শিবাশিস মুখোপাধ্যায়

ডোম্বিনীর শরীরের দিকে তাকিয়ে আনন্দিত হয়ে উঠলেন কাহ্ন। শিষ্যশিষ্যা ঘিরে থাকা তাঁর এত বছরের আচার্যের জীবন যেন তছনছ হয়ে ভেঙে পড়ল পায়ের কাছে।
ক্ষীণতোয়ার তীরে এই সিঁদুরমাখা বিকেলে পিপুল আর তেঁতুল গাছের নরম আবছায়ায় তখন স্নানের পরে ভিজে বসন ছেড়ে মাটির উপরে যেন খেলার ছলে তার জল ছিটিয়ে দিচ্ছে ডোম্বিনী। তার উজ্জ্বল শ্যামা শরীরে তখন কেবল সূর্যালোকের শেষ বেলাকার ঝিকিমিকি।
অবগাহনের পরে তখন অবশিষ্ট জলের ফোঁটাগুলো আদর শেষের অস্ফুট শ্বাসের মতো ঝরে ঝরে পড়ছে ডোম্বিনীর শরীর থেকে। স্তনের চূড়া থেকে, ঊরুর গভীর সন্ধি থেকে, নিতম্বের ঢালু রহস্য থেকে।
কাহ্ন শরীরের প্রত্যেক রোমকূপে যেন বিদ্যুতের স্পর্শ অনুভব করলেন। এ কী মায়া! এই শ্যামাঙ্গিনীর শরীরের প্রতিটি বিভঙ্গেই যেন এক অপূর্ব নন্দনস্বাদ অনুভব করছেন তিনি।
মনকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন কাহ্ন। মনে মনে বললেন, তুমি হলে সিদ্ধ। তুমি আচার্য। নগর গ্রামের প্রান্তে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়ে তোমার নিত্যদিনের ধর্মসংকেত প্রচারের কারবার। নির্বাণ আর মহাসুখই তোমার সাধনা।
সংগীত তোমার সেই সাধনের সঙ্গী। গানের প্রতিটি পদ রচনায় তোমার সৃষ্টির স্বাক্ষর। সেই সব পদে যখন দেশাখ বা পটমঞ্জরী রাগ বসিয়ে তোমার শিষ্যদের গলায় তুলে দাও, তখন তোমার নামে ঘন ঘন জয়ধ্বনি দিয়ে ওঠে তারা।
এ হেন একজন আচার্যের এ কী পরিণতি কাহ্ন? লুইপাদের সেই পদ কি তুমি ভুলে গেলে? কা আ তরুবর পঞ্চবি ডাল / চঞ্চল চী এ পৈঠো কাল। তোমার চঞ্চল চিত্তকে সংযত করো কাহ্ন। নীচজাতীয়া একজন সামান্য নারীর রূপবিভঙ্গে অস্থির হয়ে পড়াটা অন্তত তোমাকে মানায় না।
তাছাড়া যদি কথাটা লোকসমাজে জানাজানি হয়ে যায় তখন কী হবে? পথচলতি পথিকের মতো কৌতূহলে এই যে তুমি দাঁড়িয়ে পড়ে ঘাসপাতার আড়াল থেকে রমণীশরীর দেখছ, এ কথা কি আর চাপা থাকবে?
প্রাণময় এই পৃথিবীতে সকলেরই দৃষ্টিশ্রুতির বোধ আছে কাহ্ন। এই বৃক্ষ লতা অরণ্য প্রান্তর —সকলেরই আছে। তোমার এই রূপমুগ্ধ ভ্রান্তিময় অপরাহ্নের কথাটা যদি জানাজানি হয়ে যায়— তখন সমাজ কী চোখে দেখবে তোমাকে? এই শ্রেষ্ঠী-করণিক-ব্রাহ্মণ-বণিক-শুদ্র-ক্ষত্রিয়দের ক্ষমতা বিন্যাসী সমাজ কি তোমাকে ছেড়ে কথা বলবে? একে তো সহজিয়া তত্ত্বের কথা প্রচার করে বেড়াও বলে ব্রাহ্মণ আর ক্ষমতাবান ভূস্বামীর দল তোমাদের উপরে ভীষণ ক্রুদ্ধ। তার উপরে যদি এমন বিভ্রম ঘটে তোমার, তারা তো সুযোগ পেয়ে যাবে প্রত্যাঘাতের।
কথা শোনো কাহ্ন। আর এগিয়ো না। নীচজাতীয়া এই ডোম্বিনীরা এক রকমের ডাকিনী বলতে পারো। নানা মন্ত্রগুণে তারা পারদর্শিনী। রূপের আগুনে তোমাকে তারা পুড়িয়ে মারবে কাহ্ন। তুমি পরিণত হবে কেবল একতাল মাংসের পিণ্ডে। গূঢ় সাধনার সঙ্গী যে কাম, কামনার সেই উচ্চতা থেকে তুমি চ্যুত হবে কাহ্ন।
কথা শোনো। এখানে এভাবে মূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে থেকো না। ভুলে যেয়ো না তোমার কাজের কথা। আজ সন্ধ্যায় রাজনগরের পরিখার ওপারে টিলার নীচে যে শবরপল্লি সেখানে যেতে হবে তোমাকে। নতুন পদ কিছু বাঁধা হয়েছে তো কাহ্ন? সুর? সুর বসিয়েছ তাতে?
এতসব কথা ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে যান কাহ্ন। তাঁর চওড়া কালো বুকের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে একটি দীর্ঘশ্বাস। না, আর দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। পা বাড়াতে হবে এবার। রূপের মায়া কাটিয়ে এবার এগিয়ে যেতে হবে কাজের পথে।
সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে তখন চারপাশে। দৃষ্টির সামনে ক্রমশ আবছা হয়ে আসছে দূরের গাছগাছালি। আশপাশের গুবাক, মহুয়া, নারিকেল গাছের মাথায় মাথায় কোঁকড়ানো অন্ধকার।
ক্ষীণতোয়ার উঁচু পাড়ের অদূরে ঘাসপাতার এই ঝোপটি ছেড়ে কাহ্ন সবে পা বাড়াতে যাবেন, এমন সময়ে তাঁর হরিণচামড়ার ঊর্ধ্ববসনে একটি আলতো টান লাগল।
দাঁড়াও কাহ্নুপাদ।
বিজন এই প্রান্তরে নারীকণ্ঠ? চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলেন কাহ্ন। ততক্ষণে তাঁর অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে কখন পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে সেই ডোম্বিনী। ভিজে বসনটি নিঙড়ানোর পরে আলতো করে পাট করে এখন তার কাঁধে ফেলে রাখা। স্নান সমাপনের স্নিগ্ধ উজ্জ্বলতা এখনও জড়িয়ে রয়েছে তার নগ্ন শরীরে।
কাহ্নর দিকে স্পষ্ট চোখে তাকিয়ে সে বলল, চলে যাচ্ছিলে যে বড়ো? আমাকে দেখবে না তুমি, কাহ্নুপাদ?
ভয়ানক অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন কাহ্ন। ডোম্বিনী বুঝতে পেরে বলল, অবাক হয়ে যাচ্ছ? ভাবছ সামান্য একটা মেয়ে তোমাকে চিনল কী করে?
আমিও তো একজন সামান্য মানুষ গো মেয়ে। আপাতত কৃষিই আমার বৃত্তি। কিন্তু সে কথা নয়, আমি ভাবছি তুমি আমাকে অতদূর থেকে দেখে ফেললে কী করে? তবে কি তোমাদের সম্বন্ধে লোকেরা যা বলে তা সত্যি? তোমরা কি তবে সত্যিই মায়া জানো?
শরীর কাঁপিয়ে এবার হাসির তরঙ্গ তোলে ডোম্বিনী। বলে, লোকেরা কী বলে তা তুমি শোনো কেন? আমি তো জানি তারাই তোমার কথা শোনে।
সেইজন্যেই তো তাদের কথাও আমাকে শুনতে হয়।
তারা কী বলে? আমি ডাইনি?
হ্যাঁ, তোমাদের ওই রকমই কিছু একটা ভাবে কৃষকপল্লির বউ-ঝিরা।
ভাববে না, ওদের আঁচলে বাঁধা পুরুষমানুষগুলো যে ছুটে ছুটে আসে আমার নাচ গান দেখতে। আমাকে দেখতে। সেই হিংসেতেই বুঝি আমাকে ডাইনি বলে বউগুলো।
তা হতে পারে। ঈর্ষা, বিদ্বেষ, ঘৃণা এসব তো তারা জয় করতে পারেনি এখনও। সেই জন্যই তো সাধনপথের কথা বলে বেড়াই ওদের।
তুমি তোমার গান বলে বেড়াও পল্লিতে পল্লিতে ঘুরে। আর ওরা কী বলে জানো?
কী বলে? লোকটা এসে আমাদের সন্ধেটা মাটি করে দিয়ে গেল?
না কাহ্নুপাদ। একদিন শুনি নদীর ঘাটে মাটির ঘড়ায় জল নিতে এসে গাঁ ঘরের দু'জন মেয়ে তোমার কথা বলছে।
আমি যে পদ বেঁধেছি তার কথা কি তাদের বলতে শুনেছ ডোম্বিনী?
না গো, না। তারা বলছিল হরিণচামড়ার ভিতর দিয়ে তোমার চওড়া বুকের কিছুটা নাকি দেখতে পেয়েছে। তুমি না কি খুব সুন্দর। তোমার বাহুর গড়ন নাকি হাতির শুঁড়ের মতো। ওসব শুনেই তো আমিও একদিন সন্ধেবেলায় হাটের ধারে ছুটে গিয়েছিলুম তোমার গান শুনতে। তোমাকে দেখতে।
তাই নাকি? আরও একবার আশ্চর্য হলেন কাহ্ন। তা, কী দেখলে?
দেখলুম যা শুনেছি ঠিক তাই। শরীর বটে একখানা তোমার। গড়নের এমন তাল—পেশিতে পেশিতে যেন মাদল বাজছে। নাচের ছন্দ যেন আটকে রয়েছে তোমার কাঁধে, ঘাড়ে, বুকের পাঁজরে পাঁজরে। এইরকম একটা চওড়া কালো বুকের ওপর আছড়ে পড়ার জন্য মেয়েমানুষেরা মরে যেতেও পারে, জানো কাহ্নুপাদ।
আবার অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন কাহ্ন। কথায় কথায় এখন তাঁর খুব কাছে এসে পড়েছে ডোম্বিনী। তার আলতো শ্বাসের স্পর্শ টের পাচ্ছেন তিনি বুকের কাছে। নিজেকে মনে মনে সংযত করলেন কাহ্ন। কঠিন দুটি হাতের পাতায় তাকে সরিয়ে দিলেন কিছুটা দূরে। বললেন, মরে যাওয়ার কথা মুখেও এনো না ডোম্বিনী। ওসব কথা ভেবে কোনও লাভ নেই।
অভিমানে এবার ফুলে উঠল ডোম্বিনীর নাকের পাটা, তুমি বুঝি ব্রাহ্মণ? নাকি কায়স্থ? আমাকে ছুঁলে বুঝি তোমার জাত যাবে?
ডোম্বিনীর মুখে এমন কথা শুনে হেসে ফেললেন কাহ্ন। তারপরে হঠাৎ আনমনা হয়ে বললেন, শবর-ধীবর-চাষি-চণ্ডালের সঙ্গে আমার প্রতিদিনের ওঠা-বসা। জাত আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে অনেক আগেই।
তবে আর বাধা কীসের? দেখছিলে তো হাঁ করে। এখন এসো, দেখো আমাকে।
তোমাকে যখন দেখেছিলাম তখন শেষ বিকেলের আলো এসে পড়েছিল তোমার খোলা শরীরে। সত্যি সত্যিই রূপের নেশায় জড়িয়ে গিয়েছিল আমার দুটি চোখের পাতা। কিন্তু এখন দেখো, সূর্য তার সোনার থালাটিকে ডুবিয়ে দিচ্ছেন নদীর জলে। চরাচরে নেমে আসছে অন্ধকার। এই আলো অন্ধকারে তোমার নগ্নতাকেও আমার এখন পিশাচিনীর মতো আবছায়া লাগছে ডোম্বিনী। হঠাৎ আমার কী মনে হচ্ছে জানো? তোমার আমার এই অন্ধকার শরীরগুলো বোধহয় সাঁকোর মতো। তার উপরে পা রেখেই আমাদের রূপের মায়া পেরিয়ে মহাসুখের পথে যেতে হবে। আসক্তি নয় ডোম্বিনী, বন্ধনও নয়। মুক্তির মহাসুখই আমাদের আরাধ্য। তুমি কি সেই সাধনার সঙ্গী হতে রাজি? ডোম্বিনী?
ওসব মুক্তিতে আমার কীসের দরকার কাহ্নুপাদ? তোমার দুটি বাহু যদি দড়ির ফাঁসের মতো আমার গলা জড়িয়ে ধরে, আমি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরে যেতেও রাজি। আমাকে মারো তুমি কাহ্নুপাদ। তোমার ওই শক্ত বুকে আছড়ে ফেলে মারো।
না ডোম্বিনী। কেবলমাত্র ক্ষণিকের আনন্দের জন্য শরীর সম্ভোগে আমার রুচি নেই। আমার কাছে শরীর হল সাধনার উপায়।
আর তোমার পদ? তোমার গান? তোমার মুখের কথা? তার ছন্দ তুমি কোথায় খুঁজে পাও কাহ্নুপাদ? মেয়েদের শরীরের লাবণ্যের কাছে তোমার আর কোনও ঋণ নেই? বলো?
একজন নীচজাতীয়া রমণীর কথা বলার ধরনে এবারে একটু বিস্মিতই হলেন কাহ্ন। বলেও ফেললেন তাঁর বিস্ময়ের কথা। তুমি কি কখনও বিদ্যাচর্চা করেছ ডোম্বিনী? তোমার কথা শুনে তো তোমাকে অশিক্ষিত বলে মনে হচ্ছে না।
ও মা! আমি অশিক্ষিত হতে যাব কোন দুঃখে? আমি ঢোল বাজিয়ে নাচতে জানি। গাইতে জানি গলা খুলে। সাপের ফণার মতো পেঁচিয়ে বাঁধতে জানি চুলের বেণি। মাথা ঝাঁকিয়ে তাতে একটু ঝাপটা মেরে অচেতন করে দিতে পারি যে কোনও জ্ঞানী পুরুষমানুষকেও। গরিব-গুরবোরা হাটে মাঠে উৎসবে পার্বণে ঘিরে ধরে আমার নাচ তো দেখেই, মাঝে মাঝে আমার ডাক পড়ে সান্ত্রী, সেনাপতি, ব্রাহ্মণ, ভূস্বামীদের অট্টালিকাতেও। এত কিছু শেখার পরেও কি কেউ অশিক্ষিত থাকতে পারে, বলো?
আমি ও কথা বলিনি ডোম্বিনী। জানতে চেয়েছি তোমার বিদ্যাচর্চার কথা। শাস্ত্রচর্চার কথা।
কাহ্নুপাদ, লোকেরা তোমার কথায় মুগ্ধ হয়ে তোমার শিষ্য সেজে, তোমাকে দেখছি সত্যি সত্যিই আচার্যের ভেক ধরিয়ে ছেড়েছে। ব্রাহ্মণেরা তোমাকে সাধে তাড়া করে না।
সেই জন্যই তো গানের ভিতরে আড়াল তৈরি করে গোপন রাখতে হয় আমাদের সাধনার কথা। মানবদেহের অঙ্গে প্রত্যঙ্গে থাকে সেই হেঁয়ালি সমাধানের সংকেত।
আমার অত হেঁয়ালি ভালো লাগে না কাহ্নুপাদ। আমি স্পষ্ট করে আমার এই নদীতে ডুব দিতে ডাকতে পারি তোমাকে। এ কথা বলতে বলতে ডোম্বিনী একটি চোখ টিপে তার কোমরটি দুলিয়ে নিম্ননাভিতে মৃদু ঝাপটা তোলে একটা।
কাহ্ন তা দেখেও না দেখার ভান করেন। বলেন, কিন্তু আমাদের শিরায় ধমনীতে যে আর একটা নদী বহে চলে গো মেয়ে। সেই নদীরও তো একটা গন্তব্য থাকে। সেই গন্তব্যের সন্ধান ছাড়া আমার কাছে অবগাহনের অন্য কোনও অর্থ নেই ডোম্বিনী। আমি এবার যাই গো। রাত্রি নামার আগেই আমাকে শবরপল্লিতে পৌঁছোতে হবে পা চালিয়ে।
দাঁড়াও কাহ্নুপাদ। একটা কথা শুনে যাও শুধু। স্নানের আগে আজ তোমার কথা ভেবেই কাপাসতুলোয় বোনা এই সাধের বসনটি গা থেকে খুলেছিলাম আমি। তোমার সঙ্গে দেখা যখন হলই, তুমি নিজের হাতে আজ এটাকে জড়িয়ে দাও আমার গায়ে। অন্তত এটুকু করো।
ডোম্বিনীর কাঁধ থেকে আলতো আঙুলে বসনটি তুলে নিয়ে কাহ্ন জড়িয়ে দিলেন তার শরীরে। তার শরীরের সব তোলপাড়, সব ওঠাপড়া কাহ্নর চোখের সামনে থেকে আড়ালে চলে গেল একটু একটু করে। নদীতীরের বাতাসে তখন অন্ধকারের ঝাপটা। ঘাসের উপরে তার শিরশিরানি।
দায়িত্বটুকু পালন করে একেবারে শেষে আঁচলটি ডোম্বিনীর কাঁধে ফেলে দিয়ে কাহ্ন বললেন, কিন্তু একটা কথা যে বাকি রয়ে গেল ডোম্বিনী। আমি যে লুকিয়ে তোমাকে দেখছিলাম তা তুমি কেমন করে টের পেলে, সে কথা বললে না তো?
কাহ্নর কথা শুনে চোখের তারায় কৌতুক ঝিলিক দিয়ে ওঠে ডোম্বিনীর। কাহ্ন তা দেখতে পান না ভালো করে। অন্ধকারের স্বরে স্বর মিলিয়ে ডোম্বিনী ফিসফিস করে বলে, মেয়েমানুষের কিছু নিজস্ব রহস্য থাকে কাহ্নুপাদ। তার খোঁজ পেতে পুরুষের জীবন কেটে যায়।
আমি সেই রহস্যের সন্ধানেও পদ রচনা করতে চাই ডোম্বিনী।
সত্যি বলছ, কাহ্নুপাদ?
সত্যি। তোমাকে ছুঁয়ে বলছি!

সেদিন সন্ধ্যায় শবরপল্লিতে লেগেছে উৎসবের মেজাজ। দলবেঁধে জঙ্গলে গিয়ে তিনটি হরিণ শিকার করে এনেছে তারা। সেই হরিণের মাংস রান্না করে আজ সন্ধ্যায় মহাভোজে মেতে উঠেছে শবরপল্লি। একটা উঁচু টিলার নীচে বাঁশের বেড়ায় তৈরি ছোটো ছোটো সার দেওয়া ঘরের মাঝখানে একখণ্ড ফাঁকা জমি। ঘাসপাতা সাফ করে মাটি লেপে মসৃণ করা হয়েছে সেই জায়গাটিকে। তার চারপাশে ঘিরে লাল আর সাদা রঙের আঁকিবুঁকি নকশা। মাঝখানে একটা উঁচু বেদির উপরে কাঠকুটো জ্বালিয়ে তৈরি করা হয়েছে আগুন। বিশাল বড়ো একটা মাটির পাত্রে হরিণের মাংস রান্না করা হচ্ছে সেখানে।
ছেলে ছোকরার দল বড়ো বড়ো গাছের পাতা কুড়িয়ে এনে বসে পড়েছে পাত পেতে। তাদের পাতায় গরম গরম কাঙনি দানার ভাত। হাওয়ায় ভুরভুর করছে হরিণের মাংসের গন্ধ।
মাদল বাজিয়ে নাচতে শুরু করেছে শবর পুরুষের দল। মেয়েরাও এ ওকে জড়িয়ে কোমর দোলাচ্ছে সারি বেঁধে। কাঁপা কাঁপা আগুনের আলোয় ঝিকমিক করছে তাদের মাথায় গোঁজা ময়ূরের পালক। শরীরের দোলায় দুলে উঠছে গলার গুঞ্জামালা।
শবরী মেয়েদের নাচের বৃত্তটি একবার আগুনকে ঘিরে ঝুঁকে ঝুঁকে ছোটো হয়ে আসছে কিছুটা। পরক্ষণেই মাদলের শব্দে দুলে উঠে সেই নারীবৃত্তটি ছড়িয়ে পড়ছে কিছুটা দূরে।
টিলার উপর থেকে মহুয়া গাছের ফাঁকে ফাঁকে দৃষ্টি চালিয়ে গতির এই সৌন্দর্য বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিল গুঞ্জরী। আজকে সেও সেজেছে মন ভরিয়ে। তারও মাথায় আজ ময়ূরের পাখা, কোমরে জড়ানো ময়ূরের পালক, গলায় ঝোলানো গুঞ্জামালা, আর বুকে অপেক্ষার ধুকপুকুনি।
টিলার উপর থেকে পূর্ণচাঁদের শোভা দেখতে কাহ্নুপাদের আজ আসার কথা এখানে। গুঞ্জরীকে বুকে নিয়ে রাত কাটানোর কথা। তাই সন্ধে থেকেই সেজেগুজে বসে আছে গুঞ্জরী। তার মনেও মাদল বাজছে একটা। সেই কল্পনার আঘাতে আঘাতে দ্রিমিদ্রিমি দুলছে সেও।
দুলছে আর ঝুঁকে দেখছে নীচের দিকে। ওই তো চণ্ডশবর। তার পুরোনো মরদ। কাহ্নুপাদের টানে শবরপল্লি ছেড়ে এসে সে যখন ঘর বানিয়ে ছিল টিলার উপরে তার আগে তো ওই চণ্ডই ছিল তার জুড়ি। কিন্তু সেই যে প্রথম দিন গান শোনাতে এসেই তার মন মজিয়ে দিল কাহ্নুপাদ তারপর থেকে চণ্ডের উপরে গুঞ্জরীর টান কেমন যেন আলগা হয়ে এল।
তাতে অবশ্য কিছু মনে করেনি চণ্ড। কেবল বলেছিল, শবরী হয়ে তুই কাপাসতুলোর খেতে কাজ করতে যাবি গুঞ্জরী। সেটা কি ঠিক হবে রে? একবার ভেবে দেখিস।
শবরী বলেছিল, ঠিক হবে না কেন? বনের পশুর বদলে খেতের ফসল কেটে তুলব ঘরে। এই তো তফাত, নিচু ঘরে জন্মেছি, গতর কাটিয়ে খেতে হবে আমাদের—এই তো আসল কথা রে চণ্ড। ও কথা শুনে আর বাধা দেয়নি চণ্ড। টিলার উপরে নিজের ঘর নিজেই তৈরি করে নিয়েছিল গুঞ্জরী।
নীচের দিকে তাকিয়ে নাচের ঘূর্ণির মধ্যে হঠাৎ কী একটা দেখতে পেয়ে ভ্রূ দুটি কুঁচকে গেল শবরীর। আগুনমঞ্চের পাশে আজ যেন মনে হল দুখানি হরিণের চামড়ার আসন পাতা।
একটা তো কাহ্নুপাদের জন্যই। ওদের হইহল্লায় যোগ দেওয়ার পরই টিলার উপরে তার আসার কথা। কিন্তু দ্বিতীয় আসনটি কেন? তবে কি কাহ্নুপাদের বন্ধু ভুসুকুও আসবে আজ চাঁদের আলোর উৎসবে যোগ দিতে?
তা আসুক। কপাল থেকে চিন্তার রেখা সরিয়ে নিল গুঞ্জরী। সে জন্য তার কাছে কাহ্নুপাদের আসা নিশ্চয়ই আটকাবে না। এমনও হতে পারে বন্ধুকে নিয়েই হয়তো গুঞ্জরীর বাঁশবেড়ার ঘরের দরজায় হাজির হবে কাহ্নুপাদ? তাহলে কিন্তু মনে মনে একটু রাগই হবে গুঞ্জরীর। আজ কিন্তু সে একাই পেতে চায় তার কাহ্নুপাদকে। পাগল হয়ে, বিভোর হয়ে পেতে চায়।
এসব কথা ভেবে ভিতরে ভিতরে ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছিল গুঞ্জরী। সেজেগুজে, শরীরে মনে তৈরি হয়ে প্রিয় পুরুষের জন্য অপেক্ষা করাটা যে কী কঠিন কাজ তা যারা জীবনে একবারও এমন অপেক্ষার কাল কাটায়নি, তারা বুঝবে না। দিগন্তরেখার পাশ থেকে একটু একটু করে মাথার উপরে উঠে আসছে গোল চাঁদ। আর হৃৎস্পন্দন ক্রমশ দ্রুত হচ্ছে গুঞ্জরীর। গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে তাই অঙ্গনটির দিকে চোখ রেখে আনমনা হয়ে আছে সে। হঠাৎ মধুর শব্দে কেউ যেন ডেকে উঠল তার নাম ধরে। গুঞ্জরী।
চমকে ফিরে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায় সে, কাহ্নুপাদ তুমি? এত তাড়াতাড়ি?
মনে মনে তো বলছিলে প্রতিবারই কেন আমি এত দেরি করে আসি। আর আমাকে দেখেই পালটে ফেললে মুখের কথা?
মনের কথাটা কাহ্নুপাদ ধরে ফেলেছেন দেখে একটু লজ্জাই পেল গুঞ্জরী। অনেক চেষ্টা করেও লুকোতে পারল না সেটা। কেবল লজ্জারাঙা মুখটি নিচু করে বলল, ওদের উৎসবে আজকে তুমি গান শোনাবে না কাহ্নুপাদ? ওরা সকলে রেগে যাবে না তো?
আলতো হাতে তার চিবুকটি তুলে নিয়ে গুঞ্জরীর চোখের দিকে তাকালেন কাহ্ন। তারপর ঘন গলায় বললেন, আজকে চাঁদের আলোয় এই কাপাসতুলোর গাছটির পাশে কেবল তোমাকে বুকের মধ্যে নিয়ে আমি বসে থাকব গুঞ্জরী। সারা রাত।
মাথায় বাঁধা চূড়াটি থেকে একটি চুলের গুচ্ছ এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল গুঞ্জরীর কপালে। আঙুলে জড়িয়ে সেটাকে তার কপাল থেকে সরিয়ে দিলেন কাহ্ন। আদরে আদরে কাহ্নর বুকের উপরে গলে পড়ল গুঞ্জরী। রাতের হাওয়ায় ভেসে গেল সেই আদরের অস্ফুট মর্মর। দূরে কোথাও একটা ময়ূর শুকনো পাতায় শব্দ তুলে নাচতে নাচতে নেমে গেল টিলার ঢাল বেয়ে। আর দুধের মতো ঘন সাদা জ্যোৎস্নায় ভিজে গিয়ে ক্রমশ আবছা হয়ে এল নীচের শবরপল্লির উৎসব দৃশ্য।
কাহ্নর বুকের ওম থেকে মাথা না তুলেই গুঞ্জরী অস্ফুটে জিগ্যেস করল একসময়, কাহ্নুপাদ, তুমি যে আজ তাড়াতাড়ি চলে এলে আমার কাছে, ওদের তবে গান শোনাবে কে? ওরা ভাববে না তো আমি তোমাকে কেড়ে নিলাম ওদের থেকে? গুঞ্জরীর মাথায় গোঁজা ময়ূরপাখায় হাত বুলিয়ে কাহ্ন বললেন, আজকে ওদের উৎসবে গান গাইবে আমার বন্ধু ভুসুকু।
নতুন মানুষ ভুসুকুকে পেয়ে তখন মেতে উঠেছে শবরপল্লির মেয়ে মরদ জোয়ান বৃদ্ধ সকলেই। ভুসুকুর গায়ের রং তাদের মতো নিকষ কালো নয়। সাদাটে পাথরের মতো তার গা। তবে শবরদের মতোই হাঁটুর উপরে তুলে কোমরে বেড় দিয়েই সে পরেছে তার বসনখানি।
আর ভুসুকুর গলার আওয়াজ? আহা! শবরদের গানের ঝিমধরানো সুরে যখন গলা মিলিয়ে দিয়েছেন ভুসুকু তখন হাওয়ায় যেন কেঁপে উঠেছে বাঁশির আওয়াজ।
শবরপুরুষেরা ভুসুকুকে টেনে নিয়ে গেছে তাদের নাচের মধ্যে। ভুসুকুও মাদলের তালে পা মিলিয়ে এগিয়ে পিছিয়ে মিশে গিয়েছেন নাচের মাটিতে।
মহাখুশি শবরপল্লি গাছের পাতায় সাজিয়ে ভাত আর হরিণের মাংস খেতে দিয়েছেন তার সামনে। এই নাও সুস্বাদু মাংস। এই চামড়ার আসনে বসে ধীরে সুস্থে খেয়ে নাও বাছা সবটুকু। আমাদের কুটিরের মেয়েরা কিন্তু হরিণের মাংস খারাপ রাঁধে না ভুসুকু। দেখবে কেমন করে আজকে হরিণ শিকার করেছি আমরা? দাঁড়াও তবে, সকলে মিলে কেমন করে করেছি তা নেচেকুঁদে দেখাই বাছা তোমাকে। এসব দেখেশুনে কোনও গান বাঁধতে পারবে তুমি? নতুন কোনও পদ বেঁধে আজ শোনাতে পারবে আমাদের?
কথা বলতে বলতে মাথায় রঙিন কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা সর্দারগোছের একটি শবরপুরুষের চোখের ইশারায় মাটির উপরে চার হাত পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে বসে পড়ল এক শবররমণী। তাকে ঘিরে ধনুকে তির লাগিয়ে ছোঁড়ার অঙ্গভঙ্গি করে উল্লাসে চিৎকার করে উঠল চারজন শবরপুরুষ। উপাদেয় মাংসের শেষ টুকরোটুকু মুখে পুরে দিয়ে ভুসুকু লক্ষ করলেন ভীতচকিত হরিণীর মতো একটি মুখের ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছে সেই হামাগুড়ি দেওয়া মেয়েটি।
ভুসুকু বুঝলেন এ হল অভিনয়। বৌদ্ধদের সংঘে তত্ত্ব উপদেশের বুদ্ধনাটক দেখার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। তবে শবরদের এই শিকার অভিনয় অনেকটা সাদামাটা। কেবল শিকার কৌশলের নকল করছে তারা।
শুধু শবররমণীর দুটি চোখের অভিব্যক্তির দিকে বার বার চোখ চলে যাচ্ছে ভুসুকুর। প্রাণভয়ে ভীত একটি হরিণীর করুণ আর্তি যেন মেয়েটির চোখের দুটি তারায় টলমল করে কাঁপছে।
হঠাৎ চারপাশের কোলাহল আর হল্লা থেকে যেন কোথায় উধাও হয়ে গেল ভুসুকুর মন। গুনগুন করে একটা সুর শরীরের কোন গভীর থেকে উঠে আসতে লাগল তাঁর গলায়। ঠোঁটদুটো কাঁপতে শুরু করল যেন নিজেরই অলক্ষ্যে। আর তার শব্দ ঝরে পড়ল সন্ধের হাওয়ায়। ছন্দে শব্দে বাঁধা এ কী উচ্চারণ করছেন ভুসুকু? এ তো পদ। গানের পদ।
কাহারে ঘিণি মেলি আচ্ছহু কীস।
বেটিল হাক পড়অ চৌদীস।।
অপনা মাংসে হরিণা বৈরী।
খনহ ন ছাড়অ ভুসুকু অহেরী।।
স্তম্ভিত হয়ে কখন থেমে গেছে শবরপল্লির নাচ গানের হুল্লোড়। পাথরের মূর্তির মতো শবরদের পেশিতে পেশিতে যেন থমকে আছে শিকার অভিনয়ের আনন্দ উল্লাস। তারা তখন ভুসুকুর গানে মন্ত্রমুগ্ধ।
কাকে নিয়ে কিসে আছো কাকে ছেড়ে
শোনো হাঁক পড়ে চৌদিক বেড়ে।
হরিণের নিজ মাংস বৈরী
পিছনে নাছোড় ভুসুকু আহেরী।
হাঁড়িয়ার গন্ধের সঙ্গে মিশে তখন ভুসুকুর গানের সুর নেশা ধরিয়ে দিয়েছে চাঁদের আলোয় ধোওয়া রাত্রিপরিবেশে। সহজ সরল শবরগানের সুরের চেয়ে এই সুর অনেকটাই আলাদা। আর আলাদা বলেই বোধহয় জোয়ানবৃদ্ধ সকলের মন মজে গেছে সেই নতুন সুরের মায়াজালে। নির্বাক, নিস্পন্দ হয়ে তারা শুনছে সুরের এক মায়াহরিণী যেন কোনও আকাশপারের জঙ্গল থেকে ছুটতে ছুটতে আজ চলে এসেছে তাদের মাটিধুলোর অঙ্গনে। সৃষ্টির প্রথম ঝাপটাটুকু সামলে নিয়ে তখন সবে চুপ করেছেন ভুসুকুও।
হঠাৎই, সেই কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা ভেঙে শবরপল্লির নাচের আঙিনায় হাঁক দিয়ে উঠেছে কয়েকটা পুরুষকণ্ঠ। তোরা সব মাতাল হয়ে গেলি না কি রে? আওয়াজ পাচ্ছি না যে তোদের?
বুকে লোহার বর্ম আর মাথায় শিরস্ত্রাণ পরা কয়েকটা লোক যেন মাটি ফুঁড়ে অকস্মাৎ ঝাঁপিয়ে পড়েছে এই শান্ত রাত্রির মাঝখানে।
কি রে, তোরা সকলে চুপ করে কেন? তোদের মাদল পেটানোর শব্দ শুনেই তো আমরা ছুটে আসছি এখানে। পূর্ণিমার রাতে আজকাল কী করিস রে তোরা?
রাজার সান্ত্রী। কোনও বিশেষ কারণে প্রথম রাতে হানা দিয়েছে শবরপল্লিতে।
ব্যাপারটা বুঝতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগে চণ্ডশবরের। তারপর এক বৃদ্ধ শবরের সঙ্গে চকিত দৃষ্টি বিনিময় সেরে সে চাঁটি লাগিয়ে দেয় মাদলে। দ্রিমিদ্রিমি করে আবার দুলতে শুরু করে কষ্টিপাথরের মূর্তিগুলো। ভূকম্পনে যেন নড়ে উঠেছে কোনও মন্দিরের গায়ের খোদাই করা ভাস্কর্যশ্রেণি আর ভুসুকুকে তারা আড়াল করে টেনে নিয়েছে সেই সারিবদ্ধ নাচের হুল্লোড়ে।
চিৎকারের ভিতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে কয়েকজন শবররমণী রাজপেয়াদাদের সামনে তক্ষুনি হাজির করেছে মাটির পাত্র ভরা টলটলে হাঁড়িয়া। নেশার হাতছানি লাগিয়ে নিয়েছে চোখে চোখে।
আরও একবার হুঙ্কার দিয়ে উঠে তাদের উল্লাসধ্বনি থামিয়ে দিয়েছে রাজার সান্ত্রীরা। কি রে, তোরা না কি সব গোপন ধর্মের কাজ কারবার করিস পূর্ণিমার রাতে? আমাদের ব্রাহ্মণ অমাত্যেরা ওসব শুনে বেজায় চটে রয়েছেন তোদের উপরে। ব্যাপার কি রে তোদের?
এই হুঙ্কারের মাঝখানে দু-একজন সান্ত্রী শবরদের একটা দুটো চালায় উঁকিঝুঁকি মেরে দেখবার চেষ্টা করছে সেখানে আবার কারওকে এরা লুকিয়ে রেখেছে কি না।
কাঁপা কাঁপা গলায় কথা বলতে বলতে সামনের দিকে এগিয়ে এসেছে একজন শবরবৃদ্ধ, বলি ও রাজপুরুষের পো, তোমাদের ব্রাহ্মণ অমাত্যরা তো আমাদের ঢুকতেই দেয় না তোমাদের মন্দিরে। রাজনগরের ধারে যে শিবের মন্দির সেখানে একবার দুবার ঢুকতে গিয়েছিল আমাদের পল্লির মেয়েরা। দূর দূর করে তারা তাড়িয়ে দিয়েছে আমাদের। এখন আমরা যদি আমাদের মতো করে পালন করি আমাদের ধর্ম তাহলে ওদের বাপের কী, বলো তো?
শোনো গো বুড়ো, তোমাদের ধর্মপালনের কথা বলছি না, সে তোমরা জঙ্গলে যাও, শিকার করো। সিংহ-হাতির পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে মরো, কিন্তু মনে রেখো কেউ কিছু শেখাতে এলে শিখো না। ওই বেটা তান্ত্রিকসিদ্ধগুলো নাকি এখন মুখে মুখে গান বেঁধে লোকজনকে শেখানো শুরু করেছে। আবার বলছি, হাঁড়িয়া গেলো, নাচগান করো, উৎসন্নে যাও, কিন্তু সাবধান, কেউ কিছু শেখাতে এলে শিখো না।
এত কথা বলে বোধহয় গলা শুকিয়ে এসেছিল রাজপেয়াদাদের। হাঁড়িয়ার পাত্রগুলো একচুমুকে নিঃশেষ করে এদিক ওদিক ছুঁড়ে দিয়ে শবরপল্লি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে যেতে শুরু করল এবার। তাদের হাতের মুঠোয় বর্শার লম্বা লম্বা ফলাগুলো চিকচিক করে মিলিয়ে গেল জমায়েতের চোখের আড়ালে, জ্যোৎস্না রাতের ভাঁজে ভাঁজে।
ঝিম ধরানো টানা সুরে তখন আরও একবার গান ধরল শবরপল্লি। নেশায় এখন জড়িয়ে আসছে তাদের গলা। এ ওর গায়ে টলে পড়ছে একে একে।
তাল মহুয়ার ফাঁকে ফোকরে টিলার গায়ের আবছায়া কিন্তু নড়ে চড়ে উঠছে তখন। পূর্ণিমার এমন তুলকালাম রাতে এখনও বড়ো বড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলে চণ্ডশবর, আর ঘুরে ঘুরে কেবল টিলার ওপর দিকে তাকায়। হাঁড়িয়া আর হরিণের মাংসের মিশেল দেওয়া গন্ধে আজ মাথার ভিতরে তরল স্রোত বইছে তার। লোহার মতো ভারী হয়ে আসছে চোখের পাতা। তবুও বার বার তার চোখ চলে যাচ্ছে টিলার গায়ে।
হঠাৎ তার চোখে পড়ল টিলার গায়ে যেসব বড়ো বড়ো পাথরের চাঙড়, তাদের খাঁজে খাঁজে জোনাক পোকার মতো ঝকমক করছে রাজপেয়াদাদের বর্শার ফলকগুলো।
কপাল কুঁচকে আরও একবার উপরের দিকে তাকাল চণ্ড। গুঞ্জরীর ঘরের দিকে চলেছে না কি রাজার সান্ত্রীরা? কেন?
টিলার মাথায় কিছুটা ঘাসে ঢাকা সমতল জায়গা। পরনের কাপড়টা তার উপরে বিছিয়ে দিয়েছে গুঞ্জরী। শান্ত হয়ে কাহ্ন তখন শুয়ে আছেন তৃণশয্যায়। তার খোলা বুকের উপরে উপুড় হয়ে শুয়ে রয়েছে গুঞ্জরী। কান পেতে শুনছে কাহ্নুপাদের হৃৎপিণ্ডের ধকধক শব্দ।
কাহ্নুপাদ একটা গানে হৃদয়ের কর্পূর দিয়ে পান খাওয়ার কথা বলে। শবরী ভাবে সে কি শুধুই গোপন ধর্মের কথা? না রসের কথাও হাঁড়িয়ার মতো গাঁজিয়ে তোলা আছে সেখানে? যা শুনলে নেশা ধরে যায় মেয়েমানুষের মনে। ভালোবাসার নেশা।
গুঞ্জরী ভাবে এই যে এত কঠিন সব গান লিখতে পারে কাহ্নুপাদ, এই কায়দাটা তাকে কি কেউ শিখিয়ে দিয়েছে? না কি সে নিজে নিজেই আয়ত্ত করেছে এই ক্ষমতা? কাহ্নুপাদের কাছে তার গুরুর কথা মাঝে মাঝে শুনেছে গুঞ্জরী। তার নাম না কি জালন্ধরীপাদ। একজন দুজন ভক্তবন্ধুর কাছে শুনেছে কাহ্নুপাদ না কি সোমপুরীর বিহারেও ধর্মের কথা শিক্ষা করেছে এক সময়। কিন্তু বৌদ্ধ বিহার থেকে আসা যেসব ভিক্ষুদের রাজনগরের বড়োমানুষদের ঘরে দূর থেকে কখনও সখনও দেখেছে গুঞ্জরী, কাহ্নুপাদ আর তার গুরু—বন্ধুশিষ্যরা তো ঠিক তেমন নয়। তাদের তো শবর ঘরের, চণ্ডাল-তাঁতি-জেলে ঘরের পুরুষমানুষদের মতোই সাধারণ লোকই মনে হয় তার। মনে হয় তারা এই সব পল্লিরই বুঝি বাসিন্দা। শুধু যা মাঝে মাঝে ঘুরে বেড়ায় এখানে ওখানে। ভক্ত শিষ্যদের এলাকায় এলাকায়।
মনের মধ্যে একটা জিজ্ঞাসার ঘূর্ণি উঠল গুঞ্জরীর। কাহ্নুপাদের কানের কাছে ঠোঁট নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, আচ্ছা কাহ্নুপাদ, তুমি যদি আমাদের মতো লোকেদের জন্যেই গান বাঁধো তবে তা আমরা বুঝতে পারি না কেন? আমরা বুঝি ওসব কথা শোনার যুগ্যি নই?
গুঞ্জরীর অভিমানী শ্বাস পড়ল কাহ্নর গালে। চোখ দুটি বুজে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন কাহ্ন। রতিসমাপনের প্রশান্তি জড়িয়ে রয়েছে তাঁর গলায়। ভারী চোখের পাতা সরিয়ে গুঞ্জরীর মুখের দিকে এবার তাকালেন কাহ্ন। বললেন, যোগ্য হবার জন্য গুরু ধরো। সাধনপথে হাঁটতে শুরু করো এবার। তার জন্যে তো চেষ্টা করতে হবে গুঞ্জরী। আমরা গানের ভিতরে যে নদীটার কথা বলি তার এপারে আছে সুখ-দুঃখ মায়ায় ভরা এই জীবনটুকু আর ওপারে আছে করুণা, মহাসুখ। গুরু এই দুটির পারের মধ্যে একটা সাঁকো তৈরি করে দেন। চেষ্টা করলে তুমি সেটা পেরোতেও পারো।
গানের ভিতর দিয়ে আমরা তোমাকে সাঁকোর মুখটা একটু চিনিয়ে দিতে পারি। সেটা পেরোবার ইচ্ছেটা বুনে দিতে পারি তোমার ভিতরে। যদি তুমি পেরোবার চেষ্টা করো তাহলে তুমিও আমাদের সাধনপথের সঙ্গিনী হতে পারো। এ জন্যে আমরা তো ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল-শবর-ধীবর-চাষি-রাজার ভেদ করি না। উঁচু ঘরের ব্রাহ্মণরা ওসব ভেদ করে। তারা মানুষকে পাপ পুণ্যের ভয় দেখায়। মন্দিরে ঢুকতে দেয় না অস্পৃশ্যকে। জানো গুঞ্জরী, উঁচু নিচুর এই ভেদ ওদের নিজেদেরই তৈরি করা।
বুকের উপরে শুয়ে হাঁ করে কাহ্নর মুখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো গিলছিল গুঞ্জরী। পা দুটি ভাঁজ করে পিছনদিকে তুলছিল আনমনে। তন্ময়তা ভাঙল যখন পিছন থেকে দুখানি হাত এসে তাঁর কাঁধ দুটি ধরে তাকে ঝাঁকিয়ে তুলে নিয়ে গেল উপর দিকে।
কাহ্ন দেখলেন সুঠাম ঋজু চেহারার মুণ্ডিতমস্তক একজন ব্রাহ্মণ গুঞ্জরীকে শক্ত হাতে জড়িয়ে তুলে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে তাঁর সামনে। দ্রুত হাতে খুলে রাখা বস্ত্রখণ্ডটি নিয়ে কোমরে জড়িয়ে নিলেন কাহ্ন। তারপর উঠে বসে মাটি থেকে কাপড়টা গুটিয়ে নিয়ে ছুঁড়ে দিলেন গুঞ্জরীর দিকে।
কিন্তু হাত বাড়িয়ে সেটাকে দূরে ঠেলে দিলেন ব্রাহ্মণ। বললেন, থাক, খোলাই থাক। নিজে তো বেটা ভোগ করলি এই খোলা চাঁদের লাবণি। আমি যেই না এলাম অমনি মেঘে ঢেকে দিচ্ছিস?
কাহ্ন এবার চিনতে পারলেন। এই তাহলে অমাত্য হরিহর। কয়েকদিন ধরেই সংবাদ আসছিল সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে জেলেপাড়ায় ঢুকে সহজিয়াদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন অমাত্য হরিহর।
গলার আওয়াজ ততক্ষণে কঠিন হয়ে উঠেছে ব্রাহ্মণের। শিখায় হাত বুলিয়ে বলতে শুরু করেছেন—শোন বেটা, অনেক বাড় বেড়েছিস তোরা। নেহাত আমাদের রাজা হলেন বুদ্ধের ভক্ত, না হলে অনেকদিন আগেই উচিত শিক্ষা দিতাম তোদের। তবুও শুনে রাখ বেটা, এ রাজ্যে বেশিরভাগ ভূস্বামীই এখন ব্রাহ্মণ। আমাদের সঙ্গে লাগতে এলে তোরা পার পাবি না। সংঘে বসে যা খুশি কর। পাড়ায় পল্লিতে ঘুরে লোকের কানে মন্ত্র পড়তে এলে তোদের ছেড়ে দেব না।
ব্রাহ্মণের কঠিন আওয়াজের পিছনে তখন সার বেঁধে এসে দাঁড়িয়েছে সান্ত্রীর দল। চাঁদের আলোর দিকে পিছন ফিরে রয়েছে তারা। সাদা আকাশের পটে রাজপেয়াদাদের সারিবদ্ধ এই ছবিটিকে বুদ্ধনাটকের কোনও একটা দৃশ্যের মতো মনে হল কাহ্নর।
কিন্তু নাটক তখন তাঁকে টেনে নিয়ে চলেছে অন্য একটা দৃশ্যের দিকে। সান্ত্রীরা তাঁকে জোর করে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে শুরু করেছে টিলার গা বেয়ে। হরিহর গলা তুলে সান্ত্রীদের বলছেন, তাড়াতাড়ি পা চালিয়ো তোমরা। আলো ফোটার আগেই যেন পৌঁছে যেতে পারো রাজপুরীতে। ফাটকে ঢুকিয়ে দিয়ো লোকটাকে। তারপর আমি ফিরে গিয়ে ওর একটা ব্যবস্থা করব। বল্লমের খোঁচা খেয়ে পাথরের টুকরোর আড়ালে চলে যাওয়ার আগে কাহ্ন দেখলেন গুঞ্জরীর নগ্ন শরীরটাকে আঁকড়ে টেনে নিয়ে মাথা নিচু করে বেড়ার ঘরের ভিতরে ঢুকে গেলেন মুণ্ডিত মস্তক সেই ব্রাহ্মণ।

পরদিন কাহ্নর ঘুম ভাঙল একটু দেরিতে। চোখ খুলে তাকিয়ে দেখলেন যে কক্ষে তিনি শুয়ে আছেন তার মাথার অনেকটা ওপরে একটা ছাদ। ছাদের নীচে লোহার খাঁচার মতো একটা ছোট্ট কোটরের বাইরে থেকে আলো আসছে ভেতরে। এতই অল্প সেই আলো যে তা থেকে সময়ের আন্দাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। পাথরের মেঝের উপরে এবার উঠে বসলেন কাহ্ন। আড়মোড়া ভেঙে একটু নড়ে চড়ে বোঝার চেষ্টা করলেন তার শরীরে কোনও ব্যথাবোধ আছে কিনা। কাল রাতে পেয়াদাগুলো প্রথমে তাকে ধাক্কাধাক্কি করলেও পথ চলার ফাঁকে ফাঁকে তাদের সঙ্গে এমন আলাপ জমে উঠেছিল যে তারা প্রায় স্বজনবন্ধুর মতোই ব্যবহার করেছে তাঁর সঙ্গে। তিনিও বাধ্য পড়শির মতো সারাটা পথ নিজে পায়ে হেঁটে পেয়াদাদের নির্দেশ মেনে চুপচাপ ঢুকে পড়েছিলেন অন্ধকার এই কক্ষটিতে। তারপর ঘটাং করে লোহার মতো ভারী একটা কিছু বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনেছিলেন ভিতর থেকে। এটা কি তবে প্রাসাদসংলগ্ন কোনও কারাগার?
বাইরে থেকে কোনও শব্দ প্রাচীর ভেদ করে এসে পৌঁছোয় না এখানে। কক্ষের ভিতরে বসে তাই বোঝার উপায় নেই বাইরের জগৎটা ঠিক কেমন। সেখানে কি কেবল কারারক্ষীদের সতর্ক আনাগোনা? না কি দাসদাসী রাজকর্মচারী অমাত্য পারিষদদের বহুবর্ণিল উপস্থিতি?
জীবনে নানারকম অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন কাহ্ন। দরিদ্র কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। কিন্তু এক বৌদ্ধ ভিক্ষুকের সঙ্গ নিয়ে গ্রাম ছেড়ে গিয়ে বেশ কিছুটা কাল তিনি কাটিয়েছেন সংঘ-বিহার-সহজিয়াদের সান্নিধ্যে সাহচর্যে। ফিরে এসে আবার গ্রহণ করেছেন কৃষকের বৃত্তি। এই বর্ষাসেচের কৃষিপ্রদেশে যেসব ঋতুতে চাষআবাদের কাজ ঝিমিয়ে পড়ে কিছুটা সেসব সময়ে গুরু জালন্ধরিপা-র শিষ্য হিসেবে তাঁর সঙ্গেও ঘুরেছেন এখানে সেখানে। শ্মশানে-চণ্ডালে, নদীতে-নৌকোয়, শবরে-অরণ্যে সর্বত্র। সকলকে বুঝিয়েছেন যাগযজ্ঞ আচারক্রিয়া এসব করে কোনও লাভ নেই। সংসার ছেড়ে দিয়ে কোনও মোক্ষ মুক্তি নেই। এই সব কিছুর মধ্যে থেকেই উপেক্ষা করতে হয় সবকিছুকে। দুধ থেকে বেছে নিতে হয় সরটুকু। সন্ধান করেছেন সাধনপথের সহপথিকের। তারপর একদিন ওইসব সহজ সরল বৃত্তিজীবী মানুষগুলো গুরু মানতে শুরু করেছে তাঁকেও। তাদের ডাকে সাড়া দিয়েও তখন মাঝে মাঝে ছুটে যেতে হয়েছে খেতে, অরণ্যে, গুহায়, পর্বতে। গোপন সাধনার পথ চিনিয়ে দিতে হয়েছে তাদের সকলকে।
আর জীবনভোর এই অবিরাম ছোটাছুটির মাঝখানে কখনও তাঁর সময় কেটেছে গভীর অন্ধকারে কোনও শ্মশানের মাঝখানে, পাণ্ডবহীন কোনও দিকহারানো প্রান্তরের নিকষ কালো মাটিতে। কিন্তু আজকে এই কুঠুরিতে, আলো আর শব্দের বোধহীন অবস্থায়, যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন কাহ্ন, চৈতন্যপ্রাপ্তির পর থেকে এমনটা তাঁর জীবনে আর কখনও ঘটেনি।
শ্মশানরাত্রির অন্ধকারে প্রহর ঘোষণা করে শৃগালের হুক্কাধ্বনি। রাত্রিপ্রান্তরের পরতে পরতে বহে চলে মন্দবাতাস। ঘাসের ওপরে তার শিরশিরানি শব্দ শোনা যায়। একটি দুটি তারার জাগরণ আর নিমজ্জন থেকে পাওয়া যায় রাতনিশুতির আন্দাজ।
কিন্তু আলোহীন, শব্দহীন এই কক্ষে যেন প্রাণপৃথিবীর সামান্য স্পন্দনটুকুও বুঝতে না পেরে সময়চ্যুত হয়ে পড়েছেন কাহ্ন। তিনি যেন ঢুকে পড়েছেন এই ব্রহ্মাণ্ডের ভিতরের কোনও বিশাল গহ্বরে। তাকে ছাড়াই যেন ঘুরে চলেছে বাইরের পৃথিবীটা। এই অবস্থায় একটা অদ্ভুত কথাও অবশ্য মনে হল তাঁর।
আমাদের কাছে সময়ের ধারণাটা হল দিনের একটা প্রহর অথবা একটা গোটা দিন। কখনও কখনও একটা গোটা জীবন অথবা একটা আয়ুষ্কাল দিয়েও আমরা হয়তো বুঝতে চেষ্টা করি সময়কে। কিন্তু প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলেছে মহাসময়ের যে স্রোত—সেই প্রবাহটাকে যদি নিজের শিরাধমনীর স্রোতের মধ্যে ডুব দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করে কেউ, তার কাছে দিবসরজনীর এই প্রহর নির্ণয়ের খেলাটা কি নিছক ছেলেমানুষি হয়ে যায় না? গুন-গুন করে কয়েকটা পদ উঠে আসতে শুরু করে কাহ্নর গলায়
মুঢ়া দিঠ নাঠ দেখি কাঅর।
ভাগ তরঙ্গ কি সোষই সাঅর।
কাহ্ন বোঝেন একটা নতুন কবিতা ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাঁর মাথায় এই দৃশ্যহীনতার মাঝখানেও
মূঢ়রা কাতর দৃশ্যেরা লোপ পেলে
ভাঙা তরঙ্গ সাগর কি শুষে ফেলে?
জগৎ রয়েছে দেখে না মূর্খ লোকে
দুধে থাকে মাটা পড়ে না তা কারো চোখে।
সংসারে কেউ আসে না, না কেউ যাবে
কাহ্নিল যোগী লীলা করে এইভাবে।
গুনগুন করে উঠে আসা সেই কবিতার পঙক্তিগুলোকে মনে মনে সংহত করার চেষ্টা শুরু করলেন কাহ্ন।
তারপর লৌহ দরজা খোলার ভারী শব্দে সংবিত ফিরে পেলেন একসময়।
ঘড়ঘড় করে দেয়ালের একটা অংশ খুলে গেল কাহ্নর চোখের সামনে। কক্ষের অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়ল একরাশ আলো। প্রখর তীব্র দিনের আলো। সূর্য নিশ্চয়ই মধ্য গগনে এখন। তার মানে দিবসের এখন মধ্যভাগ।

রাজসভায় তখন নৃত্যগীতের ঝনঝনা। সাতরঙা কাপড়ে ঢাকা গবাক্ষের ভিতর দিয়ে রৌদ্র ঢুকে রঙিন হয়ে রয়েছে চারপাশ। একদিকে উঁচু একটি রত্নখচিত আসনে বসে আছেন রাজা মণিভদ্র। তার দুপাশে ময়ূরপুচ্ছ বাঁকিয়ে তৈরি করা বড়ো বড়ো পাখার হাওয়া টানছে দুজন স্বল্পবসনা সুন্দরী। রাজা আর তার মন্ত্রী—অমাত্য-সেনাধ্যক্ষ-রাণক রাজকর্মচারীদের বহুমূল্য পোশাকে ঝলমল করছে সভাস্থল। সভার দ্বারে বল্লম হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সতর্ক রক্ষীরা। আর মাঝখানে গালিচায় ঢাকা একটি চন্দনকাঠের আসনে পা মুড়ে বসে রয়েছেন একজন গায়িকা। তার গায়ের রঙে সাতটি সূর্যের স্বর্ণআভা। বাহুতে বাঁধা রয়েছে সোনার অঙ্গদ। বসনে-ভূষণে একটি স্নিগ্ধ উজ্জ্বলতা। কাঁচুলির ভিতরে যেন দুখানি পদ্মের টলোমলো ভার। একরাশ চুলে আটকানো একটি দ্যুতিমান হীরকখণ্ড। কিন্তু সে রমণীর চোখ দুটি বন্ধ। হাতের তালুতে ঢাকা একটি কান। আর তার কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ছে সুর। আকুল করা, পাগল করা, মাতাল করা সুর। এমন অপূর্ব আর মধুর সুর জীবনে খুব কমই শুনেছেন কাহ্ন। তিনি অপলক তাকিয়ে রইলেন সেই মায়াবতী রমণীর দিকে।
ব্রাহ্মণ অমাত্য হরিহর ভেবেছিলেন প্রহরীরা বন্দিকে নিয়ে ঢুকলেই বুঝি থেমে যাবে রাজসভার এই সংগীতচর্চা। সেই রকম নির্দেশও তিনি দিয়ে রেখেছিলেন প্রহরীদের। যাতে তারা গানবাজনার মাঝখানেই সভায় এসে হাজির করে লোকটিকে। নির্দেশ অনুযায়ী কাজও প্রহরীরা করেছিল, কিন্তু রাজা মণিভদ্র একবার ভ্রূ কুঞ্চিত করে সভাদ্বারের জটলার দিকে তাকিয়ে গান চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন জ্ঞানবতীকে।
জ্ঞানবতীর কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়া সুরের দোলায় তখন দুলে উঠছে অমাত্য-ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত-পারিষদদের শিরোভূষণ।
একসময় গান থামিয়ে বন্ধ চোখের দুটি পাতা খুলে তাকালেন জ্ঞানবতী। তাঁর চোখ পড়ে গেল সভাদ্বারের পাশে দাঁড়ানো বিভোর কাহ্নর চোখে। কাহ্ন তখনও মুগ্ধ চোখে দেখছেন জ্ঞানবতীকে।
জ্ঞানবতী বুঝলেন একজন যথার্থ রসিকের সঙ্গেই প্রথম দৃষ্টি বিনিময় হল তাঁর। বিরক্ত রাজা মণিভদ্র এবার অমাত্য হরিহরকে জিগ্যেস করলেন, ব্যাপার কী? লোকটাকে তোমরা কোথা থেকে ধরে এনেছ? হরিহর বললেন, মহারাজ কাল রাতে একে শবরদের নাচগানের হল্লা থেকে ধরে এনেছি।
একজন রক্ষী বোধহয় বিশদ বর্ণনা দিতে চাইছিল ঘটনাটির। ইঙ্গিতে তাকে নিরস্ত করলেন হরিহর। সেক্ষেত্রে শবরীর ঘরে তার রাত্রিযাপনের গুণপনা সকলের মাঝে প্রকাশিত হয়ে যেতে পারে।
ব্যাপারটা বুঝে একটা স্মিত হাসি খেলে গেল কাহ্নর মুখে। শবররমণীর সঙ্গে রাত্রিযাপনে এই মুণ্ডিতমস্তক ব্রাহ্মণের আপত্তি নেই কিন্তু সে কথাটা হাটের মাঝে রাষ্ট্র হলে তার জাত যাবে।
রাজা মণিভদ্র এবার জিগ্যেস করলেন—লোকটার অপরাধ?
হরিহর শক্ত গলায় বললেন, মহারাজ আপনি তো জানেন, কিছুটা পারিবারিক আর কিছুটা ব্রহ্মত্র সম্পত্তি অর্জনের সুবাদে ভূস্বামী হিসেবেও এখন রাজকোষে আমার করদানের অঙ্কটা খুব কম নয়। আমার তালুকে যারা জমিতে কাজ করে এ লোকটা সেই সব কৃষকদের পল্লিতে পল্লিতে ঘুরে তাদের কানে কী সব মন্ত্র শিখিয়ে বেড়ায়। চাষাভুষো মানুষগুলো সারাদিন গুনগুন করে গেয়ে বেড়ায় ওইসব হেঁয়ালির গান। ও সব গানের মাথামুণ্ডু কিছুই তো বুঝে উঠতে পারি না আমরা। তাছাড়া ও সব গানে আপনার আমার মতো উচ্চবর্ণের মানুষজনের কোনও গুণকীর্তন নেই। কেবলই নীচজাতীয় শবর-চাষা-জেলে- চণ্ডালদের জীবনের কথা। দরিদ্র কৃষকেরা যদি এদের পাল্লায় পড়ে কাজকর্ম ভুলতে বসে ক্রমশ, তাহলে রাজকর দেওয়া তো আমার মতো ব্রাহ্মণ ভূস্বামীদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াবে মহারাজ।
রাজা মণিভদ্র মন দিয়ে শুনলেন অমাত্য হরিহরের কথা। তারপর জিগ্যেস করলেন লোকটির ধর্ম কী?
অমাত্য বললেন, মহারাজ, লোকটি বোধহয় একজন সহজিয়া বৌদ্ধ। তাদের এমন কীর্তিকলাপের কথা কানে আসে আজকাল। বেটারা আমাদের ব্রাহ্মণ্যধর্মের সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে তান্ত্রিক কাপালিকদের ভেক নিয়েছে এখন।
এই ধর্মের কথাটায় এসে ব্রাহ্মণ অমাত্যের উপরে মনে মনে একটু চটে গেলেন রাজা মণিভদ্র। বৌদ্ধধর্মের প্রতি তাঁর পারিবারিক দুর্বলতা রয়েছে। তাঁরা কয়েক প্রজন্মের বৌদ্ধ। মহাযানী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মঠ তৈরির জন্য বেশ কয়েক জায়গায় ভূসম্পত্তি দান করেছেন মণিভদ্রের পিতৃপুরুষরা। এই সিদ্ধ সহজিয়ারা মহাযানীদের অনেক ভাঙচুর পার হয়ে ছড়িয়ে পড়া একটা টুকরো অংশ। তবুও এ কথা মানতেই হবে ব্রাহ্মণ্যধারার তারা সমান্তরাল প্রবাহ। সুঠাম শরীরের এই লোকটি সহজিয়া শুনে তার প্রতি একটা আগ্রহ জন্মাল মণিভদ্রের মনে।
কিন্তু মণিভদ্র জানেন, তাঁর রাজ্যের ভূস্বামীদের একটা প্রবল অংশে ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রতি জনপ্রিয়তা বাড়ছে একটু একটু করে। তাই মুখে তিনি এই আগ্রহ প্রকাশ করলেন না। শুধু বললেন, কেবলমাত্র গান বাঁধার অপরাধে লোকটিকে দণ্ড দেওয়া অবিচার হবে। অমাত্য হরিহর, আমার মনে হয়, ওকে এখন ছেড়ে দেওয়াটাই ভালো। তবে হ্যাঁ, ওর গতিবিধির উপরে নজর রাখা উচিত। সেরকম নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে নগররক্ষীদের।
আমতা আমতা করে এ প্রস্তাবে সম্মত হতে হল হরিহরকে। রক্ষীদের নির্দেশ দিলেন তিনি, লোকটাকে ছেড়ে দাও।
সমস্যা মিটিয়ে এতক্ষণে জ্ঞানবতীর দিকে তাকানোর অবসর পেলেন মণিভদ্র। তৃপ্ত কণ্ঠে বললেন, গান শুনিয়ে আজ তুমি আমার মন ভরিয়ে দিয়েছ জ্ঞানবতী। আজ তোমার গলায় ময়ূরের মতো পেখম মেলেছে রাগরাগিণী। বলো, তুমি আজ কী চাও?
এতক্ষণ রাজসভায় ঘটে চলা ঘটনার ঝাপটায় বিস্মিত হয়ে পড়েছিলেন জ্ঞানবতী। এবার নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, একটা প্রার্থনা ছিল মহারাজ। যদি অভয় দেন তো বলি।
নির্ভয়ে বলো। তোমার কোনও প্রার্থনা তো আমি কখনও অপূর্ণ রাখিনি জ্ঞানবতী।
কয়েক মুহূর্ত থেমে রইলেন জ্ঞানবতী। তারপর কাহ্নর দিকে আঙুল তুলে বললেন, এ লোকটাকে একটা দিন আমার অট্টালিকায় নিয়ে যাবার অনুমতি চাই মহারাজ। সহজিয়াদের কথা ইতিমধ্যে আমিও শুনেছি লোকমুখে। আমি শুনতে চাই ওরা কী গান করে।
জ্ঞানবতীর প্রার্থনা শুনে ঈর্ষায় বুকের ভিতরে দপদপ করে উঠল রাজা মণিভদ্রের। সন্দেহ করলেন লোকটার নিকষ কালো সুঠাম শরীরের প্রতি বোধহয় দুর্বল হয়ে পড়েছে জ্ঞানবতী। কিন্তু মুখে সে কথা প্রকাশ করলেন না তিনি। সংযত কণ্ঠে কেবল বললেন, তোমার প্রার্থনা আমি মঞ্জুর করলাম জ্ঞানবতী। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে তোমাকে। কেবল একটা দিনের জন্যই তুমি লোকটাকে রাখতে পারো তোমার অট্টালিকায়। তারপরে আর কখনও নয়।

অট্টালিকাটি দ্বিতল। গবাক্ষে ঝোলানো চিকের আড়াল দিয়ে চাঁদের আলো চুঁইয়ে পড়ে প্রতিটি কক্ষে। আলো-আঁধারির একটা মায়া তৈরি হয়। আজ তেমনই এক মায়াবী রাত্রি। মূল্যবান ঘৃতের প্রদীপ জ্বালানো হয়েছে অট্টালিকার সর্বত্র। প্রতিটি কক্ষের দেয়ালে আটকানো শ্বেতপাথরের দীপাধারে রাখা হয়েছে সেগুলো। রুপোর রেকাবিতে রাখা হয়েছে কনকচাঁপার ফুল। বাতাস ভরে রয়েছে সেই সুগন্ধে।
রাজসভা থেকে ফিরে স্নান সেরেছেন জ্ঞানবতী। তারপর দ্বার বন্ধ করে ঢুকে পড়েছেন তার বিশ্রামকক্ষে। দাসদাসীদের নির্দেশ মতো শীতল কূপের জলে স্নান আর আহারপর্ব সেরে নিয়েছেন কাহ্নও।
তিনি সিদ্ধ। রাজভোগ আর শ্মশানের কুক্কুরের বিষ্ঠা তিনি সমান উদাসীনতায় গ্রহণ করে থাকেন। এই অট্টালিকার বৈভব তাই তাঁর মনকে কণামাত্র স্পর্শ করতে পারেনি।
কাহ্নকে যে কক্ষটিতে বিশ্রাম করতে দেওয়া হয়েছিল তার সামনেই একটি পাথরের বাঁধানো প্রশস্ত অলিন্দ। তার উপরে এসে পড়েছে সন্ধ্যার প্রথম চাঁদের আলো। কক্ষের আলো-আঁধারি ছেড়ে কাহ্ন পায়ে পায়ে বেরিয়ে এসেছেন সেখানে। দ্বিতলসমান উচ্চতার অলিন্দটিতে দাঁড়িয়ে একটু ঝুঁকে পড়ে তাকিয়েছেন সামনের রাজপথের দিকে।
হাতির পিঠে চেপে এই পথে মাঝে মাঝেই সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন রাজা মণিভদ্র। প্রাসাদের লোকজনেরা তাই সব সময় সাফসুতরো করে সাজিয়ে রাখে এই পথ। জায়গায় জায়গায় লোহার দণ্ডে মশালের আগুন জ্বালিয়ে পথটিকে আলোকিত করার ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে।
এসব দেখেশুনে কৃষকপল্লি আর শবরপল্লির মানুষগুলোর কথা মনে পড়ে যায় কাহ্নর। রৌপ্যমুদ্রার মতো ঝকঝকে এই বৈভবের উলটোপিঠেই যেন তাদের বসবাস।
আনমনা হয়ে যান কাহ্ন। কোথা থেকে একটা সুর এসে যেন ছটফট করে তাঁর মনে। একবার দুবার গুনগুন করে তার রূপটি তুলে আনতে চেষ্টা করেন আলতো গলায়। কিন্তু ঠিকমতো পেরে ওঠেন না সবটা। আওয়াজে ধরা দিয়ে সেই সুর আবার ডুবে যায় বুকের গভীরে। তার চলনটা যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না কাহ্ন। এমন সময় একজন দাসী এসে এই নিভৃতি ভেঙে তাঁকে ডেকে নিয়ে গেল জ্ঞানবতীর কক্ষে।
এই কক্ষটির দেয়ালে প্রোথিত বেশ বড়োমাপের একটা নটরাজ শিবের মূর্তি। তার নীচে দীপাধারে দীপ। উজ্জ্বল ধাতুর পাত্রে ভরা টলটলে জল। তার মধ্যে ভাসিয়ে দেওয়া কিছু ফুল। অগুরুজাতীয় কোনও কিছুর সুরভি মৌতাত ছড়িয়ে রেখেছে বাতাসে। জ্ঞানবতী বসেছিলেন পালঙ্কে। আর সামনের একটি কাঠের পিঁড়িতে বসতে বলা হল কাহ্নকে। স্পষ্ট চোখে তার দিকে তাকিয়ে জ্ঞানবতী জিগ্যেস করলেন তুমি কি তখন রূপমুগ্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিলে আগন্তুক?
এ কথার কোনও উত্তর দিলেন না কাহ্ন। বললেন, যে রাগটি তুমি গাইছিলে সেটা একটু চঞ্চল প্রকৃতির। এ কি রাত্রের প্রথম প্রহরে গেয় কোনও রাগ?
জ্ঞানবতী বুঝলেন তিনি ঠিকই আন্দাজ করেছেন। লোকটি সংগীতের একজন রসিকই বটে। এর সঙ্গে হেঁয়ালি করে কোনও লাভ নেই। রাগের চরিত্রলক্ষণ নির্ণয়েও এ পারদর্শী।
—তুমি ঠিকই ধরেছ আগন্তুক। এ হল প্রথম রাত্রেরই রাগ। কামোদ। চঞ্চলতাই হল এ রাগের চরিত্র। জানো আগন্তুক, এই রাগ পরপর তিনরাত্রি ধরে আমাকে শিখিয়েছিলেন আমার উত্তরদেশী সংগীতগুরু।
কাহ্ন বললেন, আমি এবার তোমার কাছ থেকে শিখতে চাই এই রাগ। শেখাবে তুমি আমাকে? কৌতুক ঝিলিক দিল জ্ঞানবতীর চোখে। দুটি গালে আলতার রং ছড়াল এবার।
—তুমি যে শিখতে চাইছ আমার কাছে, তার আগে তো আমাকে জানতে হবে তুমি কে? সংগীতে তোমার অধিকারই বা কী?
কাহ্ন বললেন, তুমি নিশ্চিন্ত হতে পারো রমণী।
—আমাকে এখন তুমি জ্ঞানবতী বলে ডাকতে পারো।
কাহ্ন এবার বললেন—তুমি নিশ্চিন্ত হতে পারো জ্ঞানবতী। একটা রাগের রূপটুকু কণ্ঠে ধারণ করবার মতো ক্ষমতা আমার আছে।
—তুমি কি গান করো?
—আমি গান বাঁধি।
—কী সেই গান?
—তোমাদের যে শাস্ত্রীয় সংগীত আমাদের গান তার থেকে আলাদা। আমার মনে হয় তোমাদের গানে কথাটা বোধহয় খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। কথাকে আশ্রয় করে সুরের বিস্তারই তোমাদের লক্ষ্য। আর আমাদের গানে কথারই গুরুত্ব বেশি। রাগরাগিণী কেবল সেটা গাইবার একটা নির্দেশিকা।
জ্ঞানবতী বুঝলেন এই আগন্তুক পুরুষ শুধু সংগীত রসিকই নয় বিদ্যাচর্চাতেও এর অধিকার আছে নিশ্চয়ই। না হলে নিজেদের উদ্দেশ্যের কথা এত স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করা এর পক্ষে অসম্ভব হত। এবার তার গলায় সহজ অনুরোধের সুর। তোমাদের একটা গান আমাকে শোনাতে পারো আগন্তুক?
—তুমিও এখন আমাকে নাম ধরে ডাকতে পারো জ্ঞানবতী। আমার নাম কাহ্ন। চাষের খেতে কাজ করি সারাবছর। আর সেচ-কৃষির মাঝখানে ঋতু যখন অবসর দেয় আমাকে, তখন আমি গান গেয়ে বেড়াই এখানে ওখানে। তুমি তো শুনতে চাইছ আমার গান। অনেক সময় কেউ শুনতে না চাইলেও গান করতে হয় আমাকে। লতা, পাতা, গাছ পাখিদের জন্য করতে হয়।
মাথা নিচু করে গুনগুন করে গলায় একটা সুর তুলে আনতে শুরু করলেন কাহ্ন। সুর আর কথা মাখামাখি হয়ে ছড়িয়ে পড়ল সন্ধ্যাবাতাসে।
করুণা পিহাড়ি খেলহুঁ নঅবল।
সদগুরু বোহেঁ জিতেল ভববল।।
কাহ্ন গাইতে লাগলেন,
করুণার ছকে খেলি নববল
গুরুর মন্ত্রে জিতি ভববল।
দুই সরাতেই মাৎ যে ঠাকুর—
ফড়ে বলে : কানু, কাছে জিনপুর।
বোড়ে মেরে করি পয়লা সূচনা,
হয়েছে ঘায়েল গজে পাঁচজনা।
কোণঠাসা হয়ে ঠাকুর বিকল,
মন্ত্রীর জোরে জিতি ভববল।
কানু বলে, আমি ভালো দান দিই
চৌষট্টিটা ঘর গুনে নিই।
গান থামলে জ্ঞানবতী জিগ্যেস করলেন তুমি কি বুদ্ধের তান্ত্রিক?
—কী করে বুঝলে?
—গানে যে তুমি করুণার কথা বলছ, চৌষট্টি ঘরের কথা বলছ? আমি অল্পস্বল্প শুনেছি ওসব তত্ত্বের কথা। রাজপুরীর দৃশ্য থেকে দাবাখেলার উপমাটা ভালোই বসিয়ে দিয়েছ তোমার গানে। কিন্তু এ কোন ভাষায় পদ বেঁধেছ তুমি? এ তো তোমার মতো শিক্ষিত রুচিমান মানুষের ভাষা নয়।
—ঠিকই ধরেছ। তোমাদের রাজনগরের পরিখার ওপারে যে সব গরিবগুরবো চাষাভুষো ডোম চাঁড়াল মানুষেরা থাকে, এ হল তাদের ভাষা।
—কিন্তু কাহ্ন, এইখানটায় একটা রুচির আপত্তি আছে আমার। তুমি শাস্ত্রীয় সংগীতের এমন একজন রসিক মানুষ, তুমি কেন ওদের ভাষাতে বাঁধতে যাবে তোমার গান?
কাহ্ন বললেন, আমিও যে ওদেরই একজন ঘরের মানুষ। কৃষি আমার জীবিকা। শ্রমই আমার সম্বল। আমারও তো আনন্দের একটা আশ্রয় চাই জ্ঞানবতী।
—সারাদিন কাজের পর চলে এসো রাজনগরের বিষু মন্দিরে। প্রতি সন্ধ্যায় সংগীত আর শাস্ত্রপাঠের অফুরন্ত আয়োজন সেখানে। আমিও তো মাঝে মাঝেই হাজির হয়ে যাই, আমার সঙ্গেও তাহলে দেখা হয়ে যাবে তোমার।
—ব্রাহ্মণেরা মন্দিরে আমাদের ঢুকতে দেয় না, তুমি জানো না?
—আমি না হয় বলে দেব তোমার কথা।
—জ্ঞানবতী, আমার কথা বেশি বলতে গেলে তুমি বিপদে পড়বে। তাছাড়া বিশেষ একদল মানুষের দয়ার ওপরে কেন নির্ভর করে থাকবে অন্যসব মানুষের জীবন। ওরা যজ্ঞ, হোম পূজা পাঠের অধিকার থেকে নিচু জাতের মানুষকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে অনেক দূরে। কিন্তু জীবন ধর্মের পালন থেকে তো আর বঞ্চিত করতে পারেনি তাদের। তুমি যদি কখনও প্রথম বর্ষার কৃষকপল্লির ঋতু উৎসবে যেতে পারো তাহলে দেখবে জমি আর মানুষ, পুরুষ আর প্রকৃতি, রতি আর ঋতু কেমন এক হয়ে আছে সেই আনন্দপালনে, সেও কিছু কম গরবের বিষয় নয় জ্ঞানবতী। আমার গানের ভাষা হল সেই গরবের ভাষা। এই ভাষায় পদ রচনা করতে পারলে আমার বুক ফুলে ওঠে আনন্দে। তোমার কাছে রাগটি শিখতে চাইছি কারণ প্রথম রাতের চঞ্চলা মাদক মিশে আছে তার রূপে। এই সুর ওই মানুষগুলোর কাছেও হয়ে উঠবে আনন্দের একটা উপহার।
কাহ্নর কথা শুনতে শুনতে ক্রমশ মুগ্ধ হয়ে পড়লেন জ্ঞানবতী। তারপর মেদুর কণ্ঠে বললেন গাও কাহ্ন, শুরু করো, দুখানি মধ্যম স্পর্শের রীতিটুকু শিখিয়ে দিই তোমাকে। কামোদের সম্পূর্ণ দুটি আরোহণ আর অবরোহণে ভাসিয়ে দাও তোমার কণ্ঠ।
প্রহরে প্রহরে ক্রমশ গভীর হয়ে উঠল রাত্রি। চঞ্চলা কামোদ কলাপ মেলে ময়ূরের মতো আরও একবার নেচে উঠল জ্ঞানবতীর গলায়।
বাইরে রাজপথের কোলাহল, ভিতরে দাসদাসীদের ব্যস্ত পদচারণার শব্দ সব কিছু শান্ত হয়ে এল ধীরে ধীরে। ঘুমিয়ে পড়ল সেই মুখর জনপদ। জেগে রইলেন কেবল কাহ্ন আর জ্ঞানবতী। রাগের আলাপ থেকে বিস্তারে পৌঁছোলেন তাঁরা। গানের ভেতর দিয়ে জ্ঞানবতী তখন নতুন করে দেখতে পেয়েছেন কাহ্নকে। এতদিনের নারীজীবনটিকে তখন তাঁর মনে হল একটা রূপকথার মতো। তাঁর হৃদয় যেন একটা সোনার কৌটো। সেখানে ছটফট করে উঠল জ্ঞানবতীর প্রাণের ভ্রমরখানি।
কাহ্ন বললেন, জানো জ্ঞানবতী, এই গান আমি একাই বাঁধি না শুধু। আরও অনেক বৌদ্ধ সহজিয়ারা আছে। তারাও বাঁধে এমন সুন্দর গান।
জ্ঞানবতী বললেন, তেমন কোনও গান তুমি আমাকে শোনাতে পারো কাহ্ন?
কাহ্ন বললেন, আমার বন্ধু ভুসুকুই তো নতুন গান বেঁধেছে একটা। দাঁড়াও দেখি। চেষ্টা করি। যদি শোনাতে পারি তোমাকে দু এক কলি।
কাহ্ন শুরু করলেন
কাহারে ঘিণি মেলি আচ্ছ হু কীস।
বেটিল হাক পড়অ চৌদীস।
অপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী।
খনহ ন ছাড়অ ভুসুকু অহেরী।।
জ্ঞানবতী বললেন এ-ও তো তোমাদের ওই সব তত্ত্বেরই কথা কাহ্ন।
কাহ্ন বললেন, তা ঠিক। তবে—অপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী—নিজের মাংসের জন্যই হরিণ নিজের শত্রু—এই কথাগুলোর মধ্যে কি গভীর একটা সত্যি ধরা পড়েছে বলো তো? এই তো কবিতা জ্ঞানবতী! এই তো আমাদের জীবন।
মন দিয়ে জ্ঞানবতী শুনলেন কাহ্নর কথা। তাঁর জীবনের কথা, ঘরগৃহস্থালির কথা, সাধনপথের কথা। সমাজসংসার ছেড়ে যাওয়ার কথা কখনও ভাবেন না কাহ্ন। কেবল নিস্পৃহ হয়ে থাকতে চান সব কিছুর মাঝখানে। কাজ করতে চান লোকের হিতে। আর পঞ্চ তথাগতকে শরীরে প্রতিষ্ঠা করে পৌঁছোতে চান কাঙ্ক্ষিত মহাসুখে। জ্ঞানবতী বললেন, আমাকে তুমি সঙ্গে নেবে কাহ্ন?
আমি তো সঙ্গে নিতে পারি না কারোকে। আমি তোমাকে ডাক শোনাতে পারি কেবল। তুমি যদি সেই ডাক শুনে ঘামশ্রমের ওই সাদামাটা জীবনটার মধ্যে আসতে চাও তাহলে আসতে পারো। কিন্তু আমার ভরসায় নয়।
অভিমানে এবারে ফুলে ওঠে জ্ঞানবতীর ঠোঁট। আমি কি তোমাকে বিয়ে করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছি কাহ্ন, যে তুমি দায়িত্ব নেওয়ার কথা ভাবছ? আমি জানি আমার মতো ভাগ্যহীনার আর কোনও আশ্রয় নেই খাঁটি কোনও পুরুষ মানুষের হৃদয়ে। এই সোনার নূপুর আমার শিকল। আমি রাজসভার গায়িকা, এ জনপদের প্রতিটি ধূলিকণাও জানে যে আমি রাজার রক্ষিতা। মন্দিরে পূজা দিতে গেলে বাঁকা হেসে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন মহিষী আর রাজনন্দিনীরা। সকলে আমাকে ঈর্ষা করে কিন্তু আচরণে অবজ্ঞা ফুটিয়ে রাখে সবসময়। বড়ো মানুষের প্রসাদভোজী হয়ে বেঁচে থাকতে আর মনের ভিতরে কোনও সাড়া পাই না গো। বিশ্বাস করো। এদের এই ঐশ্বর্য্য আর বৈভবের তলায় তলায় সারাক্ষণ জেগে থাকে স্তাবক আর চাটুকারে ভরা একদল মানুষের জটলা। তারা লোভী, তারা সুযোগসন্ধানী। আমি ঐশ্বর্য্যের এই ঘূর্ণি থেকে উদ্ধার পেতে চাই কাহ্ন। আমার হাত দুটো ধরো।
জল ভরে আসে জ্ঞানবতীর চোখে। কাহ্ন হাতের পাতায় মুছিয়ে দেন তাঁর চোখ দুটো, তারপর বলেন, চলো।
আকাশে ভোরের রং লাগতে তখনও দেরি আছে। নদীর ধারে খেয়া নৌকার ঘাটের কাছে এসে দাঁড়ালেন কাহ্ন আর জ্ঞানবতী। কাহ্ন জানেন এ ঘাটে খেয়া পারাপার করে ডোম্বিনী। আলো ফোটার আগেই উজানে বেয়ে এগিয়ে যেতে পারলে নগরের রক্ষীদের আওতা থেকে দূরে চলে যাওয়া যাবে অনেকটা। শেষ রাতের হিমে ভোরাই খেয়ার অপেক্ষায় তাই দাঁড়িয়ে রইলেন তারা।
ওপরের আকাশের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে গুনগুন করে ভৈরবীতে একটা কোমল পর্দা ছোঁয়ালেন জ্ঞানবতী। কাহ্ন কান পেতে শোনার চেষ্টা করলেন কী একটা কথাও যেন জড়িয়ে রয়েছে সেই সুরের গায়ে। আশ্চর্য!
জ্ঞানবতী গাইছেন।
করুণা পিহাড়ি খেলহুঁ নঅবল।
সদগুরু বোহেঁ জিতেল ভববল।।
কাল রাতে কাহ্নর কাছে শোনা সেই গান। তাই তো, এই পদটি বেঁধেছিলেন কাহ্ন। কাল রাতেই।
সে গান কখন যে কণ্ঠে তুলে নিয়েছে জ্ঞানবতী কাহ্ন তা জানতেও পারেননি।
এই কি তবে দীক্ষা হল জ্ঞানবতীর? কাহ্ন কি তারও গুরু হয়ে গেলেন শেষে?
পুবের আকাশে তখন সূর্যের আলো হামাগুড়ি দিতে শুরু করেছে। তার খিলখিল আলো নেচে উঠেছে গাছের পাতায়। আর সেই অল্প আলোয় দেখা যাচ্ছে খেয়া নৌকোয় দাঁড় বেয়ে ঘাটের দিকে আসতে শুরু করেছে গাছকোমর করে শাড়ি পরা একটি মেয়ে।
ওই তো ডোম্বিনী।
ঘাটে ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাড়ের কাদা মাড়িয়ে লাফিয়ে নৌকোয় উঠে পড়েছেন কাহ্ন। ডোম্বিনীর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন—কী গো মেয়ে, আছ কেমন? পার করে দেবে নাকি আমাদের? আমাকে আর আমার এই বন্ধুটিকে। কত কড়ি লাগবে তোমার? আজ আর তোমার কোনও চিন্তা নেই। জ্ঞানবতী আজ কড়ায় গণ্ডায় মিটিয়ে দেবে তোমার পাওনা।
কাহ্ন এত কথা বললেন, কিন্তু কেমন যেন স্থবির হয়ে গেছে ডোম্বিনী। কোনও উত্তর নেই তার মুখে। কাহ্ন অবাক হয়ে বললেন—কী গো ডোম্বিনী, চিনতে পারছ না তুমি আমাকে? কথা না হয় নাই বললে। একটু হাসলেও তো পারো।
তবুও কেন হাসি নেই ডোম্বিনীর মুখে? হঠাৎ একটা সন্দেহ উঁকি দিয়ে গেল কাহ্নর মনে মনে। শিরদাঁড়ায় একটা শিহরন খেলে গেল তার। ডোম্বিনীর দৃষ্টি অনুসরণ করে তিনি তাকালেন পিছন ফিরে।
অমাত্য হরিহর জলের একেবারে কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে ধরা মুঠিতে জ্ঞানবতীর চুলের গুচ্ছ। মুখে ত্রূর হাসি।
ভেবেছিলি রাজপুরীতে সিঁদ কেটে চুরি করে পালাবি? সে কি অতই সোজা বাছা? সবচেয়ে দামি রত্নটার দিকেই যে হাত বাড়িয়েছিস রে মূর্খ। এবার তো আর অপরাধ ছোটোখাটো নয়। চল। আবার শ্রীঘর দেখিয়ে আনি তোকে। একটা রাত এজন্য অবশ্য জাগতে হল আমাকে। কিন্তু মহারাজের আদেশমতো নজরদারিটাও তো হল। চুলের মুঠি ধরে জ্ঞানবতীকে কাদায় আছড়ে ফেলে নৌকোর কাছে লাফিয়ে আসতে গেল হরিহর। কিন্তু কাহ্নর ইশারায় ততক্ষণে বাঁশের লগি দিয়ে নৌকোটিকে স্রোতের গভীরে ঠেলে দিয়েছে ডোম্বিনী। হিংস্র হাতে দাঁড়ের ঝাপটা লাগিয়ে দিয়েছে ঢেউয়ের বুকে। পাড় থেকে তার নাগাল পাওয়া তখন হরিহরের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। চেঁচিয়ে ক্রুদ্ধ স্বরে কিছু একটা বলছিল হরিহর। কিন্তু সে কথা শোনার আর সময় নেই তখন। কাহ্ন তখন বলছেন, জোরে ডোম্বিনী, আরও জোরে।
ঢেউয়ের ধাক্কায় দুলে উঠে নৌকো তখন গিয়ে পড়েছে মাঝনদীতে। ডোম্বিনী ছপাৎ ছপ দাঁড়ের আঘাত করে চলেছে ঢেউয়ের বুকে। জলের ফোঁটা ছিটকে পড়ছে হাওয়ায়।
যত তাড়াতাড়ি রাজনগরের সীমানা ছাড়িয়ে দূরে চলে যাওয়া যায় ততই মঙ্গল। একসময় বিন্দুর মতো ছোটো হয়ে মিলিয়ে গেল পাড়ের গাছগাছালি। চারপাশে কেবল জল আর জল। স্রোতের বেগ সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে ডোম্বিনী। সকালের আলোয় তার কপালে চিকচিক করছে ঘামের বিন্দু। কাহ্ন তখন শিরদাঁড়া টান করে শুয়ে পড়েছেন নৌকোর পাটাতনে।
ব্যাপার কী কাহ্নুপাদ? কাল রাতে কী এমন ঘটেছে যার জন্যে তোমাকে পালিয়ে আসতে হল এভাবে? আর ওই মেয়েমানুষটাই বা কে? ওকে তুমি পেলেই বা কোথায়?
কাহ্নুপাদের কাছে সব কথা শুনে ডোম্বিনী বলে, আচ্ছা কাহ্নুপাদ, কেমন মানুষ বলো তো তুমি? কাল সারাটা রাত কাটালে যে মেয়েমানুষটার সঙ্গে, যে তোমার হাত ধরে পথে বেরিয়ে এল সুখ সম্পত্তি ছেড়ে, তাকেই কি না দুষ্ট লোকের হাতে ফেলে রেখে তুমি পালিয়ে এলে? তোমার হৃদয় কি পাথর কেটে তৈরি কাহ্নুপাদ। এত নিষ্ঠুর কেন গো তুমি? এত নির্দয় কেন?
আমি নিষ্ঠুর নই ডোম্বিনী। আমি উদাসীন। সুখে দুঃখে সমান থাকাটা আমার সাধনা।
কাহ্ন দেখলেন ডোম্বিনীর দৃষ্টি এখনও কঠোর। বুঝলেন তার কথা শুনে কাজটা করতে বাধ্য হয়েছে বটে ডোম্বিনী, কিন্তু মনে মনে কাজটাকে সে মেনে নিতে পারেনি কিছুতেই। অগাধ জলের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন কাহ্ন। তারপর বললেন, ডোম্বিনী, নদীর এই ছোটো ছোটো ঢেউগুলোকে দেখো। প্রতি মুহূর্তে কত ঢেউ উঠছে আর ভাঙছে। কিন্তু একটা বিরাট সমুদ্রে গিয়ে যখন এই নদী মিশবে তখন আর ওই ঢেউয়ের ভাঙাগড়ার কথা কি মনে রাখবে কেউ। টুকরো টুকরো কত ঘটনা দিয়ে আমাদের জীবনটা গাঁথা। কিন্তু সব কিছুর শেষে যদি জীবনের সারাৎসার উপলব্ধি করে মহাসুখে পৌঁছোতো পারে কেউ, তখন কি ছোটোখাটো দুঃখ যন্ত্রণাগুলোকে ভারী বলে মনে হবে?
ডোম্বিনী বেশ কিছুক্ষণ মুখ ঘুরিয়ে রইল অন্য পাশে। তারপর হাতের দাঁড় রেখে বাঁশের লগিটা টেনে নিতে গিয়ে দেখল, পাটাতনে পিঠ রেখে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে কাহ্নুপাদ। নিশ্চিন্তে।

হরিহরের লোকজনেরা ঘাটে আসতে দেরি করে ফেলেছিল কিছুটা। তার তালুক থেকে বজরা জাতীয় যে বড়ো নৌকাটা রাতের অন্ধকারে উজিয়ে এসেছে নদীপথে, তার মাঝিমাল্লার দল অন্ধকারে ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেনি এই খেয়াঘাটের সঠিক অবস্থান। আলো জাগার পর অন্ধকার একটু পাতলা হতে বজরাটা নিয়ে মাল্লারা দুলতে দুলতে স্রোত ভেঙে এগিয়ে এল খেয়াঘাটের কাছে।
পাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে তখন কপাল চাপড়ে আপশোশ করছেন হরিহর। হাতের মুঠো থেকে শিকার পালিয়ে গেছে তাঁর। ঠিক সময়ে যদি তাঁর লোকেরা বজরাটিকে ভেড়াতে পারত এই ঘাটে, তাহলে লোকটা পালিয়ে যেতে পারত না এত তাড়াতাড়ি। অন্তত তার পিছু ধাওয়া করা যেত বজরা নিয়ে। নিজের তালুকের লোকজনদের দেখে মনটা অবশ্য একটু শান্ত হল হরিহরের। আপশোশ ছেড়ে এবারে তাকালেন মাটিতে পড়ে থাকা জ্ঞানবতীর দিকে। কাদায় আছাড় খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল জ্ঞানবতী। কাপড়ে চোপড়ে পলিমাটি মাখা। কাদা লেগে আছে তার চুলে আর কপালের একপাশে। দৃশ্যটা দেখে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল ব্রাহ্মণ অমাত্যের মুখে। তারপর সাঙ্গোপাঙ্গদের নির্দেশ দিলেন সংজ্ঞাহীন অবস্থাতেই একে বজরায় টেনে তোলো।
পাড় থেকে সকলে বজরায় উঠে এলে অমাত্যের নির্দেশে একসময় ছেড়ে দেওয়া হল সেই বজরা। রাজনগরের নদীর পাড়ে একটি দুটি লোকজনের ইতিউতি দেখা মিলছে সবে। স্রোতের কাঁধে চেপে বজরা বহে চলল ভূস্বামী হরিহরের নিজস্ব তালুকে।
কাঠের পাটা চিরে বজরার মাঝখানে বানানো একটি সুন্দর কক্ষ। তার ভিতরে মাদুরবিছানো। কাঠের ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ে নদীর জলে নানারকম মাছের সাঁতার কাটা। সেই কক্ষে বসেছিলেন অমাত্য। তাঁকে খবর দেওয়া হল সংজ্ঞাহীন যে রমণীকে ধরে আনা হয়েছে, নদীর খোলা হাওয়ায় তার চৈতন্য ফিরে আসছে ধীরে ধীরে। পাশ ফিরে না কি আড়মোড়া ভেঙেছে সেই রমণী। তারপর একসময় উঠেও বসেছে নৌকোর পাটায়। তাকে ভিতরে নিয়ে আসার নির্দেশ গেল এবার।
এই ব্রাহ্মণের ইচ্ছের কথা শুনে আরও একবার স্তম্ভিত হয়ে গেলেন জ্ঞানবতী। তাঁকে নাকি থাকতে হবে এই ভূস্বামীর নিজের তালুকে বিষুমন্দিরের সেবাদাসী হয়ে। প্রতি সন্ধ্যায় সেখানে বসাতে হবে সংগীতের আসর আর রাত্রে সঙ্গ দিতে হবে হরিহরকে।
রাজসভার আরও একজন অমাত্যের মনেও যে তাঁকে ঘিরে কামনার কালো পাথর জমে পাহাড় হয়েছিল সে কথা জেনে নিজের উপরে এবারে ঘৃণা জন্মাল জ্ঞানবতীর। কিন্তু এখানে সবাই অমাত্যের পেটোয়া লোক। এতবড়ো বজরায় মাঝি মাল্লারা তো আছেই, ষণ্ডামার্কা দু-একজন লাঠিয়ালের চেহারাও চোখে পড়ে গেল তাঁর। জ্ঞানবতী বুঝলেন এখানে হরিহরের কথা না শুনে বিপদ বাড়িয়ে লাভ নেই। পায়ে পায়ে তিনি এগিয়ে গেলেন বজরার মাঝখানে কাঠের তৈরি কক্ষটির দিকে।
তাকে দেখে হরিহর বললেন, এসো হে গায়িকা। দূর থেকে তো রূপের আগুনে পুড়িয়ে মেরেছ আমাদের। এবারে ঝাঁপ দেব একেবারে আগুনের ভিতরে। সেদিন রাজসভায় তোমার চোখ দেখেই বুঝেছিলাম লোকটা নেশা ধরিয়ে দিয়েছে তোমার চোখে। বেটা তান্ত্রিক বশীকরণ মন্ত্র জানে বোধহয়। আমিও ফাঁদ পেতে রেখেছিলাম। খাঁচার পাখি পালালে যাতে আমার খাঁচায় তাকে পুরতে পারি। একটা পাখি পালিয়েছে তবে তাতে আমার আপশোশ নেই। মহারাজ তোমার খোঁজ করে জানতে পারবেন তুমি শিকল কেটে ভেগেছ ওই কাপালিকটার সঙ্গেই। আর আমি থেকে যাব তাঁর সন্দেহের বাইরে। এক ঢিলে দুই পাখি মারার কৌশল কাকে বলে দেখেছ হে গায়িকা। নিজের বুদ্ধির তারিফ করে খ্যাক খ্যাক করে ন্যাড়া মাথায় হাত বুলিয়ে হাসতে লাগলেন ব্রাহ্মণ হরিহর।
ঠিক তখনই ঘটল ঘটনাটা। বাইরে থেকে কোলাহলের শব্দ পাওয়া গেল হঠাৎ। কাদের যেন পায়ের ভারে টলমল করে উঠল বজরা। মাঝি মাল্লাদের আর্তনাদের শব্দ আসতে লাগল ভিতরে। দু-একজনের গলায় যেন মরণ চিৎকার। আর নদীর জলে একের পর এক ভারী শরীরের ঝাঁপ দেওয়ার ঝপাং ঝপাং শব্দ। জ্ঞানবতী বুঝলেন নিশ্চয়ই জলদস্যুদের কবলে পড়েছে তাদের বজরা। অকূল নদীর অগাধ জলে দিনের বেলাতেই হানা দিয়েছে দস্যুরা। জ্ঞানবতী রাজসভার অনেক মানুষকে ইদানীং নদীপথে জলদস্যুদের হানাদারি বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করতে শুনেছেন। এখন সেই দস্যুদের ভয়ংকর তাণ্ডব দেখার জন্য মনে মনে প্রস্তুত করলেন নিজেকে। প্রতিরোধ, আর্তনাদ আর লাঠির ঘায়ে মানুষের মাথাফাটার ভয়াবহ শব্দ শুনে হরিহর বুঝলেন লাঠিয়াল আর মাল্লাদের সঙ্গে শেষ মোলাকাত হচ্ছে দস্যুদের। এর পরে তারা নিশ্চয়ই এসে ঢুকবে এই কক্ষের ভিতরে। ধনরত্নের সন্ধানে। দেয়ালে যে ফাঁকা জায়গাটি দিয়ে নদীবক্ষের রমণীয় দৃশ্য দেখার ব্যবস্থা করা রয়েছে তার ভিতর দিয়ে অর্ধেক শরীর বাইরে বের করে অগাধ জলের দিকে একবার তাকিয়ে নিলেন অমাত্য হরিহর। তারপর জ্ঞানবতী তার ঝাঁপিয়ে পড়ার শব্দ শুনতে পেলেন নদীর বুকে। ঝপাং।

ভোরের অনেক আগেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হয় ডোম্বিনীকে। এখন সে নিজেদের গাঁ থেকে কয়েকটা প্রান্তর পেরিয়ে কৃষকপল্লির পাশ দিয়ে ঘুরে ঘুরে যায় নৌকোর ঘাটে। এক আধদিন কাহ্নুপাদের সঙ্গেও দেখা হয়ে যায় তার।
ডোম্বিনী জানে এখন চাষবাসের কাজে মন দিয়েছে কাহ্নুপাদ। অন্ধকার থাকতেই হাল আর বলদ নিয়ে মাঠের দিকে এখন পা বাড়াবে কাহ্নুপাদ। মাটি তৈরি করে সারাদিন রোদ্দুর মাথায় নিয়ে। তারপর সন্ধেবেলায় কখনও কখনও তাকে দেখা যায় হাটের ধারের মদের দোকানে।
এরই মধ্যে হাটতলায় একদিন তাদের নাচের দলের তাঁবু পড়েছিল সন্ধেরাতে। বড়ো বড়ো মশালের আলোয় ডমরু বাঁশির তালে তালে তার নাচ দেখার জন্য লোকও জুটেছিল বিস্তর। নাচতে নাচতে কাহ্নকে সেদিন ভিড়ের মধ্যে আবিষ্কার করেছিল ডোম্বিনী। আজকেও লুকিয়ে তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে কাহ্নুপাদ। অবশ্য আজকে তার লুকিয়ে থাকার কারণটা অন্য। এত সব মেয়েমানুষকে মনে ধরে কাহ্নুপাদের। ডোম্বিনীকে যেন সে দেখেও দেখে না। কাহ্নকে দেখে কোমরের ভাঁজে ভাঁজে ঝড় তুলেছিল সে। কাহ্নুপাদের ওই পাথরে-কোঁদা শরীরটা তার চাই। ওই কঠিন পাথরের চাপে যেদিন পিষ্ট হবে তার ঢলো ঢলো যৌবন, সেদিনই যেন জীবন সার্থক হবে ডোম্বিনীর।
এখনও বিয়ে থা করে জোড়া বাঁধেনি সে। কারোকে নিয়ে ঘর বসায়নি আলাদা করে। কিন্তু জোয়ান মরদ পেলে যৌবনের খেলায় মেতে উঠতে কোনও আপত্তি নেই তার। কেবল খেলার সঙ্গীটিকে মনে ধরা চাই ডোম্বিনীর। ডোমপাড়ার আর তাঁতিপাড়ার ছেলে ছোকরাদের মুখে মুখে ফেরে তার শরীরের নানারকম গল্পকথা। একবার নাকি এক বামুনের ছেলের দম বের করে ছেড়েছিল ডোম্বিনী। ডোমের ঘরে জন্মেছে বলে প্রথমে কিছুতেই তাকে ছুঁতে চায়নি সেই ব্রাহ্মণ যুবক। গঙ্গাজল ছিটিয়ে শুদ্ধ করে তারপরে শয্যায় তুলেছিল তাকে। কিন্তু গভীর রাতে ডোম্বিনীর উথালপাতাল শরীরের কাছে হার মেনে ঘাড় নিচু করে ঘর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল শুচিবায়ুগ্রস্ত সেই ব্রাহ্মণ।
যে লোকটি তাদের নাচের দলের মাদল বাজায় তার সঙ্গেও নাকি রাত বিরেতে এধারে ওধারে দেখা যায় ডোম্বিনীকে। লোকটার নাম বলাই। জেলেপাড়ায় থাকে। ডিঙিনৌকোয় মাছ ধরে আর নাচের দলে বাজায়। ঘরে একটি বউও আছে তার। তবুও নেশাতুরের মতো লোকটি ডোম্বিনীর পিছনে পিছনে ঘুরে বেড়ায় বনে বাদাড়ে। এ নিয়ে অবশ্য চাষিপাড়া বা ডোমপাড়ার ছেলেছোকরারা কেউ কিছু মনে করে না খুব একটা। তাদের একটা পল্লি আছে বটে, সেখানে আছে পাকামাথার সব গ্রামবৃদ্ধেরা, বিচার সালিশ, পঞ্চমাথা সবই আছে তাদের। তবে গতর খাটিয়ে সারাদিন পরে ঘরে ফেরা মানুষগুলো কে কার সঙ্গে রাত কাটাল তা নিয়ে অত মাথা ঘামায় না তারা। বউ ছেলেপিলেদের ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা করে ঠিকমতো। তার বেশি কোনও কিছু নিয়ে এখানে আর মাথা ঘামানোর সময় পায় না কেউ।
শুদ্ধ শরীরের শুচিবায়ু এখনও জোর করে কেটে বসতে পারেনি এদের জীবনধারায়। ডোম্বিনীও বোঝে সে কথাটা। বোঝে তার নাচের দলের সঙ্গতকার বলাই নামের পুরষটাকে ঝড়বাদলে ভাসিয়ে নিয়ে কেমন করে বজ্রকঠিন করে তুলতে হয়। তখন নদীর স্রোত বইতে শুরু করে ডোম্বিনীর। কিন্তু বলাই নামের লোকটি তার শেষ বজ্রপাতেও তল ছুঁতে পারে না ডোম্বিনীর গভীর নদীখাতের।
ঝড়জল শেষে আকাশ নির্মল হয়ে যায়। তারা খসে পড়ে। কিন্তু কিছুতেই সুখ পায় না ডোম্বিনী। এক একবার সে ভাবে, আচ্ছা লোকটা নিজের বউকে সুখী করে কীভাবে? তারপরেই তার মনে হয় বলাই হয়তো বউয়ের সঙ্গেও সঙ্গত করতে পারে না ঠিকমতো। নাচের তাল হয়তো কেটে যায় ওদেরও।
এই কথাটা মনে পড়তে একটা অদ্ভুত ভাবনা এল ডোম্বিনীর মনে। আচ্ছা, বলাইয়ের বউ কি তবে রাতের পরে রাত ওই তাল কেটে যাওয়া আনন্দের তলায় চাপা পড়ে সুখী থাকে? না কি সেও খুঁজে নেয় অন্য কোনও বাজনদার? অন্য কোনও শক্ত পুরুষমানুষের পরশপাথর?
কাহ্নুপাদের মুখে হাটতলায় একটা গান শুনেছিল ডোম্বিনী। লোকেরাও সব রসে মজে তারিয়ে তারিয়ে শুনেছিল সেই গান।
সুসূরা নিদ গেল বহুড়ী জাগঅ।
কানেট চোরে নিল কা গই মাগঅ।।
দিবসে বহুড়ী কাড়ই ডরে ভাঅ।
রাতি ভইলে কামরু জাঅ।।
দিবসে বউটি কাক দেখলে ডরায় কিন্তু রাতে জেগে ওঠে কামনায়। ডোম্বিনী ভাবে মেয়েদের এই ছটফটানির কথাটা সহজিয়ারা জানতে পারে কী করে?
ওসব কথা কি আর এমনি এমনি জানা যায়? এ জন্যে তাদের ঘুরতে হয় খেতে খামারে, শ্মশানে-শুঁড়িখানায় সর্বত্র। চিনতে হয় পথঘাট, চিনতে হয় সব আঘাটা।
শুঁড়িখানার দরজায় আঁকা নিশানা দেখলেই অবশ্য চিনতে পারে সকলেই। ভর সন্ধেবেলাতেই যখন রাত নেমে আসে চাষিপাড়ায়, আশপাশের যারা তুলো ধোনে, যারা তাঁত বোনে, তাদের পাড়াও যখন ঘুমিয়ে পড়ে একে একে, তখন শুধু এই হাটতলায় আলো জ্বালিয়ে জেগে থাকে কয়েকটা চালাঘর। টিমটিম করে মাটির প্রদীপ জ্বলে ভিতরে।
এরকমই একটা ঘরের গায়ে বিশেষ একটা প্রতীক চিহ্ন আঁকা রয়েছে দেখে আজ ভিতরে ঢুকে পড়েছেন কাহ্ন। আজ সারাদিন জমিতে খাটুনি হয়েছে প্রচুর। সন্ধেবেলায় এখন একটু আসবের যোগান চাই তার। কই গো রসবতী, বলে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লেন কাহ্ন।
রসবতী হল দোকানি নিমাই শুঁড়ির বউ। সারাদিন তার স্বামী মদ চোলাই করে আর রসবতী হাঁড়ি করে সেই মদ সাজিয়ে রাখে ঘড়ায় ঢেলে। দোকানের ভিতরে এরকম চৌষট্টিটা ঘড়া সার দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে রসবতী। ভাঁড়ে ভাঁড়ে লাগিয়ে রেখেছে সরু নল। এতে একসঙ্গে বেশি খদ্দের এসে পড়লে তাদের সকলের হাতেই মদ তুলে দিতে সুবিধা হয় রসবতীর। কিন্তু গরিবগুরবো খদ্দেরগুলো একবার দোকানে ঢুকলে আর বেরোতে চায় না কিছুতেই। তাদের নানা রকমের বায়না। বেঁহুশ হয়ে গেলে তাদের কাছ থেকে কড়ি আদায় করাও খুব শক্ত। তবুও তাদের ভিড়েই দোকানটা ভরাভরতি লাগে সন্ধেবেলায়। আজ এখানে কাহ্ন ঢুকে পড়ায় একটা মৃদু গুঞ্জন উঠল ভিড়ের মধ্যে। সন্ধেবেলায় এখানে তাকে প্রায় দেখাই যায় না। খোঁজখবর করতে এগিয়ে এল বেশিরভাগ লোক। কারোর গলায় কুশল জিজ্ঞাসা। কারও আবার মৃদু অনুযোগ।
তাঁতিপাড়ার সুমঙ্গল রসবতীর রোজের খদ্দের। কাহ্নকে দেখে এগিয়ে আসে। বলে, আজকাল তো তোমাকে আর আমাদের বসতিতে দেখাই যায় না কাহ্ন। তুমি কি আর আমাদের কথা মনে রাখবে ভাই? শুনলাম তুমি নাকি রাজসভায় গিয়েও তোমার গান শুনিয়ে এসেছ একদিন। দেখছ তো কাহ্ন ভাই, আমরা কেমন তোমার খোঁজখবর রাখি নিয়মিত। তোমার বউঠান তো এই সেদিনও জানতে চাইছিল তোমার কথা। বলছিল কাহ্ন ঠাকুরপো তো আমাদের তাঁতিপাড়ায় আসেনি অনেকদিন হল।
আমি বললাম আরে তার কী আর সময় আছে অত। চ্যালাচামুণ্ডা জুটেছে তো অনেক। তাদের গল্পের ঠেলায় তো তিষ্ঠোবার উপায় নেই। তুমি নাকি ডাকিনী সিদ্ধ হয়ে গেছ এতদিনে। তোমার মাথায় নাকি সাতটা রথের ছাতা উড়ে থাকে সব সময়।
কাহ্ন মুচকি হেসে বললেন, ওসব কথা বাদ দাও তাঁতিদাদা, শিষ্যরা গুরুর কথা উঠলে দুচারটে অলৌকিক গল্প কাহিনি বলতে ভালোবাসে। হাত-পা-ওয়ালা একটা মানুষকে গুরু ভাবতে ভরসা পায় না সকলে। বউঠানকে বোলো সময় পেলে আমি একদিন যাব তার কাছে। বউঠানের হাতের মাছের ঝোল খাওয়া হয়নি অনেকদিন। আহা তার কী স্বাদ! শিগগিরই খেতে যাব একদিন।
আমার হাতের মদটা এবার গেলা হোক—মদের পাত্র হাতে নিয়ে এবার মুখ ঝামটা দেয় রসবতী। আর একজন তো সন্ধে থেকেই মাতাল হয়ে বসে আছেন ওপাশে।
আর একজন? কৌতূহলী হয়ে তাকালেন কাহ্ন। ভিড়ের মধ্যে দৃষ্টি চালিয়ে খুঁজতে শুরু করলেন চারপাশে। ওই তো উলটোদিকের দেয়ালে হেলান দিয়ে মাথা নিচু করে বসে রয়েছেন ভুসুকু। নিশ্চয়ই এর মধ্যেই বেশ কিছুটা মদ পেটে পড়েছে তাঁর। কাহ্ন এগিয়ে গেলেন ভুসুকুর দিকে। নিচু গলায় ডাকলেন, ভুসুকু।
রাতের আকাশে এখন তারাদের ভিড়। শান্ত নদীর বুকে তাদের উলটে ধরা ছবি। কাহ্নর কাঁধে হাত রেখে টলোমলো পায়ে অনেকটা পথ হেঁটেছেন ভুসুকু। নদীর পাড়ে পিপুল গাছের গায়ে এখন তাঁকে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিয়েছেন কাহ্ন। নদীতীরের ফুরফুরে হাওয়া চোখেমুখে লাগতে কাহ্ন বুঝলেন তাঁর নিজেরও আজ নেশা ধরে গিয়েছে একটু বেশি।
আজ আর ঘরে ফেরার শক্তি নেই তাদের পায়ে। অবশ্য ঘরে কিংবা পথে সমান উদাসীন জীবন কাটানোর কথাই ভাবেন তারা। ঘর ছেড়ে সাধনার কথা কখনও বলেননি তাদের আচার্যরা। সংসারের দুঃখ আনন্দের মধ্যে উদাসীন থাকতে পারলে তবেই তাদের গোপন সাধনার সিদ্ধি।
ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা লেগে কিছুটা যেন সুস্থ বোধ করলেন ভুসুকু। তারপর বললেন, তোমাকে একটা কথা বলব কাহ্ন?
কাহ্ন বললেন, সংকোচ বোধ করছ কেন, বলো।
জানো কাহ্ন, লোকমুখে শুনতে পাই তোমার আর আমার পদ এখন সহজিয়াদের মুখে মুখে ফেরে। চাট্টিল্ল, গুণ্ডরী, শান্তি সকলেই জীবনপাত করে রচনা করে চলেছেন তাদের পদ। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে আমাদের রচনার আবেদনই বোধহয় কিছুটা বেশি। জানো কাহ্ন, আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় কখনও কখনও এমন পদ রচনা করি যার ভিতরে কোনও ধর্মীয় উদ্দেশ্য লুকিয়ে নেই। ছন্দ আর সংগীতই হবে যার ধর্ম।
ভুসুকুর সমস্যাটা চিনতে পারলেন কাহ্ন। তার নিজেরও যে এমন কথা মনে হয় মাঝে মাঝে। আরও স্পষ্ট করে জানতে চাইলেন, তোমার ঠিক কী ধরনের পদ রচনা করতে ইচ্ছে হয় বিশদ করে বলতে পারো ভুসুকু?
ভুসুকু বললেন, ইচ্ছে হয় আমি ফুলের সুগন্ধের কথা বলি আমার পদে। বলি মানুষের জীবনের কোনও একটি ঘটনার কথা। কিংবা কোনও মধুর আখ্যানকে বেঁধে ফেলি আমার ছন্দে। আমরা তো কবি কাহ্ন। তত্ত্বহীন বিশুদ্ধ কাব্যচর্চাও তো আমাদের করা উচিত, বলো?
চিন্তায় পড়লেন কাহ্ন। বললেন, সংঘের দিক থেকে এতে হয়তো একটা আপত্তি থাকতে পারে অন্যান্য আচার্যের। আমার তেমন কোনও বাতিক নেই। কিন্তু এ বিষয়ে আমারও কিছু কথা বলার আছে ভুসুকু।
ফুলের সুগন্ধ বর্ণনাই করো কিংবা রচনা করো কোনও আখ্যান। কাব্যের গভীরে কোনও একটি স্তরে তোমাকে আরও একটা কিছু রহস্য গোপন করে রাখতেই হবে। উপরিতলে থাকতে পারে একটি বর্ণনা কিন্তু তাকে ভেদ করে শ্রোতা যেন পৌঁছোতে পারে তোমার সেই নিভৃত উপলব্ধির সারাৎসারে। না হলে সে নিজে ওই ফুলটিকে দেখে যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছে, তোমার কাব্যের কাছে তার চেয়ে বেশি কিছু আর পাওয়ার থাকে না তার।
কিন্তু কাহ্ন, গোপন করা কি কোনও কবির কাজ হতে পারে? প্রকাশ করাতেই তো তার আনন্দ।
ভুসুকু, আমার মনে হয় কবি তার আনন্দ প্রকাশ করতে চায় শ্রেষ্ঠ উপায়ে। যাতে শ্রোতার হৃদয়েও তা ছড়িয়ে দেয় সমান উত্তাপ। সেই জন্যেই তো রহস্যের গভীরে ডুব দেয় কবি। রহস্যভেদের ওই আনন্দই আমার কাছে রস আস্বাদনের আনন্দ ভুসুকু।
গভীর রাতে আসবমত্ত দুই কবির কাব্য আলোচনার মাঝে ঠিক এই সময় কোথা থেকে যেন মাটি ফুঁড়ে উদয় হল ভূতের মতো অন্ধকার এক কিশোরের। তাদের থামিয়ে স্পষ্ট গলায় বলে উঠল, ক্ষমা করবেন। আপনাদের আলোচনায় ব্যাঘাত ঘটালাম। আপনারা দুজন কি কাহ্নুপাদ আর ভুসুকুপাদ?
ভুসুকু বললেন, আমাদের পরিচয় যখন জেনেই গেছ, তখন বলো তো কিশোর, আমাদের গতিবিধি তুমি জানলে কোথা থেকে?
সুঠাম কিশোরটি এবার চিবুকটি উপরে তুলে তাকাল ভালো করে। সন্ধেবেলায় সে নাকি জেলেদের পল্লিতে খোঁজ করে এক মাতালের কাছ থেকে সন্ধান পেয়েছিল হাটতলার শুঁড়িখানার, তারপরে রসবতী তাকে সাহায্য করেছে এখানে তাদের কাছে আসতে।
তার কথা শুনে কাহ্ন বললেন, তোমার উদ্যমের প্রশংসা করতেই হয় কিশোর। এখন বলো কী উদ্দেশ্য তোমার?
—তার আগে আমার পরিচয় জানতে চান না আপনারা?
কাহ্ন বললেন, তুমি জানাতে চাইলে বলো।
—আমার নাম হল অরু। আমি একজন ব্রাহ্মণ সন্তান। ব্রাহ্মণ হরিহর হলেন আমার পিতা।
কণ্ঠনালীর কাছে আচমকা বিস্ময়ের শব্দটাকে আটকে ফেললেন কাহ্ন। তারপর ভুসুকুর হাত ধরে টেনে তুলে বললেন, আর এখানে নয় ভুসুকু। চলো তাড়াতাড়ি।
এগিয়ে চললেন তাঁরা অন্ধকারের দিকে। গন্তব্য অজানা। কিন্তু পায়ে পায়ে তাদের সঙ্গে চলতে শুরু করল সেই কিশোর। অরু। কিছুতেই সে আর সঙ্গ ছাড়ে না।

হরিহর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ার পরে মনে মনে প্রমাদ গণেছিলেন জ্ঞানবতী। ভেবেছিলেন এবার বুঝি আর নিস্তার নেই তার। বাইরে তখন দস্যুদের প্রচণ্ড উল্লাস। নিশ্চয়ই হরিহরের সমস্ত লোকজনকেই এতক্ষণে শেষ করে দিয়েছে তারা।
বজরার ভিতরে ছোটো কুঠুরিতে বসেছিলেন জ্ঞানবতী। আর মনে মনে ভাবছিলেন সেই দিনটার কথা। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই দিনটা যেন নাটকের এক একটা দৃশ্যের মতো পালটে পালটে গিয়েছিল তার চোখের সামনেই।
আগের দিনই রাজা মণিভদ্রের সভায় তিনি প্রথম দেখেছিলেন কাহ্নকে। ভালো করে তার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল অবশ্য রাত্রে তাকে নিজের বাড়িতে ডেকে নিয়ে যাওয়ার পরে।
জীবনে পুরুষমানুষ জ্ঞানবতী কম দেখেননি। কিন্তু সেই রাত্রে তাঁর মনে হয়েছিল কাহ্নর মতো মানুষ বুঝি একজনই হয়। তাঁর মধুর ব্যবহার, তাঁর রুচির আভিজাত্য, তাঁর শিল্পচিন্তার ব্যাপ্তি, তাঁর জীবনবোধের গভীরতা—এসব একেবারে মোহিত করে দিয়েছিল জ্ঞানবতীকে। মনে হয়েছিল এমন কারও সঙ্গেই বুঝি সব বৈভব, সব ঐশ্বর্যকে উপেক্ষা করে চলে যাওয়া যায়। নাই বা তিনি রাজি হলেন হাত ধরে হাঁটতে। এমন পুরুষমানুষের পাশে পাশে হাঁটতে পারলেও জীবনের পথ পেরোনোর কঠিন কাজটা সহজ হয়ে আসে অনেক।
সিদ্ধান্ত নিতে তাই দেরি করেননি জ্ঞানবতী। দ্বিধাবোধ করেননি নিরাপত্তার কথা ভেবে। প্রাসাদ-প্রসাদের সুখভোগ, হীরে-জহরতের পেটিকা—এ সমস্ত পিছুটানকেই হেলায় ছিন্ন করেছিলেন তিনি। শুধু কাহ্নর সঙ্গে যেতে পারার আনন্দে।
সেই কাহ্ন যখন অমাত্য হরিহরের হাতে তাকে বিপদগ্রস্ত অবস্থায় ফেলে রেখে উঠে পড়েছিলেন অন্য এক রমণীর নৌকোয় তখন প্রথমে একটু অবাক হলেও পরক্ষণেই একটা কৌতুকের বোধও এসেছিল তার মনে। বড়ো কম সময়ে বড়ো বেশি ভেবে ফেলেছিলেন জ্ঞানবতী। যে কোনও রকম বিপদের আঁচ পেলেই লাঙুল গুটিয়ে পালানোর ব্যাপারে পুরুষমানুষেরা প্রায় সকলেই সমান পারদর্শী।
জ্ঞানবতী লক্ষ করছিলেন নদীর পাড়ে তার চুলের গুচ্ছ মুঠিতে পাকিয়ে তর্জন গর্জন করে চলেছেন হরিহর, আর ঢেউয়ের বুক ভেঙে প্রাণপণে নৌকো বেয়ে পালিয়ে চলেছেন কাহ্ন আর অপরিচিতা সেই মাঝিমেয়ে।
হাতের মুঠি থেকে শিকার পালিয়ে যাওয়ার ক্রোধে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে গালিগালাজ করছিলেন হরিহর। অবশ্য তার হাতের মুঠি একেবারে শূ)ন্য ছিল না তখন। নৌকোয় উঠবার আগেই তিনি ধরে ফেলতে পেরেছিলেন জ্ঞানবতীকে। হরিহরের সব রাগ গিয়ে পড়েছিল তাঁর উপরেই। সবল হাতে জ্ঞানবতীর চুলের গুচ্ছ টেনে নদীর পাড়ে কাদামাটিতে তাকে আছড়ে ফেলেছিলেন হরিহর। যন্ত্রণায় চোখ বুজে ফেলেছিলেন জ্ঞানবতী।
চোখ খুলে এই বজরার মধ্যে নিজেকে ক্রমশ আবিষ্কার করেছিলেন জ্ঞানবতী। ক্রমশ, কারণ লুপ্ত চেতনার থেকে ফিরে এসে সচেতন ভাবে এই বজরার মধ্যে নিজের এসে পড়ার ঘটনাটাকে বুঝে উঠতে তার সময় লেগে গিয়েছিল কিছুটা। বজরার মধ্যে হরিহরের মাল্লা আর লেঠেলদের কথাবার্তা শুনে আঁচ করেছিলেন কিছুটা। কিছুটা আঁচ করেছিলেন ভোর থেকে সেদিনের ঘটনাক্রমটিকে মনে মনে আরও একবার গেঁথে নিয়ে।
তারপর হরিহরের লোকজনেরা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল বজরার মাঝখানে কাঠের তৈরি সেই কক্ষটিতে।
জ্ঞানবতীকে নিজের তালুকে তুলে নিয়ে যেতে পারছেন এটুকু ভেবেই উৎফুল্ল হয়েছিলেন অমাত্য হরিহর। তিনি জানতেন রাজা মণিভদ্র এ ঘটনার বিন্দুবিসর্গও টের পাবেন না। তাঁর ক্রোধ তাড়া করে বেড়াবে ওই বৌদ্ধ সহজিয়াকেই। কারণ তার সঙ্গেই গৃহত্যাগ করে পালিয়ে এসেছিলেন জ্ঞানবতী। চুরি করেছে ওই ব্যাটা বৌদ্ধ কাপালিকটাই। চোরের উপরে তাঁর বাটপাড়ির সংবাদটুকু নিশ্চয়ই থেকে যাবে লোকচক্ষুর অগোচরে।
এসব ভেবেই জ্ঞানবতীকে নানারকম অপমানজনক প্রস্তাব দিতে শুরু করেছিলেন হরিহর। ঘৃণায় ভরে উঠেছিল জ্ঞানবতীর মন। ঘৃণা শুধু লোভী, ক্ষমতাবান পুরুষমানুষদের উপরেই নয়। জ্ঞানবতীর ঘৃণা হয়েছিল নিজের শরীরের উপরেও।
আর এই সময়েই বাইরে থেকে ভেসে এসেছিল চিৎকার। হরিহরের লাঠিয়াল, মাল্লাদের আর্ত চিৎকার। ধস্তাধ্বস্তি আর লাঠালাঠির শব্দ। হিংসা আর হননের উল্লাস।
রাজা মণিভদ্রের সভায় প্রায় প্রতিদিনই উপস্থিত থাকতে হত জ্ঞানবতীকে। রাজ্যের নদীপথগুলির দুরবস্থা অজানা ছিল না তাঁর। সাধারণ বুদ্ধিতেই জ্ঞানবতী এক লহমায় বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন নির্ঘাত জলদস্যুদের হাতে পড়ে গিয়েছে হরিহরের বজরাখানা। ঠিক তখনই কক্ষের গবাক্ষের ফাঁক দিয়ে হরিহরকে জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখে আরও একবার কৌতুক ঝিলিক দিয়েছিল জ্ঞানবতীর মনে। আরও একটি পলায়ন। বিপদের মুহূর্তেই!
জ্ঞানবতী বুঝতে পেরেছিলেন বিপদ এবার ঘনিয়ে উঠেছে ভালোমতোই। দস্যুরা এই শরীরটাকে নিয়ে আঁচড়াবে, কামড়াবে এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। এমনকি তার প্রাণটুকুও হয়তো কেড়ে নিতে পারে তারা।
কথাটা মনে হতেই একেবারে চমকে উঠেছিলেন জ্ঞানবতী। কি আশ্চর্য! কাহ্নর মুখে শোনা সেই গানের পদটি কেন মনে পড়ে গিয়েছিল তাঁর? অপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী! অপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী!
কাহ্ন বলেছিলেন তাদের গানে কথাটা না কি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের সেই আশ্চর্য মুহূর্তে সেটা যেন আচমকাই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন জ্ঞানবতী। অস্ফুটে শব্দ ঝরেছিল তার ঠোঁটে— অপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী!
বজরার ভিতরে এমন কিছু লুকোনো নেই যা দিয়ে দস্যুদের পরিশ্রমের ফসল উঠতে পারে। হরিহর বজরা নিয়ে কোনও বাণিজ্যযাত্রায় যাননি। এই বজরা কেবল তাদের পাহারাদারির জন্যই আনা হচ্ছিল। ধনরত্ন কিছু না পেলে দস্যুরা সেই রাগে জ্ঞানবতীকে হত্যা করতেও পারে।
দস্যুদের কোনও একজন বজরার কক্ষটিতে প্রবেশ করবার আগেই সেইজন্য আত্মরক্ষার শেষ একটা চেষ্টা করেছিলেন জ্ঞানবতী।
জলে ঝাঁপিয়ে পড়বার আগে একটা কাঠের উঁচু বেদির উপর বসেছিলেন হরিহর। জ্ঞানবতী এরপর হামাগুড়ি দিয়ে লুকিয়ে পড়েছিলেন কাঠের সেই ফাঁপা বেদিটার নীচে ফাঁকা জায়গাটায়।
দল বেঁধে এরপর ভিতরে ঢুকে পড়েছিল দস্যুরা। সংখ্যায় অন্তত সাত আটজন তো হবেই। আঁতিপাতি করে তারা খুঁজেছিল চারিদিকে। কাঠের দেয়ালে ঘা মেরেছিল কয়েকবার। সোনারুপোর সন্ধানে।
এইসব নদীপথের দস্যুরা জানে, সোনারুপোয় ভরতি নৌকা যাতায়াত করে এখানকার জলপথে। বাণিজ্যে যায় কখনও। কখনও বড়ো মানুষের প্রমোদযাত্রায়। কিন্তু এত হানাহানির পরেও সেদিনের অভিযানে প্রায় ব্যর্থই হতে হয়েছিল তাদের।
সেই ক্রুদ্ধ সময়েই তারা দেখতে পেয়ে গিয়েছিল জ্ঞানবতীকে।
ষণ্ডামার্কা একটা লোক বজরার মেঝের উপরে শুয়ে পড়ে কাঠের পাটাতন সরিয়ে দেখার চেষ্টা করছিল নৌকোর খোলের ভিতরে কিছু লুকিয়ে রাখা আছে কি না। সেই লোকটাই প্রথমে দেখতে পেয়ে গিয়েছিল জ্ঞানবতীকে। হিঁচড়ে, টেনে বাইরে বের করে এনেছিল বেদিটার নীচে থেকে। তারপর তাদের সে কি উল্লাস!
জ্ঞানবতীকে পেয়ে তারা যেন ভুলতে চাইছিল ধনরত্নহীন এই ফাঁকা বজরায় হানা দেওয়ার ব্যর্থতাটুকু।
তারপর একে একে তারা ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করেছিল জ্ঞানবতীর ওপরে। চোখের জল লুকিয়ে জ্ঞানবতী তখনও অস্ফুটে বলে চলেছেন, অপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী!
রক্ত ঘামে মাখামাখি একটি লোক প্রথমে শক্ত হাতের আলিঙ্গনে বেঁধে ফেলতে চেয়েছিল তাঁকে। টেনে ছিঁড়ে ফেলতে চেয়েছিল তাঁর বক্ষের কাঁচুলি। তারপর তাঁর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আরও একজন। থাবা বসিয়ে আগের লোকটাকে সরিয়ে দিয়ে জ্ঞানবতীর শরীরে আছড়ে পড়েছিল দ্বিতীয় লোকটা।
কিন্তু অন্য দুজন ততক্ষণে এসে সরিয়ে দিয়েছিল তাকে। তাদের দাবি তারাই প্রথমে উপভোগ করবে এই লুণ্ঠনের সামগ্রী। নিজের শরীরের উপরে তীব্র ঘৃণা আর বিতৃষ্ণা নিয়ে জ্ঞানবতী লক্ষ করেছিলেন তার উপরে দখল কায়েম করার জন্যও দস্যুদের ভিতরে তৈরি হয়ে গিয়েছে স্পষ্ট দুটো দল। একে অন্যকে মেরে ফেলতে চায় তারা হিংস্র উন্মত্ততায়।
কক্ষ থেকে এই সুযোগে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন জ্ঞানবতী। বাইরে তখন স্পষ্ট দিনের আকাশ। নীল আকাশে উড়ন্ত কয়েকটি গাঙচিল। বজরার পাটাতনে দাঁড়িয়ে ভিতর থেকে কখনও কখনও মরণ চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলেন জ্ঞানবতী। চিৎকারের ধরন দেখে বুঝতে পারছিলেন কারোকে হয়তো শ্বাস রুদ্ধ করে শেষ করে দেওয়া হল। কারোর হয়তো আঘাত লাগল বুকের পাঁজরে। একজন নারীর দখল পাওয়ার জন্য পরস্পর হত্যালীলায় মেতে উঠেছে একদল পুরুষদস্যু। ধনরত্নের ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে অবশ্য কিছুক্ষণ আগেও বেশ মিলমিশ ছিল তাদের মধ্যে।
আর্ত চিৎকার আর হানাহানির শব্দ স্তিমিত হয়ে এসেছিল একসময়। কাতরানি আর গোঙানির আওয়াজ অবশ্য আরও কিছুক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল। তারপর সেটুকুও থেমে যেতে একসময় জ্ঞানবতী দেখেছিলেন জল আকাশের অনন্ত নীলিমায় বজরার পাটাতনের উপরে তিনি ভেসে রয়েছেন একা।
পরক্ষণেই ভুল বুঝতে পেরেছিলেন জ্ঞানবতী। না তিনি একা নন। ওই তো বজরার মাঝখানের কক্ষটি থেকে বুকে হেঁটে শরীরটাকে কোনওক্রমে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে বেরিয়ে আসছে আরও একজন। রক্তাক্ত, আহত, ক্ষতবিক্ষত।
এই তাহলে ওই মারণকক্ষের হানাহানিতে জয়ী শেষ জীবিত পুরুষ। এই তাহলে আপাতত জ্ঞানবতীর দখলদার। জ্ঞানবতী চিনতে পেরেছিলেন, এই লোকটাই প্রথমে কাঠের বেদির নীচে দেখতে পেয়েছিল তাঁকে।
আহত, ক্ষতবিক্ষত লোকটা বুকে হামা টেনে বজরার পাটাতনে পৌঁছিয়ে একবার মাথা উঁচু করে দেখল তাকে। উঃ। কী বীভৎস আর পৈশাচিক সেই বিজয়ীর দৃষ্টি! কী মর্মান্তিক আর লোলুপ তার মুখভঙ্গিমা!
লোকটি একবার উঠে বসার চেষ্টা করে হাত বাড়িয়েছিল জ্ঞানবতীর দিকে। পর মুহূর্তেই মাথা ঘুরে সপাটে আছড়ে পড়েছিল বজরার কাঠের পাটাতনে।
চোখের সামনে শেষ জীবিত লোকটিকেও ক্রমশ নিথর হয়ে যেতে দেখেছিলেন জ্ঞানবতী। তারপর আরও একবার মাথা তুলে তিনি তাকিয়েছিলেন নীল আকাশের দিকে। অগাধ নীল জলরাশির দিকে।
ঢেউয়ের ধাক্কায় ক্রমাগত দুলে চলেছিল বজরা। বাতাস বয়ে আসছিল যেন দূর সময়ের ওই পার থেকে। জ্ঞানবতীর বুকে তখনও নখের আঁচড়ের জ্বালা। ঠোঁটের উপরে নিজেরই রক্তের লোনা স্বাদ। ততক্ষণে তিনি লক্ষ করেছেন তার পরনের পোশাক-আশাকও ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে দস্যুরা। শুধু প্রাণটুকু তখনও অটুট ছিল তাঁর।
কৌতুকবোধ জ্ঞানবতীর সহজাত। মৃতদেহের সেই স্তূপের মধ্যে বসেও বড়ো মলিন কৌতুকে সে সময় জ্ঞানবতীর একবার মনে হয়েছিল তাঁর প্রাণ বুঝি প্রদীপ-কাহিনির সেই অলৌকিক শিখাটির মতো, শত হাতের ঝাপটাতেও যা নেভেনা কখনও।
আকাশ জলের অনন্ত বিস্তৃত নীলিমায় তাই তখনও কেবল ভেসে ছিল একটি বজরা আর জ্ঞানবতীর প্রাণ। কয়েকখণ্ড সাদা মেঘ আর জ্ঞানবতীর প্রাণ। কয়েকটি পাখা ঝাপটানো গাঙচিল আর জ্ঞানবতীর প্রাণ।

রাজনগরে মণিভদ্রের রাজসভা নানা কারণে নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে এখন। একে তো জ্ঞানবতী অজ্ঞাতপরিচয় সেই সহজিয়ার হাত ধরে স্বেচ্ছায় ছেড়ে গিয়েছেন রাজসুখ। তার উপরে প্রতিদিনই অমাত্য আর ধনপালেরা নানা দুঃসংবাদ বয়ে আনছেন এই ক্ষুদ্র রাজ্যটির প্রান্ত প্রত্যন্ত থেকে। ব্রাহ্মণ অমাত্যরা বলছেন সহজিয়া আর তান্ত্রিকদের অনাচারে নাকি ভরে উঠেছে রাজনগর। বৃষ্টির দেবতা তাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এখান থেকে।
ভালো ফসল ওঠেনি এবার ভূস্বামীদের গোলায় সেই কারণে কর আদায়ের লক্ষ্যপূরণ করাও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে ধনপালদের পক্ষে।
অথচ দক্ষিণের সমুদ্রকূল থেকে আসা ব্যাপারীদের কাছে সংবাদ পাওয়া গেল সেখানে এবার ফসল হয়েছে প্রচুর। বৃষ্টিদেবতা তাঁর আশীর্বাদ উজাড় করে দিয়েছেন তাদের রাজ্যে।
সমুদ্রতীরের ব্যাপারীরা নদীপথে বাণিজ্যযাত্রায় আসে এখানে। নৌকো ভরে তারা নিয়ে আসে গুবাক, নারিকেল আর পানের পাতা। মাঝে মাঝে তারা নিয়ে আসে সামুদ্রিক শঙ্খের নানা দ্রব্য। এখান থেকে বড়ো বড়ো নৌকোয় ভরে তারা নিয়ে যায় কাঙ্গনের সুগন্ধি শস্যদানা, কাপাসতুলোর কাটা সুতো আর মহুয়া। কিন্তু শস্যের ফলন এবারে এত কম, কৃষকেরা তাদের সম্বৎসরের খোরাকি থেকে বিক্রি করতে চাইছে না কোনও উদ্বৃত্ত অংশ। ভূস্বামীরা তাদের অটুট গোলায় আঁচড় কাটতেও রাজি নন।
কিন্তু ভূস্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে রাজদরবারে বেশি আলোচনার সুযোগ দেবেন না অমাত্যেরা।
ব্যাপারীদের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে এসেছিল দক্ষিণদেশের সুবন্ধু। সে একজন তৌলিক। গুবাকের ব্যাপারী। তাকে অমাত্য হরিহর নাকি হুমকি দিয়েছেন। এ প্রদেশে লোকেদের পান খাওয়ার অভ্যাস বহুদিনের। গুবাক বা সুপারির বাণিজ্যও এখানে রমরমা।
অমাত্যদের সঙ্গে বিরোধ বাঁধলে তার ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি।
সুবন্ধু মনে মনে ভাবল সে ধানের কারবারি নয়। ভূস্বামী আর শ্রেষ্ঠীদের এই বিরোধের মধ্যে তার অতটা না জড়ালেও চলে।
কৌশলে আলোচনার মুখ ঘুরিয়ে সে আর একটা অভিযোগ জানাল রাজদরবারে। রাজনগরের অরণ্যে ঢুকে মহুয়া সংগ্রহ করতে গেলে তাদের নাকি বাধা দিচ্ছে শবরজাতির মানুষেরা। কড়ি গুনে দিলেও তারা কেউ এ কাজে সাহায্য করতে রাজি নয় আর।
ব্যাপারীদের মুখে এত অভিযোগ শুনে চিন্তায় পড়েছেন রাজা মণিভদ্র। কিন্তু হাসির ঝিলিক ফুটেছে অমাত্য হরিহরের মুখে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানো বৌদ্ধ সহজিয়াদের বিরুদ্ধে তাঁর অনেকদিনের আক্রোশ।
একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মঠের ভেঙে পড়া অবয়ব দাঁড়িয়েছিল তাঁর ব্যক্তিগত ভূমি-সীমানার কিছুটা ভেতরে। জমিটিকে চাষের কাজে লাগাবার জন্য সেই ক্ষয়িষু কাঠামোটিকে ভেঙে সমতল করার কাজ করেছিলেন হরিহর। ইটপাথর খুলে লাগিয়ে নিয়েছিলেন নিজের প্রশস্ত অট্টালিকায়। সেই কারণে গ্রামশুদ্ধু সকলকে তার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলেছিল ওই কাপালিক বৌদ্ধগুলো। হরিহর তখনই বুঝেছিলেন দরিদ্র সাধারণের মধ্যে এদের যা অনায়াস যাতায়াত তাতে যে কোনওদিন বড়ো কোনও বিপদের মুখোমুখি হতে হবে তাদের মতো অমাত্য, ভূস্বামী, রাজকর্মচারীদের। শবরজাতির লোকেরা ব্যাপারীদের বাধা দিচ্ছে কেন তা কি রাজা মণিভদ্র জানেন না? জানেন না কাদের উসকানি রয়ে গেছে এর পিছনে?
কিন্তু মণিভদ্র আর উৎসাহ বোধ করেন না ব্রাহ্মণ বৌদ্ধদের এই পারস্পরিক কাজিয়ায়। এমনিতেই তার পূর্বপুরুষেরা ভগবান বুদ্ধের যে ধর্মরূপটির চর্চা করেছেন এখনকার নানা ছোটোখাটো দলে উপদলে বিভক্ত এই তান্ত্রিক বৌদ্ধদের হাতে পড়ে তার চেহারা অনেকটা মলিন। তার উপরে নদীমাতৃক এই শ্যামলপ্রদেশে কৃষকজনতার মধ্যে তন্ত্রচর্চার একটি নিভৃত জনপ্রিয়তাও তিনি টের পেয়েছেন পালা-পার্বণে। তবুও উত্তরের পার্বত্য প্রদেশের ভিনদেশী রাজাদের আগ্রহ মূলত তাকে বৌদ্ধধর্মের স্বীকার-সীমানার মধ্যে রেখে দিয়েছে এখনও। মণিভদ্রের আগ্রহেই তারা প্রতি বছর এখানে আসে। আদান প্রদান ঘটে দুটি ভিন্ন ভাষার। দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির। আর এই সব কর্মকাণ্ডের মধ্যে ভিতরে ভিতরে ক্রমশ ক্ষয়ে আসে এই দুর্বল রাজ্যের শক্তি আর শাসনসীমানা। কৃষিনির্ভর এই প্রদেশের ধনব্যবস্থায় ধীরে ধীরে শক্তিমান হয়ে ওঠে ছোটো ছোটো ভূস্বামীর দল।
জ্ঞানবতী অবশ্য অন্য একটা কথা মাঝে মাঝে বলতেন মণিভদ্রকে। বলতেন ভালো করে ভেবে দেখুন মহারাজ, ধর্মচর্চা কিংবা রাজ্যশাসন কোনও কাজেই আপনি মনের সাড়া পান না। তবুও কেন এই দুটি ভূমিকায় অভিনেতার মতন উপস্থিত থাকেন প্রতিদিন?
মণিভদ্র বলতেন, প্রতি রাত্রে রাজমহিষীদের ধবল শয্যায় ফিরে যেতেও কি আমি মনের ভিতর থেকে কোনও সাড়া পাই জ্ঞানবতী? তবুও তো যেতে হয় আমাকে। রক্তমাংসের একটা উষ্ণ প্রস্রবণের পাশ থেকে আমাকে ফিরে যেতে হয় শীতল শয্যার নরককুণ্ডে।
মহারাজ, মহিষীরা প্রত্যেকেই আপনার বিবাহিতা স্ত্রী। তাদের সম্পর্কে আপনার এই মনোভাব মর্যাদাপূর্ণ নয়।
বিবাহ কেন তাদের সমস্ত আহ্বানকে ধ্বংস করেছে জ্ঞানবতী? কেন তাদের মনে আর জ্বলে ওঠে না নতুন কোনও চকমকি?
সে দোষ তাদের নয় মহারাজ। বিবাহ তাদের মনকে অভিসারের রহস্য থেকে সরিয়ে নিয়ে গেছে। সুখ আর নিরাপত্তা পেলে মানুষ এমন শিথিল হয়ে আসে। ঝুঁকি নেবার ক্ষমতা কমে যায় তার। নিজেকে সে আর নতুন করে আবিষ্কার করতে পারে না প্রতি মুহূর্তে।
আমি ঝুঁকি নিতে রাজি জ্ঞানবতী। কিন্তু তুমি কি রাজি হবে?
এ কথার কোনও উত্তর দিতেন না জ্ঞানবতী। শুধু মৃদু হাসতেন মাথা ঝুঁকিয়ে। আর তাঁর হাসির ঝাপটায় মণিভদ্রের বুকে জ্বলে উঠত কামনার আগুন। মাঝে মাঝে মনে হত ক্ষমতার জোর খাটিয়ে দু হাতের মুঠিতে পিষ্ট করে দেওয়া উচিত এই রমণীর যৌবনের দম্ভ, শিল্পের অহংকার। কিন্তু নিজের মনকে সংযত করে রেখেছিলেন মণিভদ্র। ভেবেছিলেন জোর খাটিয়ে নয়, জ্ঞানবতীকে তিনি অধিকার করবেন ভালোবেসে। বার বার তাই মনের দখল পেতে চাইতেন মণিভদ্র, বলাবাহুল্য ব্যর্থও হতেন বারবার। তবুও যতদিন জ্ঞানবতী তার চোখের সামনে ছিলেন ততদিন একটা আশার চোরাস্রোতও বেগবান ছিল মণিভদ্রের হৃদয়ে। কিন্তু শেষ ব্যর্থতার জ্বালাটুকু কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না মণিভদ্র। তাই বৌদ্ধ আর ব্রাহ্মণদের এই সংঘাতে শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্তই নিলেন তিনি। যে করেই হোক জ্ঞানবতীকে তাঁর চাই। রাজ্য শাসনের হাজার সমস্যা আর অশান্তির মধ্যে সে-ই হবে তাঁর সান্ত্বনা।
হরিহর খবর সংগ্রহ করলেন কাপালিকটার নাম কাহ্ন। সে নাকি এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে এখানে ওখানে। রাজনগরের প্রান্তে অন্ত্যজ মানুষজনের চালায় ঘরে এখনও তার অবাধ যাতায়াত। তবে তা রাতের অন্ধকারে। তার নিজের কুঁড়েটি নাকি পড়ে আছে ফাঁকা। তার খেতের ফসল কেটেছে পড়শিরা।

অনেকদিন পরে আজ কাহ্ন উঠে এসেছেন টিলার উপরে। সেই পূর্ণিমার উৎসবের পর আর এদিকে আসেননি কাহ্ন। কৃষ্ণ-পক্ষের নিকষ কালো রাত্রি। নিজের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অবধি ঠিকমতো দেখা যায় না এই অন্ধকারে।
বেড়ার দরজায় আলতো টোকা শুনে ঘুম ভেঙে তাড়াতাড়ি উঠে বসেছে গুঞ্জরী। আবার কি রাজপেয়াদার দল জ্বালাতে এল তাকে এত রাত্রে? সেই যে কাহ্নুপাদকে তারা ধরে নিয়ে গেল তারপর থেকে আর তার ঘরের চৌকাঠ মাড়ায়নি কাহ্নুপাদ।
লোকের মুখে নানা রকম গল্প শুনেছে গুঞ্জরী। কাহ্নুপাদ নাকি রাজপুরীর একজন মেয়েমানুষকে ফুসলে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল ভিনদেশে। রাজার পেয়াদারা বার বার এসে খোঁজ নিয়েছে তার কাছে, একজন ফরসা রঙের রূপসী মেয়েমানুষকে সে এখানে দেখেছে কি না কোনওদিন। প্রতিবারই অবাক হয়ে ঘাড় নেড়েছে গুঞ্জরী আর জ্বলে পুড়ে মরেছে ভিতরে ভিতরে। মেয়েমানুষের শরীরে কাহ্নুপাদের কোনওদিন অরুচি নেই। তার শরীরে একশো নদীর ঢেউ তুলতে পারে কাহ্নুপাদ। গুঞ্জরী নিজেও সেই ঢেউয়ের দুলুনিতে আছাড় খেয়েছে অনেকবার। কিন্তু এই রূপসীটি এমন কে যার সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছে কাহ্নুপাদ? অভিমানে নাওয়া খাওয়া, সাজগোজ প্রায় ছেড়ে দিয়েছে গুঞ্জরী। তুলো খেতের কাজে কোনওদিন সে যায়, কোনওদিন যায় না। নিজের শরীরটাকে কোনওরকমে টেনে হিঁচড়ে দিন গুজরান করে গুঞ্জরী। তবে কাহ্নুপাদ যে ভিনদেশে যায়নি, এখানেই আছে, সে কথা সে জানে। লোকের মুখে মখে শোনে রাত্রিবেলায় নাকি তাকে দেখা যায় মাঝে মাঝে। চণ্ডশবর একদিন এসে বলেছিল মদের দোকানে নাকি দেখেছে কাহ্নুপাদকে। মনের আনন্দে নাকি গুনগুন করে গান গাইছিল কাহ্নুপাদ। এসব কথা শোনে আর বুকের ভেতরে জ্বালাপোড়া হয় তার। এই লোকটাকে পাবার আশায় নাকি চণ্ডশবরের ঘর ছেড়েছিল গুঞ্জরী।
বিরক্ত হয়ে বেড়ার দরজাটা খুলে দেয় শবরী। পিশাচগুলো হয়তো ঘরে ঢুকে কাহ্নুপাদকে খোঁজ করার আছিলায় ঝাঁপিয়ে পড়বে তার উপরে। এক দিনে রাজার সান্ত্রীগুলো ছিঁড়েখুঁড়ে শেষ করে দিয়েছে গুঞ্জরীর ঘুম আর বিশ্রামের রাত্রিগুলোকে।
দরজার বাইরেও এত অন্ধকার কিছু ঠিকমতো দেখে উঠতে পারে না গুঞ্জরী। তবে রাজপেয়াদাদের বর্শা ঠোকার ঠকঠক শব্দটা তো হচ্ছে না আজকে। কয়েকজন সান্ত্রীর জটলা বেঁধে নিঃশ্বাস ফেলার শব্দও পাওয়া যাচ্ছে না তো আজ? তবে কি... একটা সন্দেহ হঠাৎ ঝাঁপিয়ে আসে গুঞ্জরীর মনে। আর তখনই চাপা গলায় তার নাম ধরে ডাকেন কাহ্ন—গুঞ্জরী।
কাহ্নুপাদ? তুমি? শেষ পর্যন্ত তাহলে তুমি এলে কাহ্নুপাদ আমার কাছে? কোথায় ছিলে এতদিন? কাহ্নুপাদ? কোথায় ছিলে? কি যন্ত্রণায় আমি মরে গেছি তারপর থেকে জানো তুমি? একটা খবর নেওয়ারও দরকার মনে করলে না এতদিন?
এতসব কথা বলতে বলতে ঝরঝর করে অভিমানের ধারা নেমে আসে গুঞ্জরীর চোখে। কাহ্ন তার মুখে হাত চাপা দিয়ে থামিয়ে তাকে টেনে নেন খোলা বুকে।
প্রাথমিক মান অভিমানের পালাটুকু সারা হলে ঘরের ভিতরে একটা মাটির প্রদীপ জ্বালায় গুঞ্জরী। কাহ্ন বাধা দেন কিন্তু তাঁর কথা শোনে না সে। এদিন পরে বুকের এত কাছে পেয়েছে সে তার কাহ্নুপাদকে। আজ তাঁর মুখটা চোখভরে দেখবার এই সুযোগটা কিছুতেই হাতছাড়া করতে রাজি নয় গুঞ্জরী।
প্রদীপের আলতো আভা ছড়িয়ে পড়ে ঘরে। কাহ্ন দেখেন গুঞ্জরীর সেই লাবণ্য আর জৌলুস কৃষ্ণপক্ষের আকাশের মতোই কালো হয়ে গেছে। পরনের কাপড়টি অনেকদিন ধোয়নি গুঞ্জরী। চুলে তেল পড়েনি তার। যে গালে অমন যত্নে চন্দন ঘষত গুঞ্জরী সেই গাল দুটিও এখন রুক্ষ। তার ওপরে চোখের জলের শুকনো দাগ। কাহ্ন ফিসফিস করে বলেন, এ তোমার কী রূপ হয়েছে শবরী? শরীরে জ্যোৎস্না নেই, চালায় খড় নেই, পেটে বোধহয় ভাতও পড়েনি কতদিন। শুকিয়ে দড়ি পাকিয়ে গেছে তোমার চেহারা। এ তোমার কী অবস্থা? চণ্ড আসেনি এর মধ্যে তোমার কাছে?
এসেছিল কাহ্নুপাদ। আবার আমাকে নিয়ে যেতে এসেছিল। শবরপল্লির ঘরে। মাটির হাঁড়িতে ভাত নিয়ে খাইয়ে দিতে এসেছিল আমাকে। হাত ধরে ডেকে নিতে এসেছিল চণ্ড। বলেছিল চল শবরী, আবার জোড়া বাঁধি আমরা। একসঙ্গে থাকি। চল শবরী। চল।
যাওনি কেন তবে?
পারিনি কাহ্নুপাদ। পারিনি কিছুতেই। তুমি যে আমার মন মজিয়ে দিয়েছ কাহ্নুপাদ। আমি যে ঘর ছেড়ে এখানে এসেছি তোমাকে পাব বলে। আমার মনে কি আর কারও ঠাঁই হবে কাহু«পাদ?
মন? তাই তো। এই কথাটা তো আগে ভাবেননি কাহ্ন। ভেবেছিলেন তাঁর শরীরসাধনায় মত্ত হয়েছে শবররমণী গুঞ্জরী। ভেবেছিলেন এ রসে মজে তাদের মতো সহজিয়াদের গুরু মেনে উঁচু নিচু অনেক ঘরের মেয়েরাই এসেছে গুহ্যসাধনার পথে।
সাধনাই হল একমাত্র শর্ত। এ নিয়ে তাঁরা নারী পুরুষ ভেদ করেন না। কাহ্ন ভেবেছিলেন তেমনই কোনও ইশারা লুকিয়ে আছে গুঞ্জরীর গৃহত্যাগে। কিন্তু এই মনের কথাটা তো সত্যিই ভাবেননি কাহ্ন।
চুপ করে গেলে কেন কাহ্নুপাদ? আমার মন তোমার জন্যে যে কী টানে, কী মায়ায় ভরে উঠেছে তা তোমাকে কী করে বোঝাব কাহ্নুপাদ। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না কাহ্নুপাদ। মরে যাব। আমি মরে যাব তোমাকে না পেলে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কাহ্ন বললেন, মনের এই অবস্থা একটা মায়াতরু গুঞ্জরী। সমস্ত ব্যক্তিগত কষ্ট আর যন্ত্রণার উৎস। মহাসুখে পৌঁছোতে চাইলে শুধু এই মায়াতরুর ডালপালা ছাঁটলেই চলে না, শিকড় থেকে উপড়ে ফেলতে হয় তাকে। কিন্তু সে অনেক শক্ত কাজ। শবরী, আমার মনে হয় তোমার এখন চণ্ডর কাছেই ফিরে যাওয়া উচিত।
কাহ্নর গলা দুটি হাতে জড়িয়ে ধরে গুঞ্জরী বলে, তুমি বলছ একথা কাহ্নুপাদ? তুমি বলছ?
তাকে আদর করে বুকে টেনে নিয়ে কাহ্ন বললেন, হ্যাঁ, আমি বলছি।
কাহ্ন জানেন এ নিয়ে শবরপল্লিতে আলাদা কোনও অসুবিধা তৈরি হবে না। বিত্তবান উচ্চবর্ণের সমাজের মতো এদের জীবনে নারীকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে দেখার চল নেই অতটা। নিত্যদিনের শ্রম আর সংগ্রহে মেয়েরাও এখানে সমান অংশীদার। তাই সতীত্বের সংস্কার অতটা প্রবল হয়ে চেপে বসেনি ওদের জীবনে। তাছাড়া চণ্ড মানুষটা খাঁটি। সোনার মতো খাঁটি। চণ্ডশবরের ছোঁয়ায় গুঞ্জরী নিশ্চয়ই ফিরে পাবে তার হারানো উজ্জ্বলতা। কাহ্ন গুনগুন করে উঠলেন—
মন তরু পাঞ্চ ইন্দ তসু সাহা।
আসা বহল পাত ফলবাহা।।
গুঞ্জরী বলল, নতুন পদ কাহ্নুপাদ?
কাহ্ন ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বললেন। গানের সুরে কেঁপে উঠল প্রদীপের আলো
পাঁচ ডাল পাঁচ ইন্দ্রিয় আর তরু হল মন।
তাতে অজস্র পাতা আর ফল আসার বাহন।।
ছেদন করুক সদগুরু তার বচন কুঠার।
কাহ্ন বলেন, তরু যেন পুনঃ জন্মে না আর।।
চোখ দুটো ছলছল করে উঠল গুঞ্জরীর। লাল হয়ে উঠেছে তার কানের লতি। ফুলে ফুলে উঠছে তার নাকের পাটা।
কাহ্ন বললেন, গানটা কেমন হয়েছে বলবে না গুঞ্জরী?
এ প্রশ্নের উত্তরে গুঞ্জরী যে কাজটা করে বসল কাহ্ন তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না আদৌ।
গানটা শোনাবার পর তার প্রতিক্রিয়া জানার জন্য উৎসুক কাহ্নর ঝুঁকে পড়া গালে সশব্দে বেশ জোরালো একটা চড় কষিয়ে দিল গুঞ্জরী।
আচমকা এই আঘাতে চোখে অন্ধকার দেখলেন কাহ্ন। প্রদীপের মৃদু আলোটা যেন বোঁ করে একপাক ঘুরে গেল তার মাথার পাশ দিয়ে। জ্বালা করে উঠল ঘা লাগা জায়গাটা। নিজের অজান্তেই কাহ্ন হাত দিয়ে চেপে ধরলেন তার গাল। অবাক হয়ে বললেন, তুমি আমাকে আঘাত করলে গুঞ্জরী?
সিদ্ধাচার্য কাহ্নর মন এমন কঠিন ধাতুতে গড়ে উঠেছে যে বাইরের আর কোনও আঘাতই আর নতুন করে বাজে না সেখানে। কিন্তু শরীর? সে তো একটা রক্তমাংসের বাস্তব। তার উপরে ঘা পড়লে এখনও বাজে বৈ কি!
কাহ্ন আবার বললেন, তুমি আমাকে আঘাত করলে কেন গুঞ্জরী? চণ্ডর কাছে তুমি কি আর ফিরে যেতে চাও না তবে? এই কি তবে তোমার 'না' বলবার ধরন?
গুঞ্জরীর চোখে এখনও ক্রোধের ধিকিধিকি। শক্ত গলায় সে বলল, না কাহ্নুপাদ। তোমাকে নতুন কোনও ঝামেলায় জড়াব না আমি। সে ভয় কোরো না। তুমি তো মানুষের মনের আঘাত বুঝতে চাও না। শরীরে আঘাতের অনুভূতি তবু যদি কিছু বেঁচে থাকে এখনও। সেই ভরসায় ঘা দিলাম। তোমার জন্য রাজপেয়াদারা যখন তখন এসে ছিঁড়েখুঁড়ে দিয়ে গেছে আমাকে। তার একটা ছোট্ট আঁচড় পড়ল তোমার গালে। চিন্তা নেই কাহ্নুপাদ। তোমার সঙ্গে হয়তো আবার ভাব করে নেব। চণ্ডর কাছেই ফিরে যাব আমি আবার। কিন্তু যাবার আগে এইটুকু তোমার পাওনা ছিল।
গুঞ্জরীর কথা শুনে বিস্মিত হলেন কাহ্ন। সামান্য একজন শবর রমণীর মুখের কথায় যে গভীর আলোর দীপ্তি ছড়িয়ে পড়েছে তাতে তার নিজের অন্ধকারও জ্বলে উঠেছে এখন। হতে পারে গুঞ্জরী এভাবে কথা বলতে পেরেছে এতদিন ধরে কাহ্নর সঙ্গ করার ফলেই। কিন্তু কাহ্ন আর সে কথা ভাবছেন না।
কাহ্ন ভাবছেন, জীবনের কাছ থেকে এই শিক্ষাটা তিনি কতবারই না পেলেন। যখনই কোনও মানুষকে ধরাছোঁয়ার মধ্যে মনে হয়, চেনা মনে হয়, তখনই যেন এক একটা ঝাপটায় কত দূরের, কত অচেনা হয়ে যায় সেই মানুষটা। কাহ্ন ভাবলেন, মানুষকে এই জানা বোধহয় ফুরাবে না।
গুঞ্জরী বলল, ব্যথা করছে কাহ্নুপাদ?
কাহ্ন বললেন, প্রথমে একটু লেগেছিল। এখন ঠিক হয়ে গিয়েছে।
তবে যে বড়ো চুপ করে গেলে? কী ভাবছ?
ভাবছি, শবররমণীর হাতের পাতায় আদরই পেয়ে এসেছি বরাবর। তার কবজির জোর যে কতটা তা বুঝতেই পারিনি এতদিন।
কাহ্নর কথা বলার ধরনে এবার হেসে ফেলল গুঞ্জরী। চপেটাঘাতের শব্দটা মুছে গেল ঘরের বাতাস থেকে।
রাত্রির শেষ প্রহর ঘোষণা করল শেয়ালের চিৎকার। বেড়ার ঘরের দরজা ঠেলে পায়ে পায়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন কাহ্ন। একঝলক হাওয়া ঢুকে গুঞ্জরীর ঘরে মাটির প্রদীপটাকে নিভিয়ে দিল একদমকে।

অরু নামের কিশোরটি একটা খবর নিয়ে এসেছে সকালবেলায়। ভিনদেশী দুজন পণ্ডিত নাকি এসেছেন রাজা মণিভদ্রের রাজপুরীতে। এখানকার কয়েকজন বৌদ্ধ সহজিয়ার গান তাঁরা শুনতে চান। তার বাবা হরিহরের কাছে অরু শুনেছে এই খবর। কথাটা কাহ্নুপাদকে একবার বলা দরকার। অরু জানে আজ তাঁতিপাড়ায় কমলা বউঠানের ঘরে কাহ্নুপাদ আর ভুসুকুপাদের দুপুরে খাওয়ার কথা।
দুপুর হতে অবশ্য এখনও অনেক দেরি। কিন্তু মায়ের কাছে অনুমতি নিয়ে অরু সকাল সকাল এসে পড়েছে তার তাঁতিদাদা আর কমলা বউঠানের বাড়িতে। আর একটা আকর্ষণও অবশ্য আছে এখানে। কমলা বউঠানের ননদিনিটি তার সঙ্গে দেখা হলেই খুব ঝগড়া করে। বেণী দোলানো সেই কিশোরীটির সঙ্গে মিঠে খুনসুটির লোভ কিছুতেই সামলাতে পারে না অরু। কাহ্নুপাদ আর ভুসুকুপাদ এসে গেলে গল্পে গানে এমন আড্ডা জমে উঠবে যে আলাদা করে উমার সঙ্গে দুটো কথাও বলতে পারবে না অরু। সূর্যের আলো একটু চওড়া হতেই তাই মাঠ ভেঙে তাঁতিপাড়ার মুখটায় হাজির হয়েছে অরু। কারোর সঙ্গে দেখা হলেও কথা বলেনি। তাকায়নি কারোর দিকে। এখানে আসার কথাটা খুব একটা লোককে জানাতে চায় না সে।
তবে তাঁতিপাড়ায় চুপিসারে চাউর হয়ে গেছে কাহ্নুপাদ আর ভুসুকুর আসার খবরটা। এতদিন দুজনই ছিল তাদের নিজেদের লোক। সুখে দুঃখে বিপদে আপদে কেবলই ডাক পড়ত ওদের। কমলা বউঠানের শ্বশুর যখন মারা গেল তখন তাকে বাঁশের মাচায় চাপিয়ে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল কাহ্নুপাদ। ছেলে ছোকরার দল ভয় পেয়েছিল সেই ঝড়জলের রাতে সাপখোপ তক্ষক শৃগালের বিচরণভূমির দিকে পা বাড়াতে। আর তাঁতি সুমঙ্গল ভয় পেয়েছিল তাদের ঘরের মড়া বাসি হলে তার ঘরে বোনা কাপড়-চোপড় কেনা বন্ধ করে দিতে পারে উঁচু ঘরের রাজা-উজির-বামুন-কায়তের দল। তখন কমলা বউঠান লোক পাঠিয়ে চাষিপাড়া থেকে ডেকে এনেছিল কাহ্নকে।
ছয় সাতজন লোক জুটিয়ে এনে সেই মহাপ্রলয়ের রাতে বৃদ্ধ তন্তুবায়ের মৃতদেহ কাঁধে চাপিয়ে শ্মশানের দিকে যাত্রা করেছিলেন কাহ্ন। চুল্লির পাশে বসে বুড়ো ডোমের হাত থেকে মদ খেয়েছিলেন আকণ্ঠ। মড়ার খুলিতে ঢালা সেই শ্মশান মদের ঝাঁঝালো নেশাতেও সামান্য টলেনি কাহ্নর পা দুটো। বৃষ্টির ঝাপটায় মাঝে মাঝেই নিভে যাচ্ছিল চুল্লির আগুন। বজ্রপাতের দাপটে অন্যান্য সকলে ছুটে গিয়েছিল বিরাট একটা পাকুড়গাছের তলায়, নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে।
কেবল কাহ্ন একা কোমর বেঁধে একটা কাঁচা বাঁশের লাঠি হাতে নিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বার বার জাগিয়ে দিচ্ছিলেন কাঠের গুঁড়ির নীচে লুকিয়ে পড়া আগুনের শিখা।
ছোটোখাটো এমন অনেক উপকার ভুলতে পারেনি তাঁতিপাড়া। তাই রাজরোষে পড়লেও সব অমঙ্গল থেকে কাহ্নুপাদকে আড়াল করে রাখতে চেষ্টা করে যায় তারা সব সময়।
সকাল থেকে কমলা বউঠানের কাছে চুপিসারে সব খবর নিয়ে গেছে অনেকে। দুপুর নাগাদ হয়তো দেখা করতে আসারও মতলব ফেঁদেছে কেউ কেউ।
কমলা বউঠান সকাল থেকে মহাব্যস্ত। তাদের ঘরের উঠোনে একটা তালের গাছে তাল হয়ে থাকে সারা বছর। চ্যাঙারিতে তালের নুটি ঘষে তা থেকে ক্ষীর বের করেছে উমা। অরু এসে পড়েছে সকাল সকাল। উমার মনটা ছটফট করছে। রান্নাঘরে একটা কাঠের পিঁড়িতে উবু হয়ে বসে মাছের ঝোলের মশলা তৈরি করছিল কমলা। কিশোরী ননদিনিটির ছটফটানির কথা নজর এড়াল না। হেসে বলল, যা না উমা, সকাল থেকে এসে বসে রয়েছে বেচারি, তালের ক্ষীর একটু দিয়ে আয় না অরুকে। আবার তোর ছোঁয়া খেতে চায় কিনা দেখ!
একটা ছোটো পাত্রে কিছুটা তালক্ষীর নিয়ে অরুর কাছে হাজির হল উমা। বউঠান ভয় পাচ্ছে। ভাবছে আমার মতো তাঁতির ঘরের মেয়ের হাতে বানানো জিনিস তুমি হয়তো না ছুঁয়ে ফিরিয়ে দিতেও পারো।
অরু হেসে বলল, আর তুমি কী ভাবছ উমা? দিতে এলে যে বড়োমুখ করে, যদি আমি না খেতে চাই ওটা?
উম ছদ্মরাগে বলল, তা অবশ্য ঠিক, আমাদের ঘরে তৈরি কাপড় না পরলে তোমাদের জপ আহ্নিক বন্ধ হয়ে যাবে দুবেলা। কিন্তু আমাদের ঘরের অন্ন গ্রহণ করলে তোমাদের জাত চলে যেতেও পারে।
তালের ক্ষীর একটু মুখে দিয়ে অরু বলল, বেশ, জাত না হয় খোয়ানো গেল, কিন্তু সঙ্গে কী পাব?
কী পাবে মানে? খিদে পেয়েছে খাবার পেলে, এইতো ঢের। আবার কী চাও?
উমা, এত অল্পে আমি জাত খুইয়ে সন্তুষ্ট হতে চাই না। কাহ্নুপাদ আর ভুসুকুপাদের গান চাই। আর চাই তোমাকে। আমার কাছে সোজা কথা— পেটে খেলে পিঠে সয়।
উমার একটা হাত মুঠোর মধ্যে নিয়ে তাকে কাছে টানতে চায় অরু। উমা হাঁ হাঁ করে চেঁচিয়ে ওঠে। ছাড়ো ছাড়ো, করছটা কী? এই তোমার শাস্ত্রপাঠ করা বুদ্ধি? এক্ষুনি মঙ্গলদাদা মাছ নিয়ে ফিরবে হাট থেকে। যদি দেখতে পায় বাড়িতে ডাকাত পড়েছে সাত সকালে তা হলে কেমন পেটানি হবে তোমার বুঝতে পারছ?
অরু বলল, পারছি। বুঝতে পারছি। তাঁতির ঘরের মেয়েরা বামুনবাড়ির ছেলেদের একেবারেই অস্পৃশ্য ভাবে। কিছুতেই ঠোঁটে চুমু খেতে চায় না।
ঝগড়ায় হেরে গিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে উমার মুখ। এক মুহূর্ত থেকে চোখ তুলে তাকায় ইতিউতি। তারপর ঝটিতি এগিয়ে এসে একটা ছোট্ট চুমু দেয় অরুর ঠোঁটে। তারপর ছুট্টে ভিতর ঘরের দিকে চলে যেতে যেতে একবার পিছন ফিরে বলে যায়—রাক্ষস।
দুপুরে সকলে মিলে খেতে বসতে দেরি হল একটু। বাইরের ঘরে কাহ্ন, ভুসুকু আর অরুকে খেতে দেওয়া হয়েছে চাটাই পেতে। গৃহকর্তা সুমঙ্গলও বসে পড়েছেন অতিথিদের সঙ্গে। আর সকলের মাঝখানে বসে তালপাতার ছোটো হাতপাখা নিয়ে তাদের বাতাস করছেন কমলাবউঠান। উমা কিছুতেই বসতে চায়নি তাদের সঙ্গে। কিন্তু কাহ্নুপাদ জোর করেছেন। কমলাবউঠান বলেছেন, আহা, কী হয়েছে রে উমা, তুই ছোটো মেয়ে, আমি তো রয়েছি দেখাশোনা করার জন্য, তুই বসে পড় থালা নিয়ে। বাধ্য হয়ে তাই একপাশে থালা নিয়ে খেতে বসেছে উমাও।
কমলা বউঠান সকাল থেকে রান্নাও করেছেন অনেককিছু। শাকের ঘণ্ট দিয়ে অনেকটা ভাত খেয়েছেন ভুসুকু। কাহ্ন অপেক্ষা করছেন মাছের পদটির জন্য। আহা, কমলা বউঠানের হাতের মাছরান্না। তার স্বাদ যেন জিভ ছেড়ে যেতেই চায় না।
সুমঙ্গল জ্যান্ত রুইমাছ কিনেছিল জেলেদের কাছ থেকে। আঁশবঁটিতে বড়ো বড়ো করে কুটে তা দিয়ে ঝাল ঝাল ঝোল রেঁধেছে কমলা বউঠান। কাহ্নর পাতে সেই মাছের টুকরো তুলে দিয়ে পরম যত্নে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে নির্নিমেষ চোখে।
গার্হস্থ্যের এই সৌন্দর্যকে কখনও অস্বীকার করেননি কাহ্ন। দুচোখে তৃপ্তি নিয়ে কমলাকে বলেছেন খুব ভালো রান্না হয়েছে বউঠান। আরেকটা দেবে?
গোয়ালপাড়া থেকে টাটকা দুধ এনে তাতে দই পাতা হয়েছিল গতকাল। শেষ পাতে সেই ঘরে পাতা দই সকলের থালায় তুলে দিয়েছে কমলা।
হাতের পাতায় দই নিয়ে খুব মন দিয়ে চেটে চেটে খাচ্ছিল অরু। কাহ্ন দেখলেন চোখের ইশারায় তার ভাগের দইটুকুও অরুকে নিতে বলল উমা। বুক ভরে উঠল কাহ্নর। মনে হল তাদের ঘিরে এই রাজনগরের প্রান্তে বাস করা মানুষজনের মধ্যে কোনওদিন হয়তো গড়ে উঠবে একটি জাত ভাঙা জাতি। সেই দূর সময়টাকে কল্পনায় একবার স্পর্শ করতে চাইলেন কাহ্ন।
সকলকে চমকে দিয়ে অরু হঠাৎ বলে উঠল, আচ্ছা বউঠান, তালক্ষীর দিলে না তো ওদের?
তালক্ষীর? অবাক হলেন কাহ্ন। সেটা বানিয়েছে নাকি বউঠান? কিন্তু অরু জানল কী করে?
কমলা বউঠান বললেন, আমি বানালে কি আর অরুর এত ভালো লাগত সেটা? তালক্ষীর বানিয়েছে আমার এই ননদিনিটি। হেসে উমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী রে উমা? শুধু অরুকে দিলেই হবে? কাহ্ন আর ভুসুকুকে দিসনি এখনও? জলপান করছিলেন সুমঙ্গল। পরিহাসের এই ঝাপটায় বিষম খেলেন হঠাৎ। রান্নাঘর থেকে তালক্ষীর এনে সকলকে দিতে দিতে উমার দিকে চোখ পড়ে গেল কমলার। তার অবস্থা দেখে মুখের হাসি আঁচলে চাপতে হল তাকে।
খাওয়া-দাওয়ার পর কাহ্ন অরুকে বললেন ভিনদেশী বৌদ্ধদের রাজনগরে আসার খবরটা ইতিমধ্যেই তিনি শুনেছেন। তারা নাকি বুদ্ধ নাটক দেখতে যাবেন। সোমপুত্রের বিহারে। সেখানে নিশ্চয়ই ভিনদেশীদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে তাঁদের।
বৌদ্ধসংঘ ভাঙতে ভাঙতে সহজযানীদের মধ্যেও ভাঙন ধরেছে এখন। সহজিয়াদের দেখলে এখন ভয়ানক চটে যান অনেক বৌদ্ধই। তবুও সেখানে তাঁদের পুরোনো বন্ধু রয়েছেন কিছু কিছু। বন্ধুত্ব সবসময় সংঘের নিয়ম মানে না। তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়ে কাহ্নকে যেতে হবে সোমপুত্রে।
অরু এবারে তর্ক জুড়ে দিল একটা। আপনারা মাঝে মাঝে সংঘের কথা বলেন বটে কাহ্নুপাদ। আমার কিন্তু আপনাদের ওই সংঘ-বিহারের সংস্কৃতি একেবারেই পছন্দ নয়। দর্শনের দিক থেকেও কোথাও কোথাও যেন মিলেমিশ ঘটে চলেছে অদ্বয়বাদীদের সঙ্গে বৌদ্ধদের।
শাস্ত্রচর্চায় অরুর এই উৎসাহ খুশি করল কাহ্নকে, কিন্তু তর্কে গেলেন না তিনি। ছদ্মরাগে বললেন, আচ্ছা অরু, আমাদের গান তবে কেন পছন্দ করো তুমি?
অরু বলল, রসের কারণে। সুর আমি তেমন একটা বুঝি না। কিন্তু উৎকৃষ্ট কাব্যরসের আস্বাদ পাই আপনাদের পদগুলিতে।
আরও একটা আকর্ষণ আছে আমার। আপনারা কেবল নিজেদের নির্বাণের কথা ভাবেন না। করুণায় অধিষ্ঠিত হওয়ার কথা ভাবেন। সংসারে উদাসীন থেকে লোকহিতের চেষ্টা করেন। যে কোনও কবির এই মানবিক দায়বোধটুকু আকৃষ্ট করে আমাকে। আমাদের নিজেদের সংসারে এমনকি আমার পিতার কাজকর্মেও এই মানবিকতার অভাব খুবই পীড়িত করে আমাকে।
চিন্তিত মুখে এবার ভুসুকু অরুকে বললেন, সাবধানে থেকো অরু। তিনি যেন আমাদের সঙ্গে তোমার এত বেশি মেলামেশার কথা জানতে না পারেন। তুমি বিপদে পড়ে যাও তা আমরা চাই না কখনও।

অনেকদিন পরে আজ আকাশ কালো করে বৃষ্টি নেমেছে। গাছের পাতায় ঝরোঝরো তার সংগীত। রাজনগরীর পথে যে মানুষগুলো কাজে বেরিয়েছিল, যে মানুষগুলো ওপারে যাবার জন্য অপেক্ষা করছিল খেয়াঘাটে, তারা সবাই আজ ভিজতে শুরু করেছে আনন্দে। নদীর বুকেও আজ উথালপাথাল ঢেউ। মাছের আঁশের মতো ঝকমক করে তার উপরে ঝরে ঝরে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা। এই দুর্যোগ আর আনন্দের দিনে নৌকো নিয়ে বেরোতে একটু দেরি করে ফেলেছে ডোম্বিনী।
কাল সন্ধেয় তাদের নাচের দলের ডাক পড়েছিল উত্তর গাঁয়ের শিবমন্দিরের মেলায়। কয়েক ঘর সম্পন্ন ব্রাহ্মণের বাস সেখানে। বংশ পরম্পরায় তারাই সেবায়েত সেই মন্দিরের। কুমোরপাড়ার মাটির পুতুল, তালপাতার বাঁশি আর বাজিকরের ভেলকিখেলা ঘিরে সেখানে লোক জমেছিল প্রচুর। বুড়ো শিবের মন্দিরে অবশ্য ডোম-চাঁড়ালেরা ঢুকতে পারেনি। কিন্তু মেলার হুল্লোড়বাজির ভাগ নেবার জন্য সকলেরই ছিল অবাধ আহ্বান।
ডোম্বিনী কাল নেচেওছিল প্রাণভরে। গাজনের গানের সঙ্গে মন মাতিয়ে ঢোল বাজিয়েছিল বলাই। তারপর তাদের পাওনাগণ্ডা মিটিয়ে মন্দিরের সেবায়েতরা তুলে দিয়েছিল গোরুর গাড়িতে।
ধিকিয়ে ধিকিয়ে সারা রাত ধরে পথ চলেছে সেই গোরুর গাড়ি। তারপর শেষ রাতে তাকে নামিয়ে দিয়েছে বাড়ির কাছে। ঘুম ভাঙতে আজ তাই দেরি হয়ে গেছে ডোম্বিনীর। প্রথমে ভেবেছিল আজকের দিনটা আর নৌকো নিয়ে পারাপারের কাজে বেরোবে না। কিন্তু আকাশে বাজ পড়ার শব্দ শুনতে পেয়ে লাফিয়ে শয্যা ছেড়ে উঠে পড়েছে ডোম্বিনী। দেরিতে হলেও নৌকোর দড়ি খুলে উজিয়ে এসেছে খেয়া ঘাটের কাছে। ঝুঁঝকো বৃষ্টির মধ্যে ধু ধু নদীর বুকে পাড়ি দেওয়ার আনন্দই আলাদা। কোথায় যাচ্ছে কিছু বোঝাই যায় না। প্রতিমুহূর্তে একটা অজানা পথের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
এই অনিশ্চিতির জন্য নিজের জীবনটাকেও আনন্দময় মনে হয় ডোম্বিনীর। সুখের ঘেরাটোপে নিশ্চিত হয়ে, গহনার বাক্স বুকে চেপে, পান চিবিয়ে সংসার করা তার কাছে দমবন্ধ হয়ে মরে যাওয়ার সামিল। উঁচুজাতের কারোর ঘরের বউ হয়ে আলোনা জীবনযাপন, স্বামী, শাশুড়ি তার সন্তানদের সেবাদাসী হয়ে থাকা তার কাছে মনে হয় অসহ্য।
তার চেয়ে এই উদ্দাম অনিশ্চিতির জীবন তার বেশি পছন্দের। যখন যাকে খুশি তাকেই সে ডেকে নিতে পারে আনন্দের সঙ্গী হিসেবে। সে কারোর সম্পত্তি নয়। আবার অন্য কেউ তার সম্পত্তি হয়ে থাক—তাই ঠিক চায় না ডোম্বিনী। প্রতিদিন নতুন নতুন অভিসারের একটি নিষিদ্ধ আনন্দ আছে। ছেলেছোকরা জোয়ান বুড়ো গেরস্ত গৃহিণী সকলেই মনে মনে স্বাদ পেতে চায় সেই নিষিদ্ধতার। কিন্তু সমাজের চোখে ভালো হয়ে থাকার একটা লোভও আছে তাদের। একটা মনের মধ্যে এই দুরকম ইচ্ছের ধাক্কাধাক্কিতে কী করবে ঠিক করে উঠতে পারে না তারা। ডোম্বিনীর চলার পথের দিকে তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে থাকে। সে একটু হেসে কথা বললে একেবারে গলে যায়। কিন্তু পিছন ফিরলেই ডোম্বিনীর মুন্ডপাত করে তারা।
এসব কথা অবশ্য জানে ডোম্বিনী। কিন্ত এসব নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় না বেশি। মুখের উপরে কখনও কেউ কিছু বললে না হয় তখন জবাব দেওয়া যাবে মনোমতো।
আজকেও এই যে বর্ষানদীর ভরাবুকে তার খেয়ানৌকোর পাড়ি—এতেও সে কিছু ভীতু লোককে যাত্রী হিসেবে পায়নি বটে কিন্তু তার দুঃসাহসের সঙ্গী হতে রাজি হয়ে গেছে দশবারোজন। তাদের নিয়ে সে ভেসে পড়েছে উথালপাথাল অগাধ জলের সাম্রাজ্যে।
শক্ত হাতে দাঁড় টানতে টানতে গুনগুন করে গান ধরেছে ডোম্বিনী
বাজণাব পাড়ী পঁউয়া খালেঁ বাহিউ
হাওয়ার ভাঁজে ভাঁজে তার আলতো গলার আওয়াজ মিলিয়ে যাচ্ছে বর্ষানদীর রিমঝিম শব্দের মধ্যে। মল্লারী রাগের বেগবান উত্থানে পতনে সপাট খেলছে ডোম্বিনীর কণ্ঠ। কাহ্নুপাদ শেখায় বড়ো যত্ন করে!
এরকম একজন খেয়া নৌকার মাঝিমেয়ের মুখে রাগাশ্রয়ী গান শুনে একজন দড়ি পাকানো গোছের লোক তাকে জিজ্ঞাসা করল, শোন বাছা, কাদের মেয়েরে তুই? এ গান শিখেছিস তুই কার কাছে?
ডোম্বিনী জানে এ হল ভুসুকুপাদের বাঁধা গান। কাহ্নুপাদ আর ভুসুকুপাদ নদী অরণ্য টিলা জনপদে ঘেরা তাদের এই অঞ্চলেরই মানুষ। তাদের সঙ্গে ডোম্বিনীদের মতো সমাজ মানুষদের ঘরের লোকের সম্পর্ক।
কিন্তু ডোম্বিনী শুনেছে অনেক দূরের গাঁয়েও নাকি লোকেরা মুখে মুখে গায় কাহ্নুপাদ আর ভুসুকুর গান। ওই গানে নাকি নানারকম সব ধর্মের কথা বলা আছে। দূর গাঁয়ের পড়শিরা এখানে এসে ওদের দুজনের কাছে মন্ত্র নিয়ে যায়। ওদের দুজনকে গুরু বলে তখন তারা। ডোম্বিনী বোঝে গানই হল ওদের মন্ত্র। একবার কাহ্নুপাদ তাকে গুনগুন করে অন্য আরেকজনের গান শুনিয়েছিল। লুই। সে গানেও ছিল গুরুকে প্রশ্ন করে সবকিছু জেনে নেওয়ার কথা। লুইয়ের গানের একটা দুটো মনে করার চেষ্টা করল ডোম্বিনী।
দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ।
লুই ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জান।।
এক ঝটকায় গানটাকে স্মৃতি থেকে তুলে আনতে পেরে খুশিই হল ডোম্বিনী। নৌকোয় বসা দড়ি পাকানো লোকটা হাঁ করে লক্ষ করছিল তার কাজ কারবার। আবার বলল, এ গান তুই কার কাছে শিখেছিস রে ছুঁড়ি?
এবারে আর একটু কৌতুক করার ইচ্ছে হল ডোম্বিনীর। মুখ টিপে হেসে বলল, আমার গুরুর কাছে শিখেছি গো এই গান।
গুরু? অবাক হল লোকটা। সে তো যারা শাস্ত্রীয় সংগীত জানে তাদের লাগে শুনেছি। তোদের এ সব হাটেমাঠের গানে আবার গুরু লাগে নাকি?
ডোম্বিনী বলে, লাগে গো লাগে। সব কাজেই গুরু লাগে বুঝলে?
লোকটি কি বুঝল কে জানে, কিন্তু সারাদিন বৃষ্টি বর্ষার ঝাপটা সহ্য করে সন্ধেবেলা সে যখন ঘরে ফেরার জন্য ঘাটে নৌকো বেঁধে উঠে এল উপরে তখন রাজার দুজন পেয়াদা এসে ধরে নিয়ে গেল তাকে। চল রে মেয়ে তোকে এখন যেতে হবে রাজপুরীতে। রাজার আদেশ।

ধরে আনতে বললে এরা বেঁধে আনে। জ্ঞানবতীর সন্ধানে রাজা মণিভদ্র চর পাঠিয়েছিলেন নানা দিকে। তাদেরই একজনের কথামতো এখানে ধরে আনা হয়েছে ডোম্বিনীকে। মণিভদ্র একবার তাকিয়েই বুঝেছেন এ স্ত্রীলোকটি আর যেই হোক, জ্ঞানবতী নয়। তবুও স্ত্রীলোক বলে কথা। অন্তত তার সঙ্গে কিছু বাক্যালাপ করবার সুযোগটুকুও ছাড়তে চান না মণিভদ্র।
ডোম্বিনী এসে দাঁড়াল রাজসভায়। জীবনে এই প্রথমবার। এতদিন মুখে মুখে গল্প শুনেছে রাজসভার। তাদের শ্মশানধারের কুঁড়ে থেকে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে রাজনগরের খেয়াঘাটে আসার সময় দু-একবার হাতির পিঠে চড়ে ভোরের হাওয়া খেতে বেরোতে দেখেছে রাজাকে। তার সঙ্গে লোক-লস্কর, সান্ত্রী-পেয়াদা, পালকি মোসাহেবের লম্বা ভিড়। ও সব দেখেশুনে রাজপুরীর জৌলুসের একটা আন্দাজ পেয়েছে সে। কিন্তু আজকে পেয়াদাদের ঠেলা খেয়ে সন্ধের আলো-আঁধারিতে রাজসভায় এসে পড়ে চোখদুটো একেবারে ধাঁধিয়ে গেছে ডোম্বিনীর। মণিমুক্তোয় সাজানো বড়ো বড়ো থাম। মেঝের উপরে পাতা নতুন পলিমাটির মতো নরম গালিচা। শ্বেত পাথরের বাতিস্তম্ভ। তার উপরে লম্বাটে একধরনের প্রদীপ। রাজার মাথার মুকুটে হিরেমুক্তোর ছড়া। এসব দেখে তো প্রগলভা ডোম্বিনীর মুখে আর কথা সরে না।
রাজা মণিভদ্রও ভালো করে দেখে নিচ্ছেন ডোম্বিনীকে। সপাট চাবুকের মতো ছিপছিপে তার চেহারা। গাছকোমর করে পরা টানটান তাঁতের কাপড়। তার ভিতরে যেন আছড়ে পড়ছে নদীর ঢেউয়ের মতো অথৈ যৌবন। আঁচলের পাশ থেকে একটি পাশের বাহুমূল পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে তার। রাজসর্পের মতন চিকন আর কোমল সেই বাহু।
তার দিকে তাকিয়ে রাজা এবার জিজ্ঞেস করলেন, তুমি নাকি শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা করো?
ডোম্বিনী একবার মুখ তুলে তাকাল রাজার দিকে। এই সন্ধেবেলা রাজসভায় লোকজন বেশি নেই। দুচারজন বয়স্য আর স্তাবক নিয়ে রসালাপে ব্যস্ত ছিলেন রাজা মণিভদ্র। চরের মুখে খবর পেয়ে এখানেই স্ত্রীলোকটিকে নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি তৎক্ষণাৎ।
মণিভদ্র আবার জানতে চাইলেন, তুমি নাকি শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা করো?
এবারে থতোমতো ভাবটা কাটিয়ে উঠে ঠোঁট নাড়ল ডোম্বিনী। আমি হাটেমাঠে মেলায় মোচ্ছবে নাচ গান করে বেড়াই মহারাজ। নৌকোয় যে গানের কলি আমি গাইছিলাম সে আমার গুরুর কাছে শেখা। খেয়া পার করার সময় গান গেয়ে আমি কি কোনও দোষ করেছি রাজা?
স্ত্রীলোকটির কথা বলার ধরনে এবার কৌতুক বোধ করলেন মণিভদ্র। গুরুর কাছে শেখা গান? সে আবার কেমন? জ্ঞানবতীর সঙ্গে এই রমণীর কণ্ঠটিকে একবার তুলনা করে দেখতে ইচ্ছে হল মণিভদ্রের। বললেন, দু-এক কলি শোনাতে পারো সেই গান?
মণিভদ্রের গলায় একটা সস্নেহ কোমলতা ছিল। সেটুকু বুঝতে অসুবিধে হল না ডোম্বিনীর। ধীরে ধীরে জড়তাও কেটে যাচ্ছে তার। মাথা নিচু করে গুনগুনিয়ে উঠল সে।
সোন রুঅ মোর কিম্পি ণ থাকিউ।
নিঅপরিবারে মহাসুখে থাকিউ।।
মল্লারী রাগের ঝাপটায় ঝাপটায় গানের কথাগুলো যেন হৃদয়ে বিদ্ধ হয়ে গেল মণিভদ্রের। তিনি বুঝলেন রাগসংগীত এই রমণীর আয়ত্তে নেই বটে কিন্তু কারোর মুখে শুনে অবিকল এ তুলে নিয়েছে এই গান। সোনা, রুপো আমার কিছুই থাকেনি। নিজ সংসারে তাই আমি সুখেই আছি। এ কথা তো এই সহজ সরল গ্রামবালিকার মুখে মুখে বানানো নয়। তবে কী?...
একটা সন্দেহ উঁকি দিল মণিভদ্রের মনে। সত্যি কথা বলো হে মেয়ে। এ তো কোনও সহজিয়া বৌদ্ধের রচনা করা পদ মনে হচ্ছে। প্রাণে বাঁচতে চাও তো সত্যি কথা বলো। এ গান তোমাকে কে শিখিয়েছে? কে তোমার গুরু?
সে দিনের ঘটনার পরেও রাজার কাছে কাহ্নুপাদের নাম বলে ফেলবে এমন বোকাসোকা মেয়ে নয় ডোম্বিনী। ঘটনার এত ঘূর্ণির মধ্যে পড়েও তার মনে পড়ে গেল রাজার পেয়াদারা কাহ্নকে খুঁজে ফিরছে গ্রামে গ্রামে। লোকের মুখে মুখে রটনা শুনেছে ডোম্বিনী। কাহ্নুপাদ নাকি পালিয়ে এসেছে রাজপুরীর কোনও এক রূপসীকে সঙ্গে নিয়ে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতো একটা কথা মাথায় এল ডোম্বিনীর। তার মানে রাজা নিশ্চয়ই এখনও সন্ধান পায়নি সেই রমণীর। সে দিনের আলো-আঁধারিতে দেখা নেড়া মাথা একজন ব্রাহ্মণের মুখ মনে পড়ে গেল তার। একজন রূপসীর চুলের গোছা মুঠিতে ধরা অবস্থায় যাকে সে শেষ দেখেছিল অন্ধকার নদীর পাড়ে। এতসব কথা মাথায় ঘুরপাক খেয়ে যাওয়ায় বুকটা ধড়ফড় করে উঠল ডোম্বিনীর। কথাগুলো রাজাকে বলে দেওয়া দরকার। এতে হয়তো কাহ্নুপাদের ভালোই হবে।
স্ত্রীলোকটিকে চুপ করে থাকতে দেখে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছে রাজা মণিভদ্রের। স্বভাববিরুদ্ধভাবে উচ্চস্বরে তিনি বললেন, কী হল? শুনতে পাচ্ছ না আমার আদেশ? নাম বলো তোমার গুরুর।
স্পষ্ট গলায় ডোম্বিনী বলল, এই গানটা অবশ্য অন্য লোকের তৈরি। কিন্তু আমার গুরুকে তুমি চেনো রাজা। আমার গানের গুরু হলেন কাহ্ন।
ডোম্বিনী দেখল চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠল রাজার। ক্রোধের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে তার চোখের তারায়।
সে আবার বলল, তোমাকে আমার অনেক কথা বলার আছে রাজা। কিন্তু তার আগে তোমার লোকজনদের চলে যেতে বলো এখান থেকে।

সকাল থেকেই কুয়াশার চাদরে ঢাকা রয়েছে চারপাশ। দিনের আলোও তাই অনেকটা ম্লান হয়ে রয়েছে আজ। গবাক্ষে আর চিকের ফাঁকে ফোকরে যেটুকু আলো তাতে আলতো একটা গাম্ভীর্য তৈরি হয়েছে রাজসভায়। অন্যদিনের মতো নৃত্যগীতে মগ্ন সেই ঝলমলে পরিবেশটাও আজ নেই। অমাত্যদের মধ্যেও অনেকেই আজ সভায় অনুপস্থিত। আজকে রাজসভার সমস্ত আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছেন মুণ্ডিত মস্তক ভিনদেশী চারজন বৌদ্ধ ভিক্ষু।
পার্বত্য প্রদেশের এই ভিক্ষুরা দীর্ঘ আর দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে রাজনগরে এসেছেন পদব্রজেই। পাহাড়ি পথ পেরোনোর সময় তাঁরা হাতের মুঠোয় আঁকড়ে নিয়ে এসেছেন গাছের ডাল কেটে তৈরি বড়ো বড়ো লাঠি। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে এসেছেন কাঁধে ঝোলানো কাপড়ের ঝোলায়।
সমতলের বিভিন্ন প্রদেশে ঘুরেছেন এই বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। এঁদের মধ্যে জনা দুয়েক একেবারেই নবীন। অপেক্ষাকৃত বয়স্ক দুজন এঁদের চিনিয়ে দিচ্ছেন পথ ঘাট। নতুন নতুন প্রদেশ। নতুন নতুন জনপদ।
বয়স্ক ভিক্ষুদের একজন হলেন দোভাষী। সোমপুত্রের বিহারে তিনি ধর্মশিক্ষা করেছিলেন কিছুদিন। সমতলের ভাষা—বিশেষ করে মধ্যশ্রেণির কথ্যভাষা তিনি বলতে পারেন অনায়াসেই। রাজনগরে এর আগেও তিনি এসেছেন কয়েকবার। রাজা মণিভদ্র তাঁর পূর্ব পরিচিত।
পার্বত্য প্রদেশের দুর্গম স্থানে নানান মঠে আর গুম্ফায় যেভাবে এই ভিক্ষুরা বৌদ্ধধর্মশাস্ত্রের চর্চায় নিমগ্ন হয়ে রয়েছেন তাতে ভিতরে ভিতরে তাঁদের প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধা বোধ করেন রাজা মণিভদ্র। কালেভদ্রে তাঁরা রাজনগরে এসে আতিথ্য গ্রহণ করলে ধন্য মনে করেন নিজেকে। আতিথেয়তায় কোনও ক্রটি ঘটতে দেন না কোনও সময়।
সেই ভিক্ষুরাই যখন আজ প্রকাশ্যে এই রাজসভায় কুণ্ঠিতভাবে জানালেন রাজার কাছে একটি আর্জি রয়েছে তাঁদের, তখন মণিভদ্র যে তা জানার জন্য অতিমাত্রায় ব্যগ্র হয়ে উঠবেন—এ আর আশ্চর্য কি!
মণিভদ্র বললেন, বলুন, বলুন আপনারা। আমার ক্ষমতা খুবই সামান্য, তবুও আমি প্রাণপণ চেষ্টা করব আপনাদের প্রার্থনাটুকু রক্ষা করার।
রাজার কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে বয়স্ক দোভাষীর মাধ্যমে ভিক্ষুরা জানাতে শুরু করলেন তাঁদের প্রার্থনার কথা। সেই সঙ্গে একটি অনুযোগও রয়েছে তাদের। অমাত্য হরিহরের বিরুদ্ধে।
সেদিন রাতে ব্রাহ্মণ অমাত্য হরিহরের তালুকদারিতে ঢুকে তার অট্টালিকাটি তছনছ করে ঢুঁড়ে দেখল রাজার সান্ত্রী পেয়াদার দল। সেনাধ্যক্ষকে সঙ্গে নিয়ে রাজা নিজে নেতৃত্ব দিলেন এই অনুসন্ধানের।
রাত্রির মধ্যপ্রহরে ভিতর মহলের একটি ঘরে কুশের চাদর ঢাকা দিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন হরিহর। সেনাধ্যক্ষের ডাক শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে দেউড়ি পেরিয়ে বেরিয়ে এলেন একেবারে বাইরে। খালি গায়ে উপবীতটি আঙুলে জড়িয়ে প্রণাম করলেন রাজা মণিভদ্রকে।
মণিভদ্র বললেন, হরিহর, ভিনদেশী বৌদ্ধেরা তাদের রাজার একটি অনুরোধ নিয়ে এসেছে। আমাদের রাজনগরের যে বৌদ্ধমঠের ধ্বংসস্তূপ থেকে ইট পাথর সংগ্রহ করে তুমি তৈরি করেছ এই অট্টালিকা, সেগুলো তোমাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। পার্বত্য প্রদেশের রাজন্যদের অনুরোধ, তাঁরা নিজেদের সামর্থেই সংস্কার করতে চান ওই প্রাচীন সৌধটির, আমরা যেন তাঁদের সাহায্য করি এই কাজে।
এ আর কী এমন কথা মহারাজ? আমি ভেবেছিলাম চাষের জমি নষ্ট হচ্ছে কিছুটা। জমিটাকে যদি চাষের আওতায় ফিরিয়ে আনা যায় তবে আমাদের রাজ্যেরই মঙ্গল হবে। আপনি যখন আদেশ করছেন তখন ফিরিয়ে দেওয়া হবে ওদের বিহারের জায়গাটাকে। আশপাশের ভূমিও কিছুটা অধিকারে ছিল তাদের। সেটাও না হয় ফিরিয়ে দেওয়া যাবে।
মণিভদ্র বললেন, তার আগে দেখা দরকার তোমার অট্টালিকার কোন অংশটি তুমি বিহারের ইটপাথর সাজিয়ে নির্মাণ করেছ। এজন্য আমি অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছি রাজরক্ষীদের। সেনাধ্যক্ষকে নির্দেশ দিয়েছি এ কাজ করতে গিয়ে তারা যেন তোমার পরিবারের কোনও সদস্যকে অসম্মান না করে।
হরিহর বিগলিত হয়ে বললেন, এই নির্দেশের কোনও প্রয়োজন ছিল না মহারাজ। আপনি থাকতে সে কাজ কি কেউ করতে পারে কখনও?
অনুসন্ধানের চরিত্র দেখে হরিহর বুঝতে পারলেন কেবল প্রাণহীন ইটপাথরের সন্ধানে সান্ত্রীরা তার বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরছে না। মশালের আলোয় রাত্রির অন্ধকার ছিঁড়ে ফেলে তারা সন্ধান করছে কোনও একজন মানুষের। আরও স্পষ্ট করে বললে কোনও একজন মেয়েমানুষের।
ব্রাহ্মণ অমাত্যের উৎকোচ গ্রহণকারী কয়েকজন সান্ত্রীও আছে রাজসৈন্যের দলে। তারাও এতক্ষণে এই ভিড় আর জমায়েতের মধ্যেই তাকে গোপনে জানিয়ে দিয়ে গেছে এখানে তারা এত রাত্রে যার সন্ধানে হানা দিয়েছে সে হল জ্ঞানবতী।
রাজার উদ্দেশ্যটা বুঝতে পেরে গোপনে একটু হাসলেন অমাত্য হরিহর। সেদিন প্রাণ নিয়ে জলদস্যুদের হাত থেকে পালাতে পেরেছিলেন তিনি। কিন্তু জ্ঞানবতীর কোনও সন্ধান হরিহর নিজেও আর পাননি তারপর থেকে। জানেন না যে সে এখনও বেঁচে আছে কিনা। কিন্তু তার হাতে জ্ঞানবতীর থেকে যাওয়ার কথাটা রাজাকে জানাতে পারে কে?
ভ্রূ কুঞ্চিত করে ওই কোলাহলের মধ্যে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন হরিহর। তাঁর সব রাগ গিয়ে পড়ল ওই বুদ্ধের কাপালিকটার উপরে। দাঁতে দাঁত চেপে মৃদুকণ্ঠে তার নাম উচ্চারণ করলেন হরিহর— কাহ্ন।

কয়েকদিন হল কাহ্নর খোঁজে রাজপেয়াদারা আর মুহুর্মুহু হানা দিচ্ছে না গ্রামসীমানায়। কাহ্ন এই কদিন বসত করেছিলেন শ্মশানের পাশে ডোমপাড়ায়। রাজকর্মচারীরা কিংবা ব্রাহ্মণরা পারতপক্ষে আসতে চায় না এদিকে। নেহাত আত্মীয়স্বজন কারও মৃত্যু হলে শবানুগমন করে এদিকে আসতে বাধ্য হয় তারা।
ডোমপাড়ায় সব মিলিয়ে খুব বেশি হলে পঁচিশ তিরিশ ঘর ডোমডোমনির বাস। শুধু মৃতদেহ সৎকার করে তো আর দিন চলে না। কেউ বাঁশ চিরে দর্মা তৈরি করে, কেউ বাঁধে চাঙারি। মাঠের ধারে একেবারে শেষ ঘরটায় থাকে ডোম্বিনী।
খুব ছোটোবেলায় বাপ মরেছে তার। মা তখন খাটতে যেত জেলে মেছুনিদের সঙ্গে মাছ বিক্রির কাজে। তার সঙ্গেই আস্তে আস্তে নদীর ঘাটে যেতে শুরু করেছিল ডোম্বিনী। খেয়া নৌকোর ঘাটে এক বুড়ো মাঝির মায়া পড়ল তার উপরে। মা যখন জেলে মেছুনিদের সঙ্গে হাত লাগাত কাজে, ছোট্ট মেয়েটিকে তখন বুড়ো মাঝি তুলে নিত তার নৌকোর মাঝের পাটাতনে। সারাদিন পারাপার করত মাঝি। দুপুরবেলায় জল ঢেলে একমুঠো ভাত খাওয়ার বিশ্রাম। তার সঙ্গে থাকতে থাকতে একটু একটু করে ডাগর হয়ে উঠল ডোম্বিনী। শিখেও গেল নদীর বুকে ঢেউ সামলে খেয়া নৌকোয় পাড়ি দেওয়ার কাজ।
তারপর সেই বুড়ো যখন মরল, তখন আশপাশের সব লোকেরা বলল, ও ডোম্বিনী, বুড়োর তিনকুলে কেউই তো আর নেই। খেয়া নৌকোর মাঝি বলতেও তো ওই একজনই ছিল। তুই এক কাজ কর না বাপু, নৌকো পারাপার তুই নিজেই কর না এখন থেকে। চিন্তা নেই, তোকে আমরা ঠকাব না। কড়ি নিস আমাদের থেকে গুনে গুনে।
তারপর থেকেই নৌকোটা হয়ে গেছে ডোম্বিনীর। আর আহ্লাদ হয়েছে লোকজনের। মেয়েমানুষের মিঠে হাত। নৌকো দোলায় না বেশি জোরে। বুড়োবুড়িদের নামিয়ে দেয় হাত ধরে।
আহ্লাদ জোয়ানদেরও হয়েছে বিস্তর। দুটো চারটে কড়ি খরচা করার ক্ষমতা আছে যেসব বড়োমানুষের ছেলে ছোকরার, কাজ না থাকলেও তারা মাঝে মাঝে পারাপার করতে আসে এখানে। একটা দুটো রসের কথা বলা যাবে। নিদেনপক্ষে তাকিয়ে দেখা তো যাবে কিছুক্ষণ মেয়েটাকে।
ডোম্বিনীর শরীরের এই ছিনালি টানটা একনজরেই চিনতে পেরেছিল এক নাচের দলের মূল বায়েন। ঢোল, মাদল, বাঁশি, ঝাঁঝ সব নৌকোয় তুলে নদী পেরিয়ে নাচগানের বায়না ধরতে চলেছিল তারা। কথায় কথায় এমন পছন্দ হয়ে গেল ডোম্বিনীকে বারবার এসে সাধতে লাগল সেই লোক। চল না মেয়ে, এত সুন্দর চেহারা হয়েছে তোর। নাচলে দেখবি মধু ঝরবে চারপাশে। হুনহুন করে ছুটে আসবে ভোমরা। নাচগান সব তো শিখিয়ে নেব আমরা তোকে। চল না। বছরে আর কটা দিন। সারা বছরই তো খেয়া বাইবি। দু-চারটে দিন আর লোকজটলায় নাচগান করলে কী দোষ?
তারপরে যখন একদিন মা-ও মরে গেল তার, একা ঘরে এই ডোমপাড়ার সন্ধেগুলো অসহ্য হয়ে এল যখন, তখন সত্যিসত্যিই সে একদিন সন্ধেবেলায় ঢুঁ মারল হাটতলার ধারে গায়েন বায়েনদের আখড়ায়।
কাহ্নুপাদ যে কদিন তাদের ডোমপাড়ায় আছে সে ক'দিন অবশ্য ডোম্বিনী আর সন্ধের পর পা বাড়ায়নি অন্য কোথাও।
ঘাটের কাছে নৌকো বেঁধে এই কদিন সন্ধেবেলায় ডোম্বিনী ফিরে এসেছে তার চালাঘরে। শ্মশানধারের পাকুড়গাছের তলায় একটি উঁচু মাটির বেদি করে রেখেছে তারা। সূর্য গড়ালে ছেলেবুড়ো সকলেই জড়ো হয় সেখানে। পচাই খায়। হইহল্লা করে। তারপরে রাত গড়ালে একে একে ঘরে চলে যায় তারা। বসে থাকে শুধু ডোম্বিনী। আর বসে থাকেন কাহ্ন।
ডোম্বিনী তার জীবনের গল্প বলে কাহ্নুপাদকে। কাহ্ন বলেন নিজের কথা। ডোম্বিনী শুনতে চায় এই রাজনগরের চাষিপাড়ায় জঙ্গলবুড়িতে চাষ করতে আসার আগে কী করত কাহ্নুপাদ? কোথায় থাকত? কেমন ছিল তার অতীত জীবনের ঘরবসতি?
চুপ করে থাকেন কাহ্ন। মায়ার শিকড় ছিঁড়ে এসেছেন তিনি। পূর্ব জীবনের কোনও কথাই আর বলতে ইচ্ছে করে না তাঁর।
ডোম্বিনী তবুও কাহ্নর কিছু কিছু কথা লোকের মুখে মুখে শুনে জানে। জঙ্গল কেটে এখানে যারা চাষের জমি তৈরি করে চাষবাস করে তাদের জমিকে লোকেরা বলে জঙ্গলবুড়ি। জঙ্গলবুড়ির চাষি মানেই নতুন লোক। কয়েকপুরুষের বাসিন্দা তাদের নিয়ে কাহিনি বানায় রাশি রাশি।
তাছাড়াও কাহ্নুপাদের কাছে এ গ্রাম ও গ্রাম থেকে লোকেরা আসে বলেও তাকে নিয়ে রটনা ফেরে মুখে মুখে। সেই কাহ্নুপাদ আজ তার এত কাছের মানুষ—একথা ভেবেও গরবিনি হয়ে ওঠে ডোম্বিনী।
তাই বলে প্রথম দিনের সেই প্রত্যাখ্যান এখনও ভুলতে পারেনি ডোম্বিনী। তখন অবশ্য তার এত কাছের ছিল না মানুষটা। ডোম্বিনীও এতটা শান্ত হয়ে আসেনি স্বভাবে। সারাক্ষণই মনে একটা ছটফটানি ছিল তার। শরীরেও ছিল। শরীরের ছটফটানি যে এখন কমে গেছে তা নয় তবে তার চাল অনেক গম্ভীর। বহু ঘটনার ধাক্কায় ধাক্কায় বহে এসে তার জীবন তাকে শিখিয়েছে শরীরের আনন্দটা একটা চুল্লির দাউদাউ জ্বলে ওঠার মতো কিছুক্ষণের আনন্দ নয় মোটেই। ওরকম হলে পড়ে থাকে শুধু কালো অঙ্গার। ডোম্বিনী এখন বোঝে শরীরটাকে জ্বালাতে হয় একটা মাটির প্রদীপের মতো। যাতে সেই শান্ত আগুন থেকে মনের মধ্যে নরম আলো ছড়িয়ে পড়ে কিছুটা। বুকের ভিতরটা ভরে ওঠে তার দীপ্তিতে।
কাহ্নুপাদকে ডোম্বিনী বলেছে এই কথা। একমাত্র তাকেই যে এসব কথা বলা যায়। সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় সেজে, পুরুষে পুরুষে ঘুরে, খেয়াঘাটের পাড়িতে পাড়িতে দাঁড় ধরে একটা জীবনের মধ্যেই যেন কয়েক জন্মের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে তার।
শ্মশানপাকুড়ের নীচে বসে গভীর রাত্রি পর্যন্ত ডোম্বিনীর কথা যত শুনেছেন ততই অবাক হয়েছেন কাহ্ন। অশিক্ষিত এই সামান্য মেয়েটি নাচগানের দলে ঘুরে, দশ নাগরের সঙ্গ করে এই মানবজীবনের পাঠ গ্রহণ করেছে কত গভীর করে। শরীরের প্রশান্তির কথা, শরীরের সিঁড়িতে সিঁড়িতে পা রেখে মহাসুখে পৌঁছোনোর কথা একেই যদি বলা না যায় তো কাকে বলা যাবে? আলতো স্বরে একদিন কাহ্ন ডাক দিয়েছেন তাকে, ডোম্বিনী।
কামনাঘন সেই ডাক চিনতে ভুল হয়নি ডোম্বিনীর। তার কাহ্নুপাদ আজ তাকে ডাক দিয়েছে ভিতর থেকে। ওই শ্মশানপাকুড়ের নিঃশ্বাস যেন পড়েছে তার কপালে। ধমনিতে যেন গর্জন শোনা গেছে দূর সমুদ্রের। দিগন্তে আজ আছাড় খেয়েছে ভরা জোয়ারের নদী। কাহ্নুপাদের চওড়া বুকে ঠোঁট ঘষে ঘষে সিংহীর মতো সাড়া দিয়েছে ডোম্বিনী, বলো, কাহ্নুপাদ বলো। আমাকে তুমি নেবে আজ ওই চওড়া পাথরের মতো বুকের নীচে?
আদিকালের ওপার থেকে যেন শব্দ ঝরেছে কাহ্নর গলায়, নেব ডোম্বিনী, আজ তোমাকে নিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের প্রলয়মন্থন পর্যন্ত ছুটে চলে যাব আমি। এসো, ডোম্বিনী, এসো।
কাহ্নুপাদের শরীর আঁকড়ে ধরে চুম্বনের ঝাপটা তুলেছে ডোম্বিনী। ঘাড়ে, গলায়, বুকে, বাহুমূলে, নাভিতে সর্বত্র। তারপর দাঁড়ের মতো শক্ত করে হাতের মুঠোয় ধরেছে তার পুরুষ শরীরের মন্থন শক্তিটিকে। তপ্ত লৌহশলাকা আঁকড়ে ধরার হল্কা এসে লেগেছে হাতে। ফিসফিস করে বলেছে এত কঠিন কেন, কাহ্নুপাদ তুমি? এত মোহন কেন?
কাহ্ন বলেছেন, ও হল শরীরের বজ্রচিহ্ন ডোম্বিনী, শক্তি আর তেজেই ওর ধারণা!
বজ্রচিহ্ন? অবাক হয়ে শুনেছে ডোম্বিনী। তারপর শরীরের ঝাপটায় ঝাপটায় শিখে নিয়েছে চৌষট্টি পাপড়ির রূপকল্প।
নিঃশ্বাসে ঝড় বয়ে চলেছে কাহ্নুপাদের। আদরে আদরে অস্থির করে দিয়েছে তাকে। আর, এ কী শুনছে ডোম্বিনী? এই তীব্র আদরের মধ্যেও একটা দুটো কথা কিন্তু তার সঙ্গে বলছে না কাহ্নুপাদ। শরীরজোড়া এই ঝোড়ো নদীর উচ্ছ্বাসের মধ্যেও একটা দুটো কথা কাহ্নুপাদ কেবল বলছে তার নিজের সঙ্গে। ঝড়ের গর্জনের মধ্যেও ডোম্বিনী শুনতে পাচ্ছে সেই বৃষ্টির ফিসফিসানি।
আলো ডোম্বি তোএ সম করিব ম সাঙ্গ।
নিঘিণ কাহ্ন কাপালি জোই লাংগ।।
এক সো পদুমা চৌষঠঠী পাখুড়ী।
তাহি চড়ি নাচঅ ডোম্বী বাপুড়ী।।
তারপর চূড়ায় উঠে তারা চুরমার হয়ে গেছে একসময়। তারায় তারায়, আলোয় আলোয়, টুকরো টুকরো হয়ে ছিটকে পড়েছে আনন্দে। শান্ত এই আলোটার কথাই বোধহয় আজকাল ভাবত ডোম্বিনী।
শ্রাবণবর্ষার আঘাতে আঘাতে ভিজে কাদামাটির ব্যথিত আনন্দের মতো এখন শুয়ে আছে ডোম্বিনী। আকাশের দিকে তোলা তার মুখ। মাটিতে পাতা তার খোলা পিঠ।
তার বুকের উপর শুয়েছিলেন কাহ্ন। একসময় মুখ তুলে তাকালেন ডোম্বিনীর চোখে। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন ক্লান্ত স্বরে
সদভাবে তোকে করি আমি জিজ্ঞাসা
কার নৌকোয় তোর অত যাওয়া আসা?
বেচিস তো তাঁত, চাঙাড়ি তো নয় আর
আমিও করেছি নট সাজা পরিহার
আমি কাপালিক, তুই হলি ডোমবালা
তোর জন্যেই পরেছি হাড়ের মালা।
জল ভেঙে বটে মৃণাল তো তুই খাস
মারব ডোমনি, কেড়ে নেব তোর শ্বাস।।
একটি নতুন পদ রচনা শেষ হল কাহ্নর। অবাক হয়ে তাকাল ডোম্বিনী। কাহ্ন তাকে জিগ্যেস করছেন? কার নৌকায় তোর অত যাওয়া আসা? ডোম্বিনীর জীবনের কথা শোনার পর কাহ্ন কি ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়লেন শেষে? 'মারব ডোমনি, কেড়ে নেব তোর শ্বাস?' এ তো প্রেমিকের ঈর্ষা! কবি কাহ্ন কি আচার্য কাহ্নকে ছাপিয়ে গেলেন ডোম্বিনীর প্রেমে মজে? এমন তো হওয়ার কথা নয়। কাহ্ন তখনও আকুল হয়ে তাকিয়ে রয়েছেন ডোম্বিনীর দিকে।
কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই ডোম্বিনীর। মাথার ওপর লক্ষ লক্ষ তারায় আঁকা আকাশ। পিঠের নীচের মাটির বেদির শান্ত শয্যা। আকাশপৃথিবীর এই শয্যায় শুয়ে ডোম্বিনীর মনে হল তার কোনও ঘর নেই, কোনও মায়া নেই, কোনও পিছুটান নেই। এই শ্মশানভূমির ঘনরাত্রির মাঝখানে জন্ম আর মৃত্যু এই দুয়ের থেকেই সমান দূরত্বে সে যেন আজ আবিষ্কার করল নিজেকে। এই দুয়ের প্রতিই তার কোনও মায়া মোহ নেই। এমনকি বুকের উপর উপুড় হয়ে আছে যে মানুষটা, তার প্রতিও আর কোনও আকর্ষণ বোধ করছে না ডোম্বিনী। একটা শরীর তাকে আনন্দের চূড়ান্তটিতে পৌঁছে দিয়েছে বটে। কিন্তু সেজন্য তার প্রতি আলাদা কোনও টান অনুভব করছে না ডোম্বিনী।
কাহ্নর সঙ্গে এখন কোনও কথা বলল না ডোম্বিনী। মনে মনে শুধু বলল, এ কোন শক্তি তুমি আমাকে দিলে কাহ্নুপাদ? এ কোন নিরাসক্তি আমাকে দিলে!

সোমপুত্র বিহারে সেদিন জমে উঠল বুদ্ধ নাটকের আসর।
ভগবান তথাগতের কিছু কিছু উপদেশ, তাঁর জীবনের কিছু ঘটনা ছোটো ছোটো নাটিকার আকারে পরিবেশন করা হয় এইসব বুদ্ধনাটকে। খুব যে একটা টানা কোনও কাহিনি বলা হয় তা নয়। কিন্তু নটের পোশাকে সুসজ্জিত সহজিয়াদের নানাবিধ অঙ্গসঞ্চালনা আর অভিব্যক্তিতে শেষ পর্যন্ত জমে ওঠে এই নাটক। সরাসরি বুদ্ধের বাণী আর উপদেশ প্রচারের চেয়ে এই কৌশলী প্রচারে কিছু সুবিধাই হয় বৌদ্ধ সংঘের প্রচারকদের। সাধারণ মানুষ এই বুদ্ধ নাটকে আকর্ষণ বোধ করে বেশি।
বৌদ্ধ বিহারের পাশে একটা প্রশস্ত উদ্যানে টাঙানো হয়েছে সাদা চাঁদোয়া। তার গায়ে কমলা রঙের কাপড়ে আঁটা রয়েছে বিশেষ এক ধরনের পদ্মচিহ্ন। নীচে পাতা হয়েছে সাদা একটা পাতলা গালিচা। তার চারপাশে বসেছে বাদ্যযন্ত্রীরা। তাদের ঘিরে উদ্যানের ভিতরে গোল হয়ে বসেছে দর্শকেরা।
আজকের অভিনয় দেখতে জমায়েতও হয়েছে বিশাল। দিনের আলোয় এ নাটকের অভিনয় হয় বলে ভিড়ের ভিতরে বসে কিছুটা দূরে থেকেও নটেদের অভিব্যক্তি লক্ষ করতে অসুবিধে হয় না কারোর। সারি দিয়ে পিছনে পিছনে বসে তারা দিব্যি উপভোগ করতে পারে নাট্যরস।
অবশ্য তা তাদের পারারই কথা। মূলত শিক্ষিত শ্রেণির লোকজনেরাই ভিড় করে এইসব আসরে। নাটকের ভাষাও এই শিক্ষিত মধ্যশ্রেণির মুখের ভাষা। একেবারে চাষি-চণ্ডালদের মতো অন্ত্যজ মানুষের মধ্যে তাই এখনও ততটা জনপ্রিয় হয়নি বৌদ্ধ সংঘের এই প্রচার কৌশল।
তা নিয়ে অবশ্য ততটা চিন্তিত নন সংঘের আচার্যেরা। সহজিয়াদের কেউ কেউ একেবারে অন্ত্যজ মানুষদের মধ্যে মিশে গিয়ে মুখে মুখে গান বেঁধে স্থানীয়ভাবে ছোটো ছোটো শিষ্যবৃত্ত তৈরি করে প্রচার করার দায়িত্ব নিয়েছেন তান্ত্রিক বৌদ্ধমতের গূঢ় তত্ত্ব। তাদের সঙ্গে এই সংঘের ভিক্ষুদের একটা বিরোধ আছে বটে কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা পার্বত্য প্রদেশের ভিনদেশী বৌদ্ধদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে সহজিয়াদের এই মাটির গন্ধঘেঁষা প্রচার কৌশল। তাই, সহজিয়াদের কেউ কেউ, যারা পুরোনো বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিয়ে আজ এখানে জড়ো হয়েছে নটের ভূমিকায় অংশ নিতে, তাদের সঙ্গে এই নিয়ে কিছু আলোচনাও সেরে নিয়েছেন সংঘের আচার্যস্থানীয় কর্তাব্যক্তিরা।
ভিনদেশী কয়েকজন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে নিয়েই সোমপুত্রের এই বুদ্ধনাটকের আসরে হাজির হয়েছেন রাজা মণিভদ্র। হাতির পিঠে চড়ে অনেকটা পথ পেরিয়ে আসতে হয়েছে তাঁদের। সময়ও লেগেছে অনেকটা। তাঁদের জন্যে অবশ্য সামনের সারিতে গালিচা মোড়া আসনের ব্যবস্থা। সেখানে বসে একটু জিরিয়ে নিতে নিতে চারপাশের দর্শকদের একবার দেখে নিচ্ছিলেন মণিভদ্র।
অভিনয় এখনও আরম্ভ হয়নি। উশখুশ করছে উৎসুক জনতা। আর আশ্চর্র্য! রাজা মণিভদ্র লক্ষ করলেন সোমপুত্রের এই ভদ্রসমাবেশে ভিড়ের ফাঁকে ফাঁকে বেশ ভালো সংখ্যায় মিশে রয়েছে মলিন বসন, রুক্ষ শুষ্ক চেহারার ডোম-চাষি-চাঁড়াল-শবর জাতীয় কিছু অতি সাধারণ মানুষ। তাদের মধ্যে একটি দুটি মুখের আদল যেন চেনা চেনা লাগল মণিভদ্রের। রাজার পক্ষে রাজ্যের সব মানুষকে চেনা সম্ভব নয় কখনও। চিনলে তার রাজমুকুটের উদ্ধত গৌরবটাই যেন খাটো হয়ে যায় কিছুটা। কিন্তু মণিভদ্র মনে মনে বুঝলেন রাজনগরের সাধারণ প্রজাদের সঙ্গে এদের মুখের অদ্ভুত মিল। হতে পারে তারা তাঁর রাজ্যেরই অধিবাসী। কিন্তু এতদূরে এসে পৌঁছোল কী করে তারা? কীসের টানেই বা এল এতদূর?
নৃত্যগীতে একসময় জমে উঠল বুদ্ধনাটক। বুদ্ধজীবনের একটা ঘটনা মনোযোগ আকর্ষণ করল সবচেয়ে বেশি।
বোধিবৃক্ষমূলে রাজপুত্র সিদ্ধার্থের ধ্যানে ভীত হয়ে পড়েছে মার। তার অনুচরেরা নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছে সিদ্ধার্থকে। তাদের কারোর হাতে খড়গ, কারোর হাতে শূল, কেউ এসেছে বৃক্ষ উপড়ে নিয়ে, মারের অনুচরদের সাজসজ্জাও অদ্ভুত। তাদের কারোর মুখ শূকরের মতো। কারোর মুখ বাঘ, সিংহ, উটের মতো, কারও আবার হাতির মতো বিশাল কান।
শেষপর্যন্ত তারা যখন হার মানল তখন ঘনঘন করতালি উঠল দর্শকদের মধ্যে থেকে।
নাটক শেষে আসরে তখনও সমবেত করতালির শব্দ। কাহ্ন চলে এসেছেন সাজঘরে। আজকের অভিনয়ে দুটি চরিত্রে অংশ নিতে হয়েছে তাঁকে। একবার ভগবান তথাগতের এক শিষ্যের ভূমিকায়। আরেকবার তিনি অবতীর্ণ হয়েছেন মার-এর চরিত্রে।
আজকাল সোমপুত্রে এসে বুদ্ধনাটকে অভিনয় করা আর হয়ে ওঠে না। তা ছাড়া সংসারের মায়ার মতো নটের পোশাকও তিনি ত্যাগ করেছেন মনে মনে। পুরোনো বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে অনেকদিন পরে আবার অভিনয় করতে হল তাঁকে।
তা ছাড়া বৌদ্ধদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে জল অচল মেরুবিভাজন কোনওদিনই তেমন ভালো লাগে না তাঁর।
বিহার সংলগ্ন উদ্যানের পাশে, উদ্যান পরিচারকের একটি ছোটো ঘরকেই সাজঘর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নটের পোশাক খুলে যত্ন করে পেটিকায় তুলে রাখছেন কাহ্ন। বিহারের নবীন ভিক্ষুর দল এ কাজে সাহায্য করছে তাঁকে। এমন সময় বয়স্ক একজন ভিক্ষু এসে বললেন, তোমার জন্যে বাইরে কয়েকজন অপেক্ষা করছেন কৃষ্ণাচার্য।
তখনও মুখাবয়বের রঙিন সাজ তুলে ফেলা বাকি। একটা ছোট্ট কাপড়ের টুকরো হাতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন কাহ্ন। দেখলেন দূরে একটা পিপুল গাছের নীচে ভিড় করে তাঁর দিকে তাকিয়ে রয়েছে একদল মানুষ। কাহ্ন পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন সেদিকে।
কাহ্ন ভাবতেও পারেননি এতটা বিস্ময় অপেক্ষা করে রয়েছে তাঁর জন্য। পিপুল গাছের নীচে তাঁর জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছে রাজনগরের চেনা-অচেনা গাঁ ঘরের মানুষেরা। সুমঙ্গল তন্তুবায় আর কমলা বউঠান, অরু আর উমা, চণ্ডশবর আর গুঞ্জরী, এমনকি ডোম্বিনীও চলে এসেছে বলাই নামের তার সঙ্গতকারীটিকে জুটিয়ে নিয়ে। আর তাদের সঙ্গে এসেছে মানুষ। চাষিপাড়া, তাঁতিপাড়া, শবরপল্লি, সব জায়গা থেকে ঝেঁটিয়ে তার অভিনয় দেখতে এসেছে মানুষ। তিনটে নৌকোয় যত লোক ধরে তত। নদীর বুকে অনেকটা পথ উজান বেয়ে আসতে হয়েছে তাদের। শুকনো ফলমূল কোঁচড়ে বেঁধে হাজির হয়েছে তারা। গুঞ্জরী এগিয়ে এসে তার হাত ধরে বলেছে, কাহ্নুপাদ তুমি যে এত ভালো নকল করতে পারো অন্যকে তা তো বলোনি কোনওদিন। এ তো আমাদের শিকার খেলার থেকেও ভালো।
ভেতরে ভেতরে একটা উত্তেজনা টের পেলেন কাহ্ন। কিন্তু আচরণকে সংযত করলেন। বললেন, ঠিক আছে গুঞ্জরী, তোমরা সব নদীর ঘাটে নৌকোয় গিয়ে বসো। কাজকর্ম সেরে আমিও যাচ্ছি ওখানে। তোমাদের সঙ্গে আজকেই আমাকে ফিরে যেতে হবে রাজনগরে।
সাজঘরে ঢুকে কাহ্ন আবার অবাক। আধো চেনা একজন সহজিয়ার কাছে গান শুনছেন দুজন ভিনদেশী ভিক্ষু। সঙ্গে রয়েছেন রাজা মণিভদ্র। মাথা দুলিয়ে পটমঞ্জরী রাগে গান ধরেছেন সেই সহজিয়া। কাহ্ন মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করলেন। আরে! এ তো তাঁরই রচনা করা পদ। তাঁর মতো একজন হাটে মাঠে ঘুরে বেড়ানো তান্ত্রিকের গান গাওয়া হচ্ছে মাঠের ভেতরে? অনেকদিন পরে এই সমন্বয়ের প্রয়াস দেখে চোখে জল এল তাঁর। অচেনা সহজিয়া তখনও গাইছে
আলিএঁ কালিএঁ বাট রুন্ধেলা।
তা দেখি কাহ্নু বিমন ভইলা।।
কাহ্নু কহিঁ গই করিব নিবাস।
জো মণগোঅর সো উআস।।
তালপাতার একটা পুথির পাতায় সেই ভিনদেশীরা লিখে নিচ্ছেন তাঁর পদ—
পথ রুখে দেয় আল ও আঁধার
দেখে কাহ্নুর মন হল ভার।
কাহ্নু কোথায় গিয়ে বাঁধে ঘর
সেও দূরস্থ যে মনোগোচর।
এই গায়ক সহজিয়া বন্ধুটিই বা ওই গান শুনল কোথা থেকে? লোকের মুখে মুখেও কি তবে এতদূর ছড়িয়ে পড়তে পারে কোনও রচনা? সৃষ্টির কি এতটাই শক্তি থাকে তবে?
পায়ে পায়ে এবার সাজঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন কাহ্ন। আচার্যস্থানীয় একজন বৃদ্ধ ভিক্ষুর কাছে বিদায় নিয়ে পা বাড়ালেন নদীর ঘাটের দিকে।

অরু এসে একটা খবর দিয়ে গেছে আজ সকালবেলায়। উমা ছটফট করছে। কী করে কাহ্নুপাদকে জানানো যায় খবরটা।
রাজার সান্ত্রীরা অবশ্য আগের মতো উৎসাহ নিয়ে কাহ্নুপাদকে খুঁজছে না আর। কিন্তু সাবধানের মার নেই, কথাটা ভালোই জানে উমা। তাই সে সুমঙ্গলের ফেরার অপেক্ষায় আছে। উমার মনে হল দাদাকে একবার জিগ্যেস না করে কাহ্নুপাদের খোঁজ করতে যাওয়াটা বোধহয় ঠিক হবে না।
সুমঙ্গল গিয়েছে রাজনগরের বিষু মন্দিরের পুরোহিতের বাড়ি। মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন তিনি, পাত্রটিও ভালো ঘরের।
গুজরাট প্রদেশ থেকে কয়েকঘর রাট বা লাট ব্রাহ্মণ এসে বসতি করেছে রাজনগরে। রাজা মণিভদ্র কয়েকখণ্ড ভূমি দান করেছেন তাদের। বিবাহ কাজকর্ম ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে তারা ক্রমশ মিশে যাচ্ছে এখানকার ব্রাহ্মণদের সঙ্গে। সেই লাট ব্রাহ্মণ ঘরেরই একটি সুপাত্রের সঙ্গে কন্যার বিবাহ স্থির করেছেন এই পুরোহিত।
একমাত্র কন্যার বিবাহ বলে কথা। সেজন্য গণ্ডা গণ্ডা যৌতুক দিতে হবে পুরোহিতকে। ব্রাহ্মণীর জন্যও এই উপলক্ষ্যে কিনতে হবে কয়েকখানা নতুন শাড়ি।
তাঁতিবউ কমলারও সেই কারণে ডাক পড়েছে ব্রাহ্মণড়িতে। বামুনবাড়ির মেয়ে বউরাও দেখে শুনে কিনতে চায় কাপড়চোপড়। সেসব তাদের বুঝিয়ে সুজিয়ে দেখাতে হবে কমলাকে।
বিষু আর শিবের যে দুটি বড়ো মন্দির আছে রাজনগরে, এই পুরোহিত বংশ পরম্পরায় পুজো করেন সেখানে।
রাজা যদিও বৌদ্ধ তবুও তিনি রাজকোষ থেকেই বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন পুরোহিতের। মধ্যশ্রেণির ব্রাহ্মণ আর ধর্মভীরু সাধারণ নাগরিকেরাও এতে খুশি। তাদের উপঢৌকন আর প্রণামীও মন্দিরে আসে প্রচুর পরিমাণে।
গাঁটরি খুলে কাপড়চোপড় দেখাতে বেলা গড়িয়ে যায় অনেকটা। মেয়ে বউরা দু-দশটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে চায়।
পুরোহিত সম্পন্ন গৃহস্থ। শাস্ত্র পাঠ করেছেন অল্পস্বল্প। তালপাতা আর তেরেটপাতায় সংস্কৃত ভাষায় লেখা কয়েকটা পুথিও আছে তার কাছে। তবে আচার অনুষ্ঠান পুজো পাঠেই তাঁর বেশি আকর্ষণ। জ্ঞানকাণ্ড আর কর্মকাণ্ডের মধ্যে দ্বিতীয় পথটিকেই তিনি বেছে নিয়েছেন নানা কারণে। এতে হোমযজ্ঞ ক্রিয়াকর্মের ব্যাপারে লোকেরা তাকে ডেকে নিয়ে যায় পুণ্যের লোভে। ব্রাহ্মণ যজ্ঞের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দীর্ঘ তালিকা তুলে দেন তাদের হাতে। তার মধ্যে অনেক কিছুই বিধি অনুসারে পুরোহিতেরই প্রাপ্য। প্রণামীও পাওয়া যায় ভালো। বৈভব উপচে পড়ে ব্রাহ্মণের গৃহে।
কাপড়চোপড় বাছাবাছির পর ভিতর থেকে বাইরের দালানে বেরিয়ে এল তাঁতিবউ। যে কটা কাপড় তার কাছে ছিল সেগুলো রেখে দিল সুমঙ্গলের গাঁটরিতে।
গাঁটরি বেঁধে, কড়ি গুনে নিয়ে, যখন বামুনবাড়ি ছেড়ে বেরোতে যাবে তারা সূর্য তখন আকাশের একেবারে মাঝখানে। গনগন করছে তাত। কুমিরের দাঁতের মতো ঝকঝক করছে রোদ্দুর। চামড়ায় কেটে বসছে তার কামড়।
ঘেমে ওঠা মুখটা একবার আঁচলে মুছে নিল তাঁতিবউ। সুমঙ্গল বলল, একটু জল পাওয়া যাবে পুরুতমশাই? গামছাটা তাহলে ভিজিয়ে নেওয়া যেত। ভিতরদিকে তাকিয়ে পুরোহিত বললেন, বাইরে একটু জল পাঠাবার ব্যবস্থা করো।
পছন্দসই কয়েকখানা কাপড় কিনে মনটা বোধহয় খুশি হয়েছিল ভিতরমহলের। ব্রাহ্মণী এবার গৃহকর্তাকে ডেকে পাঠালেন ভিতরে।
বাইরে এসে ব্রাহ্মণ বললেন, বেলা যে অনেকটা গড়িয়েছে রে সুমঙ্গল। এতটা পথ যেতে হবে তোদের। পরিবারের ইচ্ছে, তোরা না হয় মুখে কিছু দিয়ে যা।
এ কথা শুনে হাঁ হাঁ করে বাধা দিয়ে উঠল তাঁতিবউ। তার আর দরকার হবে না পুরুতমশাই, বাড়িতে লোক বসে থাকবে পথ চেয়ে। আমরা বরং আজ ফিরেই যাই।
কমলা জানে বামুনবাড়িতে পাত পেড়ে খাওয়ার অসুবিধা অনেক। ছোঁয়াছুঁয়ি, ধোওয়া মোছা অনেক রকমের ঝক্কি সামলাতে হবে এখন তাদের। কিন্তু ভিতর থেকে মুখ বাড়িয়ে বাড়ির গৃহিণীও যখন পিড়াপিড়ি করলেন তখন আর কোনও আপত্তি টিঁকল না কমলার।
পাত পেড়ে তাদের খেতে বসতে হল উঠোনের একপাশে। তারা নিচু জাত। বামুনবাড়ির ঘরে বা দালানে তাদের খেতে বসার উপায় নেই। একজন দাসী এসে পাতায় করে ভাত আর ভাঁড়ে জল দিয়ে গেছে তাদের। অতিথিদের এমন আপ্যায়নের কথা কোনওদিন ভাবতেও পারে না সুমঙ্গল আর কমলা। কিন্তু এখন না বলবারও উপায় নেই তাদের। অনেকগুলো কাপড়চোপড় বিক্রি হয়েছে এদের বাড়িতে।
গরম ভাতের উপরে ঘি ঢেলে দিয়ে গেছে একজন দাসী। সঙ্গে দু'তিন রকমের তরকারি আর মাছ। মাছের বড়ো বড়ো টুকরো তিন চারটে করে একসঙ্গে দেওয়া হয়েছে পাতে।
সুমঙ্গল শুনেছে অন্যান্য জায়গায় নাকি ব্রাহ্মণরা মাছ মাংস স্পর্শ করেন না সারাজীবন। কিন্তু নদী নালায় ভরা এই প্রদেশে মাছ আর ভাতই হল প্রধান খাদ্য। এ ব্যাপারে এখানে বামুনে-চাঁড়ালে ভেদ নেই খুব একটা। শেষ পাতে তাদের দেওয়া হল মাটির ভাঁড়ে দুধ আর দই। সুমঙ্গল খেতে খেতে ভাবল এদের গোয়াল ভরতি দুষ্ট গোরুও তাহলে মিষ্টি দুধই দেয়।
উঠোনের এক কোণে তাদের খেতে দিলেও দালানের ওপাশ থেকে উঁকিঝুঁকি মেরে পুরোহিতগৃহিণী তাদের খাওয়াদাওয়ার তদারকি করেছেন কয়েকবার। এখানকার নিচু জাতের মানুষেরা এতেই অবশ্য নিজেদের জীবন ধন্য মনে করে।
খাওয়া দাওয়া সেরে তাঁতিপাড়ায় ফিরে আসতে সময় লেগে গেল খানিকটা। উমা তখন বাড়িতে ছটফট করছে একা। অরু এসে গুরুত্বপূর্ণ একটা খবর দিয়ে গেছে কোন সকালবেলায়। খবরটা এখনও কাহ্নুপাদকে জানানো হল না।
উমার মুখে কথাটা শুনেই কাঁধ থেকে কাপড়ের বোঝা নামিয়ে রেখে বেরিয়ে পড়ল সুমঙ্গল। উমার এখনও ভাত খাওয়া হয়নি দুপুরে। সে অপেক্ষা করছিল দাদা আর বউঠানের জন্যই। সকলে মিলে খেতে বসলে খাওয়ার স্বাদই যেন পালটে যায়।
কমলা আর দেরি করতে দিতে রাজি নয় তার ননদিনিটিকে। ভাত বেড়ে দিয়ে উমাকে এবার মৃদু বকুনি দিলেন কমলা। খেয়ে নে উমা। আর দেরি করিস না। বেলা যে পড়ে এল সেদিকে খেয়াল আছে?
উমা কিন্তু খেতে বসেও আনমনা হয়ে যাচ্ছে বারবার। মনটা তার ছটফট করছে কেবলই।
কিছুক্ষণ পরে হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকল সুমঙ্গল। চিন্তা নেই রে উমা। খবর নিয়ে দেখলাম হরিহর অমাত্যর তালুকেই কয়েকদিন ধরে রয়েছে কাহ্নুপাদ। চাষিপাড়ায়। অরু তো সেখানকারই কি একটা গণ্ডগোলের খবর দিতে চেয়েছে তাকে? আমার মনে হয় তার দরকার হবে না। উমা বলল, সে কী? অরু তাহলে জানে না তাদের বাড়ির অত কাছে রয়েছে কাহ্নুপাদ? সুমঙ্গল বলল, আমি ভাবছি অন্যকথা। তার বাবা যে এখনও সেটা জানতে পারেনি এই রক্ষে।
কমলা বলল, আহা। অরু কি আর সত্যি সত্যিই জানে না? না জানার ভান করে খবরটা একবার দিতে এসেছিল এখানে। আমাদের উমাকে তো একবার চোখের দেখা দেখতে পেল অন্তত।
উমা লজ্জা পেয়ে বলল, যাঃ বউঠান, কী যে বলো না!

ভুসুকুর গায়ের রংটা একটা সমস্যা তৈরি করে এসব সময়ে। ভুসুকু তার গানে অনেক সময়ে বলে 'রউতু ভনই'। এই 'রউত' বা 'রাউত' হল রাজপুত উত্তরাধিকারের শেষ চিহ্ন। তাদের পূর্বপুরুষেরা হয়তো অশ্বারোহী সৈন্য হিসেবে কখনও এসেছিলেন এই প্রদেশে। এখানকার জল হাওয়ায় মিশে গিয়েছে তাদের উত্তরসূরিরা।
কাহ্নর মতো ভুসুকু অতটা নিকষ কালো নয়। মাঠে ঘাটে লাঙল বলদ নিয়ে চাষও করেননি কোনওদিন। সারাদিনের রোদ্দুর তাই কখনও একটানা পোড়াতে পারেনি তাঁর গায়ের চামড়া। চাষাভুষোদের মধ্যে বসে থাকলেও আলাদা করে চিনে নেওয়া যায় তাঁকে। তাই তাঁকে থাকতে হয় একটু দূরে। অমাত্য হরিহরের এই তালুকদারিতে কয়েকদিন হল এসে রয়েছেন কাহ্ন আর ভুসুকু। কাহ্ন এখানে দিনরাতের ডেরা বেঁধেছেন। ভুসুকুর শুধু রাতটুকুর অবসর। দিনের বেলায় তাঁর অন্য আশ্রয় জুটেছে একটা।
হরিহরের তালুকে চাষিরা পড়েছে মহা সংকটে। এমনিতেই বৃষ্টি হয়নি এবার তেমন। গোটা ঋতুটাই শুখা গেছে। কুমিরের পিঠের মতো ফেটে চৌচির হয়ে আছে মাঠঘাট। ফসল জ্বলে শুকিয়ে গেছে মাঠেই। তাই বলে এখানকার ব্রাহ্মণ অমাত্য কর আদায়ে কিছু কম যায়নি। রাজার নাম করে শুল্ক আদায় করেছে কড়ায় গণ্ডায়।
গরিব চাষিদের এই অবস্থাটা অবশ্য খুবই চেনা কাহ্ন আর ভুসুকুর।
ছোটো ছোটো তালুকগুলিতে স্থানীয় তালুকদারেরা সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছে। আশেপাশের সব ছোটো রাজ্যগুলিতেই। বৌদ্ধ সহজিয়ারা এসব রাজ্যের অন্ত্যজ মানুষদের সঙ্গে মিশতে শুরু করেছেন বেশ কিছুদিন ধরেই। তাদের মধ্যে থেকেও অনেকে আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে সহজ সাধনায়। কেউ কেউ আবার গানের পদ রচনাও শুরু করেছে একটি দুটি। দরিদ্র মানুষের দুঃখ কষ্টের কথাকে উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে চর্যাগানে তৈরি হচ্ছে নতুন রূপক।
ভুসুকুর সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলতে বলতে তাদের বন্ধু ঢেনঢণ-এর একটি পদ মনে পড়ে গেল কাহ্নর। গুনগুন করে গেয়েও ফেললেন কিছুটা। ভুসুকু বললেন, ঢেনঢণপাদ? নতুন পদ বেঁধেছে নাকি? কই শুনিনি তো।
কাহ্ন বললেন, শোনো তবে—
টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী।
হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী।।
বেগ সংসার বড়হিল জাঅ।
দুহিল দুধু কি বেল্টে ষামাঅ।।
বলদ বিআএল গাবিআ বাঁঝে।
পিটা দুহিএ তিনা সাঁঝে।।
গরিব চাষিদের হাঁড়িতে ভাত নেই, নিত্য উপোসি থাকতে হয় তাদের। তার উপরে ঘরে আসে অতিথিরা। চাষের বলদগুলো ধুঁকছে। দু -একজনের ঘরে গাই গোরু ছিল। তাদের বাঁটের দুধ যেন বাঁটেই শুকিয়ে গেছে এবার। মানুষজন, গবাদিপশু, সকলেরই যেন শ্রীহীন দশা। চোর ডাকাতের উপদ্রবও বেড়ে গেছে চারপাশে।
অমাত্য হরিহরের তালুকে এসে গরিব কৃষকপল্লিতে ঢেনঢণের এই ছবি হুবহু মিলে যেতে দেখলেন কাহ্ন।
গানটা চুপ করে শুনে ভুসুকু বললেন, খিদের জ্বালা যেন জ্বালিয়ে দিয়েছে শব্দগুলোকে। জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগ না থাকলে এই পদ রচনা করা যায় না।
তীব্র দাবদাহে ঘাড়ে পিঠে ঘাম জমেছিল কাহ্নর। কবজির উলটো পিঠে সেটাকে মুছে নিয়ে বললেন, তত্ত্বটা কেমন গোপন করেছে দেখেছ? লোকে নিজেদের জীবনের কথা ভেবে গাইতে শুরু করবে এই গান। কিন্তু গান তাকে দুলিয়ে নিয়ে যাবে অন্য জায়গায়। লোকেরা নিশ্চয়ই ভাববে টোলায় বা লোকালয়ে আমার ঘর অথচ কোনও প্রতিবেশী নেই। হাঁড়িতে ভাত নেই অথচ নিত্য অতিথি—এসব কথার আসল মানে কী? আর ভাবতে ভাবতে একদিন নিশ্চয়ই তারা বুঝতেও শিখবে এই 'টাল' বা 'টোলা' হল মহাসুখচক্রে আসীন কোনও সাধকের ঘর। যেখানে কায়বাকচিত্তের প্রকৃতি দোষ লুপ্ত। যেখানে গ্রহণকারীর মন নিয়েও কোনও প্রতিবেশী নেই। লোকেরা একদিন নিশ্চয়ই বুঝবে 'হাঁড়ি' হল আমাদের দেহভাণ্ড আর 'ভাত' হল আমাদেরই বোধিচিত্তের কথা। সত্যি ভুসুকু, ঢেনঢণের কবিত্বশক্তির প্রশংসা না করে পারা যায় না।
ভুসুকু বললেন, কাহ্ন, কবিতাটায় হয়তো অর্থের অনেকগুলো স্তর রয়েছে। এর ব্যঞ্জনাও নিশ্চয়ই গভীর। কিন্তু তোমার কথার দ্বিতীয় অংশটায় আমার একটু আপত্তি আছে। খিদে মানুষের এমন একটা সংকট যার ভিতর থেকে তার মনকে অন্য কোথাও টেনে নিয়ে যাওয়া খুব শক্ত। তাছাড়া তোমার কি একথা মনে হয় না একজন দরিদ্র মানুষকে তার কঠিন অবস্থাটা চিনিয়ে দেওয়ার বদলে কোনও কবি যদি তার দারিদ্রকে কেবলমাত্র রসসৃষ্টির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেন, কবিতার কাছে সেটা একটা সংকট হয়ে দাঁড়িয়ে যায়?
কাহ্ন আর এই মুহূর্তে এ প্রসঙ্গে আলোচনায় উৎসাহ বোধ করলেন না। শুধু বললেন, পরে আবার কখনও এই নিয়ে কথা বলা যাবে ভুসুকু। এখানকার চাষিপাড়ায় থাকতে এসে আরও একটা সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। বেশিক্ষণ সেই সমস্যা থেকে নিজের মনকে সরিয়ে রাখতে পারছেন না কাহ্ন।
এই তালুকের চাষিপাড়ায় থাকে নিতাই। রসবতীর দোকানে মদ্যপানের আসরে কাহ্নর সঙ্গে তার আলাপ। তার কথা শুনে, গান গেয়ে ক্রমশ কাহ্নর ভক্ত হয়ে গিয়েছে নিতাই। নিতাইয়ের জোরাজুরিতেই কয়েকদিনের জন্য তার কুঁড়ে ঘরে থাকতে আসা কাহ্নর।
নিতাই আর তার বউয়ের গরিব সংসার। কাহ্ন বুঝতে পারেন নিজে না খেয়েও কোনও কোনও দিন নিতাইয়ের বউ ভাত বেড়ে দিয়েছে তাঁকে। আতিথেয়তার এই আবেগে কয়েকদিনের জন্য বাঁধাই পড়েছেন কাহ্ন।
আশপাশের মানুষজনের সঙ্গে জমেও গিয়েছে আলাপ। খেত খামারের কাজ সেরে কোনও কোনও দিন গান শোনাতে হয় তাদের। কথা বলতে হয়।
কাহ্ন বোঝেন পাপপুণ্যের ভয় কেবলই তাড়িয়ে বেড়ায় মানুষগুলোকে। বড়োমানুষের ঘরের ঠাকুর, দেবতা, যজ্ঞ আচার—এসবই তাদের দূর থেকে দেখা একটা ভয়ের জিনিস।
কাহ্ন বলেন, ওসব কথা না ভাবলেও তো চলে তোমাদের। তোমরা যে যার মতো বেঁচেবর্তে আছ, তেমন করে থাকলেই তো পালন করা হয় ধর্ম। সংসারে যে যার কাজে থেকেও সাধনা করতে পারে। এ জন্যে ঠাকুর দেবতা, যজ্ঞ আচারের কোনও প্রয়োজন পড়ে না।
এসব কথা বলতে বলতে তাদের মনে জমে ওঠা একটা গোপন ক্ষোভের আঁচ পেয়েছেন কাহ্ন। তার সহজ সরল কথাবার্তা শুনে সেই ক্ষোভ ক্রমশ দানা বেঁধেছে। কাহ্ন পড়ে গিয়েছেন নতুন একটা সংকটে।
অনাবৃষ্টির জন্য বরাবরই একটি রাত্রি উৎসব করে থাকে এখানকার কৃষকপল্লির বাসিন্দারা। ওদের বিশ্বাস এতে আকাশ নাকি খুশি হয়ে বৃষ্টি পাঠিয়ে দেয় মাটির বুকে।
যৌবনবতী কৃষকরমণীরা সেই রাতে সকলে ছুটে যায় মাঠে মাঠে। তাদের সঙ্গে জুটে যায় তাদের জুড়িরাও। কাহ্ন বুঝতে পারেন জমি আর নারী, বীজ আর বীর্যের ধারণা একাকার হয়ে মিশে আছে ওদের এই অন্ধকারের আহ্বান উৎসবে। কিন্তু একথাও ঠিক শ্রম আর কামের ধারণা দিয়ে গড়া এই উৎসবের সৌন্দর্য হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব নয় কোনও নাগরিক ভদ্রজনের পক্ষে।
ক্ষমতাবান ভূস্বামীরাও মানতে পারছেন না এদের এই উৎসবের আদিমতা। ভূস্বামীদের সঙ্গে মাটির সম্পর্ক হল অধিকারের। মাটিকে তারা চেনেন দলিল পাট্টার মধ্যে দিয়ে। কিন্তু ভূমিহীন কৃষকের দল মাটিকে ভালোবাসে শ্রমের ভাষায়। সেই ভাষাকে ভূস্বামীরা এবার অনুবাদ করে নিতে চান নিজেদের আঙ্গিকে।
এখানে এসে কাহ্ন শুনলেন চাষাভুষোদের মুখে—বৃষ্টির আশায় তারা এখানে যে রাত্রি উৎসবের আয়োজন করেছিল তাতে বাধ সেধেছেন ব্রাহ্মণ অমাত্য হরিহর। তার লোকজনেরা কৃষকপল্লিতে এসে কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়ে গেছে—দ্বাদশ ব্রাহ্মণ ডেকে এনে অনাবৃষ্টির জন্য এবার হোমযজ্ঞ করাতে হবে সেদিন। যজ্ঞের খরচ আর ব্রাহ্মণদের প্রণামী সবটাই জোগাড় করতে হবে নিজেদেরই। এর সঙ্গে অবশ্য আর একটা কথাও জুড়ে দিয়েছে হরিহরের লোকজনেরা—এ আদেশ নাকি এখানকার রাজা মণিভদ্রেরই আদেশ।
কাহ্ন বুঝলেন এক ঢিলে দুই পাখি মারার কথা ভাবেন হরিহর। এ বারেও চাষিদের চটিয়ে রাজার জনপ্রিয়তা নষ্ট করতে চাইছেন তিনি। একই সঙ্গে হোম-যজ্ঞ-আচার প্রথায় টেনে নিয়ে সে গরিব মানুষের মধ্যে সহজিয়াদের গ্রহণযোগ্যতাকেও ঠেকাতে চাইছেন কিছুটা।
ভুসুকুর কাছে কথাটা একবার পেড়ে দেখলেন কাহ্ন। ভুসুকু বললেন, এখন আর পিছিয়ে আসার কোনও উপায় নেই কাহ্ন। ভয় তাড়াতে হবে ওদের মন থেকে। আমাদের সহজ সাধনার সব কথা হয়তো সকলকে এই মুহূর্তে বলা যাবে না, কিন্তু ওদের ধর্মপালন যে ওদের মনের মতো করেই করা যেতে পারে—সেটুকু তো অন্তত বলা যাবে। পরদিন থেকেই কাজে নেমে পড়লেন ভুসুকু। চাষাভুষোদের জটলায় শোনাতে লাগলেন দারিকপাদে একটা গানের পদ—
কিন্তো মন্তেঁ কিন্তো তন্তেঁ কিস্তো রে ঝাণবখানে।
অপইঠান মহাসুহলীলে দুলখ পরমনিবাণেঁ।।
কি হবে মন্ত্রে কি হবে তন্ত্রে ধ্যানে আর ব্যাখ্যানে
মহাসুখ পেলে তবে অধিকার জন্মায় নির্বাণে।
দু-একজন সরলসিধে লোক জুটে গেল যারা জানতে চাইল, আচ্ছা ভুসুকু, তোমাদের গানে ওই যে মহাসুখ আর নির্বাণ কথা দুটো তোমরা বলছ, ওইগুলো আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না। সাদা করে বুঝিয়ে বলো দেখি আমাদের।
বেশিরভাগ লোকই বলল, অতশত কথার দরকার কী বাপু আমাদের? মোদ্দা কথা হল ব্রাহ্মণদের ওসব যাগযজ্ঞে আমাদের কোনও দরকার নেই। গাঁটের কড়ি খরচ করে আমরা ওদের পেট ভরাতে যাবই বা কেন? আমরা যা করি তাই করব। মাঠে গিয়ে চাঁদ জ্যোৎস্নার নীচে আমরা বীজ ঢেলে দেব আমাদের ঘরের সব মেয়েমানুষের শরীরে। মাটিও তো মেয়েমানুষ। সেও নিশ্চয় গর্ভবতী হয়ে উঠবে এতে। নতুন দুধের ঢল আসবে ফসলের দানায় দানায়। পাপ পুণ্যের ভয় ভুলে, যাগ যজ্ঞের মোহ ভুলে, সকলে এবারে মেতে উঠল তাদের রাত্রি উৎসবের আয়োজনে।
কথাটা কানে গেল হরিহরের। এই অবাধ্যতা পছন্দ হল না তাঁর। হরিহর ঠিক করলেন যে করেই হোক ওদের এই অমান্য করবার স্পর্ধাকে দমিয়ে দিতে হবে। দরকার হলে গায়ের জোরে। এসব কথা চিন্তা করে অরুকে একদিন ডেকে পাঠালেন হরিহর। বললেন, তোমাকে একটা কাজের দায়িত্ব দিতে চাই।
অরু তো অবাক। সে তার বিদ্যাচর্চার শখ আহ্লাদ নিয়ে পড়ে থাকে বাড়ির একপাশে। পিতা হরিহর খুব একটা আমল দেন না পুত্রকে। খোঁজখবরও প্রায় রাখেন না বললেই চলে। আজকে হঠাৎ হরিহর নিজে থেকে ডেকে তালুক সংক্রান্ত কোনও কাজে দায়িত্ব দিতে চাওয়ায় খানিকটা কৌতূহল বোধ করল অরু।
হরিহর তখন বসেছিলেন তাঁর কাছারি ঘরের বাইরে এক মস্ত দালানে। ভীম নামে একটা ষণ্ডামার্কা লোক তৈলমর্দন করছিল তাঁর অনাবৃত পিঠে। মোটাসোটা উপবীতটা গলার কাছে একটা অতিরিক্ত পাক দিয়ে কিছুটা জড়িয়ে রেখেছেন হরিহর। বাকিটুকু লেপটে রয়েছে তাঁর তৈলাক্ত শরীরে।
হরিহরের কাঁধ আর ঘাড়ের পাশে আঙুলের ছোঁয়া লাগিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে মর্দন করে চলেছে ভীম। ভীমের বিশাল দুটো বাহুতে পেশিগুলো নেচে চলেছে সমানে। মাঝে মাঝে সে মুচড়ে নিচ্ছে তার পুরুষ্টু গোঁফজোড়া।
আয়েশে চোখ বুজে রয়েছেন হরিহর। চোখ বুজেই তিনি কথা বলছিলেন অরুর সঙ্গে।
অরু কৌতূহলী গলায় বলল, কাজটা ঠিক কী করতে হবে সেটা জানাতে পারেন আমাকে?
হরিহর বললেন, কাজটা এমন কিছু নয়। সামনের পূর্ণিমায় ভীম চাষিপাড়ায় যাবে। কয়েকজন লেঠেল পেয়াদা নিয়ে। রাত্রিবেলায় আর মাঠে ঘাটে নামতে দিয়ো না চাষিদের। ওদের অনাচারে কুআচারে ভরে উঠেছে আমাদের তালুক। এসব ঠেকিয়ে দেবদ্বিজে ভক্তি ফেরাতে হবে ওদের। আপাতত এটুকুই আমাদের কাজ। আমাদের শাস্ত্র, আচার— এসব নিয়ে তোমার আগ্রহ তো কিছু কম নয়। সেজন্য ঠিক করলাম দায়িত্বটা তোমাকেই দিই।
চাষিপাড়ার গণ্ডগোলের সব কিছুই জানা ছিল তার। হরিহরের প্রস্তাবে তাই এককথায় রাজি হয়ে গেল অরু।

বিকেল থেকেই থমথম করছে চাষিপাড়া। হরিহরের লেঠেল পেয়াদারা এসে আজ সকালে হাঁকডাক করে গিয়েছে একপ্রস্থ। প্রতিবার কর হিসেবে যখন তারা ফসলের ভাগ নিয়ে যায় তখন কেবল তাদের দলবেঁধে আসতে দেখা যায় এ তল্লাটে।
লেঠেলদের সর্দার হল ভীম। সে হল হরিহরের একেবারে খাস অনুচর। তাগড়াই চেহারা। পাকানো দুটো মোচ। খাঁজকাটা হাতের গুলি। লাঠি হাতে নিয়ে ভীমের দাপট বেশ কয়েকবার দেখেছে এখানকার লোকজন। ভীমের সঙ্গে থাকে তার পঁচিশ তিরিশজনের মতো স্যাঙাত। তারাও কেউ কিছু কম যায় না। আজ সকালে দলবেঁধে ঘুরপাক খেয়েছে তারা এখানে। লোকজনের মুখে তাই টুঁ শব্দ নেই। চুপচাপ রান্নাবান্না সেরেছে সকলে। যে যার কাজে বেরিয়েছে, তারপর যে যার কুঁড়েতে ঢুকে পড়েছে একে একে।
নিতাইয়ের ঘরেও আজ থমথম করছে সকলের মুখ। কাহ্ন অবশ্য নির্বিকার। কেবল একটা কথা নিতাইয়ের মুখে শুনে কৌতূহল বোধ করেছেন তিনি। নিতাই বলেছে লেঠেল পেয়াদার দলের সঙ্গে হরিহরের ছেলেকেও না কি ঘুরতে দেখা গেছে গাঁয়ে। ভালোমানুষটি সেজে তোমার সঙ্গে সে যে আলাপ জমাতে আসে বড়ো? তা হলে আমাদের হুমকি দেয় কেন?
দুপুর গড়াতে ভুসুকু পা বাড়িয়েছেন রাজনগরের জেলেপাড়ার দিকে। কাহ্ন এখানে এখন থাকছেন বটে কিন্তু ভুসুকুর থাকার উপায় নেই। যাওয়ার পথে তাঁতিপাড়ায় সুমঙ্গলের বাড়িতে একবার ঘুরে যেতে হবে। অরুর কথাটা ওদের একবার জানানো দরকার। আলোয় আলোয় তাই ভুসুকু পা বাড়ালেন রাজনগরের দিকে। কাহ্ন অবশ্য যেতে চাননি নিতাইকে ছেড়ে। অন্তত আজকের রাতটুকু নিতাইয়ের কাছে থেকে যেতে চান তিনি। মনটা খুব একটা ভালো নেই নিতাইয়ের। বারবার বলছে, তোমরা এত চেষ্টা করলে কাহ্নুপাদ কিন্তু আমাদের চাষাভুষো লোকগুলো বড়ো ভীতু। মায়ের দুধ খায়নি বোধহয় পেট ভরে। নইলে পেয়াদারা হুমকি দিল আর আমরা ঢুকে এলাম যে যার ঘরে।
নিতাইয়ের বউও আজ ভোর থেকেই আনন্দে ছিল খুব। নিতাইকে যত্ন করে দুধ চিঁড়ে খাইয়েছে। বারবার আঁচলে মুছিয়ে দিয়েছে তার ঘাম। কাহ্ন লক্ষ করেছেন তার এই আহ্লাদীপনা। চাঁদের আলোয় ধুলোমাটিতে শুয়ে নিতাইয়ের সোহাগ পেতে চায় সে প্রাণভরে।
কাহ্ন বোঝেন ওদের আড়ম্বরবিহীন এই সাদামাটা জীবনে আজকের রাতটুকু প্রায় স্বপ্নের মতো। ওদের চোখে শস্যের দানার মতো দু'ফোঁটা খুশি চিকচিক করতে দেখেছেন কাহ্ন।
কিন্তু একসময় পেয়াদাদের হুংকারে নিভে গিয়েছে ওদের চোখের সেই আলো। অমাবস্যার মতো থমথমে হয়ে গিয়েছে সকলের মুখ। কেবল নিতাই বলে চলেছে একটানা, আমরা তোমাদের মান রক্ষা করতে পারলাম না কাহ্নুপাদ। সে জোরই নেই আমাদের পাঁজরে।
কাহ্ন বলেছেন, ও নিয়ে আর বেশি চিন্তা কোরো না নিতাই। পরে কখনও আবার না হয় আয়োজন কোরো তোমরা। তবে ওদের যা মরিয়া অবস্থা দেখছি নিতাই, তোমাদের বোধহয় লুকিয়ে ফেলতে হবে তোমাদের পালা পার্বণ। ওরা জানতে পারলেই বাধা দেবে।
চাষিপাড়ার আনাচে কানাচে ধীরে ধীরে লুকিয়ে পড়েছে দিনের আলো। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমেছে। চালায়, কুঁড়েতে, কেউ আজ আলো জ্বালেনি সন্ধেবেলাতেও।
এত চেষ্টা করেও কিন্তু মনখারাপ লুকোতে পারেনি চাষিপাড়া। রাত গড়াতেই ধপধপে চাঁদের আলোয় ভেসে উঠেছে তার মনমরা নিঝুম রূপ। এ যেন এক মৃতের পল্লি। কোথাও যেন কোনও প্রাণের সাড়া নেই। চাঁদের আলো আগে কখনও এমন সুন্দর, অমন অসহ্য লাগেনি কাহ্নর কাছে।
ঠিক এমনই সময়ে নিতাইয়ের মাটির উঠোনে জ্যোৎস্নার ভিতরে এসে দাঁড়িয়েছে আরও দুটি চন্দ্রকলা। দুজন আলোর পরি যেন আজ ডানা ঝাপটে উড়ে এসেছে নদীর ওপার থেকে। উমা। উত্তেজিত, বিধ্বস্ত, শ্রান্ত উমা। তার হাত ধরে রয়েছে ডোম্বিনী।
কাহ্ন বিস্মিত হয়েছেন, তোমরা এখানে? এত রাতে এলেই বা কেন?
বিরক্ত মুখে উত্তর দিয়েছে ডোম্বিনী, কী করব? উমা গিয়ে কেঁদে পড়ল আমার ঘরে। কত বোঝাই, মেয়ে কিছুতেই ছাড়ে না। ভুসুকুর কাছে কী সব খবর পেয়েছে। কেবল বলে, আমাকে অরুর কাছে নিয়ে চলো। কাহ্নুপাদের কাছে নিয়ে চলো। এত রাতে ঘাট থেকে নৌকো খুলে বের হয়ে আসা কি মুখের কথা? তোমাদের যে কী সব কাজ কারবার কিছুই বুঝতে পারি না আমি।
উমা কেঁদে পড়েছে কাহ্নুর পায়ে। অরুর কাছে আমাকে তুমি নিয়ে চলো কাহ্নুপাদ। আমি তাকে বারণ করব এ কাজ করতে।
কাহ্ন বললেন, সে তোমার বারণ শুনবে কেন?
উমা বলল, নিশ্চয়ই শুনবে। আমি তার হাতদুটো ধরে মিনতি করব।
ডোম্বিনী বলল, আমি ওসব ধরাধরির মধ্যে নেই কিন্তু। আমাকে নিয়ে আসতে বলা হয়েছে তাই এসেছি।
কাহ্ন বললেন, ভাগ্যিস এসেছ। সেই জন্যই তো গভীর রাতের নদীটিকেও একবার ছুঁতে পারলে দাঁড় দিয়ে।
এইসব কথাবার্তার মাঝখানে চাষিপাড়ার হাঁক শোনা গেল পাইক লেঠেলদের। পূর্ণিমার রাতের নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে তাদের আওয়াজ ছড়িয়ে পড়েছে আনাচে কানাচে। উঁচু গলায় তারা তর্কাতর্কি শুরু করেছে নিজেদের ভিতরে।
ব্যাপার স্যাপার উঁকি দিয়ে দেখতে একজন দুজন করে পথে নেমে এসেছে চাষিপাড়ার মানুষজন।
চাষিপাড়ায় আজ কোনও সাড়াশব্দ নেই। আজ রাতে আর তারা বাইরে বেরোবে না নিশ্চয়ই। অরু তাই বাড়ি পাঠিয়ে দিতে চায় লেঠেলপাইকদের।
প্রথমে আপত্তি করলেও ফিরে যেতে রাজি হয়ে গেছে অনেকেই। কিন্তু বাদ সেধেছে ভীম। কিছুতেই আজ রাতটুকু এখান থেকে যেতে চায় না সে। অরুর সঙ্গে এই নিয়ে জোর গলায় বাধিয়ে দিয়েছে তর্কাতর্কি।
তাদের তর্কাতর্কির ভিতরেই একজন দুজন করে লাঠি নামিয়ে ফিরতে শুরু করেছে পেয়াদারা। তারা বেতনভোগী। এসব নিয়ে তাদের আলাদা কোনও মাথাব্যথা নেই। তারা জানে এ জন্য যদি হরিহর রেগেও যান তবে তাদের ঘাড়ে কোপ পড়ার কোনও ভয় নেই। হরিহরের নিজের ছেলেই তাদের ফিরতে বলেছে ঘরে।
একজন দুজন করে গোটা চাষিপাড়া ক্রমশ জড়ো হয়েছে ভীম আর অরুকে ঘিরে। ভীম কিছুটা গোঁয়ার বটে কিন্তু চটজলদি পরিস্থিতির আঁচ করতে জুড়ি নেই তার। ভীম দেখল তার জন্য কোনও লেঠেল আর দাঁড়িয়ে নেই। চাষিপ্রজাদের সকলেই এখন অরুর দিকে। দাঁত চেপে এই অপমান সহ্য করে সে তখন বেরিয়ে গিয়েছে চাষিপাড়া ছেড়ে। যাবার আগে অরুর দিকে আঙুল তুলে শাসিয়েছে, কাল সকালে এর একটা হেস্তনেস্ত সে করে ছাড়বে।
তুমুল হল্লায় মাদল বেজে উঠেছে কৃষকপল্লিতে। মেয়ে মরদ সব একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে ছুট লাগিয়েছে মাঠের দিকে। একের গলায় জড়ানো অন্যের হাত। একের চোখে মাখানো অন্যের নেশা।
সকলের সামনেই বউকে পাঁজাকোলা করে উঠোনে একপাক ঘুর্ণি লাগিয়ে দিয়েছে নিতাই। গালে গাল ঘষেছে সোহাগ ভরে। তারপর কাহ্নর দিকে একবার তাকিয়ে ফিক করে একটু হেসে বউয়ের হাত ধরে ছুট লাগিয়েছে মাঠের দিকে।
কাহ্ন চেঁচিয়ে বলছেন, শোন নিতাই, ওরে শুনে যা রে, আমি আজ চলে যাচ্ছি তোদের এখান থেকে। নৌকো এসে গেছে আমার।
কিন্তু কে শোনে কার কথা। পল্লি ছাড়িয়ে তখন মাদলের শব্দ আবছা হয়ে এসেছে জ্যোৎস্নামাঠের ওপারে।
কাহ্ন বলছেন, নৌকো কি তুমি ঘাটে বেঁধে এসেছ ডোম্বিনী?
ডোম্বিনী বলে, হ্যাঁ কাহ্নুপাদ। চলো আমরা পা চালাই। ওরা না হয় আসুক পিছনে পিছনে। বাব্বা, উমার যা কান্না।
কাহ্ন আর ডোম্বিনী এগিয়ে যেতে উমার দিকে তাকিয়ে কৌতুক করে অরু, মাঠের দিকে একবার যাবে না কি উমা?
উমা বলে, ওরা সবাই ওখানে এ ওকে আদর করছে এখন। ওসব দেখতে আছে নাকি?
অরু বলল, ওদের দেখবে কেন? আমিও আদর করব তোমাকে। ওদের মতন করে। মাটির উপর শুইয়ে নিয়ে। চাঁদের আলোয় ভিজিয়ে।
উমা বলে, ধ্যাৎ। আমাদের বিয়ে হয়েছে না কি?
অরু বলে, ওদেরও যে সকলের বিয়ে হয়েছে তা নয়। এখনও ঘর বাঁধেনি তবে পরে ঘর বাঁধতে পারে এমন অনেকেই আজ মাঠে গেছে জোড়া বেঁধে। আবার এমন জোড়াও গেছে যারা কখনওই হয়তো ঘর বাঁধবে না, কেবল আজকের রাতটা বেঁধে বেঁধে থাকবে দুজনের আদরে।
উমা বলে, না গো। বিয়ে না করে ওসব করতে আমার ইচ্ছে হয় না। ভয় করে ভীষণ।
উমা এবারে ঘন হয়ে ডাকে, এই অরু।
অরু আনমনা সাড়া দেয়, উঁ।
তুমি কি সত্যিই আজ আমাকে নিয়ে মাঠে যেতে চাও ওদের মতো করে?
অরু এবার বলে, না উমা, তোমার সঙ্গে মজা করছিলাম। বিয়েটা আমার কাছেও একটা পবিত্র জিনিস। আমি আগুনের দেবতাকে সাক্ষী রেখে তোমার দায়িত্ব নিতে চাই।
তোমার বাবা যদি আপত্তি করেন?
কেন? আমাকে তোমার বিশ্বাস হয় না?
উমা ঘাড় নেড়ে বলে, হুঁ।
তাহলে সত্যি করে বলো এবারে, আজ এখানে ছুটে এসেছ কেন? তুমি কি ভেবেছিলে অমাত্যের লোকজনেদের সঙ্গে জুটে গিয়ে আমি কাহ্নুপাদের মাথায় লাঠি চালাব?
চলতে চলতে এবারে হঠাৎ থেমে যায় উমা। বলে, আমাকে তুমি ক্ষমা করো অরু। আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম। উমার মাথা এবারে নেমে আসে অরুর বুকে।
অরু আলতো হাত রাখে উমার মাথায়। বলে, চলো উমা, ডোম্বিনী যা মুখরা। আমাদের অপেক্ষা না করেই নৌকো হয়তো ছেড়েই দেবে সে।
উমা বলে, তুমি আবার কোথায় যাবে? থাকবে না এখানে?
অন্তত কয়েকটা দিন তো গা ঢাকা দিতেই হবে। কাল সকালেই ব্রাহ্মণ অমাত্যের মুখোমুখি দাঁড়ালে তার লোকজনেদের সব কটি লাঠিই তিনি আমার পিঠে ভাঙবেন।
কোনও পাকা ঘাট নেই এই তালুকের চাষিপাড়ায়। জলকাদা সামলে অরু আর উমা কোনওরকমে নৌকোয় উঠতেই খুঁটিশুদ্ধ কাছিটা উপড়ে নিয়ে নৌকো ছেড়ে দেয় ডোম্বিনী। চাষিপাড়ার জ্যোৎস্নামাখানো গাছগাছালি মিলিয়ে যায় দূরে। মাঝনদীতে টলোমলো করে নৌকো।
অরু বলে, আমার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছে কাহ্নুপাদ। বলব?
কাহ্ন বলেন, বলো।
অরু বলে, কৃষকদের এই যে রাত্রি উৎসব, এ তো ফসলের ধারণায় গড়া। সন্তানের কামনায় মধুর। কিন্তু আপনাদের গানে আপনারা যে মহাসুখে পৌঁছোনোর কথা বলেন সে তো জন্মের বিরোধী। আপনারা তো সৃষ্টির কথা বলেন না কাহ্নুপাদ। বলেন সংবরণের কথা। বীজ আর বীর্যধারা থেকে তা অনেক দূরের। এই পৃথিবীর প্রাণের প্রবাহের সঙ্গে তার সংগতি কোথায়?
কাহ্ন অরুর প্রশ্ন শুনে স্মিত হাসলেন কিন্তু কোনও উত্তর দিলেন না। কেবল তাকিয়ে রইলেন দূরের দিকে।
অসংখ্য ঢেউয়ের মাথায় মাথায় এখন ভাঙচুর চলেছে জ্যোৎস্নার। লক্ষ লক্ষ জলজ প্রাণী যেন আদিম পৃথিবীর অথৈ জলে নেচে উঠেছে হঠাৎ। এক অদ্ভুত মায়াবী উৎকণ্ঠায় কেউ কোনও কথা বলতে পারে না অনেকক্ষণ।
এক সময় এই অসহ্য নীরবতা ভাঙে অরু। কুণ্ঠিত হয়ে জিগ্যেস করে, আপনি কি আমার উপর ক্রুদ্ধ হয়েছেন কাহ্নুপাদ?
কাহ্ন বললেন, না তো।
তাহলে আনমনা হয়ে কী ভাবছেন এত?
কাহ্ন বলেন, আমি ভাবছি শরীরকে ঘিরে চাষিপাড়ার মানুষগুলোর আবেগের কথা। জানো অরু, আমার এক এক সময়ে মনে হয় শরীরকে বাদ দিয়ে মানুষের কোনও সাধনাই বোধহয় সম্পূর্ণ হবার নয়।

পরদিন সকালে হরিহর শুনলেন কৃষকরা তাদের উৎসব পালন করেছে যথারীতি। লেঠেল পেয়াদারা এসে বলল, আমাদের কোনও দোষ নেই কর্তামশাই। আমরা চেষ্টা করেছিলাম। ঠিক সময়ে হাজির হয়েছিলাম লাঠি হাতে।
দোষ যে কার সেটা ভালো করেই হরিহরকে বুঝিয়ে বলল ভীম। উমাকে সে চেনে না। কিন্তু কাল রাতে তর্কাতর্কির সময় অচেনা একটা মেয়ে যে হাত ধরে টেনে অরুকে থামাতে চাইছিল বার বার, সে ঘটনা তার নজর এড়ায়নি।
ভীম বলল, আমার মনে হয় কর্তামশাই, চাষিপাড়ার কোনও মেয়েমানুষের রসে মজেছেন আমাদের ছোটোকর্তা। কাল রাতে বোধহয় তিনিও ছুটেছেন মাঠে।
ব্রাহ্মণ অমাত্যের গলায় তখন সংস্কৃত শ্লোকের বদলে দেশীয় ভাষায় গালিগালাজ। খাঁচায় আটকানো সিংহ যেন ঘড় ঘড় করে ফুঁসে উঠছে বার বার।
সকালবেলাতেই পঞ্চাশজন লেঠেলপেয়াদা নানাদিকে ছুটল কাহ্নর সন্ধানে। একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে কাহ্ন। হরিহর এবার এর একটা শেষ দেখতে চান।
কাহ্ন তখন ভেসে পড়েছেন হরিহরের তালুক ছেড়ে। ডোম্বিনী দাঁড় বেয়ে চলেছে একটানা। বেচারি অরু আর উমা রাত জাগার ক্লান্তি নিয়ে বসেছিল। ভোরের ঠান্ডা হাওয়া তাদের ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে নৌকোর পাটাতনে।
ডোম্বিনীর নৌকো কিন্তু ভিড়তে পারল না রাজনগরের খেয়াঘাটে। শোনা গেল আরও কয়েকজন ভূস্বামী অমাত্যের চাপে পড়ে ঘাটের কাছে সৈন্য সান্ত্রী সাজিয়ে রেখেছেন রাজা মণিভদ্র। কাহ্ন এলেই যেন তাকে ধরে পুরে দেওয়া হয় রাজনগরের কারাগারে।
এই খবর নিয়ে মাঝনদীতে ডোম্বিনীর নৌকোর গায়ে এসে ভিড়ল একটা ছোট্ট জেলে ডিঙি। বলাই। ডোম্বিনীর নাচের দলের বাজনদার। বরাবরই ডোম্বিনীর সঙ্গে আনন্দে বিপদে সংগত করেছে সে সঠিক তালে। তাকে অবশ্য আজ এই মাঝনদীতে পাঠিয়ে দিয়েছে ভুসুকু। বলাইয়ের বউয়ের সঙ্গে এখন ভুসুকুর বেজায় ভাব। বলাইও খুব খুশি। ডোম্বিনীর সঙ্গে রাতবিরেতে ঘুরে বেড়ালে বউ আর অশান্তি করে না আগের মতো।
মাঝনদী থেকেই দেখা গেল ঘাটপারের সৈন্যসজ্জা। বিন্দু বিন্দু। কিন্তু অসংখ্য।
কাহ্ন বুঝলেন এখান থেকে তাকে পাততাড়ি গোটাতে হবে এবার। ক্রমশই ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছে ব্রাহ্মণরা। নাগরিক ভদ্রজনও তাদেরই পক্ষে। সহজিয়াদের চর্যাগান তারা মুছে দিতে চায় অন্ত্যজ মানুষদের মন থেকে। কাহ্ন বললেন, ডোম্বিনী, আমাকে এবার যেতে হবে দক্ষিণের সমুদ্রতীরের কোনও প্রদেশে। সেখানে কোনও একটা আশ্রয় নিশ্চয়ই জুটে যাবে আমাদের। অরুকেও মনে হয় কিছুদিন থাকতে হবে বাইরে। প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছে হরিহরের চোখে। খেপে উঠেছে ভূস্বামীর দল। মাটিকে যারা অধিকার করে থাকে—সম্পর্কের চেয়েও সম্পত্তি তাদের কাছে অনেক বড়ো। পিতা হলেও হরিহরকে এখন ভরসা করা উচিত নয় অরুর। উমাও বলল, তুমিও এখন দূরে কোথাও চলে যাও অরু।
বলাইয়ের ছোট্ট ডিঙিটায় উঠে এলেন কাহ্ন। তারপর হাত ধরে টেনে নিলেন অরুকেও। বলাই ফিরে পেল তার ডোম্বিনীর নৌকো।
খেয়ানৌকোর গা থেকে ঢেউয়ের দোলায় ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল ছোট্ট জেলেডিঙিটা।
একটুও কষ্ট হচ্ছে না ডোম্বিনীর। শান্ত সহজভাবে নৌকোর হাল ধরে সে যেন উদযাপন করছে এই বিচ্ছেদ।
কষ্ট হচ্ছে না কাহ্নরও। উদাসীন দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে আছেন অগাধ জলরাশির দিকে। খুঁজে দেখছেন দক্ষিণ প্রদেশ থেকে আসা কোনও ব্যাপারীদের নৌকো চোখে পড়ে কিনা।
কেবল অরু আর উমা চোখে চোখে তাকিয়ে রয়েছে যন্ত্রণা বুকে চেপে। দুটো নৌকো দূরে চলে গিয়ে একজনের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অন্যজনকে। চোখে জল ভরে আসে তাদের। তারপর দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে দুজনেরই।

দক্ষিণপ্রদেশের ব্যাপারীরা আগ্রহভরেই জেলে ডিঙি থেকে অরু আর কাহ্নকে তুলে নিয়েছিল তাদের একটা বড়ো নৌকোয়। সাত আটটা বড়ো নৌকোর একটা দল ফিরছিল নদীপথে। সমুদ্রের খুব কাছেই নাকি ঘরবসতি ওই মাঝিমাল্লাদের। ওরা বলেছিল গভীর সমুদ্রের নাকি ওটাই রীতি। বিপদে পড়লে এক জলযান হাত বাড়িয়ে ধরে নেয় অন্য জলযানের মাল্লাদের বাড়িয়ে দেওয়া হাত। দু-তিনটে দিন তাদের সঙ্গে গানে আর গল্পগুজবে বেশ মিশেও গিয়েছিল তারা। কখনও কাহ্ন গান ধরেছেন, দাঁড় টেনেছে মাঝিরা। কখনও হালে বসেছেন কাহ্ন আর অরু, ভাটিয়ালিতে সুর তুলেছে কোনও মাল্লা।
তৌলিক সুবন্ধুও চলেছিল এই ব্যাপারী নৌকোর দলে ভিড়ে। সে হল গুবাকের ব্যাপারী। তার সুপারি বোঝাই নৌকো সে উজাড় করে এসেছে রাজনগরে। লাভের কড়ি গুনে নিয়েছে মন ভরে। ফেরার পথে নৌকোয় ভরে নিয়েছে তাঁতের কাপড়।
কাহ্নর গান খুব পছন্দ হয়ে গেল সুবন্ধুর। এসব গানের অনেকগুলো তার চেনা। নদীপথে যাওয়া আসার সময় মাঝি মাল্লাদের মুখে শুনেছে একটা দুটো। সুবন্ধুর স্ত্রীর নাকি গানের গলাও ভালো। সংগীতে তাই সুবন্ধুর আগ্রহ প্রবল।
দু-তিন রাত নদীর বুকে কাটার পর এক উজ্জ্বল সকালে সুবন্ধু এসে হাত রাখল কাহ্নর কাঁধে। ব্যাপার কী বন্ধু? কোথায় চলেছ তোমরা দুজনে মিলে?
কাহ্ন বললেন, সে অনেক বড়ো কাহিনি তৌলিক। আমাদের মতো সামান্য মানুষদের জন্য কি তোমার অতটা সময় নষ্ট করা চলবে?
তৌলিক বললেন, যারা এত ভালো গান গাইতে পারে তারা কখনও সামান্য হয় না বন্ধু। সব দেশেই তাদের আদর জুটে যায়। বিপদে পড়ে নৌকোয় উঠে পড়েছ আমাদের। জানি না তোমরা কোথায় যেতে চাও। কিন্তু বরাবরই আমি মাঝনদীর বিপদকে ডেকে তুলতে ভালোবাসি আমার ঘরে। আপত্তি না থাকলে অন্তত কয়েকদিনের জন্য আমাদের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করো তোমরা। কয়েকটি দিন থেকে, গান শুনিয়ে তারপরে না হয় চলে যেয়ো যেখানে যাওয়ার।
আশ্রয়ের এমন অযাচিত সুযোগ ছেড়ে দিলেন না কাহ্ন। বললেন, ঠিক আছে সুবন্ধু। তুমি যখন বন্ধু বলে ডেকেছ তখন আর না বলি কী করে।
সুবন্ধু বললেন, তুমিও ডেকেছ। আমার নাম ধরে ডাকলেই যে কোনও লোকের বন্ধু হয়ে যাই আমি।
কাহ্ন রসিকতা করে বললেন, তা ঠিক, তবে তুমি ভালোমন্দ বিচারের সুযোগ দিতে চাও না কারোকে। ইচ্ছে করে নামের আগে একটা 'সু' যোগ করে রেখেছ। সুবন্ধু বললেন, এই যে বললে 'সু' যোগ দিই না আমি?
শব্দ ভেঙে ভেঙে তাদের এই পরিহাসের ধরন দেখে অনেকদিন পরে হো হো করে হেসে উঠল অরু। পরদিন সন্ধ্যায় সুবন্ধুর নৌকো ভিড়ল যেখানে সেটা একটা ছোটো জনপদ। কাছেই নাকি বৌদ্ধদের মঠ আছে একটা।
জনপদের একেবারে শেষ প্রান্তে তৌলিক সুবন্ধুর বাসগৃহটি বেশ খোলামেলা। দুটো তলে বিন্যস্ত সার দেওয়া সুসজ্জিত কক্ষ। দীর্ঘ টানা অলিন্দ। সেখানে দাঁড়ালে চোখ চলে যায় বহুদূরে।
সামনে বেশ খানিকটা খোলা জায়গা। সকালবেলার হাওয়া এসে ঘূর্ণি তুলে যায় সেখানে। হাওয়ায় চিকচিক করে বালুকার দানা। খোলা জায়গাটি ছাড়িয়ে পথ, পথ এবং গৃহের সীমানায় এক ছোট্ট প্রাচীর।
সুবন্ধু হলেন ব্যাপারী মানুষ। কর্মসূত্রে নানান ধরনের মানুষ আতিথ্য গ্রহণ করে তাঁর গৃহে। তাদের জন্য নির্দিষ্ট কক্ষও প্রস্তুত রয়েছে এখানে। কাহ্ন আর অরুর জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে তেমনই একটি সুসজ্জিত কক্ষ। ভোগসুখে আর নতুন কোনও আগ্রহ নেই কাহ্নর। কিন্তু অরু বড়ো মানুষের ছেলে। তার পক্ষে এই অযাচিত আশ্রয়টুকু আনন্দদায়কই বোধ হল।
কাল সন্ধেবেলা এখানে পৌঁছেছে তারা। চারপাশটা দেখা হয়নি ভালো করে। সকালবেলায় ঘুম ভেঙে উঠে অরু আর কাহ্ন তাই দাঁড়িয়েছিলেন বাইরের অলিন্দে। এমন সময়ে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন সুবন্ধু। তৌলিক ধনী ব্যক্তি। দাসদাসীর অভাব নেই তাঁর গৃহে। অতিথিদের দেখাশুনোর জন্য নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাদের কয়েকজনকে। আরামের সমস্ত ব্যবস্থাই তারা করেছে নিখুঁত মনোযোগে।
সুবন্ধুর আতিথেয়তায় বরং কিছুটা কুণ্ঠিত বোধ করছেন কাহ্ন। অল্প পরিচয়ের আতিথ্য। অরুও তাই সহজ হতে পারেনি এখনও। সুবন্ধুকে খোঁজখবর করতে দেখে অরু বলল, আপনি যে আমাদের আশ্রয় দিয়েছেন, এটাই আমাদের কাছে হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো। এর পরে যদি এত খোঁজখবর করেন তাহলে নিশ্চয়ই বিব্রত বোধ করবেন কাহ্নুপাদ।
সুবন্ধু কাহ্নর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, বিব্রত করার জন্যই তো তোমাকে এতদূর টেনে এনেছি বন্ধু। তুমি কথা দিয়েছ প্রাণ ভরে আমাদের গান শোনাবে। আমার গৃহিণীও তোমার গান শুনতে ভীষণ আগ্রহী। আগে বিশ্রাম নিয়ে নাও। আমিও বাণিজ্য করে ফিরেছি অনেকদিন পরে। সম্পদের চিন্তায় সময় গেছে অনেক। এখন কয়েকদিন তোমাদের সঙ্গে কাটানো যাবে আনন্দে ভর দিয়ে। সন্ধেবেলা দেখা হবে আবার।
অরু কিন্তু সন্ধে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি হয় না আদৌ। পায়ে পায়ে সে বেরিয়ে পড়তে চায় আশেপাশে। নতুন দেশের জীবনপ্রকৃতি দেখার জন্য কৌতূহলী হয়ে উঠেছে তার কিশোর মন। অরু বলল, শুনেছিলাম বৌদ্ধদের একটা মঠ আছে কাছাকাছি?
সুবন্ধু মঠে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন অরুর জন্য। তাঁর গৃহিণীর সেখানে যাতায়াত আছে নিয়মিত। তারা নামের এক বৌদ্ধ দেবীর পূজার্চনাও নাকি হয় মঠের পাশেই একটি মন্দিরে। সুবন্ধুর স্ত্রী সেখানে পূজাও দেন নিয়মিত।
একথা শুনে একটি আকর্ষণও বোধ করল অরু। এই বিষয়টিতে সে বরাবরই আগ্রহী। অরু লক্ষ করেছে ব্রাহ্মণদের শাস্ত্র আচার দেবদেবীদের ধারণার সঙ্গে অনেকদিন ধরেই লৌকিক স্তরে কোথাও একটা সমন্বয় ঘটে চলেছে বৌদ্ধ ধর্মাচারের। মঠে যাওয়ার জন্য আর তর সইল না অরুর। সে নীচে নেমে গেল সুবন্ধুর সঙ্গে। কাহ্ন রয়ে গেলেন একা।
উপরতলার অলিন্দে দাঁড়িয়ে এবার নিশ্চিন্তে বাইরে তাকালেন কাহ্ন। জায়গাটা ফাঁকা ফাঁকা। জনবসতি থেকে কিছুটা দূরে। ছোটো জনপদ বলে কোলাহলও কম। দূরপ্রান্তের দৃষ্টিসীমায় নারিকেলের সারি। দীর্ঘ পাতাগুলি হাওয়ার নেশায় মাতাল। এই কী তবে সমুদ্রবাতাস? কল্পনা করার চেষ্টা করলেন কাহ্ন। শুনেছেন সমুদ্র খুব দূরে নয় এখান থেকে। সকাল থেকেই অঙ্গনের হাওয়ায় চিকচিকে বালুকণিকা লক্ষ করেছেন তিনি। অঙ্গনের প্রাচীর পেরিয়ে পথ। সেই পথে এবার একটা অশ্বশকট লক্ষ করলেন কাহ্ন।
শকট এসে থামল প্রাচীরে ঘেরা অঙ্গনের দ্বারে। একজন সুবেশা রমণীর সঙ্গে অরু উঠে গেল সেই শকটে। অশ্বখুরের আঘাতে আঘাতে পথের বুকে উঠল ধুলোর ঘূর্ণি।

মঠে এসে এখানকার বয়োবৃদ্ধ অধ্যক্ষের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল অরুর।
অরু দেখল শুধু বৌদ্ধ শাস্ত্রই নয়, প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রপুথির অনেক কিছুই তাঁর নখদর্পণে। নতুন নতুন নানান বিষয়ে এই প্রবীণের আগ্রহ দেখে অবাক হয়ে গেল অরু। আয়ুর্বেদের তিনি মনোযোগী ছাত্র। এ বিষয়ে পুথি পাঠ করেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। পশ্চিম প্রদেশের 'কাগতি' নামক এক সম্প্রদায়ের তৈরি করা 'তুলট কাগজ' নামের এক রকমের পাতা সংগ্রহ করেছেন অনেক চেষ্টা করে। তুলটের উপরে বৌদ্ধশাস্ত্রের লিপিকরণের কাজও শুরু করেছেন কিছু কিছু। বৌদ্ধদের শাস্ত্র অরুর আগ্রহের বিষয়। বিদ্যাচর্চাতেও সে সমান উৎসাহী। নবীনতাপন্থী এই বয়োবৃদ্ধ মানুষটিকে মনে মনে ভীষণ পছন্দ করে ফেলল অরু।
মঠের এই প্রবীণ ভিক্ষুও এই কৌতূহলী কিশোরের উৎসাহ আর উদ্দীপনা দেখে প্রসন্ন হলেন মনে মনে।
অরুকে তিনি ভিতরে নিয়ে গেলেন তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহের আশ্চর্য ভাণ্ডারখানি দেখাতে। শঙ্খ নির্মিত কারুশিল্পের নানান সামগ্রীতে ঠাসা প্রবীণ অধ্যক্ষের সংগ্রহ। বয়োবৃদ্ধ এই চিরপথিক সমুদ্রপারের কারুশিল্পীদের গ্রামে গ্রামে দীর্ঘদিন ঘুরে ঘুরে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন তার ভাণ্ডারটি।
একটি দুটি কারুকাজ হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখল অরু। শঙ্খের অলংকার, শঙ্খের দেবদেবীর মূর্তি, শঙ্খের দীপদান। শুভ্রতা যেন ধ্বনিময় হয়ে আছে নিভৃত এই সংগ্রহশালায়। এখানকার কুটিরশিল্পীদের দক্ষতাকে মনে মনে প্রণাম জানাল অরু একবার।
অধ্যক্ষ বললেন, খুবই দরিদ্র এই কুটিরশিল্পীরা। তাদের ঘরের স্ত্রীলোকেরা সমুদ্রতীরের বালুকাবেলায় ঘুরে ফিরে সন্ধান করে ভালো আকারের শঙ্খের। ছোটোখাটো উপকরণে সেগুলো কেটে ঘষে পুরুষরা নির্মাণ করেন নানান সামগ্রী। তাদের এইসব নির্মাণ কখনও কখনও কেঁপে ওঠে সৃষ্টির সৌন্দর্যে। অধ্যক্ষ বললেন, আমি তেমন সৃষ্টিকর্মগুলিই খুঁজে খুঁজে তুলে নিয়ে আসি এখানে। জানো অরু, শঙ্খের মতো সাদা রঙের জীবন ওদের। সহজ, নিরাভরণ। তোমাকে একদিন নিয়ে যাব ওদের পল্লিতে। দেখলে তুমি আশ্চর্য হয়ে যাবে কি সামান্য জীবনযাপন থেকে তৈরি হয়ে ওঠে রূপের এইসব অসামান্য উপহার।
অরু এবার মনে মনে আনত হল অসামান্য এই মানুষটির কাছেও।
সন্ধেবেলায় সুবন্ধুদের উপরতলার অলিন্দে জমে উঠল গানের আসর। নীচের তলায় কোথাও কোথাও আলো জ্বলছে বটে, কিন্তু চাঁদের আলো আছড়ে পড়া এই সন্ধ্যায় এমন খোলা জায়গায় বসে আলো জ্বালাতে আজ মন চায়নি কারোরই।
দু-একদিনের মধ্যেই পূর্ণিমা। সামনের অঙ্গন ভরে উঠেছে তুমুল জ্যোৎস্নায়। অট্টালিকার আনাচে কানাচে আছাড় খেয়ে চাঁদের আলো অলিন্দে এসে তৈরি করেছে এক অদ্ভুত আলো-আঁধারি। আজ সন্ধ্যায় যেন সেই মায়াতরণীতে ভেসে পড়েছেন চারজন মানুষ। অরু আর কাহ্ন। সুবন্ধু আর তাঁর স্ত্রী।
কাহ্ন মনে মনে ভাবছেন রীতিপ্রথার খুব একটা হয়তো ধার ধারেন না সুবন্ধু। না হলে অচেনা কোনও পুরুষমানুষের সঙ্গে তার স্ত্রীর এমন মেলামেশা কষ্টসাধ্যই হত।
সংগীতের প্রতি স্ত্রীলোকটির আকর্ষণও কিছুটা বিস্মিত করেছে কাহ্নকে। গান গাইতে গাইতে তার একটি দুটি মৃদু অনুরোধের ধরন দেখে কাহ্ন বুঝতে পারলেন এ বিষয়ে তার নিশ্চয়ই কিছু ব্যুৎপত্তিও আছে।
এটুকু বুঝতে পেরে কাহ্নর অবশ্য দ্বিধাও কিছুটা দূর হল। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন মাঝিমাল্লার মধ্যে বসে নৌকোনদীর আবহে তার যে গান সুবন্ধুর ভালো লেগেছে, এই অট্টালিকার অন্দরমহলে সেই গান হয়তো সুবন্ধুর আর পছন্দই হবে না। এ গানের ভাষা হল ডোম-চণ্ডাল-ধীবর-চাষাদের ভাষা। সুবন্ধুর মতো সম্পদশালী মানুষেরা তো আর সে ভাষায় কথা বলেন না কখনও।
কাহ্নর দ্বিধা কাটিয়ে কথা বলে উঠলেন সুবন্ধুর স্ত্রী। রমণীকণ্ঠে ঝংকার দিয়ে মৃদু অনুরোধ এল এবার, আপনি কি কামোদ রাগে কোনও গান বেঁধেছেন, আচার্য?
আচার্য? সম্বোধন শুনে একটু আশ্চর্যই হলেন কাহ্ন। তাঁর পরিচয় এদের কাছে গোপন করেছেন তিনি। অরু আছে তাঁর সঙ্গে। আত্মগোপনের একটা স্পষ্ট কারণও রয়েছে তাঁদের। তবুও আশ্রয়দাতার প্রতি কৃতজ্ঞতায় কৌতূহল গোপন করলেন কাহ্ন। মাথা ঝাঁকিয়ে শুধু বললেন, বেঁধেছি। কামোদেও একটি গান বেঁধেছি আমি। শোনাচ্ছি না হয় দু-এক কলি।
চঞ্চল রাত্রিবাতাসের মতো আসরে এবার ছটফট করে উঠল কামোদ। কাহ্ন ধরলেন—
তিশরণ নাবী কি অ অঠকমারী।
নিঅ দেহ করুণা শুণমে হেরী।।
...
গন্ধ পরস রস জইসোঁ তইসোঁ।
নিংদ বিহুনে সুইনা জইসো।।
সুঠাম দুটি হাত দুপাশে ছড়িয়ে দিয়েছেন কাহ্ন। হাত দুটি ওঠানামা করছে সুরের ওঠাপড়ায়। কাহ্ন গাইছেন—
আটটি কামরা ত্রিশরণ নায়
শূন্যে করুণা দেখে নিজে কায়।
...
গন্ধ স্পর্শ রস যথাযথ
জেগে থেকে দেখা স্বপ্নের মতো।
গান শেষ হলে সকলে বললেন, অপূর্ব।
সুবন্ধু এবারে পড়লেন স্ত্রীকে নিয়ে। এই অতিথিদের সামনে তাকেও এখন গাইতে হবে দু-এক কলি। কিছুতেই রাজি হয় না তাঁর স্ত্রী।
সুবন্ধু বললেন, জানো কাহ্ন, ব্যাপারী হিসেবে আমার ভাগ্য খুব একটা মন্দ নয়। আমার খালি নৌকো বারেবারে পূর্ণ হয়ে ফেরে সোনার সম্পদে।
কথাটায় কিছু একটা রহস্যের গন্ধ পেলেন কাহ্ন। বললেন, এক্ষেত্রে আমরা তো ভাই ইতরজন, আমাদের শ্রবণ অন্তত মধুর হয়ে উঠুক সেই স্বর্ণের উজ্জ্বলতায়। অনেক পীড়াপিড়ির পর গান ধরলেন সেই রমণী।
একমুহূর্তে সমস্ত প্রশ্নের অবসান ঘটল কাহ্নর। বহু বিস্ময়ের ওপার থেকে তাঁর স্মৃতিতে চমকে উঠল একটি বিদ্যুতের রেখা। জলকল্লোলের মতো এই কণ্ঠের প্রতিটি অনায়াস ঝংকার তাঁর চেনা। এই রমণী হলেন জ্ঞানবতী।

রাজনগরের পরিখার ওপারে সুমঙ্গল তাঁতির ঘরে একদিন রাতে চড়াও হয়েছে হরিহর অমাত্যের লোকজন। পাইকপেয়াদার দল এসে হেঁকে পড়েছে তাঁতিপাড়ায়। লাঠি ঠোকার শব্দে জেগে উঠেছে সকলে।
তাঁতিপাড়ার লোকজনও ঝেঁটিয়ে জড়ো হয়েছে সুমঙ্গলের ঘরের সামনে। পেয়াদা লেঠেলদের চেহারা চরিত্র দেখে বুঝে নিয়েছে এরা কেউ তাদের রাজা মণিভদ্রের সেপাইসান্ত্রী নয়। এদের পোশাকের জৌলুসও নেই অতটা। বেশিরভাগই গাঁট্টাগোঁট্টা চেহারা। তেল চুপচুপে খালি গা। হাতের মুঠোয় পাকিয়ে ধরা লাঠি।
মুখে মুখে যত খবর ছড়িয়েছে, আশপাশের চাষিপাড়া, ডোমপাড়া থেকেও ততই লোক আসতে শুরু করেছে পঙ্গপালের ঝাঁকের মতো। সকলে বলাবলি করছে এরা নিশ্চয়ই হরিহরের নিজের তালুকের পেয়াদা। রাজা মণিভদ্রের রাজ্যে এরা ঢুকেছে কেন?
পেয়াদার দল হাঁক পেড়ে বলছে, কীরে ব্যাটা তাঁতির পো, অরুকে তোরা কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস? সে নাকি পালিয়েছে তোদের তাঁতিঘরের কোন ছুঁড়ির সঙ্গে?
এসব কথা শুনে পিত্তি জ্বলে গিয়েছে সকলের। সকলে মিলে উমাকে এনে হাজির করেছে বাইরে। সুমঙ্গল আর কমলাও বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। এই দেখ বাবু অমাত্যের লেঠেলরা। এই হল আমাদের মেয়ে উমা। এ কোথাও পালায়নি কারোর সঙ্গে। তোমরা অমাত্যকে গিয়ে বলো ভালো করে খুঁজে দেখতে। নিজের তালুকেই কোনও চাষির ঘরে লুকিয়ে রয়েছে কিনা তার ছেলে।
এ কথায় অবশ্য চিঁড়ে ভেজেনি সে রাতে। হরিহর অমাত্যের লোকজন তছনছ করে খুঁজে দেখেছে তাঁতিপাড়া। অরুর অবশ্য সন্ধান পাওয়া যায়নি এত কিছু করেও।
দু-চারদিন পরে কথাটা একদিন কানে গেল রাজা মণিভদ্রের।
সভায় তিনি হরিহরকে ডেকে বললেন, অমাত্য হরিহর, শোনা যাচ্ছে আপনার লেঠেল পেয়াদারা নাকি তালুক ছেড়ে বেরিয়ে পড়ছে আজকাল? রাজসৈন্যদের উপরে তবে কি আর ভরসা নেই আপনাদের?
মণিভদ্রের কথার ইঙ্গিতটা বুঝতে অসুবিধে হল না কারোর। ব্রাহ্মণ অমাত্যেরা যেন প্রস্তুতই ছিলেন মনে মনে। ক্ষমতাবান ভূস্বামীর দল প্রায় সমস্বরে বলে উঠলেন, মহারাজ তালুকের শস্যফলন, কর আদায়, তার পরে আপনার কাছে সে জন্যে শুল্কপ্রদান— এইসব কিছু সামলাতে হয় আমাদের। কেবল আইনকানুন রক্ষার ব্যাপারে আপনার উপরে ভরসা করেছিলাম এতদিন। কিন্তু বিপদে আপদে আমরা তো আর পাশে পাই না আপনার সৈন্যদের। উলটে তারা আমাদের বাসগৃহ তছনছ করে বেড়ায় আপনারই আদেশে। এ কারণে আমরা ঠিক করেছি যে যার তালুকে আইনরক্ষার দায়িত্বটুকুও আমরা এবার থেকে নিজেদের হাতেই তুলে নেব।
ভূস্বামী অমাত্যদের এই সমবেত প্রতিবাদের ধরন দেখে অবাক হয়ে গিয়েছেন রাজা মণিভদ্র। এ প্রদেশের ধন-ব্যবস্থায় তারা যে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এটা কিছুদিন ধরেই বেশ বুঝতে পারছিলেন তিনি। কিন্তু রাজার বিরুদ্ধেও যে তারা সকলে জোট বাঁধতে শুরু করেছে— সেটা বুঝতে কিছুটা দেরিই করে ফেলেছেন মণিভদ্র। অমাত্য ভূস্বামীদের একত্রিত শক্তির সঙ্গে সংঘর্ষ বাধলে তাঁর প্রাসাদ মাটির বাঁধের মতো ভেসে যেতে পারে একেবারেই। স্তম্ভিত হয়ে সিংহাসনে কেবল নির্বাক বসে রইলেন রাজা মণিভদ্র।
রাজসভা ছেড়ে একে একে নিষ্ক্রান্ত হয়েছেন ভূস্বামী অমাত্যরা। রাণক আর রাজকর্মচারীদের কেউ কেউ নতুন জীবিকার সন্ধানে ভিড়েছেন তাদের দলে। মণিভদ্রের সঙ্গে থেকে গিয়েছেন কেবল বয়স্য আর চাটুকারের দল। আর থেকে গিয়েছেন বৃদ্ধ সেনাধ্যক্ষ।
পরামর্শ দিয়েছেন এরা সকলে মিলে কর দেওয়া বন্ধ করে দিলে রাজকোষে টান পড়বে মহারাজ। বেতকভুক সৈন্যদের সংখ্যাও এবার কমিয়ে ফেলাই ভালো।
সৈন্যরাও এরপর চাকরি হারিয়ে বল্লম হাতে নিয়ে হাজির হয়েছে আশেপাশের তালুকগুলোতে। ভূস্বামীরাও তাদের বহাল করেছেন নিজের নিজের তালুকে।

দু-তিনদিনের মধ্যেই সুবন্ধুর গৃহে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে শুরু করলেন অতিথিরা। অপরিচয়ের আড়াল ভেঙে বেশ আলাপ জমে গেল সকলের সঙ্গেই।
এখানে এসে অবধি অরু মেতে রয়েছে তার নতুন চেনা বৌদ্ধমঠের বৃদ্ধ ভিক্ষুকে নিয়ে। দুবেলা তার যাতায়াত সেখানে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের চর্চায় আগ্রহ জন্মেছে অরুর। ভিক্ষুর কাছে সংরক্ষিত নানা পুথিতে মনুষ্য প্রজাতির আরোগ্যের পথসন্ধান তো আছেই, সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হস্তীদের চিকিৎসা বিষয়ক একটি পুথিও খণ্ডিত আকারে রয়েছে বৃদ্ধ ভিক্ষুর কাছে। এ সব দেখেশুনে একেবারে আশ্চর্য হয়ে আছে অরু।
আশ্চর্য হয়ে রয়েছেন জ্ঞানবতীও। কাহ্ন যে তাকে চিনেছেন এ নিয়ে তাঁর মনে কোনও সংশয় নেই আর। আড়াল থেকে তাঁর একটি দুটি আচরণে একথা স্পষ্ট বুঝেছেন জ্ঞানবতী। তবুও কাহ্নর সঙ্গে একান্তে কিছু কথা বলবার একটা নিভৃত অবসর খুঁজছিলেন জ্ঞানবতী। একদিন মিলেও গেল সেই সুযোগ।
সকালবেলাতেই সুবন্ধু বেরিয়েছিলেন কাজে। অরু তো এ সময়ে বসে থাকে না কখনই। উপরতলায় যে দুজন দাসদাসী ছিল জ্ঞানবতী তাদের পাঠিয়ে দিলেন অন্যত্র। তারপর পায়ে পায়ে এসে দাঁড়ালেন অতিথিদের কক্ষে।
জ্ঞানবতীকে দেখে কোনও বিস্ময় প্রকাশ করলেন না কাহ্ন। শান্ত স্বরে কেবল বললেন, বোসো।
বেশ কয়েকটি বছরের সময়-ব্যবধান তৈরি হয়েছে বটে দুজনের মধ্যে কিন্তু এমন একটি ঘটনার মধ্যে দিয়ে ঘটেছিল সেই বিচ্ছেদ যে কোনও মানুষের মনেই জীবনভোর যার একটা স্পষ্ট ছাপ থাকতে বাধ্য।
কাহ্নর মনে পড়ে গেল এই রমণীকে যখন তিনি শেষ দেখেছিলেন তখন ব্রাহ্মণ হরিহর তার চুলের গুচ্ছ হাতের মুঠিতে ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন নদীর পাড়ে।
জ্ঞানবতী অস্ফুটে বললেন, সেদিনের কথা আপনার এখনও মনে আছে কাহ্ন?
মনে আছে বৈ কি! আছে বলেই তো সুর আর স্মৃতি এক লহমায় মিলেমিশে গিয়েছিল সেদিন সন্ধেবেলার অলিন্দে।
কাহ্ন নির্নিমেষ, উদাসীন বসে আছেন দূর আকাশে তাকিয়ে। স্মৃতির পর্দায় যেন নতুন হাওয়ার ঝাপটা এসে লেগেছে আজ সকালে।
কাহ্নর এই নীরবতা জ্ঞানবতীকে কিছুটা অভিমানী করে তুলল। জ্ঞানবতী বললেন আচ্ছা কাহ্ন, আপনিই তো কৃষ্ণাচার্য?
কাহ্ন কোনও উত্তর দিলেন না। শুধু বললেন, আমাকে তুমি আপনি বলছ কেন জ্ঞানবতী?
জ্ঞানবতীর কথা আরও ধারালো হয়ে উঠল এবার। ঝাঁঝালো স্বরে বললেন, প্রথম আলাপের রাত্রে আমি তোমাকে অনুরোধ করেছিলাম ভদ্রজনের ভাষায় পদ রচনা করতে, মনে আছে তোমার?
কাহ্ন বললেন, আছে।
কিন্তু এখানে এসে মঠের প্রবীণ ভিক্ষুর মুখে শাস্ত্রের পাঠ শুনতে শুনতে একদিন জানতে পারলাম কাহ্ন নামের ভণিতায় যে সহজিয়া সিদ্ধের পদগুলি লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে প্রদেশে প্রদেশে, তিনিই পূর্বাশ্রমে কৃষ্ণাচার্য নামে রচনা করেছেন 'হে বজ্রপঞ্জিকা' নামের শাস্ত্রপুথি। সেটি তুলট কাগজ নামের এক ধরনের পাতায় লিখে সংগ্রহের ব্যবস্থাও হয়েছে এখানে। তবে কেন সেদিন তুমি আমার কাছে গোপন করেছিলে আত্মপরিচয়?
কাহ্ন এ প্রশ্নের কোনও উত্তর দিলেন না। শুধু হেসে বললেন, শান্ত হও জ্ঞানবতী। তুমি এখন অন্যের স্ত্রী। আমাকে নিয়ে তোমার এই উত্তেজনা শোভন নয়।
অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করলেন জ্ঞানবতী। তারপর সব তোলপাড় শান্ত হয়ে এলে বললেন, তোমার হাত ধরে একদিন রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম কাহ্ন। তুমি সেই হাত ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে গিয়েছিলে অন্য একজন রমণীর নৌকোয়। মেয়েরা এই অভিমান সারা জীবন ভুলতে পারে না কাহ্ন। আজ তুমি মধুর প্রতিশোধ নিতে দাও আমায়।
মধুর প্রতিশোধ? অবাক হলেন কাহ্ন। এতদিন পরেও আজ কী প্রতিশোধ নিতে চায় জ্ঞানবতী?
এই কদিনে বেশ কয়েকবার জ্ঞানবতীর কথা ভেবেছেন কাহ্ন। অনেকগুলো ঘটনার ঝাপটা লেগেছে তাঁর জীবনে। পরতে পরতে জমে উঠেছে অভিজ্ঞতা। কাহ্ন ভেবেছেন, প্রাসাদের বৈভব ছেড়ে একজন খাঁটি পুরুষমানুষের সঙ্গে ঘর বাঁধতে চেয়েছিলেন জ্ঞানবতী। সেই ঘর তো সে পেয়েই গিয়েছে। সুবন্ধু মানুষটাও তো খারাপ নয়। সম্পদে, সম্মানে, জ্ঞানবতীকে ভরিয়ে রেখেছে সুবন্ধু।
কাহ্ন ভেবেছিলেন, এতেই বুঝি তৃপ্ত হয়েছেন জ্ঞানবতী। তাছাড়া সময়ের একটা বহতা বেগ আছে। যে কোনও ক্ষতস্থানেই প্রলেপ দিতে পারে তার গতি। দারুণ কষ্টের কোনও বিন্দু থেকেও মানুষকে একটা হাস্যময় সুখের দিনে টেনে নিয়ে আসতে পারে সময়। কাহ্ন ভেবেছিলেন জ্ঞানবতীর জীবনও বুঝি বহে চলেছে সেই নিয়মেই।
কিন্তু নিয়ম আর ব্যতিক্রম পাশাপাশি থাকে চিরকাল। কাহ্ন তাই অবাক হয়ে দেখলেন এতদিন পরেও জ্ঞানবতী ভাবতে পেরেছেন মধুর প্রতিশোধ নেওয়ার কথা। কিন্তু কী সেই প্রতিশোধ? জ্ঞানবতী কি তাঁর কাছ থেকে জোর করে কিছু আদায় করতে চান এই সকালবেলায়?
অতিথি কক্ষের দুয়ারখানি ততক্ষণে বন্ধ করে এসেছেন জ্ঞানবতী। আলতো পায়ে এসে দাঁড়িয়েছেন কাহ্নর বুকের কাছে।
কাহ্ন বললেন, তুমি কী প্রতিশোধ নিতে চাও জ্ঞানবতী?
জ্ঞানবতী বললেন, আমার এই বাঁধভাঙা শরীর নিয়ে আমি তোমার বুকের উপরে ভেঙে পড়তে চাই কাহ্ন।
কাহ্ন বললেন, শরীর তো আমার কাছে কোনও ভাঙনের বার্তা নিয়ে আসে না জ্ঞানবতী। শরীর যে আমার সাধনাকে গড়ে তোলে। গড়ে ওঠে আমার কবিতা।
জ্ঞানবতী বললেন, আমিও তোমার কবিতাকে আমার লাবণ্য দিয়ে গড়ে দিতে চাই কাহ্ন। তুমি গ্রহণ করো আমার ছন্দ।
তারপর ছন্দোময় আঙুলেই যেন জ্ঞানবতী খুলতে শুরু করলেন তার পরনের বসনখানি। বক্ষের কাঁচুলি, কটিতটের নীবিবন্ধ, বাহুর অঙ্গদ একে একে খসে পড়ল শ্বেতপাথরের মেঝের উপরে।
কাহ্ন দেখলেন একটি একটি করে পোশাক আর অলংকার খুলে ফেলছেন জ্ঞানবতী আর ঘুমিয়ে থাকা একটি পদ্মের কুঁড়ি যেন পাপড়ি মেলে মেলে সম্পূর্ণ করছে তার জাগরণ। রূপের যদি কোনও ধারণা থেকে থাকে মানুষের মনে তবে তা আজ আকার ধারণ করেছে জ্ঞানবতীর শরীরে।
সাতটি সূর্যের স্বর্ণআভা দিয়ে গড়া এই শরীর। বুকের উপরে ভেসে রয়েছে দুখানি ভারহীন কোমল মেঘের খণ্ড। নিম্ননাভিতে সৌন্দর্যের আশ্চর্য ঘূর্ণি। আর তারও ওপারে, জ্ঞানবতীর শরীরের মধুরতম প্রদেশে স্পষ্ট হয়ে রয়েছে গভীরের ইঙ্গিত।
উদাসীন কাহ্নর গলা জড়িয়ে জ্ঞানবতী বললেন, একদিন তোমার পদ তুমি শিখিয়ে দিয়েছিলে আমাকে। এতদিন তাকে কণ্ঠে ধারণ করে আমি সন্ধান করেছি পথের। আজ দেহের তত্ত্ব দিয়ে আমার সাধনাকেও তুমি সম্পূর্ণ করে দাও আচার্য।
কিন্তু তুমি যে প্রতিশোধ নিতে চাও জ্ঞানবতী। সংসারের মোহ আর মায়াকে কি কাটিয়ে উঠতে পেরেছ তুমি এখনও?
পেরেছি আচার্য, পেরেছি বলেই তো স্বামী আর সংসারের সংস্কার কাটিয়ে এভাবে আসতে পেরেছি তোমার কাছে। আমার কাছে তাই এ কোনও বিশ্বাস ভাঙার অপরাধ নয়। আমার কাছে এ হল গভীর সত্যের সন্ধান। আমাদের এই দেহ কী করে সাধনার হয়ে ওঠে তুমি আমাকে তা শিখিয়ে দাও আচার্য।
কাহ্ন বললেন, জ্ঞানবতী, ব্রহ্মাণ্ডের সব তত্ত্বই নিহিত রয়েছে এ দেহভাণ্ডের ভিতরে। আমাদের দেহের পাঁচটি নাড়িতে হল পঞ্চ তথাগতের অধিষ্ঠান। কায়সাধনের জন্য সে জন্যে দেহশুদ্ধি করে নেওয়া প্রয়োজন হয় প্রথমে। পঞ্চস্থানে অধিষ্ঠিত এই পঞ্চদেবতাকে যদি নিজের শরীরের পাঁচটি নাড়িতে অনুভব করতে পারো তাহলে তোমার জড়দেহ পরিণত হবে যোগীদেহে। এসব কথা তোমাকে আর কী করে বোঝাই বলো তো? আচ্ছা দাঁড়াও, একটা গানের সুরে এই ধারণাটিকে বেঁধে যদি তোমাকে বোঝানো যায় কিছুটা। তুমি তো সুরের শিক্ষায় পারঙ্গমা। তোমার শ্রবণ কোনও সত্যে পৌঁছোতে পারে কিনা দেখো। কাহ্ন গাইতে শুরু করলেন—
পঞ্চ তথাগত কি অ কেড়ুয়াল।
বাহঅ কাঅ কাহ্নিল মাআজাল।।
চিঅ কন্নহার সুণত মাঙ্গে।
চলিল কাহ্ন মহাসুখ সাঙ্গে।।
...
শূন্যমার্গে মন ধরে হাল।
কানু চায় মহাসুখের নাগাল।।
গানের ভিতর থেকে এবার একটি গভীর আহ্বান শুনতে পেলেন জ্ঞানবতী। জন্ম-মৃত্যুর ওপার থেকে যেন একটা মহাসময়ের বোধ এসে উন্মনা করে দিল তাঁকে।
গাইতে গাইতে ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছেন কাহ্ন। তাঁর পেশিতে পেশিতে ধাবমান অশ্বের স্তম্ভিত গতি। কাহ্ন এবার আকর্ষণ করলেন জ্ঞানবতীকে। মায়ামোহের লতাপাতা ছিঁড়ে দুখানি তোলপাড় শরীর এবারে কেঁপে উঠল মহাসুখের ঘূর্ণিচক্রে।
সমাপনের পর কাহ্ন বললেন, জ্ঞানবতী, আজ থেকে তুমি সিদ্ধ।
জ্ঞানবতী বললেন, আজকের পর আমি কি তোমার কবিতায় ঠাঁই পাব, কাহ্ন?
কাহ্ন হাসলেন আলতো করে। এক অদ্ভুত প্রশান্তি তখন ঘিরে ধরেছে জ্ঞানবতীকে। ক্লান্ত আঙুলে একে একে তিনি পরে নিয়েছেন তাঁর পোশাক। তাঁর শরীর যেন ভরে উঠেছে চন্দ্রসূর্যের সব আবর্তন আত্মস্থ করে।
অতিথি কক্ষের দ্বার খুলে স্থলিত পায়ে বাইরে এলেন জ্ঞানবতী।
বাইরে তখন দাঁড়িয়ে রয়েছেন সুবন্ধু।

সমুদ্র যে এত বিশাল, মহৎ, উদার উত্তাল হতে পারে অরুর তা ধারণা ছিল না।
একটার পর একটা ঢেউ আছড়ে পড়ছে পায়ের কাছে। ফেনায় ফেনায় ছিটকে পড়ছে বালির উপর। দৃষ্টি যতদূর প্রসারিত হতে পারে তারও বুঝি ওপার থেকে ধেয়ে আসছে এই জলতরঙ্গ। সহস্র অজগর যেন গভীর থেকে তুঙ্গ পর্যন্ত আছড়ে চলেছে তাদের লেজ। প্রলয়মন্থন বুঝি একেই বলে।
জীবনে এই প্রথম সমুদ্রের সামনে এসে দাঁড়াল অরু। এতদিন নদীনালায় ভরা রাজনগরে ঝড় বর্ষায় ফুলে ওঠা নদীর ভয়ংকর রূপ দেখেছে সে। করতোয়ার বুকে অগাধ জলরাশির মধ্যে বজরায় করে ভেসে যাওয়ার বাল্যস্মৃতিও আছে তার। কিন্তু আজ এই সমুদ্র আকাশের অনন্ত বিস্তারের সামনে দাঁড়িয়ে এত দিনের সব অভিজ্ঞতাকেই তুচ্ছ মনে হল অরুর।
শিশুর মতো মুগ্ধ বিস্ময়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল অরু। মঠের প্রবীণ অধ্যক্ষ দাঁড়িয়ে ছিলেন একটু দূরে। অশ্বশকটে অনেকটা পথ অতিক্রম করে অরুকে তিনি নিয়ে এসেছেন সমুদ্রতীরের শঙ্খশিল্পীদের পল্লি দেখাতে। শকট এসে দাঁড়িয়েছে অনেকটা দূরে। শঙ্খশিল্পীদের ছোটো গ্রামটির কাছাকাছি। সেখানে এখনও যাওয়া হয়নি তাদের। গ্রাম ঘুরে আবার ফিরে যেতে হবে দীর্ঘপথ পার হয়ে। অরুকে আনমনা হয়ে যেতে দেখে প্রবীণ ভিক্ষু এবারে এগিয়ে গেলেন তার দিকে। কাঁধে হাত রেখে বললেন, সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে কী ভাবছ অরু?
অরু বলল, ভাবছি সমুদ্র আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বড়ো।
অধ্যক্ষ বললেন, ঠিকই বলেছ, পুথির পাতায় একে ধরানো যায় না। একমাত্র কাব্যই পারে সমুদ্রের ধারণাকে ধারণ করতে। ছন্দ ফুলে উঠতে পারে তার শক্তিতে।
অরু আশ্চর্য হয়ে বলল, আপনি কি কাব্যপাঠ করেন অধ্যক্ষ?
অধ্যক্ষ বললেন, নিশ্চয়ই। কাব্যের রস আস্বাদনই আমার কাছে সমুদ্র স্নানের মতো। তবে একটা কথা, কাব্য শুধু পাঠই করি না আমি। শঙ্খশিল্পীদের যে পল্লিতে তোমাকে নিয়ে যাব সেখানে কুটিরশিল্পীদের মুখে মুখে ফেরা এক ধরনের গানের সন্ধান আমি পেয়েছি। যার প্রত্যেকটি পদই আমার কাছে উৎকৃষ্ট এক একটি কবিতা।
কথা বলতে বলতেই হাঁটতে শুরু করেছে তারা। তারপর একসময় পৌঁছেও গিয়েছে শাঁখারিদের পল্লিতে।
খুবই দরিদ্র এই পল্লি। মাটি দিয়ে তৈরি ছোটো ছোটো ঘর। মাথার উপরে হোগলা পাতার আচ্ছাদন। ঘরের দেয়ালে অত্যন্ত ছোটো একটি দু'টি কুঠুরি। সেগুলিকে গবাক্ষ বললে ভুলই বলা হবে।
সমুদ্র থেকে একটি খাঁড়ি বেরিয়ে এসে বহে গেছে এই শাঁখারিপল্লির পাশ দিয়ে। অরু দেখল সেখানে কয়েকটি মাছ ধরার নৌকো বাঁধা রয়েছে। অরু বুঝল শুধুমাত্র শঙ্খসামগ্রী নির্মাণ করে জীবিকা নির্বাহ করা নিশ্চয়ই সম্ভব হয় না দরিদ্র এই শিল্পীদের পক্ষে। এজন্য মাঝে মাঝে জাল আর নৌকো নিয়ে সমুদ্রের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। ঢেউদের কোল থেকে তুলে নিয়ে আসে নানা রকমের মাছ। সেইসব বিক্রি করে নিশ্চয়ই কয়েক কড়ি উপায় হয় তাদের।
কুটিরের সামনে ছোটো ছোটো অঙ্গন। সেখানে তালপাতার ছোটো ছোটো আসন বিছিয়ে কাজ করেছে পুরুষমানুষগুলো। মেয়েরা ভিতর বাইরে ঘুরে ফিরে সাহায্য করছে তাদের কাজে।
অরু দেখল, সমুদ্র সেঁচে নিয়ে আসা শঙ্খের রং অতটা উজ্জ্বল নয়। কেটে ঘষে শিল্পীরা সাদা আর ঝকঝকে করে তুলছে সেগুলোকে। তাদের শতচ্ছিন্ন মলিন বসন, গায়ের রংও রোদ্দুরে পোড়া। কিন্তু প্রত্যেকের হাতেই মুক্তোর মতো ঝলমল করছে এক একটি শিল্পকর্ম।
বয়োবৃদ্ধ অধ্যক্ষ সেই সব কাজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন ঝুঁকে পড়ে। কারও সামনে হঠাৎ উবু হয়ে বসে পড়ছেন। একটা দুটো কথাও বলছেন হেসে হেসে।
অরু দেখল, সকলের সঙ্গেই বেশ আলাপ রয়েছে তাঁর। এখানে সবাই মান্যও করে তাঁকে। শিল্পীরা বোঝে তাদের কাজের মূল্য বোঝেন এই বয়োবৃদ্ধ মানুষটি। রসগ্রহণ হল এমনই একটি অভিজ্ঞতা রসিক আর স্রষ্টা যে বিন্দুতে এসে মিলে যেতে পারে এক মুহূর্তেই।
অধ্যক্ষ এবার একজন শিল্পীর তৈরি শঙ্খের একটি ছোটো নৌকো তুলে নিলেন হাতে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দু-একবার দেখলেন সেটিকে। তারপর অরুর হাতে দিয়ে বললেন, দেখ তো অরু।
হাতের তালুর উপর বসিয়ে এবারে শিল্পকর্মটির দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখল অরু। হাতের পাতায় ধরে যায় এতটুকুই ছোটো সেই নৌকোটি। আটজন মাল্লা দাঁড় বাইছে তার উপরে বসে। দাঁড়ের অস্ত্র হাতে নিয়ে উত্তাল তরঙ্গের সঙ্গে যেন যুদ্ধ করছে তারা। ঢেউয়ের বিক্ষোভ সামলে যেন এগিয়ে চলেছে এই নৌকো। বস্তুর জড়তা কাটিয়ে নৌকোটিকে এখন মনে হচ্ছে ধাবমান একটি জলজ প্রাণী।
অরু বুঝল এই হল ক্ষুদ্রের মধ্যে বৃহতের ব্যঞ্জনা। বিন্দুর ভিতরে সিন্ধু। এই হল শিল্প।
অধ্যক্ষ এবারে সেটিকে ক্রয় করলেন কড়ি গুনে দিয়ে। কাঁধের কমলা রঙের ঝোলায় ভরে নিলেন সাবধানী আঙুলে।
কড়ি গুনে নিয়ে কারুশিল্পীও খুশি হয়ে উঠল বেজায়। দু-এক কলি গান গেয়ে বলল, চলুন কর্তা, আপনাদের এগিয়ে দিয়ে আসি শকট পর্যন্ত।
অশ্বে টানা শকট দাঁড়িয়ে রয়েছে কিছুটা দূরে। পল্লির মাটিকাদার পথে তার চাকা আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা। চালক রয়ে গিয়েছে শকটের পাহারায়।
পল্লি পার হয়ে ছোটো শ্মশান। তারও ওপাশে পথ। শ্মশানের পাশ দিয়ে যেতে হঠাৎ একটা গানের কলি ভেসে এল অরুর কানে। স্তম্ভিত হয়ে গেল সে। দাঁড়িয়ে পড়ল এক মুহূর্ত। উঁকি ঝুঁকি মেরে পথপাশের শ্মশানের ভিতরটা একবার দেখে নেওয়ার চেষ্টা করল সে।
এক প্রায় উন্মাদ কাপালিক সেখানে গান ধরেছে নেচে নেচে। তার গলায় হাড়ের মালা, পায়ে বাজন-নূপুর, দুটি কানে ঝুলে রয়েছে কুণ্ডল। কাপালিকের গলায় কাহ্নুপাদের পদ—
যে যে আইলা তে তে গেলা।
অবণাগবণে কাহ্নু বিমন ভইলা।।
...
যারা এসেছিল চলে গেছে ফের।
কাহ্নর কাছে সেটা দুঃখের।।
মুহূর্তের দুর্বলতা কাটিয়ে পা চালাল অরু সামনের দিকে। কাহ্নুপাদের গান শুনে তার এই বিস্ময় সে প্রকাশ করতে চায় না অধ্যক্ষের কাছে।
পথের ধূলায় এখন রঙিন হয়ে উঠেছে তাদের পা। অরুর মাথা নিচু। সে ভালো করে লক্ষ করার চেষ্টা করেছে নগ্নপদ প্রবীণের প্রতিটি পদক্ষেপ। মনে মনে ভাবছে জীবনের কতটা পথ এভাবে পেরিয়ে এসেছেন বয়োবৃদ্ধ এই তরুণ হৃদয় মানুষটি।
অরুর আনমনা, হতচকিত অবস্থাটা নজর এড়াল না বৃদ্ধের। আলতো স্বরে বললেন, তুমি কি আমার কাছে কিছু গোপন করার চেষ্টা করছ অরু?
অরু এবার চমকে উঠল। কাহ্ন আর তার আত্মপরিচয় তারা গোপন করেছে এখানে। অধ্যক্ষ কি কোনওভাবে আঁচ করে ফেলেছেন সেটা? মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল সে। আমতা আমতা করে বলল, না মানে, আসলে আমি এই গানটা শুনে...
গানটা আমারও চেনা অরু। কারুশিল্পীদের মুখে এর আগেও শুনেছি আমি গানের পদগুলো। এটা কাহ্নুপাদের রচনা।
গরিব সাধারণ সব লোকের মুখের ভাষায় বাঁধা। তাদের হৃদয়েও স্থান পেয়ে গিয়েছে সহজিয়াদের এই সব পদ। কাহ্নুপাদ আর ভুসুকুপাদের কবিত্বশক্তির প্রশংসা করতে হয়। তুমি কি এই গান আগে কখনও শুনেছ অরু?
অরু এবারে স্পষ্ট করে বলল, হ্যাঁ।
এতক্ষণে শকটের সামনে এসে পড়েছে তারা। চালক বেচারি পা তুলে বিশ্রাম নিচ্ছিল উপরে বসে। পান-সুপারি চিবিয়ে নিচ্ছিল কিছুক্ষণ। তাদের আসতে দেখে এখন লাফিয়ে নামল উপর থেকে।
বৃদ্ধ অধ্যক্ষের হাত ধরে সন্তর্পণে শকটের উপরে তুলে দিল অরু। তারপর উঠে পড়ল নিজেও।
হাতের লাঠি দিয়ে চালক আঘাত করল অশ্বের পিঠে। অল্প কেঁপে উঠে এবার চলতে শুরু করল শকট। চালকের মুখ দিয়ে বেরোল, হুরর, হুই হুই, হুরর হেট হুরর হুইরে, হেট হেট।
পিছনে তাকিয়ে অরু দেখল ধুলোর ঘূর্ণিতে আবছা হয়ে আসছে অনেক দূরের শঙ্খশিল্পীদের কুটিরগুলো।

রসবতীর মদের দোকানে আজ বেজায় হইচই। রাজনগরের সুমঙ্গল তন্তুবায়ের সঙ্গে বেশ জোর একটা তর্ক লেগে গিয়েছে চণ্ড শবরের। দুজনেই মদ্যপ অবস্থায় রয়েছে এখন। সুমঙ্গল জড়ানো গলায় বলে চলেছে, তুই বেটা শবরের পো, বনে জঙ্গলে হাঁড়িয়া গিলে বেড়াস। শখ করে চোলাই করা মদ খেতে এসেই বিগড়ে গেছে তোর মাথা।
চণ্ডশবর নাকি মদ্যপান করার পর মাথা ঝুঁকিয়ে ঝুঁকিয়ে কাহ্নুপাদের নামে গালিগালাজ করে চলেছিল একটানা। তার জুড়ি গুঞ্জরীর মাথাটাই নাকি চিবিয়ে খেয়ে চলে গেছে কাহ্নুপাদ। কিছুতেই সে আর পেটে বাচ্চা ধরাতেই চায় না। মাঝে মাঝে হাঁড়িয়া গিলে চণ্ড তার উপর চড়াও হয় বটে। কিন্তু শেষের আগেই নাকি গুঞ্জরী তাকে ঠেলে নামিয়ে দেয় ঘাড় থেকে। ওতে নাকি কাহ্নুপাদের কথা অমান্যি করা হবে।
সুমঙ্গল বলেছিল, না রে মূর্খ, ও সব হল সাধকদের জন্য, আমরা হলাম গিয়ে গৃহী মানুষ। আমাদের জন্য ওসব নিদান নয়।
রসবতীর দোকানে আজকে সন্ধে থেকেই এসে জুটেছিল বলাই। মাটির পাত্র বেশ কয়েকবার ভরাভরতি উপুড় করেছে সে গলায়। বলাই বলল, তুমি যাই বলো তাঁতিদাদা, আমাদের গেরস্তঘরের মেয়েমরদগুলোকে তবে সহজিয়া গুরুগুলো ফুসলে নিতে আসেই বা কেন? আমার বউটাও তো রসে ডগমগ হয়ে জুটেছিল গিয়ে ভুসুকুপাদের সঙ্গে। তারপর একদিন যেই বলেছে আমার মরদটা অক্ষম, তুমি আমাকে একটা বাচ্চা দেবে ভুসুকুপাদ—ওমনি পাখি ফুড়ুৎ!
বলাইয়ের কথার রকমে খ্যাক খ্যাক করে হেসে ওঠে রসবতীর শুঁড়িখানার আলো-আঁধারি জটলা। সুমঙ্গল চিৎকার করে থামায় সকলকে। তারপর বলে, ওরে মুখ্যুসুখ্যুর দল, ওদের উপকারের কথাগুলো ভুলে যাসনি সবাই। তোদের বিপদে আপদে বুক দিয়ে দাঁড়ায়নি কাহ্নুপাদ? রোগে-শোকে-শ্মশানে পাসনি তাকে তোদের কাছে? ভুলে গেলি নাকি ওসব কথা?
ভিড়ের ভিতর থেকে একজন বলল, তা অবিশ্যি পেয়েছি। শ্মশানে তাকে পেয়েছি বটে, তবে কি না ডোমনি নিয়েই তো তার কারবার।
হো হো করে আবার একটা হাসির হল্লা উঠল মদ্যপানের জটলায়। সুমঙ্গল গজগজ করতে লাগল রাগে।
চাষিপাড়ার নিতাই বসেছিল ভিড়ের মধ্যিখানে। নিতাই হঠাৎ চেঁচিয়ে বলল, তবে তুমি যাই বলো বাপু, কাহ্নুপাদের কিন্তু আমাদের ফেলে পালিয়ে যাওয়াটা একেবারেই ঠিক হয়নি। এমনকি হরিহর বামুনের ছেলেটাকে অবধি নিয়ে পালালে। আর হরিহরের সব রাগ এসে পড়ল চাষিপাড়ার ওপরে। আমরা যারা দু-একজন চ্যালা চামুণ্ডা জুটেছিলুম আমাদের তো ধরে ধরে লাঠিপেটাও করেছে। আমরা কি জানি, তারা কোথায় পালিয়েছে!
সুমঙ্গল বলল, তোমাদের ওপরে হরিহর অমাত্য খেপে গিয়েছিল তোমরা ওই কি মাঠে ঘাটে উৎসব না কি করো; সেই জন্য। তা তো আর তোমাদের কাহ্নুপাদ শেখায়নি।
চাষিপাড়ার গ্রামবৃদ্ধ গোছের ঝুঁকে পড়া একজন মানুষ বসেছিল শুঁড়িখানায়। সেই বৃদ্ধ এবার খিনখিনে গলায় বলল, ওসব আমরা শিখতে যাবই বা কেন? আমরা জমি আর মেয়েমানুষ নিয়ে মাতামাতি করি ফসলের জন্য আর সন্তানের জন্য। আর ওনারা নাকি ওসব করেন 'মহাসুখ'-এর জন্য। হ্যাঃ, হ্যাঃ, হ্যাঃ।
নিতাই হঠাৎ সুমঙ্গলের দিকে তাকিয়ে তেড়িমেড়ি করে বলে উঠল, আচ্ছা তাঁতিদাদা, সন্ধে থেকেই দেখছি তুমি কাহ্নুপাদের হয়ে সমানে গান গেয়ে চলেছ? কী ব্যাপার বলো তো? নিজের বোনটাকে বিনি যৌতুকে হরিহরের ছেলের ঘাড়ে চাপাতে চাও বুঝি? কাহ্নুপাদ বুঝি ফুস মন্তর ঢুকিয়ে দিয়েছে বামুনের ওই ছেলেটার কানে?
বিনা যৌতুকে উমার বিয়ে? এখনও তো এ নিয়ে কিছু ভেবে ওঠেনি সুমঙ্গল। নিতাইয়ের কথার কুৎসিত খোঁচাটা বেশ ভালো রকমই বিঁধল তাকে। মনে মনে ভাবল এরাই কখনও মানুষকে ওপরে তুলে দেবতা বানায়। আবার কখনও আছড়ে ফেলে ভাঙে সেই মূর্তিটাকেই।
রসবতীর শুঁড়িখানা থেকে ঘাড় নিচু করে অন্ধকারে বেরিয়ে পড়ল সুমঙ্গল। পিছনে তাকিয়ে রসবতীর দরজায় আঁকা অদ্ভুত চিহ্নটাকে একবার দেখতে চেষ্টা করল ভালো করে। একে ঘোলাটে চোখ তার উপরে গাঢ় অন্ধকার। কিছুতেই আর সে চিহ্নটা চোখে পড়ল না সুমঙ্গলের। মাথা তুলে এবার আকাশের দিকে তাকাল সুমঙ্গল। ঝকমক করছে এক আকাশ তারা। পা বাড়াল এবার তাঁতিপাড়ার দিকে।
পা বাড়ালে কি হবে, এই আঁধার রাতে পথ চলাও বেশ কঠিন। পথ ঘাটও গর্ত আর খন্দে ভরা। রাজনগরের অবস্থা আর আগের মতো নেই। পথঘাটের দেখভালও আর আগের মতো নিয়ম মেনে হয় না।
শ্রীহীন রাজনগরের দূর প্রান্তে তাঁতিপাড়ায়, টলোমলো পায়ে তার ঘরের সামনে যখন এসে দাঁড়াল সুমঙ্গল তখন রাত বেশ গভীর। খোলা দরজায় তখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে উমা। তার চোখ আকাশের দিকে। সুমঙ্গল জড়ানো গলায় বলল, আকাশের দিকে হাঁ করে কী দেখছিস রে উমা?
উমা বলল, তারা। তারপর হঠাৎ বলল, আচ্ছা মঙ্গলদাদা, অরু আর কাহ্নুপাদও কি এখন এই তারাগুলোকে দেখতে পাচ্ছে?
হঠাৎ কেন যেন খুন চেপে গেল সুমঙ্গলের মাথায়! উমার চুলের মুঠি ধরে প্রবল বেগে ঝাঁকিয়ে দিতে দিতে সুমঙ্গল বলল, তোর কি মরণ হয় না, হতভাগী?

সকালবেলার আলোয় আজ খুশিতে ঝলমল করছে সুবন্ধুর বাসগৃহ। নিজের হাতে নানারকম খাদ্য পানীয়ের আয়োজন করছেন তাঁর স্ত্রী। দাসদাসীদের মধ্যেও আজ অন্য ধরনের ব্যস্ততা।
তাঁদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে স্থানীয় মঠের অধ্যক্ষ আজ প্রাতরাশ গ্রহণে সম্মত হয়েছেন তৌলিকের গৃহে। সকলেই সেই জন্য খুশি। সাতসকালেই সুবন্ধু অরুকে মঠে পাঠিয়ে দিয়েছেন অধ্যক্ষকে সঙ্গে করে নিয়ে আসার জন্য।
নীচের তলায় একটি প্রশস্ত কক্ষে চলেছে ভোজের আয়োজন। ছোটো ছোটো কাঠের আসনে সাদা পাথরের ফলক এঁটে তৈরি মূল্যবান অথচ রুচিসম্মত আসবাব। তার উপরে সকলের বসার ব্যবস্থা। রুপোর রেকাবিতে ফলমূল ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের প্রচুর আয়োজন।
কাহ্ন নেমে এসেছেন কিছুটা আগেই। সুবন্ধু মৃদুহাস্যে অভ্যর্থনা করেছেন তাঁকে। জ্ঞানবতী আজ বেশ গম্ভীর। হয়তো ব্যস্ততার কারণেই।
কিছুক্ষণ পরে অশ্বশকটের শব্দ শোনা গেল বাইরে থেকে। গৃহদ্বারের কাছে এসে থেমে গেল সেই শব্দ। অরুর সঙ্গে ধীর পায়ে হেঁটে এসে কক্ষে প্রবেশ করলেন প্রবীণ অধ্যক্ষ।
সুবন্ধু আর জ্ঞানবতী উঠে দাঁড়িয়ে স্বাগত জানালেন তাকে। উঠে দাঁড়ালেন কাহ্নও। তিনি এই গৃহের অতিথি। অন্যান্য অতিথিদের অভ্যর্থনা জানানোও তাঁর উচিত।
সকলকে বসতে অনুরোধ করলেন প্রবীণ মানুষটি। তারপর কাহ্নর দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনিই কাহ্নুপাদ?
এবারে অবাক হওয়ার পালা অরুর। অধ্যক্ষের কাছে সে এখনও গোপন রেখেছে নিজের পরিচয়। তার কাছ থেকে এই খবর পাওয়া সম্ভব হয়নি অধ্যক্ষের। অরু দেখল জ্ঞানবতী স্মিত হাস্যে তাকিয়ে রয়েছেন কাহ্নর দিকে।
কাহ্ন শান্ত হয়ে বললেন, জ্ঞানবতী বুঝি আমার পরিচয় আগেই জানিয়ে দিয়েছে আপনাকে?
ভিক্ষু বললেন, জ্ঞানবতীকে যে আপনার কবিতা শুনিয়েছি আমি এতদিন ধরে। অবশ্য তার নিজের আগ্রহ কিছু কম ছিল না। ওর কাছে শুনেই লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া আপনার গানগুলির প্রতি আমার কৌতূহল জন্মায়। আমি মঠের ভিক্ষু। তত্ত্বের কথায় আপনার সঙ্গে আমার মতে মিলবে না হয়তো। কিন্তু আপনার কাব্যের আমি ভক্ত হয়ে পড়েছি কাহ্নুপাদ। ধ্বনিতে, ব্যঞ্জনায়, অলংকারে রূপকচয়নে আপনি অতি উচ্চশ্রেণির সিদ্ধি অর্জন করেছেন। এই বৃদ্ধকেও উৎসাহী করে তুলেছেন কাব্যচর্চায়।
অন্যের মুখে নিজের প্রশংসা বেশি শুনতে অভ্যস্ত নন কাহ্ন। তিনি অস্বস্তি বোধ করলেন এই আলোচনায়। বয়োবৃদ্ধ এই প্রবীণ মানুষটির নানাবিধ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলেন তিনি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নিলেন তাঁর রুচি আর শ্রমস্বীকারের সামর্থের কথা।
কথায় কথায় সময় গড়িয়ে গেছে অনেকটা। সুবন্ধু এবার খাদ্যগ্রহণের অনুরোধ করলেন সকলকে।
আহারপর্ব জমে উঠল রকমারি পদে। নানান পাত্রে উপচে পড়ছে উচ্চশ্রেণির পলান্ন,ব্যঞ্জন, পরমান্ন। খাদ্যের সঙ্গে ব্যবস্থা ছিল পানীয়েরও। দইয়ের ঘোল আর নারিকেলের সুমিষ্ট পানীয়। কিন্তু এই গুরু আহারের পর কাহ্ন আর কিছুতেই কোনও রকম পানীয় গ্রহণে সম্মত নন। তিনি বললেন, তুমি তো জানো জ্ঞানবতী, আমি মিতাহারী। এই গুরু ভোজনের পর আর কোনও পানীয় গ্রহণে আমি নিতান্তই অপারগ।
জ্ঞানবতী অত্যন্ত বিচলিত হলেন কাহ্নর এই প্রত্যাখ্যানে। বললেন, ঠিক আছে কাহ্নুপাদ, আর অনুরোধ করব না তোমাকে। এই আমার প্রাপ্য ছিল।
এবারে অনুরোধ করলেন বৃদ্ধ অধ্যক্ষ। অল্প কিছুটা পান করে দেখুন কাহ্নুপাদ। কর্পূর মিশ্রিত নারিকেলের পানীয়ের স্বাদ অতি উত্তম।
শেষ পর্যন্ত পানীয় গ্রহণে সম্মত হলেন কাহ্নুপাদ। জ্ঞানবতী পাত্র এগিয়ে দিলেন কাহ্নর দিকে। কাহ্ন পান করলেন পরম তৃপ্তিতে। কিন্তু তার পরেই হঠাৎ যেন শরীরে একটা অস্বস্তি বোধ করলেন কাহ্ন।
তার মাথা যেন টলমল করে উঠল হঠাৎই। বসার আসনখানি যেন দুলে উঠল তীব্র কোনও ভূকম্পনে। সারা শরীরে কেমন যেন একটা অদ্ভুত প্রদাহ। কণ্ঠনালীর কাছে পাকিয়ে আসছে শ্বাসবায়ু।
কাহ্নর অবস্থা দেখে অরু বুঝতে পারলেন নিশ্চয়ই হঠাৎ অসুস্থ বোধ করছেন কাহ্নুপাদ। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আসনের কাছে ছুটে গিয়ে সে জিগ্যেস করল, কী হয়েছে আপনার কাহ্নুপাদ? অসুস্থ বোধ করছেন নাকি আপনি?
অরুর হাতটা ধরে একবার উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করলেন কাহ্ন। তরল একটা স্রোত বইতে শুরু করেছে তাঁর চেতনায়। শিরায় ধমনীতে আছড়ে পড়েছে তার গর্জন। শ্রবণ মথিত করে কোথা থেকে একটা শব্দ এসে ঝমঝম করে বেজে উঠছে চারিপাশে। তীক্ষ্ন কোনও পর্দায় যেন সুর থেকে সুরে লাফিয়ে চলেছেন জ্ঞানবতী। সেই দ্রুতির সঙ্গে যেন কিছুতেই তাল মেলাতে পারছেন না তিনি। অরুর বুকের উপর সংজ্ঞাহীন হয়ে লুটিয়ে পড়লেন কাহ্ন।
বয়োবৃদ্ধ মঠাধ্যক্ষ তাঁর সামান্য আয়ুর্বেদ চর্চার অধিকারেই বুঝলেন এ হল বিষক্রিয়া। নাড়ির গতি অতি দ্রুত। চোখের তলায় গভীর কালো। তীক্ষ্ন চোখে তিনি তাকালেন জ্ঞানবতীর দিকে।
কাহ্নর পরিণতি দেখে এবারে ভেঙে পড়লেন জ্ঞানবতী। বৃদ্ধের পায়ের উপরে পড়ে তিনি স্বীকার করলেন বিষপ্রয়োগের কথা।
হঠাৎ অরুর মনে পড়ল কয়েকদিন আগে মঠাধ্যক্ষের ঘর থেকে একটি রঙিন নির্যাস ভরা ছোটো পাত্র জ্ঞানবতীকে আঁচলের নীচে লুকিয়ে নিয়ে আসতে দেখেছিল সে। তখন যে কেন অধ্যক্ষকে সেটা জানিয়ে দেয়নি এই ভেবে এখন খুবই অনুতাপ হচ্ছে অরুর।
মুখের কথা হারিয়ে ফেললেন প্রবীণ ভিক্ষু। অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে তিনি বললেন, ছিঃ জ্ঞানবতী! অতিথির সঙ্গে এই ব্যবহার? তোমাকে একজন মানুষ বলে ভাবতে আমার ঘৃণা হচ্ছে।
সুবন্ধুর তখন পাগলের মতো অবস্থা। এই বিপর্যয়ে তিনিও সমান বিপর্যস্ত। অধ্যক্ষের হাত দুটি ধরে সুবন্ধু অনুনয় করলেন, আপনি কাহ্নর জীবন রক্ষা করুন অধ্যক্ষ।
ভেষজ প্রয়োগে অবশ্য কাহ্নর একটা আশু উপশমের ব্যবস্থা করলেন অধ্যক্ষ। ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলেন কাহ্ন। শিথিল হয়ে এল তাঁর শরীর। চোখ দুটি মেলে একবার তাকালেন স্মিত হেসে। সকলে মিলে ধরে তাকে শুইয়ে দেওয়া হল তাঁর নিজের শয্যায়। কিন্তু পরক্ষণেই যেন গভীর নিদ্রায় ডুবে গেলেন কাহ্ন। দীর্ঘশ্বাসে ফুলে উঠছে তাঁর হৃৎপিণ্ড। কয়েক মুহূর্তেই যেন বিষাদ ছেয়ে ফেলল সুবন্ধুর গৃহটিকে।
পরদিন সকালেই চিন্তিত মুখে আরও একবার কাহ্নকে দেখতে এলেন অধ্যক্ষ।
অতিথিকক্ষের একটি নিরাভরণ কাঠের শয্যায় শুয়ে ছিলেন কাহ্নুপাদ। অরু বসেছিল তার পায়ের কাছে মাটিতে।
কাহ্নর নাড়ি পরীক্ষা করে চিন্তিত মুখে অধ্যক্ষ বললেন, কাহ্নুপাদ, কালকের ভেষজ প্রয়োগে আপনার কিছুটা উপশম হয়েছে বটে। কিন্তু সম্পূর্ণরূপে বিপদ মুক্ত হতে গেলে খুবই দুর্লভ একটি ভেষজ প্রয়োগ করা প্রয়োজন। এবং তা করা প্রয়োজন এক পক্ষকালের মধ্যেই।
অরু আর্তকণ্ঠে বলল, দুর্লভ কেন? কোথায় পাওয়া যায় সেই ভেষজ?
অধ্যক্ষ বললেন, সে অনেক দূরে। উত্তরপ্রদেশের রাজনগরের অরণ্যে।
রাজনগরের অরণ্যে? আনন্দে লাফিয়ে উঠল অরু। সে তো শবরদের রাজ্যপাট। চণ্ড, গুঞ্জরী, ডোম্বিনী, ভুসুকুপাদ সকলের কথা ঝাঁপিয়ে মনে পড়ে তার।
তক্ষুনি সুবন্ধুর কাছে গিয়ে অরু বলল, আমাকে ব্যাপারীদের যে কোনও একটি নৌকোয় তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন তৌলিক। আশা করি তিন চার রাত্রির যাত্রায় রাজনগরে পৌঁছে যাব আমি।
ব্যাপারীদের নৌকোয় উঠে অরু চলে গেল সেই রাত্রেই।
পরদিন সকালে অসুস্থ কাহ্নর পায়ের কাছে উপুড় হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন জ্ঞানবতী। বার বার অস্ফুটে বললেন, আমাকে তুমি ক্ষমা করো কাহ্নুপাদ। আমাকে তুমি ক্ষমা করো।
কাহ্ন শয্যায় এলিয়ে পড়েছেন অসুস্থ হয়ে। পায়ের উপর থেকে জ্ঞানবতীকে সরিয়ে নেবেন সে শক্তি এখন নেই তাঁর। জ্ঞানবতী ফুলে ফুলে কাঁদছেন তাঁর পায়ের উপর ঝুঁকে। তাঁর চোখের জলে ধুয়ে যাচ্ছে কাহ্নর দুটি পায়ের পাতা।
অনেক কষ্টে একটা হাত বাড়িয়ে কাহ্ন রাখলেন জ্ঞানবতীর মাথায়। বললেন, জীবন মৃত্যু কোনও বিষয়েই আমার বিশেষ কোনও আগ্রহ নেই। কিন্তু এই কাজ তুমি কেন করতে গেলে জ্ঞানবতী? তবে কি তোমার মনে প্রতিহিংসার বাসনা এখনও প্রবল? মায়ার বন্ধন সত্যিই কি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারোনি তুমি?
জ্ঞানবতী এবারে শান্ত হয়ে কাহ্নকে শোনালেন এক আশ্চর্য কথা। কাহ্নর কক্ষ থেকে সেদিন তাকে বিশ্রস্ত বেশে বেরোতে দেখেছিলেন সুবন্ধু। জ্ঞানবতী সুবন্ধুর কাছে গোপন করেননি কোনও কিছু। সুবন্ধুকে তিনি বলেছেন মায়াহীন, মহাসুখের সন্ধানেই আচার্যের কাছে তাঁর যাত্রা। কাহ্নর প্রতি তার অন্য কোনও দুর্বলতা নেই।
সব শুনে সুবন্ধু বলেছেন এতই যদি মায়াহীন ভেবে থাকো নিজেকে, তাহলে নিজের হাতে বিষপান করাতে পারবে তোমার আচার্যকে? নাকি ভালোবাসো তুমি তাকেই? আমি কেবল প্রাণ বাঁচিয়েছিলাম একজন বিশ্বাসঘাতিনীর!
কাহ্নর পায়ের উপরে আছড়ে পড়ে জ্ঞানবতী আবার বললেন, নিজেকে প্রমাণ করার জন্য আমি এ কাজ করতে বাধ্য হয়েছি কাহ্নুপাদ। আমাকে তুমি ক্ষমা করো।
শীর্ণ কণ্ঠে কাহ্ন বললেন, তুমি ঠিকই করেছ জ্ঞানবতী।

রাজনগরের প্রান্তেবাসী মানুষগুলোর বুক হু হু করে উঠেছে কাহ্নুপাদের বিপদের খবর শুনে। অরু, ডোম্বিনী, বলাই, সুমঙ্গল, কমলা, উমা সকলে গিয়ে একেবারে পায়ে পড়ে গেছে গুঞ্জরী আর চণ্ডশবরের। যেমন করেই হোক অরুর কাছে শুনে দরকার মতো ভেষজটি খুঁজে দিতে হবে রাজনগরের জঙ্গল থেকে।
গুঞ্জরী দেখছে এই কিছুদিন আগেও কাহ্নুপাদের নামে কত উলটোপালটা কথা বলেছে তার মরদ চণ্ড। অথচ এখন কাহ্নুপাদের বিপদের কথা শুনে মন থেকে আঁধার কেটে গেছে চণ্ডর। সেও এখন ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঁচাতে চাইছে কাহ্নুপাদকে।
সারাদিন সারারাত পাগলের মতো বনে বনে ঘুরে বেড়িয়েছে চণ্ডশবর, গুঞ্জরী আর অরু। সূর্য উঠেছে আবার পরের সকালে, রোদ্দুর ক্রমশ চওড়া হয়েছে মাথার উপর, দিন ঢলেছে অন্ধকার রাত্রির গায়ে—তবুও হাল ছেড়ে ফিরে আসেনি তারা। খোঁজ, খোঁজ, খোঁজ। কী তুমুল আর কী অনন্ত ওদের সেই সন্ধান!
হাতের পাতা কেটে গেছে কাঁটায়। গায়ের চামড়া ছিঁড়ে গেছে গাছের বাকলে বাকলে। তবুও খুঁজে চলেছে তারা। অন্ধকার জঙ্গলের বুক থেকে যেন আরোগ্যের আলো ছিঁড়ে আনতে চাইছে তিনজন আপ্রাণ মানুষ। একসময় মিলেছে তার সন্ধান। চণ্ডশবরের হাতে ধরা একটি মাঝারি আকৃতির পাতায় চোখ পড়ে যেতেই উল্লাসে চিৎকার করে উঠেছে অরু। এই তো মিলেছে তার সন্ধান। হুবহু মিলে যাচ্ছে তার বর্ণনা। তেমনই ছোটো। তেমনই খাঁজকাটা। তেমনই শ্যাওলাসবুজ। তেমনই বৃন্তহীন। এই তো সেই ভেষজ।
গুল্মজাতীয় একটি ঝোপের পাশে নিছক অনাদরে মাথা ঝুঁকিয়ে গজিয়ে উঠেছে এই ভেষজ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়েছে মুখে মুখে। সূর্য ঢলে রাত্রি নামার আগেই দক্ষিণদেশের ব্যাপারীদের নৌকো ছাড়বে ঘাট থেকে। কাহ্নুপাদের বিপদের দিনে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াবার জন্য উৎসুক সকলেই। কিন্তু সকলের যাবার উপায় নেই। ব্রাহ্মণ ভূস্বামীরা কর দিতে অস্বীকার করেছে রাজনগরের রাজাকে। তাদের উদ্বৃত্ত শস্যে বাণিজ্য পসরা ভরে উঠেছে নৌকোয় নৌকোয়। বেশি লোকের যাওয়ার উপায় নেই সেখানে।
ভুসুকু ঠিক করে দিলেন যেতে পারবে কে কে। না, তিনি নিজে গিয়ে ভিড় বাড়াতে চান না অযথা। অরু একাই নিয়ে যেতে পারবে প্রয়োজনীয় ভেষজটি। আর সঙ্গে?
ভুসুকু ঠিক করলেন অরুর সঙ্গে দক্ষিণ দেশে যাবে ডোম্বিনী। ভুসুকু জানেন না ঠিক কী অবস্থায় এখন রয়েছেন কাহ্ন। তত্ত্বহীন সৌন্দর্যরচনায় ভুসুকুর একটি আগ্রহ রয়েছে বরাবরই। আচার্যের পোশাক পরে সারাজীবন চাপাই রইল সেটা। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই চরম মুহূর্তে আর কোনও ভুল করতে রাজি নন ভুসুকু। তার কেমন যেন মনে হল কাহ্নর সঙ্গে ডোম্বিনীর সঙ্গে একবার দেখা হওয়া উচিত।
ডোম্বিনী কিন্তু পা বাড়াল খেয়াঘাটের উলটোপথে। বেলা পড়তে এখনও অনেক দেরি। এক্ষুনি একবার রাজপুরীতে যেতে হবে তাকে।
ডোম্বিনীর মনে আছে এক বিপদের সন্ধ্যায় একাকী রাজসভায় তার একবার কথা হয়েছিল রাজার সঙ্গে। নির্দোষ কাহ্নর কথা বুঝিয়ে বলেছিল তাকে ডোম্বিনী। সরল বুদ্ধিতেও লক্ষ করেছিল রাজার পেয়াদারা পিছু নেওয়া বন্ধ করেছে কাহ্নর। সেই উপকারের কথাটা সারাজীবন ভুলতে পারবে না ডোম্বিনী। পায়ে পায়ে আজ দুপুরেই এসে দাঁড়াল মণিভদ্রের রাজসভায়।
রাজসভায় সেই চোখ ধাঁধানো জৌলুস আর নেই। রাজনগর আর তার প্রান্তেবাসী কিছু প্রজা নিয়ে একটি অত্যন্ত ছোটো অঞ্চলে এখন সীমাবদ্ধ মণিভদ্রের রাজ্যপাট। অমাত্যেরা নেই, সেনাধ্যক্ষ, পারিষদবর্গ কেউ নেই। মণিভদ্রকে অস্বীকার করে তারা কর আদায় করতে শুরু করেছে নিজের নিজের খাসতালুকে। কেবল কয়েকজন প্রসাদভোজী স্তাবক নিয়ে মণিভদ্র মত্ত ছিলেন দাবাখেলায়।
শ্রীহীন এই রাজসভায় দাঁড়িয়ে ডোম্বিনী আজ আবার বলল, তোমার লোকজনদের এখান থেকে চলে যেতে বলো রাজা। তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।
সন্ধেবেলায় একটি বজরা ছাড়ল রাজনগরের ঘাট থেকে। সমুদ্রকূলের ধারে দক্ষিণদেশের কোনও এক অনামা বৌদ্ধমঠের উদ্দেশ্যে।

প্রবীণ মঠাধ্যক্ষের হাতে ভেষজটি তুলে দিতে গেল অরু আর ডোম্বিনী। রাজা মণিভদ্র এসে দাঁড়ালেন কাহ্নর শয্যার পাশটিতে। কাহ্ন ক্ষীণকণ্ঠে বললেন, আসুন মহারাজা। আপনাকে এই ঘরে যে কোথায় বসতে বলব।
অসুস্থ কাহ্নর দ্বিধা দেখে মণিভদ্র বললেন, থাক কাহ্নুপাদ। এ নিয়ে আপনি চিন্তিত হবেন না। আমি শুধু আপনার আরোগ্য কামনা করতে ছুটে এসেছি এখানে। আপনি সুস্থ হয়ে উঠুন। রাজনগরে ফিরে আসুন তাড়াতাড়ি। বৌদ্ধধর্মের এই শ্রীহীন সাম্প্রতিক রূপটি নিয়ে আপনার সঙ্গে কিছু আলোচনা আছে আমার। অবশ্য রাজনগরের সেই বৈভব আর নেই। তবুও আমার হৃদয়ের উষ্ণতাটুকু তো আছে। সেরে উঠুন কাহ্ন।
আকুল হয়ে কাহ্নর আরোগ্য কামনা করছে তৌলিক সুবন্ধুও। জ্ঞানবতী প্রমাণ করেছে নিজেকে। কাহ্নর আরোগ্য ছাড়া এখন আর কোনও প্রার্থনা নেই সুবন্ধুর।
আরও কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে ঘর ছেড়ে বাইরে যাবার সময় আর একবার ঘুরে দাঁড়ালেন মণিভদ্র, আরও একটা কথা আপনাকে বলা হয়নি, কাহ্নুপাদ। পার্বত্যপ্রদেশের রাজপ্রতিনিধি হয়ে মাঝে মাঝেই কিছু ভিনদেশী বৌদ্ধ শ্রমণেরা আসেন রাজনগরে। সিদ্ধাচার্যদের গানে তাঁদের প্রবল আগ্রহ লক্ষ করেছি আমি। তালপাতা আর তেরেটপাতার পুথিতে তারা সেসব পদ সংরক্ষণের কাজও শুরু করেছেন। তাঁদের সংগ্রহের কাজে সাহায্য করতে করতে আমি আপনার একজন অনুরাগী হয়ে গেছি। আপনার তন্ত্রকলার সবটুকু মেনে নিতে না পারলেও আপনার কাব্যকলার একজন আগ্রহী শ্রোতা হয়ে উঠেছি আমি। সিদ্ধাচার্য হিসেবে হয়তো আপনার আপত্তি থাকতে পারে কিন্তু একজন কবি হিসেবে আমার অভিবাদন গ্রহণ করতে আশা করি আপনার আপত্তি হবে না।
সুবন্ধু এবারে ভিতরে নিয়ে গেলেন রাজা মণিভদ্রকে। মণিভদ্রের কাছে তিনি ঋণী। রাজনগরে বাণিজ্য করতে গিয়ে বহুবার বহু বিপদে আপদে তিনি সাহায্য পেয়েছেন রাজার কাছে।
ভিতরে মণিভদ্রের জন্য রাজকীয় আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেছিলেন জ্ঞানবতী।
স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে মণিভদ্রের কাছে বিদায় নেওয়ার অনুমতি চাইলেন সুবন্ধু। তিনি এখন একবার যেতে চান মঠের অধ্যক্ষের কাছে। ভেষজটির নির্যাস প্রস্তুতির বিষয়ে প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নিতে। মণিভদ্র সহাস্য সম্মতি জানালেন। সুবন্ধু চলে গেলে জ্ঞানবতী বললেন, আমাকে আপনি চিনতে পেরেছেন তো মহারাজ?
মণিভদ্র বললেন, অরু আর ডোম্বিনীর কাছে আমি তোমার কথা শুনেছি জ্ঞানবতী।
জ্ঞানবতী বললেন, আমিও অরুর কাছে শুনেছি আপনার কথা। ডোম্বিনীর কথা।
মণিভদ্র বললেন, জ্ঞানবতী, তোমার হাতে এমন ভাবে বিষপান করতে পারলে একদিন আমি মরতেও রাজি ছিলাম।
জ্ঞানবতী বললেন, এখন?
মণিভদ্র বললেন, এখন আর তার কোনও প্রয়োজন বোধ করি না আমি। বেঁচে থাকাটা খুব সুন্দর জ্ঞানবতী। বেঁচে থাকাটা আমাদের প্রয়োজন।
মণিভদ্রকে তাড়াতাড়ি ফিরতে হল অশান্ত রাজনগরে। অরুকেও একরকম জোর করেই তার সঙ্গে পাঠিয়ে দিল ডোম্বিনী। বলল, তুই ফিরে যা অরু, আমি তো আছি কাহ্নুপাদের কাছে।

ডোম্বিনীকে সঙ্গে নিয়ে অরু আর জ্ঞানবতী পরদিন গেলেন মঠে।
বহু আয়াসে ভেষজটি সংগ্রহ করা হয়েছে রাজনগরের অরণ্য থেকে। এখন তার নির্যাস প্রস্তুতির কাজে বৃদ্ধ অধ্যক্ষকে যদি কিছু সাহায্য করা যায়, তা-ও করতে চায় তারা।
প্রবীণ মানুষটি বসেছিলেন তাঁর কক্ষে। তাঁর সৌম্য ললাটে কয়েকটি কুঞ্চনরেখা।
সকলে পায়ে পায়ে এসে দাঁড়াল সেই কক্ষের দ্বারে। অধ্যক্ষ একবার দেখলেন তাদের। শূন্য তাঁর দৃষ্টি। তিনি যেন মগ্ন রয়েছেন গভীর কোনও চিন্তায়।
অরু মৃদুস্বরে একবার বলল, আপনি কি কোনও কারণে বিচলিত বোধ করছেন, অধ্যক্ষ?
অধ্যক্ষ চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, ভেষজটির নির্যাস প্রস্তুতির প্রাথমিক পর্বটুকু সমাধা করতে পেরেছি আমি। আহরণ করা গিয়েছে ভেষজের নির্যাস। কিন্তু আয়ুর্বেদ পুথিতে দেখছি পরের অধ্যায়টি বেশ কঠিন।
অরু ব্যাকুল হয়ে বলল, কী আছে সেই অধ্যায়ে?
একটি সদ্যোমৃত প্রাণীর অস্থিখোলকের পাত্রে নির্যাসটিকে কিছু সময় রেখে দিলে প্রস্তুতির প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতে পারে।
জ্ঞানবতী অস্ফুটে প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন, নরকরোটি?
অরু অধৈর্য হয়ে বলল, আমরা সেদিন দেখা সেই শ্মশান কাপালিকের সাহায্য নিতে পারি না অধ্যক্ষ?
অধ্যক্ষ ধীরে ধীরে বললেন, কিন্তু সেই করোটি তো হতে হবে সদ্যোমৃত কোনও মানুষের।
অরু বলল, শুধু মানুষই বা বলছেন কেন অধ্যক্ষ? প্রাণীটিতো ছাগ বা ওই জাতীয় কোনও প্রাণীও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কাহ্নুপাদের প্রাণরক্ষার জন্য এক্ষুনি একটি প্রাণী হত্যা করতে পারি আমি। এক্ষুনি।
অরুর কথা শুনে প্রবীণ বৌদ্ধের মুখে খেলা করে গেল ঘৃণা ও করুণায় মেশা এক আশ্চর্য অভিব্যক্তি। তীক্ষ্ন চোখে তাকিয়ে রইলেন তিনি অরুর দিকে।
চোখ নামিয়ে নিল অরু। এই প্রথম সে আঘাত করবার জন্যে প্রস্তুত হল বয়োবৃদ্ধ অধ্যক্ষকে। বলল, আপনাদের বৌদ্ধদের ওই করুণার দাম দেওয়া আমাদের এই ছোট্ট মানবজীবনে বড়ো কঠিন সমস্যা অধ্যক্ষ। কিছু মনে করবেন না, আমি ব্রাহ্মণ। প্রাণীহত্যা আমার শাস্ত্রে নিষিদ্ধ নয়।
অরুর এই আচরণে বেশ অস্বস্তি বোধ করছিলেন জ্ঞানবতী। কি করে এই অবস্থাটা থেকে বেরিয়ে আসা যায় প্রাণপণে যেন তারই পথ খুঁজে ফিরছিলেন মনে মনে। কি একটা মনে হতেই আনন্দে একেবারে চিৎকার করে উঠলেন জ্ঞানবতী, আচ্ছা অধ্যক্ষ, সদ্যোমৃত সেই প্রাণীর খোলকটি শঙ্খের হলে হয় না? সেও তো একটা কঠিন খোলকই বটে।
মুহূর্তেই কক্ষের আবহাওয়ায় একঝলক দমকা বাতাস ঢুকল যেন। সকলেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন এই সমাধানটুকু হাতের কাছে পেয়ে। সময়ও হাতে নেই বিশেষ। কিছুক্ষণের মধ্যেই মঠের সামনে থেকে অশ্বশকটে চড়ে তারা ছুটলেন সমুদ্রতীরের শঙ্খশিল্পীদের পল্লিটির দিকে।
প্রবীণ অধ্যক্ষের হাতে ধরা মৃৎপাত্রে আহৃত ভেষজের নির্যাস। সমুদ্রতীরের বালির মধ্যে সেটি প্রোথিত করে ডোম্বিনীকে রেখে গেলেন পাহারায়। অরু আর জ্ঞানবতীকে সঙ্গে নিয়ে প্রবীণ মানুষটি চললেন সদ্যোমৃত শঙ্খ খোলকের সন্ধানে।
ডোম্বিনী বসে রইল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে। নদীর বুকে পাড়ি জমিয়েছে সে এতদিন। তরঙ্গের পর তরঙ্গের ভাঙাগড়া দেখেছে মন দিয়ে। দেখেছে সমুদ্রের দিকে তাদের অবিরাম ধেয়ে চলা। কিন্তু সেই চলার পূর্ণ রূপটি যেন এই প্রথম সে দেখতে পেল চোখের সামনে।
ডোম্বিনীর চুল উড়ল হাওয়ায়। বালির কণিকা আছড়ে পড়ল চোখে মুখে। ডোম্বিনী নীরব, স্থানু। দিগন্তবিস্তৃত জলরাশির মতন দিক হারানো। জন্ম আর মৃত্যুর দুপাশেই যেন ছড়িয়ে গিয়েছে তার ছোট্ট জীবন।
কতক্ষণ যে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে এভাবে পাথরের প্রতিমার মতো বসেছিল সে, তার খেয়ালই নেই। সংবিত ফিরল জ্ঞানবতীর চিৎকারে।
কিছুটা দূর থেকে ছুটতে ছুটতে ফিরছেন জ্ঞানবতী, এ কি ডোম্বিনী, তুমি আনমনে বসে রয়েছ এভাবে? ওদিকে আরেকটু হলেই যে নির্যাস ভরা পাত্রখানি বালির উপর থেকে টেনে নিয়ে যেত শ্মশানশৃগালের দল, সেদিকে তোমার যে কোনও লক্ষ্যই নেই!
জ্ঞানবতীর ধিক্কারের মধ্যে কাছে এসে পড়েছেন অরু আর অধ্যক্ষ। তাদের হাতে টাটকা শঙ্খের খোলক।
জ্ঞানবতী ঝাঁঝিয়ে উঠলেন আবার, কাহ্নুপাদ বেঁচে উঠুন তা বুঝি তুমি আর চাও না ডোম্বিনী? নাকি আমাকে ঈর্ষা করতে শুরু করেছ মনে মনে?
অরু এবার তীব্র কণ্ঠে বলল, আপনি ভুলে যাচ্ছেন জ্ঞানবতী, রাজনগরের অরণ্য থেকে প্রাণপণ করে ভেষজটি খুঁজে নিয়ে এসেছে ডোম্বিনীই।
প্রবীণ অধ্যক্ষও তীক্ষ্ন চোখে তাকিয়ে ছিলেন জ্ঞানবতীর দিকে। বার বার জ্ঞানবতীর আচরণ যেন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে চলেছে।
অবস্থাটা বুঝে জ্ঞানবতী চোখ নামালেন এবার। বললেন, তুমি কিছু মনে কোরো না ডোম্বিনী। দূর থেকে শ্মশানের শৃগালদের আসতে দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম আমি। আমাকে ছুটতে দেখে অবশ্য এদিকে আর এগোয়নি তারা। দেখলাম তুমি বসে রয়েছ অনেক দূরে। আমি নিজেকে সংবরণ করতে পারিনি। আমাকে ক্ষমা কোরো ডোম্বিনী।
ডোম্বিনী কোনও কথা বলল না এবারও। তার চোখের তারা যেন পাথরের তৈরি।
সকলকে নিয়ে অশ্বশকট ধুলো ওড়াল ফেরার পথে। সময় যে আর হাতে নেই বেশি।

সমুদ্রের দিক থেকে লোনা বাতাস বহে আসে এখানে। ভগবান তথাগতের বন্দনাগান করেন মঠের বৌদ্ধরা। অলস গতিতে গড়িয়ে চলে দিন।
ডোম্বিনী সারাটা দিন বসে থাকে কাহ্নর শয্যাপাশে। মাটির উপরে একটি শীতলপাটি বিছিয়ে নিয়ে শুয়ে থাকে সারাটি রাত। কাহ্নর অসুস্থতার কথা বিবেচনা করে তার জন্য এখানে থাকার বিশেষ ব্যবস্থা করে দিয়েছেন সুবন্ধু। পক্ষকাল পার হতে এখনও কয়েকদিন বাকি। বেশ গুরুত্ব দিয়ে ভেষজটির নির্যাস প্রস্তুত করেছেন অধ্যক্ষ।
এ সময়ে একদিন কাহ্নর ঘরে এসে ঢুকলেন কুণ্ঠিতা জ্ঞানবতী। মরমে মরে আছেন তিনি। যে কাজ তিনি করেছেন তার জন্যে জ্ঞানবতীর অনুতাপের শেষ নেই। বার বার তিনি ক্ষমা চেয়েছেন সকলের কাছে।
ক্রমশই যেন শীর্ণ হয়ে পড়ছেন কাহ্ন। তার চোখ দুটি কোটরের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে ক্রমাগত। শ্বাস হয়ে আসছে ক্ষীণ।
চিন্তিত মুখে পদচারণা করতে করতে সেদিন ভেষজের নির্যাস তৈরি করে একটি ছোট্ট পাত্রে ভরে ডোম্বিনীর হাতে দিয়ে গেলেন অধ্যক্ষ।
জ্ঞানবতী বললেন, আমি বিষ দিয়েছিলাম ডোম্বিনী। তুমি এই অমৃতটুকু ঢেলে দিয়ো তোমার কাহ্নুপাদের গলায়। তোমার হাতে আরোগ্য লাভ করবেন কাহ্ন। এরচেয়ে আর বড়ো কী চাওয়ার আছে আমার?
দেখতে দেখতে পার হয়ে গেল একটি পক্ষকাল। রাত্রি চাঁদের পঞ্চদশ কলা পূর্ণ হল।
তার দু-একদিন পরে, একদিন সমুদ্রের দিক থেকে হঠাৎ একটা তীব্র বাতাস ঢুকল ঘরে। ডোম্বিনীর মনে হল একবার যেন কেঁপে উঠলেন কাহ্নুপাদ। তার ঠোঁটদুটো কেঁপে উঠল একবার। কোনও কথা বলতে পারলেন না তিনি। নিষ্পলক তাকালেন একবার ডোম্বিনীর দিকে। তারপর বন্ধ করলেন চোখের পাতা দুটি। চিরকালের মতো। অঙ্গনের বাতাসে তখন চিক চিক করে উড়ে গেল একরাশ বালুকণিকা।
খবর পেয়ে দৌড়ে এলেন সকলে। সার বেঁধে সকলে দাঁড়ালেন কাহ্নর শয্যাটিকে ঘিরে। নিথর কাহ্নর দিকে তাকিয়ে প্রবীণ অধ্যক্ষ ফিসফিসন করে বললেন,
যে যে আইলা তে তে গেলা
অবণাগবণে কাহ্নু বিমন ভইলা।।
কী অপূর্ব এই কবিতা! কী অপূর্ব আপনার এই সমাপন কাহ্নুপাদ!
সুবন্ধুর অবস্থা উন্মাদের মতো। জ্ঞানবতীকে ধরে রাখতে পারছেন না কেউ। সহস্র তরঙ্গের উথালপাতাল তাঁর শরীরে। বিরামহীন কান্নায় তিনি ভিজিয়ে দিয়েছেন কাহ্নর শয্যা।
সকলে একে একে বেরিয়ে গেলেন বাইরে। কান্নার তোড়ে মাটির উপর আছড়ে পড়ে হঠাৎ একেবারে চুপ করে গেলেন জ্ঞানবতী।
জ্ঞানবতীর চোখ গেল কাহ্নর শয্যার নীচের দিকে। কাঠের সেই শয্যার নীচে ভেষজের নির্যাস ভরা পাত্রখানি লুকিয়ে রাখা।
জ্ঞানবতী বিস্ময়ে ঝংকার দিয়ে উঠলেন, এ কী ডোম্বিনী! এ কী করেছ তুমি! কাহ্নুপাদকে তুমি পান করাওনি এই জীবনদায়ী অমৃত? এ কী করেছ তুমি? কী মারাত্মক ভুল তুমি করে ফেলেছ? ডোম্বিনী?
ডোম্বিনী নিষ্পলক। স্থির। জ্ঞানবতীর দিকে তাকাল একবার। তারপর খুব ধীরে ধীরে বলল, কাহ্নুপাদ নিষেধ করেছিলেন।
জ্ঞানবতী বললেন, সে কি! স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করেছেন আচার্য? তাহলে কি আমাকে তিনি ক্ষমা করতে পারেননি ডোম্বিনী?
ডোম্বিনী বলল, পেরেছেন। সেই জন্যই তো ভেষজের নির্যাস গ্রহণে আপত্তি করেছেন তিনি।
জ্ঞানবতী বললেন, তুমি কেন স্বেচ্ছায় তাঁকে মরতে দিলে ডোম্বিনী, এত সহজে চলে যেতে দিলে তাঁকে?
ডোম্বিনী বলল, জীবন অথবা মৃত্যু কোনও বিষয়েই আমাদের আচার্যের আলাদা করে কোনও আগ্রহ ছিল না। আমাদেরও তা থাকা উচিত নয় জ্ঞানবতী।

রাজনগরে ফিরে ডোম্বিনী শুনল অরু নাকি এবার বিয়ে করবে উমাকে। তার তোড়জোড় শুরু করেছে তারা ভালোমতোই।
রাজনগরের কোনও ব্রাহ্মণ নাকি এ বিবাহের কাজ করতে রাজি হয়নি প্রথমে। সুমঙ্গল আর কমলা গিয়ে তখন কেঁদে কেটে পড়েছে রাজনগরের বিষুমন্দিরের পুরোহিতের কাছে। ব্রাহ্মণীর হাতে পায়ে ধরে কান্নাকাটি করে কমলা অনেক চেষ্টায় রাজি করিয়েছে তাদের। বিষুমন্দিরের পুরোহিত অবশেষে রাজি হয়েছেন এই বিবাহের কাজ করতে। তিনি নিদান দিয়েছেন—উচ্চবর্ণের সঙ্গে নিম্নবর্ণের বিবাহে শাস্ত্রমতে আপত্তি আছে ঠিকই। তবে পাত্রটি যদি উচ্চবর্ণের হয় সেক্ষেত্রে বিবাহের একটা রীতিও আছে সেখানে। নিম্নবর্ণের কোনও কন্যা জাতে উঠতে পারে সেই বিবাহে। কিন্তু আরও একটা কথা এর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন তিনি। এজন্য পুরোহিতকে দক্ষিণা দিতে হবে দ্বিগুণ।
অরুর মনে এখন খুবই আনন্দ। সারাক্ষণই এখন সে এদিকে সেদিকে ঘুরে বেড়ায় আর চাপা খুশিতে উপচে পড়ে গুনগুন করে গান গায় দু-এক কলি। তাঁতির ঘরের এক কন্যাকে বিবাহের স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকে এই ব্রাহ্মণসন্তান।
কাহ্নুপাদের একটা বিয়ে করতে যাওয়ার গান ছিল। গুনগুন করে আজ সেটা একবার মনে করার চেষ্টা করে অরু।
জঅ জঅ দুন্দুহি সাদ উছলিআঁ।
কাহ্ন ডোম্বী বিবাহে চলিআ।
...
দামামায় বাজে জয় হে জয় হে
কাহ্ন ডোমনি চলেছে বিবাহে
গানটা গাইতে গাইতে আজ হঠাৎ মনে হয়, আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে সত্যি সত্যিই ডোম্বিনীকে বিয়ে করার একটা ইচ্ছে বুকের মধ্যে ঘুরপাক খেত কাহ্নুপাদের। কবিতার তত্ত্ব কিছুতেই বুঝতে চায় না অরু। রসেই তার চিরকালের আগ্রহ। হাজার হোক রক্তমাংসের একটা মানুষ তো ছিলেন কাহ্নুপাদ। এই জল হাওয়া ধুলো মাটিরই মানুষ। গানের পদগুলো ভোমরার মতো ঘুরপাক খায় অরুর মাথায়।
জঅ জঅ দুন্দুহি সাদ উছলিআঁ।
কাহ্ন ডোম্বী বিবাহে চলিআ।
ডোম্বী এর সঙ্গে যোই রত্তো।
খনহ ন ছাড়অ সহজ উন্মত্তো।।
কবি ছিলেন কাহ্নুপাদ। কাঙালও ছিলেন নিশ্চয়ই। আদৌ কি তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল প্রেমের টান উপেক্ষা করে নিরাসক্ত হয়ে যাওয়া? তাহলে কী করে তিনি রচনা করেছিলেন ওই কবিতা? চোখের জল মুছে কবিতাটি নিজের মতো করে আর একবার উচ্চারণ করে অরু
দামামায় বাজে জয়-হে জয়-হে।
কাহ্ন ডোমনি চলেছে বিবাহে।।
ডোমনিকে পেয়ে মিটেছে জন্ম।
যৌতুকে দেয় পরম ধর্ম।।
শবরপল্লিতে, ডোমপাড়ায়, চাষিপাড়ায় তখন লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে নানান আজগুবি কাহিনি। রসবতীর মদের দোকানে বসে সেই কাহিনি শুনে কৌতুক বোধ করেন ভুসুকু। সমুদ্রতীরের এক সিদ্ধ স্ত্রীলোকের উপরে নাকি করুণা জাগ্রত হয়েছিল কাহ্নুপাদের। স্ত্রীলোক উলটে গুপ্তবিদ্যার মন্ত্র দিয়ে আঘাত করেছিল তাকে। অসুস্থ হয়ে পড়ে কাহ্ন নাকি স্মরণ নিয়েছিলেন 'ভন্ধে' নামের কোনও ডাকিনীর। শ্রীপর্বত থেকে ভেষজ নিয়ে ভন্ধে ছুটে গিয়েছিলেন কাহ্নর কাছে। কিন্তু সেই মায়াবতী স্ত্রীলোক ভেষজটি প্রয়োগে বাধা দিয়েছেন ভন্ধেকে। সকলকে ক্ষমা করে দিয়ে কাহ্ন তাই বিপাক দেহ ত্যাগ করে চলে গিয়েছেন স্বর্গে।
এসব শুনে ভুসুকু বোঝেন শিষ্যরা মুখে মুখে নানান কাহিনি প্রচার করে চলে তাদের গুরুদের নিয়ে। বোঝেন লোকের মুখে মুখে এখন ক্রমশ অলৌকিক হয়ে উঠছেন কাহ্ন। দিনরাত্রির ঘূর্ণিতে সময় যায়। জোয়ার ভাঁটার খেলা চলে নদীর বুকে।
ডোম্বিনী তার খেয়ানৌকোর বৈঠা তুলে নিয়েছে আবার। ভোরের আকাশের মতো শান্ত হয়ে এসেছে তার চোখ।
সারাদিন সে দাঁড় বয়ে যায়। মানুষজনকে পার করে দেয়। আর স্রোতের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে গায়
সহজে চিত্ত শূন্যে পূর্ণ রাখো
কাহ্ন বিয়োগে বিষণ্ণ হয়ো নাকো।
না। বিষণ্ণ হয়নি ডোম্বিনী। কাহ্নুপাদের গান গাইতে হবে তাকে। তার কি বিষণ্ণ হলে চলে? ডোম্বিনী গেয়েছে—
কানু কানু করো বলো কানু নেই কীসে
অনুদিন ফুটে ওঠে ত্রৈলোক্যে সে।
মূঢ়রা কাতর দৃশ্যেরা লোপ পেলে
ভাঙা তরঙ্গ সাগর কি শুষে ফেলে?
সত্যি তো! সাগরের বুকে গিয়ে কি তরঙ্গ মরে যায়? নাকি তরঙ্গের পর তরঙ্গ জুড়ে তৈরি হয়ে ওঠে সাগর? সাগরের বুকে কি তরঙ্গের চলে যাওয়া? নাকি সাগরের বুকে মিশে সেও এক রকমের থেকে যাওয়া? ডোম্বিনী আবার গায়—
জগৎ রয়েছে দেখে না মূর্খ লোকে
দুধে থাকে মাটা, পড়ে না তা কারো চোখে।
সংসারে কেউ আসে না, না কেউ যাবে
কাহ্নিল যোগী লীলা করে এইভাবে।
কাহ্নুপাদ কি তবে সত্যিই চলে গেলেন সকলকে ছেড়ে? নাকি গানের সুরে আর কবিতার অক্ষরে তিনি থেকে গেলেন সকলেরই মধ্যে! এই সব ভাবতে ভাবতে খেয়া পারাপার করে ডোম্বিনী। গান গায়। নদীর বুকে পারাপার করতে করতে ডোম্বিনী এখন বোঝে—তাদের খণ্ড সময়ের এই নদীটা বহে চলেছে মহাসময়ের একটা সাগরের দিকে।
————
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।