সৈকত মুখোপাধ্যায়

স্কুল থেকে ফেরার পথে একটা মেসেজ পেলাম—জলদি একবার আসতে পারবি?
মেসেজটা পাঠিয়েছে আমার জ্যাঠতুতো দাদার বন্ধু বোধিসত্ব মজুমদার, মানে বুধোদা। আর বুধোদার ডাকে সাড়া না দেওয়াটা ডাঁহা বোকামি। অতএব বাড়ির দিকে না গিয়ে সাইকেলের হ্যান্ডেলটা বাঁকিয়ে দিলাম উত্তরপাড়া খেয়াঘাটের রাস্তায়। ওইখানেই নদীর ধারে মজুমদারদের একশো আঠেরো বছরের পুরোনো তিনমহলা বাড়ি। নাম 'হেমকুঞ্জ'। উত্তরপাড়ার জিটি রোডের একদিকে হেমকুঞ্জ, আর ঠিক উলটোদিকেই ব্যানার্জিপাড়ার ভেতরে আমার বাড়ি। ছোটবেলা থেকেই হেমকুঞ্জে আমাদের অবাধ যাতায়াত।
বাড়ি তো নয়, প্রাসাদ। হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার, যিনি এই প্রাসাদটি বানিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন বুধোদার ঠাকুরদার বাবা। 'ম্যালকম অ্যান্ড মজুমদার শিপিং কোম্পানি'-র জাহাজ একসময় কলকাতা থেকে ব্রিটেনের নানান বন্দরে মাল নিয়ে যাতায়াত করত। হেমেন্দ্রনাথ ছিলেন সেই কোম্পানির একজন পার্টনার।
কয়েক বছর আগেও এই বাড়ির ছাদে হাওয়াই চটির গোলপোস্ট বানিয়ে আমরা বন্ধুরা ফুটবল খেলেছি। নীচে দুর্গাদালানে তক্তাপোশের স্টেজ বেঁধে হযবরল কিংবা লক্ষ্মণের শক্তিশেলের মতন অনেকগুলো নাটকও করেছি। ফুটবলের রেফারি হত বুধোদা। নাটকের কসটিউম তৈরির কাজটাও বুধোদা ইচ্ছে করেই নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিত।
এমনিতে এ বাড়িতে পোষ্য হিসেবে একটা বাঘের মতন বড় অ্যালসেশিয়ান কুকুর আছে, যার নাম শিরোমণি। তবে নিজের মনেই অনেকবার ভেবে দেখেছি, বুধোদারা শিরোমণির বদলে একটা জিরাফ পুষলেও কোনও অসুবিধে ছিল না। কারণ, এ-বাড়ির দালান দরজা সবই এমন উঁচু উঁচু যে, একটা জিরাফও অনায়াসে ঘাড় উঁচু করে হাঁটাচলা করতে পারত।
বাড়িটার একশো আঠেরো বছর বয়সের সঙ্গে মানানসই বহু জিনিসপত্র, ফার্নিচার-টার্নিচার এখনও হেমকুঞ্জের এঘরে ওঘরে ছড়িয়ে রয়েছে। বুধোদা বলে ওর ঘরের সিলিং-ফ্যানটার বয়েস নাকি আশি বছর। ফ্যানটার চারটে ব্লেড, সবক'টাই কাঠের তৈরি। দেওয়ালের গায়ে যে রেগুলেটরটা বসানো আছে সেটাকে দেখতে অবিকল ট্রামের ড্রাইভার যে হ্যান্ডেলটাকে এদিক থেকে ওদিকে সরিয়ে ট্রাম চালান, সেইটার মতন।
তা ছাড়াও রয়েছে একটা পেন্ডুলাম-ক্লক, স্যুটকেসের মতন বড় একটা ভালব সেটের রেডিয়ো আর চোঙাওয়ালা গ্রামাফোন। ফ্যানটার মতন এগুলোও দিব্যি চালু অবস্থায় রয়েছে। আর দেওয়ালে টাঙানো আছে মা সরস্বতীর একটা ফ্রেমে বাঁধানো ছবি। তাঁর মুখচোখ আর গায়ের রং একেবারে মেমসাহেবদের মতন, কারণ এই ধরনের ছবিগুলো না কি তখন সাহেব শিল্পীরা আঁকতেন আর সাহেবদের দেশেই ছাপা হত।
বুধোদা এমনিতে ভয়ংকর 'টেক-স্যাভি'; ল্যাপটপ, আইফোন ছাড়া এক-পা হাঁটে না। তবু ওইসব 'অ্যান্টিক', মানে যেসব জিনিস একইসঙ্গে পুরোনো, দুর্লভ আর সুন্দর, তার ওপর ওর খুব টান। জ্যাঠাইমার কাছে শুনেছি ওর এই টানটা না কি ছোটবেলা থেকেই। এই বাড়ির যত পুরোনো জিনিসপত্র সব ও নিজের হাতে ধুয়ে-মুছে সারিয়ে টারিয়ে ঠিকঠাক রেখেছে।
এই ভালোবাসা থেকেই বছর পাঁচেক আগে মজুমদার-ফ্যামিলির ট্র্যান্সপোর্টের ব্যবসা ছেড়ে বুধোদা একটা অ্যান্টিক গুডসের বিজনেস খুলেছে। মানিকতলায় শো-রুম, নাম দিয়েছে 'মহারাজা কালেকশনস'। 'মহারাজা কালেকশনস' থেকে অ্যান্টিক গুডসের পাশাপাশি হ্যান্ডিক্র্যাফটস বা হস্তশিল্পও বিক্রি করা হয় অবশ্য। তবে সোনার টুথ-পিক থেকে গ্র্যান্ড ফাদার ক্লক, যা কিছুই বিক্রি হোক, সবই যাকে বলে ইউনিক। অন্য কোথাও চট করে সে সব দেখতে পাওয়া যাবে না। এর একটা কারণ, বুধোদার অ্যান্টিক সম্বন্ধে অসামান্য জ্ঞান। আর অন্য কারণ, বেশিরভাগ জিনিস ও নিজেই খুঁজে বার করে। নিজেকে ও বলে 'অ্যান্টিক হান্টার'।
তবে তার জন্যে বুধোদাকে প্রায় সারা বছরই ঘুরে বেড়াতে হয়। এই হয়তো বৌদ্ধ পুঁথির সন্ধানে লাদাখ ঘুরে এল তো পনেরো দিন বাদেই শুনলাম জলের তলা থেকে উদ্ধার হওয়া দেড়শো বছরের পুরোনো জাহাজের লণ্ঠন কিনতে মার্মাগাঁও চলে গেছে।
সবসময়ে যে সাঙ্ঘাতিক মূল্যবান কিছু খুঁজে পায় তা হয়তো নয়, কিন্তু নিজেই বলে—একটা জিনিস প্রত্যেকবারেই ওর ঝুলিতে জমা হয়। তার নাম আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। তা ছাড়া নানান রকমের মানুষের সঙ্গে আলাপও হয়। এইসবেই ওর আনন্দ। সে হিসেবে 'অ্যান্টিক হান্টিং'-কে ওর পেশা না বলে নেশা বললেও ভুল হবে না। আমি জানি। কারণ ওরকম বেশ কয়েকটা অভিযানে আমি বুধোদার সঙ্গী ছিলাম।
ইদানীং বুধোদার আরেকটা ব্যাপারে একটু নামডাক হয়েছে। ভারত থেকে প্রতিবছর বেআইনি রাস্তায় প্রচুর পুরোনো ছবি, মূর্তি আর ওইরকম নানান অ্যান্টিক চোরাপথে বিদেশে পাচার হয়ে যায়। তাছাড়া নকল অ্যান্টিক দিয়ে লোক ঠকানোরও অনেকগুলো চক্র রয়েছে। এই স্মাগলিং আর নকল অ্যান্টিকের কয়েকটা দলকে বুধোদা নিজে উদ্যোগ নিয়ে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। তারপর থেকে দেখছি এই ধরনের কাজে বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ এক্সপার্ট হিসেবে বুধোদার পরামর্শ চাইছে।
বুধোদার ভালো নাম, আগেই বলেছি, বোধিসত্ব মজুমদার। বয়েস তিরিশ। ছোটখাটো চেহারা। খাড়া নাক, ব্রাইট দুটো চোখ আর ছুঁচলো দাড়ির জন্যে অনেকটা শিবাজী শিবাজী দেখতে লাগে। ও আমার জ্যাঠতুতো দাদার বন্ধু। তবে বন্ধুত্বটা দাদার থেকে আমার সঙ্গেই বেশি। তার একটা কারণ, আমার মানসিকতাটাও বুধোদার সঙ্গে বেশ খাপ খায়। আমিও অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসি। ভালোবাসি দুর্গম অথচ সুন্দর জায়গায় বেড়াতে যেতে।
নিজের পরিচয়টাও একটু দিয়ে রাখা ভালো। আমার ভালো নাম মাল্যবান মিত্র, ডাকনাম রুবিক। বয়েস ষোলো। উত্তরপাড়া গভর্মেন্ট স্কুলে ক্লাস ইলেভেনে পড়ি। পেস বল করি, স্কুলের ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন এবং গতবছরেই শুশুনিয়া পাহাড়ে মাউন্টেনিয়ারিং-এর বেসিক কোর্স করে এসেছি। পড়াশোনার কথাটা নিজের মুখে বলা বোধহয় ভালো নয়, তাই এইটুকু বলে রাখি, রেজাল্ট বেরোলে প্রতিবারই এক থেকে দশের মধ্যে থাকি।
সাইকেলটা হেমকুঞ্জের দুর্গাদালানের থামে হেলান দিয়ে রেখে উঠোন পেরিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে শুরু করলাম। এত বড় বাড়িতে বুধোদা, বুধোদার বাবা-মা আর ওর কাকার ফ্যামিলি—সব মিলিয়ে মাত্র আটজন লোক থাকে। মজুমদার পরিবারের বাকি সব লোকজন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে গেছে।
সিঁড়ি দিয়ে আমি ইচ্ছে করেই আস্তে আস্তে ওপরে উঠছিলাম। উঠছিলাম আর দেখছিলাম ল্যান্ডিং-এ রঙিন কাচ বসানো বিশাল ফ্রেঞ্চ উইন্ডো-র মধ্যে দিয়ে রোদ্দুরটা কেমন রঙিন হয়ে আমার গায়ের ওপর এসে পড়ছে। হাতের নীচে এই কাঠের রেলিংটাও কি কম আশ্চর্যের, দুশো বছর ধরে ব্যবহারের পরেও যার জেল্লা এতটুকু নষ্ট হয়নি? কিংবা সিঁড়ির মাথার কাছে রাখা ওই পেতলের নটরাজ মূর্তিটা?
সিঁড়ি যেখানে শেষ হচ্ছে, সেখান থেকেই শুরু হচ্ছে সাদাকালো মার্বেল পাথরের টালি বসানো বিশাল টানা বারান্দা। বারান্দার কার্নিশে কাঠের জাফরি, যার মধ্যে দিয়ে মেঝের ওপর চিরুনির মতন রোদ্দুর এসে পড়েছে। ঢালাই লোহার কারুকাজ করা রেলিং-এর ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ভাগিরথী নদী। এই বারান্দারই শেষ প্রান্তে বুধোদার ঘর। সেই ঘরের প্রধান দ্রষ্টব্য ওই ব্রিটিশ আমলের সিলিং ফ্যান, যেটার চারটে ব্লেডের সবগুলোই কাঠের তৈরি। তা ছাড়া রয়েছে একটা ধুতরো ফুলের মতন চোঙাওলা গ্রামাফোন। দুটো জিনিসই এখনও দিব্যি চালু অবস্থায় রয়েছে।
ওই ফ্যান কিংবা গ্রামাফোনেরই সমবয়সি একটা মেহগনি কাঠের পালঙ্কের ওপর আমাদের অতি আধুনিক বুধোদা ফেডেড ডেনিম আর টি-শার্ট পরে বসেছিল। পাশে অ্যাপলের ল্যাপটপটা ভাঁজ করে রাখা আছে। বুধোদার কোলে যথারীতি একটা মোটা বই।
বুধোদা মাঝে মাঝে আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করে যে, পেশাগত কারণেই বুধোদাকে এত পড়াশোনা করতে হয়। বলে, অ্যান্টিকের তালিকায় কোন জিনিস যে আসবে, আর কোন জিনিস আসবে না, তার তো কোনও ঠিক নেই। সাহিত্যিকের কলম থেকে বিজ্ঞানীর যন্ত্রপাতি, রাজমুকুট থেকে নস্যদানি—সবই অ্যান্টিক হতে পারে, যদি তার গায়ে ইতিহাসের গন্ধ লেগে থাকে।
এই যে, গতবছরেই মুম্বইয়ের কলবাদেবী রোড দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎই দেখলাম কয়েকটা বাচ্চা ছেলে একটা বাড়ির রোয়াকে বসে বড় একটা কাঠের বাক্সের মতন কী যেন নিয়ে খেলা করছে। আমার যদি ক্যামেরা সম্বন্ধে একটু জ্ঞান না থাকত, তাহলে কি ধরতে পারতাম, ওটা এইটটিন নাইনটি সিক্সের লুমিয়ের কোম্পানির মুভি ক্যামেরা?
একইভাবে চাঁইবাসা বেড়াতে গিয়ে একটা ভাঙা বাড়ির গ্যারেজে দেখেছিলাম নাইনটিন টোয়েন্টি নাইনের ফোর্ড গাড়ি। মানে যাকে বলে ভিনটেজ কার। গাড়িটার কাপড়ের হুডের ওপর ওই বাড়ির বাসিন্দারা বাচ্চার কাঁথা শুকোতে দিয়েছিলেন। সেই গাড়ি, কলকাতায় এনে সারিয়ে তোলার পর, হায়দ্রাবাদের রুস্তম দোরাবজী পনেরো লক্ষ টাকা দিয়ে আমার কাছ থেকে কিনে নিয়ে গেলেন। সেই জন্যেই, বুঝলি রুবিক, আমাদের এই লাইনে ফ্রম আলপিন টু এলিফ্যান্ট সব বিষয়েই একটু আধটু জেনে রাখতে হয়।
বুধোদা আমাকে যতই এইসব বোঝানোর চেষ্টা করুক, আমি খুব ভালো করেই জানি, অ্যান্টিকের ব্যবসা না করে ও যদি তেজপাতাও বিক্রি করত, তাহলেও একইভাবে বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে সময় কাটাত। জ্যাঠাইমা বলেন, ছোটবেলা থেকেই ও ওইরকম। তখন তো আর ব্যবসা-ট্যাবসা কিছু করত না। তাহলে?
আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখে বুধোদা বইটা নামিয়ে রেখে সোজা হয়ে বসল। তারপর একটু কৈফিয়তের সুরেই বলল, তোকে আর্জেন্ট কল দিলাম কেন জানিস? গত প্রায় মাসখানেক ধরে লন্ডন থেকে এক সাহেব টেলিফোনে, ই-মেলে খুব ঝোলাঝুলি করছে ওর সঙ্গে মেঘালয়ের কোন একটা জঙ্গলে যাওয়ার জন্য। সাহেবের নাম গ্যাব্রিয়েল টিলম্যান। আমাকে অবশ্য বলল, গ্যাবি বলে ডাকতে।
গ্যাবির মেঘালয়ে যেতে চাওয়ার কারণটা বেশ ইন্টারেস্টিং। একশোবছর আগে ওর এক পূর্বপুরুষ না কি ওই জঙ্গলে গিয়েছিলেন। রিসেন্টলি সেই যাত্রাপথের বিবরণ সমেত ডায়েরি খুঁজে পেয়েছে গ্যাব্রিয়েল। এখন দাদুর দাদুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে ও-ও সেখানে যেতে চায়।
বলল, এর বাইরেও না কি আরও গল্প আছে। তবে অত কথা ফোনে বলা মুশকিল, তাই আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইল।
আমি রাজি হয়েই গেলাম, বুঝলি। আসলে গ্যাব্রিয়েল এমন একজনের রেফারেন্স দিচ্ছে, যে আমার স্কুলের বন্ধু—তীর্থঙ্কর সিনহা। তীর্থ এখন লন্ডনে থাকে। সেই নাকি ওকে বলেছে, কলকাতায় গিয়ে বোধিসত্ব মজুমদারের সঙ্গে দেখা করো। জঙ্গল-টঙ্গল ওর চেয়ে ভালো কেউ চেনে না।
সেই গ্যাব্রিয়েল একটু বাদেই আসবে। তাই ভাবলাম, তুইও শোন ও কী বলে। তারপর যদি তোর অসুবিধে না থাকে তাহলে...।
ঠিক তখনই পারাবত কুঞ্জের একতলার দালানে ডিং ডং শব্দে কলিং বেল বেজে উঠল। বুধোদা জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। ওখানে দাঁড়ালে বাড়ির সদর দরজাটা দেখা যায়। সেইদিকে একবার তাকিয়ে, বুধোদা বলল, গ্যাব্রিয়েলসাহেব এসে গেছে দেখছি। চল, নীচে নামি।
একতলায় নেমে, আমি আর বুধোদা বাড়ির ভেতরদিক থেকে বৈঠকখানায় ঢুকলাম। মজুমদার বাড়ির হেল্পিং-হ্যান্ড কানাইদা ইতিমধ্যেই গ্যাব্রিয়েল টিলম্যানকে সদর দরজা খুলে সোফায় বসিয়েছিল। আমাদের দেখে গ্যাব্রিয়েল উঠে দাঁড়িয়ে দিব্যি দু-হাত জোড় করে বাঙালি কায়দায় নমস্কার করল। বুধোদা আমার সঙ্গে টিলম্যানের আলাপ করিয়ে দিল, 'আমার ভ্রমণসঙ্গী' বলে। দেখলাম, গ্যাব্রিয়েলের বয়েস বুধোদার আশেপাশেই হবে, মানে তিরিশ-বত্তিরিশ আর কি। ছিপছিপে চেহারা, নীল চোখ, ঘাড় অবধি লুটিয়ে পড়া সোনালি চুল আর একই রঙের হালকা দাড়ি। গ্যাবির পোশাকটাও ওর চেহারার সঙ্গে দিব্যি মানিয়েছে—জিনসের প্যান্ট আর গেরুয়া রঙের সুতির পাঞ্জাবি। মনে হচ্ছে বিদেশি বাউল।
কানাইদা শ্বেতপাথরের গ্লাসে করে তিন গ্লাস বরফঠান্ডা ঘোলের সরবত এনে আমাদের সামনে নামিয়ে রাখল। এই এপ্রিলের দুপুরে কলকাতা থেকে উত্তরপাড়া অবধি আসতে-আসতে গ্যাবির নিশ্চয় ভালোরকম তেষ্টা পেয়ে গিয়েছিল। এক চুমুকে শরবতটা শেষ করে সে একটা তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলল। তারপর বুধোদাকে প্রশ্ন করল, ফ্রম হোয়্যার শ্যুড উই স্টার্ট, বোঢিসাটটা?
বুধোদা ইংরিজিতেই উত্তর দিল—একেবারে গোড়া থেকে।
একটু চুপ করে থেকে গ্যাব্রিয়েল তার বুধোদার কাছে আসার প্রেক্ষাপটে যা যা আছে বলতে শুরু করল। সেটাকে বাংলা করে বললে এরকম দাঁড়ায়—
আমরা টিলম্যানরা ইংল্যান্ডের খুব পুরোনো বংশ। তবে স্বীকার করে নেওয়া ভালো, তথাকথিত আভিজাত্য ব্যাপারটা আমাদের রক্তে নেই। আমরা বংশানুক্রমে আর্ল অফ নরফোকের বাগানের মালি। আর্লদের যে বিশাল প্রাসাদ, নাম শুনে থাকবে—আরুনডেল ক্যাসল—সেই ক্যাসলের লাগোয়া একরের পর একর ফল আর ফুলের বাগান কয়েকশো বছর ধরে আমরাই দেখাশোনা করছি।
ওই বাগানের চৌহদ্দির মধ্যেই আমাদের ভিক্টোরিয়ান আমলের পাথরের তৈরি কোয়ার্টার। সেটাও তোমাদের এই বাড়িটার মতনই পুরনো। তুমি নিজে যেহেতু একটা প্রাচীন প্রাসাদে বাস করো, তাই তুমি নিশ্চয় জানো, এরকম বাড়িতে কখনও-সখনও এমন দু-একটা লুকোনো জায়গা বেরিয়ে পড়ে যার অস্তিত্ব আগে কোনওদিন কেউ জানত না। মাস তিনেক আগে সেইভাবেই একটা বহু পুরোনো আলমারি সারাতে গিয়ে তার ড্রয়ারের ভেতর একটা চোরাকুঠুরি বেরিয়ে পড়ল। চোরাকুঠুরির মধ্যে ছিল একটা ডায়েরি—রিচার্ড টিলম্যানের ডায়েরি। তোমাকে তো আগেই বলেছি, তিনি ছিলেন আমার দাদুর দাদু।
আমার এই বৃদ্ধ প্রপিতামহের গল্প জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই বাড়ির গুরুজনদের মুখে শুনে আসছি। অদ্ভুত মানুষ ছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডে বরাবরই বাগান করাটাকে একটা বড় আর্ট হিসেবে মানা হয় সে কথা নিশ্চয় জানো। রিচার্ড টিলম্যান ছিলেন সেই আর্টের সবচেয়ে বড় আর্টিস্ট। তখন আফ্রিকা আর এশিয়ার কলোনিগুলোতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভালোরকম জাঁকিয়ে বসেছে। আমার দাদুর দাদু সেই সব কলোনি থেকে নানারকম ফল ফুলের গাছ আনিয়ে আরুনডেল ক্যাসলের বাগানে বড় করে তুলেছিলেন। সেই বাগান নিয়ে আর্ল অফ নরফোকের গর্বের সীমা ছিল না। সারা দেশের ব্যারন ডিউক আর কাউন্টরা রিচার্ড টিলম্যানের হাতে গড়া সেই আশ্চর্য বাগান দেখতে আসতেন, যেখানে একই সঙ্গে হাওয়াই দ্বীপের জবা, ভারতের পদ্ম, আর আফ্রিকার ডেইজি দেখতে পাওয়া যেত।
তবু একটা মাত্র ফুলের অভাবে সেই বাগান অসম্পূর্ণ রয়ে যাচ্ছিল। জানো সেই ফুলের নাম কী? অর্কিড।
তোমরা তো অর্কিডের দেশের লোক। নিশ্চয় জানো, এত সুন্দর গড়নের আর এত বিচিত্র রঙের ফুল আর কোনও প্রজাতির গাছে দেখা যায় না। বলা হয়, ঈশ্বরের রং-বাক্সে যত রকমের রং ছিল, সব মিলিয়ে-মিশিয়ে তিনি অর্কিডফুলের পাপড়ি এঁকেছেন। বিজ্ঞানীরা এখনও অবধি প্রায় পঁচিশ হাজার প্রজাতির অর্কিডের খোঁজ পেয়েছেন। তার আবার নানান উপ-প্রজাতি রয়েছে। সব মিলিয়ে ভ্যারাইটিটা ভাবতে পারছ?
এখন আমাদের লন্ডনের নার্সারিতে সবচেয়ে বেশি যে ফুল বিক্রি হয় তা হল ওই অর্কিড। আমরা এখন গ্রিন হাউসের কৃত্রিম পরিবেশে অর্কিড চাষ করা শিখে গেছি। শিখে গেছি এক রঙের ফুলের সঙ্গে অন্য রঙের ফুলের জোড় মেলাতে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইংল্যান্ডে বসে অর্কিড ফুলের নাগাল পাওয়া অত সহজ ছিল না। কারণ ব্রিটেনে মাত্র সাতরকমের অর্কিড পাওয়া যায়, আর তাদের দেখতেও বিচ্ছিরি।
সুন্দর অর্কিডের উৎস ছিল এশিয়া কিংবা আফ্রিকার নিরক্ষীয় বনভূমি। কিন্তু মনে রেখো, তখন কলোনিগুলোতে যাতায়াত আজকের মতন এত সহজ ছিল না। তার ওপর সে সব দেশের বন্দরে গিয়ে নামলেই যে অর্কিড পাওয়া যেত তাও তো নয়। প্রাণ হাতে নিয়ে ঢুকতে হত অজানা দুর্গম জঙ্গলে। সে সব গহন বনে পা রাখতে আজও মানুষের বুক কাঁপে, তখনকার অবস্থা তো ভাবতেই পারছ। তবু কিছু ডাকাবুকো অর্কিড কালেক্টর জীবন বাজি রেখে দুয়েকটা অমন অপূর্ব অর্কিড নিয়ে ইংল্যান্ড পৌঁছোত, আর সেই সব ফুলের রূপ দেখে ইউরোপের মানুষের অর্কিড-তৃষ্ণা আরও বেড়ে যেত।
একদিকে দুর্লভ, অন্যদিকে সুন্দর। এমন ফুলের জন্যে ব্রিটিশ অভিজাতরা যে পাগলামোটা করত, সেটাকে বর্ণনা করার জন্যে দুটো ইংরিজি শব্দ জুড়ে একটা নতুন শব্দই তৈরি করতে হয়েছিল—'অর্কিডিলেরিয়াম'। 'ডিলেরিয়াম' কাকে বলে জানো তো? ধুম জ্বর এলে মানুষ যে খ্যাপামোটা করে তাকে বলে ডিলেরিয়াম। অর্কিড নিয়ে খ্যাপামোকে তাই বলা হত 'অর্কিডিলেরিয়াম'।
আমার গ্রেট গ্রেট গ্র্যান্ডপার বয়েস তখন চল্লিশ। পেটা চেহারা। ফ্রেঞ্চ আল্পসে মাউন্টেনিয়ারিং করতেন, ঘোড়ার পিঠে চেপে লেক ডিস্ট্রিক্টের জঙ্গলে শিকার করতেন। তিনি ঠিক করলেন, নিজেই যাবেন ভারতবর্ষে, অর্কিডের খোঁজে।
এসেছিলেন?—জিগ্যেস করল বুধোদা।
হ্যাঁ, এসেছিলেন। উনিশশো বারোর এপ্রিল মাসে।
তারপর?
তার পরের ঘটনা আমাদের পরিবারের ওপর এক বিরাট আঘাত। তিন মাস ভারতে কাটিয়ে রিচার্ড টিলম্যান ইংল্যান্ডে ফিরছেন। যাত্রিবাহী জাহাজ 'এইচ এম ভি সিগাল' পোর্টসমাউথ বন্দরে ভিড়বে উনিশে অগাস্ট। তার বহু আগেই তিনি কলকাতা থেকে লন্ডনের রয়্যাল হর্টিকালচার সোসাইটিতে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন —পৃথিবীর দুর্লভতম অর্কিডটি নিয়ে তিনি দেশে ফিরছেন। একই ভাষায় টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন তাঁর মালিক আর্লকে, আর আমার গ্রেট গ্রেট গ্র্যান্ডমা ক্যাথারিন টিলম্যানকে। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, কখন সিগাল নামে জাহাজটা পোর্টসমাউথ বন্দরে ঢোকে।
বুধোদা গ্যারিব্রয়েলকে বলল, কিছু মনে কোরো না। একটু বাধা দিচ্ছি। তার সংগৃহীত সেই দুর্লভতম অর্কিডটা কেমন ছিল সে ব্যাপারে রিচার্ড টিলম্যান টেলিগ্রামে কিছু লেখেননি?
গ্যাবি একটুক্ষণ চুপ করে রইল। খুব অবিশ্বাস্য কোনও কথা বলবার আগে কোনও মানুষ যেরকম দ্বিধায় ভোগে, সে-ও মনে হল সেইরকমই এক দ্বিধায় ভুগছে। তারপর বড় একটা শ্বাস টেনে এক নিশ্বাসে বলল—হ্যাঁ, লিখেছিলেন। লিখেছিলেন, তিনি সংগ্রহ করেছেন, ব্ল্যাক অর্কিড। জানো বোধহয়, কালো অর্কিডের খোঁজে গত দেড়শো বছর ধরে সারা পৃথিবীর অর্কিড হান্টাররা বৃথাই দৌড়ে বেড়াচ্ছে। হ্যাঁ, আমার দাদুর দাদু, আরুনডেল ক্যাসলের বাগানের মালি রিচার্ড টিলম্যান সেই কালো অর্কিড খুঁজে পেয়েছিলেন। অন্য কোথাও নয়, তোমাদের এই ভারতবর্ষে। আজ তোমরা যাকে মেঘালয় বলো, সেই মেঘালয়ের এক গহন জঙ্গলে।
তিনি এমনকী হর্টিকালচার সোসাইটির বিজ্ঞানীদের বলেছিলেন যে পরের সপ্তাহেই লন্ডনে যে ফ্লাওয়ার শো আছে, সেখানে তিনি সেই কালো অর্কিডকে জনসমক্ষে বার করবেন। প্রদর্শনযোগ্য ফুলের তালিকায় সেই কালো ফুলের এন্ট্রি যেন করা হয় 'টিলম্যানিয়া রুডিরপিয়া' এই নামে। বুঝতেই পারছ, তিনি তার প্রিয় ফুলটার একটা বৈজ্ঞানিক নামকরণও করে ফেলেছিলেন—টিলম্যানিয়া রুডিরপিয়া।
গ্যাব্রিয়েল টিলম্যানের এই কথায় আমি আর বুধোদাও হতচকিত হয়ে বসে রইলাম। আমরা দুজনেই জানতাম—প্রত্নতাত্বিকদের চূড়ান্ত স্বপ্ন যেমন সোনার শহর এল-ডোরাডোর হদিশ খুঁজে বার করা, তেমনি সারা পৃথিবীর পুষ্পপ্রেমীদের স্বপ্ন কালো অর্কিডের দেখা পাওয়া। এ এমনই এক ফুল, যা কেউ চোখে দেখেনি, অথচ সকলেই তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। হয়তো বাকি সমস্ত রঙের অর্কিড খুঁজে পাওয়া গেছে বলেই তারা বিশ্বাস করে কোথাও না কোথাও কালো অর্কিডও রয়েছে। ঈশ্বরের রংবাক্স কি মাত্র একটা রঙের অভাবে অসম্পূর্ণ থাকতে পারে? কবির কল্পনায়, শিল্পীর তুলিতে, চিত্রপরিচালকের ক্যামেরায় বার বার তাই উঠে এসেছে ব্ল্যাক অর্কিডের কাহিনি।
কিন্তু তার বাইরে? বাস্তবের শক্ত জমিতে?
না। কালো রঙের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে কোনও কোনও অর্কিডের রং, কিন্তু সত্যিকারের কালো যাকে বলে তেমন অর্কিড এখনও মানুষের স্বপ্নের বাইরে আর কোথাও দেখা দেয়নি।
অথচ এইমাত্র গ্যাব্রিয়েল টিলম্যান আমাদের যা বলল তার মানে দাঁড়ায়, একবারের জন্যে হলেও বাস্তবের ধুলোমাটির বুকে কালো অর্কিড ফুটে উঠেছিল।
হতচকিতভাবটা কাটিয়ে আমি প্রশ্ন করলাম, তারপর কী হল? তিনি সেই অর্কিড নিয়ে নামলেন জাহাজ থেকে?
ম্লান হেসে গ্যাব্রিয়েল বলল—উঁহু। তাহলে তো সেই দিনটা উদ্যানবিদ্যার ইতিহাসে সোনার জলে লেখা থাকত, তাই না? অর্কিডের বদলে রিচার্ড টিলম্যান দেশে ফিরলেন উন্মাদ রোগ নিয়ে।
জাহাজ ডকে ভিড়বার পরমুহূর্তেই একটা পুলিশের বোট জাহাজের গায়ে গিয়ে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ পরে সেই বোটে চেপেই বন্দরে পা রাখলেন রিচার্ড টিলম্যান। তার চোখে উন্মাদের দৃষ্টি। একবার শুধু তাঁর ছেলে, মানে আমার দাদুর বাবার দিকে তাকিয়ে হাহাকার করে উঠলেন, বাঁচাতে পারলাম না। বাঁচাতে পারলাম না টিলম্যানিয়া রুডিরপিয়াকে।
তারপর?
আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে পুলিশ তাঁকে টেনে নিয়ে গেল অপেক্ষমাণ ভ্যানের দিকে।
কিন্তু কেন? কী করেছিলেন তিনি? বুধোদা জিগ্যেস করল।
খুন করতে গিয়েছিলেন। একটা কমবয়েসি নিগ্রো ছেলে ওই জাহাজে কেবিনবয়ের কাজ করত। রিচার্ড টিলম্যান নিজের ঘরের ভেতর তাকে ঢুকিয়ে পেটে ছুরি বসিয়ে খুন করতে গিয়েছিলেন। ছেলেটার পরিত্রাহি চিৎকার শুনে জাহাজের অন্যান্য কর্মচারীরা দৌড়ে এসে দরজা ভেঙে ছেলেটাকে রক্ষা করে।
বুধোদা কিছু জিগ্যেস করতে যাচ্ছিল, কিন্তু গ্যাবি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, কেন তিনি এমন কাজ করেছিলেন, সে প্রশ্ন কোরো না। উন্মাদ রিচার্ড টিলম্যান উকিলের হাজার জেরাতেও সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি।
এই ঘটনার মাস চারেক পরেই জেলে বন্দি অবস্থাতেই রিচার্ড টিলম্যানের মৃত্যু হয়। তাঁর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আক্ষরিক অর্থে 'উইথ ব্রোকেন হার্ট' তিনি মারা গিয়েছিলেন।
আর তাঁর সেই কালো অর্কিড? টিলম্যানিয়া রুডিরপিয়া?
জাহাজের কেবিনে শুকনো ফুল গাছটা নেতিয়ে পড়েছিল। শুনেছি, সেটা ছিল টেরেস্ট্রিয়াল অর্কিড। মানে যেরকম অর্কিড মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকে, অন্য গাছের ওপর আশ্রয় নেয় না। সাধারণত ওইরকম টেরেস্ট্রিয়াল অর্কিডের মাটির নীচের বালব থেকে নতুন গাছ জন্মায়। রয়্যাল হর্টিকালচার সোসাইটির বিজ্ঞানীরা রুডিরপিয়ার বালব নিয়ে গিয়ে সেই চেষ্টাই করেছিলেন। কিন্তু কোনও ফল হয়নি। কিছুদিন বাদে বালবগুলোও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সারা পৃথিবীর অর্কিডপ্রেমীদের কাছে তাই আজও টিলম্যানিয়া রুডিরপিয়া এক স্বপ্নের ফুল হয়েই রয়ে গিয়েছে।
সন্ধে নেমে এসেছিল। বুধোদা সোফা ছেড়ে উঠে ঘরের আলোগুলো জ্বেলে দিয়ে আবার সোফায় এসে বসল। তারপর গ্যাব্রিয়েল টিলম্যানকে বলল, এতক্ষণ অবধি যা বললে তা তো তোমাদের টিলম্যান পরিবারের পারিবারিক ইতিহাস। বংশানুক্রমে এসব ঘটনা তোমরা শুনে আসছ। কিন্তু এবার যখন ওনার ডায়েরি খুঁজে পেলে, তখন তাতে তো নিশ্চয় এমন কিছু ইঙ্গিত পেয়েছ যার থেকে বোঝা যায় কেন রিচার্ড টিলম্যান অমন দুর্ভাগ্যের কবলে পড়েছিলেন।
গ্যাবি টিলম্যান হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। বলল, আমিও সেই আশা নিয়েই ডায়েরিটা খুলেছিলাম। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, দেখি কি ডায়েরির শেষ কয়েকটা পাতা ছেঁড়া।
তার আগে অবধি যা আছে তা শুধুই যাত্রাপথের বর্ণনা আর কখনও কখনও কোনও ইন্টারেস্টিং ফুল বা ফলের গাছ দেখে থাকলে তার বিস্তারিত বিবরণ। অবশিষ্ট শেষ পাতাটায় যে এন্ট্রি আছে সেখানে রিচার্ড টিলম্যান লিখছেন—কাল নিহাংদের গুহামন্দিরে যাব। গাঁওবুড়োরা বলছে, ওই গুহার ভেতরেই এককালে জন্ম নিত কালো অর্কিডের গাছ। কিন্তু বহু বছর হয়ে গেল সেই গাছ আর জন্মায় না।
বোঝাই যাচ্ছে, রিচার্ড টিলম্যান পরেরদিন সেই গুহামন্দিরে গিয়েছিলেন, গাঁওবুড়োদের কথাকে মিথ্যে প্রমাণিত করে ব্ল্যাক অর্কিড ফুটেছিল এবং রিচার্ড সেই ফুল শুধু দেখতে পেয়েছিলেন তাই নয়,ফুলশুদ্ধু গাছ নিয়ে ইংল্যান্ডে রওনাও হয়েছিলেন। কিন্তু এর পরে কী ঘটেছিল, যার ফলে একটা সুস্থ মানুষ পাগল হয়ে যেতে পারে? ডায়েরির শেষ পাতাগুলো রিচার্ড ছিঁড়ে ফেলায় সেটা আর জানতে পারলাম না।
বুধোদা বললেন, কিন্তু একটা জিনিস ভেবে দেখো। একশো বছর আগে তিনি যে ফুল খুঁজে পেয়েছিলেন, সে ফুল তো আজ আর সেখানে নাও থাকতে পারে। বনের ফুল, বনের প্রজাপতি এরা পরিবেশের সামান্য হেরফের হলে অবলুপ্ত হয়ে যায়। আর গত একশো বছরে পৃথিবীর পরিবেশ তো আমূল বদলে গিয়েছে। হয়তো রুডিরপিয়াও অবলুপ্ত হয়ে গেছে।
গ্যাব্রিয়েল জবাব দিল, তাতে কিচ্ছু এসে যায় না বোধিসত্ব। সেই ফুল পেলে ভালো, না পেলেও কোনও ক্ষতি নেই। আমার কাছে এই যাত্রা হবে একটা তীর্থযাত্রার মতন। আমার এক হতভাগ্য পূর্বপুরুষের প্রতি আমার সামান্য শ্রদ্ধার্ঘ্য।
হঠাৎ টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে গ্যাবি বুধোদার হাতদুটো জড়িয়ে ধরল। বলল, তুমি আমাকে সাহায্য করো। এই পথের মধ্যে এমন অনেক জায়গা রয়েছে, আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, যেখানে এখনও সভ্য মানুষের পায়ের ছাপ পড়েনি। তোমার মতন একজন দক্ষ গাইড ছাড়া আমি একা এই জার্নি কমপ্টি করতে পারব না।
বুধোদা মাথাটা নীচু করে একটুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, সত্যি কথা বলতে কী প্ল্যানটা আমার কাছেও খুব লোভনীয়। অজানা পথে 'না জানি কী'-র খোঁজে যাত্রা। ঠিক আছে গ্যাব্রিয়েল। আমি তোমার সঙ্গে যাচ্ছি। আমি নই, আমরা। আমার এই ভাইটাও আমাদের সঙ্গে যাবে।
গ্যাবি তো শুনে খুব খুশি। আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক টেক করে একাকার।
বুধোদা কাজের কথায় ফিরল। গ্যাব্রিয়েলকে জিগ্যেস করল, আর কিছু পাওনি ওই ডায়েরিতে? ফুল বা পাখির ডেসক্রিপসন ছাড়া অন্য কোনও কথা?
গ্যাবি বলল, হ্যাঁ, বলতে ভুলেই যাচ্ছিলাম। আমার অ্যানসেসটরের একজন সফরসঙ্গীর কথাও রয়েছে। তিনি অবশ্য ইংল্যান্ড থেকে আসেননি।
তাই না কি? তিনি কে?
তিনি একজন বাঙালি সাধু, বাস করতেন অসমের গৌহাটিতে। নাম কালিনাথ ভট্টাচার্য। লোকে আড়ালে তাকে ডাকত হাতকাটা সাধু বলে, কারণ কালিনাথ ভট্টাচার্য্যের বাঁ-হাতটা কব্জির কাছ থেকে কাটা ছিল। ছোটবেলায় পড়ন্ত ঢেঁকির নীচে হাত দিয়ে ফেলেছিলেন, তারই মাশুল।
রিচার্ড টিলম্যানের মতন কেজো লোকও কালিনাথের কথা লেখার সময় আবেগ লুকোতে পারেননি। তার ভাষায়—কালিনাথের সঙ্গে দেখা হওয়াটা দৈবের অনুগ্রহ ছাড়া কিছুই নয়। ওই তান্ত্রিক সাধককে যদি না পেতেন তাহলে হয়তো মেঘালয়ের জঙ্গল থেকে সাধারণ কিছু অর্কিড নিয়েই তাকে ইংল্যান্ডে ফিরতে হত। কিন্তু অর্কিডের সেরা অর্কিড 'টিলম্যানিয়া রুডিরপিয়া' তা অদেখাই থেকে যেত।
কালিনাথের সঙ্গে তাঁর কীভাবে আলাপ হয়েছিল সে ব্যাপারে রিচার্ড কিছু লেখেননি। গৌহাটি শহরের উপকণ্ঠে কালিনাথের একটা ছোটখাটো আশ্রম ছিল, কিন্তু বেশিরভাগ সময়ে উনি শ্মশানে-মশানে, বনেজঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন। উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু কিছু উপজাতির অরিজিন না কি তিব্বতে। কালিনাথ সেইসব উপজাতিদের গ্রামেও চলে যেতেন তাদের আরাধ্য দেবদেবীদের খোঁজে। এইভাবেই উনি দক্ষিণ গারো পাহাড়ের গভীর জঙ্গলের মধ্যে নিহাং উপজাতি আর তাদের আরাধ্যা দেবী...নামটা...নামটা...।
গ্যাবি টিলম্যান স্মৃতির মধ্যে দেবীর নামটা হাতড়াচ্ছিল। বুধোদা জিগ্যেস করল—দেবী দন্তুরা কী?
গ্যাবি টিলম্যান বড় বড় চোখ করে বুধোদার দিকে তাকিয়ে বলল, ইয়েস, দেবী দন্তুরা। কিন্তু তুমি কেমন করে জানলে?
ও কিছু না। তুমি গল্পটা বলে যাও। মুচকি হেসে বলল বুধোদা। গ্যাবি আর কেমন করে জানবে যে বুধোদার অনেকগুলো প্রিয় বিষয়ের মধ্যে একটা হল টিবেটোলজি।
গ্যাবি ঢোক গিলে আবার বলতে শুরু করল—হাতকাটা সাধু এইভাবেই দেবী দন্তুরার মন্দিরের খোঁজ পেয়েছিলেন। রিচার্ড টিলম্যানের সঙ্গে গল্পে গল্পে কালিনাথ বলে ফেলেছিলেন ওই দন্তুরার মন্দিরের আশেপাশে তিনি যেমন বুনো ফুলের বাহার দেখেছেন, এতদিন বনে-জঙ্গলে ঘুরে আর কোথাও তেমনটা দেখেননি। সেসব ফুলের গাছ না কি অন্য গাছের ডালের ওপর বাসা বাঁধে।
ফুল সম্বন্ধে অভিজ্ঞ রিচার্ড কালিনাথের বর্ণনা শুনেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, কালিনাথ যে ফুলের কথা বলছেন তা অর্কিড ছাড়া আর কিছু নয়। তিনি কালিনাথকে হাতেপায়ে ধরে রাজি করিয়েছিলেন তাকে ওই নিহাং গ্রামে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। তবে কালো অর্কিড দেখতে পাওয়ার কথা তিনি তখনও স্বপ্নেও ভাবেননি।
কালিনাথ রিচার্ডের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। তিনিই ঘোর বনের মধ্যে দিয়ে রিচার্ডকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন নিহাংদের গ্রামে। আর সেই গ্রামের কাছেই রিচার্ড তার সেই দুর্লভ অর্কিড খুঁজে পেয়েছিলেন।
কিন্তু আমরা এখন সেই গ্রাম খুঁজে পাব কেমন করে? বুধোদা চিন্তিত মুখে বলল।
গ্যাব্রিয়েল কলকাতায় ফিরে যাবে বলে উঠে দাঁড়িয়েছিল। বুধোদার কথা শুনে ভারি লজ্জিত মুখে বলল, দেখেছ! ডায়েরিটা নিয়ে পথে পথে ঘোরা নিরাপদ হবে না বলে একটা স্ক্যান কপি নিয়ে এসেছিলাম। সেটা তোমাকে দিতেই ভুলে যাচ্ছিলাম। এই নাও।
বুধোদার হাতে একটা সিডি ধরিয়ে দিয়ে গ্যাব্রিয়েল টিলম্যান বলল, তুমি ডায়েরিটা পড়ো বোধিসত্ব। আমার মনে হয় রিচার্ড টিলম্যান যেভাবে পথের হদিশ রেখে গেছেন তাতে নিহাং গ্রামের রুট-ম্যাপ বানিয়ে ফেলতে তোমার অসুবিধে হবে না। দরকার হলে গুগল আর্থের সাহায্যও নিতে পারো। ট্যুর প্রাোগ্রাম বানিয়ে আমাকে ফোন কোরো।
তারপর একটু ইতস্তত করে যোগ করল, খরচের জন্যে ভেব না। ওটা আমিই বহন করব।
বুধোদাও সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। গ্যাবির এই কথা শুনে মুচকি হেসে ওর পিঠে হাত রেখে বলল, তাই হয় না কি? অভিযানের রোমাঞ্চটা শেয়ার করব, আর খরচাটা শেয়ার করব না?
গ্যাব্রিয়েল আর কোনও কথা না বলে বুধোদার হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে ধরে খুব জোরে জোরে দুবার ঝাঁকাল। তারপর পেছনে না তাকিয়ে রওনা হয়ে গেল হেম কুঞ্জের বাইরের রাস্তায় অপেক্ষমাণ অ্যাম্বাসাডরটার দিকে।
পরদিন সকালেই বুধোদা ফোন করে বলল, রিচার্ড টিলম্যানের সেই সাফারির ম্যাপ স্টাডি করলাম, বুঝলি রুবিক। লোকটা কোথায় গিয়েছিল জানিস? গারোপাহাড়ে। তা-ও ডেসক্রিপসন পড়ে মনে হচ্ছে সাউথ গারো হিলসের ওদিকটায়। ওসব জায়গা এখনও ঘন জঙ্গলে ঢাকা। কাজেই হান্টার শ্যু, ব্রিচেস আর স্লিপিংব্যাগ মাস্ট। হ্যামক আর টেন্ট গুয়াহাটি থেকে নিয়ে নেব। ওখানে আমার বন্ধু অশোক বড়ুয়া আছে, গুয়াহাটি নেচার ক্লাবের সেক্রেটারি। ওকে বললে ওই সব ব্যবস্থা করে দেবে। আর হ্যাঁ, টিটেনাস ভ্যাকসিনটা আজই মনে করে নিয়ে রাখবি।
প্ল্যান মতন তার পরেরদিন আমরা প্লেনে গুয়াহাটি পৌঁছোলাম। এখানে আমাদের সাফারির সাজসরঞ্জাম জোগাড় করার জন্যে দুদিন থাকতে হবে। বিকেলের দিকে বুধোদার বন্ধু সেই অশোক বড়ুয়া হোটেলে বুধোদার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। চমৎকার হাসিখুশি মানুষ। কথা বলতে-বলতে বুঝতে পারলাম, মানস অভয়ারণ্যের দুষ্প্রাপ্য গোল্ডেন ল্যাঙ্গুর বা সোনালি হনুমান সংরক্ষণের ব্যাপারে ওনার বিরাট অবদান রয়েছে। উনি না থাকলে চোরাশিকারীদের হাতে অমন সুন্দর প্রাণীটা শেষ হয়ে যেত।
হোটেলের বারান্দায় বসে গল্প করতে-করতে বুধোদা হঠাৎই অশোক বড়ুয়াকে জিগ্যেস করল, হাতকাটা সাধু বলে কারুর নাম শুনেছ না কি, অশোক?
আমাদের অবাক করে দিয়ে অশোক বড়ুয়া বললেন, কেন শুনব না? হাতকাটা সাধুর আশ্রম তো মোটামুটি নামকরা জায়গা। কালিনাথ নামে এক তান্ত্রিকের প্রতিষ্ঠা করা একশো বছরের পুরোনো কালিমন্দির আছে ওখানে। গত একশো বছরে ওই আশ্রম অনেক বড় হয়ে উঠেছে। কালিনাথের যে বংশধর এখন মন্দিরের প্রধান সেবাইত তাঁর নাম প্রবীর ভট্টাচার্য। অশোক বড়ুয়া তখনই প্রবীরবাবুর সঙ্গে বুধোদার টেলিফোনে কথাও বলিয়ে দিলেন। বুধোদা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন শুনে তিনি বললেন, তাহলে এখনই চলে আসুন। ফাঁকা আছি।
অশোক বড়ুয়াই তার গাড়িতে চাপিয়ে আমাকে আর বুধোদাকে হাতকাটা সাধুর আশ্রমে নিয়ে গেলেন। গ্যাব্রিয়েল আসতে চাইল না। ওর অনেক মালপত্র বাঁধাছাঁদার কাজ বাকি ছিল।
প্রবীরবাবুর মুখোমুখি বসে বুধোদা রিচার্ড টিলম্যানের সঙ্গে কালিনাথের সেই জঙ্গল অভিযানের প্রসঙ্গ তোলাতে তিনি বেশ অবাক হলেন। বললেন, এত পুরোনো কথা আপনি জানলেন কেমন করে?
বুধোদা দেখলাম নির্বিকার মুখে গুল মারল। বলল, এশিয়াটিক সোসাইটির একটা পুরোনো জার্নালে রিচার্ড টিলম্যানের লেখা ভ্রমণ কাহিনি থেকে আমরা কালিনাথের কথা জেনেছি। তারপর প্রবীরবাবুকে প্রশ্ন করল, ওই অভিযান থেকে ফিরে কালিনাথ কোনও স্মৃতিকথা ধরনের কিছু লেখেননি? কিংবা তার কোনও গল্প ভট্টাচার্য পরিবারে মুখে মুখে চলে আসেনি? আসলে আমরা ওই দন্তুরা মন্দিরের এগজ্যাক্ট লোকেশনটা খুঁজছিলাম।
প্রবীরবাবু একটু আহত সুরে বললেন, রিচার্ড টিলম্যান কি তার ভ্রমণ কাহিনিতে একথা লিখতে ভুলে গেছেন যে তাঁর উপকারী বন্ধুটি ওই অভিযান শেষ করে আর গৌহাটিতে ফিরে আসতে পারেননি?
তার মানে?—আমরা সমস্বরে জিগ্যেস করলাম।
প্রবীরবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি আমার দাদুর মুখে যা শুনেছি তা হল, ফেরার পথে তুরার জঙ্গলের মধ্যে শঙ্খচূড় সাপের কামড়ে কালিনাথ আগমবাগীশের মৃত্যু হয়েছিল।
আশ্রম থেকে বেরিয়ে বেশ কিছুটা পথ গম্ভীর মুখে হাঁটার পর বুধোদা আপনমনেই বলল, ডায়েরির শেষ পাতা ক'টার সঙ্গে এরকম আরও কত ইনফর্মেশনই যে হারিয়ে গেছে কে জানে!
গুয়াহাটিতে দুদিন কাটিয়ে, ভাড়ার জিপের মাথায় সাজসরঞ্জাম চাপিয়ে আমরা পৌঁছোলাম তুরায়। তার পরেরদিন তুরা থেকে বাঘমারা।
বাঘমারা হল দক্ষিণ গারো হিলস জেলার সদর শহর। শহরটা মেঘালয় আর বাংলাদেশের সীমানায়। এই শহরের বাঘমারা নামটা বাংলাদেশের লোকেদের দেওয়া। কিন্তু তারা আসার আগে অবধি গারোরা এই শহরটাকে ডাকতেন কোনগিট্টিম বলে। ভাগ্যিস ব্যাপারটা বুধোদার জানা ছিল, তা না হলে রিচার্ড টিলম্যানের যাত্রাপথের ধারে কাছেও আমরা পৌঁছোতে পারতাম না। টিলম্যানের ডায়েরিতে শেষ যে নামটা বুধোদা চিনতে পেরেছিল, সেটা এই কোনগিট্টিম। এর পরে আর চেনাজানা কোনও জায়গার উল্লেখ নেই। তবে একজন দক্ষ অভিযাত্রীর মতনই কোনগিট্টিম থেকে কবে কোনদিকে কতটা পথ হাঁটলেন এবং যেখানে পৌঁছোলেন সেখানকার কিছু না কিছু ল্যান্ডমার্ক রিচার্ড টিলম্যান তাঁর ডায়েরিতে লিখে রেখেছেন। তাই মনে হচ্ছিল তাঁর যাত্রাপথ অনুসরণ করতে আমাদের খুব একটা অসুবিধে হবে না।
বাঘমারায় আমরা উঠেছিলাম ডিলসা পাহাড়ের মাথায় মেঘালয় সরকারের টুরিস্ট বাংলোয়। সন্ধেবেলায় আমি, বুধোদা আর গ্যাবি ট্যুরিস্ট বাংলোর সামনের লনে বসেছিলাম। ভারি সুন্দর লাগছিল চারিপাশের নিসর্গ। আমাদের এই বাংলোকে ঘিরে যতদূর চোখ যায় ততদূর অবধি শুধু গভীর বনে ঢাকা পাহাড়ের ঢেউ। আমাদের ঠিক পায়ের নীচে বুনের বুক চিরে এঁকে এঁকে বয়ে চলেছে নীল রঙের এক নদী—যার নাম সিমসিং।
অন্ধকার আরেকটু গাঢ় হতেই একটা অদ্ভুত হাওয়া বইতে শুরু করল। ঠাসবুনোট গাছের পাতার ভেতর দিয়ে সেই হাওয়া বয়ে যাওয়ার ফলে অদ্ভুত একটা শব্দ উঠল—যেন অনেক দূরে কারা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছে। বুধোদা বলল, এই হাওয়াটার একটা নাম আছে—'গর্জ উইন্ড'। সমস্ত বনের বাতাস যখন একটা গভীর নদীখাতের মধ্যে ঢুকে পড়ে তখন তার গতি এরকম বেড়ে যায়, তার চলার পথে ঝড় ওঠে। গ্যাবি টিলম্যান ওর নিত্যসঙ্গী গিটারটা কোলের ওপর নিয়ে ক্লিফ রিচার্ডের সেই বিখ্যাত গানটা ধরল—'অ্যালোন ইন মাই সাইলেন্স আই হার্ড আ ভয়েস ক্রাই/আ ভয়েস ইন দ্যা ওয়াইল্ডারনেস, আ ভয়েস ফ্রম দ্যা স্কাই'।
এক আকাশ তারার নীচে বসে সেই গান শুনতে শুনতে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল।
পরদিন ভোরবেলা, বুধোদার মোবাইলের অ্যালার্মের শব্দে যখন ঘুম ভাঙল, তখনও সূর্য ওঠেনি। সেই ভোরেই বুধোদাকে পথপ্রদর্শক করে আমরা গারোপাহাড়ের দিকে পায়দল রওনা দিলাম।
আমি, বুধোদা আর গ্যাবি ছাড়া দুজন খাসিয়া যুবক আমাদের মালবাহক হিসেবে সঙ্গে চলেছে। ওদের একজনের নাম টনি, আরেকজনের নাম অর্কু। টনি আর অর্কু দুজনেই ভালো হিন্দি বলতে পারে, সেটা একটা সুবিধে।
বাঘমারা শহরকে পেছনে রেখে আমরা ঠিক উলটোদিকে, মানে দক্ষিণ দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। ওদিকেই পাহাড়ের ঢেউ উঁচু থেকে নীচু হতে হতে ক্রমশ বাংলাদেশের সমতলভূমিতে গিয়ে মিশেছে। মেঘালয় আর বাংলাদেশের মাঝে দেড়শো কিলোমিটার চওড়া এক পর্বতশ্রেণি পাঁচিলের মতন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই পাহাড়ের পুরোটাই গভীর জঙ্গলে ঢাকা এক অনাবিষ্কৃত দেশ, যেখানে বাসিন্দা বলতে বন্য জন্তু, নানা জাতের পাখি, প্রজাপতি এরাই। আর যদি রিচার্ড টিলম্যানের বর্ণনা সত্যি হয়, তাহলে এই জঙ্গলের ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে আছে নিহাং উপজাতিদের গ্রাম আর তাদের উপাস্যা দেবী দন্তুরার গুহামন্দির, যে গুহামন্দিরের ভেতরে রিচার্ড টিলম্যান কালো অর্কিড খুঁজে পেয়েছিলেন।
একশো বছর অনেক লম্বা সময়। এখন ওখানে যদি পৌঁছোতেও পারি, সেই ফুল কি আর আমরা দেখতে পাব?
গতকাল দুপুরে আমরা নিহাং গ্রামে পৌঁছোলাম। বাঘমারা থেকে রওনা হওয়ার পর, জঙ্গল ভেঙে সাতদিন হেঁটেছি। আমাদের সামনে মানুষের তৈরি পথ বলে কিছুই ছিল না, তবু ধন্য রিচার্ড টিলম্যান নামে সেই অভিযাত্রী। একশো বছর আগে শুধু কম্পাস আর নক্ষত্রের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে তিনি এত নিখুঁত ভাবে দিকনির্দেশ করে গিয়েছিলেন যে সেইটুকু অনুসরণ করেই আমরা যথাস্থানে পৌঁছে গেলাম।
পথের কষ্ট ছিল মারাত্মক। দা দিয়ে জঙ্গল কাটতে-কাটতে সামনে সামনে চলেছে টনি আর অর্কু, তাদের পেছন পেছন আমরা। যখন তখন আকাশ থেকে মুষলধারায় বৃষ্টি নেমেছে, আর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কোমর অবধি ডুবিয়ে দিয়েছে গলানো চকোলেটের মতন ঘোলাটে জলস্রোত। সেই জল ভেঙে আমরা এগিয়েছি। পায়ের নীচ থেকে তো গায়ে জোঁক উঠে এসেছেই, গাছের পাতা থেকে অবধি টুপটাপ খসে পড়েছে রক্তচোষার দল। তা ছাড়াও বিষাক্ত সাপ, কাঁকড়া বিছে কোনও কিছুরই অভাব ছিল না।
এই সব জঙ্গলে ঝোপঝাড়ের ঘনত্ব এতই বেশি যে তাঁবু আমাদের সঙ্গে থাকলেও তা খাটাবার জায়গা পাইনি। ছ'টা রাত গাছের ডালে হ্যামক খাটিয়ে ঘুমিয়েছি—মানে ঘুমোবার চেষ্টা করছি। কিন্তু সূর্য ডুবলেই জেগে উঠেছে অরণ্য। সারা রাত কাছে-দূরে গর্জন করে ঘুরে বেরিয়েছে চিতাবাঘ। কখনও কখনও ক্যাম্প সাইটের একেবারে পাশ থেকে বুনো হাতিদের গাছপালা ভাঙবার মড়মড় শব্দ পেয়েছি। ফলে রাতের পর রাত প্রায় না ঘুমিয়েই কাটিয়েছি আমরা।
তবু একটা জিনিস স্বীকার করতেই হবে। এর মধ্যেই যখন ঘন বনের ঘেরাটোপ ছাড়িয়ে কোনও খোলা উপত্যকায় বেরিয়েছি তখনই স্বর্গীয় সৌন্দর্যে আমাদের চোখ জুড়িয়ে গিয়েছে। এখন এপ্রিল মাস। মেঘালয়ে ফুল ফুটবার সময়। দেখেছি নদীর তীরে বাউলের আলখাল্লার মতন নানা রঙের রঙিন ঘাসফুলের প্রান্তর। আর প্রজাপতি! একসঙ্গে এত রঙের প্রজাপতি যে কোথাও উড়ে বেড়াতে পারে তা আমি কোনওদিন স্বপ্নেও ভাবিনি। বুধোদা বলল, অর্কিডের মতন মেঘালয়ের আরেক সম্পদ তার প্রজাপতি। কিন্তু দু:খের কথা—অর্কিডের মতন প্রজাপতিও চোরাশিকারীদের হাতে পড়ে ক্রমাগত এখান থেকে বাইরের দেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। হয়তো এইভাবে বহু প্রজাতির অর্কিড আর প্রজাপতি চিরকালের মতন মেঘালয়ের জঙ্গল থেকে হারিয়ে যাবে।
চলার পথে প্রথম তিনটে দিনই শুধু আমরা অমন দুর্ভেদ্য বন আর সবুজ তৃণভূমি পেয়েছিলাম। চতুর্থ দিনে আমরা প্রায় হাজার দেড়েক ফুট উঁচু চড়াই ভেঙে যে জায়গাটায় উঠে এলাম তার নামটাকে বাংলা করলে মানে দাঁড়ায় 'মৃতের উপত্যকা'। একথা আমাদের দুই খাসিয়া পথপ্রদর্শকই আমাদের জানাল।
মৃতের উপত্যকার মতন সার্থকনামা জায়গা আমি আর দেখিনি। দুদিকের দুটো পাহাড়ের দেয়ালের মাঝখানে এ এক টেবিলের মতন সমতল জায়গা যেখানে সারাদিন সারারাত ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। যত জলভরা মেঘ সব ওই দু-দিকের পাহাড়ের পাঁচিলে সমস্ত বৃষ্টি ঝরিয়ে দিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে, তাই মৃতের উপত্যকার আকাশের রং টকটকে নীল। বুধোদা বুঝিয়ে দিল—লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ঝোড়ো-বাতাস মাটির ওপরের উর্বর আবরণটাকে গুঁড়ো গুঁড়ো করে উড়িয়ে নিয়ে চলে গেছে। বেরিয়ে পড়েছে নীচের নুড়ি আর কাঁকরের স্তর, যার ওপরে একটা ঘাস অবধি জন্মায় না।
ওই মাইল মাইল বিস্তৃত রুক্ষ্ম কাঁকুরে ডাঙা আর তার ওপরে সারাক্ষণ শোঁওওও শোঁওওও শব্দে বয়ে চলা বাতাস—সব মিলিয়ে জায়গাটাকে ভারী আতঙ্কজনক মনে হয়। গারোপাহাড়ের উপজাতীয়দের বিশ্বাস মৃতমানুষের আত্মা নরলোক ছেড়ে প্রেতলোকে যাবার সময় এই মৃতের উপত্যকায় বিশ্রাম নেয়।
পঞ্চমদিনে আমরা সেই মৃত্যু উপত্যকার ঠিক মাঝখানে পৌঁছে গেলাম। এখন আমাদের চারিদিকে শুধু লাল কাঁকরের ছোট ছোট টিলা আর ঢিবি। মনে হচ্ছিল যেন পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোনও গ্রহের মাটিতে পা রেখেছি। এরকমই একটা টিলা পেরিয়ে গিয়ে ভারি অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখে আমরা পাঁচজনেই দাঁড়িয়ে পড়লাম। একটু ভুল বলা হল। আমি, বুধোদা আর গ্যাব্রিয়েল দাঁড়িয়েই ছিলাম, কিন্তু টনি আর অর্কু ভূতগ্রস্তের মতন মাটির ওপর গড়াগড়ি খেতে লাগল, আর সেইসঙ্গে শুরু করল তারস্বরে দুর্বোধ্যভাষায় মন্ত্রপাঠ।
যেটা দেখে ওদের এই অবস্থা, সেটা আর কিছুই নয়, একটা বেশ বড় জলাশয়। এরকম বৃষ্টিহীন রুক্ষ্ম জায়গায় ওরকম একটা জলাশয় থাকাটা বেশ অদ্ভুত ব্যাপার সন্দেহ নেই। কিন্তু তার চেয়েও অদ্ভুত সেই জলাশয়ের জলের রং। একদম আলকাতরার মতন কালো। আমরা তিনজনে একটু এগিয়ে সেই জলাশয়ের ধার অবধি গেলাম, কিন্তু টনি আর অর্কু কিছুতেই ওটার ধারে কাছে যেতে রাজি হল না। এই পুকুরটাকে গারো উপজাতির লোকেরা বলে 'চিরিমাক'। ওদের বিশ্বাস, মৃত মানুষের আত্মারা প্রেতলোকে রওনা হবার আগে এই পুকুরে স্নান করে যায়। ওই কারণেই পুকুরটাকে স্বচক্ষে দেখে টনি আর অর্কুর অমন পাগলের মতন আচরণ।
দন্তুরাদেবীর পবিত্র গুহার মতন এই মৃতের উপত্যকার কথা, চিরিমাকের কথা সবই রিচার্ড তাঁর ডায়েরিতে লিখে গেছেন। কাজেই আমাদের কাছে এসব অজানা ছিল না। তবু ডায়েরির পাতায় পড়া এক জিনিস, আর চাক্ষুষ দেখা আরেক জিনিস। সত্যি কথা বলতে কী মৃতের উপত্যকার ওই বিশাল নির্জনতা আমাদের সকলের মনের ওপরেই একটা চাপ সৃষ্টি করছিল। মনে হচ্ছিল, কতক্ষণে এই অদ্ভুত জায়গাটা ছেড়ে বেরোব। কতক্ষণে পৌঁছব নিহাং গ্রামে।
টনি আর অর্কু মরে গেলেও সেই মৃতের উপত্যকায় তাঁবু খাটিয়ে রাত্রিবাস করতে রাজি হল না। কাজেই সেদিন আমরা সারারাত হাঁটলাম। খুব একটা অসুবিধে হচ্ছিল না, কারণ আকাশে বেশ বড়সড় একটা চাঁদ ছিল। শুধু রাত গভীর হলে যখন দূর থেকে হাড় হিম করে দেওয়া একটা কান্নার মতন আওয়াজ ভেসে এল তখন আমারও বুকের ভেতরটা কেমন খালি খালি লাগতে শুরু করল। মনে হচ্ছিল আমার পা-দুটো যেন মাটিতে গেঁথে গেছে। বুধোদা আমাকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরে বলল, ভয় পাস না। নেকড়ের পাল শিকার করতে বেরিয়েছে। তবে মানুষকে দল বেঁধে চলতে দেখলে ওরা ভয় পায়। আমাদের ধারে-কাছে আসবে না।
তারপর ঠিক যখন ভোরের আলো ফুটি ফুটি করছে, তখনই আমরা সেই উপত্যকার কিনারে পৌঁছিয়ে গেলাম। দেখলাম, পায়ের নীচে খাড়া পাহাড় নেমে গেছে প্রায় হাজার দুয়েক ফুট। নীচের সমতলভূমি গভীর জঙ্গলে ঢাকা, ঠিক যেরকম জঙ্গল আমরা মৃত্যু-উপত্যকায় উঠবার আগে পেরিয়ে এসেছিলাম। বুধোদা বলল, যদি রিচার্ডের পথনির্দেশ ঠিক হয়, তাহলে আমাদের পায়ের নীচেই ওই জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে নিহাং গ্রাম।
এই কথা শুনে রাতজাগার কষ্ট কোথায় মিলিয়ে গেল। নতুন উদ্যমে আমরা দ্রুত উতরাই ভেঙে নীচে নামতে শুরু করলাম। জঙ্গলে যখন ঢুকলাম তখন সকাল পেরিয়ে দুপুর হয়ে গেছে। দেখলাম একটা সরু পাহাড়ি নদী জঙ্গল ভেদ করে এগিয়ে চলেছে। বুধোদা বলল, জলের উৎসের কাছাকাছি ছাড়া গ্রাম হয় না। কাজেই এই নদীর ধারাটাকে অনুসরণ করলেই আমরা নিহাং গ্রাম পেয়ে যাব।
বুধোদা ঠিকই বলেছিল। আর ঘণ্টাখানেক হাঁটতেই নদীর কিনারা থেকে জঙ্গলটা হঠাৎই অনেক দূরে সরে গেল। দেখলাম, বালিতে ঢাকা সেই চওড়া পাড়ের ওপর খুব আদিম চেহারার কিছু কাঠের ঘর দাঁড়িয়ে রয়েছে।
আমাদের দেখতে পেয়ে ওই গ্রামের কাঠের ঘরগুলো থেকে গ্রামের বাসিন্দারা বেরিয়ে এসে আমাদের ঘিরে ধরল। কথা বলে জানলাম, তারাই নিহাং। দেখলাম, নিহাংদের চেহারা এখানকার গারো কিংবা খাসিয়াদের থেকে একেবারেই আলাদা। প্রথমত এরা বেশ লম্বা, গায়ের রংটাও হলদেটে নয়, শ্যামলা। নাক তীক্ষ্ণ। গালের হাড়দুটো উঁচু। বেশিরভাগ পুরুষেরই পরনে ওভারকোটের মতন ঢোলা পোশাক, মাথায় লোমশ টুপি যার দুটো প্রান্ত কানের ওপর নেমে এসে আবার পাক খেয়ে ওপরে উঠে গেছে। ব্যাপারটা বুধোদাও খেয়াল করেছিল। চাপাস্বরে বলল, রিচার্ড তাঁর ডায়রিতে নিহাংদের তিব্বতীয় অরিজিনের ব্যাপারে যা লিখেছে সেটা একশোভাগ সত্যি। এদের চেহারা আর পোশাক-আশাক সবই তিব্বতীদের মতন। হাজার বছর এখানে কাটানোর পরেও কিছুই বদলায়নি।
টনি আর অর্কু নিহাংদের ভাষা মোটামুটি বুঝতে পারছিল। ওরাই আমাদের দোভাষীর কাজ করছিল। আমরা নিহাংদের জানালাম যে আমরা দন্তুরার মন্দির দেখতে এসেছি।
লোকগুলোর মধ্যে যে সবচেয়ে বয়স্ক, হয়তো সর্দার হবে, সে এইকথা শুনে বলল, ও মন্দিরতো তোমরা এখানে আসবার সময় পেরিয়ে এসেছ। জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়েছিল সেই মন্দির, তোমরা দেখতে পাওনি। সেই লোকটাই আরও জানাল যে, ওই মন্দিরের ব্যাপারে শেষকথা বলবে ওখানকার পুরোহিত।
জিগ্যেস করলাম, কোথায় থাকেন সেই পুরোহিত? তাতে ওরা জানাল, পুরোহিত ওই মন্দিরের কাছেই থাকেন।
কী আর করা যাবে? আমরা আবার যেদিক দিয়ে এসেছিলাম, সেইদিকেই ফিরে চললাম।
এবার আমরা পথের দু-দিকে নজর রাখতে রাখতে চলেছিলাম, যাতে মন্দিরের কোনও চিহ্ন চোখ না এড়িয়ে যায়। সেইজন্যেই বোধহয় ঘন গাছপালার ফাঁক দিয়ে সমাধিভূমিটা দেখতে পেলাম।
দেখলাম একটা বড় মাঠের মধ্যে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বহু পাথরের স্তম্ভ। স্তম্ভগুলো বানাতে পাথরের সঙ্গে পাথর জোড়া হয়নি। সবক'টাই এক পাথরের তৈরি, যাকে ইংরিজিতে বলে 'মনোলিথ'। কোনওটা খাড়া দাঁড়িয়ে রয়েছে, কোনওটা আবার মাটির ওপরে শোয়ানো। বুধোদা বলল এদিককার অনেক উপজাতিদের মধ্যেই মৃতের সমাধির ওপর এমন স্তম্ভ বানিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। খাড়া স্তম্ভগুলো পুরুষদের সমাধি আর আনুভূমিকগুলো নারীদের।
গ্যাব্রিয়েল আমাদের পেছনে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎই সে আমাদের ছাড়িয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে একটা সমাধির দিকে এগিয়ে গেল। মনোলিথের চেহারা দেখে বুঝলাম, এটা কোনও নারীর সমাধি। গ্যাবি সেটার ওপর ঝুঁকে পড়ে হাতের মুঠোয় কী যেন একটা তুলে নিল। তারপর উল্লসিত মুখে আমাদের দিকে ফিরে তাকাল। চিৎকার করে বলল, 'হেই রুবিক, সি, হোয়াট আই হ্যাভ গট। আ বিউটিফুল ল্যাম্প!'
গ্যাবি হাতটা উঁচু করে জিনিসটা আমাদের দেখাল। একটা ধাতুর তৈরি প্রদীপ। অনেক পুরোনো বলে রংটা কালচে হয়ে গেছে। সত্যিই জিনিসটা ভারি সুন্দর। কঠিন ধাতু দিয়ে যে এমন সূক্ষ্ম কারুকাজ করা যায় তা না দেখলে বিশ্বাস হয় না।
ঠিক সেই সময়েই তিরটা ছুটে এল। কালো পালকে সাজানো প্রায় চার ফুট লম্বা তিরটা শিস দেওয়ার মতন শব্দ করে আমাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে গ্যাবির হাত থেকে প্রদীপটাকে একটা নিখুঁত ঠোক্করে মাটির ওপর ছিটকে ফেলে দিল। হতভম্ব গ্যাবির হাতের চেটোটা তখনও প্রদীপ ধরার ভঙ্গিতে ওপরে উঠে আছে, কেবল প্রদীপটাই সেই চেটোর মধ্যে নেই।
শুধু গ্যাবি নয়, ঘটনার আকস্মিকতায় আমরাও স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। সেই অবস্থাটা কাটল একটা তীক্ষ্ণ চিৎকারে। ভাষাটা না বুঝলেও চিৎকারের মধ্যে আদেশের সুরটা পরিষ্কার। আমরা ঘুরে তাকালাম। আমাদের থেকে প্রায় তিরিশ-চল্লিশ ফুট পেছনে একটা উঁচু পাথরের ওপর এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন।
বুধোদা দুটো হাত মাথার ওপর তুলে নাড়তে লাগল। ওর দেখাদেখি আমরাও। সারা বিশ্বে সমস্ত লোক এই ইঙ্গিতের মানে বোঝে—সন্ধিপ্রস্তাব।
বৃদ্ধ ধনুকটা পিঠে ফেলে পাথরের ওপর থেকে লাফ দিয়ে নামলেন, তারপর বেশ লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে এলেন আমাদের দিকে।
ইতিমধ্যে গ্যাবিও ভয়ে ভয়ে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল।
আমাদের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন সেই বৃদ্ধ। ওনার বয়েস হয়তো পঁয়ষট্টি-সত্তর হবে, সেইজন্যেই বৃদ্ধ বলছি। কিন্তু শরীর এখনও লোহার রডের মতন শক্ত আর নমনীয়। দৃষ্টিশক্তির নমুনা তো একটু আগেই দেখেছি। ভদ্রলোক পরিষ্কার ইংরিজিতে বললেন, কোনও নতুন জায়গায় পা দিলে সেখানকার লোকাচারগুলোকে সম্মান দেবেন। আমরা এই সমাধিভূমিতে বিদেশিদের প্রবেশ পছন্দ করি না।
স্যরি। গ্যাব্রিয়েল হাতটা বাড়িয়ে দিল বৃদ্ধের দিকে। আমি ক্ষমা চাইছি। এরকম ভুল দুবার হবে না।
বৃদ্ধের মুখে হাসি ফুটে উঠল। তিনি গ্যাবির হাতটা ধরে বললেন, আমার নাম তাসি গেলুক। শিলং-এ মিশনারি স্কুলে পড়াশোনা করেছিলাম। তারপর ইন্ডিয়ান আর্মিতেও চাকরি করেছিলাম অনেক বছর। আমাকে নিহাংদের সঙ্গে বাইরের পৃথিবীর যোগসূত্র বলতে পারেন।
বুধোদা জিগ্যেস করল, আপনিই কি দন্তুরা দেবীর পূজারি?
ভয়ংকর অবাক হয়ে তাসি গেলুক বললেন, সে কি! আপনি দেবী দন্তুরার নাম জানেন?
বুধোদা ধীরে ধীরে তাসি গেলুককে তিব্বতীয় তান্ত্রিক দেবদেবীদের কথা, বৌদ্ধধর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে তিব্বতীয় তান্ত্রিকদের পিছু হটে ভারতে পালিয়ে আসার ইতিহাস সবই বলে গেল। শুনতে শুনতে তাসি গেলুকের মুখে খুশির হাসি ফুটে উঠল। তিনি বুধোদার হাতদুটো জড়িয়ে ধরে বললেন, খুব আনন্দ পেলাম। আপনি যে একটা প্রায় হারিয়ে যেতে বসা উপজাতি সম্বন্ধে এত পড়াশোনা করেছেন এর থেকেই বুঝতে পারছি আপনার জ্ঞানপিপাসা কতটা প্রবল। আপনি কি ঐতিহাসিক? প্রত্নতাত্বিক?
বুধোদা বলল, আমি একজন সামান্য অভিযাত্রী।
চলুন, আমার ঘরে চলুন। সেখানে বসেই আপনার বাকি কথা শুনব।
সমাধিভূমির পেছনে গাছের ছায়ায় বেশ বড়সড় ঘরটাকে এতক্ষণ খেয়াল করিনি। আমাদের সেই ঘরের উঠোনে কারুকার্য করা কাঠের চৌকিতে বসালেন তাসি গেলুক। উঠোনের এক কোণে একটা দাঁড়ের ওপর একটা ছোটখাটো ধনেশপাখি বসেছিল, আর পাখিটার সঙ্গে কথা বলছিল একটা বাচ্চা ছেলে। পাঁচ ছ-বছর বয়েস হবে। চেহারার সঙ্গে তাসি গেলুকের চেহারার খুবই মিল।
আমাদের দেখে বাচ্চা ছেলেটার মুখে বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠল। তাসি গেলুক তাকে নিহাং ভাষায় কী যেন বোঝাবার পরে ছেলেটা হাতজোড় করে আমাদের নমস্কার করল। তারপর দৌড়ে চলে গেল ঘরের ভেতরে।
আমার নাতি—নিমা তাসি। ওর মনটা খারাপ। তাই আপনাদের দেখে পালাল।
কেন? মনখারাপ কেন?
ওর বাবা-মা, মানে আমার ছেলে আর বউমা তীর্থ করতে গেছে ভুটানে। বাবা-মাকে ছেড়ে রয়েছে বলেই নিমা একটু মনমরা। না হলে দেখতেন এতক্ষণে আপনাদের ঘাড়ে-পিঠে উঠে পড়ত। যাই হোক, এবার আপনাদের এখানে আসার উদ্দেশ্য বলুন।
বুধোদা ধীরে-ধীরে তাসি গেলুককে সবই খুলে বলল। কিছুই লুকোল না, এমনকী কালো অর্কিডের কথাও না।
কালো অর্কিডের কথা শুনে তাসি গেলুক যা বললেন, তা ঠিক যেন প্রাচীন গাঁওবুড়োদের কথারই প্রতিধ্বনি। তারা যেমন রিচার্ড টিলম্যানকে বলেছিলেন—ও ফুল এখন আর ফোটে না, তেমনি তাসি গেলুকও বেশ জোর দিয়ে বললেন, ওই কালো ফুলের ব্যাপারটা সম্ভবত একটা কাল্পনিক কাহিনিই হবে। কারণ, তিনি কোনওদিন সে ফুল চোখে দেখেননি।
তবে আমাদের দন্তুরার গুহামন্দিরে তিনি অবশ্যই নিয়ে যাবেন.। মুচকি হেসে তাসি গেলুক বললেন, কালো অর্কিড না থাকলেও সেখানে অন্যরকমের গা ছমছমে জিনিসের অভাব নেই।
গ্রামের লোকেরা ঠিকই বলেছিল। আমরা যে পথ দিয়ে নিহাং গ্রামের দিকে এসেছিলাম, সেই পথেরই ধারে ছিল দন্তুরা দেবীর মন্দিরে প্রবেশের পথ। অথচ আমরা তা দেখতে পাইনি। পাওয়া সম্ভবও ছিল না। কারণ, সেটা তো সত্যিকারের কোনও পথ নয়, পাহাড়ের গায়ে একটা সরু ফাটল।
এবার তাসি গেলুকের পেছন পেছন সেই ফাটল পেরিয়ে আমরা তিনজন গুহার মধ্যে প্রবেশ করলাম। আমরা তিনজনেই কেবল। টনি আর অর্কু মরে গেলেও আমাদের সঙ্গে আসতে রাজি হল না। অপদেবীদের সম্বন্ধে ওদের ভয়টা দেখবার মতন।
হাতের জোরালো টর্চের আলোয় দেখতে পাচ্ছিলাম অন্তহীন এক সুড়ঙ্গের মতন সেই গুহা এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলেছে। এদিকে ওদিকে অসংখ্য শাখাপ্রশাখা বেরিয়েছে। তার মধ্যে ঠিক রাস্তাটা খুঁজে নিয়ে পথচলা বাইরের লোকেদের পক্ষে অসম্ভব। সুড়ঙ্গের ছাদে আর মেঝেয় জমে রয়েছে নানান বিচিত্র আকৃতির স্ট্যালাকটাইট আর স্ট্যালাগমাইট। ছাদের নানান জায়গা থেকে টুপটাপ শব্দে জল ঝরছে তো ঝরছেই।
গুহার মেঝেটা প্রথম থেকেই পেছল আর ভিজে ভিজে লাগছিল। একটু বাদে দেখলাম পায়ের নীচ দিয়ে কুলকুল করে জল বয়ে চলেছে। কিছুটা এগোনোর পর সেই জল আমাদের পায়ের পাতা ছাড়িয়ে গোড়ালি অবধি উঠে এল। আরও একটু বাদে জল আমাদের হাঁটু ছুঁলো। অনুভব করছিলাম বেশ জোরালো স্রোত আছে সেই জলে। বুধোদা বলল, মেঘালয় আর বাংলাদেশের মধ্যে ভূমিস্তরে একটা বড়সড় ফল্ট বা চ্যুতি রয়েছে— নাম 'ডাওকি ফল্ট'—যার ফলে মেঘালয়ের পাতালবাহিনী নদী যতই বাংলাদেশের দিকে এগোয় ততই মাটির ওপরে উঠে আসে। সুড়ঙ্গের শেষে, এই নদীও নিশ্চয়ই বাংলাদেশের সমতলের ওপর দিয়েই বয়ে গেছে। সে যাই হোক, আপাতত আমার চিন্তা হচ্ছিল ডুবে না মরি।
আরও একটু যাওয়ার পরে হঠাৎই তাসি গেলুক বাঁ-দিকে সুড়ঙ্গের একটা শাখা পথে বাঁক নিলেন, পেছন পেছন আমরাও। পাতালনদী পড়ে রইল পেছনে। সামনে পাথরের ছাদে একটা বড়সড় ফাঁক।
আমরা ছাদের ওই বিশাল গর্তটার নীচে গিয়ে দাঁড়ালাম। মনে হচ্ছিল যেন একটা কুঁয়োর গভীরে দাঁড়িয়ে রয়েছি। ছাদের ফোকর দিয়ে গুহার মেঝেতে বৃত্তাকারে আলো পড়েছে। সেই আলোর বৃত্তের মধ্যেই স্থাপিত হয়েছে দেবী দন্তুরার পাথরে তৈরি মূর্তি। সেই মূর্তি রীতিমতন ভয়জাগানো। দেবীর শরীর কঙ্কালসার। মুখ যেন মৃতের করোটির মতন। সার সার দাঁতগুলো মুখের বাইরে বেরিয়ে আছে। এইজন্যেই কি দেবীর নাম দন্তুরা? বুধোদাকে পরে একসময় জিগ্যেস করতে হবে।
এদিকে দেখুন। তাসি গেলুকের ডাকে ঘুরে তাকালাম। উনি যে জিনিসটাকে দেখাচ্ছেন সেটা গুহার মেঝে থেকে একটু উঁচু হয়ে জেগে থাকা একটা পাথরের প্রাকৃতিক বেদি।
এই জায়গাটা দেখেছেন? তাসি গেলুক আঙুল দিয়ে বেদিটার মাথার কাছে গাঁথা চার-পাঁচটা মোটা লোহার আংটার দিকে দেখালেন। বললেন—ওই আংটাগুলোর সঙ্গে হাত-পা বেঁধে বলি দেওয়া হত।
হাত-পা! বিস্ময়ে আমি কিছুক্ষণ কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলাম। তারপর অতিকষ্টে জিগ্যেস করলাম—হাত-পা মানে? কী বলি দেওয়া হত?
কেন? নরবলি। এককালে তো উপজাতিগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। আর যুদ্ধবন্দিদের বাঁচিয়ে রাখার রেওয়াজটা নাগা, খাসি, গারো কারুর মধ্যেই ছিল না। হেড-হান্টিং ব্যাপারটা শুনেছেন নিশ্চয়ই। ওদের থেকেই নিহাংরাও ব্যাপারটা আয়ত্ত করেছিল। এবার এদিকে দেখুন!
আবার আঙুল দিয়ে একটা জায়গা দেখালেন তাসি গেলুক। চৌবাচ্চার মতন জায়গাটার মাপ হবে বড়সড় একটা ঘরের মতন।
বেদির ঢাল বেয়ে বলির রক্ত গিয়ে পড়ত ওই কুণ্ডের মতন জায়গাটায়। এদিকে আসুন!
দন্তুরার মূর্তির পেছনের দিকটায় ছাদের আলো ভালো করে পৌঁছোচ্ছিল না। আমাদের নিয়ে সেই দিকটাতেই সাবধানে এগিয়ে চললেন তাসি গেলুক। বললেন, নরবলির কিছু চিহ্ন এখনও এখানে দেখতে পাবেন। ওই দেখুন।
দেখলাম পাথুরে দেয়ালের গায়ে সার সার জীর্ণ কিছু কঙ্কাল টাঙানো রয়েছে।
বুধোদা স্বগতোক্তি করল—মুন্ডচ্ছেদ করা হত বলে তো মনে হচ্ছে না। ধড়ের সঙ্গে মাথাগুলো জোড়া আছে দেখছি।
ঠিক ধরেছেন। চিত করে ফেলে বুকে ছোরা গেঁথে দেওয়া হত।
বীভৎস দৃশ্য। তাকাতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু চোখ সরিয়ে নেওয়ার আগেই আমার নজর গিয়ে পড়ল একেবারে ডানপ্রান্তের নরকঙ্কালটার ওপরে। এটা অন্যগুলোর তুলনায় নতুন। কঙ্কালটার কপাল থেকে নামতে নামতে আমার নজর কঙ্কালটার হাতের ওপর এসে পড়তেই আমি উত্তেজনায় বুধোদার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলাম। ডাকলাম—বুধোদা!
বুধোদা চাপাস্বরে বলল, চুপ! আমিও দেখেছি।
কঙ্কালটার বাঁ-হাতের কব্জির পর থেকে বাকি অংশটা নেই।
হাতকাটা সাধু তাহলে সাপের কাপড়ে মারা যাননি!
শুনছেন! শুনছেন!
কার যেন ডাকাডাকিতে গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। গত কয়েকদিন জঙ্গল ভেঙে হাঁটার হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরে, আজ রাতেই প্রথম তাসি গেলুকের বাড়ির উঠোনে তাঁবু খাটিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোবার সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু কপালে ঘুম নেই। চোখ কচলে উঠে দেখি তাসি গেলুক আমাদের বিছানার পাশে উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। ওনার গলার আওয়াজে বুধোদা আমার আগেই স্লিপিং ব্যাগ থেকে বেরিয়ে এসেছিল। বলল, কী হয়েছে মিস্টার গেলুক? কোনও বিপদ?
শুকনো গলায় তাসি গেলুক বললেন, আমার নাতিকে, মানে নিমাকে দেখতে পাচ্ছি না। আমার পাশেই তো শুয়েছিল। কোথায় যে গেল!
চট করে হাতের ঘড়িতে সময় দেখলাম—রাত দেড়টা। এত রাতে ওই পাঁচ বছরের বাচ্চা একা-একা কোথায় যাবে! চটপট জামা জুতো পরে নিয়ে আমি আর বুধোদা তাসির সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বোঝাই যাচ্ছে এখুনি চারপাশটা খুঁজে দেখা দরকার। বুধোদা বলল, একটু দাঁড়া গ্যাবিকেও ডেকে নিই।
গ্যাবি আমাদের পাশের টেন্টে শুয়ে ঘুমোচ্ছিল। বুধোদা টেন্টের পর্দা সরিয়ে ভেতরে মুখ ঢুকিয়ে ডাকল—গ্যাবি! তারপরেই এক ঝটকায় পর্দাটা পুরোটা সরিয়ে দিয়ে মেঝের বিছানার ওপর টর্চের আলো ফেলল। আমরা তিনজনেই দেখলাম গ্যাবির বিছানা শূন্য। টেন্ট ফাঁকা।
বুধোদাই আমাদের মধ্যে সবার আগে সম্বিৎ ফিরে পেল। তাসির হাতে একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে বলল, আমি বোধহয় বুঝতে পারছি নিমা কোথায় আছে। ওর খুব বিপদ। আর সময় নেই। দৌড়োন। এই বলে বুধোদাই সবার আগে বনের পথ ধরে দৌড়োল। পেছন পেছন আমরা দুজন। একবার ভেবেছিলাম টনি আর অর্কুকেও ডেকে নেব। কিন্তু ওরা তাসি গেলুকের বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে একটা বড় গাছের ডালে হ্যামক টাঙিয়ে ঘুমোচ্ছে। ডেকে আনতে গেলে দেরি হয়ে যাবে। এই জন্যে আর ডাকলাম না।
বুধোদা দৌড়োতে দৌড়োতে যে জায়গায় এসে থামল সে জায়গাটা আমার চেনা। দন্তুরাদেবীর গুহা মন্দিরের প্রবেশপথ।
নিমা এইখানে এসেছে! অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন তাসি গেলুক।
বুধোদা বলল, সম্ভবত তাই। চলুন, দেখে নিই।
বুধোদাকে পেছনে রেখে তাসি গেলুক এগিয়ে গেলেন। এই জটিল গুহাপথ তাঁর যতটা চেনা, আমাদের তো ততটা নয়, তাই। গতকালের মতনই টর্চের আলোয় পথ খুঁজে, জল ভাঙতে ভাঙতে এগোলাম। এগোতে-এগোতে হঠাৎই তাসি গেলুক বাঁ-দিকে বাঁক নিলেন। আজ এই রাতের অন্ধকারে ভাঙা ছাদের মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো ঢোকার প্রশ্নই নেই। তবুও তিনি যে অজস্র শাখা-প্রশাখার মধ্যে থেকে কেমন করে সঠিক পথটা চিনে নিচ্ছিলেন সেটাই এক রহস্য।
তবে পথটা যে ঠিকই বেছেছেন সে ব্যাপারে একটু বাদেই আমরা নি:সন্দেহ হয়ে গেলাম। সূর্যের আলো না থাকলেও দেবী দন্তুরার বেদির ওপরে একটা আলো ছিল—ব্যাটারি চালিত ল্যাম্পের আলো। ওই ল্যাম্পটা আমাদের খুব চেনা। কলকাতা থেকে আমরাই ওটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। আর ল্যাম্পের আলোয় যে মুখটা দেখতে পেলাম সেই মুখটাও আমাদের খুব চেনা ঠিকই, কিন্তু এখন অচেনা লাগছে। গ্যাব্রিয়েল টিলম্যানের মুখ।
গ্যাবির মুখ ঘামে ভেসে যাচ্ছে। সোনালি চুলগুলো সারা মুখে লেপ্টে আছে। আমাদের সাড়া পেয়ে গ্যাবি মুখ তুলে তাকাল। কী বীভৎস সেই মুখ! দাঁতগুলো কোনও হিংস্র প্রাণীর মতন মুখের বাইরে বেরিয়ে এসেছে। চোখের মণিদুটোও যেন জ্বলছে। ও মুখ ঘাতকের মুখ। হাঁটু গেড়ে বসে আছে গ্যাবি। ওর ডান হাতে একটা ছোরা আর বাঁ-হাত দিয়ে পাথরের বলির বেদির ওপর ঠেসে ধরেছে নিমা তাসির ছোট্ট শরীরটাকে।
আমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে গ্যাবি ছোরা ধরা হাতটা মাথার ওপরে তুলল। ও নিমা তাসিকে খুন করতে চলেছে।
তাসি গেলুকের হাতের নড়াচড়া আমরা এত কাছে দাঁড়িয়েও ভালো করে টের পেলাম না, শুধু একটা শিসের মতন শব্দ শুনতে পেলাম। পরক্ষণেই দেখলাম গ্যাবি চিত হয়ে ছিটকে পড়ল। ওর বুকের ওপর থিরথির করে কাঁপছে তাসি গেলুকের কালো পালকে সাজানো দীর্ঘ তির, যার ইস্পাতের ফলাটা পুরোটাই ওর বুকের মধ্যে ঢুকে গেছে।
আমরা তিনজনেই দন্তুরার বেদির দিকে দৌড়ে গেলাম। হাত থেকে ধনুক ফেলে দিয়ে তাসি গেলুক নিমাকে কোলে তুলে নিল। মনে হল ছেলেটা ভয়ের চোটেই জ্ঞান হারিয়েছে কিন্তু শরীরে অন্য কোনও আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেলাম না।
বুধোদা তাসি গেলুককে বলল, আপনি ওকে নিয়ে তাড়াতাড়ি ঘরে যান। ওর শুশ্রুষা করুন। আমরা একটু বাদে যাচ্ছি। তাসি গেলুক আর দ্বিরুক্তি না করে নিমাকে কোলে তুলে নিয়ে যত জোরে সম্ভব ফেরার পথে পা চালালেন।
তাসি গেলুক চলে যাওয়ার পর বুধোদা বলল, টর্চটা একটু ধর তো রুবিক। এইদিকে আলো দেখা।
আমি টর্চটা নিয়ে বুধোদার কথামতন গ্যাবির বুকের ওপর আলো ফেললাম। দৃশ্যটা বীভৎস। বহুবছর বাদে দেবী দন্তুরার বলির বেদি আবার রক্তে ভেসে যাচ্ছে। রক্তের স্রোত ঢাল বেয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে চৌবাচ্ছার মতন সেই পাথরের কুণ্ডটার মধ্যে।
গ্যাবির শরীরে যে প্রাণ নেই সেটা আর বলে দিতে হল না। কিন্তু বুধোদার দেখলাম ওসব দিকে কোনও খেয়ালই নেই। গ্যাবির প্রাণহীন শরীরের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ও সোজা ওর জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল। প্রথম পকেটটায় কিছু পেল না। দ্বিতীয় পকেটটায় হাত ঢুকিয়ে একতাড়া কাগজ বার করে আনল। টর্চের আলোতেই একবার কাগজগুলোর ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে ও উঠে দাঁড়াল। বলল, চল রুবিক। যা খুঁজছিলাম তা পেয়ে গেছি।
জিগ্যেস করলাম, ওগুলো কী বুধোদা?
রিচার্ড টিলম্যানের ডায়েরির শেষ ক'টা পাতা।
অবাক হয়ে বললাম, গ্যাবি যে বলেছিল ওই পাতাগুলো ডায়েরির মধ্যে ছিলই না!
বুধোদা গম্ভীর মুখে বলল, মিথ্যে কথা বলেছিল। ওগুলো গ্যাবিই ছিঁড়ে নিয়ে লুকিয়ে ফেলেছিল।
কেন?
নিজের পূর্বপুরুষ খুনি, এটা কি কেউ অন্যকে জানাতে চায়?
পরদিন দুপুরে আমরা নিহাং গ্রাম থেকে ফিরে যাচ্ছিলাম বাঘমারার পথে। সামনে-সামনে যাচ্ছিলাম আমি বুধোদা আর তাসিগেলুক। আমাদের পেছনে পেছনে আসছিল অর্কু আর টনি। আর আমাদের অনেক আগে ঠিক গারোপাহাড়ের একটা রঙিন প্রজাপতির মতনই নাচতে নাচতে চলেছিল রংচঙে পোশাক পরা নিমা। ও এখন খুব খুশি, ওর বাবা-মা আজ সকালেই ফিরে এসেছেন কি না।
বুধোদা হাঁটতে-হাঁটতে কথা বলে যাচ্ছিল। আমি আর তাসি গেলুক মন দিয়ে শুনছিলাম। এসব কথা আমরা কেউ জানতাম না। এর মধ্যে অনেক কথাই লেখা ছিল রিচার্ডের ডায়েরির শেষ পাতাগুলোয়।
বুধোদা বলছিল—গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে পথে বেরোনোর আগে আমাদের সেই কমন ফ্রেন্ড তীর্থঙ্করের কাছে ওর সম্বন্ধে একটু ডিটেলে জানতে চেয়েছিলাম। তীর্থ যা জানিয়েছিল তা বেশ দমে যাওয়ার মতন। গ্যাব্রিয়েলের লন্ডনের নার্সারি লাটে উঠেছে। আরুনডেল ক্যাসল থেকে যে সামান্য মাসোহারা পায়, তাও ভাগ হয়ে যায় ভাইবোনদের মধ্যে। সর্বোপরি, গ্যাবি একজন কুখ্যাত জুয়ারি। ক্রিকেট বেটিং-এর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশের খাতায় নামও উঠেছিল। সোজা কথায় ও বেশ অর্থকষ্টের মধ্যে ছিল।
বোঝাই যাচ্ছে, রিচার্ড টিলম্যানের ডায়েরি খুঁজে পেয়ে গ্যাবি হাতে চাঁদ পেয়েছিল। কালো অর্কিড আজও এক অদ্ভুত রোমান্টিক স্বপ্ন। যে ওই ফুলের খোঁজ পাবে সে যে শুধু খ্যাতিই পাবে তা নয়, খ্যাতির সঙ্গে পাবে অর্থ। তার কাছ থেকে ওই অ্যাডভেঞ্চারের গল্প কেনার জন্যে প্রকাশকেরা আর টিভি চ্যানেলের মালিকেরা টাকার থলি নিয়ে দরজায় হাজির হয়ে যাবে। এসব কথা ফুলের ব্যবসায় জড়িত থাকার ফলে গ্যাবি ভালো করেই জানত।
ভারতে এসে অর্কিডের খোঁজ করতে হলে গ্যাবিকে আমার মতন কোনও অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিস্টের সাহায্য নিতেই হত। কিন্তু গ্যাবি আমাকে ডায়েরির সবক'টা পাতা দেখালে আমি তাকে সাহায্য নাই করতে পারতাম। কারণ কী জানিস? ডায়েরির শেষ ক'টা পাতায় রিচার্ড টিলম্যান এক ঘৃণ্য অপরাধের কথা লিখে রেখেছিলেন। উনি নিজের হাতে সেই অপরাধ করেছিলেন।
উনিশশো বারোর এপ্রিলে যখন কালিনাথ আগমবাগীশের সঙ্গে রিচার্ড টিলম্যান এই নিহাং গ্রামে পৌঁছেছিলেন, তখন নানা রংবেরঙের অর্কিড দেখতে পেয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু ওসব তার তুচ্ছ মনে হয়েছিল যখন গাঁওবুড়োদের কাছে শুনেছিলেন যে, এই গ্রামেই এককালে কালো অর্কিড ফুটত।
গাঁওবুড়োরা রিচার্ডকে এ-ও বলেছিল যে, বহুদিন হল, ওই কালো ফুল আর ফোটে না। ওই ফুল ফুটত কেবল বেদির নীচের মাটিতে বলির রক্ত এসে পড়লে। মানুষের রক্ত। কিন্তু নিহাং গ্রামে তার ঢের আগেই নরবলি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
তাসি গেলুক অবাক হয়ে বলল, কালো অর্কিডের সঙ্গে নরবলির যে-কোনেও যোগ আছে সেকথা তো আমিও জানতাম না।
বুধোদা বলল, সেটাই তো অস্বাভাবিক। যে ফুল চোখে দেখা যায় না তাকে নিয়ে একটা গল্প কতদিন বেঁচে থাকবে? কিন্তু এটা তো একশো বছর আগের কথা। তখনও আপনার পূর্বপুরুষদের মনে গল্পগুলো বেঁচে ছিল। সেই গল্পই রিচার্ডের মাথায় খুন চাপিয়ে দিয়েছিল। সে ঠিক করল দন্তুরাদেবীর বেদির ওপর নতুন করে নররক্ত ঢালবে। নিহাংদের কেউ মারা গেলে যে সে নিজেও যে বাঁচবে না এটা রিচার্ড জানত। তাই সে খুন করল কালিনাথ তান্ত্রিককে। কালিনাথের রক্তের ওপর ফুটে উঠল টিলমানিয়া রুডিরপিয়া।
তারপর?—রুদ্ধশ্বাসে জিগ্যেস করলাম।
টিলম্যানিয়া রুডিরপিয়া যে গোত্রের অর্কিড তাকে উদ্ভিদবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলে 'মাইকো হেটারোট্রোফস' এরা মাটিতেই জন্মায় বটে কিন্তু পাতায় ক্লোরোফিল না থাকায় নিজেরা খাবার তৈরি করতে পারে না। পুষ্টির জন্যে এদের নির্ভর করতে হয় মাটির নীচে জন্মানো নানান ধরনের ফাঙ্গাসের ওপর। ফাঙ্গাসের তৈরি করা খাবার শুষে নিয়েই এরা বেঁচে থাকে। কিন্তু খাবার তৈরি করতে হলে ফাঙ্গাসেরও তো কাঁচামাল চাই। দন্তুরাদেবীর পাথুরে গুহায় নররক্ত ছাড়া আর কোনও কাঁচামাল ছিল না। ওই পাথুরে মেঝের ফাঙ্গাসেরা তাই শুধু নররক্ত থেকেই খাবার বানানোর মতন করে বিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল।
তাহলে বুঝতে পারছিস তো, মানুষের রক্ত ছাড়া ফাঙ্গাস জন্মায় না, আবার ফাঙ্গাস না জন্মালে কালো অর্কিড বাঁচে না। এই কথাটাই রিচার্ড টিলম্যান হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল 'এইচ এম ভি সি গাল' জাহাজের কেবিনে বসে। তার চোখের সামনেই আস্তে আস্তে শুকিয়ে যাচ্ছিল সাতরাজার ধন এক মানিক টিলম্যানিয়া রুডিরপিয়া।
তার মনের তীব্র হতাশার ছবি ধরা আছে ডায়েরির শেষ ক'টা পাতার ছত্রে ছত্রে। যতরকমের সার হতে পারে সব সে একে একে ঢেলে যাচ্ছে টিলম্যানিয়ার টবে, এমনকী জাহাজে জবাই করা গরু শুয়োরের রক্ত অবধি। অথচ কোনও খাবারেই সেই গাছের রুচি দেখা যাচ্ছে না। ওদিকে সমুদ্র পেরিয়ে জাহাজ এগিয়ে চলেছে পোর্টসমাউথ বন্দরের দিকে। সেখানে কালো অর্কিডের আবিষ্কর্তাকে সম্বর্ধনা দেবার জন্যে দাঁড়িয়ে রয়েছেন রয়্যাল হর্টিকালচার সোসাইটির পণ্ডিতেরা, আরুনডেল ক্যাসলের রাজপুরুষেরা আর তার নিজের পরিবারের লোকজন। তাদের হাতে চরম অপমানের ছবিটা কল্পনা করে শিউরে উঠছে রিচার্ড টিলম্যান। অতএব এক মরীয়া মুহূর্তে সে স্থির করল, যে অর্ঘ্যে সে দন্তুরা গুহার মধ্যে কালো অর্কিডের আবাহণ করেছিল সেই অর্ঘ্য দিয়েই আবার তার পুজো করবে—নররক্তে।
সেই জন্যেই রিচার্ড টিলম্যান খুন করতে গেল নিগ্রো কেবিনবয়কে। কিন্তু পারল না। সে বুঝতে পারল কালো অর্কিডকে সে চিরতরে হারাল। হয়তো দ্বিতীয়বার নিহাং-গ্রামে গিয়ে সেই অর্কিড সে নিয়ে আসতে পারত, কিন্তু কালিনাথকে খুন করে সেখানে ফিরে যাবার রাস্তা সে নিজেই বন্ধ করে দিয়েছে। কালিনাথের সাহায্য ছাড়া সে আর ওখানে ফিরে যেতে পারবে না। অতএব পৃথিবীর মানুষকে সে আর কোনওদিনই বিশ্বাস করাতে পারবে না যে, নিকষ কালো পাপড়ির এক অর্কিড সে সত্যিই হাতে পেয়েছিল।
চরম হতাশা তো ছিলই, তার সঙ্গে নিশ্চয় মিশেছিল কালিনাথকে খুন করার অপরাধবোধ, একটা কমবয়েসি নিরীহ ছেলেকে খুন করতে গিয়ে ধরা পড়ার অপমান। সব মিলিয়ে রিচার্ড টিলম্যান জাহাজ বন্দরে ভেড়ার আগেই মানসিক ভারসাম্য হারাল। আমার ধারণা তার বিস্ফোরক দিনলিপি তারই স্ত্রী বা সন্তান লুকিয়ে রেখে দিয়েছিল, যাতে তার কুকীর্তি দুনিয়ার সামনে না আসে।
একই চিন্তা থেকে গ্যাবিও আমাকে ডায়েরির শেষ পাতা ক'টা দেখতে দিল না। সেই পাতাগুলো ডায়েরি থেকে ছিঁড়ে নিজের কাছে লুকিয়ে রাখল। কাল রাতে সেই ছেঁড়া পাতাগুলো হাতে পাওয়ার পর দেখলাম কালিনাথের মৃত্যু রহস্য আর রিচার্ডের উন্মাদরোগের কারণ সম্বন্ধে আমার ধারণাটা ভুল ছিল না।
আমি বললাম, কিন্তু বুধোদা ডায়েরির পাতা তো তুমি পেলে গ্যাব্রিয়েল মারা যাওয়ার পর, তার পকেট থেকে। তার আগে কেমন করে আন্দাজ করলে যে গ্যাব্রিয়েল তার পূর্বপুরুষের দেখানো পথেই রক্ত দিয়ে ফুল ফোটাতে গেছে।
বুধোদা মুচকি হেসে বলল, বলতে পারিস নিমার পরমায়ুর জোর ছিল। না হলে গ্যাবির সঙ্গে প্রথম কথা হওয়ার দিন থেকেই যে প্রশ্নটা নিয়ে ভেবে যাচ্ছি, সেটার উত্তর হঠাৎ কাল রাত দেড়টার সময়ই বা মাথায় আসবে কেন?
কোনও প্রশ্ন মিস্টার মজুমদার?—জিগ্যেস করলেন তাসি গেলুক।
রিচার্ডের দেওয়া কালো অর্কিডের বৈজ্ঞানিক নামটার মানে। টিলম্যানিয়া কথাটা তো সহজ। নিজের পদবিকে অমর করে রাখার ইচ্ছে। কিন্তু 'রুডিরপিয়া' মানে কী? ল্যাটিনে তো এরকম কোনও শব্দ নেই। কাল রাতে গ্যাব্রিয়েলের তাঁবুর পর্দা সরিয়ে যখন দেখলাম ও ঘরে নেই তখনই কী জানি কেমন করে বিদ্যুৎচমকের মতন অন্য একটা শব্দ মাথায় এল। একটা সংস্কৃত শব্দ—রুধিরপ্রিয়া। মানে যে রক্ত ভালোবাসে।
কালিভক্ত সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত কালিনাথ আগমবাগীশ নিশ্চয় কথায় কথায় তার বিদেশি বন্ধু রিচার্ডকে বলেছিল, ওরকম অদ্ভুত রক্তপায়ী ফুল যদি সত্যিই কখনও দেখতে পাও, তার নাম দিও রুধিরপ্রিয়া। রিচার্ডের অনভ্যস্ত কানে রুধিরপ্রিয়া হয়ে গিয়েছিল রুডিরপিয়া। কালিনাথ স্বপ্নেও ভাবেনি তার নিজেরই রক্তের ওপর ফুটে উঠবে রুধিরপ্রিয়ার ফুল।
মানুষের মনের কী অদ্ভুত গতি—নিজের হাতে যাকে খুন করেছে তার শেষ ইচ্ছেটা ফেলতে পারেনি রিচার্ড টিলম্যান। কালো অর্কিডের নাম রেখেছে টিলম্যানিয়া রুডিরপিয়া।
সেই মুহর্তেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, কেন দন্তুরার গুহায় কালিনাথ তান্ত্রিকের কঙ্কাল ঝুলছে। কেনই বা রিচার্ড টিলম্যান মিথ্যে প্রচার করেছিল যে সে সাপের কামড়ে মারা গেছে।
কিন্তু গ্যাবিকে তো আমার মতন অনুমানের ওপর ভরসা করতে হয়নি। ও পুরো ডায়েরিটাই পড়েছিল, তাই অনেক আগে থেকেই জানত, কেমন করে শুকনো পাথরের ওপর ফুটে ওঠে টিলম্যানিয়া রুডিরপিয়ার ফুল। বুঝলাম গ্যাবিই নিশ্চয় নিমাকে বলি দেবার জন্যে দন্তুরার গুহায় নিয়ে গিয়েছে?
তারপর কী হল সে তো তোরা নিজের চোখেই দেখেছিস।
কথায়-কথায় আমরা তিনজনেই দন্তুরার গুহার সামনে চলে এসেছিলাম। আমার আর বুধোদার মধ্যে চোখাচোখি হল। বুঝতে পারছিলাম আমার মতন ওরও মনের ইচ্ছে একবার গুহার ভেতরে ঢোকা। তাই হল। শেষ বারের মতন আমি, বুধোদা আর তাসি গেলুক দন্তুরার বেদির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সকালের আলো ভাঙা-ছাদ ফুঁড়ে নেমে এসেছে পাথরের বেদির ওপর। দেখলাম, গ্যাবির শরীরটা গ্রামের লোক সরিয়ে নিয়ে গেছে, কিন্তু বেদির ওপর সামান্য লাল ছোপ তখনও লেগে রয়েছে।
আর দেখলাম, বেদির সামনে সেই কুণ্ডটার ভেতর একরাতের মধ্যেই মাথা তুলেছে একগুচ্ছ পাতা আর ডাঁটি। প্রত্যেকটা ডাঁটির মাথায় আস্তে আস্তে দুলছে কেউটে সাপের ফণার মতন উজ্জ্বল কালো পাপড়িতে সাজানো এক বিচিত্র অর্কিড।
একশো বছর পরে মানুষের রক্ত পেয়ে আবার ফুটে উঠেছে টিলম্যানিয়া রুডিরপিয়া।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন