মন্থন

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

এ কী করে বসলে হে অর্ণবকান্তি মুখার্জি! তুমি তো শালা এমন ভাবের চরকিতে লাট খাওয়ার বান্দা নও! আজ কী হয়ে গেল! শ্রবণাকে দেখতে পেয়ে ভেঙে একেবারে খানখান! পর পর সাজানো শিডিউল সব ঝেড়ে মুছে এ কোথায় চলেছ? যাচ্ছ তো না, ফিরছ। হ্যাঁ হে, ফেরা একেই বলে। দাঁড়াও। বোকামি কোরো না। লাঞ্চের পর অফিসে ফিরেই না একটা ক্লোজড-ডোর মিটিং-এ বসার কথা! ফ্যাক্টরি ম্যানেজার, চিফ ইনজিনিয়ার আর সিকিউরিটি অফিসারদের সঙ্গে! অ্যান্ড দ্যাট মিটিং ইজ ভেরি ভেরি আরজেন্ট। টপ কনফিডেনশিয়াল। ম্যানেজমেন্ট লক আউটের ডিসিশন নিয়ে ফেলেছে, সম্ভবত সেকেন্ড জুলাই থেকে তালা ঝুলছে কারখানায়। এ সময় কর্তৃপক্ষের বাহুবল বলো বাহুবল, মনোবল বলো মনোবল, সবই তো তোমরাই হে। মেইন স্টিয়ারিং ফোর্স।

সব না হলেও, এবারকার লক আউটের উদ্দেশ্য মোটামুটি তোমার অজানা নয়। ফরিদাবাদ প্রাোডাকশন শুরু করে দিয়েছে। এখন থেকে এক্সপোর্ট মেটিরিয়াল সব ওখানেই তৈরি হবে। তোমাদের এখানে শালা কিস্যু হবে না। থ্রু আউট দি ইয়ার শুধু লেবার প্রবলেম, স্লোগান, ডিমান্ড, ডেপুটেশন, ঘ্যানঘ্যান, প্যানপ্যান। পারলে তোমার কোম্পানি এ দেশটা থেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিত। তবু কেন যে নেয় না! রহস্য! রহস্য! তোমার অবশ্য এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। জুলাই, অগাস্ট, সেপ্টেম্বর তিনটে মাস প্রাোডাকশন বন্ধ ইজ কাফি। ম্যানেজমেন্টের পারপাস সার্ভ করে যাবে। তিন মাস শালা লেবারগুলো খেতে পেল কি না তা নিয়ে তুমি ভাবার কে? ভুগুক যে যার নিজের কপাল নিয়ে। গরিব দেশের জনগণকে ওভারডোজ পলিটিক্স গেলালে তাদের এই দশাই হয়। বাবাসকল, একশো রকম ট্রেড ইউনিয়নে না মজে নিজেদের সংগঠিত করো আগে। তোমাদের সাধের নস্ট্রামগুলো কত শক্তিশালী পরখ করে দ্যাখো। নইলে যে এইটিন ফরটি এইটের....। এঙ্গেলস কোট করতে গিয়ে, কে যেন বলত কথাটা? সুকান্ত? হিমানীশদা? ছাড়ো। ওসব ভাবনা কবেই বেওয়ারিশ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি এখন অন্যরকম। তাবড় তাবড় নেতারাই যেখানে সব ব্যোমভোলা মেরে বসে আছেন সেখানে তুমি কোন হরিদাস... ...! মাৎস্যন্যায় বুঝলে মাৎস্যন্যায়। মিছিমিছি সুস্থ ব্রেনকে ট্যাক্স করতে যেও না। দিব্যি মস্তিতে আছ। ক্যারি অন। ইট, ড্রিংক অ্যান্ড বি মেরী। জীবন ভাই একটাই। সুযোগ পেয়েছ, চোখটি বুজে ভোগ করে যাও। তোমার মতো আপার-টায়ারদের ছুটছাট লক আউট কোনওদিনই তেমন কামড় দিতে পারে না। স্লাইট দুশ্চিন্তা ছাড়া। তোমরা হলে গিয়ে সব মুক্তমানুষ। মুক্ত দুনিয়া গড়ার কারিগর।

গাড়ি চালাতে চালাতে তবু বারবার আড়চোখে শ্রবণার দিকে দেখছ কেন? স্টিয়ারিং-এর ওপর তোমার সুচারু আঙুলগুলো টিপটিপ কাঁপছে। শ্রবণা এখনও তোমার সঙ্গে নিজে থেকে একটাও কথা বলেনি। উদাস তাকিয়ে আছে বাইরে, রোদপোড়া রাস্তার দিকে। চশমা পরে শ্রবণাকে কেমন অন্যরকম লাগছে, যেন শ্রবণা নয়, অনেক দূরের কেউ। চেহারাও ভেঙেছে প্রচুর। আগের সেই টলটলে ভাবটাই নেই। বর্ণহীন, ফ্যাকাসে শরীর। কণ্ঠার হাড় ঠিকরে পড়ছে। চুল কমে কপাল চওড়া। তবু শ্রবণা শ্রবণাই। নিজস্ব ব্যক্তিত্বে, ভঙ্গিতে, জেদে। তুমি ভেতরে ভেতরে ভাঙতে শুরু করেছ। আ: অর্ণব, ডোন্ট বি ক্রেজি। এখন আর কোনও ভাবাবেগ তোমায় মানায় না। এখনও সময় আছে। তোমার লাল টুকটুক মারুতি সবে বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম ক্রস করল। এখনও ফিরলে মিটিংটা...। মনে রেখো ওই মিটিংটার পর একগাদা পেপারস রেডি করতে হবে। নোটিশ ফর দা ওয়ার্কারস। তারপর ইউনিয়ন লিডারদের সঙ্গে আলোচনায় বসা।

হ্যাঁ। ঠিক চারটে পনেরোয় তুমি সময় দিয়েছ ইউনিয়ন লিডারদের। সময়টা যদিও তোমার দেওয়া, বক্তব্যগুলো তোমার নয়। ওপর তলার নির্দেশাবলি পেয়ে গেছ যথাসময়ে। সেগুলোই একটা একটা করে সার্ভ করতে হবে ওদের কোর্টে। নিখুঁতভাবে, শান্ত মাথায়। অ্যাট এনি কস্ট লোকগুলোকে উত্তেজিত করা দরকার। তবে সাবধান। যত বোকা ভাবো, ওরা সবাই কিন্তু ততটা নয়। দু'চারটে জোরালো 'এস' ওরাও মারতে জানে। অবশ্য তুমি দক্ষ খেলোয়াড়। সার্ভিস রিটার্নের ব্যাপারে তোমার কোনও বিকল্প নেই। এডবার্গ ইন্ডিয়ার তাবত আধিকারিকবৃন্দ তোমার কর্মকুশলতায় মুগ্ধ, গর্বিত। কেউ কেউ আড়ালে ঈর্ষান্বিতও বটে। যেমন সান্যাল, তানেজা, কুরুভিলা। তুমি কেয়ার করো না। সিঁড়ি ভাঙা অঙ্কে তুমি ছোট থেকেই ওস্তাদ। ভালোই বোঝো কীভাবে কাটাকুটি প্লাস মাইনাস করে সঠিক উত্তরে পৌঁছোতে হয়। এবারকার রিট্রেঞ্চমেন্ট পলিসিটাকে যদি খেলিয়ে তুলতে পারো তো ব্যস। এডবার্গ ইন্ডিয়ার নক্ষত্র না হও, ইনস্যাট ওয়ান বি হওয়ার জায়গাটা তোমার বাঁধা। এমন একটা ব্রাহ্মমুহূর্তে গায়ে পড়ে শ্রবণাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে চাওয়া নিছকই মুর্খামি হয়ে গেল না?

একটু আগেও নীলবর্ণ শৃগালের ঝিরিঝিরি আলোতে বসে যখন চুমুক দিচ্ছিলে চিলড বিয়ারে তখনও কি ভেবেছিলে একটু পরেই দেখতে পাবে শ্রবণাকে? সতেরো বছর পর? লাখোটিয়া আজ একরকম জোর করেই তোমাকে নিয়ে এসেছিল লাঞ্চে। অফিস থেকে বেরোনোর আদৌ ইচ্ছে ছিল না তোমার। থাকবে কী করে? বাপ, কদিন ধরে কলকাতায় যা দুরন্ত গরম। দুপুরবেলায় সূর্য যেন কামান দাগে রাস্তায়। গাড়ি টাড়ি ফারনেস হয়ে যায়। এই গরমে কোনও ভদ্রলোকের রাস্তায় বেরোনো উচিত নয়। কথাটা তোমার নয়। তোমার বউয়ের। বেচারি মোটেই গরম সহ্য করতে পারে না। আজকেই পার্ক স্ট্রিটে আসতে আসতে ভাবছিলে গাড়িটা এয়ার কন্ডিশনড করে নেওয়া যায় কিনা। শুনেই লাখোটিয়ার কী লম্ভঝম্ভ। পারলে বেটা তখখুনি একখানা এয়ারকুলার এনে বসিয়ে দেয় তোমার চলন্ত গাড়িতেই। লোকটা কতভাবেই তোমাকে ওবলাইজ করার চেষ্টা করে। কথার ঝরনায় মেজাজটাই খোলতাই করে দিল তোমার।

তারপর গাড়ি লক করে বার-কাম-রেস্তোরাঁয় ঢুকতেই ওফ কী আরাম! জুনের প্রচণ্ড দাপটে যখন গোটা শহরটা পুড়ছে ধিক ধিক, পিচ গলছে রাস্তায়, হলদেটে গাছপালা ধুঁকছে মুমুর্ষু রোগীর মতো, প্রাণীজগৎ জুড়ে অসহায় অবসাদ, তখন হিমালয় তোমাদের জন্য এরকম পাহাড়ী শীতলতা পাঠিয়ে দেয় কোথাও কোথাও। শুধু তোমাদের জন্যই। তুমি সেই বরফগলা আবছায়ায় তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিলে একটি মনোরম লাঞ্চ। ইদানীং আবার ওখানে এক সোনালি চুল গায়িকা আমদানি করা হয়েছে। আহা, কী তার বিভঙ্গ, কী লাস্য! মাউথপিসটা ঠোঁটের কাছে ধরে দোলে মৃদু মৃদু। দোলে না, যেন জোয়ার আনে শরীরে। দীর্ঘ শরীর বেয়ে ঢেউ কুলকুল। কাস্টমাররা সব পানাহার ভুলে যায়। চারধারে দারুণ স্মার্ট পোশাকের গোটা পাঁচেক মিউজিক হ্যান্ড নিয়ে মেয়েটা আজ হাস্কি সুর ভাসাচ্ছিল,—আই ডোন্ট নো হাউ ফাআর আই হ্যাভ টু গো...হো...ও...ও

লাখোটিয়া খলবল করে উঠেছিল,—ওয়াও। শি ইজ আ রিয়েল হার্টথ্রব। সালুজা কোথথেকে এই গোল্ডেন পিসটা কালেক্ট করল বলুন তো? সিম্পলি এনচানটিং।

মেয়েটা নয়, মেয়েটার গান শুনে কেন যে তুমি অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিলে বারবার! তবে কি শ্রবণার সঙ্গে দেখা হওয়ার ইঙ্গিত আসতে শুরু করেছিল তখন থেকেই? কে জানে! প্যারাসাইকোলজিতে হয়তো ব্যাখ্যা মিলতে পারে। লাখোটিয়া যখন মেয়েটাকে চাখতে চাখতে বিজনেস টক সারছে, চুমুক দিচ্ছে ব্ল্যাক লেবেলে, দাঁতে সিজলার ছিঁড়ছে, তোমাকে তখন দুম করে হঠাৎ রবীন্দ্রনাথ ভর করে বসলেন, আর কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে...। রাবিশ। কোথায় জম্পেশ করে মেয়েটার ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস মাপবে, তা না, বুদ্ধুর মতো বিয়ারে চোখ রেখে আবৃত্তি করে চলেছ—

—কী আছে হোথায়?

চলেছি কীসের অন্বেষণে?

লাখোটিয়া ভুরু কুঁচকেছিল। স্ট্রেঞ্জ! দু' গ্লাস ঠাণ্ডা বিয়ারেই মুখার্জি সাহেব আজ আউট! যে কিনা হাঁসের মতো মাল টানতে পারে! তোমার পরিচিত মহলে প্রবাদ চালু আছে—এক পেগে মুখার্জি রঙিন হয়, দু পেগেতে ধ্যানী, তিন পেগে পদ্য ধরে, চারেতে জ্ঞানী। এরপর পাঁচ ছয়ে উঠলে তো কথাই নেই। তখন অর্ণব মুখার্জি একজন সাচ্চা বিপ্লবী। একেবারে কট্টর মার্কসিস্ট লেনিনিস্ট। সেই মক্কেলকে যদি ঠান্ডা বিয়ারই কবিতা ধরায়...

অবশেষে স্বর্গ হতে বিদায়। দুটো দশ নাগাদ কাচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলে তোমরা। আশ্চর্য! একটা মাত্র মোটা কাচের দু' ধারে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা পৃথিবী। সিঁড়িতে পা রাখতেই একঝলক রাগী বাতাস নেড়িকুত্তার মতো লাফ দিয়ে পড়ল গায়ে। গরম হলকায় চোখ-মুখ ঝাঁ ঝাঁ। তাড়াতাড়ি রুমালে নাক চাপলে। সানগ্লাস চড়ালে চোখে। তারপর যখন গাড়ির দিকে এগোচ্ছ, তখনই দৃশ্যটা সুখী সৌভাগ্যবান অর্ণব মুখার্জিকে একেবারে চুর চুর করে দিয়ে গেল। ফুটপাতের কৃপণ ছায়াটুকু ধরে কী ভীষণ ক্লান্ত পায়ে হেঁটে চলেছে শ্রবণা। চৌরঙ্গির দিকে।

শ্রবণাই তো? তুমি পাথর। নাহ এতদিন পরেও শ্রবণাকে চিনতে তোমার ভুল হয়নি। বাঁ পাটাকে সামান্য টেনে কেমন অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাঁটছে মেয়েটা। মেয়েটা? নাকি মহিলা? সতেরো বছরের অদর্শন স্বাভাবিকভাবেই তোমার কাছে শ্রবণাকে সেই কুড়ি বছরের মেয়েটিই রেখে দিয়েছে। তুমি কেঁপে উঠলে। যেমন ভাবে হঠাৎ ঝড়ে সমূল নাড়া খায় নিশ্চিন্ত গাছ কিম্বা চকিত ভূকম্পে দুলে ওঠে কংক্রিট ভিত, তেমনি তোমার গোটা অস্তিত্বটাই টলমল করে উঠল।

শ্রবণা তোমাকে দেখতে পায়নি। মাথা নীচু করে আনমনে হাঁটছে। তুমি হ্যাংলার মতো ছুটে গেলে। শ্রবণা তখন ম্যাগাজিনের স্টলটা সবে ছাড়িয়েছে।

—শ্রবণা...

শ্রবণা চমকে তাকাল। তোমাকে দেখে চকিতে ঝাড়লণ্ঠন জ্বলে উঠল দু' চোখে। জ্বলেই নিবে গেল। তুমি বোকার মতো বলে উঠেছ—আমাকে চিনতে পারছ না? আমি অর্ণব।

আলগা হেসে মাথা দোলাল শ্রবণা। কয়েক পল চোখ বুজে থাকল। তুমি দেখতেও পেলে না সেই ফাঁকে কী বিরাট একটা শ্বাস বুকের ভেতর লুকিয়ে ফেলল মেয়েটা।

তুমি আরেকটু এগোলে। শ্রবণা কত পালটে গেছে! যাবেই তো। সতেরো বছর বড় লম্বা সময়। তবে সময়ের পলি পড়ে কেউ ধু-ধু চরা হয়ে যায়, কেউ সময়ের স্রোত ধরে শুধু ছোটে।

তুমিই কি কম বদলেছ হে? তোমার গায়ে এখন রেমন্ডসের সবথেকে দামি এইট্টি টোয়েন্টি, কানাডা থেকে আনা ফেডেড জিনস, শরীর জুড়ে ফ্রেঞ্চ কোলনের সুবাস। সেজেগুজে থাকলে তোমাকে যা দেখায় না! মাইরি, দেহের কিছু বাড়তি অ্যালকোহলিক মেদ বাদ দিলে হুবহু অ্যাড মডেল। পারফেক্ট সেক্স সিম্বল। তোমার পাশে তাঁত শাড়িপরা, কাঁধে ঝোলাব্যাগ, শুকনো চেহারার দিদিমণিটি এখন এক্কেবারে বেমানান।

তুমি এক নিশ্বাসে বলে ফেললে, তোমার সঙ্গে কোনওদিন দেখা হবে ভাবতেও পারিনি। কেমন আছ?

শ্রবণা আলতো হাসল, ভালো। তুমি?

না হে অর্ণব, শ্রবণার চোখ দুটো এখনও তেমনই আছে। উজ্জ্বল, বুদ্ধিদীপ্ত। বরং মোটা দুটো লেনসের ভেতর দিয়ে তারা আরও ভাস্বর। কোনও কোনওদিন বিরল মুহূর্তে তুমি কাব্য করে উঠতে—

—কান্তারের পথ ছেড়ে সন্ধ্যার আঁধারে

সে কে এক নারী এসে ডাকিল আমারে...

শ্রবণা জীবনানন্দ ভালবাসত খুব। তবু চোখ পাকাত। তুমি হো হো হেসে উঠতে, দাঁড়াও দাঁড়াও। এখনও কিন্তু শেষ করিনি, সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে—এই পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে...

লাখোটিয়া আজ হেভি ভিরমি খেয়েছে। হায়! দুনিয়ায় কত বিস্ময়ই না আছে। শেষে মুখার্জিসাহেব কিনা...। রিয়েলি! টোটাল অর্ণব মুখার্জি কেমন যেন ভেবলে গেছে। মায়া হচ্ছে তোমাকে দেখে। কী ভীষণ ঘেমে উঠেছ। চলন্ত গাড়ির গায়ে ছিটকে আসা হাওয়ারাও তোমাকে শুকিয়ে দিতে পারছে না। হোয়াট আ পিটি! কথা বলতে গিয়ে স্মার্ট মুখার্জির গলা ধরে যাচ্ছিল,

—কী করছ তুমি এখন?

শ্রবণা তাকিয়েই আছে চলমান জনপদের দিকে,—চাকরি! স্কুলে।

—কোথায়?

—ওই যাদবপুরেই।

কী সংক্ষেপে ছোট ছোট উত্তর দিচ্ছে শ্রবণা। বুঝি স্থির করে ফেলেছে একটাও বাড়তি কথা বলবে না। দুপুরের রাস্তাঘাট এখন কিছু ফাঁকা ফাঁকা। গ্রীষ্মরোদে পুড়তে পুড়তে গাড়ি-ঘোড়াগুলো দৌড়চ্ছে গোমড়ামুখে। অবসন্ন মানুষেরা পথ চলছে।

ট্রাফিক সিগনালে থেমে তুমি সিগারেট ধরিয়েছ,—যাদবপুরে কতদিন আছ?

শ্রবণার ভাঙা গাল বেয়ে গড়িয়ে গেল দীর্ঘ ক্লান্তি, অনেকদিন। বছর চোদ্দ।

তুমি ঝটপট ভাবতে শুরু করেছ। চোদ্দ বছর কী করে হয়? বন্দিমুক্তি আন্দোলন শুরু হয়েছিল সাতাত্তরে। যতদূর জানো...

—আমাকে ছেড়েছে চুয়াত্তরের শেষে। স্পেশাল কনসিডারেশনে। শ্রবণা কোলের কাছে ব্যাগটাকে ঘন করে টেনে নিল,—আমার ছেলের জন্য।

সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড জোরে ব্রেক চেপেছ। তীক্ষ্ণ আর্তনাদের মতো যান্ত্রিক শব্দটা থেমেও অনেকক্ষণ রেশ রেখে দিল। চমকে ফিরেও মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে শ্রবণা। খর রোদে চোখ রেখে স্পষ্ট উচ্চারণ করছে,—বাহাত্তরে হয়েছে। ডিসেম্বরে। জন্ম থেকেই ক্রিপলড। কোনও পায়েই জোর নেই। নার্ভের গণ্ডগোল।

বাহা রে বা অর্ণব মুখার্জি, এই তবে মানবমন। তুমি পাগলের মতো হিসাব মেলাতে শুরু করে দিয়েছ।... তোমার সঙ্গে শ্রবণার শেষ দেখা কবে যেন? হ্যাঁ, একাত্তরের অগাস্ট। বরানগর কাশীপুর ম্যাসাকারের দিন দশেক পরে। সাংস্কৃতিক বিপ্লব-টিপ্লব তখন মাথায় উঠেছে তোমাদের। তাড়া খাওয়া কুত্তার মতো শুধু ছুটে মরছ। চারদিকে কেবল খুন জখম আর পুলিশের বল্গাহীন অত্যাচার। বারাসাত, ডায়মন্ডহারবার, কোন্নগর সব কিছুকে সদ্য ছাপিয়ে গেছে বরানগর, কাশীপুর। পলিটিকাল রিভেঞ্জের চেহারা বীভৎস পর্যায়ে। শুধুই এখানে ওখানে খুনজখম নয়, পাইকারি হারে গোপনে লাশ পাচার করাও নয়, যাকে পাচ্ছে প্রকাশ্য রাস্তায় টেনে বার করে মেরে ফেলছে। কুঠিঘাট রোডের ওপর মঞ্চ তৈরি করে নিহতদের তালিকাও নাকি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার তাণ্ডবে দেড়শো জনেরও বেশি টাটকা যুবক শেষ। শিশু আর বয়স্করা পর্যন্ত বাদ যায়নি। সুকান্ত, মিহির, অরিন্দম কেউ নেই। হিমানীশদা আগেই ধরা পড়েছেন। বেঁচে আছেন কিনা কেউ জানে না। পল্লবীও জেলে। হারাধনের দুটি ছেলের মতো তোমরা দু'জন শুধু টিমটিম জ্বলছ। ভাগ্যিস অগাস্টের প্রথম দিকেই তুমি আর শ্রবণা শেলটার নিয়েছিলে চম্পাহাটিতে। শ্রবণার মাসির বাড়ি। তারপর কবে যেন উদ্ধার হলে তুমি? সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। ওই মাস দেড়েক সময়টা যে কী ভীষণ হতাশার। তবে চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতার মুহূর্তেও বোধহয় একধরনের টান তৈরি হয়। টান, না প্যাশন? প্যাশন না মোহ? জাহাজ থেকে ছিটকে পড়া দুটো নাবিকের তলিয়ে যাওয়ার মুহূর্তের মতো অথবা মৃত্যুভয়ে পাহাড়ের গর্তে আশ্রয় নেওয়া দুটো জন্তুর মতো তোমরা তখন আঁকড়ে ধরতে চাইছ পরস্পরকে। আরও গভীরভাবে। তখনই অনেক ছেলেমানুষির মতো আরেকটা ছেলেমানুষি...রেডবুক ছুঁয়ে কোন তারিখে যেন বিয়ে করেছিলে তোমরা? সেদিন তো সাক্ষী শুধু বিশ্বাস আর পুরোহিত আদর্শ। তবু কোন দিন যেন? ওফ, তারিখটা তোমার কিছুতেই মনে পড়ছে না। কবে? কবে? কবে শ্রবণা আর তুমি নিজেদের জন্য একটা রাত...! ধুত্তোর, এত ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন? ভাবো, মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবো। একাত্তর সেপ্টেম্বরের ফসল বাহাত্তরের ডিসেম্বরের কখনই উঠতে পারে না। আহ, রিলিভড। বেঁচে গেলে। কলকল করে চোরা স্রোত নেমে যাচ্ছে শিরদাঁড়া বেয়ে। এবার কৌতুহল। একটু একটু যন্ত্রণাও। শ্রবণা কিন্তু আর কিছুই বলছে না। তুমি হাঁপিয়ে উঠছ। তোমার মারুতি বালিগঞ্জ সারকুলার ঘুরে এখন গুরুসদয় রোডে।

মিলিটারি বনানীর দিকে চোখ রেখে তুমি শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন করেই ফেললে,—তোমার বাড়িতে কে কে আছেন?

বুদ্ধিমতী শ্রবণার চিবুকের ভাঁজ অবিকল আগের মতো কঠিন হল, —আমি, আমার ছেলে, আর একটা কাজের লোক।

—বিয়ে করোনি?

নির্বোধ প্রশ্ন। শ্রবণা জবাব দিল না। ওহে অর্ণববাবু, বেশি ঘাঁটানোর দরকার কী? চুপচাপ গাড়ি চালাও না। অযথা কেন কেঁচো খুঁড়তে সাপ বার করা? বরং মানে মানে গড়িয়াহাটের মোড়ে নামিয়ে দাও পাশের বোঝাটিকে। হাতে সময় আছে, তোমার মারুতির পিক আপ দারুণ, মিনিট পঁচিশের মধ্যে অফিসে পৌঁছে যাবে।

ধ্যাৎ, গোঁয়ারের মতো তবু গড়িয়াহাট পেরিয়ে এলে। কোনও মানে হয়? লক্ষ করে দেখেছ এতটা পথ যেচে গাড়িতে লিফট দিচ্ছ, অথচ শ্রবণা তোমার সম্পর্কে একটা কথাও জিজ্ঞাসা করেনি? এখন রাগ না হোক, তোমার অভিমান হওয়া উচিত। অর্ণব মুখার্জিরও তো কিছু বলার থাকতে পারে। সেলফ ডিফেন্সে। আত্মপক্ষ সমর্থনের মৌলিক অধিকার তোমারও আছে। ভাবতে ভাবতে পুরো কভেনেন্টেড অভিমানে যাদবপুর বাসস্ট্যান্ডে গাড়ি সাইড করে দিয়েছ। আর কাণ্ডটা দ্যাখো, কিছু বলার আগে শ্রবণা নিজেই নেমে গেল। যেন বুঝে শুনেই...। পশ্চিমের হলুদ রোদে ভিজে যাচ্ছে ওর মুখ। দরজাটা ধরে এতক্ষণ পর এই প্রথম ভারী সুন্দর হাসছে,—তোমার সময় নষ্ট করলাম।

তুমি চুপ!

—পারলে একদিন সময় করে বাড়িতে এসো। তোমার যোধপুর থেকে যাদবপুর আর কতটুকু। বলতে বলতে নিজেই ঠিকানা বলছে, বউ আর ছেলেকেও এনো। খোকন লোকজন দেখলে খুব খুশি হয়। একেবারে একা একা থাকে তো। তবে বাপু আগেই বলে রাখি, আমার আস্তানা কিন্তু সরু গলির ভেতর। তোমার গাড়ি ঢুকবে না।

আবার তোমার ধাক্কা খাওয়ার পালা। শ্রবণা তাহলে তোমার সব খবরই...! তুমি মনে মনে হেরে যাচ্ছ। জেল থেকে বেরিয়ে নিশ্চয়ই তোমাকে খুঁজেছিল মেয়েটা। সজোরে দরজা খুলে গাড়ি থেকে আচমকা নেমে এসেছ। চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়েছ শ্রবণার মুখোমুখি,

—তোমার পায়ে কী হয়েছে? সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছ না কেন?

শ্রবণার হাসি নিবেছে। নিষ্পলক তাকিয়ে আছে তোমার অশান্ত মুখটার দিকে, জেনে কী লাভ?

—আমি জানতে চাই। তুমি অধৈর্য ভাবে মাথা নাড়ছ,—সব জানতে চাই।

শ্রবণার স্থির চোখে এবার ফুটে উঠছে ধারালো ভঙ্গি, চিবুক কঠিন, তোমাকে কোনওদিন নরকে যেতে হয়নি অর্ণব। তুমি কী করে জানবে পুলিশ লক আপে...বলতে বলতে থামল একটু। গলা নামাল, এ সমস্তই তোমাদের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, আর পুলিশের তরফ থেকে উপহার পেয়েছি আমি। আমার ছেলেটাও।

ফোনটা বেজেছে। বেজেই চলেছে। বাজতে বাজতে থেমে গেল। আবার বাজছে। আবার। ঈশ্বরের দোহাই অর্ণব, ওঠো। অত করে কেউ ডাকলে বুঝতে হবে কলটা আরজেন্ট। অশোকদের পার্টি থেকে রাকা ডাকছে কি! ড্রাইভার ছোকরা নিশ্চয়ই গাড়ি নিয়ে পৌঁছায়নি। মালিকের কাছ থেকে ঘণ্টা তিনেক টাইম পেয়ে নির্ঘাৎ কোথাও মাল খেয়ে উলটে পড়ে আছে। সাচ্চা মালিকের সাচ্চা ড্রাইভার। এই সব প্রলেতারিয়েতগুলো শালা চুল্লু টেনেই নিজেদের শেষ করল। বেটাদের শ্রেণীচেতনা ঢুকবে কোন পথ দিয়ে? কিন্তু তোমার রাকাই বা কী! ন্যাকামি না করে যার হোক গাড়িতে ফিরতে পারে। ইনফ্যাক্ট ফেরেও অনেক সময়। তবুও অবিশ্রাম কিরিরিং কিরিরিং কেঁদে চলেছে দ্যাখো। একদম কান দেবে না। তার থেকে হ্যাভ সাম মোর ব্লাডিমেরি। রঘুর হাতে এ মালটা দারুণ তৈরি হয়। ওয়া, কী ফাইন কালার। নির্ভেজাল রক্ত। রক্ত...রক্ত...কমরেডস দিন এসেছে রক্তের ঋণ শোধ করার। তোমাদের কর্তব্য এখন গ্রামে গিয়ে সংগঠন গড়ে তোলা। অশিক্ষিত গরিব মানুষগুলোর কাছে চেয়ারম্যানের চিন্তাধারা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তোমাদেরই। তোমরাই তাদের দেখাতে পারো মুক্তির পথ...পান করো অর্ণব। আরেকটু ব্লাডিমেরী ঢালো গলায়। পানই শক্তি। পানেই মুক্তি। চোরের মতো পালিয়ে এসেছ শ্রবণার বাড়ি থেকে। ষোলো বছরের নিষ্পাপ কিশোরটিকে দেখে কেন্নোর মতো গুটিয়ে গেলে! তোমার মনের অত জোর-টোর সব গেল কোথায়! তারপর থেকে অবিরামপান করে চলেছ। ব্রাভো। পালানোর রাস্তাটা কী সহজ। অশোকের বাড়ির পার্টিতেও গেলে না। কাল নরেন্দ্রপুরে বাপ্পাকে দেখতে যাবে তো? তোমার ছেলে?

গ্লাসের মধ্যে একদৃষ্টে কী দেখছ অর্ণব? চমকে উঠে মুখ ঢাকলে যে! কী দেখলে ব্লাডিমেরিতে! রক্ত, না শ্রবণা? সুকান্ত, না হিমানীশদা? তোমার তো কোনওদিন ভূতের ভয় ছিল না। নাকি রঘুর গপ্পো শুনে তোমারও মাথায় ঢুকেছে ব্লাডিমেরিতে মৃত মানুষের মুখ ভেসে ওঠে। দূর দূর, আরেক সিপ মেরে দাও। ঝাঁঝালো রক্ত যত নামবে কণ্ঠনালি বেয়ে, বিবেক তোমার তত জাগতে থাকবে। বিবেক...বিবেক...আমাদের দেশের সত্তর ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করে। গরিব চাষিদের সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল বেশিটাই নিয়ে নেয় মহাজনেরা। এসবই আধা সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতির কুফল। যে- কোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে সোচ্চার হতে হবে এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে। শ্রীকাকুলামের আগুন দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। আমরা জেনেছি বন্দুকের নলই শক্তির উৎস। চিহ্নিত করো সমস্ত শ্রেণীশক্রদের। ওহে অর্ণব, এই মুহূর্তে তোমার একমাত্র শ্রেণীশক্র ওই অলিভ গ্রিন টেলিফোনটা। টিঙটিঙ নাচছে দ্যাখো। যেন ক্যাবারে ডান্সার। স্ট্রিপটিজ দেখাবে। মনে হয় ওটা রাকার ফোন নয়। রাকার কাছে তুমি কি এতটাই জরুরি? আর কার হতে পারে? হ্যাঁ, তোমার এম. ডি. কিম্বা এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর। কিন্তু এটা তো তাদেরও ঘণ্টা বাজানোর সময় নয়! লেবাররা মালিকপক্ষের ধান্দাবাজি টের পেয়ে রাতারাতি ফ্যাক্টরি রেড করল নাকি? ইমপসিবল। সে যুগ এখনও দূর অস্ত। বেজে যেতে দাও। রাত মাত্র যুবতী হয়েছে। একটু আগে তোমার জার্মান কুক্কু পিকপিক ডাক ছাড়ল এগারোবার। এই তো মাতাল হওয়ার সময়।... মাথার ভেতর মদ গাঢ় হলে...সমস্ত শরীর মদে ভিজে গেলে, পাঁড় মাতাল, আকাশের দিকে তুমি উলটো করে ছুঁড়ে দাও এক ডজন কাচের গেলাস।...

তোমার রাতের সঙ্গে তোমার বিকেলের কত তফাৎ আজ। পোষমানা লিটিগনের মতো শ্রবণার পিছু পিছু গিয়েছিলে যাদবপুরের দশ ফুট বাই দশ ফুট ঘরটায়। বাড়িতে ঢুকেই শ্রবণা কেমন নিস্তেজ হয়ে গেল। মুখের সেই গনগনে আঁচ মরে ছাই। ব্যাগ থেকে টুকটাক ওষুধপত্র ফলমূল বার করে রাখল তারজালঘেরা মিটসেফের মাথায়। তারপর দরজায় নিশ্চল তোমাকে ডাকল ম্লান গলায়,—এসো।

পাশের দশ বাই আট ঘর জুড়ে পাতা বিশাল এক চৌকিতে শুয়ে আছে পঙ্গু ছেলেটা। জানলার দিকে মুখ। ওটুকু জানলা দিয়ে ছেলেটা কি আকাশ দেখতে পায়? তোমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। ভাগ্যিস পা দুটো পাতলা চাদরে ঢাকা, নইলে তুমি বুঝি অজ্ঞানই হয়ে যেতে। শ্রবণা গভীর স্নেহে হাত রাখল ছেলের মাথায়,—খোকন, তোমার কাছে একজন এসেছেন।

কী ঝকমকে চোখ ছেলেটার। মণি দুটো যেন স্বচ্ছ ঝরনার জলে পড়ে থাকা অমূল্য দুটো পাথর। শ্রবণার থেকেও তীক্ষ্ণ মুখ নাক! ঠোঁটের ওপর বয়:সন্ধির সবুজ আভাস। মাথা ভরা রেশম চুল। বড় বড় চোখ ছড়িয়ে তোমার দিকে একটু সৌজন্যের হাসি হাসল। পরক্ষণেই মাকে ব্যস্ত জিজ্ঞাসা,—কাজ হল?

—দাঁড়াও, সবে তো অ্যাপ্লিকেশন দিলাম। কবে সেটা নড়াচড়া করে দ্যাখো।

—হুঁ। এখন তো শুধুই অপেক্ষা। ছেলেটার ভাঙা গলা দিয়ে শব্দ কটা যেন ঠিকরে এল। তোমার মনে হল কান্না। কান্না কেন? মাঝে মাঝে উপহাসও তো কান্নার মতো শোনায়?

শ্রবণা অপ্রস্তুত মুখে একখানা বেতের মোড়া এগিয়ে দিল,

—দাঁড়িয়ে কেন? বোসো।

ছেলেটা এবার তোমাকে লক্ষ করছে ভালো করে। তুমি প্রায় আর্তনাদ করে উঠলে,—নাহ, আজ যাই। পরে আসব। অফিসে একটা জরুরি কাজ...

আশ্চর্য! তুমি জানতে পর্যন্ত চাইলে না কীসের দরখাস্ত করেছে ওরা। কীসের অপেক্ষায় আছে রুগণ ছেলেটা? চিকিৎসার? কোনও মানুষের? না নতুন করে কোনও আশার...?

কাওয়ার্ড, সেলফিশ অর্ণব মুখার্জি, ওখানে দু' মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার সাহস তোমার হল না, আর এখন মদের ফোয়ারা ছুটিয়ে ভাববিলাস হচ্ছে! পেগের পর পেগ ব্লাডিমেরি! ডিভানে শুয়ে পিন ফোটাচ্ছ বিবেকে! ভাবের ঘরে চুরি! মনে নেই শ্রবণা বলত—অর্ণব, আমাদের মধ্যে তোমার রক্তই কিন্তু সব থেকে বেশি নীল। ভাবের ঘরে চুরি করার চান্স কিন্তু তোমারই বেশি।

ফোট। রক্ত আবার নীল কী রে? রক্ত হল ব্লাডিমেরি। যা এখন তির তির করে ছুটছে তোমার শিরা থেকে স্নায়ুতে। এ তোমার পিতৃপিতামহের রক্ত। তোমার গ্রেট বুর্জোয়া ফাদারের রক্ত। ...সামন্ত সমাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে আধুনিক যে বুর্জোয়া সমাজ জন্ম নিয়েছে তা শ্রেণীবিরোধ দূর করেনি। এ সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছে নতুন শ্রেণীর...

অনারেবল জাসটিস অফ পীস পি কে মুখার্জি বলছেন,—অনেক রেভেলিউশন দেখানো হয়েছে। এনাফ ইজ এনাফ। কাল ভোরের ফ্লাইটেই তুমি দিল্লি যাচ্ছ। তোমার ছোটমামা পালামে থাকবে। নেক্সট মরনিং ইউ আর থ্রু টু মনট্রিল। ঝুনু তোমার সব ব্যবস্থা করে রেখেছে সেখানে। তুমি কিছু বলতে চাইলে...বুর্জোয়া ফাদার হাত তুললেন,—তোমাদের এই অতি বিপ্লবীআনাকে লেনিন কী বলেছেন জানো? শিশুসুলভ বিশৃঙ্খলা। নাথিং বাট খোকামি। তোমার জন্য আমাকে অনেক মুখ পোড়াতে হয়েছে...লাস্টলি সিন্টুকে দিয়ে...চীফ সেক্রেটারিকে ধরে...উফ, আমাদের এতদিনকার বংশগৌরব, তোমাকে নিয়ে আশা, অহংকার...

অসহ্য। ইনটলারেবল। কিছুতেই শ্রবণার কথা বলা গেল না। বলবে কী করে? সাহস ছিল? এ কী করছ! অ্যাশট্রেটা হঠাৎ ওভাবে আছড়ে ভেঙে দিলে যে! নি:শব্দ ফ্ল্যাটখানা ঝনঝনিয়ে উঠল। রঘু নির্ঘাৎ ঘুমিয়ে পড়েছে। নইলে ছুট্টে আসত। এখন তোমার আক্রোশ হচ্ছে? কিন্তু কার ওপর? বর্তমান না অতীত? অতীত, না বর্তমান? না শুধুই নিজের ওপর? ঢকঢক করে অতটা গিলে নিলে। মস্তিষ্কের ভিডিও ক্লিপিংটাকে ঠিক করতে পারছ না। দুমদাম ছবি জাম্প করছে...

... সুকান্ত উত্তেজিত পায়চারি করছে পল্লবীদের ভেতর দিকের বন্ধ ঘরে,—হিমানীশদা, মনে হয় কোথাও ভুল হচ্ছে আমাদের। এত তাড়াতাড়ি শহরে অ্যাকশান শুরু করাটা ঠিক হয়নি।

হিমানীশদা, দ্য ডেডিকেটেড ক্যাডার, সোফায় টান হওয়ার চেষ্টা করলেন। ধরমপুরের কাছে এনকাউন্টারে জখম হয়েছিলেন। ভাল মতো চিকিৎসা হয়ে ওঠেনি। বললেন, না সুকান্ত, এখন আর আমরা কোনওভাবেই জেলাকমিটির নির্দেশ অমান্য করতে পারি না। অন্ধ্রের সমস্ত লীডার আর ক্যাডার খুনের বদলা নিতে এখখুনি এখানে পুলিশ, মিলিটারি, পুঁজিপতি আর চোরাকারবারীদের খতম করা দরকার।

—আমি আবার বলছি, আমরা আসল উদ্দেশ্য থেকে সরে যাচ্ছি। বিপ্লবের থেকে বিপ্লবীআনাটা বেশি হয়ে যাচ্ছে।

...বলত না? বলত না এসব কথা ওরা? আর দোষ সব এই অর্ণব মুখার্জির! একদল প্রাণপণে বোঝাচ্ছে মূর্তিভাঙার লড়াই হচ্ছে আসলে দুটো মূর্তির লড়াই। এবং দুই মূর্তির লড়াই হচ্ছে আসলে দুই রাজনীতির লড়াই। দুই শ্রেণীর লড়াই। আর ওদিকে আরেক দল বলছে, গান্ধী এবং গান্ধীবাদ বিপ্লবীরাজনীতির বাধা। সেজন্য গান্ধীমূর্তি ভাঙা চলতে পারে কিন্তু গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে রবীন্দ্রনাথ বা বিদ্যাসাগরদের মতো বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের মূর্তি ভাঙা অনুচিত। একদল বলছে গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরো। অন্যদিকে চলছে মারিঘেলার কায়দায় শহুরে সন্ত্রাস সৃষ্টির চেষ্টা। বৃথা মাথাগরম কোরো না অর্ণব, তোমাদের তখন কিছুই করার ছিল না। হিমানীশদার মতো মানুষই কেমন শেষে বোবা মেরে গেলেন। সুকান্তকে থেঁতলে থেঁতলে মারা হল। তোমার তখন মস্তিষ্কই কাজ করত না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র নষ্ট করা উচিত, কি উচিত না, এই তো শেষে দাঁড়াল গিয়ে মূল সমস্যা। বিপ্লব আর কোথায় সেখানে? তার ওপর সে সময় ক্ষুধার্ত নেকড়ের চেয়েও নিষ্ঠুরতা ছুঁড়ে দিয়েছিল পুলিশ, সি. আর. পি.। সব কটা পার্টি ঝাঁপিয়ে পড়ছে তোমাদের ওপর। তাদের কে যে গোলাপী, কে যে গেরুয়া, কে যে লাল!

দূর দূর দূর। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে খতম অভিযান চালাতে গিয়ে লাস্ট তোমাদের শক্র গিয়ে দাঁড়াল কারা? না, কোনও জোতদার, ভূস্বামী নয়, কিছু নিরীহ ছা-পোষা কনস্টেবল সেপাই। 'পুলিশের প্রতি' বুকলেটের কী সাঙ্ঘাতিক পরিণাম হাতে-নাতে টের পেয়েছ। আরে বাবা, সিস্টেম আমূল পালটে দেওয়া কী অত সোজা! সংগঠন নেই। মাস কনট্যাক্ট নেই। যত সব রোমাণ্টিক অ্যাডভেঞ্চারিজম! তবে? তবে?

মনট্রিলে বসেই তুমি খবর পেয়েছিলে শহরে অ্যাকশন বন্ধ করার নির্দেশ এসে গেছে। ব্যস, খেল খতম! শয়ে শয়ে ছেলে সব হজম। সুকান্ত, মিহির, অরিন্দম, কেউ রইল না। সঞ্জয়ের শিরদাঁড়াটাই নাকি পুরোপুরি বেঁকে গেছে। পল্লবীর মতো তেজি মেয়ে ফুরিয়ে গেল। আর শ্রবণার পেটে এল পঙ্গু ছেলে। তবু এত কিছুর ফলে কিছু একটা কি তৈরি হয় না? অতগুলো ছেলের বিশ্বাস, আত্মদান, রক্ত কি কোনও ইতিহাসই তৈরি করে না? করে। করে। কে যেন তখন লিখেছিল... মনে রেখো, আমরা এসেছিলাম...আঠারো শো সাতান্নর রাতে আমরা ছুটন্ত ঘোড়সওয়ার।

না অর্ণব। ব্লাডিমেরির লাথিটা আজ একটু বেশিই হয়ে গেছে। নাহলে পাক্কা পাঁচমিনিট ধরে দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে রাকা আর তুমি বিড়বিড় করে চলেছ...মনে রেখো...হে আমার স্বদেশ,, আমার স্বকাল, ভাবীকাল...

—ও হেল। সেই সন্ধে থেকে বসে তুমি ড্রিংক করে চলেছ?

রাকা ত্বরিত পায়ে কাছে আসছে। উঁহু, উঠতে চেষ্টা কোরো না। তোমার ডান পা জড়িয়ে ধরছে বাঁ পাকে। চারদিকে ছড়িয়ে অসংখ্য কাচ। সাবধান। নিজের ভাঙা কাচে নিজেই যে...।

মৃদু আলোতেও কাচের টুকরোগুলো ঠিক চোখে পড়ে গেছে রাকার। স্তম্ভিত বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে গেছে দেওয়াল জোড়া ইউনিটটার সামনে,—তোমার ব্যাপারটা কী বলো তো? এভাবে বাড়িতে বসে গেলার জন্যই আজ অশোকদের ওখানে গেলে না? প্রত্যেককে কৈফিয়ত দিতে দিতে আমি...

তুমি পিট পিট তাকাচ্ছ। তোমার ঝাপসা চোখে দুলে উঠল নারী মোহিনী। তোমার স্ত্রী। লাইফ পার্টনার। ম্যাজেন্টা শিফনের আঁচল খসে পড়েছে বাঁ হাতের কোলে। উত্তেজনা ঢেউ তুলছে উদ্ধত বুক দুটোতে। ঝুলন্ত মফচেনে তারই হালকা দোলা। তুমি হাত বাড়াবার চেষ্টা করলে। নিজের হাত নিজের কাছেই ফিরে এল,—সুরঞ্জনা, ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি...

—হরিবল। রাকা দুপদাপ পা ফেলে বড় আলো জ্বালাল,—রঘু কোথায়? রঘুউউ...চিৎকার করতে করতে কোমরে আঁচল জড়াচ্ছে। সুন্দরী ভুরুতে চাপচাপ বিরক্তি। ভ্যানিটি ব্যাগ সোফায় ছুঁড়ে দিল। পেনসিল হিলে কাচ গুঁড়িয়ে তোমাকে এসে জাপটে তুলছে,—খুব হয়েছে। এদিক দিয়ে এসো। হ্যাঁ, এখান দিয়ে...আহ কাচে পা কাটবে যে...এমন সব কাণ্ড করো মাঝে মাঝে। রঘুকেও বলিহারি যাই...

রাকার পেলব কাঁধে ভর দিয়ে তুমি বেডরুমে আসছ। আজ কোন পারফিউমটা মেখেছে রাকা? তোমার শরীর অবশ হয়ে আসছে। বিছানায় বসে পড়ে তুমি প্রাণপণ শক্তিতে জড়িয়ে ধরেছ রাকার কোমর। ডুবন্ত গলায় মুখ ঘষছ ওর বুকে, আমাকে বাঁচাও রাকা...প্লীজ...আয়াম গেটিং লস্ট।

—ঠিক আছে। শুয়ে পড়ো।

—নো। আই ওয়ান্ট টু ডু সামথিং। সামথিং ফর মাই পুওর ওয়াইফ, মাই সিক চাইল্ড।

—কী আবোল তাবোল বকছ? রাকা তোমার ঘন চুলে আঙুল ডোবাল,—তোমার হয়েছেটা কী বলো তো? বিকেল থেকে এমন ছটফট করছ কেন?

—জানি না। তুমি বুঝি এই আদরটার জন্যই অপেক্ষা করছিলে, এরকমই সঙ্গ চাইছিলে কারুর। হু হু করে কেঁদে ফেললে,—আমি রিয়েলি ওদের জন্য কিছু করতে চাই।

—কাদের জন্য।

—বললাম তো। আমার স্ত্রী। ছেলে।

রাকা হেসে ফেলল, —নাহ তোমার দেখছি আজ সত্যিই মাথার পোকা নড়েছে। কাম অন। লক্ষ্মী ছেলের মতো শোও তো দেখি। কাল সকালে বাপ্পার কাছে যেতে হবে। তারপর দুপুরে ফিরে টার্ফ ক্লাব। তুলতুলিরা সবাই কাল মাঠে আসবে বলেছে মনে আছে তো?

তুমি শিশুর মতো ঢুকঢুক মাথা নাড়লে। তোমার থুতনি এক হাতে ধরে অন্যহাতে চোখের জল মুছিয়ে দিচ্ছে রাকা,

—আর কখখনো একা একা ড্রিংক করবে না। একা খেলেই তোমাকে ভূতে ধরে। ইউ সিম্পলি গেট ম্যাড আফটার...

তুমি ফুঁপিয়ে উঠলে,—আমাকে সবাই ছেড়ে চলে গেছে। সব্বাই। আই দ্য মোস্ট ডার্টি ফেলো...দ্য রেনিগেড...

—কে বলেছে? আমি আছি। চকচকে গোলাপী ঠোঁট তোমার কপালে ছোঁয়াল রাকা। চোখে উথলে পড়ছে মমতা। মেয়েরা বোধহয় সকলেই মাঝে মাঝে এরকম মা হয়ে যায়। নরম স্নিগ্ধ। তুমি সেই স্নিগ্ধতার হাত ধরে কৈশোর থেকে যৌবনে ফিরছ। যৌবন থেকে রাকায়।

—দ্যাখো তোমার কান্নায় আমার ব্লাউজ ভিজে গেছে। নটি বয়।

রাকা ঠোঁট টিপে হাসছে। তুমি আধবোজা মাতালচোখে প্রাণভরে সুন্দরী স্ত্রীকে দেখছ। গুড। এই তো বিচক্ষণতার লক্ষণ। অতীত ঘেঁটে কেঁদে মরে কাপুরুষেরা। ওয়েক আপ। দ্যাখো রাকার কী সুন্দর তেলতেলে হলুদ ত্বক। রিসেন্টলি বোধহয় ওয়াক্সিং করিয়েছে। শ্যাক করা সিলকি চুল বেয়ে নামছে সুগন্ধ। দেহের প্রতিটি খাঁজ স্পষ্ট, মসৃণ। পারফেক্ট ফেমিনিন ফিগার। তার পাশে কাকে বসাও তুমি? ক্ষয়াটে চেহারার আধবুড়ি শ্রবণা দিদিমণিকে? ভুলে যাও ডিয়ার, ভুলে যাও। এই তো ভালো ছেলের মতো শুয়ে পড়েছ বিছানায়। তুলতুলে খেলনাটাকে দেখছ নেড়ে চেড়ে। শান্তি। নেশা এবার ঘুম হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে শরীরে। ঘুমোও অর্ণব। ব্লাডিমেরির মতো অধর মদিরা পান করতে করতে তলিয়ে যাও ঘুমে।

—আসুন, আমরা তবে আজকের আলোচনা শুরু করি। নাম্বার ওয়ান, শিফটিং অফ আওয়ার টু ডিভিশনস ফ্রম ক্যালকাটা টু ফরিদাবাদ। লাস্ট মিটিং-এ ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত আপনারা জেনেছিলেন। দেখুন, আমি আজ আপনাদের আরও ক্লিয়ারলি ব্যাপারটা বোঝাতে চাই। তিনটে মেইন সুবিধে আমরা কলকাতার থেকে ফরিদাবাদে বেশি পাচ্ছি। গভর্নমেন্ট ইনসেনটিভ। র মেটিরিয়াল। অ্যান্ড পাওয়ার। দিনে দিনে সিচুয়েশন এখানে এমন দাঁড়িয়েছে যে কোম্পানির পক্ষে ব্যবসা করাই দুরূহ হয়ে পড়ছে। হিউজ লস। তাই কোম্পানি ডিসাইড করেছে ইনসট্রুমেনটেশন আর অ্যালায়েড মেশিনারি, অন্তত এই দুটো ডিভিশনকে পুজোর পর ফরিদাবাদে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আমাদের হিসেব বলছে দুটো ডিভিশন মিলিয়ে আমাদের ওয়ার্কার আছেন তেষট্টিজন। এই তেষট্টিজনকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা হয়েছে। এই তেষট্টিজনই যদি চান তো ফরিদাবাদে চলে যেতে পারেন। আমরা তাঁদের ডেফিনিটলি কিছু মার্জিনাল বেনিফিট দেওয়ার চেষ্টা করব। আইদার ইন টার্মস অফ সাল্যারি অর ইন টার্মস অফ ইনসেনটিভ। অ্যান্ড ইফ পসিবল বোথ। তা নাহলে উইথ ফুল রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট আমরা তাঁদের ছেড়ে দিতেও রাজি আছি। ডু আই বোর ইউ...?

বাহ দারুণ গুছিয়ে, কী অনায়াসে পর পর কথাগুলো তুমি বলে যেতে পারছ মুখার্জি। এই তো চাই। টেবিলের উলটোদিকের লোকগুলো কেমন পণ্ডিতের মতো ভুরু কুঁচকে বসে আছে দ্যাখো! এই সব লেবারলিডারগুলোর ভাবভঙ্গি এমন যেন তিন ভুবনের ভার ওদের ওপরেই দেওয়া হয়েছে। শুধু চোখা চোখা শব্দ সাজিয়ে ওরা পৃথিবীর সব সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে পারে। তুমি অ্যালার্ট থাকো। ঠিক উল্টোদিকে যে লোকটা বসেছে, ধুতিশার্ট, মাথায় হালকা টাক, ওকে নিয়ে বিশেষ চিন্তা নেই। লোকটাকে পালটি খাওয়ানো যায়। তার পাশে রোগা লিকলিকে বুশ শার্ট, জিনস প্যান্ট ওকেও লাইনে আনতে পারবে। প্রবলেম তোমার বাঁ দিকের চশমা-পরাকে নিয়ে। দীপেন বিশ্বাস লোকটা পার্টির হোলটাইমার। প্রচণ্ড ধূর্ত। জারোয়া টাইপ। বিষতীরের মতো ডায়ালগ ছুঁড়তে জানে। তার থেকেও বড় কথা লোকটা তোমার সম্পর্কে অনেক খোঁজখবর রাখে। মানে তোমার অতীত বর্তমান সম্পর্কে আর কি। আগের মিটিং-এ কুরুভিলাদের বিশ্রীভাবে নাস্তানাবুদ করেছে। চোখ মুখ দেখে মনে হয় আজ তোমাকেও ছাড়বে না। বাকি দু'জনও চালাক তবে তেমন খতরনাক নয়। অনেক সময় ম্যানেজমেন্টের আসল চালটা বুঝেও না বোঝার ভান করতে পারে। তোমারও আজ কর্তব্য ওদের কোনও কিছুই বুঝতে না দেওয়া। পরপর তিনটে বড় এক্সপোর্ট কনসাইনমেন্ট স্ট্যাগ হয়ে আছে। শিপমেন্ট হচ্ছে না। এ অবস্থায় কিছুদিন প্রাোডাকশন ডিটেনিং খুব জরুরি। এ এক অদ্ভুত সংকটের মুহূর্ত।...এই সব সংকটের ফলে এক মহামারি হাজির হয়...এই মহামারি অতি উৎপাদনের মহামারি। হঠাৎ সমাজ যেন এক সাময়িক বর্বরতার পর্যায়ে ফিরে যায়। তবে দীপেন বিশ্বাসকে তো সেটা বুঝতে দেওয়া চলবে না। তার চেয়ে বরং রিভলভিং চেয়ার আলতো ঘোরাও। লোকটার চোখে চোখ রাখো।

—নাউ কাম টু দ্য সেকেন্ড পয়েন্ট। মেকানিকাল উইয়িং-এর তিনজন ওয়ার্কার সম্পর্কে বলছি। ওদের মধ্যে দু'জন আপনাদের ইউনিয়ন করেন, একজন ওনাদের। বলতে বলতে চোখের মণি দুটো ধুতি শার্টের শরীরের বুলিয়ে নিলে,—তিনজনের সম্পর্কেই অভিযোগ আছে গ্রস ইনডিসিপ্লিনের। অ্যান্ড ইউ নো হাউ আওয়ার কোম্পানি লুকস অ্যাট ইনডিসিপ্লিন। ওদের চার্জশিট দিয়েছি। দরকার হলে...

—না। দীপেন বিশ্বাস এতক্ষণে মুখ খুলল। এই লোকগুলোর টাইপই যেন কীরকম। আগে তোমাদের গড়গড় করে কিছু বলে যেতে হবে তারপর ঝোপ বুঝে কোপ মারবে। মাঝে মাঝে এত দুর্বোধ্য লাগে লোকগুলোকে! না শব্দটা বলার পরও আধ মিনিট চুপ মেরে রইল। ব্যক্তিত্ব শানাচ্ছে—আমরা মনে করি এ ধরনের চার্জশিট দেওয়াটা বেআইনী। ম্যানেজমেন্ট কখনওই কারুর ওপর আনডিউ ফোর্স ক্রিয়েট করতে পারে না। আপনারা যে রিজনগুলো দেখিয়েছেন সেগুলো প্রায় সবই ভেইগ। চার্জশীট আপনাদের উইথড্র করতে হবে।

ধুতি শার্ট উত্তেজিতভাবে সায় দিল,—সবই এক ধরনের চাল। আমাদের কাছে স্যার খবর আছে আপনারা রীতিমতো জুলুম করে...

থ্যাংক গড। ওষুধ ধরছে। তুমি কুরুভিলার দিকে আড়চোখে তাকালে। কেরালাইট মানুষটি অসম্ভব গম্ভীর মুখে ফাইল দেখার ভান করছে। আর চীফ পারসোনাল সান্যাল চেয়ারের পিঠে মাথা ঠেকিয়ে চুলে আঙুল বুলিয়ে চলেছে ক্রমাগত। ম্যানেজমেন্টের অর্ডার অনুযায়ী ওরা আজ এ কে মুখার্জি, চীফ এক্সিকিউটিভ, অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে মদত দিতে বসেছে। অবশ্য ওদের তেমন দরকার ছিল না। তুমি তো একাই একশো। সমর দাশগুপ্তকে মাঝপথে থামিয়ে আন্তরিক ভঙ্গিতে হেসে উঠেছ,—কাম অন মিস্টার দাশগুপ্ত। ওয়ার্কারদের সঙ্গে কোম্পানির কোনও শক্রতা নেই, থাকতে পারে না। সত্যি কথা বলতে কি, আপনারাই তো সব। আই মিন ওয়ার্কাররা। আপনারা চালাচ্ছেন, তাই আমরা চলছি। খেয়ে পরে বেঁচে রয়েছি। কিন্তু তার মানে কি এই, যে সবরকম স্বেচ্ছাচারিতা,, অন্যায় আক্রমণ সবসময় ম্যানেজমেন্টকেই সহ্য করে যেতে হবে? বলুন। বলুন।

অনিল মণ্ডল নড়েচড়ে বসল,—ঠিক আছে। এই প্রসঙ্গে আমরা পরে আসছি। আগে প্রথম ইস্যুটা নিয়েই আলোচনা হয়ে যাক।

কুরুভিলা তোমার কানের পাশে ঝুঁকে ফিশফিশ করল, ইউ নো দ্যাট পারসন ইজ ইন অ্যালায়েড মেশিনারি।

তুমি মাথা দোলালে।

মণ্ডল বোধহয় কথাটা আঁচ করেছে। সামান্য অপ্রস্তুতভাবে সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে নিল,—আপনারা নিশ্চয়ই ভাবছেন না যে আমি নিজে ইনভলভড বলে...

—ছি ছি, এ কী বলছেন? তুমি অমায়িক হেসে ফাইভ ফিফটি ফাইভ এগিয়ে দিলে টেবিলের উলটো দিকে, —ডেফিনিটলি ফার্স্ট ইস্যুটা বেশি সেন্সেটিভ। এটা নিয়েই আগে কথা হওয়া উচিত। কোম্পানির সুবিধে-অসুবিধের সঙ্গে আপনাদের ভালমন্দও ভেবে দেখতে হবে বইকি। আপনাদের বক্তব্য আপনারা বলুন।

—কথাটা তাহলে সোজাসুজি বলি। দীপেন হাত নেড়ে তোমার সিগারেট রিফিউজ করল,—আপনাদের প্রপোজাল আমরা স্টাডি করে দেখেছি। অনেকগুলো বড় বড় ফাঁক আছে। আমরা মনে করি এখনই দুটো ডিভিশন সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার মোটেই প্রয়োজন নেই। আপনারা যে প্রবলেমগুলোর কথা বলছেন তা নিয়ে আমরা স্টেটের সঙ্গে ট্রাইপার্টাইটে বসতে পারি। দরকার হলে ইস্টার্ন জোনের কোটার ব্যাপারে আমরা সেন্ট্রাল মিনিস্টারের সঙ্গেও...

—দ্যাটস ভেরি গুড। সান্যাল দু' আঙুলে নিজের ঠোঁট টানাটানি করছে—কিন্তু এখানে পাওয়ারের ব্যাপারে গ্যারান্টি বোধহয় স্বয়ং ভগবানও দিতে পারেন না। সেটিং অ্যাসাইড দি ইনসেনটিভস উই আর গেটিং অ্যাট ফরিদাবাদ...

কুরুভিলা কাঁধ ঝাঁকিয়ে পয়েন্টটা অ্যাপ্রেশিয়েট করল।

আরে বাবা ভ্যানতারা করার দরকার কী? এক্সষ্ট্রা কথা বলা মানেই প্রতিপক্ষকে সুযোগ দেওয়া। তুমি ঝটপট বলে উঠলে, —দেখুন, এ ব্যাপারে ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত ইজ ফাইনাল। আপনারা এখন আলোচনা করে দেখতে পারেন হাউ মাচ ইউ ক্যান...।

—কিন্তু ম্যানেজমেন্ট হুইমজিকালি কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আমরা এই শিফটিং-এর ঘোর বিরোধিতা করছি।

—আপনি রেগে যাচ্ছেন মিস্টার বিশ্বাস। তুমি আবার মধুর হাসি ফোটালে ঠোঁটে,—এভরিথিং ইজ ফাইন দেয়ার। ফরিদাবাদের ওয়েদার চমৎকার...

—ওসব হাওয়া বদল-টদল আপনাদের মানায়। বিশ্বাস ঝাঁঝ ছড়াল,—আপনারা জায়গামতো খোপে খোপে নিজেদের বসিয়ে নিতে পারেন। কথায় কথায় চামড়ার রঙ বদলাতে পারেন। আমরা পারি না।

আপনি কী মীন করতে চাইছেন? তুমি বলতে গিয়েও প্রাণপণে সামলে নিয়েছ। লোকটা মাঝে মাঝেই ওভাবে তোমার দিকে বিদ্রুপ ছেটায়। ছেটাক গে যাক। খবরদার মাথা গরম কোরো না। ওদের আজ বাড়তে দাও।...প্রয়োজনে ফ্রক কোট পরেও আলোচনার টেবিলে বসতে হবে যদি আমরা বিন্দুমাত্র সুবিধা হাসিল করতে পারি...এম. ডি. না লেনিন, লেনিন না এম. ডি? নার্ভের ওপর দখল আনো মুখার্জি।

বেয়ারা কফি দিয়ে গেছে। সঙ্গে কিছু স্ন্যাকস। কাজু, বিসকিটস। ওদের মধ্যে দু'জন কফিতে চুমুক দিল। আরও কিছু অর্থহীন কথা চালাচালির পর তিনজন উঠে দাঁড়িয়েছে,.. —আপনারা যদি স্যার এভাবে অ্যাডামেন্ট অ্যাটিচিউড দেখান তাহলে কোনো কথাই চলতে পারে না।

—অভিযোগটা একটু ওয়ান সাইডেড হয়ে যাচ্ছে না?

—না। ম্যানেজমেন্টের ডিকটেটোরিয়াল অ্যাটিটিউড আমরা মানছি না। ফলস চার্জশিট দিয়ে ছাঁটাই করার ধান্দাও আপনাদের ছাড়তে হবে। পুজোর আগেই নতুন এগ্রিমেন্টের খসড়া চাই। ওয়েজ রিভিশন নিয়ে বহু দিন ধরে ধানাই-পানাই করছেন।

—তার মানে আমরা আপনাদের কোঅপারেশন পাচ্ছি না? তুমি সঠিক সময়ে সঠিকতর বাক্যটি প্রয়োগ করে দিলে,—এবং এটাই বোধহয় আপনাদের শেষ কথা?

এবার পাঁচজনই উঠে দাঁড়িয়েছে। উত্তেজিত পাঁচ নেতা,—ফাইনাল কথা বলবে শ্রমিকরা। আমরা তাদের জানাচ্ছি আপনারা কোনওমতে মূল দাবি বিবেচনা করতে রাজি নন।

তুমি পুরো গ্রেগরি পেক কায়দায় শ্রাগ করলে। লোকগুলো ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। এটাই তো চেয়েছিলে। ওয়েল ডান অর্ণব। এরপরই ফ্যাক্টরি গেটে স্লোগান শুরু হবে। জড়ো হবে শ্রমিকরা। বৃথাই গলা ফাটাবে। সেই সুযোগে তোমাদের খাম খাওয়া লোকগুলো কায়দামতন হুল্লোড় বাধিয়ে দেবে। সব কিছুই কমপিউটারাইজড। প্রাোগ্রামড। কল দ্য পুলিশ। তারপর চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে গেটে নোটিশ ঝুলিয়ে তিন মাসের জন্য তালাবন্ধ। যা শালা তোরা যেখানে পারিস। লেবার সেক্রেটারি, চীফ মিনিস্টার সব দেখা হয়ে গেছে আমাদের। এখন সরকার চালায় আমাদের মালিকরা। অ্যাবসোলিউট পাওয়ার। কোনও লাল নীল রঙওলাদের শালা ক্ষমতা নেই ট্যাঁ ফোঁ করার। ভাত ছড়ালেই কাক মিলে যায় প্রচুর।

সান্যাল তোমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল,—কনগ্র্যাটস মুখার্জি। বলতে বলতে চোখ টিপছে, —তবে এম. ডি.-র কাছে রিপোর্ট দেওয়ার সময়ে আমাদের নামটাও করবেন। আই মীন কিছুটা রোল তো আমরাও...

কুরুভিলা দক্ষিণী কায়দায় মাথা নাড়ল,—ডোন্ট ক্রাই সান্যাল। ম্যানেজমেন্টের কাছে এক্স-কমিউনিস্টদের খাতিরই আলাদা।

তুমি নির্বাক। লোকগুলোকে কিছুই বললে না উত্তরে। ঠোঁট চেপে আলতো হাসছ। হাসিটা কান্নার মতো যেন! ওরা চেম্বার থেকে চলে যাওয়ার পর দু' আঙুলে মাথা টিপে বসে আছ। হলটা কী? অনুতাপ? অনুশোচনা? নাকি শ্রবণাজনিত নস্টালজিয়া? অল বুলশীট। ওঠো! হেড অফিসে ফিরে বরং এম.ডি.-র আদর গায়ে মেখে নাও—মুখার্জি ভাগ্যিস তুমি কমিউনিস্ট ছিলে একসময়। তোমাদের মার্কসিস্টদের মতো সিচুয়েশন ট্যাকল করতে আর কেউ পারে না। হা হা...

এম. ডি.-র হবু হাসিটা বুঝি কানে ফুটছে। তুমি টেবিলে ঘুষি মারলে...তোমরা শিক্ষিত তাই তোমাদেরই পৌঁছোতে হবে অর্ধশিক্ষিত হতদরিদ্র মানুষগুলোর কাছে। তাদের চেনাতে হবে প্রকৃত শ্রেণীশক্র কারা। কারা তাদের এক্সপ্লয়েট করছে...এই যে দালাল মুৎসুদ্দির দল...আহা করো কী মুখার্জি সাহেব? টেবিলে বার বার ঘুষি চালালে তোমার হাতেই লাগবে যে। বিবেক কামড়াচ্ছে? বিবেকবাবু এতদিন ছিলেন কোথায়? কাচের ওপর ঝুঁকে কাকে দেখছ? কোন অর্ণব মুখার্জিকে? ভালো করে দ্যাখো তো সেই ছেলেটাকে দেখতে পাও কিনা। সেই বাইশ বছরের টাটকা যুবক! দু' চোখে যার মায়াবী নতুন দেশ, চুল উসখো-খুসকো, গালজোড়া কচি নরম ঘাস! ছেলেটা শ্রবণার পাশে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে বলছে—আমরাই প্রতিষ্ঠা করব শোষণহীন সমাজ। চিহ্নিত করব...

টেলিফোন অপারেটর মেয়েটি ডাকছে,—মিস্টার মুখার্জি, এম ডি ইজ অন দ্য লাইন।

তড়াক করে উঠে বসেছে—ইয়েস স্যার।

—এনি নিউজ?

—এভরিথিং পারফেক্টলি অলরাইট স্যার।

—ভেরি নাইস। তুমি কখন হেড অফিসে আসছ?

—উইদিন টুয়েলভ স্যার।

ফোন রেখে অন্যমনস্কভাবে ফ্যাক্টরির বাইরে আসছ। শাবাশ, এর মধ্যেই স্লোগান শুরু হয়ে গেছে। এত তাড়াতাড়ি লোকগুলোকে গেটে ওরা অরগানাইজ করল কীভাবে! ড্রাইভার গাড়ি ঘুরিয়ে তোমার সামনে আনছে, সমস্বরে ধ্বনি তুলল ওরা।

—দালাল তুমি নিপাত যাও। নিপাত যাও। নিপাত যাও।

নিপাতিত হবে বইকি। এখখুনি। গাড়ির ভেতর ডানলপিলোর গদিতে। তুমি চোখে সানগ্লাস চড়ালে।

—মালিকের জুলুমবাজি মানছি না। মানব না।

মেনো না ভাই। পরশু থেকে তিন মাস পেট চেপে বসে থাকো। লক আউট নোটিশ ঝুলল বলে।

—দালাল তুমি সাবধান। শ্রমিক আছে হুঁশিয়ার।

বেশ। বেশ। গেট পার হওয়ার সময়ে দীপেন বিশ্বাসের সঙ্গে ফের চোখাচোখি হল। তুমি মুখ ফিরিয়ে নিলে। ওরা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে চলেছে—দুনিয়ার মজদুর এক হও।—একশো চল্লিশ বছরের পুরোনো স্লোগান, তবু কী ধার! গোটা চত্বর গমগম করছে যেন। অনেকটা দূর চলে আসার পরও বাজছে তার রেশ। বাজছে না, যেন হাতুড়ি ঠুকছে মাথায়। তোমার বুকটা কোনও কারণ ছাড়াই ঢিপঢিপ করে উঠল। ছাড়ো তো। বর্তমান আর্থ-সামাজিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে দীর্ঘ প্রস্তুতির দরকার। প্রয়োজন বলিষ্ঠ সংগঠনের। যথার্থ নেতার। হঠকারিতায় কোনও কার্যসিদ্ধি হয় না। একবার তো দেখেইছ বালখিল্য সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। ইতিহাসের দিকে দ্যাখো। রাশিয়া, ফ্রান্স, পোলান্ড, জার্মানি, চিন...। না হে না, ওভাবে হয় না। তবু কেন যে বুক কাঁপা থামে না তোমার! কেন যে একটা শুকনো মুখ বার বার মনে পড়ে! স্বপ্নে জাগরণে তাড়া করে এক পঙ্গু কিশোর।

তারাতলার মোড়ে এসে ডানদিকে ড্রাইভারকে গাড়ি ঘোরাতে বললে। আবার ভূতটা নাচছে মাথায়।

—এদিক দিয়ে কোথায় যাবেন স্যার?

দশ আঙুলে নিজের চুল খামচে ধরেছ,—যাদবপুর।

খোকন আজ বাইরের ঘরটাতেই রয়েছে। হুইল চেয়ারে বসে গভীর মনোযোগে কী যেন লিখছে। সামনে ভেজা ন্যাতার মতো ঝুলছে শুকনো দুটো পা। ঢলঢলে পাজামার তলায় ঠ্যাঙজোড়া লতপত টেবিলফ্যানের হাওয়ায়। উ:, কী নিষ্ঠুর দৃশ্য। চারদিকে ছড়ানো জামা-কাপড়, বাসন। গোটাকয়েক বই-খাতা কাঠের র‌্যাকে এলোমেলো সাজানো। এক ঘর জিনিসপত্রের মধ্যে একদম একা হয়ে বসে আছে ছেলেটা। অজস্র দামাল চুল কামড়ে ধরে আছে ওর কপাল, চোখ। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দরজায় দাঁড়িয়ে রইলে তুমি।

—আরে আপনি? হঠাৎই চোখ তুলে অবাক হয়েছে খোকন।

তুমি অল্প হাসলে,—কেমন আছ?

—ভালো। ঝিকমিক হাসিতে ভরে গেল খোকনের মুখ,—দাঁড়িয়ে রইলেন কেন? ভেতরে আসুন। বলতে বলতে খাতা-কলমটা গুঁজে রাখল চেয়ারের খাঁজে,—মা কিন্তু নেই। স্কুলে।

—আমি তোমার কাছেই এসেছি। ওর সামনে মোড়া টেনে বসলে তুমি,—কী লিখছিলে অত মন দিয়ে?

—তেমন কিছু না। খোকনের হাসিতে লজ্জা এল। মনে হয় কবিতা-টবিতা। এই বয়সে খোকনদের বুকে তো শুধু কবিতাই থাকে।

—চা খাবেন? সরলাদি করে দিতে পারে।

—উঁহু। আজ শুধুই তোমার সঙ্গে গল্প করতে এসেছি। কাঙালের মতো ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছ। কাউকে খুঁজছ কি? সবুজ-সবুজ মনের কোনও হারিয়ে যাওয়া কিশোরকে? একচিলতে জানলার বাইরে দুপুরের আকাশটা লটকে কাছে কাটা ঘুড়ির মতো। গরম বাতাস মাঝে মাঝে ঝাঁপ দিচ্ছে ঘরে। চারদিক স্তব্ধ, তরঙ্গহীন। এভাবেই সারাটা দুপুর একা-একা বসে থাকে নাকি ছেলেটা? বান্ধবহীন? নি:সঙ্গ? তুমি এদিক-ওদিক তাকালে,—কী করো সারা দুপুর? পড়াশুনো?

—পড়ি। লিখি। চুপচাপ শুয়েও থাকি। কখনও কখনও দু-একজন বন্ধুবান্ধব আসে। স্কুলের।

—কোন স্কুল তোমার?

—এখান থেকে কাছেই। রামচরণ বিদ্যাপীঠ। খোকনকে আচমকা কেমন বিষণ্ণ দেখাল,—মাধ্যমিক দিয়েছিলাম এবার। রেজাল্ট ইনকমপ্লিট।

—সে কি? কেন? তোমার ভুরু জড়ো হল।

—জানি না। খোকন মাথা নামাল,—মা অনেক ছোটাছুটি করেছে। মার্কশিটের জন্য। কিছুই হল না। কোনো সাবজেক্টের খাতা-ফাতা মনে হয় হারিয়ে গেছে।

তোমার শরীর শিরশিরিয়ে উঠল। কী অবলীলায় কথাগুলো বলে যাচ্ছে ছেলেটা। শ্রবণা তবে সেদিন সেকেন্ডারি বোর্ডের অফিসেই গিয়েছিল! তোমাকে একবারও বলল না কেন? ওখানকার ডেপুটি সেক্রেটারি চক্রবর্তী তোমার এক গেলাসের দোস্ত। তুমি ব্যস্তভাবে ঝুঁকলে,—তোমার রোল নাম্বারটা আমাকে দাও তো।

—কী হবে? খোকন বিজ্ঞের মতো ঠোঁট ওলটালো,—এখন যেভাবে কাজ হয়, তাতে প্রতিবছরই কারুর না কারুর খাতা হারিয়ে যায়! কেউ কোথাও সিনসিয়ারলি কাজই করতে চায় না! জানেন, আমাদের স্কুলের দশজন ছেলের রেজাল্ট ইনকমপ্লিট।

ছেলেটা বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারে তো! প্রাজ্ঞ মানুষের মতো! তুমি হেসে ফেললে,—তবু দাও না! চেষ্টা করতে ক্ষতি কী?

পাতলা ঠোঁটে যেন হতাশা, কাঁপছে,—পাস করেই বা কী হবে?

সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তুমি ওর কাঁধ ছোঁওয়ার চেষ্টা করলে। সঙ্গে সঙ্গে স্বচ্ছ চোখে তোমার দিকে তাকিয়েছে ছেলেটা। তীক্ষ্ণ জিজ্ঞাসা ফুটে উঠছে মুখে,—আচ্ছা, আপনি কি এখনও বিশ্বাস করেন প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু কিছু পেটি বুর্জোয়া ক্লাসই তৈরি হয়?

তুমি থতমত খেয়ে গেলে। ছেলেটা এসব বলে কী?

—তুমি এসব জানলে কোথথেকে?

—মা-ই তো বলে। মার কাছ থেকে আপনাদের অনেক কথা শুনেছি।

চাপা উত্তেজনায় টান টান হয়ে উঠেছ। কী বলেছে শ্রবণা! ছেলেটা কি সারাক্ষণ শুধু ওই সব কথাই ভাবে নাকি? প্রতিক্রিয়াশীল! পেটি বুর্জোয়া! আসলে সঙ্গীসাথী বিশেষ নেই বলেই হয়তো...। বেরোতেও তো পারে না কোথাও। বাপ্পার কিছু স্লাইড ভেসে উঠছে তোমার চোখের সামনে। খোকনের থেকে ছোটই। এর মধ্যেই কী স্মার্ট, চৌকস। হাঁটা-চলা সবকিছুতেই ঝকঝকে ভাব। মনট্রিলেই হয়েছিল। সাতাত্তরের সেপ্টেম্বরে। বাই বার্থ ওখানেও সিটিজেনশিপ আছে একটা। রাকার ইচ্ছে আর একটু বড়ো হলে একে আবার ওখানেই পাঠিয়ে দেবে। তোমার বাসনা অন্যরকম। কানাডার থেকে স্টেটসে গেলে অনেক বেশি...

—কী ভাবছেন?

তুমি সামান্য হোঁচট খেলে। সঙ্গে সঙ্গে কোনও কথা বলতে পারলে না।

—আপনাদের দিনগুলো কী ভয়ঙ্কর ছিল, তাই না?

—হুঁ। তুমি প্রসঙ্গ ঘোরাতে চাইছ,—ওসব ছেলেমানুষির কথা বাদ দাও। তুমি কী ভালবাস বলো তো?

—বই পড়তে। খোকনের দ্রুত উত্তর,—লিটারেচার, হিস্ট্রি। কবিতা। আপনিও তো খুব ভালো আবৃত্তি করতে পারেন, তাই না?

—তোমার মা একথাও বলেছে বুঝি? তোমার গলায় হালকা লজ্জা এল,—আর কী বলেছে?

—তেমন কিছু না। এই যেমন আপনি, মিহির হালদার, প্রেসিডেন্সির বিখ্যাত ছাত্র ছিলেন। থার্ড হয়েছিলেন হায়ার সেকেন্ডারিতে।

এবার বিস্ময়ে তোমার মুখ হাঁ। আশ্চর্য! শ্রবণা তোমার নাম ওর কাছে পালটে বলেছে কেন? অর্ণব মুখার্জি নামটা পুরোপুরি মুছে ফেলতে চায় জীবন থেকে? এত ঘেন্না তোমাকে? এত ঘেন্না? এত? গোটা শরীর নাড়িয়ে রাগ আসছে তোমার। রাগ, না বিকর্ষণ? আর এসো না এখানে অর্ণব! কখখনো না। এখানে তোমার জন্য...। ছেলেটা তোমার ভাব পরিবর্তন লক্ষ করছে। তুমি চোয়ালে চোয়ালে চেপে নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করছ,—আর কী জান?

—আপনি জীবনানন্দ ভালোবাসতেন খুব। আমার বাবার মতো। বলতে বলতে কিশোরের চোখে আকাশ নেমে এল,—আমিও খুব জীবনানন্দ ভালোবাসি। সুকান্তও।

আরে আরে, তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠেছ কেন অর্ণব মুখার্জি? খোকনের মুখের কাছে মুখ নিয়ে গেছ। চোখে শিশুসুলভ কৌতুহল,—তোমার বাবাকে তুমি দেখেছ?

—না। আমার জন্মের আগেই তো কোথায় যেন...খোকনের মুখ ম্লান হয়ে এল। বাইরে বোধহয় একটু একটু মেঘ করেছে। ঘরের ভেতর আলোটা কমে গেছে হঠাৎ। অথবা খোকনের ম্লান বিষাদ খোলা জানলা দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। সেই বিষাদ ক্রমে গ্রাস করে নিচ্ছে তোমাকেও। অনিচ্ছুক শরীরটাকে ধীরে ধীরে টেনে তুললে। হঠাৎ কি মনে পড়ে গেল এম.ডি. অপেক্ষা করছে? বারোটায় বলেছ, না হয় চারটেতেই পৌঁছোলে। আজ তো তোমার সাত খুন মাপ।

—উঠলেন যে?

—হুঁ। হাসতে গিয়ে পরিষ্কার হাসি ফুটল না ঠোঁটে,—হঠাৎ একটা কাজের কথা মনে পড়ে গেল।

—আপনি ভীষণ কাজের লোক, তাই না? সেদিনও বেশিক্ষণ বসতে পারলেন না—

খোকন কি বিদ্রুপ করছে? না না, বড় মায়াবী কিশোর। সরল।

—ঠিক বলেছ। আমার খুব বিশ্রী দায়দায়িত্ব। চঞ্চল হয়ে দরজা অবধি গিয়েও ফিরলে,—তোমার অ্যাডমিট কার্ডটা দিলে না?

—নেবেনই? খোকন অবিকল প্রাপ্তবয়স্ক গলায় জিজ্ঞাসা করল। হাতের চাপে হুইল চেয়ার ঘুরিয়ে কাঠের র‌্যাকের দিকে যাচ্ছে। প্লাস্টিকের প্যাকেট থেকে কাগজটা বার করল,—জেরক্স কপি দিলাম। অসুবিধে নেই তো?

ঈশ্বর। ঈশ্বর। ঈশ্বর। প্রবেশপত্রটি খুলে নিষ্পলক হয়ে গেছ। ভেতরের চাপা কষ্টটা খাঁচা ভেঙে ছিটকে আসতে চাইছে। ঠকঠক করে কাঁপছে দুটো হাত। ...অনির্বাণ মুখার্জি... সান অফ অর্ণবকান্তি মুখার্জি।

ছেলেটাকে হতভম্ব করে দিয়ে রাস্তায় ছিটকে এসেছ তুমি।

রাজকন্যা বিম্ববতী সতীনের মেয়ে, ধরাতলে রূপসী সে সবাকার চেয়ে।...এছাড়া মায়াদর্পণ অন্য কথা বলতে পারে না অর্ণব। পর পর তিন রাত্রি বেহেড মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরলে, জর্জরিত হলে রাকার প্রশ্নের ঝাপটায় তবুও দিল্লির ফ্লাইটটা ছেড়ে দিতে হল। আয়নাটাকে হাজার আছাড় মারলেও ঠিক তাতে প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে, তাই না? সত্যের প্রতিচ্ছবি। বেশ তো ছিলে। স্বর্গের সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলে তরতর। কী কুক্ষণে যে দেখা হল শ্রবণার সঙ্গে। আরে ইয়ার, ওঠার সময় কখখনো পিছন ফিরে তাকাতে নেই। তাকিয়েছ কি ব্যস। একশোটা অক্টোপাস পা কামড়ে ধরবে। উজান স্রোতে ভেসে থাকা যে কী কঠিন! গাড্ডায় পড়ে ফরিদাবাদ মাথায়। রিজন—অর্ণব মুখার্জি ইজ সিক। নিজের কানে শোনো কথাটা—অর্ণব মুখার্জি ইজ সিক। চাকরি জীবনে এই প্রথম। অথবা শুরু বলতে পারো। তোমাকে দেখে রাকা কিন্তু সত্যিই ঘাবড়ে গেছে। একা একা বারে বসে আগে ড্রিঙ্ক করতে না তো কোনওদিন। কী হাল করেছ নিজের! করমচা-লাল চোখের নীচে দু' তিন পোঁচ কালি, চুল উসকো খুসকো, ঠোঁটে সিগারেট। ব্যালকনিতে যখন তখন বসে আছ নিঝুম! এই নিয়ে সকাল থেকে মগ তিনেক ব্ল্যাক কফি দিল রঘু তবু হ্যাঙওভার কাটে কই! বেতের দোলনা-চেয়ারে শরীর দুলছে নিজের খেয়ালে, আপন গতিতে ছুটছে মন...ফরিদাবাদে যদি চলে যেতেই হয়...খোকনকে কি ফেলে...শ্রবণা কী ভাবে...মার্কশীটটাকে ঠিক করা...একটা ভালো নিউরোলজিস্ট যদি...ডক্টর লাহিড়ী বা ডক্টর গোস্বামী...!

নিজের মধ্যে ডুবে থাকলে বাইরের পৃথিবীটাই বুঝি কোন মায়াবলে অদৃশ্য হয়ে যায়। তাই বোধহয় দেখতে পাচ্ছ না রাকাকে! মেয়েটা স্থির তাকিয়ে তোমার দিকে। অনন্তকাল। চোখেমুখে থমথমে অভিমান।

—তুমি আজও বেরোবে না?

—উঁ?

—জিজ্ঞাসা করছি আজও কি অফিস বাতিল?

—কেন? মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল। শব্দটার কোনো অর্থ হয় না। রাকা শান দেওয়া চোখে তোমাকে একবার জরিপ করে চলে গেছে রেলিঙ-এর ধারে। গ্রিল আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। দৃষ্টি দূরের পার্কটির দিকে। স্বচ্ছ নাইলনের নাইটির আড়ালে ফুলের মতো ফুটে রয়েছে ওর মোমশরীর। ফোলা ঠোঁটে রাকাকে কেমন খুকি-খুকি দেখায়। কয়েক পলক সেইদিকে তাকিয়ে তুমি মুখ ফিরিয়ে নিলে—বেরোতে পারি। কেন?

রাকা তাকাল না। তুমি আরেকটা সিগারেট ধরিয়েছ। কদিন ধরে বড় বেশি ধূমপান হয়ে যাচ্ছে। তবু যদি নার্ভগুলো বাগে আসে। বেশ কিছুক্ষণ পর রাকা ঘুরে দাঁড়াল।— তোমার সত্যি কী হয়েছে বলো তো? কদিন ধরে পাগলের মতো আচরণ করছ কেন?

সকাল থেকে আজ মেঘ জমেছে আকাশে। সেই মেঘ যেন নেমে আসছে রাকার চোখে। তোমার কিঞ্চিৎ করুণা হল। নাটকের নায়কের মতো স্বর্গতোক্তি করে উঠলে,—আমি অ' ফুলি টায়ার্ড রাকা। সিম্পলি এগজসটেড।

—ফর হোয়াট? রাকা ঝনঝন বেজে উঠেছে।

—আই ডোন্ট নো। আনএক্সপ্রেসেবল। সব কেমন আপসেট হয়ে গেছে।

রাকা ঠোঁট বেঁকিয়ে বিচিত্র মুখভঙ্গি করল,—আমি কি তোমাকে, আই মিন, ক্যান আই হেল্প ইউ?

তুমি মৃদু মাথা দোলালে।

—তুমি কি অফিসের প্রবলেম নিয়ে...?

—নট ফুললি? দাঁতে বুড়ো আঙুল কামড়ে ধরেছ তুমি। মুখে দু:খ আর অনুশোচনার পোজের দোটানা,—তবে চাকরিটা ভাবছি ছেড়েই দেব।

—হোয়াই?

—তুমি বুঝবে না।

—খুব বুঝব। রাকা অধৈর্যভাবে চুল ঝাঁকাল,—দ্যাখো, ফরিদাবাদ যাওয়াটা মোটেই কোনও প্রবলেম না। সেখানে অফিস তোমাকে ফারনিশড বাংলো দেবে। গাড়ি দেবে...হ্যাঁ, তুমি বলতে পারো বাপ্পাকে নিয়ে একটু অসুবিধে হতে পারে। আমরা চলে গেলে...বাট উই ক্যান পুট হিম অ্যাট এনি গুড স্কুল ইন ডেলহি। কলকাতার থেকে দিল্লি ফার-ফার বেটার।

—হয়তো। দু:খকে পরাজিত করে অনুশোচনার পোজটা মুখ দখল করে নিচ্ছে তোমার। সিগারেটের টুকরোটা ছুঁড়ে দিলে নীচের সবুজ লনে,—এতগুলো লোককে ভাতে মেরে...

—হেল উইথ ইওর ব্লাডি সেন্টিমেন্টস। তুমি দুনিয়ার সব লোকের ভাত-কাপড়ের ইজারা নিয়ে রাখোনি। তাছাড়া নিজেই তো বলছ মাস তিনেকের মধ্যে লকআউট, ফকআউট ক্লিয়ার হয়ে যাবে।

তুমি দু' হাতে মুখ ঢাকলে। রাকা বুঝবে না। বোঝার কোনও সঙ্গত কারণও নেই। কিন্তু অর্ণবকান্তি, তুমি কি শুধুই লকআউটের কারণেই মনমরা? নাকি, মসি লেপি দিল তবু ছবি ঢাকিল না, অগ্নি দিল তবুও তো গলিল না সোনা! ঘুমে মদে, বিভ্রমে শ্রবণা শ্রবণা! আরও বেশি গভীরভাবে ফুটে উঠছে শ্রবণা। অ্যাডমিট কার্ডটা দেখার পর থেকেই। কী করবে এখন? শূলে চড়বে নাকি?

—লিসন অর্ণব। রাকা তোমার গায়ের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। গলার স্বর ক্রমশ কোমল,—বি প্র্যাকটিক্যাল হানি। আজ অফিস জয়েন করে যাও। যদি দিল্লি যেতে হয় তো...

তুমি আচ্ছন্নের মতো উঠে দাঁড়ালে। যান্ত্রিকভাবে সারলে স্নান, খাওয়া, পোশাকপরা। নেশাগ্রস্তের মতো দরজা খুলে নেমে এলে নীচে। গাড়িতে স্টার্ট দিলে। নিশিপাওয়া মানুষের মতো পৌঁছে গেলে অফিস নয়, শ্রবণার গলির মুখে।

দরজা খুলে একটুও অবাক হয়নি শ্রবণা। শ্রবণা বোধহয় অবাক হতে ভুলে গেছে। নাকি জানত তুমি আসবে? নির্লিপ্ত গলায় ডাকল,—এসো।

হঠাৎ আবেগে ছুটে এসে তুমি হাঁসফাস করছ। ঘামে ভিজে ডবলবুল শার্ট লেপটে গেছে গায়ে। দরজা ধরে কয়েক সেকেন্ড আবেগ সামলালে। শ্রবণা ঘরের জানালাটা খুলে দিচ্ছে। ছিটের পর্দা টান-টান করে দিল। বাইরের ভারী আকাশ এবার গুমোট ছাড়তে শুরু করেছে। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে এক্ষুনি জোরে বৃষ্টি আসা দরকার। শ্রবণা চেয়ার টেনে দিল,—বোসো।

তুমি পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করলে,—খোকন কই?

শ্রবণা মরালীর মতো ঘাড় ঘোরাল। আগের দিনের তুলনায় আজ অনেক সতেজ, সুন্দর। লালপাড় তাঁতের শাড়ি শরীরে আলগা জড়ানো, পিঠের ওপর খোলা চুল। মনে হয় একটু আগে স্নান করেছে। গা থেকে একটা হালকা মিষ্টি গন্ধ উঠছে। তেল কিম্বা সাবানের। অথবা পরিপূর্ণ নারীর।

—আমি আগে দু'দিন এসেছি।

—জানি। খোকন বলেছে। শ্রবণা হাত দেখিয়ে তোমাকে আবার বসতে বলল।

—তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল। বাক্যটুকু বলতে গিয়ে তুমি তিনবার তোতলালে। কী রিডিকিউলাস অবস্থা! লেবারলিডারদের গড়গড় করে বক্তৃতা দিয়ে শেষে...।

শ্রবণার স্বর শান্ত,—আমারও।

তুমি কথার ফাঁকে এদিক-ওদিক চোখ ঘোরাচ্ছ। ভেতরের ফালি ঘরটাতেও আলগোছে উঁকি দিলে, খোকন নেই?

—না। সপ্তাহে দু' দিন ওকে একটা ফিজিওথেরাপি সেন্টারে যেতে হয়। কাছেই। সরলাদির সঙ্গে। শ্রবণা টেবিল ফ্যানটা জোর করে দিচ্ছে,—কিছু হবে না জানি। তবু চেষ্টা...।

—আমি সে কথাই বলতে এসেছি। সহজেই কথাটা পেড়ে ফেলতে পেরে তোমার বেশ ফুরফুরে লাগল নিজেকে,—খোকনের একটা ব্যবস্থা করে ফেলেছি।

—কীসের?

—আমি ভালো নিউরোলজিস্টকে দেখাতে চাই। ইনফ্যাক্ট, দু'জন বড় ডাক্তারের সঙ্গে কথাও বলেছি। খোকনকে নিয়ে যেতে হবে।

শ্রবণা কোনও কথা বলল না! নি:শব্দে খোকনের বইপত্র গোছাচ্ছে। পিছন ফিরে। মনে পড়ে চম্পাহাটিতে সেদিন ঠিক এভাবেই দেওয়ালের দিকে ফিরে, চোখের জল গোপন করেছিল শ্রবণা? তোমার জন্য খবর এসেছে, বাবা ভয়ানক অসুস্থ। হার্ট অ্যাটাক। তোমাকে দেখতে চান। তুমি মার মুখ দেখেই ধরে ফেলেছিলে খবরটা মিথ্যে। তোমার মা কোনওদিনই দৃঢ়ভাবে মিথ্যে কথা বলতে পারতেন না। সেটা শ্রবণাও বুঝেছিল। তাতে অবশ্য তোমার ফেরা আটকায়নি। আসবার সময় শ্রবণার পিঠে হাত রেখেছিলে—সাবধানে থেকো। পারলে ফিরে গিয়েই এল.সি.-র সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। খবর না পাওয়া পর্যন্ত এখান থেকে কোথাও যেও না। তারপর শ্রবণা কোথায় গিয়েছিল? কীভাবে ধরা পড়ে গেল?

আজও কি কাঁদছে শ্রবণা? আশপাশের ঘর থেকে নানারকম কোলাহল ছুটে আসছে। এ বাড়ির একতলায় শ্রবণারা ছাড়াও দু' ঘর ভাড়াটে। তোমার খুব ইচ্ছে করছে সেদিনের মতো শ্রবণার পিঠে হাত রাখতে। দাঁড়িয়ে উঠেও বসে পড়লে, —তুমি উত্তর দিচ্ছ না? তোমার আপত্তি আছে?

—যদি বলি আছে? শ্রবণা ফিরল।

—কেন?

শ্রবণার চিবুক শক্ত হচ্ছে! জেদ কিম্বা অভিমান গোপন করার চেষ্টা করলে ঠিক এরকম ভাঁজ পড়ত চিবুকে,—আমার ছেলের চিকিৎসা আমি নিজেই করাতে পারি।

—তা তো পারোই। এতদিন তো একা একাই লড়াই করেছ। আজ যদি আমি একটু কিছুও করতে পারি...

—পারো কি? শ্রবণা অদ্ভুত হাসল। হাসিতে বিদ্রুপ? না প্রত্যাখ্যান? তোমার এবার একটু একটু রাগ হচ্ছে। নিজেকে সামলাও অর্ণব। তুমি প্রায়শ্চিত্ত করতে এসেছ।

ভেতরের ঘরটার পরে বোধহয় রান্নাঘর। সেখান থেকে আচমকা প্রেসার কুকার হুইসিল দিয়ে উঠল। শ্রবণা চমকেছে—এক সেকেন্ড। নামিয়ে আসছি, বলতে বলতে দৌড়ে ভেতরে গেছে। চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করল,—চা খাবে? বসাব?

তুমি নিরুত্তর। শক্ত হয়ে বসে আছ। মাঝে মাঝে অস্থির হাতে নাড়াচাড়া করছ খবরের কাগজটা। শ্রবণা ফিরে এল,—বললে না চা খাবে কি না?

—না। তুমি আমার সামনে এসে বোসো।

শ্রবণা মোড়া টানল। ফার্স্ট পয়েন্ট, সেকেন্ড পয়েন্ট, থার্ড, এভাবে না বলতে পারলে তোমার বোধহয় অসুবিধা হয়। তাই বুঝি গলা কেঁপে গেল,—তুমি কি এখনও ইয়ে মানে রাজনীতি করো?

শ্রবণা হাসল,—এখনও মানে? রাজনীতি করতাম কবে?

উত্তরটার মানে কী? তোমার চোখে প্রশ্ন। ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছ।

—আমি রাজনীতি করতাম না অর্ণব। আমার কিছু বিশ্বাস ছিল। সমাজ সম্পর্কে। মানুষ সম্পর্কে। এখনও আছে।

—তা ঠিক। তুমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলে, —হ্যাঁ, রাজনীতি মানেই তো ধান্দাবাজি। মরে শুধু বোকারা। বলতে বলতে ঈষৎ উত্তেজিত,—সতেরো বছর আগেও মরেছে। এদেশে কমিউনিজমের নামে...

তোমাকে মাঝপথে থামাল শ্রবণা,—এটা বোধহয় তোমার বিষয় নয় অর্ণব। তুমি যেখানে আছ সেখান থেকে এসব বিচার করা যায় না। তোমার সে অধিকারও নেই।

নতুন করে ম্রিয়মাণ হচ্ছ। শ্রবণা এভাবে কথা বলছে কেন? কিছুতেই কি বিশ্বাস করানো যায় না তুমি ওর পাশে দাঁড়াতে চাও? কয়েক মুহূর্ত স্থির তাকিয়ে রইলে ওর দিকে। এই সেই মেয়ে। তোমার প্রেমের, তোমার স্বপ্নের, হীনমন্যতাবোধের শ্রবণা। রাগ ক্রমে যন্ত্রণা হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। গভীরে। আরও গভীরে। অকস্মাৎ শ্রবণার হাত চেপে ধরেছ,—আমার সম্পর্কে তোমার ধারণা খুব খারাপ, তাই না?

শ্রবণা হাত ছাড়াল না। উলটে অন্য হাতটা রাখল তোমার হাতের ওপর,—দূর পাগল। তুমি খারাপ হবে কেন? তুমি তোমার মতন।

শ্রবণার স্পর্শে তেমোর সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে যাচ্ছে। কাতরভাবে বলে উঠলে,—বিশ্বাস করো, আমি কোনও খবর জানতাম না। অনেক চেষ্টা করেও কোনওভাবে যোগাযোগ করতে পারিনি। সত্যি বলছি। তোমাকে হঠাৎ সেদিন দেখে...

শ্রবণার গলা কাঁপছে এবার,—মানুষ পরিস্থিতির দাস। তুমি, আমি, সব্বাই। আমার কোনও অভিযোগ নেই।

—তবে তুমি সাহায্য নেবে না কেন?

তোমার সামনের নারীমূর্তি আবার নীরব। হাতটা আলতো করে সরিয়ে নিচ্ছে। মোড়া থেকে উঠে জানলার ধারে গেল।

—তোমার মনে পড়ে অর্ণব, তুমি একদিন নিজের হাতে মানিকতলায় দু'জন ডাক্তারকে ধমক দিয়ে চিঠি লিখেছিলে। তারা বেশি ফিজ নিত। তোমার স্পেশালিস্টদের ফিজ কি তার থেকে কম?

কথাটা বুঝি সপাং করে বাজল তোমার পিঠে। সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছ।

—খোকনের মার্কশীট তুমি কীভাবে ঠিক করবে? বোর্ডের অফিসারকে মদ খাইয়ে? না ঘুষ?

অসহ্য। একটা আদিম পশু আচমকা গর্জন করে উঠল তোমার ভেতর থেকে। নীল রক্তে যেন আগুন ধরে গেল,—চুউউপ করো। এতই যদি তোমার নীতিবোধ, ছেলের বাবা হিসেবে আমার নাম রেখেছ কেন? এত ঘেন্না আমাকে যে ছেলের কাছে আমার নাম বলো মিহির হালদার? তোমার লজ্জা করে না?

শ্রবণা কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে রইল। ধীরে ধীরে জড়ো হচ্ছে ভুরু। জানলার ধার থেকে ফিরে আসছে। মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। মানবী নয়, যেন ধারালো জমাট বরফ,—তা অবশ্য ঠিক। বাবা হিসেবে তোমার নাম না দিয়ে সেই পুলিশের লোকগুলোর নাম দিলেও আমার চোখে কোনও তফাৎ হত না। কিংবা কোনো অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের। বা কোনও মন্ত্রীর। বা তোমাদের সমাজের যে-কোনও লোকের। খোকন তো তোমাদেরই ছেলে। তোমাদের সমাজের।

চাবুকটা বুঝি তোমাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে এবার রক্তাক্ত করবেই। তীব্র যন্ত্রণায় মুখ চোখ কুঁচকে গেছে তোমার। মাথার চুল খামচে ধরে আবার বসে পড়েছ। বসেই আছ। দু:সহ কিছু মুহূর্ত। তারপর আবার শ্রবণার স্পর্শ তোমার মাথায়,—রাগ কোরো না। তোমার নামটা আমার জীবনে একমাত্র দুর্বলতার চিহ্ন। আমার ছেলের চোখে তার বাবা একটা আদর্শ। আমি চাইনি তোমাকে দেখে তা ভেঙে যাক।

তোমার চোখ জ্বালা করছে। শেষে কেঁদেই ফেলবে নাকি? ট্র্যাজিক হিরোর মতো! হ্যামলেট রি-ইনকারনেটেড! ওঠো, সাহস আনো। চোখে চোখে তাকাবার চেষ্টা করো শ্রবণার। পারছ না কিছুতেই? শ্রবণার চোখ কিন্তু তোমার মুখে স্থির। ও তোমাকে চিনতে পেরেছে। শেষবারের মতো ওর গলার আওয়াজ ধাক্কা মারছে তোমাকে—তুমি কেন আমাকে দেখতে পেলে অর্ণব?...তুমি আর এসো না।

মাথা নীচু করে বসে আছ। এতক্ষণ পর তুমুল বৃষ্টি নেমেছে বাইরে।

তোমার চেম্বারের রঙ অফ-হোয়াইট। পর্দার রঙ কচি কলাপাতা। টেলিফোন লাল, সাদা, বাদামি। টেবিল ঝকঝকে ওয়ালনাট। জামা ফিকে গোলাপি। কিন্তু এর মধ্যে একটা রঙও যে তোমার নিজের নয় হে, অর্ণবকান্তি! তবে কি শ্রবণার দেওয়া ওই চাবুকের দাগগুলোতেই রয়েছে তোমার প্রকৃত রঙ? নিশ্চয়ই তাই। নইলে দরজার বাইরে লালবাতি জ্বালিয়ে নির্জন ঘরে ছটফট করে মরো? কী খোঁজো? প্রত্যাবর্তনের সুড়ঙ্গপথ! নিজের চেয়ারে দু' সেকেন্ড চুপ বসে থাকতে পারছ না। আহত সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করছ। হুড়মুড় করে ছুটে গেলে জানলার সামনে। দু' হাতে সজোরে সরিয়ে দিচ্ছ ভারী পর্দা। পরমুহূর্তে টেনে ঢেকে দিয়েছ জানলাটাকে। টেবিলটাকে হন হন পাক খেলে কয়েকবার। একবার চেয়ারের হাতলেও বসবার চেষ্টা করলে। পেপারওয়েটগুলো লাট্টুর মতো ঘোরাচ্ছ। একি, ওটা হাতে তুলে নিয়েছ কেন? সর্বনাশ! দেওয়ালে ছুঁড়ে মারবে নাকি? নিজের ভেতর এ কী বিপন্ন অস্থিরতা! অঙ্গে অঙ্গে শিরা যত রাণীরে দংশিল যেন বৃশ্চিকের মতো—চাবুকটা খুব জোর পড়েছে হে। টয়লেটে ঢুকে আয়নায় কি দেখো তন্ন তন্ন করে? হৃৎপিণ্ডের দাগ আয়নায় ফোটে না। চকচকে সবজে গালটাকে বুড়ো আঙুলে ঘষছ চেপে চেপে। ফর গডস সেক, একটু সংযত হও। কী ভাবছ দাঁতে দাঁত চেপে? চাকরিটা ছেড়ে দিলে কেমন হয়? ওফ, সেই উন্মাদনার দিনগুলো! ঝোপে-জঙ্গলে লুকিয়ে থেকেও কী সাঙ্ঘাতিকভাবে জ্যান্ত ছিলে! ভুল দিন। তবু দিন তো। পৃথকভাবে দিন। শুধু চব্বিশটা যান্ত্রিক ঘণ্টা তো নয়। আরে আরে, এত্ত তন্ময় হয়ে গেছ কেন? ফোনটা যে বেজেই চলেছে। তাকাও। এই তো বেশ ফিরছ পিছলে পিছলে। টেবিলের দিকে। তোলই না। ভয় কি?

—কী মুখার্জি, সাড়া নেই কেন? এগেইন ফিলিং সিক?

এম.ডি.-র গলা যেন গলা নয়, সাপুড়ের বাঁশি। ধীরে ধীরে বশ হয়ে যাচ্ছে ছটফটে সাপটা। প্রথমে স্থির হল। তারপর ফণা দোলাচ্ছে,—নো স্যার। আয়াম ফাইন।

—দেন গেট রেডি ফর আ বিগ সারপ্রাইজ! ঘণ্টাখানেকের মধ্যে জানতে পারবে।

শঙ্খচূড়ের ফণা থরথর কেঁপে উঠল। নিশ্চয়ই একটা লিফট। আরও একধাপ।

—তোমার হাতের কাজ শেষ হলে আমার ঘরে একবার চলে এসো। লেবাররা কদিন ধরে কারখানার সামনে বড্ড বাড়াবাড়ি করছে। ডি সি সেন্ট্রালের সঙ্গে একবার আলোচনা করা দরকার।

—যাচ্ছি স্যার। এখখুনি।

এম. ডি.-র ফোন যেন চাপ দিয়ে বিষটা বার করে নিল। ঝরে যাচ্ছে টপটপ, টপটপ। সাপ চেয়ারে নেতিয়ে পড়ছে। অভিনন্দন মুখার্জি সাহেব। ওয়ান মোর ফেদার টু ইওর লরেল। সাপটা আবার নিশ্চিন্ত ভঙ্গিমায় খেলা দেখাতে পারবে! নো ফোঁসফোসানি। নো ছোবল। নিজেকে ছাড়া। কুরুভিলা আগেই বলেছিল, হোয়েন ইউ ড্রিঙ্ক মুখার্জি, ইউ স্মেল মার্কসিস্ট। কুরুভিলাটাও কি চাবুক চালাতে জানে? এখন অত ভাবার সময় নেই। ইঁদুরটা এখন আবার দৌড়ের জন্য প্রস্তুত। টাই-এর নটটা ভালো করে বেঁধে নিচ্ছে গলায়।

এই-ই ভাল। শ্রবণারা তবে আসুক তোমার মধ্যরাত্রের স্বপ্নে, জাগরণে। অথবা ব্লাডিমেরির গেলাসে। বুদ্বুদের মতন।

অধ্যায় ১ / ২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%