স্যার আর্থার কোনান ডয়েল

পরিচ্ছেদ ১ঃ অশুভ সংকেত
‘ভাবতে শুরু করেছি,’ বললাম আমি।
‘আমারও তাই করা উচিত,’ অধৈর্য ভঙ্গিতে বলল শার্লক হোমস।
আমার বিশ্বাস, মানুষের মধ্যে আমি এমন একজন যে বহুদিন ধরে কষ্ট পাচ্ছি; কিন্তু স্বীকার করতেই হবে, বন্ধুর এরকম ব্যাঙ্গোক্তিতে বাধা পেয়ে বিরক্তি হল আমার।
‘সত্যি হোমস,’ ঝাঁঝের সঙ্গে বললাম আমি, ‘মাঝে মাঝে তুমি এমন আচরণ করো।’
নিজের ভাবনায় এতটাই ডুবে আছে সে, যে, আমার ভর্ৎসনার তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর পেলাম না। নিজের হাতের দিকে ঝুঁকে এল সে, না-খাওয়া প্রাতরাশ পড়ে আছে সামনে, একদৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে হাতের টুকরো কাগজটার দিকে, যেটা সে লম্বা খামটা থেকে এখুনি টেনে বের করল। তারপর সে খামটাকেই টেনে নিল, আলোর সামনে ধরল উঁচু করে, খুব সাবধানে দেখতে লাগল খামটার বাইরেটা আর সেটা মুড়ে দেবার ফ্ল্যাপটা।
‘লেখাটা পোরলকের,’ চিন্তিতভাবে সে বলল, ‘কোনো সন্দেহই নেই যে লেখাটা পোরলক-এর, যদিও এর আগে মাত্র দুবার ওর লেখা চোখে পড়েছে আমার। গ্রিক ‘e’ অক্ষরের ওপর যে অদ্ভুত টানটা, এটা ওরই হাতের। কিন্তু যদি এই লেখা পোরলকেরই হয়, তাহলে তো এটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ কিছু।’
আমাকে নয়, নিজেকেই বলছিল সে কথাগুলো, কিন্তু আমার বিরক্তি ততক্ষণে উধাও, বরং আগ্রহ জাগিয়ে তুলেছে তার কথাগুলো।
‘পোরলক তাহলে কে?’ জিগ্যেস করলাম।
‘পোরলক হল, ওয়াটসন, একটা অলঙ্কার, শনাক্ত করা যায় এমন একটা ছদ্মনাম; কিন্তু এর আড়ালে যে আছে সে হল একজন কৌশলী এবং চতুর ব্যক্তি। আগের চিঠিটাতে সে আমাকে সরাসরি জানিয়েছিল যে, নামটা তার নিজের নয়; শুধু কি তাই, চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল আমাকে যে, লক্ষ লক্ষ মানুষের এই বিশাল শহরে তাকে আমি শনাক্ত করতে পারি কিনা। পোরলকের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তার নিজের জন্যে নয়, সেই মহান ব্যক্তিটির জন্যে যার সঙ্গে সে এঁটুলির মতো লেগে আছে৷ নিজেই কল্পনা করে দেখো হাঙরের সঙ্গে একটা কাণ্ডারী মাছ, সিংহের সঙ্গে একটা ধূর্ত শেয়াল, এরকম তুচ্ছ কোনো কিছু যার সম্পর্ক আছে কোনো এক ভয়ংকরের সঙ্গে। শুধু ভয়ঙ্করই নয়, ওয়াটসন, অশুভ, চরম মাত্রায় অশুভ। আমার জ্ঞানবুদ্ধিতে তার অস্তিত্ব এরকমই হ য ব র ল। আমার মুখে প্রফেসর মোরিআর্টি সম্বন্ধে কিছু শুনেছ কোনোদিন?’
‘সেই কুখ্যাত বৈজ্ঞানিক অপরাধী, চোর-জোচ্চরদের নয়নের মণি–’
‘ওয়াটসন, ওরকম মন্তব্য কোরো না!’ বিরক্ত গলায় বিড়বিড় করল হোমস।
‘যেটা বলতে চাইছি, সাধারণ মানুষের কাছে সে তো অপরিচিত।’
‘না জেনে মন্তব্য করে ফেলেছ!’ চিৎকার করে উঠল হোমস। ‘নিজের অজান্তেই সাংঘাতিক একটা মন্তব্য করে ফেলেছ, ওয়াটসন, আমাদের সতর্ক হতে হবে। কিন্তু মোরিআর্টিকে অপরাধী বলা মানে আইনের চোখে একটা মানহানিকর মন্তব্য করা। আর সেক্ষেত্রেই আসে লোকটির আশ্চর্য প্রতিভার কথা! সর্বকালের সেরা ছকবাজ, সবরকম শয়তানির চূড়ামণি, অপরাধীদের জগতে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার মগজ, এমন এক অশ্বশক্তি সম্পন্ন মগজ যা একটা জাতির অদৃষ্ট নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেই জাতির গৌরবের কারণ হতে পারে, আবার ধ্বংসের কারণও হতে পারে। মানুষটা হল এরকম! কিন্তু সবরকম সন্দেহ থেকে, সমালোচনা থেকে, সে বরাবর নিরাপদ দূরত্ব রেখে চলেছে। তার পরিচালন-ক্ষমতা এবং নিজেকে আড়াল রাখার বুদ্ধি এতই প্রবল ও প্রশংসনীয় যে, তুমি এইমাত্র যে খারাপ কথাগুলো তার সম্বন্ধে উচ্চারণ করলে, সেটা যদি তার কানে যায় তাহলে সে তোমাকে আদালত পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারে এবং তোমার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করে তোমার সরকারি পেনশন বন্ধ করে দিতে পারে৷
জানো নিশ্চয়ই যে এই লোকটিই হল The Dynamics of an Asteroid নামের বইটার স্বনামধন্য লেখক এবং এটাও নিশ্চয়ই জানো যে, বইটা বিশুদ্ধ গণিতচর্চার ক্ষেত্রে যে দুর্লভ উচ্চতার শিখর ছুঁয়েছে, জীবিত বিজ্ঞানীদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যিনি বইটির বিরূপ সমালোচনা করার সাহস রাখেন। এরকম একজনের সম্বন্ধে কি চট করে খারাপ কথা বলা উচিত? কী হবে জানো তো? তোমাকেই সবাই বলবে দুর্মুখ ডাক্তার আর শুধুই লোকের নিন্দে-মন্দ করে বেড়ায় এমন একজন অধ্যাপক। এরকমই রটবে তোমার সম্বন্ধে! লোকটা জিনিয়াস, ওয়াটসন৷ কিন্তু এটাও জেনে রাখো আমিও সুযোগের অপেক্ষায় আছি, যদি কোনোদিন বাগে পাই লোকটাকে সেদিন
দেখবে।’
‘আশা রাখি সেই শুভ দিনের চর্মচক্ষে সাক্ষী থাকব আমি!’ সত্যিই যথেষ্ট সম্ভ্রমের সঙ্গে বললাম। ‘কিন্তু তুমি আলোচনা শুরু করেছিলে পোরলক নামে একটা লোকের বিষয়ে।’
‘ওহ্ হ্যাঁ, এই তথাকথিত পোরলক হল অপরাধ জগতেরই এক দারুণ যোগসূত্র। যদিও আমাদের জন্যে যে সে খুব নির্ভরযোগ্য যোগসূত্র তা নয়। পরীক্ষা করে দেখেছি, সে যেমন একটা যোগসূত্র, তেমনি অপরাধ জগতের হদিশ পাওয়ার একটা মাধ্যমও বটে।’
‘অর্থাৎ অপরাধ জগতের দুর্বলতম যোগসূত্র।’
‘একেবারে ঠিক বলেছ, ওয়াটসন! আর সেখানেই পোরলকের অসীম গুরুত্ব। বড় অপরাধীর ছোটখাটো শাগরেদ এই পোরলক লোকটার অর্থের প্রয়োজনও আছে; আর তাই কৌশলী পন্থায় তার হাতে দু-একবার দশ পাউন্ডের নোট পাঠিয়েছি; আর তাতে মেওয়া ফলেছে। সে আমাকে প্রয়োজনমতো আগাম খবরও পাঠিয়েছে, অনেক মূল্যবান সেইসব খবর। কেন-না তাদের সাহায্যে আমি অনেক অপরাধ ঘটার আগেই সমূলে বিনাশ করেছি। কোনো সন্দেহই নেই আমার যে তার সংকেতলিপি যদি বোধগম্য হয়, তাহলে দেখা যাবে এই টুকরো কাগজে যা পাঠিয়েছে সে, তা খুবই দরকারি কিছু।’
খামের ভেতর মোড়া কাগজটা হোমস হাত দিয়ে সোজা করল। আমি উঠলাম, ঝুঁকে দাঁড়ালাম তার পেছনে, অদ্ভুত ভাবে সাজানো কিছু সংখ্যা আর তিনটে শব্দ ছাড়া সেই কাগজে আর কিছু লেখা নেই, অবাক হয়ে তাই দেখছিলাম। কাগজটাতে যা লেখা ছিল তা এরকম :
534 C2 13 127 36 31 4 17 21 41
Douglas 109 293 5 37 Birlstone
26 Birlstone 9 47 171
‘এসবের মানে কী হোমস?’
‘স্পষ্টতই একটা প্রচেষ্টা গোপন কোনো খবর জানানোর।’
‘কিন্তু এরকম উদ্ভট সংকেতলিপির অর্থ কীভাবে জানা যাবে?’
‘এই লিপিটার মর্মোদ্ধার করা কঠিন।’
‘কী জানাচ্ছে কতকগুলো এলমেলোভাবে লেখা সংখ্যা?’
‘এই ধরনের লিপির মজাটা কী জানো? এগুলো মগজকে ক্লান্ত করে না, বরং আরাম দিয়ে থাকে। কোনো বইয়ের একটা পৃষ্ঠায় কতকগুলো শব্দের দিকে ইঙ্গিত দেওয়া আছে। যতক্ষণ না ধরতে পারছি বইটা কোন বই আর তার কোন পৃষ্ঠাটির উল্লেখ করা হয়েছে, ততক্ষণ আমি কিছুই বলতে পারব না।’
‘কিন্তু ‘ডগলাস’ আর ‘বার্লস্টোন’ লেখা আছে কেন?’
‘পরিষ্কার কারণ হল, এই দুটো শব্দ যে পৃষ্ঠাটির প্রতি উল্লেখ করা হচ্ছে সেখানে লেখা নেই।’
‘তাহলে বইটার কথা লোকটা বলেনি কেন?’
‘ব্যাপারটার মধ্যে একটা বড় চালাকি আছে ওয়াটসন। একই খামে সংকেতলিপিও থাকবে, আবার আগাম সংবাদটাও থাকবে, এটা ধরে নিলে বোকামি হবে। আর একটা খাম এখনই এসে পৌঁছবে, যদি আমি খুব ভুল না ভাবি। সেই পরের চিঠিতে হয় কোনো বুঝতে পারার মতন কিছু লেখা থাকবে আর নয়তো সেই বইটারই উল্লেখ থাকবে যার ইঙ্গিত এই কাগজটাতে দেওয়া আছে।’
হোমসের অনুমান যে অমূলক নয়, তা কয়েক মিনিটের মধ্যেই বোঝা গেল, যখন পরিচারক বিল্লি খামে মোড়া একটা চিঠি নিয়ে হাজির হল, যার আশায় দুজনেই ছিলাম।
খামটা দ্রুত হাতে খুলে হোমস বলল, ‘একই হস্তলিপি। এবং এখন লেখার নীচে সই আছে। এসো ওয়াটসন, দেখা যাক, কী সংবাদ পাঠানো হয়েছে।’ বন্ধুর চোখের ভুরুযুগল বেঁকে গেল, যখন সে পড়ে ফেলেছে লেখাটা। আরে! এ তো বুরবক বনে গেলাম বন্ধু! ওয়াটসন, আমাদের সব আশায় জলাঞ্জলি। তবুও কী লেখা আছে শোনো!’ হোমস পড়া শুরু করলঃ
‘প্রিয় মি. হোমস,
এই ব্যাপারে আর বেশি এগোব না। খুবই বিপজ্জনক ব্যাপার যে আমাকে সন্দেহ করা হচ্ছে। পরিষ্কার বুঝতে পারছি উনি সন্দেহ করছেন আমাকে। এই দ্বিতীয় খামটা আপনার ঠিকানায় পাঠাতে যাচ্ছি, যাতে আপনি আগের সংকেতলিপি বুঝতে পারেন; ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎই লোকটা এসে হাজির। এরকম সময়ে আমি ওঁকে আশাই করিনি। ঠিক সময়ে লুকিয়ে ফেলেছি কাগজপত্তর। যদি উনি দেখে ফেলতেন আমার চিঠিটা, তাহলে বিপদ হতে পারত আমার৷ কিন্তু তাঁর চোখে সন্দেহের ছায়া লক্ষ্য করেছি আমি। সংকেতলিপির কাগজটা প্লিজ পুড়িয়ে ফেলবেন। ওটা আপনার আর দরকার হবে না।
ফ্রেড পোরলক’
বসে আঙুলের মধ্যে চিঠিটা কিছুক্ষণ মোচড়াচ্ছিল হোমস্, কপালে চিন্তার ভাঁজ, তাকিয়ে আছে আগুন-চুল্লির আগুনের দিকে।
‘আসলে’, অবশেষে বলল সে, ‘এই চিঠিটার মধ্যে কিছুই নেই বোধহয়। এটাতে যা প্রকাশ পাচ্ছে, তা হল, তার অপরাধবোধ। নিজে বিশ্বাসঘাতকতা করছে, তাই অন্যের চোখে সে সন্দেহ দেখছে।’
‘অন্য লোকটি, মনে হচ্ছে, প্রফেসর মোরিআর্টি।’
‘ঠিকই ধরেছ! যখন পোরলক-এর মতো চুনোপুঁটিরা কাউকে ‘উনি’ বলে উল্লেখ করেন, তখন তোমাকে বুঝতে হবে কার কথা বলতে চাইছে ওরা৷ ওদের কাছে একজনই আছেন ‘‘তিনি’’ ঈশ্বরের মতো।’
‘কিন্তু প্রফেসরের ক্ষমতা কতদূর?’
‘হুম! বড় প্রশ্ন এটা। যখন সমগ্র ইউরোপের সবথেকে শ্রেষ্ঠ মগজটি তোমার বিরুদ্ধে এবং সেই মগজের পেছনে আছে অন্ধকার জগতের ছোট-বড় সব ওস্তাদেরা, তখন জানবে কী হতে পারে আর না পারে তার কোনো হিসেব করা যাবে না। আমাদের এই স্যাঙাতটি, পোরলক স্পষ্টতই ঘাবড়ে গিয়েছিল তার প্রমাণ আছে। বন্ধু, ভালোভাবে লক্ষ্য করো এই কাগজটা যেখানে শুধু সে সংকেত পাঠিয়েছে আর যেটি সে লিখে ফেলেছিল অশুভ সেই শক্তিমান এসে পড়ার আগেই। আগের এই কাগজটাতে অক্ষরগুলো বা সংখ্যাগুলো পরিষ্কার, ত্যাড়াবাঁকা নয়। আর দ্বিতীয় চিঠিটা লক্ষ্য করো। অক্ষরগুলো আঁকাবাঁকা। যেন খুব তাড়াহুড়োতে লেখা৷ পড়া যাচ্ছে না চট করে।
‘ঠিকই বলেছ।’ আমি বললাম। এবার আমি প্রথম কাগজটা তুলে নিলাম যাতে আছে শুধুই সংকেত, চোখ কুঁচকে মন দিয়ে দেখছিলাম। বললাম, ‘একমাত্র কোনো পাগলের পক্ষেই ভাবা সম্ভব যে এক টুকরো এই কাগজটাতে কোনো গোপন কথা জানানো হচ্ছে, আর কারোর পক্ষেই বোধহয় সম্ভব নয় বুঝতে পারা যে এতে কী বলা আছে।’
শার্লক হোমস প্রাতরাশের প্লেটটি, যার কিছুই সে খায়নি, ঠেলে সরিয়ে দিল, আর জ্বালিয়ে নিল তার পাইপ, গভীরভাবে চিন্তা করার সময় যেটা তার একমাত্র সঙ্গী।
‘আমি ভাবছি!’ আরামকেদারায় হেলান দিয়ে, সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে সে শুরু করল, ‘বোধ হয় কিছু সূত্র এতে দেওয়া আছে যেগুলো তোমার সূক্ষ্ম বুদ্ধিও ধরতে পারেনি। যুক্তি-বুদ্ধি প্রয়োগ করে একটু খতিয়ে দেখা যাক। পোরলক একটা বইয়ের দিকে ইঙ্গিত করছে। এটা থেকে শুরু করতে হবে আমাদের।’
‘খুবই অস্পষ্ট একটা ব্যাপার।’
‘ধাঁধাটাকে একটু ছোট করে নিই আমরা। যদি মন দিয়ে ভেবে দেখি, তাহলে কিন্তু ব্যাপারটা পুরোপুরি দুর্বোধ্য মনে হবে না। বইটার ব্যাপারে কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে কি?’
‘কিছুই না।’
‘বেশ, বেশ, ব্যাপারটা বোধহয় এত জটিল নয়। সংকেতলিপির শুরুতে আছে তিনটে সংখ্যা’ 534, তাই না? আমরা কি এটা অনুমান করতে পারি না যে 534 হল কোনো পৃষ্ঠার সংখ্যা? সুতরাং যে বইটার কথা বলা হচ্ছে সেটা বেশ মোটা বই এটা ধরে নিতে পারি। তো, এরকম মোটা বইটা সম্বন্ধে আর কোনো ইঙ্গিত দেওয়া আছে কি? একটা সংকেত দেওয়া হচ্ছে C2। এটার ব্যাপারে তোমার মত কী ওয়াটসন?’
‘কোনো সন্দেহই নেই যে বলা হচ্ছে দ্বিতীয় চ্যাপ্টার।’
‘ঠিক বলা হল না ওয়াটসন। তুমি আমার সঙ্গে নিশ্চয়ই একমত হবে যে, পৃষ্ঠা সংখ্যা যখন দেওয়া হচ্ছে, তখন চ্যাপ্টারের নম্বর বোধহয় ততটা দরকারি নয়। আর একটা ব্যাপারও ভেবে দেখতে হবে যদি বইটার দ্বিতীয় চ্যাপ্টারই 534 পৃষ্ঠার হয়, তাহলে প্রথম চ্যাপ্টারের পৃষ্ঠা সংখ্যা বিশাল হয়ে যাবে; সেরকমও হওয়া অসম্ভব।
‘কলাম!’ চেঁচিয়ে উঠলাম।
‘ব্রিলিয়ান্ট, ওয়াটসন। বুদ্ধির দীপ্তিতে সকালটা জমিয়ে দিয়েছ। কলামই হবে, না হলে আমি নিজেই বোকা বনে যাব। তাহলে এখন আমাদের কী করণীয়, এমন একটা চওড়া আর মোটা বইয়ের কথা ভাবা যা ছাপা আছে ডাবল কলামে, যেগুলো বেশ লম্বা কলাম...।’
‘তাহলে তো অনেকটাই বোঝা গেল।’
‘তা হয়তো গেল।...কিন্তু আর একটু মাথা খাটাতে হবে ওয়াটসন, খেলাতে হবে মগজকে আরও একটু। বইটা যদি এমন হতো যে সহজে চিনতে পারা কঠিন, তাহলে হয়তো পোরলক, এই ছুঁচোটা বইটা আমাকে পাঠিয়েই দিত। সেটা না করে সে কিছু সংকেত পাঠিয়েছে। এর মানে হল, এমন একটা বইয়ের দিকে সে ইঙ্গিত করছে, যেটা আমাদের হয়তো সকলেরই চোখের সামনে থাকে। অর্থাৎ, একটা সাধারণ বই সেটা।’
‘তুমি যা বলছ তাতে ব্যাপারটা আরও একটু পরিষ্কার হল।’
‘তাহলে আমাদের খুঁজে নিতে হবে এমন একটা বই, যেটা আকারে বড়, ডাবল কলামে ছাপা আর সকলেই বোধহয় পড়ে...।’
‘বাইবেল!’ উৎসাহী গলায় বললাম।
‘গুড, ওয়াটসন, গুড! কিন্তু তোমার অনুমান কাছাকাছি গেছে, লক্ষ্যবস্তুকে পুরো বিঁধতে পারেনি৷ অসুবিধেটা কী জানো? বাইবেলের আকার কিন্তু সবসময় একই হয় না। নানা আকারের হয়। বাইবেল-এর কথা ভাবলে কনফিউশান থেকে যাবে৷ স্ট্যান্ডার্ড একটা বইয়ের কথা ভাবতে হবে। যে বইটার 534 পৃষ্ঠা পোরলকের কপিতে যেমন, আমার কপিতেও একইরকম।’
‘সেরকম বই কী হতে পারে? মাথায় আসছে না।’
‘ব্র্যাডশ?’
‘উঁহু। ব্র্যাডশতে শব্দসংখ্যা খুব কম৷ টাইম টেবলই বেশি। অত কম শব্দসংখ্যা দিয়ে সংকেতলিপি পাঠানো যায় না...। আর কী
হতে পারে?’
‘পাঁজি!’
‘একসেলেন্ট ওয়াটসন! পাঁজি হল এমন একটা বই যা আকারে মোটা, সকলের বাড়িতেই থাকে, আর ডাবল কলামে ছাপা। দেখা যাক কী লেখা আছে 534 পৃষ্ঠায়...’
ডেস্ক থেকে টেনে মোটা পঞ্জিকাটা বের করল বন্ধু। 534 পৃষ্ঠার ডাবল কলাম আমিও দেখলাম। হোমসও। কিন্তু এখানে তো ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষে মারাঠা বিদ্রোহের ব্যাপারে কী অবস্থান নেবে সেটা বলা আছে৷ সারা ডাবল কলাম জুড়ে! তাহলে কী দাঁড়াল ব্যাপারটা?’
‘আমাদের ছোট্ট ভুলটা বুঝেছ ওয়াটসন?’
‘কী?’
‘আমরা এ-বছরের পাঁজিটা দেখছি। হতে পারে পোরলকের ইঙ্গিত গত বছরের পাঁজির দিকে। আচ্ছা সেটা দেখা যাক।’
এ-বছরের নতুন পাঁজি সরিয়ে রেখে গত বছরের পাঁজিটা তুলে নিল হোমস।
পুরোনো, অর্থাৎ গত বছরের পঞ্জিকার 534 পৃষ্ঠা খুলে দ্বিতীয় কলাম দেখেই হোমসের ঈগল চোখ ঝকমক করে উঠল।
‘একটা কাগজে লেখো ওয়াটসন। যা লেখা আছে পড়ছি।’
আমি কাগজ-কলম নিয়ে প্রস্তুত।
হোমস যা পড়ল, আমি লিখলাম, ‘There is danger may—Come—Very—soon—one’ ... ‘Douglas... rich... country... now... at... Birlstone...House...’
‘লিখেছ ওয়াটসন?’
‘লিখেছি।’
‘কী ভবিষ্যদ্বাণী করছে পাঁজি?... বার্লস্টোন হাউসে... সেটা কোথায় জানতে হবে...ডগলাস নামে এক পরিবারে বিপদ আসছে...। আর কী চাই বন্ধু? ধন্য পোরলকের ধূর্ত বুদ্ধি! সে জানিয়ে দিয়েছে আমাকে যা জানাবার।’
ঠিক সেই মুহূর্তে পরিচারক বিল্লি দরজা ঠেলল। নাটকীয়ভাবে আমাদের ঘরে ঢুকলেন, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের দুঁদে ইনস্পেকটর অ্যালেক ম্যাকডোনাল্ড্।
‘আসুন! আসুন! ইনস্পেকটর!’ হোমস যথেষ্ট উচ্ছ্বাসের সঙ্গে অভিবাদন জানাল, ‘আপনি এই সকালে অধমের বাড়িতে পায়ের ধুলো দিয়েছেন মানে সত্যিই বিপদ চুপিচুপি আসছে!’
সামনের চেয়ারে বিশাল, দীর্ঘকায় বপু নিয়ে বসতে যাচ্ছিলেন; সেই মুহূর্তে তার নজরে পড়ল টেবিলে পড়ে থাকা সাদা কাগজটার দিকে যাতে আমি লিখে রেখেছি পাঁজির অমৃতবাণী।
‘ডগলাস...বার্লস্টোন! কী ব্যাপার মি: হোমস? আপনি কি জাদু জানেন? এই নামগুলো আপনি কোথায় পেলেন?’
‘কাজকর্ম হাতে নেই। তাই আমি আর আমার বন্ধু ওয়াটসন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে গত বছরের পাঁজিটা পড়ছিলাম।’
‘পাঁজি পড়ছিলেন?’ ইনস্পেকটর একবার হোমসের দিকে তাকালেন, একবার আমার দিকে। তারপর বললেন, ‘তাহলে শুনুন খবরটা...’
‘কী খবর? হোমস রীতিমতো কৌতূহলী।’
‘বার্লস্টোন ম্যাের হাউসের কর্তা মি: ডগলাস গত রাতে ভয়ঙ্করভাবে খুন হয়েছেন।’

পরিচ্ছেদ ২ঃ শার্লক হোমসের বিশ্লেষণ
ইনস্পেকটরের মুখে খবরটা শুনে আমি যাকে বলে বজ্রাহত হলেও হোমসের মুখ দেখে বোঝা গেল না যে সে খুব অবাক বা রোমাঞ্চিত হয়েছে। শুধু তার চোখদুটো মুহূর্তের জন্যে জ্বলে উঠল এবং তার মুখ থেকে গম্ভীর মন্তব্য ভেসে এল, ‘খুবই কৌতূহলের।’
‘আপনি অবাক হচ্ছেন না?’
‘কৌতূহলী হচ্ছি, মি. ম্যাক। অবাক হব কেন? আর অবাক হবই বা কেন? কিছুক্ষণ আগেই আমার কাছে একটা খবর এসেছে যে, এক ব্যক্তির ভীষণ বিপদ। আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমি জানতে পারছি যে, বিপদটা সত্যিই ঘটেছে এবং লোকটি মৃত। সুতরাং আমি খুব, খুব কৌতূহলী হয়ে পড়েছি। কিন্তু অবাক হইনি।’
খুব সংক্ষেপে হোমস সংকেতলিপি এবং চিঠির ব্যাপারটা ম্যাকডোনাল্ডকে বুঝিয়ে দিল। এবার ম্যাকডোনাল্ডের অবাক হবার পালা।
উনি বললেন, ‘বার্লস্টোন যাব বলে সকালেই বেরিয়ে পড়েছি। ভাবলাম আপনার ডেরা হয়ে একবার ঘুরে যাই। যদি আপনি আর আপনার বন্ধু আমাকে সঙ্গ দিতে চান। কারণ একই রসের রসিক তো আমরা। কিন্তু আপনি যা শোনালেন, তাতে তো আমার মনে হচ্ছে লন্ডনে বসেই আপনি কলকাঠি নাড়তে পারবেন।
‘মনে হয় না, তা পারব,’ বলল হোমস।
‘কী বলছেন আপনি!’ ইনস্পেকটর প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘দু-একদিনের মধ্যেই সংবাদপত্রগুলোতে বার্লস্টোন রহস্য নিয়ে হই-হই পড়ে যাবে; কিন্তু যা বুঝছি আমি, রহস্যের আসল চাবিকাঠি তো লন্ডনে, যেখানে বসে একটা লোক ভবিষ্যদ্বাণী করছে যে একটা অপরাধ ঘটবে! সেই লোকটাকেই পাকড়াও করতে হবে আমাকে, আর তারপরই রহস্যের মশা, মাছি সব পিলপিল করে বেরিয়ে আসবে।’
‘ঠিকই বলছেন আপনি, মি. ম্যাক, কিন্তু সেই বদমাশ, পোরলক নামের সেই বদমাশটার গায়ে হাত দেওয়া বোধহয় খুব সহজ হবে না।’
পোরলকের পাঠানো সংকেতলিপি আর টুকরো চিঠিটা ম্যাক বারবার উলটেপালটে দেখলেন৷ তারপর ঈষৎ গম্ভীরভাবে বললেন, ‘আপনি কী বলতে চাইছেন মি. হোমস? এই পোরলক লোকটা শিখণ্ডী মাত্র। আসল মাথা এর পেছনে?’
‘প্রায় নিশ্চিত আমি।’
‘কে হতে পারে আসল মাথা? সেই প্রফেসর কি যার কথা আপনার মুখে প্রায়ই শুনি?’
‘একেবারে ঠিক অনুমান করেছেন!’
ইনস্পেকটর আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, ‘আমরা পুলিশ, মি. হোমস৷ আমাদের সব খবরই রাখতে হয়।’
‘যেমন?’ গম্ভীর গলা হোমসের।
‘আমাদের কাছে খবর আছে যে এই অধ্যাপকের সঙ্গে ভেতরে ভেতরে আপনার দহরম মহরম আছে। অবশ্য অধ্যাপক সম্বন্ধেও আমরা খবর নিয়েছি। যতদূর জানি, তিনি খুবই সম্মানীয় এবং একজন পণ্ডিত মানুষ। প্রতিভাবানও বলা যায়।’
‘যাক্, নিশ্চিন্ত হলাম।’ এবার হোমস আমার দিকে তাকিয়ে চোখ কুঁচকে হাসল, ‘পুলিশের কাছে এই সংবাদটুকু অন্তত আছে যে, শার্লক হোমসের দোস্তি চোর-ছ্যাঁচোড়ের সঙ্গে নয়; একজন প্রতিভাবানের সঙ্গে।’
‘আরে, সাহেব কী বলছেন! আপনার মুখে প্রায়ই এই অধ্যাপকের কথা শুনে, আমি একদিন নিজে তাঁর কাছে গিয়েছিলাম...’
‘তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ। গ্রহ-নক্ষত্র-ধূমকেতু এসব ব্যাপারে জানতে এসেছি এই ছুতো করে৷ বিস্ময়কর ব্যাপার! মাত্র আধঘণ্টার মধ্যে একটা গ্লোব আর একটা রিফ্লেকটর লণ্ঠন নিয়ে এসে তিনি আমাকে সব জলের মতো বুঝিয়ে দিলেন! এমনকী মহাকাশের রহস্য নিয়ে একটা বই দিলেন আমাকে পড়তে। অবশ্য, পুলিশের এই স্থূল মগজ নিয়ে সেই কঠিন বইয়ের পাঠোদ্ধার করা আমার পক্ষে আজও সম্ভব হয়নি৷ তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যের পরিচয় পেয়ে আমি অবাক হয়েছি। ভদ্রলোকের একেবারে রোগা-চিমসে চেহারা, একমাথা পাকা চুল আর কথা বলার ভঙ্গী খুবই আকর্ষণীয়। আমি যখন তার বাড়ি থেকে চলে আসছি তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে বিদায় জানালেন। মনে হল যেন, বাবার মতো কেউ একজন আমাকে আশীর্বার করছেন!’
সব শুনে হোমস মুচকি হাসল, ঘষে নিল হাতের চেটো দুটো। খুশি হলে সে যা করে থাকে। তারপর বলল, ‘দারুণ! দারুণ! এবার বলুন তো মি. ম্যাক, আপনাদের এইসব জ্ঞানগর্ভ পড়াশোনা কোথায় চলছিল, যতদূর মনে হচ্ছে, প্রফেসরের পড়ার ঘরে?’
‘ঠিক।’
‘ঘরটা বেশ আরামদায়ক। তাই না?’
‘খুবই আরামদায়ক আর সাজানো-গোছানো...।’
‘প্রফেসরের লেখার টেবিলের সামনে আপনি বসেছিলেন?’
‘একেবারে ঠিক।’
‘আপনার মুখ ছিল আলোর দিকে; আর ওর মুখে ছিল ছায়া।’
‘ঠিকই বলেছেন; সময়টা ছিল সন্ধে; মনে আছে টেবিলের আলোটা ঘোরানো ছিল আমার মুখের দিকে। অর্থাৎ...ঠিকই তো?...ছায়ার আড়ালে ছিলেন অধ্যাপক।
‘সেরকমই হওয়ার কথা। আচ্ছা, প্রফেসরের মাথার ওপরদিকে, দেয়ালে, আপনি কি একটা পেইন্টিং লক্ষ্য করেছিলেন?’
‘পেইন্টিং?’ ইনস্পেকটর কয়েক মুহূর্ত ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘আমার নজর কিছুই এড়ায় না...হ্যাঁ...ঠিক। এক সুন্দরী যুবতীর ছবি, মাথায় আলতো একটা হাত, আর দেখে মনে হয়েছিল, যুবতী যেন আমার দিকেই আড়চোখে তাকিয়ে আছে।’
‘ওটা জাঁ বাপতিসতে গ্রেইউজের আঁকা বিখ্যাত পেইন্টিং।’
আমি আর ইনস্পেকটর দুজনেই হোমসের দিকে তাকিয়ে আছি। আরামকেদারায় হেলান দিয়ে বসে হোমস জানাল, ‘জাঁ বাপতিসতে গ্রেইউজ হলেন বিখ্যাত ফরাসি শিল্পী যাঁর ছবি-আঁকিয়ে হিসেবে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল, 1750 থেকে 1800 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। তিনি...’
ইনস্পেকটর উশখুশ করে উঠলেন। বললেন, ‘একটা মার্ডারের ইনভেস্টিগেশন করতে যেতে হবে মি. হোমস, এখন শিল্প নিয়ে আলোচনা...’
‘মি. ইনস্পেকটর, পরে দেখা যাবে, এই পেইন্টিং। নাহ! ঠিক পেইন্টিংটা নয়, এর মালিকের সঙ্গে বার্লস্টোন রহস্যের কোথাও না-কোথাও একটা যোগাযোগ আছে।
‘তাই?’ ইনস্পেকটরের গলায় যেন অবিশ্বাসের সুর।
‘মাননীয় গোয়েন্দা-বন্ধু আমার..., হোমস গম্ভীর হবার ভান করে বলল, ‘একজন সত্যান্বেষীর সব রকম খবর রাখাই দরকার। এই তুচ্ছ খবরটা আপনার জেনে রাখা উচিত যে, 1865 সালে আঁকা গ্রেইউজের এই রহস্যময়ী নারীর ছবিটাই বিক্রি হয়েছিল, বারো লক্ষ ফ্রাঁ মূল্যে। অর্থাৎ কিনা, আমাদের হিসেবে চল্লিশ হাজার পাউন্ডের বেশি মূল্যে। এবার নিশ্চয়ই আপনি কিঞ্চিৎ আগ্রহী হবেন।’
দেখলাম, ইনস্পেকটর সত্যিই বিস্ময়ে অভিভূত।
‘প্রফেসর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা বিতরণ করেন, অতএব তাঁর মাস-মাইনে কত এটা জানা খুব কঠিন নয়। সেটা জেনেওছি আমি। ওর বার্ষিক আয় হল কাগজে-কলমে সাতশো পাউন্ড।’
‘মাত্র? তাহলে ওই অমূল্য ছবিটা উনি কিনলেন…’
‘ঠিক তাই। কীভাবে কিনলেন?’
‘সত্যিই বিচিত্র ব্যাপার।’ চিন্তিতভাবে বললেন ইনস্পেকটর, ‘আপনি আরো বলুন। আরো শুনতে চাই...অবিশ্বাস্য সব ব্যাপার!’
‘বার্লস্টোনের দিকে রওনা হওয়ার কী হল?’ হোমস মুচকি হাসল।
‘হাতে যথেষ্ট সময় আছে।’ নিজের হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন ইনস্পেকটর, ‘আপনার দরজাতে ক্যাব দাঁড়িয়েই আছে৷ ভিক্টোরিয়া স্টেশনে যেতে আমাদের কুড়ি মিনিটও লাগবে না৷ সেখান থেকে ট্রেন... কিন্তু আবার আগ্রহ হচ্ছে ছবিটার ব্যাপারে আরও কিছু শুনতে। আচ্ছা, একবার আপনি আমাকে বলেছিলেন, প্রফেসর মোরিআর্টির সঙ্গে তো আপনার কখনও দেখা হয়নি?’
‘কখনই না...’
‘তাহলে তাঁর ঘরের নিখুঁত বর্ণনা আপনি কীভাবে দিতে পারলেন?’
‘সেটা আবার অন্য ব্যাপার...’
‘মানে?’
‘প্রফেসরের বাড়িতে যাবার সৌভাগ্য আমার দুবার৷ নানা ছল-ছুতো করে তাঁর আর্দালির হাতে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম আমার কার্ড। দুবারই চলে আসি তিনি আমাকে ডেকে নেবার আগেই। অর্থাৎ দুবারই তাঁর মুখোমুখি হতে হয়নি আমাকে৷ শেষবার তিনি নিজের ঘরে ছিলেন না৷ বাড়ির ভেতরে গিয়েছিলেন কোনো কারণে। আর সেই সুযোগটাই আমি কাজে লাগাই৷ আর্দালিটাও ধারে-কাছে ছিল না। কেটে পড়েছিল কোথাও। আমি চট করে দরজা ঠেলে তাঁর স্টাডিতে ঢুকে পড়ি আর বলতে পারেন, তড়িৎ গতিতে টেবিলে ডাঁই করে রাখা তাঁর কাগজপত্র উল্টেপাল্টে দেখে নিই।’
‘সন্দেহজনক কাগজপত্র কিছু দেখতে পেয়েছিলেন?’
‘কিছুই না। সেটাই অবাক করেছিল আমাকে৷ এত ধূর্ত আর সতর্ক ওই পণ্ডিত লোকটা৷ গোপনীয়তা কীভাবে রক্ষা করতে হয়, তা ওঁর থেকে কেউ বোধহয় ভালো জানেন না। যাক্, সেটা অন্য ব্যাপার৷ এখন ছবিটার ব্যাপারে ফিরে আসি। অত বিশাল অঙ্কের মূল্যের ছবির মালিক যিনি হতে পারেন তাঁর ঐশ্বর্যের পরিমাণ কিছুটা নিশ্চয়ই আন্দাজ করা যায়? এত অর্থের মালিক তিনি কীভাবে হতে পারেন? প্রফেসর নিজে অবিবাহিত তাঁর ছোট ভাই ইংল্যান্ডের পশ্চিমের একটা স্টেশনে স্টেশন-মাস্টার৷ অধ্যাপক হিসেবে তাঁর বেতন বছরে সাতশো পাউন্ড। এতদসত্ত্বেও তিনি চল্লিশ হাজার পাউন্ডের একটা পেন্টিংয়ের মালিক।’
‘হুমম...’
‘ইঙ্গিতটা খুবই পরিষ্কার।’
‘আপনি বলতে চাইছেন, প্রফেসরের আয় বিশাল এবং তাঁর সেই উপার্জনের সিংহ ভাগটাই আসে বে-আইনি রাস্তায়?’
‘ঠিক তাই। যেটা আসল কথা সেটা বলি৷ প্রফেসর নিজের চারপাশে একটা দুর্ভেদ্য মাকড়সার জাল তৈরি করে রেখেছেন৷ সেই জটিল জালের মাঝখানে তিনি বসে আছেন শাহেনশার মতন।’
‘একটা ব্যাপার সম্বন্ধে আমি পরিষ্কার হতে চাইছি। এত টাকা রোজগার তিনি করেন কীভাবে? শয়ে শয়ে মানুষকে ঠকিয়ে, জাল টাকা তৈরি করে না চুরি-চামারি করে?’
‘জনাথন ওয়াইল্ড সম্বন্ধে আপনার পড়াশোনা আছে?’
‘নামটা চেনা চেনা লাগছে... জনপ্রিয় গোয়েন্দা উপন্যাসের ডিটেক্টিভ কি? স্যরি মি. হোমস। পুলিশ হিসেবে কাজের চাপ আমার এত বেশি যে কল্পনাশ্রিত রগরগে থ্রিলার পড়ার সময় আমার একেবারেই নেই...।’
‘জনাথন ওয়াইল্ড কোনোকালে গোয়েন্দা ছিল না। তাকে নিয়ে রগরগে কোনো থ্রিলারও লেখা হয়নি। সে ছিল এক ওস্তাদ অপরাধী। তার কার্যকলাপের সময়কাল ছিল 1750 সাল বা তার আশেপাশে।’
‘1750 সালের ব্যাপার...আদ্যিকালের ইতিহাস শুনে কী হবে? আমি খুব প্র্যাকটিকাল...।’
‘মি. ম্যাক, বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, আপনার পক্ষে সবথেকে প্র্যাাকটিকাল কাজটা কী জানেন? গৃহবন্দি হয়ে তিন মাস, প্রতিদিন বারো ঘণ্টা করে অপরাধীদের ইতিহাস পড়া। অপরাধ জগতের বিশাল বৃত্তের মধ্যে সবকিছুই আপনাকে জানতে হবে৷ তার মধ্যে প্রফেসর মোরিআর্টিও আছেন৷ জনাথন ওয়াইল্ড তার সময়ে লন্ডনের সব ধরনের অপরাধীদের রাজা-বাদশা ছিল। প্রত্যেক অপরাধীকে সে বুদ্ধি দিত পনেরো শতাংশ কমিশনে। সেই প্রাচীন বৃত্তের চাকা এখনও ঘুরে চলেছে। খোদ লন্ডনেই। পুলিশের কাছে তার কতটুকু খবরই বা থাকে? মোরিআর্টি সম্বন্ধে আর দু-একটা কথা বলব যা শুনতে হয়তো আগ্রহী হবেন।’
‘কান দুটো খোলা রেখে আমরা শুনছি আপনার কথা৷ কি ডঃ ওয়াটসন, তাই তো?’
‘সত্যি! কত বিস্ময়ই লুকিয়ে আছে অপরাধীদের বিশাল জগতে!’ সবিস্ময়ে আমি বললাম।
‘এই বৃত্তের, মানে এখনকার কালে প্রফেসর মোরিআর্টির বৃত্তে একটা যোগসূত্র আছে।’ হোমস বলে যাচ্ছিল, ‘প্রফেসরের ডান-হাত কে জানেন? কর্নেল সেবাসডিয়ান মোরান। এত ভদ্র জীবনযাপন করে লোকটা, যে, সন্দেহের কোনো তির, আইনের কোনো শেকল তার কাছে পৌঁছতেই পারবে না। সে হল বুদ্ধিদাতা গণেশদের মধ্যে একজন৷ আর তাকে প্রফেসর পারিশ্রমিক হিসেবে কত পে করে জানেন?’
‘কত?’
‘বছরে ছ-হাজার পাউন্ড। প্রধানমন্ত্রী যা পান, তার থেকেও বেশি টাকা। সুতরাং অনুমান করা যাচ্ছে কি মোরিআর্টির সম্পত্তির বহর! দ্বিতীয় কথা হল, আমি নিজের কায়দাতেই প্রফেসরের কতগুলো ব্যাঙ্ক-অ্যাকাউন্ট আছে খোঁজ নিয়েছিলুম...।’
‘কতগুলো?’ ইনস্পেকটর রীতিমতো উত্তেজিত।
‘কম করে কুড়িটা অ্যাকাউন্ট নানা ব্যাঙ্কে।’
‘যাক। অনেক কিছু জানা গেল। এখন আমি আবার আসল কথায় ফিরে আসি। আপনি বলেছেন যে, সরাসরি নয় যদিও, যে প্রফেসরের সঙ্গে বার্লস্টোন খুনের সম্পর্কে আছে। আর সেই ইঙ্গিত আপনি পেয়েছেন, পোরলকের চিঠি থেকে। এই সূত্র ধরেই কি আমরা এগোব?’
‘দুদিক দিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। অপরাধীদের ওপর মোরিআর্টির শাসনের বহর খুব সাংঘাতিক। তাঁর শৃঙ্খলাবোধ মারাত্মক। যাকে বলে with a rod of iron তিনি কনট্রোল করেন সবকিছু৷ যদি কেউ বেইমানি করে তাঁর রাজত্বে, শাস্তি হল মৃত্যু৷ এখন এই ডগলাস, যে খুন হয়েছে, কে বলতে পারে, হয়তো মোরিআর্টির সংগঠনের একজন সদস্য ছিল। কোনো কারণে বেইমানি করেছিল চিফের সঙ্গে৷ তার ফলে এই খুন...।’
‘এটা হল সূত্রের একদিক, মি. হোমস।’
‘আর একটা কারণ হল, ধনী পরিবারের লোক ডগলাস স্বাভাবিক কারণেই প্রফেসরের বিশাল সংগঠনের কারোর হাতে খুন হয়েছে।…আচ্ছা, খুনের সঙ্গে ডাকাতি হয়েছে কি?’
‘সেরকম খবর নেই অবশ্য।’
‘তাহলে আমাদের রওনা হতে হবে বার্লস্টোন।’
‘এগজ্যাক্টলি। আর দেরি করা ঠিক হবে না। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমাদের বেরিয়ে পড়া উচিত।’
‘যথেষ্ট সময়, বলল হোমস; চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে, ড্রেসিং-গাউন ছেড়ে কোট-প্যান্ট পরতে পরতে অপেক্ষমান ক্যাবে তিনজন চড়ে বসলাম। যেতে যেতে ম্যাকডোনাল্ড নতুন খবর দিল আমাদের। আসলে বার্লস্টোনের ঘটনার বিষয়ে ম্যাকডোনাল্ডকে চিঠি পাঠিয়েছে ওখানকার থানার অফিসার মি. ম্যাসন। চিঠিটা আমাদের দেখালেন ইনস্পেকটর। সংক্ষিপ্ত চিঠিটাতে মি. ম্যাসন যা জানাচ্ছেন তা হল, ‘এখানে যে খুনটা হয়েছে সেটা পল্লিতে বেশ হইচই ফেলে দিয়েছে এবং খুনটা বেশ রহস্যময়৷ ম্যাসন কীভাবে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাবেন সে ব্যাপারে থই পাচ্ছেন না৷ সে কারণে তিনি ওই অঞ্চলের কাউকে, কোনো সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করতেও ঠিক সাহস পাচ্ছে না। ইনস্পেকটর সাহেব জলদি আসুন। আর যদি সম্ভব হয় তো লন্ডনের স্বনামধন্য প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর মি. শার্লক হোমসকেও সঙ্গে নিয়ে আসুন।’
‘আপনাদের এই অফিসারটিকে বেশ চালাকচতুর আর কাজের মনে হচ্ছে।’ হোমস বলল। তাকে মি. ম্যাসন বার্লস্টোনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন জেনে গর্বে যে তার বুক ফুলে গেছে সেটা বুঝলাম৷ ট্রেনে উঠে হোমস বলল, ‘লন্ডনের সম্ভবত সবথেকে শক্তিশালী মগজ এবং সাসেক্সে খুন, এই দুইয়ের মধ্যে যোগসূত্রটা কী এটাই খুঁজতে হবে।’

পরিচ্ছেদ ৩ঃ বার্লস্টোনের ট্র্যাজেডি
কাউন্টি সাসেক্সের উত্তর প্রান্তে, বার্লস্টোন একটা ছোটখাটো পল্লি অঞ্চল। যেখানে উঁচু বাড়ি চোখেই পড়বে না। শুধু কটেজের সারি। এই অঞ্চলে আধুনিকতার ছাপ একেবারেই নেই। জীবনযাত্রায়, বসনে-ব্যসনে সপ্তদশ শতকের সেই ট্র্যাডিশনই চলছে৷ এটা আরও মনে হল, মি. ডগলাসদের জমিদার ভবনে পৌঁছে। স্টেশন থেকে এই ভবনের দূরত্ব আধ মাইলও বোধহয় হবে না। বিশাল এই ভবন সতেরো শতকের স্থাপত্যরীতির স্মৃতি এখনও বহন করে চলেছে। এক নজর দেখে মনে হয় বাড়ির কোনো অংশেই আধুনিক স্থপতির হাত এখনও পড়েনি।
বার্লস্টোন ভবনকে যদি একটা দুর্গ ভাবা যায়, তাহলে প্রাচীন স্থাপত্য-রীতি অনুযায়ী এই ভবনের চারধারে দুটো পরিখার কারণও বোঝা যায়। দুর্গের অভ্যন্তর শত্রু বা বাইরের অচেনা আগন্তুকদের দ্বারা যাতে হঠাৎ আক্রান্ত না হয়, তার জন্যেই প্রাচীনকালে এরকম পরিখা দিয়ে বাসভবন ঘিরে রাখা হতো। দুটো পরিখা৷ একটা বাইরের আর একটা ভিতরের দিকে। এই ধরনের পরিখা সবসময়েই জলমগ্ন থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে বাইরের পরিখা শুকিয়ে খটখটে। যদিও দ্বিতীয় অর্থাৎ ভিতরদিকের পরিখাটিতে বেশ জল আছে, আর চওড়ায় চল্লিশ ফুট। ভবনের একতলার গবাক্ষগুলো পরিখার জলের থেকে একফুটের মধ্যে অবস্থিত।
জমিদারবাড়িতে পদার্পণ করার পর দুজন প্রধান ব্যক্তির সঙ্গে আমাদের পরিচয় হল। প্রথমজন হলেন মধ্যবয়স্কা মহিলা, মি. ডগলাসের স্ত্রী। কথাপ্রসঙ্গে জানা গেল যে, তিনি খাঁটি ইংরেজ মহিলা। ডগলাসের সঙ্গে তার আলাপের সূত্রপাত লন্ডনেই৷ তাঁর দিকে তাকালেই নির্দ্ধিধায় বলা যায়, মহিলা সুন্দরী, লম্বা এবং ছিপছিপে। মুখে শোকের ভাব থাকলেও আমাদের প্রতি তাঁর ব্যবহারে আভিজাত্যের প্রমাণই পেলাম।
দ্বিতীয়জন হলেন, একজন মধ্যবয়সি ভদ্রলোক। এই ছোট পল্লিতে, বিশাল বাসভবনে স্ত্রীর সঙ্গ ছাড়া স্থানীয় এই খাঁটি ইংরেজ ভদ্রলোকের সঙ্গেই দিনের অধিকাংশ সময় কাটাতেন ডগলাস। তবে প্রথম জীবনে ডগলাস বেশ কয়েক বছর আমেরিকাতে ছিলেন। এই দীর্ঘকায় মজবুত চেহারার ভদ্রলোক, যাঁর নাম হল, সিসিল বার্কার; তাঁর সঙ্গে ডগলাসের পরিচয় নাকি অনেকদিনের, আমেরিকায় থাকাকালীন। এছাড়াও অ্যামিসের কথা বলতে হবে যে এই ভবনের বাটলার। রান্নাঘরের দায়িত্বে মিসেস অ্যালেন। এছাড়া, ভবনে মোট পরিচারকের সংখ্যা ছয়।
প্রাথমিক আলোচনা থেকে জানা গেল, তা এরকম। রাত 11টা বেজে 45 মিনিটে স্থানীয় থানা অরথম খবরটা পায়। থানার ওসি হলেন সার্জেন্ট উইলসন। সিসিল বার্কার, উত্তেজিত অবস্থায়, অত রাতে থানায় হাজির হন। হাঁপাতে হাঁপাতে তিনি অফিসারকে জানিয়েছিলেন যে, জমিদার-বাড়িতে এক সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেছে, বাড়ির কর্তা জন ডগলাস খুন হয়েছেন। খবরটা শুনেই পুলিশ-সার্জেন্ট দেরি করেননি৷ বার্কারের সঙ্গেই তিনি হাজির হন অকুস্থলে৷ তখন রাত বারোটা বেজে গেছে।
সেখানে পৌঁছে সার্জেন্ট প্রথমেই যেটা লক্ষ্য করেন, সেটা হল, দুটো পরিখাই পার হবার সেতু নামানো ছিল, অতবড় প্রাসাদের সব জানালাগুলোই আলোকিত আর ভেতরে ঢুকে তাঁর মনে হয়েছিল সর্বত্র বিপদের ঠান্ডা স্তব্ধতা। পরিচারকদের মুখ ভয়ে রক্তহীন, তারা হলের মধ্যে এক কোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে, আর বাটলার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে নার্ভাসভাবে হাত কচলাচ্ছে। শুধু সিসিল বার্কারকে দেখেই মনে হচ্ছিল তার নার্ভ বেশ স্টেডি আছে, নিজের ভেতরের আশঙ্কার ছটফটানিকে তিনি দমন করতে পেরেছেন। হলঘরের মধ্যে ঢুকে সার্জেন্টকে তিনি ইশারায় অনুসরণ করতে বলেছিলেন। সেই মুহূর্তে ভেতর থেকে আসতে দেখা গিয়েছিল ডঃ উডকে, পরিচিত মুখ, পল্লির ডাক্তার। তিনজনে তারপর প্রবেশ করেছিলেন সেই ঘরটিতে যেখানে পড়েছিল মৃতদেহ; তাঁদের পেছনে আসছিল বাটলার। বার্কারের ইশারায় বাটলার ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছিলেন যাতে পরিচারক ও পরিচারিকারা সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখতে না পায়।
মৃত ব্যক্তি মাটিতে পড়েছিল চিৎ হয়ে, হাত-পা ছড়িয়ে। পরনে লাল ড্রেসিং-গাউন, তার নীচে ঈষৎ প্রকাশ্য রাত-পোশাক৷ পায়ে বাড়িতে পরার হালকা চটি। ডাক্তার মৃতদেহের পাশে হাঁটু গেড়ে বসেছিলেন, টেবিল থেকে ছোট আকারের লন্ঠন টেনে নিয়ে মৃতের মুখের দিকে আলো ফেলেছিলেন। এক নজর দেখেই সার্জেন্ট বুঝেছিলেন যে, লোকটা দেহে প্রাণ নেই৷ মারাত্মক সব আঘাতের চিহ্ন শরীরে৷ মৃতের বুকের ওপর আড়াআড়ি পড়ে আছে একটা এমন অস্ত্র, যা সচরাচর আজকাল দেখা যায় না। একটা শটগান, যার ব্যারেলের দৈর্ঘ ট্রিগার থেকে বড় জোর একফুট হবে৷ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে, লোকটার মুখে খুবই কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে, ফলে প্রচণ্ড আঘাতে মাথাটা ফেটে চৌচির। পল্লির পুলিশ-অফিসার খুবই ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। এক বড় সংকটের মুখে পড়েছিলেন। এই পল্লি শান্ত জায়গা, সাধারণ চোর-ছ্যাঁচোড়ের উৎপাত, খুন-খারাবি এখানে ঘটেই না।
‘কোনো কিছু কেউ ছোঁবেন বা, যতক্ষণ না আমার উপরের অফিসার লন্ডন থেকে এসে পৌঁছচ্ছেন তদন্তের কাজে।
‘এখনও পর্যন্ত এই ঘরের কোনো কিছু কেউ স্পর্শ করেনি।’সিসিল জানালেন বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, ‘আমি যখন বলছি তখন জানবেন কথাটায় কোনও মিথ্যে নেই। আপনি যা এ-ঘরে দেখছেন, সবই জানবেন আগে যেমন ছিল তেমনই আছে।’
‘গুলির শব্দ পেয়েছিলেন?’ দারোগা নোটবুক বের করলেন।
‘শুনেছিলাম।’
‘সময়?’
‘ঠিক রাত সাড়ে-এগারোটা। জামাকাপড় তখনও ছাড়িনি, আমাকে শোবার জন্যে যে ঘর দেওয়া হয়েছে, সেখানে বিছানায় আনমনে বসেছিলাম; হঠাৎ কানে এল ফায়ারিংয়ের শব্দ। খুব বিকট শব্দ নয়, শব্দটা মনে হয়েছিল চাপা। আমি তাড়াতাড়ি দোতলা থেকে একতলাতে নেমে এসেছিলাম। তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে।’
‘এই ঘরের দরজা খোলা ছিল?’
‘হ্যাঁ। হতভাগ্য ডগলাস পড়ে ছিল যেমন আপনি দেখছেন এখন। এই ঘরের টেবিলে শুধু একটা বাতি জ্বলছিল৷ যে ল্যাম্পটা এখন জ্বলতে দেখছেন সেটা আমিই জ্বালাই।’
‘কাউকে দেখতে পাননি?’
‘কাউকে না৷ সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শুনে বুঝেছিলাম মিসেস ডগলাস নেমে আসছেন। ছুটে বাইরে গেলাম, তাঁকে কিছুতেই ঢুকতে দিলাম না এই ঘরে, এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য তিনি সইতে পারবেন না এই ভেবে৷ ইতিমধ্যে এ-বাড়ির হাউস-কিপার মিসেস অ্যালেন ছুটে আসছিলেন। আমি তাকেও ঘরে ঢুকতে মানা করলাম আর বললাম, মিসেস ডগলাসকে দোতলায় তাঁর ঘরে নিয়ে যেতে, তার কাছে থাকতে৷ এই যে আমাদের বাটলার, অ্যামিসও ততক্ষণে এসে গেছে। আমরা দুজনে আবার এই ঘরে ফিরে এলাম।’
‘ইতিমধ্যে দু-একজন পরিচারকের সঙ্গে আমি ঝটিতি কথা বলে নিয়েছি৷ শুনলুম পরিখার কাঠের সেতু নাকি সারারাত ওপরে তোলা ছিল।’
‘হ্যাঁ, তোলা ছিল৷ সন্ধের পর ওই সেতু আমরা ওপরে তুলে দিই, তাতে পরিখা ডিঙিয়ে কেউ বাড়ির কাছে আসতে পারে না৷ এদিন থানায় যাবার জন্যে আমি সেতু নামিয়েছিলাম।’
‘সেতু প্রতিদিনকার মতো তোলা ছিল বলছেন। তাহলে ঘাতক পালাল কীভাবে? এ তো জলের মতো পরিষ্কার যে, মি. ডগলাস নিজের মাথায় নিজেই গুলি করেছেন।’
‘সেটা আমরাও প্রথমে ভেবেছিলাম। কিন্তু এই দেখুন।’ পাশেই বিশাল গবাক্ষের চওড়া পর্দা ঝাঁ করে সরিয়ে দিলেন বার্কার। গবাক্ষের নীচের দিকে মার্বেলের চৌকাঠের কাছে ল্যাম্পটা নিয়ে বার্কার বললেন, ‘ভালোভাবে দেখুন!’ সার্জেন্ট বিস্ময়ের চোখে দেখলেন রক্তের ছাপ, মনে হল, জুতোর সোলের৷
‘কেউ জানালার এই জায়গায় উঠে দাঁড়িয়েছিল, বার্কার বললেন৷ সার্জেন্ট ভাবছিলেন চওড়া জানালা, ফ্রেঞ্চ উইনডো, অর্থাৎ শিক নেই। ঠিকই, এই জানালা গলে যে কেউ পালাতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে...,’ জিগ্যেস করলেন সার্জেন্ট, ‘আপনি কি বলতে চাইছেন পরিখার জল সাঁতরে কেউ পালিয়েছে?’
‘এগজ্যাক্টলি! দুটো পরিখা৷ জানালার নীচেরটাতে জল আছে৷ পরের পরিখাটায় শুকনো কাদা। এই সামনেরটা সাঁতরে, দ্বিতীয়টার কাদা মাড়িয়ে পালিয়ে যেতে খুনির আর কতক্ষণ সময় লাগবে?’
সার্জেন্ট কপাল কুঁচকে কিছুক্ষণ ভেবেছিলেন৷ তার মগজ বেশ ধারালো৷ সে কারণেই পরের প্রশ্নটা করলেন, যেটা খুবই প্রাসঙ্গিক, ‘বুঝলুম খুনি জানলা টপকে পরিখা সাঁতরে চম্পট দিয়েছে; তাহলে এবার প্রশ্ন হল, সন্ধের পর থেকে তো সেতু আপনারা কপিকলের সাহায্যে রোজকার মতো তুলে দিয়েছিলেন, তাহলে লোকটা এই বাড়ির ভেতরে ঢুকল কীভাবে?’
‘সেটা একটা প্রশ্ন বটে।’ বার্কার বললেন।
‘ঠিক কোন সময়ে সেতু দুটো তুলে নেওয়া হয়?’
‘ঠিক সন্ধ্যা ছ’টার সময়।’ উত্তর এল বাটলার অ্যামিসের কাছ থেকে।
‘কিন্তু আমি শুনেছি।’ দুটো কাঠের ব্রিজ ওপরে তুলে নেওয়া হয় সাধারণত সূর্যাস্তের সময়। এখন তো শীতকাল। অন্ধকার চারটে, সাড়ে চারটের ভেতরে নেমে যায়। তাহলে তো সন্ধ্যা ছ’টার অনেক আগে অর্থাৎ ওই সাড়ে চারটের সময়েই ব্রিজ আপনাদের তুলে নেওয়ার কথা।’
‘প্রতিদিনই বিকেলের দিকে মিসেস ডগলাসের বান্ধবীরা এ বাড়িতে আসেন গল্পগুজব করতে, চা খেতে। ব্রিজ পাতাই থাকে পরিখার ওপর যতক্ষণ ওঁরা না যান। ওঁদের যেতে প্রায় ছ’টা বেজে যায়। প্রতিদিন কাঠের ব্রিজ নামানো আর তোলার কাজটা আমিই তো করে থাকি।’ উত্তরটা এল বাটলার, অ্যামিসের কাছ থেকে।
‘তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এরকম।’ কপাল কুঁচকে সার্জেন্ট বললেন, ‘যদি বহিরাগত কেউ বা কারা এ বাড়িতে ঢুকে থাকে, সেতু দুটো যখন পরিখা দুটোর ওপর পাতা ছিল, অর্থাৎ সন্ধে ছ’টা বাজার বেশ কিছুক্ষণ আগেই একজন বা একাধিক মানুষ, বাড়ির ভেতর ঢুকে এই ঘরে লুকিয়েছিল রাত এগারোটা পর্যন্ত যতক্ষণ না মি. ডগলাস এই ঘরে এসে ঢুকেছিলেন।’
‘ব্যাপারটা ঠিক সেরকমই ঘটেছে! প্রতি রাতেই মি. ডগলাস শোবার ঘরে আসার আগে বাড়ির চারপাশ ঘুরে দেখতেন আলোগুলো সব জ্বালা আছে কিনা। এই রাতেও উনি রাউন্ড সেরে শোবার ঘরে ঢুকেছেন রাত এগারোটা নাগাদ, আর এই ঘরে লুকিয়েছিল যে লোকটা সে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করেছে। নিজের অস্ত্রটা ফেলে রেখে জানালা দিয়ে সে পালিয়েছে। ঠিক এইভাবেই আমি ভেবেছি৷ তা না হলে ব্যাপারগুলো ঠিক মিলছে না।’ বার্কার জানালেন।
সার্জেন্ট ঝুঁকে একটা কার্ড তুলে নিলেন। মেঝেতে মৃত ব্যক্তির পাশে পড়েছিল। কার্ডে আদ্যক্ষর লেখা আছে, ভি. ভি.। আর ঠিক তার নীচে কালি দিয়ে আঁকাবাঁকাভাবে একটা নম্বর-341...।
‘এটা কী?’ সার্জেন্ট ভ্রূ কুঁচকে সেটা দেখতে দেখতে বললেন। বার্কারও দেখলেন কার্ডটা। বললেন, এটা তো আগে চোখে পড়েনি! মনে হচ্ছে, খুনিই কার্ডটা ফেলে গেছে।
‘ভি. ভি-341...মাথায় ঢুকছে না কিছু।’
সার্জেন্ট ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখছিলেন কার্ডটা, ‘ভি. ভি. কার নামের ইনিশিয়াল হতে পারে? ডঃ উড, আপনার পায়ের কাছে ওটা কী?’
সকলে সেদিকে তাকাল। প্রমাণ-সাইজের একটা হাতুড়ি পড়ে আছে কার্পেটের ওপর। কামারশালে কামাররা যেমন হাতুড়ির ব্যবহার করে থাকে। দেয়ালের তাকে এক বাক্স পেরেক৷ সেদিকে আঙুল দেখালেন বার্কার। বললেন, ‘গতকাল সকালের দিকে মি. ডগলাস দেয়ালের ছবিগুলোর জায়গা পরিবর্তন করছিলেন। ঘরটার একটু অন্যরকম রূপ দেওয়া আর কী। আমি নিজে দেখেছি, চেয়ারের ওপর উঠে তিনি ওই ছবিটার ফ্রেমে পেরেক ঠুকছিলেন। ওটা আগে এই ঘরের অন্য দেয়ালে ছিল। হাতুড়িটার এখানে থাকার কারণ এবার নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে...।’ সিসিল বার্কার সার্জেন্টের দিকে তাকিয়ে বললেন।
‘কার্পেটের যেখানে হাতুড়িটা পড়েছিল, সেখানেই থাক।’ সার্জেন্ট নির্দেশ দিলেন, মাথা চুলকোচ্ছেন, স্পষ্টতই হতচকিত ভাব। আবার বললেন, যেন নিজের মনেই, ‘ব্যাপার-স্যাপার যা দেখছি, এসবের কূল-কিনারা পেতে হলে সবথেকে খাঁটি মগজের দরকার। লন্ডন থেকে ওঁরা এসে বুঝবেন সব। তিনি নিজেই হাত-ল্যাম্পটা তুলে ধরলেন, এবং সারা ঘরে সতর্ক দৃষ্টিতে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। ‘হ্যাল্-লো!’ আবার উত্তেজিতভাবে বলে উঠলেন, জানালার পর্দা একধারে সরিয়ে। ‘ঠিক কটার সময় জানালা বন্ধ করে পর্দা টেনে দেওয়া হয়েছিল?’
‘যখন ঘরে আলো জ্বেলে দেওয়া হয়েছিল।’ বাটলার উত্তর দিল, ‘বিকেল চারটের খানিক বাদে।’
‘কেউ এখানে লুকিয়ে ছিল, কোনো ভুল নেই।’ সার্জেন্ট হাতের আলো নীচু করে ধরলেন, পর্দার পেছনে অনেকটা জায়গা, একজন ভালোভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। সেখানে মেঝেতে কাদামাখা জুতোর ছাপ, চোখে দেখলেই বোঝা যায়। ‘এবার মি. বার্কার, আপনার কথার সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছি৷ মনে হচ্ছে, লোকটা বাড়ির ভেতরে চুপিসারে ঢুকেছিল, বিকেল চারটে বাজার পর, জানালা বন্ধ করে যখন পর্দা-টর্দা টেনে দেওয়া হয়েছিল। আবার এটাও মাথায় রাখতে হবে সময়টা স্পষ্টতই সন্ধে ছটার আগে যখন কাঠের ব্রিজ তুলে নেওয়া হয়েছিল। লোকটা সকলের চোখ এড়িয়ে এই ঘরেই ঢুকেছিল, কারণ এটাই প্রথম চোখে পড়েছিল৷ লুকোবার মতন উপযুক্ত জায়গা তাড়াহুড়োতে খুঁজে পাচ্ছিল না, সুতরাং এই ঘরে ঢুকে পর্দার পেছনে গা ঢাকা দেয়। এ একেবারে জলের মতন স্পষ্ট৷ এরকম হতে পারে প্রথমে তার ধান্দা ছিল বড় ধরনের চুরি-চামারি করবে, কারণ শুধু এ-ঘরেই প্রচুর মূল্যবান জিনিসপত্র আছে; কিন্তু মি. ডগলাস হঠাৎ এসে পড়ায় সে ঘাবড়ে যায় আর হাতেনাতে ধরা পড়ার ভয়ে খুনটা করে সটকে পড়ে।’
‘আমিও ঠিক এরকমই ভেবেছি,’ বললেন বার্কার, কিন্তু, আমি যেটা বলতে চাইছি, আমরা সময় নষ্ট করে ফেলছি না তো? এখনই কি বাইরে বেরিয়ে সারা পল্লি তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখা উচিত নয়? এখনও হয়তো লোকটা এই অঞ্চল থেকে পালিয়ে যেতে পারেনি?’ সার্জেন্ট এক মুহূর্ত ভাবল।
‘এখন তো মাঝরাত, ভোর ছটার আগে কোনো ট্রেন নেই; সুতরাং রেলপথে সে পালাতে পারবে না। যদি রাস্তা দিয়ে যায়, তাহলে তো কারোর না কারোর চোখে পড়ে যাবে, কারণ পরিখার জলে সাঁতার দেওয়ার ফলে তার ট্রাউজার, তো ভিজে সপসপে! সে যাই হোক, ওপরওলার নির্দেশ ছাড়া আমি তো এই ঘর ছেড়ে যেতে পারব না৷ আবার আপনাদের কাউকেও আমি বাইরে যেতে দিতে পারি না, যতক্ষণ না লন্ডন থেকে ওঁরা পৌঁছে যান।
ইতিমধ্যে আলোটা হাতে নিয়ে, নীচু হয়ে, তীক্ষ্ণ-চোখে মৃতদেহের দিকে তাকিয়েছিলেন। ‘এই চিহ্নটা কীসের?’, তিনি বললেন। ‘লোকটার হাতে এটা কোনো গুপ্ত সংকেত নয় তো?’ মৃতের ডানহাতটা তার জামার হাতা থেকে অনেকটা বেরিয়ে এসেছে, প্রায় কনুই পর্যন্ত৷ কনুইয়ের ঠিক নীচে, হাতের সামনের দিকে একটা অদ্ভুত-রকমের বাদামি ডিজাইন, খুবই নিখুঁত, একটা সূক্ষ্ম বৃত্তের মাঝখানে একটা ত্রিভুজ, যেন হাতের চামড়া ফুঁড়ে দগদগ করছে পুরো চিহ্নটাই!
‘এটা ট্যাটু নয়,’ বললেন ডাক্তার, চশমার মধ্যে দিয়ে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন তিনি। ‘সারাজীবনেও এরকম কিছু আমি আগে দেখিনি। মনে হচ্ছে, লোকটার হাতের ওই জায়গায়, চামড়ায় ছ্যাঁকা দিয়ে চিহ্নটা দেগে দেওয়া হয়েছে। গরুদের যেমন চিহ্নিত করতে দেগে দেওয়া হয়৷ এসবের মানে কী?’
‘আমি কোনোদিন মাথা ঘামাইনি এর মানে-টানে জানার জন্যে। বললেন সিসিল বার্কার; ‘তবে গত দশ বছর ধরে বন্ধু ডগলাস-এর হাতে আমি এই চিহ্ন দেখে আসছি।’
‘আমিও এটা দেখেছি,’ বাটলার বলল৷ ‘অনেক সময়েই যখন মনিব তাঁর ডান হাতের হাতা গুটোতেন, আমার চোখে ওই চিহ্নটা পড়েছে। আমিও ভেবেছি ওটা কীসের চিহ্ন...।’
‘কিন্তু সে যাইহোক, এই খুনের সঙ্গে হাতের ওই দাগের কোনো সম্পর্ক নেই৷ তবে ব্যাপারটা উদ্ভট, অদ্ভুত৷ এই কেসটার সবকিছুই অদ্ভুত। কী হল? আপনার আবার কী হল?’
বাটলারের মুখ থেকে শোনা গেল, ‘একী!’ আর সে আঙুল দেখাচ্ছিল মৃতের বাম হাতের আঙুলের দিকে।
‘ওঁর আঙুল থেকে বিয়ের আংটিটাও আততায়ী খুলে নিয়ে গেছে!’ অর্ধস্ফুটে সে বলল।
‘কী!’
‘হ্যাঁ, দেখুন না। মনিবের বাঁ-হাতের কড়ে আঙুলে দেখে আসছি বরাবর সোনার আংটি, ওঁর বিয়ের আংটি। কিন্তু আঙুল ফাঁকা! কোথায় গেল আংটি?’
‘ঠিকই বলছে ও,’ বার্কার বললেন।
‘বিয়ের আংটিটাও চুরি করে নিয়ে গেছে?’ সার্জেন্টের চোখদুটো ছানাবড়া!
‘তাই তো দেখছি,’ বললেন বার্কার।
মফস্বলের দারোগাবাবুর সত্যিই অবাক হওয়ার পালা। আবার মাথা চুলকে তিনি বললেন, ‘ওহ্, লন্ডন থেকে আসতে ওপরওলাদের কেন যে এত দেরি হচ্ছে! এরকম কেস, এত রহস্য বাপের জন্মে দেখার সুযোগ হয়নি। শুধু ধাঁধা আর ধাঁধা! চমকের পর চমক! এই জটিল রহস্যের সমাধান করা আমার কম্ম নয়। আমাদের এখানকার ধুরন্ধর ডিটেকটিভ হোয়াইট ম্যাসন আছেন। তিনিও আবার কোথায় যেন চলে গেলেন! তবে ম্যাসন সাহেবও পারবেন কি এই রহস্যের জটিল জাল ভেদ করে সত্যিটা যে কী তা জানতে? লন্ডন থেকে ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ড আসছেন শুনেছি৷ একেবারে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের অফিসার! অনেক অভিজ্ঞতা। ক্ষুরধার বুদ্ধি! ব্যাপারটা আরও জমে যাবে, যদি তিনি সঙ্গে করে নিয়ে আসেন বিখ্যাত গোয়েন্দা শার্লক হোমসকে। মি. হোমস তো শুনেছি দিনকে রাত, আর রাতকে দিন করতে পারেন। এমনই ধারালো তাঁর মগজ!’

পরিচ্ছেদ ৪ঃ অন্ধকার
ট্রেনে আমাদের সময় লাগল বেশ। দুপুর বারোটা নাগাদ পৌঁছলাম বার্লস্টোন স্টেশনে। সাসেক্স-এর গোয়েন্দা-অফিসার হোয়াইট ম্যাসন আমাদের অভ্যর্থনা জানাবার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন স্টেশনে৷ লোকটিকে দেখতে আদৌ গোয়েন্দা-অফিসারের মতো নয়৷ পোশাক-আশাক এবং ভাবভঙ্গী কিছুটা যেন গ্রামের মধ্যবিত্ত চাষির মতো। তাঁর বস্ ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ড ছাড়াও আমাদের দুজনকে তিনি খুবই ভদ্রভাবে ধন্যবাদ জানালেন মূল শহর ছেড়ে এতদূর আসার জন্য। ভদ্রলোককে এক নজর দেখে যেমন একটু মিয়ানো, মিনমিনে মনে হয়েছিল তা আদৌ নয়৷ প্রাণশক্তিতে তিনি ভরপুর৷ ডগলাসের জমিদার-বাড়িতে যেতে হলে কিছুটা হাঁটতে হবে। তাই তিনি প্রস্তাব দিলেন যে, স্টেশনেরই কোনো সরাইখানায় বসে আমরা একটু কফি পান করে নিতে পারি। প্রস্তাবটা আমাদের তিনজনেরই মনঃপূত হল৷ বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সরাইখানায় বসলাম আমরা। সকালের টাটকা, তাজা কফির গন্ধে মনটাও আবার তাজা হয়ে উঠল। মি. ম্যাসন জমিদারবাড়িতে যে খুন হয়েছে তার বর্ণনা দিলেন সংক্ষেপে কিন্তু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। যা বেশ বিশদভাবে পাঠকরা ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন আগের পরিচ্ছেদে। ম্যাকডোনাল্ডের হাতে নোটবুক এবং পেনসিল। ম্যাসন আবেগের তোড়ে যা বলে যাচ্ছেন, তিনি মাঝে মাঝে যেটা প্রয়োজনীয় মনে করছেন তা লিখে রাখছেন সংক্ষেপে, অবশ্যই পুলিশের সাঙ্কেতিক ভাষায়।
‘আপনারা এসে পৌঁছনোর আগে আমি সকালের দিকে একবার ম্যানর হাউসে গিয়েছিলুম৷ ওখানে আমাদের সার্জেন্ট, থানার দারোগা, উইলসন মৃতদেহের পাহারায় আছেন। যেটা প্রয়োজনীয় বুঝছেন, সে ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছেন৷ উনি আমাকে একটা হাতুড়ির কথা বললেন৷ হাতুড়িটা আমিও দেখলুম, মৃতদেহের কাছাকাছি, কার্পেটের ওপরে পড়ে আছে।’
‘হাতুড়ি?’হোমস কৌতূহল প্রকাশ করল।
‘হ্যাঁ, হাতুড়ি৷ আমি অবশ্য হাতুড়িটা ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখেছি। ওখানে আছেন ডঃ উড। উনিও আমাকে সাহায্য করলেন। কিন্তু হাতুড়িতে রক্ত, মাথার চুল কিছুই লেগে থাকতে দেখলুম না। ভেবেছিলুম মি. ডগলাস হয়তো নিজেকে বাঁচাতে হাতুড়িটা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু নাহ্, হাতুড়িটা পরিষ্কার...।’
‘নিরীহভাবে কার্পেটের ওপর পড়ে আছে।’ হোমস বলল।
‘এতে অবশ্য কিছুই প্রমাণ হয় না।’ বললেন ম্যাকডোনাল্ড; ‘আগে হাতুড়ির সাহায্যে অনেক খুনই হয়েছে কিন্তু হাতুড়িতে খুনের কোনো চিহ্নই পাওয়া যায়নি।’
‘হতে পারে স্যার। তারপর আমি মারণাস্ত্র অর্থাৎ বন্দুকটাকে পরীক্ষা করলুম। ঠিক বন্দুক বলা যায় না৷ শর্টগান বলাই ঠিক। মাত্র দু-ফুট লম্বা। কোটের ভেতরের পকেটে ওটাকে লুকিয়ে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো, এমন কিছু শক্ত কাজ নয়৷ অস্ত্রটা কোন্ কোম্পানিতে তৈরি, সেসবের উল্লেখ নেই৷ শুধু ব্যারেলের নীচে তিনটে অক্ষর দেখলুম, P-E-N। আমার মনে হয় সাবধানতার জন্যে কোম্পানীর নাম মেকানিক্যাল উপায়ে মুছে ফেলা হয়েছে...।’
‘ক্যাপিটাল P আর E এবং N ছোট করে লেখা? মানে, Pen এইরকম?’ হোমস জিগ্যেস করল।
‘ঠিক সেরকমই।’
‘Pennsylvania Small Arms Company, খুব নামকরা বন্দুক তৈরির কারখানা। অবস্থান আমেরিকায়।’ জানাল হোমস।
‘একেবারে খাঁটি কথা বলেছেন মি. হোমস। সত্যি! আপনি কত কী জানেন...ম্যাসনের প্রশংসাকে হোমস পাত্তাই দিল না।
‘তাহলে এবারে ঘটনাটা আমরা এভাবে ভেবে নিতে পারি...।’ ম্যাসন যে রেলগাড়ির গতিতে কথা বলতে পছন্দ করেন সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম৷ তিনি বলছিলেন, ‘তাহলে তো রহস্যের আসল সূত্রটাই পাওয়া গেল। যে লোকটা জমিদারবাড়িতে ঢুকে মি. ডগলাসকে হত্যা করেছে তার পরিচয় জানা গেল, সে একজন আমেরিকান।’
এবার কিঞ্চিৎ অধৈর্য হয়ে ম্যাকডোনাল্ড বললেন, ‘আরে ভাই, একটু থেমে! এত গড়গড় করে এগিয়ে যাবেন না৷ আমি কোনো প্রমাণের কথা জানি না এখনও যে, বাড়িতে বাইরের লোক কেউ ঢুকেছিল...।’
‘অনেক প্রমাণ আছে স্যার! একেবারে যাকে বলে প্রমাণের ছড়াছড়ি! খোলা জানালা, জানালার নীচে চৌকাঠে রক্তের দাগ, মৃতদেহের পাশে পড়ে থাকা কার্ড, জানালার পর্দার আড়ালে জুতোর চিহ্ন, শর্টগান!’
‘এসব সাজিয়ে রাখার কাজেও ব্যবহার করা যায়। এটা ভুললে চলবে না যে, মি. ডগলাস কিন্তু ব্রিটিশ নয়, একজন খাঁটি আমেরিকান৷ এবং আমেরিকাতে তিনি কাটিয়েছেন অনেকদিন। মি. বার্কারও তাই। আমেরিকাতেই তাঁর সঙ্গে ডগলাসের বন্ধুত্ব হয়। আমেরিকান বস্তু দিয়ে একটা জমাট নাটক সাজাতে বাড়িতে আমেরিকান কারোর অনুপ্রবেশের প্রয়োজন নেই,’ বললেন ম্যাকডোনাল্ড।
‘ও বাড়িতে আর একজন আছে, মি. অ্যামিস। বাটলার।’
‘সে আবার কীরকম? বিশ্বাস করা যায়?’
‘লোকটা ও-বাড়িতে ডগলাসের সঙ্গে আছে পাঁচ বছর৷ তার বয়ান অনুযায়ী, সে কিন্তু বাড়িতে ওই ধরনের শর্টগান কোনোদিন দেখেনি।’
ম্যাকডোনাল্ড তবুও গম্ভীরভাবে বললেন, ‘তাও আমি বলছি, ও-বাড়িতে বাইরে থেকে এসে কেউ খুন করেনি। আমি নানা সোর্স থেকে খবর নিয়ে যা জেনেছি...। বলব কি মি. হোমস?’
‘হ্যাঁ বলুন। আমি তো আরো জানতেই চাইছি।’
‘যদি ধরেই নেওয়া যায় যে, বাইরে থেকে কারোর অনুপ্রবেশ ঘটেছিল ও-বাড়িতে, তাহলে, আমি নিশ্চিত যে, সে নেহাতই চুরি-চামারি করতে আসেনি। বিয়ের আংটি মৃতের আঙুল থেকে চুরি যাওয়া আর ওই ফেলে যাওয়া কার্ডে দুটো সূত্রের মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত ব্যাপার থাকলেও থাকতে পারে৷ বেশ। ধরলাম, বাইরে থেকেই কেউ একজন বাড়িতে লুকিয়ে ঢুকে পড়ল খুনটা করার জন্যে। সে জানে, জানতেই হবে তাকে, যে দুষ্কর্মটি করে পালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে বেশ কঠিনই হবে কারণ বাড়ির চারিদিকে জলের পরিখা৷ কিন্তু খুন করার জন্যে যে অস্ত্রটা সে আনবে, তাতে তো সাইলেন্সার থাকা উচিত, কারণ যে শর্টগানের কথা বলা হচ্ছে তাতে ফায়ার করলে প্রচণ্ড শব্দ হবে, বাড়ির লোকজন ছুটে আসবে। পরিখার জলে সাঁতরে পালাতে গিয়ে সে তো ধরাও পড়ে যেতে পারে! কিন্তু অস্ত্রটা যদি সাইলেন্ট থাকত তাহলে অন্য হিসেব। এই কারণেই আমার সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে মি. হোমস।’
‘খুবই যুক্তিপূর্ণ কথা বলেছেন মি. ম্যাক। আচ্ছা, মি. ম্যাসনকে আমি একটা প্রশ্ন করতে চাই...।’
‘বলুন স্যার?’
‘আপনি কি পরিখার বিপরীত পাড়ে গিয়ে দেখেছেন যে, সেখানে কোনো জুতোর ছাপ আছে কিনা? কারণ আততায়ী পালালে তো জল সাঁতরেই পালাবে আর সেক্ষেত্রে তার ট্রাউজার এবং জুতো তো ভিজে জবজবে হয়ে থাকবে।’ সেরকম কোনো চিহ্ন কি আপনার মতো অভিজ্ঞ পুলিশের চোখ এড়িয়ে যাবে?’
‘সেরকম কোনো চিহ্নই পাইনি। আমি পরিখার অন্য পাড় তন্নতন্ন করে দেখেছি।’
‘জুতোর দাগ কিংবা প্যান্ট থেকে চুঁইয়ে পড়া জল, এরকম কিছুই চোখে পড়েনি আপনার?’
‘কিস্যু না...।’
‘লোকটা যদি ওভাবে পালিয়ে থাকে তাহলে কিছু না কিছু চিহ্ন থাকারই কথা...।’ হোমস বিড়বিড় করল।
‘এখন কি তাহলে আমরা...,’ ম্যাসন প্রশ্ন শেষ করার আগেই হোমস বলল, ‘হ্যাঁ, আর দেরি না করে এখনই আমাদের ওই বাড়িতে যাওয়া দরকার। কিছু কিছু ছোটখাটো ব্যাপার হয়তো আপনাদের চোখ এড়িয়ে গেছে...।’
‘চলুন তাহলে। হোমসের কথায় মি. ম্যাসন যেন সন্তুষ্ট হলেন না।’
হেঁটে বিশাল জমিদার-ভবনে পৌঁছতে আমাদের মিনিট দশ লাগল। দেখেই বোঝা যায়, এ ভবন প্রাচীন; সতেরো শতকের স্থাপত্যের অজস্র নিদর্শন ছড়িয়ে আছে চোখের সামনে। ঘনীভূত এক ট্র্যাজেডির জন্যে এরকম প্রাচীন, ভগ্নপ্রায় পরিপ্রেক্ষিতই যেন যথাযথ।
পরিখার নামানো কাঠের সেতু পার হয়ে আমরা ভবনের সিংহদুয়ারে পৌঁছলাম। দুজন দাঁড়িয়েছিল, সম্ভবত আমাদের অভ্যর্থনা করবার জন্যে। একজনের পুলিশের পোশাক দেখে বুঝে নিতে হল যে, তিনি সার্জেন্ট উইলসন। আর একজন লম্বা, ছিপছিপে, ফিটফাট; মি. ম্যাসন গম্ভীর গলায় জানালেন যে, তিনি হলেন বাটলার, মি. অ্যামিস।
ভদ্রতাসূচক কথাবার্তার পর আমরা সেই ঘরে পৌঁছলাম, যেখানে কার্পেটের ওপর মৃতদেহ পড়ে আছে; এমনভাবে মারা হয়েছে কার মুখ সেটা চেনাই অসম্ভব। মি. ম্যাসনের দেখলাম উৎসাহ অসীম এবং তিনি কথা বলতেও পছন্দ করেন।
‘ঘটনাটা কীরকমভাবে ঘটেছিল সেটা আমি যেভাবে ভেবেছি বলব কি স্যার?’ এই প্রশ্নটা অবশ্য তিনি করলেন ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ডকে৷ অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেন ইনস্পেকটর বললেন, ‘আমাদের পুলিশের ভাষায় ঘটনার reconstruction বা পুনর্গঠন করার কথা বলছেন তো? করুন। বলুন, শুনি।’
‘এভাবে স্যার, আমি কল্পনা করেছি ঘটনাটা...ল্যাম্পের আলো হাতে মি. ডগলাস এই ঘরে ঢুকলেন। ল্যাম্প রাখলেন টেবিলের ওপর৷ জানালার লম্বা পর্দার পেছন থেকে লাফিয়ে এল একটা লোক। তার হাতে উদ্যত শর্টগান। লোকটা ডগলাসের কাছ থেকে তাঁর বিয়ের আংটি চেয়ে বসল, ঈশ্বর জানেন ওটাই বা কেন, কিন্তু কারণ যাই হোক, ব্যাপারটা এরকমই। মি. ডগলাস লোকটার মারমূর্তি দেখে দিয়ে দিলেন আংটিটা৷ তারপর ডগলাস লোকটা ওপর ঝাঁপাতে যাবেন, সেই মুহূর্তে লোকটা ডগলাসের মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালাল। বন্দুক রাস্তা দিয়ে সঙ্গে নিয়ে যাবে কেন? ধরা পড়ার ভয়৷ উদ্দেশ্য তো সমাধা হয়েই গেছে৷ তাই বিচিত্র এই বন্দুকটা সে ফেলেই গেল৷ তার সঙ্গে একটা কার্ডও রেখে গেল, V. V. 341, এটার অর্থও ঈশ্বরই জানেন৷ তারপর সে জানালা দিয়েই পালালো, পরিখা সাঁতরে ওপারে চলে গেল; ততক্ষণে সিসিল বার্কার দেখতে পেয়েছেন কী সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছে এখানে।...কী রকম ভেবেছি আমি? মি. হোমস?’
‘খুবই ইন্টারেস্টিং, কিন্তু দু-একটা জায়গা যেন অবিশ্বাস্য লাগছে।’
‘যা ভাবা হয়েছে সবটাই উদ্ভট, এলমেলো!’ প্রায় চেঁচিয়েই উঠলেন ম্যাকডোনাল্ড, ‘কেউ একজন কারোকে হত্যা করেছে কিন্তু এই শর্টগান দিয়েই বা মারতে যাবে কেন? যাতে এত দুর্দান্ত শব্দ হবে যে, বাড়ির লোকজন ছুটে আসবে আর আততায়ীর ধরা পড়ে যাবার সুযোগ থাকবে অনেক বেশি। মি. ম্যাসন, আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনি যা ভেবেছেন, আগাগোড়া ভুল ভেবেছেন। মি. হোমস, আপনার দিকেই আমি তাকিয়ে আছি। আপনি কী ভাবছেন বলুন?’
হোমসের কপাল কুঁচকেই আছে। আর তার শ্যেনদৃষ্টি শুধু একবার ডানদিকে, একবার বাঁদিকে ঘুরছে।
‘জুতসই কোনো ব্যাখ্যা দেবার আগে আরো কিছু ব্যাপার জেনে নেওয়ার দরকার আছে।’ মন্তব্য করল হোমস। তারপর মৃতদেহের পাশে বসল হাঁটু গেড়ে, ‘মি. ম্যাক, মাথার ইনজুরিটা দেখেছেন? ওহ, মাই গড, সাংঘাতিক! মাথাটা ভেঙে চৌচির। মুখও ভেঙে গেছে, ভেসে যাচ্ছে রক্তে, মৃতকে চিনতে পারার কোনো উপায়ই নেই!’
‘হুমম্ তাই তো দেখছি।’ উদ্বেগের স্বরে বললেন ইনস্পেকটর।
‘মি. অ্যামিস?’ হোমস ডাকল।
‘ইয়েস স্যার...।’
‘মি. ডগলাসের হাতে দেগে দেওয়া এই চিহ্নটার সঙ্গে নিশ্চয়ই আপনি পরিচিত? বৃত্তের ভেতরে ত্রিভুজ?’
‘ওটা ওঁর হাতে দেখেছি স্যার।’
‘এটার অর্থ কী হতে পারে কোনো আলোচনায় শুনেছেন কখনো?’
‘না স্যার।’
‘এই চিহ্নটা যখন হাতে দেগে দেওয়া হয়েছিল, তখন অসম্ভব যন্ত্রণা পেয়েছিলেন ভদ্রলোক। মি. অ্যামিস, মি. ডগলাসের চোয়ালের কাছে আমি দেখতে পাচ্ছি ছোট একটা প্লাস্টার। এটা আপনি আগে দেখেছেন?
‘হ্যাঁ স্যার, গতকাল সকালে দাড়ি কামাতে গিয়ে ওই জায়গাটা উনি কেটে ফেলেছিলেন।
‘আপনি তো অনেকদিন আছেন। এর আগে দাড়ি কামাতে গিয়ে উনি কোনোদিন গাল বা চোয়াল কেটে ফেলেছিলেন?’
‘মনে করতে পারছি না, স্যার।’
‘এটা নোট করুন, মি. ম্যাক!’ হোমস বলল, ‘হয় এটা সমাপতন হতে পারে; আর নয়তো দাড়ি কামাবার সময় মি. ডগলাস কোনো বিপদের কথা ভাবছিলেন, অন্যমনস্ক হয়েছিলেন। মি. অ্যামিস, গতকাল কি আপনার কর্তার ব্যবহারে কোনো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেছিলেন?’
‘তাঁকে দেখে মনে হয়েছিল কোনো ব্যাপার নিয়ে তিনি যেন বেশ দুশ্চিন্তায় ছিলেন, উত্তেজিত হয়েছিলেন...।’
‘ঠিক, যা ভেবেছি তাই। তাঁর ওপর যে আক্রমণ হবে তাঁর একটা আঁচ তিনি আগেই পেয়েছিলেন৷ তাহলে কিছুটা এগোনো গেল, তাই তো মি. ম্যাক? তাহলে এবার প্রশ্ন করতে আপনিই শুরু করুন, মি. ম্যাক?’
‘না, মি. হোমস, আমার থেকে আপনিই উপযুক্ত এ ব্যাপারে।
‘বেশ, তাহলে, কার্ডটার দিকে মন দেওয়া যাক,’ V. V. 341... বেশ মোটা কার্ডবোর্ড কাগজে ছাপা। বাড়িতে এ ধরনের কাগজ দেখেছেন?’
‘মনে তো হচ্ছে না, দেখেছি বলে...,’ অ্যামিসের উত্তর।
‘আচ্ছা হাতের ওই দগদগে দাগটা সম্বন্ধে আপনার ধারণা কী মি. অ্যামিস?
‘কোনো ধারণাই করতে পারছি না স্যার।
‘মি. ম্যাক আপনি কী বলেন?
‘ভয়ঙ্কর অপরাধীদের সিক্রেট সোসাইটিতে এরকম হয়ে থাকে; আমি যতদূর জানি। সোসাইটি তাদের সভ্যদের হাতে এরকম চিহ্ন দেগে দিয়ে থাকে। আইডেনটিফিকেশান মার্ক।’
‘আমারও তাই ধারণা,’ বললেন মি. ম্যাসন।
‘বেশ এবার তাহলে হাতের ওপর এই দাগটাকে ভিত্তি করে আমরা একটু ভাবতে চেষ্টা করি। মি. ম্যাক যেমন বললেন, সেই ধরনের কোনো অপরাধীদের গোষ্ঠী থেকে একজন এজেন্ট বা একজন সদস্য এই বাড়িতে লুকিয়ে ঢুকে পড়ল, অপেক্ষা করতে লাগল মি. ডগলাস কখন আসেন। ডগলাস যেইমাত্র ঢুকলেন ঘরে, তাঁর মাথা চুরমার হয়ে গেল শর্টগানের গুলিতে, দুর্বৃত্ত পরিখা সাঁতরে চম্পট দিল; মৃত ডগলাসের পাশে একটা কার্ড ফেলে দিয়ে গেল, কারণ হল, যখন সংবাদপত্রে এই বীভৎস খুনের গল্প লেখা হবে, তখন এই কার্ডটারও উল্লেখ থাকবে; আর তার ফলে সেই গোপন অপরাধগোষ্ঠীর অন্যান্য সদস্যরাও জানবে যে, প্রতিশোধ তাহলে নেওয়া হয়েছে। মোটামুটি সব মিলে যাচ্ছে, তাই না? এখন প্রশ্ন হল, মারণাস্ত্রটা খুনি এভাবে ফেলে রেখে গেল কেন?’
‘যথার্থ।’
‘আর সব জিনিস ফেলে আততায়ী আংটিটাই বা নিয়ে গেল কেন?’
‘ঠিক, একেবারে ঠিক।’
‘আর এখনও লোকটা পুলিশের হাতে ধরা পড়ল না কেন? এখন ঘড়িতে দুটো বেজে গেছে। আমি ধরে নিচ্ছি যে, খুনের খবর চাউর হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে এই ছোট পল্লি অঞ্চলের কুড়ি মাইলের ভেতর থানার সিপাইরা জোর তল্লাশি শুরু করে দিয়েছে। জুতো জবজবে ভেজা, ট্রাউজার ভিজে সপসপে এরকম একটা অপরিচিত লোক এখনও তাদের কারোর হাতে ধরা পড়ল না? সত্যিই অদ্ভুত!’
‘ঠিক বলছেন মি. হোমস।’ গোঁফে চাড় দিয়ে ইনস্পেকটর বললেন।
‘যদি এই অঞ্চলে আততায়ীর লুকিয়ে পড়ার কোনো বিশেষ ব্যবস্থা না থাকে; কিংবা কোনও গোপন জায়গায় সে শুকনো এক সেট জামাকাপড় না রেখে থাকে; এবং পরিখার জল থেকে উঠবার পরেই যদি ভিজে ট্রাউজার এবং ভিজে জুতো না পালটে নিতে পারে, তাহলে পুলিশের হাতে তার এতক্ষণে ধরা পড়ে যাবার কথা।’ কথা বলতে বলতে হোমস জানালার কাছে এগিয়ে গেল এবং পকেট থেকে নিজের চশমা বের করে, চোখে লাগিয়ে রক্তমাখা পায়ের ছাপটা পরীক্ষা করল। ‘পায়ের ছাপ ঠিকই। কিন্তু খুবই অস্পষ্ট।’ জানালার ধারেই একটা ছোট টেবিল। তার নীচে কী যেন একটা পড়ে আছে।
‘টেবিলের নীচে ওটা কী বস্তু?’
‘মি. ডগলাসের ডাম্ব-বেল।’ অ্যামিস বলল।
‘ডাম্ব-বেল?...একটা দেখছি। এক জোড়া থাকে। আর একটা কোথায়?’
‘জানি না মি. হোমস। হতে পারে ওই একটাই আছে। এই টেবিলের নীচে কী আছে তেমনভাবে লক্ষ্য করিনি আমি।’
‘একটা ডাম্ব-বেল? স্ট্রেঞ্জ!’ হোমস গম্ভীরভাবে বলল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের ভেজানো দরজাতে, ‘ঠক্, ঠক্!’
লম্বা, সুপুরুষ চেহারা, দাড়ি-গোঁফ কামানো, চকচকে এক ভদ্রলোক ঢুকলেন ঘরে। অনুমান করতে আমার অসুবিধা হল না যে, ইনিই সিসিল বার্কার, যার সম্বন্ধে আগেই শুনেছি। ভদ্রলোক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমাদের প্রত্যেককে দেখে নিলেন।
‘আপনাদের দরকারি আলোচনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করার জন্যে দুঃখিত।’ বললেন তিনি, ‘...একেবারে টাটকা খবরটা আপনাদের কানে এসেছে কি?’
‘কোনো গ্রেপ্তারের খবর?’
‘সেটা হলে তো ঝামেলা মিটেই যেত। আসলে লোকটার বাই-সাইকেলটা পাওয়া গেছে। এ-বাড়ির দরজা থেকে একশো মিটার দূরে ওটা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। আসুন না! নিজেদের চোখে দেখে যান।’
সবাই বাইরে গেলাম।
ঠিকই, ভবনের প্রবেশপথ থেকে কিছুটা দূরে আগাছার একটা বেশ বড় ঝোপ৷ তার ভেতরেই ফেলে রাখা হয়েছিল সাইকেলটা। কয়েকজন পরিচারক সাইকেলটা স্পষ্টতই ঝোপ থেকে টেনে বের করে স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।
‘ব্যাপারটা পুলিশকে তদন্তের কাজে সাহায্য করবে তো নিশ্চয়ই।’ বললেন ইনস্পেকটর। তারপর মি. ম্যাসনের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘কী এবারে আসামি ধরা পড়বে তো?’
‘সেরকমই তো মনে হচ্ছে স্যার।’ ম্যাসন অনিশ্চিতভাবে বললেন।
‘কিন্তু আপনার মনে কি কোনো প্রশ্ন আসছে না, মি. ম্যাসন? আসামি যদি এই সাইকেলে এখানে এসেই থাকে; তাহলে সে আবার এটা ফেলে রেখে গেল কেন? তাড়াতাড়ি পালাবার কাজে তো তাকে এই সাইকেলটাই সাহায্য করত৷ মিলছে না...মিলছে না...কতকগুলো জিনিস একেবারেই মিলছে না। যে অস্ত্র দিয়ে খুন করা হল, সেই অস্ত্রটা মৃতদেহের পাশে ফেলে রেখে যাওয়া। কার্ড ফেলে রেখে যাওয়া যাতে তার আইডেনটিটি পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। আপনি কী বলেন, মি. হোমস্?’
‘একজোড়া ডাম্ব-বেলের একটা আছে। আর একটা নেই। কেন?’

পরিচ্ছেদ ৫ঃ নাটকের কুশীলব
‘স্টাডিতে যা যা দেখার সব আপনারা দেখে নিয়েছেন তো?’ জিগ্যেস করলেন হোয়াইট ম্যাসন। আমরা আবার ঘরে ফিরে এলাম।
‘আপাতত,’ বললেন ইনস্পেকটর। হোমসও ঘাড় নাড়ল।
‘তাহলে এ-বাড়ির লোকজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করে কিছু শুনতে চাইবেন মনে হয়।’ ‘অ্যামিস, ডাইনিং রুম আমরা এই কাজের জন্য ব্যবহার করতে পারি। আমরা সেখানে যাচ্ছি, প্রথমে আপনি আসুন, যা জানেন বলুন।’ ম্যাসনের প্রস্তাবমতো ডাইনিং রুমেই জিজ্ঞাসাবাদের কাজ শুরু হল।
বাটলারের উত্তরের মধ্যে সরলতা ও স্বচ্ছতা, দুই-ই ছিল। তার বক্তব্যের মধ্যে খুবই আন্তরিকতা ছিল। পাঁচ বছর সে এ-বাড়িতে আছে। যখন ডগলাস প্রথম বার্লস্টোনে এসেছিলেন, তখন থেকে। সে বুঝেছিল যে, মি. ডগলাস খুবই ধনী ভদ্রলোক, আমেরিকা থাকাকালীন পয়সাকড়ি ভালোই উপার্জন করেছিলেন। মালিক হিসেবে তাঁর দয়ার শরীর এবং তিনি বেশ বুঝদারও। আগেকার মালিকদের থেকে অ্যামিস এত ভালো ব্যবহার পায়নি। সকলের থেকে মনের মতন সবকিছু পাওয়াও যায় না। মি. ডগলাসের ব্যবহারে, কথাবার্তায় সে এমন কোনো আভাস পায়নি যে, তাঁর মনে কোনো ব্যাপারে আশঙ্কা আছে। বরং উলটোটাই বলা যায়, সে এ-যাবত যত মানুষকে কাছ থেকে দেখেছে, তাঁদের মধ্যে মি. ডগলাসকেই বরাবর ডাকাবুকো, ভয়ডরহীন মনে হয়েছে। তাঁর আদেশ ছিল, প্রতি রাতে হাতে-টানা-কাঠের সেতুকে কপিকলের সাহায্যে উপরে তুলে দিতে, যাতে পরিখার ওপর সেই সেতু ব্যবহার করে কেউ নির্বিঘ্নে বাড়িতে না ঢুকে পড়তে পারে; তাছাড়া এটাই হল এই জমিদারবাড়ির বরাবরের রীতি, এবং ডগলাস সেই রীতি ভাঙতে চাননি।
মি. ডগলাস গ্রাম ছেড়ে কোথাও যেতেন না, লন্ডনেও না; কিন্তু খুনের আগের দিন মালিক টানব্রিজ ওয়েলস-এ বাজার করতে গিয়েছিলেন। সেদিন অ্যামিস লক্ষ্য করেছিল, মি. ডগলাসের চালচলনে এক ধরনের অস্থিরতা আর উত্তেজনা; তাঁর ব্যবহারে প্রকাশ পাচ্ছিল যেন ধৈর্যের অভাব; একথা সেকথায় রেগে যাচ্ছিলেন; সেরকম তাঁকে আগে কোনোদিন দেখেনি সে (অ্যামিস)। দুর্ঘটনার দিন রাতে অ্যামিস দেরি করে বিছানায় গিয়েছিল; বাড়ির পেছনদিকে প্যানট্রিতে কাজ করছিল সে, রুপোর বাসনপত্র গুছিয়ে রাখছিল। সেই সময়েই তার কানে এসেছিল দরজার ঘণ্টা বাজছে, ভীষণ জোরে। সে কোনো গুলির শব্দ শোনেনি, তার কানে ওই ধরনের শব্দ আসা সম্ভবও ছিল না, কারণ এ-বাড়ির প্যানট্রি ও কিচেন বাড়ির একেবারেই পেছনে। মাঝে কতকগুলো দরজা আছে, যেগুলো রাতের দিকে বন্ধ থাকে। আর লম্বা দরজার মাঝে একটা লম্বা বারান্দাও আছে। ঘণ্টি বাজার অত-জোর শব্দ শুনে হাউসকিপার তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। তারা দুজনে একসঙ্গেই বাড়ির সামনের দিকে তাড়াতাড়ি এসেছিল। সিঁড়ির সামনে গিয়ে সে (অ্যামিস) দেখেছিল মিসেস ডগলাস নেমে আসছেন। না, তরতর করে নামছিলেন না তিনি; তাকে দেখে মনে হয়নি তিনি মানসিক উৎকণ্ঠার মধ্যে আছেন। যেইমাত্র তিনি শেষ সিঁড়িতে পৌঁছেছেন, মি. বার্কার স্টাডি থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। মিসেস ডগলাসকে তিনি বারবার অনুরোধ করছিলেন নিজের ঘরে ফিরে যেতে, স্টাডিতে তিনি মালকিনকে ঢুকতে দেননি।
‘দোহাই আপনাকে, নিজের ঘরে ফিরে যান আপনি!’ বার্কার চেঁচিয়ে বলেছিলেন।’জ্যাক আর নেই! বেচারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে! আপনার-আমার কারোরই কিছু করার নেই। দয়া করে নিজের ঘরে ফিরে যান!’
বারবার অনুরোধের ফলে, আবার সিঁড়ি দিয়ে উঠে মিসেস ডগলাস ফিরে যান। তিনি বার্কারের কথা শুনে আর্তনাদ করেননি। চেঁচিয়ে কেঁদেও ওঠেননি। মিসেস অ্যালেন, এ-বাড়ির হাউসকিপার তাঁকে ধরে নিয়ে যান দোতলায়, মালকিনের শোবার ঘরে মিসেস অ্যালেন তাঁকে সঙ্গ দিয়েছিলেন। অ্যামিস ও মি. বার্কার দুজনেই, স্টাডিতে ফিরে যান। সেখানে সবকিছু একইরকম ছিল যেমন পুলিশের পক্ষ থেকে ওঁরা দেখেছেন। ঘরের বাতি তখন জ্বলছিল না; কিন্তু ল্যাম্পটা পুড়ে যাচ্ছিল। জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিয়েছিলেন দুজন; কিন্তু শুধু দেখেছিলেন অন্ধকার; কিছুই দেখা যাচ্ছিল না; কোনো শব্দও কানে আসেনি। তারপর দুজনেই দৌড়ে হলঘরে আসেন, সেই ঘরের জানালায় দড়ি টেনে অ্যামিস কাঠের সেতু আবার নীচে নামায়। মি. বার্কার তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যান, পুলিশকে খবর দিতে।
বাটলারের সাক্ষ্য শেষ হল।
পুলিশের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করে হাউসকিপার মিসেস অ্যালেনের থেকে যা জানা গেল, তা মোটামুটি, তাঁর সহকর্মী, বাটলারের কথারই পুনরাবৃত্তি। মিসেস অ্যালেনের ঘরটা বাড়ির সামনের দিকে। প্যানট্রি, যেখানে অ্যামিস কাজ করছিল, সেটার মতো বাড়ির পেছনদিকে নয়। মহিলা বিছানায় শুতে যাবেন, ঠিক তখনই তাঁর কানে আসে ঝনঝন করে দরজা-ঘণ্টি বেজে ওঠার শব্দ। মহিলা কানে একটু কম শোনেন। বোধহয় সে কারণেই কোনো গুলি-গোলার শব্দ তাঁর কানে পৌঁছয়নি। আর স্টাডিরুমও ছিল বেশ দূরে। মিসেস অ্যালেন মনে করে পুলিশকে জানিয়েছেন যে, একটা শব্দ তাঁর কানে এসেছিল, যেটা তাঁর মনে হয়েছিল দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ। তবে সেই শব্দ আবার তিনি শুনেছিলেন অনেক আগে, অন্তত দরজার ঘণ্টি বেজে ওঠার আধঘণ্টা আগে। মি. অ্যামিসকে বাড়ির সামনের দিকে দৌড়ে আসতে দেখে তিনি নিজেও তার সঙ্গে দৌড়ে এগিয়ে আসেন। মি. বার্কারকে তিনি দেখেছিলেন স্টাডি থেকে বেরিয়ে আসতে, মুখ ছাইয়ের মতো সাদা আর বেশ উত্তেজিত লাগছিল তাঁকে। মিসেস ডগলাস সিঁড়ি দিয়ে নেমে, স্টাডিতে ঢুকতে যাবেন, মি. বার্কার তাঁকে বাধা দেন। তিনি বারবার মালকিনকে অনুরোধ করছিলেন, স্টাডিতে না ঢুকতে। মিসেস ডগলাস কিছু একটা বলেছিলেন মি. বার্কারকে, কিন্তু তিনি ঠিক কী বলেছিলেন, মিসেস অ্যালেন শুনতে পাননি।
‘মেমসাহেবকে ওপরে ওঁর ঘরে নিয়ে যান। ওঁর ঘরে ওঁর সঙ্গে আপনিও থাকুন!’ মি. বার্কার বলেছিলেন হাউসকিপারকে।
তখন মিসেস অ্যালেন, মেমসাহেবকে ধরে তাঁর শোবার ঘরে নিয়ে যান; তিনি চেষ্টা করছিলেন ম্যাডামকে শান্ত করতে। ম্যাডাম খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন, তাঁর সারা শরীর কাঁপছিল, কিন্তু তিনি নীচে নামবার আর চেষ্টা করেননি। পরনে ছিল শুধু ড্রেসিং-গাউন, শোবার ঘরে আগুনের চুল্লির সামনে তিনি বসেছিলেন, দুই হাতের মধ্যে মাথা ডুবিয়ে। প্রায় সারা রাতই মিসেস অ্যালেন তাঁর সঙ্গে ছিলেন। অন্য পরিচারকেরা, সবাই শুয়ে পড়েছিল, দরজার ঘণ্টি বাজার শব্দ, গুলির শব্দ, মি. বার্কারের চেঁচিয়ে কথা বলার শব্দ, কিছুই তাদের কারোর কানে যায়নি; পুলিশ আসতে, হৈ-চৈ হওয়ায় তাদের কুম্ভকর্ণের ঘুম ভেঙেছিল। এর একটা প্রধান কারণ হল, পরিচারকেরা বাড়ির একেবারে পেছন দিকে, বাড়ির সামনের দিক থেকে অনেকটা দূরে থাকে। যার ফলে তাদের কানে কিছু যায়নি।
বারবার নানা ধরনের প্রশ্ন করেও হাউসকিপারের কাছ থেকে নতুন কথা আর কিছু বের হল না। দৃশ্যত, মহিলা বেশ ভেঙে পড়েছিলেন। মালিকের মৃত্যুর কথা শুনে হা-হুতাশ করছিলেন।
মহিলার পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হল, সিসিল বার্কারকে। গতরাতে যা যা ঘটেছিল, সেসব ব্যাপারে তিনি ইতিমধ্যেই পুলিশকে যা বলেছিলেন, তার থেকে বেশি কিছু বললেন না। ব্যক্তিগতভাবে, তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস যে খুনি জানালা দিয়েই পালিয়েছিলেন। জানালার চৌকাঠে রক্তমাখা জুতোর ছাপই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। তাছাড়া, সিসিল বার্কারের মতে, যেহেতু পরিখার ওপর সেতু তোলা ছিল, তাই জানালা গলে, পরিখা সাঁতরে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য উপায় ছিল না। তিনি বলতে পারলেন না, পরে খুনির কপালে কী জুটেছিল, অথবা সে বাইসাইকেলটা ফেলে গেল কেন, যদি ওটা তারই হয়। পরিখার জলে ডুবে মরার কোনো প্রশ্নই আসে না, কারণ জল সেখানে তিন ফুটের বেশি গভীর নয়।
খুনের ব্যাপারে তাঁর নিজস্ব একটা চিন্তা-ভাবনা আছে। ডগলাস ছিলেন কম কথার মানুষ; তাঁর জীবনের মাঝের বেশ কিছু বছর তিনি কোথায় ছিলেন, কী করতেন, কীভাবে বেঁচে ছিলেন, সেসব ব্যাপারে তিনি কোনোদিনই মুখ খোলেননি। জীবনে অর্থ উপার্জন করেছিলেন তিনি অনেক। যৌবনেই দেশান্তরী হয়ে তিনি আমেরিকায় চলে যান। বার্কারের সঙ্গে ডগলাসের পরিচয় ক্যালিফোর্নিয়ায়, সেখানে তাঁরা দুজনে পার্টনার হিসেবে একটা কয়লা-খাদানের ব্যবসায় নামেন। ব্যবসায় লাভ হতো খুব, কিন্তু ডগলাস হঠাৎ খাদান বিক্রি করে দেন এবং ইংল্যান্ডে চলে আসেন। সেসময় তিনি ছিলেন বিপত্নীক। বার্কারও একা থাকতে চাননি খাদানের অর্ধেক ব্যবসার অংশীদারিত্ব নিয়ে। তিনি ব্যবসার অংশ গুটিয়ে, টাকাপয়সা বুঝে নিয়ে চলে আসেন লন্ডনে। দুজনের বন্ধুত্ব আবার নতুনভাবে শুরু হয়।
ডগলাসের কথাবার্তা শুনে বার্কারের মনে হয়েছিল যে, সবসময়েই তিনি ভীষণ কোনো বিপদের আশঙ্কায় আছেন; ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ব্যবসা-পত্তর গুটিয়ে হঠাৎ চম্পট দেওয়া এবং ইংল্যান্ডে এক শান্তিপূর্ণ অঞ্চলে তাঁর বাড়ি ভাড়া করে থাকা,’ সবকিছুই বার্কারের মনে হয়েছিল সেই আসন্ন বিপদের সঙ্গে সম্পর্কিত। বার্কারের মনে হয়েছিল, অপরাধীদের গোপন কোনো দল, অদম্য শত্রুদের কোনো সংঘটন ডগলাসের পেছনে ফেউয়ের মতন লেগেছিল। আর তারা তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেবে না যতদিন না তাঁকে মারতে পারছে। ডগলাসের কিছু কিছু আলটপকা মন্তব্য শুনে বার্কারের মনে সেরকম ধারণা হয়েছিল, যদিও তিনি বার্কারকে কখনও বলেননি সেই গোষ্ঠী কারা হতে পারে এবং কীভাবেই বা তিনি সেই সাপেদের লেজে পা দিয়েছিলেন।
‘ক্যালিফোর্নিয়ায় মি. ডগলাসের সঙ্গে আপনি কতদিন ছিলেন?’ ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ড প্রশ্ন করলেন।
‘মোট পাঁচ বছর।’
‘উনি অবিবাহিত ছিলেন, তাই বললেন না?’
‘বিপত্নীক।’
‘কখনও শুনেছেন তাঁর প্রথম স্ত্রী কোথাকার মহিলা?’
‘হ্যাঁ, মনে আছে উনি বলেছিলেন, মহিলা ছিলেন জার্মান। আমি তাঁর ছবিও দেখেছি। খুবই সুন্দরী ছিলেন মহিলা। ডগলাসের সঙ্গে আমার পরিচয় হবার একবছর আগে তাঁর প্রথম স্ত্রী টাইফয়েড রোগে ভুগে মারা যান।’
‘আমেরিকার আর কোনো বিশেষ অঞ্চলের সঙ্গে তাঁর অতীত জীবনের কোনো সংশ্রব ছিল না?’
‘আমি ওকে শিকাগোর কথা বলতে শুনেছি। ওই শহরটা সে ভালো চিনত এবং সেখানে কাজও করেছে। কয়লা আর লোহার ব্যবসা আমেরিকার যে যে অঞ্চলে হতো, সেখানকার খবর সে ভালোই রাখত। যৌবনে সে ভ্রমণ করেছিল প্রচুর।’
‘উনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন? যে গোপন গোষ্ঠীর কথা বলছেন তারা কি রাজনৈতিক ছিল?’
‘না…রাজনীতি নিয়ে ডগলাসের কোনো আগ্রহই ছিল না।’
‘এরকম আপনার কখনও মনে হয়নি যে কোনো অপরাধ করে তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন?’
‘বরং বলা যায়, এত খোলামেলা মানুষের সঙ্গে আমার আগে কোনোদিনই পরিচয় হয়নি। অপরাধ করে পালিয়ে বেড়াবার মানুষ অন্তত ডগলাস ছিলেন না।’
‘ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকাকালীন তাঁর জীবনে কোনো বিচিত্র ঘটনা ঘটেছিল কি?’
‘পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া খুব প্রিয় ছিল ওর। যেখানে অনেক মানুষের ভিড় সেখানে না যেতে পারলেই যেন ওর ভালো লাগত। সেই কারণেই আমার প্রথমে মনে হয়েছিল যে, কেউ বোধহয় ওর পেছনে লেগে আছে। তারপর যখন হঠাৎই আমেরিকা ছাড়ল সে, আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম, যে আমার সন্দেহই ঠিক। মনে হয় সে আগে থেকে কোনো ওয়ার্নিং পেয়েছিল। ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়ে সে চলে যাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই ছয় জন নানা ধরনের লোক তার খোঁজখবর নিচ্ছিল।’
‘কী ধরনের লোকজন?’
‘কী বলব, তাদের চেহারা দেখে আমার ঠিক ভদ্রলোক বলে মনে হয়নি। খাদানের অফিস খুঁজে খুঁজে তারা চলে এসেছিল, আমাকে প্রশ্ন করে মারত যে ডগলাস কোথায়। উত্তরে আমি তাদের বলেছিলাম যে, সম্ভবত সে ইউরোপের দিকে গেছে; তবে আমি বলতে পারব না তাকে কোথায় পাওয়া যাবে। ওরা যে চা-কফির আসর বসাবার জন্যে ওকে খুঁজছিল না, সেটা সহজেই বুঝতে পেরেছিলাম।
‘লোকগুলো কি আমেরিকান ছিল…মানে ক্যালিফোর্নিয়ার?’
‘ওরা ক্যালিফোর্নিয়ার লোক ছিল কিনা বলতে পারব না। তবে আমেরিকান ছিল, এটুকু বলতে পারি। আবার তারা যে কয়লাখনির লোকজন, তাও মনে হয়নি। বুঝতে পারিনি কোথা থেকে এসেছিল ওরা, যখন চলে গেল হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম।’
‘এসব ঘটনা ছ-বছর আগেকার?’
‘প্রায় সাত বছর।’
‘তারপর আপনারা দুজনে আবার ক্যালিফোর্নিয়ায় পাঁচ বছর ছিলেন, সব মিলিয়ে ওখানে মি. ডগলাসের এগারো বছর?
‘ঠিকই।
‘নিশ্চয়ই তার অতীত-জীবনের কোনো গুরুতর ঘটনা তাঁকে এত দুশ্চিন্তার মধ্যে রাখত?
‘মনে হয় সারা জীবনই কোন এক দুশ্চিন্তা ওকে তাড়া করেছে। কোনো একটা ভয় তার মনে একেবারে গেঁথে গিয়েছিল।’
‘কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তির জীবন হারানোর এরকম ভয় মনে থেকে থাকে, আর যদি সে জানে বিপদটা কী, তাহলে আপনার কি মনে হয় না, তাঁর পুলিশের কাছে গিয়ে সাহায্য চাওয়া উচিত ছিল?’
‘হতে পারে বিপদটা এমন ধরনের যে পুলিশের ক্ষমতার বাইরে ছিল তাকে প্রোটেকশান দেওয়া। একটা তথ্য আপনাদের জেনে রাখা ভালো। ডগলাস সর্বদাই সশস্ত্র থাকত। সবসময়েই তার কোমরে বা পকেটে থাকত গুলি ভরা রিভলভার। কিন্তু গত রাতে কপালটাই খারাপ ছিল বেচারার, তার পরনে ছিল ড্রেসিং-গাউন আর অস্ত্রটা সে ফেলে এসেছিল শোবার ঘরে। কাঠের সেতু যখন পরিখা থেকে তুলে নেওয়া হতো, আমার অনুমান, সে ভেবেছিল, বিপদ তাঁকে ছুঁতে পারবে না।’
‘কতকগুলো বছরের হিসেব আমাকে একটু পরিষ্কারভাবে বুঝে নিতে হবে।’ ম্যাক বললেন। ‘ঠিক ছ-বছর হয়েছে ডগলাস ক্যালিফোর্নিয়া থেকে গা-ঢাকা দিয়েছিলেন? পরের বছর আপনিও ক্যালিফোর্নিয়া ছাড়েন, তাই তো?’
‘ঠিকই বলেছেন।’
‘আর পাঁচ বছর হল তিনি বিয়ে করেছেন। তাহলে তাঁর বিয়ের সময়ে আপনি নিশ্চয়ই ফিরে এসেছেন…।’
‘তার বিয়ের ঠিক বছরখানেক আগে। আমি ছিলাম তার সবথেকে প্রিয় বন্ধু।’
‘মিসেস ডগলাসকে কি আপনি তাঁর বিয়ের আগের থেকে চিনতেন?’
‘না, তা চিনতাম না। দশ বছর আমি ইংল্যান্ডে চলে গিয়েছিলাম।’
‘কিন্তু বিয়ের পর থেকে ভদ্রমহিলার সঙ্গে আপনার একটানা পরিচয়?’
এবার বার্কার তীব্র দৃষ্টিতে ইনস্পেকটরের দিকে তাকালেন। ‘সেই থেকে আমি আমার বন্ধুর ঘনিষ্ট হয়েছি।’ বললেন বার্কার। ‘বন্ধুর স্ত্রী হিসেবে আমি মিসেস ডগলাসকে চিনব এটাই স্বাভাবিক। আপনারা যদি এই সামান্য ব্যাপারটার মধ্যে কোনোরকম সম্পর্কের ইঙ্গিত দেন।’
‘আমি ওরকম কিছুই ভাবছি না, মি. বার্কার। এই মামলার সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে এরকম যে-কোনো ব্যাপারেই তদন্ত চালানো আমার পেশার বাধ্যবাধকতা। আমি আপনাকে বিব্রত করতে চাইনি।’
‘তদন্ত করতে গিয়ে কিছু প্রশ্ন করা হয় যেগুলো সত্যিই বিব্রত করে।’ বার্কার রাগতভাবে বললেন।
‘যা ঘটেছে আমরা সেসবই নির্ভুলভাবে জানতে চাই। আপনার স্বার্থে এবং প্রত্যেকেরই স্বার্থে তথ্যগুলো পরিষ্কারভাবে জানতে হয়। তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে আপনার যে ঘনিষ্ঠতা, সে ব্যাপারে মি. ডগলাসের পূর্ণ সমর্থন ছিল?’
বার্কারের মুখের চেহারা হয়ে গেল পাণ্ডুর, আর তাঁর লম্বা, সবল হাতদুটো জড়ো করলেন তিনি, কাঁপছিল হাতদুটো। রীতিমতো গলা তুলে তিনি বললেন, ‘এই ধরনের প্রশ্ন করার কোনো অধিকার আপনার নেই!’ তারপর মৃদু দম নিয়ে বললেন, ‘এই ব্যাপারটার সঙ্গে আপনার তদন্তের কী সম্পর্ক থাকতে পারে?’
‘প্রশ্নটা আবার আমাকে করতেই হবে।’
‘বেশ, উত্তর দিতে আমি অস্বীকার করছি।’
‘অস্বীকার আপনি করতেই পারেন; কিন্তু আপনার জানা উচিত যে আপনার অস্বীকারই আপনার উত্তর। যদি লুকোবার কারণ কিছু না থাকত, আপনি উত্তর দিতে এভাবে অস্বীকার করতেন না।’
এক মুহূর্ত বার্কার কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন আর তার দুই মোটা, কালো ভ্রূ কুঁচকে রইল গভীর কোনো চিন্তায়। তারপরই তিনি তাকালেন, মুখে স্মিত হাসি। ‘বেশ বুঝতে পারছি আমি যে, ভদ্রমহোদয়রা নিজেদের কর্তব্য করতেই আসলে এসেছেন, আর সে ব্যাপারে বাধা দেবার কোনো অধিকারই আমার নেই। আমি শুধু আপনাদের বলব যে, প্রসঙ্গটা নিয়ে মিসেস ডগলাসকে দয়া করে অস্বস্তির মধ্যে ফেলবেন না, কারণ ইতিমধ্যেই তার মনের ওপর যথেষ্ট চাপ আছে। এটুকুই বলতে পারি যে, হতভাগ্য ডগলাসের চরিত্রে একটাই ত্রুটি ছিল, আর সেটা হল তার হিংসা। আমি খুবই প্রিয় ছিলাম তার, একজন বন্ধুর আর একজন বন্ধুর প্রতি এর বেশি টান থাকতে পারে না। আবার তার স্ত্রীরও সে খুবই অনুগত ছিল। সে খুশি হতো, যখনই আমি এ-বাড়িতে আসতাম। ছোটখাটো যে কোনো ব্যাপারে সে আমাকে ডেকে পাঠাত। তবুও যদি আমি আর তার স্ত্রী গল্পগুজব করতাম কিংবা কোনো ব্যাপার নিয়ে হাসাহাসি করতাম, স্পষ্ট বুঝতে পারতাম হিংসায় জ্বলে-পুড়ে মরত সে, মেজাজ হারাত আর মুখে যা আসত তার স্ত্রীকে বলে যেত, আমাকে শুনিয়ে।
একবার নয়, অনেকবারই এরকম হয়েছে যে, আমি রাগ করে বলে চলে যেতাম যে, এ-বাড়িতে আমি আসব না; তারপর সে অনুশোচনা করে, আমাকে খোসামোদ করে এমন চিঠির পর চিঠি পাঠাত যে, আমি আবার এ-বাড়িতে আসতে বাধ্য হতাম। কিন্তু ভদ্রমহোদয়রা, একটা কথা আপনাদের সকলকে শুনিয়ে রাখি, এবং জানবেন, এই প্রসঙ্গে এটাই আমার শেষ কথা যে, মিসেস ডগলাসের মতো নরম মনের, বিশ্বস্ত স্ত্রী যার কপালে জোটে সে হল প্রকৃতই ভাগ্যবান; আর এটাও বলে রাখি যে, আমার মতো বিশ্বাসযোগ্য বন্ধুও বিরল।’
মি. বার্কারের কথায় যে আবেগ আর অনুভূতি ফুটে উঠেছিল, তা বুঝতে ভুল হবার কারণ ছিল না, তবুও ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ড বিষয়টা চাপা পড়তে দিলেন না।
‘আপনি জানেন,’ বললেন তিনি, ‘যে মৃত ব্যক্তির বিয়ের আংটিটা তার হাত থেকে খুলে নেওয়া হয়েছে?’
‘সেরকমই মনে হচ্ছে।’ বললেন বার্কার।
‘মনে হচ্ছে, মানে? আপনি জানেন এটা সত্যি।’
মনে হল, বার্কার থমকে গেছেন। কী বলবেন ঠিক করতে পারছেন না। ‘যখন আমি বলেছি ‘‘মনে হচ্ছে’’, আমি বলতে চাইছি যে, এরকমও হতে পারে যে, ডগলাস নিজেই আংটিটা খুলে রেখেছিল।’
‘আংটিটা যে মৃতের হাত থেকে খুলে নেওয়া হয়েছে, সে যে-কোনো ব্যক্তিই নিক না কেন, এই ব্যাপারটা যে-কোনো মানুষের মনে প্রশ্ন তুলে দিতে পারে। পারে না কি, যে বিয়ে এবং এই নৃশংস হত্যা, দুটোর মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে?’
বার্কার তাঁর চওড়া কাঁধ নাড়ালেন। ‘আমি ঠিক জোর দিয়ে বলতে পারছি না যে, আপনার কথার সঠিক অর্থ আমি ধরতে পেরেছি,’ বললেন তিনি। ‘কিন্তু আপনার কথার ইঙ্গিত যদি ভদ্রমহিলার চরিত্রের প্রতি হয়,’ এক মুহূর্ত তাঁর দুই চোখ জ্বলে উঠল, তারপর স্পষ্টতই তিনি চেষ্টা করে নিজের আবেগে রাশ টেনে ধরলেন, ‘সেক্ষেত্রে আমি জোর দিয়ে বলতে চাই আপনার চিন্তা-ভাবনা ঠিক খাতে বইছে না। এটুকুই আমার বলার।’
‘এই মুহূর্তে আপনাকে জিগ্যেস করার মতো আর কোনো প্রশ্ন আমার নেই।’ ঠান্ডা স্বরে ম্যাকডোনাল্ড জানালেন।
‘একটা ছোট ব্যাপার আমার জানার আছে’, বলল শার্লক হোমস্। ‘যখন আপনি গুলির আওয়াজ পেয়ে ঘরে ঢুকেছিলেন, তখন টেবিলে শুধু মোমবাতিটা জ্বলছিল, তাই তো?’
‘হ্যাঁ, ঠিকই।’
‘মোমবাতির আলোতেই আপনি দেখতে পেয়েছিলেন যে কী ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটে গেছে?’
‘ঠিক।’
‘আপনি কাউকে ডাকার জন্যে, সাহায্যের জন্যে, ঘণ্টি বাজিয়েছিলেন?’
‘হ্যাঁ।
‘সঙ্গে সঙ্গেই লোকজন এসেছিল?’
‘মিনিট খানেকের মধ্যেই।’
‘যদিও তারা ঘরে এসে দেখেছিল যে, বাতিটা নিভে গেছে আর ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটা বেশ অবাক করা কাণ্ড নয় কি?’
প্রথমে বার্কারকে দেখে মনে হল, তিনি মৃদু অস্বস্তি বোধ করছেন. একটু থেমে তিনি অবশ্য উত্তর দিলেন, ‘মনে হয় না আমার এতে অবাক হবার মতো কিছু আছে, মি. হোমস। বাতির আলোয় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। আমার প্রথমেই মনে হয়েছিল, আলো জোরালো হওয়া দরকার। টেবিলে ল্যাম্পটা রাখা ছিল; আমি ওটা জ্বেলে দিই।’
‘আর বাতিটা নিভিয়ে দেন?’
‘এগজ্যাক্টলি।’
হোমস আর কোনো প্রশ্ন করল না। আর বার্কার, আমাদের প্রত্যেকের মুখের দিকে একবার করে তাকিয়ে, বলতেই হবে বেশ রাগতভাবে, ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ড একটি ছোট কাগজে লিখে পাঠিয়েছিলেন যে, মিসেস ডগলাসের ঘরে তিনি যেতে চান। কিন্তু তিনি ফিরতি উত্তর পাঠিয়েছেন যে, তিনি ডাইনিং রুমে এসেই, আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন৷ এখন ম্যাডাম এলেন। দীর্ঘাঙ্গী, সুন্দরী, বয়স তিরিশ বছর মনে হল। খুব গম্ভীর, মুখে উত্তেজনা বা কান্নাকাটির কোনো চিহ্নই নেই। আমি যেরকম ভেবেছিলাম যে, তাঁর মুখ কান্নায় ফোলা-ফোলা থাকবে, চুল থাকবে এলমেলো, সেরকম কিছুই নেই তাঁর মুখের বা চোখের ভাবে। যদিও এটা সত্যি তাঁর মুখের ভাবে ছিল পাণ্ডুরতা এবং বিষাদ, এতবড় একটা মানসিক আঘাত পেলে যা হওয়া খুবই স্বাভাবিক; কিন্তু তাঁর আচার-আচরণ মনে হল শান্ত, আবেগহীন, আর তাঁর অপরূপ গড়নের হাত, যা তিনি টেবিলে রেখেছিলেন, দেখে মনে হল অবিচলিত। তাঁর বিষাদময়, আবেদনমুখর চোখদুটি লক্ষ্য করল আমাদের প্রত্যেককেই, সেই চোখের দৃষ্টিতে অনুভব করলাম বিচিত্র এক ধরনের কৌতূহলের ছায়া। চোখের কৌতূহল এবং প্রশ্ন এবার রূপ পেল তাঁর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নে, ‘কোনো সূত্র কি এখনও আপনারা খুঁজে পেয়েছেন?’
এটা কী আমার কল্পনা যে, তাঁর সেই প্রশ্নে মৃদুভাবে প্রকাশ পেয়েছিল যেন ভয়, আশা একেবারেই না?
‘যা যা ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব সবই নেওয়া হয়েছে, মিসেস ডগলাস।’ উত্তর দিলেন ইনস্পেকটর। ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে, কোনো কিছুকেই হালকাভাবে আমরা দেখব না।’
‘টাকার বা খরচের কথা ভাববেন না।’ ঠান্ডা স্থির গলায় তিনি বললেন। ‘আমার একান্ত ইচ্ছা যে খুনিকে খোঁজার জন্যে সম্ভাব্য সব চেষ্টাই আপনারা করবেন?’
‘আশা করি আপনি আমাদের কিছু বলতে পারেন যা আমাদের অনুসন্ধানের কাজে সাহায্য করতে পারে।’
‘আমার কোনো কিছুই, যা আমি জানি, আপনাদের না বলার নেই। যা জানতে চান বলুন?’
‘মি. সিসিল বার্কারের কাছে আমরা শুনলাম যে আপনি আসলে দেখেননি। যে ঘরে ট্র্যাজিডি ঘটেছে সেখানে আপনি যাননি?’
‘না, উনি আমাকে সিঁড়ির কাছ থেকে ফিরিয়ে দেন। বারবার হাতজোড় করে বলতে থাকেন আমায় ঘরে চলে যেতে।’
‘ঠিকই। গুলির শব্দ আপনি শুনেছিলেন, তাড়াতাড়ি আপনি নীচে নেমে আসেন।’
‘ড্রেসিং-গাউন চাপিয়ে নিয়েছিলাম, তারপর নীচে আসি।’
‘গুলি ছোঁড়ার শব্দ আপনার কানে যাওয়ার কতক্ষণ পরে মি. বার্কার আপনাকে সিঁড়ির কাছে বাধা দেন?’
‘দু-মিনিটের মতো হতে পারে। সেই মুহূর্তে সময়ের অত হিসেব রাখা সম্ভব ছিল না। উনি খুবই অনুরোধ করছিলেন আমাকে ঘরের ভেতর না যেতে। উনি বলছিলেন যে আমি গিয়ে কিছুই করতে পারব না৷ তারপর মিসেস অ্যালেন, আমাদের হাউসকিপার আমাকে দোতলায় নিয়ে যান। সবটাই যেন একটা দুঃস্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল।’
‘আপনি বলতে পারবেন আমাদের যে, গুলির শব্দ শোনার আগে কতক্ষণ আপনার স্বামী একতলার ঘরে ছিলেন?’
‘না, বলতে পারব না। উনি ওঁর ড্রেসিংঘর থেকে নীচে নেমে এসেছিলেন, আমি শুনতে পাইনি উনি কখন গেছেন৷ প্রত্যেকদিন রাতে উনি বাড়ির চারপাশটা একবার ঘুরে আসতেন, কারণ ওর ভয় ছিল যদি বাড়ির কোনো জায়গায় আগুন লেগে যায়। আগুন লেগে যাওয়ার ব্যাপারে উনি খুব নার্ভাস ছিলেন। আমি যতদূর জানি একমাত্র আগুনের ব্যাপারেই ওঁর এক ধরনের নার্ভাসনেস ছিল।’
‘আপনার স্বামীর সঙ্গে আপনার আলাপ হয়েছিল ইংল্যান্ডে, তাই তো?’
‘হ্যাঁ, পাঁচ বছর হয়েছে আমরা বিবাহিত।’
‘আপনি কি ওঁকে কোনোদিন আমেরিকার কোনো ঘটনার কথা বলতে শুনেছেন, যা থেকে তাঁর বিপদ হতে পারে?’
উত্তর দেবার আগে মিসেস ডগলাস কিছুক্ষণ ভেবে নিলেন, ‘হ্যাঁ,’ তারপর বললেন, ‘সবসময়েই আমার মনে হতো যে, তিনি কোনো বিপদের কথা ভেবে ভয়ে আছেন। আমার সঙ্গে তা নিয়ে আলোচনা করতে চাইতেন না। এরকম নয় যে তিনি গোপন কথার ব্যাপারে আমাকে অবিশ্বাস করতেন। আমাদের দুজনের সম্পর্কটা ছিল বিশ্বাস এবং অনুরাগের। আসলে তিনি চাইতেন, সে সব কথা শুনে আমি যাতে ভয় না পাই৷ হয়তো ওঁর মনে হতো সেসব কথা শুনলে আমি সবসময় দুশ্চিন্তায় ভুগব, সে কারণেই তিনি কিছু বলেননি।’
‘তাহলে আপনি কীভাবে জানলেন যে উনি দুর্ভাবনায় ছিলেন?’
মিসেস ডগলাসের মুখে এক মুহূর্তের জন্যে হাসি ফুটে উঠল।’ স্ত্রীর কাছ থেকে একজন স্বামীর পক্ষে কি আদৌ সম্ভব কিছু গোপন রাখা? আমি সেটা অনুমান করেছিলাম। যখন তিনি তাঁর আমেরিকার জীবন নিয়ে চুপচাপ থাকতেন, কিছু বলতে চাইতেন না। কিছু কিছু সতর্কতা তিনি নিতেন, যা দেখে আমার সন্দেহ হতো৷ কিছু কথা মুখ দিয়ে ফস্ করে বেরিয়ে গেলেই তিনি তাড়াতাড়ি চুপ করে যেতেন। কোনো অচেনা লোক দেখলেই তার প্রতি ওঁর তাকানোর ধরন দেখে আমি কিছু আঁচ করতাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে তাঁর পেছনে বেশ জবরদস্ত কোনো শত্রু লেগে আছে। আর তিনি চাইতেন তাদের হাতে যাতে না পড়তে হয় সেজন্য নিজেকে সাবধানে রাখা। এ ব্যাপারে আমি এতটাই নিশ্চিত ছিলাম যে, বছরের পর বছর আমি ভয়ে ভয়ে কাটিয়েছি, যখন বাড়ি ফিরতে তাঁর খুব বেশি দেরি হতো।’
‘জিগ্যেস করতে পারি কি,’ বলল হোমস, ‘কোন ধরনের কথা শুনে আপনি এরকম বুঝতে পারতেন?’
‘ভয়ের উপত্যকা,’ বললেন মহিলা। ‘এই কথাগুলো তিনি বারবার বলতেন যখন আমি কিছু জানতে চাইতাম।’ ‘ভয়ের উপত্যকায় আমি গিয়েছিলাম। এখনও সেখান থেকে মুক্তি পাইনি আমি। ভয়ের উপত্যকা কি কোনোদিন পিছু ছাড়বে না আমাদের।’ আমি জিগ্যেস করতাম ওঁকে যখন দেখতাম উনি গুম হয়ে আছেন, দুশ্চিন্তা করছেন। ‘কখনও মনে হয় যে ঠিকই, তার থেকে মুক্তি পাব না কোনোদিন,’ বলতেন উনি।
‘আপনি নিশ্চয়ই ওঁকে জিগ্যেস করছিলেন যে, ভয়ের উপত্যকা বলতে তিনি কী বোঝাতে চাইছেন?’
‘জিগ্যেস করেছিলাম; কিন্তু তাতে উনি আরো গম্ভীর হয়ে যেতেন আর প্রবলভাবে মাথা নাড়তেন। ‘‘খুব খারাপ, খুবই দুর্ভাগ্যের যে, আমরা মধ্যে সে উপত্যকার ছায়ায় গিয়ে পড়েছিলাম’’, বলতেন উনি।’ ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, তোমার ওপর তার আঁচ এসে না পড়ে!’ বুঝতে পারতাম যে সত্যিই কোনো উপত্যকার কথা বলতেন উনি যেখানে তিনি বেশ কিছুদিন থেকেছিলেন, আর সেই সময়েই ভয়ঙ্কর কিছু ঘটেছিল তাঁর জীবনে। একেবারে নিশ্চিত ছিলাম আমি সে ব্যাপারে; কিন্তু এর বেশি কিছু আমি বলতে পারব না আপনাদের।
‘কোনো ব্যক্তির নাম উনি কোনোদিন বলেননি?’
‘হ্যাঁ, একবার শিকার করতে গিয়ে ওঁর একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল। বছর তিন আগে। এত জ্বর এসেছিল যে ভুল বকছিলেন উনি। মনে আছে, বিকারের ঘোরে একটা নাম বারবার তিনি বিড়বিড় করতেন৷ রাগ এবং ভয় দুটোই প্রকাশ পেত জ্বরের ঘোরে তাঁর কথা বলায়। নামটা হল, মিকগিনটি। বডিমাস্টার মিকগিনটি। যখন জ্বর থেকে সেরে উঠলেন উনি, আমি জানতে চেয়েছিলাম, ‘বডিমাস্টার মিকগিনটি কে? আর কার বডির মাস্টার ছিল সে?’ ‘অন্তত আমার মাস্টার ছিল না, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ!’ হেসে উত্তর দিয়েছিলেন উনি, তারপর কুলুপ এঁটেছিলেন মুখে। কিন্তু আমি বেশ বুঝেছিলাম যে, এই বডিমাস্টার মিকগিনটি আর ভয়ের উপত্যকা, এই দুয়ের মধ্যে কোনো একটা যোগাযোগ আছে।’
‘আর একটা বিষয় জানবার ছিল,’ বললেন ইনস্পেকটর ম্যাক।
‘মি. ডগলাসের সঙ্গে আপনার দেখা হয় লন্ডনের একটা বোর্ডিং হাউসে, তাই না? আর তারপর আপনার ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন? আপনাদের বিয়ের সময় কি কোনো গোপন এবং রহস্যময় রোমান্সের ঘটনা ঘটেছিল?’
‘রোমান্স তো ছিলই। সবসময়েই রোমান্স ছিল। কিন্তু রহস্যময় বলে কিছু ছিল না।’
‘মি. ডগলাসের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না?’
‘না, আমার কোনো প্রেমিক ছিল না।’
‘নিশ্চয়ই আপনি শুনেছেন যে তাঁর আঙুল থেকে বিয়ের আংটি খুলে নেওয়া হয়েছে। এর থেকে কি আপনার কিছু মনে হয়? ধরুন, তাঁর পূর্ব জীবনের কোনো শত্রু তাঁকে এখানে খুঁজে পেয়ে গিয়েছিল আর খুন করেছিল। বিয়ের আংটি আঙুল থেকে খুলে নেওয়ার সম্ভাব্য কারণ কী হতে পারে?’
‘শপথ করে আমি বলতে পারি যে,’ এক মুহূর্তের জন্যে হলেও চাপা এক হাসিতে মহিলার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। ‘এ ব্যাপারে আমি কিছুই বলতে পারব না,’ মহিলা বললেন।
‘ঠিক আছে, আপনাকে আর আটকাব না। এবং আবার বলছি, আমরা সত্যিই দুঃখিত যে, এরকম এক সময়ে আপনাকে এতটা কষ্ট দেবার জন্যে।’ বললেন ইনস্পেকটর। ‘আরো কিছু জিজ্ঞাস্য আছে আমাদের, অবশ্যই আছে, তবে যখন সময় হবে তখনই আপনাকে সেসব জিজ্ঞাসা করা হবে।’
মহিলা উঠে দাঁড়ালেন, এবং আবার আমি লক্ষ্য করলাম তিনি দ্রুত, কৌতূহলের চোখে আমাদের সকলকেই এক নজর দেখে নিলেন। ‘কী, আমাদের সাক্ষ্য কীরকম মনে হল আপনাদের?’ যেন এই প্রশ্নটাই ফুটে উঠেছিল তাঁর চোখে। তারপর, ভদ্রতার খাতিরে মাথা একমুহূর্ত নামিয়ে, তিনি নিষ্ক্রান্ত হলেন ঘর থেকে।
‘ভদ্রমহিলা সুন্দরী। খুবই সুন্দরী,’ চিন্তিতভাবে বললেন ম্যাকডোনাল্ড। মহিলা বেরিয়ে গেলে দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর। ‘বার্কারের সঙ্গে ভদ্রমহিলার বেশ ইন্টু-বিন্টু চলছে মনে হয়। ওই লোকটারও যথেষ্ঠ আকর্ষণ করার ক্ষমতা আছে মহিলাদের। সে তার সাক্ষ্যে স্বীকার করে গেছে যে মৃত ব্যক্তি খুবই হিংসুটে ছিল, চোখে হারাত তার স্ত্রীকে। সে নিজেই হয়তো জানত তার সন্দেহের কারণ৷ ওই বিয়ের আংটি খোওয়া যাবার ব্যাপারটাই ভাবাচ্ছে বেশি৷ এটাকে এড়িয়ে গেলে চলবে না৷ একজন ব্যক্তি যে মৃতের আঙুল থেকে তার বিয়ের আংটি ছিনিয়ে নিতে পারে। এ ব্যাপারের আপনার চিন্তাভাবনা কী, মি. হোমস?’
আমার বন্ধু দু-হাতের মধ্যে মাথা গুঁজে বসেছিল। গভীর চিন্তায় ছিল সে। এখন সে উঠে দাঁড়াল। কলিং-বেল বাজাল অ্যামিস। বাটলার ঘরে ঢুকতেই সে বলল, ‘মি. সিসিল বার্কার এখন কোথায়?’
‘দেখছি, স্যার।’
ফিরে এসে সে জানাল, ‘বার্কার বাগানে আছেন।’
‘অ্যামিস, আপনি কী ভেবে বলতে পারেন গত রাতে মি. বার্কারের পায়ে কী জুতো ছিল যখন আপনি তাঁর সঙ্গে স্টাডিতে ঢুকেছিলেন?’
‘হ্যাঁ, মনে করতে পারছি, মি. হোমস। তাঁর পায়ে ছিল ঘরে পরার চটি৷ তাঁর বুটজোড়া আমিই এনে দিয়েছিলাম যখন তিনি থানায় ছুটেছিলেন।’
‘তাঁর সেই চটিজোড়া এখন কোথায়?’
‘হলঘরের চেয়ারের নীচে এখনও পড়ে আছে।’
‘খুব ভালো, অ্যামিস, আর কিছু মনে পড়ে?’
‘হ্যাঁ স্যার। ওঁর চটিতে আমি লক্ষ্য করেছিলুম রক্তের ছাপ। আমার নিজের জুতোতেও তাই ছিল।’
‘সেরকমই হওয়া স্বাভাবিক, ঘরের অবস্থা তখন যা ছিল।’ ধন্যবাদ অ্যামিস। যখন দরকার হবে আপনাকে ডাকব।
কয়েক মিনিট বাদে আমরা স্টাডিতে ফিরে এলাম। হল থেকে হোমস ইতিমধ্যে নিয়ে এসেছে সেই বাড়িতে পরার চটি জোড়া। অ্যামিস যা লক্ষ করেছিল, আমরাও সকলে তাই দেখলাম, দুটো চটিরই নীচেটা রক্তে মাখামাখি।
‘অদ্ভুত!’ বিড়বিড় করল হোমস, জানালার আলোর সামনে চটিদুটো ধরে তীব্র দৃষ্টিতে দেখছিল। ‘খুবই অদ্ভুত, বলতেই হবে!’ বলল সে আবার। চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতায় নীচু হয়ে সে একটা চটি জানালার চৌকাঠে রক্তের দাগের ওপর রাখল৷ একেবারে চটি রক্তের ছাপের সঙ্গে খাপে খাপে মিলে গেল। মৃদু হাসল সে আমাদের দিকে তাকিয়ে। ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ড তো উত্তেজনায় ডগোমগো। ‘আরে’, প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি, ‘কোনো সন্দেহই নেই। বার্কার জানালায় এই রক্তের ছাপ নিজেই লাগিয়েছে। এটা স্লিপারের ছাপ, বুটের ছাপ নয়। খেলাটা কী? মি. হোমস, খেলাটা কী?’
‘সেই তো, খেলাটা কী?’ আমার বন্ধুও চিন্তিত মুখে বলল।
হোয়াইট ম্যাসন মুখ টিপে হাসলেন, হাতের দুটো পাঞ্জা ঘষলেন পেশাদারী সন্তুষ্টিতে। ‘আমি কী বলেছিলাম, একটা ধাঁধা!’ বেশ চেঁচিয়ে বললেন তিনি, ‘সত্যিই সবকিছু এক বিশাল ধাঁধা!’

পরিচ্ছেদ ৬ঃ ভোরের আলো
তিনজন গোয়েন্দার সংগ্রহে এখন নানারকম সূত্র, তথ্য, নানাজনের জবানবন্দি হাজির। সুতরাং তারা তিনজনেই এখন নিজেদের মধ্যে সেসব নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। আমি ‘হংস মধ্যে বক যথা!’ কী আর করব? ভাবলাম ঘুরে আসি একটু বাইরের দিকে, সতেজ বাতাসে মাথাটা একটু হালকা করে আসি। জমিদারবাড়ির চারধারে বড় সুন্দর বাগান, সবুজের মেলা। সারি সারি দেবদারু গাছ। দেখে মনে হল তাদের যত্নও নেওয়া হয় বেশ। দেবদারু গাছের সারি বৃত্তাকারে সারা ভবনকে ঘিরে আছে। মাঝখানে সবুজ ঘাসে মখমলের মতো লন। সেখানে পাথরে নির্মিত বসার জায়গা। হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে আসছিলাম৷ ফুরফুরে বাতাস মনকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। চারিদিকে সবুজের এত আয়োজন চোখদুটোকে জুড়িয়ে দিচ্ছিল।
হাঁটতে হাঁটতে লনের কাছাকাছি এসে চমকে উঠলাম। পাথরের লম্বা চেয়ারে স্পষ্ট দেখলাম, বসে আছে দুজন। মিসেস ডগলাস এবং সিসিল বার্কার। মিসেস ডগলাসকে দেখে আরো অবাক হলাম এই কারণে যে, ডাইনিং রুমে যখন তিনি এসেছিলেন, তাঁর মুখে ছিল শোক আর বিষণ্ণতার ছায়া; কিন্তু সেটা সবটাই কি ছিল অভিনয়? কারণ এখন তাঁর দুই চোখে আনন্দের দীপ্তি; তাঁর মুখে সুন্দর হাসি৷ বোধহয় তাঁর সঙ্গী কোনো একটা মজার মন্তব্য করেছেন, তার ফলেই তিনি, যাকে বলে, হেসে গড়িয়ে পড়ছেন! কিন্তু গাম্ভীর্যের মুখোশ আবার তাঁদের দুজনেরই মুখে দ্রুত ফিরে এল, যেইমাত্র তাঁরা দেখতে পেলেন হেঁটে আসছি আমি। দুজনের মধ্যে কিছু একটা কথা হল৷ বার্কার শশব্যস্তে উঠে আমার দিকে এগিয়ে এলেন।
‘এক্সকিউজ মি স্যার,’ তিনি বললেন, ‘আমি কি ডঃ ওয়াটসনের সঙ্গে কথা বলছি?’
উচ্ছ্বাসহীনভাবে আমি শুধু মাথা নাড়লাম।
‘আমরা জানি আপনি আর মি. শার্লক হোমস দুজনেই খুব অন্তরঙ্গ বন্ধু। আপনি কি কিছু মনে করবেন, যদি একটু এগিয়ে এসে মিসেস ডগলাসের সঙ্গে দুটো কথা বলেন?’
গম্ভীর মুখে আমি সেদিকে এগিয়ে গেলাম।
‘কিছু বলবেন ম্যাডাম?’ আমার স্বর গম্ভীর।
‘আপনি নিশ্চয়ই আমাকে খুব নির্মম এবং কঠিন মনের একজন মহিলা ভাবছেন?’
আমি কাঁধ ঝাঁকালাম, ‘আমি আপনাকে নিয়ে এক মুহূর্তও ভাবিনি,’ বললাম কঠিন গলায়।
‘আশা করি একদিন আমাকে ঠিক বুঝবেন, যেদিন বুঝবেন…।’
‘ডঃ ওয়াটসনের বোঝার তো কিছু নেই,’ তাড়াতাড়ি বললেন বার্কার। ‘উনি তো নিজেই জানালেন এইমাত্র, উনি তেমন কিছু ভাবেননি।’
‘ঠিকই বলেছেন।’ বললাম আমি, ‘সুতরাং আমি আবার হাঁটা শুরু করি?’
‘একটু দাঁড়ান, ডঃ ওয়াটসন’, বিনীতভাবে বললেন মহিলা। ‘আমার মনে একটা প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে, যার উত্তর, একমাত্র আপনিই দিতে পারবেন বলে আমি মনে করি৷ আপনার থেকে আর কেউ ভালো জানে না মি. শার্লক হোমসের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক কতটা গভীর; সেক্ষেত্রে আমি যদি বিশ্বাস করে তাঁকে কোনো গোপন কথা বলি, তাহলে কি তিনি পুলিশ-গোয়েন্দাদের সেই কথা বলে দেবেন?’
‘হ্যাঁ, ঠিক এই প্রশ্নটাই।’ বার্কার তাড়াতাড়ি বললেন, ‘উনি কি স্বতন্ত্রভাবে তদন্ত করছেন? নাকি পুরোপুরি উনি পুলিশের ওপর নির্ভরশীল?’
‘আমি ঠিক নিশ্চিত নই যে, এই ধরনের আলোচনায় আমার কতটা অধিকার আছে।’
‘আপনাকে একান্ত মিনতি আমার, ডঃ ওয়াটসন, বিশ্বাস করুন আমি খুব উপকৃত হব, যদি আপনি আমাদের একটু সাহায্য করেন!’
মহিলার গলার স্বরে এমনই করুণ ব্যাকুলতা ফুটে উঠল যে, আমার মনটা তাঁর প্রতি মুহূর্তে নরম হয়ে গেল।
‘মি. হোমস স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে এসেছেন,’ বললাম আমি। ‘তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তিনি নিজেই, এবং তিনি সব সিদ্ধান্তই নেন তাঁর নিজের বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী। আবার এটাও মনে রাখা উচিত যে, যাদের সঙ্গে, অর্থাৎ যে পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে তিনি এই খুনের তদন্ত করছেন, তাদের প্রতিও তাঁর একটা নৈতিক দায়িত্ব আছে বলে তিনি মনে করেন; যে অপরাধীকে চিহ্নিত করার জন্যে এত পরিশ্রম, এত তোড়জোড়, তাদের কাছ থেকে তিনি গুরুতর কোনো তথ্য লুকোবেন না বলেই মনে হয়। এর বেশি আমি কিছু বলতে পারব না। অবশ্য যদি আপনি চান তাহলে আমি মি. হোমসকে আপনার প্রস্তাবের কথা বলব।’
এই বলে আমি টুপিটা আমার মাথায় চাপিয়ে যে রাস্তায় হাঁটছিলাম, সেদিকেই আবার হাঁটা শুরু করলাম। মোড় ঘোরার মুখে, আমি আবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম যে, ওরা দুজন আবার অন্তরঙ্গভাবে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
‘মিসেস ডগলাসের কোনো গোপন কথাতেই আমার কোনো আগ্রহ নেই।’ হোমস বলল, ‘যখন আমি আমার অভিজ্ঞতার কথা তাকে জানালাম, সারা বিকেলটাই সে পুলিশদের সঙ্গে আলোচনা করে
জমিদার বাড়িতেই কাটিয়েছে। আমরা যে-ঘরে ছিলাম, সেখানে সে ফিরে এসেই চায়ের জন্যে আর জলখাবারের জন্যে চিৎকার-চেঁচামেচি জুড়ে দিল।’
‘মিসেস ডগলাসকে পাত্তা দেওয়া একেবারেই যাবে না, ওয়াটসন।’ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বন্ধু বলল, ‘এখন ভেবে দেখতে হবে ষড়যন্ত্র আর খুনের জন্যে ওদের দুজনকেই শ্রীঘরে যেতে না হয়।’
‘ব্যাপারটা এতদূর গড়াবে বলে মনে হয়?’
হোমসকে খুবই হাসিখুশি লাগছিল, খুবই ফুরফুরে মেজাজে ছিল সে। খেতে খেতে বলল, ‘শোনো হে ডাক্তার, এই চার নম্বর ডিমটা আস্ত গলায় না পুরে আমি এই ব্যাপারে কোনো কথাই বলব না।’ ইতিমধ্যে তার জন্যে ডিম (বেশ কয়েকটা), মুচমুচে টোস্ট, চা এবং আমার জন্যে শুধু চা আর্দালি দিয়ে গেছে।
‘তোমরা কি অপরাধীকে সনাক্ত করতে পেরেছ?’
‘সবটা যে পেরেছি তা বলব না,’ বলল হোমস। ‘বরং অপরাধীকে সনাক্ত করার ব্যাপারে আমরা বেশ অন্ধকারেই আছি; কিন্তু একজোড়া ডাম্বেলের মধ্যে যেটা রহস্যময়ভাবে খোয়া গিয়েছিল, তার সন্ধান যখন পেয়ে গেছি।’
‘ডাম্বেল!
‘সেকী, ওয়াটসন, এই ব্যাপারটা তোমার মাথায় এখনও ঢোকেনি যে, বার্লস্টোন মামলা ঝুলেই আছে হারিয়ে যাওয়া ডাম্বেলটার ওপর? ঠিক আছে, ঠিক আছে, বন্ধু, অত মুষড়ে পড়ার মতো কিছু হয়নি; এখানে শুধু আমরা দুজন আছি, আর তো কেউ নেই; তাই তোমাকেই বলছি কথাটা, ইনস্পেকটর ম্যাক কিংবা ওই গ্রাম্য গোয়েন্দা, মি. ম্যাসন, দুজনের কারোর মাথাতেই ঢোকেনি যে, এই কেসের আসল রহস্যই হল সেই হারিয়ে যাওয়া ডাম্বেল! একটা ডাম্বেল! ওয়াটসন, ভাবো তো, কোনো ব্যায়ামবীর একটা ডাম্বেল নিয়েই চালিয়ে যাচ্ছে! দু-হাতের ব্যায়াম, একইসঙ্গে, একটা ডাম্বেল নিয়ে কি সম্ভব? অ্যাবসার্ড! ওয়াটসন, অ্যাবসার্ড!’
বলা যায়, গপগপ করে খাচ্ছিল হোমস। আর তার চোখদুটো মাঝে মাঝে শাণিত বিদ্রুপ আর চাপা আনন্দে ঝকঝক করে উঠছিল। খাবার এবং দুই পেয়ালা চা গলাধঃকরণ করে সে আবার উচুস্বরে বলতে লাগল, ‘জলজ্যান্ত একটা মিথ্যে, ওয়াটসন, এক বিশাল, আপত্তিকর, যুক্তিহীন মিথ্যে দিয়ে আমাদের সবাইকে বোকা বানানোর চেষ্টা চলছে! যে গল্পটা বার্কার আমাদের গেলাবার চেষ্টা করেছে তার মতো নির্জলা মিথ্যে আর কিছু হতে পারে না৷ আবার বার্কারের সেই ছেলে-ভুলোনো গল্প সমর্থিত হচ্ছে কার দ্বারা? না, মিসেস ডগলাস! ভদ্রমহিলা পাকা অভিনেত্রী আর পুরো মিথ্যে বলেছেন! দুজনে মিলে একটা ষড়যন্ত্রকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। সুতরাং এখন একটাই প্রশ্ন। কেন ওরা দুজনে মিথ্যে বলছে? আর সেই সত্যটা কী যেটা তারা লুকোবার প্রাণপণ চেষ্টা করছে? এসো আমরা চেষ্টা করে দেখি ওয়াটসন, দুজনে চেষ্টা করে দেখি, যদি আমরা মিথ্যেটা খুঁড়ে বের করতে পারি আর সত্যিটাকে আবার দাঁড় করাতে পারি।
‘কেমন করে আমি জানলাম যে, তারা মিথ্যে বলছে? কারণ তারা দুজনে মিলে যে গল্পটা তৈরি করেছে তা একেবারে কাঁচা এবং অবিশ্বাস্য। ভেবে দেখো একবার! গল্পটা যা বলা হয়েছে আমাদের, খুনটা করার পর মাত্র এক মিনিটের মধ্যে দুটো কাজ করেছে। একটা হল, মৃতের আঙুল থেকে আংটি খুলে নেওয়া, বিয়ের আংটি বলে কথা! কতদিন আঙুলে গেড়ে বসে আছে। অত তাড়াতাড়ি সেটা খুলে নেওয়া সম্ভব? এবং একই সঙ্গে খেয়াল করে মৃতদেহের পাশে কার্ডটা ফেলে যাওয়া! অসম্ভব! অসম্ভব!
‘আমার বদ্ধমূল ধারণা আর আমার বিশ্বাস, তুমিও আমার সঙ্গে একমত হবে যে, আঙুল থেকে আংটিটা খুলে নেওয়া হয়েছে খুনটা হবার আগেই। বাতিটা নিমেষের মধ্যে জ্বালিয়ে নেওয়া হয়েছে মানেই খুনির সঙ্গে খুনের বলির কোনো কথাবার্তাই হয়নি। এবং ডগলাস বিষয়ে আমরা যা শুনেছি যে, সে একজন পোড় খাওয়া লোক, বেশ শক্তিশালী এবং চতুর; এসব থেকে এত সহজে মেনে নেওয়া যেতে পারে যে, ডগলাস, খুনিকে সামনে দেখে নিজেকে বাঁচাবার কোনো চেষ্টাই করল না, গুলি খেয়ে শুয়ে পড়ল আর তার আঙুল থেকে নিমেষের মধ্যে আংটি খুলে নিয়ে, নিজের পরিচয়পত্র রেখে দিয়ে, সাইকেলের কথা ভুলে গিয়ে পরিখার জল সাঁতরে এমনভাবে উধাও হয়ে গেল যে কেউ তার টিকিটিও দেখতে পেল না!
‘আবার এদিকে শটগান থেকে গুলি ছুঁড়েই খুনটা করা হয়েছিল। তাহলে তো আংটি ছিনিয়ে নেবার কিছুক্ষণ আগে খুন করা হয়েছে। আর জানালার নীচে ওই জুতোর রক্তের ছাপ? ওটা তো জুতোর ছাপই নয়, বার্কারের পায়ের চটির ছাপ। তাহলে? কী প্রমাণ হয়? যে বার্কার ইচ্ছাকৃতভাবে পুলিশকে বিপথে চালিত করতে চাইছে?
‘এখন আমাদের জানতে হবে যে, খুনটা ঠিক কোন সময়ে হয়েছে? রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত চাকর-বাকরেরা তো বাড়িতে ঘোরাঘুরি করছিল। সুতরাং নিশ্চয়ই ওরকম কোনো সময়ে খুন হয়নি? রাত এগারোটা বাজার পনেরো মিনিট আগে পরিচারকেরা সবাই শুতে চলে গিয়েছিল, একমাত্র অ্যামিস ছাড়া। সে তখন প্যানট্রিতে কাজ করছিল। আজ বিকেলে, তুমি বেড়াতে চলে যাবার পর, আমি নিজে প্যানট্রিতে দাঁড়িয়ে করিডরের সব দরজাগুলো বন্ধ করে দেখেছি; স্টাডির কোনো শব্দ, প্যানট্রি পর্যন্ত পৌঁছায় না।
‘কিন্তু হাউসকিপার, মিসেস অ্যালেনের ঘর থেকে কতটা শোনা যায়, সেটা স্বতন্ত্র প্রশ্ন। এই ঘরের অবস্থান করিডরে হলেও, এই ঘর থেকে বাড়ির বাইরের দিকে কোনো শব্দ হলে অস্পষ্টভাবে তা শোনা যায়। এই মহিলা আমাদের নিজেই জানিয়েছেন তিনি কানে কম শোনেন, কিন্তু তবুও তিনি তাঁর সাক্ষ্যে বলেছেন দরজা জোরে বন্ধ হওয়ার মতো কিছু একটা শব্দ তাঁর কানে এসেছিল, যদিও সেটা অ্যালার্ম বেজে ওঠার আধঘণ্টা আগে। অ্যালার্ম বেজে ওঠার আধঘণ্টা আগে মানে সময়টা কত হবে? রাত এগারোটা বাজতে পনেরো মিনিট। আমার কোনো সন্দেহই নেই যে, তিনি সেই সময় যে শব্দটা শুনেছিলেন, সেটাই আসলে গুলির শব্দ এবং আমি নিশ্চিত যে খুন করা বা হওয়ার সময়টা ছিল রাত এগারোটা বাজতে পনেরো মিনিট আগে।
‘তাই যদি হয়, এখন আমাদের ভেবে দেখতে হবে অবশ্যই এটা ধরে নিয়ে যে, তাদের দুজনের কেউই হত্যাকারী নয়। বার্কার এবং মিসেস ডগলাস কী করছিল, রাত এগারোটা বাজতে পনেরো মিনিট নাগাদ? যখন গুলির শব্দ শুনে একতলায় নেমে এসেছিল তারা, তখন থেকে এগারোটা বেজে পনেরো মিনিট পর্যন্ত যখন তারা অ্যালার্ম-বেল বাজিয়েছিল আর চেঁচামেচি করে চাকরদের ঘুম থেকে ডেকে তুলেছিল। এটাই হল প্রধান প্রশ্ন, এই আধঘণ্টা সময় কী করেছিল দুজনে, আর এই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলেই আমাদের ধাঁধার সমাধানও অনেকটা হয়ে যাবে।’
‘আমি একেবারে নিশ্চিত,’ আমি বললাম, ‘যে এই দুজনের মধ্যে একটা বোঝাপড়া আছে। এই মহিলার প্রাণে দয়ামায়া কিছুই নেই। তা না হলে, স্বামী ওরকম নৃশংসভাবে মারা পড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সে পরপুরুষের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করছে!’
‘ঠিক বলেছ। ওঁর ব্যবহারটা যেন খুবই অস্বাভাবিক...।’
‘তাহলে তোমার মতে বার্কার আর মিসেস ডগলাসই খুনের পেছনে আছে?’
‘তোমার প্রশ্নটা এতই স্পষ্ট যে সোজা তা লাগল এসে আমার বুকে, ওয়াটসন! যদি তুমি বরং ব্যাপারটা এভাবে বলতে পারো যে, কে খুন হয়েছিল, কীভাবে খুন হয়েছিল, এই সমস্ত তথ্য এই দুজনের ঝুলিতে আছে, তাহলে আমি তোমাকে একটা উত্তর দিতে পারি। তারা দুজনেই খুনি, এই যে তুমি একেবারে নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছ, এ ব্যাপারে আমার কাছে বেশ ধোঁয়াশা এখনও আছে। দেখি, আবার দুজনে ভাবতে শুরু করি অসুবিধেগুলো।
‘তুমি একটা সরল-রকমের ত্রিকোণ প্রেমের গল্প ভাবছ। হবেই সেরকম। কারণ তুমি তো একজন লেখক। গল্পটা এরকম যে, এরা দুজন দুজনের প্রতি গোপনে আসক্ত যদিও তাদের পথের কাঁটা হল, মি. ডগলাস। সুতরাং তাকে সরিয়ে দেওয়া হোক। এটা হল পুরো রহস্যটার একটা সরলীকরণ। বরং বার্কার আর মিসেস ডগলাসকে বাদ দিয়ে, অন্যদের সাক্ষ্য বা জবানবন্দি যদি বিশ্লেষণ করে দেখো, তাহলে দেখবে তাদের প্রত্যেকের বক্তব্য থেকে একটা তথ্যই উঠে আসছে যে, ডগলাস-দম্পতি পরস্পরের প্রতি খুবই দায়বদ্ধ ছিলেন এবং তাঁদের উভয়ের প্রতি অনুরাগেও তেমন কোনো খাদ ছিল না।’
‘এই ব্যাপারে আবার আমি নিঃসন্দেহ নই...।’ কথাটা বললাম এই কারণে যে, এক মুহূর্ত আমার চোখের সামনে বার্কারের দিকে নিবদ্ধ মিসেস ডগলাসের হাসিমুখ ভেসে উঠল।
‘ঠিক আছে, যদি ধরে নিই যে, এই দুজন ষড়যন্ত্র করে ডগলাসকে খুনটা করেছে, তাহলে এটাই মাথায় রাখতে হবে যে এমন একজনকে তারা খুন করেছে, যার মাথার ওপর বহুদিন ধরে বিপদের খাঁড়া ঝুলছে।’
‘এই বিপদের খাঁড়ার ব্যাপারটাও গল্প হতে পারে কারণ সেটা বলছে কারা? না, এই দুজন। বার্কার আর ওই মহিলা।’
হোমসকে দেখে মনে হল সে বেশ চিন্তায় পড়ে গেছে।
‘বুঝেছি, ওয়াটসন। তুমি একটা যুক্তি খাড়া করতে চাইছ যে, প্রথম থেকে ওই জুটি যা বলেছে আমাদের সবই মিথ্যা। তোমার মত অনুযায়ী যা দাঁড়াচ্ছে তা হল, ডগলাসের মৃত্যুভয় বলে কিছু ছিল না। অপরাধীদের গোপন সঙ্ঘের প্রতিও তোমার তেমন আস্থা নেই। ভয়ের উপত্যকা কিংবা বডিমাস্টার ম্যাক বা ওই ধরনের যা কিছুর কথা আমাদের জানানো হয়েছে, সবই গল্পকথা। আমার মনে হয়, সমস্ত ব্যাপারটার এটা একটা সরলীকরণ। এসো, আমরা আর একটু ভেবে দেখি। হত্যাটাকে যুক্তিসম্মত করতে তারা এইসব গল্পকথার আমদানি করেছে৷ তারপর তারা বুদ্ধি করে একটা সাইকেল বাড়ির সামনে ঝোপের ভেতর এনে ফেলে রেখে প্রমাণ করতে চাইছে যে, দুষ্কৃতি বাইরের লোক। জানালাতে রক্তমাখা ছাপও এরকমই একটা বানানো প্রমাণ। মৃতের পাশে কার্ড পড়ে থাকার ব্যাপারটাও তাই। ওরকম কার্ড বাড়িতেই তৈরি করা যেতে পারে৷ সব ব্যাপারটাই তোমার ধারণার সঙ্গে খাপ খেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ব্যাপার বোধহয় তোমার চোখ এড়িয়ে গেছে। সেটা হল, মারণাস্ত্রটা একটা বেঁটে শটগান কেন? তাও আবার আমেরিকান কোম্পানির তৈরি। কেন? কেন? কেন? বলো, ওয়াটসন!’
‘স্বীকার করছি এটার ব্যাখ্যা আমি দিতে পারব না।’
‘তার ওপর আবার এক মহিলা ও তার প্রেমিক মহিলার স্বামীকে খুন করে বিয়ের আংটিটাই সরিয়ে দিয়েছে! যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, খুনটা আমরা দুজনেই করেছি। এটা কি খুব যুক্তিপূর্ণ বলে তোমার মনে হয়, ওয়াটসন?’
‘উঁহু, মোটেই না।
‘আর একটা ব্যাপার, সাইকেলে চড়ে যে খুন করতে এল, সেই সাইকেলটাই সে নিয়ে যেতে ভুলে গেল?’
‘সত্যি, এটাও খুব আশ্চর্যের!’
‘আমরা ধরেই নিতে পারি যে, ডগলাস লোকটার অতীত জীবনে এমন ভয়ঙ্কর কিংবা আইনের চোখে আপত্তিকর কিছু ঘটেছিল যেটা সে কাউকে জানাতে চায় না। আর তার ফলেই, বাইরে থেকে কেউই প্রতিশোধ নিতে এসেছিল, খুন করে পালিয়েছে৷ কিন্তু সেই বাইরের খুনি ডগলাসের বিয়ের আংটিটা নিয়ে যাবে কেন? আমি সত্যিই এই ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না। ডগলাসের ওপর প্রতিশোধ নিতে, তাকে খুন করতে এসেছিল লোকটা যে ব্যাপারে সেটা তো আমেরিকার ব্যাপার, অর্থাৎ ডগলাসের প্রথম বিয়ের ব্যাপার৷ কিন্তু যে আংটিটা খোয়া গিয়েছে সেটা তো দ্বিতীয় বিয়ের, যেটা লন্ডনে হয়েছিল...।
‘আরো একটু ভাবা যাক। খুনি পালিয়ে যাবার আগেই বার্কার এবং মিসেস ডগলাস ধরা যাক স্টাডিতে ঢুকে তাকে ধরার চেষ্টা করলে সে ডগলাসের অতীত জীবনের সেই বিশ্রী কেলেঙ্কারির কথা সংবাদ মাধ্যমের কাছে চাউর করে দেবে। সুতরাং কেলেঙ্কারির কথা ফাঁস হয়ে যাবে এই ভয়ে তারা দুজনেই খুনিকে পালিয়ে যেতে দিয়েছিল। আর খুনি যাতে পালাতে পারে, তার জন্যে কাঠের সেতু যেটা ওপরে তুলে দেওয়া হয়েছিল, সেটা তারা খুব সন্তর্পণে আবার নামিয়ে দিয়েছিল যাতে কারোর কানে শব্দ না যায়। তারপর খুনি পালিয়ে গেলে আবার সেতু তুলে দিয়েছিল। খুনি সহজেই পালাতে পেরেছিল, কোনো কারণে সে হয়তো এটাও ভেবেছিল যে, সাইকেল ব্যবহার না করে পায়ে হেঁটে পালিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে৷ সেই একই কারণে, মানে লোকজনের চোখে যাতে না পড়ে যেতে হয়, সে শটগানটাও ফেলে গিয়েছিল। এরকম ভাবলে সমস্ত ব্যাপারটা কিছুটা যুক্তিপূর্ণ মনে হয়, তাই না?’
‘তা বটে। এখন ব্যাপারটা যুক্তিপূর্ণ মনে হচ্ছে।’
‘এবার ভাবো ওয়াটসন যে, বার্কার আর মহিলা তখন ভাবে যাতে লোক না ধরতে পারে যে, তারা খুনিকে পালিয়ে যেতে দিয়েছে, তখন বার্কারের মাথার বুদ্ধিতে জানালার নীচের দিকে রক্ত মাখা জুতোর ছাপ তৈরি করা হয়, যাতে সকলের ধারণা হবে যে, খুনি জানালা গলেই পালিয়েছে। এছাড়াও তারা দুজনই গুলির শব্দ শুনতে পেয়েছিল। কিন্তু নাটকের মঞ্চ সাজাতে তাদের কিছুটা সময় লাগে, আর তাই অ্যামিস কিংবা মিসেস অ্যালেন খুন হওয়ার আধঘণ্টা পরে বিপদ-ঘণ্টির শব্দ শুনতে পেয়েছিল, কারণ বিপদ-ঘণ্টি বাজানোই হয়েছিল খুন হওয়ার আধ-ঘণ্টা বাদে।’
‘তোমার গল্পও শুনলাম৷ কিন্তু এসব প্রমাণ করবে কীভাবে?’ কিছুটা বিদ্রুপ ফুটে উঠেছিল আমার গলায়।
হোমস সেটা গ্রাহ্য না করেও বলল, ‘ভাবছি যে খুনি সে যদি বাইরের লোকই হয়, তাহলে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে আর ধরাও যাবে৷ আর সব প্রমাণের সেরা প্রমাণ হবে সেটাই৷ কিন্তু যদি তা না হয়, তাহলে–বিজ্ঞান, যুক্তি-বুদ্ধি এসব তো আর পৃথিবী থেকে লোপ পেয়ে যায়নি। ভাবছি ওই স্টাডিতে, মানে অকুস্থলে একটা সন্ধ্যা বা একটা রাত আমাকে একা কাটাতে হবে। ভাবতে হবে, বন্ধু, ভাবতে হবে।’
‘একটা সন্ধ্যা বা একটা রাত একা স্টাডিতে কাটাবে?’
‘আমি বলি কী এখনই সেখানে যাওয়া যাক। সব ব্যবস্থা আমি করেছি ভালোমানুষ অ্যামিসের সঙ্গে কথা বলে৷ সে বার্কারের শিষ্য, বলা যায়। আমি ওই ঘরে একা কাটাব আর দেখব যে ঘরটার পরিবেশ আমাকে নতুন চিন্তার খাদ্য কিছু দিতে পারে কিনা। নিজের ক্ষমতার ওপর আমার বিশ্বাস বরাবরই। তুমি হাসছ, বন্ধু ওয়াটসন! বেশ, দেখা যাক, কী হয়। আচ্ছা, তোমার সেই বড় ছাতাটা এনেছ তো? আনোনি?’
‘এই তো, আমার সুটকেসের পাশেই আছে।’
‘বাহ্, বাহ্, আমাকে ছাতাটা কিছুক্ষণের জন্যে ধার দিতে হবে।’
‘নিশ্চয়ই। ধার তো দেবই, কিন্তু আমি ভাবছি এই সামান্য অস্ত্র! যদি বিপদ-টিপদ হয়।’
‘ভাবনার কোনো কারণ নেই, মাই ডিয়ার ওয়াটসন। বিপদের তেমন সম্ভাবনা থাকলে আমি কি তোমার সাহায্য নিতাম না? শুধু তোমার ছাতাটা নিলেই আপাতত কাজ হবে।’
রাত ন’টা বাজার কিছু আগেই, ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ড এবং হোয়াইট ম্যাসন ফিরে এলেন। তাঁরা পল্লির দিকে গিয়েছিলেন ফেলে যাওয়া সাইকেলের মালিককে খুঁজে পাওয়া যায় কিনা দেখতে। দুজনকে দেখেই মনে হল বেশ উত্তেজিত, তাঁদের তদন্তের ব্যাপারে নাকি ভালো ফল পাওয়া গেছে।
‘শুনুন বন্ধুরা,’ সহর্ষে বললেন ম্যাকডোনাল্ড, ‘স্বীকার করছি যে, আমার সন্দেহ ছিল খুনের ব্যাপারে বাইরের লোকের কোনো হাত আছে কিনা। কিন্তু এখন আমার ওই ধরনের কোনো সন্দেহ নেই। বাইসাইকেলটা কার সেটা তল্লাশি করে জানতে পেরেছি আমরা৷ যে লোকটা ওটার মালিক, তার একটা বর্ণনাও পেয়েছি। সুতরাং তদন্তে আমরা বেশ কিছুটা এগিয়েছি, বলা যায়।’
‘শুনে মনে হচ্ছে শেষের শুরু,’ বলল হোমস, ‘আমি শুনে সত্যিই খুব আনন্দ পাচ্ছি৷ আপনাদের দুজনকেই অন্তর থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
‘কী করলাম জানেন তো, সেই তথ্যটা সম্বল করে আমি আমার মতো তদন্ত করতে শুরু করলাম যে, গতকালের আগের দিন থেকেই মি. ডগলাসকে খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত লেগেছিল, যখন তিনি টার্নাব্রিজ ওয়েলসে বাজারের দিকে গিয়েছিলেন। সেখানে যাবার পরই তিনি সম্ভবত বিপদের গন্ধ পেয়েছিলেন। সুতরাং এটা পরিষ্কার হল যে, যদি সেই রাতে কোনো লোকের সাইকেলে আসার কথা ডগলাস ভেবেছিলেন, তিনি ধরেই নিয়েছিলেন যে, সে আসবে টার্নাব্রিজ ওয়েলস থেকেই।
আমরা বাইসাইকেলটা সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম এবং ওখানে যে-ক’টা সরাইখানা আছে, তাদের মালিককে দেখিয়েছিলাম। ঈগল কমার্সিয়াল নামের একটা সরাইখানার ম্যানেজার তো সাইকেলটা দেখে সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারল। জানাল যে সাইকেলের মালিকের নাম হারগ্রেভ, যে দুদিন আগে ওই সরাইখানাতেই একটা ঘর ভাড়া নিয়েছিল। সাইকেলটা ছাড়া তার সঙ্গে মালপত্র বলতে একটা সামান্য ব্যাগ ছিল। সে সরাইখানার রেজিস্টারে নাম লিখেছিল, আর উল্লেখ করেছিল যে, সে আসছে লন্ডন থেকে, কিন্তু কোনো ঠিকানা দেয়নি৷ ব্যাগটা পরীক্ষা করে দেখলাম লন্ডনের একটা দোকানের; কিন্তু লোকটা নিঃসন্দেহে একজন আমেরিকান।’
‘বেশ, বেশ,’ হেসে বলল হোমস, ‘বেশ পাকাপোক্ত কাজ করেছেন আপনারা। আর আমরা সেইসময় ঘরে বসে কী করছিলাম জানেন? আমার বন্ধুর সঙ্গে বসে নানা ধরনের গবেষণা চালাচ্ছিলাম! কাজের কাজ কিছুই করা হয়নি।’
‘ঠিকই বলেছেন, সত্যের সন্ধান পেতে হলে মাঠে নেমে কাজ করা উচিত, মি. হোমস।’ ইনস্পেকটর বেশ সন্তুষ্টির সঙ্গে বললেন।
‘কিন্তু ইনস্পেকটর ম্যাক যা জেনেছেন, তার সঙ্গে তোমার থিয়োরি মিলছে না?’ হেসে বললাম।
‘মিলতে পারে আবার নাও পারে৷ কিন্তু আপনার অভিযানের
শেষটা শুনি মি. ম্যাক। সেই লোকটাকে কি আপনারা আইডেনটিফাই করতে পেরেছেন?’
‘পারিনি বললেই চলে; এটা বুঝেছি যে নিজের আসল পরিচয় গোপন রাখতে লোকটা সবরকম সতর্কতা নিয়েছিল। ব্যাগের ভেতর যে সামান্য জামাকাপড় পাওয়া গেছে সেগুলোতে কোথাও কোনো মার্কিং ছিল না। মানে কোন দরজি বা কোথাকার দরজির তৈরি, এরকম আর কী। তার ঘরের টেবিলে এই অঞ্চলের বা পল্লির একটা ম্যাপ বিছানো ছিল। গতকাল সকালে ব্রেকফাস্ট নেবার পর সে সাইকেলে সরাইখানা ছেড়ে বেরিয়ে যায়, তারপর তার ব্যাপারে কেউ কিছু বলতে পারছে না।’
‘এই ব্যাপারটাই আমাদের ভাবাচ্ছে খুব, মি. হোমস,’ বললেন হোয়াইট ম্যাসন। ‘লোকটার মাথায় যদি এরকম মতলব থেকে থাকে যে, তাকে নিয়ে বেশি আলোচনা, হইচই না হোক, তাহলে ভেবে নেওয়া যেত সে সরাইখানায় আবার ফিরতে এবং চুপচাপ থেকে যেত সেখানে৷ হোটেল বা সরাইখানাতে নিয়মকানুন যা, তার নিশ্চয়ই জানা ছিল যে, ম্যানেজার লোকাল থানায় তার নামে একটা রিপোর্ট করে রাখবে আর তার হঠাৎ বেপাত্তা হয়ে যাওয়া এবং জমিদারবাড়ির খুনিটার সঙ্গে একটা যোগাযোগ খোঁজার চেষ্টা করা হবে।’
‘সেরকমই ভাবা উচিত। কিন্তু বলতেই হবে যে লোকটা বেশ ধুরন্ধর, কারণ এখানে সে ধরা পড়েনি।...তাকে দেখতে-শুনতে কেমন তার কিছু বর্ণনা পাওয়া গেছে?’
ম্যাকডোনাল্ড নিজের নোটবুক খুললেন। ‘কিছুটা অবশ্য জানা গেছে, যতটা লোকজনকে জিগ্যেস করে বোঝা গেল। কেউই যে তাকে খুব ভালোভাবে, মন দিয়ে খেয়াল করেছে, সেরকম নয়৷ তবুও সরাইখানার পরিচারক, কেরানি এবং ঘরের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখেন যে মহিলা, তারা সকলে যা যা বলেছে, তা থেকে এটুকুই জানা গেছে৷ লোকটার হাইট হল, পাঁচ ফুট নাইন, বয়স পঞ্চাশের আশেপাশে, চুলে পাক ধরেছে, গোঁফেও পাক ধরেছে, খাড়া নাক, আর মুখের চেহারা দেখলে নাকি লোকটাকে ডাকাবুকো বলে মনে হয়।’
‘হুমম্, একমাত্র মুখের বর্ণনা ছাড়া, বাকি সবটাই ডগলাস মশাইয়ের সঙ্গে বেশ মিলে যাচ্ছে।’ হোমস জানাল, ‘তিনিও সবে পঞ্চাশ পেরিয়েছেন, তাঁরও চুল আর গোঁফ বেশ পাকা, আর তাঁর হাইটও ওইরকম। আর কিছু জানা গেছে?’
‘লোকটার পরনে ছিল বেশ জবরদস্ত ছাই-রং সুট, আর নৌ-বাহিনিতে যারা কাজ করে তারা যেমন জ্যাকেট ব্যবহার করে, সেরকম জ্যাকেট। সাইজে একটু ছোট হলদে ওভারকোট আর একটা হাল্কা ক্যাপ।’
‘শটগানের ব্যাপারটা?’
‘ওটা দু-ফুটের থেকেও ছোট। এমনই ছোট যে তার ওই ব্যাগে ধরে যায়। এমনকী বন্দুকটা সে ওভারকোটের ভেতরেও লুকিয়ে নিতে পারে।’
‘তাহলে পুরো ব্যাপারটা কী দাঁড়াল?’
‘তাহলে শুনুন মি. হোমস,’ বললেন ম্যাকডোনাল্ড, ‘যখন লোকটার সম্বন্ধে আমরা কিছুটা জানতে পেরেছি, জেনে রাখুন তার চেহারা, পোশাক-আশাকের বর্ণনা পাওয়ার পরই, পাঁচ মিনিটের মধ্যে তার করে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে সব জানিয়ে দিয়েছি, তখন লোকটাকে ধরা যাবেই। এখনও পর্যন্ত যেটুকু করা গেছে, তাতে মনে হচ্ছে তদন্তের অগ্রগতি ভালোই।’
‘সেটা ঠিকই বলেছেন,’ বলল হোমস।
‘আরো শুনুন, মি. ডগলাসকে লোকটা সেদিন রাতে চট করে হাতের কাছে পায়নি। তখন তার কী করার ছিল? ঝোপের ভেতর সাইকেলটা সে লুকিয়ে রাখল আর সন্ধে নামলে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল৷ পরিখার ওপর সেতু তখনও নামানো ছিল, ওটা তুলে নেওয়ার সময় তখনও হয়নি, ধারে কাছে কাউকে সে দেখতে পায়নি। সে বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল, এই আশায় যে কারোর সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে, বাড়িতে ঢোকার কিছু না কিছু একটা কারণ বলে দেবে। কিন্তু সৌভাগ্যবশত, কারোর সঙ্গেই তার দেখা হল না। বাড়িতে ঢুকেই প্রথম যে ঘরটা চোখে পড়ল, তার ভেতরেই তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়ল। জানালার বড়সড় পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রইল। সেখান থেকে সে দেখতে পেয়েছিল যে, ঝোলানো-সেতু তুলে নেওয়া হচ্ছে ওপরে, আর তখনই তার মাথায় খেলল যে পালাবার সময় পরিখার জল সাঁতরেই তাকে পালাতে হবে। পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রইল সে রাত এগারোটা বেজে পনেরো মিনিট পর্যন্ত, যখন মি. ডগলাস তাঁর রোজকার বাড়ির চারধারে রাউন্ড শেষ করে প্রথম ঘরটাতে ঢুকলেন। আগন্তুক তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করল আর পালাল, ঠিক যেভাবে ভেবে রেখেছিল। তার মাথায় এই ব্যাপারটা ছিল যে, পরে যখন খোঁজাখুঁজি চলবে সরাইখানার লোকেরা তার বাহন সাইকেলের কথা বলবেই, আর সেটা তার বিরুদ্ধে একটা সূত্র হয়ে দাঁড়াবে৷ সেই কারণেই সে সাইকেলটা ফেলে রেখে গিয়েছিল আর পরিখা সাঁতরে পার হবার পর যেভাবেই হোক পালিয়েছিল লন্ডনে কিংবা এমন কোনো সুরক্ষিত লুকোনোর জায়গায় যেটার সে ব্যবস্থা করে রেখেছিল আগে থেকেই। আমার ভাবনাটা আপনার কেমন মনে হচ্ছে, মি. হোমস?’
‘সত্যি বলতে কী, মি. ম্যাক, খুবই ভালো ভেবেছেন, পরিষ্কার করে ভেবেছেন, মানে যতটা ভাবা যায়। আপনার গল্পের শেষ এখানেই৷ আর আমার গল্পের শেষটা হল, খুনটা করা হয়েছিল সবাই তা জানার আধঘণ্টা আগে৷ আরো বলতে চাই যে, মিসেস ডগলাস এবং বার্কার দুজনেই ষড় করে কিছু একটা গোপন করছেন; খুনিকে পালিয়ে যেতে তাঁরা সহায়তা করেছেন। অন্তত খুনি সটকে পড়ার আগে দুজনেই ওই ঘরে, অর্থাৎ অকুস্থলে পৌঁছে গিয়েছিলেন আর তাঁরা একটা সূত্র মাথা খাটিয়ে বের করেছিলেন, যাতে মনে হয় যে খুনি পালিয়েছে জানলা টপকে। কিন্তু আসলে, মানে সম্ভবত বলাই ভালো, তাঁরা খুনিকে পালাতে সাহায্য করেছেন টানা-সেতু আবার নীচে নামিয়ে। গল্পের প্রথম অংশটা আমি এরকম ভেবেছি।’
মি. ম্যাক আর মি. ম্যাসন দুজনেরই মনঃপুত হল না হোমসের বক্তব্য।
‘বেশ, মি. হোমস, আপনার গল্পটা যদি সত্যি হয়, তাহলে রহস্যের জটগুলো তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে,’ লন্ডনের ইনস্পেকটর বললেন।
‘আর সেক্ষেত্রে রহস্যের জট ছাড়ানোও বেশ কঠিন,’ বললেন হোয়াইট ম্যাসন। ‘মিসেস ডগলাস সারা জীবনেও আমেরিকায় যাননি বা সেখানে থাকেননি। তাহলে তাঁর সঙ্গে একজন আমেরিকান আততায়ীর কী এমন সম্পর্ক থাকতে পারে যাতে তিনি তাঁকে অপকর্মের পর পালিয়ে যেতে সাহায্য করবেন?’
‘আমার চিন্তায় একটু গরমিল আছে, সেটা মেনেই নিচ্ছি, বলল হোমস, ‘আমি একটা প্রস্তাব রাখছি, আজ রাতে নিজের মতো করে আমি অল্প একটু তদন্ত করতে চাই। মনে হচ্ছে রহস্যের সমাধান হবার যেটুকু বাকি আছে, সেটুকু মিলিয়ে দিতে পারব।’
‘আমরা কি আপনাকে সাহায্য করতে পারি, মি. হোমস?’
‘না, না! অন্ধকার আর ডঃ ওয়াটসনের ছাতা–এ দুটো হলেই আমার চলবে৷ আর অ্যামিস, ও-বাড়িতে যাকে একমাত্র বিশ্বাস করা যায়, সেই অ্যামিসের সামান্য সাহায্য দরকার হতে পারে আমার। আমার সব ভাবনার সূত্র একেবারে গোড়ার দিকের সামান্য একটা প্রশ্নচিহ্নের দিকে প্রথম দিন থেকেই ইঙ্গিত করছে, আর সেটা হল, একজন খেলোয়াড় বা ব্যায়ামবীর যদি তাঁর ব্যায়ামের মাধ্যমে তাঁর শরীরের আরো উন্নতিই করতে চান, তাহলে দুটো ডাম্বেল ব্যবহার না করে তিনি একটা মাত্র ডাম্বেল নিয়ে ব্যয়াম করেন কেন? এটা কি অস্বাভাবিক নয়? মি. ম্যাক, আপনি ধুরন্ধর ডিটেকটিভ আবার চোর-বদমাশ-খুনিদের সঙ্গে লড়ার জন্যে আপনার শরীরকেও বেশ ফিট্ রাখতে হয়। আপনি নিশ্চয়ই প্রতিদিন একটু-আধটু ব্যায়াম করেন?’
‘হ্যাঁ, চাকরি যা করি, তার দাবিতে ব্যায়াম তো করতেই হয়। ডাম্বেল, বারবেলও ব্যবহার করতে হয়।’
‘আপনি একটা ডাম্বেল নিয়ে ব্যায়াম করেন? না দুটো?’
‘সবসময় দুটো ডাম্বেলই ব্যবহার করি।’
অনেক রাতে হোমস ঘরে ফিরল। আমি ঘুমিয়েই পড়েছিলাম, সে বাইরে থেকে ঘরে ঢুকতে একটু শব্দ হল, আর তাতেই ঘুমটা চটে গেল।
‘কী হোমস?’ ফিসফিসিয়ে জিগ্যেস করলাম, ‘কিছু পেলে?’ সে কিছুক্ষণ আমার খাটের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। চুপচাপ৷ হাতে জ্বলছিল বাতি। তার লম্বা শরীরটা ঝুঁকে এল আমার দিকে, সে-ও ফিসফিসিয়ে বলল, ‘ওয়াটসন তোমার ভয় করবে না?’
‘কীসের জন্যে?’
‘আমার মতো একজন উজবুক, বুদ্ধিহীন, অন্ধ একটা লোকের সঙ্গে একঘরে রাত কাটাতে তোমার খারাপ লাগবে না? খারাপ লাগাই তো উচিত। ওহ, কী বোকা আমি! আমার বুদ্ধি কি কোনোদিনই খোলতাই হবে না? চিরকালই আমি গণ্ডমূর্খ থেকে যাব? গণ্ডমূর্খ আর বোকা?’
হাই তুলে বললাম, ‘ঘুম চোখে এই দুরূহ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। এখন বাতিটা নিভিয়ে, দয়া করে শুয়ে পড়ো।’
হোমস শুধু হা হা হা হা হাসল।

পরিচ্ছেদ ৭ঃ সমাধান
পরের দিন সকালে, প্রাতরাশের পর লোকাল পুলিশ স্টেশনে হাজির হলাম আমরা। দেখলাম সার্জেন্ট, ছোট বৈঠকখানায় ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ড এবং হোয়াইট ম্যাসন, পাশাপাশি বসে আলোচনাতে ব্যস্ত। তাদের সামনে টেবিলের ওপর প্রচুর চিঠি ও টেলিগ্রামের কাগজের স্তূপ থেকে তারা সব আলাদা করে রাখছে। একধারে তিনটি চিঠি আলাদা সরিয়ে রাখা হয়েছে দেখলাম।
‘এখনও সেই নাকে-দড়ি-দেওয়া বাইসাইক্লিস্টের খোঁজে আছেন মনে হচ্ছে?’ অমায়িক হেসে হোমস জিগ্যেস করল, ‘সেই দুষ্টুটার সাম্প্রতিক খবর কী?’
বেশ হতাশার সঙ্গে ম্যাকডোনাল্ড চিঠিপত্রের স্তূপের দিকে আঙুল দেখাল।
‘সম্প্রতি তার সম্বন্ধে রিপোর্ট পাওয়া গেছে লিসেসটার, নটিংহ্যাম, সাদাম্পটন, ডার্বি, ইস্ট হ্যাম, বিচমন্ড এবং আরো চোদ্দটা জায়গা থেকে। তারমধ্যে তিন জায়গা–ইস্ট হ্যাম, লিসেসটার এবং লিভারপুল থেকে খবর পেয়েছি লোকটার বিরুদ্ধে অপরাধের রেকর্ড আছে, একটা থানা তো তাকে গ্রেপ্তারই করেছিল। এইসব অঞ্চলে নাকি হলদে-কোট পরনে এমন সব অপরাধীরা গণ্ডায় গণ্ডায় ঘুরে বেড়ায়।’
‘ওহ্, সত্যি কী পরিশ্রমই না আপনারা করছেন!’ সহানুভূতির সঙ্গে হোমস বলল। ‘এখন, মি. ম্যাক আপনাকে, আর মি. হোয়াইট ম্যাসন আপনাকেও, আমি খুব প্রয়োজনীয় একটা পরামর্শ দেব। সে আপনারা যেভাবেই নেন সেই পরামর্শ। সেটা হল, এমন একটা কাজে আপনারা আপনাদের এনার্জি ক্ষয় করে চলেছেন, যা শেষ পর্যন্ত আদৌ কোনো কাজে লাগবে না। সুতরাং আমি আপনাদের বলব, আপনারা কেসটার তদন্ত করা থামিয়ে দিন।’
‘আপনি বলছেন রহস্যের সমাধানের কোনো আশা নেই?’ ইনস্পেকটর উত্তেজিতভাবে বললেন।
‘আমি ঠিক এটাই বলছি। আপনারা যাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন এই মুহূর্তে তার কোনো খোঁজই আপনারা পাবেন না।’
‘কী বলছেন! এই সাইক্লিস্ট! সে তো কোনো কাল্পনিক ব্যাপার নয়? আমরা তার চেহারার বর্ণনা পেয়েছি, তার ব্যাগের বর্ণনা পেয়েছি, সে একটা সাইকেলে এসেছিল সেটা জানতে পেরেছি৷ তার মানে লোকটা কোথাও ঘাপটি মেরে বসে আছে। তাহলে তাকে আমরা ধরতে পারব না কেন?’
‘ঠিকই, ঠিকই। কোনো সন্দেহই থাকতে পারে না যে সে কোথাও আছে; এবং এ ব্যাপারেও সন্দেহ নেই তাকে আমরা পেয়ে যাব। কিন্তু তা বলে ইস্ট হ্যাম বা লিভারপুল পর্যন্ত দৌড়তে হবে না৷ একটা শর্টকাট রাস্তা বের করতে হবে লোকটাকে পেতে।’
‘কিছু একটা আপনি খুলে বলছেন না৷ এরকম আপনার থেকে আশা করিনি মি. হোমস।’ ইনস্পেকটরের গলায় বিরক্তি।
‘আমার কাজের ধরন আপনি জানেন, মি. ম্যাক। আমি যা জেনেছি তা এই মুহূর্তে আপনাদের বলব না। যা জেনেছি, সেই জানাটা আর একটু পরীক্ষা করে দেখে নিতে চাই যে ঠিক জেনেছি কিনা, তারপর আমি লন্ডনে ফিরব, সব তথ্য আপনার কাছে গচ্ছিত রেখে। একটা কথাই বলে রাখি। এরকম ব্যতিক্রমী এবং চিত্তাকর্ষক রহস্য কিন্তু আমার অভিজ্ঞতায় আগে পাইনি।’
‘ঠিক ঢুকছে না আপনার কথাগুলো এই মোটা মাথায়। আমরা তো উত্তেজিত হয়ে পড়ছি আপনি কী শোনাবেন তা ভেবে।’
‘বেশ, তাহলে বলি, আমি আপনাদের গতকাল সন্ধ্যাতেই জানিয়েছিলাম যে, রাতের দিকে ম্যানর হাউসে আমি একা কিছুক্ষণ কাটাব। আর তাই কাটিয়েছি।’
‘অভিজ্ঞতা কীরকম আপনার?’
‘অভিজ্ঞতা অনেক। বিশেষত বার্লস্টোনের ওই প্রাচীন প্রাসাদের বিষয়ে অনেক কিছু জেনেছি। সেই বিষয়ে বলব কী? প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে আপনারা কি আগ্রহী?’
‘ওহ, মি. হোমস, এবার আপনি আমাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাচ্ছেন?’
‘মাফ করবেন। প্রাচীন ইতিহাস, আড়াইশো বছর আগে নির্মিত এই অপূর্ব দুর্গ, এসবের কথা এখন থাক। আমি বরং বর্তমান ঘটনাতে চলে আসি৷ গতরাতে ম্যানর হাউসে আমি ছিলাম বটে। কিন্তু কারোর সঙ্গে দেখা করিনি। না বার্কার, না মিসেস ডগলাস। তাঁদের বিরক্ত করার কোনো দরকারই আমার ছিল না। কিন্তু আমি এই প্রয়োজনীয় তথ্যটি জেনেছি যে, মিসেস ডগলাস একেবারেই দুঃখে নেই, বরং বেশ ফুর্তিতেই আছেন। গত রাতে দারুণ লোভনীয় ডিনার করেছেন। আমার বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল, মি. অ্যামিসের সঙ্গে দেখা করা, তার সঙ্গে কিছুক্ষণ গালগল্প করা। শেষ পর্যন্ত আমি তাকে রাজি করাই যে, সে কাউকে কিছু না বলে, আমাকে স্টাডিতে কিছুক্ষণ একা বসতে দেবে।’
‘কী? সেই বীভৎস মৃতদেহের সঙ্গে?’
‘না, না, এখন সব পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। আমি জেনেছি, মি. ম্যাক, আপনার আদেশ অনুযায়ীই তো স্টাডি পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। অত বড় ঘরটা গত রাতে বেশ ছিমছামভাবেই সাজানো ছিল। আমি সেখানে, একা প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট কাটিয়েছি।’
‘কী করলেন আপনি সেখানে?’
‘আসলে আমি খুঁজছিলাম সেই হারিয়ে যাওয়া ডাম্বেলটা৷ এই বস্তুটার এক বিশাল ভূমিকা আছে এই রহস্যে, এটা আমি বরাবর ভেবে এসেছি। শেষমেশ আমি লোহার সেই ভারী বস্তুটা পেয়েও গেছি।’
‘কোথায় পেলেন?’
‘সেটা বলে দিলে তো রহস্যের সমাধান হয়েই গেল। একটু ধৈর্য ধরুন, প্লিজ...একটু।’
‘ধৈর্য না হয় ধরছি৷ কিন্তু আপনি আমাদের তদন্ত বন্ধ করতে বললেন কেন?’
‘খুব সামান্য একটা কারণে, মি. ম্যাক। সেটা হল, প্লিজ কিছু মনে করবেন না, আপনি বা আপনারা যে রহস্যের সমাধান খুঁজছেন, সেই রহস্যের একেবারে গোড়ার কথাটাই আপনারা বুঝতে পারেননি।’
‘আমাদের তদন্তের মূল বিষয় হল, বার্লস্টোন জমিদারবাড়ির কর্তা মি. জন ডগলাসের রহস্যজনক মৃত্যু।’
‘ঠিক। একেবারে ঠিক৷ সে তদন্ত আপনারা করছেন আমি জানি। কিন্তু সাইকেলে আসা সেই রহস্যময় ভদ্রলোককে খুঁজে সময় নষ্ট করবেন না। কারণ এই খোঁজাখুঁজিতে কোনো লাভ হবে না।’
‘তাহলে আপনি আমাদের কী করতে বলছেন?’
‘ঠিক কী করতে হবে সেটাই আমি বলব। যদি অবশ্য আপনারা তা করেন।’
‘সবসময়েই দেখেছি আপনি যেসব পরামর্শ দিয়েছেন, তাদের পেছনে যথেষ্ঠ যুক্তি থাকে৷ ঠিক আছে বলুন কী আপনার পরামর্শ।’
‘আর আপনি কী করবেন হোয়াইট ম্যাসন?’
মফস্বলের স্বনামধন্য ডিটেকটিভ অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন৷ একবার ইনস্পেকটরের দিকে তাকাচ্ছেন, একবার হোমসের দিকে। এই প্রথম তিনি হোমসের সঙ্গে কাজ করছেন৷ হোমসের চতুর রীতি বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণাই নেই। মাথা চুলকে তিনি শেষমেশ বললেন, ‘আপনার পরামর্শ যদি ইনস্পেকটরের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, আমার কাছেও তা গ্রহণযোগ্য।’
‘চমৎকার!’ বলল হোমস। ‘বেশ, তাহলে আমি আপনাদের বলব এই সুন্দর, শান্ত গ্রামের রাস্তায় দুজনে খানিক হেঁটে আসুন। এখানকার লোকের মুখে বলতে শুনেছি, সবুজ বনানীর মাঝখান থেকে বার্লস্টোন ভবন নাকি দেখতে লাগে অপূর্ব! সেই দৃশ্য আপনারা উপভোগ করবেন না? তারপর না হয়, আমরা সবাই মিলে একটা পরিচ্ছন্ন হোটেলে লাঞ্চ সারব। এই অঞ্চল তো আমার চেনা নয়, যদি চেনা থাকত তাহলে হোটেলের নামটাও বলতে পারতাম। সন্ধের দিকে, ক্লান্ত শরীরে, কিন্তু উৎফুল্ল মনে।’
‘মশাই, আপনার রসিকতা কিন্তু সত্যিই সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে!’ রেগেমেগে ম্যাক চেয়ার ছেড়ে উঠেই পড়লেন।
‘বেশ, বেশ, দিনটা তাহলে যেভাবে ইচ্ছা, দুজনে কাটান,’ বলল হোমস। ইনস্পেকটরের পিঠ চাপড়ে, ‘খামোকা রাগ করছেন কেন? এক বিরাট সারপ্রাইজ আপনাদের জন্যে অপেক্ষা করছে! যেখানে ইচ্ছে দু-বন্ধু মিলে ঘুরে আসুন৷ কিন্তু বেশি দূরে যাবেন না, কারণ ঠিক সন্ধের মুখে দেখা হবে আমাদের। দেরি করবেন না মি. ম্যাক।’
‘এরকম পরামর্শে তবুও কিছু পদার্থ আছে।’ হেসে বললেন ম্যাক।
‘যাবার আগে একটা ছোট কাজ আছে ইনস্পেকটর?’
‘কী কাজ?’
‘মি. বার্কারকে আপনি একটা ছোট চিঠি লিখবেন...।’
‘বেশ...।’
‘যদি কিছু না মনে করেন, চিঠিটার ডিকটেশান দেব আমি৷ আর মি. ম্যাসন সেটা লিখে নেবেন...।’
‘ইনস্পেকটর ম্যাক রাজি হওয়ার ইশারা করলেন হোয়াইট ম্যাসনকে।’ ম্যাসন এক টুকরো কাগজ নিয়ে কলম বের করে প্রস্তুত হলেন।
হোমস বলে যেতে লাগল।
‘প্রিয় মহাশয়,
আমার মনে হয়েছে যে, আপনার বাসভবনের সামনে পরিখার জল অন্তত একবারের জন্য শুকিয়ে ফেলতে হবে। আমাদের মনে হয়েছে যে, শুকনো পরিখার নীচে এমন কিছু পাওয়া যেতে পারে।’
‘অসম্ভব কথা বলছেন,’ বললেন ইনস্পেকটর’তদন্ত করে আমি দেখেছি।’
‘প্লিজ, প্লিজ! ইনস্পেকটর স্যার প্লিজ, যেটা বলছি বলতে দিন।’
‘ঠিক আছে, বলে যান।’ হতাশ ভঙ্গি করলেন ইনস্পেকটর ম্যাক।
‘আমাদের মনে হয়েছে যে শুকনো পরিখার নীচে এমন কিছু পাওয়া যেতে পারে, যা আমাদের তদন্তের কাজে সাহায্য করবে। জল বের করার সব ব্যবস্থা করা হয়েছে; যারা এই ধরনের কাজ করে তারা আমাদের নির্দেশমতো আগামীকাল সকাল থেকেই তাদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ শুরু করবে।’
‘এসবের কোনো মানেই হয় না!’ ম্যাক অধৈর্যের গলায় বললেন। হোমস সেই আপত্তিকে পাত্তা না দিয়ে বলে চলল,...
‘দেবে। ব্যাপারটা প্রয়োজনীয় বলেই আপনাকে আগে থেকে জানানো প্রয়োজন মনে করলাম।’
ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ড গুম হয়ে বসেছিলেন। হোমস আবার মৃদু হেসে তাঁর পিঠ চাপড়ে বলল, ‘চিঠিটা সই করে দিন আর থানার কাউকে দিয়ে আজ বিকেল চারটের মধ্যে বার্কারের হাতে ধরিয়ে দিন। চারটে নাগাদই আমরা থানার এই ঘরে আবার মিলিত হব৷ ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা নিজেদের যা ইচ্ছে তাই করি; একটা ব্যাপারে আমি আপনাদের নিশ্চিত করতে পারি, তদন্তের শেষ ধাপে পৌঁছে গেছি।’
সন্ধে সবে নামছে, তখনই আবার আমরা জড়ো হলাম থানার সেই ঘরে। এখন আর হোমস তেমন হাসি-ঠাট্টা করছে না, গম্ভীর তার মুখ; কৌতূহলে ভেতরে ভেতরে ছটফট করছিলাম আমি, ইনস্পেকটর ম্যাক আর হোয়াইট ম্যাসনের কপাল কুঁচকে আছে, বুঝতেই পারছি দুজনেই মনে মনে বেশ বিরক্ত।
‘আপনাদের দুজনকেই বলছি,’ গম্ভীরভাবে আমার বন্ধু বলতে শুরু করল, ‘আমি অনুরোধ করছি যে, আমি যা করব তা শুধু ধৈর্য নিয়ে দেখে যান, আপনারা নিজেরাই বিচার করবেন যে আমার নিজের পর্যবেক্ষণ-শক্তি প্রয়োগ করে এই জটিল রহস্যের যে সমাধান-সূত্র বের করেছি তা কতটা গ্রহণযোগ্য। আজ সন্ধেয় বেশ ঠান্ডা পড়েছে, আমি এই মুহূর্তে জানি না আমাদের অভিযান কখন শেষ হবে; সে কারণেই আমি আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করব গরম জামা, কোট ইত্যাদি গায়ে চাপিয়ে নিতে। সবথেকে প্রথমে যেটা দরকার যে নির্দিষ্ট জায়গাতে আমাদের পৌঁছতে হবে অন্ধকার হয়ে যাবার আগেই; সে কারণেই ইনস্পেকটরের অনুমতি নিয়ে আমরা তাহলে শুরু করি আমাদের যাত্রা।’ বেশ নাটকীয়ভাবে বলল হোমস।
ম্যানর হাউসকে ঘিরে আছে যে উঁচু পাঁচিল, তার একটা জায়গায় রেলিং-এ সামান্য ফাঁক আছে সেটা হোমস আর আমি আজ বিকেলেই দেখে রেখেছিলাম। একটা মানুষ গলে যেতে পারে এরকম ফাঁক। সেই ফাঁক গলে আমরা চারজন ভবনের চত্বরে ঢুকে পড়লাম, তারপর হোমসকে অনুসরণ করে আমরা তিনজন হাঁটতে হাঁটতে এসে হাজির হলাম বেশ ঘন একটা ঝোপের সামনে, যার বিপরীত দিকেই জমিদারবাড়িতে ঢোকার প্রধান দরজা এবং ওঠানো-নামানো করা সেতুর কপিকল। সন্ধ্যে পুরো নামেনি বলেই হয়তো সেতু এখনও নামানোই আছে, তোলা হয়নি৷ ঝোপের আড়ালে হোমস উবু হয়ে বসল; তার মতো আমরাও তাই করলাম।
‘বেশ, এবার কী করতে হবে আমাদের?’ বেশ রুঢ় স্বরে ম্যাকডোনাল্ড জানতে চাইলেন।
‘ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে আর যতটা সম্ভব নীচু স্বরে কথা বলতে হবে,’ হোমস বলল।
‘এখানে আমরা কেন এসেছি? আমার মনে হচ্ছে আপনার আরো স্পষ্ট করা উচিত ব্যাপারটা।
হোমসের হাসির শব্দ পেলাম। ‘ওয়াটসন বারবার বলে যে নাটক করতে আমি নাকি ওস্তাদ,’ সে বলল, ‘আমার ভেতরে সত্যিই একজন অভিনেতা আছে আর সে মাঝে মাঝে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। আর বারবার বলে যে, আমার সঙ্গীদের একটা মঞ্চ-সফল নাটক দেখাতে৷ আমার বা আপনার পেশায় থ্রিল ব্যাপারটাই তো আসল তাই না? তো সব যদি আগে থেকে গড় গড় করে আমি বলে যাই, তাহলে অ্যাডভেঞ্চারের সেই স্বাদটাই আর থাকবে না। একটু ধৈর্য ধরে দেখুন না মি. ম্যাক, সব আপনার কাছে জলের মতো স্পষ্ট হয়ে যাবে।’
‘আশা করি ঠান্ডায় আমরা জমে যাওয়ার আগেই আপনার এইসব বড় বড় কথার একটা হিল্লে হয়ে যাবে।’ লন্ডনের ডিটেকটিভও তিক্ত রসিকতায় কম যান না।
সত্যিই পরিখার জল থেকে কুয়াশা আর জমাট ঠান্ডা উঠে এসে আমাদের হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছিল৷ রীতিমতো ঠকঠক করে কাঁপার অবস্থা। ম্যানর হাউসের গেটে শুধু একটা টিমটিমে ল্যাম্প আর বিতর্কিত স্টাডিতে আলোর স্থির ছটা। এছাড়া চারপাশে ঘোর অন্ধকার।
‘কতক্ষণ এভাবে হাঁটু মুড়ে বসে থাকতে হবে?’ যেন হাল ছেড়ে দিয়ে ইনস্পেকটর জানতে চাইলেন, ‘আর আমরা এত মন দিয়ে কী মহার্ঘ বস্তু দেখতে চাইছি?’
‘আপনার মতো আমারও ধারণা নেই, কতক্ষণ আমরা এভাবে অপেক্ষা করব,’ সামান্য রুক্ষতার সঙ্গে এবার হোমসের ফিসফিসে উত্তর ভেসে এল। ‘অপরাধীরা যদি রেলের টাইম টেবিল অনুযায়ী একেবারে সময় মেপে কাজ করত, তাহলে তো আমাদের এত হাঙ্গামা পোয়াতে হতো না। এখন ব্যাপারটা হচ্ছে, আরে! আরে! ওই দেখুন তাকিয়ে! এটার জন্যেই আমরা অপেক্ষা করছিলাম!’
হোমস ফিসফিসিয়ে বলতে বলতে আমরা দেখলাম স্টাডির উজ্জ্বল, হলুদ আলো কিছুটা আড়াল হয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে, কারণ কেউ একজন ঠিক ল্যাম্পের সামনেই চলাফেরা করছে। স্টাডির বড় জানালার ঠিক বিপরীতেই আমরা জড়ো হয়েছি এবং দূরত্বটা একশো ফুটের বেশি হবে না। জানালার দুটো পাল্লাই পুরোপুরি খুলে গেল, একটা ক্ষীণ ক্যাঁ-চ্-চ্ শব্দও কানে এল। জানালাই প্রতিবাদ করে উঠল বোধহয়৷ এবার দেখছিলাম, আধো-অন্ধকারে কোনো একজনের মাথা ও কাঁধের কিছুটা অংশ খোলা জানালা দিয়ে ঝুঁকে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। বেশ কিছুক্ষণ মুন্ডুটা এভাবে বাইরের দিকে ঝুঁকে তাকিয়েই রইল, যেন নিশ্চিত হতে চাইছিল যে বাইরে থেকে কেউ তাকে লক্ষ্য করছে কিনা। তারপর মাথাটা জানালা দিয়ে আরো ঝুঁকে এল এবং গাঢ় নৈঃশব্দে আমাদের কানে এল জল নড়ে উঠবার ছপছপ শব্দ। মনে হল, লোকটা পরিখার জলে তার হাতের কিছু একটা দিয়ে কী যেন খুঁজছে৷ হঠাৎই সে জল থেকে টেনে তুলল, কোনো জেলে যেমন জল থেকে ছিপ দিয়ে মাছ টেনে তোলে, বেশ আকারে বড়, গোলাকার কোনো বস্তু, যা লোকটা ঢুকিয়ে নিল ঘরের ভেতরে।
‘এইবার!’ হোমস চেঁচিয়ে উঠল, ‘এইবার!’
আমার সবাই উঠে দাঁড়ালাম, তার পেছনে দৌড়তে লাগলাম, হোমস আগেই নেকড়ের গতিতে টানা সেতু পার হয়ে, ভবনের প্রধান দরজাতে ঘণ্টি বাজাতে লাগল। কেউ যেন দরজার ছিটকিনি খুলে দিল দ্রুত, দেখলাম রাজ্যের বিস্ময় চোখে আর মুখে, অ্যামিস দাঁড়িয়ে আছে প্রবেশপথে। কোনো কথা না বলে, কনুইয়ের মৃদু ধাক্কায় হোমস তাকে একপাশে সরিয়ে, ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। আমরাও তার পেছনে। ঘরের ও-প্রান্তে একজন দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁকে দেখছিলাম আমরা। টেবিলে তেলের-ল্যাম্প আলো ছড়াচ্ছে, যা আমরা আগেই দেখেছি বাইরে থেকে। এইমাত্র সিসিল বার্কার ল্যাম্পটা নিজের হাতে তুলে নিলেন, আমাদের দিকে আলোর উজ্জ্বলতায় তাকিয়ে দেখছিলেন। আলো কিছুটা পড়েছে তাঁর পাথরের মতো স্থির, দাড়ি-গোঁফ-কামানো চকচকে মুখে; ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়েছিলেন আমাদের দিকে।
‘এসব হাঙ্গামার মানে কী?’ চিৎকার করে উঠলেন তিনি, ‘কী খুঁজতে এসেছেন আপনারা, বলুন তো?’
হোমস দ্রুত দৃষ্টি বুলিয়ে নিল ঘরের চারদিকে, তারপর এক লাফে এগিয়ে গেল ভিজে, বড়সড় একটা পুঁটলির দিকে, মুখ দড়িতে বাঁধা, ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে টেবিলের নীচে।
‘এই বস্তুটাই খুঁজছিলাম আমরা। মি. বার্কার, এই পুঁটলিটা, ভেতরে একটা ডাম্বেল আছে তাই বেশ ভারী, পরিখার জলের তলা থেকে যেটা এইমাত্র আপনি তুলে এনেছেন।’
‘হোমসের মুখের দিকে বিস্ময়াহত মুখে তাকিয়ে ছিলেন বার্কার।’
‘এ তো একেবারে বিনা মেঘে বজ্রপাত! কীভাবে আপনি জানলেন?’
‘এই সহজ কারণে যে, আমিই ওটা পরিখার ওই জায়গায় জলে ডুবিয়ে রেখেছিলাম।’
‘আপনি ওটা রেখেছিলেন! আ...আপনি?’
‘বরং বলা উচিত ছিল বস্তুটা, একবার তুলে দেখে নিয়ে আবার যথাস্থানে ওটা রেখে দিয়েছিলাম।’ বলল হোমস, ‘আপনার মনে পড়বে ম্যাকডোনাল্ড, যে আমি কিছুটা অবাক হয়ে গেছিলাম টেবিলের নীচে একটা ডাম্বেল দেখে, যদিও থাকা উচিত একজোড়া অর্থাৎ দুটো! বেশ কয়েকবার আমি বলেছিলাম কথাটা। কিন্তু অন্যান্য ভাবনায় আপনারা এত মজে ছিলেন যে, এই সামান্য কথাটায় আপনারা কান দেননি। আমার কী মনে হয়েছিল? যখন জল হাতের কাছেই, এবং একটা ভারী লোহার বস্তু পাওয়া যাচ্ছে না, তখন অনুমান করা খুব কঠিন নয় যে জলে কিছু ডুবিয়ে রাখা হয়েছে। কথাটা মাথায় আসতেই আমার মনে হয়েছিল, পরীক্ষা করে দেখা দরকার। সুতরাং গত রাতে, অ্যামিসের দয়ায় এই ঘরে ঢুকে এবং ডঃ ওয়াটসনের ছাতার বাঁকানো হাতল-এর সাহায্যে আমি বোঁচকাটাকে ঠিক স্পট করতে পেরেছিলাম।
‘তাহলে প্রথমেই প্রমাণ করতে হবে যে বোঁচকাটাকে কে লুকিয়ে রেখেছিল ওখানে এবং কেন। ওই কারণেই ইনস্পেকটর ম্যাক, আপনার দস্তখত করা একটা চিঠি পাঠানো হয়েছিল যে, পরিখার জল পরিষ্কার করা হবে; চিঠিটা পাবার পরই যিনি বোঁচকাটাকে ডুবিয়ে রেখেছিলেন জানালার নিকটেই জলের নীচে, তাঁর টনক নড়ল যে, অন্ধকার নামতেই ওটাকে সরিয়ে নিতে হবে। আমাকে নিয়ে চারজন সাক্ষী এখানে হাজির যারা নিজেদের চোখে আজ সন্ধ্যার সময় কিছুক্ষণ আগেই দেখেছে যে কে জলে-ডোবানো বোঁচকাটাকে তুলে নিয়েছে। এখন আমার বেশি কিছু বলার নেই, মি. বার্কারের বরং কিছু বলার থাকতে পারে।’
শার্লক হোমস ভিজে সপসপে পুঁটলিটাকে টেবিলের ওপর রাখল, ল্যাম্পের ঠিক পাশেই। তারপর যে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল ওটা, সেটার গিঁট খুলে ফেলল। পুঁটলির ভেতর থেকে সে বের করে আনল একটা ডাম্বেল, এক জোড়া জুতো, খাপের মধ্যে ভরা একটা লম্বা ছুরি; তারপর শেষমেশ, আমাদের বিস্ফারিত চোখের সামনে সে বের করে আনল আরো একটা ছোট পুঁটুলি, যার ভেতরের জিনিসগুলোও সে একটা একটা করে বের করতে লাগল। পুরুষের অন্তর্বাস, এক জোড়া মোজা, ছাই-রং টুইড সুট আর একটা ঝুলে ছোট, হলদে ওভারকোট।
‘জামাকাপড়গুলো মামুলি,’ বলল হোমস, ‘এই ওভারকোটটি ছাড়া, যাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছাপ আছে।’ ওভারকোটটা সে খুলে ধরল আলোর সামনে৷ ‘দেখুন এর ভেতরে জাবদা পকেট, যার লাইনিংটা এমনভাবে সেলাই করা যে এর ভেতর টুকরো টুকরো কিছু বস্তু ইচ্ছেমতো লুকিয়ে রাখা যাবে৷ গলার ভেতরদিকে একটা চৌকো, ছোট কাপড় সেলাই করা আছে যাতে লেখা আছে, Neal, out fitter, Vermissa, U. S. A। ওই যে দেখছেন দেয়াল-আলমারিতে কিছু মোটা মোটা বই সাজানো, ওগুলো সব হল এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা। একটা খণ্ডে প্রয়োজনীয় অংশটুকু গত রাতেই পড়ে ফেলেছি। যেখানে বলা আছে যে, ভারমিস্সা (Vermissa) হল আস্তে আস্তে বেড়ে ওঠা একটা ছোট শহর। যার অবস্থান হল, আমেরিকার সেইসব উপত্যকাগুলোর একটার মাঝখানে, যেখানে আছে শুধু লোহা আর কয়লাখনির সারি। আমার মনে আছে মি. বার্কার যে, আপনি আমাদের বলেছিলেন, মি. ডগলাসের প্রথম স্ত্রী ছিলেন কয়লা-খনি অঞ্চলের মেয়ে; সুতরাং আমরা এরকম অনুমান করতে পারি যে, মৃতদেহের পাশে যে ছোট কার্ডটা পাওয়া গেছে তাতে ছাপার অক্ষরে লেখা V. V.-র মানে হল, Vermissa Valley আর এই উপত্যকাই হল সেই উপত্যকা, যাকে বলা হয় Valley of Fear বা ভয়ের উপত্যকা। যেখান থেকে বারবার নাকি মৃত্যুর দূতেদের আগমন হয়। এবার মি. বার্কার, আপনার বাকি গল্পটা আমাদের গুছিয়ে বলা উচিত।’
আমাদের প্রতিভাবান গোয়েন্দা যতক্ষণ কথা বলে যাচ্ছিল, সিসিল বার্কারের মুখের ভাবের ঘন ঘন পরিবর্তন আমি লক্ষ করছিলাম। রাগ, বিস্ময়, আতঙ্ক৷ দিশাহারা ভাব তাঁর মুখে যেন এক এক করে আলো ফেলে যাচ্ছিল৷ শেষমেশ বুদ্ধিমান ভদ্রলোকটি যেন জোর করে, হাসি-হাসি ভাবের আড়ালে অব্যাহতি পেতে চাইলেন।
‘আপনি তো এত কিছু জানেন মি. হোমস, বাকি কাহিনিটাও, আমার ধারণা, আপনি বলতে পারবেন।’ বাঁকা হাসিতে মুখ বিতিকিচ্ছিরি করে তিনি বললেন।
‘এটুকু বিশ্বাস আমার অন্তত আছে মি. বার্কার, গল্পের বাকি অংশটা আপনার থেকে আমিই ভালো বলতে পারব; কিন্তু এখানে যারা উপস্থিত আছেন তাঁরা বোধহয় আপনার মুখ থেকেই কিছু শোনবার প্রতীক্ষায় আছেন।’
‘ওহ আপনি এরকম ভাবছেন, তাই তো? সেক্ষেত্রে আমি যেটা বলতে পারি তা হল, গল্পটাতে গোপন ঘটনা যদি কিছু থেকে থাকে, আমি তার সঙ্গে যুক্ত নই এবং সেই গোপন কথা প্রকাশ করার যোগ্য ব্যক্তিও আমি নই।’
‘আপনি যদি নিজেকে বাঁচাবার এই রাস্তা নেন মি. বার্কার,’ এতক্ষণ বাদে মুখ খুললেন ইনস্পেকটর, ‘তাহলে যতক্ষণ না আপনাকে গ্রেপ্তার করার ওয়ারেন্ট তৈরি হচ্ছে, আপনাকে আমাদের নজরবন্দি থাকতে হবে।’
‘আপনারা হলেন আইনের মহামান্য রক্ষক, আপনারা আমার বিরুদ্ধে যা করার তা করতে পারেন...।’ ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বার্কার বললেন।
মনে হল আপাতত নাটক শেষ। কুশীলবদের কারোরই কিছু বলার নেই৷ কিন্তু মঞ্চে নাটক নতুন মোড় নিল যখন কজন মহিলার অভিজাত কণ্ঠ শোনা গেল। দরজা আধখোলা ছিল৷ বাইরে দাঁড়িয়ে মিসেস ডগলাস এতক্ষণের কথাবার্তা সবই শুনছিলেন। এখন তিনি ঘরের মধ্যে ঢুকে প্রকাশ্য হলেন।
‘আপনি যথেষ্ঠ করেছেন সিসিল,’ বললেন তিনি। ‘যা ঘটে ঘটবে, কী ধরনের শাস্তি কে পাবে, তা আইনের রক্ষকরাই ঠিক করবেন। আপাতত আপনার আর কিছু করার নেই, যথেষ্ঠ করেছেন আপনি।’
‘যথেষ্ট তো বটেই বলা যায়, যথেষ্টর থেকেও বেশি,’ গভীর মন্তব্য হোমসের। ‘আমি আপনাদের প্রতি সত্যিই সহানুভূতিশীল ম্যাডাম, আপনাকে বিনীতভাবে অনুরোধ করছি, আপনি আমাদের অর্থাৎ পুলিশকে পুরোপুরি বিশ্বাস করুন। আমি আমাদের নিজের অনুসন্ধানের সাহায্যে যেটুকু জেনেছি, তা অতি অল্প৷ এবার বোধহয় সময় হয়েছে মি. ডগলাসের আসরে হাজির হওয়ার। বাকি গল্পটুকু তাঁর মুখ থেকেই আমরা শুনতে চাই।’
হোমসের কথা শুনে মিসেস ডগলাস বিস্ময়ের অভিব্যক্তি করলেন। দুজন ডিটেকটিভ এবং আমিও বিস্ময়ে হতবাক। চোখ কপালে উঠে গেল আমার, যখন দেখলাম এতবড় ঘরের একেবারে শেষপ্রান্তে জানালার একটা পর্দা সরিয়ে একজন মানুষের আবির্ভাব হল। মিসেস ডগলাস ঘুরে দেখলেন, এক ছুটে গিয়ে স্বামীকে জড়িয়ে ধরলেন। বার্কার একটা হাত বাড়িয়ে দিলেন সেই পুরুষটির দিকে।
‘অন্ধকার থেকে আলোতে বেরিয়ে এসে তুমি ঠিকই করলে জ্যাক। কতদিন এভাবে আড়ালে থাকবে?’ বললেন মিসেস ডগলাস।
‘একেবারে যথার্থ,’ বলল শার্লক হোমস, ‘মি. ডগলাস, গুড ইভনিং, আপনি যা করলেন ঠিকই করলেন।’ অন্ধকার থেকে চড়া আলোতে এসেই বোধহয় মানুষটির স্পষ্ট চোখে তাকাতে অসুবিধে হচ্ছিল। তাকিয়ে দেখছিলাম তাঁকে। মুখের চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। বড় বড় নীল চোখ, মাথার কাঁচাপাকা চুল ছোট করে ছাঁটা, মোটা গোঁফও কাঁচাপাকা, থুতনি ছোট, চোয়ালের মধ্যে দৃঢ়তার ছাপ। তিনি আমাদের প্রত্যেকের মুখের দিকে একবার করে তাকিয়ে নিলেন। তারপর আমাকে রীতিমতো অবাক করে আমার দিকেই এগিয়ে এলেন এবং আমার হাতে তুলে দিলেন কাগজের একটা বান্ডিল।
‘আপনার কথা আমি শুনেছি,’ কোমল এবং সম্ভ্রমপূর্ণ গলায় তিনি বললেড়। ‘আপনাদের মধ্যে আপনিই হচ্ছেন সেই স্বনামধন্য লেখক। একটা কথা বিনীতভাবে জানাই আপনাকে, ডঃ ওয়াটসন, আমি আপনাকে এখনই যে কাগজগুলো দিলাম তাতে একটা এমন আশ্চর্য গল্প লেখা আছে, যা হয়তো পড়ার অভিজ্ঞতা আপনার আগে হয়নি। গল্পটা আপনি আপনার নিজস্ব স্টাইল এবং নিজের ভাষাতেই লিখবেন। কিন্তু আমার একান্ত অনুরোধ, যা আমি জানিয়েছি তার কোনো ঘটনাই বাদ দেবেন না কিংবা পরিবর্তন করবেন না। ইঁদুরের গর্তের মতো একটা আধো-অন্ধকার ঘরে আমি দুটো দিন কাটিয়েছি। সেখানে বসে আমি লিখেছি আমার নিদারুণ অভিজ্ঞতার কথা৷ বলা যায় একটা গল্পই লিখেছি আমি, এবং সে গল্পটার নাম, ভয়ের উপত্যকা।’
‘মি. ডগলাস,’ বলল শার্লক হোমস নরম স্বরে, ‘আপনি যা লিখেছেন সেটা আপনার অতীত৷ আমরা এখন আপনার মুখে শুনতে চাই বর্তমানের গল্পটা। দুদিন আগেই যেটা ঘটেছে।’
‘নিশ্চয়ই শুনবেন, স্যার,’ বললেন ডগলাস, ‘কথা বলতে বলতে আমি কি ধূমপান করতে পারি? সম্মতির জন্যে ধন্যবাদ মি. হোমস। আপনি তো নিজেও একজন স্মোকার। মুখে পাইপ, আপনার সেই বিখ্যাত ছবি, সংবাদপত্রে কত দেখেছি। একজন স্মোকার হয়ে আপনি অবশ্যই অনুমান করতে পারবেন, পকেট ভর্তি তামাক নিয়ে দু-দিন বসে থাকা সত্ত্বেও আমি সেই তামাকের স্বাদ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখতে বাধ্য হয়েছি এই কারণে যে, তামাকের গন্ধও আমাকে আপনাদের কাছে ধরিয়ে দেবে।’ একটা সোফাতে যথেষ্ঠ আরামে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ডগলাস এবং প্রাণপণে টানছিলেন একটা জলন্ত সিগার যেটা হোমস তাকে এইমাত্র দিয়েছে।
‘আপনার চাতুর্য ও প্রতিভার কথাও আমি শুনেছি, মি. হোমস। কোনোদিন ভাবিনি আমাদের এভাবে সাক্ষাৎ হবে। স্বীকার করতেই হবে আমি ভাগ্যবান।’
‘আমার মাথার মধ্যে তো কিছুই ঢুকছে না,’ এতক্ষণ বাদে কথা বললেন, ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ড। ‘আপনি যদি হন, বার্লস্টোন জমিদার-বাড়ির মি. ডগলাস, তাহলে গত দু-দিন ধরে কার মৃত্যুর তদন্ত আমরা করে চলেছি? আর আপনি কোথা থেকে উদয় হলেন এখন? মনে হচ্ছে যেন চোখের সামনে দারুণ এক ভেল্কির খেলা দেখানো হচ্ছে!’
‘ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ড, আমি কিন্তু জেনেই গিয়েছিলাম যে ব্যক্তি খুন হয়েছেন, তিনি মি. ডগলাস নন। এই বাড়িতেই মি. ডগলাস বহাল তবিয়তে আছেন।’ এবার ইনস্পেকটর রীতিমতো রাগের গলায় চেঁচিয়ে বললেন হোমসকে, ‘তাহলে দুদিন ধরে আপনি আমাদের সঙ্গে চালাকির খেলা খেলছিলেন কেন? যে তদন্তের কোনো মানেই হয় না, সেই তদন্ত আমরা, পুলিশেরা চালিয়ে যাচ্ছি নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে; এবং আপনি জেনেশুনে মজা দেখছেন?’
‘ভুল অভিযোগ করছেন মি. ম্যাক। দেড়দিন ধরে আমিও আপনাদের মতো অন্ধকারেই ছিলাম। গতকাল রাতেই আমি রহস্যের জট খুলতে পেরেছি। কিন্তু আজ সন্ধের আগে আমি জানতাম, যা আন্দাজ করেছি, তা প্রমাণ করতে পারব না৷ তাই আজ সন্ধের সময় আমি আপনাদের সেই ঝোপের কাছে এনেছিলাম, বামাল সমেত অপরাধীকে ধরব বলে। এবং আপনাদের চোখের সামনেই সব নাটক ধীরে ধীরে অভিনীত হয়েছে।’
‘আমি বলছি, যে কৌশলে আপনি সত্যি জানতে পেরেছেন তা ছাড়া আর অন্য কোনো উপায় ছিল না। প্রথমে আমার মনে হয়েছিল, আপনাদের ব্রিটিশ আইনের চোখে ধুলো দিতে পারব; আমি ঠিক বুঝতেও পারছিলাম না আপনাদের আইন কতটা আমাকে অপরাধী প্রমাণ করতে পারবে। কিন্তু একটা ব্যাপার আমি ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ড ও অন্য সবাইকে জানাতে চাই যে, আমি একেবারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থা থেকে, নিজেকে বাঁচাতে যা করেছি, তার জন্যে একেবারেই লজ্জিত নই, পাপবোধে আক্রান্তও নই।...ঠিক আছে আমি এখনকার ঘটনা বিশদভাবে আপনাদের বলে যাচ্ছি, তারপর আপনারাই নিজেদের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে দেখুন আমি ঠিক করেছি না ভুল করেছি।’
‘একেবারে শুরু থেকে আমি বলব না৷ শুরুটা ওখানেই পাওয়া যাবে,’ ডগলাস ইঙ্গিত করলেন, আমাকে দেওয়া এক বান্ডিল কাগজের প্রতি। ‘খুব জমজমাট গল্প, থুড়ি, সত্যি ঘটনাও ওখানে আপনারা পাবেন৷ অল্প কথায় এটুকু বলা যায় যে, এই পৃথিবীতে কোথাও বেশ কিছু মানুষ আছে যাদের যথেষ্ঠ কারণ আছে আমাকে ঘৃণা করার৷ এবং আমার নাগাল পেতে তারা তাদের শেষ ডলারটিও খরচ করতে রাজি। যতদিন আমি বেঁচে আছি এবং বেঁচে আছে তারাও, এই বিশাল পৃথিবীর যেখানেই আমি যাই না কেন, আমার স্বস্তি নেই, নিরাপত্তাও নেই৷ আমাকে তারা তাড়া করে চলেছিল শিকাগো থেকে ক্যালিফোর্নিয়া। তারপর তাদের তাড়া খেয়ে আমাকে ছাড়তে হয় আমেরিকা; কিন্তু যখন আমি বিয়ে করলাম এবং একটা নির্ঝঞ্ঝাট জায়গায় পরিবার নিয়ে থিতু হলাম, তখন মনে হয়েছিল, জীবনের শেষ দিনগুলো শান্তিতেই কেটে যাবে।
‘কোনোদিন স্ত্রীকে খুলে বলিনি মাথার ওপর খাঁড়া ঝুলছে আমার। তাঁকে এসবের মধ্যে টেনে এনে লাভ কী? সব শুনে তিনি এক মুহূর্ত শান্তি পাবেন না; কিন্তু অশান্তির কথা ভেবে ভেবে শুধুই ভয় পাবেন। পরে মনে হয়েছে কিছু কিছু তিনি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন; হয়তো আমি মাঝেমধ্যে দু-একটা কথা গল্পচ্ছলে বলেও ফেলেছিলাম; তবুও গতকাল পর্যন্ত, আপনারা যখন তাঁকে দেখেছেন, তখনও তিনি আসল ঘটনা কিছুই জানতেন না। যা তিনি জানতেন, আপনাদের বলেছেন সব, এবং বার্কারের ক্ষেত্রেও একই কথা বলব।
যে রাতে দুর্ঘটনা ঘটেছিল, সমস্ত কথা তাদের দুজনকে বুঝিয়ে বলার সময় আমার হাতে ছিল না। আমার স্ত্রী এখন অবশ্য সবই জানেন, আমারই ভুল হয়েছিল, আগেই তাঁকে সব খুলে বলা উচিত ছিল। কিন্তু আমি নিজেই ঠিক মনস্থির করতে পারিনি কখন সব জানাব ওঁকে, কিছু মনে কোরো না প্রিয়, এক মুহূর্তের জন্যে ডগলাস তার নিজের হাতের মধ্যে তার একটি হাত টেনে নিলেন, তাই এতটা অভিনয় করতে হল আমাকে।
‘এবার যেমন যেমন ঘটেছিল সব বলছি। যে রাতে খুনটা হয়েছিল, তার আগের দিন আমি আমাদের এই পল্লির বিগ-বাজারে গিয়েছিলাম, তখনই রাস্তায় একটা লোককে আমি দেখতে পাই। এক মুহূর্তে তাকে দেখে ফেলেছিলাম আমি, কিন্তু অনেকদিন থেকে আমার অভ্যাসই হয়ে গিয়েছিল রাস্তা দিয়ে হাঁটাচলা করার সময় শ্যেনদৃষ্টিতে সব কিছু লক্ষ্য করা। লোকটাকে দেখেই আমি চিনতে পেরেছিলাম। আমার শত্রুদের মধ্যে সেই লোকটাই হল সবথেকে কঠিন শত্রু। সেই লোকটাই এত বছর ধরে আমার পেছনে লেগে আছে, আমেরিকান বলগা-হরিণের পেছনে ক্ষুধার্ত নেকড়ে যেমন লেগে থাকে। বাজার অঞ্চলে তাকে দেখামাত্রই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে বিপদ এসে উপস্থিত হয়েছে, বাজার-টাজার কিছু না করেই বাড়ি ফিরে এলাম এবং বিপদের যথাযথ মোকাবিলা করার জন্যে তৈরি হতে লাগলাম। আন্দাজ করতে অসুবিধা হয়নি যে, বিপদের মুখোমুখি হতে হবে নিজেকেই, একেবারে একা, ১৮৭৬ সাল নাগাদ স্টেটসে সবাই জানত ভাগ্যলক্ষ্মী সর্বদাই আমাকে বিপদ থেকে আড়াল করে রাখেন, এবারও আমার মনে হয়েছিল যে, ভাগ্যদেবী আমার মাথা থেকে তাঁর আশীর্বাদের হাত সরিয়ে নেবেন না।
‘পরের দিনই আমি নিজের ব্যাপারে যা কিছু সতর্কতা নেবার ছিল, তা নিলাম। বাড়ি থেকে বাইরে বের হওয়া বন্ধ করে দিলাম৷ এই লোকটার হাতের টিপ আমি জানতাম, তা হল অব্যর্থ। তার নজরে পড়ে গেলে নিজেকে বাঁচানো কঠিন হবে আমি জানতাম৷ আমাদের এই পরিখার দড়ি-টানা সেতুকে যখন ওপরে তুলে নেওয়া হয় অর্থাৎ সন্ধের পর আমি নিশ্চিন্ত থাকতাম, বিপদের ভয় মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতাম। স্বপ্নেও ভাবিনি যে, লোকটা আমার এই বাড়িতে সকলের চোখ এড়িয়ে ঢুকতে পারবে এবং মৃত্যুদূত হয়ে ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করবে আমার জন্যে। রাতের দিকে, আপনারা আগেই জেনেছেন, যখন দড়ির-সেতু তুলে নেওয়া হয়েছে, আমি ড্রেসিং-গাউন গায়ে দিয়ে, বাড়ির চারধারে ঘুরে দেখে নিতাম, এটাই আমার বরাবরের অভ্যেস। কিন্তু পরশুদিন রাতে বাড়ির চারধারে ঘোরাঘুরি শেষ করে, যেইমাত্র ঢুকলাম স্টাডিতে, সঙ্গে সঙ্গে বিপদের আঁচ পেলাম। অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে, যখন কোনো মানুষ মাথার ওপর দোদুল্যমান বিপদের খাঁড়া নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তখন প্রতি মুহূর্তেই তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় খুব প্রখর থাকে এবং সে বিন্দুমাত্র ইঙ্গিতেই বুঝতে পারে বিপদের লাল নিশান উড়ছে। ওই ডানদিকের জানালার পর্দার নীচে আমি চকিতে দেখলাম, একজনের বুট-সমেত পা আর আলো জ্বলে উঠল চোখের সামনে৷ একটা বাতি জ্বলছিল, আমারই হাতে ছিল সেটা; কিন্তু ওই জানালাটার মুখোমুখি দেখতে পাচ্ছেন ঘরের দরজা, দরজা খোলা থাকায় বাইরের করিডরের ল্যাম্প থেকে ঘরের মধ্যে আলো আসছিল বেশ৷ বাতিটা আমি বসিয়ে দিলাম সামনের টেবিলে, তারপর ছোট আলমারিটার মাথায় রাখা হাতুড়িটার জন্যে ঝাঁপালাম। ঠিক সেই মুহূর্তে সে লাফ দিল আমার দিকে। একটা ছুরি ঝলসে উঠল চোখের সামনে, আমিও হাতুড়িটা বাগিয়ে মরণপণ ঝাঁপ দিলাম তার দিকে৷ তাকে পেড়ে ফেললাম মাটিতে; তার হাত থেকে ছুরিটা ঠং শব্দে খসে পড়ল৷
মারাত্মক দক্ষতার সঙ্গে সে গড়িয়ে চলে গেল টেবিলের ওপারে, এক মুহূর্ত যেতে না যেতেই সে তার হলদে ওভারকোটের ভেতর থেকে বের করল শটগান৷ কুট্ শব্দ এল কানে; বুঝলাম সে গুলি চালাবার জন্যে প্রস্তুত৷ কিন্তু আমিও নড়াচড়ায় বরাবরই বাজপাখির মতো ক্ষিপ্র, লাফিয়ে তার গায়ে পড়ে অস্ত্রটার মুখ সরিয়ে দিলাম আমার দিক থেকে৷ অস্ত্রের ব্যারেলটা প্রাণপণে চেপে ধরলাম, চেষ্টা করছিলাম বন্দুকের মুখ যেন আমার সোজাসুজি না থাকে; বন্দুকটা নিয়ে দুজনেই উন্মত্তের মতো কাড়াকাড়ি করছিলাম প্রায় মিনিট খানেক৷ বন্দুকের থেকে যার হাত সরে যাবে, সেই গুলি খেয়ে মরবে, এরকম অবস্থা। লোকটা বজ্রমুঠিতে আঁকড়ে ছিল বন্দুকটা, কিন্তু আমি বন্দুকের মুখটা কিছুতেই আমার দিকে করতে দিইনি। ঝটাপটি করতে করতে কী যে হতে চলেছে, বুঝতে পারিনি৷ হতে পারে বন্দুকের দুটো মুখ, অর্থাৎ ডাবল্-ব্যারেল তার মুখের দিকেই ঘুরে গিয়েছিল এবং ট্রিগার টিপে দিয়েছিলাম আমিই। আবার এটাও হতে পারে, দারুণ ঝটাপটির সময় বন্দুকের দুটো মুখ তার দিকে ঘুরে যাওয়া সত্ত্বেও সে প্রচণ্ড ক্রোধে বন্দুকের ঘোড়া টিপে দিয়েছিল, আর তাতেই গুলি বেরিয়ে তার মুখটা ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল। গুলির শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই সে যেইমাত্র মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে দারুণ চমক খেলাম। সেদিন বাজারের কাছে তাকে দেখেই চিনেছিলাম, অনেক বছরের শত্রু সে আমার, তার নাম টেড্ বলডউইন। কিন্তু সেই মুহূর্তে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হল, শটগানের গুলিতে তার মুখ যেভাবে ভেঙেচুরে বীভৎস হয়ে গেছে, তার মাও তাকে দেখে চিনতে পারবে না। খুন-খারাবি জীবনে আমি অনেক দেখেছি। কিন্তু সেই মুহূর্তে টেডের মুখের কদর্য এবং শোচনীয় অবস্থা দেখে আমার নিজেরই বমি পাচ্ছিল।
‘টেবিলের একটা দিকে হেলান দিয়ে আমি হাঁফাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই বার্কার ছুটে ঘরে ঢুকল। আমার স্ত্রীও আসছেন বুঝতে পারলাম, সঙ্গে দঙ্গে দৌড়ে গিয়ে আমি তাঁকে ঘরে ঢুকতে বাধা দিলাম। রক্তাক্ত, ঝাঁঝরা মুখ নিয়ে যে দেহটি ঘরের মধ্যে পড়ে আছে, তাকে দেখলে আমার নরম-মনের স্ত্রী নিশ্চয়ই মূর্চ্ছা যেতেন। আমার অনুরোধ তিনি শুনলেন। বরাবরই নরম স্বভাব তাঁর৷ কোনোদিন আমার সঙ্গে তর্কাতর্কিতে যাননি। আমি তাকে দোতলায় তাঁর ঘরে চলে যেতে বললাম। বুঝিয়ে বললাম যে ভয়ের কিছু নেই। আমি আসছি বেডরুমে, সব খুলে বলল তাঁকে।
বার্কার যথেষ্ঠ বুদ্ধিমান। আমার দুটো-একটা ইঙ্গিতেই সে বুঝেছে কী ঘটেছে। যদিও সবটা নিশ্চয়ই বোঝেনি। বীভৎস মৃতদেহ সে-ও দেখল একপলক। তারপর আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম। ভেবেছিলাম বাটলার এবং চাকর-বাকরেরা গুলির শব্দ শুনেছে এবং এখনই ছুটে আসবে। কিন্তু কারোর যখন দেখা পাওয়া গেল না, আমরা বুঝলাম, বাড়ির পিছনদিকে থাকার জন্যে তাদের কানে কিছুই যায়নি। নিশ্চিন্ত হলাম যে, যা ঘটেছে আমরা দুজনে ছাড়া আর কেউ তার আঁচও পায়নি।
‘সেই মুহূর্তে একটা মতলব এল মাথায়। খুবই বুদ্ধিদীপ্ত মতলব। আমি বুঝতেই পারিনি যে, আমার মতো একজন গোলা লোকের মাথায় এই বুদ্ধি আসতে পারে। লোকটার ফুলহাতা জামার সামনের অংশ ধ্বস্তাধ্বস্তির ফলেই বেশ কিছুটা উঠে গিয়েছিল। আর তার হাতের সামনের দিকে, কবজি থেকে বেশ কিছুটা ওপরে, দেখা যাচ্ছিল সেই দেগে-দেওয়া চিহ্ন। দেখুন আমার হাতেও!’
মি. ডগলাসও তাঁর একহাতের কোটের হাতা তুলে উঁচু করে আমাদের দেখালেন। সবিস্ময়ে আমরা দেখলাম, তাঁরও একহাতে, কবজির বেশ ওপরে, সেই একই দেগে-দেওয়া চিহ্ন। নিখুঁত আঁকা বৃত্তের মধ্যে একটা ত্রিভুজ, ঠিক মৃত ব্যক্তির হাতে যেমন দেখেছিলাম।
‘তার হাতের ওই ব্র্যান্ড দেখেই আমার বুদ্ধি খুলে গেল। কী করা উচিত চোখের সামনে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। মৃত লোকটার উচ্চতা, চুল আঁচড়ানোর ধরন এবং স্বাস্থ্য, অবিকল আমারই মতন। বার্কার ছুটে গিয়ে দোতলা থেকে আমার একজোড়া কোট-প্যান্ট নিয়ে এল। সেগুলো পরে নিলাম চটপট, আর আমার ড্রেসিং-গাউন পরিয়ে দিলাম নিথর দেহটাকে। শুয়ে রইল সে, যেমন আপনারা তাকে দেখেছিলেন। আমরা দুজনে তাড়াতাড়ি তার পরণের সব জিনিস পুরে দিলুম একটি বোঁচকায়। বোঁচকাটাকে ভারী করার জন্যে হাতের সামনে, টেবিলের নীচে পড়ে থাকা ডাম্বেল দুটোর দিকে নজর করা গেল। একটা ডাম্বেলই যথেষ্ঠ ভারী৷ সেটা বেঁধে দিলাম বোঁচকার মুখে। তারপর জানালা গলিয়ে বোঁচকাটাকে ফেলে দিলাম পরিখার জলে৷ সঙ্গে সঙ্গে ডুবে গেল বোঁচাকাটা। যে কার্ডটা সে পকেটে নিয়ে এসেছিল এই ধান্ধায় যে আমাকে মেরে, আমার মৃতদেহের ওপর সেটা ফেলে দিয়ে যাবে, যাতে সংবাদপত্রের মাধ্যমে তার দলের লোকেরা বুঝতে পারে সে-ই পুরোনো শত্রু ডগলাসকে খুন করেছে; সেটা যথারীতি ফেলে রাখলাম তার মৃতদেহেরই পাশে। কারণ নিশ্চয়ই আপনাদের বুঝিয়ে বলতে হবে না।
‘আমার আঙুলের আংটিগুলো তার আঙুলে পরালাম। কিন্তু বিয়ের আংটিটা খুলতে গিয়ে আমি একটু চমকেছিলাম৷ যেদিন থেকে বিয়ে হয়েছে আমার, একদিনের জন্যেও খুলিনি ওটা। আঙুলে এমন এঁটে বসেছিল যে, উখা লাগত খুলতে। কিন্তু আংটিটা তো খুলতেই হবে, কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও খোলার উপায় নেই, কেননা উখার মতো একটা জিনিস এত রাতে পাব কোথায়? সুতরাং আংটিটা পরাই রইল আমার আঙুলে, আমি শুধু একটা প্লাস্টার লাগিয়ে নিলাম আংটির ওপর। মি. হোমস, আপনার বুদ্ধির তুলনা নেই, তবুও এই ব্যাপারে ফাঁকি দিতে পেরেছি আপনাকে। আমার আঙুলের এই প্লাস্টারটা যদি তুলে দেখার ইচ্ছে হতো আপনার, তাহলে দেখতেন কাটাছেঁড়ার কোনো চিহ্নই নেই আঙুলে; বিয়ের আংটিটা লুকিয়ে রেখেছি।
‘বেশ, এই ছিল পরিস্থিতি। কয়েকদিন যদি ঘাপটি মেরে থাকতে পারতাম, তারপর আমি আমার স্ত্রী, দুজনে একটা নিরাপদ জায়গায় আবার সংসার পাততে পারতাম। বাকি জীবনটা হয়তো কাটিয়েও দিতাম শান্তিতে। সেই শয়তানগুলো আমাকে নিষ্কৃতি দেবে না, যতক্ষণ পৃথিবীর যে-কোনো জায়গাতেই ঘুরে বেড়াব আমি। কিন্তু যদি ওরা খবরের কাগজ মারফত এই খবরটা পায় যে বলডউইন আমাকে সাবড়ে দিতে পেরেছে, তাহলে অবশ্য আমার আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠার শেষ হতো। বেশি সময় আমি পাইনি সে-রাতে বার্কার আর আমার স্ত্রীকে সব বুঝিয়ে বলতে; কিন্তু তারা আন্দাজ করেছিল হয়তো যে, যা কিছু করা হচ্ছে সবই আমার নিরাপত্তার জন্যে৷ বাড়ির সুবিধেমতো জায়গায় আমাকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল দুদিন।’
একটু থেমে ধাতস্থ হয়ে ডগলাস বললেন, ‘এতক্ষণ আপনাদের যা বলে গেলাম, সব নির্জলা সত্যি, একটুও মিথ্যে নেই৷ এখন আমার একটা জিজ্ঞাস্য আপনাদের কাছে। তা হল, ইংলিশ আইনে আমার বিচার হলে, সেই বিচারের ফলাফল কী হতে পারে?’
কিছুক্ষণ বাদে গলা খাঁকারি দিয়ে শার্লক হোমস বলল, ‘অন্য সবরকম আইনের মতো ব্রিটিশ আইনও একটা আইন মাত্র। খুব গুরুতর কোনো শাস্তি আপনার কপালে নাচছে এরকম আমার মনে হয় না। কিন্তু আমার এখনও কিছু ব্যাপার পরিষ্কার হয়নি।’
‘যেমন?’
‘যেমন এই লোকটি জানল কীভাবে যে আপনি এখানে থাকেন? কেমন করে আপনার বাড়িতে ঢুকল আর কী ভাবেই বা জানল ঠিক কোথায় লুকিয়ে থাকলে আপনাকে বাগে পাওয়া যাবে?’
‘কিছুই জানি না।’
হোমসের মুখ দেখলাম বেশ গম্ভীর এবং তার কপাল কুঁচকে আছে, অর্থাৎ সে বেশ চিন্তাগ্রস্ত। ‘আমার আশঙ্কা হচ্ছে এটা ভেবে যে গল্পটা এখনও শেষ হয়নি।’ বলল হোমস, ‘ইংলিশ আইনের থেকেও আরো বড় বিপদে পড়তে পারেন আপনি। এমনকী আমেরিকার শত্রুদের থেকে যে বিপদ, তার থেকেও খারাপ বিপদ। আমি আপনাকে পরামর্শ দেব, কীভাবে সাবধানে থাকতে হবে।’
এবার আমি, ডঃ ওয়াটসন, আমার পাঠকদের উদ্দেশে বলছি, ‘যারা বার্লস্টোন ম্যানর হাউসের গল্প শুনতে শুনতে হয়তো আমার মতোই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। এখন আমি বেশ কিছু সময়ের জন্যে ভুলে যেতে বলব। সাসেক্স, বার্লস্টোনের ম্যানর হাউস এবং এমনকী সময়ের হিসেব। মাননীয় পাঠকগণ, আপনাদের আমি অনুরোধ করব যে মনে মনে যাত্রা করুন আজ থেকে কুড়ি বছর অতীতে। লন্ডনের পশ্চিমদিকে, হাজার হাজার মাইল দূরে, যাতে আমি আপনাদের সামনে খুলে ধরতে পারব, এক ব্যতিক্রমী এবং ভয়ঙ্কর কাহিনি। এমনই ব্যতিক্রমী এবং ভয়ঙ্কর যে, আপনাদের পক্ষে হয়তো খুবই কঠিন হবে সেই আখ্যানে বিশ্বাস করা। যদিও যা যা শোনাব আমি আপনাদের, তা সবই রুঢ় বাস্তবতার কথা। মাফ করবেন, বানিয়ে কিছুই বলব না আমি।
‘ভুলেও ভাববেন না যে, একটা গল্প বলতে বলতে পুরো শেষ না করেই আমি অন্য একটা গল্পে ঢুকে যাব। পড়তে পড়তে বুঝবেন ক্রম অনুযায়ীই আমি এই বিরল গল্পের জাল বিছাব এবং যখন অতীতের সেই গা-ছমছমে কাহিনি আমি ঠিকমতো শেষ করব তখন আপনারাই বুঝে নেবেন কতরকম রহস্যই না আছে এই পৃথিবীতে! আমরা আবার মিলিত হব বেকার স্ট্রিটের সেই বিখ্যাত ঠিকানায়, যেখানে হয়তো আমরা গল্পের পরিসমাপ্তি নিয়ে বসতে পারব আলোচনায়৷ ততদিন পর্যন্ত আমি আশা করব এই বাস্তব ঘটনার আস্বাদে আপনারা নিজেদের পরিতৃপ্ত করতে পারবেন।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন