পলাশ বরন পাল

ধরো তুমি ফরাসি দেশের একজন লোককে একটা মজার গল্প শোনালে৷ সে কবার হাসবে জান?-তিন বার৷ যখন তুমি গল্পটা বলবে তখন প্রথম বার, তারপর যখন তুমি মজাটা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেবে তখন দ্বিতীয় বার, আর শেষ পর্যন্ত যখন গল্পের মজাটা তার মাথায় ঢুকবে তখন তৃতীয় বার৷
ইংরেজ কাউকে একটা মজার গল্প বললে সে কবার হাসবে জান?-দু-বার৷ যখন গল্পটা বলবে তুমি, তখন প্রথম বার, তারপর যখন ব্যাখ্যা করে দেবে, তখন দ্বিতীয় বার৷ কিন্তু মজাটা মাথায় তার ঢুকবেই না, কেননা মাথা নিরেট, তাই তৃতীয় বারের হাসিটি আর হবে না৷
জার্মানির কোনো লোককে যদি মজার গল্প বল একটা, তাহলে সে কবার হাসবে জান?-এক বার, যখন গল্পটা বলবে সেই সময়ে৷ গল্পটা তুমি যে তাকে বুঝিয়ে দেবে তা হবে না, কেননা তাতে তার আত্মসম্মানে বাধবে৷ আর নিজে থেকে যে গল্পের মজাটা সে বুঝবে, সে আশাও কোরো না, কেননা রসবোধ বস্তুটাই তার কাছ থেকে আশা করা অনুচিত৷
আর যদি কোনো বাঙালিকে একটা মজার গল্প শোনাতে যাও? . . . না, সে হাসবে না৷ হাসার সময়ই হবে না তার৷ তোমার গল্পটা শুরু হতে না হতেই সে তোমাকে থামিয়ে দেবে৷ বলবে, গল্পটা তার আগেই শোনা, এবং তুমি যে গল্পটা তেমন রসিয়ে বলতে পারছ না, সে কথাটাও তোমাকে স্পষ্টাস্পষ্টি জানিয়ে দেবে৷ শেষ পর্যন্ত সে বলবে, 'নাঃ, দেখো, এই গল্পটা বলতে হয় এই এমনি করে . . .' বলে, নিজেই গল্প বলতে থাকবে৷

শ্রীযুক্ত বাবু হের্শেলকে সবাই যে চিনত, সে তাঁর সত্যবাদিতার জন্য নয়, বরং ঠিক উলটো কারণেই৷ একবার রাস্তায় হের্শেলকে দেখতে পেয়ে অপর একটি লোকের ইচ্ছে হল, হের্শেলের এই অনৃতভাষিতা নিয়ে একটু মজা করা যাক৷ তাই তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে এই ভদ্রলোক বললেন, 'দেখুন, আমার এই বাক্যটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনি যদি একটুও না থেমে একটি মিথ্যে কথা বলতে পারেন, তাহলে আপনাকে আমি সেই মুহূর্তে একটি টাকা দেব৷'
শ্রীযুক্ত বাবু হের্শেল অস্ট্রোপলিয়ার তৎক্ষণাৎ বললেন, 'গতকাল যে বলেছিলেন দু-টাকা দেবেন!'
সাধারণ বুদ্ধি
অনেকদিন আগেকার কথা বলছি৷ কোন গ্রামে ঘটেছিল ঘটনাটা তা জানবার কোনো দরকার নেই৷ শুধু এইটুকু জানলেই চলবে যে, যাকে নিয়ে আমাদের গল্প সেই লোকটার নাম আনানসি৷ আনানসি কিনা বড়ো বুদ্ধিমান, আর গাঁয়ের অন্য সবাই বোকা৷ আনানসির কাছে এ কাজে সে কাজে বুদ্ধি চাইতে আসে তারা৷ আনানসি তাই ঠিক করল, দুনিয়ার যেখানে যত যা সাধারণ বুদ্ধি আছে, তা জড়ো করে রাখবে একটা থলেতে৷ থলেটা ওরই কাছে থাকবে, তাহলে সমস্ত সাধারণ বুদ্ধিও হবে ওরই৷ অন্যরা তার ভাগ চাইতে এলে পয়সা নেবে-প্রচুর লাভ হবে৷
যে কথা সেই কাজ৷ বিশাল একটা থলে জোগাড় করল আনানসি, তারপর যখনই যা টুকিটাকি সাধারণ বুদ্ধি মাথায় আসে, সব এক এক টুকরো ছোট্টো কাগজে লিখে সেই থলের মধ্যে রেখে দেয়৷
এমনি করে থলে বোঝাই হল৷ শেষ অবধি একদিন আনানসির মনে হল-সমস্ত সাধারণ বুদ্ধিই জোগাড় করা হয়েছে, কাজ শেষ৷ এবার থলেটার মুখ বন্ধ করে থলেটাকে একটা উঁচু গাছের ডালে লুকিয়ে রেখে আসতে হবে, যাতে আর কেউ তার সন্ধান না পায়৷
কিন্তু সেই বিশাল থলে নিয়ে গাছে ওঠা কি চাট্টিখানি কাজ! হাতে ধরে ওঠার তো প্রশ্নই ওঠে না৷ আনানসি তাই দড়ি বেঁধে গলায় ঝোলাল থলেটাকে৷ তারপর লম্বা একটা গাছ বেছে উঠতে শুরু করল৷
এ কাজটাও তেমন সহজ নয়৷ গাছে উঠতে গেলে হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরতে হবে গাছের গুঁড়িটাকে৷ কিন্তু সামনে ঝুলছে বুদ্ধিবোঝাই থলে, তার জন্য ধরাও যাচ্ছে না ভালো করে৷ রীতিমতো নাকের জলে চোখের জলে অবস্থা আনানসির৷
গাছের ওপর ফল পাড়তে উঠেছিল দুটো বাচ্চা ছেলে৷ আনানসির অবস্থা দেখে তারা হেসে বাঁচে না৷ এক জন বলল আরেক জনকে-'দেখ দেখ, লোকটা কী বোকা! থলেটা পিঠের দিকে ঝোলালেই তো ল্যাঠা চুকে যায়৷'
কথাটা পরিষ্কার কানে গেল আনানসির৷ হায় হায়, এতদিন ধরে এত সাধারণ বুদ্ধি সংগ্রহ করেছে সে, কিন্তু তার মধ্যে তো কোথাও এ কথা লেখেনি যে, থলে নিয়ে গাছে উঠতে হলে থলেটা পিঠের দিকে ঝোলাতে হয়!-হতাশায়, রাগে, বিরক্তিতে আগুন ধরে গেল তার মাথায়৷ এতকালের এত কষ্টের সঞ্চয়, আর তার মধ্যে এত তুচ্ছ সাধারণ বুদ্ধিটাই নেই!
রাগের চোটে থলেটা ছিঁড়ে ফেলল আনানসি, ছড়িয়ে পড়ল কাগজগুলো৷ ঠিক সেই সময়ে হাওয়া এল, উড়িয়ে নিয়ে গেল সেই কাগজগুলোকে চারদিকে৷ নানান জায়গার লোকে কুড়িয়ে পেল কাগজের টুকরো-কেউ একটা, কেউ দুটো বা তিনটে৷
সেই থেকে সব লোকেরই সাধারণ বুদ্ধি হল একটু-আধটু৷ তবে একটা কথা৷ সব বুদ্ধি কেউই পায়নি৷ তাতে লজ্জার কিছু নেই৷ কোনো সমস্যার পড়লে এ-ওকে প্রশ্ন করে, ও-একে৷
যেমন ব্যারাম তেমনি ওষুধ
ব্যারাম ঘোরতর, ডাক্তারের কাছে না গেলেই নয়৷ মুশকিল হচ্ছে, ডাক্তার দক্ষিণা নেন৷ প্রথমবারের জন্য পঁচিশ টাকা, পরের প্রত্যেকবারে দশ টাকা৷ পয়সা আছে অঢেল, কিন্তু রোগীর নাম আছে, হাত দিয়ে তার জল গলে না৷ একেবারে পঁচিশটি টাকা বেরিয়ে যাবে, ওরেব্বাস!
ভাবতে ভাবতে একটা বুদ্ধি এসে গেল৷ ডাক্তারখানায় ঢুকে একগাল হেসে ডাক্তারবাবুকে বলল, 'সেই আবার আসতেই হল আপনার কাছে৷' ভাবখানা এমন, যেন এটা প্রথমবারের আসা নয়৷ ডাক্তারের মনে না পড়লেও তিনি নিশ্চয়ই লজ্জার মাথা খেয়ে বলতে পারবেন না, 'সে কি! আগে আপনার চিকিৎসা করেছি বলে তো মনে পড়ছে না!' কম পয়সার ধাক্কা তাহলে৷
ডাক্তার গম্ভীরভাবে দেখলেন, বেশ মনোযোগ দিয়ে৷ তারপর বললেন, 'হ্যাঁ, বুঝলাম৷ ভয়ের কিছু নেই৷'
'ওষুধ কী খাব?'
-'ওষুধ? ও হ্যাঁ, আগের বার যা দিয়েছিলাম ওটাই চালিয়ে যান আর কিছুদিন৷'

হেলম শহরের হাটে এসেছেন এক পণ্ডিত, একটা ঘোড়ার দরকার তাঁর৷
ঘোড়া বেচতে এসেছে যে লোকটি, সে মহা উৎসাহে বলে চলল 'দেখুন আজ্ঞে, দুর্দান্ত ঘোড়া, এর জুড়ি পাবেন না৷ যেমনি ঝকমকে চেহারা তেমনি জলের মতো মেজাজ৷ আর দৌড়? -যেন ঝড়ের হাওয়া৷ ভোর চারটেয় হেলম ছাড়লে সকাল ছ-টার মধ্যে পৌঁছে যাবেন লুবলিন৷'
পণ্ডিত উলটো মুখ করে হাঁটা দিলেন৷ ঘোড়াওয়ালা পেছন থেকে হাঁক দিয়ে বলল, 'পছন্দ হল না? বলেন কী?'
পণ্ডিত মাথা নাড়লেন, 'না হে, এ ঘোড়া কিনে কাজ নেই৷'
'এমন ঘোড়া আর কোথাও পাবেন না, এ আমি হলফ করে বলতে পারি৷'
'না না, সে কথা নয়৷ ঘোড়া নিশ্চয়ই ভালো৷ কিন্তু কথা হচ্ছে, অত সকালে লুবলিনে আমি করবটা কী? দোকানপত্তরও তো খোলে না ছাই৷'
সেরা খাবার
ডাক্তার এসে দেখে বলে গেলেন, হাসানের বউয়ের বাচ্চা হবে৷ হাসানকে ডেকে বললেন, 'খুব ভালো ভালো খাবার খেতে দেবে এখন বউকে৷ বউয়ের গায়ে যত ওজন লাগবে, বাচ্চাও তত সুস্থ হবে৷ বুঝলে?'
হাসান মাথা নেড়ে বলল, 'আজ্ঞে হ্যাঁ, তা আর বলতে! বাজার থেকে একেবারে সেরা খাবার নিয়ে আসব৷'
বাজারে গিয়ে মাংসওয়ালার কাছে হাসান বলল, 'ওহে, সবচেয়ে ভালো মাংস দাও দেখি! আমার বউয়ের বাচ্চা হবে, ভালো ভালো জিনিস খাওয়া দরকার তার৷'
দোকানদার মাংস দিল, তার মধ্যে বেশ অনেকটা চর্বির অংশ৷ হাসানকে বলল, 'বেশি করে চর্বি দিলাম হাসান ভাই, চর্বি খেলে গায়ে ওজন লাগে৷ এ সময় গায়ে একটু ওজন লাগলে তোমার বাচ্চার স্বাস্থ্যও ভালো হবে, দেখো৷'
হাসান বলল, 'তাই তো! তা চর্বি যদি এতই ভালো জিনিস, তাহলে মাংস কিনে হবেটা কী আমার? বরং আমাকে খানিকটা চর্বিই দাও৷'
মাংসের দোকানি মাংসটা পাশে রেখে চর্বি কাটতে বসল৷ পাতায় মুড়ে চর্বিটা হাসানকে এগিয়ে দিয়ে বলল, 'দেখো হে দেখো, চর্বির রংটা দেখো৷ এমন পরিষ্কার যে দেখলে মনে হয় নারকেল তেল৷'
চর্বিটা নেওয়া হল না হাসানের৷ দোকানদারকে সেটা ধরতে বলে সে ছুটল মুদিখানার দিকে৷ নারকেল তেল যদি এতই ভালো জিনিস, তাহলে নারকেল তেলই তো কেনা উচিত৷ মুদিদোকানে গিয়ে তাই সবচেয়ে ভালো নারকেল তেল চাইল হাসান৷
দোকানি এক শিশি নারকেল তেল বার করে বলল, 'একবার তাকিয়ে দেখলেই বুঝবে, সত্যিকার খাঁটি নারকেল তেল কীরকম দেখতে হয়! একেবারে জলের মতো পরিষ্কার৷'
শুনে আবার বদলে গেল হাসানের মত৷ দোকানিকে বলল, 'তাহলে বরং নারকেল তেল না দিয়ে আমাকে এক গেলাস জলই দাও৷'
বউয়ের জন্য জল নিয়ে বাড়ি ফিরল হাসান৷

দুই বন্ধু হাসসো আর মুইয়ো৷ যুগোশ্লাভিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে থাকে তারা৷ মুইয়ো থাকে একটা ছোট্টো টিলার মাথায়, হাসসোর বাড়ি সেই টিলার ঠিক নীচে৷ দু-জনে খুব ভাব৷
একদিন মুইয়ো ফিরছে হাট থেকে, পিঠে বিশাল মোট৷ টিলার নীচে এসে দাঁড়াল সে, দম নিল একটু৷ তাকাল একবার হাসসোর বাড়ির দিকে৷ ও মা, দেখে কি, হাসসোর বাড়ির সামনে একটা সাইকেল হেলান দেওয়া৷ নতুন কিনেছে নিশ্চয়ই!
দেখেই মুইয়োর মনে হল, বাঃ, এই এত জিনিস পিঠে করে বয়ে বয়ে টিলার ওপরে ওঠার চেয়ে বন্ধুর সাইকেলে চাপিয়ে নিয়ে গেলেই তো অনেক ভালো হয়! কিন্তু হাসসো কি দেবে সাইকেল? হয়তো বলবে, 'না, তুমি অত জিনিস নিয়ে সাইকেলে উঠতে গেলে সবসুদ্ধ উলটে পড়বে৷ মাঝের থেকে সাইকেলটার বারোটা বাজবে৷'
কিন্তু তাতেই বা কী? মুইয়ো তখন বলবে, 'না না, আমি চড়ব না৷ কেবল মালগুলো চাপাব সাইকেলে, নিজে যাব পাশে পাশে হেঁটে৷' বিশ্বাস হবে না হাসসোর৷ বলবে, 'না, আমি জানি, তুমি এই আমার সামনে হেঁটে হেঁটে যাবে, তারপর একটু দূরে গিয়েই চড়ে বসবে সাইকেলে৷' মুইয়ো বলবে, 'তুমি এইটুকু বিশ্বাস করছ না আমাকে? আচ্ছা বেশ, তুমি নাহয় এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখো, আমি যা বলি তাই করি কি না৷' কিন্তু হাসসোর মত বদলানো অত সহজ নয়৷ সে বলবে, 'না ভাই, এখান থেকে কতটুকুই বা দেখা যায়৷ ওটুকু পার হয়েই তুমি. . . না না না, ওসব হবে না৷' মুইয়ো বলবে, 'কী মুশকিল! নাহয় তুমি এই গাছটার ওপর চড়ে বসে থাকো৷ তাহলে তো দেখতে পাবে, না কি? তাতে শান্তি হবে তোমার?' হাসসো বলবে, 'না,. . .'
এইরকম সব সাত-পাঁচ চিন্তা চলছে মুইয়োর মাথায়, এমন সময় দরজা খুলে সামনে এসে দাঁড়াল স্বয়ং হাসসো৷ একগাল হেসে বলল, 'আরে মুইয়ো যে, কী খবর?'
রক্ত উঠে গেল মুইয়োর মাথায়৷ এক ঝটকায় নিজের মোট কাঁধে তুলে নিয়ে বলল, 'তোমার মতো বন্ধুও আমার দরকার নেই, আর তোমার ওই কচুর সাইকেলেও আমার দরকার নেই৷'
বলে, হাঁটা লাগাল বাড়ির দিকে৷ হতভম্ব হাসসো দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, ব্যাপারটা কী হল৷

একই অফিসে কাজ করে দুই বন্ধু, থাকেও একই বাড়িতে দু-ঘরে দু-জন৷ যাতায়াতে বড়ো কষ্ট৷ অন্য অনেকে গাড়ি নিয়ে আসে, তাতে সে কষ্টটা হয় না৷ দুই বন্ধু ভাবল, দু-জনে ভাগাভাগি করেও যদি একটা গাড়ি কিনে নেয়, তাহলে সুবিধে হয় বড়ো৷
নতুন গাড়ি কেনার প্রশ্নই আসে না, পুরোনো গাড়ির ডিলারের কাছে গেল দু-জনে৷ বলল, 'সবচেয়ে শস্তা যে গাড়ি আছে, সেটাই দেখান৷' দোকানদার দেখাল একটা গাড়ি, দাম হাজার ডলার৷ দুই বন্ধু হতাশ হয়ে পড়ল শুনে৷ হা-জা-র ডলার! বাপরে বাপ! ওদের সম্বল মাত্র চারশো৷ তা, চারশোর মধ্যে কি কিছু হয় না? জিজ্ঞেস করল দোকানদারকে৷ দোকানদারের সোজা উত্তর, 'না, হয় না৷'
বিমর্ষ হয়ে বেরিয়ে আসছে দু-জনে, এমন সময় দোকানদারের হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল একটা৷ তার এক বন্ধুর একটা উট ছিল, সে সেটা বেচে দেবে ঠিক করেছিল৷ উটটা এদের গছালে কেমন হয়! দুই বন্ধুকে ডাকল দোকানদার, বলল, 'তালিম দেওয়া উট, শহরের রাস্তায় চলতে পারে, ট্রাফিক আলো দেখলে থামতে পারে, চৌকস একেবারে৷ একবার চড়েই দেখুন না, ভালো না লাগলে কিনতে বলছি না৷ চারশোর মধ্যেই পাবেন৷'
ঠিক আছে, দুই বন্ধু পরখ করে দেখতে রাজি৷ ব্যবস্থা হয়ে গেল৷ পরের দিন দোকানদার নিয়ে এল সেই উট৷ দু-বন্ধু এসে তাতে চড়ে ঘুরতে বেরোল একটু৷
ফিরে এল একটু বাদেই৷ উটের পিঠে নয়, হেঁটে হেঁটে৷ দোকানদার তো অবাক 'এ কী! উট কোথায় গেল?'
'আর বলবেন না মশাই৷ চৌরাস্তায় মোড় অবধি গেছি, ট্রাফিকের লাল আলো পড়েছে, উটটা দাঁড়িয়েছে৷ এমনি সময় আমাদের পাশে এসে দাঁড়াল একটা গাড়ি, তাতে কলেজের ছেলে-ছোকরারা দঙ্গল বেঁধে বেরিয়েছে৷ আমাদের উটটার দিকে তাকিয়ে আঙুল দেখিয়ে ওদের এক জন বলল, 'দেখ দেখ উটের পিঠে দুটো গাধা৷' শুনে তো আমরা অবাক৷ গাধা কোত্থেকে এল? আমরা দু-জন, তারপরে দুটো গাধা, এত মোট নিয়ে উটের চলতে কষ্ট হবে তো! আমরা সঙ্গে সঙ্গে নেমে পড়লাম, ভালো করে দেখে নেবার জন্য৷ গাধা-টাধা কিছুই নেই, সব ছেলেগুলোর বাজে রসিকতা৷ তখন আবার উঠতে যাব, আর হবি তো হ, এর মধ্যে ট্রাফিকের আলো সবুজ হয়ে গেল, আপনার উটও হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল চৌরাস্তার মোড় পার হয়ে, তাকে আর ধরতে পারলাম না মশাই৷'

গ্রাম থেকে লোকটি এল শহরে৷ কাজ খুঁজতে৷ ওদের গ্রামের একজন এসেছিল শহরে কিছুদিন আগে, শহরের রাস্তা ঝাঁট দেওয়ার কাজ পেয়েছিল সে৷ এ লোকটিও তাই জিজ্ঞাসাবাদ করে শহরের মিউনিসিপ্যালিটির অফিস খুঁজে বার করল, গিয়ে বলল, 'রাস্তা সাফ করবার একটা চাকরি কি হয় না?'
মিউনিসিপ্যালিটির কর্তাদের দরকার ছিল লোক, তারা বলল, 'কবে থেকে কাজে লাগতে পারবে?'
লোকটি বলল, 'এক্ষুনি৷'
মিউনিসিপ্যালিটির লোকেরা কাগজ কলম বার করে বলল, 'বেশ, তাহলে এইখানে একটা সই করে দাও, তারপর কাজে লেগে যাও৷'
লোকটি বলে, 'আমি তো সই করতে জানি না! লেখাপড়া কিছুই শিখিনি যে!'
মিউনিসিপ্যালিটির লোকেরা বলল, 'তাহলে মুশকিল৷ এখানে আমাদের নিয়ম, সই করে মাইনে নিতে হবে৷ সই না করতে পারলে চাকরি হবে না৷'
খুবই বিপদে পড়ল লোকটি৷ খেয়েপরে বাঁচতে তো হবে, শহরে একা একদম! সাথে পয়সা যা আছে তা খুবই সামান্য, তা দিয়ে দু-চার দিন চলবে হয়তো বড়োজোর৷
একটা বুদ্ধি এল লোকটির মাথায়৷ সাথে যে টাকা ছিল, তা খাবার কিনে খরচ না করে কিনে ফেলল কয়েকটা ছোটো ছোটো খেলনা৷ বাসস্ট্যান্ডে ঘুরে ঘুরে সারাদিনে বিক্রি হয়ে গেল সে কটা৷ একটু লাভও হল, তা দিয়ে সে দিনের খাওয়া হয়ে গেল৷
পরের দিন আবার একইভাবে চলল৷ খেলনা কিনল আবার, বিক্রি হল, লাভ হল কিছু৷ লাভ আস্তে আস্তে বাড়তে থাকল, ব্যাবসাও বাড়তে লাগল দিনে দিনে৷ শেষ পর্যন্ত একদিন ছোট্টো একটা দোকান দিল সে৷ দিন মাস বছর গড়াতে লাগল, দোকান বড়ো হল তার, রমরমা ব্যাবসা৷
এখন অনেক পয়সা তার, লোকজনে সবাই চেনে তার দোকান৷ একদিন ব্যাঙ্কে গিয়ে হাজির হল সে, পয়সা ব্যাঙ্কে রাখার দরকার৷ ব্যাঙ্কের লোকেরা কাগজপত্তর বার করে দিল, বলল, 'এইখানে সই করুন, তাহলেই অ্যাকাউন্ট খুলে দেব আমরা৷'
সেই পুরোনো মুশকিল৷ লোকটি বলল, 'আমি তো সই করতে পারি না, লেখাপড়া শিখিনি যে!'
ব্যাঙ্কের লোকেরা বেশ তাজ্জব হয়ে বলল, 'লেখাপড়া না জেনেই আপনি এত বড়ো ব্যাবসা চালাচ্ছেন, এত পয়সা করেছেন! লেখাপড়া জানলে কী না করতে পারতেন!'
লোকটি বলল, 'লেখাপড়া জানলে আমি হতাম রাস্তার ঝাড়ু দার৷'
এক পা, দু-পা
শ্রীযুক্ত বাবু মহামহোপাধ্যায় হের্শেল অস্ট্রোপলিয়ার যখন আট বছরের বালক মাত্র, তখন এই ঘটনা ঘটেছিল৷ শ্রীযুক্ত হের্শেলের মা একটি মুরগি রান্না করে রান্নাঘরে ঢাকা দিয়ে রেখেছিলেন৷ শ্রীযুক্ত হের্শেল তাঁর মায়ের অনুপস্থিতিতে তার থেকে একটি ঠ্যাং বার করে গলাঃধকরণ করেন৷ খানিকক্ষণ পরে শ্রীযুক্ত হের্শেলের মা আবার রান্নাঘরে আসেন৷ কী একটা কারণে সন্দেহ হওয়াতে তিনি রান্না মাংসের বাটিটির দিকে একবার দৃষ্টিপাত করেন এবং আবিষ্কার করেন যে, একটি ঠ্যাং উধাও৷ শ্রীযুক্ত হের্শেলের মা সঙ্গে সঙ্গে অনুমান করেন, এটি তাঁর গুণধর পুত্রের কীর্তি৷ পুত্রকে জিজ্ঞাসা করেন, 'দুটো ঠ্যাঙের মধ্যে একটা দেখছি যে! আর একটা কি তুই খেয়েছিস?'
বলা বাহুল্য, এই ইঙ্গিতে শ্রীযুক্ত হের্শেল একটু বিপন্ন বোধ করেন৷ কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, সমস্যার একেবারে গোড়ায় আঘাত করাই শ্রেয়৷ তাই মাতৃদেবীর দিকে তাকিয়ে তিনি অম্লানবদনে বলেন, 'মুরগির দুটো ঠ্যাং থাকে নাকি?'
মাতৃদেবী পুত্রের এই অকিঞ্চিৎকর প্রতিভার প্রকাশে আদৌ মুগ্ধ হয়েছেন বলে মনে হল না৷ প্রবল হুংকার দিয়ে তিনি বলেন, 'মুরগির ঠ্যাং তুমি আমাকে বোঝাতে এসো না, বুঝলে, পাখির ঠ্যাং কখনো একটা হয়?'
শ্রীযুক্ত হের্শেল ক্ষীণ কন্ঠে জানান, 'হয়তো এই মুরগিটার একটা ঠ্যাং ছিল!'
মাতৃদেবী উত্তর না দিয়ে বজ্রদৃষ্টি হেনে প্রস্থান করেন৷
সেদিন বিকেলে শ্রীযুক্ত হের্শেল তাঁর বাবার সঙ্গে মন্দিরের দিকে যাচ্ছিলেন৷ পথের পাশে একটা দিঘি পড়ে, তার ধারে বেশ কিছু সারস দাঁড়িয়ে ছিল৷ শ্রীযুক্ত হের্শেল তা দেখে তাঁর বাবাকে বলেন, 'বাবা, মা যে বলল কোনো পাখির একটা ঠ্যাং হয় না! এই তো, এই যে পাখিগুলো দাঁড়িয়ে আছে, এদের তো একটা করে ঠ্যাং৷'
শ্রীযুক্ত হের্শেলের বাবা জানান, 'না, ওদের ঠ্যাং দুটোই৷ একটা ঠ্যাং তুলে গুটিয়ে রাখে, বাকি এক ঠ্যাঙে দাঁড়িয়ে মাছ ধরার জন্য অপেক্ষা করে৷'
শ্রীযুক্ত হের্শেল বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, 'পা কি এমন ভাবে তুলে রাখা যায় যে, দেখাই যাবে না মোটে! কই আমাদের পা তো তোলা যায় না তেমন করে৷'
শ্রীযুক্ত হের্শেলের বাবা বলেন, 'দেখবি!' বলে ছোট্টো একটি ঢিল ছুড়ে মারেন জলের দিকে৷ সঙ্গে সঙ্গে গুটানো পা বার করে সারসগুলো থপথপ করে দৌড়োতে শুরু করে৷ বাবা বলেন, 'দেখলি তো, তোর মায়ের কথাই ঠিক!'
শ্রীযুক্ত হের্শেল মনে মনে মানতে বাধ্য হন যে, এই কথাটা নিয়ে তর্ক চলবে না৷ বাড়ি ফিরে এসে তিনি তাঁর মাকে বললেন, 'মা, তোমার কথাই ঠিক, মুরগিটার দুটোই পা৷ একটা যে তখন তুমি খুঁজে পাচ্ছিলে না, মুরগিটার দিকে একটা ঢিল মারলেই সে পা-টা দেখতে পেতে৷'
ইন্টারভিউ
দুই বন্ধু গেছে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে৷ এক জন চালাকচতুর সপ্রতিভ, অন্য জন. . .যাকগে, অত কথায় দরকার কী?
আগে ডাক পড়ল প্রথম জনের৷ ছোটোখাটো কোম্পানি, ওপরওয়ালা বসে আছে একা৷ তার দরকার শুধু বলিয়ে-কইয়ে লোক৷ প্রথম জনকে সে বলল, 'আচ্ছা, বলো দেখি, তোমার একটা চোখ যদি আমি উড়িয়ে দিই তাহলে কী হবে?' প্রথম জন বলল, 'সে কী কথা, তাহলে তো আমি আধকানা হয়ে যাব৷' ওপরওয়ালা বলল, 'ঠিক বলেছ৷ আর যদি দুটো চোখই উড়িয়ে দিই?' চাকরির উমেদার এবার বলল, 'তাহলে আমি পুরো অন্ধ৷' শুনে তো ওপরওয়ালা মহা খুশি৷ বলল, 'বাঃ, বেশ তো গুছিয়ে বলতে পার, এই তো চাই, আচ্ছা সোমবার থেকে কাজে লেগে যাও৷'
ঘরের বাইরে অন্য বন্ধু বসে৷ বেরোবার সময়ে তাকে প্রথম জন বলে দিল, 'চিন্তা করিস না, খুব সোজা৷ প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলবি আধকানা হয়ে যাব, আর দ্বিতীয়টার উত্তরে বলবি, একেবারে অন্ধ৷ তাহলেই চাকরি পেয়ে যাবি৷'
দ্বিতীয় জন ঢুকল ঘরে৷ ওপরওয়ালা বলল, 'দুটো প্রশ্ন করব তোমায়৷ উত্তর দিতে পারলে সোমবার থেকে চাকরি৷ বলো দেখি, আমি যদি তোমার একটা কান কেটে দিই তাহলে কী হবে?' দ্বিতীয় জন বলল, 'তাহলে আধকানা হয়ে যাব৷' অদ্ভুত একটা মুখভঙ্গি করল ওপরওয়ালা, কিন্তু মুখ ফুটে বলল না কিছু৷ পরের প্রশ্ন, 'যদি দু-কান কেটে দিই?' চটপট জবাব, 'তাহলে আর কিছুই দেখতে পাব না৷' খুব অবাক হয়ে ওপরওয়ালা বলল, 'ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলো তো দেখি! কান কাটা গেলে দেখতে পাবে না কেন?'
গভীর ভাবে ভাবতে শুরু করল দ্বিতীয় জন৷ অবশেষে বুঝতে পারল ব্যাপারটা৷ বলল, 'আসলে শীতকাল কিনা!'
'তাতে কী?' ওপরওয়ালা আরও পর্যুদস্ত যুক্তির বেড়াজালে৷
'বাঃ! শীতের জন্য টুপি পরতে হয় তো মাথায়! দুটো কানই যদি কেটে দেন, তাহলে তো টুপি ঝুলে পড়বে মাথার দু-পাশ দিয়ে, চোখ-টোখ সব ঢেকে যাবে যে!'

দূরের হাটে যাচ্ছিল এক চাষি৷ বিশাল হাট, এমন হাট বছরে একবারই হয়৷ চাষের জিনিস থেকে শুরু করে গোরু-ঘোড়া পর্যন্ত কেনাবেচা হয় এখানে৷ বেশি দেরি করলে হয়তো ভালো জিনিস পাওয়া যাবে না আর! তাই সে ঠিক করল আগের দিনই রওনা দেবে৷ মাঝপথে কোথাও রাতটা কাটিয়ে নেবে, তারপর একেবারে ভোর ভোর গিয়ে হাজির হবে হাটে৷
নিজের ঘোড়াটায় চড়ে চাষি বেরোল আগের দিন বিকেলের দিকে৷ রাত্তির যেখানে হল সেখানে ধারেকাছে কোনো সরাইখানা আছে বলে মনে হল না, তাই ঘোড়াটাকে রাস্তার ধারের একটা গাছের গোড়ায় বেঁধে পাশে একটা চাদর বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল৷
শেষ রাত্তিরে দুই চোর এল সে পথ দিয়ে৷ এক চোর বলল অন্য জনকে, 'ঘোড়াটাকে নিলে কেমন হয়? কালকে সকালে বড়ো হাটে গিয়ে বেচা যাবে, ভালো পয়সা মিলবে৷'
অন্য চোর একটু সাবধানি৷ সে বলল, 'কিন্তু এ ঘোড়ার মালিক যদি সক্কালবেলাই হাটে গিয়ে ওখানকার পুলিশদের বলে দেয়, তাহলে তো পুলিশ হাতেনাতে ধরে ফেলবে আমাদের৷'
প্রথম চোর বলল, 'ঃও! তার জন্য ভাবিস না৷ এক কাজ কর, তুই ঘোড়াটাকে নিয়ে কেটে পড়৷ যে দড়িটা দিয়ে ঘোড়াটা বাঁধা আছে, সেটা আমার গলায় পরিয়ে আমাকে গাছের সাথে বেঁধে দিয়ে যা!'
দ্বিতীয় চোর বলল, 'তাতে কী হবে?' প্রথম জন বলল, 'আরে সে একটা বুদ্ধি এসেছে মাথায়, দেখবি ঠিক কাজ হাসিল হবে৷' ঠিক হয়ে গেল, দ্বিতীয় জন হাটে গিয়ে ঘোড়াটা বেচে দেবে, তার পর একটা জায়গায় দেখা করবে প্রথম জনের সাথে৷
সেই মতোই হল৷ দ্বিতীয় চোর চলে গেল ঘোড়া নিয়ে, প্রথম জনকে গাছে বেঁধে৷ তার খানিক পরেই ভোর হল, ঘুম ভেঙে গেল চাষির৷ তাকিয়ে দেখে, গাছে বাঁধা একটি মানুষ৷ অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে চাষি বলল, 'কে তুমি? আর আমার ঘোড়াটাই বা কোথায়?'
চোর বলল, 'আজ্ঞে আমিই আপনার ঘোড়া৷ আসলে আমি মানুষ, অনেক পাপ করেছিলাম বলে ভগবান আমাকে শাস্তি দিয়ে দশ বছরের জন্য ঘোড়া বানিয়ে দিয়েছিলেন৷ কাল মাঝরাতে সেই দশ বছর শেষ হয়েছে, আমি শাপমুক্ত হয়ে আবার মানুষ হয়েছি৷ আপনার পায়ে পড়ি, আমাকে ছেড়ে দিন আজ্ঞে, মানুষের জীবনটা একটু মানুষের মতো বাঁচি৷'
এমন একটা আশ্চর্য ঘটনায় চাষি তো অবাক৷ বলল, 'নিশ্চয়ই, এ আর বেশি কথা কী! তুমি যে মানুষ তা এতদিন জানতাম না, কতই না লাঠি চাবুক চালিয়েছি তোমার ওপর, সে কথা ভেবেই আপশোস হচ্ছে বরং৷ যাও, আগেরবার যে সব কুকর্ম করে শাস্তি পেয়েছিলে সে সব এবার আর কোরো না যেন৷'
ছাড়া পেয়ে এক নম্বর চোর চলে গেল ঊর্ধ্বশ্বাসে৷ চাষিও ধীরে ধীরে পা বাড়াল হাটের দিকে৷
হাটে পৌঁছোতে দেরিই হয়ে গেল চাষির৷ হাট জমজমাট তখন, ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল৷ যা কিনতে
এসেছিল তার চেয়েও অবশ্য এখন বেশি জরুরি, একটা ঘোড়া কেনা৷ ঘোড়াই যদি না থাকে, তাহলে তো অন্য কোনো জিনিস কিনলে তা বয়ে নিয়ে যাওয়ারও কোনো উপায় থাকবে না৷
ঘুরতে ঘুরতে, ঘোড়া খুঁজতে খুঁজতে চাষি হঠাৎ দেখে, আরে! এ যে অবিকল তারই ঘোড়া! হ্যাঁ, কোনো সন্দেহ নেই, এ সে-ই, আবার ঘোড়া হয়ে গেছে এখন৷
প্রচণ্ড রেগে চাষি ঘোড়াটাকে বলল, 'হ্যাঁরে! তোর কি আক্কেল নেই কোনো? এইটুকু সময়ে মধ্যেই আবার কী সব কুকর্ম করে বসে আছিস? ঃও, তোকে নিয়ে আর পারা যায় না৷ চল ঘরে চল৷'
তারপর সেই ঘোড়ার বিক্রেতা, অর্থাৎ শাকরেদ চোরের দিকে তাকিয়ে বলল, 'কত দাম?'

ট্রেনে উঠে লোকটি বসার জায়গা পেল যেখানে, সেখানে তার পাশে এক বুড়ো আর মুখোমুখি সিটে দুই বুড়ো বসে কথা বলতে বলতে খুব হাসছে৷ কান পাতল লোকটি, তাদের হাসির কথা শোনার জন্য৷
এক নম্বর বুড়ো অন্যদের দিকে তাকিয়ে খুব উজ্জ্বল মুখে বলল, 'তেরো৷'
শুনেই বাকি দুই বুড়ো হো হো করে উচ্চস্বরে হেসে উঠল৷ প্রথম বুড়োও যোগ দিল হাসিতে৷
খানিক পরে হাসির দমক থামল যখন, তখন দ্বিতীয় বুড়ো বলল, 'আর একাত্তর নম্বরটা?'
বলতেই সবাই মিলে প্রায় হাসিতে উলটে পড়ে আর কি! সে হাসি শেষ হলে তৃতীয় বুড়ো বলল, 'এবার সাতান্ন!'-বলতেই আবার দমফাটা হাসি৷
তিন বুড়োর মাঝখানে বসে থাকতে থাকতে লোকটি বুঝে ফেলল সমস্ত ব্যাপারটা৷ নিশ্চয়ই এরা অনেক হাসির গল্প জানে, বার বার সেগুলো না বলে এরা সব নম্বর দিয়ে রেখেছে৷ একজন যেই 'তেরো' বলে, অন্যদের মনে পড়ে যায় কোন মজার গল্পটার কথা বলা হচ্ছে, তাই হাসে৷
বুড়োদের তখন হাসির দমক থেমেছে, লোকটি তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, 'ইয়ে, দেখুন, আমি এবার বলছি তেতাল্লিশ৷'
ভেবেছিল বুড়োরা হেসে উঠবে, কিন্তু তা হল না৷ সামান্য একটু দেঁতো হাসি দিয়ে বুড়োরা জানলার বাইরে তাকিয়ে চুপ করে বসল৷
অপ্রতিভ হয়ে লোকটি জিজ্ঞেস করল, 'কী ব্যাপার, তেতাল্লিশ নম্বরটা তেমন হাসির নয় নাকি?'
এক নম্বর বুড়ো তাকাল লোকটির দিকে, বলল, 'শুধু গল্পটা মজার হলেই তো হবে না, বলবার ভঙ্গি চাই তো৷ ভঙ্গিটা জুতসই না হলে কি আর হাসি পায়?'
খেতে না পেলে
একবার শহরান্তরে যাবার সময় মহামহোপাধ্যায় হের্শেল পথিমধ্যে একটি হোটেলে ঢোকেন কিছু খাদ্য এবং রাত্রিবাসের আশায়৷ সন্ধ্যা বহু আগেই উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, মধ্যরাত্রি সমাগতপ্রায়৷ হোটেলের মালিক শুতে যাচ্ছিলেন, সেই সময়ে শ্রীযুক্ত বাবু হের্শেল আবির্ভূত হলেন এবং তাঁর অভিলাষ ব্যক্ত করলেন৷
মালিক সবিনয়ে জানালেন, 'থাকবার জায়গা পাবেন৷ তবে খাবার আর কিছু নেই৷ অনেক রাত্তির হয়ে গেছে৷'
রাগে ফেটে পড়লেন হের্শেল অস্ট্রোপলিয়ার৷ 'কী! খাবার নেই! বললেই হল! মনে রাখবেন, আমিও বাপকা ব্যাটা৷ আমার বাবা একবার এমনি এক হোটেলে গিয়ে খাবার পাননি৷ তখন বাবা কী করেছিলেন, সে গল্প এখন ছেলেবুড়ো সবাই জানে৷ বেশ, তাহলে সেই পরিণামের জন্যই তৈরি হোন৷'
এমন তর্জন-গর্জনের সামনে সিংহও ভয় পায়, হোটেলের এই মালিকটি সিংহের চেয়ে সাহসী বলে মনে হল না৷ মিনমিন করে কোনোমতে তিনি বললেন, 'দেখুন, বলছেনই যখন, তখন একটা কথা বলি৷ কিছু কিছু খাবার তো বেঁচে গিয়েছিল, সেগুলো বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেছি, কাল সকালের জলখাবারটা ওই দিয়ে সারব ভেবেছিলাম৷ তা আপনি যখন বলছেন, সেগুলো এনে দিচ্ছি নাহয়, এত রাত্তিরে আর মারাত্মক কিছু করবেন না৷'
ভেতরবাড়ি থেকে খাবার এসে গেল৷ পরিতৃপ্তি সহযোগে খেয়ে আরামে এক গেলাস জল খেয়ে মহামহোপাধ্যায় হের্শেল বললেন, 'বাঃ, বেশ ভালো খেলাম৷ এবার ঘরটা দেখিয়ে দিন৷'
ঘর দেখিয়ে দিলেন মালিক৷ বিছানা পাতাই ছিল, হের্শেল গা এলিয়ে দিলেন৷ মালিককে বললেন, 'যাবার সময়ে দরজাটা বাইরে থেকে টেনে দেবেন৷'
মালিক তবু দাঁড়িয়ে৷ অতএব মহামহোপাধ্যায় হের্শেলকে বলতেই হল, 'আর কিছু বলবেন?'
সাহস পেয়ে মালিক বললেন, 'কিছু মনে করবেন না, আপনার বাবার যে বিখ্যাত গল্পটির কথা বলছিলেন, সেটি আমি শুনেছি কি না মনে করতে পারছি না৷ কী করেছিলেন উনি?'
'ও! জানেন না? তবে শুনুন৷ আমার বাবা খাবার না পেয়ে খালিপেটেই শুয়ে পড়েছিলেন৷'

নিউ ইয়র্কের এক নম্বর ধনী লোক রকফেলার৷ তাঁর নানা ব্যাবসা, হাজার হাজার লোক কাজ করেন তাঁর নানা কোম্পানিতে৷ তবু, এত কাজের মধ্যেও রকফেলার চেষ্টা করেন নিজে সব কিছু দেখাশোনা করার, সময় পেলেই নিজে গিয়ে তদারক করেন সব কিছু৷
এই তদারকির সময়ে এক বৃদ্ধাকে দেখে বেশ অবাক লেগেছে রকফেলারের৷ রকফেলার যে ব্যাঙ্কটির মালিক, এই ভদ্রমহিলা ঘন ঘন এসে বেশ মোটা টাকা জমা দিয়ে যান সেখানে৷ তাঁকে দেখে মনে হয় না কোনো ব্যাবসা-ট্যাবসা করেন, নিতান্তই গেরস্ত হাবভাব৷ অথচ টাকা যা জমা দেন, তার পরিমাণ চোখ এড়ানোর মতো নয়৷ কোত্থেকে এত টাকা পান উনি, প্রশ্ন জেগেছে রকফেলারের মনে৷
আমতা আমতা করে শেষ অবধি একদিন জিজ্ঞেসই করে ফেললেন, 'আপনি কী করেন?'
'কিছুই করি না, চাকরি করার বয়েস আমার পেরিয়েছে অনেক দিন হল৷'
'তবু তো কম টাকা উপার্জন করছেন না...'
'ঃও, ওই যে টাকা এখানে ব্যাঙ্কে জমা রাখতে আসি? ওটা ঠিক উপার্জন বলা চলে কি না জানি না৷ ওগুলো আমি বাজি ধরে জিতি৷'
'বাজি ধরে জেতেন? কীসের বাজি?'
'তার কোনো ঠিক নেই, সব বিষয় নিয়েই বাজি হতে পারে৷ এই ধরুন অমুক খেলায় কে জিতবে, আগামীকাল ঝড়জল হবে কি না, এমনি যা হোক৷ তারপর জিতে বাজির টাকাটা জমা রাখতে আসি৷'
'কিন্তু বাজি যদি ধরেন, তাহলে কখনো জিতবেন কখনো হারবেন৷ আপনি যেরকম শয়ে শয়ে টাকা জিতছেন, তা থেকে মনে হয় আপনি কখনো হারেন না!'
'ঃও, তার কারণ, যে-সে বাজি আমি ধরি না৷ যেটা নিশ্চিত জানি যে জিতব, শুধু সেই বাজিই ধরি৷'
'একটা ব্যাপার বুঝছি না৷ বাজির বিষয়টা যদি এতই নিশ্চিত হয়, তাহলে আপনার প্রতিপক্ষ বাজি ধরবে কেন? তারও তো বোঝা উচিত যে তার টাকাটা জলে যাবে৷'
'আমিও সেই কথা ভাবি, কেন ওরা বোঝে না৷ আমি বুঝিয়ে বলতে গেলেও বিশ্বাস করে না৷ এই যেমন দেখুন না, আমি নিশ্চিত বুঝতে পারছি যে পরশু দিন দুপুর বারোটা নাগাদ আপনার মাথার চাঁদি পতপতে নরম হয়ে যাবে, এত নরম যে মাথায় চাঁটি মারলে হাত বসে যাবে-কিন্তু আপনি কি বিশ্বাস করবেন?'
'এ আবার কীরকম কথা? মাথার চাঁদি কি কারুর পতপতে হয় নাকি?'
'বাজি ধরবেন? এক হাজার টাকা৷'
এক মুহূর্ত দ্বিধায় পড়ে গেলেন রকফেলার৷ ইনি কি কোনো চাল চালছেন তাঁর ওপর? কী বলতে চান মহিলা? এইরকম একটা অদ্ভুত বাজি ধরে উনি জিতবেন! মহিলা কি পাগল? কিন্তু যাই হোক, রহস্যটা না
জানা পর্যন্ত স্বস্তি হচ্ছে না মনের মধ্যে৷ তা ছাড়া হারলেও বড়োজোর হাজার টাকা যাবে, কোটিপতির কাছে হাজার টাকা কী আর এমন৷ এই সব সাত-পাঁচ ভেবে রকফেলার বললেন, 'ঠিক আছে, ধরলাম বাজি৷'
মহিলা সপ্রতিভভাবে বললেন, 'বেশ৷ আজকে শুক্রবার তো! পরশু তাহলে রোববার৷ ব্যাঙ্ক তো খোলা থাকবে না, আমি বরং আপনার বাড়িতেই আসব৷ বাড়ির ঠিকানাটা?'
ঠিকানা নিয়ে চলে গেলেন ভদ্রমহিলা৷
রোববার সকাল থেকে রকফেলার একটু উশখুশ করতে লাগলেন৷ মহিলা এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে বাজিটা ধরলেন কী করে? নিশ্চয়ই কিছু একটা দেখেছেন উনি রকফেলারের চোখে বা মুখে, তা থেকেই আন্দাজ করেছেন একটা আসন্ন কিছু রোগ৷ হয়তো মহিলা ডাক্তার, মুখ দেখেই রোগ বুঝে ফেলেন৷ এহেহে, তাহলে বড়ো বোকার মতো বাজিটা ধরা হয়ে গেছে!. . . কিন্তু ঠিক এই কথাই তো বলেছিলেন মহিলা, লোকে বুঝেও বুঝতে চায় না বাজিটা তারা হারবেই৷ -আশঙ্কায় বারবার মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন রকফেলার... নাঃ ঠিকই আছে তো চাঁদিটা, পতপতে হয়নি তো৷
বেলা এগারোটা হল, তখনও চাঁদি ঠিক আছে৷ সাড়ে এগারো, আবার হাত দিয়ে দেখলেন, কোনো গণ্ডগোল নেই৷ পৌনে বারো, তখনও সব স্বাভাবিক৷ এই করতে করতে বারোটা বাজল, খানসামা এসে জানাল যে বাইরের ঘরে দেখা করতে এসেছেন কেউ৷
হ্যাঁ, মহিলা এসেছেন, সঙ্গে আর এক ভদ্রলোক৷ মহিলা বললেন, 'এই ভদ্রলোককে নিয়ে এলাম৷ ইনি হবেন বিচারক৷'
মুচকি হেসে রকফেলার বললেন, 'আর বিচার করার কিছু নেই, আপনি হেরে গেছেন এই বাজিতে৷ কী করে জিতবেন ভেবেছিলেন সেইটাই আমি ভেবে পাচ্ছি না৷ দিন আমার হাজার টাকা৷'
মহিলা বললেন, 'ওমা! তা কী করে হয়? আগে দেখি আপনি যা বলছেন তা সত্যি কি না৷ আপনার মুখের কথায় তো হবে না৷'
'এইমাত্র আমি মাথায় চাঁটি মারলাম, অদ্ভুত কিছুই হল না৷ আপনি হেরে গেছেন৷'
'তা বললে হবে না৷ আপনার কথা আমি বিশ্বাস করব কেন?'
'বেশ দেখুন,' বলে মুচকি হেসে মাথা বাড়িয়ে দিলেন রকফেলার৷ মহিলা চোখের ইঙ্গিত করলেন, তাঁর সঙ্গী ভদ্রলোক রকফেলারের মাথায় বেশ ভালো করে একটি চাঁটি হাঁকড়ালেন৷ কিছুই হল না৷
এক গাল হেসে রকফেলার বললেন, 'দেখলেন তো! এবার মানবেন তো আমার কথা?'
'হ্যাঁ, এবারে আর সন্দেহ নেই৷ আপনার কথাই ঠিক৷'
'দিন তাহলে আমার হাজার টাকা৷'
বিনা বাক্যব্যয়ে ব্যাগ থেকে হাজার টাকা বার করে দিলেন মহিলা৷ তারপরে নমস্কার করে রওনা দিলেন বাইরের দিকে৷ দরজার কাছ অবধি যখন পৌঁছেচেন, রকফেলারের খেয়াল হল, বাজি জেতার উত্তেজনায় এতক্ষণ আসল কথাটাই বলা হয়নি৷ পেছন থেকে মহিলাকে ডেকে বললেন, 'একটু শুনুন!'
মহিলার সঙ্গী এগিয়ে গেলেন, মহিলা ফিরে এলেন ঘরে৷ রকফেলার বললেন, 'তাহলে আপনি
যে সেদিন বললেন, কোনো বাজিতেই আপনি হারেন না, সে কথা আর খাটে না এখন৷ এবারে আপনি হেরেছেন৷'
'তা ঠিক, আপনার কাছে হারলাম৷'
'তাহলে এবারে বুঝলেন তো, যে বাজি ধরাটা শুধু লাভের ব্যাপার নয়৷ কখনো কখনো লোকসানও হয়৷'
'না না, লোকসান হবে কেন?'
'বাঃ, হাজার টাকা গচ্ছা গেল না আপনার!'
'গচ্ছা যাবে কেন? হাজার টাকা তো আপনাকে দিলাম! কিন্তু ওই অন্য যে ভদ্রলোক এসেছিলেন, গতকাল তাঁকে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারলাম না যে রোববার দুপুর বারোটার সময় স্বয়ং রকফেলার আমার সামনে তাঁর মাথা পেতে দেবেন চাঁটি খাবার জন্য৷ এত করে বললাম, তাও কিছুতেই বিশ্বাস করলেন না৷ শেষ পর্যন্ত তিন হাজার টাকার বাজি ধরলেন আমার সঙ্গে৷ কালকে ব্যাঙ্কে আসবখন টাকাটা জমা দিতে৷ আচ্ছা, আজ আসি, নমস্কার৷'

একটা লোক ছিল, তার নামটা মনে পড়ছে না, কিন্তু দরকারও নেই৷ একদিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে দেখে, তার দরজার সামনে বসে রয়েছে একটা শুয়োর৷ তাড়িয়ে দিতে মায়া হল৷ আহা, হাজার হোক ভগবানের জীব তো! তাই শুয়োরটা রয়েই গেল৷
কিন্তু শুয়োর রাখা তো আর সোজা কাজ নয়, খাওয়ানো-দাওয়ানো নোংরা পরিষ্কার করা, অনেক ঝামেলা৷ ক্লান্ত হয়ে পড়ল লোকটা৷ বাড়ির সামনে মাথায় হাত দিয়ে বসে ছিল সে৷ এমন সময় তার এক প্রতিবেশী যাচ্ছিল সামনে দিয়ে৷ লোকটিকে দেখে হাঁক দিয়ে প্রতিবেশী বলল, 'কী, হাঁপিয়ে পড়লে নাকি?'
'হ্যাঁ ভাই, এই শুয়োরের খাটনি খাটতে খাটতে...'
'এক কাজ করো না কেন, সোজা চিড়িয়াখানায় নিয়ে চলে যাও না শুয়োরটাকে!'
'ভালো বলেছ তো! আজ হবে না, কাল যাব নিশ্চয়ই৷'
কয়েক দিন বাদে প্রতিবেশী আবার লোকটির বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, দেখল লোকটি তার শুয়োরকে গাড়িতে তুলে বেরোচ্ছে৷ অবাক হয়ে, প্রতিবেশী জিজ্ঞেস করল, 'এ কী, সে দিন শুয়োরটাকে নিয়ে যাওনি চিড়িয়াখানা?'
'লোকটি বলল, 'হ্যাঁ ভাই, গিয়েছিলাম৷ ভালো বুদ্ধিটা দিয়েছিলে৷ ভারি ভালো লেগেছে শুয়োরের৷ আজ তাই ভাবছি একটু ময়দানে খেলা দেখাতে নিয়ে যাব৷ এই বেরোচ্ছি৷'
দূরদৃষ্টি
কালীপুরের দিকে যাচ্ছে ট্রেন৷ সামনের সিটে বসা মাঝবয়সি ভদ্রলোককে প্রশ্ন করল এক যুবক-'কটা বাজে?'
ভদ্রলোক যুবকটির দিকে চেয়ে চিৎকার করে বললেন, 'জাহান্নমে যাও৷'
যুবকটি গেল চটে৷ 'এ কী ব্যবহার মশাই! আমি আপনাকে একটা সাধারণ কথা জিজ্ঞেস করলাম, কিছু অভদ্রভাবে বলেছি তা-ও নয়৷ এ কথার কিনা এই উত্তর?'
মাঝবয়সি ভদ্রলোক তাকালেন যুবকের দিকে৷ 'বেশ, কথাটা তাহলে খুলেই বলি৷ তুমি আমাকে একটা প্রশ্ন করলে, কেমন! এইবার ধরো আমি তার উত্তর দিলাম৷ ব্যাস, তুমি আমার সাথে কথাবার্তা শুরু করে দিলে৷ ট্রেনে অফুরন্ত সময়-রাজনীতি থেকে শুরু করে সাহিত্য অবধি৷ কথায় কথা গড়াল৷ তারপর হয়তো দেখা গেল যে, তুমি কালীপুরেই যাচ্ছ বেড়াতে, কোথায় উঠবে জান না৷ আমার বাড়ি কালীপুরে, অতএব আমি তোমাকে বললাম আমার বাড়িতেই উঠতে৷ তুমি এলে৷ দেখা হল আমার মেয়ের সঙ্গে৷ মেয়ের বিয়ের বয়েস হচ্ছে, দেখতে সাক্ষাৎ লক্ষ্মীপ্রতিমা৷ তোমাকেও দেখতে-শুনতে ভালোই, তা তো অস্বীকার করবার উপায় নেই৷ ব্যাস প্রথম দর্শনেই ভালো লেগে গেল দু-জনকে দু-জনের৷ তারপর তুমি নানা ছুতোয় আমার বাড়ি যাতায়াত করতে লাগলে৷ জমে উঠল তোমাদের ভালোবাসা৷ অবশেষে একদিন আমার কাছে এসে আমার মেয়েকে বিয়ে করবার অনুমতি চাইলে৷ তখন তো বলতে হবেই-তাই বলি কী, অত সময় নষ্ট করে কী হবে, আমার কথা আমি এখনই সাফ বলে দিচ্ছি-একটা ঘড়ি কেনবার মুরোদও যার নেই, তার সঙ্গে আমি আমার মেয়ের বিয়ে দেব না৷'

স্যুটের মাপ
হঠাৎ একটা দোকানে ঢুকে একটা ছিট খুব পছন্দ হয়ে গেল৷ স্যুটের ছিট৷ নিজে নিজেই মনে মনে ভদ্রলোক হিসেব করে নিলেন কতটা কাপড় লাগবে তাঁর একটা স্যুট বানানোর জন্য৷ কিনে ফেললেন, তারপর দর্জির কাছে নিয়ে এলেন সেই কাপড়৷
'একটা স্যুট বানাব, দেখুন তো যথেষ্ট কাপড় আছে কি না৷'
দর্জি দেখলেন মেপে-টেপে৷ তারপর বললেন, 'না, হবে না৷ অন্তত আরও হাতখানেক কাপড় না হলে কোনো উপায় নেই৷'
বিমর্ষ হয়ে চলে আসছেন ভদ্রলোক৷ পথেই আর একটা দর্জির দোকান দেখে ভাবলেন, 'দেখাই যাক না আর এক জনকে জিজ্ঞেস করে৷'
এই দর্জি খুব মন দিয়ে কাপড়টা মেপে-টেপে বললেন, 'হবে৷' ভদ্রলোক তো খুব খুশি৷ মাপ-টাপ দিয়ে চলে এলেন তিনি, দু-সপ্তাহ পরে স্যুট পাওয়া যাবে এই কথা রইল৷
দু-সপ্তাহ পরে দোকানে হানা দিলেন ভদ্রলোক৷ হ্যাঁ, কথার খেলাপ হয়নি, পোশাক তৈরি৷ দাম-টাম দিয়ে বেরিয়ে আসছেন, এমন সময়ে বাইরে থেকে ছুটতে ছুটতে এল দর্জির ছোট্ট ছেলে৷ খেলতে খেলতে এসেছে, হাঁপাচ্ছে৷ কিন্তু সেটা আসল কথা নয়৷ ভদ্রলোক দেখলেন, ছেলেটির গায়ে যে জামাটা, সেটা ওনার স্যুটের কাপড় দিয়েই বানানো৷
দর্জিকে ডেকে বললেন, 'দেখুন তো দেখি, আমি যা কাপড় কিনেছিলাম তাতে আপনি তো দেখছি শুধু আমার স্যুটই বানাননি, নিজের ছেলের একটা জামাও বানিয়েছেন৷ অথচ ওই একই কাপড় মেপে ওই পাশের রাস্তার দর্জি বলেছিলেন ওতে নাকি আমার স্যুটই বানানো যাবে না৷ তখনই ভাবছিলাম, আমার হিসেব কি এতই ভুল হল! এখন বুঝেছি, আসলে উনিই ঠিকমতো মাপ বোঝেন না৷'
দর্জি সবিনয়ে বললেন, 'আজ্ঞে না, তা নয়৷ আপনি যে দোকানটার কথা বলছেন সেটা আমারই মাসতুতো ভাইয়ের, ওকে আমি বিলক্ষণ চিনি৷ মাপ ও কারুর চেয়ে কম বোঝে না৷ তবে কী জানেন, ও আপনাকে কিছু ভুল বলেনি৷ আপনি যে কাপড় এনেছিলেন, তাতে আমি স্যুট বানিয়ে দিতে পেরেছি, কেননা আমার একটাই ছেলে৷ ওর যে দুটি ছেলে! দুটির জন্য জামা বানিয়ে আপনার স্যুট ওই কাপড়ে বানানো যেত না৷'

দুই বন্ধু বেড়াতে এসেছে মার্কিন দেশ থেকে জামাইকায়৷ ঘুরতে ঘুরতে এল বাজার এলাকায়৷ দেখে, একজন বসে লঙ্কা বেচছে৷ জামাইকার লঙ্কা আমাদের দেশের লঙ্কার মতো দেখতে নয়-বড়ো বড়ো গোল গোল তার চেহারা, শিমলাই লঙ্কার মতো৷ দেখে ওরা ভাবল, আপেল৷ প্রথম বন্ধু দ্বিতীয় জনকে বলল, 'খাবে নাকি?'
দ্বিতীয় বন্ধু বলল, 'না, আমার খিদে নেই৷ তুমি খাও, আমি ওদিক থেকে একটু ঘুরে আসি৷'
বলে চলে গেল সে৷ প্রথম জন তখন দোকানিকে বলল, 'দেখি গোটা দুয়েক আপেল৷'
দোকানি বলল, 'এগুলো আপেল নয়, লঙ্কা৷'
প্রথম বন্ধু বলল, 'আরে রাখো তোমার কচকচি৷ পরিষ্কার দেখছি আপেল, আর এ বলছে লঙ্কা-বুদ্ধু কোথাকার! দাও দুটো শিগগিরি৷'
দোকানি দিল দুটো 'আপেল', মানে লঙ্কা৷ প্রথমটাতে বিশাল একখানা কামড় বসিয়েই ঝালে ব্রহ্মতালু জ্বলে গেল লোকটির৷ দ্বিতীয় বন্ধু যখন ফিরে এল, তখন ঝালে তার জল গড়াচ্ছে দু-চোখ বেয়ে৷ বন্ধু জিজ্ঞেস করল, 'কী হে, কেমন লাগছে?'
আসল কথা বলতে বড়ো সম্মানে বাধল প্রথম বন্ধুর৷ তাই বলল, 'ঃও! দারুণ ভালো খেতে!'
'তাহলে চোখে জল কেন? ঝাল নাকি?'
'আরে না না৷ এত দূরে এসেছি বেড়াতে, বাড়ি-ছাড়া, তাই মায়ের কথা মনে পড়ে বড়ো দুঃখ লাগছে৷ এত চমৎকার জামাইকার আপেল, তা-ও তো মাকে খাওয়াতে পারলাম না৷ এই সব ভেবে জল আসছে চোখে৷'
'দুঃখ কোরো না৷ কই দেখি, এত ভালো বলছ, দেখি খেয়ে তোমার অন্য আপেলটা!'
প্রথম জন মুখিয়েই ছিল, দিল অন্যটা৷ দ্বিতীয় বন্ধু কামড় দিল তাতে৷ বলা বাহুল্য, তার অবস্থাও হল প্রথম জনের মতোই৷ চোখে জল ঝরতে লাগল অঝোরে৷
প্রথম বন্ধু বলল, 'এ কি! ঝাল লাগছে নাকি?'
'না ভাই, ঝাল লাগবে কেন, জামাইকার আপেল বলে কথা, এত সুস্বাদু!'
'তাহলে চোখে যে জল!'
'সে অন্য কারণে ভাই৷ নিজের কথা ভেবে দুঃখ হচ্ছে৷ ভাবছি, আমি কী আহাম্মক! সব কথাই এত দেরিতে বুঝি৷ এই দেখো না, এত দিন তোমার সঙ্গে মিশেছি, ভেবেছি তুমি আমার সত্যিকারের বন্ধু৷ আজ সে ভুল ভাঙল, তাই নিজের এতে দিনের বোকামির কথা ভেবে মনের দুঃখে চোখে জল আসছে৷ ও কথা থাক৷ তুমি খাও, আমি উঠি৷
নিজের জামা
সারা গ্রামে একজনই দর্জি৷ সুখের কথা, দর্জির হাত খুব ভালো, সবার পরনেই তাই সুন্দর পোশাক৷ না, ভুল হল, ঠিক সব্বার নয়৷ দর্জির নিজের পোশাক বানাবার তো কেউ নেই, তাই ছেঁড়াখোড়া পোশাকেই তাঁকে দেখা যায় সর্বত্র৷
একদিন হাটের থেকে ফেরবার সময় মোড়লমশাই জিজ্ঞেসই করে ফেললেন, 'কী ব্যাপার বলো তো! সবার জামা বানাচ্ছ, নিজের জন্য একটা বানাতে পারো না?'
দর্জি বললেন, 'আসল কথাটা কী জানেন? আমি গরিব মানুষ, অন্যদের জামা সেলাই করে যা পয়সা পাই তাতে টেনেটুনে চলে৷ তাই দিনরাত্তিরে যতটা সময় পাই অন্যদের কাজই করি৷ নিজের কাজ করে তো পয়সা হয় না, সে কাজ করার সময় পাই কোথায়?'
মোড়ল লোক মন্দ নন৷ বললেন, 'বেশ তো, এই নাও দুটো টাকা৷ মনে করো আমিই একজন খদ্দের, তোমার একটা জামা বানাবার জন্য টাকা দিচ্ছি৷ ব্যাস, এবার খদ্দেরের দাবি মেটাও, বানাও তোমার জামা!'
'ভালো কথা!' বলে টাকা দুটি নিয়ে চলে গেল৷
পরের হপ্তায় দু-জনে আবার দেখা হয়ে গেল হাটে৷ দর্জির পরনে এখন. . . না, যা আশা করা গিয়েছিল তা নয়৷ সেই পুরোনো শতচ্ছিন্ন জামাটিই৷ দেখে খানিকটা রাগই হয়ে গেল মোড়লের৷ বললেন, 'এ কী! আমি তোমাকে একটা কাজ দিলাম সেদিন৷ টাকা আগাম দিলাম৷ তা-ও সে কাজ এতদিন ফেলে রেখেছ!'
'না না, কিছু মনে করবেন না৷ ফেলে ঠিক রাখিনি৷ আসলে বাড়ি গিয়ে ভেবে দেখলাম, দু-টাকায় একটা জামা বানালে বিরাট লোকসান হয়ে যাবে৷ আমার ছোটোখাটো কারবার, এত লোকসান সইবে না৷ আপনার ও দুটো টাকা আমি ফিরিয়ে দিয়ে আসবখন একসময়৷'

হাটে শুয়োর কিনতে গেছে একটি লোক৷ দেখল, একজন বসেছে দুটি শুয়োর নিয়ে, বিক্রির জন্য৷ জিজ্ঞেস করল, 'শুয়োর কেমন হে?'
'আজ্ঞে কোনটা, ডানদিকেরটা না বাঁদিকেরটা?'
'বাঁদিকেরটা৷'
'চমৎকার কর্তা৷'
'আর ডানদিকেরটা?'
'ওটাও চমৎকার৷'
'খাওয়াতে কী এগুলোকে?'
'আজ্ঞে কোনটাকে, ডানদিকেরটাকে না বাঁদিকেরটাকে?'
'বাঁদিকেরটাকে৷'
'ওই আর কি ভুসি-টুসি৷'
'আর ডানদিকেরটাকে?'
'ওটাকেও ওই, ভুসি৷'
'মদ্দা শুয়োর না মাদি?'
'আজ্ঞে কোনটা, ডানদিকেরটা না বাঁদিকেরটা?'
'বাঁদিকেরটাই ধরো৷'
'ওটা মাদি৷'
'আর ডানদিকেরটা?'
'আজ্ঞে ওটাও মাদি৷'
'বয়েস কত শুয়োরগুলোর?'
'আজ্ঞে কোনটার, ডানদিকেরটার না বাঁদিকেরটার?'
'বাঁদিকেরটার৷'
'দেড় বছর৷'
'আর ডানদিকেরটার?'
'ওটারও দেড় বছর৷'
'দাম কত?'
'আজ্ঞে কোনটার, ডানদিকেরটার না বাঁদিকেরটার?'
'বাঁদিকেরটা কত?'

'দশ টাকা৷'
'আর ডানদিকেরটা?'
'ওটাও দশ টাকা৷'
'দশ টাকা দাম, ওজন কত হে?'
'আজ্ঞে কোনটা, ডানদিকেরটা না বাঁদিকেরটা?'
'বাঁদিকেরটা?'
'পনেরো কেজি৷'
'আর ডানদিকেরটা?'
'ওটাও পনেরো কেজি৷'
'ধ্যাৎ, কী যে বলো, কোনো মানে হয় না৷ দুটোরই সব কিছু এক, এ কখনো হয় নাকি? বাজে বকছ নিশ্চয়ই৷'
'তা ঠিক কর্তা৷'
'তার মানে?'
'আজ্ঞে ওই বাঁদিকের শুয়োরটা সম্বন্ধে যা যা আপনাকে বলেছি তা সবই মিছে কথা৷'
'তাই বলো! তাহলে ডানদিকের শুয়োরটার...'
'আজ্ঞে হ্যাঁ, ওটার সম্পর্কে যা যা বলেছি সেগুলোও সব মিছে কথা৷'

নতুন এক মানুষ এল শহরে৷ রাস্তায় একজন লোককে ডেকে প্রশ্ন করল, 'আচ্ছা, ধীরেন মুখুজ্যের বাড়িটা কোথায় বলতে পারেন?'
'হেঁঃ হেঁ! তা আর পারব না! ও বাড়ি আর কে না চেনে বলুন!
'সবাই চেনে বুঝি?'
'বিলক্ষণ, বিলক্ষণ৷'
'সুন্দর বাড়ি খুব?'
'হবে না? মিউনিসিপ্যালিটির গোটা তহবিলটাই যে ফাঁক হয়ে গেল ও বাড়ি তুলতে গিয়ে৷ এদিকে রাস্তা ঠিক করার কথা তুলে দেখুন একবার, দেখবেন পয়সা নেই৷ অথচ ট্যাক্স বাড়ছে ফি বছর৷ আমরা যেন ঘাসে মুখ দিয়ে চলি আর কি!'
'বাড়িটা কোথায় তা যদি একটু বলে দেন...'
'এই রাস্তা ধরে এগোন, সিনেমা হল পার হয়ে ডানদিকের গলিতে৷'
সিনেমা হলের কাছে এসে একটা পানের দোকানে আবার জিজ্ঞেস করল লোকটি, 'মুখুজ্যেবাবুর বাড়ি কোথায় দাদা?'
'কে, ধীরেন মুখুজ্যে? কেন, তার সাথে কী দরকার?'
'আজ্ঞে এই একটু ইয়ে...'
'হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝেছি বুঝেছি৷ সে সব কথা কি আর লোকসমক্ষে বলা যায়৷ আমারই ভুল, জিজ্ঞেস করাই উচিত হয়নি৷'
'না না, তা কেন? আপনি সত্যি সত্যি জানতে চেয়েছেন তা বুঝিনি৷ নইলে বলতে আমার কোনো আপত্তি আছে তা ভাববেন না৷'
'আপনার বলতে না বাধতে পারে, কিন্তু আমার শুনতে বাধবে মশাই৷ হয় কালোবাজার, নয় ঘুষ, তা না হলে চোরাচালান-এই তো বলবেন?'
'কী মুশকিল!'
'থাক৷ ও আমার না শুনলেও চলবে৷ বাড়ি জানতে চাচ্ছিলেন তো! এই গলির মধ্যে, ডানহাতে বিরাট গোলাপি বাড়ি আছে দেখবেন৷'
গোলাপি বাড়ির সামনে এসে নিশ্চিত হবার জন্য আর একজনকে প্রশ্ন করল লোকটি, 'এটাই কি মুখুজ্যেদের বাড়ি?'
'তা বলতে পারেন৷'
'তার মানে? হ্যাঁ কি না?'
'বাড়ি বললে ঠিক বলা হয় না৷'
'সেটা কীরকম?'
'বড়ো ছেলের কথা যদি ধরেন, সেটা পাগল, কাজেই বাড়ি না বলে পাগলাগারদ বলা উচিত৷ ছোটো ছেলেটা গুন্ডা, তার কথা ধরলে বলতে হয় এটা বাড়ি নয়, আখড়া৷ মেয়েটা তো বাপের জ্বালায় কোথাকার কোন এক ভ্যাগাবন্ডের হাত ধরে পালাল৷ তার কাছে ছিল নরক৷ এখন বেঁচেছে৷ আর কর্তার নিজের কথা যদি বলেন, তাহলে বলতে হয় এটা আড়ত৷ চুরির মাল সব ওখানেই জমা হয় কিনা!'
'যাক, তাহলে এটাই-'
'হ্যাঁ, এটাই৷'
বাড়িতে ঢুকল লোকটি, ধীরেনবাবুর সঙ্গে দেখাও হল৷ খবরের কাগজের থেকে এসেছে সে, একটা সাক্ষাৎকার নিতে৷ কথায় কথায় প্রশ্ন করল, 'আচ্ছা ধীরেনবাবু, আপনি এই যে মিউনিসিপ্যালিটির বড়ো কর্তা হয়েছেন, এতে কত মাইনে পান?'
'একটি ফুটো পয়সাও না৷'
'তবে করেন কেন? খাটনি তো নেহাত কম নয়!'
'বাঃ৷ টাকাই কি সব? সম্মানটা দেখছেন না! সেটা কি কিছুই নয়?'


ভুলোমনা পণ্ডিত আছে, কিন্তু এনার মতন আর একটিও নেই বোধ হয়৷ সারাক্ষণই কিছু না কিছু হারাচ্ছে, কিছু না কিছু ভুলে যাচ্ছেন বেমালুম৷ পণ্ডিতের বউ নাজেহাল একেবারে!
জলসায় গান শুনতে গিয়েছিলেন, বাড়ি ফিরলেন একটু রাত্তির করে৷ তাঁকে ঢুকতে দেখেই স্ত্রীর চক্ষু চড়কগাছ৷ খালি পায়ে বাড়ি ঢুকছেন পণ্ডিত৷
'জুতো কোথায় গেল?'
নিজের পায়ের দিকে চেয়ে চমকিত হলেন পণ্ডিত৷ বললেন, 'জুতো? ওই যাঃ, নিশ্চয়ই কোনো ভুলো লোক ভুল করে পরে চলে গেছে৷'
যুক্তির দৌড়ে চমৎকৃত হলেন গিন্নি৷ জিজ্ঞেস করলেন, 'তাই নাকি! তাহলে সে লোকটার জুতোজোড়া গেল কোথায়? সেটা তো তোমার পায়ে দেখছি না!'
'তাই তো, তাই তো! মনে হচ্ছে লোকটা বেশ ভয়ানক রকমের ভুলো স্বভাবের বুঝলে! নিজের জুতো জোড়া আমার জন্য রেখে যেতেও ভুলে গেছে বেমালুম৷'
তিন চোর আর চাষা
এক চাষা যাচ্ছিল দূরের এক হাটে৷ সাথে নিয়ে যাচ্ছিল তার একটা ছাগল আর একটা গাধা৷ সেগুলো বিক্রি করে সেই পয়সা দিয়ে অন্যান্য কিছু জিনিসপত্র কিনবে, সেই জন্য৷
রাস্তায় তিন জন চোর দেখতে পেল এই দৃশ্য৷ প্রথম চোর অন্য দু-জনকে বলল, 'আমি ওই ছাগলটাকে চুরি করতে পারি৷ যদিও ছাগলটার গলায় ঘণ্টা বাঁধা, চাষা দেখবি টেরও পাবে না৷'
দ্বিতীয় চোর বলল, 'আমি গাধাটা চুরি করব৷'
তৃতীয় চোর বলল, 'ওরে তোরা যে আর আমার জন্য কোনো কাজ বাকি রাখলি না, তাহলে আমি কী করি?' তারপর একটু ভেবে বলল, 'বেশ, আমি তাহলে ওর গায়ের জামাটা চুরি করব৷'
* * *
যেতে যেতে ক্লান্ত হয়ে পড়ল চাষা, ভাবল একটু বিশ্রাম নিয়ে নেবে৷ পাশে ছাগলটা আর গাধাটা বেঁধে রেখে পা ছড়িয়ে বসতে না বসতেই ঘুমে জড়িয়ে এল চোখ৷ তিন চোর তক্কে-তক্কেই ছিল৷ লোকটা ঘুমিয়ে পড়তেই প্রথম চোর পা টিপে টিপে গেল ছাগলটার কাছে, ছাগলটার গলা থেকে ঘণ্টাটা সন্তর্পনে খুলে নিয়ে গাধাটার গলায় বেঁধে দিল, তারপর ছাগল নিয়ে চোঁচা দৌড়৷ ঘণ্টাটা খুলে নিয়েছিল বলে শব্দও হল না, চাষারও ঘুমের ব্যাঘাত হল না৷
চাষার ঘুম ভাঙল খানিকক্ষণ বাদে৷ পাশে তাকিয়ে দেখে, গাধা আছে কিন্তু ছাগল নেই৷ গেল কোথায় ছাগলটা! ভাবতে ভাবতে চাষা এদিক চায়, ওদিক চায়৷ এমন সময়ে দ্বিতীয় চোরের আবির্ভাব৷ 'কী ব্যাপার দাদা, কিছু খুঁজছেন নাকি?' চাষা বলল, 'খুঁজছি আমার ছাগলটাকে৷'
'অ্যাঁ, কী বললেন, ছাগল? কী সর্বনাশ, আমি তো ওইদিক থেকে আসছি, দেখলাম একটা লোক একটা ছাগল নিয়ে হেলেদুলে যাচ্ছে৷ তখন তো বুঝিনি, এখন আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনার ছাগলটাই চুরি করে পালাচ্ছিল!'
ব্যস্তসমস্ত হয়ে চাষা বলল, 'কোথায় দেখলেন, অনেকটা দূরে?' দ্বিতীয় চোর বলল, 'না না, দূর কোথায়, এই তো দু-মিনিটও হয়নি, তাড়াতাড়ি ধাওয়া করলে ঠিক ধরতে পারবেন৷'
চাষা বলল, 'তাহলে আমি দৌড়ালাম৷ আপনি দাদা একটু এই গাধাটাকে দেখবেন?'
দ্বিতীয় চোর বলল, 'হ্যাঁ, এ আর বেশি কথা কী, যান আপনি দৌড়োন৷ আমি থাকছি এখানে৷'
চাষা দৌড়োল৷ বলা বাহুল্য, ছাগল পাওয়া গেল না, ফিরে এসে দেখল গাধাও নিরুদ্দেশ৷
* * *
খুবই মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে চাষা, হঠাৎ দেখল একটা খালের ওপর সাঁকো, তার পাশে বসে একটি লোক হাপুস নয়নে কাঁদছে৷
চাষার করুণা হল, লোকটির পাশে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কী হয়েছে ভাই?'
লোকটি কোনোমতে কান্না থামিয়ে বলল, 'কী আর বলব দাদা! পিঠে বস্তা নিয়ে আসছিলাম, সাঁকো পেরোবার সময়ে অসাবধানে বস্তাটা পড়ে গেছে জলে৷'
চাষা বলল, 'বস্তায় কি অনেক কিছু ছিল?'
লোকটি বলল, 'চুপিচুপি আপনাকে বলছি, কাউকে বলবেন না যেন৷ বস্তায় ছিল মোহর ভরা৷'
শুনে চাষা বলল, 'ঃও, তাহলে তো সোজা ব্যাপার৷ বস্তা জলের তলাতেই আছে, ডুব দিয়েই তুলে নিতে পারবেন৷'
লোকটি বলল, 'ওইখানেই তো মুশকিল দাদা, ডুব দেওয়ার সাধ্য আমার নেই৷ সাঁতার জানি না তো, তাই জল দেখলেই ভয় হয়৷' বলেই, চাষার দিকে চেয়ে মিনতি করে বলল, 'আপনি পারবেন দাদা? আমি কথা দিচ্ছি, বস্তা থেকে দুটো মোহর আপনাকে দেব৷'
চাষা তো হাতে স্বর্গ পেল৷ ছাগলটা আর গাধাটা চুরি গেল, সেই ক্ষতি নিশ্চয়ই ভগবান এমনি করে পূরণ করে দিচ্ছেন৷ লোকটিকে বলল, 'নিশ্চয়ই তুলে দেব৷ আপনি আমার জামাকাপড় একটু সামলান এখানে, আমি ডুব দিচ্ছি৷'
লোকটি গদগদ হয়ে বলল, 'ভাগ্যিস আপনার সঙ্গে দেখা হল!'
এই লোকটিই তৃতীয় চোর৷ চাষা জামাটামা ছেড়ে ডুব দেওয়ার জন্য তৈরি হল৷ তার পরে কী হল, তা আর বলার দরকার নেই!

এক বণিক যাচ্ছিলেন ব্যাবসার কাজে দূর দেশে৷ সঙ্গে যাচ্ছিল তাঁর চাকর৷ ব্যাবসার হিসেবনিকেশের কাগজ, কিছু দরকারি মালপত্তর ইত্যাদি ছিল সাথে৷ এসব চাপানো হয়েছিল একটা ঘোড়ার পিঠে, তারই একপাশে জায়গা করে বসে যাচ্ছিলেন ব্যবসায়ী৷ চাকর চলছিল পায়ে হেঁটে, পাশে পাশে৷
রাত্তির হল৷ বিশাল মাঠের মধ্যে তাঁবু ফেলা হল৷ খাওয়াদাওয়া সেরে বণিক বললেন চাকরকে, 'তুমি এখন ঘুমোও৷ সারাদিন হেঁটেছ তো, তুমি আমার চেয়ে ক্লান্ত৷ আমি জেগে রইলাম৷ এত মালপত্তর রয়েছে, ঘোড়াটাও আছে, পাহারা দেওয়ার জন্য এক জনকে তো থাকতে হবে! অর্ধেক রাত কাবার হলে তোমাকে জাগিয়ে দেব, তখন তুমি পাহারা দিয়ো৷'
চাকর রাজি হল৷ মাঝরাত্তিরে মনিব জাগিয়ে দিলেন তাকে৷ কিন্তু চাকরের চোখ তখনও ঘুমে জড়িয়ে আসছে৷ বণিক ঘুমোতে গেলেন, চাকরও পাশে বসে ঢুলতে লাগল৷
এদিকে চিন্তায় চিন্তায় মনিবের একটানা ঘুম হচ্ছে না৷ ঘণ্টাখানেক পরেই চোখ খুললেন তিনি৷ দেখলেন, চাকরের চোখ বোজা৷ হাঁক পাড়লেন 'কী হে, কী করছ?'
একটু নড়ে বসে চাকর চোখ না খুলেই অম্লানবদনে বলল, 'ভাবছি৷'
'কী ভাবছ?'
'ভাবছি, বাঁশের গোড়াটা তো চওড়া হয়, কিন্তু আগাটা সরু হয় কেন? আগার দিকটা চাঁছে কে?'
'বাঃ! খাসা বলেছ কথাটা, ভেবে দেখার মতো!' বলে ঘুমোলেন মনিব৷
ঘণ্টাখানেক বাদে আবার জাগলেন৷ চাকরের চোখ এখনও বোজা৷ 'কী করছ?'
'ভাবছি৷'
'কী নিয়ে?'
'ভাবছিলাম, তাঁবু খাটাবার জন্য মাটিতে তো পোঁতা হল খোঁটাটা৷ কাজেই খোঁটা ঢুকল মাটির জায়গায়৷ তাহলে ওই জায়গাকার মাটিটা গেল কোথায়?'
'বাঃ, এটাও ভালো বলেছ! বেশ বড়ো বড়ো চিন্তা খেলে তো তোমার মাথায়!'-বলেই আবার ঘুম৷
তারপর ঘুম ভাঙল যখন, তখন ভোর হচ্ছে৷ এবার চাকরের চোখ খোলা৷
'কী করছ হে?'
'ভাবছি৷'
'এবারে কী নিয়ে?'
'ভাবছিলাম, কালকে তো ঘোড়াটা সারাদিন মোট বইল৷ এখন তো ঘোড়াটাকে আর দেখছি না, তাহলে আজ মোট বইবে কে?'
দেশি-বিদেশি
ভদ্রলোক সদ্য এসেছেন ইতালি থেকে আমেরিকায়, নিউ ইয়র্কে৷ দেশ ছেড়ে চলে এসেছেন, মনটা কেমন করছে৷ রাস্তায় ঘুরছেন ইতস্তত, চোখে পড়ল একটা ইতালীয় রেস্তোঁরা৷ ভাবলেন, 'বাঃ, এই তো বিদেশে এসেও স্বদেশ রয়েছে এখানে৷' ঢুকে পড়লেন৷
বেশ ভালো রেস্তোঁরা, গমগমে ব্যাবসা৷ ভদ্রলোক অর্ডার দিলেন খাবারের-বেগুন আর পনির সহযোগে রান্না মাংস, ইতালীয় ভাষায় যাকে বলে পার্মাজানো৷ খাবার এসে গেল যথাসময়ে৷ মুখে পুরে ভদ্রলোক যেন স্বর্গসুখ অনুভব করলেন-অতি অপূর্ব রান্না৷
চেটেপুটে খেয়ে বেরিয়ে আসার আগে কাউন্টারে দাম দেবার সময়ে ভদ্রলোক উচ্ছ্বাস আর চেপে রাখতে পারলেন না৷ মালিককে বলেই ফেললেন, 'আপনার দোকানের পার্মাজানো যে কী ভালো খেলাম, তা বলে বোঝাতে পারব না৷ সত্যি বলতে কি, ইতালিতেও এত ভালো পার্মাজানো খাইনি৷'
মালিক বললেন, 'শুধু আপনি নন, আরও অনেকেই এ কথা বলেছেন৷ আসলে ব্যাপারটা কী জানেন? ইতালিতে রেস্তোঁরার লোকগুলো সব দিশি পনির ব্যবহার করে৷ আমরা মশাই ওরকম ফাঁকিবাজি করি না, বিদেশ থেকে পনির আমদানি করি, সেই ফরেন পনির দিই রান্নায়৷ ভালো হবে না!'
এই নিষ্ঠায় চমৎকৃত হলেন ক্রেতা ভদ্রলোক৷ জিজ্ঞেস করলেন, 'কোথা থেকে আনান পনির?'
'ইতালি থেকে,' উত্তর দিলেন মালিক৷

জঙ্গলে কাঠ কাটতে গেল করালীচরণ৷ কাটা কাঠ বয়ে নিয়ে আসবার জন্য সাথে নিল গাধায় টানা গাড়িটা৷ অনেক কাঠ আনা যাবে, সেই ভরসায়৷
করালীচরণ অবশ্য লোকটার আসল নাম নয়৷ গল্পটা বিদেশের, লোকটার নামটাও কীরকম খটোমটো বিদেশি নাম একটা৷ কিন্তু যাক, তাতে কিছু আসে যায় না৷ লোকটার নামটা বড়ো কথা নয়, লোকটা কী করল সেটা নিয়েই গল্প৷ সেই কথাই বলছি৷
প্রচুর কাঠ কাটা হল৷ তারপর গাড়িতে সে কাঠ তোলার পালা৷ মোটামুটি ভালোই বোঝাই হল গাড়ি৷ তবু অনেক কাটা কাঠ তখনও মাটিতে পড়ে৷ কী ব্যবস্থা করা যায় সে সবের? -করালী ভাবে৷
আর এক টুকরো কাঠ গাড়িতে ছুড়ে দিল করালী৷ ভাবল, 'পারবে তো গাধাটা টানতে?' পরক্ষণে নিজের মনেই জবাব দিল, 'আগের কটা যদি টানতে পারে, তাহলে আর এই একটাও পারবে৷ একটাতে আর কী এমন ওজনের তফাত হচ্ছে?'
তারপরে আর এক টুকরো কাঠ তুলল৷ মনে মনে সেই একই যুক্তি, 'এক টুকরোতে কী আর এমন এসে যায়, বলো! ওই কটা যখন পারছে টানতে, এই আর একটাও পারবে৷'
তারপরে আর এক টুকরো, একই যুক্তি৷ তারপরে আর এক টুকরো৷ তারপরে আর এক৷ এই করতে করতে সব কাঠই চাপিয়ে ফেলা হল গাড়িতে৷ সন্তুষ্ট হয়ে এবার নিজে গাড়িতে উঠে করালী চাপড় লাগাল গাধাটাকে-'হেই, চল চল৷'
গাধা নড়ে না৷ তাড়া দেয় করালী, ভয় দেখায়, লোভ দেখায়-কিছুতেই কিছু হবার নয়৷ চলবে কী করে? এক-এক করে যে পরিমাণ কাঠ চাপিয়েছে করালী, সে বিশাল মোট নিয়ে চলা গাধার কম্ম নয়৷
নেমে পড়ল করালী৷ বুঝেছে ভুলটা৷ কিছু কাঠ নামাতে হবে৷ এক টুকরো কাঠ গাড়ির ওপর থেকে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল জঙ্গলের মধ্যে৷ 'এতে কি পারবে গাধাটা?... অবশ্য, এক টুকরোর আর কী এমন ওজন! আগে যা ছিল, তাতে যখন পারেনি, তার থেকে এক টুকরো কম হলেও পারবে না৷'
আরও একটা টুকরো কাঠ ছুড়ে ফেলে দিল৷ 'এতেই বা পারবে কেন, তফাত তো হল মোটে এক টুকরোর৷ একটার আর কীই বা ওজন!'
আর এক টুকরো ফেলল করালী, একই যুক্তি৷ তারপর আর এক টুকরো৷ তারপর আর এক৷ একই প্রশ্ন করে যায় মনের মধ্যে, 'পারবে কি এবার?'-একই উত্তর পায়, 'কী তফাত হবে এক টুকরোয়? নিশ্চয়ই পারবে না৷' কমতে থাকে গাড়ির ওপরের কাঠের পরিমাণ, তারপর আরও কমে, আরও কমে৷
শূন্য গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরল করালীচরণ৷
সমস্যা, মীমাংসা

অনেক দিন আগেকার না পরেকার কথা তা ঠিক মনে পড়ছে না৷ হয়তো কোনোটাই নয়, একেবারে এখনকারই কথা৷
রাজধানীর সমস্ত ময়লা আবর্জনা, ভাঙাচোরা পুরোনো জিনিসপত্র যেগুলো লোকে ফেলে দিত, সে সব নিয়ে গিয়ে জমা করা হত শহরের বাইরে এক জায়গায়৷ ধারেকাছে জনমানব ছিল না, জমতে জমতে সেখানে ঢিপি হয়ে যাচ্ছিল৷
হঠাৎ পুরসভায় একদিন আলোচনা হল এই নিয়ে৷ একজন সদস্য বললেন, 'অত জিনিস ওখানে ওইভাবে পড়ে আছে, চিন্তার কথা৷ কেউ যদি চুরি করে?'
খানিকটা আলোচনার পরে ঠিক হল, ওগুলো সবই যখন সরকারের সম্পত্তি, তখন ওগুলো দেখাশোনার জন্য একজন পাহারাদারের বন্দোবস্ত থাকা উচিত৷ এর জন্য যা টাকাপয়সা দরকার তা বরাদ্দ হয়ে গেল, কয়েক দিনের মধ্যে পাহারাদার নিয়োগ করাও হয়ে গেল৷
কিছুদিন বাদে কথাটা আবার উঠল পুরসভায়৷ প্রশ্নটা হল, 'পাহারাদারকে কখন কী করতে হবে, সেটা বোঝাবে কে?' খানিকটা আলোচনার পরে ঠিক হল, একটা পরিকল্পনা পর্ষদ গঠন করা হবে, তাতে দুজন কর্মী থাকবেন-এইরকম পরিস্থিতিতে আগে অন্যত্র কী ভাবে কাজ হয়েছে তার ইতিহাস পর্যালোচনা করে পাহারাদারের কাজ কী হবে তা নিয়ে চিন্তা করবেন একজন, আর অন্যজন সেই চিন্তার ফলাফল লিখে রেখে পাহারাদারকে লিখিত নির্দেশ পাঠাবেন৷
কিছুদিন পরে পুরসভার সদস্যদের মাথায় চিন্তা ঢুকল, 'পাহারাদারকে শুধু কাজের নির্দেশ দিলেই তো হল না, সেই নির্দেশ অনুযায়ী সে ঠিকমতো কাজগুলো করছে কি না তার ওপরেও লক্ষ রাখা উচিত৷' অতএব 'কার্যসমীক্ষা বিভাগ' বলে একটা নতুন দপ্তর গড়ে উঠল, তাতে দু-জন লোক নিয়োগ করা হল৷ তাদের মধ্যে একজন হলেন অফিসার, কাজ ঠিকমতো হচ্ছে কি না তা নির্ধারণ করা তাঁর কাজ৷ অন্যজন কেরানি, অফিসারের হিসেবপত্র এবং সিদ্ধান্ত নথিভুক্ত করে রাখা তাঁর কাজ৷
এর কিছুদিন পরে যখন এ নিয়ে আবার কথা উঠল, তখন পুরসভার সদস্যরা প্রায় সকলেই একবাক্যে স্বীকার করলেন যে, এই এত কর্মীর মাইনে এবং অন্যান্য ভাতা সুষ্ঠুভাবে দেওয়া হচ্ছে কি না তার যথাযথ হিসেব থাকা উচিত৷ তার জন্য দু-জনকে নিয়োগ করা হল৷ একজন খাজাঞ্চি, যিনি সব হিসেব করবেন, এবং একজন কোষাধ্যক্ষ, যিনি সেই সব হিসেব ঠিক আছে কি না তা মিলিয়ে দেখবেন৷
পরবর্তী আলোচনায় প্রশ্ন উঠল, এই যে পুরো ব্যাপারটা, এর দায়িত্ব কার হাতে? ব্যাপারটার নাম দেওয়া হল 'আবর-উদ্যোগ', এবং এর পরিচালনা করার জন্য একটি দপ্তর তৈরি হল৷ তিন জনের চাকরি হল তাতে-অধিকর্তা, উপ-অধিকর্তা এবং আইন-উপদেষ্টা৷
বছরখানেক পরে আবার আলোচনা হল 'আবর-উদ্যোগ' নিয়ে৷
গত এক বছরের সমস্ত রিপোর্ট দেখেশুনে পুরসভার সদস্যরা বুঝলেন, এ নিয়ে খরচ বড্ডো বেশি হচ্ছে৷ খরচ কমানো দরকার৷
বহু আলোচনা হল৷ শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হল, পাহারাদারটিকে শুধু শুধু মাইনে দেওয়া হচ্ছে, ওর তেমন কাজ নেই৷ তাই ব্যয় সংকোচনের জন্য সেই পাহারাদারকে বরখাস্ত করা হল৷

'আচ্ছা বেশ, তোমাকে একটা ধাঁধা দিই৷ বলো দেখি, কোন জিনিস দেয়ালে টাঙানো থাকে, বেগুনি রঙের আর শিশ দেয় মুখ দিয়ে?'
'ওরে ব্বাস! নাঃ, এরকম কোনো কিছুর কথা তো মনে পড়ছে না৷'
'আরে ভাবো ভাবো৷'
'না পারছি না৷ বলে দিন৷'
'পারলে না? উত্তরটা শুনলে কপাল চাপড়াবে৷ রুই মাছ৷'
'অ্যাঁ কী বললেন, রুই মাছ? কিন্তু রুই মাছ তো বেগুনি রঙের হয় না!'
'কী মুশকিল, বেগুনি রং করে দিলেই বেগুনি হবে৷'
'তা বলে রুই মাছ দেয়ালে টাঙানো থাকে না তো...'
'টাঙিয়ে রাখলেই থাকবে৷ যাবে কোথায়?'
'যাই বলুন আর তাই বলুন, রুই মাছ শিশ দেয় এ কথা জন্মেও শুনিনি৷'
'দেখো, বাজে তর্ক কোরো না৷ নাচতে না জানলে উঠোনের দোষ৷ এমন ভাব করছ যেন শিশের কথাটা না বললেই ধাঁধাটা তুমি পারতে! এমনিতেও পারতে না, ওমনিতেও না৷ ধাঁধাটা একটু শক্ত করবার জন্য ওই কথাটা বলেছিলাম৷ তোমার যা ধাঁধার এলেম দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে ওটা না বললেও চলত৷

মহাকাশ অভিযান সংক্রান্ত একটা উদ্ভট সমস্যায় গড়ে গেলেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা৷ সমস্যাটা শুনলে মনে হয় সহজ, আসলে ভয়ানক কঠিন৷ তাঁদের কোনো কোনো প্রকল্পে মহাকাশযাত্রী পাঠানো হয়, তাঁরা স্বচক্ষে দেখে আসেন মহাকাশের বিভিন্ন ঘটনা, সশরীরে উপলব্ধি করে আসেন৷ মহাকাশে এই সব ঘটনা যখন তাঁরা প্রত্যক্ষ করেন, তখন তাঁদেরকে সে সব লিখে রাখতে হয়, যাতে পরে ভুলে না যান৷ মুশকিলটা এইখানেই৷ মহাকাশে তো ভারশূন্য অবস্থা৷ কলম বাগিয়ে ধরলে তার কালি নিবের দিকে এগোবে কেন, যদি মহাকর্ষ নাই থাকে?
মনে হতে পারে, এ শুধু পুরোনো কায়দার ফাউন্টেন পেনের সমস্যা৷ একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায়, ব্যাপারটা তা নয়, সমস্যা তার চেয়ে অনেক গভীর৷ ডট পেনের কালি, আরও হালে উদ্ভাবিত জেল পেনের কালি-এ সব কিছুরই কাজ করার মূলে হল মহাকর্ষ৷ মহাকর্ষ না থাকলে এ সব কোনো কালিই কাজ করবে না৷ মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা তাই একটি বেশ বড়োসড়ো বিভাগ খুলে বসল, যেখানে কালি ও কলম নিয়ে গবেষণা হবে৷ উদ্দেশ্য, মহাকর্ষবিহীন জায়গায় কাজ করবে এমন কলম তৈরি করা৷
কয়েক ডজন গবেষক নিয়োগ করা হল, অর্থ বরাদ্দ হল তিনশো কোটি ডলার৷ শুধু সংস্থার গবেষকরাই নন, বাজারে যে সমস্ত কোম্পানি পেন তৈরি করে তাদের বিশেষজ্ঞদেরও মাঝে মাঝে ডাকা হল গোপন আলোচনায়৷ গোপনীয়তার কারণ, প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য দেশ যেন এই গবেষণার ফলাফল জানতে না পারে৷
তুমুল গবেষণায় সিদ্ধিলাভ হল, দু-বছরের চেষ্টায় বার হল সেই জাদুকলম৷ যাঁরা এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁরা আনন্দে আত্মহারা৷ ঘটা করে উদ্বোধন করা হল এই নতুন কলমের৷ কলম প্রকল্পের অধিকর্তা তাঁর ভাষণে বললেন, 'মহাকাশ গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলে গেল৷ মহাকাশচারীরা এখন থেকে তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা সহজেই লিখে রাখতে পারবেন, তাতে মহাকাশযাত্রীদের এমন অনেক পুঙ্খানুপুঙ্খ অভিজ্ঞতার কথা আমরা জানতে পারব, যা আগে আমাদের স্বপ্নেরও অগোচর ছিল৷' মার্কিন সাংবাদিকেরা জানতে চাইলেন এই অত্যাশ্চর্য লিখনব্যবস্থার মূল রহস্য৷ তাঁদেরকে জানানো হল, রহস্যটা গোপনই থাকবে, যাতে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ এর নাগাল না পায়৷ এই আশ্চর্য ব্যবস্থা তাদের মহাকাশযাত্রীদের দেওয়া যাচ্ছে না বলে তারা যেন হাত কামড়ায়৷
প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ অবশ্য হাত কামড়াচ্ছিল না৷ তারা বহুদিন যাবতই তাদের মহাকাশযাত্রীদের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছিল পেনসিল৷

মা মারা গেছে ছোটোবেলায়, একটিমাত্র মেয়ে বাপের নয়নের মণি৷ এখন বড়ো হয়েছে মেয়ে, বয়েস কুড়ি হতে চলল৷ তবু দু-দণ্ড চোখের আড়াল হলেই দুশ্চিন্তায় ছটফট করে বাপের মন৷ অথচ উপায় নেই, কাজের তাগিদে প্রায়ই সকাল-সকাল বাপকে ছুটতে হয় শহরে, ফিরতে রাত্তির হয়৷ মেয়ে থাকে একা বাড়িতে, ঘরকন্নার কাজ করে, সবজি-বাগান দেখাশোনা করে৷
সবচেয়ে বড়ো ভয় বাপের, পাড়ার অপদার্থ ছোঁড়াগুলোর কোনোটা যেন এসে ভাব না জমায় মেয়ের সাথে৷ ভাব যদি বেশ জমে ওঠে, তবে হয়তো শেষ অবধি ছোঁড়া বিয়ে করতে চাইবে মেয়েকে৷ অথচ, সত্যি বলতে কি, এ ছেলেগুলোর কারুর সাথে মেয়ের বিয়ে হবে এ কথা ভাবতেও কাঁটা দিয়ে ওঠে বাপের বুকে৷ মেয়েকে তাই কড়া হুকুম দিয়ে রেখেছে-'খবরদার! এই ছোঁড়াগুলোর সঙ্গে ভাব করবি না একদম৷ ওরা যদি কেউ গায়ে পড়ে ভাব জমাতে আসে, সোজা না বলে দিবি৷ যে যা-ই বলুক, উত্তর হচ্ছে 'না'৷ বুঝলি?'
বাপ যতটা অপদার্থ ভাবে ছেলেগুলোকে, ছেলেগুলো সত্যিই ততটা খারাপ কি না তা নিয়ে অবশ্য তর্ক চলতে পারে৷ কিন্তু তার আগে অন্য একটা কথা বলা দরকার৷ পাড়ার একটি ছেলের কিন্তু সত্যিই ভারি পছন্দ মেয়েটিকে৷ সে বেচারা একা একা বসে মনে মনে ভাবে, 'আহা! এ যদি আমার বউ হয়, কী ভালোই না হয় তাহলে!'
বিয়ে তো দুরস্থান, মেয়ের সাথে আলাপ হওয়াই দুষ্কর৷ বাগানে যখন কাজ করে মেয়েটি, ছেলেটি সেধে গিয়ে বলে, 'ঘাস নিড়িয়ে দেব তোমার হয়ে?' বাপের নির্দেশমতো মেয়ে জবাব দেয়, 'না'৷ যখন কুয়ো থেকে জল তোলে, ছেলেটা জিজ্ঞেস করে, 'কষ্ট হচ্ছে? দেব আমি তুলে?' -মেয়েটা বলে, 'না৷' কখনো বলে ছেলেটা, 'ও গাঁয়ে মেলা হচ্ছে, চলো দেখে আসি কাল দুপুরে৷' কখনো বলে, 'নদীর ধারে বেড়াতে যাবে আমার সঙ্গে?' -মেয়েটার যে ইচ্ছে হয় না তা নয়, ছেলেটাকেও তো ভালোই লাগে৷ কিন্তু বাপের কাছে কথা দিয়েছে, তাই কেবলই উত্তর দেয়, 'না৷'
মহা মুশকিল! কথাই যদি না বলে, তবে ভাব হবে কেমন করে? আর ভাব যদি না হয়, তাহলে বিয়েই বা হবে কেমন করে? ছেলেটা বসে বসে ভাবে৷ ভাবতে ভাবতে ভাবতে ভাবতে শেষকালে মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল৷ হঠাৎই৷
পরের দিন মেয়েটির বাবা যখন কাজে বেরোল, তখন ছেলেটা গিয়ে সোজা হাজির হল মেয়েটির বাড়ি৷ মনে মনে ভেবে এসেছে, আজ কী বলবে৷ বাগানে বসে মাটি নিড়াচ্ছিল মেয়েটি৷ ছেলেটা বসল তার পাশে৷ তারপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, 'আচ্ছা, তুমি কি সারাজীবন বিয়ে-থা না করে এরকম একা-একা থাকতে চাও?'
মেয়েটি অবাক হল৷ এরকম প্রশ্ন শোনেনি কখনো আগে৷ এক পলক তাকিয়ে রইল ছেলেটার দিকে, তারপর বলল, 'না৷'
খুশি হল ছেলেটা৷ এবার পরের প্রশ্ন-'আমার খুব ইচ্ছে তোমাকে বিয়ে করার৷ তোমার কি অন্য কাউকে বিয়ে করার ইচ্ছে?'
থমকে গেল মেয়েটা, ভেবে পেল না কী বলে৷ কিন্তু বাবার কাছে কথা দেওয়া আছে, সে কথা তো ভাঙতে পারে না! তাই বলল, 'না৷'
'এখন তো তাই বলছ, কিন্তু তোমার বাবা যদি এসে সব শুনে আপত্তি জানান, তখন আবার তুমি বেঁকে বসবে না তো?'
'না৷'
দারুণ খুশিতে প্রায় নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরে এল ছেলেটি৷ রাতে মেয়েটিও তার বাপকে বলল কী ঘটেছে৷ শুনে গম্ভীর হয়ে বাপ বলল, 'হুঁ! তাহলে তো যতটা অপদার্থ ভেবেছিলাম ততটা নয়! তা না হলে এরকম তিন-তিনখানা প্রশ্ন ভেবে বার করল কী করে? বুদ্ধি আছে, তা মানতেই হবে৷'
অতএব পরের ছুটির দিনে যখন ছেলেটা এসে বাপের কাছে অনুমতি চাইল মেয়েকে বিয়ে করার, বাপ সম্মতি জানিয়ে দিল৷ বিয়ে হয়ে গেল৷
হালের খবর জানি না ওদের, তবে যদ্দিন জানতাম তদ্দিন তো দিব্যি সুখেই ছিল৷ নিশ্চয়ই ভালোই আছে৷

দুই পণ্ডিত বেরিয়েছেন ভ্রমণে৷ একজনের হাতে ছাতা একটা, অন্য জনের হাত খালি৷
হঠাৎ বৃষ্টি নামল৷ দ্বিতীয় পণ্ডিত ব্যস্তসমস্ত হয়ে প্রথম জনকে বললেন, 'ছাতাটা খুলুন শিগগিরি৷'
প্রথম জন গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বললেন, 'লাভ নেই৷'
'লাভ নেই মানে? বৃষ্টিতে ভিজতে হবে না, সেটা লাভ নয়?'
'কে বলল ভিজতে হবে না? ভিজবেন বই কী!'
'তার মানে? ছাতা থাকলে ভিজব কেন?'
'ছাতাটায় বড়ো বড়ো ফুটো আছে অনেক কটা৷'
'তাহলে এনেছিলেন কেন ছাতাটাকে বয়ে সাথে করে?'
'বৃষ্টি হবে ভাবিনি তো!'
রিক্তহস্তে
অনেকদিন আগেকার কথা, তাই বুঝতেই পারছ গোটা ব্যাপারটাই লোকমুখে শোনা, সত্যি ঘটেছিল কি ঘটেনি তা নিয়ে প্রশ্ন তুললে উত্তর দিতে পারব না৷ তবে হ্যাঁ, জাপানে সামুরাইদের যে খুব প্রতাপ আর খ্যাতি ছিল সে বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই৷ বোকুদেন নামে একজন বিখ্যাত সামুরাই ছিলেন, সে সম্বন্ধেও সক্কলেই একমত৷ তাঁকে নিয়েই গল্পটা৷
খেয়া নৌকোয় করে একবার একটা বড়ো নদী পার হচ্ছেন বোকুদেন৷ নৌকো লোকে বোঝাই, চাষিরা হাটুরেরা পসরা নিয়ে যাচ্ছে, নিশ্বাস ফেলার জায়গা পর্যন্ত নেই৷ এর মধ্যে বোকুদেন ছাড়া উঠেছে আর এক সামুরাই৷ তার বয়স অল্প, দেখলে মনে হয় অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না৷ কোমরের দু-দিক দিয়ে ঝুলছে খাপে ঢাকা দুটি বাহারি তলোয়ার৷ অন্য সবার দিকেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে তাকাচ্ছে এই ছোকরা সামুরাই৷
নৌকোর ভিড়ের মধ্যে এক হাটুরে একবার একটু সরে বসতে গেছে, আর ছোকরা সামুরাইয়ের তলোয়ারের খাপে একটু ঠেকে গেছে৷ আর যায় কোথায়! ছোকরা সামুরাই অমনি প্রচণ্ড হুংকার দিয়ে উঠেছে, বলে কিনা 'অপদার্থ গবেট কোথাকার! আমার তলোয়ারে নাড়া দিস এত বড়ো আস্পর্ধা!' হাটুরে তো ভয়ে ভিরমি খাওয়ার জোগাড়৷ কোনোমতে ঢোঁক গিলে বলল, 'হুজুর, ইচ্ছে করে তো করিনি, মাপ করবেন৷' কোথায় কী! ছোকরা সামুরাইয়ের হুংকার তাতেও কমে না৷ কোমরের খাপ থেকে ছোটো তলোয়ারখানা বার করে বলে, 'তোর মতো বেআক্কেলের সঙ্গে এক নৌকোয় জায়গা হবে না আমার৷'
সামনে খোলা তলোয়ার দেখে লোকটির আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে গেছে৷ ঠিক এই সময়ে, ছোকরা সামুরাই যেই পরের হুংকারটা মারতে যাবে, তার আগেই পাশ থেকে হাত তুললেন বোকুদেন৷ বললেন, 'ব্যস, যথেষ্ট হয়েছে৷ লোকটি তো বলেছে যে, ইচ্ছে করে করেনি৷ তাহলে আর অত হাঁকডাক করে হচ্ছেটা কী?'
পাশে ফিরে তাকিয়ে ছোকরা সামুরাই এবার একই সুরে বোকুদেনকে বলল, 'আর আপনি কোথাকার কে মশাই যে মাঝখান থেকে ওস্তাদি করছেন?'
বোকুদেন কিন্তু একটুও চটলেন না৷ খালি বললেন, 'আমিও আপনার মতোই একজন সামুরাই৷ ন্যায্য কথাটা বলছি৷'
শুনে ছোকরা আরোই খাপ্পা৷ বলে, 'ন্যায়-অন্যায় নিয়ে লেকচার দিচ্ছেন যে বড়ো! এই গাধাটা আর আপনি, দু-জনের মোকাবিলাই একা করে দিতে পারি তা মনে রাখবেন৷'
বোকুদেন শুধু বললেন, 'ও তাই নাকি!'
ছোকরা আস্ফালন করে বলল, 'ইয়ার্কি হচ্ছে? জানেন আমি যে গুরুর কাছে তলোয়ার চালানো শিখেছি সেই গুরুর ঘরানাকে কী বলে?'
বোকুদেন বললেন, 'না, কী করে জানব? বলুন৷'
ছোকরা খোলা তলোয়ারটা এগিয়ে ধরে বলল, 'আমাদের নাম হল অপরাজেয়-পরাক্রম ঘরানা৷ দু-মিনিট তলোয়ার ঘোরানো দেখলেই বুঝবেন, কেন এই নাম৷'
বোকুদেন বললেন, 'এই অধম হল রিক্তহস্তে-কার্যোদ্ধার ঘরানার লোক৷ বলি কী, এখানে তলোয়ার ঘুরিয়ে আর কী করবেন, লোকের ভিড়ে এখানে তো নড়বার জো নেই৷ পাড়ে ভিড়লে বরং আপনাতে আমাতে বোঝাপড়া হবে৷ এখন থামুন৷'
ছোকরা হ্যাঃ হ্যাঃ করে হেসে বলল, 'বোঝাপড়া করবেন না কচুকাটা হবেন দেখা যাবে!'
নৌকো এগিয়ে চলেছে৷ বিশাল নদী৷ ও পার যাওয়া পর্যন্ত ছোকরার তর সইবে কি না বলা মুশকিল৷ রাগে গজরাচ্ছে৷ এমন সময়ে মাঝখানে পড়ল ছোটো একটা দ্বীপ৷ বোকুদেন বললেন, 'এই তো মাঝি ভাই! এইখানেই নৌকোটা ভেড়ান না একটু, আমরা দু-জনে নামি মাটিতে৷'
মাঝি নৌকো পাড়ে নিয়ে আসার আগেই লম্ফ দিয়ে মাটিতে পড়ল ছোকরা সামুরাই, দু-হাতে উদ্যত তলোয়ার৷ বোকুদেন মাঝির হাত থেকে একটা দাঁড় নিলেন, যেন তাতে ভর দিয়ে উনিও লাফ মারতে চলেছেন এমনি একটা ভাব৷ শেষ পর্যন্ত অবশ্য দেখা গেল লাফ-টাফ কিছুই না, তীরের কাছাকাছি আসতেই উনি দাঁড়টা দিয়ে পাড়ে বোম্বাই ঠেলা লাগালেন একখানা-নৌকো তিরবেগে চলল নদীর জলে৷ তারপর মাঝিকে দাঁড়টা দিয়ে বললেন, 'জোরসে চালান এবার৷'
দ্বীপ থেকে ছোকরা চেঁচিয়ে বলল, 'কাপুরুষ কোথাকার! আয় ফিরে আয়, দেখি আজ আমারই এক দিন কি তোরই এক দিন! গুরুর চেলা যদি হোস, তো আয় এখানে৷'
নৌকো তখন ভরা গাঙে৷ বোকুদেন চেঁচিয়ে বললেন, 'আগেই তো বলেছিলাম, আমি হচ্ছি রিক্তহস্তে-কার্যোদ্ধার ঘরানার লোক৷ তোমার মতো চুনোপুঁটির মহড়া নেওয়ার জন্য আমাকে যদি তলোয়ার ধরতে হত, তবে আমার নাম বোকুদেন হত না৷'
শুনে অবশ্য সবাই খুব চমকে গেল, কেননা বোকুদেনের নাম শোনেনি এমন লোক তো ছিল না সে দেশে৷ নেহাত তখনকার কালে ফটো তোলার উপায় ছিল না, খবরের কাগজও বেরোত না, তাই বোকুদেনের চেহারাটা কীরকম, সেটা কেউ জানত না৷ আর বোকুদেনের ঘরানাটার নামও তখন অত বিখ্যাত হয়নি৷ 'ফাঁকা' বা 'রিক্ত' অর্থে জাপানি ভাষায় যে শব্দ ব্যবহৃত হয় তা হল 'কারা', আর 'হাত' হল 'তে'-এখন এই ঘরানার নামডাক সারা পৃথিবী জুড়ে৷

আলি থাকত শহরে, বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে৷ আলির অন্যান্য ভাইয়েরা থাকত গাঁয়ে, দেখাশোনা করত খেত-খামার৷ দু-দিকেই সবাই কাজে ব্যস্ত, দেখাসাক্ষাৎ হত কালেভদ্রে৷
একদিন গ্রাম থেকে একজন লোক এসে হাজির আলির কাছে৷ তখন সকাল৷ দরজা খুলল আলিই৷ লোকটি তাকে জানাল, সে আলির ভাইয়ের পড়শি, শহরে এসেছে কাজে৷ কাজ সারতে দেরি হয়ে গেলে যদি রাত্তিরে আর গাঁয়ে ফিরতে না পারে তাহলে আলির বাড়ি রাতটা কাটাতে পারবে কি না৷ আলি বলল, 'একশোবার পারবেন, এ তো আমার সৌভাগ্য! নিশ্চয়ই আসবেন সন্ধেবেলা৷'
সন্ধে বেলা সত্যি সত্যিই ভদ্রলোক এসে হাজির৷ হাতে একটি ঝোলা৷ বললেন, 'নাঃ, দেরিই হয়ে গেল৷ আপনার এখানেই অগত্যা...'
আলি বলল, 'আগেই তো বলেছি, এ বাড়ি আপনার নিজের বাড়ি ভাববেন৷' ভদ্রলোক ঝোলাটি এগিয়ে দিয়ে বললেন, 'এই যে, আসার সময় একটা মুরগি কিনে কাটিয়ে এনেছি, আপনার গিন্নির যদি আপত্তি না থাকে তাহলে রাত্তিরে মুরগির ঝোল খাওয়া যেতে পারে সবাই মিলে৷'
আলি বলল, 'এর দরকার ছিল না, আমিই নাহয় গিয়ে কিনে আনতাম কিছু৷'
যাই হোক, আলির বউ রান্নাঘরে ঢুকল সেই মুরগি নিয়ে৷ আলি যত্ন করে বসাল অতিথিকে, জিজ্ঞেস করল ভাইদের খবরাখবর৷ তারপর রান্না শেষ হলে খাওয়া হল চমৎকার৷ পরদিন সকালে খুশি মনে গাঁয়ে ফিরল ভাইয়ের পড়শি৷
কয়েক দিন না যেতেই আবার গ্রাম থেকে একজন এসে উপস্থিত৷ কে লোকটি? জিজ্ঞেস করতে বলল, 'এই যে কিছুদিন আগে গ্রাম থেকে যিনি এসেছিলেন, যিনি মুরগি কিনে দিয়ে গিয়েছিলেন আপনাকে, আমি তার বন্ধু৷' আলির ভাইদের সে চেনেও না৷ যা হোক, তবু আলি বসাল তাকে খাতির করে, রাত্তিরে আলির বউ পরিপাটি করে রেঁধে দিল৷ পরের দিন গাঁয়ে ফিরল অতিথি, খুশি হয়ে৷
দু-হপ্তা যেতে না যেতেই আবার একজন৷ আলি জিজ্ঞেস করল, 'কী চান?' 'রাতটা থাকতে চাই৷' 'কে আপনি?' 'ওই যে গ্রাম থেকে এক ভদ্রলোক এসেছিলেন... মনে আছে নিশ্চয়ই আপনার... যিনি মুরগি কিনে দিয়েছিলেন... তার এক বন্ধু এসেছিল মনে আছে তো... আমি তার আত্মীয়৷'
আলির একটু রাগ হল৷ সারা তল্লাটের সমস্ত গ্রামের সবার আতিথেয়তার ভার তার একার ওপর পড়াটা কি ঠিক? মুখে অবশ্য কিছু বলল না৷ খেয়েদেয়ে রাত্রিবাস করে সকালে বিদায় নিল অতিথি৷
তার পরের রোববার আবার নতুন অতিথি৷ পরিচয়? 'মুরগি কিনে দিয়ে গিয়েছিলেন যে ভদ্রলোক তাঁকে মনে আছে তো! তাঁর বন্ধুর যে আত্মীয় এসেছিলেন, আমি তাঁর পাশের বাড়িতে থাকি৷'
এইবার আলির ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল৷ অতিথিকে ঘরে এনে বসাল৷ ভেতরে বউকে বলে এল, 'কিছু রান্না করবে না এর জন্য৷' খানিক বাদে লোকটিকে বলল, 'খেয়ে নিন৷' বলে তার সামনে এগিয়ে দিল এক বাটি জল৷
লোকটি একটু অবাক হয়ে তাকাল আলির দিকে, বলল, 'এটা কী?'
আলি বলল, 'সেই যে ভদ্রলোক মুরগি কিনে দিয়ে গিয়েছিলেন, সেই মুরগির ঝোলের আলুগুলো আমরা ফেলে দিইনি, তা দিয়ে একটা তরকারি বানিয়েছিলাম৷ সেই তরকারিটার আলু শেষ হয়ে যাওয়ার পর ঝোলটা দিয়ে বানানো হয়েছিল একটা সুরুয়া৷ আপনাকে যে জলটা দিয়েছি, সেটা ছিল এই সুরুয়ার পাশের বাটিতে৷'
নতুন অতিথি জলে চুমুক মেরে প্রস্থান করলেন৷ হঠাৎ তাঁর রাত্রিবাসের ইচ্ছা লোপ পেল৷ এর পর থেকে আলির বাড়িতে এই রকমের লোক আসাটাও বন্ধ হয়ে গেল৷

দুই বন্ধু গিয়েছিল জঙ্গল দেখতে৷ ঘুরছে ফিরছে, হঠাৎ দূর থেকে দেখতে পেল একটা ভাল্লুক৷ ভাল্লুকটা আবার ওদের দিকেই এগিয়ে আসছে মনে হল৷ দেখে ভয়ে দু-জনেরই আত্মারাম খাঁচাছাড়া৷ ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়োতে শুরু করল এক বন্ধু৷ অবশ্য বনের মধ্যে দিয়ে পথ তো, কত আর জোরে দৌড়োবে?
ভাল্লুক এগিয়েই আসছ৷ দ্বিতীয় বন্ধু প্রথমে ভেবেছিল গাছে উঠবে৷ কিন্তু প্রথম জনকে না জানিয়ে গাছে উঠে গেলে দুজনে আর কেউ কাউকে খুঁজে পাবে না৷ তা ছাড়া, বন্ধু দৌড়ে আদৌ পার পাবে কি না সে সম্বন্ধেও যথেষ্ট সংশয়৷ চট করে এই সব ভাবতে ভাবতে দ্বিতীয় জন দৌড়ে বন্ধুর পেছন পেছন ধাওয়া করল৷ তারপর খানিকটা পেছন থেকেই চেঁচিয়ে বলল, 'করছ কি তুমি? দৌড়ে ভাল্লুককে হারাতে পারবে ভেবেছ? তার ওপর এই জঙ্গুলে পথে?'
প্রথম বন্ধু দৌড়োতে দৌড়োতেই জবাব দিল, 'ভাল্লুককে হারাবার তো দরকার নেই ভাই! তোমাকে হারালেই চলবে৷'

ঘটনাটা... না না, কাহিনিটা... কিংবা সোজা করে বলতে গেলে, গল্পটা৷ হ্যাঁ, এটাকে 'গল্প' বলাই ভালো৷ কারণ, সত্যি বলতে কী, আমার চোখের সামনে ঘটেনি কিছুই৷ নেহাত শোনা কথা৷
ছোট্ট স্টেশন৷ আশেপাশে কয়েকটা দো-চালা ঘর, দু-একটা দোকান৷ আর তার পরেই যেখানে সরকারি অভয়ারণ্যে যাওয়ার রাস্তাটা শুরু হয়েছে, সেখানে গোটা চারেক গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে৷ ওর ওপর নির্ভর করে এই জায়গাটার জীবিকা৷ ট্রেনে করে শহর থেকে লোকজন আসে-ওই দোকানে বসে চা-জলখাবার খায়, ওই গাড়ি ভাড়া নিয়ে অভয়ারণ্য দেখতে চলে যায় তারপর৷
সেদিন ট্রেন থেকে নামলেন এক ভদ্রলোক অভয়ারণ্যে যাওয়ার জন্য৷ রাশভারী চেহারা, বিশাল গোঁফ, সঙ্গে একটা মাঝারি সাইজের সুটকেস৷ অন্যদের মতো তিনিও চায়ের দোকানে বসলেন, বঙ্কু মহাপাত্রর ঠিক পাশের টেবিলে৷ অর্থাৎ অন্যদের মতো তিনিও পড়লেন বঙ্কুর পাল্লায়৷
বঙ্কু মহাপাত্র একবার ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে তাঁকে যেন জরিপ করে নিল, তারপর আস্তে করে বলল, 'দাদা কি আপ ট্রেনটায় এলেন নাকি?'
ভদ্রলোক ভুরু কুঁচকে বললেন, 'হুঁ৷'
'ফরেস্টের দিকে যাবার ইচ্ছে?'
'হুঁ৷'
'সুটকেসের মধ্যে শিকারের বন্দোবস্ত বুঝি?'
এইবার ভদ্রলোকের উত্তরে একটার বেশি অক্ষর শোনা গেল৷ বললেন, 'শিকার? ওখানে শিকার হয় নাকি? আমার তো ধারণা ছিল ওটা অভয়ারণ্য, শিকার করা আইনত বারণ৷'
বঙ্কু মহাপাত্ররও মুখ খুলে গেল৷ হাসতে হাসতে, বেশ মজলিশি মেজাজে বলল, 'আইন? এত রকমের এত আইন আছে মশাই, সব মানতে গেলে শুধু বেঞ্চিতে বসে হাওয়া খেয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে হবে৷ ও আইন কে তৈরি করেছে বলুন দেখি? সে কোনোদিন জঙ্গল দেখেছে? আমাদের এখানকার আইন অন্যরকম৷'
'কীরকম, শোনা যাক৷'
'মাছের কথাই ধরুন৷ এখানকার নদীতে মাছ না ধরলে এতদিনে জলের বদলে শুধু মাছেই নদী ভরতি হয়ে যেত৷ সেটা কি ভালো হত খুব একটা?
'বেশ, তাহলে আপনি মাছ ধরেন৷'
'তা ধরি বই কী৷ তবে আপনার বাক্সে তো ছিপ আছে বলে মনে হচ্ছে না!'
'না, ছিপ নেই৷ মাছ ছাড়া আর কিছু শিকার হয় না বুঝি?'
'কী যে বলেন! শুধু মাছ! বড়ো শিকার আছে না! আপনি তো বুঝেশুনে এসেছেন, এখনই বছরের সবচেয়ে ভালো সময়!'
'কী পাওয়া যায়?'
'খরগোশ, হরিণ এ সব তো পাবেনই, কিন্তু আসল জিনিস হচ্ছে ভাল্লুক৷ এই তো গত রোববার একটা ইয়া বিশাল সাইজের ভাল্লুক মারলাম আমি৷ দেখার মতো জিনিস ছিল মশাই!
'একাই মারলেন?'
'বঙ্কু মহাপাত্রের শাকরেদ লাগে না৷ অভিজ্ঞতার দাম বলে একটা কথা আছে, জানেন তো?'
'তার মানে আগেও ভাল্লুক মেরেছেন?'
'হেঁঃ হেঁঃ! সব কাহিনি শুনতে বসলে আপনার আর শিকার হবে না আজকে৷'
'আমার শিকার হয়ে গেছে৷'
'মানে?'
'আমাকে আপনি চিনতে ভুল করেছেন বঙ্কুবাবু৷ আমি বনবিভাগের ইন্সপেক্টর, এদিকের বনে ভাল্লুকের সংখ্যা কেন এত কমে যাচ্ছে, তা জানবার জন্য আমাকে পাঠানো হয়েছিল৷ কাজটা এত সহজ হবে ভাবিনি৷ রিপোর্টে লিখে দিচ্ছি আপনার কথা৷'
'লিখতে পারেন, তবে কাজ হবে না কোনো৷'
'মুরুব্বির জোরে পার পেয়ে যাবেন ভাবছেন? সে গুড়ে বালি৷'
'না না, সে কথা নয়৷ আসলে কী জানেন, আমাকেও আপনি চিনতে ভুল করেছেন, ইন্সপেক্টরবাবু৷'
'তাই বুঝি? কে আপনি, তাহলে বলুন৷'
'আমি হলাম এ তল্লাটের সবচেয়ে বড়ো গুলবাজ৷ এবং আপনাকে যা যা বলেছি, তার সবই নির্জলা গুল৷'

গ্রামের পুরোহিতের কাছে এল একটি লোক৷ খুব বিচলিত৷ বলল, 'ঠাকুরমশাই, আমি বড়ো বোকা৷ আমার এই বোকামির কি বিহিত হয় না কোনো?'
বুড়ো পুরুত লোকটিকে সান্ত্বনা দেবার সুরে বললেন, 'দেখো বাবা, তুমি যদি বুঝতেই পেরে থাকো যে, তুমি বোকা, তাহলে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে তোমার বোঝবার ক্ষমতা আছে৷ তবে তো তোমাকে আর বোকা বলা যায় না৷'
'তাহলে লোকে কেন বোকা বলে আমায়?'
'আরে মোলো যা! তুমি যদি নিজের বুদ্ধিতে না বুঝে থাকো যে তুমি বোকা, সেটাও যদি অন্যের কথা শুনে বুঝতে হয়, তাহলে তো তুমি নিতান্তই বোকা দেখছি!'
পুজোর ছুটিতে কাজের জায়গা থেকে দেশগাঁয়ে ফিরছে একটি লোক৷ পকেটে টাকা-পয়সা, বাড়িতে এসে ছেলেমেয়ের জামাকাপড় কিনে দিতে হবে, বউয়ের জন্যও কিছু৷
ভাগ্য খারাপ৷ ট্রেন এসে পৌঁছোল দেরি করে৷ ইস্টিশান থেকে গোটা সাতেক গ্রাম পার হয়ে পৌঁছোতে হয় তার বাড়ি৷ দেড় ঘণ্টার মতো হাঁটা৷ তার আধ ঘণ্টা হতে না হতেই অন্ধকার ঘনিয়ে এল৷ আর মিনিট পনেরো যেতে না যেতেই রাস্তার ধার থেকে দৌড়ে এসে একজন জড়িয়ে ধরল তাকে, কপালে ঠেকাল পিস্তলের নল৷ তারপর শুকনো কর্কশ গলায় বলল, 'সাথে যা আছে সব দিয়ে দাও তো দেখি ভালোয় ভালোয়!'
কিছু করার নেই৷ সব টাকা দিয়ে দিতেই হল৷
তরিবত করে ডাকাতটি সব টাকা পকেটে ভরছে, সে দৃশ্যও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে হল লোকটিকে৷ সময় যেটুকু পাওয়া যায়, সেটুকুই কাজে লাগাতে হবে৷ অনুনয়ের সুরে লোকটি তাই বলল, 'দেখুন, বুঝতেই তো পারছেন, পুজোর মুখোমুখি, মাইনের থেকে জমানো এই কটি টাকাই মাত্র সম্বল ছিল আমার৷ বউয়ের কাপড়, ছেলেমেয়েদের জামা, সব কিছুই এই দিয়ে কেনার কথা ছিল৷ এখন এরকম খালি হাতে বাড়ি গিয়ে যদি বলি, রাস্তার ধারে ডাকাতি হয়েছে, তাহলে আমার বউ কি বিশ্বাস করবে সে কথা?'
'তা আমি কী করে জানব?' হুংকার দিয়ে বলল ডাকাত৷
'দোহাই, আপনি কিছুটা সাহায্য করুন আমায়৷ যাতে আমার বউ অন্তত বিশ্বাসযোগ্য মনে করে আমার কথাটা৷'
'কী করতে হবে আমাকে?'
'আমার চাদরের মধ্যে গুলি করে দিন একটা৷ গুলির ফুটো দেখলে বুঝবে যে ডাকাতি হয়েছিল৷'
ডাকাতটা হাসল, তারপর লোকটার চাদরের এক প্রান্ত টেনে ধরে তার মধ্য দিয়ে চালিয়ে দিল পিস্তলের গুলি৷
'হ্যাঁ, বেশ দেখাচ্ছে৷ এবারে জামার হাতায় একটা৷'
ডাকাতটি জামার হাতা ঘেঁষে গুলি ছুড়ল একটা, হাতায় গুলির গর্ত হয়ে গেল৷ লোকটি বলল, 'অন্য হাতটাতেও একটা দিয়ে দিন না!'
ডাকা বিরক্ত হয়ে বলল, 'যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়৷ এত সময় নষ্ট করতে পারব না৷ তা ছাড়া আর গুলিও নেই৷'
'অ্যাঁ, আর গুলি নেই?' বলতে বলতে আস্তিন গুটিয়ে এবার এগিয়ে এল লোকটি, ডাকাতকে ধরল চুলের মুঠি চেপে, তারপর আড়ং ধোলাই দিয়ে তাকে রাস্তায় লম্বা করে শুইয়ে ফেলল৷ আর কয়েকটি রদ্দা দিতেই ডাকাত বাবাজি অচৈতন্য হয়ে পড়লেন একেবারে৷ তখন ডাকাতের পকেট থেকে টাকাগুলো সব বার করে নিজের পকেটে পুরে আবার রাস্তা ধরে হাঁটা লাগাল লোকটি৷
সামনে বড়ো উৎসবের দিন৷ রাবির সঙ্গে দেখা করতে এল একটি লোক৷ মুখচোখ শুকনো৷
'কী হয়েছে?' -জিজ্ঞেস করলেন রাবি৷
'বলেন কেন বাবাঠাকুর, বড়োই মুশকিলে পড়েছি৷'
রাবি সান্ত্বনার সুরে বললেন, 'ভগবান নিশ্চয়ই সাহায্য করবেন তোমায়৷ বলো, কী তোমার অসুবিধে৷'
লোকটি বলল, 'এই তো সামনে পরব আসছে, কিচ্ছু কেনাকাটা হয়নি, পুরোনো জামাকাপড় সব এমনই শতচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যে, তা পরে লোকসমক্ষে বেরোনো যায় না৷ তার ওপর পুজোর জোগাড়যন্তরের জন্যও কিছু তো কিনতে হবে! হাজার দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘুরছি, মাথা ছিঁড়ে পড়ছে যেন৷'
রাবি বললেন, 'বেশ তো, গুছিয়ে বলো কী কী দুশ্চিন্তা তোমার, কিছুটা সুবিধে ভগবান করবেন নিশ্চয়ই৷'
লোকটি বলল, 'প্রথমে দেখুন, পুজোর প্রসাদের জন্য কিছু কিনতে হবে৷'
রাবি বললেন, 'কত লাগবে তাতে?'
'গোটা পনেরো টাকা তো বটেই৷'
'বেশ তো, আর কী?'
'ছেলেমেয়েদের জন্য কয়েকটা জামাকাপড় না কিনলেই নয়৷'
'তাতে কত লাগবে?'
'ধরুন চল্লিশ টাকা মতন৷'
'বেশ, আর?'
'বউয়ের জন্যও একটা পোশাক যদি কেনা যেত, গোটা পঁচিশেকের মধ্যে৷'
'বেশ৷ আর?'
'সত্যি বলতে কী, সবই তো বোঝেন, পরবের দিনে নতুন একটা জামা পরার ইচ্ছে তো আমারও হয়!'
'নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই, কিনবে বই কী! কত লাগবে?'
'কুড়ি ধরুন৷'
'বেশ, আর কিছু?'
'আরও বলব?'
'কেন বলবে না, নিশ্চয়ই বলবে৷ সংকোচ করছ কেন?'
'বাবা-মাকে কিছু দিতে পারলে ভালো লাগত৷'
'কত লাগবে তাতে?'
'দু-জনের মোট ধরুন পঞ্চাশ৷'
'বেশ৷ আর?'
'আজ্ঞে না, আর কী?' -বলে একটু আশায় মুখ তুলে তাকাল লোকটি৷
এক মুহূর্ত চিন্তা করে নিলেন রাবি৷ তারপর বললেন, 'দেখো, তুমি বলেছিলে তোমার অনেক দুশ্চিন্তা৷ তোমার ফিরিস্তি যোগ দিয়ে দেখছি, এই সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর করতে তোমার মোট লাগবে দেড়শো টাকা৷ তাহলে এখন আর পুজোর জিনিস, ছেলেমেয়েদের জামাকাপড়, বউয়ের পোশাক, তোমার নিজের জামা, বাবা-মায়ের প্রণামি-এই এত সব নিয়ে দুশ্চিন্তা করবার দরকার নেই, এখন কেবল একটা কথাই ভাবো, দেড়শোটা টাকা কোথা থেকে জোগাড় করা যায়৷ দেখো দেখি, অনেকগুলো দুশ্চিন্তায় বদলে এখন একটা মাত্র দুশ্চিন্তা, কত সুবিধে!'


একই লোককে নিয়ে দুটো গল্প৷ অবশ্য গোড়াতেই বলে নেওয়া ভালো যে, এ লোকটিকে নিয়ে এরকম অনেক গল্পই আছে৷ বেছে বেছে তার মধ্যে থেকে দুটোই কেবল এখানে বলছি৷
এই লোকটি একবার পোস্ট অফিসে গেছে, একটা চিঠি পাঠাবে বলে৷ একেবারে চিঠি লিখে খামে ভরতি করে আঠা লাগিয়ে, বাড়িতে স্ট্যাম্প ছিল তা পর্যন্ত লাগিয়ে নিয়ে গেছে৷ হলে হবে কী, পোস্ট অফিসের লোকেরা তার চিঠিটা নিয়ে ওজন করে বলল, 'চিঠিটা ভারী আছে৷ আরও স্ট্যাম্প লাগাতে হবে৷'
শুনে তাজ্জব হয়ে গেল লোকটি৷ বলল, 'এমন আশ্চর্য কথা জীবনে শুনিনি দাদা৷ বলছেন চিঠিটা একেই ভারী, তার ওপরে আরও স্ট্যাম্প লাগালে তো আরও ভারী হয়ে যাবে! বরং বলুন কিছু স্ট্যাম্প খুলে নিই৷'
নিজের অফিসেও লোকটির মুশকিল হয় নানা কথায়৷ একবার শীতের দিনে, জানলা খোলা রেখেই কাজ করছিল লোকটি৷ পাশের টেবিলের ভদ্রলোক বললেন, 'দাদা, বাইরে বড্ড ঠান্ডা, জানলাটা বন্ধ করে দিন৷'
লোকটি তো অবাক৷ এ বলে কী! জানলাটা বন্ধ করে দিলেই কি বাইরেটা গরম হয়ে যাবে নাকি!

একই অফিসে কাজ করে দু-জনে৷ দু-জনেরই বাড়ি দূরের গ্রামে, শহরে একা একা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে চাকরির জন্য৷ রোববারটা কাটতে চায় না৷ এক বন্ধু আর এক বন্ধুকে নেমন্তন্ন করল তার বাসায় রোববার দুপুরে৷
খাওয়াদাওয়া হয়ে গল্পগুজব চলছে তো চলছেই, সময়ে হুঁশ নেই কারোরই৷ হঠাৎ দ্বিতীয় বন্ধু চমকে উঠে বলল, 'এই রে, দেরি হয়ে গেল বোধ হয়৷ বেরিয়ে একটা কাজে যেতে হবে৷ কটা বাজে বলো দেখি, ঘড়িটা আনতে ভুলে গেছি৷'
প্রথম বন্ধু উঠে জানলা খুলল, আকাশের দিকে তাকাল৷ সূর্য আকাশের কোথায়, তা দেখে অন্যজনকে বলল, 'এখন বাজে সাড়ে তিনটে৷'
দ্বিতীয় জন বলল, 'ঘড়ি দেখে ঠিক করে বলো না!'
প্রথম বন্ধু বলল, 'ঘড়ি তো বাপু আমার নেই৷ আমি এইভাবেই সময় দেখি৷ তবে চিন্তার কোনো কারণ নেই৷ এত পোক্ত হয়ে গেছি যে, পাঁচ মিনিটের বেশি এধার-ওধার হয় না৷'
দ্বিতীয় বন্ধু তাজ্জব হয়ে গেল৷ 'তোমার ঘড়ি নেই? আশ্চর্য!'
'কেন, আশ্চর্য হওয়ার কী আছে, দিব্যি তো চলে যাচ্ছে৷'
'বেশ, নাহয় মানলাম, দিনের বেলার জন্য ঘড়ির দরকার নেই তোমার৷ কিন্তু রাত্তিরে? ধরো, হঠাৎ যদি ঘুম ভেঙে যায়, আর মনে হয়, কটা বাজে, তখন তো বুঝতে পারবে না!'
'ঃও, সে জন্য আমার একটা সানাই আছে৷'
'সানাই তো একরকমের বাজনা বলেই জানতাম৷ তা দিয়ে সময় জানা যায় তা তো শুনিনি!'
'হ্যাঁ যায়৷ ধরো, রাত দুপুরে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল৷ তখন আমি করি কী, একটা জানলা খুলে সানাইটা বাজাতে শুরু করি৷ মোটামুটি সঙ্গে সঙ্গেই আশেপাশের কোনো একটা বাড়ির জানলা খুলে যায়, আর তা থেকে মুখ বাড়িয়ে কেউ একজন চিৎকার করে ওঠে৷ যদি বলে-এই রাত্তির আড়াইটের সময়ে কার আবার বাজনার শখ উঠল? তাহলে বুঝি আড়াইটে বাজে৷ যদি বলে-এই ভোররাত্তিরে চারটের সময়ে..., তাহলে বুঝি চারটে বাজে৷ কোনো অসুবিধে হয় না৷'

দুই বন্ধু মিলে সিনেমা দেখতে গেছে৷ ঢুকেছে যখন, তখনও সিনেমা শুরু হতে কয়েক মিনিট বাকি৷ এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে প্রথম বন্ধুর চোখে পড়ল, তাদের ঠিক সামনের সারিতে ডানদিকে ছেড়ে বসে আছেন মাথা-ভরতি টাকওয়ালা একজন লোক৷ তেল-চুকচুকে টাক, দেখলেই হাত বোলাতে ইচ্ছে করে৷ তাই বলে অচেনা একজনের টাকে কি বেমক্কা হাত বোলানো যায়!
মনের মধ্যে কথাটা সুড়সুড় করতে থাকে৷ তাই শেষমেশ বন্ধুকে বলে, 'তুই ওনার টাকে হাত বোলাতে পারবি?'
বন্ধু বলল, 'হাত বোলাতে যাব কেন খামোখা?'
প্রথম বন্ধু বলল, 'ধর, যদি বাজি ধরি যে তুই পারবি না? তাহলে? যদি পারিস তাহলে আমি তোকে পাঁচ টাকা দেব, যদি না পারিস তাহলে তুই দিবি আমায়৷'
দ্বিতীয় বন্ধু বলল, 'এ বাজি হারার কোনো প্রশ্নই নেই, এ তো খুব সহজ৷' বলে, পেছন থেকে সেই ভদ্রলোকের টাকে হাত বোলাল একবার৷ ভদ্রলোক চমকে পেছন ফিরে তাকাতেই ঝড়ের বেগে বলে চলল, 'আরে কানাই, কী খবর তোর? কতদিন বাদে দেখা! তারপর কেমন আছিস বল! কোথায় থাকিস, কী করিস, কিছুই জানি না৷ আমি তো বেলগাছিয়ায় আছি, জানিস তো! এই গত বছর পাঁচেক৷'
সামনে টাকওয়ালা ভদ্রলোক হাঁ হাঁ করে বলতে গেলেন, 'বোধ হয় ভুল করছেন, আমি তো আপনাকে চিনি না, তা ছাড়া...', কিন্তু ঠিক এই সময় সিনেমা শুরু হয়ে গেল, আশপাশের লোকজন হইহই করে বলে উঠল, 'দাদা বসুন, চুপ করুন'৷
যে যার জায়গায় বসে পড়ল, সিনেমা শুরু হল৷
অন্ধকারের মধ্যে ফিসফিস করে প্রথম বন্ধু বলল দ্বিতীয়কে 'শোন, পাঁচ টাকা তো তুই পাবিই৷ কিন্তু তুই যদি ভদ্রলোকের টাকে আর একবার হাত বোলাতে পারিস, তাহলে তোকে আরও দশ টাকা দেব৷ বাজি?'
দ্বিতীয় বন্ধু বলল, 'বাজি৷'
সিনেমার মাঝখানে যখন বিরতি হল, তখন দ্বিতীয় বন্ধু আবার হাত বোলাল সেই ভদ্রলোকের টাকে৷ ভদ্রলোক পেছনে ঘুরতেই বলল, 'তোর ব্যাপারটা কী বল তো কানাই? তখন এমন একটা ভাব করলি যেন আমাকে চিনতেই পারিসনি! সত্যি পারছিস না, নাকি ডাঁট বেড়েছে, পুরোনো বন্ধুদের চেনা দিলে এখন মান থাকছে না!'
ভদ্রলোক বললেন, 'দেখুন, আপনি কিছু একটা ভুল করছেন৷ আমার নাম কানাই নয়৷ মিছিমিছি এই সিনেমা হলের মধ্যে আর এ নিয়ে অযথা কথা বাড়াবেন না৷'
কথা বাড়াবার অবশ্য দরকারও ছিল না দ্বিতীয় বন্ধুর৷ তার কাজ হয়ে গিয়েছিল৷ তাই শুধু বলল, 'বেশ, যা বোঝার বুঝলাম৷'
বিরতির পর আবার যখন সিনেমা শুরু হল, প্রথম বন্ধু দ্বিতীয়কে বলল, 'পনেরো টাকা পাওনা হল তোর৷ এইবার একটা কথা বলি শোন৷ কথায় বলে, বার বার তিনবার৷ এর পরেও যদি আর একবার তুই হাত বোলাতে পারিস ওনার টাকে, তাহলে... নাঃ, তাহলে টাকা-ফাকা নয়, তাহলে তোকে আমি গুরু বলে স্বীকার করে নেব৷' দ্বিতীয় বন্ধু বলল, 'তবে তৈরি হ৷'
সিনেমা শেষ হল, সবাই হল থেকে বেরোচ্ছে৷ দুই বন্ধুর একটু সামনে অবার সেই ভদ্রলোক৷ দ্বিতীয় বন্ধু আবার হাত বোলাল তাঁর টাকে৷ ভদ্রলাক প্রায় মারমুখী হয়ে পেছনে ফিরে তাকালেন দুই বন্ধুর দিকে৷ তখন দ্বিতীয় বন্ধু একগাল হেসে বলল, 'আরে কানাই, তুই এখানে! কী বলব দেখ, হলের মধ্যে অন্য এক ভদ্রলোককে তুই ভেবে দু-বার তাঁর মাথায় হাত বোলালাম৷ ভাগ্যিস ভদ্রলোক কিছু মনে করেননি!'

ডাক্তারের কাছে এলেন এক ভদ্রলোক৷ হাঁটুতে খুব ব্যথা হয়েছে, সেইজন্য৷ ডাক্তার দেখেশুনে বললেন, 'ওষুধবিষুধ লাগবে না৷ আপনি শুধু রাত্তিরে শোবার আগে আধ ঘণ্টা করে বরফ লাগান হপ্তাখানেক৷'
ভদ্রলোক শুনে অবাক৷ প্রায় আঁতকে উঠে বললেন, 'বরফ?'
'হ্যাঁ, বরফ৷ দেখে মনে হচ্ছে কথাটা জীবনে এই প্রথম শুনলেন!'
'না না, ঠিক তা নয় ডাক্তারবাবু৷ আসলে ব্যথাটা যখন শুরু হল, তখন বাড়িতে আমার চাকর বলছিল গরম সেঁক দিতে৷ সেইজন্য বরফের কথা শুনে অবাক হচ্ছিলাম৷'
এবার ডাক্তার হতভম্ব৷ আমতা আমতা করে খালি বললেন, 'গরম সেঁক! তবে যে আমার চাকর বলে বরফ লাগাতে!'

বাজারে মাছ বেচে গোপাল৷ সাধ হল, বড়ো বড়ো দোকানে যেমন সাইনবোর্ড লাগায়, তেমনি লাগাবে একটা৷ শোভা বাড়বে দোকানের৷
যে কথা সেই কাজ৷ পয়সাকড়ি খরচ করে করাল এক সাইনবোর্ড৷ তাতে সুন্দর করে লেখা-'এখানে টাটকা মাছ বিক্রি হয় '৷
বোর্ড টাঙাবার দশ মিনিটের মধ্যেই একজন বললেন, 'লেখাটা হয়েছে বেশ৷ তবে নিশ্চয়ই লোকে ভাববে না যে দেড় মাইল দূরে টাটকা মাছ বিক্রি হয়৷ এখানেই এসে খোঁজ করবে৷'
অকাট্য যুক্তি৷ আবার সাইনবোর্ড-লিখিয়েকে ডাকল গোপাল৷ 'এখানে' কথাটা বাদ পড়ল৷ পয়সাও খরচ হল আরও কিছু৷
দু-দিন বাদে আবার একজন চিন্তাশীল লোক মন্তব্য করলেন, 'আচ্ছা, ওই 'বিক্রি হয়' কথাটা একটু কেমন কেমন শোনাচ্ছে না? মাছ বিক্রি হবে না তো কী হবে? বাজারের মধ্যে মাছ বিলিয়ে তো আর দেয় না কেউ! তাহলে শুধু 'টাটকা মাছ' লিখলেই কি হত না?'
আবার কিছু পয়সা গচ্ছা গেল বটে, কিন্তু এবার লেখাটা ছিমছাম হল বেশ-'টাটকা মাছ'৷
ও হরি! হপ্তাখানেক যেতে না যেতেই তুমুল শোরগোল তুললেন পাশের মাছওয়ালা, 'এটা কীরকম ঢং হল? সকলেই তো আমরা টাটকা মাছ বেচি৷ তাহলে অত ঘটা করে 'টাটকা' লেখার মানেটা কী? আমরা কি পচা মাছ বেচি নাকি? শুধু 'মাছ' লিখলে কী এমন অসুবিধেটা হত, শুনি?'
তা বটে৷ অন্য মাছওয়ালাদের কটাক্ষ করতে তো চায়নি গোপাল৷ অতএব আরও কিছু দক্ষিণা দিয়ে নতুন করে রং করানো হল সাইনবোর্ডটাকে৷ এবার লেখা- 'মাছ'৷
দিন দশেক পরের কথা৷ মাছ কিনতে এসে সাইনবোর্ডের দিকে তাকিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন একজন৷ বললেন, 'দেখেই তো দাদা চেনা যাচ্ছে যে মাছ৷ গন্ধেও মালুম দিচ্ছে৷ লেখাটার দরকারটা কী?'
সাইনবোর্ডটা ফেলে দিয়ে এল গোপাল৷ আপদ গেল৷ শান্তি৷

একটা পার্কের মধ্যে একজায়গায় দেখা গেল, একটা লোক শাবল দিয়ে মাটি খুঁড়ছে৷ খুঁড়তে খুঁড়তে বেশ হাতখানেক গভীর হল৷ তারপর সে চলে গেল৷ তার আধ ঘণ্টাটাক পরেই এল আর একটা লোক৷ ঢিবি করা মাটি গর্তের মধ্যে ফেলল সে, তারপর পা দিয়ে চেপে চেপে বন্ধ করে দিল গর্ত৷
অবাক হল সবাই৷ এ আবার কেমন ধারা কাজের? সঙ্গে সঙ্গে বুজিয়েই যদি দিতে হয়, তবে মিছিমিছি কী দরকার ছিল গর্তটা খুঁড়বার?
ফোন করা হল শহরের কর্মকর্তাদের৷ ব্যাপারটা কী?
বিব্রত হলেন কর্মকর্তা৷ 'এ হে হে, বড়ো ভুল হয়ে গেছে! আসলে দু-জনের মাঝখানে আরও একজন লোককে পাঠাবার কথা ছিল, কিন্তু সে আজকে আসেনি, তার জায়গায় অন্য কাউকেও পাইনি৷'
'কী হত সেইজন এলে?'
'তার কাজ ছিল, প্রথম জন কাজ শেষ করে চলে যাওয়ার ঠিক পরে গিয়ে ওই গর্তের মধ্যে একটা ফুলগাছের চারা পুঁতে দিয়ে আসা৷'
গল্পটা শুনেছিলাম আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে৷ দুঃখ করে বেচারা বলেছিল, 'বুঝলে, এ হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাস৷ আমরা এক-এক বার যুদ্ধ করতে করতে সব ভাঙি, তারপর চুক্তি-টুক্তি করে সেই ভাঙনের দাগ বুজিয়ে দিই৷ কিন্তু মাঝখানে শান্তির ফুল ফুটাবার জন্য যে গাছ লাগানো দরকার, সেই কথাটাই ভুলে যাই, সেই কাজটাই করা হয়ে ওঠে না কখনো৷'

দানধ্যান
শহরে স্বেচ্ছাসেবকদের দল আছে একটা, তারা এটা-সেটা ভালো ভালো কাজ করে৷ শীতের সময়ে গরিবদের চাদর দেয়, গ্রামে বন্যা হলে ত্রাণ পাঠায়, এইরকম সব কাজ৷ শহরের লোকজনেও এদেরকে সাধ্যমতো টাকাপয়সা দেয়, অন্যান্য জিনিসপত্র দিয়েও সাহায্য করে৷
বছরের শেষে হিসেব মেলাতে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবকদের চোখ ছানাবড়া৷ শহরের সবচেয়ে ধনী লোক যিনি, তিনি কোনোদিন এক পয়সাও দান করেননি৷ হয়তো না চাইলে তিনি দেবেন না৷ তাঁর কাছে তো চাওয়া হয়নি কখনো, এই ভেবে তাঁর বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হল দলের দু-জন সদস্য৷
বিনীতভাবেই ভদ্রলোককে তারা বলল, 'দেখুন, আমরা খোঁজখবর করে যেটুকু যা দেখছি, তাতে আপনার সারা বছরের আয় দশ লক্ষ টাকার বেশি৷ অথচ দান-ধ্যান বাবদ আপনি কিছু কখনো দেননি৷ সমাজের কাছ থেকে যখন এত পাচ্ছেন, তখন প্রতিদানে সমাজের ভালোর জন্য সামান্য কিছু দিতে নিশ্চয়ই আপত্তি হবে না আপনার৷'
ধনী লোকটি একটু চুপ করে রইলেন৷ তারপর বললেন, 'তোমরা তো অনেক খোঁজখবর করেছ বলছ৷ তা এত সব খোঁজ নেওয়ার সময়ে কি জানতে পেরেছ যে, আমার মা দীর্ঘদিন ধরে ভুগতে ভুগতে এখন মৃত্যুশয্যায়, মায়ের চিকিৎসার জন্য যা খরচ হয়, মায়ের নিজের পক্ষে তার শতকরা দশ ভাগও মেটানো সম্ভব নয়?'
শুনে খানিকটা বিব্রত বোধ করল স্বেচ্ছাসেবকরা৷ এটা তারা জানত না৷ ঢোক গিলে তাই আমতা আমতা করে বলল, 'আজ্ঞে না, এটা...'
'কিংবা ধরো আমার ভাই৷ সৈন্যদলে ডাক্তার ছিল, দু-বছর আগে যুদ্ধের সময়ে গোলা লেগে তার একটা হাত আর একটা পা উড়ে গেছে৷ এখন পঙ্গু অবস্থায় হুইলচেয়ারে তাকে থাকতে হয়, সে কথা খোঁজখবর করার সময়ে তোমাদের নজরে এসেছিল?'
কী একটা বলতে গেল একজন স্বেচ্ছাসেবক, কিন্তু তার আগেই ধনী লোকটি আবার শুরু করলেন- 'আমার ভগ্নীপতি গাড়ির অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেল মাস ছয়েক আগে, বোনটার তিনটে বাচ্চা, তাদের খাওয়াবারও পয়সা নেই, ভালোমতো মানুষ করা তো দূরের কথা৷ এ খবর কি তোমরা জান?'
কোনোমতে তোতলাতে তোতলাতে স্বেচ্ছাসেবকদের একজন বলল, 'আমাদের ভুল হয়ে গেছে...'
'হ্যাঁ, ভুল তো হয়েছেই৷ আমার মা-ভাই-বোনের এই অবস্থা, তাদেরকেই আমি একটি পয়সা দিই না৷ তাহলে তোমরা কী করে আশা করলে যে তোমাদেরকে দেব?'

তিন পাদরির মধ্যে কথা হচ্ছিল৷ প্রত্যেক গির্জাতেই উপাসনা করতে এসে লোকেরা কিছু টাকাপয়সা প্রণামি দিয়ে যায়৷ তার থেকে কিছু পয়সা গির্জার উন্নতির জন্য রাখা হয়, বাকিটা পান পাদরি, তাঁর নিজের রাহাখরচ হিসেবে৷ কথায় কথায় কথা উঠল, কী করে এই ভাগ করা হয়? পাদরি কতটা গির্জার জন্য রাখেন, আর কতটা নিজের জন্য?
প্রথম পাদরি বললেন, 'আমার নিয়মটা ভাই খুব সহজ৷ লোকজন তো দানপাত্রে পয়সা ফেলে যায়৷ সবাই চলে গেলে আমি মেঝের ওপর খড়ি দিয়ে একটা সোজা লাইন টানি৷ তারপর দানপাত্রটাকে ধরে পয়সাগুলো ছুড়ে ফেলি মেঝের ওপর৷ তাতে যে পয়সাগুলো দাগের বাঁ দিকে পড়ে সেগুলো রাখি ভগবানের জন্য, আর ডানধারের পয়সাগুলো রাখি আমার জন্য৷'
দ্বিতীয় জন বললেন, 'আমার নিয়মটাও অনেকটা ওই ধরনের৷ আমি মেঝের ওপর একটা গোল দাগ আঁকি৷ পয়সাগুলো ছুড়ে দিই মাটির ওপর৷ গোলের মধ্যে যে পয়সাগুলো পড়ে সেগুলো ভগবানের, আর বাইরে যেগুলো পড়ে সেগুলো আমার৷'
এবার দু-জনে মিলে তৃতীয় জনকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আর আপনি কী করেন?'
তৃতীয় জন বললেন, 'আমার নিয়মটাও আপনাদেরই মতো৷ তবে আমি দাগ-টাগ দিই না৷ দানপাত্রটাকে নিয়ে সব পয়সাগুলো ওপর দিকে ছুড়ে দিই৷ তার মধ্যে যেগুলো মাটিতে ফিরে আসে সেগুলো আমার জন্য রাখি, আর যেগুলো ওপরেই থেকে যায় সেগুলো সব ভগবানের৷'

তিনকুলে কেউ নেই, বুড়ি থাকে তার ছোট্ট কুঁড়েঘরে৷ এর-ওর-তার ফাইফরমাশ খেটে দেয়, তা থেকে দু-চারটে পয়সা পায়, আর তা ছাড়া চেয়েচিন্তে এটা-ওটা, ব্যাস, ওতেই দিন চলে যায় বুড়ির কোনোমতে৷
কিন্তু সেবার ভয়ংকর ঝড় এল, উড়ে গেল বুড়ির বাড়ির চালের অর্ধেকটা৷ নতুন করে চাল না ছাইলেই নয়৷ কিন্তু টাকা কোথায়, কে দেবে টাকা?
কোনো উপায় নেই, তাই অগত্যা বুড়ি ঠিক করল, ভগবানের কাছে চাইবে টাকা৷ কী করে খবর পাঠাবে ভগবানকে? বুদ্ধি খেলে গেল বুড়ির মাথায়, পোস্ট অফিস থেকে কিনে আনল একটা পোস্টকার্ড, তারপর গোটা গোটা অক্ষরে তাতে লিখে দিল-'হে ভগবান, দয়া করে আমাকে একশোটা টাকা পাঠিয়ো৷ বড়ো দরকার৷'
লেখা তো হল, কিন্তু ভগবানের ঠিকানা পাবে কোথায়? ঠিকানা তো জানা নেই বুড়ির! তবে কিনা, ভগবান তো খুব নামকরা লোক, ডাকপিয়োন নিশ্চয়ই জানবে ওনার ঠিকানা৷ সেই ভরসায় চিঠির ঠিকানার জায়গায় বুড়ি লিখে দিল, 'ভগবান'৷
ডাকপিয়োনের হাতে পড়ল চিঠি৷ ঠিকানা দেখে তো তার চক্ষু চড়কগাছ৷ এ যে ভগবানের কাছে চিঠি! কে লিখল, কী লিখল, তা জানবার বড়ো কৌতূহল হল পিয়োনের৷ চিঠিটা উলটে দেখে, বুড়ি মিনতি করেছে একশোটা টাকার জন্য৷
দেখে বড়ো করুণা হল পিয়োনের৷ আহা বেচারা বুড়ি, একা একা কত কষ্টে আছে, তার ওপর ঝড়ে ঘর ভেঙেছে, নিশ্চয়ই টাকাটার বড়োই দরকার! কী করা যায়?
সবার বাড়িতে যায় পিয়োন, আর বলে, 'বুড়ির ঘর সরাবার জন্য কিছু সাহায্য করুন না! সামান্য হোক, যাহোক কিছু পয়সা দিন৷ তবে একটা কথা, বুড়িকে বলবেন না যেন কথাটা৷ আমরা চাঁদা তুলছি জানলে বুড়ি নেবেই না হয়তো টাকা৷'
সকলে একটু একটু করে পয়সা দেয়, এই করে সব শেষে পিয়োন দেখল, আশি টাকা উঠেছে মোট৷ মন্দ নয় নেহাত! তখন সেই টাকা একটা খামে করে ভরে, ওপরে লিখে দিল, 'ভগবানের কাছ থেকে আসছে, বুড়ির জন্য চিঠি৷' লিখে, সেই খাম বুড়িকে দিয়ে এল৷ বলল, 'ও বুড়িমা, ডাকে চিঠি এসেছে আপনার৷'
খাম খুলে তো বুড়ি আহ্লাদে আটখানা৷ একশো পুরো না, আশি টাকা, তবু তা দিয়ে টেনেটুনে ঘর ছাওয়া হয়ে গেল৷ পিয়োন আসতে যেতে দেখে, আর ভালো লাগে তার৷
ভালোই আছে বুড়ি৷ কিন্তু সুখ কি বেশি দিন সয়! সেবার শীত পড়ল প্রচণ্ড৷ একটা কাঁথার বড়োই দরকার হয়ে পড়ল৷ ভগবানের ওপর এখন অগাধ বিশ্বাস বুড়ির, জানে তিনি তাকে বিমুখ করবেন না, তাই আবার চিঠি লিখে দিল একটা৷
আবার পিয়োনের হাতে পড়ল সেই চিঠি৷ পিয়োন দেখে, তাতে লেখা, 'হে ভগবান, বড়ো শীত
পড়েছে, কাঁথা কেনার জন্য তিরিশটা টাকা পাঠিয়ো৷ তবে এবার বাপু নিজে এসে টাকাটা দিয়ে যেয়ো৷ আগেরবার সেই যে একশোটা টাকা চেয়েছিলাম, তুমি তো পিয়োনের হাত দিয়ে পাঠালে৷ পিয়োন ব্যাটা তার থেকে কুড়িটা টাকা সরিয়ে নিয়েছে, কী আর বলব!'

রাস্তার মোড়ে বসে অন্ধ ভিখিরিটা চ্যাঁচাচ্ছিল, 'দশটি পয়সা বাবু, দশটি পয়সা মা৷' রাস্তা দিয়ে কত লোক এল গেল, কেউই ফিরে তাকায় না৷ সন্ধে হয়ে গেল, রাত্তির গড়াল, ভিখিরি পয়সা পেল না৷ জেরবার হয়ে শেষ পর্যন্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, 'হে ভগবান, চেয়েছি দশটা মাত্র পয়সা, সেটুকুও দিতে পারলে না?'
রাস্তার উলটোদিকের বাড়ির গিন্নি সামনের বারান্দায় বসে ছিলেন, শুনতে পেলেন কথাটা৷ বড়ো মায়া হল শুনে৷ হাতের কাছে পাঁচটা পয়সা ছিল, ভাবলেন, দিই ভিখিরিকে৷
রাত্তির হয়ে গেছে, তাই আর বেরোতে ইচ্ছে করল না৷ ভিখিরি বসে আছে রাস্তার উলটোদিকে, অত দূরে ছুড়েও দেওয়া যাবে না পয়সাটা৷ অন্ধ মানুষকে কাছে আসতে বলাটাও খারাপ দেখায়৷ উঠোনে পড়ে ছিল একটা ঢিল, সেটার সঙ্গে পয়সাটা বেঁধে গিন্নি ছুড়ে দিলেন ভিখিরির দিকে৷
হবি তো হ, ঢিলটা গিয়ে লাগল সোজা ভিখিরির কপালে, ব্যথায় চমকে আর্তনাদ করে মাথা ঢেকে ফেলল ভিখিরি৷ তারপরে হাতড়ে দেখে, ঢিলটার সাথে বাঁধা রয়েছে পয়সা৷ পাঁচ পয়সা৷
হাতজোড় করে প্রণাম করল ভিখিরি ভগবানকে৷ মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, 'দয়াময় হরি! দশটা পয়সা চেয়েছিলাম৷ কী ভাগ্যিস দিয়েছ পাঁচ পয়সা৷ পাঁচ পয়সারই যা তেজ, দশ পয়সা দিলে বোধ হয় আমার মাথাটা একেবারে চৌচির হয়ে যেত৷'

সারা পাড়ায় সবাই ক্যাথলিক৷ শুক্রবারে ক্যাথলিকদের মাংস খাওয়া বারণ৷ মাছ চলতে পারে, কিন্তু মাংস নৈব নৈব৷ অথচ প্রত্যেক শুক্রবার বিকেলেই মাংস রান্নার গন্ধ ভেসে আসে৷ কোথা থেকে আসে? খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, একটি বাড়িতেই মাংস রান্না হয় প্রতি শুক্রবারে, সে বাড়ির বাসিন্দারা নতুন এসেছে পাড়ায়, কারুর সঙ্গে আলাপ নেই তেমন৷
তা বলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ যাবে, আর পাড়ায় চলতে থাকবে এমন অনাচার? তা তো হতে দেওয়া যায় না! পাড়ার কর্তাব্যক্তিরা গিয়ে আলাপ করলেন নতুন বাড়ির লোকের সঙ্গে৷ বাসিন্দা একজনই, এক যুবক, কিন্তু তার দোষ নেই মাংস খাওয়ার ব্যাপারে৷ কারণ সে ক্যাথলিক মতাবলম্বী নয়, ধর্মে সে ইহুদি৷ ইহুদিদের ধর্মে তো আর শুক্রবার মাংস খেতে মানা নেই!
তবু, খুঁতখুঁত করে মন৷ সারা পাড়া যখন মাংস না খাওয়ার কৃচ্ছ্রসাধন করছে, তখনই এমন স্বাদু রান্নার গন্ধে ম ম করে চারদিক... মনটা উদাস হয়ে যায়, জিভে জল ঠেকিয়ে রাখা দায় হয়ে ওঠে৷ নাঃ৷ কর্তাব্যক্তিরা আবার হানা দিলেন যুবকের দরজায়৷ সোজাভাবে কথাটা বলতে সংকোচ, তাই বেশ খানিকটা ঘুরিয়ে কিন্তু কিন্তু করে প্রস্তাবটা পাড়লেন, 'বাপু হে, ক্যাথলিকদের পাড়াতেই যখন এসে উঠলে, বসবাস করবে এখানে, তখন ক্যাথলিকই হয়ে যাও৷ তোমারও সুবিধে, আমাদেরও সুবিধে৷'
যুবক প্রথম হেসে উড়িয়ে দিল কথাটা, কিন্তু কর্তাব্যক্তিরা নাছোড়বান্দা৷ শেষ অবধি নিমরাজি হল যুবক, বলল, 'ঠিক আছে, আমার অত মাথাব্যথা নেই ধর্ম নিয়ে, আপনাদের যদি অতই ইচ্ছে তবে হব না-হয় ক্যাথলিক৷'
সেই কথাই রইল, পরের রবিবার এক ক্যাথলিক পাদরি এসে যুবককে স্পর্শ করে বললেন, 'তুমি জন্মেছিলে ইহুদি হয়ে, জীবন কাটিয়েছ ইহুদির মতো, কিন্তু আজ এই মুহূর্ত থেকে তুমি হয়ে গেলে ক্যাথলিক৷' ব্যাস, ধর্মান্তর হয়ে গেল, পাড়ার সবাই আনন্দে অভিনন্দন জানাল৷
দেখতে দেখতে আবার এসে গেল শুক্রবার৷ সবাইয়ের বাড়ি মাছ রান্না হচ্ছে৷ সবাই জানে, মাংস রান্নার গন্ধ আজ আসবে না, উদাস হবে না মন৷ কিন্তু অনুমান ভুল, সন্ধে হতে না হতেই আবার প্রাণকাড়া গন্ধ ভেসে আসতে লাগল যুবকের বাড়ির দিক থেকে৷ পাড়ার কর্তারা আবার ছুটলেন, কড়া নাড়লেন যুবকের দরজায়৷ হাসিমুখে দরজা খুলে দিল যুবক৷ কর্তারা বললেন, 'কী ব্যাপার হে, মাংস রাঁধছ, ক্যাথলিকদের যে শুক্রবারে মাংস খাওয়া মানা তা জান না?'
এক গাল হাসল যুবক৷ বলল, 'ওর জন্য ভাববেন না৷ দোকান থেকে ভেড়ার মাংস কিনে এনেছিলাম৷ তারপর বাড়িতে এসে মাংসটা ছুঁয়ে বললাম-তুমি জন্মেছিলে ভেড়া হয়ে, জীবন কাটিয়েছ ভেড়ার মতো, কিন্তু আজ এই মুহূর্ত থেকে তুমি হয়ে গেলে মাছ৷ -কাজেই বুঝতেই পারছেন, এখন আর ওটা খেতে কোনো বাধা নেই৷'
হবু পণ্ডিত
হেলমের এক তরুণ৷ মনে তার উচ্চাকাঙ্খা, বয়সকালে পণ্ডিত হবে সে৷ পড়াশোনাও করছে পুরোদমে, কিন্তু সমস্যা হয়ে গেছে একটা৷ ধর্মপ্রাণ ইহুদি পণ্ডিতদের গালে দাড়ি রাখতে হবেই, তা না হলে পণ্ডিত বলে মানবেই না কেউ৷ অথচ এ তরুণের দাড়ি গজাচ্ছে না-বয়েস পেরিয়ে যাচ্ছে এদিকে৷ মহা মুশকিল৷
চিন্তান্বিত হয়ে শহরের মন্দিরের পুরোহিতকে একদিন খুলে বলল ব্যাপারটা৷ জিজ্ঞেস করল, 'কেন হচ্ছে বলুন দেখি এমনটা? অথচ দেখুন আমার বাবার গালে কী ঘন দাড়ি-বংশের ধারা পেলে তো আমারও ওই রকমই হবার কথা!'
পুরোহিত ভাবলেন অনেকক্ষণ৷ অবশেষে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল তাঁর মুখ৷ বললেন, 'বুঝেছি৷ আসলে তুমি তোমার মায়ের ধাত পেয়েছ৷ তোমার মায়ের তো দাড়ি নেই, তাই না?'
'ঠিক ধরেছেন তো! মাথায়ই আসেনি আমার৷'

এক শিষ্য তার গুরুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ৷ গুরুর জ্ঞান, মেধা, স্মৃতি, সব কিছু সম্পর্কেই উচ্ছ্বসিত মন্তব্য করল নিজের এক বন্ধুর কাছে৷ তারপরে বলল, 'এমনি এমনি কি আর হয় এ সব! কী কৃচ্ছ্রসাধন! জানিস, পূর্ণিমা আর অমাবস্যার দিন বাদে রোজ দিনের বেলাটা উপবাস করেন৷ একেবারে নিরম্বু৷'
বন্ধু অবাক হয়ে বলল, 'বলিস কী? আমি নিজেই তো দিনের বেলা ওনাকে ভরপেট খেতে দেখেছি৷ এক-আধ দিন নয়, বহু দিন৷'
শিষ্য বলল, 'আসলে ব্যাপারটা কী জানিস? আমার গুরু খুব বিনয়ী লোক কিনা! উনি যে অত উপবাস করেন, সে কথাটা লোকে জানুক, তাই নিয়ে মাতামাতি করুক, এ সব উনি একেবারেই চান না৷ সে কথাটা গোপন করার জন্যই লোকের সামনে উনি উপবাসের সময়েও নানারকম খাবার খান৷'
ধনী-দরিদ্র
সিনাগগে রাবি বাণী দিলেন, শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল রাস্তার মোড়ের ছোটো দোকানি৷ সত্যি, কী চমৎকার বলবার ভঙ্গি, তেমনি সুন্দর গলা, আর কথাটাও কী অপূর্ব-'এ জগতে যে দরিদ্র, পরলোকে সে-ই হবে ধনী, আর এ জগতের ধনী পরলোকে হবে দরিদ্র৷' ভাবলেও মনে শান্তি আসে৷
মনে মনে চিন্তা করতে করতে হঠাৎ শান্তির বদলে একটা দারুন বুদ্ধির উদয় হল৷ মাথায় এমনই ঘুরঘুর করতে লাগল বুদ্ধিটা যে শেষ পর্যন্ত গিয়ে হাজির হল রাবির বাড়িতে একেবারে৷
'কী খবর?' বলে অভ্যর্থনা করলেন রাবি৷
'আচ্ছা বাবাঠাকুর, এই যে আপনি আজ বললেন, এই জগতের গরিব পরলোকে গিয়ে ধনী হবে, সে কথাটা কি ঠিক? আপনি সত্যি বিশ্বাস করেন কথাটা?'
'কোনো সন্দেহ নেই৷'
'আমাকে চেনেন তো, গরিব দোকানি৷ তার মানে মরবার পরের জগতে আমি বিরাট বড়োলোক হব বলছেন?'
'নিশ্চয়ই৷'
শুনে দোকানির আনন্দ আর ধরে না৷ বলল, 'আপনার কাছে তাহলে বলতে বাধা নেই৷ আমাকে হাজার খানেক টাকা ধার দেবেন? পরলোকে যখন প্রচুর টাকাপয়সা হবে আমার, তখন শোধ করে দেব৷'
বিনা বাক্যব্যয়ে রাবি ঢুকে গেলেন ঘরের ভেতরে৷ একটু বাদেই ফিরে এলেন, হাতে কয়েকটা একশো টাকার নোট৷ দোকানির সামনেই গুনে নিলেন একবার৷ দশটি নোট, অর্থাৎ হাজার টাকা৷ লোকটি চোখ ছানাবড়া করে তাকিয়ে আছে৷
তার দিকে টাকাগুলো বাড়িয়ে ধরলেন রাবি৷ তারপর বললেন, 'শুধু একটা কথা৷ টাকাটা নিয়ে করবে কী?'
'দোকানের জন্য নতুন নতুন জিনিস কিনব বেশ কিছু৷ সামনে পরবের দিন আসছে, তাতে ঘর সাজানোর জিনিসপত্তর, এই সব৷'
'বিক্কিরি ভালো হবে মনে হয়?'
'তার আর বলতে! এই বাজারে, জিনিস পড়তে পারবে না, দেখবেন!'
হাত গুটিয়ে নিলেন রাবি৷ বললেন, 'তাহলে বোধ হয় টাকাটা দিতে পারব না৷ কেননা অত ভালো বিক্রি হলে তো এ জগতেই তুমি বড়োলোক হয়ে যাবে৷ পরলোকে তাহলে হবে গরিব৷ টাকাপয়সা পাবে কোথায় তখন, শোধ করবে কী করে?'
কিংকর্তব্যবিমূঢ়
শহরের ইহুদিপাড়ায় রাবির কাছে নালিশ জানাতে এল একটি লোক৷ তাকে সবাই হাবা বলে৷ যেখানেই যায়, পাশ থেকে লোকজন 'হাবা হাবা' বলে চ্যাঁচায়৷ এ শুধু নালিশ নয়, রাবির কাছ থেকে একটা প্রতিবিধান চায় লোকটি-কী করবে? মাথা যে তার খারাপ হওয়ার জোগাড়৷
সত্যিই তো, এ কী অন্যায়! রাবি বললেন, 'যারা এরকম বলে তারা বর্বর৷ রাস্তায় যদি এরকম কেউ বলে আর কখনো, রাস্তার পাশ থেকে একটা ঢিল বা পাথরকুচি যা পাবে তাই তুলে নিয়ে ছুড়ে মারবে তার দিকে৷ ওদের শিক্ষা হওয়া উচিত৷'
'বেশ, বুঝলাম৷ কিন্তু বাজারের মধ্যে যদি বলে, তাহলে কী করব? বাজারে তো আর ঢিল পড়ে থাকে না যেখানে সেখানে!'
'মাছওয়ালার কাছে বালতিতে জল থাকে, সেই বালতির জল ছুড়ে মেরো বরং৷ যেমন কুকুর তেমনি মুগুর হওয়া দরকার৷'
'বেশ, তা না হয় করলাম৷ কিন্তু এই মন্দিরে যখন আসি, তখন যদি কেউ বলে? এখানে তো জলও পাব না৷'
'মন্দিরে এই বাতিদানগুলো দেখছ তো? এগুলো পেতলের, বেশ ভারী৷ এর একটা তুলে মাথায় একটা ঘা দিয়ো৷'
'কিন্তু শাবাত-এর দিনে কী হবে? সে দিন তো এই বাতিদানগুলোতে হাত দেওয়া নিষেধ!'
'তা বটে৷ সে দিন কেউ যদি এমন বলে তোমায়, তাহলে বরং ঘাড়টি ধরে তার গালে একটি থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ো৷'
'বলা তো খুবই সহজ, ঠাকুরমশাই, কিন্তু আমার দিকটাও একবার ভাবুন! আপনার না-হয় স্মরণশক্তি খুব ভালো৷ কিন্তু আমি? আমার তো সবকিছু অত মনে থাকে না! আর আপনি কতরকম বলছেন দেখুন৷ রাস্তায় হলে ঢিল ছুড়তে হবে, বাজারে হলে জল ঢালতে হবে, মন্দিরে হলে বাতিদান তুলে মারতে হবে, আবার শাবাতের দিন হলে তা-ও না করে শুধু গালে থাপ্পড় মারতে হবে৷ এই এত সব জটিল নিয়ম মনে রাখার মতো বুদ্ধিই যদি থাকত, তাহলে আপনার কাছ থেকে বুদ্ধি চাইতে আসার দরকার হত কি আমার?'

ছোটোবেলায় খুব দুষ্টু ছিল জুহা, সঙ্গীসাথিদের কেউ দুষ্টুমিতে পেরে উঠত না তার সাথে৷ যৌবনকালেও সকলের সাথে রঙ্গ-তামাশা করত হরদম৷ বুড়ো যখন হল, তখনও স্বভাব বদলাল না একটুও৷ এর পেছনে লাগে, ওকে খ্যাপায়-এই নিয়েই আছে৷
বন্ধুবান্ধবরা বলল, 'জুহা ভাই, এরকম করলে তো চলবে না৷ শুধু তামাশায় কি আর জীবন কাটে?'
জুহা বলল, 'কেন, ক্ষতি কী? তা ছাড়া কারুর অপকার তো করছি না!'
লোকে বলল, 'যে বয়সের যা৷ সে সব করেছ যখন জোয়ান ছিলে৷ এখন বয়স হয়েছে, একটু বয়সের চিন্তাভাবনা করো৷ সাধুসঙ্গ করো, পরকালের কথা ভাবো৷'
জুহা বলল, 'সে জন্য চিন্তা কোরো না তোমরা৷ আমি কি আর সে কথা ভেবে দেখিনি? যুবাকালেই একজন বিখ্যাত সাধুর কাছে দীক্ষা নিয়ে রেখেছি আমি৷'
সবাই অবাক হয়ে বলল, 'কোন সাধু?'
জুহা বলল, 'ইকিমা৷ নাম শুনেছ নিশ্চয়ই৷'
হ্যাঁ, ইকিমার নাম শুনেছে সবাই৷ স্বয়ং পয়গম্বর হজরত মহম্মদের স্নেহধন্য ছিলেন ইবন আব্বাস, ইকিমা ছিলেন তাঁর বাড়ির চাকর৷ আব্বাসের বাড়িতে ধর্মকথা শুনে শুনে কোরানের বাণীর অনেক কিছুই আয়ত্ত করেছিলেন ইকিমা, পরে প্রচারও করেছিলেন তার৷ কাজেই, ইকিমার নামে অবাক হওয়ার কিছু নেই৷ কিন্তু জুহার সাথে তাঁর মোলাকাত কোথায় হল, কবেই বা হল? কী দীক্ষাই বা পেল জুহা তাঁর কাছ থেকে?
জুহা বলল, 'মহাজ্ঞানী ইকিমা বলেছিলেন আমাকে, জীবনে যা-ই কর না কেন, দুটি কথা যদি মেনে চলতে পার, তাহলে ইহজীবনে বা পরজীবনে কখনোই কোনো অশান্তি হবে না৷ ইকিমা এই দুটি মহাগুণের কথা শুনেছিলেন ইবন আব্বাসের কাছ থেকে, আব্বাস শুনেছিলনে স্বয়ং হজরত মহম্মদের কাছ থেকে৷ জীবনের আসল সম্পদ হচ্ছে এই দুটো অনুশাসন, বুঝলে?'
হামলে পড়ে সবাই প্রশ্ন করল, 'কী সেই দুটো কথা?'
'দুটো জ্ঞানই অবশ্য আমাকে দিয়ে যেতে পারেননি ইকিমা৷ বয়েস হয়েছিল তো তাঁর, ভুলে গিয়েছিলেন দুটোর মধ্যে একটা৷
হতাশ হল সবাই একটু৷ -'আর অন্যটা?'
'অন্যটা বলেছিলেন আমাকে৷'
'শুনি তবে,' উৎসাহিত হয়ে বলল সকলে৷
'আমার বয়েসও তো কম হল না! অন্যটা তাই আমিও ভুলে গিয়েছি৷'
ভাই-ভাই
একজন বেশ ধনী লোক যাচ্ছিলেন রাস্তা দিয়ে৷ এক ভিখিরি পাশ থেকে বলল, 'একটু ভিক্ষা দিয়ে যাবেন গো দাদা৷'
ধনী লোকটি পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলেন৷ ভিখিরি বলল, 'এটা কি ন্যায্য কাজ হল? সব মানুষই তো ভাই-ভাই, এই তো আমি আপনাকে দাদা বলে ডাকলাম৷ তা ভাইয়ের দুঃখ দেখলে ভাই তাকে সাহায্য করবে না? ধর্মে কী বলে?'
কথায় পর্যুদস্ত হলেন ধনী লোকটি, দিলেন একটি টাকা৷
ভিখিরি কিন্তু তাতেও থামল না৷ টাকাটা নিয়ে বলল, 'আবার ভেবে দেখুন একটু৷ এটাও কি অধর্ম হল না? আপনার কোটি কোটি টাকা৷ ভাইয়ে-ভাইয়ে ভাগাভাগি করল তো আধাআধি ভাগ আমার পাওয়ার কথা! আর আপনি সে জায়গায় আমাকে দিলেন একটি মাত্র টাকা!'
ধনী লোকটি বললেন, 'কথাটা ঠিকই বলেছ ভাই, ভাইয়ে-ভাইয়ে সমান-সমান ভাগাভাগি হওয়াই উচিত৷ কিন্তু আমার ভাই তো তুমি একা নও, তোমার মতো কোটি কোটি ভাই সারা দেশে ছড়িয়ে রয়েছে আমার৷ তাদের ভাগটাও রাখতে হবে তো! তাই তোমাকে একটা টাকাই দিলাম৷'

একটা রেস্টুরেন্টে আয়ার্ল্যান্ডীয় একজন লোক বসে খাচ্ছিল৷ অন্য একটি টেবিলে বসে ছিল তিন জন ইংরেজ৷ আয়ার্ল্যান্ডের সঙ্গে ইংল্যান্ডের ঘোর শত্রুতার সম্পর্ক৷ এই তিন ইংরেজ ঠিক করল, আয়ার্ল্যান্ডের লোকটির পেছনে লাগবে৷
আয়ার্ল্যান্ডের লোকেদের পরম প্রিয় ধর্মগুরু হলেন সন্ত প্যাট্রিক৷ আয়ার্ল্যান্ডীয় লোকেরা তাঁকে তাদের জাতির জনক বলে গণ্য করে৷ এই তিন ইংরেজ ভাবল, প্যাট্রিককে নিয়েই আক্রমণ করবে৷ তাদের একজন আয়ার্ল্যান্ডের লোকটির টেবিলে উঠে গিয়ে তাকে বলল, 'তুমি কি জান, সন্ত প্যাট্রিক ছিলেন ভণ্ড, জোচ্চোর?'
ভেবেছিল এতে আয়ার্ল্যান্ডের লোকটি খেপে ধুন্ধুমার কাণ্ড বাধাবে, কিন্তু সেরকম কিছুই হল না৷ লোকটি নির্বিকার ভাবে বলল, 'ও, তাই নাকি! জানতাম না৷'
খুবই হতাশ হয়ে নিজের টেবিলে ফিরে গেল ইংরেজ৷ বন্ধুদের বলল ঘটনাটা৷ দ্বিতীয় ইংরেজ একটু পরে এল আয়ার্ল্যান্ডের লোকটির কাছে৷ আর একটু রং চড়িয়ে বলল, 'কী হে, সন্ত প্যাট্রিক যে ঠগ বেইমান ইতর মিথ্যাবাদী ছিল, সে কথা জান?'
আবার নির্বিকার ভাবে ঠোঁট উলটে লোকটি বলল, 'না, জানতাম না৷'
কিছুই করা গেল না দেখে খুবই হতাশ হল ওরা৷ তখন তৃতীয় বন্ধু বলল, 'নাঃ, ও সবে হবে না৷ আরও কড়া দাওয়াই লাগবে৷' বলে, আয়ার্ল্যান্ডের লোকটির পাশে বসে বলল, 'তোমাকে একটা কথা বলি৷ সন্ত প্যাট্রিক যে ইংরেজ ছিলেন, এ কথাটা কি জানতে?'
এর চেয়ে বড়ো অপমান আর হতেই পারে না৷ আয়ার্ল্যান্ডের জাতির জনক কিনা ইংরেজ! যে কোনো আয়ার্ল্যান্ডীয়র পক্ষেই এ অপমান সহ্য করা সম্ভব নয়৷ তাই এবার এই লোকটি রাগে কীভাবে ফেটে পড়ে এবং সকলের সামনে হাস্যকর কিছু একটা করে কীরকম অপদস্থ হয়, তার অপেক্ষা করতে লাগল ইংরেজ বন্ধুরা৷
লোকটি কিন্তু এবারও মুচকি হাসল৷ তারপর শুধু বলল, 'হ্যাঁ, আন্দাজ করছিলাম৷ তোমার দুই বন্ধু আগেই এসে ঠারেঠোরে সে কথা আমাকে বলার চেষ্টা করছিল৷'

পাদরিদের কী যেন একটা মহাসম্মেলন হচ্ছিল কোথায়, তাতে যাচ্ছিলেন চার জায়গার চার জন পাদরি৷ পথে রাত কাটাবার জন্য চার জনে ঘটনাচক্রে এসে উঠলেন একই সরাইখানায়৷ বিশাল সরাই, তবু সেখানে চারখানা ঘর ফাঁকা ছিল না, ছিল একটা মাত্র বড়ো ঘর৷ মালিক তাই জিজ্ঞেস করলেন, ওই ঘরটাতেই চার জনে চারটে বিছানা পেতে শুয়ে পড়বেন কি না৷ বেগতিক, তাই রাজি হয়ে গেলেন সবাই৷
সন্ধেটা চার জনে কাটালেন ঘরের বাইরে, সরাইয়ের আশেপাশে এধার-ওধার ঘুরে৷ রাত্তিরে শোবার সময় হলে তখন ঘরে এলেন সকলে৷ কুশল সম্ভাষণ হল, হল দু-চারটে কথা৷ তারপর এক জন চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন৷ অন্য তিন জনের মধ্যে চলতে লাগল গল্পসল্প৷ কথায় কথায় কাজের কথা এল-তিন জনে আলোচনা করতে লাগলেন নিজেদের নিজেদের গ্রামের কথা, গ্রামের মানুষজনের কথা৷ সকলেই খানিকটা বীতশ্রদ্ধ নিজের গ্রামের ওপর-লোকগুলো এত বজ্জাত, এত রকমের বদ কাজ করে, সামাল দিতে দিতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন পাদরিরা৷ এক জন বলেই ফেললেন, 'অন্য কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে মশাই, কিন্তু ইচ্ছে থাকলেই বা কী, উপায় কোথায়?'
চতুর্থ পাদরি চাদরের ফাঁক থেকে মুখ বার করে বললেন, 'কোথায় আর যাবেন, সবই সমান৷ ধোয়া তুলসীপাতা কেউই নয়, আপনিও না, আমিও না৷'
প্রথম জন বললেন, 'তা যা বলেছেন! এই তো দেখুন না, সবাইকে এত উপদেশ দিই মাতলামি না করবার জন্য, অথচ আমি নিজেই সুযোগ পেলেই নেশা করে ফেলি প্রচণ্ড পরিমাণে৷ এই তো আজই সন্ধে বেলা সরাইয়ের একতলায় গিয়ে খেয়ে এসেছি পেট পুরে৷ বেসামালও হয়ে পড়েছিলাম একটু, তবে এখন মনে হচ্ছে সামলে নিয়েছি৷'
দ্বিতীয় জন বললেন, 'হ্যাঁ, শুধু আপনার কেন, আমার ব্যাপারটাই ধরুন না! জুয়া খেলার নেশা আমার কিছুতেই যায় না৷ গ্রামের সবাইকে বলি জুয়া না খেলতে, অথচ নিজে লোভ সামলাতে পারি না৷ গ্রামের মধ্যে তো খেলতে পারি না, কিন্তু বাইরে বেরোলেই নেশা চেপে ধরে৷ এখানে এই সরাইয়ের সামনের ঘরে একটা জুয়ার আড্ডা বসে জানেন তো-খেলে এলাম ওখানে খানিকটা৷ বেশ কিছু টাকাও গচ্ছা গেল, কিন্তু নেশা. . .!'
তৃতীয় জনও যোগ দিলেন এ কথায়৷ বললেন, 'দোষ কার নেই বলুন না! আমি যেমন, গ্রামের কেউ হয়তো এসে ধরল, সে অন্যায় করে ফেলেছে কিছু, প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা করতে হবে একটা৷ ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে আমি বিশাল পয়সা দাবি করে বসি৷ বলে দিই, না দিলে প্রায়শ্চিত্ত হবে না৷ তখন বাধ্য হয়ে লোকে পয়সা দেয়৷ আজ সন্ধে বেলা যখন দেখি জুয়া খেলা চলছে এখানে, সটান মালিকের কাছে গিয়ে বললাম, পুলিশকে জানিয়ে দেব৷ মালিক বেশ কিছু টাকা খসাল, তবে রাজি হলাম মুখ না খুলতে৷'
চতুর্থ জনের মুখ ঢাকা৷ তিন জনে হাঁক পাড়লেন, 'ও মশাই, ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি? কিছু বলুন!'
চাদর থেকে মাথা বার করলেন চতুর্থ জন৷ বললেন, 'কী আর বলব! বললাম তো, আমরা কেউই ধোয়া তুলসীপাতা নই৷ আমি শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম আমার বদভ্যাসের কথা৷'
'কী অভ্যেস আপনার? বলে ফেলুন, লজ্জা কী?'
'গণ্ডগোলটা তো ওইখানেই মশাই! আমি যে সবই বলে ফেলি! গ্রামের লোকেরা পাপ-æালনের জন্য আমার কাছে এসে বলে তাদের পাপের কথা, আর তারা চলে যেতে না যেতেই আমার পেট গুড়গুড় করতে থাকে৷ অন্যদেরকে সেসব কথা না বলে থাকতে পারি না৷ সত্যি বলতে কি, আপনারা যেসব কথা এতক্ষণ বললেন, তা শুনে অবধি আমার শরীরের মধ্যে অস্বস্তি শুরু হয়ে গেছে৷ কাল সকাল হলেই লোকজনকে গিয়ে না বলা পর্যন্ত সোয়াস্তি নেই৷'
শুনে তো অন্য তিন জনের চক্ষু চড়কগাছ৷ এসব কথা জানাজানি হলে তো মহা মুশকিল! তখন তারা চতুর্থ জনকে হাতে-পায়ে ধরেন আর কি-'বলবেন না দাদা, বলবেন না!'
অবশ্য গল্পের শেষটা আমার জানা নেই৷ ওঁরা তিন জনে চতুর্থ জনকে কীভাবে রাজি করালেন, বা আদৌ রাজি করাতে পেরেছিলেন কি না, সেসব বৃত্তান্ত আমি জানি না, যতটা জানি ততটাই বাপু বললাম৷ তবে এখন মনে হচ্ছে, চতুর্থ জন নিশ্চয়ই কিছুটা অন্তত ফাঁস করে ফেলেছিলেন, নইলে এতটাই বা জানলাম কেমন করে?

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন