ডাঃ মুনসীর ডায়রি

সত্যজিৎ রায়

আজ চায়ের সঙ্গে চানাচুরের বদলে সিঙ্গাড়া। লালমোহনবাবু কিছুদিন থেকেই বলছেন, ‘খাই-খাই’ বলে একটা দোকান হয়েছে মশাই, আমার বাড়ি থেকে হাফ-এ মাইল, সেখানে দুর্দান্ত সিঙ্গাড়া করে। একদিন নিয়ে আসব।’

আজ সেই সিঙ্গাড়া এসেছে, আর লালমোহনবাবুর কথা যে সত্যি, সেটা প্রমাণ হয়ে গেছে।

‘সামনের বৈশাখে আপনার যে বইটা বেরোবে তার ছক কাটা হয়ে গেছে?’ জিগ্যেস করল ফেলুদা।

‘ইয়েস স্যার! কাম্পুচিয়ায় কম্পমান। এবার দেখবেন প্রখর রুদ্রের হাবভাব কায়দাকানুন অনেকটা ফেলু মিত্তিরের মতো হয়ে আসছে।’

‘অর্থাৎ সে আরো প্রখর হয়ে উঠেছে এই তো?’

‘তা তো বটেই।’

‘গোয়েন্দার ইমপ্রুভমেন্টের সঙ্গে সঙ্গে তার সৃষ্টিকর্তাও ইমপ্রুভ করছেন নিশ্চয়ই।’

‘এই ক’বছর সমানে যে আপনার আশেপাশে ঘুর ঘুর করছি, তাতে অনেকটা বেনিফিট যে পাওয়া যাবে সেটা তো আপনি অস্বীকার করবেন না?’

‘সেটা মানব যদি আপনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন।’

‘কী পরীক্ষা?’

‘পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার পরীক্ষা। বলুন তো আমার মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখছেন কিনা। আপনি তো গতকালও সকালে এসেছিলেন; আজকের আমি আর গতকালের আমির মধ্যে কোনো তফাত দেখছেন কি?’

লালমোহনবাবু উঠে দাঁড়িয়ে দু’পা পিছিয়ে গিয়ে মিনিটখানেক ফেলুদাকে আপাদমস্তক স্টাডি করে বললেন, ‘কই, না তো! উঁহু। নো ডিফারেন্স। কোনো তফাত নেই।’

‘হল না। ফেল। অতএব প্রখর রুদ্রও ফেল। আপনি আসার দশ মিনিট আগে আমি প্রায় এক মাস পরে হাত আর পায়ের নখ কেটেছি। কিছু ঈদের চাঁদের মতো হাতের নখ এখনও মেঝেতে পড়ে আছে। ওই দেখুন।’

‘তাও তো!’

লালমোহনবাবু কিছুক্ষণের জন্য খানিকটা নিষ্প্রভ হয়ে হঠাৎ ফেলুদার দিকে চেয়ে বললেন, ‘ভেরি ওয়েল; এবার আপনি বলুন তো দেখি আমার মধ্যে কী চেঞ্জ লক্ষ করছেন।’

‘বলব?’

‘বলুন।’

ফেলুদা চায়ের খালি কাপটা টেবিলে রেখে চারমিনারের প্যাকেটটা তুলে নিয়ে বলল, ‘নাম্বার ওয়ান, আপনি কাল অবধি লাক্স টয়লেট সোপ ব্যবহার করেছেন; আজ সিন্থলের গন্ধ পাচ্ছি। খুব সম্ভবত টি. ভি.-র বিজ্ঞাপনের চটকের ফলে।’

‘ঠিক বলেছেন মশাই। এনিথিং এল্‌স?’

‘আপনি পাঞ্জাবির বোতাম সব কটাই লাগিয়ে থাকেন; আজ অনেকদিন পর দেখছি ওপরেরটা খোলা। নতুন পাঞ্জাবিতে বোম লাগাতে অনেক সময় বেশ কসরত করতে হয়। ওপরেরটায় সেই কসরতে কোনো ফল হয়নি বলে মনে হচ্ছে।’

‘মোক্ষম ধরেছেন।’

‘আরো আছে।’

‘কী?’

‘আপনি রোজ সকালে একটি করে রসুনের কোয়া চিবিয়ে খান; সেটা আপনি ঘরে এলেই বুঝতে পারি। আজ পারছি না।’

‘আর বলবেন না। ভরদ্বাজটা এমন কেয়ারলেস। দিয়েছি কড়া করে ধমক। এইট্টিসিক্স থেকে রসুন ধরিচি মশাই, সকালে ডেইলি এক কোয়া। আমার সিসটেমটাই—’

জটায়ুর রসুনের গুণকীর্তন কমাতে হল, কারণ কলিং বেল বেজে উঠেছে। দরজা খুলে দেখি ফেলুদারই বয়সী এক ভদ্রলোক।

ফেলুদা উঠে দাঁড়াল।

‘আসুন—’

‘আপনিই তো?’

‘আমার নাম প্রদোষ মিত্র।’

ভদ্রলোক সোফায় বসে বললেন, ‘আমার নাম শঙ্কর মুনসী। আমার বাবার নাম হয়ত আপনি শুনে থাকবেন, ডাক্তার রাজেন মুনসী।’

‘সাইকায়াট্রিস্ট?’

আমি জানতাম যারা মনের ব্যারামের চিকিৎসা করে তাদের বলে সাইকায়াট্রিস্ট।

‘সেদিনই খবরের কাগজে ওঁর বিষয় একটা খবর পড়লাম না? একটা ছবিও তো বেরিয়েছিল।’

‘হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন,’ বললেন শঙ্কর মুনসী। ‘গত চল্লিশ বছর ধরে উনি একটা ডায়রি লিখেছেন, সেটা পেঙ্গুইন ছাপছে। আপনি হয়ত জানেন না। বাবার মনোবিজ্ঞানী হিসাবে সুনাম আছে ঠিকই, কিন্তু আরেকটা ব্যাপারেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। সেটা হল শিকার। পঁচিশ বছর আগে শিকার ছাড়লেও, এই ডায়রিতে তাঁর শিকারের অভিজ্ঞতার বর্ণনাও আছে। পেঙ্গুইন এখনো লেখাটা পড়েনি; সাইকায়াট্রিস্ট শিকারীর ডায়রি শুনেই ছাপার প্রস্তাব দেয়। তবে লেখক হিসেবে যে বাবার সুনাম আছে সেটা তারা জানে। মনোবিজ্ঞান সম্বন্ধে চমৎকার ইংরিজিতে লেখা বাবার অনেক প্রবন্ধ নানান পত্র-পত্রিকায় বেরিয়েছে।’

‘খবরটা কি আপনারাই কাগজে দেন?’

‘না, ওটা প্রকাশকের তরফ থেকে বেরোয়।’

‘আই সী।’

‘যাই হোক, এবার আসল ব্যাপারটায় আসি। বাবার গর্ব হচ্ছে যে এ ডায়রিতে তিনি একটিও মিথ্যা কথা লেখেননি। তিনজন লোককে নিয়ে তিনটি ঘটনার উল্লেখ আছে ডায়রিতে। যাদের পুরো নামটা ব্যবহার না করে বাবা নামের প্রথম অক্ষরটা ব্যবহার করেছেন। এই অক্ষর তিনটি হল “এ”, “জি”, আর “আর”। এরা তিনজনেই আজ সমাজে সম্মানিত, সাক্সেসফুল ব্যক্তি। কিন্তু তিনজনেই, বেশ অনেককাল আগে, তিনটি অত্যন্ত গর্হিত কাজ করেন, এবং তিনজনেই নানান ফিকিরে আইনের হাত থেকে রেহাই পান। যদিও পুরো নাম ব্যবহার না করার দরুন বাবা আইনের হাত থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ। তবুও প্রকাশকের কাছ থেকে অফারটা পাবার পর বাবা তিনজনকেই ব্যাপারটা বলেন। “এ” আর “জি” প্রথমে আপত্তি তোলে, তারপর বাবা বুঝিয়ে বলার পর খানিকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হয়। “আর” নাকি কোনোরকম আপত্তি তোলেনি।

‘গতকাল দুপুরে খেতে বসেছি, এমন সময় চাকর এসে বাবাকে একটা চিঠি দেয়। সেটা পড়ে বাবার মুখ গম্ভীর হয়ে যায়। কারণ জিগ্যেস করাতে বাবার মুখে প্রথম “এ”, “জি” আর “আর”-এর বিষয় শুনি, আগে কিছুই জানতাম না।’

‘কেন?’

‘বাবা লোকটা একটু পিকিউলিয়ার। উনি পেশা আর পেশেন্ট ছাড়া আর কিছু জানেন না। আমি, মা, সংসার—এসব সম্পর্কেই বাবা সম্পূর্ণ উদাসীন। মা মানে আমার বিমাতা, স্টেপমাদার। আমার যখন তিন বছর বয়স তখন আমার মা মারা যান। তার দু বছর পরে বাবা আবার বিয়ে করেন। এই নতুন মা যে আমাকে খুব কাছে টেনে নিয়েছিলেন তা বলতে পারি না। আমাদের বাড়ির এক অনেক দিনের পুরানো চাকর আমার দেখাশুনা করত। সেই ব্যবধান এখনো রয়ে গেছে। যদিও এটা বলব যে বাবার স্নেহ যেমন পাইনি, তেমনি তাঁর শাসনও ভোগ করিনি।’

‘এবং তাঁর ডায়রিও পড়েননি?’

‘না। শুধু আমি না, কেউই পড়েনি।’

‘আসল প্রসঙ্গ থেকে আমরা একটু দূরে সরে এসেছি। ওই চিঠি কি এই তিনজনের একজন লিখেছেন?’

‘ইয়েস, ইয়েস। এই দেখুন।’

শঙ্করবাবু একটা খাম বার করে ফেলুদাকে দিলেন। তা থেকে যে চিঠিটা বেরোল সেটা ফেলুদার পিছনে দাঁড়িয়ে আমি আর লালমোহনবাবুও পড়লাম। প্রথমেই তলায় দেখলাম ‘এ’। তার উপর লেখা ‘আই টেক ব্যাক মাই ওয়ার্ড। ডায়রি ছাপতে হলে আমার অংশ বাদ দিয়ে ছাপতে হবে। এটা অনুরোধ নয়, আদেশ। অমান্য করলে তার ফল ভোগ করতে হবে।’

‘একটা প্রশ্ন আছে’, বলল ফেলুদা। ‘এই তিন ব্যক্তির অপরাধের কথা আপনার বাবা জানলেন কী করে?’

‘সেও খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। কৌশলে আইনের কবল থেকে মুক্তি পেয়ে “এ”, “জি” আর “আর” মনে শান্তি পায়নি। গভীর অনুশোচনা, শেষটায় ঘটনাচক্রে ধরা পড়ে যাবার ভয় ক্রমে মানসিক ব্যারামে দাঁড়ায়। বাবার তখনই বেশ নাম ডাক, এরা তিনজনেই বাবার কাছে আসে চিকিৎসার জন্য। সাইকায়াট্রিস্টের কাছে তো আর কিছু লুকোনো চলে না; সব প্রশ্নের সঠিক জবাব না দিলে চিকিৎসাই হবে না। এই ভাবে বাবা এদের ঘটনাগুলো জানতে পারেন।’

‘হুমকি কি শুধু “এ”-ই দিয়েছে?’

‘এখন পর্যন্ত তাই, তবে “জি” সম্বন্ধেও বাবার সংশয় আছে!’

‘এই তিনজনের অপরাধ কী তা আপনি জানেন?’

‘না। শুধু তাই না; এদের আসল নাম, এখন এরা কী করছে, এসব কিছুই বলেননি বাবা। তবে আপনাকে নিশ্চয়ই বলবেন।’

‘উনি কি আমার খোঁজ করছেন?’

‘সেই জন্যেই তো এলাম। বাবা ওঁর এক পেশেন্টের কাছ থেকে আপনার নাম শুনেছেন। আমাকে জিগ্যেস করাতে আমি বললাম গোয়েন্দা হিসেবে আপনার যথেষ্ট খ্যাতি আছে। তাতে বাবা বললেন, “মানুষের মনের চাবিকাঠি হাতে না থাকলে ভালো গোয়েন্দা হওয়া যায় না। ওঁকে একটা কল দিতে পারলে ভালো হত। এইসব হুম্‌কি-টুম্‌কিতে শান্তিভঙ্গ হয়। ফলে কাজের ব্যাঘাত হয়। সেটা আমি একেবারেই চাই না।” আমি তখনই বাবাকে জিগ্যেস করি মিত্তিরকে কখন আসতে বলব। বাবা বললেন, রবিবার সকাল দশটা। এখন আপনি যদি…’

‘বেশ তো; আমার দিক থেকে আপত্তি করার তো কোনো কারণই নেই।’

‘তাহলে এই কথা রইল। রবিবার সকাল দশটা, নাম্বার সেভ্‌ন সুইনহো স্ট্রীট।’

সাত নম্বর সুইনহো স্ট্রীট ডাক্তারের বাড়ি বলে মনেই হয় না; তার সদর দরজা দিয়ে ঢুকে প্রথমেই চোখে পড়ে একটা দাঁড়ানো রয়েল বেঙ্গল টাইগার, আর তার পিছনের দেয়ালে উপর দিকে একটা বাইসনের মাথা।

শঙ্করবাবু নিচেই অপেক্ষা করছিলেন, আমরা তাঁর সঙ্গে দোতলায় গিয়ে বৈঠকখানায় বসলাম। এঘরেও চতুর্দিকে শিকারের চিহ্ন। ভদ্রলোক ডাক্তারি করে এত জানোয়ার মারার সময় কী করে পেলেন তাই ভাবছিলাম।

মিনিট খানেকের মধ্যেই ডাঃ মুনসী এসে পড়লেন। মাথার চুল সব সাদা হয়ে গেছে, তবে এখনো যে বেশ শক্ত সমর্থ সেটা দেখলেই বোঝ যায়। ভদ্রলোক ফেলুদার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বললেন, ‘আপনার তো ব্যায়াম করা শরীর বলে মনে হচ্ছে। ভেরি গুড। আপনার কাজ প্রধানত মাথার হলেও আপনি যে শরীরের প্রতি দৃষ্টি রেখেছেন সেটা দেখে ভালো লাগল।’

এবার ভদ্রলোক জটায়ু ও আমার দিকে চাইতে ফেলুদা আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল।

‘এঁরা ট্রাস্টওয়র্দি কি?’ ডাঃ মুনসী প্রশ্ন করলেন।

‘সম্পূর্ণ’, বলল ফেলুদা, ‘তপেশ আমার খুড়তুতো ভাই এবং আমার সহকারী, আর মিঃ গাঙ্গুলী আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু।’

‘এই জন্যে জিগ্যেস করছি কারণ আজ সেই তিন ব্যক্তির আসল পরিচয় আমাকে দিতে হবে, না হলে আপনি কাজ করতে পারবেন না। এই পরিচয় শুধু আপনারা তিনজনই জানবেন, আর কেউ জানে না, আর কাউকে বলিনি।’

‘আপনি নির্ভয়ে বলতে পারেন, ডাঃ মুনসী’, বললেন জটায়ু। ‘আমি অন্তত আর কাউকে বলব না।’

‘ভেরি ওয়েল।’

‘তাহলে বলুন কী করতে পারি। হুম্‌কি চিঠির কথা আপনার ছেলে বলেছেন।’

‘শুধু হুম্‌কি চিঠি নয়’, বললেন ডাঃ মুনসী, ‘হুম্‌কি টেলিফোনও বটে। এটা কাল রাত্রের ঘটনা। তখন সাড়ে এগারোটা। বোঝাই যায় মত্ত অবস্থায় ফোন করছে। হিগিন্‌স। জর্জ হিগিন্‌স।’

‘আপনার ডায়রির “জি”?’

‘ইয়েস। বলে কী—“সেদিন টেলিফোনে আমি অত্যন্ত বোকার মতো কথা বলেছি। যখন তোমার কাছে ট্রীটমেন্টের জন্য যাই, তখন আমার যে ব্যবসা ছিল, এখনও সেই ব্যবসাই রয়েছে। একচেটিয়া ব্যবসা আমার, সুতরাং ‘জি’ থেকে অনেকেই আমার আসল পরিচয় অনুমান করতে পারবে। সো কাট মি আউট।” মাতালকে তো আর যুক্তি দিয়ে কিছু বোঝানো যায় না। ফলে ফোন রেখে দিতে হল। বুঝতেই পারছেন, আমি রুগী নিয়ে এত ব্যস্ত থাকি যে এদের বাড়ি গিয়ে সামনাসামনি কথা বলে যে কিছু বোঝাবো তার সময় বা সামর্থ্য আমার নেই। এ কাজের ভারটা আমি আপনাকে দিতে চাই। “এ” এবং “জি”। “আর”-কে নিয়ে চিন্তার কারণ নেই। কারণ তার সঙ্গে কথা বলে জেনেছি যে নামের আদ্যক্ষর থেকে তাকে কেউ চিনে ফেলবে এ আশঙ্কা তার নেই।’

‘কিন্তু এই তিনজনের আসল পরিচয়টা—!’

‘কাগজ পেনসিল আছে?’

ফেলুদা পকেট থেকে নোটবুক আর ডট পেন বার করল।

‘লিখুন, “এ” হল অরুণ সেনগুপ্ত। ম্যাকনীল কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার, রোটারি ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট। বাসস্থান এগারো নম্বর রোল্যান্ড রোড। ফোন নম্বর ডিরেক্টরিতে দেখে নেবেন।’

ফেলুদা চটপট ব্যাপারটা লিখে নিল।

‘এবার লিখুন’, বলে চললেন ডাঃ মুনসী, “জি” হল জর্জ হিগিন্‌স। টেলিভিশনের জন্য বিদেশে জানোয়ার চালান দেবার ব্যবসা এঁর। বাড়ির নম্বর নব্বুই রিপন স্ট্রীট। রাস্তার নাম থেকে বুঝতে পারবেন উনি পুরো সাহেব নন, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। তৃতীয় ব্যক্তির আসল পরিচয় প্রয়োজন হলে দেব, নচেৎ নয়।’

‘এদের অপরাধগুলো?’

‘শুনুন, আমার পাণ্ডুলিপি আজ আপনি নিয়ে যাবেন। মন দিয়ে পড়ে আপনার বুদ্ধি বিবেচনা প্রয়োগ করে আমাকে বলবেন এতে আপত্তিকর কিছু আছে কিনা যার ফলে বইটা বাজারে বেরোলে আমার ক্ষতি হতে পারে।’

‘ঠিক আছে। তাহলে—’

ফেলুদাকে থামতে হল, কারণ ঘরে তিনজন লোকের প্রবেশ ঘটেছে। ডাঃ মুনসী তাদের দিকে দেখিয়ে বললেন, ‘আপনি আসছেন শুনে এঁরা সকলেই আপনাকে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। আমার স্ত্রী ছাড়া এই কজন এবং আমার ছেলেই এখন আমার বাড়ির বাসিন্দা। আলাপ করিয়ে দিই, এ হচ্ছে সুখময় আমার সেক্রেটারি।’

একজন চশমা-পরা বছর চল্লিশেকের ভদ্রলোকের দিকে দেখালেন ডাঃ মুনসী।

‘আর ইনি হচ্ছেন আমার শ্যালক চন্দ্রনাথ।’

এঁর বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। দেখে কেন জানি মনে হয় ইনি বিশেষ কিছু করেন-টরেন না, এ বাড়িতে আশ্রিত হয়ে রয়েছেন।

‘আর ইনি আমার পেশেন্ট রাধাকান্ত মল্লিক। এঁর চিকিৎসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখানেই আছেন।’

এঁকে দেখে মনে হয় এঁর অসুখ এখনো সারেনি। হাত কচলাচ্ছেন, চোখ পিট পিট করছেন, আর একটানা সুস্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। বয়স আন্দাজ চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ।

পরিচয়ের পরে একমাত্র সুখময়বাবু ছাড়া আর সকলেই চলে গেলেন। ডাঃ মুনসী সেক্রেটারির দিকে ফিরে বললেন, ‘সুখময়, যাও, আমার লেখাটা এনে প্রদোষবাবুকে দাও।’

ভদ্রলোক দু মিনিটের মধ্যে একটা বড়, মোটা খাম এনে ফেলুদাকে দিলেন।

‘ওর কিন্তু আর কপি নেই’, বললেন ডাঃ মুনসী। ‘পাবলিশারকে দেবার আগে ওটা সুখময় টাইপ করে দেবে।’

‘আপনি কোনো চিন্তা করবেন না’, বলল ফেলুদা, ‘আমি এটার মূল্য খুব ভালোভাবেই জানি।’

আমরা উঠে পড়লাম। শঙ্করবাবু পাশের ঘরেই অপেক্ষা করছিলেন। এবার এসে আমাদের সদর দরজা অবধি পৌঁছে দিলেন। তারপর লালমোহনবাবুর সবুজ অ্যাম্বাসাডরে চড়ে আমরা বাড়িমুখো রওনা দিলাম।

‘একটা রিকুয়েস্ট আছে মশাই’, লালমোহনবাবু হঠাৎ বললেন।

‘কী?’

‘আপনার পড়া হলে পর আমি একবার দু দিনের জন্য পাণ্ডুলিপিটা নেবো। এটা রিফিউজ করবেন না, প্লীজ!’

‘আপনার না পড়লেই নয়?’

‘না-পড়লেই নয়। বিশেষ করে শিকার কাহিনী পড়তে আমার দুর্দান্ত লাগে।’

‘বেশ, দেবো। তবে দু দিন নয়; আপনি যে সকালে নেবেন, তার পরের দিন সকালেই ফেরত দিতে হবে। তার মধ্যে শিকারের অংশ আপনার নিশ্চয়ই পড়া হয়ে যাবে। কারণ ১৯৬৫-এর পর তো আর ভদ্রলোক শিকার করেননি।’

‘তাই সই।’

ডাঃ মুনসীর হাতের লেখা বেশ পরিষ্কার হলেও, তিনশো পঁচাত্তর পাতার পাণ্ডুলিপিটা পড়তে ফেলুদার লাগল তিন দিন। এত সময় লাগার একটা কারণ অবিশ্যি এই যে ফেলুদা পড়ার ফাঁকে ফাঁকে অনেক কিছু নিজের খাতায় নোট করে নিচ্ছিল।

তিন দিনের পরের দিন রবিবার সকালে যথারীতি জটায়ু এসে হাজির। প্রথম প্রশ্নই হল, ‘কী স্যার, হল?’

‘হয়েছে।’

‘আপনি কী সিদ্ধান্তে এলেন শুনি। এ ডায়রি নির্ভয়ে ছাপার যোগ্য?’

‘সম্পূর্ণ। তবে তাতে তো হুমকি বন্ধ করা যায় না। এই তিনজনের একজনও যদি ধরে বসে থাকে যে নামের আদ্যক্ষর থেকেই লোকে বুঝে ফেলবে কার কথা বলা হচ্ছে তাহলে সে এ বই ছাপা বন্ধ করার জন্য কী যে না করতে পারে তার ঠিক নেই।’

‘ইভ্‌ন মার্ডার?’

‘তা তো বটেই। একজনের কথাই ধরা যাক।’ “এ”। অরুণ সেনগুপ্ত। পূর্ববঙ্গের এক জমিদার বংশের ছেলে। যুবা বয়সে ছিলেন এক ব্যাঙ্কের মধ্যপদস্থ কর্মচারী। কিন্তু রক্তের মধ্যে ছিল চূড়ান্ত সৌখিনতা। ফলে প্রতি মাসেই আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। শেষে কাবুলিওয়ালার শরণাপন্ন হওয়া।’

এই ফাঁকে বলে রাখি, ফেলুদা একবার বলেছিল যে আজকাল আর দেখা যায় না বটে কিন্তু বছর কুড়ি আগেও রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখা যেত লাঠি হাতে কাবুলিওয়ালা দাঁড়িয়ে আছে। এদের ব্যবসা ছিল মোটা সুদে টাকা ধার দেওয়া।

ফেলুদা বলে চলল, ‘একটা সময় আসে যখন দেনার অঙ্কটা এমন ফুলে ফেঁপে ওঠে যে মরিয়া হয়ে অরুণ সেনগুপ্তকে ব্যাঙ্কের তহবিল থেকে চল্লিশ হাজার টাকা চুরি করতে হয়। কিন্তু সেটা সে এমন কৌশলে করে যে দোষটা গিয়ে পড়ে একজন নির্দোষ কর্মচারীর উপর। ফলে সে বেচারিকে জেল খাটতে হয়।’

‘বুঝেছি’, বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বললেন জটায়ু। ‘তারপর অনুশোচনা, তারপর মাথার ব্যারাম, তারপর মনোবিজ্ঞানী। …কিন্তু ভদ্রলোক যে এখন একেবারে সমাজের উপর তলায় বাস করছেন। তার মানে মুনসীর চিকিৎসায় কাজ দিয়েছিল?’

‘তা তো বটেই। সে কথা মুনসী তাঁর ডায়রিতে লিখেওছেন—যদিও তারপরে আর কিছু লেখেননি। কিন্তু আমরা বেশ অনুমান করতে পারি যে এই ঘটনার পর সেনগুপ্ত নিশ্চয়ই তার জীবনের ধারা পালটে ফেলে ত্রিশ বছর ধরে ধীরে ধীরে ধাপে ধাপে উপরে উঠে আজকের অবস্থায় পৌঁছেছেন। বুঝতেই পারেন সেখান থেকে আবার পিছলে পড়ার আশঙ্কা যদি দেখা দেয়, যতই অমূলক হোক, তাহলে সেনগুপ্ত সাহেব মাথা ঠিক রাখেন কী করে?’

‘বুঝলাম’, বললেন জটায়ু, ‘আর অন্য দুজন?’

“আর” ব্যক্তি সম্বন্ধে চিন্তার কোনো কারণ নেই সে তো সেদিন মুনসীর মুখেই শুনলেন। এঁর আসল নামটা উনি বলেননি, তাই আমিও বলতে পারছি না। ইনি এককালে একটি লোককে গাড়ি চাপা দিয়ে মারেন, তারপর এদিকে ওদিকে মোটা ঘুষ দিয়ে আইনের হাত থেকে নিজেকে বাঁচান। ইনিও ডাঃ মুনসীর হাতে নিজেকে সমর্পণ করে বিবেকযন্ত্রণা থেকে রেহাই পান। …ইন্টারেস্টিং হল “জি”-র ঘটনা।’

‘কী রকম?’

‘ইনি যে ফিরিঙ্গি সে তো জানেন। আর এঁর ব্যবসার কথাও জানেন। নব্বুই নম্বর রিপন স্ট্রীটে একটি বড় দোতলা বাড়িতে থাকতেন জর্জ হিগিন্‌স। ১৯৬০-এ এক সুইডিশ ফিল্ম পরিচালক কলকাতায় আসেন ভারতবর্ষের ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা ছবি করবেন বলে। তাঁর গল্পের জন্য একটি লেপার্ডের প্রয়োজন ছিল। ইনি হিগিন্‌সের খবর পেয়ে তার সঙ্গে গিয়ে দেখা করেন। হিগিন্‌সের একটা লেপার্ড ছিল বটে, কিন্তু সেটা রপ্তানীর জন্য নয়; সেটা তার পোষা! অনেক টাকা দিয়ে সুইডিশ পরিচালক একমাসের জন্য লেপার্ডটাকে ভাড়া করেন। কথা ছিল একমাস পরে তিনি অক্ষত অবস্থায় ফেরত দেবেন। আসলে ফিল্ম পরিচালক মিথ্যা কথা বলেন, কারণ তাঁর গল্পে ছিল গ্রামবাসীরা সবাই মিলে লেপার্ডটাকে মেরে ফেলে। এক মাস পরে পরিচালক এসে হিগিন্‌সকে আসল ঘটনাটা বলে। হিগিন্‌স প্রচণ্ড রেগে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে তখনই পরিচালকের টুঁটি টিপে তাকে মেরে ফেলে। পরমুহূর্তে রাগ চলে গিয়ে তার জায়গায় আসে আতঙ্ক। কিন্তু সেই অবস্থাতেও পুলিশের চোখে ধুলো দেবার ফন্দি হিগিন্‌স বার করে। সে প্রথমে ছুরি দিয়ে মৃত পরিচালকের সর্বাঙ্গ ক্ষতচিহ্নে ভরিয়ে দেয়। তারপর তার কালেকশনের একটা হিংস্র বন্‌বেড়ালকে খাঁচার দরজা খুলে বাইরে বার করে সেটাকে গুলি করে মারে। ফলে ব্যাপারটা দাঁড়ায়, খাঁচা ছাড়া বনবেড়াল পরিচালককে হত্যা করে এবং বনবেড়ালকে হত্যা করে হিগিন্‌স। ফিকিরটা কাজে দেয়, হিগিন্‌স আইনের হাত থেকে বাঁচে। কিন্তু তারপর একমাস ধরে ক্রমাগত স্বপ্নে নিজেকে ফাঁসিকাঠে ঝুলতে দেখে অগত্যা মুনসীর চেম্বারে গিয়ে হাজির হয়।’

‘হুঁ…’ বললেন জটায়ু। ‘তাহলে এখন কিং কর্তব্য?’

‘দুটো কর্তব্য’, বলল ফেলুদা। ‘এক হল পাণ্ডুলিপিটা আপনাকে দেওয়া, আর দুই—“এ”-কে একটা টেলিফোন করা।’

জটায়ু হাসিমুখে ফেলুদার হাত থেকে পাণ্ডুলিপি ভরা মোটা খামটা নিয়ে বললেন, ‘ফোন করবেন কি অ্যাপয়েন্টমেন্ট করার জন্য?’

‘ন্যাচারেলি’, বলল ফেলুদা। ‘আর দেরি করার কোনো মানে হয় না। তোপসে—এ. সেনগুপ্ত, ১১ রোল্যান্ড রোড, নম্বরটা বার করতো।’

আমি ডাইরেক্টরিটা হাতে নিতেই ফোনটা বেজে উঠল। আমিই ধরলাম। ডাঃ মুনসী। ফেলুদাকে বলতেই ও আমার হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নিল।

ব্যাপার আর কিছুই নয়—সেনগুপ্ত আরেকটা হুম্‌কি চিঠি দিয়েছেন। তাতে কী বলা হয়েছে সেটা ফেলুদা তার খাতায় লিখে নিল। তারপর ফেলুদা তার শেষ কথাটা বলে ফোনটা রেখে দিল।

সেনগুপ্তর দ্বিতীয় হুম্‌কিটা হচ্ছে এই—‘সাতদিন সময়। তার মধ্যে কলকাতার প্রত্যেক বাংলা ও ইংরিজি কাগজে বিজ্ঞপ্তি দেখতে চাই যে অনিবার্য কারণে ডায়রি ছাপা সম্ভব হচ্ছে না। সাতদিন। তারপরে আর হুম্‌কি নয়—কাজ, এবং কাজটা আপনার পক্ষে প্রীতিকর হবে না বলাই বাহুল্য!’

আমি সেনগুপ্তর ফোন নম্বর বার করে ডায়াল করে একবারেই লাইন পেয়ে গেলাম। ফেলুদার হাতে ফোনটা চালান দিয়ে আমি আর জটায়ু কেবল ফেলুদার কথাটাই শুনলুম। সেটা শুনে যা দাঁড়াল তা এই—

‘হ্যালো—মিঃ সেনগুপ্তর সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি কি—অরুণ সেনগুপ্ত?’

‘—’

‘মিঃ সেনগুপ্ত? আমার নাম প্রদোষ মিত্র।’

‘—’

‘হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। ইয়ে—আমায় একদিন পাঁচ মিনিট সময় দিতে পারেন?’

‘—’

‘তাই বুঝি? আশ্চর্য তো! কী ব্যাপার?’

‘—’

‘তা পারি বৈকি। কটায় গেলে আপনার সুবিধে?’

‘—’

‘ঠিক আছে। তাই কথা রইল।’

‘ভাবতে পারিস?’ ফোনটা রেখে বলল ফেলুদা, ‘ভদ্রলোক নাকি আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমাকে ফোন করতেন।’

‘কেন, কেন?’ প্রশ্ন করলেন জটায়ু।

‘সেটা ফোনে বললেন না, সামনা সামনি বলবেন।’

‘কখন অ্যাপয়ন্টমেন্ট?’

‘আধ ঘন্টা বাদে।’

এগারো নম্বর রোল্যান্ড রোড সাহেবী আমলের দোতলা বাড়ি। দরজার বেল টিপতে একজন উর্দিপরা বেয়ারার আবির্ভাব হল। সে কার্পেট ঢাকা কাঠের সিঁড়ি দিয়ে আমাদের দোতলায় নিয়ে গিয়ে বৈঠকখানায় বসালো। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই মিঃ সেনগুপ্ত প্রবেশ করলেন। বাড়ির সঙ্গে মানানসই সাহেবী মেজাজ; পরনে ড্রেসিং গাউন, পায়ে বেডরুম স্লিপার, হাতে চুরুট।

পরিচয় পর্ব শেষ হলে পর ভদ্রলোক জিগ্যেস করলেন, ‘আপনারা ড্রিংক করেন?’

‘আজ্ঞে না’, বলল ফেলুদা।

‘আমি যদি বিয়ার খাই আশা করি আপনারা মাইন্ড করবেন না?’

‘মোটেই না।’

ভদ্রলোক বেয়ারাকে ডেকে নিজের জন্য বিয়ার আর আমাদের তিনজনের জন্য চায়ের অর্ডার দিয়ে ফেলুদার দিকে দৃষ্টি দিলেন। ফেলুদা বলল, ‘আপনি আমাকে কেন ফোন করতে যাচ্ছিলেন সেটা আগে বলতে আপনার কোনো আপত্তি আছে? তারপর আমি আমার দিকটা বলব।’

‘বেশ তো। জে. পি. চাওলার নাম শুনেছেন?’

‘ব্যবসাদার? গুরুপ্রসাদ চাওলা? যার নামে চাওলা ম্যানসনস?’

‘হ্যাঁ।’

‘তাঁর এক নাতি তো—?’

‘হ্যাঁ। মিসিং। সম্ভবত কিড্‌ন্যাপ্‌ড।’

‘কাগজে দেখছিলাম বটে।’

‘গুরুপ্রসাদ আমার অনেকদিনের বন্ধু। পুলিশ তদন্ত করছে বটে, কিন্তু আমি ওকে আপনার নাম সাজেস্ট করি। ভুলু সেহানবিশের কাছে আপনার খুব সুখ্যাতি শুনেছি।’

‘হ্যাঁ, একটা ব্যাপারে ওঁকে আমি হেল্‌প করি।’

‘তাহলে চাওলাকে কী বলব?’

‘মিঃ সেনগুপ্ত, দুঃখের বিষয় আমি অলরেডি একটা কেস হাতে নিয়ে ফেলেছি।’

‘আই সী।’

‘আর সেই ব্যাপারেই আমি আপনার কাছে এসেছি।’

‘কী ব্যাপারে শুনি?’

‘আমি ডাঃ মুনসীর কাছ থেকে আসছি।’

‘হোয়াট!’

ভদ্রলোক সোফা থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন।—‘মুনসী আপনাকে আমার পরিচয় দিয়ে দিয়েছে? তার মানে তো আর কদিনে রাজ্যিসুদ্ধ লোক জেনে যাবে মুনসীর ডায়রির “এ” ব্যক্তিটি আসলে কে।’

‘মিঃ সেনগুপ্ত, আমি অত্যন্ত সাবধানী লোক। গোপন ব্যাপার কী করে গোপন রাখতে হয় তা আমি জানি। আমার উপর আপনি সম্পূর্ণ ভরসা রাখতে পারেন। তবে আপনি যদি ঘন ঘন ডাঃ মুনসীকে হুম্‌কি চিঠি দেন, তার ফল কী হবে সেটা আমি জানি।’

‘আমি হুম্‌কি চিঠি দেব না কেন? আপনি ডায়রিটা পড়েছেন?’

‘পড়েছি।’

‘আপনার কী মনে হয়েছে?’

‘ত্রিশ বছরের পুরানো ঘটনা। এর মধ্যে অন্তত শ’ পাঁচেক ব্যাঙ্কে তহবিল তছরুপ হয়েছে। যারা এ কাজ করেছে হয়ত তাদের অনেকেরই নামের প্রথম অক্ষর “এ”। সুতরাং আপনার ভয় সম্পূর্ণ অমূলক।’

‘মুনসী কি ব্যাঙ্কের নাম করেছে?’

‘না।’

‘আমার ব্যাঙ্কে দুজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিল যারা চুরির ব্যাপারে আমাকে সন্দেহ করে, কারণ ঠেকায় পড়ে আমি দুজনের কাছে টাকা ধার চেয়েছিলাম। দুজনেই অবিশ্যি রিফিউজ করে।’

‘মিঃ সেনগুপ্ত, আমি আবার বলছি—আপনার ভয়ের কোনো কারণ নেই। আর এই ধরনের চিঠি দিয়ে আপনার লাভটা কী হচ্ছে? ডাঃ মুনসী আইনের দিক দিয়ে সম্পূর্ণ নিরাপদ। অর্থাৎ আপনি কোনো লিগ্যাল স্টেপ নিতে পারছেন না। তাহলে কি আপনি আইনের বাইরে কোনো রাস্তা ভাবছেন?’

‘আমার বিপদের আশঙ্কা দেখলে আমি আইন-টাইন মানব না মিঃ মিত্তির। আমার অতীতের ইতিহাস থেকেই আপনি বুঝছেন যে প্রয়োজনে বেপরোয়া কাজ করতে আমি দ্বিধা করি না।’

‘আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে, মিঃ সেনগুপ্ত। তখনকার আপনি আর এখনকার আপনি কি এক? আজ আপনি সমাজে সম্মানিত’ব্যক্তি। এই অবস্থায় আপনি এমন একটা ঝুঁকি নেবেন?’

মিঃ সেনগুপ্ত মিনিট খানেক কিছু না বলে কেবল চুক্‌ চুক্‌ করে বিয়ার খেলেন। তারপর তাঁর চাউনির সামান্য পরিবর্তন দেখা গেল। তারপর তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক চুমুকে বাকি বিয়ারটা শেষ করে গেলাসটা টেবিলে রেখে বললেন, ‘ঠিক আছে—ড্যাম ইট! লেট হিম গো অ্যাহেড।’

‘আপনি তাহলে হুম্‌কির ব্যাপারে ইতি দিচ্ছেন?’

‘ইয়েস ইয়েস ইয়েস!—তবে বিপদের বিন্দুমাত্র আশঙ্কা দেখলেই কিন্তু’—

‘আর বলতে হবে না’, বলল ফেলুদা, ‘বুঝেছি।’

লালমোহনবাবু কথামতো পরদিন সকালেই পাণ্ডুলিপিটা ফেরত নিয়ে এলেন। ফেলুদা বলল, ‘এখন আর চা খাওয়া হবে না। কারণ আধ ঘন্টার মধ্যেই “জি”-র সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট।’

নব্বুই নম্বর রিপন স্ট্রীটের দরজায় বেল টিপতে যাঁর আবির্ভাব হল তাঁর মাথায় টাক, কানের পাশের চুল সাদা, আর এক জোড়া বেশ তাগড়াই গোঁফ, তাও সাদা।

‘মিঃ মিটার, আই অ্যাম জর্জ হিগিন্‌স।’

তিনজনের সঙ্গেই করমর্দনের পর হিগিন্‌স আমাদের নিয়ে দোতলায় চলল। গেট দিয়ে বাড়িতে ঢুকেই দুটো বেশ বড় খাঁচা দেখেছি, তার একটায় বাঘ, অন্যটায় হায়না। দোতলায় উঠে বাঁয়ে একটা ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখলাম তাতে গোটা পাঁচেক কোয়ালা ভাল্লুক বসে আছে মেঝেতে।

বসবার ঘরে পৌঁছে সোফায় বসে হিগিন্‌স ফেলুদাকে উদ্দেশ করে প্রশ্ন করল, ‘ইউ আর এ ডিটেকটিভ?’

‘এ প্রাইভেট ওয়ান’, বলল ফেলুদা।

বাকি কথাও ইংরিজিতেই হল, যদিও হিগিন্‌স মাঝে মাঝে হিন্দিও বলে ফেলছিলেন, বিশেষ করে কারুর উদ্দেশে গালি দেবার সময়। অনেকের উপরেই ভদ্রলোকের রাগ। যদিও কারণটা বোঝা গেল না। অবশেষে বললেন, ‘মান্‌সি তাহলে এখনো প্র্যাকটিস করে? আই মাস্ট সে, সে আমার বিপদের সময় অনেক উপকার করেছিল।’

‘তাহলে আর আপনি তাকে শাসাচ্ছেন কেন?’ প্রশ্ন করল ফেলুদা।

হিগিন্‌স একটুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘সেটার একটা কারণ হচ্ছে সেদিন রাত্রে নেশার মাত্রাটা একটু বেশি হয়েছিল। তবে মানুষের কি ভয় করে না? আমার বাবা কী ছিলেন জান? স্টেশন মাস্টার। আর আমি নিজের চেষ্টায় আজ কোথায় এসে পৌঁছেছি দেখ। এ আমার একচেটিয়া ব্যবসা। মান্‌সির ডায়রি ছাপা হলে যদি আমাকে কেউ চিনে ফেলে তাহলে আমার আর আমার ব্যবসার কী দশা হবে ভাবতে পার?’

ফেলুদাকে আবার বোঝাতে হল যে হিগিন্‌স আইন বাঁচিয়ে কিছুই করতে পারবেন না। তাঁকে আবার ব্যাঁকা রাস্তায় যেতে হবে। ‘সেটাই কি তুমি চাইছ?’ বেশ জোরের সঙ্গে জিজ্ঞেস করল ফেলুদা। ‘তাতে কি তোমার প্রেসটিজ আরো বেশি বিপন্ন হবে না?’

হিগিন্‌স কিছুক্ষণ চুপ করে বিড়বিড় করে বললেন, ‘একবার কেন, শতবার খুন করতে পারতাম ও পাজি সুইডিশটাকে। বাহাদুর, আমার সাধের লেপার্ড, মাত্র চার বছর বয়স, তাকে কিনা লোকটা মেরে ফেলল!…’

আবার দশ সেকেন্ডের জন্য কথা বন্ধ; তারপর হঠাৎ সোফার হাতল চাপড়ে গলা তুলে হিগিন্‌স বললেন, ‘ঠিক আছে; মান্‌সিকে বলো আমি কোনো পরোয়া করি না। ও যা করছে করুক, বই বেরোলে লোকে আমাকে চিনে ফেললেও আই ডোন্ট কেয়ার। আমার ব্যবসা কেউ টলাতে পারবে না।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ মি. হিগিন্‌স, থ্যাঙ্ক ইউ।’

অরুণ সেনগুপ্তর খবরটা ফেলুদা আগেই ফোনে ডাঃ মুনসীকে জানিয়ে দিয়েছিল। হিগিন্‌সের খবরটা দিতে আমরা মুনসীর বাড়িতে গেলাম, কারণ পাণ্ডুলিপিটা ফেরত দেবার একটা ব্যাপার ছিল। ভদ্রলোক ফেলুদাকে একটা বড় ধন্যবাদ দিয়ে বললেন, ‘তাহলে তো আপনার কর্তব্য সারা হয়ে গেল। এবারে আপনার ছুটি!’

‘আপনি ঠিক বলছেন? “আর” সম্বন্ধে কিছু করার নেই তো?’

‘নাথিং। …আপনি আপনার বিল পাঠিয়ে দেবেন, আমি ইমিডিয়েটলি পেমেন্ট করে দেব।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার।’

‘এটাকে কি মামলা বলা চলে?’ বাড়ি ফিরে এসে বলল জটায়ু।

‘মিনি মামলা বলতে পারেন। অথবা মামলাণু।’

‘যা বলেছেন।’

‘আশ্চর্য এই যে এমন গর্হিত কাজ করার পঁচিশ ত্রিশ বছর পরে লোকগুলো শুধু বেঁচে নেই, দিব্যি সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে চালিয়ে যাচ্ছে।’

‘হক্‌ কথা’, বললেন জটায়ু। ‘কালই বাড়িতে বসে ভাবছিলুম ত্রিশ বছর আগে যাদের চিনতুম তাদের কারুর সঙ্গে আজও যোগাযোগ আছে কিনা, বা তারা এখন কে কী করছে সেটা জানি কিনা। বিশ্বাস করুন আজই আধ ঘন্টা ভেবে শুধু একটা নাম মনে পড়ল, অপরেশ চাটুজ্যে, যার সঙ্গে একসঙ্গে বসে বায়স্কোপ দেখিচি, ফুটবল খেলা দেখিচি, সাঙ্গুভ্যালিতে বসে চা খেইচি।’

‘সে এখন কী করে জানেন?’

‘উঁহু। আউট অফ টাচ। কমপ্লীটলি। কবে কীভাবে যে ছাড়াছাড়িটা হল, সেটা অনেক ভেবেও মনে করতে পারলুম না।’

পরদিন সকালে লালমোহনবাবু এসে ফেলুদার দিকে চেয়ে বললেন, ‘আপনাকে একটু ডাউন বলে মনে হচ্ছে? বেকারত্ব ভালো লাগছে না বুঝি।’

ফেলুদা মাথা নেড়ে বলল, ‘নো স্যার, তা নয়, একটা ব্যাপারে কৌতূহল নিবৃত্তি হল না বলে অসোয়াস্তি লাগছে।’

‘কী ব্যাপার?’

‘“আর ব্যক্তিটির আসল পরিচয়। ইনি একটা হুম্‌কি-টুম্‌কি দিলে মন্দ হত না।’

‘রট্‌ন, রাবিশ, রিডিকুলাস’, বললেন জটায়ু। ‘“আর” জাহান্নমে যাক। আপনি আপনার যা প্রাপ্য তা তো পাচ্ছেনই।’

‘তা পাচ্ছি।’

ফোনটা বেজে উঠল। আমিই ধরলাম। ‘হ্যালো’ বলতে ওদিক থেকে কথা এল ‘আমি শঙ্কর বলছি।’ আমি ফোনটা ফেলুদার হাতে চালান দিলাম।

‘বলুন স্যার।’

উত্তরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ফেলুদার কপালে গভীর খাঁজ পড়ল। তিন-চারটে ‘হুঁ’ বলেই ফেলুদা ফোনটা রেখে দিয়ে বলল, ‘সাংঘাতিক খবর। ডাঃ মুনসী খুন হয়েছেন, আর সেই সঙ্গে ডায়রিও উধাও।’

‘বলেন কী!’ চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে বললেন জটায়ু।

‘ভেবেছিলাম শেষ। আসলে এই সবে শুরু।’

আমরা আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে লালমোহনবাবুর গাড়িতে বেরিয়ে পড়লাম।

সুইনহো স্ট্রীটে পৌঁছে দেখি পুলিশ আগেই হাজির। ইনস্পেক্টর সোম ফেলুদার চেনা, বললেন, ‘মাঝ রাত্তিরে খুনটা হয়েছে, মাথার পিছন দিকে ভারি কিছু দিয়ে মেরেছে।’

‘কে প্রথম জানল?’

‘ওঁর বেয়ারা। ভদ্রলোক ভোর ছটায় চা খেতেন। সেই সময়ই বেয়ারা ব্যাপারটা জানতে পারে। ডাঃ মুনসীর ছেলে বাড়ি ছিলেন না। পুলিশে খবর দেন ডাঃ মুনসীর সেক্রেটারি!’

‘আপনাদের জেরা হয়ে গেছে?’

‘তা হয়েছে; তবে আপনি নিজের মতো করুন না। আপনি যে আমাদের কাজে ব্যাঘাত করবেন না সেটা আমি পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানি। আর চারটি তো প্রাণী, ভদ্রলোকের ছেলে, সেক্রেটারি, শ্যালক আর পেশেন্ট। অবিশ্যি মিসেস মুনসী আছেন। তাঁকে কিছু জিগ্যেস করিনি এখনো।’

আমরা তিনজন শঙ্করবাবুর সঙ্গে দোতলায় রওনা দিলাম। সিঁড়ি ওঠার সময় ভদ্রলোক একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘অনেক কিছুই আশঙ্কা করছিলাম, কিন্তু এটা করিনি।’

বাবার ঘরে পৌঁছে ফেলুদা বলল, ‘আপনি যখন রয়েছেন তখন আপনাকে দিয়েই শুরু করি।’

‘বেশ তো। কী জানতে চান বলুন।’

আমরা সকলে বসলাম। চারিদিকে জন্তু জানোয়ারের ছাল, মাথা ইত্যাদি দেখে মনে হচ্ছিল, এতবড় শিকারী, আর এইভাবে তাঁর মৃত্যু হল!

ফেলুদা জেরা আরম্ভ করে দিল।

‘আপনার ঘর কি দোতলায়?’

‘হ্যাঁ। আমারটা উত্তর প্রান্তে, বাবারটা দক্ষিণ প্রান্তে।’

‘আপনি আজ সকালে বেরিয়েছিলেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘কোথায়?’

‘আমাদের ডাক্তারের ফোন খারাপ। উনি রোজ ভোরে লেকের ধারে হাঁটেন, তাই ওঁকে ধরতে গিয়েছিলাম। কদিন থেকেই মাথাটা ভার-ভার লাগছে। মনে হচ্ছিল প্রেশারটা বেড়েছে।’

‘প্রেশার কি আপনার বাবা দেখে দিতে পারতেন না?’

‘এটা বাবার আরেকটি পিকিউলারিটির উদাহরণ। উনি বলেই দিয়েছিলেন আমাদের বাড়ির সাধারণ ব্যারামের চিকিৎসা উনি করবেন না। সেটা করেন ডাঃ প্রণব কর।’

‘আই সী…একটা কথা আপনাকে বলি শঙ্করবাবু, আপনি যে বলেছিলেন ডাঃ মুনসী আপনার সম্বন্ধে উদাসীন, ডায়রি পড়ে কিন্তু সেরকম মনে হয় না। ডায়রিতে অনেকবার আপনার উল্লেখ আছে।’

‘ভেরি সারপ্রাইজিং!’

‘আপনার ডায়রিটা পড়ার ইচ্ছে হয় না?’

‘অত বড় হাতে লেখা ম্যানুসক্রিপ্ট্‌ পড়ার ধৈর্য আমার নেই।’

‘এটা অবশ্য আশা করা যায় যে আপনার বিষয় যেটা সত্যি সেটাই উনি লিখেছেন।’

‘বাবার দৃষ্টিতে যেটা সত্যি বলে মনে হয়েছে সেটাই উনি লিখেছেন। সে দৃষ্টির সঙ্গে আর পাঁচজনের দৃষ্টি নাও মিলতে পারে। আমার বলার ইচ্ছে এই, যে বাবা আমাকে চিনলেন কী করে? তিনি তো সর্বক্ষণ রুগী নিয়েই পড়ে থাকতেন।’

‘আপনার বাবার মাসিক রোজগার কত ছিল সে সম্বন্ধে আপনার কোনো ধারণা আছে?’

‘সঠিক নেই, তবে উনি যে ভাবে খরচ করতেন তাতে মনে হয় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার হওয়া কিছুই আশ্চর্য নয়।’

‘উনি যে উইল করে গিয়েছিলেন সেটা আপনি জানেন?’

‘না।’

‘গত বছর পয়লা ডিসেম্বর। ওঁর সঞ্চয়ের একটা অংশ ব্যবহার হবে মনোবিজ্ঞানের উন্নতিকল্পে।’

‘আই সী।’

‘আর, আপনার প্রতি উদাসীন হওয়া সত্ত্বেও আপনিও কিন্তু বাদ পড়েননি।’

শঙ্করবাবু আবার বললেন, ‘আই সী!’

‘এই খুনের ব্যাপারে আপনি কোনো আলোকপাত করতে পারেন?’

‘একেবারেই না। এটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।’

‘আর ডায়রিটা যে লোপাট হল?’

‘সেটা ওই তিনজনের একজন লোক লাগিয়ে করাতে পারে। বাবার পেশেন্ট হিসাবে এরা এ বাড়িতে এসেছে। বাবা যে ঘরে রুগী দেখেন, তার পাশেই তো আপিস ঘর। সেখানেই থাকত বাবার লেখাটা।’

‘আপনাদের সদর দরজা রাত্রে বন্ধ থাকে নিশ্চয়ই।’

‘হ্যাঁ, তবে বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে জমাদার ওঠার জন্য একটা ঘোরানো সিঁড়ি আছে।’

‘ঠিক আছে। থ্যাঙ্ক ইউ। আপনি এবার যদি সুখময়বাবুকে একটু পাঠিয়ে দিতে পারেন?’

মিনিট খানেকের মধ্যেই সেক্রেটারি সুখময় চক্রবর্তী এসে হাজির হলেন। ভদ্রলোক আমাদের থেকে একটু দূরে একটা চেয়ারে বসতে ফেলুদা জেরা আরম্ভ করল।

‘আমি প্রথমেই জানতে চাই, পাণ্ডুলিপিটা যে চুরি হল, সেটা কি বাইরে পড়ে থাকত?’

‘না। দেরাজে; তবে দেরাজে চাবি থাকত না। তার কারণ আমি বা ডাঃ মুনসী কেউই ভাবতে পারিনি যে সেটা এই ভাবে চুরি হতে পারে।’

‘এটা যে আর দেরাজে নেই সেটা কখন কীভাবে জানলেন?’

‘আজ থেকে ওটা টাইপ করা শুরু করব ভেবেছিলাম। সকালে গিয়ে দেরাজ খুলে দেখি সেটা নেই।’

‘আই সী…আপনি কদ্দিন হল ডাঃ মুনসীর সেক্রেটারির কাজ করছেন?’

‘দশ বছর।’

‘কাজটা পেলেন কী করে?’

‘ডাঃ মুনসী কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন।’

‘কী ধরনের কাজ করতে হত আপনাকে?’

‘ওঁর অ্যাপয়েন্টমেন্টগুলো নোট করে রাখতাম, আর চিঠিগুলোর জবাব টাইপ করতাম।’

‘চিঠি কি অনেক আসত?’

‘তা মন্দ না। বিভিন্ন দেশের মনোবিজ্ঞান সংস্থা থেকে নিয়মিত চিঠি আসত। বাইরের কনফারেন্সে যোগ দিতে উনি দুবছর অন্তর একবার বিদেশে যেতেন।’

‘আপনি বিয়ে করেননি?’

‘না।’

‘আত্মীয়স্বজন আর কে আছে?’

‘ভাইবোন নেই। বাবা মারা গেছেন। আছেন শুধু আমার বিধবা মা আর আমার এক বিধবা খুড়িমা।’

‘এঁরা এক সঙ্গেই থাকেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘আপনি এঁদের সঙ্গে থাকেন না?’

‘আমি তো এ বাড়িতেই থাকি। ডাঃ মুনসী আমাকে একটা ঘর দেন একতলায়। প্রথম থেকেই এখানে আছি। মাঝে মাঝে গিয়ে বাড়ির খবর নিয়ে আসি।’

‘বাড়ি কোথায়?’

‘বেলতলা রোড ল্যান্সডাউনের মোড়ে।’

‘আপনি এই খুন সম্পর্কে কোনো আলোকপাত করতে পারেন?’

‘একেবারেই না। ডায়রি বেহাত হতে পারে হুম্‌কি চিঠি থেকেই বোঝা যায়; কিন্তু খুনটা আমার কাছে একেবারে অর্থহীন বলে মনে হচ্ছে।’

‘ডাঃ মুনসী বস্ হিসাবে কেমন লোক ছিলেন?’

‘খুব ভালো। আমাকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন, আমার কাজে সন্তুষ্ট ছিলেন, এবং ভালো মাইনে দিতেন।’

‘আপনি কি জানেন ডাঃ মুনসীর বই বেরোলে তাঁর অবর্তমানে বইয়ের স্বত্বাধিকারী হতেন আপনি?’

‘জানি। ডাঃ মুনসী আমাকে বলেছিলেন।’

‘বই ছেপে বেরোলে তার কাটতি কেমন হবে বলে আপনার মনে হয়?’

‘প্রকাশকদের ধারণা খুব ভালো হবে।’

‘তার মানে মোটা রয়েলটি, তাই নয় কি?’

‘আপনি কি ইঙ্গিত করছেন এই রয়েলটির লোভে আমি ডাঃ মুনসীকে খুন করেছি?’

‘এখানে যে একটা জোরালো মোটিভের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে সেটা কি আপনি অস্বীকার করবেন?’

‘আমার যেখানে টাকার অভাব নেই সেখানে শুধু রয়েলটির লোভে আমি খুন করব, এটা কি খুব বিশ্বাসযোগ্য?’

‘এর সঠিক উত্তর দিতে যতটা চিন্তার প্রয়োজন, তার সময় এখনো পাইনি। যাই হোক এখন আপনার ছুটি।’

‘কাউকে পাঠিয়ে দেবো কি?’

‘আমি ডাঃ মুনসীর শালার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।’

সুখময়বাবু চলে যাবার পর জটায়ু বললেন, ‘আপনার কি মনে হচ্ছে বলুন তো, ডায়রি লোপাট আর খুনটা সেপারেট ইস্যু, না পরস্পরের সঙ্গে জড়িত?’

‘আগে গাছে কাঁঠাল দেখি, তারপর তো গোঁফে তেল দেব।’

‘বোঝো!’

শালা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এসে হাজির হলেন। কপালের ঘাম মুছতে দেখে মনে হল ভদ্রলোক একটু নার্ভাস বোধ করছেন।

‘আপনার নাম তো চন্দ্রনাথ; পদবী কী?’ ভদ্রলোক বসার পর ফেলুদা প্রশ্ন করল।

‘বোস।’

‘আপনি এখানে রয়েছেন পনেরো বছর, তাই তো?’

‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনি কী করে…?’

‘আমি ডাঃ মুনসীর ডায়রিটা পড়েছি। আপনার বিষয় অনেক কিছু জানি, তবু আপনার মুখ থেকে কনফার্মেশনের জন্য কতকগুলো প্রশ্ন করছি।’

চন্দ্রনাথ বোস আবার ঘাম মুছলেন।

‘ডাঃ মুনসী আপনাকে এ বাড়িতে থাকতে বলেন?’

‘না। আমার বোন ডাঃ মুনসীকে অনুরোধ করেন।’

‘উনি এক কথায় রাজি হয়ে যান?’

‘না।’

‘তাহলে?’

‘আমার বোন…পীড়াপীড়ি করলে পর…রাজি হন।’

‘আপনি তো কোনো চাকরি-টাকরি করেন না।’

‘না।’

‘হাত খরচা পান মাসে মাসে?’

‘হ্যা।’

‘কত?’

‘পাঁচশো।’

‘তাতে চলে যায়?’

চন্দ্রনাথবাবু উত্তর না দিয়ে মাথা হেঁট করলেন। বুঝলাম হাতখরচটা যথেষ্ট নয়।

‘আপনি তো ইন্টারমিডিয়েট অবধি পড়েছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘ছাত্র হিসেবে কীরকম ছিলেন?’

‘সাধারণ।’

‘নাকি তার চেয়েও নিচে?’

চন্দ্রনাথবাবু চুপ।

‘প্রথমবার আই. এ-তে ফেল করেননি? সেই কারণেই তো আপনার কোনো চাকরি জোটেনি, তাই নয় কি?’

দৃষ্টি নত করে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন চন্দ্রনাথবাবু।

‘এ বাড়ির কোনো কাজ আপনি করেন কি?’

‘হ্যাঁ।’

‘কী?’

‘বাজার করি। ওষুধপত্র আনি…’

‘বুঝেছি।…আপনার শোবার ঘর দোতালায়?’

‘হ্যাঁ।’

‘কোনখানে? ডাঃ মুনসীর ঘর থেকে কতদূরে?’

‘পাশে।’

‘একেবারে পাশে? লাগালাগি?’

‘ই-ইয়েস।’

‘রাত্রে ঘুমোন কখন?’

‘দশটা সাড়ে দশটা।’

‘আর ওঠেন?’

‘ছ-টা।’

‘এই খুন সম্বন্ধে আপনার কিছু বলার আছে?’

‘নো-নো স্যার। নাথিং।’

‘ঠিক আছে। আপনি এবার অনুগ্রহ করে রাধাকান্ত মল্লিককে একটু পাঠিয়ে দিন।’

রাধাকান্ত মল্লিক এসে সোফায় বসেই এক সঙ্গে হাত আর মাথা নেড়ে বললেন, ‘আমি খুন সম্বন্ধে কিচ্ছু জানি না, কিচ্ছু না…’

‘আমি কি বলেছি আপনি জানেন?’

‘বলেননি, কিন্তু বলবেন। আই নো ইউ ডিটেকটিভস। এসব জেরা-টেরা আমার ভালো লাগে না। যা বলার আমি বলে যাচ্ছি। আপনি শুনুন। আমি যে ব্যারাম নিয়ে এখানে আসি তার নাম আমি জানতাম না। মুনসী বলেন। পার্সিকিউশন ম্যানিয়া। তার লক্ষণ হল, চারপাশের সব লোককে হঠাৎ শত্রু বলে মনে হওয়া। বাবা, দাদা, পড়শী, আপিসের কোলীগ কেউ বাদ নেই। সবাই যেন ওৎ পেতে বসে আছে। সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। আগে এটা ছিল না; ঠিক কখন যে শুরু হল তাও বলতে পারি না। শুধু এটা বলতে পারি যে শেষ দিকে এমন হয়েছিল যে রাত্তিরে ঘুমোতে পারতাম না, পাছে ঘুমোলে কেউ এসে বুকে ছুরি মারে!’

‘ডাঃ মুনসীর ওষুধে কাজ দেয়?’

‘দিচ্ছিল, তবে সময় লাগছিল। কথা ছিল আর দু’হপ্তা পরে ছুটি পাব। কিন্তু তার আগেই…ছুটি হয়ে গেল…’

‘আপনি কি এখন বাড়ি ফিরে যাবেন?’

‘পুলিশ যেতে দিলেই যাব।’

‘আপনার চাকরি তো একটা আছে নিশ্চয়ই।’

‘পপুলার ইনশিওরেন্স।’

‘ঠিক আছে। আপনি এবার আসতে পারেন।’

রাধাকান্ত মল্লিক চলে যাবার পর ফেলুদা একবার খুনের জায়গা আর লাশটা দেখে এল। যে জিনিসটা দিয়ে বাড়ি মেরে খুন করা হয়েছে সেটা এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। ইতিমধ্যে পুলিশের ডাক্তার এসে দেখে বলে গেছে খুনটা হয়েছে ভোর চারটা থেকে পাঁচটার মধ্যে। পাণ্ডুলিপিটা এখনো পাওয়া যায়নি। ইন্‌স্পেক্টর সোম বলেছেন সেটা বেরোলেই ফেলুদাকে জানিয়ে দেবেন।

‘মিসেস মুনসীর সঙ্গে কি এখন কথা বলা যাবে?’ ফেলুদা জিগ্যেস করল সোমকে।

‘তা যাবে। উনি দেখলাম মোটামুটি শক্তই আছেন।’

আমরা তিনজন মিসেস মুনসীর ঘরে গেলাম। ভদ্রমহিলা জানালার দিকে মুখ করে খাটে বসে আছেন। ফেলুদা দরজায় টোকা মারতে আমাদের দিকে ফিরলেন।

আমি চমকে উঠলাম। ইনি হুবহু এঁর ভাইয়ের মতো দেখতে! যমজ নাকি?

নমস্কারের পর ফেলুদা বলল, ‘আমার নাম প্রদোষ মিত্র। আমি একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। আপনার স্বামীর মৃত্যুর ব্যাপারে তদন্ত করতে এসেছি।’

‘আপনি কিছু জিগ্যেস করবেন কি?’

দেখে অবাক হলাম যে ভদ্রমহিলার কথায় বিন্দুমাত্র কান্নার রেশ নেই।

ফেলুদা বলল, ‘সামান্য দু-একটা প্রশ্ন।’

ভদ্রমহিলা আবার জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘করুন।’

‘এই হত্যা সম্বন্ধে আপনার কিছু বলার আছে কি?’

‘ওঁর ডায়রিই হল ওঁর কাল। আমি ওঁকে কতবার বলেছি, তুমি লিখছ লেখ, কিন্তু এ জিনিস ছাপিও না। আমাদের দেশের লোকেরা এত সত্যি কথা গ্রহণ করতে পারবে না। অনেকে ব্যথা পাবে, অনেকে অসন্তুষ্ট হবে, আর আজ…’

‘আমি কিন্তু ডায়রিটা পড়েছি। আমার মনে হয় না এটা পড়লে মনে কেউ ব্যথা পেতে।’

‘শুনে খুশি হলাম।’

‘আপনি আর চন্দ্রনাথবাবু যমজ ভাইবোন?’

‘হ্যাঁ।’

‘আপনি যখন ডাঃ মুনসীকে প্রস্তাব করেন আপনার ভাইকে এ বাড়িতে এনে রাখা হোক, তখন উনি কী বলেন?’

‘অনিচ্ছাসত্ত্বেও মত দেন।’

‘অনিচ্ছা কেন?’

‘আমার ভাই কোনো চাকরি করে না সেটা উনি মেনে নিতে পারছিলেন। উনি নিজে ছিলেন কাজ-পাগলা মানুষ। কাজ ছাড়া আর কিছুই জানতেন না।’

‘অনেক ধন্যবাদ, মিসেস মুনসী। আমার আর কিছু জানার নেই।’

বাড়ি ফিরতে ফিরতে বারোটা হয়ে গেল। লালমোহনবাবু সকালে স্নান সেরে বেরোন, কাজেই সে সমস্যাটা নেই। তাঁকে বললাম দুপুরের খাওয়াটা আজ এখানেই সারতে। ভদ্রলোক রাজি হয়ে গেলেন।

‘মহীয়সী মহিলা!’ পাখাটা খুলে ফুল স্পীড করে তাঁর প্রিয় কাউচটায় বসে বললেন লালমোহনবাবু, ‘এত বড় একটা ট্র্যাজিডিতে এতটুকু টস্‌কাননি! অথচ ভাইটা একেবারে গোবর গণেশ।’

‘সেই জন্যেই মহিলার ভাইয়ের উপর এত টান’, বলল ফেলুদা, ‘এ বড় জটিল মনোভাব, লালমোহনবাবু। স্নেহ, অনুকম্পা, এসব তো আছেই; তার মধ্যে কোথায় যেন একটা মাতৃত্বের রেশ রয়েছে। ভদ্রমহিলার নিজের কোনো ছেলেপিলে নেই, এবং ডাঃ মুনসীর প্রথম পক্ষের স্ত্রীর ছেলের প্রতিও টান নেই, এসব কথা ভুলবেন না।’

‘তার উপরে যমজ।’ ‘তা তো বটেই।’

‘আপনার কি মনে হয় ভদ্রমহিলার ডাঃ মুনসীর সঙ্গে বনিবনা ছিল না?’

‘সেটা মুনসী পরিবারের সঙ্গে অন্তরঙ্গ না থাকলে বলা মুশকিল। গোয়েন্দাকে যা বোঝার বুঝতে হয় দুটি ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে, কান আর চোখ।’

‘এক্ষেত্রে কান কী বলছে?’

‘মনে একটা খট্‌কা জাগাচ্ছে।’

‘কী সেটা?’

‘সেটা আপনারা কেন বোঝেননি তা জানি না।’

এবারে আমি একটা কথা না বলে পারলাম না।

‘তুমি বলতে চাও ওঁর কথা শুনে মনে হল উনি ডায়রিটা পড়েছেন?’

‘সাবাস, তোপ্‌সে, সাবাস।’

‘কেন মশাই, ডায়রিতে কী ধরনের জিনিস আছে সেটা তো মুনসী মুখেও বলতে পারেন।’

‘একই হল লালমোহনবাবু, একই হল।’

‘মুনসীর কথায় মনে হয়েছিল ওই তিন ব্যক্তির ঘটনা ছাড়া ডায়রিতে কী আছে তা কেউ জানে না। এখন মনে হচ্ছে কথাটা হয়ত ঠিক না।’

‘তবে এটা তো বোঝাই যাচ্ছে ডাঃ মুনসীর স্ত্রীর প্রতি মোটেই বিরূপভাব পোষণ করতেন না। ডায়রির প্রথম পাতা খুললেই সেটা প্রমাণ হয়। যে স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা নেই, তাকে কেউ বই উৎসর্গ করে না।’

‘আপনি দেখছি ফর্মে আছেন। ভেরি গুড।’

‘আরেকটা ব্যাপারে আমি কানকে কাজে লাগিয়েছি মশাই; আপনি নিশ্চয়ই অ্যাপ্রিশিয়েট করবেন। ডাঃ মুনসীর নিজের ছেলের প্রতি যে মনোভাব দেখিয়েছেন তাতে তাকে শুষ্কং কাষ্ঠং বলে মনে হওয়া আশ্চর্য নয়। কিন্তু সেইখেনে দেখুন, তাঁর সেক্রেটারির প্রতি তাঁর কত দরদ!’

‘গুড। গুড।’ ফেলুদা যে অন্যমনস্ক ভাবে তারিফটা করে সোফা ছেড়ে উঠে পায়চারি আরম্ভ করে দিল।

‘কী ভাবছেন মশাই?’ প্রায় এক মিনিট চুপ থেকে প্রশ্ন করলেন জটায়ু।

ভাবছি যে তিন ঊহ্য নামের মধ্যে একজনই রয়ে গেল যার আসল পরিচয়টা পাওয়া গেল না। ফলে মামলাটার মধ্যে একটা ফাঁক রয়ে গেল যেটা আর পূরণ হবে না।’

‘আপনার কি মনে হয় ডাঃ মুনসী কোনো তথ্য—’

ক্রিং-ং-ং-ং!

আমাদের এই নতুন নীল টেলিফোনটার আওয়াজ আগেরটার চেয়ে অনেক বেশি জোর। ফেলুদা রিসিভারটা তুলে ‘হ্যালো’ বলল।

অবিশ্বাস্য টেলিফোন। যাকে ফেলুদা টেলিপ্যাথি বলে এ হল ষোল আনা তাই। কার সঙ্গে কী কথাবার্তা হল সেটা ফেলুদা ফোন নামিয়ে রেখেই বলেছিল; আমি যখন ঘটনাটা লিখতে যাব, তখন ও বলল, ‘যদিও তুই ফোনটার সময় শুধু আমার কথাগুলোই শুনেছিলি, লেখার সময় এমন ভাবে লেখ যেন দুই তরফের কথাই শুনতে পাচ্ছিস। তাহলে পাঠক মজা পাবে।’

আমি ওর কথামতোই লিখছি।

‘হ্যালো।’

‘মিঃ মিত্তির?’

‘হ্যাঁ।’

‘আমি “আর” কথা বলছি।’

‘“আর”?’

‘মুনসীর ডায়রির “আর”।’

‘ও। তা হঠাৎ আমাকে ফোন কেন? মুনসীর সঙ্গে আমার সম্পর্কের কথা আপনি জানলেন কী করে?’

‘আপনি আজ সকালে মুনসীর বাড়ি যাননি?’

‘তা তো যাবই। মুনসী আজ ভোর রাত্রে খুন হয়েছেন। সেই কারণেই যেতে হয়েছিল।’

‘আপনার চেহারা অনেকের কাছেই পরিচিত। সেটা আপনি জানেন বোধহয়। মুনসীর বাড়ির সামনে ভিড় এবং পুলিশ দেখে প্রতিবেশীদের অনেকেই বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল। তাদেরই একজন আপনাকে চিনে ফেলে আমার এক পেশেন্ট। আমিও ডাক্তার সেটা জানেন কি? এই পেশেন্টের বাড়ি গেস্‌লাম ঘন্টাখানেক আগে। তারই কাছে শুনি মুনসীর মৃত্যু ও আপনার উপস্থিতির খবর। দুইয়ে দুইয়ে চার করে বুঝি মুনসী আপনাকে এমপ্লয় করেছিল।’

‘আপনার আসল নামটা জানতে পারি কি?’

‘না, পারেন না। ওটা ঊহ্যই থাকবে। আমি জানতে চাই মুনসী আপনাকে আমার সম্বন্ধে কী বলে।’

‘উনি বলেন, আপনাকে উনি যথেষ্ট চেনেন এবং আপনাকে নিয়ে চিন্তা করার কোনো কারণ নেই। ডায়রিটা বেরুচ্ছে এবং তাতে আপনার অতীতের ঘটনা থাকছে জেনেও নাকি আপনি কোনো আপত্তি করেননি।’

‘ননসেন্স! সম্পূর্ণ মিথ্যা। ও আমাকে জানাবে কী করে? আমি তো পনেরো দিন বাইরে থেকে কলকাতায় ফিরেছি সবে পরশু রাত্রে। বাড়িতে এসে পুরানো স্টেটসম্যান ঘাঁটতে ঘাঁটতে মুনসীর ডায়রি পেঙ্গুইন ছাপছে এ খবরটা দেখি। খবরটা পড়ে আমার অস্বস্তি লাগে। মুনসী সাইকায়াট্রিস্ট হওয়াতে অনেক মনোবিকারগ্রস্ত ব্যক্তির হাঁড়ির খবর সে জানে; আমার তো বটেই। সে সব কথা কি সে ডায়রিতে লিখেছে?

‘আমি মুনসীকে ফোন করি। সে স্বীকার করে যে আমার ঘটনা তার ডায়রিতে স্থান পেয়েছে, তবে আমার নাকি চিন্তার কোনো কারণ নেই এই জন্যে যে আমার নামের শুধু প্রথম অক্ষরটা ব্যবহার করা হয়েছে। …কিন্তু তাতে আমি আশ্বস্ত হব কেন? আমি চব্বিশ বছর আগেও ডাক্তার ছিলাম, এখনও আছি। তখনকার অনেক পেশেন্ট এখনও আমার পেশেন্ট। ডায়রি থেকে তারা আমায় চিনে ফেলবে না তার কী গ্যারান্টি?’

‘আমি কিন্তু ডায়রিটা পড়েছি। আমার মনে হয় আপনার চিন্তার কোনো কারণ নেই।’

‘আপনি যখন পড়েছেন তখন আমিও পড়ব। সে কথাটা আমি মুনসীকে বলি। আমি বলি যে তোমার কথা আমি বিশ্বাস করি না। আমি নিজে তোমার লেখা পড়ে বিচার করব সেটা ছাপলে আমার কোনো ক্ষতি হবে কিনা। তুমি আমাকে লেখাটা দাও। যদি না দাও তাহলে তোমার অতীতের ঘটনা আমি ফাঁস করে দেব।’

‘এ আবার কী বলছেন আপনি?’

‘মিস্টার মিত্তির, আমি আর মুনসী একই বছর লন্ডনে যাই ডাক্তারি পড়তে। আমার বিষয় যদিও মনোবিজ্ঞান ছিল না, কিন্তু আমাদের দুজনের যথেষ্ট পরিচয় ছিল। আমি মুনসীর যে চেহারা দেখেছি সে চেহারা কলকাতার কেউ দেখেনি। সে সেখানে উচ্ছন্নে যেতে চলেছিল, আমি তাকে সামলাই, তাকে সোজা পথে নিয়ে আসি। কলকাতায় ফিরে এসে প্র্যাকটিস শুরু করার পর সে ক্রমে ক্রমে নিজেকে সংস্কার করে।’

‘আপনি মুনসীর বাড়ি গিয়ে তাঁর কাছ থেকে লেখাটা চেয়ে আনেন?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। গতকাল রাত এগারোটায়। বলেছিলাম দুদিন পরে লেখাটা ফেরত দেব। এখন অবিশ্যি তার কোনো প্রয়োজন নেই।’

‘নেই মানে? আপনি পাণ্ডুলিপি ফেরত দিলেই সেটা ছাপা হবে। লেখকের মৃত্যুর পর তার বই ছাপা হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। একে ইংরিজিতে পসথ্যুমাস পাবলিকেশন বলে সেটা আপনি জানেন না?’

‘জানি। কিন্তু এক্ষেত্রে সেটা হবে না। লেখাটা আমি পড়েছি। সেটা আমার কাছেই থাকবে। বই হয়ে বেরোবে না। আসি।’

ফেলুদা রিসিভারটা নামিয়ে রেখে দিল, তার মুখ গম্ভীর।

‘লোকটা এমন করে আমার উপর টেক্কা দিল!’ খপ্‌ করে সোফায় বসে বলল ফেলুদা। ‘এ সহ্য করা যায় না, সহ্য করা যায় না!…আর এমন চমৎকার লেখা—এইভাবে বেহাত হয়ে গেল।’

‘লেখাটা নিয়ে ভাববেন না, ফেলুবাবু।’ একটু যেন রাগত ভাবেই বললেন জটায়ু। ‘দ্য খুন ইজ মাচ মোর ইমপর্ট্যান্ট দ্যান দ্যা লেখা।’

‘আপনি লেখাটা পড়েও একথা বলছেন?’

‘বলছি। যেখানে মার্ডার হ্যাজ বিন কমিটেড, সেখানে আর ওসব কিছু তার কাছে তুচ্ছ।’

শ্রীনাথ এসে খবর দিল ভাত বাড়া হয়েছে। আমরা তিনজনে খাবার ঘরে খেতে বসলাম। লালমোহনবাবু যদিও বেশ তৃপ্তির সঙ্গে খেলেন। এমন কি চিংড়ি মাছের মালাইকারিটা খেতে খেতে বললেন, ‘আপনাদের জগন্নাথের রান্নার তারের তুলনা নেই;’ ফেলুদা শুক্‌তো থেকে দই পর্যন্ত একবারও মুখ খুলল না।

খাবার পর নিজনে তিনটে পান মুখে পুরে বসবার ঘরে বসতেই ফোনটা বেজে উঠল। আমিই ধরলাম। ইন্‌স্পেক্টর সোম। আমি ফেলুদার হাতে ফোনটা চালান দিলাম। ‘বলুন স্যার’-এর পর ফেলুদা কেবল দুটো কথা বলল। প্রথমে মিনিট খানেক কথা শুনে বলল, ‘তাহলে তো খুনটা বাড়ির লোকে করেছে বলেই মনে হচ্ছে’ আর ফোনটা রাখবার আগে বলল—‘ভেরি ইন্টারেস্টিং আমি আসছি।’

‘কোথায় যাচ্ছ?’ আমি জিগ্যেস করলাম।

‘মুনসী প্যালেস’, টেবিল থেকে চারমিনারের প্যাকেট আর লাইটারটা তুলে পকেটে পুরে বলল ফেলুদা।

‘খুনটা বাড়ির লোকে করেছে কেন বললেন?’ জটায়ুর প্রশ্ন।

‘কারণ নিস্তারিণী ঝি আবিষ্কার করেছে যে একটা হামানদিস্তা মিসিং। এ পারফেক্ট মার্ডার ওয়েপন।’

‘আর ইন্টারেস্টিংটা কী?’

‘মুনসীর একটা ডায়রি পাওয়া গেছে যাতে এ বছরের প্রথম দিন থেকে মারা যাবার আগের দিন পর্যন্ত এনট্রি আছে।…চলুন বেরিয়ে পড়ি।’

পেঙ্গুইন যে ডায়রিটা ছাপছিল সেটা ১৯৮৯ ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে। পলিশ যেটা পাণ্ডুলিপি খুঁজতে খুঁজতে মুনসীর শোবার ঘরে পেয়েছে, সেটাতে দৈনিক এনট্রি আছে ১৯৯০ পয়লা জানুয়ারি থেকে মুনসী মারা যাবার আগের রাত, অর্থাৎ ১৩ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ডায়রিটা সম্ভবত খাটের পাশের টেবিলে রাখা ছিল। সেখান থেকে মাটিতে পড়ে যায়। পুলিশ সেটাকে মাটিতেই পায়।

ডায়রিটা সোমের কাছ থেকে নিয়ে প্রথম পাতা খুলেই ফেলুদার চোখ কিসে আটকে গেল। কিছুক্ষণ ভ্রূকুটি করে পাতাটির দিকে চেয়ে থেকে আবার যেন সম্বিত ফিরে পেয়ে পাশে দাঁড়ানো শঙ্করবাবুকে জিগ্যেস করল, ‘আপনি জানতেন যে আপনার বাবা ডায়রি রাখার অভ্যেসটা শেষদিন পর্যন্ত চালিয়ে গেছেন?’

‘একেবারেই না। তবে শুনে যে অবাক হচ্ছি তা নয়, কারণ চল্লিশ বছর একটানা লিখে হঠাৎ বন্ধ করার তো কোনো কারণ নেই।’

‘সুখময়বাবু জানতেন এই ডায়রির কথা?’

‘সেটা ওকেই জিজ্ঞেস করুন।’

আমরা সকলে বসবার ঘরে জমায়েত হয়েছিলাম। মিনিট খানেকের মধ্যেই সুখময় চক্রবর্তী এলেন। ফেলুদা প্রশ্ন করাতে সুখময়বাবু বললেন, ‘ডাঃ মুনসী ডায়রি লিখবেন এতে আশ্চর্যের কিছু নেই, কিন্তু উনি কাজটা করতেন দিনের শেষে শুতে যাবার আগে। ডায়রিও শোবার ঘরেই থাকত নিশ্চয়ই, এই লাল বই আমি কোনোদিনই দেখিনি।’

‘বসুন।’

সুখময়বাবু দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন, ফেলুদা বলতে যেন একটু অবাক হয়েই বসলেন। আমি বুঝলাম ফেলুদা আরো কিছু জিগ্যেস করতে চায়।

‘সুখময়বাবু’, বলল ফেলুদা, ‘আপনি নিশ্চয়ই চান যে ডাঃ মুনসীর আততায়ীর উপযুক্ত শাস্তি হোক। তাই নয় কি?’

‘আমার দায়িত্ব’, বলে চলল ফেলুদা, ‘হল সেই আততায়ীকে খুঁজে বার করা। একটা কারণে এখন আমরা বুঝতে পারছি যে আততায়ী এই বাড়িতেই রয়েছেন। সেদিন আমি এই বাড়িতে যাঁরা থাকেন তাদের প্রত্যেককে জেরা করেছি। তার ফলে আমি এখনো কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি। হয়ত আমার তরফ থেকেই যথেষ্ট প্রশ্ন করা হয়নি, এবং যাদের প্রশ্ন করেছি তারা আমার সব প্রশ্নের জবাব দেননি। একটা প্রশ্ন আমি সেদিন করিনি, আজ করতে চাই।’

‘বলুন।’

‘একটা ব্যাপারে আমাদের মনে খট্‌কা জেগেছে।’

‘কী?’

‘শঙ্করবাবুর মতে ডাঃ মুনসী তাঁর লেখা এবং পেশেন্ট ছাড়া আর সবকিছু সম্বন্ধে উদাসীন ছিলেন। কিন্তু আপনি তো তাঁর পেশেন্টও নন, তাহলে আপনার প্রতি তিনি এতটা স্নেহবর্ষণ করবেন কেন? ডায়রিতে পড়েছি পাঁচ বছর আগে আপনার অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশন হয়; তার সমস্ত খরচ মুনসী বহন করেন। অপারেশনের পর আপনি দশ দিনের জন্য পুরী যান; সে খরচও তিনি বহন করেন। কেন? এর কোনো কারণ আপনি দেখাতে পারেন? এই পক্ষপাতিত্ব কিসের জন্য?’

‘জানি না।’

উত্তরটা আসতে যৎসামান্য দেরি হল সেটা নিশ্চয়ই ফেলুদা লক্ষ করেছে। সেটা তার পরের কথা থেকেই বুঝতে পারলাম।

‘আমি আবার বলছি সুখময়বাবু, আপনি সত্যি কথা বললে, বা গোপন না করলে, আমাদের কাজ অনেকটা সহজ হয়ে যায়।’

এবারে উত্তরে দেরি হল না।

‘আমি সত্যি বলছি।’

লালমোহনবাবু আমাদের নামিয়ে দিয়ে ‘টুমরো মর্নিং’ বলে গড়পার ফিরে গেলেন। ফেলুদা সোজা তার শোবার ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিল। বুঝলাম সে ডায়রিতে মনোনিবেশ করবে। ঘড়িতে এখন তিনটে পঁচিশ।

পাখাটা ফুল স্পীড করে দিয়ে সোফায় গা ছড়িয়ে শুয়ে আমি একটা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিন খুলে অ্যানটার্কটিকার বিষয় চমৎকার সব ছবি সমেত একটা লেখা পড়তে লাগলাম।

সাড়ে চারটায় শ্রীনাথ চা আনল। আমারটা টেবিলের উপর রেখে ফেলুদার ঘরের দরজায় টোকা দেবার সঙ্গে সঙ্গেই ফেলুদা বেরিয়ে এসে বলল, ‘এ ঘরেই চা দাও।’

বুঝতেই পারছি ডায়রিটা পড়া হয়ে গেছে, তাই জিগ্যেস করলাম, ‘কিছু পেলে?’

ফেলুদা কাউচে বসে পকেট থেকে ডায়রি আর চারমিনারের প্যাকেটটা বার করে টেবিলের উপর রেখে গরম চায়ে একটা ছোট্ট চুমুক দিয়ে বলল, ‘তোকে কয়েকটা আইটেম পড়ে শোনাচ্ছি। আমার মনে হয় চিন্তার খোরাক পাবি।’

আমি আগেই লক্ষ করেছিলাম। ডায়রির মাথার দিকটা দিয়ে কয়েকটা ছেঁড়া কাগজ উঁকি মারছে। ফেলুদা কোনোরকম তাড়াহুড়ো না করে একটা চারমিনার ধরিয়ে প্রথম টুকরো মার্কে ডায়রিটা খুলল।

‘শোন, এটা তিন সপ্তাহ আগের এনট্রি। আমি ইংরিজি থেকে বাংলা করছি। ‘আজ একটি নতুন পেশেন্ট। রাধানাথ মল্লিক। আমার ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসে প্রথমেই পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বার করে হাতের তেলোয় রেখে সেটার দিকে আর আমার দিকে বারকয়েক দেখে কাগজটা দলা পাকিয়ে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে ফেলে দিল। ওটা কী ফেললেন জিগ্যেস করাতে ভদ্রলোক বললেন, টেলিগ্রাফের খবর আপনার ছবি সমেত। আমি বললাম, আপনি কি যাচাই করে নিলেন ঠিক লোকের কাছে এসেছেন কিনা? এবারে একটা ছোটখাট বিস্ফোরণ হল। “আমি কাউকে বিশ্বাস করি না, কাউকেই না! যাচাই করে নিতে হবে বৈকি!”…পার্সিকিউশন মেনিয়া।’

চার পাতা পরে দ্বিতীয় এনট্রি।

‘শোন—আর. এম.-কে নিয়ে সমস্যা। সে নিজের বাড়িতে একদণ্ড টিকতে পারে না। তার দাদা, তার পড়শী সকলেই তার মনে আতঙ্কের সঞ্চার করছে। ডিফিকাল্ট কেস। আমি বলেছি কাল থেকে যেন সে আমার এখানে চলে আসে। দুটো ঘর তো খালি পড়ে আছে দোতলায়; তার একটাতেই থাকবে।’

তৃতীয় এনট্রি, এটাও দিন চারেক পরে।

‘আর, এম-কে নিয়ে সমস্যা মিটছে না। আজ ওকে কাউচে শোয়ানোর আগে ও আমার আপিসে এসে বসেছিল। আমি তখন বিলেত থেকে সদ্য আসা একটা জরুরী চিঠি পড়ছি। পড়া শেষ করে ওর দিকে চেয়ে একটা আশ্চর্য ব্যাপার দেখলাম। আমার ভারি কাঁচের পেপার ওয়েটটা হাতে নিয়ে ও কেমন যেন অদ্ভুত ভাবে আমার দিকে চেয়ে আছে। ও যদি আমাকেও ওর শত্রুপক্ষ মনে করে তাহলে তো মুশকিল।’

চার নম্বর এনট্রি।

‘আমার ওষুধের শিশিটা ভুল করে আপিস ঘরে ফেলে এসেছিলাম; রাত্রে শোবার আগে সেটা আনতে গিয়ে প্যাসেজ থেকেই বুঝলাম ঘরে বাতি জ্বলছে। ভেবেছিলাম হয়ত সুখময় কোনো কাজ করছে, কিন্তু গিয়ে দেখি শঙ্কর। সে আমার দিকে পিঠ করে ঝুঁকে পড়ে টেবিলের নীচের দেরাজটা বন্ধ করছে। আমায় দেখে ভারি অপ্রস্তুত হয়ে বলল ওর এয়ার মেল খাম ফুরিয়ে গেছে তাই এখানে আছে কিনা দেখতে এসেছিল। আমি ওকে দুটো খাম দিয়েছিলাম।…ওই দেরাজেই থাকে আমার পাণ্ডুলিপি।’

এরপরে একেবারে শেষ পাতায় শেষ এনট্রি। এর সঙ্গে রাধাকান্ত মল্লিকের কোনো যোগ নেই, আর এটা সত্যিই রহস্যজনক।

‘কী ভুলই করেছিলাম!…যাক্‌, তবু যে ভুলটা ভেঙেছে! কিন্তু “আর”-এর জের কি তাহলে অনির্দিষ্টকাল ধরে চলবে? নাকি ওটা নিয়ে অযথা চিন্তা করছি?’

ফেলুদা ডায়রিটা বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘অদ্ভুত কেস!’

‘তার মানে রহস্যের জট এখনো ছাড়াতে পারনি?’

‘না, তবে কীভাবে প্রোসীড করতে হবে তার একটা ইঙ্গিত পেয়েছি। এবার কিছু দৈহিক পরিশ্রম আছে। রুটিন এনকোয়ারি। তুই জটায়ুকে ফোন করে বলে দে কাল যেন সকালে না এসে বিকেলে আসেন। সকালে আমি থাকছি না।’

ফেলুদা পরদিন সকাল আটটায় বেরিয়ে আড়ইটেয় ফিরল। ও নাকি বাইরেই লাঞ্চ সেরে নিয়েছে। কাজ হল কিনা জিজ্ঞেস করতে ঠিক ভরসা পাচ্ছিলাম না। কারণ ওর মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা লক্ষ করছিলাম; তার মানে সাক্সেস না ফেইলিওর সেটা বুঝতে পারছিলাম না।

ফেলুদা সোফায় বসার আগে দুটো ফোন করল, একটা শঙ্কর মুনসীকে, অন্যটা ইন্‌স্পেক্টর সোমকে। দুজনকেই একই ইনস্ট্রাকশন, আগামীকাল সকাল দশটায় সুইনহো স্ট্রীটে বৈঠকে সবাই যেন উপস্থিত থাকে।

এবার একটা চারমিনার ধরিয়ে ফেলুদা সোফায় বসে সামনের টেবিলের উপর পাটা ছড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আমারও মুনসীর মতো বলতে ইচ্ছা করছে, কী ভুলই করেছিলাম!…রহস্য উদ্ঘাটনের চাবি সবকটা চোখের সামনে পড়ে আছে, অথচ দেখতে পাচ্ছিলাম না।’

আমি একটা কথা না জিগ্যেস করে পারলাম না।

‘অপরাধীকে আমরা চিনি তো?’

‘নিশ্চয়ই’, বলল ফেলুদা। ‘তোর যখন এত কৌতূহল, তখন আমি তোকে কয়েকটা প্রশ্ন করছি যেগুলোর উত্তর ঠিকমতো দিতে পারলে হয়ত তুই নিজেই সমস্যার সমাধান করতে পারবি।’

আমি চুপ, বুক ঢিপ ঢিপ।

‘এক, নতুন ডায়রিটায় লক্ষ করার মতো বিশেষ কিছু দেখলি?’

‘একটা ব্যাপারে খটকা লাগল।’

‘কী?’

‘খুনের আগের রাত পর্যন্ত ডায়রি লিখে গেছেন ভদ্রলোক, কিন্তু “আর” আসার কোনো উল্লেখ নেই।’

‘এক্সলেন্ট! দুই, বিসর্জন কথাটা বলতে প্রথমেই কী মনে হয়?’

‘নাটক। রবীন্দ্রনাথ।’

‘হল না।’

‘দাঁড়াও দাঁড়াও! জল…জলে কিছু ফেলে দেওয়া।’

‘গুড। তিন, নেমেসিস কাকে বলে জানিস?’

‘নেমেসিস?’

‘হ্যাঁ।’

‘ইংরিজি কথা?’

‘উঁহু। গ্রীক।’

‘ওরে বাবা, সে কী করে জানব?’

‘তাহলে শিখে নে। অপরাধ করে যে শাস্তি সাময়িকভাবে এড়িয়ে গেলেও একদিন-না-একদিন ভোগ করতেই হয়, তাকে বলে নেমেসিস। এই নেমেসিস-এরই ভয় পাচ্ছিল “এ”, “জি” আর “আর”।’

আমার ব্যাপারটা খুবই ইন্টারেস্টিং লাগছিল, তাই ফেলুদা চুপ করে আছে দেখে বললাম, ‘আরো আছে?’

‘আর একটা বলব। বেশি বললে কালকের নাটকটা জমবে না।’

‘ঠিক আছে।’

‘ফিজিশিয়ান হীল দাইসেল্‌ফ, মানে জানিস?’

‘এ তো ইংরিজি প্রবাদ, ডাক্তার, আগে নিজের ব্যারাম সারাও।’

‘আরেকটা শেষ কথা বলে দিচ্ছি তোকে, “সাজা” কথাটার অনেকগুলো মানে পাবি অভিধানে, তার মধ্যে দুটো মানে নিয়ে আমাদের কারবার।’

‘বুঝেছি।’

চা দেবার মিনিট দশেক আগে জটায়ু এসে হাজির। কাউকে বসেই প্রথম প্রশ্ন হল, ‘আমরা কোন স্টেজে আছি?’

উত্তরে ফেলুদা ‘মিনার্ভা’ বলে লালমোহনবাবুকে অসম্ভব ভ্রূকুটি করতে দেখে বলল, ‘পেনালটিমেট।’

‘পেনালটি, কী বললেন?’

‘আপনার ইংরিজিটা আর রপ্ত হল না কিছুতেই। পেনালটিমেট মানে লাস্ট বাট ওয়ান।’

‘লাস্ট স্টেজে পৌঁছাচ্ছি কবে?’

‘কাল সকাল দশটায় মুনসী প্যালেসে সর্বসমক্ষে যবনিকা উত্তোলন।’

‘আর পতন?’

‘ধরুন, তার আধ ঘন্টা বাদে।’

‘চারজনের উপর তো সন্দেহ—’

‘হ্যাঁ, ইনি, মিনি, মাইনি, মো।’

‘উঃ, কথায় কথায় আপনার এই প্রগল্‌ভতা অসহ্য। এইটে অন্তত বলুন যে শঙ্কর, সুখময়, রাধাকান্ত—’

ফেলুদা হাত তুলে বাধা দিয়ে বলল, ‘আর স্পিক-টি-নট। এইখানেই দাঁড়ি।’

‘আপনি দিন দাঁড়ি। আমার বলা শেষ হয়নি। নাটকের ক্লাইম্যাক্স আমার হাতে, আপনার হাতে নয়। এটা ওয়ার্নিং দিয়ে দিলুম।’

‘আপনি যে ভয় পাইয়ে দিচ্ছেন।’

‘ভয়ের কিস্যু নেই। আপনার সিংহাসন কেউ টলাতে পারবে না। আর তারিফের সিংহভাগ আপনিই পাবেন তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সিংহাসনের পাশে একটি ছোট্ট স্পেশাল আসন, আর তারিফের পাশে একটি মিনি-তারিফ, এ দুটো আমার বরাদ্দ থাকবেই।’

পরদিন ভোরে এক পশলা বৃষ্টি হওয়াতে আমাদের পাড়াতে কিছুটা জল জমেছিল, তাও ঠিক সাড়ে নটার সময় বগলে ছাতা, কাঁধে ঝোলা আর মুখে হাসি নিয়ে লালমোহনবাবু এসে হাজির। ‘তপেশ ভাই’, কাউচে বসে বললেন ভদ্রলোক, ‘জগন্নাথকে বোলো যেন আজ খিচুড়ি করে। নাটকের পর মধ্যাহ্নে ভোজনটা এখানেই সারব।’

চা খেয়ে দশটার পাঁচ মিনিট আগেই আমরা সুইনহো স্ট্রীটে পৌঁছে গেলাম। আমাদের আগেই পুলিশ হাজির; ইন্‌স্পেক্টর সোম ফেলুদাকে গুড মর্নিং করে বললেন, ‘আমি আপনার মেথড তো জানি। তাই সকলকেই বৈঠকখানায় জমায়েত হতে বলে দিয়েছি, বেয়ারা বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছে, কেবল মিসেস মুনসীরও থাকার দরকার কিনা সেটা জানার ছিল।’

ফেলুদা মাথা নেড়ে বলল, ‘উনি না থাকাটাই বাঞ্ছনীয়।’

সবাই যে যার জায়গা নিয়ে বসতে না বসতে একতলায় বড় ঘড়িতে ঢং ঢং করে দশটা বাজল। ফেলুদা উঠে দাঁড়িয়ে একবার চারদিকে দেখে নিয়ে ঘড়ির শেষ ঢং-এর রেশটা মিলিয়ে যেতেই কথা আরম্ভ করে দিল।

‘আমি প্রথমেই শঙ্করবাবুকে একটা প্রশ্ন করতে চাই।’

শঙ্করবাবু ঘরের উল্টোদিকে বসেছিলেন। তাঁর দৃষ্টি ফেলুদার দিকে ঘুরল। ফেলুদা বলল, ‘আমি সেদিন যখন বললাম যে ডাঃ মুনসী তাঁর ডায়রিতে অনেকবার আপনার উল্লেখ করেছেন, তা শুনে আপনি বিস্মিত হন। এবং আমি যখন বললাম যে তিনি আপনার সম্বন্ধে নিশ্চয় সত্যি কথাই বলেছেন তখন আপনি বেশ বিরক্ত হয়েই বললেন, “বাবা আমাকে চিনলেন কবে, কীভাবে, তিনি তাঁর তো রুগী নিয়েই পড়ে থাকতেন।” শঙ্করবাবু আপনি কেন ধরে নিলেন যে বাবা আপনার সম্বন্ধে অপ্রিয় কথাই বলেছেন? আমি তো কিছুই বলিনি।’

‘কারণ বাবা সামনা-সামনি আমার কখনো প্রশংসা করেননি।’

‘নিন্দে করেছেন কি?’

‘না, তাও করেননি।’

‘তাহলে আপনিই বা আপনার সম্বন্ধে ডাঃ মুনসীর প্রকৃত মনোভাব কী করে জানলেন?’

‘ছেলে তার বাবার মন জানবে না কেন? সে তো অনুমান করতে পারে।’

‘বেশ, এবার আরেকটা কথায় আসি। আমি গতকাল দুপুরে একবার আপনাদের এখানে এসেছিলাম। এ বাড়িতে ভৃত্যস্থানীয় যারা আছে তাদের ডেকে ডেকে আমি কয়েকটা প্রশ্ন করি। একটা প্রশ্ন আপনাকে নিয়ে; সেটার উত্তর দেয় আপনাদের মালি গিরিধারী। প্রশ্নটা ছিল, আপনার বাবার খুনের দিন সে আপনাকে ভোরে বেরোতে দেখেছিল কিনা। মালি বলে, হ্যাঁ দেখেছিল। তখন আমি জিগ্যেস করি আপনি খালি হাতে বেরোন কিনা। উত্তরে মালি বলে, না। আপনার হাতে একটা কালো চামড়ার ব্যাগ ছিল। বর্ণনায় বুঝি সেটা ব্রীফকেস বা পোর্টফোলিও জাতীয় ব্যাগ। এই ব্যাগে কী ছিল সেটা বলবেন কি?’

শঙ্করবাবু চুপ। তাঁর নিশ্বাস জোরে জোরে পড়তে শুরু করেছে।

‘আমি বলব কী ছিল?’ বলল ফেলুদা। শঙ্করবাবু নিরুত্তর। ফেলুদা বলল, ‘ব্যাগে ছিল আপনার বাবার ডায়রির পাণ্ডুলিপি। ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করে, বা করার আগে, আপনি সেটা লেকের জলে বিসর্জন দেন তবে তার কারণ’, ফেলুদার গলা চড়ে ওঠে, ‘আপনি ডায়রিটা পড়ে দেখেছেন যে আপনার বাবা আপনার সম্বন্ধে একটিও প্রশংসাসূচক কথা বলেননি। তিনি—’

ফেলুদার গলা ছাপিয়ে শঙ্করবাবু বলে উঠলেন, ‘ইয়েস, ইয়েস! এই বই ছাপা হলে আমার রোজগারের রাস্তা চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যেত। অলস, উদ্যমহীন, ইরেসপন্‌সিব্‌ল, অস্থিরমতি, কী না বলেননি উনি আমাকে!’

‘রাইট’, বলল ফেলুদা। ‘তাহলে এটাও স্বীকার করুন যে সেদিন গলার স্বর পালটিয়ে “আর”-এর ভূমিকা নিয়ে আপনিই আমাকে ফোনটা করে আপনার বাবা সম্বন্ধে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে কথা বলেছিলেন, সন্দেহ যাতে আপনার উপর না পড়ে?’

শঙ্করবাবু দাঁড়িয়ে উঠেছিলেন, এবার ধপ্‌ করে বসে পড়লেন।

‘“আর”-এর কথাই যখন উঠল’, বলল ফেলুদা, ‘তখন ব্যাপারটা আরেকটু তলিয়ে দেখা যাক।’

ফেলুদার দৃষ্টি এবার বাঁয়ে বসা সুখময়বাবুর দিকে ঘুরল।

‘আমি এবার আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই।’

‘করুন।’

‘ইংরিজিতে যাকে হাঞ্চ বলা হয়, সেই হাঞ্চের উপর নির্ভর করে আমি গতকাল সকালে একবার সাঁইত্রিশ নম্বর বেলতলা রোডে যাই। সকলের অবগতির জন্য বলছি। এটা হল সুখময়বাবুর বাড়ির নম্বর। আমার মনে হচ্ছিল উনি কিছু তথ্য গোপন করে যাচ্ছেন, এবং হয়ত ওঁর বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বললে কিছুটা আলোর সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।’

ফেলুদার দৃষ্টি ঘুরে গিয়েছিল, এখন আবার ফিরে এল সুখময়বাবুর দিকে।

‘আপনার মা-র সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি আপনার বাবার মৃত্যু হয় চব্বিশ বছর আগে, গাড়ি চাপা পড়ে।…এই তথ্যটি কি ডাঃ মুনসী জানতেন?’

দৃষ্টি মেঝে থেকে না তুলেই উত্তর দিলেন সুখময়বাবু।

‘জানতেন। ইন্টারভিউ-এর সময়, আমার বাবা সাঁইত্রিশ বছর বয়সে মারা যান জেনে ডাঃ মুনসী জিগ্যেস করেন কিসে তাঁর মৃত্যু হয়।’

‘খুব সতর্ক লোকেরও কেমন ভুল হয় তার একটা উদাহরণ দিই। শঙ্কর মুনসী যখন আমার বাড়িতে আসেন তখন তিনি নিজের পরিচয় দিতে বলেন যে তিনি ডাঃ রাজেন মুনসীর ছেলে। এই রাজেন নামটা আমার মাথা থেকে বেমালুম লোপ পেয়ে যায়; যেটা থেকে যায় সেটা হল “ডাঃ মুনসী”। কাল ওঁর লাল ডায়রি খুলে প্রথম পাতাতেই “আর মুনসী” দেখে আমি চমকে উঠি। তাহলে কি ডাঃ মুনসী নিজেই তাঁর ডায়রির “আর”, এবং তিনিই গাড়ি চাপা দিয়ে লোক মেরে চতুর্দিকে ঘুষ দিয়ে আইনের কবল থেকে নিজেকে বাঁচান, আর সেই মৃত ব্যক্তিরই ছেলে তাঁরই কাছে আসে চব্বিশ বছর পরে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে?’

‘ভুল, ভুল, ভুল!’ চেঁচিয়ে উঠলেন সুখময়বাবু। ‘আমার বাবাকে যিনি চাপা দেন তাঁর উপযুক্ত শাস্তি হয়।’

‘সে কথা কি ডাঃ মুনসী জানতেন?’

‘না। তাঁর ধারণা ছিল তিনিই আমার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী। আসল ঘটনা তিনি জানতে পারেন মৃত্যুর আগের দিন।’

‘কীভাবে?’

‘উনি আমাকে ডেকে বলেন যে ওঁর একটা স্বীকারোক্তি করার আছে যেটা না করলে উনি শান্তি পাবেন না। স্বীকারোক্তিটা কী জানতে পেরে আমি বলি, ডাঃ মুনসী, আপনি ভুল করছেন; আমার বাবাকে যিনি চাপা দেন তাঁর শাস্তি হয়েছিল। কথাটা শুনে উনি স্তম্ভিত হয়ে যান। আর আমিও বুঝতে পারি কেন তিনি আমার উপর এত সদয় ছিলেন।’

ঘরের উল্টোদিক থেকে একটা ছোট্ট, শুক্‌নো হাসি শোনা গেল। শঙ্করবাবু।

‘কিছু বলবেন?’ ফেলুদা জিগ্যেস করল।

‘না বললে আপনি আরো বেশি ভুল পথে গিয়ে পড়বেন।’

‘মানে?’

‘আমার বাবা জীবনে কখনো গাড়ি চালাননি।’

‘সে তথ্য আমার অজানা নয়, শঙ্করবাবু। মালির সঙ্গে কথা বলার পর আপনার ড্রাইভারের সঙ্গে আমার কথা হল।’

‘সে কী বলে?’

‘ত্রিশ বছর সে আপনাদের ড্রাইভারি করছে, তার মধ্যে সে মাত্র একটা অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। তাতে আপনার বাবার তাড়া ছিল বলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও জনবহুল রাস্তায় তাকে জোরে গাড়ি চালাতে হচ্ছিল। তাই যখন দুর্ঘটনাটা ঘটে তখন ডাঃ মুনসী খানিকটা নিজেকেই দায়ী করেন। ড্রাইভারের যাতে দণ্ড না হয় তার জন্য তিনি যা করবার সবই করেছিলেন। তা সত্ত্বেও ড্রাইভারের অনুতাপ আর আতঙ্ক কিছুতেই যাচ্ছিল না। তখন ডাঃ মুনসী তার চিকিৎসা করে তাকে ভালো করে তোলেন। অর্থাৎ আপনার বাবা ডায়রিতে একটুও মিথ্যে লেখেননি। এবং “আর” হচ্ছে নট রাজেন মুনসী, বাট ড্রাইভার রঘুনন্দন তেওয়ারি।’

‘বাট হু কিল্‌ড মাই ফাদার?’ অসহিষ্ণুভাবে চেঁচিয়ে উঠলেন শঙ্কর মুনসী।

‘এসব ব্যাপারে একটু ধৈর্য ধরতে হয়, মিঃ মুনসী’, গম্ভীর স্বরে বলল ফেলুদা। তারপর মুনসীর দিক থেকে তার দৃষ্টি ঘুরে একটি অন্য ব্যক্তির উপর গিয়ে পড়ল। ‘এ ঘরে একজন ব্যক্তি আছেন যাঁকে আমরা অসুস্থ বলে জানি’, বলল ফেলুদা। ‘এর আগে তিনি দুবার আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছেন, এবং দুবারই নানান অঙ্গভঙ্গির সাহায্যে নিজেকে অসুস্থ বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছেন। আজ তাঁকে দেখছি তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষের চেহারা নিয়ে আমার ভাষণ শুনছেন। মিঃ মল্লিক—আপনি কি আপনা থেকেই সেরে গেলেন?’

রাধাকান্ত মল্লিক হঠাৎ যেন শক্ খাওয়া মানুষের মতো চমকে উঠলেন। —‘কী—কী বলছেন বলুন।’

‘বলছি যে আমার জেরায় সকলেই অল্পবিস্তর মিথ্যা বলেছেন বা সত্য গোপন করে গেছেন, কিন্তু আপনি সবাইকে টেক্কা দিয়েছেন।’

মল্লিক এখনো এক দৃষ্টে ফেলুদার দিকে চেয়ে, তার মনের ভাব বোঝার কোনো উপায় নেই। ফেলুদা বলল, ‘আপনি বলেছিলেন পপুলার ইনশিওরেন্সে কাজ করেন। আমি সেটা ভেরিফাই করতে সেখানে গিয়েছিলাম। গিয়ে শুনলাম আপনি আর সেখানে নেই, চার মাস হল ছেড়ে দিয়েছেন। আপনি কি তাহলে বেকার। না অন্য কোথাও কাজ করছেন? ইনশিওরেন্সি অফিসে এ প্রশ্নের জবাব কেউ দিতে পারল না বলে আপিস থেকেই আপনার বাড়ির ঠিকানা জোগাড় করে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। সতীশ মুখার্জি রোড, তাই না?’

মল্লিক এখনো চুপ, তার দৃষ্টি সামনের দিকে।

‘সত্য, এ মামলায় বিস্ময়ের শেষ নেই’, বলে চলল ফেলুদা। ‘আপনি ডাঃ মুনসীকে বলেছিলেন আপনার বাবা, আপনার দাদা, সকলেই আপনার মনে আতঙ্কের সঞ্চার করেছে। অথচ আপনার বাড়ি গিয়ে দেখি আপনার বাবা দাদা, কেউই নেই। বাবা মারা গেছেন প্রায় পঁচিশ বছর হল, আর দাদা বলে কেউ কোনোদিন ছিলই না। আপনার বিধবা মা-র কাছ থেকে জানি যে আপনি একটা যাত্রা কোম্পানিতে যোগ দিয়েছেন এবং বর্তমানে টুরে আছেন।’

এবার রাধাকান্ত মল্লিক মুখ খুললেন।

‘আমি যে সত্যবাদী যুধিষ্ঠির এটা আমি কোনোদিনই ক্লেম করিনি। কিন্তু আপনি কী বলতে চান? আমি খুন করেছি?’

‘আমি ধাপে ধাপে এগোই, মল্লিক মশাই, লাফে লাফে নয়। আপনি খুনী কিনা সে ব্যাপারে পরে আসছি; প্রথমে দেখছি আপনি প্রবঞ্চক। মনোবিকারের অভিনয় করে আপনি মুনসীর কাছে এসেছিলেন চিকিৎসার জন্য। আপনি—’

‘কেন এসেছিলাম সেটা জানেন আপনি?’ ফেলুদাকে বাধা দিয়ে জোরালো গলায় বললেন মল্লিক।

‘এটা আপনার মা-র কাছ থেকে জানি যে আপনার বাবা গাড়ি চাপা পড়ে মারা যান, যিনি চাপা দেন তাঁর কোনো শাস্তি হয়নি, এবং গাড়ির মালিক এসে আপনার মা-র হাতে পাঁচ হাজার টাকা তুলে দেন ক্ষতিপূরণ হিসেবে।’

‘ইয়েস!’ চেঁচিয়ে উঠলেন রাধাকান্ত মল্লিক। ‘তখনই দেখি আমি ভদ্রলোককে, আর তারপরে ছবি দেখি কাগজে এই সেদিন। সেই একই চেহারা, আর দেখেই স্থির করি যে একে বাঁচতে দেওয়া চলে না। কল্পনা করতে পারেন? একটি বারো বছরের ছেলে, বাবার পিছনে পিছনে ট্রাম থেকে নামছে। চোখের সামনে বাবা মোটরের তলায় তলিয়ে গেল! ওঃ, কী ভয়ংকর দৃশ্য! আজও মনে পড়লে শরীর শিউরে ওঠে। মাসের পর মাস ধরে মা-কে জিগ্যেস করেছি, যে লোকটা বাবাকে চাপা দিল তার শাস্তি হবে না? “বড় লোকদের শাস্তি হয় না! বাবু, বড় লোকেরা পার পেয়ে যায়।”…আর তারপর হঠাৎ খবরের কাগজে ছবি! এক মুহূর্তে মনস্থির করে ফেলি। এর শাস্তি হবে। আর সে শাস্তি দেব আমি।’

তারপরেই মনোবিকারের অভিনয় করার সিদ্ধান্ত?’

‘হ্যাঁ, কিন্তু খুন করা যে এত কঠিন কে জানত? বুঝতে পারছিলাম এ জিনিস চট করে হবার নয়; সময় লাগবে আমার মনকে শক্ত করতে। শেষকালে মন শক্ত হল, অস্ত্র জোগাড় হল…মুনসীরই আপিস ঘরের একটা পেপার নাইফ। বাবার দেহ থেকে যে রক্ত বেরোতে দেখেছি। তাঁর হত্যাকারীর দেহ থেকেও রক্তপাত না হলে উপযুক্ত শাস্তি হবে না। তারপর—’

‘তারপর কী, মল্লিকমশাই?’

‘অদ্ভুত ব্যাপার, অদ্ভুত ব্যাপার! ছোরা হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকেছি। পশ্চিমের জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে মুনসীর উপর পড়েছে। মুখ হাঁ, আধ খোলা চোখে নিষ্প্রাণ চাউনি। নিশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ নেই! আমি খুন করব কি? সে লোক তো অলরেডি, ডেড, ডেড, ডেড!’

তৃতীয় ‘ডেড’ কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে একটা ধুপ করে শব্দ হল।

সেটার কারণ হচ্ছে ডাঃ মুনসীর শালা চন্দ্রনাথবাবু। তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে চেয়ার থেকে উল্টে মেঝেতে পড়েছেন।

সোম তাঁর দিকে দৌড়ে গেলেন। আর সেই সঙ্গে ফেলুদা বলে উঠল, ‘দেখে নিন, মিঃ মুনসী। আপনার মামা, আপনার মা-র যমজ ভাই। হি কিল্‌ড ইওর ফাদার!’

‘মানে?’ হঠাৎ থাকতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠলেন জটায়ু, ‘মোটিভ?’

ফেলুদার দৃষ্টি আবার শঙ্করবাবুর দিকে গেল। ‘আপনি বলতে পারেন না, শঙ্করবাবু? আপনি তো ডায়রিটা পড়েছেন?’

শঙ্করবাবু ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন।

‘মানুষকে চেনা অত সহজ নয়, শঙ্করবাবু’, বলল ফেলুদা। ‘জানোয়ারের সঙ্গে মানুষের আসল তফাত, জানোয়ার ভান করতে জানে না, অভিনয় জানে না, মনের ভাব লুকোতে জানে না। …ডাঃ মুনসী আপনার মা সম্বন্ধে মোটেই উদাসীন ছিলেন না। থাকলে ডায়রিটা তাঁকে কখনই পড়তে দিতেন না। কখনই সে ডায়রি তাঁকে উৎসর্গ করতেন না। ব্যাপারটা আসলে উল্টো। ঔদাসীন্য যদি কারুর তরফ থেকে হয়ে থাকে তিনি হলেন আপনার বিমাতা, যিনি তাঁর সমস্ত স্নেহ, ভালোবাসা, চিন্তা, ভাবনা, ঢেলে দিয়েছিলেন তাঁর অকর্মণ্য ভাইয়ের উপর।’

‘…এবার খুনের মোটিভটা কী? সেটা কি একবার সমবেত সকলকে বলবেন?’ প্রায় যান্ত্রিক মানুষের মতো কথা বেরোল শঙ্করবাবুর মুখ থেকে।

‘বাবার উইলে চার ভাগ পাবে মনস্তাত্ত্বিক সংস্থা, চার ভাগ আমি, আর আট ভাগ আমার মা।’

ইতিমধ্যে মিঃ সোমের পরিচর্যায় চন্দ্রনাথবাবুর জ্ঞান ফিরেছে। ফেলুদা তাকে উদ্দেশ করে প্রশ্ন করল, ‘খুন করার সিদ্ধান্ত কি আপনার?’

চন্দ্রনাথবাবু মাথা নাড়ালেন, তাঁর দৃষ্টি মেঝের কার্পেটের দিকে। একটা দীর্ঘশ্বাসের পর কথা বেরোল, এত ক্ষীণ, যে বেশ কষ্ট করে বুঝতে হয়।

‘না। সিদ্ধান্ত…ডলির। ডলিই আমার হাতে…হামানদিস্তা তুলে দেয়!’

‘হুঁ, বুঝেছি।’ ফেলুদা যেন বেশ ক্লান্তভাবেই চেয়ারে বসে পড়ল। ‘শুধু একটা আপসোস, গভীর আপসোস…ডায়রিটা বেরোলে নিঃসন্দেহে সাহিত্যিক হিসাবে ডাঃ মুনসীর সুনাম হত। সেই ডায়রি এখন সলিলগর্ভে!’

‘অ্যাটেনশন! স্পটলাইট!’

ঘর কাঁপিয়ে সবাইকে চমকে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন জটায়ু। সবাই তাঁর দিকে দেখছে দেখে একটা অদ্ভুত হাসি হেসে কাঁধের ঝোলা থেকে একটানে একটা ফাইল বার করে সেটাকে মাথার উপর তুলে ঝাণ্ডার মতো নাড়াতে নাড়াতে বললেন, ‘জলে যায়নি! জলে যায়নি! হিয়ার ইট ইজ!’

‘ডাঃ মুনসীর পাণ্ডুলিপি?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল ফেলুদা। ‘সেটা কী করে হয়?’

‘ইয়েস স্যার! থ্যাঙ্কস টু বিজ্ঞানের অগ্রগতি। একদিনে পড়া হবে না বলে এটা জিরক্স করিয়ে রেখেছিলাম, জিরক্স! এক্স ই আর ও এক্স!…নিন সুখময়বাবু, টাইপিং শুরু করে দিন, শেষ হলে পর সোজা নর্থ পোল।’

এখানে অবিশ্যি একটা জটায়ু মার্কা ভুল হল, পেঙ্গুইন নর্থ পোলে থাকে না, থাকে সাউথ পোলে।

অধ্যায় ১২ / ১২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%