাম৷ তীব্র একটা সুগন্ধ৷ আমি স্বগোতোক্তি করে উঠলাম, এক্সিলেন্ট!
দ্যাট আরোমা? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন রাজা মার্কণ্ডেয়দেব৷
সে তো বটেই৷ তবে আমি অনন্ত আচার্যের বাস্তব বোধেরও তারিফ করছি৷ ব্যাপারটা আমি ব্যাখ্যা করছি৷ কোনো প্রবাহমান তরলে ঘূর্ণি কখন তৈরি হয়? যদি দুটো কাউন্টার কারেন্ট, মানে বিপরীতমুখী স্রোত থাকে অথবা যদি তরলটি প্রবাহতলে কোনো ছিদ্র থাকার কারণে সেখান দিয়ে বেরিয়ে যেতে থাকে৷ দিব্যস্নানমের ধারা নালা দিয়ে বয়ে যাওয়ার সময় ঘূর্ণি তৈরি হচ্ছিল৷ এ থেকে অনন্ত আচার্য অনুমান করেন যে পাষাণ বেদীর দুটি পাথরের মধ্যে ফাঁক তৈরি হয়েছে এবং সেখান দিয়ে প্রবাহিত তরল বেরিয়ে যাওয়ার কারণে ঘূর্ণি তৈরি হচ্ছে৷ অর্থাৎ, পাষাণ বেদীর তলাটা ফাঁকা৷ প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী ভরাট নয়৷ তিনি নিজের অনুমানের সত্যতা যাচাই করার জন্য ভল্টে নেমেছিলেন৷ হাতে ছিল কেরোসিনের মশাল৷ কিন্তু অনেক খুঁজেও তিনি এমন কোনো সূত্র পাননি যা থেকে প্রমাণিত হয় যে বেদীর নীচের অংশটি ফাঁকা একটি কক্ষ৷ সম্ভবত আট নম্বর ভল্টে খোঁজাখুঁজির সময় তিনি তাঁর হাতের মশালটি ধাতব দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে রেখেছিলেন৷ এবং আজ আগুনের উত্তাপে যেমন দেওয়াল দু-ফাঁক হয়ে গেল সেদিনও ঠিক তেমনই ঘটেছিল৷ দেওয়াল ফাঁক হয়ে যাওয়ার বিস্ময়ে বিমূঢ় অনন্ত আচার্য সেটাকে কোনো দৈবী নির্দেশই ভাবেন এবং নিঃশঙ্ক মনে এই কক্ষে প্রবেশ করেন৷ আর এখানেই তিনি একটা ভুল করে বসেন৷ ঠাণ্ডা হয়ে গেলে দেওয়াল যে আবার আপনা-আপনিই জুড়ে যাবে তা তিনি ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেননি৷ উত্তাপই যে দরজা খোলার চাবিকাঠি সেটা জানা না থাকায় কক্ষের মধ্যে আটকা পড়েও তিনি দরজা খোলার জন্য হাতের মশাল ব্যবহার করেননি৷ হয়তো মশালও তখন নিভু নিভু৷ অসহায় অবস্থায় কক্ষের মধ্যেই তিলে তিলে তাঁর মৃত্যুহয়৷
কোয়াইট লজিক্যাল৷ বললেন রাজা৷
বিষ্ণু রাজাকে উদ্দেশ্য করে বলল, স্যর, অনন্ত আচার্যের বডি এখান থেকে বার করার কী হবে?
তার জন্য যা ব্যবস্থা করার হয় কর৷ কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই যেন গোপন থাকে৷
আমি বললাম, কপার প্লেটগুলোও তো উপরে নিয়ে যেতে হবে৷
রাজা বললেন, সার্টেনলি৷ আমি আগামীকাল ডেকান স্কুল অব ল্যাঙ্গোয়েজ স্টাডিতে ফোন করে প্রফেসর ম্যাথুকে প্যালেসে আসার জন্য অনুরোধ করব৷ উনিই মনে হয় এই কপার প্লেটগুলোর পাঠোদ্ধারের জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি৷
পরের দিনের কর্মসূচি হল সকাল ছ-টায় মন্দিরের বিগ্রহের দিব্যস্নানম প্রত্যক্ষ করা এবং মন্দিরের গর্ভগৃহে সরজমিন তদন্ত করা৷ দেখা যাক সেখানে নতুন কোনো ক্লু পাওয়া যায় কিনা৷
ঠিক পৌনে ছ-টায় বিষ্ণু আমাকে নিতে এল৷ পরনে দক্ষিণি ধুতি৷ বিষ্ণু বলল, মন্দিরে ঢুকতে হলে ধুতি পরা বাধ্যতামূলক৷ তাই তোমার জন্য একটা ধুতি নিয়ে এসেছি৷
আর মহিলাদের? জানতে চাইলাম আমি৷
শাড়ি পরতে হয়৷
বাঃ! চল যাওয়া যাক৷
মন্দিরের সিঁড়িতে জুতোজোড়া গচ্ছিত রেখে আমি আর বিষ্ণু মন্দিরে প্রবেশ করলাম৷ মন্দিরের গোপুরমটি একশো ফুট উঁচু৷ তাতে অসংখ্য দেবদেবীর মূর্তি৷ মন্দিরে ইতিমধ্যেই অনেক ভক্ত সমাগম হয়েছে৷ ভক্তদের ভিড় থেকে কিছু বাংলা কথাও কানে এল৷ বাঙালি ট্যুরিস্ট এই সাতসকালেই মন্দিরে হাজির৷
আমার সঙ্গে বিষ্ণুকে দেখে মন্দিরের সেবায়েতরা সসম্ভ্রমে আমাদের গর্ভগৃহের ভিতরে নিয়ে গেল৷ দুটি চৌকো থামের পিছনে বেদীর উপর পদ্মনাভের বিগ্রহ৷ যোগনিদ্রায় শায়িত৷ নাভি থেকে নির্গত পদ্মের উপর লক্ষ্মীদেবীর মূর্তি৷ সহস্রফণা সাপ শ্রীঅনন্ত পদ্মনাভের মাথার উপর আচ্ছাদন সৃষ্টি করেছে৷ অলস অভিজাত ভঙ্গিমা৷ পৃথিবীর ধনীতম দেবতারই মনে হয় এমন ভঙ্গিমা মানায়৷
বিগ্রহের দু-পাশে রাখা দেড় মানুষ সমান উঁচু প্রদীপদানে অসংখ্য প্রদীপ কম্পমান শিখায় জ্বলছে৷ ঠিক ছ-টায় শুরু হল দিব্যস্নানম৷ ঢাক এবং বেহালার মতো একরকম বাজনার সমবেত বাদনের সঙ্গে সুরেলা অথচ গম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণ৷ প্রথমে আলিম্পন৷ জনাদশেক পুরোহিত পদ্মনাভের অঙ্গে একধরনের মিশ্রণের প্রলেপ দিতে লাগলেন৷ মিশ্রণটির শুচিশুদ্ধ সুবাসে গর্ভগৃহের বাতাবরণ পবিত্র হয়ে উঠল৷
আমি বিষ্ণুকে জিজ্ঞেস করলাম, এই মিশ্রণটায় কী আছে?
বিষ্ণু পাশে দাঁড়ানো একজন সেবায়েতকে ডেকে আমার প্রশ্নটা করল৷
সেবায়েত মালায়ালমে যা উত্তর দিল তার ইংরেজি অনুবাদ শুনে বুঝলাম যে সে এ ব্যাপারে বিশেষ কিছু জানে না৷ মিশ্রণটির প্রস্তুতপ্রণালী সম্পূর্ণ গোপন৷ মন্দিরের মূল পুরোহিত বংশই কেবলমাত্র উত্তরাধিকার সূত্রে সেটি জানতে পারে৷ তবে ওই মিশ্রণের কয়েকটি ভেষজ উপাদানের নাম সে জানে৷ যেমন হরিতমঞ্জরী, কল্যাণ সুগন্ধীকাম, বনমালিনী, অকরভ, চম্পক, চন্দন, বনহরিদ্রা ইত্যাদি৷
জিজ্ঞেস করলাম, অনন্ত আচার্যের অবর্তমানে তাহলে কে এই মিশ্রণ তৈরি করছে?
বিষ্ণু উত্তর দিল, অনন্ত আচার্যের দুই ছেলেও এই মন্দিরের পুরোহিত৷ ওনারাই করছেন৷ আজকে অফিসিয়ালি অনন্ত আচার্যের মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা হওয়ার পর ওনার বড়োছেলেই হবেন মন্দিরের প্রধান পুরোহিত৷
আলিম্পন শেষ হতে প্রায় আধঘণ্টা লাগল৷ এরপর দিব্যস্নানম৷ নানা সুগন্ধি এবং আয়ুর্বেদিক উপাদানযুক্ত জল দিয়ে পদ্মনাভের বিগ্রহকে স্নান করানো হতে থাকল৷
ইতিমধ্যে আমি এবং বিষ্ণু বিগ্রহের পায়ের দিকে সরে এসেছি৷ জল বেরনোর নালাটা এই দিকেই৷ জায়গাটা একটু অন্ধকারাচ্ছন্ন৷ দিব্যস্নানমের জল নালা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে৷ ভালো করে লক্ষ্য করতেই দেখতে পেলাম যে সেই প্রবাহধারার এক জায়গায় ঘূর্ণি তৈরি হচ্ছে৷ বেদীর নীচের ভল্টে এর ঠিক তলার অংশেই মেঝের উপর কাল এই তরল পড়ে থাকতে দেখেছিলাম৷ নালার ওই জায়গাটা লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় যে ওখান দিয়ে তরল বেরিয়ে যাচ্ছে৷ গর্ভগৃহের তলাটা নিরেট, এই ধারণা বদ্ধমূল হওয়ায় বেদীর মেঝে ফুটো হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা কারোরই মাথায় আসেনি৷ কিন্তু অনন্ত আচার্য বুদ্ধিমান মানুষ হওয়ায় হয়তো প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে ভাবতে পেরেছিলেন৷
কথা প্রসঙ্গে বিষ্ণু বলল, বিগ্রহের আলিম্পন এবং দিব্যস্নানম, দুটো কাজই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ সদাচার এবং নিয়মনিষ্ঠার সঙ্গে এগুলি পালিত না হলে পদ্মনাভ রুষ্ট হবেন এবং বিগ্রহ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে, এরকম একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে৷ শোনা যায় পর্তুগিজ আক্রমণ থেকে বাঁচতে রাজা ইন্দ্রায়ুধ পেরুমলের আমলে রাজপ্রাসাদ এবং মন্দিরের সমস্ত বাসিন্দা নিরাপদ আশ্রয়ে আত্মগোপন করে৷ তিনদিন পরে আক্রমণের সম্ভাবনা দূর হলে মানুষজন ফিরে এসে দ্যাখে যে মূর্তির গায়ে ফাটল ধরেছে৷ ইতিহাসে কেবলমাত্র ওই তিনদিনই বিগ্রহের সেবা বন্ধ ছিল৷
পরে কি আবার সেই ফাটল সারানো হয়?
অবভিয়াসলি৷ নবরত্ন মিশ্রণের প্রলেপ লাগিয়ে সেই ফাটলগুলো বন্ধ করা হয়৷
পুরো ব্যাপারটাই একটু অদ্ভূত৷
কোন ব্যাপারটা?
এই যে নবরত্ন মিশ্রণের প্রলেপ লাগানোর ব্যাপারটা৷ এরকম মূর্তি কি ভূ-ভারতে আর একটাও আছে যেটা এরকমভাবে ট্রিটেড হয়?
খুব সম্ভবত না৷ এ সবই কুহক শর্মার কুশলী মস্তিষ্কের উদ্ভাবন৷
কিন্তু পুরো ব্যাপারটার তো একটা মানে থাকবে৷ সলিড পাথরের মূর্তি তৈরি না করে টুকরো টুকরো পাথর দিয়ে মূর্তি তৈরি করা এবং সেটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রত্যেকদিন আলিম্পন এবং দিব্যস্নানমের এই যে বাধ্যতামূলক এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়া, এর প্রয়োজনটা কী ছিল?
বিষ্ণু মুচকি হেসে বলল, নো ওয়ান নোজ৷ ইউ স্যুড থ্রো সাম লাইট অন দ্য ম্যাটার!
জাস্ট এ মিনিট, তুমি একটু আগে কী বললে? এসবই কুহক শর্মার উদ্ভাবন?
হ্যাঁ৷ তাঁর তৈরি নিয়মকানুন মেনেই তো আলিম্পন এবং দিব্যস্নানম সম্পন্ন হয়৷
কোথায় তাঁর সেই নিয়মকানুন? কুহক শর্মার লেখা কোনো টেক্সট কি পাওয়া গেছে?
বিষ্ণু একটা অপ্রস্তুতের হাসি হেসে বলল, স্যরি৷ আমি এবং স্যর দু-জনেই এই ব্যাপারটা তোমার কাছে মেনশন করতে ভুলে গেছি৷ আসলে আলিম্পন এবং দিব্যস্নানমের প্রক্রিয়াটি কুহক শর্মারই সৃষ্টি৷ এর জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান থেকে শুরু করে সমস্ত পদ্ধতি প্রকরণ তিনি লিপিবদ্ধ করে গেছেন৷ তাঁর রচিত সেই পুঁথি নাকি প্রধান পুরোহিতের হেফাজতে মন্দিরে সংরক্ষিত আছে৷
আমি বললাম, ব্যাপারটা আমারই অনুমান করা উচিত ছিল৷ বিগ্রহটি যখন কুহক শর্মার আমলে প্রতিষ্ঠিত তখন দিব্যস্নানমের ব্যাপারটাও কুহক শর্মার প্রচলন হওয়াটাই স্বাভাবিক৷ আচ্ছা, সেই পুঁথি কি একবার দেখা যেতে পারে?
হ্যাঁ৷ যেতে পারে৷ তবে আমি কেন, স্যর পর্যন্ত মনে হয় সে পুঁথি কোনোদিন চোখে দেখেননি৷ আসলে সেটা দেখার কোনো প্রয়োজনই কোনোদিন পরেনি৷ সেই কারণেই বোধ হয় ব্যাপারটা আমাদের মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল৷
তা হলে সেটা দেখার বন্দোবস্ত করুন৷
অবশ্যই৷ তবে স্যরকে বিষয়টি আগে জানাতে হবে৷
দুপুর দুটো৷ লাইব্রেরিতে পৌঁছে দেখলাম রাজা এবং একজন সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ বসে কথাবার্তা বলছেন৷ আমি ঢুকতেই রাজা বলে উঠলেন, মিট প্রফেসর জিনু ম্যাথু৷ হি ইজ অ্যান অথরিটি ইন অ্যানসিয়ন্ট ডেকান ল্যাঙ্গোয়েজেস৷
আমি প্রফেসর ম্যাথুর সঙ্গে করমর্দন করলাম৷ রাজা আমার একটা বেশ লম্বা চওড়া ইন্ট্রোডাকশন তাঁর সামনে পেশ করলেন৷
প্রফেসর ম্যাথু আমাকে উদ্দেশ করে বললেন, তা হলে কাজ শুরু করা যাক?
আমরা দু-জন লাইব্রেরির মূল কক্ষের পাশে একটা ছোটো ঘরে গেলাম৷ ঘরটিতে একটি টেবিলের উপর সার সার তামার প্লেটগুলো সাজিয়ে রাখা হয়েছে৷ সব মিলিয়ে গোটা পঞ্চাশেক প্লেট৷ মুখের অভিব্যক্তি থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে নতুন আবিষ্কৃত প্লেটগুলো দেখে প্রফেসর বেশ চমৎকৃত৷ তিনি প্লেটগুলো হাতে নিয়ে দেখতে লাগলেন৷
প্রায় দশ মিনিট পর্যবেক্ষণের পর তিনি মুখ খুললেন, অসাধারণ আবিষ্কার! কুহক শর্মার রহস্য মনে হয় কোনোদিনই শেষ হওয়ার নয়!
কী আছে এই প্লেটগুলোতে? জিজ্ঞেস করলাম আমি৷
প্লেটে ব্যবহৃত লিপির নাম হল কোলেঝুথু৷ কুহক শর্মার আমল থেকেও পাঁচশ বছর আগে দশম শতাব্দী নাগাদ এই অঞ্চলে এর প্রচলন ছিল৷ এই লিপির উদ্ভব ঘটে তামিল-ব্রহ্মী স্ক্রিপ্ট থেকে৷ তবে এই প্লেটগুলো কুহক শর্মার আমলেরই৷ এই যে দেখুন প্রতিটা প্লেটে কুহক শর্মার নাম এবং রাজবংশের প্রতীক গরুরের ছবি খোদাই করা আছে৷
প্লেটগুলোর বিষয়বস্তু কী?
প্রফেসর বললেন, আমি অনুবাদ করে যাচ্ছি৷ আপনি নোট নিন৷
লিপির অনুবাদ থেকে যে তথ্য পাওয়া গেল তার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ এই রকম আমি কুহক শর্মা থিরুপুর বন্দর থেকে মুসলমান ব্যবসায়ীদের জাহাজে আরব দেশ গমন করি৷ আমার এই যাত্রার লক্ষ্য ছিল জ্ঞানার্জন৷ এডেন হয়ে লোহিত সাগর অতিক্রম করে আমি সৈয়দ বন্দরে উপস্থিত হই৷ সেই স্থান থেকে ভ্রাম্যমান একটি মেষপালকের দলের সঙ্গে আমি আমার উদ্দিষ্ট লক্ষ্য আলেকজান্দ্রিয়া অভিমুখে রওনা হই৷ হিস্পানিয়ার টলেডো প্রদেশের বিখ্যাত ধাতুবিদ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল জারকলি সেই সময় আলেকজান্দ্রিয়ায় শিক্ষকতা করতেন৷ আমি তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করি৷ তিন বছরের শিক্ষান্তে আমি ধাতুবিদ্যায় বিশেষ বুৎপত্তি লাভ করি৷ ধাতব পাতের উপর তাপ প্রয়োগে আয়তন বিকার নিয়ে আমার গবেষণা আল জারকলির বিশেষ প্রশংসা লাভ করে৷
আমার জ্ঞানতৃষ্ণায় প্রীত হয়ে জারকলি এরপর আমাকে কায়রো শহরে বসবাসকারী জগদ্বিখ্যাত চিকিৎসাশাস্ত্রী ইবন-অল-নাফিসের কাছে প্রেরণ করেন৷ এই ব্যক্তিটির সঙ্গে পরিচয় আমার জীবনে দিশানির্দেশক হয়ে ওঠে৷ ভারতীয় আয়ুর্বেদে আমার বুৎপত্তি দেখে তিনি আমাকে মিশর দেশের গুপ্ত ভেষজবিদ্যায় পারদর্শী করে তোলেন৷ এই গুপ্ত ভেষজবিদ্যার প্রয়োগে মানব শরীরকে জীবিত অবস্থায় বহু বৎসর টিকিয়ে রাখা যায়৷ রাসায়নিকের প্রয়োগে শরীরে তৃতীয় ভূতের পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট মাত্রার নীচে নামিয়ে সরীসৃপের মত মানুষকে স্থবির অথচ জীবিত রাখার এই বিশেষ বিদ্যা সে দেশে কয়েক সহস্র বৎসর ধরে চর্চিত হয়ে আসছে৷ মিশর দেশে নদী তীরে বহু প্রস্তর নির্মিত ত্রিভুজাকৃতি সমাধি মন্দির রয়েছে যার মধ্যে রাজা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দেহ এই প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত আছে৷
শিক্ষা সমাপনান্তে আমি দেশে প্রত্যাগমন করি এবং পুনরায় রাজবংশের প্রধান বৈদ্য পদে অধিষ্ঠিত হই৷ পরবর্তী পাঁচবৎসরকাল আমি মিশরীয় এই গুপ্তবিদ্যার দেশজ সংস্করণ আবিষ্কারে মনোনিবেশ করি৷ দেশে প্রত্যাবর্তনকালে আমি মিশর দেশ থেকে কিছু রাসায়নিক সঙ্গে এনেছিলাম যেগুলি এখানে উপলব্ধ নয়৷ ওই রাসায়নিকসমূহের উপযুক্ত বিকল্প ব্যতিরেকে দীর্ঘদিন এই দেশে ওই গুপ্তবিদ্যার চর্চা যে সম্ভব নয় তা উপলব্ধি করে আমি বিকল্প আবিষ্কারের গবেষণায় মনোনিবেশ করি৷ আমার প্রস্তুত নবরসায়নের মিশ্রণ পক্ষী এবং মার্জারের শরীরে অতি সংগোপনে প্রয়োগ করে আমি প্রাথমিক সাফল্য লাভ করি৷ ইতিমধ্যে রাজা অসুস্থ হন এবং প্রধান রাজবৈদ্য রূপে তাঁর চিকিৎসার ভার আমার উপরেই ন্যস্ত হয়৷ আমি এই সুবর্ণ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে রাজার শরীরের উপর আমার আবিষ্কৃত রসায়নসমূহ প্রয়োগ করি৷ পদ্মনাভের কৃপায় মানব দেহের উপর আমার পরীক্ষাও সাফল্য লাভ করে৷
এই তাম্রফলকে আমি আমার আবিষ্কার পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে লিপিবদ্ধ করলাম৷
সংক্ষিপ্ত এই ভূমিকার পর তাম্রফলকগুলিতে নানা ভেষজ এবং রাসায়নিকের প্রস্তুতি পদ্ধতি এবং তার প্রয়োগ কৌশল বর্ণনা করা হয়েছে৷ প্রফেসর ম্যাথু সেগুলোর অনুবাদ করে চললেন৷ নোট নিতে নিতে বেশ কয়েকটা নাম কানে এল যেগুলো সকালে মন্দিরের সেবায়েতের মুখে শুনেছিলাম৷ যেমন, হরিতমঞ্জরী, অকরভ, চম্পক, চন্দন ইত্যাদি৷ তবে বেশিরভাগ উপাদানের ক্ষেত্রেই স্থানীয় নাম ব্যবহার করা হয়েছে৷ অন্তত উচ্চারণ শুনে আমার সেরকমই মনে হল৷ স্বাভাবিক কারণেই সেগুলো যে কী তা বোধগম্য হল না৷
সবগুলো তাম্রফলক অনুবাদ করতে প্রায় তিনঘণ্টা সময় লাগল৷ এর মধ্যে দু-বার গরম কফি আর স্ন্যাক্স এসেছে৷
কাজ সেরে আমি এবং প্রফেসর ম্যাথু লাইব্রেরি কক্ষে ফিরে এলাম৷
রাজা দেখলাম একজন ব্যক্তির সঙ্গে বসে কথা বলছেন৷ কপালে চন্দনের ঘনঘটা এবং পোশাক-আশাক দেখে ব্যক্তিটিকে পুরোহিত বলেই মনে হল৷ সেখানে বিষ্ণুও উপস্থিত৷
আমরা ঢুকতেই রাজা বললেন, কি আপনাদের কাজ শেষ হল? তারপর নতুন ব্যক্তিটির দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, পরিচয় করুন, ইনি রঘুনন্দন আচার্য৷ অনন্ত আচার্যের জ্যেষ্ঠ পুত্র৷ ইনিই এখন মন্দিরের প্রধান পুরোহিত৷
রঘুনন্দন আচার্য করজোড়ে আমাদের নমস্কার করলেন৷ আমরাও তাঁকেপ্রতিনমস্কার জানালাম৷ রঘুনন্দন আচার্যকে দেখলেই বোঝা যায় যে তিনি অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ৷ চন্দনচর্চিত চওড়া কপাল৷ আয়ত প্রাণবন্ত দুটি চোখ৷ দাড়ি গোঁফ কামানো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন গম্ভীর মুখমণ্ডল৷
এনার তো গুরুদশা৷ মনে মনে ভাবলাম আমি৷ এঁরাও কি ধরাকাছা নেন নাকি? কে জানে৷ ইনি তো নেননি৷
রাজা আমার উদ্দেশে বললেন, বিষ্ণু আমাকে বলল যে তুমি নাকি কুহক শর্মার পুঁথি দেখতে চেয়েছ৷ সত্যি বলতে কি, কুহক শর্মার পুঁথির ব্যাপারটা আমারই তোমাকে বলা উচিত ছিল৷ কিন্তু চিরকাল চোখের আড়ালে থাকায় ওটার কথা আমার মনেই পড়েনি৷ তুমি ওটা দেখতে চেয়েছ শুনে আমি রঘুনন্দন আচার্যকে পুঁথি সমেত এখানে আসার জন্য অনুরোধ করি৷ উনি সেটি নিয়ে এসেছেন৷
ইতিমধ্যে রঘুনন্দন আচার্য টেবিলের উপর রাখা একটি কারুকার্য করা রোজ উডের বাক্স খুলে একটি পুঁথি আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এই সেই পুঁথি৷ কুহক শর্মার সহস্তে লিখিত৷
শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল৷ আমার দুই হাতের তালুর উপর জীবন্ত ইতিহাস৷ পুঁথির উপরে ও নীচে কাঠের পাটা দিয়ে রেশমী সুতো বাঁধা৷ আমি পুঁথিটি খুললাম৷
রঘুনন্দন আচার্য দক্ষিণি উচ্চারণের ইংরাজিতে বললেন, পুঁথিটি মন্দিরে অত্যন্ত যত্নসহকারে সংরক্ষিত থাকে৷ আলিম্পন এবং দিব্যস্নানম প্রক্রিয়াটি আমরা বংশপরম্পরায় শিখি৷ তাই এটি আর দেখার প্রয়োজন পরে না৷ সম্ভবত বহুযুগ পরে এটি সূর্যের আলো দেখল৷
আপনি কি পুঁথিটি পড়েছেন? জিজ্ঞেস করলাম আমি৷
না৷ আমার পড়ার দরকার পরে না৷ ওটি আমার কণ্ঠস্থ৷ শৈশব থেকে আমাদের বংশের পুরুষেরা ওটি শুনে শুনে শিখে যায়৷ তবে কখনোই এই বিদ্যা বাইরে প্রকাশিত হয় না৷
আপনি কি আমাদের পুঁথিটির বিষয়বস্তু বর্ণনা করতে পারেন?
দেখুন, এই বিদ্যা জনসমক্ষে প্রকাশ না করার জন্য আমরা পদ্মনাভের কাছে সংকল্পবদ্ধ৷ তবে আপনার কাজের সুবিধা যদি হয় তাহলে আমি বিস্তৃত বিবরণ বাদ দিয়ে সংক্ষেপে এটি বর্ণনা করতে পারি৷
ঠিক আছে৷ তাই করুন৷
যদিও স্মৃতি থেকে আমি বলতে পারি তবুও আপনাদের সুবিধার্থে আমি পুঁথিটি থেকেই পাঠ করছি৷ পুঁথির ভাষা সংস্কৃত৷ কিন্তু লিপি মালায়ালম৷ তাহলে শুনুন৷
অনন্ত আচার্য পাঠ এবং ব্যাখ্যা শুরু করলেন৷ আলিম্পন এবং দিব্যস্নানমের দীর্ঘ বর্ণনা৷
পুঁথিটি পড়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে৷ আলিম্পন এবং দিব্যস্নানমের বর্ণনা ইতিমধ্যে শেষ৷ আর হয়তো গোটা দশেক পৃষ্ঠা বাকি৷ রঘুনন্দন আচার্য থমকে গেলেন৷ তাঁর ভ্রূর সংকোচন দেখে মনে হল যেন তিনি সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত কোনো কিছুর মুখোমুখি হয়েছেন৷
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী হল?
রঘুনন্দন আচার্য বললেন, এই পাতাগুলো তো পড়া যাচ্ছে না! এটা কী ভাষা!
মানে?
শেষ পাতাগুলো অন্য লিপিতে লেখা৷ এটা তো আমার জানা ছিল না!
ঘরে উপস্থিত সকলে উৎসুক হয়ে পুঁথির উপর ঝুঁকে পড়েছে৷ প্রফেসর ম্যাথু খোলা পুঁথির দিকে একঝলক তাকিয়েই বললেন, কোলেঝুথু৷ এই পাতাগুলো কোলেঝুথু লিপিতে লেখা!
আমি ছাড়া ব্যাপারটা সবারই অজানা৷ প্রফেসর ম্যাথু বললেন, তামার প্লেটগুলো যে লিপিতে লেখা এই পাতাগুলোও সেই লিপিতে লেখা৷
রঘুনন্দন আচার্যও এতক্ষণে গর্ভগৃহের তলায় নবআবিষ্কৃত ভল্ট থেকে তামার প্লেট উদ্ধারের কথা জেনে গেছেন৷ তিনি অবাক হয়ে বললেন, তাই নাকি?
রঘুনন্দন আচার্য প্রফেসর ম্যাথুর হাতে পুঁথিটি তুলে দিলেন৷
পুঁথির শেষ পৃষ্ঠাগুলি কুহক শর্মার উত্তম পুরুষে রচিত৷ কুহক শর্মা লিখছেন, ষোল বৎসর রাজত্ব শেষে শ্রাবণী পূর্ণিমার দিন আমি পদ্মনাভের শরীরে বিলিন হয়ে যাব৷ এরপর ঠিক অর্ধসহস্রতম বৎসরে শ্রাবণী পূর্ণিমার দিন বিগ্রহের আলিম্পন এবং দিব্যস্নানম বন্ধ থাকবে৷ ধীরে ধীরে বিগ্রহ বিদীর্ণ হবে এবং বিগ্রহের শরীরে তাঁর আগমন লক্ষণ প্রকট হয়ে উঠবে৷ বিগ্রহ থেকে তাঁর দেহ উদ্ভুত হলে নিম্নবর্ণিত রসায়নগুলি নির্দেশানুযায়ী তাঁর দেহের উপর প্রয়োগ করতে হবে৷
এই নির্দেশের শেষে রয়েছে রসায়ন ও ভেষজের একটি তালিকা এবং প্রয়োগ প্রণালী৷
রঘুনন্দন আচার্য বললেন, কিন্তু শ্রাবণী পূর্ণিমা তো ছয়মাস আগেই অতিক্রান্ত!
ঘরে উপস্থিত সকলে কিংকর্তব্যে বিমূঢ়৷ কী বলবে কেউই ভেবে পাচ্ছে না মনে হয়৷
আমি রঘুনন্দন আচার্যের উদ্দেশে বললাম, যে উপাদানগুলোর কথা কুহক শর্মা এখানে উল্লেখ করেছেন সেগুলো কি আপনার পরিচিত?
হ্যাঁ৷ আমি কৈশোর থেকে আয়ুর্বেদ চর্চা করছি৷ এগুলি মূলত মানব শরীরে ধনাত্মক শক্তির বৃদ্ধি ঘটিয়ে পুনযৌবন প্রদান করে৷
এক্সিলেন্ট! দেখুন তো এই ভেষজ এবং রাসায়নিকগুলি আপনার পরিচিত কি না? তামার ফলক থেকে নোট নেওয়া রাইটিং প্যাডটা আমি রঘুনন্দন আচার্যের দিকে এগিয়ে দিলাম৷
দু-এক মিনিট প্যাডটার উপর চোখ বুলিয়েই রঘুনন্দন আচার্য উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, এই লেখা আপনি কোথায় পেলেন? এখানে তো আলিম্পন এবং দিব্যস্নানমের সমস্ত কিছুই বর্ণনা করা আছে৷
আপনার জানা উপাদানগুলির সঙ্গে এখানের বর্ণনা মিলে যাচ্ছে?
হ্যাঁ৷ কিন্তু এখানে উপাদানগুলির মালায়ালম নাম ব্যবহৃত হয়েছে৷ আর আমরা ব্যবহার করি সংস্কৃত নাম৷ পুঁথিতে সেরকমই তো আছে৷
আমি উত্তেজনায় সোফা থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠেছি, সেকেন্ড মিস্ট্রি সলভড!
রাজা, বিষ্ণু, প্রফেসর এবং রঘুনন্দন আচার্য সবাই আমার এই আকস্মিক উত্তেজনায় জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন৷
রাজা বললেন, সলভড?
হ্যাঁ৷ সমাধান হয়ে গেছে৷ তবে সেটা কী আমি এখনই বলছি না৷ শুধু আমার কথামতো কয়েকটা কাজ করতে হবে৷
রাজা বললেন, কী কাজ?
প্রথম কাজ, আগামীকাল বিগ্রহের আলিম্পন এবং দিব্যস্নানম বন্ধ রাখতে হবে৷ দ্বিতীয়, রঘুনন্দন আচার্যকে পুঁথিতে লিখিত কুহক শর্মার ওই নির্দেশ অনুযায়ী রাসায়নিকগুলি জোগাড় করতে হবে৷ এবং তৃতীয়, আগামীকাল মন্দির সাধারণের জন্য বন্ধ রাখতে হবে৷
রাজা একটু অবাক হয়ে বললেন, আলিম্পন এবং দিব্যস্নানম বন্ধ রাখতে হবে? তাতে কী লাভ হবে?
আমি বললাম, দেখুন, এটা আমার কথা নয়৷ কুহক শর্মা নিজেই এমন নির্দেশ দিয়ে গেছেন৷ আর লাভ কী হবে সেটা এখনই বলছি না৷ কারণ, বিষয়টি আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করলেও প্রমাণ ছাড়া কিছু বলতে যাওয়াটা অসমীচীন হবে৷
রঘুনন্দন আচার্য বললেন, কিন্তু বিগ্রহের সঙ্গে বহু ভক্তের আবেগ জড়িয়ে৷ তাই হঠাৎ আলিম্পন এবং দিব্যস্নানম বন্ধ রাখতে হলে মানুষকে একটা কারণ তো জানাতে হবে৷
বিষ্ণু এতক্ষণ চুপচাপ আমাদের কথা শুনছিল৷ সে রঘুনন্দন আচার্যের উদ্দেশে বলল, আচার্যদেব, আপনার পিতার আকস্মিক মৃত্যুকেই তো কারণ হিসাবে লোকের সামনে তুলে ধরা যেতে পারে৷
বিষ্ণু আমার প্রস্তাবকে প্রচ্ছন্নভাবে সমর্থন করায় রাজাও দেখলাম আর আপত্তি করলেন না৷ তিনি রঘুনন্দন আচার্যের উদ্দেশে প্রস্তাব পেশ করলেন, তাহলে জার্নালিস্ট মশাইয়ের কথামতো কাল আলিম্পন এবং দিব্যস্নানম বন্ধ থাকুক?
রঘুনন্দন আচার্য সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন৷
রাজা বললেন, আজই তাহলে মন্দিরের ওয়েবসাইটে নোটিশ দিয়ে আগামীকাল মন্দির বন্ধ থাকার কথাটা জানিয়ে দাও বিষ্ণু৷
আমি বললাম, কাল ঠিক সকাল ছ-টায় আমরা মন্দিরের গর্ভগৃহে মিট করব৷ আশাকরি সেখানেই পাঁচশ বছরের মিথের সমাপ্তি ঘটবে৷
পরদিন সকাল ছ-টায় আমরা মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করলাম৷ প্রফেসর ম্যাথু বললেন, কাল সারারাত উত্তেজনায় নাকি তাঁর ভালোভাবে ঘুমই হয়নি৷
আজ মন্দিরের রক্ষীরা বহুদূর থেকেই পূণ্যার্থীদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন৷ মন্দির চত্বর শুনশান৷ গর্ভগৃহে আমরা পাঁচজন৷
আমি সকলকে উদ্দেশ্য করে বললাম, আমাদের একটু ধৈর্য ধরতে হবে৷ রহস্য সমাধান হতে কতক্ষণ লাগতে পারে তা এখনই বলতে পারছি না৷
আমরা বিগ্রহের সামনে মেঝের উপর বসলাম৷ শুরু হল আমাদের প্রতীক্ষা৷
অতি ধীরে কাটছে সময়৷ আমরা নিজেদের মধ্যে নানা কথা বলাবলি করছি৷
ঘড়ির কাঁটা তিনপাক খেয়ে ন-টার ঘরে পৌঁছোল৷ এখনো পর্যন্ত কিছুই ঘটেনি৷ শুধুমাত্র বিগ্রহের শরীরের ভিজে ভাবটা যেন কিছুটা কম৷ প্রতিদিন আলিম্পন এবং দিব্যস্নানমের ফলে ভিজে ভাবটা তৈরি হয়৷ আজ সেসব কিছুই হয়নি৷
আরও দু-ঘণ্টা অতিক্রান্ত হল৷ সময় যেন আর কাটতেই চাইছে না৷
আরও একঘণ্টা৷ কমতে কমতে ভিজে ভাবটা আর নেই বললেই চলে৷ কিন্তু কুহক শর্মার ধরায় অবতরণের কোনো চিহ্নই বিগ্রহের শরীরে নেই৷
সবাই অপেক্ষা করতে করতে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে৷ আমি বললাম, আপনারা লাঞ্চ করে আসুন৷ আমারটা প্যাক করে পাঠিয়ে দিলেই হবে৷
রঘুনন্দন আচার্য বললেন, আমিও যাচ্ছি না৷ আমারটাও একটু পাঠিয়ে দিলে ভালো হয়৷
রাজা বিষ্ণু এবং প্রফেসর ম্যাথু লাঞ্চ করতে বেরিয়ে গেলেন৷
ওঁদের লাঞ্চ সেরে ফিরতে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগল৷ বিষ্ণু আমাদের জন্য ফ্রুট জুশ, কর্ন-চিজস্যাণ্ডউইচ আর ফল নিয়ে এসেছে৷
দেখতে দেখতে চারটে বাজল৷ এখনো কিছুই ঘটল না৷ আমার নিজেরও বেশ অধৈর্য লাগছে৷
সাড়ে-চারটে নাগাদ রাজা বললেন, আমরা কি ব্যাপারটা এখানেই শেষ করতে পারি?
অপেক্ষা এত দীর্ঘায়িত হচ্ছে যে আর কিছু ঘটবে বলে কেউই আশা করছেন না৷
তাহলে কি আমার অনুমান ভুল?
আমি বিগ্রহটিকে আরেকবার ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করব বলে বেদীর দিকে এগিয়ে গেলাম৷ ঝুঁকে পড়ে খুঁটিয়ে দেখতেই চোখে পড়ল বিগ্রহের গায়ে সূক্ষ্ম অথচ দীর্ঘ ফাটল৷ শায়িত মূর্তিটিকে মাটির সমান্তরালে দ্বিখণ্ডিত করে যে তল, ফাটল ঠিক সেই তল বরাবর৷ ফাটলটি সমস্ত মূর্তি জুড়েই তৈরি হয়েছে৷
আমি আনন্দে লাফিয়ে উঠে বললাম, আমার অনুমান ঠিক!
সবাইকে বিগ্রহের সামনে ডেকে বললাম, লক্ষ্য করে দেখুন, বিগ্রহের সমস্ত শরীর জুড়ে ফাটল তৈরি হয়েছে৷ এটা আর কিছুই নয়, একটা জোড়!
সবাই ঝুঁকে পড়ে ফাটলটা দেখতে লাগলেন৷ বিষ্ণু এবং রঘুনন্দন আচার্যের উদ্দেশে বললাম, আমার সঙ্গে একটু হাত লাগান৷
আমি বিগ্রহের মাথার দিকে, রঘুনন্দন আচার্য মাঝখানে এবং বিষ্ণু পায়ের দিকে ধরল৷ বললাম, বিগ্রহের উপরের অংশটা ধরে টেনে তুলুন৷
তিনজন টানতেই বিগ্রহের উপরের অংশ জুতোর বাক্সের ঢাকনার মতো উঠে এল৷ নীচের অংশে মূর্তির খোলের মধ্যে শায়িত একটি মানুষের দেহ!
এটা কার দেহ? সবার মুখেই উত্তেজিত প্রশ্ন৷
আমি বললাম, কুহক শর্মা!
অ্যাঁ!
সে কী!
অ্যাবসার্ড!
ওঃ গড!
উপস্থিত সকলের মুখ দেখে মনে হল যে এমন বিস্মিত তাঁরা জীবনে কখনও হননি৷
আমি রঘুনন্দন আচার্যের উদ্দেশে বললাম, পুঁথিতে যেমন ভাবে বলা আছে আপনি ঠিক সেরকমভাবে রাসায়নিকগুলি কুহক শর্মার দেহের উপর প্রয়োগ করুন৷
তিনি আমার কথামতো আগে থেকেই রাসায়নিকগুলি প্রস্তুত করে রেখেছিলেন৷ সেগুলো তিনি কুহক শর্মার দেহের উপর প্রয়োগ করতে লাগলেন৷ কুহক শর্মার নিজের ভাষ্য অনুযায়ী রাসায়নিকগুলির প্রয়োগের আধঘন্টার মধ্যেই দেহে প্রাণের লক্ষণ ফুটে ওঠার কথা৷
আবার অপেক্ষার পালা৷
আধঘন্টা!
একঘন্টা!
দু-ঘন্টা!
কিন্তু কোথায় কী! দেহে প্রাণসঞ্চারের কোনো লক্ষণই নেই৷
ঘটনার আকস্মিকতায় মার্কণ্ডেয়দেব মনে হয় স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন৷ এতক্ষণে কিছুটা ধাতস্থ হয়ে আমার উদ্দেশে বললেন, তুমি এই ব্যাপারটা অনুমান করেছিলে কী করে?
উপস্থিত সবার মনেই মনে হয় এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছিল৷
আমি বললাম, আপনাদের সবার সাহায্য ভিন্ন এই রহস্যের সমাধান করা আমার পক্ষে সম্ভব হত না৷ আমি আপনাদের থেকে পাওয়া তথ্যগুলো যুক্তিপূর্ণভাবে সাজিয়েছি মাত্র৷ পদ্মনাভের বিগ্রহ যে কেবলমাত্র বিগ্রহ নয় এ সম্ভাবনার কথা আমার মাথায় আসে গতকাল কুহক শর্মার রচিত পুঁথির অনুবাদ শোনার পর৷ সেখানে আমি এমন কয়েকটি ভেষজ এবং রাসায়নিকের নাম শুনি যেগুলির উল্লেখ তামার ফলকেও আছে৷ অবশ্য, তামার ফলকে দ্রব্যগুলির মালায়লম নাম আর পুঁথিতে সংস্কৃত নাম ব্যবহার করা হয়েছে৷ কিন্তু কয়েকটির ক্ষেত্রে মালায়লম এবং সংস্কৃত নাম একই বা উচ্চারণের দিক থেকে প্রায় এক৷ দুটো টেকসটের এই কমন ব্যাপারটা আমাকে স্ট্রাইক করে৷ তার সঙ্গে ভাবুন, দু-হাজার শালগ্রাম দিয়ে মূর্তি তৈরির ব্যাপারটাও অদ্ভুত৷ কয়েকটা নুড়িকে গায়ে গায়ে সাজালে তাদের মধ্যে ফাঁক থাকবেই৷ কোনো সিমেন্টিং মেটিরিয়াল দিয়ে যদি না সেই ফাঁক বুজিয়ে দেওয়া হয় তাহলে ওই ছিদ্রপথে তরল পদার্থ অনায়াসে যাতায়াত করতে পারবে৷ এবার আসা যাক তামার ফলকগুলোর কথায়৷ ফলকগুলোতে কুহক শর্মা তাঁর বিজ্ঞানকে তিনটি ধাপে বর্ণনা করেছেন৷ প্রথম ধাপে আছে মানবদেহকে দীর্ঘকালের জন্য সুষুপ্ত করার পদ্ধতি৷ দ্বিতীয় ধাপে সেই দেহের রক্ষণাবেক্ষণ এবং শেষ ধাপে দেহটিকে পুনর্জাগ্রত করার প্রক্রিয়া৷ অন্যদিকে, মন্দিরের পুঁথিতে রয়েছে মালায়লম বর্ণমালায় লেখা রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি এবং কোলেঝুথু বর্ণমালায় লেখা পুনর্জাগরণ প্রক্রিয়া৷ সেখানে সুষুপ্তকরণ প্রক্রিয়াটি নেই৷
প্রফেসর ম্যাথু প্রশ্ন করলেন, কিন্তু পুঁথিতে কুহক শর্মা দু-রকম ভাষা ব্যবহার করলেন কেন?
সম্ভবত গোপনীয়তার স্বার্থে৷ আপনার কাছ থেকেই শোনা যে কুহক শর্মার আমলেরও পাঁচশ বছর আগে কোলেঝুথু লিপি এই অঞ্চলে প্রচলিত ছিল৷ অর্থাৎ, কুহক শর্মার সময়েই ওই লিখন পদ্ধতি সম্ভবত আর প্রচলিত ছিল না বা খুবই কম প্রচলিত ছিল৷ কুহক শর্মার আমলে যে প্রচলিত লিপি তা অনেকটাই আধুনিক মালায়লমের মতো৷ প্রতিদিনের জন্য প্রয়োজনীয় আলিম্পন এবং দিব্যস্নানম প্রক্রিয়া কুহক শর্মা তাঁর আমলের লিপিতেই সংস্কৃত ভাষায় বর্ণনা করেন৷ অর্থাৎ, যে কেউ সেটি পড়ে বুঝতে পারবে৷ কুহক শর্মা তাঁর বিজ্ঞান অন্যের হাতে যাতে পৌঁছোতে না পারে সে বিষয়ে সচেতন ছিলেন৷ তাই তিনি পুঁথির জ্ঞান কেবলমাত্র মন্দিরের মূল পুরোহিত বংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এরকম একটি নির্দেশ দিয়ে যান৷ তবে তিনি জানতেন যে এটুকু সুরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়৷ সুরক্ষার দ্বিতীয় স্তর হিসাবে তিনি পুঁথির দেহ পুনর্জাগরণ পর্বটি কোলেঝুথুতে লেখেন৷ অর্থাৎ, ওই লিপিটি পড়তে না জানলে পুঁথির জ্ঞান চুরি করা সম্ভব নয়৷
রাজা বললেন, কিন্তু কুহক শর্মার মতোবিচক্ষণ ব্যক্তি কি বোঝেননি যে পাঁচশো বছর পরে ওই লিপি কারোর পক্ষে না পড়তে পারার সম্ভাবনাই বেশি?
আমি বললাম, অবশ্যই তিনি সেটা বুঝেছিলেন এবং তার জন্য তিনি ব্যবস্থাও নিয়েছিলেন৷ প্রথমত, কুহক শর্মাকে এমন ব্যবস্থা করতে হত যাতে বিগ্রহের আলিম্পন এবং দিব্যস্নানম প্রতিদিন বাধ্যতামূলকভাবে সম্পন্ন হয়৷ তিনি সেটা নিশ্চিত করার জন্য এই দুটিকে পদ্মনাভের নিত্যসেবার অংশ করে দিয়েছিলেন৷ এর সঙ্গে সঙ্গে তিনি আরেকটি জিনিসও নিশ্চিত করলেন; সেটি হল ওই পুঁথির নিত্য পাঠ৷ আলিম্পন এবং দিব্যস্নানমের জন্য পুরোহিতকে প্রতিদিন পুঁথিটি পড়তেই হবে এবং পুঁথির শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠা পড়তে হলে পুরোহিতকে কোলেঝুথু জানতেই হবে৷ এই উপায়ে তিনি পুরোহিত বংশে কোলেঝুথু চর্চা বজায় রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন৷
রাজা বললেন, কিন্তু আলিম্পন এবং দিব্যস্নানমকে কুহক শর্মা কেন বাধ্যতামূলক করলেন?
এই দুটি প্রক্রিয়া বিগ্রহের মধ্যে রক্ষিত তাঁর দেহের নিত্যনৈমিত্তিক রক্ষণাবেক্ষণ ভিন্ন আর কিছুই নয়৷ পুঁথিতে আলিম্পন ও দিব্যস্নানমের যে বর্ণনা আছে তার সঙ্গে তামার ফলকের দেহ রক্ষণাবেক্ষণ রসায়ন হুবহু মিলে যাচ্ছে৷ কি তাই তো?
রঘুনন্দন আচার্য আমার কথায় সম্মতি জানালেন৷
পদ্মনাভের মূর্তিটি সচ্ছিদ্র অর্থাৎ ইংরাজিতে যাকে বলে porous৷ মূর্তিটি শালগ্রাম দিয়ে তৈরি৷ এই শালগ্রাম বস্তুটি কিন্তু আদৌ শিলা নয়৷ এগুলো হল সামুদ্রিক জীবাষ্ম যা হিমালয়ের নদীগুলিতে পাওয়া যায়৷ যতদূর জানি গঠনগতভাবে এগুলিও সচ্ছিদ্র৷ এছাড়াও সম্ভবত শালগ্রামগুলি এমন কোনো পদার্থ দিয়ে জোড়া যা তাদের মাঝের ফাঁকগুলোকে পুরোপুরি বুজিয়ে দেয়নি৷ আলিম্পন এবং দিব্যস্নানমে ব্যবহৃত পদার্থগুলি এই ছিদ্রপথেই মূর্তির ভেতরে ঢুকে যায়৷ এবং সবার অলক্ষ্যে মূর্তির ভিতরে রাখা কুহক শর্মার দেহের রক্ষণাবেক্ষণ চলতে থাকে৷ অর্থাৎ, মূর্তিটি একটি কফিন ভিন্ন আর কিছুই নয়!
প্রফেসর ম্যাথু বললেন, ফিরে আসবেন বলেই মনে হয় মন্দিরের লুকোনো ভল্টে কুহক শর্মা তাঁর বিজ্ঞানকে সুরক্ষিত করে গিয়েছিলেন৷
আমি বললাম, সম্ভবত তাই৷ পাঁচশ বছর পরে জেগে উঠে তাঁর স্মৃতিশক্তি কী অবস্থায় থাকবে সে বিষয়ে কুহক শর্মা নিশ্চিত ছিলেন বলে মনে হয় না৷ সেই কারণেই তামার ফলকে লিখে রাখা৷
বিষ্ণু বলল, অর্থাৎ কুহক শর্মা মারাই যাননি?
ইয়েস৷ আসলে কুহক শর্মা পদ্মনাভের শরীরে বিলীন হয়ে যান বলে যে মিথটি প্রচলিত আছে সেটি তারই ইঙ্গিত৷ ষোল বছর রাজত্ব ভোগ করে প্রায় আটষট্টি বছর বয়সে কুহক শর্মা নিজের দেহকে সুষুপ্ত করেন এবং পদ্মনাভের বিগ্রহের মধ্যে সংরক্ষণ করেন৷ অবভিয়াসলি তিনি এ কাজে কয়েকজন বিশ্বাসী লোকের সাহায্য নিয়েছিলেন৷ তারাই পরিকল্পনামতোওই গল্পটি রটিয়ে দেয়৷
রাজা বললেন, কিন্তু কুহক শর্মার মাথায় হঠাৎ এরকম একটা খেয়াল চাপল কেন?
আমি বললাম, এ খেয়াল তো মানুষের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য৷ কে না চায় অমর হতে৷ অমরত্বের লোভে মানুষ কত অদ্ভুত কাণ্ডই না ঘটায়৷ স্বৈরাচারীদের অতৃপ্তিবোধ তো মনে হয় আরও বেশি৷ শোনেননি, চাউসেস্কু আর তার স্ত্রী পুনযৌবন লাভের বাসনায় কী কী সব করেছিল! নবযৌবন যাপনের জন্য নতুন প্রাসাদ পর্যন্ত তেনারা বানিয়ে ফেলেছিলেন৷ বিজ্ঞানের শক্তিতে বলিয়ান কুহক শর্মার মতো সর্বগ্রাসী একনায়কের যে সেরকম ইচ্ছাই হবে তাতে আর আশ্চর্য কী!
রাজা বললেন, তাহলে আজ এখনও উনি জাগ্রত হচ্ছেন না কেন?
সম্ভবত এখানেই কুহক শর্মার জিনিয়াস ফেল করে গেছে! এ দেশ স্মৃতির দেশ৷ স্মৃতিতে ধারণ করাকেই আমরা শিক্ষার পরাকাষ্ঠা বলে মনে করি৷ ছন্দে লেখা কুহক শর্মার পুঁথি পুরোহিত বংশের শিক্ষার অঙ্গ৷ এই শিক্ষা পুরোহিত বংশে স্মৃতিতেই প্রবাহিত হয়ে চলেছে৷
রঘুনন্দন আচার্য মাথা ঝুঁকিয়ে আমার কথার সমর্থন করলেন৷
এই পাঁচশো বছরে কোনো একসময়ে সম্ভবত এই কারণেই পুঁথির পাঠ পুরোহিত বংশ থেকে লোপ পায়৷ সঙ্গে সঙ্গে লোপ পায় কোলেঝুথু চর্চাও৷ আলিম্পন এবং দিব্যস্নানমের প্রক্রিয়া যেহেতু স্মৃতিতেই ধরা ছিল তাই কেউ-ই আর পুঁথি খুলে দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি৷ অর্থাৎ, কোলেঝুথুতে লেখা পুঁথির শেষ অংশটি চলে যায় বিস্মৃতির অতলে৷ যদি না এমন ঘটত তাহলে হয়তো অনন্ত আচার্য শ্রাবণী পূর্ণিমার দিন কুহক শর্মার নির্দেশানুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারতেন৷ হয়তো অর্ধসহস্রাব্দের সুপ্তি কাটিয়ে জেগে উঠতেন কুহক শর্মা৷ কিন্তু আজ অর্ধসহস্রাব্দ পার করে কেটে গেছে বেশ কয়েকমাস৷ হয়তো দেহ সংরক্ষণের পুরো সিস্টেমটাই এক্সপায়ার করে গেছে৷ মানে, কুহক শর্মার রসায়ন হয়তো পাঁচশো বছর পর্যন্তই দেহকে পুনর্জাগ্রত করার মতো অবস্থায় টিকিয়ে রাখতে সক্ষম ছিল৷ আরও একটা ব্যাপার, বিষ্ণু আমাকে বলেছিল পর্তুগিজ আক্রমণের সময় তিনদিন আলিম্পন এবং দিব্যস্নানম সম্ভব হয়নি৷ সিস্টেম এক্সপায়ার করে যাওয়ার সেটাও একটা কারণ হতে পারে৷ কুহক শর্মার দেহ এখন স্রেফ একটা মমি!
উপস্থিত সকলেই নির্বাক৷ রাজা তাকিয়ে আছেন কুহক শর্মার দিকে৷ বিষণ্ণ দৃষ্টি৷
বিষ্ণু রাজার উদ্দেশে বলল, স্যর, এরপর আপনার কী নির্দেশ?
রাজা সহসা কোনো উত্তর দিলেন না৷ তারপর ধীর কণ্ঠে বললেন, কুহক শর্মার দেহ এখানেই থাকবে৷ আলিম্পন এবং দিব্যস্নানম প্রতিদিন যেমন চলে তেমনই চলবে৷ এ ঘটনা যেন বাইরে প্রচারিত না হয়৷ পদ্মনাভের সঙ্গে কুহক শর্মাও ভক্তের পূজা পাবেন৷
রাজার নির্দেশানুযায়ী আমি, রঘুনন্দন আচার্য এবং বিষ্ণু বিগ্রহের উপরের অংশ খাপে খাপ মিলিয়ে নীচের অংশের উপর স্থাপন করলাম৷ পদ্মনাভ ফিরে এলেন পূর্ণ শরীরে৷
এক স্বৈরাচারীর সমস্ত পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দিয়ে জীবনদেবতা কি মুচকি হাসলেন?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন