দেবাশিস পাঠক
বরফে বরফে ঢেকে গিয়েছে উপত্যকা। চরাচর মুড়ে গিয়েছে সাদা আস্তরণে। প্রাসাদের সামনে গাছগুলোর ডালে ডালে এখন তুষার নাচন ৷
আকাশে আলো ফুটেছে। কিন্তু সূর্যোদয়ের বর্ণিল প্রকাশ এখনও অগোপন। প্রাসাদের বাইরে তাকিয়ে মনটা ফের বরফ ঢাকা শৈত্যে জবুথবু হয়ে গেল লোহারার রানির।
লোহারা। পিরপঞ্জাল পর্বতশ্রেণির মধ্যে অবস্থিত এই রাজ্য। হিমালয়ের পশ্চিমাংশে এই পর্বতশ্রেণির দু'পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে দুটি নদী, বিতস্তা আর নীলম ।
রানি নিজে অবশ্য কাবুলের মেয়ে। সেখানকার শাহী বংশের রাজকন্যা। মহাভারতের গান্ধারী যেখান থেকে বিয়ে হয়ে এসেছিলেন এই দেশে, সেখানেই জন্মেছেন রানি। ভীমদেব শাহীর কন্যা তিনি, এ নিয়ে মনে মনে প্রচ্ছন্ন গর্বও আছে তাঁর।
এসব আগডুম বাগডুম ভাবতে ভাবতে চোখ পড়ল পাশটাতে। এখনও গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে দিদ্দা। রানির চোখ তার উপর পড়তেই, চোখ পিট পিট করে তাকাল সে। ফুটফুটে মেয়েটার দিকে তাকালেই মনটা কেমন নরম আর পবিত্র হয়ে যায়, ভাবলেন রানি।
মেয়ে তাঁকে দেখছে, টের পেয়েই তিনি বলে উঠলেন, ‘সুপ্রভাত দিদ্দা।' 'সুপ্রভাত মা।'
‘এরকম একটা সকালেই তোকে জন্ম দিয়েছিলাম, জানিস।'
‘জানি মা। সেদিনকার সকালের গল্প শুনতে শুনতে আমার মুখস্থ হয়ে গেছে।' হেসে ফেলেন রানি। দিদ্দা বলে চলে।
‘তখনও আঁধার কাটেনি। রাতের ঘন তমিস্রা আর বর্ণিল উষার মধ্যবর্তী কোনও একটা সময়। তুমি তখন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলে। প্রতি মুহূর্তে তোমার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি মরে যাবে।'
“ঠিক তাই, দিদ্দা। তবে আমি মরিনি। ঠিক যখন ভাবছিলাম, এবার হাল ছেড়ে দেব, মৃত্যুর হাতে সঁপে দেব নিজেকে, তখনই তুই এলি।'
‘জানি মা। ঠিক তখনই ধাই আমাকে দু'হাতে তুলে নিয়ে দেখাল তোমাকে। বলল, ‘দেখুন রানি মা, আপনার মেয়ে হয়েছে।'
ছোট্ট দিদ্দার মুখে তারই জন্মবৃত্তান্তের বিবরণ শুনে হেসে ফেলেন রানি। সত্যিই, একই কাহিনি বারবার শুনে মেয়েটার মুখস্থ হয়ে গেছে।
ভাবতে ভাবতে পুঁচকে দিদ্দার গায়ে হাত বুলোতে থাকেন রানি। দিদ্দার পোশাকের নীচ দিয়ে হাত পৌঁছয় তার পায়ে। দিদ্দার মুখটা বদলে যায়। এক লহমা আগের হাসিখুশি ভাবটা উধাও হয়ে গিয়ে ফুটে ওঠে যন্ত্রণার আভাস। রানি জানেন, এ যন্ত্রণা শারীরিক নয়, মানসিক।
দিদ্দার পায়ের পাতাটা পূর্ণ গঠিত নয়। বাঁ পায়ের পাতাটা ডানদিকে বাঁকানো। আঙুলগুলোও মাঝখান থেকে নীচের দিকে মোড়া। মেয়েটা কোনওদিন স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে চলতে পারবে না, দৌড়ানো তো অনেক দূরের কথা ।
চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চলে আসে রানির।
বাইরে তখন ফের তুষারপাত শুরু হয়েছে। চারদিকে তাকালেই মনে হচ্ছে একদল খচ্চরের পিঠে সাদা বস্তা রাশি রাশি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একটা পরতের পর আর এক পরত। একটা বস্তার উপর আর একটা বস্তা।
ভেতরে আগুনের চুল্লিতে কাঠের শোঁ শোঁ আওয়াজ ।
এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে দিদ্দার পায়ের ওপর থেকে হাতটা সরিয়ে নেন রানি। ‘কেন আমি এমন খুঁত নিয়ে জন্মালাম মা?' অজস্রবার প্রশ্নটা করেছে দিদ্দা। করা শুরু করেছে সেই যবে থেকে সে কথা বলতে শুরু করেছে, তবে থেকে । আজও আরও একবার প্রশ্নটা করল সে। ভুরু কুঁচকে। মুখটা বেঁকিয়ে। তার নিজস্ব অস্বস্তি প্রাণপণ ফুটিয়ে তুলে।
আগে যতবার এই প্রশ্নের মুখে পড়েছেন রানি, ততবার যে উত্তর দিয়েছেন, আজও সেই উত্তরটাই দিলেন। ‘সবই ঈশ্বরের ইচ্ছা।'
দিদ্দার দু'চোখ জলে ভরা। সেটা আড়াল করতে মুখ ঘোরাল সে। রানি দু'হাতে তার মুখটা ধরলেন। তারপর দৃঢ়স্বরে বললেন, ‘কাঁদে না দিদ্দা। তোমার শারীরিক খুঁত নিয়ে কান্নাকাটি ঝগড়াঝাঁটি না করে, সেটাকে মেনে নিতে শেখো, সোনা।' দু'হাত দিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিলেন রানি ছোট্ট দিদ্দার গাল থেকে। তারপর ফের আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি মহীয়সী হতে জন্মেছ দিদ্দা, এক সফল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে তোমার জন্য। সে কথা কি তোমার জানা নেই, বেটি?
দিদ্দা ততক্ষণে চোখের জল ঝরানো থামিয়ে ফেলেছে। সামলে নিয়েছে নিজেকে। তার জননীকণ্ঠে তখন কেবলই স্নেহের আর্দ্রতা। রানি বলে চলেন, ‘একদিন না একদিন তুমি খুউব বড় হবে দিদ্দা। হবেই। কেউ তোমাকে আটকাতে পারবে না। শুধু একটু ধৈর্য ধরতে হবে।'
দিদ্দার মনে পড়ে যায় তার অযুতবার শোনা গল্পের কথা। তার জন্মের সময়কার ঘটনাবলির কথা। এই কথাগুলো তাকে কাঁদায়, ভাবায়, আত্মবিশ্বাস জোগায়।
খুঁতো, তায় আবার কন্যাসন্তান। জন্মের পরেই গলা টিপে মেরে ফেলাটাই ছিল তার অনিবার্য নিয়তি। তবু দিদ্দা যে বেঁচে গিয়েছিল তার কারণ এক দীর্ঘকায়, ভয়ানক দর্শন ব্যক্তি। আচার্য তুঙ্গদেব। জ্যোতিষশাস্ত্রবিদ। সনাতন শাস্ত্রে সুপণ্ডিত। তন্ত্রবিদ্যাতেও ৷ কন্যার জন্মের পর তাঁকেই ডেকে পাঠিয়েছিলেন লোহারার রাজা সিংহরাজ। রাজসভায় এলেন তুঙ্গদেব। জানলেন কন্যার জন্মক্ষণ এবং জন্মের সময়কার খুঁটিনাটি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। তারপর বসলেন গণনায়।
সিংহরাজ তখন অস্থির। এই পঙ্গু কন্যাকে বিসর্জন দিতে তিনি মনেপ্রাণে তৈরি। অন্যদিকে রানি আশঙ্কায় উদ্বেল। এই বুঝি মহাপণ্ডিত তুঙ্গদেব ঘোষণা করলেন, নবজাতিকা অলক্ষুণে। তাকে বর্জন করাটাই রাজার পক্ষে মঙ্গলজনক হবে।
সিংহরাজ অনর্গল তুঙ্গদেবের কানের কাছে ফিসফিস করে বলে চলেছিলেন, ‘আচার্যদেব ! আপনি একবার বলুন। আপনি বললেই এই অশুভ লক্ষণযুক্ত নবজাতিকাকে শ্বাসরোধ করে শেষ করে দেওয়ার আদেশ দিতে আমি এতটুকু ইতস্তত করব না । আপনি একবার কেবল বলুন।'
কোনও উত্তর দিচ্ছিলেন না আচার্য তুঙ্গদেব ।
তারপর হঠাৎ, বজ্রনিনাদের মতো ঘোষণা করলেন, ‘নবজাতিকা প্রতিবন্ধী নয়, দিব্যাঙ্গ বিশিষ্ট। কুলক্ষণা নয়, সুলক্ষণা। অতি শুভ লগ্নে জন্ম এই জাতিকার। জন্ম মুহূর্তের গ্রহনক্ষত্রের সন্নিবেশ স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে, একদিন এই জাতিকা মহানায়িকা হবে। হয়ে উঠবে এক মহীয়সী রাজ্ঞী।'
সিংহরাজের মুখচোখে অবিশ্বাস সেদিন গোপন থাকেনি। তবু, আচার্য তুঙ্গদেবের জ্যোতিষচর্চায় যশের কথা ভেবে পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিলেন। আগামীতে শুভ হবে, এই আশায় বুক বাঁধলেন। বেঁচে গেল দিদ্দা।
তবু, বাবার চোখেমুখে ফুটে ওঠা হতাশাটা মাঝে মধ্যেই ধরে ফেলে দিদ্দা। দেখে, তার বাবা কী প্রবল আকুতি নিয়ে তাকিয়ে আছেন তার খুড়তুতো ভাই বিগ্রহরাজের দিকে। বোঝে, ওরকম একটা সর্বাঙ্গসুন্দর, সুগঠিত শরীরসম্পন্ন পুত্র চেয়েছিলেন সিংহরাজ। এখনও সে বাসনা তাঁর পূরণ হয়নি। অতৃপ্ত সিংহরাজের চোখে সেই অপূর্ণ বাসনার রং সদা লেগে থাকে। তাঁর কথাবার্তায় ফুটে ওঠে তাঁর বুকের গভীরে জমাট বেঁধে থাকা একটা না-পাওয়া।
দিদ্দা তাই বিগ্রহরাজকে হিংসা করে। বিগ্রহরাজ বয়সে দিদ্দার চেয়ে এক বছরের ছোট। গাঁট্টাগোট্টা চেহারা। শারীরিক কসরত করে রোজ। চলাফেরায় এখন থেকেই রাজকীয় ঔদ্ধত্য। আর দিদ্দা বেশ টের পায়, সিংহরাজের তার প্রতি প্রীতিবাৎসল্যের সুবিধা নিতে এতটুকু পিছপা হয় না বিগ্রহরাজ। সুযোগ পেলেই জ্যাঠার আদর উপভোগ করে চেটেপুটে।
চারদিকে কোথায় কে কী করছে, সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর বিগ্রহরাজের। যখনই দেখে আশপাশে কেউ নেই, দিদ্দাকে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দেওয়ার জন্য ছোঁক ছোঁক করে। অসহায় দিদ্দা মাটিতে পড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়াতে পারছে না, এ দৃশ্য দেখে দারুণ মজা পায় বিগ্রহরাজ। অবশেষে কোনও এক পরিচারিকা ছুটে আসে। ধরে দাঁড় করায় দিদ্দাকে। সেদৃশ্য দেখে হাসিতে লুটোপুটি খায় বিগ্রহরাজ। আর রাগে গরগর করতে থাকে ছোট্ট দিদ্দা।
দিদ্দা কখনও সখনও বিগ্রহরাজের পিঠের ওপর চড়ে তাকে গল্প শোনাতে চায়। সে দৃশ্য নজরে পড়লেই সিংহরাজ দাঁত কিড়মিড় করতে থাকেন। আর বিগ্রহরাজও তখন কড়া চাউনিতে ভয় পাইয়ে দেয় দিদ্দাকে।
এসব দিদ্দা রোজ দেখে। ফি-দিন বোঝে এসবের তাৎপর্য। এমনি করেই কেটে গেছে তার দশ-দশটা বছর।
দশম বর্ষীয়া দিদ্দা এখন ভালমতোই বুঝে গিয়েছে একটা কথা। বাবা সিংহরাজ তাকে ঘেন্না করেন। তাকে মেয়ে হিসেবে মেনে নিতে লজ্জা পান। তাঁর মতো একজন শক্তিশালী রাজার থাকবে একটা স্বাস্থ্যবান, লড়াকু ছেলে। তা নয়কো, তাঁর একটা খুঁতো খোঁড়া মেয়ে! লজ্জার পাওয়ারই কথা।
তাকে নিয়ে বাবা-মায়ের মধ্যে নীরব চাপানউতোর বোঝার মতো বড় হয়ে গিয়েছে দিদ্দা। বাবা-মায়ের ভিতরকার দ্বন্দ্বটা কেবল যে তাকে ঘিরে নয়, সেটাও বুঝতে শিখেছে সে। মা গান্ধারের শাহী বংশের মেয়ে। সে বংশের দাপট এবং গৌরব লোহারার রাজাদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। সেই বংশের আদুরে মেয়ে বউ হয়ে এসে পড়েছেন লোহারার সিংহরাজের হাতে, এ নিয়ে একটা চাপা আফশোস আছে রানির। তার উপর সিংহরাজ আবার বদমেজাজি। আসবে আসক্ত। মদ আর মোসাহেবদের পেছনে বেহিসাবি খরচ করেন। সেসব মোটেও পছন্দ নয় দিদ্দার মায়ের। ফলে, ঠোকাঠুকি অনিবার্য হয়ে ওঠে।
দিদ্দা শুনেছে বাবা-মায়ের কথাবার্তা। আড়াল থেকে।
‘এভাবে অর্থের অপচয় করবেন না সিংহরাজ। আপনি রাজা। মদ আর তোষামুদে পার্ষদদের পেছনে অর্থ ওড়ানো আপনার শোভা পায় না।'
‘আমাকে জ্ঞান দিতে এসো না খোঁড়া মেয়ের মা। তোমার দাপুটে বাপ তো ভূ-ভারতে আমার চেয়ে যোগ্য কাউকে জামাই হিসেবে পাননি, সেটা মনে রেখো, একালের গান্ধারী'।
‘মহারাজ! মনে রাখবেন এ মেয়ে একদিন মহাশক্তিধর হবে। রানি হয়ে দেশ শাসন করবে।'
‘রাখো তোমার ওসব বুজরুকি মাখানো বুকনি। আমার তো মাঝে মাঝে দুটো কথা মনে হয়।'
‘কী কথা?’
‘এক, তোমরা, গান্ধারের রাজকন্যারা কখনও পূর্ণাঙ্গ রমণী হতে পার না। সে ক্ষমতাই তোমাদের নেই। নিজের অন্ধত্ব আড়াল করতে তোমাদের গান্ধারী চোখে পট্টি বাঁধতেন। আর তুমি জন্ম দিয়েছ একটা খোঁড়া মেয়ের। আর দুই, সেই খুঁত ঢাকবে বলে ওই তুঙ্গদেবকে তুমি ঘুষ দিয়েছ। তোমার বাপের তো অর্থের অভাব নেই। ওই ভীমদেবের রাজকোষ থেকেই অর্থ উৎকোচ দিয়ে তুমি আর তোমার বাবা, তুঙ্গদেবকে দিয়ে ওরকম অদ্ভুত একটা ভবিষ্যদ্বাণী করিয়েছ। ওসব গ্রহনক্ষত্র, হ্যানাত্যানা, সব মিথ্যে। বুজরুকি। অর্থের দ্বারা বশীভূত জ্যোতিষাচার্য দিদ্দার সম্পর্কে ভালো ভালো কথা বলেছেন। তোমরা তাঁকে দিয়ে বলিয়েছ। সবই অর্থের খেলা, তাই না বড়লোকের বেটি!
মা রাগে ঘৃণায় কক্ষত্যাগ করেন। বাবা কুৎসিত হাসিতে ফেটে পড়েন। দিদ্দার দু'চোখ বেয়ে অশ্রুধারা নামে। সে হাত বাড়িয়ে ছোঁয় তার বিকৃত পা। পরম মমতায় হাত বোলায় সেটার গায়।
এসবের পাশাপাশি আরও একটা কথা বোঝে দিদ্দা। সে বোঝে তার দাদু ভীমদেব একজন পরম শক্তিধর রাজা। তাঁর রূঢ় কটু বাক্য আর দোর্দণ্ড প্রতাপের জন্য সবাই তটস্থ হয়ে থাকে। অথচ, এই মানুষটাই যখন তার দিকে তাকান, ওঁর চোখে অদ্ভুত মায়া আর কোমলতা লক্ষ করে দিদ্দা। যখন তিনি তাকে কোলে তুলে নেন, দিদ্দা পরম স্নেহের স্পর্শ টের পায়। তার টানেই যে তিনি ঘন ঘন গান্ধার ছেড়ে লোহারায় আসেন, সেটাও বেশ বুঝতে পারে দিদ্দা। দাদুর আসার খবর পেলেই সে খোঁড়াতে খোঁড়াতে দৌড়ায় রাজসভার দিকে। সে সময় কে কী বলল, দাসদাসীরা তার ছোটার চেষ্টা দেখে উৎকণ্ঠিত না বিদ্রুপে ভরা তির্যক মন্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছে তার দিকে, সেসবে কান দেয় না দিদ্দা। রাজসভায় পৌঁছানোর পর সিংহরাজের কঠোর দৃষ্টি আর তাকে সন্ত্রস্ত করতে পারে না। ভীমদেব দু'হাত বাড়িয়ে তাকে কোলে তুলে নেন। দাদুর বুকের আশ্রয়টায় পরম নিশ্চিন্ত বোধ করে দিদ্দা। কোলে উঠেই ভীমদেবের গলা জড়িয়ে ধরে সে। লক্ষ করে দেখেছে, এই মুহূর্তগুলোতে বিগ্রহরাজ যেন কোথায় লুকোবে, বুঝে পায় না। রাজসভার এককোণে সেঁটে থাকে। পারতপক্ষে ভীমদেবের মুখোমুখি হতে চায় না ।
আর সভাসদরাও সবাই এতদিনে বুঝে গেছেন, প্রবল প্রতাপান্বিত গান্ধাররাজ ভীমদেব শাহীর সবচেয়ে আদরের নাতনি দিদ্দা। তাই তাঁরাও, বিশেষ করে এই সময়টায়, দিদ্দার প্রতি যেন বেশি বেশি করে সম্মান প্রদর্শন করে।
এরকমই একটা অবসরে ঘটে গেল সেই ঘটনা, কিংবা দুর্ঘটনা।
দিদ্দা তখন ছোটবেলা কাটিয়ে মেয়েবেলার পথে। জগৎ ও জীবন নিয়ে আস্তে আস্তে আগ্রহ বাড়ছে তার। নিজের কৌতূহল মেটাতে তখন সে পড়ছে, শুনছে, শিখছে নানা কিছু। টের পাচ্ছে, সে খোঁড়া হওয়া সত্ত্বেও তার সৌন্দর্য আর বুদ্ধিমত্তা চোখ টানছে অনেক পুরুষের।
সেরকম একটা সময়ে কথাটা কানে গেল দিদ্দার। দাদুর কাছে যেতে যেতে শুনল, বিগ্রহরাজ হিসহিসিয়ে বলছে, “তোর দাদু আর কদ্দিন? বুড়োটা মারা পড়বে শিগগির তখন দেখব, এত আদর কোথায় থাকে!'
অন্যদিন হলে কথাটা শুনেও না শোনার ভান করত দিদ্দা। ঘর থেকে রাজদরবারে দাদুকে দেখতে যাওয়ার পথে ও কারও কথায় না দেয় না। এই অভ্যেসটা রপ্ত করে ফেলেছে ও। কিন্তু এদিন ঘুরে দাঁড়াল ।
বলল, ‘হিম্মত থাকে তো রাজদরবারে গিয়ে দাদুর মুখের ওপর কথাটা বল। আয় আমার সঙ্গে।
বিগ্রহের হাত ধরে টানল দিদ্দা। হাত ছাড়িয়ে পালাতে গিয়ে পড়ে গেল বিগ্রহ । হেসে উঠল দিদ্দা। ঠিক যেমন করে দিদ্দা পড়ে গেলে বিকটভাবে হেসে ওঠে বিগ্রহরাজ, আজ ঠিক তেমন করে হাসিতে ফেটে পড়ল রাজকুমারী দিদ্দা। হাসতে হাসতে লক্ষ করল, বিগ্রহের দু'চোখে শুধু ভয় আর আতঙ্ক। সেটা দেখে আরও মজা লাগল তার ।
তারপর দাদামশায়ের কোলে বসে তাঁর লোমশ হাত নিয়ে খেলতে খেলতে দিদ্দা আবৃত্তি করে গেল সেদিন, সেইসব সংস্কৃত কবিতাগুলো, যেগুলো সে সদ্য শিখেছে। দাদুর মুখটা ভরে উঠল খুশিতে। আর মায়ের মুখটা গর্বে।
সেগুলো দেখতে দেখতে বিগ্রহের কথাটা ভুলেই গিয়েছিল দিদ্দা। মনে পড়ে গেল বাবার একটা মন্তব্যে।
‘খোঁড়া মেয়ের এত বিদ্যা শিক্ষা কোন কাজে লাগবে? বরং পঙ্গু মেয়ে বেশি বিদূষী হলে তার পাত্র জুটবে না।'
শোনামাত্র গর্জে উঠলেন গান্ধাররাজ।
‘একটা কথা তোমায় বলি, জেনে রাখো সিংহরাজ। বিদ্যা কখনও বিফলে যায় না। আর দিদ্দার মতো মেয়ের ক্ষেত্রে তো যাবেই না। লোহারার সিংহরাজের কন্যা আর গান্ধাররাজ ভীমদেব শাহীর দৌহিত্রীকে বিয়ে করতে অনাগ্রহী হবে, এমন যুবক ভূ-ভারতে পাওয়া যাবে না, এ ব্যাপারেও নিশ্চিত থেকো।'
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সিংহরাজের খোঁড়া মেয়ে, খঞ্জ রাজকন্যে।'
বাবার গলার বিদ্রুপের স্বরটা চোখে জল এনে দিল দিদ্দার। অশ্রুবিন্দু পড়ল ভীমদেব শাহীর লোহার মতো শক্ত লোমশ হাতে। জল থেকে জ্বলল আগুন।
ভীমদেব আলতো করে কোল থেকে নামিয়ে দিলেন দিদ্দাকে। বললেন, “এখন তুমি নিজের ঘরে যাও। আমি একটু পরেই ওখানে যাব।'
সভাকক্ষ ছেড়ে ঘরে যাওয়ার সময় দিদ্দা দেখল মা নিজের হাত দুটো মুঠি করে নিজের কোলে চাপড়াচ্ছেন। স্পষ্টতই সংবরণ করতে চাইছেন তাঁর ক্রোধের আবেশ।
যেতে যেতে দিদ্দা শুনতে পেল দাদু বাবাকে বলছেন, ‘তোমার মেয়ে খোঁড়া হতে পারে সিংহরাজ, কিন্তু সে যে একদিন সব্বাইকে ছাড়িয়ে যাবে, সেটাও তো তোমার অজানা নয়। না কি ভারতখ্যাত জ্যোতিষাচার্যের কথায় ভরসা নেই তোমার?'
বাবা কী বললেন দাদুকে, শুনতে পেল না দিদ্দা। কিন্তু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যেতে যেতে সে বেশ বুঝতে পারছিল, দাদুর এসব কথা উদ্ধৃত করে মাকে পরে কথা শোনাতে ছাড়বেন না সিংহরাজ। ভবিষ্যতের কথা ভেবে আতঙ্কিত হল সে।
প্রতিবারই ভীমদেব শাহী লোহারাতে এলে খুশিতে ভরে যায় দিদ্দার দিনগুলো। এবার তারমধ্যেই খানিকটা ভয়ের প্রলেপ।
বিগ্রহরাজের পড়ে যাওয়া, তার ভয় পাওয়া, দিদ্দার জন্য সিংহরাজকে শ্বশুরের তিরস্কার, এসবের পাশাপাশি আরও একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল সেবার।
গান্ধারে প্রত্যাবর্তনের আগের দিন ছোট্ট দিদ্দাকে অশ্বশালায় গেলেন ভীমদেব। ঘোড়াশালের বিদঘুটে গন্ধে নাক কুঁচকে গেল দিদ্দার।
‘এখানে কেন দাদু? ঘোড়ার গুয়ের গন্ধে আমার গা গুলিয়ে উঠছে। তাছাড়া, তুমি তো জান দাদু, আমি ঘোড়াদের ভয় পাই।'
“তা বললে তো চলবে না দিদ্দা।'
‘না, না, তুমিই বল, ঘোড়াগুলো কী বড় বড়! আর কেমন জোরে জোরে ডাক ছাড়ে মাঝে মাঝে। ভয় হয়, কখন আমাকে লাথি মেরে ফেলে দেবে। আমি যে খোঁড়া দাদু।' দিদ্দা প্রায় কেঁদেই ফেলে।
‘ওসব ছাড়ো দিদিভাই। দ্যাখো না, তোমার জন্য আমি কী উপহার এনেছি। উপহারের কথা শুনে আগ্রহ বাড়ে দিদ্দার। দাদুর পাশে পাশে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে সে। একটু এগোতেই নজরে এল একটা হোঁতকা মতো লোক আস্তাবলের একটা দরজা খুলে বেরিয়ে আসছে। সঙ্গে একজন রোগাটে লম্বা ছেলে। দেখে মনে হচ্ছে ছেলেটার বয়স দিদ্দারই মতো। দিদ্দা যেমন দাদুর হাত ধরে যাচ্ছিল, ছেলেটাও তেমনই লোকটার হাত ধরে বেরিয়ে এল। দু'জনেই ভীমদেব শাহীকে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানাল।
‘তৈরি আছে তো? বলেছ ওকে সব কথা?' ভীমদেব জিজ্ঞেস করলেন।
‘হ্যাঁ প্রভু। সব বলা আছে। ও একেবারে তৈরি।'
ভীমদেব এবার নাতনির দিকে ঘুরলেন।
“দিদিভাই, এ হল আমার অশ্বশালার প্রধান রক্ষক। ওর নাম বরুণ। আর এ হল বরুণের ছেলে, নরবাহন। এখন থেকে নরবাহন এখানেই থাকবে। তোমাকে অশ্বচালনা শেখাবে।'
‘কিন্তু আমি তো তোমায় বললুম দাদু, ঘোড়া আমি মোটেই পছন্দ করি না।'
দিদ্দা কথাগুলো অনুচ্চস্বরে বললেও শুনতে পেয়েছিল নরবাহন। সে একটু এগিয়ে এসে মাথাটা নামিয়ে ফের সম্মান জানাল দাদু আর দিদাকে। তারপর নম্রকণ্ঠে বলল, ‘রাজকুমারী! আপনাকে অশ্বচালনায় প্রশিক্ষিত করার সুযোগ পেয়ে আমি গর্বিত। আপনি মোটেই চিন্তা করবেন না। দেখবেন, ঘোড়ারা কেমন সুসভ্য, অনুগত প্রাণী।'
মুখ তুলে তাকাল দিদ্দা। ছেলেটার চোখের মণি দুটো হালকা বাদামি। চুল ঘন ছেলেটা হাসল। ওকে দেখে হাসি খেলে গেল দিদ্দার মুখেও। সেও মাথা ঝাঁকাল । সম্মতিসূচক শরীরী ভাষা ৷
হাসি খেলে গেল ভীমদেব শাহীর মুখেও। দিদ্দার কাঁধে হাত রেখে তিনি বললেন, ‘আর কান্না নয় দিদিভাই। আমি চলে যাব। কিন্তু তুমি আর কাঁদবে না, কথা দাও।' পরদিন ভীমদেব শাহী যখন লোকলস্কর নিয়ে লোহারার রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করছেন, তখন তাঁকে বিদায় জানানোর জন্য প্রধান ফটকে দিদ্দার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল নরবাহন। ভীমদেব শাহীর ঘোড়ায় টানা রথ দিগন্তে মিলিয়ে যেতেই সে আলতো স্বরে জানতে চাইল, ‘দাদুকে আপনি খুব ভালবাসেন, তাই না?'
সরাসরি কোনও উত্তর না দিয়ে দিদ্দা পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘তোমার দাদুর জন্য তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে, তাই না?”
কাঁদো কাঁদো মুখে মাথা নাড়াল নরবাহন।
পরের দু'ঘণ্টায় দেখা গেল, সিংহরাজের প্রাসাদের কক্ষে কক্ষে, প্রাসাদ চত্বরের হ্রদে, প্রাসাদের চারদিকের ঘন পাইন গাছের অরণ্যে, খেলে বেড়াচ্ছে দিদ্দা আর নরবাহন। দু'জনের মুখই হাসিতে খুশিতে উজ্জ্বল।
নরবাহন আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করছে দিদ্দাকে, ‘আপনি সত্যি সত্যি ঘোড়ায় চড়তে চান না, রাজকুমারী?'
আর দিদ্দা খিল খিল করে হাসতে হাসতে মাথা নাড়াচ্ছে। দু'জনের বন্ধু হয়ে উঠতে দেরি হল না।
খুব অদ্ভুতভাবে আর একটি ঘটনার ভেতর দিয়ে বন্ধুত্ব হয়ে গেল দিদ্দা আর বলগার । বলগাও লোহারায় এসেছিল গান্ধার থেকে। গান্ধারের রাজধানী উদাভণ্ড। তারই কাছে, একটা ছোট্ট গাঁয়ে থাকত বলগারা। অতি দরিদ্র পরিবারের কন্যাসন্তান বলগা। দু'বেলা খাবার জুটত না। তাই বাপ-মা দুটো পয়সার জন্য তাকে লোহারায় পাঠিয়েছিল এক পরিচিত মহিলার কাছে। সম্পর্কে সে বলগার পিসি। লোহারায় দর্জির কাজ করে পেট চালাত সেই পিসি। লোহারায় আসা ইস্তক মনমরা হয়ে থাকত বলগা। মনে পড়ত তার নিজের গাঁয়ের কথা। মনে পড়লেই বাড়ি ছেড়ে আসার দুঃখ, মাকে ছেড়ে থাকার শোক চোখের জল হয়ে নামত তার দু'গাল বেয়ে। সেজন্যই মাঝে মাঝে একা একা দাঁড়িয়ে থাকত নদীর ধারে। রাজপ্রাসাদের অদূরে কুল কুল করে বয়ে চলে সেই নদী। আর তার পাড়ে দাঁড়িয়ে কাঁদত বলগা অঝোর ধারায়।
সেদিনও নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল বলগা ।
আর তখনই চোখ চলে গিয়েছিল নদীর পাড়ে, সে যেখানে দাঁড়িয়ে তার থেকে আর একটু দূরে, প্রাসাদের দিকে। মাটিতে পড়ে আছেন রাজকুমারী দিদ্দা। উঠে দাঁড়ানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। পারছেন না। কাঁদছেন। চিৎকার করছেন। যখনই উঠতে চেষ্টা করছেন তখনই তাঁকে ধাক্কা মেরে আবার কাদায় ফেলে দিচ্ছেন যুবরাজ বিগ্রহরাজ। কাদায় মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে রাজকুমারীর পোশাক।
রাগ চড়ে গেল বলগার মাথায়। কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। তারপরই ঠিক করে ফেলল, এই মুহূর্তে কী করতে হবে।
ছুটে গেল বিগ্রহরাজের দিকে। গিয়েই বুকে সজোরে একটা ঘুসি । আচমকা আক্রমণে টাল সামলাতে পারেনি বিগ্রহ। কাদায় পড়ে গেল। পরক্ষণেই উঠে পড়ে তাড়া করল বলগাকে। বলগা টের পেল, চেহারাটা যতই হৃষ্টপুষ্ট হোক, বিগ্রহ বেশ জোরে দৌড়ায় ৷ পিছন থেকে ধরে ফেলল সে বলগাকে। গলাটা বাহু দিয়ে জাপ্টে ধরে ঘুমি চালাল ব্লগার বুকে। চিৎকার করে বলল, ‘অ্যাই নোংরা নীচু জাতের বজ্জাত মেয়ে, তোর সাহস হয় কী করে আমাকে ছোঁয়ার?’
কথাটা শেষ করার আগেই বিগ্রহ টের পেল তার পিঠে একটা ঘুসি পড়ল প্রচণ্ড জোরে। মাটিতে পড়ে গেল বিগ্রহ। পড়েই তার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল।
বিগ্রহ মরল না বাঁচল, সেটা খেয়াল করারও দরকার মনে করেনি বলগা। ছুটে গেল রাজকুমারীর কাছে। যত্ন করে নিজের হাতে দিদ্দাকে তুলল সে কাদা থেকে। দিদ্দা বলল, ‘তুমি কে, জানি না। তবে তুমি যে-ই হও, তুমি আমার বন্ধু। তুমি না এসে পড়লে বিগ্রহ আমাকে মারতে মারতে নদীর জলে ফেলে দিত।'
‘আপনি সাঁতার জানেন না, রাজকুমারী?' প্রশ্নটা করেই বলগার মনে পড়ল, দিদ্দা খোঁড়া। অজান্তেই রাজকুমারীর দুর্বল জায়গায় আঘাত করে ফেলেছে বুঝতে পেরে জিভ কাটল লজ্জায়। তারপর হাত জোর করে নতশিরে বলল, ‘আমার ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন, রাজকুমারী।'
মাথা নিচু করার সময় চোখ গেল নদীর জলে। দু'জনেই জলের কাছে চলে এসেছে। এখানে নদীর জল স্থির। জলে দিদ্দার মুখের স্পষ্ট প্রতিফলন। তার কালো চুল। তার কাজল কালো বড় বড় দুটি চোখ।
জলের প্রতিচ্ছবিতেই দেখতে পেল বলগা, বিগ্রহরাজ তাদের ঠিক পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। বিগ্রহ কিছু করার আগেই বলগা দিদ্দার কোমর জড়িয়ে তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে ঝাঁপ দিল নদীর জলে। শুধু বলল, 'রাজকুমারী! ভয় পাবেন না। শুধু আমাকে চেপে ধরে থাকুন।’
সাঁতরে ওপারে দিদ্দাকে নিয়ে পৌঁছে গেল বলগা। অন্য পাড়ে তখন বিগ্রহ হতাশায় লম্ফঝম্প করছে। যখন দিদ্দাকে নদীতীরে সযত্নে শুইয়ে দিচ্ছে বলগা, তখন সে লক্ষ করল, রাজকুমারী হাসছে। পাহাড়ি ঝরনার মতো উচ্ছল সেই হাসির ধারা।
এতক্ষণ পর বলগার নাম আর পরিচয় জানতে চাইল দিদ্দা। বলগা সবকিছু ঠিকঠাক বলল বটে তাকে, কিন্তু তখনও একটা ভয় তার মনের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। সে এটা নিশ্চিত বুঝেছে, বিগ্রহরাজ তাকে ছাড়বে না। সুযোগ পেলেই তাকে মারবে, পারলে মেরে ফেলবে। ঠিক সেই মুহূর্তে দিদ্দা বলল সেই কথাটা।
‘তুমি তোমার দর্জি পিসিকে বলে দিও, আজ থেকে তুমি রাজকুমারীর কাজে বহাল হয়েছ। আমার প্রধান পরিচারিকা হতে আপত্তি নেই তো তোমার?'
বলগা তখনও নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। দিদ্দার বলা তখনও শেষ হয়নি... ‘এটা কিন্তু সর্বক্ষণের কাজ। আমাকে বয়ে নিয়ে যেতে হবে তোমাকে । আমি যেখানেই যাব, তুমি আমাকে বহন করবে। সর্বক্ষণ থাকবে আমার সাথে। তাহলে আর আমাকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হবে না। বিপদে পড়তে হবে না। পারবে তো কাজটা করতে বলগা ?'
আনন্দে, উত্তেজনায় রাজকুমারীকে ধন্যবাদ জানাতেও ভুলে গেল বলগা। শুধু মাথাটা নাড়িয়ে ‘হ্যাঁ' বলল।
হঠাৎ তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চিৎকার করে উঠল দিদ্দা। বিগ্রহ যে কখন তাদের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, খেয়ালই করেনি বলগা। দিদ্দার চিৎকারে তার চোখ পড়ল বিগ্রহরাজের উপর।
‘বলগার গায়ে আর কখনও হাত তোলার চেষ্টা কোরো না বিগ্রহ। ও এখন থেকে রাজকুমারীর প্রধান সহচরী। রাজকুমারীর মুখ্য বান্ধবীর যেন এতটুকু অসম্মান না হয়।'
অসহায় আক্রোশে হাত মুঠি করে রাজপ্রাসাদের দিকে ঘুসি চালাল বিগ্রহরাজ। একেবারে বাতাসে। তার পর দ্রুত চলে গেল প্রাসাদের দিকে।
দিদ্দা একগাল হেসে বলল, ‘এসো বলগা। প্রাসাদে চলো। মায়ের সঙ্গে তোমার আলাপ করিয়ে দিই। আশা করি, তোমার দর্জি পিসি তোমার এই নতুন চাকরিতে আপত্তি করবেন না।
ঘোরের মধ্যে প্রাসাদে পা রাখল বলগা। সে লোহারার রাজকুমারীর প্রধান সহচরী, এই কথাটা তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না তার।
আয়নার নিজেকে বারবার দেখে দিদ্দা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। চারপাশের লোকজন সততই বলে, তার মায়ের মতোই সুন্দরী সে। শুধু পায়ের দিকে তাকালেই তার সব ভাল লাগা উধাও হয়ে যায়। জন্মগত খুঁত তার। বহু চিকিৎসক দেখিয়েও কোনও সুরাহা হয়নি।
মাঝে মাঝেই একটা প্রশ্ন তাকে বিব্রত করে।
তবে কি এই জন্মগত শারীরিক ত্রুটির জন্যই কোনওদিন পাত্র জুটবে না তার? কোনওদিনই যদি তার বিয়ে না হয়, কোনওদিনই যদি সে মা না-হতে পারে, তাহলে কী হবে?
একদিন আর থাকতে না পেরে নরবাহনকেই জিজ্ঞেস করে বসে দিদ্দা, ‘তুমি কি আমাকে বিয়ে করতে চাও?'
বেশ কয়েক বছর ধরে দু'জন একসঙ্গে অনেকটা করে সময় কাটিয়েছে প্রতিদিন। আস্তাবলে দেখা করেছে, গল্পগুজব করেছে, খেলেছে। পরস্পর পরস্পরের সাহচর্যে স্বচ্ছন্দ, সেটা দু'জনেই টের পেয়েছে। তাই, তাই-ই, আজ দিদ্দার মনে হয়েছে, প্রশ্নটা নরবাহনকে জিজ্ঞেস করা যেতেই পারে ।
আচমকা এমন প্রশ্নের অভিঘাতের জন্য তৈরি ছিল না নরবাহন। তোতলাতে তোতলাতে বলল, ‘আমার সে সাহস নেই রাজকুমারী। এমন সম্মানের কথা আমি স্বপ্নেও...’। ততক্ষণে লজ্জায় তার ফর্সা গাল দুটো সীব ফলের মতো লাল হয়ে উঠেছে।
নরবাহনের অবস্থার দিকে দিদ্দার লক্ষ ছিল না। সে খানিকটা উদাস স্বরে, অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, “একদিন না একদিন আমি কোনও রাজাকে বিয়ে করে লোহারা ছেড়ে অনেক দূরের কোনও দেশে চলে যাব। তখন তুমি কী করবে নরবাহন ?'
এই প্রশ্নে নরবাহন সামান্যতম বিব্রতও হয় না। মুহূর্তে উত্তর দেয়, ‘আপনাকে অনুসরণ করব রাজকুমারী। সেটাই আমার কাজ। সেটা করার জন্যই আমাকে নিয়োগ করেছেন গান্ধার রাজ ভীমদেব শাহী।'
সত্যিই তো । এটাই তো রোজ করে আসছে নরবাহন লোহারাতে আসার পর থেকে । বিগ্রহরাজ কখনও কখনও তাকে মেরে সারা শরীরে কালশিটে ফেলে দিয়েছে। নাক-মুখ থেকে রক্ত ঝরেছে। তবুও রাজকুমারীকে রক্ষার ব্যাপারে এতটুকু শিথিলতা কোনওদিন দেখায়নি নরবাহন।
নরবাহনের উত্তরটা শুনে তার মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা খুঁজে পেল না দিদ্দা ৷ নরবাহন আর বলগাকে পাশে পেয়ে সে সত্যিই ভীষণ খুশি, ভারি নিশ্চিন্ত।
আর একটা ব্যাপার ইদানীং লক্ষ করেও ভীষণ নিশ্চিন্ত বোধ করে দিদ্দা। সিংহরাজ বদলে গিয়েছেন। বাবার কটূক্তি আর নিত্য শুনতে হয় না মাকে। বরং বাবা যেন আজকাল রানির ব্যাপারে বেশি যত্নবান, বেশি মনোযোগী।
ক'দিনের মধ্যে সিংহরাজের আচরণে এহেন পরিবর্তনের কারণ বুঝে ফেলল দিদ্দা। রানি মা ফের অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন।
এর আগেও বেশ কয়েকবার গর্ভধারণ করেছেন রানি। কিন্তু প্রতিবারই গর্ভপাত হয়ে গিয়েছে তাঁর। আর প্রতিটি গর্ভপাতের পর ফুঁসে উঠেছেন সিংহরাজ। অনর্গল কটূক্তি বর্ষণ করেছেন প্রকাশ্যে, রানির সম্পর্কে। প্রতিবারই ধাত্রী ঘেরাটোপের বাইরে এসেছে মাথা নিচু করে। আর প্রতিবারই সিংহরাজকে রাগে গজরাতে দেখেছে দিদ্দা। বলতে শুনেছে, ‘মেয়েছেলেটা কোনওদিন পেটের মধ্যে পুরো সময়ের জন্য বাচ্চা ধরে রাখতে পারে না। এরকম করলে ওর সুস্থ সবল ছেলে হবে কোত্থেকে? পেট খসানো মেয়েছেলে। বাবার মুখে মায়ের সম্পর্কে এরকম অপমানজনক মন্তব্য শুনে মাথা আর ঠিক রাখতে পারেনি দিদ্দা। বলেছে, ‘এতে মায়ের কী দোষ?' রাগে ফেটে পড়েছেন সিংহরাজ। বলেছেন, ‘আমি চাই না তুমি এসব ব্যাপারে নাক গলাও।'
অনেকবারই কথাটা শুনেছে দিদ্দা। শুনে চুপ করে থেকেছে। কিন্তু সেবার আর পারল না। চাকরবাকরদের সামনে অপমানটা মেনে নেওয়া সম্ভব হল না তার পক্ষে। সটান বাবার মুখের ওপর বলেছে, ‘আমি আপনার মেয়ে, লোহারার রাজকন্যা। লোহারার রাজার কোনও অযোগ্য দাসী নই। কথাটা মনে রাখবেন।'
এমন সরাসরি প্রতিবাদে অবাক হয়েছেন সিংহরাজ। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকেছেন। তারপর কেটে কেটে বলেছেন, “কিন্তু আমার চোখে তুমি তো তাই দিদ্দা। খোঁড়া মেয়ে একটা। কোনও কাজেই আসো না।'
বলগা সেদিন ওখান থেকে দিদাকে সরিয়ে না আনলে রাগের চোটে জ্ঞান হারাতে পারত দিদ্দা। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে আস্তাবল থেকে দৌড়ে এসেছিল নরবাহনও। দু'জন মিলে দিদ্দাকে নিয়ে গিয়েছিল নদীর ধারে।
শরতের আকাশ। শান্তস্রোতা নদী। মৃদুমন্দ শারদীয় বাতাস। সব মিলিয়ে প্রকৃতির শাস্তভাব ছায়াপাত করেছিল দিদ্দার মনেও। ওর রাগ দুঃখগুলো আকাশের সাদা মেঘের মতো ভেসে গিয়েছিল। জাফরান ফুলের গন্ধ ভুলিয়ে দিয়েছিল তার ব্যথা আর রাগ।
ফিরে এসে মায়ের ঘরে ঢুকেছিল দিদ্দা। মা শান্ত কণ্ঠে তাকে বলেছিলেন, 'বাবার সঙ্গে মুখে মুখে তর্ক কোরো না দিদ্দা। এতে তুমি কষ্ট পাবে আর উনি দুঃখ পাবেন। সমস্যা মিটবে না এতটুকুও। তোমরা কেউই বদলাবে না। বদলাবে না তোমার ভাগ্যও ।' দিদ্দা বলেছিল, “উনি তো কেবল একটা ছেলে চান। সুস্থ সবল একটা ছেলে। সেই ছেলের জন্ম দিতে গিয়ে যদি তুমি মরেও যাও, তাতেও তো ওঁর কোনও ক্ষতি দেখি না ।'
‘ধ্যাত! বোকা মেয়ে। আমি মরব কেন? আর ছেলে তো উনি চাইবেনই। সিংহাসনের একজন উত্তরসূরি তো চাই।' ‘কেন? আমি তো পড়াশোনায় খারাপ নই। আমি কি লোহারার সিংহাসনে বসতে পারি না?'
‘না বেটি। পুরুষমানুষ ছাড়া অন্য কেউ সিংহাসনে বসতে পারে না।'
শুনে অবাক হয়ে যায় দিদ্দা। এ কেমন অবিচার, ভেবে কূল পায় না সে। পিরপঞ্জালের মানুষ দেবীদের পুজো করে, মা সারদার ভক্ত তারা, কিন্তু ঘরের মেয়েদের সিংহাসনে বসার অধিকার দেয় না।
ভাবতে থাকে দিদ্দা। তার যদি ভাই না হয় তবে সিংহাসনে আসীন হবে ওই বিগ্রহরাজ। একটা নিষ্ঠুর গণ্ডমূর্খ হবে রাজা। শারীরিক বল ছাড়া যার আর কিছুই নেই, সে পাবে লোহারার রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকার। আর দিদ্দা, যে রোজ শিক্ষকদের কাছে, গুরুদেবের কাছে কাব্য,স্মৃতি ও ব্যাকরণ চর্চায় প্রশংসিত হচ্ছে, সে শাসন করার সুযোগ পাবে না। ভাবনায় যতি টানতে পারে না দিদ্দা।
রানির প্রসূতিকালীন জটিলতা বাড়তে থাকে। বিছানায় শুয়ে থেকে থেকে তিনি কঙ্কালসার। তবু তিনি যে নির্বিঘ্নে প্রসব করবেন, এমন কোনও নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না চিকিৎসকরা। গোটা প্রাসাদ তাঁকে ঘিরে উদ্বিগ্ন।
উদ্বেগ বাড়ছে দিদ্দারও। নরবাহন আর বলগা নানা কথাবার্তায় ভুলিয়ে রেখে উদ্বেগের মাত্রা কমানোর চেষ্টা করে তার। এরই মাঝে দিদ্দা লক্ষ করে, সিংহরাজ আজকাল ঘন ঘন প্রাসাদের বাইরে রাত কাটাচ্ছেন। রাজকার্যের প্রয়োজনে তাঁকে প্রায়ই লোহারার বাইরে গিয়ে থাকতে হচ্ছে।
রাজ্যের বাইরে কী এমন রাজকার্য, বুঝে পায় না দিদ্দা। শুধু টের পায়, সিংহরাজের অনুপস্থিতিতে দাপট বাড়ছে আমলা আর মন্ত্রীদের। ক্ষমতা আর সম্পদের লোভে তারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটিতে মেতে থাকে। মাঝে মধ্যে তাদের ঝগড়া থামাতে রানিকেও হস্তক্ষেপ করতে হয়।
মন্ত্রী আর আমলাদের বিবাদ মেটানোর জন্য রানি যখন সালিশি সভা বসান নিজের ঘরে, তখন মায়ের ঘরের দরজায় কান পেতে থাকে দিদ্দা। রাজকার্যের গতিপ্রকৃতি, হাল হকিকত জানার আগ্রহ তার প্রচুর। সেই সূত্রেই সে জানতে পারে, অন্যান্য রাজন্যবর্গের সঙ্গে শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে কাশ্মীর ও পিরপঞ্জালে শক্তিসাম্য বজায় রাখতে তৎপর সিংহরাজ। সেজন্যই তাঁর এত ঘন ঘন বহির্রাজ্যে গমন।
এভাবে লুকিয়ে কথাবার্তা শুনতে গিয়ে একদিন ধরা পড়ে গেল দিদ্দা। তাকে টানতে টানতে নিয়ে যেতে যেতে বিগ্রহরাজ বলছিল, “তোর সব কীর্তিকলাপ তোর বাবাকে বলে দেব। ফাঁস করে দেব, তুই আড়ি পাতিস। রানির সঙ্গে মন্ত্রী-অমাত্যদের গোপন আলোচনা শুনিস।'
নিয়ে যাওয়ার সময় বিকৃত পা-টা ঘষটাচ্ছিল পাথুরে মেঝেতে। খুব লাগছিল দিদ্দার। বিগ্রহের আঙুলগুলো চেপে বসে যাচ্ছিল দিদ্দার বাহুতে। চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসছিল তার।
হঠাৎ প্রচণ্ড চিৎকার করে উঠল দিদ্দা। থতমত খেয়ে বিগ্রহ হাতের মুঠিটা একটু আলগা করল। এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিল দিদ্দা। তারপর, তার যে পা-টা ঠিক আছে সেই পা দিয়ে সজোরে লাথি কষাল বিগ্রহের দু'পায়ের মাঝখানে। বিগ্রহ ব্যথায় ককিয়ে উঠল।
দিদ্দা তাকে শাসাল, ‘আমিও বাবাকে তোমার কীর্তিকলাপ ফাঁস করে দেব। বলে দেব বাবার ঘোড়াগুলোকে নিয়ে তুমি কী করে বেড়াও।'
জোঁকের মুখে নুন পড়লে যেমন হয়, বিগ্রহর অবস্থা তখন সেইরকম।
সিংহরাজের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিগ্রহ তাঁর ঘোড়ার পিঠে চেপে বেড়িয়ে পড়ে প্রাসাদ থেকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রাসাদের বাইরে থাকে। তারপর যখন ঘোড়াটাকে নিয়ে ফেরে তখন দেখা যায়, ঘোড়ার মুখে গ্যাঁজলা উঠছে। সেটার শরীরের জায়গায় জায়গায় চাবুকের বাড়িতে চামড়া ফেটে রক্ত বের হচ্ছে।
নরবাহনের কাছ থেকেই দিদ্দা এসব জেনেছে। নরবাহনকে দড়ি নিয়ে বেঁধে রেখেই তো বিগ্রহ সিংহরাজের ঘোড়া ছুটিয়ে বের হয়।
নরবাহন অনেকদিন ধরেই দিদ্দাকে বলছিল, কথাগুলো সিংহরাজকে বলার জন্য। দিদ্দা বলেনি। কারণ, সিংহরাজ তাঁর খোঁড়া মেয়ের কথা কতটা বিশ্বাস করবেন, তা নিয়ে সংশয়ে ছিল দিদ্দা। আজ একেবারে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে সেই গোপন সংবাদটিকেই প্রয়োগ করল সে।
বিগ্রহরাজ বুঝতে পেরেছিল, দিদ্দা কার কাছ থেকে কথাটা জানতে পেরেছে। তাই যেতে যেতে থুতু ফেলে বলে গেল, ‘খোঁড়া মেয়ের পা-চাটা কুত্তাও জুটেছে আজকাল।'
ক'দিন পর সিংহরাজ ফিরলেন।
দিদ্দা এবারও তাঁকে বিগ্রহরাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সুযোগ পেল না। রাজপ্রাসাদে ফিরে স্ত্রী-কন্যাকে আপন কক্ষে ডেকে পাঠালেন সিংহরাজ। বললেন, ‘আমি দিদ্দার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছি। শীত পড়ার আগেই কাশ্মীরের রাজার সঙ্গে ওর বিয়ে দেব। তোমরা তৈরি হও।'
রানি সবিস্ময়ে বলে উঠলেন, “ওই ক্ষেমগুপ্তর সঙ্গে...!'
তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই মাছি ওড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নাড়লেন রাজা। বললেন, “এ হল রাজনৈতিক গাঁটবন্ধন। ক্ষেমগুপ্ত দিদ্দাকে পাবে। বিনিময়ে ও ওর রাজ্যের একাংশ আমাকে যৌতুক হিসেবে দেবে। পরিষ্কার লেনদেন।
‘এটা বিয়ে না বাণিজ্য রাজা?' রানি চিৎকার করে উঠলেন।
সিংহরাজ গলা না চড়িয়ে বললেন, ‘সামান্য একটুকরো জমি, রানি। তার বেশি কিছু দিতে রাজি নয় ক্ষেমগুপ্ত। খোঁড়া মেয়ের জন্য এর বেশি আর কী-ই বা পাওয়া যাবে?'
কান্নায় ভেঙে পড়লেন রানি। দিদ্দাকে শুধু বললেন, “তোর বাবা তোকে বেচে দিল দিদ্দা। এক টুকরো জমির জন্য তোকে বিক্রি করে দিল তোর বাবা ৷ '
দিদ্দা কিছু বুঝে উঠতে না পেরে দাঁড়িয়ে রইল।
ক্ষেমগুপ্তের সঙ্গে বিয়েটা মোটেই দিদ্দার পক্ষে সুখকর হবে না, নিশ্চিত ছিল নরবাহন আর বলগা ।
ক্ষেমগুপ্ত নারীবিলাসী পুরুষ। সব সময় স্তাবক পরিবৃত হয়ে থাকেন। তাঁর বাবা পর্বগুপ্ত সম্পর্কেও মানুষজন ভাল কথা কিছু বলে না। আগের রাজাকে ষড়যন্ত্র করে হত্যা করে পর্বগুপ্ত কাশ্মীরের সিংহাসনে বসেছিলেন। শেষে নাকি তাঁকেও যন্ত্রণা পেয়ে মরতে হয়েছিল।
লোকে বলে, ক্ষেমগুপ্তর চেয়ে তাঁর মন্ত্রী ফাল্গুন অনেক বেশি বুদ্ধিমান, অনেক বেশি ক্ষমতাশালী। সম্পর্কে সে ক্ষেমগুপ্তর শ্বশুরমশাই। নিজের মেয়ে চন্দ্রলেখার সঙ্গে ক্ষেমগুপ্তর বিয়ে দিয়েছে। চন্দ্রলেখাই ক্ষেমগুপ্তর প্রধান ও প্রথম মহীষী। দিদ্দা তার দ্বিতীয় পত্নী হবে।
এসব খবরের বিন্দুবিসর্গও জানা ছিল না দিদ্দার। তার বিয়ে ঠিক হয়েছে জানার পর নরবাহন আর বলগা মিলে এসব খবরাখবর জোগাড় করেছিল। দিদ্দাকে সব কথা জানানো উচিত হবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে ছিল বলগা। শেষ পর্যন্ত অবশ্য জানিয়ে ছিল সব কথা । পরামর্শ দিয়েছিল, দিদ্দা তার মায়ের সাহায্য নিয়ে বিয়েটা ভেঙে দেওয়ার ব্যবস্থা করুক।
সব কিছু শোনার পর হেসে উঠেছিল দিদ্দা। বলেছিল, ‘মায়ের নিজের বিয়ে কী হবে তার ঠিক নেই, তো আমার বিয়ে! এবারও যদি গর্ভপাত হয়ে যায় কিংবা শেষমেশ মা যদি আরও একটা কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়, তাহলে সিংহরাজ রানি আর নবজাতিকা, দু'জনকেই মেরে ফেলবেন।'
‘তবে তো মা সারদাই ভরসা,' বলেছিল বলগা।
সে কথা শুনে আরও জোরে হেসে ওঠে দিদ্দা। বলে, “দেবী যদি ভরসাযোগ্য হতেন তবে কি আর আমি খোঁড়া হয়ে জন্মাতাম?'
সেবার পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেন দিদ্দার মা ।
নবজাতক ভাইটাকে আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে কসুর করেনি দিদ্দা। কিন্তু ধাত্রী দিদ্দার হাতে সদ্যোজাত ছেলেকে তুলে দিয়েছে, এটা জানতে কিংবা দেখতে পেলেই তর্জন গর্জন করতেন সিংহরাজ। পঙ্গু মেয়েটা যদি তাঁর মূল্যবান পুত্র সম্পদকে ফেলে দেয়, তাহলে কী হবে!
বাবা তাকে ভালবাসেন না। ভাই জন্মেছে মানে সে-ই লোহারার সিংহাসনে বসবে। তাকে লোহারা থেকে বিদায় নিতেই হবে। মনে মনে স্থির-সংকল্প হয় দিদ্দা।
একদিন নরবাহন আর বলগাকে নিয়ে সে চলে যায় সাম্রাজ্যের সীমান্ত প্রাচীরের কাছে। সেখান থেকে পশ্চিম দিকে তাকালে স্পষ্ট দেখা যায় কাশ্মীর।
আকাশে সেদিন সাদা মেঘের ওড়াওড়ি। কাশ্মীর সেদিন আবৃত ঘন কুয়াশায়। দূর থেকে দেখলেও বোঝা যায় সে রাজ্যের বিশালত্ব। লোহারা, রাজাপুরী, প্রাণতোষের মতো রাজ্যগুলোকে কাশ্মীরের পাশে পিঁপড়ে বলে মনে হয়।
কাশ্মীরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে দিদ্দা। তারপর আচমকা চিৎকার করে ওঠে।
‘আমার নিয়তি অপেক্ষা করছে ওখানে, ওই কাশ্মীরে। আমি দু'হাতে সামলাব ওই ভূমি। আমি ওদের দেখিয়ে দেব, আমিও পারি। ভাগ্যবিধাতা আমার জন্য যে শীর্ষপদ রেখে দিয়েছেন, সেটা কাশ্মীরেই অধিগত করব আমি। করবই।'
দিদ্দার চিৎকারে চারদিকের নৈঃশব্দ্য ভেঙে খান খান। গাছের ডালে বসে থাকা পাখিদের ঝাঁক চমকে ওঠে। তারপর ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উড়ে যায় অনির্দিষ্ট গন্তব্যে। আকাশে বাতাসে তাদের ডানা ঝাপটানোর শব্দের রেশ রয়ে যায় বেশ কিছুক্ষণ ৷
তারপর ফের নিস্তব্ধতা চরাচর জুড়ে।
আর সেই নীরবতা আবারও ভেঙে পড়ে দিদ্দা প্রত্যয়ী চিৎকারে।
‘আমি কাশ্মীরের সম্রাজ্ঞী হবই।'
নরবাহন আর বলগা বিস্ময়ে বিস্ফারিত চোখে দেখে, তাদের চেনা, প্রতিবন্ধী দিদ্দা বদলে গিয়েছে। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর তার চোখ আর কণ্ঠস্বর।
দিদ্দাকে তাদের কেমন যেন অচেনা বলে মনে হয়।
মাঝে মাঝে দিদ্দা নিজেই নিজেকে চিনে উঠতে পারে না। নিজের কাছেই নিজেকে অচেনা লাগে তার।
যেমন সেদিন হল বিগ্রহরাজের সঙ্গে ঝগড়ার সময়।
সুযোগ পেলেই বিগ্রহ তাকে নিয়ে নানা কটু মন্তব্য করে। মশকরা করে তার পঙ্গুত্ব নিয়ে। এসব প্রায় সহ্য হয়ে গিয়েছিল দিদ্দার। শুধু সেদিন পারল না ।
তাকে একা দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসেছিল মুষ্ক চেহারার বিগ্রহ। দাঁত বের করে বলেছিল, ‘রাজকুমারী দিদ্দা! তুমি না জন্মালেই বোধহয় ভাল হত। সিংহরাজ তো মনে করেন তাঁর একটাই সন্তান। আর সেটা পুত্রসন্তান, উদয়রাজ।'
‘মা কিন্তু আমায় ভালবাসে।' কথাটা বলে ফেলেই দিদ্দার মনে হল, এটা না বললেই ভাল হত।
‘রানি মা!’ হা হা করে হেসে উঠল বিগ্রহ। ‘উনি তো এখন উদয়রাজের মা। দিদ্দার কথা তিনিও ভুলে যাবেন ক'দিন পরেই। স্রেফ তোমার বিক্রি হওয়ার অপেক্ষা।'
‘বিক্রি' শব্দটা কানে যেতেই সচকিত হয়ে ওঠে দিদ্দা। বলে ওঠে, “বিক্রি? কী বলতে চাইছ তুমি বিগ্রহ ? '
‘কেন? জান না বুঝি? তোমার বাবা তোমায় বিক্রি করে দিয়েছেন। খোঁড়া মেয়ের তো কানাকড়িও দাম নেই। সে জায়গায় উনি তো ভালই দর পেয়েছেন। বুদ্ধিমান লোক, মানতেই হবে।' কেটে কেটে কথাগুলো বলল বিগ্রহ।
‘তোমারই বা কী জুটবে কপালে? লোহারের পরবর্তী রাজা তো উদয়রাজ। তুমি তো আর সিংহাসন পাচ্ছ না।'
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলেই বিগ্রহরাজের সামনে থেকে সরে এল দিদা। এর আগে কোনওদিন প্রকাশ্যে সিংহাসন নিয়ে কারও সঙ্গে বাদানুবাদে জড়ায়নি সে। ভেবেও দেখেনি এসব ব্যাপারে। আজ এসব নিয়েও তাকে মাথা ঘামাতে হচ্ছে। নিজের পরিবর্তনে নিজেই আঘাত পেল দিদ্দা।
যে বিষয় নিয়ে কোনওদিন ভাবনাচিন্তা করেনি, সেই বিষয় ভাবনা মাথার ভেতর ক্রমাগত ঘুরপাক খেতে লাগল।
সেদিন নদী পাড়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় দিদ্দা সরাসরি নরবাহনকে নিৰ্দেশ দিল, ‘খুঁজে বের করো, আমাকে কাশ্মীরের রাজার সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে বাবা ঠিক কী কী পেতে চলেছেন? আমার বিয়ের সম্বন্ধ তাঁকে কতটা লাভবান করতে চলেছে?'
প্রাসাদে ফিরে এসে পোশাকের ঘেরাটোপ থেকে পা দুটো বের করে সেগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল দিদ্দা। একটার গড়ন একেবারে নিখুঁত। সুন্দর, ফর্সা, দেখলেই মনে হয় চুমু খাই, আদর করি, হাত বুলিয়ে দিই। আর একটা বিকৃত। পাতাটা উল্টো দিকে বেঁকানো, আঙুলগুলো কুঁকড়ে আছে। দেখলেই মনে হয় শয়তানের পা। আদরের ইচ্ছে জাগে না।
একই নারী - শরীরে দু'রকম পা। একটা যেন পরীর, আর একটা যেন পিশাচিনীর । একটা সুন্দরীর, আর একটা প্রেতিনীর।
কথাটা মনে হতেই খিল খিল করে হেসে উঠল দিদ্দা। হাসির শব্দ দু-এক ফোঁটা তরল মুক্তোর মতো তার চোখ ছাপিয়ে গাল বেয়ে পড়ল।
দিদ্দার মনে হল, তার ভেতরেও তো দু'-দুটো সত্তা বাস করছে। একটা সংসার বিবিক্ত সরলপ্রাণা এক যুবতীর। আর একটা তীব্র উচ্চাশার তাড়নায় অস্থির, চারদিক ছাপিয়ে ওঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষায় মগ্ন এক নারীর। স্বার্থ ছাড়া যে কিচ্ছুটি বোঝে না। নোয়ানো মাথা ছাড়া যে আর কিছু দেখতে চায় না।
কোনও প্রেমের আকর্ষণ তার বুকে ঢেউ তোলে না। ক্ষমতা করায়ত্ত করার জন্য তার বুকে উথালপাথাল জেদ তৈরি হয়।
বৈপরীত্যে মোড়ানো দিদ্দার নারীসত্তা। স্ব-অনুভবে সেটা উপলব্ধি করেই ফের খিল খিলিয়ে হাসতে থাকে লোহারার রাজকুমারী। তারপরেই ভাবতে বসে, কীভাবে পুরুষ না হয়েও সে অধিগত করবে ক্ষমতার আসন। কীভাবে বিগ্রহের মতো লোকদের মুখ বন্ধ করে সে দেখাতে পারবে ক্ষমতার দাপট।
সন্ধে হল। লোহারার রাজপ্রাসাদের কক্ষে কক্ষে জ্বলে উঠল প্রদীপ। কিন্তু রাজকুমারীর মন জুড়ে জাঁকিয়ে বসা অন্ধকারের পরত মোছার সাধ্য প্রদীপ শিখাগুলোর ছিল না। ঘর জুড়ে আলো আঁধারি। তারমধ্যেই কক্ষে প্রবেশ করল নরবাহন। সে দিদার বিয়েকে কেন্দ্র করে লেনদেনের খবর এনেছে। নরবাহনের কাছ থেকে দিদ্দা যা জানল, তা এই রকম:
জয়েন্দ্রবিহার কাশ্মীরের একটি অতিপরিচিত বৌদ্ধবিহার। সেখানকার বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আসলে সংগ্রাম নামে এক স্থানীয় ভূস্বামীর কাছে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। ক্ষেমগুপ্ত সেই জয়েন্দ্রবিহার পুড়িয়ে দিয়েছেন। বিহারে অবস্থিত পিতলের বৌদ্ধ মূর্তিটাও তিনি গলিয়ে দেন। সেই পিতল দিয়েই তিনি তাঁর নিজের তৈরি শিবমন্দির ক্ষেমগৌরীশ্বর মুড়িয়ে দিয়েছেন। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সংগ্রামের শরণাপন্ন হয়েছিল, কারণ সংগ্রামও ছিল বিদ্রোহী ভূস্বামী। কাশ্মীরের রাজাকে কর দেওয়া বন্ধ করে সে। তার ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের প্রতি রাগে ওই জয়েন্দ্রবিহারের ভূসম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কাশ্মীররাজ ক্ষেমগুপ্ত। জয়েন্দ্রবিহার ধ্বংসের কাজে তাঁর সহায়ক ছিলেন লোহারার রাজা সিংহরাজ। সেই সাহায্যের প্রতিদানে সিংহরাজের পঙ্গু কন্যাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছেন ক্ষেমগুপ্ত। সেই সঙ্গে মনস্থ করেছেন, জয়েন্দ্রবিহারের অধীনে থাকা ছত্রিশটা গ্রাম বিয়েতে যৌতুক হিসেবে তাঁর শ্বশুর সিংহরাজের হাতে তুলে দেবেন । নরবাহনের কথা শুনে দিদ্দা বুঝতে পারে, তার ভাবী স্বামী এক ধর্মান্ধ নিষ্ঠুর পুরুষ। আর তাঁর বৌদ্ধ বিদ্বেষী কার্যকলাপে মদত দিচ্ছেন দিদ্দার বাবা, সিংহরাজ।
এই ধর্মান্ধ নিষ্ঠুর রাজা কি নিজেই তার পাণিপ্রার্থনা করেছেন, না কি তার বাবা সুযোগ বুঝে তাঁর গলায় দিদ্দাকে ঝুলিয়ে দেওয়ার ফন্দি এঁটেছেন? এই প্রশ্নগুলো ঘুরতে থাকে দিদ্দার মাথায় ।
সেই অবকাশে নরবাহন ক্ষেমগুপ্তের বিষয়ে আরও যে যে সংবাদ তাকে জানায়, সেগুলো এরকম : রাজা ক্ষেমগুপ্ত একজন পাঁড় মাতাল। তাঁর পার্ষদরাও মোটেই সুবিধার লোক নয়। তারাই আসলে রাজাকে মদে ডুবিয়ে রাখতে চায়। এই সুযোগে ক্ষেমগুপ্তের শ্বশুর ফাল্গুন আস্তে আস্তে সব ক্ষমতা করায়ত্ত করে ফেলেছেন। তাঁর কন্যা চন্দ্রলেখাই ক্ষেমগুপ্তের প্রথমা মহিষী।
এসব একেবারেই নতুন সংবাদ নয়। এখন নরবাহনের মুখ থেকে পূর্বশ্রুত কথাগুলো পুনরায় শুনে দিদ্দার শুধু একটা কথাই মনে হল।
তাহলে সে মহীয়সী হয়ে উঠবে কীসের ভিত্তিতে? লোহারার পঙ্গু রাজকুমারী হিসেবেই কি তবে লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়বে তার কথা, আর সেটাকেই জ্যোতিষাচার্য তুঙ্গদেব তার মহীয়সী হিসেবে খ্যাত হওয়া বলে ধরে নিয়েছেন ? পঙ্গুত্বের কারণে বিখ্যাত হওয়াটাই কি তবে তার অনিবার্য নিয়তি?
ভেবে কূল পায় না দিদ্দা।
পরদিন সকাল থেকে সে লক্ষ করল, বদলে গিয়েছে লোহারার রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ।
তার মা যুগপৎ উল্লসিত ও বিষণ্ন। উল্লসিত উদয়রাজের আগমনের কারণে। লোহারা তার আগামী রাজাকে পেয়ে গেছে আর সেই রাজা তাঁরই ছেলে, এটা ভেবেই উল্লসিত রানি। অন্যদিকে তিনি বিষণ্ণ, কারণ তাঁর প্রিয় কন্যা দিদ্দার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। সে তাঁকে ছেড়ে চলে যাবে নিজের শ্বশুরালয়ে।
প্রাসাদের ভেতরে এবং বাইরে কিন্তু কেবলই আনন্দ লহরী আর উৎসবমুখরতা। সিংহরাজ পুত্রসন্তান লাভ করেছেন। এতদিন পর তাঁর ঔরসই যে লোহারার ভাবী রাজা হবে, সেটা নিশ্চিত হয়েছে। তাই উদয়রাজকে ঘিরে সবাই আনন্দিত। সেই সঙ্গে যে কাশ্মীরের বিশালত্ব আর ক্ষমতার দাপটকে লোহারা এতদিন সমীহ করে এসেছে, ভয় পেয়েছে, সেই কাশ্মীরের রাজাই জামাতা হতে চলেছেন লোহারার। একই পরিবারের বন্ধনে আবদ্ধ হতে চলেছে কাশ্মীর ও লোহারা। এখবর জেনে লোহারাবাসী উল্লসিত, উৎসবপ্রাণিত। চতুর্দিকে তারই ইশারা। এরই মধ্যে দিদ্দা আর একটা বিষয় নিয়ে ভাবিত হয়ে পড়ে। বলগা সহচরী হিসেবে কাশ্মীরে তার শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার ছাড়পত্র পাবে, এটা সে নিশ্চিত। কিন্তু নরবাহন? সে তো বলেই রেখেছে, গান্ধারে প্রত্যাবর্তনের কোনও বাসনা নেই তার, দিদ্দার অনুগামী হয়ে কাশ্মীরে যাবে বলেই সে ঠিক করে ফেলেছে। কিন্তু কাশ্মীরের রাজা ও তাঁর পার্ষদরা তাকে কেমনভাবে নেবেন, সে কথা জানা নেই দিদ্দার। আর অজানা বলেই, সে কথা মনে হলে তার বুক দুর দুর করতে শুরু করে।
বিয়ের মণ্ডপেই প্রথম ক্ষেমগুপ্তকে নিজের চোখে দেখার সুযোগ পায় দিদ্দা। সুদর্শন পুরুষ। বেশ লম্বা। ভীষণ ফর্সা। কিন্তু খুব রোগা। মোটেই পেশিবহুল ষণ্ডামার্কা চেহারা নয়। মুখে দাড়ি। দাড়ি গোঁফ মেহেন্দি করা। এটা বোধহয় কাশ্মীরের অভিজাত পুরুষদের মধ্যে প্রচলিত কেতা। সেই তামাটে খয়েরি রঙের আড়ালে তার মুখে নানা ধরনের বলিরেখা, যেগুলো স্পষ্টতই বয়সের কারণে নয়, অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে প্রকটিত। ক্ষেমগুপ্তর হাসিটা ভীষণ আকর্ষক। আর জিনিস দেখে বেশ মজাই লাগল দিদ্দার। ক্ষেমগুপ্তর পার্ষদবর্গ রাজাকে পারলে সব সময় পুজো করে। ভীষণ তোষামুদে তারা। আর ক্ষেমগুপ্ত ব্যাপারটা বেশ উপভোগই করেন।
বিয়ের আসরে সিংহরাজের লোক দেখানো আদিখ্যেতায় অবশ্য মনটা বিরক্তিতে ভরে উঠল দিদ্দার। কোনওদিন আড়ালে কিংবা প্রকাশ্যে, একান্তে কিংবা সর্বজনসমক্ষে, মেয়ের প্রতি এত ভালবাসা সিংহরাজ দেখিয়েছেন বলে মনে পড়ে না দিদ্দার। বরং সব সময় মনে হয়েছে, বাবা তাকে ঘেন্না করেন। এখন কাশ্মীররাজের সামনে সিংহরাজের এমন ন্যাকামিতে আপ্লুত কিংবা বিস্মিত হল না দিদ্দা। বরং রাগে তার গা-টা রি রি করতে লাগল।
একইরকম বিরক্তি বোধ হয় লোহারার রানি, দিদ্দার মায়েরও। তাই বিয়ের অনুষ্ঠানে তাঁকে খুব একটা প্রকাশ্যে দেখা গেল না। ছোট্ট খোকা উদয়রাজকে সামলানোর অছিলায় তিনি অন্তঃপুরেই নিজেকে আটকে রাখলেন। বারবার সবাইকে বলতে লাগলেন, ভৃত্য আর পরিচারিকাদের হাতে লোহারার ভাবী রাজাকে ছেড়ে দেওয়ার পক্ষপাতী নন তিনি। দিদ্দা সব বুঝল। মনে মনে হাসল শুধু।
শিবিকায় দিদ্দাকে তুলে কাশ্মীর থেকে আগত বরযাত্রী নিজভূমের দিকে রওনা দিল। শিবিকায় দিদ্দার সহযাত্রী হল বলগা। আর শিবিকার পাশে পাশে চলতে লাগল অশ্বারোহী নরবাহন। ভাবটা এমন যেন দিদ্দার রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষার যাবতীয় দায় তার একার। দু'জন বিশ্বস্ত অনুচর শ্বশুরালয়ে তার সঙ্গে চলেছে, এটা জেনে দিদ্দা ভীষণ নিশ্চিন্তবোধ করেছিল।
শিমিকার গভীর গহন অরণ্য পেরিয়ে যেতে হল তাদের। নানা সুগন্ধী ফুলের গন্ধে সে বনের বাতাস মাতোয়ারা। দিদ্দা বুঝল, দাদু ভীমদেব শাহীর গান্ধারের চেয়ে তার জন্মভূমি লোহারা যতটা প্রকৃতির রূপ রস গন্ধে সমৃদ্ধ, তার থেকেও এ ব্যাপারে বেশি সমৃদ্ধিশালী কাশ্মীর। এখানকার মাটিতে অফুরান উর্বরতা। বাতাসে অফুরান সুবাস। ঝরনার জলে অনর্গল ধারা। পরিমণ্ডলে নিরন্তর পক্ষীকূজন।
আসতে আসতেই কাশ্মীরকে বেশ ভাল লেগে গেল দিদ্দার।
ক্ষেমগুপ্ত পালকির পর্দা সরিয়ে আহ্বান জানালেন দিদ্দাকে।
‘কাশ্মীরে সুস্বাগতম রাজ্ঞী দিদ্দা। শ্রীনগর আপনাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য তৈরি।'
ক্ষেমগুপ্তকেও ভারি ভাল লেগে গেল দিদ্দার। কাশ্মীরে পৌঁছানো মাত্র।
পালকি থেকে নামতে যাবে দিদ্দা।
অভ্যস্ত ভঙ্গিতে তাকে সতর্ক করে দিল বলগা।
‘সাবধানে পা-টা ফেলবেন রাজকুমারী।'
‘রাজকুমারী নয়, রানি।'
পা ফেলতে ফেলতেই সম্রাজ্ঞীসুলভ অহমিকায় দিদ্দা হুঁশিয়ার করে দিল বলগাকে। বলগা জিভ কাটল।
সত্যিই তো, তার ভুল হয়ে গিয়েছে সম্বোধনে
লোহারার রাজকুমারী এখন কাশ্মীরের রানি।
লজ্জায় ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে অধোবদন হল সে। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে দিদ্দা পালকি থেকে নামল। বলগাকে থামিয়ে স্বয়ং ক্ষেমগুপ্ত ভর দিয়ে চলার জন্য বাড়িয়ে দিলেন তাঁর কাঁধ। সে কাঁধেই নিজের ভার রাখল দিদ্দা।
বলগা আর নরবাহন টের পেল, তাদেরকেও মানিয়ে নিতে হবে এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে।
কাশ্মীরের ঠান্ডা বাতাস তাদের পোশাক ভেদ করে সুচ ফোটাচ্ছে তখন।
কাশ্মীরে পা রাখার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দিদ্দা একটা কথা স্পষ্ট বুঝে গেল। ক্ষেমগুপ্ত তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। সে তাকে সত্যিই ভালবাসে। চোখে হারায় । মুহুর্মুহু জানতে চায়, তাকে স্বামী হিসেবে পেয়ে দিদ্দা খুশি কি না ।
পক্ষান্তরে দিদ্দা তাতে মুগ্ধ নয়। সে ক্ষেমগুপ্তকে অল্পবিস্তর পছন্দ করে। ওইটুকুই। একটা ভাল লাগা আছে রাজার প্রতি। কিন্তু তাই বলে তার প্রেমে সে আত্মহারা, এমনটা নয়। বরং, ক্ষেমগুপ্তর বেশ কিছু কাজকর্ম তার একেবারেই না-পসন্দ।
এই যে রাজা মাঝেমাঝেই মন্ত্রিসভার নীতি নির্ধারক বৈঠক বাতিল করে দিয়ে শিয়াল শিকারে বেরিয়ে যান, কিংবা প্রজাদের অভাব অভিযোগ শোনার বদলে স্রেফ ফাল্গুনের পরামর্শ শুনে রাজ্য চালান, সেটা একেবারেই অপছন্দ দিদ্দার। এসব দেখলে তার রাগ হয়।
ঠিক একইরকমভাবে সে সহ্য করতে পারে না রাজার স্তাবকদের। ওরা ক্ষেমগুপ্তকে বলে ‘কঙ্কনবর্ষা’। কথায় কথায় কঙ্কন অর্থাৎ সোনার বালা পাওয়ার লোভে তারা হাত পাতে ক্ষেমগুপ্তের সামনে। আর ক্ষেমগুপ্তও আগুপিছু না ভেবে তাদের সোনায় মুড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। এতে যে রাজকোষ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, রাজ্য যে আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে, সে সব বিষয়ে মাথাও ঘামায় না ক্ষেমগুপ্ত। দিদ্দা রাজার এই বেহিসাবি খরচ মেনে নিতে পারে না। মোসাহেবদের জন্য অপব্যয় দেখলে তার গা-টা রাগে জ্বলতে থাকে। রাজা যেদিন স্তাবকদের জন্য এই বিপুল অর্থব্যয় বন্ধ করে দেবেন, তার পরদিনই যে এরা রাজার পাশ থেকে সরে যাবে, আর ঘন ঘন ‘কঙ্কনবর্ষা'র নামে জয়ধ্বনি তুলবে না, সেটা দিদ্দা ভালমতোই টের পায়।
তবে ক্ষেমগুপ্ত যে নিজেকে অনেকটা বদলে ফেলেছে কিংবা ফেলছে, সেটাও দিদ্দা টের পায়।
অন্দরমহলে দাসদাসীরা ফিসফাস করে, রাজা নাকি আর বাইরের নারীদের পেছনে আগের মতো সময় আর অর্থ না উড়িয়ে রানির সঙ্গেই বেশি সময় কাটান। দিদ্দা নাকি তাকে অন্দরমুখী করেছে। দিদ্দা নিজেও দেখতে পায়, প্রায়ই জুয়াড়ির দল রাজপ্রাসাদের ফটক থেকে বিদায় নেয়। রাজা নানা অজুহাতে তাদের ফিরিয়ে দেন।
দিদ্দার রূপ, কথাবার্তা, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, প্রশ্ন করার বিষয় ও ধরন, সবেতেই যে ক্ষেমগুপ্ত মুগ্ধচিত্ত, সেটাও দিদ্দা ভালমতোই বুঝতে পারে। খুব চেষ্টা করে ফাল্গুনের জায়গাটা যাতে সে নিজে পায়, সেটা নিশ্চিত করার জন্য। কাশ্মীর রাজসভার গঠনশৈলী এতদিনে বুঝে ফেলেছে দিদ্দা। বেশির ভাগটাই জেনেছে চন্দ্রলেখার কাছ থেকে। ক্ষেমগুপ্তের প্রধানা মহিষীকে দিদ্দা সতীন থেকে বন্ধু বানিয়ে ফেলেছে অল্পসময়ের মধ্যে। দুই সখী যখন একান্তে গল্প করে, তখন সেখানে বলগাও প্রবেশাধিকার পায় না।
লোহারার রাজসভার সঙ্গে কাশ্মীরের রাজসভার অনেক পার্থক্য। কাশ্মীর বড় রাজ্য। রাজসভাটাও বড়। বৃহত্তর হওয়ার কারণে জটিলভাবে বিন্যস্ত এখানকার মন্ত্রিপরিষদ এবং অমাত্যবর্গের স্তর বিভাজন। চন্দ্রলেখার কাছ থেকে দিদ্দা জেনেছে, কাশ্মীরের রাজসভায় দুটো মুখ্য গোষ্ঠী আছে। একাঙ্গ আর তান্ত্রিন। একাঙ্গরা মূলত রাজার দেহরক্ষী। রাজার সঙ্গে লেপ্টে থাকে সারাক্ষণ। অন্যদিকে তান্ত্রিনরা মূলত পদাতিক সৈন্য। বাইরের শত্রুদের থেকে কাশ্মীরকে রক্ষার দায়িত্ব তাদের। চন্দ্রলেখা বলেছে, একটা সময় ছিল, যখন এই একাঙ্গ আর তান্ত্রিনরা পরস্পর আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করত, সিংহাসনের উত্তরাধিকার। সিংহাসনে রাজ পরিবারের কোন সদস্য বসবে, সেটা ঠিক করার দায়িত্ব ছিল তাদেরই ওপর। প্রশাসন চালাত তারা নিজেদের মর্জিমতো। রাজার বকলমে রাজাজ্ঞা জারির ক্ষমতা ছিল তাদের। সেসব অতীত এখন। তবুও, তাদের সুনজরে না থাকলে, মুশকিলে পড়তে হয়। চন্দ্রলেখা সাবধান করে দিয়েছিল দিদাকে।
যবে থেকে জানতে পেরেছে চন্দ্রলেখা ক্ষেমগুপ্তর প্রধানা মহিষী, প্রথম পত্নী, তবে থেকে রাজার প্রীতিপক্ষপাত থেকে চন্দ্রলেখাকে কীভাবে সরাবে, তার জায়গাটা সে নিজে নেবে, সেসব কথা ভেবে এসেছে দিদ্দা। কখনও সখনও, দু'-একবার, বলগার সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনাও করেছে। কিন্তু এখন তার লক্ষ্য বদলেছে। রাজা আর চন্দ্রলেখার সম্পর্ক রসায়ন নিয়ে আর মাথা ঘামায় না দিদ্দা ।
দিদ্দা বুঝে ফেলেছে, চন্দ্রলেখা আসলে দাবার বোড়ে। তার বাবা ফাল্গুন আর বোনপোদের হাতের পুতুল। চন্দ্রলেখার আরও কয়েকটা বোন আছে। এরমধ্যে দুই বোনের ছেলে, মহিমন আর পাতাল, প্রধানমন্ত্রী ফাল্গুনের শাগরেদ।
চন্দ্রলেখা শান্তশিষ্ট, মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে। ক্ষমতার লোভ কিংবা উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার একেবারেই নেই। সেই সাদাসিধা মানসিকতার সুযোগ নিয়েছে ফাল্গুন, মহিমন আর পাতাল। ওরাই পছন্দমাফিক রাজানুগ্রহ পাওয়ার জন্য চন্দ্রলেখাকে ব্যবহার করে। ফাল্গুনের কাছে চন্দ্রলেখা হল উন্নতির সোপান। আর বোনপোদের কাছে সে হল রাজার অনুগ্রহ লাভের মাধ্যম। সব মিলিয়ে, নিজের অজান্তেই চন্দ্রলেখা তার ক্ষমতালোভী পরিবারের দালাল হয়ে উঠেছে। নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছা বলে তার কিছু নেই। সমবয়সি কোনও সঙ্গী ছিল না এতদিন। দিদ্দা আসায় সে একটা সঙ্গী পেয়েছে। এজন্যই দিদ্দার সঙ্গে তার এত সখ্য। দিদ্দাকে পেয়ে সে খুব খুশি।
বামন আর জিষ্ণুর ব্যাপারেও দিদ্দাকে সর্তক করেছে ওই চন্দ্রলেখাই। এরা দু'জনেই পাক্কা জুয়াড়ি। রাজাকে দ্যূতক্রীড়ায় আসক্ত করেছে ওই দু'জন। এরাই রাজসভায় পণ্ডিত, সংস্কৃতিমনস্ক, গভীরভাবের গম্ভীর মানুষদের বিষয়ে আলটপকা মন্তব্য করে । তাঁদের অসম্মান করে। ওদের পাল্লায় পড়েই ক্ষেমগুপ্ত পণ্ডিত বিদ্বজ্জনদের কথায় কর্ণপাত করে না ।
রাজার পার্ষদবর্গের মধ্যে আরও দু'জন ধূর্ত শৃগাল হল হরি আর ধূর্জটি। চন্দ্রলেখার কাছ থেকে দিদ্দা অবগত হয়, এই দু'জনই রাজাকে মেয়ের জোগান দেয়। তার লাম্পট্যে উৎসাহ জোগায়। কাছেপিঠে তিন-তিনটে অরণ্য আছে। দামোদরাণ্য, লালণা আর শিমিকা। এসব জায়গায় রাজকার্য ফেলে রাজা শৃগাল শিকারে ছোটেন হরি আর ধূর্জটির প্ররোচনায়।
চন্দ্রলেখার মুখেই দিদ্দা শোনে তার শ্বশুর পর্বগুপ্তের জীবন-কথা।
পর্বগুপ্তের পূর্বপুরুষরা ছিলেন লেখক। কাশ্মীররাজ যশক্ষরার রাজসভায় পর্বগুপ্তর স্থান হয়েছিল স্রেফ করণিক হিসেবে। যশক্ষরা যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন তাঁর গোপন ধনভাণ্ডারের হদিশ জেনে ফেলে পর্বগুপ্ত। সহজেই সেখান থেকে আড়াই হাজার স্বর্ণমুদ্রা সরিয়ে ফেলে। তারপর কাশ্মীররাজের যাবতীয় সম্পত্তি কব্জা করে। সিংহভাগ নিজে আত্মসাৎ করে বাকিটা বিলিয়ে দেয় রাজার অমাত্যদের মধ্যে। তারাও পর্বগুপ্তের অনুগত হয়ে পড়ে।
এরপর যশক্ষরার পুত্রসন্তান সংগ্রামদেবের দিকে হাত বাড়ায় পর্বগুপ্ত। যশক্ষরার প্রয়াণের পর নাবালক সংগ্রামদেবের অভিভাবক হিসেবে সিংহাসনে বসায় যশক্ষরার মা, অর্থাৎ সংগ্রামদেবের ঠাকুমাকে। একাঙ্গরা তখনও তার চালটা ধরতে পারেনি। বুঝল ক'দিন পর।
সেবার শীতে তুষারপাত হল খুব। তার মধ্যেই পর্বগুপ্ত তার অনুগত সেনাদের দিয়ে ঘিরে ফেলল রাজপ্রাসাদা। ভয়ানক তুষারপাতের কারণে তান্ত্রিনরা রাজার বাকি সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে উঠতে পারল না।
সংগ্রামদেব প্রাসাদের অভ্যন্তরেই বন্দি হল পর্বগুপ্তর বাহিনীর হাতে। তার গলায় একটা ভারী পাথর ঝুলিয়ে সংগ্রামদেবকে ফেলে দেওয়া হল বিতস্তার জলে। তারপর থেকে আর কেউ সংগ্রামদেবের খোঁজ পায়নি।
এরপর কাশ্মীরের রাজ সিংহাসনে বসে পড়ল পর্বগুপ্ত। কাশ্মীরবাসী অবাক দৃষ্টিতে দেখল, চেহারা বদলে গিয়েছে তার। দাড়িতে মেহেন্দি লাগিয়েছে সে। দাড়ির রং অভিজাতদের মতো তামাটে-কমলা করে ফেলেছে সেদিনের করণিক। যারা এর প্রতিবাদ করল, তাদের মরতে হল।
পর্বগুপ্ত নাকি রোগে ভুগে, দারুণ কষ্ট পেয়ে মারা গেছিল। জলউদরী হয়েছিল তার। পেট ফুলে ঢোল। লোকে বলেছিল, এই রোগ পর্বগুপ্তের কুকর্মের ফল। ভগবানের বিচার নাকি।
কথাগুলো জানা ইস্তক একটা কথাই মনে হয়েছে দিদ্দার।
তার শ্বশুরকুলের শিরায় উপশিরায় যে রক্ত বইছে, সেটা কোনও রাজবংশের রক্ত নয়। খুনি আর লুটেরার রক্ত।
এরচেয়ে তার নিজের জন্ম তো অতি উচ্চবংশে। লোহারা ও গান্ধার, উভয় রাজ্যের শাসকের রাজরক্ত বইছে তার শরীরে।
নিজের বংশ মর্যাদার কথা ভেবেই দিদ্দা ঠিক করে ফেলল, এবার কাশ্মীরকেও বুঝিয়ে দিতে হবে আভিজাত্যের মাহাত্ম্যটা কোথায়। এখানে প্রকট করে তুলতে হবে তার রাজকীয় উপস্থিতি। জানান দিতে হবে তার স্বকীয় ঔজ্জ্বল্যের।
নিজস্ব বৈভবের প্রকাশ ঘটিয়ে কাজটা করতে হবে।
খুনি, লুটেরা, কেরানির বংশের বউ হিসেবে একাজ করায় কোনও গৌরব নেই। দিদ্দা মনে মনে তার লক্ষ্য স্থির করে ফেলে।
দিদ্দা চায়নি সরাসরি সংঘাতে যেতে। তবু ফাল্গুনের সঙ্গে সংঘাত এড়াতে পারল না সে। ফাল্গুনই বিষয়টাকে অনিবার্য করে তুলল।
পিত্রালয় থেকে অগুনতি পেটিকা এসেছে দিদ্দার সঙ্গে। বিবাহের উপহার সামগ্রীতে ঠাসা। সবক'টি খুলে দেখারও সময় পায়নি এতদিন।
সেদিন সবকটা পেটিকা নিয়ে বসেছিল দিদ্দা। একটা একটা খুলছে। আর দাসীরা তার নির্দেশমতো জায়গায় জায়গায় জিনিসগুলো রেখে দিচ্ছে।
চন্দ্রলেখাও ছিল সেখানে। সে পেটিকার ভেতর থেকে উপহার সামগ্রী বের করছে আর মাঝে মাঝে ‘উরিব্বাস! কী সুন্দর!' বলে চিৎকার করে উঠছে। দিদ্দা মৃদু মৃদু হাসে। মুখে কিছু বলে না। সে বেশ বোঝে ফাল্গুন তার মেয়ের বিয়েতে এত যৌতুক দেয়নি।
কখনও-কখনও দিদ্দা একটা কানের দুল, একটা গলার হার কিংবা একটা হাতের কঙ্কন চন্দ্রলেখাকে পরিয়ে দেয় আর বলে ‘বাঃ! কী সুন্দর দেখাচ্ছে। এটা তুমিই নাও ভাই। তোমাকে দারুণ মানাবে।' চন্দ্রলেখা আপত্তি করে না। নিয়ে নেয় ভালবাসার উপহার হিসেবে।
এর মধ্যে ঘরে ঢোকে ফাল্গুন।
‘মহারানির জয় হোক।'
‘প্রণাম নেবেন মহামন্ত্রী।'
‘রানি! আর তো বলগা আর নববাহনকে কাশ্মীরে আটকে রাখার অর্থ হয় না। আমরা ঠিক করেছি, ওদের পরিবর্তে কাশ্মীরের একজন সৈন্য আর কাশ্মীর রাজমহলের
একজন দাসী মহারানিকে উপযুক্ত পরিষেবা দিতে পারবে। কোনও অসুবিধা হবে না।'
কথাগুলো শুনেই রাগে জ্বলে উঠল দিদ্দা। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। হাত মুঠো করে ফেলল।
তারপর শান্ত কিন্তু দৃঢ়ভাবে বলল, ‘মহামন্ত্রী যে আমার জন্য এত ভাবেন, সেকথা জেনে আমি যারপরনাই আহ্লাদিত। কিন্তু বলগা আর নরবাহনকে লোহারায় ফেরত পাঠানোর কোনও ইচ্ছা আপাতত আমার নেই। আমি কাশ্মীরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কোনও সংশয় প্রকাশ করছি না। শুধু জানাতে চাইছি, বলগা ও নরবাহনের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। আমি এইমুহূর্তে অন্তত ওদের আমার কাছছাড়া করতে চাই না।'
‘কিন্তু মহারানি...।' কিছু বলার চেষ্টা করল ফাল্গুন। কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে দিদ্দা কিঞ্চিৎ গলা চড়িয়ে বলল, ‘আর একটা কথা মহামন্ত্রী। আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে ভবিষ্যতে নাক গলাবেন না। আমার হয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আপনাকে দেওয়া হয়নি, এটুকু শুধু মনে রাখবেন।'
‘অবশ্যই মনে রাখব রানি দিদ্দা।'
কথা আর না বাড়িয়ে কক্ষত্যাগ করল ফাল্গুন। দিদ্দা টের পায়, সাপ পরে ছোবল মারার প্রস্তুতি নিতে এখন বিদায় হল।
তাই সে রাতেই রাজা ক্ষেমগুপ্তকে শয্যায় কাছে পেয়ে দিদ্দা আবদার করল, নরবাহন আর বলগা যাতে স্থায়ীভাবে কাশ্মীরে থাকতে পারে, সে বন্দোবস্ত করার জন্য।
দিদ্দার প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া ক্ষেমগুপ্তর সাধ্য ছিল না সে আবদার অগ্রাহ্য করার। পরদিন একেবারে লিখিত রাজাদেশের মাধ্যমে সবাই জানল, রানি দিদ্দার ব্যক্তিগত সহচরী হিসেবে বলগাকে নিয়োগ করেছেন স্বয়ং কাশ্মীররাজ। তিনিই নরবাহনকেও তাঁর মন্ত্রিপরিষদের কনিষ্ঠতম সদস্য হিসেবে জায়গা করে দিয়েছেন।
আস্তাবল ছেড়ে রাজসভার কাজে নিযুক্ত হয়ে নরবাহন প্রথমদিকে মোটেই খুশি হয়নি। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সে প্রশাসনিক কাজকর্মে দক্ষতা দেখাতে শুরু করল। তবে বলগা লক্ষ করেছিল, প্রতিদিন কাজের শেষে প্রাসাদে নিজের কক্ষে প্রবেশের আগে নরবাহন নিয়ম করে অশ্বশালায় যায় আর আপেল বাগানে পড়ে থাকা আপেল কুড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ঘোড়াদের খাওয়ায়। রাজার মন্ত্রী হয়েও অশ্বপ্রেম অস্তমিত হয়নি তার।
ফাল্গুন বেশ বুঝতে পারছিল, দিদাকে কাবু করা যতটা সহজ সে ভেবেছিল, ততটা সহজ হবে না। সেনাধ্যক্ষ রাক্কা এবং তার অনুগত সৈন্যবর্গ যশোধর, হিম্মাকা, মুকুল প্রমুখকে সে দিদ্দার বিষয়ে সতর্ক করে দিল। বলল, কিছুদিন এখন সবাইকে পরিস্থিতি বুঝে চলতে হবে। দাদুর আপত্তি সত্ত্বেও বলগা আর নরবাহন কাশ্মীরের সরকারি পদে বহাল হয়েছে, একথাটা অগোপন হওয়ার পর মহিমন আর পাতালও দিদ্দাকে সমীহ করতে শুরু করল।
সত্যিই, কাশ্মীর উপত্যকায় তখন অন্য হাওয়ার প্রবহমানতা মালুম হচ্ছিল আমজনতারও।
কাশ্মীরের ইতিহাস আর ভূগোল বুঝে নিচ্ছিল দিদ্দা।
ইতিহাস বোঝার জন্য পুঁথির আখরে ডুব দিল সে। জানতে পারল, পর্বগুপ্তের রাজত্বকাল মোটে দুবছর। অত গুপ্তহত্যা, ষড়যন্ত্র করে দিদ্দার শ্বশুর যে ক্ষমতা করায়ত্ত করেছিলেন, তা ভোগ করতে পেরেছিলেন মাত্র দু'বছর ধরে। পাহাড়, পর্বতে ঘেরা ভূমি কাশ্মীর। তাই এই রাজ্যকে দেবী পার্বতীর ভূমিরূপ বলা হয়। একদা এই অঞ্চল ছিল হ্রদময়। পরে সেখানে জন্ম নিয়েছে পার্বত্য অঞ্চল। কাশ্মীরের প্রচলিত বিশ্বাস, এখানকার সিংহাসনে যিনি আসীন হন, তিনি দেবী পার্বতীরই প্রতিনিধি। এসব কারণেই এই ভূমে পূজিত হন অর্ধনারীশ্বর। এক দেহে হরগৌরীর যুগ্ম অধিষ্ঠানের মূর্তি। কাশ্মীরবাসীর প্রিয়মন্ত্র তাই,
চাংপেয়গৌরার্ধশরীরকায়ৈ কর্পূর গৌরার্ধশরীরকায়।
ধম্মিল কায়ৈ চ জটাধরায় নমঃ শিবায়ৈ চ নমঃ শিবায়।।
প্রপংচসৃষ্টয়ুন্মুখলাস্যকায়ৈ সমস্তসংহারকতাংডবায় ।
জগজ্জনন্যৈ জগদেবকপিত্রে নমঃ শিবায়ৈ চ নমঃ শিবায়।।
লোহারায় সংস্কৃত পাঠে সব সময় গুরুর কাছে প্রশংসিত হত দিদ্দা। তাই প্রার্থনা মন্ত্রের অর্থ বুঝতে অসুবিধা হয় না তার। মন্ত্রের অর্থ সরলভাবে চন্দ্রলেখাকে বুঝিয়ে দেয় সে। চন্দ্রলেখা মোহিত হয়ে শোনে, এতদিন ধরে যে মন্ত্র সে ভক্তিভরে উচ্চারণ করেছে, তার প্রকৃত অর্থ।
শিব এবং পার্বতী, উভয়কেই প্রণাম জানাই। প্রণাম জানাই তাঁকে যাঁর দেহ গলানো সোনার মতো উজ্জ্বল। প্রণাম জানাই তাঁকেও যাঁর দেহ জ্বলন্ত কর্পূরের মতো দেদীপ্যমান । প্রণাম জানাই তাঁকে যিনি জটাধারী। প্রণাম জানাই তাঁকেও, যাঁর কেশদাম সুবিন্যস্ত ।
শিব দুর্গা দুজনকেই প্রণাম নিবেদন করি। প্রণতি জ্ঞাপন করি তাঁর প্রতি যিনি নৃত্য ছন্দে জগৎ সৃষ্টি করেছেন। প্রণাম জানাই তাঁকেও যিনি রুদ্ররূপে সংহার করেছেন সবকিছু। হে জগৎজননী, আপনাকে প্রণাম। হে জগৎপিতা, আপনাকেও প্রণাম।
নমঃ শিবায়ৈ চ নমঃ শিবায়।।
ভূগোল বুঝতে গেলে প্রকৃতি আর মানুষের কাছে যেতে হয়। পুঁথি পাঠে সে কাজ সম্পূর্ণতা পায় না। তাই ক্ষেমগুপ্তর সঙ্গে দেবস্থান পর্যটনে বেরিয়ে পড়ে দিদ্দা।
ক্ষেমগুপ্ত ভাবে, তার নব বিবাহিত পত্নী বুঝি খুব ভক্তিমতী। ঠাকুর দেবতায় ভারি বিশ্বাস তার। সে খুশি হবে ভেবে, দিদাকে কাশ্মীরের মন্দিরগুলোতে নিয়ে যায় সে। কিন্তু টেরও পায় না, দিদ্দা আস্থা রাখে না প্রথাগত দেব অর্চনায়। বরং, দেবপূজার তীব্র বিরোধী সে। যে দেবতারা তাকে পঙ্গু করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে, যে দৈব লিখনে তাকে সহ্য করতে হয়েছে উপেক্ষা আর অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য আর অপমান নিয়ে কাটাতে হয়েছে দিনের পর দিন, সেই অদৃষ্ট লেখক দেব-দেবীদের প্রতি তার না আছে কোনও বিশ্বাস, না আছে কোনও ভক্তি।
কিন্তু এসব কথা ক্ষেমগুপ্তকে বলা চলে না। তাই তার নিজের মনের ভাব কাশ্মীররাজকে ঘুণাক্ষরেও জানতে দেয় না দিদ্দা।
জানতে, বুঝতে দেয় না আরও অনেক কিছু। জয়েন্দ্রবিহার পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়ে সেখানকার বুদ্ধমূর্তি ধ্বংস করে, সেই মূর্তির পিতল গলিয়ে ক্ষেমগুপ্ত তৈরি করেছে ক্ষেমগৌরীশ্বর মন্দির। সেই মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে ধর্মান্ধ নরঘাতক পরস্ব অপহারণকারী ক্ষেমগুপ্তকে ধিক্কার জানাতে ইচ্ছা করে দিদ্দার। মনের ইচ্ছা মনেতেই গোপন রেখে মুখে হাসি আর চোখে ভক্তিভাব বজায় রেখে মন্দিরের গর্ভগৃহে পুরোহিতদের আশীর্বাদ নেয় দিদ্দা, ক্ষেমগুপ্তের সঙ্গে।
পর্বগুপ্তেশ্বর আদতে একটি শিবমন্দির। পর্বগুপ্ত তৈরি করেছিলেন এটি। এখানকার শিবমূর্তির দিকে তাকালে দু'চোখ জুড়িয়ে যায়। দেবদর্শনে ভক্তি নয়, শিল্পকীর্তির প্রতি মুগ্ধতার আবেশ জড়িয়ে যায় দিদ্দার চোখেমুখে। ক্ষেমগুপ্তকে সেকথা টের পেতে দেয় না সে।
‘বাবা খুব ধর্মভীরু মানুষ ছিলেন।' দিদ্দাকে বোঝানোর চেষ্টা করে ক্ষেমগুপ্ত। পর্বগুপ্ত সম্পর্কে তার আত্মজের মূল্যায়ন শুনে দিদ্দার হাসি পায়।
তারা দু'জন যায় সুরেশ্বরী তীর্থেও। এখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল পর্বগুপ্ত জলউদরী রোগে আক্রান্ত হয়ে। সেখানে স্বর্গত পিতার উদ্দেশে পারলৌকিক কর্ম সম্পাদন করে ক্ষেমগুপ্ত। দেবদ্বিজে ভক্তিহীন দিদ্দা সহধর্মিনী হিসেবে তার পাশে পাশে থাকে।
ক্ষেমগৌরীশ্বর মন্দিরে মূর্তি দর্শন করে বের হওয়ার সময় ঘটনাটা ঘটল। রাজা রানিকে যুগলে দর্শনের প্রত্যাশায় মন্দির চত্বরে ভিড় করা জনতা আকাশ-বাতাস জুড়ে আওয়াজ তুলল, ‘মহারানি দিদ্দা দীর্ঘজীবী হোন।'
নিজের নামে জয়ধ্বনি শুনে নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না দিদ্দা। বিস্ময়ের সেই আবেশ কাটতে না কাটতে, অর্ধনারীশ্বরের যে উপাসকরা শৈবতীর্থ ক্ষেমগৌরীশ্বরে পুজো দিতে এসেছিল তারা আওয়াজ তুলল, ‘দিদ্দাক্ষেমর জয় হোক। জয়তু দিদাক্ষেম।'
ক্রমে ‘দিদ্দাক্ষেম’ কথাটাই গ্রাস করে ফেলল শুধু “দিদ্দার নামে জয়ধ্বনিকে। যুগ্ম নাম উচ্চারণে এমন অভিনব জয়ধ্বনি শুনে হর্ষোৎফুল্ল দিদ্দা। আর দিদ্দার খুশিতে ক্ষেমগুপ্তও দারুণ খুশি। সে আস্তে আস্তে বলে, ‘দ্যাখো, প্রজারাও জেনে গিয়েছে তোমাকে আমি কতটা ভালবাসি। তাই আমার নামের আগে জুড়ে দিয়েছে তোমার নামও।' দিদ্দার প্রতিক্রিয়া কেবল হাসি। মনমুগ্ধ করা হাসি।
অন্তরে অন্তরে সে বুঝতে পারে, ক্ষমতার সুগন্ধী তাকে মাতোয়ারা করে তুলছে। ডানা মেলছে শক্তি সামর্থ্যের প্রজাপতি। গোপন ইচ্ছের শুঁয়োপোকা আস্তে আস্তে পূর্ণতা অর্জন করছে।
কাশ্মীরের মন্দিরগুলো দেখে রাজপ্রাসাদে প্রত্যাবর্তনের কয়েকদিনের মধ্যে অন্তঃপুরের দাসীরা সবাই বলাবলি করতে লাগল, রানি দিদ্দার পেটে সন্তান এসেছে। তাঁর গর্ভলক্ষণ সুস্পষ্ট। দৈব আশীর্বাদেই এমন ঘটনা। সবাই নিশ্চিত।
চন্দ্রলেখা ছাড়া অন্তঃপুরের সবাই খুশিতে মেতে উঠল। বলগা এমনিতেই সর্বক্ষণ দিদ্দার ছায়াসঙ্গিনী ছিল। বিষয়টা তার নজরেই প্রথম পড়েছিল। এখন থেকে সে যেন দিদ্দার শরীরে লেপ্টে গেল।
সবচেয়ে খুশি হয়েছিল ক্ষেমগুপ্ত। তার বাবা হওয়ার দিন যত এগোতে লাগল, সমগ্র কাশ্মীর তত উৎসবমুখী হতে লাগল। আর এই উৎসবমুখিনতার পেছনে সক্রিয় সহযোগিতা ছিল রাজকোষের। চারদিকে দেদার অর্থ বিলোতে লাগল ক্ষেমগুপ্ত। সবকিছু দেখে ফাল্গুন ও তার অনুগামীরা আরও বিমর্ষ।
রাজার নির্দেশে রাজসভায় প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যহতি পেয়ে নরবাহনও নিযুক্ত হয়েছিল দিদ্দার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী হিসেবে।
এসময় বলগার চোখে ধরা পড়ল নরবাহনের মধ্যে একটা অদ্ভুত অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন। দিদ্দার পেট যত বড় হয়, নরবাহন যেন তত ঈর্ষা ভরা চোখে গর্ভিনী দিদ্দাকে দেখে। রাজা যত বেশি দিদ্দার পাশে পাশে থাকতে চায়, নরবাহন যেন তত বেশি বিরক্ত হয়। বলগা জানে, নরবাহন ভেতরে ভেতরে দিদ্দাকে ভালবাসে। কিন্তু তার এরকম বহিঃপ্রকাশ আগে কখনও দেখেনি সে।
এরই সমান্তরালে বলগা অনুভব করে, নরবাহনের তার প্রতি অনাসক্তি কিংবা উদাসীনতা তাকে ব্যথিত করছে। সে রূপে গুণে দিদ্দার সমতুল্য নয়, সেটা বলগা নিজেও জানে। তা নিয়ে কখনও মাথাও ঘামায়নি। কিন্তু এই প্রথম নরবাহনের ঔদাসীন্য ও দিদ্দার প্রতি অতিরিক্ত অনুরক্তি বলগাকে ব্যথিত করে তুলল।
এক শীতের রাতে জন্ম নিল অভিমন্যু। দিদ্দা আর ক্ষেমগুপ্তর প্রথম সন্তান। সেই তুষারপাতের রাতেই কাশ্মীররাজ প্রসূতি সদনে এসে প্রায় অর্ধচেতন সদ্য প্রসবিনী দিদ্দার হাতে গুঁজে দিলেন কিছু স্বর্ণমুদ্রা। তাতে লেখা আছে ‘দিদ্দাক্ষেম' কথাটি।
প্রায় অচেতন হয়ে পড়ে থাকা দিদ্দা সেই স্বর্ণমুদ্রার তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারল কি না, তা নিয়ে তার কোনও চিন্তা আছে বলে মনে হল না।
জ্ঞান ফিরতেই ধাত্রী দিদ্দার কোলে তুলে দিল অভিমন্যুকে। দিদ্দা তার গালে চুমু দেওয়ার আগে ছুঁয়ে দেখল সদ্যোজাতর পা দুটি। বারবার করে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। তারপর স্বস্তিভরা স্নেহচুম্বন এঁকে দিল শিশুর দুইগালে। অভিনন্দনবার্তা এল লোহারা থেকে। দিদ্দার মা তাকে পত্রযোগে জানালেন, যত শিগরির সম্ভব, মহারাজ ভীমদেব শাহী কাশ্মীরে তাঁর দৌহিত্রীনন্দনকে দেখতে আসছেন ৷
দিদ্দা সহর্ষে ঘোষণা করল, ভীমদেহ শাহী কাশ্মীরে এলে তাঁকে সে মার্তণ্ড প্রস্রবণ দেখাতে নিয়ে যাবে । সেখানকার জমি থেকে বুনো ফুল তুলে উপহার দেবে তার দাদুকে । সে নিজেও সেই ফুল গুঁজবে তার নিজের খোঁপায়।
এসব কথা শোনার পর ক্ষেমগুপ্ত প্রহসন করে বলল, “ওসব চলবে না। ভীমদেব শাহী তোমার প্রিয়জন মানে কি আমার প্রিয়জন নন? আমি তাঁকে গোটা শ্রীনগর ঘুরিয়ে দেখাব। অন্য কারও হাতে সে দায়িত্ব দিতে পারব না।'
দিদ্দা ক্ষেমগুপ্তর চোখের দিকে তাকায়। রাজার কথায় যে আন্তরিকতা স্পষ্ট সেটাও বুঝতে পারে। কিন্তু রাজার প্রতি ভালবাসায় ভেসে যাওয়ার কোনও তাগিদ অনুভব করে না সে। রাজাকে সে এখনও মন ঢেলে ভালবাসতে পারেনি, সেটা আরও একবার অনুভূত হয়।
পুরো ঘটনাটা ঘটে বলগার চোখের সামনে। বলগা অনুভব করে পরস্পরকে ভালবাসার ক্ষেত্রে দিদ্দার আর ক্ষেমগুপ্তর অবস্থানগত পার্থক্য। দিদ্দার চোখের ভাষা বোঝার ক্ষমতা তার ভালমতোই আছে।
তবে কি দিদ্দাও নরবাহনকে ভীষণ ভালবাসে? সেজন্যই কি সে রাজা ক্ষেমগুপ্তর প্রতি এতটা উদাসীন ?
কথাগুলো মনে হতেই কষ্ট পায় বলগা। যেন নরবাহনকে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে ওই রূপসী রমণী দিদ্দা।
ভীমদেব শাহী কাশ্মীরে এলেন যখন, তখন অভিমন্যুর বয়স তখন প্রায় এক বছর। উদাভণ্ড উপপ্লবে অশান্ত হয়ে উঠেছিল। সেটা প্রতিহত করতে করতেই কেটে গিয়েছে এতগুলো মাস।
উদয়রাজকে সঙ্গে করে এনেছিলেন ভীমদেব। ‘আরে, ওর বাবা-মা তো ওকে ছাড়তেই চাইছিল না। কোনওরকমে ওকে ছিনিয়ে এনেছি'। হাসতে হাসতে দিদ্দাকে বলেন গান্ধাররাজ।
আর উদয়রাজ দিদ্দার কাছে জানতে চায়, ‘তুমি আমার কে হও? আগে তো কখনও তোমাকে লোহারায় দেখিনি।'
তার চুলে হাত বুলোতে বুলোতে দিদ্দা বলে, ‘আমি তোমার কে হই, তা এখনই জানার দরকার নেই। বড় হলে আপনি জেনে যাবে আমি তোমার কে। তখনই তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কেমন, সেটা বোঝার সত্যিকার তাগিদ অনুভব করবে তুমি।' কাশ্মীর ত্যাগ করার আগে দুটো ঘটনা ঘটালেন ভীমদেব শাহী। একটা গোপনে ৷ অপরটি প্রকাশ্যে।
বিদায় মুহূর্তে বলগা আর নরবাহনকে কাছে ডেকে তাদের কানে কানে বললেন, ‘এখানে হাঙরদের ভিড়ে দিদ্দা একা। সুযোগ পেলেই ওরা ওকে ছিঁড়ে যাবে। যতদিন না অভিমন্যু বড় হয়, তোমরা দু'জন দিদ্দাকে আগলে আগলে রেখো।'
আর মার্তণ্ড প্রস্রবণে ভ্রমণ সেরে ফিরে এসে ঘোষণা করলেন, প্রস্রবণ থেকে প্রায় এক ক্রোশ দূরে একটি বিষ্ণু মন্দির প্রতিষ্ঠা করবেন তিনি। সে মন্দিরের নাম হবে ‘ভীমকেশব’ মন্দির ।
কথাটা জানামাত্র ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ফাল্গুন আর তার অনুগামীরা। ক্ষেমগুপ্তও কি মেনে নিতে পারবেন এটা? তাঁর রাজ্যে গান্ধারের রাজা স্বনামাঙ্কিত বিষ্ণু মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে চলেছেন, এটা শুনে কি ক্ষিপ্ত হবেন না ক্ষেমগুপ্ত? সেই রাগ বিরক্তির আঁচ কি দিদ্দার ওপরে গিয়ে পড়বে না? ভাবতে বসে নরবাহন।
কিন্তু বলগা এর পেছনে দুটো উদ্দেশ্য স্পষ্ট খুঁজে পায়।
এক, ভীমদেব শাহী এই মন্দির প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কাশ্মীরবাসীকে তাঁর আপন প্রতাপের বিষয়ে, তাঁর নিজস্ব কীর্তি গরিমার বিষয়ে, অবগত করতে উৎসুক।
দুই, এই মন্দির প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি সংকেতিত করতে চাইছেন, তাঁর দৌহিত্রী দিদ্দাও ক্ষমতার অঙ্কে, প্রতাপের পরিমাপে তাঁরই অনুগমন করতে শুরু করেছে। সেও ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এটাও কাশ্মীরবাসীকে বোঝানো দরকার।
ভীমদেব শাহীর মন্দির নির্মাণের প্রস্তাবে ক্ষেমগুপ্ত যে অসন্তুষ্ট, সেটা প্রথমদিকে তার আচরণে বোঝা যায়নি।
বোঝা গেল, যখন তিনি দ্বিতীয়বার কাশ্মীরে আসার কথা বললেন।
সেদিন সন্ধে নেমেছিল আর পাঁচটা দিনের মতোই। প্রতিদিনকার মতোই খেলা শেষে মায়ের ঘরে এসেছিল অভিমন্যু। দেখল দিদ্দা লেফাফা থেকে একটা পত্র বের করে পড়েছে। ‘কী পড়ছ মা? আমার সঙ্গে খেলবে না?'
‘দিদার চিঠি এসেছে লোহারা থেকে। সেটাই পড়ছি বাবা।' দিদ্দা বলে, অভিমন্যুর পায়ে হাত বোলাতে বোলাতে। অভিমন্যুর দুটো পায়ের আঙুলই খুব সুন্দর। দুটো পাতাই ভীষণ সুগঠিত। সুযোগ পেলেই দিদ্দা ছেলের পা স্পর্শ করে আর ভাবে, তার পায়ের বিকৃত কুৎসিত অংশ যখন তার মা ছুঁতেন, সে কেমন লজ্জায় যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেত। ‘কী লিখেছেন দিদা? তিনি কি কাশ্মীরে আসবেন? আমি তো কোনওদিন দিদাকে দেখিনি মা।'
‘না বাবা, তিনি আসবেন না। আসবে তোমার মামা আর তার সঙ্গে আমার দাদামশাই। গান্ধারের রাজা ভীমদেব শাহী।'
উদয়রাজ আসবে শুনে অভিমন্যুর মুখে চোখে একটা অস্বস্তি ফুটে ওঠে। এর আগে বার দুয়েক দিদির সঙ্গে দেখা করতে এসেছে উদয়রাজ। সিংহরাজ মন্ত্রীসান্ত্রীদের দিয়ে তাকে কাশ্মীরে পাঠিয়েছেন। অভিমন্যু আর উদয়রাজ প্রায় সমবয়সি। ফলে, এতদিন উদয়রাজ এলে অভিমন্যু খুশিই হত। কিন্তু এখন সে বালক নয়, কৈশোরে পা দিয়েছে। উদয়রাজ আসছে শুনে তেমন খুশি হতে পারল না।
কারণটা বোঝা গেল একটু পরেই। অভিমন্যু দিদ্দাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কাকে বেশি ভালবাস, মা? আমাকে না উদয় মামাকে?'
‘দু-জনকেই ভালবাসি বাবা।'
‘না, তাহলে চলবে না। উদয়মামাকে তুমি কেন ভালবাসবে?”
‘বাসব না-ই বা কেন? সে তো আমার ভাই।'
‘আর আমি তোমার ছেলে, মা।'
‘তোমরা দু-জনেই আমার কাছে দুটো রত্ন, অভিমন্যু।'
কথাটা অভিমন্যুর যে খুব একটা পছন্দ হল, তা নয়। তবু খানিকটা নিমরাজি হয়েই সে মায়ের কথাটা সামরিকভাবে হলেও হজম করে নিল।
সেদিন রাতেই শয্যায় রাজাকে পাশে পেয়ে দিদ্দা ক্ষেমগুপ্তকে বলল, ‘জানো, দাদু আবার আসছেন।'
দিদ্দা ভেবেছিল ক্ষেমগুপ্ত আগেরবারের মতোই খবরটা শোনামাত্র উচ্ছ্বসিত হবে। কিন্তু প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া দেখাল না ক্ষেমগুপ্ত। এতক্ষণ দিদ্দার চুলে বিলি কাটতে কাটতে সে আলতো স্বরে, সোহাগ ভেজানো গলায় বলছিল, “দিদ্দা, তুমিই আমার সব, তুমিই আমার জগৎ।' আচমকা ভীমদেব শাহীর কাশ্মীর ভ্রমণে পুনর্বার আসার কথা শুনে যেন তাল কেটে গেল। দিদ্দার মাথা থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে ক্ষেমগুপ্ত রুক্ষ স্বরে বলে উঠল, “মনে হচ্ছে গান্ধাররাজের গান্ধারের রাজকার্যের চেয়ে কাশ্মীরের ব্যাপারে বেশি আগ্রহ।'
‘তিনি যে আমাকে বড্ড ভালবাসেন, রাজা। সেজন্যই তিনি এতদূরে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।' দিদ্দা আদুরে গলায় বলে। তাতেও বরফ বিশেষ গলে না। ক্ষেমগুপ্ত নিজেকে সরিয়ে নেয় দিদ্দার কাছ থেকে। দিদ্দা তাকে জড়িয়ে ধরতে চায়। কিন্তু সে পাশ ফিরে শোয়।
‘আগে যখন দাদু এসেছেন তুমি তো কখনও আপত্তি করনি রাজা।'
‘আপত্তি করার আমি কে!'
ক্ষেমগুপ্ত ঘুমিয়ে পড়ার ভান করে।
সকাল হতেই দিদ্দা দেখতে পায় ক্ষেমগুপ্ত শিকারে যাওয়ার তোড়জোড় করছে। হরি আর জিষ্ণু দামোদরাণ্যে বুনো শুয়োর শিকারের ব্যবস্থা করেছে।
এরকম হুটহাট করে শিকারে যাওয়া ভীষণ অপছন্দ দিদ্দার। অন্যদিন দিদ্দা বারণ করলে রাজা মেনে নিত তার আপত্তি। হরি আর জিষ্ণুকে হতাশ করে দিদ্দাকে কোলে নিয়ে অন্দরমহলের দরজায় খিল দিত।
আজ দিদ্দার বারণ শুনল না ক্ষেমগুপ্ত। তবে দিদ্দার চোখমুখে ফুটে ওঠা বিরক্তির ভাব সে সেদিনও এড়িয়ে গেল না, অগ্রাহ্য করল না। যাওয়ার আগে একান্তে কাছে টানল দিদ্দাকে। দু-হাতের তালু দিয়ে তার মুখখানি ধরল। তাকাল তার চোখের দিকে, সরাসরি।
‘রাগলে তোমাকে অপরূপা লাগে, দিদ্দা।'
দিদ্দা আর পারল না। হেসে ফেলল।
রাজাও হাসতে হাসতে শিকারে বেরিয়ে যাওয়ার আগে দিদ্দার উদ্দেশ্যে বলে গেল, ‘অত ভাবতে হবে না সুন্দরী। তোমার দাদুর এতটুকু অসম্মান হবে না এখানে। ওঁকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসতে বলো।'
‘আজ কি শিকারে না গেলেই নয়, মহারাজ?'
‘সন্ধে নামলেই ফিরে আসব তোমার বাহুডোরে, প্রিয়ে।'
সন্ধা নামলে ক্ষেমগুপ্ত রাজপ্রাসাদে ফিরল বটে, তবে সুস্থ শরীরে নয়। মুখ থেকে গ্যাজলা বের হচ্ছে। সারা গায়ে দুটি বেরিয়েছে। গুটিগুলো ডালের দানার মতো। প্রচণ্ড জ্বর। রাজা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। শরীর কাঁপছে থর থর করে। রাজা চলছে টলতে টলতে।
রাজবৈদ্যকে সঙ্গে সঙ্গে খবর দেওয়া হল। তিনি এলেন। পরীক্ষা করলেন ক্ষেমগুপ্তকে। তারপর গম্ভীর মুখে দিদ্দাকে জানালেন, ‘মহারানি, এ হল লুতা ব্যাধি । জংলি মাকড়সা মানুষের শরীরের ওপর দিয়ে হেঁটে গেলে এ রোগ হয়। মহারাজকে বাঁচানো অসম্ভব। আমাকে মার্জনা করবেন।'
ক্ষেমগুপ্তর মৃত্যু আসন্ন। এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র রাজপ্রাসাদে। মন্ত্রী, অমাত্যেরা একে একে ভিড় করতে লাগল প্রাসাদের ভেতর। বাইরে জড়ো হতে লাগল জনতা।
দিদ্দা নরবাহনকে ইশারায় কাছে ডাকল। তারপর বলগাকে। ফিসফিস করে বলল, ‘অভিমন্যুকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে দাও। পরিস্থিতি মোটেও ভাল ঠেকছে না।' নরবাহন আর বলগা নিষ্ক্রান্ত হল।
ফাল্গুন চেয়েছিল রাজা তাঁর শয়নকক্ষে অন্তিম নিঃশ্বাস ত্যাগ করুন। দিদ্দা সেটা হতে দিল না। ফাল্গুনের নির্দেশ সরাসরি অমান্য করে দাসদাসী ও রাজপ্রহরীদের আদেশ দিল ক্ষেমমঠে ক্ষেমগুপ্তকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। হুসকাপুরের কাছে সেই মঠ। বরাহক্ষেত্রে অবস্থিত এই মন্দির ক্ষেমগুপ্ত দ্বারা নির্মিত। সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার বাসনা ছিল রাজার। মঠটা তৈরিই হয়েছিল সেজন্য। এখন রাজার ইচ্ছা পূরণ করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিল দিদ্দা।
ফাল্গুন নাছোড়বান্দা। ‘মহারানি, ক্ষেমমঠে যেতে কমপক্ষে আধবেলা লাগবে। মহারাজের এই শরীরে অত ধকল সহ্য হবে না।' ফাল্গুন যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চায়। দিদ্দা আপন বক্তব্যে অনড়।
‘আমাকে শেখাতে আসবেন না প্রধানমন্ত্রী। কাশ্মীরের ভূগোল আমি আপনার চেয়ে খুব একটা কম চিনিনি এই কয়েক বছরে। বরাহক্ষেত্রে পৌঁছতে মোটেই কয়েক ঘণ্টা লাগবে না। রাজশকট যদি যোগ্য সারথি চালায় তবে শ্রীনগর থেকে সেখানে পৌঁছতে বেশিক্ষণ লাগার কথা নয়।
অসুস্থ ক্ষেমগুপ্তকে নিয়ে ক্ষেমমঠের দিকে রওনা দিল রাজবাহিনী। দিদ্দা ডেকে নিল চন্দ্রলেখাকে। অনর্গল অশ্রুবর্ষণে চন্দ্রলেখার চোখ ফুলে গিয়েছে। মুখ রক্তবর্ণ। সে কোনও কথা না বলে দিদ্দার শিবিকায় চড়ে বসল।
ক্ষেমমঠে পৌঁছনোর পর এক ঘণ্টাও কাটল না, কাশ্মীর রাজ ক্ষেমগুপ্তের জীবনদীপ নির্বাপিত হল।
আর রাজার মৃত্যুর পর এক ঘণ্টাও কাটল না, বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ল রানি দিদ্দা আর প্রধানমন্ত্রী ফাল্গুন।
ততক্ষণে নরবাহন আর বলগা অভিমন্যুকে রাজার আস্তাবলের এক গোপন কক্ষে রেখে বরাহক্ষেত্রে পৌঁছে গিয়েছে। সেখানে উপস্থিত হয়ে এক অত্যাশ্চর্য দৃশ্য দেখল তারা।
চিতা সাজানো হয়ে গিয়েছে। ক্ষেমগুপ্তর মরদেহ চিতার ওপর শোয়ানো।
ফাল্গুন দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করল, ‘সময় হয়ে গিয়েছে রানি দিদ্দা। সহমরণের জন্য প্রস্তুত হন।
দিদ্দার মুখ বিষাদে ভরা। শরীরটা যেন সামনে নুইয়ে পড়েছে। একটা আসনের হাতলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। প্রাণপণ চেষ্টা করছে নিজেকে সোজা রাখার।
এককোণে দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রলেখা। কেঁদে কেঁদে তার চোখমুখ ফুলে গিয়েছে। সারা মুখে আতঙ্কের ছাপ। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা হারিয়েছে সে। তাই, বাবা ফাল্গুনের হাতে ভর দিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে।
‘দিদ্দা সহমৃতা হবেন না। অন্য অনেক মহত্তর কর্তব্য পালনের জন্য ওঁর জীবিত থাকাটা দরকার।'
নরবাহনের কথায় উপস্থিত সবাই সচকিত হয়ে উঠল। দিদ্দাও। নরবাহনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে সে যেন সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করতে লাগল ।
‘মহত্তর কর্তব্য পালনের প্রণোদনায় বহু কালাগত প্রথার বিরুদ্ধাচরণ! তা সেই মহত্তর কর্তব্যটা কী, শুনি।'
ফাল্গুনের কণ্ঠে বিদ্রুপের আওয়াজ।
সরাসরি তার কথার কোনও উত্তর দিল না নরবাহন। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল দিদ্দার সামনে। একটু আগে তার গলায় যে রুক্ষতা, কর্কশতা, ছিল, তা উধাও। কান্নাভেজা মিনতিভরা গলায় সে দিদ্দাকে বলে, “মহারানি দিদ্দা, আপনার নাবালক সন্তান অভিমন্যুকে ফেলে রেখে আপনি কীভাবে পরলোকগত স্বামীর চিতায় মৃত্যুবরণ করবেন? আপনি কেন অভিমন্যুকে এই নাবালক বয়সে বাবা-মা, দু'জনের স্নেহ থেকে বঞ্চিত করবেন সহমৃতা হয়ে?”
‘তা রাজপুত্র অভিমন্যু এখন কোথায়?' জানতে চাইল ফাল্গুন। ‘আমার ভৃত্যদের কাছ থেকে জনেছি, সে প্রাসাদে নেই। পরলোকগত পিতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য তাকে তো এখানে উপস্থিত হতেই হবে।' বলেই ফাল্গুন ঘুরে গেল দিদ্দার দিকে। বলল, ‘আর মহারানি! আপনাকে রাজার সহমৃতা হতেই হবে।'
‘অভিমন্যুর জন্য উৎকণ্ঠিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। সে নিরাপদেই আছে।' দিদ্দার কণ্ঠস্বরে হঠাৎ ফিরে আসা দার্ঢ্য। ‘সময়মতো আমিই তাকে রাজসভায় নিয়ে আসব। সেজন্যই আমি সহমৃতা হচ্ছি না।' দিদ্দা জানিয়ে দেয় ফাল্গুনকে।
‘সময়মতো মানে?’ ফাল্গুনের কণ্ঠস্বরে আর সৌজন্যের বালাই থাকে না।
‘সময়মতো মানে যখন পরিস্থিতি বা পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনুকূল বা নিরাপদ বলে মনে হবে, তখন। তার আগে নয়,’ দিদ্দার স্পষ্ট উত্তর শুনে যুগপৎ ক্রোধ আর হতাশা খেলে যায় ফাল্গুনের মুখে।
আসরে অবতীর্ণ হয় নরবাহন। ফের। দ্বিগুণ প্রত্যয়ে। ‘মহামন্ত্রী ফাল্গুন নিশ্চয় অবগত আছেন যে শাস্ত্রের মহত্তর কর্তব্যের প্রণোদনায় বিধবার সহমৃতা না-হওয়ার দৃষ্টান্ত আছে।'
‘অমাত্য নরবাহন বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন, সিংহাসনের উত্তরাধিকারীর নিরাপত্তা রক্ষা কেবল রানির দায়িত্ব নয়। সেটা নিশ্চিত করার জন্য বিধবা রানির বেঁচে থাকার কোনও আবশ্যকতা, বিন্দুমাত্র যৌক্তিকতা নেই। যুবরাজ যতদিন না সাবালক হচ্ছেন, ততদিন আমরা সবাই না হয় তাঁকে রক্ষা করার শপথ নিচ্ছি।'
‘মার্জনা করবেন মহামন্ত্রী ফাল্গুন! মা-ই তো সন্তানের স্বাভাবিক অভিভাবক। মায়ের কর্তব্য অন্য কেউ পালন করতে পারে না। তাই, তাই-ই নাবালক যুবরাজের প্রতিনিধি হয়ে তাবৎ রাজকর্ম সমাধার দায় যুবরাজের মায়ের উপরেই বর্তায়। আমাদের কারও ওপর নয়।’
মাথা আর কণ্ঠস্বর, দুটোই উঁচু করে কথাগুলো বলে নরবাহন।
প্রাঙ্গণে আচমকা নীরবতা।
সেই নীরবতা ভেঙে ভেসে আসে চিত্রলেখার কণ্ঠস্বর।
‘এসব বিবাদ বিতর্ক এমন শোকের পরিবেশে আমি সহ্য করতে পারছি না। পিতাকে অনুরোধ, অবিলম্বে এই তর্কাতর্কি বন্ধ করুন। আমি মহারাজ ক্ষেমগুপ্তের সহমৃতা পত্নী হওয়ার সৌভাগ্য স্বেচ্ছায় গ্রহণ করতে ইচ্ছুক।' ফাল্গুন কিছু বলার চেষ্টা করে। দিদ্দাও। দু-জনকেই থামিয়ে দিয়ে চিত্রলেখা বলে, “দিদ্দার বেঁচে থাকাটা দরকার। ওর জন্য মহারাজের প্রেম ছিল। এখনও ওর সন্তান আছে। আমার তো কোনও কালেই কিছু নেই। মহারাজের প্রেম পাইনি কোনওদিন। নিঃসন্তান বিধবা আমি। আমার বেঁচে থাকার কোনও আবশ্যকতা নেই। তাছাড়া আমিই তো রাজার প্রধান মহিষী ছিলাম।'
দিদ্দার চোখ তখন অশ্রুবারিতে পূর্ণ। চোখেমুখে পরম কৃতজ্ঞতার ভাব । চন্দ্রলেখা তাকায় তার দিকে। তারপর বলে, “দিদ্দা! তুমি খুব ভাল মেয়ে। তোমার ক্ষমতা আছে। যোগ্যতাও। চিতার আগুনে সঁপে দিয়ে তুমি নিজেকে নষ্ট কোরো না। আমি তোমার জায়গাটা নিচ্ছি চিতার আগুনের জন্য। মহারাজ আমাকে আগে বিয়ে করে প্রাসাদে এনেছিলেন। তাঁর শেষযাত্রায় সঙ্গী হওয়ার অধিকার তাই কেবল আমারই আছে।'
চিত্রলেখার কথাগুলো যেন পরিবর্তন এনে দেয় দিদ্দার মনোলোকে। সে সোচ্চারে ঘোষণা করে, ‘আমি রাজাধিরাজ ক্ষেমগুপ্তর উত্তরাধিকার লালন করার জন্য সহমরণ নয়, বৈধব্যজীবন বেছে নিলাম।'
দিদ্দাকে বুকে টেনে নেয় চিত্রলেখা।
একেবারে সহোদরার মতো দু'জনে দু'জনকে আলিঙ্গন করে। দু'জনের চোখেই তখন জল।
আর ফাল্গুনের চোখে তখন ক্রোধের আগুন। আপন অভীষ্ট পূরণের যে আশাটুকু ছিল তার, সেটা শেষ করে দিল তারই মেয়ে। নিষ্ফলতার আস্ফালন প্রকাশের অবকাশটুকুও রাখল না চিত্রলেখা।
ফাল্গুনের চোখ হতাশায় জ্বলতে থাকে।
ফাল্গুনের মনের আগুনই বুঝি লেলিহান বহ্নিশিখা হয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিল শ্রীনগরকে। একদিন গভীর রাতে শ্রীনগরে আগুন লেগে গেল। ধোঁয়ায় ঢেকে গেল চারদিক। শহরের কেন্দ্রস্থলে ছিল বর্ধনস্বামীর প্রাচীন মন্দির। নগরের আগুনের গ্রাস থেকে বাঁচানো গেল না সেই দেবালয়টিকেও। পুড়ে মরল বহু মানুষ। স্বজনহারা, গৃহহীন মানুষেরা সর্বস্ব হারিয়ে কাতারে কাতারে জড়ো হল রাজপ্রাসাদের প্রাঙ্গণে।
প্রথমদিকে তাদের মনে দিদ্দার প্রতি বিদ্বেষ ছড়াতে সমর্থ হল মহিমন আর পাতাল । তাদের প্ররোচনায় বিশৃঙ্খল শোকোন্মত্ত জনতা ধরেই নিয়েছিল তাদের তাবৎ দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী দিদ্দা। তার প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণেই তাদের সবকিছু পুড়ে ছাই। লোহারা থেকে এই ডাইনি কাশ্মীরকে শেষ করে দেবে বলে এসেছে।
জনতা যে ক্ষিপ্ত, এ বিষয়ে প্রকৃত অবস্থাটা দিদ্দাকে জানতে দেয়নি রাক্কা।
ক্ষেমগুপ্তের মৃত্যুর পর আত্মগোপন করেছিল ফাল্গুন। আর তারই স্থলাভিষিক্ত হয়েছিল রাক্কা। প্রথম প্রথম রাক্কার চোখ দিয়েই ঘরপোড়া স্বজনহারানো জনতার অবস্থা বোঝার চেষ্টা করেছিল দিদ্দা। কিন্তু শেষমেশ তার চোখের সামনে প্রকৃত চিত্রটা তুলে ধরেছিল নরবাহন। তারই পরামর্শে রাজ কোষাগার খুলে দেওয়া হয়েছিল শ্রীনগরের আমজনতার জন্য।
নরবাহনই একদিন খবর দিল, রাজপ্রাসাদে ঢোকার জন্য বিশাল একটা বাহিনী নিয়ে প্রধান ফটকের বাইরে অপেক্ষমান ফাল্গুন। সেসময় নিজের কক্ষে রানি দিদ্দা রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছিল মহামন্ত্রী রাক্কার সঙ্গে। খবরটা শোনামাত্র রাক্কা বলে উঠল, 'আজ্ঞা দিন, ওই বিদ্রোহী ফাল্গুনকে খতম করে দিই।'
দিদ্দা সম্মতি দিতে যাচ্ছিল। বাধা দিল নরবাহনই। রাক্কার উপস্থিতি রীতিমতো অগ্রাহ্য করে রানিকে সে-ই বোঝাল, ‘বিদ্রোহের খবর ভুল হতে পারে। ফাল্গুন দক্ষ প্রশাসক। তার পদ তাকে ফিরিয়ে দিলে সে বশ্যতা স্বীকার করতেও পারে। মহারাজ ক্ষেমগুপ্তের সবে মৃত্যু হয়েছে। রাজ্যের পরিস্থিতি এখন টালমাটাল। এই সময় সবাইকে বিক্ষুব্ধ করে তোলাটা সঙ্গত হবে না।'
নরবাহনের যুক্তি দিদ্দার মনে ধরল। সে নিজের সশস্ত্র বাহিনীকে তৈরি থাকতে বলল। কিন্তু প্রাসাদের দরজা খুলে দিল ফাল্গুনের জন্য।
ফাল্গুন নিজের বাহিনী নিয়ে প্রাসাদের ভেতর প্রবেশ করল। অস্ত্র সমর্পণ করল দিদ্দার কাছে। আর্ত কণ্ঠে বলল, ‘ক্ষমা চাইছি মহারানি। যারা আমার বিরুদ্ধে আপনার কানে বিষ ঢালছে, তাদের ভয়েই আমি পালিয়ে ছিলাম।'
দিদ্দা হাসল। অপরূপার ভুবনমোহিনী হাসি গোটা পরিবেশটাকেই বদলে দিল। সম্রাজ্ঞী দিদ্দা বলল, ‘আর এমন ভুল করবেন না ফাল্গুন। আর আমাকে ফেলে পালাবেন না। ভুল তো শুধু আপনি করেননি, আমিও করেছি। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, আসুন, আমরা হাতে হাত মিলিয়ে কাশ্মীরকে নতুনভাবে গড়ে তুলি।'
অভিমন্যুকে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল দিদ্দা। জনতার ভিড়ে মিশে যেতে লাগল ৷ মুহুর্মুহু জনজোয়ারে আওয়াজ উঠল, 'মহারানি দিদ্দা দীর্ঘজীবী হোন।' প্রত্যুত্তরে করজোড়ে দিদ্দা ভিড়ের কাছে আবেদনভরা কণ্ঠে বলতে লাগল, ‘আপনারা মহারাজ ক্ষেমগুপ্তের পরলোকগত আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করুন। আর প্রার্থনা করুন তাঁর পুত্র, যুবরাজ অভিমন্যুর জন্য।' তবু জনতা চিৎকার করে চলে, ‘মহারানি দিদ্দা দীর্ঘজীবী হোন।' দিদ্দাকে ঘিরে জনতার উন্মাদনা দেখে অভিমন্যু বলে, ‘মনে হচ্ছে তুমিই কাশ্মীরের নতুন শাসক।' দিদ্দা কোনও উত্তর দেয় না। অভিমন্যু ভুল কিছু তো বলছে না। নীরবতা দিয়ে তার কথায় সিলমোহর দেয় তার মা।
মহিমন তার শ্বশুর শক্তিসেনার গৃহে বসে ষড়যন্ত্র করছে দিদ্দার বিরুদ্ধে। পাতাল তো বটেই, মহিমনের সঙ্গে যোগ দিয়েছে হিম্মাকা, মুকুল প্রমুখ অভিজ্ঞ সৈনাধ্যক্ষরাও।
পরিহাসপুর থেকে এসে তাদের সঙ্গে যোগদান করেছে এরমন্তক, ললিতপুর থেকে এসেছে উদয়গুপ্ত আর যশোধর।
দিদ্দার কাছে সব খবর এসে পৌঁছয় গুপ্তচরদের মাধ্যমে। শক্তিসেনার বাড়ি আক্রমণ করে সব ক'টা বিদ্রোহীর মুণ্ডচ্ছেদ করবে বলে মনস্থ করে দিদ্দা। এক্ষেত্রেও বাধা দেয় নরবাহন। বলে, “ওরা যতদিন না প্রকাশ্যে মাথাচাড়া দিচ্ছে, ততদিন আমাদের তরফে তড়িঘড়ি কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।' দিদ্দা প্রথমে অরাজি থাকলেও শেষমেশ কথাটা মেনে নেয়। অপেক্ষা করতে থাকে কবে সাপেরা বেরিয়ে আসবে তাদের গর্ত থেকে।
বেশিদিন লাগল না। প্রাসাদের উত্তরে পদ্মস্বামীর মন্দিরে গিয়েছিল দিদ্দা। সঙ্গে অভিমন্যু। বলগা আর নরবাহনও ছিল তাদের সঙ্গে। সেখানেই হামলা হল তাদের ওপর। আটকে পড়েছিল তারা মন্দিরের গর্ভগৃহে। দিদ্দার নির্দেশে নরবাহন কথাবার্তা চালায় গেরুয়া বস্ত্র পরিহিত হামলাকারীদের সঙ্গে। জানা যায়, ললিতপুরের ব্রাহ্মণ তারা। যশোধর তাদের নিয়ে এসেছে শ্রীনগরে। প্রচুর স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে তাদের বশ করে ফেলে দিদ্দা। তারা স্বপ্নেও যে পরিমাণ অর্থের কথা কোনওদিন ভাবেনি, তার চেয়েও বেশি অর্থ দিয়ে তাদের সঙ্গে রফা করে নরবাহন, দিদ্দার নির্দেশে।
মন্দির থেকে সুস্থ দেহে প্রাসাদে ফিরে এসেই রানি দিদ্দার আদেশে শক্তিসেনার বাড়ি আক্রমণ করে কাশ্মীরের সৈন্যবাহিনী। গ্রেফতার করা হল ষড়যন্ত্রীদের। মহিমন, পাতাল, সবার মুণ্ডচ্ছেদ করা হল। মাথাগুলো পাথর দিয়ে থেঁতলে সর্বজনচক্ষের সম্মুখে ছুঁড়ে ফেলা হয় বিতস্তার জলে। আর কবন্ধ ধড়গুলো ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলা হল আবর্জনার স্তূপে, শেয়াল কুকুরের খাদ্য হিসেবে।
জনমানসে বিদ্রোহের পরিণতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা গড়ে উঠুক। যাদের মাথায় দিদ্দাদ্রোহী হওয়ার চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, তারা বুঝে যাক, কী ধরনের শাস্তির মুখে পড়বে তারা। মূলত এই কারণেই প্রকাশ্যে নদীবক্ষে কাটা মুণ্ড নিক্ষেপ ও কবন্ধ লাশগুলোকে শেয়াল-কুকুরে খাওয়ার জন্য ফেলে রাখা।
‘রাক্কাকে কী করবেন? ওর পদ কেড়ে নিয়ে আপনি ফাল্গুনকে পুনর্বহাল করেছেন। ও কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়,” বলগা বলে।
দিদ্দার সাফ জবাব, “ও নিয়ে তোমার মাথা না ঘামালেও চলবে। সম্রাজ্ঞী জানেন কাকে কীভাবে কখন কী করবেন। তাঁকে সে কাজ করতে দাও। আর তোমার কাজ হল সম্রাজ্ঞীকে এখান থেকে ওখানে, ওখান থেকে সেখানে নিয়ে যাওয়া। তুমি নিজের কাজটা মন দিয়ে করে যাও।'
এত রূঢ়ভাবে দিদ্দা জবাব দেবে, বলগা ভাবতেও পারেনি। সে এনিয়ে দ্বিতীয় আর কোনও কথা বলার সাহস পায় না।
ক'দিন পর জানা গেল, ফাল্গুন তীর্থযাত্রায় বের হবে। প্রথমেই সে যাবে প্রাণতোষে ।
সেখানে তার ছেলে কদমরাজ থাকে। তার কাছেই যাবে ফাল্গুন। রানির কাছে ছুটি চায় সে। দিদ্দা সানন্দে তার ইচ্ছা মেনে নেয়। রাক্কা স্বপদে পুনর্বহাল হয়।
বলগা অবাক হয়ে ভাবে, সত্যিই, সব বিষয়ে তার মাথা না ঘামানোই ভাল।
রাক্কাকে প্রধানমন্ত্রিত্বে শুধু ফিরিয়ে আনা নয়, সিন্ধু নামে রাক্কার এক নবাগত অনুগামীকে অর্থমন্ত্রকে নিযুক্ত করল দিদ্দা। নরবাহনের ভয়ানক আপত্তি ছিল। তাতে কর্ণপাত করার প্রয়োজন মনে করল না দিদ্দা। মুখের ওপর বলে দিল, ‘কাকে রাজকার্যে কোথায় নিয়োগ করা হবে, সেটা আমার ওপর ছেড়ে দিলে ভাল হয় না!' রানির কাছে মৃদুধমক খেয়ে গুটিয়ে গেল নরবাহনও।
সব ষড়যন্ত্রীকে নৃশংসভাবে হত্যা করলেও কোনও এক অজানা কারণে, নরবাহন বলা সত্ত্বেও, যশোধরকে খতমের আদেশ দেয়নি দিদ্দা। সেনাবাহিনীতে সে স্বপদেই বহাল ছিল। সে-ই দিদ্দাকে বোঝাল, সৈন্যরা যুদ্ধ করার জন্য ক্ষেপে উঠেছে। তাদের রক্ততৃষ্ণা মেটানোর জন্য অবিলম্বে ব্যবস্থা না-নিলে তারা গোল পাকাতে পারে।
রানি অনুমতি দিলেন পার্বত্য এলাকা আক্রমণের। সেখানকার রাজা থাক্কানা ৷ কাবুল তথা গান্ধারের শাহী বংশের রক্ত দিদ্দার মতো তার শরীরেও বইছে। থাক্কানার বাহিনী মাঝেমাঝেই কাশ্মীর সীমান্ত অতিক্রম করে হামলা করে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলই দিদ্দা । এখন যশোধরের ইচ্ছা পূরণ করতে থাকানোর রাজ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ার আদেশ দিল। সেখানে যাওয়ার পর যশোধর ও তার নেতৃত্বাধীন কাশ্মীরী সেনাবাহিনীর কোনও খবর রাজসভায় এসে পৌঁছয়নি। তা নিয়ে গোটা রাজ্য উদ্বিগ্ন হওয়ার সুযোগ অবশ্য পায়নি । কারণ, কাশ্মীর তখন অভিমন্যুর বিয়ে নিয়ে মেতেছে।
পাত্রী জয়লক্ষ্মী। সুন্দরী, তবে, দিদ্দার মতো নয়। দিদ্দার মতো ব্যক্তিত্বও নয় তার। পিতৃহারা কন্যা। কাশ্মীরের প্রাচীন রাজবংশের আত্মীয়। ধনসম্পত্তির অভাব নেই। জয়লক্ষ্মীর মতো জয়লক্ষ্মীর মা-ও রানি দিদ্দার ব্যক্তিত্বকে সমীহ করে চলে। তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
এই বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে কোনও বিপাকে পড়লে অভিমন্যু তার শ্বশুরবাড়ির তরফে আর্থিক সাহায্য তো পাবেই, কাশ্মীরের অভিজাতদের একটা বড় অংশের সমর্থন পেতেও তার কোনও অসুবিধা হবে না। এসব সাত পাঁচ ভেবেই এই সম্বন্ধটায় দিদ্দা সম্মতি দিয়েছিল।
মহা সমারোহে অভিমন্যু-জয়লক্ষ্মীর বিবাহের পরদিনই শ্রীনগরে এসে পৌঁছল কাশ্মীরী সৈন্যবাহিনীর বিজয় অভিযানে সাফল্যের সংবাদ। থাক্কানাকে পরাস্ত করে বাহিনী নিয়ে ফিরে আসছে যশোধর।
যুবরাজের বিবাহ উৎসব সদ্য সম্পন্ন হয়েছে। তার রেশ কাটেনি এখনও। তার মধ্যেই সমগ্র কাশ্মীর জুড়ে বিজয় উৎসব পালনের নির্দেশ দিল মহারানি দিদ্দা।
সেই উৎসব প্রস্তুতির মধ্যেই রাক্কা দিদ্দাকে খবরটা দিল। গুপ্তচরদের মাধ্যমে সে জানতে পেরেছে, যশোধর থাক্কানাকে মোটেই যুদ্ধে পর্যুদস্ত করেনি। বরং তার কাছ থেকে প্রচুর অর্থ উৎকোচ হিসেবে নিয়েছে। বিনিময়ে, সে যাতে নিশ্চিন্তে পার্বত্য অঞ্চলে রাজ করতে পারে, তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আগে যশোধরের পরিকল্পনা ছিল, অভিযান থেকে ফিরেই সঙ্গের বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে রানি দিদ্দার ওপর। এখন রানি বিজয় উৎসবের আয়োজন করেছেন এবং তার প্রতি তিনি প্রসন্ন, সুতরাং দেদার অর্থ পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা আছে তার। এসব কথা জানতে ও বুঝতে পেরে সিদ্ধান্ত বদলেছে যশোধর।
রাক্কার মুখে এসব শুনতে শুনতে দিদ্দার মুখে পাথুরে কাঠিন্য নেমে আসে। চোখে জ্বলে ওঠে বহুদিন ধরে নিভে থাকা একটা আগুন।
শ্রীনগরে পৌঁছনো মাত্র যশোধর টের পায়, তার বাহিনীকে ঘিরে ফেলেছে রানি দিদ্দার অনুগত সেনারা। নেতৃত্বে নরবাহন ।
যশোধরকে মেরে তার লাশ ঘোরানো হয় শ্রীনগরের রাস্তায় রাস্তায়। উৎসবে মেতে থাকা জনতা সেই শরীর দেখে শিউরে ওঠে।
ঠিক সেই সময়েই খবরটা আসে।
সিংহরাজ ও তাঁর পত্নী নিহত হয়েছেন বিগ্রহরাজের হাতে। প্রাসাদ থেকে পালিয়ে গিয়েছে উদয়রাজ। সদ্য বিয়ে হয়েছিল তারও। নবোঢ়া পত্নীও সহগামিনী হয়েছে তার। শেষবার যখন উদয়রাজকে দেখা গিয়েছে, তখন কাশ্মীরের দিকেই আসছিল সে। বাবা-মায়ের জন্য শোকাবিষ্ট কিংবা উদয়রাজের জন্য চিন্তান্বিত হওয়ার সময় পেল না দিদ্দা। খবর এল, গোটা কাশ্মীর জুড়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে যশোধরের সমর্থকরা। হরিরাজ আর সুভদ্রের মতো পেশাদার দাঙ্গাবাজেরাও যোগ দিয়েছে তাদের সঙ্গে। বিতস্তার জল রক্তে লাল। লাশ জমছে শ্রীনগরের রাস্তায়। প্রাসাদের সুরক্ষা বলয়ে নিজেকে আটকে ফেলল দিদ্দা। একাঙ্গ আর তান্ত্রিনদের পাশে পেল সে। শুধু নিজের জন্য নয়। অভিমন্যুর জন্যও। মহারাজ ক্ষেমগুপ্তের ঔরসকে রক্ষা করার দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজেদের কাঁধে তুলে নিল রাজার দেহরক্ষী বাহিনী এবং পদাতিক সৈন্যরা।
অভিমন্যুকে ভত্তরকা মঠে লুকিয়ে রাখল নরবাহন। জয়লক্ষ্মীকেও। নীরবে, সবার অজান্তে, দিদ্দার আদেশের অপেক্ষা না করে, কাজটা সেরে ফেলল সে।
নিজের ওপর নিজেরই রাগ হচ্ছিল দিদ্দার। রাক্কার ওপর অতিনির্ভরতাই কাল হয়েছে, বেশ বুঝতে পারছিল সে। রাক্কার উসকানিতে যশোধরকে হত্যা আর তার বাহিনীকে আক্রমণ করাটা একেবারেই ঠিক হয়নি। দিদ্দার বিরুদ্ধে নিকট ভবিষ্যতে বিদ্রোহ করার কোনও অভিপ্রায় ছিল না যশোধরের। তাই তাকে এখনই মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী ছিল না। সেই ভুল, আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কারণে অবদমিত বিদ্রোহ ফের জাগরূক কাশ্মীরের বুকে। বুঝতে পারে দিদ্দা। ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে সে।
মধ্যরাত্রে দিদ্দার কক্ষে ডাক পড়ে নরবাহনের।
‘বলুন রানি, আমি আপনার বিপন্মুক্তির জন্য আর কী কী করতে পারি? আমি অভিমন্যুকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দিয়েছি। অর্থের লোভ দেখিয়ে বেশ কিছু ভাড়াটে সৈন্য জোগাড় করেছি। আপনার বলার অপেক্ষা না করেই এগুলো করেছি। এবার আপনি বলুন আর কী করতে হবে।'
নরবাহনের বাচনভঙ্গি আহত করে দিদাকে। তার মনে হয় নরবাহন প্রতিটি কথায় তাকে হুল ফোটাচ্ছে।
শান্ত স্বরে দিদ্দা তাকে বলে, ‘আর একটা দুটো কাজই করতে হবে তোমাকে। শ্রীনগরে যারা খাবার বিক্রি করে, তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার করো। আর যেভাবে পার, বিদ্রোহীদের মধ্যে যারা নেতা গোছের, তাদের মাথাগুলো হাজির করো আমার সামনে।'
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সম্রাজ্ঞীর আজ্ঞা পালন করে নরবাহন। খাদ্য ব্যবসায়ীরা বন্দি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রোহীদের খাবারের জোগানে টান পড়ে। পরবর্তী কয়েকদিনের মধ্যে যশোধরের সমর্থকরা গত্যন্তর না দেখে শ্রীনগর ত্যাগের পরিকল্পনা করে। তাদের ধরে ধরে মুণ্ডচ্ছেদ করতে আর কাটা মুণ্ডু ও কবন্ধ লাশগুলোকে বিতস্তার জলে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতে কোনও অসুবিধা হয় না নরবাহনের অনুগামী সেনাদের। সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়ে গুপ্তহত্যা সংঘটিত হয় মসৃণভাবে।
বিদ্রোহ দমন শেষে রাক্কাকে পদচ্যুত করল দিদ্দা। নরবাহনকে উন্নীত করল রাজাঙ্ক পদে। সে পদ প্রধানমন্ত্রীরও ওপরে। দিদ্দা আর অভিমন্যুর ঠিক পরেই।
‘আমি এ পদের উপযুক্ত নই রানি।' নরবাহন নরম স্বরে বলে। তার চোখে আনুগত্যের ভাব স্পষ্ট৷
‘তুমি আমাকে সতত বন্ধুত্ব দিয়ে ঘিরে রেখেছ নরবাহন। এটা তারই পুরস্কার।' নরবাহন নীরবে চোখ তুলে তাকায় দিদ্দার দিকে।
তার মনে হয়, সিংহাসনে আসীন ওই অপরূপা নারী কোনও রক্তমাংসের রানি নন। রাজরাজেশ্বরী কোনও দেবী।
তারপর আস্তে আস্তে সিংহাসন কক্ষ ত্যাগ করে সে।
তার শরীরী ভাষায় আনুগত্যের পূর্ণ লক্ষণ প্রত্যক্ষ করে নিশ্চিন্ত হয় দিদ্দা। একদিন যাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিল সে অসহায় মুহূর্তে, আজ তার হাতেই বাকি জীবনের দায়িত্ব সঁপে দিতে মন চায় তার। কোনও অসহায়তার আবেশে নয়। স্বস্তি লাভের প্রণোদনায় তার এই চাওয়া।
‘বেঁচে থাকার কোনও অর্থ খুঁজে পাচ্ছি না। জেনেছি, আমি আপনার কাছে অপরাধী। ভেবে এসেছিলাম, কাজের মাধ্যমেই আপনি আপনার প্রতি আমার মনোভাব বুঝে নেবেন। কিন্তু আমার প্রতি আপনার ক্রোধের কোনও কারণ বুঝে পেলাম না। সে যাই হোক, আপনার প্রতি কোনও অপরাধ যদি অজান্তেও করে ফেলে থাকি, তবে তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। অন্তিম প্রার্থনা, আপনার প্রতি আমার আনুগত্যের কথা, আপনার প্রতি আমার বিশ্বস্ততার গভীরতা, আপনি কদাচ ভুলে যাবেন না।'
নরবাহনের ঝুলন্ত দেহের পাশে এই লেখাটি উদ্ধার হয়। রানি দিদ্দার উদ্দেশে লেখা তার শেষ পত্র।
নিজের কক্ষের ছাদ থেকে ঝুলছিল নরবাহনের দেহ। মুখের রং বেগুনি হয়ে গিয়েছিল, রক্ত জমাট বাঁধার কারণে। গলায় এত শক্ত করে ফাঁস এঁটেছিল সে, যে গলাটা ফুলে গিয়েছিল।
অকুস্থলে চিঠিটা পড়ে দিদ্দা। তার পর থেকে সেটার হদিশ কেউ পায় না। প্রত্যুষে নরবাহনের দেহ উদ্ধারের পর দিদ্দাকে নিজের কক্ষে একান্তে পেয়ে গেছিল বলগা। কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, 'আপনি ওকে মেরে ফেললেন রাজ্ঞী দিদ্দা!'
বলে ফেলেই নিজেকে সংবরণ করে নিল। মনে ভয়ের উঁকিঝুঁকি। অপেক্ষা করতে লাগল, কখন তাকে নির্বাসনে পাঠানোর কিংবা বন্দি করার আদেশ দেয় দিদ্দা।
কিন্তু দিদ্দা সেসব কিছুই করল না। ধীর পায়ে বলগার কক্ষ ত্যাগের অপেক্ষা করল । তারপর সন্ত্রস্ত বলগা যখন দরজা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে, তখন শান্ত কণ্ঠে প্রতিটি শব্দের ওপর জোর দিয়ে বলল, “তুমি শুধু নও, আমিও তাকে ভালবাসতাম বলগা। আমার সবচেয়ে পুরনো বন্ধু নরবাহন। '
আর কোনও কথা না বলে বলগা নিষ্ক্রান্ত হল।
আপন কক্ষে একাকী দিদ্দা ভাবতে লাগল পূর্ববর্তী ঘটনাক্রম। একটু একটু করে স্মৃতি খুঁড়ে বের করতে লাগল আগের কয়েকদিনের ঘটনা পরম্পরা। পর্যায়ক্রমিক ভাবে।
দিন কয়েক আগের এক সন্ধ্যা।
বলগার কাছে চুল বাঁধতে বসেছিল দিদ্দা। তার দীর্ঘ ঘন কেশরাশির মধ্যে বলগা যখন চিরুনি চালাচ্ছিল তখনই সে প্রশ্নটা করে বলগাকে।
‘বলগা। তোমার একঘেয়ে লাগে না জীবনটাকে? রোজই এক কাজ। একইভাবে সকালে ওঠা, সূর্যাস্তের সময় আসা ইস্তক একইরকম ব্যস্ততা, তারপর সাঁঝ ঘনালে কর্মহীন একাকীত্ব।'
‘চলে তো যাচ্ছে।'
“আমার তো মনে হয় এজন্যই নরবাহন মাঝে মধ্যে আমার নির্দেশ অমান্য করে জীবনে রোমাঞ্চ আনে।'
‘কিছু মনে করবেন না রানি, নরবাহনের মতো বিশ্বস্ত ব্যক্তিরা আপনাকে ঘিরে থাকে বলেই আপনি অনেক কিছুর আঁচ টেরও পান না। নিরাপদে নিশ্চিন্তে রাজকীয় সুখ ভোগ করতে পারেন।'
আয়নার দিকে মুখ করে বসেছিল দিদ্দা। কথাগুলো বলার সময় গলার স্বরে এবং আয়নায় প্রতিফলিত প্রতিবিম্বে বলগার ক্রোধ স্পষ্ট টের পেল সে। এর আগে বলগাকে এভাবে কথা বলতে, এরকম প্রতিক্রিয়া দেখাতে দেখেনি দিদ্দা ৷ এতদিন ধরে কোনওদিন, একবারের জন্যও। দিদ্দা অবাক হয়েছিল।
বিস্ময় আরও বাড়ল তার। আবহাওয়া হালকা করার জন্য দিদ্দা বলগাকে বলে, ‘তোমার বিয়ে করতে ইচ্ছে করে না, বলগা ?’
'বুড়ি হয়ে গেছি। এখন আর কে-ই বা আমাকে বিয়ে করবে?'
‘কে বলে তুমি বুড়ি হয়েছ? বল তো এখনই তোমার পাত্র খুঁজে আনতে পারি। বেশি দূর যেতে হবে না। চেনাশোনার ভেতরেই অনেককে পাওয়া যাবে।'
‘কাউকে পাবে না। তারা সবাই তোমাকে নিয়ে ব্যস্ত।'
বলগার কণ্ঠস্বরে এমন কিছু একটা ছিল যা দিদ্দাকে অবাক করে দেয়। জিজ্ঞাসু নেত্রে ঘাড় ঘুরিয়ে বলগার দিকে তাকায় দিদ্দা। সরাসরি। বুঝে নিতে চায়, ও কার কথা বলতে চাইছে।
দিদ্দা কিছু একটা সন্দেহ করছে, টের পেয়েই প্রসঙ্গ পালটে ফেলে বলগা । বদলে ফেলে গলার স্বর। মুছে ফেলে মুখ থেকে বিরক্তি রেখাগুলো।
‘আমি বিয়ে করে অন্য কোথাও চলে গেলে কে আপনার দেখাশোনা করবে রানি? এমন যত্ন করে কে আপনাকে বয়ে নিয়ে যাবে এদিক থেকে ওদিক, এঘর থেকে ওঘরে, এখান থেকে ওখানে?'
দিদ্দা হাসে। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বলগা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে বারবার স্মৃতিপটে ফুটে উঠতে থাকে বলগার রাগ, বিরক্তি ভরা মুখ। বোঝার আর খোঁজার চেষ্টা করে বলগার এরকম মনোভাবের কারণ। এক-আধবার মনে হয়, বলগা নরবাহনের প্রতি অনুরক্ত আর নরবাহন তার প্রতি।
মনে হয়, কাশ্মীরের রানি আর তার দুই বিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গীকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে ত্রিকোণ টানাপোড়েনের জটিল জ্যামিতি।
রানির কাছে পরদিন সকালে এসেছিল সিন্ধু।
এই যুবকের হিসাবশাস্ত্রে এলেম দেখে মুগ্ধ দিদ্দা। অথচ তার নিয়োগে ভীষণ আপত্তি ছিল নরবাহনের। সত্যি কথা বলতে কী, নরবাহন সিন্ধুর প্রতি কখনও প্রসন্ন ছিল না। সেই অপ্রসন্নতা প্রকাশ পেত সবসময়, নানা কথাবার্তায়।
সেদিন সিন্ধু এসেছিল একটা সামান্য খরচের বিষয়ে অনুমতি চাইতে। বিরক্ত হয়েছিল দিদ্দা।
‘এসব ছোটখাটো ব্যাপারে আমাকে বিরক্ত করবে না সিন্ধু।'
‘না করে উপায় কী মহারানি?' ‘মানে? কী বলতে চাইছ তুমি?'
‘যেকোনও বিষয় নিয়ে মহারাজ অভিমন্যুর কাছে গেলে, তিনি বলেন, তিনি নামেই রাজা। নামসর্বস্ব রাজা হিসেবে কোনও বিষয়ে স্বাধীন মতামত জানানোর ক্ষমতা তার নেই। তিনি বলেন, রাজাঙ্কর কাছে যেতে। রাজাঙ্ক নরবাহনই তো রাজ্যটা চালাচ্ছেন। রাজাঙ্ক নরবাহন ভয়ানক ব্যস্ত মানুষ। তাঁর তো সময়ই পাওয়া যায় না। তাই ভেবে দেখলাম, রাজা আর রাজাঙ্কর পর তো আপনিই আছেন, যিনি রাজা অভিমন্যুর নামে রাজাঙ্ক নরবাহনের হয়ে রাজ্য চালাচ্ছেন। শ্রীঅভিমন্যু নামে রাজা। আসল রাজা শ্রীনরবাহন। আর আপনি হলেন শ্রীনরবাহনের প্রতিনিধি। অন্তত লোকে তো তাই বলে। তাই, অগত্যা, আপনার কাছেই এলাম মহারানি।'
সেই থেকে নরবাহনের সঙ্গে তার নিজের সম্পর্ক রয়াসন নিয়ে কাটাছেঁড়া শুরু করেছিল দিদ্দা।
ক'দিন পর, গতকাল সকালে ঘটেছিল সেই ঘটনাটা।
সিন্ধু আবার এসেছিল দিদ্দার সঙ্গে দেখা করতে। একটা গোপন খবর দেওয়ার ছিল তার। মুখচোখ তখন তার লাল। ছুটতে ছুটতে হাঁপাতে হাঁপাতে এসেছিল সে।
‘কী ব্যাপার সিন্ধু? আবার কী হল?”
‘প্রধানমন্ত্রী রাক্কা গুপ্তচরদের কাছ থেকে একটা ভয়ানক খবর পেয়েছেন। কিন্তু আপনাকে জানানোর সাহস পাচ্ছেন না। আমাকে খবরটা বলেছেন এবং সাবধান করে দিয়েছেন, আমি যেন কোনওভাবেই সেই গোপন সংবাদ আপনার কর্ণগোচর না করি। কিন্তু সে খবর আপনাকে না জানালে আপনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে বলে মনে হয়েছে আমার।'
‘কী এমন খবর, সিন্ধু ?'
‘আজ রাত্রে রাজাঙ্ক নিজের কক্ষে আপনাকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন?' ‘হ্যাঁ। রাজাঙ্কর সেই ভোজসভায় তো প্রধানমন্ত্রী রাক্কাও নিমন্ত্রিত।' ‘খবর এসেছে, সেখানেই খাবারে বিষপ্রয়োগ করে আপনাকে আর প্রধানমন্ত্রীকে একযোগে হত্যা করা হবে। রাজাঙ্ক সেরকম পরিকল্পনাই করেছেন।'
‘তারপর?’
‘তারপর মহারাজ অভিমন্যুকে বন্দি করে ক্ষমতা করায়ত্ত করার পরিকল্পনা তাঁর। ' ‘আচ্ছা! তা প্রধানমন্ত্রী রাক্কা কী করবেন বলে ঠিক করেছেন?'
‘যত দূর জানি, তিনি অসুস্থতার অজুহাতে রাজাঙ্কর ভোজসভায় উপস্থিত থাকবেন না ।’
সিন্ধু চলে যাওয়ার পর দিদ্দা নরবাহনকে দাসীর মাধ্যমে খবর পাঠাল, শরীর ভাল নেই, রানি আজকের নৈশভোজের আসরে আসতে পারবেন না। রাজাঙ্ক বরং রানির কক্ষে সে সময় হাজির হোন। জরুরি আলোচনা আছে।
রাতের বৈঠকে সব কথা খোলাখুলি বলবে বলে ভেবেছিল দিদ্দা। পারল না। শুধু বুঝিয়ে দিল, নরবাহন যে মাঝে মধ্যেই তার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে দ্বিমত পোষণ করছে, সেটা মোটেও ভালভাবে নিচ্ছে না দিদ্দা।
রাতে নরবাহন যখন নিজের ঘরে ফিরে গিয়েছিল তখন প্রায় মাঝরাত। তারপর এই হতভম্ব করে দেওয়া সকাল।
অপ্রত্যাশিত শূন্যতা। অনাকাঙ্ক্ষিত বন্ধু বিচ্ছেদ।
নরবাহনের মৃতদেহ দাহ হওয়ার পর সন্ধ্যায় বলগার কক্ষে আসে দিদ্দা। অন্য এক দাসীর কাঁধে ভর দিয়ে।
বলগা অবাক হয়। আগে কখনও এমনটা হয়নি।
বলগার হাতে একটা কৌটো তুলে দেয় দিদ্দা ।
‘এতে নরবাহনের চিতাভস্ম আছে বলগা। এ বস্তু তোমারই জিম্মায় থাকা উচিত। তুমিই এটার প্রকৃত অধিকারী।’
বলগাকে আর কিছু বলার সুযোগ না-দিয়ে ফিরে যায় দিদ্দা।
পরদিন সকালে সদ্যোখিত সূর্যদেবকে সাক্ষী রেখে বিতস্তার জলে কৌটোটা খুলে ছাই ছড়িয়ে দেয় বলগা।
কৌটো খুলে নীচু হয়ে জলে ফেলার সময় কিছুটা ছাই ঠান্ডা বাতাসে উড়ে গিয়ে পড়ে বলগার মুখে ও চুলে। বুকে ও গালেও লাগে সেই ছাই।
এক লহমার জন্য বলগার মনে হয়, নরবাহন তাকে আদর করছে। সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিচ্ছে।
চোখের জল মুছে নিয়ে প্রাসাদের দিকে এগোতে থাকে সে।
প্রাসাদে ঢুকতে ঢুকতেই জানতে পারে, রানি দিদ্দার নির্দেশে রাক্কা আর সিন্ধুর শিরশ্ছেদ করা হয়েছে।
ডেকে পাঠানো হয়েছে ফাল্গুনকে। তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদে পুনর্বার বহালের রাজাজ্ঞা জারি করেছে দিদ্দা।
কয়েকদিনের মধ্যে দিদ্দা সকাশে ফাল্গুন।
কোনও আবেগের বিস্ফোরণ ঘটল না। অভিযোগ-পাল্টাঅভিযোগে নষ্ট হল না সময়। পাতাল আর মহিমনকে নিকেশ করা নিয়ে, ফাল্গুন কন্যাদের নির্বাসনে পাঠানো নিয়ে, এমনকী তাকে ফিরিয়ে আনার কারণ পূর্বাপর বিশ্লেষণ করা নিয়ে, ব্যয়িত হল না একটাও বাক্য।
দিদ্দা শুধু বলল, ‘আপনাকে আমার দরকার ফাল্গুন। আপনি পুনরায় প্রধামন্ত্রীর কার্যভার গ্রহণ করুন।
ফাল্গুন দিদ্দার দিকে তাকিয়ে রইল।
‘আপনার গুপ্তচররা নিশ্চয় রাজ্যের সম্প্রতিক ঘটনা ও পরিস্থিতি নিয়ে আপনাকে
অবগত করেছে। আপনার নিজস্ব সংবাদ সংগ্রহের সূত্রের বিষয়ে আমি সব জানি। সুতরাং...।'
প্রাণতোষ থেকে সদ্য প্রত্যাগত ফাল্গুন চমকে উঠল রানির বচনে ।
তারপর নতমস্তকে, প্রায় অনুচ্চারিত স্বরে বলল, ‘আমি সম্মানিতবোধ করছি মহারানি। আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ।'
সেদিন থেকেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যভার গ্রহণ করল ফাল্গুন।
রাজাঙ্কর পদ অবলুপ্ত হল।
সরকারিভাবে সেকথা জানিয়েও দেওয়া হল।
অভিমন্যু অসুস্থ।
দিদ্দা অস্থির।
খবর পাওয়ামাত্র তার কক্ষে ছুটে গিয়ে দিদ্দা দেখল, ছেলেটা কাশছে। কাশির সঙ্গে রক্ত। গায়ে প্রচণ্ড জ্বর। মাকে কাছ থেকে দেখেও চিনতে পারল না সে জ্বরের ঘোরে। সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগেই অবস্থা আরও খারাপ হল। রাজ্যের শ্রেষ্ঠ বৈদ্যরা তো বটেই, ভিনরাজ্য থেকেও নামী চিকিৎসকদের জরুরি তলব করে আনা হল। তাঁরাও চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখলেন না।
রানিকে যখন অভিমন্যুর মৃত্যু সংবাদ দেওয়া হল, তার চোখে এক ফোঁটাও অশ্রুবিন্দু দেখা গেল না। তাই নিয়ে দাসীরা নিজেদের মধ্যে কানাকানি করতে লাগল। বলগা শুধু বুঝল, রোজ চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনার সূত্রে দিদ্দা অবশ্যম্ভাবী পরিণতি সম্পর্কে আগেই আন্দাজ পেয়ে গিয়েছিল। মনকে শক্তও করে নিয়েছিল সেইমতো। সুতরাং তার এই প্রতিক্রিয়ায় কোনও অস্বাভাবিকত্ব দেখতে পেল না বলগা।
অভিমন্যুর বড় ছেলে নন্দীগুপ্ত। দশ বছরের বালক। তাকেই সিংহাসনে বসাল দিদ্দা ৷ বড্ড রোগা, একেবারেই রাজপুত্রসুলভ চেহারা নয় তার। সিংহাসনে বসলে তার পা পৌঁছয় না মাটিতে রাখা রাজকীয় পাদানিতে। সিংহাসনের হাতলে পৌঁছয় না তার হাত ।
এমন অরাজকীয় শীর্ণতা দিদ্দার চোখকে পীড়া দেয়। মনকেও। ঠিক করে, নন্দীগুপ্তের খাওয়াদাওয়ার দিকে বিশেষ ভাবে নজর দেবে সে নিজে।
দেখল, সুস্বাদু পুষ্টিকর খাবার দিলেও তা মুখে তুলতে চায় না নন্দীগুপ্ত।
সেদিন রাতে খাবার সময় নবাভিষিক্ত রাজাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করল দিদ্দা। সে কাশ্মীর রাজ্যটিকে চালাচ্ছে নন্দীগুপ্তর অভিভাবক-প্রতিনিধি হয়ে। তাকে নিয়ে কোনও সন্দেহ তৈরি হয়নি তো তার নাতির মনে?
‘কী ভয় তোমার? খাবারে বিষ মেশানো আছে, এমন ভাবছ নাকি?'
বড় বড় চোখ তুলে ঠাকুরমার দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে নাবালক রাজা। ‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তোমাকে পরিবেশনের আগে প্রতিটি খাবার খেয়ে পরীক্ষা করে দেখে রন্ধনশালার নির্দিষ্ট সুপকাররা। তাদের শুধু এই কাজের জন্যই রাখা হয়েছে। ' দিদ্দা আশ্বস্ত করতে চায় ভীতিবিহ্বল নাবালককে।
‘আরে বাবা, বুঝছ না কেন, খাবারে বিষ থাকলে সেই বিষক্রিয়ার আগে মরবে স্বাদ আস্বাদনকারী সুপকার। সে খাদ্য আর পরিবেশন করা হবে না তোমাকে।' দিদ্দা নিজের বিরক্তি গোপন করতে পারে না।
‘আমার খিদে পায় না, ঠাকুরমা।' ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই কথাটা বলে নন্দীগুপ্ত। ‘রোজ যেন কমছে সেটা।'
ডেকে পাঠানো হল রাজ্যের সেরা আয়ুর্বেদাচার্যদের। রাজভিষকের সঙ্গে আলোচনায় বসলেন তাঁরা। তাঁদের পরামর্শ মেনে নন্দীগুপ্তকে পাঠানো হল সেই সব অঞ্চলে যেখানে ঔষধি ভেষজর বন আছে। সঙ্গে রইল একজন বিশ্বস্ত রাজকর্মচারী। সেই কর্মচারীর দেওয়া প্রতিবেদন প্রত্যহ দেখত দিদা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। বলগাকে জানাল, ক্রমে নন্দীগুপ্তের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।
এক পক্ষকাল কাটল। রাজসিংহাসনে আবার নিয়মিত বসা শুরু করল নন্দীগুপ্ত। তারপরই সেই মহা দুর্যোগ।
আপন কক্ষ থেকে সিংহাসনকক্ষে যাওয়ার পথে পড়ে গেল নন্দীগুপ্ত। চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে জানালেন, সে মৃত। দুর্বল হৃৎপিণ্ড তার ক্রিয়া বন্ধ করেছে।
ঘটনাস্থলে দৌড়ে এল দিদ্দা। প্রথমেই মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিল সেই রাজ কর্মচারীর বিরুদ্ধে যে ওষধি ভেষজের বনে নন্দীর সহচর ছিল। লোকটা বলার চেষ্টা করল, সেখানেও মাঝে মাঝে নন্দী জ্ঞান হারাত। সেকথা প্রতিবেদনে লিখে পাঠাত সে। দিদ্দা তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিল না। তার নির্দেশে সেনাধ্যক্ষর তরবারি লোকটার শরীর এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল।
দিদ্দা দেখল, ত্রিভুবনগুপ্ত আর ভীমগুপ্ত, নন্দীগুপ্তের দুই ভাই, আতঙ্কিত নেত্রে একদৃষ্টে দাদার মৃতদেহর দিকে তাকিয়ে আছে।
অল্প সময়ের মধ্যে দু'-দুটো মৃত্যু।
কাশ্মীরের সিংহাসন অভিশপ্ত। এমন আতঙ্ক দানা বাঁধছে।
কথাটা মনে হতেই দিদ্দা আদেশ দিল, নন্দীগুপ্তের দেহটা দাহ করার ব্যবস্থা করা হোক। অবিলম্বে। আর দেরি করা চলবে না।
ত্রিভুবনের রাজ্যাভিষেকের নির্দেশ এল তার পরেই।
ব্লগার কানে এল দাসদাসীদের ফিসফাস। এই পিশাচিনীর হাত থেকে রাজকুমার ত্রিভুবন বাঁচবে তো? সবাইকেই তো এক-এক করে খাচ্ছে এই ডাইনি রানি। স্বামী, পুত্র, বিশ্বস্ত সহচর, কাউকে বাদ দিচ্ছে না ।
তাদের আশঙ্কা সত্যি হল। ক'দিনের মধ্যে মারা গেল ত্রিভুবনও। শিকার করতে গিয়েছিল। ঘোড়া থেকে নামতে গিয়ে পড়ে যায়। পাথরে মাথা ঠুকে যায়। মাথা ফেটে মৃত্যু।
দুর্ঘটনায় ত্রিভুবনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কাশ্মীরের রাজপ্রাসাদের বাতাসে ভাসতে শুরু করল কয়েকটা জিজ্ঞাসা।
এক, এত ছোট ছেলেকে শিকারে যাওয়ার অনুমতি দিল কে? আর দিলই বা কোন আক্কেলে?
দুই, কেন কোনও পরিচারককে রাজার শিকারযাত্রায় সহচর করে পাঠানো হয়নি? এমন অদ্ভুত ঔদাসীন্য কেন ত্রিভুবনের প্রতি? সদ্য নিযুক্ত দু'জন পার্ষদ কেবল গিয়েছিল ত্রিভুবনের সঙ্গে। কেন কোনও অভিজ্ঞ শিকারি যায়নি তার সঙ্গে?
তিন, দুর্ঘটনার বিষয়ে তদন্তকারী রাজকর্মচারীরা নাকি রানি দিদ্দাকে জানিয়েছে যে পর্যাণ অর্থাৎ ঘোড়ার পিঠে বসার গদিটা নাকি ঠিকমতো বাঁধা ছিল না। তাই অশ্বপৃষ্ঠ থেকে অবতরণের সময় পড়ে যায় ত্রিভুবন। ফলে, এই মৃত্যু। এই প্রতিবেদন হাতে পেয়েও রানি নাকি কোনও ব্যবস্থা নেননি অশ্বশালার কোনও কর্মীর বিরুদ্ধে। কেন?
বলগার মনেও ধন্দ তৈরি করছিল এই প্রশ্নগুলো। তার সন্দেহ আর সংশয় গাঢ়তর হচ্ছিল একথা শোনার পর যে দিদ্দাপুর নামে এক নতুন নগর নির্মাণ প্রায় সমাপ্তির পথে। সেখানে নির্মিত হয়েছে এক অভ্রংলিহ বিষ্ণু মন্দির। স্থাপিত বিষ্ণুমূর্তির অভিষেক সম্পন্ন। সেই বিষ্ণুমূর্তির নাম দিদ্দাস্বামী। শুধু কাশ্মীরের আনাচ কানাচ থেকে নয়, অর্থ আর কর্মের সন্ধানে দিদ্দাপুরে ইতিমধ্যেই ভিড় জমাতে শুরু করেছে বহু মানুষ। তারা কাশ্মীর নয়, মধ্যদেশ, লতা এবং সৌদত্র থেকে আসছে।
দিদ্দাপুর নির্মাণ ও দিদ্দাস্বামীর প্রতিষ্ঠার খবরটা শ্রীনরে খুব একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেনি এতদিন। তার কারণ, শ্রীনগরের কেন্দ্রস্থলে একটা বিশাল মঠ নির্মাণ করেছে মহারানি দিদ্দা। সেখানেও ভিড় জমাচ্ছে নানা জায়গার মানুষ। দ্রুত জনপ্রিয়তা বাড়ছে দিদ্দার সেই সূত্রে।
কাশ্মীরের প্রতিটি প্রান্তে ক্রমশ জনতার রানি হয়ে উঠছে দিদ্দা। অনুভব করে বলগা । কাশ্মীরের রাজ সিংহাসন অভিশপ্ত। এই কথাটা জনমানসে গেঁথে যাওয়ার মধ্যে তিনটে ঘটনা ঘটল।
এক, সিংহাসনে আসীন হল অভিমন্যুর কনিষ্ঠ পুত্র ভীমগুপ্ত।
দুই, শ্রীনগরে এসে পৌঁছল গান্ধাররাজ ভীমদেব শাহীর প্রয়াণ সংবাদ। ভেঙে পড়ল দিদ্দা। অভিমন্যু কিংবা ত্রিভুবনের মৃত্যুর পরও তাকে এত শোকার্ত হতে দেখেনি কেউ ।
তিন, মারা গেল ফাল্গুন।
উন্মাদের মতো আচরণ করতে লাগল দিদ্দা। সে একেবারে অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়েছে। তাকে পরামর্শ দেওয়ার মতো কোনও শুভাকাঙ্ক্ষী আর নেই।
আর এরই মধ্যে কাশ্মীরের রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠবৃত্তে আবির্ভূত হল এক যুবক। তুঙ্গা।
দীর্ঘকায় তরুণ। গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল হরিদ্রাভ। চোখের মণি দুটো সবুজ। সদা হাস্যময় । ভীষণ সপ্রতিভ।
সে এসেছিল প্রাণতোষ থেকে। লোহারার শাসক পরিবারের মতো সেও খাসা সম্প্রদায়ের। ডাকহরকরার কাজ করত। চিঠি নিয়েই প্রাণতোষ থেকে শ্রীনগরে এসেছিল। লজ্জার বালাই না-রেখে ভরা রাজসভায় স্বয়ং রানির সামনে দাঁড়িয়ে একটা চাকরি চাওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিল তুঙ্গা।
বলেছিল, ‘আমি যে কোনও কাজ করতে পারি মহারানি। অল্পবয়সে ক্ষেতে মহিষ চরানোর কাজও করেছি।'
‘তাহলে কোনও ক্ষেত খামারে কাজ না খুঁজে এই রাজসভায় এসেছ কেন?” দিদ্দা জানতে চায়।
‘কারণ, আমি যে লিখতে-পড়তে জানি মহারানি। পিঠে করে শুধু চিঠি বয়ে বেড়াই, তা নয়। লেফাফায় ঠিকানা দেখে ঠিক লোকের কাছে চিঠিটা পৌঁছে দিতেও পারি । কেউ যদি লেখাপড়া না জানে, তবে তার বয়ানে চিঠি লিখেও দিই। কবিতাও লিখতে পারি।' মৃদু হেসে বলে তুঙ্গা।
সপ্রতিভ সুদর্শন তরুণের প্রগলভতায় এতটুকু অসন্তুষ্ট না হয়ে রানি দিদ্দা বলে, ‘রাজসভায় প্রশাসকের দরকার পড়ে, কবির নয়।'
তাতেও তুঙ্গা এতটুকু অপ্রতিভ হয় না। বলে, 'আপনি ঠিক যেমনটা চাইছেন, আমি তেমনটাই। চাইলে, পরখ করে দেখতে পারেন মহারানি। ডাকহরকরার কাজের ফাঁকে আমি প্রশাসনিক কাজেও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। বাদ্দিভাসা আমার গাঁ। সেটা তো বটেই, তার পাশের আরও দু-দুটো গাঁয়ের রাজস্ব সংগ্রহের ভারপ্রাপ্ত আমিই। স্থানীয় সামন্তপ্রভু এব্যাপারে আমাকেই ভরসা করেন।'
আর কিছু বলতে হয় না। দিদ্দা তুঙ্গাকে রাজকার্যে নিয়োগ করে।
প্রথম প্রথম ছোটখাটো কাজের দায়িত্ব তুঙ্গার ওপর ছেড়ে দিত দিদ্দা। ছোটখাটো কাজ মানে কোনও নির্মীয়মাণ শহর পরিদর্শনের কাজ, কোনও প্রকল্পের হিসাবপত্র দেখার কাজ, এসব আর কী। আস্তে আস্তে তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করা শুরু হল। রাজসভার সবাই বুঝতে পারল তুঙ্গার প্রতি মহারানির প্রীতিপক্ষপাত রয়েছে। রানির এই বিশেষ স্নেহভাজন যুবকটিকে চটাতে সাহস করত না কেউ। অথচ তার চালবাজি আর ঔদ্ধত্য, বয়ঃজ্যেষ্ঠদের সম্মান করার ক্ষমতা আর বাগাড়ম্বর দেখে প্রায় সবাই বিরক্ত।
বলগাকেও ছাড়ল না তুঙ্গা একদিন। সামনে পেয়ে মুখের ওপর জিজ্ঞেস করল,
‘আমাকে বিশেষ পছন্দ কর না তুমি, তাই না?'
এসব কথার কোনও উত্তর দিতে রুচি হয় না বলগার। তবে নিজের অসন্তুষ্টি বুঝিয়ে দিতে ছাড়ে না সে। কটমট করে তাকিয়ে থাকে তুঙ্গার দিকে।
‘তোমার কী ধারণা, আমি স্রেফ অর্থ আর পদের মোহে মহারানির শরণাপন্ন হয়েছি?' তুঙ্গা বলে। তার কথা বলার ধরন দেখে গা জ্বলে যায় বলগার।
‘তাছাড়া আর কী।' বিড়বিড় করে বলে সে।
‘তুমি রানির খাস দাসী। তার বহুদিনের সঙ্গিনী। তুমি অন্তত আমাকে ভুল বুঝো না। আমি সুদূর প্রাণতোষ থেকে শ্রীনগরে শুধু অর্থ আর রাজপদের লোভে ছুটে আসিনি।' তুঙ্গা নরম গলায় বলগাকে বোঝানোর চেষ্টা করে ।
জিজ্ঞাসু চোখে বলগা তাকায় তুঙ্গার দিকে। বেশ লম্বা ছেলেটা। দেখতেও আকর্ষণীয়।
‘আমি এসেছি মহারানির সেবা করব বলে,” গলা নামিয়ে বলে তুঙ্গা।
‘ভুল বলছ। মহারানি নয়, মহারাজ। মহারাজ ভীমগুপ্তের সেবা করবে বলে...' বলগাকে বক্তব্য শেষ করতে দেয় না তুঙ্গা। থামিয়ে দিয়ে বলে, “আমি এতটুকু ভুল বলিনি। তুমি কি টের পাও না, কাশ্মীরের প্রকৃত শাসক কে? ভীমগুপ্ত তো নামেই রাজা। কাশ্মীরকে বলশালী, সমৃদ্ধিশালী রাজ্যে পরিণত করেছেন মহারানি দিদ্দা। একমাত্র তিনিই আমার মূল্য বুঝবেন, এই আশাতেই আমার এখানে আসা।”
বলগা কোনও উত্তর দেয় না।
কারণ, তুঙ্গা ভুল কিছু বলেনি।
ক্ষেমগুপ্তর সময় কাশ্মীর ছিল একটা সুবৃহৎ কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঘুণ ধরা রাজ্য। প্রশাসন বলে কিছু ছিল না। অমাত্যরা পারস্পরিক রেষারেষিতে মেতে থাকত। তারা প্রত্যেকে রাজার অনুগ্রহ প্রত্যাশী ছিল। তাই নিয়েই লড়াই ঝগড়া চলত তাদের মধ্যে। ক্ষেমগুপ্তর নেক নজরে পড়লেই সোনাদানা, মণিমুক্তো জুটত অঢেল। জুয়া আর মদের আসরে, নর্তকীদের দেহ বিভঙ্গ প্রদর্শনের সভায় উড়ত রাজ কোষাগারের অযুত অর্থ।
সেই কাশ্মীরকে বদলে দিয়েছে দিদ্দা। আপন দক্ষতায় কাশ্মীরকে করে তুলেছে শক্তিশালী সার্বভৌম রাজ্য। শত্রুর কাছে প্রায় দুর্ভেদ্য এখন এই ভূমি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তো ছিলই। দিদ্দার আমলে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মনুষ্যকৃত শিল্প-ভাস্কর্যের সমাহার । ভারতীয় রাজনীতিতে কাশ্মীরকে বাইরে রেখে কোনও রাজন্যশক্তি জোট গঠন করার কথা ভাবতেই পারে না কেউ।
এসব কথা শুধু তুঙ্গা বা বলগা কিংবা রাজসভার অমাত্যবর্গ জানে ও মানে, তা নয়। কাশ্মীরের আমজনতাও স্বীকার করে এসব। তারা সমীহ করে দিদ্দা। কাশ্মীর বাসীর চোখে দিদ্দাই শাসক। মহারানি। শাসন ব্যবস্থার শেষ কথা। বাকি সব্বাই ভীমগুপ্তের মতোই নামসর্বস্ব পদাধিকারী মাত্র।
এহেন তুঙ্গাকে কেন্দ্র করে ভীমগুপ্ত আর দিদ্দার সংঘাত দেখা দিল। তুঙ্গার ঔদ্ধত্য মানতে পারছিল না ষোলো বছরের কিশোর। ঠাকুরমা তার কথায় গুরুত্ব দেয় না। অথচ ওই তুঙ্গার সব কথা মেনে নেয়। প্রকাশ্যে ভীমকে অবজ্ঞা করার ঔদ্ধত্য দেখায় ওই যুবক। অথচ ঠাকুরমা কিছু বলে না। তাই ভীমগুপ্ত প্রকাশ্যে দিদ্দার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করল। সাফ জানাল, তুঙ্গাকে আর রাজকোষের অর্থ তছরুপ করতে দেবে না সে। কেড়ে নেবে ওই উদ্ধত নব্যের তাবৎ ক্ষমতা।
ভীমগুপ্তকে বন্দি করা হল। আর বছর দুয়েক কাটাতে পারলেই সাবালকত্ব অর্জন করত ভীম। তার পর সে-ই হত কাশ্মীরের রাজা। ভাগ্য তাকে সে সুযোগ দিল না। কিংবা অধৈর্য হয়ে উঠে সে নিজেই সে সুযোগ হারাল।
বন্দি অবস্থায় খাদ্যে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হল ভীমগুপ্তের।
আর যেদিন ভীমগুপ্ত মারা গেল, সেদিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার পেল তুঙ্গা। গোটা রাজ্যে, রাজপ্রাসাদের ভেতরে কিংবা বাইরে, কেউ জানতে চাইল না, কীভাবে, কেন, মারা গেল ভীমগুপ্ত। কীভাবে বিষ পৌঁছল কারাগারের অভ্যন্তরে, সে নিয়ে
কোনও তদন্ত হল না।
গোটা রাজ্যে, রাজপ্রাসাদের ভেতরে কিংবা বাইরে, কেউ জানতে চাইল না, কীভাবে, কেন, তুঙ্গার মতো একজন অল্পবয়সি অনভিজ্ঞ যুবককে মহারানি দিদ্দা প্রধানমন্ত্রিত্ব অর্পণ করলেন। এসব যেন প্রত্যাশিতই ছিল।
শুধু বলগা মনে মনে একবার বলল, “দিদ্দা! রানি নও, তুমি পিশাচিনী।'
প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়েছে। তুষারপাত হচ্ছে অবিরত। সারা দুনিয়া যেন দ্বিবর্ণ চিত্র। সব রং মুছে গিয়ে টিকে আছে কেবল সাদা আর কালো। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ আর তুষারাবৃত ভূপ্রকৃতি।
রাজ উদ্যানে প্রবেশের মুহূর্তে দিদ্দা টের পেল, কেউ একজন তাকে অনুসরণ করছে। দিদ্দা জানে, সে কে। তার পায়ের আওয়াজ, নিঃশ্বাসের ধ্বনি, শব্দময় অস্তিত্ব, নিঃশব্দ উপস্থিতি, সব তার চেনা হয়ে গিয়েছে এই কদিনে।
‘কিছু খুঁজছেন?’
‘না, তেমন কিছু নয়’। ঘাড়টা না ঘুরিয়েই বলে দিদ্দা। আকাশ থেকে তুষার কণা ঝরছে অবিরত। সারা মুখে কুচি কুচি শৈত্য। হেসে উঠল দিদ্দা। খিল খিল করে। কিশোরীসুলভ অনাবিল খুশিতে। বলগার কাঁধে ভর দিয়ে।
ক'দিন আগেই নিজের বাম হাতের তালুতে একটা নতুন রেখা লক্ষ করেছে সে। আচার্য তুঙ্গদেব নাকি বলতেন, তালুতে নতুন রেখার উদয় মানেই ভাগ্য বদলের ইঙ্গিত।
হয় আরও সৌভাগ্যশালী নয় আরও দুর্ভাগা হবে ওই ব্যক্তি, যার হাতের তালুতে নয়া রেখা দেখা দিয়েছে।
‘আপনি হাসছেন। তার মানে আপনি আজ খুব খুশি।'
এবার প্রশ্নকর্তার দিকে ঘুরে যায় দিদ্দা। ফের উলটো দিকে ঘুরে দু'হাত ছড়িয়ে দেয় দু'পাশে। আবেগে কিংবা শীতে কাঁপতে থাকে তার কণ্ঠ।
‘এই তুষারভূম আমার। এ হল আমার কাশ্মীর। আমি এই ভূমির সার্বভৌম শাসক। তুষারভূমের রাজ্ঞী।'
‘সে তো কদিনের জন্য...।'
বক্তাকে তার বক্তব্য শেষ করতে দেয় না দিদ্দা। মাথা নাড়ে দু'পাশে । জোরে জোরে । ‘না, মোটেই তা নয়। কোনও নামসর্বস্ব শাসক নই আমি। নই অন্তরালবাসিনী চালিকা শক্তি। এই তুষারভূমের রাজা ও রাজ্ঞী, দুই-ই আমি। এ আমার কাশ্মীর। এই কাশ্মীরের আমি।'
‘কিন্তু লোকে...’। তুঙ্গার গলায় সংশয়। মুখে কালো ছায়া।
‘লোকে আমায় মেনে নেবে। তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই আমার।'
‘কিন্তু তারা তো বলে...'
আবার তুঙ্গাকে থামায় দিদ্দা। ‘তারা মুখে যাই বলুক, বুকের কোটরে তারা জানে ও মানে, এই ভূমি আমার হাতেই সবচেয়ে নিরাপদ। আমার শাসনেই তাদের সবচেয়ে নিশ্চিন্ত যাপন সুনিশ্চিত। সেজন্যই আমার প্রতিটি কথা মেনে নেয় তারা। প্রশ্নাতীত আনুগত্যে পালন করে প্রতিটি রাজাজ্ঞা। সংশয়াতীত প্রসন্নতায় গ্রহণ করে আমার প্রতিটি পদক্ষেপ। তুষারভূমের খঞ্জ রাষ্ট্রীর পদক্ষেপ।'
তুঙ্গা মাথা নিচু করে মেনে নেয় দিদ্দার সব কথা। দ্বিরুক্তি করার সাহস হয় না
তার।
ক'দিন পর দিদ্দাস্বামী মন্দিরে যায় মহারানি দিদ্দা। সঙ্গে তুঙ্গাকে নেয়নি। সঙ্গে থাকলে তুঙ্গা তার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যেত। দেখতে পেত, মন্দিরে উপস্থিত জনতা রানিকে দেখে প্রবল উৎসাহে চিৎকার করেছে, ‘জয় মহারানি দিদ্দার জয়। জয় ভগবান শ্রীবিষ্ণুর জয়।' মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত দেবতা আর প্রসাদবাসিনী রানি, তাদের চোখে ও আবেগে মিলেমিশে একাকার। প্রবল আত্মবিশ্বাসে ভেসে যায় দিদ্দা।
ফেরার পথে ভয়ঙ্কর তুষার ঝড়। প্রাসাদের কাছে পৌঁছে দিদ্দা দেখে একদল গেরুয়া পোশাক পরিহিত ব্রাহ্মণ বসে আছেন পথের দু'ধারে। বলগা এগিয়ে গিয়ে খবর নিয়ে আসে, ওঁরা প্রায়পোরেশনে বসেছেন।
মৃত্যু কামনায় উপবিষ্ট ব্রাহ্মণের দল অবিরাম শাপ-শাপান্ত করতে থাকে দিদ্দার নামে।
একটা মেয়েছেলে, অবলা নারী রাজত্ব চালাবে, এ তাঁরা কিছুতেই মেনে নেবেন না। তাই দিদ্দা সিংহাসন ত্যাগ না-করা পর্যন্ত তাঁরা এক কণা খাবারও মুখে তুলবেন না। এ বিষয়ে বদ্ধপরিকর তাঁরা। ব্রহ্ম শাপে সর্বনাশ অনিবার্য রানির।
বলগা বলে, ‘এঁদের এড়িয়ে প্রাসাদে প্রবেশ করুন।” সে পরামর্শে কর্ণপাত করে না দিদ্দা। প্রতিবাদী, ধরনারত গেরুয়া পক্ষের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। অবিচলিত দৃঢ় কণ্ঠে বলে, “আপনাদের নেতাটা কে, তাঁকে একটু দেখি। সাহস থাকে তো তিনি এগিয়ে আসুন।'
এগিয়ে আসামাত্র তাকে চিনে ফেলে দিদ্দা। মুণ্ডিতমস্তক ওই গৈরিকধারীকে। ‘ও! তুমি! বিগ্রহরাজ! নিজের রাজপাট ছেড়ে এখন এখানে উপদ্রব করতে এসেছ বুঝি?'
দিদ্দাকে দু’হাত ছড়িয়ে বাধা দিয়ে চায় বিগ্রহরাজ। রুখতে চায় সপারিষদ রাজ্ঞীর রাজপ্রাসাদে প্রবেশ।
পারে না। বিক্ষুব্ধ গেরুয়াপক্ষকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় রানির বাহিনী। দিদ্দা বলগা-সহ অন্যদের নিয়ে প্রাসাদে ঢোকে।
তুঙ্গার আপত্তি সত্ত্বেও দিদ্দা প্রাসাদে ঢুকেই তাকে সরিয়ে দেয় প্রাসাদের এক গোপন কুঠুরিতে। কারণ, সে জানত বিদ্রোহীরা রাজপ্রাসাদে ঢুকতে পারলে প্রথমেই তুঙ্গার খোঁজ করবে। তাকে হত্যা করবে তারা। মহারানির নিরাপত্তা বলয় ভেঙে দেওয়াটাই হবে তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য।
এরপর প্রাসাদের বাইরে প্রায়োপবেশনরত ব্রাহ্মণদের ডেকে পাঠায় দিদ্দা।
ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে, বরফে ভেজা গেরুয়া পোশাক সামলাতে সামলাতে, দিনভর অনশনরত ব্রাহ্মণের দল হাজির হয় দিদ্দার সম্মুখে। তার সামনে একটা বিরাট থালা। তাতে ডাঁই করা স্বর্ণমুদ্রা আর স্বর্ণালঙ্কার।
‘কী চান আপনারা?' দিদ্দা নম্রকণ্ঠে জানতে চায়।
‘আমরা চাই রাজসিংহাসনে বসুন কোনও বলিষ্ঠ পুরুষ।' 'কেন ?'
‘অন্তঃপুরিকার হাতে রাজ্য নিরাপদ হতে পারে না।'
‘কিন্তু তেমন কোনও শঙ্কায় কি শঙ্কিত হতে হয়েছে কাশ্মীরকে এতদিন ধরে? মহারাজ ক্ষেমগুপ্তর মহাপ্রয়াণের পর?'
‘নাবালক রাজার অভিভাবিকা হয়ে রাজ্য চালানো আর স্বনামে সার্বভৌম শাসক হিসেবে রাজ্য চালানো এক কথা নয়, এটা নিশ্চয় আপনি মানবেন।'
‘কিন্তু মহারাজ ক্ষেমগুপ্তের কোনও পুরুষ উত্তরাধিকারী তো আর জীবিত নেই। সেটাও নিশ্চয় আপনারা জানেন।'
‘সেজন্যই তো আমরা লোহারার রাজবংশীয় পুরুষ বিগ্রহরাজকে কাশ্মীরের রাজা হিসেবে চাই। ওই বংশের কোনও নারীকে নয়।'
আর কথা বাড়াল না দিদ্দা। আর একটু এগিয়ে গলা চড়িয়ে বলল, “বিক্ষোভ প্রত্যাহারের জন্য কী মূল্য চান আপনারা? ওই থালায় রাখা সব কিছু আপনাদেরই। রাজি থাকলে এগিয়ে এসে গ্রহণ করে আমাকে কৃতার্থ করুন। ব্রাহ্মণদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের সুযোগ দিন আমাকে। সেইসঙ্গে কাশ্মীরের রানি হিসেবে আগামী দিনেও আপনাদের সুখশান্তি নিরাপত্তা সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার।'
গুটিগুটি পায়ে এক এক করে সিক্ত বসন গৈরিকধারীরা এগোতে থাকে। সারাদিন খায়নি তারা। তার উপর এই তুষারপাত আর শৈত্যপ্রবাহ। স্বর্ণমুদ্রার স্তূপ তাদের চলার শক্তি জোগায়।
কিছুক্ষণ পর দেখা গেল ভিড় উধাও। দাঁড়িয়ে তখনও বিগ্রহরাজের একান্ত অনুগ্রহভাজন গুটিকয়েক কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ। মহারানির সশস্ত্র বাহিনী ততক্ষণে তাদের ঘিরে ফেলেছে। এমন ফাঁদে পড়ার কথা কস্মিনকালে ভাবতেও পারেনি বিগ্রহরাজ।
বলগার কাঁধে ভর দিয়ে বিগ্রহর সামনে এগিয়ে যায় দিদ্দা। তারপর সপাটে একটা চড় কষায় তার বাঁ গালে। টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায় বিগ্রহ। উঠে দাঁড়াতেই তার দু'পায়ের মাঝখানে নিজের অবিকৃত সবল সুঠাম পা দিয়ে লাথি কষায় দিদ্দা। একেবারে ছেলেবেলার মতো। বিগ্রহরাজ ব্যথায় ককিয়ে ওঠে।
‘আমার মা-বাবাকে তুই মেরেছিস, দিদ্দা গর্জন করে ওঠে। ‘আমার ভাইকে দেশছাড়া করেছিস। আমি কিচ্ছুটি করতে পারিনি তখন। এবার তোকে ছাড়ব না বিগ্রহরাজ।'
এরপর এল রাজ্ঞীর আদেশ, ‘প্রহরীরা, একে নগ্ন করে একবিন্দু জল কিংবা খাবার না দিয়ে বের করে দাও কাশ্মীর থেকে। সীমান্তে পৌঁছানো পর্যন্ত নজর রাখো ওর ওপর। ওকে কিচ্ছুটি দেবে না। পানীয়, খাদ্য, বস্ত্র, ঔষধ, এমনকী প্রহারটুকুও নয়। ওর দেহে এতটুকু আঘাতও করবে না। ওর নিয়তি ও নিজেই ডেকে এনেছে। রাজ্য থেকে বের করে দেওয়ার আগে আজ রাতে প্রাসাদের বাইরে হিমের মধ্যে উলঙ্গ করে ফেলে রাখো এই শয়তানকে।'
পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই শ্রীনগর জুড়ে শুরু হল বিদ্রোহ দমনের কাজ। তুঙ্গার বাহিনী খতম করল রাক্কার ছেলে সুলক্ষণকে। গুপ্তচররা খবর দিয়েছিল, সে-ই বিগ্রহরাজকে ডেকে এনেছিল শ্রীনগরে।
যেসব বিদ্রোহী ব্রাহ্মণ আগের রাতে রাজপ্রাসাদ থেকে স্বর্ণমুদ্রা আর স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে সানন্দে ফিরে গিয়েছিলেন, তাঁদেরও খুঁজে খুঁজে বের করল তুঙ্গার সেনারা। প্রত্যেককে হত্যা করে রক্তাক্ত লাশগুলো ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হল শ্রীনগরের প্রাচীরের বাইরে। সেখানে শেয়াল কুকুরের দল তাঁদের মৃতদেহগুলো দিয়ে ভোজ সারল ।
আর শীত সহ্য করতে না পেরে লাশ হয়ে যাওয়া বিগ্রহরাজের প্রাণহীন দেহ পড়ে রইল নগরের রাজপথে।
ত্রাসে কম্পমান জনতাকে জানানো হল সর্বশেষ রাজাজ্ঞার কথা।
‘শুধু মহারানি নন, কোনও রাজকর্মচারীর বিরুদ্ধাচরণ করার সাহস যদি কেউ দেখায়, প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে, তবে সে বা তারা যেন এরকম হত্যার উৎসবে মৃতের ভূমিকা পালনের জন্য তৈরি থাকে। এই পরিণতি তাদের জন্যও অপেক্ষা করছে।'
সন্ত্রস্ত কাশ্মীরবাসী আরও বেশি বেশি করে রাজানুগত্য প্রকাশের জন্য তুষারপাত অগ্রাহ্য করে রাস্তায় নেমে মহারানি দিদ্দার নামে জয়ধ্বনি দিতে শুরু করল।
বেলা বাড়লে টঙ্কশালা থেকে সদ্য তৈরি হয়ে আসা মুদ্রাগুলো যখন ঘাঁটছিল, তখন সেই জয়ধ্বনি কানে গেল দিদ্দার। মুদ্রাগুলোতে স্পষ্টাক্ষরে তার নাম মুদ্রিত।
এতদিনে আচার্য তুঙ্গদেবের ভবিষ্যদ্বাণী ফলেছে। আজ সার্বভৌম রাজ্ঞী সে। অদ্ভুত তৃপ্তিতে ভরে গেল তার হৃদয়।
তুঙ্গাকে ডেকে পাঠাল দিদ্দা। দু'হাত ছড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আমাকে গ্রহণ করো আজ সমূহ বিনাশে, সমস্ত চিতাগ্নি আজ অভিষেবারি হোক।'
তুঙ্গার মতো সদা সপ্রতিভ যুবকও হতবিহ্বল হয়ে পড়ে।
গাঢ়তর হয় দিদ্দার কণ্ঠ।
বলে, “এসো তুঙ্গা। কাছে এসো। আজ থেকে তোমায় অনিদ্রা দেব অনভ্যাস সুখ যাপনের। তোমাকে দেব অসম্পর্ক রমণীর ভালবাসা। দুঃখ দেব অদর্শনের। নীলাভ রাত দেব কাল গণনার। এসো তুঙ্গা, এসো ।
বিস্ময় বিহ্বল তুঙ্গা মুখটা নামিয়ে আনে দিদ্দার মুখের কাছে।
তার কপোলে চুম্বন এঁকে দেয় কাশ্মীরের রানি দিদ্দা। তারপর ফিস ফিস করে তুঙ্গার কানে কানে বলে, ‘খুঁজতে শুরু করো উদয়রাজ ও তার পরিবারকে। উদয়রাজের পুত্র সংগ্রামরাজই হবে আমার পর কাশ্মীরের রাজা।'
তুঙ্গা হতবাক হয়ে তাকায় দিদ্দার দিকে। দিদ্দা তার ভুবনমোহিনী হাসি হাসে। আর বলে, ‘দেরি কোরো না তুঙ্গা। সংগ্রামরাজ এখনও বালক। তাকে তো কাশ্মীরের রাজসিংহাসনের উপযুক্ত উত্তরাধিকারীর মতো মানুষ করতে হবে। সে দায়িত্ব তো তোমার আর আমারই।'
একটু আগে তুঙ্গা দিদ্দার মুখে সংগ্রামরাজের কথা শুনে হতাশ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এখন তার মনে হল, কোনও দেবী আজ রাজরাজেশ্বরী মূর্তি ধারণ করে পরম ভক্ত হিসেবে আদেশ করছেন তাকে।
ততক্ষণে বলগা প্রবেশ করেছে রাজ্ঞীর কক্ষে। মোহাবেশে দিদ্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে তুঙ্গাকে। বিড়বিড় করে বলে, “দিদ্দা! তুমি সত্যিই মোহময়ী বিষকন্যা । লোকে কিছু ভুল বলে না।'
অসহায় প্রতিদিন শেষে ‘সুখী হও' বলে বলগা প্রাণপণ শাপ দিতে চেয়েছিল দিদ্দাকে। কোনওদিন পারেনি। আজও পারল না।
মধ্য এশিয়া তখন উত্তাল। তুরস্ক আর সিরিয়া জুড়ে ইসলাম তখন ছড়াতে চাইছে নিজেকে। পবিত্র ভূমি জেরুজালেমে তখন ইসলামের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত। সব কিছু মিলিয়ে মধ্য এশিয়া জুড়ে তখন সংঘাত আর অশান্তির বাতাবরণ। প্রতিটি ধর্ম সম্প্রদায় নিজেদের ভৌগোলিক পরিসীমা প্রসারণে ব্যস্ত।
দিদ্দার কানে সব কথাই আসে। সুশিক্ষিত সুপ্রশিক্ষিত গুপ্তচর বাহিনী সব খবরাখবর পৌঁছে দেয় তাকে। মধ্য এশিয়ার রাজনৈতিক বৃত্তান্ত শোনার সঙ্গে সঙ্গে দিদ্দা ঝালিয়ে নেয় তার নিজের জানা ও চেনা রাজনৈতিক ইতিহাস। ভীমদেবের কাছ থেকে মধ্য এশিয়ার সংক্ষুব্ধ বলয়ের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাঠ নিয়েছিল দিদ্দা। সেই পাঠের সুবাদে সে জানে, খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দ থেকে মধ্য এশিয়ায় খ্রিস্টান ধর্মের প্রাদুর্ভাব হ্রাস পেতে শুরু করেছে। জেরুজালেমের ইসলামি শাসনাধীন হয়ে যাওয়াটা তারই অনিবার্য পরণতি। তবে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা ফের জোট বাঁধছে। পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে তারা। সেজন্যই ফের সংবর্তের ঘনঘটা ঘনায়মান সমগ্র মধ্য এশিয়া জুড়ে। জেরুজালেমের মাটিতেও বিদ্রোহ দানা বাঁধছে। ভীমদেব শাহর কাছ থেকে রাজনৈতিক পাঠ না পেলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি দিদ্দা এত সহজে বুঝতে পারত না৷ তার রাজনীতিক গুরু হিসেবে ভীমদেব শাহীর কথা মনে পড়লেই তাঁর উদ্দেশে দু'হাত আপনা থেকে জুড়ে যায় দিদ্দার। মাথা নিচু হয়ে যায় প্রণামের প্রণোদনায় ৷
কাশ্মীরের ভেতরে ও বাইরে তাকালে, সব কিছু মন দিয়ে, গভীরভাবে, নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দিদ্দা স্পষ্ট অনুভব করে, তুঙ্গাকে তার সবসময় পাশে পাওয়া দরকার । ষড়যন্ত্রকারী আর বিশ্বাসঘাতকরা ঘিরে ফেলেছে তাকে, টের পায় দিদ্দা। আর সেই বৃত্তে দাঁড়িয়েই সে আরও বেশি বেশি করে তুঙ্গার প্রয়োজনীয়তা টের পায়।
রাক্কা ছিল সেনাবাহিনীর দায়িত্বে। মহারানি দিদ্দার সৈন্যাধ্যক্ষ সে। মধ্য এশিয়ার গোলমাল সেই সামলাত। কিন্তু রাক্কার শিরশ্ছেদের পর থেকে অবস্থাটা বেশ খানিকটা বদলে গিয়েছে। মধ্য এশিয়ার যুদ্ধবাজ গোষ্ঠীপতিরা আজকাল প্রায়শই হুমকি দেয় দিদ্দাকে। শুধু মধ্য এশিয়া নয়, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং ইউরোপ থেকেও মাঝেমধ্যেই চলে আসছে প্রতিস্পর্ধী বার্তা। জেহাদি কণ্ঠস্বর।
দুনিয়াটা বদলে যাচ্ছে। পুরনো রাজবংশগুলো ক্রম ক্ষীয়মান। পুরাতন রাজধানীগুলোর পতন হচ্ছে অহরহ। সীমান্তরেখা বদলাচ্ছে হরদম। নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মাথা চাড়া দিচ্ছে। কাশ্মীরের অভ্যন্তরীণ সমীকরণেও সেসবের ছায়াপাত টের পায় দিদ্দা। তার গুপ্তচররা অহর্নিশ তাকে সাম্প্রতিকতম অবস্থার বিষয়ে অবগত রাখে। তাদের তৎপরতার কোনও সীমা-পরিসীমা নেই।
খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে নবোখিত সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থার লেখচিত্রে আপন স্থানাঙ্ক বিষয়ে নিঃসংশয় হতে চায় দিদ্দা ।
খবর এসে পৌঁছয়, আফ্রিকা আর এশিয়া, উভয় মহাদেশেই নতুন ধর্মমত হিসেবে ডানা ছড়াচ্ছে ইসলাম। এই নতুন ধর্ম তার আগ্রাসী মানসিকতা নিয়ে বিপদ হয়ে দেখা দিতে পারে। মনে মনে টের পায় দিদ্দা।
সেই সঙ্গে এটাও বুঝতে পারে, ইসলামের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গণিতও বেশ জটিল। সেখানেও আবহাওয়া উথালপাথাল। নিস্তরঙ্গ পাথার নয় সেটা।
আফগানিস্তানের পাহাড়ি এলাকায় দাস শাসক ছিলেন আবু সবুক্তিগিন। কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা যখন ভেঙে পড়ছে, তখন সেই সুযোগটা ব্যবহার করতে কার্পণ্য করেননি তিনি। প্রভুদের শিকল ছিঁড়ে তিনি নিজেকে স্বাধীন শাসকের ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত করেন। গড়ে ওঠে গজনবী বংশীয়দের শাসন। সামানিদদের তুর্কি দাসরা সেই প্রথম শাসক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ লাভ করল।
৯৯৭ খ্রিস্টাব্দ। বালখ থেকে গজনীতে ফিরছিলেন আবু সবুক্তিগিন। রাস্তাতেই প্রবল অসুস্থতা। উজবেকিস্তানের তেরমিজ আর পেরোতে পারলেন না সৰুক্তিগিন । মাত্র ৫৫ বছর বয়সেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।
তখন সামানিদদের গৃহযুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন সবুক্তিগিনের জ্যেষ্ঠপুত্র মাহমুদ। উত্তর-পূর্ব ইরানের নিশাপুরে তিনি তখন ঘাঁটি গেড়ে বসেছিলেন। সবুক্তিগিনের ইন্তেকালের পর সিংহাসনে বসেছেন তাঁরই ভাই ইসমাইল, এই খবরটা কানে যাওয়ামাত্র চাচা বোরগুজ আর ছোট ভাই নুর-উদ্দিন ইউসুফের হাতে নিশাপুরের ভার সঁপে দিয়ে বাহিনী নিয়ে গজনীর দিকে অগ্রসর হলেন মাহমুদ।
গজনিতে মুখোমুখি হল দুই ভাইয়ের সৈন্যবাহিনী। ইসমাইলের বাহিনীতে হাতি ছিল প্রচুর কিন্তু রণকৌশলে ঘাটতি ছিল। সেই সুযোগটাই কাজে লাগালেন মাহমুদ। ঝটিতি আক্রমণে বিধ্বস্ত করে দিলেন আমির ইসমাইলের বাহিনীকে। প্রায় এক বছর ধরে চলা সেই যুদ্ধের শেষে গজনীর সুলতান হলেন মাহমুদ।
মাহমুদের শাসনকালে পশ্চিম ইরানের বুয়ায়িদের সীমান্ত ছাড়িয়ে চলে গেল গজনবীদের রাজ্য। বুয়ায়িদে ছিল শিয়াদের শাসন। মাহমুদ সেখানে প্রতিষ্ঠিত করলেন সুন্নি ইসলামিদের জমানা ।
ইরান শাসন করলে তবে না ইসলামি দুনিয়ার নায়ক হয়ে ওঠা যায়!
মহামুদ ব্যাপারটা জানতেন এবং মানতেন। ইরান অধিগত করার পর ইসলামি দুনিয়ার নায়ক হওয়ার স্বপ্ন তাঁর সফল হল।
বুখারা আর সমরখন্দ শাসনের জন্য আব্বাসিরা স্থানীয় যে পরিবারের হাতে শাসনভার তুলে দিয়েছিল, তাদের থেকে সামানিদ শাসক বংশের উদ্ভব ও বিকাশ। আস্তে আস্তে তারা তাহিরি আর সাফারিদদের অধীনে থাকা অঞ্চলগুলোতেও আধিপত্য বিস্তার করে। উত্তর-পূর্ব ইরানে এই দুটো গোষ্ঠীর রমরমা কমে যায় সামানিদদের সৌজন্যে। সাফারিদদের দাপট সিস্তানের মতো ছোট্ট একটা প্রদেশে সীমায়িত হয়ে পড়ে। ইরান থেকে আমু দরিয়া পার হয়ে তুর্কি উপজাতিরা সামানিদদের সাম্রাজ্যে ঢুকে পড়ত। পশুচারণ ছিল তাদের মুখ্য জীবিকা। তুর্কি দাসদের নিয়ে গঠিত বাহিনীতে তাদের জায়গা করে দিত সামানিদরা। এভাবেই সামানিদরা হয়ে উঠল ওই অঞ্চলে দুর্ধর্ষ শক্তি। দিদার কানে যখন সবুক্তিগিন আর মাহমুদের খবর পৌঁছয়, তখন তার মনে পড়ে যায়, ৯৫০-এর দশকে সামানিদরা তুর্কি উপজাতীয় পশুচারণকারীদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করতে সমর্থ হয়েছিল। বিষয়টা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন ভীমদেব শাহী। তখন থেকেই গুপ্তচর বাহিনীর প্রতিবেদনে এই আশঙ্কা প্রকাশিত হচ্ছিল যে ইসলাম অতি শীঘ্র হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করবে। সামানিদরা যে নব্য পারসীয় ভাষার বিকাশে তৎপর, সে খবরও দিদ্দার কানে এসে পৌঁছাল। এই নব্য পারসিক ভাষা ইরানের সংস্কৃতিবান মানুষদের পছন্দের ভাষা। এর ব্যাকরণের গঠনে আছে আরব্য ভাষার ছোঁয়া আর শব্দ ভাণ্ডার কথ্য পারসিক ভাষায় পুষ্ট। ফিরদৌসের বীর গাথায় তখন রুস্তমের বন্দনা ইরানের আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। রুস্তম ইসলামি সাহিত্যের বীর চরিত্র। সেই প্রাচীন বীরচরিত্র ফিরদৌসের ছন্দসৌজন্যে ইরানি মুসলমানদের আত্ম সচেতনতার আধার হয়ে উঠল। অন্য কথায়, ফিরদৌসের কাব্য প্রতিভার গুণে প্রাচীন ইসলামি সংস্কৃতির চরিত্র বীর রুস্তমের নব্য ইরানি সংস্কৃতিতে আত্তীকরণ সম্পন্ন হল। ফিরদৌস কাব্যরচনা শুরু করেছিলেন সামানিদদের শাসনকালে। কিন্তু শাসন ক্ষমতা যখন গজনবীদের করায়ত্ত হল, তখন থেকে তিনিও তাঁর রচিত কাব্য উৎসর্গ করতে শুরু করলেন নবাগত শাসকদের।
এই ঘটনাপ্রবাহের খুঁটিনাটি নজর এড়ায়নি দিদ্দার। নিবিড় অবলোকনের কারণে সে বুঝতে পেরেছিল সামানিদদের পতন ও গজনবীদের উত্থান কেবল ভূ-রাজনীতির ভরকেন্দ্রের বদল নয়। এর মাধ্যমে সূচিত হচ্ছে একটা নতুন ভাষা। দিশা খুঁজে নিচ্ছে একটি নব্য সাংস্কৃতিক পরম্পরা।
যদি নবজাগ্রত ভাষা ও সংস্কৃতি তার নিয়ন্ত্রণাধীনে না থাকে, তবে তার অনন্য ভাষা, সংস্কৃতি এবং পরম্পরার রক্ষাবিধান সম্ভব নাও হতে পারে, এটা ভেবেই দিদ্দা মাঝে মাঝে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
শুধুমাত্র পারস্য বা ইরানে নয়, আফ্রিকা মহাদেশেও খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দী থেকে ইসলাম বিস্তার লাভ করতে শুরু করেছিল। আস্তে আস্তে সাহারা মরুভূমির ভেতর দিয়ে চলা বাণিজ্যপথে অবস্থিত মরূদ্যানগুলিতে ইসলাম প্রসার লাভ করছিল। সেটাও নজর এড়ায়নি দিদ্দার। ঘটনাপ্রকৃতি ভালভাবে লক্ষ করে সে উপলব্ধি করেছিল, আফ্রিকা মহাদেশে ইসলামি ভাবধারার প্রসার আগ্রাসী অস্ত্রর সাহায্যে হয়নি। বণিকেরা সেখানে ইসলামের প্রচারে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। এর আগে অন্য কোথাও এমন কাণ্ড ঘটেনি। লোহিত সাগরের পূর্ব উপকূলবর্তী নগরসমূহে অবস্থিত বাণিজ্য পথগুলি ধরেই ইসলাম আফ্রিকায় জাঁকিয়ে বসেছে।
ইসলামের বৃদ্ধির এই ধারা লক্ষ করে দিদ্দা স্পষ্ট বুঝতে পারে আগামীতে বহু বাণিজ্য পথ ও বাণিজ্য কেন্দ্রে ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। সেটা কেবল সময়ের অপেক্ষা।
ইউরোপও ইসলামকে এড়াতে পারছিল না তখন। ৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের কথা দিদ্দার স্পষ্ট স্মরণে আছে। তখন সে সবে সবে কাশ্মীরে রাজবধূ হয়ে এসেছে। তখনই জার্মান সম্রাট প্রথম অটোর লেচফিল্ডের যুদ্ধে বিজয় সংবাদ তার কানে এসে পৌঁছেছিল। হাঙ্গেরির রাজা হারকা বুলস্কুকে তিনি পরাস্ত করেছিলেন। তাঁর কাছে হার স্বীকার করেছিল লেহেল এবং সুরদের গোষ্ঠীপতিরাও। ৯৬০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ রাজপ্রাসাদের প্রহরীরা বুলস্কুকে ঘিরে ধরে দাবি তোলে, চিনে বিজয় অভিযান চালাতে হবে। হারকা বুলস্কুকে তারা চিনের সম্রাট হিসেবেও দেখতে চায়।
তাদের দাবি মেনে নিতে রাজি অটো। তবে শর্ত আছে তাঁরও। প্রথম শর্ত, প্রাসাদরক্ষীরা কখনও তাঁর অবাধ্য হবে না। দ্বিতীয় শর্ত, অভিযান চলাকালীন কোনও সৈনিক কোনও সাধারণ নাগরিকের এতটুকু ক্ষতি করতে পারবে না। তৃতীয় শর্ত, কোনওভাবে লুঠতরাজ চালানো যাবে না। অন্তিম শর্ত, জার্মান সেনারা বিজিত রাজ পরিবারের কোনও সদস্যের সামান্যতম ক্ষতি করতে পারবে না।
প্রাসাদরক্ষীর দল সবক'টি শর্ত মেনে নিতে রাজি হল।
চিনে তখন নয়া সম্রাট। নাম তাইজু। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন সংশাসনের। অটোর প্রতি তাঁর রক্ষীদের অগাধ আনুগত্যের খবর যখন এসে পৌঁছেছিল কাশ্মীরের রাজপ্রাসাদে, তখন ক্ষেমগুপ্ত আর দিদ্দা দু'জনেই অভিভূত হয়ে গিয়েছিল। দু'জনেই বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে ভেবেছিল, এমন প্রজানুগত্য যদি কাশ্মীরের রাজাও পেতেন!
৯৬৫ খ্রিস্টাব্দ। পূর্ব ইউরোপের স্লাভ উপজাতি খাজারিয়া সাম্রাজ্য আক্রমণ করল। রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চল, ককাশাসের উত্তরাঞ্চল, ইউক্রেনের পূর্ব দিক, কাজাখস্থানের পশ্চিমভাগ, উজবেকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল এবং ক্রিমিয়াকে নিয়ে গঠিত খাজারিয়া সাম্রাজ্য। সেখানেই হানা দিল কিয়েভান রুশরা। হার স্বীকার করতে হল খাজার বংশীয় শাসকদের।
৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ঘটে গেল আর একটা আশ্চর্যজনক ঘটনা। জাপানের ধনী জমিদাররা কর দেওয়া বন্ধ করে দিল। জাপান সরকার পড়ল মহা বেগতিক অবস্থায় । রাজস্ব আদায় প্রায় শূন্য। এমন অবস্থায় তারা সেনাবাহিনীর ব্যয় নির্বাহ করার সামর্থ্যও হারাল। ধনী জমিদাররা নিজ নিজ এলাকায় নিজস্ব বাহিনী গড়ে তুলল। সেসব সেনাবাহিনীতে যারা যোগ দিল তাদের পরিচিতি হল সামুরাই কিংবা বুসি নামে। খবরটা যখন দিদ্দার কানে পৌঁছল। সে ধরেই নিল, জাপানের জমিদাররা কাশ্মীরের সেনাবাহিনী গঠনের কায়দাকানুন বিষয়ে অবগত হয়ে সেটারই অনুকরণ করছে। কারণ, কাশ্মীরেও সেনাবাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে এরকম পদ্ধতিই অনুসৃত হয়। কাশ্মীরে কোনও কেন্দ্রীয় বাহিনী নেই । সামন্ত প্রভু বা দামারদের নিজ নিজ বাহিনী আছে। দামাররা সেই বাহিনীর ব্যয়ভার বহন করে। তবে কাশ্মীরের সামন্তপ্রভুরা নিষ্কর ভূসম্পত্তির অধিকারী হওয়ার সুযোগ পান না।
চারপাশে এত সংঘর্ষ, সংগ্রাম, পরিবর্তন, গোলমাল। সেসবের বিষয়ে জানতে জানতে দিদ্দার অনুভব করে, তার মতো শারীরিক ত্রুটিসম্পন্ন কেউ নয়, কাশ্মীরের দরকার একজন শক্তিমান, বলশালী রাজা। পুরুষ নৃপতি। যিনি শুধু গুপ্তচরদের দেওয়া খবরের ভিত্তিতে ষড়যন্ত্র আর বিরোধী শক্তির কলাকৌশল ক্ষুরধার মস্তিষ্ক প্রয়োগে ব্যর্থ করে দেবেন, তা নয়। যিনি আপন বলের বন্যায় ভাসিয়ে দেবেন যাবতীয় প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ, রুখে দেবেন তাবৎ সামরিক অভিযান।
দিদ্দার মনে এই ভাবনাগুলো ঘুরপাক খেতে থাকে। নিজের শারীরিক অসামর্থ্যের কথা ভাবলে হতাশা তাকে গিলে খায়। চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসে।
দুর্নীতিগ্রস্ত রাজঅমাত্যরা দিদ্দার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। আমজনতার একাংশের সক্রিয় সাহায্য সমর্থন পাচ্ছে তারা। জানতে পারে দিদ্দা।
কাশ্মীরের সামন্তপ্রভু দামাররা জোট বাঁধছে। জাপানের জমিদারদের মতো তারাও রাজস্ব জমা না দেওয়ার ছক কষছে। নিজস্ব বাহিনী, শক্তিশালী সেনা সংগঠনের সাহায্যে শ্রীনগরের প্রাসাদ শক্তিকে ক্ষমতাচ্যুত করার নীল নকশা তৈরি করে ফেলেছে তারা। খবর এসে পৌঁছয় দিদ্দার কানে।
দিদ্দা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তার উদ্বেগের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। প্রতি মুহূর্তে আরও বেশি করে একজন সুযোগ্য পৌরুষসম্পন্ন রাজাকে পাশে না-পাওয়ার অসুবিধা অনুভব করে।
ফাল্গুন পরলোকে গিয়েছেন।
নরবাহনও।
তুঙ্গা আছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। সবসময় পাশে পাশে।
অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিশ্বের টালমাটাল আবহের মধ্যে তুঙ্গার কাঁধটাকেই আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরে দিদ্দা। কেবল ভর দেওয়ার জন্য নয়, চোখের জল ফেলার জন্যও। শুধু রাজ্য রাজনীতির বৃত্তে নয়, ব্যক্তিগত বৃত্তে ও দিদ্দার তুঙ্গা নির্ভরতা আরও বাড়তে থাকে ৷
সারাজীবন তাকে একা একাই সব সামলাতে হয়েছে। বলগা, ক্ষেমগুপ্ত, নরবাহন কিংবা ফাল্গুন কখনও কখনও বাড়িয়ে দিয়েছে নিজ নিজ কাঁধ। কখনও চলার সময় ভর দেওয়ার জন্য, কখনও তার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেওয়ার জন্য। কিন্তু কেউ কোনওদিন দিদ্দার নির্ভরযোগ্য সর্বক্ষণের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠতে পারেনি। কিংবা চায়নি।
দিদ্দাকে সবকিছু একা হাতেই সামলাতে হয়েছে। নিজেকে এবং কাশ্মীরকে। প্রাসাদ রাজনীতির প্রকোপ কখনও-কখনও গিলে খেতে চেয়েছে তার তাবৎ সাফল্য, যাবৎ সংস্কারমূলক পদক্ষেপ। নস্যাৎ করে দিতে চেয়েছে তার প্রশাসনিক দক্ষতা। অন্য কোনও কারণে নয়, স্রেফ সে অবলা নারী, এই অসার যুক্তিতে। রানির মুকুট তার মতো শারীরিক প্রতিবন্ধী নারীর মাথায় উঠুক, এটা চায়নি অনেকেই। প্রাসাদের ভিতরে এবং প্রাসাদের বাইরেও। কাশ্মীরের রাজ্যসীমার ভিতরে এবং প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতেও। কেবল বিগ্রহরাজ নয়, দামার বা ব্রাহ্মণরা নয়, আরও অনেকে। তারা নানাভাবে বিপর্যস্ত করতে চেয়েছে দিদ্দাকে। মানসিকভাবে শুধু নয়, প্রাণেও। দিদ্দার ওপর প্রাণঘাতী হামলার ছক কষা হয়েছে একাধিকবার।
শুধু আগাম খবরের জোরে দিদ্দা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে।
কিন্তু নিরন্তর সতর্কতার অনুশীলন, ভালবাসাহীন ভাললাগাকে আঁকড়ে যাপন, তাকে দেহে মনে ক্লান্ত করেছে।
সেই ক্লান্তিই দিদ্দাকে আরও বেশি বেশি করে দিদ্দা ঠেলে দিয়েছে তুঙ্গার দিকে। চারদিকে হাজার খুঁজেও দিদ্দা তার বিপন্ন প্রহরে ভরসাযোগ্য আর কোনও কাঁধ খুঁজে পায় না যখন তখন। তুঙ্গার বৃষস্কন্ধ ছাড়া।
তুঙ্গার কাঁধে সে নির্ভয়ে মাথা রাখতে পারে।
তুঙ্গার বুকে সে নিশ্চিন্তে রাখতে পারে মুখ ।
অশ্রুপাতের লগ্নে কিংবা রক্তক্ষরণের প্রহরে, তুঙ্গা ঠিক হাজির হয়ে যায় তার পাশটিতে।
তুঙ্গাই এখন দিদ্দার পিঠ এবং চোখ। শ্রবণ ও ঘ্রাণ। শারীরিক শক্তি ও মানসিক সামর্থ্য। তুঙ্গাই দিদ্দার প্রধানমন্ত্রী এবং মুখ্য সেনাধ্যক্ষ। অসামরিক প্রশাসন এবং সৈন্য পরিচালনা ও সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ, সবক্ষেত্রেই তুঙ্গার নির্দেশই অন্তিম উচ্চারণ।
প্রথম প্রথম এ নিয়ে ফিসফাস কম হত না। দাসীদের আলোচনায় কিংবা জনতার মজলিশে এ নিয়ে মশকরাও কম হত না। আস্তে আস্তে সব থেমে গিয়েছে। তুঙ্গাকে ঘিরে জনতার সম্ভ্রম আর রানির তার প্রতি অগাধ নির্ভরশীলতায় চাপা পড়ে গিয়েছে যাবতীয় রঙ্গ-রসিকতা এবং সমালোচনা। লোকে জানে এবং মানে, কেবল যে মানে তা নয়, নিজেদের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত উপলব্ধির সৌজন্যে নতশির হয়ে স্বীকার করে, তুঙ্গাই সেই সমর্থ পুরুষ, যিনি রানি দিদ্দার তথা কাশ্মীরের রক্ষক হওয়ার সামর্থ্য রাখেন। কাশ্মীরবাসীর মনোলোকে এই পরিবর্তনের সংবাদ অজানা থাকে না দিদ্দার। নিজের সিদ্ধান্তের এমন সার্থকতা তাকে তৃপ্ত করে ।
দিদ্দা ভীমদেবশাহীর কাছে শিখেছিল, মধ্যাহ্ন সূর্যের কোনও সঙ্গী থাকে না। মধ্যাহ্ন সূর্যের সঙ্গী থাকাটা প্রকৃতিবিরুদ্ধ অবস্থা।
কিন্তু তাও, তুঙ্গার সঙ্গ তাকে স্বস্তি দেয়।
চারদিককার অট্টহাসির ভিতর যখন বিরাট একটা ডোম-কাকের লাশ নিয়ে অন্ধকার পাহাড় স্ফীত হয়ে ওঠে, পৃথিবীর সমস্ত রূপ অমেয় ডোম-কাকের মৃতদেহের দুর্গন্ধের মতো দিদ্দা যেখানেই যায়, সেখানেই বাতাসে স্বাভাবিকভাবে মিশে যায়, তখন তুঙ্গার সান্নিধ্য করে নির্মাণ নতুন পাহাড় এক। সাদা রোদ আর সবুজ পাতার মতো প্রাণ দিদ্দার ক্লান্ত বুকে শৈলের গহ্বর থেকে আলোর তরঙ্গকে করে আহ্বান।
অভ্রংস্পর্শী পাহাড়, স্বপ্নের শিখর জাগানো নীল ঘুমের মতো ঘিরে থাকে দিদ্দাকে, নিয়ত।
সামনে পাহাড় নিজের অচলতা ভুলে থাকে বেলা-অবেলায়। হামাগুড়ি দিয়ে সে চলে দলে দলে মেঘের খেলায়। অবসর মুহূর্তে সেদিকে আপন মনে চেয়ে থাকে দিদ্দা । কাশ্মীরের মহারানি।
পুরুষ জাতির একটা অর্থহীন অহমিকা আছে। কিছুতেই নিজেদেরকে স্ত্রীর থেকে উচ্চস্তরের না ভেবে থাকতে পারে না। উচ্চস্তরের, উচ্চদরের, উচ্চমর্যাদার! নিজেকে ‘স্বামী’, ‘প্রভু’, ‘বর’ ইত্যাদি করে শ্রেষ্ঠত্ববাচক শব্দগুলো নিজেদের পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে রেখে রাজ্যপাট করাটাই তাদের স্বভাব। সেই কৃত্রিম মোহভঙ্গ হোক, তারা কিছুতেই চায় না।
এ জিনিসটা দিদ্দা খুব ভালভাবে লক্ষ করেছিল সিংহরাজের মধ্যে। এ জিনিসের ব্যতিক্রম দেখেছিল দিদ্দা ক্ষেমগুপ্তের ভিতর।
নরবাহন নিজেকে এই পরিচিত পুরুষচিহ্নের ব্যতিক্রম করে তুলতে চায়নি। আর স্বাভাবিক এই প্রথার ব্যতিক্রমই তুঙ্গাকে দিদ্দার মনের আরও কাছাকাছি করে তুলল। বিপদের সময়, অসহায় মুহূর্তে, একান্ত বেদনায় আর্দ্র প্রহরে, দিদ্দা তুঙ্গাকে কাছে ডেকে নিতে শুরু করল।
তবু, তবুও, সব সময় বৈভবের সমুদ্রে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে ভাল লাগে না দিদ্দার নির্জনতায়, বিচ্ছিন্নতায়, নিঃসঙ্গতায় নিজের সঙ্গে নিজের যাপনের আকর্ষণ দিদ্দার বুকে চেপে বসে।
এরকম একটা সময়ে দিদ্দা এল অভিনবগুপ্তর কাছে। তাঁর মঠে।
সন্ন্যাসী অভিনবগুপ্ত কাশ্মীরের রানির যথাযথ দেখভালের ব্যবস্থা করেন। দিদার চোখে তিনি দেখেন, সব কিছু ছেড়ে সংসার থেকে দূরে সরে যাওয়ার বাসনা।
দিদ্দা তাঁকে অকপটে জিজ্ঞেস করে, ‘আর কিছু কি আছে বাকি, আমার জন্যে? স্বামী, পুত্র, পৌত্র, সবাইকে খুইয়েছি। প্রিয় সখাকেও। আর কী বাকি আছে আমার জন্য?'
মধুর ‘জীবন। আর তোমার কাশ্মীর। এ দুটো তো এখন ফুরোয়নি তোমার জন্য দিদ্দা।'
প্রত্যয়ী কণ্ঠে বলেন স্বামী অভিনবগুপ্ত।
এক চোখ জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকিয়ে থাকে দিদ্দা সন্ন্যাসীর দিকে।
‘জীবন একদিন না একদিন সবাইকেই ছেড়ে চলে যায় মহারানি। সেটা প্রকৃতির অনিবার্যতা। তাই বলে অনিবার্যকে আগাম আহ্বান করে আনার কোনও মানে হয় না।' সন্ন্যাসী বলেন।
‘জীবন আসলে কী গুরুদেব? এই বেঁচে থাকা কিংবা বয়ে চলা, আদতে কী?' ‘আমি নই, সে উত্তর তোমাকে দিতে পারেন বুয়াদেব।'
‘তিনি কে, গুরুদেব? কোথায় পাব তাঁকে?'
‘বুয়াদেব আমারই শিষ্য। ভৈরবনাথের গুহায় তাঁর অবস্থান। সংসারত্যাগী ওই তরুণই পারবে তোমাকে বুঝিয়ে দিতে, জীবনটা আসলে কী? কেন সংসার ত্যাগের সময়, সব কিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার সময়, তোমার এখনও আসেনি, সেকথাটা তোমাকে বুঝিয়ে বলতে পারে বুয়াদেব।'
পরদিন সকালেই ভৈরবনাথের উদ্দেশে রওনা দেয় দিদ্দা। একা। সঙ্গে কোনও রক্ষী, প্রহরী, দাস-দাসী নেয় না সে।
ভৈরবনাথে পৌঁছে দিদ্দা এক অদ্ভূত অবস্থার সম্মুখীন হল।
তন্ত্রসাধনা করছেন বুয়াদেব। নৈঃশব্দ্য বিরাজ করছে সেখানে। নিজের শ্বাসের শব্দ নিজের কানেই ফিরে আসে। তা বলে জীবন সেখানে স্তব্ধ, এমনটা নয়। বুয়াদেবের শিষ্য ও অনুগামীরা নানা কাজ করছেন। কিন্তু প্রয়োজনাতিরিক্ত একটি শব্দও কেউ উচ্চারণ করছেন না। আর দেব অর্চনার সঙ্গে যুক্ত নয়, এমন কাজও কেউ করছেন না। দেবাদিদেব মহাদেব এবং দেবী মহাসরস্বতী তাঁদের উপাস্য। এবং গুহাভ্যন্তরে তাবৎ কর্মের নিয়ামক।
এই ভৈরবনাথের গুহাতেই বুয়াদেবের কাছে দিদ্দা শুনল প্রথম অদ্বৈতবাদের তত্ত্ব। অভিনবগুপ্তের সঙ্গে তার দীর্ঘ পরিচিতির সুবাদে দিদ্দা পরিচিত হয়েছিল তিনটি গুহ্যতত্ত্বের।
শুদ্ধবিদ্যাদায়ক করেস্তবসিদ্ধি ।।
শুদ্ধ জ্ঞান তোমাকে জগতের অধিপতি করবে।
বিতর্ক আত্মজ্ঞানম ৷৷
নিজের বিষয়ে জ্ঞানই হল চিন্তার বিচ্ছুরণ।
ভূতাকঙ্কুটিতাদাবিমুক্ত ভূয়ায় পতিসমাহপ্রদ।।
বিশ্ব সৰ্প খোলস ত্যাগ করে ফের পরমেশ্বর হয়ে উঠবে।
আর ভৈরবনাথের গুহায়, ধ্যানী তান্ত্রিক বায়ুদেবের সান্নিধ্যে, দিদ্দার অবগত হল অদ্বৈত সাধনের বিষয়ে। আত্ম আর ব্রহ্মকে এক হিসেবে উপলব্ধি করার সম্পর্কে।
পরিচিত হল প্রত্যভিজ্ঞার সঙ্গে।
চেতনের স্তর থেকে ঊর্ধ্বলোকে উন্নীত হয়ে সত্যকে উপলব্ধি করা এবং আত্মজ্ঞান লাভ করাই হল প্রত্যভিজ্ঞা। এখানে আত্মস্বরূপ উপলব্ধি মানে নিজের শরীরের বিষয়ে সচেতনতা অর্জন নয়, আত্মার বিষয়ে অবগত হওয়া।
বুয়াদেব দিদ্দাকে শেখালেন, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু ঘটেছে, ঘটছে এবং ঘটবে, সেসবের পেছনে মূল কারক হলেন শিব। এই পৃথিবী, যা নেহাতই পার্থিব উপাদান দ্বারা হঠিত, সেটি চালিত হয় শিবের ইচ্ছানুসারে। পরমেশ্বর তাঁর ইচ্ছামাফিক আমাদের প্রসারিত করতে পারেন, অন্য কোনওকিছুর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেও পারেন। এই ইচ্ছাই হল মাহেশ্বরী শক্তি। দেবী সরস্বতীর সেই মাহেশ্বরী শক্তির প্রণোদনাতেই আমাদের সৃষ্টি, স্থিতি এবং লয় ।
বুয়াদেব বলে চলেন আর দিদ্দা তন্ময় হয়ে শোনে।
এই জগৎ, পৃথিবীর যাবতীয় প্রাণী ও উদ্ভিদ, নদ-নদী, পঞ্চভূত, মেধা, অহং ও আত্মা, সবকিছুই শিবের অংশ। যদি সবই পরমেশ্বরের অংশ হয় তবে দ্বৈত চেতনার স্থান কোথায়! সবই তো এক। সবই তো একাত্ম। সবই তো শিবময়।
অতএব আমাদের একমাত্র অন্বিষ্ট শিব। আমরা যদি শিবময় চেতনায় অবগাহন করি, তবে চারপাশের বস্তুতান্ত্রিকতা আর আমাদের ছুঁতে পারবে না। ধ্যান বা সাধনা হল এই শিবময় চৈতন্যে অবগাহনের নৈষ্ঠিক প্রয়াস। মানবজন্মের একটাই লক্ষ্য থাকা উচিত। জন্ম ও পুনর্জন্মের চক্র থেকে বেরিয়ে শিবের সঙ্গে একীভূত হয়ে যাওয়া। সেটা হতে পারলেই মোক্ষ লাভ হবে। এই সহজ সত্য অনুধাবন করলেই আমাদের বাঁচাটা সহজ ও সুন্দর হবে।
‘আমরা যদি সবাই শিবের অংশ, তবে আমাদের মধ্যে, একের সঙ্গে অন্যের, এত পার্থব্য কেন?' দিদ্দার মনে প্রশ্ন জাগে।
বুয়াদেব উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর এই নবাগত শিষ্যাটি যে কেবল গুরুবাক্য শুনে মুগ্ধতা নিয়ে ফিরে যেতে আসেনি, তা তিনি অনুভব করেন। টের পান, জীবনসত্য ছোঁয়ার জন্য দিদ্দার আকুতি কতটা তীব্র! তাই তিনি তখন কর্মের দর্শন ব্যাখ্যা করতে বসেন।
যখন জাগতিক বস্তুবাদে আমরা মগ্ন হই, তখন আমাদের প্রত্যেকের সামনে হাজির হয় বিকল্প। পার্থিব সুখের ধারণা আছে মানেই একাধিক বিকল্পের ভিতর থেকে কোনও একটাকে বেছে নেওয়ার সুযোগ, নিদেনপক্ষে স্বপ্ন, আছে। এই পছন্দ-অপছন্দের তাড়না আমাদের বিবিধ জীবনচর্যার দিকে ঠেলে দেয়। আর নির্বাচিত বিকল্প কিংবা পছন্দের জীবন রচনা করে কর্মের। আমরা যা হতে চাই, যা পেতে চাই, যাকে ভালবাসতে চাই, যার ভালবাসার যোগ্য করে নিজেকে গড়ে তুলতে চাই, সেই চাওয়াটা আমাদের নিয়তি নির্মাণ করে। চাহিদার ভিত্তিতে নির্মিত সেই নিয়তি আমাদের জীবন পথের রচয়িতা। সেই নিয়তিই আমাদের শরীর ও মনকে, চিত্ত ও চিন্তাকে অন্যের চেয়ে পৃথক করে দেয়। আমাদের প্রত্যেককে বিশিষ্টতা প্রদান করে।
বুয়াদেব বলে চলেন। বলেন, হৃদয়ের গভীর থেকে উর্দীর্ণ গাম্ভীর্যের শক্তিতে। বোঝা যায়, এসব কথা নিছক ওষ্ঠ নিঃসৃত কথার ফুলঝুরি নয়। এগুলোর পিছনে আছে জীবনবোধ ছুঁয়ে থাকা প্রত্যয়। সেই প্রত্যয় তাঁর বাণীকে বিশ্বস্ত করে তোলে, বলিষ্ঠতা দেয়।
দিদ্দা একমনে শুনতে থাকে বুয়াদেবের কথা।
যদি কেউ প্রেমকে জীবনের চরম আকাঙ্ক্ষিত বস্তু বলে মনে করে, তবে সে ভাগ্যের হাতে সমর্পিত হয়। সেই ভাগ্য তাকে নিজের মতো করে কুঁদে, নিজের ছাঁদে ফেলে, নির্মাণ করে। অনুরূপভাবে কেউ যদি প্রেমপূর্ণ হওয়ার বদলে আত্মঅহং পূর্ণ হতে চায়, আত্মশ্লাঘায় টইটম্বুর থাকে, তবে তার গর্ব, তার অহমিকা তার জীবনচর্যাকে নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ করে। ভাগ্য তখন তাকে পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে বাঁধতে পারে না। আবার কেউ যদি হতে চায় শুদ্ধশীল, বিশুদ্ধবোধে বাঁধতে চায় তার আজও আগামী, তবে তার সেই লক্ষ্য তার তাবৎ কর্মে শুদ্ধতার ছোঁয়া এনে দেয়।
প্রতিটি লক্ষ্যের অন্তিমে এরকম পৃথক পৃথক ফল অপেক্ষা করে আমাদের প্রত্যেকের জন্য। লক্ষ্যের ভিন্নতার কারণে ফল ভিন্ন হয়। ফল প্রাপ্তির বৈচিত্র সত্ত্বেও ফলের লক্ষ্যে অগ্রগমনের পথে কোথাও কোথাও, কোনও কোনও বিন্দুতে, একের পথ অন্যের পথকে, একের লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টা অন্যের লক্ষ্য বিন্দুতে পৌঁছনোর পথরেখা পরস্পরকে কাটাকাটি করে, ছেদ করে, পুরোপুরি পরস্পরবিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে না। এই পারস্পরিক যোগের সূত্রটাই, লক্ষ্যের বিভিন্নতা সত্ত্বেও লক্ষ্য অর্জনের প্রয়াসে সাধারণ বিন্দুর অবস্থানই, আমাদের বৈচিত্র সত্ত্বেও এক করে বেঁধে রাখে। এই এক করে বেঁধে রাখা মানে কিন্তু একাকার করে দেওয়া নয়। আমরা একে অন্যের সঙ্গে মিশে যাই না, অন্যের ভিতর হারিয়ে যাই না, কিন্তু অন্যকে ছেড়েও যাই না। পার্থক্য সত্ত্বেও পৃথক হই না ।
এ একেবারে গণিতের তত্ত্বের মতো। কিংবা সমাজজীবনে বিভেদের মতো ঐক্যগ্রন্থির উপস্থিতির মতো। বহুর ভিতর দিয়ে এক হয়ে ওঠার মতো।
বুয়াদেবের কথা ছুঁতে পারে, কিন্তু জাপটে ধরতে পারে না দিদ্দা। অনুভববেদ্য হয়েও এই তত্ত্ব যেন তার অনায়ত্ত থেকে যায়।
তাই বুয়াদব বলতে থাকেন। যতি টানেন না ব্যাখ্যা দানে।
তুমি যদি কারও শুভাকাঙ্ক্ষী হও, তবে তার জন্য করা তোমার শুভকর্মের ফল তুমি পাবেই। সেই ফল প্রাপ্তি কাল হতে পারে, পরশু হতে পারে, এক সপ্তাহ, এক মাস কিংবা এক বছর পর হতে পারে, এমনকী এ জন্মে না হয়ে পরজন্মেও হতে পারে। কিন্তু এই যে অঙ্কের উত্তর হিসেবে প্রাপ্ত ভাল কিংবা মন্দ, সেটা তোমাকে জন্ম-পুনর্জন্মের চক্রের মধ্যে আটকে রাখবে। তোমাকে তোমার কর্মফল পাওয়ার জন্য ফের জন্মাতেই হবে। আর এই জন্ম-পুনর্জন্ম, কর্মফল হিসেবে সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যের অর্জন, এসব কিছুই তোমাকে শিবের কাছ থেকে, সত্যের কাছ থেকে, সুন্দরের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে। কারণ, শিবই সত্য এবং সুন্দর। সত্যম শিবম সুন্দরম। তাঁকে পাওয়ার
মধ্যেই সকল কর্মফলের সমাপন।
এবার দিদ্দার বুকে প্রশ্ন মাথা চাড়া দেয়। সে বলে, 'তার মানে মনুষ্যজন্মের অর্থই হল কর্মফলের কারণে জন্ম-পুনর্জন্মের চক্রে আটকে পড়া। তাই যদি হবে, তবে এর থেকে মুক্তি লাভের উপায় কী?'
বুয়াদেব দিদ্দার মুখের দিকে তাকান। সন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে তার মুখের প্রতিটি রেখা পাঠ করেন। তারপর ফের দিদ্দার প্রশ্নের উত্তর দিতে শুরু করেন। হিরন্ময় কণ্ঠস্বরে ক্ষরিত হয় স্কটিক স্বচ্ছ জ্ঞান।
যদি মানুষ ভাবে, কোনওকিছুই তার নিজের নয়, সবই শিবময়, সবকিছুই শিবের, তবে মুক্তিলাভ বা মোক্ষলাভ সহজ হয়ে যায়। হারালে তাই দুঃখ কোরো না। জিতলে তাই উৎসব কোরো না। কারণ গ্রহণ কিংবা বর্জন, অর্জন কিংবা ক্ষয়, কোনও কিছুতেই শিবের কিছু যায় আসে না। আনন্দে এবং দুঃখে তিনি সমান অনাসক্ত অবস্থানে অটল থাকেন।
যদি তুমি শিবত্ববোধে জারিত হও, তবে তখন তুমি আর কারও বন্ধু, পিতা, মাতা, সন্তান, সন্ততি, ভ্রাতা, ভগিনী, কিছুই থাকবে না। তুমি তখন আর কিছুই নয়, কোনও বস্তুই নয়। শিব যখন সবার জন্য চিন্তা করছেন, তখন তুমি অপরের জন্য চিন্তা করে নিজের সময় ও সামর্থ্যের অপচয় করবে কেন?
শিবই তো সত্য। বস্তুবাদ মানব শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এমনকী দেবতারাও এর থেকে, এই পরিণতি থেকে বাঁচতে পারেন না।
‘পুরাণ পড়েছ?' বুয়াদের জিজ্ঞাসা করেন।
দিদ্দা মাথা নাড়ে। সে পুরাণ পাঠ করেছে। যেটুকু পড়েনি, সেটুকু দাদু ভীমদেব শাহীর কাছ থেকে শুনেছে।
‘বায়ুপুরাণ ও শিবপুরাণে উল্লিখিত দক্ষযজ্ঞের কথা তবে তুমি নিশ্চয় জানো। এবারও দিদ্দা ইতিবাচক ইঙ্গিতেই মাথা নাড়ে।
বুয়াদেব বলে চলেন তাঁর ব্যাখ্যা।
যখন মহাদেব আর সতীর বিচ্ছেদ ঘটল, তখন মহাদেব উন্মাদপ্রায় হয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ, মহাদেব নিজেকে সুখবোধ ও দুঃখচেতনার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছিলেন। তাঁর সেই বিচারধারার জন্যই নটরাজ মূর্তিতে তাণ্ডব নৃত্য পরিবেশন। তাঁর চিত্তের অস্থিরতা বিম্বিত হল পৃথিবীর প্রকম্পনে। নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন বলেই তিনি নিজের ও সৃষ্টির ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন।
অথচ দেখ শ্রীরামচন্দ্রকে। তিনি সীতার বিচ্ছেদের বেদনায় নিজেকে সমর্পণ করেননি। তাই সৃষ্টি ধ্বংসের কর্মে বেদনা বিনাশের প্রণোদনায় প্রবৃত্ত হননি। বরং সেই বেদনাকে ক্রোধে পরিণত করে সেই ক্রোধাগ্নিতে দহন করেছেন অশুভ শক্তির। বধ করেছেন রাবণকে ।
অর্থাৎ, চৈতন্যে শিবময়ী হও।
বেদনায় হোয়ো না আচ্ছন্ন।
কষ্টকে ক্রোধে, অশ্রুকে আগুনে বদলে ফেলতে শেখো।
খারাপ পরিস্থিতিতে নিজেকে ধরে রাখা এবং ভাল পরিস্থিতির জোয়ারে গা ভাসিয়ে না দেওয়াই তোমার অবশ্যকর্তব্য হওয়া উচিত।
কোনও অবস্থার কাছেই আত্মসমর্পণ কোরো না।
বুয়াদেবের কথাগুলো নাড়িয়ে দেয় দিদ্দার অন্তঃমূল। যা বোঝার সে বুঝে গিয়েছে, এমনটাই মনে হয় তার।
দিদ্দা ঠিক করে, এবার থেকে কেবল শিবই হবেন তার অভীষ্ট। তার পুত্র, পৌত্র, স্বামী, যারা তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে তাদের তো বটেই, এমনকী তার যেসব আত্মীয় পরিজন এখনও জীবিত, তাদেরও বিস্মৃত হবে সে। ভুলে যাবে রাজত্বের কথা।
বহিদুনিয়ার দিকে তাকাল দিদ্দা। সেখানে পাখি, পশু, গাছপালা আর মানুষ। দিদ্দা আর তাদের মধ্যে কোনও পার্থক্য খুঁজে পেল না। সে বুঝে গিয়েছে, কর্ম অনুসারে শিবই তাদের পৃথক করেছে। নইলে, এরা সবাই এক। অভিন্ন।
এই অনুভবের বলয়ে যখন আরও তলিয়ে যাচ্ছিল দিদ্দা তখনই ডাক এল স্বামী অভিনবগুপ্তের কাছ থেকে। অভিনবগুপ্তকে সে গুরুর আসনে বসিয়েছে। তাঁর আদেশ তার কাছে সদা পালনীয়।
অলঙ্ঘনীয় সেই আদেশের কারণেই ভৈরবনাথ গুহার বাইরে পা রাখল দিদ্দা। অভিনবগুপ্তর কাছে পৌঁছনোর জন্য এগোতেই সে দেখল আশপাশের লোকজন তাকে দেখছে। রানি যে প্রসাদ ছেড়ে এখানে, সেকথা কাশ্মীরের মানুষ জানত না। আজ বহুদিন পর রানিকে দেখতে পেয়ে তারা ভিড় জমাতে শুরু করল দিদ্দার চারপাশে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দিদ্দা যত এগোয়, ভিড় তত বাড়তে থাকে। জনতার ভিড়।
‘বলুন গুরুদেব, কী আপনার আদেশ?'
‘তুমি তো এর মধ্যেই দেখছি তোমার নিয়তির সঙ্গে সঙ্গেই এখানে এসে গিয়েছ, বলেন অভিনবগুপ্ত। মুখে তাঁর মৃদু হাসি। জনতার ভিড়ের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করেন তিনি। বলেন, ‘বোঝো, এই জনতার কাছে তোমার প্রয়োজন আজও ফুরোয়নি। তাই তোমার অদর্শনে কাতর হয়ে তোমাকে দেখামাত্র এখানে ভিড় করেছে। তোমাকেই এবার বাছতে হবে, কোনটা তোমার নিয়তি হবে। তুমি কি সর্বত্যাগী সন্ন্যাসিনীর জীবন গ্রহণ করবে? না কি এই জনতার দুঃখ নিরসনের জন্য, এই জনতার সুখ বর্ধনের জন্য চেষ্টা করবে? জনগণরানি নাকি ওজস্বিনী সন্ন্যাসিনী, কোনটা তোমার অভীষ্ট হবে, সেই বিকল্প তোমাকেই নির্বাচন করতে হবে।'
স্বামী অভিনবগুপ্তের পাদস্পর্শ করে দিদ্দা। অভিনব তাকে আশীর্বাদ করেন। আশীর্বচন উচ্চারণকালে তিনি নীচু স্বরে বলেন, “তোমার ব্যক্তিত্ব মানবসেবার উপযোগী। তবে সেবাকার্য পূর্ণোদ্যমে করার জন্য সিংহাসনের সিলমোহর দরকার । তাই, সিংহাসন যদি তোমারই হয়, তবে তুমি তাতে আসীন হও। সিংহাসনে তোমার অধিষ্ঠান কাজে লাগাও মানুষের উপকারের জন্য। তোমার কর্মে যদি তোমার রাজ্য ও রাজ্যবাসীর কল্যাণ হয়, তবে সে কর্ম থেকে বিরত হোয়ো না। সেই কর্ম সাধনে ইতস্তত কোরো না ।'
সাধ্বীর হৃদয় নিয়ে জনতার ভিড়ে মিশে যাওয়ার সংকল্প নিল দিদ্দা।
আর পিছন ফিরে তাকানোর অবকাশ নেই।
মঠের বাইরে এসে দেখল জনতার ভিড়। আর সেই ভিড় ঠেলে তার দিকে এগিয়ে আসছে তুঙ্গা। এবং তার সঙ্গে বলগাও।
দু'জনের কাঁধে ভর দিয়ে দিদ্দা জনতার জয়ধ্বনি শুনতে শুনতে এগিয়ে গেল শকটের দিকে।
জনতা তখন অবিশ্রান্ত গর্জনে ঘোষণা করছে, ‘মহারানি দিদ্দার জয়!' দিদ্দার ইশারায় থামল শকট।
ভিড়ের দিকে তাকাল দিদ্দা।
তারপর অবিচলিত কণ্ঠে জনতার উদ্দেশে ছুঁড়ে দিল তার আবেদন।
‘বলুন, কাশ্মীরের জয় ! '
জনতা ফেটে পড়ল আবেগে।
মুহুর্মুহু জয়ধ্বনি উঠল, ‘মহারানি দিদ্দার জয়! মহাভূমি কাশ্মীরের জয়!
সেই জয়ধ্বনি শুনে তুষারভূমের খঞ্জ রাজ্ঞী স্মিত হাসিতে আপন অনুভবকে নিজ অবয়বে ফুটিয়ে তুললেন।
রাজশকটে তার উল্টোদিকে বসে বলগা ফের ভাবতে বসল, এ কে? সন্ন্যাসিনী? রানি? না পিশাচিনী?'
সেই মুহূর্তে বলগার মনে হয়, জীবনকে লালন করার ধারণা মরণ কিংবা আগ্রাসনের পূর্ণ বিপরীত মেরু সঞ্জাত ধারণা নয়। কোথাও একটা তারা সহবাসী চেতনা হয়ে যায় । বলগা লক্ষ করে, দিদ্দার চোখের দৃষ্টিতে যুগপৎ দেখা দিচ্ছে ও মিলিয়ে যাচ্ছে, বীভৎসতা আর স্নেহ। আর সেই দৃষ্টির মূলে বিরাজ করছে নির্মোহতা, যাকে সৃজন করেছে দিদ্দার কালগত অভিজ্ঞতা।
দিদ্দার আবদ্ধ অন্তরের কথন যেন তার চোখের ভাষায় শুনে ফেলে বলগা।
অভিনবগুপ্তর মঠ থেকে প্রাসাদে প্রত্যাবর্তনের পর সে এক অন্য দিদ্দা।
আরও বলিষ্ঠ।
আরও জেদি।
আরও কর্মোদ্যোগী ।
চোখে মুখে আরও দাঢ়্য ।
নির্দেশে আরও স্পষ্টতা।
কাশ্মীরকে পুরোপুরি বদলে ফেলার জন্য আরও তৎপরতা।
নতুন নতুন উদ্যোগ ঘিরে প্রতিদিন ব্যস্ততা বাড়তে লাগল কাশ্মীরবাসীর। রাজ প্রশাসনের এবং সাধারণ জনতারও।
তৈরি হল বলগার নামাঙ্কিত বলগা মঠ। সেখানে চালু হল মেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা। শিক্ষার সর্বজনীন প্রসারে বিশ্বাসী দিদ্দা। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও শিক্ষিত, পরিশীলিত হয়ে সামাজিক কার্যকলাপে অংশ নেবে, অর্থনৈতিক অবদানের শরিক হবে, এটাই দিদ্দার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন সার্থক করতেই মেয়েদের পাঠশালা চালু হল প্রথমে বলগা মঠে, তারপর কাশ্মীরের কোনায় কোনায়। সেইসঙ্গে শুশ্রূষালয়। সেখানে মিলত সর্বপ্রকার চিকিৎসার সুযোগ।
প্রত্যন্ত গ্রামে-গঞ্জে সেইসব শিক্ষালয় আর চিকিৎসালয়ে সেবাব্রতী হিসেবে যোগ দিলেন অভিনবগুপ্ত এবং বুয়াদেবের তরুণ শিষ্যরা। যুবক সন্ন্যাসীদের কাছেই প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করল মেয়েরা, ছেলেরাও ।
গোটা রাজ্যে একটা নতুন সকাল আসার খুশি। বহির্বিশ্ব যখন মেতেছে রণ-রক্ত-সফলতাকে ঘিরে, তখন দিদ্দা কাশ্মীরকে দিল অন্যরকম ভিত গড়ার ডাক। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে যেন সহসা ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়াল কাশ্মীর।
দুর্যোগপুর্ণ আবহাওয়া কাশ্মীরের অনিবার্য প্রাকৃতিক নিয়তি। সেই নিয়তির মোকাবিলায় যথেষ্ট শক্তপোক্ত নয় পল্লিতে পল্লিতে দরিদ্র কাশ্মীরবাসীর বাড়ি। দিদ্দা চালু করল গৃহ নির্মাণ কর্মসূচি। গ্রামবাসীরা নিজেদের পাকা বাড়ি পাবে। তার জন্য যা যা উপাদান লাগে, জোগাবে কাশ্মীরের রাজপ্রাসাদ। রাজমিস্ত্রিদের মজুরির অর্থও আসবে রাজ কোষাগার থেকে। শুধু গ্রামে গঞ্জে মেয়েদের এগিয়ে এসে সেই বাড়ি তৈরির কর্মসূচিতে হাত লাগাতে হবে। দিতে হবে স্বেচ্ছাশ্রম। এটা বাধ্যতামূলক।
গ্রামে গঞ্জে আলোড়ন ফেলে দিল এই অনন্যসাধারণ কর্মসূচি। অন্তঃপুরবাসিনীরা এগিয়ে এল আপন সামর্থ্যে গৃহ নির্মাণের জেদ নিয়ে। তাদের উৎসাহ উদ্দীপনা দেখে তাক লেগে গেল প্রাচীনপন্থী কাশ্মীরি সমাজের। নারীর যে আন্তর শক্তি এতদিন উপেক্ষিত, অবহেলিত ছিল, সেই শক্তির এমন বিপুল স্ফুরণ বিস্মিত করল আপামর কাশ্মীরবাসীকে। পুরুষরা যখন বাইরের কাজে ঘরের বাইরে, তখন ঘরের চৌহদ্দিতে থেকে নতুন শক্তপোক্ত পাকা ঘর নির্মাণের মহাযজ্ঞে চারিদিকে একেবারে হইচই ফেলে দিল কাশ্মীরের কন্যারা, বধূরা, মায়েরা, মেয়েরা। দিদ্দা যেন এক অচেনা কাশ্মীরকে অন্দরমহল থেকে টেনে বের করে বিরাট কর্মযজ্ঞে জুতে দিল।
অভিনবগুপ্তর পত্র এসে পৌঁছল রাজপ্রাসাদে। সন্ন্যাসী দিদ্দার এই কর্মপ্রকল্পে মুগ্ধ।
দিদ্দা তাঁকে প্রণাম জানিয়ে চিঠি লিখল। নিজের মঠে যখন সেই পত্র খুললেন স্বামী অভিনবগুপ্ত, তখন তাঁর মুখে হাসি খেলে গেল। কারণ, তিনি দেখলেন তাতে লেখা, দিদ্দা লিখেছে, ‘স্বামী বুয়াদের আমাকে শিখিয়েছেন মঙ্গলকর্ম দ্রুত হোক, বিলম্বিত লয়ে হোক, একদিন না একদিন তা কল্যাণপ্রদ হবে। সেই বিশ্বাসেই, সেই শিক্ষার প্রতি আস্থার বশেই আমি এই সর্বজনীন কল্যাণকর্মে ব্রতী হয়েছি। আমাকে আশীর্বাদ করবেন গুরুদেব।”
‘জয়োস্ত্র!’অন্তরের অন্তস্তল থেকে শব্দটি উঠে এল অভিনবগুপ্তের কণ্ঠে। অস্ফুটে। কিন্তু স্পষ্টভাবে।
সেই উত্তরপত্র থেকেই একটি নতুন প্রকল্পের বিষয়ে অবগত হলেন স্বামী অভিনবগুপ্ত। কাশ্মীরের বুক চিরে চলে গিয়েছে রেশম পথ। পূর্বের সঙ্গে পশ্চিমকে জুড়েছে সেই বাণিজ্য পথ। ভারতের সমভূমি থেকে উঠে আসা সেই পথ পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের রোমকে জুড়েছে। তিব্বতীয় মালভূমিও এই পথের সূত্রই কাশ্মীরের সঙ্গে সংযুক্ত। স্বামী অভিনবগুপ্ত এবং সন্ন্যাসী বুয়াদেবের মঠে যাওয়া আসার পথে দিদ্দা লক্ষ করেছে, এই রেশম পথ ধরে যাতায়াতকারী বণিকরা স্থানীয় স্তরে উৎপাদিত সামগ্রীর প্রতিও বেশ আগ্রহী। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তুঙ্গা আর বলগা দিদ্দাকে জানিয়েছে, কাশ্মীরের গ্রামে গঞ্জে উৎপাদিত ওইসব জিনিসের চাহিদা আছে ইউরোপীয় বাজারে।
এটা জানার পর থেকেই দিদ্দা স্বপ্ন দেখছে, কাশ্মীরি হস্তশিল্পকে বিশ্ব বাজারে পৌঁছে দেওয়ার। আর সেই সূত্রে কাশ্মীরের গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করে তোলার। তাই বাণিজ্য পথে দেশি-বিদেশি বণিকদের যাতে কোনও অসুবিধা না-হয়, বণিকরা যাতে আরও বেশি করে কাশ্মীরের রেশম পথ ধরে পণ্য পরিবহণে আগ্রহী হয়, সেজন্য লাগুর আর গুজরাটের মধ্যে দিদ্দা নির্মাণ করাল একাধিক পান্থশালা।
বণিকদের আকৃষ্ট করার জন্য জায়গায় জায়গায় পতিত জমিতে নির্মিত হল রংবেরংয়ের ফুলের বাগান। সেইসব উদ্যান তৈরি করতেও কাজে লাগান হল পল্লিবাসী কাশ্মীরিদের স্বেচ্ছাশ্রম।
নতুন কাশ্মীর তোমাকে চায় ।
এগিয়ে এসো নব নির্মাণ কর্মসূচিতে।
গ্রামে-গ্রামে, নগরে-পল্লিতে মহারানি দিদ্দার কর্মচারীরা রীতিমতো বাজনা বাজিয়ে চিৎকার করে এসব কথা প্রচার করতে লাগল।
এতদিন স্রেফ হানাহানি আর রক্তপাত দেখে অভ্যস্ত, ক্লান্ত কাশ্মীর জেগে উঠল নতুন উদ্যমে। স্রেফ টিকে থাকার লড়াই অভ্যস্ত জনতা এই প্রথম স্বদেশ গড়ার কাজে সরাসরি ভাগীদার হওয়ার সুযোগ পেল। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সামর্থ্য না থাকলেও যে দেশসেবার কাজ করা যায়, সেটা এবারই প্রথম অনুভূত হল সর্ব স্তরে।
সেই অস্মিতা দিদ্দার প্রতি অনুগত্যে বদলে যেতে সময় নিল না।
আর সেটা লক্ষ করেই বুকের গভীরে আগুন জ্বলে উঠল জয়লক্ষ্মীর। সেও রাজকন্যা। সেও রাজবধূ। তবে কেন তাকে শাশুড়ির অনুগত হয়ে থাকতে হবে? বিশেষত সেই শাশুড়ি যখন তার বৈধব্যের জন্য দায়ী।
পিশাচিনী দিদ্দা নিজেই তার স্বামী, পুত্র, পৌত্রদের গোপনে হত্যা করে কাশ্মীরের রাজ সিংহাসনে আসীন হয়েছে, এই সুপ্রাচীন জনশ্রুতি নতুন করে জয়লক্ষ্মীর হৃদয় কন্দরে বিষণ্নতার বাষ্প আর প্রতিহিংসার জ্বালা জাগিয়ে তুলল।
কাশ্মীরে তখন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা বেজায় ক্ষুব্ধ। ভগবান বুদ্ধের লৌকিক দর্শনে আকৃষ্ট হয়ে দলে দলে লোকে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করছিল। কিন্তু দিদ্দার জনকল্যাণমুখী কর্ম তাতে বাদ সাধল। যে সমস্ত শিক্ষাসত্র, চিকিৎসালয় আর পান্থশালা নির্মিত হয়েছিল রাজানুগ্রহে, সেগুলির সবক'টিতে শৈবদর্শনের বাণী লেখা থাকত দেওয়ালে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শিবলিঙ্গ। নিত্য পূজিত হত সেগুলি। পাঠদান, শুশ্রূষা ও অতিথিশালার ব্যবস্থাপনা ছিল শৈব সন্ন্যাসীদের হাতে। তারা স্বামী অভিনবগুপ্ত কিংবা বুয়াদেবের অনুগামী। এসবের মাধ্যমে বৌদ্ধবিহারমুখী জনজোয়ার প্রাণের টানে দিক বদল করছিল। কাশ্মীরের মানুষ শৈবধর্মের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ছিল। প্রতিদিন শৈব ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা বুদ্ধি পাচ্ছিল।
ক্ষেমগুপ্তের মতো বৌদ্ধ বিহার বিনষ্ট করে নয়, সমাজকল্যাণ কর্মসূচির মাধ্যমে শৈব ধর্ম প্রচারিত হওয়ায় সেই ধর্মের আকর্ষণ প্রায় অলঙ্ঘনীয় হয়ে উঠেছিল।
অস্ত্রের মাধ্যমে কেউ জয়ী হতে চাইলে সেই বিদ্বেষ নির্ভর জয়যাত্রাকে রোধের জন্য পাল্টা বিদ্বেষ বিষ ছড়ানোর আয়োজন করা যায়। কিন্তু মঙ্গলকর্মের সূত্রে যদি জয়যাত্রা শুরু হয়, বিদ্বেষ দিয়ে বা দৈহিক শক্তি প্রয়োগে তাকে প্রতিহত করা যায় না ।
সেটা অনুভব করেই আরও উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা। তাঁদের বিহারগুলোতে যখন অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল, তখনও তাঁরা এতটা অসহায় বোধ করেননি। তখন ক্ষোভের আগুনে সেঁকেছিলেন নিজেদের ধর্মকে ছড়িয়ে দেওয়ার তাগিদ।
কিন্তু এই সুখী আবহে, খুশির প্রস্তুতিতে, ক্ষোভের অনুপস্থিতিতে নিজেদের ধর্মবিশ্বাসের প্রতি মানুষকে টেনে আনার তাগিদটাই হারিয়ে যাচ্ছিল।
দিদ্দা যদি শুধু শৈবধর্মকে উৎসাহিত করত, তাহলেও সংক্ষোভের একটা প্রকোষ্ঠ খুঁজে পেতেন বৌদ্ধ শ্রমণরা। কিন্তু বুদ্ধিমতী দিদ্দা শৈব ধর্মমতের পাশাপাশি শক্তি সাধক তান্ত্রিক এবং বিষ্ণু উপাসক বৈষ্ণবদের প্রতি রাজানুগ্রহ প্রকাশে কার্পণ্য করছিল না। আর তাতেই আরও বেকায়দায় পড়ছিলেন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা।
অবশেষে তাঁরা সুযোগ পেয়ে গেলেন সেবার বসন্তে। জয়লক্ষ্মীর সৌজন্যে।
কাশ্মীরের প্রাচীন রাজ পরিবারের কন্যা হওয়ার সুবাদে জয়লক্ষ্মীর সঙ্গে বিবাহের আগে থেকেই বৌদ্ধ বিহারগুলোর যোগাযোগ ছিল। নিজের ক্ষোভকে প্রকৃত বিদ্রোহে বাস্তবায়িত করতেই জয়লক্ষ্মী বৌদ্ধদের সঙ্গে তার যোগাযোগ আরও বৃদ্ধি করেছিল।
এসবের মধ্যেই আর একটি ঘটনা ঘটে গেল।
মহামর্দন নামে এক বণিককে হাজির করা হল দিদ্দার রাজসভায়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গুপ্তচর বৃত্তির। বণিকের ছদ্মবেশে সে বিভিন্ন পান্থশালায় বিভিন্ন সময় দিন কাটাচ্ছিল।
এই ঘটনা অন্য মাত্রা পেল যখন প্রকাশ্য রাজসভায় এসবের জন্য দিদ্দাকে দায়ী করল জয়লক্ষ্মী। সে স্পষ্ট বলল, রেশম পথে আসা বণিকদের সুবিধার্থে দিদ্দা যেসব পান্থশালা নির্মাণ করছে, সেগুলোর কারণেই কাশ্মীর আরও বেশি করে বাইরের শত্রুদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে। মহামর্দনও জেরার মুখে যা বলল তার অর্থ একটাই দাঁড়ায়। মহারানি দিদ্দার তথাকথিত জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি তার কাজের সুবিধা করে দিয়েছে।
জয়লক্ষ্মী পুরো বিষয়টা নিয়ে বৌদ্ধ শ্রমণদের সঙ্গে গোপনে আলোচনায় বসল। শ্রমণ মুখ্যরা বললেন, এই অভিযোগে, দেশদ্রোহিতার অজুহাতে দিদ্দাকে কারারুদ্ধ করার এটাই মোক্ষম সুযোগ। কিন্তু জয়লক্ষ্মী সেকথা মানতে পারল না। পারল না কারণ, অতীতে দিদ্দা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কাজে জড়িত, এমন কোনও অভিযোগ কানাঘুষোতেও শোনা যায়নি। সুতরাং, আজ দিদ্দার কাজের জন্য কাশ্মীরের নিরাপত্তা বিপন্ন, এই বার্তা জনমানসে চট করে গ্রহণযোগ্য হবে না। স্রেফ একথার প্রচারে দিদ্দার জনভিত্তি টলানো যাবে না। উল্টে জয়লক্ষ্মীর অভিপ্রায় নিয়ে মানুষজন সন্দিহান হয়ে উঠবে।
কয়েকদিন আলোচনা পর্ব চলার পর দিদ্দাকে গ্রেফতার করে কারাবন্দি করার পরিকল্পনা বর্জিত হল।
তবে ঠিক হল, এখন থেকে দিদ্দার প্রতিটি গতিবিধির ওপর নজর রাখা হবে। সামান্যতম সুযোগ পেলেই তাকে আক্রমণ করা হবে। বাক্যে এবং অস্ত্রে। যুক্তিতে এবং শারীরিকভাবে।
দিদ্দার মনে হয়েছিল, মহামর্দন-কাণ্ড জয়লক্ষ্মীর মস্তিষ্কপ্রসূত। জয়লক্ষ্মী যে তার প্রতি প্রসন্ন নয়, সেটা তার আচার-আচরণে প্রকাশ হয়ে যাচ্ছিল। বলগা নিজে বিষয়টার প্রতি দিদ্দার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু বিষয়টাকে আমল দিতে ইচ্ছা হয়নি তার।
দিদ্দার টনক নড়ল তখন, যখন খবর এল, রেশম পথের পার্শ্ববর্তী পান্থশালা গুলো কাশ্মীরের শত্রুদের ঘাঁটি হয়ে উঠছে, রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে, এরকম গোপন প্রচারের জেরে ওই পান্থশালাগুলোর আশপাশের গ্রামসমূহে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ লোটাকম্বল গুটিয়ে অন্যত্র বাস করার জন্য বেরিয়ে পড়ছে।
দিদা জানতে পারল, গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে স্রেফ ওই গুজবের কারণে। এমনকী এরজন্য শৈব সন্ন্যাসীদের প্রতিও মানুষের শ্রদ্ধা, আস্থা, ভরসা টলে যাচ্ছে। শৈব সন্ন্যাসীরা যে কাশ্মীরের হিতাকাঙ্ক্ষী সর্বত্যাগী মানুষ, সে কথাটায় বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে মানুষ। বিভিন্ন চিকিৎসালয়ে মানুষজন আহত ব্যক্তি বা রোগীর চিকিৎসক বা শুশ্রূষাকারী হিসেবেও শৈব সন্ন্যাসীদের বিশ্বাস করতে পারছে না। তাঁদের দেওয়া ওষুধ কিংবা পথ্য খেতে চাইছে না।
এসবের মূলে একটাই কারণ। মহামর্দন কেবল বণিক পরিচয় দিয়েই নয়, শৈব সন্ন্যাসীর ভেক ধরেও বিভিন্ন পান্থশালায় রাত্রিবাস করেছে, এমনটা নিজের জবানবন্দিতে জানিয়েছিল। আর সেই তথ্য জয়লক্ষ্মীর অনুগামী বৌদ্ধ ভিক্ষুরা জনগণের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দিয়েছিল। জনতা বুঝে উঠতে পারছিল না, প্রত্যেক শৈব সন্ন্যাসীকে বিশ্বাস করা যায় কি না।
বৌদ্ধরা কোনওদিন কাশ্মীরের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। কিন্তু শৈবরা এখন করছে। এমন একটা দাবিও গুপ্তচর মারফত সুকৌশলে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল সাধারণের মধ্যে।
কথাটা শোনার পর থেকে দিদ্দার মনের প্রশান্তি আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছিল। অনুদ্বিগ্ন অবস্থান ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল।
সে রাতে শিবের ধ্যানে মগ্ন ছিল দিদ্দা। তখনই ঘরের বাইরে কয়েকটা ছায়ামূর্তি নজরে এল বলগার। বারবার চেষ্টা করল দিদ্দার ধ্যান ভাঙানোর। পারল না। চক্ষু মুদ্রিত ধ্যানমগ্নতা থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষণ দেখা গেল না দিদ্দার মধ্যে।
কীভাবে বাঁচাবে দিদ্দাকে? উপায় খুঁজতে লাগল বলগা। হঠাৎ করেই উপায়টা এল মাথায়। তুঙ্গাকে খবর পাঠাতে হবে। এক্ষুনি। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল বলগা । প্রাসাদ থেকে বেরিয়েই ছুট দিল। বুঝতে পারল, পেছন পেছন কেউ আসছে। পায়ের শব্দ জানান দিচ্ছে তার অস্তিত্ব।
বলগা পেছন দিকে না তাকিয়েই তার দৌড় জারি রাখল।
আচমকা ছুটন্ত বলগাকে রাস্তার পাশের একটা ঘরে টেনে ঢুকিয়ে নিল একজন মহিলা। সে বলগাকে যা বলল, শুনে মাথা ঘুরে গেল বলগার।
“শিগগির রানি দিদ্দাকে প্রাসাদ থেকে সরিয়ে দিন। সমগ্র প্রাসাদ দখল করেছে বিদ্রোহীরা। বিদ্রোহী সেনাদের মুখ হলেন জয়লক্ষ্মী। প্রয়াত মহারাজ অভিমন্যুর বিধবা। মহামর্দনকে কারাগার থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে রানি দিদ্দাকে মেরে ফেলার জন্য।' খুব দ্রুত কথাগুলো বলেই সে সেখান থেকে চলে যেতে উদ্যত হল। বলগা তাকে হাত ধরে টানল।
বলগার মনে হল, সে যদি চিৎকার করে তুঙ্গাকে ডাকতে পারত। পারল না। সেই মুহূর্তে বাইরে ফিসফিসানির শব্দ শুনতে পেল দু'জন।
তাকে ঘরের আসবারের পেছনে লুকোতে বাধ্য করল সেই মহিলা ।
ঘরের বাইরে ফিসফিস আওয়াজ খানিকক্ষণ পর থেমে গেল।
বলগা কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখল। তারপর সেই মহিলার কানে কানে বলল, ‘ওই যে রাস্তাটা দেখছ, ওটা দিয়ে গেলে একটা সুড়ঙ্গ পাবে। সেই সুড়ঙ্গ শেষে তুঙ্গার ঘর। ওকে পারলে এখনই খবর দাও।'
‘আর আপনি?’
‘আমার কথা ভেবো না। আমি দেখছি। তুঙ্গা যদি নিজ কক্ষের পরিবর্তে সেনাবাহিনীর যুদ্ধ অনুশীলন কেন্দ্রে থাকেন, তবে সেখানে ওঁকে খবর দিতে যাচ্ছি। সেখানে যাওয়ার পথ উল্টো দিকের একটা সুড়ঙ্গ দিয়ে। আমি চিনি।'
কথা শেষ হওয়া মাত্র বলগা আর মহিলাটি, দুজনে দু'পথে তুঙ্গাকে খবর দেওয়ার জন্য ছুটল। তারা ঘরের বাইরে কোনও সৈনিককে দেখতে পেল না। তবে দূর থেকে একটা চিৎকারের শব্দ আসছিল।
সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশের পূর্ব মুহূর্তে বলগা স্বকর্ণে শুনল, জয়লক্ষ্মী চিৎকার করে বলছে, ‘ওই দাসীকে এক্ষুনি বন্দি করে আমার সামনে আনো। পিশাচিনী দিদ্দার সব অপকর্মের সঙ্গী ও। আমার স্বামীকে, আমার ছেলেদের ওরাই খেয়েছে।'
ওদিকে প্রাসাদের কক্ষে ধ্যান থেকে উঠে চোখ খুলল দিদ্দা। দেখল মহামর্দন তার সামনে। হাঁটু গেড়ে বজ্রাসনের ভঙ্গিতে বসে। দু'হাতে ধরে আছে খোলা তরবারি। বলগাকে ওরা হাত-পা বেঁধে নিয়ে এসেছে। সে চুপ করে বসে আছে। দু'চোখ বেয়ে অশ্রু নামছে তার। মুখ বাঁধা। ফলে চিৎকার করতেও পারছে না।
দিদ্দার অনুসন্ধানী দৃষ্টি চারদিক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করল।
বাইরে একদল সেনা ‘রানি জয়লক্ষ্মীর জয়' বলে চিৎকার করে উঠল। তাদের চিৎকারে রাতের ঘুম ভেঙে একটা পাখি, সম্ভবত একটি পেচক, চ্যাঁ চ্যাঁ শব্দ করতে করতে উড়ে গেল।
আচমকা রণমূর্তি ধারণ করল দিদা । চকিতে ধ্যানাসনের নীচ থেকে একটা তরবারি বের করল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তরবারির একটা কোপে কেটে ফেলল মহামর্দনের ডান হাত। যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল মহামর্দন। রক্তে ভেসে যাচ্ছে তার শরীর। সেই অবস্থাতেই এক পায়ে ভর দিয়ে লাফিয়ে উঠল দিদ্দা। নরবাহন এভাবেই তাকে ঘোড়ার পিঠে লাফ দিয়ে উঠতে শিখিয়েছিল। যখন মাটিতে বসে পড়ল দিদ্দা, তখন দেখা গেল মহামর্দনের বাঁ হাতটিও দিদ্দার তরবারির আঘাতে কাটা পড়েছে।
জনা দশেক সৈন্য ছিল মহামর্দনের সঙ্গে। রানির রণচণ্ডী মূর্তি দেখে তারা ভয়ে পিছিয়ে গেল। মহামর্দন তখন দু'হাত কাটা অবস্থায় কাতরাচ্ছে। তার কাটা হাতের রক্ত মুখে মেখে নিল দিদ্দা। পিশাচিনীর মতো হেসে উঠল।
সেই বিকট মূর্তি দেখে ভয় পেয়ে সৈন্যরা সব ‘ডাইনি মারতে আসছে, পালা' বলে দৌড় লাগাল।
দিদ্দা ফের হাতে ভর দিয়ে মেঝেতে ঘষটাতে ঘষটাতে বলগার কাছে গেল। টানতে টানতে নিয়ে গেল তরবারিটাও। কেটে ফেলল বলগার হাত-পায়ের বাঁধন। খুলে দিল তার মুখের কাপড় ।
বলগা তখন হাউ হাউ করে কাঁদছে।
মুহূর্তের অসতর্কতা।
তার মধ্যেই কেউ পিছন থেকে এসে দিদ্দার তরবারি তার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে তারই গলায় ধরল।
দিদ্দা চিৎকার করে উঠল।
সেই চিৎকার আসলে এক খঞ্জ নারীর অসহায়তার আর্তনাদ।
দিদ্দা বুঝতে পারল নিরস্ত্র অবস্থায় এক পায়ে ভর দিয়ে এই জনা দশেক সশস্ত্র সেনায় মোকাবিলা সে করতে পারবে না।
সৈন্যদের মধ্যে একজন এগিয়ে এল দিদ্দার দিকে। ভাল করে নিরীক্ষণ করল তার রক্তমাখা মুখ। তারপর কেটে কেটে বলল, “তুই একটা পিশাচিনী।’
চারদিক থেকে সঙ্গে সঙ্গে ভেসে এল নানা কণ্ঠস্বর।
‘তুই স্বামীখেকো ডাইনি।'
—তুই নাতিখেকো যোগিনী।'
—তুই রানি নস, তুই পিশাচিনী।'
কথাগুলো দিদ্দার কানে আগে যে আসেনি, তা নয়। তবে এই প্রথম কেউ দিদ্দার সামনে, তারই মুখের ওপর কথাগুলো বলার ঔদ্ধত্য দেখাল।
রাগে কাঁপতে লাগল দিদ্দার সারা শরীর। সন্ন্যাসিনীর নিরাসক্তি অন্তর্হিত হয়ে নারীর ক্রোধ তখন তাণ্ডব করছে তার শরীর আর মন জুড়ে।
রাগে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল দিদ্দা। কয়েক মুহূর্তের জন্য। সম্ভবত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। জ্ঞান হারানোর আগের মুহূর্তে সে দেখেছিল একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসছে তাদের দিকে।
ব্লগার চিৎকার তার কানে ঢুকল, ‘তুঙ্গা, বাঁচাও আমাদের।'
জ্ঞান ফিরে দিদ্দা দেখল, চারপাশে বিদ্রোহী সৈনিকদের লাশ। তুঙ্গা দাঁড়িয়ে আছে উন্মুক্ত তরবারি হাতে।
দিদার মনে হল, পরম নিশ্চিন্ত আশ্রয় নিজে হেঁটে পৌঁছে গিয়েছে তার কাছে।
যেতে হয় সবাইকেই।
তাকেও একদিন যেতে হবে।
তুঙ্গাকেও। তার আগে কিংবা পরে।
থেকে যাবে কাশ্মীর।
ঘুম ভাঙার পর থেকে আজ দিদ্দার মনটা কেবল হু হু করছে। ক'দিন আগেই জয়লক্ষ্মীর পরিকল্পনায় মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। বলগার উপস্থিত বুদ্ধি আর তুঙ্গার তৎপরতায় সেদিন প্রাণে বেঁচেছে দিদ্দা। অস্ত্র চালনার যা যা শিক্ষা এতদিন সে পেয়েছে, সেগুলোর সবক'টি প্রয়োগ করেও সে রাতে দিদ্দা নিজেকে রক্ষা করতে পারত না, যদি ওই দু'জন না থাকত।
মৃত্যু ভয় তার তেমনভাবে নেই। স্বজনহারা জীবনে বাঁচতে অভ্যস্ত মানবী জীবনে মৃত্যুভয় আলাদা করে কোনও ভয়ের বীজতলা তৈরি করে না ।
কিন্তু কাশ্মীরকে নিয়ে ভয় দিদ্দার রয়েছে। তার মৃত্যুর পর কাশ্মীরকে কে সামলাবে, সে চিন্তা আজকাল তাকে মাঝে মাঝেই পেয়ে বসে। তার অনুপস্থিতিতে তুঙ্গা কাশ্মীরবাসীর কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়েও যথেষ্ট সংশয়ী দিদ্দা।
বৈকালিক গল্পগুজবের সময় বলগা কথাটা জিজ্ঞেস করেছিল। হালকা চালেই বলেছিল কথাটা।
‘আপনি কি তুঙ্গাকে ভালবাসেন মহারানি?'
‘না। হঠাৎ এই প্রশ্ন? '
‘এই মুহূর্তে তুঙ্গার চেয়ে বেশি বিশ্বস্ত, শক্তিশালী, যুদ্ধপটু যুবক আপনার আশপাশে নেই। তাই মনে হচ্ছিল, ওকে যদি আপনি জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন, তবে সেটা সবার পক্ষেই ভাল হবে। আপনার পক্ষে, সমগ্র কাশ্মীরের পক্ষেও।'
কথাটা শুনেই গর্জে উঠেছিল দিদ্দা। হতে পারে বলগা তার সবচেয়ে পুরনো, সবচেয়ে বিশ্বাসভাজন সহচারী। তা বলে এমন চরম ব্যক্তিগত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার বা এরকম ব্যক্তিগত ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়ার সাহস তার হয় কী করে!
‘মুখে লাগাম দাও বলগা। ভুলে যেও না, আমি কাশ্মীরের রাজ্ঞী। আর তুমি সামান্য বেতনভুক্ত পরিচারিকা। আর তুঙ্গা বেতনভুক রাজকর্মচারী। কোনও রাজরক্ত তার শরীরে বইছে না।'
বলগা সঙ্গে সঙ্গে মাফ চেয়ে নিয়েছিল।
আর সেদিন রাতেই বলগাকে নিজের কক্ষে ডেকে এনে দিদ্দা খুলে বলেছিল তার মনের কথা।
‘বিকেলের আচরণের জন্য আমি দুঃখিত বলগা ।'
‘দুঃখিত তো আমার হওয়া উচিত মহারানি। ক্ষণিকের জন্য হলেও আমি নিজের অবস্থান বিস্মৃত হয়েছিলাম।'
‘ছাড়ো ওসব। তুমি আমার সবচেয়ে পুরনো বন্ধু। এসব কথা তুমি আমাকে বলতেই পারো।'
বলগা কোনও উত্তর দেয় না। সে বুঝতে পারে না, জল কোনদিকে গড়াচ্ছে।
তখনই দিদ্দা বদলে ফেলে তার কণ্ঠস্বর। ঘন আর গাঢ় করে ফেলে তার ঝরনার মতো আওয়াজ। তাতে জুড়ে দেয় দীর্ঘ শ্বাসাঘাত। বলে, ‘কেন তুঙ্গাকে বিয়ে করিনি, জানো বলগা? ভয়ে ওকে বিয়ে করিনি। বিয়ে করলে পাছে নিয়তি ওকেও আমার কাছ থেকে কেড়ে নেয়।’
বলগা আলো আঁধারিতে দেখতে পায় দিদ্দার চোখের কোলটা চকচক করে উঠছে। বুঝতে পারে, কোন আশঙ্কা দিদ্দাকে নিত্য তাড়া করে বেড়াচ্ছে। সে চুপ করে থাকে। তারপর আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সাধ্বী নয়, তপস্বিনী নয়, রানিও নয়, নারী দিদাকে কিছুক্ষণ একলা থাকতে দেওয়া উচিত বলে মনে হয় তার।
বলগা চলে যাওয়ার পর সমস্ত কক্ষটা এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ্যে ভরে যায়। এদিন যখন বলগার মৃত্যু সংবাদ এসে পৌঁছল দিদ্দার কাছে, দিদ্দা অনুভব করল, সেদিনকার সেই নৈঃশব্দ্য ঘিরে ধরেছে তাকে।
একলা ঘরে কাঁদার জন্য তার কিছুটা সময় দরকার, বুঝল দিদ্দা।
আর সেই সঙ্গে তার মনে হল, এক ভয়ানক ঘূর্ণিঝড়ের মুখে পড়তে চলেছে কাশ্মীর । তুঙ্গাকে ডেকে পাঠাল সে আপন কক্ষে। আর, দাসীদের জানিয়ে দিল, বলগার অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ায় উপস্থিত থাকতে পারবে না সে।
গোটা রাজপ্রাসাদ বুঝল, বিশ্বস্ত সহচরীকে হারিয়ে রানি আজ জীবনযুদ্ধে বড্ড একা হয়ে পড়েছেন।
শুধু দিদ্দা জানল, বলগা ছাড়া জীবনে তাকে অনেক কিছু নিজে নিজে করতে হবে। সেজন্য নিজেকে তৈরি করার সময় চাই তার।
সত্যিই ভয়ানক ঝড় আসার ইঙ্গিত পাচ্ছিল সবাই। পাহাড় পেরিয়ে আসা সেই ঝড়ে শুধু যে কাশ্মীর বিপর্যস্ত হবে তা নয়, গোটা হিন্দুস্তান বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এ বিষয়েও নিশ্চিত ছিল সবাই। পর্বত অতিক্রম করে আসা সেই ঘূর্ণাবর্তের নাম গজনী ।
ভীমদেব শাহীর মৃত্যুর পর আফগানিস্তানের সিংহাসনে বসেছিলেন জয়পাল। ভীমদেব শাহী নিজেই তাঁর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী কে হবে, তা ঠিক করে গিয়েছিলেন। তবে জয়পাল শাহী বংশের কেউ ছিলেন না। সবুক্তিগিন আক্রমণ করলে জয়পাল প্রায় বিনা যুদ্ধে তার কাছে নতি স্বীকার করেন। এই সংবাদ ব্যথিত করেছিল দিদ্দাকে । সেই তখন থেকে পেশোয়ার তুর্কিদের কবজায় চলে যায়। ফলে কাবুল, কাশ্মীর আর লোহারা, তুর্কি আগ্রাসনের আশঙ্কায় দিন গুনতে শুরু করেছিল।
দিদ্দা কাবুল আর লোহারা, উভয় রাজ্যের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছিল। দিদ্দা তুঙ্গার সঙ্গে আলোচনা করে এটা ভালমতোই বুঝতে পেরেছিল যে আবু মনসুর সবুক্তিগিন চট করে কাশ্মীর আক্রমণের ঝুঁকি নেবে না। বরং জয়পালকে বাগে আনার পর তার মূল্য লক্ষ্য হবে লোহারা। জয়পাল আত্মসমর্পণ করেছে, এখবর পাওয়ার পর দিদ্দা লোহারার সঙ্গে কাশ্মীরের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও মজবুত করার দিকে জোর দিল। তুঙ্গার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পরই এই পদক্ষেপ। আর এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দিদ্দা সবুক্তিগিনকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, সে যদি লোহারা আক্রমণ করে তবে তা বরদাস্ত করবে না কাশ্মীর। একই সঙ্গে কাবুলে বার্তা পাঠাল দিদ্দা। কাবুল তুর্কি আক্রমণের শিকার হলে তারা সাহায্যের জন্য কাশ্মীরকে পাশে পাবে।
দিদ্দার শক্তি সামর্থ্য জনপ্রিয়তার কথা, দৈহিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সাহস করে তলোয়ার ধরার কথা, রণরঙ্গিনী মূর্তিতে ষড়যন্ত্রকারীদের খতম করে ফেলার কথা গজনীতেও পৌঁছেছিল। তাই, অন্তত দুই দশক তুর্কিরা কাশ্মীর, কাবুল ও লোহারায় হানা দেয়নি।
কিন্তু এসব জেনেবুঝেও দিদ্দা শান্ত থাকতে পারে না। তার বয়স হচ্ছে। তুঙ্গারও। চলতে ফিরতে কষ্ট হয় দিদ্দার। অসুস্থ হয়ে পড়ছে মাঝে মাঝেই।
এরই মধ্যে গুপ্তচরদের মাধ্যমে খবর আসে সবুক্তিগিনের বড় ছেলে মাহমুদ তার ভাই ইসমাইলকে পর্যুদস্ত করে গজনীর মসনদ দখল করেছে। মাহমুদের মতো অহঙ্কারী কর্তৃত্ববাদী শাসক যে কোনও রাজ্যের সিংহাসনে কোনও মহিলাকে দেখলেই সেই রাজ্যকে দুর্বল ভেবে আক্রমণ করবে, সেই আশঙ্কা দিদ্দাকে গ্রাস করে ফেলল।
তখন থেকেই আপন অসহায়তা, একাকীত্ব, রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা, শারীরিক অসুস্থতা ও দুর্বলতা নিয়ে বিড়ম্বনা, সব যেন একসঙ্গে গিলে খেতে লাগল দিদ্দাকে।
‘এবার কাশ্মীর তার আগামী রাজাকে চাইছে, তুঙ্গাকে বলে দিদ্দা।
‘সে তো একরকম ঠিক করাই আছে', তুঙ্গা বলে।
'কে?'
‘কেন? সংগ্রামরাজ। উদয়রাজের পুত্র।'
‘তেমনটাই ভেবেছিলাম। তবে এখন ভাবছি অন্য কথা।'
‘কী ? ’
‘কাশ্মীরের সিংহাসনে কে বসবে তা ঠিক হবে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে?'
‘প্রতিযোগিতা? কীসের প্রতিযোগিতা?'
‘অনেক ভেবে দেখলাম, শুধু উদয়রাজের বড় ছেলেকে নয়, আমার পিতৃকুলের সব রাজপুত্রদের উপস্থিত করো। প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে আমি তাদের ভেতর থেকে বেছে নেব আমার উত্তরাধিকারী। কাশ্মীরের সিংহাসন কার অধীনে থাকলে আগামী দিনে তুর্কি আগ্রাসন প্রতিহত করা সম্ভব হবে, সেটাও বুঝে নেওয়া দরকার।'
‘কেবল রাজপুত্ররা? রাজকন্যারা নয়?'
‘না৷’
‘কেন ?'
‘আমার পিতৃকুল ও শ্বশুরকুল, উভয় দিকেই ছেলের সংখ্যা বেশি। মেয়েরা প্রায় নেই বললেই চলে। একজন অবশ্য আছে। সে গান্ধার পেরিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকে। তার দুনিয়া সম্পর্কে, চারদিকের বিপদ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিষয়ে কোনও জ্ঞান নেই। কাশ্মীরের সিংহাসন কোনও জনবিচ্ছিন্ন, রূপটানের বিষয়ে কেবল জানে এমন কন্যাসন্তানের হাতে নিরাপদ নয়।'
‘যদি অভয় দেন তবে আর একটা জিজ্ঞাসা।'
‘নির্ভয়ে করো, তুঙ্গা। অত ইতস্তত করার কিছু নেই।'
‘কেন আপনি আপনার শ্বশুরকুলের রাজপুত্রদের এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছেন না?'
‘কারণটা খুব পরিষ্কার তুঙ্গা। আজ যে কাশ্মীর তুমি দেখছ, সেই কাশ্মীর আমার তৈরি। আমার স্বামী-শ্বশুরের কাশ্মীর এটা নয়। তাই আমার স্বর্গত স্বামীর কোনও আত্মীয়কে আমি কাশ্মীরের সিংহাসনে বসতে দেব না। এই সিংহাসনে কেবল তারাই বসতে পারবে যাদের শরীরে জন্মসূত্রে আমার রক্তের ধারা বইছে। আর কেউ নয়। কোনও ভাবে নয়।'
তুঙ্গার হাতে নষ্ট করার মতো সময় ছিল না। দিকে দিকে রাজপুরুষেরা ছুটল উপহারের ডালি আর প্রতিযোগিতার আমন্ত্রণপত্র নিয়ে।
প্রতিযোগিতার দিন বিপুল সংখ্যক মানুষ ভিড় করেছিল তাদের আগামী শাসক কে হয়, সেটা দেখার জন্য।
তুঙ্গা যে এই উত্তরাধিকারী নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে সংশয়ে ভুগছে, সেটা জানা ছিল দিদ্দার। তাই সে পুরোটা এমনভাবে পরিকল্পনা করেছিল, যাতে কোথাও কোনও ফাঁক না থাকে।
তুঙ্গা বলেছিল অসিযুদ্ধ, তিরন্দাজি আর ঘোড়সওয়ারির মাধ্যমে নির্বাচন করা হোক কাশ্মীরের সিংহাসনের উত্তরাধিকারীকে। দিদ্দা সেই প্রথাগত পরীক্ষার পথে হাঁটেনি। তার নির্বাচন পদ্ধতি অভিনব।
সকালে রাজপ্রাসাদের মাঠে জড়ো হল রাজপুত্রের দল। সব মিলিয়ে ছয়-সাত জন । তাদের সামনে একটা বিরাট পাত্রে আপেল রাখা হল। যে রাজপুত্র নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আপেল ওই পাত্র থেকে তুলে নিজের সংগ্রহে রাখতে পারবে, সে-ই হবে কাশ্মীরের আগামী রাজা।
রাজপুত্রের দল লাফিয়ে পড়ল পাত্রটার উপর। নিজেদের মধ্যে মারামারি করতে লাগল। পাত্র থেকে আপেল পড়ে গিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। রাজপুত্ররা সেইসব আপেলের দখল পাওয়ার জন্য একে অপরকে আঁচড়ে, কামড়ে, ছুরির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে তুলল। শরীরগুলো রক্তাক্ত ও ঘর্মাক্ত। সংঘর্ষ থামতেই চায় না।
এই ভিড়ের মধ্যে দিদ্দা বারবার খোঁজার চেষ্টা করল সংগ্রামরাজকে। দেখতে পেল না। মনে একটা সংশয়কীট কামড় বসাতে শুরু করল। সংগ্রামরাজ কি তবে প্রতিযোগিতায় জিততে পারবে না? অথচ ছেলেটিকে দেখে বলিষ্ঠ সুঠাম চেহারার ভদ্র স্বভাবের চটপটে ছেলে বলেই মনে হয়েছিল দিদ্দার।
দিদ্দার নির্দেশে রাজকর্মচারীরা ঘণ্টাধ্বনি করে জানিয়ে দিল, প্রতিযোগিতার সময় শেষ। ঘোষণামাত্র রাজপুত্ররা ছেঁড়া পোশাকে রক্তাক্ত দেহে ‘যে ক-টা পাওয়া যায়’ বলে আপেলের পাত্রে হাত ঢোকাল ।
দেখা গেল, পাত্র তখন প্রায় ফাঁকা।
আর ঠিক তখনই দিদ্দার চোখ গেল মাঠের এককোণে। সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে সংগ্রামরাজ। পাশে আপেল জড়ো করে ঢিবি বানিয়েছে সে।
কিছুক্ষণের মধ্যে পুরো বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল সবার কাছে।
বাকি রাজপুত্ররা যখন সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আপেল নিজ নিজ ঝুলিতে ভরবে বলে নিজেদের মধ্যে মারামারি, কামড়াকামড়ি করছিল, তখন সংগ্রামরাজ সেসবের মধ্যে জড়ায়নি। পাশ থেকে চিৎকার করে সে অন্য রাজপুত্রদের পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিচ্ছিল। আর নিজে তাদের ঝুলি থেকে পড়ে যাওয়া, ছিটকে যাওয়া, গড়িয়ে পড়া আপেল ডাঁই করছিল একপাশে।
তাই প্রতিযোগিতার সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর বাকি রাজপুত্ররা যখন ছিন্নবেশ, রক্তাক্ত শরীর আর প্রায় না-থাকা আপেলের পুঁজি নিয়ে হতাশ কিংবা ভবিষ্যৎ ভাবনার কারণে চিন্তাগ্রস্ত, তখন সংগ্রামরাজ হাস্যোৎফুল্ল, তরতাজা, এবং অনেকটা ভাবলেশহীন । স্রেফ রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগে সে নিশ্চিত করতে পারে আপন জয়। অন্যদের পরাজিত না করেও সে রক্ষা করতে পারে আপন স্বার্থ। দিদ্দা দু'চোখ ভরে তাকিয়ে দেখে সংগ্রামরাজকে। তার উত্তরপুরুষ। তার সিংহাসনের ন্যায়সঙ্গত দাবিদার। আনন্দে বুকটা ভরে ওঠে তার।
তুঙ্গাকে ইশারায় কাছে ডাকে দিদ্দা। তারপর বলে, ‘কাল সকালে রাজসভায় তুমি সংগ্রামকে রক্ষা করার শপথ নেবে। আর সংগ্রাম, তুমিও কাল প্রত্যুষে রাজসভায় উপস্থিত থাকবে।'
সেই রাতে স্বামী অভিনবগুপ্ত উপস্থিত হলেন কাশ্মীরের রাজপ্রাসাদে। তাঁর আগমন সংবাদ পেয়ে তাঁকে বরণ করে নেওয়ার জন্য প্রাসাদের প্রধানদ্বারে উপস্থিত হল দিদ্দা। পাদস্পর্শ করে প্রণতি জ্ঞাপন করল অভিনবগুপ্তের প্রতি।
সন্ন্যাসী ধীর কিন্তু প্রত্যয়ী কণ্ঠে বললেন, ‘আচার্য তুঙ্গদেব যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তা সফল হয়েছে। এবার সব কিছু ছাড়ার সময় সমাগত দিদ্দা। নিজেকে প্রস্তুত রাখো মহাপ্রস্থানের জন্য।'
পরদিন সকালে ভরা রাজসভায় প্রায় একসঙ্গে প্রবেশ করল সংগ্রামরাজ আর তুঙ্গা।
দু'জনেই একযোগে নতশিরে প্রণাম জ্ঞাপন করল। প্রথমে আচার্য স্বামী অভিনবগুপ্তকে, তারপর দিদ্দাকে।
দিদ্দা বলল, “তোমরা প্রতিশ্রুতি দাও, দু-জনে একযোগে কাজ করবে, রক্ষা করবে কাশ্মীরকে।
সংগ্রামরাজ এবং তুঙ্গা একযোগে উচ্চারণ করল শপথবাক্য।
‘আমরা দু-জনে আমাদের সকল সামর্থ্য একীভূত করে মহারানি দিদার স্বপ্নপূরণে তা ব্যয়িত করব। আমরা রক্ষা করব এই রাজ্য। আমরা যৌথভাবে প্রতিহত করব বিদেশি শক্তির যাবতীয় আক্রমণ। আমরা আজ এই মুহূর্ত থেকে কায়মনোবাক্যে এই প্রতিজ্ঞা পালনের জন্য প্রস্তুত।'
দিদ্দা হাসল।
অভিনবগুপ্ত স্বস্তিবচন উচ্চারণ করলেন ।
উপস্থিত জনতা চিৎকার করে উঠল, ‘জয় রানি দিদ্দার জয়! জয় কাশ্মীরের জয়!'
তথ্য পেটিকা
কলহনের ‘রাজতরঙ্গিনী' দিদ্দা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যের উৎস। ইতিহাস অনুসারে, ৯৮০/১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১০০৩ খ্রিস্টাব্দ, অর্থাৎ প্রায় সিকি শতাব্দী ধরে কাশ্মীরের সার্বভৌম রানি ছিলেন দিদ্দা।‘রাজতরঙ্গিনী' লেখা হয়েছিল দ্বাদশ শতাব্দীতে, আনুমানিক ১১৫০ খ্রিস্টাব্দে, অর্থাৎ দিদ্দার মৃত্যুর দেড়শো বছর পর।
মধ্যযুগীয় ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে নারীর ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল উদাহরণ রানি দিদ্দা। ২৩-২৪ বছর তাঁর শাসনকাল হলেও আদতে প্রায় অর্ধ-শতাব্দী ধরে কাশ্মীরের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব সরাসরি ব্যাপৃত।
‘রাজতরঙ্গিনী’ ছাড়াও তাঁর শাসন ক্ষমতার চিহ্ন মুদ্রিত আছে কাশ্মীরে উদ্ধার হওয়া নানা মুদ্রায়। ক্ষেমগুপ্ত নিজের সঙ্গে তাঁর নাম জুড়ে যে মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন তাতে লেখা ‘দি-ক্ষেমগুপ্ত-দে’। সম্ভবত ‘দিদ্দাক্ষেমদেব ‘ নামের সংক্ষিপ্ত রূপ এটি।
তিনি নিজে যখন কাশ্মীরের একচ্ছত্র শাসক, তখন দিদ্দা যে মুদ্রার প্রচলন করেন, তাতে লেখা ‘শ্রীদিদ্দাদেব’। স্পষ্টতই ‘দেব' উপাধি দিদ্দার নারীশক্তির পুরুষ রাজার সমমর্যাদা অর্জনের ইঙ্গিত। ৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ দিদ্দার শাসনকালের ৬৫ তম বর্ষে নির্মিত বৌদ্ধমূর্তিতেও দিদ্দার নামের সঙ্গে পুরুষ বাচক উপাধি ‘দেব’ অন্বিত। আবার ৯৯২ খ্রিস্টাব্দের শ্রীনগর লিপিতে দিদ্দার নামের সঙ্গে ‘রাজ্ঞী' উপাধি যুক্ত করা হয়েছিল। এটা স্পষ্টতই নারী হিসেবে তাঁর সর্বময়ী শাসনকর্ত্রী হয়ে ওঠার চিহ্ন বহন করছে। দিদ্দা যে পৌরুষপূর্ণ শাসনকর্ত্রী ছিলেন, শারীরিক পঙ্গুত্ব সত্ত্বেও সম্ভ্রম উদ্রেককারী ছিলেন, এগুলো তারই ইঙ্গিত।
‘রাজতরঙ্গিনী’র ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন অরেল স্টেইন। হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত এই ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ বহু অনুসন্ধান চালিয়েও শ্রীনগরের কাছে দিদ্দাস্বামী মন্দির কিংবা দিদ্দাপুর নামের কোনও নগরের চিহ্ন খুঁজে পাননি। তাঁর অনুমান, শ্রীনগরের দিদামার অঞ্চলের নামকরণে দিদ্দার উপস্থিতি প্রতিফলিত হয়েছে।
অরেল স্টেইনের গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, কাশ্মীরের ব্রাহ্মণ পরিবারের জ্যেষ্ঠ কন্যাকে ‘দিদ্দা' নামে ডাকা হত এবং তা ছিল সেই মহীয়সী রাজ্ঞীর প্রতি প্রজন্মান্তরেও বহমান সম্ভ্রমের বহিঃপ্রকাশ।
নরবাহন, বলগা, তুঙ্গা, অভিনবগুপ্ত, সবার কথাই উল্লিখিত হয়েছে ‘রাজতরঙ্গিনীতে। তবে বিগ্রহরাজ সেখানে দিদ্দার তুতো ভাই নয়, ভাইপো হিসেবে বর্ণিত।
ভীমদেব শাহী কর্তৃক নির্মিত ভীমকেশব বিষ্ণু মন্দিরের হদিশ বুমজুতে পেয়েছিলেন অরেল স্টেইন। মার্তণ্ড প্রস্রবণের উত্তরে অবস্থিত এই মন্দির পরবর্তীকালে মসজিদে পরিণত হয়। বাবা বামদিন সাহিব নামের এক মুসলমান সাধক সেখানে বাস করতেন।
আনুমানিক ১০০৩ খ্রিস্টাব্দে দিদ্দার মৃত্যু হয়।
তার প্রায় দশ বছর পর গজনীর সুলতান মাহমুদ কাশ্মীর আক্রমণ করেন। তখন কাশ্মীরের রাজা ছিলেন দিদ্দার ভ্রাতুষ্পুত্র সংগ্রামরাজ। সংগ্রামরাজ এবং তুঙ্গা দিদ্দাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কিছুদিন যৌথভাবে কাশ্মীর রক্ষার দায়িত্ব পালন করলেও তাঁরা বেশিদিন পারস্পরিক সখ্য রক্ষা করতে পারেননি। কাশ্মীরের ইতিহাস সেই বিচ্ছিন্নতার কথাও বলছে।
ঋণ স্বীকার:
১। দেবিকা রঙ্গচারীর গবেষণা পত্র Invisible Women - Visible Histories -
Gender- Society and Polity in North India
২। পঞ্জাবের RIMT বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষক অজয় বেদও উধমপুরের গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ ফর বয়েজের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সমতা শর্মা প্রণীত "Queens of Kashmir- A Glimpse of Kashmirós Women Rulers"
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন