কল্যাণ সরকার

আমি কোনো প্রথিতযশা লেখক বা সাহিত্যিক নই। কোনোকালেই তা ছিলাম না। শখের বশে দু-একটা গল্প টল্প লিখে থাকি মাঝেমধ্যে। তবে তার সংখ্যাটাও নিতান্তই কম। আসলে যেই ধরনের গল্প আমি লিখি, বা ভালো করে বললে, যেই ধরনের গল্প লিখতে আমি বেশি ভালোবাসি... তা হল ভৌতিক গল্প। এরপর কিছু মানুষ আছেন, যারা আমার এই গল্প পড়েন, পড়ে নিজেদের মতামত দেন, এবং সর্বোপরি ভালোমন্দের উপলব্ধিটা জানান। তাদের কাছ থেকে এই উৎসাহটা পাই বলেই বারবার আমার মনে হয় কলমটা ধরি, নতুন কিছু লেখার চেষ্টা করি।
কিন্তু এইখানে এসেই মাঝে মাঝে থামতে হয় আমার। লেখার ইচ্ছেটাকে চেপে যেতে হয় মনের গভীরে। কারণ আমার মনে হয়, এযাবৎ কাল অবধি ভূত নিয়ে যতো গল্প লেখা হয়েছে, তা হয়তো পৃথিবীর আর অন্য কোনো বিষয়ের উপরে লেখা হয়নি। তাই বর্তমান কালে ভূতের গল্পে নতুন প্লটের বড়ই আকাল। তাছাড়া এখানকার এই ডিজিটাল মাধ্যমের যুগে পাঠকদের ভয় পাওয়ানোটাও একজন লেখকের পক্ষে বড্ড দূরহ ব্যাপার। মোবাইল ইন্টারনেটের সৌজন্যে আজকালকার সবাই এতো বেশি ভূতের সিনেমা, বা ওয়েব সিরিজ দেখে ফেলেন যে নিছক গল্প পড়িয়ে তাদের ভয় পাওয়ানোটা সত্যিই মুশকিল।
তবুও আমি সবসময় চেষ্টা করি, আমার গল্প পড়ে পাঠকরা যেন সেই ভয়টাকে উপভোগ করতে পারেন, যেটা তারা একটা ভৌতিক গল্প পড়ার সময় প্রত্যাশা করেন। আর সেজন্যই আমার দরকার পড়ে নতুন নতুন প্লটের। কিন্তু সেই প্লট আবার যখন তখন আমার মাথায় আসতে চায়না। অগত্যা লেখালেখি থামিয়ে, সারাক্ষণ ভাবা ছাড়া তখন আর বিশেষ কিছুই করার থাকেনা।
দিনকয়েক আগে আমি ঠিক এইরকমই একটা অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম। নতুন গল্প লিখতে তো ইচ্ছা করছিল, কিন্তু যুতসই কোনো প্লট মাথাতেই আসছিল না। কি করবো বুঝেও উঠতে পারছিলাম না। ঠিক ওইরকম একটা সময়, আমার গল্পের একজন পাঠিকা হঠাৎ একদিন আমায় বললেন...
- 'স্যার, আপনার কাছে ফকির বাবার ঠিকানাটা পাওয়া যাবে?'
বেশ অবাক হলাম ওনার কথাটা শুনে। হঠাৎ ফকির বাবার ঠিকানা কেন?
যদিও ফকির বাবার সাথে আমার নিজস্ব কোনো পরিচয় নেই। একজনের মুখ থেকেই শুনেছিলাম ওনার নাম। তবে এইটুকু জানতাম যে উনি একজন তন্ত্রসাধক। মানুষের বিপদ-আপদে সাহায্য করে থাকেন। বিশেষতঃ সেই বিপদগুলো, যেগুলো ঠিক সুস্থ স্বাভাবিক না। অর্থাৎ কিনা যার মধ্যে লুকিয়ে আছে কোনো অলৌকিক বা অস্বাভাবিক কারন। শুনেছিলাম, তার থেকে তিনি নাকি বহু মানুষকে উদ্ধারও করেছেন। তাই জন্য লোকে ওনাকে মানেন, এবং বিশ্বাস করেন। আমি আমার একটা পুরোনো গল্পে ফকির বাবার এই অদ্ভুত ক্ষমতার কথা উল্লেখও করেছিলাম একবার। আমার মনে হল সেই গল্প পড়েই হয়তো আমার এই পাঠিকার মনে ওনার প্রতি বিশ্বাস জন্মেছে, এবং মনে হয়েছে উনি যেই বিপদের মধ্যে আছেন... তার থেকে কেবলমাত্র ফকির বাবাই পারেন ওনাকে উদ্ধার করতে।
সে যাই হোক, কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে... কি এমন ঘটছে ওনার সাথে, যার জন্য হঠাৎ করে ফকির বাবার ঠিকানা প্রয়োজন হয়ে পড়লো? কথাটা জিজ্ঞেস করতেই উনি রাজি হলেন আমাকে সেই ঘটনাটা শোনাতে। আর তারসাথে কেন জানি আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ও বলে উঠল... হয়তো ওনার কাছ থেকেই আমি পেয়ে যেতে চলেছি আমার পরবর্তী গল্পের প্লটটাও। তাই বেশ মনযোগ সহকারেই প্রস্তুত হলাম ওনার কাহিনী শোনার জন্য। এরপর উনি আমায় যা বললেন, যেভাবে বললেন, তা শোনার পর... জানিনা আপনারা বিশ্বাস করবেন কিনা... ওই দিনে দুপুরেও আমার শিরা-উপশিরা দিয়ে একটা ভয়ের শিহরণ খেলে গেল।
আজ আমি সেই ঘটনাটার কথাই শোনাতে চলেছি আপনাদের। তবে, এই কাহিনীটা আপনারা সত্যি বলে বিশ্বাস করবেন, নাকি নিছক গল্প ভেবে উপভোগ করবেন, তা সম্পুর্ণটাই আপনাদের নিজস্ব মতামত। কারণ, একটা কথা তো স্বীকার করতেই হবে যে এই পাঠিকার সাথে আমার খুব সামান্যই পরিচয়। তাই উনি যে সব সত্যি কথাই আমায় বলেছেন, তার কোনো প্রমাণ আমার কাছে নেই। তবে একটা কথা বলতে পারি, বহুদিন বাদে আবার কোনো গল্প লিখতে বসে সেই আগের মতোই গা ছমছম করছে। মনের ভিতর কেমন যেন একটা অদ্ভুত অস্বস্তি হচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছে... কেউ যেন আমার আশেপাশেই রয়েছে! সে আমায় দেখছে... নজর রাখছে আমার উপর।
যাই হোক, গৌরচন্দ্রিকা অনেক হলো। এবার তাহলে আসল ঘটনায় আসি। তবে যেহেতু এই কাহিনীটির সমস্তটুকুই আমার ওই পাঠিকার মুখ থেকে শোনা। তাই আমি চেষ্টা করছি ওনার ভাষাতেই ঘটনাগুলোকে আপনাদের সামনে তুলে ধরার। এতে হয়তো বিষয়টা আরও বেশি গ্রহণযোগ্য হবে আপনাদের কাছে।
নমস্কার... আমার নাম সায়নী ঘোষ সরকার। আমি একজন তিরিশোর্দ্ধ বিবাহিতা মহিলা, এবং এক সন্তানের মা। আমার বাপের বাড়ি রিষড়াতে, আর বিয়ে হয়েছে আগরপাড়ায়। তবে বর্তমানে এখন আর আমরা আগরপাড়ার বাড়িতে থাকিনা। জমি জায়গা নিয়ে কিছু শরিকি বিবাদের কারণে বিয়ের তিন বছর পরই আমরা শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে বরানগরের একটি ভাড়া বাড়িতে এসে উঠেছিলাম। তারপর সেখানে আবার বছর তিনেক থাকার পর, মাস দেড়েক আগে জোকাতে নিজেদের একটা 2BHK ফ্ল্যাট কিনে, সেখানে চলে আসি আমরা। এখানে ''আমরা'' বলতে... আমি, আমার স্বামী অরিন্দম সরকার, শাশুড়ি মা মধুছন্দা সরকার, আর আমাদের পাঁচ বছরের ছেলে টুকাই এর কথা বলেছি।
অরিন্দম এইমুহুর্তে একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে ম্যানেজার পদে চাকরি করে। আর আমার শ্বশুর মশাই যেহেতু কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী ছিলেন তাই শাশুড়ি মা এখনও তার পেনশন পান। মোটের উপর চারজনের সংসার বেশ ভালোভাবেই চলে যায়। কোনোরকম অসুবিধা বা ঝুট-ঝামেলা সেরকম কিছু ছিলনা বললেই চলে। কিন্তু আমাদের মতো এইরকম একটা নির্ঝঞ্ঝাট পরিবারেও যে হঠাৎ করে এমন একটা বিপদের কালো ছায়া নেমে আসবে, তার ধারণা আমার কোনোদিনই ছিলনা।
তবে সেই ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু বলার আগে আরও একটা কথা জানিয়ে রাখা দরকার, তা হল... আমাদের ফ্ল্যাটের অবস্থানটা আমি জোকা বললেও, সেটা কিন্তু ঠিক প্রপার জোকাতে নয়। বরং জোকা থেকে কিছুটা ভিতরের দিকেই। আসলে আগে আমরা যেই বাড়িটায় ভাড়া থাকতাম, তার বাড়িওয়ালা বেশ কিছুদিন ধরেই রেনোভেশনের জন্য আমাদের ঘরটা খালি করতে বলছিলেন। আর সেইজন্য আমাদের একটা অন্য বাড়ির দরকার ছিল খুব তাড়াতাড়ি। কিন্তু অরিন্দমের আবার ইচ্ছা ছিল, এই বাড়ি ছাড়ার পর ও আর অন্য কোথাও ভাড়া যাবেনা। নিজের বাড়িতেই উঠবে। তাই বেশ কয়েক মাস ধরেই কলকাতার দিকে নতুন ফ্ল্যাটের সন্ধানও করছিলাম আমরা। কিন্তু বাজেটের মধ্যে সেরকম পছন্দসই কিছু খুঁজেই পাচ্ছিলাম না। প্রপার সিটিতে যাও বা দু-একটা ভালো লাগছিল, কিন্তু সেগুলোর দাম সবই আকাশ ছোঁয়া। এইরকম একটা অবস্থায় অরিন্দমের এক অফিস কলিগ হঠাৎ একদিন আমাদের এই ফ্ল্যাটটার খোঁজ এনে দিল। প্রথমবার দেখতে এসেই জায়গাটা বেশ মনে ধরে গেল আমার। যদিও একটু ভিতরে, কিন্তু চারপাশের খোলামেলা শান্তশিষ্ট পরিবেশ দেখে আমার খুব পছন্দ হয়ে গেল ফ্ল্যাটটা। তারমধ্যে আবার এটার দামটাও ছিল সাধ্যের মধ্যে। তাই মনস্থির করতে খুব একটা বেশি দেরী করলাম না।
আমরা যেদিন বুকিং করতে এসেছিলাম, সেইদিনই কথা বলে নিয়েছিলাম... ফ্ল্যাট আমাদের খুব তাড়াতাড়ি চাই। প্রোমোটার মানুষটিও দেখলাম বেশ ভালো। উনি কথা দিয়েছিলেন, আমাদের ঘরটাই উনি সবার আগে কমপ্লিট করে দেবেন। আর দিয়েও ছিলেন তাই। আমাদের এই G+7 শান্তিনীড় বিল্ডিংয়ের টোটাল ২১টা ঘরের মধ্যে আমরাই সবার প্রথম গৃহপ্রবেশ করে এখানে ঢুকেছিলাম।
এরপর দেখতে দেখতে কেটে গেল প্রায় দেড়মাস সময়। তারমধ্যে আরও গোটা ছয়েক ফ্যামিলি চলে এল তাদের নিজেদের ফ্ল্যাটে। শান্তিনীড় ধীরে ধীরে মানুষের কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠতে শুরু করলো।
আমাদের ফ্ল্যাটটা ছিল বিল্ডিংয়ের চারতলায়। রুম নাম্বার ৩০১। অন্যান্য ফ্লোরে লোক চলে এলেও আমাদের এই ফ্লোরটায় এখনও কেউ আসেনি। অর্থাৎ ৩০২ আর ৩০৩ নম্বরটা খালিই পড়ে আছে। তারমধ্যে ৩০৩ নম্বরের যেই ঘরটা, সেটা আবার একদমই আমার ঘরের মুখোমুখি। ওই ফ্ল্যাটের যারা মালিক, অর্থাৎ অতনুদা আর সুলেখাদি... ওনারা বেশ কয়েকবার এসেছিলেন নিজেদের ঘরটা দেখার জন্য। সেই সুবাদে আমাদের সাথে ভালো পরিচয়ও হয়ে গেছিল ওনাদের। ওনারা যতবারই ফ্ল্যাট দেখতে আসতেন, একবার অন্তত আমাদের ঘরে ঢুঁ দিয়ে যেতেনই। কখনও আবার হাতে সময় থাকলে, বসে গল্প করে চাও খেয়ে যেতেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বেশ মিশুকে লোক। তবে সুলেখাদির তুলনায় অতনুদা একটু কমই কথা বলতেন।
অতনুদা লোকটার বয়স চল্লিশ বিয়াল্লিশের কাছাকাছি হবে। রোগা-পাতলা চেহারা, মাথায় হালকা টাক, চোখে চশমা পরেন। এক নজরে দেখলেই শান্তশিষ্ট, নিপাট গোবেচারা টাইপের ভদ্রলোক বলেই মনে হয়। আবার অপরদিকে সুলেখাদি ছিল ওনার ঠিক উল্টো। লম্বা-চওড়া, রাশভারী চেহারার একজন মহিলা। বয়স সাঁইত্রিশ আটত্রিশের বেশি হবেনা। কপালের একদম উপরের দিকে একটা লাল রঙের সিঁদুরের টিপ পরতো, আর ঠোঁটদুটো সবসময় পান খাওয়ার কারনে লাল হয়ে থাকতো। ওকে দেখলেই কেমন যেন আগেকার দিনের জমিদার গিন্নীগুলোর কথা মনে আসতো।
আমার এখনও মনে আছে, অরিন্দম একবার অতনুদাকে সিগারেট অফার করেছিল। উনি সেটা হাত বাড়িয়ে নিয়েও নিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরেই সুলেখাদি এমনভাবে ওনার দিকে চোখ কটমট করে তাকালো, যে বেচারা ভয়ে ভয়ে সিগারেটটাই ফিরিয়ে দিয়ে বললেন..
- 'নাঃ থাক... একটু আগেই খেয়ে এসেছি। এখন আর খাবোনা। ডাক্তার বেশি স্মোকিং করতে মানা করেছে।'
এই নিয়ে আমি আবার রাতে অরিন্দমকে বলেছিলাম...
- 'দেখলে তো অতনুদা সুলেখাদিকে কতোটা ভালোবাসে। তাকানো মাত্রই সিগারেটটা ফিরিয়ে দিল। আর তুমি তো আমার বারণ শুনতেই চাওনা।'
আমার এই কথায় অরিন্দম হেসে বলেছিল...
- 'ভালোবাসে না হাতি... অশান্তির ভয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিল। কিছুই কি বুঝিনা ভেবেছ? আসলে তোমার এই অতনুদা রীতিমতো ডরিয়ে চলে নিজের বউকে। এমনিতেই মহিলার যা দশাসই চেহারা, দেখলে আমারই কেমন যেন ভয় ভয় লাগে।'
তবে সুলেখাদিকে নিয়ে অরিন্দম মজা করে যাই কিছু বলুক না কেন, একটা ব্যাপারে কিন্তু অস্বীকার করার জায়গা নেই। তা হল... সুলেখাদির চেহারা রাগী রাগী হলেও, ওর কথাবার্তা, স্বভাব-চরিত্র, মানুষের সাথে ব্যবহার, এগুলো সবই খুব ভালো ছিল। আজ অবধি কখনও আমাদের বাড়িতে ও খালি হাতে আসেনি। যতোবারই এসেছে, সবসময় কিছু না কিছু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে টুকাইয়ের জন্য চিপস আর ক্যাডবেরি তো বাঁধাধরাই ছিল। ওকে দেখলেই টুকাই বলত... চিপস আন্টি এসে গেছে। আর সুলেখাদিও যে টুকাইকে খুব ভালোবাসতো, সেটা ওর চোখমুখ দেখেই বোঝা যেত।
অবশ্য এই অপত্য স্নেহের পিছনে অন্য একটা কারণ থাকাও খুব স্বাভাবিক। আর সেটা হল, সুলেখাদি ছিল নিঃসন্তান। বিয়ের বারো বছর কেটে যাওয়ার পরেও, ও এখনও মা হতে পারেনি। ওর নাকি ওভারিতে কিছু একটা প্রবলেম থাকায় ডাক্তার ওকে অনেক আগেই বলে দিয়েছিল... সন্তান জন্ম দেওয়ায় ওর মুশকিল আছে। আর সেই জন্যই হয়তো আমাদের বাড়িতে এসে টুকাইকে দেখে ওর মনে মাতৃত্বের মমতাটা জেগে উঠেছিল। তবে কারণ যাই হোক, সুলেখাদি আর টুকাই যে একে অপরকে সত্যিই খুব ভালোবাসতো... এই ব্যাপারে আমার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না। আর আমিও এই নিয়ে ওদের কোনোদিন কোনোরকম বাঁধা দিইনি। বরং আমার শাশুড়ি মা আমাকে বেশ কয়েকবার বলেছিলেন...
- 'ব্যাপারটা কিন্তু এবার বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে সায়নী। সুলেখা যখনই আসে, তখনই ওরকম টুকাই টুকাই করতে থাকে কেন?'
আমি তাতে হেসে বলেছিলাম...
- 'থাক না মা! এতে অসুবিধার কি আছে? বাচ্চা দেখলে অনেকেরই ওরকম হয়।'
আসলে আমার মনে হতো একজন নিঃসন্তান মহিলা যদি আমার ছেলের সাথে কথা বলে, ওকে আদর করে, সাময়িক মাতৃত্বের স্বাদ নিতে চাইছে, তাহলে নিক না। এতে ক্ষতি তো কিছু নেই।
যাই হোক, শান্তিনীড়ে আসার পর এইভাবেই কেটে যাচ্ছিল আমাদের দিনগুলো। নিজেদের নতুন বাড়িতে এসে সবাই বেশ আনন্দেই ছিলাম। এরমধ্যে অরিন্দমের অফিস থেকে ওকে দিন সাতেকের জন্য একটা ট্রেনিংয়ে পুণে পাঠানোর কথা হল। সেটা করে আসতে পারলে ওর নাকি প্রোমোশনও হয়ে যাবে। ও অবশ্য অফিসে ''হ্যাঁ'' বলার আগে আমায় একবার জিজ্ঞেস করেছিল... নতুন জায়গায় আমরা তিনজন একা থাকতে পারবো কিনা? আমি তাতে ওকে বলেছিলাম...
- 'কেন পারবো না? এখন তো বিল্ডিংয়ে অনেক ফ্যামিলি এসে গেছে। তাছাড়া সারাক্ষণ গেটের সামনে দারোয়ানও দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো অসুবিধা হলে ওদেরই না হয় ডেকে নেব। তুমি নিশ্চিন্তে যাও। মাত্র তো সাত দিনের ব্যাপার। ও আমি ঠিক সামলে নেবোখন।'
এরপরে অরিন্দম আর কোনো দ্বিমত করেনি। অফিসে জানিয়ে দিয়েছিল ও ট্রেনিংয়ে যেতে রাজি। কিন্তু অরিন্দমের যাওয়ার যখন আর মাত্র দিন দুয়েকের মতো বাকি, ঠিক তখনই আমাদের বিল্ডিংয়ে এমন এক ঘটনা ঘটলো যা আমার এতোদিনের চিন্তাভাবনা, আত্মবিশ্বাস, সবকিছুই এক লহমায় নষ্ট করে দিল।
আমার আজও মনে আছে... সেইদিনটা ছিল রবিবার। অরিন্দমের অফিস ছুটি, তাই ও সেলুনে গেছিল চুলদাড়ি কাটাতে। আমি আপন মনে রান্নাঘরে রান্না করছিলাম। হঠাৎ আমাদের ঘরের কলিং বেলের আওয়াজটা আমার কানে এল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম... সকাল এগারোটা বেজে কুড়ি মিনিট। মনে মনে বেশ আশ্চর্যই হলাম!
এই সময় আবার কে এল? এখন তো কারো আসার কথা নয়। তাছাড়া অরিন্দম তো এই কিছুক্ষণ আগেই গেল, তাহলে কি ও আবার ফিরে এল?
কথাগুলো মনে মনে ভাবছি, ততোক্ষণে আরও দুবার বেলের আওয়াজটা হল। ব্যস্ত হয়ে দ্রুত পায়ে গিয়ে দরজাটা খুলতেই চোখে পড়ল... দরজার সামনে হাতে একটা বড় ব্যাগ নিয়ে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে সুলেখাদি। ওকে হঠাৎ এইরকম একটা সময়ে আসতে দেখে আমি বেশ অবাকই হলাম। ওরা সাধারণত দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর কিম্বা বিকেলের দিকেই এখানে আসে। কিন্তু আজ সকালের দিকে কেন এল, তা বুঝে উঠতে পারলাম না। তাছাড়া অন্য দিনের তুলনায় আজ ওর সাজগোজটাও যেন একদম আলাদাই ছিল। পরনে লাল বেনারসি শাড়ি, মুখে চড়া মেককাপ, ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক, চোখে আই-লাইনার, এমনকি মাথায় একটা চন্দ্রমল্লিকা ফুলও গোঁজা। দেখে মনে হল হয়তো কোনো বিয়ে বাড়ি যাবে।
আমি দরজার বাইরে সামান্য উঁকি দিয়ে বললাম...
- 'অতনুদা আসেনি?'
সুলেখাদি ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে হাসি মুখে বলল...
- 'কেন... আমার বুঝি একা আসতে নেই? নাকি একা আসলে ঢুকতে দেবে না?'
কথাটা শুনে আমি একটু লজ্জায় পড়ে গেলাম। কোনোমতে সামলে নিয়ে বললাম...
- 'ছি ছি... তা কেন হবে? আসলে তুমি তো কখনও একা আসো না, তাই জিজ্ঞেস করলাম।' তারপর একটু থেমে বললাম...
- 'তা এত সাজগোজ করে চললে কোথায়? কোনো বিয়ে বাড়িতে যাচ্ছো বুঝি?'
- 'সেরকমই বলতে পারো। আসলে কি বলো তো... অনেকদিন টুকাইয়ের সাথে দেখা হবে নাতো, তাই ভাবলাম যাওয়ার আগে একবার দেখা করে যাই। তা, কই সেই রাজকুমার?'
আমার কেন জানি মনে হল, সুলেখাদি কোথায় যাচ্ছে, সেটা আমাকে ঠিক জানাতে চাইল না। তাই এড়িয়ে গেল কথাটা। আমি এবার টুকাইকে ডাক দিতেই যাব, তার আগে দেখলাম সুলেখাদি নিজেই ডাকতে শুরু করল।
- 'প্রিন্স... প্রিন্স.. কোথায় তুমি? দেখে যাও তোমার জন্য কতকিছু নিয়ে এসেছি।'
ওহ.. একটা কথা বলতে ভুলে গেছিলাম। সুলেখাদি প্রথমদিন থেকেই টুকাইকে প্রিন্স বলেই ডাকে। চিপস আন্টির গলায় নিজের নাম শোনা মাত্রই পাশের ঘর থেকে ছুটে এল টুকাই। তারপর কোনো কথা না বলে একলাফে উঠে বসলো সুলেখাদির কোলে। সুলেখাদিও ওকে আদর করে হামি খেতে খেতে টেবিলের উপর রাখা বড় ব্যাগটার চেন খুলে ফেলল। তারপর, একের পর এক দামি দামি খেলনা, দামি চকোলেট, চিপস... সব বোঝাই করে রাখতে লাগল টেবিলের উপর।
আমি যেন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম!
- 'এসব কি সুলেখাদি!!! এত্তো কিছু কেন এনেছ?'
আজ যেন আমারও কিঞ্চিৎ রাগই হল ওর উপর। এসবের মানে কি? কেন এত কিছু এনেছে ও? ও কি তবে এইসব দিয়ে আমার ছেলেটাকে বশ করতে চাইছে? আমি বেশ গম্ভীর গলাতেই বললাম...
- 'কিছু মনে কোরোনা সুলেখাদি, এইসব আমি রাখতে পারবো না। ওর বাবা এসে দেখলে খুব রাগারাগি করবে আমার উপর। তুমি এমনিতে রোজ টুকাইয়ের জন্য চকোলেট, চিপস নিয়ে আসো... তা নিয়ে কোনোদিন কিছু বলিনি। কিন্তু তাই বলে এতো কিছু! আমার পক্ষে রাখা সম্ভব হবে না।'
সুলেখাদি এবার সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর দুই হাত দিয়ে আমার হাত দুটোকে চেপে ধরে বলল...
- 'দোহাই সায়নী... আজ তুমি এগুলো আমায় ফিরিয়ে দিওনা। আমি যে বহু আশা করে প্রিন্সের জন্য এইসব কিনে এনেছি। আর, ও তো আমার সন্তানেরই মত... তাইনা বলো? তাছাড়া তুমি নিজে একজন মা হয়ে, আরেকজন নিঃসন্তান মায়ের যন্ত্রণাটা কি বুঝতে পারো না? আজকের পর ছেলেটার সাথে আবার কবে দেখা হবে জানিনা। তাই দয়া করে আমায় নিরাশ কোরোনা। আমি কথা দিচ্ছি তোমায়, আর কোনোদিন এমন ভুল আমি করবো না। শুধু আজকের দিনটা আমায় না বোলোনা। প্লিজ সায়নী... প্লিইইইজ....'
সুলেখাদি শেষের কথাগুলো বলার সময় ওর গলাটা কেমন যেন ভারি হয়ে এল। দেখতে পেলাম ওর চোখের কোনদুটো চিকচিক করছে জলে। কেমন যেন মায়া হল ওর মুখটার দিকে তাকিয়ে। ও তখনও আমার হাতদুটো ধরে, অসহায় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, আমার উত্তরের অপেক্ষায়। ওকে দেখে আমার বুকটাও কেন জানি ভারি হয়ে এল। চোখদুটো ভেজা ভেজা অনুভব হতে লাগল।
আমিও এবার ওর হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে খুব শান্ত গলায় বললাম...
- 'ঠিক আছে। থাক এগুলো।'
ও খুশিতে আত্মহারা হয়ে আবার সোফায় এসে বসে পড়লো। তারপর পরম আদরে কাছে টেনে নিল টুকাইকে।
সেদিন সুলেখাদি প্রায় আধাঘণ্টা মতো ছিল আমাদের ঘরে। তারমধ্যে ও শুধু এককাপ চা-ই খেয়েছিল, আর ওর বাকি সময়টুকু কেটেছিল টুকাইকে আদর করে। এরপর সুলেখাদি আমায় বলল...
- 'আজ তাহলে যাই আমি... যাওয়ার আগে অবশ্য ঘরটাও একবার দেখে যেতে হবে।'
এর উত্তরে আমি বললাম... 'যাই বলতে নেই। বলো আসি।'
তাই শুনে সুলেখাদি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তারপর বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। আর আমিও আবার দরজা বন্ধ করে এসে, পুনরায় মনোযোগ দিলাম রান্নায়।
এরপর কেটে গেছিল প্রায় চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময়। তার মধ্যে টুকাই নিজের নতুন খেলনা নিয়ে খেলতে বসে গেছিল, শাশুড়ি মাও নিজের ঘরে বসে টিভি দেখছিলেন, আর আমি রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম চিকেনটা বানাতে। ঠিক ওইরকম সময় হঠাৎ কেমন যেন একটা বিচ্ছিরি পোড়া পোড়া গন্ধ এসে লাগল আমার নাকে। প্রথমে ভাবলাম মাংসটা বুঝি কড়াইতে পোড়া লেগে গেছে। পরক্ষনেই মনে হল...
তা কি করে সম্ভব? এই একমিনিট আগেই তো আমি মাংস কষিয়ে জল ঢেলে এসেছি। এতো তাড়াতাড়ি কি করে পোড়া লাগতে পারে? কিন্তু তাহলে এই গন্ধটা আসছে কোথা থেকে! আমাদের চারতলায় তো আর কোনো লোকও থাকেনা যে তাদের ঘর থেকে আসবে।
আমি বেশ অবাক হয়ে গন্ধের কারণ খুঁজতে শুরু করলাম। কিন্তু সারা ঘরে এমন কিছু খুঁজে পেলামনা, যার থেকে ওই পোড়া গন্ধটা আসতে পারে। এদিকে প্রতিমুহুর্তে অনুভব করতে পারলাম গন্ধের তীব্রতাটা যেন ক্রমশ বেড়েই যাচ্ছিল। হঠাৎ আমার কানে এল বাইরে থেকে কারা যেন খুব চিৎকার চেঁচামেচি করছে। তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখতে পেলাম... ৩০৩ নম্বর রুম অর্থাৎ সুলেখাদিদের দরজার ফাঁক দিয়ে কালো কালো ধোঁয়া বাইরে বেরিয়ে আসছে। আর সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের দারোয়ান এবং বিল্ডিংয়ের কিছু লোকজন চিৎকার করছে। আর সাথে করে দরজাটায় ধাক্কাধাক্কিও করছে।
কেউ বলছে... 'উনি কি বাইরে বেরিয়েছিলেন?'
দারোয়ান বলছে... 'না... শুধু ঢুকতে দেখেছিলাম'
আরেকজন বলছে... 'নিশ্চয়ই গায়ে আগুন দিয়েছে, শিগগিরি পুলিশে কল করো'
একজন দেখলাম সাথে সাথেই মোবাইলে কাকে যেন কল করে বলছে... 'হ্যালো, পুলিশ থানা.... স্যার আমি শান্তিনীড় বিল্ডিং থেকে বলছি... আমাদের এখানে একজন সুইসাইড করেছে।'
টুকরো টুকরো কথাগুলো শুনে মাথার ভিতরটা কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গেল আমার।
এখানে আবার কে গায়ে আগুন দিল? এই ঘরে তো সুলেখাদি ঢুকেছে, নিজের ঘর দেখতে। ওর আবার কদিনের জন্য বিয়ে বাড়িও যাওয়ার কথা। তাহলে কে সুইসাইড করল?
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ায়, সারা শরীরটা থরথর করে কেঁপে উঠলো আমার! সুলেখাদি বলেছিল...
—'আজকের পর ছেলেটার সাথে আবার কবে দেখা হবে জানি না...'
কিন্তু কেন বলেছিল ও এমন? তবে কি ও এর মানে অন্য কিছু বোঝাতে চেয়েছিল? ও কি তাহলে বলতে চেয়েছিল, আজকের পর আর টুকাইয়ের সাথে ওর কোনোদিন দেখা হবেনা?
তারমানে এই ঘরে এখন যে গায়ে আগুন দিয়েছে, সে হল.......
বুকের ভিতরটা তীব্র গতিতে ধড়াস ধড়াস করতে থাকল আমার।
হঠাৎ সুলেখাদিদের ঘরের ভিতর থেকে বিকট একটা ''ফটাস শব্দ শোনা গেল। আর তার সাথেই কে যেন একজন ভয়ার্ত গলায় বলে উঠল...
—'মাটিতে পড়ে মাথার খুলিটা ফেটে গেল বোধ হয়।'
কথাটা শুনে আমার চোখের সামনে কেমন যেন একটা অন্ধকার ঘনিয়ে এল। আমি আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকে এসে, ধপকরে সোফায় বসে পড়লাম।
* * *
পুলিশ এল প্রায় পনেরো কুড়ি মিনিট বাদে। ততক্ষনে অরিন্দমও ফিরে এসেছিল সেলুন থেকে। পুলিশের লোকেরা দরজা ভেঙ্গে ভিতরে ঢোকামাত্রই, ঘরের ভিতর থেকে জমে থাকা চাপ চাপ কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাইরে বেরিয়ে আসতে থাকল। তারসাথে ভেসে আসতে লাগল দমবন্ধ করা প্রচণ্ড বিকট একটা মাংস পোড়া গন্ধ। আমি সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখতে পারবো না তাই ঘরেই বসে রইলাম। বেশ কিছুক্ষণ বাদে অরিন্দম এসে বলল...
—'পাঁচ লিটারের জার ভর্তি করে কেরোসিন তেল এনে রেখেছিল। পুরো শরীরটাই প্রায় কালো হয়ে ছাই হয়ে গেছে। তবে মরার আগে অনেক পাগলামি করেছিল সুলেখাদি। পাশের ঘরে গিয়ে কাঁচি আর রেজার দিয়ে নিজের মাথা ন্যাড়া করেছিল। চুলগুলো সেখানে এখনও পড়ে আছে। শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ, আর বাকি সব পোশাকও নাকি পাওয়া গেছে সেই ঘরে। পুলিশের ধারণা সম্পুর্ণ উলঙ্গ হয়ে, নিজের গায়ে পাঁচ লিটার কেরোসিন তেল ঢেলে তারপর আগুন দিয়েছিল।'
আমি তখন আর কিছু শোনার বা বোঝার অবস্থায় ছিলাম না। প্রচণ্ড বিধ্বস্ত লাগছিল নিজেকে। খুব ক্ষীণ কণ্ঠে অরিন্দমকে জিজ্ঞেস করলাম...
—'বডি নিয়ে গেছে পুলিশ?'
ও বলল...
—'সে কি আর নেওয়ার অবস্থায় আছে? কোনোরকমে কাচিয়ে কুচিয়ে যা নেওয়া যায়, তাই নিয়ে গেছে।'
কোনোরকমে উঠে দাঁড়ালাম আমি। তারপর টলতে টলতে আমাদের দরজার সামনেটায় এসে দাঁড়ালাম। উল্টোদিকে তখন দেখা যাচ্ছে সুলেখাদিদের দরজাটা খোলা অবস্থায় রয়েছে। তার মানে পুলিশ দরজা ভাঙেনি, লক ভেঙে ভেতরে ঢুকেছে।
আমি দেখতে পারলাম একজন পুলিশের লোক একটা সুইপার গোছের ছেলেকে দিয়ে ঘরের ভিতরটা ঝাঁট দেওয়াচ্ছে। আর তারফলে একগাদা কুচানো চুল বেরিয়ে এসে বাইরের হাওয়ায় উড়ছে। আমি জানি এগুলো সব সুলেখাদিরই মাথার চুল। হয়তো কোনো জমে থাকা রাগে, জেদে, অভিমানে ও নিজের মাথার চুলগুলো এইভাবে পাগলের মতো কেটে কুচিকুচি করেছে। আজ সকালের ওর মুখটা বারবার ভেসে উঠতে লাগল আমার চোখের সামনে। আর মনে হল, বুকের ভিতর জমে থাকা দলা পাকানো কান্নাটা এক্ষুনি চিৎকার হয়ে বেরিয়ে আসবে আমার গলা দিয়ে।
নাঃ... আমি আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না সেখানে। চলে এলাম ঘরের ভিতর।
এর পরের দুদিন বেশ ভোগানি গেল আমাদের। পুলিশের লোক এসে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করল আমায়। আমিও যা যা ঘটেছিল, সব সত্যি কথাই বললাম। শুনেছিলাম অতনুদাকেও নাকি জেরা করার জন্য থানায় নিয়ে গেছিল পুলিশ। অতনুদা সেখানে স্বীকারও করেছিল, আগের রাতে ওদের দুজনের নাকি ঝগড়া হয়েছিল। তবে সেটা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সাধারণ কথা কাটাকাটি যেমন হয়, সেরকমই। তার বেশি কিছু না। যদিও ওদের ঝগড়ার কারনটা আমরা তখনও কেউ জানতে পারিনি, তবুও কেন জানি আমার মনে হল... অতনুদা বিষয়টাকে সাধারণ বললেও, অতোটাও সাধারণ কিছু হয়নি। তা না হলে সুলেখাদির মতো মহিলা আত্মহত্যা করার মানুষ নন।
যাই হোক, দুদিন পর সবই একটু একটু করে শান্ত হয়ে এল। পুলিশ এসে ৩০৩ নম্বরের দরজাটা বাইরে থেকে তালা দিয়ে গেল, আর দারোয়ানকে বলে গেল... ওই ঘরে কেউ যেন ঢুকতে না পারে।
এতোদূর অবধিও মোটামুটি সব ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু আমাদের অসুবিধাটা শুরু হল তৃতীয় দিন থেকে।
সেদিন অরিন্দম অফিস থেকে ফিরলো রাত সাড়ে আটটা নাগাদ। ফিরেই দেখলাম কেমন যেন থম হয়ে বসে গেল ও। কি হয়েছে কারণ জিজ্ঞেস করাতে ও আমতা আমতা করে বলল...
—'জানো, আজ একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটলো একটু আগেই। আমি যখন লিফটে উঠলাম, সব ঠিকই ছিল। কিন্তু লিফটটা যেই তিনতলা ছাড়লো... অমনি শরীরটা কেমন যেন নিজের থেকেই ভারি হয়ে গেল। সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আর যখন চারতলাতে এসে নামলাম... মনে হল কেউ যেন পিছন থেকে টেনে ধরে রাখার চেষ্টা করছে আমায়। কত কষ্ট করে যে ঘর অবধি এসে বেলটা টিপলাম, সেটা আমিই জানি।'
লক্ষ্য করলাম কোনো এক অজানা কারণে অরিন্দমের দুইহাতের রোমগুলো তখনও খাড়া হয়ে আছে।
আমি রান্নাঘর থেকে একগ্লাস জল এনে অরিন্দমের হাতে দিয়ে, ওর পাশে বসলাম। তারপর ওর মাথাটা আমার কাঁধের উপর টেনে নিয়ে খুব ঠাণ্ডা গলায় বললাম...
-'আসলে তুমি পরশুদিন তো সারাক্ষন ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিলে। তার উপর আবার আগুনে পোড়া ডেডবডিটাকেও ঘর থেকে বের করতে দেখেছ। তাই হয়তো তোমার মাথার মধ্যে এখনও ওগুলো ঘুরছে, আর সেইজন্যই আজ একা আসার সময় তোমার এইসব ফিল হয়েছে। এগুলো আর কিছুই না, জাস্ট মনের ভুল... অনেকের সাথেই এরকম হয়। এতো না ভেবে তুমি যাও, জামাকাপড় ছেড়ে হাত-পা ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি চা বানিয়ে দিই.... চা খাও... দেখবে সব ভুলভাল চিন্তা মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে।'
অরিন্দম আরও কিছুক্ষন একমনে বসে কি যেন একটা ভাবলো, তারপর সোফা থেকে উঠে ধীরে ধীরে বাথরুমের দিকে চলে গেল।
ওর চোখমুখ দেখেই আমি বুঝতে পারছিলাম একটা চাপা ভয় তখনও ওর মধ্যে ভর করে রয়েছে।
তবে সত্যি কথা বলতে কি, এইসব ব্যাপারে আমার আবার ভয়ডর প্রায় নেই বললেই চলে। আমি প্রায়শই রাত জেগে ভূতের গল্প পড়ি, মোবাইলে ভূতের সিনেমা দেখি, এমনকি মাঝে মধ্যে রাতে ঘুম না এলে একা একা গিয়ে ব্যালকনিতেও দাঁড়িয়ে থাকি। কিন্তু আজ অবধি কোনোদিন কিছুতে ভয় পেয়েছি বলে আমার মনে পড়েনা।
সুলেখাদির মর্মান্তিক মৃত্যুটা আমার কাছে দুঃখজনক ছিল ঠিকই... কিন্তু তাই বলে ওর কথা চিন্তা করে আমি যে খুব ভয় পাচ্ছিলাম, তা কিন্তু মোটেই নয়। তবে নিজের সাহসিকতা নিয়ে আমার এই ভ্রান্ত ধারণা কাটতে খুব বেশি সময় লাগল না। আর সেটার সূত্রপাত হল সেইদিন রাতেই...
আমার ভালো করেই মনে আছে, সেইদিন রাতে লিফটের ওই ঘটনাটা হওয়ার পর অরিন্দম দরকার ছাড়া খুব বেশি কথা বলছিল না কারোর সাথে। ওকে দেখেই মনে হচ্ছিল ও যেন কোনো একটা দুশ্চিন্তায় ডুবে আছে। আমি বেশ কয়েকবার চেষ্টাও করেছিলাম ওকে নর্মাল করার। কিন্তু তাতেও খুব একটা ফল হয়নি। পরেরদিন অরিন্দমের পুণে যাওয়ার কথা ছিল, তাই নিয়েই ও বারবার আমায় বলে যাচ্ছিল...
—'বুঝতে পারছি না, কাল যাওয়াটা আদৌ ঠিক হবে কিনা!'
আমি একটু বিরক্ত হয়েই ওকে বলেছিলাম...
—'উফফফ.. তুমি চিন্তা করাটা বন্ধ করো তো এবার। বলছি তো আমি আছি, কোনো অসুবিধা হবে না। আর কোনো অসুবিধা হলে ভাইকে ফোন করে ডেকে নেব। ও না হয় কদিন এসে থেকে যাবে এখানে।'
আমার কথা শুনে অরিন্দম কতোটা নিশ্চিন্ত হতে পেরেছিল, তা জানি না। তবে ও আর এই ব্যাপারটা নিয়ে কোনো কথা বাড়ায় নি।
সেই রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে আমরা সবাই একটু আগেই শুয়ে পড়েছিলাম। টুকাই শুয়েছিল শাশুড়ি মায়ের ঘরে। ওনার নাকি একা শুতে গা-টা কেমন ছমছম করছিল।
অন্যদিন টুকাই শাশুড়ি মায়ের ঘরে শুলে, অরিন্দম সবসময় আমার সাথে মিলিত হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সেই রাতে দেখলাম ও ওইরকম কিছুই করল না। বিছানায় শোওয়া মাত্রই উল্টোদিকে ঘুরে ঘুমিয়ে গেল। ভাবলাম অফিসে হয়তো কাজের প্রেসার ছিল, তাই ক্লান্ত হয়ে আছে। আমিও আর ওকে জ্বালাতন করলাম না। মোবাইল ঘাটতে ঘাটতে কখন যে আমার চোখটাও বুজে এসেছিল, নিজেও জানিনা।
রাত তখন প্রায় সোওয়া একটা। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে, ঘুমটা ভেঙে গেল। অনেককেই বলতে শুনেছি, পরিচিত মানুষ মারা গেলে নাকি রাতে স্বপ্নটপ্ন আসে। কিন্তু আজ অবধি আমার সেরকম কোনো অভিজ্ঞতা হয়নি। তবে সেদিন রাতে কেন যে ওই স্বপ্নটা দেখলাম....!!!!
আমি দেখলাম, সুলেখাদি ন্যাড়া মাথায় আমাদের সোফার উপর বসে টুকাইয়ের সাথে জোর করে ওর নতুন খেলনাগুলো দিয়ে খেলছে। টুকাই কিছুতেই খেলতে চাইছে না, ও ভয় পেয়ে কাঁদছে। তাও সুলেখাদি ওকে ছাড়ছে না। কেমন যেন বিচ্ছিরি ভাবে হাসছে, আর ওকে চেপে ধরে রেখেছে নিজের সাথে। ঘুমের মধ্যেই আমি যেন শুনতে পেলাম... টুকাই চিৎকার করে ডাকছে, মা.. মা.. বলে।
এরপরেই হঠাৎ করে ঘুমটা আমার ভেঙে গেল। বুঝতে পারলাম গলাটা শুকিয়ে এসেছে। অন্যদিন আমি খাটের পাশে জলের বোতল রেখেই শুই। কিন্তু সেদিন কোনো কারণে রাখতে ভুলে গেছিলাম। আমি বিছানা থেকে উঠে রান্নাঘরে গেলাম জল আনতে। জলটা খেয়ে রান্নাঘরের আলোটা নিভিয়ে যখন আমি বেরোতে যাচ্ছি, ঠিক তখনই কেমন যেন একটা বিদঘুটে পোড়া পোড়া গন্ধ এসে লাগল আমার নাকে।
আশ্চর্য... এতো রাতে পোড়া গন্ধ! অবাক হয়ে গেলাম। আমি কি তাহলে গ্যাস নিভাতে ভুলে গেছি? আরও একবার রান্নাঘরের আলো জ্বালিয়ে সব কিছু ভালো করে দেখলাম।
নাঃ... সবই তো ঠিকই আছে। তাহলে এই গন্ধটা আসছে কোথা থেকে?
ঘরে তখন সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আমি কাউকে কিছু না বলেই, একাএকা চুপচাপ হলরুমে এসে দাঁড়ালাম। এখান থেকে যেন উগ্র পোড়া গন্ধটার তীব্রতাটা আরও বেশি করে নাকে এসে লাগছে। কিন্তু কোথা থেকে আসছে এই গন্ধ... আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। বেশ কিছুক্ষণ হতবুদ্ধির মত ওখানেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। তারপরেই হঠাৎ করে আমার চোখ গেল, আমাদের ঘরের মেইন ডোরটার দিকে।
কেমন যেন একটা অদ্ভুত সন্দেহ জাগল মনের মধ্যে। আমি ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম বন্ধ দরজাটার দিকে। তারপর আস্তে আস্তে দরজার ছিটকিনি খুলে, পাল্লাটা সামান্য ফাঁকা করতেই, জীবনে প্রথমবার আমার শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল।
হ্যাঁ... আমি যা সন্দেহ করেছিলাম, ঠিক তাই! গন্ধটা আসছে আমাদের রুমের বাইরের অন্ধকার বারান্দাটা থেকে।
কিন্তু এটা কি করে হতে পারে? একজন মানুষ, যে কিনা তিনদিন আগে আগুনে পুড়ে মারা গেছে, তার সেই পোড়া গন্ধ আমি তিনদিন পরে এই গভীর রাতে কি করে পেতে পারি? এটা তো অসম্ভব ব্যাপার। নিজের ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে নিজেই যেন বিশ্বাস করে উঠতে পারলাম না আমি।
তাড়াতাড়ি দরজাটা বন্ধ করে আমি সেখান থেকে বেডরুমে ফিরে এলাম। বিছানায় শুয়ে একবার মনে হল অরিন্দমকে সব ব্যাপারটা খুলে বলি। কিন্তু তারপরেই আবার মনে হল... ও এমনিতেই ভয় পেয়ে রয়েছে। এইসব কথা শুনলে আরও হয়তো ঘাবড়ে যেতে পারে। তাই ওকে আর ডাকাডাকি না করে, চুপচাপ শুয়ে পড়লাম ওর পাশেই। যদিও আমার চোখে তখন ঘুমের লেশমাত্র ছিল না, তবুও একরকম জোর করেই চোখ বুজে পড়ে রইলাম আমি। শুনতে পারছিলাম আশেপাশেই কোথাও যেন একটা বিড়াল করুণ সুরে মানুষের গলায় কেঁদেই চলেছে। নিশুতি রাতের অন্ধকারে সেই ডাকটা শুনে কেন জানি খুবই অস্বস্তি লাগছিল আমার। কিন্তু ওইমুহুর্তে বিছানা ছেড়ে উঠে আমি যে ওটাকে তাড়াবো, সেই সাহস আমার ছিল না। তাই বাধ্য হয়েই কানের উপর বালিশ চাপা দিয়ে, অরিন্দমকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইলাম। এরপর কখন যে আমার দুচোখে ঘুম নেমে এল, তা নিজেও জানি না।
* * *
পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে বেশ দেরীই হয়ে গেল আমার।
ওইদিনই আবার অরিন্দমের পুণে যাওয়ার কথা। বিকেল চারটেয় দমদম থেকে ফ্লাইট। দুপুর দেড়টার মধ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে ও। তাই সেদিন সকাল থেকেই কাজের চাপটাও ছিল বেশি। ও যা যা নিয়ে যাবে সেগুলো বের করে দেওয়া, তাড়াতাড়ি রান্না করা, ঘর গোছানো, স্নান করে ঠাকুরকে পুজো দেওয়া.. এইসব কর্মব্যস্ততার মাঝে আগের রাতের ঘটনাগুলো মাথা থেকে প্রায় বেরিয়েই গেছিল আমার। তবে মাঝে মাঝে যখন কোনো দরকারে নিজের ঘরের দরজাটা খুলতে হচ্ছিল, আর ৩০৩ নম্বর রুমটার দিকে চোখ পড়ে যাচ্ছিল... তখন কয়েকবার মনে পড়ে গেছিল আগের রাতের কথাগুলো। কিন্তু দিনের আলোয়, তখন ওই সম্পুর্ণ ব্যাপারটাকেই কেন জানি মনের ভুল বলেই মনে হয়েছিল আমার।
সেদিন দুপুরবেলায় অরিন্দম যখন বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে.. তখনই আকাশটা কেমন যেন কালো করে ছিল। আর ও বেরিয়ে যাওয়ার আধা ঘন্টার মধ্যেই ঝেঁপে বৃষ্টিটাও নেমে গেল। আমরা তিনজন দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে একটু শুয়ে ছিলাম নিজেদের ঘরে। এমনিতে দুপুরে ঘুমানোর বদভ্যেস আমার নেই। কিন্তু গতরাতে ঘুমটা ঠিকমতো হয়নি তাই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়লাম।
চোখ যখন খুললাম, তখন চারিদিকে অন্ধকার হয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। মোবাইলে সময় দেখে বেশ অবাকই হলাম। প্রায় তিন ঘন্টারও বেশি সময় ধরে ঘুমিয়েছি আমি। মনে মনে ভাবলাম, আজ রাতের ঘুমটা গেল আমার। তবে একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হলাম যে অরিন্দম আজ বাড়িতে নেই। তাই রাতে দেরি করে ঘুম আসলেও, কাল সকালে ওঠার অতো তাড়া নেই।
সন্ধ্যে পৌনে সাতটা নাগাদ চা বানিয়ে শাশুড়ি মাকে যখন দিতে গেলাম, উনি একটা অদ্ভুত কথা বললেন...
—'কি হয়েছে সায়নী? ওই বাড়ির কারো সাথে ঝগড়া হয়েছে বুঝি?'
আমি অবাক হয়ে বললাম...
—'ঝগড়া!!! কই নাতো!'
—'তাহলে একটু আগে বাথরুমে ঢুকে গুমরে গুমরে ওইভাবে কাঁদছিলে কেন?'
—'বাথরুম..??? আমি...???' কথাটা শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম।
-'কই আমি তো বাথরুমে যাইনি মা। আমি তো রান্নাঘরে চা বানাচ্ছিলাম।'
শাশুড়ি মায়ের মুখ দেখে মনে হল, উনি যেন আমার কথাটা ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারলেন না। নিজের মনেই উনি বিড়বিড় করে বললেন...
—'তুমি বাথরুমে যাওনি!!! কিন্তু আমি যে পরিষ্কার শুনলাম......'
হঠাৎ আমার মনে পড়ল গতরাতের সেই বিড়ালের কান্নার আওয়াজটার কথা। আমি একটু হেসে উঠে বললাম...
—'ওহ... বুঝেছি। আপনি হয়তো সেই বিড়ালের কান্নার আওয়াজটা পেয়েছেন। কাল রাতে আমিও পেয়েছি সেই আওয়াজ।'
—'বিড়ালের কান্না???' শাশুড়ি মায়ের বিস্ময় যেন আরও বেড়ে গেল।
—'আর বলবেন না মা। কে জানে কোথা থেকে এই আপদটা এসে জুটেছে। হয়তো সিঁড়ি বা দরজার সামনে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। তারপর সারাক্ষণ ওই মড়াকান্না কাঁদতে থাকে। দাঁড়ান.. কালকেই দারোয়ানকে বলে ওটাকে তাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।'
আমার কথা শুনে শাশুড়ি মা আর বিশেষ কিছু বললেন না বটে। তবে ওনার চোখ মুখ দেখে মনে হল, উনি হয়তো কথাটা ঠিক মন থেকে সায় দিতে পারলেন না।
সেদিন রাত নটা, সোওয়া নটা নাগাদ অরিন্দমের ফোন এল। ও হোটেলে পৌঁছে গেছে, পথে কোনোরকম অসুবিধা হয়নি ওর। অরিন্দমের ফোনটা রেখেই রাতের রুটি করতে যাবো বলে কিচেনের দিকে পা বাড়াচ্ছিলাম, হঠাৎ আমার নজর পড়ল হলরুমের সাদা মার্বেলটার উপর।
আশ্চর্য... এখানে এরকম চুল এল কোথা থেকে? সারা হলরুমের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মানুষের মাথার এক বিঘত সাইজের কাটা চুল। সেগুলো আবার ফ্যানের হাওয়ায় এদিক সেদিক উড়ছে। দেখেই খুব রাগ হল শাশুড়ি মায়ের উপর। ওনার এরকম অভ্যাস আছে কাঁচি দিয়ে চুল কাটার। আগা ফেটে গেলেই নিজের চুল নিজেই কেটে নেন। আজও নিশ্চয়ই তাই করেছেন। মনে মনে ওনার উপর বেশ রাগই হল। কিন্তু মুখে কিছু বললাম না। শুধু চুলগুলোকে ঝাঁটা দিয়ে জড়ো করে ডাস্টবিনে ফেলে দিলাম। তারপর হাত ধুয়ে আবার গেলাম রুটি করতে।
তবে সেদিন একটা ব্যাপার আমি খেয়াল করতে পারিনি, যদি পারতাম তাহলে হয়তো মিছিমিছি শাশুড়ি মায়ের উপর রাগ করতাম না। আর সেই ব্যাপারটা হল... শাশুড়ি মা যখনই চুল কাটেন, তখন কাঁচা পাকা চুল মেশানো থাকে। কিন্তু সেইদিন আমার মার্বেলে ছিল... শুধুই কাঁচা চুল!!!
ওইদিন রাত দশটার পর আবার ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হল। অন্যসময় অরিন্দম বাড়িতে থাকলে, আমাদের খেতে খেতে রাত প্রায় এগারোটা, সাড়ে এগারোটা বেজে যায়। কিন্তু সেদিন কোনো কাজ না থাকায় আমরা সাড়ে দশটার মধ্যেই সবাই খেয়ে নিয়েছিলাম। শাশুড়ি মা বললেন, ওনার আজও নাকি একা শুতে অসুবিধা হচ্ছে। তাই তিনজনেই এক ঘরে শুয়ে পড়তে। সেই শুনে আমি বললাম...
—'ঠিক আছে মা... আপনি না হয় টুকাইকে নিয়েই শুয়ে পড়ুন। আমার একা শুতে কোনো অসুবিধা হবেনা।'
উনি কেমন যেন চিন্তিত গলায় বললেন...
—'পারবে তুমি একা শুতে?'
আমি মৃদু হেসে বললাম...
—'হ্যাঁ... হ্যাঁ... কেন পারবো না? আগে তো নিজের বাড়িতে একাই শুতাম।'
শাশুড়ি মা আর কোনো কথা বাড়ালেন না। শুধু টুকাইকে নিয়ে নিজের ঘরে যেতে যেতে বলে গেলেন...
—'ঠিক আছে... দরজাটা ভেজানো রইলো তাহলে। অসুবিধা হলে ডাক দিও।'
আমিও ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম। আসলে সত্যি কথা বলতে কি, টুকাই ওই ঘরে শোওয়ায় মনে মনে আমি একটু খুশিই হয়েছিলাম। কারণ এমনিতেই দুপুরে আজ অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছি আমি। তাই রাতে ঘুম আসতেও দেরি হবে। তার উপর কাল আবার অরিন্দমের অফিসের তাড়াও নেই। তাই আরামসে একটা ওয়েব সিরিজ দেখা হয়ে যাবে। টুকাই সামনে থাকলে মোবাইলে কিছু দেখাই যায়না। বড্ড জ্বালাতন করে ও।
তারপর আর কি... যেই ভাবা সেই কাজ। রাত পৌনে এগারোটা নাগাদ আশ্রমের এর সিজন-২ টা চালিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম আমি। অনেকদিন ধরেই এটা দেখার শখ ছিল আমার। বাইরে তখনও একনাগাড়ে বৃষ্টি পড়ে চলেছে। এইরকম একটা ঠাণ্ডা ওয়েদারে হালকা চাদর গায়ে জড়িয়ে, বিছানায় শুয়ে শুয়ে মুভিটা দেখতে বেশ ভালোই লাগছিল।
রাত তখন কটা বাজে... বড় জোর বারোটা কি সোওয়া বারোটা হবে। আমি তখন সবে তিনটে কি চারটে এপিসোড শেষ করেছি। ঠিক এমন সময় হঠাৎ করে পেটটা মোচড় দিয়ে, পিরিয়ড হয়ে গেল আমার। যদিও জানতাম সময় এসে গেছে, তবুও রাত বিরেতে এরকম কিছু হলে কেন জানি খুব বিরক্ত লাগে আমার। রাগও হয় ভীষন। কিন্তু কি আর করা যাবে?
বাধ্য হয়েই মোবাইলটা বন্ধ করে একটা স্যানিটারি প্যাড নিয়ে ঢুকলাম বাথরুমে। আর সাথে সাথেই এমন এক অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হলাম, যাতে আমার অন্তরাত্মাটা পর্যন্ত ভয়ে কেঁপে উঠল। জানিনা আপনাকে বললে আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা। তবে সেই রাতে বাথরুমের দরজাটা বন্ধ করা মাত্রই আমার কানে এল... একজন মহিলা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আমার বাথরুমের ভিতর। ওর নাক টেনে টেনে গুমরে কাঁদার আওয়াজটা একদম পরিষ্কার শুনতে পারছিলাম আমি। তবে এটাও সত্যি যে সেসময় ওখানে আমি ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি, কেউ ছিল না! বাথরুমটা একদম খালিই পড়েছিল!
তাহলে এই আওয়াজটা আসছে কোথা থেকে? মারাত্মক চমকে উঠলাম আমি। তাড়াতাড়ি একছুটে বেরিয়ে এলাম বাথরুমের বাইরে।
কিন্তু আশ্চর্য! বাথরুম থেকে বেরোনো মাত্রই আর কোনো আওয়াজ শুনতে পেলাম না আমি। মনে মনে কেমন যেন একটু সন্দেহ হল।
তাহলে কি আমার শুনতে কোনো ভুল হয়েছে?
আবার সাহস করে বাথরুমের ভিতর ঢুকলাম আমি। তারপর পুনরায় দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করলাম। ব্যাস... সাথে সাথেই আবার সেই কান্নার আওয়াজটা শুরু হয়ে গেল। মনে হল কেউ যেন একদম আমার পাশে দাঁড়িয়ে, গায়ে গা ঠেকিয়ে কাঁদছে। আর এই গলার আওয়াজটা আমার খুব চেনা। শরীরটা কেমন যেন ভারি হয়ে এল আমার। গলাটা নিজের থেকেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। আমি আর একমুহুর্তও ওখানে না দাঁড়িয়ে, তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বাইরে এসে হলরুমে দাঁড়ালাম।
বুকের ভিতরটা তখনও ঢিপঢিপ করছে আমার। একবার মনে হল ওখানে দাঁড়িয়েই প্যাডটা পরে নিই... কেই বা দেখতে যাবে?
কিন্তু তার পরক্ষনেই মনে হল... কিসের ভয়ে আমি বাথরুমে যাচ্ছি না? এরকম আবার কখনও হয় নাকি যে ফাঁকা বাথরুমে কেউ কাঁদবে? নিশ্চয়ই আমার বুঝতে কোথাও ভুল হচ্ছে। হয়তো সেই বিড়ালটাই আবার কাঁদছে, আর আমি ভাবছি বাথরুমে কেউ রয়েছে।
নিজের মনকে আগের থেকে অনেকটা সাহস জুগিয়ে আবার আমি এগিয়ে গেলাম বাথরুমের দিকে। মনে মনে ঠিক করলাম, যেই আওয়াজই হোক না কেন.. নিজের কাজ শেষ করে তবে এইবার বাথরুম থেকে বেরোবো।
কিন্তু আমার সমস্ত সাহস, সব আত্মবিশ্বাস.. সকল কিছুই এক লহমায় শেষ হয়ে গেল, যখন আমি বাথরুমের দরজাটা বন্ধ করলাম। আবার সেই একই ভাবে কেউ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আর এইবার তার সাথে অনুভব করলাম আওয়াজটা ক্রমশ যেন আমার দিকেই এগিয়ে আসছে।
কাছে... আরও কাছে... আরও আরও কাছে... একদম আমার কানের সামনে।
কিছুতেই নিজেকে আর শক্ত রাখতে পারলাম না আমি। অনুভব করলাম আমার সারা দেহের ওজন যেন কয়েকগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। তার সাথে হাত-পাগুলোও কেমন যেন অবশ হয়ে গেছে। নড়াচড়া করার শক্তিটুকুও আমি যেন আর পাচ্ছিলাম না...
ঠিক ওইরকম একটা অবস্থায়, হঠাৎ আমার চোখ গেল বাথরুমের কমোডের একদম নিচ দিকটায়। ওখানে জড়ো হয়ে পড়ে আছে মানুষের মাথার এক বিঘত সাইজের কুচানো চুল। এইবার আর বুঝতে অসুবিধা হল না যে... এই চুল আমার শাশুড়ির না। এই চুল হল তার, যে কিনা জেদে, রাগে, তেজে পাগল হয়ে গিয়ে নিজের মাথার চুল নিজে কেটে ন্যাড়া হয়েছিল।
অর্থাৎ, সুলেখাদির চুল...
ওর নামটা মাথায় আসা মাত্রই ওই বন্ধ বাথরুমের ভিতর আমি যেন ওর পারফিউমের গন্ধটাও অনুভব করতে পারলাম।
এরপর সেদিন আমি কি ভাবে যে ওই বাথরুমের খুলে শাশুড়ি মায়ের ঘরে ছুটে গেছিলাম, তা শুধু আমিই জানি।
শাশুড়ি মা আমার আওয়াজ পেয়ে ঘুম থেকে জেগে গিয়ে আমায় জিজ্ঞেস করেছিলেন... আমি ভয় পেয়েছি কিনা?
আমি নিজেকে খুব শান্ত করে নিয়ে বলেছিলাম...
—'না.. না.. আসলে অনেকদিন একা শুই না তো, তাই ঘুম আসছিল না।'
তারপর শাশুড়ি মায়ের ছোটো অ্যাটাচ বাথরুমটায় নিজেকে ফ্রেশ করে, সেইরাতে আমি ওই ঘরেই শুয়েছিলাম।
কিন্তু শোওয়ার পরেও, অনেক রাত অবধি আমি সেই ফুঁপিয়ে কাঁদার আওয়াজটা পেয়েছিলাম। বুঝে ছিলাম, এটা কোনো বিড়ালের আওয়াজ নয়... এটা মানুষের আওয়াজ... কিম্বা আরও ভালো করে বললে, এটা হয়তো কোনো জীবিত মানুষেরই আওয়াজ নয়....
এতোদূর জানার পর হঠাৎ করেই একটা প্রশ্ন এসেছিল আমার মনে। সায়নীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম...
—'আচ্ছা, তোমার কথা শুনে যা বুঝেছি... তাতে তো তোমাকে বেশ সাহসী আর বাস্তব মনোভাবাপন্ন একটা মেয়ে বলে মনে হয়েছিল আমার। কিন্তু তারপরেও তুমি এতো সহজে ওইসব ভূত প্রেত অলৌকিকতায় বিশ্বাস করে নিলে? একটু ভেবে দেখলে না যে হতেই তো পারে ওগুলো সবই তোমার মনের ভুল। তাছাড়া মানুষের বাথরুমে চুল পড়ে থাকা কি অস্বাভাবিক কিছু? সে তো সবার বাথরুমেই থাকে। কিন্তু তাই বলে সেটা যে সুলেখাদিরই চুল হতে হবে... এ কথা তোমায় কে বলে দিল? একটু ভেবে বলো তো, তুমি যা বলছো সেগুলো কি বর্তমানে এই বিজ্ঞানের যুগে দাঁড়িয়ে বিশ্বাস করা যুক্তিসংগত?'
আমার প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছিল সায়নী। ও হয়তো আমার কাছ থেকে এই ধরণের কোনো কথা একেবারেই প্রত্যাশা করতে পারেনি। কারন আমি নিজেও এর আগে বেশ কিছু ভৌতিক গল্প এমন লিখেছি যা সত্যি ঘটনা অবলম্বনে। এবং তার মধ্যে তো একটা গল্প আমি আমার নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে দাবীও করেছি। তাই ও হয়তো ভেবেছিল, আমি অন্ততঃ ওর কথায় বিশ্বাস করবো। কিন্তু আমিও অন্যদের মতো অবিশ্বাস সূচক প্রশ্ন করায়, ও যেন একটু মর্মাহতই হয়েছিল। তবে আমার ওই প্রশ্নের খুব সুন্দর একটা উত্তর দিয়েছিল সায়নী। সেটা আমি এখানে তুলে ধরছি। ও আমায় বলেছিল...
—'আপনি একদম ঠিক কথাই বলেছেন। আমার এই ঘটনাগুলো যে শুনবে, সেই অবিশ্বাস করবে। ভাববে হয়তো আমি বানিয়ে বানিয়ে বলছি, কিম্বা সবটাই আমার মনের ভুল।
আসলে এগুলো এমন একটা ব্যাপার যে যারা ভুক্তভোগী হয়, তারা ছাড়া কেউ মানতেই রাজি হয়না এইসব ঘটনায়। এতোদিন যেমন আমিও মানতাম না। কিন্তু ওই রাতের পর আমার সব চিন্তাভাবনা, ধ্যানধারণায় আমূল পরিবর্তন এসে গেছিল। আমি বুঝতে শিখেছিলাম, একজন মানুষের মৃত্যুর পরেই তার সবকিছু শেষ হয়ে যায়না। বরং তারা চাইলে মৃত্যুর পরেও আমাদের মাঝেই থাকতে পারেন। আর শুধু থাকতেই নয়, তাদের ইচ্ছা হলে তারা ভয়ঙ্কর রকমের ক্ষতিও করতে পারেন আমাদের। ঠিক যেমনটা ঘটেছিল আমার বা আমার পরিবারের সাথে।'
সায়নী এরপর নিজের পরবর্তী দুদিনের ঘটনাগুলোও বলেছিল আমায়। সেগুলো শোনার পর অনেকেরই হয়তো অবিশ্বাস হতে পারে ওর কথা। ভাবতে পারেন ও বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা কথা বলেছে আমাকে। কিন্তু আমি জানি, ও যা বলেছে সেগুলো মিথ্যা ছিলনা। আর এটা বোঝার একটা সহজ উপায় আছে। আপনারাও চাইলে বুঝতে পারবেন। আর সেই সহজ উপায়টা হল... আপনার অনুভূতি।
আসলে একটা কল্পনা আশ্রিত গল্প, আর একটা সত্যি ঘটনার মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয় এই অনুভূতি। যেটা নিয়ন্ত্রিত হয় আমাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে। ওর গল্পটা শুনতে শুনতে আপনারও যদি আমার মতো হঠাৎ করে গা ছমছম করে ওঠে, কিম্বা নিজের থেকেই সারা শরীরে শিহরণ খেলে যায়... তাহলে আপনিও বুঝতে পারবেন সায়নী মিথ্যা কথা বলছে না। কারন মন গড়া কাহিনীতে কখনও শরীর ভারি করেনা, যেটা এখন আমার এই ঘটনাগুলো লিখতে গিয়ে হচ্ছে।
যাই হোক, অনেক কিছুই বলে ফেললাম। অনেক কথাই বোঝালাম। এবার তাহলে আসল কাহিনীতে ফিরে যাই। সায়নীর মুখেই না হয় শুনে নিই, ওর বাকি দুদিনের পরবর্তী ঘটনাগুলো।
* * *
পরেরদিন ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ঘুম ভেঙে গেছিল আমার। কেমন যেন একটা অস্বস্তি, একটা দুশ্চিন্তায় সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি আমি।
বারবার কিছু প্রশ্ন এসে আমার মনের ভিতরটা তোলপাড় দিচ্ছিল। যার উত্তরগুলো আমি হাজার খুঁজেও পাচ্ছিলাম না। বারবার মনে হচ্ছিল...
সুলেখাদি তো নিজের ইচ্ছাতেই আত্মহত্যা করেছিল। ওর সাথে তো আমরা কোনো খারাপ ব্যবহার করিনি। তাহলে ও কেন শুধু শুধু এসে আমাদের এইভাবে ভয় দেখাচ্ছে? কেন করছে এমন? কি চাইছে ও আমাদের কাছে থেকে?
তাছাড়া, আমি তো জানতাম মৃত্যুর পরে মানুষের সব দুঃখ কষ্টেরই অবসান হয়ে যায়। তাহলে ওর কেন হলনা? কিসের এতো ব্যথা... এতো কিসের যন্ত্রণা ওর মনে? সারারাত ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ওইভাবে... ও কেন কাঁদে?
উত্তরগুলো পেলাম সকালবেলায় ফোনে। আমার মায়ের কাছ থেকে। আসলে গতরাতের ওই ঘটনাগুলোর কথা কাউকে বলতে না পারলে, আমি ঠিক শান্তি পাচ্ছিলাম না। কিন্তু বলবো কাকে? বাড়িতে বয়স্ক শাশুড়ি আর টুকাই। তারমধ্যে শাশুড়ি এমনিতেই একটু ভয় পেয়ে রয়েছেন। ওনাকে বললে উনি আরও ভয় পেয়ে যাবেন, তাতে হিতে বিপরীত হবে। টুকাই তো বাচ্চা... ওর কথা বাদই দিলাম। রইলো বাকি অরিন্দম। ও এখন বাড়ি থেকে এতো দূরে রয়েছে, ওকে এইসব বলে ওর টেনশন বাড়াতে চাইছিলাম না আমি। তাই বাধ্য হয়েই সকাল সকাল মাকে ফোন করে সমস্ত ঘটনাগুলো বলেছিলাম।
সব কথা শোনার পর মা যা উত্তর দিয়েছিল, সেটা শুনে আমার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেছিল। মা বলেছিল...
—'মানুষ যখন কোনো হতাশা, কোনো আকাঙ্ক্ষা বুকে নিয়ে আত্মহত্যা করে... তখন তার মুক্তি অতো সহজে হয়না। অনেক সময় তো শ্রাদ্ধশান্তির পরেও সে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে পারেনা।'
মা আরও বলেছিল...
—'এইক্ষেত্রে কিন্তু খুবই সাবধান থাকতে হয়। কারণ একটা মানুষ জীবিত অবস্থায় যার যতোটা প্রিয় হয়, মৃত্যুর পর তার ঠিক ততোটাই শত্রু হয়ে যায় সে। আসলে এই সময়টাতে সেই মৃত ব্যক্তি চেষ্টা করে তার কাছের মানুষটাকেও সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার। আর তারজন্যে সে যেকোনো রকম বেপরোয়া কাজ অবধি করতে পারে।'
মায়ের কথা শুনে প্রথমে আমার মনে হয়েছিল...
আমাদের বাড়িতে আবার সুলেখাদির কাছের মানুষ কে আছে? এই তো সবে দেড় মাসের পরিচয় ওদের সাথে।
কিন্তু তারপরেই হঠাৎ একজনের কথা মনে পড়লো। আর সাথে সাথেই এক অজানা আশঙ্কায় বুকের ভিতরটা কেমন যেন খালি হয়ে গেল আমার!
সুলেখাদি কোন হতাশা, কোন আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নিজেকে এইভাবে জীবন্ত পুড়িয়ে মারলো... সেটা বুঝতে আর বাকি রইলোনা আমার।
কাঁপা কাঁপা গলায় মাকে জিজ্ঞেস করলাম...
—'এবার আমি কি করবো মা? অরিন্দমও এখানে নেই। টুকাইয়ের যদি কোনো বিপদ হয়। আমি সামলাবো কি করে?'
মা আমায় বলল...
—'তুই ভয় পাস না। দাঁড়া, তোর বাবার সাথে কথা বলি। অরিন্দম যতোদিন না আসে, আমি আর তোর বাবা না হয় তোর ওখানেই থেকে আসবো।'
মায়ের কথা শুনে মনটা এবার অনেকটাই যেন হালকা অনুভব হল আমার। এমনিতেই ওদের সাথে আমার দেখা হচ্ছিল না, তাও প্রায় অনেকদিন হয়ে গেল। শেষ দেখেছিলাম, এই ফ্ল্যাটে যখন গৃহপ্রবেশের পুজো করেছিলাম, তখন। তাও ওরা এসেছিল মাত্র আধবেলার জন্য। তারপর না আমি যেতে পেরেছি রিষড়াতে, আর না ওরা এসেছে এখানে। তাই আজ যখন শুনলাম মা-বাবা এখানে এসে থাকবে দিন কয়েক, তখন হঠাৎ করেই ভয়ের রেশটা কেটে গিয়ে একটা খুশির আমেজে ভরে উঠল মনটা।
সেদিন সকাল সাড়ে নটা নাগাদ, বিল্ডিংয়ের নিচে সব্জিওয়ালা ভ্যান নিয়ে এল। ভাবলাম মা বাবা আসছে, এখান থেকে বেশি করে সব্জি কিনে রাখি। মাছ, মাংসটা না হয় যেদিনেরটা সেদিন কিনে আনলেই হবে। একটা ব্যাগ হাতে করে ফ্ল্যাটের দরজাটা টেনে দিয়ে নিচে চলে এলাম। নিচে তখন পাঁচতলার গৌরী বৌদি লিফটের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দোতলার রুম্পাদির সাথে কথা বলছে। আমায় লিফট থেকে বেরোতে দেখেই, গৌরী বৌদি ডাক দিল...
—'সায়নী শোনো... তোমার সাথে কিছু কথা আছে।'
—'হ্যাঁ বৌদি বলো'
—'তোমরা তো চারতলাতেই থাকো, রাত বিরেতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না?'
কথাটা শুনেই চমকে উঠলাম আমি! তারমানে ওরাও নিশ্চয়ই কিছু অনুভব করতে পারছে। তবু না বোঝার ভান করে বললাম...
—'কিরকম অসুবিধা বৌদি?'
গৌরী বৌদি একবার একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে নিয়ে চাপা গলায় বলল...
—'আমার তো পাঁচতলা থেকে নামতে গেলেই শরীরটা কেমন যেন ভারি হয়ে যাচ্ছে। নিজের থেকে সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। সারাক্ষণ মনে হচ্ছে ফাঁকা লিফটে কেউ আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তোমার হচ্ছে কিছু?'
আমি একটু ভেবে নিয়ে বললাম...
—'হ্যাঁ... আমারও ওরকম লাগছে মাঝে মাঝে। দুদিন আগে অরিন্দমও বলেছিল এই একইকথা। আমি তো ভেবেছিলাম, আমাদের রুমটা চারতলায় বলেই হয়তো আমাদের এরকম লাগছে। এখন তো শুনছি তোমাদেরও একই অবস্থা। আচ্ছা.. কি করা যায় বলো তো এটা নিয়ে?'
রুম্পাদি এবার একটু রাগ দেখিয়েই বলল...
—'কি আবার করবে? এখন ভোগো এইসব। মরার আর জায়গা পেলেন না উনি... বিল্ডিংয়ে এসেই মরতে হল। তারমধ্যে চেহারা খানা কি ছিল, দেখেছিলে তো। রাহুলের বাবা কাল বলছিল... ওনার নিশ্চয়ই সিংহ বা বৃষ এই জাতীয় কোনো ভারি রাশি ছিল। তাই পুরো বিল্ডিং জুড়েই এই অস্বস্তিটা হচ্ছে। ভারি রাশির লোকেরা আত্মহত্যা করে মরলে নাকি সেখানে এইরকম অসুবিধা টসুবিধা হয়।
যাক গে, আমার কি... আমি তো আজ ফুল ফ্যামিলি নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যাচ্ছি। যতোদিন না এইসব অলুক্ষুনে ব্যাপার পুরো ঠিক হচ্ছে, ততোদিন আর এ মুখোও হচ্ছি না।'
রুম্পাদির কথা শুনে গৌরী বৌদি বলল...
—'ওহ... তোমরাও আজ যাচ্ছো? আমরাও তো যাচ্ছি আজ বিকেলে। এমনিতেও অনেক দিন যাওয়া হচ্ছিল না, এই সুযোগে গিয়ে দিন কয়েক থেকে আসি বাবা।'
ওদের কথাবার্তা শুনে মনটা হঠাৎ কেমন যেন হয়ে গেল। তারমানে বিল্ডিং আজ অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যাবে। এরমধ্যে আমি যদি কোনো বিপদে পড়ি, তাহলে তো চেঁচিয়েও লোক পাওয়া যাবে না। নিজেকে কেন জানি অসহায় বোধ হতে লাগল আমার। একবার মনে হল, বাবা-মাকে এখানে আসতে মানা করে দিই, তারচেয়ে আমিই বরং শাশুড়ি আর টুকাইকে নিয়ে রিষড়ায় চলে যাই। তারপর আবার মনে হল... এতোদিন বাদে নিজেরাই থাকতে আসতে চাইছে। মানা করাটা হয়তো ঠিক হবে না।
কি করবো আর কি না করবো ভাবতে ভাবতে আনমনে সব্জির ব্যাগটা নিয়ে লিফটে উঠলাম। দরজাটা বন্ধ হওয়া মাত্রই হঠাৎ মনে হল ফাঁকা লিফটে কেউ যেন আমার ঘাড়ের উপর এসে বসে গেল। কি প্রচণ্ড ওজন বেড়ে গেল শরীরটার... সে আমি বলে বোঝাতে পারবো না। আর সত্যি কথা বলতে কি, আমি যেন রীতিমতো অনুভবও করতে পারছিলাম... মারাত্মক ভারি চেহারার কেউ আমার গলার দুপাশে পা ঝুলিয়ে ঘাড়ের উপর বসে আছে। কোনোমতে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি।
লিফট চারতলা আসার পর, দরজা খুলে গেল। আমি সেখান থেকে বেরোতেই যাবো... এইবার আমি অনুভব করলাম কে যেন আমার কোমরটাকে চেপে ধরে আটকে রেখে দিয়েছে। আমি এগোতে চেয়েও এগোতে পারছি না। আর এতো স্পষ্ট সেই হাতের স্পর্শ... আমি যেন প্রত্যেকটা আঙ্গুল অনুভব করতে পারছিলাম নিজের কোমরে।
অরিন্দমের সেদিন রাতের কথাটা মনে পড়ে গেল আমার। ও কেন এত চিন্তিত ছিল, এইবার আমি বুঝতে পারলাম। অতি কষ্টে একপা দুপা করে ধীরে ধীরে বেড়িয়ে এলাম লিফট থেকে। তারপরে কোনোমতে নিজের রুমের দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই নিজেকে একটু হালকা মনে হতে লাগল আমার।
ঘড়িতে তখন সকাল দশটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। রান্নাঘরে ব্যাগ থেকে সব্জিগুলো নামিয়ে রাখতে রাখতে চিন্তা করছিলাম... ছেলেটাকে এখনও খাওয়ানো হয়নি। সেই কোন সকালে একটু কমপ্ল্যান দিয়ে দুটো বিস্কুট খেয়েছে। হয়তো খিদে পেয়ে গেছে ওর।
শাশুড়ি মায়ের টি.ভি থেকে কার্টুনের আওয়াজ ভেসে আসছে। আমার এই হয়েছে এক জ্বালা। সারাক্ষণ কার্টুনে ডুবে থাকে ছেলেটা। নাওয়া-খাওয়াটাও পর্যন্ত ভুলে যায় এই চক্করে। হঠাৎ টুকাইয়ের একটা মৃদু হাসির শব্দ পেলাম আমি। তবে শাশুড়ি মায়ের ঘর থেকে না। মনে হল আওয়াজটা এল হলরুমের পাশের বাথরুম থেকে।
টুকাই কি তবে টি.ভির রুমে নেই? সন্দেহবশতঃ রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে উঁকি দিলাম শাশুড়ি মায়ের রুমে।
এ কি... ঘর তো খালি। টি.ভি চলছে টি.ভির মতো। কিন্তু টুকাই তো নেই এখানে। ও তো সচরাচর কার্টুন ছেড়ে উঠতে চায়না। তাহলে গেল কোথায় ও? শাশুড়ি মায়ের বাথরুম থেকে জলের আওয়াজ আসছে, তারমানে উনি স্নানে গেছেন। কিন্তু টুকাই কই গেল?
বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন ছ্যাঁত করে উঠল আমার। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলাম হলরুমের বাথরুমটার দিকে। আবার আমার কানে এল টুকাইয়ের মৃদু হাসির শব্দ। তাড়াতাড়ি বাথরুমের ভিতর উঁকি দিতেই দেখলাম টুকাই সেখানে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
উফফফফ.... এতোক্ষন দমটা যেন আমার বুকের ভিতর আটকে ছিল। ওকে সুস্থ অবস্থায় দেখে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়লাম আমি। তারপর একটু রাগী গলায় বললাম...
—'এখানে কি করছিস? নিশ্চয়ই আবার জল ঘাটছিলিস?'
ও হাসি মুখে আমায় বলল...
—'না মা... একটুও জল ঘাটিনি। দেখো.. দেখো.. আমার হাত ভেজা নেই।'
সত্যিই তো! ওর হাত তো একদম শুকনো। আমি এবার অবাক হয়ে বললাম...
—'তাহলে হাসছিলিস কেন?'
এর উত্তরে আমার সাড়ে পাঁচ বছরের বাচ্চাটা যা বলল, তাতে আমার পেটের ভিতরটা মোচড় দিয়ে সারা শরীরটা কেমন যেন থরথর করে কেঁপে উঠল। ও বলল...
—'আমি চিপস আন্টির সাথে খেলছিলাম তো!'
সেইমুহুর্তে ওখানে দাঁড়িয়ে আমি বুঝতে পারলাম। আমি এখন যেই ভয়াবহ বিপদের মধ্যে রয়েছি, তাতে দিন-রাত বলে কোনো কথা নেই। ও যে কোনো সময়, যে কোনো মুহুর্তে আসতে পারে আমাদের ঘরে। ওকে আটকানোর ক্ষমতা আমার হাতে নেই।
* * *
সেদিন দুপুর একটা দেড়টা নাগাদ মা আর বাবা এল আমাদের বাড়িতে। ওরা আসার আগে অবধি নিজেকে যতোটা অসহায় বলে মনে হচ্ছিল, ওদের দেখার পর সেই ভাবটা অনেকটাই কেটে গেল আমার।
বিকেল চারটে অবধি বেশ ভালোই কাটলো তারপর। বহুদিন বাদে মা বাবাকে কাছে পেয়ে খাওয়া-দাওয়া আর জমিয়ে গল্প গুজব করতে করতে সময়টা যে কি করে কেটে গেল... টেরই পেলাম না আমি। কিন্তু অসুবিধাটা শুরু হল বিকেল চারটের পর।
টুকাই তখন শাশুড়ি মায়ের ঘরে ওনার বিছানায় ঘুমাচ্ছিল। হঠাৎ শাশুড়ি মা আমায় ডাক দিলেন। গিয়ে দেখি ছেলে আমার ঘুমের মধ্যেই থরথর করে কাঁপছে। আমি ছুটে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরতেই বুঝতে পারলাম, জ্বরে টুকাইয়ের গা একদম পুড়ে যাচ্ছে।
আমি তাড়াতাড়ি ওর গায়ে ব্ল্যাঙ্কেট চাপা দিলাম। ঘরে ওর জ্বরের ওষুধ ঞ্ঝ-২৫০ ছিল, সেটাও খাইয়ে দিলাম। আমি বরাবর দেখেছি এই ওষুধটা খাওয়ানোর আধা ঘন্টার মধ্যে ঘাম দিয়ে ওর জ্বর অনেক নেমে যায়। কিন্তু সেদিন এক ঘন্টা হয়ে যাওয়ার পরও ওর না তো ঘাম দিচ্ছিল, আর না জ্বর নামছিল। তারমধ্যে ওকে আমি অনবরত জলপট্টিও দিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তাতেও কোনো ফল হচ্ছিল না। দুশ্চিন্তায় দুর্ভাবনায় আমার মাথা পাগল পাগল লাগছিল তখন। আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না, কি করবো?
বাবা আমায় বলল...
—'এইভাবে রিস্ক নিয়ে বাড়িতে ফেলে রেখে কোনো লাভ নেই। তার চেয়ে এখানে কোনো চাইল্ড স্পেশালিষ্ট থাকলে, তার কাছে নিয়ে গেলে ভালো হয়।'
আমাদের বাড়ি থেকে মিনিট পনেরো দূরত্বে একজন চাইল্ড স্পেশালিষ্ট আছেন। আমি ফোন করে খোঁজ নিলাম... তিনি তখন চেম্বারেই ছিলেন। আমি আর বাবা টুকাইকে নিয়ে বেড়িয়ে গেলাম সেই ডাক্তারের কাছে। মাকে বাড়িতে রেখে গেলাম যাতে শাশুড়ি মাকে একা বাড়িতে থাকতে না হয়।
ডাক্তারবাবু টুকাইকে দেখামাত্রই একটা ইঞ্জেকশন দিলেন। আর তার মিনিট পনেরো পর দেখলাম টুকাইয়ের জ্বরটা ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলো। আমিও যেন এতোক্ষনে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। একটু আগে অবধি আমার মাথা যেন কাজ করা সম্পুর্ণই বন্ধ করে দিয়েছিল। এইবারে আমি একটু শান্ত হলাম।
প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে ডাক্তারবাবু আমায় জিজ্ঞেস করলেন...
—'ছেলের এতো জ্বর বাঁধলো কি করে? বৃষ্টি তে ভিজেছিল নাকি?'
সত্যিই তো! জ্বরটা কি করে এল সেটা তো আমিও জানি না। আমতা আমতা করে বললাম...
—'না তো ডাক্তার বাবু। বৃষ্টিতে তো ভেজেনি।'
উনি আবার গম্ভীর গলায় বললেন...
—'তবে...?'
এই তবে''র উত্তরটা তখন আমার কাছেও ছিল না। তাই চুপ করে ছিলাম। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ করে দুটো কথা আমার মনে পড়লো।
একনম্বর হল, টুকাই বলেছিল... আমি তো চিপস আন্টির সাথে খেলছিলাম। আর দ্বিতীয় নম্বর, মা বলেছিল... মৃত ব্যক্তি এই সময় নিজের প্রিয় মানুষটাকে সাথে করে নিয়ে যেতে চায়।
কথাদুটো মনে আসতেই ওই ভীড়ে ভরা কলকাতার রাস্তার মধ্যেও আমার শরীর দিয়ে যেন একটা ঠাণ্ডা শিহরণ বয়ে গেল।
তাহলে কি সুলেখাদি সেই চেষ্টাই করছে?
আমার চোখের সামনে ওর মুখটা যেন ভেসে উঠল এবার। কপালের একদম উপরের দিকে একটা বড় লাল টিপ পরে, আর পানের জর্দায় দুটো ঠেঁট গাঢ় লাল করে সুলেখাদি যেন আমার দিকে তাকিয়ে খিকখিক করে হাসছে।
উফফফ... কি বীভৎস সেই হাসি। মনে পড়তেই আমার বুকের রক্ত যেন জল হয়ে গেল। আমি ভয়ের চোটে নিজের অজান্তেই নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে নিলাম।
টুকাইকে নিয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম, তখন ঘড়ির কাঁটা প্রায় সাতটা ছুঁই ছুঁই। বাবা আমাদের রুমে পৌঁছে দিয়ে বলল...
—'তোরা যা... আমি একটু আসছি নিচ থেকে।'
বাবাকে আমি মানা করতেই যাচ্ছিলাম যে রাত হয়ে গেছে, এখন আর নিচে যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু এই লোকটা কোনোদিনই কারো কথা শোনেনি, তাই বলেও কিছু লাভ হতো না। আমি টুকাই কে নিয়ে ঘরে ঢুকে এলাম।
ঘরে ঢুকেই দেখলাম, মা আর শাশুড়ি মা একঘরে বসে টি.ভিতে সিরিয়াল দেখছে। শাশুড়ি মা তো ঠিকঠাকই আছেন, কিন্তু মায়ের মুখটা দেখে কেমন যেন লাগল। মনে হল খুব যেন আতঙ্কে রয়েছে। আমি মা কে ডেকে পাশের ঘরে নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলাম...
—'কি হয়েছে তোমার?'
মা ঘরের দরজাটা সামান্য একটু ভেজিয়ে দিয়ে একটা চেয়ারের উপর এসে বসল। তারপর থমথমে মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল...
—'একটু আগেই আমি ওকে দেখলাম রে মাম্পি।'
ওহ... বলা হয়নি, মাম্পি হল আমার ডাক নাম। বাপের বাড়ির সবাই আমায় ওই নামেই ডাকে। আমি বিস্মিত চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম...
—'দেখলে মানে! কাকে দেখলে?'
মা মুখটা কালো করে নিয়ে ভয় জড়ানো চাপা গলায় বলল...
—'সুলেখাকে...'
বুকের ভিতরটা ধড়াস করে উঠল আমার। এটা কি করে সম্ভব? মা তো কোনোদিন ওকে দেখেই নি। শেষবার যখন গৃহপ্রবেশের সময় মা এখানে এসেছিল, তখন তো সুলেখাদির সাথে আমার পরিচয়ই হয়নি। তাহলে মা চিনলো কি করে?
কথাটা জিজ্ঞেস করতেই, মা বলতে শুরু করল...
—'তোরা যখন টুকাইকে নিয়ে বেরিয়ে গেলি, তার কিছুক্ষণ পরেই তোর শাশুড়ি আমায় বলল... চা খাবেন দিদি? তাহলে একটু চা বানিয়ে আনি।
তাই শুনে আমিও বললাম... থাক আপনার করতে হবে না। আপনি বসুন, আমিই করে আনছি।
এইবলে রান্নাঘরে এসে চায়ের জলটা বসালাম। ততোক্ষণে বাইরে অন্ধকার নেমে গেছে। ঘরের ভিতর লাইট জ্বলছে। খেয়াল করে দেখেছিস নিশ্চয়ই, তোদের রান্নাঘরের আলোটা জ্বালালে বাঁদিকের দেওয়ালটাতে একটা আবছা ছায়া পড়ে?'
আমি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম। মা আবার বলতে শুরু করলো...
—'আমি তখন ফুটন্ত জলে চা পাতাটা ঢালতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ আমার নজর পড়লো বাঁদিকের দেওয়ালটার দিকে। আমি দেখলাম সেখানে পরপর দুটো ছায়া পড়েছে। একটা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে, তার হাতে চা পাতার কৌটো। আরেকটা ছায়া দেখলাম বসে আছে, তার হাঁটু দুটো বুকের কাছে ভাজ করা। কিন্তু ওইসময় রান্নাঘরে আমি ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি ছিলনা।'
কথাটা শুনেই আমার বুকের ভিতরটা কেমন যেন শুকিয়ে গেল। কাঁপা কাঁপা গলায় মাকে জিজ্ঞেস করলাম...
—'তারপর তুমি কি করলে?'
—'কি আবার করবো? তাড়াতাড়ি করে চা বানিয়ে ঘরে চলে এলাম।'
বিস্ময়ে আমার মুখ দিয়ে তখন কোনো কথা আসতে চাইছিল না। মা যে বরাবরই একটু ডানপিটে আর সাহসী গোছের মহিলা এটা আমার জানা। আর মায়ের এই গুণের কিছুটা অংশ হয়তো আমিও পেয়েছি। কিন্তু তাই বলে ওইরকম একটা দৃশ্য দেখার পরও ওখানে দাঁড়িয়ে চা বানানোর সাহস, আমার অন্তত নেই। মাকে জিজ্ঞেস করলাম...
—'তুমি ভয় পেলেনা? মানে কোনো অসুবিধা হল না তোমার?'
মা দেখলাম এবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল...
—'ভয়? না, ভয় তো সেরকম পাইনি। আসলে, তুই তো জানিসই এইসব ব্যাপার আমার কাছে নতুন না। বিয়ের পর পরই আরও দুবার আমার সাথে ঘটেছিল এইরকম ঘটনা। তখন অবশ্য তোরা কেউ হোস নি। কিন্ত এইবার যেন...'
মা একটু থামলো। আমি কৌতুহলী গলায় প্রশ্ন করলাম...
—'কিন্তু এইবার যেন কি???'
—'কিন্তু এইবার যেন আমার ব্যাপারটা ঠিক সুবিধের বলে মনে হচ্ছে না। তোর কাছ থেকে সুলেখার সম্পর্কে আমি যাই শুনেছি... তাতে আমার মনে হয়েছে ও বরাবরই খুব জেদি ছিল। তা নাহলে মরার আগে কেউ নিজের মাথার চুল কেটে ন্যাড়া হয় কখনও? কতোটা তেজ, কতোটা পাগলামি থাকলে একটা মানুষ এইরকম করতে পারে, সেটা ভেবে দেখেছিস? আমার তো কেন জানি মনে হচ্ছে, ও মরার আগে হয়তো ল্যাংটো হয়ে পুরো ঘরে উদ্দাম নৃত্য করেছিল আর পাগলের মত হেসেছিল।
আসলে জেদি মানুষেরা এইরকমেরই হয়। ওদের যখন মাথায় রক্ত উঠে যায়, তখন ওরা নিজেদের যন্ত্রণা দিতে ভালোবাসে।
মায়ের মুখ থেকে এই ধরণের বর্ণনা শুনে আমার সারা শরীরটা কেমন যেন অস্থির করে উঠল। চোখের সামনে যেন পর পর ভেসে উঠল সম্পুর্ণ দৃশ্যটা...
সুলেখাদি নিজের ফাঁকা ফ্ল্যাটের মেঝেতে বসে কাঁচি দিয়ে কচকচ করে কেটে যাচ্ছে নিজের মাথার চুল। গোছা গোছা সেই চুল এসে জড়ো হচ্ছে ওর পায়ের সামনে। এইবার ও ন্যাড়া মাথায় ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। ওর কপালে তখনও একটা বড় লাল টিপ, চোখে কাজল আর ঠেঁটে রক্তের মতো গাঢ় লাল লিপস্টিক। এইবার একে একে নিজের শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ আর অন্যান্য পোশাক খুলে ফেলে নির্লজ্জের মতো নগ্ন হয়ে দাঁড়ালো সুলেখাদি। তারপর পাগলের মতো উদ্দাম নৃত্য করতে করতে দাপিয়ে বেড়াতে লাগলো ফাঁকা ফ্ল্যাটের এক ঘর থেকে আরেক ঘরে। তারমধ্যেই ও কখনও উন্মাদের মতো অট্টহাসি হাসতে থাকল... আবার কখনও গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।
এইসব কিছুর মাঝেই হঠাৎ করে ওর হাতে উঠে এল, কেরোসিন তেল ভর্তি একটা পাঁচ লিটারের ড্রাম। তারপর জলে ভেজা চোখ নিয়ে হাসতে হাসতে সেই ড্রামের তেল ঢেলে ফেলল নিজের মাথার মধ্যে। ওর সিঁদুরের টিপ, চোখের কাজল গলে পড়তে লাগল নাক দিয়ে, গাল দিয়ে। ড্রামের তেল শেষ হতেই সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মাটি থেকে একটা দেশলাই তুলে নিল ও। তারপর একটা কাঠি জ্বালিয়ে, সেটা নিজের শরীরে ছোঁয়ানোর আগে অন্তিম বার পাগলের মতো খিকখিক করে হাসলো সুলেখাদি। তারপরেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। আর সারা ঘর ছেয়ে গেল দম বন্ধ করা একটা বিশ্রী মাংস পোড়া গন্ধে।
উফফফফ... আমার নিশ্বাসটা কেমন যেন বন্ধ হয়ে এল। মনের হল চোখের সামনে দেখতে পারছি ওই জ্বলন্ত আগুনের লেলিহান শিখাগুলোকে। আর তার মধ্যে একবুক জেদ নিয়ে বসে আছে সুলেখাদি। চামড়া পোড়ার যন্ত্রণাও ওর মুখ দিয়ে একটু আর্তনাদ বের করতে পারছে না... এতো ওর অভিমান... এতো ওর রাগ।
—'কিরে মাম্পি... কি ভাবছিস তুই?'
মায়ের ধাক্কায় হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে এল আমার। কখন যে ঘামে ভিজে গেছি, নিজেও জানি না।
—'কিরে, এতোক্ষন ধরে যে এতো কিছু বলে গেলাম... কিছু শুনতে পারলি তুই?'
আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললাম...
—'না তো মা... কিছুই শুনতে পাইনি।'
মা একমুহুর্ত আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কি যেন চিন্তা করলো। তারপর বলল...
—'থাক... ওইসব আর না শুনলেও হবে। এখন যেটা বলছি সেটা শোন... কাল সকাল হলেই তাড়াতাড়ি করে ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিবি। এই বাড়িতে আর একটা দিনও থাকা চলবে না। আমরা সবাই মিলে কাল রিষড়া চলে যাব।'
মায়ের কথা শুনে সেদিন যদি আমি রাজি হয়ে যেতাম, তাহলে হয়তো পরেরদিন আমাদের অতো বড় বিপদের মুখে পড়তে হতো না। কিন্তু কথায় বলে... কপালের লিখন, খণ্ডাবে কে?
তাই তো মাকে আমি বলেছিলাম...
—'না মা... এতোদিন যখন ভয়ে ভয়ে কাটিয়ে দিলাম। আরও একটা দিন না হয় ভয় পেয়েই কাটিয়ে দেব। কিন্তু কাল রিষড়া যাওয়া আমার হবে না। যেতে হলে পরশুদিন যাব।'
মা অবাক হয়ে বলেছিল...
—'কিন্তু কেন? কাল তোর কি এমন কাজ আছে এখানে?'
—'কাল দুপুরের পর আমি একবার বেরোবো। অতনুদার বাড়ি যেতে হবে। আমাকে জানতেই হবে কি এমন ঘটলো ওদের মধ্যে যার জন্য সুলেখাদি এইভাবে সুইসাইড করলো। এটা জানতে না পারলে আমি যে রিষড়াতে গিয়েও শান্তি পাবোনা মা।'
—'তার জন্য ওর বাড়ি যাওয়ার কি আছে? ফোন করে নিলেই তো পারিস।'
—'দুইদিন ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছি। ফোন সুইচড অফ। হয়তো লোক লজ্জার কারণে বন্ধ করে রেখেছে। তাই কাল একবার আমাকে ওখানে যেতেই হবে।'
এরপর মা আর কোনো কথা বলেনি। বুঝেছিল হয়তো আমাকে বারণ করে কোনো লাভ হবে না। তাই নিজের মেয়ের জেদের কাছে একরকম চুপ করেই যেতে হয়েছিল।
ঘড়িতে যখন প্রায় রাত পৌনে আটটা বাজে, তখন আমাদের দরজায় কলিং বেলের আওয়াজ হল।
বুঝতে পারলাম বাবা এতোক্ষনে সিগারেট খেয়ে, পান চিবুতে চিবুতে বাড়ি ফিরেছে। বাবার আবার নিজের পছন্দ মতো পান না হলে মুখে রোচে না। আর পান সব দোকানে বানায় না। তাই খুঁজে পেতে সময় লেগেছে। মা উঠে দরজা খুলতে যাচ্ছিল। আমি বললাম...
—'তুমি বসো। আমি দেখছি।'
দরজা খুলতেই দেখলাম বাবা সিঁড়ির দিকে কেমন আশ্চর্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমায় দেখেই বলল...
—'বউটা কে রে?'
আমি অবাক হয়ে বললাম...
—'কোন বউ?'
—'কেন... একটু আগে তোর ঘরে কেউ আসেনি?'
—'কই না তো... কেউই তো আসেনি।'
বাবা চোখেমুখে কেমন যেন একটা বিস্ময়ের ছাপ নিয়ে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকে এল। বুঝতে পারলাম, বাবার সাথেও কিছু একটা অদ্ভুত নিশ্চয়ই ঘটেছে, যার উত্তর বাবা এখনও মেলাতে পারেনি।
দরজাটা বন্ধ করেই বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম...
—'কি হয়েছে? কাকে দেখেছ তুমি?'
বাবা বেশ কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো আমার দিকে তাকিয়ে রইল... তারপর চোখদুটো সরিয়ে নিয়ে বলল...
—'না মানে, কি হল বলতো... আমি লিফটে আসছিলাম... হঠাৎ করে লিফটটা তিন তলায় এসে থেমে গেল, আর দরজা খুলে গেল। আমি বারবার সুইচ টিপলাম, কিন্তু দরজা বন্ধ হল না। তারপর ভাবলাম একটা তলার তো ব্যাপার... আমি না হয় সিঁড়ি দিয়েই চলে যাই। সেই মতো, সিঁড়ি দিয়েই আসছিলাম। তখন ফাঁকাই ছিল সিঁড়িটা, আমি ছাড়া অন্য কোনো লোকজন ছিলনা। বাঁকের কাছে এসে হঠাৎ আমি দেখতে পেলাম, চারতলা থেকে একটা লম্বা চওড়া মহিলা নিচের দিকে নামছেন। আমি ভাবলাম তোদের ঘরেই এসেছে বুঝি। কারন চারতলায় তো তোরা ছাড়া আর কেউ থাকেনা।
যাই হোক, আমি যখন ওই মহিলাটিকে পাশ কাটিয়ে উপরে উঠতে যাচ্ছি... তখন ও হঠাৎ করে আমায় বলল... টুকাই এখন কেমন আছে? আমিও ওর দিকে তাকিয়ে বললাম.. ভালো আছে। জ্বরটা নেমেছে এখন।
কথাটা বলেই একটা ধাপ উপরে উঠে, আচমকা আমার মনে হল... মহিলাটি যদি তোর ঘরেই গিয়ে থাকে, তাহলে টুকাই কেমন আছে সেটা আমায় জিজ্ঞেস করার কি হল? উনি তো নিজেই দেখে এসেছেন।
সাথে সাথেই পিছনে ঘুরে তাকালাম আমি। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে গেলাম এটা দেখে যে সিঁড়িতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। তাড়াতাড়ি নেমে এলাম বাঁকের মুখে। কিন্তু তলার সিঁড়িগুলোও একদম ফাঁকা। আমার একটা ধাপ উঠতে না উঠতেই, একজন মহিলা কি করে এতোগুলো সিঁড়ি পেড়িয়ে যেতে পারে... সেটাই তখন বুঝে উঠতে পারছি না। তারপর থেকেই কেন জানি একটা অস্বস্তি হচ্ছে। শরীরের ভিতরটা কেমন যেন লাগছে, ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।'
বাবার কথা শুনে আমার হাত-পা ততক্ষনে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। কাঁপতে থাকা গলায় বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম...
—'তুমি দেখেছ বউটাকে? কেমন ছিল দেখতে?'
বাবা বলল...
—'তোদের সিঁড়িগুলোতে এমনিতেই খুব কম পাওয়ারের আলো... তারমধ্যে তাকিয়েও ছিলাম একমুহুর্তের জন্য। ভালো করে দেখতেও পাইনি। তবে এইটুকু মনে আছে... গোলগাল মুখ ছিল আর কপালে একটা বড় লাল টিপ।'
বাবার কথা শুনে আমার বুকের ভিতরটা যেন ধড়াস করে উঠল। এও কি কখনও সম্ভব? একটু আগে বাবা যার সাথে কথা বলেছে, সেই মানুষটা কিনা মারা গেছে আজ থেকে চার পাঁচদিন আগে। হে ঈশ্বর...
মাথার ভিতরে সবকিছু কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গেল আমার।
* * *
সেই রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর ঠিক হল মা আর শাশুড়ি মা এক রুমে শোবে। আমি আর টুকাই শোবো আমাদের রুমে। আর বাবা শোবে হলরুমের ডিভাইনে। যদিও আমি বাবাকে বহুবার বলেছিলাম আমাদের রুমে শুতে। কিন্তু বাবা রাজি হয়নি। আগেই বলেছি, এই মানুষটা কোনোদিনই কারো কথা শোনেনি। নিজের যা ভালো মনে হয় বরাবর তাই করে এসেছে।
যাই হোক সেদিন এগারোটার মধ্যে আমরা যে যার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। ওহ বলা হয়নি... টুকাইয়ের আর সেভাবে জ্বর আসেনি। গা-টা হালকা গরম ছিল ঠিকই, তবে বুঝতে পারছিলাম ওষুধ চলতে থাকলে কালকে এটাও সেরে যাবে।
মা শোয়ার আগে এসে একটা লোহার সাঁড়াশি রেখে গেল আমাদের তোষকের তলায়। আর সাথে করে একটা হনুমান চালিশার বই রেখে দিল টুকাইয়ের বালিশের পাশে। আমায় বলল...
—'রাতে ভয় পেলে হনুমান চালিশাটা পড়িস। আর কোনো অসুবিধা হলে আমায় ডাক দিস।'
আমি বললাম...
—'আমার তো পিরিয়ড চলছে, এরমধ্যে হনুমান চালিশা পড়তে পারবো?'
মা বলল...
—'বইটা না ছুলেই হল। তোর তো মুখস্থ। মনে মনেই পড়িস।'
এরপর আমি দরজা ভেজিয়ে টিউব লাইটটা অফ করে, নাইট ল্যাম্প জ্বালিয়ে শুয়ে পড়লাম। গতকাল প্রায় সারারাতই জাগা ছিলাম, তাই আজ চোখে ঘুম ধরতে বেশি সময় লাগল না।
রাত তখন কটা বাজে ঠিক জানা নেই। কেমন যেন একটা অদ্ভুত অস্বস্তিতে ঘুমটা ভেঙে গেল আমার। মনে হল ঘরটা যেন অস্বাভাবিক রকমের গরম হয়ে উঠেছে, তার সাথে একটা বিচ্ছিরি গন্ধও নাকে আসছিল আমার। ঘুমের চোখে আমি বুঝে উঠতে পারলাম না কিসের এই বাজে গন্ধ। তবে মনে হল গন্ধটা আমার খুব চেনা...
কিসের যেন গন্ধ... কিসের গন্ধ...
হঠাৎ মনে পড়লো আমার। এটা তো সেই মাংস পোড়া গন্ধ! বুকটা যেন ছ্যাঁত করে উঠল আমার। এক নিমিষে চোখের থেকে ঘুমটা উড়ে গেল। আমি ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালাম। আর সাথে সাথেই যেই দৃশ্য আমি দেখলাম, তাতে আমার সর্বাঙ্গ ভয়ে আতঙ্কে থরথর করে কেঁপে উঠল।
ঘরের লালচে নাইট ল্যাম্পের আলোয় আমি পরিষ্কার দেখতে পারলাম একটা লম্বা চওড়া শাড়ি পরা ছায়ামূর্তি আমার বিছানা থেকে মাত্র হাত দুয়েক দূরত্বে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ও যে তখন আমাদের দিকেই দেখছে সেটা বুঝতে আমার আর কোনো অসুবিধা হল না। জমাটা কালো সেই ছায়ামূর্তিটার দিকে তাকিয়েই আমার সারা শরীরের রক্ত যেন এক লহমায় জল হয়ে গেল। আমার নিশ্বাসটা যেন গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে আটকে রইল। কাঁপা কাঁপা হাতে আমি বিছানার পাশের বেডসুইচটার দিকে হাত বাড়ালাম।
ঘরের আলো জ্বলে ওঠা মাত্রই আশ্চর্য হয়ে গেলাম আমি।
আরে এখানে তো কেউ নেই। ঘর তো একদম ফাঁকাই পড়ে আছে। তাহলে কি কোনো স্বপ্ন দেখছিলাম আমি? নাকি ওটা আমার কোনো মনের ভুল ছিল?
কি জানি... হয়তো তাই। সারাদিন এসব নিয়ে এতো ভাবছি, সেইজন্যই হয়তো ভুলভাল স্বপ্ন দেখেছি। নিশ্চিন্ত হয়ে আবার লাইটটা নিভিয়ে দিলাম আমি।
কিন্তু এ কি!!!! আলো নেভা মাত্রই আমার নজরে পড়ল, ছায়ামূর্তিটা তো এখনও সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। চাপ চাপ কালো অন্ধকারে ওর চোখমুখ ভালো করে বোঝা না গেলেও, ও যে প্রচণ্ড রাগে আমাকেই দেখছে... সেটা আমি ভালোই বুঝতে পারছিলাম।
আমি তাড়াতাড়ি আবার বেড সুইচটা অন করলাম।
কিন্তু এইবার কেন জানি আর আলো জ্বললো না। মারাত্মক ভয়ে আমি অনবরত সুইচটা অন অফ করতেই থাকলাম। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হলনা। আরও একবার আড়চোখে ছায়ামূর্তিটার দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম আমি।
ওটা যেন বেশ কিছুটা এগিয়ে এসেছে খাটের দিকে। এইবার কি করবো আমি? মা দের ডাকবো চিৎকার করে? নাকি টুকাইকে নিয়ে ঘর থেকে ছুটে পালাবো? কিন্তু খাটের সামনেই তো ও দাঁড়িয়ে আছে। তাহলে কি করবো এখন?
হঠাৎ আমার মনে পড়লো হনুমান চালিশার কথাটা। আমি তাড়াতাড়ি নিজের চোখ বন্ধ করে নিয়ে মনে মনে বলতে লাগলাম...
জয় হনুমান জ্ঞ্যানগুন সাগর,
জয় কপিস তিহু লোক উজাগর....
পুরো হনুমান চালিশাটা অনবরত বলেই যেতে থাকলাম।
একবার... দুবার... তিনবার... অসংখ্যবার।
হনুমান চালিশাটা বলতে বলতে কখন যে ঘুম এসে গেছিল নিজেও জানিনা। ঘুম ভাঙলো পরেরদিন সকালবেলায় মায়ের ডাক শুনে...
—'কিরে, আর কত বেলা অবধি ঘুমাবি... এবার ওঠ!'
লম্বা একটা হাই তুলে, আড়মোড়া ভেঙে খাট থেকে নামতে যেতেই হঠাৎ নজর পড়ল আমার ঘরের আলমারিটার দিকে। দেখেই বুকের ভিতরটা কেমন যেন ছ্যাঁত করে উঠল। মনে পড়ে গেল গতরাতে ওইটার সামনেই তো দাঁড়িয়ে ছিল কালো ছায়ামূর্তিটা।
কিন্তু তারপর যেন কি হল? আমি যেন কি করলাম? ঠিক মনে করে উঠতে পারছি না।
ঘটনাটা আরও একবার মনে করার চেষ্টা করার চেষ্টা করলাম আমি।
ও হ্যাঁ... মনে পড়েছে। ছায়ামূর্তিটা ধীরে ধীরে আমার দিকেই এগিয়ে আসছিল। আমিও ভয় পেয়ে হনুমান চালিশা বলতে শুরু করেছিলাম। এরপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি... নিজেও জানিনা। তারমানে ওটা যে ছিল বা যাই ছিল, সেটা আর আমাদের কোনো ক্ষতি করে উঠতে পারেনি। মনের মধ্যে কেমন যেন এক অদ্ভুত সাহস পেলাম আমি। বুঝতে পারলাম... এই কদিন ধরে সর্বক্ষণ আমাদের আশেপাশে যে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দিয়ে বেড়াচ্ছে, সে যতই ভয় দেখাক না কেন... আমাদের কোনো ক্ষতি করার ক্ষমতা তার নেই।
কথাটা মাথায় আসতেই সকাল সকাল নিজেকে বেশ হালকা আর চাপমুক্ত বলে মনে হল আমার। মা আরও একবার জিজ্ঞেস করেছিল আমায়...
—'কিরে, রিষড়া যাবি আজকে? চল, চলে যাই। শুধু শুধু এই বিপদের মধ্যে পড়ে থেকে কোনো লাভ নেই।'
আমিও খুব আত্মবিশ্বাসের সুরে মাকে বলে ছিলাম...
—'তোমাকে বললাম তো যেতে হলে কাল যাব। কিন্তু আজ আমাকে একবার অতনুদার বাড়ি যেতেই হবে। আর তুমি এইসব নিয়ে বেশি চিন্তাভাবনা কোরো না। আমাদের কোনো ক্ষতি হবে না।'
কিন্তু তখনও বুঝিনি, আমার এই আত্মবিশ্বাস কত বড় বিপদের মধ্যে ঠেলে দিতে চলেছে আমায়। যদি বুঝতাম, তাহলে হয়তো মায়ের কথা সেদিন কোনোমতেই অমান্য করতাম না আমি।
যাই হোক, মা আর এই নিয়ে আমায় খুব বেশি জোরাজুরি করেনি। বলার মধ্যে শুধু এইটুকুই বলেছিল...
—'অতনুদার বাড়ি যেতে হলে, তোর সাথে আমি যাব। একা একা তোকে কিছুতেই যেতে দেব না।'
আমিও আর এই নিয়ে মায়ের সাথে কোনো তর্ক করিনি। মনে মনে ভেবেছিলাম, মা গেলে ভালোই হবে। রাস্তায় কথা বলতে বলতে যাওয়া যাবে। আসলে মেয়েদের এমন অনেক কথা থাকে যেগুলো বাড়িতে শাশুড়ির সামনে বলতে অসুবিধা হয়।
সকালের দিকে সেদিন আর কোনোরকম অসুবিধা হয়নি আমাদের। টুকাইয়ের শরীরটাও একদম ফিট হয়ে গেছিল। গতরাতে যেই গা গরম ভাবটা ছিল, সেটাও তখন আর ছিলনা। আমি ভেবে রেখেছিলাম, দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর্ব মিটিয়ে তারপর যাবো অতনুদার বাড়ি। সেই অনুযায়ী কাজগুলো সব সেরে রাখছিলাম।
মাঝে বাবা একবার ডাক দিয়ে বলল...
—'মাম্পি দেখ তো আমার ঘাড়ের কাছটা, আর পিঠের দিকটায় কি হয়েছে? কেমন যেন জ্বালা জ্বালা করছে!'
দেখলাম, বাবার ঘাড়ের আর পিঠের তিন-চার জায়গায় নখের আঁচড়ের দাগ। মানুষ যখন শরীরের কোনো জায়গায় খুব জোরে চুলকোয়, আর তার ফলে সেই জায়গাটা চিরে গিয়ে, লম্বা লম্বা পাঁচটা দাগ হয়ে যায়। অনেকটা ঠিক ওইরকমই। আমি বাবার পিঠে মলম লাগিয়ে দিয়ে বললাম...
—'কাল রাতে কি তোমায় মশা কামড়েছে নাকি? এইভাবে চুলকেছো কেন? ইশশশ... দেখ তো, কি অবস্থা হয়েছে পিঠটার।'
বাবা বেশ অবাক হয়ে বলল...
—'মশা...? কই না তো! আমি তো কিছু টের পাইনি।' তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল...
—'কি জানি! হয়তো ঘুমের ঘোরে হয়ে গেছে।'
* * *
সেদিন দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষ করতে করতে প্রায় আড়াইটে বেজে গেছিল। তারপর থালাবাসন মেজে সব গুছিয়ে গাছিয়ে রাখতে সময় লেগেছিল আরও আধ ঘন্টা। এই বাড়িতে আসার পর আমি এখনও কাজের লোক জোগাড় করে উঠতে পারিনি। তাই সব কাজ নিজেকেই করতে হয়। তবে ওইদিন মা হাতে হাতে করে দেওয়ায় সময় একটু কম লেগেছিল।
আমরা যখন অতনুদার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, তখন ঘড়িতে সোওয়া তিনটে বাজে। এখানে আমরা বলতে আমি, মা, আর টুকাই। শাশুড়ি মা অবশ্য বলেছিলেন টুকাইকে বাড়িতে রেখে যাওয়ার জন্য। কিন্তু কেন জানি আমি না থাকাকালীন টুকাইকে ওই বাড়িতে রাখতে ঠিক সাহস পাচ্ছিলাম না। তাই ওকে সঙ্গে নিয়েছিলাম।
আমাদের বাড়ি থেকে অতনুদার বাড়ি অটোতে গেলে মিনিট পনেরোর রাস্তা। কিন্তু অসুবিধা একটাই। ওই রুটের অটোটা একটু
কম পাওয়া যায়।
যাই হোক, আমরা যখন ওনার বাড়ির কাছে গিয়ে পৌঁছালাম... তখন প্রায় চারটে ছুঁই ছুঁই। গেটের সামনে থেকে ভিতরের দিকে তাকাতেই মনে হল গোটা বাড়িটা কেমন যেন থমথম করছে। যদিও বহুদিনের পুরোনো এই দোতলা বাড়িটার সম্পুর্ণটা অতনুদাদের নয়। ওরা শুধু একতলাটা কিনেছিল। দোতলায় অন্য একটা পরিবার থাকে। গেট খুলে ভিতরে যেতেই অতনুদার মা আমাকে দেখে বলল...
—'তুমি সায়নী না?'
মাসখানেক আগে সুলেখাদির সাথে আমি একবারই মাত্র এসেছিলাম এখানে। তাও মাত্র আধাঘণ্টার জন্য। তখনই পরিচয় হয়েছিল অতনুদার মায়ের সাথে।
আমি মৃদু হেসে বললাম...
—'হ্যাঁ মাসিমা... আচ্ছা অতনুদা আছেন?'
ওনার মুখটা দেখলাম হঠাৎ করে কেমন যেন কালো হয়ে গেল। উনি এবার আমার মায়ের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই, আমি আবার বললাম...
—'এটা আমার মা'
মাসিমা এবার খুব নির্লিপ্ত গলায় বললেন...
—'ওহ আচ্ছা..' তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন...
—'অতনু আছে... যাও ওর ঘরে'
অতনুদার পরিবারে মা ছাড়াও দাদা, বৌদি আর দুই ভাইপো আছে। তাদের মধ্যে একজন ফার্স ইয়ারে পড়ে, আরেকজন এইবার মাধ্যমিক দেবে। একতলায় ঘর বলতে তিনটে। এতোগুলো মানুষের মাত্র তিনটে ঘরে থাকার অসুবিধা হয়ে যাচ্ছিল বলেই সুলেখাদির কথায় নতুন ফ্ল্যাটটা কিনেছিলেন অতনুদা। কিন্তু ভাগ্যে যদি ভোগ করার সুখ না থাকে, তাহলে হয়তো রাজরানি হয়েও কোনো লাভ হয়না। সীতার মত আজীবন সেই বনবাসেই দিন কাটাতে হয়।
পর্দা সরিয়ে যখন অতনুদার ঘরে ঢুকলাম, তখন উনি মাথার উপর একটা হাত রেখে নিজের বিছানায় শুয়ে আছেন। আমাদের দেখেই কোনোমতে বিছানার উপর উঠে বসে বললেন...
—'ওহ, তুমি এসেছো? জানতাম আসবে।'
অতনুদাকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম আমি! একি চেহারা হয়েছে ভদ্রলোকের? রোগা পাতলা উনি আগাগোড়াই ছিলেন ঠিকই। কিন্তু এখন কেমন যেন শুকিয়ে কঙ্কালসার হয়ে গেছেন। তারমধ্যে মুখের চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে। চোখের নিচেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কালির ছাপ। ঠেঁট গুলোও শুকিয়ে কেমন সাদা হয়ে গেছে। দেখে মনে হল এই চার পাঁচদিনেই অতনুদার বয়স যেন এক ঝটকায় চল্লিশ বছর বেড়ে গেছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম...
—'আপনি কি করে জানলেন আমি আসবো?'
আমার প্রশ্ন শুনে মৃদু হাসলেন অতনুদা। কিন্তু কোনো উত্তর দিলেন না। তারপর আমাকে আর মা'কে অবাক করে দিয়ে নিজের জামার বোতামগুলো খুলতে লাগলেন উনি। আমরা দুজনেই হতভম্বের মতো চেয়ে রইলাম ওনার দিকে।
কিছুক্ষণ বাদেই নিজের জামাটা সম্পুর্ণ খুলে খালি গায়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন উনি। আর সাথে সাথেই ওনাকে দেখে আঁতকে উঠলাম আমরা।
একি!!!! ওনার সারা গায়ে এগুলো কিসের দাগ???
দেখে মনে হচ্ছে অতনুদার সম্পুর্ণ শরীরটা কেউ যেন যথেচ্ছ নখের আঁচড়ে চিরে চিরে দিয়েছে। লাল লাল রক্ত জমে রয়েছে সেইসব দাগে।
অতনুদার এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে তখনই দুটো কথা আমার মাথায় চলে এল।
এক... মানুষ যদি নিজের শরীরে জোরে চুলকোয় তাহলে সাধারণত চার আঙ্গুলেরই দাগ পড়ার কথা! বুড়ো আঙ্গুলটা তখন অতোটা কাজে আসেনা। পাঁচ আঙ্গুলের দাগ তখনই পড়বে যখন কেউ কাউকে ইচ্ছাকৃত খিমচি দিয়ে ধরে আঁচড় কাটবে।
আর দুই নম্বর হল... নিজের পিঠের এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে মানুষের পক্ষে হাতের পাঁচটা আঙ্গুল দিয়ে এইভাবে চুলকানো সম্ভবই নয়।
কথাগুলো মাথায় আসতেই আমার বুকের ভিতরটা হঠাৎ করে ধড়াস করে উঠল। কারণ আমি জানি অতনুদার সাথে এগুলো কে করেছে। তারমানে বাবাকেও কি কাল রাতে সেই-ই......
উফফফ... কথাটা চিন্তা করতেই আমার শরীরটা কেমন যেন ভয়ে শিউরে উঠল।
অতনুদা ততোক্ষণে জামাটা আবার পরে নিয়ে বিছানায় বসে বললেন...
—'আমি টানা পাঁচরাত পাঁচদিন জেগে আছি। ও আমাকে কিছুতেই ঘুমাতে দেয়না। যখনই দুচোখের পাতা এক হয়ে আসে, তখনই ও আমার শরীরের উপর বসে সারা দেহে নখের আঁচড় কাটতে থাকে। ব্যাথায় যন্ত্রণায় দাপিয়ে উঠে ঘুম ভেঙে যায় আমার।'
একটু থামলেন অতনুদা। তারপর আবার বললেন...
—'আর, শুধু কি ঘুম? ও আমায় ঠিক করে খেতেও দেয়না এখন। কখনও ভাত ভর্তি থালা মাটিতে ফেলে দেয়, আবার কখনও ঝোলের বাটিতে জলের গ্লাস উল্টে দেয়। কিছুতেই শান্তিতে থাকতে দেবেনা ও আমায়। ওর রাগ, ওর জেদ এখনও শান্ত হয়নি আমার উপর।'
একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেড়িয়ে এল অতনুদার গলা থেকে। তারপর টেবিলে রাখা ওনার আর সুলেখাদির বিয়ের ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বললেন...
—'আমি জানি ও হয়তো আমায় আর বাঁচতে দেবেনা। আর সত্যি কথা বলছি, তাই নিয়ে আমার কোনো আফসোসও নেই। তোমরা শুধু টুকাইকে একটু সাবধানে রেখো। ও খুব ভালোবাসতো তো টুকাইকে, তাই তোমরা না বললেও জানি তোমাদের বাড়িতে কিছু না কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা অবশ্যই ঘটছে। আর সেইজন্যই আমি নিশ্চিত ছিলাম তোমরা আসবে এখানে।'
আমি এবার অতনুদার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম...
—'অতনুদা... কেন করলো সুলেখাদি এমন? কি এমন ঝগড়া হয়েছিল আপনাদের মধ্যে যে ওকে এতো বড় একটা সিদ্ধান্ত নিতে হল?'
অতনুদা দেখলাম এই প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে নিজের মাথাটা নত করে নিলেন। বুঝলাম না উনি কি লুকাতে চাইছেন আমাদের থেকে। কিন্তু মা এইবার বেশ রাগী গলায় বলে উঠল...
—'দেখুন অতনুবাবু... আপনাদের স্বামী-স্ত্রীর ঝামেলার কারণ জানার আমাদের কোনো শখ নেই। কিন্তু এটা কেমনতর কথা মশাই... আপনারা অশান্তি করবেন, আপনার স্ত্রী আত্মহত্যা করবে... আর তার ফল ভোগ করবে আমার মেয়ে? আপনিই বলুন না, এটা কি কোনো যুক্তিসংগত ব্যাপার হল?'
অতনুদা এইবার মাটির দিকেই দৃষ্টি রেখে খুব ঠাণ্ডা গলায় বললেন...
—'আমি যদি বলি, সুলেখার আত্মহত্যা করার পিছনে কারণ একমাত্র টুকাই... তাহলে কি কথাটা বিশ্বাস করবেন আপনারা?'
আমার বুকের ভিতর হঠাৎ করে যেন একটা প্রচণ্ড বজ্রাঘাত হল! চিৎকার করে বললাম..
—'মানেএএএএ... কি বলতে চাইছেন আপনি???'
অতনুদা সেই একইরকম ঠাণ্ডা গলায় বললেন...
—'হ্যাঁ... একদমই ঠিক বলছি।' টেবিল থেকে সুলেখাদির ফটোটা হাত বাড়িয়ে তুলে নিয়ে, সেটার কাচের উপর হাত বোলাতে বোলাতে অতনুদা বলতে লাগল...
—'বিয়ের পর পরই ডাক্তার আমাদের বলে দিয়েছিল সুলেখার বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা কম। ওর ওভারিতে এমন একটা প্রবলেম আছে, যার কারণে ওর সন্তান ধারণ করার ক্ষমতা ৯০ শতাংশ নেই বললেই চলে। কিন্তু সুলেখার মাথায় গেঁথে গেছিল... দশ শতাংশ চান্স এখনও আছে যে ও মা হতে পারবে। আর সব সময় সেই আশাতেই থাকতো ও। কিন্তু সময় যত গড়াতে লাগল, ওর স্বপ্ন ততই ভাঙতে থাকল। ধীরে ধীরে ও কেমন যেন ডিপ্রেশনে চলে যেতে শুরু করল। বিভিন্নরকম মনের রোগ দানা বাঁধতে থাকল ওর ভিতর। আমি ওকে কাউন্সিলিং করানোর চেষ্টাও করেছিলাম কয়েকবার, কিন্তু ও তাতে রাজি হয়নি।
দিনকে দিন ওর রাগ, তেজ, জেদ, অভিমান সবকিছুই বাড়তে থাকল। মেজাজ খারাপ হয়ে থাকা, কথায় কথায় যার তার সাথে ঝগড়া করা... এগুলো যেন ওর সারাক্ষণের সঙ্গী ছিল। আমি ওকে কতো বুঝিয়েছিলাম যে অনাথ আশ্রম থেকে একটা বাচ্চা না হয়, দত্তক নিয়ে নিই। কিন্তু নাঃ... ওর একটাই জেদ, ওর নিজের বাচ্চা চাই।
শেষে ভাবলাম এই পরিবেশ ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে থাকলে হয়তো ওর মনটা ভালো হবে। তাই জন্য ওই শান্তিনীড়ের ফ্ল্যাটটাও কিনলাম। কিন্তু তখন বুঝিনি যে ওই ফ্ল্যাট কেনাটাই আমার জীবনে এতো বড়ো বিপদ ডেকে আনবে।'
আমার আর মায়ের মুখে তখন কোনো কথা আসছিল না। আমরা অধীর আগ্রহে অতনুদার দিকে তাকিয়ে ছিলাম ওনার পরবর্তী কথাগুলো শোনার জন্য। উনি আবার বলতে শুরু করলেন...
—'সুলেখা যেদিন প্রথমবার আপনাদের বাড়িতে গেছিল, সেদিনই টুকাইকে দেখে ওর ভালো লেগে গেছিল। ওই প্রথম আমি দেখেছিলাম, একজন অন্য কারোর সন্তানের উপর সুলেখার অতো মায়া জন্মেছিল। তারপর ওই মায়া, ওই ভালো লাগা থেকেই সুলেখার মনে টুকাইয়ের প্রতি এসেছিল এক অকৃত্রিম ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসার থেকেই জন্ম নিয়েছিল এক নিঃসন্তান মায়ের মাতৃত্বের টান। ক্রমশ সুলেখা যেন টুকাইকে নিজের সন্তান বলেই ভাবতে শুরু করছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম... ও আবার একটা আঘাত খেতে চলেছে। তাই ওকে সাবধান করতাম, বাধা দিতাম। কিন্তু ও আমার কথা কিছুতেই শুনতো না। দিনে দিনে টুকাইয়ের প্রতি ওর টান এমন পর্যায়ে চলে যেতে লাগল যে ও সারাক্ষন স্বপ্ন দেখতো টুকাইকে নিজের কাছে রাখার।'
অতনুদা নিজের কথা আবার থামালেন। তারপর একটা হাত বাড়িয়ে টুকাইকে নিজের কাছে ডাকলেন। টুকাই সোফা থেকে উঠে ওনার দিকে এগোতেই যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই আমি ওর হাত ধরে ওকে ওখানেই আটকে দিলাম। অতনুদা আমার এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করে মৃদু হাসলেন। তারপর একটা লম্বা নিশ্বাস ছেড়ে আবার ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন....
—'সুলেখা যেদিন মারা গেল... তার আগেরদিন সন্ধ্যায় আমি যখন অফিস থেকে ফিরলাম, ও তখন আমায় একটা অদ্ভুত কথা বলল। ও বলল... আমি যেন তোমাদের বাড়িতে গিয়ে, অরিন্দম আর তোমার সাথে কথা বলি যে টুকাইকে আমরা দত্তক নিতে চাই।'
অতনুদার কথাটা শুনেই চমকে উঠলাম আমি!
সুলেখাদি এরকম কথা বলেছিল? এতো ভয়ঙ্কর একটা কথা ও মাথায় আনলো কি করে? আমার ছেলেকে পছন্দ হয়েছে বলেই, ওকে দিয়ে দিতে হবে? এটা কি মামাবাড়ির আবদার নাকি? প্রচণ্ড রাগে গা''টা আমার রিরি করে উঠল। অতনুদা হয়তো আমার মনের কথাটা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই আমার দিকে তাকিয়ে উনি বললেন...
—'হ্যাঁ... কথাটা শুনে ঠিক তোমার মতোই চমকে উঠেছিলাম আমি। ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম... কেউ কারো সন্তানকে কেন শুধু শুধু তোমায় দিতে যাবে? তাতে ও আমায় যুক্তি দিয়েছিল... ওর সন্তান ধারণে অসুবিধা আছে, কিন্তু তোমার বা অরিন্দমের সেই অসুবিধা নেই। তাই তোমরা চাইলেই আবার দ্বিতীয় সন্তান নিতে পারবে। কিন্তু ওর সেই বিকল্প নেই।'
মা এইবার আর নিজের ধৈর্য রাখতে পারল না। হঠাৎ করেই চিৎকার করে উঠল...
—'কেন... ও কি এটাকে মগের মুলুক পেয়েছিল নাকি যে বিকল্প থাকলেই নিজের পেটের সন্তান ওকে দিয়ে দিতে হবে? আশ্চর্য মহিলা তো..'
অতনুদা মায়ের দিকে তাকিয়ে খুব ভদ্রভাবে বললেন...
—'মাসিমা... যেই মেয়েটার কথা বলছেন আপনি, সে কিন্তু এখন আর বেঁচে নেই।'
আমি মা'কে ইশারায় চুপ করতে বলে, অতনুদার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললাম...
—'তারপর কি হয়েছিল?'
অতনুদা বিছানায় একটু হেলান দিয়ে বসে, আবার বলতে শুরু করলেন...
—'সেইরাতে খুব ঝগড়া হয়েছিল আমাদের। ও আমাকে হাজারবার হাজার রকম ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, আমি যাতে টুকাইকে তোমাদের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে আসি। কিন্তু আমি প্রতিবারই ওকে না বলেছি। আসলে সত্যি কথা বলতে কি... সুলেখার একটা মানসিক রোগ থাকলেও, আমার তো সেটা ছিল না। তাই ঠিক ভুলের পার্থক্যটা আমি জানতাম।
যাই হোক, যেটা বলছিলাম। সেদিন একটা সময় আমাদের অশান্তি এত চরম সীমায় পৌঁছে গেছিল যে আমাকে বাধ্য হয়ে জীবনে প্রথমবার ওর গায়ে হাত তুলতে হয়েছিল। তারপর আর ও আমার সাথে ওইদিন একটাও কথা বলেনি। সারারাত কিচ্ছুটি না খেয়ে বিছানার একটা কোনায় বসে অনবরত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই গেছিল।
জানো সায়নী... মেয়েটাকে দেখেনা সেইদিন আমার সত্যিই বড্ড কষ্ট হচ্ছিল গো। কিন্তু কি করবো বলো? আমারও যে হাত-পা বাঁধা। ভেবেছিলাম একটা দিন কেঁদে নিক, তাহলে হয়তো মনের কষ্টটা হালকা হবে। কিন্তু পরেরদিন আমি বাজারে বেরোতেই ও যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে ওরকম করে ফেলবে... সেটা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল।'
লক্ষ্য করলাম অতনুদার চোখদুটো জলে ভিজে গেছে। ওনাকে দেখে আমারও কেন জানি চোখটা ছলছল করে উঠল। গলার স্বর একদম নরম করে বললাম...
—'সুলেখাদিকে আপনি যে এত ভালোবাসেন, সেটা কি ও দেখতে পাচ্ছে না? তারপরেও এত কষ্ট দিচ্ছে কেন আপনাকে?'
অতনুদা এবার মৃদু হাসলেন আমার কথায়। তারপর একটা উদাস বললেন...
—'বেঁচে থাকতেই যে নিজের রাগ, জেদ, অভিমানের সামনে আমার ভালোবাসাটা দেখতে পেলনা। মরে যাওয়ার পর তার কাছ থেকে আর এসব আশা করি কি করে বলো? এখন তো ওর কাছে আর মানুষের মতো হৃদয়ও নে.....'
অতনুদা কথাটা সম্পুর্ণ করার আগেই একটা জোরালো ধপশব্দে আমরা চারজনেই চমকে উঠলাম। তাকিয়ে দেখলাম টেবিলের উপর রাখা জল ভর্তি প্লাস্টিকের বোতলটা মেঝেতে পড়ে আছে।
অতনুদা হঠাৎ প্রচণ্ড উত্তেজিত গলায় চিৎকার করে বললেন...
—'তাড়াতাড়ি... তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যাও তোমরা... ও এসে গেছে... টুকাই এখানে থাকলে অসুবিধা হতে পারে... ফাস্ট... ফাস্ট... আর একমুহুর্তও দেরী কোরানা...'
বুকের ভিতরটা যেন ধড়ফড় করে কেঁপে উঠল আমার। তার সাথেই অনুভব করলাম শরীরটা যেন হঠাৎ করেই ভারি হয়ে গেল। গায়ের রোমগুলোও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে খাড়া হয়ে উঠল। কিন্তু শরীর নিয়ে এতকিছু ভাবার সময় এখন আমার নেই। অতনুদা অনবরত বলেই যাচ্ছিলেন...
—'ফাস্ট... ফাস্ট.... ফাস্ট...'
ঘরের ভিতর আবার আরেকটা যেন কিসের শব্দ হল।
কিন্তু আমি আর কোনোদিকে না তাকিয়ে একটানে টুকাইকে নিয়ে ছুটে চললাম ঘরের বাইরের দিকে। শুনতে পেলাম অতনুদা পিছন থেকে চিৎকার করে বলছেন...
—'যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওই ফ্ল্যাট ছেড়ে কোথাও চলে যাও তোমরা। ওর শ্রাদ্ধ হয়ে গেলেও ওর মুক্তি হয়নি। তাই যতোদিন না ওর মুক্তি হয় ভুলেও ফিরে এসো না। নইলে কিন্তু বিপদ... ঘোর বিপদ হতে পারে তোমাদের...'
অতনুদার শেষ কথাগুলো যেন আমার বুকে তীরের মতো এসে বিঁধলো। কিন্তু আজ রাত যে আমাকে থাকতেই হবে ওই ফ্ল্যাটে। আজকেই যদি কিছু হয়... ভয়ে আতঙ্কে সারা শরীরটা কেমন যেন দুমড়ে মুচড়ে এল আমার।
সন্ধ্যার হালকা অন্ধকারে টুকাইকে কোলে আমি আর মা তখন নিয়ে ছুটে চলেছি.... কোথায় যাচ্ছি জানি না। কিন্তু যে করেই হোক অতনুদার বাড়ি থেকে আমাদের দূরে যেতেই হবে। যতোটা দূরে সম্ভব...
সায়নীর কথাগুলো যতোই শুনছিলাম, ততোই যেন অবিশ্বাস্য লাগছিল আমার কাছে। বারবার কেন জানি মনে হচ্ছিল...
সত্যিই কি এইরকম ঘটনা কখনও ঘটে? নাকি এগুলো সবই ওর মস্তিষ্ক প্রসূত?
কি জানি!
তবে সত্যি মিথ্যা যাই হোক না কেন? একটা ব্যাপার তো অবশ্যই আছে এই ঘটনাগুলোর মধ্যে। আর তা আমাকে মানতেই হবে। যতই আমি এই ঘটনাগুলো শুনছি, ততোই যেন এগুলোর উপর আমার কৌতুহল আর আকর্ষণ দুই-ই বেড়ে চলেছে। আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে... একটা গা ছমছম করা অদ্ভুত অনুভূতি!
সচরাচর এরকমটা কিন্তু আমার সাথে খুব একটা হয়না। আসলে ভৌতিক গল্পে বরাবরই আমি ভয়টা একটু কম পাই। তার উপর আবার একাধিক ভূতের গল্প লেখা এবং পড়ার সুবাদে, মনের ভিতর আজকাল ভয়ের অনুভূতিগুলোও যেন অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। তাই ভয় বিষয়টাকে এখন আর আমার দ্বারা উপভোগ করাও হয়ে ওঠেনা।
কিন্তু এই ঘটনাটা শোনার সময়, আজ বহুদিন বাদে আবার আমার সেই পুরোনো অনুভূতিগুলো পুনরায় সাড়া দিয়ে উঠলো। মনে হল, নিজের অজান্তেই সারা শরীরে একটা শিরশিরানি ভাব অনুভব করতে পারছি আমি। তাই অস্বীকার করার জায়গা নেই... কিছু তো একটা অবশ্যই রয়েছে এই গল্পটার মধ্যে, যেটা বিশ্বাস অবিশ্বাসের উর্দ্ধে। তা না হলে কেনইবা শুধু শুধু আমার রোমকূপগুলো এতোদিন বাদে এইভাবে খাড়া হয়ে উঠবে?
সায়নীকে জিজ্ঞেস করলাম... 'তারপর কি হল?'
কিছুক্ষন চুপ করে থেকে ও জবাব দিল...
—'তারপর কি হল, সেটা বলবো তো ঠিকই.. কিন্তু আপনি কি আর বিশ্বাস করবেন?
আমি অবাক হয়ে বললাম...
—'কেন করবো না? এতোক্ষন যদি বিশ্বাস করতে পারি, তাহলে এখন না করার কি আছে?'
একটু মৃদু হাসলো সায়নী। তারপর বলল...
—'আসলে কি বলুন তো, এই কদিনে আমি একটা কথা খুব ভালো করে বুঝে গেছি, যাদের সাথে এইসব অলৌকিক, অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে, তারা ছাড়া এই পৃথিবীর আর কেউ এগুলোকে বিশ্বাস করেনা। হয়তো করা সম্ভবও নয়।
তাই সামনাসামনি যেই যতো বলুক না কেন, সে আমার কথায় বিশ্বাস করছে। আমি জানি তারাও দূরে গিয়ে আমার প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করে। হয়তো হাসি ঠাট্টাও করে আমার কথা নিয়ে। তাই এখন আর কাউকে এসব বলতেও ইচ্ছা করেনা। মনে হয় যা ঘটার, তা তো আমার সাথে ঘটেই গেছে... কাউকে বলে কি লাভ?'
আমার মনে হল, খুব একটা ভুল কিছু বললো না সায়নী। সত্যিই তো... ওর কথাগুলো নিয়ে তো আমার মনেও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আমিও তো ওকে সম্পুর্ণ বিশ্বাস করতে পারছিনা। তাহলে ওর লাভ কি আমাকে বলে?
আমি সায়নীকে বললাম...
—'দেখ সায়নী... কে বিশ্বাস করলো, আর কে বিশ্বাস করলো না... তার উপর তো নির্ভর করে সত্যি কখনও পাল্টে যায়না। আর এটাও ঠিক যে এগুলো এমন একটা কথা, যা অনেকের পক্ষেই মেনে নেওয়া অসম্ভব। তাই তোমার যাকে মনে হবে ঘটনাগুলো বলার, তাকে তুমি অবশ্যই বোলো। এরপর সে কি ভাবলো না ভাবলো, সেটা না হয় তার উপরেই ছেড়ে দাও।'
এইবার সায়নী আর কোনো প্রশ্ন করলো না এই নিয়ে। ও নিজের সেই রাতের পরবর্তী ঘটনাগুলো আবার আমায় বলতে শুরু করলো...
সেদিন সন্ধ্যায় অটো করে বাড়ি ফেরার পথে মা আমায় পরিষ্কার জানিয়ে দিল... মা আর আমার কোনো কথাই শুনতে চায়না। আমি যেন বাড়ি ফিরেই ব্যাগপত্র সব গুছিয়ে ফেলি। আজ রাতেই আমরা রিষড়া ফিরে যাবো।
আমিও আর মায়ের মুখের উপর কোনো কথা বললাম না। সত্যি কথা বলতে কি, আমি নিজেও চাইছিলাম না যে আজ রাতটা আমি এখানে কাটাই। টুকাইয়ের ব্যাপারটা জানার পর থেকেই কেমন যেন একটা আতঙ্ক ঢুকে গেছিল মনের ভিতরে। বারবার মনে হচ্ছিল... সুলেখাদি হয়তো এখনও চেষ্টা করে যাচ্ছে টুকাইকে নিজের কাছে রাখার জন্য। তাই তো ও প্রতিমুহুর্তে এইভাবে ফিরে ফিরে আসছে, আর আমাদের ভয় দেখাচ্ছে।
কিন্তু ও কি জানে না যে ও এখন আর টুকাইকে নিজের কাছে রাখতে পারবে না। কারণ ও তো মারা গেছে। আর একজন মরা মানুষ কি কখনও একজন জীবিত মানুষকে নিজের কাছে রাখতে পারে? এটা কি কখনও সম্ভব?
তারপরেই হঠাৎ করে আমার মনে পড়ল ওই কথাটা। মানুষ মৃত্যুর পর নিজের প্রিয়জনেরই সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে যায়। সে তখন প্রচণ্ডভাবে চেষ্টা করে নিজের প্রিয় মানুষটাকেও তার সাথে মৃত্যুলোকে টেনে নিয়ে যাওয়ার। সুলেখাদিও কি তাহলে সেই চেষ্টাই করছে? ও কি চাইছে টুকাইকে মেরে ফেলে ওর সাথে...
কথাটা ভাবতেই বুকের ভিতরটা প্রচণ্ড রকম কেঁপে উঠল আমার। অটোর মধ্যেই টুকাইকে চেপে জড়িয়ে ধরলাম আমি। মনে মনে বললাম...
—'হে ভগবান, যা ক্ষতি করার তুমি আমার করো... কিন্তু আমার ছেলেটার যেন কোনো বিপদ না হয়, সেই খেয়াল রেখো প্রভু।'
অনেকক্ষণ ধরেই মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল আমার। অটো থেকে নেমে বাড়ির দিকে যেতে যেতে সেটা জিজ্ঞেস করলাম মাকে...
—'আচ্ছা মা... সুলেখাদি যদি আমাদের বিল্ডিংয়ে আসতে পারে, আবার অতনুদার বাড়িতেও যেতে পারে... তাহলে আমরা রিষড়ায় চলে গেলে, ও কি আর সেখানে যেতে পারবে না?'
আসলে অতনুদার কাছে সব কথাগুলো শোনার পর থেকে টুকাইকে নিয়ে এতো বেশি দুশ্চিন্তা হচ্ছিল, যে ছোটো ছোটো সম্ভাবনাগুলোও যেন বড্ড বেশি ভাবিয়ে তুলছিল আমায়।
মা দেখলাম কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আমার মুখের দিকে। হয়তো মেয়ের অসহায়তাটা মা তখন খুব ভালো ভাবেই আন্দাজ করতে পারছিল। তাই খুব শান্ত গলায় বলল...
—'তুই চিন্তা করিস না মাম্পি... ও রিষড়ায় যেতে পারলেও যাবেনা। আসলে কি বলতো, মৃত্যুর পর মানুষের আত্মা প্রধানত দুটো জায়গাতেই ঘোরাফেরা করে... এক, ও যেখানে মরেছিল... আর দুই, ও যেখানে থাকতো। তাই টুকাইকে নিয়ে আমরা যদি রিষড়ায় চলে যাই, তাহলে ওর আর ক্ষতির সম্ভাবনা নেই।'
মায়ের কথায় মনে মনে বেশ সাহস পেলাম আমি। ভেবে নিলাম বাড়ি ফিরেই তাড়াতাড়ি সব গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়তে হবে। আর একটা রাতও এখানে কাটানো ঠিক হবে না।
* * *
শান্তিনীড়ের গেটের সামনে পৌঁছেই, সন্ধ্যার আলো আধাঁরিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা দৈত্যাকার বিল্ডিংটাকে দেখে বুকের ভিতরটা আবার কেমন যেন ছ্যাঁত করে উঠল। মনে হল এই অন্ধকার বিল্ডিংয়েরই কোনো এক অন্ধকার কোনায়, ন্যাড়া মাথায় লাল টিপ পরে ঘাপটি দিয়ে বসে আছে সুলেখাদি। ওর পান খাওয়া লাল টকটকে লোভী জিভ দিয়ে হয়তো এখন টপটপ করে লালা পড়ছে টুকাইয়ের জন্য।
ছেলেটাকে দুহাতে আঁকড়ে ধরে আমি ভয়ে ভয়ে পা রাখলাম লিফটের ভিতর। দরজাটা বন্ধ হওয়ার পরই কেন জানি আমার মনে হল... আজ হয়তো এখানে কিছু একটা অঘটন ঘটতে পারে। তারপর থেকেই নিজের নিশ্বাস আটকে মারাত্মক এক উৎকণ্ঠায় আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম দরজাটা খুলে যাওয়ার। পাশে দাঁড়ানো মা''ও হয়তো আমার এই আতঙ্কটা বুঝতে পারছিল। তাই অনুভব করলাম একটা হাত আমার কাঁধটাকে শক্ত করে ধরল। মা হয়তো বোঝাতে চাইল... ভয় পাসনা, আমি তোর সাথে আছি। লিফট নিজের মতো উপরের উঠে চলল...
একতলা... দোতলা... তিনতলা....
তারপর... চারতলায় এসে দাঁড়িয়ে গেল ওটা। দরজাটা খুলে যেতেই আমি যেন একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
আমার পাশ দিয়ে মা প্রথমে বেড়িয়ে গেল বাইরে। তারপর আমি যখন টুকাইকে নিয়ে বেরোতে যাচ্ছি, ঠিক তখনই আমার খেয়াল হল... হাতটা যেন এখনও আমার কাঁধটাকে শক্ত করে চেপে ধরে আছে! আমি চেষ্টা করেও এগোতে পারছি না!
একি... মা তো লিফটের বাইরে!!! তাহলে এটা কার হাত???
ভয়ে আতঙ্কে আমার সম্পুর্ণ শরীরটা এবার থরথর করে কেঁপে উঠল। আমি জোর করে বেরোনোর জন্য ছটফট করতে লাগলাম। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হলোনা। অদৃশ্য একটা হাত যেন আমার দেহের ওজন শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল তখন। লিফটের বাইরে থেকে মা বিরক্তির সুরে চিৎকার করে বলল...
—'কিরেএএ... বেরোচ্ছিস না কেন? বেরোওওও...'
এর উত্তরে আমি মা'কে নিজের দুরবস্থার কথা বলতেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু তার আগেই দেখলাম... লিফটের দরজাটা আবার নিজের থেকেই বন্ধ হতে শুরু করলো!
আমি টুকাইকে নিয়ে পাগলের মতো চেষ্টা করতে লাগলাম দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য শক্তিবলে আমার পা দুটো যেন লিফটের মেঝেতেই জমাট বেঁধে আটকে রইলো। দরজাটা যখন প্রায় বন্ধ হয় হয় অবস্থা, তখন দেখলাম হঠাৎ করে মা এসে ওর মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাতে দরজাটা আবার আগের মতো খুলে গেল, আর আমিও অনুভব করলাম... আমার কাঁধের উপর এখন আর কারো হাতের স্পর্শ নেই।
মা আমায় প্রচণ্ড বকা দিয়ে জিজ্ঞেস করল...
—'কিরে... পাগল হয়ে গেছিস নাকি? বেরোচ্ছিস না কেন লিফট থেকে?'
কিন্তু সেই মুহুর্তে মায়ের কোনো প্রশ্নের জবাব দেওয়ার অবস্থায় আমি ছিলাম না। টুকাইকে নিয়ে দ্রুত গতিতে লিফট থেকে বেরিয়ে এসে ঘরের কলিং বেল টিপলাম আমি।
নাঃ... আর একমুহুর্তও না... এক্ষুনি... এক্ষুনি এই ফ্ল্যাট ছাড়তে হবে আমাদের। নইলে ভয়ঙ্কর বিপদ ঘটে যাবে।
কিন্তু মানুষ যতোই পরিকল্পনা করে রাখুক না কেন? তাতে ভবিতব্যের কখনও কোনো পরিবর্তন হয়না। আর সেই রাতে এই ব্যাপারটা আমি খুব ভালো করেই বুঝেছি।
দু-তিনবার বেল বাজানোর পর বাবা ব্যস্ত হয়ে এসে যখন দরজাটা খুলল, তখনই বাবার বিধ্বস্ত মুখ দেখে বুঝেছিলাম... বড়সড় একটা অঘটন অবশ্যই ঘটেছে। কিন্তু কি ঘটেছে সেটা জিজ্ঞেস করার আগে, বাবা নিজেই উত্তেজিত গলায় আমায় বলল...
—'ওহ.. তুই এসেছিস? আমি তোকেই ফোন করতে যাচ্ছিলাম... তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে যা.. দেখ গিয়ে তোর শাশুড়ির কি হয়েছে?'
কথাটা শুনেই ছুটে গেলাম রান্নাঘরের দিকে। সেখানে গিয়ে দেখলাম, রান্নাঘরের মধ্যেই একটা চেয়ারে মাথা এলিয়ে বুকে হাত দিয়ে বসে আছেন শাশুড়ি মা। ওনাকে এই অবস্থায় দেখা মাত্রই আমার যেন পায়ের তলার মাটি সরে গেল। তাড়াতাড়ি গিয়ে ওনার বুকটা ডলে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলাম...
—'কি হয়েছে মা?'
উনি খুব ধীরে ধীরে জবাব দিলেন...
—'বড্ড ব্যথা করছে...'
বাবা বলল...
—'আমরা দুজনে তো একসাথে বসেই টিভি দেখছিলাম। উনি বলল, আপনি বসুন আমি একটু চা করে নিয়ে আসি। তখনও কিন্তু সুস্থই ছিলেন। তারপর চা করতে এসে, কি যে হল জানি না। হঠাৎ একটা আওয়াজ পেয়ে রান্নাঘরে ছুটে এসে দেখি, উনি মাটিতে পড়ে বুক ধরে দাপাদাপি করছেন। কোনোরকমে মাটি থেকে উঠিয়ে চেয়ারে বসিয়েছি আর তখনই তোরা এসেছিস।'
আমি বাবার উপর রাগ দেখিয়ে চিৎকার করে বললাম...
—'চেয়ারে বসানোর কি ছিল? একটু কোলে করে তুলে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শোওয়াতে পারলে না?'
বাবা দেখলাম হতভম্বের মতো আমার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। মা আমাকে বলল...
—'এই মাম্পি... কি বলছিস এইসব? বাবা কি এগুলো পারে নাকি করতে?'
আসলে শাশুড়ি মা'কে দেখে তখন আমার এতোটাই দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে গেছিল যে বাবার সাথে ওনার সম্পর্কটাও আমি ভুলে গেছিলাম। আর তাছাড়া আমি বিশ্বাস করি... মানুষের জীবনের থেকে কোনো সম্পর্ক কখনও বড় হতে পারেনা। কিন্তু এইসব নিয়ে তর্ক করার সময় তখন আমার ছিলনা। কোনোমতে আমি আর মা মিলে ধরাধরি করে শাশুড়ি মাকে বিছানায় শুইয়েই, সাথে সাথে ফোন করলাম ডাক্তারকে। তারপর শাশুড়ি মায়ের মাথার পাশে বসে বুকে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম।
ডাক্তার এলেন মিনিট কুড়ি পর। এরপর শাশুড়ি মাকে ভালো করে চেক করে... কয়েকটা মেডিসিন আর টেস্ট লিখে দিয়ে বললেন...
'ওনার একটা মাইল্ড হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে। এখন আমি একটা ইঞ্জেকশন দিয়ে যাচ্ছি। এতে উনি ঘুমিয়ে পড়বেন। বাইচান্স রাতে যদি ঘুম ভেঙে গিয়ে কোনো অসুবিধা হয়, বা ব্যথা করছে বলে তাহলে এই দুটো ওষুধ খাইয়ে দেবেন। আর কাল সকালে অবশ্যই টেস্টগুলো করিয়ে নেবেন।'
হার্ট অ্যাটাক শব্দটা শুনেই আমার হাত-পাগুলো কেমন যেন ঠাণ্ডা হয়ে এল। আমি ডাক্তার বাবুকে বললাম...
—'টেনশনের কোনো ব্যাপার নেই তো ডাক্তার বাবু? মানে আপনি যদি বলেন... তাহলে কিন্তু আমি হসপিটালেও অ্যাডমিট করাতে পারি।'
ডাক্তার বাবু মৃদু হেসে বললেন...
—'ওরকম যদি বুঝতাম, তাহলে কি আমি ঘরে ফেলে রাখতে বললাম? চিন্তা করবেন না। খুবই মাইল্ড অ্যাটাক। আচমকা করোনারি ব্লকেজ হয়ে গেলে এরকম হয়। আপনি ওষুধগুলো আনিয়ে রাখুন, আর কাল একবার টেস্টগুলো করিয়ে নেবেন।'
ডাক্তার বাবু শাশুড়ি মাকে ইঞ্জেকশন দিয়ে চলে গেলেন। আমাদের গেটের দারোয়ানটাই ডাক্তার বাবুকে সাথে করে নিয়ে এসেছিল আমাদের ঘর অবধি। আমি ওর হাতেই টাকা আর প্রেসক্রিপশনটা দিয়ে ওষুধগুলো আনিয়ে নিলাম।
কেন জানি খুবই বিধ্বস্ত লাগছিল নিজেকে। অরিন্দম এখানে নেই। তারমধ্যে ওর মায়ের যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে আমি মুখ দেখাবো কি করে? কথাটা ভেবেই মনটা তখন এতোটা ভারি হয়েছিল যে অন্য চিন্তাগুলো মাথা থেকে সম্পুর্ণ বেরিয়েই গেছিল।
আসলে মানুষের অদৃশ্য বিপদ যতই বড় হোক না কেন, চোখের সামনের বিপদ সবসময়ই তাকে ভুলিয়ে দিতে পারে। আর আমার ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল সেদিন। শাশুড়ি মায়ের এইরকম অবস্থা দেখে সুলেখাদির ভয় কখন যেন ভুলেই গেছিলাম আমি।
কিন্তু ভয়কে আমরা ভুলে থাকতে চাইলেও, ভয় যে আমাদের বেশিক্ষণ ভুলে থাকতে দেয়না। ওর সময় হলেই ও ঠিক ফিরে আসে স্বমহিমায়। আর এর প্রমাণও আমি পেয়েছিলাম সেই রাতে।
সন্ধ্যেবেলায় ডাক্তার বাবু ইঞ্জেকশন দিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর সেই যে শাশুড়ি মা ঘুমিয়ে ছিলেন, আর ওঠেন নি ঘুম থেকে। আমরাও ওনাকে সুস্থ দেখে ধীরে ধীরে নিশ্চিন্ত হয়ে উঠছিলাম।
সেই রাতে আমাদের খাওয়া-দাওয়া শেষ হতে প্রায় সাড়ে এগারোটা বেজে গেছিল। খাওয়ার পর আমি মাকে বলেছিলাম, যাতে মা আর বাবা আমার ঘরে শুয়ে পড়ে। আমি না হয় টুকাইকে নিয়ে শাশুড়ি মায়ের ঘরে শুয়ে পড়বো। কিন্তু মা তাতে রাজি হয়নি। মা বলেছিল...
—'এইটুকু বিছানায় তোরা তিনজন শুতে পারবি না। তার চেয়ে তুই আর টুকাই বরং তোর ঘরেই শো। আমি এখানে থাকছি তো। কোনো অসুবিধা হলে ডাকবো তোকে।'
এরপর আমি আর কোনো কথা বলিনি। টুকাইকে নিয়ে নিজের ঘরে এসে দরজা ভেজিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। সারাদিনের দৌড়ঝাঁপ আর চিন্তায় এতোটাই ক্লান্ত হয়েছিলাম যে শোওয়া মাত্রই কখন যে দুচোখ বুজে ঘুম নেমে এসেছিল... বুঝতেই পারিনি।
* * *
রাত তখন ঠিক কটা বেজেছিল মনে নেই। হঠাৎ ঘুমের চোখে শুনতে পেলাম, মা আমায় ডাকছে। চোখ খুলে তাকাতেই দেখলাম, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মা বলছে...
—'মাম্পি... হনুমান চালিশাটা শিগগিরি নিয়ে আয় তোর শাশুড়ির ঘরে।'
আমি ঘুমের চোখেই টুকাইয়ের বালিশের তলা থেকে হনুমান চালিশাটা নিয়ে ছুটে গেলাম শাশুড়ি মায়ের ঘরে। সেখানে গিয়ে দেখলাম বাবা, মা, আর শাশুড়ি তিনজনেই জেগে। আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গিয়ে শাশুড়ি মাকে জিজ্ঞেস করলাম...
—'কি হয়েছে মা? আবার বুক ব্যথা করছে?'
তা শুনে আমার মা বলল...
—'না না... এখন আর ওনার বুক ব্যথা করছে না। তবে দাঁড়িয়ে থেকে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়েছিল তো। তাই মাথা, কোমড়, হাঁটু এসব জায়গায় চোট পেয়েছেন। ওখানেই ব্যথা করছে এখন। তোকে ডাক্তার যেই ওষুধটা দিতে বলেছিল সেটা দিয়ে দে।'
আমি শাশুড়ি মাকে ওষুধ খাইয়ে ওনার পিঠ, কোমর এইসব জায়গাগুলো মালিশ করে দিতে লাগলাম। এরমধ্যে বাবা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল...
—'তখন কি হয়েছিল আপনার? হঠাৎ করে পড়ে গেলেন কেন?'
বাবার প্রশ্ন শুনে শাশুড়ি মা ধীরে ধীরে আমার মুখের দিকে ঘুরে তাকালো। তারপর খুব ক্ষীণ কণ্ঠে আমায় বলল...
—'তখন জানো তো, রান্নাঘরে আমি চা বানাচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হল কে যেন রান্নাঘরের জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। আমি ভাবলাম চারতলার জানালায় কে আবার উঁকি দিচ্ছে? বিড়াল টিরাল হবে হয়তো। ঘুরে তাকাতেই কি দেখলাম জানো?'
আমি বললাম.. 'কি?'
শাশুড়ি মা চোখদুটো বড়বড় করে বলল...
—'আমি দেখলাম জানালা দিয়ে সুলেখা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে...'
শুনেই বুকটা আমার ধড়াস করে উঠল। তবু কোনোমতে নিজের ভয়টাকে সামলে বললাম...
—'না মা.. আপনি হয়তো ভুল দেখেছেন।'
শাশুড়ি মা উত্তেজিত গলায় বলল...
—'অসম্ভব... সেই লাল টিপ... সেই কাজল পরা চোখ... সেই পান খাওয়া লাল ঠোঁট... আমি কিছুতেই ভুল দেখতে পারিনা। তারপরেই তো বুকটা প্রচণ্ড ব্যথা করে উঠল। চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে গেল। আর আমি মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেলাম।'
কি বলবো কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমি জানি শাশুড়ি মা মিথ্যা বলছেন না। কিন্তু এই অবস্থায় ওইসব কথা আমি ওনাকে আর ভাবতে দিতে চাইছিলাম না। তাই সান্ত্বনা দিয়ে বললাম...
—'ঠিক আছে ছাড়ুন তো মা। যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন তো আমি এসে গেছি, আর কোনো ভয় নেই।'
শাশুড়ি মা হয়তো এবার একটু নিশ্চিন্ত হলেন। তাই বালিশে মাথা রেখে আবার চোখ বুজলেন। আমি ওনার কোমর মালিশ করে দিতে থাকলাম।
কিছুক্ষন পরে হঠাৎ মা আমায় বলে উঠল...
—'আরে.... এই হনুমান চালিশাটা এখানে কি করে এল? এটা তো আমি টুকাইয়ের বালিশের নিচে রাখতে বলেছিলাম তোকে।'
আমি অবাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম...
—'আশ্চর্য... তুমিই তো আমায় বললে এই ঘরে নিয়ে আসতে।'
—'আমি!!!!!' মা বিস্মিত মুখে আমার দিকে তাকালো। আর সাথে সাথেই আমার শরীরের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো যেন থরথর করে একসাথে কেঁপে উঠল।
টুকাই ওই ঘরে একা শুয়ে আছে... আর ওর বালিশের নিচে এখন হনুমান চালিশাটাও নেই! আমি কাঁপতে কাঁপতে হনুমান চালিশাটা নিয়ে ছুটে গেলাম আমার ঘরে। আর সেখানে পৌঁছে আমি যা দৃশ্য দেখলাম... তাতে বুকের ভিতর আমার হৃৎপিণ্ডটা যেন একমুহুর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেল!
ঘরের নাইট ল্যাম্পের আলোয় আমি পরিষ্কার দেখলাম... টুকাই বিছানার উপর ঘুমিয়ে আছে, আর ওই একই বিছানার উপর ওর ঠিক পাশেই বসে আছে একটা কালো রঙের ছায়ামূর্তি। আর সেই ছায়ামূর্তি তখন কি যেন একটা করছিল টুকাইয়ের শরীরে। এইবার আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। আমার গলা দিয়ে চিৎকার বেরিয়ে এল....
—'টুকাআআআআআইইইই.....'
অন্ধকারের মধ্যেই ছুটে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলাম টুকাইকে। ততক্ষনে বাবাও এসে লাইট জ্বালিয়ে দিয়েছিল ঘরের। আলো জ্বলার পর আমিও আর দেখতে পাইনি সেই ছায়ামূর্তিকে। তবে টুকাইয়ের গলায়, বুকে, আর ঘাড়ে বেশ কয়েকটা পাঁচ আঙ্গুলের নখের আঁচড় স্পষ্ট দেখতে পারছিলাম তখন।
সেই রাতে আমরা আর কেউই দু চোখের পাতা এক করতে পারিনি। সবাই লাইট জ্বালিয়ে একটা ঘরেই বসে ছিলাম। তারপর ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই গাড়ি ভাড়া করে চলে এসেছিলাম রিষড়ায়। এখনও আমরা সবাই রিষড়াতেই আছি। অরিন্দমও পুণে থেকে ফিরে এখানেই থাকছে।
অতনুদার সাথে অরিন্দমের কথা হয়েছে ফোনে। ওদের নাকি দোষ কাটানোর পুজো হয়ে গেছে, এখন আর কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। তাই আমাদেরও ফিরতে বলছিল ফ্ল্যাটে। কিন্তু আমি চাইছিলাম ফেরার আগে যদি একবার ফকির বাবার সাথে দেখা করতে পারতাম তাহলে ভালো হতো।
সব শুনে আমি বলেছিলাম...
—'দেখ সায়নী, ফকির বাবার ঠিকানা তো আমি ঠিক জানিনা। তবে সে না হয় জিজ্ঞেস করে নেবো। কিন্তু আমি যতদূর জানি উনি এখন আর ওখানে থাকেন না। তাই ওনাকে পাওয়া মুশকিল।
তবে আমার মনে হয় অতনুদা যখন নিজেই বলছেন, পুজো দেওয়ার পর আর কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। তাহলে হয়তো সত্যিই সব ঠিক হয়ে গেছে। তবু তোমায় বলবো নিজের মনের শান্তির জন্য ফকির বাবার মতো অন্য ভালো কাউকে খুঁজে বের করে একবার কথা বলে নাও। সে যদি বলেন যেতে... তবেই না হয় ফিরো। এতে তোমরাও নিশ্চিন্ত হতে পারবে।'
আমার কথা শুনে সায়নী বলেছিল...
—'ঠিক আছে, তাই করবো না হয়। দেখি ভালো কাউকে খুঁজে পাই কিনা।'
এই ঘটনার সপ্তাহ খানেক পর সায়নীর সাথে আর একবারই কথা হয়েছিল আমার। ও তখন জানিয়েছিল.. ওরা এখনই ফিরছে না শান্তিনীড়ে। কবে ফিরবে তারও কোনো ঠিক নেই। তবে ওখানে ফেরার পর আবার যদি কখনও কোনো অসুবিধা হয়, তাহলে ও নিশ্চয়ই জানাবে আমায় সেই ঘটনা।
কিন্তু এখন ওরা সকলেই বেশ ভালো আছে। সায়নীর ভাই নিজের ফ্যামিলি নিয়ে মুম্বাই শিফট হয়ে যাওয়ায়, ওদের আর ঘরেরও কোনো অসুবিধা নেই।
সব শুনে ওদের জন্য মনে মনে বলেছিলাম...
—'ঈশ্বর.. ওদের তুমি ভালো রেখো..'
* * *
এই ঘটনার পর কেটে গেছিল প্রায় মাস তিনেক সময়। ততোদিনে আমিও বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম যে সায়নীর সাথে আর কোনোরকম অঘটন কিছু ঘটেনি। কারন ও বলেছিল, ওর সাথে যদি নতুন করে কিছু আবার ঘটে, তাহলে ও সেটা অবশ্যই জানাবে আমায়। কিন্তু এতোদিন হয়ে যাওয়ার পরেও ওর থেকে যখন কোনো ফোন আসেনি, তখন আমি ধরেই নিয়েছিলাম... সায়নীরা সবাই এখন ভালই আছে।
কিন্তু আমার এই ভাবনাটা যে কতোটা ভুল ছিল, তা বুঝতে পেরেছিলাম আরও দিন কয়েক পরে। সেদিনটা ছিল শনিবার। অফিসে নিজের কাজে ব্যস্ত ছিলাম আমি। হঠাৎ পকেটে থাকা মোবাইলটা বেজে উঠল। সেটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে গেলাম আমি। ওখানে লেখা আছে... সায়নী, ব্রাকেটের মধ্যে শান্তিনীড়।
কি ব্যাপার, ও হঠাৎ ফোন করছে কেন? তাহলে কি আবার নতুন কিছু শুরু হল? চিন্তিত মনে ফোনটা রিসিভ করতেই, উল্টোদিক থেকে ভেসে উঠল সায়নীর গলার স্বর...
—'কল্যাণদা, আমরা বুঝে গেছি ও আর আমাদের ওখানে থাকতে দেবে না। তাই ফ্ল্যাটটা বিক্রি করার লোক খুঁজছি এখন।'
—'মানে! কেন? কি হল আবার?'
—'সে অনেক কথা। আপনাকে জানাবো বলেই ফোন করেছিলাম। আপনি কি ফ্রি আছেন এখন?'
হাতে কাজের চাপ ছিল। তারমধ্যে অফিসে বসে সায়নীর সব কথা অতো মনযোগ দিয়ে শুনতেও পারতাম না। তাই ওকে বললাম...
—'আমি যদি তোমাকে রাত আটটার দিকে ফোন করি, কোনো অসুবিধা হবে?'
সায়নী জানালো ওর কোনো অসুবিধা নেই। সেসময় ও ফাঁকাই থাকে। তাই আমি যেন ওকে রাত আটটাতেই ফোন করি। এরপর ও ফোন রেখে দেওয়ার পর থেকেই সারাক্ষণ কেমন যেন একটা উদ্বেগ, একটা কৌতুহল কাজ করতে লাগল আমার ভিতর। কিছুতেই আমি মন বসাতে পারলাম না নিজের কাজে। ঘনঘন ঘড়ি দেখতে লাগলাম, আর অপেক্ষা করতে থাকলাম রাত আটটা বাজার। বেশ কয়েকটা প্রশ্ন বারংবার ঘুরেফিরে আসছিল মাথার মধ্যে। বারবার মনে হচ্ছিল...
আবার কি হতে পারে ওদের সাথে? আচ্ছা... ওরা সবাই ভালো আছে তো? টুকাইয়ের কিছু হয়নি তো আবার? সায়নীরা কি তবে মায়ের বাড়ি থেকে ফিরে এসেছিল ওখানে? কিন্তু কেন???
এইরকম আরও অনেক জিজ্ঞাস্য, যা আমার মনমস্তিষ্ককে তোলপাড় করে তুলছিল সারাদিন... তার উত্তর পেলাম সেদিন রাত আটটার পর। ওইদিন বাড়ি ফিরে সায়নীকে ফোন করা মাত্রই ও আমায় বলল...
—'আমি এতোক্ষন আপনার কলের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। আপনি বলেছিলেন যদি নতুন করে আবার কিছু ঘটে, তাহলে যেন আপনাকে জানাই।'
আমি বললাম... 'হুম! তা নতুন কিছু ঘটলো নাকি আবার?'
আমার প্রশ্নের উত্তরে সায়নী কিছুক্ষন চুপ করে রইল। তারপর ধীরেধীরে বলতে শুরু করল...
—'মায়ের বাড়িতে মাস দুয়েক বেশ ভালোভাবেই কেটে গেল আমাদের। কোনোরকম অসুবিধা কিছু ছিলনা। এরপর একদিন হঠাৎ অরিন্দম আমার কাছে আমাদের শান্তিনীড় ফ্ল্যাটের চাবিটা চাইলো। আমি একটু অবাক হয়েই ওকে জিজ্ঞেস করলাম... ওখানকার চাবি দিয়ে কি হবে? তার জবাবে ও আমায় জানালো, ওর নাকি অফিসের কোন দরকারি কাগজপত্র রয়ে গেছে ওই বাড়িতে। সেটা আনতে যেতে হবে। আজ অফিস থেকে একটু আগে বেরিয়ে ফেরার পথে ও সেটা নিয়ে আসবে। ওই বাড়িতে অরিন্দম একা যাবে শুনেই আমার যেন তখন একটু কেমন লেগেছিল। ওকে জিজ্ঞেসও করেছিলাম... আমি সাথে যাব কিনা? ও বলেছিল... যেতে হবেনা। ও একাই পারবে।
অরিন্দম সেদিন একাই গিয়ে নিয়ে এসেছিল কাগজটা। ফিরতে বেশ রাতই হয়েছিল। ও বলেছিল... ওর নাকি কোনো অসুবিধা হয়নি। কিন্তু একটা ব্যাপার আমি লক্ষ্য করেছিলাম... সেদিনের পর থেকে অরিন্দমের মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছিল। ওইদিন ওর সাথে কি ঘটেছিল... তা আমি জানি না। ও কোনোদিন বলেও নি আমায়। তবে কেন জানি ওখান থেকে ফেরার পর, অরিন্দম এখানে আর মায়ের বাড়িতে থাকতে চাইছিল না। কিছু বললেই বলতো... আমি কি ঘরজামাই নাকি যে তোমাদের বাড়িতে থাকবো? এই নিয়ে বেশ কয়েকবার কথা কাটাকাটিও হয়েছিল আমাদের। কিন্তু অরিন্দম জেদ ধরে বসেছিল, কেউ না গেলে ও একাই গিয়ে থাকবে আমাদের ফ্ল্যাটে। আমি তো আপনাকে আগেই বলেছি... আমাদের মধ্যে ঝগড়া অশান্তি একটু কমই হতো। কিন্তু এই একটা ব্যাপার নিয়ে আমাদের সম্পর্কটা দিনকে দিন কেমন যেন তিক্ত হয়ে উঠছিল।আমি ওকে কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারছিলাম না যে ওখানে গেলে টুকাইয়ের বিপদ হতে পারে। ওর একটাই বক্তব্য... তখন যা কিছুই হয়েছিল, সেসময় ও পুণেতে ছিল। কিন্তু এখন গেলে ওইসব আর হবে না।
যাই হোক, এইসবের মাঝেই একদিন অতনুদা এলেন অরিন্দমের সাথে, আমাদের রিষড়ার বাড়িতে। কথায় কথায় উনি আমায় বললেন...
—''অরিন্দমের মুখে সব কথাই শুনেছি আমি। তা একটা জিনিস বলি কি, তোমরা কিন্তু একবার গিয়ে দেখতে পারো ওখানে। প্রয়োজন হলে নাহয় টুকাইকে এখানে রেখেই, তোমরা দুজনে যাও। দিন দুয়েকের জন্য ওখানে থেকে অবস্থাটা একটু দেখে এসো। তারপর ভালো বুঝলে টুকাইকে পরে নিয়ে যেও... ব্যাস।''
এরপর অতনুদা আরও বললেন...
—''আসলে কি বলো তো সায়নী, নিজের বাড়ি ছেড়ে কতোদিনই বা এইভাবে থাকা যায়? আর তাছাড়া, এখন তো দুমাস প্রায় কেটেই গেছে... আমাদের বাড়িতেও আর কোনো অসুবিধা হয়না। আমার মনে হয়, তোমার ওখানেও সব ঠিকঠাকই থাকবে। তাই একবার গিয়ে দেখতেই পারো।''
অতনুদার কথাগুলো শুনে কেন জানি আমার মনে হল, উনি কথাটা খুব একটা খারাপ বলেননি। আর যতোই হোক, এটা আমার নিজের বাড়ি হলেও, অরিন্দমের কাছে তো ওর শ্বশুরবাড়ি। আর একজন ছেলের পক্ষে দিনের পর দিন তার শ্বশুরবাড়িতে থাকা.. এটা আত্মসম্মানে লাগার মতোই ব্যাপার। মনে মনে ঠিক করে নিলাম এই বিষয়টা নিয়ে অরিন্দমের সাথে আর কোনো ঝামেলা করবো না আমি। তার চেয়ে বরং শাশুড়ি মা আর টুকাইকে রেখে আমরাই দিন কয়েকের জন্য থেকে আসবো ওখানে। যদি বুঝি সব ঠিকঠাক আছে, তাহলে না হয় ওদেরও নিয়ে যাওয়া যাবে।
রাতে এই কথাটা অরিন্দমকে জানানোয়, ও বেশ খুশিই হয়েছিল। ঠিক করেছিল দুদিন পর যেই রবিবারটা আসছে, সেই দিন আমরা ফিরে যাবো আমাদের শান্তিনীড়ের ফ্ল্যাটে। কিন্তু তখনও আমরা জানতাম না, আমাদের জন্য ওখানে কি ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করে আছে। যদি জানতাম, তাহলে হয়তো কিছুতেই ওখানে ফিরে যেতে রাজি হতাম না আমি। যাই হোক, এই ব্যাপারে কিছু বলার আগে, আমি আরও একটা বিষয়ে আপনাকে জানিয়ে রাখতে চাই। ওইদিন অতনুদাকে আমি গল্পের ছলে জিজ্ঞেস করেছিলাম... ওনার সাথে ঠিক কি কি ঘটতো ওই রাতগুলোয়? কেন ওনার গায়ে এইরকম নখের আঁচড়গুলো পড়তো? তাছাড়া উনি টেরই বা পেলেন কি করে সুলেখাদির অস্তিত্ব?
আমার এই প্রশ্নের উত্তরে অতনুদা বেশ কিছুক্ষন চুপ করে শূন্যদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন ঘরের দরজাটার দিকে। তারপর ধীরেধীরে শান্ত গলায় বলেছিলেন...
—''সুলেখাকে আমি সত্যিই খুব ভালোবাসতাম। জানতাম, ও একটু জেদি, বদরাগী। অনেক ছেলেমানুষি আছে ওর মধ্যে। তবে মানুষ হিসেবে ওর মনটা বড় ভালো ছিল। আর ওর ওই সুন্দর নরম মনটাই, বরাবর আমায় আকৃষ্ট করতো ওর প্রতি। বাধ্য করতো ওকে আরও বেশি ভালোবাসতে।''
এরপর কিছুক্ষন থেমে উনি আবারও বলেছিলেন...
—''নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয় মানুষটার নিঃশব্দ বিচরণও যে টের পাওয়া যায় সায়নী। তার গন্ধ পাওয়া যায়, তাকে অনুভব করা যায়।
জানো, যেদিন সকালে ও মারা গেছিল... সেদিন রাতে কিছুতেই ঘুম আসছিল না আমার। ওর ফাঁকা বালিশটার দিকে যতবারই চোখ পড়ছিল, ততবারই যেন বুকের ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে উঠছিল। নিজেকে কিছুতেই সামলাতে পারছিলাম না আমি। একটা দলা পাকানো যন্ত্রণা চিৎকার বেরিয়ে আসছিল গলা থেকে। সেদিন কতোক্ষন এইভাবে কেঁদেছিলাম, নিজেও জানিনা। তবে ভোররাতের দিকে হয়তো কোনোভাবে চোখটা লেগে গেছিল। হঠাৎ ঘুমের ঘোরেই শুনতে পেলাম... আমার অন্ধকার ঘরের খালি বিছানাটার উপর কোনো মহিলার যেন হাতের শাঁখা-পলা নড়ার টুংটাং শব্দ। চমকে উঠলাম আমি! এতো রাতে আমার ঘরে এই শব্দ আসছে কোথা থেকে? এখানে তো আমি ছাড়া আর কেউ নেই। তাহলে?
ভালো করে শুনতেই বুঝতে পারলাম, শব্দটা আমার বহু পরিচিত। শেষ বারো বছর ধরে শুনে আসছি আমি এই আওয়াজ। এমনকি গতকাল রাতেও শুনেছি। কিন্তু আজ তো এই আওয়াজ শোনার কথা নয়। কারন যার হাত নড়লে এই শব্দটা হয়, সে তো আজ সকালেই....
বিস্মিত হয়ে নিজের মনেই বলে উঠলাম...
—''সুলেখা...!!!!''
আর সাথে সাথেই একটা অসহ্য চাপ অনুভব করলাম বুকের মধ্যে। মনে হল খুব ভারি কিছু একটা যেন ধীরেধীরে চেপে বসল আমার বুকের উপর। আমি চেষ্টা করেও সেটাকে সরাতে পারলাম না। সেই সঙ্গে সারা শরীরেও শুরু হল মারাত্মক এক তীব্র জ্বলন। কেউ যেন প্রবল জিঘাংসায় আমার গোটা শরীরময় তার হিংস্র নখের আঁচড় কেটে যাচ্ছিল। ব্যথায় যন্ত্রণায় বাকিটা সময় ছটফট করতে থাকলাম আমি। কিন্তু সেসময় যে কাউকে চিৎকার করে ডাকবো, সেই ক্ষমতাও আমার তখন ছিলনা। শুধু সহ্য করে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করে উঠতে পারলাম না আমি। এরপর প্রতি রাতেই এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকলো আমার সাথে। আর শুধু রাতেই বা বলি কি করে?
দিনেও যখন খেতে বসতাম বা ঘুমানোর চেষ্টা করতাম... এইরকম বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রনা ও আমায় দিয়েই চলতো। ক্রমশই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমায় যন্ত্রনা দিয়ে ও যেন মৃত্যুর পর সুখীই হচ্ছে। তাই নীরবে সেগুলো মেনেও নিয়েছিলাম আমি। দিনের পর দিন অভুক্ত থেকে, আর রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে শরীর ধীরেধীরে অবসন্ন হয়ে পড়ছিল আমার। এমনকি একটা সময় তো মৃত্যুকেই আমার যন্ত্রণা অবসানের পথ ভেবে, তার জন্যে অপেক্ষাও করতে শুরু করেছিলাম আমি। ভেবেই নিয়েছিলাম, শ্রাদ্ধের পরেও ওর যখন মুক্তি ঘটেনি, তার মানে ও আমায় না নিয়ে এখান থেকে যাবে না। ততোদিনে তোমরাও শান্তিনীড় ছেড়ে এখানে চলে এসেছো। তাই তোমাদের... বিশেষ করে টুকাইকে না পেয়ে ও আমার উপর আরও হিংস্রভাবে অত্যাচারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। ঠিক এমন একটা সময়ে মা একদিন বাড়িতে দোষ কাটানোর জন্য পুজো দিল এবং আরও কি কি সব যেন উপাচার করলো। কি পুজো, কিসের উপাচার... তা আমি কিছুই জানি না। কারন তখন আমি শয্যাশায়ী। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতাটুকুও তখন আমার ছিল না। কিন্তু ওই দিন একটা ব্যাপার আমি বেশ লক্ষ্য করলাম। সুলেখার মৃত্যুর পর ওটাই প্রথম রাত ছিল... যেদিন ও আর এলো না। বহুদিন পর সেইদিন রাতে আমি একটু নির্ঝঞ্ঝাটে খাবার খেতে পারলাম। এমনকি সারারাত ধরে নিশ্চিন্তে ঘুমাতেও পারলাম কোনোরকম ঝামেলা ছাড়া। এরপর থেকে আস্তে আস্তে সবই প্রায় ঠিক হতে শুরু করল। আমিও আবার আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠলাম। অনেকদিন ধরে ঘরের কোনে বন্দী থাকার ফলে আমি যেই দিবারাত্রির পার্থক্যটা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম, সেইদিনের পর থেকে আবার সব আগের মতই ঠিকঠাক হয়ে গেছিল। কোনোরকম বাধাবিঘ্ন ছাড়াই আমি বেরোতে পারছিলাম ঘরের বাইরে। প্রান ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম খোলা হাওয়ায়।''
এরপর অতনুদা কিছুক্ষন চুপ করে চেয়ে রইলেন মাটির দিকে। তারপর ধীরেধীরে শান্ত গলায় বললেন...
—''ওই দিনের পর সুলেখাকে আমি আর কখনোই অনুভব করতে পারিনি। হয়তো আমার প্রতি জমে থাকা হাজারো অভিমান নিয়েই এই পৃথিবী থেকে মুক্তি নিয়েছে ও। তবে আমি ওকে এখনও খুব ভালোবাসি। যদি পরজন্ম বলে সত্যিই কিছু থেকে থাকে, তবে সেই জন্মেও আমি ওকে নিজের স্ত্রী হিসেবেই পেতে চাই। মিটিয়ে দিতে চাই এই জন্মের সমস্ত আক্ষেপ, সব না পাওয়ার যন্ত্রনাগুলো।''
অতনুদার মুখ থেকে শেষের কথাগুলো শোনার পর স্বাভাবিক ভাবেই মনটা একটু ভারি হয়ে এসেছিল আমার। তবে একটা কথায় আমি বেশ আশ্বস্ত হয়েছিলাম... সুলেখাদি এখন মুক্তি পেয়ে গেছে। এই পৃথিবীতে ওর আর কোনো অস্তিত্ব নেই। মনে হয়েছিল এইবার টুকাইকে নিয়ে আমার আর অতো দুশ্চিন্তা করতে হবে না। কারন যার ভয়ে সারাক্ষণ ওকে বুকের মাঝে আগলে রাখতাম আমি, একমুহুর্তের জন্যেও নিজের চোখের বাইরে হতে দিতাম না। সেই ভয়টা এখন আর নেই। ইহলোকের মায়া কাটিয়ে তিনি এইমুহুর্তে বিলীন হয়ে গেছেন পরলোকে।
* * *
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে সায়নীকে জিজ্ঞেস করলাম...
—'তা তোমরা কি সেই রোববার ফিরে গেছিলে শান্তিনীড়ে?'
—'হ্যাঁ গেছিলাম। তবে আমি আর অরিন্দম। শাশুড়ি মা আর টুকাই তখন রিষড়ার বাড়িতেই ছিল।'
—'তারপর... ওখানে কিছু অসুবিধা হয় নি?'
এইবার সায়নী একটু মৃদু হেসে বলল...
—'ঠিক এই একই চিন্তাটা আমিও প্রথমে করেছিলাম। ভেবেছিলাম ওখানে গেলে হয়তো কোনো অসুবিধা হবে। কিন্তু বিশ্বাস করুন দিন তিনেক ওই বাড়িতে সারাদিন, সারারাত থাকার পরেও কোনোরকম অদ্ভুত কিছু ঘটেনি আমাদের সাথে।'
একটু থামলো সায়নী। তারপর একবার ভেবে নিয়ে বলল...
—'তবে হ্যাঁ... ছোট্টছোট্ট দুটো এমন ঘটনা ঘটেছিল... যাতে আমার মনেও সাময়িক একটা ভয় জাগিয়ে তুলেছিল। কিন্তু সেই ভুল ভাঙতেও খুব বেশি সময় লাগেনি আমার।'
—'কোন ছোট্ট ঘটনা?' কৌতুহলী গলায় প্রশ্নটা করলাম আমি।
তার উত্তরে সায়নী একদম গোড়ার থেকেই বলতে শুরু করল ঘটনাগুলো...
—'মাস দুয়েক পরে শান্তিনীড়ে ফিরে, প্রথমে সত্যিই বেশ অবাক হয়েছিলাম আমি। এই দুমাসের মধ্যেই যে আমাদের বিল্ডিং এর এতোটা ভোল পাল্টে যাবে, সেটা আমি কল্পনাও করিনি। অনেক নতুন পরিবার ততোদিনে তাদের নিজেদের ফ্ল্যাটে থাকতে চলে এসেছিল। স্বাভাবিক ভাবেই লোকজনের ভিড় বেড়েছিল। নতুন মুখ আর অচেনা মানুষে বিল্ডিং আগের থেকেও আরও প্রাণবন্ত এবং জমজমাট হয়ে উঠেছিল। এরমধ্যে বেশ কিছু টুকাইয়ের বয়েসী কচিকাঁচাও ছিল। যাদের দেখামাত্রই আমার মনে হল, এবার এখানে এলে টুকাইয়ের আর খেলার সঙ্গীর অভাব হবে না। ওইটুকু টুকু বাচ্চা ছেলেমেয়ে গুলোর সহজ সরল হাসিখুশি মুখগুলো চোখে পড়তেই, কেন জানি এই বিল্ডিংটার প্রতি যে চাপা আতঙ্কটা আমার ছিল, সেটা নিজের থেকেই অনেকটা কম হয়ে গেল। মনে হল... তাই তো, এখানে তো কাউকে দেখেই ভীত সন্ত্রস্ত বলে মনে হচ্ছে না। তাহলে আমরা কেন মিছিমিছি ভয় পেয়ে অন্য জায়গায় পড়ে রয়েছি? সাথে সাথেই ভেবে নিলাম দিন দুয়েকের মধ্যে যদি অঘটন কিছু না ঘটে তাহলে টুকাই আর শাশুড়ি মা'কে এখানে ফিরিয়ে নিয়ে আসবো।
যাই হোক, এইক্ষেত্রে একটা কথা জানিয়ে রাখা দরকার। শান্তিনীড় বিল্ডিং এর সব ফ্লোরে লোক চলে এলেও, আমাদের ফ্লোরটায় কিন্তু আমরা ছাড়া আর কেউ আসেনি। সুলেখাদি মারা যাওয়ার পর, অতনুদা যে এখানে কবে আসবেন, কিম্বা আদৌ আসবেন কিনা... তার কোনো ঠিক নেই। আর বাকি রইল যেই ফ্ল্যাটটা, সেটাও যারা কিনেছেন তারা থাকেন বাইরে। মাসে মাসে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ পাঠিয়ে দেওয়া ছাড়া... এখানে আসার তাদের আর কোনো গরজ দেখা যায়না। তাই ওই ঘরটাও সেই প্রথম থেকেই একইভাবে বন্ধ পড়ে রয়েছে।
আমি এইবার যে দুমাস পরে ফ্ল্যাটে ফিরলাম, সত্যি কথা বলতে কি, বিল্ডিংয়ের এই জমজমাট পরিবেশ দেখে প্রথমে আমার খুবই ভালো লাগল। কিন্তু তারপর যেই আমি আমাদের চারতলার নির্জন ফ্লোরটায় পা রাখলাম, অমনি গাটা কেমন যেন শিরশির করে উঠল আমার। মনে হল শান্তিনীড়ের এই সম্পুর্ণ বিল্ডিংটার সাথে আমাদের এই চারতলার ফ্লোরটার কোথাও যেন একটা অদ্ভুত পার্থক্য রয়েই গেছে। আর এই কারণে নিজের ঘরে ঢোকার পরেও বেশ কিছুক্ষন ভয়ে ভয়েই ছিলাম আমি। কিন্তু এরপর সময় যতো গড়াতে লাগল, মনের সেই ভয়টাও ততোই যেন শিথিল হয়ে এল। এখানে আসার পরেই কাজের ব্যস্ততার মধ্যে ডুবে যাওয়ার ফলে দুমাস আগের ওই ঘটনাগুলোর কথা কখন যেন ধীরেধীরে মাথা থেকে বেড়িয়েই গেল আমার।
ওইদিন আমি আর অরিন্দম সকালের দিকটা ঘরদোর পরিষ্কার করেই কাটিয়ে দিলাম দুজনে। এতোদিন ধরে ঘরটা বন্ধ পড়ে থাকায়, ঘরের সর্বত্রই একটা পুরু ধুলোর আস্তরণ জমে ছিল। সেগুলো পরিষ্কার করতে করতেই কখন যে বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল, টেরও পেলাম না। দুপুরের খাবারটা অরিন্দম অনলাইনেই অর্ডার করল বাড়িতে। এরপর খাওয়াদাওয়া সেরে, একটু বিশ্রাম নিয়ে, সন্ধ্যেবেলায় দুজনে মিলে বেরিয়ে ছিলাম টুকিটাকি বাজার করতে। তারপর ফিরে এসে রান্নাবান্না, খাওয়াদাওয়া, আর ঘুম। এরমধ্যে এমন কোনো ঘটনাই ঘটলো না যা আমার কাছে অস্বাভাবিক বলে মনে হবে। বরং এটা বলতে পারি, ওইদিন ফাঁকা বাড়ি থাকায় বহুসময় পর আমার দুজনে একান্তে একটা ভালো সময় কাটিয়েছিলাম।'
আমি একটু বিরক্ত হয়ে বললাম...
—'তবে যে বললে দুটো ছোটো ছোটো ঘটনা ঘটেছিল!'
সায়নী এবার একটু গম্ভীর গলায় বলল...
—'হ্যাঁ... সেই কথাই বলছি এখন। পরেরদিন অরিন্দম যথাসময়েই নিজের অফিসের জন্য বেরিয়ে গেছিল। আমিও সারাদিন ব্যস্ত হয়ে ছিলাম নিজের কাজবাজ নিয়েই। বিকেলের দিকে যখন দোকান থেকে ডিম কিনে নিয়ে ফিরছি... তখন গেটের মুখেই হঠাৎ করে পরিচয় হল ছয়তলার নতুন বাসিন্দা রিম্পিদির সাথে। কথা বলতে বলতেই ও একরকম আমায় জোর করে টেনে নিয়ে গেল ওদের ঘরে। বলল... ''ছেলে, শাশুড়ি কেউই যখন বাড়িতে নেই, তখন একাএকা ঘরে বসে করবেটা কি শুনি? আসো একটু চা খেয়ে যাও।''
আমিও ভেবে দেখলাম, কথাটা নেহাৎ খারাপ বলে নি। সারাদিন ধরে তো এমনিতে ঘরের মধ্যেই বসে আছি। একটু আড্ডা দিলে ভালোই লাগবে। তাই আমিও আর না করলাম না।
এরপর রিম্পিদির ঘরে চা শিঙাড়া খেয়ে, জমিয়ে গল্পগুজব করে যখন উঠলাম, ঘড়িতে তখন প্রায় পৌনে সাতটা বাজে। বাইরে সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হয়ে রাত নেমে এসেছে। আমি ছয়তলা থেকে লিফটে করে চারতলা এসে নামলাম। এতোক্ষন অবধি সবকিছু মোটামুটি ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু লিফটের বাইরে পা রাখা মাত্রই হঠাৎ আমার চোখ গেল সুলেখাদিদের তালা বন্ধ দরজাটার দিকে। আর সাথে সাথেই নির্জন করিডরটায় দাঁড়িয়ে আমার বুকের ভিতরটা কেমন ছমছম করে উঠল। আমি তাড়াতাড়ি তালা খুলে, ঘরে ঢুকে, লাইট জ্বালিয়ে তারপর যেন একটু নিশ্চিন্ত বোধ করলাম। তবে আমি ভয় পেলেও, অরিন্দম বাড়ি আসার মধ্যে এমন কিছুই ঘটল না, যা প্রকৃত ভয় পাওয়ার মতো। শুধু মাঝে একবার ঘরে বসে শুনতে পেলাম... কেউ যেন চারতলার লিফটের দরজা খুলল। আমি ভাবলাম বুঝি অরিন্দম এসে গেছে। তাই তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজাটা খুলতেই, দেখতে পেলাম আলো অন্ধকারে ঢাকা করিডরটা সেই আগের মতোই খালি পড়ে আছে। কেউ নেই সেখানে।
কিন্তু আমি যে স্পষ্ট শুনতে পেলাম দরজা খোলার আওয়াজটা! তাহলে! গাটা কেন জানি আরও একবার শিরশির করে উঠলো আমার। আমি তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। এরপর কিছুক্ষন চুপ করে বসে ভাবলাম... এপার্টমেন্টে এখন অনেক নতুন লোক এসেছে। হতেই তো পারে, তাদের মধ্যে কেউ অন্য ফ্লোরে যেতে গিয়ে অখেয়াল বশতঃ চারতলায় নেমে পড়েছিল। পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফিরে গেছে। সামান্য এই ব্যাপারে এতোটা ভয় পেয়ে গেলাম আমি?
নিজের এই ভীরুতার উপর এবার নিজেরই যেন একটু রাগ হল আমার। মনকে শক্ত করে বোঝালাম, যতোক্ষন না সত্যিকারের ভয় পাওয়ার মতো কিছু ঘটছে, ততক্ষণ আমি আর কিছুতেই ভয় পাবো না। এই ঘটনার পর সেদিন সত্যিই আর আমি কিছুতে ভয় পাইনি। তবে হ্যাঁ... একটা ব্যাপারে বেশ আশ্চর্য হয়েছিলাম বটে... আর সেটা ঘটেছিল আমাদের ঘুমিয়ে পড়ার পর।
রাত তখন ঠিক কটা বাজে ঘড়ি দেখিনি। অরিন্দম আর আমি দুজনেই সেসময় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম। হঠাৎ অনুভব করলাম, অরিন্দম নিজের হাতটা ঘুমের ঘোরে আমার উপরে রাখল। যদিও এটা কোনো অবাক করা বিষয় নয়। এরকম ও প্রায়শই করে থাকে। কিন্তু সেদিন ও গায়ে হাত রাখা মাত্রই আমি যেন চমকে উঠলাম।
আশ্চর্য! ওর হাতটা এরকম বরফের মত ঠাণ্ডা কেন? আর একজন মানুষের হাত এতোটাই বা হিমশীতল কি করে হতে পারে? ঘুম জড়ানো চোখেই পাশ ফিরে একবার দেখতে গেলাম আমি। কিন্তু তারপরেই আবার মনে হল... হালকা শীত পড়ে গেছে। হয়তো হাতটা কোনোভাবে ব্ল্যানকেটের বাইরে বেরিয়ে গেছিল, তাই এরকম ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। আমি চোখ বোজা অবস্থাতেই হাতটার উপর ভালো করে চাপা দিয়ে দিলাম ব্ল্যানকেটটা। তারপর আবার ঘুমিয়ে গেলাম।
হয়তো কয়েক সেকেণ্ডই কাটলো মাত্র। এবার হঠাৎ আমি শুনতে পেলাম... আমার কানের সামনে কোনো মহিলার চুড়ি নড়ার টুংটাং শব্দ। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম আমি! অরিন্দম তো চুড়ি পরে না। তাহলে এই শব্দ আসছে কোথা থেকে???
ধড়ফড় করে বিছানার উপর উঠে বসলাম আমি। আর ঠিক তখনই দেখলাম, আমাদের ঘরের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে আসছে অরিন্দম। অন্ধকারের মধ্যে আমাকে এইভাবে বসে থাকতে দেখে, ও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো...
—''কি হল... ঘুম থেকে উঠে এইভাবে বসে আছো কেন?''
কিন্তু আমি তখন ওর প্রশ্নের কোনো উত্তর দেওয়ার অবস্থায় ছিলাম না। ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষন ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম...
—''তুমি এতক্ষণ বিছানায় ছিলে না? তাহলে কই গেছিলে তুমি?''
অরিন্দম মুচকি হেসে সিগারেটের প্যাকেটটা আর লাইটারটা টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বলল...
—''ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল। তাই বাথরুম করে, হলরুমে বসে একটা সিগারেট খেয়ে এলাম।''
ওর জবাব শুনে আমার বিস্ময়ের মাত্রাটা যেন আরও কয়েকগুন বেড়ে গেল! যদি অরিন্দম এখানে ছিল না, তাহলে কয়েক সেকেণ্ড আগে আমার গায়ে হাতটা রাখল কে? কেইবা ওরকম চুড়ির শব্দ করল কানের সামনে?
মাথার ভিতর সবকিছুই কেমন যেন গোলমাল হয়ে গেল আমার! অরিন্দম হয়তো আমার মুখ দেখে ব্যাপারটা কিছুটা আঁচ করতে পারলো। তাই এগিয়ে এসে আমার পাশে বসে, আমায় দুই হাতের মধ্যে জড়িয়ে ধরে খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল...
—''কি হয়েছে?''
আমিও এবার ওকে চেপে ধরে, ওর বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে ধীরেধীরে সমস্ত ঘটনাটাই খুলে বললাম। সব শোনার ও আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল...
—''আসলে সেদিন অতনুদার কাছ থেকে যেই ঘটনাগুলো শুনছিলে, সেগুলোই আজ ঘুমের ঘোরে স্বপ্নের মধ্যে দেখেছো। বাস্তবে এইসব কিছুই ঘটেনি। তাছাড়া আমি তো জেগেই ছিলাম হলরুমে। যদি অস্বাভাবিক কিছু ঘটতো, তাহলে তো আমিও টের পেতাম। তাই না?''
অরিন্দমের কথাগুলো শুনে মনে হল... ও হয়তো ঠিক কথাই বলেছে। আসলে আমি স্বপ্নই দেখেছি। তা না হলে সারা সন্ধ্যে যখন একা বাড়িতে ছিলাম, তখন কিছু না ঘটে এখন কেন ঘটতে যাবে?
এরপর আমি আর কোনো কথা বাড়ালাম না। চুপচাপ শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। আর কিছুক্ষনের মধ্যে ঘুমটাও এসে গেল।
সেই রাতে আর এমন কিছুই ঘটলো না, যা আমার দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে।
* * *
সায়নীকে আমি জিজ্ঞেস করলাম...
—'আচ্ছা, তোমার কি মনে হয়? সেই রাতে তুমি সত্যিই স্বপ্ন দেখেছিলে? নাকি ওটা বাস্তবিকই ঘটেছিল তোমার সাথে?'
আমার প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষন চুপ করে কি যেন ভাবলো সায়নী। তারপর বলল...
—'সেদিন রাতে তো আমার ওটাকে স্বপ্ন বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন জিজ্ঞেস করলে বলবো, ঘটনাটা বাস্তবেই ঘটেছিল আমার সাথে। শুধু আমি বুঝে উঠতে পারিনি। যদি বুঝতাম, তাহলে হয়তো টুকাইকে ফিরিয়ে আনার মতো মারাত্মক ভুল আমি করতাম না।'
কথাটা শুনে আমারও বেশ আশ্চর্যই লাগল। মনে হল, অতনু বাবু যে বলে ছিলেন... সুলেখার আত্মা মুক্তি পেয়ে গেছে। তাহলে কি সেটা ভুল ছিল? নাকি উনিও ঠিক করে বুঝতে পারেন নি ব্যাপারটা?
কৌতুহলী গলায় সায়নীকে জিজ্ঞেস করলাম...
—'এরপর কি হল? তুমি তো বললে দুটো ঘটনা তোমার মনে সন্দেহ জাগিয়ে ছিল। তা দ্বিতীয় ঘটনাটা কি?'
সায়নী আবার বলতে শুরু করলো...
—'পরেরদিনটা ছিল মঙ্গলবার। অরিন্দমের সাথে আমার আগের থেকেই কথা হয়েছিল যদি ওই দিনও কোনো অসুবিধা না হয়, তাহলে শাশুড়ি মা আর টুকাইকে আমরা বুধবার এখানে নিয়ে চলে আসবো। সেই মতো আমিও সারাদিন ধরে একটু খেয়াল রাখার চেষ্টা করছিলাম, কোনো অস্বাভাবিক কিছু অনুভব হচ্ছে কিনা। কিন্তু না... গোটা দিন একা বাড়িতে থাকার পরেও সেরকম কিছুই অনুভব করতে পারলাম না আমি।
অরিন্দম সেদিন ওর সময় মতোই অফিসে বেরিয়েছিল... তারপর থেকে সারাটা দিন আমি নিজের ঘরেই ছিলাম। কখনও কিচেন, কখনও বাথরুম, কখনও হলরুম... এমনকি সন্ধ্যার পর বেশ কিছুক্ষন আধো অন্ধকার করিডরটার মধ্যেও হাঁটাহাটি করেছি। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেছি সুলেখাদিদের তালাবন্ধ দরজাটার দিকে। কিন্তু সত্যি বলতে কি, কিচ্ছু বুঝতে পারিনি আমি। না তো কোনো গা ছমছম করেছে আমার, আর না তো কোনো শরীর ভার হয়েছে।
অদ্ভুত ভাবে সেদিন বরং নিজেকে অনেক বেশি হালকা মনে হচ্ছিল আমার। আমি বুঝে গেছিলাম... অতনুদা একদম ঠিক কথাই বলেছিল। এই পৃথিবীতে সুলেখাদির আর কোনো অস্তিত্ব নেই। এরপর রাতে অরিন্দম বাড়ি ফেরার পর আমি বাবাকে ফোন করলাম। বলে দিলাম, বাবা যেন কাল সময় মতো শাশুড়ি মা আর টুকাইকে এখানে দিয়ে যায়। অরিন্দমকে দেখে বুঝলাম ও বেশ খুশিই হয়েছে আমার সিদ্ধান্তে। কারন ছেলেকে ছেড়ে থাকতে ওরও আর ভালো লাগছিল না।
যাই হোক, সেই রাতে খাওয়াদাওয়া সেরে সাড়ে এগারোটার মধ্যে শুয়ে পড়লাম দুজনে। ঘুম আসতেও খুব বেশি সময় লাগলো না।
প্রায় ঘন্টা দেড়েক ভালোই ঘুমালাম। এরপর হঠাৎ একটা চাপা গলার কান্নার আওয়াজে ঘুমটা আচমকা ভেঙে গেল আমার। বালিশের পাশে রাখা মোবাইলটা হাত বাড়িয়ে তুলে নিয়ে, তাতে সময় দেখলাম রাত একটা বেজে কুড়ি মিনিট।
এতো রাতে কে কাঁদছে আবার? সুলেখাদি নয়তো? বুকের ভিতর ধুকপুকুনিটা যেন নিজের থেকেই বেড়ে গেল আমার। পাশে শুয়ে থাকা অরিন্দম তখন গভীর ঘুমে নাক ডাকছে। একবার মনে হল ওকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দিই, কিন্তু তার পরক্ষনেই আবার মনে হল... নাঃ, আজ আমি এর শেষ দেখেই ছাড়বো। আমি দেখতে চাই এটা সত্যিই সুলেখাদির কান্নার আওয়াজ, নাকি আমার মনের ভুল!
অরিন্দমকে কিছু না বলেই আমি চাদরটা গায়ে জড়িয়ে চুপচাপ বেরিয়ে পড়লাম ঘর থেকে। হলরুমে আসা মাত্রই সেই মড়াকান্নার আওয়াজটা যেন আরও জোরে শুনতে পেলাম আমি। তার সাথে এও বুঝতে পারলাম, আওয়াজটা আসছে আমাদের মেইন ডোরটার ঠিক বাইরে থেকেই। বলতে লজ্জা নেই গভীর রাতে এরকম একটা কান্নার শব্দ শুনে গাটা কেমন যেন শিরশির করে উঠল আমার! মনে হল যেন সারা দেহে নিজের থেকেই কাঁটা দিয়ে উঠল!
আমি সাহসে ভর করে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম দরজাটার দিকে। তারপর হাতল ঘুরিয়ে খুলে ফেললাম সেটাকে। দরজাটা খোলা মাত্রই শীতের একরাশ ঠাণ্ডা হাওয়া এসে আমার সর্বশরীর কাঁপিয়ে দিল। আমি খুব সন্তর্পণে মাথাটা বের করে উঁকি দিলাম ঘরের বাইরে। আর সাথে সাথেই সিঁড়ির লাইটের আবছা আলোয় দেখতে পেলাম, ঠিক আমাদের দরজার সামনেই বসে আছে একটা ধুসর রঙের ধুমসি বিড়াল। রাতের অন্ধকারে ওর হলদেটে চোখদুটো তখন আগুনের গোলার মতো জ্বলছে।
ওটাকে দেখে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল আমার গলা দিয়ে। নিজের বোকামিতে নিজেরই যেন হাসি পেয়ে গেল আমার। মনে হল... এটা কি অবস্থা হয়েছে আমার! একটা বিড়ালের কান্না আর মানুষের কান্নার মধ্যে সাধারণ পার্থক্যটাও বুঝতে পারছি না আমি।
এরপর পুনরায় দরজা বন্ধ করে ঘরে ফিরে এলাম আমি। তারপর বিছানায় শুয়ে আবার নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লাম।
তবে সেই রাতে সত্যিই যদি বিড়ালের কান্না আর মানুষের কান্নার মধ্যে পার্থক্যটা বুঝতে পারতাম আমি, তাহলে নিশ্চিত হয়েই বলতে পারতাম... আমাদের দরজার সামনে তখন বিড়াল বসে থাকলেও, কান্নার আওয়াজটা ওর ছিলনা। কারন....
বিড়াল কোনোদিন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে পারে না!!!!'
* * *
ফোনে সায়নীর কথাগুলো শুনতে শুনতে কখন যে আমার গায়ের রোমগুলোই খাড়া হয়ে উঠেছিল বুঝতে পারিনি। আসলে একটা ব্যাপার আমি খুব ভালো ভাবে লক্ষ্য করে দেখেছি। যতোবারই এই ঘটনাটা আমি সায়নীর মুখ থেকে শুনি, কিম্বা যতোবারই এটাকে লেখার চেষ্টা করি... ততবারই কেমন যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি হয় আমার। কেন জানি একটা অজানা ভয় এসে চেপে ধরে আমায়। কিন্তু কেন যে এটা হয়, তার উত্তর আমি আজ অবধি পাইনি।
সায়নীকে জিজ্ঞেস করলাম...
—'পরেরদিন টুকাই আর তোমার শাশুড়ি মা ফিরে এসেছিল শান্তিনীড়ে?'
ও বেশ কিছুক্ষন চুপ করে থেকে তারপর থমথমে গলায় জবাব দিল...
—'হ্যাঁ ফিরেছিল। আর সেই ফিরে আসাটা যে কতো বড়ো কাল হয়ে গেছিল আমাদের জীবনে, তা ভাবতে গেলেও আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। মনে হয় ওই একটা রাতেই হয়তো আমার জীবনের সব কিছু শেষ হয়ে যেতে পারতো। শুধু ঈশ্বর সহায় ছিলেন বলেই, আজ আমি আপনাকে এই ঘটনাগুলো বলতে পারছি। তা নাহলে নিশ্চিতরূপে আমি এতোদিনে পাগল হয়ে যেতাম।'
আমি হতবাক হয়ে গেলাম সায়নীর কথা শুনে। বিস্ময় জড়ানো গলায় ওকে জিজ্ঞেস করলাম...
—'এসব কি বলছো তুমি? কি হয়েছিল সেদিন?'
ও সেদিনের ঘটনাটা বলতে শুরু করল। আর সত্যি কথা বলতে কি, সেটা শুনে আমার নিশ্বাসটাও যেন বন্ধ হয়ে এল।
—'পরেরদিন সকাল এগারোটা, সাড়ে এগারোটা নাগাদ বাবা এসে শাশুড়ি মা আর টুকাইকে দিয়ে গেল এখানে। তারপর দুপুরবেলা একটু খাওয়াদাওয়া করেই আবার বিকেল চারটের মধ্যে ফিরে গেল বাড়িতে। অনেকদিন পর টুকাই শান্তিনীড়ে আসতে পারায় বেশ খুশি হয়েছিল সেদিন। নিজের পুরোনো সব খেলনা, বাই-সাইকেল, দোলনা এগুলো ফিরে পাওয়ায় আনন্দে ও যেন আত্মহারা হয়ে উঠেছিল। ওগুলোকেই আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকছিল সারাক্ষণ। বাবা চলে যাওয়ার পর আমি ওকে ঘোরাতে নিচে নিয়ে গেছিলাম। সেখানে নতুন আসা বাচ্চাদের সাথে বেশ কিছুক্ষন খেলাও করেছিল টুকাই। এরপর সন্ধ্যে হওয়ার একটু আগেই আমরা ফিরে এসেছিলাম নিজেদের ঘরে। এরমধ্যে কোথাও কোনোরকম অসুবিধা কিছু হয়নি।
আমার মনে আছে সেদিন অরিন্দম সাড়ে সাতটার মধ্যে ফিরে এসেছিল অফিস থেকে। তারপর জামাকাপড় ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে ও যখন এক কাপ চা নিয়ে টিভিটা চালিয়ে বসল, ঘড়িতে তখন প্রায় রাত আটটা বাজে। ঠিক এমন সময় ওর মোবাইলে একটা ফোন এল। কিছুক্ষন কথা বলার পর ফোনটা রেখে অরিন্দম গম্ভীর গলায় বলল...
—'ছোটোকাকা মারা গেছে! আমায় বেরোতে হবে।'
এইক্ষেত্রে জানিয়ে রাখি, অরিন্দমের ছোটোকাকা বলতে আমার আগরপাড়ার সেই কাকাশ্বশুর, যার সাথে অশান্তির কারণেই আমরা ওখানকার বাড়ি ছেড়ে ভাড়া বাড়িতে গিয়ে উঠেছিলাম।
যাই হোক, অরিন্দমের মুখে কথাটা শোনামাত্রই শাশুড়ি মা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলেন...
—'সজল মারা গেছে!!! আমিও যাবো বাবু তোর সাথে। এতোদিন যাই থাকুক, মানুষটা তো একই পরিবারের। শেষবেলায় একবার চোখের দেখা না দেখলে যে শান্তি পাবো না।'
অরিন্দম দেখলাম ওর মাকে কোনো বাধা দিল না। শুধু আমাকে একবার বলল... ওদের হয়তো আজ রাতে আর ফেরা হবে না। আমি একা এখানে থাকতে পারবো কিনা?
তাই শুনে আমি বললাম...
—'আমার কোনো অসুবিধা হবে না। তোমরা নিশ্চিন্তে যাও।'
এরপর সাড়ে আটটা নাগাদ অরিন্দম ওর মাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল আগরপাড়ার উদ্দেশ্যে। আর তার সাথে হঠাৎ করে ঘরটাও কেমন যেন খালি খালি হয়ে গেল। আমি যে খুব ভয় পাচ্ছিলাম সেটা নয়, তবে কেন জানি একটু অস্বস্তি ভাব লাগছিল আমার। আমি চিন্তাটাকে অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য টিভিতে গান চালিয়ে বাথরুমে গেলাম। শাশুড়ি মা যাওয়ার আগে বলে গেছিল, দুপুরের রান্নাগুলো ফেলে দিয়ে আমি যেন গায়ে জল ঢেলে এসে হাঁড়িতে দুটো সিদ্ধ ভাত করে নিই। সেই মতো আমিও তাই করলাম।
ভাত হতে বেশি সময় লাগল না। ঘড়িতে যখন প্রায় সাড়ে নটা বাজে, তখন আমার মনে হল, শুধু শুধু রাত করে কি হবে? কেউ তো আজ আসার নেই যে অপেক্ষা করবো। তারচেয়ে খেয়েদেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি।
তারপর আর কি...যেই ভাবা সেই কাজ। টুকাই আর আমি খেয়েদেয়ে যখন দশটা নাগাদ বিছানা করছি, এমন সময় হঠাৎ আমাদের ডোর বেলটা বেজে উঠল। এতো রাতে বেলের আওয়াজ শুনে বেশ আশ্চর্যই হলাম আমি!
এতো রাতে কে এল আবার? ব্যস্ত হয়ে দরজাটা খুলতেই দেখতে পেলাম ছয়তলার রিম্পিদির মেয়ে ঐষিকা দাঁড়িয়ে আছে আমাদের দরজার সামনে। আমাকে দেখেই ও হাসি মুখে বলল...
—'আন্টি, কালকে তুমি মাকে পাটিসাপ্টা বানানো শিখিয়েছিলে। আজ মা বানাতে গিয়ে সব পুড়িয়ে ফেলছে। তাই আমাকে বলল, তোমাকে একটু ডেকে নিয়ে আসতে।'
রিম্পিদি যে পাটিসাপ্টা তুলতে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলছে, সেই গন্ধ আমি দরজা খোলা মাত্রই পেয়েছিলাম। কিন্তু এতো রাতে যে টুকাইকে একা ঘরে রেখে যাব সেটা ঠিক হবে না। এদিকে ওকে যাওয়াটাও এখন সম্ভব না। কারণ বাবু এখন নিজের ফেভারিট কার্টুন দেখতে বসেছেন। সরাতে গেলেই কান্না জুড়ে দেবেন। কি করবো ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না।
কিছুক্ষন ভেবে নিয়ে ঐষিকাকে বললাম...
—'শোনো না, আমি তোমার মাকে পাটিসাপ্টা তোলাটা শিখিয়ে দিয়ে এক্ষুনি চলে আসছি। তুমি ততক্ষণ একটু ভাইয়ের খেয়াল রেখ।'
ও ''ঠিক আছে আন্টি'' বলে খুশি মনে ঘরে ঢুকে গেল। ঐষিকা ক্লাস এইটের ছাত্রী। এইটুকু সময় যে ও টুকাইয়ের খেয়াল রাখতে পারবে, সেই বিশ্বাস আমার ছিল।
লিফটে করে ছয়তলায় উঠে তাড়াতাড়ি রিম্পিদির ঘরের বেল টিপলাম আমি। আর এরপরে এমন একটা ঘটনা ঘটলো, যেটা আমার কল্পনারও অতীত ছিল!
দরজাটা খুলল ঐষিকা!!!!
আমাকে দেখে হাসি মুখে ও বলল...
—'আরে আন্টি, আসো আসো ভিতরে আসো।'
তারপরেই চিৎকার করে নিজের মাকে ডেকে বলল...
—'মা দেখো সায়নী আন্টি এসেছে।'
আমার ততক্ষনে ভয়ে হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। কোনোমতে আমতা আমতা করে বললাম...
—'তুমি টুকাইকে এতো রাতে একলা ঘরে রেখে চলে এলে?'
ঐষিকা একটু অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল...
—'টুকাইকে একলা রেখে এসেছি! কই, টুকাইয়ের কাছে তো আমি যাইনি আন্টি!'
ইতিমধ্যে রিম্পিদিও এসে দাঁড়িয়েছে ঐষিকার পিছনে। রিম্পিদি বলল...
—'হ্যাঁ সায়নী... ও তো ঘরেই সন্ধ্যা থেকে। কোথাও তো বেরোয় নি।'
আমার মাথার ভিতর তখন সবকিছু কেমন যেন জট পাকিয়ে গেছে। এটা কি হল আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। আমি বিড়বিড় করে বললাম...
—'তবে যে ও এসে আমায় বলল, মায়ের পাটিসাপ্টা গুলো.....'
হঠাৎ আমার মনে পড়ল, দরজা খুলে আমি যেই পোড়া গন্ধটা পেয়েছিলাম, সেটা তো রিম্পিদির ঘর থেকে আসছে না! কিন্তু হিসেবে তো বলে এখান থেকেই সেই গন্ধ সবচেয়ে বেশি পাওয়া উচিৎ। তাহলে আমি কিসের পোড়া গন্ধ পেলাম???
বুঝতে অসুবিধা হল না, আমার ঘরের দরজায় যে দাঁড়িয়েছিল... গন্ধটা আসছিল তার শরীর থেকে! আর সে হল...
সুলেখাদি!!!!!
নামটা মনে করতেই আমার সমস্ত শরীর যেন ভয়ে আতঙ্কে একদম রক্তশূন্য হয়ে গেল। আমি ''টুকাই টুকাই'' চিৎকার করতে করতে উন্মাদের মতো ছুটে চললাম সিঁড়ি দিয়ে। পাঁচতলা পেরিয়ে চারতলার সিঁড়িতে আসতেই দেখতে পেলাম, এতোক্ষন ধরে যেই লাইটটা জ্বলছিল, সেটা এখন নিভে গেছে। তার ফলে সম্পুর্ণ করিডরটা ঢেকে গেছে ঘুটঘুটে অন্ধকারে। আমার বুকের ভিতর কেউ যেন হাতুড়ি পিটতে শুরু করল। মনে হল আমি যেন দম আটকে এক্ষুনি এখানেই পড়ে যাবো। কোনোরকমে নিজেকে শক্ত করে অন্ধকারের মধ্যেই ছুটে গেলাম আমার ঘরের সামনে। তারপর দরজাটা খুলতে গিয়েই দেখলাম সেটা ভিতর থেকে বন্ধ।
আমি পাগলের মতো অনবরত বেল বাজিয়ে আর দরজায় ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম...
—'টুকাই... টুকাই... দরজাটা খোল বাবা... মাকে একটু ঢুকতে দে... টুকাই... টুকাই...'
কিন্তু কোনো উত্তর এলো না ভিতর থেকে। আমি আবার কাঁদতে কাঁদতে চেঁচিয়ে উঠে বললাম...
—'ভিতরে কি করছিস তুই? শুনতে পারছিস না, দরজাটা খুলতে বলছি.... টুকাই.. টুকাই..'
কিন্তু এইবারও সেই আগের মতোই কোনো জবাব এলনা। হঠাৎ আমি ঘরের ভিতর থেকে টুকাইয়ের মৃদু কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। ও কাউকে বলছে...
—'এটা তুমি কি করছো চিপস আন্টি?'
''চিপ্স আন্টি'' শব্দটা কানে আসামাত্রই আমার মাথার সমস্ত শিরা উপশিরাগুলো যেন ফেটে যেতে চাইল। চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসতো চাইল কোটরের বাইরে। নিজের উপর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলাম না আমি। উদভ্রান্তের মতো নিজের মাথা দিয়ে সজোরে দরজায় আঘাত করতে করতে বলতে লাগলাম...
—'সুলেখাদিইইইই... দোহাই তোমার, আমার ছেলেটার কোনো ক্ষতি কোরোনা... ও আমার একমাত্র সন্তান'
তারপর আবার বললাম...
—'টুকাই... সোনা বাপ আমার, যাসনা মাকে ছেড়ে... তোকে ছাড়া মা যে বাঁচবেনা বাবা...'
আমি যখন এইভাবে অনবরত মাথা ঠুকে দরজা খোলার ব্যর্থ চেষ্টা করছি, ঠিক তখনই রিম্পিদি আর ওর স্বামী প্রসেনজিৎদা, বিল্ডিংয়ের আরও দশ পনেরো জন লোককে নিয়ে চলে এল আমার ঘরের সামনে। তারপর শাবল আর হাতুড়ি দিয়ে অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই ভেঙে ফেলল দরজার লকটা।
দরজা খুলে যাওয়া মাত্রই আমি বিদ্যুৎ গতিতে ঘরের ভিতর ঢুকলাম। আর সেখানে আমার চোখে পড়ল, মেঝের উপর চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে... টুকাই!!!!
এরপর আমার গলা দিয়ে শুধু একটা বুকফাটানো আর্তনাদ বেরিয়ে এসেছিল। তারপর আর কিছু মনে নেই আমার।
যখন চোখ খুললাম, তখন আমি রিম্পিদিদের ঘরের বিছানায় শোয়া। আমার পাশে বসে আছে টুকাই। রিম্পিদি জানালো...
—'ডাক্তার এসেছিল। টুকাইকে চেক করে গেছে। বলেছে, টুকাই নাকি কোনো কিছুতে ভয় পেয়ে সাময়িক জ্ঞান হারিয়েছিল। তবে এখন চিন্তার কোনো কারন নেই। ও একদম ফিট আছে।'
কথাটা শুনে আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে টুকাইকে বুকে জড়িয়ে বাচ্চাদের মতো কেঁদে ফেললাম।
ওইদিন সারারাত আমরা রিম্পিদিদের ঘরেই ছিলাম। এরপর পরেরদিন অরিন্দম এসে সব শুনে আমাদের আগরপাড়ার বাড়িতে নিয়ে গেল। এখনও আমরা সেখানেই আছি।
যেই কাকা শ্বশুড়ের জন্য এতোদিন এখানে থাকতে অসুবিধা হত, উনি এখন না থাকায়, অরিন্দমের ইচ্ছা শান্তিনীড় ফ্ল্যাট বিক্রি করে এখানে নিজের বাবার ভিটেতেই বাড়ি বানানোর। সত্যি বলতে কি, আমারও আর কোনো ফ্ল্যাট বা বাড়ি কেনার ইচ্ছা নেই। তাই আমিও অরিন্দমকে এখানেই ঠিকঠাকভাবে বাড়ি বানাতে বলেছি। হয়তো আর কিছুদিনের মধ্যেই অরিন্দম ওখান থেকে আমাদের সব জিনিসপত্র এখানে নিয়ে চলে আসবে। তবে আমি বা টুকাই দুজনের মধ্যে কেউই আর কোনোদিন শান্তিনীড়ে পা রাখবো না। সে সুলেখাদি থাকলেও না... আর না থাকলেও না।
কারণ নিজের সন্তানের থেকে মূল্যবান কোনো সম্পত্তি হতে পারেনা।'
সব শোনার পর সায়নীকে একটা শেষ প্রশ্ন করেছিলাম আমি...
—'আচ্ছা টুকাই কিছু বলেনি, সেদিন ঘরের ভিতর কি হয়েছিল?'
এর উত্তরে সায়নী বলেছিল...
—'টুকাই বাচ্চা ছেলে। ও যতোটুকু বলেছে, তাতে বুঝেছি ও ঘরে সোফায় বসে যখন টিভি দেখছিল, তখন নাকি ওর পাশে চিপ্স আন্টি এসে বসেছিল। ওর দিকে তাকিয়ে হাসছিল। তারপরেই নাকি হঠাৎ করে ওর গলা টিপে ধরেছিল চিপস আন্টি। এরপর ওর আর কিছু মনে নেই।'
এটা শুনে আমার গলা থেকে শুধু একটাই শব্দ বেরিয়ে এসেছিল...
—'ভয়ঙ্কর!!!'
এরপর সায়নীকে আমি বলেছিলাম...
—'হয়তো প্রকৃতির নিয়মে সুলেখার অতৃপ্ত আত্মা কোনো না কোনোদিন মুক্তি ঠিকই পাবে। আর খুব সম্ভবত সেটা ওর বাৎসরিক হওয়ার পরেই হবে। তবে তোমরা যে আর শান্তিনীড়ে ফিরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটা নিয়েছ। এটা সত্যিই খুব ভালো করেছ। কারন তুমি ঠিকই বলেছ... সন্তানের থেকে মূল্যবান সম্পত্তি, সত্যিই এই পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না। ভালো থেকো তোমরা সবাই। ঈশ্বর তোমাদের মঙ্গল করুন, এই প্রার্থনাই করি আমি।'
এরপর বিষন্ন চিত্তে ফোনটা আমি রেখে দিয়েছিলাম। বুঝেছিলাম, আজও এই পৃথিবীতে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যুক্তিতে যার ব্যাখ্যা মেলা ভার।
সমাপ্ত
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন